কৌশিক মজুমদার
প্রথম পরিচ্ছেদ— চিনা পাড়ায় অদ্ভুত হত্যাকাণ্ড
১২ ডিসেম্বর, ১৮৯২, কলিকাতা
এবার কলকাতায় জাঁকালো ঠান্ডা পড়েছে। দিনের বেলাতেও আকাশ মেঘলা। একটু আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। সারাদিন সূর্যের দেখা নেই বললেই চলে। পাঁচটা বাজতে না বাজতে কুয়াশার পাতলা আস্তর গোটা শহরটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলছে। আপার সার্কুলার রোডের একধারে মাঝে মাঝে বেশ কয়েকটা ময়লাবাহী রেলগাড়ি দাঁড়িয়ে। গত দুই তিনদিন যাবৎ কী এক কারণে তাদের ময়লা পরিষ্কার হয়নি। দুর্গন্ধে রাস্তা দিয়ে চলা দায়। কিছুদিন আগে অবধি এই গাড়িতে করে ময়লা ধাপাতে নিয়ে যাওয়া হত। লোকে ঠাট্টা করে নাম দিয়েছিল “ধাপা মেল।” ইদানীং সে ব্যবস্থা বন্ধ। ফলে কাক, চিল, শকুনি আর হাড়গিলের উপদ্রবে আশেপাশের সব বাড়ির শার্সি সারা দিনরাত বন্ধ রাখতে হয়। রাস্তার পশ্চিমদিকে প্রায় ছয় ফুট প্রশস্ত একটা কাঁচা ড্রেন। এই ড্রেন দিয়েই পাশের বাড়িগুলির পায়খানা, রান্নার জল বয়ে যায়। কেউ কেউ আবার এটাকেই পায়খানা হিসেবে ব্যবহার করে। আজ এই শীতসন্ধ্যায় সেই গন্ধ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। একটু এগিয়ে গেলেই যদু মিত্তিরদের বিরাট বাঁশঝাড় আর পগাড়। পগাড়ের পশ্চিমপাড়ে নারকেল আর তেঁতুলের সারি। কারা যেন সেখানে বসে নারকেল পাতা পুড়িয়ে আগুন পোহাচ্ছে। ওই পাড়ে পাকা বাড়ি আর নেই বললেই চলে। সব ঘুঁটে দেওয়া মেটে দেওয়ালের বাড়ি।
রাস্তায় দূরে দূরে গ্যাসবাতি। সন্ধ্যা হলেই পুরসভার মুটে বগলে মই নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে পথে পথে আলো জ্বালতে। মই বেয়ে ল্যাম্পপোস্টে উঠে প্রথমে ন্যাকড়া বুলিয়ে পরিষ্কার করে আলোর শেডের কাচ। তারপর চাবি ঘুরিয়ে চালু করে গ্যাস। সবশেষে দেশলাই জ্বালিয়ে বাতি ধরায়। কিন্তু তাতে আর কতটুকু আলো হয়? শুধু বাতির নিচটুকু আর আশপাশে সামান্য আলো ছড়ায়। এমন শীতের কুয়াশা ঢাকা সন্ধ্যায় এক অদ্ভুত হলদেটে চোখের মতো আলোগুলো জেগে থাকে। যেন সদ্য পিলেজ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। রাতের পথ দিয়ে যারা হেঁটে যায়, তাদের আপাদমস্তক শালমুড়ি দেওয়া, যেন তারা এ মরজগতের কেউ নয়, প্রেতলোকের বাসিন্দা। খুব প্রয়োজন না থাকলে এমন রাতে কেউ বাড়ি থেকে বার হয় না। আর হতে গেলেও নানা ঝামেলা। কর্পোরেশনের ঠিক পাশেই উড়িয়া পালকিবাহকদের আড়া রয়েছে। কিন্তু সন্ধের পর তাদের বের করার থেকে ঈশ্বরকে পাওয়া অনেক সহজ। তবু দ্রুত পায়ে এক যুবক সেই পথে চলেছে। সে বেচারা পুলিশে কাজ করে। ব্রাহ্মণসন্তান। নাম প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। কিছুদিন আগেই পুজোর সময় সারাবছরের সঞ্চিত ছুটি নিয়ে দেশের বাড়ি গেছিল। ষষ্ঠীর দিন দেশের বাড়ি পৌঁছোতে না পৌঁছোতে টেলিগ্রাফ পৌঁছেছিল, “এক বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া গেছে। টেলিগ্রাফ পাওয়ামাত্র কলকাতা চলে এসো।” গোটা ছুটি সেই মুণ্ডহীন লাশের অনুসন্ধানেই কেটেছিল তার। ভেবেছিল বছর শেষে কিছুদিন ছুটি নেবে। আগামীকালই বাড়ি যাবার কথা। একটু আগে খবর এসেছে চিনা পাড়ায় নাকি অদ্ভুত এক মৃতদেহ পাওয়া গেছে।
চাকরি বড়ো বালাই। সেই কনকনে ঠান্ডায় এখন তাকে চিনা পাড়ায় দৌড়োতে হবে। “আগে জানলে কে এমন চাকরি করত!” মনে মনে ভাবে সে। ভাবতে ভাবতেই আড়ার ধারে এসে হাঁক পাড়ল, “বেহারা... ও বেহারা।” কোনও সাড়া নেই। আবার ডাকল, “ও দাসপো...।” এবার আড়ার পাশের ছাউনি থেকে মৃদু উত্তর এল, “কোন হেলা বাবু?”
“পালকি বার করো। চিনে পাড়ায় যাব।”
“মাতে ইচ্ছা নাহি”
প্রিয়নাথের মাথা এমনিতেই গরম। যা বুঝছে ছুটি আর নেওয়া হল না। চোদ্দো বছর পুলিশের চাকরিতে একবারও নিজের ইচ্ছেমতো ছুটি নিতে পারেনি। তাতে আবার বেহারার এই বেয়াড়াপনায় রীতিমতো চটেই গেল সে।
“ইচ্ছা নাহি বললে হবে?” এবার গলা চড়াল প্রিয়নাথ। “পুলিশ। শিগগির চলো। দেরি হলে গারদে পুরে দেব।”
‘পুলিশ’ এমন একটা শব্দ, যাতে কাজ হয় দ্রুত। চারজন বেহারা হাই তুলতে তুলতে নিতান্ত অনিচ্ছায় বেরিয়ে এল। সঙ্গে বাচ্চা মতো একটা মশালচি। রাতের অন্ধকারে এ-ই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। এই মশালচিরা খুব একটা সুবিধের লোক না, প্রায়ই পালকিবাহকদের সঙ্গে সড় করে আরোহীকে ডাকাতদের আস্তানায় নিয়ে যায়। বড়োলাট আইন করে এদের বন্ধ করার ব্যবস্থাও করেছিলেন, কিন্তু রাতের অন্ধকারে এরা ছাড়া গতি নেই। তাই আইন আইনের মতো রয়েছে আর এরা বহাল তবিয়তে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তারপর খানিক সময় গেল দরদস্তুরি করে। সরকার বাহাদুর এদের চার আনা ফি বেঁধে দিলেও এত ঠান্ডায় রাতের বেলা এরা আরও দস্তুরি চায়। শেষ অবধি মশালচি সহ ছয় আনায় রফা হল। পকেট থেকে কুক কেলভির ট্যাঁকঘড়িটা বের করে প্রিয়নাথ দেখল রাত দশটা বেজে গেছে। যেতে আরও ঘণ্টাখানেক। “ধাক্কুড়াকুড় হেঁইয়া নাবড়” ছন্দের বুলি তুলে চারজন বাহক পালকি কাঁধে পালকি নিয়ে চিনে পাড়ার দিকে চলল। রাস্তায় জনপ্রাণী নেই। মাঝে মাঝে কিছু ফিটন বা ল্যান্ডো ঊর্ধ্বশ্বাসে ময়দানের দিকে ছুটছে। গাড়ির ভিতর মাতাল বাবুদের আর বেশ্যাদের বিকটস্বরে হইহই শোনা যাচ্ছে। তারপরই সব আবার নিস্তব্ধ। দূরে কেল্লায় তোপ দাগার শব্দ পাওয়া গেল। পথের যেন আর শেষ নেই। হ্যারিসন রোডের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখতে পেল বিজলিবাতির আলোতে রাস্তা ভেসে যাচ্ছে। বছর তিনেক আগে কিলবার্ন অ্যান্ড কোম্পানি প্রথম এই রাস্তায় বিজলিবাতি লাগানো শুরু করে। এই বছরই কাজ শেষ হল।
গত শতকের শেষের দিকে কথা। ইটালিয়ান সাহিত্যিক ক্যাসানোভার প্রিয় বন্ধু ছিলেন এদোয়ার্দো তিরেত্তা। কিন্তু বিধি বাম, তাঁকে দেশছাড়া হতে হল রাজনৈতিক কারণে। নানান জায়গাতে ভাসতে ভাসতে এসে ঠেকলেন এই কলকাতায়। সুপারিন্টেনডেন্ট অফ স্ট্রিটস অ্যান্ড বিল্ডিং-এর চাকরিও জুটিয়ে ফেললেন! আর সেই টাকায় কিনে ফেললেন একটা গোটা বাজার। নাম দিলেন তেরিত্তি বাজার, যা আজকের টেরিটি বাজার। সবার মুখে মুখে এরই নাম চিনা পাড়া। চিনা পাড়ায় খুনখারাপি লেগেই থাকে। চিনেদের মাথা গরম। কথায় কথায় ছোরাছুরি বার করে। তাই চিনে পাড়ায় খুন শুনে প্রথমে তেমন আমল দেয়নি প্রিয়নাথ। পরে যখন জানল স্বয়ং টমসন সাহেব নিজে খবর পাঠিয়েছেন, বুঝলো ব্যাপার গুরুচরণ। খানিক বাদে বেহারাদের পা মন্থর হয়ে এল। প্রিয়নাথ উঁকি মেরে দেখল আশেপাশের দৃশ্য বদলে গেছে। সরু রাস্তা, সাপের মতো এঁকেবেঁকে গিয়েছে। কোথা থেকে অদ্ভুত একটা ধূপের গন্ধ ভেসে আসছে। দুপাশে লাল লাল লন্ঠনে বাতি জ্বলে এক অপার্থিব আলোর সৃষ্টি করেছে। আর সেই আলোতে দেখা যাচ্ছে দেওয়ালে, বাড়ির দরজায় দুর্বোধ্য চিনে ভাষায় রঙিন বিজ্ঞাপন ঝুলছে। অন্য সময় এ পাড়ায় এসেছে প্রিয়নাথ। চিনা সরাইগুলো গমগম করে, চন্ডুখোরদের আস্তানায় ভিড় জমায় বেশ কিছু মানুষ, কেউ তারের বাদ্য বাজিয়ে গান গায় অচেনা ভাষায়। কিন্তু আজ যেন কোন জাদুমন্ত্রবলে গোটা পাড়াটা নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। কোনও এক অশুভ শক্তি যেন প্রচণ্ড আক্রোশে গলা টিপে গোটা পল্লিটির দম বন্ধ করে রেখেছে। সরাইগুলো বন্ধ। চৈনিক ধর্মমন্দিরটার দরজাও খিল দিয়ে আঁটা। রাস্তার একধারে এক চুচ্চুড়ে মাতাল চিনে বসে ঢুলছে। আর কেউ কোথাও নেই।

বেহারারাও যেন কিছু একটা আঁচ করতে পেরে বুলি বন্ধ করে দিল। তারাও নিঃশব্দে হেঁটে চলেছে। মোড় ঘুরতেই প্রিয়নাথের চোখে পড়ল একদল মানুষ। তারা অতি নিচুস্বরে চিনে ভাষায় কী যেন বলাবলি করছে। সবার কণ্ঠে একটা ভয়ের ভাব। প্রিয়নাথ পালকি থেকে নেমে বেহারাদের দস্তুরি চুকাতেই তারা প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে উলটোদিকে পাড়ি দিল। একটু এগোতেই দেখল হেড জমাদার মওলা বক্স। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে তার কাজের বেশ নামডাক আছে। প্রিয়নাথের সঙ্গে সামান্য হৃদ্যতাও বর্তমান। প্রিয়নাথ অবাক হয়ে দেখলে মওলা বক্স এক গ্যাসবাতির তলায় বসে পেট চেপে ধরে বমি করছে। তার চোখে অদ্ভুত এক আতঙ্কের ছাপ।
“কী হয়েছে মওলা বক্স? শরীর খারাপ?” প্রিয়নাথ জিজ্ঞাসা করল।
পাশাপাশি দুবার মাথা নাড়ল সে। তারপর অস্ফুট কণ্ঠে শুধু বলল, “বাইশ বছর চাকরি করছি সাহেব, এ জিনিস কোনও দিন দেখিনি।”

মওলা বক্সের পাশেই তার ঢাকা লণ্ঠনটা পড়ে ছিল। সেটাকে হাতে নিয়ে আগুনটা একটু উসকে দিল প্রিয়নাথ। তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়াল ভিড়ের কেন্দ্রস্থলে। সেই কুয়াশা ঘেরা রাতে লন্ঠনের আলোয় প্রিয়নাথ যা দেখল, তা না দেখলেই বরং ভালো হত। প্রথম দেখাতে শুধু অস্বাভাবিক সাদা একটা দেহ তার চোখে পড়েছিল। একটু খেয়াল করতে যা দেখল, তাতে তার হাড় হিম হয়ে গেল। দেহটি এদেশি কোনও মানুষের নয়। ভিনদেশি। চুল সোনালি। চুলে জট। গালে হালকা না-কামানো দাড়ি। বুকের পাঁজরের নিচ থেকে লম্বালম্বি কেটে পেটটা চিরে দুফালা দেওয়া হয়েছে। তার ঠিক নিচে যেখানে পুরুষাঙ্গ থাকার কথা, কোনও নিপুণ অস্ত্র দিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে সেটাও। কিন্তু এগুলো কিছুই না। প্রিয়নাথ অবাক বিস্ময়ে দেখল গোটা দেহটা অদ্ভুতভাবে রক্তশূন্য। যেন বিরাট কোনও সিরিঞ্জ দিয়ে দেহের সমস্ত রক্ত টেনে নেওয়া হয়েছে একবারে। আর সেই রক্তের কিছুটা দিয়ে মৃতের বুকে আঁকা রয়েছে বিচিত্র এক চিহ্ন, যা প্রিয়নাথ আগে কোনও দিন দেখেনি।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ— চন্দননগরে খুন
২০ জুন, ২০১৮, কলকাতা
সব কিছুর শুরু হল একটা হোয়াটসঅ্যাপ থেকে। দেবাশিসদা পাঠিয়েছেন। কাল অনেক রাতে। আমি তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দেখিনি। আজ সকালে দেখলাম। প্যাড থেকে ছেঁড়া একটা কাগজের টুকরোর ছবি। কাঁপা কাঁপা হাতে তোলা। স্পষ্ট কিছু না। অনেক চেষ্টা করে যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, কোনও ছড়া বা কবিতাজাতীয় কিছু হবে। রুলটানা পাতায় বাংলা অক্ষরে লেখা। সকাল থেকে বেশ কয়েকটা রিপ্লাই করেছি। উত্তর আসেনি। সিন-ও হয়নি। ফোন করলাম, বেজে গেল। কাল দেখি, একবার চন্দননগরে দেবাশিসদার বাড়ি ঢুঁ মেরে আসতে হবে।
দেবাশিসদা একা মানুষ। সরকারি আর্কাইভে কাজ করেন। সারাদিন বই নিয়ে থাকেন। পুরোনো বই, পুথি, এইসব। চন্দননগরে বড়োবাজারের পাশে দোতলা বাড়ি, আগাপাশতলা বইতে ঠাসা। আমি গেলেই তাক থেকে নামিয়ে নামিয়ে দুষ্প্রাপ্য সব পুথি আর বই দেখান। হ্যালহেডের গ্রামারের প্রথম সংস্করণ কিংবা রামধন স্বর্ণালঙ্কারের খোদাই করা ছবি সহ অন্নদামঙ্গল আমি দেবাশিসদার বাড়িতেই প্রথম দেখেছি।
“এসব বাড়িতে রাখেন কেন? মিউজিয়ামে দিয়ে দিন”, যখনই যাই, বলি। দেবাশিসদা হাসেন। “আসলে ব্যাপারটা কি বলো তো, একা মানুষ, বয়স হয়েছে। কিছু নিয়ে তো একটা থাকতে হবে… তোমাদের মতো সে বয়স নেই যে মেয়েরা আমার সঙ্গ পেতে চাইবে। যার জীবনে বউ নেই, বই-ই সই।” দেবাশিসদার বউ কিছুদিন হল অন্য একজনের সঙ্গে ঘর ছেড়েছেন। সন্তানাদি নেই, ফলে ডিভোর্সে খুব সমস্যা হয়নি। আমার সঙ্গে আলাপ কেসের ব্যাপারে। ওঁরই কেস। আমিই বউদিকে ফলো করে সব প্রমাণ ওঁর হাতে তুলে দিয়েছিলাম।
আমি পেশায় প্রাইভেট ডিটেকটিভ। এত কিছু থাকতে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এই কাজ কেন? একটাই উত্তর। আমার ঠাকুরদার বাবা তারিণীচরণ। কলকাতার প্রথম বাঙালি প্রাইভেট ডিটেকটিভ। উনিশ শতকের শেষের দিকে কলকাতায় যখন এদিকে ওদিকে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সিগুলো গজিয়ে উঠতে থাকে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে নাম করা ছিলেন ক্রিক রোডের জন ড্রিসকল সাহেব। সে যুগেই তাঁর ফি ছিল ষোলো টাকা। তারিণীচরণ কীভাবে যেন তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছিলেন। ধীরে ধীরে কাজ শিখে ক্লাইভ স্ট্রিটে নিজেই চেম্বার কেনেন। নাম রে প্রাইভেট আই অ্যান্ড কোং। স্পেশালাইজড ইন ডিভোর্স কেসেস। তখন কলকাতায় সায়েবপাড়ায় আনাচেকানাচে নষ্টামি। শ্রীমতী টমকিন্স বিবাহিত হয়েও গোপনে সহবাস করতেন ক্যাপ্টেন সিমারের সঙ্গে। তাঁর স্বামী সন্দেহ করেও হাতেনাতে ধরতে পারছিলেন না। ড্রিসকল সাহেবের কথায় কেস আসে বড়দাদুর কাছে। বড়দাদু নাকি রাধাবাজারের বেঙ্গল ফটোগ্রাফারের মালিক নীলমাধব দে-কে ধরে সিমার সাহেবের জানলার ধারে ঝোপে ক্যামেরা লাগানোর ব্যবস্থা করেন। জন ব্লেস কোম্পানি তখন সবে বাজারে হ্যান্ড ক্যামেরা এনেছে। তা দিয়ে যা ছবি ওঠে, সেই ছবির জোরেই টমকিন্স তাঁর স্ত্রীকে ডিভোর্স দেন। এইসব ঘটনা বড়দাদুর নীল ডায়রিগুলোতে লেখা আছে। প্রতি বছর একটা। ১৮৯০ থেকে। এই ডায়রিগুলো আমি দেখেছি। সবকটা প্রায় অক্ষত। মাঝে শুধু ১৮৯২-এর শেষের দিকের এন্ট্রি কেউ বা কারা ছিঁড়ে নিয়েছে। আর ১৮৯৫-৯৬-এর ডায়রি মিসিং। ছোটো থেকেই ইচ্ছে ছিল গোয়েন্দা হব। মা-বাবা দুজনেই বাধা দিয়েছিলেন। ওঁদের ইচ্ছেমতো যাদবপুরে মেকানিক্যাল পড়েওছিলাম। কিন্তু যাকে বলে নিয়তি। চাকরি জোটেনি। শেষ অবধি বড়দাদুর ক্লাইভ স্ট্রিটের অফিসটাই ঝেড়েমুছে অফিস খুলে বসেছি। বাবা চলে গেছেন গত বছর ক্যান্সারে। তার কিছুদিন বাদেই আচমকা মা। সংসারের টান বলতে যা বোঝায় তার কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই। ভাড়াবাড়িতে একা থাকি। কাজের মাসি সকালে রান্না করে দেন। তাই দুবেলা খাই। এবারে গরম খুব জ্বালিয়েছে। প্রতিবার দুই-এক দিন করে কালবৈশাখী হয়। এবার কিচ্ছু না। ড্রেনগুলো শুকিয়ে পচা গন্ধ বেরোচ্ছে। রাস্তায় বেরোলেই চারিদিক থেকে এসি মেশিনের গুনগুন আওয়াজ। দুপুরে গরমে টেকা মুশকিল। তাও অফিসের কাচের দরজা এঁটে বন্ধ করে, জানলার পর্দা নামিয়ে সারাদিন চেয়ারে বসে থাকি খদ্দেরের আশায়। অলসের মতো ফেসবুক স্ক্রল করি, পাবজি খেলি। দেবাশিসদা আমার প্রথম ক্লায়েন্ট। এখনও যে সামান্য কিছু ক্লায়েন্ট আসে, তাঁদের বেশিরভাগই দেবাশিসদার সুপারিশে এবং ডিভোর্স কেস। দুই বছর আগে যে উৎসাহে গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছিলাম, এখন তা অনেকটাই নিভে গেছে। বুঝেছি ফেলুদা-ব্যোমকেশরা বইয়ের পাতাতেই থাকে। গোয়েন্দাদের চেয়ে বোরিং জীবন আর কারও হয় না। ঠিক এমন সময় ফোন এল মোবাইলে। বিশ্বজিৎ ফোন করেছে। বিশ্বজিৎ বড়োবাজারের এক বড়ো শাড়ির দোকানের কর্মচারী।
“দাদা, শিগগির আসুন, ওঁরা এসেছেন”, ফিসফিস করে বলল সে।
ওঁর দোকানে ইদানীং এক নেতা গোছের মানুষ তাঁর বান্ধবীকে নিয়ে শাড়ি কিনতে আসেন, খবর পেয়েছিলাম। তাঁর স্ত্রী আমাকে কেসটা দিয়েছেন। আমিও বিশ্বজিৎকে কিছু টাকা দিয়ে ফিট করেছিলাম খবর দেওয়ার জন্য। ও কথা রেখেছে। আমি একলাফে চেয়ার থেকে উঠেই গোপন ক্যামেরা সহ সব কিছু নিয়ে ছুটলাম। কিন্তু শুরুতেই ফ্যাসাদ। আমার বুলেট বাইকের সামনে কে যেন একটা বড়ো গাড়ি পার্ক করে রেখেছে। গাড়ি বের করা যাচ্ছে না। চেঁচামেচি করে ড্রাইভারকে আনা গেল বটে, কিন্তু সব মিলিয়ে প্রায় পনেরো মিনিট নষ্ট। ওঁরা কতক্ষণ আর দোকানে থাকবেন? ঊর্ধ্বশ্বাসে গাড়ি চালাতে চালাতেই বিশ্বজিৎকে ফোন করলাম, “ওঁরা আছেন এখনও?”
“হ্যাঁ দাদা, কিন্তু আর বেশিক্ষণ থাকবেন না। শাড়ি কেনা প্রায় শেষ।”
“তোমার কাছে মোবাইল আছে? তাতে ভিডিও তোলা যায়?”
“হ্যাঁ দাদা।”
“তবে যাতে কেউ না দেখতে পায়, এমনভাবে ভিডিও তোলো। আর হ্যাঁ, দুজনের মুখ যেন পরিষ্কার বোঝা যায়।”
“কিন্তু দাদা... টাকাটা...”
“পাঁচশো পাবে, তুমি আগে কাজটা করো তো দেখি”, বলতে বলতেই বুঝলাম কী ভুল করেছি। ট্রাফিক সার্জেন্ট দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতে তাঁর পাশ দিয়েই গাড়ি ঢুকিয়ে দিয়েছি নো এন্ট্রিতে।
হাতের ইশারায় ট্রাফিক সার্জেন বললেন গাড়ি সাইড করতে। বুঝলাম কপালে দুঃখ আছে। শুধু তাই না, আজ আর সময়মতো দোকানে যাওয়া গেল না।
“লাইসেন্স?” নিরাসক্ত গলায় বললেন অফিসার।
হিপ পকেটে হাত দিয়ে পার্স বার করতে গিয়ে সত্যজিতের ভাষায় “জাম্পিং জোহোসাফ্যাট”, সর্বনাশের মাথায় বাড়ি। তাড়াহুড়োতে পার্স টেবিলে ফেলে এসেছি। ওতেই আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স, প্রাইভেট ডিটেকটিভের লাইসেন্স, টাকা, সব আছে। প্রথম উপায় হাতে পায়ে ধরা। ভাবলাম সেটাই করি। তারপর কী মনে করে সত্যিটা বলেই দিলাম, “স্যার, আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ।”
শুনে ভদ্রলোক এমন মুখ করলেন, যেন আমি বলেছি আমি সুপারম্যান। খানিক অবাক হয়ে মুখের দিকে চাইলেন। তারপর একেবারে ঠান্ডা গলায় বললেন, “লাইসেন্সটা দেখান প্লিজ।”
বুঝলাম এ বড়ো কঠিন ঠাঁই। উনিও বুঝলেন আমার কাছে কিছুই নেই, এমনকি মাথায় হেলমেটটাও। পাশে হোর্ডিংয়ে বড়ো বড়ো করে জ্বলজ্বল করছে, “সেফ ড্রাইভ, সেফ লাইফ।” নিজেকে কেমন যেন অদ্ভুত বোকা বোকা লাগছিল। পাশ দিয়ে পথচারীরা যাচ্ছে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে পড়েছে রগড় দেখতে। পুলিশ ভদ্রলোক সেই একইভাবে ঠান্ডা গলায় কাকে যেন ডাকলেন, “হরিপদ, অ্যাই হরিপদ”।
হরিপদ কাছেপিঠেই কোথাও ছিল। একেবারে বশংবদ হয়ে চলে এল। “কিছু বলবেন স্যার?”
“হ্যাঁ, শোন, এই গাড়িটা থানায় যাবে। আর এই ভদ্রলোককেও নিয়ে চল।”
এবার আর হাতে পায়ে ধরা ছাড়া উপায় রইল না। কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, “ছেড়ে দিন স্যার। ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না।”
“এসব বলে আর কী লাভ বলুন। চলুন, থানায় চলুন।”
“আর স্যার গাড়িটা?”
“গাড়ি থানাতেই পড়ে থাকবে। মাটি পড়বে। ও গাড়িতে আমি লাউগাছ গজিয়ে ছাড়ব”, অদ্ভুত হেসে বললেন সেই ইনস্পেক্টর।
পুলিশের গাড়িতে চাপিয়ে আমাকে বড়োবাজার থানায় আনা হল। বিশ্বজিৎ ফোন করছে। ভাইব্রেট হচ্ছে। ধরা উচিত। কিন্তু ধরতে সাহস পাচ্ছি না। ওঁরা নিশ্চয়ই দোকান ছেড়ে চলে গেছেন। বিশ্বজিৎ কি ওঁদের ভিডিও তুলতে পারল?
কেন জানি না, অফিসার সরাসরি নিজের টেবিলে নিয়ে গেলেন আমাকে।
“চা খাবেন?” গলার স্বর একটু নরম যেন।
“না”, বুঝতে পারছিলাম না কী বললে ঠিক হবে।
“নাম কী?”
“তুর্বসু রায়।”
“বয়স?”
“সাতাশ।”
“কী করা হয়?”
“বললাম তো, প্রাইভেট ডিটেকটিভ।”
“সত্যি নাকি? বলো কী হে…” আপনি থেকে তুমিতে নামতে ভদ্রলোকের ঠিক দুই সেকেন্ড লাগল, “পড়াশুনো কদ্দূর?”
“যাদবপুর থেকে মেকানিক্যাল।”
“তাহলে এসব কী করছ? সময় নষ্ট!!!”
জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। চুপ করে রইলাম।
“লাইসেন্স আছে না নেই?”
“আছে”, বলে লাইসেন্স নম্বরটা বললাম।
ভদ্রলোক সামনের কম্পিউটারে সেই নম্বরটা মেরে কী সব খুটখাট করলেন। তারপর অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যখন মুখ খুললেন ঠোঁটের পাশে হালকা হাসি। “যাক, সত্যি কথাই বলছিলে তবে।”
এবার আমার মাথা গরম হওয়া শুরু হল। “আপনার কেন মনে হল আমি মিথ্যে বলছি?”
“বলা তো যায় না, কার কী মতলব। তবে ট্রাফিক আইন ভাঙার যা ফাইন সেটা তো দিতেই হবে বাবা।”
“দেব না বলেছি নাকি? আমায় ছেড়ে দিন। আমি টাকা নিয়ে আসি। অথবা কাউকে ফোন করি, টাকা দিয়ে গাড়ি ছাড়াক।”
“আরে বসো, বসো। এত তাড়া কীসের? এক কাপ চা খাও।” বুঝলাম নিয়ম মেনে চালান কেটে টাকা দেওয়া ব্যাপারটা ওঁর ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। উনি চান উপরি কিছু। ফোনটা ক্রমশ ভাইব্রেট করছে। ধরতে পারছি না। একসময় কেটে গেল। আর কী আশ্চর্য, তার ঠিক পরে পরেই ইন্সপেক্টরের ফোন বেজে উঠল।
“হ্যালো, ইনস্পেক্টর সামন্ত বলছি... বলুন... হ্যাঁ… হ্যাঁ… ফোনের টাওয়ার দেখে? হ্যাঁ স্যার। হ্যাঁ। এই তো আমার সামনেই বসে আছে। নো এন্ট্রিতে ঢুকে গেছিল স্যার। অ্যারেস্ট করে এনেছি। হ্যাঁ স্যার। নিশ্চিন্ত থাকুন। আরে না না, ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না… আসুন স্যার। আমি আছি।”
ফোন রেখে খানিক আমার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন ইনস্পেক্টর। তারপর খুব ধীরে ধীরে বললেন, “চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেট থেকে ফোন করেছিল। কাল রাতে একজন খুন হয়েছে। মারা যাবার আগে শেষ হোয়াটসঅ্যাপ তোমাকেই করেছিল। চন্দননগর পুলিশ তোমায় ইন্টেরোগেট করবে। তোমায় এখন ছাড়া চলবে না হে…”
আমার মাথা বনবন করে ঘুরছিল। দেবাশিসদা? কিন্তু কে? কেন? আর ওই ছবিতেই বা কী ছিল?
“জানি উচিত না, তবুও জিজ্ঞেস করছি, কে বুঝতে পারছ?”
মাথা নাড়লাম।
“সেই মেসেজটা দেখা যায়?”
আমি কোনও কথা না বলে ফোনটা এগিয়ে দিলাম। অবশ্যই দেবাশিসদার পাঠানো মেসেজটা খুলে।
ইনস্পেক্টর অনেকক্ষণ মন দিয়ে দেখলেন।
“এ তো কোনও ডায়রি বা লেখার পাতা মনে হচ্ছে। তাড়াহুড়োতে তুলতে গিয়ে হাত কেঁপে গেছে। বাংলায়, সেটা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু পড়া যাচ্ছে না। দাঁড়াও, জুম করে দেখি।
…এই তো, কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। একটা শব্দ বুঝলাম শুধু। দ্যাখো তো তোমার চেনা কেউ নাকি?”
তিনি আবার মোবাইলটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। দেখলাম প্রায় গোটা স্ক্রিন জুড়ে ব্লু ব্ল্যাকে একটা শব্দই ফুটে আছে— “প্রিয়নাথের।”
তৃতীয় পরিচ্ছেদ— এত্তেলা
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের জার্নাল (২)
মওলা বক্সকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “এই স্থানের ইনস্পেক্টর কি উপস্থিত হইয়াছেন?” সে অঙ্গুলি দিয়া ভিড়ের মধ্যস্থলে কোনওমতে দেখাইয়া দিল। ইনস্পেক্টর কী যেন ভক্ষণ করিতেছিলেন, তাঁহার গণ্ডদ্বয় খাদ্যের চাপে বিস্ফারিত হইয়া আছে। এই নারকীয় পরিবেশেও যে কাহারও ক্ষুধার উদ্রেক হইতে পারে, তাহা আমার অন্তত চিন্তার বাহিরে ছিল। আমাকে দেখিবামাত্র ইনস্পেক্টর কোনওক্রমে সেই খাদ্য গলাধঃকরণ করিয়া কহিলেন, “আপনি এখানে কোথা হইতে?”
আমি। আপনি যেখান হইতে।
ইনস্পেক্টর। আমি তো থানা হইতে আসিয়াছি।
আমি। আমিও।
ইনস্পেক্টর। আপনি কী রূপে সংবাদপ্রাপ্ত হইলেন?
আমি। আমায় স্বয়ং টমসন সাহেব এই কেসের ভার দিয়াছেন।
ইনস্পেক্টর বেজার মুখে কহিলেন, “আসিয়াই যখন পড়িয়াছেন, তখন আসুন উভয়ে মিলিয়াই অনুসন্ধান আরম্ভ করি।”
মৃতদেহটি প্রথম খুঁজিয়া পায় এক চিনা বুড়ি। গলির যে স্থলে মৃতদেহটি নিক্ষিপ্ত হইয়াছিল, তাহার আশেপাশে জমা ময়লা ও কাষ্ঠনির্মিত দুইটি রেড়ির তেলের বাতিস্তম্ভ থাকিলেও তাহা নিষ্প্রদীপ। অনুমান করা যায় কেহ সেই তেল চুরি করিয়া লইয়াছে। ফলে সকলের নজর এড়াইয়া মৃতদেহ এই স্থলে আনা বিশেষ কষ্টসাধ্য নয়। খুন অন্য কোথাও হইয়াছে তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। এত বড়ো খুন হইল, কিন্তু সামান্য রক্ত। খুনি খুন করিয়া দেহ ফেলিয়া গিয়াছে। ইনস্পেক্টর জানাইলেন রাত সাতটা নাগাদ মৃতদেহটি দেখিতে পাওয়া যায়। বুড়ি দেখিয়াই চিৎকার চেঁচামেচি করিয়া লোকদের অবগত করে। তাহাদের কেউ পুলিশে যাইতে রাজি হয় নাই। শেষে এক বাঙালি যুবক সরাসরি লালবাজারে গিয়া প্রথম এত্তেলা (First Information Report) দেন। এই স্থলে জানাইয়া রাখি যে পুস্তকখানিতে ওই এত্তেলা লিখিত হয় তাহা তিন ভাগে বিভক্ত। একখানা স্বয়ং টমসন সাহেব রাখেন, অপর দুই অংশে তাহারই নকল করিয়া একটি সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ বিভাগের প্রধান কর্মচারীর নিকট প্রেরণ করা হয়, অবশিষ্টখানি বিচারকের নিকট প্রেরিত হয়। আমি টেলিগ্রাম পাইয়া আসিয়াছি। এত্তেলা দেখিবার সময় হয় নাই। ইন্সপেক্টরের নাম সুন্দরলাল দত্ত। গোলগাল নধর গঠন, মুখে অদ্ভুত সরলতা। তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম “এত্তেলাখানি দেখাইতে পারেন?”
তিনি বুকপকেট হইতে ভাঁজ করা এক তা কাগজ বাহির করিলেন। লন্ঠনের আলোয় উহা পাঠ করিলাম। উহার সারমর্ম এইরূপ-
“আমার নাম শ্রী গণপতি চক্রবর্তী। জাতিতে ব্রাহ্মণ। আমি মধ্যে মধ্যেই বিশেষ প্রয়োজনে চিনা পাড়ায় আসিয়া থাকি। আজও আসিয়াছিলাম। বৈকালে চলিয়া যাইব স্থির ছিল, কিন্তু অকস্মাৎ অতিশয় বৃষ্টি শুরু হওয়ায় প্রত্যাগমন করিতে পারি নাই। রাত্র সাত ঘটিকা নাগাদ তীব্র চিৎকার শুনিতে পাই। গিয়া দেখি একদল চিনা এই গলির সম্মুখে দাঁড়াইয়া কী কহিতেছে। চিনা ভাষা ভালো বুঝি না। তবে “শিতি, শিতি” শুনিয়া বুঝিলাম কোনও মৃতদেহ সংক্রান্ত ঘটনা হইবে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম কীভাবে ইহা এই স্থলে আসিল? কেহ জবাব দিতে পারিল না। কী করিব বিবেচনা করিয়া উঠিতে পারিলাম না। মৃত ব্যক্তি ভিনদেশি। প্রচণ্ড আক্রোশ না থাকিলে কেহ এইপ্রকার খুনে লিপ্ত হয় না। মৃতের বক্ষোপরি অদ্ভুত চিহ্নটি দেখিয়া আরও বিস্মিত ও আতঙ্কিত হইয়া ঠিক করিলাম পুলিশকে এই খবর অবিলম্বে প্রদান করা উচিত। তাই আমি থানায় আসিয়াছি ও এই সংবাদ প্রদান করিতেছি। আমি কাহারও উপর নালিশ করিতেছি না বা কাহারও উপর আমার সন্দেহ হয় না। কারণ আমি নিজেই অনেক পরে সেই স্থানে উপস্থিত হইয়াছিলাম। কেহ পুলিশের নিকট যাইতে রাজি ছিল না বলিয়া আমি আসিলাম। এই আমার এজাহার।”
আমি এত্তেলা পাঠ করিয়াই বুঝিলাম এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান বা ইহার রহস্য উদ্ঘাটন নিতান্ত সহজ নহে। এই অনুসন্ধানের নিমিত্ত বিশেষ কষ্টভোগ করিতে হইবে ও কষ্ট করিয়াও যে কতদূর কৃতকার্য হইতে পারিব তাহা বলা যায় না। যাহা হউক অনুসন্ধানের কার্য যখন আমার উপর পতিত হইয়াছে, তখন সাধ্যমতো চেষ্টা করিতেই হইবে। গলির একধারে একটি বসিবার স্থল ছিল। সেখানে বসিয়া দুইজন কনস্টেবলকে নির্দেশ দিলাম লাশ যেন এই মুহূর্তেই লাশকাটা ঘরে লইয়া যাওয়া হয়। দুইজন ঈষৎ ভীত অবস্থায় মুর্দাফরাসের গাড়িতে লাশ চাপাইল। মৃতের দেহের চারিদিক সিক্ত হইলেও যে স্থলে লাশ ছিল, তাহার নিম্নভাগ প্রায় শুষ্ক, এমনকি মৃতের পশ্চাদভাগও তেমন সিক্ত হয় নাই। বুঝিলাম বৃষ্টির পূর্বেই দেহ আনিয়া রাখা হইয়াছে। তবে বুকের চিহ্ন জলে ধুইল না কেন? মনে এই প্রশ্ন জাগিতেই লন্ঠন লইয়া বুকের সেই চিহ্নকে নিবিড়ভাবে দেখিলাম। বুঝিলাম শোণিতরেখা শুধু নয়। ধারালো কোনও অস্ত্র দিয়া বুকে ওই চিহ্ন খোদিত হইয়াছে, আর রক্ত বা বিজাতীয় রক্তবর্ণ কোনও তরল একেবারে শুকাইয়া আঁট হইয়া রহিয়াছে। বৃষ্টির সাধ্য নাই তাহাকে মুছিয়া ফেলা। কনস্টেবলরা লাশ লইয়া গেল। আমি ভাবিতে বসিলাম। ১ম, এই মৃতদেহটি কাহার। ব্যক্তি বিদেশি এবং পুরুষ। যেরূপে তাহাকে হত্যা করা হইয়াছে, তাহা নিতান্ত সামান্য খুন নয়। কোনও গভীর ষড়যন্ত্র ইহার পশ্চাতে থাকিবার সমূহ সম্ভাবনা। ২য়, কাহার দ্বারা এই জঘন্য কার্য হইতে পারে? সচরাচর নেটিভরা বিদেশিদের আক্রমণ করিতে চায় না। করিলেও লাশ গুম করিয়া দেয়। এক্ষণে প্রতীয়মান যে, খুনির সজ্ঞান চেষ্টা ছিল যাহাতে লাশ খুঁজিয়া পাওয়া যায়। ৩য়, মৃতের বুকের ওই অদ্ভুত চিহ্নের অর্থ কী?
এত্তেলার একটি বাক্য আমার মনে আগ্রহ সৃষ্টি করিয়াছিল, “মৃতের বক্ষোপরি অদ্ভুত চিহ্নটি দেখিয়া আরও বিস্মিত ও আতঙ্কিত হইয়া ঠিক করিলাম পুলিশকে এই খবর অবিলম্বে প্রদান করা উচিত”, অর্থাৎ এই ব্যক্তি ওই অদ্ভুত চিহ্নের অর্থ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত আছেন। স্থির করিলাম তাঁহাকে দিয়াই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করিব। সুন্দরবাবুকে কহিলাম, “এই গণপতি এই স্থলে বর্তমান আছেন কি?”
সুন্দরবাবু। থাকিবে না? তাহাকে এক কোণে বাঁধিয়া রাখিয়াছি।
বুঝিলাম ধরিয়া আনিতে বলিলে বাঁধিয়া আনার প্রবাদ সুন্দরবাবুর ন্যায় মানুষদের দেখিয়াই সৃষ্টি হইয়াছে। ঈষৎ বিরক্ত হইয়া কহিলাম, “বাঁধিয়া রাখিয়াছেন কেন? এখনি উহার রজ্জু কাটিয়া এই স্থানে লইয়া আসুন।”
সুন্দরবাবু বেজার মুখে “হুম” বলিয়া স্থান পরিত্যাগ করিলেন, বোধ করি উহাকে আনিবার জন্যেই। লাশ সরাইয়া দিবার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও কমিয়া আসিতেছিল। একলা আমি সেই অভিশপ্ত নিশীথে তীব্র শীতের দংশনে কাতর হইয়া খুনের কূলকিনারা খুঁজিতেছিলাম।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ— জিজ্ঞাসাবাদ
১৩ ডিসেম্বর, ১৮৯২, কলিকাতা
মধ্যরাত অতিক্রান্ত। প্রিয়নাথ বুঝল আজ সারারাত হয়তো এখানেই কাটবে। তীব্র ঠান্ডা হাড় অবধি কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এদিকে আকাশে আবার মেঘ জমছে। টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হল। সুন্দরবাবু সঙ্গে করে বছর তিরিশ-বত্রিশের এক যুবককে ধরে নিয়ে এলেন। যুবকের গায়ের রং চাপা, টিকালো নাক, সরু গোঁফ, রোগা চেহারা, চোখদুটি অস্বাভাবিক বুদ্ধিতে জ্বলজ্বল করছে। দেখে বোঝা যায় ভদ্রঘরের সন্তান, কিন্তু পোশাক ইত্যাদিতে প্রতীয়মান যে এই ভদ্রসন্তানটি ইদানীং বেশ অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। প্রিয়নাথ তাকে নিজের পাশে বসতে বলল। যুবকটি মাথা গুঁজে এক কোনায় দাঁড়িয়ে রইল। অকারণে তাকে বেঁধে রাখাটা সে খুব ভালোমনে মেনে নিতে পারেনি। প্রিয়নাথ বেশ নরম গলাতেই বলল, “আপনাকে শুধু শুধু বেঁধে রেখেছে। খুব অন্যায়। আমি থাকলে এমনটা হতে দিতাম না।”
যুবকের ভিতরের ক্ষোভ যেন ফেটে বেরোল, “আমিই গিয়ে থানায় খবর দিলাম, আর আমাকেই কিনা খুনি ভেবে ধরল। এ কেমন বিচার?”
“বটেই তো, বটেই তো”, বলে প্রিয়নাথ আবার যুবককে তার পাশে বসতে আহ্বান করল। এবার গুটিগুটি পায়ে সে প্রিয়নাথের পাশে এসে বসল। প্রিয়নাথ বললে, “অনেক রাত হয়েছে জানি, তবু কটা প্রশ্ন করেই আপনাকে ছেড়ে দেব।”
“বলুন কী জানতে চান।”
— আপনার নাম কী?
— আমার নাম শ্রীযুক্ত গণপতি চক্রবর্তী।
— আপনার বয়স কত?
— এই আশ্বিনে চৌত্রিশ হল।
— আপনার কোন জেলায় বাসস্থান? আপনার পিতার নাম কী?
— (খানিক চুপ করে থেকে) আমার পিতা মহেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। আমি শ্রীরামপুরের চাতরার দোরেপাড়ার জমিদারবাড়ির সন্তান। বাবার কন্ট্রাক্টারির ব্যবসা ছিল।
— সে বাড়ির ছেলে হয়ে এই পাড়ায় এই সময় আপনি কী করছিলেন?
— (নিশ্চুপ)
— আপনি নির্ভয়ে বলতে পারেন, কোনও ব্যক্তিগত কারণ হলে আমি তাতে নাক গলাব না। কিন্তু আমি সত্যটা জানতে আগ্রহী।
— আমি বাড়ি থেকে পালিয়েছি।
— কবে?
— তাও প্রায় বিশ বছর হল। ছোটো থেকেই গানবাজনা, জাদুর খেলা ভালো লাগত। লেখাপড়ায় মন ছিল না। সারাদিন মাদারিদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম জাদুর খেলা শিখব বলে। ঠাকুরকে বলতাম, আমায় মস্ত বড়ো জাদুকর করে দাও… ঠাকুরদা ভালোভাবে নিলেন না। বললেন লেখাপড়া না করলে জমিদারির এক পয়সাও মিলবে না। আমিও একরোখা। রইল তোমার জমিদারি, বলে পরদিনই বাড়ি থেকে একবস্ত্রে পালালাম। তখন বারো বছর বয়স।
— তারপর?
— কিছুদিন আমার বন্ধু প্যাদনার সঙ্গে রাস্তায় রাস্তায় জাদুর খেলা দেখাতাম। তারপর ও উৎসাহ হারিয়ে ফেলল। আমিও ভাবলাম সাধু হব। একাই চলে গেলাম বৈদ্যনাথধামে। গুরুর সেবা করে, গাঁজার কলকে সেজে দিয়ে গুপ্ত মন্ত্রতন্ত্র শিখলাম, ঝাড়ফুঁক, জড়িবুটি, ভেষজবিদ্যাও শিখলাম। কত লোককে সারিয়েছি সে আপনি ভাবতেও পারবেন না। একসময় মনে হল এটা করতেই কি আমি জন্মেছি? ঘর ছেড়েছি? আমি তো জাদুকর হব বলে ঠিক করেছিলাম। তাই আবার সব ছেড়েছুড়ে কলকাতায় চলে এলাম।
প্রিয়নাথ বুঝল, এই যুবক বড়ো সাধারণ মানুষ নয়।
— কলকাতায় কোথায় থাকেন?
— আপাতত দর্জিপাড়ায়। রামানন্দ পাল মশাইয়ের বাড়িতে। ওখানে ‘নাট্যসমাজ’ নামে একটা নাটকের কেন্দ্র খুলেছে। সেখানে আমি জাদুকরের ভুমিকায় অভিনয় করি। পয়সাকড়ি কিছু পাই না, দুবেলা খাওয়া জোটে আর রাতে রিহার্সাল রুমেই শুয়ে থাকি।
— দর্জিপাড়ায় তো কিছুদিন আগে জাদুকর নবীনচন্দ্র মান্না আর অম্বিকাচরণ পাঠক ‘দ্য উইজার্ডস ক্লাব’ খুলেছেন। আপনি তাঁদের চেনেন?
— আমি খুবই ঘনিষ্ঠ ওঁদের। আপনি খোঁজ নিতে পারেন। দর্জিপাড়ায় বাসের একটা কারণ ওই ক্লাবও বটে। ওখানেও রাত কাটাই মাঝেমধ্যে।
— আবার ফিরে আসি প্রথম প্রশ্নে। আজ এখানে আপনি কী করছিলেন?
— আপনি কি জানেন, মাসখানেক আগে রবার্ট কার্টার কলকাতায় ম্যাজিক দেখাতে এসেছেন? সঙ্গে এক চিনা জাদুকর চিন-সু-লিন। আমার ইচ্ছে ওঁদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করি। কিন্তু চিনা ম্যাজিক বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তাই ইদানীং প্রায়ই সন্ধ্যায় এই চিনা ধর্মমন্দিরে এসে চিনা ম্যাজিকের পুথি পাঠ করি। আজও সেই কারণেই এসেছিলাম।
প্রিয়নাথ যুবককে দেখছিল আর বিস্মিত হচ্ছিল। তার বয়সিই হবে। কিন্তু এ কি সত্যি কথা বলছে? না নেহাতই তাকে বুকনি দিয়ে ভোলানোর চেষ্টা করছে?
— আপনি যেমন দাবি করছেন, সত্যি কি আপনি ততটাই পারদর্শী?
যুবকের মুখে একটা স্মিত হাসি দেখা দিল। সে ঠোঁট চেপে হাসছে। কিন্তু সেই অন্ধকারে যেন দৈববাণীর মতো ভেসে এল এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বর, “ইনস্পেক্টর সাহেব, বছরের পর বছর গুরুর পায়ে পড়ে থেকে এ বিদ্যা শিখেছি, সে কি সাধে? আর আপনি আমার বিদ্যায় সন্দেহ প্রকাশ করছেন?”
অবাক বিস্ময়ে প্রিয়নাথ লন্ঠন তুলে দেখল, যুবকের ঠোঁট তিলমাত্র কাঁপছে না। তবু অসামান্য এক দক্ষতায় সে কথা বলে চলেছে। প্রিয়নাথের মুখের ভাব দেখে গণপতির বেশ মজা লাগছিল। এবার সে হেসে ফেলল।
— আপনি কীভাবে এটা করলেন?
— এর নাম ভেন্ট্রিলোকুইজম। বহু বছরের চেষ্টায় আমি একে সঠিক ভাবে আয়ত্তে এনেছি।
প্রিয়নাথের ঘোর তখনও কাটেনি। ভাবল ছেড়েই দেবে একে। হঠাৎ মনে পড়ল যে কারণে একে ডাকা সেটাই তো জানা হল না।
— আপনার এত্তেলায় একটা বাক্য দেখলাম। মৃতের বুকের উপরের চিহ্ন দেখে আপনি বিস্মিত হয়েছেন। এই চিহ্ন আমার কাছে অপরিচিত। আপনি কি এই চিহ্ন চেনেন?
এতক্ষণ যুবকের মুখে যে স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল, তা যেন কেউ এক নিমেষে মুছে দিল। তার জায়গায় এল ভয়ের ছায়া। ইতস্তত করে গণপতি বলল, হ্যাঁ, চিনি। এটি চিনাদের গুপ্ত চিহ্ন। এর নাম ই-চিং। বিভিন্ন গুপ্ত সমিতি একে ব্যবহার করে। মূলত আটখানা চিহ্ন থাকে ই-চিং-এর। এটা তারই একটা।
— এর মানে কী?
— এই চিহ্নের আপাত অর্থ বজ্রপাত, বৃষ্টি। কিন্তু ই-চিং-এর দর্শন অনুযায়ী এর মানে স্বর্গ আর পৃথিবীর মিলন। মৃতের নতুন জীবন… কেউ বা কারা মৃতদের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে। মৃতকে নতুন প্রাণ দিতে চাইছে। আর যারা এটা করছে, তারা সহজে থামবে না। কারণ এই চিহ্নের আর-এক অর্থ ‘এক হাজার বাধার মধ্যেও সঠিক পথ’।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ— চিনদেশীয় বিচিত্র চিহ্নসমূহ
(সমাচারচন্দ্রিকা পত্রিকায় প্রকাশিত ‘চৈনিক দর্শন’ প্রবন্ধের অংশবিশেষ;
লেখক অজ্ঞাত)

“… এক্ষণে আমি চীনদেশীয় বিভিন্ন লিপি লইয়া আলোচনা করিব। চিনা সভ্যতার প্রাচীনতম লিপিদের মধ্যে অন্যতমটির নাম ই-চিং অথবা ই-কিং। চীন দেশের মূলত দুই ধর্ম, তাও এবং কনফুসিয়াস, উভয়েই ইহাকে পবিত্র বলিয়া মানিয়া থাকে। ইহার মূলে রহিয়াছে চৌষট্টিখানি চিহ্ন, যাহাদের পারিভাষিক নাম ‘হেকসাগ্রাম।’ এই চিহ্নসকল আবার সরলরেখা দ্বারা নির্মিত। প্রতিটি সরলরেখা অভগ্ন এবং ভগ্ন— দুই প্রকারের হইতে পারে। ভগ্ন রেখাটি স্ত্রী সত্তার প্রতীক। ইহা নেতিবাচক শক্তি বা ইন-কেও চিহ্নিত করে। অপরপক্ষে অভগ্ন রেখাটি পুরুষ, ইতিবাচক শক্তি বা ইয়াং-এর প্রতীক। এই ইন ও ইয়াং একত্রে মিলিয়া জগৎসংসারের সকল কার্যকারণ বা তা-আই-চি-র মূল। এই তা-আই-চি কোন স্থির অভিধা নয়, ইহা ক্রমাগত এবং সতত পরিবর্তনশীল। সকল বস্তু সমূহের উৎপত্তি ইহা হইতেই আবার ইহাতেই সকল বস্তুর লয়। তা-আই-চি-র সঙ্গে জড়িত অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হইল ‘তাও’ বা সঠিক পথ। এই সঠিক পথের দিশা যেমন মহাজাগতিক তেমন তাহা মনুষ্যের অন্তরেও সমান বিদ্যমান। মনুষ্য অন্তরে তাও নাম পরিবর্তন করিয়া ‘তে’ নাম গ্রহণ করে। ই-চিং এর এক দর্শনে যদি তাওয়ের ধারণা রহিয়া থাকে, অন্যদিকে রহিয়াছে সুন-জু বা অতিউত্তম পুরুষের ধারণা। সঠিক পথ বা তাও মানিয়া চলিলে যে কোন সাধারণ মানুষে অসামান্য ক্ষমতা দেখা দিতে পারে, এবং সেও সুন-জু হইয়া উঠিবে। সেই পথ দেখাইবার চিহ্ন বা কৌশলই হইল ই-চিং। সংক্ষেপে পাঠকদিগকে ই-চিং এর চিহ্নসকল বুঝাইয়া দিবার প্রয়াস করিব। আদিকালে দুটি মাত্র চিহ্ন বিদ্যমান ছিল, ভগ্ন এবং অভগ্ন রেখা। ইন এবং ইয়াং। মিথ্যা এবং সত্য। ধীরে ধীরে ইহাদের সহিত আরও দুইটি করিয়া রেখা যুক্ত হইয়া তিনটি রেখার এক একটি বিন্যাস তৈরি করে। প্রতিটি বিন্যাস আবার এক একটি প্রাকৃতিক উপাদানের সহিত জড়িত। নিম্নের চিত্রে বিশদ বর্ণিত হইল—

চিত্রে ইহা প্রতীয়মান যে পৃথিবী, অগ্নি, বারি ও স্বর্গের চিহ্ন প্রতিসম (symmetrical)। ইহারা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী চিহ্ন, যদিচ ইহাদের মধ্যে স্বর্গে তিনটি ইয়াং বর্তমান রহিয়াছে এবং পৃথিবীতে তিনখানি ইন। ফলে ইহাদের মধ্যেও সর্বাপেক্ষা উত্তম চিহ্ন স্বর্গের। নিম্নে এই আট বিভিন্ন চিহ্ন, তাহাদের চৈনিক নামসকল এবং উহাদের অর্থ প্রদান করা হইল।
১। পৃথিবী (কু’উন) — সমর্পণ, স্থির, বৃদ্ধি, রক্ষা করিয়া চলা
২। পর্বত (কে’এন)— উচ্চতা লাভ, আদর্শবান হৃদয়, জ্ঞান, প্রজ্ঞা
৩। বারি (কা’আন)— দুর্বলতা, গতি, পরিবেশকে পরিবর্তন করিবার ক্ষমতা
৪। বায়ু (সান)— দ্রুতগতি, অদৃশ্য শক্তি
৫। বজ্র (চে’এন)— স্বর্গ আর পৃথিবীর মিলন, আত্মার নতুন জীবন লাভ, সহস্র বিঘ্ন সত্ত্বেও সঠিক পথের দিশা
৬। অগ্নি (লি)— ধ্বংস, ভয়াবহ পরিবর্তন, ক্ষতি
৭। হ্রদ (তু’উই)— স্থিতাবস্থা, নতুন জীবনের সূত্রপাত, নিম্নগামী জীবন
৮। স্বর্গ (চ’ ইয়েন)— উন্নতি, প্রগতি, স্বপ্ন। ইচ্ছাপূরণ
এই সকল প্রাথমিক চিহ্ন ব্যতীত যত দিন গিয়াছে এক একটি করিয়া রেখা বৃদ্ধি পাইয়া ই-চিংকে আরও কঠিনতর করিয়া তুলিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে চারটি ইন ও ইয়াং রেখা দ্বারা মোট ৬৪ প্রকার বিন্যাস সম্ভব, এই বিন্যাস…”
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ— দেবাশিসদা
২০ জুন, ২০১৮, কলকাতা
এই জগতে কারও কারও পরিচয় ঘটনাচক্রে হয়, আবার কেউ কেউ একে অপরকে খুঁজে নেন যেন। দেবাশিসদা ঠিক তেমনি আমাকে খুঁজে নিয়েছিলেন। বছর তিনেক আগের কথা। তিন-চারটে চাকরি করে বুঝে গেছি, আমার দ্বারা চাকরি হবে না। কলেজেরই এক বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেও স্থায়ী রোজগারে বিশ্বাসী। ঠাকুরদার বাবার অফিসটা ভাড়ায় দেওয়া ছিল। এক মাড়োয়ারি সেটাকে তাঁর গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাঁকে ওঠাতে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। শেষে থানা পুলিশের ভয় দেখানোতে কাজ হয়। বাবার থেকে শুরুতে লাখ খানেক টাকা নিয়েছিলাম। সে টাকা গেল অফিস সাজাতে, গোপন ক্যামেরা, রেকর্ডার ইত্যাদি দরকারি জিনিসপত্র কিনতে, আর আনন্দবাজার, টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ব্যক্তিগত কলামে বিজ্ঞাপন দিতে। বড়দাদুর আমলের নামটা বদলাইনি, একই রেখেছিলাম। রে প্রাইভেট আই অ্যান্ড কোং। তবে ডিভোর্স কেসের স্পেশালাইজেশানটা দিতে প্রবৃত্তি হয়নি। আনন্দবাজারে সেই বিজ্ঞাপনটা দেখেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন দেবাশিসদা। দেবাশিস গুহ। চন্দনগরে বাড়ি। সেই সূত্রেই আমার প্রথম চন্দননগরে যাওয়া।
প্রথম যেদিন গিয়েছিলাম আকাশ যেন ভেঙে পড়ছে ঝড়বৃষ্টিতে। অকাল সন্ধ্যা নেমেছে বেলা চারটেতেই। দেবাশিসদার বাড়ি যখন ঢুকলাম, তখন জামাকাপড় ভিজে একশা। বাড়িতে দেবাশিসদা একাই ছিলেন।
“আরে, এ তো পুরো ভিজে গেছ দেখছি। তোমাকে তুমিই বললাম। আমি সামনের মাসে পঞ্চাশে পড়ব। তুমি আমার অর্ধেক হবে বড়োজোর। আপনি ডাকার কোনও মানেই নেই।”
উনিই আমায় শুকনো টিশার্ট দিলেন একটা, সঙ্গে ধুতি, মাথা মোছার গামছা। তৈরি হতে না হতে দেখি ট্রে-তে আমার জন্য অপেক্ষা করছে ধোঁয়া ওঠা কফি। বললেন, “আজকে কি ফিরতেই হবে? একে তো জামাকাপড় সব ভিজিয়েছ, আর ওপর যা দুর্যোগ দেখছি, রাস্তায় একমাত্র লেডি অফ হ্যাপি ভয়েজ-ই ভরসা।”
“তিনি কে?”
“সে কী হে গোয়েন্দা? তুমি ইতিহাস বই-টই পড়ো না বুঝি?”
স্বীকার করতে বাধ্য হলাম মাধ্যমিকের পর আর পড়িনি। মাধ্যমিকেও যে খুব আনন্দের সঙ্গে পড়েছি তা নয়। আমাদের ইতিহাস মাস্টার অসীমবাবুর সাল তারিখ ধরা আর না পারলেই বেতের বাড়ি… ইতিহাস মানে আমার কাছে এ-ই। সেটাই বললাম ওঁকে।
“বুঝলাম।” কফির কাপে চুমুক দিয়ে এবার একটা সিগারেট ধরালেন দেবাশিসদা।
‘ব্যাসিলিকা অফ দি হোলি রোসারি’-র নাম শুনেছ?
“নাহ। শুনিনি কোনও দিন।” আমার সরল স্বীকারোক্তি।
“শুনেছ, শুনেছ। লোকে একে এখন ‘ব্যান্ডেল চার্চ’ বলে। তবে ১৫৯৯ সালে গির্জাটি ঠিক কোথায় নির্মাণ করা হয়েছিল, সে নিয়ে তর্কের অবকাশ আছে। যেহেতু সেই সময়ে পর্তুগিজদের শহর ছিল বর্তমান হুগলি জেলখানা সংলগ্ন অঞ্চলে, গির্জাও তাই তার আশেপাশেই কোথাও থাকা উচিত বলে মনে হয়। যুবরাজ খুররম দিল্লির সিংহাসন দখলের জন্য হুগলির পর্তুগিজদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু পর্তুগিজরা তাঁকে সাহায্য করেনি। ১৬২৮ সালে যুবরাজ খুররম সম্রাট শাহজাহান নাম নিয়ে মসনদে বসলেন। রাগ তো আগেই ছিল, এবার তাঁর নির্দেশে মুঘল সৈন্য হুগলি আক্রমণ করে। প্রায় সাড়ে তিন মাস যুদ্ধের পর পর্তুগিজরা মুঘলদের কাছে পরাজিত হয়ে হুগলি থেকে বিতাড়িত হয়। ৪,৪০০ জন পর্তুগিজকে বন্দি করে আগ্রা নিয়ে যাওয়া হল। তারপর আগ্রাতেই নাকি সেই আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটে, যার ব্যাখ্যা আজও কেউ দিতে পারেনি।”
“কী ঘটনা?” কফি খেতে খেতে আচ্ছন্নের মতো শুধু শুনে যাচ্ছিলাম আমি।

“পর্তুগিজ বন্দিদের মধ্যে ছিলেন পাদরি জোয়াও দা ক্রুজ। তাঁকে ফেলে দেওয়া হয় এক উন্মত্ত হাতির সামনে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই হাতি তাঁর কোনও ক্ষতি করার বদলে শান্ত হয়ে তাঁকে পিঠে তুলে বসায়। এই ঘটনায় মুগ্ধ হয়ে সম্রাট শাহজাহান বিপুল অর্থ, ক্ষমতা আর ৭৭৭ বিঘা জমি দান করে পর্তুগিজদের পুনরায় হুগলিতে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৬৩৩ সালে পর্তুগিজরা ফের হুগলিতে ফিরে এসে ধ্বংসপ্রাপ্ত হুগলি শহরের উত্তরে এক শহর স্থাপন করে। পর্তুগিজরা বন্দরকে বলত ‘বন্ডেল’, আর সেখান থেকেই এই শহরের নাম হয় ‘ব্যান্ডেল’।
“এর সঙ্গে সেই লেডির কী সম্পর্ক?”
“লেডি অফ দি হ্যাপি ভয়েজ আসলে মেরি মাতার এক মূর্তি। ১৬৩২ সালে মুঘলদের আক্রমণের সময় মূর্তিটিকে রক্ষা করার জন্য তিয়াগো নামে এক পর্তুগিজ বণিক মূর্তিটি নিয়ে হুগলি নদী পার করে অপর পারে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুঘলদের আক্রমণে তিয়াগো মাঝনদীতেই মারা যান । মূর্তিও নদীতে ডুবে যায়। নতুন গির্জা পত্তনের কিছুদিন পরে হাতির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া সেই পাদরি জোয়াও দা ক্রুজ নাকি এক রাতে নদী থেকে দৈববাণীর মতো ডাক শুনতে পান। পরদিন সকালে তিনি নদীর ধারে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে দেখেন যে মেরি মাতার মূর্তিটি নদী থেকে জেগে উঠেছে। এর কিছুদিন বাদেই এক রাতে, ঠিক আজকের মতো ঝড়বৃষ্টি। এক পর্তুগিজ জাহাজ ভয়ংকর ঝড়ের কবলে পড়ে এসে উপস্থিত হয় গির্জার সামনে হুগলি নদীতে। জাহাজের ক্যাপ্টেন লেডি অফ হ্যাপি ভয়েজ-এর কাছে মানত করেছিলেন যে ঝড়ের কবল থেকে প্রাণে বাঁচলে জাহাজের প্রধান মাস্তুলটি তিনি গির্জায় দান করবেন। ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই হোক বা যাই হোক, সে যাত্রা জাহাজটি ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পায়, এবং ক্যাপ্টেন তাঁর মানত অনুসারে জাহাজের একটি মাস্তুল ব্যান্ডেল চার্চে দান করেন। সে মাস্তুলটা দীর্ঘদিন গির্জার সামনে কবরখানার ঠিক পাশেই ছিল। এই কিছুদিন আগে, ২০০৯ সালের কুখ্যাত আয়লা ঝড়ে মাস্তুলটি ভেঙে পড়ে। তাই বলছিলাম, আজ রাতে ফিরলে একমাত্র লেডি অফ হ্যাপি ভয়েজ তোমায় বাঁচাতে পারেন।”
বৃষ্টি গাঢ় হচ্ছিল। সঙ্গে বাড়ছিল ঝড়ের বাতাসও। বাড়িতে ফেরা মুশকিল। ইচ্ছেও করছিল না। এমন ইন্টারেস্টিং একজন মানুষের দেখা পাব ভাবিনি।
“বাড়ি না ফিরতে পারলে এখানে থেকে যেয়ো।” দেবাশিসদা বললেন।
“তার দরকার হবে না। আমাদের আদি বাড়ি আছে চুঁচুড়ায়। জগন্নাথ মন্দিরের কাছেই। রাস্তার ওপর। রায়বাড়ি বললে যে কেউ চেনে।”
“তাহলে তো তুমি আমার পাড়ার ছেলে হে”, বলেই হঠাৎ এক নিমেষে গম্ভীর হয়ে গিয়ে দেবাশিসদা আমায় প্রশ্ন করলেন, “তোমায় একটা কেস দেব, কিন্তু তার আগে যদি তোমায় একটু পরীক্ষা করে নি, তবে আপত্তি আছে?”
প্রথম কেস। হাতে টাকাপয়সা কিচ্ছু নেই। ফলে আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না। মাথা নাড়লাম।
“তোমার অফিসের নাম রে প্রাইভেট আই অ্যান্ড কোং। তুমি কি জানো, আজ থেকে একশো বছরের কিছু আগে ঠিক এই নামে, এই জায়গায় আর-একটা অফিস ছিল?”
“আজ্ঞে জানি।”
“সে কী? তুমি না বললে ইতিহাস নিয়ে তোমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই, আর এটা জেনে গেলে কী করে?”
“আমার ঠাকুরদার বাবার অফিস ছিল। স্বর্গীয় তারিণীচরণ রায়। তিনিও প্রাইভেট ডিটেকটিভ ছিলেন।”
অনেকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন দেবাশিসদা, বজ্রাহত মানুষের মতো। তারপর অদ্ভুত হেসে বললেন, “তুমি জানো না তুর্বসু, কতদিন ধরে তোমায় আমি খুঁজছি।”
“কেন?”
“সব বলব। আগে বলো ঠাকুরদার বাবার সম্পর্কে তুমি কী জানো।”
“খুব বেশি কিছু না। ঠাকুরদা ছোটো থাকতেই বড়দাদু নিরুদ্দেশ হয়ে যান। আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। বড়দাদুকে নিয়ে যতটা জানি, তা ওঁর ডায়রি থেকে।”
“তারিণীচরণের ডায়রি!!” প্রায় লাফিয়ে উঠলেন দেবাশিসদা। “সে জিনিস আছে তোমার কাছে?”
“আছে। ওটা দেখেই তো আমার গোয়েন্দাগিরির শখ জাগে। কিন্তু আপনি আমার বড়দাদুর কথা জানলেন কীভাবে?”
“সব বলব তোমায়। সে ডায়রি দেখা যায়? অক্ষত আছে?”
“আছে। ১৮৯০ থেকে ১৯০১, এই দশ বছরের নানা ঘটনার এন্ট্রি আছে। শুধু বছর দু-এক ছাড়া। ১৮৯২-৯৩-এর শেষ থেকে এন্ট্রি কে যেন ছিঁড়ে নিয়েছে। একই অবস্থা ১৮৯৫-৯৬-এর। ডায়রিটাই নেই।”
“এমন কেন? ডায়রি তো জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর অবধি হয়?”
“না, তারিণী বৈশাখ থেকে নতুন বাংলা ডায়রিতে লিখতেন। ফলে তাঁর ডায়রি এপ্রিল থেকে মার্চ, বৈশাখ থেকে চৈত্র।”
একটা কালো ছায়া দেবাশিসদার মুখে দেখতে পেলাম। খানিক ভেবে বললেন, “আমার কেস আমি তোমাকেই দেব।”
“এবার আমি একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
“অবশ্যই। তুমি গোয়েন্দা, তুমিই তো প্রশ্ন করবে হে।”
“আমাকেই কেন?”
আবার সেই অদ্ভুত একপেশে হাসি হেসে দেবাশিসদা বলেছিলেন, “কারণ তুমি তারিণীচরণের প্রপৌত্র। গোয়েন্দাগিরি তোমার রক্তে।”
সপ্তম পরিচ্ছেদ— তারিণীচরণ
১৩ ডিসেম্বর, ১৮৯২, কলিকাতা
পুলিশের ঝামেলা মিটিয়ে গণপতি যখন ছাড়া পেল, তখন প্রায় শেষ রাত। তাকে ছাড়ার আগে পুলিশ আবার তার বয়ান লিখে সই করিয়ে তবে ছাড়ল। শীতকাল বলে তখনও আলো ফোটেনি। এই সময়ে কোথায় ফিরবে বুঝতে পারছিল না সে। পাশের নহর থেকে ভিস্তিরা তাদের চামড়ার মশকে জল ভরছে। ভোরের আলো ফুটলেই রাস্তায় জল ছিটাবে। বৃষ্টি নেই, আকাশ মেঘলা। তবু জল ছিটানোর কী দরকার কে জানে। পথের ধুলো জলের সঙ্গে মাখামাখি হয়ে তাল পাকিয়ে কাদার মতো হয়ে আছে। দুই পা চললেই সেই চ্যাটচ্যাটে কাদা পায়ে জড়িয়ে জুতোর সঙ্গে উঠে আসে। কর্পোরেশনের ভ্রূক্ষেপ নেই। সাতপাঁচ ভেবে গণপতি আর দর্জিপাড়ার দিকে গেল না। বাকি রাত ক্লাইভ স্ট্রিটে তারিণীর অফিসেই কাটিয়ে দেবে। তারিণী নতুন অফিস খুলেছে। ডিটেকটিভ এজেন্সি। সারা দিনরাত ওখানেই পড়ে থাকে। বিয়ে করেনি। বাড়িতে বিধবা মা ছাড়া কেউ নেই। ইচ্ছে হলে এক-দুই দিন চুঁচুড়ায় দেশের বাড়িতে গিয়ে থেকে আসে। গণপতি ক্লাইভ স্ট্রিটের দিকেই পা বাড়াল। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধ জেতার পর লর্ড ক্লাইভ নিজেই এই রাস্তার নাম রাখেন ক্লাইভ স্ট্রিট। কোম্পানির কাউন্সিলের সদর দপ্তর এককালে পুরোনো ফোর্ট উইলিয়ামের মধ্যে ছিল। আর কেল্লা ছিল ক্লাইভ স্ট্রিটের মাঝবরাবর, প্রায় লালদিঘি অবধি। এই রাস্তা সোজা বড়বাজার অবধি যেত বলে ইংরেজরা একে ‘রোড টু গ্রেট বাজার’-ও বলত।

রে প্রাইভেট আই অ্যান্ড কোং-এর সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় বেশ কয়েকবার ধাক্কা মারার পর তারিণী দরজা খুলে দিল। চোখে ঘুম জড়ানো। প্রথমে গণপতিকে চিনতে পারছিল না। গণপতি বললে, “এত রাতে তোমায় বিপদে ফেললাম। এক কাণ্ড হয়েছে। ভিতরে গিয়ে বলছি, চলো।” তারিণী “এসো, এসো” বলে গণপতিকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করল। ঘরের ভিতর মিশকালো অন্ধকার। আজকাল গন্ধকের একধরনের কাঠি বেরিয়েছে। দেশলাই নাম। কিন্তু বাজে খরচা বলে লোকে ব্যবহার করে না। তারিণী হাতড়ে হাতড়ে চকমকি পাথর ঠুকে শোলা ধরাল। সেই শোলায় গন্ধকের সাদা কাঠি ঠেকিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সেই আগুনে শেষে একটা প্রদীপ জ্বালাল। ঘরে আলো হল কিছুটা। অফিসঘর বলতে যা বোঝায় তেমন কিছু না। একটা টেবিল, খান তিনেক চেয়ার, কিছু বই, ডাঁই করা পত্রিকা এলোমেলো রাখা। পাশে মাটিতে একটা গদি পাতা, তাতে একটা চাদর আর বালিশ। রাতের শয্যা।
চুঁচুড়া থেকে কলকাতায় এসে তারিণী প্রথমে নানারকম কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছিল। কিছুদিন রাধাবাজারে এক দোকানে খাতা লেখার কাজ করে। সেখানে বড্ড কম মাইনে দিত। খাটনিও বেশি। বুদ্ধিমান তারিণী নতুন চাকরি পেয়ে গেল। চাঁদপাল ঘাটে এক গুদামে মালের হিসেব রাখার কাজ। বেশ কিছু বছর আগে চন্দ্রনাথ পাল নামে একজন মুদির দোকানদার ছিলেন। যেসব ব্যবসায়ী আর দোকানদাররা এখানে নৌকা থেকে নামতেন, তাঁরা ওই দোকান থেকে জিনিস কিনতেন। তাঁর নামেই এই ঘাটের নাম হয় চাঁদপাল ঘাট। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদস্থ কর্মচারীরা এই ঘাটেই নামলে তাঁদের সম্মানে তোপধ্বনি করা হত কেল্লা থেকে। পরে লটারি কমিটি গঙ্গার ধার বরাবর পাকা রাস্তা বানিয়ে নাম দেয় স্ট্র্যান্ড ব্যাংক। এখন অবশ্য সবাই একে স্ট্র্যান্ড রোডই বলে। একপাশে সারি সারি গুদাম। সেখানেই একদিন ড্রিসকল সাহেবের সঙ্গে আলাপ। সাহেব তখন লালবাজারের পুলিশ ইনস্পেক্টর। তাঁর কাছে খবর ছিল বেআইনি পথে আফিম পাচার করা হচ্ছে কোনও একটা গুদাম থেকে। তিনি তারিণীকে পুলিশের খোঁচড় হওয়ার প্রস্তাব দেন। ভালো দস্তুরি। তারিণী চিরকাল অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে। সেও রাজি হয়ে যায়। কিছুদিন বাদেই বুঝতে পারে প্রদীপের তলাতেই অন্ধকার। সে যে গুদামে কাজ করে, সেখানেই তার নাকের ডগা দিয়ে নুনের বস্তায় আফিম পাচার হচ্ছে। যথারীতি ড্রিসকল সাহেবকে খবর দেওয়ায় তিনি গুদামের মালিককে বমাল গ্রেপ্তার করেন। তারিণী কুড়ি টাকা বকশিশ পেলেও তাঁর চাকরিটা যায়। ভালো দিক একটাই। ড্রিসকল সাহেবের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে সে। এরপর প্রায় দুই বছর পুলিশের খোঁচড় হিসেবে কলকাতা, চন্দননগর, চুঁচুড়া, কালনা কোথায় না গেছে? সাহেব চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ক্রিক রো-তে নিজের ডিটেকটিভ এজেন্সি খোলেন। তারিণী বছর দু-এক তাঁরই সহকারী হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু সাহেবের শরীর ভেঙে যেতে থাকল। মেমসাহেব মারা গেলেন। ছেলেরা ইংল্যান্ডে চলে গেল। সাহেব গেলেন না। রয়ে গেছেন এই দেশ আঁকড়ে। তবে এখন আর বেশি কেস নেন না। তিনিই নিজের হাতে তারিণীকে অফিস সাজিয়ে দিয়েছেন। এমনকি, তারিণী যে সুন্দর কাঠের চেয়ারটায় বসে, সেটাও সাহেবেরই দেওয়া। রোজ সকালে উঠে চেয়ারটাকে ভালো করে ন্যাকড়া দিয়ে মুছে তারপরই বসে।
“খাওয়াদাওয়ার কোনও ব্যবস্থা দেখছি না যে?” গণপতি প্রশ্ন করল।
“ও পাট আর রাখিনি ভাই। মোড়ের মাথায় একটা ছোটো দোকান খুলেছে। সকালের জলখাবার থেকে রাতের খাওয়া সব পাওয়া যায়। একটু বসো। তোমায় খাওয়াব। গুটকে কচুরি আর জিলিপি। গজাই ভাজে কতরকম। জিবেগজা, ছাতুর শুটকে গজা, কুচো গজা…” বলতে বলতেই গণপতির মুখের দিকে তাকিয়ে তারিণীর কথা বন্ধ হয়ে গেল। গণপতির মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর।
“কী হয়েছে গণপতি?”
“আজ একটা খুন হয়েছে। চিনা পাড়ায়। সেটা বড়ো কথা নয়। কিন্তু এই খুনে একটা বীভৎস ভয়ানক চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছি। কেন যেন মনে হচ্ছে এই খুন শেষের শুরু। পুলিশে আমার বিশ্বাস নেই। তুমি হালে গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছ। তোমায় সব খুলে বলতে এসেছি।”
“সিগারেট খাবে? মার্কোপোলোর টাটকা সিগারেট। সাহেব এক টিন দিয়েছেন।”
গণপতি মাথা নাড়ল। খাবে না। তারিণী নিজেই একটা ধরাল প্রদীপের আগুনে। তারপর বলল, “বলো কী বলবে?”
ঘণ্টাখানেক পরে যখন গণপতি তার কথা শেষ করল, তখন তারিণীর কপালেও চিন্তার ভাঁজ। আকাশেও সবে ভোরের আলো ফুটেছে।
“চিহ্ন বিষয়ে তুমি নিশ্চিত?”
“একশো শতাংশ।”
“তুমি পুলিশকে এই চিহ্নের অর্থ বলেছ?”
“বলেছি। কিন্তু বিস্তারিত কিছু বলিনি।”
“সে এক হিসেবে ভালোই করেছ। চিহ্নটা তো তোমার মনে আছে, এই কাগজে একটু এঁকে দেবে?” বলে একটা উড পেনসিল আর কাগজ এগিয়ে দিল।
গণপতি এঁকে দিতেই তড়িদাহত মানুষের মতো ছিটকে উঠল তারিণী। “এ কী! এই চিহ্ন তো আমারও চেনা!”
“তুমি চিনলে কীভাবে?”
“তিনদিন আগেই স্টেটসম্যান পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল। তাতে এই চিহ্ন দেখেছি।”
“বলো কী? আছে সেই পত্রিকা তোমার কাছে?”
“দাঁড়াও দেখি”, বলে হাঁটকেপাঁটকে তারিণী একটা ভাঁজ করা কাগজ নিয়ে এল। “এই দ্যাখো।”
বিজ্ঞাপন দেখে গণপতির একগাল মাছি। এই অনুষ্ঠানে যাবে বলেই তো সে কবে থেকে হাপিত্যেশ করছে। জাদুকর রবার্ট কার্টার আর চিন-সু-লিনের ম্যাজিকের বিজ্ঞাপন। করিন্থিয়ান থিয়েটারে।
তারিণীকে সেটা বলতেই সে বলল, “তাহলে তো ভাই আমাকেও তোমার সঙ্গে যেতে হয়। যা বুঝতে পারছি, খুনের একটা বড়ো সূত্র এই ম্যাজিশিয়ান সাহেবের শো-তে লুকিয়ে আছে। এই ডিভোর্সের কেস আর ভালো লাগছে না। নতুন কিছু চাই। আজ মঙ্গলবার। সামনের শনিবার শো আছে। তারপর সাহেব আর কটা শো করবেন ঠিক নেই। চলো সামনের শনিবার যাওয়া যাক।”

“কিন্তু টিকিট? আর দাম? আমার কাছে তো কানাকড়িও নেই ভাই।”
“সে আমি ড্রিসকল সাহেবের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করব। আর টিকিটের এক টাকা নিয়ে চিন্তা কোরো না। সাহেব মেমসাহেবদের ডিভোর্স করিয়ে করিয়ে যা রোজগার করেছি, তাতে এই টাকা আমিই দিতে পারব। বরং তোমায় ধন্যবাদ। এতদিনে সত্যিকারের একটা কেস পেলাম। তুমি বসো। মোড়ের দোকানটা খুলেছে বোধহয়। আমি জলখাবার নিয়ে আসি।” গণপতি স্থির দৃষ্টিতে হাতের বিজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে রইল।
অষ্টম পরিচ্ছেদ— কিছু বিচ্ছিন্ন প্রশ্ন
২০ জুন, ২০১৮, কলকাতা
প্রায় ঘণ্টা তিনেক বসে থাকার পর থানার সামনে একটা গাড়ি এসে থামল। সামন্ত অবশ্য এই সময়ে আমাকে দুবার চা বিস্কুট খাইয়েছেন। লাল চা। চন্দননগর থেকে তিনজন এসেছেন। তাঁদের মধ্যে একটু উচ্চপদস্থ যাকে মনে হল, তিনি সামন্তকে বললেন, “আমরা একটু ইন্টেরোগেশান করব। ঘরটা খুলে দিন।”
আগে কোনও দিন থানার ইন্টেরোগেশান রুম দেখিনি। সিনেমায় যা দেখেছিলাম তাতে আমার স্থির ধারণা ছিল একটা অন্ধকার ঘর, যাতে ঢুকিয়ে আগাপাশতলা পেটানো হয়। সত্যি বলতে কী, পেটের ভিতরটা কেমন গুড়গুড় করছিল। গল্পের গোয়েন্দাদের পেট গুড়গুড় করে না। ফেলুদা বা ব্যোমকেশকে কোনও দিন পুলিশের সামনে ঘাবড়ে যেতে দেখিনি। আমারও যাওয়া উচিত নয়, এইসব ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। একবার ভাবলাম ফেলুর মতো দারুণ স্মার্ট কিছু একটা বলে পুলিশকে চমকে দেব, বদলে মুখ দিয়ে বেরোল, “একটু বাথরুমে যাব স্যার?”
“হ্যাঁ, অবশ্যই।”
এক কনস্টেবল আমাকে টয়লেটের পথ দেখিয়ে দিল। হিন্দি সিনেমায় গোয়েন্দা এই টয়লেটের ছোটো জানলা গলেই পালিয়ে যায়। কিন্তু এই টয়লেটের কোনও জানলা ছিল না। খুব উপরে একটা ছোটো ঘুলঘুলি, যা দিয়ে মোটাসোটা একটা ইঁদুরও গলতে পারবে কি না সন্দেহ।
বেরিয়ে আসার পর ইন্টারোগেশান রুমে নিয়ে যাওয়া হল। একটা টেবিল। দু-তিনটে চেয়ার। একপাশে রেকর্ডার। আলোতে ঝলমল অফিস রুমের মতোই। মানে যেমন ভেবেছিলাম তা নয়। মনে একটু সাহস এল। চন্দননগরের অফিসার একটু হেসে বললেন, “চা খাবেন?”
পুলিশ কিছু অফার করলে না বলতে নেই। তাই উপরে নিচে মাথা নাড়লাম।
“আপনি তুর্বসু রায়? প্রাইভেট ডিটেকটিভ?”
আবার একইভাবে মাথা নাড়লাম। খবর নিয়েই এসেছেন বোঝা গেল।
“আপনি এত ঘাবড়াচ্ছেন কেন বলুন তো? আপনাকে তো খুনের দায়ে গ্রেপ্তার করছি না। শুধু কয়েকটা হেল্প চাইছি। যিনি খুন হয়েছেন, দেবাশিস গুহ, লাস্ট কয়েক বছর আপনি তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ইন ফ্যাক্ট, অন্য কারও সঙ্গে তাঁর সেরকম কোনও সম্পর্ক ছিল না। আপনি বুদ্ধিমান ছেলে, নিজে গোয়েন্দাগিরি করেন, তাই যদি কিছু সাহায্য করতে পারেন এই কেসে…”
পেটের গুড়গুড়ানিটা কমছিল ধীরে ধীরে। সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, “কখন খুন হলেন দেবাশিসদা? কীভাবে?”
“সব বলব, তার আগে আপনি কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দিন। দেবাশিসবাবুর সঙ্গে আপনার প্রথম আলাপ কতদিন আগে?”
“বছর দু-এক… ২০১৬-র জুন মাসে আমি প্রথম ওঁর বাড়ি যাই।”
“মানে পুরো দুবছর। তা যোগাযোগ হল কীভাবে?”
“আমি আনন্দবাজারে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম। সেটা দেখেই দেবাশিসদা আমায় ডেকে কেস দেন। আমার প্রথম কেস।”
“কী কেস?”
“ওঁর বউকে ফলো করার। উনি সন্দেহ করছিলেন, ওঁর বউ অন্যের সঙ্গে প্রেম করে। প্রমাণ পাচ্ছিলেন না। আমি ওঁর বউকে সাতদিন ফলো করে গোপন ক্যামেরার ছবি তুলে ওঁকে দিই। সেই ছবির সূত্রেই নাকি উনি ডিভোর্স কেসটা ফাইল করছিলেন।”
“কী ছবি তুলেছিলেন?”
“ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কলিগের ছবি। সাউথ সিটিতে, ভিক্টোরিয়ায়… একটা চুমু খাওয়ার ছবিও তুলেছিলাম।”
“বাঃ, বেশ করেছিলেন। আপনি ওঁর স্ত্রীর নাম জানেন?”
“হ্যাঁ, অপর্ণা গুহ।”
“আর ওই প্রেমিকের নাম?”
“সুতনু ব্যানার্জি।”
“আপনি ওঁর স্ত্রীকে চিনলেন কী করে? ওঁর বাড়িতে দেখেছিলেন?”
“না, দুদিন গেছি ওঁর ডিভোর্সের আগে। বউদি বাড়ি ছিলেন না। আমাকে দেবাশিসদা বউদির ছবি দিয়েছিলেন।”
“আচ্ছা, কেস নেওয়ার আগে যে ক্লায়েন্টের বিষয়েও খোঁজ নিতে হয়, সেটা কি আপনার জানা আছে গোয়েন্দা মশাই?”
“মানে?”
“মানে আপনার ক্লায়েন্ট, দেবাশিস গুহকে নিয়ে কিছু খোঁজখবর নিয়েছেন কি?”
“না… মানে...”
“নাকি, আপনি সেই… আমি দোকানদার, খদ্দের আমার ভগবান… এই নীতিতে বিশ্বাস করেন?”
এবার বেজায় রাগ হল। প্রাইভেট ডিটেকটিভ বলে যা খুশি বলে যাবে নাকি?
“কী বলতে চান পরিষ্কার করে বলুন তো!”
“পরিষ্কার করে শুনে রাখুন”, ভদ্রলোকের গলায় এখন বেশ ধার, যদিও মুখটা হাসি হাসি, “এখনও আপনার সামনে অনেক পথ চলা বাকি। এরপর থেকে কোনও কেস এলে আগে ক্লায়েন্ট সম্পর্কে খোঁজ নেবেন। এখানেও যদি খোঁজ নিতেন তবে জানতেন, আপনার সঙ্গে আলাপের দেড় বছর আগে ২০১৪-তে অপর্ণা গুহ তাঁর স্বামীর নামে চন্দননগর থানায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশের কাছে এসে হাতে পায়ে ধরে দেবাশিস গুহ রক্ষা পায়। তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল রেড লাইট এরিয়ার, আমাদের কাছে খবর আছে। মুচলেকা দেবার পরও বউয়ের ওপর অত্যাচার কমেনি। সে বেচারি ২০১৬-র শুরুতে আর না পেরে বাপের বাড়ি থাকা শুরু করে। আর হ্যাঁ, ডিভোর্সের কেসটা অপর্ণাই করেন, দেবাশিস না। দেবাশিসবাবু খুব চেষ্টা করেছিলেন কেসটা যাতে না হয়। হলে তো খোরপোশ দিতে হবে… মানে আপনি যখন দেবাশিসবাবুর বাড়ি গেছিলেন, তখন অলরেডি কেস এবং সেপারেশান চলছে।”
মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। “তাহলে আমাকে পয়সা দিয়ে অ্যাপয়েন্ট করার মানে কী?”
“সেটাই তো আমরাও জানতে চাইছি। সেপারেশান চলাকালীন সুতনু ব্যানার্জির সঙ্গে অপর্ণার একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এখন ওরা বিয়ে করে সুখে সংসার করছে। জানেন সেটা?”
মাথা নাড়লাম। জানি না। জানার কথা মাথাতেও আসেনি। ছবি তুলে দেবার পর সেটা নিয়ে দেবাশিসদা কী করেছেন জানার আগ্রহ হয়নি। উনি যখন যা বলেছেন বিশ্বাস করে গেছি।
“এবার বলুন দেখি, যার ডিভোর্স কেস চলছে সে আবার নতুন করে বউ-এর পিছনে গোয়েন্দা লাগাবে কেন?”
“হয়তো কেস জোরদার করতে... ওঁর মনে হয়েছিল স্ত্রীর সঙ্গে অন্য পুরুষের সম্পর্ক আছে প্রমাণ করতে পারলে কেসটা ওঁর পক্ষে জোরদার হবে।”
অফিসার এবার সোজা আমার চোখে চোখ রেখে তাকালেন। তারপর বললেন, “কাদাটা ঘাঁটব না ভেবেছিলাম। ঘাঁটতে বাধ্য করলেন। কিছুই যখন জানেন না, এটাও নিশ্চয়ই জানেন না যে দেবাশিস গুহর বিরুদ্ধে অপর্ণা গুহর অভিযোগ ঠিক কী ছিল। দেবাশিস ওঁকে বাধ্য করতেন দেবাশিসের বন্ধুদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতে। অপর্ণার ইচ্ছের বিরুদ্ধে। আর… আর নিজে সেইসব ছবি তুলে রাখতেন। সে তুলনায় আপনার তোলা ছবি তো নস্যি... ও দিয়ে কী হবে?”
আমি চুপ।
অফিসার এবার একেবারে কেটে কেটে বললেন, “বুঝতেই পারছেন, ডিভোর্সের ব্যাপারটা একেবারে বাহানা ছাড়া কিছু না। আপনার মতো আনাড়ি গোয়েন্দা ছাড়া যে কেউ দুদিনে ধরে ফেলত। হয়তো সেজন্যেই আপনাকে ডেকেছিলেন। জানতেন আপনি ধরতে পারবেন না। প্রথম ক্লায়েন্ট পেয়ে আনন্দে উদ্বাহু হয়ে নাচবেন। কত টাকা নিয়েছিলেন এই কাজের জন্য?”
“দশ হাজার”, মিনমিন করে বললাম।
“রসিদ দিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“গুড। যাই হোক, আমি আবার আমার প্রশ্নটা করছি, ভালো করে ভেবে জবাব দিন। কী মনে হয়, এত গোয়েন্দা থাকতে ঠিক কেন আপনাকেই ডেকেছিলেন দেবাশিস গুহ?”
নবম পরিচ্ছেদ— করিন্থিয়ান থিয়েটার
(সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয় পত্রিকায় প্রকাশিত চিঠি, ১৮.১১.১৮৯২)
মহাশয়,
আপনার ৩০শে অক্টোবর তারিখে প্রকাশিত একটি পত্রে জনৈক শ্রী হরিদাস সাহা সর্ব্বরী মহাশয় কলিকাতাস্থিত করিন্থিয়ান থিয়েটারের বিষয়ে মন্তব্য করিয়াছেন, “ইহার মালিক কোন লণ্ডনের সাহেব হইতে পারেন।” ইহা সম্পূর্ণরূপে ভুল তথ্য। ভারতবাসীগণের গর্বের বিষয় ইহা কোন সাহেব কর্তৃক স্থাপিত নহে, নিতান্ত এক স্বদেশীয় ব্যবসায়ী ইহার স্থাপনা করিয়াছেন। তাঁহার নাম জামসেদজি ফ্রামজি মাদান। যতদূর জানিতে পারিয়াছি, এই মাদানের জন্ম সিপাহী বিদ্রোহের সালে, ২৭ এপ্রিল বোম্বের এক পারসী পরিবারে। পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে মাত্র এগারো বৎসর বয়সে তিনি বিদ্যালয়ের পাট চুকাইয়া এলফিনস্টোন ড্রামাটিক ক্লাবে প্রপ বয়ের চাকুরি লন। ১৮৭৫ সালে ইহা অ্যামেচার থিয়েটার হইতে প্রফেশনাল থিয়েটারে পরিণত হইলে বোম্বে ত্যাগ করিয়া গোটা ভারতবর্ষ ঘুরিয়া ঘুরিয়া ইহারা নাট্য প্রদর্শন করিতেন। ১৮৮২ তে মাদান স্বয়ং থিয়েটারের সংস্রব ত্যাগ করিয়া করাচীতে একটি ব্যবসা শুরু করেন। শোনা যায় ওই বৎসরই তিনি কলিকাতায় চলিয়া আসেন। কলিকাতায় আসিয়া চাঁদপাল ঘাটে জাহাজে মাল আমদানী রপ্তানীর গুদাম কিনেন। এক্ষণে ভাগ্যলক্ষ্মী মাদানের সহায় হন। কিন্তু আফিম সংক্রান্ত কিছু গণ্ডগোলের সূত্রপাত হওয়ায় তিনি অন্য ব্যবসার দিকে মনোনিবেশ করেন। তদুদ্দেশ্যেই প্রখ্যাত করিন্থিয়ান হলটি খরিদ করিয়া তিনি থিয়েটারের রূপদান করেন এবং করিন্থিয়ান থিয়েটার নাম প্রদান করেন।
এই থিয়েটারটি এক্ষণে পারসী নাট্য-গীত চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। শুধু তাহাই নহে সাহেবগণও এই থিয়েটারে আপনাপন কসরত দেখাইতে ব্যগ্র। এই থিয়েটার অন্যান্য দেশীয় অপেরা এবং থিয়েটার অপেক্ষা শতগুণে উত্তম। ইহাতে প্রবেশ করিলে ধরায় অমরাভ্রম হইয়া থাকে। কলিকাতায় এই একটিমাত্র থিয়েটার যাহাতে বৃহৎ টানাপাঙ্খার ব্যবস্থা থাকায় প্রখর গ্রীষ্মেও দর্শক সাধারণের কিঞ্চিন্মাত্র অসুবিধার সৃষ্টি হয় না।
এদানি শুনা যাইতেছে লন্ডনের বিখ্যাত বাজিকর কার্টার সাহেব অতি শীঘ্র এই থিয়েটারে আসিয়া আপন জাদুবিদ্যা প্রদর্শন করিবেন। কার্টার সাহেব বিশ্বের সেরা জাদুকর বলিয়া খ্যাত এবং উহার “পলায়নী বিদ্যা” যাহারা দেখিয়াছে, বলিয়াছে এমনটি আর হয় না। আপামর কলিকাতাবাসী এই অপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হইবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছে।
শ্রী মহেন্দ্রনাথ দত্ত
সিমলা, কলিকাতা
দশম পরিচ্ছেদ— মৃতের পরিচয়
১৩ ডিসেম্বর, ১৮৯২, কলিকাতা
চিনা পাড়ার কাজকর্ম মিটিয়ে প্রিয়নাথ দেখল ভোর হয়ে গেছে। কিন্তু তার কাজ শেষ হয়নি। মৃতদেহ পাঠানো হয়েছে মেডিক্যাল কলেজের শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষে। এককালে সাহেবসুবোরাই একমাত্র এই ঘরে ঢোকার অনুমতি পেতেন। গোটা দৃশ্যটা বদলে দেন একজন বাঙালি। মধূসুদন গুপ্ত। ১৮৩৬ সালের ২৮শে অক্টোবর তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। দ্য ইংলিশম্যান পত্রিকা খুব নাটকীয়ভাবে এই খবর ছেপেছিল। বাংলা করলে তা এইরকম—
‘মানবদেহ ব্যবচ্ছেদকারী প্রথম ভারতীয়’
২৯ অক্টোবর, ১৮৩৬: কলিকাতায় এ এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী খবর। মেডিকেল কলেজের সকল ফটকগুলা আবদ্ধ করিয়া দেওয়া হইয়াছে, পাছে এই বিধর্মী কাজ বন্ধ করিবার উদ্দেশ্যে প্রাচীনপন্থীরা কলেজে আক্রমণ চালায়। মেডিকেল কলেজের শব রাখিবার ঘরে ভিড়, উপস্থিত রহিয়াছেন কলেজের সকল ইংরেজ অধ্যাপক ডাক্তার। সঙ্গী ছাত্রবন্ধুরা ভিড় করিয়া রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করিতেছেন। সমস্ত ক্যাম্পাস ফাঁকা, সকলে শবঘরের নিকটে ভিড় করিয়া আসিয়াছেন। নির্দিষ্ট সময়ে ডাক্তার গুডিভের সহিত দৃপ্তপদে কক্ষে প্রবেশ করিলেন একদা সংস্কৃত কলেজের আয়ুর্বেদ বিভাগের ছাত্র পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত। বর্তমানে পণ্ডিত গুপ্ত একইসঙ্গে মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক এবং ছাত্র। ডাক্তারি শাস্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ সার্জারি, যাহা বর্ণহিন্দুদের গোঁড়া কুসংস্কারের জন্য ভারতে এখনও করা সম্ভব হয় নাই, সেই কাজটিই আজ করিতে আসিয়াছেন পণ্ডিত গুপ্ত, তাঁহার হস্তে একটি শব ব্যবচ্ছেদ করিবার তীক্ষ্ণ ছুরি।
মধুসূদন বিনা দ্বিধায় শবের দিকে অগ্রসর হইলেন। শবদেহের নির্ভুল স্থানে ছুরিটি প্রবেশ করাইলেন তিনি। মুখে কোনও আড়ষ্টতা বা অস্থিরতার চিহ্নমাত্র নাই। অত্যন্ত নিখুঁত এবং সুন্দরভাবে সম্পন্ন করিলেন শব ব্যবচ্ছেদের কাজ। ভারতবর্ষের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিজ্ঞানী সুশ্রুতের পরবর্তীতে এই প্রথম মানবদেহ ব্যবচ্ছেদ হইল। নিষেধের জগদ্দল ভার সরাইয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভারত এক নতুন যুগে প্রবেশ করিল।
সেই থেকে ১৮৫৬ সালে মৃত্যুর আগের দিন অবধি শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করে মধুসূদন গুপ্ত রোগের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এখন শব ব্যবচ্ছেদ কক্ষের মূল দায়িত্ব ডাক্তার জন মার্টিনের হাতে থাকলেও ডাক্তার গুপ্তের শিষ্যরা, বিশেষ করে রাজকৃষ্ণ দে এই কক্ষটির দেখাশোনা করেন। রাজকৃষ্ণর সঙ্গে প্রিয়নাথের বিশেষ সদ্ভাব ছিল। আগে কোথায় যাবে, লালবাজার, না মেডিক্যাল কলেজ? দোনোমনা হয়ে শেষে লালবাজারে টমসন সাহেবের সঙ্গে দেখা করতেই রওনা দিল প্রিয়নাথ।
সাহেব নিজের অফিসঘরেই ছিলেন। আর্দালি প্রিয়নাথের আসার সংবাদ দিতেই তিনি প্রিয়নাথকে ডেকে নিলেন ভিতরে। সাহেবের মুখ থমথম করছে। প্রিয়নাথকে দেখেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “বলো কী দেখলে?”
প্রিয়নাথ আনুপূর্বিক গোটা ঘটনা সাহেবের কাছে বলল, বুকের উপর চিহ্ন সমেত। শুনে টমসন সাহেবের মুখের ছায়া আরও গাঢ় হল।
“এখন কী করবে ভাবছ?”
“আপনি যা বলবেন…”
“তবে এক কাজ করো। একটু বিশ্রাম নিয়ে মেডিক্যাল কলেজে চলে যাও। গিয়ে একবার রাজকৃষ্ণর সঙ্গে দেখা করো। দ্যাখো শব ব্যবচ্ছেদে কিছু বোঝা যায় কি না। আর হ্যাঁ, সকাল থেকে পত্রিকা দেখার সময় পেয়েছ?”
“না স্যার।”
“এই দ্যাখো।” বলে একটা ভাঁজ করা স্টেটসম্যান এগিয়ে দিলেন টমসন।
অবাক বিস্ময়ে প্রিয়নাথ দেখল, তাতে ছোটো করে হলেও চিনা পাড়ার খুনের খবর লেখা।
“এ কী করে হল স্যার! আমিই তো পৌঁছোলাম রাত এগারোটায়!”
“তার আগেই কেউ বা কারা সংবাদটা স্টেটসম্যানে পৌঁছে দিয়েছে, দায়িত্ব নিয়ে। আমি নিজে স্টেটসম্যান দপ্তরে খোঁজ নিয়েছি। গতকাল সন্ধে সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে ওঁদের অফিসের বাইরের ডাকবাক্সে কেউ একটা কাগজের টুকরো ফেলে গেছিল। তাতে চিনা পাড়ায় খুনের খবর লেখা। সম্পাদক আমার পরিচিত। তিনি বলেছেন চিঠিটা আমাকে পাঠাবেন।”
“সময়টা কীভাবে জানা গেল স্যার?”
“প্রতি আধঘণ্টা অন্তর ওঁরা ডাকবাক্স ক্লিয়ার করেন। সাড়ে সাতটার ডাকে কাগজটা ছিল।”
“তার মানে মৃতদেহ খুঁজে পাবার আগেই কেউ খবর দিয়েছে পত্রিকা অফিসে। সেটা কী করে সম্ভব?”
“মানে একটাই। যে খবর দিয়েছে সে হয় নিজে খুনি, বা খুনির স্যাঙাত, নয় খুন হতে দেখেছে।”
“কিন্তু খুন হতে দেখলে পুলিশের কাছে না এসে পত্রিকার অফিসে খবর দেবে কেন?”
“পুলিশকে এখনও এ দেশের নেটিভরা একটু এড়িয়েই চলে, সেটা মানো তো? আমি তা ভাবছি না। ভাবছি একটা খুনের খবর দিলে আমাদের ব্রিটিশ সরকার তো ভালো পুরস্কার দেন। সেই সুযোগ সে নিল না কেন?”
“তাহলে তো…”
“হ্যাঁ, তাহলে যে সম্ভাবনাটা পড়ে থাকে, সেটা হল খুনি নিজেই খবরটা দিয়েছে। আর যদি সেটাই হয়, তবে সে ব্যাপারটা গোপন রাখতে চাইছে না। সে চাইছে সবাই এটা জানুক কিংবা সে কাউকে একটা বার্তা দিতে চাইছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, সেটা হলে এটা সবে প্রথম খুন।”
শিউরে উঠল প্রিয়নাথ। ঠিক এই কথাটাই গণপতি কয়েক ঘণ্টা আগে বলেছিল না! “এক হাজার বাধার মধ্যেও সঠিক পথ”...
“এবার আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি স্যার?” প্রিয়নাথ বলল।
“বলো...”
“কাল আপনি নিজে আমায় টেলিগ্রাম করেছিলেন। মানে এই খুন কোনও সাধারণ খুন না। যে খুন হয়েছে আপনি তাকে চেনেন?”
সরাসরি জবাব না দিয়ে টমসন সাহেব প্রিয়নাথকে পালটা প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা প্রিয়নাথ, তুমি তো মৃতদেহ দেখেছ। তোমার কী ধারণা?”
“মৃত ব্যক্তি পুরুষ, বয়েস কুড়ি-বাইশ। ইউরোপীয়। সোনালি চুল, জটপাকানো। দাড়িও অযত্নে রাখা। কাটা নয়। এখন একটাই কাজ। মৃতদেহের পরিচয় খুঁজে বার করা।”
ম্লান হাসলেন টমসন সাহেব।
“সে কাজটা আমিই তোমার হয়ে করে দিচ্ছি বরং। তুমি অকুস্থলে পৌঁছোনোর আগেই মৃতের পরিচয় আন্দাজ করা গেছে। গতকাল সকাল থেকেই তাঁকে পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে গোপনে খোঁজ একটা চলছিল, তোমার জানা নেই।”
“গোপনে কেন?”
গলা প্রায় খাদে নামিয়ে ফিসফিসে স্বরে টমসন সাহেব বললেন, “মৃতের নাম পল কিথ ফিসমোরিস ল্যান্সডাউন। আমাদের বড়োলাট ল্যান্সডাউনের আপন খুড়তুতো ভাই।”
একাদশ পরিচ্ছেদ— “প্রিয়নাথের শেষ হাড়”
২০ জুন, ২০১৮, কলকাতা, চন্দননগর
মাথাটা কেমন তাজ্জিম তাজ্জিম করছিল। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এই ভদ্রলোক কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন? কিন্তু তা তো মনে হচ্ছে না। আর যদি তা না হয়, দেবাশিসদা, যাঁকে আমি প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতাম, ভালোও বাসতাম, আমাকে বড়োসড়ো মুরগি বানিয়ে গেছেন, আর সেটা আমি টেরও পাইনি। মিনমিনে গলায় জানালাম আমি এসবের কিছুই জানতাম না।
“সে কী... আপনি না গোয়েন্দা! প্রাইভেট ডিটেকটিভ!! কিছুই বোঝেননি এত কিছু ঘটে গেছে?”
উত্তর দিলাম না।
পুলিশ অফিসার বললেন, “আপনাকে একটু আমাদের সঙ্গে চন্দননগর যেতে হবে। আপত্তি নেই নিশ্চয়ই। আর থাকলেও কিছু করার নেই।”
“আমি গিয়ে কী করব?”
“সেটা গেলেই বুঝতে পারবেন।”
আগে পুলিশের গাড়ি মানেই ছিল লড়ঝড়ে জিপ। এখন অবস্থা বদলেছে। দামি এসইউভি চড়িয়ে আমাকে নিয়ে চলল চন্দননগরের দিকে। বেরোবার আগে সামন্ত আবার একগাল হেসে বলল, “বাইকটা রইল তাহলে। সময় করে ছাড়িয়ে নিয়ে যেয়ো।”
গাড়ির ভিতরে চড়া এসি। তাতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম হচ্ছিল। দুপুর অবধি কিচ্ছু না, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় কী হয়ে গেল। অফিসার পাশেই বসে বসে ফেসবুক স্ক্রল করছিলেন। মুখে কথা নেই। বুকের ব্যাজ থেকে বুঝলাম ওঁর নাম এ মুখার্জি। উনি এখন বাঁকুড়ার কোন একটা অশ্লীল জোকসের পেজে জোকস পড়ছেন, মিম দেখছেন আর মাঝে মাঝে হ্যা হ্যা করে হাসছেন। অসহ্য লাগছিল।
চন্দননগর যখন পৌঁছোলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা। বড়বাজারের দৈনিক ভিড় এড়িয়ে ডানদিকের গলিতে দেবাশিসদার বাড়ির সামনে তখনও কিছু লোকের জটলা। বাড়ির সামনে পুলিশ দাঁড়িয়ে। অফিসার আমাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকতে গেলে কনস্টেবল রাস্তা ছেড়ে দিল। ভিতরে ঢুকে অফিসার প্রথমবার কথা বললেন, “আপনার মনের জোর কেমন?”
“ভালো বলেই তো জানি।”
“তবে শুনুন, দোতলায় উঠে যা দেখবেন, মাথা ঠান্ডা রাখবেন। অলরেডি দুজন কনস্টেবল অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের হাসপাতালে পাঠিয়েছি। আর-একজন যেন সেই লিস্টে যোগ না হয়।”
“কেন, কী হয়েছে?”
“সেটা নিজের চোখেই দেখতে পাবেন। কিন্তু একটাই রিকুয়েস্ট, শক্ত থাকবেন।”
খুব চেনা লাল সিমেন্টে বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। এবার ডানদিকে বেঁকলেই দেবাশিসদার বসার ঘর কাম লাইব্রেরি। যতবার এসেছি, এই ঘরেই বসেছি। এবার ঢুকতেই যে চমক খেলাম তেমন ইহজন্মে আর খাইনি। আলমারিগুলো প্রায় খালি। সব বই টেনে মাটিতে এনে ছড়িয়ে ফেলা হয়েছে। আর সবকিছুর মাঝখানে… দেবাশিসদা বসে আছেন।
হ্যাঁ, বসে আছেন। তাঁর বেতের চেয়ারটাতে। কিন্তু সেই চেয়ারের তলার বেত ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাটা। দেবাশিসদার হাত দুটো পিছনে পিছমোড়া করে বাঁধা। পা দুটোও শক্ত নাইলনের দড়ি দিয়ে কেউ বা কারা বেঁধেছে। মুখের ভিতর একটা কাপড় গোঁজা, যেটা হয়তো একসময় সাদা ছিল, কিন্তু এখন বাদামি রং নিয়েছে। চেয়ারের চারিদিকে মেঝেতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। দেবাশিসদার শরীরে এক টুকরো সুতোও নেই। সম্পূর্ণ উলঙ্গ। আর গোটা শরীরে অগুনতি কাটার দাগ। কেউ যেন মারার আগে খুব সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে ওঁর সারা গায়ের বিভিন্ন জায়গা থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নিয়েছে বিভিন্ন আকারে। চেয়ারের ঠিক নিচেই থকথকে জেলির মতো রক্ত জমে আছে। তাতে ভনভন করছে মাছির দল। আর তখনই খেয়াল করলাম যেখানে দেবাশিসদার অণ্ডকোশ থাকার কথা, সেটা নেই। কোনও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেউ কেটে নিয়েছে। তবে এগুলো কিছুই না। দেবাশিসদার মৃত্যু হয়েছে অন্য কারণে। ওঁর বুক থেকে বেরিয়ে আসা ড্রাগনের মুখ খোদাই করা প্রায় আড়াই ইঞ্চি ড্যাগারের হাতলটা আমি চিনি। কিউরিও শপ থেকে কয়েক মাস আগেই কিনে এনেছিলেন। আমাকে দেখিয়েওছিলেন।

“খুব সস্তায় পেয়ে গেলাম। মাত্র পাঁচ হাজারে। লোভ সামলাতে পারলাম না ভাই।” বলেছিলেন, মনে আছে।
কেউ প্রচণ্ড অত্যাচার করেছে প্রায় সারারাত ধরে। তারপর খুন করেছে দেবাশিসদাকে। কিন্তু কেন? কতটা আক্রোশ থাকলে একজন মানুষকে এইরকম নৃশংস ভাবে মারা যায়? তাহলে কি দেবাশিসদা কিছু জানতেন? খুব গোপন কিছু? যাতে কেউ বা কারা নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে তাঁকে খুন করল? বুঝতে পারছি না। মাথাটা ঘুরে গেল। আমি পাশেই একটা চেয়ারের হাতল ধরে কোনও মতে ব্যালান্স রাখলাম।
“জল খাবেন?”
মাথা নাড়লাম। খাব।
“চলুন, পাশের ঘরে চলুন।”
এই ঘরটাও আমার চেনা। একবারই এসেছিলাম। দেবাশিসদার বেডরুম। আগে বিছানার মাথায় ওঁর আর বউদির একটা ছবি ছিল। বাঁধানো। এখন আর নেই। আমি খাটে বসলাম। একজন কনস্টেবল প্লাস্টিকের বোতলে জল এনে দিল। প্রায় অর্ধেকটা খেয়ে নিলাম এক নিঃশ্বাসে। একটু যেন স্বাভাবিক হলাম।
“লিং-চি। সহস্র আঘাতে মৃত্যু।” প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম আমি।
“মানে?”
“দেবাশিসদাকে যেভাবে খুন করা হয়েছে... চিনাদের অতিপ্রাচীন এক হত্যার পদ্ধতি। নাম লিং-চি। এতে অপরাধীকে কষ্ট দিয়ে দিয়ে মারা হয়। তার সারা শরীর থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। জ্যান্ত থাকতে থাকতে। শেষে তার পুরুষাঙ্গ কেটে তার বুকে ছোরা ঢুকিয়ে তার ভবলীলা সাঙ্গ করা হয়।”
এতক্ষণে অফিসার বোধ করি আমাকে একটু সিরিয়াসলি নিলেন।
“আপনি শিওর?”
“হ্যাঁ। আমি জানতাম না। কিছুদিন আগে টেলর সুইফট-এর একটা গান বেরিয়েছে। পপ গান। নাম ‘Death By A Thousand Cuts’। কেন অমন অদ্ভুত নাম, তা দেখতে গুগল করে এই লিং-চি র নাম জানতে পারি। ১৯০৫ সালে চিনা সরকার আইন করে এই অত্যাচার বন্ধ করে দেয় ও একে বেআইনি ঘোষণা করে। কিন্তু দেবাশিসদাকে এভাবে কারা মারল, কেন মারল, সেটাই মাথায় আসছে না।”
“কাল রাত বারোটা তেইশে দেবাশিসবাবু আপনাকে হোয়াটসঅ্যাপ করেন। মোবাইলটা ওঁর টয়লেটে ছিল। লুকানো। খুব সম্ভব আততায়ীরা আসছে সেটা উনি টের পেয়েছিলেন, কিংবা ওঁদের থেকে কিছু সময় চেয়ে নিয়েছিলেন টয়লেট যাবেন বলে। সেখান থেকেই উনি আপনাকে মেসেজ করেন। আপনি পেয়েছেন তো সেটা?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু কম আলো আর হাত কেঁপে গেছিল। তাই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। অনেক কষ্টে শুধু ‘প্রিয়নাথের...’ কথাটা বুঝতে পেরেছি।”
“সেখান থেকে কিছু আন্দাজ করতে পেরেছেন কি?”
“কিচ্ছু না।”
“আচ্ছা, প্রিয়নাথের শেষ হাড় বললেও কিছু রিং করছে না?”
আবার মাথা নাড়লাম। না।
অফিসার এবার উঠে পাশের ঘরে গেলেন। নিয়ে এলেন প্লাস্টিকের ফয়েলে মোড়া একটা ছেঁড়া কাগজের টুকরো। দেখে মনে হয় কোনও রুলটানা খাতার থেকে দ্রুত ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। ধারগুলো অসমান।
অফিসার আমার চোখের সামনে সেই কাগজটা ধরলেন।
“ফোনের ফ্লিপ কভারের পিছনে এটা লুকানো ছিল। প্রথমে কেউ পায়নি। পরে কভার খুলতেই চোখে পড়ে। আর তখনই আপনার খোঁজ শুরু হয়।”
দেখলাম। এটাই আমাকে পাঠিয়েছিলেন দেবাশিসদা। জীবনের শেষ মেসেজে। কিন্তু এ কী! এ তো ছড়ার মতো কিছু একটা! কাগজে লেখা-
“প্রিয়নাথের শেষ হাড়
মুরের কাব্যগাথা
গণপতির ভূতের বাক্স
তারিণীর ছেঁড়া খাতা
তুর্বসু জানে।”
খুব ঠান্ডা গলায় এবার পুলিশ অফিসার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “সবই তো দেখলেন, বুঝলেন। এবার ঝেড়ে কাশুন তো! আপনি ঠিক কী জানেন?”
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ— লাশকাটা ঘরের লোকটা
১৩ ডিসেম্বর, ১৮৯২, কলিকাতা
প্রিয়নাথ ঠিক করল নিজে একবার মেডিক্যাল কলেজে যাবে। সারারাত ঘুম হয়নি। তবু কী এক অজানা আতঙ্কে প্রিয়নাথের ঘুম আসছিল না। ব্যাপারটার মূলে না গেলে তার শান্তি নেই। টমসন সাহেব যা শোনালেন, তাতে চাপ আরও বাড়বে। সরাসরি ওপরতলা থেকে। যে বা যারা এই কাজ করেছে, হয় তারা বোকা নয় দুঃসাহসী। বাঘের লেজে হাত দেওয়ার ফলাফল জানে না। তারা জানুক না জানুক, এর ফল যে প্রিয়নাথকে ভোগ করতে হবে, তা সে খুব ভালোভাবে জানে।
রাস্তায় লোকজনের ভিড়। আকাশে আজও মেঘ করেছে। লালবাজারের পাশেই এক হরকরা পত্রিকা বিক্রি করছিল। প্রিয়নাথ একখানা ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া পত্রিকা কিনল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ বোলাতে লাগল মূল খবরগুলোতে। রাজনীতির খবরে তার খুব একটা আগ্রহ নেই। আগ্রহ রোজকার খবর বা অপরাধে। শোভাবাজারে একটা চেরেট গাড়ি এক মাতালকে চাপা দিয়ে মেরেছে, চিৎপুরের পাশেই ডাকুরা এক পালকি লুট করে আরোহী মহিলাকে আধমরা করে রেখে গেছে, সামনের শনিবারে কার্টারের ম্যাজিক শো হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। একটা খবর ছোটো হলেও তাতে চোখ আটকে গেল। খবরে লেখা—
নিজস্ব সংবাদদাতা: লুনাটিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও অকর্মণ্যতার এক চরম লজ্জাজনক দৃষ্টান্ত আমরা ইংরাজ সরকারের নজরে আনিতে ইচ্ছুক। শহরে নেটিভদের উদ্দেশ্যে নির্মিত লুনাটিক অ্যাসাইলাম হইতে নিয়মিত বদ্ধ উন্মাদরা পলায়ন করিতেছে। এই খবর জনসাধারণ তো দূরস্থান, পুলিশ বিভাগও কতটা জানেন সন্দেহ।
প্রসঙ্গত জানাই গত শতকের পঞ্চাশের দশক হইতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয়দের পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে চিকিৎসার প্রচলন করেন। সেই সময় অন্যান্য অসুখের ন্যায় ভারতবর্ষে মানসিক ব্যাধিরও কোনও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাপদ্ধতি বিদ্যমান ছিল না। কোম্পানির উদ্যোগে রসা রোডে স্থাপিত হয় একটি মানসিক চিকিৎসালয়। স্থানীয় বাসিন্দারা ইহাকে বলিতেন রসা পাগলা। ১৮৪৮ সালে এই ‘রসা পাগলা’-র ঠিকানা বদলায়। রেসকোর্সের নিকটেই ‘ডালান্ডা হাউস’-এ স্থান পায় ‘লুনাটিক অ্যাসাইলাম ফর দ্য নেটিভস’। পশ্চিমে পেশোয়ার হইতে পূর্বে বার্মা, এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের রোগীরা এই স্থানে চিকিৎসার আশায় আসিয়া থাকেন।
ডালান্ডা হাউসের এক প্রতিনিধি নাম গোপন রাখিয়া জানাইয়াছেন, গত প্রায় ছয় মাস যাবৎ ডালান্ডায় উন্মাদের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাইতেছে। আমাদের খবর পাওয়া অবধি অন্তত পাঁচজন উন্মাদ পাগলাগারদের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করিয়া পলায়ন করিয়াছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাহারা কলিকাতা শহরে বিনা বাধায় নিশ্চিন্তে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। খবরে ইহাও প্রকাশ যে পলাতকদের মধ্যে দুর্ধর্ষ খুনী উন্মাদ লালু মণ্ডলও আছে। লালু মণ্ডল খালি হাতে তিনজনকে হত্যা করিয়াছিল। বিচারে সে উন্মাদ সাব্যস্ত হয় এবং তাহাকে ডালান্ডায় রাখিবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমন উন্মাদের কলিকাতার রাস্তাঘাটে ঘুরিয়া বেড়ানো সাধারণ নাগরিকের পক্ষে যে কতটা বিপজ্জনক তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। হাসপাতালের তরফে পুলিশে এত্তেলা এখনও অবধি করা হয় নাই। এরূপ আচরণকে অমার্জনীয় ব্যতীত কিছু বলা যায় কি?”
পিঠে আলতো হাত পড়তে চমকে ফিরে তাকাল প্রিয়নাথ। ধবধবে ধুতি আর কালো কোট পরা এক প্রৌঢ় তার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন। সাদা মোটা গোঁফ। মাথায় একরাশ পাকা চুল। হাতে ডাক্তারির বাক্স।
“কী খবর হে দারোগা? মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়ছ যে! সরকার কি তোমার টেবিল চেয়ার কেড়ে নিল নাকি?”
প্রিয়নাথ মনেপ্রাণে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারকে শ্রদ্ধা করে। নামজাদা ডাক্তার। প্রায় একা হাতে গড়ে তুলেছেন প্রথম জাতীয় বিজ্ঞান সমিতি, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অব সায়েন্স। একটু ঠাট্টা ইয়ার্কি করেন ঠিকই, কিন্তু মানুষটা খাঁটি সোনা।
“আপনি কি মেডিক্যাল কলেজের দিকে যাবেন নাকি? তাহলে চলুন একসঙ্গে যাওয়া যাবে।”
“না বাপু, আজকাল আর হাসপাতালে যাওয়া হয় না। তবে ওদিকেই যাচ্ছি। এক রোগীর বাড়ি, প্রাইভেট কল। বেচারার সান্নিপাতিকে প্রায় মরমর অবস্থা। যাবে তো চলো।”
রাস্তায় যেতে যেতে প্রিয়নাথকে প্রশ্ন করলেন মহেন্দ্রলাল, “তা তুমি ওদিকে কেন? শরীর ভালো তো?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। একটা কেসের ব্যাপারে যাব। আচ্ছা, সার্জারিতে এখন কে আছে জানেন? রাজকৃষ্ণ দায়িত্ব নিয়েছে, কিন্তু সে তো ইদানীং নিজেই অসুস্থ। কার সঙ্গে গিয়ে দেখা করব?”
মাথা নাড়লেন মহেন্দ্রলাল। “ডামাডোল চলছে ভায়া। চরম ডামাডোল। মার্টিন সাহেব একা মেডিক্যাল কলেজ, ভবানীপুরের পাগলা গারদ আর ডালান্ডা হাউসের দায়িত্বে। কোনোটাই ঠিকঠাক চালাতে পারছেন না। যে যা পারছে করে খাচ্ছে। দুঃখ হয়, বুঝলে! এককালে মধুসূদন গুপ্ত, নবীন মিত্র, উমাচরণ শেঠরা এই হাসপাতালে কাজ করে গেছেন। আর এখন! যাই হোক। এক কাজ করো। আমার এক ছাত্র আছে, গোপাল, গোপালচন্দ্র দত্ত। খুব ভালো ছেলে। কাজও জানে। রাজকৃষ্ণ এখন ওর উপরেই ভরসা করে। চলো তবে। তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।”
প্রিয়নাথ ভাবে এক অর্থে ভালোই হয়েছে। পুলিশ দেখলে এমনিতেই মানুষের একটা বাধো বাধো ভাব হয়। চেনা লোক থাকলে সে সমস্যা নেই। মেডিক্যাল কলেজের গেট দিয়ে ঢুকেই সোজা বাঁদিকে হাঁটা দিলেন মহেন্দ্রলাল। ছোটোখাটো এক যুবক অন্যমনস্ক হয়ে হেঁটে যাচ্ছিল মাথা নিচু করে। মহেন্দ্র তাঁকেই ডাকলেন, “গোপাল, ও গোপাল। একবার শুনে যাও...”
যুবক একটু থতোমতো খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। এতক্ষণ কিছু একটা ভাবছিল সে। কপালে ভ্রূকুটি। মহেন্দ্রলালকে দেখে এগিয়ে এসে মাথা নিচু করে প্রণাম করল। মুখে চিন্তার ভাব বজায় রইল।
“শোনো হে গোপাল, এ হল প্রিয়নাথ। পুলিশে কাজ করে। কী একটা ব্যাপারে তোমার সাহায্য লাগবে। তুমি একটু দেখো।”
“আমি আর কী দেখব মাস্টারমশাই। আমার হাতেও কি আর কিছু আছে নাকি? মার্টিন সাহেব যা খুশি তাই করছেন। এতদিন রাজকৃষ্ণবাবুর অনুপস্থিতিতে আমি আর উইলসন সাহেব তো ভালোই চালাচ্ছিলাম। সার্জারি, শব ব্যবচ্ছেদ দুটোই চলছিল ভালো। এদানি কোন এক অজ্ঞাতকুলশীলকে এনে লাশকাটা ঘরে বসিয়েছেন। তার না আছে কোনও ডাক্তারি ডিগ্রি, না আছে কোনও নিয়মকানুন।”
“বলো কী? কী শুরু হল এসব! কে এই লোক? বাঙালি?”
“না, না। সাহেব। সদ্য লন্ডন থেকে এসেছে। স্বয়ং মার্টিন সাহেবের কাছের লোক। তাঁর আদেশেই উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।”
“এ কি ডাক্তারি ছাত্র?”
“কী জানি কী মাস্টারমশাই। নিজের মতো থাকে। কথা কম বলে। লাশকাটা ঘরের একপাশে বকযন্ত্র, বুনসেন বার্নার সব আনিয়েছে। দিনরাত সেসব নিয়ে পড়ে থাকে।”
“এসবের সঙ্গে ডাক্তারির কোনও সম্পর্ক আছে নাকি?”
“সেটা কে কাকে বোঝাবে বলুন? এই তো কাল রাতে একটা মড়া এল। ইউরোপিয়ান। হিসেবমতো দায়িত্ব আমার পাবার কথা। কাজ শুরু করতে গেছি, শুনলাম নাকি আমার আর উইলসন সাহেবের সঙ্গে সে ব্যাটাও থাকবে। এসব লোক থাকলে কাজে অসুবিধা হয়, আর কিছু না।”
প্রিয়নাথের কান খাড়া হয়ে উঠল। সে যে কেসের ব্যাপারে এসেছে সেটা নিয়েই আলোচনা হচ্ছে তাহলে।
“আমি আসলে গতকালের ওই মড়াটার ব্যাপারেই এসেছিলাম”, গলা খাঁকরে বলল প্রিয়নাথ।
প্রিয়নাথকে দেখলেও এতক্ষণ খেয়াল করেনি গোপালচন্দ্র। এবার একটু চমকে তাকাল।
“আপনিই অফিসার ইন চার্জ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। তা বলতে পারেন।”
“আসুন তবে আমার সঙ্গে। মাস্টারমশাইও যাবেন নাকি?”
মহেন্দ্রলাল ট্যাঁকঘড়ি বের করে “ওরে বাবা, সাড়ে দশটা বেজে গেছে? না হে প্রিয়নাথ, তোমরা এগোও। আমার কলে লেট হয়ে গেছে”, বলে হাঁটা লাগালেন। প্রিয়নাথ গোপালের পিছু পিছু লাশকাটা ঘরের দিকে পা বাড়াল।
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের জার্নাল (৩)
এক অতি সংকীর্ণ গলিপথ বাহিয়া আমরা একটি ভবনের সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। বাহিরে একটি ফলকে উৎকীর্ণ রহিয়াছে ‘Pandit Madhusudan Gupta. Anatomy Dissection Hall’। শ্রী গোপালচন্দ্র সেই ভবনে প্রবেশ করিলেন না। অপর একটি পথ দিয়া ভবনের পশ্চাতে আমাকে নিয়া চলিলেন। এই পথ আরও সংকীর্ণ এবং দুইধারে প্রাকার, ফলে অন্ধকারাচ্ছন্ন। একটি কাচের দরজা খুলিয়া গোপালবাবু আমাকে ভিতরে আসিতে আহ্বান করিলেন। দীর্ঘ অন্ধকার করিডরের শেষ প্রান্তে একটি কক্ষে আলো জ্বলিতেছে। কক্ষে ঢুকিয়াই মধ্যস্থলে একখানি বড়ো টেবিলে গতকালের মৃতদেহটি দৃশ্যমান হইল। আমি দেখিয়াও না দেখিবার ভান করিয়া রহিলাম। স্বেচ্ছায় এ দৃশ্য কে দেখিতে চাহে? কক্ষের এক কোণে প্রচুর কাচের বয়াম, তাহাতে লাল নীল বিজাতীয় সব তরল পদার্থ রাখা। এককোণে একটি বকযন্ত্রে কী যেন ফুটিতেছে। বুনসেন বার্নারের হিসহিস শব্দ ব্যতীত আর কোনও শব্দ নাই। এক দীর্ঘকায়, কৃশকায় সাহেব অত্যন্ত ঝুঁকিয়া কিছু একটা পরীক্ষা করিতেছেন।
আমাদের পদশব্দে পিছন ফিরিলেন। তাঁহার ললাট বিস্তৃত, নাসিকা তীক্ষ্ণ, গাল ভাঙিয়া হনু দুইটি পরিষ্কার দেখা যাইতেছে। তাঁহার চোখে অদ্ভুত এক দীপ্তি। যেন কোনও উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় সদা দীপ্যমান। চক্ষু দেখিলেই অনুমান হয় ইনি কোনও সাধারণ ব্যক্তি নহেন।
“ইউরেকা! পাইয়াছি!” বলিয়া তিনি আমার সঙ্গীর দিকে হাস্যমুখে চাহিলেন।
গোপাল হাসিল না। শুধু শুষ্ক কণ্ঠে আমাদিগের আলাপ করাইয়া দিল।
“ইনি প্রিয়নাথবাবু। উনি মি. সাইগারসন।”
“আপনি কি পুলিশে কর্মরত?” খাঁটি লন্ডনের ইংরাজিতে জিজ্ঞাসা করিলেন সাহেব।
আমি অত্যন্ত চমকিত হইলাম। এ খবর সাহেব পাইলেন কী উপায়ে? কিছু সময় আগে পর্যন্ত আমি স্বয়ং জানিতাম না এখানে আসিব। আমার বিস্ময়াকুল দৃষ্টি দেখিয়া সাহেব মৃতদেহটির দিকে নির্দেশ করিয়া আবার বলিলেন, “বোধ করি এই কেসের ভার আপনার উপরেই ন্যস্ত হইয়াছে?”
আমার বিস্ময় বাধা মানিল না। ইনি কি জাদুকর? ডাকিনী বিদ্যার অধিকারী? গুপ্তচর? কী অলৌকিক উপায়ে ইনি এই সমস্ত কথা জানিয়া ফেলিতেছেন?

গোপাল দেখিলাম ততটা বিস্মিত হয় নাই। ফিসফিস করিয়া আমায় কহিল, “সাহেবের এই এক বাতিক। কী করিয়া সব জানিয়া ফেলেন কে জানে!”
সাহেব কহিলেন, “মহাশয়, আমার অনুমান সঠিক বলিয়াই বোধ হইতেছে। আর যদি তাহাই হয়, তবে আপনার সহিত গোপনে আমার কিছু আলোচনা আছে।”
গোপাল কী বুঝিল জানি না। “আমি চলিলাম, আজ খান তিন অপারেশান রহিয়াছে। আমার তো আর বসিয়া থাকিলে চলিবে না”, বলিয়া কালক্ষেপ না করিয়া চলিয়া গেল।
আমার বিস্ময়ের ভাব তখনও কাটে নাই। জিজ্ঞাসা করিলাম, “মহাশয়, আপনি কী উপায়ে নির্ণয় করিলেন আমি পুলিশে কর্মরত এবং এই কেসের দায়িত্ব আমা-পরি ন্যস্ত হইয়াছে?”
সাহেব হাসিয়া কহিলেন, “তাহা লইয়া আলোচনার সুযোগ ঘটিবে। আপাতত যাহা বলিতেছি শ্রবণ করুন। এই ব্যক্তির মৃত্যু ছুরিকাঘাতে হয় নাই।”
আমি চমকিত হইলাম। “কী বলিতেছেন?”
“ঠিকই বলিতেছি। ইহার মৃত্যুর কারণ আমি সদ্য আবিষ্কার করিয়াছি। নিজ চক্ষে দেখুন।” বলিয়া আমাকে মৃতের সামনে নিয়া গেলেন। হাতের লন্ঠনটি উঠাইয়া মৃতের মুখের সামনে ধরিলেন।
“কী দেখিতেছেন?”
খুব সূক্ষ্মভাবে দেখিয়া বুঝিলাম মৃতের মুখমণ্ডল অস্বাভাবিক হরিদ্রাভ এবং নাসিকার নিকট বেশ কিছু কৃষ্ণবর্ণ বিন্দু বর্তমান। সাহেবকে তাহাই বলিলাম।
“ব্রাভো! এক্ষণে আপনি ইহা হইতে কী নিরূপণ করিলেন?”
মাথা নাড়িলাম। কিছুই বুঝি নাই।
সাহেব একটি স্ক্যালপেল লইয়া মৃতের মুখগহ্বর হইতে কিছুটা মাংস লইলেন। উহাকে খানিক পিষিয়া উত্তমরূপে ভাপে জারিত করিলেন। যে মণ্ডটি উৎপন্ন হইল তাহা রক্তাভ। সাহেব তাহাতে আরও দুইটি তরল প্রয়োগ করিলেন।
“ইহার একটি হইল বেঞ্জিন আর অপরটি ক্ষার।”
মিশাইতেই সেই রক্তবর্ণ তরল সবুজাভ হরিদ্রা বর্ণ নিল। সাহেব হাততালি দিয়া হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। “একমাত্র ক্লোরোফর্মে মৃত্যু হইলেই এই বর্ণ পরিবর্তন দেখা যাইবে। অন্যথায় নহে। এই ব্যক্তি ছুরিকাঘাতে মারা যায় নাই। গিয়াছে অতিরিক্ত ক্লোরোফর্ম প্রয়োগে। মৃত্যুর পর ইহার শরীর ছুরিকাঘাতে বিকৃত করা হইয়াছে।”
প্রায় ভূতগ্রস্তের মতো কহিলাম, “তাহলে ইহার রক্ত?”
মৃতের হাতের ক্ষুদ্র ক্ষতের প্রতি নির্দেশ করিয়া সাহেব কহিলেন, “এই ক্ষতস্থান দিয়া তাহা বাহির করিয়া লইয়াছে।”
“কাহারা?”
“তাহা আমারও প্রশ্ন বটে।”
“আর ইহার বক্ষে কাহারা ইহারই রক্ত দিয়া চিহ্ন অঙ্কিত করিল?”
“কাহারা জানা নাই, তবে ইহা নিশ্চিত যে চিহ্ন যাহাই হউক, ওই রক্ত এই ব্যক্তির নহে। আমি পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছি।”
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ– পলায়নী বিদ্যা
১৫ ডিসেম্বর, ১৮৯২, কলিকাতা
বড়বাজারের জগন্নাথ ঘাট এলাকায় আর-একটি ঘাট ছোট্টুলাল দুর্গাপ্রসাদ ঘাট। এর দক্ষিণে লাগোয়া সিঁড়ি। তা দিয়েই লোক চলাচল করে। একটু খেয়াল করলে ঘাটের দেওয়ালে একটা মার্বেল ফলক চোখে পড়বে। ইংরেজি ও বাংলায় লেখা। বছরখানেক আগেই লাগানো হয়েছে। তাতে লেখা, “ইং ১৮৮৭ সালের ২৫-এ মে তারিখের ঝটিকাবর্তে সার জন লারেন্স বাষ্পীয় জাহাজের সহিত যে সকল তীর্থযাত্রী, অধিকাংশ স্ত্রীলোক, জলমগ্ন হইয়াছেন তাহাদিগের স্মরণার্থ কয়েকটি ইংরাজ রমণী কর্ত্তৃক এই প্রস্তরফলকখানি উৎসর্গীকৃত হইল।” কলকাতার ক্লাইভ ঘাট স্ট্রিটের ম্যাকলিন অ্যান্ড কোম্পানির জাহাজ ছিল সার জন লরেন্স। ১৮৮৭ সালে সে জাহাজে বালেশ্বরের চাঁদবালি পর্যন্ত যাওয়ার ভাড়া ছিল তিন টাকা দু পয়সা। যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে গেলে ভাড়াও বেড়ে যেত চড়চড়িয়ে।
সে বছর ২৫ মে তারিখে কয়লাঘাট জেটি থেকে বহু যাত্রী উঠেছিলেন জন লরেন্সে। ঠিক কত ছিল সেদিন যাত্রীর সংখ্যা, তার হিসেব কোম্পানি কোনও দিনই দেয়নি। তবে ভিড় বেড়ে যাওয়ার কারণে ভাড়া বাড়িয়ে প্রথমে করা হয়েছিল পাঁচ টাকা দু পয়সা, এবং জাহাজে ওঠার পর যাত্রীদের বলা হয়েছিল মাথাপিছু আরও এক টাকা করে বেশি দিতে হবে। সে টাকা যাঁরা দিতে পারেননি, তাঁদের নাকি নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘাড় ধরে। তাঁরা পরে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন।
আপার ক্লাস আর লোয়ার ক্লাস, দুই ডেকেই প্রচণ্ড ভিড়। যাত্রীদের বেশিরভাগই ছিলেন মহিলা। এমন গাদাগাদি করে নাকি লোক তোলা হয়েছিল যে ডেকের ওপর যাত্রীদের ঘাড় ঘোরানোর মতো জায়গাটুকু পর্যন্ত ছিল না। ঝড় আসবে সে কথা আগে থেকে জানা ছিল না তা কিন্তু নয়। জাহাজ ছেড়েছিল ২৫ মে, আর সেই দিনেরই ভোরের কাগজ ইংলিশম্যান-এর আবহাওয়া বার্তায় প্রচণ্ড ঝড়ের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। লেখা হয়েছিল মেদিনীপুর এবং কটকের মাঝামাঝি অঞ্চলে সে ঝড়ের কেন্দ্র এবং বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকবে সে কথাও বলা হয়েছিল। এই সতর্কবার্তা সংকেত সত্ত্বেও শত শত যাত্রী নিয়ে ২৫ তারিখ রাত্রে কয়লাঘাট জেটি ছাড়ল সার জন লরেন্স। আর সে রাত্রেই এল ঝড়। ২৭ মে টেলিগ্রামে জানা গেল জাহাজ এখনও চাঁদবালির স্টিমারঘাটে নোঙর করেনি। ম্যাকলিন কোম্পানি তাতে কান দিল না। যেন কিছুই হয়নি। শেষে ২ জুন ইংলিশম্যান পত্রিকা ছাপল, ‘সব শেষ’। রেজোলিউট নামে এক জাহাজ নাকি সাগর মোহনায় শত শত মৃতদেহ ভাসতে দেখেছে। সেই থেকে এই ঘাটের ভূতুড়ে ঘাট নামে বদনাম হয়ে গেছে। নতুন কোনও স্টিমার ছাড়ে না। মাঝেমধ্যে কিছু আফিমের জাহাজ চিনে যায় এই ঘাটে।
এ দিন ভোর হলেও আলো ফোটেনি ঠিকভাবে। সকালের শীতে গোটা শহর কুঁকড়ে আছে। ভিস্তিরা এখনও রাস্তা ধোয়াতে বেরোয়নি। তবু তার মধ্যেই আপাদমস্তক শালমুড়ি দিয়ে দুটি লোক দ্রুতপায়ে চলেছে ছোট্টুলাল দুর্গাপ্রসাদ ঘাটের দিকে। একজনের কাঁধে ঝোলানো বস্তা। তার মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর। যেন অনাগত কোনও ঘটনার প্রতীক্ষা করে চলেছে সে। অন্যজন বিড়বিড় করতে করতে চলেছে পাশে পাশে, “কী দরকার ভাই? এখনও সময় আছে। এসব কাজ কোরো না। বেঘোরে প্রাণটা হারাবে। মাঝখান থেকে আমি অপরাধী হয়ে থাকব।” অন্যজন কোনও উত্তর দিল না। খানিক বাদে শুধু বলল, “আমি ঠিক করে ফেলেছি। এখন ভগবানেরও সাধ্য নেই আমাকে আটকায়।”
এই দুই যুবক আমাদের পূর্বপরিচিত। বস্তা কাঁধে গণপতি আর তার সঙ্গী তারিণীচরণ। এই শীতের হাড়কাঁপানো ভোরে গঙ্গার ঠান্ডা হাওয়ায় জমে যেতে যেতে তারিণী নিজেকেই গালাগাল দিচ্ছিল। তার সামান্য কথার ভুলেই আজ এই অবস্থা। গত পরশু সকালে গণপতির জন্য কচুরি আর তরকারি নিয়ে যখন অফিসে ফিরল, তখনও গণপতি এক দৃষ্টিতে সেই বিজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে।
“খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি। একেবারে কড়াই থেকে তুলে আনা। ঠান্ডা হলে মজা পাবে না”, বলে শালপাতার দোনাটা গণপতির হাতে ধরিয়ে নিজেও খেতে শুরু করল। গণপতি একটু অন্যমনস্কভাবেই একটা কচুরি ছিঁড়ে মুখে পুরল। আর সঙ্গে সঙ্গে বিষম খেল। গণপতির মুখ দিয়ে অদ্ভুত গোঙানির শব্দ, তীব্র কাশির দমক, চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। তারিণী একরকম ভয়ই পেয়ে গেল। নিজের দোনাটা ফেলে গণপতির পিঠে মালিশ করতে লাগল এঁটো হাতেই। মুখে বলতে লাগল “শান্ত হও, শান্ত হও।” আর ঠিক তখনই অদ্ভুত চকচকে ধাতব একটা জিনিস গণপতির মুখে দেখতে পেল সে।
খানিক বাদে গণপতি কিছুটা সামলে নিল। তারিণী এগিয়ে দিল জলের ঘটি। প্রায় এক ঘটি জল খেয়ে হাঁফ ছাড়ল গণপতি। খাওয়া শেষ হতেই প্রশ্ন করল তারিণী, “তোমার মুখের ভিতর ওটা কী?”
চমকে উঠে গণপতি বলল, “কোনটা? কিছু নেই তো?”
“মিথ্যে বোলো না। আমি নিজের চোখে দেখলাম। চকচকে সরু ধাতব কিছু একটা।”
“দেখেই যখন ফেলেছ, তখন ভালোভাবেই দ্যাখো”, বলে গণপতি নিজের ঠোঁটের ডানদিক টেনে ধরল। তারিণী অবাক হয়ে দেখল গণপতির গাল আর মাড়ির মধ্যে অদ্ভুত এক গর্ত, অনেকটা পকেটের মতো। আর সেই পকেট থেকে কড়ে আঙুলের সমান বাঁকানো একটা মোটা তার বার করে আনল গণপতি।
“এটাও একরকম সিঁধকাঠি। তবে আকারে ছোটো। সায়েবরা একে বলেন টর্ক রেঞ্চ। যে কোনওরকম তালা খোলায় অব্যর্থ।”
“তুমি কি চুরিচামারি ধরলে নাকি?”
“তাহলে তো ভালোই হত। অন্তত কিছু পয়সাকড়ির মুখ দেখতাম। না হে, এ আমার ম্যাজিকের সরঞ্জাম।”
“আর তোমার মুখের ওই পকেট?”
“ওটা গুরুদেবের কথায় বানানো। হিমালয়ে থাকতে। ইংরাজ আইন বড়ো কঠিন জিনিস ভায়া। কোনটা আইনি আর কোনটা বেআইনি বলা মুশকিল। একটু এদিক ওদিক হয়েছে কি ধরে জেলে পুরে দেবে। তাই সাধুরা প্রায় সবাই মুখে এমন পকেট বানিয়ে নেশার জিনিস রাখেন। তবে আজকাল শুনছি অপরাধীরাও এই পকেটের খোঁজ পেয়েছে।”
ঠিক এই জায়গাতেই ভুলটা করে ফেলল তারিণী। অবিশ্বাসের গলায় বলল, “এইটুকু তার দিয়ে তুমি যে-কোনো তালা খুলতে পারবে?”
“যে-কোনো। এমনকি পুলিশের হাতকড়াও”, বলেই গণপতি ফতুয়ার পকেট থেকে একটা হাতকড়া বের করে আনল। “এই দ্যাখো, এই হল স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন হ্যান্ডকাফ। এ দেশে কিছুদিন হল এসেছে। ডবল লক।”
চোখ কপালে উঠল তারিণীর, “এ জিনিস তুমি পেলে কীভাবে?”
“আমাকে এটা দিয়েই বেঁধে রেখেছিল কাল রাতে। চাইলে ছাড়াতে পারতাম। ছাড়াইনি। বরং ঘণ্টা দুই ধরে ভালোভাবে এটা পরীক্ষা করার সুযোগ হল। যখন ছেড়ে দিল, দেখি একপাশে অবহেলায় পড়ে আছে। সামান্য হাতসাফাই করে নিয়ে এলাম আর কি।”
“এ দিয়ে তুমি করবেটা কী?”
“জাদু দেখাব। শুধু কার্টার সাহেবই কি পলায়নী বিদ্যা দেখাতে পারেন? আমি পারি না? বহুদিন ধরে এই ম্যাজিকের মতলব এঁটেছি আমি। সব ছিল, শুধু এই হাতকড়া পাইনি। যা পেয়েছিলাম সব ম্যাজিশিয়ানদের হাতকড়া। ও দিয়ে জাদু দেখালে কেউ গুরুত্ব দেবে না। দরকার ছিল আসল পুলিশি হাতকড়া। কত খুঁজেছি। পাইনি। এমন ভাগ্য, মেঘ না চাইতেই জল। শনিবার তো কার্টারের ম্যাজিক, তার আগেই এই শহরে গণপতির ম্যাজিক হবে।”
“কোথায়?”
“এমন জায়গায়, যেখানে পুলিশ সহজে খবর পাবে না। শুধু আমাদের ম্যাজিক ক্লাবের সদস্যদের জানাব। তাঁরা এখনও জানেন না আমি কী। আর হ্যাঁ, তুমি হবে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট।”
“আ-আ-আমি!” তারিণীর মুখ এতটা হাঁ হল যে সেখান দিয়ে একটা গোটা চড়ুই পাখি ঢুকে যেতে পারে।
“হ্যাঁ তুমি। আমাকে একদিন সময় দাও। পরশু তুমি আর আমি মিলে ভোর ভোর চলে যাব ম্যাজিক দেখাতে।”
“কোথায়?”
“ছোট্টুলাল দুর্গাপ্রসাদ ঘাটে।”
গণপতির একটাই উদ্দেশ্য। দ্য উইজার্ডস ক্লাবে নিজেকে প্রমাণ করা। অম্বিকাবাবু আর নবীনবাবু তাকে স্নেহ করেন বটে, কিন্তু সে তার ব্যবহারের জন্য। তার জাদুবিদ্যা দেখে নয়। এই তো সেদিনই নবীনচন্দ্র যখন কথায় কথায় বলছিলেন হ্যারি হুডিনির মতো পলায়নী বিদ্যা পৃথিবীতে কারও করা অসম্ভব, তখন গণপতি মৃদু কণ্ঠে প্রতিবাদ করছিল। বলেছিল, সুযোগ পেলে সেও এই বিদ্যা প্রদর্শনে সক্ষম। নবীনচন্দ্র ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলেছিলেন, “হুডিনির তুমি কী জানো হে ছোকরা? ওঁর অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা। তাঁর জাদু দেখাবে তুমি? নাটুকে ভোজবাজি দেখানোর জাদুকর? এ তোমার হাতসাফাইয়ের কাজ নয় হে। রীতিমতো আসল ম্যাজিক। এই যে কার্টার সাহেব, এত বড়ো ম্যাজিশিয়ান, তিনিও পলায়নী বিদ্যা দেখান স্টেজে। আর হুডিনি? তিনি আসল পুলিশ হ্যান্ডকাফ পরে, বস্তা বাঁধা অবস্থায় ঠান্ডা নদীর জলে ঠেলে ফেলে দিলেও ঠিক বন্ধন ছাড়িয়ে উঠে আসেন। পারবে? পারবে এইরকম ম্যাজিক করতে?”
সেই দিন থেকে গণপতির মনে জেদ চেপে গেছিল। পুলিশের হ্যান্ডকাফটা পেয়ে ঠিকই করে নিল কার্টারের আগে সে-ই পলায়নী বিদ্যা দেখাবে। তাও স্টেজে না। গঙ্গার ঠান্ডা জলে। তারিণীর থেকে কিছু টাকা নিয়ে চিৎপুরের এক প্রেস থেকে একটা হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে উইজার্ড ক্লাবে বিলিয়েছে। তাতে লেখা—
উইজার্ড ক্লাবের সম্মাননীয় সদস্যদের জানানো যাইতেছে
ভারতবর্ষে প্রথমবার মুক্ত গঙ্গাবক্ষে অনুষ্ঠিত হইবে
গণপতির পলায়নী বিদ্যা
(আসল স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন হ্যান্ডকাফ সহযোগে)
ছোট্টুলাল দুর্গাপ্রসাদ ঘাট
বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ১৮৯২, ভোর ছয় ঘটিকা
আপনি আমন্ত্রিত
ঘাটে পৌঁছে ক্লাবের অন্তত কয়েকজনকে দেখবে বলে আশা করেছিল গণপতি। কেউ নেই। একদিকে দুটো গরিব ভিখারি আগুন পোহাচ্ছে। দু-একটা কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাকি ঘাট শুনশান। চাতালের গা বরাবর উঁচু ধাপিতে দেওয়ালের গা ঘেঁষে সবুজ চাদরে গা মাথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে কেউ একটা। ডানদিকে লাল রং করা দেওয়ালের গায়ে গাঁথা আছে বেলেপাথরের সেই ফলক। তারিণী যেন একটু নিশ্চিন্ত হল।
“কেউ তো নেই। চলো চলে যাই।”
“আর তো ফেরার উপায় নেই ভাই। ম্যাজিশিয়ান একবার শো-এর ঘোষণা করে দিলে পৃথিবী উলটে গেলেও তা হবে। দ্য শো মাস্ট গো অন।”
“কিন্তু দেখবে কে? ওই ঘুমন্ত ভিখারি আর নেড়ি কুত্তোগুলো?”
“দরকার হলে তাই। আর তুমি তো আছ।”
“সে আছি, কিন্তু যাদের জন্য করা...”
“আর কথা নয়, ছটা প্রায় বাজতে চলল। শো-তে দেরি হয়ে যাবে।”
ধীরে ধীরে পোশাক খুলল গণপতি। তার গায়ে চাপা প্যান্ট আর পাতলা জামা। কনকনে ঠান্ডায় গা হাত পা জমে যাচ্ছে। চোখে মুখে হাওয়া যেন ছুরি চালিয়ে দিচ্ছে ক্রমাগত। কুয়াশা এখনও পুরো কাটেনি। গণপতি জোরে নিঃশ্বাস নিল। ফুসফুস অবধি জমে গেল যেন। দুজনে ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে জেটির দিকে। কারও মুখে কোনও কথা নেই। সেই জেটি, যেখান থেকে বছর পাঁচেক আগেই ছেড়েছিল সার জন লরেন্স। এদিকটায় জল খুব গভীর। জেটির শেষ প্রান্তে এসে মুখ খুলল গণপতি, “আমি তৈরি। আমাকে এই বস্তায় ঢুকিয়ে দাও।”
বস্তার মুখ খুলে গণপতি বার করল বিরাট বড়ো এক রশি, শিকল আর হ্যান্ডকাফ। যেভাবে লোকে ট্রাউজার পরে, ঠিক সেই কায়দায় ঢুকে গেল বস্তার মধ্যে। তার পরামর্শমতোই তাকে শিকল দিয়ে বাঁধল তারিণী। শিকলের শেষে লাগিয়ে দিল মোটা ইয়েল তালা। তারপর দুই পা বাঁধল রশি দিয়ে। আর সবশেষে গণপতি নিজের দুই হাত জড়ো করে বাড়িয়ে দিল তারিণীর দিকে। তারিণীর বুক ঢিপঢিপ করছিল। কাঁপা কাঁপা হাতে সে গণপতিকে পরিয়ে দিল স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন হ্যান্ডকাফ।
“তুমি বেরুবে কীভাবে?” তারিণীর গলা কেঁপে যায়।
“সে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি সে পদ্ধতি জানি। এক মিনিটে বেরিয়ে যাব। নাও এবার বস্তার মুখ সেলাই করে দাও”, বলেই গণপতি কোলকুঁজো হয়ে বস্তায় বসে পড়ল। তারিণী বস্তার মুখ বেঁধে দিল মোটা সুঁই সুতো দিয়ে। ভিতর থেকে গণপতির চাপা গলার আওয়াজ শোনা গেল, “এবার আমাকে ঠেলে ফেলে দাও।”

তারিণী বস্তার দিকে তাকায়। এখান থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব। সে জেনে বুঝে খুন করতে পারবে না। জোরের সঙ্গে বলে উঠল, “না।”
“বোকামো কোরো না তারিণী। তুমি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। যা বলছি করো।”
“তুমি মারা গেলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।”
“তুমি আমায় না ফেললে আমার আত্মহত্যা ছাড়া গতি থাকবে না। তাই অত ভেবো না। ফেলে দাও জলে।”
“তুমি বেরিয়ে আসবে তো? এক মিনিটের মধ্যে? যেমন বলেছিলে? আমায় ভয় করছে।”
“পাগলামো কোরো না। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ফেলে দাও।”
তারিণী জোরে শ্বাস নিল। একটু সাহস পেল বোধহয়। তারপর নিচু হয়ে দুই হাতে বস্তাটা খিমচে ধরে গড়িয়ে দিল জেটি থেকে। উঁচু জেটির নিচে ভারী বস্তার ছপাৎ শব্দে যেন জ্ঞান ফিরল তারিণীর। তার দুই চোখ বেয়ে নেমে এল জলের ধারা। নিচে জলের বড়ো বড়ো তরঙ্গ। আর কিচ্ছু নেই। তারিণীর মাথা কাজ করছিল না। সে জেটি বেয়ে ছুটতে লাগল পুলিশ স্টেশনের দিকে। নিজের হাতে সে আজ গণপতিকে হত্যা করেছে। ঘাটের পাথুরে মেঝেতে পৌঁছে কী মনে হল, আবার জলের দিকে তাকাল। সকালের গঙ্গা একেবারে পুকুরের মতো স্থির। নিস্তরঙ্গ। জলে সামান্য ঢেউ অবধি নেই।
“গ-ণ-প-তি-ই-ই-ই”— দুই হাত মুখের কাছে নিয়ে চিলচিৎকারে ডাকল তারিণী। দুটো কুকুর ভয় পেয়ে পালাল আর ঘাটের ধারের ভিখারিরা অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চাইল।
এদিকে জলে পড়ামাত্র গণপতির মনে হল সে মারা যাবে। তীব্র ঠান্ডা জল বস্তা ভেদ করে ভিতরে ঢুকছে। তাকিয়ে দেখল চারিদিকে কালো কালো জল। হিমালয়ের গুরুদেব তাকে মিনিট দু-এক দম বন্ধ করে থাকার শিক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ঠান্ডা জলে তার মাথা কাজ করছে না। পলায়নী বিদ্যার একটা কৌশলও মাথায় আসছে না গণপতির। জলে ভিজে দড়ি গায়ে এঁটে বসেছে। ফুসফুসে চাপ দিচ্ছে ক্রমাগত। গণপতিকে তীব্র এক আতঙ্ক গ্রাস করল, যার কথা সে আগে কোনও দিন ভাবেনি। প্রায় এক মিনিট চলে গেল মুখের থেকে টর্ক রেঞ্চ বার করে হাতের হ্যান্ডকাফ খুলতে। গতকাল সারাদিন ধরে এটাই প্র্যাকটিস করেছে সে। তখন লেগেছিল তিরিশ সেকেন্ডের কম। এখন প্রায় দ্বিগুণ সময় লাগল। হাত ছাড়ানোর পরে কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। টর্ক রেঞ্চটা নিয়ে এবার শিকলের সঙ্গে লাগানো ইয়েল তালাটা খোলার চেষ্টা শুরু করল সে। চমকে খেয়াল করল এই তালাটা লাগাতে গিয়ে উত্তেজনায় তারিণী তালার পিনটা কোনও ভাবে বাঁকিয়ে দিয়েছে। ফলে রেঞ্চ আর কাজ করছে না। ক্রমাগত ঘুরে যাচ্ছে। জোরে চাপ দিতে গিয়ে রেঞ্চের একদিক আঙুলে বিঁধে গেল গণপতির। পনেরো সেকেন্ড লাগল ওটাকে আবার জায়গায় আনতে। ঠান্ডায় হাতের আঙুলগুলো জমে যাচ্ছে। কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না। আরও কুড়ি সেকেন্ড খুঁচিয়ে ক্লিক আওয়াজ হতেই গণপতি বুঝল তালা খুলেছে। এবার দড়ি আর বস্তাটা কাটতে হবে। জুতোর ভিতরে রাখা লোহার পাত খুঁজতে গিয়ে আবার আঙুলে সার পাচ্ছিল না। পাতটা ধরতে গিয়ে আঙুল কেটে গেল। তীব্র জ্বলুনি। গণপতি কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছিল না। নাকে আসছিল হালকা রক্তের গন্ধ। আড়াই মিনিট পরে যখন তার মনে হল আর পারবে না, ফুসফুস ফেটে যাবে দুম করে, ঠিক তখনই দুই হাঁটুর ঝটকায় বস্তা ছিঁড়ে গণপতির দেহ জলের উপরে ভেসে উঠল। বুক ভরে ঠান্ডা বাতাস নিল সে। দূরে ঘাটের পোড়া গন্ধ, পচা ফুলের গন্ধ, সবই যেন ভালো লাগল সেই মুহূর্তে। গণপতি খুব কাছ থেকে মৃত্যুকে দেখে নিয়েছে। সে এবার ঘাটের দিকে সাঁতার কাটতে লাগল। কিন্তু অদৃশ্য কোনও শক্তি যেন তাকে নিচের দিকে টানছে। তার দুই পা ধরে টেনে নিতে চাইছে পাতালের অতল গহ্বরে। মাথা কাজ করছিল না, তবু সে বুঝতে পারল তার পা আর চলছে না। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তাঁর প্রবল আকর্ষণে ডুবিয়ে দিচ্ছে গণপতিকে। জল বেড়ে উঠছে… গলা, কান, মাথা… আহহহ…
ঠিক তখনই একটা সবল হাত তার চুলের মুঠি ধরল দৃঢ়ভাবে। তার শরীরকে নিজের শরীরের উপর রেখে নিয়ে চলল ঘাটের দিকে। তারিণী। জলে নড়াচড়া দেখেই সে ঝাঁপ মেরেছিল। গণপতি নিজেকে মুক্ত করায় অবাক হতে না হতেই দেখল কোনও অজানা কারণে আবার ডুবে যাচ্ছে। আর তাই কোনওক্রমে সাঁতরে গণপতির কাছে পৌঁছে গেছিল সে।
ঘাটে উঠে দুজনেই চিতপাত হয়ে শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। কারও মুখে কোনও কথা নেই। এদিকে শহর কলকাতা জাগছে ধীরে ধীরে। গণপতি উঠে বসে। তারিণী তখনও শুয়ে। গণপতি কিছু বলতে যাবে, এমন সময় একটা আওয়াজে দুজনেই চমকে উঠল। হাততালির আওয়াজ। ঘাটের দক্ষিণ পাশের সেই সিঁড়িতে সবুজ চাদর গায়ে একা দাঁড়িয়ে হাসিমুখে হাততালি দিচ্ছেন উইজার্ড ক্লাবের প্রেসিডেন্ট শ্রীনবীনচন্দ্র মান্না।
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ— ছড়ার অর্থ
২০ জুন, ২০১৮, চন্দননগর
কেন জানি না, আচমকা আমার এতক্ষণের ভয় ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল। এক লম্বা অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে আলো দেখতে পাবার মতো আমিও একটা সূত্র দেখতে পেলাম। বারবার করে দেবাশিসদার লেখাটা পড়ছিলাম...
“প্রিয়নাথের শেষ হাড়
মুরের কাব্যগাথা
গণপতির ভূতের বাক্সে
তারিণীর ছেঁড়া খাতা”
চার লাইনের কবিতায় চারজনের কথা, যার তিনজন আমার কাছে পরিচিত, দ্বিতীয়জন ছাড়া। কিন্তু মুশকিল হল, এদের নিয়ে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন দেবাশিসদা? আর তাঁকে এমনভাবে মরতেই বা হল কেন? খুব সম্ভব দেবাশিসদা এমন কিছুর খোঁজ পেয়েছিলেন, যাতে কারও অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। সে বা তারা সেটার খোঁজেই এসেছিল। দেবাশিসদাকে অত্যাচার করে জানতে চেয়েছিল তার হদিশ। দেবাশিসদা সহজে বলেননি, আমি নিশ্চিত। তাহলে লিং-চির প্রয়োজন হত না। কিন্তু কী সেই জিনিস?
“কী ব্যাপার, মুখে যে কথা ফুটছে না… কিছু বুঝলেন?” চমক ভাঙল পুলিশ অফিসার মুখার্জির কথায়। “এদের চেনেন? এই প্রিয়নাথ, মুর, গণপতি, তারিণী…?”
“মুরকে চিনি না। বাকিদের চিনি।”
“অ্যাঁ? বাহ, চমৎকার। তাহলে চাঁদমুখ করে ঠিকানাগুলো দিয়ে দিন তো। ধরে নিয়ে আসি।”
মশকরা করার সুযোগ পেয়ে ছাড়তে ইচ্ছে হল না। বললাম, “আগের ঠিকানা কিছু জানা আছে। কিন্তু এখন কোথায় আছেন তা জানতে গেলে একটু পরিশ্রম করতে হবে।”
“কীরকম?”
“একটা উইজা বোর্ড লাগবে।”
“কী বোর্ড? বাংলায় বলুন”, অফিসারের চোখ মুখ দিয়ে প্রচুর বিস্ময় ফেটে বেরোচ্ছে।
“বাংলায় বলতে গেলে বলতে হয় ভৌতিক স্বতঃলিখন যন্ত্র। একটা বড়ো কাঠের বোর্ডের ওপর বিভিন্ন অক্ষর A থেকে Z, সংখ্যা ১ থেকে ৯, ০ লেখা থাকে। তার ওপর তিনকোনা এক বোর্ড ক্যাস্টর দানার ওপরে এমনভাবে বসানো থাকে যাতে বড়ো বোর্ডটা নির্বিঘ্নে ঘুরতে পারে। হাতের আঙুলের চাপে ছোটো বোর্ড বড়ো বোর্ডে লেখা অক্ষরের ওপর ঘুরে ঘুরে এক-একটা শব্দকে নির্দেশ করে। বিদেহী আত্মাই নাকি মিডিয়ামের আঙুলের ওপর ভর করে উত্তরের শব্দগুলো বলে দেয়।”
“মানে?”
“ধরুন, কয়েকজন একসঙ্গে বসেছেন। চোখ খুলে ধ্যান করছেন আর বলছেন, এই ঘরে কোনও শুভ শক্তি থাকলে সাড়া দিন। সবার হাত বোর্ডের লাভ সাইনের উপর। বোর্ডের লাভ চিহ্ন গিয়ে নিজে নিজে বসবে YES ঘরের উপর। মনে করুন, আপনি জিজ্ঞেস করলেন, প্রিয়নাথ তুমি ঘরে আছ? দেখবেন আবার সেই লাভ চিহ্ন YES ঘরে বসবে। তারপর আপনার যা যা জিজ্ঞেস করার করে নেবেন। তবে হ্যাঁ, উত্তর যেন হ্যাঁ, না-তে হয়। বেশি বড়ো উত্তর তেনারা দিতে পারেন না...”
“শুনুন মশাই, আমার সঙ্গে ফাজলামি করতে আসবেন না, হ্যাঁ… এমন জায়গায় ভরে দেব যে সাতদিন সোজা হয়ে বসতে পারবেন না। সোজা কথায় বলুন। এদের ঠিকানা জানেন, না জানেন না?” বুঝলাম বেশ বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। তবু কনফিডেন্স হারালাম না, “কী করে জানব? তিনজনই মরেছেন বহুকাল হল। এখনকার ঠিকানা জানা নেই।”
“কারা এঁরা?”
“প্রিয়নাথকে অন্তত আপনার চেনা উচিত ছিল। যাই হোক, বলেই দিই। দেবাশিসদার থেকেই এঁর কথা শোনা। প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৫৫ সালে, নদিয়ার চুয়াডাঙায়। পেশায় পুলিশ কর্মচারী। বাংলায় প্রথম গোয়েন্দা গল্পের লেখক। প্রধানত নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘দারোগার দপ্তর’ নামে একটা সিরিজ ১২৯৭ বঙ্গাব্দ থেকে টানা বারো বছর চালিয়েছিলেন তিনি। তখনকার দিনে হটকেকের মতো বিক্রি হত। প্রিয়নাথ ১৮৭৮ থেকে ১৯১১ সালের ১৫ মে অবধি কলকাতা ডিটেকটিভ পুলিশে কাজ করেন। দারোগার দপ্তর প্রতি মাসে বেরোত। তখনকার দিনে সব শিক্ষিত বাঙালির ঘরে অন্তত দুই-এক কপি এই বই দেখা যেতই। যেসব কেস প্রিয়নাথ সলভ করেছিলেন তাদের বিস্তারিত বিবরণ লেখা থাকত এর পাতায় পাতায়। অবশ্য পরে পাঠকের চাহিদার চাপে কিছু বিদেশি গল্পও সত্যি বলে চালিয়েছিলেন...”
“অ... তা এই ভদ্রলোকের হাড়ের কেসটা কী?”
“সেটাই তো মাথায় ঢুকছে না... হার হলে নাহয় বুঝতাম কোনও কেসে হার জিতের হারের কথা হচ্ছে। আবার গলায় পরার অলংকার যে হার, তাও হতে পারত। কিন্তু এ হাড় তো হাড্ডি। যা মানুষের ২০৬ খানা থাকে…” বলেই চমকে উঠলাম। জটায়ুর ভাষায় হাই ভোল্টেজ স্পার্ক।
“বুঝেছি। প্রিয়নাথের শেষ হাড় কী বুঝেছি… শোনা যায় জীবৎকালে মোট ২০৬টা কাহিনি লিখেছিলেন প্রিয়নাথ, যার মধ্যে ২০৫টার সন্ধান পাওয়া যায়। আর-একটা কাহিনি কবে লিখেছিলেন, কী ছিল তাতে, কেউ জানে না। হয়তো এমন কিছু ছিল, যা তখন প্রকাশের অযোগ্য মনে করে পাণ্ডুলিপি ধবংস করে দিয়েছিলেন প্রিয়নাথ নিজেই। হয়তো সেই কেসে তাঁর হার হয়েছিল। অন্তত এমনটাই এতদিন ভাবা হত। কিন্তু দেবাশিসদার এই লেখা পেয়ে কেন জানি মনে হচ্ছে প্রিয়নাথের এই হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির খোঁজ তিনি পেয়েছিলেন...”
“সে পাণ্ডুলিপির খুব দাম বুঝি?” অফিসারের গলা এবার বেশ নরম।
“দাম তো বটেই। হাতে পেয়ে গেলে কলকাতার ইতিহাস আবার নতুন করে লিখতে হবে কি না কে জানে।”
বুঝতে পারছিলাম ইনস্পেক্টর গভীর চিন্তায় পড়েছেন। খানিকক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “আর বাকি দুজন?”
“গণপতি মানে জাদুকর গণপতি। গণপতি চক্রবর্তী। জন্ম শ্রীরামপুরের কাছে ছাতরা গ্রামে একটি জমিদার পরিবারে। ছেলেবেলায় লেখাপড়ায় উৎসাহী ছিলেন না। বরং গানবাজনায় বেশি উৎসাহ ছিল তাঁর। সতেরো-আঠারো বছর বয়েসে তিনি গৃহত্যাগ করেন, হিন্দু সাধুদের থেকে গুপ্ত মন্ত্রতন্ত্র, ভবিষ্যৎ ও অদৃষ্ট গণনা, ঝাড়ফুঁক এবং নানা রোগের অলৌকিক চিকিৎসাবিদ্যা শেখার জন্য। তিনি দু-একজন জাদুকরের সংস্পর্শেও এসেছিলেন। সেই সময় নানা জাদু শিখে পরে গুরুর কথাতেই আবার সংসারে ফিরে আসেন। শুরুতে উইজার্ডস ক্লাবে মামুলি হাতসাফাই ইত্যাদির খেলা দেখাতেন। কেউ বেশি পাত্তা দিত না। তারপর কিছু একটা হয়। রাতারাতি ক্লাবে গণপতি একজন কেউকেটা হয়ে ওঠেন। প্রায় একই সময়ে কলকাতায় কার্টার সাহেব ম্যাজিক দেখাতে এসেছিলেন। সাহেবের শেষ শো-তে একটা দুর্ঘটনা ঘটে। কার্টার এবং সহকারী স্টেজেই মারা যান। কিন্তু কীভাবে, তার বিস্তারিত বিবরণ কোত্থাও নেই। সেসময়ের সব পত্রিকা এই ব্যাপারে অদ্ভুতভাবে নীরব।
এই ঘটনার কিছুদিন পরেই গণপতি প্রিয়নাথ বসুর গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসে যোগ দেন এবং কৌতুক অভিনয়, মজাদার খেলা দেখিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর পলায়নী বিদ্যা ছিল দেখার মতো। বিদেশে হুডিনির মতো তিনিও যে-কোনো বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারতেন। তিনি ভৌতিক ক্ষমতাসিদ্ধ, দর্শকদের মনে এই ধারণা দৃঢ়মূল হয়েছিল। বেশ কিছুদিন তাঁকে একটা ভারী সিসার বাক্স বয়ে নিয়ে যেতে দেখা যেত। বলতেন এতে নাকি ভূত পোষা আছে। সে বাক্সে কোনও তালাচাবি ছিল না, তবু অনেকে চেষ্টা করেও সেই বাক্স খুলতে পারেনি। বাক্স কীভাবে তাঁর কাছে এল, আর কীভাবেই বা একদিন আচমকা দেখা গেল আর নেই, সে রহস্য আজও কেউ ভেদ করতে পারেনি। আমি শিওর, সেই বাক্সের কথাই দেবাশিসদা বলেছেন।”
“কী করে বুঝলেন? “
“উনিই আমাকে এই বাক্সের কথা বলেছিলেন। বাকি গল্পটাও। এটাও বলেছিলেন, ‘আমরা বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, ইস্টার আইল্যান্ডের রহস্য নিয়ে মাথা ঘামিয়ে চলছি, এদিকে ঘরের পাশেই এত বড়ো সব রহস্য লুকিয়ে আছে, তার খোঁজ কেউ রাখি না।’ তবে আমার বিশ্বাস, চুপিচুপি উনি এই সন্ধানটা চালাচ্ছিলেন। প্রায়ই বলতেন, ‘ভাবতাম আমি একাই এসব জানি। এখন দেখি পিছনে লোক লেগেছে।’ তারা কারা, বা উনি কী খুঁজছেন কোনও দিন বলেননি।”
“আর তারিণী?” স্পষ্টই অফিসার এবার বেশ কৌতূহলী।
“ইনি এমন একজন, যাঁর সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। আমার বড়দাদু, স্বর্গীয় তারিণীচরণ রায়। কলকাতার প্রথম বাঙালি প্রাইভেট ডিটেকটিভ। তারিণীচরণ ১৮৯০-এর শেষ থেকে কলকাতায় ডিটেকটিভগিরি শুরু করেন। প্রায় সেসময় থেকেই তাঁর ডায়রি লেখার স্বভাব। মৃত্যুর আগে অবধি প্রায় সব ডায়রি আমার কাছে আছে। শুধু ১৮৯২-৯৩-এর শেষের দিকের কিছু অংশের পাতা ছেঁড়া। ১৮৯৫-৯৬ ডায়রিটাই নেই।”
“এও তো এক রহস্য…” অফিসার বললেন।
“তা তো বটেই। দেবাশিসদা এই ডায়রির ব্যাপারে জানতেন। আমাকে প্রশ্ন করতেন। জানতে চাইতেন তারিণী সম্পর্কে। একবার বলেছিলেন ওই ছেঁড়া পাতাগুলো নাকি এক গ্র্যান্ড ডিজাইনের, এক বিরাট জিগস পাজলের শেষ কটা টুকরো। কীসের ডিজাইন, কী পাজল... কিচ্ছু খুলে বলেননি।”
“তাহলে আপনার কী মনে হয়? এই লিস্টটা মরার আগে আপনাকে লিখে পাঠানোর মানে কী?”
আমি আবার ভালো করে লিস্টটা দেখলাম। আর এবার দুটো নতুন ব্যাপার চোখে পড়ল। এক, কবিতাটা জেল পেনে লেখা ধরে ধরে, আর তুর্বসু জানে-টা ডট পেনে দ্রুত হাতে। যার একটাই মানে। কবিতাটা আগে কোথাও লেখা ছিল। তাড়াহুড়ো করে সেই প্যাডের পাতা ছিঁড়ে নিচে আমার নাম লেখা হয়েছে। দ্বিতীয়, যে প্যাডে কবিতা লেখা ছিল, তার বাঁদিকে পারফোরেশান। তাড়াতাড়ি ছিঁড়তে গিয়ে কাগজ অসমানভাবে ছেঁড়া হয়েছে। ফলে পারফোরেশান বরাবর কাগজ না ছিঁড়ে মাঝে কিছুটা ঢুকে গেছে। আর তাতেই হয়েছে বিপত্তি। “মুরের কাব্যগাথা” শব্দে মুরের আগে আর একটি বা একাধিক শব্দ লেখা ছিল। আভাস পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না।
অফিসারকে দেখালাম। খানিক নাক চুলকে তিনি বললেন, “তাহলে উপায়?”
“একটু ঝামেলা আছে। একটা মোটা প্যাড, লম্বায় ৫ ইঞ্চি চওড়ায় ৩ ইঞ্চি, একধারে নীল কালির ছাপ… এই বইয়ের গাদা থেকে খুঁজে বার করতে হবে। আর আমি যদি ঠিক ভাবি, তাহলে এই প্যাডটা দেবাশিসদার পাশের টেবিলে দেখেছি। কিছু লিখতে গেলে, সে ফোন নম্বর হোক বা কারও নাম, উনি এতেই লিখতেন। প্যাডের উপরে লাল কভারে Oxford লেখা।”
প্যাড খুঁজে পেতে পনেরো মিনিটের বেশি লাগল না। পাতায় পাতায় ফোন নম্বর, নাম, হিজিবিজি কাটা। আমার নাম আর নম্বরের পাশে লাল কালিতে লেখা ‘তারিণীর প্রপৌত্র’। মাঝামাঝি গিয়ে ছেঁড়া পাতাটা পাওয়া গেল। ত্রিভুজের মতো ছোট্ট একটা কাগজের টুকরো তাতে আটকানো। খুদে অক্ষরে কী যেন লেখা। ভালো করে দেখতে দেখা গেল, লেখা আছে ‘তৈ’। মানে ‘তৈমুরের কাব্যগাথা’। এতে লাভের লাভ কী হল বুঝলাম না। কে এই তৈমুর? তাঁর কাব্যগাথার সঙ্গে তারিণী বা প্রিয়নাথের কী সম্পর্ক? কিছুটা জট খুলতে না খুলতে আবার পাকিয়ে গেল।
অফিসার পাশেই ছিলেন। “কিছু বুঝতে পারছেন?”
“এটা বুঝছি না। তবে বাকি তিনটে থেকে একটা ভাসা ভাসা ধারণা যেন আকার নিচ্ছে।”
“কীরকম?”
“১৮৯২-৯৩ সালে, যে সময়ে তারিণীর ডায়রির পাতা গায়েব হয়ে গেছে, ঠিক সেই সময়ই প্রিয়নাথ দারোগাগিরি করছেন, গণপতি তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করবেন বলে ভাবছেন… একই সময় এই তিনজন একসঙ্গে কলকাতা শহরে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। আর ঠিক সেই সময় কার্টারের শেষ ম্যাজিক শো-তে স্টেজেই মৃত্যু হচ্ছে। সে মৃত্যু এমন মৃত্যু যে কোনও পত্রিকা খোলসা করে বলছে না ঠিক কী হয়েছিল। না স্যার… আমি নিশ্চিত ভয়ানক কিছু একটা ঘটেছিল সেসময়।”
“সে নাহয় হল, কিন্তু সে তো একশো বছরের আগের ঘটনা। আর এই খুন তো টাটকা। আজকের। এত পুরোনো ঘটনা, যদি কিছু ঘটেও থাকে, তার জন্য এতদিন পরে দেবাশিসবাবুকে মরতে হবে কেন?”
“দেবাশিসদা নিশ্চয়ই কিছুর সন্ধান পেয়েছিলেন। কিছু বিপদ চিরকালীন। ধরে নিন এটাও সেইরকম কিছু একটা। গত একশো বছর ধরে কেউ বা কারা একটা দৈত্যকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চাইছে। আমার স্থির বিশ্বাস, দেবাশিস গুহ জেনে হোক বা না জেনে সেই দৈত্যের গায়ে ঢিল ছুড়ে তার ঘুম ভাঙাতে চেয়েছিলেন।”
ষষ্ঠদশ পরিচ্ছেদ— তৈমুর
১৭ ডিসেম্বর, ১৮৯২, কলিকাতা, রাত ৯টা
খুব অস্থির লাগছিল গণপতির। কিছুতেই যেন নিশ্চিন্ত হয়ে বসতে পারছে না। দুই-একবার মাথায় হাত দিয়ে চুল ঠিক করে নিল। করিন্থিয়ান থিয়েটার আজ কানায় কানায় ভরা। কার্টার সাহেবের ম্যাজিকের আজ শেষ দিন। নবীন মান্না বলেছেন আজ নাকি কী সব স্পেশাল হবে। গণপতি আর তারিণী যেখানে বসে আছে সেখানে বসার সামর্থ্য তাদের নেই। বারো টাকা তাদের দুজনের সারা মাসের আয়ের বেশি। সেদিন সকালে নবীনবাবু গণপতির পলায়নী বিদ্যা দেখে চমৎকৃত হয়ে নিজেই ওদের দুজনের জন্য বক্সের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। দুজনেই আজ সাহেবি পোশাক পরে এসেছে। নিজেদের না। থিয়েটার কোম্পানি থেকে এক বেলার জন্য চেয়েচিন্তে আনা। এই বাবদ দেড় আনা কড়ায়গন্ডায় ম্যানেজারবাবু আগেই বুঝে নিয়েছেন। তারিণী উত্তেজিত, জীবনে প্রথমবার এই থিয়েটারে ঢুকতে পেরে। গণপতির উত্তেজনা সেরকম না একবারেই। যেন কোনও এক অনাগত বিপদের আশঙ্কা করছে সে। তারিণী বুঝবে না। হিমালয়ে গুরুর কাছে নানা বিদ্যা শেখার মধ্যে এটাও আয়ত্ত করেছিল গণপতি। বাতাস যেন ফিসফিসিয়ে তার কানে এসে কু ডেকে যায়। এমনটা এর আগে দুই-একবার হয়েছিল। প্রতিবার শেষটা খুব দুঃখজনক হয়েছে। কলকাতায় এসে গুরু হিসেবে পেয়েছিল বলরাম দে স্ট্রিটের জওহরলাল ধরকে। পামিং-এর রাজা। বাংলায় যাকে বলে হাতসাফাইয়ের খেলা। তাঁর কাছেই নাড়া বেঁধে হাতসাফাই শিখতে শুরু করে গণপতি। প্রথমে সরষে, তারপর মটর, তারপর মটর কড়াই হাতের ভাঁজে লুকানোর অভ্যাস করাতেন তিনি। গণপতি বিরক্ত হত। চাইত একেবারে টাকা হাপিসের খেলা শিখতে। জওহরলাল হাসতেন। বলতেন, “ধীরে অভ্যাস করো। এর ফল পরে বুঝতে পারবে।” যেদিন টাকা হাপিসের পদ্ধতি শেখাবেন, সেদিনও সকাল থেকে গণপতির এমন উচাটন ভাব। জওহরলাল জিজ্ঞাসাও করলেন, “কী ব্যাপার? আজ এত অস্থির দেখছি! মন শান্ত করো। তা না হলে এই খেলা শেখা যাবে না।” নিজেকেই ধমকে, শান্ত করে টাকা হাপিসের গোপন পদ্ধতি শিখেছিল গণপতি। তারপর তার হাতে জওহরলাল তুলে দিয়েছিলেন পঞ্চাশ টাকার বড়ো একটা নোট, “দেখি এটাকে হাপিস করে দেখাও…।” মা ভবতারিণী আর গুরুর নাম স্মরণ করে হাতের দুই ঝটকায় গণপতি যখন নোটটা তালুর ভাঁজে লুকিয়ে ফেলল, জওহরলাল অবাক না হয়ে পারেননি। খুশি হয়ে তিনি ওই টাকা গণপতিকে পুরস্কার দিয়েছিলেন। তাঁকে প্রণাম করে গণপতি উইজার্ডস ক্লাবে আসতে না আসতে খবরটা পায়। জওহরলাল ধর আর নেই। তাকে ম্যাজিক শিখিয়েই জওহরলাল রাস্তায় বেরিয়েছিলেন কোনও কাজে। এমন সময় এক চেরেট গাড়ি কোথা থেকে তাঁকে চাপা দিয়ে চলে যায়। সে গাড়ির ঘোড়া নাকি পাগলা হয়ে গেছিল। ঘটনাস্থলেই জওহরলাল মারা গেছেন।
অনেকদিন বাদে আজকে আবার গণপতি বাতাসে সেই গন্ধটা পাচ্ছে। দম বন্ধ করা। অস্বস্তিদায়ক। শ্মশানের স্মৃতির মতো। তারিণীর মহা ফুর্তি। কিন্তু গণপতি খুশি হতে পারছে না। কোথাও একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল যেন, হাসি, চিৎকার, কথাবার্তা সবকিছু যেন হাজার গুণ জোরে তার কানে এসে বাজছে। অবশেষে খুব জোরে বেজে উঠল ড্রাম। বারবার শুধু একটা কথা ভাবছিল গণপতি। খুব ভুল জায়গায় বসেছে সে। তার স্থান মঞ্চের এদিকে না, ওদিকে। মঞ্চের ওপরে। ফুটলাইটের চুনজ্বলা আলো কাঁপতে লাগল। পর্দার অন্যদিকে আর-এক লম্বা যুবক একটু অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল। হাতে পাতলা একটা চটি বই। সেটার কান ধরেই মোচড়াচ্ছিল সে। আজ এই শেষ শো-টা শেষ হলে বাঁচে। যেমনটা সে ভয় পেয়েছিল ঠিক সেটাই হয়েছে। তার এখন থাকার কথা মেডিক্যাল কলেজে, সেই লাশটার পাশে। কিছু একটা গণ্ডগোল হচ্ছে ভেবে তার দাদা তাকে পাঠিয়েছেন অন্য এক কাজে। এই দেশে। অন্য নাম আর পরিচয় দিয়ে। দাদা ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের হোমরাচোমরা। এতটাই, যে তাঁকেই স্বয়ং ব্রিটিশ সরকার বলা যায়। ভাইয়ের চেয়ে সবদিকে এগিয়ে, কিন্তু অলস। পরিশ্রম করতে রাজি নন। অগত্যা ভাইকেই গোপনে আসতে হয়েছে এই দেশে। তার আসল পরিচয় কেউ জানে না। কার্টারও না। জানেন কেবল তার দাদার বন্ধু চিফ ম্যাজিস্ট্রেট টমসন সাহেব আর ডাক্তার মার্টিন।
প্রথমে ভাবনা ছিল কী পরিচয়ে সে আসবে? অভিনয়। এর আগে উইলিয়াম এস্কট নাম নিয়ে হ্যামলেট নাটকে, কিংবা জুলিয়াস সিজারে ক্যাসিয়াসের ভূমিকায় অভিনয় করেছিল সে। নাটকের সূত্রেই ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় যাওয়া। গোটা আমেরিকা জুড়ে প্রায় একশো আটাশটি অভিনয় করে তার দল। মঞ্চ তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা নয়। তবে কার্টারের খেলায় অভিনয়ের সুযোগ নেই। কার্টারই তার হাতে এই বইটা ধরিয়ে বলেছেন এটা থেকে আবৃত্তি করতে। সেই থেকে তার কাছেই বইটা থাকে।
১৮২৭ সালে প্রকাশিত বইটার লেখকের নাম নেই। মুদ্রক কেলভিন এফ এস থমাস। কোন এক বোস্টনবাসী নিজের খরচায় বইটা ছাপিয়েছিল। বেশ কটা কবিতা। দীর্ঘ কবিতা একটাই। পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেছিল সে। বারবার পড়েছিল, প্রায় সারারাত। বইটা সে কাছছাড়া করে না। বইয়ের প্রথম পাতায় কালো কালিতে এক কোনায় ছোটো ছোটো করে লেখা ওঁর খুব চেনা এক লেখকের নাম। কে জানে হয়তো বেনামে বইটা তাঁরই লেখা।
আবার বেজে উঠল ড্রাম। প্রথমে কার্টার ঢুকবেন, তারপর কিউ পেলেই তাকে ঢুকতে হবে মঞ্চে। স্টেজ ম্যানেজার হাতের ইশারা করল। চারজন সহকারী মঞ্চের পিছনে থেকে ঠেলে নিয়ে এল পাগড়ি পরা, লাঠি হাতে এক পুতুলকে। তার সামনে একটা দাবার বোর্ড। পুতুলের ডান হাত দাবার ছকের ওপরে। দুই সহকারী পুতুলের নিচের কাবার্ডের দরজা খুলে দেখিয়ে দিল সেখানে একগাদা গিয়ার আর কগ চাকা, কোনও মানুষ লুকিয়ে নেই। ড্রামের আওয়াজ বাড়তে বাড়তে প্রায় কানের পর্দা ফাটিয়ে দেবে, এমন সময় যেন অন্ধকার ফুঁড়ে উদয় হলেন ম্যাজিশিয়ান কার্টার। প্রায় ছ-ফুট লম্বা, খাড়া নাক, ওলটানো চুল, হাসিমুখ। কার্টারের পরনে লম্বা ফ্রক কোট, বো টাই আর পায়ে চকচকে পালিশ করা জুতো। ঢুকেই দুই পকেট থেকে বার করলেন দুটো রুমাল আর সে দুটো মুঠো করে ছুড়ে দিতেই দুটো পায়রা ঝটপট করে উড়ে গেল হলের মধ্যে। দর্শকদের হাততালির আওয়াজে হলেও যেন একশো পায়রা উড়ে গেল।
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান, বয়েজ অ্যান্ড গার্লস… আজ থেকে এক দশক আগে আমি ভারতে এসেছিলাম। তবে কলকাতায় না। এসেছিলাম হিমালয়ে। সেখানে এক গুরুর কাছে দীর্ঘদিন জাদু শিক্ষা করেছি আমি। শিখেছি গোপন সব জাদুবিদ্যার কথা। গুরু আমার ওপর খুশি হয়ে এই পুতুলটি উপহার দিয়েছিলেন আমায়…”
সব মিথ্যে কথা, গণপতি ভাবছিল, এই লোক আর যাই হোক কোনও দিন হিমালয়ে গিয়ে জাদু শেখেনি। ভারতীয় জাদুতে এই দেখনদারি নেই একেবারেই।
“এই পুতুলের নাম তৈমুর। সেই অত্যাচারী দস্যু, যিনি এককালে গোটা এশিয়ার ত্রাস ছিলেন। সমরখন্দে তাঁর সমাধিতে লেখা আছে, ‘আমি যেদিন ফের জেগে উঠব, সেদিন সমস্ত পৃথিবী আমার ভয়ে কাঁপবে!’ এই পুতুলে তৈমুরের আত্মা লুকানো আছে। এখন শুধু দরকার তাঁকে জাগিয়ে তোলা।”
দর্শকদের মধ্যে চাপা ভয়ের একটা নিঃশ্বাস টানার শব্দ হল। বাকি সব চুপচাপ। থমথমে।
“কেউ একটাও কথা বলবেন না। কেউ কারও দিকে তাকাবেন না। আমি এবার এই আত্মাকে জাগিয়ে তুলব”, বলে যেন হাওয়া থেকেই কার্টার হাজির করলেন এক ম্যাজিক ওয়ান্ড। আর এটাই কিউ।
সেই যুবক ধীরে ধীরে এসে দাঁড়াল ফুটলাইটের সামনে। অদ্ভুত গমগমে গলায় আবৃত্তি করতে থাকল...
“Kind solace in a dying hour
Such, father, is not (now) my theme—
I will not madly deem that power
Of Earth may shrive me of the sin
Unearthly pride hath revell’d in—
I have no time to dote or dream:
You call it hope— that fire of fire!”
স্তবকের ঠিক মাঝামাঝি ক্যাঁচ করে একটা শব্দ হল। তৈমুরের মাথাটা অল্প নড়ে উঠল যেন! কার্টার চোখ বুজে বিড়বিড় করছেন। যুবক বলে চলেছে—
“It is but agony of desire:
If I can hope— Oh God! I can—
Its fount is holier— more divine—
I would not call thee fool, old man,
But such is not a gift of thine.”
কার্টার ম্যাজিক ওয়ান্ডটা একবার ঘড়ির কাঁটার দিকে, একবার বিপরীত দিকে ঘোরাচ্ছেন। ঘোরানোর গতি বাড়ছে। কার্টারের হাত প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। এদিকে আবৃত্তির লয় বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। হঠাৎ সব স্তব্ধ। কার্টার হাঁফাচ্ছেন। সেই যুবক চুপ। শুধু একটাই ক্যাঁচকোঁচ শব্দ শোনা যাচ্ছে গোটা হলে। তা যেন বেড়ে উঠছে ক্রমাগত। তৈমুরের হাত সেই দাবার বোর্ডে নড়ছে। পাশাপাশি। ঠিক জ্যান্ত মানুষের মতো। গণপতি জীবনে এমন অদ্ভুত জিনিস দেখেনি।
কার্টার এবার দর্শকদের থেকে কোনও একজনকে উঠে আসতে বললেন। এমন একজন, যিনি ভালো দাবা খেলতে জানেন। কেউ ওঠে না। শেষে মৃদু হেসে কার্টার বললেন, “আমি জানি বড়োলাট দাবায় পারদর্শী। আমাদের অসীম সৌভাগ্য, তিনি নিজে আমাদের এই শো দেখতে এসেছেন। আর তাঁর জন্যেই আজ এক স্পেশাল খেলা দেখাব আমি, যা গোটা সফরে দেখাবার সাহস করতে পারিনি। সে কথা পরে। আমি মাননীয় বড়োলাটকে অনুরোধ করব তিনি যেন দয়া করে একবারটি মঞ্চে আসেন।” চমকে গেল গণপতি। তারিণীও। সব কাজ ফেলে ল্যান্সডাউন এসেছেন ম্যাজিক খেলা দেখতে!
একটু আপত্তি করে হাসিমুখে মঞ্চে উঠলেন বড়োলাট। তাঁকে প্রায় হাত ধরে তৈমুরের কাছে নিয়ে গেলেন কার্টার। আবার নিচের ক্যাবিনেট খুলে বড়োলাটকে দেখিয়ে দেওয়া হল কিছু চাকা ছাড়া ভিতরে কেউ লুকিয়ে নেই। ডালা বন্ধ করা হল। তৈমুরের সামনে সাদা গুটি। বড়োলাটের সামনে কালো। তিনি সামনে দাঁড়াতেই তৈমুর রাজার সামনের বোড়ে দুই ঘর এগিয়ে দিল। প্রায় কিছু না ভেবেই বড়োলাট তাঁর রাজার সামনের বোড়েও দুই ঘর এগোলেন। এক ঝটকায় তৈমুর রাজার ডান পাশের হাতিকে টেনে নিয়ে এল সাদা বোড়ের পাশে। বড়োলাট এটা আশা করেননি। তিনি একটু ভেবে মন্ত্রীর পাশের কালো ঘোড়াকে আড়াই চাল দিয়ে এগিয়ে আনলেন সামনে। তৈমুর নিজের মন্ত্রীকে বাড়িয়ে দিল কোনাকুনি, চার ঘর। এবার বড়োলাট একটু বিভ্রান্ত। অন্য ঘোড়াটাও আড়াই চালে এগিয়ে দিলেন সামনে। ব্যস! তৈমুর যেন এটার অপেক্ষাই করছিল। কালো হাতির সামনের বোড়েকে খেয়ে মন্ত্রী চলে গেল সোজা রাজার সামনে। কিস্তিমাত। আর মাত্র একটা বোড়ে খেয়ে। চার চালে এমনভাবে কিস্তিমাত হবেন, তা বুঝি বড়োলাট নিজেও ভাবেননি। আর তাও একটা পুতুলের কাছে। লজ্জায় তাঁর ফর্সা মুখ লাল। কার্টার বুঝি বুঝলেন ব্যাপারটা। বললেন, “হিজ হাইনেস! একটা কথা বলি। আমরা সাধারণ মরমানুষ। আমাদের কি ক্ষমতা আছে বিদেহী আত্মার সঙ্গে লড়ার? আর তাও যে-কোনো আত্মা না। স্বয়ং তৈমুরের আত্মা। রণকৌশলে যাঁর জুড়ি একদা পৃথিবীতে ছিল না, তাঁর সঙ্গে দাবার ময়দানে আপনি বলে তাও চার চাল অবধি টিকতে পেরেছেন। আমি আপনাকে বলছি, এর আগে বেশিরভাগ মানুষ খেলার সাহসই দেখায়নি। যারা দেখিয়েছে, কেউই দুই চালের বেশি টেকেনি। বড়োলাটের জন্য সবাইকে একটা অভিনন্দন জানাতে অনুরোধ করছি।” বড়োলাট না হলেও তৈমুরের জন্য গোটা হল হাততালিতে ফেটে পড়ল। কার্টার বড়োলাটকে তাঁর বসার জায়গা অবধি পৌঁছে দিলেন। এবার কার্টার সরাসরি ফিরলেন সেই যুবকের দিকে। “আর-একটা হাততালি লন্ডনের বিখ্যাত অভিনেতা সাইগারসনের জন্য, যিনি আজ কবিতাটি আপনাদের সামনে পাঠ করলেন।”
সামান্য কিছু হাততালির শব্দ শোনা গেল। যুবক মাথা নিচু করে কী যেন ভাবতে ভাবতে উইংসে ঢুকে গেল। কার্টারের সঙ্গে হাত মেলানোর সময় বড়োলাট কার্টারের হাতে একটা কাগজের টুকরো গুঁজে দিলেন। কী লেখা আছে তাতে?
সপ্তদশ পরিচ্ছেদ— গণপতির ভেলকি
১৭ ডিসেম্বর, ১৮৯২, কলিকাতা, রাত সাড়ে নটা থেকে দশটা
বড়োলাট মঞ্চ থেকে নেমে যেতেই কার্টার আবার ফিরে গেলেন তাঁর বুকনিতে। যাকে বলে প্যাটার। “অন্য খেলা দেখানোর আগে আমি আপনাদের জানিয়ে দিতে চাই ম্যাজিশিয়ান হিসেবে আমার কাজ আপনাদের আনন্দ দেওয়া। আর ঠিক সেটাই আজ আমি করব। আমি আজ এই মঞ্চে যাই করি না কেন, দয়া করে মনে রাখবেন, আমি আপনাদের বোকা বানাব না। কিছুতেই না।”
“ঠিক সেটাই তুমি করতে যাচ্ছ”, মনে মনে বিড়বিড় করে বলল গণপতি।
তারপর আধঘণ্টা ধরে নানা ভেলকি দেখিয়ে গেলেন কার্টার। কাচের বয়াম থেকে রুমাল বেরোচ্ছে তো বেরোচ্ছেই। হাওয়া থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ তাস এনে টিপ করে ছুড়ে দিতে লাগলেন দর্শকদের দিকে। “এটা আপনার জন্য” বলে ছুড়ছেন, আর তাস যেন পোষমানা পাখির মতো উড়ে গিয়ে যাঁর নাম তাঁর কোলে পড়ছে। প্রথম তাস পড়ল বড়োলাটের কোলে। তিনি সবাইকে দেখালেন। ইস্কাবনের সাহেব। হাতে উদ্যত তলোয়ার। একে একে দূরের আসনেও ছিটকে যেতে থাকল তাস। শেষে যখন একেবারে পিছনে বসা দর্শকদের কাছেও তাস উড়ে গিয়ে পড়তে লাগল, গোটা হল ফেটে পড়ল হাততালিতে। হঠাৎ কার্টার সাহেব থেমে গেলেন। পিছনের অর্কেস্ট্রার আওয়াজ মৃদু আর গমগমে হয়ে গেল। কার্টার এগিয়ে এলেন সামনে। গম্ভীর ব্যারিটোন গলায় বললেন, “আমি আপনাদের থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনাদের আগেই বলেছি, আমি আজ একটা স্পেশাল খেলা দেখাব। যে খেলা হাজার হাজার বছর আগে ভারতের কোনও এক নাম না জানা ফকির আবিষ্কার করেছিলেন, যে খেলা একদল বেদে দেখিয়েছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে, সারা বিশ্বে যে জাদু দেখানোর সাহস আজ অবধি কোনও ইউরোপিয়ান করেননি, আজ সেই খেলাই আমি আপনাদের দেখাব। কারণ দুটো। এক— আজ আমার শো-র শেষ দিন, আর দুই, স্বয়ং বড়োলাট আজ এখানে উপস্থিত আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, ক্ষমা কেন? কারণ এই দুরূহ খেলাটি দেখাতে কিছু প্রস্তুতি দরকার, আর ঠিক সেইজন্য আজ আমি আমার চিরপরিচিত পলায়নী বিদ্যা বা এসকেপ আর্ট দেখাতে পারব না। আমি দুঃখিত, আপনারা যাঁরা আমার শো আগে দেখেননি, তাঁরা এই খেলা থেকে বঞ্চিত হবেন।”
“এক্সকিউজ মি”, নিচে দ্বিতীয় রো থেকে ভেসে এল কার গলা। এ কণ্ঠ গণপতির চেনা। কার্টারেরও।
উঠে দাঁড়িয়ে এইমাত্র যিনি কথাটা বললেন, তিনি কলকাতার পরিচিত মুখ। উইজার্ড ক্লাবের প্রেসিডেন্ট নবীনচন্দ্র মান্না।
কার্টার ঠিক এই ধরনের বাধার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। কেউই না। তবু তিনি সামলে উঠে বললেন, “বলুন কী বলবেন?”
“আসলে আমরা যারা জাদুর খেলা দেখাই, তারা একটা মন্ত্রকে বীজমন্ত্রের মতো জপ করি। দ্য শো মাস্ট গো অন। যা হয় হোক। খেলা বন্ধ করা যাবে না। সাহেব, এখানে বেশিরভাগ দর্শক আপনার পলায়নী বিদ্যা দেখতেই এসেছেন। আপনি তাঁদের বঞ্চিত করবেন না। আপনি স্পেশাল দেখাতে চান দেখান, কিন্তু তা বলে যে খেলা বিজ্ঞাপিত হয়ে গেছে তাকে বাদ দিয়ে নয়।”
অন্য কেউ হলে হয়তো কার্টার গুরুত্বই দিতেন না। কিন্তু নবীন মান্না বেশ কেউকেটা লোক। বড়ো বড়ো জায়গা অবধি তাঁর হাত আছে। তাঁকে চটানো ঠিক সমীচীন মনে করলেন না কার্টার।
“বুঝলাম মিস্টার মান্না, কিন্তু আমি যে খেলাটি দেখাতে চলেছি, তা ঠিকভাবে পারফর্ম করতে গেলে অন্তত আধ ঘণ্টা আমাকে নিবিড়ভাবে মনঃসংযোগ করতে হবে। একটু ভুল হলে কারও মৃত্যু অবধি হতে পারে। এসকেপ আর্ট খুবই কঠিন এক বিদ্যা। তারপরে অন্য কোনও জাদু দেখানো সম্ভব হয় না। আপনারা বরং ততক্ষণ আমার সহকারী বিখ্যাত চিনা জাদুকর চিন-সু-লিনের চৈনিক জাদু দেখুন।”
নবীন মান্না তবু আসনে বসলেন না, বরং সবাইকে অবাক করে মঞ্চে উঠে এলেন। কার্টারের দিকে সোজা তাকিয়ে বললেন, “আমার একটা প্রস্তাব আছে। দেখুন আপনি রাজি কি না। আমার এক শিষ্য আছে। নেটিভ। সে পলায়নী বিদ্যায় যে দক্ষতা অর্জন করেছে, তা যে-কোনো ইউরোপিয়ান জাদুকরের সমকক্ষ। আমার ইচ্ছা, আজ আপনার পরিবর্তে সে এই পলায়নী বিদ্যা সবার সামনে প্রদর্শন করুক।”
“অসম্ভব! এই বিদ্যা কোনও শিক্ষানবিশের খেলা বা তাসের জাদু না। একটু এদিক-ওদিক হলে আপনার শিষ্য নির্ঘাত মারা যাবে। আমি তা হতে দিতে পারি না। আপনি এই খেয়াল ত্যাগ করুন।”
এদিকে উত্তেজিত তারিণী ক্রমাগত গণপতিকে খোঁচাচ্ছিল; “তোমার কথাই তো বলছে মনে হচ্চে হে! তুমি তৈরি তো?” গণপতি নিজে কেমন বোকা হয়ে গেছিল। সাহেবি ইংরাজি উচ্চারণ ভালো না বুঝলেও হাবেভাবে ব্যাপারটা অল্প বুঝতে পারছিল। কিছুটা তারিণীও অনুবাদ করে বলছিল। এভাবে এইরকম সুযোগ আসবে, সে ভাবেওনি। কিন্তু যখন এল, একদিকে তার বুক উত্তেজনায় দুরুদুরু করছে, মন বলছে সাহেব যেন রাজি হন। করিন্থিয়ান থিয়েটারে ম্যাজিক দেখানোর সুযোগ কজনের ভাগ্যে জোটে? আর যদি জুটে যায়, তবে গণপতিই হবে প্রথম ভারতীয়, যার ভাগ্য এই শিকে ছিঁড়ল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত একটা ভয় তাকে চেপে ধরছে। এত বড়ো মঞ্চে ম্যাজিক সে কোনও দিন দেখায়নি। আর-একটা ব্যাপার আছে। গঙ্গায় পলায়নী বিদ্যা দেখানোর সময় যন্ত্রপাতি সব তার নিজের, এখানে সাহেবের যন্ত্রে কাজ করতে হবে। অবশ্য অন্যদিকে দেখতে গেলে সব ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিকের যন্ত্রে আগে বাঁচার উপায়টা করে রাখে। ফলে গঙ্গায় মারা যাবার যে ঝুঁকি ছিল, এখানে তা নেই বললেই চলে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, সাহেব কি রাজি হবেন? মুখের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একবার সে দেখে নিল টর্ক রেঞ্চটা ঠিকঠাক আছে কি না।
এদিকে মঞ্চে নবীন মান্না আর কার্টারে বেশ তর্কই বেধে গেছে। নবীন মান্না গঙ্গাবক্ষে গণপতির পলায়নের কথা বললেন। জানালেন, তিনি অনেকদিন ধরে এই যুবককে নিজে ম্যাজিক শিক্ষা দিচ্ছেন (যদিও তা সত্যি নয়)। কিন্তু কিছুতেই সাহেব রাজি হচ্ছেন না দেখে শেষে তিনি তুরুপের তাসটি ফেললেন, “আপনি কি ভয় পাচ্ছেন মি. কার্টার? একজন নেটিভের কাছে হেরে যাবার ভয়?”
এই চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করা কার্টারের পক্ষে মুশকিল। গণপতি পরিষ্কার দেখতে পেল কার্টার একবার সামনের সারিতে বসে থাকা বড়োলাটের দিকে তাকালেন। বড়োলাট কোটের পকেট থেকে ঘড়ি বার করে বারবার দেখছিলেন, তিনি কার্টারের দিকে চেয়ে দুবার উপরে নিচে ঘাড় নাড়লেন। যার মানে হ্যাঁ। কার্টার অবশেষে নবীন মান্নাকে বললেন, “ওয়েল, আপনার কথাই থাক। ডাকুন আপনার শিষ্যকে, কিন্তু পরে কিছু হলে দোষ দিতে পারবেন না এই বলে রাখলাম।”
নবীন মান্না মৃদু হেসে উত্তর না দিয়ে সোজা তাকালেন গণপতি আর তারিণীর বক্সের দিকে। একটু গলা কাঁপিয়ে ঘোষণা করলেন, “দর্শকরা, যাঁরা পলায়নী বিদ্যা দেখতে এসেছেন, তাঁদের আজ নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হবে না। জাদু দেখাবেন আমাদেরই এক নেটিভ বাঙালি জাদুকর, যিনি আমাদের উইজার্ডস ক্লাবের তারকাও বটে, যাঁর গঙ্গাবক্ষে পলায়নী বিদ্যার কথা নিশ্চয়ই আপনারা শুনেছেন (মজার ব্যাপার এখানে অনেককে মাথা নাড়াতে দেখে গণপতি আর তারিণী দুজনেই যুগপৎ অবাক হল। দশ মিনিট আগেও নবীন মান্না ছাড়া কেউ তাদের গঙ্গা অভিযানের কথা জানত না। এখন লোকে এমন মাথা নাড়াচ্ছে, যেন সবাই সেখানে উপস্থিত ছিল)… আমি ডেকে নিচ্ছি বিখ্যাত জাদুকর, ইজ হি আ ম্যান অর আ ডেভিল? ইজ কন্টিনিউয়াসলি আস্কড, এভরি ম্যান, উওম্যান, অ্যান্ড চাইল্ড শুড সি দিস ওয়ান্ডারফুল ম্যান, দ্য গ্রে-এ-এ-এ-ট গণপতি…” হলের বেশিরভাগ দর্শকই দেশীয়। নতুন কিছু দেখার আশায় তারা করতালিতে হল ফাটিয়ে দিল। গণপতি অতি ধীরে বক্স থেকে নেমে মঞ্চের দিকে এগিয়ে এল। সামান্য হলেও ঘাবড়ে গেছে সে। সবার দৃষ্টি তার দিকে। মঞ্চে ওঠার সময়ই একবার হোঁচট খেয়ে গেল। হেসে উঠলেন দর্শকদের কেউ কেউ। কার্টারকে দেখলে মনে হয় কে যেন তাঁর মুখে চিরতাগোলা জল ঢেলে দিয়েছে। কোনওক্রমে হাত মিলিয়ে গণপতিকে ইংরাজিতে বললেন, “তুমি আমার যন্ত্রপাতি দেখে নাও। চিন-সু-লিন আধ ঘণ্টা ম্যাজিক দেখাবে। তারপরেই তোমার পালা। দেখো, প্রাণটা যেন বাঁচে।” নবীন মান্না হাসিমুখে গোটাটার অনুবাদ করে শেষে যোগ করে দিলেন, “দাও তো বাছা, সাহেবের মুখে নুড়ো জ্বেলে… এ এক তুমিই পারবে…”
গোটা মঞ্চে আবার আওয়াজ শুরু হল। এবার চৈনিক সুর। মঞ্চে পায়ে পায়ে এসে ঢুকলেন চৈনিক জাদুকর চিন-সু-লিন। গণপতি কার্টারের সহকারীর সঙ্গে মঞ্চের পাশে যেতে যেতে হঠাৎ চমকে দেখল চৈনিক জাদুকরের চোখের মণির রং গাঢ় নীল। কোনও চিনা লোকের চোখের রং নীল হয়, তা গণপতির জানা ছিল না।
চিন-সু-লিনের ছোটোখাটো চেহারা। ম্যাজিক যে দারুণ কিছু দেখাচ্ছেন, তা-ও নয়। তবে তাঁর ম্যাজিকে বেশ চটক আছে। আর কার্টারের ম্যাজিকের থেকে এঁর তফাত হল, ইনি একটিও শব্দ উচ্চারণ করেন না। খাঁটি চিনা জাদু বলে ‘ড্রিম অফ ওয়েলথ’ নামে এক ম্যাজিক দেখালেন লিন। ছোটো এক ধাতুর খালি পাত্রে কিছুটা দুধ ঢেলে গরম করলেন তেলের বাতির খোলা আগুনে। দুধ ফুটতে না ফুটতে ভিতর থেকে ফোয়ারার মতো বেরিয়ে এল অসংখ্য ধাতব মুদ্রা। তাঁর সহকারীর গোটা ট্রে ভরে গেল, তবু মুদ্রা বেরোচ্ছে তো বেরোচ্ছেই। শেষে জাদুকর সেই পাত্র থেকে টেনে বার করলেন বিরাট বড়ো একটা চৌকো সিল্কের কাপড়, যাতে একশো টাকার নোটের ছবি আঁকা। আবার দুইজন সহকারী সেই কাপড়ের দুই দিক ধরে একবার ঝাঁকুনি দিতেই কাপড় অদৃশ্য। মঞ্চের ঠিক মাঝবরাবর ভেসে আছে বিশাল এক মুদ্রা।
কার্টারের এক সহকারী এবার গণপতিকে নিয়ে গেল ভিতরের দিকে। লিনের জাদু শেষ হলেই তাকে স্টেজে নামতে হবে। এদিক-ওদিক চেয়ে কার্টারকে দেখতে পেল না সে। কার্টার যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন। হলের পিছনে অন্ধকার গলিতে টিমটিমে কেরোসিন তেলের আলো। বাইরের দর্শকদের উল্লাস, হাততালির আওয়াজ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে এখানে। সহকারী বিরাট এক বাক্সের সামনে উপস্থিত করলেন গণপতিকে। এক মানুষ সমান। ডালা খুলতেই গণপতির চক্ষু চড়কগাছ। ভিতরে ক্রুশকাঠের মতো বড়ো একটা পাটাতন, তার সঙ্গে আটকানো অন্তত গোটা দশেক শিকল, হাতকড়া, দড়িদড়া। সহকারী বুঝিয়ে বললেন, এতে দর্শকদের মধ্যে থেকে কেউ একজন এসে জাদুকরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়ে বাক্সে ভরে দেবেন। তারপর পাঁচ মিনিটের মধ্যে জাদুকর সেই বন্ধন মুক্ত হয়ে বেরোবেন।
এতসব বোঝানোর ফাঁকেই সহকারী বিড়বিড় করে বলছিলেন কী যেন। গণপতি হাত উঠিয়ে তাঁকে থামিয়ে দিল। বারবার পরীক্ষা করতে থাকল দড়িদড়া, হাতকড়া আর লোহার মোটা মোটা ক্লাম্পগুলো। নিজের মনেই অস্ফুটে একবার যেন বলে উঠল, “এ যে কংসের কারাগার…।” তিন-চারবার ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে খুটখাট কী যেন করল সে। তারপর সব নিস্তব্ধ। সহকারী বাইরে দাঁড়িয়ে। ওদিকে চিন-সু-লিনের খেলা প্রায় শেষ। গণপতি ভিতরে ঢুকে কী করছে? আর কেউ জানুক না জানুক, সহকারী জানে ভিতরে বাতাসের চলাচল কম। আনাড়ি লোকের জ্ঞান হারানো অসম্ভব না। একটু ঘাবড়ে গিয়েই দরজা খোলার চেষ্টা করে দেখল, কোন অদ্ভুত উপায়ে গণপতি নিজেকে ভিতরে আটকে ফেলেছে। বাইরে থেকে দরজা খোলা যাচ্ছে না। এখন উপায়? কার্টার সাহেবকে ডাকা যায়। কিন্তু তিনি তো দলের সবাইকে বলেই দিয়েছেন আজকের স্পেশাল ম্যাজিকের আগে তাঁকে কিছুতেই যেন বিরক্ত না করা হয়। তাঁর হাতে বাছাই কিছু সহকারী নিয়ে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে কী করছেন কে জানে। এদিকে সময় এগিয়ে যাচ্ছে, গণপতির কোনও সাড়াশব্দ নেই। বাইরে থেকে বেশ কয়েকবার টোকা দিয়েও লাভ হয়নি কিছুই। আচ্ছা ফ্যাসাদ! ওপরচালাকি করতে গিয়ে মরল নাকি লোকটা? তাহলে তো কেলেঙ্কারির একশেষ।
খানিক ভেবেচিন্তে কার্টারকে জানাবে বলেই ঠিক করল সে। রওনা দিল কার্টারের ঘরের দিকে। ঘরের দরজা বন্ধ, সামনে দরজায় প্রায় কান পেতে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। সহকারী কাছে যেতেই একটু চমকে তাঁর দিকে যে ফিরল, তাকে তিনি চেনেন। এ সেই লন্ডনের সাহেব, যে শুরুতে কবিতা পাঠ করে, আর মাঝেমধ্যেই কোথায় যেন হাপিস হয়ে যায়। কার্টারের এই দলটা অদ্ভুত। সবাই মিলে একসঙ্গে ম্যাজিক দেখায়, তবু কার্টার শো-র পরে বিশেষ কিছু লোক বাদে বাকিদের খবর রাখেন না, কথা বলা তো দূরস্থান। শো শেষে প্রত্যেকের ভাগের টাকা বুঝিয়ে পরের শো কবে তা বলে দেওয়া হয়। আগের দিন এসে একটা রিহার্সাল হয়, মাঝে কে কী করল, কোথায় গেল, কেউ তার খোঁজ রাখে না। বেশিরভাগ গিয়ে ভিড় জমায় সোনাগাছির বেশ্যাপট্টিতে। বিশেষ করে সাহেবরা। কালো মেয়েদের গা নাকি ঠান্ডা হয়। শরীরের জ্বালা জুড়াতে তাদের জুড়ি নেই। তিনি নিশ্চিত, এই সাইগারসন সাহেবও সেখানেই যায়। শুধু সেখানেই না, সাহেবকে চাংওয়ার পাশে চন্ডুখোরদের আস্তানাতেও একদিন দেখেছেন তিনি… অনেক গুণই আছে এই সাহেবের। কিন্তু এখন দরজায় কান লাগিয়ে এ কী করছে?
সাইগারসন চমকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার?”
“আসলে একটা সমস্যা হয়েছে। সেই নেটিভ ছোকরা নিজেকে আটকে ফেলেছে বাক্সে। মরে-টরে গেল কি না কে জানে।”
“চলো তো দেখি”, বলে সাইগারসন সেই সহকারীর পিছু নিল।
ইলিউশন বক্স তখনও বন্ধ। সাইগারসন দু-একবার খোলার চেষ্টা করলেন। ধাক্কা দিলেন। কোনও শব্দ নেই ভিতর থেকে। এদিকে চিন-সু-লিনের খেলা শেষ। গোটা হল ভেসে যাচ্ছে করতালির আওয়াজে। সাইগারসন পকেট থেকে বার করল পাতলা একটা লোহার পাত। দরজার ফাঁকে ঢুকিয়ে আস্তে করে চাড় দিয়ে খুলে ফেলল দরজার পাল্লা।
ভিতরে দেহের উপরের অংশ প্রায় অনাবৃত করে দাঁড়িয়ে আছে গণপতি। সারা দেহ ঘর্মাক্ত। মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। যে হাসি দেখবে বলে দুজনের কেউ আশা করেনি।
ম্যাজিক দেখিয়ে বাও করেই চিন-সু-লিন দ্রুত ঢুকে গেলেন উইংসে। যেন খুব তাড়া। সোজা হাঁটা দিলেন কার্টারের ঘরের দিকে। যাবার পথে চিনা টুপিটা খুলতে টুপির সঙ্গেই খুলে হাতে চলে এল দুইদিকে দুই ঝোলানো বেণিওয়ালা পরচুলা। একঝলকে গণপতি দেখল ভিতরে ছোটো করে ছাঁটা সোনালি চুল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গণপতি শুনল মঞ্চে তার নাম ঘোষণা করা হচ্ছে।
পোশাক পরে নিল গণপতি। সে জানে তাকে ঠিক কী করতে হবে। ছয়জন মিলে সেই ইলিউশন বক্স নিয়ে উপস্থিত হল মঞ্চে। গোটা মঞ্চ থমথমে। কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না একজন নেটিভ আজ করিন্থিয়ান থিয়েটারে ম্যাজিক দেখাবে। আদৌ সে পারবে কি না সেই সন্দেহটাই সবার কাছে প্রবল। এক কোনায় নবীন মান্না নিজে দাঁড়িয়ে। গণপতির কাছে এসে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “সব দেখেশুনে নিয়েছ তো ভায়া? কোনও অসুবিধা থাকলে বলো, এখনও সময় আছে।”
প্রশ্নই নেই। কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়ল গণপতি।
এবার ঘোষণার দায়িত্ব নিলেন নবীন মান্না নিজে। দর্শকদের বুঝিয়ে দিলেন এই খেলার কৌশল। এই বাক্সের মধ্যে শিকল, আর দড়াদড়ি দিয়ে গণপতিকে বেঁধে রাখা হবে বাক্সের মাঝের ক্রুশকাঠের সঙ্গে। বাঁধবেন দর্শকদেরই এক বা একাধিক জন। দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। গণপতি বাঁধন খুলে বেরিয়ে আসবেন, যেমন কার্টার সাহেব আসেন। এখানে নবীন মান্না একটা প্যাঁচ কষলেন। কার্টার সাহেব পাঁচ মিনিটে বেরিয়ে আসেন। গণপতির বেলায় আরও দুই মিনিট বাড়িয়ে সাত মিনিট করে দিলেন। একটু হ্যান্ডিক্যাপ পাক ছোকরা।
ডেকে নেওয়া হল তিনজনকে। তিন সাহেব। তিনজনই প্রথমে পরীক্ষা করে নিলেন হাতকড়া আর দড়ি। সব ঠিকঠাক আছে কি না। গণপতি তৈরি। ঢুকে পড়ল বাক্সে। তিন সাহেব মিলে প্রায় দশ মিনিট ধরে তাকে বেঁধে ফেললেন ভিতরের ক্রুশকাঠে। হাতকড়ার চাবি রইল এক সাহেবের হাতে। দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল।
এদিকে আসনে বসে তারিণী আবার পেটের ভিতর গুড়গুড়ানি টের পেল। সেই সেদিনকার মতো একটা ভয় তাকে চেপে ধরছে, যেদিন সে আর গণপতি সকালে গঙ্গার ঘাটে গেছিল। এখন অবশ্য মরার ভয় নেই তেমন, তবে ভয় অন্য। যদি গণপতি বেরোতে না পারে! সাহেবি কল। কী বানিয়ে রেখেছে বলা মুশকিল। কেমন একটা বমি বমি পাচ্ছে যেন।
মঞ্চে বেজে উঠল গম্ভীর ড্রাম। সবাই চুপ। কী হয় কী হয় ভাব। নবীন মান্না রুমাল বের করে ঘাম মুছলেন। ল্যান্সডাউন আবার পকেট থেকে ঘড়ি বার করে দেখলেন। মঞ্চের ঠিক মাঝে সেই বাক্স রাখা। আশেপাশে কেউ নেই।
ঠিক সাড়ে তিন মিনিটের মাথায় দড়াম করে দরজা খুলে গেল। দুই পাল্লায় দুই হাত দিয়ে দরজা খুলে দিয়েছে গণপতি। তার ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। তলায় শুধু একখানা ইজের পরা। এই ম্যাজিক কার্টারের কৌশলের অনুকরণ নয়, সম্পূর্ণ নতুন এক জাদুবিদ্যা। একে তো কার্টারের চেয়েও কম সময়ে গণপতি বেরিয়ে এসেছে আর ওই বাক্সের মধ্যে এত কম সময়ে পোশাক পরিবর্তন সে করল কীভাবে, তা কারও মাথায় ঢুকছিল না। গণপতি দুই হাত ওঠাল দর্শকদের দিকে। খানিকক্ষণ সবাই চুপ। তারপর হলে শুধু তালির আওয়াজ... কিন্তু এ কী? গণপতি কী করছে? সবাইকে চমকে দিয়ে গণপতি আবার ঢুকে গেল সেই বাক্সে। আর ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল।
এটা কেউ আশাও করেনি। বুঝে উঠতেই খানিক সময় গেল। নবীন মান্না দৌড়ে গেলেন বাক্সের কাছে। ডাকতে লাগলেন “গণপতি, গণপতি” বলে। কোনও সাড়া নেই। সবাই অবাক। বুঝতেই পারছে না কী করবে। সময় বয়ে যাচ্ছে। বাজনদারেরা বাজনা বাজাতে ভুলে গেছে। গোটা হল জুড়ে এবার হইচই শুরু হল। তারিণীর মনে হল এবার সে নিশ্চিত বমি করে ফেলবে। ঠিক এই সময় উইংসের পর্দা সরিয়ে প্রায় দৌড়ে ঢুকলেন কার্টার সাহেব। নবীনের দিকে চেয়ে শুধু বললেন, “আগেই বলেছিলাম আপনাকে।” সোজা বাক্সের সামনে গিয়ে কী এক অদ্ভুত কায়দায় খুলে ফেললেন ডালা।
সবাই, এমনকি কার্টারও অবাক বিস্ময়ে দেখলেন, ভিতরে ক্রুশকাঠে শিকল, হাতকড়া আর দড়িতে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা অবস্থায় গণপতি দাঁড়িয়ে আছে। মুখে অপার্থিব এক হাসি। সম্পূর্ণ পোশাক পরা। না বললে কেউ বিশ্বাসই করবে না একটু আগেই সে সব শিকল আর পোশাকের বন্ধনমুক্ত হয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল ফুটলাইটে। এ কি সত্য? না স্বপ্ন? গোটা করিন্থিয়ান হলকে যেন কোনও জাদুকর অদ্ভুত ম্যাজিকে স্ট্যাচু বানিয়ে দিয়েছে। শুধু নবীন মান্না ঘড়ি দেখলেন। এই পাঁচ মিনিট শেষ হল।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ— সপ্তম সূর্য
২০ জুন, ২০১৮, চন্দননগর
চন্দননগর স্ট্র্যান্ডে গঙ্গার ঘাটে ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া সিঁড়িতে বসে আছি আমি আর পুলিশ অফিসার অমিতাভ মুখার্জি। নামটা একটু আগে নিজেই বলেছেন। ভদ্রলোক মানুষ হিসেবে খারাপ না। আচমকা এত বড়ো কেস মাথায় এসে যাওয়ায় একটু চাপে পড়ে গেছেন এই যা। দেবাশিসদার কবিতাটার কিছুটা উদ্ধার করাতে আমার ওপরে একটু ভরসা এসেছে মনে হল। একটা সিগারেট সাধলেন আমায়। আমি না বলাতে নিজেই একখানা ধরিয়ে উদাস মুখে গঙ্গায় লঞ্চের আসা যাওয়া দেখতে লাগলেন। রাত হয়ে গেছে। পাড়ের দুই দিকেই জ্বলে উঠছে একের পর এক আলো। সেই আলোর প্রতিবিম্ব জলে পড়ে কাঁপা কাঁপা রেখায় যেন ভ্যান গঘের আঁকা ছবি। অফিসারের কপালে তিন-চারটে ভাঁজ। বোঝা যাচ্ছে ভেবেও কিছু করতে পারছেন না বলে হতাশ।
হাতের এক টোকায় সিগারেটটা সোজা জলে ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসার চেষ্টা করলেন। তারপর মাস্টারমশাইয়ের মতো জিজ্ঞেস করলেন, “বলুন দেখি, চন্দননগরের নাম চন্দননগর কেন?”
এটা জানতাম। হরিহর শেঠের লেখা আমার পড়া ছিল। ক্যুইজের উত্তর দেবার মতো করে বললাম, “এ নিয়ে অনেকরকম মত আছে। ত্রিবেণীতে এসে গঙ্গা তিনটে ধারায় ভাগ হয়ে গেছিল। যমুনা, সরস্বতী আর ভাগীরথী। এই যমুনা পরে কল্যাণীর বাগেরখালের দিকে গিয়ে চারঘাটে এসে হারিয়ে যায়। বাকি রইল ভাগীরথী আর সরস্বতী। সরস্বতী ছিল মূল নদী। তার তীরেই সপ্তগ্রাম বন্দর। বাণিজ্য জাহাজ আসত চিন, আরব, পারস্য থেকে। তারপর ষোড়শ শতকে ভয়াবহ কিছু একটা হয়, যার ফলে সরস্বতীর বুকের জলধারা কমে যেতে যেতে প্রায় শুকিয়ে যায়। ওদিকে বাড়তে থাকে ভাগীরথীর নাব্যতা। ফলে বাণিজ্য জাহাজ চলাচল বেড়ে যায় এখানে। হিজলি থেকে নুন বোঝাই করে পর্তুগিজরা নদীর ধারে গোলা বা গুদাম করে রাখতে থাকে। তারা গুদামকে বলত ওগোলি, আর সেই থেকেই হুগলি এসেছে। হুগলি আর সরস্বতীর মাঝে ধনুক বা চাঁদের কলার মতো জায়গায় ছিল তিনটে গ্রাম। বোড়ো, খলিসানী আর গোন্দলপাড়া। ভাগীরথীর দিকের এই তিন গ্রাম নিয়েই চন্দননগরের উত্থান। মনসামঙ্গল কাব্যের চাঁদ সদাগর হুগলি নদীর ধারে বোড়াইচণ্ডীর মন্দির স্থাপন করেন। কেউ বলেন এই চণ্ডী থেকেই প্রথমে চণ্ডীনগর আর পরে চন্দননগর নাম হয়। আবার হরিহর শেঠ নিজে লিখেছেন শহর দেখতে অনেকটা চাঁদের কলার মতো হওয়ায় চন্দ্রনগর থেকে নাকি চন্দননগর হয়েছে।”
অফিসার নিজেও এতটা জানতেন বলে মনে হয় না। অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি কি গোয়েন্দাগিরির সঙ্গে ইতিহাস নিয়েও চর্চা করেন নাকি!”
“আগে করতাম না। দেবাশিসদার পাল্লায় পড়ে কিছুদিন হল আগ্রহ হয়েছে। পসার তো জানেন, প্রায় কিছুই নেই। তাই অঢেল সময়।”
“না, না। ভালো তো। আমরা কলুর বলদ। চাকরি করে আর অন্য পড়াশোনার সময় পাই না। জানেন তো, এককালে আমারও ইতিহাস সাবজেক্ট ছিল। ভালোই লাগত পড়তে… ইচ্ছে ছিল ইতিহাস নিয়েই গবেষণা করব। সিন্ধু সভ্যতার লিপি পাঠোদ্ধার করব। কিন্তু ওই যে ম্যান প্রোপোজেস আর উপরওয়ালা ডিসপোজেস… বাবা মারা গেলেন। চাকরির তাড়নায় পুলিশে যোগ দিলাম। এখন এইসব করে বেড়াচ্ছি। আপনি একদিকে ভালোই করেছেন। এসব লাফড়ায় ঢোকেননি। আমাদের মশাই জান কয়লা হয়ে গেল। ভাবুন তো, ধোন কেটে, বিচি কেটে ফেলে রেখে গেছে… কী অদ্ভুত কেস রে বাবা…”
“কেটে কোথায় ফেলল?”
“মানে?”
“এই যে কাটল, কেটে ফেলল কোথায়? ওটাও তো এভিডেন্স!”
“আরেহ, তাই তো...” অফিসারের এতক্ষণে মাথায় ঢুকল ব্যাপারটা। “আপনি এখানেই বসুন। আমি এক্ষুনি আসছি”, বলেই মোবাইলে কাকে যেন চেষ্টা করতে করতে ছুটে গেলেন পাশেই পার্কিং করা গাড়ির দিকে। আমি পাশ দিয়ে একটা ঘটিগরমওয়ালাকে ডেকে পাঁচ টাকার ঘটিগরম কিনলাম। খিদে পেয়েছে।
সারাদিনে সেই সকালের পর এতক্ষণে একেবারে একা। সেই আমি, যার জীবনে তেমন কিছু ঘটে না, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় যা যা ঘটে গেল, তাতে বদহজম না হয়ে যায়! পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়া, দেবাশিসদার খুন, হেঁয়ালি ভরা মেসেজ, লিং-চি, প্রিয়নাথ, গণপতি, সব মিলেমিশে যা ঘোঁট পাকিয়েছে, সহজে এ থেকে ছাড়া পাব বলে মনে হয় না। ভাবতেই নিজেকে নিজে ধমক দিলাম। আমি না গোয়েন্দা? রহস্য যত জটিল, গোয়েন্দাদের তত ফুর্তি হওয়া উচিত। হোমস, পোয়ারো থেকে ফেলু মিত্তির, ব্যোমকেশ সবাইকে তো তেমনই দেখেছি। মুশকিল হল বইতে খুনের গল্প পড়া আর নিজে তার সাক্ষী থাকায় বিস্তর তফাত, আর সবচেয়ে বড়ো কথা, সাহস জিনিসটা আমার বরাবর বেশ কম। মুখে কিছুটা স্মার্টনেস দেখালেও পেটে এখনও প্রজাপতি উড়ছে। পা কাঁপছে। যুক্তি বুদ্ধি সব গুলিয়ে যাচ্ছে।
গঙ্গার হাওয়া বইছে বেশ জোরে। একটু জোলো। হয়তো বৃষ্টি নামবে। যা গরম পড়েছে! দেবাশিসদা বলতেন, “খুব গরম লাগলে শুধু ভাববে তুমিই এই গরমের জন্যে দায়ী। তুমিই তুর্বসু, সূর্য, সপ্তম সূর্য।” আমি অবাক হয়েছিলাম। সূর্যের আবার প্রথম দ্বিতীয় কী? সূর্য তো একটাই… আদি অনন্তকাল ধরে আমাদের জ্বালিয়ে যাচ্ছে।
“ধুসস...” হেসে ফেলেছিলেন দেবাশিসদা। “বৌদ্ধদের পবিত্র গ্রন্থ ‘বিশুদ্ধি মগগ’-এ বিশ্বচক্র নিয়ে গোটা একটা অধ্যায় আছে। তাতে লেখা, বিনাশ তিনরকম। জলে, আগুনে আর বায়ুতে। মহাপ্লাবনের পরে অবিরাম বৃষ্টি শেষ হবার পরে আকাশে দ্বিতীয় সূর্য উদিত হয়। খেয়াল করো, এই মহাপ্লাবনের কথা কিন্তু বাইবেলের নোয়া আর আমাদের মনুর কাহিনিতেও আছে। খুব সম্ভব ঘটনাটা সত্যিই ঘটেছিল। দ্বিতীয় সূর্য উঠলে দিন রাতের প্রভাব মুছে গেল। এইভাবে তৃতীয়, চতুর্থ আর পঞ্চম সূর্য উদিত হয় আর অস্ত যায়। শেষ হয় এক-একটি পর্ব। পঞ্চম সূর্যের সময় সমুদ্র জলহীন হয়ে যায়। ষষ্ঠ সূর্য এলে পৃথিবী ঢেকে যায় ধোঁয়ায়। এখন সেই পর্ব। এর পরেই আসবে তুর্বসু। সপ্তম সূর্য। তার বিপুল তেজে জ্বলে উঠবে সারা বিশ্বসংসার।”
“এ বই আপনি পেলেন কোথায়?”
“পাব আর কোথায়? এসব কি আর কেউ কিনতে পারে? প্রাচীন পুথি। পেয়েছি এক জায়গায়...”
“আরে কোথায় বলবেন তো!”
“হরিহরের বাপের বাড়ি।”
“এই শুরু হল আপনার হেঁয়ালি মার্কা কথা। কে হরিহর? কে-ই বা তাঁর বাবা? কিছুই তো জানি না।”
“হরিহর মানে হরিহর শেঠ। সত্যজিৎ রায়ের অনেক আগে ‘লেজিয়ঁ দনার’ পাওয়া মানুষ। মহামানবই বলা চলে। এই চন্দননগরের প্রাণপুরুষ। হরিহর শেঠ-কে ‘লেজিয়ঁ দনার’ দেওয়া হয় ১৯৩৪ সালে৷ একাধারে ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও সংগ্রাহক৷ জেলায় প্রথম নারীশিক্ষার জন্য স্কুল ‘কৃষ্ণভাবিনী নারী শিক্ষা মন্দির’ তাঁর হাতে তৈরি৷
হরিহর শেঠ-এর সঙ্গে চিঠিতে বেশ যোগাযোগ ছিল গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের৷ ১৯৩৭ সালে বিংশতি বঙ্গসাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় চন্দননগরের জাহ্নবী আবাসে, যেটা বর্তমানে রবীন্দ্র ভবন। রবীন্দ্রনাথ এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন আর একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতাও দেন৷ চন্দননগর মিউজিয়ামে একদিন যেয়ো। এই অনুষ্ঠানের ছবি-সহ বিস্তারিত বিবরণী, প্রেস রিলিজ ইত্যাদি সযত্নে রক্ষিত আছে৷ এই অনুষ্ঠানের প্রধান আহ্বায়ক ছিলেন হরিহর শেঠ৷ মিউজিয়ামের প্রায় ৮০ শতাংশ সংগ্রহ হরিহর শেঠ মারফত এসেছে৷ তাদের মধ্যে অষ্টম শতকের বুদ্ধমূর্তি এক অমূল্য সংগ্রহ৷ ১৯৪৭ সালে ফরাসি চন্দননগরকে ‘Ville Libre’ বা মুক্ত নগরী ঘোষণা করা হলে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ভবনে ভারতের জাতীয় পতাকা প্রথম উত্তোলন করা হয়৷ নবগঠিত পৌরসভার সভাপতি নির্বাচিত হন হরিহর শেঠ৷ তাঁর লেখা ‘সংক্ষিপ্ত চন্দননগর পরিচয়’ চন্দননগরের ইতিহাস সম্পর্কে একটি আকর গ্রন্থ৷ পাওয়া যায়। অবশ্যই কিনে পড়বে। বুঝলে?”
“বুঝলাম। কিন্তু এঁর সঙ্গে তাঁর বাবার কী সম্পর্ক?”
“নৃত্যগোপাল শেঠ ছিলেন হরিহর শেঠের বাবা। নিজের বাবার স্মৃতিতে তিনি স্থাপন করেন নৃত্যগোপাল স্মৃতিমন্দির। ১৯২০ সালের ২৩ মে তাঁরই বদান্যতায় চন্দননগর পুস্তকাগার ঠাঁই পেল এই স্মৃতিমন্দিরে। ভবনের দ্বার উদ্ঘাটন করেছিলেন স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি আর পুস্তকাগারে গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশাই। শুধু লাইব্রেরি না। লাইব্রেরি কাম অডিটোরিয়াম।”
“এর আগে চন্দননগরে লাইব্রেরি ছিল না?”
“ছিল তো। ১৮৭৩ সালে উর্দিবাজারে এক ভাড়াটে বাড়ির দোতলায় যদুনাথ পালিত আর মতিলাল শেঠ মিলে চন্দননগর পুস্তকাগার স্থাপন করেন। তারপর বেশ কয়েকবার স্থান পরিবর্তন করে শেষে এখানে ঠাঁই পায়।”
“আচ্ছা, আর এখানেই আপনি সব উদ্ভট বই আর পুথি খুঁজে পান, তাই তো?”
“শুধু কি খুঁজে পাই? ও বাড়ি বড়ো অদ্ভুত জায়গা। কিছু খুঁজে পেলে লুকিয়েও রাখি।”
“মানে?”
“মানে একটা বালির কণাকে লুকাতে গেলে কোথায় লুকানো ভালো?”
“আরও বালির মধ্যে।”
“তাহলে একটা রেয়ার বই বা নথি লুকানোর সেরা জায়গা কোনটা?”
“ওহহ… বুঝেছি। লাইব্রেরি। তাই তো?”
“সাবাস তোপসে! তাহলে? এতক্ষণ বলছিলে না তুমি কিছু জানো না, এবার তো জানলে? তাই তো?”
“হ্যাঁ, তা বলতে পারেন।”
“এখন তাহলে আমি আইনস্টাইন হয়ে যাব।”
“উফফ, আবার হেঁয়ালি। কী বলছেন খোলসা করে বলুন না।”
“একটা বাজে গল্প আইনস্টাইনের নামে চলে। ডাহা মিথ্যে, তবে গল্পটা খাসা। একবার তাঁর ড্রাইভারের শখ হয়েছে পিছনের সিটে বসার। মানে আইনস্টাইন সাজার। আইনস্টাইন এক কথায় রাজি। তিনিই ড্রাইভ করছেন। ড্রাইভার পিছনে বসে। এক সেমিনারে গিয়ে ড্রাইভারকে সবাই আইনস্টাইন ভেবে ঘিরে ধরেছে। “একটু বুঝিয়ে বলবেন, থিয়োরি অফ রিলেটিভিটি-টা ঠিক কী?” ড্রাইভার পড়েছে মহা ফাঁপরে। কিন্তু হাজার হোক আইনস্টাইনের ড্রাইভার। হাজির জবাবে ওস্তাদ। বলে কিনা, এ আর এমন কী কঠিন? এ তো আমার ড্রাইভারও জানে। বলে দাও হে ব্যাপারটা কী…”
খুব হেসেছিলাম দুজনে। তারপর দেবাশিসদা বলেছিলেন, “আমিও এখন থেকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলব ‘তুর্বসু জানে’, কেমন?”
কারেন্টের শক লাগার মতো চমকে উঠলাম। ‘তুর্বসু জানে’, এটাই ছিল না সেই কাগজে?
পকেট থেকে মোবাইল বের করেই অফিসারের নম্বরে ফোন করলাম আমি। পেটে আবার বুড়বুড়ি কাটা শুরু হয়েছে। অফিসারের অনেক আগে করা একটা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি। আমি এখন জানি যে আমি ঠিক কী জানি।
ঊনবিংশ পরিচ্ছেদ— মঞ্চে মৃত্যু
১৭ ডিসেম্বর, ১৮৯২, কলিকাতা, রাত দশটা
গোটা করিন্থিয়ান হল যেন কাঁপছে। হাততালির আওয়াজে। সাহেবদের ‘ব্রাভো, ব্রাভো’, কিছু দেশীয় মানুষ তো দাঁড়িয়েই পড়লেন তালি দিতে দিতে। গণপতির মনে হল সে স্বপ্ন দেখছে। এ সত্যি হতে পারে না। চারিদিক যেন টলে গেল তার। নবীন মান্না ঠিক সময়ে ধরে না ফেললে হয়তো মঞ্চেই উলটে পড়ত। প্রায় ধরে ধরে তাকে নিজের জায়গায় বসিয়ে দিলেন নবীন মান্না। তারিণী তখন উত্তেজনায় দুই রোগা রোগা হাতে গণপতিকে জাপটে ধরেছে। তারিণীর দুচোখে জল। মুখে শুধু “কী দেখালে ভাই, কী দেখালে...” বলেই চলছে ক্রমাগত। ওদিকে মঞ্চে আবার পর্দা নেমে এসেছে। শুরু হয়েছে গম্ভীর বাজনা। একটু পরেই হবে কার্টারের স্পেশাল। হল আবার চুপচাপ, থমথমে। গণপতির উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কোনও এক অজানা বিপদের আশঙ্কা, যেটা প্রায় চলেই গেছিল, ফিরে এসেছে আবার। দ্রিম দ্রিম করে আওয়াজ কানে তালা লাগিয়ে দিল প্রায়। পর্দা খুলে গেল। খুলতেই দেখা গেল মঞ্চের ঠিক মাঝখানে গাঢ় লাল কাপড়ে ঢাকা একটা ঘরের মতো। বাইরে কার্টার দাঁড়িয়ে। কার্টারের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ‘চৈনিক’ জাদুকর চিন-সু-লিন, আর তাঁর পাশে মাথায় পাগড়ি, চকচকে পোশাক, গালে দাড়ি এক ভারতীয় দাঁড়িয়ে। এই লোকটাকে কেমন চেনা চেনা মনে হল তারিণীর। কোথায় যেন দেখেছে। অনেকদিন আগে না। খুব সম্প্রতি। কিন্তু কোথায়, তা কিছুতেই মনে পড়ছিল না। কার্টার এদিকে তাঁর প্যাটার শুরু করে দিয়েছেন, “আজ, মাননীয় বড়োলাট বাহাদুরের সামনে আমি সেই জাদুর খেলা দেখাব, যা হিমালয়ে আমার গুরু আমাকেই একমাত্র শিখিয়েছিলেন আর বলেছিলেন বিশেষ মানুষদের ছাড়া কাউকে না দেখাতে। কোনও ইউরোপীয় আজ অবধি সফলভাবে এই খেলা দেখাতে সক্ষম হননি। শুধুমাত্র হাতের কারসাজি নয়, এই ম্যাজিকে লাগে সত্যিকারের মন্ত্র, যা ছাড়া এই জাদু অসম্ভব। তাই আমি যখন এই খেলা দেখাব, আমার এই ভারতীয় সঙ্গী রাখহরি মন্ত্র উচ্চারণ করবে, যাতে গোটা জাদুতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটে। আমি আজ, এই মঞ্চে দেখাব এক অসম্ভব জাদুর খেলা”, বলে টেনে টেনে উচ্চারণ করলেন “ই- ন্ডি-য়া-ন- রো-প- ট্রি-ক”… শোনা মাত্র ম্যাজিক সার্কেলের যে সদস্যরা খেলা দেখতে এসেছিলেন, সবাই তালি দিয়ে উঠলেন। গণপতি অবাক। তার ধারণা ছিল এই ম্যাজিকের অস্তিত্ব শুধুমাত্র লোককথাতেই আছে। হিমালয়ে থাকাকালীন অনেক সিদ্ধাই পাওয়া সাধুদের সে এই জাদুর কথা জিজ্ঞাসা করেছে, কেউ সঠিক বলতে পারেননি। বেশিরভাগই বলেছেন পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো এও এক রূপকথা। আর সেই ম্যাজিক দেখাবেন এই সাহেব!
গণপতির ভ্যাবলা ভাব দেখে তারিণীও অবাক হল। কী এমন ম্যাজিক যে তার বন্ধুও হতবাক হয়ে গেছে! কার্টার এবার ব্যাখ্যা শুরু করলেন। শূন্য থেকে হাত ঘুরিয়ে নিয়ে এলেন লম্বা, মোটা একটা রশি। গোটানো। বললেন, প্রথমে রাখহরি মন্ত্র পড়ে দেবতাকে জাগাবে। তারপর কার্টার শূন্যে ছুড়ে দেবেন দড়ি। দড়ি মাটিতে নেমে আসবে না। দাঁড়িয়ে থাকবে স্তম্ভের মতো। সেই দড়ি বেয়ে উঠে যাবেন চিন-সু-লিন। কার্টার তাঁকে ভ্যানিশ করে দেবেন। এই ম্যাজিকের জন্য একজনকে মঞ্চে ডাকলেন কার্টার। মঞ্চে এলেন এক ইংরেজ সাহেব। কার্টার এবার বললেন, তাঁর ইশারা পেলেই চিন-সু-লিন আর রাখহরি ঢুকে যাবেন সেই পর্দাঘেরা স্থানে। রাখহরি শুদ্ধ করবেন লিনকে। তারপর সেই মন্ত্রবলে বলীয়ান লিন উঠে যাবেন দড়ি বেয়ে। তাঁর দেহ বায়ুভূত হয়ে যাবে। এরপর তিনিই আবার দেহ ধারণ করবেন হলের বাইরে গিয়ে। হেঁটে আসবেন সামনের দরজা দিয়ে।
“এক্সকিউজ মি!” এক সন্ধ্যায় এই নিয়ে দুইবার এই কথা শুনতে হল কার্টারকে। তবে এবার বক্তা অন্য। বক্তা সেই রোগা, লম্বা ইংরেজ সাহেব, যিনি এইমাত্র উঠে এসেছেন মঞ্চে। “একটা কথা ছিল মি. কার্টার। মি. লিনের কোনও যমজ বা দেখতে একরকম কোনও মানুষকে যে আপনি বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেননি, তার প্রমাণ কী? কীভাবে জানব যিনি অদৃশ্য হচ্ছেন আর যিনি ফিরে আসছেন, দুজন একই লোক?
কার্টার থমকে গেলেন একটু। তারপর বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার পরিচয়?”
সাহেব একটু হেসে বললেন, “আমার নাম এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি। আমি সম্প্রতি বাংলায় পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেল পদে আসীন হয়েছি।”
“আপনার তবে কী মত? কীভাবে জানা যাবে, দুজনেই এক মানুষ?”
“আমি বেশ কয়েকবছর এক গবেষণায় রত আছি। অপরাধবিজ্ঞানে মূল সমস্যা অপরাধীকে একেবারে নিশ্চিত করে চিহ্নিত করা। শুধু চিহ্নিত করা যাচ্ছে না বলেই প্রতি বছর হাজার হাজার অপরাধী ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে আর স্বাধীনভাবে সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ বিষয়ে প্রথম আলোকপাত করেন ফ্রান্সিস গ্যালটন। আমার সঙ্গে তাঁর নিয়মিত পত্রে যোগাযোগ আছে। তবে তাঁর শনাক্ত পদ্ধতি বেশ জটিল। বার্তিলোঁর পদ্ধতিও তাই। তাই অনেক গবেষণা করে আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, দুটো মানুষের হাতের ছাপ কখনোই একরকম হবে না। তারা যমজ ভাই হলেও নয়।”
গোটা হলে একটা গুনগুন শুরু হল। এও আবার হয় নাকি? অনেকে নিজের হাতের পাঞ্জার দিকে চাইতে লাগল। কার্টার এবার বললেন, “তবে এই হাতের ছাপ নেব কীভাবে?”
“সে আপনি ভাববেন না। হাতের ছাপ আমার একটা বাতিক হয়ে গেছে। সময় পেলেই পরিচিত অপরিচিত সবার হাতের ছাপ নিয়ে পরীক্ষা করি। ছাপ নেওয়ার যন্ত্রপাতি সব আমার পকেটেই থাকে”, বলে পকেট থেকে ভুষোকালি মাখা একটা প্যাড আর কাগজ বের করলেন হেনরি। চিন-সু-লিন-কে ডেকে তাঁর ডান হাতের পাঞ্জায় কালি মাখিয়ে পরিষ্কার একটা ছাপ নিলেন কাগজে। কার্টার এবার হেনরিকে দাঁড় করালেন উইংসের ঠিক পাশে। এই খেলা নাকি এত বিপজ্জনক যে একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে দেখলে দর্শকেরও ক্ষতি হতে পারে। কার্টার আচমকা “ওম-ম-ম” বলে উঠলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দুজন ঢুকে গেলেন পর্দাঘেরা কক্ষে। ভিতরে শুরু হল গম্ভীর মন্ত্র উচ্চারণ।
নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা ।
খট্বাঙ্গ চন্দ্রহাসঞ্চ বিভ্রতী দক্ষিণে করে ।।
বামে চর্ম্ম চ পাশঞ্চ ঊর্ধ্বাধোভাগতঃ পুনঃ ।
দধতী মুণ্ডমালাঞ্চ ব্যাঘ্রচর্মধরাম্বরা ।।
কৃশোদরী দীর্ঘদংষ্ট্রা অতিদীর্ঘাতিভীষণা ।
লোলজিহ্বা নিমগ্নারক্তনয়নারাবভীষণা ।।
কবন্ধবাহনাসীনা বিস্তারা শ্রবণাননা ।
এষা কালী সমাখ্যাতা চামুণ্ডা ইতি কথ্যতে ।।
চামুণ্ডা কালীর মন্ত্র। কিন্তু এখানে কেন? ভাবল গণপতি। যাক গে যাক… সাহেব কী করেন দেখি। মন্ত্র বন্ধ হল। সাহেব এবার দড়ি ছুড়ে দেবেন শূন্যে। কিন্তু আবার বিপত্তি। দড়িতে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। সাহেব পর্দার ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে রাখহরিকে কিছু বললেন। তিনি দ্রুত পায়ে দড়ি নিয়ে উইংসে মিলিয়ে গেলেন। ফিরে এলেন খানিক পরেই। সাহেবকে দড়িটা প্রায় ছুড়ে দিয়েই ঢুকে গেলেন ভিতরে। কার্টার এবার দড়ি ছুড়ে দিলেন শূন্যে। গণপতি, শুধু গণপতি কেন, হলের সবাই চমকে দেখল সাপের ফণার মতো দুলছে দড়ির ডগাটা। যেন এইমাত্র ছোবল মারবে। তারপর হঠাৎ যেন কীসের এক অমোঘ টানে একেবারে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। যেন দড়ি না, একটা বাঁশের দণ্ড। দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না, একটু আগে একেই হাতে গুটিয়ে রেখেছিলেন কার্টার। দর্শকদের মধ্যে একটা শ্বাস টানার শব্দ শোনা গেল। কার্টার সাহেব পকেট থেকে একটা ডুয়েলের ফ্লিন্টলক পিস্তল বার করলেন। হাতির দাঁতের বাঁট। বিখ্যাত বন্দুক প্রস্তুতকারক জন হারম্যানের নিজের হাতে তৈরি। দুটো করে গুলি ভরার ব্যবস্থা আছে এতে। সেটা উপরের দিকে তাগ করে গুলি ছুড়তেই মঞ্চ ঢেকে গেল সাদা ধোঁয়ায়। আর সেই ধোঁয়াতেই দেখা গেল চিন-সু-লিন-কে। অদ্ভুত দক্ষতায় যেন টিকটিকির মতো সরসর করে সোজা দড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছেন তিনি। মাথার দুই বেণি ঝুলছে দুই পাশ থেকে। দেখতে দেখতে দড়ির মাথায় উঠে গেলেন। কার্টার সাহেব অন্য পকেট থেকে বার করলেন আর-একটা ফ্লিন্টলক পিস্তল। আবার উপরের দিকে লক্ষ্য করে ছুড়লেন গুলি। ঝপ করে একটা শব্দ হল। ঠিক একইসঙ্গে মঞ্চের মাঝের সেই পর্দাঘেরা স্থানের পর্দা খসে পড়ে গেল। সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখল ভিতরে কেউ নেই। রাখহরি না। চিন-সু-লিন না। তবে চিন-সু-লিনের স্মৃতি হিসেবে পড়ে আছে তাঁর কাপড়চোপড়। একটা পুঁটুলির মতো। আর-একজন আছে। এতক্ষণে তারিণী বুঝল কেন রাখহরিকে তার চেনা চেনা ঠেকছিল। অবিকল রাখহরির মতো, তাঁরই পোশাকে একজন বসে আছে মঞ্চের মাঝখানে। তাকে একটু আগেই মঞ্চ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবু কোন অজানা মন্ত্রবলে সে আবার ফিরে এসেছে স্পটলাইটের একদম মাঝখানটাতে… তৈমুর, আর তার হাত অদ্ভুতভাবে নড়ে চলেছে, একেবারে আসল মানুষের মতো।
হাততালি শুরু হতেই কার্টার সবাইকে হাত তুলে থামালেন। ম্যাজিক এখনও বাকি আছে। লিনের পোশাকের সামনে নিয়ে গেলেন হেনরিকে। হেনরি হাতে একটা লাঠি নিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পরীক্ষা করে দেখলেন, ভিতরে কোনও মানুষ লুকিয়ে নেই। এবার ম্যাজিকের দ্বিতীয় অংশ। লিনের ফিরে আসা। কার্টার নিজে এবার অদ্ভুত মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করলেন। একবার করে মন্ত্র উচ্চারণ করেন আর হাতের লাঠি দিয়ে তৈমুরকে স্পর্শ করেন। এ মন্ত্র কোনও চেনা ভাষার নয়। তাঁর দৃষ্টি স্থির দরজার দিকে। সবাই সেদিকেই তাকিয়ে আছে। এই বুঝি দরজা খুলে ঢুকলেন লিন। সময় কেটে যাচ্ছে। এক মিনিট। দুই মিনিট। কেউ ঢুকছে না। দর্শকরা এবার উশখুশ করতে শুরু করল। কার্টারের মন্ত্র গেল থেমে। মঞ্চের ওপরে খুব দূর থেকে একটা মৃদু কাঠের ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ শোনা গেল যেন। কার্টার উপরের দিকে তাকালেন। বোঝার আগেই মঞ্চের উপরের কাঠের পাটাতন ভেঙে হুড়মুড়িয়ে নিচে এসে পড়ল ভারী কিছু একটা। একটা দেহ। মৃতদেহ। মানুষের। মানুষটার সারা দেহে একটা সুতোও নেই। ঘাড়টা মটকে গেছে মাটিতে পড়ামাত্র। ইনস্পেক্টর জেনারেল একলাফে কার্টারকে সরিয়ে সোজা চলে এলেন মৃতদেহের সামনে। দর্শকদের তখন বিহ্বল অবস্থা। স্বয়ং বড়োলাট উঠে দাঁড়িয়েছেন। চিৎকার করে উঠলেন এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি, “কেউ জায়গা থেকে নড়বেন না। কেউ হল ছেড়ে বেরোবেন না। বাইরে তালা লাগিয়ে দাও।”

ধীরে পায়ে এগিয়ে এসে ঝুঁকে পড়লেন মৃতদেহের পাশে। ছোটো ছোটো করে কাটা সোনালি চুল। চোখ খোলা। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে। গলায় লাল হয়ে বসে গেছে আঙুলের ছাপ। চোখের তারা নীল। মুখটা বড্ড চেনা। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন কার্টারের দিকে। “চেনেন এঁকে?”
মঞ্চে কথায় বাজিমাত করা কার্টারের মুখে বাক্যি ফুটছে না। যেন বজ্রপাত এক নিমেষে তাঁকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কোনওরকমে অস্ফুটে বললেন, “ডিক... ডিক…”
“কে ডিক?”
“রিচার্ড হ্যালিডে… চিন-সু-লিন…”
“কী বলছেন আপনি? চিন-সু-লিন? এ তো ইউরোপিয়ান…”
“হ্যাঁ। ও-ই। ও ছদ্মনামে ম্যাজিক দেখাত।”
“কিন্তু এটা কী হল? কী মনে হয় আপনার?”
“নিশ্চয়ই ম্যাজিক দেখানোতে কিছু গণ্ডগোল হয়েছে। আমার জাদুতে ওর দেহ বায়ুভূত হয়েছে, কিন্তু আবার ঠিকঠাক দেহধারণ করতে পারেনি। মন্ত্রে কোনও গণ্ডগোল ছিল। আমার ভুল... আমার ভুল…”
“সে কী করে হয়? এ তো গলা টিপে খুন!” হেনরি বললেন।
“আমি জানি না। বিশ্বাস করুন কিচ্ছু জানি না।”
কার্টারের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। দেখেই মনে হচ্ছে এখুনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন। হেনরি কিছু বোঝার আগেই লম্বাপানা এক তরুণ কার্টারকে ধরে নিল। একে হেনরি চেনেন। এ সেই লোকটা, যে শুরুতে কবিতা আবৃত্তি করে। সাইগারসন নাম। কার্টারকে ধরে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে প্রায় ফিসফিস করে সে হেনরিকে বলল, “মড়ার হাতের ছাপটা একবার নিয়ে দেখুন না স্যার...”
এটা হেনরির মাথায় আসেনি। সত্যি সত্যি এ-ই সেই লোক কি না জানার এর থেকে ভালো উপায় নেই। আবার পকেট থেকে প্যাড কাগজ বার করে ছাপ নিতে গিয়েই বুঝে গেলেন নিশ্চিতভাবে এই সেই লোক। বাঁ হাতে এখনও ভুষো কালির দাগ লেগে আছে। তবু নিয়েই নিলেন একটা ছাপ। যদি আদালতে প্রশ্ন তোলে।
এদিকে অস্থির দর্শকদের সামলাচ্ছেন ম্যাজিস্ট্রেট টমসন আর তাঁর দলবল। হেনরি সাহেব ইশারায় টমসনকে ডাকলেন। মঞ্চে ডেকে ফিসফিস করে বললেন, “বডি হাসপাতালে পাঠাতে হবে। তবে তুমি যেয়ো না। বিশ্বস্ত কেউ আছে?”
“আছে স্যার। তবে নেটিভ। কাজ ভালোই জানে। ডাকব?”
হেনরি সাহেব সম্মতি জানাতেই টমসন এক দেশি পুলিশকে ডাকলেন। ছেলেটি বেশ চটপটে। উঠে এল দ্রুত।
“তোমার নাম কী, মাই বয়?”
“প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় ইওর অনার স্যার”, স্যালুট ঠুকে বলল সে।
টমসন মনে মনে হাসলেন। স্বয়ং ইনস্পেক্টর জেনারেলকে দেখে ঘাবড়ে গেছে বেচারা।
“তুমি এক কাজ করো। এই বডিটাকে মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাও। ওখানে মার্টিন আছেন। ওঁকে আমার কথা বলবে, আর যতক্ষণ না যাই, তুমি থাকবে...” বলে উইংসের দিকে তাকিয়ে বললেন হেনরি, “টমসন, এবার দর্শকদের ধীরে ধীরে ছেড়ে দাও। কিন্তু ম্যাজিকের দলের সবাই যেন মঞ্চের পিছনে উপস্থিত থাকে। তুমি মঞ্চের পিছনে গিয়ে সবাইকে জড়ো করো। আমার কিছু জানার আছে।”
টমসন চলে গেলে হেনরি উপরের দিকে তাকালেন। কাঠের দুর্বল পাটাতন ভেঙে নিচে পড়েছে দেহটা। কিন্তু এখানে এই পাটাতন কেন? মাটিতে পড়ে থাকা কাঠের টুকরোগুলো তুলে নিলেন হেনরি। পাতলা কাঠের চেরা তক্তা। তবে... তাহলে…

“একটা কথা ছিল স্যার”, পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সাইগারসন। “আপনি আমায় চেনেন না। আমি আপনাকে চিনি। সেন্ট এডমুন্ড কলেজে আমার দাদা আপনার সহপাঠী ছিল। তারপর আপনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিলেন আর দাদা ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্সে।”
“কী নাম তোমার দাদার?”
তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে নামটা বলল সাইগারসন। আক্ষরিক অর্থেই চমকে উঠলেন হেনরি। “কিন্তু আমি তো শুনেছিলাম তুমি…”
“যা শুনেছিলেন ভুলে যান স্যার। এসব ভাবার সময় নেই। পরে সব খুলে বলব। এদিকে খেলা শুরু হয়ে গেছে”, বলতে না বলতে গ্রিনরুম থেকে শোনা গেল গুলির শব্দ।
“কার্টার”, বলেই সাইগারসন দৌড়োল সেদিকে। পিছন পিছন হেনরি।
গ্রিনরুমের দরজা আধা ভেজানো। ভিতরে টিমটিমে কেরোসিনের বাতি প্রায় নিভু নিভু। তবু যা দেখতে পেলেন, হেনরির পক্ষে সেটাই যথেষ্ট। একটা হাই ব্যাক চেয়ারে অদ্ভুতভাবে এলিয়ে রয়েছেন কার্টার। মাথার ঠিক মাঝে একটা ফুটো, সেখান থেকে দরদরিয়ে রক্তের ধারা নেমে আসছে। আর তাঁর ডান হাতের তর্জনীতে তখনও ধরা আছে যে যন্ত্রটা, সেটা একটু আগেই হেনরি দেখেছেন। জন হারম্যানের তৈরি ফ্লিন্টলক ডুয়েল পিস্তলজোড়ার একটা।
বিংশ পরিচ্ছেদ— ডিরেক্টর
২০ জুন, ২০১৮, চুঁচুড়া
ঠিক এখন যেখানে বসে আছি, এভাবে কোনও দিন এখানে আসব বলে ভাবিনি। খুব ছোটো ছিলাম যখন, বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে নিয়মিত আসতাম। পুজোতে। বাড়ির বয়স প্রায় দুশো হতে চলল। ছোটো ছোটো ইট দাঁত বের করে আছে এদিক-ওদিক থেকে। দেওয়াল ফাটিয়ে দিয়েছে বট অশ্বত্থের চারা। চুঁচুড়ার জগন্নাথ মন্দিরের এলাকায় প্রায় রাস্তার ওপর এই বাড়ি কিনেছিলেন তারিণীচরণের বাবা। কোনও এক অজানা কারণে প্রায় জলের দরে তাঁকে বাড়ি বেচে দিয়েছিলেন এক ওলন্দাজ সাহেব। তারিণীর বাবা সামান্য কেরানির কাজ করতেন হুগলি জেলা বোর্ডে। তিনি রাতারাতি এই বাড়ি কেনার টাকাই বা কোথায় পেলেন, সেও এক রহস্য। তবে বাবার মুখে শুনেছি তখনকার ম্যাজিস্ট্রেট রডনি সাহেব নাকি নিজে উদ্যোগ নিয়েছিলেন এই ব্যাপারে। তারিণীর বাবা দীনবন্ধু বাড়ি ভোগ করতে পারেননি। বছরখানেকের মধ্যেই সন্ন্যাস রোগে মারা যান। তারিণী এক ছেলে। তিনিও চলে যান কলকাতায়, প্রাইভেট ডিটেকটিভ হতে। বাড়িতে তাঁর মা ছাড়া কেউ থাকতেন না। বিশ শতকের শুরুর দিকে অদ্ভুতভাবে তারিণীর ভাগ্য ফিরে যায়। প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হয়ে তিনি আবার চুঁচুড়া ফিরে আসেন। এই বাড়ি সংস্কার করান। বিয়ে করেন। ম্যাজিস্ট্রেট কুমার গোপেন্দ্রকৃষ্ণ দেবের সঙ্গে তাঁর সদ্ভাব বাড়ে। তবে কলকাতায় যাতায়াত বন্ধ হয়নি। কিন্তু আগের মতো তারিণী আর নিয়মিত অফিস খুলতেন না। কেউ কেউ বলে গোপনে তিনি বিপ্লবীদের দলে যোগ দিয়েছিলেন। কেউ বলে সাধুসঙ্গে মন দিয়েছিলেন। তারিণীর মৃত্যু ঠিক কীভাবে হয়, কেউ জানে না। তিনি শেষ বয়েসে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছিলেন। তাঁর নিখোঁজ হবার পর তাঁর ছেলে, আমার ঠাকুরদা, সরলাক্ষ, সংসারের হাল ধরেন। সরলাক্ষ ছিলেন একেবারে বিষয়ী মানুষ। পড়াশোনা শেষ করেই জেলা বোর্ডে চাকরি জুটিয়ে নেন, আর সারাজীবন সুনামের সঙ্গেই কাজ করেন। তাঁর দুই ছেলে। আমার বাবা আর জেঠু। বাবা যেহেতু কলকাতায় চাকরি পেলেন, তাই চুঁচুড়া থেকে চলে আসতে হল। কলকাতায় বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। উত্তর কলকাতায়। তারপর দু-তিনটে বাড়ি বদলে এখনকার বাড়িতে আছি বছর চারেক। আমার বড়ো হয়ে ওঠা কলকাতাতেই। এদিকে জেঠুমণি কাজ নিলেন চন্দননগর মিউনিসিপ্যালিটিতে। ফলে শিকড় গেড়ে বসলেন আমাদের আদি বাড়িতে। আমরা যেতাম। ওই পুজোর সময়। তারপর জেঠু মারা গেলেন। বাবা-মাও। জেঠুর দুই ছেলের মধ্যেও তেমন সদ্ভাব নেই। শরিকি ঝামেলা। আমার বিরক্ত লাগে। আজকাল আর যাই না। আমাদের ঘরটা প্রায় সারাবছর তালা বন্ধ থাকে। ঠাকুরদা, জেঠু কিছুটা সংস্কার করিয়েছিলেন। সেই অংশে তাঁরাই থাকেন। আমাদের জুটেছে মূল বাড়িটা। ভাঙাচোরা। অনেকদিন হল সংস্কার করা হয় না। বহুদিন পরে এই বাড়িতে রাত্রিবাস করছি। একটু আগেই অমিতাভবাবুর পুলিশের গাড়ি এসে আমায় ছেড়ে দিয়ে গেছে। কাল সকালে আবার বেরোতে হবে। আজ বিকেলে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো মাথায় এল দেবাশিসদা কীসের কথা বলছিলেন। নৃত্যগোপাল স্মৃতিমন্দির। চন্দননগরের গ্রন্থাগার। সেখানেই কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছেন দেবাশিসদা। কী রেখেছেন, ঠিক কোথায় রেখেছেন, তা জানা নেই। তবে ভাবের ঘরে ঢোকার চাবি যখন পেয়েছি তখন অনুসন্ধানে দোষ কী? মুশকিল একটাই। আজকের মতো বন্ধ হয়ে গেছে লাইব্রেরি। খুলবে আবার সকালে। স্পেশাল পারমিশান করে খোলানো যায়, তবে শুধুমাত্র হাঞ্চের ওপর নির্ভর করে খড়ের গাদায় সুচ খোঁজা চাপের ব্যাপার। পুলিশ অফিসারও একমত হলেন আমার সঙ্গে। ঠিক হল, কাল লাইব্রেরি খুললে আমরা দুজনেই যাব।
কিন্তু আজ রাতে থাকব কোথায়? “এখানে চেনাজানা কেউ আছে, যে রাতে থাকতে দেবে?” অফিসার জিজ্ঞেস করলেন।
“এখানে নেই, তবে আমাদের আদি বাড়ি আছে চুঁচুড়ায়।”
“সেখানে কেউ থাকে?”
“জেঠিমা, জেঠুর ছেলে। এক রাতের জন্য ব্যবস্থা হয়ে যাবে। মাঝে একদিন খুব বৃষ্টিতে দেবাশিসদার বাড়ি আটকে গেছিলাম। ভেবেছিলাম আসব। আর আসা হয়নি।”
“তবে এত রাতে আর কলকাতা যাবেন কেন? কাল তো আবার আসতেই হবে। চলুন আমি আপনাকে গাড়ি করে চুঁচুড়ায় ছেড়ে দিয়ে আসি।”
জেঠিমা তৈরি ছিলেন না। তবু ডাল, ভাত, মাছের ঝোল দিয়ে যত্ন করে খাওয়ালেন। এমন যত্ন আগে কোনও দিন পাইনি। পরে কারণটা বোঝা গেল। খেতে খেতেই শুনলাম, বড়দা, মানে জেঠুর বড়ো ছেলে নাকি উচ্ছন্নে গেছে। বিয়ে করেনি। দিনরাত নেশাভাং করে। রাতে বাড়ি ফেরে না অনেক সময়। চাকরি কোনও দিনই করত না। দু-একটা ব্যবসার চেষ্টা করেছে। চলেনি। সবসময় তার টাকার প্রয়োজন। এখন নাকি মাঝে মাঝে জেঠিমাকে মারধরও করে। ছোড়দা বিয়ে করে বড়ো চাকরি নিয়ে নয়ডা থাকে। কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই। মাকে এক টাকাও পাঠায় না। জেঠিমার চলছে কোনওক্রমে, জেঠুর পেনশানে। জেঠিমা মারা গেলে দাদার কী হবে এই নিয়ে চিন্তা।
চোখ মুছতে মুছতেই জেঠিমা বললেন, “তবে ভগবান আছে রে! আমাদের এই ভাঙাচোরা বাড়ি, এতদিন কেউ কিনতে চায়নি। ইদানীং বেশ কিছু দালাল আসছে কেনার জন্য। ভালো টাকাও দেবে বলছে। বাড়ির দাম নাকি আজকাল খুব ভালো চলছে। কিন্তু কী বল তো, শরিকি বাড়ি, তোর মত না নিয়ে কিছু করা যাবে না। আমি তো রোজই খোকনকে বলি, তোকে একবার জানাতে। যাক, ভালোই হল, তুই নিজেই এলি… এবার ভাব, বিক্রি করবি কি না। করলে যা পাওয়া যাবে, তাতে তোরও একটা সুসার হবে। বলতে নেই, তুইও তো তেমন কিছু….”
“আচ্ছা ভেবে দেখব”, বলে কাটিয়ে দিলাম।
জেঠিমার থেকে চাবি নিয়ে ঘরে ঢুকে কোনওমতে ধুলো-টুলো ঝেড়ে খাটে বসে আছি। শুনেছি এই ঘরেই নাকি তারিণী থাকতেন। উঁচু উঁচু ছাদ, কড়ি বরগা, যদিও তার অবস্থা ঢিলে। কবে ভেঙে পড়ে, ঠিক নেই। সামনেই একটা মলিন ছবি টাঙানো। রোগা পাতলা বুদ্ধিদীপ্ত মুখের এক তরুণের ছবি। হালকা গোঁফ। বড়ো বড়ো চোখ। তারিণীচরণ রায়। একটা চেয়ার টেনে উঠে দাঁড়িয়ে একটা কাপড় দিয়ে কাচ পরিষ্কার করলাম। তারপর খুব কাছ থেকে দেখলাম ছবিটা। আগে কোনও দিন এভাবে দেখব বলে ভাবিনি। কিন্তু আজকে এমন এক ফ্যাসাদে পড়েছি, কেন যেন মনে হচ্ছে একশো বছর আগের এই ভদ্রলোকও কোনও ভাবে এর সঙ্গে জড়িত। কীভাবে? সেটা জানলে তো হয়েই যেত। ছবির তলায় প্যাঁচানো হাতে ছাপা “বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড।” কলকাতার প্রাচীনতম স্টুডিয়ো। বছর দু-এক হল বন্ধ হয়ে গেছে। ১৮৪৩ সালে স্যামুয়েল বোর্ন এ দেশে এলে তখন কলকাতার এক ফোটোগ্রাফার উইলিয়াম হাওয়ার্ডের সঙ্গে সিমলায় অংশীদারিত্বে গড়ে তোলেন বোর্ন অ্যান্ড হাওয়ার্ড৷ এর মাঝে ১৮৪২ সালে আগ্রায় চালর্স শেফার্ড এবং আর্থার রবার্টসন গড়ে তুলেছিলেন ‘শেফার্ড অ্যান্ড রবার্টসন’৷ পরবর্তীকালে শেফার্ড সিমলা গেলে আর রবার্টসন ব্যবসা ছেড়ে চলে গেলে তখন নতুন অংশীদারিতে গড়ে ওঠে ‘হাওয়ার্ড, বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড’৷ তবে ১৮৬৬ সালে হাওয়ার্ড ব্যবসা ছেড়ে চলে গেলে তখন থেকে এই প্রতিষ্ঠানের নাম হয়— বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড। ১৯১১ সালে পঞ্চম জর্জের আসা ঘিরে দিল্লি দরবারের অনুষ্ঠানের ‘অফিশিয়াল ফোটোগ্রাফার’-এর দায়িত্বে ছিল এই প্রতিষ্ঠান। দেখেই ফেলুদার ‘গোরস্থানে সাবধান’-এর B&S মনে পড়ে গেল।
ছবির নিচেই একটা দেওয়াল আলমারি। কাচে ঢাকা। তাতে গুচ্ছের বই। আলমারিতে তালা লাগানো নেই। মোবাইলে চার্জ প্রায় শেষ। পাবজি খেলতেও ইচ্ছে করছে না। ভাবলাম বই পড়া যাক। একটানে খুলে ফেললাম আলমারি। ভিতরে ধুলোভরা। কত বছর খোলা হয় না কে জানে! বার্তিলোঁ আর গ্যালটনের অপরাধবিজ্ঞানের বই, ডিকেন্স, গাবোরিওর সেট, হোমসের গোয়েন্দা গল্প, আর বেশ কিছু ম্যাজিকের বই। এর মাঝেই লেখকের নাম না লেখা পাতলা একটা বই চোখে পড়ল। “চুঁচুড়া কথা।” উলটে দেখলাম তাতে সহজ ভাষায় চুঁচুড়ার ইতিহাস লেখা আছে।
কথিত আছে যে, এ অঞ্চল চিঁচড়া জাতীয় বেতগাছের জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল এবং সেখান থেকেই এ শহরের নাম হয়েছে চুঁচুড়া। ষোল শতকের কুলিহান্ডা নামের ছোট্ট এ গ্রামটি সাতগাঁও সরকার-এর অধীন আরসাহ পরগনায় অবস্থিত ছিল। পরে এটি ধরমপুর ও কুলিহান্ডা নামে দুটি জনপদে পরিণত হয়। ‘চিনসুরা’ বা চুঁচুড়া এলাকা উত্তর চন্দননগরের তুলাপটিঘাট থেকে ধরমপুর ও বালিমোড়ের দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত। মুগল কর্তৃক পর্তুগিজদের বিতাড়নের পর ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ওলন্দাজরা হুগলিতে আসে। তাঁরা মুগল সম্রাটদের কাছ থেকে চুঁচুড়ায় বাণিজ্য করার ‘ফরমান’ বা হুকুমনামা লাভ করে। ওলন্দাজ নৌ-সেনাপতি ভ্যান ডার ব্রাক ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে চুঁচুড়ায় কুঠি স্থাপন করেন এবং বাটাভিয়াস্থ ওলন্দাজ ডাইরেক্টরেটের প্রথম গভর্নর হন।
পরবর্তী ৫৭ বছরে ওলন্দাজরা বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি লাভ করে এবং চুঁচুড়া শহরের পত্তন করে। তারা আফিম, সোরা, কাঁচা রেশম, রেশমজাত দ্রব্য, সুতা ও সুতিবস্ত্র, চাল, চিনি, মাখন, শাক-সবজি প্রভৃতির ব্যবসা করত। ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত গুস্টেভাস দুর্গ দ্বারা শহরটি সুরক্ষিত ছিল। ওলন্দাজ গভর্নর সিক্টারম্যানের সন্নিকটস্থ দ্বিতল বাড়িটি এখন বর্ধমানের বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কমিশনারের বাড়ির বিপরীতে রয়েছে ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে জি. ভার্নেট কর্তৃক নির্মিত ওলন্দাজ গির্জা। গোরস্থান রোডের পুরাতন কবরস্থানটি মূলত ওলন্দাজদেরই কবরস্থান।
চুঁচুড়ার এখন অবধি পাওয়া প্রাচীনতম মানচিত্রে ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত গুস্টেভাস দুর্গের দক্ষিণে এই কবরখানাটি দেখা যায়। এখন চুঁচুড়াতে যাকে গোরস্থান রোড বলে সেটা গোটাটাই ঊনবিংশ শতকে ছিল ওলন্দাজদের দখলে। আকারে ছোটো হলেও চরিত্রে পার্ক স্ট্রিটের গোরস্থানের কথা মনে আসে একে দেখে। প্রায় প্রতিটি কবরের উপর বিশাল বিশাল ওবেলিস্ক আর গায়ে লেখা বিগত শতকের না বলা ইতিহাস। বিশেষ করে অনেক টুম্বস্টোনে VOC লেখা দেখে শিহরিত হতে হয়। এই VOC ছিল “Vereenigde Oost-Indische Compagnie”, যার ইংরাজি United East India Company। ইংরেজদের অনেক আগেই এই ডাচ কোম্পানি এশিয়া থেকে মশলা, রেশম ইত্যাদির ব্যবসা করে ফুলেফেঁপে উঠেছিল। একটি কবরে আবার ফ্রি ম্যাসনদের কম্পাসের চিহ্ন খোদাই করা। ঊনবিংশ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকায় যে গুপ্ত সমিতির শুরু (যদিও শুরুতে তা গুপ্ত ছিল না), তার ছোঁয়া যে আমাদের গঙ্গার পাড়ে এসে ভিড়েছিল, তা দেখলে সত্যি অবাক লাগে। কোনান ডয়েলের সৃষ্ট চরিত্র গোয়েন্দা শার্লক হোমসের এক পিতামহর সমাধি এই কবরখানায় বিদ্যমান। তিনি জর্জ ভার্নেত। শিল্পী ভার্নেতের তুতো ভাই। বলা হয় হোমসের ঠাকুমা নাকি ছিলেন এই ভার্নেতেরই বোন!”
এই বইটা শিওর আমার বাবার। বইয়ের শুরুতেই এক কোনায় বিরূপাক্ষ রায়, বাবার নাম সই করা। আরও মজার ব্যাপার, ঠিক এই অধ্যায়টার শেষেই বড়ো বড়ো করে বাবা ক্যাপিটালে একটা শব্দ লিখেছেন, “CONCORDIA!!!!!” এই নাম, বা এতগুলো বিস্ময়বোধক চিহ্ন কেন, তা আমার মাথায় ঢুকল না। উপরের তাকে বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য বই দেখলাম, যদিও পোকায় কাটা। ১৮৮৫ সালে গ্রেট ইডেন প্রেস থেকে প্রকাশিত গিরীন্দ্রলাল দাসের লেখা ভোজবিদ্যা, যাতে আবার “ইংরাজি ম্যাজিক সম্বন্ধীয় ক্রীড়া” রয়েছে; আছে উইজার্ডস ক্লাবের নানা ছোটোখাটো ক্রোড়পত্র, চন্দননগর জাদুকর চক্রের কিছু লিফলেট। একটা বই প্রায় অক্ষতই আছে। বইয়ের মলাটে সাদা চুল, সাদা মোটা গোঁফ, একহাতে জাদুদণ্ড আর অন্য হাতে রুমাল নিয়ে এক মড়ার খুলিতে হাত রেখে সরাসরি পাঠকের দিকে তাকিয়ে আছেন এক জাদুকর। ছবিতেও তাঁর দৃষ্টি যেন আমার ভিতর অবধি পড়ে নিচ্ছে। এতদিন বাদেও মলাট তার ঝকঝকে ভাব হারায়নি। বইয়ের ওপরে লেখা “জাদুবিদ্যা” আর নিচে গোটা গোটা হরফে ছাপা রয়েছে “শ্রী গণপতি চক্রবর্ত্তী”। এই সেই গণপতি! যাঁকে পি সি সরকারের গুরুদেব বলা হয়? ইলিউশান ট্রি, ইলিউশান বক্স, কংসের কারাগার আর পলায়নী বিদ্যায় যাঁর জুড়ি ছিল না! কিন্তু এই বই এখানে কেন? আমাদের পরিবারে কেউ ম্যাজিক দেখাত বলে তো জানা নেই। একটু কৌতূহলী হয়েই বইয়ের প্রথম পাতা ওলটালাম। টকটকে লাল কালিতে সুন্দর হাতের লেখায় লেখা, “বন্ধুবর তারিণীকে দিলাম। তৈমুরের সহিত ইহাকেও রাখিয়া দিয়ো। গণপতি চক্রবর্ত্তী।”
আমার মাথা সত্যি সত্যি ঘুরতে লাগল। আবার সেই তৈমুর! ঠিক যে লাইনটার মানে করতে পারিনি এখনও। এটা এখন পরিষ্কার, গণপতি, তারিণী, প্রিয়নাথ আর তৈমুর, সবাই এক সুতোতে বাঁধা পড়েছিলেন। কী সেই সুতো? জানি না। তৈমুর সেদিন যেমন এক রহস্য ছিল, আজও সে আবার ফিরে এসেছে নতুন রহস্য নিয়ে। হয়তো অন্য রূপে। ভাবতে ভাবতেই চোখে পড়ল বইয়ের তাকে কাগজ চাপা দিয়ে রাখা খোলা চিঠিটা। একটা এ-ফোর কাগজে টাইপ করা। কিন্তু এ কী! এ লেখা এ ঘরে এল কীভাবে? হাত পা কাঁপছিল। কোনওক্রমে পড়লাম—
“অভিনন্দন তুর্বসু।
তুমি তারিণীর সত্যিকার উত্তরাধিকারী। একদম ঠিক ধরেছ। আমি জানি তুমি জানো। কোনও বই বা লেখা লুকিয়ে রাখতে হলে তার জন্য সেরা জায়গা হল আরও অনেকগুলো বই। তাই তোমার বাড়ির বইয়ের তাকটাই বেছে নিলাম। কীভাবে এই ঘরে ঢুকলাম, তা একটু জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তুমি জানতে পারবে। সেটা নিয়ে ভাবি না।
এ লেখা যখন পড়ছ, খুব সম্ভব আমি আর বেঁচে নেই, বা নিরুদ্দেশ হয়েছি। জরুরি কথা আছে। অবশেষে তৈমুরের সন্ধান পেয়েছি। তাঁকে ডিরেক্টরের দায়িত্বে রেখে আসা হয়েছিল। আমি নিশ্চিত। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওঁকে খুঁজে বার করো। না হলে সবার বিপদ। কাউকে এ ব্যাপারে বলবে না। আবার বলছি, কাউকে না। আমার পিছনে লোক লেগেছে। ওরা যে-কোনো ক্ষতি করতেও পিছপা হবে না। তুমিও সাবধানে থাকবে।
দেবাশিসদা।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন