মধ্যখণ্ড— সন্ধান

কৌশিক মজুমদার

প্রিয়নাথের কথা

এক

সুতানুটি আর কলকাতার আশেপাশে বসত আর কারখানা স্থাপনের পর ইংরেজ বণিকরাই জমিদারের ক্ষমতা দখল করল। ফলে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বও তাদের উপরেই চাপে। ১৭০৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ফোর্ট উইলিয়ামে এক সভায় আলোচনার পর কোম্পানি একজন হেড পিয়ন, পঁয়তাল্লিশজন পিয়ন, দুজন বর্শাধারী আর কুড়িজন গোয়ালাকে বেতনভুক পাহারাদার হিসেবে নিযুক্ত করে। এঁরাই ছিলেন কলকাতার প্রথম পুলিশ বাহিনী। ধীরে ধীরে কলকাতার ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে। গড়ে ওঠে একের পর এক থানা। ১৮০০ সালে ওয়েলেসলি কমিটি কলকাতাকে চল্লিশটা থানায় বিভক্ত করেন। তাদের পনেরোটা ছিল সাহেব মহল্লায়, বাকিগুলো নেটিভদের ব্ল্যাক টাউনে। স্যামুয়েল ডেভিসকে সুপারিন্টেন্ডেন্ট জেনারেল অফ পুলিশ পদে নিযুক্ত করা হয়। বরকন্দাজরা ছিল বাউন্ডারি গার্ড। নজর রাখত আশেপাশের কোনও ডাকাত কলকাতায় না ঢুকে পড়ে। চৌকিদাররা রাতপাহারা দিত, দাঙ্গা বাধলেই ছুটে যেত টাউন গার্ড। প্রথম দিকে শিক্ষিত বাঙালি যুবকরা পুলিশে যেতে আগ্রহ দেখাত না ঠিকই, কিন্তু ১৮৬৮ থেকে বাঙালিরাও ইনস্পেক্টর পদে যোগ দিতে থাকেন। টাউন কলকাতায় জনবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে অপরাধ। পাপ। এদিকে পুলিশরা প্রায় সবাই দুর্নীতিতে ভরা, অপরাধীর বন্ধু আর নিরীহের যম। মানুষ পারতপক্ষে পুলিশের দ্বারস্থ হয় না। পুলিশের নানা গোপন রিপোর্টে একের পর এক তাঁদের অপদার্থতার কথা। এসব দেখে বিরক্ত হয়ে উঠলেন এক সাহেব। নাম স্টুয়ার্ট স্যান্ডার্স হগ। ১৮৬৬-র মাঝামাঝি বর্ধমানের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট থেকে বদলি করে তাঁকে নিয়ে আসা হল পুলিশ কমিশনার আর কলকাতা কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান বানিয়ে। চেয়ারে বসে হগ সাহেব প্রথমেই রিপোর্ট দিলেন, “ইউরোপীয় অফিসাররা মদ্যপ, অপদার্থ আর তাঁদের আচরণ সন্তোষজনক না। স্বয়ং পুলিশ সুপার ফেরিস অকর্মণ্য।” এখানেই থামলেন না হগ। ঠিক করলেন নিজের হাতে খোলনলচে বদলে দেবেন গোটা সিস্টেমের। চেয়ারম্যান হিসেবে তৈরি করলেন ঝাঁ চকচকে একটা বাজার। লর্ড কার্জন তার নাম রাখলেন ‘হগ মার্কেট’। এর মধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যে, হগ সাহেব আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না।

১৮৬৮ সালের পয়লা এপ্রিল রাত দুটোয় এক বিট কনস্টেবল আমহার্স্ট স্ট্রিট দিয়ে যেতে যেতে পেভমেন্টের ওপরে এক তালগোল পাকানো দেহ দেখতে পান। এক স্ত্রীলোকের দেহ। কোমরের তলায় বাঁ হাত আর মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত ডান কানের কাছে। ধারালো কোনও অস্ত্র দিয়ে কণ্ঠনালি সরাসরি কাটা, গোটা দেহ যেন রক্তে ডুবে আছে। স্ত্রীলোকটি যুবতি, সুন্দরী এবং খ্রিস্টান। কলকাতার পত্রিকাগুলো সোচ্চার হয়ে উঠল, অবিলম্বে অপরাধীকে শাস্তি দিতে হবে। এদিকে এতদিন গয়ংগচ্ছ করে কাটানো কলকাতা পুলিশ বুঝতেই পারছিল না কী করবে। এবার সত্যি সত্যি চটে গেলেন হগ। নিজের হাতে বাছাই করা কিছু দক্ষ অফিসারদের নিয়ে একটা টিম তৈরি করলেন। তাঁরা কিছুদিনের মধ্যেই জানতে পারলেন মৃতার পরিচয়। রোজ ব্রাউন, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান, দেহপসারিণী। রিচার্ড রিড নামের এক অফিসার প্রায় একা হাতে অপরাধীকে ধরলেন। হগের মুখরক্ষা হল। কিন্তু তিনি বুঝে গেলেন এইভাবে চলবে না। ১৮৬৮ সালের ২৮ নভেম্বর, পুলিশ কমিশনার হিসেবে তিনি এক অর্ডার জারি করলেন। কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে সেই ১৪৯ নম্বর অর্ডারটা ঐতিহাসিক, কারণ এই এক অর্ডারেই একেবারে বাছাই করা সৎ পুলিশ অফিসারদের নিয়ে গঠিত হল কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট। তার ঠিক দশ বছর বাদে এই বিভাগে যোগদান করল প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, আর সে এখন জানে হগ সাহেবের সাধের ডিপার্টমেন্টের সম্মান আবার ধুলোয় মিশল বলে। বড়োলাট কোনওক্রমে পত্রিকাদের ঠেকিয়ে রেখেছেন, শোনা গেছে ঘুষ দিয়ে। কিন্তু লোকের মুখকে থামাবে কে? প্রথম খুনটার কথা বেশি লোক জানতে না পারলেও দিন দশেক আগে করিন্থিয়ান থিয়েটারে পরপর দুই ম্যাজিশিয়ানের মৃত্যু তো সবার চোখের সামনে হয়েছে! বড়োলাট নিজে উপস্থিত ছিলেন। প্রিয়নাথ ছিল। এমনটা যে হতে পারে তা সে ভাবতেও পারেনি। নিজের অফিসে বসে আবার সেই অভিশপ্ত রাতের কথা চিন্তা করছিল প্রিয়নাথ। ঘটনাগুলোকে সাজাচ্ছিল একের পর এক। সেদিন সন্ধেবেলা আচমকা টমসন সাহেব তাকে বলেন ম্যাজিক শো-তে যাবার জন্য। বড়োলাট নাকি যাবেন ঠিক করেছেন। বড়োলাট বসেছিলেন একেবারে সামনের রো-তে। প্রিয়নাথের দায়িত্ব ছিল তাঁর দেখভাল করা। তাই ম্যাজিকের দিকে নজর না দিয়ে তাঁকেই দেখছিল প্রিয়নাথ। খুব অস্থির ছিলেন বড়োলাট। বারবার ঘড়ি দেখছিলেন। ঘাম মুছছিলেন ডিসেম্বরের এই শীতেও। যেন আঁচ করছিলেন কিছু একটা হবে। কার্টার যখন তৈমুরকে দেখাল, তখন অনেকের মতো প্রিয়নাথও চমকে গেছিল। তারপরই দেখল পকেট থেকে বড়োলাট কাগজের একটা টুকরো বার করে নিজের হাতের তেলোতে লুকিয়ে ফেললেন খুব তাড়াতাড়ি। সে কাগজে কী ছিল প্রিয়নাথ জানে না। একটু বাদে কার্টার বড়োলাটকে মঞ্চে ডাকলেন। কাগজের ব্যাপারটা প্রিয়নাথের মাথায় ছিল না। বড়োলাট নেমে এলেন। নিজের জায়গায় বসলেন। বারবার ঘড়ি দেখতে লাগলেন। তিনি কি কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছিলেন? যদি করেন, তো কীসের জন্যে?

প্রিয়নাথ দলের সহযোগীদের থেকে নেওয়া জবানবন্দির কাগজগুলো টেনে নিল। প্রায় সবই একরকম। এরা মূলত ব্রিটিশ। লন্ডনের আশেপাশেই থাকে। গরিব। টাকার জন্য কার্টারের দলে যোগ দিয়েছে। ভারতে আসার মাস দুই আগে কার্টারের এক সহযোগী এদের ট্রেনিং দিয়ে পাঠিয়েছে। সবাই নতুন। পরিচয় হয়েছে জাহাজে। পুরোনোদের মধ্যে একজনই ছিল। বুড়ো জর্জ হগ। সে প্রায় ছোটোবেলা থেকে কার্টারকে মানুষ করেছে। কার্টার তাকে ছাড়া এক পা-ও চলতেন না। কার্টারের এমন মৃত্যু বুড়ো মেনে নিতে পারছিল না। কেঁদেই যাচ্ছিল ক্রমাগত। প্রিয়নাথ তার জবানবন্দিটাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দ্যাখে—

—আপনার নাম?

—জর্জ। জর্জ হগ।

—লন্ডনেই থাকেন?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। বেকার স্ট্রিটের পাশে। এক বস্তিতে।

—কার্টারকে কতদিন চেনেন?

—ওর নাম কার্টার না। জনসন। হ্যারি জনসন। ওর বাপ লিন্ডসে ছিল নামকরা চোর, খুনে। ওর মা, শার্লি কাজ করত ওয়ার্ক হাউসে। থাকত আমার বস্তিতেই। হ্যারি আমার কাছেই সারাদিন কাটাত। বাপটা তো সুযোগ পেলেই ওকে মেরে হাতের সুখ করত। তাই বাপের কাছে যেত না। মাকে কিন্তু খুব ভালোবাসত ছোকরা। মা বাড়িতে এলেই পায়ে পায়ে ঘুরত।

—তারপর?

—তারপর আর কী? ওর বাবা মরে গেল। মানে কেউ একটা মেরে ফেলে রেখেছিল আমাদের বস্তিতে। সে এক বীভৎস ব্যাপার। গলার নিচ থেকে পেট অবধি চেরা। নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে রয়েছে। গায়ে অজস্র আঘাতের চিহ্ন। চেনা যাচ্ছে না। অণ্ডকোশ কাটা। খুব রাগ না থাকলে কেউ এমন করে না। কোনও মহিলাঘটিত ব্যাপার হবে… বোঝেনই তো সব… মা-টা পাগল হয়ে গেল সেই দেখে। ছেলে মা-কে বেডলাম মানসিক হাসপাতালে ভরতি করে পালিয়ে গেল।

—পালিয়ে গেল? কোথায়?

—অনেক পরে যখন ফিরে এল তখন দেখা করতে এসেছিল। আমি চিনতেই পারিনি। নাম বদলেছে। পোশাক বদলেছে। পালিয়ে নাকি কোন এক ফরাসি জাদুকরের চ্যালা হয়ে ছিল কিছুদিন। তিনি নাকি ওঁকে ম্যাজিকের নানা বিদ্যা শিখিয়েছেন। তিনি মারা যেতেই ও নাম বদলে নিজেই ম্যাজিক দেখানো শুরু করেছে। আমাকে বলল, “জর্জ কাকা, আপনি তো একলা মানুষ, আমার দলে চলে আসুন।” আমিও হাত পা ঝাড়া… চলে গেলাম ওর দলে। তখন কি জানতাম, আমার চোখের সামনে ওকে এভাবে মরতে দেখতে হবে…

—কোন ম্যাজিশিয়ানের কাছে গেছিল, কিছু বলেছে?

—হ্যাঁ, রবার্ট হুডিন। সেইজন্যেই তো রবার্ট কার্টার নাম নিয়েছিল। ম্যাজিশিয়ান হবার পরে আর আগের কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখেনি ও, আমি ছাড়া। অবশ্য, শার্লিকে দেখতে যেত নিয়মিত।

—কার্টার, মানে হ্যারির মা এখনও বেঁচে আছেন?

—হ্যাঁ। বেডলামেই ওঁর চিকিৎসা চলছে।

—হ্যারির আর কোনও আত্মীয়স্বজন?

—ছোটো একটা ভাই আছে। একেবারেই বখাটে। যতসব উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলেপিলের সঙ্গে মেশে। হ্যারির থেকে মাঝে মাঝে টাকা চাইতে যেত। শুরুর দিকে দিত। শেষে আমি মানা করায় আর দিত না।

—সে ভাইয়ের নাম কী?

—উইগিন্স। উইগিন্স জনসন।

—আচ্ছা, এবার চিন-সু-লিনের কথায় আসি। মানে রিচার্ড হ্যালিডে। একে চিনতেন আপনি?

—না। হ্যারি চিনত। একেবারে শেষ মুহূর্তে ওকে দলে আনা হয়। খুব উদ্ধত। হ্যারির মুখে মুখে কথা বলত। আমরা কেউ সাহস করতাম না। ও বলত।

—আর হ্যারি? হ্যারি প্রতিবাদ করত না?

—একদম না। মাথা নিচু করে শুনত। আমি কয়েকবার বলেছিলাম, কেন কিছু বলে না? অদ্ভুত জবাব দিয়েছিল।

—কী জবাব?

—বলেছিল ‘পাপের প্রায়শ্চিত্ত’।

—কী পাপ?

—জানি না।

—হ্যালিডে কেমন ম্যাজিক দেখাত?

—নেহাত মামুলি। কোনও সঙ্গী নিত না। শো-এর পর সোজা চলে যেত।

—কোথায়?

—জানি না, তবে শুনেছি বেশ্যাপাড়ায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল। সে তো বোধহয় আরও একজনের ছিল।

—সে কে?

—সাইগারসন। একেও শেষ মুহূর্তে ঢোকানো হয়। হ্যারি একে একদম পছন্দ করত না। ওর দাদা নাকি ব্রিটিশ সরকারের বড়ো হোমরাচোমরা। সত্যি মিথ্যে জানা নেই অবশ্য। তাই কবিতা বলতে একে ডাকা হয়েছে। এই ছোকরা চুপচাপ থাকে। কথা বলে না। বিশেষ মেশেও না কারও সঙ্গে। মাঝে মাঝে কোথায় হাওয়া হয়ে যায়। মাঝে মাঝে দলের সঙ্গেই থাকে। নিজের ঘরে একলা বসে বেহালা বাজায়।

—আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে?

—একবারই। আর আমার সেটা মনে আছে, কারণ ও আমাকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিল।

—কী সেটা?

—হ্যারির বাবার চোখের মণির রং কী ছিল?

—কী রং?

—নীল, ঘন নীল।

—শেষ প্রশ্ন। এই গোটা ঘটনায় সবার হিসেব পাওয়া যাচ্ছে। একজনের বাদে। রাখহরি। সে যেন হাওয়াতে মিলিয়ে গেছে। আপনি তার পরিচয় জানেন?

—নাহহ। সেই ভয়ংকর রাতে আমিও তাকে প্রথমবার দেখি। সেই শেষবার।

একের পর এক প্রশ্ন জাগছে প্রিয়নাথের মনে। রাখহরি তবে কে? কোথা থেকে এল? গেলই বা কোথায়? আর সাইগারসন? মেডিক্যাল কলেজের লাশকাটা ঘরে কী করছিলেন তিনি? উইংসের পাশে উঁকি মারছিলেন কেন বারবার? কার্টারকে ধরে ধরে নিয়ে যাবার আগে হেনরি সাহেবের কানে কী বলেছিলেন? কার্টারকে ঘর অবধি পৌঁছে দিয়েছিলেন সাইগারসন। এমনটাই বলেছিলেন তিনি। নিয়ে যাবার সময়ই নাকি কার্টারের জ্ঞান ফিরে আসে। কার্টার নিজে পায়ে হেঁটে গ্রিনরুমে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। কিন্তু সবাই যখন গুলির শব্দ পেয়ে সেই ঘরে যায়, তখন দরজা আধখোলা। দরজা বন্ধ করার পর আবার দরজা খুলে আত্মহত্যা কেন করতে যাবেন কার্টার? নাকি হ্যারি? একজনের কাছেই সে উত্তর থাকতে পারে। যে শেষবার কার্টারকে জীবিত দেখেছে। সাইগারসন। প্রিয়নাথ বুঝল, তাকে অন্তত একবার সাইগারসনের সঙ্গে কথা বলতে হবে। অনেকগুলো রাস্তা তার কাছে গিয়েই গিঁট পাকিয়ে আছে।

দুই

অষ্টাদশ শতকে কলকাতা শহরে আসা সাহেব মেমসাহেবরা তাঁদের সঙ্গে লন্ডনের হাওয়াও বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা কলকাতাতেই আমোদপ্রমোদের জন্য বেশ কিছু পাঞ্চহাউস আর ট্যাভার্ন খুলে বসেন। ইংরেজরা নিজের দেশের মডেলে এইসব আড্ডাখানাগুলো গড়ে তুলেছিলেন। বাংলার মানুষের সমাজজীবনের থেকে এরা একেবারেই বিচ্ছিন্ন ছিল। ট্যাঙ্কস্কোয়ার (ডালহৌসি), লালবাজার আর কসাইতলা (বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট) ছিল তখনকার কলকাতার প্রাণকেন্দ্র। এই অঞ্চলেই আদিযুগের কলকাতার ট্যাভার্ন আর পাঞ্চহাউসগুলো গড়ে উঠেছিল। এদের মধ্যে সেরা ছিল ১৭৮০ সালে লালবাজারের হারমোনিক ট্যাভার্ন। বড়ো বড়ো হোটেলের চেয়েও এই আড্ডাখানার মর্যাদা বেশি ছিল। নিয়মিত বসত চা-কফির মজলিশ। এর আমন্ত্রণের টিকিট পাবার জন্য হাপিত্যেশ করে থাকতেন বড়ো বড়ো ইংরেজ আমলারা। মিসেস ওয়ারেন হেস্টিংস স্বয়ং ছিলেন এর অন্যতম পেট্রন। ১৭৮৫-তে হেস্টিংস বিদায় নিয়ে লন্ডন চলে গেলে হারমোনিকের ভাগ্যও বদলাতে থাকে। প্রথমে কোন এক সুবি সাহেব সেখানে স্কুল খুলে বসেন। সেই স্কুল চলল না বিশেষ। শেষে উনিশ শতকের শুরুতেই ইংরেজ সরকার এই বাড়ির এক অংশে স্থাপন করলেন প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট। ঠিক তার পরে পরেই কলকাতা পুলিশ বিভাগ চালু হতেই এই বাড়ি আর ঠিক পাশে জন পামারের বাড়ি নিয়ে লালবাজারে পুলিশের হেডকোয়ার্টার চালু হল। পামারের বাড়ির একতলার কোণে ছিল গোয়েন্দা বিভাগ, আর সেখানেই প্রিয়নাথের অফিস। অফিস থেকে কয়েক পা হেঁটে গেটের বাইরে দাঁড়াতেই দেখতে পেল একটা খালি পালকি দাঁড়িয়ে। তাতে চেপে প্রিয়নাথ বেহারাদের নির্দেশ দিল, “উইলসন সাহেবের হোটেলে চলো।” ডেভিড উইলসন শহরের সাহেবদের কাছে ডেইন্টি ডেভি নামে পরিচিত ছিলেন। ১৮৩৫ সালে কলকাতায় এসে সাহেব ‘অকল্যান্ড হোটেল অ্যান্ড হল অফ নেশনস’ নামে এক হোটেল খুলে বসেন। ব্যবসা ভালোই চলছিল। তখনকার সেরা হোটেল স্পেন্সেস-এর পরেই লোকে এর নাম করত। ১৮৬৫ নাগাদ উইলসন সাহেব কোনও এক অজানা কারণে হোটেলের নাম বদলে রাখলেন ‘গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল’। কাগজে অবশ্য এ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল, কিন্তু সাহেব নাম বদলাননি। গাড়োয়ান আর পালকিবেহারারা অবশ্য এখনও উইলসন সাহেবের হোটেলই বলে। এই হোটেলেই কার্টারের গোটা দল আছে। তাদের চলে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পরপর এই দুই খুনের পর পুলিশ কমিশনার কিছুদিনের জন্য তাদের যাওয়া আটকে দিয়েছেন।

প্রিয়নাথ চলেছে সাইগারসনের সঙ্গে দেখা করতে। এর আগে একবার সে টমসন সাহেবকে বলেছিল সাইগারসনকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। সাহেব অনুমতি দেননি। ওটা নাকি তিনি নিজেই করেছেন। প্রিয়নাথ বুঝতে পারছে কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সাহেব সাইগারসনকে আড়াল করছেন। তাই কাউকে না জানিয়েই সে সাইগারসনের সঙ্গে দেখা করবে ঠিক করল। গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের দোতলায় কার্টারের দলকে রাখা হয়েছে। কার্টারের আলাদা ঘর। দরজায় বোর্ড ঝুলছে এখনও, “রবার্ট কার্টার, গ্রেটেস্ট ম্যাজিশিয়ান অফ দ্য ওয়ার্ল্ড।” মানুষটা নেই, বোর্ড রয়ে গেছে। প্রিয়নাথ অজান্তেই কাষ্ঠ হাসি হাসে। আর ঠিক তখনই তার কানে আসে মৃদু একটা বেহালার আওয়াজ। প্রিয়নাথ গানবাজনা বিশেষ বোঝে না, কিন্তু যে বাজাচ্ছে, সে যে দারুণ বাজায় তা বুঝতে সংগীতজ্ঞ হতে হয় না। সাইগারসন ঘরেই আছে। বুড়ো জর্জ বলেছিল ঘরে থাকলে সে একা একা বেহালা বাজায়। লবি দিয়ে হেঁটে বাজনার উৎসের কাছে এসে আবার চমকাল প্রিয়নাথ। সাইগারসনের জন্য আলাদা ঘর! এমন তো হবার কথা না। সাধারণত দলের প্রধান ম্যাজিশিয়ান বা ম্যানেজার আলাদা ঘর পান। বাকিরা একসঙ্গে ডরমেটরিতে থাকেন। কিন্তু এটা কী? সামান্য আবৃত্তি (যেটা সে অর্থে ম্যাজিকের সঙ্গে খুব একটা দরকারিও না) করে একটা আলাদা ঘর? জর্জ বলেছিল এর দাদা নাকি বড়ো হোমরাচোমরা, সেইজন্যেই কি অকর্মণ্য ভাই এসব সুযোগ পাচ্ছে? কে জানে! কিন্তু এর বাজনার হাত যে খাসা তা মানতেই হবে। দরজায় নক করতেই ভিতরের বাজনা থেমে গেল। আবার নক করতে যেতেই প্রিয়নাথ বুঝতে পারল দরজা ভেজানো। ভিতর থেকে আওয়াজ এল, “কাম ইন।”

ভিতরে ঢুকে প্রিয়নাথের মনে হল ঘরে আগুন লেগেছে। ঘন ধোঁয়ায় সারা ঘর ভর্তি। জানলা বন্ধ। একটু ধাতস্থ হতেই বুঝল এ ধোঁয়া কড়া পাইপের ধোঁয়া। প্রিয়নাথ নিজে ধূমপান করে, তবু এই ধোঁয়ায় তার কাশি শুরু হল। সাইগারসনের মুখে কালচে তেলতেলে একটা ক্লে পাইপ আর তা থেকে ভসভসিয়ে ধোঁয়া উঠছে। সাইগারসনের কপালে ভাঁজ, যেন গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছিলেন। প্রিয়নাথকে দেখে এগিয়ে এসে ঘরে বসতে বললেন। ক্ষমা চাইলেন ঘরের এই অবস্থার জন্য। খুলে দিলেন জানলা। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে কোচে বসার পর প্রথম প্রশ্ন সাইগারসনই করলেন, “বলুন অফিসার, পালকিতে চড়ে আসতে আপনার কোনও অসুবিধা হয়নি তো?”

চমকে উঠল প্রিয়নাথ। ঠিক যেমনটা আগের দিন চমকেছিল। এ তো কার্টারের চেয়েও বড়ো ম্যাজিশিয়ান! কীভাবে জানল সে পালকিতে এসেছে? প্রিয়নাথের মুখের হতভম্ব ভাব বুঝতে পারলেন সাইগারসন। এগিয়ে দিলেন সেদিনের স্টেটসম্যান পত্রিকার একটা খবর। গত পরশু এক ছ্যাকড়া গাড়ির ঘোড়া পাগল হয়ে এক পথচারীকে চাপা দেয়। ইদানীংকালে এরকম ঘটনা তিনখানা ঘটল। পথচারীরা গাড়োয়ানকে উত্তমমধ্যম দিয়েছে। ফলে গাড়োয়ানরা তিনদিন ধর্মঘট ডেকেছে। কিন্তু এর সঙ্গে…

উত্তরটা সাইগারসনই দিলেন। “গাড়োয়ানরা ঘোড়ার গাড়ি বন্ধ রেখেছে। আপনার আসার উপায় হয় পায়ে হেঁটে, নয় পালকি। পায়ে হেঁটে আপনি আসেননি। কারণ কাল রাতে অল্প বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় কাদা। কিন্তু আপনার বুটজুতো একেবারে চকচক করছে। অতএব…” প্রিয়নাথ বেশ অবাক হল। বিলাতের স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনে ইদানীং শার্লক হোমস নামে এক গোয়েন্দার গল্প বার হচ্ছে। আর্থার কোনান ডয়েল নামে এক ডাক্তারের লেখা। টমসন সাহেব সেই ডাক্তারকে চেনেন। উনিই প্রিয়নাথকে সেসব গল্প পড়িয়েছেন। সে গোয়েন্দাও অনেকটা এমন। কিন্তু সে তো গল্পের গোয়েন্দা, এ তো খাঁটি রক্তমাংসের মানুষ।

একটু আমতা আমতা করেই জিজ্ঞেস করল প্রিয়নাথ, “আচ্ছা, আর-একটা কথা। সেদিন লাশকাটা ঘরে আপনি কীভাবে জানলেন যে আমি পুলিশে কাজ করি? আমি তো সাদা পোশাকে ছিলাম। আর এই কেসের দায়িত্ব আমি পেয়েছি সেটাই বা জানলেন কীভাবে?”

“আপনি কি সেটা জানতে এত কষ্ট করে পালকি চেপে এলেন? তা তো মনে হয় না।”

“আজ্ঞে তা না। অন্য জিজ্ঞাসাও আছে। তবে যেভাবে আপনি পালকির কথা বললেন, তাতে মনে হল আর কি।”

“আমি নিজে মার্টিন সাহেব আর গোপালচন্দ্রকে বলেছিলাম লাশকাটা ঘরে যেন কাউকে না নিয়ে আসে। তারপরেও আপনি এলেন। মানে পদাধিকার বলে আপনি এসেছেন। কী সেই অধিকার যাতে নির্বিঘ্নে আপনি লাশকাটা ঘরে ঢুকতে পারেন? এক, আপনি কোনও ডাক্তার, অথবা তদন্তকারী অফিসারদের কেউ। আপনি যদি ডাক্তার হতেন তবে গোপাল আপনার পরিচয়ে মিস্টার প্রিয়নাথ না বলে ডাক্তার প্রিয়নাথ বলত। মানে আপনি তদন্তকারী অফিসার। আর এই কেসের কথা খুব কম মানুষকেই জানানো হয়েছে। আপনি জানেন। মানে এই কেসের ভার আপনাকেই দেওয়া হয়েছে। কেমন কিনা?”

“বাহ… আপনি বলার পর জলের মতো সোজা লাগছে। এবার একটাই প্রশ্ন, যার জন্য আমার এখানে আসা…”

“বলুন।” নিভে যাওয়া পাইপ আবার ধরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সাইগারসন।

“আপনি কে? এই কেসের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?”

খুব ধীরে ধীরে মুখ থেকে পাইপ সরালেন সাইগারসন। কপালের ভাঁজ আরও গভীর হল। খাড়া নাক প্রায় চিবুক ছুঁয়েছে। চোখ মেঝের কার্পেটের দিকে। খানিক বাদে মুখ তুলে সোজা প্রিয়নাথের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন সাইগারসন, “আপনার কী মনে হয়?”

একটু ইতস্তত করল প্রিয়নাথ। ঠিক এই পরিস্থিতি হবে ভাবেনি। তবু একটু ভেবে বলল, “দেখুন, আপনি কে তা আমি বলতে পারব না। কিন্তু যতটা জেনেছি কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছি না। আপনি ম্যাজিকের দলের সামান্য কবিতাপাঠক নন, কিন্তু আবৃত্তি ভালো করেন, মনে হয় কোনও এক সময় ভালো থিয়েটার করতেন। দারুণ বেহালা বাজান সেটা তো শুনতেই পেলাম। রসায়নে প্রগাঢ় জ্ঞান, নইলে সেদিন ক্লোরোফর্ম নিয়ে এত কিছু বলতে পারতেন না। উঁচু মহলে হাত আছে। আপনার দাদা একজন কেউকেটা। কিন্তু আপনি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের কেউ নন, তাহলে এমন লুকিয়ে থাকতেন না। আবার অপরাধীও নন, তাহলে টমসন সাহেব আপনাকে আগলে রাখতেন না…” বলতে বলতেই প্রিয়নাথের মাথায় যেন গোটা ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল, “আপনি কোনও প্রাইভেট ডিটেকটিভ নন তো?”

একটু থমকে গিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন সাইগারসন। “এলিমেন্টারি, ডিয়ার অফিসার। আমি এই ভয়টাই করছিলাম, ঠিক কখন কে আমায় ধরে ফ্যালে। এ দেশেও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সঙ্গে পাল্লা দেবার মতো মাথা আছে তাহলে”, বলেই হাত বাড়িয়ে দিলেন সাইগারসন, “আমি সাইগারসন মোহেলস। প্রাইভেট না। কনসাল্টিং ডিটেকটিভ।”

“সেটা কী?”

“যখনই সরকারি পুলিশ কোনও আতান্তরে পড়ে, তখনই আমায় ডাকে। আমি সামান্য ফি-এর বদলে তাদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। অপরাধী ধরা পড়ে। তারা সব ক্রেডিট নেয়, আর আমি আমার ফি পকেটে পুরি। এ ব্যাপারে বিশ্বে আমিই একা এবং অদ্বিতীয়।”

লোকটা বেশ অন্যরকম, কিন্তু অহংকারী। উদ্ধত। ভাবছিল প্রিয়নাথ। তারপরেই মনে পড়ল অনেক প্রশ্ন করা বাকি।

“আমার কিছু প্রশ্ন আছে।”

“নির্দ্বিধায় বলুন। কথা দিচ্ছি মিথ্যে বলব না।”

“আপনি এই কার্টারের দলের সঙ্গে এসেছেন কী করতে?”

“মি. টমসন আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।”

“কিন্তু কেন?”

“একটা কেসের ব্যাপারে।”

“কোন কেস?”

“আপনি জানেন হয়তো। ডালান্ডা হাউস থেকে পাগলরা ক্রমাগত ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে। হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক।”

“কিন্তু যারা পালিয়েছে তারা সবাই তো নেটিভ, আর ছোটোলোক। এদের খুঁজতে বিলেত থেকে আপনাকে এ দেশে আসতে হল কেন? আর তাও পরিচয় ভাঁড়িয়ে?”

“প্রথম প্রশ্নের উত্তর আগে দিই। যারা পালিয়েছে কিংবা হারিয়েছে তারা নেটিভ, আপনার ভাষায় ছোটোলোক, কিন্তু একটা ব্যাপার জানেন কী, এদের একটা মিল আছে। এরা সবাই পুরুষ, আর শুধু পাগলামো না, এদের প্রত্যেকের অপরাধের ইতিহাসও আছে। এদের একজন লালু মণ্ডল, সোনাগাজির তিনজন বেশ্যাকে গলা টিপে মেরেছিল। বাকিদেরও খুন বা ধর্ষণের ইতিহাস আছে। এই ধরনের পাগলরা ছাড়া পাচ্ছে কীভাবে? আর ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে কোথায়? সবাই ভয় পাচ্ছে এরা ছাড়া পেয়ে আরও অপরাধ করবে, কিন্তু আমার ভাবনা অন্য।”

“সেটা কী?”

“আমি কেস রিপোর্ট দেখেছি। এই পাগলদের যা অবস্থা, বাইরে বেরিয়ে শান্ত হয়ে থাকা তাদের পক্ষে অসম্ভব। আমি নিশ্চিত ছিলাম কিছুদিনের মধ্যেই অন্য কোনও অপরাধ করতে গিয়ে এরা ধরা পড়বেই। কিন্তু আশ্চর্য! একজনও ধরা পড়েনি। সবাই যেন কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে।”

“এর কারণ?”

“সব সম্ভাবনাগুলোকে বাদ দিলে যেটা পড়ে থাকে, যতই অসম্ভব মনে হোক না কেন, সেটাই সত্যি।”

“আর সেটা কী?”

মাথাটা ঝুঁকিয়ে একেবারে প্রিয়নাথের মুখের সামনে এনে সাইগারসন বললেন, “আমার স্থির বিশ্বাস এই পাগলদের একজনও বেঁচে নেই।”

প্রায় লাফিয়ে উঠল প্রিয়নাথ, “মানে!”

“কেউ বা কারা খুব সন্তর্পণে এদের খুন করছে।”

“কিন্তু কেন?”

“ঠিক এই জায়গাতেই আমিও আটকে আছি। তিন-চারটে ছেঁড়া ছেঁড়া সুতো দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু তারা আবার কুয়াশায় মিলিয়ে যাচ্ছে।”

“আর আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন? আপনি নিজের পরিচয়ে না এসে পরিচয় গোপন করলেন কেন?”

“এই উত্তরটা ঠিক এখন দিতে পারছি না। ধরে নিন আমারও কদিন গা ঢাকা দেবার প্রয়োজন হয়েছে। লন্ডন আমার জন্য খুব গরম হয়ে উঠেছিল। থাকা যাচ্ছিল না। আর তাই দাদার কাছে টমসন যখন সাহায্য চান, আমিও সুযোগ পেয়ে চলে আসি।”

“আপনি কার্টারকে চিনতেন?”

“কার্টার না, ওঁর নাম হ্যারি। হ্যারি জনসন।”

“জানি। জর্জ বলেছে।”

“হ্যারিকে আমি চিনতাম না। কিন্তু ওর ভাই উইগিন্স আর তার দলবল আমার বিশেষ পরিচিত।”

“মানে ওই লোফাররা?”

“কে বলেছে আপনাকে ওরা লোফার? জর্জ?”

“হ্যাঁ।”

“বুড়ো আসলে উইগিন্সকে দুচোখে দেখতে পারে না। উইগিন্সের মা পাগল। বেডলামে ভরতি। ইদানীং হ্যারি কিছু পয়সাকড়ি দিচ্ছে, আগে তো উইগিন্সই চালাত।”

“কীভাবে?”

“উইগিন্সের দলবলের একটা সুবিধে আছে। ওদের কেউ সন্দেহ করে না। ওরা যেখানে সেখানে চলে যায়, আমার জন্য খবর নিয়ে আসে, আমি ওদের পয়সা দিই।”

“আর অন্য ম্যাজিশিয়ান? রিচার্ড হ্যালিডে?”

“ডিয়ার অফিসার, তাহলে আপনাকে আর-একটা খবর দেওয়া যাক। রিচার্ড হ্যালিডে শখের ম্যাজিশিয়ান। তার আসল পেশা অন্য।”

“সেটা কী?”

“সে ছিল বেডলাম হাসপাতালের ডাক্তার।”

“বলেন কী! এই বেডলামেই তো…”

“হ্যাঁ, হ্যারি আর উইগিন্সের মা শার্লি ভরতি।”

“তবে সে কেন নাম পরিচয় ভাঁড়িয়ে এ দেশে এসেছে?”

“আমি সেটা জানার বহু চেষ্টা করেছি। জানতে পারিনি। এই সফরের আগে হ্যারি তার গোটা দলকে নতুন করে সাজায়। এক বুড়ো জর্জ ছাড়া। সে আর-এক সেয়ানা। কথাই বলে না।”

“তাও তো আপনার একটা প্রশ্নের জবাব দিয়েছে।”

“হ্যারির বাবার চোখের রং তো? হ্যাঁ। হয়তো প্রশ্নের গুরুত্বটা বোঝেনি।”

“আপনি এটা জিজ্ঞাসা করলেন কেন?”

“একটা খটকা। বলার মতো কিছু হয়নি এখনও।”

“ও হ্যাঁ, সেদিন কার্টার মঞ্চে অজ্ঞান হয়ে যাবার পরে আপনিই তো তাঁকে গ্রিনরুমে নিয়ে যান?”

“অজ্ঞান হয়নি, মাথা ঘুরে গেছিল একটু। নিয়ে যেতে যেতে ঠিক হয়ে যায়। নিজে হেঁটেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।”

“ভিতর থেকে?”

“হ্যাঁ, আমি আওয়াজ পেয়েছি।”

“তাহলে আমরা যখন গেলাম, তখন দরজা খোলা পেলাম কেন?”

“কার্টার, মানে হ্যারি নিজেই দরজা খুলে দিয়েছিল।”

“কাকে?”

“যে তাকে খুন করল, তাকে।”

“মানে? কার্টার আত্মহত্যা করেননি?”

“কার্টারের ডান হাতে বন্দুক ছিল, আর ও ছিল বাঁহাতি। ফ্লিন্টলক বন্দুকের ট্রিগারে যে পরিমাণ চাপ দিতে হয় তা কমজোরি হাতে দেওয়া সম্ভব না। এটা খুন। আপনি নিশ্চিত থাকুন।”

“কে খুন করেছে আপনি জানেন?”

“বোধহয় জানি। আমার ধারণা রাখহরি হতে পারে। কিন্তু কার্টারের ভ্যানিশিং অ্যাক্টের মতো রাখহরিও সেদিন থেকে ভ্যানিশ।”

“একটা কথা। আমি বড়োলাটের দেখাশোনা করছিলাম। উনি একটা কাগজের ফালি হাতে নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। পরে আমি অনেক খুঁজেও সে কাগজ দেখতে পাইনি…”

সাইগারসনের চোখ চকচক করে উঠল। “দারুণ চোখ তো আপনার! বড়োলাট সে কাগজ মঞ্চে কার্টারের সঙ্গে হাত মেলানোর সময় তাকে দেন। কার্টার এক ঝলক দেখেই পকেটে রেখে দিয়েছিল। কার্টার মাথা ঘুরে পড়ে গেলে আমি ওকে ধরে নেবার অছিলায় ওর পকেট থেকে আলগোছে কাগজটা নিয়ে নিয়েছিলাম।”

“কী ছিল সেই কাগজে?”

“নিজেই দেখে নিন”, বলে সাইগারসন উঠে গিয়ে একটা টার্কিশ চটির তলা থেকে এক টুকরো কাগজ প্রিয়নাথের সামনে এনে দিলেন। কাগজে তিনটে সোজা দাগ। একটার ওপর একটা। এমন চিহ্ন আগে সে দেখেছে। সেই মৃতের বুকে অনেকটা এমন চিহ্ন ছিল।

“আবার ই-চিং?”

“আপনি ই-চিং-এর মানে জানেন?”

“প্রথম হত্যার খবর দিয়েছিল যে যুবক, তার থেকে নামটা শুনেছিলাম। বিস্তারিত জানি না। আপনি জানাতে পারেন?”

“জানাব, আগে বলুন আপনার হাতে একটু ফাঁকা সময় আছে?”

“আছে। কেন?”

“ডালান্ডা হাউসে যেতে হবে। ধরাচূড়া পরে না, সাদা পোশাকে যাবেন। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। একটা মতলব ফেঁদেছি…”

তিন

প্রিয়নাথরা ডালান্ডা পৌঁছোতে থাকুন, বরং এই সুযোগে উনিশ শতকে কলকাতার উন্মাদালয়গুলোর অবস্থা নিয়ে দু-এক কথা বলা যাক। বিলেতের মতো এ দেশেও সেই সময় পাগলদের ভয়ংকর কিছু মনে করা হত। মানুষ নয়, দানব। “গভীর রাতে যেসব নাম না জানা শয়তানি আত্মারা নেমে আসে পৃথিবীতে, তারাই তাদের কিছু অংশ ছেড়ে যায় এদের মধ্যে”, লিখেছিলেন এক সাহেব ডাক্তার। নেটিভ থেকে সাহেব, সবাই কোনওরকমে এদের থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইতেন। ভাঙা আস্তাবল, জেল বা পরিত্যক্ত ব্যারাকের চারদিকে তিনগুণ উঁচু পাঁচিল দিয়ে এদের ঘিরে রাখা হত। একবার পরিবারের কাউকে এর ভিতরে ঢোকাতে পারলেই নিশ্চিন্ত। তারপর তাঁর কথা ভুলে যেতেন সবাই। এই পাগলাগারদগুলোর দায়িত্বে থাকতেন কোনও এক সিভিল সার্ভেন্ট, যাঁর এই পাগলদের নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না। ফলে গোটা দায়িত্বই এসে পড়ত কিপারের ওপর। এই কিপাররা কেউই শিক্ষিত ছিলেন না। এমনকি অনেক সময় তো কুখ্যাত অপরাধীদের সাজা হিসেবে পাগলাগারদের কিপারের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হত। তাঁদের একটাই মন্ত্র ছিল, “ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করো।” ইউরোপীয়দের জন্য আগে কেন্ডারডাইনের একটা ছোটো মানসিক হাসপাতাল ছিল হোয়াইট টাউনে। মেডিক্যাল বোর্ড ১৭৮৭-র মে মাসে বির্জিতালাও আর জেনারেল হাসপাতালের মাঝে আরও একটা বড়ো উন্মাদাগার স্থাপনের কথা ভাবে। তখন সার্জন উইলিয়াম ডিক নিজের খরচায় এই ভবনটি নির্মাণ করেন। শুধু শর্ত হয়, কোম্পানি তাঁকে ভাড়া বাবদ মাসান্তে চারশো টাকা এবং পরে মহিলাদের আলাদা ভবন হলে তার জন্য দুশো টাকা দেবে। ১৮২১-এ ডিক মারা গেলেন। কোম্পানি ঠিক করল এই হাসপাতাল বন্ধ করে দেবে। আর ঠিক তখনই ডিকের হাসপাতালের হেড কিপার মি. বিয়ার্ডসমোর জেনারেল হাসপাতালের ঠিক পিছনে আর-একটা মানসিক হাসপাতালের প্রস্তাব দেন। ১৮৫৩-তে বিয়ার্ডসমোর মারা যান। ১৮৫৫-তে স্বয়ং ব্রিটিশ সরকার এই হাসপাতালটি অধিগ্রহণ করেন। তখন থেকেই এই হাসপাতালের ভাগ্য বদলাতে থাকে। সবাই এর নাম দেয় ভবানীপুরের পাগলাগারদ। সেখানে ওষুধ বলতে ছিল শুধু মরফিন বা আফিম, তাও নেটিভ পাগলাগারদে বাড়ন্ত। রসা পাগলায় নেটিভদের জন্য হাসপাতালের অবস্থা রোগীর ভারে দিনে দিনে সঙ্গিন হয়ে উঠলে ধলন্দর প্রান্তরে “ডালান্ডা হাউস” গড়ে ওঠে। দেড়শো জন রোগীর জন্য তৈরি হাসপাতালে শুরুতেই তিনশো জনের বেশি রোগীকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আর-একটা সমস্যা ছিল। অপরাধী আর নিরপরাধ, দুই ধরনের পাগলকেই ঠাঁই দেওয়া হত এখানে। ইংরেজ সরকারকে এই নিয়ে বেশ কয়েকবার জানানো হয়, কিন্তু সরকার গা করেননি। গোটা ভারতে তখন ছটা পাগলাগারদ, কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ ডালান্ডা। এর ভিতরে কী হয় কেউ জানে না। বিশাল উঁচু গোল এই বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে মানুষ যায় আর তাকিয়ে তাকিয়ে দ্যাখে। ভাবে ভিতরে কেমন সব প্রাণীরা আছে? বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের ভয় দেখায়। মাঝে মাঝে ভিতর থেকে ভেসে আসে তীব্র আর্তনাদ, আর্ত চিৎকার। পথচারীরা শিউরে উঠে তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যায় ডালান্ডা হাউসকে।

সাইগারসন আর প্রিয়নাথের পালকি দুটো ডালান্ডা হাউসের বিশাল সদর দরজা অবধি এল না। ওরা ভয় পায়। একটু পায়ে হেঁটে বিরাট লোহার পাত দেওয়া সদর দরজার সামনে যখন এল প্রিয়নাথ, তখন সামনে বেশ জটলা। তিন-চারজন মিলে একটা ঘোড়ায় টানা ময়লা ফেলার গাড়ি থেকে একজন বেশ শক্তপোক্ত লোককে টেনে ভিতরে ঢোকানোর চেষ্টা করছে। মাথার একদিকে চাপ চাপ রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। নাক ফেটে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। গলায় মোটা লোহার বেড়ি। খালি গা। একটা লেংটি মতো পরা। শিকল দিয়ে বাঁধা হাত-পা। লোকটা প্রাণপণে চিৎকার করছে, ভিতরে যাবে না। এক গাঁট্টাগোঁট্টা সাহেব কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আর তারই নির্দেশে একজন লোক একটা মোটা কাঠের রুল দিয়ে দমাদ্দম পেটাচ্ছে পাগলটাকে। এই সাহেবই সম্ভবত ডালান্ডার কিপার। পাগল লোকটা মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে, আবার ওকে টেনে তুলে মারছে। অর্থহীন প্রলাপের মতো চিৎকারে ভরে উঠছে আকাশ বাতাস। প্রিয়নাথ শুধু সেই জড়ানো শব্দাবলির মধ্যে বারবার “ও বুক রে… ও বুক...” বুঝতে পারল। খুব ইচ্ছে করছিল একবার দৌড়ে গিয়ে হাতের লাঠিটা কেড়ে কিপারটাকেই দু ঘা লাগাবে। কিন্তু হাতে একটা চাপ অনুভব করল। সাইগারসন এমন কিছু একটা অনুমান করেই তার হাত টেনে ধরেছেন। একটু এগিয়ে গেলেন সাইগারসন। সোজা কিপারের কাছে গিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “এক্সকিউজ মি স্যার, আপনিই তো ডালান্ডার কিপার?”

একটু চমকে উঠল লোকটা। তখনও তার মুখে একটা পৈশাচিক আনন্দের রেশ খেলে যাচ্ছে। পাগলটাকে প্রায় ঢোকানো হয়ে গেছে গেটের ভিতরে। সাইগারসনের প্রশ্নে ভুরু কুঁচকে গেল, “হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কে?”

গলা নামালেন সাইগারসন, “একটু দরকারি কথা আছে। সময় হবে?”

“যা বলার এখানেই বলুন”, কিপার তাঁকে ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাঁচে।

“আমার সঙ্গের এই ভদ্রলোক”, বলে প্রিয়নাথকে দেখালেন সাইগারসন, “বর্ধমান রাজপরিবারের ছেলে। এঁর দাদা বদ্ধ উন্মাদ। বাড়িতে রাখা যাচ্ছে না। এদিকে সরকারি নিয়মকানুন মেনে চলতে গেলে জানাজানি হয়ে যাবে, সেটাও এঁরা চান না। তাই যদি একটু কথা বলা যেত...”

বেশ সন্দেহের চোখে প্রিয়নাথের দিকে তাকাল কিপার। প্রিয়নাথ একটু হাসবার চেষ্টা করল। এই নাটকটা যে হতে যাচ্ছে, সেটা আগেই সাইগারসন বলেছিলেন। বুঝিয়েছিলেন সেই চৈনিক সংকেতের অর্থও, যদিও তাতে খুব বেশি ইতরবিশেষ হয়নি প্রিয়নাথের ক্ষেত্রে। সে যে তিমিরে, সেই তিমিরেই পড়ে আছে। বর্ধমান রাজবাড়ির ছেলের অভিনয়টা তাকে এখন চালিয়ে যেতে হবে।

“আপনি কে?” সাইগারসনকে প্রশ্ন করল কিপার।

“আমি ওঁর বন্ধু। ওঁকে ইংরাজি শেখাই। আমার নাম বেসিল এসকট।” বলেই হাত বাড়ালেন সাইগারসন।

লোকটা গোয়েন্দা না হয়ে অভিনেতা হলেও নাম করত, মনে মনে ভাবল প্রিয়নাথ।

বাড়ানো হাত ধরল না কিপার। ভুরু কুঁচকেই বলল, “ডাঃ মার্টিনের সঙ্গে কথা বলতে হবে।”

একগাল হাসল সাইগারসন। “তাহলে আর আপনার কাছে আসা কেন? কুমার বাহাদুর পাঁচকান করতে চাইছেন না। দেখুন না, আপনি যদি… খরচাপাতি নিয়ে ভাববেন না।”

শেষ কথায় মন্ত্রের মতো কাজ হল। কিপার আবার দুজনকে আগাপাশতলা দেখে নিয়ে বলল, “ভিতরে আসুন।”

বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে একটা বড়ো উঠোনে এসে পড়ল ওরা। একধারে জমি খুঁড়ে কিছু চাষের চেষ্টা চলছে। মাটি কোপাচ্ছে তিনজন পুরুষ। ঘাস বাছছে দুই মহিলা।

“এখানে চাষবাসও হয়?” জিজ্ঞেস করলেন প্রিয়নাথ।

“বলেন কী? পিছনে অনেকটা জায়গা জুড়ে কফির চাষ। দেখতে যাবেন? লন্ডনের কফির দালালরা রীতিমতো এই কফির প্রশংসা করেন। আমি তো আখ আর সাপান কাঠেরও চাষ করাচ্ছি। মার্টিন সাহেব বিশেষ সময় পান না এখানে আসার… আমাকেই সব দেখতে হয়।”

দেখতে দেখতে যাচ্ছিল প্রিয়নাথরা। যারা অপেক্ষাকৃত সুস্থ, তাদের ছেড়ে রাখা হয়েছে। অবশ্য এর মধ্যে নেটিভ কর্মচারীও থাকতে পারে। সবাই একেবারে চুপচাপ কাজ করছে। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না। কারও দিকে তাকাচ্ছে না। প্রিয়নাথের কেমন ভয় ভয় করছিল। আগে কোনও দিন পাগলাগারদে আসতে হয়নি তাকে। মোরাম বিছানো পথ বেয়ে অফিস ঘরের দিকে এগিয়ে গেল তিনজন। চারিদিকে অদ্ভুত একটা গন্ধ। দুর্গন্ধ। তার মধ্যে এই ঝকঝকে অফিসঘরটা একটু বেমানানই ঠেকছে। অফিসটা মার্টিন সাহেবের। পাশের ছোটো ঘরটায় কিপার বসে। দরজার সামনের প্লেট থেকে প্রিয়নাথ বুঝল এর নাম জ্যাসন স্মিথ। আজ কী হবে গোটাটাই স্মিথ সাহেবের মর্জি।

চেয়ারে বসে আর্দালিকে তিনজনের জন্য চা আনতে বলে অবশেষে একটু স্বাভাবিক হল স্মিথ। ঠোঁটের কোনায় একটু হাসিও দেখা গেল। বলল, “ডালান্ডা নিয়ে অনেকে অনেকরকম কথা বলে মশাই। পত্রপত্রিকাতেও দুর্নাম করে। কিন্তু এখানে তাদের কাউকে এনে রাখুন দেখি এক সপ্তাহ! বাপ বাপ বলে বাড়ি পালাবে।”

“এঁর ভাই কিন্তু সাধারণ লোক নন। একটু স্পেশাল ব্যবস্থা লাগবে… হবে তো?”

“সব হবে। পয়সা দিলেই হবে। কিন্তু তা বলে রাজপ্রাসাদের মতো হবে না, বলে দিলাম। একটু মানিয়ে গুছিয়ে নেবেন। আর খুব আদরযত্ন চাইলে সেটা কি আর আপনারা নিজেরা করতেন না? তাহলে কি আর এখানে দিতেন?” হাসি হাসি মুখে প্রিয়নাথের দিকে তাকিয়ে শেষ কথাগুলো বলল ডালান্ডা হাউসের কিপার।

প্রিয়নাথ কিছু বলল না। সে খুব বেশি ইংরাজি জানে না, এই ভাবটা রেখে গেলেই ভালো। বরং সাইগারসনের কানের কাছে মুখ নিয়ে সে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমাদের ঘুরে দেখতে দেবে না?”

সাইগারসন সেটাই বললেন। কিপার খানিক চিন্তিত মুখে বলল, “ঘুরে দেখার কী আছে? সবাই যেমন সুবিধা পায়, এঁর ভাইও তেমনই পাবেন।”

“তবু দেখুন, কুমার সাহেব একবার দেখতে চাইছেন, আসলে টাকা লাগাচ্ছেন, কিন্তু ভাইয়ের দেখভাল ঠিকঠাক হবে কি না, সুরক্ষা ব্যবস্থা কেমন, এসব না জানলে…” সাইগারসন বললেন।

“নিশ্চিন্ত থাকুন, আমাদের এখানে কোনও কিছু নিয়ে একটুও চিন্তা নেই।”

প্রিয়নাথ আবার মুখ নিয়ে গেল সাইগারসনের কানের কাছে। সাইগারসন যেন একটু অস্বস্তিতেই পড়লেন। তারপর বললেন, “আজ্ঞে কিছুদিন আগে ফ্রেন্ডস অফ ইন্ডিয়া একটা খবর ছেপেছিল আপনাদের নিয়ে। তাতে বলেছিল গত ছয় মাস ধরে নাকি আপনাদের এখান থেকে রোগী পালাচ্ছে…”

“কুত্তার বাচ্চা”, বলে উঠল কিপার।

দুজনেই চমকে গেলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমা চেয়ে কিপার বলল, “আপনাদের বলিনি। ওই ব্যাটা রিপোর্টারকে বললাম। নাম যদি জানতে পারতাম… কী করে যে খবর পেল কে জানে!”

“মানে খবরটা সত্যি?”

এবার গলাটা একটু খাদে নামিয়ে কিপার বলল, “লালু মণ্ডলটা সত্যি। বাকিগুলো ভুল। বানিয়ে লেখা।”

“কী করে পালাল লালু মণ্ডল?”

“সে আমি কী করে বলব মশাই? জানলে কি ধরে আনতাম না? মহা বজ্জাত। যখন ঢুকেছিল, তখন মাথায় তিনটে খুনের মামলা। সামনে এলেই কামড়ে দেয়। এখানে আমরা চিকিৎসা করে অনেক শান্ত করে দিয়েছিলাম। মার্টিন সাহেব নিজে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অনেকটা শান্তও হয়ে গেছিল। আর শিকলে বেঁধে রাখতে হত না। কে বুঝবে যে সেয়ানা পাগল? কোন সুযোগে দেওয়াল টপকে পালিয়েছে।”

“এত উঁচু দেওয়াল টপকে পালাল? সম্ভব?”

“আপনি লালুকে দেখেননি। ওর পক্ষে কিচ্ছু অসম্ভব না। এখন দেখুন আমাদের ঝকমারি। পুলিশ মাঝে মাঝেই খোঁজ নিয়ে যায়। পুলিশ নিজেও খুঁজছে। আমি পড়ে গেছি ঝামেলায়। মাঝে মাঝেই আমায় এসে পুলিশ জেরা করে। ওদের কে এক টমসন আছে, সে তো আদাজল খেয়ে লেগেছে লালুকে খুঁজতে।”

তাহলে খবর সত্যিই। টমসন হালে পানি না পেয়েই সাইগারসনকে ডেকেছেন, ভাবল প্রিয়নাথ।

“তবে নিতান্ত যদি দেখতে চান, চলুন দেখিয়ে আনি”, বলে উঠে দাঁড়াল স্মিথ। ফলে প্রিয়নাথদেরও উঠে দাঁড়াতেই হল। স্মিথ ওদের নিয়ে চলল গোল বিল্ডিংয়ের একদিকে। যেতে যেতেই বিড়বিড় করছিল স্মিথ, “লোকজন নেই, মেথর আসছে না, যাতায়াতের টাঙ্গা বন্ধ, চালাবার জন্য টাকা নেই, চলবে কী করে? এই দেখুন এটা হিন্দুদের রান্নাঘর, আর ওপাশেরটা মুসলমানদের। সুতরাং আপনার ভাইয়ের জাত যাবার ভয় নেই…”

“আর ইউরোপীয়?” এই প্রথম কথা বলল প্রিয়নাথ।

“আপনি জানেন না? এখানে শুধু নেটিভদের চিকিৎসা হয়। ইউরোপিয়ানরা সব ভবানীপুরে। ওখানে রাজকীয় ব্যবস্থা।”

নিচু ছাদ, একের পর এক ঘর। অনেকটা সৈন্যদের ব্যারাকের মতো। ভিতরে এক এক ঘরে চারজন করে রোগীর ব্যবস্থা। দেওয়ালে নখ দিয়ে আঁচড় কেটে কেটে অদ্ভুত সব ছবি এঁকেছে এরাই। সে ছবির মানে কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। ঘরগুলোতে আলো কম। রাতে একেবারে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার হয়ে যায় বলাই বাহুল্য। একজন রোগীকে অদ্ভুত একটা পোশাক পরিয়ে বিছানায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। এমন পোশাক প্রিয়নাথ আগে কোনও দিন দেখেনি।

“কী এটা?” প্রিয়নাথই বলল।

“এটাকে বলে স্ট্রেট জ্যাকেট। শক্ত ক্যানভাসের জ্যাকেট, এতে রোগীর হাত বেঁধে পিছমোড়া করে দেওয়া হয়। রোগী আর নড়তে চড়তে পারে না।”

প্রিয়নাথের মুখে একটা ভয়ের ছাপ ফুটে উঠেছিল বোধহয়। সেটা দেখেই স্মিথ বলল, “চিন্তা নেই। একেবারে বদ্ধ পাগল ছাড়া এমন করা হয় না। আর সবসময় তো না... যখন বাড়াবাড়ি করে তখন। এই ছেলেটাও বড়ো বাড়ির ছেলে। রাজপরিবারের। শুধু এর ছোটোভাই চায় না বড়োভাই সম্পত্তি পাক। অনেকটা আপনার মতন, কী বলেন?” বলেই প্রিয়নাথের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল স্মিথ।

প্রিয়নাথ গম্ভীর হয়েই রইল। ঠিক এমন সময় প্রায় দৌড়ে ঘরে ঢুকল এক নেটিভ বুড়ো। চোখেমুখে উত্তেজনা। স্মিথকে কী যেন বলতে গিয়ে প্রিয়নাথদের দেখেই থমকে গেল। স্মিথ কিছু আঁচ করেই বলল, “কী হয়েছে? কিছু গোলমাল?”

প্রায় বিড়বিড় করে ভাঙা ইংরাজিতে বুড়ো বললে, “মার্টিন সাহেব কাম স্যার। ভেরি অ্যাংগ্রি স্যার। ইউ প্লিজ কাম স্যার।”

প্রায় লাফিয়ে উঠল স্মিথ। “ডাঃ মার্টিন? এসময়? কী হল আবার? এদিকে আপনারা এখানে, আপনাদের দেখলে আমাকে নিশ্চিত জেলে পুরবে। এই লখন, এঁদের নিয়ে ডি ব্লকে চলে যাও তো। ডাঃ মার্টিন ভিজিটে এলেও ওদিকটায় যাবেন না”, বলে ওদের দিকে ফিরে বললেন, “মার্টিন যতক্ষণ আছে, আপনারা একটু গা ঢাকা দিয়ে থাকুন, বোঝেনই তো... লখন, এঁদের নিয়ে যাও।”

এতক্ষণ প্রিয়নাথ দেখেনি, প্রায় ছায়ার মতো দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কুচকুচে কালো এক যুবক। খালি গা। দেহে যেন মাংসপেশির ঢেউ উঠেছে। প্রিয়নাথ বুঝল এ যুবক অসীম শক্তি ধরে। এই তবে লখন! কিন্তু কোথায় যেতে হবে ওদের? অদ্ভুত এক শঙ্কা নিয়ে লখনের পিছু পিছু পা বাড়াল ওরা দুজন। আর ঠিক তখনই প্রিয়নাথ খেয়াল করল লখনের ডান হাতের কড়ে আঙুলটা নেই।


চার

লখন ওদের নিয়ে চলল অদ্ভুত এক গোলকধাঁধার মতো পথ দিয়ে। যত এগোতে লাগল মূত্র আর পুরীষের তীব্র গন্ধ নাকে এসে লাগল প্রিয়নাথদের। দুজনেই রুমাল দিয়ে নাক ঢাকল। তার মানে এদিকে সাধারণদের বাস। লম্বা বারান্দায় যেতে যেতে আচমকা এক প্রায় উলঙ্গ পুরুষকে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেখল তারা। লখনের মুখে একচিলতে হাসি। সে লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “কি হে কাঙালিচরণ, আজ আবার গড়াগড়ি দিচ্চ? ঝুড়ি থেকে পড়ে গেলে বুঝি?” কাঙালিচরণও নিতান্ত অসহায়ের মতো বললে, “কী করব ভাই, গড়িয়ে পড়েছি। কেউ উঠিয়ে না দিলে উঠতে পারছি না।” লখন তার দুই হাত ধরে টেনে ওঠাতে ওঠাতে বললে, “আজ তুমি কী হয়েছ?”

—আজ আবার কী হব? আমি তো আলু ছিলাম, আলুই থাকব। তাই তো গড়াগড়ি দিচ্চি।

—এই যে সেদিন বললে তুমি পটল!

—না, না, সে তো আমায় কেষ্টা ভুল বুঝিয়েছিল। আমি আসলে আলু। পটল হল ও নিজে।

কাঙালিকে ঘরে ঢুকিয়ে দিতে গেলে আর-এক মুশকিল। সে কিছুতেই ঢুকবে না। বারবার বলছে সে রোদে বসবে, সে তো সবজি, রোদ না পেলে বাঁচবে কীভাবে? অগত্যা লখন তাকে উঠিয়ে একপাশে বসিয়ে দিয়ে গেল। “রাতে আবার ঘরে নিয়ে যেয়ো ভাই, ঠান্ডা লাগলে শুকিয়ে যাব”, বললে কাঙালি। তাকে আশ্বস্ত করে পাশের ঘরের দিকে যেতেই তীব্র কণ্ঠের একটা চিৎকার শুনতে পেল তারা। লখন “এই রে আবার খেপেছে” বলে দ্রুত পা বাড়াল। পিছু পিছু প্রিয়নাথরাও সেই ঘরে ঢুকতেই বুঝতে পারল স্পেশাল আর জেনারেল ওয়ার্ডে তফাত ঠিক কোথায়। একটু আগে দেখে আসা সেই কোন রাজবাড়ির ছেলের ঘরটা এর তুলনায় রাজপ্রাসাদ মনে হচ্ছে। নিশ্চিতভাবেই এটা সেই কুখ্যাত ডি ব্লক। গোটা ঘরটা স্যাঁতসেঁতে, মেঝেতে জল জমে আছে, ছাদ বেয়ে কালো কালো ছত্রাক বাসা বেঁধেছে। দেওয়ালে নোনা ধরে পলেস্তারা খসে আসার জোগাড়। একটা খাট অবধি নেই। বস্তা আর জাজিম পেতে তাতেই রোগীদের শুইয়ে রাখা হয়েছে। এই ঘরে দুজনকে দেখতে পেল ওরা। একজন দরজার দিকে পিছন ফিরে শুয়ে আছে। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। আর-একজন, যার গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল ওরা, সে জাজিমে বসে দুর্বোধ্য জড়ানো গলায় কী যেন বলছে, লখন তার কাছে যেতেই সে জড়ানো গলাতেই বলল, “আজকে আমায় নিয়ে যাবে বলেছিলে? নিয়ে গেলে না তো?” লখন বললে, “যাব যাব, তাড়া কীসের? সময় হলেই নিয়ে যাব।”

—আমি সকাল থেকে তৈরি হয়ে বসে আছি, তোমরা কেউ আসছই না। কখন নেবে আমায়? নিয়ে চলো এক্ষুনি…

—এক্ষুনি তো নিয়ে যাওয়া যাবে না, সব জোগাড়যন্ত্র করে তবে নিয়ে যেতে হবে। মার্টিন সাহেব নিজে এসেছেন তদারক করতে…

রোগীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “সাহেব এসেছেন? তাহলে আজ হবে বলছ?”

—নিশ্চিতভাবে। সন্ধ্যা হোক।

—তাহলে আমাকে একটু বাইরে নিয়ে চলো। শেষবারের মতো একবার চারদিক দেখে নিই।

লখনের প্রিয়নাথদের ফেলে যাবার ইচ্ছে ছিল না। সে ইতস্তত করে প্রিয়নাথদের মুখের দিকে চাইল। প্রিয়নাথ একটু হাসার চেষ্টা করল। “তুমি এঁকে নিয়ে একটু ঘুরেই আস। আমরা এখানেই আছি। ইনি কি আজ ছাড়া পাবেন?”

হো হো করে হেসে উঠল লখন। “আপনি তাহলে কিছুই বোঝেননি স্যার। এর ধারণা এ হল ফাঁসির আসামি। একে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে। রোজ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই অপেক্ষায় থাকে, কখন একে ফাঁসি দেওয়া হবে। জনে জনে জিজ্ঞাসা করে। এভাবে চলবে সন্ধ্যা অবধি। তারপর ঘুমিয়ে পড়বে।”

“কেউ এঁকে সত্যিটা বলে না?”

“বলে। আমিই বলতাম। বিশ্বাস করে না জানেন। মরার এক অদ্ভুত নেশা পেয়ে বসেছে ওকে। ভাবে মরলেই সব কষ্ট দূর হবে। লোকে বাঁচার স্বপ্ন দেখে ভালো থাকে, আর এ মরার স্বপ্ন দেখে। আগে শুধরে দিতাম। এখন আর দিই না। এই তো অবস্থা। থাক না এর মধ্যেই একটু ভালো যদি থাকতে পারে...”

লখনকে যত দেখছিল, অবাক হয়ে যাচ্ছিল প্রিয়নাথ। এ বড়ো সাধারণ ছেলে না। কথায় শিক্ষার ছাপ। বেশ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। এ ছেলে এখানে কী করছে? ভাবল জিজ্ঞাসা করবে, কিন্তু তার আগেই “আপনারা একটু অপেক্ষা করুন এখানে, আমি এঁকে বাইরে থেকে ঘুরিয়ে আনি। কোথাও বেরোবেন না। মার্টিন সাহেব দেখলে অনর্থ হবে”, বলে লখন সেই পাগলকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। সাইগারসন এতক্ষণ চুপ ছিলেন। খুব সম্ভব বোঝার চেষ্টা করছিলেন কী কথাবার্তা চলছে। এবার সুযোগ পেয়ে প্রিয়নাথ তাঁকে গোটাটা খুলে বললে।

“আপনারা এখানে এসেছেন কেন? এই নরকে? চলে যান... এখুনি চলে যান... নইলে বড্ড বিপদ...” গম্ভীর গলায় এই কথাগুলো শুনে দুজনেই একসঙ্গে তাকাল ঘরের একেবারে কোনার দেওয়ালের দিকে। পিছন ফিরে শুয়ে থাকা রোগী এবার তাদের দিকে ফিরেছে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে। চোখের পলক পড়ছে না।

এমনটা যে হতে পারে দুজনের কেউই ভাবেনি। সাইগারসন প্রথম সংবিৎ ফিরে পেলেন। প্রিয়নাথকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বলছে?” প্রিয়নাথ ইংরাজিতে বলতেই সাইগারসন নির্দেশ দিলেন, “পাগলের কথাকে হালকা ভাবে নেবেন না। কেন এমন বলছে সেটাও জানতে চান।”

—আপনি এ কথা বলছেন কেন? —প্রিয়নাথ জিজ্ঞাসা করল।

—তা বলব না? এ বড়ো পাপের জায়গা। বড়ো পাপ এখানে… বড়ো পাপ… বড়ো পাপ… বড়ো পাপ… এখানে পাপ ঢুকেছে। অশুভ আত্মার ভর হয়েছে। সেই আত্মারা এসে আমাদের রক্ত চুষে খায়। ছিবড়ে বানিয়ে দেয়।

—কী বলছেন আপনি? কোন আত্মা?

—আপনারা জানেন না? এই ধলন্দরের মাঠে এককালে ঠগিরা কত মানুষের দেহ পুঁতে দিয়েছে। গভীর রাতে সেসব আত্মারা জেগে ওঠে। তখন তারা খুঁজতে বেরোয়...

—কাদের?

—পাপীদের। সেই মানুষের পাপ খেয়ে ওরা বেঁচে ওঠে। তারপর একসময় মানুষটাকেই খেয়ে নেয়। গোটা। শব্দ ওঠে... চপ চপ চপ… আমি সে শব্দ পেয়েছি...

—কাকে খেয়েছে ওঁরা?

—কেন, লালু মণ্ডলকে? এই ঘরেই থাকত। ওই যে, ওইদিকে। প্রথম যখন আনল, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হত। সারারাত ছটফট করত। তারপর মাটির নিচের আত্মারা ওকে ধরল। ধীরে ধীরে চারিয়ে বসল ওর মাথায়, ওর শরীরে। কেমন একটা শান্ত হয়ে যেতে থাকল লালু। চুপচাপ। কথা বলত না। গালাগাল দিত না। চেহারাও কেমন একটা ফ্যাকাশেপানা হয়ে গেছিল। ভ্যাবলার মতো দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বসে থাকত। বসে বসেই বাহ্যি পেচ্ছাপ করত। এরকমই চলত। শুধু মাঝে মাঝে আত্মারা ভর করত ওর দেহে। তখন সারা শরীরে খিঁচুনি। মাথা ঠুকত দেওয়ালে। ওকে সেসময় শিকল বেঁধে, জ্যাকেট পরিয়ে রাখত। নিয়ে যেত ঝাড়াতে।

—কোথায়?

—তা আমি কী জানি? এদের ওঝা আছে, ঝেড়ে দেয়। তবে ভূতেরাও ছাড়ে না। শোধ নেয়…

—কীভাবে জানলেন?

—লালু দেখাত। আঁচড়ের দাগ। আত্মারা দেহ ছেড়ে দেবার আগে দাগ রেখে যায়। হাতে, বুকে… ঝাড়ানোর পর কিছুদিন একেবারে চুপচাপ থাকত লালু। তারপর একদিন রাতে আত্মারা এসে ওকে নিয়ে গেল।

—আপনি দেখেছিলেন?

—না। আমার রাতে ঘুম হয় না। সেদিন রাতে হয়েছিল। হতেই হবে। ওরা যখন আসে কাউকে জানায় না। আমার খুব আবছা মনে আছে। তিন-চারজন সাদা পোশাক পরা আত্মা এসেছিল। লালুকে নিয়ে গেল। তারপর চপ চপ চপ করে চিবিয়ে খেল… পরদিন ওদের বললাম... ওরা বলল লালু নাকি পালিয়েছে... আমি ভুল দেখেছি… স্বপ্ন দেখেছি…

—তা আপনি এখানে কেন?

—আমার পিছনে শল্ল ছেড়ে দিয়েছিল।

—সেটা কী?

—শল্ল জানেন না? মরা চণ্ডালের নাভি থেকে তৈরি হয়। অপদেবতা। শল্ল ভয়ানক খারাপ জিনিস। আপনার ভিটেমাটি উচ্ছেদ করবে। আমার এক জ্ঞাতি তারাপীঠের শ্মশান থেকে এই শল্ল জোগাড় করে গোপনে আমার ভিটাতে পুঁতে দিয়েছিল। যার বাড়িতে শল্ল ঢোকে, সেই বাড়ি নির্বংশ করে ছাড়ে। বউটা মরল, মেয়েটা মরল। লোকে আমায় এই নরকে ছেড়ে গেল। আমার মাথার মধ্যে এখনও শল্ল চলে বেড়ায়। আমি টের পাই…

—বউ আর মেয়ে মারা গেল কীভাবে?

—সে তো শল্লই মারল। আমার মাথায় বাসা বেঁধেছিল। আমার সঙ্গে কথা বলত। সে কথা আর কেউ শুনতে পেত না। আর সে কথা না মেনেও আপনার উপায় নেই। সারাদিন কানের কাছে ফিসফিস ফিসফিস… মনে হয় মাথাটা ফেটে যাবে... একরাতে শল্ল আমায় বলল, বউ আর বাচ্চাটাকে রেখেছিস কেন? শেষ করে দে… আমি অনেক বোঝালাম। হাতে পায়ে ধরলাম। শুনল না। কুড়োল দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে দিল। পুলিশ এল। আমি বললাম শল্ল মেরেছে। আমি মারিনি। বিশ্বাস করল না। এই নরকে নিয়ে এল।

—এখানে কেমন আছেন?

—ভালোই। এরা আমার কথা শুনেছে। বোঝে আমার মাথায় শল্ল বাসা বেঁধেছে, তাই দেখুন…

বলে ধীরে ধীরে মাথায় বাঁধা নোংরা ফেট্টিটা খোলা শুরু করল। খোলা হতেই প্রিয়নাথ আর সাইগারসন দুজনেই হাঁ হয়ে দেখল, লোকটার কপালের ঠিক ওপরে একটু ডানদিকে চুল অনেকটা জায়গা জুড়ে কামানো, আর সেখানে হাঁ করে রয়েছে গভীর কালো একটা গর্ত।

“এখান দিয়েই শল্লকে বার করে, বুঝলেন তো”, মাথার ফুটোর দিকে তর্জনী দেখিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল লোকটা…


পাঁচ

লালু মণ্ডল যে পালায়নি সেটা প্রিয়নাথেরও এবার মাথায় ঢুকেছে। তার চেয়েও বড়ো যে সমস্যা, ডালান্ডা হাউসে কিছু একটা চলছে। সেটা কী, ধরেও ধরা যাচ্ছে না। সাইগারসন সাহেব এ দেশে নতুন, ফলে ঘাঁতঘোঁত খুব বেশি জানা সম্ভব না। সেদিন একটু পরেই লখন ঘরে ঢুকে তাদের প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল, যেন তারা গোপন কিছু জেনে ফেলেছে। হাবেভাবে মনে হয় লখন কিছু জানে। বলবে না। পুলিশের পদাধিকারের জন্য অনেকে আবার প্রিয়নাথকেও চেনে। সবাই ডালান্ডা হাউসের কিপার না যে তাদের বর্ধমানের ছোটো কুমারের গল্প বলে বোকা বানানো যাবে। তবে একটা কিছু হয়েছে। সেদিন মার্টিন সাহেব আসার আগে কিপার বেশ ফুর্তিতেই ছিল, কিন্তু সাহেব চলে যাবার পর কিপার স্মিথের মুখ দেখেই বোঝা গেল ভয়ানক কোনও দুঃসংবাদ নিয়ে সাহেব এসেছেন বা কোনও কারণে তাকে চরম ধমক খেতে হয়েছে। প্রিয়নাথদের প্রায় পত্রপাঠ “পরে দেখব, এখন কিছু হবে না” বলে বিদায় করে দিল।

ফেরার পথে সেই পাগলের সব কথা সাইগারসনকে বলল প্রিয়নাথ। সাইগারসন বললেন, “এখন একটাই উপায়। এমন একজন বিশ্বস্ত দেশীয় লোক দরকার যে পুলিশের লোক না, তাকে কেউ সন্দেহ করবে না, কিন্তু সে আমাদের হয়ে কাজ করে দেবে। লন্ডন হলে চিন্তা ছিল না। আমার পরিচিত এমন বেশ কিছু লোক আছে… কিন্তু এ দেশে আপনিই ভালো বলতে পারবেন।”

মাথা নিচু করে খানিক ভাবল প্রিয়নাথ। শীতসন্ধ্যার কুয়াশা নেমে এসেছে চারিদিকে। ঠান্ডা বাড়ছে। অন্ধকারে ইতিউতি গ্যাসবাতির আলো। প্রিয়নাথের মনে পড়ছে সেই দিনের কথা, যেদিন এই সমস্ত কিছুর শুরু হয়েছিল। কে জানত একটা সামান্য এত্তেলা থেকে এইরকম এক অদ্ভুত রহস্যে জড়িয়ে পড়বে, যার কোথাও কোনও কূল কিনারা দেখা যাচ্ছে না!

দুজনেই হেঁটে চলেছে, কারও মুখে কোনও কথা নেই। সাইগারসনের মুখের ক্লে পাইপ থেকে ধোঁয়া উঠছে অবিরত। একটা প্ল্যান মাথায় আসছে, তবে মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু উপায়ও তো নেই। অনেক ভেবে শেষে প্রিয়নাথ বললে, “ক্রিক রোডে জন ড্রিসকল নামে এক প্রাইভেট ডিটেকটিভ আছেন। তবে বুড়ো হয়ে গেছেন। এখন আর কাজ করেন না। তাঁর এক চ্যালা, নাম তারিণীচরণ রায়, কিছুদিন হল ক্লাইভ স্ট্রিটে রে প্রাইভেট আই নামে ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলে বসেছে। ছোকরা চালাক চতুর, যদিও তেমন পসার নেই। তাকে তেমন কেউ চেনেও না। আপনি বলেন তো কথা বলে দেখতে পারি...”

“খুব ভালো প্রস্তাব। তবে কালই যাওয়া যাক।” উত্তেজনায় দুই হাতের তেলো ঘষতে লাগলেন সাইগারসন।


তারিণীর কথা


এক

ম্যাজিকের পরের দিন ঘুম থেকে উঠতে উঠতে দেরি হয়ে গেল তারিণীর। যা হল, তারপর ঘুমোনোও অসম্ভব। গণপতির অবাক করা খেলা আর তার ঠিক পরপর দুখানা মৃত্যু। কার্টার সাহেব নাকি মাথায় বন্দুকের গুলি করে আত্মহত্যা করেছেন। তারিণীর বড্ড ইচ্ছে করছিল একবার গ্রিনরুমে গিয়ে দেখার। কিন্তু ওকে ঢুকতে দেবে না। এখনও এ দেশে প্রাইভেট ডিটেকটিভের বড়ো একটা কদর নেই। বিলেতে নাকি পুলিশরা বিপদে পড়লেই প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে যায়। এখানে যে কবে সেসব হবে! শুধু একটা প্রশ্ন বারবার তারিণীর মাথায় চাড়া দিচ্ছে। কাল দর্শকদের সবাইকে যখন ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল, তারিণী বেরিয়েছে সবার পরে। যতটুকু বোঝা যায় বুঝতে চেয়েছে, উইংসের ভিতরে কী চলছে। মঞ্চের মাঝখানে একা বসে আছে তৈমুরের পুতুল। মঞ্চের মাঝে না, একেবারে পিছনের পর্দার গায়ে ঠেলে দিয়েছে কেউ বা কারা। কিন্তু ম্যাজিকের সময় তো পুতুল স্টেজের প্রায় মাঝেই ছিল! নাকি তারিণী ভুল ভাবছে? গণপতির সঙ্গে কথা বলে দেখতে হবে। গণপতি কাল রাতে আর আসেনি। বোধহয় ম্যাজিক ক্লাবেই গেছে। এ ছাড়াও আরও কী একটা খটকার কথা কাল রাতে মাথায় এসেছিল। কোন একটা হিসেব মিলছে না। তখন হালকা তন্দ্রা এসেছে। সকালে উঠে তারিণী দেখল সে বেমালুম ভুলে গেছে সেই খটকার কথা। শুধু মনে আছে যখন টমসন সাহেব ম্যাজিকের সব সহযোগীদের ডাকলেন, কাউকে একটা খুঁজছিল সে। খুঁজে পায়নি।

টেবিলের ওপর এক বান্ডিল চিঠি পড়ে আছে। বেশিরভাগই অকাজের। নানা পেটেন্ট ওষুধের বিজ্ঞাপন। বটকৃষ্ণ পাল অ্যান্ড কোম্পানির। ম্যালেরিয়া জ্বরের যম জারমোলিন, পেট খারাপের কুমারেশ... এসব দেখতে দেখতেই এর মধ্যে বেশ মোটা অ্যান্টিক কাগজে ছাপা চিঠি চোখে পড়ল। খাম দেখেই চমকে গেল তারিণী। এই সময় তার কাছে এই চিঠি! চিঠির খামে শুধু তারিণীর নাম আর অফিসের ঠিকানা লেখা। প্রেরকের নাম নেই। দরকারও নেই। এই হালকা হলুদ চিঠির কাগজ তার চেনা। আগে একবার পেয়েছে। এ ডাক উপেক্ষা করা যাবে না। ভোঁতা ছুরি দিয়ে খামটা খুলে ফেলল তারিণী। ভিতরে আর-একটা মোটা কাগজ। তাতে শুধু লেখা, “২৮ ডিসেম্বর, ১৮৯২, রাত ৯টা। হেডকোয়ার্টার।” ব্যস! আর কিচ্ছু না। নিচে শুধু লাল কালিতে একটা চিহ্ন ছাপা। একটা কম্পাস আর একটা স্কোয়ার অনেকটা ইংরাজি A অক্ষরের মতো রাখা। মাঝে লেখা G। তারিণী জানে এই G-এর দুটো মানে, গড আর জিওমেট্রি। তারিণী এটাও জানে এই ডাক কোথা থেকে এসেছে। কিন্তু এই অসময়ে? যাই হোক, হাতে সময় আছে এখনও।

দুপুরে খেয়েদেয়ে টানা একটা ঘুম দিল তারিণী। মাথা ধরে আছে। যদি ঘুম দিলে সারে। যখন উঠল তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে প্রায়। তারিণী রাস্তায় বেরোয়। এক কোনায় দাঁড়িয়ে এক ছোকরা বসে বাদাম ভাজা আর পাঁঠার ঘুগনি ফিরি করছে। দু পয়সার ঘুগনি কিনে মুখে দিতে যাবে, ঠিক তখনই রাস্তার উলটো দিকে তারিণী লোকটাকে দেখল। প্রথমে তেমন খেয়াল করেনি। কিন্তু দ্বিতীয়বার দেখায় প্রচণ্ড চেনা চেনা লাগল। গায়ের রং ফর্সা, বেঁটে, গাঁট্টাগোঁট্টা, পেতে আঁচড়ানো চুল, দাড়ি গোঁফ কামানো, কিন্তু দুই ধূর্ত চোখ আগে কোথাও দেখেছে তারিণী। তারিণীর এই এক গুণ। কাউকে একবার দেখলে ভোলে না, সে যত আগেই হোক। এরও কারণ আছে, ড্রিসকল সাহেব তাকে শিখিয়েছিলেন মানুষকে চিনতে হয় তার চোখ দিয়ে। যতই ছদ্মবেশ ধারণ করুক আর অভিনয় করুক, মানুষ তার চোখ বদলাতে পারে না। থামের আড়াল থেকে ভালো করে নজর করল তারিণী। লোকটা একটা গ্যাসবাতির নিচে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক চাইছে, যেন কাউকে খুঁজছে। তারপর না পেয়ে কোমরের গেঁজে থেকে কী একটা বার করে আবার ঢোকাল। একটু বাদেই রাস্তার উলটো দিক থেকে এগিয়ে এল এক তরুণ। একে চেহারার দিক থেকে আগের জনের একেবারে বিপরীত বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না। লম্বা গাঁট্টাগোঁট্টা চেহারা, কুচকুচে কালো গায়ের রং। তাকে দেখে আগের লোকটা যেন খেপেই গেল। কী কথা হচ্ছিল তা উলটো দিক থেকে তারিণীর বোঝা সম্ভব না। তবে বেঁটে লোকটা রেগে যাচ্ছিল আর লম্বা ছেলেটি হাসিমুখে তাকে শান্ত করছিল। বেঁটে লোকটা গেঁজে খুলে কিছু দেখাতে গেল। ছেলেটা বাধা দিল। এবার ছেলেটা নিজের ফতুয়ার পকেট থেকে কিছু টাকা নিয়ে লোকটার হাতে গুঁজে দিতে গেল। লোকটা কিছুতেই নেবে না। হাবেভাবে তারিণী বুঝল সে সন্তুষ্ট না। আরও চায়। ছেলেটা তিন-চারবার তার গায়ে হাত দিয়ে বোঝাতে যাচ্ছিল। লোকটা প্রতিবারই হাত ছিটকে ফেলে দিচ্ছিল। লোকটা কিছু একটা দাবি করছে। এবার ছেলেটা মাথা নাড়ছে। সম্ভব না। লোকটা তবু চাপাচাপি করতে থাকল। শেষে ছেলেটা কিছু বলায় লোকটা একটু শান্ত হল। দুজনে মিলে একসঙ্গে কোথাও একটা রওনা দিল। তারিণীও ঘুগনির পাতা ফেলে দ্রুত পায়ে ওদের পিছু নিল। বেঁটে লোকটাকে চেনা চেনা লাগছিল, হাঁটা শুরু করতেই সে নিশ্চিত হল। চোখ দেখে কিছুটা চিনেছিল। হাঁটা দেখে আর কোনও সংশয় রইল না। রাখহরি। কাল রাতে একেই খুঁজছিল তারিণী। কিন্তু রাখহরির সঙ্গে এই ছেলেটা কে? আর রাখহরিই বা এখানে কী করছে?

বেশ দূরত্ব রেখে তারিণী দুজনের পিছু নিল। রাখহরি তখনও উত্তেজিত। বারবার হাত নেড়ে নেড়ে কী সব বলছে, আর ছেলেটাও তাকে বোঝাচ্ছে। এই গলি সেই গলি করতে করতে হঠাৎ তারিণী আবিষ্কার করল যে এমন জায়গায় চলে এসেছে, যেখানে তার আসা উচিত না। শোভাবাজার স্ট্রিট। এই রাস্তা পশ্চিমে গঙ্গার ঘাট অবধি চলে গেছে। এ রাস্তায় বাঁ হাতেই বিখ্যাত ঔষধবিক্রেতা বটকৃষ্ণ পালের তিনতলা অট্টালিকা। সেখান থেকে একটু এগিয়ে মোড় ঘোরার আগেই সুর পরিবারের নবরত্ন মন্দির। এ সব পেরিয়ে এগিয়ে গেল ওরা। পিছনে তারিণী। এবার বাঁ হাতে ঘুরলেই কুখ্যাত সোনাগাজি পিরের গলি; দূরে পির সাহেবের মাজারটা দেখা যাচ্ছে। ঠেসাঠেসি সব বাড়ি। একধারে একতলার খোলার ঘর, সামনে আবর্জনা। তারই পাশে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মহিলা। চাকর, মুটে, ছোটোলোকরা এদের রূপের উপাসক। এদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এদেরই একজন তারিণীর হাত টেনে ধরে বললে, “কি রে বাবু, আয় না... খুশি করে দেব। বেশি পয়সা লাগবে না…” তারিণী হাত ছাড়াতে গেল। ওরা অনেকটা এগিয়ে গেছে। “আয় না বাবু, তিনদিন খেতে পাই না…” হাত ছাড়িয়ে কোনওমতে এগিয়ে গেল তারিণী।

ওরা এখন চলেছে কোঠাবাড়িগুলোর দিকে। এদিকটা অপেক্ষাকৃত উঁচু দরের। এখানে দালাল আর ফড়েদের ভিড়। দোতলা বা তেতলায় বেশ্যারা থাকে। কারও কারও বাঁধা বাবু আছে। তারা ভাগ্যবান। বাকিরা ছুটো। সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ হল। তারিণী পা চালিয়ে একটু কাছে এল ওদের। বেশি দূরে থাকলে হারিয়ে যাবার ভয়। কাছে আসায় দু-একটা কথাও আবছা শুনতে পাচ্ছে সে। রাখহরি বলল, “ওসব বুঝি না। আমার পাওনা আমি চাই, নইলে কাউকে মানব না, সব বলে দেব…।” ছেলেটা একবার বলল, “আগে গোলাপের কাছে তো চলো, আজ রাতে ফুর্তি করো। বাকিটা আমি দেখছি।” আবার ফতুয়ার পকেট থেকে কিছু টাকা রাখহরিকে দিল ছেলেটা। তারিণী দেখল ছেলেটার ডান হাতে চারটে আঙুল। কড়ে আঙুলটা নেই।

এবার আর রাখহরি মানা করল না। দুজনে একটা বড়ো দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। উপর থেকে গান শোনা যাচ্ছে—

“বাঁকা সিতে ছড়ি হাতে বাবু এসেছে।

হেসে কাছে বসেছে।।

কামিজ আঁটা সোনার বোতাম,

চেনের কী বাহার,

রুমালে উড়ছে লেভেনডার,

গলায় বেলের কুঁড়ির হার,

গলা ধরে সোহাগ করে, নইলে কি মন রসেছে?”

“এই রে”, বলে উঠল ছেলেটা। “কপাল খারাপ হে, গোলাপের বাঁধা বাবু আজ এসেছে। আজ তো আসার দিন না, তবু এল কেন? যাই হোক, চিন্তা নেই, ওদিকে চলো, দেখি অন্য কোথাও কিছু হয় নাকি”, বলে আর-একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়ির সামনেটা অন্ধকার। একেবারে নিস্তব্ধ। বোঝাই যাচ্ছে ভিতরে কোনও বাবু নেই। তারিণী একটু দূরত্ব রেখে একটা পানের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। রাস্তায় লোকজন গাড়িঘোড়া বাড়ছে। সব কথা শোনা যাচ্ছে না। খুব সাবধানে এবার সে রাস্তা পেরিয়ে প্রায় ওদের পাশে চলে এল। ঝুঁকি আছে, তবু উপায় নেই। রাখহরিকে যখন পেয়েছে, ছাড়া যাবে না। যা শোনা গেল তাতে বুঝল দরদস্তুর চলছে।

ছেলেটা বলল, “কি গো, লোক বসাবে?”

অন্ধকার থেকে শোনা গেল, “লোক কে? তুম না ইয়ে ড্যাকরা?”

শুনেই রাখহরি খেপে গেল। ছেলেটি তাকে শান্ত হতে বলে বলল, “আমি না। আমার এই বন্ধু। দর কত?”

“কিতনে সময় কে লিয়ে?”

“সারা রাত।”

“ছে টাকা পড়বে।”

“চার টাকায় হবে তো বলো। নইলে চললাম।”

“হোবে, কিন্তু দারুখচ্চা অলগ।”

“সে নাহয় আরও এক টাকা দিয়ে দেব…”

তারিণী অবাক হয়ে গেল। আগে তার কোনও ধারণাই ছিল না, এমন দরদস্তুর খোলা রাস্তায় এভাবে জোরে জোরে হতে পারে...। বেশ্যাটা রাজি হল। অবাঙালি মেয়ে বোঝাই যাচ্ছে। বেঁকে বসল রাখহরি। সে মুখ না দেখে ঘরে ঢুকবে না। অগত্যা ছেলেটা পকেট থেকে একটা দেশলাই বার করে ঠুকে জ্বালিয়ে মেয়েটার মুখের সামনে ধরল। ওইটুকু আলোতে যা বোঝা গেল তাতে তারিণীও বুঝল এ অপরূপা সুন্দরী। রাখহরি খুশি। তবু বলল, “এই পাঁচ টাকা কে দেবে?”

“ও তোমায় ভাবতে হবে না। আমি তোমায় এনেছি যখন, আমিই দেব। তুমি ফুর্তি করো।”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। আজ ছেড়ে দিলুম। কিন্তু কাল তুমি আমায় ওখানে নিয়ে যাবে। নইলে অনত্থ বাধাব এই বলে দিলুম।”

ভিতর থেকে কেউ একটা এসে রাখহরিকে নিয়ে উপরে উঠে গেল। মেয়েটা ঘরে ঢুকে দরজা দেবার আগে সেই কালো ছেলেটা ওকে ডাকল। তারপর একেবারে ফিসফিস করে বলল, “এখন এই একশো টাকা রাখো, কাজ শেষ হলে আরও পঞ্চাশ; যেমন বলেছিলাম।”

তারিণী পরিষ্কার বুঝল, কিছু গণ্ডগোল আছে। এখন তার কাছে দুটো রাস্তা, এই ছেলেটার পিছু নেওয়া, অথবা অপেক্ষা করা, যতক্ষণ না রাখহরি বেরোয়। ভেবেচিন্তে সে থেকে যাবার সিদ্ধান্তই নিল। বাড়ির বাঁদিকে একটা অন্ধকার গলিতে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে। কতক্ষণ তা বলা মুশকিল। কুয়াশা নেমে আসছে রাস্তা জুড়ে। ঠিক এমন সময় টুংটাং আওয়াজে এসে দাঁড়াল একটা ঘোড়ার গাড়ি। বাড়িটার সামনে। উঁকি মেরে দেখল তারিণী। বাড়ির দরজা খুলে গেল। তিনজন ষণ্ডা প্রকৃতির জোয়ান একজনকে পাঁজাকোলা করে গাড়িতে তুলে দিল। লোকটা অসাড় হয়ে আছে। অন্ধকারে চিনতে না পারলেও তারিণী যেন বুঝতে পারল, এ রাখহরি ছাড়া আর কেউ না। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে? কিছু বোঝার আগেই গাড়ির গাড়োয়ান ঘোড়ার পিঠে মারল এক চাবুকের বাড়ি। তারিণী গলি থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছে। এবার সে স্পষ্ট দেখল গাড়িটাকে। ছ্যাকড়া না, ঘোড়ায় টানা ময়লা ফেলার গাড়ি। এই গাড়িগুলোই ময়লা বয়ে নিয়ে যায় ময়লাবাহী রেলগাড়িতে। সেখান থেকে ধাপা। তবে কোনও দিন কোনও জ্যান্ত মানুষকে এই গাড়িতে চাপতে দেখেনি তারিণী। গাড়ি ধীর গতিতে গলির বাঁক ঘুরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

দুই

সেই রাতে বাড়ি ফিরে ঘুম এল না তারিণীর। বুঝল বিরাট কোনও একটা ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু সেটা ঠিক কী, তারিণীর মগজে ঢুকছে না। একবার ভাবল কী দরকার এইসব ঝামেলায় জড়িয়ে, পরক্ষণেই তার প্রাইভেট ডিটেকটিভ সত্তা তাকে ক্রমাগত খুঁচিয়ে যেতে থাকল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তারিণী গত কয়েকদিনের ঘটনাগুলোকে ভাবছিল, যদি কোনও সূত্র মেলে। চিনা পাড়ায় এক ইউরোপিয়ান খুন হল। পুলিশে সেই খবর দিল গণপতি। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল আর ছেড়ে দিল। মৃত্যুটা অদ্ভুত। গোটা দেহ থেকে কেউ যেন রক্ত শুষে নিয়েছে, পেট চেরা আর সবচেয়ে বড়ো কথা অণ্ডকোশ কাটা। মৃতের বুকে অদ্ভুত চৈনিক চিহ্ন। সেই চিহ্ন আবার কার্টারের ম্যাজিক শো-র বিজ্ঞাপনেও। বারবার এই অদ্ভুত চিহ্নরা ফিরে ফিরে আসছে কেন? গণপতির থেকে শুনেছে এদের নাম নাকি ই-চিং। চিনাদের গোপন চিহ্ন। সে চিহ্ন এখানে কী করছে? এরা কি কোনও সংকেত? কাউকে কোনও বার্তা দিতে চাইছে কেউ?

তারপর সেই অভিশপ্ত দিন। ম্যাজিক দেখাতে গিয়ে দুজন জাদুকর একসঙ্গে মারা গেলেন। দুটোই দুর্ঘটনা? প্রথম ক্ষেত্রে কার্টার বলেছিলেন চিন-সু-লিনের দেহ বায়ুভূত হয়েছে কিন্তু ঠিকঠাক দেহ পায়নি, তাই এমন হয়েছে। কিন্তু যদি তাই হয়, লিনের গলায় কার আঙুলের দাগ? কার্টার কেন আত্মহত্যা করলেন? রাখহরি শো শেষে কোথায় গেল? আজকে সে এত অস্থির ছিল কেন? কারও সঙ্গে দেখা করতে চাইছিল। কালো ছেলেটাই বা কে? কিছু একটা বলে দেবার ভয় দেখাচ্ছিল রাখহরি। সেটা কী? ম্যাজিকের মধ্যে তৈমুরের পুতুল মাঝখান থেকে মঞ্চের একধারে চলে গেল কেমন করে? এই তিনটে মৃত্যু কি আলাদা আলাদা? নাকি এক সূত্রে বাঁধা? আর-একজনকে খুব মন দিয়ে দেখেছে তারিণী। সেই সাইগারসন নামের লোকটা। তার চোখ যেন সর্বদাই কী একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। উইংসের ধারে লোকটার অস্থির নড়াচড়া দেখতে পেয়েছে। কার্টারকে মঞ্চ থেকে নিয়েও গেছিল সেই সাহেব। কে ও? সংজ্ঞাহীন রাখহরিকে ময়লার গাড়ি চাপিয়ে কোথায় নিয়ে গেল? রাখহরি সংজ্ঞাহীন, না মৃত?

ভাবতে ভাবতে মাথা গরম হয়ে গেল তারিণীর। বাইরে ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটেছে। হাতমুখ ধুয়ে জলে ভেজানো ছোলা গুড় খেয়ে বাইরে বেরোল। ঠান্ডায় গোটা শহর জমে আছে। রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে। এক ভিস্তি মশক দিয়ে রাস্তা ধোয়াচ্ছে। পালকি বেহারা একজনকেও দেখা যাচ্ছে না। কী করবে ভেবে না পেয়ে সে সোজা রওনা দিল গণপতির আস্তানার দিকে। কাল সারাদিন দেখা হয়নি। কথা বলে যদি কিছু উপায় বার হয়। পথে এক ফিরিওয়ালা সকালের খবরের কাগজ বিক্রি করছিল। তারিণী একটা স্টেটসম্যান কিনে নিল। সেদিনের ঘটনার কোনও খবর পাওয়া যায় কি না। প্রথম পাতায় কোনও খবর নেই। যা আছে বিলেতের খবর। রানি কী বলেছেন, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ভারতকে নিয়ে কী ভাবছেন, মাঝের বেশ কিছু পাতাতেও অন্যান্য খবর। তারিণী যেটা খুঁজছিল, সেটা পেল বিজ্ঞাপনের পাতার এক ধারে। বিডন স্ট্রিটে রয়্যাল বেঙ্গল থিয়েটারে “নাট্য-বিকার” নামে এক হাসির নাটকের বিজ্ঞাপন। তার ঠিক ওপরেই আছে স্টার থিয়েটারে গিরিশ ঘোষের ‘বুদ্ধ’। এই বিজ্ঞাপনগুলোর ঠিক ডানদিকে ছোট্ট করে খবর। বাংলায় খবরটা এইরকম—

করিন্থিয়ান থিয়েটারে দুর্ঘটনা

নিজস্ব সংবাদদাতা: আপনারা সকলেই অবগত আছেন যে বিশ্ব প্রসিদ্ধ জাদুকর রবার্ট কার্টার বেশ কিছুকাল হইল কলিকাতায় তাঁহার অদ্ভুত জাদুবিদ্যা প্রদর্শন করিতে আসিয়াছিলেন। গত শনিবার, ১৭ ডিসেম্বর তারিখ করিন্থিয়ান থিয়েটারে এই শোয়ের অন্তিম দিনে দুইটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। ওইদিন জাদু প্রদর্শনকালে ‘ভারতীয় দড়ির জাদু’ দেখাইবার সময় জাদুকরের সামান্য ভুলে তাঁহার সহযোগী জাদুকর চিন-সু-লিনের মৃত্যু ঘটে। জাদুকর কার্টার এই শোক সহিতে না পারিয়া এবং এই দুর্ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী মনে করিয়া খানিক বাদেই নিজ মস্তকে পিস্তলের গুলি ক্ষেপণ করিয়া আত্মহত্যা করেন। বড়োলাট ল্যান্সডাউন এই জাদুর অনুষ্ঠানে স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানাইয়াছেন ঘটনাটি দুঃখজনক এবং ইহার সম্পূর্ণরূপে তদন্ত হইবে যাহাতে এইপ্রকার মৃত্যু আর না ঘটে। করিন্থিয়ান থিয়েটার পরবর্তী ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকিবে।

খবর দেখে কেমন দমে গেল তারিণী। কেউ যেন প্রবল প্রচেষ্টা চালাচ্ছে গোটা ব্যাপারটা ধামাচাপা দেবার। কিন্তু কে আর কেন? ভাবতে ভাবতে গণপতির ঘরের সামনে পৌঁছে গেল তারিণী। ঘর বলতে ম্যাজিক সার্কেলের অফিসেরই একটা ছোট্ট অংশ। তাতেই কোনওমতে মাথা গুঁজে থাকে গণপতি। দরজায় ঘা দিতে ভিতর থেকে কোনও আওয়াজ এল না। জোরে জোরে কড়া নাড়ল তারিণী। এবার জড়ানো গলায় উত্তর এল, “কে? কে এসেছিস?”

গণপতি নেশা করে আছে। গলার আওয়াজেই বুঝল তারিণী। গণপতির সব ভালো, এই মদের নেশাটা ছাড়া। অল্প বয়েসে বিবাগি হয়ে যাওয়া থেকে সুরা তার সঙ্গী। কোনও দিন নেশা করে মাতলামো করে না, কিন্তু নেশা করতে পারে অঢেল। তারিণী বহুবার বলেও কিছু করতে পারেনি। শুধু বলে, “এই কারণবারি সাক্ষাৎ মা কালীর প্রসাদ হে। এঁকে তুশ্চু করতে আছে? তুমিও নাও”, বলে তারিণীর হাতেও গেলাস ধরিয়ে দেয়। তারিণীর প্রবৃত্তি হয় না। “না হে, গোয়েন্দাদের এসব খেলে চলে না। বুদ্ধিতে মরচে পড়ে যায়”, বলে কাটিয়ে দিয়েছে কতবার।

আজকে সকাল সকাল গণপতি নেশা করেছে? না কালকের নেশার খোঁয়ারি কাটেনি এখনও?

“আমি তারিণী। দরজা খোলো”, বলার খানিক বাদেই গণপতি দরজা খুলল। তাকে দেখে চমকে গেল তারিণী। চোখ জবাফুলের মতো লাল। মুখ থেকে ভকভক করে দেশি মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। খালি গা। একটা ময়লা ধুতি কোনওক্রমে জড়ানো কোমরে।

“এ কী অবস্থা তোমার?” বলে ভিতরে ঢুকে তারিণীর চোখ কপালে উঠে গেল। মেঝেতে সারি সারি মদের বোতল সাজানো একের পর এক। প্রায় সবকটাই খালি। পাশে খাটের ওপর একতাড়া সাদা কাগজ আর তাতে কী সব আঁকিবুঁকি কাটা। পাশে একটা মোমবাতি জ্বলে জ্বলে প্রায় নিভে গেছে।

“গত দুইরাত ঘুমোইনি ভায়া।”

“কেন? কী হয়েছে?”

“কার্টারের জাদু আমায় ঘুমোতে দিচ্ছে না। যে জাদু আমার গুরু অবধি অসম্ভব বলেছেন, সেটা কার্টার দেখাল কীভাবে? সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে অবধি শান্তি পাচ্ছি না। চেষ্টা করছি ম্যাজিকটাকে ধরার। দিনরাত খাতায় নকশা বানাচ্ছি। কিন্তু ধরতে পারছি না। হাতে এসেও যে সুড়ুৎ করে পালিয়ে যাচ্ছে।”

“এতে কোনও তন্ত্র মন্ত্র নেই বলছ?”

“বিন্দুমাত্র না। কার্টার সবাইকে ফাঁকি দিতে পারবে। আমাকে না। সেদিন যে মন্ত্র পড়েছিল সেই রাখহরি, তার সঙ্গে ম্যাজিকের কোনও সম্পর্ক নেই। ও লোক ভোলানো মন্ত্র।”

“ভালো কথা, রাখহরি নিয়ে তোমায় একটা কথা জানাই”, বলে গতকালের গোটা ঘটনাটা বলল তারিণী। সে জানে যতই মদ খাক, গণপতি মাতাল হয় না, তার মাথা পরিষ্কার থাকে।

সব শুনে গম্ভীর হয়ে গেল গণপতি। “তুমি নিশ্চিত? ওটা রাখহরিই?”

“আমি মুখ দেখলে ভুলি না গণপতি। রাতারাতি দাড়িগোঁফ কামিয়েছে, কিংবা সেদিনেরটা নকলও হতে পারে। প্রথমে কিছুটা সন্দেহ হচ্ছিল, পরে হাঁটা দেখে নিশ্চিত হলাম ওটা রাখহরি।”

“তুমি আগে রাখহরিকে হাঁটতে দেখলে কখন?”

“কেন মঞ্চে! ও যখন সেই পর্দাঢাকা ঘরে ঢুকল। হাঁটার সময় রাখহরির ডান হাতটা স্থির থাকে, বাঁ হাতটা ক্রমাগত সামনে পিছনে দুলতে থাকে।”

“ঠিক বলেছ। কার্টারের দড়িতে কিছু সমস্যা ছিল। যখন আবার নিয়ে ফিরল, তখন আমিও দেখলাম। ডান হাত স্থির। বাঁ হাত দুলে যাচ্ছে।”

“হ্যাঁ, কিন্তু দড়ি নিয়ে যাবার সময় হাত দোলেনি কেন?” তারিণীর মাথায় চিন্তার ছাপ।

“মানে? কী বলতে চাইছ তুমি?”

“এখন আমার মনে পড়ছে। স্পষ্ট মনে পড়ছে। মন্তর পড়া হল। কার্টার দড়ি ছুড়তে গেলেন। দড়িতে কিছু সমস্যা হল। কার্টার সেই কাপড়ের ঘরে মুখ বাড়িয়ে রাখহরিকে ডাকলেন। রাখহরি ডান হাতে দড়ির বান্ডিল দিয়ে পিছন ফিরে ভিতরে ঢুকে গেল… না হে গণপতি। তখন তার বাঁ হাত কেন, কোনও হাতই দুলছিল না।”

“তুমি নিশ্চিত?”

“নিশ্চিত। মজার ব্যাপার, ও যখন দড়ি হাতে ফিরে এল তখন ওর বাঁ হাত আবার দুলছিল।”

“কী বলতে চাও তুমি?”

“একটাই সিদ্ধান্তে আসা যায় এ থেকে। যে গেছিল সে রাখহরি না, যে ফিরেছে সে রাখহরি। এখন আমার পরিষ্কার মনে পড়ছে দুজনের হাঁটার ধরন একেবারে আলাদা।”

“তাহলে বেরোল কে?”

“একটু ভেবে দ্যাখো গণপতি। চিন-সু-লিন আর রাখহরির মধ্যে তফাত কোথায়? দুজনেই ছিপছিপে, দুজনেই খাটো, দুজনেই চটপটে…”

“পোশাক পরিবর্তন”, চেঁচিয়ে উঠল গণপতি। “আমি কী গাধা! আমার নিজের ম্যাজিক আমি নিজে চিনতে পারলাম না। মঞ্চের মধ্যে পর্দাঢাকা ঘরে ঢুকে চিন-সু-লিন দ্রুত রাখহরির পোশাক পরে নেয়। গালে দাড়ি গোঁফ সহ, যাতে তাকে কেউ চিনতে না পারে। সে জানত মঞ্চের আলোতে পিছন ফিরে যাওয়া চিন-সু-লিনকে সবাই রাখহরিই ভাববে। আরও বড়ো কথা, এই দড়ির পালটানোটা যে ম্যাজিকের আসল ভাঁওতা, সেটা কেউ ভাবতেই পারবে না।”

“ঠিক তাই। এবার দড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল চিন-সু-লিন। ফেরত নিয়ে এল রাখহরি।”

“কিন্তু রাখহরি ভিতর থেকে বেরোল কোন পথে?”

“সেটা তো তুমি আমায় বলবে ভাই। শুধু আমি একটা জিনিস জানি, যে পথে তৈমুর মঞ্চে ঢুকেছে, সেই পথেই রাখহরি বেরিয়েছে।”

গণপতির চোখ গোল গোল হয়ে উঠল। এক লাফে খাটের ওপর উঠে হিজিবিজি কাটা কাগজগুলো নিয়ে এল। উত্তেজনায় তার গলার স্বর কাঁপছে, “আর... আর তুমি কী দেখেছ বলো তো ভাই?”

“ও হ্যাঁ। আর-একটা ঘটনা। সেই কাপড়ের পর্দা প্রথম যখন খসে পড়ল, তখন ধোঁয়ার মধ্যেই দেখলাম তৈমুরের পুতুল মঞ্চের মাঝে বসানো। কিন্তু যদি তাই হয়, চিন-সু-লিনের দেহ ছাদ ভেঙে ঠিক মাঝখানেই এসে পড়ল। পুতুল তখন অনেকটা পিছনে প্রায় পর্দার কাছে। অনেক ভেবেও বুঝিনি পুতুলটা অতটা সরে গেল কীভাবে?” বলতে বলতে আঁতকে উঠল তারিণী। গণপতি এতক্ষণ ভুরু কুঁচকে শুনছিল, আচমকা সে তার দুই শক্ত হাতে তারিণীকে জাপটে ধরেছে। তার মুখ দিয়ে বাংলা মদের গন্ধ আসছে ভকভক করে। তারিণীর গালে চকাস করে একটা চুমু খেয়ে গণপতি বললে, “হয়ে গেছে… হয়ে গেছে… কার্টারের জাদুর রহস্য সমাধান হয়ে গেছে”...

তিন

“সেদিন আমি যতক্ষণ মঞ্চে ছিলাম, খুব মন দিয়ে মঞ্চটা খেয়াল করেছি”, গণপতি বললে। “তোমার মনে থাকবে হয়তো, মঞ্চে ওঠার সময় আমি সামান্য হোঁচট খেয়েছিলাম।”

“হ্যাঁ। অনেকে হেসেও উঠেছিল। আমি তো ভাবলাম তুমি ঘাবড়ে গেছ।”

“ঘাবড়ে যাইনি। আসল স্টেজ আর নকল স্টেজের মাঝে বুটজুতো ঢুকে গেছিল।”

“নকল স্টেজ?”

“করিন্থিয়ান থিয়েটারের স্টেজ কাঠের তৈরি। মজবুত কাঠের। কিন্তু কাল স্টেজে উঠে আমি পরিষ্কার বুঝেছি এই স্টেজ সদ্য বানানো। তাও হালকা নরম কাঠের। ঠিক যে কাঠ দিয়ে ওপরের ছাউনি বানানো হয়েছিল। আর...”

“বুঝেছি, যা ভেঙে পড়ে চিন-সু-লিন মারা যায়।”

“ঠিক তাই।”

“কিন্তু আসল মঞ্চের ওপর আবার একটা স্টেজ বানাতে হল কেন?”

“ম্যাজিকে ততটাই দর্শক দেখেন, যতটা তাঁকে ম্যাজিশিয়ান দেখাতে চান। গোটা ম্যাজিকে সব বেরোনো বা ঢোকা হয়েছে পাশের উইংস দিয়ে। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে হবে মঞ্চে ঢোকার রাস্তা শুধু দুই পাশেই আছে। ঠিক এখানেই কার্টার বাজিটা মেরেছেন। আসল মঞ্চের ওপরে আরও একটা নকল মঞ্চ তৈরি করেছেন কাঠ দিয়ে, যার একটা অংশ খোলা বা বন্ধ করা যায়। মঞ্চের নিচ থেকে কোনও জিনিস ওপরে ওঠানো অথবা নিচে নামানো যাবে সেই দরজা দিয়েই। তাই ম্যাজিকের মঞ্চের সেই লাল পর্দার ঘরের পর্দা খসে পড়লে যখন তৈমুরকে দেখা গেল, তখন সবাই অবাক হলেও আমি হইনি। কারণ বুঝেছিলাম নিচে কোনও গোপন দরজা দিয়ে পুতুলটাকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে একটা ঘটনার হিসেব কিছুতেই মিলছিল না। তৈমুরের ম্যাজিক তো প্রথমেই হয়ে গেছে। আবার একই ম্যাজিক, একই প্রপস মঞ্চে আনার কারণ কী? কোনও ভালো জাদুকর এক মঞ্চে এক ম্যাজিক দুবার দেখায় না। কিন্তু ভেবে দ্যাখো সেদিন কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা তৈমুরকে দুবার দেখেছি, যেখানে দ্বিতীয়বার না দেখা গেলেও চলত।”

“হ্যাঁ, রোপ ট্রিকে তো তৈমুরের কোনও ভূমিকাই নেই! তাও সে ছিল কেন?”

“ঠিক এই প্রশ্নটাই গত দুদিন ধরে নিজেকে করছি ভাই। উত্তর পাচ্ছিলাম না। তুমি এসে আমার চোখ খুলে দিলে।”

“কিছুই বুঝতে পারছি না। শুরু থেকে বলো।”

“রোপ ট্রিকের ঠিক আগে মঞ্চে যে লাল পর্দার ঘরটা বানানো হয়েছিল, সেটার নিচেই ছিল গোপন দরজাটা। কার্টার প্রথমে বুকনি শুরু করে। তারপর রাখহরি আর চিন-সু-লিন, যারা অনেকটা চেহারাগতভাবে এক, ভিতরে ঢুকে যায়। কার্টার এবার দড়ি পালটানোর নামে রাখহরিকে ডাকে। কিন্তু ভিতরে ততক্ষণে পোশাক বদলে বেরিয়ে এসেছে চিন-সু-লিন। সে দড়ি নিয়ে উইংসের ভিতরে চলে যায়। ঠিক একই সময় নিচ থেকে তৈমুরের পুতুল তুলে দেওয়া হয়, আর সেই পথেই নিচে নেমে যায় রাখহরি। এটা আমি বুঝতে পারিনি, তোমার কথায় মাথায় এল।”

“মানে সেসময় মঞ্চে মাত্র দুইজন? কার্টার আর তৈমুর?”

“না না, আর-একজন ছিলেন। পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেল, যাঁকে শুরুতেই কার্টার বেশ দূরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি এই বদলটা না বুঝতে পারেন। যাই হোক, রাখহরি সোজা দৌড়ে চলে এল ডানদিকের উইংসে। চিন-সু-লিন ওখানেই দড়িটা রেখে গেছিল। সেটা নিয়েই রাখহরি মঞ্চে এল, কার্টারকে দড়ি ছুড়ে দিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল। ভেবে দ্যাখো তারিণী, কী দারুণ প্ল্যান। এবার চিন-সু-লিন পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাবে, আর ঘুরে এসে সদর দরজা খুলে ঢুকবে। সবাই ভাববে সে ভ্যানিশ হয়ে আবার দেহ ধারণ করেছে। একেবারে নিখুঁত। এমনকি পুলিশের বড়কর্তা হাতের ছাপ পরীক্ষা করেও কিছু করতে পারবেন না, কারণ মানুষ তো বদলাচ্ছে না।”

“তাহলে দড়ি সোজা দাঁড়াল কীভাবে? বেয়ে ওপরে উঠল কে? রাখহরি?”

“দড়ি বেয়ে কেউ ওঠেনি তো!”

“মানে? কী বলতে চাও?

“তোমাকে একটা গল্প বলি। সেটা শোনো আগে। আমার গুরুদেবের থেকে শোনা। একবার এক কারাগারে একজন অপরাধীকে বেঁধে রাখা হয়। জানালার ছিদ্র এত ছোটো যে তা দিয়ে গলে বেরোনো অসম্ভব। অপরাধী জানতেন তাঁর সঙ্গীরা নিচেই আছে। বিছানার চাদর ছিঁড়ে, পাকিয়ে তিনি দড়িও বানালেন। কিন্তু সে দড়ি নিচ অবধি বয়ে নিয়ে যাবে কে? একটা পুরুষ্টু দেখে গুবরে পোকা ধরে সেটাকে সরু সুতো দিয়ে বাঁধলেন। সরু সুতোর শেষে ছিল তাঁর দড়ি। পোকার মাথার কাছে একটু খাবার লাগিয়ে দিলেন। পোকা গন্ধে ভাবল খাবার সামনেই আছে। এই ভেবে গুড়গুড় করে দড়ি বয়ে নিয়ে সে কারাগারের নিচে চলে এল। কার্টার সেই কায়দাটাই করেছেন।”

“কিচ্ছু বুঝলাম না…”

“কার্টার একটা ধাপ্পা দিয়েছেন। মঞ্চের ওপরে আড়াআড়ি কালো শক্ত সুতো টাঙানো ছিল। খালি চোখে দেখা অসম্ভব। কার্টারের সাদা পাকানো দড়ির ডগাতেও একইরকম সরু কালো সুতো ছিল। তার ডগায় আবার একটা হুক জাতীয় কিছু। কার্টার মন্ত্র পড়ে দড়ি ছোড়ার নাম করে হাতের দড়িটা শুধু সেই টাঙানো কালো সুতো টপকে দেন। দড়ির সামনে হুকসহ কালো সুতো গিয়ে পড়ল লাল পর্দাওয়ালা ঘরে। যে ঘরে দাঁড়িয়ে আছে রাখহরি। রাখহরি সেই কালো সুতোর ডগা ধরে ধীরে ধীরে টানতে থাকে। দর্শক দেখতে পায় দড়ি সাপের মতো দুলছে। দড়ি টেনে একেবারে ওপরের সুতো অবধি নিয়ে এপারে সেটাকে কিছুর সঙ্গে বেঁধে দেয় রাখহরি। হয়তো তৈমুরের হাতের সঙ্গেই। ব্যস! হয়ে গেল ম্যাজিক!”

“কোথায় হল? দড়ি বেয়ে উঠল কে?”

“ও হরি, এটাও বোঝোনি? দড়ি বেয়ে ওঠার আগে কার্টার বাঁদিকের পকেট থেকে একটা বন্দুক বার করে ফাটালেন। ধোঁয়ায় ভরে গেল চারদিক। ওটা ব্ল্যাংক কার্টিজ। ওতে শুধু আওয়াজ আর ধোঁয়াই হয়। সেই ধোঁয়াতে সবাই দেখল কেউ একটা দড়ি বেয়ে উঠছে, তাই তো?”

“হ্যাঁ, দেখলাম তো।”

“কিন্তু নারকেল গাছ বা দড়ি বেয়ে মানুষ উঠতে তো তুমি দেখেছ। এই ওঠায় তোমার কিছু অস্বাভাবিক লাগেনি?”

“লাগেনি বলব না। চিন-সু-লিন, মানে যে-ই হোক না কেন, ঠিক যেন বেয়ে উঠছিল না। টিকটিকির মতো সরসর করে সোজা দড়ি বরাবর ভেসে উঠে যাচ্ছিল।”

“একদম ঠিক। যেন ভেসে ভেসে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছিল। যেতে যেতে এক জায়গায় থেমে গেল। তাই তো?”

“হ্যাঁ, তাই তো দেখলাম।”

“ঠিকই দেখেছ। কারণ কোনও মানুষ ওভাবে সরসরিয়ে দড়ি বেয়ে উঠতে পারে না। পারে একমাত্র হাওয়াভরা পুতুল। চিন-সু-লিনের মতো পোশাকপরা একটা হালকা হাওয়া-ভরা পুতুল রাখহরি বেঁধে দিয়েছিল দড়ির সঙ্গে। হাইড্রোজেন গ্যাস ভরা এমন পুতুল অনেক সাহেব ম্যাজিশিয়ান ব্যবহার করে থাকেন। তাই এত পলকা দড়ি বেয়ে উঠতেও পুতুলের কোনও অসুবিধাই হয়নি।”

“তারপর?”

“তারপর কার্টার ডান পকেট থেকে আর-একটা বন্দুক বার করলেন। এটা কিন্তু আসল বন্দুক। টোটা ভরা। সেই হাওয়া-ভরা বেলুন লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লেন। বেলুন ফেটে গেল। পোশাকআশাক সমেত ঝুপ করে মাঝে পড়ে গেল চিন-সু-লিনের পুতুল। পর্দা খুলে গেল। দেখা গেল মঞ্চে তৈমুর ছাড়া আর কেউ নেই।”

“রাখহরি গেল কোথায়?”

গণপতি এবার হেসে ফেলল, “তুমি কি এখনও বোঝোনি তৈমুরের ভিতরে মানুষ থাকে, যে ওকে চালায়? আমার ধারণা, অন্য সময় চিন-সু-লিন ভিতরে বসে থাকে। দাবার চালও দেয়। কিন্তু এক্ষেত্রে দড়িতে পুতুল বেঁধে দিয়েই রাখহরি তৈমুরের মধ্যে লুকিয়ে পড়েছিল। হাওয়া-ভরা পুতুলটাও সম্ভবত তৈমুরের ভিতরে করেই মঞ্চে আনা হয়েছে। বললাম না, এই ম্যাজিকে তৈমুরের ভূমিকা বড়ো সাধারণ না।”

“তারপর?”

“তারপরেই তো গণ্ডগোল শুরু হল। খেলা কার্টারের হাত থেকে বেরিয়ে গেল। অন্য কোনও বড়ো ম্যাজিশিয়ান কার্টারের ওপর এক দান নিলেন। কার্টার আশা করেছিলেন দরজা দিয়ে চিন-সু-লিন ঢুকবে। ঢুকল না। আমার যতদূর মনে হয় ম্যাজিকের শেষ অংশটা এইরকম হবার কথা ছিল... চিন-সু-লিন সদর দরজা দিয়ে ঢুকবে, মঞ্চ আবার ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে। দেখা যাবে তৈমুর নেই। কিন্তু সেজন্য রাখহরি সহ পুতুলটাকে এই গোপন ট্র্যাপডোরের ওপরে থাকতে হবে, যাতে দরজা খুললেই সেটা নিচে নেমে আসে। কার্টার সভয়ে খেয়াল করেন পুতুল ঠিক মাঝখানে রাখা। ট্র্যাপডোরের ওপরে নেই। তিনি শুরু করলেন মন্ত্র উচ্চারণ আর তৈমুরকে হাতের লাঠি দিয়ে ঠেলা, যাতে সে ঠিক জায়গায় চলে আসে… কিন্তু তারপরেই তো ছাদ ভেঙে নিচে এসে পড়ল চিন-সু-লিন। বাকিটা তো সবাই দেখেছে।”

“চিন-সু-লিন ছাদে গেল কী করে?”

“তাকে কেউ মেরে ওই পাটাতনে শুইয়ে রেখেছিল।”

“সে কে?”

“তা আমি কী করে বলব? পুলিশ বলতে পারবে।”

“তোমার কী মনে হয় গণপতি?”

“একটাই ব্যাপার বুঝতে পারছি, কার্টারকে কেউ ব্যবহার করেছে। চিন-সু-লিন-কে খুন করার দরকার ছিল। কিন্তু এমনভাবে, যাতে কারও সন্দেহ না হয়। কার্টার অজ্ঞাতে সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন।”

“কার্টার কিছু জানতেন না বলছ?”

“জানলে আর মনস্তাপে আত্মহত্যা করবেন কেন বলো? আমার কেন জানি না মনে হয়, জাদুকর কার্টার সূর্যতামসীর খেলায় মেতেছিলেন। নইলে এমন হবার কথা না। তোমায় বলিনি, সেদিন কিন্তু শুরু থেকেই আমার মন কু গাইছিল।”

“সূর্যতামসী কী?”

“এ এক ভয়ানক জাদুবিদ্যা। কালাজাদু। জাদুর জগতে এর নামও অনেকে মুখে আনে না। আমার গুরুর মুখে শোনা। ভারতীয় জাদু বড়ো সাধনার ধন। একে নিয়ে যা খুশি, যখন খুশি করা যায় না। সবার সামনে সব খেলা দেখানোও পাপ। আর যদি তা নিতান্ত করতেই হয়, তবে সূর্যতামসীর ব্রত নিয়ে খেলতে হয়। এ এক অদ্ভুত খেলা। বলা হয়, স্বয়ং শয়তান নাকি এই খেলা শেখান। শিখতে গেলে বাজি রাখতে হয় নিজের আত্মাকে। আত্মা বিকিয়ে দিতে পারলে শয়তান সব দেয়। খুব দ্রুত। যশ, খ্যাতি, ধন… সব। কিন্তু তার বদলে ধীরে ধীরে শয়তান খেলোয়াড়কে নিজের বশে নিয়ে আসবে। তখন শয়তান দিন বললে দিন, রাত বললে রাত। যা বলবে মানতেই হবে।”

“আর যদি কেউ তা না মানে?”

“তখন শয়তান তার আত্মাটাকে চুষে খেয়ে নেয়।”

চার

এক হপ্তার বেশি কেটে গেছে। কার্টারের কথা শহর ভুলে গেছে বোধহয়। এর মধ্যে বড়োদিন চলে গেছে। প্রতিবারের মতো এবারও ধুমধাম বড়ো কম হয়নি। ডালহৌসি আর চৌরঙ্গি অঞ্চলের প্রত্যেক সাহেব বাড়িই দেবদারু গাছের ডাল, ফুল লতাপাতা, রুপোলি ও নানা রঙের কাগজের চেন দিয়ে সাজানো হয়েছিল। চিনাবাজারের দোকান আর ইউরোপ শপগুলো আলোর মালায় সেজে উঠেছিল। সাহেব মেমরা ঘোড়ায় টানা বগি গাড়ি চেপে বেরিয়েছিলেন কেনাকাটা করতে। বড়োদিনের বড়ো দোকান হোয়াইটঅ্যাওয়ে লেডল আর হল অ্যান্ডারসন যেন স্বপ্নপুরী। তারিণী কিংবা গণপতির মতো লোকেদের সাহসই হয় না সেসব দোকানে ঢোকার। গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে নাকি বড়োদিন উপলক্ষ্যে বিদেশ থেকে নর্তকীরা এসেছিল। কলকাতার পাশাপাশি সুবে বাংলার বহু জায়গার রাজকর্মচারী ও সেনা কর্তারা এতে নিমন্ত্রিত ছিলেন। পরদিন পত্রিকাগুলো ফলাও করে তার বিবরণ ছেপেছিল।

নিজের ক্লাইভ স্ট্রিটের অফিসের চেয়ারে বসে বসে একগাদা পত্রিকা জোগাড় করে এইসবই পড়ছিল তারিণী। সেদিনের পর থেকে গণপতির সঙ্গেও আর দেখা হয়নি। ও নাকি বর্ধমানের দিকে কোথায় গেছে ম্যাজিক সার্কেলের সদস্যদের সঙ্গে খেলা দেখাতে। তারিণীর হাতেও কাজ নেই। কাল ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়েছে। হেডকোয়ার্টারে মিটিং ছিল। কার্টারের ম্যাজিক শো-র পরের দিনই চিঠি পেয়েছিল তারিণী। সে আহ্বান উপেক্ষা করা যাবে না।

তার চুঁচুড়া নিবাসকালে প্রায় না জেনেই এই ভ্রাতৃসংঘের সদস্য হয়েছিল তারিণী। এককালে এই চুঁচুড়া ছিল ওলন্দাজদের অধীনে। কিন্তু ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কিছু কর্মচারীর অসাধুতার জন্য রাজস্বের সব টাকা হল্যান্ডের রাজার কাছে পৌঁছোত না। তিনি বিরক্ত হয়ে ১৮২৪ সালে এক চুক্তির মাধ্যমে তাঁদের একশো আশি বছরের উপনিবেশ চুঁচুড়া ইংরেজদের দিয়ে বদলে ইংরেজদের থেকে সুমাত্রা দ্বীপের অধিকার নিয়ে নেন। সেই বছরই ৭ মে দুই ইংরেজ সাহেব বেলাই আর স্মিথ এসে চুঁচুড়ার অধিকার নিলেন। হল্যান্ডের পতাকা নেমে ইংল্যান্ডের ইউনিয়ান জ্যাক উঠল। চুঁচুড়া অধিকার করে ইংরেজরা প্রথমেই ১৬৯৭ সালে ওলন্দাজদের তৈরি গ্যাসটাভাস দুর্গ ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দিলেন। সেই দুর্গের কড়ি বরগা নিয়ে ১৮২৯ সালে ইংরেজদের ব্যারাক তৈরি হয়। এই ব্যারাক তৈরি করতে বহু ওলন্দাজ আর বাঙালি প্রজাদের উচ্ছেদ করা হল। তাঁরা তুমুল আন্দোলন করলেন, কিন্তু কোনও কাজ হল না।

ইংরেজদের এই দম্ভ আর প্রতিপত্তি মেনে নিতে পারলেন না চুঁচুড়াবাসী বহু ওলন্দাজ। তাঁরা খুব মিশুক প্রকৃতির ছিলেন। অনেকেই বাঙালি মহিলাদের বিয়ে করে, বাংলা ভাষায় কথা বলে প্রায় বাঙালি হয়ে গেছিলেন। তাঁরা এবং কিছু বাঙালি মিলে ফ্রি ম্যাসনদের একটি শাখা চুঁচুড়ায় স্থাপন করেন। তারিণীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, চুঁচুড়া বার্তাবহের সম্পাদক দীননাথ বাঁড়ুজ্জে তারিণীকে প্রায় জোর করেই এই দলের সদস্য করেন।

ঠিক এইখানে মধ্যযুগে স্থাপিত এই গোপন সমিতিকে নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। মধ্যযুগে ক্রুসেড শেষ হলে খ্রিস্টান নাইটদের বেশিরভাগ যুদ্ধের লুটের ধনে অত্যধিক সম্পদশালী হয়ে ওঠেন। এই সম্পদ এতটাই ছিল যে, একসময় তাঁরাই হয়ে ওঠেন গোটা ইউরোপের ব্যাংকার। ইউরোপ জুড়ে তাঁরা বানাতে থাকলেন একের পর এক দুর্গ, ভবন আর ক্যাথিড্রাল। আর সেসব বানাতে গিয়েই তাঁরা ম্যাসনদের সংস্পর্শে আসেন। ম্যাসন মানে গোদা বাংলায় রাজমিস্ত্রি। তাঁদের আবার একটা নিজস্ব গোষ্ঠী ছিল, যাঁরা নিজেদের বাইবেলে বলা সলোমনের মন্দিরের নির্মাতাদের বংশধর মনে করতেন। তাঁদের জ্যামিতির জ্ঞান ছিল অসামান্য আর এই জ্যামিতিক জ্ঞানকে তাঁরা ঈশ্বরের সমান বলে ভাবতেন। তাঁরা ছিলেন একেবারে স্বাধীন। গোটা ইউরোপে যেখানে খুশি তাঁরা যেতে পারতেন।

ম্যাসনরা নিজেদের মধ্যে ফ্রি ম্যাসন নামে এক গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। তাঁদের নিজস্ব করমর্দনের পদ্ধতি তৈরি হয়, যেটা শুধু সভ্যরাই জানবে। আগে ফ্রি ম্যাসনদের বাস ছিল কুটিরে, যাদের ‘লজ’ বলা হত। তাঁরা ছিলেন দরিদ্র কিন্তু জ্ঞানী। এঁদের সবার ওপরে ছিলেন মাস্টার ম্যাসন। তাঁর লজে বসে সবাই গণিত আর ঈশ্বরের নানা অজানা দিক নিয়ে আলোচনা করতেন। তাই তাঁদের দলের চিহ্নে থাকত একটা স্কোয়ার আর একটা কম্পাস— রাজমিস্ত্রির অপরিহার্য দুই সঙ্গী। মাঝে লেখা G, মানে গড, আবার জিওমেট্রি।

মধ্যযুগে নাইটদের সঙ্গে ম্যাসনদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অবস্থাটা বদলাতে থাকে তখন থেকেই। নাইটদের দেখাদেখি ম্যাসনরাও তাঁদের সভায় নানা গোপন আলোচনা, গোপন আচার অনুষ্ঠান করা শুরু করলেন। শুধু ঈশ্বরের আলোচনায় আবদ্ধ না থেকে গোপন ষড়যন্ত্র, নাইটদের গুপ্তধনের ভাগবাঁটোয়ারা বা তাঁদের হদিসও পাওয়া যেতে থাকল ম্যাসনদের সভায়। আর যেই না এইসব গোপন ব্যাপারস্যাপার ঢুকল, ম্যাসনরা প্রায় নিজের অজান্তেই গোপন সমিতিতে পরিণত হতে লাগলেন। শুরুতে তাঁদের যে ব্রত ছিল গণতন্ত্র ও সাম্য, সেটা রইল, কিন্তু দলে তিনটে স্তর তৈরি হল। প্রথম স্তরে শিক্ষানবিশ, দ্বিতীয়তে ফেলো আর একেবারে শেষে মাস্টার ম্যাসন। মাস্টারের ওপরেই দলের পরিচালনার ভার। ঈশ্বরের আলোচনা গৌণ হয়ে গেল। ষড়যন্ত্র, নিষিদ্ধ মিটিং, রাষ্ট্রদ্রোহ, গির্জার বিরোধিতা, সবকিছুর আখড়া হয়ে উঠল ফ্রি ম্যাসন লজ। কোথাও কোথাও এদের নিষিদ্ধও ঘোষণা করা হল। ওলন্দাজ গভর্নর জ্যাকোয়া ভার্নেতের নাতি মার্কাস ভার্নেত চুঁচুড়ায় ফ্রি ম্যাসনদের একটি লজ স্থাপন করেন। নাম রাখেন কনকর্ডিয়া। নামে ফ্রি ম্যাসনদের আড্ডা, কিন্তু আলোচনা হত কীভাবে ইংরেজদের দাপটের অবসান ঘটানো যায়। যেহেতু অনেক ওলন্দাজ এই দলে ছিলেন, তাই ইংরেজরা এঁদের সন্দেহ করেননি। সাদা চামড়ার কী মাহাত্ম্য! মাঝে মাঝে ভাবে তারিণী। এটাই যদি কোনও নেটিভ সমিতি হত, তাহলে কবেই সরকার একে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিত! এর অবশ্য আর-একটা কারণ ছিল। বড়োলাট বেন্টিঙ্ক নিজে ফ্রি ম্যাসন ছিলেন। তিনি এককালে ‘গ্র্যান্ড মাস্টার অফ অল ইন্ডিয়া’ উপাধিও নিয়েছিলেন। তাই ইংরেজরা ফ্রি ম্যাসনদের সচরাচর ঘাঁটায় না। চুঁচুড়ার ফ্রি ম্যাসনদের দলে কিছু ইংরেজ আছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁরা ধোঁকার টাটি। তাঁদের সামনে প্রয়োজনীয় আলোচনা কিচ্ছু হয় না।

কলকাতায় বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে ফ্রি ম্যাসনদের একটা লজ আছে। তাতে নেটিভ প্রায় নেই বললেই চলে। সব ইংরেজ। কয়েক বছর আগে বাবু প্রসন্নকুমার দত্ত প্রথম বাঙালি, যিনি কলকাতার লজে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। এখন তিনি ফেলো পদে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে মুখে যতই ভ্রাতৃত্বের কথা হোক, সবাই জানে বাবু প্রসন্নকুমার কোনও দিন মাস্টার হতে পারবেন না। সে অধিকার কেবল সাহেবদের জন্য বাঁধা। তারিণী চুঁচুড়ার ফ্রি ম্যাসন ফেলো, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাকে বলা হয়েছে কলকাতায় ফ্রি ম্যাসনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। আরও একটা কারণ ছিল। ভার্নেত তাকে বলেছিলেন একটু চোখকান খোলা রাখতে, যদি চুঁচুড়ায় ইংরেজদের গতিবিধি সম্পর্কে জানা যায়।

সেদিন সকালে চিঠিটা পেয়ে তাই সে উপেক্ষা করতে পারেনি। ঠিক রাত নটায় পৌঁছে গেছিল ৫৫, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের হেডকোয়ার্টারে। দরজায় গোপন করমর্দন হল গেটপাস। সেটা সেরে ভিতরে গিয়ে দ্যাখে পরিবেশ থমথমে। সবাই কালো কোট পরে এসেছেন। যেন কারও শোকসভা। সামনে মঞ্চ। টেবিলে বসে আছেন গ্র্যান্ড মাস্টার হ্যালিফ্যাক্স। দুইপাশে দুটো মোটা মোমবাতি জ্বলছে। পিছনে লাল পর্দায় ম্যাসনদের চিহ্ন। সবাই যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছেন। তারিণী ভাবল কাউকে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু তার আগেই সবাই উঠে দাঁড়াল, আর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন সস্ত্রীক বড়োলাট ল্যান্সডাউন। সেই কার্টারের ম্যাজিকের দিনই বড়োলাটকে প্রথমবার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তারিণীর। এত তাড়াতাড়ি আবার দেখতে পাবে ভাবেনি। কিন্তু বড়োলাট এখানে কী করছেন? তাঁর স্ত্রীই বা সঙ্গে কেন? দুজনের পরনেই শোকের পোশাক। বড়োলাট মঞ্চে উঠলেন না। নিচেই একেবারে সামনের সারিতে বসলেন। হ্যালিফ্যাক্স উঠে দাঁড়ালেন, “আজ আমাদের এই সভার উদ্দেশ্য কোনও আলোচনা বা বিতর্ক নয়। আজ আমরা এক বিশেষ কারণে মিলিত হয়েছি। আমাদেরই এক ব্রাদার, ব্রাদার পল কিথ ফিসমোরিস ল্যান্সডাউন গত ১২ ডিসেম্বর নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। ব্রাদার পল চার বছর আগে এই দেশে আসেন। লন্ডনের ফ্রি ম্যাসনারির সদস্য আমাদের এই ব্রাদার কিছুদিনের মধ্যেই সবার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। সংঘের যে-কোনো কাজে তিনি এগিয়ে আসতেন সবার আগে। তাঁর হাসিমুখ, মিষ্ট ভাষা আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, খুব বেশিদিন সংঘ ব্রাদার পলকে কাছে পেল না। তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভরতি হলেন। সেখান থেকে দুই বছর চিকিৎসার পরে সুস্থ হলেও তিনি গৃহবন্দিই থাকতেন। গত ১২ তারিখ সকালে কাউকে না বলে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। পুলিশ ও প্রশাসন তাঁকে খোঁজার বিস্তর প্রচেষ্টা চালায়, কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেই রাতেই চিনা পাড়ায় তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রাদার পলের মতো সদাহাস্যময়, অজাতশত্রু মানুষকে কে হত্যা করল, আর কেনই বা করল তা আমাদের অজানা। বড়োলাট নিজে এখানে উপস্থিত। তিনিও শোকগ্রস্ত। তবু তাঁকে অনুরোধ করব কিছু বলার জন্য।”

বড়োলাট উঠে দাঁড়ালেন। তিনি রোগা মানুষ, তাই বেশ ঢ্যাঙাও লাগে। মাথার সামনের দিকে চুল উঠে গেছে। চেহারার মধ্যে চোখে পড়ে মোটা গোঁফখানা। তাঁকে দেখেই মনে হচ্ছে তিনি শোকাকুল। মাথায় যেন পাহাড় ভেঙে পড়েছে। মুখ ফ্যাকাশে। চোখ ছলছলে। এই রূপ তো সেদিন দেখেনি তারিণী! এ কোন বড়োলাট? যেন গোটা মানুষটাই পালটে গেছে। ধরা গলায় তিনি শুধু বললেন, “আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। ব্রাদার পলের খুনি তার শাস্তি পাবেই, যদি না এতদিনে ঈশ্বর তাকে তার প্রাপ্য শাস্তি দিয়ে থাকেন।”

সভা আরও খানিক চলল। তারিণী বুঝতে পারল এই সেই খুন, যার খবর গণপতি এনেছিল। বিভিন্ন লোকের কথায় তারিণী পলকে বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছিল। সবাই পলের প্রশংসাই করছে। এমন লোককে খুন হতে হল কেন? আর একটা কথা, পলের কী অসুখ হয়েছিল?

তারিণীর ভিতরে আবার জিজ্ঞাসা ছটফটাচ্ছে, কিন্তু কাকে জিজ্ঞেস করবে? সভা শেষে সবাই যখন নিজেদের মধ্যে মৃদু স্বরে কথা বলছে, বড়োলাট চলে গেছেন, তারিণী দেখল এক কোনায় চেয়ারে বসে আছেন বাবু প্রসন্নকুমার। বয়স হয়েছে। আজকাল নিয়মিত আসেন না সভায়। তবু আজকের সভার গুরুত্ব বুঝে এসেছেন। তারিণী গুটিগুটি পায়ে তাঁর কাছেই গেল। তারিণীকে দেখেই একগাল হাসলেন প্রসন্নকুমার, “এসো এসো হে আমার চুঁচুড়ার ব্রাদার। সেই যে কলকেতায় এসে দেখা করে আমার হাত ধরে এখেনে এসে ঢুকলে, তারপর তো বুড়োর কোনও খবরই নাও না।” তারিণী মাথা নিচু করে রইল। প্রসন্নকুমার বলে চললেন, “আমি অবশ্য সব খবর পাই। ড্রিসকল সাহেবের কাছে শিক্ষানবিশি করে এখন নিজে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হয়েচ। পশার বাড়চে… এখন আর বুড়োর কী দরকার?”

নিচু হয়ে পায়ের ধুলো নিয়ে তারিণী বলল, “কী যে বলেন কত্তা! আসলে আপনিও আসেন না, আমাকেও সাহেব পেঁচাপেঁচি নানা কাজে পাঠান। তাই...”

প্রণামে প্রসন্নকুমার স্পষ্টতই প্রসন্ন হলেন, “আরে কত্তা আবার কী? তুমিও ফেলো আর আমিও ফেলো। আমরা দুই ব্রাদার, নেটিভ ব্রাদার, কী বলো?”

“তা যা বলেছেন। আচ্ছা, এই ব্রাদার পলকে চিনতেন আপনি?”

“ওমা! তা চিনব না? বড়োলাটের আপন খুড়তুতো ভাই। রাইটার হিসেবে এসেছিল। কিন্তু রাইটার্স বিল্ডিং-এ থাকত না। বড়োলাটের সঙ্গেই থাকত। ছেলে ভালোই ছিল শুরুতে। হাসিখুশি। যে-কোনো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত... তারপর যে কী হল...”

“কী হল?”

“ওমা! তুমি জানো না? বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছিল তো! প্রথমে কিছুদিন চেপে রাখতে চেয়েছিল। লাভ হয়নি। তারপর দুই বছর ভবানীপুরের পাগলা গারদে ভরতি ছিল। সেখান থেকে ছাড়িয়ে এনে শেষ এক বছর লাটভবনে। কিন্তু লাটভবনে যা পাহারার কড়াকড়ি, সেখান থেকে পালাল কী করে সেটাই মাথায় ঢুকছে না। আর অমন বদ্ধ পাগলকে খুনই বা করবে কে?”

পরদিন সকালে বসে বসে প্রসন্নকুমারের করা প্রশ্ন দুটোই ভাবছিল তারিণী। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুলে অবাক। বুড়ো ড্রিসকল সাহেব এসেছেন। সঙ্গে আরও দুজন। একজন দেশি, অন্যজন সাহেব। সেই সাহেবকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে গেল তারিণী। এ তো সেই সাইগারসন! কার্টারের ম্যাজিকের দলের লোক। অন্যজনকেও সে দেখেছে। এ পুলিশের লোক। চিন-সু-লিনের লাশ স্টেজে পড়ার পর টমসন সাহেব একেই ডেকেছিলেন মঞ্চে। তারিণী কারও মুখ ভোলে না।

সসম্মানে তিনজনকে নিয়ে অফিসে বসাল তারিণী। ড্রিসকল সাহেবই শুরু করলেন, “কেমন আছ তারিণী? কাজকর্ম সব চলছে তো?”

তারিণী বশংবদের মতো মাথা নাড়ল।

“ইনি মিস্টার সাইগারসন মোহেলস, লন্ডনের প্রাইভেট ডিটেকটিভ। আর উনি আমাদের গোয়েন্দাবিভাগের অফিসার প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়। ওঁদের তোমাকে কিছু বলার আছে।”

অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল তারিণীর ঠোঁটে, “আমারও ওঁদের অনেক কিছু বলার আছে।”


তুর্বসুর কথা


এক

সেদিন রাতে দেবাশিসদার চিঠি পেয়ে প্রথমেই ভাবলাম অফিসারকে একবার ফোন করি। তারপরেই মনে হল দেবাশিসদা বারণ করেছেন। এই তল্লাশি আমাকে একাই চালাতে হবে। এই চিঠির কথা আপাতত কাউকে বলা যাবে না। পরদিন বলার মতো ঘটনা একটাই ঘটেছিল। যদিও সেটা বেশ ভয়াবহ। আমি আর অফিসার মুখার্জি দুজনে গেছিলাম চন্দননগর গ্রন্থাগারে। বিরাট গ্রন্থাগার। লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোক সদাশয়, যদিও পুলিশ দেখে একটু ঘাবড়ে গেছেন মনে হল। দেবাশিসদার খুনের কথাটা খবরের কাগজে এখনও না এলেও লোকমুখে ওঁর কানে এসেছে। দু-একবার কথা বলতে বলতে ঠোঁট দিয়ে জিভ চেটে নিলেন দেখতে পেলাম। একটু হেঁ হেঁ করে আমাদের জানালেন দেবাশিসদা প্রায়ই আসতেন এখানে। অনেক সময় প্রায় সারাদিন বসে পড়াশোনা করতেন। কারও সঙ্গে খুব বেশি আলাপ ছিল না। তবে তাঁর কোনও এক অনুগামী ছিল। লাইব্রেরিয়ান তাঁর নাম জানেন না। দেবাশিসদাও বলেননি। শুধু কয়েকবার বই ইস্যু করার সময় বলেছেন, “যাই, এটা পড়ে আমার চ্যালাকে জ্ঞান দেওয়া যাবে।”

“আপনার কথাই তো বলেছিল বলে মনে হয়, কি মশাই?” জিজ্ঞেস করলেন অফিসার।

“আর কেউ নেই বলছেন?”

“থাকলেও এখনও খোঁজ পাইনি। কেন, আপনি কাউকে জানেন?”

মাথা নাড়লাম। জানি না। বললাম, “কী কী বই উনি সেই চ্যালার জন্য ইস্যু করেছেন মনে আছে?”

“দাঁড়ান, ইস্যু রেজিস্টার দেখি”, বলে ভদ্রলোক একটা গাবদা খাতা বার করলেন। তাতে সব সদস্যদের নাম আর তাঁরা কবে কী বই ইস্যু করিয়েছেন তা লেখা। দেবাশিস গুহ-র নামের নিচে শেষ যে কটা বইয়ের নাম দেখলাম, তাতে দুটো ‘চন্দননগরের ইতিহাস’, একটা ‘ব্যান্ডেল চার্চের ইতিহাস’, ‘বাংলার পুলিশের ইতিহাস’, ‘দারোগার দপ্তর’, ‘সংবাদপত্রে সেকালের কথা’ তো ছিলই, সঙ্গে ছিল বেশ কিছু ম্যাজিকের বই। সেই প্রাচীন ব্ল্যাক ম্যাজিক, তন্ত্র মন্ত্র থেকে হুডিনি অবধি। জাদুকর গণপতির ওপর শেষদিকে ওঁর বেশ আগ্রহ হয়েছিল। তাঁর জীবনী, অবনীন্দ্রকৃষ্ণ বসুর ‘বাঙ্গালীর সার্কাস’, অজিতকৃষ্ণ বসুর ‘জাদুকাহিনী’ সহ প্রচুর ম্যাজিকের বই পড়ছিলেন। আর একটা ম্যাগাজিনের বেশ কিছু সংখ্যা তিনি রিডিং সেকশানে বসে পড়ে নোট নিয়েছিলেন। নাম ‘ম্যান, মিথ অ্যান্ড ম্যাজিক’। যে তিনটে ইস্যু তিনি পড়তে নিয়েছিলেন, একটার বিষয় ফ্রি ম্যাসন, একটার বিষয় লিং-চি, আর অন্যটা বেশ অদ্ভুত, এডগার অ্যালান পো। পৃথিবীর প্রথম গোয়েন্দা কাহিনির লেখক এই সিরিজে জায়গা পেলেন কী করে, সেটাই মাথায় এল না। আমি লাইব্রেরিয়ানকে অনুরোধ করলাম ম্যাগাজিনগুলোর ফটোকপি করে দেওয়া সম্ভব কি না। একটু গাঁইগুঁই করে শেষে রাজি হলেন। সঙ্গে পুলিশ থাকার এই সুবিধে।

তবে অফিসার মুখার্জি অস্থির হয়ে উঠছিলেন। এখানে দেবাশিসদা কি কিছু লুকিয়ে রেখেছেন? রাখলে সেটা কি? শেষে তিনিই লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা এই দেবাশিসবাবু এখানে বসে যে বই পড়তেন, তাঁর কোনও নিজস্ব জায়গা ছিল?”

“ছিল বইকি! একেবারে পিছনে পুরোনো বইয়ের র‍্যাকগুলোর পিছনে ছোটো একটা টেবিল আছে। ওখানেই চেয়ার পেতে বসতেন। ওদিকটা বেশ নির্জন। কেউ যায়-টায় না। আলো একটু কম হলেও পড়াশোনার জন্য খাসা জায়গা।”

“উনি ছাড়া আর কেউ ওখানে বসেন না?”

“নাহ। যারা রেগুলার আসে, তারা জানে ওটা ওঁর জায়গা। টেবিলে ওঁর বই-ই রাখা থাকে। আমরা গোছাই না।”

“কেন?”

“আসলে একটু খেয়ালি টাইপ লোক ছিলেন তো, পড়তেন, নোট নিতেন। একবার গোছাতে গিয়ে কোনও বইয়ের মধ্যে রাখা ওঁর একটা নোট বোধহয় হারিয়ে যায়। খুব রেগে গেছিলেন। সেই থেকে ওঁকে জিজ্ঞাসা না করে ওঁর বই গোছাই না।”

“ওঁর পড়ার জায়গাটা দেখা যায়?” জিজ্ঞেস করলেন অফিসার মুখার্জি।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই, কেন নয়?” বলে লাইব্রেরিয়ান (পরে নাম জেনেছিলাম সুজিত দত্ত) আমাদের নিয়ে গেলেন লাইব্রেরির মধ্যে দিয়ে। উঁচু উঁচু তাকে সারি সারি বই সাজানো। কিছু নতুন, বেশিরভাগই পুরোনো। গোলকধাঁধার মতো পথ। একেবারে শেষে দেওয়ালের ধারে এক কোনায় ছোট্ট একটা টেবিল পাতা। তাতে কিছু ম্যাজিক নিয়ে জিম স্টেইনমেয়ারের কিছু বই ছড়ানো, সেই তিনটে ম্যাগাজিন আর ছোট্ট একটা বাক্স। চামড়ার।

“এই বাক্সটা কীসের?”

“সেই আপনাকে বলছিলাম না, গোছানোর কথা। সেই থেকে উনি নিজের নোটপত্র যাবার আগে এই বাক্সে আটকে রেখে যেতেন, যাতে বই গোছালেও এটা কেউ না ধরে। এটার একটা নামও দিয়েছিলেন উনি, ‘প্যান্ডোরার বাক্স’।”

একেবারে দেবাশিসদাচিত নাম। স্বর্গ থেকে প্রমেথিউস আগুন চুরি করায় দেবরাজ জিউস মানবজাতির উপরে রেগে গিয়ে তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য, হেফেথাসকে দিয়ে একটি মাটির নারী বানিয়ে তাঁকে জীবন দেন। নাম প্যান্ডোরা। প্যান্ডোরাকে তৈরি করার জন্য ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতিকে বেছে নেওয়া হয় মডেল হিসেবে। আফ্রোদিতি তাকে দেন সৌন্দর্য্য-লাবণ্য-আকাঙ্ক্ষা। হার্মিস তাকে দেন চাতুর্য ও দৃঢ়তা, অ্যাপোলো সংগীত শেখান। প্রত্যেক দেবতাই তাঁদের নিজেদের সেরাটা দিয়ে সাজিয়ে তোলেন প্যান্ডোরাকে। অনেকটা আমাদের দেবী দুর্গার মতো। সবশেষে দেবরাজ জিউসের স্ত্রী হেরা প্যান্ডোরাকে উপহার দেন হেরার অনন্য বৈশিষ্ট্য, কৌতূহল। প্যান্ডোরাকে দেবতাদের তরফ থেকে উপহার হিসেবে পাঠানো হয় প্রমেথিউসের ভাই এপিমেথেউসের কাছে। প্যান্ডোরাকে দেখামাত্র তার প্রেমে পড়ে যান এপিমেথেউস। এপিমেথেউস-প্যান্ডোরার বিয়েতে প্যান্ডোরাকে দেবরাজ জিউস উপহার দেন এক অপূর্ব বাক্স। নিষেধ করে দেন এটি খুলতে। দেবরাজ জিউসের নিষেধাজ্ঞা পরাস্ত হয় দেবরানি হেরার দেওয়া উপহার কৌতূহল-এর কাছে। বিয়ের উপহার একবার দেখতে প্যান্ডোরা বাক্সটি খোলামাত্র বাক্সবন্দি রোগ-জরা-হিংসা-দ্বেষ-লোভ-মিথ্যা ইত্যাদি সব স্বর্গীয় নীচতা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের পৃথিবীতে, প্যান্ডোরা যখন বাক্সটা বন্ধ করতে পারে তখন শুধু আশা রয়ে যায় সেই বাক্সে। পৃথিবীর প্রথম ও একমাত্র সর্বগুণে গুণান্বিত মানবী পৃথিবীর জন্য নিয়ে আসে নারকীয় দুর্ভোগ। অনেক কিছুর মতো এটাও দেবাশিসদার থেকেই শোনা। কিন্তু কী আছে দেবাশিসদার এই বাক্সে? বাক্সটায় কোনও লক নেই। এঁটে বসানো। মুখার্জি বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেন সেটাকে খোলার। পারলেন না। ডালাটা এঁটে বসা। আমায় দিয়ে বললেন, “একবার দেখুন তো, যদি খুলতে পারেন...” বলেই সুজিতবাবুকে নির্দেশ দিলেন ফটোকপিগুলো করিয়ে আনতে। সুজিতবাবু ভীতু মানুষ। একটু থতোমতো খেয়ে চলে গেলেন।

আমিও বেশ কয়েকবার টানাটানি করলাম। নাহ। বাক্স খোলা যাচ্ছে না। এটা খোলার কোনও কায়দা আছে। এ বাক্স সাধারণ বাক্স না। ম্যাজিশিয়ানরা এই ধরনের বাক্স ব্যবহার করেন। কায়দামতো না হলে খোলা অসম্ভব। আশেপাশে বেশ কটা কাগজ ছড়িয়ে আছে। তাতে হিজিবিজি নোট। তার থেকে একটা কাগজ উঠিয়ে মুখার্জি বললেন, “দেখুন তো এটা কী?” একটা তালিকা বানাচ্ছিলেন দেবাশিসদা। কিছু শব্দ চেনা, কিছু অচেনা। সেই তালিকায় লেখা— পো... তৈমুর... স্টেজে খুন... প্রিয়নাথ... ডালান্ডা হাউস... সাইগারসন???!!!... গণপতি… তারিণী... ডিরেক্টর।

“কিছু বুঝতে পারছেন?” মুখার্জি বললেন।

“নাহ। সাইগারসন আর ডিরেক্টর নতুন চরিত্র। আগে এঁদের কথা শুনিনি।” মিথ্যেই বললাম। ডিরেক্টরের কথা ছিল সেই চিঠিতে।

“এক কাজ করুন। আপনি এই লিস্টটা ফটোকপি করে নিয়ে যান। আর ওই ম্যাগাজিনগুলোও, যেগুলো আপনার জন্যেই উনি তুলেছিলেন। আমার নম্বর তো রইলই। যদি কিছু ক্লু পান, ফোন করে দেবেন। আমাদের হাজার কাজ মশাই, এই এক বিচিকাটা কেস নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। ওদিকে এঁর বউকেও তো ইন্টারোগেট করতে হবে। যদি কিছু জানেন... বলা যায় না মশাই কার কোথায় কী খার থাকে...”

“আর এই বাক্সটা?” বললাম আমি।

“এটা স্টেশনে নিয়ে যাই। ওখানে খোলার চেষ্টা করতে হবে। কী পেলাম আপনাকে জানিয়ে দেবখন। আপনি বরং একটা কাজ করুন, আপনার ফটোকপিগুলো হয়ে গেছে মনে হয়। নিয়ে আসুন, তারপর চলুন রওনা হই। অনেক বেলা হল।”

আমি ফটোকপি আনতে পা বাড়ালাম। মুখার্জি আবার সেই বাক্স খোলায় মন দিলেন। ফিরে এসে দেখি ভদ্রলোক দরদর করে ঘামছেন, তবু খোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

“কী বালের বাক্স মশাই, কিছুতেই খোলা যায় না... এ তো ভাঙতে হবে যা মনে হচ্ছে।”

“প্যান্ডোরার বাক্স ভাঙবেন না, কী বেরিয়ে আসে কে জানে।” একটু হেসেই জবাব দিলাম আমি।

“আপনার কাজ হয়ে গেছে?”

আমি হ্যাঁ বলতেই, উনি “লাস্ট ট্রাই, একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে” বলে বাক্সটাকে এবার উপর নিচে না খুলে লম্বালম্বি রেখে পাশাপাশি খোলার চেষ্টা করলেন। কী অবাক কাণ্ড! ক্লিক করে একটা শব্দ হল। প্যান্ডোরার বাক্স খুলে গেছে। বাক্সটা পাশাপাশিই খোলে। আর খুলতেই ভিতরের জিনিসটা আমাদের নজরে এল। প্রথমে প্লাস্টিক ফয়েলে মোড়া কালচে একটা বস্তু মনে হচ্ছিল। ভালো করে দেখতে বুঝলাম কালচে তরল শুকিয়ে এসেছে ততক্ষণে। ম্যাজিক বক্সে প্লাস্টিকের ভিতরে কোনও অজানা জাদুতে চলে এসেছে দেবাশিসদার খুনের সেই এভিডেন্সটা, যেটা কাল থেকে হন্যে হয়ে পুলিশ খুঁজছিল। দেবাশিসদার দেহ থেকে ছিন্ন অণ্ডকোশ।

দুই

আজ প্রায় দশদিন হয়ে গেল দেবাশিসদা মারা গেছেন। খুন হয়েছেন। খুনের কোনও কিনারা হয়নি এখনও। কলকাতায় ফিরে সবার আগে থানা থেকে বাইকটা উদ্ধার করলাম। কিছু টাকা খসল। কিন্তু উপায় নেই। বাইক ছাড়া কোনও কাজ করা যাবে না। এখন আমি ভাড়াবাড়িতে। নিজের খাটে বসে আছি। আমার চারদিকে একগাদা কাগজের তাড়া। বেশিরভাগই ফটোকপির পাতা। যত পড়ছি, তত গুলিয়ে যাচ্ছে সবকিছু। দেবাশিসদা কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাধা ছিল। বলতে পারেননি। আর যখন বলতে গেলেন, সময় পেলেন না। তার আগেই খুন হয়ে যেতে হল তাঁকে। কী জানতেন দেবাশিসদা, যার জন্য এমন নৃশংসভাবে তাঁকে মরতে হল? খাটে বসে এইসবই ভাবছিলাম। গোটা ব্যাপারটার মধ্যে অদ্ভুত একটা দেখনদারি আছে। কেউ যেন নেটফ্লিক্সের টিভি সিরিজের স্ক্রিপ্ট লিখবে বলে প্লট সাজাচ্ছে। একমাত্র ভিক্টোরিয়ান গোয়েন্দা গল্পে এসব ঘটে। আজকালকার খুনখারাপি বড্ড পানসে। আর এখানে পদে পদে ড্রামা, যে ড্রামার অন্যতম অভিনেতা দেবাশিসদা নিজেই। ধরলাম দেবাশিসদাকে কেউ খুন করতে এল, তিনি লুকিয়ে বাথরুমে এলেন। এখানে অন্য যে-কোনো মানুষ হলে কাউকে ফোন করে বলত, “ভাই বাড়িতে লোক ঢুকেছে, আমায় বাঁচা”, কিংবা সোজা পুলিশে ফোন করত। উনি সে পথে গেলেনই না। আমি, যে চন্দননগরে থাকিই না, থাকি কলকাতায়, তাকে…. না না, ফোন না, হোয়াটসঅ্যাপ করলেন। তাও ঝাপসা একটা ছবি। পুলিশ যাতে আমায় খুঁজে পায়, তাই কাগজের নিচে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে দিলেন, “তুর্বসু জানে।” সোজা কথা, মরার আগে বাঁশ দিয়ে গেলেন। কিন্তু কেন? আবার সেই লোকই আমাদের বাড়ি দেখার দালাল সেজে জেঠিমার থেকে চাবি নিয়ে আমায় চিঠি লিখলেন? ফোনে বা সাক্ষাতে বলতে কী হয়েছিল? যে লোক নিজের বউকে অন্য লোকের সঙ্গে শুতে বাধ্য করে, সে-ই আবার বউয়ের পিছনে গোয়েন্দা লাগায় কেন? তাঁর খুনিও আবার তেমনি। সরাসরি বুকে ছুরি বিঁধিয়ে খুন কর, তা না করে প্রাচীন চিনা পদ্ধতি বেছে নিল। এটা কি নাইট্যশালা নাকি? মাঝে মাঝে সিরিয়াসলি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে এগুলো বাস্তবে ঘটছে, আমি কোনও সিনেমার সেটে নেই। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেদিন লাইব্রেরিয়ান সুজিতবাবু বলতে পারেননি, কে আগের দিন ওই বাক্স ধরেছে। চন্দননগর লাইব্রেরিতে অনেকেই আসেন। আর ওটা এমন জায়গা, একটু চোখের আড়ালে গিয়ে যে কেউ ওই জিনিসটা বাক্সে রাখতে পারে। ঠিক এই জায়গায় একটু নাড়া খেলাম। যে কেউ? না বোধহয়। এমন একজন, যে জানে সেই বাক্স কেমন করে খুলতে হয়। আমার আর অফিসারের সেদিন প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগেছিল সেই বাক্স খুলতে, কিন্তু অপরাধী সে সময় পাবে কোথায়? তাকে খুব দ্রুত এই বাক্স খুলতে হবে। সুতরাং দুটো ব্যাপার পরিষ্কার। এক, সে বাক্স খুলতে জানে, দুই, সে জানত এখানে বাক্সটা রাখা আছে। আবার সেই নাটুকেপনা। দেবাশিসদার অণ্ডকোশ এমন কোনও দামি বস্তু না যে সেটাকে বাক্সে সংগ্রহ রাখতে হবে। কেন কাটল জানি না, যদি বা কাটল, সামনেই গঙ্গা। ভাসিয়ে দিলে কে টের পেত? তা না করে এভাবে করার মানে কী? কিছুই হিসেবে মেলে না, যদি না… মাথাটা ঘুরে উঠল যেন... যদি না খুনি কোনও মেগালোম্যানিয়াক সাইকো হয়। খুনের চেয়ে দর্শকাম, এই থিয়েটারি ঢং তার কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কেন বা কাকে খুন নয়, কীভাবে খুন করা হচ্ছে সেটাই তার কাছে চরম আনন্দের বিষয়। খুন তার কাছে খেলা। এ খেলায় সে মন্ত্রী। সে যে-কোনো দিকে যে-কোনো চাল দিতে পারে। আর আমরা সবাই... আমি, দেবাশিসদা, অফিসার মুখার্জি, সবাই তাঁর হাতের বোড়ে। আমরা শুধু এক ঘর এক ঘর করে এগোচ্ছি। সে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে গোটা দাবার ছকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আর বলছে, “দ্যাখো, আমায় দ্যাখো।” আমার হাড় শিরশিরিয়ে উঠল। এ কার সঙ্গে মরণখেলায় নামলাম? কিন্তু একবার যখন খেলা শুরু হয়েছে, এর শেষ না দেখে উপায় নেই। আমি পালাতে পারি, কিন্তু লুকাতে পারব না। খুনি আমার অজান্তেই আমার মন পড়া শুরু করে দিয়েছে। সে জানত আমি যাবই নৃত্যগোপাল স্মৃতিমন্দিরে। আমার জন্যেই সে সাজিয়ে রেখেছিল দেবাশিসদার অণ্ডকোশ। একমাত্র তাহলেই হিসেব মেলে। আর তা যদি হয়, আমি নিশ্চিত, এই উন্মাদ, মেগ্যালোম্যানিয়াক খুনির পরের টার্গেট আমি।

দরজায় টোকা পড়ল। খুব আস্তে আস্তে। আমি জানি উর্ণা এসেছে। উর্ণা আমার বাড়িওয়ালার মেয়ে। ঝকঝকে মাথা। আমার মতো ভ্যাদভ্যাদে আলুসেদ্ধমার্কা না। আগে আমাকে বিশেষ পাত্তা দিত না। নিজের মতো থাকত। একদিন গড়িয়াহাটে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে মার্কেটিং করতে গিয়ে ওর পার্স চুরি যায়। পার্সে মোবাইল, এটিএম কার্ড সব ছিল। পুলিশ গা করেনি। এদিকে কেঁদে কেঁদে মেয়ের অবস্থা খারাপ। কাকু মানে ওর বাবা বাধ্য হয়ে আমায় বলেছিলেন যদি কিছু করতে পারি। এখানে আমি কিছুটা ভাগ্যের সাহায্য পেয়েছিলাম। ওই এরিয়া ভজাদার নখদর্পণে। ভজাদা লোকাল গুন্ডা, আবার পার্টিরও নেতা। ওর সঙ্গে পরিচয় ওর ভাইয়ের বউয়ের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে। বউটা ভালো। ভাই সন্দেহবাতিক। সে যাই হোক, ভজাদার নজরের বাইরে ওদিকের পাতাটাও নড়ে না। ওকে জানাতেই বলল, “ঠিক কোথায় হয়েছে বলতে পারবি ভাই?” জেনে নিয়ে বললাম। “আধ ঘণ্টার মধ্যে ফোন করছি”, বলে ফোন রেখে দিল ভজাদা। ঠিক চল্লিশ মিনিট বাদে ফোন এল, “তুই গড়িয়াহাটের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর সামনে চলে আয়। এসে আমায় একটা ফোন করবি। আমি চলে আসব।” বাইক নিয়ে গিয়ে দেখি বেদুইনের সামনে ভজাদা দাঁড়িয়ে, হাতে একটা চটের থলে। “চল ভিতরে চল”, বলে বেদুইনের ভিতরে নিয়ে গিয়ে টেবিলে বসেই দুটো ফিশ রোল অর্ডার দিল। তারপর টেবিলে ব্যাগ উপুড় করতেই আমার চক্ষুস্থির। খুব কম করেও গোটা দশেক লেডিস পার্স!

“সকাল থেকে এই হয়েছে, এবার তোর কোনটা বেছে নে।”

“মানে! তুমি এগুলো পেলে কোথায়?”

“উঁহুঁ উঁহুঁ... ওসব প্রশ্ন করবি না। আম খাবার দরকার আম খা, আঁটি গুনে কী করবি?”

“কিন্তু আমি জানব কী করে কোনটা?”

“খুলে খুলে দেখ তবে। এটিএম কার্ড তো আছে বললি।”

ভাগ্য ভালো দ্বিতীয় পার্সটা খুলতেই পার্সে উর্ণার প্রেসিডেন্সির আই কার্ড পাওয়া গেল। আমি আবার দেখতে যাচ্ছিলাম ভিতরের সবকিছু ঠিকঠাক আছে নাকি। ভজাদা ধমক দিল, “দেখার কিচ্ছু দরকার নেই। এই ভজহরি মুখুজ্জেকে যখন বলেছিস, কোনও ব্যাটার ক্ষমতা নেই একটা কাগজ এদিক-ওদিক করার। আর মেয়েদের পার্স দেখতে নেই জানিস না?”

থতোমতো খেয়ে পার্স বন্ধ করে রাখলাম।

“মেয়েটা কে? লাভার?”

“আরে না, না। তেমন কিছু না। বাড়িওয়ালার মেয়ে।”

ততক্ষণে রোল এসে গেছে। ভজাদা রোল চিবুতে চিবুতে মিটিমিটি হাসতে লাগল, “শোন ভাই, কিছু না থাকলে এমন সুন্দরী মেয়ের পার্সের জন্য তুই সেই নর্থ কলকাতা থেকে আধ ঘণ্টার মধ্যে এখানে চলে আসতি না। ফি নিবি না নিশ্চয়ই...”

“ধুসস, এর জন্য ফি নেওয়া যায় নাকি?”

“তাই তো, তাই তো। এরপরেও বলবি শুধুই বাড়িওয়ালার মেয়ে! বাড়িওয়ালার জন্য এমন পিরিত তো গোটা কলকাতা শহরে কারও নেই রে... তোর বাড়িওয়ালা তো মহা ভাগ্যবান!”

কথা ঘোরানোর জন্য বললাম, “বাকি পার্সগুলোর কী হবে?”

“কেন, তোর লাগবে? দরকার? গোয়েন্দাগিরি ভালো চলছে না বুঝি? নিয়ে যা যেটা খুশি…”

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ফিরে এসে উর্ণাকে পার্স দিতেই ছলছল চোখে একগাল হেসে সেই যে “থ্যাঙ্কিউ তুর্বসুদা” বলেছিল, সেই আমাদের প্রথম কথা। তারপর প্রায় বছরখানেক কেটে গেছে। এর মধ্যে তিনবার আমরা গোলদিঘির ধারে গিয়ে বসেছি। দুদিন ভিক্টোরিয়া গেছি। ওর বাবা-মা জানেন না। জানলে আমাকে এই বাড়ি ছাড়তে হবে। বাড়িতে আমরা অপরিচিতর মতো থাকি। আমার ঘরে সচরাচর ও আসে না। এলেও দরজায় খুব মৃদু টোকা মারে। ঠিক এখন যেমন মারছে।

উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। ও সাততাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল। মুখে একটা চাপা হাসি।

“আরে! তুমি পাগল নাকি? এই ভরদুপুরে আমার ঘরে! তোমার মা জানতে পারলে আমাকে বাড়িছাড়া করবে।”

ফিক করে হাসল উর্ণা। হাসলে ওর আক্কেলদাঁতটা দেখা যায়। ওকে আরও সুন্দরী লাগে। ডানদিকের ভুরুটা তুলে বলল, “মা বেরিয়েছে। জয়া মাসির বাড়ি। আসতে দেরি হবে। আর বাবা তো অফিস... তাই দেখতে এলাম, আমাদের ভাড়াটিয়া মশাই কী করছেন...”

“তা বেশ করেছ। আজ টিউশানি নেই?”

“নাহ। কী ব্যাপার বলো তো? আমি কি তোমায় খুব বিরক্ত করছি? এসে থেকে তাড়াতে চাইছ! ওকে চললাম। বাই।”

“আরে না, না...” প্রায় ছুটে গিয়ে ওর হাত টেনে ধরি। “আমি তো চাই তুমি সারাক্ষণ আমার কাছেই থাকো।”

“খুব পাকা পাকা কথা শিখেছ, তাই না... সরো তো। খাটটা একেবারে কাগজের গাদা বানিয়ে রেখেছ তো। কী ব্যাপার, প্রেমপত্র লিখছ নাকি?”

“সেটাই বাকি আছে। অনুপমের কোট করছে একজন আর প্রেমপত্র লিখছি নাকি আমি! এগুলো একটা কেসের ব্যাপারে… তোমাকে দেবাশিসদার কথা বলেছিলাম?”

“কোন দেবাশিসদা?” পা নাচাতে নাচাতে উর্ণা বলল।

“সেই যে চন্দননগরে থাকেন। খুব বিদ্বান মানুষ। বউ ছেড়ে চলে গেছে…”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, বলেছিলে মনে পড়ছে অল্প অল্প। তাঁর কেস?”

“তাঁরই বলতে পারো। তিনি খুন হয়েছেন।”

উর্ণা বেশ চমকে গেল। ওর ঠোঁটদুটো ছোটো, তাই হাঁ করলে একেবারে পারফেক্ট ইংরাজি ‘ও’ অক্ষরের মতো দেখায়। তেমনটাই দেখাচ্ছিল।

“বলো কী? কবে?”

“দিন দশেক হল। কিন্তু সমস্যা সেখানে না। দেবাশিসদা কিছু একটা গোপন খবর জানতে পেরেছিলেন। তাই তাঁকে খুন হতে হল। সেটা যে কী, তা বোঝার চেষ্টাই চালাচ্ছি।”

আমার কথা শুনতে শুনতে খাটের কাগজগুলো গোছাচ্ছিল উর্ণা। হঠাৎ প্রশ্ন করল, “তা গোপন খবরের সঙ্গে এডগার অ্যালান পো-র কী সম্পর্ক?”

দেখলাম ওর হাতে সেই ফটোকপি করে আনা ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠাগুলো। তাতে পো-র ছবি।

“আসলে মারা যাবার কিছুদিন আগেই দেবাশিসদা একটা তালিকা বানিয়েছিলেন। তাতে শুরুতেই পো-র নাম। পো-কে নিয়ে পড়াশোনাও করছিলেন যা জেনেছি। তাই লোকটাকে নিয়ে পড়ছিলাম।”

“ও। তা কী কী জানলে পো সম্পর্কে?”

“গ্রাহামস পত্রিকার সম্পাদক, প্রথম আধুনিক গোয়েন্দাকাহিনির লেখক, আর্মচেয়ার ডিটেকটিভ দুঁপ্য-র স্রষ্টা, দারুণ সব ভয়ের গল্পের লেখক, আর… আর হ্যাঁ, মারা গেছিলেন রহস্যজনকভাবে।”

“মানে? কীভাবে?”

“১৮৪৯ সালের ৩ অক্টোবর বাল্টিমোরের এক রাস্তার ধারে প্রায় সংজ্ঞাহীন পো-কে খুঁজে পান জেকব ওয়াকার নামে এক ভদ্রলোক। গায়ে প্রবল জ্বর। বিড়বিড় করে ভুল বকছেন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চারদিন পর তিনি মারা যান। গায়ের পোশাক যেটা পরেছিলেন, সেটা ওঁর না। কার, তা কেউ জানে না। সারা গায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। যেন কোনও হিংস্র পশুর নখের দাগ। অজ্ঞান অবস্থাতেই বহুবার রেনল্ডস বলে কাউকে একটা ডাকছিলেন। সে যে কে, তাও কেউ জানে না। মারা যাবার আগে নাকি শেষ কথা বলেছিলেন, ‘লর্ড, হেল্প মাই পুয়োর সোল।’ কীভাবে তাঁর এই দশা হল আজও রহস্য। রহস্যের এখানেই শেষ না, মারা যাবার পর তাঁর সমস্ত মেডিক্যাল রেকর্ড, মায় ডেথ সার্টিফিকেট সমেত গায়েব হয়ে যায়। পো-এর মৃত্যুর আসল কারণ কেউ জানে না। শুধু নানারকম কথা প্রচলিত। কেউ বলে স্বয়ং শয়তানের কাছে তিনি আত্মা বন্ধক রেখেছিলেন। শয়তানই তাঁর আত্মা চুষে নিয়েছে। এইসব আগে জানতাম না। এই ম্যাগাজিনটা পড়ে জানলাম।”

“বাহহ... এত কিছু লেখা আছে, আর ভদ্রলোক যে দারুণ কবিতা লিখতেন সে কথা নেই?”

“জানতাম, কবিতাটাই তোমার আগে চোখে পড়বে... আছে। দ্য র‍্যাভেন নামে একখানা কবিতার কথাও আছে বটে।”

“ব্যস! এটুকুই? আর উনি যে তৈমুরের কাব্যগাথা লিখলেন সে বিষয়ে কিচ্ছুটি লেখেনি?”

সারা পৃথিবীটা যেন আমার চোখের সামনে টলে গেল এক নিমেষে। ‘তৈমুরের কাব্যগাথা’ এই শব্দগুলো উর্ণা জানল কীভাবে? ওর তো এসব কিচ্ছু জানার কথা না।

আমার ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দেখে উর্ণা কিছু আঁচ করল। বলল, “বুঝিয়ে বলব?”

আমি উত্তর দিতে পারলাম না। শুধু ওপরে নিচে মাথা নাড়লাম। এইসব সময়ে উর্ণার ভিতরের মাস্টারি ভাবটা জেগে ওঠে। খাটের ওপর দুই পা তুলে বাবু হয়ে বসে বলল, “শোনো তবে। ১৮২৭ সালের কথা। পো-এর তখন আঠেরো বছর বয়স। ইচ্ছে কবিতা লিখে জগৎজয় করবেন। কিন্তু পকেটে রেস্ত নেই। এদিকে বাপ-মা মারা যাবার পর যে অ্যালান পরিবার তাঁর দেখাশোনা করত, তারাও বলল এবার পথ দ্যাখো। বেচারা পো এডগার পেরি নামে আমেরিকার সৈন্যদলে যোগ দিলেন। কিন্তু কবিতা লেখার নেশা তখনও কাটেনি। তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন নিজের কবিতার খাতাখানা। বোস্টন হারবারে মাসিক পাঁচ ডলার মাইনাতে কাজ পেলেন পো। সেই টাকা জমিয়ে সেই বছরই তাঁর কিছু কবিতার সংকলন প্রকাশের জন্য কেলভিন এফ এস থমাসকে ধরলেন। চল্লিশ পাতার এই বই মাত্র পঞ্চাশ কপি ছাপা হয়েছিল। মূল কবিতাটা ৪০৬ লাইনের। লর্ড বায়রনের স্টাইল অনুকরণ করে এশিয়ার বিখ্যাত বিজেতা তৈমুরলং-এর কাব্যগাথা। বইয়ের নাম ‘Tamerlane and Other Poems’। সঙ্গে আরও কিছু কবিতা। পো-এর প্রথম প্রকাশিত বইতে নিজের নাম অবধি দেননি তিনি। ‘বাই এ বোস্টোনিয়ান’ নামে ছাপা হয়েছিল সে বই।”

“হুম। বুঝলাম। কিন্তু এ তো দুশো বছর আগের গল্প। আজকের দিনে এই বইয়ের গুরুত্ব কোথায়?”

“কী বলছ হে তুর্বসু রায়?” বাক্স রহস্যের সিধুজ্যাঠার স্টাইলে বলে উঠল উর্ণা। ফেলুদা ওর ফেভারিট ডিটেকটিভ। সব বই মুখস্থ। “সারা বিশ্বে এখন মাত্র বারো কপি এই বইয়ের হদিশ পাওয়া গেছে। শেষ জানা কপিটা ক্রিস্টির নিলামের দোকানে কত টাকায় বিক্রি হয়েছে জানো?”

আবার পাশাপাশি মাথা নাড়লাম।

গালে একটা ঠোনা মেরে দিয়ে উর্ণা বলল, “জানো না তো জানো কী ডিটেকটিভ সাহেব? ফেলুদা হলে ঠিক বলে দিত। পাঁচ কোটি টাকা বুঝলে, পাঁ-আ-চ কোটি”, বলে হাতের পাঁচটা আঙুল আমার চোখের সামনে মেলে ধরল।

“তার মানে আজকে যদি সেই বইয়ের আর-এক কপির সন্ধান পাওয়া যায়?”

“তাহলে আমাদের পরের তিন প্রজন্মকে আর কিছু করেকম্মে খেতে হবে না। হেসেখেলে চলে যাবে।”

এই ‘আমাদের’ কথাটা আমার কানে বড্ড মধুর শোনাল। গলাটা অদ্ভুত গম্ভীর করে এবার একেবারে সিধুজ্যাঠাকে কোট করল উর্ণা, “গোল্ডমাইন, ফেলু, গোল্ডমাইন।”

তিন

—দেবাশিসদার সঙ্গে আপনার প্রথম আলাপ?

—২০১১-র ডিসেম্বরে। অহর্নিশ পত্রিকার একটা অনুষ্ঠান ছিল জীবনানন্দ সভাঘরে। সেখানে দেবাশিস এসেছিল বক্তৃতা দিতে। অসম্ভব সুন্দর বলেছিল। অনুষ্ঠান শেষে পত্রিকার সম্পাদককে বলে আমিই আগ বাড়িয়ে পরিচয় করি।

—কী নিয়ে বলেছিলেন?

—উনিশ শতকের কলকাতার মনোচিকিৎসা।

—তারপর?

—আসলে আমি তখন এম.এ. করছিলাম। ইতিহাসে। আমার স্পেশাল পেপার ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস, তাই দেবাশিসের বক্তৃতা শুনতে গেছিলাম। শোনার পর যখন আরও জানতে চাই, ও আমাকে ওর চন্দননগরের বাড়ি যেতে বলে। আমরা ফোন নম্বরও এক্সচেঞ্জ করি।

—আপনি গেছিলেন?

—হ্যাঁ, পরের হপ্তাতেই। এক রবিবার করে। ও আমাকে অনেক মেটেরিয়াল দিয়েছিল। সেখান থেকেই আমাদের ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়।

—আর বিয়ে?

—তিন মাসের মধ্যে। যাকে বলে ঝট মাঙ্গনি, পট বিহা। তখন যদি বুঝতাম… আসলে বাবা মারা গেছিলেন, মাও দেখলেন ছেলে ভালো। বিয়ে হয়ে গেল। তবে ঘটা করে কিছু হয়নি, জাস্ট কোর্ট ম্যারেজ। আমার মা, এক বান্ধবী, আর দেবাশিসের এক বন্ধু সাক্ষী দিয়েছিল।

—বিয়েটা কোথায় হয়েছিল?

—কলকাতাতেই। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে আমার পরিচিত এক ম্যারেজ রেজিস্ট্রার আছেন। বাণী রায়। তিনিই বিয়ে দিয়েছিলেন।

—দেবাশিসদা তো স্টেট আর্কাইভে চাকরি করতেন?

—হ্যাঁ, শেক্সপিয়র সরণিতে।

—কাজটা ঠিক কী ছিল জানেন?

—খুব মামুলি কাজ। ১৯৮০ সাল থেকে স্টেট আর্কাইভ বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষ বা পরিবারের ব্যক্তিগত সংগ্রহ নিজেদের আর্কাইভে রাখতে থাকে, অবশ্যই সে পরিবারের অনুমতি নিয়ে। দেবাশিস এই বিভাগেই কাজ করত।

—কত সাল থেকে কত সাল অবধি এই সংগ্রহ রাখা?

—১৮৫৯ থেকে ১৯৪৭, মানে ধরুন ওই সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে স্বাধীনতা অবধি।

—এখানে দেবাশিসদার কাজটা ঠিক কী ছিল?

—ধরুন কোনও বিখ্যাত ব্যক্তি বা তাঁর পরিবার তাঁদের সংগ্রহ আর্কাইভে দিতে চান। তাঁরা ডিরেক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনিই দেবাশিসকে দায়িত্ব দেন, দেখেশুনে, বেছে, ক্যাটালগ করতে…

—দাঁড়ান, দাঁড়ান… এই ডিরেক্টর কে?

-ওমা! উনিই তো সর্বেসর্বা। স্টেট আর্কাইভের মাথা…

—আচ্ছা, বুঝলাম। তারপর?

—দেবাশিস ওর কাজ নিয়ে খুব একটা উৎসাহী ছিল না কোনও দিন। বরং ও নিজের পড়াশোনা, লিটল ম্যাগাজিনে লেখালেখি, এসবে ডুবে থাকতে ভালোবাসত অনেক বেশি। বলত চাকরিটা নাকি জাস্ট পেট চালানো আর বই কেনার টাকা জোগাড়ের জন্য। চাকরির সঙ্গে ওর মনের যোগ ছিল না কোনও দিনই। তবে ২০১২-র শেষদিকে অবস্থাটা বদলে যায়।

—কীরকম?

—কোনও এক পরিবার থেকে তাদের পুর্বপুরুষের কোনও সংগ্রহ আর্কাইভে দেবার জন্য আবেদন করা হয়। দেবাশিস যায় দেখতে। ফিরে এসে ওর চোখমুখের অবস্থা দেখার মতো। চোখ যেন জ্বলছে। কোনও গুপ্তধনের সন্ধান পেলেও মানুষ এমন করে না। এখনও মনে আছে, সেই রাতে ও এক সেকেন্ড দুই চোখের পাতা এক করেনি। সারারাত অস্থিরভাবে হেঁটে বেড়িয়েছে।

—কারণ কিছু বলেছিলেন? মানে আপনি জিজ্ঞাসা করেননি?

—করেছিলাম। বলেছিল এমন একটা কিছু পেয়েছে, যাতে কলকাতার ইতিহাস বদলে যাবে চিরকালের মতো। কিন্তু শুধু তা নয়, আরও একটা জিনিস ছিল ওর চোখে, যেটা আগে কোনও দিন দেখিনি...

—কী সেটা?

—লোভ। ভয়ানক এক লোভ। আর সে লোভ জ্ঞানের লোভ না, অর্থের লোভ।

—সেটা কী করে বুঝলেন?

—নানা কথার মধ্যে বেশ কয়েকবার বলেছিল, তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আর কষ্ট করে এই ছোট্ট বাড়িতে থাকতে হবে না। সব ঠিকঠাক চললে আমরা কোটিপতি হয়ে যাব।

—আপনি জিজ্ঞাসা করেননি, উনি কী পেয়েছেন?

—না, আমি আসলে ওর কথাগুলো সিরিয়াসলি নিইনি। ওর বইপত্রের ব্যাপারে অদ্ভুত একটা অবশেসন ছিল। বিশেষ করে রেয়ার বইপত্রের ওপরে। আর তা নিয়ে অবলীলায় মিথ্যে কথাও বলত। আনাড়ি কেউ এলেই দেখাত ওর কাছে নাকি আসল হ্যালহেডের ব্যাকরণ, রামধন স্বর্ণালঙ্কারের কাঠখোদাইয়ের বই আছে। প্রচুর দামি। আসল কথা হল ওগুলো সব ফ্যাক্সিমিলি। নকল। হাজার টাকাও দাম না। কিন্তু বলত। বলেই আনন্দ। আমি প্রায়ই ওর বই গুছিয়ে দিতাম। একটা কাগজের টুকরো অবধি ফেলতে দিত না। সব নাকি রেয়ার, কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হবে। এই কোটির গল্প বিয়ের পরে এত শুনেছি যে, সেবার আর খুব একটা পাত্তা দিইনি।

—তারপর?

—তারপর থেকেই ও কেমন বদলে যেতে থাকে। খিটখিটে হয়ে যায়। কোনও দিন তালাচাবির হ্যাবিট ছিল না। একটা মোটা লাল ফাইলে কীসব কাগজ এনে ড্রয়ারে লক করে রাখে। কী জিনিস জিজ্ঞেস করতে খেঁকিয়ে উঠেছিল।

—আপনার কী মনে হয়? এই পরিবর্তনের পিছনে কী কারণ থাকতে পারে?

—আমি জানি না, সত্যিই জানি না। তবে আমার মনে হয় এই মিডিওকার জীবন ওর পছন্দ ছিল না। ও চাইত খ্যাতি, অর্থ, ক্ষমতা। কিন্তু ওর চাকরিতে সে সুযোগ ছিল না। কোনওভাবে ওর কাছে সে সুযোগ আসে। শুধু তাই না, ওর অন্য একটা চাহিদাও ছিল, সেটা পরে জেনেছি।

—কী?

—মানে... ও রেগুলার রেড লাইট এরিয়ায় যাওয়া শুরু করল। বদলটা আগেই চোখে পড়ছিল, মনের ভুল ভেবে এড়িয়ে গেছি। কিন্তু মেয়েরা বোঝে, জানেন... আমার প্রতি ওর ইন্টারেস্ট কমে যাচ্ছিল। রাতে আলাদা খাটে শুত।

—রেড লাইট এরিয়াটা জানলেন কী করে?

—ওর এক বন্ধু আমায় বলল। ফোন করে। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। পরে ও নিজে আমায় গাড়ি করে নিয়ে গিয়ে দেখাল ওই পাড়া থেকে বেরোচ্ছে...

—কোন পাড়া?

—বেশ্যাপাড়া। তবে আমাদের এই চন্দননগরের বেশ্যাপট্টিতে নিয়মিত যেত খবর পেয়েছি।

—এই বন্ধুটির নাম কী?

—মাপ করবেন। বলা যাবে না। আসলে আমি তার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমি নাম জানাব না।

—আপনি সরাসরি দেবাশিসদাকে প্রশ্ন করেননি? তিনি কেন এমন করছেন?

—অবশ্যই করেছি।

—তাতে উনি কী বললেন?

—প্রথমে চমকে গেল। ভাবতে পারেনি আমি জানতে পারব। তারপর বহুবার জিজ্ঞেস করল আমায় কে বলেছে? আমি নাম বলিনি। নাম জানার জন্য আমাকে অনেক চাপ দিয়েছে। মেরেওছে। বলিনি।

—কেন বলেননি?

—বলব কেন? তাহলে তো ও সাবধান হয়ে যাবে। আমিও আর খবর পাব না।

—যাই হোক, বলুন।

—বলার আর কী আছে? ও পাগলের মতো কিছু একটার পিছনে পড়ে ছিল। অন্য কোনওদিকে নজর ছিল না। আমার দিকেও না। একদিন বলতে গেলাম, যা বলল তাতে ওর সঙ্গে আর কথা বলার প্রবৃত্তি জাগেনি।

—কী বলেছিলেন?

—দেখুন, আপনি আমার চেয়ে ছোটোই হবেন। আমার বলতে বাধছে।

—বুঝতে পারছি। কিন্তু আপনি আমার অবস্থাটা বুঝুন। দেবাশিসদা খুন হয়েছেন। আমিও যে কোনও দিন খুন হয়ে যেতে পারি… এখন একটাই উপায় আমার কাছে। মরি কি বাঁচি, দেবাশিসদার খুনি আমাকে ধরার আগে, আমায় তাকে ধরতে হবে... আমাকে ছোটো ভাই ভেবেই বলুন...

—ও একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দেয়। বলে, ও নাকি আর আমার শারীরিক চাহিদা মেটাতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, যেহেতু আমি স্ত্রী আর আমার প্রতি ওর একটা দায়িত্ব আছে, তাই ওর এক বন্ধুর সঙ্গে আমি চাইলেই শুতে পারি। ওর কোনও আপত্তি নেই।

—আপনি কী বললেন?

—কী বলব? এক ঘণ্টার মধ্যে সুটকেস গুছিয়ে বাপের বাড়ি চলে এসেছি...

—দাঁড়ান, দাঁড়ান… কিন্তু আমি যে শুনেছিলাম উনি আপনাকে ওঁর বন্ধুর সঙ্গে শুতে বাধ্য করেছিলেন। শুধু তাই না, তার ছবিও তুলে রেখেছিলেন?

—এ মা!! ছিঃ... এই হল মুশকিল। আপনার কাছে একটু ভুল খবর গেছে। আমাদের ডিভোর্সের কেসে এই প্রসঙ্গটা উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু ছবি-টবি… ছিঃ। কে বলেছে আপনাকে?

—সে তো বলা যাবে না ম্যাডাম। ধরে নিন তিনিও আমার বন্ধু।

—তবে তিনি যার থেকে শুনেছেন ভুল শুনেছেন, বা নিজেই বাড়িয়ে বলেছেন। ছবি-টবি কিছু ছিল না।

—তারপর আর কোনও দিন দেবাশিসদার সঙ্গে কথা হয়নি?

—না। প্রবৃত্তি হয়নি। কোন এক চ্যালা জুটিয়েছিল। প্রায়ই সে আসত ওর কাছে। রাতের বেলায়।

—তার নাম জানেন?

—জানি না। জানার ইচ্ছে হয়নি।

—আপনার বর্তমান স্বামী…

—সুতনু? ও বেচারা মাটির মানুষ। আইটি-তে কাজ করে। সাতেও নেই, পাঁচেও নেই।

—এঁর সঙ্গে আপনার পরিচয়?

—স্কুলের বন্ধু ছিল। তবে দারুণ কিছু না। আমার এই ঘটনার পর যখন সেপারেশান চলে, তখন ও আবার ফেসবুকে যোগাযোগ করল। প্রচণ্ড মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছিল। ওই সেপারেশনের সময়ই আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ডিভোর্সের পরে বিয়ে করে নিই। আর এখন তো দেখতেই পাচ্ছেন...

—অভিনন্দন। কত মাস?

—পাঁচ হবে। আর কিছুদিন পর থেকে চলাফেরা রেস্ট্রিক্ট করে দেব। যাই হোক, আমি উঠি তবে? এই অবস্থায় এতদূর আসতাম না, নেহাত আপনি এমনভাবে বললেন, না করতে পারলাম না। ও হ্যাঁ, আর-একটা কথা জানিয়ে রাখি। আমার যখন সেপারেশান চলছিল, তখনও দেবাশিস আমায় শান্তি দেয়নি। আমার পিছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছিল। সে খবরও আমার কাছে আছে। লোকটাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম, কিন্তু কী অদ্ভুত দেখুন, ও মারা গেছে, আমার দুঃখ হবার কথা, হাজার হোক এককালের স্বামী তো… কিন্তু একটুও দুঃখ হচ্ছে না জানেন… আপনি হয়তো আমাকে খুব বাজে টাইপের মহিলা ভাবছেন…

—এ মা! না না। তা কেন হবে? আপনার জায়গায় থাকলে যে কেউ এমনটাই করত। আপনি এসব ভাববেনই না। এখন আপনার শরীর ভালো না। মন খুশি রাখুন। আপনাকে এতটা কষ্ট দিলাম বলে সরি। কিন্তু অনেক অনেক ধন্যবাদ...

—না, না, ঠিক আছে ঠিক আছে… আচ্ছা আমি তো আপনাকে কোনও দিন দেখিনি। দেবাশিসের সঙ্গে আপনার পরিচয় হল কীভাবে, সে গল্পটা তো শোনা হল না?

—সে আর-একদিন বলব। আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে… আপাতত জেনে রাখুন একটা কেসের ব্যাপারেই…

—আর একটা কথা—

—বলুন

—আমাদের এই দেখা করা নিয়ে কেউ যেন কিচ্ছু না জানে। আমার স্বামী আমাকে একটা নতুন জীবন দিয়েছেন। দেবাশিসের মৃত্যুর পর পুলিশ ফোন করেছিল, তাতেই ও একটু আপসেট। ও যদি জানে আমি আবার সেই জীবনকে রিলিভ করছি, তবে বড্ড দুঃখ পাবে। প্লিজ কাউকে বলবেন না। আপনি এত করে অনুরোধ করলেন, তাই এলাম।

—কথা দিচ্ছি দিদি, বলব না। আপনি চলে যান। শরবতের দাম আমি দিয়ে দেব।

প্যারামাউন্টে দুটো ডাব শরবতের দাম মিটিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম। এবার যেতে হবে স্টেট আর্কাইভে। ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে।

চার

স্টেট আর্কাইভের ডিরেক্টরের দেখা পাওয়াটা আরও কঠিন হতে পারত, কিন্তু এখানে একটা সুবিধে হল। উর্ণার কোনও এক মাসিও নাকি ওখানেই কাজ করেন। উনিই আমার সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দিয়েছেন। শেক্সপিয়র সরণিতে বিরাট নীল-সাদা বিল্ডিং। তিনটেয় সময় দিয়েছিলেন। যেতে যেতে প্রায় সাড়ে তিনটে হয়ে গেল। ভেবেছিলাম ভদ্রলোক রেগে যাবেন, কিন্তু কার্ড দিয়ে ঘরে মুখ বাড়াতেই একগাল হেসে “আসুন আসুন” বলে ডেকে নিলেন। চা-ও অফার করলেন। বুঝলাম ওঁর কাজের চাপ এখন বেশি নেই।

“অরুণ, তুমি একটু বিশুকে চা দিয়ে যেতে বলো তো”, বলে আমার দিকে ফিরলেন ভদ্রলোক। বাইরে নেমপ্লেটে নাম দেখেছি। প্রশান্ত মজুমদার।

—আমাকে আপনার কথা শর্মিষ্ঠা বলল। ও কে হয় আপনার?

—সত্যি বলতে কী, আমার সঙ্গে পরিচয় নেই। আমার বাড়িওয়ালার আত্মীয় উনি।

—অ। তা আমি কীভাবে হেল্প করতে পারি?

—দেবাশিস গুহকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছিল।

—সে তো পুলিশ এসেছিল। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে জেরা করে গেছে। অফিসের অনেকের সঙ্গেই কথা বলেছে। আবার আপনি কেন?

—আজ্ঞে আমার সঙ্গে পুলিশের কোনও বিরোধ নেই। আমরা একসঙ্গেই কাজ করছি ধরে নিতে পারেন। আসলে দেবাশিসদা আমার কাছের মানুষ ছিলেন। তাঁর খুনটা মেনে নিতে পারছি না। তাই আমিও...

—ওহহ। ভালো, ভালো। আমি আগে কোনও দিন কোনও প্রাইভেট ডিটেকটিভ দেখিনি, জানেন! এত বছরে এই প্রথম। তা বলুন, কী জিজ্ঞাসা করবেন?

—২০১২ সালের শেষের দিকে দেবাশিসদাকে কোনও একজনের ব্যক্তিগত সংগ্রহ পরীক্ষা করে আর্কাইভ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই সংগ্রহটা কার বা কী, সেটা জানার উপায় আছে?

—২০১২? সে তো অনেকদিন আগের কথা। তখন তো আমি এই চেয়ারে ছিলামও না। ডিরেক্টর মিসেস সেনের রিটায়ার করার পর সামুইবাবু চার্জে ছিলেন…

—আপনি কিছুই বলতে পারবেন না?

—না, না, তা কেন? ২০১২-তে আমি তখন চিফ আর্কাইভিস্ট। দেবাশিসের সঙ্গে ভালোই আলাপ ছিল। কিন্তু অনেকদিন তো হয়ে গেল। দাঁড়ান...

বলেই আবার সেই অরুণ নামের লোকটিকে ডেকে বললেন ২০১২-১৩ সালের অ্যাকুইজিশান খাতা নিয়ে আসতে। বিশু ততক্ষণে চা দিয়ে গেছে। দুধ ছাড়া লাল চা। সেই চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মজুমদার সাহেব একটা কাষ্ঠহাসি হাসলেন।

—দেবাশিস ছেলেটা খারাপ ছিল না। প্রচুর পড়াশোনা করত। কাজ বুঝত। কিন্তু হাই অ্যাম্বিশান ছিল। প্রায়ই বলত, এসব ছেড়েছুড়ে একদিন ঠিক বেরিয়ে যাব দেখবেন মজুমদারদা। শেষের দিকে অবশ্য নিয়মিত অফিস করত না। লেটে আসত। আসলে ফ্যামিলিতে একটু প্রবলেম ছিল, জানেন নিশ্চয়ই। কিন্তু তা বলে খুন হয়ে যাবে, সেটা কোনও দিন ভাবিনি। এই তো, খাতা নিয়ে এসেছে।

অরুণ বগলে মোটা একটা খাতা নিয়ে ঢুকে গেছে। ডিরেক্টর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “২০১২-র কোন মাস বলতে পারবেন?”

—শেষের দিকে, আপনি অক্টোবর থেকে দেখুন।

—অক্টোবর… অক্টোবরে কিছু নেই। নভেম্বর… নভেম্বর… হ্যাঁ এই তো, নভেম্বরের ৩০ তারিখ বেশ কিছু জিনিস অ্যাকোয়ার করা হয়েছে। এই যে দেবাশিসের সই। দাঁড়ান, ডিসেম্বরটাও দেখে নিই। নাহ... এটাই হবে... এই যে...

খাতায় তাকিয়ে আমি মাথামুন্ডু কিছু বুঝলাম না। সরকারি খাতা বোঝা আমার সাধ্য নেই। তাই খুব বিনীতভাবে বললাম, “যদি কোথা থেকে আর কী সংগ্রহ করা হয়েছিল বলেন…”

—হুঁ। এবার মনে পড়ছে। মলয় কৃষ্ণ দত্ত, মানে হাটখোলার দত্তবাড়ির বংশধর। বোধহয় সব বেচে দিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছিল। ঠাকুরদার বাবার কিছু জিনিস দিয়ে যেতে চেয়েছিল।

—হাটখোলার দত্ত মানে?

—আপনি হাটখোলার দত্তদের নাম শোনেননি! বিরাট বনেদি বংশ মশাই। আমি অত কিছু জানতাম না। দেবাশিসের থেকেই শুনেছি। চিঠিটা ওরা তখনকার ডিরেক্টরকে করেছিল। উনি আমাকে মার্কা করে দেন। আমার থেকে চিঠিটা দেখে দেবাশিস জানায় যে ও নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অ্যাকুইজিশান করবে। তখনই এদের পরিবারের গল্প শুনি...

—কী গল্প?

—ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পাটনা গুদামের আমদানি-রপ্তানি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন দেওয়ান জগৎরাম দত্ত। উনিই হাটখোলায় এঁদের আদি বাড়িটা তৈরি করেন। তাঁর দাদু রামচন্দ্র দত্তও ছিলেন কোম্পানির মুৎসুদ্দি। রাজনৈতিক কারণে গুপ্তঘাতকের হাতে তাঁকে খুন হতে হয়। ৭৮, নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে এঁদের আদি বাড়িকে কিছুদিন আগেও লোকে পাখিওয়ালা বাড়ি বলত। প্রচুর পাখি ছিল এই বাড়িতে। এঁদের আদিপুরুষ নাকি পুরুষোত্তম দত্ত। আদিশূরের আমন্ত্রণে কৌলঞ্চ থেকে বাংলায় আসেন। কলকাতার ইতিহাস রচয়িতা প্রাণকৃষ্ণ দত্তও এঁদের বংশেরই ছেলে। তবে বড়ো বংশে যা হয়, এখন হাজার হাজার শাখাপ্রশাখা। কেউ কারও খবর রাখে না। সবাই নিজের নিজের মতো বাড়ি করেছে। কেউ বিদেশে থাকে, কেউ অন্য রাজ্যে, তবে দুর্গাপুজোটা কিন্তু এখনও নিয়ম করে হয়। ২০০ বছরের পুরোনো দুর্গাপুজো। ভাসানের দিন নীলকণ্ঠ পাখি ছাড়ে… জানেন না?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখেছিলাম বটে টিভিতে।

—ওই বাড়ি।

—ও। তা ইনি কোন জন? যার জিনিসপত্র অ্যাকোয়ার করা হল?

—ইনি এক আশ্চর্য মানুষ। আমাদের পোড়া দেশে নাম পেলেন না। ইনি ছিলেন সেসময়ের নামকরা ডাক্তার। ডাক্তার গোপালচন্দ্র দত্ত। মহেন্দ্রলাল সরকারের ছাত্র। প্রথমদিকে মেডিক্যাল কলেজে শব ব্যবচ্ছেদ বিভাগে কাজ করতেন। পরে নিজেই মানসিক রোগীদের নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁর অধ্যবসায় ফল দেয়। প্রথমে দেশি পাগলদের জন্য তৈরি ডালান্ডা হাউসের দায়িত্বে তাঁকে দেওয়া হয়, পরে ভবানীপুরে সাহেবদের পাগলাগারদের সুপার হয়ে নাকি রিটায়ার করেছিলেন। তখনকার দিনে খুব কম নেটিভই এমন সুযোগ পেতেন।

—বাপরে! দারুণ ব্যাপার তো! তাঁর কী কী জিনিস অ্যাকোয়ার করা হয়েছিল?

—দাঁড়ান দেখি। লিস্ট আছে। এই তো, একটা ছবির খাতা, বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য বই, একটা ভার্নাকুলার ম্যানুস্ক্রিপ্ট, আর মিসেলেনিয়াস...

—ভার্নাকুলার ম্যানুস্ক্রিপ্ট মানে?

—বাংলায় লেখা পাণ্ডুলিপি।

—কীসের ওপরে?

—তা তো লেখা নেই। যা আছে তাই বলছি।

—এগুলো কি খুব জরুরি? মানে বই বাদে যা যা বললেন...

—দাঁড়ান। সঙ্গে একটা নোটশিট আছে। তাতে লেখা আছে এগুলো কেন অ্যাকোয়ার করা হল। এই তো, ছবির খাতাটা হল তখনকার দিনে করা অ্যানাটমি স্টাডি, বইগুলো তো রেয়ার বুকস লেখা, ম্যানুস্ক্রিপ্টের নোটে কী লেখা আছে শুনুন, পড়ছি, “দি আননেমড ম্যানুস্ক্রিপ্ট ইজ এ ক্রনিকল অফ নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরি পোলিশ ইনভেস্টিগেশান”, মানে উনিশ শতকের কোনও পুলিশি তদন্তের কাহিনি। পাশে আবার পেনসিল দিয়ে দেবাশিস কী যেন লিখেছে, অনাথ? দেখুন তো, ঝাপসা হয়ে গেছে।

আমি দেখলাম। পেনসিলের লেখা অনেক জায়গায় উঠে গেছে। যা দেখা যাচ্ছে তা হল ….anath!!

—আচ্ছা, এই মিসেলেনিয়াসে কী ছিল?

—দাঁড়ান, নোট দেখি। হ্যাঁ, এই যে লেখা আছে। ওল্ড মেডিক্যাল রিপোর্ট, অটোপ্সি রিপোর্ট, লেটারস অ্যান্ড সাম পেজেস অফ এ ডায়রি।

আমি ভিতরে ভিতরে তখন প্রায় কাঁপছি।

—কার ডায়রি, কিছু লিখেছে?

—নাহ। তবে বিখ্যাত কারও হবে। নইলে সংগ্রহে রাখা হল কেন?

—আপনি জিজ্ঞাসা করেননি?

—আসলে তখনকার ডিরেক্টর সাহেব ওঁকে খুব ভালোবাসতেন। দেবাশিস সরাসরি ওঁকেই রিপোর্ট করত। আমি তাই আর নাক গলাইনি।

—ওঁর সঙ্গে কথা বলা যাবে?

—এই একটা ব্যাপারে আমি আপনাকে হেল্প করতে পারব না। সামুইবাবু গতবছর হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। তার আগেই রিটায়ার করেছিলেন অবশ্য।

—একটা অনুরোধ। আমি ওই ম্যানুস্ক্রিপ্ট আর ডায়রির পাতাগুলো দেখতে চাই।

—তাহলে একটু সমস্যা আছে। আপনাকে একটা চিঠি করতে হবে। আমাকেই। আমি অ্যাপ্রুভ করে দিলে আমাদেরই কারও সঙ্গে গিয়ে আপনাকে দেখতে হবে। কিছু নোট করার হলে করবেন। কিন্তু নিতে পারবেন না।

—অনেক ধন্যবাদ। আমি এক্ষুনি চিঠি লিখে দিচ্ছি।

—দিন তবে। আর এই অরুণের সঙ্গে চলে যান। ও আপনাকে দেখাবে।

—শেষ প্রশ্ন। দেবাশিসদা কি আপনার কাছে কিছু গচ্ছিত রেখে গেছিলেন?

—আরে বাবা না বলেছি তো… ওঁর সঙ্গে এতটাও ঘনিষ্ঠতা ছিল না আমার। আমার কাছে গচ্ছিত রাখতেই বা যাবে কেন? আপনি অরুণের সঙ্গে যান। একটা চিঠি করুন। তারপর যা দেখার দেখে নিন। আমাকে একটু কাজ করতে হবে।

এরপর আর বসা যায় না। হঠাৎ মজুমদার সাহেবের মেজাজ বিগড়াল কেন কে জানে!

চিঠি লিখে পারমিশান আসতে আসতে আধা ঘণ্টা লাগল। অরুণ বলে ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে চললেন অ্যানেক্স রুমে। সারি সারি আলমারি গাদাগাদি করে রাখা। এর কোনোটার মধ্যেই আছে জিনিসগুলো। অরুণবাবুর হাতে একটা কাগজ। তাতে আলমারি আর ফাইলের নম্বর লেখা। ভুলভুলাইয়ার মতো গলিঘুঁজি ঘুরে অবশেষে একটা আলমারির সামনে দাঁড়ালাম আমরা। আলমারির গায়ে একটা নম্বর সাদা পেন্ট দিয়ে লেখা। অরুণবাবু প্রথমে সেই নম্বর মেলালেন। তারপর “এই আলমারি” বলে চাবি দিয়ে খুলে “কোন মাস যেন, নভেম্বর, তাই তো?” বলে নিচের দিক থেকে বার করলেন বড়ো একটা কাঠের বাক্স।

পাশেই একটা টেবিল; তার ওপরে রেখে এবার কাগজের সঙ্গে বাক্সের নম্বর মেলালেন তিনি।

—এটাতেই আছে সেই ম্যানুস্ক্রিপ্ট আর ডায়রির কাগজ।

বাক্স খুলতেই সুন্দর ছোটো ছোটো হাতে লেখা খুব পুরোনো একটা কাগজের বান্ডিল দেখতে পেলাম। লাল সুতো দিয়ে বাঁধা। বেশ মোটা। ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পেলে প্রায় একটা উপন্যাসের সমান হবে। হাতে তুলে নিয়ে প্রথমেই একটু অদ্ভুত লাগল। কেন জানি না। আমি পড়তে শুরু করলাম। লেখা আছে—

“যে সকল রোমহর্ষণকারী হত্যাকাণ্ডের নায়ক স্থির হয় না, অথবা যে সকল মোকদ্দমার হত্যাকারী পলায়িত অথবা লুক্কায়িত থাকেন, ঈশ্বর জানেন কেন সেই সকল মোকদ্দমা সন্ধানের ভার আমারই হস্তে পতিত হয়। ভুল বলিলাম। পতিত হইত। দীর্ঘ তেত্রিশ বৎসর সুনামের সহিত কলিকাতা ডিটেকটিভ পুলিশের কার্য সুষ্ঠুভাবে নির্বাহ করিয়াছি। আজই আমি কর্ম হইতে অবসর গ্রহণ করিলাম। এতকাল যে সকল মোকদ্দমার কিনারা করিতে সমর্থ বা সময় সময় অকৃতকার্য হইয়াছি, তাহা অনেক সময় দারোগার দপ্তরে প্রকাশ করিতাম।”

মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে এল, “প্রিয়নাথের শেষ হাড়!”

প্রথম পাতা পড়ে দ্বিতীয় পাতা পড়তে যাব, সুতো দিয়ে বাঁধা। অরুণবাবু বেশ গাঁইগুঁই করছিলেন। সুতো খোলার নিয়ম নেই, যা দেখার তাড়াতাড়ি দেখুন, পাঁচটা বেজে গেছে, অফিস টাইম শেষ ইত্যাদি, কিন্তু আমি তেমন পাত্তা না দিয়ে একটানে খুলে ফেললাম সুতোর গিঁট। বোধহয় কিছু ভুল হয়েছিল। হাত ফসকে ঝরঝর করে পড়ে গেল পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো। কিন্তু এ কী! এতক্ষণে বুঝলাম শুরুতেই কেন অদ্ভুত লেগেছিল। প্রথম পাতা বাদে প্রতিটা পাতা একেবারে চকচকে নতুন, আর ধবধবে সাদা। গোটা বাক্সে আর কিচ্ছুটি নেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%