উত্তরখণ্ড— সমাধান

কৌশিক মজুমদার

প্রথম পর্ব— মনোসরণি

আজ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে বেশ সাজসাজ ব্যাপার। বছর শেষের দিন। ক্যালকাটা মেডিক্যাল সোসাইটির বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হবে আজ। ১৮৭৯ সালের ২৪ নভেম্বর স্থাপিত হওয়া এই সোসাইটির প্রথম সভাপতি ছিলেন ডি.বি.স্মিথ। দারুণ মানুষ। নেটিভদের মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ যাতে ছড়িয়ে পড়ে সেদিকে তাঁর নজর ছিল প্রথম থেকেই। মূলত তাঁর উদ্যোগেই শুরু হয় এই বার্ষিক সভা। ১৮৮০-তে শুরু হয়ে এবছর এই সভা বারো বছরে পড়ল। শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্ররাই না, বিজ্ঞানে উৎসাহী মানুষ মাত্রই এই সভায় যাবার জন্য মুখিয়ে থাকেন। যাঁরা অনুমতি পান না, তাঁরা চেষ্টা করেন সভার রিপোর্ট জোগাড় করার। এই বছরের সভায় একেবারে শেষের দিকে বসে আছেন আমাদের পরিচিত দুজন। বাঙালি ভদ্রলোকটি একটু উশখুশ করছেন। এ জাতীয় সভায় বসে থাকার চেয়ে অপরাধীর পিছু ধাওয়া করতেই তিনি অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। পাশে ফ্রক কোট পরা নাক লম্বা সাহেবটি অনেকক্ষণ ধরে কী যেন পড়তে ব্যস্ত। সভা এখনও শুরু হয়নি। তাঁরা এসেছেন একটাই কারণে। আলোচনার বিষয়বস্তু। আজকের মূল আকর্ষণ ডাক্তার গোপালচন্দ্র দত্তের ভাষণ। মনোবিজ্ঞানের নতুন দিক নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। এই গোপালচন্দ্রকে কিছুক্ষণের জন্য দেখেছিল প্রিয়নাথ, সেই লাশকাটা ঘরে। কিন্তু তাঁর ভাষণ শুনতে আসার কী দরকার, তা প্রিয়নাথের মাথায় ঢোকেনি। টমসন সাহেব এদিকে তাকে নির্দেশ দিয়েছেন সাইগারসনের সঙ্গে সঙ্গে থাকার।

খানিক এদিক-ওদিক তাকিয়ে আর না পেরে প্রিয়নাথ জিজ্ঞাসা করল, “কী পড়ছেন সাহেব?”

সাহেব যেন শুনতেই পাননি।

আর-একবার জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও চুপ করে গেল প্রিয়নাথ। একটা ছোট্ট পাতলা বই। মলাটে লেখা সাদার্ন লিটেরারি ম্যাগাজিন, রিচমন্ড ভার্জিনিয়া। বইটি বেশ প্রাচীন। পাতা হলুদ হয়ে এসেছে। সাহেব এর মধ্যে কী পেয়েছেন কে জানে, ডুবে আছেন পুরোপুরি। এদিকে মঞ্চসজ্জা চলছে। অনুষ্ঠান শুরু হতে খানিক সময় বাকি। বই থেকে মাথা উঠিয়ে সাইগারসন বললেন, “আপনি ব্যারন ভন কেম্পেলেনের নাম শুনেছেন?”

মাথা নাড়ল প্রিয়নাথ। শোনেনি।

“উলফগ্যাং ভন কেম্পেলেন ছিলেন হাঙ্গেরির ইঞ্জিনিয়ার। তবে পেশায় রানি মারি থেরেসার পরামর্শদাতা। একবার ১৭৬৯ সালে এক ফরাসি জাদুকর চুম্বকের নানা খেলা দেখিয়ে রানিকে চমকে দেয়। তখন ব্যারন বলেন যে তিনি হাতে সময় পেলে মাত্র ছয় মাসে এর থেকে অনেক ভালো খেলা বানাতে পারবেন। বানালেনও।”

“কী সেটা?”

“একটা পুতুল। অটোমেটিক। পুতুলটার মাথায় পাগড়ি, এক হাতে লাঠি, অন্য হাত দাবার বোর্ডে। পুতুলের নাম তুর্কি। কেউ চাল দিলে পুতুলটা ফিরতি চাল দেয়। চেনা চেনা লাগছে?”

“এ কী!! এ তো…”

“তৈমুর। তাই তো? অনেকটা তাই। আবার তা নয়ও। কেম্পেলেনের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলের বন্ধু যোহান মেলজেল এই পুতুলের কারুকাজ জেনে নেন। আর একটু অদলবদল করে আমেরিকায় মেলজেল’স চেজ প্লেয়ার নামে এর খেলা দেখাতে থাকেন। তখনকার দিনে সব জাদুকরের কাছে এই পুতুল একরকম বিস্ময়ই ছিল। অনেকেই চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কেউ এর রহস্যভেদ করতে পারেননি। শেষে ১৮৩৬ সালের এপ্রিল মাসে এই ম্যাগাজিনে Mäelzels’s Chess Player নামের এক প্রবন্ধে এক ভদ্রলোক রীতিমতো গবেষণা করে এই পুতুলের রহস্য ফাঁস করেন। এই সেই লেখা…” বলে প্রিয়নাথের সামনে বইটা মেলে ধরলেন সাইগারসন।

“আরেহ! এডগার অ্যালান পো! ইনি তো...”

“হ্যাঁ, দ্যুপঁ নামে এক গোয়েন্দাকে নিয়ে কিছু গল্প লিখেছেন বটে। খুব একটা সুবিধার না। দুপ্যঁ একটাই কায়দা জানত, অনেকক্ষণ চুপ থেকে আচমকা একটা কথা বলে বন্ধুকে চমকে দেওয়া। কিছু যুক্তিবুদ্ধি ছিল বটে, কিন্তু পো যতটা দেখিয়েছেন, ততটাও না। বরং এই লেখাটা বেশ ভালো। পো একের পর এক ছবি দেখিয়ে প্রমাণ করেছেন যে এই যন্ত্র আদৌ স্বয়ংক্রিয় না, এর ভিতরে মানুষ থাকে। কীভাবে থাকে সেটাও ডায়াগ্রাম এঁকে বুঝিয়েছেন। এই দেখুন…”

“ঠিক এটাই তো সেদিন তারিণী আমাদের বলল!”

“ভুল বলছেন। তারিণী বলেনি। বলেছে ওর সেই জাদুকর বন্ধু। তবে একবারমাত্র মঞ্চে দেখে যে প্রায় সত্তর বছর ধরে চলে আসা ধাঁধার সমাধান করে দেয়, সে বড়ো সাধারণ জাদুকর নয়!”

“তৈমুরের প্ল্যানটা কার?”

“কার্টারের। আমি যে বইটা পাঠ করি, ওটা কার্টারই আমায় দিয়েছিল। লেখকের নাম নেই। তবে প্রথম পাতায় সই আছে E.A. Poe। আমার বিশ্বাস ছিল ওটাও পো-র লেখা। কিন্তু নিশ্চিত ছিলাম না। এই ম্যাগাজিনেও দেখুন, শুরুতেই পো-র সই। কোনও কারণে পো-র ব্যক্তিগত সংগ্রহ কার্টারের হাতে আসে। সেখান থেকেই ও তৈমুরের আইডিয়া পায়।”

“পো-র বই কার্টার পেল কীভাবে?”

“পো প্রায় কপর্দকশূন্য হয়ে মারা যান। তাঁর সব জিনিস আমেরিকার চোরাবাজারে জলের দরে বিক্রি হয়ে যায়। রবার্ট হুডিন সেই সময় আমেরিকায় ম্যাজিক দেখাচ্ছেন। উনিই এসব নিয়ে এসেছেন। আর ওঁর মৃত্যুর পরে এরা কার্টারের দখলে আসে।”

“কিন্তু এই ম্যাগাজিন আপনার কাছে!”

একটা চোরা হাসি ফুটে উঠল সাইগারসনের মুখে। “জানি না, বলা উচিত হবে কি না, গতকাল রাতে আমি কার্টারের ঘরে ঢুকেছিলাম। ঘরটা পুলিশ সিল করে দিয়েছে জানি। তবে তাতে আমার খুব একটা অসুবিধে হয়নি। ঘরে একটা সিন্দুকে এই ম্যাগাজিনটা পেলাম। আর এই ম্যাগাজিনের মধ্যেই ছিল আসল জিনিসটা।”

“আসল জিনিস? সেটা আবার কী?”

“দাঁড়ান দেখাই”, বলে সাইগারসন কোটের পকেটে হাত ঢোকাতে না ঢোকাতে চারিদিকে হাততালির আওয়াজ। মঞ্চ তৈরি। অনুষ্ঠান এখুনি শুরু হবে।

“পরে দেখাচ্ছি”, বলে সাইগারসন আবার সেটা পকেটেই গুঁজে রাখলেন।

মঞ্চে একে একে উঠে এলেন মার্টিন সাহেব, উইলসন সাহেব আর গোপালচন্দ্র। দুই সাহেবকে প্রিয়নাথ চিনত না। সাইগারসন চেনালেন। এই মার্টিন সাহেব নাকি সম্পর্কে টমসন সাহেবের ভগ্নীপতি। এতদিন টমসনের কাছে থেকেও প্রিয়নাথ জানত না।

শুরুতেই তাঁর বক্তব্য রাখলেন মার্টিন সাহেব। ক্যালকাটা মেডিক্যাল সোসাইটির স্থাপন, ইতিহাস, উদ্দেশ্য নিয়ে নানা কথা বলার পর নিজেই বললেন, “আজকাল আমি আর সোসাইটির কাজে মন দিতে পারি না। একদিকে মেডিক্যাল কলেজ, অন্যদিকে ভবানীপুর আর ডালান্ডা হাউসের দায়িত্ব সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। তবু আমি সোসাইটিকে ধন্যবাদ দেব, তাঁরা নিরন্তর তাঁদের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মেডিক্যাল কলেজের সার্জিক্যাল বিভাগের দায়িত্ব দারুণভাবে সামলাচ্ছেন ডাঃ উইলসন। তিনি এবং তাঁর ছাত্ররা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক নিয়ে যে গবেষণা চালাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।” মার্টিন বেশি কিছু বললেন না। বোঝা গেল তিনি কোনও কারণে একটু অন্যমনস্ক। খুব সাদামাটা ভাবে গোপালচন্দ্রের পরিচয় দিলেন। এটাও বললেন, গোপাল সার্জিক্যালের ছাত্র হলেও মনোবিদ্যা নিয়ে ভালোই কাজ করছে। শেষে বললেন, “আমার অবর্তমানে এরাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমি আর বেশিদিন এই পদে থাকছি না। আমার শরীর ভালো না, আমি আগামী মাসেই বিলেত ফিরে যাব। তবে আমার থাকা না-থাকাতে কিছু হবে না। বিজ্ঞান এবং সত্যের জয় হবেই।”

এরপরেই বলতে উঠল গোপালচন্দ্র। সে উঠতেই নেটিভ ছাত্রদের এক অংশ হাততালি দিয়ে উঠল। গোপাল তাহলে বেশ জনপ্রিয়, প্রিয়নাথ ভাবল। সামান্য ভদ্রতাসূচক ধন্যবাদ দিয়েই গোপাল নিজের গবেষণার বিষয়ে বলতে শুরু করল। তার বিষয় মনোরোগে সার্জারির ভূমিকা। সে শুরুই করল এই বলে, “মানুষ পাগল কেন হয়? লন্ডনের বিখ্যাত পাগলাগারদ বেডলামে রবার্ট হুক, রিচার্ড কিং সহ বিভিন্ন বিজ্ঞানী এই বিষয়ে একমত হয়েছেন যে মানব রক্তে হিউমর নামে একটি বস্তুর পরিমাণ বেড়ে গেলে রক্ত গরম হয়ে যায়। বিশেষ করে মস্তিষ্কের রক্ত। এই সমস্যা যেমন এদেশি নেটিভদের, তেমনি ইউরোপীয়দেরও। ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রে ভয় বেশি, যেহেতু তাঁরা এই দেশের তাপমাত্রায় অভ্যস্ত নন। রক্ত গরম হয়ে গেলে মানুষ উত্তেজিত হয়ে যায়, রেগে যায় এবং এমন সব কাজ করে যা সুস্থ মানুষ করে না। এর কোনও ওষুধ নেই। উপায় একটাই। অস্ত্রোপচার। ইউরোপে বহু আগে থেকে ট্রেপ্যানিং নামে একটি অস্ত্রোপচার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। এতে একটি ড্রিল দিয়ে রোগীর মাথায় প্রথমে একটি ছোটো ফুটো করে দেওয়া হয়, যাতে গরম রক্ত থেকে হিউমরের বাষ্প বেরিয়ে যেতে পারে। অনেক সময় এতেই কাজ হয়। না হলে ছিদ্রের মাপ বাড়াতে হবে। এই ছিদ্রটি করতে হবে ক্রেনিয়াম বরাবর। কিন্তু আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে চাইছি। আমি চাই আগে রোগীর মস্তিষ্কের ঠিক কোথায় সমস্যাটা সেটা নির্ধারণ করা হোক। যদি নির্ধারিত জায়গাটি চিহ্নিত হয়, তবে সেই ফুটো দিয়ে মস্তিষ্কের সেই অংশটা কেটে ফেলে দিলেই রোগী সুস্থ হয়ে যাবে। মস্তিস্কের কর্টেক্স অংশ, যা আমাদের যুক্তিবুদ্ধি নির্ধারণ করে, সেই অংশই এই অস্ত্রোপচারের আদর্শ স্থান। শুনেছি বেডলামে কিছু কিছু চিকিৎসক এই ধরনের কাজ করছেন। ভারত তথা এশিয়ায় এ ধরনের কাজ আজ অবধি হয়নি। আমরা বেডলামের ধাঁচে ডালান্ডা হাউসে এই পরীক্ষা করতে শুরু করেছি। আপনাদের জানাই ইতিমধ্যে দুজন রোগীর ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া গেছে।

আগে একটা সমস্যা ছিল। খুলি ফুটো করার ব্যথা অনেকে সহ্য করতে পারত না। অপারেশন টেবিলেই মারা যেত। আমরা সৌভাগ্যবান, ইদানীং ক্লোরোফর্ম নামে এক আশ্চর্য রাসায়নিক আবিষ্কার হয়েছে, যাতে রোগীকে অপারেশনের সময় অজ্ঞান রাখা যায়।”

প্রায় এক ঘণ্টা বক্তৃতা দিল গোপালচন্দ্র। এবার প্রশ্ন-উত্তরের পালা। উঠে দাঁড়াল এক নেটিভ ছাত্র। গোপালকে অভিনন্দন জানিয়ে সে বলল, “কিন্তু ডাক্তার দত্ত, একটা ব্যাপার বলুন, ইদানীং নাকি বেডলামে অন্য একটি ব্যবস্থাতেও রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে। ১৬৬৭ সালে জঁ ব্যাপ্তিস্তে ডেনিস প্রথম এই পদ্ধতিতে পাগলদের চিকিৎসার কথা বলেন। এতে নাকি হিউমর দূর করার জন্য বারবার খুলি ফুটো বা অস্ত্রোপচারের দরকারই নেই। রোগীর দেহের রক্ত পুরো বার করে অন্য রক্ত পুরে দিলেই রোগী সুস্থ হয়ে যাবে। ডেনিস নিজে পনেরো বছরের একটা ছেলের রক্ত বদলে ভেড়ার রক্ত দিয়ে তাকে সারিয়ে তুলেছিলেন। তারপরেও নাকি অনেক রোগী সুস্থ হয়েছেন। আপনি আপনার বক্তব্যে তো এই নিয়ে একটা কথাও বললেন না…”

আগুনে যেন ঘি পড়ল। প্রিয়নাথ স্পষ্ট বুঝতে পারল গোপালচন্দ্র রাগে জ্বলে উঠেছে।

“আপনি জানেন ডাঃ কৈলাসনাথ গুপ্ত, যে, এই কথার জন্য আপনি গ্রেপ্তার অবধি হতে পারেন? ব্লাড ট্রান্সফিউশান বা রক্ত পরিবর্তন একটা অপবিজ্ঞান এবং প্রমাণিত অপবিজ্ঞান। আপনার কি মনে হয়, আমি ডেনিসের কথা জানিই না? কিন্তু আপনি কি জানেন, তারপরে ডেনিস একই পদ্ধতিতে আরও দুজনের চিকিৎসা করেন, যারা দুজনেই মারা যায়! রক্ত এমন একটা পদার্থ, যেটা যার যার নিজস্ব। একজনের রক্তের সঙ্গে অন্যজনের রক্ত মেশে না। মিশলেও তা কাকতালীয়। রক্ত সমীক্ষার এই পদ্ধতিতে মৃত্যুর হার এতটাই বেশি যে স্বয়ং ইংরেজ সরকার বাহাদুর একে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। আর আপনি এই বিজ্ঞানের সারস্বত মঞ্চে এইসব অপবিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করছেন? ধিক আপনাকে!”

মার্টিন সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তাঁর শরীর খারাপ লাগছে। তিনি সকলের থেকে ক্ষমা চেয়ে মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন। সভাও আর বেশিক্ষণ চলল না। প্রিয়নাথ সাইগারসনের দিকে চেয়ে দেখল তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করছে। চোয়াল দৃঢ়। মনে হল অনেকক্ষণ ধরে কিছু একটা খুঁজছিলেন, পেয়ে গেছেন।

যেন সামনের বাতাসকেই বলছেন, এমনভাবে সাইগারসন বলে উঠলেন, “পল কিথ ফিলমোরিস ল্যান্সডাউন কীভাবে মারা গেলেন আমি জানি।”

প্রিয়নাথের চোখ গোল গোল হয়ে গেছে, “কে মারল তাঁকে?”

—কে মারল বলিনি তো! বললাম কীভাবে মারা গেলেন।

—দুটো তো একই হল।

—তাই কী? না বোধহয়। তবে এই প্রশ্নের উত্তর দেবার সময় আসেনি এখনও। আর দু-একটা সূত্র হাতে আসা বাকি। কয়েকটা জট পরিষ্কার করতে হবে। তাহলেই তিনটে খুন একেবারে এক সরলরেখায় চলে আসবে…

—মানে কার্টার আর চিন-সু-লিনের মৃত্যুর সঙ্গে পলের মৃত্যুর যোগ আছে?

—অবশ্যই। কুয়াশাটা প্রায় কেটে গেছে, আর-একটু আলো।

—অনুষ্ঠান শুরুর আগে কী একটা দেখাবেন বলছিলেন?

—ও হ্যাঁ, এই দেখুন। কাল কার্টারের আলমারিতে পেলাম।

প্রিয়নাথ দেখল একটা ছবি। সাদা-কালো, কিন্তু তাতে তুলি দিয়ে রং করা। এই ধরনের ছবিকে এম্বেলিসড ফটোগ্রাফ বলে। ছবিতে এক মহিলা বসে আছেন। মলিন মুখ। ইউরোপীয় পোশাক, সোনালি চুল একঢাল। ছবির পিছনে একটা পেনসিল দিয়ে লেখা, ‘শার্লি জনসন, মাদার’। কার্টারের মা।

“এবার আর-একটা জিনিস দেখুন”, বলে হাতের ম্যাগাজিন থেকে একটা পুরোনো পেপার কাটিং বার করলেন সাইগারসন। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের পুরোনো একটা পেপার কাটিং। তাতে লেখা—

The Cradle

On the 20th ultimo, Miss Charlot Harley of Bradford Street gave birth of a beautiful boy. Mother and son doing well. Papers please copy.

“কী বুঝলেন?” সাইগারসন শুধালেন।

“একটা জিনিস অদ্ভুত লাগছে। মিস লেখা। মিসেস নয় কেন? আর পেপারে কেন?”

“ঠিক ধরেছেন। লন্ডনে সবার জন্মপত্র বাধ্যতামূলক, যদি অবশ্য তাঁদের বাবা-মা দুজনেই থেকে থাকেন। শুধু মা থাকলে জন্মপত্র হয় না। সেক্ষেত্রে জনসংখ্যার হিসেব রাখতে পত্রিকার এই কলামে জন্মের খবরটা ছাপিয়ে দেওয়া হয়।”

“তার মানে হ্যারি জনসন…?”

“অবৈধ সন্তান। ছবি দেখেই সেটা আমি বুঝেছি।”

“কীভাবে?”

“শার্লির চোখের রং দেখুন। গাঢ় নীল। বুড়ো জর্জ আমায় বলেছে হ্যারির বাবার চোখের রং ছিল নীল। হ্যারির চোখের রং…”

“বাদামি।”

“একদম তাই। দুজন নীল চোখের মানুষের সন্তান সচরাচর বাদামি চোখের হয় না।”

“কিন্তু বুড়ো জর্জের চোখের রং তো বাদামি…”

সাইগারসন খুব ধীরে ধীরে প্রিয়নাথের দিকে ফিরলেন। আর সোজা তাকিয়েই রইলেন। প্রিয়নাথ দেখতে পেল এতক্ষণে তাঁর ঠোঁটের কোনায় একটা হাসি তিরতির করে কাঁপছে।

দ্বিতীয় পর্ব— গোধূলিসন্ধির নৃত্য

সাইগারসন আর প্রিয়নাথ যখন গোপালচন্দ্রের লেকচার শুনছিলেন, ঠিক সেই সময় তারিণী আর গণপতি হেঁটে হেঁটে চলেছে সোনাগাজির বিখ্যাত বেশ্যাপট্টির দিকে। তারিণী একাই যেতে পারত, কিন্তু জানে, যে কাজে যাচ্ছে, তাতে একা গেলে মারধর তো খাবেই, প্রাণও যেতে পারে। গণপতি এক অদ্ভুত মানুষ। হয়তো বিবাগি হয়ে সংসার ছেড়েছিল বলেই। সংসারে কেউ তার কাছে অচ্ছুত না। কাউকে সে দূরে ঠেলে দেয় না। তারিণী নিজে দেখেছে, সর্বাঙ্গে কুষ্ঠ প্রায় গলে পচে যাওয়া ভিখারিকে গণপতি কী পরম মমতায় সেবা করছে তার সাধ্যের মধ্যেই। সোনাগাজির পতিতাদের মধ্যেও অনেকেই তার চেনা। বেশ্যাদের মূল সমস্যা একটাই, যৌন রোগ। একবার রোগে ধরলে বাঁধা বাবু ছেড়ে দেয়। ছুটকোরা আর কাছে ঘেঁষে না। নাম হয়ে যায় দাগি বেশ্যা বলে। একবার দাগি হলে তার দুর্দশা আর বলার মতো না। বছর কুড়ি আগে বারবনিতাদের যৌন রোগ পরীক্ষার জন্য সরকার চোদ্দো আইন চালু করেন। তাতে যৌন রোগ পরীক্ষার জন্য নিদারুণ অত্যাচার করা হত বেশ্যাদের ওপর। ফিরে এসে অনেকেই ভিক্ষা করতেও বাধ্য হয়। তারিণী জানে, খুব আতান্তরে পড়লে নিজের অসুবিধা করেও গণপতি তাদের অর্থসাহায্য করে। একমাত্র পানদোষ বাদ দিলে গণপতির মতো মানুষ হয় না।

“মদটাই বা খাও কেন? ছেড়ে দিতে পারো না?” প্রায়ই বলে তারিণী।

“একদিন ছেড়ে দেব, দেখো। আমি ঠিক করেই রেখেছি। সারি সারি সুরার বোতল নিয়ে মাঝে বসব। সারারাত ধরে একের পর এক বোতল খালি করতে থাকব। রাত বাড়বে। নেশা বাড়বে। হয়তো বেহুঁশ হয়েও যেতে পারি। কিন্তু পরদিন থেকে আর মদ ছোঁব না।”

“সেদিন আর এসেছে!” বলে তারিণী হাসে।

হাঁটতে হাঁটতে ওরা সোনাগাজির গলিতে চলে এসেছে। সাইগারসন সাহেব তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন রাখহরির কী হল খোঁজ নেবার। সেটা নিতে গেলে এখানে আসা ছাড়া গতি নেই। আর একা আবার আসতে তারিণীর সাহসে কুলায়নি। যবে থেকে গোয়েন্দাগিরি ধরেছে, তারিণী ডায়রি লেখা শুরু করেছে। দুখানা মোটা মোটা ডায়রি ভরে গেছে, যদিও তাতে আসল ঘটনা কম, কবিতাই বেশি। অনেকেই জানে না, গণপতি জানে, তারিণী মনেপ্রাণে এক কবি। তার খুব ইচ্ছে একদিন তার কবিতার বই বেরোবে। বটতলার সস্তার প্রেস থেকে না, রীতিমতো দামি কাগজে, লাল কাপড়ে বাঁধাই হয়ে, সোনার জলে নাম খোদাই করে। কিন্তু গত কয়েকদিনে যা চলছে, তাতে তারিণীর কবিতা লেখা মাথায় উঠেছে। দুইবেলার ঘটনা লিখতে গিয়েই পাতা ভরে উঠছে একে একে।

সোনাগাজির গলিতে ঢুকে একটু পরেই গণপতি বাঁদিকে এক সরু পথ ধরল। পাশাপাশি বড়োজোর দুজন যাওয়া যাবে।

—এইদিক পানে ঢুকলে কেন? সেই বাড়ি তো এদিকে না!

—জানি, কিন্তু এখান থেকেই খবর পাওয়া যাবে।

—এখানে কার বাড়ি?

—বাড়ি তো এক বাবুর। কে তা জানি না। তবে বর্তমানে থাকে লক্ষ্মীমতি। এই সোনাগাজির গলিতে অমন একখানা চরিত্র খুঁজে পাওয়া ভার।

—কেন হে?

—বুঝলে তারিণী, নেহাত লক্ষ্মীমতি মেয়েমানুষ, তায় আবার রাঁড়, তাই তুমি বেঁচে গেলে। যদি ও পুরুষমানুষ হত, আর গোয়েন্দাগিরিতে নামত, তবে তোমার আর সাইগারসন সাহেবের মতো অনেক গোয়েন্দার নাক কাটত এক হাতে। ঘর থেকে এক পাও বেরোয় না। এদিকে গোটা কলকাতার সব খবর ওর কাছে থাকে। খোদায় মালুম কেমন করে। খবর পেতে হলে ওর চেয়ে ভালো কেউ হয় না। আর মনটাও সোনা দিয়ে বাঁধানো।

—তোমার সঙ্গে আলাপ কীভাবে?

—সে আর বলো কেন? এককালে রাস্তায় রাস্তায় মাদারির খেলা দেখাতাম। একবার ভুলে ঢুকে পড়েছিলাম এই গলিতে। দালালরা আমায় চোর ভেবে পিটিয়ে প্রায় আধমরা করে দিয়েছিল। লক্ষ্মীমতিই আমাকে উঠিয়ে নিয়ে আসে এই বাড়িতে। সেবা করে সুস্থ করে তোলে। বললাম না, এঁরাও যে মায়ের জাত, সেটা আমরা ভুলে যাই প্রায়ই।

বলতে বলতে দুজনে এক দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। সদর দরজা বন্ধ।

“লক্ষ্মীমতি, ও লক্ষ্মীমতি, বলি আছ নাকি?” গণপতি হাঁকল।

উপর থেকে কাঁসরের মতো গলায় আওয়াজ এল, “কোন ড্যাকরা, নিমুষ্কের ব্যাটা রে! আমি কি ঘর থেকে বেরুই? সকাল সকাল ছেনালি কত্তে এয়েচিস নাকি?”

গণপতি হেসে ফেললে। তারিণীর দিকে তাকিয়ে বলল, “মন যেমনই হোক, লক্ষ্মীমতির ভাষাটি বড্ড সরস। কিছু মনে কোরো না ভাই”, বলে আবার হাঁকল “দিদি, আমি গণপতি। দরকার ছিল একটু।”

খানিকক্ষণ কোনও আওয়াজ নেই। তারপর সদর দরজা খুলে গেল। এক থুত্থুড়ে বুড়ি দরজা খুলে দিয়ে একপাশে দাঁড়ালে। ওপর থেকে আবার শোনা গেল, “মাসি, এঁদেরকে আমার কাচে পাঠাও।”

পাঠাতে হল না। গণপতি সিঁড়ি বেয়ে চটাপট উঠতে লাগল। পিছন পিছন একটু কুণ্ঠিতভাবে তারিণী। উপরে উঠে ডানদিকে ঘুরেই একটা হলঘর। তারিণী উঁকি মেরে দেখল ঘর খালি। তাতে ফরাস পাতা, হুঁকো, মদের বোতল, পেয়ালা সব গড়াগড়ি যাচ্ছে। এক কোণে ডালা খোলা অবস্থায় একটা হারমোনিয়াম। কাল রাতে আসর জমেছিল বোঝা যাচ্ছে। তার পাশের ঘর থেকে এক মহিলা কণ্ঠ ভেসে আসছে। তারিণীরা ঢুকতেই দেখল এক স্থূলাঙ্গী ধবধবে ফর্সা মহিলা গায়ে কোনওক্রমে একটা কোরা কাপড় জড়িয়ে খাটে বসে জাঁতিতে সুপুরি কাটছে। কাপড়ে তার শরীরের যতটা ঢাকা পড়েছে, তার বেশিটাই অনাবৃত। তারিণী লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিল। সামনে মেঝেতে বসে একটা পনেরো-ষোলো বছরের মেয়ে কেঁদে কেঁদে কী যেন বলছে। লক্ষ্মীমতি তার হাতের জাঁতি দিয়ে দুজনকে ইশারায় দুটো চেয়ারে বসতে বলল। মেয়েটা তখনও বলে যাচ্ছে, “... সেখানে গে দেকি চারিদিকে পেয়াদা পাক গিসগিস কচ্চে। তাদের আগুতে দেকেই তো ভয়ে আমার বুক গুড়গুড় কত্তে লাগল। শুনেচি নাকি আরকের টবে বসায়, গরম লোহার শিক ঢোকায়, এইসব ভাবনায় কাপড়ে মুতে ফেলেচি। একজন এসে বললে, তোর ব্যামো আচে? ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বল্লুম, না। পরে বলল, সরে আয়। তোকে ন্যাংটো হতে হবে। যদি বেশি নজ্জা করে তো চোকে কাপড় বাঁধ। আমার তো নজ্জাতে পরান যাচ্চে, তবু ভয়েতে যা বলচে তাই কচ্চি, নইলে মারবে না ধরবে এই ভেবে হাতখানি চোকে দিয়ে চুপ করে ডাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর আর মাতামুন্ডু কী বলব এনাদের সামনে?”

“তুই বল, এঁদের গেরাহ্যি করার দরকার নেই কো।” লক্ষ্মীমতি বললে।

“দিদি, তারপর একটি ভদ্দরনোক কাচে এসে বললে, ন্যাংটো হও। আমি তো চোকে হাত দিয়ে আচি। সে বার দুই বলে আপনিই ন্যাংটা কল্লে। তারপর আঁটকুঁড়ির ব্যাটা বলে কিনা, পা ফাঁক করে ডাঁড়া। কী আর করি। ডাঁড়ালাম। বলব কী দিদি, হাঁটু গেড়ে বসে সব ঘুঁটে ঘুঁটে দেখলে, ম্যা গো…” বলে মেয়েটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।

লক্ষ্মীমতি সুপুরি কাটতে কাটতেই বললে, “কাঁদিস নে নিস্তারিণী। আমি বাবুকে বলে দেবখন। চন্নননগরে নাকি এসবের হ্যাপো নেই। সবাই যাচ্চে, তুইও যা।”

“তুমিও চলো দিদি”, নিস্তারিণী চোখ মুছে বললে।

“আ মোলো গতরখাগি! আমার কি গেলে চলবে? আমি এখন ঢোক্কা মাগি। আমায় বাবু বেঁধে রেখেচেন তাই আচি। তোর ডবকা বয়স। অনেক ভবিষ্যৎ পড়ে আচে। তুই এখন যা। পরে আসিস। একটা কাজ আচে। কত্তে হবে।”

“কী কাজ দিদি?”

“বল্লুম না, এখন যা... বাবুরা এয়েচেন কেন দেকি। কতা বলি… তুই বরং মাসিকে বল এঁয়াদের জন্য এট্টু শরবতের...”

“না, না, আমরা কিছু খাব না”, ব্যস্ত হয়ে উঠল তারিণী।

“কেন? বেশ্যার বাড়ির জলও খেতে নেই বুঝি? তা ভালোমানুষের পো, এতই যদি ঘিনপিত তা এয়েচ কেন। বেরিয়ে যাও, এখুনি বেরিয়ে যাও।”

তারিণী দেখল রাগে লক্ষ্মীমতির গোটা দেহ কাঁপছে। গণপতি কোনওমতে শান্ত করলে।

“আরে দিদি, ও ভালো ছেলে। এসব ভেবে বলেনি। আসলে এইমাত্তর খেয়ে বেরুলাম তো। কিন্তু তাতে কী? শরবত তো আর খাওয়া নয়, যাকে বলে পান করা। কি তারিণী, তাই তো?”

তারিণীর তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। কোনওক্রমে উপরে নিচে মাথা নাড়াল।

লক্ষ্মীর মেজাজ একটু ঠান্ডা হয়েছে। সে নিস্তারিণীকে গম্ভীর গলায় আদেশ দিল, “শোন, একটু শুকনো মুচকুন্দ ফুল দিয়ে আনবি।”

গণপতি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাবুর কী খবর দিদি?”

“আর খবর! সে কতায় আচে না,

কপাল আমার বক্ত,

শক্ত দেখে ভাতার নিলাম,

হাগে শুধু রক্ত

আমার হয়েচে সেই মরণদশা। দিন দশ-পনেরো হল শরীলে আর জোর নেই। কিছু করে-টরে না। এসে বলে, মাতা ধরেচে। মাতা টিপে দে। তবে কিচুদিন হল বড্ড চিন্তায় আচে বেচারা। সবসময় কী যেন সব ভাবে। ভয়ে ভয়ে থাকে। জিজ্ঞেস কল্লে বলে, এসব তুই বুঝবিনে। কী কুক্ষণে যে চিটিটা আমার হাতে এল…”

“কীসের চিঠি?” তারিণী জিজ্ঞেস করে।

“সে আমি কী জানি… তা তুমি কে বাছা?” শেষ কথাটা তারিণীকে উদ্দেশ্য করে বলা।

এবারেও উত্তর দিল গণপতি, “দ্যাখো কাণ্ড। এখনও তোমাদের আলাপ করাইনি! এ হল তারিণী। আমার মিতে। শখের গোয়েন্দা। খুব ভালো ছেলে।”

শখের গোয়েন্দা শুনে তারিণী একটু দমে গেল, কিন্তু আবার ভাবল ঠিকই আছে। সব খুলে বলতে গেলে এ আবার চুপ করে যাবে।

“তা শখের গোয়েন্দার আমার বাড়ি কী কাজ?” শরবতের রাগ এখনও যায়নি মনে হচ্ছে, তারিণী ভাবে। তারপর বেশ মিনমিন করেই বলে, “আসলে দিদি, এর আগের রাস্তা দিয়ে সোজা গেলে যে পানের দোকানটা আছে...”

“হ্যাঁ, দাশুর দোকান…”

“তার উলটো দিকের বাড়ির...”

“হ্যাঁ, রতনমণি আর হীরেমন থাকে। দুই বোন। এক জাঁদরেল বাবু দুটোকেই রেকেচে। রতন ভালো মেয়ে। তবে হীরেটা বদ। যেদিন যেদিন বাবু আসে না, খুচরো কাজ করে। আজকাল নাকি এক দালাল ফড়ের সঙ্গে আশনাই হয়েচে।”

“না, না, সেই বাড়ি না। তার পাশের বাড়ি...”

লক্ষ্মীর মুখ গম্ভীর হল। “কেন, ওই বাড়িতে কী হয়েচে?”

“কিছু না। কে থাকেন সেটা জানতে চাই।”

“ভূত থাকে বুজলে, ভূত! তুমি নেহাত ভাইয়ের সঙ্গে এয়েচ, তাই তোমায় কিচু বল্লাম না। নইলে অন্য কেউ ভরদুকুরে ওই অপয়া বাড়ির নাম কল্লে আমি জুতো মেরে তার মুক সোজা করে দিতাম।”

তারিণী দেখল মহা মুশকিল, এ যে কথায় কথায় রেগে যায়। কিন্তু আবার চুপ থাকলেও কাজ হবে না। এদিকে বুড়ি মাসি তাদের জন্য শরবত নিয়ে এসেছে। দুজনে একটাও কথা না বলে চুপচাপ শরবত খেতে লাগল।

প্রথম কথা বলল লক্ষ্মীমতি নিজেই।

“কিচু মনে কোরো না ভাই। তুমি এসে অব্দি তোমার সাতে মুক নেড়ে নেড়ে কতা কইচি। পোড়ামুক আমার। আসলে ওই বাড়ি বড়ো অপয়া। ওর নাম কেউ নেয় না বড়ো। এককালে খুব জমাটি বাড়ি ছিল ওটা। দোতলা বাড়ি। সতেরো-আঠারোটা ঘর। সব ঘর ভরা। এক-এক ঘর এক-এক মেয়েমানুষের। সন্ধে হলেই যেন উৎসব লেগে যেত। গানের আওয়াজ, নাচের আওয়াজ। ত্রৈলোক্য রাঁড় পেত্থমে ওই বাড়িতেই এসেই ওটে। পরে বাড়ির ওপরতলা একা ওর হয়েছিল। মাগি পয়সা করেচিল। রাখতে পারলে না। তারপর খুনখারাপি ধল্লে। একবার ওসব পতে গেলে আর ফেরা যায় নাকো। ত্রৈলোক্যও পারলে না। দারোগা প্রিয়নাথের হাতে ধরা পল্লে। ফাঁসি হল। কিন্তু মরার আগে বুঝি সে অভিশাপ দিয়েচিল। ও বাড়ির একজনও আর বাঁচলে না। সবাই একে একে ফৌত হল। এখন ভূতুড়ে বাড়ির মতো পড়ে থাকে...”

“কেউ থাকে না ওখানে?”

“থাকে না বলব না, তবে আমাদের কেউ থাকে না।”

“মানে?”

“আমি তো ঘর থেকে বেরুই না বাপু, যা শুনি মুকের কথা। ও বাড়ি নাকি পাগলের আস্তানা। একপাল পাগল রয়েচে ওই বাড়িতে। হীরেমন ওদের চিৎকার শুনেচে। ওরা কোতা থেকে আসে, কোতায় যায়, কেউ জানে না। অশৈলী সব কায্যকলাপ। হীরেমন তো বলেচে, ওরা মানুষ নয় খোক্কসের বাচ্চা। কাঁচা কাঁচা জন্তুজানোয়ারের রক্ত খায়।”

“হীরেমন দেখেছে?”

“না দেখেনি, তবে মাঝে মাঝেই একপাল ভেড়া নিয়ে আসত ঠেলায় চাপিয়ে। অনেকদিন এমন হয়েচে, আবার গাড়িতে চাপিয়ে তাদের ফেরত নিয়ে যাচ্ছে। নাড়িভুঁড়ি সব এলানো। দেহে কোতাও রক্ত নেই। এই রক্ত সব কে খাচ্চে বল দেকি? ওই খোক্কসের বাচ্চাগুলো।”

“কতদিন হল এরা এসে রয়েছে?”

“তা বাপু দিন গুনে তো বলতে পাব্বো না, মাস ছয় তো হবেই।”

“আপনাদের চেনা কেউ ওই বাড়ি যায় না?”

“ঢুকতে দিলে তো! সামনে দরোয়ান থাকে। কাচে গেলেই দূর দূর করে ভাগায়। সেই হীরেমনের পিরিতের ছোকরা, গেচিল কী হচ্চে দেখতে, এমন তাড়া দিয়েচে, হারামজাদা বাপের নাম ভুলে গেচে। তবে ভালো একটাই, কদিন হল বাড়িতে আর কেউ নেই নাকি। সদরে তালা। রতন বলচিল, দিদি এতদিনে শান্তিতে ঘুমুতে পাব্বো।”

“তালা কবে থেকে?”

“এই তো দিন পনেরো হবে।”

তারিণী হিসেব করে দেখল, সেই রাখহরির ঘটনার পর থেকেই বাড়ি তালাবন্ধ। হঠাৎ তারিণীর মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। বলল, “আচ্ছা দিদি, এই পনেরো দিনে এই পাড়ার কোনও মেয়ে কি পালিয়ে গেছে?”

লক্ষ্মীর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে উঠল। এতটাই চমকাল যে তার আঁচল খসে বাঁদিকের স্তন যে পুরো উন্মুক্ত হয়ে গেছে সেটা খেয়ালই করল না।

“হ্যাঁ, ময়না। কিন্তু সে কথা তুমি জানলে কী করে? এ পাড়ার বাইরে তো তা কেউ জানে না!”

“বলব। কিন্তু ময়নাকে নিয়ে কিছু বলুন।”

“ময়নার আসল নাম ফুলমতী। বিহারে বাড়ি। এখানে এসেচে দুই বচর হল। ডবকা মাগি। কিন্তু পয়সার খুব লোভ। শুনেছি ডবল বেশ্যা। মাগির মাও বেবুশ্যেগিরিই কোত্ত। এখানে এসে এক ফড়েকে ধরে সায়েবদের সঙ্গে খুব ঢলানি। মাগির মাটিতে পা পড়ে না। ওই বাড়িতে মাজে মাজে সায়েব খদ্দের আসত। তখন মাগির ডাক পোত্ত। পনেরো দিন মাগি বেপাত্তা। এ পাড়ার কেউ ওকে দুচোখে দেখতে পাত্তো না। তাই সবাই চুপচাপ আচে। তা তুমি কীভাবে জানলে বাছা?”

“আমি ওকে দেখেছি। আজ উঠি। আর দিদি, একটাই কথা, আপনার বাবুর নামটা যদি বলেন...”

“ভাতারের নাম এই পাপ মুকে নিতে নেই। জানো না?”

“তবু যদি সাঁটে বলেন।”

“সাঁটে? এই ধরো নতুন চাঁদ।”

“ও আচ্ছা, নবীন চন্দ্র... আর পদবি? সেটা তো বলতেই পারেন।”

“মান্না”, লাজুক হেসে বললে লক্ষ্মীমতি।


তৃতীয় পর্ব— তিমির হননের গান

গতকাল ফিরেছি বেশ রাতে। আজ অফিসে আসতে আসতে দেরি হয়ে গেল। অফিসে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। এখন একলা কিছুক্ষণ ভাবতে হবে। কোনও ক্লায়েন্ট এসে পড়লে মুশকিল। তারিণী রায়ের সেই কাঠের চেয়ারে বসে একটা খাতা পেনসিল নিয়ে এ-ফোর কাগজে লিস্ট বানাতে থাকলাম। কী কী জেনেছি, আর কী জানিনি। আসলে সেইসব সাদা কাগজ পেয়ে আমার মতো ডিরেক্টর সাহেবও ঘাবড়ে গেছিলেন। আমাকে বারবার অনুরোধ করলেন ব্যাপারটা পাঁচকান না করতে। উনি নাকি তদন্ত কমিটি বসাবেন একটা। এটা এখন জলের মতো পরিষ্কার, দেবাশিসদা খুব সন্তর্পণে একটা একটা করে প্রিয়নাথের সেই ম্যানুস্ক্রিপ্ট চুরি করেছিলেন। কীভাবে? তা খোদায় মালুম। সঙ্গে ডায়রির পাতা। আমার মন বলছে এই ডায়রির পাতা তারিণীর। “তারিণীর ছেঁড়া খাতা।” কিন্তু দেবাশিসদার লেখা সেই চার লাইনের ছড়া অনুযায়ী সেই খাতার তো গণপতির ভূতের বাক্সে থাকার কথা।

এমন সময় ফোন। অফিসার মুখার্জি ফোন করেছেন।

—কী খবর মশাই? কিছু পেলেন?

—পেলাম বলতে আশাপ্রদ কিছু না। একটা কথাই জানতে পেরেছি, প্রিয়নাথের সেই পাণ্ডুলিপি আমাদের সরকারি আর্কাইভ থেকে চুরি করেছিলেন দেবাশিসদা। সঙ্গে তারিণীর ডায়রির পাতাও।

—কী করে জানলেন? আপনি গেছিলেন দেখা করতে?

—হ্যাঁ। শুনলাম পুলিশও গেছিল জেরা করতে।

—আমিই গেছিলাম তো। খুব একটা কিছু লাভ হয়নি। চুরির কথা আপনি জানলেন কীভাবে?

—সে অনেক গল্প। সাক্ষাতে বলা যাবে।

—আপনি এখন কোথায়?

—আমার অফিসে। ক্লাইভ স্ট্রিটে।

—বাহ। আমিও একটা কাজে লালবাজারে এসেছি। ফেরার পথে আপনার অফিসে যাব। আপনি হোয়াটসঅ্যাপে আমায় লোকেশানটা পাঠিয়ে দিন।

—এক্ষুনি দিচ্ছি। আপনি কিছু জানলেন?

—এদিকে খুব চাপ ভাই। এক লোকাল নেতা খুন হয়েছে, সেই নিয়ে দুই রাত ঘুমোই না। আজ আবার লালবাজারে ডেকেছে।

—অটোপ্সি রিপোর্ট এসেছে?

—হ্যাঁ, নতুন কিছু নেই। সারা গায়ে আঘাত করে কষ্ট দিয়ে শেষে ছোরা দিয়ে খুন। তবে বিচিটা মরার আগেই কেটেছে।

—কিন্তু দেবাশিসদার… মানে ওটা ওই লাইব্রেরিতে কীভাবে এল, সেটা বুঝতে পারলেন?

—কেউ কিচ্ছু বলতে পারছে না। আমি সবাইকে জনে জনে জেরা করেছি। তবে আপনিও সাবধানে থাকুন ভাই। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এই কেসে আপনাকে জড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। যাই হোক, আমি আসছি। সাক্ষাতে কথা হবে।”

অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে, হোয়াটসঅ্যাপ করে আবার লিস্টে মন দিলাম। কিছু ক্লু এদিক-ওদিক ছড়িয়ে রয়েছে। সেগুলোকে গোটাতে হবে। লিখতে থাকলাম—

১। দেবাশিস গুহ নিজের বাড়িতে খুন হলেন। খুনি (বা খুনিরা) অত্যাচার করল (কীসের জন্য?)

২। দেবাশিসদা কোনওমতে লুকিয়ে আমায় হোয়াটসঅ্যাপ করলেন (সময় পেলেন কখন?)

৩। ‘তুর্বসু জানে’ লিখে দেবাশিসদা আমায় ফাঁসালেন। কিন্তু আমি কী জানি?

৪। আমার ঘরে দালাল সেজে ঢুকে দেবাশিসদা লিখে এলেন তৈমুর ডিরেক্টরের কাছে আছে (কবে? জেঠিমাকে ফোন করতে হবে)

৫। আর্কাইভের ডিরেক্টর বললেন তাঁকে কিচ্ছু দেওয়া হয়নি…

ঠিক এইখানে একটা খটকা লাগল। ডিরেক্টরের চেম্বারে এটাই ছিল আমার শেষ প্রশ্ন। এটা করামাত্র ডিরেক্টর চটে গিয়ে বলেছিলেন, “আরে বাবা না বলেছি তো… ওঁর সঙ্গে এতটাও ঘনিষ্ঠতা ছিল না আমার।” এটা প্রথম প্রশ্নে কেউ বলে না। একসময়ই বলে, যখন একই প্রশ্ন তাকে দ্বিতীয়বার করা হয়। মানে আগে কেউ একই প্রশ্ন তাকে করেছিল। কিন্তু সেটাই বা কী করে সম্ভব! আমি ছাড়া তো দেবাশিসদার এই চিঠির কথা আর কেউ জানত না! নাকি জানত? সে কে? পকেটেই দেবাশিসদার চিঠিটা ছিল। এবার দেখেই বুঝলাম বিসমিল্লায় গলদ হয়েছে। এটা দেবাশিসদার লেখা চিঠি হতেও পারে, নাও হতে পারে। ছাপা চিঠি। যে কেউ লিখতে পারে। তলায় সইটা অবধি নেই। যেহেতু আমি ধরেই নিয়েছি এই বিষয়গুলো আমি আর দেবাশিসদা ছাড়া কেউ জানে না, তাই অন্য কেউ লিখতেই পারে না। কিন্তু এখন বেশ মনে হচ্ছে আর-একজন কেউ আছে, যে কিছুটা হলেও গোটা ব্যাপারটা জানে। দেবাশিসদার সেই চ্যালা? যে রাতে আসে? আমি কেন যেন নিশ্চিত ছিলাম ওটা আমি। কিন্তু যদি ওটা আমি না হয়ে অন্য কেউ হয়, আর দেবাশিসদা তাকে সব বলে থাকেন, তবে তো আরও একজন আছে যে সব জানে। কিন্তু সে কে?

মাথায় আসতেই জেঠিমাকে ফোন করলাম। ফোনে আবার রিংটোন, ‘ওম নমঃ শিবায়’। প্রায় অধৈর্য হয়ে ছেড়ে দেব, এমন সময় জেঠিমা ধরলেন।

—কে-এ-এ… হ্যালো… কে-এ-এ?

—জেঠিমা, আমি টাবু।

—ও টাবু? বল বাবা, কী ঠিক করলি? বাড়ির অংশটা বেচবি?

—সেজন্যেই ফোন করলাম জেঠিমা। সেই দালাল তোমায় কোনও নম্বর দিয়ে গেছিল? ফোন করব।

—সেসব তো কিছু দেয়নি, শুধু বলেছিল আবার আসবে।

—ও। তা এই দালাল দেখতে কেমন? নাম বলেছে?

—দেখতে তো ভালোই বাবা। ভদ্রলোকের ছেলের মতোই। লম্বা, দাড়িগোঁফ নেই। ছিলিম চেহারা। খুব সিগারেট খায়। নাম বলল সঞ্জয় দাস। তোর ঘর খুলে দিলাম। ঘুরে-টুরে দেখল। বলল পছন্দ হয়েছে।

—কবে এসেছিল মনে আছে?

—ওমা! সেটাই বলিনি তোকে? তুই যেদিন এলি, সেদিন সকালেই তো এসেছিল। আবার এলে কী বলব? তুই রাজি?

আমার মাথা ঘুরছিল। কোনওমতে হ্যাঁ হ্যাঁ করে রেখে দিলাম। আমি বুঝে গেছি ও দালাল আর আসবে না। আমি যেদিন চুঁচুড়া গেছি, সেদিন সকালবেলায় সে এসেছিল। মানে দেবাশিসদা ততক্ষণে মৃত। আর চেহারার যা বর্ণনা পেলাম, তাতে দেবাশিসদা হতেই পারেন না। তাহলে এ কে? দেবাশিসদার সেই চ্যালার প্রতি সন্দেহ বাড়ছে। লিস্টটা শেষ করি—

৬। দেবাশিসদা মারা যাবার পরের দিন সকালে আমার বাড়িতে গিয়ে কে চিঠি লিখে এল?

৭। অপর্ণা গুহকে নিয়মিত দেবাশিসদার বিষয়ে খোঁজ দিত কে? কোনও কাছের বন্ধু? কার কাছের? অবশ্যই এমন একজন, যে দেবাশিসদার কাছের। কারণ অপর্ণার কাছের লোক, কিন্তু দেবাশিসদাকে গভীরভাবে চেনে না, এমন লোকের কথা তিনি শুনবেনই বা কেন? আবার সেই চ্যালা উঁকি দিচ্ছে।

৮। দেবাশিসদার অণ্ডকোশ লাইব্রেরিতে গেল কীভাবে? এমন একজন নিয়ে গেছে, যে লাইব্রেরিকে হাতের তালুর মতো চেনে, অথবা তাকে কেউ সন্দেহ করবে না, কিংবা দুটোই।

৯। প্রিয়নাথের কাগজ বা তারিণীর ডায়রির কোথাও নিশ্চিতভাবে পো-র লেখা সেই দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সন্ধান আছে। সেটা তো আর আমার কাছে নেই। তাহলে আমাকে এর মধ্যে জড়ানোর মানে কী?

১০। যে কাগজ দেবাশিসদা চুরি করে এনেছিলেন, সেগুলো এখন কোথায়? (বাড়ি তো সিল করা)। দেবাশিসদার ওয়ারিশ কে?

আবার ফোনের কি-প্যাড ডায়াল করলাম।

—হ্যালো অপর্ণাদি, আমি তুর্বসু বলছি।

—আপনার লজ্জা করে না? আপনি কোন মুখে আমার সঙ্গে কথা বলছেন?

—কেন দিদি, কী হল?

—কী হল? সেদিন এই অসুস্থ শরীর নিয়ে এতদূর গেলাম, আপনাকে সব কথা খুলে বললাম, আর আপনি এটা জানালেন না যে, আপনিই সেই শয়তান যাকে দেবাশিস আমার আর সুতনুর পিছনে গোয়েন্দাগিরি করতে লাগিয়েছিল! আপনি আমাদের ইন্টিমেট অবস্থার ছবিও তুলেছেন।

—দিদি, আসলে ওটাই আমার প্রথম কেস…

—চুপ করুন। দিদি বলে ডাকতে লজ্জা করে না? আপনি আর ফোন করবেন না আমাকে।

বলে ফোন রেখে দিলেন অপর্ণা। কীভাবে উনি এত খবর জানছেন? একটা লোক আছে, যে ইন্দ্রজিতের মতো আড়ালে থেকে গোটা খেলাটাকে চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। এই খেলায় আমি কোনও এক চাল দেবার আগে সে আরও দুই চাল এগিয়ে আছে। আমি নিশ্চিত, দেবাশিসদার খবর অপর্ণাকে দিত এই লোকটাই। উলটোটাও। দেবাশিসদা ভাবতেও পারেননি তাঁরই কাছের লোক তাঁর পিঠে ছুরি মারছে। মুশকিল হল অপর্ণা এর নাম বলবেন না। ফলে এ যে কে, তা বোঝা অসম্ভব।

ঠিক এমন সময় অপর্ণা দেবীর আলগোছে বলা একটা কথা মাথায় এল। তাঁদের বিয়ে দিয়েছিলেন ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের বাণী রায়। দেবাশিসদার পক্ষে সাক্ষী দিয়েছিলেন তাঁর এক বন্ধু। কে এই বন্ধু? তাঁর নাম এই কেসে এখনও কেউ করেনি। আমিও দেবাশিসদার মুখে তাঁর কোনও বন্ধু আছে বলে শুনিনি। অফিসেও যা বুঝলাম, কোনও বন্ধু ছিল না। তাহলে এই বন্ধুটি কে? খুব যদি ভুল না হয়, এ-ই হয়তো দেবাশিসদার সেই চ্যালা। ডবল এজেন্ট। উত্তর দিতে পারেন অপর্ণা দেবী। ফোন করলাম। নাম্বার ব্লক। এখন উপায় একটাই।

অফিসে তালা মেরে চললাম ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে। এখন মির্জা গালিব স্ট্রিট নাম হলেও লোকে আগের নামেই ডাকে। এই রাস্তাতেই বিখ্যাত লেখক থ্যাকারে সাহেব জন্মেছিলেন। রাস্তায় ঢুকতেই দেওয়ালে হলুদ রঙের বড়ো বিজ্ঞাপন দেখতে পেলাম। ম্যারেজ রেজিস্ট্রার বাণী রায়। সঙ্গে ফোন নম্বর। নিচে ব্র্যাকেটে লেখা, কালম্যানের পাশে। কালম্যান এখানকার বিখ্যাত কোল্ড স্টোরেজ। কোল্ড কাটসের জন্য খুব জনপ্রিয়। দুধারে খাবার দোকানের গন্ধে ম-ম করছে। কালম্যান পেরিয়ে একটু দূরেই ঘুপচি অফিস। আলো কম। গিয়ে দেখলাম মোটা চশমা পরা এক অবিবাহিত (বিধবাও হতে পারে) বয়স্ক মহিলা গম্ভীর মুখে আনন্দবাজার পড়ছেন। আমাকে দেখে একটা ফর্ম এগিয়ে দিলেন।

—এটা ভরে আনবেন। আপনার নাম, পাত্রীর নাম, দুই কপি ফটো, আধার কার্ডের জেরক্স আর অরিজিনাল আর তিনজন সাক্ষী। দুরকম রেট আছে। নর্মাল দেড় হাজার, আর তৎকালে তিন।

—আমি বিয়ে করব বলে আসিনি।

—তবে?

—একটা কথা জানার ছিল।

—বলুন।

—২০১২-র মার্চে আপনার এখানে দুজন বিয়ে করেছিলেন। দেবাশিস গুহ আর অপর্ণা বসু।

—সে করতে পারে। কত লোকে কত বিয়ে করছে…

—আমার সেই বিয়ের সাক্ষীদের নাম চাই।

—অ। ডিভোর্স হচ্ছে বুঝি? আপনি কি গোয়েন্দা? প্রাইভেট ডিটেকটিভ?

বুঝলাম এই দাবি নিয়ে ওঁর কাছে অনেকেই আসে। হেসে মাথা নাড়ালাম।

—তার রেট আলাদা। পাঁচশো টাকা। ক্যাশে। আমি চেক নিই না।

—আজ্ঞে একটু কমসম…

—এক রেট।

উপায় নেই। রাজি হতেই হল। হাতে দরাদরির সময়ও নেই। অফিসার ফোন করছেন। নিশ্চয়ই ওঁর লালবাজারের কাজ হয়ে গেছে। ফোন ধরলাম।

“কোথায় আছেন মশাই?”

“একটু ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে এসেছি, একটা কাজে। আপনার হয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ, আমি তো যাচ্ছি আপনার অফিসে।”

“আসুন, আমি আসছি এখুনি।”

এদিকে মহিলা নিতান্ত অনিচ্ছায় উঠে একটা গোদরেজের আলমারি খুলে ধীরেসুস্থে খুঁজেপেতে একটা লাল মোটা খাতা বার করলেন। উপরে বড়ো করে ২০১২ লেখা।

—কোন মাস বললেন? মার্চ? তাই তো?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। নাম দেবাশিস গুহ।

—আগে পাঁচশো টাকা দিন। এটা আমার খাতার কপি।

দিলাম।

খাতা ঘুরিয়ে ধরলেন মহিলা। খাতায় ছবি আটকানো। দেবাশিসদা, আর অপর্ণার। পাসপোর্ট সাইজ। তাঁদের সই। নিচে তিনজন সাক্ষীর সই। প্রথম জন সুপর্ণা বসু, শিওর অপর্ণার মা। দ্বিতীয় জন দেবযানী দত্ত। এ অপর্ণার সেই বান্ধবী। আর তারপরেই দেবাশিসদার সেই বন্ধুর নাম ক্যাপিটালে লেখা। সঙ্গে সই। আমি প্রথমবার দেখে ভাবলাম ভুল দেখছি। আবার দেখলাম। খাতার পাতা একটু হলুদ হয়েছে, কিন্তু কালো কালিতে লেখা নাম জ্বলজ্বল করছে। এই নাম আমি চিনি। একটু আগেই এর সঙ্গে কথা হয়েছে। খাতায় লেখা, অমিতাভ মুখার্জি। ব্র্যাকেটে লেখা ও.সি., চন্দননগর পি এস।


চতুর্থ পর্ব— যেইসব শেয়ালেরা

—এখন উপায়?

—গোপালচন্দ্র কিছু একটা আঁচ করে পালিয়েছে। তবে চিন্তা নেই। ওকে ঠিক ধরে নেব। তার আগে আর-একজনের সঙ্গে কথা বলতেই হবে।

—সে কে?

—বুড়ো জর্জ। তবে এখন দুপুর গড়িয়েছে। ও আর হোটেলে নেই। কোথায় আছে আমি জানি।

—কোথায়?

—চিনে পাড়ায়। চন্ডুখোরদের আস্তানায়।

চিনে পাড়ায় কদিনের মধ্যে আবার যেতে হবে, ভাবেনি প্রিয়নাথ। সেই রাস্তা, ঝুলছে লাল লাল বাতির সারি। তবে সেদিন রাতের দমবন্ধ পরিবেশ আজ উধাও। দোকান সব খোলা। চিনা মন্দিরের দরজাও বন্ধ নেই। যেন একইরকম দেখতে অন্য কোনও এক জায়গায় সে এসেছে। তবে এ পাড়া সাহেবের বেশ চেনা তা হাবেভাবেই বোঝা গেল। উনি কি তবে এখানে নিয়মিত আসেন? সরু গলি বেয়ে একটা ঘুপচি ঘরের সামনে দুজন এসে দাঁড়ালেন। দরজায় লাল পর্দা ঝুলছে। তাতে সোনালি রঙের ড্রাগনের ছবি আঁকা। তারা দুজন সামনে এসে দাঁড়াতেই কোথা থেকে এক হলুদমুখো চিনা এসে উপস্থিত। সরু চোখ। মুখে হাসি।

—কাম, কাম স্যার। কাম ইন স্যার।

সাইগারসন যেন নিজের বাড়িতেই ঢুকছেন, এমনভাবে ঢুকে গেলেন। চিনা মালিক প্রিয়নাথকেও বেশ খাতির করে ভিতরে নিয়ে গেল। দিনের বেলাতেও ভিতরে আলো-আঁধারি। জানলায় মোটা লাল পর্দা টানা। কিছু মিটমিটে আলো জ্বলছে। আর গোটা ঘরে অদ্ভুত গন্ধের একটা ধোঁয়া স্থির হয়ে রয়েছে। ভিতরে লম্বা সরু প্যাসেজের দুইদিকে প্রচুর লোক এলিয়ে পড়ে আছে। বেশিরভাগেরই পাশে রয়েছে অদ্ভুত দেখতে একটা পাইপ। পাইপের একটা দিক লম্বা আর অন্যদিক তিনটে প্যাঁচ খেয়ে সোজা দাঁড়িয়ে আছে। এই মুখটা একটা ছোটো কলকের মতো। পাশের বাটিতে জলে সাদা সাদা কীসব যেন ভাসছে। সাইগারসন বোঝালেন পাইপে চন্ডুর গুলি পুরে আগুন ধরিয়ে দিতে হবে। যিনি গুলি খাবেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে টান মেরেই ঘুরে পড়বেন। তখন আড্ডার লোকেরা চিনির জলে ভেজানো শোলার টুকরো তাঁর মুখে গুঁজে দেবেন। একটু বেশি পয়সা দিলে তিনি পাবেন বাতাসা, আর সবচেয়ে বেশি পয়সার খদ্দেররা পাবেন রসমুন্ডি।

মালিক খাতির করে দুজনকে দুটো তুলোভরা তোশক আর মাথায় দেবার বালিশ দিল। দুটোই তেল চিটচিটে। সাইগারসন বললেন, “এবার চুপটি করে শুয়ে থাকুন। হাতে পাইপ নিয়ে। জর্জ এখানেই আসে।”

—আপনি কী করে জানলেন?

—জর্জকে এই আস্তানার সন্ধান আমিই দিয়েছি।

সাহেব চন্ডুর আস্তানার মালিককে জানালেন তাঁরা আজ গুলি নেবেন না। তবু বসে আছেন দেখে কিছু টাকা দিলেন। মালিক দুজনের জন্য দুটো বড়ো বড়ো রসমুন্ডি এনে দিল। চন্ডুর পরে এ জিনিস খেলে নাকি মৌতাত বাড়ে।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। টলমল পায়ে পর্দা সরিয়ে ভিতরে ঢুকল বুড়ো জর্জ। প্রিয়নাথের দেখেই মনে হল এ যেন আর বেশিদিন বাঁচবে না। সারা মুখ লাল, চোখ ফোলা ফোলা। অদ্ভুত একটা অস্থিরতা সারা দেহ জুড়ে। ঢুকেই এক কোণে একটা খালি জায়গা দেখে শুয়ে পড়ল। মালিক প্রায় দৌড়ে গিয়ে এগিয়ে দিল চন্ডুর পাইপ। কলকেতে চন্ডুর গুলি পুরে আগুন ধরিয়ে দিল নিজেই। জর্জ এক টান মেরেই ঘুরে শুয়ে পড়ল। মালিক তার মুখে গুঁজে দিল বাতাসা।

খানিক বাদে বুড়ো একটু শান্ত হলে সাইগারসন প্রিয়নাথকে চোখের ইশারা করলেন।

-চলুন। যাওয়া যাক।

দুজনে এসে বুড়োর পাশে বসলেন। জর্জের নেশা তখনও ভালোভাবে কাটেনি। ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দুজনের দিকে। সাইগারসন বুড়োর কাঁধে হাত রাখলেন। যেন ডুবন্ত মানুষ কুটো ধরেছে, এইভাবে সেই হাত চেপে ধরে জর্জ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ধীরে ধীরে জর্জের হাতে হাত বোলাতে লাগলেন সাইগারসন। জর্জ কেঁদেই চলেছে। সাইগারসন খুব নরম গলায় এবার বললেন, “তোমার ছেলে মারা যাওয়াতে আমিও কম দুঃখিত নই জর্জ। সব খুলে বলো।”

জর্জ প্রায় ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। “কিন্তু তুমি! তুমি জানলে কীভাবে?”

“অনুমান। একেবারে প্রথম থেকে বলো জর্জ, শুরুটা না জানলে শেষটা কিছুতেই হাতে আসছে না।”

জর্জ এবার প্রিয়নাথের দিকে তাকাল।

“ইনি? ইনি আমার বন্ধু। খুব ভালো মানুষ। তোমার ছেলে কেন মারা গেল সেটা ইনিই খুঁজে বার করছেন।”

“খুঁজে আর কী হবে? আমি জানি। যবে থেকে ও গংসিদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছিল, আমি জানতাম একদিন ওর এই অবস্থা হবে। এই চিনেরা কারও বন্ধু হয় না সাইগার, কারও না। আমি পুলিশকে সব বলিনি। তোমাদের বলছি। না বললে শান্তিতে মরতেও পারব না”, বলে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল জর্জ।

খানিক বাদে নিজেই বলতে শুরু করল, “শার্লটকে আমি চিনি অনেক ছোটো থেকে। ওর মা ল্যাম্বেথ ওয়ার্ক হাউসে কাজ করত। বাবা ছিল না। ছোট্ট শার্লি মায়ের সঙ্গে যেত ওখানে। হপ্তায় আঠেরো সেন্ট রোজগার। তাতেই মা-মেয়ের চলত। আমার প্রতিবেশী ছিল ওরা। ব্র্যাডফোর্ড স্ট্রিটে আমাদের পাশেই দুই কামরার একটা ঘুপচি ঘরে ভাড়া থাকত দুজন। সেবার খুব ঠান্ডা পড়েছিল। শার্লির মা মারা গেল। ড্রপসিতে। সারা দেহ ফুলে গেছিল। তখন শার্লি মাত্র পনেরো। ফুটফুটে ফুলের মতো। আমার বউও ওকে খুব ভালবাসত। শার্লি খুব কাঁদল। মেরির দয়া হল। মেরি অমনই ছিল। কারও দুঃখ সইতে পারত না। আমাদেরও ছেলেমেয়ে ছিল না। শার্লি আমাদের সঙ্গেই থাকতে লাগল। মেয়ের মতো। বিশ্বাস করো, আমি ওকে তখনও অন্য নজরে দেখিনি। তারপর একবার লোহার বিম পড়ে আমার পা ভাঙল। আমি ঘরে বসা। মেরি ল্যাম্বেথে কাজে যেত। ঘরে আমি আর শার্লি একা। ও আমায় খুব ভালোবাসত। পাপা, পাপা বলে ডাকত। একদিন দুপুরে… তারপর রোজ চলতে থাকল। মেরি বেরিয়ে গেলেই আমরা শুরু করে দিতাম। মেরি কোনও দিন সন্দেহটুকু করেনি। তারপর একদিন শার্লির পেটে বাচ্চা এল। মেরি ওকে খুব মারল। তাও শার্লি পেটের বাচ্চার বাবার নাম বলেনি। কিন্তু আমি তো জানতাম। শার্লিকে তাড়িয়ে দিল মেরি। ও আবার আগের বাসাতেই ফিরে গেল। আমি লুকিয়ে কিছু সাহায্য করতাম, যাতে মেরি জানতে না পারে।

হ্যারির জন্মের পর শার্লি অনেক চেষ্টা করেও কাজ পেল না। ল্যাম্বেথে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ওখানে তো মেরি আছে। বাধ্য হয়ে দেহব্যবসায় নামল। আমি একেবারে চাইনি। কিন্তু কী-ই বা করার ছিল। হ্যারি বড়ো হতে লাগল। বড়ো আর অবাধ্য। এদিকে ব্র্যাডফোর্ড স্ট্রিট চওড়া করার জন্য আমাদের বস্তি উঠিয়ে দিয়ে ঠাঁই দিল বেকার স্ট্রিটের পাশে। এখনও ওখানেই থাকি। বেকার স্ট্রিটে আসার কিছুদিনের মধ্যেই যক্ষ্মাতে মেরি মারা গেল। ল্যাম্বেথের হাড়ভাঙা খাটুনি আর পোষাচ্ছিল না ওর। ভাবলাম এবার শার্লিকে বিয়ে করে সম্পর্কটা পাকা করে নিই। কিন্তু কপালে নেই। শার্লি ততদিনে লিন্ডসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। লিন্ডসে ছিল পাকা খুনে আর চোর। একটাই কাজের কাজ করেছিল, হ্যারিকে নিজের পদবিটা ব্যবহার করতে দিয়েছিল। কিন্তু দুচোখে দেখতে পারত না ওকে। রোজ মদ খেয়ে এসেই পেটাত। ততদিনে শার্লি আবার ল্যাম্বেথে ফিরে গেছে। লিন্ডসের মার খেয়ে ছেলে ভয়ে আমার কাছে লুকিয়ে থাকত। ডাকত গ্র্যান্ডপা বলে। তারপরেই লিন্ডসের ওই শয়তান জারজ ছেলেটা এসে উপস্থিত।”

“লিন্ডসের ছেলে?”

“হ্যাঁ, হোয়াইট চ্যাপেলের এক বেশ্যার পেটে লিন্ডসের একটা ছেলে ছিল। মা-টা খুন হয়ে যায়। ছেলে এসে শার্লিদের সঙ্গেই থাকতে শুরু করে। ছেলে তো না, স্বয়ং শয়তানের মূর্তি। ও আসার পরে হ্যারি বদলে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে। কিছুদিন পরে শার্লি আর লিন্ডসেরও একটা ছেলে হয়। উইগিন্স। হ্যারিকে লিন্ডসের সেই জারজ ছেলে বোঝায়, এবার আর হ্যারির কদর থাকবে না। তার কথাতেই দুজনে মিলে গংসিদের দলে নাম লেখাল।”

“এই গংসি কারা?” প্রিয়নাথ শুধাল।

“চিনাদের গোপন দল। চিন থেকে পালিয়ে যেসব অপরাধী উদ্বাস্তুরা ব্রিটেনে আশ্রয় নিত, তারা ছোটো ছোটো অনেকগুলো গোপন সমিতি গড়ে তুলেছিল। এই সমিতিদের বলা হত টং। আর ব্রিটেনে যত টং ছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক ছিল গংসি। এরা খাঁটি চিনে ছাড়াও ব্রিটিশ, মালয়, মেক্সিকানদেরও নিত। যোগ্যতা একটাই। যে-কোনওরকম ঘৃণ্য অপরাধ করতে পিছপা হলে চলবে না। আর এদের দলে একবার ঢুকলে না মরা অবধি নিস্তার নেই। এদের নিজস্ব সাংকেতিক ভাষা ছিল। নাম ই-চিং। কাউকে খুন করবার আগে অত্যাচার করে মারত। তাকে বলত লিং-চি। এতে সারা দেহে আঘাত করে করে কষ্ট দিয়ে শেষে বুকে ছুরি বিঁধিয়ে হত্যা করা হত। হত্যার ঠিক আগে কেটে নেওয়া হত অণ্ডকোশ। দেহে ধারালো অস্ত্র দিয়ে লেখা হত চিহ্ন। এইসব এদের কাছে প্রায় ধর্মের মতোই ছিল। যেদিন লিন্ডসেকে ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখলাম, সেদিন আর কেউ বুঝুক না বুঝুক আমি বুঝেছিলাম কে এই কাজ করেছে। আর কে করিয়েছে।”

“কে করিয়েছে?”

“লিন্ডসের সেই জারজ ছেলে। বাবাকে সহ্য করতে পারত না। তার মাকে বিয়ে না করে লিন্ডসে শার্লিকে বিয়ে করেছিল। সেই রাগ তো ছিলই। ও এসেছিল বাবাকে খুন করতে। কিন্তু নিজে করার সাহস ছিল না। হ্যারিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করল। হ্যারি চিরকালের বোকা। ফাঁদে পা দিল। লাভের লাভ কী হল? হ্যারিকেই পালাতে হল। আর শার্লি পাগল হয়ে বেডলামে ভরতি হল।”

“লিন্ডসের সেই ছেলেকে আপনি আর দেখেছেন?”

“লিন্ডসে মারা যাবার পরে আর দেখিনি। শুধু জেনেছিলাম কোনও এক ডাক্তারের অ্যাপোথেকারিতে সহকারীর কাজ করে। দেখলাম অনেক বছর বাদে। ইন্ডিয়াতে আসার আগে। হ্যারি একদিন আমার কাছে ওকে নিয়ে এল। বলল, গ্র্যান্ডপা, ও আমাদের সঙ্গে ইন্ডিয়া যাবে। খুব জরুরি দরকার। আমি অনেক মানা করেছিলাম জানেন? হ্যারি বলল, না। ও যাবেই। বেডলামে ও মায়ের খেয়াল রাখে। মাকে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসত হ্যারি। কী লাভ হল? দুজনই প্রাণ হারাল।”

প্রিয়নাথ দস্তুরমতো চমকে উঠল, “তার মানে!!”

“হ্যাঁ, মায়ের পদবি ব্যবহার করত রিচার্ড। বাবারটা করতে নাকি ঘেন্না হয়। ওর মায়ের পদবি ছিল হ্যালিডে, সেটাই লিখত।”


পঞ্চম পর্ব— উত্তরপ্রবেশ

সোনাগাজি থেকে দর্জিপাড়া হাঁটাপথ। এ গলি ও গলি ধরে তারিণী আর গণপতি চলল নবীন মান্নার বাড়ির দিকে। তারিণীর মাথায় চিন্তার ভাঁজ। গণপতি কেমন যেন বোকা হয়ে গেছে। কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। সেই সেদিন চিনা পাড়ার খুনের ঘটনার পর একে একে যা ঘটে চলেছে, প্রায় সবকটাই তার হিসেবের বাইরে। শেষ চমক একটু আগে খেল। নবীন মান্নাও যে রাঁড় পোষেন, আর সেটা অন্য কেউ না, স্বয়ং লক্ষ্মীমতি, এটা এতদিনেও ঘুণাক্ষরে জানতে পারেনি! পাক্কা ম্যাজিশিয়ান বটে! ভাগ্যিস তারিণী জিজ্ঞাসা করল। কিন্তু তারিণী কেন নবীন মান্নার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে সেটা গণপতির মাথা দিয়ে আসছে না। তবে তারিণী কিছু একটা আভাস পেয়েছে, নইলে এমন ভূতে পাওয়ার মতো তক্ষুনি দৌড়োত না।

গণপতির কাজ একটাই। তারিণীর সঙ্গে নবীন মান্নার দেখা করিয়ে দেওয়া। নবীন মান্না এর আগে তারিণীকে দেখেছেন। সেই গঙ্গার ঘাটে বা সেদিন থিয়েটারে। কিন্তু সেভাবে আলাপ হয়নি। তারিণী নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে রাস্তায় চলছে। ওর এই রূপ আগে দেখেনি গণপতি।

একটু বাদেই দুজনে নবীন মান্নার বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত। খুব বড়োলোক না হলেও বেশ সচ্ছল মানুষ নবীন মান্না। নুনের ব্যবসা আছে, পূর্বপুরুষের টাকা আছে। তাই ম্যাজিক, থিয়েটার এসব করে মনের সাধ মেটান। কলকাতার বাবুয়ানাতে তবু তাঁকে মধ্যবিত্তই বলা চলে। দরজায় টোকা দিতে চাকর এসে দরজা খুলে দিল। সে গণপতিকে চেনে। আগে বেশ কয়েকবার দেখেছে।

“বাবু আছেন?” গণপতি শুধাল।

“এজ্ঞে আছেন। ভিতরবাড়িতে। আপনেরা আসেন।” বলে তাদের দুজনকে নিয়ে একতলার বসার ঘরে বসতে বলল। মাঝারি সাইজের ঘর। চারটে বড়ো বড়ো জানলা, মাথায় লাল-নীল কাচ বসানো। দুটো দরজার একটা অন্দরমহলে যাচ্ছে আর একটা সদরে। সামনে ছোটো দেউড়ি। ঘরে চেয়ার, টেবিল, আলমারি, আর ছোবড়ার গদিওয়ালা উঁচু একটা তক্তাপোশ সাদা চাদরে ঢাকা। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গোটা চার-পাঁচ তাকিয়া। তারিণীরা ওখানেই বসল।

দেওয়ালে রঙের পোঁচড়া ঘুরিয়ে একদিকে তিনটে গোলাপফুল, আর অন্যদিকে দুটি পাখি আঁকা। যেদিকটা ফাঁকা, সেখানে শোভা পাচ্ছে ডিমের মতো ফ্রেমে বাঁধানো নবীনবাবুর বাবার ফটোগ্রাফ, রবি বর্মার শান্তনু-গঙ্গা, রানি ভিক্টোরিয়ার ছবি। ছবির তলায় ধূপদানি দেখে তারিণী বেশ মজা পেল। দেবতাদের সঙ্গে রানিও তবে এই বাড়িতে পুজো পান!

ভাবতে ভাবতেই নবীন মান্না বেরিয়ে এলেন। আদুড় গা। একটা পাড়-ছেঁড়া ধুতি গুটিয়ে পরা। গণপতিকে দেখেই বললেন, “কী ব্যাপার হে গণপতি? এই অসময়ে? সব ঠিক আছে তো? বসো বসো, দাঁড়াতে হবে না।”

নিজেও বসলেন তক্তপোশে। ওদের পাশেই।

গণপতি বেশ কিন্তু কিন্তু করে বলল, “আজ্ঞে দরকারটা আমার না। দরকার এর। আমার বন্ধু তারিণী। ওকে তো আপনি দেখেছেন।”

“হ্যাঁ, দেখেছি বটে, তবে কথা হয়নি। বলো কী দরকার”, বলে তারিণীর দিকে হাসিমুখে ফিরলেন নবীনচন্দ্র।

তারিণীকে ড্রিসকল সাহেব যা যা শিখিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে প্রথম হল জেরা করার সময় যাকে জেরা করছ, তাকে ভাববার বা তৈরি হবার সময় দেবে না। আঘাতটা করবে একেবারে শুরুতেই। আর সেটা এত জোরে, যেন সামলাতে সময় লাগে। বড়ো বড়ো ঘাঘু অপরাধী অনেক সময় মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে না। গোটা রাস্তায় আসতে আসতে ঠিক এই মুহূর্তটার অপেক্ষাই করছিল তারিণী। কোনওরকম ভদ্রতার পথেই গেল না। সোজা নবীনচন্দ্রের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, “একটা কথাই জানতে চাই, আপনি চিঠিটার কথা পুলিশকে বললেন না কেন?”

নবীনের হাসিমুখ একনিমেষে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তাঁর দুই চোখে তারিণী যা দেখতে পেল, তার নাম আতঙ্ক। খানিক চুপ করে থেকে নবীন একটু থেমে থেমেই বললেন, “কী... কীসের চিঠি?”

“যে চিঠির সঙ্গে কার্টারের মৃত্যুর যোগ আছে সেই চিঠি।”

“কে বলেছে আমি কোনও চিঠি পেয়েছি? বেরিয়ে যাও। এক্ষুনি বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। আর গণপতি, আমি তোমায় করিন্থিয়ান থিয়েটারে ম্যাজিক দেখানোর ব্যবস্থা করলাম, আর তার বদলে তুমি এইসব বন্ধু নিয়ে আসছ? তুমিও বেরোও। কোনও দিন যেন আমি তোমার মুখ না দেখি। আর হ্যাঁ, উইজার্ড ক্লাবের ঘরে তোমার থাকা আজ থেকে বন্ধ। তুমি নিজের পথ দ্যাখো”, নবীনচন্দ্র ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন। রাগে তাঁর গোটা শরীর কাঁপছে।

গণপতি অপ্রস্তুত হয়ে ওঠার উপক্রম করলেও তারিণী নড়ল না। বরং হাসিমুখেই বসে রইল। খুব শান্ত গলায় বলল, “রাগ করবেন না নবীনবাবু, তবে আমাদের বললে আপনার লাভ বই ক্ষতি হত না। প্রিয়নাথ দারোগার নাম জানেন তো? তিনি নিজে এই কেসের ভার নিয়েছেন। উনি বড়ো সহজ মানুষ নন। সেদিনের জোড়া মৃত্যুর সঙ্গে আপনার যোগাযোগের কথা যদি তিনি জানতে পারেন, তবে আপনাকে ছেড়ে কথা বলবেন না। নিশ্চিত থাকুন। আর কথা বার করার পুলিশের অনেক উপায় আছে। আমি ওঁর কথাতেই এই তদন্তে সাহায্য করছি। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি নবীনবাবু, আপনি সত্যি কথা বললে আপনার নাম কেউ জানবে না। আমি জানি আপনি কোনও অপরাধ করেননি। ফেঁসে গেছেন। আপনাকে ফাঁসানো হয়েছে। কিন্তু গোটা ঘটনাটা খুলে না বললে কীভাবে বুঝব বলুন তো, ঠিক কী হয়েছিল?”

নবীনচন্দ্র একটু যেন শান্ত হলেন। একবার ভিতরমহলের দিকে, একবার রানির ছবির দিকে তাকালেন। তারপর তারিণীর পাশে ধপ করে বসে বললেন, “সব বলব। কিন্তু তার আগে আমারও কিছু প্রশ্ন আছে।”

—বলুন।

—তোমরা চিঠির কথা কার থেকে জানলে?

—লক্ষ্মীমতিকে আপনিই বলেছেন।

—লক্ষ্মীমতি!! তার খবর তোমাদের কাছে এল কীভাবে? এ খবর তো...

—ধরে নিন কপালজোরে। আপনার লক্ষ্মীমতি একবার আমাদের গণপতিকে প্রাণে বাঁচায়। তখন থেকে সে গণপতিকে ভাই মেনেছে।

মাথা টিপে বসেছিলেন নবীন মান্না। ধীরে ধীরে বললেন, “এই পাতানো ভাইয়ের কথা আমিও শুনেছি। ওর মুখেই। নাম বলেনি। আমিও জিজ্ঞেস করিনি কোনও দিন।”

—তারপর বলুন।

—কী বলব?

—চিঠির ব্যাপারটা।

—এই চিঠির সঙ্গে কার্টারের সম্পর্ক আছে, সেটা তুমি বুঝলে কেমন করে?

—লক্ষ্মীদিদির মুখে শুনলাম, প্রায় দিন দশ-পনেরো হল আপনি আনমনা। বলছেন, কী কুক্ষণে চিঠিটা পেলাম। দশ-পনেরো দিন আগে একটাই ঘটনা ঘটেছিল, যাতে আপনি ভেঙে পড়তে পারেন। আর সেটা মঞ্চে জোড়া মৃত্যু। আমি যদি ভুল না করি, চিঠি আপনি পেয়েছিলেন তারও আগে। কিন্তু তখন বোঝেননি সেই চিঠির গুরুত্ব। বুঝেছিলেন কার্টার মারা যাবার পর। আর কোনও কারণে নিজেকে দোষী ভাবছেন।

—একেবারে ঠিক ধরেছ।

—যদি কিছু মনে না করেন, এটা কি সেই চিঠি যেটা আপনি স্টেটসম্যান পত্রিকার অফিসের ডাকবাক্সে ফেলে এসেছিলেন?

আবার চমকালেন নবীন মান্না। এ যুবক দেখতে সাধারণ হলেও এর এক অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতা আছে, অথবা প্রখর বুদ্ধি ধরে। সব কিছু কীভাবে অনুমান করছে? তাও একেবারে ঠিকঠাক?

যেন নবীনচন্দ্রের মনের কথা বুঝতে পেরেই তারিণী বলল, “সেদিন প্রিয়নাথ দারোগা আমার অফিসে এসেছিলেন। কথায় কথায় বললেন, গত ১২ ডিসেম্বর চিনা পাড়ায় যে সাহেবকে খুন করা হল, তাঁর দেহ পাওয়া গেছে প্রায় মাঝরাতে। কিন্তু পরদিন সকালে স্টেটসম্যানে এই খবর ছাপা হয়। পুলিশ তদন্ত করে দেখেছে, আগের দিন সন্ধ্যাবেলাতেই কে যেন ডাকবাক্সে একটা বেনামি চিঠি ফেলে দিয়ে গেছিল। সেটা কে পুলিশ ধরতে পারছে না। কাল চিঠির কথা শুনে তাই ওটাই সবার আগে মনে পড়ল।”

“ঠিক ধরেছ”, বললেন নবীনচন্দ্র। “কী কুক্ষণে যে চিঠিটা ফেলতে গেলাম!”

“আপনি চিনা পাড়ায় সাহেবের মৃত্যু দেখেছিলেন?” জিজ্ঞাসা করল তারিণী।

পাশাপাশি মাথা নাড়লেন নবীনচন্দ্র, “তোমাদের মতো আমিও পরদিন খবরের কাগজেই দেখি। আমার সন্দেহ হয়েছিল এটা বুঝি আমার চিঠির জন্যেই, তবু মনকে সান্ত্বনা দিয়েছি। ভেবেছি আমি ভুল। বুঝিনি আমাকে শুধু বাহক হিসেবে ব্যবহার করেছিল।”

—কে?

—কার্টার। ও-ই আমাকে চিঠিটা দিয়েছিল।

—কবে?

—গত বারো তারিখ। এই সন্ধে পাঁচটা নাগাদ হবে।

—কোথায়?

—সোনাগাজিতে। ওর নিয়মিত যাতায়াত ছিল ওখানে।

—ওরও বাঁধা মেয়েছেলে ছিল?

—না। ও যেত পাড়ার একটেরে একটা বাড়িতে। ও বাড়িতে মাঝে কেউ থাকত না। পরে শুনেছি একপাল পাগল এনে রাখত। সেখানে ময়না বলে একটা মেয়ে যেত শুধু। ওই বাড়িতে ওর কী কাজ অনেক জিজ্ঞেস করেছি। বলেনি। আসলে যতই বন্ধু হোক, ও সাহেব। আমি নেটিভ। তফাত তো থাকবেই। তাই আমিও বেশি কিছু জানতে চাইনি।

—আপনি সেদিনের কথা বলুন।

—সেদিন লক্ষ্মীর কাছে গেছিলাম দুপুরবেলা। রাতে এক জলসায় যাবার কথা ছিল। বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দাশুর পানের দোকান থেকে একখিলি পান কিনে মুখে পুরতে যাব, এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে কার্টার নেমে এল উলটোদিকের বাড়ি থেকে। সে দৃশ্য আমি কখনও ভুলব না। চোখে উদভ্রান্ত দৃষ্টি, সারা শরীর যেন ভয়ে কাঁপছে, কপালে ঘাম। আমাকে দেখেই প্রথমে ভূত দেখার মতো চমকে গেল। তারপর কী ভেবে রাস্তা পার হয়ে উলটোদিকে এসে বলল, মান্না, তোমাকে আজ আমার একটা উপকার করতে হবে। বদলে পরে তুমি যা চাইবে, আমি রাজি হব। আমি বললাম, কী উপকার? বলল, আমাদের পরের শো-র বিজ্ঞাপনে কিছু বদল হবে। আমি সেটা লিখে দিয়েছি। তুমি এই খামটা শুধু স্টেটসম্যানের অফিসের সামনে ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ো। কেউ যেন দেখতে না পায়।

—আপনি জিজ্ঞাসা করেননি, কেন এত গোপনীয়তা?

—করেছিলাম। বলল করিন্থিয়ান হলের নাকি দারুণ চাহিদা। কেউ জানতে পেলে আগেভাগে বুক করে নেবে।

—আপনার মনে হল এটা সত্যি?

—মনে হয়নি। কিন্তু আর কিছু বলার আগেই প্রায় দৌড়ে ও ওই বাড়িতে ঢুকে গেল।

—আপনি খুলে দেখলেন না, কী লেখা আছে?

—আমাকে কি তোমার চামার মনে হয়? আমি বিশ্বাসভঙ্গ করি না।

—তারপর? চিনা পাড়ায় খুনের পরে কার্টারের কাছে গেছিলেন?

—হ্যাঁ। ওর হোটেলে। সেদিন ওর অন্য রূপ। মনে খুব ফুর্তি। সেজেগুজে তৈরি হচ্ছিল। আমি প্রসঙ্গ তুলতেই বলল, ও নাকি আমার মনের ভ্রম। আমি আজব কল্পনা করছি। চিনা পাড়ার খুনের সঙ্গে ওই চিঠির কোনও সম্পর্কই নেই।

—আর?

—আর বেশিক্ষণ কথা হয়নি। ও বেরিয়ে গেল। স্বয়ং বড়োলাট নাকি ওর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন।

—বড়োলাট নিজে? কেন?

—তা জানি না।

—সেই আপনাদের শেষ কথা?

—না। আর-একবার হয়েছিল।

—কবে?

—যেদিন কার্টার মারা গেল, সেদিন সন্ধ্যায়। আমি গ্রিনরুমে গেছিলাম।

—কী কথা হল?

—সেদিন দেখি একেবারে অন্য মূর্তি। চোখ ছলছল। মুখ গম্ভীর। আমাকে অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করল।

—কী প্রশ্ন?

—বলল, মান্না, তুমি কর্মফল মানো? ভগবান মানো? স্বীকার করলাম দুটোই মানি। তারপর বলল, তুমি জানো, জিসাস বলেছেন পাপ করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়? বললাম, তাও জানি। তখন বলল, হাত যখন হাতিয়ার ব্যবহার করে প্রাণ নেয়, তখন পাপ কার হয়? হাতের না হাতিয়ারের? বললাম, কারও না, হাত যার পাপ তার। প্রায়শ্চিত্ত করতে হলে সে-ই করবে। কার্টার একলাফে উঠে আমায় জড়িয়ে ধরে বলেছিল, তুমি আমার মনের সংশয় দূর করলে।

—কী সংশয়?

—আমিও সেটা জানতে চেয়েছিলাম। কার্টার মুচকি হেসে বলেছিল, বুঝলাম প্রয়োজনে হাতিয়ার হাতের আদেশও অমান্য করতে পারে। কারণ পাপ যদি করেই থাকে, হাত করেছে। হাতিয়ার না।


ষষ্ঠ পর্ব— বিভিন্ন কোরাস

বাইরে আবার অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। আজ মনে হয় ভাসাবে। পনেরো মিনিট হয়নি, রাস্তায় জল দাঁড়িয়ে গেছে। গত দুদিন যেরকম গুমোট গরম পড়েছিল, তারপর এই বৃষ্টিটা দরকার ছিল। দূরে কোথাও এফএম-এ গান বাজছে। অঞ্জন দত্তের ‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে’।

আমি আমার অফিসরুমের চেয়ারে বসে আছি। অফিসের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। আমার গায়ে একটা সুতো অবধি নেই। পরনে শুধু একটা জাঙ্গিয়া। পাখা চলছে, তবু সারা গা দরদর করে ঘামছে। দুটো হাত মাথার পিছনে রাখা। এখন টনটন করছে। আমার ঠিক উলটো দিকে বসে আছেন পুলিশ অফিসার অমিতাভ মুখার্জি। হাতে রিভলভার।

ঘণ্টাখানেক আগেই আমি ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ছিলাম। ভেবেছিলাম আর আসব না অফিসে। কিন্তু অফিসার মুখার্জির ফোন এল। পরপর তিনবার। ধরিনি। তারপর হোয়াটসঅ্যাপ, “চলে এসো তুর্বসু। আমি সব জানি। তুমি অপর্ণা জানো, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট জানো, আমিও উর্ণা জানি।” উর্ণার নাম দেখে চমকে গেলাম। লোকটা উর্ণার ব্যাপারে জানল কীভাবে? আমার আর উর্ণার কথা তো ওর বাবা-মা অবধি জানে না! আমার পিছনে লোক লাগিয়েছিল নিশ্চিত। বুঝলাম পালিয়ে লাভ নেই। কতদিন পালাব? আর কোথায়? লোকটা আমার অফিস চেনে, চুঁচুড়ার বাড়ি চেনে, উর্ণাদের বাড়িও চেনে বোধহয়। যে দেবাশিসদাকে ওরকম করতে পেরেছে, সে আমাদেরও ক্ষতি করতে পিছপা হবে না। তাহলে? বরং দেখাই যাক না, কী হয়। এ লোক আমাকে খুন করবে না। করার হলে অনেক আগে করে দিত। আমি কিছু একটা জানি, বা জানি বলে ও ভাবছে। সেটার জন্যেই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।

আমি ফোন ব্যাক করলাম, “আপনি দাঁড়ান। আমি আসছি।”

দেখলাম আকাশে ঘন মেঘ জমছে। মেঘের রং ঘন নীল। ঠিক সেই সহজ পাঠের মতো। বাইকে করে ফিরতে ফিরতেই ঠিক করলাম, আর যাই করি নার্ভাস হওয়া যাবে না। মাথা ঠান্ডা রাখতেই হবে। অফিসের দরজার সামনেই দাঁড়িয়েছিলেন মুখার্জি। মোবাইলে কিছু একটা দেখছিলেন। আমায় দেখে আচমকা গম্ভীর হয়ে গেলেন। শুধু বললেন, “ভিতরে চলুন।”

তালা খুলে ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকেই মুখার্জি দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন।

“ফোনটা দিন”, ততক্ষণে ওঁর হাতে উঠে এসেছে সার্ভিস রিভলভার।

আমি বিনা বাক্যব্যয়ে মোবাইলটা ওঁর হাতে দিলাম। লক খুলে। রিভলভারটা আমার দিকেই তাগ করে অনেকক্ষণ ধরে কল লিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ চেক করলেন। তারপর মুখ উঠিয়ে বললেন, “আমাকে ফোনের পর আর কাকে কাকে ফোন করেছেন?”

“দেখতেই তো পাচ্ছেন। আপনিই শেষ। আর কাউকে না।”

“আমাকে কি বোকাচোদা পেয়েছেন? লাস্ট কল ডিলিট করা যায় না?”

“যায়, তবে কাকে করব? আর বলবই বা কী? আপনার মতো বুদ্ধিমান লোক কি কোনও প্রমাণ রেখে কাজ করেন? কিছু বলতে গেলে আমি বরং মানহানির মামলায় ফেঁসে যাব। আর কীসে কীসে ফাঁসাবেন কে জানে।”

শুনেই অফিসারের চোখ যেন জ্বলে উঠল। আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঠেসে দিলেন দেওয়ালে। রিভলভার উঁচিয়ে বললেন, “জামাকাপড় খুলুন। এক্ষুনি। সব।”

আমিও বশংবদের মতো সব খুললাম। প্রথমে আমার জামা প্যান্ট, পার্স খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন অফিসার। তারপর গোটা গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কী যেন খুঁজলেন। শেষে বললেন, “জাঙ্গিয়া খুলুন আর উবু হয়ে বসুন।”

রাগে, হতাশায় কান্না পাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক করেছিলাম মাথা ঠান্ডা রাখব। কিচ্ছু না বলে তাই করলাম। অফিসার ভালো করে দেখে নিলেন পাছার ফুটোতে কিছু লুকানো আছে কি না। নেই দেখে একটু স্বস্তি পেলেন মনে হল।

—জাঙ্গিয়া পরে নিন। চেয়ারে গিয়ে বসুন। আর সিসি টিভির ক্যামেরাটা কোনদিকে?

—নেই।

—বলেন কী? আপনি গোয়েন্দা, আর অফিসে সিসি টিভি নেই?

—এতদিন দরকার পড়েনি। এবার মনে হচ্ছে লাগানো উচিত ছিল।

অফিসার শুনতে পেলেন না। পেলেও গা করলেন না বিশেষ।

—চুপচাপ চেয়ারে গিয়ে বসুন। গোয়েন্দাদের বিশ্বাস নেই। আর হ্যাঁ, দুটো হাত মাথার পিছনে। বেশি সেয়ানা হতে যাবেন না যেন।

অফিসার আমার ছোট্ট অফিসে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন কোথাও কোনও গোপন ক্যামেরা আছে কি না। একদিকে ডাঁই করা পুরোনো কাগজের স্তূপ। সেই তারিণীর আমলের। ফেলব ফেলব করে ফেলা হয়নি। অফিসার সেখান থেকেই একটা ফাইল তুলে নিলেন।

“কী আছে এতে? ও বাবা! কবিতা? কে লেখে, আপনি?”

“না, এগুলো তারিণীচরণের কাগজ। বেশিরভাগ উইতে খেয়েছে, কিছু রয়ে গেছে।”

“আপনার সেই দাদু কবিতাও লিখতেন নাকি?”

“তাই তো শুনেছি।”

“তাহলে গোয়েন্দাগিরি করতেন কখন?” বলে পড়তে লাগলেন, “আমরা পুরুষ, নীরস অতি/ নহি অধিকারী সুখে/ কে দেবে মোদের সুধার কলস/ তৃষিত কাতর বুকে? কী বালের কবিতা মশাই!” শেষ লাইনটা আমাকে বলা।

আমি খুব শান্ত গলায় বললাম, “আপনি কি তারিণীর কবিতা পড়তে এসেছেন?”

ফাইলটা আমার টেবিলে ছুড়ে ফেলে দিলেন অফিসার। একরাশ ধুলো উড়ল। মাথা নেড়ে বললেন, “নাহ। এসেছি আপনার সঙ্গে কথা বলতে।” বলে উলটো দিকের চেয়ারে বেশ আরাম করে বসলেন অমিতাভ মুখার্জি। বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে।

“আসলে আমাদের একটু সতর্ক থাকতে হয়। এই আর কি। বিশেষ করে আপনাদের মতো গোয়েন্দাদের থেকে। কিছু মনে করবেন না। আপনাকে আমি গান্ডু টাইপই ভেবেছিলাম। আপনি তো বর্ণচোরা আম। দেখলে বোঝাই যায় না, এত বুদ্ধি ধরেন।”

আমি গলগল করে ঘামছি। হাত টনটন করছে। বললাম, “হাত নামাতে পারি?”

“নামান, তবে চালাকির চেষ্টা করবেন না। সামনে পেতে রাখুন। কায়দা করলে অবস্থা টাইট করে দেব।”

“যেমন দেবাশিসদার করেছেন?”

“দেবাশিসদাকে আমি মারিনি। সরি টু সে।”

“মানে? তাহলে মারল কে?”

“সে জেনে আপনার কাজ নেই। আপনি শুধু আপনার কাজটা করুন।”

“সেটা কী?”

“তারিণীর ডাইরিতে যে ডিরেক্টরের কথা আছে, তাঁকে খুঁজে বার করা।”

“তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন? মানে থাকা সম্ভব?”

“বেঁচে থাকার প্রশ্নই নেই। কারণ যা মনে হয়, এই ডিরেক্টর কোনও ব্যক্তি না। বস্তু। তারিণীর খুব প্রিয় কোনও বস্তু। বাক্স, সিন্দুক, এই জাতীয়। যেখানে কিছু লুকিয়ে রাখা যায়। সেটা তাঁর পরিবারের লোক ছাড়া কারও জানা সম্ভব না। আর তাই আপনাকে প্রয়োজন।”

“দেখুন, একটা বেসিক মুশকিল আছে। ঘটনা হল, তারিণী নিয়ে আপনারা যা জানেন, আমি তার থেকে ঢের কম জানি। তাঁকে নিয়ে পরিবারে খুব বেশি আলোচনা শুনিনি। তাঁকে চেনা মূলত তাঁর ডায়রি পড়ে। যাতে অধিকাংশ কবিতা, আর কেসের কথাই লেখা। আপনাকে তো আগেই বলেছি, শুধু ১৮৯২-৯৩-এর শেষের দিকের কিছু পাতা আর ১৮৯৫-৯৬-এর ডায়রি আমি পাইনি। বাকি যা আছে পড়েছি। নিতান্ত মামুলি কেস। তাতে এই ডিরেক্টরের উল্লেখ অবধি নেই। আপনাকে সাহায্য করতে হলে আমাকেও কিছু তথ্য জানতে হবে। না হলে অন্ধকারে হাতড়াব কেমন করে? আমি আপনাকে সাহায্য করতে রাজি। কিন্তু কিছু খটকা দূর না করলেই নয়।”

অফিসারের মুখ দেখে কনভিন্সড মনে হল। মুখে কিছু বললেন না। একটু সাহস পেয়ে বললাম, “আমার কিছু জানার আছে। বলা যাবে কি? রেকর্ড যে হচ্ছে না সে তো বুঝতেই পারছেন।”

অফিসার রিস্ক নিলেন না। টেবিলে থাকা আমার ফোনটা তুলে একেবারে স্যুইচ অফ করে শেষে বললেন, “তা বটে। বলুন কী কী জানতে চান?”

—শুরু থেকে শুরু করি। দেবাশিসদা একজন চ্যালার কথা অনেককেই বলতেন। নাম করতেন না। সেটা কি আপনি?

—হ্যাঁ। দেবাশিসদা এককালে টিউশানি করতেন। আমি গরিব ঘরের ছেলে। বাবা ছিল না। আমাকে বিনা পয়সায় পড়াতেন। আপনাকে তো বলেইছি, স্টুডেন্ট ভালো ছিলাম। খুব ভালোবাসতেন আমায়। চ্যালা বলে ডাকতেন। মাঝে কিছুদিন যোগাযোগ ছিল না। পুলিশে চাকরি পাবার পরে আবার ওঁর কাছে যাই। তখনও ওঁর বিয়ে হয়নি। রাত জাগতেন। আমিও রাতেই যেতাম।

—কেন?

—আমার গবেষণার শখ ছিল। ইতিহাস নিয়ে। দেবাশিসদার বাড়ি গেলে নানারকম আলোচনার সুযোগ পেতাম। মনের খিদে মিটত।

—দেবাশিসদার বিয়েতে আপনি সাক্ষী ছিলেন?

—হ্যাঁ। আপনি যে এটা বার করে ফেলবেন সেটা আমার মাথাতেও আসেনি। বললাম না, যতটা গান্ডু ভেবেছিলাম আপনি তা নন।

—তারপর অপর্ণা দেবীর সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে?

—আমি বুঝতে পারছি আপনি কী বলতে চাইছেন। বউদি আর আমার সেরকম কিছু রিলেশান ছিল না। আসলে বিয়ের পর বউদি জানতে পারেন দেবাশিসদা ইম্পোটেন্ট। ওঁদের কোনও ফিজিক্যাল রিলেশান হত না। শেষে তো আলাদা খাটে শুত দুজন। দেবাশিসদা পাত্তা দিতেন না। পড়াশোনা নিয়েই থাকতেন। আমার সঙ্গে বউদির ভালো বন্ধুত্ব ছিল। আভাসে ইঙ্গিতে আমায় সব বলেছিলেন। ২০১২-র শুরুতে ওঁদের বিয়ে হল, আর শেষের দিকে দেবাশিসদা ডাক্তার গোপালচন্দ্র দত্তর বাড়িতে ফাইলটা পেলেন।

—যে ফাইলে প্রিয়নাথের লেখা শেষ দারোগার দপ্তর ছিল?

—এটাও ধরেছেন? গুড। তবে দারোগার দপ্তর না। কারণ এ লেখা ছাপানোর জন্য ছিল না।

—আপনি পড়েছেন সেই লেখা?

—হ্যাঁ। দেবাশিসদাই গোপনে এক এক পাতা করে চুরি করে প্রায় গোটাটাই নিয়ে এসেছিলেন। প্রথম পাতা ছাড়া। ওঁর কাছেই ওটা দেখতে পাই।

—কী ছিল তাতে?

—তখনকার কলকাতার এক কেস। যার কিছুটা আপনিও জানেন। মঞ্চে দুই ম্যাজিশিয়ানের মৃত্যু আর চিনা পাড়ায় এক খুনের কথা। সেটা বড়ো কথা না। প্রিয়নাথের লেখা অনুযায়ী এই কেসে আরও তিনজন তাঁর সঙ্গে ছিলেন। একজন তারিণী রায়, একজন জাদুকর গণপতি আর এক রহস্যময় সাহেব।

—রহস্যময় কেন?

—সাহেবের নাম সাইগারসন। এসেছেন লন্ডন থেকে। খাড়া নাক। পাইপ খান। ফ্রক কোট পরেন। এসেছিলেন সেই ম্যাজিকের দলের সঙ্গে। কিন্তু অসম্ভব ভালো অনুমান ক্ষমতা। পড়লে একজনের কথাই মাথায় আসে—

—শার্লক হোমস!

—একদম তাই। আবার টাইমলাইনও ম্যাচ করছে। দেবাশিসদা বেকার স্ট্রিট সোসাইটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা মানেন হোমস সত্যি সত্যি জীবিত ছিলেন। তাঁরা যা জানান, সেটা জেনে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ।

—সেটা কী?

—তাঁদের থিয়োরি অনুযায়ী, মরিয়ার্টি মারা যাবার পরে নাকি হোমস গা ঢাকা দিতে ভারতে আসেন। সালটা ১৮৯২। ভাবতে পারেন! শুধু তাই না, এরপরেও একবার হোমস ভারতে এসেছিলেন। কবে জানেন? ১৮৯৫-৯৬। ভেবে দেখুন। ঠিক যবে যবে হোমস আসছেন, তারিণীর ডায়রি খোয়া যাচ্ছে। শার্লক হোমসের বাবার নাম ছিল সাইগার হোমস। তাই তিনি নাম নেন সাইগারসন। মজার ব্যাপার, প্রিয়নাথের লেখাতে সাহেবের নাম সাইগারসন মোহেলস। এই MOHELS-এর শব্দগুলো এদিক-ওদিক করলে কী হয় বলুন তো!

—HOLMES…!!!

—ঠিক তাই। এটা বুঝতে পেরে আমাদের ঘুম উড়ে যায়। কিন্তু প্রমাণের কোনও উপায় নেই। আর তারপরেই দেবাশিসদার চোখে পড়ল বইটার কথা।

—টেমারলেন?

—বাপরে! আমি তো সোজা জিনিস নন মশাই! হ্যাঁ, সেই কোটি টাকার বই। আর সেটা আঁচ করার পর থেকেই দেবাশিসদা আমায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা শুরু করলেন। সব কথা বলতেন না। আমিও রেগে যেতে শুরু করলাম। মাঝে মাঝেই আমার আর দেবাশিসদার তর্ক হতে লাগল। বুঝতাম উনি চাইছেন আমি যাতে না আসি। ইঙ্গিত দিতে শুরু করলেন, আমি আসলে বউদির সঙ্গে প্রেম করতে আসি। এমনকি একদিন বউদিকে এটাও বললেন, উনি চাইলে আমার সঙ্গে শুতে পারেন। ভেবেছিলেন এইভাবে আমাকে ঝেড়ে ফেলতে পারবেন। এককালে যে লোকটাকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছিলাম, এক মুহূর্তে চরম ঘৃণা এল। বুঝতে দিলাম না। জোঁকের মতো এঁটে রইলাম। কিন্তু ভিতরে ভিতরে বউদির কাছে ওঁর বিপক্ষে বলতে থাকলাম। একদিন রাউন্ডে বেরিয়ে দেখি চন্দননগরের বেশ্যাপট্টিতে ঢুকছেন। কেন কে জানে! মনে হল এই যে ইম্পোটেন্সি, এটাও হয়তো ওঁর ভান। আমি বউদিকে ডেকে দেখালাম।

—তারপরেই তো সেপারেশান।

—হ্যাঁ। তখনই বউদির এখনকার বরের সঙ্গে আলাপ হয়। আর দেবাশিসদা আপনার খবর পান।

—সেটা কীভাবে?

—আমি বলেছি না, আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। আমি বুঝতে দিতাম না। আন্দাজ করার চেষ্টা করতাম উনি কীসের খোঁজ করছেন। পেপার দেখে একদিন নিজেই বললেন, তারিণীর সেই গোয়েন্দা অফিস আবার খুলেছে। একটু খোঁজ নাও তো, একই নামে, একই জায়গায় কে অফিস খুলল? আমিও খবর এনে দিলাম। আপনাকে যে কেসটা দেওয়া হয়েছিল, সেটা ধোঁকার টাটি। যাতে সন্দেহ না হয়। আসলে ওঁর দরকার ছিল আপনাকে।

—কেন?

—সেই জায়গাতেই আসব। কারণ দরকারটা এখনও ফুরোয়নি। প্রিয়নাথের লেখায় তারিণীর একটা সম্পত্তির কথা ছিল। যার নাম ডিরেক্টর। এটাও লেখা ছিল, এখানেই নাকি তারিণী গুরুত্বপূর্ণ সব জিনিস লুকিয়ে রাখেন। শুধু তাই নয়, এই ডিরেক্টর বস্তুটি নিজেও অত্যন্ত দামি। দেবাশিসদা সেটার খোঁজ চালাচ্ছিলেন। আর তাই আপনাকে দরকার ছিল। উনি তারিণীর বংশধরের খোঁজ করছিলেন, এভাবে পেয়ে যাবেন, ভাবেননি।

—মানে ওই বইয়ের জন্য দেবাশিসদাকে আপনি খুন করলেন? কিন্তু বই কোথায় সে তো কেউ জানে না!

—প্রথমেই বলি, দেবাশিসদা খুন হয়েছেন নিজের দোষে। নিজের লোভের জন্য। আমি ওঁকে খুন করিনি।

—তাহলে?

—আগেই বলেছি, প্রিয়নাথের লেখায় চিনা পাড়া আর চিনা কিছু গুপ্ত সমিতির কথা আছে। আমি জানতাম না এখনও তাদের অস্তিত্ব বর্তমান। দেবাশিসদা কীভাবে যেন তাদের খবর পেয়ে গেছিলেন। টেরিটি বাজারে তাদের গোপন আড্ডা আছে। দেবাশিসদা রিসার্চ করে বুঝতে পেরেছিলেন, এই কাহিনির অন্য অংশটা চিনা পাড়ায় কোথাও লুকানো আছে। প্রিয়নাথ নিজেও যেটা জানতেন না, বা জানলেও লেখেননি, আমার ধারণা দেবাশিসদা সেটার সন্ধান পান।

—সেটা কী?

—আমিও পরিষ্কার জানি না। তবে চিনাদের গুপ্ত সমিতি, অক্ষর, নিয়ম নিয়ে নানা কথা বলতেন। আসল কথাটা এড়িয়ে যেতেন।

—কী কথা?

—কীসের সন্ধানে তিনি এমন পাগলের মতো খোঁজাখুঁজি করছেন।

—অবশ্যই সেই বই।

—নাহহ। আমিও তাই ভাবতাম। একদিন বলেওছিলাম। দেবাশিসদা অদ্ভুত হেসে বলেছিলেন, সিরাজের মৃত্যুর পর মিরজাফর সিরাজের প্রিয়তমা লুৎফাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। লুৎফা কী বলেছিলেন জানো? বললাম, জানি না। বললেন, বলেছিলেন, যে বাঘের সওয়ার হয়, সে কি গাধার পিঠে চড়ে? এককালে ভেবেছিলাম ওই বইটাই আসল। কিছু না অমিতাভ, কিছু না। সারা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় আনার মতো গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছি এখন । সামান্য চার-পাঁচ কোটি টাকা আমাকে দেখাচ্ছ?

—কোন গুপ্তধনের কথা বলছিলেন উনি? জানেন?

একটু থেমে অফিসার বললেন, “গণপতির ভূতের বাক্স।”

—সেটা আসলে কী?

—আমিও জানি না। আপনাকে তো তাও একটা বাক্সের কথা বলেছিলেন, আমাকে দেবাশিসদা সেটাও বলেননি। শেষের দিকে বেশ ভয়ে ভয়ে থাকতেন।

—সেটা আমিও বুঝেছি। কিন্তু কাদের থেকে?

—বললাম না জানি না। কিছু জিজ্ঞাসা করলেই বলতেন, ওরা জানলে মুশকিলে পড়ে যাব। আমার কী হয় ঠিক নেই। ওরা গণপতির বাক্সের খোঁজে আছে। সমন পাঠাচ্ছে। আমাকে খুঁজে দিতেই হবে।

—ওরা কারা?

—জানি না।

—কে আমাকে রাতে হোয়াটসঅ্যাপ করেছিল?

—দেবাশিসদাই করেছিলেন হয়তো। অন্তত আমি না। আমি সেই রাতে ওঁর কাছে যাইনি। যদি আমায় অপরাধী ভেবে থাকেন, ভুল ভেবেছেন।

—কিন্তু আমাকেই বা পাঠালেন কেন?

—দুটো কারণ হতে পারে। তাঁকে দিয়ে করানো হয়েছিল, অথবা কোনও এক সময় তাঁর বিবেক জাগ্রত হয়েছিল। বুঝেছিলেন তিনি আর বাঁচবেন না। তাই প্রকৃত উত্তরাধিকারীকে জানিয়ে মারা গেছিলেন, যাতে আপনার খোঁজ পড়ে, আর আপনি গোটা ব্যাপারটা জানতে পারেন।

—তার মানে যারা দেবাশিসদাকে খুন করল, তারা এখন আমার কথাও জানে?

—জানা অসম্ভব না।

—তারাই কি আমার চুঁচুড়ার বাড়িতে চিঠি দিয়ে এসেছিল?

—না। ও আমার লোক। চিঠির টাইপটা আমি করেছিলাম।

—আপনি আমার চুঁচুড়ার বাড়ির কথা জানতেন?

—দেবাশিসদা আপনার বিষয়ে সব বলেছেন। জগন্নাথ মন্দির, রাস্তার ওপর বাড়ি, রায়বাড়ি বললেই সবাই চেনে। আর কিছু লাগে? সেই রাতে আমি আপনাকে গাড়ি করে চুঁচুড়ার বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনি চিঠিটা পান।

—কেন?

—সকালবেলা দেবাশিসদার মারা যাবার খবর পেতেই বুঝলাম এবার আমাকে হাল ধরতে হবে। আপনাকে ছাড়া যাবে না। তখনও হোয়াটসঅ্যাপের কথা জানতাম না। তবে দেবাশিসদা আপনাকে এতদিন অন্ধকারে রেখেছিলেন সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু আমার ডিরেক্টরের খোঁজ দরকার ছিল। ওই বইয়ের জন্য। আমার টাকার দরকার ছিল।

—আর উর্ণার খবর?

—আপনার কি মনে হয় এই কদিন আমি গাব জ্বাল দিচ্ছিলাম? আপনাকে নিয়ে কাজ করব, আর আপনার সম্পর্কে মিনিমাম খোঁজটাও নেব না?

—প্রিয়নাথের খাতা, তারিণীর ডায়রির পাতা আর ১৮৯৫-৯৬-এর ডায়রি, এই তিনটে এখন কোথায়?

—প্রথম দুটো কোথায় আমিও জানি না। দেবাশিসদার গোটা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাইনি। তৃতীয়টা এখনও কেউ দেখেনি। দেবাশিসদাও না। দেবাশিসদার বিশ্বাস ছিল ওতেই গণপতির বাক্সের খোঁজ আছে। শেষের দিকে উনি ওটার খোঁজেই ছিলেন।

—সেটা কি ডিরেক্টরের মধ্যে থাকতে পারে?

—বলা মুশকিল। কারণ ডিরেক্টর যে কী বস্তু সেটাই অজানা।

—দেবাশিসদার অণ্ডকোশ লাইব্রেরিতে গেল কীভাবে?

খানিক চুপ থেকে অফিসার বললেন, “আমিই রেখেছি।”

—কেন?

—দেবাশিসদার মারা যাবার খবর আমি অফিসে আসার আগেই পেয়েছিলাম। যদিও বুঝতে পারিনি। সকালে উঠে দেখি দরজার সামনে প্যাকেটটা কেউ ফেলে রেখে গেছে। দেখেই বুঝেছিলাম কিছু একটা অঘটন হয়েছে। ফেলিনি। ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলাম। পরদিন সঙ্গে করে নিয়ে গেছিলাম। হাজার হোক এভিডেন্স। ফেলতে মন চাইছিল না। লাইব্রেরিতে ওই ম্যাজিক বাক্সটা দেখে মাথায় প্ল্যান এল। ওটা খুলতে আমাকে দেবাশিসদাই শিখিয়েছিলেন। আপনি ফটোকপি করাতে গেলেন, আমিও ওটা ঢুকিয়ে দিলাম। পরে এমন দেখালাম যে আচমকা খুলে ফেলেছি। আসলে আমার সাক্ষীর দরকার ছিল, যাতে সন্দেহ আমার ওপরে না পড়ে।

—আমার থেকে কী সাহায্য চান?

—একটাই। গণপতির বাক্সের খোঁজ। আর তার জন্য ডায়রি। আর ডায়রি পেতে গেলে ডিরেক্টরের সন্ধান লাগবে।

—কিন্তু একটু আগেই তো আপনি বললেন ওই বই পেলেই আপনার হবে। আপনার টাকার দরকার।

—ছিল বলেছি। এখন আর নেই।

—কেন? নেই কেন? টাকা পেয়ে গেছেন?

—ও বই বেচে যা টাকা পাবেন সব আপনার। আমার শুধু বাক্সের খোঁজ লাগবে। প্রাণের চেয়ে দামি কিছু নেই ভাই।

আমি অফিসারের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওঁর চোখে অদ্ভুত এক আতঙ্ক।

—ওরা আমাকে মেরে ফেলবে এবার। দেবাশিসদার পরে আমার পিছনে লেগেছে। আমার বাড়ি কোথায় জেনে গেছে। আমাকে ফলো করছে। এর একটাই মানে। আমাকে এবার গণপতির বাক্স খুঁজে দিতে হবে। নইলে আমারও দেবাশিসদার মতো হাল করবে।

—কী করে বুঝলেন?

পকেট থেকে একটা কাগজ বার করলেন অফিসার। সাদা কাগজ। তাতে তিনটে সমান্তরাল লাইন। মাঝেরটা দুভাগে ভাঙা।

—এর মানে কী?

—চিনা অক্ষর ই-চিং। মানে অগ্নি। অর্থ— ভয়াবহ পরিণতি, ধ্বংস, মৃত্যু।

—এ জিনিস আপনার কাছে?

—গত তিনদিন ধরে আমার বাড়ির ডাকবাক্সে কেউ ফেলে যাচ্ছে। সমন…


সপ্তম পর্ব— উন্মেষ

“তোমার কাছে এই ডিরেক্টর এল কেমন করে?” সাইগারসন জিজ্ঞাসা করলেন।

“আজ্ঞে, আপনি চিনেছেন? এ জিনিস আমার না। এই অফিস প্রায় নিজের হাতে ড্রিসকল সাহেব বানিয়ে দিয়েছেন। যা দেখছেন, সব ওঁরই দেওয়া।”

“এ বড়ো সাধারণ জিনিস না হে তারিণী। বিলেতেও এ জিনিস খুব কমই আছে। সাবধানে রাখবে। যত্নে রাখবে। আর এটা খুলতে জানো তো?”

তারিণী অবাক। ডিরেক্টরকে যে খোলা যায় সেটা তার ধারণারই বাইরে। সাইগারসন একগাল হেসে ডিরেক্টরের সামনে ঝুঁকে একটা ছোট্ট বোতামে চাপ দিলেন। ডালা খুলে এল। ভিতরে ফাঁকা।

“এককালে গোপন কিছু লুকিয়ে রাখতে এ জিনিসের জুড়ি ছিল না। এখন পাওয়াই যায় না। কিছুদিন বাদে তো লোকে নামও জানবে না। যাই হোক, তুমি কী কী জানলে বলো…”

গতকাল সারারাত গির্জায় ঘণ্টা বেজেছে। আজ নতুন বছরের প্রথম দিন। গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের একতলার বিরাট হলঘরটাকে পৃথিবীর সব দেশের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘হল অফ অল নেশনস’। আজ এখানে মজুত থাকবে নানা খাদ্য আর পানীয়। সাহেবরা তাঁদের মেমসাহেবদের নিয়ে সেখানে এসে নতুন বছর উদযাপন করতে পারবেন। শোনা যায় সেখানে নাকি সাহেবরা এদেশীয়দের মতো কোলাকুলিও করেন। দেশীয় মানুষদের এই অনুষ্ঠানে ঢুকতেই দেওয়া হয় না। তাই সত্যি মিথ্যে বলা মুশকিল। সবচেয়ে বড়ো ভোজ আজ বড়োলাটের প্রাসাদে। কলকাতার পাশাপাশি সুবে বাংলার বহু জায়গার রাজকর্মচারী আর সেনাকর্তারা এতে নিমন্ত্রিত। উৎসব শুরু হবে ব্রেকফাস্ট দিয়ে আর শেষ হবে ডিনার আর বলড্যান্সের পরে। অপেরা, থিয়েটার, বোট রেস, পিকনিক, ক্রিকেট, সব কিছুই আজ খোলা। আর আছে ঘোড়দৌড়। দৌড় হবে এলেনবরা কোর্স, খিদিরপুরের আখড়ার মাঠে, আর রেসকোর্সে। আজ সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেছে তারিণীর। সেই কাকভোরে একদল ধর্মপ্রাণ বাঙালি খ্রিস্টান খোল কর্তাল নিয়ে নগর পরিক্রমা করছিল। ধর্ম বদলালেও স্বভাব যাবে কোথায়? জানলা দিয়ে সবে আলো আসছে। তারিণী দেখল তার ভীষণ কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে। এমনিতে নিজের লাল ডায়রিতেই সে কবিতা লেখে, কিন্তু সে ডায়রি তো আজকাল রোজনামচা লিখতেই ভরে যাচ্ছে। টেবিলে মোটা একটা ফাইল পড়ে আছে। এটা ড্রিসকল সাহেবের থেকে আনা। নানা টুকিটাকি কাজের জিনিসপত্র, হিসাব কিতাব। তারিণী তারই একটা তালিকা বার করে পিছনে কবিতা লিখতে শুরু করল, “আমরা পুরুষ, নীরস অতি/ নহি অধিকারী সুখে…” চার লাইন লিখতে না লিখতে না লিখতে দরজায় টোকা। তারিণী অবাক। এত সকালে কে এল! খুলে দেখল প্রিয়নাথ দারোগা আর সাইগারসন সাহেব হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। সাহেব সহবত জানেন। টুপি খুলে “গুড মর্নিং অ্যান্ড ভেরি হ্যাপি নিউ ইয়ার” বললেন। প্রিয়নাথ শুধু মাথা ঝুঁকিয়ে হাসল। তারিণী দুজনকেই ঘরের ভিতরে নিয়ে এল। ঢুকেই আজ সাহেবের নজর পড়ল ডিরেক্টরের দিকে।

ডিরেক্টরের গোপন কুঠুরি দেখিয়ে সাহেব নিজের জায়গায় বসেই বললেন, “এখন বলুন, রাখহরির কী সংবাদ পেলেন?”

‘রাখহরি সম্ভবত আর বেঁচে নেই’, বলে তারিণী সব বলল। সোনাগাজির সেই বাড়ি, পাগলের আস্তানা, পেট চেরা ভেড়ারা, ময়নার নিরুদ্দেশ, কার্টারের আনাগোনা, নবীনচন্দ্রের চিঠি, ফ্রি ম্যাসনদের সভায় শোনা ব্রাদার পলের পাগলামোর কাহিনি, এমনকি মরার দিন নবীনকে বলা কার্টারের শেষ কথাগুলোও। প্রিয়নাথ দেখতে পেল শুনতে শুনতে সাহেবের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে। তারিণী বলা শেষ করতেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন সাহেব, “বাই জোভ! তুমি তো কেসটা প্রায় সলভই করে দিয়েছ হে! গল্পটা এতদিনে পরিষ্কার হয়ে এসেছে। আর ছোট্ট একটা জট খোলা বাকি। সেটাও খুলে যাবে, চিন্তা নেই। বিলেতে তোমার মতো একখানা গোয়েন্দা জন্মালে আমার আর পসার হত না। ওয়েল ডান।”

তারিণী আর প্রিয়নাথ দুজনেই ফ্যালফ্যাল করে সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারা গোটা ব্যাপারের আগাপাশতলা কিছুই বুঝতে পারছিল না। সাহেব বোধহয় সেটা ধরতে পারলেন। একটু হেসে পাইপ ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “আমি যতটা বুঝেছি, গল্পটা নিজের মতো বলছি। ছোটোখাটো কিছু পয়েন্ট এদিক-ওদিক হতেই পারে। কিন্তু এই একটামাত্র গল্প, যাতে জিগস পাজলের মতো সবকটা ঘটনা একেবারে নিখুঁতভাবে মিলে যায়।

এই গোটা কেসে দুটো দিন। তিনটে মৃত্যু। একটা গত ১২ ডিসেম্বর, চিনা পাড়ায় বড়োলাটের পাগল খুড়তুতো ভাইয়ের লাশ পাওয়া গেল। অন্যটা ঠিক তার পাঁচদিন পরে। ১৭ তারিখ। করিন্থিয়ান হলে। মারা গেলেন দুই ম্যাজিশিয়ান। কার্টার আর চিন-সু-লিন। আমি ওঁদের মঞ্চের নামই বলছি।

প্রথম মৃত্যুটা সবচেয়ে চমকে দেবার মতো। বড়োলাটের বাড়িতে তাঁর ভাই থাকতেন। সেখানে যথেষ্ট কড়া পাহারা। সেই দুর্ভেদ্য লাটভবন থেকে একটা সুতো বার করে নিয়ে আসা মুশকিল, একটা মানুষ তো দূরের কথা। তাহলে যুক্তি আসে, পল নিজেই বেরিয়েছিলেন, অথবা তাঁকে বের করে আনা হয়েছিল। আমি শুরুতে প্রথমটাই ভেবেছিলাম, কারণ আমি জানতাম না পল পাগল ছিলেন আর বেশ কিছুদিন ভবানীপুরের পাগলা গারদেও তাঁকে ভরতি করে রাখা হয়েছিল। তারিণী খবরটা জানতে পেরেছে। সঙ্গে ও এটাও বলল, ভবানীপুর থেকে পলকে ছাড়িয়ে আনা হয়। কেন? উত্তরটা বোধহয় কোনও দিনই পেতাম না, যদি না আমরা ডালান্ডা হাউস যেতাম আর গোপালচন্দ্রের লেকচার শুনতাম।”

তারিণীর বিস্ময় বাড়ছে। সে হতবাক হয়ে বলল, “আপনি কী বলছেন, সেটাই তো বুঝতে পারছি না সাহেব!”

“বুঝিয়ে বলছি। গতকাল লেকচারে যা বুঝলাম, পাগলদের চিকিৎসায় দুটো পদ্ধতি আছে। একটা আইনি, যাতে খুলি ফুটো করে মাথার কিছু জায়গা খালি করে দেয় বা মগজের আক্রান্ত অংশকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। এতে রোগী একেবারে গোরুর মতো শান্ত হয়ে যায়। কিংবা সারাজীবন জড়ভরত হয়ে কাটায়। বিশেষত যারা খুব দুর্দান্ত পাগল, বা খুনের প্রবণতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা কার্যকরী। তবে যাই হোক, দিনের শেষে বড্ড নৃশংস। জানি না, কোনও দিন অন্য কোনও চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার হবে কি না, যাতে অনেক কম বেদনায় রোগীর চিকিৎসা করা যাবে।

ঠিক এখানেই এল দুই নম্বর পদ্ধতি। বহু বছর ধরে বেশ কিছু ডাক্তার লন্ডনে চেষ্টা করছিলেন সেটা। কিন্তু এতে রোগীর মৃত্যুর হার এত বেশি যে রানি নিজে আইন করে সেটা বন্ধ করে দেন।”

“সেটা কী?”

“ব্লাড ট্রান্সফিউশান। রক্ত বদলে দেওয়া। উন্মাদ মানুষের রক্ত বদল করে কিছুটাও যদি অন্য সুস্থ মানুষের রক্ত, এমনকি শান্ত কোনও পশু, যেমন ভেড়ার রক্ত পুরে দেওয়া হয়, তাহলে নাকি রোগীর পাগলামো অনেক কমে। লন্ডনে থাকতে এর কথা আমার কানে এসেছিল। কাল শুনে নিশ্চিত হলাম।”

“কিন্তু এভাবে কি পাগলামো কমানো যায়?” এবার প্রিয়নাথ প্রশ্ন করল।

“সেটা কে বলবে? বিজ্ঞানের কাজ নতুন নতুন উপায়ের সন্ধান করা। কাল তো শুনলেন, গোপালচন্দ্র বললেন, একজন মানুষের রক্ত একেবারে তার নিজস্ব। একজনের রক্ত অন্যকে দিলে সে মারা যাবেই। এদিকে যাঁরা এই রক্ত বিনিময়ের পক্ষে, তাঁরাও এমন অনেক উদাহরণ দেখিয়েছেন যেখানে একজনের রক্ত অন্যজনকে দিলেও সে বেঁচে থাকে। সত্যি এই দুটোর মধ্যে কোথাও একটা লুকিয়ে, যতদিন না জানব কিচ্ছু বলা যাবে না।”

“কিন্তু যেটা বলছিলেন...” তারিণী ধরিয়ে দিল।

“ও হ্যাঁ। কার্টার মানে হ্যারির মা ছিল পতিতা। কুমারী বয়সে জর্জের সঙ্গে সম্পর্কে হ্যারির জন্ম। কিন্তু জর্জ তার বাবার বয়সি। শার্লি কোনও দিন তার আর জর্জের সম্পর্ক স্বীকার করেনি। তবে আমার ধারণা, হ্যারি আঁচ পেয়েছিল। সে জর্জকে ভালোবাসত। আর ভালোবাসত তার মাকে। সৎ বাবা লিন্ডসে ছিল লম্পট। তাকে মারত, শার্লিকে মারত। হ্যারির মনে রাগ জমছিল। কিন্তু সেই রাগের বারুদে আগুন ধরানোর কেউ ছিল না। সেই আগুনটাই ধরাল রিচার্ড এসে। রিচার্ডও হ্যারির অবৈধ ছেলে। মায়ের কাছে মানুষ। মাকে ভালোবাসাই স্বাভাবিক। মা খুন হবার পরে যখন সে দেখল তার বাবা লোকটি নিশ্চিন্তে অন্য মহিলার সঙ্গে সংসার পেতেছে, তখন সে ঠিক করল লিন্ডসের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। কিন্তু নিজের হাতে লিন্ডসেকে খুন করার যে শক্তি বা সাহস কোনোটাই তার ছিল না। ফলে তাকে একজন হাতিয়ার খুঁজতে হল। শার্লির ছোটো ছেলে উইগিন্স তখন খুব ছোটো, কিন্তু হ্যারি তাগড়াই, বলশালী। লিন্ডসেকে সহ্য করতে পারে না। রিচার্ড তার হাতিয়ার পেয়ে গেল। হোয়াইট চ্যাপেলের আশেপাশেই কিছু চিনা বস্তি আছে। সেখানেই খুব সম্ভব রিচার্ড গংসিদের সংস্পর্শে আসে। এরা মারাত্মক হিংস্র দল। কাউকে খুন করতে পিছপা হয় না। হ্যারিও এদের দলে যোগ দিয়েছিল। মুশকিল হল, দলে যোগ দেওয়া কঠিন, আরও কঠিন বেরিয়ে আসা। এটা হ্যারি বুঝতে পারেনি। গংসিদের সাহায্য নিয়ে সে লিন্ডসেকে খুন করল। শুধু খুন না, গংসিরা খুনের যে বিশেষ পদ্ধতিতে নিজের স্বাক্ষর রেখে যেত, সেই পদ্ধতিতে। লন্ডন পুলিশ ভাবল, কোনও চিনা দল খুন করেছে। হ্যারি শান্তি পেল। ভাবল আর চিন্তা নেই। কিন্তু দুটো ঘটনা ঘটল, যা সে ভাবতেও পারেনি। এক, শার্লি পাগল হয়ে গেল। জানি না, সে বুঝেছিল কি না যে তার ছেলেই এই খুন করেছে। আর দুই, হ্যারি কিছুতে ভয় পেল। যদি আমার অনুমান সত্যি হয়, তবে গংসিরা তাকে আরও খুনের বরাত দিতে লাগল। কিন্তু সে তো খুনি না। যা করেছে রাগে করেছে। শার্লিকে বেডলামে ভরতি করে সে গা ঢাকা দিল। চলে গেল ফ্রান্সে। রবার্ট হুডিনির শিষ্য হল। হুডিনি মারা গেলে হ্যারি নতুন নাম নিল কার্টার। এই নামেই সে ম্যাজিক দেখাতে লাগল।

একসময় তার মনে হল লন্ডনে ফিরে আসা উচিত। পুলিশ বা গংসি তাকে এতদিনে ভুলে গেছে। সে লন্ডনে ফিরে এল। বেডলামে এল মাকে দেখতে, আর যাকে কোনও দিন দেখতে চায়নি, সেই রিচার্ড হ্যালিডেকে দেখল মায়ের চিকিৎসক হিসেবে। কার্টারকে দেখামাত্র সে চিনতে পারল। রিচার্ড বুদ্ধিমান আর ধুরন্ধর ছেলে। ডাক্তারের অ্যাপোথেকারিতে কাজ করতে করতে নিজের মেধাতেই ডাক্তার হয়ে গেছে। পাগলের ডাক্তার। কিন্তু যার রক্তে বেআইনি কাজ করার নেশা, সে কি আর সোজা পথে চলতে পারে? রক্ত পরিবর্তনের যে পদ্ধতি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাতেই তার আগ্রহ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সে আর তার দলবল গোপনে বেডলামে কিছু রোগীর ওপর পরীক্ষাও চালাতে লাগল। হতে পারে শার্লিও তাদের একজন।

এদিকে ভারতে অন্য কাহিনি ঘটছে। ল্যান্সডাউন বড়োলাট হয়ে ভারতে এলেন। সঙ্গে তাঁর প্রিয় ভাই। সেই ভাই হাসিখুশি, সবাই তাকে ভালোবাসে, একদিন হঠাৎ করে পাগল হয়ে গেল। বড়োলাট বেশ কিছুদিন চেষ্টা করলেন ব্যাপারটা চাপা দিতে। তারপর ভবানীপুরে ভরতিও করলেন। এমনিতে যখন কাজ হল না, ডাক্তার বললেন খুলি ফুটো করতে হবে। প্রিয় ভাইয়ের ওপরে এই নৃশংস চিকিৎসা বেঁচে থাকতে হতে দেবেন না তিনি। তাই ভাইকে নিয়ে এলেন বাড়িতে। ভাইয়ের পাগলামো বাড়তে লাগল। ঠিক এখানেই কেউ, আমি জানি না, ডাক্তার মার্টিন বা ডাক্তার উইলসন বা অন্য কেউ তাঁকে ব্লাড ট্রান্সফিউশানের কথা বললেন। হাতে সরু একটা নল লাগিয়ে অন্য মানুষের রক্ত বা পশুর রক্ত পুরে দেওয়া। অনেক কম কষ্টকর। বড়োলাট রাজি হলেন। কিন্তু যেখানে ব্রিটিশ সরকার নিজে এই পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন, সেখানে সেই সরকারের একেবারে উপরে থাকা একজন মানুষ কীভাবে এই তথাকথিত অপবিজ্ঞানের চর্চা করবেন?

ঠিক হল গোটা ব্যাপারটা হবে ম্যাজিক শো-র আড়ালে। যখন ম্যাজিশিয়ান মঞ্চে ম্যাজিক দেখাবেন, সেই ম্যাজিকের আড়ালে হবে আসল ম্যাজিক। বড়োলাটের ভাই সুস্থ হয়ে উঠবেন। বেডলাম থেকে বাছা হল রিচার্ডকে। কিংবা সে নিজেই উদ্যোগী হল। হাজার হোক বড়োলাটের ভাই। কাজটা সফল হলে টাকা, সম্মান দুই-ই পাবে। আর ম্যাজিকের ধোঁকার টাটিটার জন্য দরকার হল কার্টারকে। কার্টার হয়তো প্রথমে রাজি হয়নি। কিন্তু একে শার্লি তখন বেডলামে রিচার্ডের অধীনে, আর দুই, গংসির দল আজও লন্ডনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। কার্টারকে ব্ল্যাকমেল করা কঠিন হল না। যাতে রিচার্ডের আসল পরিচয় কেউ না জানে, তাই বুড়ো জর্জ বাদে সবাইকে সরিয়ে নতুন দল নেওয়া হল। জর্জকে খুব সম্ভব কার্টারই রাখতে অনুরোধ করেছিল। ভারতে যাত্রার ঠিক আগের দিন আমার দাদার কাছে খবর আসে। উনি কিছু একটা আঁচ করেছিলেন। এদিকে ডালান্ডা হাউসের পাগলদের সংখ্যা কমছিল ক্রমাগত। টমসন দাদাকে জানান। আমারও গা ঢাকা দেবার দরকার ছিল। নাম বদলে আমাকেও দলে ভিড়িয়ে দেওয়া হল।”

“কেউ কিছু আপত্তি করেনি?”

“আপত্তির লোক ছিল একজনই। রিচার্ড। ওকে বলা হয়েছিল আমি এক দাগি অপরাধী, পালানোর সুযোগ খুঁজছি। এতেও যদি কিছুমাত্র আপত্তি থাকত, যে একশো পাউন্ডের থলেটা ওকে দেওয়া হয়েছিল, তারপর আর কোনও আপত্তি করেনি। এখানে এসে আমি বুঝতে পারি কিছু একটা সমস্যা আছে। কার্টার আর রিচার্ড দলের কারও সঙ্গে মেশে না। প্রায়ই কোথায় বেরিয়ে যায়, ফেরে না। তারিণীর অনুসন্ধানে এখন সেটা বোঝা গেছে। কেন ডালান্ডা হাউস থেকে পাগল উধাও হয়ে যাচ্ছিল, আর তারা যাচ্ছিল কোথায়?”

“কোথায়?” প্রশ্ন করল প্রিয়নাথ।

“আপনি এখনও বুঝতে পারেননি অফিসার মুখার্জি? সোনাগাছির সেই বাড়ি কোনও সাধারণ বেশ্যালয় না। ওটা একটা পরীক্ষাগার। ডালান্ডা হাউস থেকে পাগলদের এনে তাদের গায়ে বিভিন্ন পশু আর মানুষের রক্ত ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হত। একেবারে শুরুতেই বড়োলাটের ভাইয়ের ওপরে পরীক্ষার আগে বড়োলাট নিশ্চিত হতে চাইছিলেন পদ্ধতিটা ফুলপ্রুফ কি না। পাগলদের দেখাশোনার জন্য ময়নাকে রাখা হয়েছিল। ওই বাড়িতে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হত না। আর বাড়ির সামনে প্রায়ই রক্তশূন্য পশুদের পাওয়া যেত।”

“সেই পাগলরা কোথায়?” তারিণী বললে।

“পরীক্ষাগারে খরগোশদের ওপরে পরীক্ষা শেষ হলে সেই খরগোশদের কী করা হয় জানো তারিণী?”

তারিণী মাথা নাড়ল।

“কেটে পুঁতে দেওয়া হয়। যাই হোক, যেটা বলছিলাম, যতদূর মনে হয় বড়োলাট আশ্বস্ত হন। ১২ ডিসেম্বর সকালে গোপনে লাটভবন থেকে পলকে বার করে এনে দুপুর নাগাদ অপারেশান শুরু হয়। ঠিক এখানে কিছু গণ্ডগোল হয়। কী গণ্ডগোল, তা আমার জানা নেই। আমি লাশ দেখেছি। আমার মনে হয়েছে অতিরিক্ত ক্লোরোফর্মের ব্যবহার হয়েছিল সেদিন। সঙ্গে রক্তমোক্ষণ শুরু করে দেওয়া হয়েছিল হাত থেকে। রক্তচাপ দ্রুত কমে গিয়ে অপারেশন টেবিলেই রোগী মারা যায়।”

“তাহলে এটা তো….”

“একেবারেই তাই। পিওর অ্যান্ড সিম্পল দুর্ঘটনা। অপারেশন টেবিলে যেটা হয়েই থাকে।”

“তাহলে একে এইরকম রূপ দেবার কারণ?”

“কারণ একটাই। বড়ো আঘাত ছোটো আঘাতকে ঢাকে। হাতে শিরায় যে ছিদ্রটা ছিল সেটাকে লুকানোর প্রয়োজন ছিল। তা না হলে যে কেউ বুঝে যেত ব্লাড ট্রান্সফিউশান করা হয়েছে। অন্তত ডাঃ মার্টিন বা ডাঃ গোপালচন্দ্রের মতো অভিজ্ঞ লোক তো বুঝতেই পারতেন। তাই গোটা দেহকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া হল। তাও গংসিদের পদ্ধতিতে। বুকে এঁকে দেওয়া হল চিহ্ন। ভেড়ার রক্তে। আমি তো আগেই বলেছিলাম, ও রক্ত মানুষের না।

তারপর কুয়াশা আর অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে দেহ রেখে আসা হল চিনা পাড়ায়। যাতে একটু তদন্ত করলেই লোকে ভাবে এটা গংসিদের কাজ। তা না হলে এই বেআইনি কাজে বড়োলাট সহ সবার ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা!”

“এ তো ঠান্ডা মাথায় খুন!” প্রিয়নাথ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।

“খুন না। দুর্ঘটনাকে চাপা দেবার চেষ্টা। খুনের রূপ দিয়ে। শুধু একজন মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেনি।”

“কে?”

“কার্টার। তার বিবেক বলছিল কিছু একটা ভুল হচ্ছে। তাই সে নেমে এসেছিল। কোন এক ফাঁকে খবরটা লিখে একটা চিঠিতে পুরে দিয়েছিল, যাতে অন্তত সংবাদপত্রে খবরটা আসে। তা না হলে তো এত কিছু হতই না।”

“কিন্তু কার্টার আর চিন-সু-লিন, মানে রিচার্ড মরল কীভাবে?”

“একটা আন্দাজ করেছি। সঠিক জানি না। আজকেই জেনে যাব। সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে আপনারাও যাবেন। মি. টমসনের নিমন্ত্রণ আছে। তাঁর সঙ্গে আমরাও যাব অনাহূত হয়ে।”

“কোথায়?”

“নিউ ইয়ারের ভোজসভায়। স্বয়ং বড়োলাটের প্রাসাদে।”


অষ্টম পর্ব— সোনালি সিংহের গান

১৭৯৯ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ১৮০৩ সালে কলকাতায় তৈরি হয় পেল্লায় রাজভবন। তৈরির বরাত পেয়েছিলেন চার্লস ওয়েট নামের এক স্থপতি। লেগেছিল তখনকার দিনেই আশি হাজার পাউন্ড, আসবাবে আঠেরো হাজার পাউন্ড আর রাস্তা ইত্যাদিতে তিন হাজার পাউন্ড। এক লাটভবন বানাতেই কোম্পানির ফৌত হবার দশা। তবে হ্যাঁ, লোকে যখন যায়, দেখে বলে জিনিসের মতো জিনিস একখানা। মাথায় পতপত করে উড়ছে ইউনিয়ান জ্যাক, সামনে বন্দুকধারী উর্দিপরা সান্ত্রি, ব্যাপারই আলাদা। আজকে তো নিউ ইয়ার ডে-তে গোটা রাজভবন সাজানো হয়েছে কতরকম রংবেরঙের ফুলে। আজ দুপুরে মহাভোজ। ভোজের মেনুর মধ্যে একটা প্রধান জিনিস হল ‘বোরস্ হেড’ বা শুয়োরের মাথা, যা রোজমেরি, বে-লিফ আপেল আর অন্যান্য উপকরণ দিয়ে সাজিয়েগুছিয়ে পরিবেশন করা হয়। নানারকম খাদ্য পানীয় থরে থরে টেবিলে রাখা। আছে টার্কি, ডাক রোস্ট, প্লাম, পুডিং, যত রাজ্যের জিনিস দিয়ে তৈরি বিরাট পাই, ট্যাঞ্জারিন, লেবু, খেজুর, বাদাম, কিসমিস, চকোলেট, আরও কত কী!! বড়োলাট আজকের দিনে নিজে অতিথিদের আপ্যায়ন করেন। রাজভবনে ঢুকতে একটু সমস্যা হয়েছিল। সাইগারসনকে নিয়ে আপত্তি না থাকলেও প্রিয়নাথ, বিশেষ করে তারিণীকে নিয়ে দ্বাররক্ষীরা আপত্তি করছিল। তাও তো তারিণী আজকে সাহেবি পোশাক পরে এসেছে। টমসন সাহেব বুঝিয়েসুঝিয়ে তাদের রাজি করলেন। সাইগারসন পথে তাঁকে সব খুলে বলেছেন। প্রথমে টমসন রাজি হননি, পরে সাইগারসন তাঁকে বোঝান, তিনি এমন কিছু করবেন না যাতে বড়োলাট অসন্তুষ্ট হন। গোটা কেসের ঘটনাও টমসন সাহেবকে জানাতে হয়েছে। অগত্যা তিনি রাজি হয়েছেন।

লাটভবনে পৌঁছে তারিণীরা দ্যাখে পার্টি শুরু হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। পানীয়র গেলাস হাতে নিয়ে ঘুরছেন সাহেব মেমসাহেবরা। তারিণী আর প্রিয়নাথকে দেখে তাঁদের কয়েকজন অবাক হলেন, কয়েকজন ভুরু কোঁচকালেন বোঝা গেল। বিরাট বড়ো হলঘরের এক কোণে বড়োলাট ল্যান্সডাউন দাঁড়িয়ে। হাসিমুখে সবাইকে আপ্যায়ন করছেন। টমসন সাহেব সাইগারসনকে নিয়ে সোজা সেদিক পানে রওনা হলেন। পিছন পিছন তারিণী আর প্রিয়নাথ। প্রিয়নাথ ঠিকই শুনেছিল। বড়োলাট এই দিন হ্যান্ডশেকের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয়দের কায়দায় আলিঙ্গনও করেন। তবে সেটা অবশ্যই ইউরোপীয়দের। তাদের কপালে করমর্দনও জুটবে কি না সন্দেহ। প্রথমেই টমসন করমর্দন করে আলিঙ্গন করলেন। বড়োলাট হেসে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালেন। টমসন এবার সাইগারসনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। প্রিয়নাথ দেখল, আলাপ করানোর পর বড়োলাটের কানের কাছে মুখ নিয়ে টমসন সাহেব কী যেন বললেন। শুধু “এঁর দাদা…” টুকু শোনা গেল। বড়োলাটের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। সাইগারসনের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, “কিন্তু আমি তো শুনেছিলাম…” “ভুল শুনেছিলেন” বলে সাইগারসন এগিয়ে এসে করমর্দন করলেন। এবার আলিঙ্গনের পালা। আলিঙ্গন করতে করতে বড়োলাট বললেন, “তারপর বলুন, আপনার কী সেবা করতে পারি?”

“কিচ্ছু না, শুধু পলের রক্ত পরিবর্তনে দুর্ঘটনা ঘটায় কার্টার আর রিচার্ডকে কেন মরতে হল, সেটা বললেই চলবে।”

ঘরে বাজ পড়লেও বুঝি বড়োলাট অনেক কম চমকাতেন। প্রিয়নাথ দেখল রাগ, অবিশ্বাস, আতঙ্ক সবকিছু একসঙ্গে তাঁর মুখে খেলা করছে। প্রথমে মনে হল এক্ষুনি তিনি তাদের তাড়িয়ে দেবেন। তারপর কোনওক্রমে নিজেকে সামলে বললেন, “এসব আপনি কী বলছেন, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!”

সাইগারসন খুব নরম গলায় বললেন, “হুজুর, আমি জানি, যে ব্যক্তিগত শোক আপনার ওপর দিয়ে গেছে তার তুলনা নেই। কিন্তু আপনি তো আমার পরিচয় পেলেন। সত্যের একবারে গোড়া অবধি না পৌঁছে আমার শান্তি নেই। আপনি দয়া করে বলুন, ঠিক কী হয়েছিল। সঠিক উত্তর আপনি ছাড়া কারও কাছে নেই।”

বড়োলাট খানিক থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর টমসন আর সাইগারসনকে ডেকে বললেন, “আসুন আমার সঙ্গে। আমি জানতাম একদিন এই দিনটা আসতে চলেছে, তবে এত তাড়াতাড়ি আসবে সেটা ভাবিনি।” টমসন রওনা দিলেও সাইগারসন গেলেন না। “পরিচয় করিয়ে দিই, ইনি পুলিশ অফিসার প্রিয়নাথ মুখার্জি, টমসন সাহেবের অধস্তন। আর উনি এক আশ্চর্য মানুষ। প্রাইভেট ডিটেকটিভ তারিণীচরণ রায়। আজকে আমি যা জেনেছি, তা এঁদের সাহায্য ছাড়া জানা সম্ভব ছিল না। আমি যা জানি, এঁরাও তাই জানেন। আমি এঁদেরকেও সঙ্গে নেবার অনুমতি চাইছি।”

বড়োলাট মুখে কিছু বললেন না। শুধু সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালেন। হলঘরের পাশেই লাইব্রেরি ঘর। থরে থরে বই সাজানো তাতে। ঢুকে নিজের হাতে মোটা মেহগনি কাঠের দরজা বন্ধ করে দিলেন বড়োলাট। এগিয়ে গেলেন মাঝে রাখা টেবিলের দিকে। টেবিলে ছড়ানো বেশ কিছু বই, পাখির ছবি। নিজে বসলেন। ওঁদেরও বসতে বললেন। প্রিয়নাথ আর তারিণী তবু দাঁড়িয়েই রইল।

—বলুন কী জানতে চান? তবে তাঁর আগে আমাকে একটা কথা দিতে হবে আপনাদের চারজনকে। আপনাদের জীবদ্দশায় বা আমাদের কারও জীবদ্দশায় এ কাহিনি যেন দিনের আলো না দ্যাখে। রাজি? কারণ এর অন্যথা হলে আমি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব, আর সেটা কারও জন্য ভালো হবে না।

সবাই কথা দিল।

—এই ঘটনার কোনও বিবরণ কেউ লিখে রেখেছেন?

তারিণী স্বীকার করল সে ডায়রিতে লিখেছে। বড়োলাট আদেশ দিলেন টমসন যেন সত্বর সেই ডায়রির পাতাগুলো নিজের দখলে এনে নষ্ট করে দেন। টমসন রাজি হলেন। এবার বড়োলাট তাকালেন সাইগারসনের দিকে। তিনি প্রস্তুত হয়েই ছিলেন, বললেন,

“গত ১২ ডিসেম্বর, আপনার ভাই পলের অপারেশনের সময় অতিরিক্ত ক্লোরোফর্ম প্রয়োগ আর রক্তমোক্ষণে সে মারা যায়। এমন দুর্ঘটনা হতেই পারে। তবু এই দোষে কার্টার আর রিচার্ডকে মরতে হল কেন?”

দুঃখের একটা হাসি ফুটে উঠল বড়োলাটের মুখে, “আপনি কিছুই জানেন না ডিটেকটিভ। আপনি জানেন কত আদরের ভাই ছিল আমার পল? বাপ মা নেই। আমার চেয়ে ঢের ছোটো। আমিই বাবার মতো মানুষ করেছিলাম। ওর গায়ে একটা আঘাত লাগুক, তার চেয়ে নিজে সে আঘাত পিঠ পেতে নিতাম। বুদ্ধিমান, হাসিখুশি, ভালো ক্রিকেট খেলে, দারুণ গান করে। পলকে দেখতাম আর আমার গর্ব হত। আদর্শ ইংরেজ বলতে যা বোঝায় তাই। কিন্তু সুখ সইল না ওর কপালে। ওর মায়ের বংশে পাগলামো ছিল। সেটা উত্তরাধিকার সূত্রে পেল। দেখতে দেখতে ভাইটা আমার কেমন বদলে গেল। কথা শোনে না। কিছু বলতে গেলে মারতে আসে। ডাক্তার মার্টিনকে দেখালাম। উনিই বললেন ভবানীপুরে ভরতি করতে। খুব একটা লাভ হল না। শেষে শুনলাম ওর মাথার খুলি নাকি ফুটো করে দেবে। তখন আর রাখিনি ওকে। বাড়িতেই নিয়ে এসেছিলাম।”

“রক্ত পরিবর্তনের কথা জানলেন কীভাবে?” সাইগারসন বললেন।

“একদিন কথায় কথায় ডাক্তার মার্টিন বলে ফেলেছিলেন। আসলে রিচার্ডকে উনি আগে থেকেই চিনতেন। ওঁর অ্যাপোথেকারিতে কাজ করেই রিচার্ড বড়ো হয়েছে। এটাও বলেছিলেন এটা নিষিদ্ধ উপায়। আমি প্রথমে রাজি ছিলাম না। কিন্তু আমার স্ত্রী জানতে পেরে বারবার আমাকে অনুরোধ করতে থাকে, শেষে আমিও রাজি হয়ে যাই। পলকে ও নিজের ছেলেই মানত।”

“তারপর?” আবার ধরিয়ে দেন সাইগারসন।

খানিক চুপ থেকে শুরু করলেন বড়োলাট ল্যান্সডাউন, “রিচার্ডের নিজের স্বার্থ ছিল। ও মনেপ্রাণে চাইছিল বেডলামের চিফ সার্জেন হতে। কিন্তু বয়স কম। একমাত্র আমার সুপারিশে কাজ হতে পারত। আর তাই ও কার্টারের ম্যাজিক দলের সঙ্গে এ দেশে চলে আসে পলকে সারাতে। প্রথমে ডালান্ডা হাউসের কিছু পাগলের ওপর পরীক্ষা করা হয়। কয়েকজন মারা যায়, কিন্তু কয়েকজন সেরেও ওঠে। মার্টিন নিজে আমায় বলেন, এ চিকিৎসায় সুফল পাবার সম্ভাবনা প্রচুর। আমার স্ত্রীর জোরাজুরিতে আমি শেষ অবধি রাজি হলাম।

যেমন ভেবেছিলাম, তেমন হল না। ১২ তারিখ সারাদিন কোনও কাজ করতে পারিনি। অপেক্ষায়। কী হয় কী হয় ভাব! সন্ধেবেলা রিচার্ড এল। সঙ্গে কার্টার। রিচার্ড জানাল অপারেশানে একটু ভুল হয়েছে। পল মারা গেছে। মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল। তাও সেটা বুঝতে দিলাম না। বললাম, পলের দেহ এখন কোথায়? রিচার্ড জানাল ও নাকি বাধ্য হয়ে গোটা দেহ ছিন্নভিন্ন করে চিনা পাড়ায় ফেলে আসার ব্যবস্থা করেছে। না হলে নাকি সবাই জেনে যাবে ও বেআইনি অপারেশান করে। ভেবে দেখুন, যে ভাইয়ের মাথায় সামান্য ফুটো অবধি আমি সহ্য করতে পারিনি, তার দেহ এমনভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে…”

বড়োলাট খানিক চুপ করলেন। চোখের কোলে জল টলটল করছে। লাইব্রেরি নিস্তব্ধ। শুধু বাইরে থেকে মাতাল সাহেবদের উল্লাসের শব্দটুকু শোনা যাচ্ছে। বড়োলাট আবার শুরু করলেন, “রিচার্ডের হাড়ে হাড়ে ছিল শয়তানি। ও বুঝেছিল, এই ঘটনার পরে ওর আর বেডলামের প্রধানের পদ পাওয়া হবে না। তাই ও এসে সরাসরি আমায় ব্ল্যাকমেল করল। বলল, আমাকে ওর সুপারিশপত্র লিখে দিতে হবে। না হলে ও সবাইকে জানিয়ে দেবে আমি ওকে দিয়ে আমার ভাইয়ের রক্ত পরিবর্তনের কাজ করিয়েছি। এতে ওর থেকে আমার ক্ষতি বেশি।”

“আপনিই বা রাজি হবেন কেন?” প্রিয়নাথ মুখ খুলল।

“ওর কাছে প্রমাণ ছিল। পলের যৌনাঙ্গ, যেটার হদিশ অনেক খুঁজেও পুলিশ করতে পারেনি। আমাকে মানতেই হল। কিন্তু আমিও হেনরি ফিসমরিস ল্যান্সডাউন, প্রধানমন্ত্রী লর্ড সেলবার্নের নাতি। আমায় ধমকাবে ওই বস্তির ছোকরা? ঠিক করলাম কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলব। কার্টারকে লাটভবনে ডেকে পাঠালাম।”

তারিণী ফিসফিস করে প্রিয়নাথকে বলল, “স্যার, এটা তাহলে সেই দিন, যেদিন নবীন মান্না হোটেলে এসেছিলেন।”

প্রিয়নাথ কিছু বলল না। শুধু ওপরে নিচে ঘাড় নাড়ল।

“কার্টার নিজে হ্যালিডেকে পছন্দ করত না। কিন্তু ওর মা বেডলামে ভরতি। তাই কিছু বলতেও পারছে না। সব বলল আমাকে। আমি ওকে অফার দিলাম, ও একটা ম্যাজিক শো অ্যারেঞ্জ করুক, সেখানে সবার চোখের সামনে হ্যালিডেকে মরতে হবে। শার্লির দায়িত্ব আমি নেব। ও পলের সঙ্গে যা করেছে, আর তারপরেও যে ব্ল্যাকমেল করে চলেছে, ওকে বাঁচতে দেওয়া যেত না। শনিবারের শো-তে তাই স্পেশাল হিসেবে ইন্ডিয়ান রোপ ট্রিক রাখা হয়। ঠিক হয়, ম্যাজিকে আমাদের দুজন লোক সাহায্য করবে, যেটা কার্টার জানবে, হ্যালিডে না। ম্যাজিকের একটা অংশে হ্যালিডে বেরিয়ে আসবে, তার জায়গায় একই পোশাকে দড়ি নিয়ে রাখহরি ভিতরে ঢুকবে। হ্যালিডে চলে যাবে সোজা সদর দরজায়। ম্যাজিক শেষে ক্লাইম্যাক্সে সে ঢুকবে দরজা খুলে। সেটাই হয়নি। আমার লোক ছিল। হ্যালিডে বেরোনো মাত্র তাকে টুঁটি টিপে খুন করে। শুধু করেই না, দেহটাকে নগ্ন করে পাতলা পাটাতনে রেখে দেয় যাতে সেটা ভেঙে পড়ে হলভরা লোক হ্যালিডেকে দ্যাখে। আমার ভাইয়ের সঙ্গে ও যা করেছে, তাতে এটুকু করাই যায়।”

সবাই চুপ। প্রথম কথা বললেন সাইগারসন। “সেদিন আপনি নিজে কার্টারের হাতে একটা কাগজ গুঁজে দেন। কেন?”

“কার্টারকে আমি কথা দিয়েছিলাম প্রতিশোধ আমার সামনেই হবে। আমি নিজে উপস্থিত থাকব। তখনই ও জানায়, আমি যদি শেষ মুহূর্তে মত বদল করি তাহলে যেন ওকে জানাই। মৃত্যু পরোয়ানাটা আমি নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলাম। তাও এক চিনা চিহ্নে। চিহ্নটা আমাকে কার্টারই শিখিয়েছিল।”

“আর তিনটে প্রশ্ন। এক, হ্যালিডেকে কে খুন করল? দুই, রাখহরিকে কেন খুন করা হল? আর শেষ প্রশ্ন, কার্টার তো আপনার সব কথা মেনে চলেছিল, তাকে খুন করালেন কেন?”

“হ্যালিডেকে খুন করেছে ভাড়াটে খুনি। আমি তার নাম জানি না। জানার প্রয়োজনও নেই। ডাঃ মার্টিন ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পুরস্কারস্বরূপ তাঁকে দ্বিগুণ পেনশন দিয়ে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছি। রাখহরিকে খুন করা হয়নি, শুধু মাথার সামনেটা ফুটো করে ঘিলুর একটু অংশ চেঁছে নেওয়া হয়েছে, যাতে ও কোনও উত্তেজনা আর দেখাতে না পারে। ওকে ডালান্ডা হাউসে নিয়ে রাখা হয়েছে। ওর উপরে পরীক্ষা হবে।”

“হ্যালিডেকে কে খুন করেছে বোধহয় বুঝতে পারছি”, সাইগারসন বলল।

“কে?”

“হ্যালিডের গলায় আঙুলের দাগ স্পষ্ট। মঞ্চের পিছনের অন্ধকারে পিছন থেকে কেউ হ্যালিডের গলা টিপে ধরেছিল। আমি দেখেছি। নটা আঙুলের দাগ আছে…”

“লখন!” প্রিয়নাথ অজান্তেই বলে উঠল।

“হলে অবাক হব না। তাহলে হুজুর, শেষ প্রশ্নটা? কার্টারকে কেন মরতে হল?”

“সে কী! কার্টার তো আত্মহত্যা করেছে, আপনারা জানেন না? আমি তো তাই জানি”, দেখেই বোঝা গেল বড়োলাটও অবাক হয়েছেন।

“আপনি একটু ভুল জানেন হুজুর। কার্টারের বন্দুক ছিল ডান হাতে। ও বাঁহাতি। আমি ওকে সেদিন গ্রিনরুমে পৌঁছে দেবার পর ও ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর কেউ একটা এসেছিল। যে তার বিশ্বস্ত। তাকে কার্টার দরজা খুলে দিয়েছিল। সেই এসে কার্টারকে খুন করে।”

“কিন্তু আমি তো এ বিষয়ে কিচ্ছু জানি না! আমি তো ভাবতাম কার্টার আত্মহত্যা করেছে!” বড়োলাট বললেন।

“তাহলে একটাই সিদ্ধান্তে আসা যায়, সে রাতে কার জন্য কার্টার দরজা খুলেছিলেন, সেটা আর কোনও দিনও জানা যাবে না।”

“আমার জন্য।” পাশ থেকে গলা খাঁকরে বললেন টমসন।

চার জোড়া চোখ তাঁর দিকে নিবদ্ধ। কী বলছেন তিনি?

খুব ধীর গলায় টমসন বলতে থাকেন, “এই গোটা কেসে একটা জিনিসের কথা বারবার আলোচনায় এসেছে। কিন্তু সেটা যে কী বস্তু, তা কেউ দেখেনি, আমি দেখেছি।”

“কী সেটা?”

“কার্টারের লেখা সেই চিঠি, যেটা স্টেটসম্যান অফিসের ডাকবাক্সে ফেলে আসা হয়েছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু কে এই কাজ করেছে, সেটা বার করতে পারিনি। আপনারা কেউ জানেন?”

সবার আগে পাশাপাশি মাথা নাড়ল তারিণী। তারপর বাকি দুজন। নবীন মান্নাকে কথা দিয়েছে তাঁর নাম কেউ জানবে না।

“যাক, তাহলে ধরে নিতে হবে কার্টার নিজেই গেছিল ফেলতে। সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ তাতে যা লেখা ছিল সেটা।”

“কী ছিল তাতে?”

পকেট থেকে একটা দোমড়ানো কাগজ বার করে দেখালেন টমসন। “এই সেই চিঠি। দেখুন এতে কী লেখা আছে।” সবাই দেখল চিঠিতে লেখা, “The dead body of Governor General’s cousin brother is supposed to be found Near Teritti Bazar, China town. Detailed information may be given on the basis of payment. Please contact Carter the Magician. Sharp.”

স্টেটসম্যান খবরটা ছাপে, কিন্তু এই শেষ অংশটা বাদে। কিন্তু সম্পাদক আমার বন্ধু বলে চিঠিটা আমাকে দেখান। আমি আবার ইঁদুরের গন্ধ পাই। বুঝতে পারি কার্টার কম শয়তান না। টাকার লোভে সব করতে পারে। বড়োলাট আমায় সব খুলে বলেন। ফলে বুঝলাম এর সঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। হ্যালিডের ছিল ক্ষমতার লোভ আর কার্টারের টাকার। টাকার বদলে আজ নয় কাল ও যদি সব কথা বলে দেয়, তবে মহান ইংরেজ শাসনের ভিত কেঁপে যাবে। আমি কাউকে কিচ্ছু জানালাম না। ঠিক করলাম কার্টার বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়েছে। সেদিন কার্টার অসুস্থ হয়ে গ্রিনরুমে গেল। মঞ্চে হইচই। কপাল ভালো ইনস্পেক্টর জেনারেল হেনরি নিজেই আমায় বললেন মঞ্চের পিছনে গিয়ে সহযোগীদের একত্র করতে। আমি সবার অজান্তে কার্টারের গ্রিনরুমের সামনে এসে দরজায় টোকা দিলাম। কার্টার জিজ্ঞেস করল, কে? নাম বলতে দরজা খুলে দিল। টেবিলেই ডুয়েলের পিস্তলটা রাখা ছিল। একটা গুলি মঞ্চে ব্যবহার করেছিল। জানতাম আর-একটা গুলি পিস্তলের ভিতরেই থাকবে… নিজের পুলিশি রিভলভারটা আর ব্যবহার করতে হল না। জানতাম না ও বাঁহাতি। ভাবলাম পারফেক্ট ক্রাইম। কেউ ধরতে পারবে না। এখন বড়োলাট বাহাদুর যদি আমায় দোষী বলেন, তবে যে শাস্তি দেবেন, মাথা পেতে নেব।”

সাইগারসন লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। “অদ্ভুত খেলায় মেতেছিল এরা দুজন। লোভের খেলায়। যে খেলায় প্রাণ বাজি রেখে খেলতে হয়। খেলা শুরু হলে কারও রেহাই নেই…”

তারিণী এতক্ষণে মুখ খুলল। একটাই কথা বলল সে। অনেকদিন আগে গণপতির মুখে শোনা। “সূর্যতামসী।”


অন্তিম পর্ব— বিকীর্ণ বাতাস

সাইগারসন সাহেব কলিকাতা হইতে চলিয়া যাইবেন। আমরা সকলেই বিষণ্ণ। এই সামান্য সময়ে সাহেব যেন আমাদিগের কাছের মানুষ হইয়া উঠিয়াছিলেন। গত বৎসর যে ভয়াবহ নাটকের পর্দা উন্মোচিত হইয়াছিল, গত সপ্তাহের নববর্ষের দিনে তাহারই যবনিকাপাত হইয়াছে। কিন্তু মন বলিতেছিল এখনও কিছু বাকি আছে। হৃদয় ভারাক্রান্ত। সত্য জানিয়াও গোপন রাখার ভার যে কী দুঃসহ, তাহা ভাষায় বর্ণনা অন্তত আমার পক্ষে সম্ভবপর নহে। সাহেব খবর পাঠাইয়াছেন উনি আজ বৈকালে তারিণীর অফিসে যাইবেন। আমাকেও যাইতে হইবে। টমসন সাহেব দায়িত্ব দিয়াছেন, উহার রোজনামচার পৃষ্ঠা সকল যেন আমি সংগ্রহ করিয়া বিনষ্ট করি। কিন্তু আমার গোপন ইচ্ছা, আমি বিনষ্ট করিব না। আমার হেপাজতে গোপনে রাখিয়া দিব। ভবিষ্যতে যদি কোনও দিন ইহা লিপিবদ্ধ করি, তবে এই সকল অভিশপ্ত দিবস রাত্রির ঘটনাবলি স্মৃতিতে জাগরূক করিতে উক্ত পৃষ্ঠা সকল আমার পরম বান্ধবের ন্যায় সাহায্য করিবে।

বৈকালে পৌঁছিয়া দেখি সাইগারসন সাহেব উপস্থিত। গণপতি নাই। তারিণী তাহার ডায়রির বিশেষ এন্ট্রির পৃষ্ঠাসকল ছিঁড়িয়া আলাদা রাখিয়াছিল। আমি যাইতেই হাতে ধরাইয়া দিল। সাইগারসন সাহেব বলিতেছিলেন, “আমি ঠিক করিয়াছি এক্ষণে উত্তরের উদ্দেশে যাইব। দার্জিলিং, কালিম্পং হইয়া তিব্বতে। শুনিয়াছি লামারা বিশেষ অতিথিবৎসল হন।” আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিয়াছিল। ভাবিলাম সাহেবের সহিত এই শেষ দেখা। গণপতির বুঝি সাহেবের সহিত আর দেখা হইল না। বুঝি নাই দুই বছর বাদে আরও ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখে আসিয়া সাহেবের সহিত আবার মোলাকাত হইবে। গণপতির ভুতের বাক্স লইয়া গোটা দেশ তথা বিশ্বে যে মহা গোলযোগ আরম্ভ হইয়াছিল, সেকথা বিস্তারিত তারিণী তাহার ডায়রিতে লিখিয়াছে। ও বাক্সের মালিক যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রলয় ঘটাইতে সক্ষম তাহা তখনও না বুঝিলেও আজ বুঝি। পরমেশ্বরের কৃপায় বাক্সের ভূত আজ নিদ্রাভিভূত। আশা রাখি সুদূর ভবিষ্যতে কেহ আর ইহাকে জাগাইবে না। তবে জাগাইলে যে প্রলয়কাণ্ড ঘটিবে তাহা ভাবিলেই হৃদয় কম্পিত হয়। সেসব কাহিনি বারান্তরে বলার ইচ্ছা রহিল।

যাহা হউক, সেদিনের কথা বলি। সাহেবের দৃষ্টি টেবিলের উপর একখানি কাগজে পড়িল। তারিণীকে প্রশ্ন করিলেন, “ইহা কী লিখিয়াছ তারিণী?”

লজ্জিত স্বরে তারিণী কহিল, “আজ্ঞে, গোয়েন্দাগিরির পাশাপাশি আমি কবিতা চর্চাও করিয়া থাকি। নিতান্ত নেটিভ ব্যাপার…”

সাহেব খুশি হইলেন। ফ্রক কোটের পকেট হইতে একখানি ছোটো পুস্তিকা বাহির করিয়া তারিণীকে দিয়া বলিলেন, “ইহা কার্টার আমাকে দিয়াছিল। কবিতার পুস্তিকা। এই পুস্তিকাখানিই আমি পাঠ করিতাম। এখন ইহার প্রয়োজন ফুরাইয়াছে। পুস্তিকাটি যত্ন করিয়া রাখিবে। এখনই ইহা অত্যন্ত দুর্লভ। কালে কালে ইহা মহামূল্যবান হইবে।”

তারিণী কহিল, “কিন্তু রাখিবার জায়গা কোথায়?”

“কেন, তোমাকে তো দেখাইলাম। ডিরেক্টরের জিম্মায় ইহাকে রাখিয়া দাও।”

তারিণী একগাল হাসিয়া পুস্তকটিকে লাল মোটা খামে পুরিয়া, কাপড়ে জড়াইয়া ডিরেক্টরের অন্দরে রাখিয়া দিল। উঠিবার আগে সাহেব আমাকে বলিলেন, “অফিসার মুখার্জি, পড়ুন দেখি, তারিণী কী লিখিয়াছে? অর্থও বলিবেন।”

আমি পড়িতে শুরু করিলাম “আমরা পুরুষ, নীরস অতি/ নহি অধিকারী সুখে….”

“…কে দেবে মোদের সুধার কলস/ তৃষিত কাতর বুকে?” কী বাজে কবিতা মাইরি! তারিণী কেমন গোয়েন্দা ছিল জানি না, তবে বিচ্ছিরি কবিতা লিখত, এটা বুঝেছি। অফিসার চলে গেছেন আধঘণ্টা হয়েছে। মাথা এখনও ভোঁ ভোঁ করছে। যারা অফিসারের খবর পেয়েছে, তারা যে আমার খবর পাবে না, তার কী গ্যারান্টি! ভাবতে ভাবতে কবিতা লেখা পোকায় কাটা পাতাটা ওলটালাম। পিছনে একটা লিস্ট। ইংরাজিতে লেখা। হেডিং-এ লেখা, “Inventories from Mr. Driscol for the office of Tarini Churan Roy”। মানে এই অফিসের জন্য ড্রিসকল সাহেব যা যা দিয়েছিলেন তার হিসেব। কাজ নেই। তাই চোখ বোলাচ্ছিলাম। লেখা—

Files on previous cases— 15 nos.

Books on detection— 16 nos.

Wooden Table— 2 nos.

Wooden Chair (Chipandale Director)— 1 nos.

দেখেই লাফিয়ে উঠলাম। আরে! আমি তো সেই চেয়ারেই বসে! এর নাম চিপেনডেল ডিরেক্টর! কী জিনিস এটা? সঙ্গে সঙ্গে গুগল খুললাম। দেখি লেখা, “টমাস চিপেনডেলের জন্ম ইয়র্কশায়ারের কাছে ওটলিতে। তাঁর নামের উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় ১৭৪৮ সালে, যখন তিনি তিরিশ বছর বয়সে লন্ডন শহরে একটি কাঠের আসবাবের দোকান খুলে বসেন। তখন লন্ডনে ছুতোরের ব্যবসার খুব রমরমা। জর্জ সেডন নামে এক মিস্ত্রির কারখানায় প্রায় চারশো কর্মচারী কাজ করতেন। চিপেনডেলের ব্যবসা অত বড়ো ছিল না। ট্রাফালগার স্কোয়ারের এক কোণে গোটা পঞ্চাশ কর্মচারী নিয়ে তিনি চেয়ার, টেবিল, বুককেস, মোমবাতি দান, ঘড়ির কেস, তাস খেলার টেবিল ছাড়াও একেবারে নতুন একটা আসবাব বানান— যার নাম তিনি দেন ‘সোফা’। চিপেনডেলের আসবাব ও ডিজাইন ছিল অদ্ভুত সুন্দর, কিন্তু সেরকম আরও অনেক ছুতোরেরই ছিল। ১৭৫৪ সালে চিপেনডেল আচমকা একটা কাজ করে বসলেন। তাঁর দোকানের যত আসবাব তৈরি হয়, তার ডিজাইন একত্র করে ১৬০টি ছবি সম্মিলিত একটা বই প্রকাশ করলেন। নাম, দ্য জেন্টলম্যান অ্যান্ড ক্যাবিনেট মেকার’স ডিরেক্টর। তখনকার দিনে দাঁড়িয়ে এ ভাবনা ঐতিহাসিক। স্থপতিরা এই ধরনের কাজ আগে করলেও আসবাবের ক্ষেত্রেও যে এমন বই প্রকাশ করা যায় তা প্রথম চিপেনডেলের মাথাতেই আসে। সে ছবিও ছিল দেখার মতো। কোন আসবাব ঘরে রাখলে তা ঠিক কেমন দেখাবে, ছায়াসহ সেই ছবি ত্রিমাত্রিক ও নিখুঁতভাবে এঁকেছিলেন তিনি। আজকাল যত আধুনিক ক্যাটালগ দেখা যায়, সবাই জেনে বা না জেনে চিপেনডেলকেই অনুসরণ করে। মোনালিসার ছবি বা মাইকেল এঞ্জেলোর ভাস্কর্যর মতো সেসব আসবাব এখন অমূল্য। এই চিপেনডেলের সেরা কাজ ছিল দ্য ডিরেক্টর, যাতে একটা লুকিয়ে রাখা ক্যাবিনেট থাকত। আজ অবধি মাত্র দুটো চিপেনডেল ডিরেক্টর পাওয়া গেছে। গুগলে দেখলাম, অবিকল আমার চেয়ারটার মতো দেখতে। চেয়ারের ঠিক নিচে পাশ বরাবর যে কাঠের টুকরোটা আছে তাতে ফুলের কাজ। মাঝে একটা ফুল, চারদিকে লতাপাতা। নেমে এসে মাটিতে বসে ফুলের ঠিক মাঝখানটায় চাপ দিলাম। খট করে একটা শব্দ করে পাল্লাটা খুলে গেল। ভিতরে অন্ধকার। হাত ঢুকিয়ে বুঝলাম কিছু রাখা আছে। টেনে বার করে আনলাম। কাপড়ে প্যাঁচানো দড়ি বাঁধা একটা ছোট্ট প্যাকেট। দেখলেই বোঝা যায় একশো বছরেরও বেশি বয়স হয়েছে। কাপড় জ্যালজ্যালে হয়ে গেছে। দড়ি জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। কাপড় ছিঁড়তেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটা লাল খাম। মুখ আটকানো। আমার তর সইছিল না। হাত কাঁপছে। কোনওমতে খাম ছিঁড়তেই বেরিয়ে এল বাদামি রঙের একটা বই। আমি নেটে আগে দেখেছি। অবিকল সেটা। বিশ্বাস হচ্ছে না। হাত বোলালাম। আবার… আবার... সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল আরও বড়ো কাজ বাকি। তারিণীর ডায়রি? যা থেকে গণপতির ভূতের বাক্সের সন্ধান পাওয়া যাবে? ডিরেক্টরের খোপে আবার হাত ঢোকালাম। কিছু ঠেকল না। এবার টর্চ মেরে দেখলাম। ভিতরটা খাঁ খাঁ করছে। একটা সুতোর টুকরো অবধি নেই।

“সারাদিন দূর থেকে ধোঁয়া রৌদ্রে রিরংসায় সে উনপঞ্চাশ

বাতাস তবুও বয়— উদীচীর বিকীর্ণ বাতাস”

(ক্রমশ...)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%