সৈকত রক্ষিত
রাতের অন্ধকার কেটে ভোর হয়েছে। তবে ভোরের অস্বচ্ছতা এখনো কাটেনি। জিনগা-ডুংরির মাথা থেকে দেখা যায় অখন্ড চরাচর জুড়ে তালশাঁসের মতো সেই অস্বচ্ছতা, বিভোর করে রেখেছে প্রকৃতিকে। একটু বাদেই গুয়া শালিকের হলুদ ঠ্যাঙের মতো বর্ণাভা নিয়ে পুবদিগন্তে থাপুথুপু হামাগুড়ি দিয়ে উঠবে দিনের প্রথম সূর্য। তারই ছটায় এই টিলার মাথা থেকে আরো প্রকট হয়ে উঠবে গ্রামগুলি—জীবনডি, ডেলিকচা, পলপল।
গ্রাম যেখানে মাথাচাড়া দিয়ে জেগে নেই, সেখানে জাগ্রত হয়ে রয়েছে বর্ষার জল পেয়ে লহলহ করতে থাকা জঙ্গল। সেই জঙ্গল কোথা থেকে কোথায় যে চলে গেছে! নিরবচ্ছিন্ন দৃষ্টি নিয়ে ক্রমশ দূর থেকে আরো দূরে তাকালে তুন্তা, দেলঘাটাও অনুমান করে নেওয়া যায়। নদীর কূলে শত বছরের ভাঙা জৈন মন্দিরগুলি ধ্বস্ত ও কালের প্রহারে ক্ষতবিক্ষত। যেন শোকের প্রহর গুনছে। জলের ওপরে থুবড়ি খেয়ে এই পড়ল বলে।
জিনগা-ডুংরি থেকে অবশ্য সে-নদী দেখা যায় না। জঙ্গলে জঙ্গলে আড়াল হয়ে থাকে। তবে উল্টোদিকে তাকালে, চোখে পড়বে সেই ‘ঝরনা নদী’টি। বালি ও নুড়িপাথরের ওপর দিয়ে সির-সির বয়ে চলা তার স্রোতের ওপরে জিনগা-ডুংরির মাথা ছাপিয়ে এসে পুবের নরম রোদ পড়বে—ডিংলা ফুলের মতো। ইলিক-ঝিলিক করবে সারা নদী।
কিন্তু জারমণি কি ততক্ষণ অপেক্ষা করবে? কেনই-বা করবে? চরাচর জেগে ওঠার আগেই পাটনকে নিয়ে সে এই তল্লাট ছেড়ে ‘অদৃশ্য’ হয়ে যেতে চায়। যত শিগগির সম্ভব। কোনো দ্বিধা নিয়ে নয়, ভয় নিয়েও নয়। বরং অন্তর্গূঢ় এক দৃঢ়তা নিয়ে সে প্রস্থান করতে চায় জিনগা-মাঈয়ের এই ‘থান’ থেকে। এই আগাছা আর জঙ্গলে ভরা ডুংরি-পাহাড় থেকে।
সে তার হাতে শক্ত করে ধরা আগাভাঙা টাঙিটি সেই নদীর দিকে বাড়িয়ে পাটনকে কিছু দেখায়। তারপর, দু’জনেই, ধাপে ধাপে নেমে যেতে থাকে সেদিকেই। যেদিকে ঝরনা নদী।
এদিকে তেমন জঙ্গল নেই। এখানে-সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে মস্ত মস্ত চাটান। কোথাও কোথাও পলাশ গাছ। ওপর থেকে সেগুলোকে দেখতে ‘ঘাস-বঝা’র মতো লাগে। যেন রাতের অন্ধকারে লোমশ শরীরে সর্বদা ভিজে গায়ে থাকা ‘দুলদুলি ভূত’ ড্যামের ওপার থেকে মাথায় ঘাসের বোঝাগুলি এনে যত্রতত্র ফেলে দিয়েছে আর লুদুপুদু ছুটে পালিয়ে গেছে তার ডেরায়।
এই দুলদুলি ভূতকে কেউ কখনো দেখেনি। তবে স্থানীয় গ্রামবাসীরা পূর্ব-পুরুষদের সূত্র ধরে কল্পনা করে—এই অপদেবতাটি নাকি এরকমই, বন্য মানুষের মতো। অথবা ডুগডুগির তালে নাচতে নাচতে দাঁড়িয়ে পড়া ভালুকের মতো। তার ভিজে গায়ে থাকাটাও তাদের কল্পনার বিস্তার। এর থেকে বোঝা যায়, দুলদুলি ভূতের সঙ্গে জলের সম্পর্ক রয়েছে। সম্পর্কটা অবশ্য অন্য রকমের। তারা মনে করে, ড্যামের ওপারে বসবাসকারী এই ভূতটিকে এপারে আসতে হলে সাঁতরে আসতে হয়। তবে যখন-তখন সে গ্রামে এসে ঢোকে না। আসে কখনো-সখনো। ‘ঠেকে-যোগে’। যে-বছর সে তার জল ঝরতে থাকা লোমশ শরীর নিয়ে ড্যাম পেরিয়ে আসে এবং গ্রামবাসীদের অলক্ষ্যে রাতের অন্ধকারে শেয়ালের মতো এই জঙ্গল-ডুংরি অধ্যুষিত গ্রামগুলির কোনো একটিতে আত্মগোপন করে থেকে যায়, সে-বছরই অবধারিতভাবে অঞ্চলে দেখা দেয় শুখা। অর্থাৎ খরা।
এই মুহূর্তে ‘খরা’ শব্দটি এই পরিপ্রেক্ষিতে যে কতটা বেমানান তা চতুস্পার্শ্বের দৃষ্টিনন্দন সবুজাভা দেখলে টের পাওয়া যায়। কেমন একটা ভিজে ভিজে ভাব। বাতাস বইছে ফিনিফিনি। খেয়ালখুশি মতো। ভোরের সেই জংলা বাতাসে প্রকৃতির মিশ্র সুবাস। কত যে রঙ্গোনী, চাপকাঁটা আর টাঁড়ডিংলা ফুলের গন্ধ। কত-কত কুড়চির সুবাস। যেন তরঙ্গে তরঙ্গে খেলছে মানভূমের ঝুমুর।
আর কত গাছের ডালে থেঁৎলে যাওয়া মৌচাকের গন্ধও বাতাসের হেলকে মিশে গেছে। একবার বুকভর্তি শ্বাস নিলে মনে হয়, আঃ! সত্যিই যেন গোটা অঞ্চল জুড়ে বিরাজ করছে নন্দন-কানন। প্রাণ জুড়িয়ে যায়! ওহ, প্রাণ রে!
জারমণি নেমে আসতে থাকে। হাতের বুচাটাঙিটি দিয়ে জঙ্গল-ঝাড়ি টালতে টালতে। পিছনে মাথা কামানো পাটন। সে এখন তার অগ্রবর্তিনীর পথকে দৃষ্টিহীনের মতো অনুসরণ করে চলেছে। এভাবে না-চলে উপায়ও নেই। তার এই নির্জীব অনুসরণ দেখে, এটাও মনে হয় যে, জীবনের পরবর্তী অগ্রগমনের জন্যও হয়তো জারমণির পথপ্রদর্শনকেই তার প্রতি ডেগে—প্রতি পদাঙ্কে, আঙুলে আঙুলে— অনুধাবন করে যেতে হবে। তাকে দেখে, অন্তত এই মুহূর্তে, এতোটাই অনন্যোপায় দেখায়।
এটা আরও বেশি করে মনে হয় প্রতিকূলতার মধ্যেও জারমণির প্রতিটি অতিনিশ্চয় পদক্ষেপের কারণেও। কী তার দৃঢ়তা! কী খরভঙ্গি! এই নিশ্চয়তার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন জয়ের ইশারাও রয়েছে। কী সেই জয়? হয়তো, এতদিনের এত-এত মানুষের ভাবনায়, তাদের প্রতিদিনকার লোকজীবনে বেঁচে থাকা সমস্ত অতিকথাকে বাস্তবে খন্ডন করে দেওয়াটাই তার জয়। জয়ের প্রতীক হিসেবে জিনগা-মাঈয়ের থান থেকে তুলে নিয়ে এসেছে বহু লোককথার, বহু অতিরঞ্জিত কাহিনি ও প্রবাদের উৎস এই ভয়ঙ্কর ‘বুচাটাঙি’। তার হাতে শক্তমুঠিতে ধরা এই সেকেলে হাতিয়ারটিই এখন তার আত্মপ্রত্যয়ের দুর্লভ নিশান।
শেষ রাতের দিকে কি বৃষ্টি হয়েছিল? বাতাসে জলা-জলা ভাব। অবতরণ যত বাড়তে থাকে, ততোই জংলি ফুলের গন্ধের পরিবর্তে, একটু একটু করে, নাকে আসে মেঠো ঘ্রাণ। নেমে আসার পথে দুপাশাড়ি কাঁধ-উঁচু আগাছার মগডালগুলিতে উড়ে উড়ে বসছে বাগঢলু১ । অলসগতিতে ঝুনঝুনি গাছের শীর্ণডাল পেঁচিয়ে ধরছে বিষধর সরীসৃপ। জারমণির সেদিকে নজর নেই। তবু, কোনো কারণে, সে একটা চাটানের গায়ে দাঁড়িয়ে পড়লে, পাটন জানতে চায়, ‘কাকে দেখছিস? লোক আসছে নকি?’
জারমণি জবাব দেয় না। সে হাতের বুচাটাঙিটি মুন্ডকর্তনের ভঙ্গিতে বাতাসের বিরুদ্ধে দ্রুত চালনা করে ঘুরে দাঁড়াতে পারত তার দিকে। কিন্তু সে তা করলো না। শুধু কঠোরতা নিয়ে তার দিকে আধপাক ঘুরে, আবার সে চোখ ঘুরিয়ে নিল। পাথর থেকে নেমে আবার অবতরণের পথ ধরল। এখনো কয়েক দিন ধরে বেণির অবন্ধনে থাকা তার রুক্ষ কেশগুলি সুদূর আসমানে ঝাঁক বেঁধে উড্ডীয়মান চুঁইচুপুস পাখির মতোই উড়তে লাগল।। এখনো সূর্য ওঠেনি। ভোরের আলোয় আকাশে চাঁদের জলছাপ, এখনো।
উপত্যকার অভিমুখে কয়েকটি ধাপ নেমে, পায়ে পায়ে নুড়ি পাথরের কর্কশ শব্দ তুলে, জারমণি ঝাঁঝিয়ে উঠল পাটনের কথায়। বললো, ‘লোক? কন লোক আসবেক?’
জবাবের পরিবর্তে এই প্রতি-প্রশ্নের ঔদ্ধত্য পাটনকে চমকে দিল। সে সম্ভবত বুঝে উঠতে পারল না কেন এই উদ্ধত আচরণ, জারমণির। সে এটাও আঁচ করতে পারল না যে, তার এই ঔদ্ধত্যের মধ্যে ক্রোধ আছে, ঘৃণা এবং অবজ্ঞা আছে, এমনকি প্রতিহিংসাও আছে। আর এটা না-বোঝাতে, প্রহরণধারিণী এই আদিম নারীটিকে সত্যিসত্যি তার অনেকাংশে দুর্বোধ্য ঠেকতে লাগল। মনে হলো, এখন আর একটি-দুটি লোকের যাওয়া-আসাতে কিছুই যায় আসে না। অল্প সময় বাদেই জারমণি তাকে হয়তো একগ্রাম লোকের সামনে এমনভাবে ঠেলে দেবে, যেভাবে দড়ি-দড়া বাঁধা শূকরকে মুদগরের উপর্যুপরি আঘাতে ঘায়েল করতে নিষ্ঠুরের মতো নিক্ষেপ করা হয় বধ্যভূমিতে।
কোথায় সেই বধ্যভূমি? জারমণি কোন দিকে নিয়ে চলেছে মুন্ডিতকেশ পাটনকে? সত্যিই কি এই যাত্রা তার সেই অভিমুখেই অন্তিম গমন? গাঢ় হয়ে ভাবতে পা শিথিল হয়ে এলো তার। এমনিতেই সে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় প্রপীড়িত, প্রহারে প্রহারে জর্জরিত। সারা শরীরে গাঢ় হয়ে ওঠা নির্যাতনের রেখাগুলি এখন আর তার প্রতি বিগত অত্যাচারের প্রতিবাদের সরব ভাষ্য হয়ে নেই, বরং তারা এখন তার শোকগাথা। এতসবের পরেও কি তার সঙ্ঘটিত অপরাধের শেষবিচার হয়নি? হরিত্থানের থামে বেঁধে, ক্ষৌরকার ডেকে, যত গ্রামবাসীদের সামনে মাথা মুন্ডন করেও তাকে কি দেওয়া হয়নি তার চরম এবং পরম দন্ড? ধিক বিচার! ধিক তবে এই দন্ডদান!
আর মাথা মুন্ডনের অধ্যয়াটিই তো তার দন্ডদানের শেষ অধ্যায় নয়। তার পরেও, তার জীবন এবং মৃত্যু নিয়ে জিনগা-মাঈ বিচার করবে বলে তাকে এই জিনগা-ডুংরিতে রাতভর আটক করে রাখা হয়েছিল। উইঢিপি ভরা, বহুকালের ধ্বস্ত ও পরিত্যক্ত একটি ঘরে। যেখানে প্রায় প্রতিটি ঢিপির ভেতরে ‘বিঁড়া’র মতো মোচড় দিয়ে রয়েছে বহু বহু প্রচীন বিষধর সরীসৃপ। সেই ঘর থেকে, জিনগা-মাঈয়ের বুচাটাঙি হাতে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, স্পর্দ্ধার সঙ্গে তাকে খালাস করেছে জারমণি।
তবে একে কি সেই অর্থে খালাস বলা চলে, যদি এই জারমণিই তাকে এখন আবার এক বধ্যভূমি থেকে ছাড়িয়ে আরেক বধ্যভূমির দিকে নিয়ে যায়? প্রকাশ্যে, সবার সামনে, তাকে নিধন করবে বলে?
না। মৃত্যুর দিকে আর একপাও যাবে না পাটন। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। চড়াইয়ে। ঢালুতে কয়েক হাত নেমে গেছে জারমণি। সেদিকে তাকিয়ে, সে, অসম্মতির দুর্বল কন্ঠে বলে, ‘হামি নাই যাব। তুঁই কথাকে নিয়ে যাছিস হামকে?’
‘কীঈঃ।’ পিছন ফিরে পাটনকে দেখে জারমণি। টাঙির ওপরে পাথর ছিঁটকে পড়ার মতো টঙ করে ওঠে তার কন্ঠস্বর। ভয় পেয়ে যায় পাটন।
‘হামকে তুঁই নিয়ে যাছিস, কথাকে?’
প্রশ্নটি নিছক প্রশ্ন হলে হয়তো একটি ভৌগোলিক জবাব দেওয়া যেত। কিন্তু এখানে প্রশ্নের আড়ালে রয়েছে সন্দেহ এবং ভয়। বোঝা যায়, পাটন এখন জারমণিকেই সন্দেহ করছে। ভয় করছে যেখানে সে তাকে নিয়ে যেতে চাইছে সেই জায়গাটিকে, সেখানকার আদিম-বর্বর নৃশংস মানুষগুলিকে। যারা ভূমি থেকে অনেক অনেক ওপরে অবস্থান করা অদৃশ্য লোকদেবতাকে সাক্ষী রেখে নিজেদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে। যারা জিনগা-মাঈ নামের লোকদেবতাটির হাতের ‘বুচাটাঙি’র দেহাই দিয়ে, ভয় দেখিয়ে, নিজেরাই নির্বলের প্রতি অত্যাচারের খড়্গ ধরতেও কসুর করে না। এই জারমণি সিংসর্দার কি এখন তাদেরই প্রতিনিধি? পাটন তার রাতজাগা আর্ত ও ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে থাকে তার সেই অস্ত্রধারী কঠিন হাতটির দিকে।
তাকিয়ে থাকতে থাকতে পাটনের মনে পড়ে যায়, আজ যে-হাতে জারমণি সিং সর্দার অস্ত্র ধরেছে, একদিন সেই হাতে এই পাটন শবরও অস্ত্র ধরেছিল। আজ যেমন হাতে অস্ত্র পেয়েই জারমণি তাকে বশ করে রাখতে চায়, সেদিন পাটনও কি তেমনটাই চায়নি? অন্তত, অস্ত্রধারী তা চাক বা না-চাক, অস্ত্র তা চেয়েছিল। কালে কালে, যুগে যুগে, অস্ত্রের ধর্মই তা। সে কেবলি তার ধারণকারীকে দিয়ে আধিপত্যের কথা জাহির করতে চায়।
সেই সঙ্গে আবার এটাও ঠিক যে, অস্ত্র কখনোই একমুষ্টিতে থাকে না। সে অপতিব্রতা। এক পুরুষের হাত থেকে আরেক পুরুষের করতলগত হয়। জগতে নৈমিত্তিক এই পালাবদল চলছে। সেদিন পাটনের হাতে যে অস্ত্র ছিল, আজ তা-ই উঠে এসেছে জারমণির হাতে। সেদিন জারমণির যে-কাতরতা ছিল তার কাছে অভীপ্সিত, আজ জারমণিও কি সেই কাতরতা, সেই বশম্বদ অক্রুর আচরণই পাটনের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে? সশস্ত্র হয়ে থাকলে, অস্ত্রের এই ভাষা, এই ভয়ঙ্করতা অবাঙমনসগোচর হয়ে থেকে যায়। শুধু টের পাওয়া যায় তার মাতন। সে এমনই আগ্রাসী ও প্রতিহিংসাপরায়ণ মহাবেশ সৃষ্টি করতে পারে।
পাটন এটা বুঝতে পেরেছিল, যখন সে নিরস্ত্র হয়ে পড়েছিল। একটি প্রায়-অন্ধকার কক্ষে জারমণি অন্তরীণ থাকাকালীন, সশস্ত্র দ্বারী হিসেবে থাকতে থাকতে, কোনো একটি বিশেষ মুহূর্তে জারমণিকে দেখে তার মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে টুপ করে খসে পড়েছিল অস্ত্রটি। সেই দৃশ্য তার মন ও মনন, চিন্তা-চেতন নি:শব্দে আউল-ঝাউল করে দিয়েছিল। তার জীবনের যাবতীয় জাড্য ভেঙে দিয়ে নতুন একটি অভিমুখ এনে দিয়েছিল। দৃশ্য-দৃশ্যান্তর তার এমনভাবে মনে পড়ে যেতে থাকে, যেন কোনো সাঁওতাল ঘরে মরা-হারার খবর পেয়ে স্বয়ং ধর্মরাজের দূতের মতো এসে হাজির কোনো পাইটকার, পট খুলে জীবনের শাশ্বত বৃত্তান্ত শুনিয়ে যাচ্ছে—পাটনের দৃষ্টিতে সেই পটে কেবলি ভেসে ভেসে উঠছে সেদিনের সেই বিশেষ মুহূর্তটি...
টানা তিনদিন ধরে সুনসান জঙ্গলের মাঝে শবরদের একটি ঘরে অন্তরীণ জারমণি। নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে শিকল-বন্ধ ঘরের বাইরে রাখা হচ্ছে না। বারান্দায়, আঙিনায় দুদন্ড এসে দাঁড়ানো কিংবা পায়চারি করা তাও নিষিদ্ধ। এমনকি, তার কন্ঠস্বরটিকেও যথাসম্ভব অবদমিত করে রাখতে বলা হয়েছে। সে হাঁটাচলা করবে না, কথা বলবে না—গৃহস্থরাও কেউ তার মুখ দেখতে না-পেলেই ভালো। এমন কড়াকড়ির মধ্যে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছিল জারমণি। সে আর পারছিল না আলো-হাওয়াহীন ঘুপসি ঘরের মধ্যে থাকতে। তার ওপর চৌকাঠের ওপারে এক রুক্ষ ও তিরিক্ষি মেজাজের ধনুর্ধর যুবকের অনবরত প্রহরা।
তবু প্রথম প্রথম সে তাও মেনে নিয়েছিল। সে ভেবেছিল, যার সঙ্গে ভাবভালোবাসার সূত্রে সে তার নিজের পলপল গ্রামের ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে এখানে, এই ডেলিকচা গ্রামে, সেই অঙ্গদ যত দ্রুত সম্ভব তাকে এই বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করবে এবং তার সেই ভালোবাসার পুরুষই বাস্তব করে তুলবে তার স্বপ্নকে। কিন্তু অন্তরীণ থাকতে জারমণি বুঝে যায়—বিপদের এই মুহূর্তে তার সেই পুরুষ আর তার কাছে নেই। ফলত স্বপ্ন পূরণ হবার নয়। তাকে ভালোবেসে জীবনের অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে আসাও আর সম্ভব নয়। তার বদলে এই দ্বারী—এই সহোদর পাটনের অনিবার্য আধিপত্য তাকে মেনে নিতে হবে। যে তাকে অন্ধকার থেকে মুক্তি দেওয়া তো দূরে থাক, আরো অন্ধকারের দিকেই নিয়ে যেতে যায়। তার তখন মনে পড়তে থাকে ঘরের কথা। তার ফেলে আসা জীবনের কথাও। সে নিজেকে আর সংযত রাখতে না-পেরে, দরজায় ক্রমাগত ধাকলানি দিয়ে নাগাড়ে বলে যেতে থাকে, ‘কই শুনছিস গো! তুঁই এখনি খুলে দে কপাটটা। খুলে দে নাই ত হামি দমে চেঁচাব! লোক জড় করে দিব!’
গৃহস্থ বুড়োবুড়িরা জারমণির এই বেপরোয়া মরিয়া ভাব দেখে রীতিমতো শঙ্কিত হয়ে ওঠে। সত্যিই কি সে এবার চেঁচিয়ে উঠবে? এভাবে চেঁচিয়ে উঠলে লোক জড়ো হয়ে যাবে, জানাজানি হবে! এই নির্জন জঙ্গলে তাদের লাগালাগি দু-তিনটি ঘর ছাড়া আর ঘর নেই বললেই চলে। যদিও জানাজানি হওয়ার পক্ষে এক গ্রামবাসীই কাফি। একজনের মুখ থেকে এই বার্তা শত-সহস্র জনের কাছে, চুটি ধরাতে-না-ধরাতে, খরিশ সাপের পারা ছলকে ছলকে চলে যায়। আর তখন হাড়ি-নাপিত-মুদি-মাহাত—কারোরই জানতে বাকি থাকবে না যে, এখানে একটি ‘রমণী-রতন’ আছে। ভাঙা ঘরে চাঁদের আলোর মতো যে খাইড়াদের এই পর্ণকুটিরে বিরাজ করছে। শেষতক খবর চলে যাবে তাদের কাছেও, যারা কোদোবাড়িয়ে বিচ ছড়ানোর মতো দূরে-কাছের গ্রামগুলিতে, হাটে-ঘাটে, খবর সংগ্রহকারীদের গোপনে গোপনে পাঠিয়ে দিয়েছে। মেয়েটির হালহকিকত জানতে। খবর পেয়ে জারমণির গ্রাম থেকে তখন বোরহৈলের২ পারা ছুটে আসবে যত মাতব্বরের দল। আনন্দে উলফা দিতে দিতে আসবে আরো কত কত ছ্যেলা-ছঁড়া। তখন এই গুরুতর কান্ডের ভয়াবহ পরিণতি থেকে শবরদের একজনও কি ‘পাঁখি ধান’৩ হয়েও বাঁচতে পারবে?
সেই ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে, পাটন, ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ঘরের ভেতরে থাকা জারমণির ওপর। আগে এই নিয়ে কয়েকবার তাকে সতর্কও করে দিয়েছে পাটন। কিন্তু এখন সে আর কোনো বোঝাবুঝির রাস্তায় গেল না। সটান উঠে এলো দাওয়ায়। দাওয়ার প্রান্তে বন্ধ কপাটের শিকলটি খুলে, অবুঝের মতো, চন্ডক্রোধে সজোরে লাথি মারল দরজার গায়ে। আর উদ্ধত ভঙ্গিতে তার হাতে ধরা বিষদিগ্ধ তীরটি কাঁধের কাছে অনেকটাই উৎক্ষিপ্ত করে, বিদ্ধ করে দেওয়ার আক্রোশে বলে উঠলো, ‘চেঁচাবিস তুঁই? লে চেঁচা! চেঁচা কত চেঁচাবি! বিদকে দিব!’
সেই মুহূর্তে, জারমণি পুরোনো শিমূল গাছের গুঁড়িটিতে বসে মুখ নিচু করে চোখের জল মুছছিল। আচমকা ঝড়ের গতিতে পাল্লা খুলে যাওয়ায় সে চমকে ওঠে! ভয়ও পেয়ে যায় পাটনের এই রূপ দেখে। চোখের জল মোছা ইষদোষ্ণ আঁচলটি নিয়ে, হাতে দলা পাকাতে পাকাতে, চেঁচানোর কথা সে ভুলেই যায়। গলায় আটকে থাকা কান্না দিয়ে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, অবোধ কিশোরীর মতো নরম সুরে বলে, ‘ঘরকে যাব!’
পাটনের মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে তীরটি ফসকে পড়ে গেল! চৌকাঠে! লাল হয়ে গেল তার বজ্রমুষ্টি। মুহূর্তে অন্তর্হিত হয়ে গেল অদম্য ক্রোধ, হিংসা—অস্ত্র তথা বাহুবল দিয়ে পরাভূত করার বর্বরোচিত আকাঙ্ক্ষাও।
পাশের ঘরটিতে, তখনো লেহে-লেহে করে জ্বলছে চ্যালাকাঠ। তারই বিচ্ছুরিত হরিদ্রাভায় আংশিক প্রতিভাসিত হয় জারমণির থমথমে মুখমন্ডল। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া বাবুই পাখির মতো ভিজে রয়েছে তার দীর্ঘায়ত চোখের কোমল পাতাগুলি। নাকের ছাউনির তলে সোনালি নোলক বিষাদের ভাষা নিয়ে, অভিব্যক্তি নিয়ে স্পন্দিত হচ্ছে বারে বারে।
পাটনের মুখে রা নেই। সে চেয়েই থাকে। অন্ধকারে অধিষ্ঠিত সেই জ্যোতির্ময়ীর দিকে।
এই প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গদৃষ্টিতে পাটন দেখল জারমণিকে। অস্ত্রের আবেশ তার কেটে গেল। আর সে তখন অনুভব করলো—তার হাত থেকে অস্ত্রেরই পতন হয়নি, পতন হয়েছে অস্ত্রের মহাবেশের এবং তার একচ্ছত্র আধিপত্যের। পতন হয়েছে বশ্যতার এবং যথার্থই অস্ত্রের প্রতি তার আনুগত্যের। দাসত্বের। একটি নারী-সৌন্দর্য যেন প্রবলতর অস্ত্র হয়ে তাকে মুষ্টিবদ্ধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে ভেতরে ভেতরে চঞ্চল করে তুললো।...
পাটন এখনো জারমণির দিকে চেয়ে থাকে। চেয়ে থাকে তার হাতে কঠোরভাবে ধরা সেই বুচাটাঙিটার দিকে। মন উদাস ও বিষণ্ণ হয়ে যায়, পাটনের। হায়! এই সেই জারমণি! আজ হাতে অস্ত্র পেয়ে সে কি আবার নতুন করে তার প্রতিশোধ নিতে চায়? নিজের হাতে? তাই জিনগা-মাঈয়ের শেষ বিচারের অপেক্ষাতেও সে থাকেনি, হয়তো নিজেই পাটনের বিচার করবে বলে তাকে সে নিজেই নিয়ে চলেছে তার হেফাজতে। নারীর প্রতিশোধস্পৃহা কি এতোটাই তীব্র হয়?
কিন্তু কীসের প্রতিশোধ? কোন অন্যায়ের? জারমণির প্রতি অনুরক্ত হয়ে সে তাকে আকাঙ্ক্ষা করেছিল। জারমণি তার সে-আকাঙ্ক্ষার শিকার হয়নি। উপরন্তু পাটনের সারা শরীর জুড়ে তার প্রত্যাখ্যানের সাক্ষ্য-প্রমাণ রেখে দিয়েছে সে। ‘লাকড়ামুতা’ গাছের শুকনো ডাল দিয়ে যেভাবে সে নিষ্ঠুরের মতো, জল্লাদের মতো, বাউরি বাগালের মতো নাগাড়ে প্রহার করে গেছে, সেই প্রহারের প্রতিটি হৃদয়হীন অস্তিত্ব গোরুর গলায় গলাসির দাগের মতো এখনো ফুটে রয়েছে তার পিঠে, ঘাড়ে, বাহুগুলিতেও। সেদিকে তাকিয়ে, এখন আর নতুন করে চোখ ভিজে ওঠে না পাটনের। এমনকি, এতোর পরেও, জারমণির প্রতি অপ্রতিরোধ্য সেই আকাঙ্ক্ষা এতটুকুও চিড় খায়নি। যদিও, এখন আর সে-আকাঙ্ক্ষার কোনো বহি:প্রকাশ নেই। তাকে যতটা সম্ভব কাবুতে রেখে, ত্রস্ত ও ক্লেশিত দৃষ্টি মেলে ধরলো সে জারমণির দিকে।
‘ভালছিস য্যা? আওগা!’ জারমণি রুক্ষ্ম গলায় তাকে ধাপ ধাপে নেমে আসতে বলে।
পাটন চেয়েই থাকে। যেন শুধু চেয়ে থাকার জন্য চেয়ে থাকা। কোনো লক্ষ্যবস্তু নেই—অন্তদৃষ্টি তার অন্য জগতে।
বড়ো উদাস দেখায় পাটনকে। এ কোন পাটন? কোথায় গেল সেই পৌরুষ জাহির করা প্রতিহিংসাপরায়ণ যুবক? কোথায় গেল হাতের তির আর স্কন্ধের তূণ? তার নিজেরই নিজেকে কেমন রূপান্তরিত জীব মনে হয়। এই রূপান্তরই কি শেষতক তাকে মেনে নিতে হবে? এই তার নিয়তি?
‘এখনো ডাঁড়ায় আছিস? আয়—’
গায়ে কালসিটে আর চুঁইয়ে চুঁইয়ে বেরিয়ে আসা রক্তের শুকিয়ে যাওয়া অবশেষ নিয়ে, পাটন দাঁড়িয়ে থাকে। পিঠে লেগে রয়েছে ধুলো বালি। কুটোকাটা আবর্জনা। বগলের লোমে খড়ের টুকরো। লাগাতার অনাহারে পেট ঢুকে গেছে কোন সুন্দে। আরো দু-এক দন্ড সেখানে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে, ঘাড় ঘোরাতেই সে ঝাপসা দেখতে পায়—পলপল থেকে জিনগা-ডুংরির দিকে আসার কাঁপা-কাঁপা মেঠো পথটি। মাঠ পেরিয়ে এই পথ দিয়েই তো কাল পলপলের গ্রামবাসীরা ঢোল বাজিয়ে তাকে নিয়ে এসেছিল শোহরত করতে করতে। এখন আবার সেই পথেই তাকে ফিরে যেতে হবে, পলপলে?
পাটন জানে না, জারমণির হাতের ওই বুচাটাঙি তার অদৃষ্টের কোন ভাষা উৎকীর্ণ করে রেখেছে। তার মনে হলো, যদি সত্যিই জারমণির হাতে তার অন্তিম লীলার কথা লেখা রয়েছে, তবে তাও সাঙ্গ হোক। তবু সে ধন্য হবে। জারমণিকে ঘিরে সে তার মনোজগতে যে আকাঙ্ক্ষার জাল রচনা করেছিল, এখন সে-জাল বিস্তৃত হতে হতে, তাকে লালন করতে করতে—আকাঙ্ক্ষা এখন আসুরী কামনায় পর্যবসিত হয়েছে। সে যতোই নিষ্প্রাণ, নির্জীব হয়ে পড়ুক না-কেন, তার অন্তর্গত তৃষ্ণা তাতে মোটেই অনাসক্ত হবে না। গিরগিট থেকে খন্ডিত ল্যাজ যেমন বিচ্ছিন্ন প্রাণ হয়েও একা একা স্পন্দন তুলে চলে, এও তেমনি। অনাচার, অত্যাচার, এমনকি চরম দন্ডদানের রায় ঘোষণা করেও তাকে সঙ্কল্পচ্যুত করা সম্ভব নয়। জারমণিকে দেখে পাটনের মনে তো কেবল প্রেম-সঞ্চার হয়নি, প্রেমের বিভ্রমও সঞ্চারিত হয়েছে। জারমণিকে ভালোবেসে তাই সে ভালোবেসেছে তার হাতের বুচাটাঙিও।
ঘরের কথা মনে পড়ে গেল পাটনের। জঙ্গলের ভেতরে চারপাশে গাছপালায় ঢাকা ডেলিকচা গ্রামটি জিনগার মাথা থেকে দেখা যায় না। চার ঘরের সেই গ্রামে, তাদের ঘরটি কি এখনো অক্ষত রয়েছে? পাটন অনায়াসে অনুমান করতে পারে সেই ঘর আর ঘরের মানুষগুলোর করুণ পরিণতি! তার বৃদ্ধ বাপ-মায়ের জন্য হঠাৎ মন আনচান করে উঠল। কে জানে, তারা কোথায় কী অবস্থায়!
আর অঙ্গদ? জারমণির মুখে পুনঃপুনঃ উচ্চারিত সেই অঙ্গদ? কই, সে তো আর একদন্ডের জন্যও এলো না? এখনো কি তার কানে এই ভয়াবহ সংবাদ পৌঁছোয় নি? কোনো উড়া খবরও পায়নি সে? অথচ, জারমণির স্থির বিশ্বাস ছিল, যে-অঙ্গদের হাত ধরে সে এসেছে, সে তাকে এমনভাবে ফেলে চলে যেতে পারে না। সে আসবে। সে আসবে। সে আসবেই আসবে!
না। পাটন চায় না অঙ্গদ আবার এই ত্রিসীমানায় আসুক। এমনকি পাটনের জীবন যদি অনিশ্চিত হয়, যদি সে না-ও বেঁচে থাকে, তবু যেন সে জারমণির মুখোমুখি এসে না-দাঁড়ায়। পাটন বেঁচে থাকতে জারমণি যদি পাটনের না হয়, তাহলে পাটন মরে গেলেও জারমণি যেন অঙ্গদেরও না হয়।
তবে অঙ্গদকেও কি তারা ছেড়ে দেবে? পলপলের সেই হাতিয়ারি মানুষের দল? তাদের হাত থেকে কোনোভাবেও কি সে পারাঙ্গত৪ পাবে? কতদিন সে লুকিয়ে বাঁচতে পারবে? মানুষ তো কর্ম করে বাঁচে। তার কর্মজীবনের বার্তা পলপলে গিয়ে পৌঁছবে না? সে পারবে, তার বিরুদ্ধে হুঙ্কারিত অস্ত্রগুলির প্রতিরোধ গড়ে তুলতে? যদি সে পারে, তবে সে আসুক। অবশ্যই আসুক।
ভেতরে ভেতরে এমনি আরো অনেক কথার অনুরণন নিয়ে, পাটন, নিরীহ ছাগল-চোরের মতো পা বাড়ায়। সঙ ধরে সে জারমণির। তখনও সে লক্ষ রাখে জারমণির হাতে দোল খেতে থাকা বুচাটাঙিটির দিকে। ধারালো নয়। পুরু হয়ে জঙ ধরেছে। তবে তা এতোই দমি যে উঠাউঠি গোটা তিনেক সজোর কোপ দিয়ে একটি বলিষ্ঠ পুরুষের উন্নত ধড় থেকে মুন্ডকে ভূপাতিত করা যায়। তারপর পুরনো কোনো বট গাছের মূলে, যেখানে বহু বহু বছর ধরে লোকদেবতার উদ্দেশে নিবেদিত মাটির হাতি-ঘোড়ার ডাঁই হয়ে রয়েছে, তলে তলে রয়েছে সরীসৃপ, সেখানে এই মুন্ডটিও নামিয়ে দিয়ে বলা যায়, হে গরামথান, হে আমাদের সহস্র সহস্র বছরের যত পূর্বপুরুষদের গ্রামদেবতা, তোমাদের উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত হলো পাপিষ্ঠের এই রক্ত! তুমি ধরিত্রীকে কল্মষমুক্ত করো আর উর্বর করো মাটিকে! যুগে যুগে এভাবেই যেন অত্যাচারীর নিধন হয়। এভাবেই যেন...এক ঝটকায় হাত টেনে ধরলো জারমণি। পাটনের। আরেক হাতে তার উদ্ধত বুচাটাঙি। স্তন থেকে, কাঁধ থেকে, মাথা থেকেও ঢের ঢের ঊর্ধ্বে তুলে সে আঘাতের মুদ্রায় গর্জন করে বলে উঠল, ‘কন ধারে ঘুরছিস? চল ইধারে—’ জারমণি তাকে ঝুড়জঙ্গলের ভেতর দিয়ে উল্টোদিকের সুঁড়িপথটিতে এগিয়ে যেতে বলে। টিলা থেকে নেমে যে-রাস্তা মাঠে গিয়ে মিশেছে।
জারমণির মতলব বুঝে উঠতে পারে না পাটন। কী চায় এই উগ্রস্তনী চন্ডালিনী? সে কি তাকে জ-ভ দিতে চায়? তাহলে গ্রামে যাওয়ারই বা প্রয়োজন কী? এখানেও সে-কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায় না? জারমণির চোখে আক্রোশ ও ধিক্কার ফুটে উঠতে থাকে। কার প্রতিই বা তার এই বিরূপতা, তাও ধরতে পারে না পাটন। সে কাতর হয়ে বিস্ময়বিমূঢ় উক্তি করে বলে, ‘জারমণি, তুঁই হামকে কাটবি? জিনগার টাঙিয়ে হামকে জিনগা-মাঈয়ের থানে বলি দিবিস? তার হতে হামকে তদের গাঁকে ক্যানে নিয়ে যাতে খুজছিস? লে, লে তুঁই ইখেনেই চটা হামকে। চটা—’ স্বেচ্ছায় ঘাড়ে চোট নেওয়ার জন্য জারমণির হাঁটু ধরে বসে পড়ে পাটন। মাথা হেঁট করে বলতে থাকে, ‘চটা। চটা হামকে। লে—’
‘নাই! নাই! নাই!’ উন্নতগ্রীবা জারমণি শূন্যে চোখ মুদে থাকে। অতঃপর ঘাড়ের ওপরে তার এলোচুলের মাথাটিকে এপাশ-ওপাশ ঝাঁকুনি দিয়ে যা বললো, তা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল পাটন। শ্রুত বাক্যটিকেও সে যেন সত্য বলে মেনে নিতে পারে না। জানতে চায়, ‘তুঁই কী বলছিস? ধর্ম করে বল।’
হ্যাঁ, ধর্মকে সাক্ষী রেখেই জারমণি আবারও বলে, জিনগা-মাঈয়ের হাতের এই অস্ত্র সে আসমান থেকে মাটিতে নামিয়ে আনতে চায়। এই অস্ত্রকে সে করে তুলতে চায় ধর্মের অস্ত্র। যে-অস্ত্র ন্যায় ও সত্যের জন্য রক্তপাত ঘটায়, যে-অস্ত্র বিনাশকারীদের বিনষ্ট করে সমাজকে অপদেবতা থেকে মুক্ত করে।
না! পাটনের নিধন সে আর চায় না। তার অঙ্গে অঙ্গে ভিন্ন ক্রোধ প্রবাহিত। প্রয়োজনে সে চায় পাটনের নিধনকারীদের নিধন। অখন্ড জগৎ চরাচরে সমস্ত জীব, সম্যক প্রাণীকূল নিদ্রিত হয়ে পড়লেও, নিদ্রিত দেহের ভিতরেও কাম যেমন জাগরুক থাকে, তেমনি তাদের প্রতিটি প্রহরে তারা জাগিয়ে রাখবে তাকে। এই অস্ত্রকে। একটি মুহূর্তের জন্যও সঙ্গ ছাড়া করবেন না।
জারমণি সেই বুচাটাঙি পাটনের দুর্বল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘লে, আওগা!’
মনসা পূজার আর মাত্র চার-পাঁচটা দিন বাকি। ইতিমধ্যে পাঁঠা-পায়রা-হাঁসের দর উঠতে শুরু করেছে হাটগুলোতে। যারা আরেকটু বেশি দামে বিকতে চায়, তারা মাল নিয়ে শহরের দিকে চলতা দেয়। কেউ দড়ির জাল লাগানো বড়ো বড়ো ঝাঁপির ভেতরে হাঁস ঢুকিয়ে বাসের মাথায় তুলে দেয়। যার দু-দশটা মাল থাকে, সে ঝুড়ির মুখ কাপড়ে বেঁধে নেয়। হাতে হাতে নেয় পায়ে বাঁধা পায়রা। পাঁঠা বাসের ওপরে কিংবা ভেতরেও ঢুকিয়ে নেয়। কেউ আবার বস্তা জড়িয়ে সাইকেলের সিটের সামনের রডটিতে বেঁধে, ফুরফুর প্যাডেল করতে করতে, গ্রাম থেকে বেরিয়ে যায়। সারা রাস্তা ম্যাঁ-ম্যাঁ ডাকতে ডাকতে যায় পাঁঠাটি। তেমন কোনো পাঁঠা-বিক্রেতাকে রাস্তায় দেখতে পেয়ে কেউ কেউ বলে, ‘হেই পাঁঠাআইলা! শুনো হে! কত লিবে দামটা বলবে ন—’
খদ্দেরের ভোগার জুত নেই বুঝতে পারলে বিক্রেতা দাম বলতেও নারাজ। শহরের বাজার সে বুঝে ফেলেছে। গ্রামের মানুষের ওপর তার তেমন আর্থিক আস্থা নেই। সাইকেল না-থামিয়ে হাওয়ার অনুকূলে তার অনৈচ্ছিক জবাব ভাসিয়ে দিয়ে যায়, ‘লার-ব্যাঅ্যাঅ্যাঅ্যা! দাম দিতে লারবে! বাজার এখন উঁচন্তির দিকে...’
বাজার-দর যা-ই হোক না-কেন, গ্রামের এতবড় পরবে ঘরে ঘরে হাঁস কাটার ধুম পড়ে যায়। মানসিক থাকলে আলাদা কথা, তা না-হলে পাঁঠা তো সবাই দিতে পারে না, তারা আট-দশটাকা দিয়ে একমুঠার একটি পায়রা কিনে নিয়ে যায়। মাংস ছাড়া কি পরব মানায়? তাও আবার চ্যাংমুড়ি-কানির পূজা। তাই আশপাশের হাটগুলিতে এখন গুঁতাগুঁতি ভিড়। যখন-তখন বৃষ্টিও নামছে ঝিপঝিপ করে। ছাগলের নাদি-নাদাড়ি আর হাঁসের বিষ্ঠা পায়ে পায়ে মাড়িয়ে খরিদ্দার দরাদরিতে ব্যস্ত। কেউ পাঁঠার পিঠে আদর করার ভঙ্গিতে আলতো চাপড় মারছে, কেউ মাজার হাড় টিপে কুত করার চেষ্টা করছে। আবার কেউ হাঁসের মোলায়েম সুন্দর গ্রীবা শক্ত মুঠোয় ধরে সটান নাকের কাছে তুলে হাঁসটিকেই বিক্রেতা ধরে বলছে, ‘লিবার দর যা বলেছ, বলেছ। ইবার দিবার দর বল, কুম্পানি।’
দুটি চ্যাটাল হলুদ পা নিয়ে শূন্যে অসহায় দাপাদাপি করতে থাকে হাঁসটি। ‘ছ্যারক্যাট’ শব্দে মলত্যাগ করে খদ্দেরের গায়ে।
হাটের এই মুখরতা শুধু হাটগুলিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে মানুষের মনে এখন পরবের উদ্দীপনা, ফুর্তি। প্রতিটি মনসা মেলায় ঢেররাত তক চলছে ঢাঁই-ঢক্কর জাঁতগান। এদিক ওদিক থেকে বর্ষার ভারি বাতাসে ভেসে আসতে থাকে ঢোল-পেঁপটি-বিষমঢাকির সুরেলা ধ্বনি।
পলপলেও অনেক রাত অব্দি জাঁতমঙ্গল হয়েছে। উপর কুলহিতে। নামোকুলহিতে অবশ্য কিছু হয়নি। ‘ঢুলকীগীতের’ মহলা তো দূরে থাক, হারমোনিয়ামের পোঁ-টুকুও ওঠেনি। তাদের মন পড়েছিল অনেক দূরে। জিনগা-মাঈয়ের কাছে।
আর আগুয়ান খুড়াও তেমনি। কোনো কিছুই তার মনে দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করে না। এই রাগে ত এই ঠান্ডা। গ্রামের কোনো যুবকের প্রতি সে হয়তো এমন ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল, দেখা যায় টুকু বাদে সেই যুবকটিকেই বলছে, ‘কই ভাইগ্না, তুমার দিয়াশল খাড়িটা দাও ন, চুটিটা ধরাব।’ আগুয়ান সিংসর্দার এমনি। আলাভোলা। সবসময় একটা আবেগজনিত পুলকে সে খাইড়াঘরের হাঁড়িতে মহুল ফুটার মতন হরদম বলকিছে৫। এখন এই মুহূর্তে তাকে দেখে কে বলবে যে, তার বিটিকে নিয়ে এতবড় একটা হবিদবি৬ কান্ড ঘটে গেছে?
হরিবোল মেলার থাম্বায় খড়ের মোটা দড়ি ঘুরিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল পাটনকে। মাথা কামানোর জন্য উপরকুলহি থেকে ডাকা হয়েছিল গ্রামের ক্লিষ্ট লাপিতকে। থামের পাশে ডমন দাঁড়িয়েছিল গলায় ঢোল নিয়ে। অভিযুক্ত পাটনের মাথায় ক্ষুর চালনা দেখতে দেখতে ডমন একটা গ্রামীণ গতে ডুগু-ডুগু বাজিয়ে যাচ্ছিল তার ঢোলকটি। সেই বাজনা শুনে লোকজন এসে জড়ো হচ্ছিল। লোক জমতে জমতে যেন খুঁকড়া লড়াইয়ের পরব লেগে গিয়েছিল। তারপর, ক্ষৌরকর্ম শেষে পাটনকে নিয়ে তারা সদলবল জিনগা-ডুংরির দিকে এগোতে থাকে। সারাটা পথ ঢোল বাজাতে বাজাতে...
এখন সে-সবের কিছুই আগুয়ানের মনে ছায়াপাত করে নেই। কদিন হলো তার ছোটো ছেলে শঙ্কর অসুস্থ। তাকে খাওয়ানোর জন্য সে বাঁকুরামের ঘর থেকে একটা কাঁসার টুবকায় ভেঁড়ি দুধ নিয়ে আসে— ভাদরিয়া চালের একটা ঝুমুরের কলি গাইতে গাইতে। পায়ে কাদা নিয়ে সদরের পাল্লাহীন চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ঢোকে। হঠাৎ সে মুখ তুলে জারমণির ঘরটির দিকে তাকায়। এখনো কপাটটা ঠেসানো আছে দেখে, বউকে বলে, ‘জারমণি আজ ঘুমাবেকেই নকি? উঠা উয়াকে। এগৌ, কপাটটা ধাকলা ক্যানে।’
‘উঠেছে! বানধারে গেছে!’ জারমণির মা পার্বতী বলে। যদিও জারমণি যে কখন কপাট খুলে বেরিয়ে গেছে তা পার্বতীও জানে না। জারমণির ঘরটি খোলা দেখে তার ধারণা হয়েছে, প্রতিদিনের মতো আজও মায়ের আগে-আগে ঘুম থেকে উঠেছে জারমণি। এবং গ্রামের আর পাঁচটি মেয়ের মতো অন্ধকার থাকতে থাকতে প্রাতঃকৃত্য সারতে সে কোনো নদী-পুকুরের দিকে চলে গেছে। এবার ফিরে আসবে।
হেঁশেলে ঢুকে কাঠের উনুনটির পাশে দুধের ছোটো ঘটিটি নামিয়ে দেয় আগুয়ান। তালপাতার ছিঁড়া পাখাটি তার ওপরে চাপা দিয়ে সে সুরহীন গলায় আপন খেয়ালে গেয়ে ওঠে—
আনন্দ নিরানন্দ অতি
আমি মন বাঁন্ধি চিরানন্দে
সখি, রূপেরে বরিব রঙ্গে...
ভোরের দিকে জিনগা ডাকছিল। বৃষ্টিও হয়ে গেছে। হালি বৃষ্টির জল পেয়ে এই দু-একদিনে বকনা বাছুরের মতো ফুর্তালা হয়ে উঠেছে লতপাত। মাঠের ধারে ধারে ষাঁড় তুলসার ঝোপগুলি ঝাড়ালো হয়েছে। ফুল ধরেছে সাদা সাদা। বর্ষায় গায়ের পুরনো ধুলো ধুয়ে জলা বাতাসে দোল খাচ্ছে ফুলখাড়ি। নাককাটা গাছের শাখায় শাখায় নথের মতো ধরেছে ছোটো ছোটো রঙবিরঙ্গী কলি। উড়ছে ভুঁসড়ি পোকা।
আকাশ এখন ঘোলাটে হয়ে রয়েছে— দুঃস্থ সাঁওতালের কোমরে জড়ানো অমলিন বস্ত্রখন্ডের মতো। রোদ উঠছে না। বাতাসের চলাচল অনেকক্ষণ থেকে থুম মেরে আছে। বৃষ্টি এলো বলে। একটু আগে হয়ে যাওয়া বারিশের নিশান এখনো খড়ের চালগুলিতে। ছাঁচের খড়গুলিতে দীর্ঘবিরতি নিয়ে পড়ছে। যেন ‘টপকি টপকি পড়ে লোর!’
‘লোর’ তো চোখের জল। এই অতিকায় মায়াময় নশ্বর জগতে একই সঙ্গে কত মানুষ যে অশ্রুপাত করছে! কিন্তু কে কার খবর রাখে। সংসারে প্রকাশ্যে যত মানুষ রোদন করছে তার চেয়ে ঢেরগুণ অহরহ কেঁদে চলেছে অপ্রকাশ্যে। গোপনে, আড়ালে। আবার এটাও তো মিথ্যে নয়, যত মানুষের চোখ থেকে অন্তস্পর্শী লোর পড়ছে, তার চেয়েও অধিক মানুষের শোকগ্রস্ত চোখ আজ পাথর হয়ে রয়েছে। অথচ তারাও কেঁদে চলেছে।
জারমণি এখনো কাঁদছে। তবে এখন তার কান্নায় চোখ থেকে লোর পড়ে না। যখন তা পড়েছিল, জারমণি মনে করে, তখন তার সে-কান্না ছিল আত্মক্ষয়ী। তখন সে কেবল নিজের জন্য, নিজের দুঃখ মোচনের জন্য কেঁদেছিল। সুখান্বেষণের জন্য কেঁদেছিল। কিন্তু এখন তেমনভাবে সে আর কাঁদতে চায় না। সে কাঁদতে চায় অশ্রুকে গোপন করে। অশ্রুহীন এ কান্না সমাজের ঘটমান অনাচার ও অসত্যের প্রতিবাদে নিবেদিত কান্না। তাই যাবতীয় প্রতিকূলতা এবং পারিপার্শ্বিক ভয়কে তোয়াক্কা না-করে সে একা-একাই রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়েছে তার ঘর থেকে। ভিত্তিহীন অতিকথার অসারত্বকে উপলব্ধি করেছে সে। আর যা করেছে, তা হলো, সত্যের প্রতিভূ তথা অন্যায়ের বিনাশকারী বলে বহু মুখে কথিত ওই জিনগা-মাঈয়ের বুচাটাঙিটিকে সে উৎপাটিত করে আসমান থেকে মাটিতে নিয়ে এসেছে। অযৌক্তিক কল্পনাভূমি থেকে প্রোথিত করে দিয়েছে বাস্তবের জীবনক্ষেত্রে।
এবার তাকে ভরসা করে, অনুসরণ করে, তাকে সাক্ষী রেখে আরো আরো এগিয়ে যেতে চায়। সে দেখতে চায়—ধর্ম অপেক্ষা অধর্মের প্রতাপ কতখানি। কতখানি সে দোর্দন্ড! একদিকে পলপলের লোকসমুদয়, আরেকদিকে পাটন—মাঝখানে জারমণি। আবার অন্যপক্ষে, একদিকে অঙ্গদ, অপরদিকে পাটন—সেখানেও মাঝখানে এই জারমণি। সে দেখতে চায়—সেই কি নিমিত্ত? হেতু? কারণ? যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে সে এটাও দেখে যেতে চায়, একটি নারীর নিমিত্ত লোকসমাজের এই সনাতন যুদ্ধের আদৌ কি অবসান সম্ভব? যদি তা সম্ভব হয়েও থাকে, তাহলে যে-ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র হয়ে ওঠে, যুদ্ধের শেষে সেই কুরুক্ষেত্রে কোন ধ্বজা ওড়ে? ধর্মের, না অধর্মের? ন্যায়ের, না ন্যায়হীনতার? সত্যের, না বিভ্রমের?
পাটনের হাতে বুচাটাঙি। ধাপে ধাপে প্রতিমুহূর্তে মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম নিয়ে সে নেমে আসতে থাকে। পেছনে জারমণি।
জারমণি যে নদী-পুকুরে যায়নি, সেটা পার্বতী বুঝতে পারল অন্যভাবে। সে দেখল ঢেঁকিঘরের ‘টালনা’৭ য় তার কাচা কাপড়-গামছা তেমনি রয়েছে টাঙানো। তেলের বাটি গড়াগড়ি খাচ্ছে খাটের তলে। জলহীন গরয়াটিও কাল রাত্তির থেকে যেখানে ছিল, এখনো সেখানেই রয়েছে—মাঝের ঘরে, চালের পুড়ার গা ঘেঁষে। সাধারণত, সে এই গরয়াটি কাঁখে নিয়ে বেরোয় আর তেল নেয় ওই ছোট্ট বাটিতে করে। ফেরার সময় স্নান সেরে গামছায় মাথা মুছে ওই গামছাটিকেই সে পাকিয়ে নেয় তার ভিজে চুলের গোছায়। খাবার জলও নিয়ে আসে কলসি ভরে।
ঘরে এসে, প্রায় প্রতিদিন নিয়ম করে, জারমণি গরয়াটি হেঁসেল ঘরে ঠিক সেই জায়গায় দেয়াল ঘেঁষে রেখে দেয়, যেখানে দেয়ালের গায়ে একটা কুলুঙ্গি কাটা আছে। কুলুঙ্গিতে আছে কাজললতা, কাঠের লাল ফ্রেমে আটকানো একপাশ ভাঙা ছোট্ট আরশি, মোষের শিংয়ের কাঁকই৮ । আয়না-চিরুণি নেওয়ার আগে সে গরয়াটি নামিয়ে ঢেঁকিঘরের চালার নীচে এসে দাঁড়ায়। চুলের গোছায় পেঁচিয়ে রাখা ভিজে গামছাটিকে সে মাথা থেকে খুলে দুহাতে ওসার করে ধরে। দু-তিনটে পাক নাটাইয়ের মতো ঘুরিয়ে, গামছাটিকে ডাঁটো করে। তারপর নাগাড়ে ঝট ঝট শব্দে চুল ঝাড়তে থাকে। এই মোহন মুহূর্তে তার অঙ্গের প্রতিটি ‘নৃত্য পটীয়সী মুদ্রা’ যে কেবল অনির্বচনীয় হয়ে ওঠে তা-ই না, আশ্চর্য মোহবিস্তারকারীও।
তখন চালার ফাঁকফোকর দিয়ে গুঁড়ি মেরে ঢোকে বুনো হলুদের মতো নিরুত্তাপ রোদ। যা তার অঙ্গ-লাবণিকে আরো ঐশ্বর্যময় করে তোলে। দেহের প্রতি অঙ্গের কম্পন তার অখন্ড শরীর জুড়ে এক নান্দনিক তরঙ্গ সৃষ্টি করে।
তখন পিঠভরা তার কেশরাশি যাতে পিঠের ওপরে ছড়িয়ে না থাকে, তাই ললাট ঊর্ধ্বমুখী রেখে, মাথাটিকে সে যতোটা সম্ভব পশ্চাতে ঠেলে। তাতে, বলা বাহুল্য, তার কুঁচযুগল একটা টানের প্রাবল্যে প্রকট হয়ে ওঠে। সুডৌল স্তনদুটি তখন বুকের ওপরে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে ‘আঁধার রাতে লাল শালুকের মতো’ স্ফূটিত হয়ে থাকে।
তখন বুকের ওপরে ছড়িয়ে রাখা ভিজে আঁচলটি টাটিয়ে ওঠা বৃন্ত দুটিকেও আর অনুদ্ভিন্ন করে রাখতে পারে না। চুলের ওপরে গামছার প্রতিটি ছটকায় বিক্ষিপ্ত জলকণাগুলি, রৌদ্রাভায় চিকচিকায়—ডাঁইড়কা মাছের রূপালি আঁশের মতো বিচ্ছুরিত হতে থাকে! আর কটিদেশ থেকে ঊর্ধ্বাঙ্গ অনেকটা ধনুকের মতো চাড় নিয়ে বেঁকে থাকায় নিতম্ব দুটিও এই সমগ্র কম্পনের ভরকেন্দ্র হয়ে তারই প্রতিকম্পন তুলতে থাকে।
এরকম সময়ে ঘরে কেউ থাকে না বললেই চলে। ছাগলের খোঁয়াড়ে ছাগল থাকে না। কাড়া-গোরুগুলিকেও, চঁদা, পাতপালহা খাওয়াতে ক্ষেত-মাঠ পেরিয়ে দূরের বনকে নিয়ে যায়। পার্বতী থাকলে হয়তো তখন গোয়ালের বাসি গো-লাদগুলি খাঁচিতে তুলে পিঁদাড়ে গিয়ে গোবর-খালে ফেলে আসে। উঠোন ঝাঁটপাঁট দেয়। ধান সিজাসিজি হয়ে গেলে হাতের তালুতে গুড়াখু তামুক নিয়ে লদর-ফসর হেঁটে বাঁধের ঘাটে চলে যায়।
আর আগুয়ান? সে যে কখন থাকে আর কখন থাকে না তা বলা ভার। গাঁয়ে থাকলেও সে কি আর ঘরে থাকে? হয়তো হরিবোল মেলায় বসে বসে আশপাশের গ্রামে কোথায় কী আসর হলো তাই নিয়ে দেশ-দুনিয়ার গল্প করে। কখনো হাতের গামছাটি দিয়ে পৈতাধারীদের মতো পিঠ রগড়ায়, আর না-হলে থাম্বায় কান ফটফট করা রাম ছাগলের পারা গা ঘঁষতে থাকে। কোনো ঝুমৈরাকে পেলে তো কথাই নেই! তখন ডেকে পাঠালেও ঘরকে আসতে চায় না। যে ডাকতে আসবে তাকে ‘হালসাতে’৯ আসে। রাগে গনগনায় এসে ঘরকে ঢোকে। সবার আগে বউকে একহাত নেয়। বলে, ‘কীঈ বঠে র্যা ব? রাতে-দিনে তুঁই কি হামাকে কপাটকুনটায় বাঁইন্ধে রাখবিস? হ্যাঁহ?’
পার্বতী আজ ঘুম থেকে উঠেছে দেরিতে। ততক্ষণে জারমণির পুকুর থেকে ফিরে আসার কথা। আসেনি। ইতিমধ্যে গোয়ালঘর আর খোঁয়াড় ঝাঁটপাট দিতে দিতে সে জারমণির কথা ভুলেই গিয়েছিল। হঠাৎ মনে পড়াতে চনমনিয়ে ওঠে। বাঁশের ঝাঁটা হাতে উদ্ভ্রান্তের মতো এঘর-ওঘর উঁকি মেরে দেখে। না, আসেনি জারমণি। তারপর যখন দেখা যায় যে, জলের শূন্য কলসি, তেলের বাটি, কাপড়-গামছা সবই ঘরে আছে অথচ জারমণি নেই, তখন পার্বতীর ‘বজ্জাঘাত’ হয়। মাথার ঠিক থাকে না তার। ঘরে আগুয়ান নেই সেকথা ভুলে গিয়ে সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আগুয়ানকেই ডাকতে থাকে, ‘হাই শুন! কনদিগে গেলে! শুনবে ন...।’
আগুয়ান দূরে কোথাও যায়নি। ঘরের বাইরে ছিল। আজকালের মধ্যে সে উপরকুলহির মাহাত বাঁধের পাঁকমাটি গোরুর গাড়িতে করে ক্ষেতে চালাবে। তাই গাড়িটিকে জুতজাত করে রাখছিল। গাড়ির দু’পাশে দুটো ডালামতো আছে, যাকে বলে ঝড়া। তাতে অনেকদিনের পুরনো বস্তা-ছেঁড়াগুলো ফেলে দিয়ে সে তালাই লাগিয়ে কাজ সারতে চায়। এমনি সময়ে পার্বতীর অস্থির ডাকাডাকি শুনে ঘরে ঢোকে।
সে কিছু বলার আগেই, পার্বতী বলে, ‘হামার জারমণ বিটি ঘরের ল্যা পালাঞছে গো! উ নাই যায় বাঁধকে। সিনাতেও যায় নাই। যাও দেখবে—’ শাড়ি-গামছার দিকে সে হাত বাড়িয়ে দেখায়। বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারে না, কান্নায় ভেঙে পড়ে।
‘যায় নাই বানধারে? তাইলে কন খালকে গেছে উ?’ কথার সুরে জারমণির প্রতি রাগ ফুটে ওঠে আগুয়ানের। সে কথা না-বাড়িয়ে যেই জারমণির খোঁজে ঘর থেকে বেরতে যাবে, অমনি বাইরে থেকে ডাক দিতে দিতে ঘরে এসে ঢোকে বিহারীলাল। বলে, ‘আগুখুড়া! খোবোর শুনলে?’
‘কী খোবোর?’
‘কী খোবোর মানে?’ বিহারীলালের জিজ্ঞাসার সুরে আগুয়ানের প্রতি মৃদু ভর্ৎসনাও ছিল। যার মেয়েকে নিয়ে ঘটনায় গোটা পলপলের তলের মাটি উপর হয়ে গেল, সেই আগুয়ান বলে কি না কী খোবোর? কাল জিনগা-ডুংরিতে অন্ধকার নেমে আসার পর থেকে, ভেতরে ভেতরে প্রতিটি মানুষের মনে কি উদ্বেগজনিত একটা কৌতূহল ছিল না? আগুয়ান এখন ল্যাকাচৈতন সাজতে পারে, কিন্তু গ্রামের লোকেরা যতই হোক পাটনের জন্য তো চিন্তিত ছিল? পাটনের জীবন-মরণ নিয়ে খোবোরটা শুনার জন্য? তাদের ঔৎসুক্য এটা জানার জন্যও ছিল যে, জিনগা-মাঈয়ের বিচারের জন্য যাকে ‘লায়াঘরে’ আটক করে রেখে আসা হলো, জিনগা-মাঈ সত্যিই তার বিচার করে কি না। করলে, কী সেই বিচার?
ভোর হওয়ার পর অনেকে সেটা জানার জন্য ডুংরির দিকে গিয়েছিল, যদিও ডুংরিতে ওঠার সাহস কারো হয়নি। অনিবার্য অলৌকিক কোনো কারণ ছাড়া জিনগার থানে উঠতে গেলে তার যে কী পরিণতি হতে পারে তা তো তাদের অনেক আগে থেকেই জানা আছে। তাদের তখন মনে পড়ে যায় সেই অমুক গাঁয়ের তমুক লোকটির কথা। যে ওষুধ করার জন্য অমুক গাছের শিকড়টি ডুংরির মাথা থেকে আনতে গিয়েছিল। তারপর তার যা ফের হয়েছিল, তা আর কহতব্য নয়। সে মানুষরূপী এক প্রেতযোনির তাড়া খেয়ে, রুদ্ধশ্বাসে দৌড়তে দৌড়তে গ্রামে ঢুকেছিল। লোকজন সবাই জড়ো হয়ে গেলে সে ওই যাত্রায় ভাগ্যক্রমে তার বেঁচে যাওয়ার কথা সবিস্তার বলে। এবং সে পণ করে, আর কখনো জিনগার কাছাকাছি যাবে না। একা একা তো কখনোই না।
যাদের কৌতূহল একটু বেশি, তারা ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়েছে। মুঠো করে লুঙ্গির ঝুল তুলে রেখেছে হাঁটুর কাছে। সির-সিরে বাতাস বইছে। শিমুল তুলোর মতো ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টির ফোঁটা। মেঘ করে রেখেছে। গ্রাম থেকে বেরিয়ে আড়শা রোডে উঠলে, দূরে, পশ্চিমমুখে তাকালে দেখা যায়—দুলদুলি ভূতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে টিলাগুলি। ভালডুংরি, চোরনাচা-ডুংরি। মাথা চাড়া দিয়ে উঠে রয়েছে জিনগা। আসমানে চলমান মেঘগুলি হস্তিশাবকের মতো ডিগবাজি দিয়ে চলেছে। রাস্তা ডিঙোলে খোলামেলা মাঠ। টাঁড় জমি। দিকচিহ্নের মতো কিনারে কিনারে দুটি-চারটি কুঁড়েঘর। আড়াল হয়ে রয়েছে গাছপালায়। মাঠ ছাড়িয়ে যতই পশ্চিমে এগিয়ে যাওয়া যায়, ততোই উপত্যকা জুড়ে ঘন হতে থাকে বুনো গাছগাছালি। ঝুড় জঙ্গল। এক গাছের গা বেয়ে ওঠা পাইনা-লতা দূরের কোনো ধ-মহুল বা বাঁদরলাঠি গাছের মগডালে গিয়ে পাক খায়। জোড়ে জোড়ে ঘুপটি মেরে থাকে গিরগিটি। গুলগুলি চোখে তাকায়।
পলপলের দু-চারজন নিছক আগ্রহবশত ডুংরির দিকে যেতেই, কালীপুরের জগৎপতি মাহাত, একটি আধপাগলা বুঢ়া, তাদের আটকায়। জগৎপতির হাতে বুয়ানডাল, হাঁটুর ওপরে তোলা ঠেঁটি নোংরা ধুতি আর গায়ে একটি বড়ো হাতাওয়ালা পিঠফাটা জামা। তার পায়ে কোথাও কিছু হয়নি, ‘কুল আঁটি’ও নেই, তবু সে সবসময় একটু একপাশে হেলে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটে, যেন তার পায়ে সদ্য সদ্য গোঠবাইগনের কাঁটা ভুঁকে গেছে। তেমনিভাবেই সে মাঠের ওপর দিয়ে আসছিল। পলপলের লোকজনদের দেখে সে তাদের টেকায়। তাদের সাবধান করতেই যেন সে কালিপুর থেকে পলপলে রদবদিয়ে ছুটে আসছে। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে, হাতের শুকনো ডালটিকে অকারণ নাচাতে নাচাতে বলে, ‘পালাও! যাইওনা! উপরে ঠাকুরের মাহাত্ম্য লাইগে গেছে!’
‘কী হঁয়েছে?’
‘ভূমিজ ছঁড়াটার আর দেখা পাবে নাই।’
‘ক্যানে? কী হঁয়েছে, জগা?’ পতেন বলে, ‘খুলাসা করে বল ন রে ভাই!’
জগৎপতি বলে, ‘উ পাষাণ হঁয়ে গেছে। এমনে করে ডাঁড়ায় আছে—’
হাতের ডালটা তৎক্ষণাৎ বগলে গুঁজে নেয় জগৎপতি। তারপর সে চোখের পাতা টুপ করে পকড়ি দোকানের ঝাঁপের মতো ফেলে দিয়ে একটি হাস্যোদ্রেককারী মুদ্রায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, দু’দন্ড।
এই সময় মুখের ভঙ্গিমাটি সে এমন করে যাতে বুঝে নেওয়া যায় যে, সেই পাষাণীকৃত মূর্তির জীবদ্দশায় চোখ থেকে দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। আর তার বাঁহাতটি অর্ধোত্তোলিত রয়েছে বরাভয় মুদ্রায়—বগলে ডালটিকে চেপে রেখেছে বলে হাতটিকে সে যথেষ্ট তুলতে পারছে না।
তবু জগতের কথা ও ভঙ্গিতে পাষাণ হয়ে যাওয়া যুবকটির যে-মুদ্রা তাদের কল্পনায় ভেসে ওঠে তাকে তারা নিছক ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিতে পারে না। গম্ভীর হয়ে যায় সকলে। তাদের চোখেমুখে অলৌকিক ভীতির একটা প্রচ্ছন্ন আভাস থেকে যায়।
বাঁকু বলে, ‘হ্যাঁ জগৎ, তকে কে দিল ই-খোবোরটা? পাছে তুঁই উপরকে উঠেছিলিস নকি?’
‘উপরকে? বাপহেই! উখেনে উঠে দেখবার হিম্মৈত কার হবেক? এৎবড় মরদ কথায় আছে? কালীপুর-কণারবেড়া-পলপল কন গাঁয়ে আছে?’
‘তাইলে কে দেখল? কে তকে ই-খোবোর দিল?’
‘ওই ত বললি। লিজের চৈখে ত দেখি নাই। তবে শুনলি—’ জগৎ মাহাত জানায়, কণারবেড়া গ্রামের একটি বাগালছ্যেলা দেখতে চেষ্টা করেছিল যে, ভূমিজ ছকরাটা বেঁচে আছে না-মরে ফুরায় গেছে। সাহস করে সে জিনগার মাথায় উঠতে পারেনি। পাশের অন্য একটি ডুংরিতে উঠে দূর থেকে ‘লায়াঘর’টির দিকে তাকিয়ে সে নাকি দেখতে পেয়েছিল—লায়াঘরের জানলা-দরজায় কাঠের পাটার আড়াল নেই। গাছের গুড়ি কিংবা দড়িদড়ার টানও নেই। সে পরিষ্কার দেখতে পায় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে পাটন সিং সর্দার।
মুখের কথাতেই খবরটির সত্যতা ছড়িয়ে পড়তে লাগল আরো বহু মুখে। যত ছড়িয়ে পড়ে ততই তাতে সংযোজিত হতে থাকে নতুন নতুন ভয়-ভাবনা মিশ্রিত টিপ্পনি।
এদের মুখের খবরই গন্ধগোকুলের মতো মুখে করে বিহারী নিয়ে আসে নামোকুলহিতে। আগুয়ান খুড়ার কাছে।
এসব শুনে পার্বতী আরো ভয়ে কাঠাঞ১০ গেল। ভয় যে আগুয়ানও পেয়েছে সেটা তার কথাতে মালুম করা যায়। আগুয়ান বলে, ‘উ যদি পাষাণ হঁয়ে গেছে, তাইলে হামার বিটি কথায় গেল? কথায় উ হারায়-ফুরায় গেল!’
আগুয়ানকে কেমন অস্থির অস্থির লাগে। বিহারী তাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
হরিবোল মেলায় ততক্ষণে আরো সব লোকজনের ভিড়। সেই ভিড়ে মিশে গেল তারাও।
ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল অঙ্গদ। কিছুটা অস্বচ্ছ ও বিমূঢ় তার দৃষ্টি। চোখ মেলে থাকলেও তার মনে কোনো কৌতূহলোদ্দীপনা জাগলো না। এমন কোনো জিজ্ঞাসাও উঁকি দিল না—এ কোথায় এসে পড়েছি আমি? গ্রাম নয়, অরণ্য নয়। ডুংরি-পাহাড়-গন্ডশৈলের পৃষ্ঠভূমিতেও সে নেই। তার চোখের সামনে নিস্তরঙ্গ প্রবাহিত এক নদী। কুলুকুলু বাতাস। এপার থেকে ওপার দৃষ্টি ওসার করে সে নিবিষ্ট চিত্তে অবলোকন করছে এই নিষ্কাম স্রোতোস্বিনীকে। অভূতপূর্ব উপকূলবর্তী সৌন্দর্য! যদিও এই মুহূর্তে তার অংশত অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে সৌন্দর্যবোধ বলেও হয়তো কিছু নেই। নেই তার অতীত ও ভবিষ্যৎ। যেন এখানে এই নদী-সংলগ্ন বিপুল বালুকারাশির ভেতর থেকে জগৎ-চরাচরের আদিম প্রাণের মতো চকিতে জেগে উঠেছে সে।
তার জাগরণের এই আপাত অপার্থিব ক্ষণটিতে দূরের একটি অনুচ্চ কুঁড়েঘর থেকে নদীর প্রবহমান বাতাসে ভেসে ভেসে আসছিল শঙ্খধ্বনি। নদীর ওপারে প্রাচীন কুসুম্ভ গাছটির তলায় রজ্জুতে আবদ্ধ একটি শ্বেতঘোটক। আকাশের দিকে মুখ করে আশঙ্কায় ডেকে উঠছিল সেটিও। এই শঙ্খধ্বনি বা হ্রেষা কোনোটিই, সেই মুহূর্তে, অঙ্গদের কানে এসে পৌঁছোয়নি। অঙ্গদ নির্নিমেষ তাকিয়ে রয়েছে আদি-অনন্তকাল ধরে বহমান ঝুঝুঙা নদীটির পানে। কিন্তু কী দেখছে সে? ওই নদীটির দিকে তাকিয়ে?
কী শান্ত পরিমন্ডল! কলরবহীন। ঘাটে ঘাটে অবগাহন করছে কত নারী-পুরুষ। বালির ওপরে থাপসি গেদে হাসছে চাঁদের মতো শিশু। কচি কচি মুঠোয় ঝুরঝুরে বালি নিয়ে তাই-তাই করছে কলসি কাঁকালে উঠে আসা সিক্তবসনা জননীকে।
কাঁধে জলভর্তি টিনের বাঁক নিয়ে বাঁইকারা চলে যাচ্ছে ইটভাটার দিকে। খালি বাঁক নিয়ে নদীপারের ঢাল বেয়ে নামছে আরেক দল। অদ্ভুত এক কর্মময় ছন্দে জীবন এখানে আবর্তিত।
এখানে সবাই গড়ার কাজে রত। এখানে যেন কোথাও ধ্বংস নেই। শত শত হাত একত্রিত হয়ে কেবলি গড়ে চলেছে। গড়েই চলেছে। নদী-উপত্যকা থেকে বিমুখ হয়ে পাড়ের দিকে উঠে এদিক-ওদিক চোখ ফেরালে দেখা যায় এখানে-সেখানে হোড় করা আছে ইট। কোথাও পাকা কোথাও কাঁচা। কোথাও আবার ছোটো ছোটো চৌকাকার জমিতে আবদ্ধ নারী-পুরুষ। তারা যৌথ উদ্যোগে অবিরাম নির্মাণ করে চলেছে সভ্যতার মহামূল্যবান ভিত্তি।
সত্যিই তো, এখানে প্রতিনিয়ত নির্মাণই চলছে। আর ধ্বংস? ধ্বংস কোথায়, অঙ্গদ কি তা জানে? সে বিমূঢ় বিস্ময়ে আসমান দেখে। চিমনির মুখ থেকে উদগীরিত ধোঁয়া হৈলহৈলা সাপের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে গগনময়।
মাথায় মাথায় ইটের থাক দিয়ে রেজারা বোঝাই করছে শহরমুখী লরি। রাবিশ উড়ছে পায়ে পায়ে। বগলে মলাটবিহীন লম্বা খাতা নিয়ে, ঘুরে ঘুরে, পায়চারি করছে মুন্সি। বাতাসে মাথার চুল আউল-ঝাউল। কখনো চিমনি, কখনো রেজাদের মিষ্টিমধুর কলরব, উঁচু-নিচু ডাঙায় হোড় করা পাকা ইট, আবার কখনো অবিচল বয়ে চলা ঝুঝুঙাকে দেখে মুন্সির যেন আবেগ আসে। নিজেকে শুনিয়ে গুনগুন করে গাইতে ইচ্ছে হয় মানভূমের সেই পুরনো ঢুয়া গান।
এখন সে-গান আর কে গায়! হয়তো দূরের ওই গেরুয়াবেশী বাউলকে দেখে এমন ইচ্ছে জেগে উঠল মুন্সির। ওই বাউল এই পথ দিয়েই প্রায় দিন চলে যায়। কোথায় যে যায়! হয়তো-বা দূরের গ্রামগুলিতে মাধুকরীর খোঁজে। গলায় ঝোলানো তার তৈলাক্ত দোতারা। বাঁধনের দড়িতেও কাইট বসে গেছে।
কোপানো মাটিতে জল ঢেলে ভিজিয়ে রেখেছিল কাল। আজ সকাল থেকে সেই মাটি দিয়ে জায়গায় জায়গায় ইট গড়ছে খাদিয়ারা। পুরুষটি কাঠের ফর্মা মাটি দিয়ে পূরণ করে দিচ্ছে আর তার বউটি সেই ফর্মা সমতলে গিয়ে উপুড় করে রাখছে রোদে। ফর্মা থেকে খসে যাওয়া ইট শুকানোর জন্য।
যত্রতত্র পড়ে আছে ঝুড়ি, কোদাল। টিনের বাঁহকে নদীর জল। হামাগুড়ি দেওয়া শিশু মনের আনন্দে মাটি খাচ্ছে। হঠাৎ হাওয়ার দাপটে বাঁশের ঝড়া থেকে প্রায় লাফিয়ে, টিনের বাটিতে বাসিভাত ঢেকে রাখা খাদিয়ার গামছাটি গড়িয়ে গড়িয়ে, লাট খেতে খেতে, এক ক্ষেত থেকে চলে যায় আরেক ক্ষেতে। ইট গড়ার নেশায় খাদিয়া তা দেখেনি। রেজাও না। একটি আকন্দ ঝাড়ে আটকে গিয়ে দারিদ্র্যের নিশান হয়ে উড়তে থাকে।
রেজার এবার চ্যাঠা হয়। হাতে কাঠের খালি ফর্মাটি নিয়ে সে, পৈড়ানে দাঁড়িয়ে, কোমরে ঘুনসি বাঁধা ন্যাংটো শিশুটিকে চেঁচিয়ে বলে, ‘এ ভুলকা, গামছাটা উড়ে যাছে। আন আন, আন আন!’
‘উড়ুক! উড়ে যাক!’ এটা বলার পরেও সে ছুটে গিয়ে শতচ্ছিন্ন গামছাটি ঝোপ থেকে তুলে নিজের মাথায় পাগড়ি করে জড়িয়ে নেয়। আর ছোনাচের বকাসুরের মতো পর পর কয়েকটি উলফা দিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসে।
‘হঁঅঅ! বাহবা! বাহবা!’ মুন্সি ভাটার ওপর থেকে তারিফ করতে থাকে শিশুটির। ভুলকার! বলে, ‘ই একদিনকে গৈমরা হবেক। হবেকেই!’
‘হোক, হোক! হলেই ভাল!’ বাউলটিও দূর থেকে প্রতি-উত্তর দেয় মুন্সির কথার। সে জানায়, ছোনাচের দেশ এই পুরুইলা। এখানে এক গম্ভীর সিংমূঢ়ার মৃত্যু হলেও এমনি শিশুর ভেতর থেকে জন্ম নেয় আরেক গম্ভীর। বলতে বলতে সে ভাটা পেরিয়ে চলে যাচ্ছিল। মুন্সি তাকে ডাকে।
‘হই! অমন আম-ফাবড়া বলে দিঁয়ে চলে গেলে হবেক? আইস, আইস!’
বোধ হয় আজকে ভাটাতে আসার ইচ্ছে ছিল না তার। তাই মাটি কেটে নেওয়া খাল-খাবলা পথ মাড়িয়ে এদিকে না-এসে, ওপরের পাকদন্ডি দিয়ে চলে যাচ্ছিল দূরবর্তী দুয়ারসিনি গ্রামের দিকে। মুন্সির ডাকে সে নেমে আসে ভাটার দিকে। মুন্সিও এগিয়ে আসে। হোড় করা পাকা ইটের ছায়ায় এসে বসে তারা। পাঁজা থেকে উড়ে যায় রামবোনি।
‘আড়ে আড়ে পালাতে ছিলে?’ মুন্সি হাসে। বলে, ‘গান না শুনালে থোড়াই যাতে দিব? কি ভরত?’
ভরত এই ভাটাতে আগুনের কাজের দায়িত্বে আছে। সরপোস তুলে তুলে সে কয়লা দেয়। ভেতরে ভেতরে আগুন আর ওপরে চিমনি ডিম্বাকারে ঘুরতে থাকে। ভরত তার পায়ের জুতো দুটো দু’হাতে নিয়ে পরস্পর ঠোঁকাঠুকি করে আগে রাবিস ঝেড়ে নেয়। তারপর একটি হাত সে শূন্যে চিমনির দিকে প্রলম্বিত করে বলে, ‘এই ভাঠার জীবন যেমন কৈলা১১, তেমনেই হামাদের কৈলা হৈল তুমার গান। তুমার গানটা, বুঝলে বাউলবাবা, যখন শুনি, তখন জি-টা১২ যেমন শোল মাছের পারা উফাল মারে!’ কথাটা শুনে সতর্ক হয়ে বাউল বলে, ‘দেখ বাবা, ‘আমার গান’ বৈ-ল না।’ নিজের মুখের সামনে সে তার তর্জনি দ্রুত একপাক ঘুরিয়ে বলে, ‘ই দেশ-দুনিয়ায় ক-ন কিছুই আমার-তুমার লয় বাবা। আমার এই দাঢ়িগুলারও মালিক ভিনু লোক। আমরা তাইলে কী করছি? ন, আমরা উনার ‘পরকাশ’ বঁহে বুলছি।’
‘বা:! বোড়ো সুন্দর বললে বাউলবাবা। টুকু ঘুরে১৩ বল ন।’
মুন্সির কথায় ‘বাউলবাবা’ আবার তার বয়ানটির সরল বিস্তার ঘটিয়ে যা বললো, সেটা আরেক কথা। ফলত, সেটা তার ভাবগত বিশ্লেষণ হলেও ‘প্রকাশ’ শব্দটি তার ব্যাখ্যায় পুনর্বার উল্লিখিত হলো না। অথচ এই শব্দটির জন্যই তার উপরোক্ত কথাটি আশ্চর্য ব্যঞ্জনাপূর্ণ তথা ভাবমধুর হয়ে উঠেছিল।
সম্ভবত, ‘প্রকাশ’ বলতে বাউলবাবা বলতে চেয়েছে—আমরা প্রত্যেকে একেকটি মাধ্যম মাত্র। আমরা যে-যা করছি, তা পূর্বনির্দিষ্ট। অন্যের কাজ। আর এই কাজের ভেতর দিয়ে সেই অদৃশ্য কর্মযোগীর দিব্য অস্তিত্ব অথবা আলো বহন করে চলেছি। আমাদের প্রত্যেকটি কাজের ভেতরে ছিটকে বেরিয়ে আসছে তাঁরই স্ফুলিঙ্গ। এভাবে জীবনাচারণের মাধ্যমে আমরা দন্ডে দন্ডে সেই মালিকের সঙ্কীর্তন করে চলেছি। কেউ ইট গড়ে, কেউ গান গেয়ে।
বৈরাগ্যের জীবন এই বাউলবাবার। নাম সাধুচরণ দাস মহন্ত। কোথায় যে তার বাস, কোন গ্রামে তা কেউ জানে না। জিগ্যেস করলে বলে ‘ডেরা? হ্যাঁ বাবা, এই য্যা এখন আমি তুমার ইখিনে আছি, ত এখন এইটাই আমার ডেরা। লয়?’ এই বলার মধ্যে সে যে তার আস্তানা গোপন করে, তা নয়। বরং বলা যেতে পারে, এই দর্শনকে ভিত্তি করে, সাধুচরণ, তার ডেরাটিকে অনেক-অনেক ওসার করে নিতে পেরেছে। সে-ডেরায় ইট দিয়ে বসানো প্রাচীরের মজবুত বাঁধন নেই। নেই ব্যক্তিগত সুখান্বেষণ কিংবা পিছুটান। তাঁর সবটাই হলো গানে গানে জীবনকে ভেলার পারা ভাসিয়ে নিয়ে চলা।
অবাক মানুষ এই সাধুচরণ। তাকে কখনো নিজের কথা বলতে শোনা যায় না। গান গেয়েও সে কখনো পারিশ্রমিক দাবি করে না। বলে, ‘গানের নামে মুদা দিও না বাবা। যদি দিবে ত তুমার যা ইচ্ছা দাও এই পেটের নামে। গান তো সংগীত। মাহাত্ম্য প্রচারের জিনিস। সেই সংগীত বিকে আমি যদি রোজগার করি, তাহলে আমার কূট হবেক। নরকের রাস্তায় যাব আমি!’
সাধুচরণের এই ভাবনা সরাসরি মনুর স্মৃতিরই প্রতিধ্বনি তোলে। মনুর সমাজ আজ আর নেই। কবেই তা বিলঙ্ঘিত হয়েছে। আজ আমরা একটি বৃহত্তর সঙ্কর সমাজের দিকে চলেছি, এবং সেই সমাজের যা জন্ম দেওয়ার, তা সে দিয়ে চলেছে।
মুন্সিকে একটু ভাবগম্ভীর দেখায়। এই আলোচনা ভরতের হয়তো নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল। যদিও, সাধুচরণ যখনই এখানে আসে, তখনি এমন দুটো একটা কথা সে বলেই ফেলে। তাতে সবটা যদি কেউ না-ও বোঝে, তবু যেটুকু সে বুঝবে সেটুকু দিয়ে আত্মপ্রক্ষালন সম্ভব না-হলেও অন্তত ওপর-ওপর ভিজিয়েও তো দেওয়া যায়?
সাধুচরণকে দেখে ভাটার আরো কয়েকজন জুটে যায়। গান শুনতে। ভরত বলে, ‘লাও বাউলবাবা, তুমার দমে খৈদ্দার জুটে গেছে। ইবার একটা যুতাঁই১৪ গান শুনাও দেখি।’
‘এখন যদি গান শুনাই, তাইলে ঢের ডেরি হঁয়ে যাবেক। যাব জজলঙ। উখেনে আজ যত বাউল পাটিরা আসবেক।’
‘রাখ তুমার জজলঙ ন ফজলঙ।’ ভরত সজোরে মাটিতে চাপড় মারতেই তার চুলে গুঁজে রাখা কাঠের কাঁকইটি পড়ে যায়। সেটা তুলে নিয়ে সে বেপরোয়া শূন্যে হাত নেড়ে এমনভাবে বলে ওঠে যেন জজলঙ গ্রামের আসরে সাধুচরণের না-গেলেও চলে। প্রকৃত আসর তো এটাই, যেখানে তাকে দেখতে পেলে আশপাশের লোক এসে জড়ো হতে শুরু করে।
দোতারায় টুং টুং গতের আওয়াজ ওঠে। সাধুচরণের দৃষ্টি বহতা নদীর দিকে বাঁক নেয়। নদীর বাতাসে বুকের ওপর ছড়িয়ে পড়ে তার কাঁচা-পাকা দাড়ি। বাজাতে বাজাতে সে ঘাড়ের ওপর থেকে দোতারাটি আলতো করে নীচের দিকে টেনে নেয়। চোখের পাতা নামিয়ে নির্বাক হয়ে যায় দুদন্ড। এই দুদন্ডেই যেন সে অভিনিবিষ্ট হয়ে পড়ে। ভাবের উদ্রেক হয়। ভাটিয়ালি মিশ্রিত সুরে তার হাতের দোতারায় সুমধুর ধ্বনি যেন নদীর বুকে মন্থর নৌকোটির মতো হেলেদুলে চলেছে। উদাস কন্ঠে সাধুচরণ গায়—
এমন বন্ধ্যা নদীর কূলে আমি
ঘর বাঁন্ধিলাম রে
নদীতে ঢেউ উঠে না, কূল ভাসে না
আসে না তুফান যে।।
এখন কারে আমি বলব মালিক—
ও নিঠুর নিদয়া নাও
ভাসাও আমারে ভাসাও...
দোতারার সঙ্গে প্রাণ আকুল করা সুর তরঙ্গায়িত হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেই সুর মুহূর্তে সচকিত করে দেয় অঙ্গদকে। সে ঘুরে তাকায়। একদৃষ্টে সে চেয়ে থাকে অনেকক্ষণ সেই বাউলটির দিকে। তখনও সে গেয়ে চলেছে—
সারা জীবন ধরে আমি
পেলাম না কূল সংসারে
আমার মনোময় বসতবাটি
ভেসে গেল বাসনার চরে।।
এখন কারে আমি বলব মালিক—
ও ভাঙাগড়ার নাও
ভাসাও আমারে ভাসাও...
অঙ্গদ অভিভূত হয়ে পড়ে। যে-অনুভূতি তার হারিয়ে গিয়েছিল, এখন যেন একটু একটু করে আবার ফিরে পেতে থাকে। ফিরে পেতে থাকে তার সেই বিস্মৃত অনুভবের জগৎ। এই মর্মস্পর্শী সুর তার ভেতরে ভেতরে অনির্বচনীয় অনুরণন তুলতে থাকে। সে আর নদীর চরে দূরবর্তী শ্মশানে বসে থাকতে পারে না। মনে হয়, এই সুরে সুরে যে অদৃশ্য সোপান গড়ে উঠছে, তাতে সে যেন কোথাও পৌঁছে যাচ্ছে। পৌঁছে যাচ্ছে...
পায়ে পায়ে বালি ভেঙে অঙ্গদ এগিয়ে যেতে থাকে। এগিয়ে যায় তার অন্তর্জগতেও। অদৃশ্য কোনো টানে যেন যোজন মাইল দূর থেকে আসা সেই সুর, সেই গানের কাছে সে পৌঁছতে চাইছে। তাকে স্পর্শ করতে চাইছে। সেই অসংকীর্ণ ভাবলোকে সমর্পণ করতে চাইছে নিজেকে—
সাধু বলে দুখে-তাপে
কেমনে পাষাণ-কপাল খন্ডিব
আমি কার তরেই-বা রইলাম বেঁচে
কারে মরণ সঁপিব।।
এখন কারে আমি বলব মালিক—
আমার জনম-বোঝা লাও
ভাসাও আমারে ভাসাও...
একটি খড়বোঝাই গোরুর গাড়ি, নৌকোর মতোই স্থলভূমিতে টলমল করতে করতে চলেছে। সাটিক হাতে এক জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ গাড়োয়ান চালনা করছে তাকে। মোহাবিষ্টের দৃষ্টিতে অঙ্গদ তাকিয়ে সেদিকে। সেই গো-শকটটির দিকে। তার ঘূর্ণায়মান চক্র, গাড়োয়ান, গাভি দুটির দিকে। সাধু তখনো গেয়ে চলেছে—
ভাসাও আমারে ভাসাও...
ভোরের আলো ফুটে গেছে। প্রাক-ভোরের আকাশের ঘোলাটে ভাব আর নেই। ছিন্নবিচ্ছিন্ন মেঘ কেটে গিয়ে পুবের দিগন্ত এখন আর ক্যারকেটা পাখির ডানার মতো ধূসর নয়। আলতা গাবানো রক্তিম সূর্য উঠছে ডিগিডিগি করে। ক্রমশ ওসার হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে তার ভুবনমোহিনী ছটা।
ওরা ততক্ষণে অনেক দূর চলে গেছে। ডুংরি-উপত্যাকা ছাড়িয়ে। চলে যেতে চায় আরো দূরে। বুচাটাঙির ভরসায়। এছাড়া তাদের কাছে আর আছেটাই বা কী? অস্ত্র নেই, খাদ্য নেই, বাসস্থানও নেই। এমনকি শরীরে শরীরে আচ্ছাদন যেটুকু প্রয়োজন, তাও নেই। ধূলিধূসরিত গা পাটনের। পরণে একখন্ড বস্ত্র। জারমণিরও ঊর্ধ্বাঙ্গে আলাদা করে কোনো বস্ত্রকখন্ড নেই। কোমরে জড়ানো শাড়িটিকে সে অদ্ভুত কৌশলে বুকের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে তার ওসার পৃষ্ঠদেশও ঢেকে নিয়েছে। তাতে যৎসামান্য অঙ্গসঞ্চালন করলেও তার শরীরের চড়াই-উৎরাই অংশের এতটুকুও দৃষ্টিগোচরে আসে না। শুধু তার অন্তর্গত তেজ নিয়ে শাড়ির তলে আপাত অবদমিত স্তনদুটি অনেকটা স্থলভূমি জুড়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে। আর এই কম্পনজনিত কারণে, কিছুক্ষণ বাদে বাদে, শাড়ির আঁচলটি আলগা হতে শুরু করে। জারমণি তখন আবার একটি নতুন মোচড় দিয়ে আঁচলার প্রান্তটি তার সুদৃশ্য কাঁকালে ঝটিতে গুঁজে নেয়।
তখন জারমণিকে দেখতেও অন্যরকম লাগে। যেন এই মুহূর্তে সে যেকোনো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে রণরঙ্গিনী হয়ে দাঁড়াতে পারে—তার যে-ভাবমূর্তির আভাস ইতিপূর্বে পাটন পেয়েছে। যখন জারমণিকে কেন্দ্র করে চরম জেগে উঠেছিল তার আকাঙ্ক্ষা, লিপ্সা, এমনকি রিরংসাও। তার সেইসব বহুমাত্রিক তমোগুণ কি ইত্যবসরে বিদূরিত হয়ে গেল? নাকি, তার সুদূর বিতাড়ন সম্ভব নয়? সম্ভব নয় তার আমূল উৎপাটন। যতক্ষণ এই রমণভোগ্যা রমণী বর্তমান থাকবে, ততক্ষণ চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে কলঙ্ক নির্মোচন কি আদৌ সম্ভব?
জারমণি পাটনের ক্ষত-বিক্ষত পিঠ লক্ষ করে। তার কি মনে পড়ে যায় গতকালের আগের দিনের ঘটনার ইতিবৃত্ত? জঙ্গলের ভেতরে সেই গোধূলি লগন? যেভাবে সে প্রহারে প্রহারে এই পাটনকে নির্জীব করে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তা যেন এখন কল্পনাতেও আনা অনায়াস নয়। তার নিজের কাছে নিজেরই প্রতিহিংসাপরায়ণ সে-রূপ এতোটাই এখন কষ্টকল্পিত, এতোটাই অপ্রত্যয়িত বলে বোধ হয়।
তখন সেই জারমণি কি এই জারমণি ছিল?। নাকি সেই অশুভ সন্ধ্যার মুহূর্তে তার ভেতরে ভর করেছিল অন্য কোনো দৈবশক্তি? সে তো গরামথানের ঠাকুরকেও ডেকেছিল। ডেকেছিল জিনগাকে। তাকে সাক্ষী রেখে বলেছিল.. না, সেই ভয়ঙ্কর সংলাপ আর দোহরাতে চায় না জারমণি। এমনকি সে এটাও ভাবতে চায় না যে, সেদিনের সেই প্রেতাকাঙ্ক্ষা নিয়ে জেগে ওঠা পাটনই আজকের এই বশীভূত পাটন। সেই পাটনকে সে সেখানেই ছেড়ে এসেছে। যেভাবে সাঁওতালরা বঙা ভূতকে মাথায় করে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে আসে গ্রামের সীমানা পেরিয়ে। যেভাবে বেদেরা বৃদ্ধ সাপকে ছেড়ে আসে জঙ্গলে। জারমণিও সেই দূরাত্মাকে সেখানেই ছেড়ে এসেছে। এই পাটন আর সেই পাটন নয়।
সত্যিই কি নয়?
কিন্তু, এই জারমণি তো সেই জারমণি। পাটনের চোখে তার একরতিও হেরফের হয়নি। তার রূপে, রাগে, ভাবে, ভঙ্গিতে কোথাও। তার যে-যে অঙ্গগুলির নির্বাক গর্জনশীল ভাষা পাটনের ভেতরে হুঙ্কার এনে দেয়, এখনো পাটনের মনে হয়, সেই সেই অঙ্গগুলি মদনদেবের অদৃশ্য ধ্বজাকে উড্ডীয়মান রেখেছে। আর এই ভাব-ভাবনার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি বলে, পাটন কিন্তু সেই আগের পাটনই থেকে গেছে। তার আদিম ও বর্বর সত্তাকে জঙ্গলে তো ছেড়ে আসতে পারেইনি, উল্টে বিসর্পিত অরণ্যটিকেই সে নিজের ভেতর নিয়ে এসেছে। যে-কোনো মুহূর্তে যা ফনফনিয়ে উঠতে চায়।
ওরা হেঁটেই চলেছে। ডুংরিগুলোকে পিছনে ফেলে। তবে আরো কতদূর ওরা চলে যেতে চায়, তা বোধহয় ওরাও জানে না। কখনো ঝুড়-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, বড়ো বড়ো চাটান পাথরের পাশ দিয়ে ঘুরে, আবার কখনো পাহাড়ী সুঁড়িপথ ধরে তারা গাছগাছালির ভেতর দিয়ে ঢুকে এমন ঢালু উপত্যকায় বেরিয়ে আসে, যেখানে একটিও গাছ নেই, আগাছা নেই। যেখানে মাথার ওপর দিয়ে হঠাৎ ঝুরাবোনির ঝাঁক দূরবর্তী জিনগা-ডুংরির দিকে চলে যায়।
জিনগা-ডুংরি এখন ঢের পিছনে। সকালের প্রথম আলোতেও দূর থেকে কেমন কুয়াশাচ্ছন্ন দেখায়। তবে যতই পিছনে থাকুক না-কেন, তার উত্তুঙ্গ শিখর কিন্তু তেমনিই উৎপতিত হয়ে. রয়েছে আসমানে।
জিনগা-ডুংরি থেকে নেমে ওরা ঝরনা নদীর দিকে যায়নি। ওপর থেকে সেই নদীর নাতি বিস্তৃত চর জারমণির চেখে পড়ছিল। সে দেখেছে ওই নদীমাতৃক ভূমিও। যদিও সেদিকে তাকিয়ে নিজেকে আর দুর্বল করেনি জারমণি। তবে যেভাবেই হোক, ওই পশ্চিমখন্ডের দিকে তাকিয়ে, মুহূর্তের জন্য হলেও, জারমণির কি মনে পড়ে যায়নি, অঙ্গদকে?
অঙ্গদই এই ঝরনা নদীকে নিয়ে জারমণির মনে একটা রূপকথার ভূখন্ড গড়ে দিয়েছিল। যেন তা এক স্বপ্নের দেশ। এখানে মানুষ আছে কিন্তু হিংসা নেই, বৈরিতা নেই। সমাজের অনুশাসন এখানে মানুষের সম্পর্ককে, আকাঙ্ক্ষা ও প্রেম-ভালোবাসাকে নিগৃহীত করে না। এখানে লোকবলহীন দুর্বলের ওপরে সবলের দলবদ্ধ স্বেচ্ছাচার নেই। এখানে অস্ত্র দিয়ে, প্রতিহিংসা দিয়ে আধিপত্য কায়েম রাখা হয় না। এখানে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রটিত হয় না অসত্য। তাই জিনগাকে নিয়েও এদের মধ্যে বাড়াবাড়ি নেই। এরা বিশ্বাসই করে না যে, জিনগা ডাকলে তবেই আকাশ থেকে বারিশ নেমে আসে। এখানে মানুষ অনেক ব্যাপারে উদাসীন, অপেক্ষাকৃত কম কৌতূহলী।
জারমণি শুনে অবাক হয়েছিল যে, নদীতীরবর্তী গ্রামের মহিলারা নদীর পাড়ে কাপড় ছেড়ে অসতর্ক হয়ে স্নান করে। স্নানরতা নারীকে এখানে কেউ ঘিয়াখাড়া ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে লক্ষ করে না। জারমণির মনে হয়েছিল অসূয়াবর্জিত এখানের জীবনযাপনে নিবিড় সুখ ও নিরুদ্বেগ প্রশস্তি আছে। তাই ঝরনা নদীর তীরবর্তী টাঁইড়পানিয়া গ্রামে নদীর ধারে কুঁড়েঘর করে থাকার কথাও সে মনে মনে ভেবে রেখেছিল। ডেলিকচা গ্রামে জঙ্গলের মাঝে অঙ্গদের ঘরটিতে এতগুলো পুরুষের বেষ্টনীতে অন্তরীণ থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল সে। তবু এই ঝরনা নদী, এই কুঁড়েঘর, এই টাঁইড়পানিয়ার কথা ভেবে নিজেকে আরো একটু ধৈর্যশীল করে রাখতে চেয়েছিল।
শেষ অব্দি সে আর পারেনি। কারণ সে বুঝে গিয়েছিল তার এই স্বপ্ন আর পূরণ হবার নয়। যে তাকে এই স্বপ্ন দেখিয়েছিল অথবা যাকে নিয়ে জারমণি নদীর তীরে বসত নির্মাণ করতে চেয়েছিল, তার নৈকট্য সে আর কোনোদিনই পাবে না। তবু শেষ পর্যন্ত সে তারই অপেক্ষাতে ছিল। এমনকি, এই পাটন যখন লালসায় প্রমত্ত হয়ে উঠেছিল, যখন সে তার সব সংযম হারিয়ে জারমণির দিকেই ধাবিত হয়েছিল, তখনো জারমণি, অঙ্গদকে নিয়ে তার সঙ্কল্প থেকে এক ডেগ সরে যায়নি। সে তখনো ভেবেছিল, অঙ্গদ আসবে! অঙ্গদ আসবে! সে ঠিক প্রবল পরাক্রম নিয়ে তার এই কামান্ধ রিরংসু সহোদরের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে!
পড়েনি! অঙ্গদ সেদিনও আসেনি, আজও আসেনি। এখনো যদি সে গ্রমাবাসীদের প্রতিহিংসার বলি না-হয়, যদি সে বেঁচেও থাকে, তাহলেও জারমণি এতদিনে জেনে গেছে—অঙ্গদ আর আসবে না। কোনোদিনই আসবে না। সে যে ভীতু বলে আসবে না, তা নয়। সে যে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চায় না বলে আসবে না, তা নয়। সে যে মৃত্যুকে ভয় পায় বলে আসবে না, তাও নয়। সে আসবে না তার কারণ—তার ভালোবাসাতেই পৌরুষের অভাব। উত্তিষ্টমান অস্ত্রকে যে প্রতি-অস্ত্র দিয়ে জব্দ করতে হয়, তা সে জানেই না।
ফলত যে-ভূমিতে জারমণির স্বপ্ন ও সঙ্কল্পের মৃত্যু হয়েছে, জারমণি সেদিকে আর গেলই না। আরো কত কাঁটা ঝোপ, হলুদ ফুলে মাতন লাগা কত কত গুইহা বাবলার বড় বড় গাছ, কোথাও আলপথ, খাল-ডোব, কোথাও বা শুকনো পুকুর পেরিয়ে ঝালদার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল তারা। তবে আড়শা রোড ধরে নয়, ঝুড়ে-ঝাড়ে-জঙ্গলে নিজেদের পথ নিজেরাই করে নিয়ে হেঁটে যেতে লাগল।
এখন, এতটা পথ হেঁটে আসার পরেও, তাদের পায়ে পায়ে এতটুকু ক্লান্তি নেই। অবসাদ নেই। যেন তাদের যাবতীয় ক্লান্তি, অবসাদ, পশ্চাদপদতা তারা জিনগার কাছে গচ্ছিত রেখে এসেছে। এখন কেবল একটি নিরূপদ্রব ভূখন্ডের অন্বেষণে তাদের এগিয়ে যাওয়া। শুধু এগিয়ে যাওয়া।
বেলা বাড়ছে। সকালের রোদে এবার অল্প তপ্তভাব। এদিকে ছিটেফোঁটা বৃষ্টি নেই। ডোবাগুলোতে জল নেই। শুকনো। চাষের জমিগুলোতে পুকুরের পাঁকমাটি ফেলেছে চাষিরা। পাঁক কেটে কেটে গোরুর গাড়িতে লাদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রোদ উঠছে তরতর করে। জেগে উঠছে ক্ষুধাও। যদিও এই মুহূর্তে জল ছাড়া ক্ষুধা নিবৃত্তির আর উপায় নেই। জলই-বা কোথায়? ক্যানেল তো পিছনে ফেলে এসেছে।
আর কিছুদূর গেলে জারগো মোড়। সেদিকে না-গিয়ে ওরা পাকারাস্তা ডিঙিয়ে ঢালুতে নেমে গেল। কিছুটা নেমে যেতে সামনেই দেখতে পেল এরন্ড বৃক্ষে ঘেরা পুকুরটিকে। পুরো পুকুরটি ঢেকে রয়েছে এক ধরনের লতানে ঘাসে। তবে জল বেশ পরিষ্কার। কেউ যেন বিভ্রম সৃষ্টির জন্য এই দাম বিছিয়ে রেখে চলে গেছে। ঘাসগুলির মাথায় ফুটে রয়েছে অজস্র সাদা-বেগুনি ফুল। শিশুর মতো দোল খাচ্ছে হাওয়ায়। অবাক হয়ে যেতে হয়! এ কেবল প্রকৃতির অনাবিল সৃষ্টিই নয়, মহিমাও! ইতিমধ্যে তাদের ফেলে আসা দীর্ঘপথে তারা কত যে গাছগাছালি দেখল, বন দেখল, দেখল কত-কত আসমানমুখী তাল-খেজুরের সারি, তারা কেউই যেন এমনভাবে তাদের অসহায় যাত্রাপথের সঙ্গী হতে পারেনি। তাদের ঝামুরে যাওয়া অন্তর্লোকে, শোকে-দুখে বিবশ হয়ে যাওয়া মনে এমনভাবে প্রাণের সঞ্চার ঘটায়নি। কতদিন বাদে তারা খুঁজে পেল বুঝি জীবনের দিশা!
এক দন্ডমাত্র সেই ফুলগুলির দিকে তাকিয়ে, পাটনের পিপাসা তিরোহিত হয়ে গেল। আর তার মনে উদয় হলো ভিন্ন একটি বাসনার। যদি এই জলাশয়ে ঝপাং করে ঝাঁপ দিয়ে পাটন একটি সবৃন্ত ফুল উৎপাটিত করে আনে? এবং ওই ফুলটি তার সর্বস্ব সমর্পণের স্মারক হিসেবে জারমণির হাতে দিয়ে বলে—‘নারী, আমার হাতে তুমি অস্ত্র দিও না। আমি অস্ত্রবহন করে অবসন্ন, ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। বরং এইক্ষণ থেকে আমাকেই তুমি অস্ত্র হিসেবে উপযোগ করো।’
যদি বলে—‘নারী, আমরা এমন কোথাও কি চলে যেতে পারি না, যেখানে মানুষ অস্ত্রের ব্যবহার জানে না? অস্ত্রের নামই শোনেনি? এমন কোনো ভূখন্ড কি নেই, যেখানে স্বপ্ন রচনার জন্য হাতিয়ারের কথা ভাবতে হয় না? অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে না রক্তপাত?’
যদি বলে—‘নারী, আমি সত্যিই অস্ত্র বহনে অপারগ। তুমি আমার হাতে এই মহাভার তুলে দিয়ে অস্ত্রের অমর্যাদা করো না, বিশ্বাসহন্তা হতে শিখিও না আমাকে। কামনার অভিমুখে উগ্র করে তোলো না আমরা বর্বরোচিত তেজ। নারী, তুমিই পারো আমার অন্ধত্বকে বিমোচিত করতে। পুরুষের নিশানরূপে যে-অস্ত্র আমি মফস্বলে আপন অঙ্গে বহন করে চলেছি, তুমি আমাকে তার তাড়না থেকে মুক্তি দাও। আমাকে নিষ্কাম করো। আমার তমসাচ্ছন্ন দৃষ্টিকে নির্মল করো, যাতে আমি ফুলের দিকে তাকাতে পারি। নারীর দিকে তাকাতে পারি। বন্য সুবাসকে কামের অনুঘটক রূপে নয়—বহুবিধ সুঘ্রাণে পরিপূর্ণ এই জগৎচরাচরকে যাতে আমি বর্ণময় দেখি।’
কিন্তু এসবের কিছুই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে পারলো না পাটন। জারমণির হাতে বুচাটাঙিটি দিয়ে সে ঘাটে নামার জন্য এগিয়ে গেল।
পুকুরে ঘাট বলে কোথাও কিছু নেই। এক জায়গায় জলে অর্ধনিমজ্জিত হয়ে রয়েছে একটি হাসা-পাথর। সেই পাথরে বসে অঞ্জলিবদ্ধ হাতের দিকে মুখ নামিয়ে আনতেই পিঠে একটা মৃদু কম্পন খেলে যায়। জারমণিও যেন বুঝতে পারল, পিঠময় তার কালসিটেগুলোতে টান পড়তেই ব্যথা অনুভব করল পাটন। তারপর সে ঘাড়টা যতটা সম্ভব কম নামিয়ে, মুখের কাছে আঁজলা এনে, পান করতে লাগল সেই সুশীতল জল।
জয়ন্তী বৃক্ষের ছায়ায় দাঁড়িয়ে জারমণি লক্ষ করছিল। সে দেখছিল পাটনের এই জলপান। তার দু-হাতের কনুই দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে আঁজলার জল। খোলা পিঠ। পিঠ জুড়ে এখনো জেগে রয়েছে জারমণিরই হাতে প্রহারের চিহ্নগুলি। দেখতে দেখতে হঠাৎ কি যে মনে হলো! সে বুচাটাঙিটিকে আরো শক্ত মুঠোয় ধরে কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল সেই পিঠটির দিকে। আর অস্ত্রসহ হাতটিকে মাথার ওপরে তুলতেই তার যেন পার্থিব জ্ঞান লোপ পেয়ে গেল। সে ভাবতে লাগল—আঃ! এই মুহূর্তে! এই মুহূর্তে! এই মুহূর্তেই যদি...
পাটন উঠে এলো হাতে ফুল নিয়ে। সেই ফুলটি দেখিয়ে জারমণিকে বলতে লাগল, ‘ফুল হামি চিনতেই লারি। দেখ ন, কী ফুল বঠে ইটা?’ বলতে বলতে ফুলটি সে গুঁজে দিল জারমণির মাথায়। ভিজে হাতটিও বুলিয়ে দিল তার চুলে।
বুচাটাঙিটি পুকুরের জলে ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে হলো জারমণির। কিন্তু নাহ, পাটনই তাকে নিরস্ত করল। বলল, ‘থাক ক্যান্নে। কখন কী কামে আসে।’
পলপলে তখন অন্য হাওয়া। চলছে উড়া খবরের চাপান-উতোর।
রাত থেকেই অনেকে কৌতূহলী হয়ে ছিল, ব্যাপারটা কী ঘটছে জানার জন্য। যদিও ভোরের আলো ফুটতে-না-ফুটতে জিনগা-ডুংরিতে গিয়ে সমস্ত কিছু দেখে আসবে এমন সাহস কেউ দেখায়নি। ঝিপঝাপ বৃষ্টিও পড়ছিল। গ্রাম থেকে বেরিয়ে এসে, আড়ষা রোডে দাঁড়িয়ে, পশ্চিমাকাশে ডুংরির মাথার দিকে তাকালে একাট গা-ছমছমানি টের পাচ্ছিল সবাই। ভয় তো ছিলই, রহস্যও ছিল। কিন্তু সকালের মেঘলা আকাশে ফিনকি দিয়ে রোদ ওই টিলার গায়ে পড়তেই, রাতের ভয় আর ভোরের গা-ছমছমানি সবই কোথায় চলে গেল!
কেউ কেউ আবার যাবতীয় কৌতূহলের নিরসন ঘটাতে সরেজমিনে তদন্ত করে আসতে অন্যকে উৎসাহিত করে। তাতে অনেকে রাজি নয়। সেটা জিনগার ওপরে খবরদারি করা হয়। বলা যায় না, হয়তো তার প্রতিফল স্বরূপ দেখা যাবে—আসছে চৈৎ-বৈশাখের দিনে ক্ষেতে গোবর-মাটি চালাতে গিয়ে, ঠিক যেখানে ‘শহর-মহুল’১৫ টা আছে, সেখানে হয়তো দুলদুলি ভূতের মতো কোনো সন্ন্যাসী তার গরুর গাড়ি টেকাল১৬ আর তারপরই রোদে মুর্ছা খেয়ে মরে গেল বুঢ়া গাড়োয়ান—গোরু খেদানোর সাটিকটি তখনো তার হাতে ধরা। ডানদিকে মাথা কাত হয়ে রয়েছে। গাড়োয়ানের পরন নোংরা ধুতি, হাফ হাতা গেঞ্জি, হাজার ছেঁদার। তখনো সে গাড়িতেই রয়েছে। গাড়ি চলছে খালে খন্দে। নিরীহ গোরুদুটি পথ চিনে চিনে গলা১৭ র দুয়ার-ছামুয়ে ‘সাইড’ করে দেবে। তৎক্ষণাৎ শুরু হয়ে যাবে গাড়ি ঘিরে কান্নাকাটি। চেঁচামেচি। গুলিনের১৮ মাথা থেকে ঘোমটা পড়ে যাবে। গাড়ির চাকে কপাল ছেঁচে ছেঁচে সে বলতে থাকবে—‘অ মা গ! ই কী হৈল গ! বুঢ়ামানুইষটা য্যা যাবার বেলিও হামার সঙে ঠনঠন রা কাইঢ়ে গেল গ! ইয়াকে কন ভূতে লি-ল!’
তখনো দেখা যাবে ঘুরে-ফিরে জিনগার কথা আসছে। যারা অবিশ্বাসী, নিন্দুক, জিনগা তাদেরকে এভাবেই দন্ডদান করে থাকে। আগে আগে ঘটে যাওয়া এমন দু-একটি আকস্মিক মৃত্যুর অলৌকিক কারণের কথা এখনো, এই পলপলে, পুরোনো বুঢ়া-বুঢ়িরা উল্লেখ করে থাকে। অনেকের কাছে সেগুলো শুনতে ‘রাতকহনী’র মতো লাগে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে। তারা আর বাপ-ঠাকুরদাদাদের শোনা কথায় পৈতাতে চায় না। তারা চাক্ষুষ দেখে, যাচাই করে, তবেই বিশ্বাস করতে চায়।
সকালে সেরকম কয়েকজন ছ্যেলাছকরাও ভিড়ের মধ্যে এসে জোটে। কৃষ্ণপদ মহাত, অশ্বিনী, হেমন্ত সিংসর্দার। তারা সবাই এক কথা বলে। বলে, ‘যা হবার হবেক, চল সবাই মেলে জিনগা-মাঈয়ের উপরে যাঁইয়ে দেখে আসি। কেমন পাষাণ হয়েছে।’
অশ্বিনী বলে ‘আ-র বলছে নকি পাষাণের চৈখে জলও আছে। লে হুড়কা! ইয়াকে বলে— জাঙ্ঘিয়ার বুক পাকিট!’ বলে সে হাসতে থাকে। হাসে সঁডু, বিহারীলাল আর অশ্বিনীও।
বুড়ো পাঁচুলাল ছেলেদের ধমক দেয়। জিনগাকে নিয়ে এভাবে হাসাহাসি করাটা ঠিক নয়। রেগে গিয়ে বলে, ‘তদের সোবটাতেই হাসোল্লোভী? ঠাকুর-দ্যাবতা মানামানি নাই? কী জানিস তরা জিনগার? ক্যানে পাষাণের চৈখে জল, বল ন?’
ভিড়ের আড়াল থেকে অশ্বিনী জবাব দেয়, ‘হামরা নাই জানি দাদু। তুঁইয়েই বলে দে।’
পাঁচুলাল সত্যিই ওই পাষাণ মূর্তিটির ভাবগত তাৎপর্য তুলে ধরে তাদের সামনে। নিজের মতো করে সে জানায়, আজকের প্রতিকূল পরিস্থিতিই মানুষের চোখে জল এনে দিচ্ছে। ‘রোয়ে-ভাতে’ খাচ্ছে তারা। এতোটাই তারা বেদনাহত। কিন্তু তা বলে ভেঙে পড়লে চলবে না। মানুষকে উঠতে হবে, জাগতে হবে। তাকে পাড়ি দিতে হবে আরো ঢের পথ। বামহস্তের বরাভয় মুদ্রায় ভগবান তাকে অদৃশ্য প্রেরণা দিচ্ছে—এগিয়ে চলো।
মাঝবয়সীরা বৃদ্ধের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল। কিন্তু ওই ছ্যেলাছকরার দল? মুখ টিপে হাসাহাসি করল। পাঁচুলাল যখন তার ব্যাখ্যা শেষ করে জিগ্যেস করে, ‘কী বুঝলিস?’ তখন তারা বলে ওঠে, ‘না:! গোল পোস্টের উপরে চৈলে গেল। আউটের বাহিরে।’
বিহারী পাঁচুলালকে বলে, ‘তুমি চুপ দাও ন দাদু। তুমি ক্যালার ক্যানে ফৈড়াগুলার সঙে আলতা-ফালতা বকছো? তুমার কথা বুঝার পারা ইয়াদের মাথায় গেধি আছে? মাহত ছঁড়া হালের বঁটা বৈ কিছু বুঝতে খুঁজে নাই। চুপ দাও ত তুমি!’
পাঁচু চুপ মেরে যায়। তবে বিহারীলাল ভুল কিছু বলেনি। মাহাতরা চাষবাস ছাড়া আর কোনো কিছু তেমন বুঝতে চায় না। তারা লেখাপড়া শিখেও চাকরি-বাকরিতে না গিয়ে ঘরে এসে হালের বঁটা ধরে। চাষের কাজে পরম উৎসাহে নেমে পড়ে। এটা বলে দেওয়াতে সবাই সাবাশি দেয় বিহারীকে।
হরিবোল মেলা ঘিরে উপরকুলহি-নামোকুলহির কিছু লোকজন যখন এরকম হাসি-ঠাট্টায় ব্যস্ত, তখন ঘরে সাইকেলটা রেখে দৌড়াদৌড়ি করে এদিকেই এলো আগুয়ানখুড়া। সে জারমণির খোঁজে একা-একা সাইকেল নিয়ে একপ্রস্থ ঘুরে এলো। এখানে সেখানে দেখে এলো যদি কেউ তাকে তার মেয়ের খোঁজ দিতে পারে। তেমন কোনো সন্ধান সে কোথাও পেল না। তাই এখন গ্রামের আরো কিছু লোকজন নিয়ে একঠিনে জমা করল। হরিবোল মেলায়। আর তাদের সবাইকে সে তার আগের কথাটি দিয়ে শুরু করে বলল, ‘উ ছঁড়াটা যদি পাষাণ হঁয়ে গেছে, তাইলে হামার জারমণ বিটি গেল কথায়? কথায় উ মরে হারাঞ গেল?’
‘ক্যানে, কী হঁয়েছে তোর বিটটার?’ পাঁচুলাল জানতে চায়। দড়িবাঁধা চশমা সে কানে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আটকে রেখেছে। সে উদ্বেগ নিয়ে চেয়ে থাকে আগুয়ানের দিকে। অন্য গ্রামবাসীরাও হঠাৎ যেন স্তম্ভিত হয়ে যায়। তারাও আগুয়ানের মুখের দিকে চায়।
আগুয়ান বলে, ‘বিটি হামার ঘরেই নাই। কন ফাঁকে যে ছন্ন হয়ে গেল!’
গ্রামবাসীরা শুনে অবাক। তারা কেবল পাটনের পাষাণ হয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছে, কিন্তু জারমণিও যে ঘর থেকে উধাও হয়ে গেছে, কই এমন খবর তো তারা পায়নি?
বিহারী অবশ্য জানত। কিন্তু আগুয়ানই তাকে বলতে না-করেছিল। আগে সম্ভাব্য স্থানগুলিতে খোঁজ-খবর না নিয়ে তার উধাও হয়ে যাবার খবর ছড়িয়ে দিতে চায়নি সে। তবে এখন তো আর না জানিয়ে উপায়ও নেই।
এই খবরে সঙ্গে সঙ্গে হরিবোল মেলার পুরো পরিবেশটা অন্যরকম হয়ে গেল। বদলে গেল তার সেই লঘু সুর। গ্রামের লোকজন ভীত ও চঞ্চল হয়ে পড়ল।
ভিড় ভিড় করে হরিবোল মেলার কাছে জড়ো হতে লাগল গ্রামের বাদবাকি লোকরাও। উপরকুলহি-নামোকুলহি দু-তরফের লোকই এলো। এমনকি, আগে উপরকুলহির যে-মাহাতরা নামোকুলহির ভূমিজদের এই কাজে সমর্থন জানায়নি, যারা ঢোল-শোহরত করতে বিহারীলালের ডাককে অগ্রাহ্য করে দিয়েছিল সেই ঢেলু মাহাত, গোবর্ধন মাহাত, পতেন, তারাও ক্ষেতে উগাল-সামাল দেওয়ার কাজ বন্ধ রেখে যোগ দিল এই ঘটনায়।
তবে কৈলাশ ধীবরকে দেখা গেল না এবারেও। হয়তো সে ঝুড়ি-সাইকেল নিয়ে অন্ধকার থাকতে বেরিয়ে গেছে গ্রাম ছেড়ে। তার মাছের ব্যবসায়। পুকুরগুলোতে এখন তেমন জল নেই। আষাঢ় শেষ হতে চলল অথচ বর্ষাও সেভাবে পড়েনি। যে-যার পুকুর থেকে আগেই মাছ ছেঁকে নিয়েছে। বাজারে মাছ আক্রা। শহর থেকে বাসে বাসে চালানি মাছ গঞ্জের বাজারে ঢুকছে। বাসি-তেবাসি মাছ। তা-ই পড়তে পায় না। কৈলাশ এখন সেই মাছই আড়তদারের কাছে ধর্ণা দিয়ে নিয়ে আসে। গ্রামের হাটে বেচতে বসে। ঘরে আসতে আসতে ঝিঙাফুল ফুটে যায়। আবার কাজ-ঘরে বায়না ধরে থাকলে ফিরতে ফিরতে ঢের রাত। সত্যিই তার সময়ের বড়ো অভাব। একেক সময় বিরক্ত হয়ে সে নিজেই বলে, ‘কাঁচামালের ব্যবসার মতন নচ্ছার ব্যবসা আর নাই। যত চোদ্দ চুয়াড়ি কারবার!’
কৈলাশ যে একা আসেনি, তা নয়। কাজের লোকেরা, বিশেষ করে যারা কিনাবিকা করে খায়, তারা যে-যার কর্মক্ষেত্রে চলে গেছে। খাটোয়া লোকেরাও মজুরির ধান্দায় গেছে শহরে, গঞ্জে। তবু আগুয়ানের বিটিকে নিয়ে কাল হরিবোল মেলায় এত বড়ো কান্ড ঘটে যাবার পরেও আজ সে উধাও হয়ে যাওয়াতে নানান মানুষ মনে নানান সন্দেহ নিয়ে আসতে থাকে। তারা বহুভাবে জেরা করতে থাকে আগুয়ানকে। কিন্তু কোনো জেরারই সন্তোষজনক জবাব আগুয়ান দিতে পারেনি। সে বলতে পারছে না যে, ঠিক কখন জারমণি ঘর থেকে উধাও হয়ে গেছে। গ্রামের লোকেরা নিজেরাই বলাবলি করে সেটা অনুমান করতে চেষ্টা করে। তারা বলে, জারমণি যে-ভোরবেলাতে ঘর থেকে বেরোয়নি সে-ব্যাপারে নি:সন্দেহ। ভোরবেলাতে বেরলে গ্রামের কারও-না-কারও চোখে পড়ে যেত সে। তাছাড়া আগুয়ান নিজেও অনেক ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। এই হরিবোল মেলায় বসে তবে সে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে পুকুরের ধারে যায়।
আবার জারমণি যদি রাত থাকতে বেরিয়ে গেছে, তাহলে সে কোথায় যেতে পারে? কার কাছে? একা মেঞামানুইষের রাতেভিতে বেরোনোর মতো সাহস কি হবে? কেউ কেউ এমনও বলল যে, সে বেরোয়নি। তাকে ঘর থেকেই কেউ ডেকে নিয়ে গেছে। রাতের অন্ধকারে। কিন্তু কে ডেকে নিয়ে যেতে পারে? নিশুতি রাতে এই গ্রামের কুলহি দিয়ে তার ঘরে ঢুকে কে তাকে ছলে-বলে ডেকে নিয়ে আসতে পারে? পারে কি কেউ?
‘হঁ, পারে!’
‘কে পারে?’ আগুয়ান নিজের পেটের সামনে তর্জনি কাঁপিয়ে বলল, ‘এখনেই তার নাম বল। তা বাদে—’
বৃদ্ধ পাঁচুলাল তার হাতের তৈলাক্ত লাঠিটা অনেকটা দূর থেকে আগুয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘জিনগা!’
এটা শুনতেই সমস্ত তর্জন-গর্জন স্তব্ধ হয়ে গেল। আগুয়ানের মুখেও আর রা নেই। তারা তাদের এই নীরবতা, এই নৈ:শব্দ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চাইল যে, এটাও সম্ভব। কেন সম্ভব? হয়তো জিনগা-মাঈ কোনো মোহিনীরূপ ধারণ করে জারমণির কাছে হাজির হয়েছিল। পলপলের সমস্ত মানুষ যখন নিদ্রায় আচ্ছন্ন, যখন বাইরেও একটি কাকপক্ষীরও চলাচল ছিল না, তখন হয়তো তাকে চোখে ঘুমের আবেশ থাকতে পথে বের করে নিয়ে এসেছিল। তারপর তার সঙ্গে নানান মন ভুলোনো গলফ করে, গলফ করে, গলফ করে...
কোথায় নিয়ে গেল তাকে, জিনগা? কেনই-বা নিয়ে গেল?
‘ই সোব জিনগার লীলা।’ পাঁচুলাল বলে। আর ‘লীলা’র কথা উল্লেখ করে সে বুঝিয়ে দিল যে, লীলার নামে এটা আসলে জিনগা-মাঈয়ের প্রতিশোধ। যেভাবে একটি নিরীহ যুবককে গ্রামের এতগুলো মানুষ মিলে প্রকাশ্যে অপমান করেছে, প্রহার করেছে এবং সেই অসভ্য কলংক-কর্মের সঙ্গে জিনগা-মাইয়ের নাম জড়িয়ে, উল্লাসের সঙ্গে তারা ওই যুবককে মৃত্যুমুখে ফেলে দিয়ে এসেছে, জিনগা কি তার কোনো বিচার করবে না? এভাবে ষড়যন্ত্রপূর্ণ হত্যালীলার কি কোনো দন্ডবিধান হবে না? তাহলে কেন গ্রাম থেকে ওই দূরে ডুংরির মাথায় অধিষ্ঠান করে জিনগা-মাঈয়ের অহরহ বিনিদ্র যাপন? কী দেখছে সে ওই টঙের ওপর থেকে? কেনই-বা তার হাতে সাবেকি আমলের বুচাটাঙি?
আগুয়ান এই যুক্তি মানতে নারাজ। মানতে চায় না নামোকুলহির আরও কয়েকজন ভূমিজ। কলেবর সিংসর্দার, বাঁকু সিংসর্দার এরা। আগুয়ানের মতোই তাদেরও বক্তব্য —অপরাধ তো জারমণি করেনি, তাহলে কেন সে দন্ডিত হবে? অপরাধ করেছিল যে পাটন, গ্রামবাসীরা তাকে প্রহার করলেও তার চরম দন্ডের জন্যই তো তাকে লায়াঘরে বন্দি করে এসেছিল। যে-দন্ড একমাত্র জিনগা-মাঈ দিতে পারে।
এর কোনো জবাব কারো জানা নেই। এমনকি, পাঁচুলালেরও না। সে উল্টে একটি প্রশ্নই করে বসে। পাটন কি সত্যিই অপরাধী? সত্যিই কি সে কোনো অপরাধ করেছিল?
‘জডুর করেছিল!’ জোরের সঙ্গে বলল বাঁকু সিংসর্দার। কিন্তু কী সেই অপরাধ তা পরিষ্কার করে বলতে পারল না। পাশ কাটিয়ে বলল, ‘শুধু পাটৈনা ক্যানে, ম্যান আসামী ত ওই শালা অঙ্গা শবর। হামরা তাকৌ ছাড়ব নাই। আজ হোক, কাল হোক, উয়াকৌ হামরা জিনগার কাছকে ভেজে দিব। লায়াঘরে।’
‘না!’ পতেন রাজোয়াড়ের সঙ্গে আরো কয়েকজন মাহাত এবার রুখে দাঁড়াল। ভূমিজদের এই কঠোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। ঢেলু, গোবর্ধন, নিশিবরসহ উপর কুলহির যারা ছিল তারা প্রায় সবাই বলল, ‘যা হবার হঁয়ে গেছে। ফের যদি ই-ঘটনা ঘটে, তাইলে হামরাও এখনি বলে দিছি—হামরা তাকে টেকাব। হাঁসকে কী করে ‘ফুঅড়’ করতে হয়, স্যাটা হামরা জানি।’
‘ইহার মানে?’ কলেবর সরাসরি প্রশ্ন করে পতেনকে।
‘মানে যেটা বুঝাছে, স্যাটাই। এক গন্ডা বললে চারটাই বুঝাবেক ন?’ পতনের হয়ে গোবর্ধন মাহাত জানিয়ে দেয়, যেভাবে জিনগা-মাঈয়ের নামে আদিম অত্যাচার করা হলো একটি শবর যুবকের ওপরে, যদি অন্য কারোর বেলাতেও এই বর্বরতার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা যায়, তাহলে ভূমিজরা একদিকে, পলপলের বাকি সবাই আরেকদিকে থেকে সরাসরি সংঘর্ষে নেমে পড়বে। ভূমিজদের বিরুদ্ধে।
এটা পরিষ্কার বলে দেওয়াতে অখন্ড পলপল দ্বিখন্ডিত হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় সিংসর্দারদের সঙ্গে গ্রামের অন্য সকলের জোর বচসা। ঠেলাঠেলি, তর্কাতর্কি, হুজ্জত।
বিহারীলাল মাহাত পড়ে যায় মহা ফ্যাচাঙে। সে কোন দিকে যাবে? আগুয়ানখুড়ার সঙ্গে তার যা ঘরোয়া ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, তাতে সে কিছুতেই আগুয়ানের বিপক্ষে যেতে পারবে না। সে শিল্পী মানুষ। আগুয়ান তাদের শিল্পীদলের অন্যতম উৎসাহী লোক। অথচ তার কথা ভাবতে গেলে, গ্রামের মাহাতদের কাছেই বিহারীর মানসম্মান থাকে না। মাহাত হয়ে মাহাতদের বিরোধিতা করলে, লোকে তাকে ‘দগলা’ বলবে না?
এমনি আরও কয়েকজন আছে, যাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিছক মাহাত-ভূমিজ এই নিরিখে গড়ে ওঠেনি। তারা কেউই চায় না, গ্রামের ভাব-ভালোবাসা এভাবে নষ্ট হয়ে যাক।
বিহারী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। উত্তেজনায় সে ঘন ঘন পানের পিক ফেলে। ভিড়ের মধ্যেই। আর ইয়াকে-উয়াকে ‘হেই কাকা’, ‘হেই খুড়া’ বলে হাত ধরে টানে। বলে, ‘অমন না কর খুড়া—’
‘ধৌর খুড়া না কুলকুঁড়া’! ঝিকনায় হাত ছাড়িয়ে নেয় নিশিবর মাহাত। নিজের বুকে সে নিজেই মুগুর পিটার মতন গুম গুম কিলাতে কিলাতে বলে, ‘মাহত বঠি হামরা! মাহত! তেলেঙ্গিদের জাত বঠি! হামরা রাগতে রাগি নাই। কিন্তুক যদি রাগি ন ভূমিজ-ফুমিজ অ্যাঁড়ের কাকৌ মইনব নাই। আইড়-কদলা কদলান দিব!’
‘হঁ হঁ স্যা ত বঠেই।’ বিহারীলাল নিশিবরের স্পর্ধা মেনেও নেয়। সত্যিই তো ক্ষেতে-আইড়ে হাল-কোদাল চালানোর পটুত্ব মাহাতদের জন্মগত। কিন্তু গ্রামের বিভিন্ন জাতের মানুষের এতদিনের প্রীতির সম্পর্কের দিকটি চিন্তা করে এরকম কোনো অহিতকর কাজ উত্তেজনার বশে করে ফেলাটা কি ঠিক? বিহারী কব্জিতে পানের কষ টেনে বলে, ‘তুমিয়েই চিন্তা করে বল ন ভালা!’
‘কীঈঈ চিন্তা করব? ইয়াতে চিন্তা করার ক-ন সিন নাই। মনে রাখবিস—এই নিশিবর মাহত যখন হাল চলায় ন, তখন হালেই চলায়। য্যাটা বলেছি স্যাটা ফাইলেল।’
‘হামরাও ত হালেই চলায় রে বাবা। ভখা মানুষ ‘টাকটর’ কথায় পাবিস?’
বিহারী বলে। সাক্ষী হিসেবে সে পতেন রাজোয়াড়কেও টেনে নেয়। সে ভেবেছিল, পতেন তার এই ভূমিকাকে প্রশংসা করবে। কিন্তু দেখা গেল পতেনও তাকে একচোট নিল। বলল, ‘বকাচদা! হামরা ভূমিজদের রাস্তায় ঘুরায় আনতে খুঁজছি ত তোর এত পঁন্দ ফাটছে ক্যানে? পাছে ভূমিজ ঘরে তোর বিটি দিয়া আছে নকি?’
বিহারীলালও তেমনি। রাগতে জানে না। তার অনবরত পান খাওয়া মুখে হাসতে হাসতে বলে ফেলে, ‘দিয়া থাকলে ত ভালই হৈত। তাইলে আর এত লিয়াই-ঝগড়াই হৈত নাই।’
এদিকে গ্রামের যারা আরো প্রবীণ, যারা পাঁচুলালের মতো গ্রামের সমস্ত মানুষের মধ্যে একটা সৌহার্দ্য বজায় রাখতে চায়, তারা এই পরিস্থিতিতে বিচলিত হয়ে পড়ে। আগুয়ানও এসব চায় না। যতই হোক, তার মধ্যেও তো কিছুটা শিল্পীমন আছে। তাছাড়া দিনরাত যাদের সঙ্গে থাকছে, আড্ডা দিচ্ছে, হাসিঠাট্টা করছে, তাদের সঙ্গে এই ধরনের অপ্রীতিকর সম্পর্ক কি কাম্য?
শেষতক আগুয়ান তার আবেগ দিয়ে বলতে বাধ্য হলো, ‘ইটা কেমন তুমাদের কর্ম, হ্যাঁ? হামার বিটির কিনারা করতে তুমরা আইলে। আর এখন হামার কথা ভুলে তুমরা বাদা-বাদিয়ে মত্ত হঁয়ে গেলে? ইটা তুমাদের ঐন্যায় লয়? তাইলে তুমরা হামদের বিপদের দিনে ডাঁড়াবে নাই? তাইলে তুমাদের সঙে হামাদের কিস্যার সম্পর্ক? কিস্যার লিয়াদিয়া?’ আগুয়ান কেঁদে ফেলে।
আগুয়ানের এই অবস্থা দেখতে কারও ভালো লাগে না। তারা চেঁচামেচি থামিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে। তারপর বলে, ‘ঠিক আছে, জারমণির তালাসি হামরা করব। যদি জিনগা-মাঈয়ের ‘কিরপা’ হঁয়েছে, তাইলে ত বাঁইচে গেল। আর বাঁইচে গেলে উ য্যা কথায় কার কাছে লুকাঁয় থাকবেক, স্যাটা কি হামরা জানব নাই?’
সেই সঙ্গে এটাও ঠিক হয় যে, গ্রামের মধ্যে যে-কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে সবাইকেই এসে একঠিনে দাঁড়াতে হবে। যখন বিচারের প্রয়োজন হবে, তখন ষোলো আনা ডেকে তার বিচার হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দু-চারজনের হটকারি এবং অমানবিক ক্রিয়াকলাপ কোনোভাবেই মান্য হবে না। কেউ অন্ধকারে ঝাড়ের একটা বাঁশ কেটে নিয়ে গেল, কী খাপরার চালে আংশি বাড়িয়ে একটা লাউ চুরি করে নিয়ে গেল, তারপর ধরা পড়লে হরিবোল মেলায় দাঁড় করিয়ে ভুখা মানুষের মাথার চুল ‘কাড়া-কাঁইচা’ করে ছাড়া হবে—এ ধরনের মধ্যযুগীয় ক্রূর মানসিকতা আজকের দিনে আর চলে না। যদি এখনও কোনো কোনো গ্রামে এই প্রথা চালু থাকেও, পলপলে তা চলতে দেওয়া হবে না। দন্ডস্বরূপ বড়জোর যা হতে পারে তা হলো সাধ্যমতো আর্থিক জরিমানা। একঘরে করাও চলবে না।
‘তাইলে অঙ্গদ শবরকে কি হামরা ছাইড়ে দিব? খালাস?’ বিহারীলাল জানতে চাইল—পাটনের দাদা অঙ্গদের কথা উঠছে না কেন? অপরাধ করে পালিয়ে গেলে ষোলআনা কি তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে না?
‘ক্যানে লিয়া হবেক নাই? নিশ্চয়ই লিয়া হবেক।’ নিশিবর মাহাত বলে, ‘দোষীকে ধরা হবেকেই। স্যা পুয়াল গাদায় লুকাক, চাই ইঁদুর গাঢাঁয় থাক। তাবাদে অপরাধী যৎক্ষণ না দোষের ‘হঁ স্বীকার’ করছে, যৎক্ষণ না এই ষোলআনায় তার বিচার বসছে, ডন্ড হছে, তৎক্ষণ তাকে খালাস দিয়া হবেক নাই।’ বলতে বলতে, নিশিবর কাদাক্ষেতে ইউরিয়া ঝিঁটার মতো হাতের ভঙ্গি করে, ছেলে-ছোকরাদের উৎসাহিত করে বলে, ‘যাও রে বাবুরা! হলহৈলা সাপের পারা যে-জন দিগে ছৈড়াঞ যাও! ছ্যেলা-বুঢ়া সোকৈলকে বলছি—তুমরা সেই আগের পারা ‘নিসপ্যাকটারগিরি’ শুরু করে দাও। তুরন্ত খোবোর আন—কথায় আড়ায় আছে শালা অঙ্গা শবর—। যেখিনে অঙ্গা থাকব্যাঅ্যাক সেইখিনে-এ-এ-এই থাকবেক জারমণ!’
ভিড়ের পিছন থেকে কোনো ছঁড়া চেঁচিয়ে দিল, ‘লেচ্চিড়া! প্যাঁসপ্যাঁস!’
সভা ভঙ্গ!
কে বলল পাটন শবর পাষাণ হয়ে গেছে? মিছা কথা।
কালদিন যে-খোবোরটা পলপলের ছ্যেলাছকরা থেকে অনেক বয়স্ক লোকও বিশ্বাস করেছিল এবং নিজেরাই মুখে মুখে চাউর করেছিল, এখন তারাই সেই খোবোরটিকে মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। তারা বলে বেড়াচ্ছে, ‘পাষাণ হঁয়েছে ন ঘঁড়ার ডিম হঁয়েছে!’
তাহলে কী হয়েছে, পাটনের? যা হয়েছে তা যে হবে, এটা তাদের অধিকাংশের কাছে প্রত্যাশিত ছিল। দেবস্থান থেকে ‘ছন্ন’ হয়ে গেছে পাটন। অদৃশ্য হয়ে গেছে! অথচ জিনগা-ডুংরিতে থানের নীচের ধাপে যে লায়াঘরটিতে তাকে অমন ভাঙা কপাটের আড়াল দিয়ে তাতে আবার দড়িদড়া বেঁধে, গাছের ডালের জাঁক দিয়ে রাখা হয়েছিল, এখন সেসব জাঁকের গটাই ফাঁক। তাকে আটক করার জন্য যা যা জিনিসপাতি কাজে লাগানো হয়েছিল, সবই পড়ে আছে যেমনকার তেমনি। কোনো একটি সামানও ইধার-উধার হয়নি। সেগুলো পড়ে থাকতে দেখে, মনে হচ্ছে, মুড়পুচকা দিয়ে গোরু পালিয়ে গেছে! আর গোয়ালঘরে খোঁটার সঙ্গে বাঁধা গলাসিটি অবিকৃত বন্ধনীসহ পড়ে রয়েছে।
জিনগা-ডুংরির লায়াঘর থেকে পাটনের অন্তর্ধানের এই সংবাদটি, সর্বপ্রথম কোনো একজন পায়নি। যারা জারমণিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, অথবা অঙ্গদকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, অথবা অঙ্গদের সূত্রে জারমণি কিংবা জারমণির সূত্রে অঙ্গদ শবরকে ‘পুয়ালগাদা থেকে ইঁদুরগাঢ়া’ সর্বত্র খানা তল্লাশি চালিয়ে, তোলপাড় করে ধরে আনতে গ্রাম থেকে ডুংরি-ডাহারে ‘হলহৈলা সাপের পারা’ ছড়িয়ে পড়েছে, তারাই কয়েকজন ‘যা হয় হোককেই’ বলে উঠে এসেছিল জিনগা-ডুংগরিতে। আর এসেই দেখে জিনগার এই অলৌকিক লীলা।
‘হঁ, লীলাই বঠে।’ বাঁকু ভিড় থেকে ফারাকে সরে এসে বলে, ‘হামরাও ত এইটাই খুজেছিলি। ডন্ড হামরা দিব নাই। ডন্ড দিবার থাকলে জিনগা-মাঈ দেক। আর যদি উয়াকে খালাস দিবার থাকে, ত খালাস দেক।’
বিহারীলাল বলে, ‘এখন যা করেছে মঙ্গলের লাইগেই করেছে।’
ততক্ষণে সঁডুও ডুংরিতে এসে হাজির। বাঁকু, আগুয়ান, বিহারীলালদের ঘিরে যারা কথা শুনছিল, তাদের ঠেলে সে সামনে দাঁড়িয়ে, প্রশ্ন করে বিহারীলালকে, ‘কী করেছে?’
‘ওই ত দেখ। যাকে হামরা এমন কৈষে আটক করে দিয়ে গেলি, এক রাতের ভিৎরে জিনগা তাকে ছন্ন করে দিল।’
‘ছন্ন’ শব্দটির সঙ্গে কোথাও অলৌকিক ভাব রয়েছে। তাই পাটনের ছন্ন হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে কৌতূহল চেপে রাখতে না-পেরে, দু’জন-একজন করে ডুংরিতে এসে জড়ো হচ্ছে। তাদের যাবতীয় মনগড়া সংস্কার ভুলে গিয়ে, কেবল পলপলের লোকেরাই নয়, আশপাশের গ্রামগুলি থেকেও কেউ কেউ এসে লায়াঘরটিতে উঁকি মেরে যাচ্ছে।
হেমন্ত-অশ্বিনী-কৃষ্ণপদরা তাদের পুরো দলটিকে নিয়ে এসেছে। ছ্যেলাছকরার দল এর-তার মুখে ‘ছন্ন’ শব্দটি শুনে ‘যত প্যাঁন্দ’ বলে হাসাহাসি করে। আর বলে, ‘ছন্ন হয়েছে? পালানছে! উ-শ্লা খাইড়া ঘরকে চলে গেছে। ডেলিকচা।’
পালিয়ে যাওয়ার কথাটা বলে দেওয়াতে শ্রুতিকটু লাগল বাঁকুর। পছন্দ হলো না আগুয়ানেরও। তবু ছ্যেলাছকরাদের মুখ থেকে শুনে যখন আরও কেউ কেউ বলতে লাগল, তখন করীকর মাহাত অনেকটা সমর্থনের ভঙ্গিতে বিস্ময় প্রকাশ করে। বলে, ‘কিন্তুক পালাল কী উপায়ে? এমন মজবুত করে—’
বাঁধন যে-বেশ মজবুত ছিল তাতে সন্দেহ নেই। এদিক-ওদিক থেকে টান দেওয়া ছিল দড়ির। আগুয়ান গভীরভাবে লক্ষ করতে গিয়ে ধরে ফেলে—বাঁধনগুলির মধ্যে-দড়ির একটা খি সামান্য একটু কেটে দেওয়াতে সমস্ত বাঁধনটাই আলগা হয়ে গেছে। আর তখন, দরজার যে-পাল্লাটি গাছের গুঁড়ির চাপে আটকে রাখা হয়েছিল, সেটিও ঢিলে হয়ে যায়। ফলে ভেতর থেকে সামান্য ঠেলে দিতে সেটা বাইরের দিকে উল্টে পড়েছে এবং বেরিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়ে গেছে। সেই পথ দিয়েই চলে গেছে পাটন।
এটা বুঝতে পেরেও অন্যদের তা বলতে চায় না আগুয়ান। এই সূত্রে এখন তার কাছে জারমণিরও ঘর থেকে ‘ছন্ন’ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে আরও কয়েকটি ব্যাপার—জারমণি কেন ঘর থেকে পালিয়ে গেল? সে কখন এবং কার কাছে গেল? সে কি অঙ্গদের জন্য পালাল? নাকি পাটনের জন্য?
এখন আগুয়ানের পূর্ব-নির্দিষ্ট ভাবনাটিও উল্টে-পাল্টে গেল। আগুয়ান ভাবতে থাকে গত দু-তিনটে দিনের কথা। ভাবনার শুরু সেই জঙ্গল থেকে। ডেলিকচা গ্রামকে ঘিরে থাকা জঙ্গল। বেলা তখন পড়ন্ত। গোধূলির অন্তিম লগ্ন। তামাম জঙ্গল জুড়ে কুলায় ফিরে আসা অজস্র পাখিদের ডালে ডালে প্রবল উদ্দীপনা। কলরব। আগুয়ানের মনে পড়ে যাচ্ছে...
পলপলের গ্রামবাসীরা ততক্ষণে খবর পেয়ে গেছে। জারমণি আছে ডেলিকচাতে। অঙ্গদ শবর তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে সেখানে। বনের মাঝে। এই খবরে উত্তেজিত গ্রামবাসীরা ডাং-ঠেঙা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। কোথায় অঙ্গদ! তারা তার ঘরে গিয়ে শোনে অঙ্গদ সেখানে নেই, জারমণিও নেই। উত্তেজিত গ্রামবাসীরা লাথি মেরে—গঁড়হাইরে—সদরের ফটক ঠেলে হই-হই করে তাদের উঠোনে ঢুকে পড়ে। ঘরে তখন পুরুষ মানুষ বলতে বৃদ্ধ ও শিশুরা। মেয়েরা ইতিমধ্যে গ্রামবাসীদের মারণ-উল্লাস শুনে আর মাতন দেখে লুকিয়ে পড়েছে যে-যার কপাটকুনে। কেউ ছুটে গেছে বনের ভেতরে। পাটনকে সাবধান করে দিতে—পলপলের লোকেরা চড়াও হয়েছে! তারা আসছে। পালা এই বতর!
এদিকে অঙ্গদের বৃদ্ধ বাপ কাঁপতে থাকে ভয়ে। সে ডন্ডবত করে। কাঁদুমাঁদ হয়ে বলে, ‘মারিস না বাপ! হামরা কুছু জানি নাই, কুছু করি নাই। পরের বিটিকে ভাগায় আনতে হামরা ক্যানে বলব? তুমরা হামদের ছাইড়ে দাও। আর যদি ডন্ড দিবে তো দাও যে আইনেছে তাখে।’
‘যে আইনেছে তাখে? উ তোর ব্যাটা লয়?’
‘উ ব্যাটা লয়, পাঁঠা বঠে।’
‘তাইলে বলি দিব! আর তোকেও হামরা ছাইড়ে দিব? সোব হিসটিরি তুঁই জানিস। বল তোর বড় ব্যাটাটা কথাকে গেছে? কথায় আছে অঙ্গদ? বল নাই ত চটাব।’
অঙ্গদের বাবা সহদেব শবর বলে, তার মাথায় টাঙির চোট বসিয়ে দিলেও সে হদিশ দিতে পারবে না। সে জানে না। সত্যিই জানে না সে। বলে, ‘হেই বাপ, আমি নাই মিছা বলি। হামি একবারকেই নাই জানি—অঙ্গা কথায় আছে। তরা যেখিন ল্যা পারিস উয়াকে ঢুঁড়ে আন!’
‘আর হামদের বিটিছ্যোলাটি? উয়াকে কথায় লুকাঁয় রাইখেছিস? বল নাই ত—’
‘স্যাও হামি নাই জানি বাপ। হামরা বুঢ়া-বুঢ়ি ই-ঘটনার কৌ কিছু জানি নাই!’
এরা নিরীহ এবং দুর্বল। সমানে সমানে টেক্কা দেবার মতো এদের তেমন লোকবল নেই বলে, পলপলের লোকেরা তাদের প্রতি আরও বেশি কঠোর হয়ে ওঠে। তাদের ওপর, তাদের ঘরদোরের ওপরে যাচ্ছেতাই অত্যাচার চালাতে থাকে। ঘরের চাল ভেঙে দেয়, লতপাত ছিঁড়ে দেয়। তারপর কোথা থেকে কী খবর পেয়ে তারা সদলবল দৌড়তে থাকে জঙ্গলের দিকে। তাদের কারও হাতে আকাশমণির ডাং, কারও হাতে ছাদনদড়ি, টাঙি, কারও হাতে আধলা ইঁট কিংবা বাঁশ-বেগনার ডাল।
পাটন ওই নির্জন জঙ্গলের ভেতরেই ছিল। এইসব মারমুখী গ্রামবাসীদের সংঘবদ্ধ পায়ের শব্দ পেয়েও, নিজের জায়গা থেকে সে পালিয়ে যায়নি। জারমণি তার সঙ্গে যাবে না জেনেও, সে, একা নিজের প্রাণ বাঁচাতে লুকিয়ে পড়েনি আরও ঘন জঙ্গলের ভেতরে। সেও তখন প্রমত্ত হয়ে উঠেছে। জারমণিকে হাতের নাগালে পাবার জন্য। যদিও, তাকে নাগালে পাবার আগেই গ্রামবাসীরা শিবগাজনের ভগতাদের১৯ মতো রে-রে করে এসে ঘিরে ফেলে তাকে। তারপর...
তাকে মারধোর করে, ছাগল চোরের মতো ধাকলাধাকলি করে ভিড়ের ভেতর দিয়ে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, আগুয়ানের এখন মনে পড়ে যায়, সে তখন পাটনকে নয়, সে দেখছিল জারমণিকে। জারমণির চোখ থেকে অতি সংগোপনে গড়িয়ে পড়া একটি উজ্জ্বল অশ্রুর ফোঁটা আগুয়ানের চোখ এড়িয়ে যায়নি।
কিন্তু আগুয়ান, জারমণির এই অশ্রুবিন্দুটিকে জারমণিরই অশ্রুবিন্দু মনে করেছিল। সে ভেবেছিল, পাটনের প্রতি অমীমাংসিত ক্রোধেরই স্খলন ঘটছে তার গড়িয়ে পড়া চোখের জলের ভেতর দিয়ে। হয়তো সে কাঁদছে এই জন্য যে, পাটনের মতো একজন ইতর কামাসক্তকে সে নিজের হাতে দন্ডিত করতে পারল না। এই অনুশোচনায় তার সেই অশ্রু তার ক্রোধের রূপান্তর। তার সেই অশ্রু তার অনুশোচনার পার্থিব অভিব্যক্তি।
এখন আগুয়ানের মনে হচ্ছে, ভুল! সে ভুল বুঝেছিল। জারমণির চোখ থেকে একান্তে গড়িয়ে পড়া সে-অশ্রু ছিল তার পাটনের প্রতি নিবেদিত।
জারমণিকে সেখানে আর একদন্ডও রাখা হয়নি। তাকে তৎক্ষণাৎ ভিড়ের ভেতর থেকে বের করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ঘরে। ঘরের বাইরে থেকে, কারা যেন কলঙ্ক জ্ঞানে, গোচারণভূমি থেকে ফিরে আসা গবাদির মতো পশ্চাতদেশে ধাকলানি দিয়ে, চৌকাঠের ওপারে ঠেলে দিল তাকে। হেঁশেলের দরজায় গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল জারমণি। আর সেই দরজার গায়ে ঝুলতে থাকা লোহার শিকলিটিতে সশব্দে মাথা রেখে, সে, আচমকা কেঁদে উঠল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
আগুয়ান, জারমণির এই কান্নাকেও জারমণিরই কান্না মনে করেছিল। সে ভেবেছিল, নিজের এহেন দুর্দশার জন্য, হেনস্তার জন্য পবিত্র অশ্রু বিসর্জনের ভেতর দিয়ে নিজের প্রায়শ্চিত্ত করছে জারমণি। সে কাঁদুক। আরও কাঁদুক।
কিন্তু এখন আগুয়ানের মনে হচ্ছে, ভুল! সে ভুল বুঝেছিল। জারমণির সে-কান্না, বস্তুত, জারমণির প্রায়শ্চিত্ত তথা আত্মশুদ্ধির নিমিত্ত কান্নাই ছিল না। সে-কান্না ছিল পাটনের প্রতি তার জেগে ওঠা আকাঙ্ক্ষা তথা বিহ্বলতার কান্না!
জারমণি অন্ধকার ঘরে কপাট দিয়েছিল। ভেতর থেকে খিল এঁটে দিয়ে সে ভেতরেই ছিল। মায়ের কথাতেও সে কপাট খোলেনি। নিজেকে সংযত করে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায়নি কারও সামনে।
কিন্তু আগুয়ান, জারমণির এই অন্ধকার ঘরে লুকিয়ে থাকাকেও, লোকলজ্জা তথা কলঙ্কের কারণে আত্মগোপন ভেবেছিল। তার মন, তার ভাবনা যখন কলঙ্ক-নির্ভার হবে, তখন ঠিকই সে নিষ্কলঙ্ক হয়ে অন্ধকার ঘরের দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে আলোর উঠোনে এসে দাঁড়াবে।
আগুয়ানের এখন মনে হচ্ছে, ভুল! সেটিও ছিল তার একটি প্রপঞ্চময় ধারণা। সে ভুল বুঝেছিল। বস্তুত, কলঙ্ক-মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসবে বলে জারমণি অন্ধকার ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দেয়নি। সে তথাকথিত এই সমাজে কলঙ্কিত হতে চেয়েছিল বলেই ঘরে ঢুকেছিল। সে চেয়েছিল অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারে যেতে। তাই রাত্রির অন্ধকারেই পাটনের কাছে গেছে এবং তাকে মুক্ত করেছে।
আগুয়ান অন্যমনস্কের মতো তাকিয়ে থাকে ওই বিশৃঙ্খল লায়াঘরটির দিকে। তাৎক্ষণিক ঔদাস্যও ফুটে ওঠে তার সে-দৃষ্টিতে। তবু এখন তাকে যেন অনেকটাই নিশ্চিন্ত, নিরুদ্বেগ লাগে। অন্য অনেক সরল ও বোকা মানুষের মতো আগুয়ানও জিনগা-মাঈকে মানে। তাকে বিশ্বাস করে। এমনকি, জিনগা নিয়ে লোকমুখে প্রচারিত প্রায় সবকটা হাস্যকর ও উদ্ভট, অযৌক্তিক খন্ড কাহিনিগুলিকেও কেবল যে সত্য বলে মান্য করে, তা-ই না। সে মনে করে, এভাবেই দন্ডের প্রতি তার বিদ্বেষবহ্নি প্রধূমিত হয়ে ওঠে। কিন্তু যতোই হোক, নিজের বেলাতে আগুয়ান সেটা মনেপ্রাণে মানতে চায়নি। সে এটা মোটেই চায়নি যে, দন্ডার্হ পাটনের মতো জারমণিও তার অলৌকিক দন্ড প্রাপ্ত হোক।
কিন্তু একটা ব্যাপার এখনও অসরলই থেকে গেল তার কাছে। যে-জারমণি অঙ্গদের হাত ধরে, তার ঘর থেকে, গ্রাম থেকে পালিয়ে গেল, সেই জারমণিই কেন তাহলে পাটনের জন্য গোপনে অশ্রুপাত করে? যে-অঙ্গদ স্পর্ধার সঙ্গে, দায়িত্বের সঙ্গে এবং দুঃসাহসিকতার সঙ্গে জারমণিকে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে তুলল, সে-ই বা কেন তাকে ফেলে চলে গেল? প্রাণের ভয়ে? প্রাণের ভয়ে তাহলে পাটনও জারমণিকে ছেড়ে অন্যত্র চলে গেল না কেন? সে কি জানত না, বিচারবুদ্ধিহীন হয়ে পড়া উন্মত্ত গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়ার সম্ভাব্য পরিণতি? বোধহয়, এখানেই চিড় খেয়ে গেল তার সেই পূর্বনির্দিষ্ট ধারণা।
যে-ধারণা কেবল আগুয়ান পোষণ করে না, গ্রামের লোকেরাও মনে করে, জারমণি যখন অঙ্গদের সঙ্গে পালিয়ে গেছে, তাহলে অঙ্গদই তার প্রেমাস্পদ। এখনও, জারমণিকে ফিরে পাওয়া গেলে একমাত্র অঙ্গদের কাছেই পাওয়া যেতে পারে। তাই এ-ব্যাপারে পাটনের নামটি তাদের মনে আসেনি। জারমণির জন্য তারা অঙ্গদকেই আগে খুঁজে পেতে চায়। আগুয়ানও চায়, জারমণি ওদিকে পাটনের সঙ্গে পালিয়ে যেতে থাকুক, তার এদিকে মূঢ় গ্রামবাসীরা অঙ্গদের খোঁজ-তল্লাশি পুরোদমে চালিয়ে যাক। চালাক।
তবে এখন তো আর পাটনের খোঁজ-খবর করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। পাটন তো এখন জিনগা-মাঈয়ের অলৌকিক ক্রিয়া বলে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বাইরে থেকে কেউ দড়ি কেটে দেওয়াতে তার পক্ষে পালিয়ে যাওয়া যে সহজ হয়েছে, এটা ভেতরে ভেতরে বুঝেও ওরা জিনগা-মাঈয়ের মাহাত্ম্যে বিশ্বাস করতে চায়। কেন না, জিনগাকে তারা তাদের মনের মতো করে গড়তে চায়। তাদের আকাশকুসুম চিন্তা তথা শিশুসুলভ কল্পনাগুলিকে জিনগার অলৌকিক ক্রিয়া বা লীলা-মহিমা বলে লোকমুখে ছড়িয়ে দিতে চায়। হয়তো তারা মনে করে, ঠাকুর-দেবতাকে লোকসমাজে মাঝে-মধ্যে দুটো একটা ইন্দ্রজালের খেলা দেখিয়ে দিতে হয়। নচেৎ সরল ও নির্বোধ গ্রামবাসীদের কাছে সেইসব লোক-দেবতাদের মহিমা প্রচারিত হবে না, মানুষের আস্থা থাকবে না এবং আখেরে ক্রমশ অবিশ্বাসী ও উদাসীন হতে হতে তারা বিভিন্ন গরামথান থেকে একদিন লোকদেবতাদের উৎখাত করে নদী পার করে দিয়ে আসবে। আর সেদিন থেকেই গ্রামে গ্রামে দেখা দেবে খরা-অজন্মা-মারী।
ডুংরির ওপর থেকে একে একে লোক নামতে থাকে। সবাই নেমে যাওয়ার পরেও, বিহারীকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আগুয়ান। অনেক দূর অব্দি সে দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেখতে থাকে। দেখতে দেখতে অভিভূত হয়ে যায়। আহা! কি অদৃষ্টপূর্ব নৈসর্গিক শোভা। মাঠে মাঠে লাঙল ঘোরাচ্ছে চাষিরা। কেউ গোরুরগাড়ি থেকে ঝুড়ি মাথায় পুকুরের পাঁক নিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে ক্ষেতে। কর্মব্যস্ত গ্রামবাসীরা আগামী চাষের কথা ভেবে শুরু করেছে অক্লান্ত খাটাখাটুনি। বাগালরা নানান গোষ্ঠ থেকে গাভি ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গ্রামে। বাঁশির বদলে তাদের হাতে এখন বুয়ানের ডাল।
আড়শা রোডে অনবরত ঝালদা আর সিরকাবাদের মানুষের চলাচল। তাদের মাথায় ছাতা। দীর্ঘবিরতিতে লোক বোঝাই গাড়ি যাচ্ছে টলোমলো করে।
আপাতদৃষ্টিতে এর মধ্যে কোনো কাব্য নেই, সংগীত নেই। তবু, আগুয়ানের মনে হয়, আকাশ-বাতাস-বৃক্ষ-বনানী থেকে শুরু করে প্রকৃতির প্রতিটি তন্দ্রীতে বেজে চলা কোনো ঝুমুর সে বাতাসের হেলকে হেলকে শুনতে পাচ্ছে। মুগ্ধতা আসে তার। যদিও সে-মুগ্ধতা গুছিয়ে সে প্রকাশ করতে পারে না তার ‘রাঢ়ুষ্টা ভাষায়’। তবু বিহারীকে ডেকে বলে ওঠে, ‘চারোধার বোড়ো সুন্দর লাগছে ত! এমন ত ভাই হামি কোবৌ দেখি নাই। ঘরের কাছটায় থাইকেও। আর মনে হছে, যেদিকেই ভালছি, সেদিকেই হামার বিটিকে দেখতে পাচ্ছি। জারমণিকে!’
এই প্রলাপের কোনো অর্থ ধরতে পারে না বিহারীলাল। সে দ্রুত থুতনি পিছনে ঘুরিয়ে, বাতাসে একপ্রস্থ পানের পিক উড়িয়ে দেয়। আগুয়ানের মুখের দিকে মুখ রেখে অবাক হয়ে বলে, ‘পাছে তুমার গাঁধি লাগল নকি, আগুখুড়া? ই কী বলছ? —চল চল বাবা! নইলে এখনেই বলবে—’
‘কী বলব রে?’
‘বলবে য্যা, মনটায় হছে ঝাঁপায় মরে দিব!’
‘নাই!’ আগুয়ান বলে, এখানে যে একবার আসবে, প্রকৃতির এমন সান্নিধ্যে, সে মরার কথা কোনোদিনই বলবে না। এটাই তো আসল লীলা। জিনগার নয়, প্রকৃতির। প্রকৃতি কেবল বাঁচতেই শেখায়। তাই চারদিকে অনবরত বেজে চলেছে তার উজ্জীবনের শাশ্বত সংগীত। দরকার শুধু শোনার মতো সংবেদনশীল কান।
আগুয়ান ভাবের মধ্যে বলে, ‘এ বিহারী, লে! এই বতর একটা ঝুমৈর হাঁকা ন।’
‘অঃ! এই যোগে মদৈলটা থাকলে যা জুত হৈত ন! আচ্ছা, নাই ত নাই। বিন-মাদৈলেই হোক।’ বিহারী একটু গলাটা ঝাড়ে। তারপর ডুংরির ওপর থেকে নীচে ছড়িয়ে থাকা এই মায়াময় প্রকৃতিকে শোনাতে সে বড়ো দরদ দিয়ে উদাত্ত গলায় গেয়ে ওঠে। কলিতে কলিতে ডান হাতটিকে কপালে ঠেকিয়ে আবার সামনে ছড়িয়ে দেয়। রাধার বিরহে চোখ যেন ছলছল করে তার—
রজত-বরণ অঙ্গ দেখেও দেখে না অনঙ্গ
সে বিনে নি:সঙ্গ আমি মনোবেদন কারে
জানাই গো
মুখ পুড়ায়ে কাল করে দে সখি আমি হব
কানাই গো...
পেরিয়ে গেল আরও কয়েকটা দিন।
অঙ্গদকে বড়ো কাহিল দেখায়। এই ক’দিন তার ক্যাঁন্দ গাছের মতো কালো শরীর আরও কালো হয়ে উঠেছে। হাড়-পাঁজরা সবই কেমন বেরিয়ে আসতে চাইছে। চোখের দৃষ্টিও মুহ্যমান। সে এখন ভালো করে হাঁটতে পারে না, চলাফেরা করতে পারে না। একটা গভীর আলস্য তাকে রোজই এই কর্মময় জগৎ থেকে, লোকলস্কর নিয়ে উচ্ছল জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে। তার এই বেঁচে থাকা স্পৃহাহীন বেঁচে থাকা। কোনো কিছুর প্রতি তার কোনো আকর্ষণ নেই, অভিরুচি নেই। চোখের দৃষ্টি ক্রমশ তমসাচ্ছন্ন হয়ে আসছে। সবকিছুই ঝাপসা দেখছে সে। গায়ে নোংরা, পায়ে বেড়ে উঠেছে নখ। মাথার চুলগুলিতে জট পড়ে দড়ি-দড়ি হয়ে গেছে। বেনামূলের মতো। এরকম একমাথা চুল নিয়ে সে একটি উদুম্বর গাছের মূলে, নির্জনে এসে বসে রয়েছে। একা একা। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, দীর্ঘপথ ছুটে আসার দরুন সে হাঁপিয়ে উঠেছে।
শ্বাস উঠছে ঘন ঘন। সে তাই এই বৃক্ষছায়ায় বসে আরও কয়েক দন্ড জিরিয়ে নিতে চায়!
উদুম্বর বৃক্ষটির নীচে বসেই থাকল অঙ্গদ। নির্মোহ নিরাসক্ত দৃষ্টিতে, সম্মুখ পানে চেয়ে।
কুলু-কুলু শব্দে মহাকালের স্বরূপ নিয়ে বয়ে চলেছে নদী। ভাটার কর্মীরা ইট গড়ছে—খাদিয়ারা কাঁচা ইট রোদে দিচ্ছে। পৈড়ানের হোড় থেকে শুকনো ইট, মাথায় মাথায়, চটপটে হাতে সাজিয়ে তুলছে মেয়েরা। তারা দল বেঁধে খলবলে পায়ে ছুটে চলেছে ভাটার দিকে। বগলে খাতা চেপে, মুনশি, আপন মনে গাইছে বাউল। নদীর ওপারে কুসুম্ভ বৃক্ষের পাতারা কাঁপছে। শন-শন বাতাসে।
কর্মোদ্যোগজনিত এই স্মিত কোলাহলের কিছুই কানে আসে না অঙ্গদের। তার গভীর-গভীরতম শ্রবণেন্দ্রিয়ে সব কোলাহলই মনে হয় যেন দূরাগত। সে এতটাই আচ্ছন্ন, আত্মস্থ। এভাবে থাকতে থাকতে মন উদাস করা আত্মচিন্তায় মগ্ন হয়ে যায় সে। এই ঐহিক জগৎ-সংসার সম্পর্কেও তার বৈরাগ্য আসে। মনে হয়, জগৎ-সংসার আসলে দুঃখময়! তৃষ্ণাময়! এখানে প্রতিটি মানুষই তৃষ্ণার্ত। তাই মানুষে মানুষে এখানে প্রেম জাগে না, হৃদয় চুরমার করে জেগে ওঠে স্বার্থপরতা। এখানে অস্ত্রধারী মানুষই সর্বেসর্বা। অস্ত্রের বলে তারা যে-কোনো অন্যায় করতে পারে, অসত্যকে সত্যের মর্যাদা দিতে পারে। আজ আর মানুষের কোনো বিবেক নেই, বিচার নেই। এমন জগতে কুন্ঠিত হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে প্রতিবাদস্বরূপ আত্মহননই শ্রেয়। এই ভাবনা নিয়েই অঙ্গদ পড়ে থাকল ওই বৃক্ষমূলে। দিনের পর দিন।
তার এই অচল অবস্থান দেখে নদীতীরবর্তী মানুষেরা তাকে সাধু-সন্ত ভেবে বসে। দূরের গ্রাম থেকে জাম্বুবতী নামে এক বৃদ্ধাজননী নিয়মিত একটি টিনের থালায় অন্ন-ব্যঞ্জন রেখে যায়। অঙ্গদ উদাসীন। তা ঘুরেও দেখে না। ইটভাটার পোষা কুকুরটি এসে খেয়ে চলে যায়।
জাম্বুবতীর তাতেও আক্ষেপ নেই। জটাজুটধারী শীর্ণকায় অঙ্গদের উদ্দেশে সে বলে, ‘তুমি আমার শত-শত বছরের অভুক্ত বাংলার সন্তান। তোমার নিমিত্ত অন্ন নিবেদন করে আমি ধন্য হতে চাই। তা যদি কুক্কুরেও খায়, তবুও আমি পুণ্যবতী হব!’
মন্থর গতিতে বইতে লাগল মহাকাল। ঝুঝুঙা নদী। উদুম্বর বৃক্ষমূলে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল একটি মস্ত বল্মীক!
একদিন তার সামনে দিয়ে আবার পেরিয়ে যায় সেই খড়বোঝাই গো-শকটটি। যাকে চালনা করছে এক অস্থিসার বৃদ্ধ। মাথায় পক্ককেশ। লোলচর্ম। কোটরাগত চোখ দুটির ভেতর দিয়ে যেটুকু দৃষ্টি তার বেরিয়ে আসছে, তাতেই সে দেখছে এই আলোকিত আশ্চর্য ভুবন!
গরুর গাড়িটিতে অনেক উঁচু অব্দি বোঝাই করা খড়। গরু দুটিকে ঠিক পথে চালনা করার জন্য বৃদ্ধের হাতে একটি ছোট্ট চাবুক। একই জোয়ালের নীচে গোরু দুটি বদ্ধ থাকলেও এবং আপাতদৃষ্টিতে সমান মনে হলেও আসলে ভেতরে ভেতরে তারা অসমান। বৈপরীত্যপূর্ণ।
বৃদ্ধ গাছের সামনে গাড়িটিকে থামিয়ে সেই নিষ্প্রাণ রুগ্ন অবসাদগ্রস্ত যুবকটিকে, তার একেবারে নিজস্ব প্রাকৃত ভাষাতে জিগ্যেস করে, ‘বৎস! কে তুমি? কেনই-বা এমন অবসাদাচ্ছন্ন ও জীবন্মৃত অবস্থায় নিজেকে ফেলে রেখেছো এই বৃক্ষছায়ায়?’
অঙ্গদ অনেকক্ষণ নিরবচ্ছিন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বৃদ্ধের দিকে। তাকে সনাক্ত করতে চেষ্টা করে। কোনো একদিন, কোথাও সে যেন এই প্রবীণ মানবকে ঠিক এই অবস্থাতেই দেখেছিল। তখনও এই গাড়ি, এই গাভীদ্বয় ছিল। ছিল গো-শকট ভর্তি স্তম্ভও। কিন্তু অনেকক্ষণ অনিমেষ চেয়ে থেকেও সে কোনোকিছু স্মরণে আনতে পারল না। তার মন বলে যেন কোনো বস্তু নেই। সবই কেমন বিস্মৃতির অতলে চলে গেছে। সে স্মরণে আনতে পারল না সেই দিনটির কথা, যেদিন সে নদীতীরে বসেছিল আর মুগ্ধবিস্ময়ে দেখছিল নদীতীরবর্তী জগৎচরাচরকে। সেদিন সেটা যেন ছিল অন্য জগৎ। আর আজকে এই উদুম্বর বৃক্ষের ছায়ায় বসে সে অবলোকন করছে আরেক সংসার। কালের সঙ্গে-সঙ্গে, এভাবেই কি মানুষের জগৎ ও জীবন পরিবর্তিত হয়ে চলে? একেই কি বলে জগতের চলিষ্ণুতা?
সেদিন নদীতীরে বসে থাকতে থাকতে, নিকটবর্তী ইটভাটায় সে শুনেছিল বাউলের কন্ঠে একটি ভাটিয়ালি গান। গানটি তার অনুভূতিতে অদ্ভুতভাবে নাড়া দিয়েছিল। এই অশীতিপর বৃদ্ধও কি তেমনি গভীরভাবে তার ভেতরে আলোড়ন এনে দিতে চাইছে? পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে তার মৃত্তিকাচ্ছাদিত দেহ ও সুসুপ্ত প্রাণ?
হ্যাঁ, সেদিন, নদীতীরবর্তী বাতাসে সেই ভাটিয়ালি সুর যখন ভেসে আসে, এবং সে আচ্ছন্ন হয়ে, আবিষ্ট হয়ে সেই সুরের টানে টানে মোহগ্রস্তের মতো এগিয়ে যাচ্ছিল বাউলের দিকে, ঠিক তখনি সে দূরের পথ দিয়ে যেতে দেখেছিল এই গো-শকটটি। এই বৃদ্ধই ছিল সেদিন গাড়োয়ান। বহু-বহু বর্ষ বাদে আজও সে গাড়োয়ান। সেই নদীতীরবর্তী পথে, সেই জনজীবনে তাকে যেমনটি দেখা গিয়েছিল, এখনো এই উদুম্বর গাছের ছায়ার সামনে শকটারূঢ় থাকাকালীন, এতটা সময়ের ব্যবধানেও, তাকে তদ্রুপই দেখাচ্ছে। এই গাড়োয়ানের কি কোনো পরিবর্তন নেই? জরা নেই? মৃত্যু নেই?। ক্ষয় নেই? সমস্তই যখন পাল্টে যায়— এই জগৎ ও জীবন, এই চরাচর ও প্রাণীকূল, তখন এই বৃদ্ধই বা দেশ ও কালের স্পর্শের অতীত হয়ে থাকে কী করে? কে তুমি? হে অক্ষর, অমর...
যদিও অঙ্গদ প্রশ্ন করে না। ভাবে। তখনো সে অভিন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বৃদ্ধের দিকে।
বৃদ্ধ তার নীরবতা ভাঙতে চায়। সে পুনরায় জিজ্ঞাসা করে, ‘বল, বৎস, কে তুমি?’
অতঃপর বৃদ্ধের প্রশ্নের জবাব সে নিষ্প্রাণ কন্ঠে বলে, ‘হে বয়ঃবৃদ্ধ, হে মহাপ্রবীণ, আমাকে মার্জনা করিবেন। আমি জানি না আমি কে!’
‘হে অর্বাচীন! আমি এতদপেক্ষা অধিকতর তোমার নিকট হইতে প্রত্যাশা করি নাই।’
‘কেন? তাহা কি জানিতে পারি?’
‘হে অর্বাচীন! এই ধরাধামে কোনো মনুষ্যই জানে না তার প্রকৃত স্বরূপ। সে নিজের সৃষ্টির কথাও জানে না, বিনাশের কথাও জানে না। অথচ এই সৃষ্টি ও বিনাশ লইয়াই জগৎ। প্রতিটি দন্ডে, পলে, অনুপলে সৃষ্টি যেমন চলিতেছে, বিনাশও তেমনি চলিতেছে। প্রতি অহে প্রতি রহে, একদিকে যেমন সহস্র সহস্র কীটানুকীট-মনুষ্যের জন্ম হইতেছে, অপরদিকে তেমনি সেই প্রাণের বিনাশও ঘটিতেছে। জন্ম ও মৃত্যু, সৃষ্টি ও বিনাশ, সংগীত ও কোলাহল—এই বৈপরীত্যই জগতের মূল তত্ত্ব বলিয়া মান্য করিবে।’
‘হে মহাপ্রবীণ! কিসের প্রয়োজনে, কোন সুদদ্দেশ্যে এই বৈপীরত্যমূলক তত্ত্ব তাহা শুনিতে আমার হৃদয় ও মন বড়ই ব্যাকুল হইয়া উঠিতেছে।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে পীড্যমান! জগতের এই বৈপরীত্যমূলক তত্ত্ব জাগতিক জ্ঞানের প্রয়োজনে। আর জ্ঞান সর্বদা সদুদ্দেশ্যমূলক। দুই বিপরীতমুখী গতিশীল বস্তুর ঘর্ষণে যেমন তাপ উৎপন্ন হয়, তেমনি জগৎরূপতলে সংঘটিত বৈপরীত্যপূর্ণ ঘটনাবলি থেকে সংবেদনশীল আত্মায় জ্ঞানের উদয় হয়। এই জ্ঞানই জাগতিক জ্ঞান।’
জাগতিক জ্ঞানবিষয়ক এই শ্লোকটি অঙ্গদের দুর্বোধ্য লাগে। সে অতীব বিনয়ের সঙ্গে সেই বৃদ্ধ গাড়োয়ানকে আত্মসমর্পণপূর্বক বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমার জ্ঞানাধার অতিশয় ক্ষুদ্র। আমি জীবদ্দশায় কস্মিনকালেও বিদ্যা ও জ্ঞানের নিমিত্ত পরমারাধ্যের সাধনা করি নাই। আমি ব্যাধের সন্তান। পশু ও প্রাণী হত্যাই ছিল আমার জীবন। তাই আমি বিদ্যাহীন মূর্খ হইয়াও তীরন্দাজ হইয়াছি। আমি তৃণ চিনি, তীর চিনি, শরাসন চিনি। কিন্তু অক্ষর কদাপিও না। অক্ষরচর্চিত জ্ঞান আমার নাই। এবম্বিধ কারণে, জ্ঞান বিষয়ে আমি পরাঙ্মুখ ।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! জগতে ভীরু কাপুরুষ এবং অহংকারী যারা তারাই জ্ঞান বিষয়ে পরাঙ্মুখ হইয়া থাকে। তুমি ইহার কোনটি তাহা তোমাকে নি:সঙ্কোচে জানাইতে বলি। অতঃপরই বলিয়া রাখি—জ্ঞান অক্ষরচর্চাপ্রসূত নহে। অক্ষর চর্চা করিলে জ্ঞানের চর্চা হয় ইহাতে সংশয় নাই। কিন্তু তাহা দ্বারা জ্ঞানের বিস্তার বিশেষ ঘটে না। প্রকৃত জ্ঞান অর্জিত হয় এবং জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটে প্রখর ও উন্মুক্ত দৃষ্টিশক্তি তথা সংবেদনশীলতা হইতে। সুতরাং তুমি ব্যাধের সন্তান বলিয়া তোমার কুন্ঠিত হইবার প্রয়োজন নাই। একজন উচ্চকুলোদ্ভুত পুরুষ পুঁথিচর্চা করিয়া পন্ডিত হইতে পারে, কিন্তু একজন হাড়ি-বাউরি-ডোম-মেথর-চন্ডাল বা ব্যাধসন্তান পন্ডিত না হইয়াও তদঅপেক্ষা অধিকরতর শ্রদ্ধাবান জ্ঞানী হইতে পারে। অধিক আরও বলি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পন্ডিতেরা দুর্বিনীত ও কটুভাষ হইয়া থাকে, কিন্তু জ্ঞানীরা সর্বদাই নম্র বিনীত তথা অন্তর্মুখী হয়। তজ্জনিত কারণে জগতে পন্ডিত অপেক্ষা জ্ঞানীর প্রয়োজন অধিক। ভুলিও না, তুমি ব্যাধ হইলেও এই জগতে তোমারও প্রয়োজন রহিয়াছে!’
বৃদ্ধ গাড়োয়ানের মুখনি:সৃত এই বাণীগুলি অঙ্গদের ক্ষীণবল দেহেও প্রাণের সঞ্চার ঘটাল। কিন্তু সেই সঙ্গে বৃদ্ধের অন্য একটি উক্তি তার অন্তরাত্মাকে ছুঁয়ে গেল। সে বিস্মিত হয়ে গেল বৃদ্ধের এই অন্তর্দর্শিতায়। মহাপ্রবীণের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে, সে বিস্ময়বিমূঢ় দৃষ্টিতে দু’দন্ড চেয়ে থাকল সেই অন্তরঙ্গ মহাজ্ঞানীর দিকে। বলল, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি নি:সংকোচেই স্বীকার করছি আমি ভীরু। অহংকারী নই। অহংকার করিবার মতন আমার কোনও কিছুই নাই। আমার ধন নাই, মান নাই—শৌর্য-বীর্য-প্রতাপ কিছুই নাই। এমনকি—’ বলতে গিয়েও থেমে যায় অঙ্গদ। সে কি অন্যকিছু ব্যক্ত করতে চেয়েছিল? তার এই ক্লিষ্ট দশায় মনে পড়ে যাচ্ছে তার অতীত? তার জারমণি?
অঙ্গদ বলে, ‘আমি আজ হৃতসর্বস্ব এবং ভগ্নপ্রায়। কিন্তু হে মহাপ্রবীণ! কে আপনি? আপনার স্বরূপ জানতে আমি উৎকন্ঠিত হয়ে পড়ছি। বলুন, কে আপনি?’
বলা মাত্র অঙ্গদ সামনে তাকিয়ে দেখে সেই মহাপ্রবীণ নেই। খড়ভর্তি গো-শকটটি মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বৃদ্ধের এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়াতে অঙ্গদ বিস্মিত হল কি না তা বোঝা গেল না। তার কোনও প্রকাশ নেই। সে ধ্যানস্থ পুরুষের মতো চিন্তা করতে লাগল তাঁকে নিয়ে। শ্লোকাকারে ব্যক্ত তার প্রতিটি হিতোপদেশ, তার দর্শন— এই মানব-সংসার বিষয়ে তার সারস্বত অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানগুলি নিয়ে। সেই উদুম্বর গাছের ছায়ায় উপবিষ্ট হয়ে।
তারপর, একসময়, তার গায়ে পাখির মল পড়লে, সে রুষ্ট হয়ে খসখসে ও ঝাঁকড়া একমাথা চুলসহ চোখ তুলে উপরে চেয়ে থাকে। বিষ্ঠাত্যাগী পাখিটির সন্ধানে। দেখা যায়, একটি দুটি নয় তখন আরও অনেক পাখি এসে জড়ো হয়েছে। ডালে ডালে তাদের কী নাচন! তেমনি কলরবে ব্যস্ত তারা। অঙ্গদের রোষ তৎসত্ত্বেও প্রশমিত হল না। তখনও সে স্থির ও কুপিত দৃষ্টি নিয়ে অবলোকন করতে লাগল বৃক্ষটিকে। তার নজরে পড়ে আরও বহু কিছু, যা ইতিপূর্বে সে কখনোই এমনভাবে দেখেনি। সে দেখল পাখিদের বহুবিধ কীর্তিকলাপ, গাছটির এ-ডালে ও-ডালে কাঠকুটো দিয়ে বানানো তাদের বাসা, কান্ডের গা বেয়ে পিপীলিকা আদি পোকামাকড়ের অবিরাম নি:শব্দ ওঠানামা, পাকাফলগুলিকে ঘিরে কীটপতঙ্গের ওড়াওড়ি ইত্যাদি। একই স্থানে এত প্রাণের সমাহার, অথচ সে ভ্রুক্ষেপ করেনি। তাকিয়ে তাকিয়ে ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ল সে। কিন্তু তবু আহার গ্রহণে প্রবৃত্ত হলো না। যেভাবে গত বহুবর্ষ যাবৎ সে আহার-বিহার বন্ধ করে এই বৃক্ষতলে আশ্রয় নিয়ে রয়েছে, তেমনিভাবে এই বৃক্ষতলেই অনড় থাকল। সে জঠরাগ্নির জ্বালা প্রশমিত করতে চায় না। বরং সেই অগ্নির প্রভাবে ধীরে ধীরে লীন হয়ে যেতে চায়। ধ্বংস চায় সে নিজের। অঙ্গদ মগ্ন হয়ে থেকে গেল আত্মক্ষয়ের নেশায়।
নদীর ওপারে গ্রামবাসীদের দাহভূমি। প্রায় প্রতিদিনই এই দাহভূমিতে দলবদ্ধভাবে আসছে শোকাচ্ছন্ন মানুষ। কেউ কাঁদতে কাঁদতে, কেউ বা শোকে আর্তনাদ করতে করতে, লুটিয়ে পড়ছে ধরাতলে। শ্মশানযাত্রীরা তুলে ধরছে তাকে। শোকোত্তীর্ণ হতে শোনাচ্ছে শাশ্বত বাণী।
শোকার্ত স্বজনদের সম্মুখে, দেখতে দেখতে ভস্ম হয়ে যাচ্ছে তাঁদের প্রিয়জনদের এতদিনকার সযত্ন লালিত দেহ। প্রাণপাখিহীন এই নশ্বর শরীর পুড়ে গিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে গগনমুখী। কাঠ গুঁজে দিচ্ছে চিতায়। তারই পাশে আবার নতুন করে সাজানো হচ্ছে আরও একটি চিতা। পথে পথে ধুলো উড়িয়ে আসছে আরেকটি পরিবার। শ্মশানের ধোঁয়ার মতোই, আকাশে-বাতাসে মিশে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের প্রিয়জনের জন্য বিলাপ আর কান্নার ধ্বনি।
দূরে ওই গাছের তলটিতে বসে, সামনে তাকিয়েও এসবের কিছুই অঙ্গদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। তাকিয়ে থেকেও সে যেন কিছুই দেখছে না। এতটাই জড় তার দর্শনেন্দ্রিয়।
দূরে কোথাও কোনও পথ দিয়ে চলেছে সেই বাউলবাবা। তাকে দেখা যাচ্ছে না। তবে বাতাসে ভেসে আসছে তার গান—
ও মন, কার কাছে কী পাবি রে তুই
মিছে আশায় বসে আছিস
কে ভাবে তোর আশার কথা
কোন ভিখারি কোন দেবতা
কোন সে নারী আপনারাই
খেদবে রে তোর মুখের মাছি
তুই মিছে আশায় বসে আছিস...
কোথায়, কোনদিক থেকে এই গান ভেসে আসছে, ঘাড় ঘুরিয়ে তা দেখারও স্পৃহা হলো না অঙ্গদের। সে অবনত থেকে আরও অবনত মস্তকে, গড় করার ভঙ্গিতে, ধনুকের মতো হেঁট হয়ে রইল।
এখানে নতুনভাবে জীবন শুরু করার তোড়জোড় চলছে। এই মাঠারিতে। এখানে কোথাও মরার চিহ্ন নেই। সর্বত্রই প্রাণ। এখানেও অরণ্য আছে, বহুদূর অব্দি পরিব্যপ্ত। তবে পরিবেশ এখানে দিনের বেলাতেও আঁধার হয়ে থাকা নয়। জংলি পরিবেশে মানুষ এখানে মানুষের প্রতি হিংসা পুষে অস্ত্র উঁচিয়ে আত্মগোপন করে থাকে না। প্রকৃতি আশ্চর্য একটা মনোমুগ্ধকর সান্নিধ্য রচনা করে রয়েছে।
টিলা এখানেও আছে। একটা নয়, চতুর্দিকে। তবে টিলাগুলি জিনগা-ডুংরির মতো অতটা গননচুম্বী নয়। অতটা শূন্যে উঠে যায়নি। এখানের এই চারপাশের টিলা বা ডুংরিগুলি মাঝখানের প্রায় সমতল ভূমিটিকে আগলে রেখেছে। আর প্রান্তে অবস্থিত প্রতিটি টিলাতে অবস্থান করছে একেকজন ‘দুয়ারসিনি’।
টিলার গা বেয়ে বেয়ে একেবারে মাথা পর্যন্ত ছেয়ে রয়েছে বৃক্ষ-বিরুৎ-গুল্ম। ততটা ঘন নয় বলে, টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালে যেন আকাশ ছোঁয়া যায়। এমনকি, সেখানে থেকে ‘হে-এ-এ-এ জারমণি!’ বলে প্রলম্বিত হাঁক দিলে, সমতলভূমির দিকে সে আবেগময় আহ্বান চারপাশে প্রতিধ্বনি তুলে, প্রস্তরখন্ডের মতো গড়িয়ে আসতে থাকে জারমণির কাছে।
জারমণি তখন তালপাতা কেটে এনে বানানো তাদের কাঁকাল-উঁচু কুটিরের ভেতরে থাকলেও পাটনের আহ্বান শুনতে পায়। হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে তৎক্ষণাৎ। আর দেখে এই টিলা থেকে সেই টিলা। একই জায়গায় এক অক্ষ ধরে দাঁড়িয়ে থেকে, ঘাড়ের ওপরে তার প্রলম্বিত কেশরাজিসমেত মাথাটিকে রেখে, পাক খেতে খেতে, দেখতে থাকে কোন ডুংরির কোন দিকে থেকে আসছে তার পুরুষটির এই আহ্বান।
ততক্ষণে, পূর্বমুখী টিলাটির গা বেয়ে লাফাতে লাফাতে নেমে আসছে পাটন। সঙ্গে টেনে আনছে শুকনো কাঠপাতের মস্ত বোঝা। জ্বালানি করতে। টিলার গায়ে গায়ে যেমন রাজ্যের বুনো গাছ আছে, তেমনি আবার নীচের সমতলে রয়েছে কত যে পলাশ আর মহুয়া-শিমুল। পলাশ গাছগুলির একটিও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। কোনোটি আয়েস করার ভঙ্গিতে কাত হয়ে রয়েছে, আবার কোনোটি যে-কোনও মুহূর্তে সামান্য দমকা বাতাসে যেন সমূলে উৎপাটিত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় মাটি থেকে কয়েক হাত ওপরে স্থির হয়ে গিয়েছে। জারমণি ভেঙে আনে ডাল।
আর রূপকথার মতোই, আশ্চর্য একটি পুকুরও আছে মাঠারিতে। পশ্চিমের টিলাটির পাদদেশে। নাম ইরাবতী। তার জল যেন ছাগশিশুর মতো সোল্লাসে অনবরত টলমল করছে। স্বচ্ছ সেই জলে সূর্যোদয়ের লগ্নে পড়ে সারি সারি তালের ছায়া। আবার অপরাহ্নে পড়ে দূরবর্তী টিলাটির প্রতিবিম্ব। ভোরের দিকে, পুষ্করিণী ঘেরা তালগাছগুলি, জনহীন এই নিসর্গভূমিতে প্রভাতের কুটিকা ভেদ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠান্ডা বাতাস বইলে তার শন শন শব্দ জারমণি-পাটন ছাড়া আর কারও কানে পৌঁছোয় না।
মাঠারির গ্রামবাসীরা রয়েছে আর দূরে। এখানে মানুষই নেই, অস্ত্র উঁচিয়ে আত্মগোপন করে থাকা তো দূরের কথা। কে-কার শত্রু হবে? এখানে কীসের দ্বন্দ্ব? কীসের লড়াই? অরণ্য ভিন্ন এখনে সম্পদ কই? যে-সম্পদের স্বাধিকার জাহির করতে বিজয় কেতনের মতো ভূপৃষ্ঠে সাড়ম্বরে প্রোথিত রাখা হবে সঙ্গীন?
তবু, সেই বুচাটাঙিটি এখনও তেমনি রয়েছে। পাটন সযত্নে সেটাকে রেখে দিয়েছে তাদের তালপাতার ঘরটির ভেতরে কোথাও। হয়তো জারমণি এখন সে অস্ত্রের কথা ভুলেই গিয়েছে অথবা ভুলতে বসেছে।
কিন্তু পাটন? এতটুকুও ভুলে যায়নি। সে তার হেফাজতে একটি জলজ্যান্ত অস্ত্রকে রেখেছে বলেই, চেষ্টা করেও অস্ত্রের কথা সে ভুলতে পারছে না। ভোলা সম্ভব নয়।
পাটন ভুলতে চায়ও না। এ পাটন আবার অন্য এক পাটন। জিনগা-ডুংরি থেকে মুক্ত হয়ে আসার পর এই যে পাটন, এ পাটন সেই আগের ডেলিকচার পাটন নয়। আগের পাটন সশস্ত্র দ্বারী হয়েও জারমণিকে দেখে সে ফেলে দিয়েছিল তার হাতের অস্ত্র। কেন না, সে অস্ত্রের বন্ধন থেকে খালাস পেতে চেয়েছিল।
কিন্তু এখন? জারমণিকে ‘অর্জন’ করার পর তার আবার অস্ত্রী হওয়ার কামনা জেগে উঠছে। তাহলে কি সেই জঙ্গলের মাঝে সেই প্রমত্ত পাটনকে জারমণি যে-কথাটি বলেছিল সেই উক্তিরই পরম সত্যতা বহন করে চলেছে এই পাটন? সেখানে কী বলেছিল, জারমণি?
জারমণি যা-ই বলুক না কেন, সে তা বলেছিল পাটনের কথার প্রতিকথায়। পাটন নিজেকে নিরস্ত্র করার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছিল—‘আমি অস্ত্রের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দিয়েছি। অস্ত্র অস্ত্রেরই দাসত্ব শেখায়। প্রেম হৃদয়ের মুক্তি আনে। আমি প্রেমিক। আমি কেন প্রতিটি মুহুর্তে অস্ত্রের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকব?’ জারমণি, ঠিক তখনি, প্রত্যুত্তরে বলেছিল—‘পুরুষ বলে! এটাই তোমার অভিশাপ। এই অভিশাপের খেসারত দিতে, প্রায়শ্চিত্ত করতে, যাবজ্জীবন তোমাকে অস্ত্রের অন্বেষণে হাহাকার করে যেতে হবে!’
পাটন হয়তো এতদিনে জারমণির এই কথাগুলি ভুলে গিয়েছে। কিন্তু আদৌ ভুলতে পারেনি তার এই তালপাতার ঘরের অন্ধকারে সযত্নে গচ্ছিত অস্ত্রটিকে। এই না-ভোলার মধ্যে দিয়ে সে কেবল অস্ত্রই নয়, অস্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে বহন করে চলেছে পুরুষের অভিশাপটিও। আর এই অভিশাপ ততদিন তাকে বহন করে যেতে হবে, যতদিন না এই জারমণি তার জারমণি হয়ে থাকছে।
কিন্তু কেন? পাটনেরও কি সংশয় জাগে না, এখন যে-জারমণিকে সে ‘অর্জন’ করেছে, সে- জারমণি কোন জারমণি? এই জারমণি কি তার জারমণি? নাকি এই জারমণি এখও তার জারমণি নয়? এই সংশয়ের জন্যই কি অস্ত্র? নাকি সংশয় নিরসনের জন্য অস্ত্র? সংশয় তো অন্ধকারের নামান্তর। অস্ত্র দিয়ে কি সত্যি সংশয়ের অন্ধকার দূরীভূত হয়? জ্ঞানরূপ অসি দ্বারা তাকে ছেদন করতে হয়। কে জ্ঞানী? পাটন নাকি জারমণি? জারমণি নাকি অঙ্গদ? কে জ্ঞানী? অঙ্গদ নাকি পাটন?
পাটন শিশুর মতো লাফাতে লাফাতে টিলার গা বেয়ে নামতে থাকে। নেমে আসে তাদের তালপাতার ঘরটির দিকে। ঘরের চারপাশে বেড়া দেওয়ার জন্য সে জড়ো করে রেখেছে গাদাগুচ্ছের শুকনো ডাল, পাতপালহা। কিছু লতাও ছিঁড়ে এনেছে, যেগুলো দিয়ে ডালের গায়ে ডাল রজ্জুর মতো পোক্ত বেঁধে দিতে পারে।
বাইরের আলো থেকে তালপাতার নিচু ঘরটিতে, হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকলে, ভেতরের অন্ধকারকে আরও গাঢ় মনে হয়। সেই অন্ধকারে জারমণিকে দেখতে পেল না পাটন। সেই গাঢ় অন্ধকারের মধ্যেও কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারে বলে, সে, আরও খনিকক্ষণ, তার নিজের চোখের সঙ্গে অন্ধকারের চোখ মিলিয়ে স্থির হয়ে চেয়ে রইল।
অন্ধকার ধাতস্থ হয়ে গেলে সে এদিকে-ওদিক লক্ষ করল। জারমণি কোথাও লুকিয়ে রয়েছে বলে মনে হল না। অতঃপর জারমণিকে দেখতে না পেয়ে, পাটন ঠিক এই মুহূর্তে তড়িঘড়ি দেখে নিতে চাইল তার লুকিয়ে রাখা বুচাটাঙিটিকে। যেন জারমণি এবং এই আদিম হাতিয়ার সমার্থক।
সে হামাগুড়ি দিয়ে আরও কতকটা এগিয়ে গেল। এভাবে এগিয়ে যেতে যেতে বারে বারে অনুভব করতে লাগল—ভূমিতে বিছিয়ে রাখা খেজুর পাতার তলে কাঠকড়ি ফলের মতো হড়হড় করতে থাকা মাটির শক্ত ঢেলা আর পাথরের টুকরোগুলিও। তবে অভ্যস্ত হাঁটুতে তা তেমন পীড়া দিতে পারে না। তালপাতার এই ঘরটির বিপরীত প্রান্তে পৌঁছে, সে আড়াল হিসাবে ডাঁই করে রাখা পাথর খন্ডগুলি উন্মাদগ্রস্তের মতো এদিক-ওদিক ছড়িয়ে দেয়। এই মুহূর্তে যে-কেউ এসে পড়লে, সে মনে করবে নির্জন নিস্তব্ধ দ্বিপ্রহরে ডুংরি থেকে নেমে আসা কোনও বরাহ কিংবা ভল্লুক তালপাতার ঘরটির ভেতরে ঢুকে উৎপাত শুরু করেছে। ঠিক তেমনিভাবে, পাটন, সেই পাথরে চাপা দিয়ে রাখা মোটা বাকলগুলিকেও সরিয়ে দিল। বের করল, বহু বহু যুগ ধরে মরচে পড়া অস্ত্র—সেই বুচাটাঙি! তারপর নিশ্চিন্ত মনে সেটা করতলে রেখে, সে উল্টে পাল্টে দেখতে লাগল।
পাথরগুলি সরিয়ে দেওয়াতে তালপাতার ঘরটির উল্টোদিক থেকে আলোর ফিনকি পড়ছে টাঙিটির গায়ে।
মটকিতে জল নিয়ে আসে জারমণি। ঘরে ঢুকতেই, সে দেখে ফেলে পাটনকে। পাটন ঘাবড়ে যায়। সতর্ক হয়ে সে কিছু বলার আগে, জারমণিই বলে, ‘এখনও আছেই উটা?’
‘কী?’
‘বুচাটাঙিটা।’
‘হঁ। আছে ত থাকুকেই।’ পাটন স্বাভাবিক গলায় বলতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঘরে যেটা রাখাই আছে, সেটা হঠাৎ জারমণির অনুপস্থিতিতে কেন বের করে দেখার প্রয়োজন হল, সে-কথা এড়িয়ে যায় পাটন। সে আবার পাথরের গায়ে পাথর চাপানোর আগে, ছাল-বাকলের ভেতরে হাতিয়ারটিকে গুঁজে খেজুর পাতায় আড়াল করে দেয়।
জারমণি হাসে। ঘরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকার মুখে যেটুকু আলো এসে পড়ে, সেই বিচ্ছুরিত আলোয় পাটন স্পষ্ট দেখতে পায় জারমণির দ্যোতনাপূর্ণ স্মিত হাসিটুকু। এই হাসি অবিকল সেদিনের সেই হাসি। যেদিন এরন্ড বৃক্ষে ঘেরা পুকুরটি থেকে জলপান করে উঠে, পাটন, জারমণির হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া অস্ত্রটিকে কুড়িয়ে নিয়েছিল। আর নারীর ফেলে দেওয়া অস্ত্রকে পুনরায় পুরুষের হাতে কুড়িয়ে নেওয়ার যুক্তি হিসাবে সে বলেছিল, থাক, এটা কখনও কাজেও লেগে যেতে পারে। এই কথায় জারমণি সাড়া দেয়নি। কেবল মৃদু হেসেছিল। ঠিক আজকেরই মতো।
পাটন এখনও ভেবে দেখল না, জারমণির সেদিনের সেই হাসিতে, অথবা আজকের এই হাসির ভেতরে অন্য কোনো নির্বাক ভাষা কি ছিল? ছিল কি ভাষার অতিরিক্ত কোনো দ্যোতনা? ছিল না কি, নারীর ওই ওষ্ঠে লিপ্ত অস্ত্র অন্বেষণে রত পুরুষের প্রতি সামান্যতমও করুণা?
পাটন বোঝেনি। সেদিনও বোঝেনি, আজও বুঝল না। আজ বরঞ্চ জারমণিরই মনে অন্য কোনো ভাবনা উঁকি দিল। কেন পাটন, এতদিন পর, অন্ধকারে লুকিয়ে রাখা বুচাটাঙিটিকে পাথরের তল থেকে বের করে আনতে চাইল? জারমণি সে প্রশ্ন পাটনকে করল না। প্রশ্ন করে তাকে সতর্ক করে দিতে চাইল না। চাইল না তার স্বতঃস্ফূর্ততায় বাধা দিতে। বরং সে যা চাইল, তা হল—প্রশ্ন না করেও প্রশ্নের উত্তর পেতে। আর তার জন্য জারমণি প্রতীক্ষায় থাকল। আজ না হোক কাল। কাল না হোক পরশু। একদিন না একদিন...
এই জারমণিকে পেয়ে পাটন এখন বড়ো খুশি। সে ভাবতে পারেনি, এভাবে তার অন্তর্গত মৌন আহ্বানে জারমণি সাড়া দিতে পারে। তার প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করে সে তার কাছে আসতে পারে—তাকে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করতে পারে—তাকে নিয়ে ওই আদিম ভূখন্ড ছেড়ে সে চলেও আসতে পারে এখানে। এই লোক-বসতিহীন মাঠারিতে।
তার চেয়েও তার কাছে যেটা ছিল এতদিন দুরাশা, যাকে এখন স্বপ্নের বাস্তবায়নও বলা যেতে পারে, তা হল—যে-জারমণি নানান যুক্তির নিরিখে পাটনের জীবন-অভিমুখে পা বাড়াতে চায়নি, আজ সেই জারমণিকে নিয়েই সহবাস করছে সে। যদিও এটাকে ঠিক ‘সহবাস’ বলা যায় না। আবার ভিন্নার্থে বলাও যায়। এই জন্য যে, ডুংরির শীর্ষে তালপাতার একটাই নিচু ঘর বানিয়ে তারা দু’জন একত্রে বসবাস করছে। করছে রাত্রিযাপনও।
তবু, পাটন যতই তার নৈকট্য পাচ্ছে, দিন দিন ততই তার দুর্বোধ্য লাগছে এই নারীকে। রহস্যময়ও লাগছে। তাকে ঘিরে নানান অস্বচ্ছ ও অমীমাংসিত ধারণাও পাটনের ভেতরে নির্মিত হচ্ছে, যাকে এককথায় বলা যেতে পারে সংশয়। এখন তার মনে নয়, এই সংশয় তার মনে যেমন-যেমন তীব্রতা পেতে থাকবে, তার ভেতরে অস্ত্রের চাহিদাটাও তদ্রুপ অনিবার্য হয়ে উঠবে।
ইদানীং যতক্ষণ পাটন এই মাঠারিতে থাকে, কামকাজের জন্য কিংবা এটা-সেটা বিক্রি করতে মাঠারি থেকে বেরিয়ে জার-গ মোড়ে না যাচ্ছে, ততক্ষণ, এই জনহীন বন্যভূমিতে একটা ভাবনা দিন দিন তাকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলছে। সে ভাবে, জারমণিকে সে পেয়েছে ঠিকই। কিন্তু এই পাওয়া কি তার ‘অর্জন’? জারমণি তো স্বেচ্ছায় তার কাছে এসেছে। স্বেচ্ছায় এসেছে বলে সে যে কোনও দিন যে-কোনো মুহূর্তে যে-কোনো স্থানে স্বেচ্ছায় তার কাছ থেকে চলেও যেতে পারে। তবে এই চলে যাওয়া তার গ্রামে নয়, ঘরে নয়। পলপলে সে যাবে না। সেখানে তার আর ঠাঁই নেই। আর যদি যায়ও, তাহলে তার যে কী পরিণতি হতে পারে তা নিশ্চয় তার অজানা নয়?
পলপলে না গিয়ে সে আর কোথায় যেতে পারে পাটন জানে তা-ও। তাই এখন পাটনের মনে হয়, যেভাবে হোক, যেখানে হোক যে-কোনো অবস্থাতেই হোক—জারমণির ওপর তার অবশ্যই নজরদারি রাখতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে তার স্বাধীন গতিবিধির ওপরেও।
জারমণির প্রতি পাটনের এই সন্ধিগ্ধ মনোভাব গড়ে উঠত না, কিন্তু তবু গড়ে উঠল তার প্রতি জারমণির অপ্রত্যাশিত আচরণের কারণে। জারমণি কি সত্যিই পাটনকে চেয়েছে বলে পাটনের সঙ্গে এসেছে? নাকি পাটনকে ফেলে রেখে সে অন্য কোথাও চলে যাবে বলেই পাটনকে নিয়ে এসেছে? পাটন তার জীবনসঙ্গী হবে না, সঙ্গীও হবে না, সে শুধুই হবে তার অভিমুখ। এটা আঁচ করার পরেও পাটন তাকে ছেড়ে যেতে চায় না। সে হয়তো আশা করে আছে এমনই যে, অচিরে জারমণির এই মাঠারিতে মন বসে যাবে, মন বসে যাবে তার পাটনের ওপরেও। আর তখন নিজেকে সে এমন কঠোরভাবে, নিবিড় করে, শুধু নিজেরই কাছে পাট পাট করে রাখবে না। সে নিজেকে প্রকৃত অর্থে অনাবৃত করে ছড়িয়ে দেবে পাটনের সমীপে। বলবে, ‘লে, আয় তুঁই হামার পাশকে। হামকে ছুঁয়ে দেখ। ছু।’
তখন পাটন যদি তার অভিমানবশত প্রশ্ন করে বসে, কেন এতদিন বাদে সে তাকে ডাকছে তার কাছে, তার শরীর স্পর্শ করতে?
‘এতদিন হামি তকে বিড়ে দেখলি—’
‘এতদিন লাগল হামকে বিড়তে? এতদিন?’ পাটন বিস্মিত এবং বিমূঢ়ও। যে-জারমণির জন্য সে এতদিন ধরে এতরকমভাবে নিজেকে অহরহ পীড়িত করল, যাকে স্পর্শের মধ্যে পেতে সে প্রমত্ত হয়ে উঠল এবং যে-জারমণির কারণেই রচিত হল দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ-অত্যাচারের এই বিস্তৃত অধ্যায়, যা এখনও শেষ হয়ে যায়নি এবং সর্বোপরি, যে-জারমণির জন্য পাটন জীবন উৎসর্গ করতেও পশ্চাদপদ হয়নি—সেই পাটনকে, জারমণির তখনই কি যাচাই করা হয়ে যায়নি? তারপরেও তার এতদিন লেগে গেল অগ্নি-পরীক্ষায়? তাকে বিড়ে দেখতে? এখানেও, জারমণির স্মরণে এনে দেওয়ার জন্য সে হয়তো প্রসঙ্গ টেনে আনবে ডেলিকচার। যখন সে পাটনদের ঘরে অন্তরীণ। কিংবা ডেলিকচার সেই জঙ্গল, যেখানে পাটন জারমণির জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েছিল। জনহীন জঙ্গলে তাদের দীর্ঘ কথা চালাচালির মুহূর্তে সে অনেক কথার ভেতরে এরকম একটা কথাও বলে উঠেছিল যে, আমি পুরুষ। তবুও তোমাকে ছাড়া আমার কোনো গৌরব নেই। তোমাকে ছাড়া আমি সত্যিই একা। নি:সঙ্গ আমি। ব্রাত্য আমি।
আর শুধু মুখের কথাতেই বা কেন? সে কি তার নিষিদ্ধ আচরণ দিয়েও জারমণিকে বুঝিয়ে দেয়নি জারমণির প্রতি সে কতখানি অনুরক্ত? কতটা অন্ধ? সে তো এটাও বুঝিয়ে দিয়েছে যে, জারমণির প্রতি-অঙ্গুলি পরিমাণ অনাবৃত শরীরকে তার দিব্যদৃষ্টিতে দেখার জন্য সে যার পর নাই উদগ্রীব। তার প্রতিটি অঙ্গের জন্য পাটনের প্রতিটি অঙ্গ সর্বদা জাগ্রত, উতলা ও পিপাসার্ত। এই নারী কী তা টের পায়নি? টের পেয়েছিল বলেই তো সে তাকে বলে উঠেছিল, ‘কামান্ধ পাটন!’
তবে এখন অতীতের কথায় ফিরে যেতে চায় না পাটন। জারমণি যা নিকট অতীতে করেনি, অথবা দূর-ভবিষ্যতে করলেও করতে পারে, নাও করতে পারে, তা নিয়ে এখনই সে তার কাল্লনিক বিতংস এভাবে বিস্তার করতে চায় না। সে নিজেকে যতটা সম্ভব অনুত্তেজিত রাখে।
জারমণি তাকে তার শরীর স্পর্শ করতে না দিয়ে একদিকে যেমন তার সংযমের পরীক্ষা নিচ্ছে, অপরদিকে সে দেখতে চাইছে, এখনও তার ভেতর থেকে সেই রজোগুণসম্পন্ন পাটন শবর গর্জন করে বেরিয়ে আসে কি না। কাম শরে বিদ্ধ যে-পাটনের আরণ্যক রূপ সে দেখেছে সেই ডেলিকচার জঙ্গলে। যদি এখানেও সেই একই পশু আবার তার ভেতর থেকে উল্লম্ফন দিয়ে বেরিয়ে আসে, তাহলে এই পাটনকেও সে উদ্ধত তর্জনীতে তিরস্কারপূর্বক বলে উঠবে, ‘যা তুঁই! হামি যে বসমতার উপরে পা দিঁয়ে আছি, তুঁই সেই বসমতার ল্যা ঢের ঢের ধূরকে চলে যা। চৈলে যা এখনি! যেমন আর ক-ন দিন তকে দেখতে না হয়। ক-ন দিন না!’
পাটন কি তখন চলে যাবে? না। সে চলে যাবে বলে তো জারমণির কাছে আসেনি? প্রথমবারেও আসেনি, এবারেও আসেনি। তবু প্রথমবার, সেই জঙ্গলের ভেতরে জারমণিকে নাগালের মধ্যে পেয়েও সে জারমণিকে পায়নি। তার কাছ থেকে চলে গিয়েছিল। চলে যায়নি, তাকে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। তখন সে ছিল একা। আর তার বিরুদ্ধে ছিল কত-কত গ্রামবাসী। তবু সেই গ্রামবাসীদের উপস্থিতি টের পেয়েও সে পালিয়ে যায়নি। শেষ অব্দি সে তার বক্ষসংলগ্না করতে চেয়েছিল এই নারীকে।
কিন্তু আজ? এই মাঠারিতে? এই মাঠারি থেকে সে নিজেও যাবে না, জারমণিকেও যেতে দেবে না। সেদিন ডেলিকচার বনে সে নিরস্ত্র ছিল। কেন না, ইতিপূর্বে সে ফেলে দিয়েছে তার পিঠ থেকে তূণীর, কাঁধ থেকে ধনুক আর হাত থেকে বিষদিগ্ধ তিরটিও। সেদিন তাই পুরুষ হয়ে হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দেওয়ার খেসারত তাকে কড়ায়-গন্ডায় দিতে হয়েছে। আজ সে-ভুল আর করতে চায় না। আজ যে-কোনো প্রতিকূলতাকে জব্দ করতে সে তার অভ্যস্ত হাতে ধরবে সেই বুচাটাঙি।
আর তাই মাঝে মাঝে, যখন সে একা থাকে, সেই তালপাতার অন্ধকার ঘরটিতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে, পাথর সরিয়ে দেখে আসে, অস্ত্রটি তার জাগ্রত আছে কি না। অস্ত্রের জাগ্রতাবস্থা দেখার অর্থ হল নিজেরও জাগ্রতাবস্থাকে যাচাই করা। হ্যাঁ, পাটন জেগে আছে।
জেগে আছে এইজন্য বলা যায় যে, এখন সে আগের মতো আর জয়ের ব্যাপারে দ্বিধাচিত্ত নয়! জয় তার অবশ্যম্ভাবী। কাজেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভীরুর মতো পলায়নের আর প্রশ্নই আসে না।
কিন্তু কার সঙ্গে তার এই যুদ্ধ? কে তার প্রতিপক্ষ? পাটন ততটা নিশ্চিতভাবে নিজেও জানে না। তবে তার মনে হয়, শত্রুপক্ষ আসছে। যে-কোনো দিক থেকে যে-কোনো অতর্কিত মুহূর্তে সে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে, যখনই সে জারমণিকে এই মাঠারির প্রান্তরে একা একা চলতে-ফিরতে দেখে—এই গাছপালার আড়ালে, গর্গট ঝোপের পাশে পুকুর পাড়ে কিংবা ছোটো ছোটো ডুংরিগুলির মাথায়—তখনি, এই ভাবনা আসে তার। এই আশঙ্কা থেকে পাটন যেমন জারমণির ওপর তার নজরদারি কায়েম রেখে চলেছে, তেমনি সে তার অস্ত্রটির প্রতিও খেয়াল রেখেছে। সে এমনটাও ভাবে—হয়তো জারমণিই সেই বুচাটাঙিটিকে গোপনে অপহরণ করে দিয়ে এলো পাটনের কোনো প্রতিপক্ষের হাতে। আর বলল, ‘উঠো তুমি। জাগ্রত হও। কেন নিজেকে ক্ষীণকায় দুর্বল মনে করো? মানুষের হাতের অস্ত্রই হল শক্তি। যাহ, তুমি এই শক্তি লইয়া তোমার শত্রুর মুখোমুখি হও। মুন্ডচ্ছেদ কর তার!’
তালপাতার ঘরটি থেকে হামাগুড়ি দিতে দিতে, পাটন যখন সবে কৃকলাসের মতো মুখটি বাড়িয়েছে, দেখে চারপাশের টিলাগুলিতে হাজার হাজার ভোরের পাখি। ভোরের রাঙা আলো পেয়ে, ইরাবতীর পাড়ের তালগাছগুলিতে কালিন্দীদের ল্যাংটো শিশুর মতো দোল খাচ্ছে বাসার গায়ে গায়ে লেপটে থাকা বাবুই পাখিগুলি। আর জারমণি?
জারমণি ধাপ বেয়ে উঠে যাচ্ছে। গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে। শ্রোণীভারা অলস গমনা। যেন তার প্রতিটি মুদ্রায় বেজে উঠছে ভৈরবীঠাঁট। আহা জারমণি! কোথায় চলেছে? কতদূরে?
পাটন হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে ঢোকে। বের করে আনে বুচাটাঙি।
অঙ্গদ সেই উদুম্বর গাছের ছায়ায় হেটমুন্ড হয়ে পড়েই আছে। সম্মুখবর্তী শ্মশানে তখন চিতা জ্বলছে। ইতস্তত ঘোরাফেরা করছে দুটি-একটি কুকুর। কৌ গাছের ডালে কর্কশ ডেকে চলেছে কাক। কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে আসমানে। গাছের সামনে ঢিপির ওপারে বসে রয়েছে শোকার্ত পরিবার। মন তাদের বিষাদগ্রস্ত। তারা দেখছে বহ্নিমান চিতা।
অঙ্গদের সামনে পড়ে আছে এক পতরি অন্নব্যঞ্জন। একটু আগেই যা রেখে গেছে কোনো এক গ্রামবাসিনী। অপর এক জাম্বুবতী। মাছি বসছে তাতে। উড়ে উড়ে। শ্মশান বিমুখ হয়ে একটা ক্ষুধার্ত সারমেয় ঢিপির ওপর দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ থেকে তাকিয়ে রয়েছে গাছের তলায় সেই স্তূপীকৃত ভাতের দিকে। যে-কোনো মুহূর্তে সে শালপাতা শুদ্ধু কামড়ে টেনে নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু সে দ্বিধায় রয়েছে। গাছতলায় উপবিষ্ট মানুষটি এখনো জীবিত না মৃত?
কুকুরটিকে আড়াল করে এসে দাঁড়াল সেই গো-শকট। সেই সাটিক হাতে বৃদ্ধ গাড়োয়ান, সেই গাভীদ্বয়, আর গাড়ি ভর্তি খড়। আগের মতোই প্রশান্তিপূর্ণ নির্বিকল্প তার দৃষ্টি, কন্ঠস্বরেরও কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাতে গোরু খেদানের সাটিক নিয়ে, গাড়িতে বসে থেকে, সেই বৃদ্ধ একটি সম্বোধন মাত্র উচ্চারণ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করল অঙ্গদের, ‘বৎস’!’
আচমকা এই সম্বোধনে অঙ্গদ সচকিত ও বিস্মিত হয়ে তাকায়। গাড়িতে বসে থেকেই গাড়োয়ান বলে, ‘বিস্মিত হইয়ো না। আমি ছিলাম, আমি আছি এবং আমি থাকবও।’
অঙ্গদ বলে, ‘তুমি যদি ছিলে, তবে কেন তুমি আমার চোখে দৃষ্ট হও নাই? কেন তুমি আমার জিজ্ঞাসার জবাব না দিয়ে অন্তর্ধান করলে? এক্ষণে বল— কে তুমি? তোমার যথার্থ স্বরূপ উন্মোচিতকর।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! আমি সর্বদাই আছি। তৎসত্ত্বেও আমার দর্শন পাওয়া যায় না। আমার উপস্থিতি, আমার অস্তিত্ব, জ্ঞানচক্ষু দ্বারা অনুভব করিতে হয়। আমি একই সময়ে সদাসর্বদা সর্বত্র বিরাজমান। আমার শৈশব-যৌবন নাই, জরা নাই, মৃত্যুও নাই। আমি লোকক্ষয়কারী প্রবৃদ্ধ মহাকাল। লোকসমূহ সংহার করিতে আমি এখানে প্রবৃত্ত আছি।’
অঙ্গদ নতমস্তকে দন্ডবত করে। ললাট উন্নত করে বলে, ‘হে প্রবৃদ্ধ! হে মহাপ্রবীণ! আমার ঔদ্ধত্য ও কটুভাষ মার্জনা করিবেন।’
মহাপ্রবীণ অঙ্গদকে মার্জনাপূর্বক কহিলেন, ‘বৎস, কী তোমার ক্লেশ? নিবেদন করো। তোমাক দেখিয়া মনে হইতেছে, তুমি জীবন ও জগৎ সম্পর্কে যাবতীয় উদ্দীপনা, সম্যক আশা হারাইয়া ফেলিয়াছ। অনন্ত জীবন-প্রবাহ হইতে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়াছ।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আপনি যাহা ব্যক্ত করিলেন তাহা সর্বাংশ সত্য। আমি, বাস্তবত, জীবন ও জগৎ বিষয়ে সম্পূর্ণ হতোদ্যম হইয়া পড়িয়াছি। মানব শরীরে মনই হইল তাহার পঙ্খ। আমার পঙ্খ কর্তিত হইয়াছে। ফলত আমি আর উড্ডয়ন-সক্ষম নই। মন যখন ধ্বস্ত হইয়া যায়, সে-মানবদেহ পক্ষীহীন খাঁচার তুল্য। বাতাস তাহাকে উপহাসের ছলে দোলাইতে থাকে। হে লোকক্ষয়কারী! আপনি কৃপা করিয়া আমার শরীররূপ খাঁচাটিকে অনতিবিলম্বে ধ্বংস করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! জগতের কোনো একটি তৃণখন্ডকেও আমি যদৃচ্ছাক্রমে ধ্বংস করিতে পারি না। যদ্যপি আমি পার্থিব সমস্ত কিছুরই ধ্বংসকারী। বিনাশক। প্রকৃতপক্ষে, তা এই জগৎ চরাচরের। প্রতিটি বস্তু নিজের নিয়মে আমার প্রভাবেই ধ্বংস হইয়া যায়। তোমার এই দেহও তদ্রুপ। এখনি তাকে ধ্বংস করিবার ক্ষমতা আমারও নাই। যাবৎকাল তুমি জীবিত থাকিবে, তাবৎকাল এই দেহ লইয়াই তোমাকে জীবন যাপন করিতে হইবে। অতএব মনকে উজ্জীবিত কর, শরীরকে তেজস্বী কর, নচেৎ তোমার দুর্গতির অবসান তো হইবেই না, তুমি অধিকতর দুর্গতির সম্মুখীন হইবে। হে ক্লিষ্ট, তুমি উঠিয়া দাঁড়াও! তুমি এই উদুম্বর বৃক্ষের তল হইতে সরিয়া আইস।’
অঙ্গদ বলল, ‘হে বিনাশক! আমি নিজের মতো করিয়া নিজেই আত্মধ্বংসের পন্থা নির্ণয় করিয়া লইয়াছি। আমি বহুবর্ষ যাবৎ আহার-বিহার বন্ধ করিয়া স্থানুবৎ পড়িয়া আছি। তাহাতেই আমি কৃশ হইতে কৃশতর হইয়া, বল্মীকে রূপান্তরিত হইতেছি। এমতাবস্থায় আরও কিছুকাল অতিবাহিত হইলে, অবশেষে কোনো এক সায়ংকালে এই ধরাধাম হইতে মুক্তি পাইব। এই যে আমার অন্নব্যঞ্জন, গ্রামবাসীরা আমার প্রতি উদার ও করুণাচিত্ত হইয়া রাখিয়া গিয়াছে। কিন্তু আমি তাহার প্রতি লুব্ধ হই নাই, তাহা স্পর্শও করি নাই।’
মহাপ্রবীণ দেখলেন, সেই অন্নব্যঞ্জনের ওপরে ভন ভন করছে শতশত কালো মাছি। পরম উৎসাহে তারা ভক্ষণ করে চলেছে। উল্টোদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি উঁচু ঢিপির উপরে তখনো লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা সারমেয়কেও দেখলেন। তারপর...
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে প্রায়োপবিষ্ট! তুমি এই মুহূর্তে অনবরত কোলাহলময় জটিল জগৎসংসার হইতে পলায়নোন্মুখ। তুমি প্রচলিত অর্থে নিষ্কর্মা হইয়া রহিয়াছ। প্রায়োপোবেশন করিয়া কালাতিপাত করিতেছ। নিষ্কর্মার মৃত্যু হইল শুধুই ‘মরণ’। তাহা অধোগমন। মুক্তি নহে। প্রকৃত কর্মযোগীর মৃত্যু হইল মুক্তি। তোমার কর্ম নাই, উপরন্তু সংসারের প্রতি বীতরাগ হইয়া তুমি এমন মানব শরীর লাভ করিয়াও এখন পশ্চাদগমন করিতে চাহ। ইহাও কদাপি সম্ভব নহে। জীবের জন্মই হয় মৃত্যুর নিমিত্ত। তথাপি প্রাণীকুল কখনো জীবদ্দশায় মৃত্যুর কথা স্মরণে আনে না। তাহা বিস্মৃত হইয়া কর্ম করে। মানুষের কর্মই মানুষের সদগতি আনে। হে হতোদ্দম, হে কর্মবিমুখ, তুমি কর্মের প্রতি আগ্রহান্বিত হও।
‘অপিচ, ইহাও শুনিয়া রাখ—অপরের উপহার স্বরূপ অন্নাহার তোমার সম্মুখে থাকা সত্ত্বেও তুমি তাহা গ্রহণে এযাবৎকাল অনিচ্ছুক রহিয়াছ—শত শত মক্ষিকা তাহা উদরস্থ করিতেছে। ইহার দ্বারা তুমি ওই উদার গৃহস্থের ও আহারের অবমাননা করিতেছ। ফলশ্রুতিস্বরূপ পরজন্মে তোমাকে এইরূপ ঘৃণ্য মাছি হইয়াই নরকদ্বারে পাপীষ্ঠের জীবন অতিবাহিত করিতে হইবে। আবার, ওই দূরে বিপ্রতীপ অবস্থান লক্ষ করিয়া দেখ, এখনো সেই অভুক্ত সারমেয় তোমার এই পাতের দিকে ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিয়াছে। তুমি তাহাকেও বঞ্চিত করিতেছ। এখনো যদি তুমি এই অন্ন উদরস্থ না কর, তাহা হইলে ওই ক্ষুধার্ত কুকুরের শাপে জন্মান্তরে তোমার সারমেয় গতি হইবে। অতঃপর, হে শীর্ণকায়, তুমি প্রায়োপবেশনের ইচ্ছা পরিহার করিয়া অন্নগ্রহণ কর। বলিষ্ঠ হও। তুমি উঠিয়া দাঁড়াও। এই উদুম্বর বৃক্ষের তল হইতে সরিয়া আইস তুমি।’
অঙ্গদ সেই বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মনে কয়েকটি শব্দকে বারে বারে উচ্চারণ করে চলে। বৃদ্ধের সারবান উপদেশাবলী যতটা সম্ভব সে হৃদয়ঙ্গম করতে রীতিমতো প্রয়াস চালায়। যদিও, তার মনে হয়, সে যেন তাঁর যোগ্য অনুসরণের পাত্র নয়। প্রায়ই তার খটকা লাগে। দুর্বোধ্য বলে মনে হয় তাঁর শ্লোকগুলি।
মহাপ্রবীণ তাকে এভাবে তাঁর মুখের পানে চেয়ে থাকতে দেখে বলে ওঠেন, ‘বৎস, তুমি কি কিছু ব্যক্ত করিতে চাহ?’
অঙ্গদ বলল, ‘হে প্রাজ্ঞ! আমার গ্রহণক্ষমতার দৈন্য হেতু আপনার অনেকানেক ব্যক্ত বিষয় আমি অনুবর্তনে অপারগ হইয়া পড়ছি। তথাপি, আপনার ভাবময় মিষ্টভাষা আমার বোধে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনৃজু হওয়া সত্ত্বেও তা শ্রবণ করিতে আমার উত্তরোত্তর আগ্রহ বৃদ্ধি পাইতেছে। হে চিরঞ্জীব, আমাকে সরল করিয়া বলুন কর্ম কী? যোগ কী? কর্মযোগীই-বা কাহাকে বলে? সদগতিই-বা কী?’
মহাপ্রবীণ উবাচ..
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে গুড়াকেশ! তুমি আমার নিকট হইতে যাহা যাহা জানিতে চাহ, আমি তৎসমুদায় তোমার গ্রহণের উপযুক্ত করিয়া সংক্ষেপতঃ বর্ণন করিতেছি। এক্ষণে আমার নিকট তাহা শ্রবণ কর। জগতে প্রাণীকুল যাহা সম্পাদন করিতেছে তাহাই কর্ম। কিন্তু তাই বলিয়া সমস্ত কর্ম সম্পাদনেযোগ্য নহে। যে-যে কর্ম করিলে তাহা ব্যক্তির, সমাজের তথা রাষ্ট্রের প্রতিকূল হয়, মানবের অহিত হয়, বিবেকের ক্ষয় বা দংশন হয় তাহা এককথায় ‘বিকর্ম’ বা ‘কুকর্ম’ বলিয়া জানিও। বিকর্ম সর্বদাই পরিত্যজ্য। ইহা ব্যতিরেকে কিছু কর্ম আছে, যাহা অনিবার্য বা অপ্রতিরোধ্য কর্ম, যাহা না করিলে প্রাণীকুল বাঁচিয়া থাকিতে পারে না, যেমন আহার-নিদ্রা-শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ। মানুষ ইচ্ছা করিলেও ইহার কোনো একটিও ছাড়িতে পারে না। সাধারণভাবে ‘যোগ’-বলিলে উপায় বা উপার্জন, মিলন, কাল, শুভকাল, ধ্যান, অবলম্বন, তন্ময়তা ইত্যাদি বুঝাইলেও ‘যোগ’ -এর অর্থ আরও ব্যাপক। ক্রিয়া তখনই যোগ হয়, যখন সেই ক্রিয়ার সহিত কয়েকটি গুণবাচক লক্ষণ প্রকাশ পায়। যথা—কৌশল, একাগ্রতা, বুদ্ধি এবং নিষ্কামতা।
‘কর্মযোগী, তিনিই, যিনি আসক্তিহীন হইয়া একাগ্রচিত্তে কৌশল প্রযুক্ত কর্ম করিয়া আত্মাকে উন্নত স্তরে লইয়া যাইবার প্রয়াসে রত থাকেন। এইভাবে কর্ম করিয়া চলিলে আত্মার স্বর্গলাভ হয়। তাহাই হইল আত্মার সদগতি প্রাপ্তি বা মুক্তি। আমার এইরূপ অভিমত।’
অঙ্গদ বলল, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি ইহা শুনিয়া অতিশয় তৃপ্তবোধ করিতেছি। কিন্তু আমি আমার অন্তরের অতৃপ্তি যে কোনো প্রকারেই বিস্মৃত হইতে পারিতেছি না।’
‘কী তোমার অন্তরের অতৃপ্তি?’
‘যে-নারী আমার প্রতীক্ষায় ছিল, আমি তাহার প্রতীক্ষাকে অমর্যাদা করিয়াছি। তাহাকে নিরাশ করিয়াছি। তাহাকে বিপদ হইতে উদ্ধার করা তো দূরে থাক, আরও বেশি বিপদের পানে ঠেলিয়া দিয়া আমি পলাইয়া আসিয়াছি। এক্ষণ, সেই নারীর কাছে আমি নারীর অমর্যাদাকারী এবং বিশ্বাসঘাতকও।’
‘কে সেই নারী যাহার প্রতি তুমি এরূপ অনভিপ্রেত ব্যবহার করিলে?’
‘সে আমার বাগদত্তা।’
‘সে যদি তোমার বাগদত্তা-ই, তাহা হইলে তুমি তাহার নিকট হইতে পলায়ন করিয়া আসিলে কীসের নিমিত্ত?’
‘পলায়ন না করিলে আমাকে সংঘর্ষণের মোকাবিলা করিতে হইত। আমি পলায়ন করিয়াছি ভীরু ও কাপুরুষ বলিয়া। আমি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে অপটু বলিয়া। আমি যে-কোনো ধরনের রক্তক্ষয়ী বিবাদকে মানবতার পরাজয় জ্ঞান করি বলিয়া। সর্বান্তে, আমি তুচ্ছ একটি নারীর জন্য লড়াই করিয়া মরিতে চাহি না বলিয়াও। তাই আমি নিজের জীবন বিপন্ন করা অপেক্ষা পলায়নকে শ্রেয়স্কর বিবেচনা করিয়াছি।’
‘তুমি কি নিশ্চিত যে সংঘর্ষ বাধিয়াছে এবং তুমি তথায় উপস্থিত হইলে, তোমাকে তাহাতে লিপ্ত হইতে হইত?’
‘না, আমি নিশ্চিত নই।’ অঙ্গদ স্বীকার করে সে ইতিমধ্যে যা বলেছে, তার সবটাই সে বলেছে সংঘর্ষ ঘটতে পারে, এই আশঙ্কা থেকে। এমনও হতে পারে, কোনও সংঘর্ষ, কোনো লড়াই-ই হয়নি। এবং সেই নারী এখনও অঙ্গদের প্রতীক্ষায় আছে। অথচ অঙ্গদ স্রেফ লোকমুখে উড়ো খবরের ভিত্তিতে পালিয়ে এসেছে অকুস্থল থেকে। অথবা এমন হতে পারে—ওই খবরটি তার কাছে পৌঁছে দেওয়াটাই অভিসন্ধিমূলক, যাতে সে ভয়ে অন্যত্র প্রস্থান করে এবং তার বাগদত্তা অপর পুরুষের এক্তিয়ারভুক্ত হয়ে যায়।
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! তুমি সত্যিই ভীরু কি না, তাহার মীমাংসা বাদে হইবে। নারী সত্যিই তুচ্ছ-অকিঞ্চন কি না, তাহারও মীমাংসা বাদে হইবে। কিন্তু এখন বলা যায় যে, তুমি ভয়ে পলাইয়া আস নাই—ভয়ের সম্ভাবনাকে ভয় পাইয়া পলাইয়া আসিয়াছ। এক্ষণ তোমার উচিত, তুমি নিজ উদ্যোগে যথায় প্রয়োজন তথায় গমন করিয়া এ বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও যথার্থ সংবাদ সংগ্রহ করিয়া আন। কোথায় অবস্থান করিতেছে সেই নারী? কেমন দশায় সে দিনাতিপাত করিতেছে? সে কি অদ্যাবধি তোমার প্রতীক্ষায় রহিয়াছে? তোমাকেই বাঞ্ছা করে? কিন্তু তাহার পূর্বে, হে ক্লিষ্ট, অন্নভোজন কর, বলিষ্ঠ হও। আর এই উদুম্বর বৃক্ষের ছায়া হইতে ত্বরায় বাহির হইয়া আইস। যাও তুমি—গ্রামে গ্রামে, দেশে দেশে। যাও তুমি হাতে করঙ্ক লইয়া সে-নারীর সন্ধানে ভ্রমণ কর। সংবাদ লইয়া আইস তাহার।’
দীর্ঘদিন অভুক্ত অঙ্গদ সেই বলবর্ধক অন্নব্যঞ্জন গোগ্রাসে ভক্ষণ করল। তারপর সে গো-শকটে বসে থাকা বৃদ্ধ গাড়োয়ানকে বলল, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি এই মুহূর্তে নিরস্ত্র। নিরস্ত্র হইয়া কেমনে এ কাজ করিব? আমি দুর্বল। তাহার উপর আমার ঢাল নাই, তরোয়াল নাই। পথেঘাটে আজিকাল প্রাণঘাতী শত্রুর অভাব নাই...’
মহাপ্রবীণ তখন তাঁর হাত থেকে বুয়ানের ছোট্ট ডালটি অঙ্গদকে ধরিয়ে দিয়ে বললেন ‘ইহাই তোমার অস্ত্র! এই অস্ত্র লইয়া যাহ তুমি সেই দূর দেশে। যাহ—’বলতে বলতে উধাও হয়ে গেলেন।
অঙ্গদ বেরিয়ে পড়ল।
ওদিকে ওরাও নিশ্চিন্ত হয়ে বসে নেই। লাগু রেখেছে অনুসন্ধান। গ্রামে গ্রামে বেরিয়ে পড়েছে ওরা। তবে ওদের হাতে ভিক্ষাপাত্র নেই, গোরু খেদানোর জন্য ব্যবহৃত বুয়ান গাছের সরু ডালটিও নেই। আছে হাতে হাতে ডাং-লাঠি। ওরা এখন, কয়েকজন ‘দেখা মাত্তর ঢাঁড়াও’ পন্থা নিয়েছে। তারপর, গ্রামের ষোল আনার বিচারে যা হওয়ার হবেক। দেখা যাবেক।
‘আগে মাইরে শালাকে সুখ করে লিব।’ সঁডু হড়বড় করে পা চালিয়ে যেতে যেতে বলে। তার কাঁচফাটা কুয়াশাচ্ছন্ন চশমায় পথের আবডাব ঠিকমতো দেখতে না পেয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে—হাতের বুধুয়া ডান্ডাটি নিয়ে। সঙ্গীরা দাঁড়ায় না। আড়শা রোড ধরে তারা যেন মুরি লাইনের শেষ বাস ধরার তাড়া নিয়ে লদপদ করে চলেছে। এ-ওর কাঁধে কনুইয়ে ঠুঁকাঠুঁকি করে।
সঁড়ু আঁঠু মচকে যাওয়া ব্যথা অনুভব করে। ল্যাংচাতে থাকে। সে ডাক দেয়, ‘এ ফৈকরা! ডাঁড়া রে ভাই, ডাঁড়া! পড়ে হলি তরা নাই দেখতে পালি?’
ফৈকরাসহ ওরা পিছন ফিরে তাকায়। সত্যিই তো! কেউ খেয়ালই করেনি সঁড়ুদ্দা কখন পড়ে গিয়েছে। ফৈকরা কাছে এসে বলে, ‘তুমার ক্যালার না চলার জুত আছে, না চশমার জুত আছে। এমন দেখনশভা চশমা পরার কী দরকার?’
‘না না ঠিকেই আছে।’ অশ্বিনী আবার র্যাঁদার উপর বাঁশলা চালায়। বলে, ‘কানার পা খালেই পড়ে।’
কানা বলে দেওয়াতে সঁড়ুর সম্মানে লাগে। খুব গম্ভীর হয়ে সে প্রতিবাদ করে। বলে, ‘ঔশা, ইটা তুঁই ঠিক বললিস নাই। শ্লা, হামার লেটে বিহা না হলে তোর পারা দু-দুটা ব্যাটা হত। আর তুঁই কি-ন আমাকে কানা বলছিস? কালদিন তোর বাপকেও বলবিস?’
‘আই দেখ! বাপ কাঢ়াস না, বাপ কাঢ়াস না! তুঁই হামাকে যে গালবাখান দিবিস দে। হারামি বল, বকাচদা বল। কিন্তুক যদি বাপ কাঢ়াবিস—’
‘লে, লে, অমন হয়। তার জন্যে নিজেদের ভিৎরে রাস্তায় লড়হাই লাগতে হবেক নকি?’ হেমন্ত তাদের ঠান্ডা করে। কিন্তু সে বড়ো জুতসই উপসংহারও টানে। বলে, ‘হামরা বাহারের শত্রুকে মারব কি, ঘরে-ঘরেই হামাদের দুশমণি।’
আড়শা রোড বরাবর এগিয়ে ওরা জীবনডির মোড়ে আসে। মোড়ের চা-পকড়ির দোকানগুলি কেমন মরা-মরা দেখায়। গাঁজাথাসা পুনকা শাকের মতোন। খদ্দের নেই। শরাবন পড়ে গেল। বৃষ্টিও নেই। তাছাড়া এসময় চাষবাসের ব্যাপারে জোগাড়-জাতি করতে হয় বলে, গ্রামবাসীদের হাতে নগদ পয়সাও থাকে না। দোকানগুলিতে চেয়ার বেঞ্চি ফাঁকা। লোচ-কাটার মত মুখে লালার সুতো তুলে হাই তুলছে দোকানি। ভিয়েনের কারিগর পা ছড়িয়ে বেঞ্চিতে বসে খাড়ি নিমকি কাটার ছুরি দিয়ে পা নুচছে।
দোকান দেখে সঁড়ুর এক কাপ চা খেতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু পৈসা কই? আবার পয়সা যে তার নেই, তাও বলা চলে না। এব্যাপারে তার নিজস্ব একটা নীতি বা ভাবনাচিন্তা কাজ করে। পয়সাকে সে চ্যাং মাছ মনে করে। যেটা পকেটে নিয়ে বেরলে যে-কোনো সময় অন্যের ঝুড়িতে পড়তে পারে। এই খরচের ভয়ে রাস্তায় বেরলে সে টাকাপয়সা নিয়েই বেরোয় না। অথচ গ্রামে থাকলে বিরাট ফুটানি দেখায়! যখন-তখন হস্তব্যস্ত হয়ে, হাতে একটা নম্বরী নোট নিয়ে আসে। হয়তো বিহারী কিংবা বাঁকু কিংবা আর যে কাউকে হোক, তার কাছে গিয়ে বলে, ‘বাঁকুদ্দা, দাদ্দা-দাদ্দা-দাও ন এইটার খুচরা। ঘরে মাংস-আইলা শ্লা বৈসে আছে, দাম চুকাতে হবেক।’
সুয়া-শ টাকা দরের মাংস সঁড়ুরাম যে কত খায়, তা কারো জানতে বাকি নেই। বাঁকুও তেমনি বলে, ‘য়েজ্জাহ। টুকু আগুই আসতে হয় ন? এই এখনি জীবনডির মৈলুল জলহা আইসে ঘরে বসেছিল। উয়াকে বউয়ের একজড়া শাড়ির দাম চুকালি।’ এই কথা শুনে হাসতে থাকে সবাই।
তবে সঁড়ুর কিন্তু আয়-উপায় হয় ভালো। বছরে সনলা সুঁটি বিকে, গোবর বিকে তার নগদে বহু আয়। চার-পাঁচটা সনলা গাছ আছে বাড়ি ধারে। কম করে হলে দু-তিন বস্তা করে সুঁটি সিরকাবাদের বাজারে নিয়ে গিয়ে পাইকারের ডেরায় ফেলতে পারলে কড়কৈড়া তিনটি নম্বরী। আর গোবরকুঁড়টা তো চাষিকে চুক্তি দেয়। নিজের ক্ষেতেও ফেলে। কাড়া-গোরু আছে ঢের। সঁড়ু কি আর যে-সে সঁড়ু!
জীবনডির মোড়েও ওরা আর দাঁড়ায় না। ফক করে ডানদিকে নেমে রম-পম হেঁটে সদলবলে এগিয়ে চলে। সিধা ডেলিকচা। জঙ্গলে ঢোকার আগে, ওদের দেখা হয়ে যায় গুজর মুদির সঙ্গে। মাথায় ভ্রাম্যমান হাটমশলার দোকান নিয়ে আসছে।
গুজরও পলপল-আইলাদের দেখতে পায়। তাদের এই অবস্থায় দেখে সে বুঝে যায় তারা কী মতলবে কোথায় চলেছে। তবু কাছাকাছি আসতে সে যেন কিছুই জানে না, বকাভঁড়, এমনি ভাব করে বলে, ‘হই! তুমরা য্যা ব? ডাং-লধড়া নিয়ে কথাকে? পাছে কাড়া ঘুরাতে যাছো নকি?’
‘কাড়াকে ত হামরা খুজেই পাছি নাই।’ কল্যাণী মাহাত বলে, ‘খুজে পালে তবে ন উয়াকে ঘুরাঁয় ঘদদিগে নিয়ে যাব? ছানি২০ খাওয়াব।’
‘হ্যাঁ সঁড়ুখুড়া, কথায় যাছো? ডেলিকচা নকি?’
‘হঁ, ওই শ্লা খাইড়াদের খোঁজে।’
‘অ বাবা!’ গুজর প্রচলিত প্রবাদের সুর টেনে বলে, ‘তুমাদের এখনো বিহার বাদে ছামড়ায় লাচ চলছেই?’
সঁড়ুও হাসতে হাসতে বলে, ‘বিহার বাদে মানে? বিহা ত হয়েই নাই?’
‘ধৌর। ফালতা কথা বাদ দাও ন।’ ফৈকরা অধৈর্য্য হয়ে বলে, ‘এ গুজর, আরেকবার জারমণির খোবোরটা টুকু আইনে দে ন মাইরি। পারবিস?’
‘না ভাইরে! তাবাদে হামার দিয়া খোবোরে যদি না মিলে, তখনকে বলবিস—এই শালা গুজরকেই ছ্যাঁচ! হামি আর সিয়াইডিগিরি করব নাই। সাতো করলেও তদের ল্যাঠায় থাকব নাই আর।’
সঁড়ু বলে, ‘নাআ, স্যাটা ক্যানে হবেক। তবে হামরাও বৈসে ত নাই। তকলি ঘুরাছিই। উয়াদের একটাকে যদি মিলে যায়, তাহলেই জারমণির খোবোর মিলে যাবেক। কথায় বলে—’ সঁড়ু বিহারীলালের মুখ থেকে সদ্য শোনা প্রবাদটি উল্লেখ করে, ‘মাহাত মাথায় মুদির ঘঙ/সরা-সানকি একেই সঙ।’ ক্ষেতে মাঠে চাষের কাজে পড়ে থাকা মাহাত বউদের সঙে পুকুরকাটা মুদিদের পিরিত করার বিষয়টি এই লোককথাটির মাধ্যমে ফাঁস করে দেওয়াতে গুজর আর সেখানে দাঁড়ায় না। মাথায় ভার নিয়ে গম্ভীর হয়ে চলে যায়।
জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়ে ওরা। লোকজন নেই। গা ছম-ছম নিস্তব্ধতা। দূরে কাছে জোড়া ঘুঘু ডাকছে। যদিও বর্ষাটা পড়ল না বলে জঙ্গলের গাছপালাও ফনফন করে বেড়ে ওঠেনি। বড়ো বড়ো গাছগুলিকে ঘিরে ঝোপ-ঝাড়গুলি শুকিয়ে মাকড়ির জালের মতো হয়ে রয়েছে। কাঁটা ঝোপের মাথায় লেপ্টে থাকা তক্ষকের সিড়িংসিটিং বাচ্চা আপন মনে দোল খাচ্ছে। বাতাসে মহুল মদের গন্ধ।
ওরা অঙ্গদ শবরের ঘরের কাছাকাছি এসে পড়ে। তালগাছটি থেকে এগিয়ে একটু তফাতে এখনো প্রাচীন ডালপালা বিস্তার করে দাঁড়িয়ে আছে সেই রতন কৈড়লা গাছটি। এই সেই গাছ, যে-গাছের তলায় জারমণি এসে দাঁড়িয়েছিল রাতের অন্ধকারে। যেদিন সে অঙ্গদের সঙ্গে পলপল থেকে পালিয়ে আসে। নানান ঘুরপথ দিয়ে, অঙ্গদ, জঙ্গলের ভেতরে তাদের এই ঘরে জারমণিকে নিয়ে আসে। তবে এনেই সে ঘরে ঢোকায়নি। এই গাছটির তলায় দাঁড় করিয়ে রেখে, সে, দুলকি চালে ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। সদরের টিনের ফড়কি খোলাই ছিল—সব সময় যেমন থাকে। অঙ্গদ আবার তক্ষুণি ঘর থেকে বেরিয়েও আসে। তারপর গাছতল থেকে ঘরে নিয়ে ঢোকায় সেই ‘কালকুদরি’ কালনাগিনীকে। এই কালনাগিনী ঘরে ঢোকার পর থেকে...
এখন আর সদরে দরজা বলে কিছু নেই। ফড়কিটি নেই, নেই ঘরের চারপাশে ডালপালার বেড়াও। জারমণির খোঁজে এসে তারা সব তছনছ করে দিয়েছে, সেগুলি আর নতুন করে খাড়া করা হয়নি। বাঁধা হয়নি বেড়াও। কে জঙ্গলের ভেতর থেকে ডাল কেটে আনবে, রুলি কেটে আনবে? শক্ত হাতে কুড়ুল ধরে চোট মারবে এমন কোনো পুরুষ মানুষ নেই।
থাকার মধ্যে ঘর আগুলে পড়ে আছে ওই বুঢ়া সহদেব শবর। আঙনায় পুরানো সনলা মুঢ়া যেমন পড়ে থাকে। এখনো সে আগের মতো খাট দখল করে আছে। তবে শুয়ে নেই। বসে বসে দুটো হাঁটু অল্প অল্প কাঁপাচ্ছে আর খোঁয়াড়ের বাইরে রুগণ-প্রায় শূকর-শূকরীগুলি নির্জীব পড়ে থাকতে দেখে বিচলিত হয়ে ডাক পাড়ছে তার ভাইয়ের বউকে। মেনকাকে।
মেনকা বোধ হয় তার ছোটো-নুনিকে নিয়ে ক্ষেতের আলে আলে গর্তগুলিতে ইঁদুর খুঁজে বেড়াচ্ছে। সহদেব এবার সেই একইভাবে তার বউকেও ডাকে। কিন্তু সঞ্চারীও এই বুঢ়াটির ডাককে আজকাল তেমন গ্রাহ্য করে না। কথায় কথায় বিরক্ত হয়। রেগে যায়। সহদেব তখন হাঁটুতে বাতের যন্ত্রণা নিয়ে নিজেই উঠব-উঠব করে, সঞ্চারীর উদ্দেশে বলে, ‘হ্যাঁ গো, তরা আছিস ন পাছে মললিস? এতবার যে হাঁকাছি ত নাই রা দিতে হয়?’
‘আর কত রা দিব? কতকাল ধরে ডাকবিস তুঁই? ভগবান তকে নাই ডাকছে?’ ঝনঝনে গলায় বলতে বলতে, ঘরের ভিতর থেকে আঁচলা মাটিতে লুটিয়ে, বেরিয়ে আসে সঞ্চারী। একটু ক্ষণ নির্বাক বিষণ্ণ দৃষ্টিতে বউয়ের দিকে চেয়ে থাকে সহদেব। সে মৃত্যুর কথা উচ্চারণ করল বলেই কি সঞ্চারীও এভাবে তাকে প্রত্যুত্তর দিল? এখন তাদের সম্পর্কটা এমনি। চাপান-উতোরের সম্পর্ক। তাদের সম্পর্কের ভিতরে তারা এখন জীবন নিয়ে বেঁচে নেই, মৃত্যু নিয়েই বেঁচে আছে।
সহদেবের চোখ আর ছলছল করে না। শুকনো, বয়স্ক চোখ। বলে, ‘বরাগুলানকে জলটা হলেও দে। দেখছিস নাই কেমন মরে মরে পড়ে আছে? জীবকে এমন করে পাললে নরকভোগ হয়।’
যদিও সহদেব নিজেও জানে না, মানুষ কখন নরক ভোগ করে। বেঁচে থাকতে, নাকি মরণোত্তর? বিশেষ করে, যেদিন থেকে তার দুটি ব্যাটাই ঘরছাড়া হয়ে গিয়েছে, তারপর থেকে যে-দুর্দশার জীবন, প্রায়শ্চিত্তের জীবন তারা কাটাচ্ছে, নরক নিশ্চয় এর চেয়েও পীড়াদায়ী নয়?
সঞ্চারী মাটির সরায় জল এনে শুয়োরের খাপরিতে ছড়-ছড় করে ঢেলে দেয়। আর জঙ্গল থেকে এই দু-তিন দিনে যে নিমফলগুলি কুড়িয়ে এনেছে, সেগুলিও একটা তালাই বিছিয়ে রোদে ছড়িয়ে দিতে থাকে।
এমনি সময়ে নির্জন জঙ্গলে আবার অনেকগুলো পায়ের শুকনো পাতা মাড়িয়ে আসার মচমচ শব্দ পেয়ে উৎকন্ঠিত হয়ে পড়ে তারা। সঞ্চারী মেলে দেওয়া নিমফলের ওপর থেকে যেন তার কড়া-পড়া কর্মঠ হাতটিও সরিয়ে নিতে পারে না। সে তীরবিদ্ধ শূকরীর মতো কাতর দৃষ্টিতে ফড়কির দিকে তাকিয়ে থাকে।
প্রতিবেশী বাউরিয়া পলপলের গ্রামবাসীদের আসতে দেখে। বিনন্দের ঘরের বাচ্চাগুলি ছুটে গিয়ে খবর দিয়ে আসে। এসময়ে তাদের ঘরেও পুরুষ বলতে কেউ থাকে না। যে-যার কাজে বেরিয়ে যায় রোজগারের ধান্দায়। মেয়ে-বউরা নিজের নিজের ঘরের উঠোন থেকে উঁকি মেরে দেখে। কেউ আবার ছেলেকে কাঁধে নিয়ে তালতলে এসে দাঁড়ায়।
হড়বড় করে ওরা উঠোনের দিকে এগিয়ে না এসে বাইরেই দাঁড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে চাপা ক্রোধ ও দৃঢ়তা নিয়ে সহদেবকে বলতে থাকে, ‘এ বুঢ়া! হামাদের গাঁয়ের বিটিছ্যেলাটিকে কথায় লুকায় রাইখেছিস? বল, কন গাঁয়ে উয়াকে পাঠাঞ দিঁয়েছিস?’
‘হ্যাঁ বাপ, তদের বিটিছ্যেলা ত তরা নিয়েই গেছিস? আ-র ঘুইরে যে খুঁজতে আসছিস?’ সহদেব খাটে বসেই বলে। তাদের কাছে যায় না। সেখানে বসে থেকে সে দেখতে পাচ্ছে লোকগুলির হাতে হাতে ডাং-ঠাঙাও রয়েছে।
সঞ্চারী বলে, ‘হামদের মাইতর ব্যাটাটাকে তুমারা যে মাইরে মরাঞ দিলে,তার বাদেও তুমাদের সাধ পুরে নাই? ইবার হামরা বুঢ়াবুঢ়ি আছি। যদি হামদের মরালে তুমাদের বিটিছ্যেলাটি ঘুরৎ আসে, ত মরাও ক্যানে হামদের। ঠেঙায় মরাও।’
সহদেব সঞ্চারীর কথাকে সমর্থ করে। বলে, তারা কী খেয়ে যে বাঁচবে তার নাই ঠিক। ঘরে এক আঁজলা চাল পর্যন্ত নাই, ভুট্টাও নাই। পরিবারের সকলে মিলে পাকানো দড়ি আর গোরু-বাঁধা পাখা হাটে হাটে বিক্রি করে ভুটু যখন সেই সন্ধের পর ঘরকে আসে, তখন যা আয়-উপায় করে আনে, তাতেই কোনো রকমে ওই নির্জীব শূকরগুলির মতো তারাও ছেলে-বুড়ো-বাচ্চা মিলে থালাতে বাটিতে মাড়ে-জলে খেয়ে বেঁচে আছে। আর ক’দিনই-বা এভাবে তারা বাঁচবে? ছেলের অপরাধে যাবজ্জীবন অপরাধী হয়ে থাকার চেয়ে প্রতিপক্ষের হাতের দন্ড ঢের সহনীয়। আর কতদিন এভাবে ব্যাটার কৃতকর্মের পাপ তারা বহন করবে? সন্তানের জন্ম দিয়ে কি এতোটাই মহাপাতকের কাজ করছে?
বুড়োবুড়ির এই কথাগুলি তাদের অন্তর ছুঁয়ে যায়। বুঝতে পারে, সত্যিই এরা জানে না—জারমণির কোনো খবর জানে না। এদের কথা থেকে বোঝা যায়, অঙ্গদেরও কোনো হদিশ এদের জানা নেই। তাদের অবর্তমানে যে-দুঃসহ জীবন এরা যাপন করে চলেছে, তাতে এরা যে এই কুলাঙ্গার ব্যাটাদের কথা ভেবে শোকও করছে না, সেটাও এদের পীড়িত ও তিক্ত জীবনকথন থেকে অনুমান করা যায়।
তবে পাটন যে মরে যায়নি, জিনগা-ডুংরি থেকে পালিয়েছে, সে-খবর কিন্তু এরাও জানে। এদের কাছে সংবাদটি পৌঁছে দিয়েছে এই ডেলিকচা গ্রামের অন্য প্রতিবেশীরা। হাঁসুয়া বাউরি আর বিনন্দ বাউরি। এরাই তো পলপলে গিয়েছিল। পলপলের গ্রামবাসীদের হাতে প্রহৃত পাটনকে আবার ডেলিকচায় ফিরিয়ে আনতে। তারা বলেছিল, ঠিক আছে, পাটনও যদি অপরাধী হয়ে থাকে,তাহলে তার অপরাধের শাস্তি তো সিংসর্দাররা নিজহাতে দিয়েছে। এবার তাকে ছেড়ে দিক। বলা বাহুল্য, তারা তা দেয়নি। উলটে এই বাউরিদের কথায় বুড়ো কলেরব সিংসর্দার বলে উঠেছিল, ‘ডন্ড হামরা দিব নাই। হামরা ইয়াকে জিনগা-ডুংরিয়ে আটক রাইখে আসব। তাবাদে বাঁচাক-মরাক যা করার জিনগা-মাঈ করবেক।’ তাই শেষতক জিনগামাঈ কী করে সেটা জানার কৌতূহল তো হাঁসুয়াদের ছিলই। সে-খবর তারা পরের দিনই জীবনডির মোড়ে বোল-বোম-এর চায়ের দোকানে পেয়ে যায়।
কিন্তু এখন পাটনকে তারা মেরে ফেলেছে বলে যে-অভিযোগের সূত্রটুকু উঠে আসে সঞ্চারীর বক্তব্যে, সবার আগে সঁড়ু মাহাত সেটা সংশোধন করে দিতে, সঞ্চারীকে বলে, ‘কে বলল, পাটৈনাকে হামরা মরায় দিয়েছি? উ ত পালাঞ গেছে।’
‘পালানছে!’ কৃত্রিকম বিস্ময় প্রকাশ করে সঞ্চারী।
সহদেব কিন্তু নির্বিকার বলে যায়, ‘মরলেই কী আর পালালেই কী।’
এরপরেও ওদের আর এখানে থাকার কোনো অর্থ হয় না। এদেরকে, এই বুড়োবুড়িকে, এ বিষয়ে আর জিজ্ঞাসাবাদ করা না-করা সমান। তবু ওদের মধ্যে থেকে ভরত সিংসর্দার, ফৈকরা সিংসর্দার বলে, ‘জারমণিকে পাছে অঙ্গা তদের ক-ন কুটুমঘরে ঢুকায় রাইখেছে নকি?’
কুটুমঘর? কথাটা শুনেও সহদেব কোনো সাড়া করে না। যাদের ঘরে ভাত নাই, তাদের আবার কুটুম থাকে নাকি? তারপর ফৈকরা জানতে চায়, ‘কন-কন গাঁয়ে তদের কুটুম আছে? বল ন। হামরা সেই-সেই গাঁয়ে পিয়ন পাঠাব।’
কুটুম ঘরগুলিতেও তল্লাশি করতে যাবে শুনে সঞ্চারীর কেমন অস্বস্তি বোধ হয়। সহদেব কিন্তু কোনো লুকোছাপা না করে বলে দেয়। বলে, ‘হঁ, যাও। পাঠাও ক্যানে। ওই ত আহাড়রায় উয়ার পিসি থাকে, আর মামাঘর টাঁইড়পাইনায়। লোক পাঠাও ক্যানে। ভিৎরি খোবার আনুক।’
ওরা আর দাঁড়ায় না। যেভাবে দ্রুত পা চালিয়ে এসেছিল, ঠিক তেমনি দ্রুত পা চালিয়ে তালগাছের পাশ দিয়ে শনশনায় বেরিয়ে আসে। আসতে গিয়েও, সঁড়ু আবার ফিরে যায়। বলে আসে, ‘আজ চলে যাছি। কিন্তুক হামরা ফের ঘুরে আসব। জারমণিকেও হামদের চায়, আর অঙ্গা শবরকেও চায়। উয়ার ডন্ড এখনো বাকি আছে।’
হাতে ভিক্ষার পাত্র নিয়ে ঘুরতে লাগল অঙ্গদ। গ্রামে গ্রামে। ডি-ডিহাতে। দেখতে দেখতে সে আরও হীনবল হয়ে পড়লো। সে আর চলতে পারে না। দৃষ্টিতে কাঁপা-কাঁপা অন্ধকার দেখে। তার চোখ ঢুকে গিয়েছে চোখের কোটরে। পেট ঢুকে গিয়েছে পেটে। কন্ঠা বেরিয়ে পড়ছে। অস্থিসার দেহে পঞ্জরগুলি আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে যেন চড়াৎ শব্দে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে চাইছে! তার নিজেরই নিজের এই শরীরকে এক প্রলম্ব লৌহ জঞ্জিরের মতো লাগে। যাকে সে আর বহন করতে পারে না। তৎসত্ত্বেও, যখনি জারমণির কথা মনে পড়ে, তার অন্তরাত্মা জাগ্রত হয়ে ওঠে। প্রবলভাবে কেউ যেন তার স্থিতিজাড্যে বলপ্রয়োগ করে বলে, ‘যাহ তুমি ! যাহ!’ এই অন্তরাত্মাই কি সেই সর্বদা বিরাজমান প্রশান্তিময় পুরুষ? তার মহাপ্রবীণ?
অঙ্গদ এগিয়ে চলে। নিজেকে বেড়িবদ্ধ মানুষ অথবা শুধুই লোহার শিকল মনে করে, গ্রামের পথ জুড়ে সে ধুলো উড়িয়ে, যেতে থাকে। পথ জুড়ে থেকে যায় শিকল টানার দাগ—‘দগড়া’। যে-দাগ, আজ নয়, কাল নয়—অনন্তকাল ধরে থেকে যাবে। কেন না, অনন্তকাল ধরে, এভাবেই মানুষ খুঁজে বেড়াবে তার কাঙ্ক্ষিত নারী। আর তাই অনন্তকাল ধরে অস্ত্রের অন্বেষণও সমান্তরালভাবে চলবে।
অঙ্গদ এগিয়ে চললো। হাতে তার উন্নত সঙীন—গাছের সরু ডালটি।
কত গ্রাম পেরিয়ে গেল। কত জনপদ। কিন্তু কোথাও সে দেখতে পেল না একটিও তার নিজের লোক। তার বাবা নেই, কাকা নেই, ভাই নেই। আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। তাহলে কার কাছে সে জানতে চাইবে জারমণির খবর? নাকি এরা কেউই আর জীবিত নেই? শত্রুর হিংসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে সবাই। সর্বস্ব। হয়তো তারপরেও একজনই শুধু বেঁচে আছে। যার কোনো ধ্বংস নেই। কেউ তাকে ধ্বংস করতেও পারবে না। সে জারমণি! জারমণি!
অঙ্গদ যতবার তার কথা ভাবে, ততবার সে নতুন করে চঞ্চল হয়ে পড়ে। গতি আসে তার রুগণ শরীর জুড়ে। তার মনে হয়, না, সে দুর্বল হয়ে পড়েনি। যদি সে যথার্থই শক্তিহীন হয়ে পড়ে, তাহলে জারমণির নামে কেন শানিত হয়ে ওঠে তার ইন্দ্রিয় সকল? জারমণির প্রতিভাস যেন তার তমাশাচ্ছন্ন মনকে আলোর ভুবনে পরিণত করে। আর সে এগিয়ে চলে সেই পথ ধরে।
এই পরিভ্রমণকালে অঙ্গদের মনে কখনও বৈরাগ্যও আসে। তার মনে হয়, কেন সে এভাবে বেরিয়ে পড়েছে? কেন সে অহরহ আত্মক্ষয় করে চলেছে একটি নারীর জন্য? শত অন্বেষণের পরেও, নারীকে কি সত্যিই খুঁজে পাওয়া যায়? নাকি, যা পাওয়া যায়, তা আসলে নারী নয়—নারীর বিভ্রম? অঙ্গদ কি সেই বিভ্রমের সন্ধানে পরিব্রাজকের মতো পথে পথে, দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াবে? তার একটি জীবন দিয়ে অর্জিত একটি সুন্দর বিভ্রম নিয়ে সে কী করবে? যদি সেই বিভ্রম তাকে অমৃতত্বে উন্নীত না করে? সে কি সেই বিভ্রমের ভেতর দিয়ে তুলে-ধরবে কোনো পরম সত্যকে? নাকি, সত্যই আসলে একটি অখন্ড বিভ্রম? এই জগন্মন্ডল দেখতে দেখতে কত যে প্রশ্নের উদয় হয় তার মনে! অথচ, এর কোনোটির জবাব জানা নেই তার। জানেন কি সেই বৃদ্ধ লোকটি? তার সেই মহাপ্রবীণ?
অঙ্গদ যতই পরিভ্রমণের মধ্য দিয়ে এই দেশ এই লোকসমাজ এই নিখিল সৃষ্টিকে দেখতে দেখতে চলে, ততই ভেতর থেকে সে পালটে যেতে থাকে। সঙ্কীর্ণ ও বদ্ধ পরিমন্ডল থেকে সে যেন ছড়িয়ে যেতে থাকে ক্রমশ। কত মানুষ সে দেখছে, কত ভাষা কত কাজ, কত লড়াই-দ্বন্দ্ব-প্রেম-হিংসা। আর এইসব দেখতে দেখতে সে ভুলেই যেতে বসেছে, কেন, কোন কাজে সে হাতে অস্ত্র আর করঙ্ক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে?
তার এটাও মনে হয়, এভাবে বিভ্রমে ফেলে দেওয়ার জন্যই কি মহাপ্রবীণ তাকে সেই উদুম্বর বৃক্ষের তল থেকে এই প্রসারিত ভুবনে মিলিয়ে দিলেন? জগৎ যে নিজেই একটি মায়ার পিন্ড বৈ কিছু নয়, এটা উপলব্ধি করতেই তিনি প্রেরণ করলেন তাকে? হয়তো তিনি বলে চলেছেন—দেখ, দেখতে থাক। আর এভাবেই তুমি তদেকচিত্ত হয়ে খুঁজে বেড়াও নিজেকে। এইসব কিছুর মধ্যে এই সকলের মধ্যে নিজেকে খোঁজো তুমি। নিজেকে জানো। জারমণিকে নয়।
আমি তবে কেন জারমণিকে খুঁজছি? কেন আমি পথে পথে, জনপদে হাহাকার করছি সেই স্ত্রী-কাঞ্চন লাগি? এখান থেকেই কি বিভ্রমের শুরু নয়? বিভ্রম যদি হয়ও, কীভাবে সে-বিভ্রম কাটিয়ে উঠতে হয়, অঙ্গদ তা জানে না। কীভাবে জগৎকে দেখতে হয়, বুঝতে হয়, তাও তার অজানা। তাই সে কেবল দেখেই চলেছে। তার কোনো তাৎপর্য খুঁজে পাচ্ছে না সে। সে দেখছে —রাজপথে মানুষের কলহ। কত রমণী প্রহার করছে তার মদ্যপানাক্রান্ত পুরুষকে। কত অসহায় জননী নদীর তরঙ্গে ভাসিয়ে দিচ্ছে কোলের সন্তান, কত বৃদ্ধ নি:সঙ্গ একাকী—অধরা নি:সীম আকাশে দিকে তাকিয়ে, কত উন্মাদ কোনো বিশেষ মুহূর্তে প্রকৃতিস্থ হয়ে শুধু নির্নিমেষ দিগন্তের পানে চেয়ে নিজের সঙ্গেই কথা বলে যায়।
কেউ কেউ হতভাগ্য। দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে পারল না, সংসারী হতে পারল না। ভালোবাসাহীন অপ্রেম জীবন নিয়ে কী হবে? ঘাটে-বাটে ঘুরে বেড়ায়। আবার কোনো বৃদ্ধ সদা কোলাহলময় এই জগৎ থেকে পরিত্রাণের প্রহর গুনে চলেছে। কেউ আবার এমন সুন্দর জগতে মনুষ্যজীবন পেয়েও অশ্রুপাত করছে। ব্যর্থতায়, নৈরাশ্যে, তিক্ততায়। সে ফিরে যেতে চাইছে যেখান থেকে এসেছিল, সেখানেই। হয়তো জননীর যোনিমূলে মাথা ঠুকে ঠুকে বলছে, ‘আমাকে তুই আনলি কেন? ফিরিয়ে নে!’
সেই সাধুও কি সেদিন আক্ষেপ করেনি? ‘ভাসাও আমারে ভাসাও’ বলে? নাকি হতাশায়, নিরাশায়, ব্যথতায় আত্মহননের ভেতরে কোনো ভাসান নেই? ভাসান হচ্ছে এই মায়ার সংসারে বেড়ির বন্ধন। এই বন্ধন নিয়ে, সে যতই এগিয়ে যাবে, মোহনা ততই তার নিকটবর্তী হবে। কাছে এসে ধরা দেবে।
আচ্ছন্নতা কেটে যায় অঙ্গদের। কোথায় চলেছে সে, জারমণির সন্ধানে? কোথায় সে যাবে? কোন দেশের কোন গ্রামে? সে কোনো কিছুই স্থির করতে পারে না। মনে হয়, তাকে অনুসন্ধান করার নির্দিষ্ট কোনো খন্ড নেই। সে নারী, সে সর্বত্র বিচরণকারিণী। যে-কোনো দেশে, যে-কোনো গ্রামে গিয়ে সে খোঁজ নিতে পারে তার জারমণির। কিন্তু বাস্তুবত, কোথাওই তার খোঁজ পায় না সে। তবু সে খোঁজ করেই চলে।
এভাবে খোঁজ করতে করতে, ঘুরতে ঘুরতে, এসে পড়ে জীবনডির মোড়ে। এখানে নিছক কৃপাপ্রার্থী ভিক্ষুকের মতোই সে তার করঙ্ক দোকানির দিকে বাড়িয়ে দেয়। ভিক্ষাপাত্র হাতে উদাস তার দৃষ্টি। নিস্পৃহ তার মন। সে দাঁড়িয়ে থাকে। কয়েক দন্ড থাকতে থাকতে, হঠাৎ কানে আসে জারমণির নামটি। তাকে তৎক্ষণাৎ যেন অন্তর্গূঢ় ভাবজগৎ থেকে নামিয়ে নিয়ে আসে কঠিন কঠোর এই বস্তুমন্ডলে। দোকানে দাঁড়িয়ে অঙ্গদ খবর পায়—জারমণি এখানে নেই। সে পলপলে নেই, ভেলিকচায় নেই, ডুংরিতে নেই। পাটনকে নিয়ে সে অনতিদূরে কোথাও শুরু করেছে তার নতুন জীবন।
নতুন জীবন! অঙ্গদের মন আকুল হয়ে উঠল। চোখ থেকে টস-টস করে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুবিন্দু।
আকাশে মেঘ নেই তবু সারা আশমান জুড়ে অভূতপূর্ব মেঘলা ভাব। যেন আকাশ নিজের বুকে নিজেই আপনমনে খেলা করে চলেছে! যতদিন এখানে রয়েছে জারমণি, এমনটি আর কোনোদিন দেখেনি। মাঠারি যে এমন চাঞ্চল্য জাগানো রূপময়ী হয়ে উঠতে পারে, তা আজকে না দেখলে মনেই হত না। আকাশের এই কোমল মধুর অবগুন্ঠন মাঠারির নৈসর্গিক পরিমন্ডলটিকে আশ্চর্য একটি নান্দনিক উদ্যানের মতো করে তুলেছে। জারমণির টান মেরে খুলে ফেলা বেণীর আলুলায়িত কেশরাজির মতো ফুরফুর করে উড়ে বেড়াচ্ছে আধাজংলা বাতাস। ডুংরি-ডহর থেকে গাছে-পাতে। ডালে ডালে। তারই উচ্ছলতা নিয়ে তালগাছগুলির পাতায় পাতায় দোল খাচ্ছে বাবুইয়ের বাসাগুলি। পাখি উড়ে এসে লেপ্টে বসছে তাদের গায়ে। থেকে থেকে সেই মেঘলা আকাশের সঙ্গে প্রাক-মধ্যাহ্নের একসুতো করে কনকরৌদ্র যেন লুকোচুরি খেলছে। কখনও সেই রৌদ্র, মনোরম ছোটো ইরাবতী পুষ্করিণীটিতে পাড়ে খুলে রাখা জারমণির শাড়ির আঁচলার মতো দুদন্ড পড়ে থেকে, আবার তা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর এই সবকিছুই বিমোহিত করে তুলছে জারমণিকে।
পশ্চিমের ডুংরি থেকে বাতাসের হেলকে আসছে কুটজ কুসুমের সুঘ্রাণ, যা পাটনের ভেতরে উসকানিমূলক চাঞ্চল্য জাগিয়ে দিচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, অন্তত একবার সে পাড়ের ওপরে উঠে, তার বড়ো বড়ো চোখগুলি আরও আরও বিস্ফারিত করে, গভীর বিস্ময়বোধ নিয়ে, অন্তহীন চেয়ে থাকবে সেই ঘাটটির দিকে, যে-ঘাটে জারমণি এখন মৎস্যকন্যার ন্যায় সন্তরণশীলা।
আর তা যদি না হয়, যদি সেই দীর্ঘস্থায়ী অবলোকনের অবকাশ সে না পায়, তাহলে অন্তত অবগাহন সম্পূর্ণ করে জারমণি যখন তার সারা শরীরে জলরাশি নিয়ে ঘাট থেকে পাড়ের দিকে এগিয়ে আসবে এবং একটা সময় সে তার অপার্থিব নমনীয় শরীর আরও নমনীয় করে, ইরাবতীর পাড়ে স্খলিত বস্ত্রটিকে ডান হাত দিয়ে তুলে নেবে...হায়! এ দৃশ্য তো আরওই নিষিদ্ধ। এমনকি, কখন জারমণির অবগাহন শেষ হবে, সেই সময়টি অনুমান করে, সে যে সটান এক ছুট দিয়ে. পুষ্করিণীর পাড়ে উঠে যাবে এবং অখন্ড একটি দৃষ্টিতে সবকিছুই দেখে নেবে তার—এমন উপায়ও পাটনের নেই। তাহলে পর জারমণির সঙ্গে তার বর্তমান ‘সহবাসের’ শর্ত খন্ডিত হবে, জারমণি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠবে এবং তার পরিণতি স্বরূপ—যে-ধরিত্রীকে স্পর্শ করে রয়েছে এই নারীর বজ্রকঠিন পা, তার থেকে যোজন-যোজন ক্রোশ ফারাকে বিতাড়িত হতে হবে পাটনকে। সেই মুহূর্তে।
তবু দুরাশা নিয়ে নিজেকে আলোড়িত করে রাখে পাটন। পুষ্করিণীর পাড়টির ওপারে, জারমণি, নিজেকে পূর্ণ বিকশিত করে, মেলে ধরে, সাঁতার কেটে চলেছে। ঠিক যেন চৈত্রের পলাশ থেকে পড়ে যাওয়া ফুলটি, হেলকে হেলকে খেলা করে বেড়াচ্ছে সরোবর জুড়ে। আহা! আর পাড়ের ওপারে? পাড়ের ওপারে পাটন। সে নাকের কাছে বুচাটাঙি উঁচিয়ে রেখে নিরাপত্তা দিয়ে চলেছে জারমণিকে।
কিন্তু যতই সে নিরাপত্তা দিক না কেন, মন যে তার উতলা। তার কেবলি মনে হচ্ছে, তার এবং জারমণির মধ্যেকার এই পাড়টিকে কোনোভাবে কি খন্ডন করা যায় না? যদি সে উন্মাদের মতো উপর্যুপরি তার হাতের বুচাটাঙি দিয়ে আঘাত করে? আঘাত করেই চলে? না। মানুষের অস্ত্র দিয়ে প্রকৃতিকে বিখন্ডিত করা যায় না। প্রকৃতি যে প্রজায়িনী—সন্তান প্রসবকারিণী! মাতা!
পাটন বুচাটাঙিটিকে ডান হাতে কঠিন করে ধরে। মুখমন্ডলের সামনে নাসিকা ভেদ করে গগনচুম্বী করে রাখে। আর চোখ দুটি সদাসতর্ক রেখে, রীতিমতো বিশ্বস্ত দৌবারিকের মতো, সে প্রহরায় থাকে জারমণির। অনেক বলার পরেও, জারমণি, এই কাজ থেকে নিরস্ত করতে পারেনি তাকে। হাত থেকে অস্ত্রটিও খসিয়ে নিতে পারেনি। পারবেও না। পাটন যে মুহূর্তে-মুহূর্তে বহি:শত্রুর আগমনের আশঙ্কা করে। সে মনে করে যে-কোনো দিন, যে-কোনো মুহূর্তে, যে-কোনো দিক থেকে—নৈঋত-ঈশান কোণ থেকেও—শত্রু আসতে পারে। শত্রু তার আসবে। আসবে। আসবেই!
পাটনের অনুমান সঠিক হল। একদিন শত্রু এলও। সে এল পশ্চিমের ডুংরির কোল ঘেঁষে নৈঋত কোণ ধরে।
জারমণি সেদিনও ইরাবতীর বক্ষে জলক্রীড়ায় মগ্ন। মুক্ত মহাস্তন ও নিতম্বের ভারে তার শম্বুক-বরণ শরীর সে জলের উপরিতলে ভাসিয়ে রাখতে পারছিল না। উভুকি-ডুভুকি করছিল। কখনও ভেসে উঠছিল, কখনও তলিয়ে যাচ্ছিল তলদেশে। নিমজ্জিতাবস্থায় সে নতমুখ হয়ে যখন-যখন দেখছিল তার এই নিরাবরণ দেহ, লোমশ যোনি, তখন নিজেও সে সম্মোহিত হয়ে পড়ছিল। তার বাসনা হচ্ছিল আরও আরও জলের গহীনে চলে যেতে এবং নিজের প্রতি উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠতে। অতঃপর সে ভেসে উঠছিল। তার তখন কিঞ্চিৎ ব্রীড়াবোধ হচ্ছিল এই ভেবে যে, উঁচু পাড়ের ওপরে প্রহরারত পাটন তাকে বিবসনাবস্থায় না দেখলেও এই মোহময় প্রকৃতি কি দেখছে না? দেখছে না কি পুংলিঙ্গের মতো ঝুরি নামিয়ে অটল দন্ডায়মান ওই মহাবৃক্ষটি? কিংবা পাড় বরাবর সারি সারি তালগাছ? অথবা পায়ে বিভূতি নিয়ে পড়ে থাকা মহাদেবের মতো পশ্চিমের ডুংরি—যার স্থিতিশীল মনোরম প্রতিবিম্বটি জারমণির সুবিশাল স্তন ও নিতম্বের ধাক্কায় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে?
পাটন তটস্থ হয়ে পড়ল। পশ্চিমের ডুংরির ঢাল বেয়ে ধপ ধপ শব্দের সঙ্গে সে শুকনো পাতা মাড়িয়ে যাওয়ার আওয়াজ পেতে থাকে। আওয়াজটি যেন ক্রমশ গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে আসছে পুষ্করিণীর দিকে। পাটন এই শব্দকে প্রথমে ভেবেছিল দক্ষিণমুখী। কিন্তু পরে সে টের পায়, শব্দটি আসছে নৈঋত কোণ বরাবর। সে দন্ড দুয়েক সেদিকে তাকিয়ে থাকে। শব্দটি উত্তরোত্তর আরও কাছে আসছে। এবার যেন সে স্পষ্ট শুনতে পায় দুটি পায়ের চলন।
পাটন তার নাকের কাছে খাড়া করে রাখা বুচাটাঙিটিকে ঠিক ওই একই অবস্থানে রেখে, দারুনির্মিত পুত্তলিকার মতো সে পুষ্করিণীটিকে অর্ধাংশ পাক দিয়ে নৈঋত কোণে ছুটে যায়। ডুংরির পাদদেশে গিয়ে চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে। দেখতে পায়, গাছগুলির ফাঁক দিয়ে নেমে আসছে কোনো এক অনার্য পুরুষ। চন্ডালদেহী। এ-ডাল সে-ডাল ধরে, কখনও-বা ঘষটে ঘষটে, সে প্রবল পরিশ্রম করে শেষপর্যন্ত নীচে নেমে আসে। হাঁপাতে থাকে।
পাটন তাকে কিছুক্ষণ লক্ষ করে। হয়তো সে ভেবেছিল লোকটিই প্রথম বলবে। কিন্তু লোকটি তার যথেষ্ট দুর্বল শরীর নিয়ে আরও একটু হাঁপিয়ে নেয়। জিরিয়েও নেয়।
‘কে ব-ঠ তুমি?’ পাটন জিগ্যেস করে, ‘শুনতে পা-ছ?’
শুনতে পেয়েছে। কিন্তু তখনও সে কোনো প্রত্যুত্তর করেনি।
পাটন এবার ধমক দিয়ে বলে, ‘ইটা হঁয়ে তুমি কথাকে যাছো? ডাঁড়ায়ো না। চৈলে যাও ফারাকে—ই-সময়ে তুমি ক্যানে আইসেছ ইখিনে?’ উত্তর না পেয়ে, পাটন, একটার পর একটা প্রশ্ন করে চলে তাকে। এই সবকটা প্রশ্নের জবাব যা-ই হোক না কেন, সবকটা প্রশ্নের ভিতরে একটা সাযুজ্যও আছে। সাযুজ্যটি হল ভয়ের। আতঙ্কের। পাটনের প্রশ্নগুলি যেন জানান দিচ্ছে, এই সময়ে এখানে ভয়ের পরিবেশ রয়েছে। তবে সে এসেই যখন পড়েছে, তখন দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। ওই দূর দিয়ে চলে যাক।
জায়গাটির প্রতি আগন্তুকের তাতে আরও কৌতূহল বাড়ে। সে ভাবে এই সময়ে কী আছে এখানে? কেন অস্ত্র হাতে দন্ডায়মান লোকটি তাকে অনেকটা দূর দিয়ে চলে যেতে হুকুম করছে?
হ্যাঁ, হুকুমই। পাটনের গলা কথোপকথনের শুরু থেকেই চড়া। উত্তেজিত।
লোকটি এদিক-ওদিক তাকায়। পাটন তাকে তাকাতেও নিষেধ করে বলে, ‘খোবোড়দার! ভালিস না উ-ধারে।’
লোকটি পুষ্করিণীর দিকে চোখ ঘোরাতেই দেখতে পায় জলের ওপরে খেলা করছে একমাথা চুল। যা, খুবই চেনা চেনা লাগে তার।
এবার সে পাটনের প্রত্যেকটি প্রশ্নের জবাব দেয়। পর পর। সে বলে, না, এই পথ দিয়ে সে অন্যত্র যাবে না। কেন না, সে এখানেই এসেছে। এখানে দাঁড়াতে নিষেধ করলেও সে এখানেই দাঁড়াবে। দূরেও যাবে না। কেন না, সে এখানে এসেছে। এই সময়েই সে এখানে এসেছে, কেন না, এই সময়ে সে এখানেই আসতে চেয়েছে।
পাটন অবাক। বাঁশপাতার মতো এই লোকটি কী বলে! সে এইসময় আসতে চেয়েছে, এখানেই আসতে চেয়েছে এবং এখান থেকে অন্যদিকে যাবে না? পাটন হাতে বুচাটাঙি নিয়ে থাকলেও কাঁধে যেন সে তীরধনুক নিয়ে শিকারের উদ্দেশ্যে, এই তামাম এলাকার আধিপত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এমনিভাবে, তার তর্জনী বহুদূরে প্রসারিত করে লোকটিকে দেখিয়ে দেয়। রীতিমতো ঝাঁঝের সঙ্গে পাড়ের উপর থেকে নিচে অবতরণ করতে বলে।
না! লোকটি পাড় থেকেও নীচে নেমে আসবে না, বরং সে আরও এগিয়ে যাবে সেই ঘাটের দিকে, যে-ঘাটে সেই কারন্ডবী নারী এখন সন্তরণশীলা।
পাটন তাকে সেদিকে যেতে দেবে না। কোনো মতেই না। লোকটি পুষ্করিণীর পাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে—জারমণির ঘাট থেকে অনেকটাই দূরে। পাটন পুষ্করিণীর পাড়ের ঢালের দিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে—লোকটি থেকে অনেকটা দূরে। এভাবে দূরত্ব বজায় রেখে তারা পরস্পর তূণীর থেকে তীর নিক্ষেপ করার মতো একে অপরের দিকে বাক্যবাণ নিক্ষেপ করতে থাকে। পাটন একটি কথা বললে, লোকটিও পালটা একটি কথাতে তার প্রত্যুত্তর পৌঁছে দেয়। যদিও, আপাত দৃষ্টিতে, তাদের মধ্যে সাদৃশ্যের অভাব। সমতাও নেই। পাটন তার সুঠাম শরীর নিয়ে বন্য শিকারীর মতো বুক ওসার করে দাঁড়িয়ে। তার শরীরে যৌবন এই পুষ্করিণীর জলের মতোই হামরাম করছে। অভাব কেবল সেই পুষ্করিণীতে বিচরণ করার মতো একটি মরালীর।
পক্ষান্তরে, ওই লোকটি সত্যিই ঝাড়ের একটি বাঁশপাতার মতো লিকলিক করছে। মাথার চুলগুলি যেন চুল নয়, উশির। বেনার মূলের মতো। চুলে মাথাটি তার ভারী। ঘাড়ের ওপরে কাকাতাড়ুয়ার মতো আটকে আছে। পাটনের পেশিবহুল দেহের পাশাপাশি, এই লোকটি নিতান্তই মেদমাংসহীন, অস্থিসার। যেন কবেই সে হতযৌবন হয়েছে।
শরীর অনুপাতে পাটনের অস্ত্রটি বেশ মানানসই। লোকটিরও ‘অস্ত্রটি’ মানানসই, তবে সেটাও তার শরীর অনুপাতে। পাটনের দৈহিক বল থাকলেও, তার বাক্যগুলি কর্কশ, ভোঁতা এবং গভীরতাহীন। তুলনায় লোকটির ভাষা মার্জিত, ভাবগম্ভীর ও শাণিত। শরীর তার নির্বল হলেও ভাষা তার যথেষ্ট বলীয়ান। তবে সে-বল চেঁচিয়ে প্রকাশ করে না সে। আবার মৃদুভাষীও মনে হয় না।
লোকটি কথামতো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেখে, পাটন তাকে জোরের সঙ্গে তার বাহু প্রসারিত করে নিষেধ করে, ‘খোবোড়দার!’
লোকটি তবুও এক কদম এগিয়ে যায়।
পাটনও তার দিকে এক পা বাড়িয়ে দেয়। তখনও পাড়ে সে ওঠে না।
এভাবে ধাপে ধাপে তারা পরস্পর কাছাকাছি হতেই জোর হইচই বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। এই চেঁচামেচি জারমণির কানে যেতে সে ঘুরে তাকায়। দেখতে পায় লোকটিকে। পাটনের অস্ত্রহাতে প্রহরা সত্ত্বেও কী করে এই লোকটি এখানে এসে গেছে, ভেবে পায় না জারমণি। সে মনে মনে পাটনের প্রতি তার অনাস্থা প্রকাশ করে। চিৎকার করে ডাকতে থাকে পাটনকে। বলে, ‘কে বঠে উ-লোকটা? উ-ক্যানে মেঁঞামানুইষের ঘাটের দিগে আসছে? টেকা তুঁই উয়াকে। টেকা!’
‘জানি নাই ই কে বঠে!’ পাটন পাড়ের নীচ থেকে চেঁচিয়ে জবাব দেয়, ‘ই ক-ন কিছু বলছে নাই।’
জারমণি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। লোকটি এদিকেই এগিয়ে আসছে দেখে সে ক্রমশ গভীর জলে নিজের শরীর নিমজ্জিত রাখে। আর জলতলের ওপরে সুডৌল চিবুকটিকে ভাসিয়ে দিয়ে সে লোকটির গতিরোধ করতে না পারায় উত্তেজিত হয়ে ভর্ৎসনা করে চলে পাটনকে। কেমন পুরুষ এই পাটন! পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে সে তার হেপাজতে থাকা একটি নগ্ননারীকে আড়াল দিয়ে রাখতে পারে না, প্রতিরুদ্ধ করতে পারে না তার অগ্রগমন। পাথরের মতো শরীর আর হাতে অস্ত্র নিয়েও সে একটি তুচ্ছ দুর্বল পীড়িত মানুষকে রুখতে অক্ষম। এ কেমন পুরুষ পাটন! ধিক তোর পৌরুষ!
কথাগুলি পাটনের গায়ে লাগে। সে এবার নীচ থেকে পাড়ের ওপরে উঠে আসে। জারমণির দিকে পিছনে ফিরে, লোকটির মুখোমুখি দাঁড়ায় সে। আর জলে সন্তরণরত সেই নারীর ভর্ৎসনায় ক্রুদ্ধ হয়ে, সে লোকটিকে আটকানোর জন্য কয়েক হাতের ব্যবধানে দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়ায়। দৃঢ়তা নিয়ে জানতে চায়, ‘বল, কে ব-ঠ তুমি?’
লোকটি জানায়, তার পরিচয় সে পাটনকে দেবে না। দেবে ওই নারীকে। সে বলে, ‘পথ ছাড়। হাট তুঁই, হাট!’
না, পাটন তাকে পথ ছেড়ে দেবে না। উপরন্তু সে লোকটির সম্মুখে বিপদের গন্ডী স্বরূপ হাতের টাঙিটি তাদের মধ্যবর্তী ভূমিতে নামিয়ে দিয়ে বলে, ‘যদি এই হাৎয়ার তুমি ডেইঙঘেছ তাইলে এই হাৎয়ার দিয়ে হামি তুমা—’
লোকটি পাটনকে তার বাক্য সম্পূর্ণ করতে দেয় না। তার আগেই সে লাথি মেরে পুকুরপাড় থেকে নীচের তালগাছগুলির দিকে নিক্ষেপ করে হাতিয়ারটিকে। হতভম্ব হয়ে যায় পাটন।
কিন্তু এই অব্দিই। তাকে আর এক পা-ও এগোতে দেয় না সে। কবজি টেনে ধরে। এতক্ষণ পাটনকে তার পৌরুষ নিয়ে ভর্ৎসনা করল জারমণি। একটি পুরুষ প্রহরায় থাকা সত্ত্বেও কেন আরেকটি পুরুষ তার ঘাটের দিকে এগিয়ে আসবে, কেন তাকে মাঝপথে আটকে দেওয়া হবে না—এইসব বলার পরও, মনে হয়, জারমণি যেন ডুব দিয়ে দিয়ে ঘটনাটি বেশ উপভোগ করছে। তবে শরীরকে সে কখনও আচমকা শোল মাছের মতো লাঠ খাওয়ায় না। কথা বলার সময়ও সে আগের মতোই থুতনিকে শুধু ভাসিয়ে রাখে। এমনকি হাসেও।
শুরু হয়ে যায় দুটি পুরুষের মধ্যে জোর বিতন্ডা। লোকটি জারমণির দিকে তার হাত বাড়িয়ে দেখায়—তাকে ওই নারীর কাছেই যেতে হবে। আর পাটন, সে তো জারমণির দিকে তাকাবে না। সে তার দিকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, পুকুরপাড় থেকে দূরের ডাঙা জমির দিকে হাত প্রসারিত করে দেখায়—এক্ষুণি লোকটি যেন ওই পথে প্রস্থান করে। পাটন পুনর্বার অস্ত্রটি কুড়িয়ে আনে। ঠান্ডা মাথায় তাকে বুঝিয়ে বলে, তুমি দুর্বল মানুষ। তুমি আমার সঙ্গে সংঘর্ষে যেও না। তাতে তোমার ক্ষতি ভিন্নু লাভ হবে না। কারণ কী, আমার হাতে তোমাকে দমন করার মতো যথেষ্ট অস্ত্র আছে।
‘আর তুমার?’ পাটন গর্বের সঙ্গে বলে, ‘কী আছে তুমার?’
‘হামার হাতেও অস্তর আছে! এই হামার অস্তর!’ লোকটি শুকনো ডালটি বাড়িয়ে দেয়।
হো:! হো:! হো:! পাটন প্রবল উল্লাসে হাসতে থাকে। লোকটির ওই অস্ত্র দেখে তার সেই হাসি যেন জলের উপর দিয়ে— স্থলভূমির উপর দিয়ে—আকাশে-বাতাসে-ডুংরি-ডাহারে ছড়িয়ে যায়। তখনও থামে না তার অট্টহাসি। সে জারমণির দিকে না তাকিয়েও জারমণিকে উদ্দেশ করে বলে, ‘দেখ জারমণি! দেখ! এই বুঢ়াটা কেমনি অস্ত্র নিয়ে কুরুক্ষেত্তে আইসেছে। দেখ!’
হাসতে থাকে জারমণিও। বহুশ্রুত সে-হাসির সঙ্গে আলোড়ন তোলা শব্দ পুনর্বার শুনতে, লোকটি সেদিকেই তাকিয়ে থাকে। শিহরণ জাগে তার শরীর জুড়ে। পাটন ঈর্ষান্বিত হয়। তাকে কটূক্তি করে। বলে, ‘ওই নারীকে দেখে তোমার বিপদ ডেকে আনবে না। তুমি পশ্চাৎপদ হও! সংযম রাখো, বৃদ্ধ!’’
কি! লোকটি নিজেকে আর সংযত রাখতে পারে না। চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘নরাধম! তুই বিশ্বাসঘাতক! তুই আমাকে সংযমের কথা বলিস? কামান্ধ! দূর হয়ে যা আমার পথ থেকে।’ পাটনকে সে কাঁধে এক ধাকলানি দিয়ে ফেলে দিতে চেষ্টা করে, পারে না। পাল্টা ধাক্কায় সে নিজেই টলমলিয়ে যায়।
জারমণির হাসি থেমে যায় চকিতে। শোনা কথাগুলি আবার শুনতে চায় সে। কী বললো ওই লোকটা? পাটন বিশ্বাসঘাতক? পাটন কামান্ধ? জারমণির এতক্ষণে সন্দেহ হয়—কে তবে এই পুরুষ? তার কথায় উত্তেজিত হয়ে, পাটন যখন তাকে প্রহার করতে উদ্যত হয়, তখন জারমণিই তাকে নিবারিত করে। বলে, ‘থাম তুঁই! মারিস না উয়াকে, থাম!’
পাটন হাত নামিয়ে নেয়।
জারমণি পাটনকে উদ্দেশ করে বলে, ‘উয়াকে শুধা উ কী লিতে ইখেনকে আইসেছে?’
পাটন সেই মতো লোকটিকে জিগ্যেস করে ‘তুঁই কী লিতে ইখেনকে আইসেছিস?’
লোকটি পুষ্করিণীর দিকে তার হাত বাড়িয়ে দেখায়, ‘ওই জলে ক্রীড়া করছে যে নারী, যে মরাল-গামিনী, আমি তাকে ঘুরৎ নিয়ে যেতে এসেছি।’
‘ঘুরৎ?’ পাটন আবার আগের মতো হাসে। হাসতে হাসতে সে জারমণিকে বলে ‘শুন জারমণি, কী বলছে! ই বলছে তকে লিয়ে যাবেক!’
‘উয়াকে শুধা, উ ক্যানে হামকে ঘুরৎ নিয়ে যাতে আইসেছে? উ হামার কে বঠে?’
‘তুঁই ক্যানে উয়াকে ঘুরৎ নিয়ে যাতে আইসেছিস? তুঁই কে বঠিস উয়ার?’
ওই দুর্বল লোকটি এবার সত্যি সত্যিই দুর্বল হয়ে পড়ে। বলে, ‘জারমণি! হামি অঙ্গদ বঠি। হামি—’ জারমণি ডুব দেয়। অনেকক্ষণ সে ডুবেই থাকে। লোকটি তখন পাটনকে বলতে থাকে, ওই নারী অন্য কারো হতে পারে না। সে তারই স্ত্রীধন। তাই তাকে সে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে। সে অঙ্গদ! অঙ্গদ! অঙ্গদ! ডেলিকচার অঙ্গদ শবর।’
পাটন তা মানতে রাজি নয়। সে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, অঙ্গদ বলে কাউকে সে জানে না, চেনে না। কখনও শোনেনি এই নাম। সে কেন তার স্ত্রীধনকে একটি পরপুরুষের দখলে ছেড়ে দেবে?
‘এই স্ত্রীধন তোমার?’ অঙ্গদ বিস্ময় এবং অবজ্ঞার দৃষ্টিতে পাটনকে দেখে।
‘হ্যাঁ। আমি তাকে অর্জন করেছি। যেভাবে জঙ্গলের দক্ষ মানুষ মৃগয়া থেকে তার শিকার নিয়ে ফেরে, আমিও তেমনি এই নারীকে নিয়ে এসেছি। এই নারী এখন আমার অর্জিত সম্পদ! পুড়ায় ভরা ধান, গোয়ালে পয়স্বিনী-দুগ্ধদা গাভী অপেক্ষাও যা মহার্ঘ।’
‘তুমি বিশ্বাসহন্তা। আমি বিশ্বাস করে, আমারই সহোদর ভেবে যে-স্বোপার্জিত ধন তোমার হাতে অর্পণ করেছিলাম, তাকে নিরাপদ রাখার জন্য, তুমি তার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে-প্রতিশ্রুতি পালন করোনি। তুমি স্বার্থপর। আর আজ কিনা—’
‘তুমিই যদি তাকে অর্জন করে এনেছো, যদি এই সন্তরণশীলা নারী তোমারি সম্পদ হয়ে থাকে, তাহলে সে কেন আজ তোমাকে চিনতে পারে না? কেন সে আমার এই বিশাল বন্য সাম্রাজ্য থেকে অনায়াসে পালিয়ে, আজও তোমার আশ্রিতা হয়নি?’
‘তুমি ধূর্ত। তুমি কুচক্রী বলে। ওই সন্তরণশীলা নারী অদ্যাবধি তোমার হৃদয়গত হয়নি। তুমি তাকে বিপাকে ফেলে বিভ্রান্ত করেছ।’
পাটন আকাশে বাতাসে তার আত্মগৌরবের হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘ভুল তোমার নারী দর্শন। নারীই মায়া। নারীই বিভ্রম। আজ পর্যন্ত জগতে কোনো পুরুষ নারীকে ভুল পথে চালিত করতে পারেনি। বরং নারীই তাদের রূপ দিয়ে, কাম দিয়ে, কলা দিয়ে, ছলনার বশবর্তী করে পুরুষকে প্রলোভনের পথে টেনে এনেছে। তাকে মোহগ্রস্ত করেছে। তার চারপাশের এই বিরাট জগতকে তুচ্ছ করে দিয়ে তাকে নারী ধ্যান, নারীই জ্ঞান, নারীকেই তার অষ্টপ্রহরের জপমালা করে তুলতে শিখিয়েছে।’
‘আমি বিশ্বাস করি না ওই নারী তোমাকে এসব শিখিয়েছে। কেউ কাউকে শিক্ষা দিতে পারে না— শিক্ষা অর্জন করতে হয়।’
‘সত্যিই শিক্ষা দেওয়া যায় না?’ পালটা প্রশ্ন করে বসে পাটন। উত্তরের জন্য চেয়ে থাকে অঙ্গদের মুখের দিকে। অঙ্গদও দ্বিধায় পড়ে যায়। পাটন তখন বলে ‘ওই তো, ওই নারী আমাকে শেখাচ্ছে অনভিপ্রেত পুরুষকে বিতাড়িত করতে। তাই আমি তোমার বিতাড়নে উদ্যমী হয়েছি। এটা শিক্ষা নয়?’
‘না, এটা শিক্ষা নয়। এটা ওই নারীর নির্দেশ। সে-নির্দেশ তুমি মানতে বাধ্য। কারণ তুমি নিজেই ওই নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে দিব্যচক্ষু ও জ্ঞানচক্ষু হারিয়েছে। তুমি তার দাস। দাসের কেবল দাসত্ব থাকে, মূল্যবোধ থাকে না। তাই তুমি সহোদরের অর্জিত ধনের যথাযথ মূল্য দাও নি। তাকে অন্যায়ভাবে অধিকার করে রেখেছ। তোমার এই অধিকারকেও আমি ধর্মত অধিকার বলে মানি না।’
‘ধর্মত? কাকে বলে ধর্ম? কাকে বলে ন্যায়-অন্যায়? পাটন আবার আক্রমণের ঢঙে পালটা প্রশ্ন করে। এবারেও সে জবাবের জন্য মুখাপেক্ষী হয় অঙ্গদের।
অঙ্গদ চিন্তাও করে। সত্যিই তো, এই শব্দসমুচ্চয় যখন-তখন যত্রতত্র উচ্চারিত হয়ে থাকে, কিন্তু এর অর্থ কি সত্যিই আমরা জানি? সে দ্বিধায় পড়ে যায়। তাকে এভাবে নীরব দেখে, পাটনই ফের তার মতো করে জবাব দেয়। বলে, ‘আমার কাছে ধর্ম এটাই—আমি একজন যৌবনবতী রমণীর প্রতিহারী হয়ে আছি। মানুষের প্রায়-বসবাসহীন নির্জন এই ভূখন্ডে। এখানে যে-কোনো সময় প্রতিপক্ষ প্রলুব্ধ হয়ে ওই নারীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। বিপন্ন হতে পারে আমারও জীবন। কই, তবু তো আমি পালিয়ে যাইনি? এভাবেই একজন নারীর প্রতি একজন পুরুষের যথার্থ ধর্ম আমি পালন করে চলেছি। বছরের পর বছর ধরে। সেই ধর্ম মেনে আমি তোমকে বলছি—তুমি চলে যাও এখান থেকে। ত্বরায় চলে যাও।’
এবার অঙ্গদও বিদ্রুপের হাসি না হেসে পারে না। সেও তাকে উপহাস করে বলে, ‘এই যদি তোমার ধর্ম হয় তাহলে যে ধর্মহন্তা, তোমার কাছ থেকে আমাকে ধর্মকথা শুনতে হবে? আর তুমি কি এখানে ওই নারীর সঙ্গে ধর্মপালন করতে পড়ে রয়েছো? তুমি ভন্ড এবং অসৎ। মিথ্যাভাষী। সুযোগসন্ধানী। তুমি নিজেও জান কী উদ্দেশ্যে তুমি ওই নারীর সঙ্গ পালন করে যাচ্ছো, তাও তুমি সেটা পৌরুষের সঙ্গে, সততার সঙ্গে স্বীকার করতে পারো না। ভয় পাও! তুমি বীরের অহমিকা নিয়ে থাকা প্রকৃত কাপুরুষ! ভীরু!’
‘আমি অতিকায়! দেহে-মনে আমি যথার্থ অজগর! আমি প্রবল! আর তুমি? তুমি তৃণের ন্যায় তুচ্ছকায়। তুমি হীন, দুর্বল। আমার বীরত্বকে তুমি তাই যুক্তিশৃঙ্খলে পরাহত করতে চাও। আমি এক পদাঘাতে প্রস্তুরও বিচূর্ণ করতে পারি! দেখাও তোমার সে-ক্ষমতা! রুগ্ন, কৃশ, পরিত্যক্ত বল্মীক! দেখাও!’
‘আমি অহমিকার বশবর্তী হয়ে কর্ম করি না। জগতে দুর্বল ও দাম্ভিক মানুষেরাই ক্ষমতা প্রদর্শন করে। প্রকৃত ক্ষমতাধর নিজেকে সংযত রাখে।’
হো:! হো: হো:! পাটন হাসতে হাসতে বলে, ‘আবার যুক্তি সাজাও? ধুরন্ধর বাচস্পতি! শুনে রাখো—জগতে প্রকৃত কাপুরুষ ও ভীরু হচ্ছে সে, যে আত্মরক্ষার্থে যুক্তি সাজিয়ে পিছিয়ে আসে। যেমন তুমি।’
‘ভুল। তুমি শুনে রাখো, দুষ্ট—জগতে প্রকৃত কাপুরুষ ও ভীরু হচ্ছে সে, যে আত্মরক্ষার্থে যুক্তি না সাজিয়ে পিছিয়ে আসে।’
ওদিকে ইরাবতীর জলে নিমজ্জিত জারমণি মাঝে মাঝে ভেসে উঠছে, আবার তলিয়ে যাচ্ছে। আর উপভোগ করছে, তাদের এই বাদানুবাদ। এখনও, অঙ্গদের এই কথাগুলি ইতিহাসের ছিন্ন পত্রাংশের মতো যেন উড়ে উড়ে আসছে তার কাছে। কখনও তার এটাও মনে হয়, পাটনের সঙ্গে অঙ্গদের হয়ে জারমণিই বুঝি কথা বলে চলেছে। সে চায়, এই কথোপকথন চলুক। এর একটা নিষ্পত্তি হোক। বিহিত হোক। হওয়া দরকার। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়।
অঙ্গদ তখনও তাকে বলে চলেছে, ‘আর তুমি এটাও জান—ওই নারীর কাছে তোমার এই তথাকথিত ধর্মের আচ্ছাদনে আচ্ছাদিত কুরূপ যদি একবার উন্মোচিত হয়ে পড়ে, তাহলে ওই নারীর রজঃসিক্ত বস্ত্রখন্ডও স্পর্শ করার যোগ্য হবে না তুমি! তুমি দ্বিচারী বলে গণ্য হবে। তুমি ওই নারীর দৃষ্টিতে হেয় হবে। সমাজে কোনো নারীই দ্বিচারী পুরুষকে পছন্দ করে না। সে তোমাকে ত্যাজ্য করবে। অথবা তোমাকে এই সূত্র ধরে যাবজ্জীবন খোঁয়াড়ে আবদ্ধ শূকরের মতো পীড়িত করে মারবে। নারী ভালোবাসতে জানে বলেই সে পীড়ন জানে ততোধিক। তারা যতই জননী আখ্যাত হোক, নিষ্ঠুরের খেলায় তারা পুরুষের চেয়ে ঢের ঢের অবুঝ, অযৌক্তিক, ক্রূর, হৃদয়হীন।’
হাতে বুচাটাঙি নিয়েও পাটন কিছু বলতে পারে না। তার মনে পড়ে যায়, ডেলিকচার জঙ্গলে সে-ও একদিন জারমণিকে এই ধরনের একটি কথা বলেছিল। নারীর জিদ প্রসঙ্গে সেও ‘হৃদয়হীন’ শব্দটি ব্যবহার করেছিল। সে বলেছিল, ‘হৃদয়হীন জিদ বজায় রেখে যদি তুমি জয়ীও হও, তাহলেও মনে রাখবে— তোমার প্রতিটি জয়ই পরাজয়ের নামান্তর। নারীর জিদ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়। বাস্তব-অবাস্তব বিবেচনা করতে জানে না। তাই তার পরিণতি হয় ভয়াল।’ তার জিদ, তার হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়া, তার বাস্তব-অবাস্তব বিবেচনা করতে না পারা—এই সবের মধ্যেও কি তবে তাদের আচরণে পুরুষের চেয়ে অধিক নিষ্ঠুরতার দৃষ্টান্ত নেই? তার চেয়েও যে মারাত্মক বাক্যটি সেদিন পাটন তাকে বলেছিল, তা হল—‘তোমার প্রতিটি জয়ই পরাজয়ের নামান্তর।’
আজ এই মুহূর্তে অঙ্গদের ভর্ৎসনায় নারীর চারিত্রের সেই আভাসটুকু ফুটে ওঠে না? তার ইচ্ছে হল, সেই জারমণির দিকে একদন্ড তাকাতে। কিন্তু সে-সুযোগও যে তার নেই। সে কেবল প্রতিহারী। হায় প্রতিহারী!
‘আমিও মনে করি, প্রতিটি পুরুষের উচিত নারীর নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু তোমার ভেতরে এই ঔচিত্য কাজ করে বলে আমি সন্দেহ করি। আর এই সন্দেহের নমুনা তুমি ইতিপূর্বেই দিয়েছ। দাওনি? বল?’ অঙ্গদ প্রশ্নটি করেও, জবাব পাবার আগেই সে জানিয়ে দেয়, এতদিন ধরে ‘দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে’ ঘুরে সে জারমণির খোঁজ করে গিয়েছে। কিন্তু নানা লোকমুখে সে যা-যা খবর পেয়েছে তাতে মস্তিষ্ক তার উগ্র ও চঞ্চল হয়ে পড়েছে। তার মনে হয়েছে জারমণি নয়, পাটনকেই তার আগে দরকার। তার সৌভাগ্য এটাই যে, একই জায়গায় একই সঙ্গে দু’জনকেই সে পেয়ে গিয়েছে। সে তার সমস্ত প্রশ্নের একটা একটা করে জবাব আদায় করে তবেই যদি যেতে হয়, সে যাবে। নচেৎ নয়।
‘বল তুমি? তোমার কাজ দিয়ে অভয় দিয়ে তুমি কি তোমাকে সন্দেহ করার মতো কাজ করোনি?’
‘না। আমি একজন নারীর প্রতি একজন পুরুষের কোনো ব্যবহারে, কোনো আচরণেই সন্দেহের অবকাশ রাখিনি। এমনকি—’
‘কী এমনকি?’
কথা পালটে দেয় পাটন। উলটে অঙ্গদকে সে জিগ্যেস করে, ‘প্রতিহারী হয়ে আমি কি তার নিরাপত্তা দিইনি?’
‘না, দাওনি। প্রতিহারীর ভূমিকা অযাচিতভাবে নিয়ে তুমি জারমণির থেকে আমাকে সুকৌশলে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছ। অপরদিকে আমার ব্যাপারে জারমণিকেও তুমি অন্ধকারের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলে। আর এই সবকিছুই তুমি করেছিলে একটি রমণভোগ্যা নারীর কাছে তোমার একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে। হীরক-খন্ডের মতো যে-স্ত্রীধন আমি ঘরে এনে তুলেছি, তার প্রতি তোমার দুর্দমনীয় আকর্ষণ হেতু, তুমি চেয়েছিলে আমাকে সরিয়ে দিয়ে কোনো বিবাদ, কোনো সংঘর্ষ এবং সূচ্যগ্র পরিমাণ রক্তপাত ছাড়াই সেই স্ত্রীধন লুন্ঠন করতে। তুমি কি মনে করো, তুমি তা করতে পেরেছ?’
‘হ্যাঁ পেরেছি।’ পাটন বলে, ‘এখন তুমি চেষ্টা করলেও এই নারীকে আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। সে আমার! সে আমার! সে আমার অধিকৃত জঙ্গম সম্পত্তি!’
অঙ্গদ বলে, ‘আমি তো তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে আসিনি। আমি জারমণিকে নিতে এসেছি। সেই সঙ্গে ভর্ৎসনা করতে এসেছি তোমাকে।’ এই কথা বলে, সে বটের কচি ঝুরির মতো চুলগুলি ঝটকা মেরে মুখের সামনে থেকে সরিয়ে দেয়। জারমণির দিকে তাকিয়ে উচ্চকন্ঠে আহ্বান জানায়, ‘জারমণি। আমি অঙ্গদ! আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। আমি তো বলেই ছিলাম আসব—’
জারমণির জবাব শুনতে দেয় না পাটন। সে-ও তার দিকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে ততোধিক জোরালো গলায় বলে ওঠে, ‘না, জারমণি! এ অঙ্গদ নয়। অঙ্গদ মরে গেছে কবেই। এই বৃদ্ধের সঙ্গে তুমি যাবে না—তুমি আমার সহচর হয়েছ, তুমি আমার। তুমি আমারই থাকবে। ওই তালপাতার কুটিরে আমি তোমার জন্য স্বর্গশয্যা রচনা করব।’
পাটনের এই ভঙ্গি দেখে অঙ্গদ হেসে ফেলে। ঠাট্টা করে বলে, ‘কোনদিকে রয়েছে তোমার জারমণি? কাকে তুমি বলছ? জারমণির দিকে সরাসরি তাকিয়ে, তার চোখে চোখ রেখে তোমার এই কথা বলার মতো সৎসাহস নেই। আবার বলছি, তুমি কাপুরুষ। জারমণি যদি তোমারই হবে, তাহলে হে কামুক, তুমি তোমার নির্বস্ত্র নারীর নগ্নরূপ দেখতে স্পর্ধিত হও না কেন? কই, আমার মতো দাঁড়াও দেখি তার মুখোমুখি। দাঁড়াও—’
কিন্তু পাটন তো সেদিকে তাকাবে না। ঘুরবে না। সে তার বক্তব্য জারমণির দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেই বলতে থাকে, ‘না জারমণি! এই বৃদ্ধ তোমাকে ফেলে রেখে আবার পালিয়ে যাবে। তুমি নি:সঙ্গ হয়ে পড়বে আরও। এর তত্ত্বকথায় বিশ্বাস কোর না।’
‘জারমণি! আমি বলছি, তোমাকে কথা দিচ্ছি, তোমাকে ফেলে আর যাব না। আমার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে। তোমারও শিক্ষা হওয়া উচিত এই অধম পুরুষটির কূটকৌশলের কাছে। তুমি খবরদার এর সঙ্গে থাকবে না। মনে রেখো অধমের সঙ্গে স্বর্গশয্যায় শয়ন অপেক্ষা উত্তমের সহিত স্থন্ডিলশায়ী হওয়া সর্বদা স্বস্তিদায়ক। তুমি চল—আমি তোমাকে চালাঘরে রাখব। আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি। যাবে না তুমি?’
জারমণি থুতনি ভাসিয়ে রেখে, মুখ দিয়ে পিচকিরির মতো জলের ফোয়ারা নিক্ষেপ করে, স্ফূর্তির সঙ্গে অঙ্গদকে বলে, ‘তুমি ভুল ভাবছো। কোনো নারীই তার পুরুষের জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করে বসে থাকে না। তোমার এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত।’
‘আমার এই অকাল বার্ধক্যই আমার প্রায়শ্চিত্ত।’
‘তোমার এই ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া উচিত।’
‘বিশ্বাসহন্তা সহোদরের হাতে তোমাকে অর্পণ করাই আমার অনুতাপ।’
‘তোমার এই ভুলের জন্য দন্ডিত হওয়া উচিত।’
‘তোমার জন্য সহস্র প্রহরের হাহাকারই আমার দন্ড।’
জারমণি হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে সে কখনও ডুব দেয়, কখনও শোল মাছের মতো তার শরীর দেখিয়ে ‘উফাল’ মারে।
অঙ্গদ তখনও বলে চলে, ‘তবুও তুমি আমাকে পুনর্বার ক্ষমা করো জারমণি। তুমি অতীত ভুলে যাও—চল আমার সঙ্গে। সমভিব্যাহারে উদ্যত হও।’
‘না! অতীত তুমি ভুলবে না, জারমণি।’ পাটন ঠিক এখান থেকে শুরু করে, ‘মনে করো সেই অতীত, যখন তোমার দুর্দশার সংবাদ লোকমুখে পেয়েও তোমার এই প্রিয়তম অঙ্গদ তোমার কাছে ছুটে আসেনি। মনে করো সেই অতীত, যখন আমার বাপ-মা তোমাকে আমাদের ঘর থেকে বিতাড়িত করতে গিয়েছিল, আমিই সেখানে প্রতিবাদ করে তোমাকে আশ্রিতা করেছিলাম। তখনও তোমার এই প্রিয়তম অঙ্গদ কাপুরুষের ভূমিকা নিয়ে নির্বাক ছিল। মনে করো সেই অতীত, যখন বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে তোমাকে রক্ষা করব বলেই আমি স্বেচ্ছায় তোমার বন্ধ-গৃহের প্রতিহার আগলে রেখেছিলাম। তখনও তোমার এই প্রিয়তম অঙ্গদ তোমাকে বিবাহোত্তর জীবনের অলীক স্বপ্ন দেখাচ্ছে। মনে করো সেই অতীত যখন গ্রামবাসীদের রোষে আমি দগ্ধ হচ্ছি এবং তোমারও অগৌরব মুখে মুখে রটিত হচ্ছে, তখনও তোমার এই প্রিয়তম অঙ্গদ গ্রামবাসীদের মাঝে এসে দন্ডের ভাগীদার হয়নি। কেন না, সে সমস্যাকে ভয় পায়, প্রহারকে ভয় পায়, মৃত্যুকে ভয় পায়। এর কোনোটার বিনিময়েই সে তোমাকে চায় না। আর আমি? সমস্ত কিছুর বিনিময়ে তোমাকে চাই। শুধু তোমাকেই চাই।
‘সেদিন সে আসেনি, আজ সে আসছে। প্রায়শ্চিত্ত করে, অনুতপ্ত হয়ে, দন্ডিত হয়ে। আর আজ সে এসে তোমাকে প্রতিহারীর নিরাপত্তা দেওয়ার সুবাদে আমার কাছে কোনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ত করেই নি, উলটে আমাকে কৌশলী, কুচক্রী, বিশ্বাসহন্তা বলছে। আমাকে কামান্ধ, কুক্কুর বলছে। এই কি আমার প্রতিদান? বিশ্বাস করো—’ পাটন কাঁদো কাঁদো গলায় বলতে থাকে, ‘তোমাকে আমার করে নেব বলে আমার কোনো পূর্বনির্ধারিত কৌশল ছিল না। তোমার প্রথম মুখদর্শনই আমাকে কৌশলী হতে শিখিয়েছে। আমি কখনও কোনো স্ত্রী-শরীর দেখিনি। তোমার শরীরের অলঙ্কৃত গঠনই আমাকে কৌতূহলী করেছে, আমাকে নিষিদ্ধ দর্শনের জন্য প্ররোচিত করেছে এবং ধীরে ধীরে কামান্ধ করে তুলেছে। তোমার সেই শরীর স্পর্শ করার দুরাশায় দন্ডে দন্ডে আমার দেহ কদলপত্রের মতো কম্পিত হচ্ছে। তথাপি আমি ধৈর্যচ্যুত হইনি। পুনর্বার তোমাকে নিগৃহীত করার আসুরিক পন্থা অবলম্বন করিনি। কেন? নিগ্রহের মধ্যে কোনো প্রেম নেই। আজ অব্দি জগতে দাসত্ব দিয়ে প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবু আমি তোমার দাসত্ব করেও তোমাকে জয় করতে চায়। কেন না, তুমি সুন্দর। তোমকে লুন্ঠন করতে চায় না। কেন না, সুন্দরকে লুন্ঠন করা গর্হিত কর্ম। এরপরেও কি তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না?
‘যদি ওই পলায়নকামী বুড়োটা তোমার চোখে ক্ষমার্হ হয়ে থাকে, তাহলে আমিই-বা হব না কেন? তুমি আমাকে ক্ষমা করো জারমণি। আমাকে বর্বরতা কাটিয়ে উঠতে সময় দাও। তুমি যেয়ো না ওই সুপ্ত-লিঙ্গ জরাগ্রস্ত মানুষটির সঙ্গে সহগমনে। যেও না! যেও না! যেও না!’
জারমণি ডুব দিল। সে কিন্তু একটি বারও বলেনি সে অঙ্গদের সঙ্গে যাবে, কিংবা অঙ্গদের সঙ্গে যাবে না।
আবার সে যে পাটনের সঙ্গেই থেকে যাবে, তাও বলেনি। ফলে তাদের দু’জনের মধ্যে একটি অমীমাংসাহেতু বিবাদের উপক্রম হয়।
বিবাদ অনিবার্য। একটি মাত্র বন্য শূকরীকে দুই বিপরীতমুখী ব্যাধের দুটি তীর এসে বিদ্ধ করেছে। শূকরীটি কার? এখন কে হবে তার ন্যায্য মালিক?
জারমণি জানিয়ে দেয়, এ ব্যাপারে তার কোনো নির্বাচন নেই। সে যে-কোনো জনের হতে পারে। কিন্তু কে সেই জন? জারমণি বলে, ‘হামি নাই বলব স্যাটা। তরা নিজেরাই বিচার কর। লড়হাই কর।’
হ্যাঁ, লড়াই। বর্বরতা দিয়েই শুরু হয় ওদের বর্বরতা থেকে উত্তীর্ণ হবার উদ্যোগ। ওরা প্রস্তুত হতে থাকে সেই লড়াইয়ের জন্য। আর জলে সন্তরণশীল সেই যৌবনবতী মরালী শুধু হেসে যায়।
পাটন তার হাতের বুচাটাঙি আরও শক্ত করে ধরে। দু’পা পিছিয়ে যায়।
অঙ্গদও তার হাতের শুকনো সরু ডালটি নিয়ে পিছিয়ে আসে। তারপর দুপক্ষই একে অপরের গায়ের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সবেগে ধাবিত হয়। প্রতিবেগে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় অঙ্গদ। শুধু পড়ে যাওয়াই নয়, সে ছিটকে চলে যায় তালতলের দিকে। পাশেই বটবৃক্ষ। বটের ঝুরি ধরে সে কোনো মতে দাঁড়িয়ে ঝড়ের মতো তার অস্ত্রটির দিকে অগ্রসর হয়। পাটন অট্টহাস্য করে। প্রবল আত্মগৌরব নিয়ে, সদ্য নারীর মালিকানাপ্রাপ্ত পুরুষের দম্ভ ও অহঙ্কার নিয়ে, পাটন দীর্ঘক্ষণ কটূক্তি করে চলে অঙ্গদকে। প্রতিকথায় সে তাকে ঠাট্টা করে। উপহাস করে।
অঙ্গদের ভেতরে ভেতরে ক্রোধ অনলে রূপান্তরিত হয়। তবু নিজেকে সে যতটা সম্ভব সংযত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু তার মুখ দিয়ে কটু কথা বেরিয়েই আসে। বলে, ‘তুমি অধম। অধম হয়েই থাক। তোমার ওই কু-যুক্তি আর নীচ মানসিকতা দিয়ে নারীকে আর নীচে নামিয়ে এনো না।’
‘তুমি আমাকে অধম বললে?’
‘অধম বৈকি? আবারও বলছি— নারীর লোভে যে নিজের সহোদরকে অস্বীকার করে, সে শুধু অধমই নয়, সে কুক্কুর। সে লোভি। পথ ছাড় তুমি—’
‘না। যে-পথে অগ্রসর হলে নারীপ্রাপ্তি ঘটে, আমি সেই পথ ছাড়ি না। সে-পথ শুধু আমারই! এমনকি—’ পাটন মাটি থেকে বুচাটাঙিটি হাতে নিয়ে, চারি কোণের চারটি ডুংরির মাথায় তার কাল্পনিক দুয়ারসিনীদের উদ্দেশে স্পর্ধার সঙ্গে বলে ওঠে, ‘যদি ওই টিলার শীর্ষ থেকে দুয়ারসিনীর বদলে কোনো রাক্ষসও নেমে এসে ওই নারীর প্রলোভনে এই পথ দিয়ে যেতে চায়, আমি এই বুচাটাঙি দিয়ে তারও মুন্ড কর্তন করব! তবু পথ আমি ছাড়ব না। এই পথ প্রকৃত বিপদের পথ। রক্তক্ষরণের পথ। তুমি নিরীহ মানুষ, তুমি অস্ত্র ধরতেই জানো না—তুমি কেন এপথে যেতে চাও? বরং যে-পথ দিয়ে তুমি অবতরণ করেছিলে, আবার সেই অভিমুখে প্রস্থান করো।’ বলে সে আবার হাসে। বিদ্রুপের হাসি।
‘আমি নিরীহ। আমি অস্ত্র ধরতে জানি না। আমি এই ধরিত্রীর বুকে একবিন্দুও রক্তপাত চাই না। তাই জন্যই কি আমি তোমার বিদ্রুপের পাত্র?’
‘শুধু আমার নয়। নিরস্ত্র ও নির্ধন মানুষ আজকের দিনে সকলের কাছে উপহাসের পাত্র।’
সত্যিই কি তাই? মানুষ কি আজ এরকমই হয়ে গেছে। সমাজ কি এইভাবে এগিয়ে চলেছে? কোনদিকে চলেছে? বড়ো নিরাশ দেখায় অঙ্গদকে। সে নিজেই তার হাতের শুকনো ছড়িটি উলটেপালটে দেখে আর মনে মনে আক্ষেপের সঙ্গে অভিযোগ করতে থাকে তার সেই বৃদ্ধের কাছে। বলে, ‘এ তুমি কী অস্ত্র দিলে! যা দেখে প্রতিপক্ষ ভীত ও সন্ত্রস্ত হয় না! যা দিয়ে শত্রুর বিনাশ হয় না! প্রতিঘাত করা যায় না। যা দেখে শত্রুরা কটাক্ষ করে! হায়! আমিও যদি এই শুকনো গাছের ডালটির বদলে একটি তরবারি আনিতে পারতাম!’
অঙ্গদ ফিরে চলে গেল।
আবার সেই উদুম্বর বৃক্ষের নীচে এসে বসল অঙ্গদ। সে ক্লান্ত। অবসন্ন। মাথার চুলগুলি তখনও তার কপাল জুড়ে স্রস্ত হয়ে রয়েছে। গায়ে মৃত্তিকার ছাপ। পাটনের প্রতিবেগে নিক্ষিপ্ত হওয়ায় হাঁটুতে আঘাতও পেরেছে সে। সেখান থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। নিজের রক্তকে দেখে, অঙ্গদ, নিজেই ভয় পেয়ে যায়। সে তার শ্রান্ত শরীরটিকে যতটা সম্ভব সম্মুখে বাড়িয়ে, পথ থেকে একমুষ্টি ধূলি তুলে নেয়। সেই ধূলি দিয়ে ঢেকে দেয় ক্ষতস্থানটি। একটি মাছি ঘুরতে থাকে।
অঙ্গদ যে কেবল পরিশ্রান্ত, তা-ই না। এই মৃণ্ময় পার্থিব জগৎ সম্পর্কে একটা বিষাদও তাকে পুনরায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। এই অভিযানটির জন্যও তার অনুতাপ হয়। মনে হয়, ‘আমি কেন যে গেলাম সেই নারী-সন্ধানে! কেন আমি নিজেকে সহোদর বলে পরিচয় দিলাম আপন সহোদরের কাছে? কেন আমি একটি নারীর জন্য লালায়িত হলাম? এবং সেই নারীর দাবিতে সোচ্চার হয়ে অসূয়া করলাম আমার অমন স্নেহের ছোটোভাইকে? সে যদি অন্ধ ও অবোধ হয়ে থাকে, আমি তো তা নই? আমি তো তার চেয়ে ঢের আগে, জন্মসূত্রে, এই আলো-অন্ধকারে আচ্ছন্ন জগৎকে দেখছি? আমি কেন তার চেতনার উন্মেষ ঘটালাম না? জগতে ত্যাগই শ্রেষ্ঠতম ধর্ম, ঔদার্য মানবের মহান চরিত্র। আমি কেন সেই পথের মহিমা অনুধাবন করলাম না? কেন আমি নারী-যোধনে প্রমত্ত হয়ে উঠলাম? তার হস্তগত নারীর জন্য কেনই-বা আমি এমন অহর্নিশ হাহাকার করছি? কেন আমি ত্যাগী ও নিরাসক্ত হতে পারছি না? আজকের এই সমাজে নারী তো এভাবেই সামান্য অন্যমনস্ক হলে একহাত থেকে ভিন্ন হাতে চলে যায়।
‘শুধু আজকের সমাজে কেন? চিরদিনই নারী নারীই থেকেছে। হস্তান্তরযোগ্যা। লুন্ঠনভোগ্যা। পরস্ব ধন। মানুষের সমাজে এমনি কত অস্থাবর ধনই তো এক ধনাগার থেকে ভিন্ন ধনাগারে চলে যায়। এক হেপাজত থেকে আরেক হেপাজতে। কই, মানুষ তো তার জন্য বিলাপ করে না?। আমি কেন তাহলে এভাবে, এই উদুম্বর গাছের তলে বসে, থেকে-থেকে বিলাপ করে চলেছি? কেন আমি আমার কৃতকর্মের জন্য নিরন্তর অনুতপ্ত হচ্ছি? কেন আমার এই অন্তর্রোদন? কীসের জন্য? মূঢ় আমি! অজ্ঞান আমি!’
বিষাদের দৃষ্টিতে সামনে চেয়ে থাকে অঙ্গদ। চিতার আগুন তখন দাউ দাউ জ্বলছে। অঙ্গদের মনে হল, জগতে ধ্বংসের কি শেষ নেই? এই নিরবচ্ছিন্ন ধ্বংস প্রক্রিয়া কি শান্তির পথে যায়? মীমাংসার পথে যায়? কখনও কি যাবে?
অঙ্গদের আবার এটাও মনে হয়, তার এই নিষ্ফল প্রত্যাবর্তনও আরেক ভুল। সে কেন ফিরে এল? অনুজের বুচাটাঙি দিয়ে যদি তার মুন্ড ওই চপলা নারীর সম্মুখে ধুল্যবলুন্ঠিত হয়ে থাকত—যদি হত্যা দিয়েও এহেন অমীমাংসিত বিষয়ের মীমাংসা ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হত, তাহলেও কৃতার্থ হত তার অনিত্য জীবন। কেন না, জীবন দিয়ে জীবনের শান্তি স্থাপনের চেয়ে মহৎ কর্ম আর কী-ই বা হতে পারে?
‘আমি ভুল! আমি ভুল! হে সহোদর, আমার হাত সত্যিই অস্ত্রধারণে অপারগ। ওহ! ওহ! ওহোহোহো!...’ বিষাদে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ল অঙ্গদ।
‘বৎস!’
ভগ্নপ্রায় অনুতাপী অঙ্গদ চোখ তুলে তাকাতে পারে না। প্রগাঢ় দৃষ্টিতে ভূমির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে, একসময় তার মগ্নতা কাটে। মুখ তোলে। দেখে সেই চিরপ্রশান্তিপূর্ণ মুখচ্ছবি! তার সম্মুখভাগে বরাভয় মুদ্রার মতো স্থির ও অচঞ্চল সেই বৃদ্ধ।
‘তুমি অস্ত্র চাহিয়াছিলে? তোমার পরিতাপ নিবারণার্থ এই লও অস্ত্র।’ বৃদ্ধ একটি প্রলম্বিত তরোয়াল চর্মকোশ থেকে খুলে তার পায়ের সামনে, ভূমিতে রেখে দেয়। বলে, ‘যাও, অতঃপর মুন্ডচ্ছেদন করিয়া আইস তোমার প্রতিপক্ষের।’
‘না, অস্ত্র আমি চাহি না। আমি মুন্ডপাতও চাহি না।’
‘তবে কীসের নিমিত্ত তৎকালে তুমি অস্ত্রের জন্য হা-হুতাশ করিতেছিলে?’
‘তখন আমি ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম। এই ক্রোধই আমার অন্তরে জন্ম দিয়াছিল অস্ত্রের জন্য হাহাকারের। অধিকন্তু তখন আমি আমার নিজের অস্ত্রটি দেখিয়া বারে বারে বিস্মিত হইতেছিলাম—হে মহাপ্রবীণ, অস্ত্রের নামে আপনি ইহা কী বস্তু ধরাইয়া দিলেন আমার হস্তে? একটি শুষ্ক-বিশীর্ণ বৃক্ষ শাখা?’ ভাবলে, এখনও যেন অঙ্গদের বিস্ময়ের ঘোর কাটে না।
বৃদ্ধ গাড়োয়ান স্মিত হেসে তাকিয়ে থাকল পরিতাপরত অঙ্গদের প্রতি। তারপর—
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! জগতে অস্ত্র দ্বিবিধ। আমি তোমাকে যাহা অর্পণ করিয়াছিলাম, তাহা অরিন্দম নহে। তাহা দ্বারা তুমি নিজেকে হত্যা করিতে পার, শত্রুকে নহে। আর এই মুহূর্তে তোমার সম্মুখে যাহা জাজ্জ্বল্যমান, তাহা দ্বারা শত্রু নিধন সম্ভব।’
এই শ্লোকটির গূঢ়তা বোধগম্য হয় না অঙ্গদের। তা একই সঙ্গে বৈপরীত্যপূর্ণ তথা অসম্ভবও প্রতীয়মান হয়। যে অস্ত্র দিয়ে নিজেকে হত্যা করা যায়, তা দিয়ে অপরকে হত্যা করা চলে না কেন? অথবা, নিজেকেই যদি আমি হত্যা করে বসি, তাহলে আমিই আবার শত্রুদমনে যাব কোন অলৌকিক বলে?
অঙ্গদ এই পরস্পরবিরোধী ঘটনার সংশয়াতীত বিশ্লেষণ চাইল তাঁর কাছে। অঙ্গদ বলল, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি দুর্মেধা। মূর্খ। সেহেতু আপনার এই অসরল ভাবার্থ এখনও আমার দুর্বোধ্য বোধ হইতেছে। হে বাচস্পতি! যদি পূর্বোক্ত শ্লোকটি পুনরায় আমার মতো করিয়া আমার শ্রবণার্থ নিবেদন করেন তাহা হইলে আমার সংশয়রূপ তমিস্রা দূরীভূত হয়।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! অস্ত্র বিষয়ক প্রাগুক্ত শ্লোকটি পুনর্বার তোমার মতো করিয়া তোমার শ্রবণার্থ নিবেদন করিতেছি। শ্রবণ করো। স্মরণে রাখিও, যাহারা আত্মোন্নতির জন্য সচেষ্ট নহে, যাহারা কর্মযোগরহিত, যাহারা সংশয়বাদী, যাহারা তর্কবাগীশ, তাহাদের নিকট ইহার সারমর্ম অসার। সুতরাং তাহাদের নিকট এই ভাবের অবতারণা করিলে অথবা তাহাদিগকে এই আচরণ গ্রহণ করিতে বলিলে কেবল মীমাংসাহীন কূট তর্কজাল বিস্তৃত হইবে। অতএব এই কর্ম কদাপিও করিবে না। অতঃপর বলি, শত্রুকে নিধন করিবার পূর্বে নিজেকে নিধন করো। নিজেকে নিধন করিবার প্রতিভূ বা প্রতীকী অস্ত্রস্বরূপ তোমাকে ওই গুল্মদন্ডটি অর্পণ করিয়াছিলাম। বস্তুত, নিজেকে নিধন করার অর্থ হইল ‘অহম’ কে নিধন করা। এই অহমের অর্থ হইল নিজের প্রতি নিজের আসক্তি। মানুষ নিজের প্রতি আসক্ত হইয়া পড়ে নিজেরই সৃষ্ট ভ্রান্ত ধারণার দ্বারা। যাহা তোমাকে সত্য হইতে বিচ্যুত করিবে। সুতরাং সেই ভ্রান্তি বিনাশপূর্বক তুমি নিজের ভিতরে নিজের সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করো। যদ্যপি তুমি তাহা না করো, তাহা হইলে তোমার অন্তরস্থ পরস্পরবিরোধী বল তোমাকে লইয়া বিবাদ করিয়া তোমাকে লক্ষ্যে অগ্রসর হইতে দিবে না। পথ হইতে বিপথে লইয়া যাইবে। যে-কারণে শকটে অধিরূঢ় আমি হাতে এই দন্ড লইয়া শকট পরিচালনা করিতেছি।’
এই অভিভাষণটি শোনার পর অঙ্গদের কাছে একদিকে যেমন তার হাতে অস্ত্র হিসাবে ওই ছড়িটি দেবার তাৎপর্য পরিষ্কার হয়ে যায়, অন্যদিকে তেমনি, এই বৃদ্ধের গোরুর গাড়িতে থাকাকালীন হাতে সাটিকটি রাখার গূঢ় আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাটিও বুঝে যায়। যে-সাটিক দিয়ে সে নিজের ভেতর দুই বিরোধীশক্তির প্রতীক রূপ গাভী দুটিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। যার অভাবে গাড়ি যে-কোনো মুহূর্তে খানাখন্দে পড়ে যেতে পারে।
অতঃপর মহাপ্রবীণ তাকে লৌকিক অস্ত্রের কথা বললেও প্রতীকী অস্ত্রের সূত্রে অঙ্গদ জানতে চাইল নিজেকে নিয়ে গড়ে ওঠা অমূলক ধারণা সম্পর্কে।
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! এই ভ্রান্ত ধারণা সকল কী কী? কী উপায়ে আমি নিজের ভিতরে নিজের সত্য প্রতিষ্ঠিত করিব?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! ভ্রান্ত ধারণা সকল কী কী তাহা বলিতেছি। অবহিত হও— যাহার ধন নাই সে নিজেকে ধনী বলিয়া অহঙ্কার করে, যাহার বিদ্যা নাই সে নিজের পান্ডিত্য লইয়া বড়াই করে, যাহার হাতিয়ার নাই, সে নিজেকে সশস্ত্র বলিয়া জাহির করে, যে হীনবল সে শক্তিমানের ন্যায় গর্জন করে, যে অজ্ঞান সে জ্ঞানীর ভান করে—এই সমুদয় হইল ভ্রান্ত ধারণার লক্ষণ। ভ্রান্ত ধারণা সম্পূর্ণ লুপ্ত বা বিনাশপ্রাপ্ত হইলে তবে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ভ্রান্ত ধারণা বিনাশপ্রাপ্ত হয় জ্ঞানের আলোকে। জ্ঞান হইল চেতনার দীপ্তি। এই চেতনা লব্ধ হয় জগতদর্শনের মাধ্যমে।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! যে-হাতিয়ার আপনি আমার হাতে এক্ষণ অর্পণ করিতে চাহেন, তাহা সত্বর আমার নিকট হইতে লইয়া যাউন। আমি আর অস্ত্র চাহি না।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন। তুমি যদি যুযুৎসু (যুদ্ধআকাঙ্ক্ষী) হইয়া থাক, যদি তুমি প্রতিপক্ষের সহিত যুদ্ধে যাইতে দৃঢ়সঙ্কল্প হইয়া থাক, তাহা হইলে অস্ত্র তুলিয়া লইতে কুন্ঠিত হইতেছ কী হেতু? কী হেতু অস্ত্রের ঔজ্জ্বল্য দেখিয়া তোমার হস্ত প্রকম্পমান?’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমার হস্ত প্রকম্পমান তাহার কারণ আমার হস্ত অস্ত্র ধারণের উপযুক্ত নহে। অস্ত্র আপনি লইয়া যাউন। আমি অস্ত্রও চাহি না, যুদ্ধও চাহি না। প্রথমবারের উদ্যোগে আমি পরাজিত ও বিদ্রুপ-বাণে বিদ্ধ হইয়াছি। বিতাড়িত হইয়াছি। এই উদ্যোগ আমার কাছে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।’
‘জগতে কোনো উদ্যোগই সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইতে পারে না। প্রতিটি উদ্যোগই মানুষের জন্য কতিপয় শিক্ষণীয় পাঠ রাখিয়া যায়। সেথায় কী প্রকার অভিজ্ঞতা তোমার সঞ্চয় হইল?’
অঙ্গদ পরপর তার অভিজ্ঞতার কথা বলে যেতে লাগল। সে বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! সেথায় আমার যেরূপ অভিজ্ঞতার সঞ্চয় হইল তাহা ক্রমান্বয়ে বলিয়া যাইতেছি—
১. নিরস্ত্র মানুষ উপহাসের পাত্র।
২. সময়ের ব্যবধানে পরনির্ভরশীল নারীর পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
৩. নারী নিজে শক্তিহীনা, অবলা। নিজের শরীরকে বলরূপে ব্যবহার করিয়া যে কোনো শক্তিকে সে বশংবদ করে।
৪. নারী নিজেকে তৃতীয়পক্ষ রূপে সুরক্ষিত রাখিয়া প্ররোচনা দিতে পারে লড়াইয়ের।
৫. নারী অবলা বলিয়া পুরুষের দুর্বলতাকে সে অব্যর্থ অস্ত্র করিয়া ব্যবহার করে।
৬. নারীর নিজ অবস্থান কখনো স্পষ্ট হয় না।
৭. নারী ক্ষমা ও বিবেচনা জানে না। পুরুষকে সে তার প্রতিপক্ষ মনে করে।
৮. নারী যেদিকে, পুরুষের উদ্যম ও প্রেরণা সেদিকেই।
৯. নারীকে গুরুত্বহীন দৃষ্টিতে দেখা কদাপিও উচিত নহে।
উপরিবর্ণিত অভিজ্ঞতাগুলি শুনে মহাপ্রবীণ মৃদু হাসলেন। তারপর তিনি অঙ্গদকে যা বললেন, তাতে অঙ্গদ স্তম্ভিত। বিহ্বল। মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘উদ্যোগ তোমার ব্যর্থ হয় নাই। উদ্যোগ-পর্বে তুমিই জয়ী হইয়াছ।’
‘আমি?’
‘হ্যাঁ, তুমিই।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি যুদ্ধের এই উদ্যোগ-পর্বে যুদ্ধ না করিয়াও কীভাবে জয়ী হইলাম তাহা সবিস্তার শুনিতে অসহিষ্ণু হইয়াছি। আপনার সানুগ্রহ বচন শ্রবণে কাঙ্ক্ষা করি।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! অভিজ্ঞতারূপ অস্ত্রই মানুষের প্রকৃত যুদ্ধাস্ত্র। পরাজিত মানুষ তার পরাজয়ের গ্লানি হইতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। বিজয়ী তার জয়কেই চরম সাফল্য জ্ঞান করে গৌরবে বিভোল হইয়া থাকে। পরবর্তী লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে সে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে। তুমি যে অভিজ্ঞতা ওই সমরাঙ্গন হইতে সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছ, তাহাই তোমার পরাজয়োত্তর লড়াইয়ে বিশেষ কাজে আসিবে। তাহা তুমি কদাপিও বিস্মৃত হইও না। এই মহামূল্যবান অভিজ্ঞতাই তোমাকে জয়ের মার্গ প্রশস্ত করিয়া দিবে। তুমি ভগ্নদশা হইতে জাগ্রত হও। পরবর্তী সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করো নিজেকে। উঠ তুমি। ওই উদুম্বর বৃক্ষের তল হইতে বাহির হইয়া আইস। পরিসর ক্ষেত্রে দাঁড়াও।
‘অধিকন্তু, এই অভিজ্ঞতা তোমাকে আরও এক শিক্ষণীয় পাঠ দিতেছে। তাহা হইল—নিজেকে জানার। তুমি নিরন্তর নিজেকে জান। তুমি আগে যাহা ছিলে, এখনও কি তাহাই আছো? এখনও কি তুমি বলিবে, নারী অকিঞ্চন? তোমার অভিজ্ঞতার সারণি তাহা বলে না। যে-তুমি পূর্বে বলিয়াছিলে, নারী তুচ্ছ, সেই তুমিই এখন অভিজ্ঞতালব্ধ হওয়ার পর বলিতেছ—নারীকে গুরুত্বহীন দৃষ্টিতে দেখা কদাপিও উচিত নহে। অধিক আর কী বলিব? শুধু বলি, তোমার নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নাই। তুমি পুনরায় পূর্ণোদ্যমে নিজেকে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করিয়া চল। মনে রাখিও, অস্ত্র ও শস্ত্র দ্বারাই যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না। তাহা অদক্ষ অদূরদর্শী যুদ্ধবাজদের ধারণা। যুদ্ধের মারণাস্ত্র হইল জ্ঞান। তুমি আত্মদর্শন কর, জগদ্দর্শন কর, তোমার এবং তোমার চারিপার্শ্বের জীবন হইতে তুমি প্রতিনিয়ত সঞ্চয় করিতে থাকো তোমার সেই মারণাস্ত্র। তোমার সেই ‘অক্ষর’ জ্ঞান। তুমি আপাত দৃষ্টিতে ক্লিষ্ট ও হীনবল। তাই তুমি আমার প্রিয়। আমি চাই জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হউক। আমি তোমার মাধ্যমে এই জগৎ হইতে দুষ্ট শক্তি নির্মূল করিতে চাহি। কেন তুমি সেই দুষ্টশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইবে না? কেন তুমি জগদ্দর্শনে যাইবে না? কেন তুমি নিত্যনৈমিত্তিক জীবন হইতে সংগ্রহ করিবে না তোমার হাতিয়াররূপ জ্ঞান? আইস, আমার এই গো-শকটে আরোহণ কর। আমি তোমাকে জগদ্দর্শন করাই। জগদ্দর্শনই হইল প্রকৃত বিশ্বরূপ দর্শন।’
অতল মগ্নতা নিয়ে অঙ্গদ চেয়ে থাকে মহাপ্রবীণের দিকে। সে কী বলবে ভেবে পায় না। সত্যিই কি সে এই মুহূর্তে মহাপ্রবীণের গো-শকটে অধিরূঢ় হবে? সে জগদ্দর্শনে বেরিয়ে পড়বে? যা জগদ্দর্শন, তাই বিশ্বরূপ দর্শন। অঙ্গদ কি জানে বিশ্বরূপ দর্শন কী? কেনই-বা মহাপ্রবীণ জগদ্দর্শন এবং বিশ্বরূপ দর্শনকে অভিন্ন বলে উল্লেখ করছেন?
আবার এটাও তো ঠিক যে, এই গো-শকটে আরোহণ করলে বিলাপী অঙ্গদ যে উদ্যোগ-পর্ব থেকে প্রত্যাবর্তিত হয়ে যুদ্ধের নিমিত্ত নিজেকে প্রস্তুত করছে তাও পরিষ্কার হয়ে যায়। তাহলে সত্যিই কি অঙ্গদ শান্তি চায় না, যুদ্ধই চায়? নাকি জগতে শান্তির জন্য প্রস্তুতির নামই যুদ্ধ? এখনো এতগুলি জিজ্ঞাসার জবাব অজানা রয়ে গেছে অঙ্গদের।
তাছাড়া, অঙ্গদ এক্ষুণি কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চায় না। সে নিজেকে আরও জানতে চায়। মহাপ্রবীণের কাছে এখনও যে তার অগণিত তত্ত্বানুসন্ধান বাকি। তথাপি, অঙ্গদ কী অনুভব করে—এই মহাপ্রবীণের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে করতে ইতিমধ্যে তার অন্তর্গত বিলাপ অনেকটাই অপসৃত হয়ে গিয়েছে? এভাবেই কী সে ভাবলোক থেকে বাস্তবলোকে আসছে? ক্রমশ আসক্তি থেকে যাচ্ছে নিরাসক্তির দিকে? প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্তিতে?
অঙ্গদ বলে, ‘হে তত্ত্বপ্রণেতা! গো-শকটে অধিরূঢ় হইবার পূর্বে আমি আপনার নিকট আমার আরও কিছু অজ্ঞতা সবিনয় নিবেদন করি। আমাকে তাহার সবিস্তার ও অকঠিন বিশ্লেষণ দ্বারা জীবন ও জগতের প্রতি কৌতূহলী করিয়া তুলুন। হে মহাপ্রবীণ, ‘অক্ষর’ জ্ঞান বলিতে কী বুঝাইতেছে?। ‘অক্ষর’ কী আর ‘জ্ঞান’ই বা কী?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে তত্ত্বাগ্রহী! জ্ঞানের কথা আমি পূর্বে বলিয়াছি। তৎসত্ত্বেও তোমার যখন শুনতে আগ্রহ জন্মিয়াছে, তখন তাহা পুনর্বার কহিব। হে শ্রবণেচ্ছু, তত্ত্বগত আলোচনায় ‘অক্ষর’ বলিতে লিপি বা বর্ণ কদাপিও বুঝিবে না। অক্ষরের অর্থ হইল যাহা ‘ক্ষর’ নহে। যাহা নশ্বর বা ভঙ্গুর নহে। যাহার ক্ষরণ নাই, বিনাশ নাই, তাহাই অক্ষর। ব্রহ্ম, পরমাত্মা, জীবাত্মা, শিব, বিষ্ণু, আকাশ হইল অক্ষর। ইহাদের সৃষ্টিও নাই, ধ্বংসও নাই। লোকজীবনে অক্ষর বলিতে আত্মাকেই মানুষ সচরাচর বুঝিয়া থাকে।
‘সত্য বিনা জ্ঞান অমূলক। অভিজ্ঞতালব্ধ সত্যই হইল জ্ঞান। এই ব্রহ্ম, পরমাত্মা, জীবাত্মা আদির সহিত আমি এই ‘জ্ঞান’কেও (তৎসহ সত্য) অক্ষর বলিয়া অভিহিত করিয়াছি। তাহার কারণ, জ্ঞানেরও সৃষ্টি নাই, বিনাশও নাই। এই মহাবিশ্বে সত্য অর্থে জ্ঞান চিরকাল রহিয়াছে এবং তাহা থাকিবেও। মানুষ তাহার সপ্ত ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, মুখ, গাত্র—এই পঞ্চইন্দ্রিয় এবং তৎসহ পান ও অপান) দ্বারা এই জ্ঞানকে অনুসন্ধান করে আহরণ করে। সমাজে তাহারা ‘জ্ঞানী’ আখ্যাত হন। অধিকন্তু আমার অভিমত এই যে, জ্ঞানকে যেমন আমি অক্ষর বলিয়াছি, তদ্রূপ ‘অক্ষর’কেও আমি জ্ঞান বলিতে চাহি। আমার মতে জ্ঞানও যাহা, পরমাত্মাও তাহা। আমি এইরূপ ব্যক্ত করি। অতঃপর নিবেদন কর।’
অঙ্গদ বলে ‘হে মহাপ্রবীণ! আপনি জগদ্দর্শনের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। বস্তুত, এই ‘জগৎ’ কী? যাহাকে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত দর্শন করিতেছি তাহাকেই বা আবার নতুন করিয়া দর্শন করিবার কারণ কী?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন ‘হে অর্বাচীন! জগৎ হইল চিরন্তন সত্যের প্রকাশ তথা জীবনের সমাহৃত রূপ। এই রূপকে দর্শন করিয়া চিরন্তন সত্যের স্বরূপকে অনুসন্ধান করিতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে, বারংবার দেখা বস্তুকে আবার নতুন করিয়া দর্শনের কিছু নাই। কিন্তু তাহা যথার্থ নহে। ‘জগদ্দর্শন’ হইল জগতের বহির্পৃষ্ঠ থেকে অন্তর্পৃষ্ঠ দর্শন। বহির্পৃষ্ঠ হইল দৃশ্য ঘটনাবলি, আর অন্তর্পৃষ্ঠ হইল তাহার অনিবার্য সত্য। বহির্পৃষ্ঠ হইল কার্য, অন্তর্পৃষ্ঠ হইল তাহার কারণ। জ্ঞান তথা বুদ্ধি দিয়া জগতের এই সত্যানুসন্ধানই হইল জগদ্দর্শন। ইহাই আমার মত।’
অঙ্গদ নির্বাক হয়ে ধূমায়মান শ্মশানভূমির দিকে চেয়ে থাকে। তার এই অস্বচ্ছ ও চিন্তিত দৃষ্টি দেখে বোঝা যায়, মহাপ্রবীণের এই জগদ্দর্শনের ব্যাখ্যা এখনও তার কাছে বোধগম্য হয়নি। সে বুঝতে পারেনি, কোন মহান উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে মানুষ জগদ্দর্শন করে বেড়ায় এবং কেনই বা প্রয়োজন হয় সত্যানুসন্ধানের?
জীবদ্দশায় মানুষমাত্র যা চায়, তা হল— শান্তি। এই সত্যান্বেষণ কি তাকে সেই শান্তি দিতে পারে? অঙ্গদও তো সেই শান্তি চায়। শান্তি চায় বলেই সে পুনর্বার হাতে অস্ত্র ধারণ করে সহোদরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চায় না। শান্তি চায় বলেই তো সে মহাপ্রবীণের দেওয়া অস্ত্র স্পর্শ করতে চায় না। সে শত্রুর মুন্ডচ্ছেদ চায় না। শান্তি চায় বলেই তো সে এই কোলাহলময় জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে এই নির্জন গাছের ছায়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। সমাজ ও সংসার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। পরন্তু তার এটাও মনে হয়—জগৎ তো আসলে একটা বিশৃঙ্খল কর্মপিন্ড। এখানে বহু বৈপরীত্যপূর্ণ কর্ম অনবরত সম্পন্ন হয়ে চলেছে। তারাই বা কোন সত্যের ইঙ্গিত বহন করে? অঙ্গদ পরপর তার সেই জিজ্ঞাসাগুলি মহাপ্রবীণের কাছে নিবেদন করে।
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আপনার শ্লোকার্থ সম্পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করিতে না পারায় আমার সংশয় হইতেছে। আপনি আমার সংশয় বিমোচন করুন। জ্ঞান তথা বুদ্ধি দিয়া জগতের সত্যানুসন্ধানই হইল জগদ্দর্শন? কিন্তু এই সত্য লইয়া কী করিব—জীবনে শান্তিই যদি না কাম্য হয়? সত্য অপেক্ষা শান্তির প্রয়োজনই কি জীবনে অধিক নহে? জগদ্দর্শন করিয়া যদি সেই শান্তি আমি না পাই, তাহা হইলে কেন আমি বিচলিত হইতে জগদ্দর্শনে যাব?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! পুনরপি আমার এই উক্তি শ্রবণ কর—জ্ঞান তথা বুদ্ধি দিয়া জগতের সত্যানুসন্ধানই হইল জগদ্দর্শন। ইহার অন্যথা হইতে পারে না। জীবনে শান্তিই কাম্য। যে-জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, সে-জীবন বুঝিতে হইবে এখনও ঘোর কর্মে নিযুক্ত রহিয়াছ। সে-জীবনে দুর্দশা অনিবার্য। আবার সত্যকেও শান্তির অন্তরায় ভাবিবার কারণ নাই। সদর্থে, সত্যাচরণই হইল শান্তির উৎস। ইহলোকে কোনো অসৎ মানুষের অন্তিম পরিণতি শান্তির হইতে পারে না। জগদ্দর্শনে সত্য দর্শন হয়। জগদ্দর্শন জ্ঞানচক্ষুকে উন্মীলিত করে। লোকজীবনে সেই পুরুষই শান্তি পাইয়া থাকেন, যিনি কর্মের মধ্যেই নিজেকে লীন করেন না, কোনো জাগতিক বস্তুও যাহাকে মোহগ্রস্ত করিতে পারে না। অর্থাৎ যিনি ‘ঘোর কর্মে’ নিযুক্ত থাকেন না, তিনিই শান্তি পান। স্মরণে রাখিও, শুধুমাত্র বিচলিত করাই জগদ্দর্শনের উদ্দেশ্য নহে। তবে সত্য যদি মানুষকে বিচলিত করিয়া থাকে, তবে তাহারও প্রয়োজন আছে। এই তাৎক্ষণিক বিচলিতাবস্থা তাহাকে কঠিন সত্যের সম্মুখীন হইতে, সত্যের নিকট আরও দৃঢ় হইতে শিক্ষা দিয়া থাকে।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি আর বিচলিত হইতে চাহি না। আমি লড়াই সংঘর্ষ চাহি না, আমি কর্ম-কোলাহল হইতে মুক্ত হইতে চাহি বলিয়াই তো এই উদুম্বর বৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় লইয়া আছি। হে দিগদর্শক, আপনি বলুন, আমার এই অবস্থান কি অযথার্থ?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! একমাত্র পলায়নকামী পুরুষই তার পারিপার্শ্বিককে প্রতিপক্ষ জ্ঞান করিয়া থাকে। কিন্তু পলায়নের দ্বারা কখনও শান্তি লব্ধ হয় না। সেহেতু, তোমার এই উদুম্বর বৃক্ষের ছায়াও তোমার শান্তিস্থল নহে। ইহা অযথার্থ। এই বৃক্ষছায়ায় তুমি তোমার দেহকে লইয়া অবস্থান করিতেছ, কিন্তু দেহস্থ তোমার মন তোমার আত্মা এখনও সতত অস্থির ও চঞ্চল হইয়া রহিয়াছে। পারিপার্শ্বিক নির্জনতার দ্বারা আত্মা ও মনের শান্তি আসিতে পারে না। লোকজগৎ হইতে অবিচ্ছিন্ন থাকিয়া কর্ম করিয়া অন্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করিতে হয়। তুমি উঠ। জাগ্রত হও। এই উদুম্বর বৃক্ষের তল পরিহার পূর্বক কর্মময় লোকজগতে নিজেকে নিয়োজিত কর।’
কর্মময় জগতে নিজেকে নিয়োগ করার কথা শুনে, অঙ্গদ ঠোঁটে তির্যক হাসি নিয়ে তাকিয়ে থাকে মহাপ্রবীণের দিকে। এই হাসিতে কি কিছুটা বিদ্রূপেরও আভাস লক্ষ করা যায়? অঙ্গদ ভাবে, মহাপ্রবীণ একটু আগে বললেন যে, ‘ঘোর কর্মে’ নিযুক্ত থাকলে জীবনে শান্তি আসে না, আবার তিনিই কর্ম করার উপদেশ দিচ্ছেন। বলছেন যে, জগতের প্রতিটি মানুষ যখন কর্ম করে চলেছে, তখন নিজেকে সেই কর্মময় জগৎ থেকে আলাদা করে রাখলে মনে কখনও শান্তি আসতে পারে না। এই বৈপরীত্যপূর্ণ শ্লোকের ভাবসর্বস্বে সংহতি কোথায়? আদতে কি তা বৈপরীত্যপূর্ণ?
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আপনি এইদন্ডে আমাকে ‘ঘোর কর্ম’ হইতে বিরত থাকার উপদেশ দিলেন, কেন না, ঘোর কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করিলে সেই পুরুষের মনে শান্তি আসে না। আবার পরক্ষণেই বলিতেছেন—উদুম্বর বৃক্ষের তল হইতে উঠিয়া আমি যেন কর্মময় জগতে নিজেকে নিয়োজিত করি। এই দ্বিবিধ উপদেশ কি অভিন্ন?’
মহাপ্রবীণ তাকালেন অঙ্গদের দিকে। ঠোঁটে স্মিত হাসি। আর তাতেই যেন তার সংশয় দূরীভূত হল।
তারপর—
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! শান্তিলাভের প্রসঙ্গে আমি যাহা-যাহা বলিয়াছি তাহা অভিন্ন। কর্ম বিনা শান্তি কদাপিও আসে না। কিন্তু সেই কর্ম কখনোই ‘ঘোর কর্ম’ নহে। অর্থাৎ আসক্তিপূর্ণ কর্ম নহে। ‘আমি কর্ম করিতেছি’, ‘আমার কর্ম করিতেছি’, ‘আমার প্রয়োজনে করিতেছি’ ইত্যাদি আমিত্ব-সর্বস্ববোধ হইতে মোহ জন্মিয়া থাকে। এইরূপ কর্ম মনে শান্তি আনে না—মনের অভ্যন্তরে আসক্তিকে তীব্রতর করিয়া দেয়। যে-পুরুষ সকল কামনা ত্যাগ করিয়া নিস্পৃহ, নির্মম, নিরহঙ্কার হইয়া জীবনাচরণ করেন তিনিই শান্তি পান এবং অন্তঃকালে নির্বাণ লাভ করেন।
‘হে প্রপীড়িত। সংযমই হইল শান্তির উপায়। অসংযম হইল অশান্তি তথা অবিনাশের মূল। ইন্দ্রিয়সুখের টানে মন ধাবিত হইলে, সেই ইন্দ্রিয় মানুষের প্রজ্ঞাকে হরণ করে। সেইরূপ হরণ করে যেরূপ বায়ু তাড়িত নৌকাকে জল হরণ করিয়া লয়। তুমি জলধি দর্শন কর আর নিজেকে শিক্ষিত কর, স্থিতপ্রজ্ঞ হও। প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত না হইলে সে-পুরুষ সংযমী হইতে পারে না। ভাবিয়া দেখ, সমুদ্রে আসিয়া মিশিতেছে কত কত নদনদী ও বৃষ্টির জলরাশি। আপূর্যমান সমুদ্র তাহার পরও অচলবৎ—অনুচ্ছ্বসিত, বিকারহীন। সেই প্রকার সর্বকামনা যাঁহাতে প্রবেশ করিয়া লয় হইয়া যায়, তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ। তিনিই শান্তি পাইয়া থাকেন। কিন্তু কামকে যিনি কামনা করেন, যিনি কাম্য—ফলাকাঙ্ক্ষী, সেই কামকামী কদাপিও শান্তি পাইবেন না।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! জগৎ সম্পর্কিত আমার আরও একটি কৌতূহলের অবতারণা করিতেছি। আমার দৃষ্টিতে আমি দেখিতেছি, জগৎ হইল একটি শৃঙ্খলাহীন কর্মক্ষেত্র। এখানে নানাবিধ পরস্পরবিরোধী কান্ডকারখানা সংঘটিত হইতেছে। এহেন জগৎ দর্শনে কোন সত্যের অন্বেষণ সম্ভব?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিশৃঙ্খলা দেখিতে পাওয়া গেলেও, জগতে সেইসব কর্মই প্রতিনিয়ত সম্পাদিত হইতেছে যাহা অবশ্যম্ভাবী। যাহার সম্ভাবনাকে কেহই প্রতিরোধ করিতে পারিবে না। এখানে কোনো খন্ডে উদ্যানে ফুল ফুটিতেছে, শস্যক্ষেত্রগুলি ফসলে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে, আবার কোনো খন্ডে দেখা দিতেছে খরা ও অজন্মা। কোথাও নদী শীর্ণকায়, কোথাও-বা তা প্রবলা স্রোতস্বিনী। কোথাও অভুক্ত জননীর ক্রোড়ে অনাহারী শিশুর মৃত্যু ঘটিতেছে, আবার কোথাও অত্যাহার দরুন ধনাঢ্য মরণাপন্ন। কোথাও নির্দোষ মানুষ গুলিবিদ্ধ হইতেছে, আবার কোথাও প্রতিহিংসাপরায়ণ দোষী অট্টহাস্য করিতেছে। তথাপি, এই বৈপরীত্য সত্ত্বেও, জগৎ ধর্মক্ষেত্র এবং পবিত্র পুণ্যভূমি।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! যে-ভূমিতে দন্ডায়মান হইয়া প্রতিহিংসাপরায়ণ পুরুষ হাতে অস্ত্র ধারণ করে, রক্তপাত ঘটায়, যে-ভূমিতে অবলা জননী সন্তানের তরে কাঁদিয়া কাঁদিয়া দিবানিশি অশ্রু বিসর্জন দিতেছে, শোক করিতেছে সেই ভূমি কী হেতু ধর্মক্ষেত্র এবং পবিত্র পুণ্যভূমি তাহা শ্রবণ করিতে আমি উদগ্রীব হইয়া আছি।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! অতিক্ষুদ্র হইতে অতিবৃহৎ সংঘটিত কর্মকান্ডের ভিতর দিয়া মানুষ এই ভূমিতে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করিতে নিরন্তর প্রয়াসী। জগতে অসত্য কখনও সত্যের আসনে প্রতিষ্ঠা পাইতে পারে না। কালে কালে যুগে যুগে মানুষ এই সত্য হইতে জ্ঞান আহরণ করিতেছে। এই জগৎ সত্য ও জ্ঞানের পীঠস্থান বলিয়াই তাহা পবিত্র এবং ধর্মক্ষেত্রও। পক্ষান্তরে, সৃষ্টি এবং ধ্বংসও এই জগতেরই আরেক লীলা। ইহাকেও শাশ্বত সত্য বলিয়া জানিবে। জগতে যাহা কিছু সৃষ্টি হইতেছে তাহার ধ্বংস অনিবার্য। আবার ধ্বংস হইলে তবেই নতুন সৃষ্টি সম্ভব। অনাদি অনন্তকাল হইতে জগতে এই বৈপরীত্যপূর্ণ প্রক্রিয়া সক্রিয় আছে বলিয়াই লোকজগতে ইতরশ্রেণির কাছে জীবন সর্বদাই কাঙ্ক্ষিত, সুন্দর। মরণ অসুন্দর। অনভিপ্রেত।’
জীবন ও মরণের এই প্রসঙ্গটিতে এসে অঙ্গদের আবার খটকা লাগে। সে মনে করে, জগতের সমস্ত মানুষই জীবনে উল্লসিত হয় আর মরণে কাতর হয়ে পড়ে। তাহলে কেন কেবল ইতরশ্রেণির কাছেই জীবন সুন্দর এবং মরণ শোকাবহ? মহাপ্রবীণ তারও জবাব দিলেন।
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! জীবন আনন্দের, মরণ শোকের—এই ধারণা জগতের বিষয়াসক্ত মানুষ মাত্রই করিয়া থাকেন। জগতে তারাই ইতরশ্রেণি। কিন্তু যাঁরা জন্ম ও মৃত্যুকে সমদৃষ্টিতে বিচার করেন, তাঁরা কখনও শোকে ও উল্লাসে বিহ্বল হয়ে পড়েন না। কেন না, তাঁহারা জানেন যে, যে-প্রাণীর জন্ম হইতেছে, তাহার মরণ হইবেই। আবার মরণ হইলে তাহার পুনর্জন্মও হইবে। কাজেই যাহা অবশ্যম্ভাবী তাহা লইয়া শোকে মুহ্যমান বা আনন্দে বিহ্বল হইয়া পড়া অর্থহীন। এই চিত্তবৈকল্য চিত্তের মোহগ্রস্ততারই লক্ষণ। তুমি ক্রমশ এই আসক্তি তথা মোহগ্রস্ততা হইতে নিজের মনকে উত্তীর্ণ কর। আবারও বলিতেছি, উদুম্বর বৃক্ষের তল হইতে বাহির হইয়া লোকজগতে আইস। দেখ ওই বাউলকে (বহুদূরে সেই বাউল গাবগুবি বাজিয়ে আপন মনে গান গেয়ে চলেছে), সে-ও প্রতিদিন দ্বারে দ্বারে প্রতিটি মানুষের কাছে জীবনের শাশ্বত বাণী পৌঁছাইয়া দিতেছে। তুমি এইসব মানুষকে দেখ, জগৎকে দেখ। তুমিই-বা কেন স্থানুর ন্যায় এই বৃক্ষতলে থাকিয়া অহরহ পরাজিত মানুষের ন্যায় ভগ্নদশা লইয়া পড়িয়া রহিয়াছে? উঠ তুমি। গাত্রোত্থান কর। আর দৃঢ়হস্তে এই তরবারি ধারণ করিয়া ত্বরায় ধাবিত হও সেই অশুভ শক্তির বিনাশের লাগিয়া। তুমি তার সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হও!’
মহাপ্রবীণের কথায় তরবারির দিকে তাকিয়ে চোখ যেন ঠিকরে গেল অঙ্গদের। তার অন্তরাত্মা কম্পিত হয়ে উঠল। এই চাঞ্চল্যকে সে কোনোভাবে প্রশমিত করতে পারে না, গোপনও করতে পারে না। সে সবিনয়ে তার এই বিকার নিবেদন করল মহাপ্রবীণের কাছে।
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমার দৃষ্টির সম্মুখ হইতে এই মারণাস্ত্র আপনি লইয়া যাউন। ইহা হস্তে ধারণ করা তো দূরের কথা, এই শোণিত-পিপাসুকে দেখিলে আমার দেহে কম্পন আসিতেছে, মন পলায়নের তরে অস্থির হইয়া উঠিতেছে। আপনি ইহা অপসারিত করুন।’
‘তুমি তাহা হইলে যুদ্ধ করিতে চাহ না?’
‘না’
‘তবে কীসের লাগিয়া তুমি এমন ভগ্নদশা হইয়া বিমর্ষ বদনে নির্জীব অবস্থান করিতেছে?’
‘যে-নারী আমার জীবনের প্রেরণা, আমার শক্তি, আমার বল, তাহাকে হারাইয়া আমার আজি এই ভগ্নদশা হইয়াছে। আমি ইতিপূর্বেও বলিয়াছি। জীবন সম্পর্কেও আমার হতাশা জন্মিতেছে। আমি বুঝিয়াছি, যে শক্তিমান, যে প্রবল সে চিরদিনই দুর্বলের সম্পদকে অধিকার করিয়া রাখিবে। জগতে চিরদিনই শক্তির জয় ঘোষিত হইয়া যাইবে। চিরদিন মহাপ্রতাপের ধ্বজা আশমানে উড্ডীন থাকিবে। হে মহাপ্রবীণ, আপনি কি আমার এই ক্ষোভোক্তি সঠিক বলিয়া স্বীকার করিবেন না?’
মহাপ্রবীণ উবাচ..
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! তোমার এই ক্ষোভোক্তিতে ক্ষোভেরই প্রাধান্য রহিয়াছে। ইহাতে সর্বাংশ সত্য নাই। চিরদিন শক্তির জয় ঘোষিত হইতে পারে না। চিরদিন মহাপ্রতাপের ধ্বজাও উড্ডীন থাকিতে পারে না। জগতে চিরদিন চিরকাল সত্যের জয় ঘোষিত হইয়া থাকে। সাময়িকভাবে অসত্য জয়ী হইলেও তাহারও অচিরে পতন ঘটে। সুতরাং তুমি মনে এতাদৃশ ক্ষোভ রাখিও না। বরঞ্চ সচেষ্ট হও—যে তোমার স্ত্রীধনকে অধিকার করিয়া রাখিয়াছে, তাহার নিকট হইতে তাহাকে পুনরাধিকার করিবার তরে।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! পুনরায় অধিকারের প্রশ্নে অনিবার্যত যুদ্ধ আসিয়া পড়ে। আমি যে আর সহোদরের সহিত সংগ্রামে লিপ্ত হইতে চাহি না। আপনি আমাকে প্ররোচিত করিবেন না।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! আমি যাহা করিতেছি, তাহা কদাপিও প্ররোচনা নহে। প্ররোচিত কার্য সর্বদা মহাদুর্দিন ডাকিয়া আনে। আমি তোমাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করিতে চাহিতেছি। তোমাকে ন্যায়ের জন্য লড়াইয়ে জাগ্রত করিতে চাহিতেছে।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! ন্যায় ও অন্যায় বিষয়ে আমি অজ্ঞ। আমাকে সেই বাক্য বলুন, যাহাতে আমি বুঝিতে পারি—ন্যায় কী আর অন্যায়ই বা কাহাকে বলে?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! ন্যায় হইল তাহাই যাহার সপক্ষে বিবেক জাগ্রত হইয়া ওঠে। অন্যায় হইল তাহাই যাহার বিরুদ্ধে বিবেক বিদ্রোহী হইয়া ওঠে। তুমি এই মুহূর্তে যুদ্ধের ব্যাপারে তোমার অসম্মতি প্রকাশ করিলেও তোমার বিবেক কি ক্ষণে ক্ষণে বিদ্রোহী হইয়া উঠিতেছে না—তোমার স্ত্রীধনকে তোমার অধিকারে পাইবার নিমিত্ত?’
‘উঠিতেছে। তথাপি আমি পুনরায় বলিতেছি—আমি একটি নারীকে জয় করিবার তরে আমার সহোদরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে চাহি না। অনুগ্রহ করিয়া আমাকে মার্জনা করিবেন।’
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন। প্রশ্ন একটি নারীর নহে, প্রশ্ন এক সহোদরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ারও নহে। প্রশ্ন হইল ন্যায়ের। নারী নয়, সে তোমার স্ত্রীধন। সহোদর নয়, সে তোমার শত্রু, প্রতিপক্ষ। সে একটি অশুভ শক্তি। এই অশুভ শক্তির বিনাশের নিমিত্ত তোমাকে এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে হইবে। যদ্যপি, তুমি তাহাতে অসম্মত থাক, তাহা হইলে তোমার নহে এই যুদ্ধে ধর্মের পরাজয় হইবে এবং লোকজীবনে অশুভ শক্তির জয়ধ্বজা উড্ডীন থাকিবে। কালে কালে মানুষ এই ন্যায়-বিনাশক শক্তির কাছে অনায়াসে আত্মসমর্পণ করিবে এবং গড়িয়া উঠিবে ধর্মহীন সমাজ। আমি সেই দুর্দিনের কথা চিন্তা করিয়া তোমাকে সমাজ রক্ষার্থে, সত্য রক্ষার্থে, ধর্ম রক্ষার্থে এই তামসিক শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে প্রবৃত্ত হইতে উপদেশ প্রদান করি। এখন তোমার বক্তব্য তুমি নির্দ্বিধায় নিবেদন করিতে পার।’
অঙ্গদ কী বলবে ভেবে পায় না। সে আরও অনেকটা সময় চিন্তামগ্ন থাকে। মহাপ্রবীণের এই উপদেশকে খন্ডন করার মতো কোনো যুক্তি আর খুঁজে পায় না। তার মনে হয়, তিনি যা বলছেন তার সবটাই সমর্থনযোগ্য, পালনীয়। অথচ সে তা একবাক্যে পালনে সমর্থ হতে পারছে না। কেন? কীসের জন্য তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই বিলম্ব অঙ্গদ সেই প্রশ্ন উত্থাপন করে।
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! ইতিমধ্যে আপনি যাহা যাহা বলিয়াছেন, আপনার সেই সব উক্তি সমুদায় সত্য। তা আমার পক্ষে অবশ্য পালনীয়ও। তথাপি আমি তাহা পালনে সচেষ্ট হইতে পারিতেছি না কেন? হে দোষজ্ঞ, এই অন্তর্গূঢ় কারণ আপনি সবিস্তার করুন। আমি শুনিতে উৎকন্ঠিত হইয়া পড়িয়াছি।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে শ্রাবক! যাহা সত্য ও পালনীয় তাহা এখনও তুমি পালনে অসমর্থ হইয়াছে, ইহার কারণ—এখনও তুমি সম্পূর্ণত দ্বিধা হইতে উত্তীর্ণ হইতে পার নাই। এখনও তুমি নির্মোহ হইতে পার নাই। জাগতিক বিষয় ও বস্তু সম্পর্কে তোমার অদ্যাবধি মোহ আছে, আসক্তি আছে। তুমি যতদিন না নির্মোহ, নিরাসক্ত ও নির্দ্ধিধ হইতে পারিতেছে, ততদিন পর্যন্ত তোমার স্ত্রীধনকে যে করায়ত্ত করিয়া রাখিয়াছে, তাহাকে তুমি অশুভ তামসিক শক্তি না বলিয়া সহোদর বলিবে, ওই স্ত্রীধনকে অস্থাবর সম্পদ না বলিয়া নারী বলিবে, এবং ততদিন পর্যন্ত অশুভ শক্তি কর্তনকারী এই অস্ত্রটিকে দেখিয়া তুমি ক্ষণে ক্ষণে চমকিত হইয়া উঠিবে। তোমার দুর্বল শরীর কম্পিত হইবে, তোমার মন হত্যাজনিত অপরাধে ত্রস্ত হইয়া উঠিবে এবং পলায়নকামী হইয়া এই উদুম্বর বৃক্ষের তলে সমাজের ঘৃণ্য ক্লীবের ন্যায় পতিত হইয়া থাকিবে। পুনঃ শুনিয়া রাখ—আমি আপাত প্রস্থান করিতেছি। তবে এই অস্ত্র লইয়া যাইতেছি না। ইহা তোমারি নিকট সযত্নে গচ্ছিত রাখিয়া যাইতেছি। তুমি উলটাইয়া-পালটাইয়া ইহাকে পর্যবেক্ষণ কর, ইহার সহিত আলাপ কর আর দেখ এই অস্ত্র তোমাকে কী প্রকার সন্দেশ দিতেছে।’
অস্ত্রটির দিকে চেয়ে অঙ্গদ আর্তনাদ করে ওঠে। বলে, ‘না, না, না! হে মহাপ্রবীণ...’
মহাপ্রবীণ ততক্ষণে উধাও। খড়বোঝাই গাড়িটিও আর সেখানে নেই। অঙ্গদ নির্নিমেষ চেয়ে থাকল সেই কোশমুক্ত তলোয়ারটির দিকে। আর বলে উঠল, ‘হে যুদ্ধায়ুধ...’
কেবল অস্ত্র দিয়ে কাজ চলতে পারে না শস্ত্রও দরকার। তাই বুচাটাঙি থাকা সত্ত্বেও পাটন এই কদিনে একটা মহাধনুকও বানিয়েছে। তার নামকরণও করেছে। তৈরি করে রেখেছে গোছা গোছা তিরও। যে তিরগুলি পরপর অব্যর্থ নিক্ষেপ করলে অন্তত একগ্রাম মানুষকে মাঠারির এই পবিত্র ভূমিতে সে ভূতলশায়ী করে দিতে পারে। তিরগুলি পিঠের ওপরে গুচ্ছাকার রাখার জন্য গাছের ছাল-বাকল আর কান্ডের ফালি দিয়ে একটি চোঙাকৃতি পাত্রও বানিয়েছে। এই পাত্রটিই তূণীর। তিরগুলি শর দিয়ে বানানো। তিরের ফলা চকচকে পেটাই লোহার, যেগুলি সে জার-গ গ্রামের এক কামারশাল থেকে বানি দিয়ে গড়িয়ে নিয়েছে। তবে তিরের ফলার ছুঁচলো মুখ বা পুঙ্খটিতে সে এখনি বিষ মাখিয়ে রাখেনি। প্রয়োজনের কথা ভেবে বিষও সে মজুত রেখেছে তার ওই তালপাতার ঘরটির ভেতরে, কোনো এক গোপন কুলুঙ্গিতে।
অবসর সময়ে সে এই তির-ধনুক নিয়ে আপন খেয়ালে মহড়াও দেয়। হয়তো জারমণি কাঠপাত কুড়োতে কুড়োতে টিলার মাথা থেকে নেমে উলটোদিকে চলে গিয়েছে, পাটনও তাকে অনুসরণ করে গেছে, তারপর যখন দেখে সে কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ঘুরে ঘুরে গাছের বাকল, শুকনো ফল কুড়োচ্ছে, তখন তার কাছাকাছি থেকে, পাটন তার ধনুক থেকে একটার পর একটা তির নিক্ষেপ করে চলে কোনো কিংশুক কিংবা সর্জ বৃক্ষের গায়ে। অথবা জারমণি যখন স্নান করে, পাটন তখন তার দিকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে তালগাছের কান্ডকে অনেকটা আক্রোশ নিয়েই এদিক-সেদিক থেকে তিরবিদ্ধ করতে থাকে।
তির-ধনুকের প্রয়োজন এমনিতে হত না। কিন্তু সম্প্রতি আচমকা বহির্শত্রুর আক্রমণই তাকে এই সাবধানতা নিতে বাধ্য করেছে। সেদিন যদি তার কাছে এই শস্ত্রটি থাকত, তাহলে শত্রুকে কি সে জারমণির অতটা নিকটে ঘেঁষতে দিত? সে ডুংরি বেয়ে শত্রুর পাতপালহা পাড়িয়ে নেমে আসার খড়খড়ে শব্দ পাওয়া মাত্র পুকুরপাড়ের নীচে বামপদ প্রসারিত ও দক্ষিণপদ সংকুচিত করে—প্রত্যালীঢ় ভঙ্গিতে উপবেশন করে, গর্জন করে উঠত, ‘ফারাক যাও! ফারাক যাও!’
কিন্তু সেদিন সে তা করতে পারেনি। তবে সেদিনের না-পারা আজ তাকে অনেক বেশি পারঙ্গমতার দিকে নিয়ে গেছে। তাকে আরও আরও সাবধান করে দিয়েছে নিরাপত্তার বিষয়টিতে। সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, তার হেপাজতে পরস্ব ধন আছে। এই নিরাপত্তার ব্যবস্থাটি তার আরও আগেই করা উচিত ছিল। পরস্ব ধনের জন্য শত্রু হানা দিতেই পারে। একজন দুজন নয়, একাধিক শত্রুর আক্রমণও তাকে ঠেকাতে হতে পারে। পাটন এখন তার জন্যও তৈরি।
তবে প্রশ্ন হল, জারমণি কি পরস্ব ধন? নাকি সে পাটনের নিজস্ব? নিজস্ব ধন যদি হয়ে থাকে, তাহলে তাকে অধিকারে আনার প্রশ্নই ওঠে না। আর যদি সে পরস্ব হয়, তাহলে, সত্যিই কি পাটন তাকে অধিকারে রেখেছে? এর কোনো একটি প্রশ্নের সঠিক জবাব পাটন নিজেও জানে না।
পাটন শুধু জানে জারমণি স্ত্রীধন। এই টিলা-ডুংরি অধ্যুষিত বন্যভূমির মাঝখানে সে একা ওকে আগলে রেখেছে। কাজেই এখন অহরহ অস্ত্র উঁচিয়ে রেখে তাকে অতন্দ্র প্রহরা দেওয়া ছাড়া তার আর কোনো কর্তব্য নেই।
কিন্তু এইভাবে প্রহরা দিতে দিতে পাটন এখন সত্যিই হাঁপিয়ে উঠেছে, সে আর কতদিন জারমণির দিকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে থাকবে? সে আর কতদিন পলাশে, সর্জ বৃক্ষে অকারণ নিক্ষেপ করে যাবে তার ধারাল তির? কতদিন দক্ষিণের উপত্যকা জুড়ে ফুটে থাকা গিরিমল্লিকা ফুলের গন্ধ-বিধুর সমীরণে বিবশ হয়ে, জারমণির অঙ্গ-পরশ লাগি ক্রোধে আক্রোশে তার হস্ত-পদ দিয়ে দলিত-মথিত করবে জঙ্গলঝাড়ি? যে-কামশরে সে প্রহরে প্রহরে বিদ্ধ হয়ে পড়ছে, বাঁশপাতার মতো লিকিলিকি কাঁপছে তার শরীর, সেই কামশর দিয়ে কি সে একটিবারও বিঁধতে পারবে না এই শঙ্খিনীকে? এই তীব্র আমিষগন্ধা অঙ্গনাকে?
সেই তালপাতার ঘরে নিত্য ঝুপঝুপ করে সন্ধ্যা নামে! তারা ঢুকে পড়ে। আচমকা ঝোড়ো হাওয়া বইতে থাকে টিলাগুলির ওপর দিয়ে। পুকুর পাড়ের তালবীথির সশব্দ কম্পনেও ঘুম ভাঙে না জারমণির—সে পাটনের থেকে ঢের তফাতে নিদ্রাচ্ছন্না হয়ে প্রসারিত অঙ্গে টান টান হয়ে শুয়ে থাকে। তখন যদি পাটন একবার তার অনাঘ্রাত দেহের কাছে নামিয়ে আনতে পারে তার নাসারন্ধ্র! যদি সে জারমণির যোনি সদৃশ লোমশ বাহুমূলের ভেতরে ঠেসে গুঁজে দিতে পারত তার ঘ্রাণেন্দ্রিয়! কিংবা যদি সে জারমণির সুডৌল চুচুকটি অনাবৃত করে দিতে পারত! আর তার সদম্ভ পদাঘাতে পর্ণ কুটিরটির দেয়াল চৌচির করে আশমানের চাঁদকে পিঠে তূণীর আর হাতে ধনুক নিয়ে সোল্লাসে বলতে পারত, দেখ! দেখ হে ভানু! যে-চাঁদ সুদূর আশমানে খেলা করে, আমি তাকে শরাঘাতে এই ধরিত্রীপৃষ্ঠে আনয়ন করেছি! আমাকে বীরবাহু বল।
ছাই! পাটন নিজেও জানে সে কেমন বীর। জারমণির কাছে তার বীরত্বের দৌড় কত দূর। সে ততটুকুই দৌড়তে পারে যতটুকু দৌড়ায় কৃকলাস—বাদাড়গড়া পর্যন্ত। তবু এই কল্পনাবিস্তার করা জারমণিকে নিয়েই পাটনের অলীক অবাস্তব কল্পনার কোনো ইয়ত্তা নেই। যেন বাস্তবে নয়, কল্পনাতেই সে পেতে চায় এই নারীকে। যেন তার সঙ্গে কাল্পনিক সহবাস বাস্তব সহবাস অপেক্ষা ঢের ঢের গুণ সুখদায়ক। রিপুশীতলকারী।
পাটন কাঁদতে থাকে। তালপাতার ঘর থেকে বেরিয়ে, প্রবেশপথটিতে বসে, নি:শব্দে কেঁদে চলেছে। তার একটি হাঁটু ঊর্ধ্বমুখী, আরেকটি হাঁটু পাট করে ধরাশায়ী করে রেখেছে। মস্ত ধনুকটিও পড়ে রয়েছে মাটিতে। পিঠে তিরের গোছা। তার কান্নার কোনো শব্দ নেই, সাক্ষীও নেই কেউ। তবু সাক্ষী যদি কেউ থেকেই থাকে, তবে তা হল ওই আশমানের চাঁদ। যার কাছে সে নিজেকে ‘বীরবাহু’ বলে জাহির করতে চেয়েছিল। এখন সেই চাঁদই রুপালি আভায় ঝিলিক দিয়ে ওঠা পাটনের চোখের কোল বেয়ে পড়া বেদনার অশ্রু।
এখনও সারা তল্লাট ব্যেপে দমকা হাওয়া বইছে। থেকে থেকে। দিনের হলকা এখন নিশুতিরাতের আষাঢ়ী বাতাসের মতো সুশীতল। বৃষ্টি নেই। আকাশে জলদ মেঘও নেই। তবু এই রাতেও স্বচ্ছজলে টলমল করতে থাকা ইরাবতী পুকুরটির ঘাটে ঘাটে তারস্বরে ডেকে চলেছে যত ভেককুল। পাটনও, তাদের মতো, এখনও বিনিদ্র। কিন্তু ওই মন্ডুকগুলির মতো তার ডেকে ওঠার উপায় নেই। জারমণি জেগে যেতে পারে। অথচ তার যে ডাকতে ইচ্ছে করছে না তা তো নয়। প্রবলভাবে করছে।
হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসার শব্দ কানে আসে পাটনের। জারমণি কি উঠে পড়েছে? রাত এমন কিছু গভীর হয়নি। তবু এই পাহাড়-জঙ্গলে, যেখানে ধারে কাছে মানুষের বসতি নেই বললেই চলে, সেখানে সন্ধ্যা যেতে না যেতে পুরু হয়ে নামে রাতের অন্ধকার। নৈ:শব্দ্য সেই রাতকে আরও নিবিড় করে তোলে।
এখন অবশ্য অন্ধকার নেই। শুক্লপক্ষের অপার্থিব আলো ডুংরিতে, পুকুরে, তালগাছের পাতায় পাতায় ছৌ-মুখোশপরা শিশুর মতো খেলা করছে। দূরবর্তী মূল সড়ক দিয়ে ঝুমুর বাজিয়ে চলে যাচ্ছে কোনও গাড়ি। গাড়িটি যে ছৌশিল্পীদের তা ঝুমুর শুনে বোঝা যায়। দূরের কোনো গ্রামে আসরে চলেছে তারা। এই গাড়ির আনাগোনা থেকেও অনুমান করা যায় রাত বেশি হয়নি।
জারমণি বেরিয়ে আসছে দেখে হাতের উলটোপিঠ দিয়ে চোখের জল মুছতে চেষ্টা করে পাটন। কিন্তু চোখের ভিজে ভাব থেকেই যায়। জারমণি পাটনের সেই চোখের দিকেই সন্ধিগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। সরাসরি কান্নার কথা জিগ্যেস না করে, সে বলে, ‘তুঁই কী করছিস ইখিনে বসে? একা একা? কে তকে ইখেনে বসে থাকতে বলেছে?’
সত্যিই তো! পাটন জানে না, কে তাকে এভাবে এই নির্জন রাতে তালপাতার ঘর থেকে বেরিয়ে একা বসে থাকতে বলেছে? কাঁদতেই বা বলেছে কে? এমনকি, তাকে তির-ধনুকে সজ্জিত হয়ে প্রহরাতেই বা থাকতে কে বলেছে? পাটনের অদৃষ্ট। পাটন এখন নিজের সম্পর্কে এভাবেই ভাবে। কপাল না পুড়লে কোনো সক্ষম পুরুষ-মানুষের এমন করুণ দশা হয়?
জারমণির কথার জবাব দিতে গিয়ে, পাটন, তার কান্নাকে আর গোপন করে না। জবাবও সে দেয় অসম্পূর্ণ বাক্যে। না দেওয়ার মতো করে। বলে, ‘কে আর বলেছে—’
‘কীহ?’
পাটন এবার কেঁদে ফেলে। হু-হু করে। সে যে জারমণির জন্য কাঁদছে না, অথবা সে যে জারমণির জন্যই কাঁদছে, সেটা বুঝিয়ে দিতে সে শুরু করে অন্য কথা বলে। বলে, ‘হামি কি আর সাধে কাঁদছি? ভগবান হামার কপালে নরকভোগ লেখেছে। হামি তার হতেই কাঁদছি।’
‘নরকভোগ? কে বলল?’
‘কে আর বলবেক?’ পালটা প্রশ্ন করে পাটন জারমণির মুখের দিকে এমনভাবে চেয়ে থাকে, যেন সে তার কাছ থেকে এই কথার জবাব চায় না, চায় এই কাতর ও ক্ষুধার্ত পুরুষটির প্রতি তার দৈহিক করুণা! প্রসাদ!
জারমণি কিছুই বলে না। তার চোখে-মুখে এতটুকুও ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না— করুণা তো দূর। উলটে সে ততোধিক নির্বিকার থেকে উপভোগ করে তার এই তামাশা।
পাটন নিজেই বলে নরকভোগের কথা। সে বলে যে, সে জোয়ান মরদ হয়ে মেয়েমানুষের সঙ্গে নিষ্ফল রাত্রি যাপন করে চলেছে। আরও কত যে রাত তাকে এভাবে যাপন করে যেতে হবে তা সেও জানে না। হয়তো এভাবেই বহে যাবে তার সুন্দর যৌবন। বার্ধক্য এসে যাবে। তবু সন্তানের জন্ম দেওয়া তার আর হবে না। সে অপুত্রক থেকে যাবে। অপুত্রক পুরুষ মৃত্যুর পরে পুন্নাম নরকে যায়। চোখের জল দিয়ে, পাটন, এই কথাটিই বুঝিয়ে বলতে চায় জারমণিকে।
জারমণিও তেমনি। ‘আসন্ন নরকভোগী’ কে ‘পুৎ’ নামের নরক থেকে উদ্ধার করার কোনো গরজই তার নেই। সহানুভূতি প্রকাশ করা তো আশাতীত। পাটনের এই বেদনাশ্রু মিশ্রিত সংলাপের সমর্থনে একটি শব্দও সে ব্যয় করল না। সে আরও কিছুটা ঢালুর দিকে নেমে, ডালপালায় ঘন হয়ে থাকা কুসুম্ভ গাছটির তলায় ঝুপ করে বসে পড়ল। সংক্ষিপ্ত ডাক দিয়ে অন্ধকারেই উড়ল কোনো কপিঞ্জল।
আর পৃষ্ঠ প্রদর্শন নয়। পাটন এবার জোর করেই, মাটির ওপরে পাছার ঘষটানি দিয়ে একটি অর্ধবৃত্তাকার পাক দিল। পাকটির সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে গেল তার পিঠের ওপরে তিরভর্তি বৃহৎ তূণীরটিও। পাটন চেয়ে থাকল সেই গাছতলাটির দিকে।
কিন্তু হায়! জ্যোৎস্নালোকে ডুংরির মাথা থেকে পাদদেশ সর্বত্র যখন আলোয় আলোকময়, তখন ওই কুসুম্ভতল আশ্চর্যরকম অন্ধকারে ঢাকা। ঝিঁঝিও ডাকছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকেও, পাটন, জারমণির কিছুই দেখতে পেল না। এমনকি, জারমণিকেও সে দেখতে পেল না। সে যতক্ষণ নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকল, ততোক্ষণ শুধু শুনে গেল কানালী থেকে বহাল ক্ষেতে আলের ফাটল দিয়ে গড়িয়ে পড়া বর্ষার কাদাজলের শব্দ—চুর্চুর! চুর্চুর!
অনেকদিন বাদে মানুষ এবার আকালের চেহারা দেখছে। সকাল হতে না হতে প্রখর তেজ নিয়ে উঠছে সূর্য। দিগন্তজোড়া মাঠ-প্রান্তর সব ধু-ধু করছে। মাঝেমাঝেই অকর্ষিত ক্ষেত পড়ে আছে। বিঘার পর বিঘা। কোনো কোনো ক্ষেতে লাঙল ঘুরেছে। ধানের চারাও পোঁতা হয়েছে কোথাও কোথাও। কিন্তু জলের অভাবে অপুষ্ট আফরগুলি খড়ের মতো হয়ে গিয়েছে। যারা রুয়ারুয়ি করতে পারেনি, ঢেরদিন আগেই হাল ছেড়ে দিয়েছে তারা। ভাদর মাস পড়ে গিয়েছে। এখন রুইলে ফসল যা হবে তাতে বড়োজোর বীজধানটুকুই উঠে আসতে পারে। খাটাখাটুনিই সার। কিন্তু তাও তো সম্ভব নয়। জল যেমন নেই, তেমনি আবার বীজধানও ফুরিয়েছে। চারাও নেই। ছোটো ছোটো আফরগাঢ়িগুলিতে আফর শুকিয়ে ঝামুরে গেছে। এখন জল পেলেও সেটা কোনো কাজে আসবে না।
জিনগা-মাঈয়ের ডাক ঢেরদিন হল শোনা যাচ্ছে না। এই ডাক শোনার জন্য গ্রামবাসীরা এখন আর আগের মতো উৎকর্ণ হয়ে থাকে বলেও মনে হয় না। তাদের মধ্যেও জিনগা-মাঈয়ের প্রতি আস্থার কেমন যেন একটা অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে খুব কম লোকই তা প্রকাশ্যে বলে ফেলে। যারা তা প্রকাশ করে না, তারা মনে মনে এখন ভাবতে শিখেছে—সত্যিই কি বৃষ্টি আসা-না-আসারসঙ্গে জিনগা-মাঈয়ের কোনোরকম সম্পর্ক আছে? নাকি তা লোকমুখে চলে আসছে বলে চলেই আসছে?
জিনগা-মাঈয়ের প্রতি সত্যি যদি গ্রামবাসীদের আস্থার অভাব দেখা দেয়, তাহলে তার অন্যতম কারণ বোধহয় এটাই যে, জিনগা-মাঈয়ের কাছ থেকে তারা সেসব অলৌকিক কর্মকান্ড বা ‘ইন্দ্রজাল’ আশা করেছিল, তা তারা দেখতে পায়নি।
বুচাটাঙি নিয়েও তাদের হয়তো অনেকটাই মোহভঙ্গ হয়েছে। এখন তারা বুঝে গিয়েছে, গ্রামে বিপদ-আপদ যা-ই ঘটুক না কেন, যে-কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিক না কেন, গ্রামবাসীদেরই তা সমাধান করতে হবে। ষোলোআনা বসিয়ে। এমনকি অত্যাচার-অনাচারের বেলাতেও জিনগা-মাঈয়ের বুচাটাঙি অলক্ষে অপরাধীর ঘাড়ে না-ও নেমে আসতে পারে। যদিও বুকে চাপড় মেরে জোরের সঙ্গে কেউ জিনগা-মাঈকে অস্বীকার করতে পারে না। সেদিকে ডর আছে! যতোই হোক, তাদের এই সংস্কার বা বিশ্বাস তো আর আজকের নয়। ঢের দিনের। কাটতেও সময় লাগবে।
তবে সত্যি বলতে কি, ইন্দ্রজাল তারা আশা করেছিল। আশা করেছিল পাটন-জারমণির ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে। পাটনকে জিনগা-থানে রাতভর আটক রাখার পরেও তার যে কিছু হয়নি, তাতেই পলপলের গ্রামবাসীরা হতাশ। যদিও পরদিন জিনগা-ডুংরিতে উঠে যখন তারা সেই জিনগা-থানে যায় এবং গিয়ে দেখে যে, যে-লায়াঘরটিতে নানান কসরত করে, দড়ি-দড়া দিয়ে বাঁধাছাঁদা করে আটক রাখা হয়েছিল পাটনকে, সেই ঘরে খুঁটাখুঁটি-দড়ি সব খুলে পড়ে রয়েছে। পাটন নেই। তাদের কল্পনাতেও আসেনি যে, পাটন পালিয়ে যেতে পারে। অথবা তাকে কেউ পালিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। জিনগার প্রতি এতোটাই ছিল তাদের আস্থা। তাই পাটনের এই পালিয়ে যাওয়াকে তারা বাস্তবিক পালিয়ে যাওয়া ভাবেনি, ভেবেছিল ‘ছন্ন’ হয়ে যাওয়া। মুখে মুখে কেউ কেউ তা রটিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু সেই রটনা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তারা ধরে ফেলেছিল—পাটন শবর পালিয়ে গিয়েছে। এখানে জিনগার কোনো কেরামতি নেই। যদি কারো কেরামতি থেকে থাকে, তবে সে হল জারমণি। জারমণি সিংসর্দার। এটা আর কেউ বুঝুক না বুঝুক, জারমণির বাবা আগুয়ান সিংসর্দার সেইদিনই জিনগা-মাঈয়ের ডুংরিতে উঠে বুঝে গিয়েছিল। কিন্তু সে কাউকে বলেনি। এমনকি, লোকের কাছে এখনও সে এই পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে না-জানার ভান করে থাকে। রাতের অন্ধকারে জারমণিরও ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়াকে সে পালিয়ে যাওয়া বলেনি। গ্রামবাসীদের কাছে বলেছে এখানে জিনগা-মাঈয়ের অলৌকিক হাত আছে। পাটনের মতো জারমণিও ‘ঘর ভিৎরের ল্যা ছন্ন হঁয়ে গেছে।’ এই বলে দিয়ে সে জারমণিকে খোঁজাখুঁজির ব্যাপারে তার যাবতীয় উদ্যোগের ইতি টেনে দিয়েছে। ঘরে সে তার বউ পার্বতীকে সান্ত্বনা দিয়ে প্রকৃত পিতার মতোই বলেছে, জারমণি যেখানেই গেছে নিজের ইচ্ছেয় গেছে। সে যেন নিজের মতো করে থাকে। সুখে থাকে।
পার্বতী ঝনকাঠে মাথা ঠুকে কেঁদেছে। ঠিক যেখানে মাথা রেখে কেঁদেছিল জারমণি।
জারমণি আজ আর কাঁদে না। সে হাসছে। পার্বতী কিন্তু আজও মেয়ের জন্য কেঁদে চলেছে। কখনও আগুয়ানকে, কখনও তার বড়ো ব্যাটা চঁদা বা শঙ্করকে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘তরা ঘরের এৎগুলা লোক আছিস কৌ টুকু খোঁজখবর নিয়ে দেখছিস নাই! কথায় গেল দেখ ন, দেখ ন রে কথায় চৈলে গেল হামার পেটের বিটি! হামার জারমণ!’ কখনও সে একা-একাই ঘরের কোণে, কপাটের আড়ালে একঘেয়ে সুরে কেঁদে কেঁদে বলে চলে সেই একই কথা, ‘এ বিটি! তুঁই কথায় হারাঞ গেলি! হামার জারমণ রে...।’
বউ কাঁদতে শুরু করলেই আগুয়ান ঘর থেকে শন-শন করে বেরিয়ে চলে যায়। সিধা হরিমন্দিরের চাতালে। যাবার সময় বউয়ের প্রতি অভিযোগ করে মেহনাতে মেহনাতে যায়, ‘ইয়ার হতে ঘরটায় একডন্ড থাকা দায় হঁয়েছে। দিনে-রাতে জারমণ আর জারমণ। ইবার বাছাকে হামিয়েই পলপল ছাইড়ে পালাব!’
চঁদা, ঘরে থাকলে ঘরেই থাকে। গামছা পরে। ধরুক-ধুসুক চেহারা। খালি গা। হাঁটুর নিচ পর্যন্ত গোবোর-মাটি মাখামাখি। গোহাল-গোরু দেখাশুনা করে। কখনও কাড়া-গোরুকে দেবার জন্য ছেনি নিয়ে বসে বসে কুটি কাটছে, কিংবা গোরু-কাড়ার পেচ্ছাপ জমতে জমতে জভি হয়ে গেলে সে জলমুরিতে বাঁশ কুঁচছে, আর না হলে পায়রার টঙে ঢামনা দেখতে পেলে ইঁয়া মটা শাল ডাং নিয়ে তাকে দমতক ঢাঁড়াচ্ছে২১ । সারাদিন এমনি ইটা-স্যাটা কাজ নিয়েই থাকে চাঁদা। মাকে কাঁদতে দেখলে সে অবশ্য ঘর থেকে ‘সিধা হরিমন্দির’ চলে যায় না। তবে বাপের মতো সে-ও খিজলায়২২ । দু-হাতে ধরা পুয়ালের আঁটি ছেনিতে কাটতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়। ঘাড় তুলে বড়ো ঘরটার দিকে তাকিয়ে গলার শিরা ফুলিয়ে বলে ওঠে, ‘উ কন খালকে গেছে কী করে বুঝব? উয়াকে না পাওয়ালে কি গলাটায় রেচে২৩ লিব, বল?’ উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে রচ-রচ খড় কেটে চলে।
শঙ্কর কিছু বলে না। মা কাঁদছে দেখলে মায়ের পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে। কাঁধের উপর থেকে শাড়ির খুঁটটা নিয়ে সে কেবল উদাস হয়ে চিবোয়। মুখে প্রকাশ না করলেও তাকে দেখে বোঝা যায়—যেদিন থেকে তার দিদি এই ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছে, সেদিন থেকে তার মনে সুখ নাই। আনন্দ নাই। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গেও সে হাল্লা-ফুর্তি করে না। গাদি খেলতে যায় না। পিয়াল পাকা পাড়তে বনকেও যেতে চায় না। মায়ের কাছে কাছে থেকে মায়ের মধ্যে সে যেন দিদিকে পেতে চেষ্টা করে। কখনও এঘর-সেঘরে ঘোরাফেরা করতে করতে, কিংবা ঘরের পিছনে ‘বাড়ি ধারে’ পুয়াল গাদার মাথায় গুলতি হাতে বসে থাকতে থাকতে, হঠাৎ ক্যাঁকলাস দেখতে পেয়ে ভয়ে ঘসঘস করে নেমে ছুটে আসে দাওয়ায়। তারপর আচমকা খেয়াল হলে বলে ফেলে, ‘হ্যাঁ মাঈ, মাঈ গ! দিদি পাছে পিসিঘরে আছে?’
আগুয়ান যতই উদ্যোগহীন ও নিশ্চেষ্ট হয়ে থাক না কেন, গ্রামের লোকেরা কিন্তু এখনও মাঝে মধ্যে তল্লাশি চালিয়েই যাচ্ছে। যদিও সেটা উপর-উপর। তারা জেনে গিয়েছে ওসব ছন্ন হওয়া-টওয়া সোব ‘ভৈল’। মিথ্যা। জিনগা-ফিনগা বারো-শত বলে জারমণির ভিৎরি ব্যাপারটা গোপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু কাছিম কৎক্ষণ হাত-পা গুটিয়ে খোলের ভিৎরে থাকে? সত্য তো একদিন জানাজানি হবেই। এখন বেরিয়ে পড়ছে প্রকৃত ঘটনা।
আসলে এটা ‘ফিটিং কেস’। ছ্যেলাছোকরাদের ভাষা। তাদের বক্তব্য, প্রেমের টানে পাটনের সঙ্গ ধরে পালিয়েছে জারমণি। আর এই পালিয়ে যাওয়ার আগে যা-যা ঘটেছে সব লোকদেখানি। এসব ক্ষেত্রে নাকি আরও মারাত্মক সব ঘটনাও ঘটে থাকে।
তবে যার মেয়ে সেই আগুয়ানই খোঁজাখুঁজির ব্যাপারে তেমন তৎপর না হওয়াতে তল্লাসি কাজে অনেকটা ঢিমে কেটে গিয়েছে। নেহাত গ্রামের ইজ্জতের ব্যাপার বলে এখনও পলপলের লোকজনেরা জারমণিকে পাক বা পাক, পাটনকে হাতের কাছে পেতে চাইছে। বিশেষ করে সিংসর্দাররা। তাদের রাগ এইজন্য যে, পাটন জিনগা-মাঈয়ের দন্ড তো পেলই না, উপরন্তু তাদের বিটিছ্যেলাটিকেও সে ভাগিয়ে নিয়ে গেল। এই কারণে, এখন অঙ্গদ শবরকে বাদ দিয়ে পাটন শবরের উপরেই তাদের যত আক্রোশ।
জারমণিকে পেলেও পলপলের লোকেরা তাকে তার ঘরে আশ্রয় দেবে না। এমনকি, গ্রামেও ঢুকতে দেওয়া হবে না। সে বেজাতের মরদের সঙ্গে রাত্রিবাস করছে। বরং, যদি সম্ভব হয়, তাহলে তারা জারমণিকে পাটনের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অঙ্গদের হাতে অর্পণ করবে। অঙ্গদই তার দাবিদার। অঙ্গদই তার প্রকৃত প্রেমিক। এই অঙ্গদের সঙ্গে ভালোবাসার সূত্রে সে পলপল ছেড়ে চলে গেছে ডেলিকচা গ্রামে, তাকে বিয়ে করে ঘর-সংসার করবে বলে।
কিন্তু কেন সেই ঘর-সংসার সে অঙ্গদের সঙ্গে গড়তে পারল না, সেসব খবরও কিছু কিছু এখন এদিক-ওদিক সিমটুনি পাখির মতো উড়ে আসতে শুরু করেছে। তার অধিকাংশ খবর জোগাড় করেছে গুজর। সে তার ভাউরি দোকান নিয়ে যখনি ডেলিকচায় গেছে, তখনি অঙ্গদের প্রতিবেশিরা জারমণির যাবতীয় ঘটনা গুজরের কাছে খুলাসা করে দিয়েছে। গুজরও তাদের মুখ থেকে কথায় কথায় সব বের করে নিতে পেরেছে। তার থেকে জানা যায়, প্রতিবেশীরা কোনও উচ্চবাচ্য না করলেও, জারমণিকে নিয়ে অঙ্গদের প্রথম রাতের অন্ধকারে ডেলিকচায় আসা থেকে শুরু করে পাটনের সুকৌশলে ‘দোহাড়ি’২৪ পাতা—এই পুরো অধ্যায়টি সম্পর্কে তারা ছিল রীতিমতো কৌতূহলী এবং ওয়াকিবহাল। নির্জন দুপুরে, রাতের অন্ধকারে তারা আড়ি পাততো। শবরদের ঘরের প্রতিটি লোকের আচার-আচরণ, বাইরা-সামা লক্ষ রাখত। তারা কে কী বলছে, কেন চেঁচামেচি-লিয়াই-ঝগড়া হচ্ছে, ঘটনা কোন দিকে মোড় নিচ্ছে বা নিতে পারে তা নিয়েও তারা যে-যার ঘরে নিজেদের মধ্যে আলোচনাও করেছে।
আর যতদিন গেছে, এই শবরদের চেয়ে ওই দু-ঘর বাউরি আর একঘর সিংহসর্দার প্রতিবেশীই যেন বেশি বুকে ধকধকি নিয়ে থাকত। কী হয় কী হয়! বিনন্দর বউ পুশি বাউরি তো একদিন বিনন্দকে বলেছিল, ‘ইয়ারা ভূমিজ বিটিছ্যেলাটিকে যে শেষে কী তক্ক করবেক কে জানে। ডরেই লাগছে! যদি পার ত যাও ক্যানে—পলপলে যাঁইয়ে ভিৎরে ভিৎরে খোবোরটা উয়াদের কানে ফেলে দিঁয়ে আসবে। বলবে—’
কিন্তু নাহ, বিনন্দ তা করেনি। সেটা প্রতিবেশীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হতো। তাছাড়া ব্যাপারটি যখন ভালোবাসাবাসির, তখন মানুষ হয়ে এমন অমানুষের কাজ করা কি ঠিক?
ডেলিকচার এই প্রতিবেশীরা যে জারমণির ঘটনাটি গোড়ার ল্যা জানত, সেকথা তারা গুজর মুদিকে বলেনি। বলেছে, ‘হামরা ঢের বাদে জাইনেছি। তখন যাকে বলে— কুড়ি গন্ডায় এক পণ হঁয়ে গেছে।’ বলা যায় না, ঘটনার সূত্রপাত থেকে জানি বললে তাদেরকেও হ-ড়-ঘ-চ করা হতে পারে। ধুসলা পড়তে পারে তাদের পিঠেও। পলপলের সিংসর্দাররা বলবেক, ‘তরা সোব জাইনে-শুনেও থুতুস সাপের পারা ল্যাকা সাজে আছিস? হামদের নাই জানাস? তরা এমন ‘পাকচুক’! তাইলে জডুর তরাও উদায়ের সঙে সাঁট আছিস? ভূমিজদের বেইজ্জত করতে খুঁজছিস? আয় শালা! ধানঝাড়ার পারা ঝাড়ব তদেরকেও!’
হাঁসুয়া বাউরি গুজবকে বলেছে, জারমণিকে অঙ্গদ নিয়ে এলেও ‘ম্যান দোষী’ কিন্তু ওই পাটন। অঙ্গদ নায়। অঙ্গদের প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, ‘উ ব্যাচারির কী দোষ?’ উয়াকে ত বাহারে-বাহারেই রাইখে দিল। আর যা কিছু হৈরাগোল করার করল ওই পাটন। উ-য়েই মৈন২৫ -টা দিল।’
গুজর মুদির মারফত সিংসর্দারদের কাছে এই খবর পৌঁছানোর পর থেকে ব্যাপারটা উলটাদিকে ঘুরে গেছে। কেউ কেউ বলেছে, জারমণিকে দরকার নাই, অঙ্গদকেও দরকার নাই। ওই শালা পাটৈনাকে ধরে আন আর ঢুকা হামদের এই ‘ছাড়-ঘরে!’
এই সুরে সুর মিলিয়েছে বুড়ো কলেবর সিংসর্দার, হরেরাম সিংসর্দার, মণ্টু, জয়রাম, ভিরগু সিংসর্দার এরা সব। কিন্তু সেও অনেকদিন হয়ে গেল। এখন সেই তেজ তাদের মধ্যে আর নেই। ঝিমিয়ে পড়েছে। মনে ফুর্তি নেই।
ফুর্তি থাকবে কী করে? গোটা অঞ্চলে খরা। কাজ নেই, আয়-উপায় বন্ধ। পেটের জোগাড় করবে না এইসব শিয়াল খেদতে ডাঙাজমিয়ে রঁন্দ২৬ দিয়ে বুলবে? পেটের আগে তো কেউ নেই? তাই নিয়ে ছ্যেলাছোকরার দল মজাও করে। অশ্বিনী, নিজের পেটে ফটাস ফটাস তালি মেরে বলে, ‘পেট’ বানানটা বল ন? প-য়ে এ-কার ট। আর উল্টায় দিলে? ট প-য়ে একার। তার মানে কী? মানে হৈল—পেটের উপরে কেউ নাই। সজা থাকলেও ‘টপে’ আর উল্টায় দিলেও ‘টপে’।’
অশ্বিনীর এই বিচিত্র বিশ্লেষণে অন্যরাও হাসে। কৃষ্ণপদ বলে, ‘ইয়ার পেটে যা বিদ্যা আছে—ই পঞ্চাৎ ওপিসে চাখরি পাঁইয়ে যাবেক।’
‘ক্যানে?’
‘উখেনেই ত যত উল্টাসিধা চলে।’
‘খুড়ি! কই গো—এ খুড়ি!’
‘হঁ, যাছি রে। যাছি। কে বঠিস?’
ঘরের ভেতর থেকে পার্বতী ঘোমটা মাথায় দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। সদর দরজার দিকে তাকিয়ে দেখতে পায়—অনেকটা ঢালুতে কুলহির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সঁড়ু মাহাত। নলকূপটির কাছে, জভির মধ্যে পা ডুবিয়ে। তার পাশে এক পাইকার। বালিগুমার পান্ডা মাহাত। পাতা সুদ্ধু ভেরেণ্ডা ডাল দিয়ে সে পিঠ ঘষছে। আদুড় গা। পরনে আকাচা ঠেঁটি ধুতি। আর হাঁটুর ওপরে ধুতিটাও পরে তেমনি। ধুতি লয়, যেমন কোমর থেকে বিরহি বস্তা ঝুলছে। তাকে এই এলাকায় সবাই চেনে। লিরনে, খরায়, দুর্দিনে তার বেশি দেখা পাওয়া যায়।
দাওয়ায় তৈলাক্ত খুঁটিটার পাশে পার্বতীর মুখ দেখতে পেয়ে সঁড়ু, ঘরে না ঢুকে, রাস্তা থেকেই বলে, ‘এ খুঁড়ি, আগুখুড়া কন ধারে গেল?’
‘ক্যানে—হরিমন্দিরটার ঠিনে নাইখে?’
‘কই? ঐটা হঁয়েই ত হামরা আলি।’
‘তাইলে কে-জানে, বিহাইরার সঙে কণারবেড়া যাব বলতেছিল।’
‘কণারবেড়া কী ধুনতে গেল, অ্যাঁহ?’ এই যোগে আগুয়ানকে না পেয়ে সঁড়ু বিরক্তি প্রকাশ করে।
‘মুচিঘরকে। ঢোল ছাইতে।’
‘হেই! লৌতন ঢোল কিনল এই কবেই, তাই ছাইতে গেল?’
‘হঁ!’ পার্বতী বলে, ঢোলটা নতুন হলেও আগুয়ান সেটাকে তাদের চালাঘরের ভিতরে মুধুনে ঝুলিয়ে রেখেছিল। ‘চালহা ইঁদুরে’ কেটে দিয়েছে তার চামড়া।
‘অঅঅ।’
সঁড়ুকে আর জবাব দিতে হয় না। বাড়ি-ধার থেকে ঘরের আঙিনায় এসে পড়ে আগুয়ান। দু-হাতে দুটো পাকা পেঁপে। কাঁধে সেই চিরাচরিত কুড়ুল। মাথার চুল এলোমেলো, সারা মুখে ঘাম। পিঠে গড়িয়ে নামছে সদ্য ত্যাগ করা বোনি পাখির গরম গু। সঁড়ুর পাশে পান্ডাকে দেখামাত্র, দু-হাতে পেঁপে দুটো নিয়ে সে পাগলের ঢিল ফাবড়ানোর ভঙ্গিতে চিড়বিড় করে বলে ওঠে, ‘নাই, নাই! এখন বিকাবিকি নাই।’
‘এখন যদি না বিকবে তাইলে বিকবে কখন? এই ত সিজিন।’ পান্ডার হয়ে সঁড়ুই বলে যায়। তার ঝাপসা চশমার আড়ালে দু’চোখের বিস্ময় মালুম করতে পারে না আগুয়ান।
সঁড়ু ঘরে ঢোকে। পান্ডা তখনও কুলহিতেই দাঁড়িয়ে। ডাল দিয়ে নিজের পিঠ নুচছে। সাইটকাচ্ছে২৭ ।
‘বিকবে নাই ক্যানে? বুঝে দেখ—’ সঁড়ু আগুয়ানকে বোঝায়, এখন অঞ্চল জুড়ে চলছে খরা। দোকানে-বাজারে জিনিসপত্রের দরে আগুন। পাইকাররাও তাই এ বছর মালের ভালো দর দিচ্ছে। সঁড়ু বলে, ‘তুমার ঘরে মাল যখন আছে, তখনকে এই খরার বাজারে নাফা করে লাও। এই ত বতর!’
আগুয়ান বলে ঠিক তার উলটো কথা। ‘খরা বলেই ত মাল হামি বিকব নাই। দরকার নাই নাফায়। আজ হামি দু-পওসা বেশি পাবার লোভে বিকে দিব, তা বাদে গটা বছরটা চলবেক কিসে? তখনকে হামাকেই ত ডবল-তে-ডবল দামে কিনতে হবেক। কী বুঝলিস?’
‘হামি ঠিকেই বুঝেছি, তুমি বুদতে পার নাই।’
‘ক্যানে? কী বুদতে পারি নাই?’
‘হামি বলছি কী—তুমার যৎটুকু দরকার তৎটুকু ‘চাকী’ করে রাখাই থাক, বাকি পুয়ালটা তুমি বিকে দাও ক্যানে? ক্যানে বাড়তি জিনিসটা ঘরে ইস্টক করে রাখবে?’
‘কই স্যা-রকম বাড়তি?’
আগুয়ান জানায়, গেল বাঁধনা পরবের পরে-পরেই তো সে একগাড়ি খড় ভেলাইডির এক পাইকারকে বিক্রি করে দিয়েছে। দর অবশ্য ভালো পায়নি। তখন কে জানত যে সামনে আকাল আসছে? আর এখন আকাল এসে গেছে বলে বিক্রির ব্যাপারে বেঁকে বসেছে আগুয়ান। তার ঘরেও তো এতগুলো গরু-কাড়া আছে, তাদের খাওয়াবে কী? ঘরের চাল ছাওয়া-ছাওয়ির দরকার হলে সে-ই বা কোথায় কোন গাঁয়ে গাঁয়ে গরুর গাড়ি নিয়ে খড় কিনতে ছুটবে?
তাছাড়া আসছে বছরেও যে ভালো বর্ষা নামবে, চাষাবাদ হবে, তারও কি কোনও নিশ্চয়তা আছে? সেইসব ভেবেচিন্তে যেটুকু প্রয়োজনের খড় আছে তা ঘরেই মজুত রাখতে চায় আগুয়ান।
‘দরটা ভাববে ন?।’
‘কী দর?’
সঁড়ু আগুয়ানের ঘরের পিছন দিকে ঘাড় উঁচু করে তাকায়। চাকীগাদা করে সাজানো খড়ের স্তূপটি দেখে। যদিও এভাবে দেখা অর্থহীন। তাতে কী বোঝা যায়? তবু সঁড়ু আন্দাজে বলে, ‘তুমার যা আঁটি বাঁধা আছে, তাথে পণ পেছু একশ ষাটের উপরে পাবে। হামার ছুটু ছুটু আঁটি। তাথেই দেড়শ টাকা দর দিঁয়েছে।’
‘দিবেকেই। না দিঁয়ে উপায় আছে?’
খরার জন্য পরে আরও বেশি দর পাবে বলে অনেকে এখনি উজাড় করে দিতে চাইছে না। আবার আগুয়ানের মতো গ্রামবাসী, তারা দুর্দিনের কথা ভেবে নিজের ঘরেই মাল রেখে দিতে চায়। তাইলে শহরের লোকেরা কোথা থেকে খড় পাবে? সেখানে যেসব বড়ো বড়ো ডেয়ারি বা খাটাল আছে সেগুলো চলবে কিসে?
আর গ্রামের চাষীদের বেশি দর দিলেও, পাণ্ডা কী এই মাল বলরামপুরে তার বড়ো পাইকারকে কম দরে বিকে? এখানে যদি সে দেড়শো টাকা পণ দেয়, ওখানে কম করে হলেও একশো আশির কমে দিতে হারগিজ মানবে না। চাইবে দুশো। সারা বছর সে এই কাজই করে থাকে। আশপাশের সমস্ত চাষীদের মাল সংগ্রহ করে নিয়ে বলরামপুরে ফেলে। সেখানে বড়ো পাইকার তার কাছ থেকে কিনে মেশিনে চাপের মধ্যে রেখে বান্ডিল করে। সেই খড় লরি বোঝাই হয়ে চলে যায় টাটা-চান্ডিল-বোকারো-পুরুলিয়া।
‘তাইলে নাই দিবে? বিকবার নাই?’ পান্ডা বাইরে থেকে জিগ্যেস করে।
আগুয়ান বলে, ‘ই-বসসর নাই।’
‘একশো ষাট? পোঁষোট্টি?’
‘নাই।’ পেঁপে দিয়ে কাঁধের বিষ্ঠা সরিয়ে ফেলে আগুয়ান।
এতক্ষণ শংকরও অন্ধকার ঘরে ঢেঁকির ঘরটিতে চুপটি মেরে বসে লুকু বাঁদরের পারা সব শুনে যাচ্ছিল। আর চেয়ে চেয়ে দেখছিল পান্ডাকে। পান্ডাকে সে পছন্দ করে না। সে জানে, এই বুঢ়াটি এলেই তাদের ঘরের খড়গুলো সব সামুটে নিয়ে চলে যায়। তার আর খড়ের গাদায় চেপে আঁজির পাড়া হয় না। লাফঝাপ করা হয় না। তাই এখন আগুয়ান বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় শংকরও খুশি। সেও পান্ডাকে চেঁচিয়ে বলে, ‘বলছে ত নাই বিকবেক ! যা ক্যান্নে!’
পান্ডা চলে যায়। নলকূপের জল খেয়ে, হাত-মুখ ধুয়ে, কুলকুচো করতে করতে। তার পেছু পেছু সঁড়ু। পান্ডা নিজের মনে গাইতে গাইতে যায়—
নেংটি ইঁদুরে ঢোল কাটে, কাটে হে
বতরে পিরিতি ফুল ফুটে...
মাড়ে-ভাতে-খাপরা শাগে যা পেয়েছে তাই খেয়ে, দুপুর-দুপুর বেরিয়ে পড়েছে আগুয়ান। বিহারীর পাইডেল-ভাঙা সাইকেলটা নিয়ে। সাইকেলের হ্যাণ্ডেলে একটা থলিতে ঝুলিয়ে নিয়েছে গোটা কয়েক পিঁপা আর একগাঁঠ কচি কচি সনলা শাগ। এই নিয়েই সে চলল বোহনই-এর ঘরে।
দুপহরে আড়শা রোড সুনসান। দুটো-একটা ফাঁকা যাত্রীবাহী বাস পেরিয়ে যাচ্ছে। ভিড় নেই তেমন।
রাস্তাতেও মানুষের আনাগোনা কম। কাজ না থাকলে কে আর ঘর থেকে বেরোয়। তাছাড়া টানা অনাবৃষ্টির ফলে চারপাশ শ্মশানভূমি হয়ে যেন জ্বলছে। ক্ষেত-মাঠ পুড়ছে। ক্যানেলেও জল নেই। রোদের এমন তেজ যে, ঘরজামাইও গ্রাম ছেড়ে খেঁক শিয়ালের পারা পালাবে।
‘শহর মহুল’ আর জীবনডি-র মোড় পেরিয়ে আগুয়ান এগিয়ে চলে। তার সাইকেলে থলির বহর এবং গায়ে সানলাইটে কাচা নীলে চোবানো জামাটি দেখে, জীবনডির মোড়ে ‘বোলবোম’ -এর দোকান-ঘরে বেঞ্চিতে বসে থাকা পুনুলাল কুমার বুঝে যায়— আগুয়ানের গন্তব্যস্থল কোথায়। এই রোদে আগুয়ানের মাথায় ছাতার বদলে পাগবাঁধা গামছা! কোনো সম্বোধন ছাড়াই সে চেঁচিয়ে বলে, ‘বহিনঘরকে যা-ছ, ত ছাতাটাও লিতে নাই? একটা গামছা? ইব-বাবাআ!’
‘কী করবি রে বাছা! খরায় এই জুটছে এই ঢের।’ বলতে বলতে সে ইচ্ছে না থাকলেও সাইকেল থেকে নেমে পড়ে। দোকানের টাট২৮ -এর ছায়াতে দুদন্ড দাঁড়িয়ে, পাগটা খুলে সেই গামছায় মুখ মুছে বলে, ‘আসছে বসসর যদি ধানধুন জুতের হয়, তাইলে পায়ে একজড়া নাগরা আর মাথায় কাশীপুরের রাজার টোপি লিব।’
পুনুলাল হাসে। দোকানিও আগুয়ানের কথায় যোগ দেয়। বলে, ‘টোপি-নাগরা পরলেই কী আর না পরলেই কী? তুমি খুড়া এমনেই রাজা। বিন পাগের রাজা।’
‘হঁ।’ পুনুলাল বলে, ‘এই পুরুইলায় ঝুমৈরের রস যার ভিৎরে ঢুকে আছে সেই রাজা। কথায় বলে—,’ সে কোনো একটি প্রাসঙ্গিক লোককথা উল্লেখ করতে গিয়েও মনে করতে পারে না। অস্বস্তিতে পড়ে যায়।
‘কী বলে কথায়?’ আগুয়ান তখন নিজের মতো করে ঝুমুরের এক কলি সামান্য নাচের ভঙ্গি করে গেয়ে দেয়। বলে, ‘কথায় এইটা বলে—
দিদি লো ছঙ ছঙ
তুমার সঙে পিরিত করে
হামার পাইল্টে গেল রঙ—
দিদি ছঙ ছঙ...’
উল্টোদিকের পোকোড়ি দোকান থেকে কেউ চোঙা ফুঁকে বলে, ‘লেচ্চিড়া! প্যাঁস প্যাঁস!’
আগুয়ান লোকমারফত আগেই খোবোর পাঠিয়ে দিয়েছিল। বোনের কাছে। তাদের গ্রামেরই বৈনতেয় মাহাতর ভাইঝি দিয়া আছে পলপলে। নামোকুলহিতে পাঁচু বুঢ়ার ঘরে। পাঁচুর মাইতর ব্যাটা খকনার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বৈনতেয়র ভাইঝি টুসির। সে জামাই-ঘরে এসেছিল তালবিচ নিতে। টুসি বাপের ঘরের জন্য কয়েক ঝুড়ি তালবিচ বাঁধের আইড়ে, ক্ষেতের আইড়ে ঘুরে ঘুরে কুড়িয়ে, আস্তাকুঁড়ে জমা করে রেখেছিল। সেগুলো নিয়ে যেতেই, বৈনতেয়, পলপলে তার জামাইঘরে এসেছিল পরশু, গুরুবারে। এই বিচ নিয়ে গিয়ে তারা তাদের ডাঙ্গা জমিটার চারধারে পুঁতে দেবে। একহাত আন্দাজ গাঢ়হা করে। গাছগুলিই বড়ো হয়ে জমির বেড়া বা রঁন্দ হিসেবে কাজ করবে। বৈনতেয়রা চারভাই মিলে, ভাগে, ওই ডাঙাজমিতে পটাস গাছের বন করছে। পাঁচ বছর বাদে উড়ান।
তালবিচের বস্তাটি যখন সে সাইকেলে বাঁধাবাঁধি করছে, সেই সময় আগুয়ান দেখতে পায় তাকে। ঝালদার হাট থেকে সে পাঘা কিনে ফিরছিল। আগুয়ান তাকে বলে, ‘হেই! বৈনতা ভাইগ্না য্যা ব! কী খেবোর?’
‘এই য্যা—তালবিচ লাদায় নিয়ে যাছি।’
‘রঁন্দ দিবে?’
‘হঁ।’
তারপর দু-এক কথা সেরে আগুয়ান বলে, ‘ভালই হৈল ভাইগ্না। তুমি হামার বহিনঘরের ছ্যেলা-ছঁড়া কাকৌ দেখতে পালে একটুকু খবরটা দিঁয়ে দিবে ত—’
‘কী খোবোর?’
‘বোহনইকে বলে দিবে য্যা হামি পরশুকে চিটিডিয়ে আসছি—তিনটার জয় ভলানাথে।’
‘ঠিক আছে। পুরা বলে দিব। আর কিছু বলতে হবেক? খাসি-তাসি নিয়ে আসছ—’
‘খাসি?’
‘হঁ ত বোহনইঘরকে যা-ছ শুধা হাঁতেই যাবে?’
‘হঁ:। খাসি ন ল্যাপড়া।’
বৈনতেয় খোরবটা ঠিক দিয়েছিল দৈত্যারির ঘরে ঢুকে। যদিও তিনটার বাসে যাবার কথা বললেও, আগুয়ান বাসে যায়নি। বিহারীর সাইকেলটা যখন পেয়েই গেল, তখন আর ফালতা ভাড়া দিয়ে বাসে যাবে কেন?
পিচ রাস্তা ছেড়ে ঢালুপথে ঘটাং ঘটাং শব্দে চিটিডি ঢুকতেই, দু-তিনটে বাচ্চা পথের ধুলো উড়িয়ে, ‘মামা আইসেছে! মামা আইসেছে!’ বলতে বলতে ছুটে আসে। তাদের খালি গা। কেউ উলঙ্গ, কারো পরণে ছেঁড়া ইজেরটুকু। তারা এতক্ষণ ‘জয় ভোলানাথ’ বাসটি পেরিয়ে যাবার পরেও মামার আসার অপেক্ষায় ভেঁড়রা গাছের ছায়ায় বসেছিল। এখন মামাকে দেখে কিই না খুশি! কেউ সাইকেলে উঠতে চায়, কেউ আবার হাত বাড়ায় থলিটার দিকে।
ভাদুরানি তখন কাঠের উনুন থেকে ছাই বের করে মুখ-কাটা টিনে রাখছিল। আকাশমণির শুকনো ফল তারা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। ছাইটিও ফেলনা নয়। এই ছাই দিয়ে কাপড় কাচে। সোডার মতো।
বাচ্চাগুলোর হইচই শুনে ভাদু উঠে পড়ে। বুঝতে পারে দাদা তার এসে গেছে। দৈত্যারিও আসে। রোদ তখন নিস্তেজ হয়েছে। সে দড়ির খাট উঠোনে পেতে দিয়ে বলে, ‘বৈ-স, বৈ-স। তাইলে কিসে আসা হৈল? তিনটার জয় ভলানাথে?’
ভাদুর হাতে থলিটা দিয়ে, আগুয়ান বলে, ‘আঢ়াইটার সাইকেলে। বাহারে ট্যাঁড়রা আছে।’
‘সাইকেলে? এই বম্ভরোদে সাইকেলে?’ দৈত্যারি কীভাবে বিস্ময় প্রকাশ করবে বুঝতে পারে না। যদিও পলপল থেকে চিটিডি সাইকেলে আসাটা এমন কোনো ব্যাপার নয়। এত অবাক হওয়ারই বা কী আছে? তবু দৈত্যারিকে তার ‘ইও’২৯ দোষবশত অবাক হতেই হয়। বলে, ‘ইও কখনো হয়? এই বম্ভরোদে মাথায় ছাতাও নাই। ইও কখনো হয়?’
ঠিক এইসময়ে বাইরে সাইকেল পড়ার শব্দ হয়। সঙ্গে সঙ্গে ভাদুর ছুটু বিটি লৌতনী খবর দিতে ছুটে আসে উঠোনে। বলে, ‘অ্যা মামা, পিলকা সাইকেলটায় চাপতে যাঁইয়ে ফেলল। পি-ট উয়াকে।’
‘ক্যানে র্যা বাঁদরগুলা! উঠা সাইকেল!’ আগুয়ান ধমকে দেয়। তারপর যেভাবে কান-কালাদের সঙ্গে চেঁচিয়ে কথা বলতে হয়, অনেকটা তেমনিভাবে বোহনইকে বলে, ‘ইবার পৈতাবে ন নাই?’
এখন অবশ্য আর প্রত্যয় না গিয়ে উপায় নেই— সাইকেলেই এসেছে আগুয়ান। দৈত্যারি মৃদু মৃদু হাসে। বলে, ‘ভাল ভাল।’
সজনে শাগগুলা তুলে নিয়ে ভাদু মাটির বারান্দায় থলিটা উপুড় করে দেয়। পেঁপেগুলো এদিক-ওদিক গড়িয়ে চলে যায়। ভাদু ছেলেমেয়েদের ডাকে। বলে, ‘এ জয়ী, এরেই পিলকা। আয় ন তরা। লে, শাগগুলা সবাই মেলে দুহুরে দে। তা বাদে পিঁপা খাবি। আমি তাৎকে৩০ দাদাকে শরবৎ বনায় দিছি।’
‘না-না। শরবৎ-তরবৎ কিসকে? জলের ঘটিটা দে ন।’
‘এখন গরমের দিন। আর বলছ শরবত খাব নাই? ই—’
‘ইও কখনো হয়?’ দৈত্যারি বলার আগে আগুয়ানই বাক্য সম্পূর্ণ করে দেয়। হাসতে হাসতে। ভাদুকে বলে, ‘লে লে। বনাবি ত বনা।’
বলতে না বলতে শরবত হয়েও যায়। একগ্লাস জলে একমুঠা চিনির ঝাপটানি। লেবু ছাড়া। হাতে মুখে জল নিয়ে সেটাই চঁক-চঁক খেয়ে নেয় আগুয়ান। ভাদু দাঁড়িয়ে থাকে পাশে। পাছায় হাত মোছে। হঠাৎ অভিমানের সুরে বলতে শুরু করে, ‘হ্যাঁ দাদা, তোর এতদিন বাদে আসতে মন হৈল? তোর সংসারে ত যা হবার হঁয়েছে। হামাদের যে কী হছে-যাছে স্যাটা টুকুও খোবোর লিতে নাই? টুকুও লিতে নাই?’
‘কী হঁয়েছে তদের?’
ভাদু যেই বলতে যাবে, অমনি দৈত্যারি বলে ওঠে, ‘ধুট। ছা-ড় ন ইয়ার পেঁপলা কথা। মাঁইঞা লোকের কথা কৌ শুনে?’
‘নাই শুনব?’ আগুয়ান জানতে চায়।
‘শাস্তরে বলেইছে : যে হবেক মাঁইঞালোকের বশ/বুঝে লিবে তার গটাই লস।’
‘কন শাস্তরে ইটা বলেছে?’
‘আহ, অত কি আর মনে আছে। ওই লোকের মুখে শুনে শুনে যৎটুকু মনে ছিল তৎটুকু দিলি শুনায়।’
‘দিলি শুনায়’! রাগে দৈত্যারিকে ভেঙিয়ে দেয় ভাদু। তারপর আগুয়ানকে বলে, ‘ই খেলোড়ি হঁয়েছে। খেলোড়ি।’
‘খেলোড়ি?’ আগুয়ান অবাক হয়। ঘরে ভাত নাই আর জুয়া খেলতে শিখেছে দৈত্যারি?
‘তবে কী বলছি?’ ভাদু দুশ্চিন্তা করে, ‘আর সংসারটা যে চলবেক কিসে স্যাদগে চিন্তা নাই।’
দৈত্যারি পাল্টা প্রশ্ন করে বসে, ‘চিন্তা যদি নাই করছি, তাইলে বউ-ব্যাটা-বিটি নিয়ে এই আকালে পাঁচটা পেটের ইস্টিমার চলছে কিসে? হাওয়া-কলে?’
হাওয়া-কল? আগুয়ান বোহনই-এর মস্তিষ্কপ্রসূত এই নতুন শব্দটি শুনে হেসে ফেলে। বলে, ‘টি-কল, গ্যাঁড়াকল, ইঁদুরকল—উড়াকল তক্ক শুনেছি। কিন্তুক ইটি ত বাবু শুনি নাই। আচ্ছাআ শুনালে বোহনই তুমি। হাওয়া-কল! ইও কখনো হয়?’
‘হয়-হয়।’ দৈত্যারি বেশ বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে, কচড় থেকে চুটি বের করতে করতে বলে, ‘কলের ভিৎরে হাওয়া ঢুকলেই—হাওয়া-কল! লাও, চুটি ধরাও।’
দৈত্যারি আগুয়ানের হাতে চুটি দেয়। আগুন দিতে বলে পিলকাকে। বলে, ‘দে ন রে পিলকা। খাড়িটা চুলহাশালের ল্যা ধরায় আন ন।’
‘হামি নাই পারব। হামি এখন শাগ দুহুরছি নাই দেখছিস? লৌতনীকে বল ক্যান্নে।’ পিলকা বাপের মুখের ওপর সাফ জবাব দেয়।
‘উ-ও ত শাগ দুহুরছে।’
‘হামরা তিনলোকেই দুহুরছি বাবা।’ ছোটো ব্যাটা মন্মথ বলে। বাস্তবিক, ওরা তিনজনই এখন বারান্দায় গোল হয়ে বসে, কুলার মধ্যে সজনে পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে রাখছে। ভিতর ঘরে পিঁপা কাটছে ভাদু।
দৈত্যারি নিজেই উঠে উনুনশালে গিয়ে বসে। নিভন্ত ছাইয়ের মধ্যে একটা রাহেড় খাড়ি গুঁজে জোরে ফুঁ দিতেই উনুনের ছাই তার সারা মুখে, মাথায় বসে যায়। তাকে দেখতে লাগে ঠিক পেণ্ট করা নাটুয়া শিল্পীর মতো। যেন এক্ষুণি হাতে জ্বলন্ত আগুন না এনে সে ইঁয়া তরোয়াল নিয়ে ঢোল-ধমসা-বাঁশির সঙ্গতে নাচতে নাচতে আগুয়ানের দিকে এগিয়ে আসবে। পেটে-পিঠে রঙের ছাপছুপ। দুহাতের কনুইয়ে বাঁধা রঙিন কাপড়ের ফালিগুলি হাওয়ায় উড়বে। বাজনার তালে তালে উঠোন জুড়ে নাচতে থাকবে বোহনই—ইর্গ্যাদ্দা! ইর্গ্যাদ্দা! গ্যাড়ে-গ্যাড়ে-গ্যাড়ে-গ্যাদ্দৌ!
দৈত্যারি চুটিতে আগুন দিয়ে, লুঙ্গি তুলে, মুখের ছাই মুছে ফেলে। তারপর সে নিজেই আগুয়ানের কাছে স্বীকার করে যে ভাদুর অভিযোগ মিথ্যে নয়। গেল হাপ্তার হাটে সে জুয়ো খেলতে বসে পঁচিশ টাকা হেরে এসেছে। হাটে গিয়েছিল সে খাট ছাওয়ার বাবোই দড়ি কিনতে। চার লতি দড়ি না এনে সে মদ খেয়ে জুয়ো খেলে ঘর ঢুকেছে। আর তাতেই যত দুশ্চিন্তা ভাদুরানির।
আগুয়ান এবার বলে, ‘তবে য্যা বললে মাঁঞালোকের কথা ফালতা—শুনবার দরকার নাই?’
‘আহ, তার মানে সোব কথা শুনবার নাই। ওই দুটা-একটা শুনবে আর দুটা-একটা শুনেও অকান করে দিবে। তবে যাঁইয়ে সংসারে শান্তি থাকবেক।’
আগুয়ান ফের হাসে। বলে, ‘বুঝলে বোহনই, তুমার নাম দৈত্যারি যে ক্যানে হৈল। মনু হওয়া উচিত ছিল।’
‘মনু? কন মনু? এই চিটিডি-র দুধু কুমারের ব্যাটা মনু? ন, ষাঁড়ারাম সদদারের লাতি মনু?’
‘হামদের উপরকুলহির। চতুরানন সদদারের ব্যাটা বৈবস্বত মনু।’ আগুয়ান রসিকতা করে। দৈত্যারির পক্ষে অবশ্য ব্রহ্মাকে নিয়ে আগুয়ানের এই বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা ধরতে পারা সম্ভব নয়। সে কি জানে, ব্রহ্মার চতুর্দশ পুত্রের অন্যতম এই বৈবস্বত মনুই মনুষ্যজাতির অবশ্যপালনীয় আচার-সংক্রান্ত গ্রন্থ ‘মনুসংহিতা’ প্রণয়নকারী? আগুয়ানও তার লোকজ মণীষার গুণে এই শাস্ত্রপ্রণেতাকে পলপলের লোক বানিয়ে দিয়েছে। বাক্যের প্রায় প্রতিটি শব্দ এমন সুন্দরভাবে দ্ব্যর্থক হয়ে উঠেছে যে, ‘উপরকুলহি’, ‘চতুরানন’, এবং ‘সর্দার’ যে এখানে যথাক্রমে ‘দেবলোক’ ‘ব্রহ্মা’ এবং ‘প্রধান দেবতা’ তা ধরতে না পারাটাই স্বাভাবিক। দৈত্যারি তাই আগুয়ানদের গ্রামের এই লোকটিকে না-জেনেও জানার ভান করে বলে, ‘অঅঅঅ! চতুরাননের ব্যাটা? ভালোই ত। তাইলে আজের ল্যা তুমি হামাকে মনু বলেই হাঁকাবে।’
‘হাসির কথা লয় দাদা।’ ঘরের ভিতর থেকে ভাদু তার স্বামী সম্পর্কে আরো অভিযোগ তুলে আগুয়ানকে বলে, ‘তুমি এখনি ইয়াকে কান কামড়ায় ভালো করে বলে যাও। হাটে যাঁইয়ে যেমন টাকাপৈসা না উড়ায় আসে। হামরা খাটোয়া মানুইষ। সারাদিনে ক-চৌকা মাটি কাটলে তবে পঁচিশ টাকা আসে, বল ন?’
‘দেখবাবু, কান কামড়াকামড়ি করতে হামি লারব। দক্তা-তামুক খাঁইয়ে হামার দাঁত-লাও গেছে। তার হতেই বলছি—তদের সংসার তরা নিজে বুঝ। হামি তাও বোহনইকে বারুণেই করছি। তারপর—হরিনাম লে কানের পাশে/না লিবি ত হামারেই আছে। ভালো কথা বলে গেলি, ইবার যা মনে দেখা দেই সেইটাই করবি। আর কী বলব?’
ভাদু পিঁপা কেটে থালায় নিয়ে আসে। সবাইকে দেয়। পাকা পিঁপা পেয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যায় বাচ্চাগুলোর মধ্যে। এই সময়ে কুলহির কুকুরটাও তাদের উঠোনে এসে দু-দন্ড দাঁড়িয়ে এর-ওর মুখের দিকে চায়। কোনো অভ্যর্থনা না পেয়ে সে উদাস হয়ে গলি দিয়ে গুটি গুটি রাস্তায় বেরিয়ে যায়।
দাওয়ার প্রান্তে বসে, পিঁপা খেতে খেতে, ভাদু জিগ্যেস করে, ‘বউদিদি তাইলে এখনৌ কাঁদছে?’
আগুয়ানের বদলে দৈত্যারিই বলে ওঠে, ‘কাঁদবেক নাই? ঘরের ল্যা জুয়ান বিটিছ্যেলা যদি চলে যায়? যতই হোক, মায়ের মন বঠে ন?’
‘হঁ হঁ।’ আগুয়ান বলে, ‘এখন কিছুটা কমেছে। তাও কখনো দেখি কপাট কুণে বসে নিজের মনেই ‘জারমণ’ ‘জারমণ’ বলে কাঁদছে। হামরা কত বুঝাই কিন্তুক নাহ।’
‘তাইলে আর ক-ন সন্ধান পাওয়া গেল নাই?’
‘কই?’
‘খুজাখুজি চলছে ন নাই?’
‘চলছে ওই রকম। খাইড়া বঠে ন। সাপের গাঢ়ায়ও থাকতে পারে। কন বন-জঙ্গলে ঢুকে আছে হামরা বুদতে পারব? খাইড়াদের জায়গা খাইড়ারাই জানে।’ দৈত্যারির প্রশ্নের জবাবে আগুয়ান বলে, ‘তবে কেউ কেউ বলে নকি হাও উত্তরে গঙ্গার ধারে পালাঞ গেছে। ভাটায় কাজ করতে।’
‘হঁ, স্যাটাও হতে পারে। এই খরায় গাঁয়ে-ঘরে থাকলে পেট চলাবেক কী উপায়ে?’ ভাদু বলে। আসলে, এই জেলায় যখন খরা দেখা দেয়, তখন এখানকার বিত্তহীন নিম্নবর্গের মানুষ গতর খাটিয়ে রোজগার করতে নাবালে চলে যায়। তবে বর্ষার আগে আগে বৃষ্টিবাদলার জন্য সমস্ত ভাটা বন্ধ হয়ে যায়। ওদিকের ভাটাতেও তো এখন চিমনি বন্ধ। পুরুলিয়াতে খরা বলে এবছর এখানের কাঁসাই নদীর ধারে ধারে যেসব ভাটা আছে, সেগুলো এখনো চলছে। খরা বলেই সেগুলোতে নতুন রেজা-খাদিয়া নেওয়ার সুযোগ কম।
‘তাইলে আর কথায় থাকতে পারে?’
‘যেখিনেই থাকুক, হামি ত বলব উয়ারা যেমন সুখে-শান্তিয়ে থাকে।’ আগুয়ান বলে, ‘এখন খুঁজে পালেও তো আর গাঁয়ে আনা চলবেক নাই?’
‘আর গাঁয়ে ঢুকতেও দিবেক নাই।’ দৈত্যারি বলে, ‘বিটিছ্যেলা বলে কথা। পুরুষ মানুইষ হলে কিছুই নাই।’
আগুয়ান আর কোনো কথা বলে না। এতক্ষণ বেশ ফুর্তিতে ছিল সে। হঠাৎ জারমণির প্রসঙ্গ ওঠাতে তারও মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়। সে আচমকা উঠে পড়ে খাট থেকে। সাইকেল নিতে গলির দিকে যায়।
‘বৈ-স দাদা। বৈ-স—’ ভাদু ডাকাডাকি করে। একেবারে রাতে ভাত খাওয়া-দাওয়া করে ভোরে যাওয়ার কথা বলে। পীড়াপীড়ি করে। না হলে আর একটু থেকে জল-দিয়া বাসি ভাতে সজনে শাকটা অন্তত খেয়ে যাক। কিন্তু আগুয়ানের মনটা কেমন ভেঙে গেল।
‘নাহ। হামি আর রইভই নাই। যাছি—’ সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে বেরিয়ে যায় আগুয়ান। বাচ্চাগুলো পিছনদিকে টানতে চেষ্টা করে মামার সাইকেল।
আগুয়ান চোখের জল গোপন করতে পিছন ফিরে তাকায় না। চলে যায়।
অঙ্গদ আর পারছিল না। সে এই অস্ত্র থেকে, অস্ত্রের নৈকট্য থেকে নিজের মুক্তির জন্য অস্থিরচিত্ত হয়ে পড়েছিল। যতবার উন্মুক্ত তরবারিটির দিকে তাকিয়েছে, যতবারই সে তার সঙ্গে সংলাপ বিনিময় করতে গেছে, ততবার, তার মনে হয়েছে অস্ত্রটি তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলতে চাইছে।
মানুষকে ক্রুদ্ধ করাই অস্ত্রের উদ্দেশ্য। তার সৃষ্টির সার্থকতা। তা না হলে অস্ত্রের কদর থাকে না। উপযোগিতাও থাকে না। মানুষ প্রতিহিংসা-পরায়ণ না হলে হাতে অস্ত্র ধরবে কেন? অস্ত্রই মানুষকে শত্রু করে তুলতে চায়। শত্রু না থাকলে মানুষ কাকে নিধন করবে? নিধনের জন্যই তো অস্ত্র।
উদুম্বর গাছের তলায় পড়ে থাকা অস্ত্রটি এটাও বলেছে যে, সে নিজেই হলো মহাশক্তি। কিন্তু কার শক্তি সে? যে তাকে ধারণ করে। অস্ত্রের কোনো জাত নেই, বিচার নেই। সে ন্যায়-অন্যায়ও জানে না। সে কেবল নিধনার্থ চালিত হতে জানে।
অস্ত্রের সঙ্গে কথোপকথনেও অঙ্গদ, অস্ত্রের মুখ থেকে এই কথাগুলি শুনতে শুনতে অদ্ভুত বেদনানুভূতিতে উন্মাদের মতো বারে বারে আর্তনাদ করে উঠছিল, ‘হে মহাপ্রবীণ! হে মহাপ্রবীণ! আমাকে ক্লেশমুক্ত করুন! অস্ত্রের বিড়ম্বনা হইতে আমাকে অতি সত্ত্বর উদ্ধার করুন।’ বলতে বলতে সেই অস্ত্রের কাছেই সে তাৎক্ষণিক সংজ্ঞাহীন হয়ে, প্রণিপাতের ভঙ্গিতে লুটিয়ে পড়ে যায়।
একটা সময়, গো-শকটের কর্কশ শব্দ হয়। তার আচ্ছন্নতা কাটে। চেতনার উত্থান ঘটে। মনে হয়, আমি এতদিন কোথায় ছিলাম? এখনি-বা কোথায় অবস্থান করছি? আমার সম্মুখে কে এই বৃদ্ধ? কেন সে আমার প্রতি অমন অন্তরভেদী দৃষ্টিনিক্ষেপ করছে? তারপর হঠাৎ তরবারিটির দিকে চোখ পড়তেই, অঙ্গদের সম্মোহন কেটে যায়। সে পুনরায় ফিরে আসে তার প্রজ্ঞায়। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তার অনি:শেষ কৌতূহলে।
কিন্তু এই অস্ত্র নিয়ে তার যে উদ্বেগ ও উচাটন তা শেষ পর্যন্ত অন্তরে সংগুপ্ত রাখতে পারে না। সে বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ে এই ভেবে যে, একটি আপাত অভিব্যক্তিহীন মূক হাতিয়ার কতখানি প্রগলভ হয়ে উঠতে পারে! নির্বাক হয়েও সে কি প্রবল বা'য়। কী তার প্রবৃত্তি উদ্রেককারী ইশারা।
অঙ্গদ বলে, ‘হে সর্বময়! এ কোন পরীক্ষায় আমাকে অবতীর্ণ করিলেন? যাহা আমাকে নির্বল করে, যাহা আমার ভিতরে ত্রাস সঞ্চারিত করিয়া দেয়, সেই অস্ত্র কেন আপনি আমার দৃষ্টিসীমায় গচ্ছিত রাখিয়া গেলেন? এ যে শুধু রক্তপতনে প্ররোচনা দেয়! এ কেবল মানুষের হাতে মারণ-ঝঙ্কার শুনিতে চাহে! হে নিসূদক, এই সুন্দর পৃথিবী কি কখনোই অস্ত্রসম্ভারহীন হইবে না?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! বিনাশ ও ধ্বংস ব্যতিরেকে অস্ত্র আর কিছুই চাহে না। অশুভ শক্তি নির্মূলীকরণে অস্ত্র অনিবার্য। যাহা অনিবার্য তাহাকে স্বীকার করিতে হইবে। তুমি ত্রস্ত বোধ করিতেছে কেন? আমি জানি, অস্ত্র ধারণে তুমি অপারঙ্গম। তথাপি অস্ত্র তোমাকে ধারণ করিতেই হইবে। তন্নিমিত্ত ত্রাস ও জাড্য হইতে মুক্ত করিতে আমি তোমাকে অস্ত্রমুখীন করিয়াছি। হে প্রিয়চিকীর্ষু! পরা ও অপরার সমন্বয়ে গঠিত এই জগৎ, যা, বৈপরীত্যপূর্ণ এবং অসাম্যপূর্ণ। সমাজে কামই অস্ত্রের জন্মদাত্রী। অসামান্য তার প্রকাশ। যতদিন অহমকে কেন্দ্র করিয়া নিজস্ব ও পরস্বের গন্ডী থাকিবে, যতদিন ধনকে কেন্দ্র করিয়া ধনাঢ্য ও নির্ধন থাকিবে, যতদিন দুষ্পূরণীয় ইন্দ্রিয় সম্ভোগের চক্রে নারী ও পুরুষ থাকিবে, ততদিন এই সুন্দর পৃথিবী অস্ত্রসম্ভারহীন হইবে না। আর যতদিন না এই সুন্দর পৃথিবী অস্ত্রসম্ভারহীন হইবে ততদিন আধিপত্য ও বশ্যতা, প্রভুত্ব ও দাসত্ব অটল থাকিবে।’
অঙ্গদ বিস্ময়াভিভূত হয়। বিমর্ষও হয়ে পড়ে। তার মনে হয়, অখন্ড মানবকল্যাণের কী আর কোনো পথ নেই? কাম ও তজ্জনিত অস্ত্রসংঘাতই মানুষের নিয়তি? কামই তাহলে সর্বময়, নিয়ন্তা? মানুষের আত্মীক উত্তরণের পথে এই অজর-অমর কাম কি অন্তরায়? নাকি অভিশাপ?
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! জগতের সম্যক অস্ত্রসম্ভার বিসর্জিত হইলেও কি জগৎ অস্ত্রসম্ভারহীন হইতে পারে না? হে প্রিয়ংবদ! কী উপায় অবলম্বন করিলে এই পৃথিবী অস্ত্রসম্ভারহীন হইতে পারেতাহা বিস্তার করিয়া পুনর্বার আমাকে বলুন। আপনার অমৃতবাক্য শ্রবণ করিয়া আমার তৃপ্তি হইতেছেনা।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন ‘হে অর্বাচীন! পূর্বোক্ত বাক্যে আমি বলিয়াছি সমাজে কামই হইল অস্ত্রের জন্মদাত্রী। অস্ত্রসম্ভার বিসর্জিত হইলে কাম বিসর্জিত হয় না। অতএব সর্বাগ্রে কামকে বিসর্জন দাও। তাহা হইলে এই সুন্দর পৃথিবী অস্ত্রসম্ভারহীন হইবে। অতঃপর কামের স্বরূপ বিষয়ে বিস্তার করিয়া কহিতেছি। তদগতচিত্তে শ্রবণ করো। কাম হইল লোকসমাজের সর্বগ্রাসী অমিতপরাক্রম শত্রু। কাম প্রতিহত হইলে ক্রোধের জন্ম হয়। ক্রোধ হইতে সম্মোহ বা অবিবেক বা ভ্রান্ত ধারণা জাগ্রত হয়, অবিবেক হইতে আসে সামাজিক বিধান উল্লঙ্ঘন, সামাজিক বিধান উল্লঙ্ঘন হইতে বুদ্ধিনাশ হয়। বুদ্ধিনাশই ধ্বংসের মূল। যেমন ধূমের দ্বারা বহ্নি এবং মলের দ্বারা আদর্শ (আয়না) আবৃত থাকে, জরায়ু দ্বারা ভ্রুণ আবৃত থাকে, তদ্রুপ কাম ক্রোধ দ্বারা এই লোকজগতের সমস্ত প্রাণী আবৃত আছে। হে শ্রাবক, এই নিত্যবৈরী কামরূপ চিরক্ষুধার্ত অনল দ্বারা জ্ঞানীগণেরও জ্ঞান আবৃত হয়। অতএব আপনাকে সুদৃঢ় করিয়া আত্মীক উত্তরণের প্রয়োজনে এই কামরূপ দুর্দমনীয় শত্রুকে হনন করে। এই শত্রুই অশুভ শক্তি। অশুভশক্তির উত্থান ও প্রসার প্রতিরোধ করো। জগতে অস্ত্রের মুর্খ-গৌরব জাহির করিতে দেশের সহিত দেশের, জাতির সহিত জাতির অথবা সম্প্রদায়ের সহিত সম্প্রদায়ের যে সাড়ম্বর যুদ্ধ ঘোষিত হয়, তাহাও এই কামেরই বৃহদানুষ্ঠানিক প্রকাশ। যুদ্ধবাজ মাত্রই কামুক। যৌনাভিলাষী।’
অঙ্গদের নিজেকে অনন্যোপায় মনে হয়। তদ্দন্ডে সে মনতস্তাপও করে। ভাবে, হায়! আমি কি কিছুই করতে পারি না? যদি আমি এই মুহূর্তে—
অঙ্গদকে নি:শব্দে স্বগতোক্তি করতে দেখে মহাপ্রবীণের মুখে অনুত্তেজ হাসির উদয় হয়। তিনি জানতে চান অঙ্গদ কী ভাবছে? কী বিষয়ে সে এমন চিন্তামগ্ন হয়ে নিজের সঙ্গে নিজে কথোপকথনে রত?
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! অশুভ শক্তি দমন বিষয়ক আপনার সুললিত বাক্য আমাকে ক্লীবত্ব হইতে জাগ্রত হইতে যারপরনাই প্রাণিত করিতেছে। আমি উত্তরোত্তর নি:সংশয় ও নির্দ্ধিধ হইতেছি। এই ভূপাতিত অস্ত্রটি দেখিয়া আমার বোধ হইতেছে, যদি এই কালেই এই নিশিত তরবারির চন্ডকোপ দ্বারা কামকে আমি খন্ডিত-বিখন্ডিত করিয়া দিতে পারিতাম! হে অন্তরজ্ঞ! এই ভুলুন্ঠিত অস্ত্র আপনি কৃপা করিয়া আমাকেই অর্পণ করুন। আমি যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করিতে চাহি।’
মনে হল, অঙ্গদের এই সিদ্ধান্ত মহাপ্রবীণকে সন্তোষ দান করল। তিনি তো এটাই চেয়েছিলেন? তিনি চেয়েছিলেন অঙ্গদ অশুভ শক্তির প্রতি বৈরিতা নিয়ে অস্ত্র ধারণ করুক। উদুম্বর বৃক্ষের তল থেকে সে বেরিয়ে আসুক। গাত্রোত্থানপূর্বক অবতীর্ণ হোক যুদ্ধে।
এখনো তিনি সে-অভিমত ব্যক্ত করলেন। সেই সঙ্গে অঙ্গদের এই গাত্রোত্থানের উদ্যোগে তিনি যে প্রসন্ন, তাও প্রকাশ হয়ে পড়ল তাঁর আদর্শে অনুগমনেচ্ছু এই ভক্তের কাছে। কারণ তিনিই মত, তিনিই পথ। মহাপ্রবীণ চান, তাঁকে দেখতে দেখতে, তাঁর অমিত বিভায় অঙ্গদ আরও বেশি সম্পৃক্ত হয়ে উঠুক। সে যতই তাঁর ভাবে, তাঁর আদর্শে, তাঁর মধ্যেই লীন হয়ে যাবে, ততই সে মহাত্মার পথকে খুঁজে পাবে। খুঁজে পাবে অন্ধকার থেকে আলোর দিশা। এখনও তার ঢের-ঢের দেরি।
তথাপি, আপাতত স্থিতিশীলতা কাটিয়ে ওঠা এই অঙ্গদকে সাদরে গ্রহণ করে, নিজেকে তিনি তাঁর কাছে পরিপূর্ণরূপে মেলে ধরতে চাইলেন। কে তিনি? কী তিনি? তাঁর মত ও পথের যে অনুসারী, তিনি কী চোখে দেখছেন তাকে? এইসকল বস্তু নিয়েই তিনি উপস্থাপিত করলেন নিজেকে।
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে যুযুৎস! তোমার এমত সিদ্ধান্তে আমি প্রীত। তোমাকে অভয় প্রদান করি। তুমি উত্তরোত্তর আমার নৈকট্য গ্রহণ করো। তাহা হইলে তুমি উত্তরোত্তর সংশয় ও শঙ্কা হইতে উত্তীর্ণ হইবে। আমি সর্বভূতে সমদর্শী। আমার প্রিয়-অপ্রিয় বলিয়া কিছু নাই। তৎসত্ত্বেও যাহারা আমাকে ভজনা করে, তাহারা আমাতে অবস্থান করে, আমিও তাহাদের অন্তরে অবস্থান করি— তাহাদের লক্ষ্যাভিমুখে থাকি। যদি অতিদুরাচার ব্যক্তিও অনন্যচিত্ত হইয়া আমাকে ভজনা করে, সেও সজ্জন বলিয়া গণ্য। কারণ সে সম্যক দৃঢ়নিশ্চয়। সে যথাকালে ধর্মাত্মা হয়। ধর্মাত্মা ব্যক্তিই চিরস্থায়ী শান্তিলাভ করিয়া থাকে। হে প্রশীর্ণ! জানিয়া রাখো—আমার ভক্ত প্রনষ্ট হয় না। যাহারা সমাজে পাপযোনি তথা অন্ত্যজ, তাহারাও আমাকে আশ্রয় করিয়া পরমাগতিপ্রাপ্ত হয়। অতএব এই সুখহীন অনিত্য সংসারে যখন জন্মগ্রহণ করিয়াছ, তখন মুক্তির জন্য আমাকে ভজনা করো। তুমিও মদগতচিত্ত হও। আমার অনুগামী ও ভক্ত হও। আমার পূজক হও। আমাকে দন্ডবত করো। এইপ্রকারে আপনাকে নিযুক্ত করিয়া মৎপরায়ণ হইলে আমাকে পাইবে।
‘হে গুড়াকেশ! আমাকে অব্যক্ত মূর্তিরূপে জানো। আমার দ্বারা এই সমস্ত জগৎ ব্যপ্ত। সর্বদা সর্বত্রগামী হইয়াও মহান বায়ু (সমস্ত বায়ু) যেমন ভূমন্ডলে স্থিত, সেইরূপে সর্বভূত আমাতে স্থিত—এই অবধারণ করো। মানুষী-তনু-আশ্রিত অজ্ঞ মূঢ়গণ আমাকে অবজ্ঞা করিয়া থাকে। বৃথা আশাকরী, বৃথাকর্মী, বৃথাজ্ঞানী ও চেতনাহীন তাহারা মোহকারী রাক্ষসী ও আসুরী স্বভাব পাইয়া থাকে। কিন্তু মহাত্মারা দৈবী স্বভাব আশ্রয় করিয়া একাগ্রমনা হইয়া আমাকে অব্যয় জানিয়া ভজনা করিয়া থাকে।
‘হে অর্বাচীন! আত্মশ্লাঘবান, অনম্র, ধনমানের জন্য যাহারা গর্বিত, তাহারা দম্ভের সহিত নিজ ধর্মপরায়ণতা প্রচারের উদ্দেশ্যে, নিজের নাম প্রচারের উদ্দেশ্যে অবিধিপূর্বক যজন করিয়া থাকে। তাহারা অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধ আশ্রয় করিয়া আমার দ্বেষ্টা ও নিন্দক হয়। সেইসব দ্বেষকারী ক্রূর নরাধমগণকে আমি সংসারে অসুর যোনিতে নিরন্তর নিক্ষেপ করিয়া থাকি।
‘হে বিনম্র! কাম, ক্রোধ ও লোভ—নরকের এই ত্রিবিধ আত্মনাশকারী দ্বার। অতএব এই তিন ত্যাগ করিবে। এই ত্রিবিধ তমোদ্বার হইতে বিমুক্ত যে-নর আপনার শ্রেয় আচরণ করে, তাহার পরমাগতি প্রাপ্ত হয়। যে শাস্ত্রবিধি ত্যাগ করিয়া যথেচ্ছাচারে প্রবৃত্ত হয়, সে উদ্দেশ্যসাধনে ব্যর্থ হয়। সে অসুখী ও অধমগতি প্রাপ্ত হয়। অতএব কার্য-অকার্য ব্যবস্থার নির্ণয়ের জন্য শাস্ত্রই তোমার প্রমাণ তথা কর্তব্যনির্ণায়ক। ইহার বিধানানুসারে বুদ্ধি ও ধৃতিসহযোগে ইহলোকে তোমার কর্ম সম্পাদন করা উচিত।’
মহাপ্রবীণের এই মধুর বচন শুনতে শুনতে অঙ্গদ আচ্ছন্ন হয়ে যায়। যদিও পূর্বোক্ত অনেক অনেক ভাষ্য শ্রবণকালে তার কোথাও কোথাও যেভাবে খটকা লেগেছে, এখনও দুটি-একটি বিষয়ে তার তেমনি খটকা লাগে। এমনকি, কোনো ক্ষেত্রে সে সম্পূর্ণ সহমতও পোষণ করতে পারে না। মহাপ্রবীণের ভাব গ্রহণ করার মতো বুৎপত্তির অভাব রয়েছে তার মধ্যে। তাই কখনও ভুল বোঝার দরুন অথবা কোনো কোনো শ্লোকের অন্তর্নিহিত ভাব সঠিক অর্থে বুঝতে না পারার দরুণ সে পিছিয়ে পড়ে, নিজের মনে তাদের ভুল ব্যাখ্যা করে বসে। তবে এইসকল ধন্দ নি:সঙ্কোচে কাটিয়ে উঠতেও সচেষ্ট সে।
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আপনি ‘অহম’ বর্জনের কথা ইতঃপূর্বে বলিয়াছেন। অথচ এখন আপনি যাহা যাহা বলিলেন তাহাতে কোথাও আপনার ‘অহংভাব’ নিরতিশয় ব্যক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ‘আমি সর্বভূতে’ সমদর্শী, ‘আমার দ্বারা এই সমস্ত জগৎ ব্যাপ্ত’ ইত্যাদি বলিয়া আপনি নিজেই আপনার গুণকীর্তন করিতেছেন। কী হেতু? আবার যাহারা নিজের নাম প্রচারের জন্য কর্ম করিতেছে, তাহাদের আপনি নিন্দা করিতেছেন। দন্ড ঘোষণা করিতেছেন। অথচ এস্থলে আপনিও আপনার মহানুভবতার প্রচার করিতেছেন। তাহা হইলে আপনার এই প্রকৃতির কারণে কেহ যদি আপনার নিন্দক হইয়া পড়ে, তাহাতে দোষের কীই-বা দেখিতেছেন? কখনও ভয় দেখাইয়া, কখনও-বা প্রলোভন দেখাইয়া আপনি ব্যক্তিকে আপনার নিকট সমর্পণ করিতে বলিতেছেন। ইহারই-বা কারণ কী?’
অঙ্গদের এই স্পর্ধিত প্রশ্ন মহাপ্রবীণ উৎকর্ণ হয়ে শুনলেন। হাসলেনও। এমনকী মহাপ্রবীণের দ্বিচারিতা সম্পর্কে প্রশ্নগুলি এমন অকপটে এবং অকুতোভয়ে অঙ্গদ তাঁর কাছে নিবেদন করায় তিনি তাকে সাধুবাদও জ্ঞাপন করলেন। তারপর—
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! আমাকে সর্বাংশ বুঝিতে তোমার কিঞ্চিৎ ভুল হইয়াছে। তুমি আমাকে নিছক ব্যক্তি বলিয়া কল্পনা করিয়াছ। কিন্তু আমি নৈর্বক্তিক। আমি যাহা যাহা বলিয়াছি, তাহা কোথাও কোথাও তুমি হয়তো অশ্রুত হইয়াছ। আমি বলিয়াছি, ‘আমাকে অব্যক্তমূর্তিরূপে জানো।’ ইহা বলিবার কারণ হইল এই যে, আমি ব্যক্তি নই—ব্যক্তির ধ্যান-জ্ঞান, আদর্শ তথা অখন্ড শাস্ত্রের আধার। আমি বলিয়াছি—‘আমিই মত, আমিই পথ’। ইহা বলিবারও অর্থ হইল এই যে, আমি সমাজের, রাষ্ট্রের, দেশের, কালের আচার-আচরণ-সংবলিত ধর্মীয় বিধান। বুদ্ধি ও ধৃতি সহযোগে এই বিধানানুসারে কর্ম সম্পাদন করিতে প্রয়াসী হইলে তোমার আত্মোন্নতি ঘটিবে। তুমি অধমগতিপ্রাপ্ত হইবে না। তোমার পরমাগতি লাভ হইবে। হে জ্ঞানান্বেষি! অতঃপর বলি। আমি আত্মপ্রচার করি নাই, যশকীর্তন করি নাই। সমাজ তথা দেশকে, মানবকে উৎসন্ন হইতে রক্ষা করিতে, তামসমুক্ত জীবনের নিমিত্ত তমসাচ্ছন্ন মানবের মস্তিষ্কে জ্ঞানের শলাকা প্রজ্জ্বলিত করিতে উৎসাহদানার্থ আমি শাস্ত্রসম্মত উন্নততর বিধান লোকমানসে প্রচার করিতেছি এবং যাহারা এই সুন্দর ভুবনকে কামান্ধের দৃষ্টিতে অবলোকন করে, যাহারা ‘আমার’ অর্থে উক্ত উন্নততর বিধানের প্রতি হিংসা পোষণ করে, নিন্দা করে, আমি সেইসব দুষ্ট ব্যক্তিদের শাস্তিস্বরূপ দন্ড ঘোষণা করিতেছি। অধিকন্তু, ইহাও বলি—আমাতে সমর্পণের অর্থ হইল জীবনের নির্দিষ্ট মার্গের কাছে নিজেকে সমর্পণ। ভয় দেখাইয়া আমি বিপথগামীকে সাবধান করিয়া দিতেছি, প্রলোভন দেখাইয়া আমি সেই অবোধকে শুভ-বোধের দিকে আকৃষ্ট করিতেছি। হে মুখাপেক্ষি! এখন নিশ্চয় আমার দ্বিচারিতার বিষয়ে তোমার অমূলক ধারণার অবসান হইয়াছে।’
‘হে মহাপ্রবীণ, ধৃষ্টতা মার্জনা করুন।’ বৃদ্ধের পদযুগল স্পর্শ করে আছে যে ভূমি, অঙ্গদ সেই ভূমিতে অবনতমস্তক হয়ে থাকল। মহাপ্রবীণ তাকে স্মিত হাসিতে মার্জনা করলেন। অতঃপর তাকে পুনরায় প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করলেন।
অঙ্গদ বলে, ‘হে বুৎপাদক! আপনি ধর্মীয় বিধানের কথা বলিতেছেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ‘ধর্ম’ কী, তাহা অদ্যাপি আমার অজানা। দেখিতেছি নানা সময়ে নানান স্থানে নানান মানব সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধর্ম লইয়া হানাহানি চলিতেছে। মানুষ অহরহ হিংসার বলি হইতেছে। তাহা হইলে রক্তপাতের মাধ্যমেই কি সমাজে ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়, নাকি ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হইলে দেশে অনিবার্য রক্তপাত ঘটে—হিংসার আগুন প্রখর ও সর্বত্রগামী হইয়া ওঠে? আপনি তাহা জানাইয়া আমার অজ্ঞতা ভঞ্জন করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলে, ‘হে অর্বাচীন! কালরূপ সম্মার্জনীর ঘর্ষণে অনেকানেক রঙিন সামগ্রী যেমন বিবর্ণ হইয়া ভিন্ন রং ধারণ করে, তেমনি অনেকানেক শব্দেরও কালের প্রাবল্যে অর্থগত প্রতিসরণ ঘটে। আদি অর্থ হইতে বিচ্যুত হইয়া তাহা ভিন্ন অর্থের এমনকী সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থেরও দ্যোতক হইয়া উঠে। আজ ‘কুরুক্ষেত্র’ শুনিলেই মনশ্চক্ষুতে সর্বাগ্রে বিশাল যুদ্ধভূমি প্রতিভাসিত দেখিতে পাও। অথচ এই কুরুক্ষেত্র যে বস্তুত ধর্মক্ষেত্র, তাহা স্মরণে আসে না। আদিতে ইহা বারো যোজন এলাকা বিশিষ্ট একটি তীর্থস্থান ছিল। নাম সমন্তপঞ্চক। ‘এই স্থানে মৃত ব্যক্তি পুণ্যলোকপ্রাপ্ত হইবে’—এই অভিপ্রায়ে, চন্দ্রবংশীয় রাজা কুরু উগ্র তপস্যায় এই ক্ষেত্র কর্ষণ করেন এবং ইন্দ্র হইতে ওই বর লাভ করেন। তখন হইতে সমন্তপঞ্চক কুরুক্ষেত্র নামে পরিচিত হইয়া পড়ে। কিন্তু তারও পরবর্তীকালে এই ধর্মক্ষেত্রটিতে কুরু-পান্ডবের যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ায় লোকমানসে তার ধর্মক্ষেত্ররূপে পরিচিতি বিলুপ্ত হইয়া যায়। মানুষ আজ সমন্তপঞ্চককে বিস্মৃত হইয়াছে। তাহার তীর্থভূমি পরিচয়ও ভুলিয়া গিয়াছে।
‘ধর্ম’কে লইয়াও অনেকাংশ তাহাই হইয়াছে। মানুষ ভুলিতে বসিয়াছে ধর্মের ইতিবাচক তথা কল্যাণমূলক অর্থনিচয়। ‘ধর্ম’ বলিতে বুঝায় ‘যাহা সমাজকে ধারণ করে,’ অর্থাৎ ধর্ম হইল ‘লোকধারক’। আরও নানাবিধ অর্থ বহন করে এই ধর্ম—যেমন অহিংসা, পুণ্য, ন্যায়, বিচার, গুণ, ঈশ্বরানুরাগ, যজ্ঞাদি, তৎসহ ‘আত্মা’ এবং ‘ধনু’ও ধর্মের সমার্থক। ধর্মের শেষোক্ত দুইটি অর্থ বিশেষভাবে চিন্তা করিয়া দেখো। ইহা হইতে অনুমান করা যায় যে, অতীতে ধর্মকে কতখানি পবিত্র তথা উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করা হইয়াছিল। মানুষ যাহাতে প্রতিপক্ষকে অন্যায় আক্রমণ না করে, যাহাতে এই পুণ্যভূমিতে একটি গর্হিত রক্তবিন্দুও পতিত না হয়, তাহার জন্যই ধর্মের সমার্থকজ্ঞান করা হইয়াছে যুদ্ধের হাতিয়ার এই ধনুকে। মানুষ যাহাতে ইহাও স্মরণে রাখিতে পারে যে, লড়াই হইলে তা সতত হইবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ধর্মকে সাক্ষী রাখিয়া। আজ আমরা দেখিতেছি ধর্মের কি দুর্দশা! আজ মানুষ সেই ধর্মের উপরই আঘাত হানিতেছে। ধর্মকে লইয়া দাঙ্গা, রক্তপাত। ধর্মকে লইয়া রাজনীতি। হা ধর্ম!’
অঙ্গদ বলে ‘হে মহাপ্রবীণ! অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধর্মকে সাক্ষী রাখিয়া আজকের সমাজে ধর্মের এই অধোগতি কী কারণে হইল তাহা জানিতে সবিশেষ ঔৎসুক্যবোধ করিতেছি।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! আজিকার সমাজে ধর্মের অধোগতি হয় নাই। সমাজের অধোগতি হইয়াছে। সমাজ-সংস্কারক তথা বিধায়কদের আত্মীক অধোগতি হইয়াছে। ধর্মকর্ম-বিদ্বেষী রাক্ষস-প্রবৃত্তি দিনে দিনে সক্রিয় হইয়া উঠিতেছি। এই অশুভ শক্তির বিনাশ আজ জরুরি। অশুভ শক্তির প্রয়োজনেই নিরীহ মানুষের হাতেও হাতিয়ার ধারণ আজ অবশ্যম্ভাবী হইয়া উঠিতেছে।’
অঙ্গদ তটস্থ হয়ে ওঠে। চোখে-মুখে ফুটে উঠতে থাকে তার দুই অশক্ত মুষ্টিতেও অস্ত্র ধারণের ব্যাকুলতা। সে বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! সমাজ রক্ষার্থ অস্ত্রধারণই যদি আজ সত্য হইয়া থাকে, তাহা হইলে আমি সেই সত্যপালনে আগ্রহী। আমি আমার রুগ্ন ও কদাকার মুষ্ঠিতেও অস্ত্রধারণ করিতে ইচ্ছুক। আমি যুদ্ধাকাঙ্ক্ষী।’
মহাপ্রবীণ নিরুত্তর।
‘হে মহাপ্রবীণ! আপনি আমাকে তত্ত্বে উৎসাহদান করিয়াছেন। আমাকে তত্ত্বজ্ঞ করিয়া তুলিয়াছেন। অথচ এখন আমি এই দন্ডে, সেই মাঠারিতে অস্ত্রাঘাতে ধাবিত হইতে যাঞ্চা করিতেছি কিন্তু আপনি আমার হস্তে হাতিয়ার অর্পণ করিতেছেন না। হে মহাপ্রবীণ! সত্বর আমার হস্তে অস্ত্র সমর্পণ করুন। আমার প্রতিপক্ষকে আমি এই ধর্মাস্ত্রের নির্বিরতি আঘাতে বহুধাবিভক্ত করিব! তাহাকে বোটি বোটি করিব!’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে চঞ্চল প্রতিস্পর্ধী! চাঞ্চল্য প্রশমিত করো। উগ্রতা দমন কর। আমি ইতঃপূর্বেও যাহা বলিয়াছি, তাহা পুনর্বার বলিতেছি। মনঃসংযোগ করো। কেবল অস্ত্র লইয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া যায় না। ইহা মূঢ়তা। যুদ্ধের মহাস্ত্র হইল জ্ঞান। জ্ঞান হইতে কৌশলের জন্ম। কৌশল দ্বারা শত্রুকে পরাহত করিতে হয়। তুমি এখন অবধি সেই জ্ঞান আহরণ করিতে পার নাই। কারণ তুমি তত্ত্বজ্ঞ হইলেও জগদ্দর্শন তোমার সম্পূর্ণ হয় নাই।’
অঙ্গদ নিজের চাঞ্চল্য দমন করে। মহাপ্রবীণের প্রতি তার প্রসারিত দৃষ্টি অটুট রেখে বলে, ‘হে প্রবৃদ্ধ! আবার নতুন করিয়া জগদ্দর্শনের কী প্রয়োজন? আমি আপনার ভিতর দিয়াই ইতিমধ্যে জগর্দ্দশন করিয়াছি এবং এখনো করিতেছি।’
সে স্বপ্নোত্থিতের মতো উন্মীলিত দৃষ্টিতে মহাপ্রবীণের দিকে এমনভাবে চেয়ে থাকে, যেন নতুনভাবে সে এই জগৎ এই পরিমন্ডলকে অবলোকন করছে। যে-অতিপুরুষ তার সম্মুখে দন্ডায়মান, তাঁর ভেতরেই কী সে এই জগতের দর্শন পায়?
মহাপ্রবীণের মুখমন্ডল জুড়ে প্রসন্ন হাসির আভা ছড়িয়ে পড়ে।
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! আমি জগতের আচরণবিধি মাত্র। আমিও একক। এককের মাধ্যমে সমষ্টি দর্শন হয় না। জগৎ বিপুলা। জগৎকে দর্শন করিতে হইলে জগতের পথে পথে পরিভ্রমণ করো। দেখ মানুষের দুঃখ-দারিদ্র-আহার-বিহার-বাসস্থান, দেখ মানুষে মানুষে সম্পর্ক, অস্তিত্ব রক্ষার নিরলস প্রচেষ্টা, ভাষা ও বোধের বিকাশ, জ্ঞান। দেখ সত্যের প্রকৃত রূপ। দেখ ত্রিবিধ গুণের বিকাশ।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে প্রদৃপ্ত! আমি আপনাতে প্রপন্ন হইয়াছি। আমি আপনার শরণাগত। আমাকে অতঃপর সত্যাভিমুখে চালিত করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ..
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে নরপুঙ্গব! জগদ্দর্শনই সত্য। বিশ্বরূপই সত্য। আমি অতঃপর তোমাকে সেই দর্শনকর্মে প্রবৃত্ত করতে চাহি। তুমি অনতিবিলম্বে এই তৃণ-পরিপূর্ণ গো-শকটে অধিরূঢ় হও।’
অত্যন্ত হীনবল শরীর নিয়েও, অঙ্গদ, বিশাল অস্ত্র হাতে সেই খড় বোঝাই গরুর গাড়ির ওপরে টলমল করতে করতে উঠে বসে। অনেকটা পদ্মাসনের ভঙ্গিতে। উন্মুক্ত তরবারিটি সে যুগল মুষ্ঠিতে দৃঢ়ভাবে ধরে নাকের সামনে খাড়া করে রাখল। ঊর্ধ্বমুখী। তরবারিটি এতোটাই দীর্ঘ যে, মাথা ছাড়িয়ে সেটা অনেকখানি শূন্য ভেদ করে রইল। উপবেশনের এই মুদ্রায়, অঙ্গদের শীর্ণকায় শরীরের পঞ্জরগুলি টানটান হয়ে পড়ল। খসখসের মতো মোটা ও বিস্তৃত কেশরাজি ঘাড় থেকে নেমে পিঠেও এসে পড়েছে। লিঙ্গাবরণ স্বরূপ নাভিকুন্ডের নীচে একটি সংকীর্ণ বস্ত্রখন্ড ছাড়া শরীর তার অনাবৃত। নির্বস্ত্র।
গো-চক্রযানে গাড়োয়ানের আসনে সেই প্রবৃদ্ধ। হাতে ছোট্ট একটি সাটিক। যা দিয়ে প্রয়োজনে মৃদু আঘাত করে চলেছেন গরু দুটিকে। তাদের অভিমুখ বরাবর এই জীবনমার্গে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।
গাড়োয়ান গাড়ি ছেড়ে দিল। রট-রট শব্দে ঘুরতে লাগল চক্রনেমি। গো-শকটের মাথায় দুলে উঠল অঙ্গদ। গাড়োয়ান তাকে চাঞ্চল্য দমনে করে, মানসিক চাঞ্চল্য ও উত্তেজনা সংবরণ করে বসার উপদেশ দিলেন। সেইসঙ্গে বললেন, ‘জগদ্দর্শনের মূল ইন্দ্রিয় চক্ষু ও কর্ণ। তুমি উক্ত ইন্দ্রিয়দ্বয় সদা-সর্বদা জাগ্রত রাখো।’
অঙ্গদ সেভাবেই জাগ্রত রাখল নিজেকে। তারপর জগদ্দর্শনের লক্ষ্যে অনির্দিষ্টকালের সফরে সে জীবনমার্গে যাত্রা করল।
হে-ঈ-ঈ-ঈ-ঈ-ঈ!
প্রবল উল্লাসে শূন্যে লাফিয়ে উঠল পাটন। হাতে ধনুক নিয়ে। পিঠের তৃণে কাঁড়ের গোছায় ঝড়ঝড় শব্দ। সবেগে একটা পাক দিয়ে, ঘুরে, সে শুকনো লতাপাতা আর যত ভাবরি-ঝুনঝুনির ঝোপঝাড় পিষ্ট করে তালগাছের সারির পাশ দিয়ে ছুটতে ছুটতে আসে। জারমণির কাছে। এক দমে সে চড়াইয়ে উঠে যায়। ঘরে ঢোকার আগে তালপাতার ঝুপড়িটির থেকে অদ্ভুত একটা ‘ভুভ-ভুভ-ভুভ-ভুভ’ ডাক কানে আসে। কীসের ডাক? মালুম করতে পারে না পাটন। এদিক-ওদিক তাকায়। হঠাৎ ঝুপড়ির ভেতর থেকে কোকিলের মতো একটা ধূসর কলো রঙের পাখি, ঠোঁটে জ্যান্ত গিরিগিটি নিয়ে তার মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল।
জারমণি ঘরে নেই। তার জট ছাড়ানো মাথার একগোছা চুল নিয়ে পড়ে আছে কাঠের পুরোনো চিরুনিটি। এই চিরুনি, এই কেশগুচ্ছ—যা জারমণির, তা অগ্রাহ্য করে ঝটিতি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারল না পাটন। যেভাবে গলাসি ধরে বাগাল টানে গরুকে, যেভাবে মধ্য-নিশীথে প্রস্ফুটিত কুমুদিনী টেনে আনে চাঁদকে, ঠিক তেমনিভাবেই জারমণিই যেন তাকে টেনে আনলো তার কাছে!
পাকা তালের গন্ধে ঘরের বন্ধ বাতাস ভারী হয়ে রয়েছে। তালটিও গড়গড়াচ্ছে চাটাইয়ের ওপরে। খসে পড়া গিরগিটির ল্যাজটি তেজ নিয়ে লাফাচ্ছে তখনও। পাটন সেটাকে তুলে বাইরে ঝিঁটে দেয়। আর চিরুনটি নিয়ে সে উল্টে-পাল্টে দেখতে থাকে। জারমণির চুল! চুল তো দেহের একটা তন্তু বৈ কিছু নয়। তবু কী টান! কী আকর্ষণ! নাকের কাছে চিরুনিটি এনে প্রবলভাবে ঘ্রাণ নিতে থাকে সে। তার মধ্যেই সে যেন অখন্ড একটি নারীশরীরের সুবাস পায়। দেখতে দেখতে পাটন আবিষ্ট হয়ে পড়ে। চোখের পাতা দুটি তার আপুনি বন্ধ হয়ে আসে, নিষিদ্ধ আবেগে। সে আর কোনোকিছুই দেখতে পায় না। দেখে...
ঘরে না পেয়ে, পাটন, টিলার ঢাল বেয়ে কয়েক পা নেমে আসে। অদূরে শিমূল গাছটির ছায়ায় দাঁড়ায়। চিন্তা করে। এখন কোথায় আর যেতে পারে, জারমণি! এই তো একটু আগে সে ঘরের ভেতরে ছিল। শরীরে তার আলস্য ছিল। ব্যথা ছিল। মেজাজও দু-দিন ধরে খিটখিটে। পাটন তাই প্রতিহার আগলে ঘরে থাকেনি। সে দু-দন্ডের জন্য ঝুড়ে জঙ্গলে ঘোরার জন্য ধনুক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। এইটুকু সময়ের মধ্যে তার উধাও হয়ে যাওয়াটা জারমণির প্রতি তার সন্দেহকে তীব্রতর করে তোলে। যদিও, পাটন নিজেও ঠিক ঠিক জানে না, জারমণি কী করতে পারে আর জারমণি কী করতে পারে না। তাই ইদানীং জারমণিকে তার আরও বেশি রহস্যাবৃতা, ছলনাময়ী মনে হয়।
ছলনা যে আগেও সে করেনি তাও কি জোরের সঙ্গে বলতে পারবে, পাটন? ডেলিকচার জঙ্গলে সেই গোধূলি লগ্নের ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর মুহূর্তটি কি ভুলে গেছে সে? সেই গাছে গাছে এমুড়ো-ওমুড়ো চিহড়লতা টাঙিয়ে বানানো দোলনায় পাটনের দু-পংক্তির লোকগানটির তালে তালে এই অলোকসুন্দরীর অতি-রমণীয় দোলন? সে হাসলো। পাটনের সুখদায়ক মধুর ঠেলনে দোলও খেল। কিন্তু শেষতক এই পাটনকেই সে নিজে প্রহারও করল। অপদস্থ করল সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের গ্রামের লোকদের দিয়ে।
আবার এই জারমণিই গ্রামবাসীদের নজর এড়িয়ে জিনগা-মাঈয়ের থান থেকে দুর্যোগের রাতে খালাস করে আনল পাটনকে। কিন্তু আনার পর? সেই জারমণি আর এই জারমণি নয়। সে ক্ষণে ক্ষণে রূপ পরিগ্রহ করে। সর্বদাই সে অধরা। তার সবচেয়ে বড়ো ছলনা তো এটাই যে, পাটনের সঙ্গে সে আছে অথচ পাটনের সঙ্গে সে নেই। এও কী তার সুচতুর শঠতা নয়?
এখন প্রায়শ, ভাবতে গেলে, পাটন ক্ষিপ্ত চন্ডাল হয়ে ওঠে। তার ইচ্ছে হয়, জারমণির সামনে সে আর শিষ্ট নিরীহ প্রতিহারী হয়ে থাকবে না। নিজের যাবতীয় সংযম চৌচির করে, মুষ্টিবদ্ধ ধনু আর তূণবদ্ধ তীর জানুর চাপে মড়মড় করে ভেঙে দিয়ে, সে তার জংলী তামসিক অভিব্যক্তি নিয়ে প্রখর হয়ে দাঁড়াবে। আর গোসাপের মতো কামে ক্রোধে শরীর ফুলিয়ে ‘গর্গর-গর্গর’ ভয়ঙ্কর কর্কশ আওয়াজ করে উঠবে! হয়তো সেই আওয়াজ শ্রুতিমধুর নয়, ভরা বর্ষার ব্যাঙের মতোও নয়, তবু এই কর্কশ, কাব্যহীন ছন্দহীন ডাকই কী ওই বিল্বস্তনী রমণীর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেবে না—পাটন শুধু লিপ্ত হতে চায়। লিপ্ত হতে চায়। আর কিছু নয়। কিছুই নয়। লিপ্ত হতে চায়।
বাস্তবিক, আর কিছুই নয়। এই আধা-জঙ্গুলে ও আধা বর্বর পরিবেশে জারমণিকে নিয়ে যে-জীবন সে কাটাচ্ছে, সে-জীবনে সে প্রতিদিন যা যা করে অথবা যা যা করে না, তা শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়সুখে জারমণির সঙ্গে সে লিপ্ত হতে পারছে না বলে অথবা জারমণির সঙ্গে সে লিপ্ত হবে বলেই। যদিও পাটন আজতক জানে না, কবে সে জারমণির সঙ্গে লিপ্ত হবে, অথবা আদৌ কি সে লিপ্ত হতে পারবে? এখন, এটা সে জেনেই গেছে, এই লিপ্ত হওয়া না-হওয়াটা তার ওপরে নির্ভর করে না। নির্ভর করে জারমণির ওপরে। কিন্তু কবে? কবে তার এই বিভীষণ অঙ্গকে নিয়ে অখন্ডকাল জুড়ে মিথুনাবদ্ধ হয়ে থাকবে জারমণি?
পাটন পলে পলে প্রত্যাশায় থাকে। নিজেকে সে আশাহত করতে চায় না। একবার তার মনে নৈরাশ্যের উদয় হলে সে নিজেই হয়তো উদ্যমহীন হয়ে পড়বে। তার মনও ভেঙে পড়বে। তখন যে অলীঢ়া রমণীকে নিয়ে তার মন কুসিম্ব পাতার তলে বিন-বিন-বিন-বিন করতে থাকা দিগভ্রান্ত পোকার মতো অনবরত বহুরঞ্জিত চলচ্ছবি এঁকে চলেছে, যার স্তন-যুগলকে কখনও কুমুদ, কখনও বিল্ব, কখনও প্রস্ফুটিত চাঁদের সঙ্গে তুলনা করে, যার নিতম্বকে মনে হয় কনককলস আর ঊরুকে গজশূন্ড, সেই অলোকসামান্যা নিতম্বিনীকেই তখন মনে হবে দশ-মাসান্তর শুধুই সন্তানপ্রসবা নারী। তার মধ্যে কোনো মায়া নেই, ছলনা নেই, অনুভূতি উদ্রেককারী কল্পনার দিগন্তপ্রসারী বিস্তার নেই।
অথচ এখন? একথা ভাবা তো দূরের কথা, কল্পনাও করা যায়? দিগন্তপ্রসারী কল্পনার বিস্তার নেই ভেবে সে কি তাকে ছেড়ে—মাঠারির এই মোহময় পরিবেশ ছেড়ে— অন্যত্র চলে যেতে পারবে? পারবে কি তার খঞ্জন-গঞ্জন আঁখি ভুলে দূর অযোধ্যা পাহাড়ের গবরিয়া জঙ্গলে কিংবা সেই মৌতড়—যেখানে কালীকে শিকলে বেঁধে রাখা হয়, তার কাছাকাছি ‘নয়নঝুরি জলাধারে’র নির্জন কোলে নিরীহ নিপাট মৎস্যজীবী হয়ে অবশিষ্ট জীবন বিতিয়ে দিতে? পারবে না। কেন না, সেখানে মহাবেশ নেই। সে পারবে না, কেন না সেখানে জারমণি নেই। জারমণি—যাকে না পেয়েও সহবাস করা যায়, অথবা সহবাস করেও যাকে পাওয়া যায় না। জারমণি—
পাটনের মতো একজন চন্ডাল পুরুষের পক্ষে এই পরিস্থিতি যে কতটা দুঃসহ, দুর্দমনীয়, তা পাটন ছাড়া অন্য কারো পক্ষে বুঝে ওঠাও সম্ভব নয়। পাটন তবু বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায় না। সে জারমণিকে পেলেও জারমণির সঙ্গেই থাকতে চায়, জারমণিকে না পেলেও অন্তত জারমণির ভূমি স্পর্শ করেও এই বনখন্ডে কবেকার শুকনো অর্জুন ফলের মতো পড়ে থাকতে চায়। সে যেতে চায় না যোজন যোজন দূরে। এই নারীর অলিখিত শর্ত মেনেই সে তার বশম্বদ হয়ে থাকতে চায়। ইত্যবসরে সে নিজেকে আশ্বস্ত করে রাখে এই বলে যে, একদিন না একদিন সেই শর্তকাল তো শেষ হবে। সেদিনও কি সে পাবে না তাকে?
কিন্তু এটা বলা যতটা অনায়াস, পালন করা ঠিক ততটাই কঠিন। তাই এখনও নিজেকে নিয়ে তার এই দ্বৈরথ—এই দোলাচলচিত্ততা সে কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছে না। সে কী করবে? কোন পন্থা অবলম্বন করবে? কোন আচরণ? সে কার বশম্বদ হয়ে থাকবে—জারমণির? নাকি তার কামজনিত অন্তর্দহনের? সে কার বশম্বদ হয়ে থাকবে—বাক পানি পদ পায়ু উপস্থ নিয়ে তার কর্মেন্দ্রিয়ের? নাকি, মন বুদ্ধি চিত্ত অহংকার নিয়ে তার অন্তরেন্দ্রিয়ের? কথন বাহুল্য, তার এই প্রশ্নে ভেলাবৃক্ষে ফল ভেদ করে যেমন বিচি বেরিয়ে আসে তেমনি জ্ঞানেন্দ্রিয়-অন্তেরেন্দ্রিয়কে স্পর্শ করে প্রমত্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে চায় তার কর্মেন্দ্রিয়। কারণ? সে চন্ডাল। সে কামান্ধ।
সে নিজেও তা স্বীকার করে। জগতে নারী এবং কাম ব্যতিরেকে কিছুই সে দেখতে পায় না। কোনোকিছুকে সে সত্য বলে মানে না। সেই ডেলিকচার জঙ্গলে, গাছপালার আড়ালে-আড়ালে, গোধুলির ভাতি যখন ক্রমশ পাটকিলে হয়ে আসছিল তখন নিজমুখে সে বলেনি সে-কথা? —‘জগতে নারী বৈ আর কিছুকে আমি স্বীকার করি না। নারী সত্য, নারীই মায়া, নারী জাগরণ আবার নারীই জীবন ও জগতের অদৃশ্য নিয়ামক। পুরুষের সর্বকর্ম-ধর্মের চরমতম ও অভীষ্ট লক্ষ্যই হলোনারী।’
সে এটাও বলেছিল যে, অন্ধত্বের চক্রনেমিতেই জগৎ-সংসার ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রেম-ভালোবাসা-আবেগ-হাহাকার সবই তো অন্ধ। অন্ধ রিপুর তাড়ায় আবর্তিত হচ্ছে মানুষের পিপাসার্ত জীবন। পিপাসা থেকে যেমন মানুষের চিরকালীন মুক্তি সম্ভব নয়, তেমনি এই অন্ধত্ব থেকেও নয়। অন্ধত্ব বিনা জগৎ অসার। অন্ধকার। অসুন্দর।
ওহ! এই অন্ধত্ব যে তাকে কোথায় নিয়ে যাবে! কোন পাতাল গহ্বরে! যাকে অবলম্বন করে সে এই গহ্বর থেকে উত্তীর্ণ হতে চায়, মুক্তি পেতে চায়, সেই কামই তার অদৃশ্য অলাতচক্রে তাকে নিরন্তর আবদ্ধ রেখেছে। তাকে কুম্ভীপাকে তৈল-ভর্জন করছে। তার এই দুর্দশার কারণ কি জারমণি? নাকি জারমণিকে নিয়ে, তার মোহময়ী অপার্থিব সৌন্দর্যকে নিয়ে পাটনের ভেতের জেগে ওঠা আকাঙ্ক্ষা—আকাঙ্ক্ষা থেকে বাসনা—বাসনা থেকে লোভই তার সম্যক দুঃখের উৎস?
কামনা-বাসনার জাগ্রত প্রতিভূরূপে সে তার অধোশরীরের যে ‘আজানুলম্বিত বাণলিঙ্গ’ ধারণ করে রয়েছে, উদভ্রান্ত হয়ে নিজের এই উপস্থটির প্রতিও সে নিজেই কুপিত হয়ে ওঠে। তখন কী যে করবে ভেবে পায় না। মনে হয় এই মুহূর্তে তাকে ছিন্নাংগ করে ফেলি। হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে বুচাটাঙি নিয়ে নিজের হাতে নিজের গোপন অঙ্গটিকে কোপে কোপে শতখন্ড করে এই পার্বত্য বনভূমির চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিয়ে দুঃখে-ক্ষোভে-পীড়নে-অনুশোচনায় দক্ষিণামুখী হয়ে তার বলতে ইচ্ছে হয়, ‘হে দিঙনাগ! হে সত্যপালক ঋতম্ভর! আমি কামাগ্নিতে জর্জরিত হয়ে বলছি—আমার এই বীজাংগ যেন কংকরময় পার্বত্যভূমিতে রোদে-তাপে-খরায় চিরতরে লীন হয়ে যায়! যেন কোনোদিন তা উদ্ভিন্ন হয়ে শত-শত বৃক্ষের জন্ম দিতে না পারে। জগতে কামই আজীবন দুঃখ শোকের উৎস। আমি চাই তার সর্বকালীন বিনাশ ঘটুক। আমি চাই—’ বলতে বলতে সে যন্ত্রণাকাতর হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়বে। আর তার সংকর্তিত শরীর নিয়ে, জারমণির প্রতি তার প্রকম্পমান তর্জনি প্রসারিত করে অভিসম্পাত দিয়ে বলে উঠবে, ‘তুমি কুচক্রী! স্বার্থপর! তুমি রূপ ও যৌবন নিয়ে আত্মগর্বে গর্বিতা। যৌবন অরণ্যে তোমার কুসুমভাতি যেন দিনে দিনে আপান্ডুর হয়। আমি অভিসম্পাত দিচ্ছি— তোমার নিকশিত কান্তি ঝামর হউক! পরজন্মে তুমি পেচকের মতো কুদর্শনা হও! কুদর্শনা হও! কুদর্শনা হও! তোমাকে দর্শন করেও কোনো পুরুষের যেন কামোদ্রেক না হয়!’
কিন্তু বাস্তবে? এর একটি কথাও সে জারমণির কাছে মুখ ফুটে বলতে পারে না। তার আকাশ-পাতাল— রোহিত-সফরী—ভাবনাই সার। এই তেজি ও উর্জস্বলা নারীকে দেখতে দেখতে সে এটাও বুঝে গেছে যে, নারীই প্রবলা। পুরুষের অভিশাপ তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। তার শরীর থেকে তুচ্ছ একটি রোমকণ্টককেও উৎপাটিত করতে পারবে না। উল্টে নিজেকেই তার অভিশপ্ত মনে হয়। মনে হয়, এই পবিত্রভূমি মাঠারিতে এসে সত্যিই তার পুনর্জন্ম হয়েছে। সে এখন আর সেই পাটন নয়। সে এখন জারমণির খোজা-প্রহরী। সে প্রায়শ্চিত্ত করে চলেছে তার গতজন্মের কৃতকর্মের।
জারমণি হাসতে হাসতে লতপাতের ভেতর থেকে তার ভুবনমোহিনী মুখ বের করে। আর তাতেই, শিমূলগাছের তলে দাঁড়িয়ে থেকে চকিতে জারমণিকে দেখতে পেয়ে ফুর্তিতে ঢলোঢলো হয়ে ওঠে পাটন। তার ছুটে আসার ক্লান্তি গোপন না করে, বাঁ-হাতের ধনুকটিকে দূরের তালগাছগুলির দিকে বাড়িয়ে উত্তেজনায় বলতে থাকে, ‘চ! চ দেখ হামি—’
‘কী দেখব?’
‘হামার সঙ্গে চ, হামি দেখাব!’
কী দেখাবে সে?
পাটন উত্তর দেয় না। জারমণিকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়। ডুংরির দিকে। জারমণি ছুটতে থাকে। মেদিনী কাঁপিয়ে, পাটনের পেছু পেছু।
তারা ডুংরিতে ওঠে না। উপত্যকা জুড়ে তালগাছের সারি। তেমনি একটি গাছের কাছে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাঁ হাতের ধনুকটি দিয়ে, পাটন, জারমণিকে দেখায়—মস্ত একটি ঢ্যামনা সাপকে সে কেমন তীরবিদ্ধ করে নামিয়েছে। দেখো! এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাওয়া তীরটি নিয়ে সেই সাপটি এখনো আলস্যে আড়মোড়া ভাঙছে যেন। তার আর পালাবার শক্তি নেই। শিকারকে তীরবিদ্ধ করার সাফল্যে পাটন আদুড় গায়ে পৌরুষ নিয়ে হাসতে থাকে। অকুস্থলে জারমণিকে নিয়ে সে যেন তাকে বলতে চায়, ‘এবার বলো, বলো তুমি—আমি বীরবাহু নই? পুরুষ নই? আমি কি পারি না লক্ষ্যকে ‘বাণবিদ্ধ’ করতে?’
কিন্তু জারমণি সেভাবে ফুল্ল হয়ে ওঠে না। বরং তার মনে বিপরীত প্রতিক্রিয়া হয়। যেন তীরটি ওই সাপটির পিঠে নয়, সরাসরি জারমণিকে বিদ্ধ করেছে, এমনি বেদনা-বিহ্বল নয়নে সমদর্শীর দৃষ্টিতে সে মুমূর্ষু সরীসৃপটির দিকে নিরবচ্ছিন্ন তাকিয়ে থাকে। তালগাছের মাথাও লক্ষ্য করে। পুকুরপাড়ে, ডুংরি-ডহরে সর্বত্র যখন তালগাছগুলিতে পাকা তাল ধরেছে, ধুপধাপ পড়ছে ঢেলা-বাবলা-ফুলখাড়ির ঝোপে, পুকুরের জলে, যেখানে-সেখানে দমকা বাতাসেও ভেসে আসছে পাকা তালের গন্ধ, তখন এদিকের সারিতে একটি গাছেও ফল ধরে নেই। শুকিয়ে ঝুলছে শিশ্নসদৃশ ‘মরমী ফুল’৩১ গুলি। হয়তো এখানে কোনো খাদ্যের সন্ধানে উঠছিল ক্ষুদার্ত সাপটি। যে তালগাছে মরমীফুল বেরিয়ে আসে, সে-গাছ বন্ধ্যা। কখনোই ফল ধরে না। মন বিষণ্ণ হয়ে যায় জারমণির।
‘ইটা কী করেছিস তুঁই, আঁই?’
‘নাই দেখতে পাছিস? আমি ইয়াকে একেই কাঁড়ে বিঁধেছি। মরায় দিয়েছি!’
‘ক্যানে মরালিস? ই তোর কী করেছে? কীসের হতে তুঁই ইয়াকে দিলি মরায়?’
পাটন ঘাবড়ে যায়। জারমণির এমন প্রতিক্রিয়া তো সে আশা করেনি মোটেই! তারা জংগলে বাস করছে। প্রয়োজনে ফল-মূল খেয়ে শিকার করেই তো জীবন কাটাতে হবে। তাছাড়া সে তো শবর। ব্যাধের বংশধর। তার হাতে আজকেই তো আর এই আদিম হাতিয়ারটি ওঠেনি। শিকার যখন আছে, শিকারকে ভূপাতিত করাই তার কাজ। সেভাবেই সে জারমণিকে বলে। বলে, ‘হামার হাঁতে কাঁড় আছে ত হামি নাই ইয়াকে বিঁধব? মরদের অস্তর তবে কিসের লাইগে?’
শেষোক্ত প্রশ্নটি করে, পাটন বুঝতে পারে, এমন প্রশ্ন তার জারমণিকে করা সংগত হয়নি। তার হাতে তীর আছে বলেই সে সরীসৃপটিকে বিদ্ধ করেছে। বিদ্ধ যদি সে নাই-বা করবে, তাহলে আর অস্ত্রের উপযোগিতা কী? কী তার প্রয়োজন? পাটন যদি জারমণির কাছে নিজেকে পুরুষ বলে জাহির করতে চায়, তাহলে এ প্রশ্নের উত্তর তো তারই দেবার কথা। কিন্তু পারবে কি সে? পারবে এর যথাযথ জবাব দিতে?
অস্ত্রের সার্থক ব্যবহারই যদি অস্ত্রের উপযোগিতা হয়ে থাকে, তাহলে, উর্ধাংগে ধৃত হাতিয়ার দিয়ে সে যখন একটি সরীসৃপকে বধ করতে পারলো, তখন নিম্নাংগে ধৃত অপর হাতিয়ারটি দিয়ে কেন সে আরেক সর্পিণীকে বধ করতে পারছে না? কেন সে এতদিন পরেও একটি বারের জন্যও তাঁর ‘বাণলিঙ্গের’ অব্যর্থ উপযোগকারী হয়ে উঠতে পারল না? কেন?
জারমণি প্রত্যক্ষ দৃষ্টিতে অবিচল তাকিয়ে থাকে—তার সম্মুখে ধনুক-হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ‘মহাবাহু’র দিকে। পাটন জারমণির শরীর থেকে আঁশটে গন্ধ পায়। সে আরো কাছে এগিয়ে আসে তার।
সাপটিকে দেখতে পেয়ে চতুর্দিকে পাখিদের কিচির-মিচির শুরু হয়েছে। অন্যান্য পাখ-পাখুড়কে তারা সাবধান করে দেয়। কাক এসে বসছে তালের খঁদায়। দুপুরের রোদ হঠাৎ ঝাপসা হয়ে যায়। ছায়ার আস্তরণ পড়ে। মেঘ জমতে থাকে আকাশজুড়ে। ইশানকোণে লালধুলো আসমান ভেদ করে উঠতে থাকে। ঝড় এলো বলে!’
জারমণির চোখেও সেই ঝড়ের পূর্বাভাস। মুখ তার থমথম করে। আক্ষেপের গলায় বলে ওঠে, ‘তুঁই নাই জানিস! নাই জানিস তুঁই!’
‘হামি নাই জানি? কী?’
‘অস্তর চলাতে।’
জারমণির মুখনি:সৃত এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি, তৎক্ষণাৎ, পাটনের অন্তর তোলপাড় করে দিল। সে অস্ত্রচালনা জানে না? ভুল জায়গায় সে নিক্ষেপ করেছে তার তির? পাটন বিমূঢ় হয়ে দেখতে থাকে এই শ্রীময়ীকে। আর এবারেও তার হাত থেকে জারমণির পায়ের কাছে খসে পড়ে গেল মুষ্টিবদ্ধ ধনুকটি!
জারমণি আর একদন্ডও দাঁড়াল না সেখানে। যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকেই ছুটে ছুটে চলে গেল।
‘জারমণি! শুন তুঁই। শুন—’ পিছন থেকে চেঁচিয়ে ডাকতে থাকে পাটন। সাড়া পায় না। তিরসমেত জখন সাপটির ল্যাজ ধরে, মাটিতে ঘষটাতে ঘষটাতে, সে জারমণির পদানুসরণ করে ঝুপড়ির দিকে এগিয়ে যায়।
গো-শকটের মাথায় খড়। অনেক উঁচু অবধি উঠে গেছে। তার ওপরে পদ্মাসনে উপবিষ্ট অঙ্গদ। যুগল-মুষ্টিতে ধরা অস্ত্র। নাসিকা বরাবর সেই অস্ত্রটিকে সে শূন্যে উঁচিয়ে রেখেছে। গাড়ি চলছে। হ্যাঁচড় হ্যাঁচড়! রট-রট! গাড়োয়ান মহাপ্রবীণ। তাঁর হাতে গাছ থেকে সদ্য ভেঙে আনা একটি সরু ডাল বা সাটিক।
কখনো সোজা পথে, কখনো খালে ডোবে গবাদির তৃণভর্তি এই গাড়িটি চলেছে তো চলেছেই। দিনের পর দিন। আদি অনন্তকাল। যাত্রা অন্তহীন। গন্তব্যও অজানা। শুধু এগিয়ে চলাটাই যেন লক্ষ্য। গ্রামে-গঞ্জে-কুলহিতে-পল্লিতে প্রতিটি জনপদের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলে গাড়ি। দাঁড়ায়। আবার চলে। আবার হয়তো দাঁড়িয়ে পড়ে কোথাও। খড়ের খদ্দের দেখে অথবা নিছক কৌতূহলবশত। দিনের শেষে বিক্রি অনুযায়ী সাজানো খড়ের উচ্চতা অনেকটাই নেমে আসে। গো-শকটের মাথায় বসে থাকা অঙ্গদও সেইভাবে নেমে-নেমে আসে। নেমে আসে তার উঁচানো অস্ত্রটিও।
পরদিন আবার নতুন করে চাপানো হয় আঁটি। আবার শুরু হয় যাত্রা। গাড়ির দুলুনিতে, ছন্দে ছন্দে, গাড়োয়ানের সঙ্গে উপরে উপবিষ্ট শীর্ণকায় লোকটির চলে নানাবিধ কথোপকথন।
গ্রামের বাটে বাটে এখন আগের মতো রোদের তাত নেই। নির্বর্ষ ঋতু কবে পেরিয়ে গেছে। তবু কখনো রোদ উঠছে কখনো বৃষ্টি-বাদলা। চাষিদের ধান তো মরেই গেছে। তাহলেও জলঝড় না হলে প্রাণীকুল বাঁচে কী করে? ডোবা-পুকুরও তো ভরতে হবে। হয়তো সে কথা মনে রেখে আসমান সদয় হয়ে ওঠে। ঝমঝম করে দু-এক পশলা বারিশ হয়ে যায়। পথের লোকজন কেউ গাছতলে, কেউ গ্রামের ‘মড়পে’ গিয়ে দাঁড়ায়। বাচ্চারা তো হুটোপুটি করে। পথের ধারে বহুদিন যাবৎ পড়ে থাকা গরুর গাড়ির ধাঁচাটির তলে ঢুকে পড়ে। কান-ফটফট-ছাগলও আসে।
গাড়োয়ান চায় না খড়গুলো তার বৃষ্টিতে ভিজে গাঁজা-থাসা হয়ে নষ্ট হোক। খড় একবার ভিজে গেলে গুমা-গুমা গন্ধ হয়। গরু-কাড়াতে খেতে চায় না। বিক্রি করলে দামও তেমন মেলে না। চলে কী উপায়ে? ব্যবসার প্রাণ হল পুঁজি। আর লাভ হল তার রক্তমাংস। কাজেই শুধু পুঁজি বাঁচলে হবে না, ব্যবসায় যদি মুনাফা না হয় তাহলে সে-ব্যবসা রক্তাল্পতায় ভোগে। গাড়োয়ান এসব ভেবে, তার খড়-বোঝাই গাড়িটিকে সাঁওতালদের গ্রামের নিমতলের দিকে নিয়ে যায়। কখনও গরুদুটিকে চুমকুড়ি দিয়ে, কখনো হাতে সাটিক থাকা সত্ত্বেও প্রহার না করে ঈষৎ ল্যাজ মুচড়ে ‘হা-হা-হিঁঈঈ’ বলে দাঁড়িয়ে পড়ে। নিজের মাথায় পাক দিয়ে রাখা গামছাটি খুলে একপ্রস্থ কপালের ঘাম মোছে। মুখের সামনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাতাস খায়।
হু-হু করে ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। গাড়ির মাথায় খড়ের উপরে টুপটাপ পড়ে নিমফল। অঙ্গদের গায়ে-মাথায়ও পড়ে। ধুলো ঢোকে তার চোখে। চোখ কিচ কিচ করে। রীতিমতো বিরক্তির সঙ্গে, ওপর থেকে সে চেঁচাতে থাকে, ‘মহাপ্রবীণ! মহাপ্রবীণ! গাড়ি কেন থামাইয়া দিলেন?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘বৎস! ধৈর্য রাখো। সহিষ্ণু হও। যে কোনো প্রকার পরিস্থিতিকে অনুকূল ভাবিবার চেষ্টা করো। অধৈর্যে চিন্তা -চেতনা-প্রজ্ঞা বিচলিত হয়। উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। কর্মনাশ হয়। হে অর্বাচীন! গাড়ি থামাইয়া দিয়াছি দুর্যোগ বুঝিবার জন্য। দুর্যোগের মুখে পড়িয়া নিজেকে থামাও। দুর্যোগ বুঝিয়া প্রয়োজনে প্রতিরোধের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা লইয়া পুনরায় যাত্রা করো। দেখ, ওই দুরন্ত শিশুটিকে—’
অঙ্গদ পথের দিকে চায়। বৃষ্টি তৎক্ষণাৎ ধরে গেলেও ঝড়ো হাওয়া দৈত্যের মতো ধেয়ে আসছে। সাঁওতালদের চাল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। গরু হামলাচ্ছে। বাতাসের ঝাপটানিতে ধুলোর সঙ্গে উড়ছে বালি। শুকনো তৃণ। এই অবস্থায় অঙ্গদ লক্ষ করে সেই শিশুকে। পেটে ছাগল ছানাটিকে চেপে বাতাসের বিপরীতে সে পিছন ফিরে হাঁটছে। তার কোনো বিকার নেই। বিরক্তি নেই। এভাবে ধুলিকণা থেকে নিজের চোখ বাঁচিয়ে সে ঢুকে গেল তার ঘরে।
অঙ্গদের অবাক লাগল। কত তুচ্ছ ঘটনা। এমন ঘটনা সে আকছার দেখছে। কিন্তু কখনো সে খেয়াল করেনি যে এর মধ্যেও জীবনের শিক্ষণীয় কিছু আছে। আছে সেই মহৎ তত্ত্ব, মহাপ্রবীণের উপরোক্ত ভাষ্যে যার ব্যাখান মেলে।
‘হা-হিঁঙ্গট-টাকটাক।’ গরুর গাড়ির ‘মহাদেবে’ হাত রেখে, ঠেলে, গাড়োয়ান নিমতল থেকে গাড়িটিকে রাস্তার দিকে ঘোরায়। তারপর দুটো গরুর মাঝখানে ডুব দিয়ে ফের সে উঠে দাঁড়ায়। হাতে সাটিক নিয়ে বসে পড়ে নিজের জায়গায়।
ততক্ষণে ঝড়ও থেমে গেছে। রাস্তা জুড়ে পড়ে আছে যত শুকনো পাতা, বিচালি। কোনো ঘরের চালা থেকে উড়ে এসেছে কুলো। কোথাও রাস্তার মাঝে জামডাল ভেঙে পড়ে রয়েছে। আকন গাছের ডালে বসে লম্বা ল্যাজ নিয়ে টিঙ-টিঙ দোল খাচ্ছে ঢেপচু পাখি। মাটি ঈষৎ ভিজে উঠেছে। সোঁদা সোঁদা গন্ধ।
বৃদ্ধ গাড়োয়ান গরুর ল্যাজ মুচড়ে দেয়। গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। হ্যাঁচড়-হ্যাঁচড়। গাড়ির ওপরে খড়ের গাদায় বসে দুলুনি উপভোগ করে অঙ্গদ। এভাবে দুলতে দুলতে এক গ্রাম পেরিয়ে আরেক গ্রামের সীমানায় ঢুকে পড়ে।
বেশির ভাগ গ্রামের সীমান্তে রয়েছে শিমূল, মহুল, কুসুমের মতো বৃক্ষ। অথচ নিমগাছটি রয়েছে গ্রামের মাঝে। যেন সেই গাছ ঘিরেই বসতি গড়ে উঠেছে। আবার এটাও লক্ষ করে অঙ্গদ, একেকটি গ্রামে কামার-কুমার-মাহাত সবই আছে। কিন্তু তাঁতিদের পরিবারটি রয়েছে একেবারে প্রান্তে। এটারও ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না সে।
গাড়োয়ান অঙ্গদকে জানিয়ে দিলো, গ্রামের বিষয়ে যদি তার এমনি কোনো কৌতূহল থাকে, তাহলে সে তা গ্রামের মানুষের থেকেও জেনে নিতে পারে। বৈজ্ঞানিক না হয়েও তাদের মধ্যে বহু প্রাচীনকাল থেকে বিজ্ঞানচেতনা কাজ করছে। মানবকল্যাণের স্বার্থে তার ওপরে ভিত্তি করে অনেক জরুরি তত্ত্বও খাড়া করা যায়। তারা ঘরোয়া উপাদান দিয়ে বিজ্ঞানকে ঘরোয়া রীতিতে প্রায়োগিক করে নিয়েছে।
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! মানবের ইন্দ্রিয় চতুর্দশ প্রকার। কিন্তু জগদ্দর্শনের ক্ষেত্রে মন-বুদ্ধি-চক্ষু-কর্ণই হইল প্রধান। তুমি দেখিয়া যাও, শুনিয়া যাও। মনকে অচঞ্চল রাখিয়া বুদ্ধি দিয়া তোমার পর্যবেক্ষণের বিচার বিশ্লেষণ করো।’
অধিকন্তু তিনি আরও বললেন যে, জীবনের সর্বক্ষেত্রে অন্যকে বলতে দাও, তুমি কম বলো। নিজেকে সর্বপ্রকার শিক্ষার্থী জ্ঞান করো। তার জন্য মনের মধ্যে কোনো প্রকার অভিমান পুষে রাখাও অহেতুক। জ্ঞান সর্বদা নিম্নে বিরাজ করে।
এই সময়ে এক বুড়ো গ্রামবাসী খড় কেনার জন্য গাড়ি থামায়। অঙ্গদ তার কাছে উপরোক্ত কৌতূহল প্রকাশ করলে সে জানায়—নিম ছাড়া উল্লিখিত গাছগুলির জন্য এতবড়ো জায়গা দরকার হয় যে, গ্রামের মাঝখানে তাদের রাখা সম্ভব হয় না। নিমগাছ স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। মানুষ প্রাচীনকাল থেকে জানে। এই গাছের হাওয়া যাতে তারা সেবন করতে পারে, তাই এই গাছ বড়ো হলেও গ্রামের ভেতরে, এমনকি ঘরের চৌহুদ্দিতেও রাখা হয়।
‘আর তাঁতিঘর? কুলহির মুড়ায় থাকে ক্যানে?’ অঙ্গদ জানতে চায়।
‘অ, স্যাটাও শুনবে? শুন তবে—’ লোকটি জানায়, তাঁতিঘর যেখানে থাকে, সেখানে ঘরের লাগোয়া অনেকটা খোলামেলা জায়গার দরকার হয়। তারা সুতো পাকায়, সুতোয় রং করে, টান দিয়ে শুকোয় ইত্যাদি। সে-কারণে সবসময় গ্রামের প্রান্তে তাদের অবস্থান। ওই যে, ঝুমুরে আছে—‘কুলহি মুড়ায় তাঁতিঘর/কাপড় বুনে ছর-ছর।’
গ্রামবাসীটি চলে গেলে, অঙ্গদ একটু বিমনস্ক হয়ে পড়ে। ঝুমুরের সূত্রে তার বহু দিন আগে সেই বাউলকে মনে পড়ে যায়। নদীর ধারে উদাসীন পড়ে থাকতে থাকতে, এই বাউলই তো সেদিন অঙ্গদকে প্রথম গভীরতভাবে তার মনে জীবন সম্পর্কে বৈরাগ্যের অনুভূতি এনে দিয়েছিল। ভিতর থেকে নাড়া দিয়েছিল তাকে। বাউল গান ধরেছিল নদীরতীরবর্তী ইটভাটাতে। ভাটাতে তখন কত মানুষ যে কর্মরত! কতরকম তাদের কাজ। প্রত্যেকে নির্মাণে ব্যাকুল। অঙ্গদ এখনো অবিকল সেই দৃশ্যই দেখতে পায় তার চোখের সামনে। ইটভাটাতে একদিকে চলছে জীবনের তৎপরতা, গড়ার উদ্যোগ। আবার তার বিপরীতে উদাসীন প্রবহমান স্রোতস্বিনী—যে নির্মাণ বোঝে না, বোঝে না জীবনও। সে কেবল সর্বস্ব ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। কূল থেকে অকূলে। আজ অঙ্গদের মনে হয়—এই বিসর্জনই কী চিরকালীন সত্য নয়? সেই সত্যই কি অঙ্গদের অজানিতে আকুল করে অঙ্গদের প্রাণ?
আজ আর সেই বাউলের মুখ পরিষ্কার মনে করতে পারে না অঙ্গদ, ভুলেই গেছে। কিন্তু আজও সে ভুলতে পারেনি তার গানের স্থায়ীটুকু। গাড়ির দুলুনিতে, দুলতে দুলতে, সে অন্যলোকে চলে যায়। এই জগতে থেকেও এই জগতে নেই। জীবন-বৈরাগ্যের গভীর আবেশে আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকে, ‘ও নিঠুর নিদয়া নাও/ভাসাও আমারে ভাসাও...’
গাড়ি চলছে। অঙ্গদ তখনো উঁচানো হাতিয়ার দুহাতে ধরে গুনগুন করে আউড়ে চলেছে বৈরাগ্যের মহান বাণী। যা মানুষকে কেবল ব্যাকুল করে না, ঘরছাড়াও করে দেয়—‘ও নিঠুর নিদয়া নাও/ভাসাও আমারে ভাসাও...’ যে-বাউল বাইরে গান ধরেছে, সেই বাউলই ভেতরে শ্রোতার অন্তরে তার খঞ্জনি দিয়ে টোকা মেরে বলছে, ‘ও সংসারি, আর কতদিন দাঁড়ে বসা পাখি হয়ে থাকবে? কতদিন তুমি এভাবে বসে বসে দানা খাবে? শিকল কেটে বেরিয়ে এসো। দেখ বাইরে কী বিপুল আকাশ—উড়ে বেড়াও! চরে বেড়াও! এসো মনোময়, আমার মতো বৈরাগী হও...।’
ওঃ! অঙ্গদের চোখে জল এসে গেল। ধীরে ধীরে তার মনে পড়ে যেতে লাগল গ্রামের কথা। ঘরের কথা। আজ তারা কোথায়! কোথায় হারিয়ে গেল তারা? ইতিমধ্যে অনেক মুখ যেন তার স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে আসছে। অনেক পথ-ঘাট-ডুংরি-ডহর। অরণ্যখন্ডও। সে কোথায় ছিল আর কোথায় এসে পড়েছে! এখনি-বা চলেছে কোথায়? কোথায় তার গন্তব্য? কোনো কিছুই জানে না অঙ্গদ। সে শুধু ভেসে চলেছে। জীবনতরীতে। কোলে আগলে রাখা কোন সর্পদংশিত দেহে প্রাণসন্নিবেশ করতে এই ভেসে চলা তাও কি সে জানে? তবে কেন সে চলেছে? কেন সে এভাবে এই বুড়োটির পাল্লায় পড়েছে? কেন সে তার সম্মোহন থেকে চিরতরে খালাস করতে পারছে না নিজেকে? কেন? কেন? কেন?
যে-মন উত্তর অনুসন্ধান করবে, সেই মনকে কেউ যেন ঠেলে ভিন্ন অভিমুখে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। যেভাবে আড়লি ঝড়া সমেত গো-শকটকে চাষিরা চাপান ফেলা ক্ষেত থেকে রাস্তার দিকে ঘুরিয়ে দেয়, সেভাবেই কেউ অঙ্গদের মন আপন গার্হস্থ্য কৌতূহল থেকে বৈরাগ্যের দিকে টেনে ধরছে। আর বারে বারে বলছে, খবরদার! ও-কথা জানতে চেয়ো না। মনে করো, এই ভেসে চলাই জীবন। এই ভেসে চলাই লক্ষ্য। জীবনের ধ্রুবপদ।
কিন্তু তা তো নয়। তাই যদি হয়, তাহলে এই মুহূর্তে তার অন্তর এমন বাষ্পাকুল হয়ে উঠছে কেন? তার অতীতের জীবনের জন্য? এ তার কী হলো! বৈরাগ্যের সুর কেন তার অন্তরাকাশে গার্হস্থ্যের মূর্ছনা সৃষ্টি করছে? কেন সত্যান্বেষী না হয়ে সে অলীক মায়ার বন্ধনে ফিরতে চাইছে? কেন সন্ন্যাস থেকে সে কবেকার হারিয়ে যাওয়া, ফেলে আসা আত্মীয়-স্বজনদের ঘোরসংসারের পাকেচক্রে নিজেকে জড়িয়ে নেবার কথা ভাবছে? সংসার তো নিরেট কারাগার। একটি মুহূর্তের জন্যও সেখানে মুক্তির নি:শ্বাস পড়ে না, পড়ে কেবলি দীর্ঘশ্বাস। অভাব-অনটন-দারিদ্র-কলহ প্রতিনিয়ত মানুষকে অমানুষ করে তোলে। হিংসা-ঈর্ষা আর নীচতা-সঙ্কীর্ণতা এমন অমূল জীবনকে দুদিনে কালিপড়া সরা-সানকির মতো করে দেয়। অঙ্গদ কি এতোর পরেও সেই ফেলে-আসা জীবনে ফিরে গিয়ে কালিমালিপ্ত হতে চায়? সে মুক্তি চায় না? সত্যদর্শন-জগদ্দর্শন তার অভিপ্রেত নয়? সে ফিরে যাবে? ডেলিকচায়?
অঙ্গদ জানে না, এই খরায় সেই জঙ্গল আর জঙ্গল আছে কী নেই। জঙ্গলের ভেতরে আছে কি তাদের সেই ছোট ছোট কুঁড়ে ঘরগুলি? বাপ-মাকে খুব স্পষ্ট আর মনে পড়ছে না। আবছা ভেসে উঠছে কাকার মুখ। ঘরের বাচ্চাদের কথাও সে ভুলে গেছে। তারা কে? কী তাদের নাম? আজ দেখলেও চিনতে পারবে না। যেমন তাকে দেখে একজনও বলতে পারবে না যে, এই সেই অঙ্গদ শবর। তার চোহারা এমনি উনপাঁজুরে। অস্থিসার। একমাথা খসখসের মতো চুল। গাল বসে গেছে, চোখ ঢুকে গেছে। হাতে পায়ে গরুড়ের মতো নখ। এইসব কি তার কৃতকর্মের ফল? কিন্তু কী করেছে সে? কী অপরাধ? যার জন্য বিধাতা তাকে এমন শাস্তি দিল? বিধাতা বলে আদৌ কিছু আছে কী?
মায়ের জন্য মন কেমন করছে! তার একটু একুট করে মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে পড়ে যাচ্ছে সেই মাকে, যে জারমণিকে অপ্সরা বলেছিল, আবার কালনাগিনীও বলেছিল। হয়তো সে ভুল কিছু বলেনি। হয়তো প্রকৃত অপ্সরাই লোকজগতে কালনাগিনী হয়ে ওঠে। রূপ-যৌবনকে অক্ষত রাখতে প্রয়োজনে ছোবল তাদের মারতেই হয়।
কিন্তু অঙ্গদকে ছোবল মারল কে? পাটন, নাকি জারমণি? এটা ভাবতে গিয়েও অঙ্গদ কিন্তু বিরূপ হয়ে উঠল না তার প্রিয় সহোদরের প্রতি। উল্টে তার মনে হতে লাগলো শেষমেশ একটি নারীর কারণেই ভেসে গেল তার সুন্দর জীবন! ছতিছিন্ন পাঁশুটে হয়ে গেল তার লাল আমডুর মতো যৌবন! একটি নারীর জন্য! যদি তখন মায়ের কথা শুনে এই কালনাগিনীকে জঙ্গলে এনে জঙ্গলেই ছেড়ে দিত! তাহলে হয়তো এমনভাবে বিষাক্ত হয়ে উঠতো না সে। তার বাপ-মা-ঘর-সংসার ছেড়ে এভাবে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াতে হতো না পথে পথে। যে মা তাকে ঘরের সবার সামনে—বাবার সামনে, কাকা-কাকীর সামনে, ছোট ছোট ভাইয়ের সামনে, ভাইপোদের সামনে অপমান করে তীব্র ভাষায় বলেছিল, অঙ্গদ সর্বনাশের কাজ করছে, তাকে প্রহার করে এই ঘর থেকে এই মুহূর্তে বিতাড়িত করা হোক, সেই মায়ের প্রতি এখন আর দ্বেষ নেই অঙ্গদের। বরং সেই মায়ের কাছেই তার ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে। তার লোলচর্ম অথর্ব হাত মাথায় নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে—মা, আমি বড়োই ক্লান্ত! আমাকে স্নেহের পরশ দাও। আমি অতি দুর্ভাগা।
‘মহাপ্রবীণ! মহাপ্রবীণ!’ গাড়ির মাথা থেকে আবার ধৈর্য হারিয়ে চিৎকার করতে লাগল অঙ্গদ। বলল, ‘এ দন্ডে গো-শকটের গতি রোধ করুন। আমাকে অবতরণে সাহায্য করুন। আমি আপনার সহিত আর এহেন নিষ্ফল ভ্রমণ করিতে ইচ্ছুক নই। মহাপ্রবীণ! আমার বক্তব্য কি আপনার কর্ণগোচর হইতেছে? গাড়ি থামাইয়া দিন। মহাপ—’
গাড়ি থেমে গেল। পথের ধারে। গাড়োয়ানের আসন থেকে নেমে মহাপ্রবীণ কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে ঘাড় উঁচু করে লক্ষ করলেন খড়ের গাদার ওপরে বসে থাকা কৃপাণ হাতে উদ্বিগ্ন অঙ্গদকে। তার উদ্বেগ যেন আকস্মিকভাবে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অস্বাভাবিক চঞ্চল হয়ে উঠেছে কোটরে ঢুকে থাকা সজল চক্ষুদুটি। ততক্ষণে আর একটি কথাও না বলে, খড়ের গাদার ওপরে অস্ত্রটি রেখে পড়িমরি করে সে নেমে আসছে গো-শকট থেকে। তারপর ধান্যহীন ক্ষেত্রের আল টপকে টপকে সে দিকভ্রান্তের মতো অশ্ববেগে ছুটতে থাকে।
মহাপ্রবীণ তাকে ডাকেন। কিন্তু সে-ডাকেও সাড়া দেয় না অঙ্গদ। ছুটতে থাকে। একটার পর একটা ধানক্ষেত পেরিয়ে সে দূরবর্তী ডাঙায় গিয়ে ওঠে। সেখান থেকে তার জটাসদৃশ মাথাভর্তি কেশে ঝাপটানি দিয়ে, হাত নাড়তে নাড়তে চিৎকার করে বলে, ‘আমাকে আর ডাকিবেন না! আপনার গো-শকটে নিষ্ফল ভ্রমণ আমি আর করিতে চাহি না। তাহাতে আমার শোকতাপ-রূপ অগ্নি মোটেই শীতল হইবে না। কিঞ্চিতও না।’
‘বৎস!’
অঙ্গদ থমকে দাঁড়ালো। সেখান থেকে মহাপ্রবীণের ডাক শুনেও নড়ল না। এক পা-ও না। মহাপ্রবীণ তার সমীপে এগিয়ে আসতেই সে আবার ছুটে গিয়ে একটি ল্যাদা গাছে তরতর করে উঠে পড়ে। মগডালের চেঙ্গিতে বসে পা দোলাতে থাকে।
মহাপ্রবীণ গাছতলে পৌঁছে আসমানে তাকান। বলেন, ‘উৎশৃঙ্খল হইও না! আইস! অবতরণ করো!’
পাটন কয়েক দন্ড কী যেন চিন্তা করে। ভাবান্তর হয় তার। অতঃপর সে ভূমিতে অবতরণ করে।
অঙ্গদের মাথায় তাঁর প্রশান্তির হস্তাংশ স্পর্শ করতেই তার সেই চাঞ্চল্য, সেই উদ্বেগ মুহূর্তে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায়। সে ক্রমশ ফিরে আসতে থাকে পূর্বাবস্থায়। তবু তার চোখের কোলে ঝিমিকি নিয়ে থাকা অশ্রু-বিন্দুটি নজর এড়িয়ে গেল না মহাপ্রবীণের। অঙ্গদ তাঁর দিকে করুণাপ্রার্থীর মতো চেয়ে থাকল। নির্বাক।
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! তুমি আকস্মিক আবেগে তাড়িত হইয়াছ। আকস্মিক আবেগকে সর্বথা বর্জন করো। ইহা তোমাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করিবেক। তোমার কর্মপথ হইতে তোমাকে ভিন মার্গে চালিত করিবেক। কর্ম করো আবেগবিহীন হইয়া। মন-বুদ্ধি-কৌশল প্রয়োগ করিয়া। তাহা হইলে এই কর্ম তোমার দুঃখের, অনুশোচনার হেতু হইবে না।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমার লক্ষ্য কী তাহাই আমি জানি না। জানিলেও আমি তাহা বিস্মৃত হইয়াছি। আমার স্বগৃহে প্রত্যাবর্তনের টান শরাবনের বহি-র মতো অন্তরের দুকূল খলসিয়া দিতেছে। আমাকে আমার মধ্যে সমস্ত কিছুর বিস্মরণ ঘটাইয়া দিয়াছে। মনে হইতেছে, আমার জননী আমাকে তাহার তাপিত বক্ষে সস্নেহে ধারণ করিবার লাগিয়া ক্রন্দনপূর্বক আহ্বান করিতেছে। আমার পিতা তাহার এই ‘কুলাঙ্গার’ সন্তানের জন্য শরীরে ব্যাধি লইয়া আঙিনায় খাটিয়ায় বসিয়া শোক না করিয়া থাকিতে পারিতেছে না। তাহারা অনাহারে অনিদ্রায় নি:সঙ্গ দিনযাপন করিতেছে। আর এই অব্যক্ত ক্লেশ দ্বারা আমি প্রতিমুহূর্তে সংক্রমিত হইয়া উঠিতেছি। আপনি আমাকে ত্বরায় এই ক্লেশ হইতে বিমুক্ত করুন। আমাকে আমার স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিতে দিন।’
‘শান্ত হও! শান্ত হও! বৎস, শান্ত হও!’
‘আমি কী করিয়া শান্ত হইব? উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণ কখনো অশান্ত মনকে শান্ত করিতে পারে না। যাহাদের মনে অহরহ অশান্তির অগ্নি প্রজ্বলনশীল, যাহারা সংসার-কলহের দরুন গার্হস্থ্য জীবনে টিকিয়া থাকিতে অপারগ, যাহাদের সন্তান পিতার প্রতি নিষ্ঠুর, অত্যাচারী, পত্নী কলহপ্রিয়া তাহারা পথে পথে চোখের জল পুঁছিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়। আমি তো এমন ভ্রমণকে আমার জীবনের নিয়তি করিতে চাহি না। তবে কেন আপনি আমাকে এহেন অফলপ্রদচক্র হইতে বাহির হইতে দিতেছেন না?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে সন্তাপি! সর্বাগ্রে তোমাকে জানাইতেছি—জীবনে কোনো যাত্রাই সম্পূর্ণ অফলপ্রদ হইতে পারে না। তুমি যাহাকে ব্যর্থ বলিতেছ, তাহা কখনো না কখনো তোমাকে জীবনের মহামূল্যবান অভিজ্ঞতার অন্তত একটি কণিকা হইলেও দান করিবে। বহু কণিকার সমন্বয়ে মানুষের অন্তর্দীপন ঘটে— জ্ঞানভান্ডার পূর্ণ হইয়া ওঠে।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! কিন্তু এই বিশুদ্ধ জ্ঞান-ভান্ডার লইয়া আমি কী করিব, যদি না আমি অন্তরের বেদনা ও দুঃখানলকে, বিষাদকে কাটাইয়া উঠিতে পারি? নানাবিধ অন্তর্যাতনায় আমি অহরহ পুড়িতেছি। আমার হৃদয় আজ প্রমথিত হইয়া উঠিয়াছ। হে ক্লেশনিবারক! আপনি সেই বাক্যসমূহ ব্যক্ত করুন যাহাতে আমার উদ্বেগ প্রশমিত হয়। আমার মন শান্ত, যুক্তিসহনশীল তথা তাপোন্মুক্ত হয়।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে প্রপীড়িত! তুমি সবে জগদ্দর্শনের পথে পা বাড়াইয়াছ। তৎহেতু পিছুটান ভুলিতে পার নাই এখনো। তোমার দুঃখ অতীব ক্ষুদ্র। এই জগতে আরো অগণিত মানুষ তোমা অপেক্ষা কঠিন ক্লেশে বিষাদে যন্ত্রণায় জীবন অতিবাহিত করিতেছে। তুমি সেই সব নিরুপায় মানুষদের দেখ। দেখ জগতের আরো বৃহৎ ক্লেশ ও দুর্ভোগকে। নিজেকে ক্ষুদ্র গন্ডী হইতে বাহির করিয়া শত-সহস্র কাতর শোকাতুর মানবের পার্শ্বে দাঁড়াইয়া নিজের সর্বস্বকে তুচ্ছ করিতে শিখ। তাহা হইলে আত্মাকে নির্ভার করতে পারিবে। নির্ভার আত্মা-ই শোকহীন। নির্ভার-ই সকল আনন্দ, মহত্ত্ববোধ ও শান্তির অনি:শেষ উৎস। নিজের ঘর, নিজের সংসার, নিজের সন্তান, নিজের পিতামাতা অনবরত এই সঙ্কীর্ণ ‘নিজ’ ভাবনা পরিত্যাগ করো। মনে করো, তোমার নিজস্ব বলিয়া এই ভব-সংসারে কিছুই নাই। তাহা হইলে তুমি উদ্বেগ ও দুঃখানল হইতে মুক্ত হইবে। দেখিবে এই অখন্ড জগৎসংসার তোমার আপন বলিয়া প্রতীয়মান হইবে। হে অর্বাচীন! সদা মনে রাখিবে সৃষ্টিকর্তা তোমাকে চক্ষু দান করিয়াছেন নিজের দুঃখে ও শোকে কাঁদিবার জন্য নহে। তুমি সর্বদা অপরের জন্য কাঁদো। অপরের জন্য অশ্রুপাত করো। তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমাকে জিহ্বা দান করিয়াছেন অহরহ নিজের কথা বলিবার জন্য নহে। তুমি তাহাতে অপরের কথা বলো। অপরের গুণকীর্তন করো। তোমার হস্তরূপ কর্মেন্দ্রিয় দ্বারা তুমি অপরের জন্য কর্ম করো। তাহা হইলে দেখিবে ক্ষুদ্র ও ব্যক্তিগত শোককে তুমি জয় করিতে শিখিয়াছ। তুমি বীতশোক হইয়াছ। তুমি জগতের শোকে মোহ্যমান হও। মনে রাখিও, প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো নিজের জন্য শোক করেন না...’
মহাপ্রবীণ বলে চলেছেন। তাঁর এই উপদেশাবলী শুনতে শুনতে অঙ্গদ তন্ময় হয়ে যায়। মশালের তাপে সজনে গাছের গা থেকে যেমন চতুর্দিকে লেপটে থাকা শুঁয়োপোকারা ধঁপা ধঁপা মাটিতে পড়তে থাকে, তেমনি অঙ্গদের দুর্বল মন আচ্ছন্ন করে রাখা শূককীটরূপ ভাবনাগুলি একে একে অপসারিত হয়ে তার মনকে, তার অন্তরাত্মাকে দেখতে দেখতে ভারমুক্ত করে দিল।
নিজেকে এখন তার অনেকটাই নিরাসক্ত বোধ হতে লাগল। মনে হলো, বাস্তবিক, আমি কার জন্য ক্রন্দন করছি? এই জগতে সত্যিই কি ‘আমার আপন’ বলে কেউ হয়? ইতিমধ্যে পথেঘাটে এমন অনেক জননীকে সে সন্তানের জন্য বুকে চাপড় মেরে হা-হুতাশ করতে দেখেছে, তারাও কি তার মাতা নয়? কেন সে তাদের দহনশীল বুকে আশ্রয় নিতে বলতে পারে না, ‘মা! তুমি কার জন্য শোক করো? এই তো আমি তোমার সন্তান। জগতে এক সন্তান বিদেয় হলে আরেক সন্তান মাতৃক্রোড়ে আশ্রয় নেয়। জননীর অঙ্কদেশ কখনো শূন্য হয় না। মা, আমাকে তোমার স্তন্য পান করাও। আমার অপক্ক মস্তকে তোমার স্নেহাদ্র হস্ত বিলেপন করো। আমাকে জগৎ দেখাও, মা!’
মহাপ্রবীণের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, টপ টপ করে চোখের জল গড়িয়ে পড়ল অঙ্গদের। তিনি বুঝতে পারলেন এই অন্তর্বাষ্পের হেতু কী, উৎস কোথায়, কার উদ্দেশেই বা তা নিবেদিত। গভীর প্রশান্তিপূর্ণ স্মিত হাসিতে তিনি অঙ্গদকে অবলোকনপূর্বক কহিলেন, ‘বৎস!’ আনন্দাশ্রু বিমোচিত করো। মনকে প্রবল করো। নিরপেক্ষ করো। অতঃপর আমি যাহা যাহা তোমাকে উদ্দেশ করিয়া কহিতেছি, তাহা তাহা তুমি অনন্যচিত্ত হইয়া শ্রবণ করো।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে ব্যাধনন্দন! তুমি পীড়িত বলিয়াই অন্যের পীড়াকে অকৃত্রিম সহানুভূতির সহিত উপলব্ধি করিবে। সতত স্মরণে রাখিবে জগৎ পীড়াময়। কর্মের মাধ্যমে মনুষ্যকে এই পীড়া হইতে উদ্ধার পাইতে হয়।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে স্বরূপদর্শী! আমার কর্ম কী? লক্ষ্য কী? কী করিলে আমি নিজেকে এই করুণ দশা হইতে উদ্ধার করিতে সমর্থ হইব তাহা জানিবার তরে আমার মন ক্ষণে ক্ষণে ব্যগ্র হইয়া উঠিতেছে।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! পূর্বেও আমি তোমার পীড়ার কারণ তথা লক্ষ্যের কথা ব্যক্ত করিয়াছি। তুমি জগদ্দর্শনকালে তাহা বিস্মৃত হইয়াছে। পুনরায় তাহার অবতারণ করিতেছি। মনঃসংযোগ করো। হে শ্রাবক, তুমি তোমার প্রিয় সহোদর দ্বারা হৃতসর্বস্ব হইয়াছ। সেই বিশ্বাসহন্তার দ্বারা তুমি অন্যায়ের শিকার হইয়াছ। যে হরণ করে, অন্যায়দি করে সে অশুভ শক্তি। তোমার কর্মের লক্ষ্যই হইল সহোদরের নিকট হইতে তোমার সেই নারীকে আপন হস্তগত করা এবং ওই অশুভ শক্তির বিনাশ সাধন করা। জগতে অশুভ শক্তির উত্থানকে অঙ্কুরে বিনষ্ট না করিলে তাহা উদ্ভিন্ন হইয়া মহীরূহের আকার ধারণ করে। এক মহীরূহকে নির্মূল না করিলে তাহা শত শত মহীরূহের জন্ম দেয়। জগৎ অন্যায়-অবিচার-অধর্মের অন্ধকারে পরিপূর্ণ হইয়া অচিরে ধ্বংস ডাকিয়া আনে। সুতরাং ধংসের প্রারম্ভেই ধ্বংসকে প্রতিরোধ করো। তুমি সহোদরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া, তাহাকে পরাহত করিয়া সর্বজীবের কল্যাণে এই লোকমন্ডলকে অধর্ম হইতে রক্ষা করো—ধর্মের প্রতিষ্ঠা করো।’
‘সহোদরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা?’ মহাপ্রবীণের মুখ থেকে এই নির্দেশাত্মক বাক্যটি শুনে অঙ্গদ শিহরিয়া ওঠে। বিস্মিত হয়।
‘তুমি বিস্মিত হইতেছে কী কারণে? সে তোমার সহোদর বলিয়া? নাকি যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে হইবে বলিয়া?’
‘উভয়বিধ কারণেই। বিস্মিত নয়, আমি শঙ্কিত হইতেছি। আমি সহোদরের সহিত কদাপিও যুদ্ধ রচিব না।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! তোমার শঙ্কা অমুলক। সহোদর নয়— সে বিনাশকারী। যুদ্ধ নয়—ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। ধর্মের জয় হইলেই সত্যের জয় হয়। যতদিন না তুমি তাকে বিনাশ করো, যতদিন না সত্য-ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করো, ততোদিন অসত্যের গ্লানি হইতে, দুঃখ ও যাতনা হইতে, এই দুর্দশা হইতে তোমার উদ্ধার নাই। তুমি অহরহ ক্লেশ পাইবে। সন্তপ্ত হইবে। সুতরাং সেই বিশ্বাসহন্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ তোমাকে করিতেই হইবে।’
এই অবধি বলে মহাপ্রবীণ অঙ্গদের মুখের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকেন। অঙ্গদকে গভীর চিন্তামগ্ন দেখায়। তার মনে হয়, জগতে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত অবিশ্বাস ও অধর্ম সংঘটিত হয়ে চলেছে। কত মানুষ কত মানুষের চোখে বিশ্বাসহন্তা হয়ে উঠছে। কত অবিচার, কত অনর্থক নিধনও ঘটে যাচ্ছে। কে কার বিচার করছে? কে কার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে? তাহলে একা তাকেই বা কেন মহাপ্রবীণ ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে ইন্ধন দিয়ে চলেছেন? তাছাড়া এই জগৎ বিশাল। অপ্রমেয়। একটি মানুষের লড়াইয়ের দ্বারা কি এই অখন্ড জগতে ধর্ম সংস্থাপন সম্ভব?
মহাপ্রবীণ তারও জবাব দিলেন। এবার তিনি অঙ্গদের কাছে অপকট হয়ে উঠলেন তার জিজ্ঞাসার প্রতিবচনে।
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে প্রাশ্নিক! তুমি দুর্বল বলিয়াই বিশেষভাবে আমার নজরে আসিয়া পড়িয়াছ। এই জগতে দুর্বলরা সতত অত্যাচারিত, অপমানিতও। তাই দুর্বলের হাতেই আমি আমার অস্ত্র সমর্পণ করিতে চাহি। তুমি আমার সেই নির্বাচিত অস্ত্রী। জগতে অন্যায় ও অধর্ম দমনে যে নিপীড়িত শ্রেণীর সশস্ত্র উত্থান ঘটিয়াছে উহা আমি দেখিতে চাহি। আমি দেখিতে চাহি এই জগতে সর্বগ্রাসী শক্তির বিলয় এবং সত্যের জয়। তুমি আমার দৃষ্টিতে সেই নিপীড়িতের প্রতিনিধি মাত্র। তুমি জয়ী হইবেই। কেন না, তুমি ন্যায়ের জন্য, বিচারের জন্য, সত্যের জন্য যুদ্ধ করিতে চাহ। তাই এই ধর্মযুদ্ধকে আমি নিপীড়িত মানুষের প্রেরণাস্বরূপ তুলিয়া ধরিতে চাহি। এককের যুদ্ধ দ্বারা সমগ্রের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয় না, ইহা যথার্থ। তথাপি সমগ্রকে ন্যায় ও ধর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ করাই আমার লক্ষ্য। অতঃপর ইহাও শুনিয়া রাখো। আমি যাহা-যাহা তোমাকে বলিতেছি, তাহা শুধু তোমাকে না—তোমার মাধ্যমে এই জগতের সমস্ত নরকূলকে বলিতেছি। তুমি সেই কোটি কোটি শ্রোতার প্রতিনিধিস্বরূপ।
‘হে অর্বাচীন! অতঃপর বলো, তুমি কি এখনো দ্বিধান্বিত? এই পৃথিবীকে চিরতরে সুন্দর ও ধর্মময় করিতে, তুমি কি তোমার বিশ্বাসহন্তা সহোদরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিতে আগ্রহী? যে তোমার স্ত্রীধন হইতে তোমাকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করিল, তুমি কি সেই অন্যায়ের প্রতিকার চাহ না? যে-সহোদর তোমারই বাগদত্তার কাছে তোমাকে দুর্বল প্রতিপন্ন করিয়া ঠাট্টা করিল, তামাশা উড়াইল, তোমার অস্ত্র দেখিয়া তোমাকে অট্টহাস্যে উপহাস করিল, সেই ঠাট্টা ও উপহাসের, সেই অট্টহাসের প্রতিশোধ লইয়া তোমার ক্লীবত্বহীনতাকে জাগ্রত করিয়া তুলিতে চাহ না? সর্বোপরি, জগতে সত্য-প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত যুদ্ধ করিতে চাহ না তুমি?’
অঙ্গদকে তখনো চিন্তাকুল দেখায়। মুখে বাক্য সরে না। তাকে এভাবে শূন্যদৃষ্টিতে নিরুত্তর থাকতে দেখে, মহাপ্রবীণ তার অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইলেন। সেদিনও ঠিক এইভাবে তিনি তাকে ক্লীবত্ব থেকে উত্থানের নিমিত্ত উৎসাহিত করেছিলেন। প্রাণিত করেছিলেন। সহোদরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠার জন্য—ধ্বংসকামী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার জন্য।
অঙ্গদ মনে করতে চেষ্টা করে সেকথা। সেদিনের সেই মুহূর্তটি। ভাবতে ভাবতে তার স্মরণে আসে...
সেদিনও এমনিভাবে নিজের দুর্দশার কথা চিন্তা করে শেষতক সে দ্বিধাহীন চিত্তে অস্ত্র ধরতে চেয়েছিল পাটনের বিরুদ্ধে। যুদ্ধ করতেই চেয়েছিল সে। কেন না, সে বুঝতে পেরেছিল, যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই। নির্বিকল্প সংগ্রাম ছাড়া কোনোভাবে কোনো উপায়ে বিনাশকারীকে নির্মূল করা অসম্ভব।
তাহলে আজ আবার কেন নতুন করে তাকে এই সংশয় ও জড়তা কাটিয়ে উঠতে চিন্তায় পড়তে হচ্ছে? কেন সে যুক্তি খুঁজছে? কেন সে আপন সহোদর এবং রক্তপাতজনিত সংঘর্ষের প্রশ্নে আতঙ্কিত হয়ে পশ্চাদপদ হচ্ছে? একি তার সন্ধিগ্ধচিত্ততা, নাকি চিত্তের দুর্বলতা? অঙ্গদ নিবিষ্ট মনে ভাবতে থাকে। ভাবনার অতলে নিমজ্জিত হয়ে যায় সে।
তারপর ধীরে ধীরে, ধীরে ধীরে, আবার তার মনের সেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভাবের উদয় হতে থাকে। সে কল্পনায় দেখতে পায়—অগ্রজ হয়ে নয়, কঠোর প্রতিপক্ষ হয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে সে দাঁড়িয়েছে তার শত্রুর সম্মুখে। চারপাশে টিলায় ঘেরা কয়েক যোজন ব্যাপী সেই পবিত্র মাঠারিভূমির মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে সে তার গগনচুম্বী তলোয়ার বাতাসে হিলি-হিলি কাঁপিয়ে দামামার শব্দে হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠছে, ‘তুমি অসুন্দর! তুমি অধর্ম! তুমি শুধু আমার নয়— এই পত্র-পুষ্প বৃক্ষরাজি, এই সাগর-নদী-পুষ্করিণী থেকে শুরু করে কীট-পতঙ্গ-পিপীলিকা-শম্বুক—এই জগৎ চরাচরের প্রতিটি প্রাণীর শত্রু তুমি। আমিই তোমার শত্রুঞ্জয়! এই আমার বিনাশক হাতিয়ার। আমি তোমাকে এই ধরাতল থেকে চিরতরে উৎপাটিত করবোই। হে নারীলিপ্সু! হে দুর্মতি পাটন! হে পরস্বধন অপহরণকারী কামান্ধ! তোমার বিনাশ আসন্ন!’
এই মৌন সংলাপটির প্রতিধ্বনিই যেন অঙ্গদের সারা শরীরে আলোড়ন তুলে দেয়। তার প্রতিটি অঙ্গ অশ্বত্থপত্রের মতো কম্পিত হতে থাকে। রুদ্ধ হয়ে আসে তার অবদমিত কন্ঠস্বর। সেভাবেই সে মহাপ্রবীণের জিজ্ঞাসায় তার ইতিবাচক সম্মতি জানিয়ে, বিরতিহীনভাবে বলে যেতে থাকে, ‘হে মহাপ্রবীণ! হে অরিদমনাকাঙ্খী! আমি এখন আর তিলেক মাত্রও দ্বিধান্বিত নই। এই পৃথিবীকে চিরতরে সুন্দর ও ধর্মময় করিতে, আমি আমার বিশ্বাসহন্তা সহোদরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিতে যার পর নাই তৎপর। যে-সহোদর আমারই বাগদত্তার কাছে আমাকে দুর্বল প্রতিপন্ন করিয়া ঠাট্টা করিল, আমার মহাপ্রবীণপ্রদত্ত অস্ত্র দেখিয়া অট্টহাস্যে উপহাস করিল, সেই ঠাট্টা ও উপহাসের, সেই ক্রূর অট্টহাস্যের প্রতিশোধ লইয়া আমি আমার অক্লীবত্বকে জাগ্রত করিয়া তুলিতে চাহি। সর্বোপরি, হে মহাপ্রবীণ, জগতে সত্য ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত যুদ্ধ করিতে চাহি আমি!’
তার এই অটল উদাত্ত ঘোষণা সমগ্র পরিমন্ডলটিকে মুহূর্তমধ্যে অন্যরকম করে দিল। শস্যহীন গোধূমক্ষেত্রের ওপর দিয়ে তখন গোধূলির দিগন্তপ্রসারী আলো ক্রমশ বিলীয়মান। দুর্গতিনাশিনীর ছো-মুখোশের মতো যে-আলো বর্ণোজ্জ্বল অথচ উত্তাপহীন। ফুরফুরে হাওয়া খেলছে মাঠে মাঠে। কেঁপে উঠছে আলের ওপরে গোঠবাইগন আর ভাবরির ঝোপ। অঙ্গদের উশীরসদৃশ কেশগুচ্ছে আড়াল হয়ে রয়েছে পশ্চিম দিগন্তের সূর্যবিন্দু। দেখতে দেখতে যা শিশুর হাতের লাটিমের মতো গড়িয়ে গেল!
সন্ধে নেমে এলো!
অঙ্গদের ভাবান্তর দেখে মহাপ্রবীণ তৃপ্ত বোধ করেন। খুশি হন। ঠোঁটে সেই চিরপ্রশান্ত হাসি নিয়ে অঙ্গদকে বলেন, ‘হে যুযুৎসু! স্থির হও। শান্ত হও। বিচলন দমন করো। অতি প্রগলভ হইয়ো না। কাল এখনো সমাসন্ন নহে। এখনো যুদ্ধের সময় উপস্থিত হয় নাই। কেন না, এখনো তোমার জগদ্দর্শন সম্পূর্ণ হয় নাই। চল, হে ক্রান্তিকাঙ্ক্ষী! গো-শকটে আরোহণ কর। অস্ত্র ধরো।’
আড়ষা রোডে ব্যস্ততা এখন অনেক বেশি। বিশেষ করে বলরামপুর এবং সিরকাবাদের জন্য। এই দুটো জায়গার গুরুত্ব রয়েছে। বলরামপুর ভালো ব্যবসার ক্ষেত্র। এখানে লাক্ষা-গালার কারবার ভালো। বেশ কিছু পুরোনো গালাকুঠি এখনও আছে। পশুহাটও লাগে। টাটা-চান্ডীলের গাড়ি অনবরত ঢুকছে। আর সিরকাবাদ তো আখচাষের জন্য রীতিমতো উল্লেখযোগ্য। এখানে ধানিজমি তেমন নেই বললেই চলে। আখই প্রধানশস্য। অযোধ্যা পাহাড়ের নীচে সিরকাবাদ এবং তার আশপাশের বিস্তৃত পার্বত্য এলাকা জুড়ে এই পুন্ড্র ক্ষেত্র। মাড়াইকল বসিয়ে আখের পানা করা হচ্ছে। সেই পানা শালে ফুটিয়ে ফুটিয়ে করা হচ্ছে গুড়। মাটির বড়ো বড়ো হাঁড়ি ভর্তি সিরকাবাদের গুড় চলে যাচ্ছে গ্রামে গ্রামে, ডি-ডিহাতে, জেলার বাইরেও। আড়ষারোডে তাই গাড়ি থেকে শুরু করে ইটভাটার লরি সব চলে।
ডেলিকচার এসবের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। সেখানে কিছু মানুষের আদিম অরণ্যপ্রকৃতিই ভরসা। অরণ্য তাদের বাসভূমি এবং জীবিকাও। এই অরণ্যে থাকতে থাকতে বাজার-শহরকে তারা দেখতে ভুলে গিয়েছে। জীবনডি-র মোড়ই তাদের বাজার। তারা কাঠমোট, আনাজপাতি, জংলী ফল-মূল বিকতে এখানে আসে। শালপাতা-পলাশপাতার খালা-পতরিও আনে। এখানে কিছু চা-পকড়ির দোকান আছে, আছে চৌকস বাজারিয়া লোকজন।
তবে ডেলিকচার জঙ্গলের ভিতর দিয়েও শুধু যে গ্রামবাসীদের আনাগোনা বেড়েছে, তাই না। এই কিছুদিনে চারঘর বসতিও বাড়তে বাড়তে ছ-ঘর হয়েছে। এছাড়াও আরও দু-ঘর শবর এসেছে। এই শবর পরিবার দুটি যে ঠিক কখন কোথা থেকে এসে এখানে তাদের ঝুপড়ি করে নিয়েছে, তা কেউ জানতে পারেনি। হয়তো সভ্যতার তাড়া খেয়ে—তথাকথিত সভ্য মানুষদের উৎপাতে তারা এই নির্জন অরণ্যভূমিকে তাদের নিরাপদ আশ্রয় মনে করছে। এখনও তাদের সঙ্গে বিনন্দ, হাঁসুয়া বা অন্যান্য পুরোনো বসবাসকারীদের তেমন আলাপচারী হয়নি। শবর বলেই তারা ততোটা বহির্মুখী নয়। বাকপটুও নয়। লোকজনের সামনে সচরাচর আসতে চায় না। এলেও, কথা বলাটাই যেন অপরাধের—এই ভয় নিয়ে কেমন সিঁটিয়ে থাকে। যদিও নিজেদের মধ্যে তারা বেশ খোলামেলা। আনন্দফুর্তিতে থাকে। নিজেরা মদ তৈরি করে, মদ খায়, আবার আনাগোনার পথে কোনও ক্রেতা কিনতে চাইলে ক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করে তাকে চুপিচুপি এনেও দেয়। মহুল পচানো মদ। আটটাকা বোতল বা ‘পাট’, অর্থাৎ ‘পাঁইট’। বাড়তি জল মেশায় না। বলে, ‘খাঁইয়ে দেখ। ইসপিরিটের পারা। খাড়ি দিলে তিৎকে৩২ উঠবেক!’
হাঁসুয়া বাউরি একদিন খেয়েও এসেছে। দুপহরে ভাতের সঙ্গে যে ডুমুর ভাজা সে খেয়েছিল, সেই ডুমুর একটা পলাশপাতের পোঁটলায় নিয়ে গিয়েছিল। চাট করে মদের সঙ্গে খেতে। সে জেনে এসেছে, যে-শবর ছোঁড়াটা মদ বিক্রি করে তার নাম কঁঢ়িরাম খাইড়া। তারও বয়স পাটনের কাছাকাছি। দু-এক বছরের ছোটই হবেক বরঞ্চ, বড়ো নয়। ‘কঁঢ়িরাম’-এর যে কী মানে তা কঁঢ়িরাম নিজেও জানে না। জানেনা হাঁসুয়াও। হয়তো অলস বা কুঁড়ে অর্থে এই অঞ্চলে যাকে চলতি কথায় ‘কুঢ়িরাম’ বলা হয়, তার থেকেই সে হয়ে গিয়েছে ‘কঁঢ়িরাম’। তবে যেভাবে সে এসে-কে -এসেই শিল্পোদ্যোগী হয়ে পড়েছে, তাতে-সে-অর্থে তাকে কঁঢ়িরাম বা কুঢ়িরাম কিছুই বলা যাবে না।
কঁঢ়িরামের বউ আছে। এই বয়সে তার দু-তিনটে ব্যাটা-বিটি। তারা কখনও মায়ের কোলে, কখনও ঝুড়ে-পাতে ষাড়া হাঁসের পারা ঘুরে বেড়ায়। বিনবিন করে উড়তে উড়তে যে-বাগঢুলু এসে ঝোপে-ঝাড়ে বসে, সেগুলি ধরে। সুতোতে বাঁধে। কিংবা পায়ুতে খৈড়কা গুঁজে ‘শুলি’ দিয়ে উড়িয়ে পাছায় চাপড় মেরে ফুর্তিতে নাচতে থাকে।
কঁঢ়িরাম শবরের বউটি দেখতে ভেঁদির মতো। তেমন সুশ্রী দেখতে হলে হয়তো সেই টানেই হাঁসুয়া পয়সা না থাকলেও প্রতিবেশী হিসাবে ‘খাতা খুলে’ সময়ে-অসময়ে তার কাছে দু-এক পাট মদ খেতে আসত, কিন্তু এমনই তার ভুবননাশিনী রূপ যে নেশা চটে যায়। তবু হাঁসুয়া কঢ়িরামের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করেছিল। জানতে চেয়েছিল তাদের নিয়ে হেরিফেরি আরও কিছু। কিন্তু পারেনি। কঁঢ়িরাম তাকে ঘরের চৌহদ্দিতেও ঢুকতে দেয়নি। সে তার ঘরের চারপাশে ভেঁড়রা ডালের বেড় দিয়ে রেখেছে। যে মদ খেতে চায়, তাকে সে হাও দূরে—সেই আস্তা গাছটির তলে পাঠিয়ে দেয়। আর নিজে বসে থাকে ঘরের উঠোনে। এদিক-ওদিক নজর রাখে। যদিও সে নিজেই মনে করে তার ভয়ের কিছু নেই। আবগারির ঘুষখোররা যদি টুনকি রোগের পারা আমচকা এসেও পড়ে, সে দেখিয়ে দিতে পারবে ঘরে সে মদ তৈরি করে না। সে মহুলের হাঁড়িতে বাখর দিয়ে আরও গভীর জঙ্গলে কোনও আঁকড়া ঝোপের ভিতরে ঢাকাঢুকি দিয়ে রেখে আসে। সেখানেই পচতে থাকে। সেখনেই জ্বাল দেয়। মহুলের হাঁড়িটির মুখে আরও একটা হাঁড়ি উপুড় করে বসিয়ে রাখে। ঢাকা দেওয়া এই হাঁড়ির ছেঁদার মুখে নলের মতো করে একটা লম্বা বাঁশ জুড়ে দেয়। ছিবড়ে ফেলে দেওয়া মহুলের রসটি যখন মিজুমিজু আঁচে বলকিতে থাকে, তখন তার বাষ্প ওই বাঁশের নলটির ভিতর দিয়ে যেতে যেতে ঠান্ডা হয়ে ফের তরল হয়। অন্য একটি মাটির হাঁড়িতে সেই তরল ফোঁটা-ফোঁটা করে জমতে থাকে। এটাই মহুল মদ বা মহুয়া।
আসলে এটা স্পিরিট। এর সঙ্গে পরিমাণমতো জল মিশিয়ে লঘু করে কঁঢ়িরাম বিক্রি করে। তবুও তার তেজ কমে না। সত্যিই তাতে জ্বলন্ত দেশলাই ‘খাড়ি’ ছুঁইয়ে দিলে আগুন হুদকে উঠবে! এই মদ তারাও খায়। কঁঢ়ি, কঁঢ়ির বউ, ঘরের অন্যান্য বুড়া-বুড়িরাও। আর যে-যার মতো ঝিমোয়। আপন মনে বিড়বিড় করে। একেক দিন এই দুটো পরিবার মিলে ধুন্ধুমার গানবাজনা লাগিয়ে দেয়! সন্ধে থেকে রাগে রাগে পিটতে থাকে মাদল। বিকৃত উচ্চারণে বেসুরো গলায় হাঁকায় ‘শালিভুলা’ ঝুমৈর—বঁধু, আসবে বলে কই আইলে/হামার দিন গেল চৌরাহা ভাইলে...
এই নতুন পরিবার দুটি বাদ দিলেও, টোলাতে যে মোট ছ-টি পরিবার আছে, তাদের মধ্যে শবর বলতে অঙ্গদদের পরিবার।
আর আছে একঘর ভূমিজ, দু-ঘর কুমহার, দু-ঘর বাউরি। একটি বিনন্দ বাউরির পরিবার, অন্যটি হাঁসুয়া বাউরির। বিনন্দ গতবছর আষাঢ় মাসে তার বিটি সুনন্দার বিয়ে দিয়েছে বড়াম গ্রামে। কিন্তু বিয়ের পরেই নতুন বউকে নিয়ে শ্বশুরঘরে খিটিমিটি লেগে যায়। বৌয়ের পক্ষ নিয়ে বাপ-মায়ের সঙ্গে ব্যাটাও লিয়াই লাগতে শুরু করে। এই নিয়ে অশান্তির বিরাম ছিল না। দু-দিন ছাড়া ক্যালেকেচে। সুনন্দা বাপের ঘরকে চলে আসত। শেষে ব্যাটা ও ব্যাটার বউ ভিনু হয়ে যায়। বাপ-মা আর ভাইবোনের সংসার ছেড়ে এই ডেলিকচাতে চলে আসে। বছরদিন হল তারাও নতুন ঘর করে থাকছে। বিনন্দই সে-ঘর করে দিয়েছে। বিনন্দর জামাই পান্ডা বাউরি। জয়পুর লাইনের বাসে ‘এজেণ্টি’ করে। তিন-চারটে বাস ধরা আছে। সারাদিনে ষাট-সত্তর টাকা রোজগার। শেষবাসে কাজ করে সে থলিতে চাল-ডাল-হাটমশলা৩৩ নিয়ে ঘরে আসে। সুনন্দাও বসে থাকে না। বনে-বনে ছাগলের পাল নিয়ে ঘোরে।
ভূমিজদের পরিবারটি বেশ বড়ো হয়ে উঠেছে। তাদেরও এবার নতুন একটা ঘর না করলে চলে না। সহদেবদের মতো এখানেও দু-ভাইয়ের পরিবার একসঙ্গে এক বাখৈলে থাকে। ভরত সিংসর্দার আর শলাবত সিংসর্দার। ভরতের কপাল ভালো। তার তিনটেই ব্যাটা। বিটি নেই। বড়ো ব্যাটা রঘুনন্দন সিংসর্দারের বয়স তাও প্রায় বছর সতেরো। তারপরের ব্যাটা দুটো—উকিল সিংসর্দার ও মহন সিংসর্দার। তারা এক-দেড় বছরের ছোট বড়ো।
শলাবতের আবার তিন বিটির পর এক ব্যাটা, মানিক। তিন বিটিই বিয়ের উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। জারমণিকে নিয়ে যখন ঘটনাটি ঘটে, তখন শলাবত তার তিনবিটিকেই চাঁড়ে-মাড়ে মামাঘরে রেখে এসেছিল। ভয়ে। তখন তারা এমন কিছু ধিঙ্গি হয়নি। বড়ো মেয়ে কাঞ্চনী তখন ছিল বছর বারোর। তারপর উমা, তারপর টেপি। টেপি সবার ছোট। তবে কাঞ্চনী এখন আর বালিকা নেই। জারমণির ঘটনাও তো দেখতে দেখতে ঢেরদিন পেরিয়ে গেল। সেই কাঞ্চনীও এখন সতেরো ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দেখতেও সুন্দর। তাই নিয়ে ঘরের মালিকদের খুব দুশ্চিন্তা। বিশেষ করে জারমণিকে নিয়ে কান্ডটি ঘটে যাওয়ার পর তাদেরও মনে ডর ঢুকে গিয়েছে। তারা চায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিটিকে বিয়ে দিয়ে শ্বশুর ঘরে ঠেলে দিতে। যতদিন না সেটা করে উঠতে পারছে ততদিন তাদের মনে ঘুটঘুটি থাকছেই। শলাবতের বউ অষ্টমীর রাত হলেই ‘বায়ু উঠা’র মতো এই চিন্তা আরও বেশি করে তাকে চেপে ধরে। প্রায়দিন সে শলাবতকে বলে, ‘কই রাইবাইশা আসছে? উয়াকে খোবোর দিয়া আছে ন?’
‘আহ। রোজই বলতে হবেক?’ শলাবত বিরক্ত হয় অষ্টমীর উপর। বারে বারে সে একই প্রশ্ন করে। তাদের ঘরে যে বিয়ে দেবার উপযুক্ত ‘বিটি বাইঢ়ে’ আছে, সেটা রাইবাইশাকে জানানো আছে কী নেই। আসলে সিংসর্দারের মেয়ের বাপ কখনও পাত্র খুঁজতে গ্রামে গ্রামে যাবে না। যদি যায় তাহলে তো পাত্রপক্ষের ধারণা হবে নিশ্চয় তার বিটির কোনও খুঁত আছে। বিটি বিকাছে নাই। তাদের সামাজিক রীতি অনুসারে পাত্রের বাপই আসবে মেয়ে খুঁজতে। তাকে নিয়ে আসবে তাদের বিয়ের ব্যাপারে মধ্যস্থতাকারী ওই ‘রাইবাইশা’। শলাবত তাকে বলেও রেখেছে। এখন সে যদি না আসে তো শলাবতের দোষ? সে কী করবে? রাইবাইশাও তো ‘চালহের মাথায় ডিংলা আগলাতে’ ঘরে বসে নেই। ‘পাঘাছিঁটা গরুর’ মতো সেও ত দৈঁড়ে বুলছে। আজ বড়াম তো কাল বাঘবিঁধা, ঘুরে দিন পলপল, তার ঘুরে দিন জজলঙ—সহস্রমারী হয়ে তাকে দৈনিক এইসব গ্রামে গ্রামে হাগা-পঁদে ছুটার মতো ছুটতে হচ্ছে।
শলাবত বলে, ‘বলা যখন আছে, তখন ঠিকেই আসবেক। দুদিন আগে, আর নাই ত দুদিন পরে। তবে হাটবারে যদি উয়ার সঙে দেখা হঁয়ে যায়—ঝালদার হাটে, ত আরেকবার খোবোরটা কানে ফেলে দিব।’
‘দিতেই হবেক। নাইলে দেখছিস নাই? তখন কী করতে কী হঁয়ে যাবেক।’ অষ্টমী বলে।
উল্লেখ না করলেও তার বলার ভঙ্গিতে শলাবত টের পায় সে জারমণির ঘটনাটি মনে করিয়ে আগে থাকতে সাবধান করে দিতে চাইছে। কিন্তু জারমণির ঘটনা কি আর গ্রামে গ্রামে আকছার ঘটে? তাছাড়া অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভাব-ভালবাসা তো হতেই পারে। হলে যে তার পরিণতি সবসময় ‘সাত কান্ডে’ গিয়ে দাঁড়াবে এমনটা ভাবাও ঠিক নয়। কবে কী ঘটে গিয়েছে সে ঘটনার রেশ কি মানুষের মনে আজ আর আছে?
শলাবত কিছু বলে না। সে লাল্টিনের আলোটিকে কমিয়ে দরজার আড়ালে রেখে দেয়। দাওয়া থেকে নেমে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাছের গায়ে পেচ্ছাপ করে।
ঘুটঘুইট্টা অন্ধকার! আকাশে চাঁদের খন্ডও নেই। অমাবস্যার রাত। থেকে থেকে সারা জংগল জুড়ে ঝড়ের মতো দমকা হাওয়া বইছে। হাওয়ার ধরনটা এমন, মনে হচ্ছে যেন এই একটু আগে তুমুল বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। এখনও ভিজে রয়েছে গাছপাত। তালগাছে কোনও শুকনো পাতা লেগে নেই বলে হাওয়ার দাপটে খড়খড় শব্দও হচ্ছে না। ‘টিহিক! টিহিক!’ করে কাছেপিঠে কোনও রাতচরা পাখি ডাকছে। খাইড়াঘর থেকে হইচই শোনা যাচ্ছে। ওরা ঢেররাত অবধি জেগে থাকে। ঘরের চালে ইঁদুর ছোটাছুটি করছে শলাবতের। সে কোমর থেকে লুঙ্গি নামিয়ে ঘরে ঢোকে।
একটু ঠান্ডা-ঠান্ডা ভাব। আজ অনেকদিন বাদে শলাবতের ইচ্ছে হল বউয়ের দিকে পাশ ফিরে শুতে। তার গায়ের কাঁথাটি নিজের দিকে টেনে নেওয়ার আগে, শলাবতের হাত তলে-তলে অন্য দিকে যায়।
ঝাঁইঝাঁই করে ওঠে অষ্টমী। শলাবতের ডান হাতটিকে ঝটকানি দিয়ে সরিয়ে দেয়। বলে, ‘এখনও সাধ মেটল নাই? বুঢ়ান্তিকালেও? এতটুকু লৈজ্জাশরম নাই? আহাহাহাআ! ঘরে বিটিগুলা বাইঢ়ে আছে।’
পাশের ছোট ঘরটিতে শুয়ে আছে শলাবতের মেয়েরা। জাগন্তই আছে। অষ্টমী তবু কথাগুলো চেঁচিয়ে বলে। তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে। যাতে বউয়ের প্রথমবারের প্রত্যাখ্যানে শলাবত ভিজা মুঢ়ির পারা দমে যায়— দ্বিতীয়বার চেষ্টা না করে। কিন্তু তা হল না।
আসলে, অষ্টমীর কথা বলার ভঙ্গিটাই ঘুইণা মেঁঞাদের মতো। তার জবাব দিতে গেলে শুরু থেকেই কলহের পর্যায়ে চলে যায়। তখন আর স্বাভাবিক বাদানুবাদ সম্ভব নয়। সঙ্গে সঙ্গে শলাবতেরও মটকা গরম হয়। সে-ও নির্লজ্জের মতো গলা তুলে বলতে থাকে, ‘লৈজ্জা? কিসের লৈজ্জা? কিসের হতে মরদে বিহা করে? স্যাটা নাই জানিস তুঁই? দিব জানায়?’
‘যা যা তকে আর মদ্দানি দেখাতে হবেক নাই। বেড়ে মরদ হঁয়েছে।’
‘হাই দেখ। বেশির বেশির করিসেই না বলে দিছি—’
‘ক্যানে কী করবিস তুঁই? কী করবিস রে খালভরা?’
ব্যাস! লেগে গেল দুজনে। কথার পিঠে কথা চলতে লাগল। শেষপর্যন্ত এই কলহ এমন একটা বিচ্ছিরি পর্যায়ে চলে যায় যে, অষ্টমীর পক্ষে আর স্বামীর সঙ্গে একঘরে শুয়ে থাকা সম্ভব হয় না। সে বাইরে বেরিয়ে আসে। অনেক রাত অবধি একা-একা দাওয়াতেই বসে থাকে। কাঁদে।
বসে থাকতে থাকতে একসময় নিজের ভুল সে বুঝতে পারে। তার আফশোস হয়, যতই হোক, শলাবত তো তার স্বামী। দাম্পত্য জীবনের অর্থই হল সহজীবনযাপন। স্ত্রী-পুরুষের একসঙ্গে জীবন কাটানোর মধ্যে ‘সহবাসের’ গুরুত্বকে কি অস্বীকার করা যায়? জীবনের এই স্বাভাবিক চাহিদা, এই তাগিদকে কি অবদমিত রাখা যায়? তাহলে অন্যদিকে অন্যরূপে তা প্রকাশ পায়। যা কখনওই স্বামী-স্ত্রীর যৌথ-জীবনে শান্তি এনে দিতে পারে না।
অষ্টমীর শলাবতের ওপরে নয়, নিজের ওপরে রাগ হয়। সে যদি অমন কুকুরের মতো ঝাঁঝিয়ে না উঠত? যদি তাকে বুঝিয়েই ফিসফিস করে বলত যে, ‘হাই শুন। শরীরটা ভালো নাই আজ। তিনদিন হঁয়েছে। আজ লাড়াঘাঁটা করতে হবেক নাই।’ এমনটা বললে শলাবত নিশ্চয় তাকে আর পীড়াপীড়ি করতো না? কিন্তু কখনোও সে এভাবে কথা বলতেই পারে না। শত চেষ্টা করেও না।
শলাবতের প্রতি তার মন কোমল হয়ে আসে। বারান্দা থেকে ঘরের ভেতরে ঢোকে। তেলের অভাবে লাল্টিনটা তখন নিভে গিয়েছে। অন্ধকারে সে বিছানা হাতড়ায়। শলাবতের শরীরে অস্থানে হাত দিয়ে খুঁটা নেড়ে ডাকে, ‘কই শুনলিস! ঘুমালি নকি? ঘুমালি—’
যুদ্ধ হচ্ছেই। আর কোনওভাবে, কোনও উপায়েই অশুভশক্তির বিনাশ সম্ভভ নয়। এ ব্যাপারে অঙ্গদ তো অনেক আগেই দৃঢ়মনস্ক হয়েছে। এখন সে তার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে শত্রুপক্ষের কাছে। হাতে মশাল নিয়ে, সে, নিরস্ত্র হয়ে তার কাছে আসে। শুধু এইটুকু জানাতে।
চারপাশে অন্ধকার রিঙরিঙ করছে। গাছে গাছে ঝিঁঝি ডাকছে। আকাশে খঞ্জনা পাখির চোখের মতো একসুতো শুক্লপক্ষের চাঁদ। মশালের আলোয় পথ দেখে, সে, ঠিক আগের মতো পশ্চিমের ডুংরির গা বেয়ে লাট খেতে খেতে নেমে আসে পুষ্করিণীটির কাছে। পাড়ের উপর দিয়ে বড়ো বড়ো পায়ে তালগাছগুলিকে পিছনে ফেলে হাঁটতে থাকে। অন্ধকারে, শূন্যে ঝুলতে থাকা বটের ঝুরিতে তার মাথার ছড়ানো চুল আটকে যায়। মাথায় টান পড়তেই ক্ষিপ্ত রাজর্ষির মতো বিরক্তিতে বলে ওঠে অঙ্গদ, ‘কে? কে পাষন্ড?’ অতঃপর এক ঝটকায় সে জট ছাড়িয়ে ততোধিক দ্রুতপায়ে ইরাবতীর পাড় থেকে নেমে সম্মুখ পানে হাঁটতে থাকে। দুলকি চালে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় আগের দিনে দেখা সেই তালপাতার ঘরটিকে লক্ষ্য করে।
টিলার গা বেয়ে সেখানে তাকে আর উঠতে হয় না। তার আগেই সে দেখতে পেয়ে যায়, দূরবর্তী ডুংরির মাথায় কে যেন মহাযজ্ঞের আগুন জ্বেলেছে। পুড়ছে অরণি। সেই অগ্নিকুন্ডের সামনে যেন খুঙ্গি-পুঁথি নিয়ে বসে আছে কোনও যজ্ঞোপবীতধারী ব্রাহ্মণ পুরোহিত।
পাটন তিন-চারটে গাছের গুড়ি একঠিনে করে সবে আগুন জ্বেলেছে। দাউ-দাউ আগুনের শিখায় ঝলমল করে উঠছে তার চন্ডাল মূর্তি। পিঠে তূণীর। বিশাল ধনুকটিকে নামিয়ে রেখেছে মাটিতে। আগুন জ্বেলে সে রোঁয়াসুদ্ধ ধুঁড়সাচ্ছে৩৪ মরা কাঠবিড়ালি। সেগুলি পড়ে রয়েছে তার পায়ের কাছে।
কাঠবিড়ালি শিকার করার একটি আদিম যন্ত্রও বানিয়েছে পাটন। যন্ত্রটি আর কিছুই নয়—আসমান ভেদ করে ওঠা বিশাল এক লিকলিকে বাঁশ। তার মুখের কাছে ইস্পাতের ছুঁচালো ফলা। এটাও সে জার-গ মোড়ে গিয়ে কামারঘর থেকে করে এনেছে। এই ফলা লাগানো বাঁশটি কাঁধে নিয়ে সারাদিন টো-টো করে। ডুংরির নীচ থেকে উপর পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায়। ঘাড় উপরে করে, গাছের তলে দাঁড়ায়। যেখানে সে গাছের গা বেয়ে কাঠবিড়ালির আনাগোনা দেখতে পায়, সেখানে এই মারণযন্ত্রটি গাছের গুড়িতে জায়গা মতো ঠেকিয়ে রেখে, মুখে অবিকল কাঠবিড়ালির মতো ‘ক্রিঁচ! ক্রিচ!’ ডাকতে থাকে। ডাক শুনে কাঠবিড়ালি যেই নেমে আসতে যায়, অমনি বাঁশের ফলাটি দিয়ে তাকে এমন খোঁচানো হয় যে, সেটা তার পেটে বিদ্ধ হয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ প্রাণীটি শূন্য থেকে গাছের মূলে টপ করে পড়ে! পাটনের পায়ের কাছে। সেই কাঠবিড়ালিগুলিই এখন সে ঝলসানোর কাছে ব্যস্ত।
অঙ্গদ তাকে দূর থেকেই দেখতে পায়। টিলার শীর্ষে জ্বলছে আগুন। কুন্ডের সামনে বসে রয়েছে সেই সর্বগ্রাসী। সেই নারীলিপ্সু, পাষন্ড পাটন। সেই কামান্ধ দুর্মতি পাটন। তাকে দেখামাত্র রক্তে শিহরণ খেলে যায় অঙ্গদের। সংযমী হয় সে। হাতের মশালটি নিয়ে তৎক্ষণাৎ উপরেও ওঠে না। উপত্যকায় দাঁড়িয়ে, বার-দুয়েক মশালটি এপাশ-ওপাশ দোলা দিয়ে সে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জানান দেয়। যদিও পাটনও ইতিমধ্যে মশালধারী আগন্তুককে লক্ষ করেছে। ওখানে বসে থেকেও সে তালপাতার ঘর, জারমণি এবং আশপাশের চতুর্দিক নজর করে যাচ্ছিল।
এবার মশালটিকে অনড় রেখে, অঙ্গদ, তারস্বরে বলতে থাকে, ‘হেই ডুংরিশীর্ষে উপবিষ্ট চন্ডাল! হে অস্ত্রগর্বে গর্বিত মূঢ়! হে পরস্বাপরহণকারী! শুনিয়া রাখো...!’
ঘরে তখন জারমণি নেই। হঠাৎ করে অঙ্গদকে দেখে চমকে উঠেছিল পাটন। যদিও তখন অঙ্গদের কাছে কোনও অস্ত্র ছিল না। নিরস্ত্র প্রতিপক্ষকে আঘাত করা চলে না। আচমকা বিবাদের নিষ্পত্তি করতে যুদ্ধের জন্যও আহ্বান জানানো যায় না। যুদ্ধের ব্যাপারে স্থির-সংকল্প হয়ে সে-খবর আগাম জানিয়ে রাখতে হয়। অঙ্গদ এসেছে সেটাই জানিয়ে দিতে। পাটনকে।
কিন্তু শোনার আগেই ক্ষিপ্ত ও তটস্থ পাটন হাতে মশাল নিয়ে টান টান হয়ে দাঁড়ায়। যেন মাটি ভেদ করে উঠে দাঁড়াল এক প্রাচীন জগদ্দল প্রস্তর। সে-ও উপর থেকে চেঁচিয়ে নীচের ওই বুভুক্ষু শীর্ণকায় পুরুষটির প্রতি ঈষৎ ক্রোধ নিয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জানতে চায়, ‘হেই উদ্ধত পুরুষ! শীর্ণকায় পঞ্জরসর্বস্ব! কে তুমি, যে এই মাঠারিভূমিতে দাঁড়িয়ে এমন অবদ্য স্পর্ধিত ভাষা উচ্চারণ করো? কে তুমি? আমার যজ্ঞস্থলে আগত কৈনেয়ক-কুক্কুর! দূর হও!’
‘কুক্কুর! তুমি আমাকে কুক্কুর বলো? চন্ডাল!’ অঙ্গদ শূন্যে মাথা তুলে পাটনকে উদ্দেশ করে বলে, ‘আমাকে সারমেয় বলিয়া তুচ্ছজ্ঞান করিতে চাহ? এই পবিত্র মাঠারিক্ষেত্র থেকে বিতাড়িত করতে চাহ আমাকে? অপবিত্র, অস্পৃশ্য, অশৌচ বলিয়া তোমার বর্ণগৌরব জাহির করো?’
‘করি! আমার গৌরবান্বিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আমার মহাবল শরীর আছে—শৌর্য-বীর্য-পৌরুষ আছে। আর ওই যে তালপাতার নিবাস—’ পাটন বলতে গিয়েছিল, ওই কুটিরে সযত্নে রক্ষিত আছে তার করায়ত্ব অনন্ত যৌবনা স্ত্রীধন। কিন্তু না, কথা ঘুরিয়ে সে তেজের সঙ্গে বলে, ‘কী আছে তোমার? কিসের জন্য তুমি বজ্রনাদ করো? কী হেতু গর্বিত?’
‘আমি গর্বিত আমার শরীরের এই অস্থিপঞ্জরের জন্য। দুর্মুখ! মনে রেখো—অস্থি দিয়াই শত্রুদমনের নিমিত্ত বজ্র নির্মিত হয়। আর ওই মেদমাংস জম্বুকে টেনে নিয়ে যায়। কুক্কুরে খায়।’
এই জীর্ণ-শীর্ণ অতিদুর্বল লোকটির মুখ থেকে এমন বীরত্বের বাণী শুনে, পাটন নিজের হাসি আর চেপে রাখতে পারে না। সে জ্বলন্ত মশাল হাতে ধরে খাঁজবহুল মহাশরীরে প্রবল তরঙ্গ তুলে আসমান চৌচির করে উন্মাদের মতো হাসতে থাকে। অনেকক্ষণ বাদে সে-হাসি নিস্তরঙ্গ হয়ে এলে বিজ্ঞের মতো বলে যে, মানুষ জীবিত থাকলে তবেই তো কুকুর-শেয়ালে খাওয়ার প্রশ্ন আসে। মৃতদেহ নিয়েই তাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি হয়, জীবিতদের নিয়ে নয়। কিন্তু ‘আমাদের এই দুজনের মধ্যে মল্লযুদ্ধে কে মরবে? কে জীবিত থাকবে?’ পাটন চিৎকার করে জানতে চায়, ‘বলো? কে মরবে? যে দুর্বল।’
‘মুর্খ, অতি মুর্খ তুমি। দুর্বল মরে না। যুদ্ধে অধার্মিকের মৃত্যু হয়।’
‘অধার্মিকের মৃত্যু? সত্যিই কি হয়?’ পাটন যেন বলতে চাইল, ‘তাহলে কেন ওই ভন্ড ছলনাকারিণীর মৃত্যু হচ্ছে না? সে আমার প্রতি তার প্রেমের ছলনা করে আমাকে এই মাঠারিতে নিয়ে এলো, আমি তাকে সহধর্মিণী বলে বিশ্বাস করে তার সঙ্গে থাকছি, বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে, তার নিরাপত্তা দিতে অহরাত্র প্রতিহারীর মতো তাকে চোখে চোখে আগলে রাখছি—একজন নারীর কাছে প্রকৃত পুরুষের ধর্ম আমি আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছি। অথচ ওই পাষন্ডী? ওই যোজনগন্ধা? সে আমার পৌরুষ আজও স্বীকার করে না। তার মোহময় শরীর দিয়ে, তার কামকুহক দিয়ে আমাকে কুপিত করে। অথচ আমার কোপানলের প্রশমন ঘটায় না। তার যে-অঙ্গের জন্য আমি দন্ডে দন্ডে তৃষ্ণার্ত হচ্ছি, সেই অঙ্গ দিয়ে সে আমার প্রগাঢ় পিপাসা একটি দন্ডের তরেও নিবারিত করে না। তার মধুময় যে-স্তনকে আমি চন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করি, উত্তিষ্ঠমান চুচুকদ্বয়সহ সেই চন্দ্রসন্নিভস্তন সে কখনও বস্ত্রাচ্ছাদন মুক্ত করে আমাকে প্রত্যক্ষ করাল না। তার যে-নিতম্ব ধরণীতে অনবরত কম্পন তোলে, আমাকে আমার এই ধনুর্বাণ নিক্ষেপকারী কর্কশ হাত দিয়ে তাকে একটিবারও নিষ্পিষ্ট করতে দিল না! নারীর এই অধর্ম কি অপ্রতিবিধেয় থেকে যাবে? এই অধর্মের তাহলে মৃত্যু কই? ধ্বংস কই?’—তার মনে এই ভাবনাগুলি গুঞ্জন তুললেও পাটন তা প্রকাশ করল না। প্রকাশ করতে না পারার উত্তেজনা নিয়ে, সে রীতিমতো রুষ্ট হয়ে বলে উঠল, ‘কে ধার্মিক সে-বিচার করবে কে? কিসে তার নিষ্পত্তি হবে?’
‘যুদ্ধে। আর কোনওভাবে ধর্ম-অধর্মের নিষ্পত্তি হয় না।’ অঙ্গদ তাকে জানিয়ে দেয়, যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার বার্তা নিয়েই সে এখানে এসেছে। তার সঙ্গে এটাই ফয়সালার একমেবাদ্বিতীয়ম পথ। সে পূর্বঘোষিত যুদ্ধ করতে চায়। আজ হোক, কাল হোক, সে তৈরি হয়েই আসছে। তুমিও তৈরি হও।
হাতের প্রজ্জ্বলিত মশালটি দোলাতে দোলাতে, বাতাসে ‘ফরফর-ফরফর’ শব্দ করতে করতে, অঙ্গদ, ক্রমশ গাছপাতের আড়ালে চলে গেল।
পাটনের মুখে তখনও কথা নেই। চিন্তাকুলিত সে টিলার মাথায় ঠায় দাঁড়িয়েই থাকে। তার হাতে ধরা মশালটি অনড়। জ্বলতে থাকে দাউ দাউ করে। হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল,‘জারমণি!’
আকাশে সুন্দর চাঁদ উঠেছে। কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদ—‘অখন্ডমন্ডল বিধু’। নির্মেঘ আকাশ জুড়ে নাগকেশরের মতো হাসছে! বাতাস বইছে মৃদুমন্দ। পথের দু-পাশাড়ি ক্ষেত। উড়ে আসছে ধানের পোকা। মাঝে মাঝে নি:শব্দে বঞ্জুল বৃক্ষের উপর দিয়ে উড়াল দিচ্ছে পেঁচা— হঠাৎ করে চোখ পড়ে যাচ্ছে অঙ্গদের। পূর্ণিমার আবছা আলোয় ধানক্ষেতও সে দেখতে পায়। ধানে শিস হয়েছে। এখনও পুরুষ্টু হয়নি। দুধ ঢুকছে। হাওয়ায় লহলহ করছে প্রতিটি নীচু ক্ষেত।
দুহাতের মুষ্ঠিতে অস্ত্র উঁচিয়ে রেখে, অঙ্গদ চারপাশ দেখতে দেখতে যায়। পরিমন্ডল জুড়ে এক নয়নাভিরাম প্রশান্তি বিরাজ করছে। কোথাও কোনও রুক্ষতা নেই, তীব্রতা নেই। শস্য-শ্যামলা- ধরিত্রী শ্রীময়ী রূপ প্রদর্শন করছে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্য চিন্তা আসে অঙ্গদের। অকস্মাৎ সে-চিন্তা বিঘ্নিত হয় গাড়োয়ানের প্রশ্নে।
‘বৎস! কী দেখিতেছ?’
‘চন্দ্রকলা।’
‘অধিকন্তু আর কী দেখিতেছ?’
‘অধিকন্তু আর দেখিতেছি কদম্বের তলায় উপবিষ্টা এক বৃদ্ধাকে। সে একাগ্রচিত্তে—’
‘চরকায় সুতা কাটিতেছে? সত্যিই কি তুমি সেই কদম্ববৃক্ষ, কদম্ববৃক্ষের নীচে বৃদ্ধার সুতা কাটা দেখিতে পাইতেছ? পুনর্বার নিরীক্ষণ করো।’
অঙ্গদ নিরবচ্ছিন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সারা আকাশ মাতিয়ে রাখা ওই ঝলমলে চাঁদটির দিকে। সে খুঁজতে থাকে সেই বুড়িকে, যে বহু-বহু পুরুষ আগে থেকে কদমগাছের তলে বসে আপন মনে চরকায় সুতো কেটে চলেছে। আজও।
গাড়িও থেমে নেই। গাড়োয়ানের দু-পায়ের মাঝখানে, নীচে, টুং-টাং দোল খাচ্ছে ঝুলন্ত লন্ঠন। রাস্তার ধারে ক্ষেতের ওপরে লম্বা হয়ে পড়ছে চলমান গরুদুটির পায়ের ছায়াগুলি। দূর থেকে ভেসে আসছে শিয়ালের হুক্কাহুয়া। সাঁওতালদের গ্রামে ধীর লয়ে বেজে চলেছে আড়বাঁশি। চাঁটি পড়ছে লম্বা মাদলেও। সহরায় পরব এলো বলে!
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! পূর্ণচন্দ্রকে উত্তমরূপে নিরীক্ষণ করিয়াও আমি কোথাও সেই বৃদ্ধাকে দেখিতে পাইতেছি না, যে কদম্ব বৃক্ষের নিচে বসিয়া চরকায় সুতা কাটিতেছে। হে ক্রান্তদর্শী! কেন এমন হইল?। কোথায় অন্তর্হিত হইয়া গেল সেই বৃদ্ধা? সেই কদম্ব বৃক্ষ?’
‘বৎস। চন্দ্রপৃষ্ঠে কস্মিনকালেও কদম্ববৃক্ষ ছিল না। সেথায় কোনও বৃদ্ধাও কোনওদিন চরকা কাটে নাই। সেথায় যে-ছবিটি ফুটিয়া রহিয়াছে, তাহা ভিন্ন এক লোককাহিনীর। তাহা হইল এক ব্রাহ্মণ ক্রোধে চন্ডাল মূর্তি ধারণ করিয়া শূকরীকে প্রহার করিতেছে। প্রহাররত সেই ব্রাহ্মণ তার হাতের কাষ্ঠনির্মিত খুঙ্গিটি মাথার উপরে তুলিয়া ধরিয়াছে। বাতাসে তাহার চৈতন উড়িতেছে। লক্ষ করো।’
অঙ্গদ আবার চাঁদের দিকে তাকায়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে সত্যিই সে কুপিত ব্রাহ্মণের ছবিটিই দেখতে পায়। ব্রাহ্মণ এতটাই উত্তেজিত হয়ে শূকরকে খুঙ্গি দিয়ে উপর্যুপুরি আঘাত করছে যে, ব্রাহ্মণের মাথার চুটকি বারে বারে ঝটকা খেয়ে এপাশ-ওপাশ উড়তে থাকে। আঘাতপ্রাপ্ত শূকরীটি চেষ্টা করছে ছুটে পালাতে।
কিন্তু কেন ব্রাহ্মণের এই রুদ্রমূর্তি? অদৃশ্য শূকরকে প্রহার করার কারণই বা কী? এর পটভূমিতে কোন লোককাহিনী রয়েছে তা জানতে কৌতূহলী হয়ে পড়ে অঙ্গদ।
মহাপ্রবীণ সে-কাহিনীও সবিস্তার বিবৃত করেন। তিনি বলেন যে, একদা এক কোপনস্বভাব ব্রাহ্মণ মাঠারি ভূমিতে এক যৌবনপ্রমত্তা চন্ডালিনীকে জ্বালানীর জন্য কাষ্ঠসংগ্রহ করতে দেখেছিলেন। মাঠারি তখন যেন মর্ত্যের নন্দন কানন! নয়ন-সুন্দর নীল আকাশ! সেই আকাশের কোলে গজশুন্ড মেঘ। বাতাসের তরঙ্গে ভেসে আসছে বুনোফুলের সৌরভ। টিলার পাদদেশে ফটিক জলের কুমুদিনী। তাতে ছায়া পড়েছে সারি সারি তাল আর ভল্লাতক বৃক্ষের! পদ্মঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে জলক্রীড়া করছে মরাল-মরালী।
কিন্তু ওই চন্ডালিনীর পাশাপাশি এই নিসর্গ, এই সুগন্ধবহ বাতাস, এই অপরূপ মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির সৌন্দর্যও অপ্রতুলবোধ হতে লাগল ব্রাহ্মণের। আহা, কি তার অঙ্গশোভা! কি সৌষ্ঠব। ছন্দময় নিতম্ব। অপৃথুল কটিদেশ। দাড়িম্বের ন্যায় চুঁচি। তুলি-অংকিত আঁখির উপরে যেন কিংশুকের ভ্রুপল্লব। চিম্পিত৩৫ নাভি। তেমনি চুম্বনপিপাসিত ওষ্ঠাধর আর ‘ধনি মুখমন্ডল চান্দ বিরাজিত।’
তাকে অখন্ড দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে ব্রাহ্মণ মদনবাণে অবশ হয়ে পড়লেন। আর বললেন, ‘হে পদ্মিনী! আমি তোমার প্রতি ঘোর আকর্ষণবোধ করিতেছি। তোমার অঙ্গে অঙ্গে যে রূপ ও লাবণ্যের ছটা বিচ্ছুরিত হইতেছে তাহাতে আমি বিদীর্যমাণ। তোমার দেহস্থ স্তূপে যে বিদাহী কামাগ্নি তুমি অবদমিত রাখিয়াছ, তাহার তুচ্ছ স্ফুলিঙ্গে আমি মূর্ছিত হইতেছি। আমার দিশা ও ভাষা উভয় লুপ্ত হইবার উপক্রম। হে গৌরবিণী! এক্ষণে আমি তোমাকে আমার গূঢ় মনোরথ অকপটে জানাই। তুমি রাজি থাকিলে তেমার গর্ভে আমি ক্ষাত্রসন্তান দিতে পারি। চল, এই কুশাসনে শয়ন করো।’
চন্ডালিনী বিস্ময়ের দৃষ্টিতে কামার্ত ব্রাহ্মণকে দেখতে লাগল। তারপর তার স্বভাববশত অঙ্গুলি-স্ফোটন করতে করতে বলল, ‘হে প্রলুব্ধ ব্রাহ্মণ! অনতিদূরে আমার সুদেহী ভর্তা শূকর চরাইতেছে। সেও ভবাদৃশ কোমপনস্বভাবের এবং সে বলভদ্র। আমি চন্ডালিনী। আমি ক্ষেত্রজ সন্তান আমার গর্ভে ধারণ করিতে অনিচ্ছুক। আপনি সত্বর এই পবিত্র মাঠারিভূমি হইতে সুদূরে গমন করুন।’
একথা শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন বীর্যস্খলনরত ব্রাহ্মণ। তিনি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে চন্ডালিনীকে অভিসম্পাত দিয়ে বললেন, ‘হে প্রবঞ্চনাকারিণী! হে অবশীভূতা! যে-ব্রাহ্মণ তোমার রূপমুগ্ধ, যে তোমার অঙ্গ দর্শনপূর্বক কামানলে দগ্ধ ও প্রমত্ত হইয়া উঠিল, তুমি তাহার অনল প্রশমিত করিতে প্রত্যাখ্যান করিলে! আমি তোমাকে অভিসম্পাত দিতেছি—অচিরে তোমার শীর্ণদশা হইবে, তোমার যৌবনাহংকার চূর্ণ হইবে, তুমি নি:সন্তান হইয়া শূকরীতুল্য জীবনযাপন করিবে!’ এই বলে, সেই কুপিত ব্রাহ্মণ শূকশিম্বা বৃক্ষের পাশ দিয়ে দ্রুত অন্তর্ধান করলেন।
বাস্তবিক, বিয়ের কয়েক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও চন্ডালিনীর গর্ভসংক্রমণ হল না। তার স্বাস্থ্যও দিন দিন ভেঙে পড়তে লাগল। শরীর ও যৌবন হারিয়ে অনতিবিলম্বে সে কুরূপা হয়ে গেল। আর অহরহ তার স্বামীর গঞ্জনার কারণ হয়ে উঠল।
নিজের এই দুর্দশা দেখে চন্ডালিনী দিন নেই, রাত নেই কেবল কাঁদে। ঘরে থাকলেও কাঁদে, জলাভূমিতে শুয়োরের পাল চরাতে নিয়ে গেলেও একা একা কেঁদে বেড়ায়। নিজের মনে বলে, ‘হায়! এমন নি:সন্তান জীবন অপেক্ষা শূকরীর জীবন ঢের ভালো।’
একদিন ঊষাকালে ব্রহ্মা স্বামীর কোপে শয্যা-বিতাড়িতা সেই চন্ডালিনীকে একা একা পলাশ গাছের তলে বসে অশ্রুমোচন করতে দেখে জিগ্যেস করলেন, ‘হে নারী! তুমি ক্রন্দন করিতেছ কিসের লাগিয়া? কিসের দুঃখ তোমার? কী হেতু সংক্ষোভ অকপট নিবেদন করো।’
চন্ডালিনী বলল, ‘নারী হয়ে নি:সন্তান জীবনই আমার সম্যক দুঃখের কারণ। এমন জীবন অপেক্ষা শূকরীর জীবনও ঢের ভাল।’
‘তুমি নি:সন্তান?’
‘হ্যাঁ। এক কুপিত ব্রাহ্মণের ইচ্ছাপূরণে অসম্মত হওয়ায় আমি তাঁর শাপে শুষ্ক অড়হর ঝাঁটির ন্যায় কুরূপা, গতযৌবনা ও বন্ধ্যা হয়ে পড়েছি। বিবাহের ত্রি-বৎসরাধিককাল অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও আমি সন্তানের জন্ম দিতে পারিনি। এই অক্ষমতা হেতু আমার স্বামী আমার কটিদেশে পদাঘাতপূর্বক আমাকে তার শয্যাপার্শ্ব থেকে বিতাড়িত করেছে। আমি কাঁদছি এই দুঃখে। হে লোকপিতামহ! আমি শূকরীর জীবন যাঞ্চা করি। আমাকে শূকরীর জীবন দাও।’
ব্রহ্মা এই নারীর দুঃখের কারণ শুনে বিগলিত হলেন। তারপর বললেন যে, ওই ব্রাহ্মণ যদি পুনরায় কোনো ‘অবশীভূতা’কে এইরূপ অভিসম্পাত দেয়, তাহলে তার ব্রাহ্মণত্ব বিনষ্ট হবে। সে চন্ডালযোনি প্রাপ্ত হবে। তিনি চন্ডালিনীকে বললেন, ‘হে বন্ধ্যা! হে সন্তানহীনা সন্তপ্তা নারী! তুমি কি সত্যই শূকরীর জীবন কাঙ্ক্ষা করো?। তবে তাই হবে।’
চন্ডালিনী শূকরীর জীবন প্রাপ্ত হল। অতঃপর শূকরীটি বারে বারে সেই ব্রাহ্মণের ভুট্টাক্ষেতে ঢুকে পড়লে ব্রাহ্মণ তাকে প্রহার না করে প্রহারের ভঙ্গিতে চিৎকার করে তাড়িয়ে দেন কিন্তু একদিন সেই শাস্ত্রপাঠরত ব্রাহ্মণ তাঁর ক্রোধকে বশে রাখতে পারলেন না। তিনি হাতে খুঙ্গি নিয়ে পশ্চাদ্ধাবন করলেন শূকরীর। ভুট্টাক্ষেত্রের ভিতরে ঢুকে খুঙ্গি দিয়ে বেদম প্রহার করতে থাকেন প্রাণীটিকে। প্রহারের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণ শূকর-যোনি প্রাপ্ত হন। আর শূকরী ব্রাহ্মণীর জীবন লাভ করে।
অঙ্গদ স্তম্ভিত হয়ে যায়। অনেকক্ষণ অবধি তার মুখে কোনও বাক্য সরে না। মহাপ্রবীণও নির্ভাষ। শুধু দোদুল্যমান লন্ঠনের শব্দ, চাকার কর্কশ শব্দ আর গোক্ষুরের শব্দ একইরকমভাবে ধ্বনিত হয়ে চলে। রাত্রি বাড়ে। রাত্রির নৈ:শব্দ্য ও নির্জনতা বাড়ে। স্বচ্ছ হয়ে ওঠে কৌমুদী। আকাশে চাঁদের ‘সভা’ দেখা যায়।
অঙ্গদ আবার নতুন করে আকাশ দেখে। আর বিষাদের সঙ্গে বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! কদম্ব বৃক্ষ তাহা হইলে আর নাই?’
‘সেই কদম্ব নাই। সেই বৃদ্ধা নাই। সেই চরকাও নাই। চাঁদের গায়ে সুতা কাটিবার দিনও অন্ত হইয়া গিয়াছে। এখন হইতে জগজন চাঁদের দিকে তাকাইয়া ওই শূকরী প্রহাররত কুপিত ব্রাহ্মণকেই দেখিতে পাইবে। বৃদ্ধাকে নয়।’
‘হে মহাপ্রবীণ! ইহা শুনিয়া আমার মন বেয়াকুল ও বিষাদিত হইতেছে কেন? আমার চিত্তবৃত্তি অটল করুন।!’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! তুমি নির্বস্তুক ভাবনায় আলোড়িত। কঠোর হও। সত্যকে স্বীকার করো। ভাবাবেগ দমন করো। মনে রাখিও—জগতে সমস্ত কিছুই জীর্ণ ও নশ্বর হইয়া যায়। সত্য বৈ ধ্রুব অবিনশ্বর ও অজীর্ণ বলিয়া কিছু নাই। কালে কালে এই রূপেই প্রাচীনের জায়গা নবীন দখল করিয়া লয়। আর এই রূপেই লোকজগতে প্রচলিত হয় নতুন লোককথা ও লোককাহিনির।’
অঙ্গদের ভেতরটা কেমন হু-হু করতে থাকে। কিছুতে সে তার মনের ঔদাস্য কাটিয়ে উঠতে পারে না। সত্যিই কি তাহলে চাঁদ-বুড়ির লোকগল্পটির দিন ফুরিয়ে গেল? শিশুরা মায়ের কোলে খেলা করতে করতে কোন গল্প শুনবে? রুষ্ট ব্রাহ্মণের এ গল্প তো শিশুদের শোনাবার নয়। সে দাপিয়ে উঠবে কী দেখার জন্য? কোন চাঁদের টিপ মা তার সন্তানের কপালে বসিয়ে দেবে? অঙ্গদ কোথাও একটা শূন্যতা অনুভব করে। তার মন উত্তরোত্তর স্ফূর্তিহীনতায় ভরে ওঠে। কথা সরে না মুখ দিয়ে। তবু সে মহাপ্রবীণকে প্রশ্ন করে বসে।
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! অশ্রু সম্বরণ করো। অতঃপর আমার প্রতিবচনের প্রতি অভিনিবিষ্ট হও। বাস্তবিক, ইহা শিশুদের শুনাইবার উপযুক্ত লোককথা নহে। তবে জানিয়া রাখো—শিশুর কাছে চাঁদ ও জননী সমান আকর্ষণীয়। চাঁদের প্রতি শিশুকে আকৃষ্ট করিবার নিমিত্ত কোনো গল্পকথার প্রয়োজন নাই। বরং প্রাপ্তবয়স্কদের সেদিকে আকৃষ্ট করিতেই লোককথার প্রয়োজন। এই লোককথাটি তাই বিশেষ করিয়া তাহাদের জন্য। তাহাদের চেতনার উন্মেষ ঘটাইবার জন্য। হে অর্বাচীন! ইহার জন্য বিষাদাক্রান্ত হইও না। কেবল স্থবিরমনস্করাই অতীতের জন্য বিষাদগ্রস্ত হয়। অনুশোচনা করে। তুমি নতুনের সহিত, অধুনার সহিত, বর্তমান তথা চলিষ্ণুতার সহিত নিজের মেলবন্ধন ঘটাও, তাহা হইলে তুমিও নবীন হইয়া উঠিবে। তোমারও অতীতের জন্য কোনো দুঃখ হইবে না। মনে কোনও শোক রেখাপাত করিবে না।’
অঙ্গদ তখনও নির্বাক। উপরোক্ত কথায় তার কোনো সাড়া নেই। পথের ধারে কুল-কুসুম্ভ ও কাষ্ঠমল্লিকা গাছগুলি পূর্ণিমার আলোয় এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নাগফণীর মাথা থেকে ডাক দিয়ে উড়ে গেল লক্ষ্মী পেঁচা। কানালী খেত থেকে জল সড়সড়-সড়সড় শব্দে আল ভেঙে পড়ে যাচ্ছে বহালের ধান খেতগুলিতে।
পথে এখন কথোপকথনরত গ্রামবাসীরা বেশ উদ্যমী পায়ে এগিয়ে চলেছে। তাদের যাওয়ার এই ক্ষিপ্রতা দেখে বোঝা যায়, ঘরে নয়, তারা কাছাকাছি কোনো আসরে কিংবা মেলায় চলেছে। গ্রামীণ মেলায়। সাইকেলেও জোড়া আরোহী। ঘণ্টি বাজছে টিংটিং। ঘণ্টির শব্দে গোরুগুলো ভিড়কে গেলে, গাড়োয়ান তাদের পিঠে আলতো চাবুক ঠেকায়। চুমকুড়ি দিয়ে পথের ধারে নিয়ে আসে। তারপর—
অঙ্গদ বলে, ‘হে প্রবর্তক! এই লোককথাটি কোন চেতনাকে স্মরণে আনিয়া দিতেছে? ইহার সারমর্ম কী তাহা জানিতে বড়োই ইচ্ছুক। আপনার সানুগ্রহে তাহা নিবেদন করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! গল্পটিতে নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের পার্শ্বে প্রকৃত সহানুভূতিসম্পন্নের দাঁড়াইবার আবেদন রহিয়াছে। সেই সঙ্গে পীড়নকারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তথা প্রতিবিধানও সূচিত হইয়াছে। প্রকটিত হইয়াছে কাম-ক্রোধ-লোভের অবিবেচক প্রয়োগের পরিণতি। ইহাদের অতি প্রয়োগ অথবা অনুপযুক্ত ক্ষেত্রে প্রয়োগ হইতে সতর্ক থাকিও। যাহারা বলীয়ান—তাহাদের যত্রতত্র নির্বলের প্রতি বলপ্রয়োগের ব্যাপারে সাবধান করা হইয়াছে। আর বলা হইতেছে, রিপুকে দমন করো। কামরূপসর্পকে সংযমরূপ ঢাকনি দিয়া কুম্ভস্থ করিয়া রাখো। প্রতিকূল ক্ষেত্রে প্রমত্ত হইয়া সেই সরপোশ খুলিয়া দিলে কুম্ভস্থ অসংবৃত সর্প তোমাকেই দংশন করিবে। লোকসমাজে তুমি মানী হইতে অসম্মানী হইবে। ব্রাহ্মণ হইতে চন্ডালে রূপান্তরিত হইবে।
‘পক্ষান্তরে, বন্ধ্যা নারীর সমাজে দুর্দশার চিত্রটিও দেখানো হইয়াছে। নারীর বন্ধ্যাত্ব কখনও কাম্য নহে। বন্ধ্যাত্ব জীবনের পরিপন্থী।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি আপনার মাঙ্গলিক লোকদর্শন ও অমিয় বাণী শ্রবণ করিয়া যৎপরোনাস্তি আনন্দ লাভ করিতেছি ও সমৃদ্ধ হইতেছি। আমি উত্তরোত্তর আবেগাশ্রু সম্বরণপূর্বক বিষাদোত্তীর্ণ হইতেছি। হে মহাসত্ত্ব! আপনি অতীতে একদা আমাকে সমদর্শী হইতে বলিয়াছিলেন— ইহা না হইতে পারা আমার যাবতীয় ক্লেশের কারণ। হে প্রিয়ংবদ! আমি এক্ষণে ‘সমদর্শী হওয়া’র ব্যাখ্যান শুনিতে অতীব কৌতূহল প্রকাশ করিতেছি।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! আমি ইতঃপূর্বে তোমাকে সমদর্শী হইতে বলিয়াছিলাম। আমি ইহাও বলিয়াছিলাম যে, তোমার সম্যক দুঃখের কারণ সমদর্শী হইতে না পারা। আমি পুনরায় তাহা ব্যক্ত করিতেছি। হে বীরণকেশ! ইহা স্মরণে রাখিও—সমদর্শী তাহাকে বলা হয়, যিনি ধ্যান বা একাগ্র চিন্তার দ্বারা সমত্ব অর্থাৎ সিদ্ধি-অসিদ্ধিতে সমজ্ঞান লাভ করিয়াছেন এবং সেই রূপ আচরণ করেন। জ্ঞানী ও পন্ডিতগণ—প্রকৃত বিদ্যাবিনয়সম্পন্ন মানুষ গো, হস্তী, কুক্কুর তথা চন্ডালেও সমদর্শী হয়। সমদর্শী পুরুষের দুঃখের জন্য হা-হুতাশ নাই, আনন্দের জন্য উল্লাস নাই। কারণ, আনন্দ ও দুঃখ তাহার কাছে ভেদশূন্য। আশা করিলে আশাহত হইতে হয়, প্রত্যাশা করিলে বঞ্চিত হইতে হয়, লাভের কাঙ্ক্ষা করিলে অলাভে কষ্ট পাইতে হয়। আশা-প্রত্যাশা-লাভাদি ফলাশা ছাড়া কর্মকে কর্ম বলিয়া সম্পাদন করো এবং তাহার যেকোনো প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক বলিয়া গ্রহণ করো। মনকে অনড়-অটল রাখো। একমাত্র জপ ও ধ্যানের দ্বারা মনকে এইরূপ উদাসীন রাখা যায়। ইহাও বলিয়া রাখি—সাংসারিক মানুষ জপ ও ধ্যানের কথা শুনিলে চমকিয়া ওঠে। তাহারা ভাবে জপ ও ধ্যান করিতে হইলে বুঝি জঙ্গলে বিটপ-মূলে যাইতে হয়। উইঢিপির উপরে বসিয়া অনাহারে অনিদ্রায় থাকিয়া কেবলি মন্ত্র আউড়াইতে হয়। ইহা কদাপিও নহে। জপের অর্থ মন্তর আওড়ানো নহে। জপ ও ধ্যান সমার্থক— একাগ্রচিন্তার দ্বারা জ্ঞানলাভের প্রয়াস। এই একাগ্রচিন্তা কর্মের অবকাশে মানুষ যে-কোনো সময় যে-কোনো অবস্থাতে করিতে পারে। জানিয়া রাখো— ইষ্টচিন্তার জন্য উপবাস-অনাহার অনাবশ্যক। গৌতমবুদ্ধ বুদ্ধত্বলাভের পূর্বে কিছুকাল আহার-বিহার বর্জিত উৎকট তপস্যা করিয়াছিলেন। কিন্তু অবশেষে তা নিরর্থক জানিয়া তিনি নিবৃত্ত হন। ইহা তোমার স্মরণে আনিতে সেই উদুম্বর বৃক্ষের তলে অনাহারে থাকাকালীন তোমাকে আমি অন্নগ্রহণে প্রবৃত্ত করিয়াছিলাম।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! তাহা আজও স্মরণে রাখিয়াছি। সে-অন্ন সেদিন গ্রহণ করিয়া বুঝিয়াছিলাম যে, যাহা করি না কেন, তাহার জন্য প্রাণকে জীবিত রাখিতে হইবে। প্রাণ থাকিলে তবেই প্রাণায়াম সম্ভব। হে মহিমান্বিত! অতঃপর বলুন—কেন আমার মুষ্টিবদ্ধ এই বিসদৃশ ও বেমানান অস্ত্রটি সর্বক্ষণ আমার নয়ন সম্মুখে রাখিয়া বহন করিতে হইতেছে? ইহা অতীব অস্বস্তিকর।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! তোমার হস্তাধীন হাতিয়ারটিকে তুমি নিছক অস্ত্র জ্ঞান করিও না।
‘‘ধনু:’ অস্ত্র হইলেও যেমন তাহা ‘ধর্ম’ তেমনি এই যুদ্ধাস্ত্রটিও নিছক অস্ত্র নহে, ইহাও ধর্ম। আমি তোমার হস্তে ধর্মকে ন্যস্ত করিয়া রাখিয়াছি। তাহা এই কারণে যে, তোমার যাতে স্মরণে থাকে তোমাকে যুদ্ধ করিতেই হইবে এবং সে-যুদ্ধ হইবে ধর্মযুদ্ধ। অর্থাৎ সত্য-প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। ইতিপূর্বে তুমি এই শপথ একবার বিস্মৃত হইয়াছিলে। কারণ তখনও জগদ্দর্শনে তুমি অভ্যস্ত হও নাই। তাহা তোমাকে আবেগাক্রান্ত ও বিহ্বল করিয়া তুলিয়াছিল। এখন তুমি প্রতিদিন জ্ঞানী হইয়া উঠিতেছ। আমি জ্ঞানীর অত্যন্ত প্রিয়, জ্ঞানীও আমার অতীব প্রিয়। সুতরাং, হে জ্ঞানান্বেষী! তুমি আমার প্রিয়। আমার আত্মাই। কেন না, জ্ঞানকে আমি আত্মার অভিন্ন বলিয়া মনে করি। যেখানেই জ্ঞানের চর্চা, যেখানেই জ্ঞানের অবস্থান—সেখানেই আমি বিরাজমান, ইহা সদা স্মরণে রাখিও। কখনওই ভুলিও না।’
গো-শকট তখনও এগিয়ে চলেছে। ঢিমে তালে। চাকায় একই রকম ‘কাঁ-ই-ই-ই কচ’ শব্দ করতে করতে। খড়ের গাদার উপরে বসে অঙ্গদের তন্দ্রা আসে। দুলুনিতে। তবু সেই কৃপাণটি ধরে থাকে। আর এগিয়ে যেতে যেতে ডানদিক বাঁদিক লক্ষ করতে করতে যায়।
চাঁদ এতক্ষণে আরও ঝকঝকে হয়ে উঠেছে। তার রুপোলি আভায় মাঠ-ময়দান-গাছপালা সব কেমন কুয়াশাচ্ছন্ন ও রহস্যময় লাগে। অঙ্গদ যদি মহাপ্রবীণের মুখ-নি:সৃত আপ্তবচন শুনতে শুনতে এভাবে নিজেকে অনেকটাই স্থিতধী করে তুলতে না পারত, তাহলে হয়তো এতক্ষণ সে ওই খড়ের গাদা থেকে জাম্বুবানের মতো লাফিয়ে জ্যোৎস্নার ভিতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে—ধানখেত-বিরহিবাড়ি-কোদোবাড়ি পেরিয়ে দূরবর্তী কোনো শবরগ্রামে গিয়ে ঢুকে পড়ত। তারপর নিজেই নিজের কান মলে, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, এই বৃদ্ধের উদ্দেশে বলত ‘হেই বুঢ়া! হামি আর তোর পুয়ালগাদার গাড়িয়ে নাই চাপব। কুটকুটাছে। বাপ-রে বাপ! ই-বুঢ়াটার পাল্লায় কেউ পড়ে! যা বলছে ন! হামি আর ইয়ার ল্যাতাড়ে৩৬ থাকছি নাই। ক্যানে থাকব? তুমি নারীকে দেখলে নিষ্কাম হতে বলবে। তুমি বিষয়-সম্পত্তি থাকলে ভোগ-বাসনা ছাইড়ে সাধু-বৈরাগী-বোমভলা হতে বলবে। তুমি সংসার-পরিবারকে ফেলে বংবৈলা-টোটো-কুম্পানি হতে কান-ফুসফুসি দিবে। তাইলে বাঁইচে থাকব কিসের লাইগে? কী ধুনতে? বসে বসে নিমডাল চিবাব? ধুৎ-ধুৎ-ধুৎ!’ আবার পরক্ষণেই সে খেতের আলে বসে কাঁদতে থাকবে। বলবে, ‘হায়! হামি পালাঞ কি আর পারাঙ্গত পাব? যেখানেই যাব— বুঢ়া সেখানেই পুয়ালগাড়ি নিয়ে ব্রেক কষে ডাঁড়ায় যাবেক। বলবেক—হে অর্বাচীন! আইস, পুনঃ সোয়ার হও।’
যদি সেই বুড়ো গাড়োয়ান তাকে পুনর্বার সোয়ারি হতে না বলত তাহলে সে শবরদের গ্রামে ঢুকে গ্রামবাসীদের সঙ্গে মিশে যেত। তারপর সেখানেই আত্মগোপন করে থাকতে থাকতে, একদিন সেও শুরু করত তার নতুন জীবন।
কিন্তু এখন সে-ভাবনাই তার এল না। এ-জীবন যে আবার নতুন হয়ে উঠতে পারে, তাকে আবার নতুন করে গড়ে তোলা যায়—এমন ভোগবিলাসী চিন্তা থেকে সে অনেকটাই সরিয়ে নিয়েছে নিজেকে। সে পালিয়ে যাবে কেন? কোথায় পালাবে? কেন পালাবে? কার জন্য? বাইরের কোনো ভোগ্য তথা মায়াময় আকর্ষণ কি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে? এই সমুদয় প্রশ্নের জবাব তার অন্তরে বিলীন হয়ে আছে। যেভাবে সমুদ্রে এসে নদী-নালা-বর্ষার জল বিলীন হয়ে যায়। এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব এখন আর কোনোভাবে তাকে বেহেড, মতিভ্রষ্ট করতে পারবে না। তার দিন-দিন প্রাজ্ঞ হয়ে উঠতে থাকা মনে অস্থিরতা আনতে পারবে না। তাকে আলোড়িত করতেও পারবে না। মানুষ আলোড়িত হয় কখন? যখন সেই আলোড়নের কারণের সঙ্গে, বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে জড়িত রাখে। এখন সেই আত্মকেন্দ্রিক সংশ্লেষণ থেকে অঙ্গদ নিজেকে সরিয়ে আনছে। আর এইভাবে সে দেখছে এই বিপুলা লোকসংসারকে। এই মোহময় জগৎকে।
তারপরেও প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে সে সহোদরের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন? এই যুদ্ধ কি তার ব্যক্তিগত প্রতিশোধ চরিতার্থ করার জন্য নয়? জারমণিকে সে লড়াই-সংঘর্ষের মাধ্যমে পরের অধিকার থেকে নিজের অধিকারে ছিনিয়ে আনতে চাইছে কেন? এর মধ্যে কি তার ব্যক্তিগত লক্ষ্যপূরণ নেই? এই যুদ্ধ কি তার নিজস্ব লাভ-অলাভের মীমাংসা করে দেবে না? মহাপ্রবীণের কাছে সে নিজেই প্রশ্নসমুচ্চয় একটার পর একটা উত্থাপন করে গিয়েছে। সেখানে তিনি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, কোনো ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিগত নারী-সম্পত্তি জয় করে ফিরিয়ে আনার জন্য রণোৎসাহী করে তুলছেন না তিনি। জারমণি অঙ্গদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে, কিন্তু এই যুদ্ধ ব্যক্তিগত যুদ্ধ নয়। তার একার যুদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জগতে সঙ্ঘটিত হয়ে চলা ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্যের প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। অন্যায়কে দমন করে ন্যায়, অসত্যকে দমন করে সত্যকে জাগরিত করার যুদ্ধ। জারমণি এখানে উপলক্ষ্যমাত্র। জারমণিকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের এই দীর্ঘকালব্যাপী প্রস্তুতি চললেও তা আসলে জারমণিকে লক্ষ্য করে চলছে না। চলছে ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে। তাই মহাপ্রবীণ এই যুদ্ধকে বারে বারে বলছেন ধর্মযুদ্ধ।
এই প্রতীকী যুদ্ধে তামসিক শক্তির বিরুদ্ধে অঙ্গদ একাই লড়ছে না। আবার সাত্ত্বিক শক্তির বিরুদ্ধে পাটনও একা লড়ছে না। জগতে দুপক্ষেরই আছে কয়েক অক্ষৌহিণী সেনা। মহাপ্রবীণ তাকে এও বলেছেন যে, পবিত্র মাঠারিভূমিতে সঙ্ঘটিত হবে বলে যে-যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, সে-যুদ্ধ আসলে আবহমান কাল ধরেই সঙ্ঘটিত হয়ে চলেছে এই পৃথিবীতে। যুদ্ধ চলছে। প্রতি মুহূর্তে চলছে। জগৎ জুড়ে চলছে। প্রকাশ্যে, গোপনে। আমরা দেখতে পাই বা না পাই। এখন জরুরি হয়ে পড়েছে সেই যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করা। জগতে হীনশক্তির উত্থান এতটাই প্রবল হয়ে উঠছে যে, জগৎকে তা দিন দিন অন্ধকারের দিকে নিয়ে চলেছে। ধ্বংসের দিকে নিয়ে চলেছে। এই ধ্বংসের আশু প্রতিরোধ প্রয়োজন। শুভ ও মাঙ্গলিক শক্তির সংগঠিত হওয়া এখন বড়োই দরকার। পক্ষান্তরে, মাঠারিভূমির যুদ্ধ মানুষকে আরও আরও সত্যপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রাণিত করে তুলবে বলেই এমন সাড়ম্বর আয়োজন।
পক্ষান্তরে এটাও ঠিক যে, অঙ্গদের কাছে মাঠারিভূমির যুদ্ধ, বস্তুত, যুদ্ধের একটা মহড়া মাত্র। এই যুদ্ধ থেকে তাকে অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে হবে, জ্ঞানী হয়ে উঠতে হবে, অকুতোভয় হতে হবে, যাতে সে সত্যিকারের যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারে। সে-যুদ্ধ হল জীবনযুদ্ধ। এই ধরণীতল হল সেই পবিত্র মাঠারিভূমি— মহাধর্মক্ষেত্র!
গাড়ির চাকা গর্তে পড়ে যেতেই টঙে বসে থাকা অঙ্গদ টাল খেয়ে কেঁপে ওঠে। নিজেকে সামলে নেয়। আরও কিছুটা গিয়ে গাড়ি ধীরে ধীরে শ্লথ হয়ে থেমে যায়। গোরুকে খড় দিতে হবে, জল খাওয়াতে হবে। তারাও ঝিমুচ্ছে। গতি আনতে হবে তাদের ক্ষুরে ক্ষুরে।
গাড়োয়ান জোয়ালের নীচ দিয়ে মাথা গলিয়ে বেরিয়ে আসে। নেমে পড়ে অঙ্গদও। গাড়োয়ানকে সে সাহায্য করে। সুতবইটি বের করে সে কাঁইচির মতো করে খুলে জোয়ালের নীচে ঠেকিয়ে দেয়। পুরো গো-শকটটি এখন এই সুতবই-এর ভরে দাঁড়িয়ে থাকে—গাড়োয়ান গোরু দুটিকে খুলে জলাশয়ের দিকে নেমে চলে যায়।
জলাশয়টি একটি ছোট্ট ডোবা মতো। চারপাশে লম্বা লম্বা ঘাস, তারই মাঝখানে এই জলাশয়টির জল চকচক করছে। সাঁওতাল ঘরের উঠোনে পড়ে থাকা কাঁসার জামবাটির মতো সেই চাঁদের ছায়া জলের উপরে ঝিলিক দিয়ে উঠছে।
গোরু দুটি নিজে থেকে জলাশয়ের দিকে এগিয়ে যায়। গাড়োয়ানও খালি পায়ে ঘাস মাড়িয়ে নেমে যেতে থাকে। জলাশয়ের কাছাকাছি যেতে, একসঙ্গে একঝাঁক টুরি ব্যাং ঘাটের ধার থেকে টপাটপ লাফ দিয়ে জলের দিকে চলে গেল! কেঁপে উঠল জলে পড়ে থাকা চাঁদের প্রতিবিম্বটি। কিন্তু তারপরই যেন একটি অপার্থিব মুগ্ধতা অপেক্ষা করছিল। ততক্ষণে অঙ্গদও জল খেতে ঘাটে নেমে এসেছে। সে দেখে ঘাট আলো করে ফুটে রয়েছে একা-একটি লাল শালুক! হাওয়ায় দুলতে দুলতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে যেন প্রেমিকার মতো হাসছে। অথবা এই কুমুদের প্রতি অবিচল দৃষ্টি রেখে হেসে চলেছে আসমানের ওই দীপ্তিমান।
অঙ্গদ ক্ষণে ক্ষণে বিস্মিত হতে থাকে। জারমণিকে মনে পড়ে যায় তার। নিজেকেও কি মনে পড়ে না? যদিও সে তা মনে করতে চায় না। সন্ন্যাস জীবন অবলম্বনকারী যেমন গার্হস্থ্য জীবনের কথা—আত্মীয়-স্বজন-পরিবার-পরিজনদের কথা ভুলে থাকতে চায়, মনে তাদের স্থান দিতে চায় না, অঙ্গদও তেমনি। অতীত জীবনের কথা টেনে এনে সে চায় না নিজেকে দুর্বল করতে। বলা যায় না—মানুষের মন...
তবে সত্যিই এই নিশুতিরাতে, নির্জনে, পুকুর জুড়ে ফুটে থাকা একটি লালশালুকের সঙ্গে চাঁদের এই গভীর এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রণয় নিবেদন অঙ্গদকে বিভোর করে দিল। আহা! কী নিষ্পাপ, সুন্দর এবং কামহীন আলাপ!
সত্যিই কামহীন। সত্যিই চাঁদ এখানে প্রণয়ীর ভূমিকায় ক্রীড়ারত। চাঁদকে তাই বলা হয়—কুমুদ-বান্ধব বা কুমুদনাথ। মহাপ্রবীণ স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি অঙ্গদকে এটাও বললেন যে, এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। জীবনের এই দুর্লভ মুহূর্তগুলি উপভোগ করো। আর একান্তে কথা বলো নিজের সঙ্গে। এটাও এক ধরনের ধ্যান। এইভাবে চিন্তার গভীরতা আসে, নিজের ভেতরে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়। জানা যায়। মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! নিজেকে জানো। নিজকে জানো। নিজেকে জানো।’
গোরুগুলি তখন ‘চভক-চভক’ জল খাচ্ছিল। গাড়োয়ান তাদের ‘হেইট! হেইট!’ করে ঘাট থেকে তুলে আনল গাড়ির কাছে। কয়েকটা আঁটি ঝেঁকে বের করে মুখের কাছে খুলে খাওয়াতে লাগল।
অঙ্গদ বাঁশঝাড়ের তলে গিয়ে দাঁড়ায়। প্রস্রাব করে। বাঁশঝাড়ের মাথায় জোৎস্নার আলো পড়ে, অনেকটা মন্ডলাকার জায়গায় আলোছায়ার শিল্পিত চিত্রণ ফুটে উঠেছে। অঙ্গদের গায়েও। কিন্তু সেদিকে চোখ নেই অঙ্গদের! সে দেখতে লাগল— বাঁশ গাছের ফুল! এমন দৃশ্যও তো সে কখনও দেখেনি। বাঁশ গাছে কি ফুল হয়? যদি হয় তাহলে তা সব গাছে হয় না কেন? ভাবতে ভাবতে গো-শকটে উঠে পড়ে। হাতে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে। কর্কশ শব্দে ঘোরে গাড়ির চাকা। পিঠে, মাথায় চাঁদের আলো নিয়ে দোল খেতে খেতে অঙ্গদ এগিয়ে চলে।
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আপনাকে কর্মনিষ্ঠ রূপে দেখিতেছি। আপনি আপনার কর্ম করিয়া চলিয়াছেন। আপনাকে কর্মবিমুখ অলস দেখিতেছি না কেন? ইহার কারণ কী? আপনার কর্ম করার কি কোনো প্রয়োজন রহিয়াছে?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! শ্রেষ্ঠ মানুষ যে-যে আচরণ করেন, সাধারণ মানুষ সেই-সেই আচরণ করিতে প্রয়াসী হয়। তাঁহার অনুবর্তী হয়। আমি তত্ত্ব, আমি আচার, আমিই আচরণকারী। ত্রিলোকে আমার কিছুই কর্তব্য নাই, অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তিযোগ্য নাই। তথাপি আমি আমার কর্মে নিযুক্ত আছি। কারণ, যদি কখনও অতিন্দ্রিত (অনলস) হইয়া কর্মে নিযুক্ত না থাকিতাম, তবে মনুষ্যগণ সর্বপ্রকারে আমার পথ অনুসরণ করিত। যদি আমি কর্ম না করিতাম, এই লোকসমূহ উৎসন্ন যাইত। আমিও সংকরের (বর্ণসংকরের) কর্তা হইতাম। এই সকল লোকজগৎ ধ্বংস হইত।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! কর্মবিমুখতার সঙ্গে বর্ণসংকর উৎপাদন তথা জগৎ ধ্বংসের কারণ কী?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! মানুষ কর্মবিমুখ হইলে দুষ্কর্মের প্রবৃত্তি তাহার মনে প্রবল হইতে থাকে। বিবিধ দুষ্কর্মের মধ্যে বর্ণসংকর উৎপাদনও একপ্রকার দুষ্কর্ম। দুষ্কর্ম সমাজের রীতি-আচার-আচরণ এবং যাবতীয় কল্যাণমূলক শৃঙ্খলাকে অস্বীকার করিতে চাহে। তখনই সমাজ উচ্ছৃঙ্খল হয়। উচ্ছৃঙ্খল সমাজের পতন অনিবার্য—ইহা অবশ্য জানিবে।
‘হে ব্যাধনন্দন! মনে রাখিবে—ঝড়ের পূর্বাভাস স্বরূপ যেমন মলয় গম্ভীর হইয়া পড়ে, মনুষ্যগণের মৃত্যুর পূর্বে যেমন ব্যাধির প্রকোপ দেখা দেয়, সমাজের ধ্বংসের পূর্বেও তেমনি ধ্বংসের উপসর্গ রূপে দুষ্ট অহিতকর শক্তির উত্থান ও শৃঙ্খলাহীনতা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকাশ পাইতে থাক। সেই উপসর্গগুলি সম্পর্কে সাবধান থাকিবে।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! সমাজ ধ্বংসের সেই উপসর্গগুলি কী কী তাহা জানাইয়া সত্বর আমার কৌতূহল ভঞ্জন করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে উদ্বিগ্ন! এক্ষণে সমাজ ধ্বংসের উপসর্গগুলি কী কী তাহা সবিস্তার নিবেদন করিয়া তোমার কৌতূহল ভঞ্জন করিতেছি। ধ্বংসের প্রথম এবং প্রধান উপসর্গ হইল সমাজের প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রে ভাঙন—বন্ধুত্বে ভাঙন, দলে ভাঙন, কর্মক্ষেত্রে ভাঙন, সংসারে ভাঙন, এমনকি স্বামী-স্ত্রীতে মনোমালিন্য এবং পরিশেষে তজ্জন্য বিবাহে ভাঙন। সর্বক্ষেত্রে—‘আমিত্ব’ প্রবল হইয়া উঠিবে। মনুষ্য নিজের স্বার্থ বৈ অন্যের স্বার্থ চিন্তা করিবে না, নিজের কথা বৈ অন্যের কথা বলিবে না, নিজের কথা শুনাইতে ব্যগ্র হইয়া উঠিবে কিন্তু অপরের কথা শুনিতে ও বুঝিতে চাহিবে না। মনুষ্য সর্বক্ষেত্রে আত্মপ্রচার করিবে। দু-মুদ্রা দান-ধ্যান করিলে চারি টঙ্কার ঢক্কা-নিনাদ করিবে, সমাজে প্রকৃত সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের ঘোর আকাল দেখা দিবে, কেহ কাহাকেও বিশ্বাস করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারিবে না—বিশ্বাসী মনুষ্যেরও অভাব দেখা দিবে। সমাজে অসততা ক্রমে ক্রমে স্বাভাবিক হইয়া উঠিবে। সততা লইয়া হাসি-ঠাট্টা-তামাসা উড়াইবে। অসৎ মনুষ্যদের এতোটাই ধনাগম ঘটিবে যে তাহারা সৎ মনুষ্যদের নির্বোধ ভাবিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিবে। সমাজে প্রতিষ্ঠা পাইবার জন্য সর্বক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা দেখা দিবে। সাধারণ সম্পর্কগুলির ভিতরেও একটি অসুস্থ রেষারেষি চলিতে থাকিবে। প্রত্যেকে প্রত্যেককে অসূয়া করিবে। একজন অপর জনের ভালো দেখিতে পারিবে না। যে-কোনো প্রকারে অর্থোপার্জনের জন্য মনুষ্যগণ মরিয়া হইয়া উঠিবে। ফলে আদর্শ বলিয়া কোনো বস্তু থাকিবে না। আদর্শহীন ব্যক্তি মুখে এককথা বলিবে কিন্তু মনে আরেক থাকিবে। মুখে সৌজন্যমূলক হাসি দেখাইবে কিন্তু অন্তরে শত্রুতা লালন করিয়া চলিবে। অপরের যে-ধর্মকে সে অন্যায় বলিবে, নিজের বেলায় সেই অন্যায় কর্ম সে করিবে এবং বলিতে গেলে তাহার সপক্ষে দুর্বল যুক্তি খাড়া করিবে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাজে ছিদ্রান্বেষী হইয়া উঠিবে এবং একে অপরের অনুপস্থিতিতে কটু-কঠোর সমালোচনা করিতে ছাড়িবে না। সন্দেহ, স্বার্থ, অবিশ্বাসের ওই বাতাবরণে নব্য শব্দ আমদানি হইতে থাকিবে। যেমন একে অপরের কখনো কাজে-কর্মে সাহায্য করিলে, সেই ‘কাজে আসা’কে ‘ব্যবহার করা’ বলিয়া পরবর্তীকালে অভিযোগ তুলিবে। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি সন্দেহ অবিশ্বাস নিয়ে অভিযোগ দিন দিন বাড়িয়া চলিবে। ফলে দুজনে দুজনকে যে-কোনো প্রকারে নাকাল করিতে চেষ্টা করিবে। স্বামী বাহিরে অপরের দ্বারা অপমানিত হইলে স্ত্রী ঘরে সেই অপমানকে সমুচিত বলিয়া তাহার কাটা ঘায়ে লবণ ছিটাইবে। দাম্পত্য সম্পর্ক এতটাই মন্দ হইয়া উঠিবে যে, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে প্রতিপক্ষ মনে করিবে। সহবাসে অনাগ্রহ দেখাইয়া স্ত্রী স্বামীকে জব্দ করিতে চাহিবে। সংগমে লিপ্ত হওয়াকে ‘ধর্ষণ’ বলিবে। স্বামীকে টেক্কা দিতে স্ত্রীও নিজস্ব জগৎ গড়িতে চেষ্টা করিবে। আর তার জন্য সে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে সচেষ্ট হইবে। পরপুরুষের সহিত তাহার মেলামেশা শুরু হইবে। সাংসারিক অশান্তিকে পরপুরুষেরা আরও তীব্র করিয়া দিয়া পরস্ত্রীর মন না পাইলেও শরীর পাইতে চেষ্টা চালাইবে। সংসারের অশান্তি ভুলিতে স্বামী মদ্যপান করিবে। স্ত্রীসংসর্গ-না পাইয়া ধীরে ধীরে বাহিরে নারীসঙ্গে অভ্যস্ত হইয়া উঠিবে। স্ত্রীও মদ্যপান ও ধূম্রপান করিবে। যতই নগরায়ণ ঘটিবে এবং মনুষ্য আধুনিক হইয়া উঠিবে, ততই নর-নারী তথা সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এইরূপ তিক্ত সম্পর্ক গড়িয়া উঠিবে। ফলে নগরে নগরে বেশ্যালয় থাকা অত্যন্ত জরুরি হইয়া উঠিবে। দেহোপজনীবিনীরাও তাহাদের দেহ-ব্যবসার সামাজিক তথা সরকারি স্বীকৃতির দাবি করিবে। সংসারে কলহপ্রিয় এই নারীদের একাংশ প্রগতিবাদী নারী আন্দোলনে নামিয়া পড়িবে এবং দলীয় কর্মীদের সহিত কেহ কেহ স্বেচ্ছায় অবৈধ সম্পর্কে জড়িত হইয়া পড়িবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসকল নারী যেমন স্বামী-পরিত্যক্তা হইবে, তেমনি কুদর্শনাও হইবে। তথাকথিত ‘আধুনিক’ স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সহিত বিবাহবন্ধনে জড়িত হইয়া পড়ার জন্য প্রায়শ অনুতাপ করিবে। ইহাদের সন্তান অবহেলায় বাড়িতে থাকিবে। বাপ-মায়ের আচরণ দেখিয়া সেও ক্রমশ দুর্বিনীত হইয়া মানসিক ব্যাধির শিকার হইবে। শহরে-নগরে ক্রমবর্ধমান মনোরোগীদের জন্য চিকিৎসালয় গড়িয়া উঠিবে। দিন দিন বিবাহ-বিচ্ছেদ বাড়িতে থাকিবে। নর এবং নারী উভয়ের দাম্পত্য অতৃপ্তির কারণে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ দেখা দিবে। ক্রমে ক্রমে প্রবর্তনের তীব্রতা হেতু সমলিঙ্গ-প্রেম সামাজিক বলিয়া গ্রাহ্য হইবে।
‘কোনো ক্ষেত্রে স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্ককে মানিয়া লইতে না পারিয়া স্বামী আত্মহত্যা করিবে অথবা স্ত্রীকে মারিয়া নিজেও মরিবে। আবার কোনো ক্ষেত্রে স্ত্রীর প্ররোচনায় এবং পরোক্ষ সহযোগিতায় ওই পরপুরুষটি স্ত্রীর সামনেই তার স্বামীকে খুন করিবে। আরও নানাবিধ কারণে সমাজে হত্যা-রিরংসার ঊর্ধগতি পাইবে। নেশাগ্রস্তের দ্বারা পানীয়ের বিক্রি হু-হু করিয়া বাড়িতে থাকিবে। পাড়ায় পাড়ায়, এমনকি ঘরেও ‘ঠেক’ বসিবে। হতাশ এবং দিশাহীন নতুন প্রজন্মও তাহাতে ভাসিয়া যাইবে। তাহারা দেশ লইয়া ভাবিত হইবে না। সক্রিয় রাজনীতির প্রতিও তাহাদের আগ্রহ কমিয়া আসিবে। দেশে বেকারত্ব বাড়িয়া চলিবে। রাজনৈতিক দলগুলিতে ভদ্র-শিক্ষিত-সচেতন কর্মীর অভাব দেখা দিবে। ফায়দা লুটিবার জন্য যত অসৎ-অসাধু-গুন্ডা-বদমাইশরা সেথায় ভিড় করিবে। নতুন কর্মীরা যাহাতে দলে আসে এবং থাকিয়া যায়, সেই কথা চিন্তা করিয়া যুবতী তথা গৃহবধূদেরও দলে অন্তর্ভুক্ত করিয়া রাখা হইবে। ফলত নেতা এবং দলীয় কর্মীদের মধ্যে প্রায়শ নানা প্রকার অবৈধ কান্ড ঘটিতে থাকিবে। সংবাদপত্র সেই গোপন কেচ্ছা চাউর করিয়া অর্থ কামাইবে। সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক দল এবং নেতাদের প্রতি আস্থা ও ভক্তিশ্রদ্ধা থাকিবে না। মিথ্যাবাদী, দুরাচারী, চোর, ভন্ড তথা অর্থগৃধ শাসকগোষ্ঠী, নেতা এবং তাদের দলবলকে জব্দ করিতে বঞ্চিত ও নিপীড়িত অরণ্যবাসীদের বল-ভরসায় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেশব্যাপী ঘোর উগ্রপন্থার উদ্ভব ঘটিবে।
‘স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুস্থ যৌন সম্পর্ক সমাজে যৌনতার ভাসসাম্য বজায় রাখে। এই সম্পর্কে ভাঙন ধরায় যৌনাচারের ক্ষেত্রে সমাজ জুড়ে ব্যাপক অনাচার দেখা দিবে—শিশুমৈথুনের ঘটনা আকছার ঘটিবে। এমনকি সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ আট-নয় বছরের কন্যার সহিতও যৌন নির্যাতনে লিপ্ত হইতে দ্বিধা করিবে না। মানব মন পাশবিক হইয়া উঠিবে। মানুষের এই পাশবিক প্রবৃত্তির সুযোগ লইয়া বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলি নারীকে পণ্য করিয়া তুলিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিবে। তাহার আব্রু বলিয়া আর কিছু রাখিতে দিবে না। পোশাকে-আশাকে, আচরণে যৌন কুরুচি উপচাইয়া পড়িবে। নারী নারীত্ব হারাইবে। কখনও কখনও নারীকে পুরুষ বলিয়াও ভ্রম হইবে। এবং সর্বোপরি—বাঁশ গাছে ফুল ফুটিবে!’
এই দীর্ঘ কথন শুনতে শুনতে, অঙ্গদের মনে হয়, তার চারপাশে ক্রমশ অন্ধকার ঘনিয়ে নামছে। তার কন্ঠানালি চেপে ধরতে চাইছে কেউ। সারা সমাজ জুড়ে প্রকাশমান ধ্বংসের এই উপসর্গগুলি যে আসলে নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তা যে জীবনের যবনিকা পতনের কীর্তন তা সে বুঝতে পারে এখন। তারই মধ্যে আবার বাঁশ গাছের প্রসঙ্গটি যেন তাকে আরও হতবাক করে দেয়।
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! সমাজ-ধ্বংসের এই উপসর্গগুলি শুনিয়া আমার অন্তরাত্মা প্রকম্পিত হইতেছে। সমাজের সর্বত্র ঘোর অমানিশা বৈ আমি আর কিছুই দেখিতে পাইতেছি না। আমি কিয়ৎক্ষণ পূর্বে বাঁশ গাছে ফুলও দেখিয়াছি। ইহা দেখা কি অশুভ?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! কোনো কিছু দেখিয়া, কোনো অবস্থাতেই ত্রস্তবোধ করিও না। অন্তরাত্মাকে বিচলিত করিও না। সমাজের সর্বত্র যাহা তুমি দেখিতেছ, তাহা ঘোর অন্ধকারের উপসর্গমাত্র, অন্ধকার নহে। সুতরাং সেই উপসর্গকে নিবারণের নিমিত্ত সচেষ্ট হও।
‘হে স্থিতধী! বাঁশগাছের ফুল দর্শন করা অশুভ নহে। ইহা সমাজের পক্ষে অশুভ। কুলক্ষ্মণ। মনে রাখিও, সমগ্র সমাজব্যাপী এই অন্ধকারের উপসর্গ নামিয়া আসার কারণ মনুষ্যের মনে দুষ্ট বোধের জাগরণ। আমি এক্ষণ পর্যন্ত যাহা-যাহা বিবৃত করিলাম, তাহা বস্তুতপক্ষে সেই দুষ্টবোধের জাগরণেরই ইতিবৃত্ত। তাহার প্রকাশ একেক ক্ষেত্রে একেকভাবে ঘটিতেছে। কোথাও নারী পুরুষধর্মিনী মাতঙ্গিনী হইয়া উঠিতেছে, আবার কোথাও অশীতিপর বৃদ্ধ ফুলের ন্যায় সুন্দর নাবালিকাকে নির্যাতন করিয়া দৈহিক কামনার প্রশান্তি খুঁজিতেছে।
‘প্রকৃতপক্ষে, মনুষ্যের মধ্যে তামসিক তৃষ্ণা প্রবল হইতেছে। তজ্জন্য সমাজ ভোগবাদী হইয়া উঠিতেছে। ভোগবাদী সমাজে হাহাকার প্রতিনিয়ত চলিতে থাকিবে। মনুষ্যের পিপাসার নিবৃত্তি কখনো হইবে না। মনুষ্য মনুষ্যের ভিতরে ধর্মকর্মদ্বেষী রাক্ষসকে দেখিতে পাইবে। কিন্তু হে জ্ঞানান্বেষি! তুমি সেই রাক্ষসকে দেখিয়া কদাপিও ভীত হইও না।
‘মনে রাখিবে, এই রাক্ষসকে নিধন করিতে না পারিলে সমাজ তথা দেশকে অশুভশক্তি হইতে মুক্ত করা অসম্ভব। হে বীর! ইহাও মনে রাখিও— যখন-যখন ধর্মে ক্ষয় (গ্লানি) হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান (উদয়) হয়, তখন-তখন আমি দেহ ধারণপূর্বক আবির্ভূত হই। আপনাকে সৃজন করি। সাধুগণের পরিত্রাণজন্য এবং দুষ্কৃতীগণের বিনাশজন্য, ধর্মসংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই!’
মহাপ্রবীণের মুখ থেকে আবির্ভাবের এই মহান বাণীটি শোনামাত্র, অস্ত্রসমেত অঙ্গদের মাথা হেঁট হয়ে গেল। চলমান গো-শকটে খড়ের গাদার উপরে তেমনিভাবে কয়েকদন্ড নতমস্তকে থেকে সে অনুভব করতে লাগল এই বাণীর মাহাত্ম্য। তারপর—
অঙ্গদের মনে হল তার চোখের পাতায় গাঢ় হয়ে বসে থাকা অন্ধকার যেন দূরীভূত হচ্ছে। কেটে যাচ্ছে যাত্রাপথ জুড়ে থাকা প্রলম্বিত আঁধার। সে দেখতে পায়—শত-শত প্রভাকীটের নাচন! ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে সেই জোনাকির দল! তারা গো-শকটের খড়ের গাদা আচ্ছাদিত করে ফেলে। খেলা করতে থাকে অঙ্গদের বেনামূলের মতো মাথাভর্তি চুলের ফাঁকে, ফোকরে। উড়ে উড়ে বসে তার হাতে ধরা আশমানমুখী অস্ত্রের গায়েও।
দূর থেকে গ্রামবাসীদের কোলাহল আসে। দুটি-একটি হ্যাজাকের আলো দেখা যায়। গ্রামীণ মেলা বসেছে। পাথুরে ডাঙা জমিতে শামিয়ানা খাটিয়ে নাচনী নাচের আসর বসছে। সবে বেজে উঠছে পেঁপটি বাঁশি।
গাড়োয়ান মহুলতলে গাড়ি রাখে। নেমে পড়ে অঙ্গদও। তারপর গুটি গুটি ছুটে গিয়ে তারা ভিড়-গাদালে মিশে যায়। গাড়োয়ানের পাশে চুপটি করে বসে পড়ে অঙ্গদ।
নাচের আগে শুরু হয় মানভুমের ঝুমুর। হঠাৎ উলম্ফন দিয়ে আসরে ঢোকে মাদৈলা। দুড়দাড় মাদল পিটতে থাকে—আসরে চরকির মতো পাক দিতে দিতে। মুহূর্তের মধ্যে আসর গরম করে দেয়। গলার মাদৈল যেন সে বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছে। আসর শুদ্ধু লোক চেঁচিয়ে বলতে থাকে—‘চ্চলৌ! চ্চলৌ আগুয়ানখুড়া! বাহবা-কে-বাহবা।’ হঠাৎ মাদৈলে শেষ চাঁটি দিয়ে, হাত দুটি মুক্ত করে শূন্যে বাড়িয়ে দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে সে হাঁটু মুড়ে বসে পড়তেই, বিহারীলাল গান ধরে—
পুরুলিয়াবাসী হামরা পুরুলিয়াবাসী
হামদের নাম শুনলে বাবুভায়া করে হাসাহাসি গো
পুরুলিয়াবাসী...
আগুন জ্বালি ঝুড়িঝাঁটি ছমাস-লমাস পরের খাটি
পরের ক্ষেতে ধান ফললে লিজের রকম হাসি গো
পুরুলিয়াবাসী...
গাছের গুঁড়িটি জ্বলতে জ্বলতে নিভে গিয়েছে। কিন্তু ধোঁয়া উঠছে তখনও।
এখন সন্ধে হলে তাদের ঝুপড়ির সামনে একটা জুমড়া কাঠ জ্বেলে রাখে পাটন। যেটা রাতভর জ্বলতে থাকে। আলো জ্বলছে দেখলে ডুংরি থেকে বেজি, কটাস, হুড়াল ঝুপড়ির ভিতরে ঢুকতে সাহস পাবে না। তা ছাড়া সাপখোপ ঢুকলেও চোখে পড়ে যায়। অনেক সময় দিনের বেলাতেও ক্যাঁকলাস-গিরগিটি ঢুকে থাকে। বর্ষার সময়টাতে একদিন একটি পাহাড়ি চিতিকে পাটন তাদের ঘরের তালপাতার আড়াল দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে চমকে উঠেছিল।
জারমণি তখন ঘরে ছিল না। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সে ডুংরির ধারে ধারে ছাতু কুড়াতে বেরিয়ে পড়েছিল। আর পাটন ঝুপড়ির সামনে ক্রমশ ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া ছোট্ট জমিটি কোদাল দিয়ে কোপাচ্ছিল। ভুট্টা বুনবে বলে। কয়েক দিন ধরে কোদাল চালিয়ে মাটি সে তৈরি করে নিয়েছিল। সে ঝুপড়িতে ঢুকতে যাচ্ছিল জমিতে পোঁতার জন্য ভুট্টার বীজ আনতে। ঘরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে সে দেখতে পায় ওই দৃশ্যটি—সাপটি ততক্ষণে মুখ বের করে খুব শ্লথগতিতে ঝুপড়ির বাইরে বেরিয়ে যায়।
তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে আসে পাটনও। ঝুপড়ির পিছন দিকে গিয়ে সে দেখে সাপটি সরসর করে এগিয়ে চলেছে ভৃঙ্গ ঝাড়ের পাশ দিয়ে। পাটনের হাতে তখন কিছুই ছিল না। কোনো গাছের ডালও না। সে একটা পাথর তুলে ছুঁড়ে মারে। আক্রমণ টের পেয়ে সাপটি তীব্রগতিতে ঝুনঝুনি ঝোপে ঢুকে অদৃশ্য হয়ে যায়।
কিছুদিন পরে আবার আরেকটি ঘটনা। ডুংরির জমিতে তখন ভুট্টা গাছগুলি মানুষসমান। প্রতিটি গাছে দুটো-তিনটে করে পুরুষ্টু ভুট্টা হয়েছে। মাঝরাত্তিরের দিকে সেই ক্ষেত থেকে একটি শৃগাল এসে ঢোকে ঝুপড়িতে। সে চুপটি মেরে ঠায় বসে থাকে পাটনের হাঁটুর কাছে। শৃগালের গায়ের গন্ধে ঘুম ভাঙতে চমকে ওঠে পাটন। জারমণিকে জাগানোর সময়ও পায়নি। শৃগালটি ছুটে বেরিয়ে যায়। ডুংরির মাথায় উঠে নেমে যায় ওপারে।
পাহাড়-জঙ্গলে এমন ঘটনা অভাবনীয় কিছু নয়। এখানে থাকতে থাকতে তারা এসবের সঙ্গে দীর্ঘদিন হল অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তবু এখন রাতের দিকে ঘরের সামনে গাছের গুঁড়ি জ্বেলে রাখে। সমতল ভূমি থেকে অনেকটাই ওপরে, তাদের তালপাতার ঝুপড়িটির সামনে এই আগুন প্রহর জুড়ে জ্বলতে থাকে। এই আগুনই জানিয়ে দেয়—এখানে মানুষ বসতি করেছে।
আগে ডাঙা জমিতে কৃষিকার্যের ব্যাপারে পাটনের কোনো আগ্রহ ছিল না। ডুংরিতে ডুংরিতে সে তির ধনুক নিয়ে ঘুরে পাখি মারত। সাপখোপ মেরে বেড়াত। কোনো কোনো দিন গুচ্ছেক ব্যাং তার পরনের বস্ত্রখন্ডে লটপটিয়ে আনত।
জারমণি এসব পছন্দ করেনি। সে চায়নি, যে-পাহাড়ী-জংলী ভূমিতে তারা রয়েছে, সেখানকার পশুপাখিদের এমনভাবে হত্যা করতে। সে অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিল, যেদিন পাটন মস্ত একটি সরীসৃপকে তালগাছের গা থেকে তীরবিদ্ধ করে নামিয়েছিল। সে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল পাটনের ওপরে। তারপর থেকে পাটন এই চাষবাসে নেমেছে। তবে জারমণির নজর এড়িয়ে অনেক সময় পাখি, কাঠবেড়ালি মেরে পুড়িয়ে খেয়েও নেয়। যতই হোক ব্যাধের বংশধর তো। আত্মরক্ষার জন্য, বহি:শত্রুদের অতর্কিত আক্রমণ ঠেকাতে, এখনও সে তির-ধনুক হাতছাড়া করে না। জংলী জায়গায় থাকার কোনো বিশ্বাস আছে? কোন দিক থেকে কোন শত্রুর অতর্কিত আক্রমণ আসে?
তবে অল্পবিস্তর চাষবাস করাতে তাদের লাভও হয়েছে। ঘরে কিছুটা খাদ্য তো মজুত থাকে।
ভুট্টা ছাড়াও ওই ডাঙা জমিটিতে তারা অড়হরের চাষও করে। ভুট্টা ভালো হলে তা দিয়ে অনেকদিন চালিয়ে নিতে পারে। কিছুটা বিক্রি করে। জার-গ মোড়ে গিয়ে পাইকারকে দিয়ে আসে। বিক্রির পয়সায় নুন-তেল-চাল-আলু নেয়।
আবার কোনো দিন কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে গিয়ে পাটন দোকানিদের কাছে বিক্রি করে আসে। এখন হাটেও যেতে শুরু করেছে। তবে এখনও হাটে সে জারমণিকে নিয়ে যেতে সাহস করেনি। যদিও তাদের এই ঘটনা বহু বছর হতে চলল, তবু পাটন ঝুঁকি নিতে চায় না। যদি হাটের মাঝে পলপলের গ্রামবাসীরা লাঠি-টাঙি নিয়ে ঘিরে ধরে তাদের? কিংবা তার এই কুকীর্তির জন্য যদি অন্যান্য গ্রামের শবররা তাকেই আক্রমণ করে বসে? যদি বলে, ‘তুমি এই ভূমিজ বিটিছ্যেলাটিকে লুটে ভূমিজদের কাছে হামদের ইজ্জত গুচাঁয় দিয়েছ। তুমাকে হামরা আজ যখন পাঁইয়েছি, তখনকে ছাড়ব নাই। ডণ্ড দিব! গাছের সঙে বাঁইন্ধে মারব তুমাকে!’
তবে এই ভয় এখন সম্পূর্ণ অমূলক। তখন এটা নিয়ে গ্রামবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা ছিল। সে-সময় হয়তো এমন কিছু হলেও হতে পারত। কিন্তু এখন? সেই পুরনো মানুষজনও আর নেই। অনেকে গত হয়েছে। অনেকে ভুলেই গিয়েছে। আবার যারা মনে রেখেছে, তাদের মনেও আগের পারা সেই প্রতিহিংসা নেই। বললেও তারা এখন আর হুট-হাট মারধোর করতে যাবে না। এক গাঁয়ের মানুষ যদি মারধোর করে, তখনি অন্য গ্রামের মানুষও তো এগিয়ে আসবে? এখন তো তারা আর পলপলে কিংবা ডেলিকচাতে নেই। তারা নিজেদের মতো করে এই মাঠারিতে আছে। কারও সঙ্গে তাদের কোনো ঝঞ্ঝাট-ঝামেলা নেই। এমনকি, পাটন তো মাঠারির আশপাশের গ্রামবাসীদের সঙ্গে সয়দাপাতি কেনাকাটার সুবাদে একটা সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। যাতে তেমন কখনো কোনো প্রয়োজনে সে তাদের ডাকাহাঁকাও করতে পারে। বলতে পারে, ‘চল ভাই, তুমরা হামার হঁয়ে ডাং নিয়ে ডাঁড়াবে। উয়ারা হামদের মারধোর করতে আসছে।’
কিন্তু তারও কি সত্যিই কোনো প্রয়োজন আছে? ঘটনার সময় যখন কেউ তাদের কাছে এল না, এখন এত বছরের ব্যবধানে কি আর কেউ আসে? তাদের এই না-আসাতেও বোঝা যায়, ঘটনার রেশ আর নেই। মানুষ যে-যার পেট সামলাতে কাজেকর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাটন এভাবে নিজেকে বোঝায়। নিজেকে সে নিরুদ্বিগ্ন রাখে। বহি:শত্রুদের আকস্মিক আক্রমণের ব্যাপারে।
বরং সে এখন অনেক বেশি চিন্তিত নিজেকে নিয়ে। অথবা জারমণিকে নিয়ে। অথবা জারমণি এবং তার সম্পর্ককে নিয়ে। এই সম্পর্ক যে কী তা আজও তার কাছে পরিষ্কার হল না। যত দিন না সে জারমণির শরীরের সঙ্গে তার শরীর জোড়া লাগাতে পারছে, ততদিন এটা বলা যাবে না যে, জারমণি তার স্ত্রী, সে তার পুরুষ। তাতে জারমণিকে নিয়ে সে এখানে পালিয়ে এলেই কী, আর জারমণির সঙ্গে এক বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকলেই-বা কী? নিকটবর্তী গ্রামের মানুষ হয়তো তাদের এই জীবনকে বন্য দাম্পত্য জীবন বলেই জানে। কিন্তু পাটন তো খুব ভালো করে জানে তা আদৌ নয়। পাটন জারমণির সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া তো দূরের কথা, এখনও পর্যন্ত তার একটিও গোপন অঙ্গকে স্পর্শ করতে পারেনি—এমনকি, এই গহীন আরণ্যক পরিবেশে অনাবৃত অবস্থায় দেখারও সুযোগ পায়নি।
কী করেই বা পাবে? এখনও জারমণি যখন ওই কুমুদশোভিত সরোবরটিতে উলঙ্গ হয়ে সাঁতার কেটে অবগাহন সম্পূর্ণ করে, পাটন তখন তার দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে তির ধনুক হাতে প্রহরায় থাকে। সে কী করে দেখবে জারমণিকে? অথচ যদি সে সাহস করে একটি বার সেদিকে চেয়ে. থাকতে পারতো? তাহলে সহজেই তার চোখে পড়ে যেত ইরাবতীর ফটিক জলে হেলকানি দিয়ে মরালীর মতো খেলে বেড়াচ্ছে জারমণি। যেন স্বর্গের মানবী! অপ্সরা! সে দেখতে পেত সেই দুর্লভ অপার্থিব দৃশ্যটিও—মৃন্ময় ঘটের মতো তার উন্নত পীনপয়োধর-যুগল একবার ডুবছে আর একবার উঠছে। উলোটি পালোটি খাচ্ছে মৎসগন্ধা শরীর।
যদিও সে ঘটোন্ধি নয়। সেই আয়তলোচনার অতি-বিকশতি স্তনযুগল বিল্বফলের সঙ্গেই তুলনীয়। সে বিল্বস্তনী। রাক্ষসদৃষ্টিতে তার সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করা যায় না। তার দিকে নিষ্পলক নিরুত্তাপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হয়। যেভাবে লালশালুকের দিকে নিরবচ্ছিন্ন তাকিয়ে থাকে চাঁদ।
পাটন তা পারেনি। সেদিনও সে পারেনি, আজও সে পারেনি। এই এত-এত বছর ধরে তার জারমণির শরীরকে দেখতে না পারার অক্ষমতা যেভাবে নিজের কাছে তাকে নপুংসক প্রতিপন্ন করে দিয়েছে, সেটা ভাবতে গেলে তার নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয়। যেন জারমণিই সেই অদৃশ্য তির, যা তালগাছের ঢামনা সাপটির মতো বিদ্ধ হয়ে রয়েছে পাটনের শরীরে। এখন তাকে সে ঝাঁকুনি দিয়ে উপড়েও ফেলতে পারে না, আবার তিরবিদ্ধ হয়েও থাকতে পারে না।
তার এই অক্ষমতা কি শুধু তার নিজের কাছেই প্রকাশ হয়ে পড়েছে? জারমণিও কি টের পায়নি? পাটনের কাজেকর্মে, আচরণে? নাকি পাটনের সঙ্গে তার এই বিচিত্র সম্পর্ক বজায় রেখে সে দেখতে চায়—পাটন কতোটা পুরুষ? অথবা সে কি আদৌ পুরুষ নাকি নপুংসক? অথবা পাটন যদি নপুংসক নাও হয়ে থাকে, তাহলেও, এভাবেই সে এই রাক্ষসটিকে, এই চন্ডালটিকে—এই কামান্ধ পাটনকে নপুংসক করে রেখে নিজের দেওয়া অভিশাপকে নিজেই ফলিয়ে দিতে চাইছে? পাটন তা বুঝুক। পাটনই বুঝে দেখুক। জারমণি কিছু বলবে না। তাকে দেখে কিছু বুঝে ওঠাও মুশকিল।
জারমণি তো পাটনকে অভিশাপ দিয়েই ছিল। সে অভিশাপও ছিল তার পুরুষত্বহীন হওয়ার। পাটন এখন পদে পদে তা অনুভব করে না? তার মনে পড়ে না ডেলিকচার জঙ্গলে সেদিনের সেই গোধুলি লগন? পাটন যখন মরিয়া হয়ে উঠেছিল জারমণিকে লুন্ঠন করতে? তার শরীরকে স্পর্শ করতে? সে কামে লোভে জর্জরীভূত হয়ে, বাস্তবজ্ঞানশূন্য হয়ে যাবতীয় প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে গিয়েছিল রণরঙ্গিণী রমণীটির দিকে। জারমণি তখন তার হাতের ‘লাকডামুতা’ গাছের ডালটি দিয়ে পাটনকে উপর্যুপরি আঘাত করতে করতে প্রায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তবুও পাটন এতটুকু দমে যায়নি। সে টেনে ধরেছে জারমণির আলুলায়িত অঞ্চল। ক্রধোন্মত্তা জারমণির ভেতর প্রতিশোধের আগুন তখন গস গস করছে! অসহায় জারমণি বিদ্বিষ্ট নয়নে সেই নিপট-কপট-নরাধমের দিকে তাকিয়ে, তার বামহস্তপ্রলম্বিত করে বলে যেতে লাগল, ‘তুমি অক্ষম! তুমি দন্ডার্হ! তুমি রজোদর্শনকালে অসতর্ক নারীর যোনিদেশে উঁকি মেরেছ। তুমি পুরুষের ধর্মচ্যুত হয়েছ! নিন্দ্য তুমি! অভিসম্পাতযোগ্য তুমি! পরজন্মে তুমি অন্দরমহলের খোজা-প্রহরী হয়ে করুণ জীবন কাটাবে। —শোন তোমরা! শোন! হে ক্রন্দসী! হে আকাশ-আশমান, ডুংরি-পাহাড় আর অরণ্যের বিরুৎ-গুল্ম-বৃক্ষ। তোমরা প্রত্যেকে শুনে রাখ! আমি অভিসম্পাত দিচ্ছি—’ সে পাটনের দিকে তার তর্জনী উঁচিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘তুই নপুংসক হবি! নপুংসক হবি! নপুংসক হবি!’
প্রতিধ্বনি উঠল সারা জঙ্গল জুড়ে। আম্রাতক ও বরুণ বৃক্ষের ডালে ডালে কলরব করে উঠল যত পাখির দল। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে গেল ভৃঙ্গরোল। কয়েক দন্ডের জন্য গোটা তল্লাট নিশ্চুপ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
পাটনের মনে পড়ে না সেই অবিস্মরণীয় দৃশ্য?
পাটন এখন বুঝে গেছে এই নারীই মোহিনী। সে ছলনা করে পাটনকে তার সঙ্গে বেঁধে রেখে আসলে সে তার দেওয়া নিষ্ঠুর অভিসম্পাত চরিতার্থ করে তুলতে চাইছে। এভাবেই সে প্রতিশোধ নিতে চাইছে তার। পাটনকে দিয়েই সে পাটনের নপুংসকতা উপলব্ধি করাতে চাইছে। সে বুঝুক যে, একদা জারমণি তাকে যে অভিসম্পাত দিয়েছিল, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে উঠেছে তার জীবনে। তার পৌরুষ থাকা সত্ত্বেও সে নপুংসক। জারমণির কাছে। জারমণি তার কোনো পৌরুষকেই পৌরুষ বলে স্বীকার করে না। জারমণির চোখে সে নিন্দ্য। সে দন্ডার্হ। সে অক্ষম। ক্ষমা করা তো দূরের কথা, জারমণি এভাবেই পাটনকে তার অপরাধের, তার কৃতকর্মের দন্ডে দন্ডে দন্ড দিয়ে চলেছে।
যদিও পাটন আজও মনে করে না যে, সে কোনো নিন্দনীয় কাজ করেছে, কোনো অপরাধ করেছে। তাহলে কেন তার এই অমানবিক শাস্তি? জারমণির চোখেই বা সে কেন আজও ক্ষমার অযোগ্য, তাও তার বোধগম্য হয় না। তাই সে বিভ্রান্ত। সে চঞ্চল। সে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। এই নিষ্ঠুর দুর্বোধ্যতা সে আর বহন করতে পারছে না। তার পক্ষে তা এখন চূড়ান্ত এবং অসহ্য হয়ে উঠেছে। সে এর একটা বিহিত চায়।
কিন্তু কী বিহিত? যদি সে জেনে যেত যে, জারমণিকে সে কোনো দিনই পাবে না, যেভাবে সে তাকে পেতে চাইছে— যেভাবে একজন পুরুষ তার নারীকে কাছে পেতে চায়— তাহলেও সে একদিক দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে পারত। আবার যদি সে এটাও জেনে যেত যে, জারমণি অন্য কারও নয়, সে পাটনের। পাটন তাকে আজ না পেলেও কাল পাবে, তাহলেও সে একরকমভাবে নিজেকে আশান্বিত করে রাখতে পারত। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এর কোনোটাই যে নয়। তাই সে এমন কিছু একটা করে ফেলতে চাইছে, যাতে এই মায়া থেকে, এই আপাত রজ্জুহীন অবিচ্ছেদ্য বন্ধন থেকে সে চিরতরে নিজেকে মুক্ত করতে পারে। মুক্ত করে দিতে পারে জারমণিকেও—তার জীবন থেকে, জীবনের এই অনির্দিষ্ট অমীমাংসিত পথরেখা থেকেও।
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ জেগে ওঠে পাটন। চোখের পাতা খুলতেই তার চোখ ঠিকরে যায়। ভাদ্রের চাঁদ সারা আকাশ জুড়ে কোটালের মতো ধনুক হাতে খেলা করছে। ভুট্টার দানার মতো পূর্ণিমার সেই উজর আলো, তাদের চালার ফাঁকে ফাঁকে, তালপাতার ঘরের ভিতরে উপচে পড়েছে।
পাটন কিছু একটা খুঁজতে এদিক-ওদিক হাতড়ে বেড়ায়। খড়খড় শব্দ হয়। সে বের করে আনে কবেকার সেই বুচাটাঙি। তারপর সেটাকে নিজের মুখের কাছে ধরে সে আপনমনে বিড়বিড় করে বলতে থাকে, এই সেই জিনগা-মাঈয়ের বুচাটাঙি, যাকে জারমণি একদিন পুকুরের জলে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিল। সেই অস্ত্রই সেদিন কুড়িয়ে রেখেছিল পাটন। সে বলেছিল, পুরুষের হাতে অস্ত্রের প্রয়োজন পড়তে পারে। আজই সেই প্রয়োজনের দিন। সে বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, দূরদর্শী। সেদিনই সে বুঝতে পেরেছিল—কোনোদিন না কোনোদিন এই সর্বদর্শী নির্বাক হাতিয়ারটি তার হয়ে কথা বলবে। অস্ত্র মানুষ নয়। মানুষ নয় বলেই সে প্রবঞ্চনা জানে না। বিশ্বাসঘাতকতা জানে না। সে সত্যনিষ্ঠ। সঙ্কটের দিনে যে তাকে ধারণ করে, সে তার হয়েই প্রতিপক্ষকে আঘাত হানে। আজ এই অস্ত্রের প্রতিটি আঘাতে অবসান হয়ে যাবে তার প্রতিটি দ্বন্দ্ব ও সংশয়ের। যে-কামনা তার শরীর জুড়ে শিহরণ আনে, শরাবনের বহির মতো বইতে থাকে, সেই কামনার নিবৃত্তি ঘটাবে সে শোণিতপ্রবাহের ভিতর দিয়ে। জারমণির যে-মুখশ্রীতে সে চন্দ্রাবস্থান দেখত, এখন সেই মুখশ্রীকে সে আঘাতে আঘাতে কদর্য, কুৎসিত করে দেবে! তাকে ঘুঁটের মতো কুদর্শনা করে ছাড়বে! মধুকলসের ন্যায় যে-বক্ষযুগলকে সে অনাবৃতাবস্থায় চোখের দেখা দেখতে চেয়েছে আর স্বপ্নে বহুদিন বহুভাবে তাকে চুম্বন ও চোষণ করেছে, আজ সেই কলসকে সে বুচাটাঙির কোপে-কোপে খাপ্তাডাঙা করে ছাড়বে। আর যে-চিম্পিত নাভিকুন্ডের সঙ্গে তার নাভি এবং জঘনাঞ্চলের সঙ্গে তার জঘন লিপ্ত করে দিয়ে সে জারমণির সঙ্গে নিজের শরীরের শঙ্খ লাগানোর ভাবনায় বছরের পর বছর ধরে নিরলস বিনিদ্র নিশিযাপন করে গেছে, আজ সে-সংযোগের সম্ভাবনাকে সে চিরতরে লুপ্ত করে দেবে! সে তার প্রতিটি অমানবিক অস্ত্রাঘাতে জারমণির ওই গোপনাঙ্গটিকে শতদলের শতখন্ডিত পাপড়ির মতো করে ছাড়বে! যাতে ভবিষ্যতে আর কোনওদিন কোনো চাঁদের সঙ্গে তার প্রেমনিবেদন না হয়। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন কোনো পুরুষের সঙ্গে তার নারী অঙ্গ জুড়ন না যায়। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন কোনো পাটন শবর এভাবে এমন একটি নারী-শরীরের জন্য যুগ যুগ ধরে নিরন্তর হাহাকার না করে।—বলতে গিয়ে চোখ তার ছলছল করে ওঠে। তার মনে পড়ে যায় ডেলিকচা গ্রামে এমন একটি রাতের কথা...
সেদিনও আকাশে ছিল পূর্ণিমার চাঁদ। জারমণির ঘরের শিকল খুলে সে ঢুকে পড়েছিল নিদ্রাচ্ছন্না নারী-শরীর উন্মোচন করে দেখতে। তবে সেদিন তার হাতে কোনো হাতিয়ার ছিল না। ঘরের বাইরে গাছের গুঁড়িও পুড়ছিল না। বরং সেদিন কাষ্ঠদহনের চেয়েও শতগুণ অগ্ন্যুত্তাপ ছিল তার শরীর জুড়ে। ছিল কামের সর্বগ্রাসী আগুন। আজ সেই আগুন, অন্তত এই মুহূর্তে, নির্বাসিত! সেদিন সে জারমণির গোপনাঙ্গ দেখতে উৎকন্ঠিত হয়ে পড়েছিল। আর আজ? সে তাকে ধ্বংস ও অবলুপ্ত করে দিতে মরিয়া।
হাতের বুচাটাঙিটিকে পাটন আলো-আঁধারিতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে আর ভাবতে থাকে জারমণির অন্তিমক্ষণটির কথা। তার দুচোখে চিক চিক করছে বহু বছরের প্রাচীন অশ্রু। সে তার কাতর দৃষ্টিতে শেষবারের মতো দেখে নিতে চায় জারমণির সেই নিরুপম মুখশ্রী। আর অতি বাস্তব হয়ে সে চেষ্টা করে সেই মুখকে অলঙ্কারবর্জিত নিছক একটি সাধারণ নারীর মুখ কল্পনা করে দেখতে। সে চেষ্টা করে, এতদিন ধরে তার প্রতিটি অঙ্গকে যে এত-এত উপমায়, উৎপ্রেক্ষায় সাজিয়ে তুলেছিল, সেইসব চাপানগুলিকে একে একে ফিরিয়ে নিতে। সে ভাবতে চেষ্টা করে—জারমণির এই মুখ একটি নারীর মুখ মাত্র। তা চাঁদ নয়। জারমণির বক্ষদেশ — যেকোনো নারীর বক্ষদেশের মতোই। তা কখনোই বিল্ব নয়, কনককলস নয়— কিছুই নয়। কিন্তু নাহ, পাটন সেভাবে ভাবতেই পারে না। সে যতবারই তার দিকে তাকায়, তার চিন্তায় কল্পনায় সমস্ত নৈসর্গিক অলঙ্কার ভিড় করে আসে এই অমর্ত্য সুন্দরীকে ঘিরে। আর সে ভাবতে গিয়ে অন্য এক ভাব-জগতে অন্তর্লীন হয়ে যায়। আবেগে আপ্লুত হয়ে সে অস্পষ্ট কন্ঠে শুধু একটিই শব্দ বারে বারে আওড়ে চলে, ‘জারমণি! জারমণি!’ তার হাত থেকে খসে পড়ে যায় অস্ত্র।
জারমণির ঘুম ভেঙে যায়। সে পাটনের চোখে জল দেখে বিচলিত হয়ে ওঠে। বলে, ‘কী বঠে? কী হঁয়েছে তোর? বলবি ন?’
পাটন বলতে পারে না। সে তৎক্ষণাৎ তালপাতার ঘরটি থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। ভুট্টা ক্ষেতে — গাছে গাছে তখন চাঁদের আলোর বান ডেকেছে। টিলার ঢালুতে হেলে থাকা পলাশ গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে, পাটন, চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের কোল থেকে গড়িয়ে যায় দ্বিধান্বিত অশ্রুর ফোঁটাটি।
অঙ্গদের এখানে আর থাকতে ভালো লাগছিল না। চারপাশে বড়োবেশি হইচই। চিৎকার-চেঁচামেচি।
এই জায়গা ছেড়ে ওই নদীতীরে নিরিবিলি জায়গায় যাওয়া যায় না, যেখানে অন্তত শান্তিতে দুদন্ড বসা যায়? অঙ্গদ জিজ্ঞেস করে। বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! এই বাজার-স্থল বড়োই কোলাহলময়। মানুষ এখানে কলহরত। তাহাদের ভাষা কর্কশ, ভঙ্গি উত্তেজক। এই কোলাহল হইতে শীঘ্রই অন্যত্র প্রস্থান করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! নিজের কথা ভাবিয়া সামান্য কারণেই পলায়নমুখী হইও না। প্রতিটি ঘটনায় নিজেকে প্রত্যক্ষদর্শীরূপে উপস্থিত রাখিতে চেষ্টিত হও। ঘটনার আপাত সত্য নহে, অভ্যন্তরীণ প্রকৃত সত্যকে অন্বেষণের প্রয়াস কর। ভাবিয়া দেখ, যাহাকে তুমি নিছক কোলাহল কহিতেছ, তাহা কি সত্যই কোলাহল? মনুষ্য কোলাহল করিয়া তাহাদের সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই করিতেছে। তাহারা ন্যায্য দামে ন্যায্য বস্তু চাহিতেছে। লোকজগতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই সত্যপ্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্ব অনবরত চলিতেছে। তাহা হইতে নিজেকে বিমুখ করিও না।’
অঙ্গদ নিজেকে সংযমী করে। নিজের ভুলও বুঝতে পারে সে। তার মনে যে এখনও অধ্যবসায়ের অভাব রয়েছে তা অনুভব করে। সহানুভূতির সঙ্গে ওই ক্রেতাটির কথাও তার ভাবা উচিত, যে ওজনে একটি কি দুটি কচু কম পেয়েছে বলে হাটের মাঝে এত এত লোকের সামনে ক্রেতার সঙ্গে বিবাদে নেমে পড়ল। যদিও এটাকে বিবাদ বললে সংকীর্ণ করা হয়। বস্তুত, এটাই হল সত্যপ্রতিষ্ঠার লড়াই। কোনো মানুষের কাছে দুটি কচুর কোনো মূল্য নাও থাকতে পারে, কিন্তু ওই বিত্তহীন মানুষটির কাছে ওই সামান্য জিনিসটিরই মূল্য অনেক বেশি। দারিদ্র্যকে তুচ্ছজ্ঞান না করে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা দেখা দরকার।
ভোজন শেষে তারা উঠে পড়ে। নদীতে নেমে হাতমুখ ধুয়ে নেয়। আঁজলায় আঁজলায় পেট ভরে জল খায়। তারপর পাড়ে উঠে আসে তারা। গাড়িতে বসে।
নদীর পাড় বরাবর তাদের গাড়ি হেলেদুলে এগোতে থাকে। নদীর ফুরফুরে মিহিন বাতাস গায়ে লাগে। একটু ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা ভাব। শীত পড়তে আর বেশি দিন নেই। বাঁদিকে নদী আর ডানদিকে পাথুরে-কাঁকুরে মাঠকে রেখে তারা এগিয়ে যায়। গো-শকটে ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ হয়। পাথর মাড়িয়ে যাওয়ার। আরও খানিকটা এগোনের পর দেখা যায় জায়গায়-জায়গায় খাদ করা রয়েছে। খাদ কেটে বের করা হয়েছে পাথর। বেরিয়ে পড়েছে লালমাটি। যতদূর চোখ যায়, সারা মাঠে একবিঘৎ করে বেরিয়ে আছে কুড়ুল চটানো গাছের গুঁড়ি। এখন সেই গুঁড়িগুলিতে কচি পাতা নিয়ে সরু সরু ডাল বেরিয়ে আসছে সোনাঝুরির। ডাক দিতে দিতে লম্বা ঠ্যাং নিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে কাদাছেঁচি পাখি। নির্জন জায়গায় মানুষ দেখলে এমনি ডাকতে থাকে তারা। উড়েও যায় না। মাথার উপরে চক্কর দিয়ে ডেকেই চলে।
গো-শকটে খড়ের গাদায় বসে থেকে বিরাট নীল আকাশটিকে তখনি নজরে পড়ে যায় অঙ্গদের। মন্থর গতিতে ভেসে যাচ্ছে ক্ষীণ মেঘ। যেন কোনো বাগাল ছ্যেলা আকনগাছের ফলগুলি ডাং মেরে ফাটিয়ে ফাটিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে ভেতরকার তুলো। খড়ের গাদার উপরে বসে অস্ত্রটি উঁচিয়ে রেখে, সেদিকেই চেয়ে থেকে অঙ্গদ। আর ভাবতে থাকে অদৃষ্টপূর্ব মনোরম এই লোকজগৎ নিয়ে।
সত্যিই এই জগদ্দর্শন তার জীবনে স্বতন্ত্র এক অভিজ্ঞতা নিয়ে এল। শুধু অভিজ্ঞতাই নয়, তা দিন দিন ভেতর থেকে আমূল পালটে দিচ্ছে তাকে। কতৌ দিন ধরে কতৌ মানুষকে সে দেখে চলেছে! কত কত ঘটনার যে সে প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে থাকছে! এর কোনো অন্ত নেই। যদি তার ভেঙে পড়া ধ্বস্ত ও নৈরাশ্যপূর্ণ জীবনে একদা এই গাড়োয়ানকে সে না পেত, তাহলে প্রকৃত মানবদর্শনও অধরাই থেকে যেত তার। জীবনও থেকে যেত অপূর্ণ। জ্ঞানবিনা জীবন কখনও পূর্ণতার দিকে যায় না। সে-বেঁচে থাকাও হয় খন্ডিত বেঁচে থাকা।
তবে এটা ভাবলে ভুল হবে যে, লোকদর্শন সতত সুখদ, আনন্দদায়ক। তা কিন্তু নয়। বিশেষ করে, অনুভূতিপ্রবণ মানুষের কাছে বরঞ্চ তা যতটা না সুখানুভূতির উদ্রেক করে, তার চেয়ে ঢের বেশি হৃদয়মন্থন করে বেদনাকে তুলে আনে। তখন বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসতে চায়। মনে হয়, এ আমি কী দেখছি! কেন দেখছি! জরা-ব্যাধি-মৃত্যু নিয়ে এই করুণ পৃথিবীতে কত মানুষ কত রকমভাবে যে কাঁদছে! কেউ সন্তান না পেয়ে কাঁদছে, কেউ সন্তান পেয়েও কাঁদছে। কেউ দারিদ্র্যের কারণে কাঁদছে, কেউ প্রাচুর্যের কারণে কাঁদছে। কেউ কেউ বাঁচতে চেয়ে কাঁদছে, কেউ ঘাটের কাছে বসে মৃত্যুর জন্য অশ্রুপাত করে চলেছে। নিজের হৃদয়াবেগকে তখন আর সংযত রাখা যায় না। মনে হয় শত-শত কোটি কোটি মানুষের মর্মন্তুদ বেদনায় যে মাটি সিক্ত হয়ে রয়েছে, আমি কি সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে রয়েছি! এ আমি কোথায় এলাম! মা, মা-গো! আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে!
কিন্তু ফিরিয়ে নেবার তো উপায় নেই। এখানে এই জগতে যা-যা আছে, যা-যা নেই সবকিছুকেই স্বীকার করে নিতে হবে। আর তারপর এই সবকিছু থেকে উদ্ধার করতে হবে নিজকে। সমগ্র মানবকে। তাই এমন কোমল হৃদয়াবেগ নিয়ে ভেঙে পড়লে চলবে না। সুখে ও শোকে নিজেকে অটল অভিন্ন রাখতে হবে। যা অনিবার্য, যা অবশ্যম্ভাবী তার জন্য মনকে বিষাদাচ্ছন্ন করা অজ্ঞতা। গঞ্জের বাজারে কসাইয়ের নিষ্ঠুর হাতে নিরীহ ছাগটি বলি হতে দেখে, গো-শকটের উপর থেকে চেঁচিয়ে উঠেছিল অঙ্গদ। মহাপ্রবীণ তাকে নির্বিকারচিত্তে বলেছিলেন, ‘বৎস! উতলা হইও না। জগতে সমস্ত পশুই বধ্য।’
এখন আর সে-বিষণ্ণতা নেই অঙ্গদের। তার হাতে ধরা এই অস্ত্রটিও তো তাকে এই শিক্ষাই দিচ্ছে। যুদ্ধ করো, কিন্তু ধর্ম রক্ষা করো। অধর্ম দিয়ে কখনও নিজেকে কলুষিত করো না। অপবিত্র করো না। মনের পবিত্রতার নামই পূজা।
‘পবিত্র’ নিয়ে ভাবতেই, অঙ্গদের মাঠারির কথা মনে পড়ে যায়। মাঠারি। পবিত্রভূমি মাঠারি। আজ যা পবিত্রভূমি, কাল তা-ই কি যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তরিত হবে? অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! মাঠারিকে আপনি ‘পবিত্রভূমি’ বলিয়াছেন? কী কারণে মাঠারি পবিত্রভূমি তাহা জানাইয়া আমাকে ধন্য করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! নানাবিধ কারণে মাঠারিভূমিকে পবিত্র মাঠারিভূমি বলিয়া জানিবে। এই মাঠারিভূমির কুমুদশোভিত ইরাবতী সরোবরে উষালগ্নে দেবতারা অবগাহন করেন। আজ পর্যন্ত এই মাঠারিভূমিতে একবিন্দু অধর্ম রক্তপাত হয় নাই। এই ভূমিতে বিচরণকারী পশুপক্ষি-পতঙ্গ-সরীসৃপ আত্মরক্ষার তথা প্রতিহিংসার বিষ বহন করে না। এখানকার নৈসর্গিক শোভা একমাত্র নন্দনকাননের সহিত তুলনীয়। এখানকার মৃদুমন্দ মলয় সর্বদা বহু বিচিত্র পুষ্পের সুবাস এবং মৌচাকস্থ মধুর গন্ধ বহন করিয়া বেড়ায়। এই ভূমিতে কখনো কোনো যুদ্ধাস্ত্র পতিত হয় নাই বলিয়া ভূমির উর্বরাশক্তি অদ্যাবধি বিনষ্ট হয় নাই, খরা ও অজন্মার প্রকোপ ঘটে নাই। এই সেই পবিত্র মাঠারিভূমি, যেখানে ধর্মকে দমন করিয়া অধর্মের উত্থান ঘটিতে পারে নাই। অধর্ম শোক, অধর্মই অন্ধকার।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আপনি একদা বলিয়াছেন, মানুষ নিজেই নিজের শোকে বিহ্বল। তাহা হইলে মানুষ কেন তাহার শোক হইতে উত্তীর্ণ হইবার চেষ্টা করে? আপনার বিচারে কোন জন শ্রেষ্ঠ?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে প্রত্যয়ী! আমি বলিয়াছি আত্মার দ্বারা আত্মাকে উদ্ধার করিবে। আত্মাকে অবসন্ন (পতিত) করিবে না। আত্মাই আত্মার বন্ধু, আত্মাই আত্মার শত্রু। নিজের চেষ্টার দ্বারা নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতি করিবে—অবনতির গহ্বরে নিজেকে ফেলিয়া রাখিবে না। যে নিজ চেষ্টায় আত্মজয়ী হইয়াছে, সে নিজের বন্ধু, যে হয় নাই সে আত্মঘাতক। আমি এইরূপ মত পোষণ করি।
‘সর্বদা অন্তঃকরণকে বশীভূত কর। তবেই তুমি জিতাত্মা পুরুষ হইতে পারিবে। জিতাত্মা পুরুষের আত্মা শীতে ও উষ্ণতায়, সুখে ও দুঃখে এবং মানে-অপমানে সমাহিত বা নির্বিকার থাকে। যোগী তিনিই, জিতাত্মা তিনিই, তিনিই শ্রেষ্ঠ, যিনি লোষ্ট-প্রস্তর-কাঞ্চনে সমদর্শী। তিনি শত্রু-মিত্র-বন্ধু-সুহৃৎ-উদাসীনদ্বেষ্য এবং মধ্যস্থর প্রতি, সাধুগণের প্রতি তথা পাপিষ্ঠদের প্রতি সমভাবাপন্ন।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! মিত্র, বন্ধু, সুহৃৎ কি সমার্থক নহে? মধ্যস্থ ও উদাসীন কাহাকে বলিতেছেন? ‘লোষ্ট্র’ শব্দের অর্থ কী? ‘লোষ্ট্র-প্রস্তর-কাঞ্চনে সমদর্শী’ বলিতে আপনি কোন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! মিত্র-বন্ধু-সুহৃতের মধ্যে কিঞ্চিত অর্থের তারতম্য রহিয়াছে। ‘মিত্র’ অর্থে স্নেহবান জানিবে, ‘বন্ধু’ অর্থে হিতাকাঙ্ক্ষী প্রিয়জন জানিবে এবং ‘সুহৃৎ’ হইল যে-উপকারী প্রত্যুপকারের আশা করে না। ‘মধ্যস্থ’ বলিতে তাহাকে বুঝিবে, যে বিরুদ্ধ উভয় পক্ষের হিতৈষী আর ‘উদাসীন’-এর অর্থ হইল যে কোনো পক্ষ অবলম্বন করে না। অর্থাৎ নিরপেক্ষ। অতঃপর ‘লোষ্ট্র-প্রস্তর-কাঞ্চনের’ প্রসঙ্গে আসিতেছি। ‘লোষ্ট্র’ হইল ঢিল বা শক্ত মাটি, ইট প্রভৃতির খন্ড। যে-মানুষ স্বর্ণখন্ডকে ইট-পাথরের খন্ড অপেক্ষা অধিক কিছু মনে করেন না তিনিই প্রকৃত সুখী। তাঁর আত্মা কখনো শোকাচ্ছন্ন হয় না। তিনিই শ্রেষ্ঠ যোগী পুরুষ। যোগী পুরুষ লোভকে দমন করেন। যাহা পাওয়া যায় তাহাতেই নিজেকে সন্তুষ্ট রাখেন। সুখদুঃখাদিতে অবিচলিত, বিদ্বেষহীন, সিদ্ধি-অসিদ্ধিতে সমভাবাপন্ন হইয়া থাকেন। তাহার ফলে কর্ম করিলেও কর্মের মোহে জড়াইয়া পড়েন না। কায়-মন-বুদ্ধি—কেবল ইন্দ্রিয়গণ দ্বারা কর্ম করেন। আত্মাকে নির্লিপ্ত রাখেন। তুমিও সেই রূপ চিত্তে কর্মাচরণ কর—কর্ম করিয়াও আত্মাকে নিষ্ক্রিয় রাখ। আবার আত্মার নিষ্ক্রিয়তা সত্ত্বেও কর্ম করিয়া চল। জ্ঞানরূপ অগ্নি দ্বারা কর্মফলের প্রতি আসক্তিকে ভস্মীভূত কর। কর্মফলাশাশূন্য, সংযতচিত্ত, তথা অনাসক্ত মনে কর্ম করিলে জলদ্বারা পদ্মপত্র যেমন সিক্ত হয় না, তেমতি তুমিও পাপগ্রস্ত হইবে না।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! এই বিশাল লোকজগতে কী পাপ আর কী পুণ্য তাহা কী করিয়া বুঝিব? কী রূপে তাহা নির্ণীত হয়? জ্ঞান দ্বারা কি পাপের খন্ডন সম্ভব?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! সৎকর্মের প্রতিকূলতাই পাপ আর অসৎকর্মের প্রতিকূলে যাহা-যাহা সংঙ্ঘটিত হইয়া থাকে, তাহাই পুণ্য জানিবে। সাধুপুরুষেরা কদাচ পাপকর্মের অনুষ্ঠান বা আনুকূল্য করেন না। তুমিও ইহা ভুলক্রমেও করিবে না। অধিকন্তু জানিয়া রাখ—জ্ঞান দ্বারা অবশ্যই পাপের খন্ডন সম্ভব। যদি সর্বপাপী অপেক্ষা তুমি পাপিষ্ঠ হইয়া থাক, তথাপি জ্ঞান-তরণী দ্বারা সর্বপাপ পার হইবে। যেমন প্রদীপ্ত অগ্নিতে কাষ্ঠসমুদয় ভস্মসাৎ হয়, সেইরূপ জ্ঞানাগ্নি সর্বকর্মের আসক্তিরূপ বন্ধনকে ভস্মসাৎ করে। ইহলোকে জ্ঞানের ন্যায় পবিত্র কিছুই নাই। জ্ঞান হইল সেই তরবারি যাহার দ্বারা সংশয়রূপ অন্ধকারকে বিখন্ডিত করিয়া দূর করা যায়।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! মনে হইতেছে, কর্মের সন্ন্যাস এবং কর্মযোগ বিষয়েও এখনও আমার আশানুরূপ বুৎপত্তি হয় নাই। এই দুইয়ের মধ্যে কোন আচরণ শ্রেয় তাহা আমাকে সুনিশ্চিত করিয়া বলুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! সন্ন্যাসের অর্থ হইল—আসক্তির আশঙ্কায় কর্মবর্জন। এহেন সন্ন্যাসমার্গ বা সাংখ্য অপেক্ষা কর্মযোগমার্গ শ্রেষ্ঠ। যিনি ঈর্ষা করেন না, আবার আকাঙ্ক্ষাও করেন না—এইরূপ পুরুষ কর্ম করিলেও তিনি সন্ন্যাসী। যাঁরা অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন তাঁরা সাংখ্য (সন্ন্যাসমার্গ) ও যোগ (কর্মযোগমার্গ) পৃথক বলিয়া থাকেন। পন্ডিতরা তাহা বলেন না। তুমি সন্ন্যাস ও যোগকে অভিন্ন জানিবে। তবে কর্মযোগ বিনা সন্ন্যাস পাওয়া দুঃখজনক।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! অতঃপর মিথ্যা কী, সত্য কী, সত্যের গুরুত্ব কতটুকু তাহাও জানার প্রবণতা আমার ক্রমে বৃদ্ধি পাইতেছে। আপনি সে-সম্পর্কে কতিপয় বাক্য নিবেদন করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অনুসন্ধিৎসু! অতঃপর সত্য-মিথা বিষয়ক যাহা বলিতেছি তাহা শ্রবণ কর। মিথ্য বা অনৃত হইল আত্মপ্রতারণার প্রকাশ। ইহাকে পাপ বলিয়া জানিবে। সত্য হইল ন্যায় ও ধর্মের অভিব্যক্তি। ইহা সর্বদা সদাচার বলিয়া জানিবে। লোকজীবনে সত্যের গুরুত্ব ততখানি, যতখানি তালচোঁচ পক্ষির কাছে তালবৃক্ষের গুরুত্ব অথবা মীন-এর কাছে জলাশয়ের গুরুত্ব। অধুনাকালে ইহা মনে রাখিলেই যথেষ্ট। যদিও আধুনিক-পূর্বকালে সত্যের গুরুত্ব আরও অধিক ছিল। সত্যপ্রতিপালন শ্রেষ্ঠ আচরণ বলিয়া বিবেচিত হইত। কিন্তু আজিকার লোকসমাজে সত্য সম্পর্কিত সেই শ্রদ্ধায় অশ্রদ্ধার ছায়া পড়িয়াছে বিবিধ কারণে।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আধুনিক-পূর্বকালে সত্যপ্রতিপালন কতখানি শ্রেষ্ঠ আচরণ ছিল তাহা জানিতে ইচ্ছা করি। আজিকার লোকসমাজে তাহা অচল হইলেও বর্ণন করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! তৎকালীন সময়ে সমাজকল্যাণমূলক যাবতীয় কর্ম সম্পাদন করা অপেক্ষা সত্যপ্রতিপালন শ্রেষ্ঠ আচরণ বলিয়া বিবেচিত হইত। বলা হইত যে, শত শত কূপ খনন করা অপেক্ষা এক পুষ্করিণী প্রস্তুত করা শ্রেষ্ঠ, শত শত পুষ্করিণী খনন করা অপেক্ষা এক যজ্ঞানুষ্ঠান করা শ্রেষ্ঠ, শত শত যজ্ঞানুষ্ঠান অপেক্ষা এক পুত্রোৎপাদন করা শ্রেষ্ঠ। এবং শত শত পুত্র উৎপাদন অপেক্ষা এক সত্য প্রতিপালন করা শ্রেষ্ঠ। একদিকে সহস্র অশ্বমেধ ও অন্যদিকে এক সত্য রাখিয়া তুলনা করিলে সহস্র অশ্বমেধ অপেক্ষাও সত্যের গুরুত্ব অধিক।’
অঙ্গদ বলে ‘হে মহাপ্রবীণ! আজিকার লোকসমাজে সত্যের প্রতি এই শ্রদ্ধায় কী কারণে অশ্রদ্ধার ছায়া পড়িয়াছে?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! সমাজ এখন তমো গুণ দ্বারা আক্রান্ত। তাহার ফলে মনুষ্য অনাচার, অধর্ম, অসত্য পালন করিতে কুন্ঠিত নয়, অনুতপ্তও নহে। এখন মনুষ্য আত্মোন্নতি চাহে না। তাহারা রিপুসর্বস্ব দৈহিক উন্নতি চাহে। পার্থিব সুখ চাহে। তাই সর্বপ্রকার আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে দমন করিয়া অসত্য ও অধর্ম সমাজের সর্বস্তরে প্রবলাকার ধারণ করিতেছে।’
অঙ্গদকে আত্মমগ্ন দেখায়। মুখে কোনো কথা নেই। মহাপ্রবীণের কথাগুলির সত্যতা নিয়ে সে চিন্তা করে। সে দেখতে পায় কীভাবে সমাজের বিভিন্ন ঘটনায়, মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের ভেতর দিয়ে প্রামাণিক হয়ে উঠছে তাঁর তাত্ত্বিক মন্তব্যগুলি। ফলে এই তত্ত্ব নেহাতই আর তত্ত্ব হয়ে থাকছে না, তা হয়ে উঠছে মানুষের আচরিত সত্য।
কথা বলতে বলতে তারা অনেকদূর এগিয়ে আসে। সেই পাথুরে মাঠ পেরিয়ে গেছে। বাঁদিকে নদীকে রেখে আরও অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে লোকালয়ের দিকে। দূরে দূরে ছোটো ছোটো গ্রাম। এখান থেকেই চোখে পড়ে। কখনও কাঁটাওলা লম্বা লম্বা বেউড় বাঁশের ঝাড়ে কিংবা পড়াশির জঙ্গলে কুঁড়েঘরগুলি আড়াল হয়ে যায়। গাড়ি তখনও এগিয়ে চলে।
অঙ্গদ তখনও দুলুনি খেতে খেতে যেতে থাকে। শরীরের দুলুনিতে দুলে উঠতে থাকে তার আশমানমুখী সঙ্গীনটি। হাওয়ায় দুলছে ভরা ক্ষেতের ধানও। গো-শকটের চাকার শব্দে হঠাৎ হঠাৎ ধান ক্ষেত থেকে উড়ে যাচ্ছে তালচটির ঝাঁক। ঝোপের আড়ালে ঢুকে পড়ছে ধুরবুল্লি। এই পাখিটি এতই ছোটো, রং এতটাই মেটে মেটে যে সামনে থাকলেও চোখে পড়ে না। ধূলোর সঙ্গে মিশে থাকে। খর্খর-খর্খর করে ডানায় ধুলো মেখে উড়াল দেয়।
ঝিঁঝি ডাকছে বাবলা গাছে। দূরের ‘শাঁকবাইদ’-এর শালবনের দিক থেকে ভেসে আসছে গ্রামবাসীদের কলবর। কথোপকথন।
ক্রমশ সেই সোরগোল বাড়তে থাকে। নারীকন্ঠের কান্নাও কানে আসে। লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে গাড়োয়ান সেদিকেই নিয়ে যেতে থাকে তার গাড়ি। একপাশে থেকে গেল বড়োবাঁধ। বাঁধ পেরিয়ে ক্যাটলাপুর। অঙ্গদ উৎকর্ণ হয়ে শোনার চেষ্টা করে। এই অঙ্গদই যদি আজ থেকে দু-চার বছর আগে সন্ধ্যার প্রাক্কালে এই জায়াগাতে এসে গ্রামবাসীদের এরকম কোলাহল শুনতে পেত, তাহলে হয়তো সে ভীত ও চঞ্চল হয়ে পড়ত। হয়তো তখন সেদিকে না যেতে চেয়ে পীড়াপীড়ি করত গাড়োয়ানকে। বলত, ‘মহাপ্রবীণ! মহাপ্রবীণ! আমি গ্রামবাসীদের উন্মত্ততাপূর্ণ কোলাহল শুনিতেছি। আপনি সত্ত্বর এই পথ পরিহার করুন। ভিন্ন পথে গো-যান লইয়া চলুন। ক্রুদ্ধ ও মদ্যপ গ্রামবাসীরা আমাদের প্রতিও আক্রমণমুখী হইতে পারে। আপনি শুনিতেছেন? গো-যান ভিন্ন পথে লইয়া চলুন! মহাপ্রবীণ!’
কিন্তু এখন? সেই অঙ্গদ, সেই মহাপ্রবীণ, সেই কোলাহল। তবু অঙ্গদের মন এতটুকু বিচলিত নয়। তার দেহে মনে কোথাও অকারণ ভয় ও উদবেগ নেই। অস্থিরতা নেই। গো-শকট সেই গ্রামবাসীদের কোলাহলপ্রমত্ত শালবনের অভিমুখে এগিয়ে চলেছে। অঙ্গদ তবুও মহাপ্রবীণের কাছে তার বাড়তি কৌতূহল প্রকাশ করে না। খড়ের গাদায় থেকে, অর্জুন গাছগুলির ফাঁকে হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে আসা হইচই থেকে সে আঁচ করতে চেষ্টা করে এই কোলাহলের কারণ। কী বলছে তারা? কেনই-বা নারীকন্ঠের ক্রন্দন?
গো-শকটটি আরও কাছাকাছি আসতেই দেখা যায়—দূরের সেই ক্যাটলাপুর-নতুনডি গ্রামটি থেকে মানুষ তখনও ছুটতে ছুটতে আসছে এই বনের দিকে। শুরু হয়েছে প্রবল কান্নাকাটি। কয়েকজন গ্রামবাসীর কন্ঠ উত্তেজিতও। ভিড়ে ঢোকার আগে, গাড়োয়ান, গাড়ি থামিয়ে অবতরণ করে। খড়ের ভেতরে অস্ত্রটি গুঁজে নেমে আসে অঙ্গদও। তারাও ভিড়ের সঙ্গে ঘনশালবনটির অনেকটা ভেতরে ঢুকে যায়। আর দেখে ভয়ংকর এক দৃশ্য—একটি আঠারো কি কুড়ি বছরের যুবক গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়েছে শালগাছের ডাল থেকে। এই ঝুলে পড়া দু-একদিনের নয়। আরও আগের। তার বিবর্ণ বিকৃত চেহারাতেই তা বোঝা যায়। চোখের কোল থেকে শুরু করে নাক, চোয়াল সবই মাছিতে কয়েকদিন ধরে খেয়ে তার রূপ কি বিভৎস করে দিয়েছে! এখনও সেই বাসি ও পচা মৃতদেহটি ঘিরে ভুঁনভুঁন করছে জঙ্গলের শত শত মাছি। তীব্র গুঞ্জরণ। দুর্গন্ধ বেরচ্ছে শরীর থেকে। হাতের চেটো ও তলপা মরা গো-সাপের মতো ফ্যাকাশে। চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে দেহের অস্থিগুলি। তাতে বোঝা যায় পচে-গলে নরম হয়ে ঝুলছে দেহটি। কেউ তাকে গাছ থেকে নামাতে চাইছে না। তার ঘরের লোকেরাও না। তারা এখন কান্নাকাটিতে ব্যস্ত। গ্রামের লোকদের সঙ্গেও চলছে তাদের উত্তপ্ত বচসা।
গ্রামের লোকেরা চৈতা মাহাতর মৃত্যুর জন্য দায়ী করছে তার মাকে এবং তার বড়দাদা ফলারিকে। হদাং মাহাত তো পরিষ্কার বলে দিল ছেলেটির দাদাকে। বলল, ‘ফলারি! চৈতা কিন্তুক মরত নাই। তরাই ইয়াকে মরালি। এই তুঁই আর তোর ওই বুঢ়ি মাঈটা।’
‘কী তুঁই উল্টাসিধা বলছিস? আমাদের ঘরে-ঘরের ব্যাপার। তুঁই আমাদের ল্যা বেশি জানবিস?’ ফলারি রেগে যায়। চৈতার আত্মহত্যার ব্যাপারে হদাং তাদেরকে জড়িয়ে দেওয়াতে সে ভয়ও পায়। থানায় খবর চলে গিয়েছে দুপুরেই। পুলিশ এলো বলে। এখন যদি এরা এমনি সব বলতে থাকে, সাক্ষী পুরে, তাহলে মা-ব্যাটা কেউ কি রেহাই পাবে?
হদাং ছাড়নেবালা নয়। তার পক্ষে আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে যায়। উত্তমের ভাই সুত্তম মাহাত, গুইনা, ভজা মাহাত, তারাও ওই একই কথা বলে। শালগাছের তলে বসে মাথায় হাত নিয়ে কাঁদতে থাকা বুড়িটিকে দেখিয়ে সুত্তম বলে, ‘ই, ই যা বঠে ন! একের নম্বর হারামি বুঢ়ি বঠে।’
গুইনা বলে ‘নামটা বোড়ো সুদর। স্যান্ট উঠছে। কপূরা মাহাতান।’
‘হেই গুইনা-সুত্তৈমা! মুখ সামলায় তরা কথা বলবিস। বুঢ়ি বুঢ়ি কী করছিস? আ-র বলছে হারামি। শ্লা, এমন পিটব ন।’
‘ক্যানে কী মন্দ বলেছে? ঠিকেই ত বলেছে?’ ফলারির প্রতিবাসী হদাং মাহাত। সে জোরের সঙ্গে বলে, ‘এই ক্যাটলাপুর-লৌতনডির এত-এত লোক সবাই মিছা বলছে? সবাইকে তুঁই চদু-বংবৈলা ভাবছিস? আর তুঁই একাই শিয়ান?’
হদাং পার্টি করে। ফলারির পাশের বাড়িতে থাকলেও সে তার বিরোধী দলের। ফলারির কথার জবাবে বক্রোক্তি করে সে, ‘ঘরে-ঘরের ব্যাপার আর থাকল কই? গাঁয়ের ত কেউ জানতে বাকি নাই ব!’
ফলারি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। বাস্তবিক, ঘটনাটি তাদের পারিবারিক হলেও গ্রামের সবাই জেনে গিয়েছে। জেনে তো যাবেই। অবৈধ ঘটনা ‘ঘঁড়ার খুরে’ ছুটতে থাকে। এখন আবার নতুন করে তা নিয়ে চাপা আলোচনা শুরু হয়ে যায়।
হরি মাহাত একটা শালডাল নিয়ে প্রহরীর মতো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে নিজের মনে বলে ওঠে, ‘যা হবার ঠিকেই হঁয়েছে। আগুন যদি খাবে, তাইলে আঙরা ত হাগতেই হবেক।’
গুইনা তাতে যোগ দেয়, ‘আর বেসন খালে পোকোড়ি হাগবে।’
অঙ্গদ তার কাছে যায়। বলে, ‘কী হঁয়েছিল এই ছকরাটার? ই গাছে টাঙায় মরল ক্যানে?’
‘ক্যানে মরল, শুনবে? আইস তবে। ফারাকে।’ হরি অঙ্গদকে লোকজনের ভিড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটু দূরে নিয়ে যায় আর বলে, ‘যে ঘটনায় আজ চৈতা মরল, এমন ঘটনা সোব ঘরেই ঘটছে। ঠক বাছতে গাঁ উজাড় হঁয়ে যাবেক। কিন্তুক তাও ওই বুড়িটির লাইগেই আত্মহত্যা করতে হল চৈতা মাহাতকে।’
‘ঘটনাটা কী? মায়ের সঙ্গে ক-ন হঁয়েছিল?’
‘লিয়াই-ঝগড়া? না না স্যা লয়। ভিৎরি জিনিস।’ হরি পুরো ঘটনাটি জানিয়ে দেয়। আগাগোড়া। চৈতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তার নতুন বউদির। বছর তিনেক হল ফলারি তাকে বিয়ে করে এনেছে দুবড়া থেকে। বউটি দেখতে সুন্দর। আবার ফলারির চেয়ে চৈতাও দেখতে ভালো। হাসিখুশি। শ্বশুরঘরে আসার পর থেকে এই দেওরকে তার মনে লেগে যায়। প্রথম-প্রথম তাদের মধ্যে বেশ হাসিঠাট্টা-রসিকতা চলত। তারপর সম্পর্ক ক্রমশ গভীরে চলে যায়। সুযোগ পেলেই তারা একঘরে ঢোকে। কাছে-কাছে আসে। বেশির ভাগ দিন দুপুরের দিকে ঘরে কেউ থাকত না। ক্ষেতে লাঙল-গোরু-হাল নিয়ে কাজ করত ফলারি। সঙ্গে ছোটোভাইটিও থাকত। বাটলুয়া। আর চৈতা তখন গাড়িয়ে মাটি-সার-গোবর চালাত। ঘরে এসে গোবরকুঁড়ের কাছে কুলগাছের ছায়ায় গাড়ি লাগিয়ে সে আগে চলে আসত তার বউদির কাছে। দুজনে এক ঘরে ঢুকে পরস্পর শরীরী আলাপ করত।
দাদার সঙ্গে মিলনে তৃপ্ত হত না বউদি। সে বড়োবেশি হড়বড় করত। বাঁধের ঘাটে বউদি তার কোনো কোনো সখিকে একথা বলেওছে। স্ত্রী নগ্ন হলেই তার শরীর মুহূর্তের মধ্যে এতটাই উত্তপ্ত হয়ে যেত যে, তার পক্ষে স্ত্রীকে সময় দেওয়া সম্ভব হত না। তাই বউদির কোনো দিনই ক্ষুধা নিবৃত্ত হত ন। চৈতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সে তার কাছে নিজের সম্ভোগেচ্ছা পূরণ করে নিত।
চৈতাকে সে শিখিয়েছিল কীভাবে ধীরে ধীরে মিলনের তৃপ্তি দিতে হয়— এই কাজে কখনও তড়িঘড়ি করতে নেই। ভয়েরই বা কী আছে? এ সময় শাশুড়িও ঘরে থাকে না। বনকে যায়। বনের ধারে ধারে ঘুরে কাঠমোট কুড়িয়ে একেবারে নদীতে স্নান সেরে ঘরে আসে। বউদি তাই তাকে নির্ভয়ে মিলিত হতে বলত। একদিন ওই অবস্থায় শাশুড়ি আচম্বিতে ঘরে ঢুকে পড়ে। দেখে তাদের মৈথুনদৃশ্য! ব্যাস!
হরি বলে, ‘বুড়ি তখনকে ঢুকে দেখছে—আর ইদিকে পুরা চলছে! তখন কী করবেক? বুঢ়ি আঙনার ল্যা একটা চ্যালাকাঠ নিয়ে যাঁইয়ে বাছাকে বসাতেই শুরু। চৈতাকেও পিটছে আর বউটাকৌ ছেঁচছে। আদাবাদি। তার বাদে বাটলুয়াকে ক্ষেতকে পাঠায়। ডাইকে আনে উয়ার বড়ব্যাটাকে।’
ফলারি তখনও বুঝতে পারেনি, কেন ছোটভাইকে দিয়ে তাকে এসময় হঠাৎ ঘরে ডেকেছে। এসে দেখে চৈতাকে তার মা চ্যালাকাঠ নিয়ে মেরে তুড়পা করাছে! ফলারিকেও বলে, ‘পিট ইয়াকে! কামাইনাকে ই-ঘরের ল্য হ্যাড়হ্যাচ্চাঁয় বাইর কর! ছি-ছি-ছি-ছি:! এমন কান্ড! ইয়ার এমন গুণ! হ্যাঁ:।’
‘কী হঁয়েছে কী? কীসের হতে মারছিস?’
‘কীসের হতে? শুধা ওই খালভরাকে। হামার বলতেও যে লাজ লাগছে। ই-খালঢুকনা এমন কীত্তি করল!’
ওদিকে ঘরে ঢুকে ফলারি দেখে তার বউও কপাটকুণে কাঁদছে। কপূরা তার দিকেও চ্যালাকাঠ ধরা হাতটি বাড়িয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ‘আর ওই খালভরি! ওই সুয়াংখাওকি! ওই রেন্ডি মাগি ভাইভাতারী! উয়ার পেটটা ভরতেই ছিল নাই! শেষতক ইয়ার সঙ্গেও! কসবি মাগি!’
ফলারির আর বুঝতে কিছু বাকি থাকে না। সঙ্গে সঙ্গে তারও মাথা গরম হয়ে যায়। সে বউকে বাদ দিয়ে আগে তার ভাইকেই চুলের মুটি ধরে বেদম চড়চাপড় লাগাতে থাকে। মারতে মারতে হাপচানি দিয়ে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়। বলে, ‘খোবোড়দার তুঁই ই-ঘরে পা দিবিস! যদি তোকে ঘরে ঢুকতে দেখেছি ত ইবার ‘ধুসলা’৩৭ খুলে মারব।’
ততক্ষণে পাড়াপ্রতিবেশীরা এসে জড়ো হয়েছে। তারা তো অবাক! যে-ভাইকে ফলারি এত ভালোবাসে, তাকে সে আজ এমনভাবে মারল! এমন গালমন্দ করল! শুধু ফলারি নয়, সেই সঙ্গে তার মা-ও। তারা ঘটনার কথা জানতে চায়। কিন্তু ঘরের লোকেরা কেউ কোনো কথা বলে না। বিরক্ত হয়ে সদর দুয়ারে হুড়কা দিয়ে ঢুকে পড়ে। প্রতিবেশীরা ভিতরের ব্যাপারটি ধরে ফেলে।
লজ্জায়, অপমানে প্রহৃত হয়ে সেদিনই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় চৈতা। তখনি। রাতেও সে ঘরে ফিরল না। পরের দিনও ফিরল না। তার পরের দিনও না। এভাবে তার ঘরে না-ফেরা ছদিন হয়ে গেল। তবু একটি বারের জন্যও কেউ তার অভাব বোধ করল না। তার ঘরে না আসার কারণ জানতে চাইল না। এমনকি, খোঁজ-খবরও নিল না যে সে কোথায় রয়েছে বা কোথায় কোথায় থাকতে পারে। তারা ভুলেই গেল ভাইটির কথা।
সাতদিনের দিন তাদের ঘরে খবর দিতে এল দু-তিনজন কাঠকুড়ানি মাহাতান। তারা গিয়ে বলল কপূরাকে। বলল, ‘এগো দিদি, দিদি গো! বনের ভিতরে কে গলায় দঁড়ি দিয়েছে। চিনাছে নাই। যাও ন দেখে আসবে।’
‘কথায়? কখন তরা দেখলিস?’
‘এই ত এখনি। শাঁকবাইদ-এর বনে।’
‘পাছে ইয়া বঠে নকি—এ রে ফলারি রে। এ ফলারি। যা দেখে আয় ন যাযা-যাযা। হাই কে গলায় দঁড়ি নিয়েছে বলছে!’
দৌড়াদৌড়ি ঘরে ঢুকে কপূরা ফলারিকে শালবনে পাঠায়। সঙ্গে বাটলুয়াও যায়। খবরটি তৎক্ষণাৎ ছড়িয়ে পড়াতে তাদের পেছু ধরে গ্রামের আরও সব লোকজনও লুঙ্গি আঁটতে আঁটতে শালবনের দিকে ছুটতে থাকে।
তারা বনের ভিতরে ঢুকে স্তম্ভিত! গভীর বিস্ময় নিয়ে রাক্ষসের মতো বহু পুরনো শালগাছটির দিকে তাকিয়ে থাকে। এ-গাছে সে-গাছে তারস্বরে ডাকতে থাকে চ্যারেঙ্গ পোকা। ফলারির তখন মনে পড়ে গেল এই ভাইটির প্রতি তাদের সেদিনের ব্যবহার। কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ হতে লাগল তার। এমনকি তার এটাও মনে হতে লাগল—সত্যিই কি ভাই হয়ে সে এমন বিরাট কোনো অপরাধ করেছিল, যার জন্য তাকে এইভাবে দন্ডিত হতে হল?
তার চেহারা দেখে তাকে তখন চেনাও মুশকিল ছিল। তাছাড়া সে যে এই বনের ভিতরে ঢুকতে পারে এটা ক্যাটলাপুরের কেউ ভাবতেও পারেনি। ‘শাঁকবাইদ’-এর এই শালবনটি এতটাই ঘন যে দিনের বেলাতেও গ্রামবাসীরা ভিতরে ঢুকতে সাহস করে না। ক্যাটলাপুর-লৌতনডি থেকে দুবড়া যাওয়া-আসার সময় তারা বনের ভিতরে না ঢুকে ঘুরাট পথে আসে। বড়বাঁধের ধারে ধারে।
আর যারা কাঠকুড়াতে যায়, তারাও এই শালবনটির খুব ভিতরে না ঢুকে বাইরে বাইরে ঝুড়ি নিয়ে শুকনো কাঠপাত কুড়িয়ে আনে। আজ দুর্গন্ধ পেয়ে তাদের মনে সন্দেহ হয়। তারা কিছুটা ঢুকতেই দূর থেকে দেখতে পায় লম্বা শালগাছের ডাল থেকে গোরুবাঁধা দড়ি গলায় জড়িয়ে একটা ছকরা ঝুলছে।
পুলিশ এলো। সঙ্গে নিয়ে এলো ডোমও। গাছ থেকে নামানো হল মৃতদেহ। তালাইয়ে রেখে তাকে চটের সঙ্গে বাবোই দড়ি দিয়ে বাঁধা হল। ম্যাটাডোরে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হল পুরুলিয়া। দেবেন মাহাত সদর হাসপাতালে। ময়নাতদন্তের জন্য। সঙ্গে ফলারি ছাড়াও গেল তাদের আরও দুই কাকার-ব্যাটা ভাই।
শালবন জুড়ে নেমে এলো অন্ধকার।
বিকেলের আলো থাকতে ওরা শালবন থেকে বেরিয়ে আসে। পশ্চিম দিগন্তে সূর্য তখন অনেকখানি ঢলে পড়েছে। গগনচুম্বী শালগাছগুলির ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছে ষাঁড়া-হাঁসের ঠোঁটের মতো বর্ণময় রোদ। বনসংলগ্ন পুবদিকের মেঠোপথ বরাবর বাজড়া ক্ষেতে শালগাছের লম্বা লম্বা ছায়া পড়েছে। বিম্বিত প্রতিকৃতিগুলি দেখলে মনে হয়, লুঠতরাজ শেষে ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে, রণপা পরেই শুয়ে পড়েছে মগ দস্যুরা। সেই ছায়া মাড়িয়ে গো-শকটটি, উঁচুনীচু মেঠোপথ ধরে দড়মড়-দড়মড় করে ছুটতে থাকে। কিছুটা যাওয়ার পর চড়াই। গতি শ্লথ হয়ে যায়। গোরুগুলিও দম ফেলার বিরতি নেয়।
বাঁদিকে থেকে গেল সেই গ্রামটি, ক্যাটলাপুর-লৌতনডি। ডানদিকে রেললাইন ডিঙোলে মনে হয় গ্রামের সীমানা শেষ। এই রেললাইনই উত্তর-দক্ষিণে গ্রামটির চৌহদ্দি বেঁধে দিয়েছে। লাইনের ওপারে পুবদিকে অনেকখানি ফাঁকা মাঠ। ডকা-অর্জুন আর শিরীষের গাছগুলি ছাড়িয়ে দেখা যায়—বড়বাঁধের জল গোধূলির সিঁদুরে আলোয় এয়োতি নারীর কপালের মতো টলমল করছে। ঘাটের জলে খেলা করছে উচ্চিঙ্গট। পাড়ের ওপরে কোথাও রেড়িগাছের ঝোপ, কোথাও হেলে পড়েছে করঞ্জা। ছাগল ডাকছে। চরে বেড়াচ্ছে কাদাখোঁচা পাখি। পুকুরটি এতই বড়ো যে দু-দন্ড চেয়ে থাকতে হয়। বিশ-বাইশ বিঘা জমি নিয়ে এই সরোবর। বারো মাস তিরিশকাল জল থাকে। চারপাশে সবুজ পরিবেশ। চোখ জুড়িয়ে যায়।
গো-শকটের মাথায় বসে, পুকুরটি দেখতে দেখতে, এগিয়ে চলে অঙ্গদ। যদিও সে তার মন থেকে তৎক্ষণাৎ মুছে ফেলতে পারছিল না সেই ভয়ংকর দৃশ্যটি—শালগাছের ডালে ঝুলছে মাছিতে খেয়ে বিকৃত করে দেওয়া চৈতা মাহাতর মৃতদেহ, যে অনাহারে মরল না, অত্যাচারে মরল না, রোগে, মহামারিতে দুর্ঘটনায়ও মরল না—হায়! তাকে ‘কামকুম্ভীরে’ টেনে নিয়ে গেল।
অঙ্গদের মনে হয় কামই তার কালান্তক। বাদবাকি সবাই, সব কিছুই হল তার অনিবার্য মৃত্যুর ছলনা মাত্র। একথা চিন্তা করতে করতে অদ্ভুত একটি প্রশ্ন করে বসে অঙ্গদ। বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! মানুষ জাগ্রত অবস্থায় কর্ম করে, নিদ্রিত অবস্থায় বিশ্রাম গ্রহণ করে। অন্যান্য প্রাণীকুলও তদ্রূপ। কিন্তু এই বিশাল জগৎসংসারে কে অহোরাত্র সদাসর্বদা নিদ্রাহীন থাকিয়া কর্ম করিয়া চলিয়াছে?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! এই বিশাল জগৎসংসারে তিনজন অহোরাত্র সদাসর্বদা জাগত থাকিয়া আপন আপন কর্ম করিয়া চলিয়াছে। ইহারা হইল—কাম, কাল ও কালান্তক। ইহাদের ঘুম নাই, ক্লান্তি নাই, বিশ্রাম নাই। কাল সর্বদা প্রবহমান। কালান্তক আয়ু শেষ হওয়া মাত্র ডাকিয়া লইবার জন্য প্রতিটি ক্ষণ জাগিয়া বসিয়া রহিয়াছে। আর কাম—মনুষ্যের স্নায়ুশরীরে তাহার বসবাস হইলেও মনুষ্য ঘুমাইলেও সে বিনিদ্র থাকে। তজ্জন্য ঘুমের মধ্যেও মনুষ্যের কামোন্মাদনা জাগে। রেতঃপাত হয়। ইহারা তিনজনই অন্ধ। তন্মধ্যে কাম সর্বনাশা।’
কাম যে সর্বনাশা তার পরিচয় কতদিক থেকে কত রকমভাবে পাচ্ছে অঙ্গদ। সে বিস্মিত হয়। কখনো মন তার উদাসও হয়ে পড়ে। মনে হয়, কামই লোকসংসারে অন্ধকার ডেকে আনছে। আবার জগৎ যদি সম্পূর্ণ কামহীন হত? তাহলেও কি চরাচর ও জীবন সুন্দর হয়ে উঠত? ‘নিষ্কামতা’ কি শুধুই একটি ধারণামাত্র? বাস্তবে তা কি কখনো সম্ভব হয়ে উঠতে পারে? কোথাও যেন একটা দ্বিধা তার থেকেই যাচ্ছে।
ভাবতে ভাবতে, অঙ্গদ খেয়াল করেনি, গো-শকটটি কখন গ্রামের কুলহির ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে। সে দিশা ফিরে পায় একটি শিশুর কান্নায়। কোমরে ঘুনসি বাঁধা এই ন্যাংটো শিশুটি ঘর থেকে বেরিয়ে ধুলোভরা কুলহির পথে পথে তার বাবাকে খুঁজে চলেছে।
অঙ্গদ জানতে চাইল গাড়োয়ানের কাছে—এই শিশুটি কেন একা একা কেঁদে বেড়াচ্ছে? তার এহেন অনাদর কী হেতু?
কখনো বাঁহাত, কখনো ডানহাত দিয়ে গোরু দুটির পিঠে আলতো চাপড় মারতে মারতে গাড়োয়ান জানিয়ে দেয়, এই শিশুটির সম্প্রতি পিতৃবিয়োগ ঘটেছে। মৃত্যু কি তা সে এখনো জানে না। তাকে বোঝানো হয়েছে তার বাবা দূরদেশে মুনিষের কাজে গেছে। এদিকে তার গ্রামে ক্ষেতে ক্ষেতে ধান পেকে উঠছে, এখনো বাবা তার ঘরে না আসায় সে তিনচার দিন থেকে অস্থির হয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। ঘরে মন টিকছে না। মা-ও তাকে আগলে রাখতে পারছে না। সে এখন একা একাই বেরিয়ে পড়েছে বাপের খোঁজে।
পিতৃহারা এই অবোধ শিশুটিকে দেখে মন হাহাকার করে উঠল অঙ্গদের। তার মনে হল, হায়। জগতের নিদারুণ অব্যক্ত শোক থেকে এই শিশুটিরও কি নিষ্কৃতি নেই? শোকের কাছে, অনুশোচনার কাছে, শিশু বৃদ্ধ কেউ কি ক্ষমার্হ নয়? কয়েক দিন আগে, কোনো একটি গ্রামের মূল সড়ক দিয়ে যেতে যেতে সে দেখেছিল, এক বৃদ্ধ অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় বসে তার একমাত্র সন্তানের কুকীর্তির জন্য অশ্রুবিসর্জন দিয়ে চলেছে। ছেলে এমনই গুণধর যে, বিয়ে করে ঘরে বউ আনার পর সে এখন আর বুড়ো বাপ-মায়ের দিকে ঘুরেও দেখছে না। তাদের খেতে পর্যন্ত দিচ্ছে না। বেশির ভাগ দিন তারা অনাহারে থেকে এমন পুত্র জন্ম দেওয়ার কারণে অহরহ মনস্তাপ করে চলেছে। আজ তারা বার্ধক্যে পৌঁছেছে। তাদের শরীরও দুর্বল। নইলে এই কুলাঙ্গার পুত্রের মুখে জ্বলন্ত নুড়ো দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতেও তারা ইতস্তত করত না। তাতে এতটুকুও পুত্রশোকে কাতর হত না তারা। না হওয়ারই কথা। ভগবান প্রচেতারই কি হয়েছিল? তাঁর প্রথম দশটি সন্তানের প্রত্যেকে রাক্ষস হয়েছিল। প্রচেতা তাঁর মুখনির্গত অগ্নি দ্বারা সেই মহাতেজস্বী রাক্ষসরূপী পুত্রদের দগ্ধ করেন। তাঁর মনে সামান্যও দ্বিধা হয়নি। অনুতাপ হয়নি। তিনি এই রাক্ষস কুলকে ধ্বংস করে তাদের আগ্রাসন থেকে শুধু যে নিজের বংশকে রক্ষা করেছিলেন, তা-ই না। এই পবিত্র ধরিত্রীকেও নিষ্কলঙ্ক, প্রাণময় ও সুন্দর করেছিলেন।
অঙ্গদের মনে হল, কি বিচিত্র এই অসার জগৎ। মানুষ পুত্রকে অগ্নিদগ্ধ করতে চায়, আবার সেই মানুষই পুত্র কামনায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সত্যিই কি পুত্র কামনায়? নাকি আদতে স্ত্রীসংসর্গ দ্বারা কামচরিতার্থ করতে বিবাহ নামক যৌন বন্ধন আবশ্যক? কেন মানুষ বিবাহ করে? কেন সে পুত্র চায়? পুত্র কাকে বলে? কেন বংশরক্ষার প্রয়োজন? স্বামী যাকে স্ত্রী বা ভার্যা বলে, সেই নারীর প্রকৃত স্বরূপ কী? অঙ্গদ এই প্রশ্নচয় মহাপ্রবীণকে করে বসে।
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নসমূহের উত্তর শুনিতে অতিশয় একাগ্র হও। সর্বাগ্রে শুনিয়া রাখ—বিবাহ কখনোই যৌনবন্ধন নহে। বিবাহের সর্বাংশ উদ্দেশ্য স্ত্রীসংসর্গ দ্বারা কামচরিতার্থ করাও নহে। এক কথায় ‘বিবাহ’ হইল একদিকে যথেচ্ছাচার যৌন-গমনকে নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যদিকে সমাজকে সুশৃঙ্খলাবদ্ধ, নিয়মনিষ্ঠ তথা পরিবার সৃষ্টির মাধমে সুসভ্য করিয়া রাখিবার উপায়মাত্র। বিবাহের মাধ্যমে নারী-পুরুষের সঙ্গম তথা যৌনাচারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই বিধিবদ্ধতা না থাকিলে মানুষের যৌনজীবনের সহিত কুক্কুর তথা ছাগাদির ইতর বিশেষ থাকিত না। সুসভ্য সমাজ বলিয়াও কিছুই থাকিত না।
‘মনুষ্য বিবাহ করিয়া সন্তান কামনা করে। যদি কেবলমাত্র ইন্দ্রিয় সুখই কাম্য হইয়া থাকে, তাহা হইলে সে সন্তান কামনা করিবে কেন? সন্তানই বংশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখিয়া চলে।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! কেবলমাত্র বংশ রক্ষার নিমিত্তই কি মানুষ সন্তান কামনা করিয়া থাকে? নাকি, অন্যবিধ কারণও রহিয়াছে?’
মহাপ্রবীণ উবাচ..
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে জ্ঞানান্বেষি! মনুষ্য জন্মিবা মাত্র সে চতুর্বিধ ঋণে ঋণবান হইয়া পড়ে। এই চতুর্বিদ ঋণ হইল—দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ ও মনুজঋণ। এই সকল ঋণ যথাকালে পরিশোধ করা কর্তব্য। এই চতুর্বিদ ঋণ কী উপায়ে পরিশোধযোগ্য তাহা বলিলেই ঋণের পরিচয়ও জানা যাইবে। এক্ষণে তাহা নিবেদন করিতেছি : যজ্ঞদ্বারা দেবঋণ, বেদাদি অধ্যয়ন ও তপস্যা দ্বারা ঋষিঋণ, পুত্রোৎপাদন ও শ্রাদ্ধতর্পণাদি দ্বারা পিতৃঋণ, এবং অনৃশংসাচরণ দ্বারা মনুজঋণ পরিশোধযোগ্য হয়। যে-ব্যক্তি এই সকল ঋণ পরিশোধ করিয়া নিজেকে মুক্ত করিতে অসম্মত হয়, তাহার সদগতি লাভ হয় না।’
শুনতে শুনতে অঙ্গদের মনে সংশয়ও দেখা দেয়। মনে হয়, এই কথাগুলি আজকের সমাজে, আজকের এই তথাকথিত ‘আধুনিক’ মনস্ক মানুষদের কাছে নেহাতই অবাস্তব এবং ঈশ্বরবাদী উপদেশ বলে মনে হতে পারে। এই আধুনিক মানুষেরা বহুলাংশ ঈশ্বর-টিশ্বরে বিশ্বাস করে না। কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখলে মানুষের দুঃখ-দুর্দশার শেষ থাকবে না, সে নরকে যাবে, এমন কথা তো কোথাও বলা হয়নি? যদি সত্যিই ঈশ্বর একটি কাল্পনিক ধারণামাত্র হয়ে থাকে, তাহলেও এই ধারণাকে সামনে রেখে মানুষের জীবনকে উন্নতর জীবনের দিকে নিয়ে যেতে ঈশ্বরকে নিষ্পাপ ও কলুষমুক্ত মানুষেরই চূড়ান্ত প্রতিভূ হিসেবে কি দেখা হয়নি? যাতে মানুষ সেই প্রতিভূকে অনুসরণ করে এবং সমাজ হয়ে ওঠে ঈর্ষা-হিংসা-দ্বেষ তথা সৎ ও রক্তপাত বর্জিত।
কিন্তু আজকের সমাজে একশ্রেণির মানুষ নিজেকে দুর্বিনীত, তার্কিক এবং যে-কোনো বিষয়ে সন্দেহপ্রবণ হওয়াকে তাদের আধুনিকতা এমনকি প্রগতিশীলতা বলেও জাহির করে। এরা দেশজ সংস্কৃতির ব্যাপারে অজ্ঞ, অগভীর এবং সহজেই পরদেশি সংস্কৃতিভাবনায় নিজেকে আচ্ছন্ন রাখতে ভালোবাসে। গৌরব বোধ করে। আজকের সমাজে তাই উপরোক্ত ঋণ প্রসঙ্গটি কি কোনোভাবেও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? বিশেষ করে, ‘যজ্ঞ’, ‘তপস্যা’ ইত্যাদি শব্দগুলি এই সমাজের পক্ষে অসমঞ্জস বলে মনে হবে না? অঙ্গদ অনেকটা সেই সংশয় থেকে প্রশ্ন করে বসে। বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আজিকার সমাজে এই চতুর্বিধ ঋণের কি কোনো প্রকার মূল্য রহিয়াছে?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! উপরোক্ত ঋণ চিরদিনই পালনীয়। আজিকার দিনে এই ঋণ পরিশোধে মনুষ্যের মতি নাই বলিয়া সমাজ দিন দিন রাক্ষসমনস্ক হইয়া উঠিতেছে। চতুর্বিধ ঋণ উত্তমরূপে বুঝিয়া দেখ। ইহা মানুষের জন্ম হইতে মৃত্যু পর্যন্ত সামাজিক আচরণবিধি বৈ অন্য কিছু নহে।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ!’ আজিকার সমাজে মানুষের দেবভক্তি লীন হইয়া আসিতেছে। তাহা হইলে মানুষ যজ্ঞ দ্বারা দেবঋণ পরিশোধ করিতে আগ্রহ হইবে কেন? সমাজের শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে এখন বেদাদি পাঠ ক্রমশ উঠিয়া যাইতেছে, ঋষি লইয়াও তাহাদের কোনো প্রকার শিরঃপীড়া নাই। তাহা হইলে তাহারা বেদাদি অধ্যয়ন দ্বারা ঋষিঋণ পরিশোধ করিতে আগ্রহী হইবে কেন? আজিকার সংসারে পিতাপুত্রের সম্পর্ক মন্দ। পিতার প্রতি পুত্রের শ্রদ্ধা দূরে থাক—পিতাকে বৃদ্ধাবাসে পাঠাইয়া অথবা বিবাহ করিয়া বিচ্ছিন্ন হইয়া পুত্র তাহার একার দাম্পত্য জীবন কাটাইতেছে। সে-জীবনেও অশান্তি। সন্তান উৎপাদনেও তাহাদের গরজ নাই। তাহা হইলে এই মানুষ পিতৃঋণ পরিশোধ করিতে আগ্রহী হইবে কেন? মানুষের আচরণে আজি নৃশংতার কোনো অভাব নাই। তাহাদের বিবেক নাই, সততা নাই, ন্যায়-অন্যায় বোধ নাই। তাহারা সজ্ঞানে অন্যায় ও অধর্মাচরণ করিতে কুন্ঠিত হয় না। এমন মানুষ মনুজঋণ পরিশোধ করিতে আগ্রহী হইবে কেন?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! তুমি যাহা-যাহা বলিলে সেই সব সামাজিক লক্ষণ হইতে বুঝা যাইতেছে যে, সমাজে এক শ্রেণির মনুষ্য এখন প্রকৃত অর্থেই চন্ডমনস্ক হইয়া উঠিতেছে। তাই মনুষ্য তমোগুণসম্পন্ন হইয়া পড়িতেছে। তমোগুণসম্পন্ন মনুষ্যের চৈতন্যও তমসাচ্ছন্ন থাকে। তাহাদের মন বৈগুণ্য দ্বারা চালিত হয়, সদভাবনা দ্বারা নহে। তত্রাপি, সমাজে মঙ্গল সাধন করিতে হইলে, ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করিতে হইলে, হিংস্রতাবর্জিত সমাজ প্রতিষ্ঠিত করিতে হইলে অকল্যাণকর শক্তির নিপাতন জুরুরি। তুমি সেই বিনাসের লক্ষ্যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও। মনুষ্যকে অন্ধকার হইতে আলোর অভিমুখে আন। তাহাদের চঞ্চল মনকে সুগ্রন্থপাঠে নিমজ্জিত কর। দুর্মতি পুত্রকে পিতার সমীপে ফিরাইয়া আন। যাহাদের বিবেক নাই, সততা নাই, ন্যায়অন্যায় চেতনা নাই তাহাদের মনে সেই সকল মাঙ্গলিকবোধ জাগ্রত কর। অন্যথায় এই সমাজ ধ্বংস হইয়া যাইবে। হে অস্ত্রধারি! পুনরায় বলিতেছি। চতুর্বিধ ঋণ পালনে মতি আনো। ইহা মনুষ্যের চারিত্রিক ও সামাজিক আচরণবিধি। ইহাও মনে রাখিবে, সমাজের তাবৎ মনুষ্যই রাক্ষস হইয়া যায় নাই। এখনও বহু মনুষ্য সততার সহিত জীবন যাপন করিতেছে বলিয়া সমাজ টিকিয়া রহিয়াছে। তাহা না হইলে কবেই নরকঙ্কাল হইয়া পড়িত।’
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! কিন্তু সেই সব সৎ মানুষেরা আজিকার দিনে তপস্যা করিতেছে বলিয়া ত মনে হয় নাই। সমাজে কোথাও যজ্ঞানুষ্ঠান সম্পন্ন হইতেও কদাচ দেখি। মনুষ্য শুভবুদ্ধি সর্বস্ব হইলেও কি সে বেদাদি পাঠ, তপস্যা ও যজ্ঞ করিবে বলিয়া আপনি মনে করেন?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! বেদাদি পাঠ, তপস্যা ও যজ্ঞ—এই বিষয়গুলি বুঝিতে তোমার কোথাও ভ্রম হইতেছে। উক্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে তোমার অজ্ঞতা ভঞ্জন করিতে আমি বলিতেছি, শ্রবণ কর। তপস্যা সম্পর্কে আমি পূর্বে বলিয়াছি। পুনরায় বলিতেছি— তপস্বী হইতে হইলে সংসার ত্যাগ করিতে হয় না। তপস্যার অর্থ সংসার-ধর্ম ছাড়িয়া অরণ্যে গমন নহে। অঙ্গে ভস্ম মাখিয়া সেথায় কোনো বল্মীক পৃষ্ঠে বসিয়া ধ্যান করাকে তপস্যা বলে না। তপস্যা হইল একাগ্রচিত্তে চিন্তা করা। মনশ্চক্ষু উন্মিলিত করা, নিজেকে জানা। কর্মের অবসরে যে-কোনো সময়ে তা করা যাইতে পারে। বেদাদি পাঠ-এর অর্থ হইল আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের জানা। তৎকালীন সমাজের ইতিহাস বিষয়ে অবগত হওয়া। আমাদের প্রাচীন শিল্পসাহিত্য-সংস্কৃতি জানা। সমাজের নিয়মরীতি বিষয়ে বিদিত হওয়া এবং মনুষ্য হিসাবে নিজেকে উন্নীত করিতে প্রয়াসী হওয়া। পরিশেষে, যজ্ঞ বিষয়ে বলিতেছি। তপস্যার ন্যায় ‘যজ্ঞ’ সম্পর্কেও মনুষ্য ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে। যজ্ঞ বলিলে তাহারা মনে করিয়া লয় যে, মণ মণ কাষ্ঠ বা অরণি দাহ করিতে হইবে, তাহাতে বড় বড় কুম্ভ হইতে ঘৃত লইয়া আহুতি দিতে হইবে—চারিদিকে জটা ও দীর্ঘ শ্মশ্রুধারী মুনি-ঋষিরা উপবিষ্ট থাকিবেন এবং যজ্ঞস্থলে গগনচুম্বী শিখা উঠিতে থাকিবে। একদা যজ্ঞ অনেকাংশে এই রূপ ছিল। আরও বিবিধ প্রকার যজ্ঞ ছিল। কিন্তু কালে কালে যজ্ঞেরও পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। তাহা রূপকে পরিণত হইয়াছে। পুরাকালে ‘যজ্ঞ’ বলিয়া যে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হইত, তাহার নির্দিষ্ট কতকগুলি অঙ্গ ছিল। যেমন—এক, যজমান বা যজ্ঞকর্তা। দুই, যে দেবতার তুষ্টির জন্য যজ্ঞ হইত। তিন, যে দ্রব্য দেবতার প্রতি নিবেদিত হইত। চার, যে অভীষ্টলাভের জন্য যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হইত, অর্থাৎ যজ্ঞের সংকল্প। যজ্ঞের উদ্দেশ্য হইল—দেবতার প্রাপ্য দেবতাকে দিয়া তুষ্ট করিয়া অভীষ্ট আদায়। এই অভীষ্ট ব্যক্তিগত হইতে পারে। যথা—পুণ্যসঞ্চয়, পুত্রলাভ, সংসারে শান্তিস্থাপন ইত্যাদি। অথবা সামাজিকও হইতে পারে। যথা—খরা হইতে বাঁচিতে পর্যাপ্ত বৃষ্টি, মহামারি হইতে ত্রাণ। যিনি উদ্যোগী হইয়া যজ্ঞ আরম্ভ করিতেন তিনিই যজমান। যাহা দেবতার প্রতি নিবেদিত হইত তাহাই প্রধানত হবি বা ঘৃত, কিন্তু পশু, শস্য, পুরোডাশ ইত্যাদিও দেওয়া চলিত। এই সবকিছুই ‘হবি’ বলিয়া গণ্য হইত। অগ্নিই প্রধান দেবতা, তাঁহাকে সহজে পাওয়া যায় এবং তিনি মূর্তিমান হইয়া হবি গ্রহণ করেন। অপর দেবতারা স্বয়ং দর্শন দিতেন না। এই কারণে অগ্নিকে তাঁহাদের প্রতিভূ বা প্রতীক স্বরূপ আহুতি দেওয়া হইত। নিবেদিত দ্রব্য ভক্ষণ করে, অগ্নি যাহা ফেলিয়া রাখিতেন, তাহা অতি পবিত্র ‘যজ্ঞাবশিষ্ট’ বস্তু। ইহা অমৃততুল্য। যজমান তাহা সবান্ধব খাইয়া ধন্য হইতেন।
‘ক্রমে ক্রমে এই যজ্ঞে রূপক আসিল। এমন অনেক অনুষ্ঠান, যাহাতে কোনো অভীষ্ট লাভের সম্ভাবনা আছে, তাহাই যজ্ঞ বলিয়া গণ্য হইতে লাগিল। যা অর্পণ বা ত্যাগ করা যায়, তাহাই হবি। যাহাতে অর্পণ করা যায়, তাহা অগ্নি। দেবগণ জনসাধারণের মঙ্গল বিধান করেন, অতএব তাঁহারা জনহিতের বা সমাজের প্রতীক। দেবতাকে বা অগ্নিকে অর্পণ করার অর্থ জনহিতকল্পে কোনো দ্রব্য প্রদান করা। যথা—পিপাসা নিবারণের নিমিত্ত কোনো কূপ বা জলাশয় খনন করা, তাহা হইল পূর্তযজ্ঞ। সংস্কৃতির উন্নয়নের নিমিত্ত কোনো অনুষ্ঠান—তাহা হইল সংস্কৃতি যজ্ঞ। হবির অর্থও ব্যাপক হইয়া দাঁড়াইল। যাহা কিছু নিয়োগ বা প্রদান করা যাইতে পারে— তাহা বিত্ত, সামর্থ্য, এমনকী নিজের বল, বুদ্ধি, জ্ঞান, ইন্দ্রিয় পর্যন্ত। অবশেষে সংকল্প অর্থাৎ যে অভীষ্টর কামনায় যজ্ঞ হইতেছে তাহা পর্যন্ত হবির অন্তর্গত হইল। যজ্ঞাবশিষ্টে উৎকৃষ্ট বস্তুতে যজ্ঞকর্তার আর স্বত্ব রহিল না। তাহা দেবতার অর্থাৎ জনসাধারণের সম্পত্তি হইল। তবে যজ্ঞকর্তা জনহিতের কারণে জনসাধারণেরই একজন হিসাবে তা ভোগ করিয়া কৃতার্থ হইতে পারেন।’
অঙ্গদ বলে ‘হে মহাপ্রবীণ! আজিকার দিনে তাহা হইলে কোন কোন কর্মকে যজ্ঞ বলিব?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! ব্যাপক দৃষ্টিতে বিহিত কর্মের অনুষ্ঠান মাত্রই যজ্ঞ বলিয়া জানিবে। যে সমস্ত জনহিতকর, সমাজকল্যাণমূলক অনুষ্ঠান সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হইয়া চলিয়াছে, তাহাই হইল যজ্ঞ।’
অঙ্গদের ধারণা এতক্ষণে স্বচ্ছ হয়ে উঠল। এখন সে বুঝতে পারল, সমাজে বিভিন্ন মানুষের মুখ থেকে বিভিন্ন কর্মের সঙ্গে ‘যজ্ঞ’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার কারণটি আসলে কী। বস্তুত, এখন কর্মযজ্ঞই হইল পুরাকালের সেই যজ্ঞ।
অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আপনি বলিয়াছেন, মনুষ্য অপুত্রক হইলে সদগতি প্রাপ্ত হয় না। তাহা হইলে আপনি বলুন সন্তানের কারণে পিতা কী রূপে সদগতিপ্রাপ্ত হয়? সন্তানকে পুত্র বলা হইত কেন?’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে প্রাশ্নিক! সন্তান জন্মগ্রহণ করিয়া পিতাকে ‘পুন্নাম’ নরক হইতে উদ্ধার করে। তাহাতে পিতা সদগতি লাভ করে। ‘পুৎ’ নামক নরককে ‘পুন্নাম’ নরক বলা হয়। সন্তান উক্ত পুৎ নামক নরক হইতে তাহার পিতাকে উদ্ধার করে বলিয়াই সন্তানকে ‘পুত্র’ বলা হয়।’
‘পুত্র! পুত্র! পুত্র!’ অঙ্গদ বারে বারে এই শব্দটি উচ্চারণ করতে থাকে। আর যতবার উচ্চারণ করে, ততবারই শব্দটির বিরাটত্ব অনুভব করে সে। উত্তরোত্তর তার সেই উচ্চারণ আর্তনাদের মতো শোনাতে লাগল।
মহাপ্রবীণ বিস্মিত হলেন। তিনি এর কারণ জিজ্ঞাসিলেন। কেন ‘পুত্র’ শব্দটি বারংবার উচ্চারণ করে আর্তনাদ করছে অঙ্গদ?
অঙ্গদ সাশ্রুনয়নে অকপট স্বীকার করে। বলে ‘হে মহাপ্রবীণ! সন্তানের নাম যে-কারণে ‘পুত্র’ হইল, তাহা শ্রবণ করিয়া আমার মনে ক্রমে শোকের উপক্রম হইতেছে, মনে হইতেছে, আমি পিতার কুলাঙ্গার পুত্র। আমি আমার পিতার জন্য কিছুই করিতে পারি নাই। তাহাকে নরক হইতে উদ্ধার করা দূরে থাক, জীবদ্দশাতেই আমি পিতামাতার জীবনকে নরক করিয়া তুলিয়াছি। আমিও আর কোনোদিন সদগতিপ্রাপ্ত হইব না। হায়! মন যে আমার বড়োই আনচান করিতেছে! বড়োই উদবেলিত হইতেছে! আমার গৃহের কথা, পিতা ও মাতার কথা মনে পড়িয়া যাইতেছে। আর যতবার মনে পড়িতেছে, ততবারই অন্তর শতধা বিদীর্ণ হইতেছে। হে মহাপ্রবীণ! আমি কি একবার আমার পিতার কাছে নতমস্তক হইয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া আসিব? আজ্ঞা করুন।’
মহাপ্রবীণ উবাচ...
মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে সংশয়াপন্ন! অতীতের জন্য অনুশোচনা করিও না। অতীতের জন্য অনুশোচনা এবং মৃতের জন্য শোক অভিন্ন। তাহা কদাপিও করিও না। যে দুষ্কর্ম করিয়া তুমি নিজেকে কলুষিত করিয়াছ, অবশিষ্ট জীবনে সুকর্ম করিয়া নিজেকে সেই কলুষ হইতে মুক্ত কর। গৃহের কথা মনে করিয়া নিজেকে দুর্বল করিও না। সদা স্মরণে রাখিও—তোমার সাংখ্যতুল্য জীবন। সন্ন্যাসীদের যেমন গৃহীজীবনের কথা স্মরণে আনিতে নাই, তেমারও তদ্রুপ। শেকসন্তপ্ত হইও না। আবেগকে দমন কর। নিজেকে কঠোর কর! কঠোর কর! কঠোর কর!’
‘নাই! নাই! নাই!’ দু’মুঠোয় ধরা তরবারির গায়ে মাথা ঠেকিয়ে রেখে অঙ্গদ তার অক্ষমতা প্রকাশ করে। না, সে পারছে না। সে আবেগকে দমন করতে পারছে না। নিজেকে কঠোর করতে পারছে না। এখনো হঠাৎ-হঠাৎ ঘরের কথা মনে পড়লে সে কাতর হয়ে পড়ছে। বাবা ও মায়ের কথায় তার দু’নয়নে বারিধারার মতো অশ্রু গড়িয়ে নামছে। সে আর কেমন করে নিজেকে কঠোর করবে? আর কী করলে সে নিরাসক্ত হবে? মন যে বড়োই অ-বশ্য! বড়োই অ-বোধ! সে কেমন করে এই দুর্দমনীয়, এই অবাধ্য মন-পাখিকে বেড়ি পরাবে? সে যে পোষ মানে না। কেমন করে তাকে সে বশীভূত করবে? মন! মন! ওঃ মন রে...
মহাপ্রবীণ তখনো তাকে বলে চলেছেন, ‘হে বিবশ! শোকে বিহ্বল হইও না। অন্তর দীর্ণ করিও না। নিরাসক্ত হও! নিরাসক্ত হও! একটি তুচ্ছ পিপীলিকা যেমন সযত্নে ও নির্বিকারচিত্তে তাহার ডিম্বকে শত প্রতিকূলতার ভিতর দিয়া বহন করিয়া চলে, তুমিও সেইরূপ অমলিনচিত্তে শোক বহন করিয়া চল। তোমার অন্তরে শোককে লীন কর। যেভাবে সমুদ্রগর্ভে নদী বিলীন হইয়া যায়। যেভাবে প্রায়ান্ধকারে গোধূলির প্রভা বিলয়প্রাপ্ত হয়। তুমি আকাশের পানে অবলোকন কর আর নিজেকে ভিন্নমনস্ক কর।’
অঙ্গদ চোখের কোলে অশ্রু নিয়ে আকাশের দিকে তাকায়। কৃষ্ণপক্ষের রাত। অন্ধকার তখন গাঢ় হয়েছে। ঠাণ্ডা পড়ছে একটু একটু। সে দেখে সেই অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে আসছে মোষের শিঙের মতো বাঁকানো চাঁদ। অঙ্গদ মনে মনে বলে উঠল, ‘হে নিভানন! আমাকে আলোকিত কর!’
দেখতে দেখতে কয়েক যুগ কেটে গেল। সময় যে কী দ্রুত বয়ে চলে! বাস্তবিক, নদীর স্রোতের চেয়েও সময়ের গতিবেগ বেশি।
বাইরে থেকে দেখলে জীবনডির মোড় থেকে পলপল কিংবা পলপল থেকে ডেলিকচা, বড়াম— কোথাও বড় কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে না। রাস্তাঘাট তেমনই আছে। জঙ্গলও আছে। তবে কোথাও কোথাও গাছপালা কিছুটা কাটা হয়েছে বলে জঙ্গলের সেই ঘনত্ব আর নেই। তার মধ্যেও পরিবর্তন যেটুকু হয়েছে, তা হল, আড়ষা রোডে গ্রামবাসীদের যাতায়াত বেড়েছে, যাত্রীবাহী বাসও বেড়েছে। এই সময়-কালে গ্রামের বহু পুরনো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বহু মানুষ বার্ধক্য নিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায়। যারা একদা ছিল শিশু-কিশোর তাদের চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে, চুলদাড়ি আর বেশি করে পেকেছে। কিন্তু তাদের মনে উৎসাহ-উদ্দীপনা আগের মতোই আছে।
কোনো ঘরে মানুষ মরেছে ঠিকই পাশাপাশি বেশির ভাগ ঘরে নতুন মানুষ এসেছে। কারো বিয়ে হয়েছে, কারো কারো বিয়ে হয়ে সন্তানও হয়েছে। নতুন নতুন মুখ, নতুন ছেলে-ছোকরার দল এখন গ্রামের মাতব্বরদের জায়গায় পৌঁছে গেছে। ঘরবাড়ি, চাষাবাদ অংশীদারীত্বে খন্ডিত হয়েছে। প্রতিটি মানুষের মধ্যে একটা অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কেউ নিজেকে নিয়ে খুশি নয়। বউ-সংসার নিয়ে খুশি নয়, চাষাবাদ নিয়ে খুশি নয়। আর যারা ব্যবসাপাতি করছে, তারা আপন আপন বৃত্তি নিয়েও সন্তুষ্ট নয়। কে যে কী নিয়ে খুশি তাও ঠিক বোঝা যায় না। বোধ হয় এরকম একটা অস্থির সময়ে মানুষ যে জিনিসটিকে ধরতে চায়, তা হল রাজনীতি।
পলপলেও এখন ভালো দলাদলি ঢুকে গেছে। তার ফলে গ্রামের মানুষগুলির মধ্যে সেই আগেকার প্রীতির সম্পর্ক আর নেই। ভেতরে ভেতরে তারা গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে ভাগাভাগি হয়ে থাকে। গ্রামে রাজনীতি ঢুকলে যা হয়, এখানেও তাই হয়েছে। বিচ্ছিন্নতা তো ঢুকেইছে, সেই সঙ্গে হিংসা, ঈর্ষা, স্বার্থপরতা মানুষের মনগুলিকে চোদ্দ আনা-ই নষ্ট করে দিয়েছে। গ্রামে চিরদিনই হিংসা-ঈর্ষা রয়েছে। গ্রামের মানুষ বলেই যে সে সহজ-সরল, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু গ্রামীণ রাজনীতি তাদের আগের চেয়ে ঢের বেশি স্বার্থপর, সংকীর্ণ এবং সন্দেহপ্রবণ করে তুলেছে। এখন মানুষকে বিচার করা হয় তার রাজনৈতিক অবস্থান দেখে।
আগুয়ানখুড়া অতিবৃদ্ধ হয়ে পড়েছে। আগের মতো নেই। সেই ছড়িয়ে থাকা প্রাণোচ্ছল মানুষটি যেন গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে। বয়স হয়েছে বিহারীরও। গানের গলাও ভেঙে গেছে তার। তা হলেও গ্রামের এমনি আর কয়েকজন আছে যারা গান-ঝুমৈর নিয়ে থাকে, শিল্পরসিক লোক, তারা এই ‘কামড়াকামড়ি রাজনীতি’র ধারেপাশেও নেই। কোনো পার্টিই তাদের হাতে ঝান্ডা ধরাতে পারেনি। আগুয়ানের তো আবার ছুলাচাঁছা কথা। এই বয়সেও সে নতুন প্রজন্মকে বলে, ‘যাস না চোরের দলে নাম লেখাতে। ‘পাটিপোলেটি করা ত লয়—চোরের পেছু পেছু ঘুরা।’
নিজেকে এখন প্রস্তুত মনে করল অঙ্গদ। মনে করল এতদিনে তার জগদ্দর্শন হয়েছে। যদিও এখনো তা সম্পূর্ণ হয়নি। মহাপ্রবীণ নিজেই বলেছেন, জগদ্দর্শন কখনো সম্পূর্ণ হবার নয়। এই প্রাণবিশ্ব তথা অখন্ড মন্ডলকে জানার কি অন্ত আছে? নিরন্তর নিরবধিকাল তা চলতেই থাকে। তৎসত্ত্বেও, অঙ্গদ এখন অনেক স্থিতধী, প্রজ্ঞাবান, কৌশলী ও দূরদর্শী হয়ে উঠেছে। ইহকালের সঙ্গে পরকালকেও সে আরশিতে প্রতিবিম্বিত দেখতে পায়। প্রত্যক্ষ করে অবশ্যম্ভাবীকে। নিয়তিকে। এই প্রত্যয় নিয়ে অঙ্গদ আবার বেরিয়ে পড়ল প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার চূড়ান্ত বার্তা নিয়ে।
বার্তা সে আগেই পৌঁছে দিয়েছে। মাঠারিভূমিতে সশরীরে উপস্থিত থেকে বীরের সমক্ষে অদম্য বিরোচিত আচরণ করে সে জানিয়ে দিয়েছে যুদ্ধই চায় সে। যে-যুদ্ধে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, সে-যুদ্ধে প্রাণত্যাগ করতেও তার সামান্যতম ভীতি তো দূরের কথা, দ্বৈরথও নেই। সংশয় নেই। কোনো রকম পশ্চাদপদতা নেই। এখন প্রতিপক্ষের কাছ থেকে সেই অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের সম্মতি প্রয়োজন।
মশাল হাতে বেরিয়ে পড়ল অঙ্গদ!
গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন পথ। পাথুরে, খানাখন্দময়। সেই দীর্ঘপথ অতিক্রম করে, সে এসে হাজির হল জঙ্গলের সম্মুখে। অসংখ্য প্রাচীন বৃক্ষরাজি এতটাই গগনচুম্বি হয়ে উঠেছে যে, অঙ্গদের দৃষ্টিও ততটা ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে না। দিবালোক ছাড়া এই জঙ্গলের ব্যাপ্তি অনুমানও করা যায় না। এখন আশমানে তাকালে মনে হয় মাথার ওপরে আদিবাসীদের চামড়ায় ছাওয়া রণদুন্দুভির মতো অভেদ্য অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। বহুকালের সর্জ, সেগুন, শাল্মল, অর্জুন আর মাঝে মাঝে তাল-তমাল-পালশ-জম্বীর বৃক্ষগুলি ঘিরে রেখেছে এই মাঠারিকে। এই গহন অরণ্য ভেদ করেই ঢুকতে হয় সেখানে। যদিও এইসব গাছের ফাঁক দিয়ে ঢুকে গেলেও মাঠারিভূমিতে ঢোকা যায় না। তারপরও গায়ে গায়ে আছে অসংখ্য জগদ্দল পাথর। যেন কিনার বরাবর চতুর্দিকে এই মস্ত মস্ত প্রস্তরখন্ডের আরেক প্রস্থ বেষ্টনি দিয়ে দুর্গের মতো ঘিরে রাখা হয়েছে মাঠারিকে। তাই যে-কোনো দিক দিয়ে অনায়াসে মাঠারি গর্ভ-খন্ডে পৌঁছানো যায় না।
অঙ্গদ জানে সেই গোপন পথটি। সেই দুষ্প্রাপ্য পথ দিয়েই সে ঢোকে মাঠারিতে। তবে একবার ঢুকে গেলে, মনে হয়, এ কোন অমরাবতী! মাথার ওপরে চাঁদোয়ার মতো খোলামেলা আকাশ। মন্থর মেঘ চরে ঐরাবতের পারা। মনোরম সরোবর। তালের সারি। কত বুনো ফুলের গাছ, ফলের গাছ! কত ঝোপ-ঝাড়-লতা-গুল্ম। কত কত করন্ড ঘিরে উড়ছে মধুমক্ষিকার দল! সুবাসিত বাতাসে উড়ছে বাগঢুলু। মালভূমি থেকে ক্যাঁন্দ-কুড়চি-খেজুরের গাছ ধাপে ধাপে উঠে গিয়েছে টিলার মাথায়। কোথাও কোথাও টিলার গায়ে গড়িয়ে আসতে আসতে থেমে যাওয়া পাথরের খাঁজে-খাঁজে বসে আছে মন্থর সরীসৃপ, আবার কোথাও যেন যুগ যুগ ধরে ঘাড় তুলে রয়েছে অনড় অচল স্থবির কৃকলাস। দংশন জানে না। বৃদ্ধ কৃকলাস।
তেমনি এক বহুবর্ষ প্রাচীন অজগর সর্প মড়মড় করে অঙ্গদের গমনপথে এসে তার বিমর্ষ ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে বলে, ‘হে প্রতিস্পর্ধি! এইক্ষণে কী হেতু তোমার আগমন? তুমিও কি সরীসৃপকূলের নিধন চাও?’
‘আমি তোমার মিত্রজন। তোমার নিধনকারীর প্রতিহন্তা আমি।’
এই কথা শুনে অজগরটি অঙ্গদের পথ থেকে সরে দাঁড়ায়।
অঙ্গদ আগের সেই প্রবেশ পথ দিয়ে, প্রবল তেজ ও বিক্রম নিয়ে, পাথরের মাঝে মাঝে বেড়ে ওঠা ধুস্তর ও গলগল বৃক্ষের জঙ্গল সরিয়ে ঢুকতে থাকে। আচমকা গাছের ডালপালা নড়ে উঠতেই অজস্র রাতকানা পাখি চ্যারবের করে ওঠে। কপিত্থ বৃক্ষের মগডালে কিচকিচ করে হনুর দল। পেঁচা উড়ে যায়।
অঙ্গদ মাথার উপরকার প্রশাখা সরিয়ে, এক চাটান থেকে আরেক চাটানে লাফিয়ে যায়। আবার নামে। তারপর সুড়ঙ্গ ধরে এগিয়ে আসতে আসতে একসময় ঢুকে পড়ে পাটনের গড়ে। সেখান থেকে বড় বড় ডেগ ফেলে সে নির্ভীক চিত্তে এগিয়ে যায় আরও আরও ভেতরের দিকে। বাঁদিকে টিলার উপরে কুঁড়েঘরটিকে লক্ষ করে সে হাঁটতে হাঁটতে তার পাদদেশে এসে দাঁড়ায়। ততক্ষণে তার বামহাতে কম্পমান মশালটিও স্থির হয়ে দর্দর করে জ্বলতে থাকে।
‘হেই প্রতিপক্ষ! হে আত্মপরায়ণ! আমার এমন উচ্চকিত আহ্বান তোমার কর্ণগোচর হয় না? তুমি এই দন্ডে নিম্নভূমিতে অবতরণ কর!’ অঙ্গদ সবিক্রম ডাক দেয়! যেভাবে একজন প্রকৃত মল্লযোদ্ধা, জানুতে সদম্ভ চাপড় মেরে মল্লভূমিতে আহ্বান জানায়। কিন্তু সেই ডাকেও কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে আরও জোরালো হুঙ্কার ছাড়ে সে।
কুঁড়েঘরটি থেকে কেউ বেরিয়ে নিম্নভূমিতে নেমে এলো না। কিন্তু দূরের উচ্চতম টিলাটি থেকে মেঘমন্দ্র কন্ঠে ধ্বনিত হয়ে এল প্রতিপ্রশ্ন, ‘কে তুমি?’
মশালটি দোলাতে দোলাতে, অঙ্গদ, এগিয়ে গেল সেই ধ্বনির উৎসাভিমুখে। টিলাটির আরও নিকটে গিয়ে ললাট বিস্তৃত করে ঊর্ধ্বমুখে তাকাতেই দেখে—মস্ত এক ধনুর্বাণ হাতে তেজস্বী মুদ্রায় দাঁড়িয়ে আছে পাটন। তার বামপার্শ্বে জারমণি। মশাল উঁচিয়ে। হাতের অগ্নিকুন্ডটি নাড়াতে নাড়াতে অঙ্গদ গর্জে ওঠে, ‘কি! পরিচয় কাঙ্ক্ষা কর?’
আলোকশিখাটিকে যতটা সম্ভব মুখমন্ডলের সম্মুখে এনে, অঙ্গদ দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, ‘আমার প্রলম্বিত কেশরাজি, অচর্চিত দীর্ঘশ্মশ্রু আর অস্থিপঞ্জরসর্বস্ব এই ক্ষীণতনুই আমার সগর্ব পরিচয়। আমি বহুবর্ষ প্রতীক্ষিত তোমার প্রতিপক্ষ!’
‘প্রতিপক্ষ?’ পাটন হাসে। বিদ্রূপ মিশ্রিত সেই হাসি। বলে, ‘হে জটাজুটধারি! তুমি নিজেই নিজেকে আমার প্রতিপক্ষ বলে ঘোষণা কর। সাধু! কিন্তু আমার তো কোনো প্রতিপক্ষ নাই। মাঠারি আমার দুর্ভেদ্য দুর্গ। এই বিশাল প্রাকৃতিক গড়ে কোথাও কোনো প্রাকার নাই। আছে অজস্র ঘনসন্নিবদ্ধ বৃক্ষরাজি আর আছে চতুষ্পার্শ্বে প্রাকারের ন্যায় সজ্জিত মহাকায় প্রস্তরখন্ড। এই দুর্গে কোনো দ্বারী নাই, প্রহরী নাই। আদিম হাতিয়ারে সজ্জিত হয়ে কোনো শবর-ব্যাধ অহরহ প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করতে অতন্দ্র দন্ডায়মান নাই। তথাপি আমি সুরক্ষিত। কারণ, এই মাঠারিকে কেন্দ্র করে যত-যত লোকবসতি আছে—যত সাঁওতাল-শবর-ব্যাধ শ্রেণি আছে, তারা আমার হিতাকাঙ্ক্ষী আর আমি তাদের শত্রুহন্তা। আমি বন্য অধিপতির ন্যায় এখানে অবস্থান করি।’
‘তোমার সেই আধিপত্যকেই আজ আমি ধ্বংস করতে চাই।’
‘নির্বোধ তুমি। এমন আস্ফালন অধিকতর উদাত্ত কন্ঠে করো না। দূরবর্তী গ্রামবাসীরা শুনতে পেলে তারা তরাসে রে-রে করে ছুটে আসবে। অচিরেই তোমাকে ভূপাতিত করে তোমার কন্ঠস্তব্ধ করবে।’
‘তুমি লোকবলের কথা উল্লেখ করে আমাকে ভীত ও উৎকন্ঠিত করে তুলতে চাও? ছি:! তুমি আত্মতুষ্টিতে ভুগছো। তাই বিরোধীশক্তির উত্থানের সংবাদ রাখো না।’
‘বেশ। এখন এই মাত্র তুমি এই মাঠারিভূমি থেকে প্রস্থান করো। নচেৎ তোমার ওই মুষিকতুল্য একমুষ্টি শরীরকে আমি চিপিটকের ন্যায় পিষ্ট করিয়া মারিব। তুমি কি জানো না বীরভূমিতে কেবল বীরেরই প্রবেশ মান্য হয়?’
অঙ্গদ সদম্ভে জানায়, ‘তুমি শুনে রাখো, কাপুরুষ! প্রস্থান করবো বলে আমি এখানে প্রবেশ করিনি। এই মুহূর্তে তুমিও আমাকে তোমার কল্পিত বীররূপেই মান্য করতে পার!’
‘তুমি? তুমি আমার কল্পিত বীর? হা: হা: হা:!’
মাঠারিভূমির আরণ্যক নিস্তব্ধতাকে খান খান করে অসুরের ন্যায় চিৎকার করে উঠল অঙ্গদ, ‘হ্যাঁ! আমি বীর! বীর! আমিই বীর!’ টিলার শীর্ষদেশে গাছগুলির মগডাল থেকে একপ্রস্থ কলরব করে উড়ে ফের নিস্তব্ধ হয়ে সাঁই গাছ আর শৃগালকোলির ডালে ডালে বসল পাকপাখালিরা। কত চটক মদনিকা কপিঞ্জল আর শারিকা। অঙ্গদ বলে চলে, ‘আমার দুর্বল তনু দেখে তোমার মনে হাস্যোদ্রেক হচ্ছে? তোমার পেশিবহুল শরীরের তেজে তুমি আমাকে অবজ্ঞা করছ?। ক্রব্য ভক্ষণকারী রাক্ষস! নারীকে বামপার্শ্বে রেখে তুমি তার কাছে হাস্যাস্পদ করে তুলছো আমাকে? এই তোমার বীরত্বের নমুনা? ধিক!’
‘হে কুপিত! অক্ষম ক্রোধবশত তুমি এখন প্রলাপ উচ্চারণ করছো। শুনে রাখো— যে বীর সে বীরই। নারীর সম্মুখে তার বীরত্বের নমুনা জাহির করা নিষ্প্রয়োজন। সুতরাং তোমার ধিক্কারে আমার কী যায় আসে?’
‘হে দুর্মতি পাটন! আত্মগরিমায় বিভোর হয়ো না। তুমি কী জানো—কাকে বলে প্রকৃত বীর? পেশি নয়, মুদগর নয়, গদা-খেটক নয়, এমনকি, যে দেড়মণ ওজনের ধনুষ্কটি তুমি তোমার বলশালী হস্তে অনায়াসে ধারণ করে এখানে অবিচল দন্ডায়মান রয়েছো, তার কোনোটাই বীরত্বের পরিচয় নয়। প্রকৃত বীর হল সে-ই, যে লোকমানসে যাথার্থ্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তোমার আবার বীরত্ব কোথায়? তুমি তো স্বয়ং অসত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত।’
পাটন বিস্ময় নিয়ে বলে ওঠে, ‘অসত্য? আমি অসত্যের ওপরে প্রতিষ্ঠিত?’ সে তূণীর থেকে একটি তির বের করে, তা দিয়ে মশাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা জারমণিকে দেখিয়ে বলে, ‘এই দিব্যাঙ্গনাকে তুমি অসত্য বলবে? আর এই মহাভার ধনুক, যাকে আমি কঠোর সত্যজ্ঞানে নাম দিয়েছি ‘ভীমভেদ’, তাকেও অসত্য বল তুমি?’
‘হ্যাঁ। তাই। এইসবই আপাত সত্য। তুমি মায়ার রাজ্যে অবস্থান করছো। হায়! তোমাকে দেখে আমার করুণা হয়।’
করুণার কথা শুনে শানিত শব্দবাণ দিয়ে সে প্রত্যাঘাত করে অঙ্গদকে। কখনো রোষানলে, কখনও বিদ্রূপে ও কটাক্ষে। বলে, ‘হে পতঙ্গতুল্য! হে লঘুভার! তোমার আস্পর্ধা এতটাই যে তুমি বীরকে করুণা কর? এই মুহূর্তে এক ফুৎকারে তোমাকে আমি ধরাশায়ী করতে পারি। দেখ আমার প্রস্তরতুল্য প্রসারিত বক্ষ, ভারবাহী স্কন্ধ আর এই দেখ কেমন আমি বীরবাহু—’ বলতে বলতে সে তার দক্ষিণ বাহুটি মশালের সম্মুখে তুলে ধরে। পেশি প্রদর্শন করে হাসতে হাসতে জারমণিকে বলে, ‘দেখ রানি! দেখ! ওই পতঙ্গ নাকি আমাকে করুণা করে। হা: হা: হা:!’
জারমণি কোনো মন্তব্য করে না। মশাল হাতে সে উভয় পুরুষকে শুধু পর্যবেক্ষণ করে আর একাগ্রচিত্তে শুনতে থাকে তাদের বাচিক চাপান-উতোর।
পাটনের বিদ্রূপাত্মক হাসি দেখে আবার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে অঙ্গদ। টিলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে সে বজ্রকন্ঠে তার উদ্দেশে বলতে থাকে, ‘দুর্মতি পাটন! আমি কৃশ তাই আমাকে পতঙ্গ বলে উপহাস কর? শিশ্নোদরপরায়ণ ইতর! তুমি আমাকে তোমার অঙ্গের তেজে তাচ্ছিল্য করছো? তুমি ধ্বংস হবে! অচিরেই তোমার ধ্বংস অনবার্য হয়ে উঠছে! আর সেই ধ্বংসের দিনে এমনি করেই পৃথিবী হাসবে। তোমার অবাঞ্ছিত পদভারে ধরিত্রী আজ নুব্জ হয়ে আছে। তোমাকে নিধন করে আমি এই মৃণ্ময় জননীকে নির্ভর করতে চাই। মুক্ত করতে চাই। সেই সঙ্কল্পে আমার যুগ যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। কত-কত বর্ষা-বসন্ত পেরিয়ে গিয়েছে। তবু আমি সেই ব্রত থেকে আজও ভ্রষ্ট হইনি। রিপু দমনে, সংযম সাধনায় আজ আমি ক্ষীণতনু। দেহ আমার শুষ্ক কদলীকান্ডের ন্যায় লঘু, অনাহারক্লিষ্ট অথর্ব নাগফণির ন্যায় কুৎসিতদর্শন। কিন্তু তাই বলে তুমি আমাকে হীনবল ভেবে অবজ্ঞা করো না বৎস! আমি তোমা অপেক্ষা ঢের বলবান। কেন না আমি বিষধর। আর তুমি স্থূলকায় নির্বিষ স্বর্ণগোধিকা। তোমার বারংবার দংশনও আমাকে জব্দ করতে পারবে না।’
‘জারমণি! শুনছো! দেখ—বামন কেমনভাবে চন্দ্রস্পর্শের অভিলাষে ভূমিতে নিরর্থক লম্ফঝম্প দেয়। হা: হা: হা:।’
‘আবার তুমি উপহাসের হাসি হাসছো?’
‘হাসছি তোমার বালখিল্য আস্ফালন দেখে।’
‘বালখিল্য? তবে শোনো, শুনে রাখো—’
‘দুর্বল প্রতিপক্ষের কোনো কথা আমি শুনি না। কারণ আমি জানি, অক্ষম আর দুর্বলের আস্ফালন শেষমেশ করুণ আর্তনাদ হয়ে বায়ুমন্ডলে মর্মরিত হয়।’
‘বারংবার দুর্বল সম্ভাষণ করে তুমি আমাকে অপমানিত করছো। হে অদূরদর্শি, হে অজ্ঞাহঙ্কারি, আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি—প্রতিপক্ষকে দুর্বল ভেবে যে-কান তুমি চাপা দিয়ে বধিরতার ভান কর, একদিন তোমার সেই কর্ণদ্বয় সত্যিই বধিরতাপ্রাপ্ত হবে। যে-নারীকে বাহুলগ্না করার প্রয়াসে তুমি অদ্যাবধি তৃষ্ণার্ত, নিরলস এবং উন্মাদ হয়ে আছো, যে-প্রিয়ভাষিণীর সমুধুর বাক্য শ্রবণ করতে তুমি দন্ডে দন্ডে উৎকর্ণ হয়ে থাকো, একদিন তোমার সেই প্রিয়তমার বাক্যও তুমি কাতর হয়েও শুনতে পাবে না। তুমি মুহুর্মুহু উতলা হবে শুধু। এরপরও কি তুমি অট্টহাস্য করবে? হাসো। যত খুশি হাসো। মূর্খরা এভাবেই বিপন্নতার প্রাকমুহূর্তে হেসে থাকে। ঠাট্টা-বিদ্রূপ আর কটাক্ষপূর্ণ সে-হাসি।’
‘হ্যাঁ! আমি তোমাকে কটাক্ষই করছি। করছি তোমার এই অভিশাপের কথা শুনে। এই জগতে দুর্বলদের তাৎক্ষণিক অস্ত্রই হল কারণে-অকারেণ অভিসম্পাত বর্ষণ করা কিন্তু তারা জানে না, সবলের সশস্ত্র বাহু সেই অভিসম্পাতকারীকে, তার বা'য় কন্ঠকে কুষ্মান্ডের ন্যায় খিদি-খিদি৩৮ করিয়া কর্তন করে। জগতে অস্ত্রই হল সত্য। অস্ত্রই হল বশম্বদকারী। অস্ত্রই হল নিয়ামক।’
‘মূঢ় তুমি। তুমি এখনো তৃপ্তিদায়ক ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে আছো। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে তোমার শাশ্বত ও নিগূঢ় ধারণা হয়নি। জেনে রাখো, জগতে যুগ-যুগ ধরে, কাল পরম্পরায়, কেবল দুর্বলরাই অস্ত্রের তরে হাহাকার করে। অস্ত্রের জোরে তারা নিজেদের বলীয়ান ও অহঙ্কারী ভেবে বসে। আর নিরস্ত্রকে সর্বদা দুর্বল ভেবে অবজ্ঞা করে। অথচ কালের পরিহাস এটাই যে, সেই নিরস্ত্রদের হাতেই তার নিধন হয়। কারণ ইহলোকে নিরস্ত্র, নিপীড়িত ও অত্যচারিত মানুষরাই সত্যদর্শী হয়। সত্য, আদর্শ, নিষ্ঠা ও নৈতিকতা তাদের অদৃশ্য ও অনমনীয় অস্ত্র। আর সবলেরা আত্মগরিমায়, অহংবোধে বিভোর হয়ে এসবের ধার ধারে না।’
‘অহো! কী বিচিত্র তোমার মানব-দর্শন। আজকের দিনে যা সর্বাংশ অচল। নিশ্চয় কোনো গুলিখোর অশীতিপর বৃদ্ধের কাছে তুমি এইসব পাঠ নিচ্ছ?’
‘গুলিখোর বৃদ্ধ? পাষন্ড! যে আমাকে এই দুর্বোধ্য লোকজগৎ, এই জীবনের চিরকালীন মার্গ দেখাচ্ছে, আমাকে শোক থেকে ধর্ম ও বীতশোকের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, আমার আত্মাকে বৈমনস্য থেকে সঙ্কল্পাভিমুখী করছে, যে আমার পীড়ন-অস্থিরতা ও চাঞ্চল্যকে হরণ করে স্থির-প্রাজ্ঞ-লক্ষাভিমুখ তথা রণবিদ্যায় নিষ্ণাত করে তুলছে, তাকে তুমি ভাঙ্গ সেবনকারী বল? বৃদ্ধ বল? হে নিষ্ঠ্যুত জীব! বাস্তবিকই, তোমার জন্য আমার করুণা নয়। আজও তোমার জ্ঞানচক্ষু কিঞ্চিন্মাত্রও উন্মিলিত হল না! হায়! যে-নারীকে তোমার বিপুল নশ্বর দেহ দেখিয়ে যৌবন দেখিয়ে তুচ্ছ পৌরুষ দেখিয়ে প্রতারিত করে এই মাঠারিভূমিতে বন্দি করে রেখেছ— কুক্কুরের মতো দিনান্তে উপর্যুপরি সঙ্গম করবে বলে, তোমার ধ্যান-জ্ঞান-চিন্তা-চেতনা অহর্নিশ সেই নারীর কুহক জাগানো অঙ্গগুলিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে! তাই তুমি জগৎকে দেখতে পাও না। তুমি জানো না—জীবন কি সুদূরপ্রসারী! কাল কি উদাসীন ও নিষ্ঠুর দন্ডধারী! তুমি জানো না, যে-যৌবনের মগ্নতায় তুমি স্বপ্নে জাগরণে কল্পনায় নারীর গোপন অঙ্গই কেবল দর্শন কর, একদিন জীবন অরণ্যে সেই যৌবন-কুসুম-ভাতি নিষ্প্রভ হয়ে যায়!’
‘তুমি দূর-অতিদূর ভবিষ্যতের স্বকপোলকল্পিত কথা ভেবে আত্মসুখ নিয়ে থাকো। আমি আজকের কথা চিন্তা করি। এই মুহূর্তকে চিন্তা করি। আমার কাছে ভবিষ্যৎ সত্য নয়, যা ঘটমান তা-ই সত্য। আমি ঘটমানকে দেখতে চাই।’
‘ঠিক। আর তাই তুমি দূরদ্রষ্টা নও। ঘটমানতার বাইরে অখন্ডনীয় ভবিতব্যকে দেখতেও পাবে না তুমি। অথচ আমি মনশ্চক্ষুতে অনাবিল দেখতে পাচ্ছি—কি করুণ দশায় আমার পদতলে তুমি পরাভূত হতে চলেছ। আজ না হোক কাল, কাল না হোক শত-সহস্র-অযুত-নিযুত বর্ষ পরেও যে-মহারণের সূত্রপাত ঘটবে এই বারো যোজন ব্যাপী পবিত্র মাঠারিভূমিতে, সেখানে ভান্ডীর বৃক্ষের ন্যায় তোমার পতন অবশ্যম্ভাবী!’
যে উত্তেজনা এবং দৃঢ়তা নিয়ে অঙ্গদ এই ভবিতব্যের কথা বলে, তা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায় পাটন। তক্ষুণি সে তার প্রত্যুত্তর করে না। বরং কয়েকটি মুহূর্ত নির্বাক-নিস্তব্ধ থেকে যায়। তার চোখে মুখে ভীতির সঞ্চার হয়। যেন সে নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছে, সত্যিসত্যিই জঙ্গলের মাঝে সমূলে উৎপাটিত হয়ে শক্তিধর বৃক্ষের মতোই মড়মড় শব্দে পতন হচ্ছে তার শালপ্রাংশু দেহের। ভয়ার্ত পশু ও পক্ষীকুল পালাচ্ছে। সেই মহাপতনের শব্দ থেমে যেতেই, তার চেতনার উন্মেষ ঘটে। অঙ্গদকে সে এবার বলে, ‘তুমি আমাকে উত্তেজিত করছো! এই কি তোমার দূরভিসন্ধি?’
‘আদপেই দূরভিসন্ধি নয়। আমি তোমাকে উত্তেজিত করতেই এসেছি। যাতে তুমি আর কালবিলম্ব না করে অতিসত্বর যুদ্ধে অবতীর্ণ হও। আমি তো আজ প্রস্তুত। আমি তোমাকে সদলবলে রণাঙ্গনে আসতে আহ্বান করছি। এই বার্তা নিয়ে আমি মশালচী হয়ে তোমার দুর্ভেদ্য আঙিনায় প্রবিষ্ট হয়েছি। হে মহেষ্বাস! যুদ্ধে তোমার বীরোচিত সম্মতিস্বরূপ তোমার মশাল আমাতে হস্তান্তর কর আর এই মাঠারিভূমি থেকে আমাকে প্রস্থানে অনুজ্ঞা কর! আর বল—কোন তিথিতে, কোন লগ্নে তুমি ওই বিটঙ্কতুল্য পর্বতশীর্ষ থেকে রণাঙ্গনে অবতরণ করবে?’
পাটনকে ঈষৎ চিন্তাপর দেখায়। এতক্ষণ যেভাবে সে বাক্যে বাক্যে নিজেকে বীর এবং শত্রুদলনকারী বলে জাহির করছিল, বলশালী বাহু উত্তোলন পূর্বক আস্ফালন করছিল, এখন যেন তার সেই সব স্বগতভাষণেরই পরীক্ষা! আর তার এই পরীক্ষাতে, পাটন, জারমণিকে পাশে পেতে চায়। পেতে চায় এই মহীয়সী নারীর নিবিড় শলা।
আলোকিত মুখাংশ ধীরে ধীরে জারমণির দিকে ঘুরিয়ে, পাটন দ্বিধাচিত্তে সোহাগ-সম্বোধনে বলে, ‘রানি! এই চূড়ান্ত মুহূর্তে তুমি কিছুই বলবে না? আমি কি হস্তান্তরিত করব, অগ্নিদন্ড?’
জারমণির হাতে ধরা মশালটি তখনও প্রবল শিখায় জ্বলে চলেছে। সেই শিখার দিকে তাকিয়ে, সে, পাটনকে বলে, ‘যে-অগ্নি লেলিহান হয়ে উঠছে, তুমি তার কাছে কী প্রত্যাশা কর?’
পাটন নিরুত্তর। যাকে সে ‘রানি’ বলে উষ্ণ সম্বোধন করলো, তার মুখ থেকে অন্তত এই মুহুর্তে এমন কুটার্থ-বাক্য মোটেই প্রত্যাশিত নয় পাটনের। জারমণিকে জবাব দেওয়া তো দূরের কথা, তার অর্থই সে বুঝে উঠতে পারে না। সে তাকিয়ে থাকে জারমণির মুখমন্ডলের দিকে। যার ঠোঁট অনড়, অকম্পিত। চোখের দৃষ্টি অন্তর্ভেদী, অপলক।
জবাবের অপেক্ষায় থেকে অঙ্গদ আবার বলে, ‘হে ভীমভেদধারি! সময়াসন্ন। দ্বিধান্বিত হইও না। যুদ্ধই যখন অবশ্যাম্ভাবী, তখন আইস! হস্তান্তর কর তোমার মশাল। আর বল—’
বাক্য সম্পূর্ণ করতে হয় না অঙ্গদকে। চিন্তার আবেশ কেটে যায় পাটনের। বলে, ‘সহোদর! তবে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু কর!’
জারমণির হাত থেকে মশালটি নিয়ে সে টিলার শীর্ষ থেকে ধাপে ধাপে নেমে আসে উপত্যকায়।
‘সহোদর’ শব্দটি উচ্চারণ করতে গিয়ে কি সেই মুহূর্তে মাংসাদ জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে গেল পাটনের? কিন্তু কেন সে এই শব্দটি উচ্চারণ করল? সে কী শেষবারের তরে এই কথাটিই অব্যক্ত রেখে দিল যে, সে অঙ্গদের প্রতিপক্ষ নয়, সে তার শত্রু নয়? তার প্রিয় অনুজ সে? নাকি সে অঙ্গদের কথাবার্তা, অকুতোভয় কন্ঠস্বর আর রাজসিক আচরণ দেখে তার অন্তর্নিহিত দূরপ্রসারী শক্তিকে উপলব্ধি করতে পেরেছে?। অন্তত সে তা আঁচ করতে পেরেছে? অঙ্গদের এই অন্তর্নিহিত শক্তিকে অনুমান করেই সে তাকে সমীহ করতে এমন সম্বোধন করে?
আর অঙ্গদেরই বা সে-সম্বোধন শুনে হৃদয় বিচলিত হয়ে উঠল না কেন? কেন সে এমন নৈর্ব্যক্তিক নয়নে শুধু চেয়ে থাকল? নৈর্ব্যক্তিক নাকি প্রচ্ছন্ন আবেগাপ্লুত? তবে কি এত-এত বছরের সত্য-সাধনার পরেও এখনও সে নিজের মোহমুক্তি ঘটাতে পারেনি? এখনও সে তার প্রতিপক্ষকে, বস্তুত, প্রতিপক্ষ ভাবতে পারছে না? এখনো সে তার অন্তরের অন্তঃস্থলে কোথাও তার সহোদরের প্রতি দুর্বলতা অনুভব করছে?
করলেও, আচরণে তা মোটেই ফুটে উঠল না অঙ্গদের। এমন শোণিত সম্পর্কের উচ্চারণ শুনেও এতটুকুও অবনমিত হল না তার অক্ষিপল্লব, তার প্রপীড়িত ললাট! বরঞ্চ আরও দৃঢ়মুষ্ঠিতে সে তার হাতের মশালটি নির্দ্বিধায় পাটনের হাতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘হে দুর্মতি পাটন! যুদ্ধাবতরণের বার্তা স্বীকার করে নিয়ে তুমি আমার উদবেলিত হৃদয়ে আজ প্রশান্তির সঞ্চার করলে। হে প্রতিপক্ষ, বল—তুমি কোন দিন অস্ত্রবল, শত্রুবল, লোকবল তথা আনুষঙ্গিক ভোজ্য-পানীয় ও শকটযান নিয়ে এই পবিত্র মাঠারিভূমিতে লোকলস্করসহ হাজির হবে? কবে তুমি প্রতিপক্ষকে যুদ্ধার্থ আহ্বান জানিয়ে মদনভেরির যোজনব্যপী ধ্বনি দিতে চাও?’
অসম্মতি প্রকাশের ভঙ্গিতে পাটন অঙ্গদের মশাল হাতে নিয়ে, দুপাশে থুতনি নেড়ে জানাল—না, আগে সে ভেরি বাজিয়ে যুদ্ধের ধ্বনি দেবে না।
কিন্তু কেন? সে যদি যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত মনে করে থাকে, তাহলে কেন সে এই মহাধ্বনি দিয়ে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাবে না?
পাটন তার কারণও জানিয়ে দিল। বলল, সে তো যুদ্ধ চায়নি। সে জারমণিকেই চেয়েছে। তাহলে কেন সে প্রথমে এই রণতূর্য বাজাবে?
অঙ্গদ তেজের সঙ্গে বলে উঠল, ‘হে দুর্মতি পাটন! তুমি মেধাহীন, প্রজ্ঞাহীন। তাই তুমি যুদ্ধের পটভূমির গভীরতা আগাম অনুধাবন করিতে পার নাই। যেহেতু তুমি পরস্বাপহরণ করেছ, তজ্জন্য যুদ্ধের অবতারণাকারী তুমি। তোমারই উচিত, প্রথম মদনভেরি বাজিয়ে প্রতিপক্ষকে সদম্ভে আক্রমণের জন্য আহ্বান জানানো।’
‘আমাকে প্রজ্ঞাহীন আখ্যা দিয়ে তুমি নিজেকে সপ্রজ্ঞ জাহির করছ। কিন্তু জেনে রাখ, হে তেজোদ্দীপ্ত! এই স্ত্রী-অলঙ্কৃত জগতে কোনো নারীই কোনো পুরুষের পরস্ব নয়। বল ও বীর্য যার আছে, নারী তার কাছে নিজস্ব। পুরুষের অধিকৃত নারী সেই পুরুষের কাছে তার পৌরুষের প্রতিভূ! আর এভাবেই প্রকৃত পুরুষ তার অর্জিত নারীর গর্ভে আগামী দিনের কথা ভেবে উত্তরকালের বীরের জন্ম দিয়ে যায়। তোমার মতো অপুষ্ট, নির্বল, হীনবীর্য পুরুষেরা নারীসহবাসে ধরিত্রীর বুকে পুষ্টিহীন রুগ্ন বংশ রেখে যায়, যাকে কোলে পেয়ে এই ধরিত্রী শোকসন্তপ্ত ও ক্রন্দনমুখরা হয়।’
‘ভীরু! কাপুরুষ! কবুল করার পরেও তুমি বিরুদ্ধ যুক্তি দিয়ে এখন সমারঙ্গন থেকে বিমুখ হতে চাও? তোমার এই পলায়নমুখিনতাকে আমি চিরদিনের জন্য চূর্ণ করবো বলেই এই যুদ্ধের আয়োজন।’
‘তুমি আত্মপ্রতারক! শঠতা জানো। তা না হলে কেন তুমি এমন অসত্য উচ্চারণ করছো?’
‘অসত্য উচ্চারণ?’
‘হ্যাঁ, অসত্য উচ্চারণ!’ পাটনের কন্ঠস্বর আবেগবিহ্বল হয়ে পড়ে। সে কোনোভাবে নিজেকে সংবরণ করে বলে, ‘একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞাসিতে চাই। তুমি এই যুদ্ধ করে কি আমার কাছ থেকে তোমার ওই অপরূপা-অপ্সরা-কামাগ্নিকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চাও? তাই যদি হয়, তাহলে এতদিন ধরে তুমি যে আমাকে কথায়-কথায় শত বাক্যে কামান্ধ, কামাতুর বলে অভিযোগ করে এসেছো, আজ আমিও তোমাকে তদপেক্ষা অধিক কামুক বলতে পারি না?’
‘আমার কথার প্রতিধ্বনি তুলে অনুপযুক্ত অনুচ্চার্য শব্দ উচ্চারণ করো না মূঢ়! বাক সংযত কর! আমি আজও, এই দন্ডেও, তোমাকে কামান্ধ বলছি। নারীকে ভোগের বাসনায় তুমি প্রহরে প্রহরে অনুক্ষণ শুধু লোভ-লিপ্সা-কামের শব্দ উচ্চারণ করে চলেছ। তোমার গায়ে আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি আবৃত হয়ে আছো এক অদৃশ্য ‘কামাবলী’তে। তাই তুমি জীবদ্দশায় কোনোদিনও ‘কৃষ্ণ’ শব্দটি উচ্চারণ করতে পারবে না। কারণ এতদিনে তোমার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠদীর্ঘ মনুষ্যজিহ্বাটি পুরু ও আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে। একদিন সেইক্ষণ আসবে, যখন তোমার সংবিৎ ফিরবে। সেদিন তুমি এই অপাপবিদ্ধ শব্দটি অন্তত একটি বারের জন্য হলেও উচ্চারণ করতে মরিয়া হয়ে উঠবে। কিন্তু তোমার সব প্রয়াস বিফলে যাবে। আর তুমি নিরয়গামী হবে। যারা ‘কৃষ্ণনাম’ উচ্চারণ করতে পারে না, তাদের জন্যই মৃত্যুর পরে নরকের দ্বার খুলে যায়!’
‘এসবই তোমার প্রলাপ। তুমি এখনও আমার জিজ্ঞাসার যথাযথ জবাব দাওনি।’
‘প্রতিপক্ষের প্রশ্নের জবাব দিতে ভয় পাওয়া কাপুরুষের লক্ষণ। তোমার কি আমাকে তাই মনে হয়েছে?’
‘তেমন মনে না হলেই আমি যার পর নাই খুশি হবো। আমি বীর বলেই মানুষকে কাপুরুষ দেখতে চাই না। কল্পনাও করি না।’
‘এখন পুনরায় বল, কী তোমার জিজ্ঞাসা?’
‘কেন তুমি যুদ্ধের জন্য এমন উতলা হয়ে উঠেছ? আমাকে পরাভূত করে, তুমি কি ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চাও আমার হৃদয়ের ধনকে? ঢাক-ঢোল-কাড়া-নাকাড়া-ভেরির শব্দ আর শতকোটি বাণের আঘাতে তুমি কি আর্তনাদে মুখরিত করে তুলবে এই মাঠারিভূমির বাতাস আর অকালে মৃত্যু ঘটাবে আমার প্রেমিক হৃদয়ের? তা-ই তুমি চাও?’
‘তোমার আবার হৃদয়! যারা রতির আবর্তে থাকে, তাদের আবার হৃদয় কি? তুমি অবিবেচক! হৃদয়হীন!’
‘আবার তুমি প্রসঙ্গান্তরে যাচ্ছো। যথাযথ জবাব দাও। হে প্রজ্ঞাবান! তুমি কি ছিনিয়ে নিয়ে যেতে চাও...’
‘তবে শোনো! আমি আজ আর নারীকে তোমার দখল থেকে পুনরুদ্ধারার্থে যুদ্ধ করতে চাই না। আমি এই সুন্দর জগতে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে যুদ্ধের জন্য উতলা। যে-অন্যায়ের বীজ এই মাটিতে বপন করা হয়েছে, তা প্রতিদিন উদ্ভিন্ন হচ্ছে। তাকে অতিসত্বর উৎপাটিত না করলে, ধীরে ধীরে তা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠবে। জগৎ ভরে যাবে অনাচার, অবিচার, অস্ত্র আর রক্তক্ষরণে! আর তুমি? তুমিও যখন এই যুদ্ধে সম্মত, তখন তুমিই-বা কী চাও এই যুদ্ধের শেষে?’
পাটন তৎক্ষণাৎ কোনো কিছু না বলে, তার অবনমিত ললাট ধীরে ধীরে আকাশের পানে তুলে নির্বাক থাকল দুদন্ড। হস্তান্তরিত মশালের আলোয় চিক চিক করছে তার ললাটাংশ। সে রীতিমতো দৃঢ়তার সঙ্গে, দাঁতে দাঁত চেপে, সাড়ম্বরে বলে উঠল, ‘আমি জারমণিকেই চাই। আমি জারমণিকেই চাই বলে ক্ষমতা, পৌরুষ, বীরত্ব ও অস্ত্রের নিরঙ্কুশ প্রতিষ্ঠা চাই। তাই আমার চেয়ে তোমাকে দুর্বল ভেবেও এই অসম যুদ্ধে সম্মত হচ্ছি আমি। তোমার হয়ে আরও যারা আমার প্রতিপক্ষের পাঁতিতে ব্যূহ রচনা করতে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবে, আমি আর আমার আদিবাসী সাঁওতাল-শবর-কুড়মী ধনুর্ধর বাহিনী দিয়ে একে একে তাদের সবাইকে নিশ্চিহ্ন করতে চাই। শাদ্বলের চিরহরিৎ তৃণকে আমি শত্রুর শোণিতে রক্তাক্ত করতে চাই।’
‘আমিও প্রতিহত করতে চাই তোমার এই ঔদ্ধত্যকে! নির্মূল করতে চাই এই পৃথিবীর বুক থেকে যত অস্ত্র ও অস্ত্রীকে। অন্যায্য পৌরুষকে।’ আর তোমার যে-মুখ থেকে এই বাণী আজ উচ্চারিত হল, আকাশময় ধ্বনিত হল, আমি তোমার সেই কদর্যমুখ পায়ে পায়ে চিপিটকের ন্যায় পিষ্ট করে ছাড়ব!’
‘তবে তাই হোক! সহোদর, যুদ্ধের আয়োজন কর!’
পাটনের মশালটি হাতে নিয়ে, অঙ্গদ, লম্ফ দিয়ে দিয়ে ক্ষাত্রতেজে ছুটতে লাগল— জঙ্গলের মাঝে জগদ্দল পাথরগুলির দিকে। বিপরীতমুখী হাওয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠল তার শিখাটি।
অঙ্গদ চলে গেল! যুদ্ধের মশালরূপ সম্মতি নিয়ে।
এবার যুদ্ধের প্রস্তুতি।
_____________________________________________________
১ ফড়িং
২ বোলতার
৩ ধান ঝাড়ার সময় শিসের গুচ্ছে থেকে যাওয়া কিছু ধান, যা পরে গুচ্ছ খুলে আবার ঝাড়া হয়
৪ নিষ্কৃতি
৫ ফুটছে
৬ মারাত্মক
৭ বাঁশের আলনা
৮ চিরুনি
৯ খেঁকি কুকুরের মতো তেড়ে
১০ কাঠ হয়ে
১১ কয়লা
১২ প্রাণটা
১৩ আরেকবার
১৪ জুত করে
১৫ স্থানীয় নামে পরিচিত মহুয়াগাছ
১৬ আটকাল
১৭ কুড়মি গৃহকর্তা
১৮ গৃহকর্ত্রী
১৯ ভক্তদের
২০ খড় কাটা
২১ মারছে
২২ বিরক্ত হয়
২৩ কেটে
২৪ মাছ ধরার বিশেষ উপায়
২৫ বিষাক্ত পদার্থ
২৬ পাথুরে জমিতে বেড়া বাঁধা, অর্থাৎ নিষ্ফল কর্ম
২৭ চাবুক মারছে
২৮ ঝাঁপ বা ছাউনি
২৯ এটাও
৩০ ততোক্ষণে
৩১ ফল না হওয়া তালগাছের পুরুষ ফুল
৩২ ধপ করে জ্বলে
৩৩ মুদিখানার জিনিস
৩৪ ঝলসাচ্ছে
৩৫ কুঞ্চিত
৩৬ সংস্রবে; ঝামেলায়
৩৭ ঢেঁকির মাথায় লাগানো কাঠের দন্ড, যা দিয়ে শস্য কুঁটা হয়।
৩৮ খন্ড খন্ড
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন