আদি কান্ড প্রণয় ও দন্ডবিধান পর্ব

সৈকত রক্ষিত

পুব-পশ্চিমে পাকা রাস্তা। আচমকা যেন ছুটে চলে গেছে। গিটির ওপরে পিচ ঢালা এই নির্জন রাস্তাটি ‘আড়ষা রোড’। পুবদিকে চলে গেল আড়ষা-আহাড়রা-সিরকাবাদ, পশ্চিমে ঝালদা-তুলিন পেরিয়ে মুরি। তুলিন ও মুরির মাঝখানে জোলার গামছার মতো পেতে রাখা সুবর্ণরেখা নদী। তবে তুলিন-মুরি সে তো অনেকটা দূর। পিচ-রাস্তার ওপরে ঠিক যেখানে দাঁড়ালে, ঢালুতে নামলেই চিটিডি গ্রাম, সেখান থেকে ঝালদা খুব দূরে নয়, কিন্তু তুলিন কম করে হলেও আঠারো কিমি।

এই অঞ্চলের গ্রামবাসীরা আড়ষা রোড ধরে ‘ব্যেবসিক কাজে’ ঝালদার হাটে যায়। কেউ গবাদি কেনাবেচা করতে, কেউ-বা সবজি নিয়ে। কেউ আবার আখের বোঝা মাথায় নিয়ে, বিকতে বিকতে, ঝালদা পেরিয়েও চলে যায়। আর যারা ‘আসর-করা লোক’, যাদের সময়ে সময়ে ‘মাত’১ লাগে, তারা নাচনীর বায়না করতে এই রাস্তা ধরেই ফর্ফর করে সাইকেল ছুটিয়ে দেয়। ঝালদার আগে জারগো মোড়, সেখান থেকে মাঠারি। চারপাশে টিলা-ডুংরি আর পলাশবনে ঘেরা মাঠারি অপূর্ব গ্রাম! মাথার ওপরে আকাশ যেন নাগকেশরের ফুল!

শুধু মাঠারি কেন, আড়ষা রোডের ওপর দাঁড়িয়ে একপাক ঘানি-ঘুরা ঘুরলে মনে হয় পুরো তল্লাটটি অখন্ড এক নিসর্গচিত্র। পাথৈরা মাঠ, জঙ্গলঝাড়ি আর ধানিজমি থেকে অনেকটা ওপরে এই পাকা রাস্তা। তাই গৈড়ানে নেমে যাওয়া উত্তরের গ্রামগুলি সহজে নজরে আসে। বিস্তৃত ধানখেত, আলের ওপরে ঝুঁকে পড়া তাল-খেঁজুরের সারি। কোথাও কোথাও নাঢ়া পলাশ গাছ যেন ছোনাচের কার্তিকের মতো লাফ দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাটিতে। তারপর ক্রমশ ঘন হয়েছে জঙ্গল।

জঙ্গল এদিকেও আছে। রাস্তা থেকে দক্ষিণ মুখে নেমে গেলে আঙিনায় পড়ে থাকা জনহার ভুতির মতো এখানে-সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে ছোটো ছোটো গ্রাম। পলপল-রুগড়ি-কদমপুর-ঝাঁপা-হারাদা ইত্যাদি। কেউ কারো গায়ে লাগালাগি হয়ে নেই। মাঝখানে কত যে গাছপালা! কত বনতুলসীর ঝোপ, কত বকাভেঁড়রি আর পঙা। আস্থা-গাঁজন-ভালুকসুক্তি আর কাঁটা শিরীষ বাদেও কত-কত নাম না জানা গাছের জঙ্গল ঠেসে গেছে ডুংরিকোল অব্দি।

‘ডুংরি’ হল ছোটো পাহাড় বা টিলা। ভালডুংরি, চোরনাচা-ডুংরি, জিনগা-ডুংরি— দক্ষিণ থেকে পশ্চিমে এই ডুংরিগুলো আপাদমস্তক জঙ্গল নিয়ে কোটালের মতো অতন্দ্র প্রহরায় রয়েছে। ভোরখোর বর্ষায় পাদদেশে হামরাম করে ক্যানেলের জল। বেগুনকুদর গ্রামের কাছে অযোধ্যা পাহাড়ের নীচে মুরগুমা ড্যাম। কেউ কেউ বলে, যে-বছর অপদেবতা ক্যানেল পার হয়ে গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়ে, সে-বছর আষাঢ়-শ্রাবণে ডুংরির মাথা থেকে ‘জিনগা-মাঈ’-র ডাক শোনা যায় না, বৃষ্টিও হয় না—খরায় মানুষকে গ্রামছাড়া হতে হয়।

দু-দশ বছরের মধ্যে তেমন কোনো ভূত ক্যানেলের জলে ছপছপ করে সাঁতার কেটে এপারে ওঠেনি। বন-বাদাড়ের ভেতর দিয়ে ভিজে গায়ে দৌড় মেরে ঢুকে পড়েনি গ্রামগুলিতে। খরাও হয়নি। হয়তো সে-কারণে ‘জিনগা-মাঈ’ নামের এই লোকদেবীটির প্রতি গোটা অঞ্চলের গ্রামবাসীদের বিশ্বাস দিনদিন বেড়ে চলেছে। তারা মনে করে, জিনগা-মাঈ পুরদস্তুর কল্যাণময়ী। জিনগা-ডুংরির মাথায় আছে জিনগা-থান। ওই থানে তার নিরুপদ্রব বসত। ওপরের ওই ‘টঙ’ থেকে সে সবকিছু দেখতে পায়। কিন্তু তার দেখা পায় ক-জন?

জিনগা-থানে ওঠার কথা কেউ কল্পনাও করে না। যদিও পলপল গ্রাম থেকে পশ্চিমে কনারবেড়া, কালিপুর, মুষয়াটাঁড় গ্রামগুলি জিনগা-ডুংরির ভিত্তিদেশ ঘিরে রয়েছে। ওই সব গ্রামের লোকেরা তাদের ঘরের দাওয়া থেকে আসমানে তাকালে সর্বদর্শী সাক্ষীগোপালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ওই ডুংরিটিকে দেখতে পায়। দেখতে পায় না ডুংরির মাথায় গাছপালায় আড়াল হয়ে থাকা তার থানটি। হয়তো তাই না-দেখা এই জিনগা-থান নিয়ে গ্রামবাসীদের মুখে মুখে গড়ে ওঠা লোককাহিনি আর ‘অতিকথা’-র অন্ত নেই। অন্ত নেই তাদের আবেগেরও। ভয়-ভালোবাসা-আবেগ আর স্বপ্ন-কল্পনা দিয়ে জিনগাকে তারা আপন আপন গ্রামের ষোলোআনার সদস্য করে নিয়েছে।

উত্তর দিকে কোনো ডুংরি নেই। পাহাড় নেই। এমনকী এক-আধটা ঢিপি পর্যন্ত নেই। তবে একসময় অঞ্চল বিস্তৃত যে গভীর অরণ্য ছিল, তার অবশেষ এখনো রয়ে গেছে। নিকটবর্তী গ্রামবাসীদের আচার-আচরণ, ভাষা, স্বভাব-প্রকৃতি থেকেও আরণ্যক জীবনের পরম্পরা লক্ষ করা যায়। আর বিস্তৃতি কমে গেলেও, এখনো, কোথাও কোথাও জনহীন ঘন জঙ্গলের অস্তিত্ব রয়েছে। আছে জংলি মানুষও।

জীবনডি থেকে বড়ামের দিকে যেতে একপাশে রয়ে যায় ডেলিকচা। এই গ্রামটি এতটাই জঙ্গলের ভেতরে যে সাধারণ মানুষের তা নজরে আসে না। রাত-বিরেতে মানুষ যে এমন জঙ্গলের ভেতরে আস্তানা গেড়ে থাকতে পারে, তা বিশ্বাস হয় না। অথচ দিনের পর দিন এই জঙ্গলে পড়ে রয়েছে সহদেব শবর আর তার ভাই ভুটু শবর। তাদের বউ-ব্যাটা-বিটি-ঘরসংসার নিয়ে।

শবর ছাড়াও আরো তিন-তিনটে ঘর আছে এই বনের ভেতরে। বাউরি ও ভূমিজদের। অরণ্যের আড়ালে, ছাড়া-ছাড়া ভাবে যে-যার মতো ঘর করে আছে। এই চারটি ঘর নিয়ে ডেলিকচা গ্রাম হলেও, জঙ্গলের মাঝে এই বসতিটি আসলে একটি টোলা। প্রকৃত ডেলিকচা গ্রামটি পশ্চিমমুখে। জঙ্গল যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে শুরু হয়েছে তার ডাঙা। ডাঙাটা পেরিয়ে গেলে গ্রামবাসীদের বাইদ-বহাল খেত। ওই ডেলিকচা থেকে উঠে এসে তারা জঙ্গলে বসতির পত্তন করেছে। তবে কেন এই নতুন ডেলিকচার পত্তন হল, কেনই বা চারটি ঘরের গ্রামবাসীরা তাদের আদিগ্রাম ছেড়ে বনের মাঝে বসত গড়ল, সে বৃত্তান্ত পরে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, জঙ্গলের ভেতরে এই মানুষগুলির বসবাস অনেকটা নিরুপদ্রব। তাদের সঙ্গে প্রতিবেশী মানুষের কোনো যোগাযোগ আছে বলে তো মনে হয় না। অরণ্য হোক, কী শ্মশানভূমি হোক, হিংস্র জন্তুজানোয়ার আর ভূতপ্রেতের চেয়েও মানুষের সবচেয়ে কাছের শত্রু হল মানুষ। এখানে বিষধর সরীসৃপ আছে, শ্বাপদ আছে, কিন্তু প্রাণঘাতী সমগোত্রীয় সে-দুশমন কি সত্যিই আছে?

আচমকা শোনা গেল জঙ্গলের ভেতরে ধাবমান পায়ের শব্দ। এক ধেনুকধারী যুবক কুঁড়েঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল। পাতপালা মাড়িয়ে ছপ-ছপ-ছপ-ছপ করে দৌড়ে গেল সে। অদৃশ্য কোনো আক্রমণ প্রতিহত করতে। মেদহীন শক্ত সুঠাম তার চেহারা। লম্বাটে গড়ন। গোঁফদাড়ি নেই বললেই চলে। বগলে লোমের গুচ্ছ। খালি গা। পাকা তালের মতো ঘন কালো গায়ের রং। হাঁটু অব্দি ঝুলে থাকা নোংরা বস্ত্রখন্ডটি যেন সে কেবল লজ্জা নিবারণের উদ্দেশ্যে কোমরে পাক দিয়ে রেখেছে।

ছোটাছুটি করে একটু জিরিয়ে নিতে সে রতনকৈড়লা গাছটির তলে দাঁড়ায়। হাঁপাতে থাকে। ধস-ধস করে ওঠানামা করে তার প্রশস্ত বুক। ঘাড় উঁচু করে সে কি শত্রুপক্ষীয় কাউকে লক্ষ করার চেষ্টা করে? কে তার শত্রু? কার উদ্দেশ্যে তার এই শানিত আক্রমণের তৎপরতা? হিংস্রতা নিয়ে কোটরে বসা তার চোখ দুটি সোনাল পোকার মতো পাক খাচ্ছে। এই যুবকের নাম পাটন শবর। কাউকে দেখতে না পেয়ে পাটন আবার ওই কুঁড়েঘরটিতে ঢুকে পড়ে।

দুপুরের পড়ন্ত বেলা। জঙ্গল ঘিরে আশ্চর্য এক নিস্তব্ধতা। জায়গার জায়গায় আলো-ছায়া। দূরে কোথাও একইভাবে ডেকে চলেছে জোড়া ঘুঘু! ঘু-ঘুঘুচ-চু:! ঘু-ঘুঘুচ-চু:! এক ঘুঘুর ডাকের অবিকল প্রতিধ্বনি তুলছে দূরবর্তী কোনো গাছের ডালে বসে থাকা আরেক ঘুঘু। তাতে নির্জনতা আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

একটি তেজি কুকুর বেরিয়ে আসে শবরদের ঘর থেকে। কালো, ন্যাজকাটা। তালগাছটির কাছে দাঁড়িয়ে সে পেটে-দুলুনি দিয়ে বারকতক ঝাঁই ঝাঁই করে নাগাড়ে ডাকতে থাকে। তারপর, হয়তো কিছু একটা দেখতে পেয়ে, প্রবল গতিতে হেঁসর-ফেঁসর ছুটে গেল জঙ্গলের গভীরে।

বেরিয়ে এল পাটনও। তাকে অনুসরণ করে, কাঁড়-বাঁশ হাতে, সেও ছুট লাগাল পেছু পেছু। শুকনো পচা পাতা আর ঝুড়ঝাড় মাড়িয়ে।

দেখতে দেখতে নেমে এল অন্ধকার।

ঝিঁঝি ডাকছে। অন্ধকারে রিঙ-রিঙ করে উড়ছে রুলি পোকা। জংলি বাতাসে মহুল সিজানোর গন্ধ। বড়াম পেরিয়ে নদী তীরবর্তী গ্রামগুলি থেকে ক্ষীণ ভেসে আসছে পেঁপটি বাঁশির সুর। জংলি ঢেলাগাছগুলি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি উড়ে আসছে। শবরদের উঠোনে। বসছে তালপাতার বেড়ার গায়ে। পেঁপে গাছের পাতায়। নাককাটা ফুলের মগডালটিতে মিশে গিয়ে লিকলিক করছে শিশু গিরগিটি। দোল খাচ্ছে হাওয়ায়।

মাটির বারান্দায় লন্ঠন। দপদপ করছে মাটিতেলের২ অভাবে। ঠেঁটি লুঙ্গি কিংবা গামছা পরে, আদুড় গায়ে যারা দড়ির খাটগুলিকে টেনে উঠোনে সলা করতে বসেছে, লন্ঠনের ম্রিয়মাণ আলো বিচ্ছুরিত হয়ে তাদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছয় না। লন্ঠনটি দপ করে নিভে যায়।

ঘরের ভেতরে জ্বলছে কাঠের উনুন। ভাত ফুটছে মাটির হাঁড়িতে। হাঁড়ি ঘিরে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা শিখায় উঠোনের কালো কালো লোকগুলির পিঠ-কাঁধ চকচক করে। খাটের ওপরে কোথাও ঠেসান দিয়ে রাখা লাঠি, কোথাও রয়েছে ‘কাঁড়বাঁশ’ অর্থাৎ তিরধনুক। মদের গন্ধ মুখে মুখে।

যে-ঘরে কাঠের উনুন জ্বলছে সেই ঘরেই তাদের খাওয়া-শোওয়া। সেই ঘরের তাঁতিখুটায় বাঁধা রয়েছে ঢাইড় ছাগল। রাতে কখনো নাদি-নাদাড়ি পড়ে তাদের ছেঁড়া বিছানায়। ছাগলের গড়িয়ে আসা পেচ্ছাপে চাটাইয়ের প্রান্ত ভিজে যায়।

এই ঘরে সহদেব থাকে পরিবার নিয়ে। পাশের ঘরটিতে তার ভাই ভুটু শবরের পরিবার। আর দু-টি ঘরের সামনে যে-বারান্দা সেখানে সারাটা দিন শুয়ে-বসে থাকে সহদেবের বুড়ি মা। এ-ছাড়া বারান্দায় উঠতে, বাঁদিকের প্রান্তে আরো একটি ছোট্ট ঘর রয়েছে। এটা তাদের শস্যঘর। এখানে থাকে চাষের ধান-কলাই-ভুট্টা-আমড়ু। বর্ষার কথা ভেবে জ্বালানির জন্য রাখা থাকে জঙ্গল থেকে আনা গাছের শুকা ডাল, ঝাঁটি, পালহার বোঝা। ঘরে, বারান্দায় যেখানে-সেখানে ঝুলতে থাকে ইঁদুর ধরা ছোটো ছোটো ঘুগি, পাখি ধরা ‘লাঠা-কাঁইড়া’। উঠোনে পড়ে আছে কুড়ুল। চ্যালা কাঠ।

ঘরের ভেতরে ঘেমে উঠেছে পাটন। উনুনে গোঁজা কাঠের আগুনে ঝলমল করছে তার ঘর্মাক্ত মুখ। জঙ্গলের ভেতরে বুয়ান ঝাড়ে আড়াল হয়ে থাকা উইঢিবি থেকে সে মেরে এনেছে একটা মৈষা ঢঁড়। অবিকল খরিশ সাপের মতো দেখতে। ফণাহীন এই সাপটিকে খোসা ছাড়িয়ে সে কাটারি দিয়ে খন্ড খন্ড করছে। নুন-হলুদ মাখিয়ে ঝলসে নেবে। টিনের থালায় মাড়ভাত ঢেলে আগুনে অর্ধদগ্ধ এই সাপটিকে পাতে পাতে নিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খাবে। সাপের থেঁতলানো মুখে ল্যাটল্যাটে রক্ত। মুন্ডুটা কুপিয়ে আলাদা করতে গিয়ে, পাটন, মদের নেশায় আপন মনে কীসব বকতে থাকে। রাগে, আক্রোশে। কাঠের রস পুড়ে চিড়চিড় শব্দ হয় উনুনে। ভুপ ভুপ নাচে ভাতের ঢাকাটি। ফেন গড়িয়ে পড়ে।

‘এ-এ-!’ ঝিঁঝি ডাকা উঠোনে দাঁড়িয়ে, অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা দেখতে পায় গুরুধন শবর। ভুটুর বড় ছেলে। খাট থেকে ধড়ফড় করে উঠে পড়ে বাকি সবাই। সহদেব, ভুটু, অঙ্গদ। আসে সহদেবের বউ সঞ্চারী। দূরের ঘরটির বারান্দায় কানায় বসে আলছ্যেলাকে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে ভুটুর বউ মেনকা বলে, ‘কী বঠে? কী?’

কাটারি হাতে ঘাড় উঁচু করে উঠোনের দিকে তাকিয়ে থাকে পাটনও। তারপর সেও হড়বড় করে বেরিয়ে আসে। উঠোনের দড়ির খাটগুলির ফাঁকে তারা গায়ে চাপাচাপি করে একে অপরকে ঠেলাঠেলি করে। যতমুড় এক জায়গায় করে অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভয়ে ধস ধস করতে থাকে প্রত্যেকের বুক।

‘কী দেখছিস? হে:!’ উদবেগ নিয়ে জানতে চায় পাটন।

‘ওই ত। হু—’ দশ-বারো বছরের কিশোর গুরুধন, অন্ধকারের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে দেয়। গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে দৃশ্যমান তিনটি আলো ক্রমশ এগিয়ে আসছে তাদের কুঁড়েঘরটির দিকে। আলোগুলি গাছেপাতে আড়াল হয়ে যাচ্ছে।

তারা তাকিয়েই থাকে। কারো মুখে কথা নেই। হাতে তিরধনুকটি নিয়ে, পাটন, এক ঝলক শস্যঘরটির দিকে তাকায়। বাইরে থেকে শিকল তোলা সেই ঘরটির কপাট কে যেন ভেতর থেকে অল্প অল্প করে ঠেলছে।

অঙ্গদ, পাটনের দাদা, ছুটে গিয়ে বারান্দায় ওঠে। বন্ধ দরজার সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে, ‘ক্যানে ধাকলাছিস? এ জারমণি! টুকু শুন ন হামার কথা। সুগুম থাক—’ বলে, সে ফের উঠোনে এসে তাদের সঙ্গে ঠেসাঠেসি করে দাঁড়ায়।

আলোগুলি তাদের ঘরের দিকে আসতে আসতে দক্ষিণ-পশ্চিমে ঘুরে যায়। নদীর দিকে।

নিশ্চিন্ত হয় ওরা। যে-যার জায়গায় আলগা হয়ে বসে পড়ে। যদিও তাদের মন থেকে ভয় পুরোপুরি কাটে না। বুকে ধকধকানি থেকেই যায়। এভাবে সারাক্ষণ কী বুকের ভেতরে ভয় পুষে রাখা যায়? কতদিনই-বা তা রাখা সম্ভব?

এবার আরো জোরে কপাট ধাকলানির শব্দ হতে লাগল। শস্যঘরটির ভেতর থেকে কপাটের গায়ে দু-হাতের মুঠোয় সজোরে কিল মারতে মারতে অস্থির হয়ে ওঠে জারমণি, ‘হামকে খুলে দে গো! ক্যানে তরা শিকল দিঁয়ে রাইখেছিস? খুলে দে!’

‘চুপ দে ন। অমন ক্যানে ছুটুছ্যেলার পারা ঝুঁক ধরছিস? তকে কি মাসাবধি আটক করে রাখব?’ অঙ্গদ বন্ধ দরজাটির সামনে দাঁড়িয়ে বলে। শিকলটি নামিয়ে কপাট সে খোলে না।

ভেতরে জারমণি কান্নায় ফুঁপিয়ে ওঠে। অঙ্গদের কোনো কথা সে আর বিশ্বাস করতে চায় না। সে কি এভাবে জঙ্গলের মাঝে একা একটি ঘরে দিনরাত অবরুদ্ধ হয়ে থাকবে বলে পালিয়ে এসেছে তার সঙ্গে? সে কি স্বপ্নেও ভেবেছিল তার এমন পরিণতি হতে পারে? আলো থেকে এসে একঘর অন্ধকারে বন্দি হবে?

অঙ্গদ তাকে সান্ত্বনা দেয়। মনে কোনো রাগ, কোনো উত্তেজনা ছাড়াই বোঝানোর চেষ্টা করে, এমনভাবে তাকে আর বেশিদিন থাকতে হবে না। আজ হোক কাল হোক সে তার মুক্তির ব্যবস্থা করবেই। সবে তো তিনটি দিন হল তার অন্তরিত থাকা। এর মধ্যে এতটা উতলা হয়ে চলে? অঙ্গদও কি তার জন্য চিন্তিত নয়? সে কি হাত-পা গুটিয়ে বসে রয়েছে?

‘কই, তুঁই কী করেছিস? হামি এমনি আঁধার ঘরে থাইকে পচব? আর তুঁই হামাকে আটক করে উড়ে উড়ে বুলবিস?’

আপত্তি জানায় অঙ্গদ। সে কি উড়ে বুলছে? তার মনে-প্রাণে ভয় নেই? তবু সে যতটা সম্ভব নিজেকে আড়ালে রেখে, নিরাপদে থেকে লোকমুখের উড়ো খবরগুলো ধরতে চেষ্টা করছে। সে জানতে চাইছে, পলপল থেকে জারমণি পালিয়ে আসার পর কী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে সেই গ্রামবাসীদের মধ্যে। তারা কি ইতিমধ্যে জানতে পেরেছে কোথায় পালিয়ে গেছে জারমণি? কার সঙ্গে পালিয়েছে? আর জানতে পারুক বা নাই পারুক, যে-গ্রাম থেকে এমন একটি জুয়ান বিটিছ্যেলা নিখোঁজ হয়ে যায়, সে গ্রামে কী ধরনের তোলপাড় হয়? যদি জানা যায় যে, তেমন কোনো বিক্ষোভ হচ্ছে না, যদি বাপ-মায়ে মনে করে যে, বিটিছ্যেলা গেছে ভালোই হয়েছে জহড় গেছে— তাহলে অঙ্গদই বা আর জারমণিকে নিয়ে ডেলিকচা ছেড়ে অন্য কোথাও পালিয়ে যাবার কথা ভাবতে যাবে কেন? সে তো এখানে তাকে নিয়ে ঘর করতে পারে? জিনগা-মাঈয়ের নাম করে তার কপালে সিঁদুর ঘঁষে। জারমণি তো এটাই চেয়েছিল?

জারমণি কাঁদতে থাকে। তার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলা, দরজায় ধাক্কা দেওয়া, সুর করে কেঁদে ওঠা—এই সবগুলোতে ভয় পেয়ে যাচ্ছে সহদেব-সঞ্চারী থেকে শুরু করে ঘরের সবাই।

তাদের ভয়ের কারণ একটাই—যদি জানাজানি হয়ে যায়? এই ঘরের কাছাকাছি তো আরো ঘর আছে। প্রতিবেশী আছে। এমন নি:স্তব্ধ জঙ্গলের মাঝে, একটি গৃহবন্দি নারীর কান্না তাদের মনে কৌতূহল জাগিয়ে তুলবে না? এমনও তো হতে পারে—সম্পূর্ণ অপরিচিত সেই কান্নার ধ্বনি শুনতে শুনতে তারা উৎসের দিকে এগিয়ে আসবে। তারপর গুটি গুটি পাটনদের শস্যঘরটির দেয়াল কোণে চোরের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। আবার এমনও হতে পারে—রাতে জঙ্গলের মাঝে কোনো নারীকন্ঠের কান্নাকে অশরীরী ঘটনা মনে করে, তারা হয়তো ঘরের বাইরে বেরোনোর সাহসই পাবে না। পরদিন সকাল হতে-না-হতে, হয়তো লুলকা বাউরি কিংবা বিনন্দ এই রহস্যজনক সংবাদটি জানাতে ভোর-ভোর অঙ্গদের ঘরকে চলে আসবে। উত্তেজিত হয়ে যতটা সম্ভব স্বপ্ন-যজ্ঞে উদারহস্তে ঘি ঢেলে বলবে, ‘এ অঙ্গা, অঙ্গারে, কাল রাতে একটা অজব জিনিস দেখলি!’

‘কী?’

‘রাতের বেলি সাদা কাপড়ে পরীর পারা একটা বিটিছ্যেলা গটা বন কাঁইন্দে কাঁইন্দে ঘুরে বুলতে ছিল। মাইরি। বাপের কিরা। হামি উয়ার কান্না শুনেছি। বুঝলি সহদেব—’ আলোচনায় সে সহদেবকেও টেনে নেবে।

তবে ঘটনা এভাবে শেষ নাও হতে পারে।

‘হেই!’ পাটন হুংকার দিয়ে উঠল। মেয়েলি কান্না পছন্দ নয় তার। সে দরজার সামনে থেকে টেনে সরিয়ে দিল অঙ্গদকে। আর নিজে তার আক্রমণাত্মক দৃঢ় কন্ঠস্বরে ঘরবন্দি জারমণির উদ্দেশে বলে উঠল, ‘সুগম থাক! নাই ত এখনেই তকে খতম করে দিব। কী শুনছিস?’

এমনতর হত্যার হুমকিও তোয়াক্কা করল না জারমণি। সেও পালটা জবাব দিল, ‘হঁ, খতম কর হামকে! খতম কর! দেখি তুঁই কেমন মরদ।’ কিন্তু এই তেজ বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারল না। এটুকু পরেই সে তার বন্ধ ঘরের হুড়কার ওপরে মাথা ঠুকে ঠুকে একঘেয়ে বিরক্তিকর সুরে বলে যেতে লাগল, ‘হামি পলপল যাব! নাই থাকব হামি ঘর-ভিৎরে আটক হঁয়ে! তরা শিকলটা খুলে দে!’

‘মানবিস নাই তুঁই? হে:।’ পাটন ফের তাকে সতর্ক করে, ‘খোবোড়দার চেঁচাবিস! সুগুম থাক বলছি!’

উঠোনে খাটের তল থেকে কুকুরটি দাওয়ায় উঠে এসে পাটনের পাশে দাঁড়ায়। ভুখতে ভুখতে সেও যেন প্রভুর কথারই পুনরাবৃত্তি করতে থাকে, ‘সুগুম থাক! সুগুম থাক!’

কাঁদতে লাগল জারমণি...

রাত এমন কিছু হয়নি। কিন্তু নি:স্তব্ধতা উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। বাড়ছে চ্যারেঙ্গ পোকার ডাক। ঢেররাতের দিকে বৃষ্টি নামতে পারে। একটু আগেও গাছগুলিতে পাতা নড়ছিল। খড়খড় শব্দ হচ্ছিল ঘরের বাইরে তালগাছটির মাথায়। এখন বাতাসের এতটুকু চল-বল নেই। বিতিকিচ্চি গুমোট ভাব। এমন গুমোট আর অন্ধকারে রাতদিন ঘরবন্দি থেকে অস্থির হয়ে পড়েছে জারমণি। তবু যদি এই ভ্যাপসানি না থাকত, যদি একটু বাতাস খেলা করত, তাহলে ওই বন্ধ ঘরটিতেও কিছুটা বাতাস ঢুকত, চালার ফাঁকফোকর দিয়ে। এখন যেমন তালশাঁসের মতো আবছা চাঁদের আলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকছে।

নীচু ও অপরিসর এই ঘরগুলির দেয়াল মাটির। শবরদের নিজের হাতে বানানো। কিন্তু ঘরের চালাগুলি সেভাবে খাপরা বা টালি দিয়ে বোনা নয়। ভাঙাভাঙি টালিতে কিছুটা ছাওয়া, বাকি অংশে তাল-খেজুরের বাইল এনে মাথার ওপরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সামান্য ঝড়ে সে পাতাগুলো যাতে উড়ে না যায়, তার জন্য কোথাও কোথাও গাছের ছাল দিয়ে বাঁধা রয়েছে।

উঠোন যে খুব বড়ো তা নয়। ইচ্ছে করলে সাফসুতরা করে তাকে বাড়িয়ে নেওয়া যায়। চারপাশে নানান বিষাক্ত আগাছা, জংলা ঝাড়, এমনকী গাব-পলাশ-কুসুম আর মস্ত মস্ত শিমুল গাছগুলি পর্যন্ত চতুর্দিক থেকে চেপে ধরেছে তাদের এই ভিটাটিকে। পাহাড়ের রাটা ঘাস আর জুরগুঞ্জার ঝাড় জোর করেই জঙ্গল থেকে তাদের উঠোনে এসে ঢুকে পড়তে চায়। কোনো কোনো দিন নির্জন দুপুরে ঘরের দেয়াল ঘেঁষে মন্থর চালে বিষধর সাপ ইঁদুরের গর্ত খুঁজে বেড়ায়। দাওয়ায় একা একা মাথা হিলায় নধর কৃষ্ণলাস।

জারমণি কী ভেবেছিল, অঙ্গদের হাত ধরে সে এমন পরিবেশে এসে পড়বে? তার বাবা-মা-ভাইদের বিরাট একটি সংসারের দারিদ্র্যের বন্ধন থেকে মুক্তির অভিপ্রায়ে পালিয়ে এসে আখিরে সে আরেক বন্দিদশায় অসহায় আবদ্ধ হবে?

জারমণি আর পারে না। পাটনের গর্জনও তাকে ঘরের ভেতরে বশে রাখতে পারে না। সে এবার মরিয়া হয়ে অঙ্গদকে বলতে থাকে, ‘কই শুনছিস গো? তুঁই এখনি খুলে দে কপাটটা। খুলে দে নাই ত হামি দমে চেঁচাব! লোক জড় করে দিব!’

কী! তার মুখ থেকে এই কথা শুনে ভয়ে আঁতকে ওঠে তারা। উঠোন থেকে দাওয়ায় উঠে আসে সবাই। যতটা সম্ভব ভালোবেসে, মিষ্টি মিষ্টি করে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করে। সেই সঙ্গে তারা এটাও আগাম বুঝিয়ে দেয় যে, জারমণি যদি সত্যি চেঁচিয়ে প্রতিবেশীদের জড়ো করে, তাহলে তার কী ভয়ংকর পরিণতি হতে পারে। এমন নিশুতিরাতে একটি বিপন্ন যুবতীর আর্তনাদ অনেক দূর অব্দি ছড়িয়ে পড়বে। তা শুনে এই ডেলিকচার বাকি তিনটি ঘরের লোকজন হাতে হাতে ডাং নিয়ে ছুটে আসবে। ছুটে আসতে পারে আরো দূরে দূরে থাকা আদিবাসীর দলও। তখন তাদের কাছে এই গোপন করে রাখা ঘটনা কী আর গোপন থাকবে? জানাজানি হয়ে যাবে না? আলো-অন্ধকারে রহস্যাবৃত ঘরটিকে ঘিরে তারা কী একবারও জানতে চাইবে না—কে এই বন্দিনী? কেনই বা তাকে এভাবে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে?

গ্রামবাসীরা জড়ো হয়ে গেলে জারমণি তখন তাদের কাছে সবকিছু খুলে বলে দেবে। বলবে, ‘দেখ, দেখ তুমরা। ইয়ারা সবাই মেলে হামাকে কেমন আটক রাইখেছে. আর ওই অঙ্গদ শবর...’

জারমণির মুখ থেকে এইসব বৃত্তান্ত শোনার পর গ্রামবাসীরাই তার মুক্তির জন্য উদ্যোগী হয়ে পড়বে। উত্তেজিত হয়ে তারা চাল তাড়বে, কেউ লাথি মেরে দেয়াল ধসকাবে। বলবে, ‘ভাঙ! ছ্যাচরাফুটা করে দে ঘর-দুয়ার! আর কনধারে গেল ওই বকাচদা অঙ্গা? ঘসড়ায় নিয়ে আয় উয়াকে! আন...’

ভাবতেই বুক ধসধস করে ওঠে পাটনের। প্রতিপক্ষের এমন বৃহদাকার ফৌজদারি সে একা সামাল দিতে পারবে? তার কাঁড়ধনুকে একটি একটি করে তির জুড়ে, কতজনকে সে শায়েস্তা করবে? তা ছাড়া এতগুলো হাতিয়ারি মানুষ যখন চড়াও হবে, তখন তির নিক্ষেপের সত্যিই কি কোনো অবকাশ তার মিলবে?

এক্ষুণি এতদূর অব্দি ভেবে ভীত হয়ে পড়ার হয়তো প্রয়োজন নেই। তবে এটা ঠিক, জারমণি যদি সত্যি চেঁচিয়ে ওঠে, যদি সে মনে মনে ভেবে নিয়েছে যে কেঁদেকেটে, চুল ছিঁড়ে, কপাটের আগলে মাথা কুটে চিৎকার করে জঙ্গলে বসবাসকারী মানুষজনদের সে জড়ো করবে এবং নিজেকে এই আদিম পুরুষগুলির বর্বর গ্রাস থেকে খালাস করতে পারবে, তাহলে এমন মতলব নি:সন্দেহে ভয়ংকর। এবং সেটা হটকারিতাও।

কিন্তু কীভাবে জারমণিকে এই হটকারিতা থেকে তারা বিরত করবে? সে তার ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে। তা না-হলে কেন চিৎকার করে লোক ডাকার কথা বলবে? কই, ইতিপূর্বে একবারও তো সে এমন সংকল্পের কথা উচ্চারণ করেনি? সে কি তবে মরিয়া হয়ে উঠেছে? নারী অপরহরণকারীর পরিণতি যাই হোক-না-কেন, সে কি জানে না, কয়েক রাত্রি যাবৎ পর-পুরুষের হেফাজতে থাকা নারী আখেরে উদ্ধার পেলেও তার দন্ড-দুর্গতি সাধারণত কী হয়ে থাকে?

হয়তো এসবের কিছু এই মুহূর্তে ভাবছে না জারমণি। অথবা সবকিছু ভাবার পরেও, কিংবা কোনো কিছু না ভেবে, তার একটাই ভাবনা— চার দেয়ালের আঁটসাঁট বন্দিত্ব চাকনাচুর করে খোলামেলা আঙিনায় এসে দাঁড়ানো।

তার এই ভাবনার মধ্যে এই চাওয়ার মধ্যে অতিরেক কিছু নেই। অন্যায়ও নেই। লাগাতার তিন-তিনটি দিন সে—দিন নেই রাত নেই—একটা ঘুপচি ঘরে ঢুকে রয়েছে। দু-দন্ড গায়ে বাতাস লাগানোর উপায় নেই। আষাঢ় মাস। বৃষ্টির নাম-নিশান নেই। হাপা-ডবহা এখনো শুকনো। তাই দিনে-রাতে ভ্যাপসা ভাব। আকাশ থমথমে। জঙ্গল পরিবৃত এই মেটে ঘরগুলোতে শরীর হাঁসফাঁস করতে থাকে। নদীর দিকে তাও কিছুটা স্বস্তি মেলে। চর জুড়ে সিনিসিনি বাতাসের বহমানতা টের পাওয়া যায়। আর প্রাণ খুলে অন্তহীন আসমানের দিকে তাকালে তো মহামুক্তির আনন্দ! রোমে রোমে ঘটে উদ্দীপন।

আহা, কতদিন যে জারমণি আকাশ দেখেনি। নদী দেখেনি। কাঠকুড়োতে জঙ্গলের গভীরে যেতে যেতে, কত যুগ সে চাটুকাঁটা গাছে একান্তে ফুটে থাকা বেগুনি ফুলটির দিকে নির্বাক বিস্ময়ে তাকিয়ে মনের কথা বলেনি। কতদিন তার জটপড়া চুলে গুঁজে নেয়নি একটি গর্গট ফুল! নক্ষত্রের মতো! হইহই করে সহেলিদের সঙ্গে ঝুড়ি কাঁখে নিয়ে ভোর-ভোর কুড়োতে যায়নি তুম্বা ছাতু। কতদিন!

জারমণি হলহল করে কাঁদতে থাকে। বন্ধ কপাটে মাথা রেখে। নিষ্পাপ নাবালিকার মতো বলতে থাকে, ‘হামি ঘরকে যাব। মায়ের কাছকে যাব। তরা ছাইড়ে দে গো হামকে। নাই ত চেঁচায় উল্কাপাত করব।’

এই সরল একমাত্রিক সংলাপটি থেকে ফুটে ওঠে তার কচি মনের আবেগ। যদিও তার দেহে মনে পাড়-ভাঙা যৌবন। যা তাকে কঠোর থেকে কঠোরতর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রাণিত করবে। নিজেকে আরো বেশি ঠেলে দেবে তার অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে। যেখানে প্রেম-ভালোবাসা-যৌবনের জয়গান রচিত হয়।

এই জয়ের লক্ষ্যেই তো জারমণি অঙ্গদ শবরের সঙ্গে আসতে চেয়েছিল। এসেছেও। অঙ্গদ তো তাকে চুরি করে আনেনি। একদা এই মানভূমে বাহুর জোরে পাঁজাকোলা করে নাচনী আনার মতোও সে আনেনি তাকে। এখন যদি বা এল, সে কেন এখনি ফিরে যাওয়ার কথা বলে? সত্যিই কি তার মায়ের কাছে এই প্রত্যাবর্তন আবার নতুন এক আক্রমণের অধ্যায়ের সূচনা করবে না? জারমণি কি এতদূর ভেবেছে?

হয়তো অঙ্গদও ভাবেনি। অথচ এটা অনিবার্যত তার ভাবা উচিত ছিল। ভাবা উচিত, শেষতক ভীরুতা দিয়ে কদাপিও জয়সূচক কার্যোদ্ধার হয় না। বিশেষ করে নারী, যা সর্বদাই পরস্ব ধন, তাকে করায়ত্ত করতে হাত প্রসারিত করলে সে-হাতের দৃঢ়তার ও প্রাবল্যের প্রয়োজন। মনে রাখতেই হবে—যেকোনো নারীর পশ্চাদভূমিতে রয়েছে এক অদৃশ্য কুরুক্ষেত্র। অপেক্ষমাণ এক যুদ্ধের আহ্বান। পুরাণে, ইতিহাসে কালে-কালে এই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটেনি? একটি নারীর প্রেরণায় যেমন ঐতিহাসিক মহল গড়ে ওঠে, তেমনি একটি নারীকে নিয়ে সংঘটিত কলহে ধ্বংস হয়ে যায়নি কত-কত মহল? অখন্ড নগর? কত সভ্যতা?

পাটন কোনো বোঝাপড়ায় গেল না। শিকলটি খুলে অবুঝের মতো লাথি মারল দরজার গায়ে। আর উদ্ধত ভঙ্গিতে বিষদিগ্ধ তিরটি কাঁধের কাছে উৎক্ষিপ্ত করে বলতে লাগল, ‘চেঁচাবিস তুঁই? লে চেঁচা! চেঁচা কত চেঁচাবি! বিদকে দিব!’

ভাগ্যিস, সেই মুহূর্তে দরজা থেকে তফাতে ছিল জারমণি। পুরোনো শিমুল কাঠের গুঁড়িটিতে বসে মুখ নীচু করে চোখের জল মুছছিল। সে চমকে ওঠে। তাৎক্ষণিক ভয়ও পেয়ে যায় পাটনের এই ভয়াল রূপ দেখে। চোখের জল মোছা ঈষদুষ্ণ আঁচলটি নিয়ে হাতে দলা পাকাতে পাকাতে, চেঁচানোর কথা ভুলে যায় সে। গলায় আটকে থাকা কান্না নিয়ে, হাঁপ তুলে তুলে, নরম সুরে বলে, ‘ঘরকে যাব!’

পাটনের মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে তিরটি ফসকে পড়ে গেল, চৌকাঠে। লোল হয়ে গেল তার বজ্রমুষ্টি। মুহূর্তে অন্তর্হিত হয়ে গেল অদম্য ক্রোধ, হিংসা—অস্ত্র তথা বাহুবল দিয়ে পরাভূত করার বন্য আকাঙ্ক্ষাও।

পাশের ঘরটিতে, তখনো উনুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে চ্যালাকাঠ। তার বিচ্ছুরিত হরিদ্রাভায় আংশিক প্রতিভাসিত হয় জারমণির থমথমে মুখমন্ডল। ভিজে রয়েছে তার চোখের কোমল পাতাগুলি। নাকের ছাউনিতলে সোনালি নোলক বিষাদের ভাষা নিয়ে, অভিব্যক্তি নিয়ে স্পন্দিত হচ্ছে বারেবারে।

পাটনের মুখে রা নেই। সে চেয়েই থাকে। অন্ধকারে অধিষ্ঠিত সেই জ্যোতির্ময়ীর দিকে। নাম?

জারমণি সিংসর্দার।

এই প্রথম একটি নিরবচ্ছিন্ন পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিতে পাটন দেখল জারমণিকে। আর দেখতেই সবকিছু কেমন তল-উপর হয়ে গেল। ছিচ্ছাতুর হয়ে গেল তার সমস্ত আঁটোসাঁটো আয়োজন। মনে হল, বাঁশের যে ঘুগি-ফাঁদটি গোঠবেগুনের টোপ দিয়ে সে খেতের আলে পেতে রেখেছিল, ‘ভুঁস ইঁদুর’ মারতে, এখন সে নিজেই আটকে গেল সেই ফাঁদটিতে। নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেল তার যাবতীয় উল্লম্ফন! শৌর্য-বীর্য। হাত থেকে স্খলিত হল তার অস্ত্র!

কিন্তু সেই স্খলন তার মনে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করল না। রূপের কাছে অস্ত্রের এমন অধোমুখী পরাভব তার ভেতরে স্বতন্ত্র ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত করে দিল। তার মনে হল, যে-অস্ত্র একবার ভূপতিত হয়ে গেছে, তাকে পুনর্বার হস্তে ধারণ করার আদৌ প্রয়োজন আছে কি? সে দ্বিধাচ্ছন্নও হয়ে পড়ল। কোনটি আসলে অস্ত্র? ওই বিষদিগ্ধ তির, নাকি এই রূপদগ্ধ রমণীর মুখমন্ডল? কে প্রবলতর?

যেভাবে পাটন আকস্মিক দৃষ্টিতে জারমণিকে দেখল এবং স্তম্ভিত হয়ে গেল, আজ থেকে বছর দুয়েক আগে অঙ্গদও কী সেভাবে দেখেছিল তাকে? সেভাবেই প্রথম দর্শনে বিভোর হয়ে পড়েছিল তার মাদকতায়?

বন্দিদশায় জারমণির মনে পড়তে লাগল তার সেই ফেলে আসা দিনগুলির কথা। তার ঘরের কথা, গ্রামের কথা, বনে বনে তার কাঠকুড়ুনি জীবনের সূত্রে অঙ্গদের কথাও।

ছোটোবেলা থেকে জারমণি টো-টো করে বুলত। ঘরে তার একদন্ড বাস নেই। যে একসময় বাঁশের লাল টুপা নিয়ে ঝুড়েজঙ্গলে খেতে-মাঠে পড়ে থাকত, কিশোরী থেকে যুবতী হয়ে সে-ও তার সঙ্গীদের দেখাদেখি কাঁখে ঝুড়ি নিল। সারাটা বেলা টাঁড়ে-টিখরে, আমবনে, আমড়ু খেতে, তালতলে ঘুরে বেড়াতে লাগল। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে কয়েকদিনই সে অঙ্গদকে দেখতে পেয়েছে। পাখি ধরার জন্য গাছে-ঝোপে-ঝাড়ে ‘লাঠা-কাঁইড়া’ ঝুলিয়ে দিয়ে আশপাশে ঘুরঘুর করছে।

একেকদিন পাখি শিকার করতে সে ডেলিকচার এই জঙ্গল ছেড়ে পলপল পেরিয়ে ডুংরিকোলে চলে যেত। জঙ্গলের দিকে। খেতে খেতে ইঁদুর আর বনে-জঙ্গলে পাখির নেশায় কোথায় কোথায় যে ঘুরত! একদিন অন্যদিকে চোখ চলে যায় অঙ্গদের। মহুল গাছের তলে দেখতে পায় গ্রামের দুটি বিটিছ্যেলা ঝুড়ি নিয়ে মহুল কুড়াচ্ছে। তখন দুপহরের রোদ। বিরতি নিয়ে টুপটাপ মহুল পড়ছে গাছ থেকে। একটি ছাগলছানাও গাছের ছায়ায়। ঘুরে ঘুরে খাচ্ছে ফুল।

অঙ্গদের দৃষ্টি ছাগলছানার দিকে নয়। সে আড়চোখে দেখতে থাকে নোলকবিঁধা মুখের কালো মেয়েটিকে। এমনি মগ্নতার মুহূর্তে, ছাগলটি যখন ঝুড়ির মহুলগুলো খেতে থাকে, তখন ছুটে আসে অঙ্গদ। ‘খাই-ল! খাই-ল! ফুরাল সোব ঝুড়ির মহুল। এহেহে!’ বলতে বলতে সে ছাগলটিকে তাড়িয়ে দেয়। ভেঁড়রি ঝুড়ের দিকে।

জারমণি তাকে দেখে হাসে। হাসে ভানিও। দু-জনের সে-হাসিতে ছিল দুষ্টুমির ইঙ্গিত। অঙ্গদ তাতে প্রশ্রয় পেয়ে যায়। সে রোদ থেকে মহুলতলে এসে দাঁড়ায়। বলে, ‘এখন এতবেলায় ত বেশি পাওয়াবেক নাই। মহুল কুঢ়াতে হলে ভোর-ভোরকে আসতে হয়।’

ওরা আবার হাসে। অঙ্গদের এই কথার মধ্যে তাদের অজানা কিছু নেই। ভোরবেলার দিকেও, অন্ধকার থাকতে, তারা একপ্রস্থ কুড়িয়ে নিয়ে যায়। তখন তো মহুলতলগুলিতে গ্রামের মেয়েদের হাট লেগে যায়। ঘরে গিয়ে জমানো মহুলের সঙ্গে এগুলোও রোদে মেলে দেয়। ফের দুপুরের দিকে বেরিয়ে পড়ে। পেলে ভালো, না পেলে জঙ্গল ঘুরে কাঠমোট কুড়িয়ে ঘরকে নিয়ে যায়। জ্বালানি করতে। দিনভর তাদের এই করে কেটে যায়।

আর যখন গাছে গাছে তালশাঁস হয় তখন তো বলারই কথা নয়! বাগালছ্যেলাদের দিয়ে গাছ থেকে তাল পাড়িয়ে নেয়। সেই তাল খেতে খেতে কখন যে গড়িয়ে যায় বেলা! পেটও ভরে।

তবে গোরু-ছাগল খেদা বাগালছ্যেলাগুলা বড়ৌ বাঁদর। গোটা দুপুর তালগাছগুলিতে তাদের দৌরাত্ম্য চলতে থাকে। নীচে থাকে যত সাকরেদ। কথায় কথায় ঝগড়া, কুস্তাকুস্তি। ঠোঁটের ডগে হরদম লেগে থাকে যত গ্রাম্য ভাষা—‘বেটিচোদ’, ‘বহিন-মাউগা’, ‘বকাচদা’। আবার কোনো কাঠকুড়ুনি ছঁড়িকে যেতে দেখলে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘লেচ্চিড়া! প্যাঁস প্যাঁস!’

অনেকদিন হয়েছে, এদের কাছে জারমণি যখন তাল চেয়েছে, এরা হড়বড় করে কাঁদি সুদ্ধু দিয়েছে। কেউ আবার দিতে গিয়ে লোভ দেখিয়ে ফিরিয়েও নিয়েছে। বলেছে, ‘য়ে:, ইয়াকে রোজেই দিবেক। দিস না।’

একটা দিনের ঘটনা জারমণি আজও ভুলতে পারে না। তালগাছের তলে ঘুনসি-কোমরে কোনো ছোটোছেলেকে দেখলে মনে পড়ে যায় সে-ঘটনা। সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা। কদমফুলের মতো চরে বেড়াচ্ছে মেঘ। হাওয়ায় উড়ছে মিহিমিহি বৃষ্টি। বেশ আরামদায়ক দুপুর। চারপাশে মোটা মোটা আলবাঁধা শস্যহীন শুকনো খেত। সেইসব খেতের একদিকে, ঘুটুতে, তিনটে-চারটে তালগাছ। গাছের তলে অন্তত গোটা দশেক ছেলে। বয়স দশ-এগারো। কেউ কেউ কাতান নিয়ে গাছে উঠে রয়েছে। তারা সবাই ছেঁড়া-ফাটা প্যান্টগুলি (জামা কারুরই নেই) খুলে তালের বালদো৩ দিয়ে চেপে রেখেছে। যাতে বৃষ্টিতে ভিজে না যায়। বেদম ফুর্তিতে তারা তালশাঁস কেটে খাচ্ছে আর চলছে ন্যাংটো পোঁদে তিড়িং-বিড়িং নাচানাচি।

তালশাঁসের প্রতি লোভ সামলাতে না পেরে, জারমণির সঙ্গে ভানিও আসে। জারমণি বলে, ‘এই, দে ন হামদের দুটা তাল। দিবি?’

গাছের ওপর থেকে, পাতার আড়ালে মুখ লুকিয়ে কেউ বলেছিল, ‘চিপতে দিবি?’

হো-হো করে হেসে উঠেছিল তালতলের বাঁদরগুলো।

কিন্তু ভানিও কি কম নাকি? সেও তেমনি জবাব দিয়েছিল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে, কাঁখের ঝুড়িটি মাথায় নিয়ে, সে তৎক্ষণাৎ পাছা ঘুরিয়ে বলেছিল, ‘নাই ধন। তদের তাল তদেরই থাক, আমাদের তাল আমাদের।’

অঙ্গদ গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা পাখি-ধরা ফাঁদটির দিকে লক্ষ রাখে। ‘ফাঁদ’ বলতে ওই ‘লাঠা-কাঁইড়া’। শবররা এটা ঘরেই বানিয়ে নেয়। বাঁশ চিরে চিরে কিছু কঞ্চি করে। কঞ্চিকে তারা বলে ‘বিশড়ি’। আর দাউলি কিংবা কুডুল দিয়ে জৈড় অথবা বড়গাছের গা চেঁছে চেঁছে বের করে দুধ। সেই দুধ জমিয়ে রাখে হাতখানেক লম্বা বাঁশের চোঙের মধ্যে। চোঙটি হল ‘কেঁড়ে’, লোকভাষায় ‘কাঁইড়া’। এর মধ্যে সামান্য সরষের তেলও মিশিয়ে দেয়। আধঘণ্টার মধ্যে কাঁইড়ার দুধ খয়েরি হয়ে যায়। আঠাল ভাবও আসে। এবার সেই বিশড়ির গোছটি আঠার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখে। এখন একটি করে বিশড়ি বা কঞ্চি টেনে তুলতে গেলে তার সঙ্গে চটচটে আঠাও উঠে আসে।

পাখি ধরার সময় সাধারণত দু-তিনটি কাঠি নিয়ে আড়াআড়ি সাজিয়ে পছন্দমতো জায়গায় রেখে দেয়। কাঠিগুলির একটিতে সুতো দিয়ে ঝুলিয়ে রাখে ঘুর্ঘুরা পোকা। জ্যান্ত পোকাটি নড়াচড়া করলে আঠা লাগানো কাঠিগুলোও নড়তে থাকে। ক্যারকেটাপাখি সেদিকে আকৃষ্ট হয়। সেই পোকাটিকে খেতে চেষ্টা করে, অমনি সামান্য টানে কাঠিগুলো খুলে গিয়ে তার সারা গায়ে, ডানায় আঠা লেসালেসি হয়ে যায়। সে আর উড়তে পারে না। আড়ে লুকিয়ে থাকা শিকারি ছুটে এসে ছপ করে ধরে ফেলে।

এই মুহূর্তে, অঙ্গদের, ঝুড়ে পেতে রাখা লাঠা-কাঁইড়াটির দিকে নজর নেই। দুটি-একটি পাখি এসে জুটেছে। তারা পোকা দেখে উত্তেজনায় কিচির-মিচির করে নাচানাচি করছে। আটাড়ি লতে। অঙ্গদ শুধু লক্ষ করে যায় জারমণিকে। তার খোঁপা করা চুল, নাকের চালায় ঝুলতে থাকা ছোট্ট সোনালি নোলক, ওসার নিম্নদেশ। আহা, কী সুন্দর করেই না সে একটি একটি মহুল কুড়িয়ে আঁচলে রাখছে। আঁচল থেকে ঝুড়িতে।

মহুলের ঝুড়ি কাঁখে তুলে নেবার আগে, জারমণি, ধুলি-ধূসর আঁচলটি ঝেড়ে তার সরু কোমরের বেড় বরাবর এক পাক ঘুরিয়ে নেয়। ফাট-ধরা ব্লাইজটিতে টান পড়ে, প্রকট হয়ে উঠল বৃক্ষসরোবরে প্রস্ফুটিত সারঙ্গ-যুগল। সেদিকে চেয়ে থাকতেই, অঙ্গদ, মুহূর্তের মধ্যে শরীর জুড়ে একটা শিরশিরানি টের পায় যা বস্তুতপক্ষে, কামদেবের অলস গাত্রোত্থান।

অঙ্গদ তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারে না। তার এই নির্ব্যাজ দৃকপাত লক্ষ করে মহুল গাছের আড়াল থেকে হেসে ওঠে ভানি। গম্ভীর হয়ে যায় জারমণি। ছদ্মক্রোধ নিয়ে পুরুষটির দিকে চায়। সে যেন কোনো অচেনা-অজানা আগন্তুক, এমনিভাবে তাকে ঝাঁঝের সঙ্গে বলে ওঠে, ‘এই! তুঁই ডাঁড়ায় কী ঠাকুর দেখছিস?’

হাসি তখনো থেমে যায়নি ভানির। সে গাছের আড়ালে মুখ লুকিয়ে দ্ব্যর্থক জবাব দেয়, ‘ক্যারকেটা।’

জারমণি হাসতে গিয়েও হাসে না। ‘তোর লাঠা-কাঁইড়ার দিগে খেয়াল নাই? হা ভাল—হাই দেখ—’ বলতে বলতে এবার হেসে ফেলে সে। আগাছার জঙ্গলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে মিছিমিছি বলে, তার ফাঁদে পাখি জড়িয়েছে। সারা গায়ে চিট নিয়ে উড়তে পারছে না।

বাঘনখ আর ভাবরির ঝোপ মাড়িয়ে, অঙ্গদ শবর, ঢ্যালা গাছের জঙ্গলের দিকে ছুটতে ছুটতে চলে যায়। পিছন থেকে ভানি চেঁচিয়ে বলে, ‘এএএই লোকটা! কাল আসবি। মহুল পাইড়ে দিবি ইয়াকে।’

পরের দিন অঙ্গদ আসেনি। সে এসেছিল দিন তিনেক বাদ। সেই মহুলতলে। গল্প করতে। মহুল কুড়িয়ে দিতে। আস্তে আস্তে এভাবেই তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায় অঙ্গদের। সে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে জারমণির প্রতি। যদিও ভানি বেশি স্বচ্ছন্দ। বেশি মেলুক। কথায় কথায় হেসে ওঠে, রঙ্গরসিকতা করে। বেশ প্রাণখোলা ভাব রয়েছে তার মধ্যে।

জারমণি তেমনটি নয়। সে আত্মস্থ প্রকৃতির। গভীর ও লাজুক। অনর্গল কথা বলা, হো-হো হেসে ওঠা, অকারণ চাঞ্চল্য—কোনোটাই তার চরিত্রে মানানসই নয়। তবুও, অঙ্গদের তার দিকে মন পড়ে থাকে। আমের কুহুর মতো চোখ দুটির চাহনিতে যে অতল গহীনতা হামেহাল বিরাজ করে, তাতে লুব্ধ হবার মতো কাব্যিক অনুভূতি নি:সন্দেহে তার নেই। হয়তো তাই জারমণির এলোখোঁপাটি তার অন্তর্মানস উতলা করে। এই একটিই দৃশ্য ঘুরে ঘুরে তার কল্পনায় আসে। অঙ্গদের নিজেকে তখন অস্থির অস্থির লাগে। কী করব কী নাই!

দুটো হাত দিয়ে, ঘুরিয়ে খসে পড়া চুলের গোছটি খোঁপা করে নেয় জারমণি।

শেষ হয়ে গেল মহুলের সময়। গাছগুলোতে এখন আর ফুল নেই। বাতাসে নেই মাদকতা জাগানো মহুয়ার সুবাস।

ন্যাড়া গাছগুলোতে ঝাপল-ঝাপল পাতা হয়েছে। ডালে ডালে হয়েছে ফল। কচড়া হবে। আর কিছুদিন বাদে। অঙ্গদ ছদ্ম আলস্য নিয়ে গাছের ডালগুলি দেখে। উদ্দেশ্যহীন তার চাহনি। অতঃপর ঢেউ খেলানো কাঁখে ঝুড়ি নিয়ে জারমণি যখন জঙ্গলে ঢোকে, তখন অঙ্গদও তার পেছু নেয়। আশেপাশে কোনো কাঠুরে সন্দেহজনকভাবে তাদের লক্ষ করছে কিনা তাও সে দেখে।

পটাশ জঙ্গলে এসে নিরাশ হতে হল জারমণিকে। তার আগেই গ্রামের মেয়েরা এসে শুকনো ডালপাতা সামুটে নিয়ে গেছে। মস্ত বোঝার আকারে দড়ির জালে বেঁধে, মাথায় চাপিয়ে, চৈতালি ঝুমের গাইতে গাইতে চলে গেছে। চারপাশ এখন সুনসান। তিতির ডাকছে কোথাও।

পটাশের জঙ্গলে রকমারি পাখি আসে না। কোনো কোনো ডালে নাচানাচি করছে সিমফুচি। পাখিগুলো এতই ছোটো যে চোখেই পড়ে না। ডালে-পাতে মিশে থাকে। লোকজন নেই। গা সিরসির করা নির্জনতা। যে-নির্জনতায় গাঢ় হতে থাকে বিরহের অনুভূতি। জেগে উঠতে চায় শরীর। একটানা ডেকে চলেছে পাঁড়ুক।

দূরে দূরে রয়েছে জারমণি। এদিক-ওদিক থেকে দুটো-চারটে ঝাঁটি এনে ঝুড়িতে রাখছে। রাখছে সোনাঝুরি, অর্জুনের শুকনো ফল। অন্য সময় হলে, চোখের ইশারায় তাকে ডেকে নিত অঙ্গদ। এখন কাছেপিঠে কেউ নেই দেখে সরাসরি জারমণির কাছে এগিয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল, ‘যাবিস?।’

‘কথাকে?’

‘উদারকলা করছিস?’ অঙ্গদ হাসে। কোথায় যেতে হবে জারমণি জানে না? তাহলে সে এমন অজ্ঞতার ভান কেন করে? সে আবার বলে, ‘চ ক্যান্নে। এখন কেউ নাই।’

‘হাউ বনটায় ভানি ঢুকেছে। উয়ার বাপের সঙে গেছে ছাগলের কুসুম পালহা পাড়তে।’ থুতনি দিয়ে দেখিয়ে, জারমণি আবার অঙ্গদের কাছ থেকে ছিটকে দূরে গিয়ে ঝুনঝুনি ঝোপ উপড়াতে থাকে।

‘এত ডর?’ অঙ্গদ হাসে।

মুখ ঘুরিয়ে নিজের হাসি গোপন করে জারমণিও। তারপর গুটি গুটি ঢুকতে থাকে বনের ভিতরে।

অনেকটা পিছনে থেকে অঙ্গদ অনুসরণ করে তাকে। তার নির্বিকার হাবভাব দেখে মনে হবে যেন গোঠ থেকে পালিয়ে আসা গোরু খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে।

বাড়তে থাকে গাছপালার ঘনত্ব। প্রচুর আগাছায় সীমানা ঘেরা সে-জঙ্গলের ভেতরে ঢোকার পথ বলতে একটা সংকীর্ণ প্রবেশমুখ। ঝুড়ঝাড় আকর্ষ সরিয়ে কুঁজো হয়ে ঢুকতে হয়। এ-পথে মানুষের আনাগোনা নেই। বনের গভীরে চরতে আসা গবাদি এপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে। দাঁতাল শুয়োরও এপথেই জল খেতে নেমে যায় ক্যানেলের দিকে।

কোথাও কোনো লোকজন নেই। খুব কাছ জনপদও নেই। তবু যা আছে, তা হল, এক অলৌকিক নৈসর্গিক শোভা। যেন গন্ধর্বলোকের জন্যই রচিত এই ভূখন্ড। ক্যানেলপারে দাঁড়ালে, সামনে সবুজ বনানী। চড়াই থেকে উৎরাইয়ে নেমে এসেছে। গাছপালা নিয়ে বিকটাকার শিবলিঙ্গের মতো উৎক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে ‘চোরনাচা-ডুংরি’। তার পাশের চূড়াটিতে কোনো আদিবাসী যেন বাঁশের ছাতা খুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওখানেই ‘জিনগা-মাঈয়ের থান’।

জিনগা-মাঈকে কেউ দেখেনি। অন্তত গত বিশ-পঞ্চাশ বছরে সাহস করে কেউ ওপরে ওঠেনি। তবে এখনো প্রতিবছর তার পুজো হয়। ডুংরির মাথায় নয়, দূরে কোনো এক আদিবাসী গ্রামে। আগে এই পুজো ডুংরির মাথাতে হত।

কেন তার থানে না হয়ে দূরবর্তী জনপদে তার পুজোর প্রচলন হল, সে অন্য এক লোককাহিনি। তবে পুজো যেখানেই হোক-না-কেন, সাধারণ গ্রামবাসীদের মনে তার জিয়ন্ত অস্তিত্ব নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আষাঢ় মাসে সারা তল্লাট জুড়ে একটা গম্ভীর গুড়ুগুড়ু ডাক শোনা যায়। তারা বলে, ‘হুই শুনো! জিনগা ডাকছে!’ আর জিনগা ডাকলে? বৃষ্টি হবে।

দূরবর্তী চোরনাচা-ডুংরির চূড়ার দিকে দু-এক মুহূর্ত নিশ্চল তাকিয়ে থাকে অঙ্গদ। যেন সে উৎকর্ণ হয়ে রয়েছে মানুষের পদশব্দ কিংবা গোরুর গলায় বাঁধা কাঠের ‘জরকা’র ধ্বনি শোনার জন্য। নাকি সে জিনগার ডাক শুনতে পায়? গা ছমছম করে অঙ্গদের। কেউ কী ঢেলাঝুড়ে লুকিয়ে লক্ষ করছে তাকে?

সে বৈঠার মতো দু-হাত দিয়ে কাঁটালতা আর মাকড়সার জাল সরিয়ে, কুঁজো হয়ে, সুড়ঙ্গের মতো পথটিতে ঢুকে পড়ে। আবছা আলো-আঁধারিতে। সেই সুড়ঙ্গ ধরে এমন একটি জায়গায় বেরিয়ে আসে, জঙ্গল যেখানে মুক্ত। এখানে বড়ো বড়ো বনস্পতির মাথায় চন্দ্রাতপের মতো টাঙানো নীল আকাশ। উদাস ভেসে বেড়ায় ঝারাবারা৪ মেঘ! ক্যাঁন্দ-ভুঁড়রু-পিয়ালের সারি। কোথাও বাঁদরলাঠি, কোথাও সতীবাবলা, শিমুল। বহু প্রাচীন মহুল গাছগুলি যেন জিনগা-মাঈয়ের নির্দেশে অতন্দ্র প্রহরী মতো আগলে রয়েছে এই অরণ্যভূমিকে। অনেকটা আদিবাসী সাঁওতালদের শ্মশানের মতো। তবে ভারী ভারী পাথরগুলিই নেই।

এই দুর্গম ভূখন্ডেও মানুষ যে একেবারে আসে না তা নয়। বোধহয়, দুর্গমতার প্রতি মানুষ প্রবলতম আকর্ষণ অনুভব করে। তাকে হাতছানি দিয়ে আহ্বান জানায়। আদিবাসীর দল কাঠের বোঝা নিয়ে, গান গাইতে গাইতে, সুঁড়িপথ দিয়ে নেমে যায়। তারা শবর-সাঁওতাল-ভূমিজ রমণী। পুরুষরা এদিকে সচরাচর আসে না। সেটা বুঝতে পেরেই কি অঙ্গদ এদিকে আসে? নাকি, জারমণির ‘অলৌকিক’ আকর্ষণ তাকে নিয়ে এসেছে এখানে? এই গহিনতায়?

ভয়-ভয় করে অঙ্গদের। সে এদিক-ওদিক তাকিয়েও জারমণিকে দেখতে পায় না। কোথায় ছন্ন হয়ে গেল! এই এক্ষুণিই তো সে ঢুকল। তার মনে জিনগা-মাঈয়ের কথা মনে আসে। সে মাথা তুলে চোরনাচা-ডুংরিটির দিকে তাকালে শূন্যে দৃশ্যমান শৃঙ্গটিতে চোখ পড়ে যায়। চোখে পড়ে শৃঙ্গের উপরিভাগে সেই ছত্রাকটিও। সত্যি কি সেটা ছাতা? নাকি কোনো দেব-দেউলের ভগ্নাবশেষ? অঙ্গদ জানে না। গ্রামবাসীরাও না। তেমন কৌতূহল নিয়ে কেউ ওঠেনি ওই ডুংরির শীর্ষে। ভয় পায়।

ভয়ের কারণটি যে সম্পূর্ণ দৈব, তা অবশ্য নয়। ‘চোরনাচা’ নামটি থেকে অনুমান করা যায়, চোরের উৎপাত আছে ডুংরিতে। সেখানে কেউ যেতে সাহস করে না। অনেকে আবার ‘চরনাচা’ও বলে। অন্ধকার হলে কী সেখানে নাচতে থাকে জিনগা-মাঈয়ের চররা?

হঠাৎ নারীকন্ঠের হাস্যরোল প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। চমকে উঠল অঙ্গদ। সে দেখে, করম গাছের গা বেয়ে ওঠা চিহড়লতাটি জড়িয়ে দোল খাচ্ছে জারমণি! ঢালুতে গড়িয়ে যাচ্ছে তার কাঠকুচোর ঝুড়ি।

ঠোঁটে গোপন করা হাসি নিয়ে, অঙ্গদ, অপলক চেয়ে দেখতে থাকে এই ভয়ংকর ছলনাময়ীকে। তফাতে দাঁড়িয়ে। কোমরে আঁট করে জড়ানো গামছা।

দূরে পলাশবুদা আর আঁকড়ার ঝুড়। তাতে আড়াল হয়ে আছে একটি প্রাচীন কুয়ো। জল নেই। গভীরতাও নেই। গাছগাছালিতে ঢাকা থাকে বলে ভেতরটা অন্ধকার-অন্ধকার লাগে। হয়তো একদা গভীর ছিল এই কুয়োটি। কুয়োতলা থেকে একটি জলবাহিকা নালি চলে গেছে বনভূমির ওপর দিয়ে। হয়তো এখানে কোনো প্রস্রবণ ছিল। তাকে বাঁধা হয়েছিল বেড় দিয়ে। কুয়োর মতো। নালা কেটে তার জল গ্রামবাসীরা টেনে নিয়ে যেত। পরবর্তীকালে হয়তো অনাবৃষ্টির কারণে কৃষ্যভূমি অকর্ষণযোগ্য হয়ে পড়ে। প্রস্রবণ শুকিয়ে জন্ম নেয় এই জঙ্গলমহল।

লোকবিশ্বাস অবশ্য তা নয়। গ্রামবাসীরা মনে করে, এই কুয়োর পাড়ে এনে হাজার হাজার বর্গীকে বলি দেওয়া হয়েছিল। বর্গীর রক্ত প্লাবন এনেছিল। সেই রক্ত ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল উষরভূমিতে। সেই থেকে এই অঞ্চল এত বেশি উর্বরা। এত বেশি আরণ্যক।

জারমণি তখনো হাসছে। তার রূপলাবণ্যে একটা বুনো বুনো ভাব আছে। তার সুডৌল মুখের গড়নটি, এই প্রাকৃতিক পরিবেশে, আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে তার পাকা ঢেলা ফলের মতো গাঢ় রঙে। ধূলিধূসরিত মাথার চুল। পুরু ঠোঁট। দমকে দমকে ঝিলিক দিয়ে উঠছে নোলকটি। চুলের ধপলায় ঈষৎ আড়াল হয়ে থাকা অতল চাহনিতে কোথাও যেন একটা শরীরী অভিসন্ধি আঁচ করে অঙ্গদ। তাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে। অঙ্গের লাগি অঙ্গ কাতর হয়ে ওঠে তার। তবু, জারমণি আজ তার কাছে যাবে না। যাবে না। নামবে না ওই বর্গীকূপটিতে।

অঙ্গদের রাগ হয়। সত্যিই কী জারমণি আসবে না তার কাছে? তাহলে সে কেন এই নির্জনে এসে ঢুকল?

‘কাঠ কুঢ়াতে।’ জারমণি বলে। বলে নিজেই হাসতে থাকে। জ্বালানির কাঠ তো জঙ্গলের যেখান-সেখান থেকে কুড়ানো যায়। যেমনটি সবাই কুড়িয়ে থাকে। জঙ্গল জুড়ে মেয়েরা কাঠপাত কুড়োচ্ছে। তাদের এড়িয়ে যেতে কখনো কখনো এদিকে চলে আসে তারা। এদিকেও যে লোকের আনাগোনা নেই, তা নয়। তবে এখানে নিজেদের আড়াল করার উপায়ও তারা বের করে নিয়েছে। উপায়টি হল ওই বর্গীকূপ।

জারমণির ঘন কালো মুখমন্ডল জুড়ে কপট হাসি। অঙ্গদ আর সইতে পারছিল না। সে তাকে ধরতে গেলে চিহড়লতাটি ছেড়ে দিয়ে রদবদিয়ে পালায় জারমণি। পারে না। অঙ্গদ জড়িয়ে ধরে তাকে। পুরুষের জাগ্রত ও সবল স্পর্শ প্রতিবারই রোমাঞ্চকর লাগে জারমণির। অঙ্গদের আবেষ্টনীতে বিবশ হয়ে পড়ে সে।

‘পালাবিস কথায়? তকে লেলহে মাছির পারা ধরব।’

‘ছাড়। মাঝি মাইঞাগুলা দেখতে পাবেক।’ জারমণি নখ দিয়ে অঙ্গদের হাতে গাঢ় আঁচড় কাটে। নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার কোনো চেষ্টাই করে না।

ঝোপঝাড় সরিয়ে ওরা ঢিপির ওপরে উঠে আসে। মরচে পড়া আংটা ধরে ধরে দু-জনই নেমে যায় নীচে। বর্গীকূপে।

দিনভর তাপ উদগিরণ করে সূর্য এখন মন্থর হয়ে পড়েছে। ক্রমশ ঢলে পড়ছে পশ্চিমে। কদম আর পিঁড়রা গাছের ফাঁক দিয়ে তেরছা হয়ে পড়ছে নিস্তেজ আলো। জঙ্গল জুড়ে পাখিদের চ্যারবেরানি। আকাশে মেঘ চালছে। দূর জঙ্গল দিয়ে কোনো বাগাল গোরু-ছাগলের পাল নিয়ে যাচ্ছে। নামার পথে তাদের জল খাওয়াচ্ছে ‘ভগুয়া হারা দ’৫ -তে। দহ থেকে গবাদির পাল একে একে উঠে তালসারির পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে গ্রামের দিকে। তাদের গলায় ঝোলানো সঙ্ঘবদ্ধ কাঠের ঘণ্টাগুলির ছন্দময় ধ্বনি অনুভূতিতে জাগিয়ে দিচ্ছে আশাবরী ঠাট। মৃদু হাওয়ার কাঁপন উঠছে দুধিলতে।

কাঁপন উঠছে অঙ্গদের শরীরময়। বিকীর্ণকেশা জারমণিরও। টিস টিস করে তার বুক। যদি মানুষের কন্ঠস্বর শুনে কোনো কাঠকুড়ুনি কৌতূহলী হয়ে উঁকি মারে এই কূপের ভেতরে? যদিও ঝোপ-জঙ্গলে ডুবে থাকা এই পরিত্যক্ত অগভীর কূপটিকে কেউ নজরেই আনে না। সারা পিঠে, ভাঙা খোঁপায় আর কনুই দুটিতে স্যাঁতসেতে কাদাবালি মাখামাখি হয়ে যায় জারমণির। বুকে, বগলে ঘাম নিয়ে তার শরীর দ্রিমি-দ্রিমি কাঁপে।

তার নি:শ্বাসের উষ্ণতা টের পায় অঙ্গদ। ঘর্মাক্ত শরীর থেকে পায় স্ত্রীঘ্রাণও। সে জারমণির লোমশ বগলে নাক ডুবিয়ে বকনা বাছুরের মতো ঘষতে থাকে। আর ডানহাতটিকে, জোর করে তার ব্লাউজের তলা দিয়ে ঠেলে দেয়। জারমণি তাকে আপ্রাণ টেনে ধরার প্রয়াস চালায়। পারে না। অঙ্গদের চাষাড়ে হাত গিয়ে পড়ে তার সবৃন্ত টাটিয়ে ওঠা স্তনের ওপরে। তাকে মোচড় দিতেই সমগ্র তল্লাট জুড়ে একটা চাপা শব্দ শোনা যায়। যেন হিলিহিলি কাঁপতে থাকে চরাচর।

‘অত চিপিস না তুঁই! ডর লাগছে! ঘরকে যাব।’

‘চুপ!’

‘বারিস আসবেক। নাই শুনছিস? জিনগা ডাকছে।’ জারমণি চঞ্চল হয়ে ওঠে, ‘ছাড় তুঁই ছাড়।’ জারমণি অঙ্গদের হাতে কামড় দিয়ে, শরীরের উষ্ণতা প্রশমিত না করে, পালিয়ে আসে বন থেকে।

জঙ্গলে বৃষ্টি নেমে আসার আগে সে ঢুকে পড়তে চায় ঘরে। সারাটা পথ সে ছুটতে ছুটতে আসে। মাথায় কাঠকুচোর ঝুড়ি। উপর কুলহিতে ঢোকার মুখে সে পেয়েছিল ‘ছাগল ভিড়কানো’ বৃষ্টির ফোঁটা।

সেদিনের মতো আজও বনের মাঝে শবর পুরুষদের কঠোর প্রহরায় নাগাড়ে তিনদিন অন্তরীণ থাকায় ‘ঘরকে যাব, ঘরকে যাব’ বলে মন অস্থির হয়ে উঠেছে জারমণির। এই ঘরে ফিরে যাবার সূত্রে আজও তার মনে পড়ে যাচ্ছে জিনগা-মাঈকে। যদি সে কোনোভাবে তাকে উদ্ধার করতে পারত এই বন্দিত্ব থেকে! তার দক্ষিণহস্তে মুষ্টিবদ্ধ কুঠারটি দিয়ে এমন কোনো অলৌকিক ঘটনা কি ঘটতে পারে না? আজ যদি তা নাও থাকে, তাহলে আর কোনো হাতিয়ার কি নেই, যা দিয়ে কিছু একটা ঘটিয়ে দেওয়া যায়?

জারমণি মনে মনে জিনগা-মাঈকে ডাকে। জিনগা তাকে উদ্ধার করুক। সে থাকতে চায় না এমন ভয়াল পরিবেশে। একটু আগে সে শুনানি দিয়েছিল—তাকে দরজা খুলে উঠোনে বেরিয়ে আসতে না দিলে সে অর্গলে মাথা কুটবে। চিৎকার করে গ্রামবাসীদের ভিড় করাবে। যদিও জারমণি জানে না, তার সে-আর্তধ্বনি কতদূর পৌঁছবে। এই জঙ্গলের ভেতরে দ্বিতীয় কোনো ঘর আছে কি না তাও তার জানা নেই। আছে কি শবর-বিরহড়-সর্দারদের দলবদ্ধ বসবাস? শুধু এটুকু জানে—জীবনডি-চিটিডি-পলপল-আড়ষা কোনো গ্রামই তার কন্ঠধ্বনির নাগালে নয়। আর সে নীলোৎপলগন্ধাও নয় যে তার শরীরী গন্ধে যোজন দূর থেকে এসে পড়তে পারে কুকুরের চেয়েও প্রবল ঘ্রাণশক্তিসম্পন্ন মানুষ। যদিও, দ্রুপদকন্যার মতো সেও অসিতবর্ণা। গেঁড়ি-গুগলির খোলের মতো গায়ের রং। শাবক হস্তীশুন্ডের ন্যায় ঊরু। আর ‘নিতম্ব মনোহর অতি’। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে, শরীরের চড়াই-উৎরাই গড়ন স্পর্শ করে, তার কি এখন মনে হয় না—এসব তার দেহসম্পদ নয়, বস্তুত কামসম্পদ। তজ্জন্য সে পুরুষের কঠিন নিগড়ে বন্দি।

এখন কোথায় গেল সেই অঙ্গদ শবর? যে তাকে বিহা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে এসেছে এই অরণ্য-মাঝারে? কৃতদার জীবনে জীবিকার সন্ধানে, যে এই আদিম বন্য পরিমন্ডল ছেড়ে, তার মাতা-পিতা আর সহোদর ছেড়ে সিরকাবাদে আখচাষিদের গ্রামে চলে যাওয়ার কথা বলেছিল? সে বলেছিল ... না, অঙ্গদকে নিয়ে আর ভাবতে চায় না জারমণি। গত তিন-তিনটে দিন সে ঢের ভেবেছ এই পুরুষটিকে নিয়ে। যাকে সে বিশ্বাস করেছিল। ভালোবেসেছিল। যাকে শুধু শরীরেই নয়, মনেও ভেবেছিল পুরুষ। কিন্তু এখন কোথায় তার পৌরুষ? তার যত মৌখিক প্রতিশ্রুতি? ঘরের মধ্যে থেকেও, পরিবারের মধ্যে থেকেও, মুখ ফুটে দাপটের সঙ্গে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারে না অঙ্গদ। ভাইয়ের কাছেও তার উপস্থিতি অনুল্লেখ্য। মৌন।

নিভে যাওয়া লন্ঠনটি নিভেই রয়েছে। তেল ঢেলে পুনরায় তাকে জ্বালানো হয়নি। উঠোন, বারান্দায় অন্ধকারে মিশে থাকা তাদের কালো শরীরগুলি দপ করে উঠছে ঘরের ভেতরে জ্বলে ওঠা ধ-কাঠের আগুনে। তারই অপর্যাপ্ত আভায় দেখা যায়—পরিবারের লোকজনদের মাঝে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে শৌর্যহীন বসে রয়েছে অঙ্গদ। যেন সে অপরাধী। তার অবিমৃশ্যকারিতার জন্য সে কি অনুশোচিত? বোঝাই যায় তার কৃতকর্মের সপক্ষে ঘরের মালিকদের সমর্থন বা সহযোগিতা কিছুই নেই।

সত্যিই নেই। ছোটোভাই পাটনকে বাদ দিলে, বলা চলে, সহদেব, সঞ্চারী, ভুটু, মেনকা—এদের একজনও ভিন গাঁ থেকে ভিনজাতের বিটিছ্যেলাকে ভাগিয়ে আনার ব্যাপারটিকে ভেতর থেকে মেনে নিতে পারেনি। এই ঘটনায় তারা বেশি করে ভেবেছে নিজের নিরাপত্তার দিকটি।

যদিও, অঙ্গদের, জারমণিকে নিয়ে ঘরে ঢোকার সময় থেকে, পাটনকে দেখে তেমন চিন্তিত ও ভীত মনে হয়নি। সে তার ধনুর্ধর ভঙ্গি ও আচরণে ইতিপূর্বে তা বুঝিয়েও দিয়েছে। সে দুঃসাহসী। বেপরোয়া। হয়তো সে-কারণে তার অগ্রজের এই অব্যূঢ়া কন্যাকে আপন ঘরে নিয়ে আসার মতো বীরত্বসূচক কাজটির দরুন তার মনে এতটুকুও বৈমনস্য নেই। উদবেগ নেই। সে এটাকে তার সহোদরের হটকারিতাও বলতে নারাজ। সে মনে করে, নারীকে লুন্ঠন করে হোক, অপহরণ করে হোক অথবা যেভাবেই হোক-না-কেন স্বগৃহে আনতে পারাটাই বীরের ধর্ম, পুরুষের ধর্ম। এমনকী, নারী স্বয়ং মোহিনী হওয়া সত্ত্বেও ছলে-বলে-কৌশলেও তাকে পুরুষের ভূমিতে অধিষ্ঠিত করতে পারাটাও তার সপুংসক বৈশিষ্ট্য। তাই প্রথম যেদিন অঙ্গদ একটিও ধনুর্বাণের অব্যর্থ নিক্ষেপ ব্যতিরেকে এই নারীটিকে লাভ করে এবং তাকে তার বনাবাসে নিয়ে আসে, তখন, তার মুখদর্শন করা তো দূরের কথা, শুধু ঘটনাটিতে তারা সকলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েছিল। কেবল পাটন বাদে।

পাটন খুশিই হয়েছিল। এই জন্য যে, অপেক্ষাকৃত অধম ও মনুষ্যেতর ব্যাধজাতির ঘরে এমন একটি উচ্চাসনযোগ্যা তথা রূপময়ী ‘রমণীরতন’কে তার অগ্রজ নিয়ে আসতে পেরেছে বলে। যদিও, তখনো পর্যন্ত এই নারীটির প্রতি সে বিমুখই ছিল। ছিল অনেকাংশে রুক্ষ, অসভ্য। তার মুখদর্শন করারও কোনো তাগিদ সে অনুভব করেনি। কেন-না, নারী তো এখানে গৌণ। নারী অর্জনই মুখ্য। সে সমর্থন করেছিল অঙ্গদের সেই অর্জনকে। আজ, অন্তরণের এই তৃতীয় দিনে, বলা যায়, এই প্রথম পাটনের সরাসরি দৃষ্টিবিনিময় হল এই নারীর সঙ্গে। দেখল তার নিরুপম মুখশ্রী। আর দেখা মাত্র তার উদ্ধত হাতিয়ারটি ফস করে মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে খসে পড়ল, ভূমিতে!

তার মনে পড়ে গেল প্রথম দিনটির সেই মুহূর্তটি, যখন সে আঙিনায় দন্ডায়মান এই মোহিনীর দিকে একটি বারের জন্যও পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেনি। কেন যে দেখেনি! জারমণিও ছিল তখন অবগুন্ঠিতা। ঘোমটার অন্তরালে, ব্রীড়ায় মৃদু মৃদু স্পন্দিত হচ্ছিল তার ধাতব নোলকটি। পাটনের মনে পড়ে যাচ্ছে...

সদরে টিনের ফড়কিটি ঠেলে তালপাতের বেড় দেওয়া উঠোন ঢুকতেই ঝাঁই-ঝাঁই করে উঠল তার মা। অঙ্গদের কথা শুনে চুলহা থেকে একটা জ্বলন্ত জুমড়া কাঠ হাতে নিয়ে সে আঙিনায় নামে। ফিকে অন্ধকারে হেঁটমস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা জারমণির কাছে আসে। পুড়তে থাকা ডালের আলোয় তার ঘোমটা ঢাকা মুখ দর্শন করে সঞ্চারী তিক্ততার সঙ্গে বলে ওঠে, ‘তুঁই ই কালকুদরীকে কথার ল্যা আনলি রে কামাইনা? কথায় কুঢ়ায় পালিস ইয়াকে? খেদ এখনি, খেদ! এরে পাটৈনা। পাটৈনা রে—’

পাটনের মুখে রা নেই। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে সে ইঁদুর-ধরা ঘুগি বুনছিল। খাটে শুয়ে ছিল বুড়ো সহদেব। সে উঠে বসে। খাটের তলায় পড়ে থাকা ডাংটিকে পা দিয়ে টেনে টেনে নাগালে আনতে চেষ্টা করে। কুঁজো হয়ে মাটি থেকে ডাংটা তুলে, জারমণির মুখের দিকে বাড়িয়ে রেখে জিগ্যেস করে অঙ্গদকে, ‘কাখে আইন্যে ঘরে ঢুকালিস তুঁই? ই-কে বঠে? কন জাতের বঠে?’

কয়েক মুহূর্ত আগে ঘরে ঢুকে সবকিছু জানিয়ে দিয়েছে অঙ্গদ। সে তো আর জারমণিকে নিয়ে গজগজায় ভেতরে ঢোকেনি। সেভাবে ঢোকা বিপজ্জনকও। যদি তখন কোনো প্রতিবেশী এসে মহুলা মদ খেয়ে আলতাফালতা গল্ফ জুড়েছে সহদেব কিংবা ভুটুর সঙ্গে? অঙ্গদের পেছু ধরে আসা এই বিটিছ্যেলাটিকে দেখামাত্র সে তখন অতিশয় আগ্রহী হয়ে উঠবে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে জানতে চাইবে তার ‘লাড়ি-লক্ষত্ত’। আর মুহূর্তের মধ্যে সংবাদটি চাউর হয়ে যাবে ডেলিকচা থেকে জীবনডি, চিটিডি থেকে পলপল পর্যন্ত।

অঙ্গদ সেটা জানে। জানে বলে জারমণিকে নিয়ে সে রাতের আঁধারে বনের রাস্তা ধরে এই ডেলিকচাতে ঢোকে। তালগাছটি পেরিয়ে, কয়েক হাত তফাতে রতনকৈড়লা গাছটির আড়ালে তাকে দাঁড় করিয়ে সে ঘরে যায়। ঘরে অন্য কেউ নেই দেখে, চুপুচুপু সঞ্চারীকে বলে, ‘মাই গ, হাই শুন। হামার সঙে একটা বিটিছ্যেলা আইসেছে।’

‘বিটিছ্যেলা?’ সঞ্চারী অবাক।

‘হঁ। উ এখন এই ঘরেই থাকবেক। হামদের সঙে।’

‘কনধারে? কই?’

‘বাহারে। গাছতলটায় ডাঁড়ায় আছে।’

ঘর থেকে বেরিয়ে রতনকৈড়লা গাছটির আড়াল থেকে সে ডেকে আনে জারমণিকে। ততক্ষণে ঘরের মধ্যে হাল্লা শুরু হয়ে গেছে। ঘরে, দাওয়ায়, যে-যেখানে ছিল, তারা উঠোনে এসে জড় হয়ে যায়। শলা করে।

ভিৎরি ব্যাপারটি বোঝার পরেও সহদেব ফের জানতে চায়, ‘খুলে বল তুঁই, ইয়াকে ক্যানে আইনেছিস? কী বিটিছ্যেলা বঠে? কন গাঁয়ের? কার ঘরের ল্যা ভাগায় আনলিস?’

একসঙ্গে এতগুলো প্রশ্নের আবার নতুন করে জবাব দিতে বিরক্ত হয় অঙ্গদ। খিজলায় ওঠে। বলে, ‘কতবার বলব? বললি ত সদদার বঠে। পলপলের বঠে।’

‘পলপলের?’ গ্রামের নামটি শুনতেই চিন্তায় পড়ে যায় সহদেব। ভুটুও। গলাসি পাকাতে শন নিয়ে বসেছিল সে। হাতে অসম্পূর্ণ ‘পাঘা-দড়ি’টি নিয়েই এগিয়ে আসে। বলে, ‘কন গাঁয়ের? পলপলের?’

‘হঁ।’

‘য়েই? পলপলে কার ঘরের বঠিস?’ ভুটু এবার সরাসরি জিগ্যেস করে জারমণিকে। জারমণি চুপ।

সহদেব মনে করতে চেষ্টা করে, কার ঘরের হতে পারে ‘ছঁড়ি’টা। কয়েকটাই সর্দার ঘর আছে পলপলে। কোনো কোনো মুরুব্বিকে সে একসময় জানতও। বাটুল সিংসর্দার, ধরণী সিংমুড়া, ধনঞ্জয় সিংসর্দার। তারা কী এখন কেউ বেঁচে আছে? ওদিককার গ্রামের মাহাতরা আশ্বিনমাস শেষ হতে-না-হতেই মাঠচৌকি দিতে খাইড়া-শবরদের ডাকত। যাতে খেত থেকে পাকাধান কেটে কেউ নিয়ে যেতে না পারে। তখন সপরিবারে সহদেবও গেছে খেতের ধান রাখাদারি করতে। কাঁড়ধনুক নিয়ে রাতভর বসে থাকতে। তারপর কাৎতিক মাসে খেত উড়ান হয়ে গেলে খামার পাহারা দিতে হত। রুগড়ি-কদমপুর ইত্যাদি গ্রামের মাঝি-ভূমিজ-শবররাও এই গ্রাম সেই গ্রামে চাষিদের ঘরে ঘরে কামিন-মুনিষ খাটত। ধান ঝাড়াঝাড়ি, বড় পাকানো, কুচড়ি করা, মরাই বাঁধা—এমনি বহুত কামকাজ। এখন সহদেবের আর কোথাও যাওয়া-আসা নেই। এখনকার পলপলের কোনো লোককে সে জানে না। তারাও চিনবে না এই সহদেব শবরকে। সারা অঙ্গে বাতের যন্ত্রণা নিয়ে যে রাতদিন কঁক-কঁকায়। বুড়োও হয়েছে তাড়াতাড়ি। এখন তার সেই ডাং ধরা পাকা শরীর নেই। অথচ কে বলবে, বেশি না বছর বারো আগেও, এই হনুমুইড়া বুঢ়াটিই আহাড়রা গ্রামে একাই একটি ডাকাত দলকে রৈগদে নিয়ে গিয়েছিল? আহাড়রা-তে অঙ্গদের পিসাঘর।

সহদেব ভাবে, তবে কী সে বিভীষণ সিংসর্দারের ঘরের বিটিছ্যেলা? সে নাম জানতে চায় জারমণির। বলে, ‘কার ঘরের বঠিস গো তুঁই? নাম কী বঠে তোর?’

সঞ্চারী খেঁকিয়ে ওঠে। বলে, ‘রা কাঢ়ছিস নাই য্যা? বল, কী নাম?’

জারমণি তখনো নির্বাক দাঁড়িয়ে রয়েছে। আঙিনাতেই। মাথা হেঁট করে, বুড়ো আঙুলে আঁচড় কাটছে মাটিতে। তাকে ঘরে ঢুকতে বলা তো দূরের কথা, দাওয়াতেও উঠতে দেওয়া হয়নি।

সবাইকে শুনিয়ে সঞ্চারী ঠাট্টা করে বলে, ‘ইয়ার ঠসক দেখ কেমন! ঢঙঢাঙ আর গতর দেখে বুঝাছে—অবছরি বঠে ই। অবছরি।’

কথায় ঠাট্টার সুর থাকলেও এর সত্যতা কি পুরোপুরি অস্বীকার করা যায়? ‘অপ্সরা’ লৌকিক প্রয়োগে হয়ে উঠেছে ‘অবছরি’। যদিও, আঁধারে রূপের বিচার চলে না। কেবল গায়ের শ্বেতশুভ্র বর্ণাভাতেও কী উদ্ভাসিত হয় অপ্সরার প্রকৃত রূপভাষ? স্বর্গে নয়, এ যে মর্ত্যে বনে-বাদাড়ে ভ্রাম্যমাণ অন্য অপ্সরা। নাকি সে সরীসৃপের মতো? আপাত নিরীহ। সুন্দর। অথচ সেই সৌন্দর্যের তলে তলে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে তার মারণ-দংষ্ট্র। বিষের পুঁটুলি!

সঞ্চারী রাগে মেহনাতে থাকে। তার দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ‘অবছরি? কালকুদরি!’

‘নাম বল গ তোর!’ ধমক দিয়ে ওঠে সহদেব।

‘জারমণি সিংসর্দার।’

‘কার ঘরের বঠিস? বাপ কে তোর?’

এবারও চুপ করে থাকে জারমণি। ভয় পায়। বাপের নামটি বললে যদি কাল সক্কালেই কেউ পলপল গ্রামে তার ঘরে খবর দিয়ে আসে? তাহলে, জারমণি নিশ্চিত জানে, তার জীবনের আর আশা নেই। বাপের নাম না জেনেও খবর দিয়ে আসা যায়। অবশ্য সেক্ষেত্রে অঙ্গদও কি পারাঙ্গত পাবে? কাজেই তেমনটি যে করা সম্ভব নয়, তাও সে বুঝতে পারে।

তবে ভয় থেকে সে কোনোভাবেই মুক্ত নয়। আজ হোক, কাল হোক, তার ঘরের ও গ্রামের লোকেরা জেনে যাবেই এই ঘটনার কথা। কে তাকে নিয়ে গেছে, এই নাম তারা এক্ষুণি বাছনিক করে জানতে না পারলেও, এটা তো জেনেই যাবে—জারমণি কোনো বেজাতের ‘ছঁড়া’র সঙ ধরে চলে গেছে। তারপর যা হবার তা তো ইতিমধ্যে নিশ্চয় শুরু হয়ে গেছে। আর তাই, আসন্ন বিপদের কথা চিন্তা করে জারমণি চায়, যত শিগগির সম্ভব এই এলাকা ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে। যেখানে গিয়ে তারা স্বামী-স্ত্রীর জীবন শুরু করে দেবে। খাটাখাটুনি করে, উপার্জন করে, গড়ে তুলবে তাদের নিজস্ব স্বাধীন ঘর। যাবার মুহূর্তে, একটিবারের জন্য জিনগা-থানে ওঠা হয়তো সম্ভব হবে না।

অন্যান্য অনেক ভয় মেশানো লোক-ভাবনার সঙ্গে, সেখানে ওঠার আরেকটি ভাবনাও গ্রামের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে। ডুংরির মাথায় উঠে, থানে পা রাখতে গেলে, সে নাকি আর ফিরে আসে না। থানের চারপাশে আছে নানান বিষাক্ত বুনো গাছ আর লতাপাতা। আছে বনভাবরি, চাকলতা আর আতুড়ি লত। ফুলখাড়ির ঝোপ। কোথাও ঢোলকদম আবার কোথাও আলকুশির দামড়া দামড়া গাছ। রোঁয়া উড়ছে। এইসব গাছের ডালে হাতমচড়া লতের মতো শরীর পাকিয়ে মটকা মেরে থাকে পাহাড়ি চিতি। এরাই যেন জিনগা-মাঈয়ের চর। কোন ফাঁকে কোথা থেকে যে দংশন করে চোখের দেখুতে উধাও হয়ে যাবে! এই ভয়েও জিনগা থানে কেউ ওঠে না। এমনকী, গোরু-বাছুরের ওষুধ বানাতে যে দুষ্প্রাপ্য ‘ঘুঁইট’ গাছের ছাল-ফলের প্রয়োজন হয়, তা সেখানে আছে জেনেও কেউ গাছে উঠতে সাহসী হয় না। অঙ্গদ ঘরে বসে জিনগার নাম নিয়ে সিঁদুর ঘষে দেবে জারমণির মাথায়।

কপালে সিঁদুর ভরানোর সহজ সরল প্রত্যাশা নিয়ে ঘর ছাড়তেই সবকিছু কেমন জটিল ও এলোমেলো হয়ে গেল তাদের। যে ঘরের ভরসায়, যে বাপ-মায়ের ভরসায় অঙ্গদ জারমণিকে নিয়ে এল, এখন সেই ঘর থেকেই উঠল প্রথম আপত্তি। কোনো অবছরি নয়, আস্ত একটি আপদকে সে ঘরে এনে তুলেছে। তাকে এই ঘরের মধ্যে রেখে কোনোভাবেই তাদের থাকা সম্ভব নয়। কে তার ঝক্কি সামলাবে? আবার এই মুহূর্তে, ঘর ছেড়ে বাইরে থাকাও অসম্ভব। সে কোথায় যাবে? কোন গিরিগুহায়? কোন সুড়ঙ্গে?

শুরু হয়ে গেল গোলমাল। হট্টগোল। পাটনও আর নির্বিকার থাকতে পারে না। ঘুগিগুলো ফেলে রেখে, সবার আগে সদরের টিনের ফড়কিটা বন্ধ করে দেয়। হঠাৎ করে যাতে কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে। সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করে সে। নিষেধ করে এমন চেঁচিয়ে কথা বলতে। যদিও তার নিজের কন্ঠস্বরটিই সবার চেয়ে উচ্চগ্রামের। তেমনি তেজি। সামান্য কলহ-বিবাদ হলেও তারা এমনি জোরের সঙ্গে বাক্যালাপ করে থাকে। জঙ্গলের মাঝে তাদের বসত বলে, জংলি জীবনযাপনের মতো কন্ঠস্বরেও আছে অবাধ স্বাধীনতা। কন্ঠকে নিয়ন্ত্রণের সভ্য চেতনা তাদের থাকার কথা নয়। নেইও। কিন্তু ঘটনাটি গোপন রাখার তাগিদে এখন তার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

জারমণি সেই আঁচড়ানো ভূমির ওপরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। যেন তাকে ঘিরে কোনো গঞ্জের গোলাঘরে পণ্য কেনাবেচার সান্ধ্য বাজার বসেছে। ওদিকে, এতক্ষণ যেন কারো নজরেই পড়েনি—একটা ছেঁড়া তালাইয়ের ওপরে কাপড়খানিতে গু-মুত নিয়ে দলা পাকিয়ে দাওয়ার একপ্রান্তে পড়ে রয়েছে সহদেবের বুঢ়ি মা। তার লোলচর্মে ঢেকে থাকা ঘোলাটে চোখের ফাঁক দিয়ে সে এই লোকগুলোর রঙ্গ দেখে চলেছে। একটি নারীকে কেন্দ্র করে। দেখেছে অন্ধকারে দন্ডায়মান ওই আগন্তুক নারীকেও। এখন তাদের খুনোখুনির উপক্রম দেখে ওই বুঢ়ি ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলতে থাকে, ‘অমন না করিস তরা! একটা বিটিছ্যেলারে লাইগে ক্যানে টাংলা ধরছিস? হাই শুন—’

কিন্তু কে শোনে বুঢ়ির কথা? যদিও সে সারকথাটি বলে তাদের সাবধান করে দিতে চেয়েছে। মাতা-পিতা-সহোদরের এমন নাড়ির সম্পর্কটিকে তারা যেন একটি নারীর জন্য কলহ করে নিষ্ঠুর করে না তোলে। হাতে হাতে না তুলে নেয় অবুঝ হাতিয়ার।

এই অশীতিপর বৃদ্ধা কী জানে, সময়ে সময়ে এই প্রবণতা নিয়তিও হয়ে দাঁড়ায়? নারী এমন মোহিনী, এমনি সে প্ররোচনা উদ্রেককারিণী যে, তার উপস্থিতিতে পুরুষ সর্বদা অস্ত্রোত্তলনের কথাই চিন্তা করে। কখনো তা যৌনাস্ত্র, আবার কখনো রক্তক্ষয়ী মারণাস্ত্র। রমণী থাকলে সংঘর্ষ অনিবার্য। কে তাকে খন্ডাবে? ‘রমণী’ শব্দেই যে মটকা মেরে রয়েছে ‘রণ’ ও ‘রমণ’।

লাঠি ফেলে ট্যাংলা ধরেছিল সহদেব। অঙ্গদ সেই অস্ত্রটি বাপের হাত থেকে কেড়ে নিতে গেলে, সহদেব তাকে কনুইয়ের ধাক্কায় মহুল পচানো হাঁড়িটির দিকে ঠেলে দেয়। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পাটনও। গালাগাল করে বাপকে। ভুটু সহদেবকে জাপটে ধরে অস্ত্রটি ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু তখনো তেজ তার কমেনি। যার মূঢ়তার দরুন এই কলহ, সেই অঙ্গদকে সে রাগে গুরগুর করতে করতে, ভুটুর অসমাপ্ত গলাসিটা নিয়ে, পিঠে সপাং সপাং বসিয়ে দেয়। আর অকথ্য গালাগাল করতে থাকে।

ভুটু বলে, ‘ইয়াকে মাইরে আর কী হবেক? ছুটুছ্যেলা বঠে? কী শিকাবি ইয়াকে?’

‘ক্যানে মারবেক নাই? ই সববনাইশা কাজ করেছে। ইয়াকে মাইরে খেদুক ঘরের ল্যা। আর এই কালকুদরীকে—’ সঞ্চারী জারমণিকে ঠেলে দেয় সদরের দিকে। বলে, ‘এ লো, এই, যা তুঁই ইখেন ল্যা। হামার ব্যাটার মাঁস খাতে আইসেছিস? খালভরি! কালিপুর-তিলাইটাঁড়-তানাসি—এত এত গাঁ আছে চারোধারে, কথাও তোর ছঁড়া জুটল নাই? শেষতক হামার ‘নিরহী’ ব্যাটাটাকেই ডংশিলি? কালনাগিনী!’

কালনাগিনী! এমন অপবাদ শোনামাত্র চম করে চোখ পাকিয়ে তাকায় জারমণি। এতক্ষণ যে চোখ দু-টি উদাস হয়ে ছিল, এখন সেগুলো খড়মের মতো হয়ে উঠল! অন্ধকারেও তা চকচক করতে লাগল। কঠিন সে দৃষ্টি। যদিও, মুখে সে একটিও শব্দ উচ্চারণ করল না।

সঞ্চারী কিন্তু বলতেই থাকল। তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলে যেতে লাগল মেনকাও। দাওয়াতে বসে নাকি সুরে কান্না জুড়ে দিল সঞ্চারী। বারে বারে ব্যাটার নাম করে আক্ষেপ করে বলল, ‘শেষতক তুঁই এমন বিপদ ঘরে ঢুকান দিলি। হামাদের যে বন ছাইড়ে পালাতে হবেক রে এএএ!’

‘হামরা ক্যানে পালাব? ঘর আছে, সংসার আছে। ইয়ার কী আছে?’ সহদেব অঙ্গদের দিকে আঙুল বাড়িয়ে অভিযোগ করে বলতে লাগল, ‘ই পরের বিটি ভাগায় আইনেছে। ইয়াকে ইখেনে আশ্রয় দিলে হামরা টেকতে পারব? তার ল্যা ই নিজেই চলে যাক। চলে যাক এখনি।’

সহদেব এটা বলাতে ভুটুও মুখ খোলে। বলে, ‘হঁ, এখনি উ বিদায় হোক। যে- বিটিছ্যেলাটিকে সঙে আইন্যে ঢুকানছে, সেই বিটিছ্যেলাটিকে সঙেই নিয়ে যাক। হামরা যেমনেই আছি, শান্তিয়ে আছি। ই-বিপদের জিনিস ঘরে কেনে আটক করে রাখব?’

ঘরের প্রায় সবাই একই কথা বলাতে মনে বড় ব্যথা লাগে অঙ্গদের। অভিমানও হয়। সে পাটনের মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর, বুকের ভেতরে গুমরে ওঠা কান্না নিয়ে বলে, ‘ঠিকেই আছে তবে। তরা সবাই যখন চলে যাতেই বলছিস, ত হামরা চলেই যাছি। নাই থাকব ই-ঘরে।’

অন্ধকারে চোখের জল কাঁধ ঘুরিয়ে মুছে, জারমণিকে ডেকে নেয় অঙ্গদ। সদরের ফড়কিটা খুলে সে যখন ঘর থেকে বেরোতে যাবে, তখন সেই দুয়ারটিতে টান-টান হয়ে দাঁড়ায় পাটন। বলে, ‘নাই! ই-ঘরে যখন উয়াকে ঢুকানছিস, তখনকে এইখেনেই থাকতে হবে। পালায় যাওয়া চলবেক নাই।’

ওরা পাটনের এই বীরোচিত অঙ্গবিন্যাস আর দৃপ্ত কন্ঠস্বর শুনে হতভম্ব হয়ে যায়। কারো মুখ থেকে পালটা কথা বেরিয়েও আসে না। নেই কোনো জিজ্ঞাসা। পাটনের নির্ণায়ক ভাষায় প্রতিপক্ষ তুচ্ছ হয়ে যায়।

‘ইয়াতে হামদের বদনাম হয়ে যাবেক নাই?’ পাটন জানায়, এভাবে ওই রমণীটির হাত ধরে অঙ্গদকে যদি আসন্ন বিপদের কথা চিন্তা করে বিতাড়িত করা হয়, তাহলে এতে তাদের পৌরুষের অবমাননা হয়। একসময় প্রচার হবে তাদের ভীরুতার, অপৌরুষের। লোকে কি বলবে! যে-ঘরে এতগুলো পুরুষ, তারা সকলে মিলেও একটি নারীর নিরাপত্তা দিতে পারল না? তা যদি না-ই দিতে পারা যায়, তাহলে তারা এই তির-টাংলা নিয়ে কেন শবর হয়ে জন্মেছে? জঙ্গলে থেকে যদি জংলির মোকাবিলা না করতে পারে তাহলে কেনই-বা এমন দন্ডাকারণ্যে তাদের বসবাস? শুধু পরের খেত-খামারে, পরের অন্নধন প্রহরা দিতেই কি তাদের জন্ম? নিজের স্ত্রীধন রক্ষার বীরোচিত সামর্থ্য তাদের নেই? এমন ছিন্ন মুষ্ক তারা? ছি:!

পাটনের এই যুক্তি তাদের সুপ্ত সম্মানবোধ জাগিয়ে দেয়। ঘা দেয় তাদের কাপুরুষতায়। তারা পাটনকে ঘাটাতে সাহস পায় না। বরং তার যুক্তি মেনে নিয়ে তারা জানতে চায়, কীভাবে আগলে রাখবে এই স্ত্রীধন? সুষ্ঠু সমাধানের আগের মুহূর্ত অব্দি কে তাকে দেখভাল করবে? কে রাখবে তাকে দ্বারীর মতো চোখে চোখে প্রহরায়?

‘হামি!’ পাটন তার বুক ওসার করে জানিয়ে দেয়, কার্তিকের পাকা ধান আগলে, শবর পুরুষ যেমন রাতভর শীত-শিশির অগ্রাহ্য করে পিঠে তূণীর ভর্তি কাঁড় নিয়ে ধনুক হাতে অটল বসে থাকে, সেইভাবে থাকবে সে।

বাস্তবিক, খেতে পাকা ধান যদি সম্পদ হয়ে থাকে, তবে এই যৌবনবতী নারীও কী তদপেক্ষা মহার্ঘ সম্পদ নয়? নারীও তো সেই খামার, যেখানে উপচে পড়ে যৌবন শস্য?

বন্ধ শস্যঘরটির কাঠের দরজায় লাথি মেরে হাট করে খুলে দিল পাটন। আর জারমণিকে আদেশের ভঙ্গিতে ডেকে বলল, ‘যা গো যা। সামা!’

ঘোমটায় ঢাকা মুখ নীচু করে, জারমণি, গুটিগুটি ঢুকে যায় সেই ঘরে।

প্রবলমুষ্ঠিতে হাতিয়ার ধরা দ্বারপালের মতো, পাটন, কয়েক দন্ড, সেই শস্যঘরটির চৌকাঠপ্রান্তে দাঁড়িয়েই থাকে। যেন সে মুহূর্তে কতর্ব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। প্রত্যক্ষত, তার হাত থেকে অস্ত্রটি খসে না পড়লেও, অস্ত্রটি যেন তার হাতের অস্ত্র হয়ে আর নেই। কেন না, ভাবনার আশ্চর্য এক আচ্ছন্নতায় সে এখন আর অস্ত্রী নয়। একটি স্ত্রীধনের প্রতিরক্ষা দিতে এবং তার লুন্ঠন প্রতিরোধ করতে, দিশা হারিয়ে ফেলা অস্ত্রজীবীর মতো সে তার চোখের সামনে কোনো প্রতিপক্ষের অস্তিত্ব কল্পনা করতে পারে না। বরঞ্চ, উত্তরোত্তর, তার নিজেরই প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে ইচ্ছে হয়। এতক্ষণ যে ছিল একনিষ্ঠ রক্ষী, পরামর্শদাতা, এখন মুহূর্তে সেই সব ছদ্মবেশ টান মেরে ফেলে, প্রকৃত গদ্দার হতে ইচ্ছে হয় তার। আর এই ধনরক্ষার্থে যারা তার ওপরে ভরসা করে রয়েছে, কুঠুরিবন্দিনী নারীর দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, সেই সব পুরুষদের দিকেই হাতের জাগ্রত কোদন্ডে শস্ত্র তাক করে পূর্বাপর জ্ঞানশূন্য হয়ে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘খামুশ!’ বলতে ইচ্ছে হয়—শতসহস্র দুগ্ধবতী গাভী তথা যোজন মাইলব্যাপী লাঙলোপযোগী নিষ্কর ভূমি অপেক্ষা রমণভোগ্যা এক যৌবনবতী নারী অধিকতর মহার্ঘ। কেবল যুযুৎসু পুরুষই পারে রণাঙ্গন থেকে সেই অস্থাবর সম্পত্তির দখল নিতে। আইস, তোমরা আমার সঙ্গে অনতিবিলম্বে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও।

ভাবতে গিয়ে গা শিউরে উঠল পাটনের। এ কী মতিভ্রম! সে কি পিতা-ভ্রাতা-খুল্লতাতের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণে উদ্ধত? নিজেকে সংযত করে সে। তবে এভাবে কী নিজেকে পুরোপুরি সংযত করা সম্ভব? যে-মনোভূমিতে কামনার বীজ প্রোথিত হয়ে গেছে এবং আকাঙ্ক্ষার বারিতে যা একবার সিক্ত হয়ে উঠেছে, তার ভূমি-চৌচির-করা অঙ্কুরোদগম ঘটবে না? কেবল সগোত্র ও সহোদর বলেই কি নিজেকে প্রশমিত রাখা যায়?

নারী যে প্রশমন জানে না! সে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে পুরুষকে তার যাবতীয় গূঢ় আকাঙ্ক্ষায় প্ররোচিত করে লেলিহান করে দেয়। ভোগ-রমণের আগেও, সে কুলুকুলু স্রোতের মতো ভয়ংকর করে তোলে তার অন্তর্নিহিত বাসনাকে—নারীর গোপন করে রাখা সব গোপনতাকে দেখার বাসনাকে। সেই বাসনার ভয়াবহ আকর্ষণ থেকে দুর্যোধন কি বাঁচাতে পেরেছিল নিজেকে? সেখানেও তো ভ্রাতার বিরুদ্ধে ভ্রাতাই অস্ত্রধারী? বস্ত্র আকর্ষণ করে, বস্তুত, সে তো দেখতে চেয়েছিল দৌপদীর গোপনতা। দ্রৌপদীর যোনিদেশ। লাগামহীন সে উদগ্র কামনা! নারীর এই অগ্ন্যাস্ত্রে প্রতি পুরুষের এই অযাচিত আগ্রাসনের পরিণতি থেকে, শেষতক, দুর্মতি দুর্যোধন কি রক্ষা পেয়েছিল? যদি তেমনি কোনো অযাচিত আকাঙ্ক্ষা, মনে মনে পোষণ করে থাকে পাটন, সেও কি তবে বেঁচে যাবে জারমণির অগ্ন্যুদগার থেকে?

জারমণি সিংসর্দার। অস্থির আকস্মিক-দৃষ্টিতে তাকে দেখলে তার মুখাবয়বটি চোখের ওপরে কোনো প্রভাবই ফেলে না। কিন্তু সেই মুখটির দিকেই, যদি দৃষ্টির গভীরতা নিয়ে দু-দন্ড নিরবচ্ছিন্ন তাকিয়ে থাকা যায়, তাহলে পুরুষের সমস্ত ইন্দ্রিয় ঝনঝন করে বেজে ওঠে! সুপ্ত ইন্দ্রিয়ানুভূতি সজাগ হয়ে ওঠে তৎক্ষণাৎ। আপাত নারীত্ব ব্যতিরেকে তার ভেতরে যেন পাপ-পাট হয়ে রয়েছে আরো এক স্বতন্ত্র নারী। ঠিক যেমন ফণা তুলে দাঁড়ানো খরিশের দিকে নিষ্পলক কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায়, এ নিছক সরীসৃপই নয়, দন্তমূলে বিষ নিয়ে এ যেন প্রতিহিংসাপরায়ণ নারীর মতো দংশন ক্রীড়ায় আহ্বান জানাচ্ছে। জারমণিও কি তাই নয়? এর অখন্ড অবয়ব জুড়ে কি যে একটা জংলি, কামজ আকর্ষণ রয়েছে! রয়েছে তার ঝিনুক দিয়ে চিরে বের করে আনা অনায়ত চোখ দু-টিতে, ক্রমশ গড়ানে নেমে আসা নাকে, নাকের ছায়ায় ফিনফিন করে দুলতে থাকা লুলুকটিতে, এমনকী অপরিসর নাসারন্ধ্রেও। বটপাতার মতো তার পুরু ওষ্ঠযুগল যেন চুম্বনের অধীর তৃষ্ণায় বিস্ফারিত হয়ে রয়েছে। আর বুকের ওপরে চুচুক দুটি অস্ফুট সারঙ্গের মতো বলশালী পাঞ্জায় নিষ্পিষ্ট হবার হার্দিক আমন্ত্রণ জানায়।

ডালপালা মেলে ধরা এই ভাবনাই কি, আচ্ছন্ন করতে করতে, তার প্রতি উত্তরোত্তর আকৃষ্ট করছিল? প্রায়ান্ধকার শস্যঘরটিতে যেটুকু তাকে দেখা যাচ্ছিল, অথবা যেটুকু তাকে দেখা যাচ্ছিল না, তা-ই কি ধাপে ধাপে পাটনকে ঠেলে দিচ্ছিল ভিন্ন কোনো ভাবনার দিকে? পরিকল্পনার দিকে?

মাটির বারান্দায় দেয়াল ঘেঁষে রাখা রয়েছে কাঁচভাঙা লণ্ঠনটি। মৃদু বাতাস ঢুকে দপ দপ করে জ্বলছে। শিস উঠছে। তার ঠিকরানো আলো তেমনভাবে শস্যঘরটির ভেতর অব্দি পৌঁছচ্ছে না। তবু জারমণির শরীরের একাংশ—তার বাহুমূল, ঢালু কটিদেশ, কদলী সদৃশ ঊরু পাটনের দৃষ্টিকে যেন ঠেলা জালে টেনে আনে জারমণির দিকে। আর ঘরময় যেটুকু আবছা আলো থাকে, থাকে তার রহস্যময় ও কল্পনাপ্রবণ বিচ্ছুরণ, তাতে পাটন চোখ মুদেও জারমণির লুলুকবিঁধা টলমলে মুখটি দেখতে পেয়ে যায়। আহা! এই বতর! যদি হঠাৎ বাতাসের একটি প্রবল ঝাপটে, সারা ঘরের একমাত্র আলোর উৎস ওই লন্ঠনটি দপ করে নিভে যায়? তাহলে সেই ঘুটঘুটে আঁধারে, পাটনের মনশ্চক্ষুতে আরো—আরো—উজ্জ্বলতর হয়ে উঠবে না জারমণির নাকবিঁধা সোনালি লুলুকটি? আর সেই অন্ধকারের সংক্ষিপ্ত অবকাশে পাটন আচমকা চৌকাঠের ওপারে তার একটি প্রসারিত পা ফেলে জারমণির কাছে গিয়ে দাঁড়াবে না? হয়তো সে তার বারেবারে ফুলে ওঠা নাকের পাটায় হাত বুলিয়ে, তার অসহায় চোখের জলটুকু মুছে দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠবে, ‘জারমণি! ঘরকে যাবিস? আজ ভোর-ভোরকেই হামি তকে...’

নাহ। বাতাসের ঝাপটে লন্ঠনটি নিভল না। পাটনও, কোনো অজুহাতে ঢুকল না সেই ঘরটিতে, যেখানে জারমণি রয়েছে। ঘরের ভেতরে পড়ে থাকা পুরোনো গাছের গুঁড়িটিতে বসে সে একা-একাই ফেলছে চোখের জল। এমনকী, পাটনের এই মুহূর্তের সারা শরীর জুড়ে অভিব্যক্তি দেখে এটাও মনে হয় না যে, বন্দিনী নারী-শরীরটিতে তার হাতের অমন কোমল স্পর্শ দিয়ে, সহানুভূতির সঙ্গে সে উচ্চারণ করতে পারে উপরিউক্ত কোনো সংলাপ। সে আড়চোখে একটি দুর্বোধ্য দৃষ্টি নিয়ে জারমণির দিকে তাকিয়েই থাকে। তারপর ঘরের অন্য কেউ তাকে লক্ষ করছে দেখে, সে কী বলতে কী বলে ফেলে। প্রায় ধমকের সুরে বলে, ‘কাঁদিস না! ঘর-ভিৎরে কে তকে ঠেঙাছে? সুগুম থাক?’

পাটনের এই অনমনীয় রুক্ষ আচরণ দেখে, ভয়ে, একটু গুটিয়ে যায় জারমণি। তার এতটাই বেপরোয়া ভাব যে অঙ্গদের উপস্থিতিকে সে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনে না। যদিও অঙ্গদের সে ভাই। তবু সে দাপটের সঙ্গে জাহির করতে চায়—অঙ্গদের মতো মিনমিনে লেদাড়ু সে নয়। সে দুর্বিনীত। নারীর প্রতি কোনো দুর্বলতাও তার নেই। হলেই বা সে জারমণি।

বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে আসে পাটন।

বড়োসড়ো উঠোন। ফুরফুর করে বইছে আষাঢ়ের বাতাস। বিকেলের দিকে দু-একপশলা জোর বৃষ্টি হওয়ায় গরম কমেছে। বাতাসের হেলকে দোল খাচ্ছে উঠোনের গাছপালাগুলি—নিম, বুচ আর আঁকড়া। একেকবার জোরালো বাতাস বইলে সড়সড় শব্দ হচ্ছে তালগাছটিতে। যেকোনো সময় তার গা থেকে খসে পড়তে পারে লটকে থাকা শুকনো পাতাটি। খেত-মাটি-জঙ্গল ভিজে গিয়ে সোঁদা গন্ধ নাকে আসছে। আঁকড়া গাছটির মগডালে নাচানাচি করছে অজস্র জুনপুকি।

খুক-খুক কাশতে কাশতে, কোমরে লুঙ্গির পাক খুলে চুটি বের করে পাটনের বাপ। সহদেব। চেঁচিয়ে সে ডাকে ভুটু শবরের ছুটু ছ্যেল্যটিকে। বলে, ‘এ তপা, তপা রে। খাড়িয়ে টুকু আগুন দিয়ে যা ন বাপ।’

‘নাইখে। ঘুমাংগেছে।’ মাটির বারান্দার শেষমুড়ার ঘরটি থেকে জবাব দেয় ভুটুর বউ। মেনকা। সে নিজে উনুন থেকে একটা জ্বলন্ত পলাশ ডাল এনে তার ভাসুরের পায়ের কাছে, মাটিতে, নামিয়ে দেয়। বলে, ‘শক্তায় একথাল মাড়ভাত খাঁইয়ে লিল আর আড়াগড়া দিল উলটে।’

‘কার কথা বলছিস গো?’ সহদেব জিগ্যেস করে মেনকাকে, ‘কে খাঁইয়ে ঘুমাল?’

‘তপা, তপা!’ লন্ঠনের আপাণ্ডুর আলোয় দাওয়ায় বসে পাকিয়ে রাখা গলাসিগুলিকে একজায়গায় গোছ করতে করতে ভুটুই জবাব দেয়। পুরো গোছটাকে সে আলাদা একটা দড়িতে গাঁটরি করে বেঁধে রাখে। কাল ঝালদার হাটে নিয়ে যাবে। বিক্রি করতে। ঝালদা এখান থেকে দশ কিলোমিটারও না। বাপের সঙ্গে তপাও যাবে সেই হাটে। ফিরবে সে হাটের জিলপি আর গুলগুল্লা খেয়ে। কাগজের ফিরফিরি হাতে নিয়ে, নাচতে নাচতে।

চুটিতে আগুন ধরিয়ে, সহদেব টানতেই ভুলে যায়। খাটের ওপরে বসে-বসে সে পাছাটি গুছিয়ে নেয়। তাকিয়ে থাকে শস্যঘরটির দিকে। যে-ঘরে আস্ত একটি অন্যূঢ়া কন্যা...

কিছু কি মনে পড়ে যাচ্ছে, সহদেবের? তার ফেলে আসা অতীতের দু-একটি মুহূর্ত? হয়তো মনে পড়ছে। হয়তো এমন অকালে তার শরীর দাগা না দিলে, এই ‘কালকুদরি’কে দেখে, সেও জেগে উঠতে পারত প্রতিহিংসায়। নিছক স্পর্শাকাঙ্ক্ষায়। তার সায়ন্তন উপস্থিতি ছিল তেমনি অনুভূতি উদ্রেককারী। আঃ, কী তার শরীরের মাতন! কী ঠাট! এ যেন শুধুই নারী নয়, এ হল পুরুষের জাগরণ-মন্ত্র। বেদের হাতের সেই বাজনা, যা ডুমু-ডুমু-ডুমু-ডুমু শব্দে বেজে ওঠে আর ঝাঁপির ভেতর থেকে জাগিয়ে, ক্রমশ ল্যাজের ওপরে খাড়া করে দেয় জোড়া খড়মের চিহ্নযুক্ত সরীসৃপটিকে। বাস্তবিক, কাম তো সরীসৃপই, যাকে চেপেচুপে রাখতে হয়। ঝাঁপি খুললেই ফণা তুলে দাঁড়ায়!

কার্তিক মাসে তখন ছিল ভরা খেত। পাকাধান উপচে পড়ছে। গোধূলির পাংশু আলো ধানগাছগুলির মাথার ওপর দিয়ে, গড়িয়ে গড়িয়ে, মন্থর গতিতে চলে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে। সন্ধ্যা নামছে। খেতের একদিকে, আলের ওপরে, হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকার মতো ছিল ছোট্ট একটি ঘর, যাকে বলে ‘কুমা’। খেত পাহারার এই ঘরটি ছিল শুকনো ডালপালা আর ভাঙা টিন দিয়ে বানানো। দরজার মুখে ছোট্ট ‘ফড়কি’।

সবে সন্ধে হয়েছে বলে, তখনো, ‘কুমা’-র ওপর দিয়ে ঝাঁক ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে গুয়াশালিক আর রামবোনি। ‘কুমা’র সামনে পালহা জড়ো করে সহদেব তখন আগুন জ্বালার আয়োজন করছে। এমনি সময়ে, আজও ভাবতে অবাক লাগে সহদেবের, কোথা থেকে যে একটি মেয়ে এসে তার কুমা থেকে দু-হাত দুরে দাঁড়িয়েছিল! তার মাথায় ছিল গোবর লেপা বাঁশের ঝুড়ি। তাতে কিছু নোংরা কাপড়-চুপড় আর কয়েকটি গাদর জনহার। ভুট্টা। মেয়েটি নি:শব্দে হাসে। হাতে ভুট্টা নিয়ে।

সহদেব জিগ্যেস করে, ‘কী বঠে গো’?

‘কুছু লয়। এমনেই। ভাবলি আগুন জ্বালছিস ত এই জনহারটা পুড়াব।’ মেয়েটি বলে, হাতের ভুট্টাটি পুড়িয়ে, সেটা খেতে খেতে সে চলে যাবে তার গ্রামের দিকে।

‘হঁ, এই ত এখনেই জ্বালব। কন গাঁয়ের বঠিস?’

‘তিলাইটাঁড়ের।’

‘তিলাইটাঁড়ের? উ-গাঁয়ে ত সবাই সাঁওতাল?’

‘একঘর বাদে। গাঁটার ভিৎরে একাই হামরা কুড়মি।’

‘অ। কথাকে গেছলিস?’

বউটি তার কাঁখের দাপিয়ে ওঠা আলছেলেটিকে দেখিয়ে বলে, ‘এই বাবুটাকে মামাঘরকে নিয়ে গেছলি। ওই য্যা গাঁ-টা দেখাছে—ওই—রুগড়ি। কদমপুরের কাছে।’

কথা বলতে বলতে বউটি এগিয়ে আসে। ‘কুমা’র কাছে। কোলের ছেলেটিকে মাটিতে নামিয়ে দিলে সে মায়ের হাঁটু ধরে ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বউটি তার ঝুড়িটিও পায়ের কাছে নামিয়ে দেয়। ঝুড়ির ভুট্টাগুলির দিকে তাকালে, বউটি নিজে থেকে সহদেবকে বলে, ‘ইয়ার মামাঘরে দমে জনহার হঁয়েছে। ত, মামারা বলল, যা গুচ্ছেক নিয়ে। সিজাঁয়, পড়াঁয় খাবি। —অ্যা গ্যাডে, অ্যা গ্যাডে। খেতের ধারকে যাস না ব্যাটা। বিগি আছে, বিগি!’

‘বিগি’ বলাতে পোকামাকড়ের ভয়ে হামাগুড়িরত গ্যাডেও খেতের ঢালুতে আর নামে না। হাত-পায়ের ভরে, শরীরটিকে চাকাগাড়ির মতো আগে-পিছে দেলাতে থাকে। মজা পায়।

বউটি, ইতিমধ্যে যে তার নাম বলেছ বামৈরী মাহাতান, সে, আগুন জ্বলে উঠতেই আগুনের পাশে গিয়ে বসে। হাত-পা একটু সেঁকে নেয়। এখনো শীত পড়েনি। তবু এই লোকবসতিহীন ফাঁকা মাঠে কার্তিকের কুলুকুলু বাতাসে বেশ জাড় লাগছে। গায়ে কাঁথা-চাদর নেই। ব্লাউজহীন বুকটিকে সে শাড়ির আঁচল দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে। শিশুটির গায়েও অপর্যাপ্ত বস্ত্র। প্যান্ট নেই। শুধু একটি বোতাম-ছেঁড়া ঢলঢলে জামা। তাতেও সে বেশ চনমনে। নামটি অদ্ভুত। গ্যাডে। তার চেয়েও সহদেবের কানে অন্যরকম শোনায় ‘বামৈরী’। কী-ই বা তার অর্থ?

নিজের নামের অর্থ বোঝাতে অনেক কথা বলতে হয় বামৈরীকে। তাতে সহদেবের সঙ্গে তার কথোপকথন জমে ওঠে। বামৈরী জানায়, তার বিয়ে হয়েছে আজ থেকে বছর দশ আগে। যখন টাকায় চার আঁটি পুয়াল মিলত। এখন ত এক আঁটি খড়ের দাম এক টাকা। বিয়ে যখন হয়, তখন তার এই নামটি ছিল না। বাপের ঘরে সবাই তাকে লালমণি ডাকত। বিয়ের পরে পেটে সন্তান আর আসে না। পাঁচসাত বছর পেরিয়ে গেল। তখন গ্রামের লোকের পরামর্শে এবং তাদের সামাজিক রীতি অনুসারে লালমণিকে ‘বামৈর’ দিতে হয়। ‘বামৈর’ দেওয়া বলতে ঠাকুরের কাছে মানসিক করে পুজো দেওয়া। তার বাপের ঘরের গ্রামের বুঢ়িরা তাকে এই পরামর্শ দিয়েছিল। বলেছিল, ‘এ লালমণি, তর পেটে ছ্যেলা আসছে নাই বলে তুঁই কাঁদছিস? কাঁদলে কি পেটে ছ্যেলা আসে ধন? হায় শুন, তুঁই মনসা ঠাকুরের কাছে বামৈর দে। জড়ুর ফল পাবিস।’

শাশুড়ি তাকে নিয়েও গিয়েছিল। মনসা মেলায়। যেদিন বামৈর দিতে মন্দিরে যায়, তার আগের দিন ‘বার’ করতে হয়। বারের পরদিন উপাস। সে স্নান সেরে ভিজে কাপড়ে মন্দিরে আসে। পুরোহিতের সামনে মাথা হেঁট করে বসে।

মা মনসাকে সাক্ষী রেখে, পুরোহিত, একহাতে মশাল ধরে। ভেঁড়রি ডালে কানি জড়িয়ে বানানো মশাল। কেরোসিনে ভিজিয়ে জ্বালানো হয়। মন্ত্র বলতে বলতে, পুরোহিত, জ্বলন্ত মশালটিকে বন্ধ্যা নারীর দিকে এগিয়ে দিয়ে, তার ডানহাতের মুঠোয় রাখা ধুনার গুঁড়ো ঝিঁটতে থাকে। হুদকে ওঠে আগুন! কিন্তু তা নারীর শরীর স্পর্শ করে না। এইভাবে কয়েকবার করে। আবার মন্ত্রোচ্চারণ। পুজোপাঠ। ভোগ নিবেদন। বামৈর দেওয়া দেখতে গ্রামের অনেকে মন্দিরে এসে ভিড় করে। তাদের প্রত্যেককে প্রসাদ দেওয়া হয়।

বামৈর দেওয়ার পর কোলে সন্তান পেয়েছে বলে, মুখে মুখে লালমণির নাম হয়ে যায় ‘বামৈরী’।

বামৈরী সলজ্জ ভঙ্গিতে হাসে। থুতনি নামিয়ে। হয়তো নিজের কাছেই সে লজ্জিত হয়েছে এটা ভাবতে যে, সত্যি কি সে বামৈর দিয়ে সন্তান লাভ করেছে? নাকি কারো উদার দাক্ষিণ্যে প্রথাগত নিয়মে সে একদিন গর্ভবতী হয়ে যায়?

সহদেবও হাসে। বামৈরীর হাত থেকে ভুট্টাটা নিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে দেয়। উলটেপালটে। ঝুড়িতে অর্জুনের কচি ছালগুলি দেখে জিগ্যেস করে, ‘ইগলা, কী করতে নিয়ে যাছিস? ওষোধ করবি?’

‘হঁ।’

‘কিস্যার ওষোধ?’

এবারও লজ্জায় তার মুখ নীচু হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয় না। সে অন্যভাবে ঘুরিয়ে বলে, ‘এই আলছ্যেলাটাকে যে খাওয়াছি, ত পেট ভরছে নাই। তার হতেই ছ্যেলার মাকে এই বাকলাগুলার রস খাতে হয়। খালে ‘উ-টা’ বড়ো হয়। তখনকে ছ্যেলার পেট ভরে।’

সহদেব কিছুই বুঝতে পারে না। কোনটা বড়ো হয়? কীসে পেট ভরে? সে পালটা প্রশ্ন করে বসলেও বামৈরী বোঝাতে পারে না। তখন সে আঁচলটা সরিয়ে দেখায়।

ডাঁই করা কাঠপাতাগুলো চিড়-চিড় শব্দে পুড়ছে। গোধূলি পেরিয়ে অন্ধকার নেমেছে খেতে, মাঠে। দূরের বহাল খেতগুলোর ওপার থেকে সমস্বরে ভেসে আসছে শিয়ালের ডাক। বামৈরী তখনো স্তনটিকে আড়াল করে না। লেলিহান শিখায় তাকে, তার বলয়টিকে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে দেখতে, সহদেব, শিয়ালের মতোই লুকুলুকু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তাকিয়েই থাকে।

জ্বলন্ত চুটি হাতে, অন্ধকারে, জারমণির ঘরটির দিকে তাকিয়ে সহদেবের কি এত বছর বাদ মনে পড়ে গেলে তার বিগত যৌবন? জারমণির সূত্রে সে কি আসলে বামৈরীকেই প্রত্যক্ষ করছে? হায় রে জীবন! মোহহীন, দাগাবাজ! পলায়নোন্মুখ! জীবন বহমান। যৌবন বহমান। বহমান ফটিকজলের ঝলমলে কামরূপ নদীটিও। যে-নদী একদিকে ফেলে আসে বিস্তৃত বালুর চর, আরেকদিকে ডাকে প্লাবন।

অন্ধকারে জোনাকির মতো জ্বলে ওঠে চুটির মুখ। ধোঁয়া দেখা যায় না। জঙ্গলের গাছগুলিতে ডেকেই চলেছে ফড়িঙ্গা। খন্ডিত চাঁদের আকাশে উদাসীন ভেসে যাচ্ছে হস্তীশাবকের মতো শ্বেতশুভ্র মেঘদল। মন বড়ো উদাস, বিষণ্ণ হয়ে যায় সহদেবের।

পাহাড়ের ওপরে, জিনগা-থানের পিছনের গ্রামগুলি থেকে ভেসে আসছে জাঁতগানের ঢোল-কর্তালের ধ্বনি। হয়তো গয়ালিকচা, কমলাবহাল কিংবা সাহাড়জুড়ি গ্রামে, আসন্ন মনসাপূজা উপলক্ষ্যে পুরোদস্তুর চলছে মনসা মঙ্গলের মহলা। আসরে তারই মাতন উঠেছে—

হোওওওও গাছের ডাল হিলে হিলে

গাছের ফুলে ঝৈরে পড়ে

মা মনসা যায় লখিন্দরে ঝলিবারে-এএএএএ

হৌঔঔঔ...

শেষরাতের দিকে আচম্বিতে ঘুম ভেঙে যায় অঙ্গদের। দাওয়াতে শুয়ে স্বপ্ন দেখছে সে—পুবের আকাশ শুক পাখির ঠোঁটের মতো রাঙিয়ে, ভোরের সূর্য বেরিয়ে আসছে—ভেলাবিচির মতো। গাছ-কোমর শাড়ি পরে আশপাশের গ্রামের কাঠকুড়ুনি মেয়েরা যাচ্ছে জঙ্গলে। শুকনো পুকুরের পাঁকমাটি, কাড়ার গাড়িতে লাদিয়ে, ঝুমৈর গাইতে গাইতে খেতে মাটি চালাচ্ছে দেশোয়ালি মাঝি ছোকরা। ততক্ষণে তেজ নিয়ে শনশন করে উঠছে সূর্য। যুবকটি হাতের পাঞ্জা দিয়ে চোখ আড়াল করে। —এই অব্ধি দেখে চমকে ওঠে অঙ্গদ। তাহলে কি অন্ধকার কেটে গিয়ে প্রকট হয়ে উঠেছে দিনের আলো? মাঠে, খেতে, নদী-পাহাড়-জঙ্গলে বেরিয়ে পড়েছে গ্রামের মানুষ? সে কীভাবে এখন...

বারান্দায় বসে হাঁপাতে থাকে অঙ্গদ। কিন্তু আকাশের দিকে তাকাতেই, উজ্জ্বল চন্দ্রালোকের আভাস পায়। যদিও অধিকতর রুপোলি তথা উজ্জ্বল হয়ে ওঠা চাঁদটিকে সে দেখতে পায় না। তবে আঁচ করে, চাঁদ এখন মাথায় মাথায়। পাহাড়, জিনগা-থান, ক্যানেলপার, জঙ্গল আর এই অখন্ড প্রকৃতিকে বেষ্টন করে থাকা ছিন্নবিচ্ছিন্ন গ্রামগুলি যখন সুপ্তাবস্থায়, আসমানে ফোকলা চাঁদটি তখনো কোটালি করে যাচ্ছে। শুক্লপক্ষের আলো জঙ্গলের গাছগুলি থেকে ভোরের শিশিরের মতো টসটসিয়ে পড়ছে। ঝিকিমিকি করে উঠোনের গাছপাতাগুলি। ঘরের চাল থেকে টপকে পড়া চাঁদের আলো দাওয়া জুড়ে। পড়ে রয়েছে খুরাভাঙা দড়ির খাট।

ইঁদুরে-কাটা তালাই বিছিয়ে শুয়েছিল অঙ্গদ। ধীরে ধীরে উঠে সে, শস্যঘরটির দরজায় সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শিকলটি খুলে, কপাটের ফাঁটলে মুখ রেখে, কখনো আলতো টোকা মারে, কখনো মৃদুস্বরে ডাকে, ‘এ জারমণি! উঠ। উঠবিস ন, ডেরি করলে ভোর হঁয়ে যাবেক। তখনকে—’

ভোর হয়ে গেলে কী হবে? বাক্যটি সম্পূর্ণ করে না অঙ্গদ। তবে বোঝা যায়, মাঠে জঙ্গলে, ক্যানেলপারে গ্রামবাসীদের চলাচল শুরু হওয়ার আগে সে জারমণিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তে চায়। কিন্তু কোথায়?

ভেতর থেকে ঘুমের রেশ নিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল জারমণি। বলল, ‘কে বঠিস হে? এত রাতে?’

‘আহ, ক্যানে চেঁচাছিস? অঙ্গা বঠি। চ বাইরা, বাহারকে যাবিস ন?’

এতক্ষণে জারমণির চ্যাঠা হয়। সে বুঝতে পারে তার গ্রামের ঘরে সে শুয়ে নেই। বরং এখন, রাত থাকতে, যে লোকটি তাকে ঘুম থেকে তুলতে চাইছে, তার হাত ধরেই তো সে পালিয়ে এসেছে পলপল থেকে। পালিয়ে এসেছে তাকে ভালোবেসে। তাকে বিয়ে করবে বলে। আর এভাবেই সে কঠোর পরিশ্রম, দারিদ্র্য, অনাহার আর পৈতৃক শাসনের বেড়ি থেকে নিজেকে মুক্ত করবে। হায়! কোথায় সে মুক্তি? উলটে সে নিজেই নজরবন্দী হয়ে গেল। বিয়ে করে স্বাধীন জীবন পাওয়া দূরের কথা, প্রকৃতির আলো-হাওয়াটুকু গ্রহণ করারও স্বাধীনতা তার এখন নেই। তাই রাত থাকতে, লোকচক্ষুর অন্তরালে তাকে প্রাকৃতিক কর্ম সেরে ফেলতে হয়। এভাবে কতদিন চলতে পারে? কতদিন?

ভেতর থেকে হুড়কাটি না খুলে, জারমণি কাঁদতে শুরু করে। বলে, ‘হামকে ছাইড়ে দে। হামি চলে যাব যথা-মন-তথা। হামি নাই থাকব গো হামকে ছাইড়ে—’

‘কাঁদিস না ন!’ বাইরে দাঁড়িয়ে, কপাটের ফাঁকে মুখ রেখে তাকে সান্ত্বনা দেয় অঙ্গদ, ‘রাতে-দিনে কাঁদলেই তুঁই কিনারা পাবি? খুল, দুয়ারটা।’

জারমণি হুড়কা খুলে দেয়। শাড়ির আঁচলে মোছে চোখের জল। সর্দি টানে। তারপরেও কান্নার রেশ থেকে যায় তার।

অঙ্গদ ফের বোঝানোর চেষ্টা করে। আজ হোক, কাল হোক, এখান থেকে সে নিয়ে চলে যাবে জারমণিকে। পাহাড়ের মাথায় জিনগা-থান। ওপারে আছে টাঁইড়পাইনা গ্রাম। সেখানে অঙ্গদের মামাঘর। আপাতত, সেখানে নিয়ে গিয়ে জারমণিকে তুলবে সে। মামা-মামির কাছে। পাহাড়ের এদিককার গ্রামবাসীদের সাধারণত ওদিকে বড়ো একটা যাতায়াত নেই। ওখানে কেউ তাদের সহজে খোঁজ পাবে না। ওদিককার মানুষজনও একটু ভিন্ন প্রকৃতির। তারা অনেকটা স্বাধীনচেতা, আদিম এবং গোষ্ঠীবদ্ধ। হাটে-বাটে যত্রতত্র তাদের টো-টো করা নেই। পাহাড়ে, পাহাড়তলিতে থাকতে থাকতে, তাদের জীবনযাপনের ধরন পাহাড়ি প্রজাতির মতো। গ্রামগুলি ছোটো ছোটো। বসতি হাতগোনা। জংলী ও কৃষিনির্ভর তাদের বেঁচে থাকা। তারা পাহাড় থেকে নেমে আসা ‘ঝরনানদী’তে গা খুলে স্নান করে। নদীর বুকে একটা পরিসর জায়গায় নদীর জল সঞ্চয় করে, সেখান থেকে ‘সিনি’ দিয়ে আবাদের জমিতে জল ঝিঁটে।

‘সিনি’ হল একটা বড়ো টিনের পাত্র, যার দু-প্রান্তে লম্বা দুটো দড়ি আটকানো। দড়ির প্রান্তদুটি দু-জনে ধরে, দোলনার মতো দুলিয়ে গতিশীল অবস্থায় কুন্ড থেকে ছোঁ মেরে জল নিয়ে তা জমিতে ফেলে দেয়। এভাবে দোলন চলতে থাকে। চলতে থাকে চাষের জমিতে জল ঝিঁটার কাজ। প্রয়োজনে জারমণিকে নিয়ে অঙ্গদও এমনি জীবন বেছে নিতে পারে। তবে সে তো ভবিষ্যতের কথা। এখন মামা-মামির কাছে জারমণিকে রেখে পাছার ধুলো ঝেড়ে, সে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়বে। কাছাকাছির মধ্যে নয়। সে চলে যাবে অনেক দূরে। আড়ষা রোড ধরে, ডানদিকে, বেলডি হয়ে সিধধা পুরুলিয়া।

পুরুলিয়া হল বাজার-শহর। সেখানে কাজের অভাব? মধ্য বাজারে মাড়ারি গদামে মৈটার কাজও করতে পারে। মাড়ুঘরগুলোতেও কাজ থাকে। অনেক ঘরে দকানি-স্বামীর অবর্তমানে নি:সঙ্গ বউয়েরা পুরুষদের দিয়ে সংসারের কাজ করাতে ভালোবাসে। থাকারও জায়গা দেয়। আর তা না হলে, আড়ষা রোডে পড়ে, ডানদিকে সে চলে যাবে ঝালদা-তুলিনের দিকে। তুলিন থেকে মুরি।

সুবর্ণরেখা নদীর ধারে মুরির কাঁচের কারখানা। কারখানার ধারে-পাশে একটা দু-হাত জায়গা পেলে সে কড়াই-ঝাঁঝরা আর ডজন খানেক গিলাস কিনে চা-পকড়ির দোকান খুলে বসবে। দৈনিক বিশ-তিরিশ কাপ চা বিক্রি করতে পারলেও চালের জোগাড়টা হয়ে যাবে। এভাবে যদি সে, বেশিদিন নয়, অন্তত বছর তিন-চার কাটিয়ে দিতে পারে, তাহলে আর কীসের চিন্তা? পলপলের লোকেরা তখন একেবারে ভুলে না গেলেও, তাদের মন থেকে এ ঘটনাটি অনেকটা মুছে যাবে। গ্রামবাসীদের, বিশেষ করে জারমণির ঘরের লোকজনদের, জারমণির প্রতি কিংবা অঙ্গদের প্রতিও সেই আক্রোশ আর থাকবে না। তারা হয়তো তখন মনে করবে, যাকগে, করে-কম্মে যখন খাচ্ছে, তখন তাদের দাম্পত্য জীবনে বিঘ্ন ঘটানো ঠিক নয়। বরং তারা যেখানেই থাকুক সুখে ও সংগমে থাকুক, শান্তিতে থাকুক। তখন তারা আবার ফিরে আসতেই পারে তাদের এই কৃষিনির্ভর গ্রামে। অঙ্গদ এভাবেই জারমণিকে বোঝায়। বোঝাতে বোঝাতে ঘর থেকে বের করে সে তাকে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ক্যানেল পারে নিয়ে যায়।

হাতে লন্ঠন দুলিয়ে, জারমণির আগে আগে অঙ্গদ। কয়েক হাত পিছনে জারমণি, ঘোমটা মাথায় হেঁট হয়ে ছোটো ছোটো পায়ে হাঁটে। ভঙ্গিতে লাজুক দেখালেও, এখন পায়ে পায়ে তার লজ্জা নেই, ব্রীড়া নেই। বরং প্রতিটি পদক্ষেপে আছে ভয়। আজ পুরো দু-দিন হল সে গ্রামছাড়া। তার ঘরের লোক, গ্রামের লোক, তারা কি কেউই ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নয়?

গ্রামের লোকেরা যদি এখনো না জেনে থাকে, ঘরের লোক? তার চঙখ্যাপা বাবা নিশ্চয় আকন্ঠ মদ্যপান করে, টাঙি নিয়ে হাটে হাটে তল্লাশি করে বেড়াচ্ছে। কোথায়, কার সঙ্গে যেতে পারে তার আইবুড়ো মেয়েটি? সত্যিই কি সে পরপুরুষের সঙ্গে চলে গেছে? জারমণিকে দেখে তারা কোনোদিনই এমনটি ভাবতে পারেনি। তার ভেতরে যে এমন দুঃসাহসিক স্বপ্ন থাকতে পারে, তার আচার-আচরণে, কথাবার্তায় কখনো তা ধরা পড়েনি। নাকি তার পরিণত শরীর দেখে, তার বাঁধ ভাঙা রূপ ও যৌবন দেখে কাঠপাত কুড়োনোর সময় জঙ্গল থেকে কেউ তাকে তুলে নিয়ে পালিয়ে গেছে বিহারের দিকে? মুরি পেরিয়ে রাঁচি-বুন্ডু-তামাড়?

যাই হোক-না-কেন, তার মেয়ের গ্রামছাড়া হওয়ার কারণ যদি কোনো পুরুষ হয়ে থাকে, তাহলে আগুয়ান সিংসর্দার তার ঘাড়ে চোট মারবেই। এবং জারমণি যদি স্বেচ্ছায় চলে গেছে, তাহলে তাকেও ওই পাহাড়ের মাথায় জিনগা-মাঈয়ের উদ্দেশেই নিবেদন করা হবে। কে তাকে রক্ষা করবে?

ঘটনার পরিণতি সংক্রান্ত এই ভয়, এই ধকধকি নিয়ে প্রতি মুহূর্ত কাটছে জারমণির। এই ভয় থেকে সে বুঝছে এখান থেকে যদি তাকে ছেড়েও দেওয়া হয়, যদি অঙ্গদ কিম্বা পাটন কিম্বা তাদের ঘরের লোকেরা এই আপদটিকে ঘরে আটকে রাখা বিপজ্জনক মনে করে এবং ঘর থেকে তাকে চলে যেতে বলে—রাতের অন্ধকারে ঘরের দুয়ার খুলে দিয়ে জঙ্গলের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, ‘যা তুঁই, চৈলে যা। যেখিন ল্যা আইসেছিস তুঁই সেখিনেই চৈলে যা।’ — জারমণি কি পারবে আবার তার গ্রামে ফিরে যেতে? ঘরে ফিরে যেতে?

না। সে যখন একবার পুরুষের ইশারায় বেরিয়ে এসেছে, তখন তার ঘর আর তার ঘর নয়। এমনকী পরপুরুষের ডেরায় সে রাত্রিযাপন করেছে বলে তার বাপ আর বাপ নয়, তার ভাই দুটিও আর তার ভাই নয়, দাদা নয় তার দাদা। শুধু বছর পাঁচেকের নাবালিকা বোনটি তার, লুলকি, কিছু বুঝতে না পেরে গভীর বিস্ময়ে নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকবে তার দিকে। আর মা?

মায়ের কথায় মনটি বিষাদে ভরে যায় জারমণির। সে মায়ের মুখটি মনে পড়াতে চায় না। অথবা দাদা ও ভাইদের ক্রোধান্বিত গম্ভীর মুখভঙ্গি আর তার বদমেজাজি বাপের সশস্ত্র প্রতিচ্ছবি একটি দন্ডের জন্যও তাকে মায়ের কথা ভাবতে সময় দেয় না।

কিন্তু এখন, এই দু-দুটো দিন এবং রাত অতিক্রান্ত হওয়ার পর, কেন জানি না, মাকেই মনে পড়ে যাচ্ছে। হয়তো যে প্রতিকূল অবস্থায় সে নিজেকে এনে ফেলেছে, তাতে সে বুঝতে পেরেছে তার উত্তরণের কোনো অনায়াস দিশা নেই। হয়তো তাই অন্তিম দশায় এখন তার মনে ভেসে উঠেছে মায়ের শোকগ্রস্ত করুণ মুখটি। কে জানে, মা হয়তো এখনো জেগেই রয়েছে। বিনিদ্রার কারণে চোখের নীচে কালি জমেছে, ফুলে উঠেছে। হয়তো এখনো সে আলুথালু বেশে, জটপড়া চুলে ঢেঁকির গড়ে মাথা রেখে, বারে বারে কেবলি ডেকে চলেছে, ‘তুই কথায় গেলি বিটি। ফিরে আয় ন গো। নাই তকে বকব। নাই মারব। তুঁই ফিরে আয়...’

না, আর সম্ভব নয়। জারমণি এখন জেনে গেছে, তার পক্ষে আর কোনো মতে ঘরে ফেরা সম্ভব নয়। মৃত্যুভয়জনিত কারণ অবশ্যই একটা কারণ। কিন্তু শুধু মৃত্যুভয়জনিত কারণই একমাত্র হেতু নয়। যদিও, পরশু রাতের আঁধারে যখন সে অঙ্গদের সঙ্গে তাদের এই ঘরে এসে ঢোকে, তখনই বুঝে গিয়েছিল, সে যা ভেবে এসেছে, তা বাস্তবে ততটা সহজ নয়। বরং পুরোটাই ভ্রান্ত। তাই বন্ধকুঠুরিতে ঢোকার পর থেকে সে দরজায় ধাক্কা মেরেছে, বেরিয়ে আসার জন্য আছাড়-পাছাড় করেছে এবং চিৎকার করে বারে বারে বলেছে ‘হামি ঘরকে যাব। হামি নাই থাকব গোওওও।’

এখনো সে এখানে না থাকার কথা বলেছে, তবে ‘ঘরকে যাব’ একথাটি আর একটি বারের জন্যও উচ্চারণ করেনি। কেননা, ইতিমধ্যে সে জেনে গেছে, পলপল গ্রামে তার আর কোনো ঘর নেই। পৈতৃক আশ্রয় নেই। ওখানে স্বখাত ভূমিতে সে রচনা করে এসেছে তার দাহক্ষেত্র। চলছে দহনের আয়োজন।

চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে গেল জারমণির। লন্ঠন দুলছে। দুলে দুলে চলেছে।

অঙ্গদ আবার বলে মামাঘরের কথা...

পলপল গ্রামে সেদিন অন্য মাতন। সন্ধে হতে-না-হতে গ্রামে যেন ধুলোট লেগে যায়। মনসাপূজার এখনো এক পক্ষ দেরি। তার জন্য উপরকুলহিতে বেলা ডুবতে না-ডুবতে মনসামঙ্গলের আসরের আয়োজন চলতে থাকে। মন্দিরের সামনে চট-চাটাই বিছানো, রিডভাঙা পুরোনো হারমোনিয়ামটি ঘুণাঘর থেকে নিয়ে আসা, ছাই দিয়ে হ্যারাকিনের কাঁচ মোছা, জ্বালানো, কাঁধে কাঁধে ডুগি-তাবলা নিয়ে লদপদ করে ছুটতে ছুটতে আসা, সেই সঙ্গে ঢোল-কর্তাল-ছুমছুমি। তারপর ঢোলে দু-একটি চাঁটি আর হারমোনিয়ামে পোঁ উঠতেই দেখা যায়, বগলে পেঁপটি বাঁশি নিয়ে রদবদিয়ে আসছে হরেরাম কালিন্দী। তা করতেই, মূল গায়েন খড়ু ধীবরও এসে পড়ে। দন্ডবত করে আসনে বসে। অমনি শুরু হয়ে যায়—

বন্দিব বন্দিব আমিইই চরণ দু-খানি

নৌকায় করে পার কর মা ভবতরঙ্গিনী

বন্দির বন্দির আমি

আকাশ বন্দি পাতাল বন্দি বন্দি ধরাতল

বন্দিব বন্দিব আমিইইই...

বন্দনা চলতে চলতে ছেলেছোকরারা আসতে থাকে একে একে। কেউ বিড়ির শেষ টান দিয়ে, কেউ বা অন্ধকারে আকন্ঠ লুঙ্গি তুলে মুখ মুছে, ছুটে এসে টুপ করে আসরের পিছন দিকে বসে পড়ে।

তবে সে তুলনায় ভিড় এখন গাদাগাদি নামোকুলহিতে। ওখানে এখন নতুন জিনিস। চলছে ‘ঢুলকিগীত’-এর রিহার্স্যাল। সাধারণত প্রতিবছর মনসাপূজা উপলক্ষ্যে নামোকুলহির ছোকরার দল সারারাত ধরে যাত্রা-নাটক করে থাকে। উপরকুলহিতে জাঁতগানের আসর যেমন চলে, চলতে থাকে। কিন্তু এবছর থেকে নামোকুলহির ছেলেরা ঠিক করেছে—যাত্রা নাটক বাদ দিয়ে তারা ঢুলকিগীত করবে। এটা সারা পুরুলিয়াতে এখন নতুন। শুরু হয়েছে গত এক-দেড় বছর। ইতিমধ্যে জেলার গ্রামাঞ্চলে তা ছড়িয়ে পড়েছে। ভাঁউরিডি-বোদোলডি-ক্যাটলাপুর-কাঞ্চনপুর থেকে শুরু করে বরাবাজার-বিষকুদরা-ক্যুচা-ভমরাগড়া নানান দিকে।

পলপলে এই উদ্যোগ নিয়েছে মূলত আগুয়ান সিংসর্দার। এই র‌্যাঙহা লোকটি কোথাও আসর হচ্ছে শুনলে দু-পাট মদ খেয়ে সেই নেশায় পাঁচক্রোশ রাস্তা চলতা দিতে পারে। খালি গা, হাঁটুর ওপরে ধুতি। সঙ্গী হিসেবে তার কাঁধে সবসময় থাকে একটা কুড়ুল। আসরে গিয়ে ছকরাপাটির মতো ফুর্তি আর নাচখেল করে ভোর-ভোর এসে ঢোকে তার গ্রামে। এসেই ছাগল চরাতে চলে যায়। চৈৎ মাসে বরাবাজারের কাছে হাতিখেদার মেলায় সে ঢুলকিগীত দেখে মোহিত হয়ে গেছে। গ্রামে এসে বলেছে, ‘একটা বামফার জিনিস দেখলি। ওহোহোহো!’ তাই এবারের মনসাপুজোয় সে উপরকুলহির সবাইকে তাতিয়ে দিয়েছে। বলেছে ‘শ্লা, হামরা কিসে কম বঠি? ঢোল-হারমোনি-পেঁপটি হামদের নাই নকি? কী দেখাছে? লাগা ত তরা! লাগা, তাবাদে দেখছি—’

এই উৎসাহে তারা এখন উঠে পড়ে লেগেছে। চলছে মহড়া।

‘ঢুলকিগীত’ নাম থেকে বোঝা যায়, এই গীতে ঢোলক এবং গীতের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। যদিও ঢুলকিগীত শুধু নাচ গান নয়। সেই সঙ্গে অভিনয়ের একটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে এটাতে। তবে পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে নাচ-গান অভিনয় সবটাই পরিবেশিত হয় রঙ্গ-ব্যঙ্গ-রসিকতার ঢঙে। দেশজ তথা লোক-আঙ্গিকে এখানে একেকটি ছোটো ছোটো পালার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় বিশুদ্ধ হাস্যরস। যার সঙ্গে দৈনন্দিন গ্রামীণ জীবনের সংযোগ গভীর। দর্শকরা না হেসে থাকতে পারে না। আর তেমনি তার নাচের মাতন। যখনি ‘রং৬ -টা ঘুরে ঘুরে আসে, অমনি আসর গার্দাগোল! ঢোল-ধামসা-আড়বাঁশি-খাপুয়া-ঝুমঝুমিতে উল্কাপাত। দর্শকরা পর্যন্ত উঠে পড়ে। আসরের শিল্পীদের দেখাদেখি তারাও বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করে। ‘বাহরে দাদা! বাহবা!’ পড়তে থাকে জোর কুলকুলি।

আজ বিকেল থেকেই জমিয়ে নেশা করে রিহার্সালে এসে হইচই সামলাচ্ছে আগুয়ান। যদিও অতিরিক্ত ভিড় হয়ে যাচ্ছিল বলে রিহার্সালের জায়গা অন্যত্র করা হয়েছে। হরিবোল মেলায় না করে, এখন বাঁকুখুড়ার ঘরে চলেছে জোর মহড়া। সেখানে সবাইকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। কপাট ঠেলাঠেলি করলে আগুয়ান তার কাঁধের কুড়ুলটি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। আর বলছে, ‘তরা এমন ক্যানে করছিস বল ন? দেখবার জিনিস ত দেখবিসেই রে বাবু। পেকটিসটা করতে দে। এখনি যদি সোব দেখে লিবি ত স্যা-দিনকে কী দেখবিস? গুষ্টির গাঁইড়?’ ছেলের দল ভিড়-ভিড় করে পালায়।

কিন্তু তা-বাদেও বাঁকুখুড়ার ঘরে মহলা দেওয়ার একটা বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার এক গোয়াল কাড়া। মহলা চলাকালীন তারা আদাবাদি কেউ না কেউ জোর হামলে উঠছে। তাতে আসরে বিঘ্ন ঘটছে আর ‘পিলিয়ার’রাও ঘাবড়ে যাচ্ছে।

ঢুলকিগীতে আগুয়ানের শিল্পীর ভূমিকা নেই। সে গায়ক-বাজনদার-অস্তাদ কিছু নয়। শুধু উৎসাহদাতা। বাঁকুখুড়া বাজায় খাপুয়া। এছাড়া অন্যান্য যেসব বায়েন আছে, তারা গোলাকার হয়ে বসেছে। গোলের মাঝখানে ঢুলকিগীতের মূল শিল্পীযুগল। মেল-ফিমেল পিলিয়ার। তারা পালা বিশেষে একজন গাইবে, অন্যজন নাচবে। অথবা দু-জনই নাচবে, গাইবে। অভিনয়ও চলতে থাকবে সঙ্গে সঙ্গে। আর প্রতিটি গীতে ধুয়ো ধরবে মন্ডলাকারে বসে থাকা বাজনদাররা।

তবে ঢোলকটি থাকবে যুগলের পুরুষটির গলায়। যেটা করছে বিহারীলাল মাহাত। সে ভালো অভিনয়ও জানে। ফিমেল তো এখন নেই। তাকে অনুষ্ঠানের দু-দিন আগে ভাড়া করে আনা হবে। ফিমেল আসে রঘুনাথপুরের ‘অনির্বাণ ড্রেস হাউস’, ‘রূপশ্রী ড্রেস হাউস’ এবং বাঁকুড়ার ‘সাজঘর’ থেকে। পোশাক সমেত ফিমেলের জন্য ‘রূপশ্রী’তে টাকা বানকি দেওয়া আছে।

এখন ফিমেলের বদলে গাঁয়ের একটা ফুর্তিবাজ ছঁড়াকে গতানো হয়েছে। এই পালায় ওই ছঁড়াটি সেজেছে বোন। সে পুরুলিয়ার একেকটি গ্রাম নিয়ে বৈশিষ্ট্যসূচক গীত বলছে এবং বলার পর দাদাকে মিনতি করছে দাদা যেন তাকে ওই গ্রামে বিয়ে না দেয়। এভাবেই চলতে থাকে একের-পর-এক গীত—

রাঙামেট্যায় দমে ল্যাঠা

বিচার বসায় খুড়া-জ্যেঠা

সিঁদুর ঘঁষে পালাঁয় দিলে হাঁকায় জরিমানা।

থানা-পুলিশ-মকদ্দমা

লড়তে পারে ক-জনা

যার চাবুক তারেই ঘঁড়া এমনি জমানা।।

দাদা লেহোর করি—হামার ই-কথাটি রাখিঅ

রাঙামেট্যায় বিহা না দিঅ...

শেষ লাইনটি শেষ হতেই দুড়দাড় বেজে ওঠে লোকবাদ্যগুলি। নাচতে থাকে মেল-ফিমেল। দর্শকদের খুল্লমখুল্লা উল্লাস। কেউ শিসকারি দেয়, কেউ গায়ের গেঞ্জি খুলে মাথার উপরে উড়ায়। আবার কেউ জমিনে একটা ডিগবাজি দিয়ে দেয়। বাজনা থামতেই আবার নতুন করে শুরু হয়—অন্য গ্রামের নাম দিয়ে—

আড়ষা-তুন্তা-চিটিডিয়ে

ডাকাত আছে ডিয়ে ডিয়ে

সৈন্ধ্যরাতে হুড়কা দেই ঘরে।

ভুখল ভুখল খাঁচির ধানে

দিনেরাতে মরাই বাঁধে

না খাঁইয়ে টাকা পোস্টাপিসে ভরে।.

দাদা লেহোর করি—হামার ই-কথাটি রাখিঅ

চিটিডিয়ে বিহা না দিঅ...

আগুয়ান আর থাকতে পারে না। বাজনার মাতন উঠতেই, সেও কুড়ুল নিয়ে আসরের ভেতরে ঝপাং করে ডাঁইড়কা মাছের পারা লাফিয়ে ঢুকে পড়ে। আর তার হাতের কুড়ুলটি ওসার করে দু-হাতে ধরে, নানান ছলাকলা করে, পাছা উঁচিয়ে এড়ি তুলে তুলে নাচতে থাকে। বাজনদাররা হাসতে হাসতে ধুয়ো দেয়—দাদা লেহোর করি—হামার ই-কথাটি রাখিঅ...

এই সময় আগুয়ানের ঘর থেকে ডাক আসে। নাচ চলাকালীন, একটা ফৈচকা ছঁড়া তার ভোগাটা টেনে দেয়। নাচ থামিয়ে বেদম রেগে যায় আগুয়ান। চড় মারতে উদ্যত হয়। বলে, ‘ভেতাঙি কচ্ছিস? এমন কান-চোপিটায় দিব ন।’

‘দিবে? আর তুমাকে য্যা কখন ল্যা ডাকছে, নাই শুনতে পা-ছ?’

‘কে ডাকছে?’

‘জানলাটার দিগে ভালবে তবে ন!’

আগুয়ান জানলার দিকে তাকাতে দেখে তার মাইতর ব্যাটা। শংকর। আগুয়ান ধমক দিয়ে জানতে চায়, ‘কী বঠে র‌্যাহ?’

‘ঘরকে চল। মা হাঁকাছে।’

‘কিস্যার লাইগে?’

‘আগু চল ন। ঘরে বলব।’

‘এখন নাই যাব, যাহ!’

শংকর করুণ মুখ করে ফিরে চলে গেল। কুড়ুল নিয়ে নাচতে লাগল আগুয়ান—দাদা লেহোর করি...

রাত খুব হয়নি। নামোকুলহির বাজ-বাজনা থেমে গেছে। গোটা গ্রাম জুড়ে ঝুপঝুপে অন্ধকার। তার ওপর চতুর্দিক থেকে ছুতারের র্যাঁদা-করাত চালানোর মতো যত ব্যাঙের ভঁ-ভাঁ ডাক নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতাকে আরো অসহ্য করে তুলেছে।

ঘরে ঢোকার রাস্তার ওপরেই নলকূপ। রাস্তাটি বারোমাস জভি-কাদায় প্যাচপ্যাচ করে। এর-তার ঘরের হাঁসগুলি পুকুরে যাওয়া-আসার পথে এখানে একটু চরে নেয়। ঘরের দেয়াল কোলে গা ঘষতে থাকা শুয়োরগুলি, মাঝে মাঝে এই কাদায় এসে ডুবে থাকে। ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে। আগুয়ান পায়ে পায়ে কাদা নিয়ে ঘরের দিকে যায়।

আগুয়ানের ঘরে সদর দুয়ার বলে কিছু নেই। খোপ কাটা রয়েছে। পাল্লাহীন। হয়তো কখনো তার-পতর দিয়ে আটকানো একটা টিনের কপাট ছিল। ঢিবি মতো উঁচু চৌকো আঙিনা। অনেকটা গৈড়ানে কুলহির রাস্তা দেখা যায়। ঘরের বাসন-কোসন ধোয়া জল, ছাগলের লাদি-লাদাড়িসহ পেচ্ছাপ নালা কেটে রাস্তায় গিয়ে পড়ে।

ক্রমশ চড়াই বেয়ে, ঘরের অভিমুখে এগোতেই, আগুয়ান দেখে, প্রতিদিনের মতো আজও কুপি জ্বলছে। বারান্দায় দেয়ালের গায়ে কুলুঙ্গির মতো দেখতে ‘দিরখা’র ভেতরে বসানো সেই কুপিটির আবছা আলো ঘরটিকে বিষাদাক্রান্ত করে রেখেছে। অন্যদিনর মতো ঘরের ভেতর থেকে কোনো হইচইও কানে আসে না তার। সে নিজেই বড়ো ব্যাটার নাম ধরে ডাকে, ‘চদাঁ রে, এ চঁদা!’

‘হঁ।’ চঁদা সাড়া দেয়। উঠোনের ছাগলগুলিকে একে একে খোঁয়াড়ে ঢোকায় সে।

শংকর লন্ঠন এনে মাঝ আঙিনায় দাঁড়ায়। আগুয়ান ঢোকে। কাঁধের কুড়ুলটিকে সে, মাটির দাওয়ায় উঠে, চালার বাতায় গুঁজে দেয়। পায়ের কাদা ঝাড়ে। কুপির নীচে ছোট্ট দড়ির খাটটিতে, ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে রয়েছে লুলকি।

ভেতরের ঘরটি থেকে বেরিয়ে আসে আগুয়ানের বউ, পার্বতী। সে কাঁদুমাঁদু গলায় বলে, ‘ঘরে এৎ বড় বিপদ। আসরটাই বড় হৈল? ছ্যেলাটাকে ডাকতে পাঠালি—’

‘ক্যানে কী হঁয়েছে?’ আগুয়ান অজানা বিপদের আভাস পেয়ে চঞ্চল হয়ে ওঠে, ‘বলবি ন কী বিপদ?’

‘বিটিটা য্যা বনকে গেছে, এখনো ঘুরে নাই।’

‘কীহ?’

পার্বতী আর কিছু বলতে পারে না। কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে বসে পড়ে। খাটের খুরাটিকে দু-হাতে বেড় দিয়ে ধরে মাথা নামিয়ে দেয়।

শংকর দাঁড়িয়েই থাকে। বাপের মুখের দিকে চেয়ে, লন্ঠন হাতে। তারও মুখে-চোখে ভয়ের আভাস। বরঞ্চ, এই নিয়ে চঁদার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। নির্বিকার। সে আপন মনে সংসারের টুকিটাকি কাজ করেই চলেছে। মায়ের মতো করে সে একবারও ভাবল না যে, হ্যাঁ ভালা, যে-বিটিছ্যেলাটির সৈন্ধ্যায় ঘর ঢুকার কথা, স্যা এখনো আইল নাই ক্যানে? তাইলে কী হঁয়েছে?

পার্বতী যতবার এই নিয়ে তার উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে, চঁদাকে এদিক-ওদিক খোঁজাখুঁজি করতে বলেছে, ততবার উলটে সে তার মাকেই খিচখিচ করে উঠেছে। বলেছে, ‘কী আর হবেক? গলায় দড়ি নিয়ে মরবেক? জুয়ান বিটছ্যেলাকে যদি রাতে দিনে গাল-বাখান দিস, বকাঝকা করিস, তাইলে উয়ার কি আর ঘরে আসতে মন করবেক? উ নিশ্চয়ই মনের অনুরাগে চিটিডিয়ে চলে গেছে।’ শুধু এইটুকু বলে নিজে দোষে খালাস হয়ে গেছে সে।

চিটিডিতে জারমণির পিসির ঘর। যদি সে পিসিঘর চলে গিয়ে থাকে, তাহলে সেখানেও তো চঁদা একবার খোঁজ নিয়ে আসতে পারত? সে যায়নি। ঘুরতে ঘুরতে জঙ্গলে তার কাঠকুড়োনোর জায়গাগুলোও দেখে আসেনি। এমনও তো হতে পারে হঠাৎ শরীর খারাপ হয়ে মাথা ঘুরে সে পড়েই রয়েছে? মাসিক চলছে!

এখনো সে জারমণির রাগ করে পিসিঘরে চলে যাওয়ার কথা বলাতে, আগুয়ান তার বউয়ের ওপরে একচোট নেয়। বলে, ‘অ, তাইলে তুঁই উয়ার সঙে লিয়াই-ঝগড়া করেছিস? তার হতেই উ পাঁলানছে। তকে বলে দিলি, যদি হামার বিটিকে হামি ঘুরৎ না পাই, তাইলে তকেও হামি বনবাসে পাঠাব।’ এই বলে, আগুয়ান চালায় গুঁজে রাখা তার কুড়ুলটিকে ফের কাঁধে নেয়। সঙ্গে নেয় চঁদা আর শংকরকে।

সবার আগু আগু সে নিজেই লন্ঠন দোলাতে দোলাতে জঙ্গলে ঢুকে যায়।

জঙ্গলে অনেকটা ঢোকার পর, শুধু গাছের গায়ে গাছ ছাড়া আর কিছুই তার নজরে পড়ে না। মাথা তুললে ডালপাতের ফাঁকফুঁকর দিয়ে দেখা যায় মালা-খসা কুড়চি ফুলের মতো আকাশের গায়ে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে তারা। একপাশে গোঁসা করে রয়েছে ‘চিড়ু খাওকা’ চাঁদ। কানে আসছে মিলনের জন্য কাতর হয়ে ওঠা ব্যাঙের ডাক। গাছে গাছে ঝিঁঝি ডাকছে। এখানে এসে মনে হচ্ছে রাত হয়েছে ঢের। ভয়ে ও দুশ্চিন্তায়, একই অক্ষে দাঁড়িয়ে, চারপাশ ঘুরে ঘুরে, আগুয়ান ডাকতে লাগল, ‘জারমণিইইই! জারমণ রেএএএএএ...’

‘—এএএএএ!’ জঙ্গল জুড়ে, বারে বারে ফিরে আসতে লাগল তার অন্তিম প্রতিধ্বনি।

লন্ঠন দুলছে। দুলে দুলে চলেছে।

অঙ্গদ আবার বলে মামা ঘরের কথা। তার মামা চামটু শবরের চাষবাস-নির্ভর জীবন হলেও, ধানিজমি বিশেষ নেই। বড়োজোর দু-আড়াই বিঘে। তাতে মণ পনেরো-বিশ ধান হয়। তবে পাহাড়ের গায়ে তাদের ডাঙা আছে ঢেরটাই। সেই জমিতে চামটু আর তার বউ গুণী শবর ভুট্টা, বিরহি, লত-বাদামের চাষ করে। বিরহি-বাদামটা ঝালদার হাটে বিক্রি করলেও, তিরিশ-পঁয়ত্রিশ মণ ভুট্টা যা হয় সবটাই ঘরে খাওয়ার জন্য রেখে দেয়। তারা নি:সন্তান। দু-জন ছাড়া ঘরে আর কোনো ছ্যেলাপুইলাও নেই। যখন-তখন কাঠের চুলহায় ভুট্টা গুঁজে পুড়িয়ে খাওয়ার ব্যাপার থাকে না। তাই আকালের কয়েকটা মাস তারা দু-জনে নুন দিয়ে গোটা গোটা সিদ্ধ করে অথবা ঢেঁকিতে কুঁটেও লপসি করে খায়। ঢিমাগুড় মিশিয়ে। দিনভর ছাগল-ভেঁড়ি নিয়ে পাহাড়ে টো-টো করা কাজ।

হ্যাঁ, গন্ডা পাঁচেক ছাগলের একটা পাল আছে চামটুর। তাদের পুঁজি দিনকে-দিন বেড়ে চলেছে। এখান থেকে সে একটা থোক টাকা উপার্জন করে। এর জন্য তাকে হাটে হাটে যেতেও হয় না। আড়ষা-ঝালদা-বলরামপুরের লুঙ্গিপরা মুসলমান পাইকার পাহাড়ি পথ ধরে হাটের আগের দিন তার ঘরকে পৌঁছে যায়। কুশি৭ চুলকে মিষ্টি ডাক দেয়, ‘চামটু ভাই!’

আর তখন, চামটু হয়তো আসমানমুখী বিশাল আঁকশি নিয়ে, ঘাড় নীচু করে চৌকাঠ ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসছে। পাঁজরা বেরনো, দুর্বল, হাবসি চেহারা। মাথায় খামচা-খামচা চুল। যেন হাঁস চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ায়, হাটের মাঝে বিচার বসিয়ে চুলগুলি তার ‘কাড়া-কাঁইচা’ করে দেওয়া হয়েছে। নিজের দম দেখানোর জন্য, চামটু, পাইকারকে দেখেও না দেখার ভান করে। তারপর বলে, ‘মাল ছুটু আছে। বিকবার নাই।’

আসলে, পাইকারের কাছে সে গরজ দেখিয়ে, চলতি বাজার থেকে দামটা দু-পাঁচটাকা উঁচন্তির দিকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু পাইকারও যে মুসলমান।

‘ফের এমনও ত হতে পারে’, অঙ্গদ, মামাকে নিয়ে যতটা পারে ভালো ভালো সম্ভাবনাগুলোই জারমণিকে জানায়, যাতে তার উদবেগ কিছুটা কমে। অঙ্গদের ওপরে আস্থা অটুট থাকে।

‘কী?’

ভাইগ্নার প্রতি খেঁচখেঁচা মামার মনগড়া ভালোবাসা দিয়ে তার কাল্পনিক সংলাপগুলিকে বেশ মোলায়েম করে বলে, ‘হামার সোব বিত্তান্ত শুনে, চামটু মামা বলবেক, মামার ঠিনকে আইসে তুমি পেটের চিন্তায় পুরুইলা যাবে? মুরি যাবে? ক্যানে? এত লোক যদি এই পাহাড়-ডুংরিয়ে করে খাতে পারে, তুমোও ক্যানে পারবে নাই? আর নাই ত এককাজ করো ভাইগ্না। তুমাকে কথাও যাতে হবেক নাই—’ এটা বলতে গিয়ে, চামটু হয়তো উপার্জনের একটি বিকল্প প্রস্তাব রাখবে অঙ্গদের কাছে। হয়তো সে বলবে, ছাগলের চাষটা দু-জনে মিলে করি। এর জন্য অঙ্গদকে কোনো পয়সাপাতি ঢালতে হবে না। পাবেই বা কোথায়? ছাগল সব চামটুর। শুধু টাঁইড়ে-জঙ্গলে খেদে বুলা আর খোঁয়াড়ে এনে পাতপালহা দেওয়ার কাজ অঙ্গদের। জারমণি খোঁয়াড় পরিষ্কার করবে। পাল খাওয়াতে নিয়ে যাবে। গুণীর সঙ্গে সংসারের কাজেও সে হাত লাগাবে। ছাগল বিক্রি করে যা রোজগার হবে তার অর্ধেক নেবে চামটু, বাকি অর্ধেক অঙ্গদ। যাকে বলে, ‘হাপেনহাপ!’ তাতেও তো সুন্দর মাঁইয়া-মরদের জীবন কেটে যেতে পারে? পারে না?

প্রস্তাবটি জারমণিরও মনে ধরে যায়। সে অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে। স্বামীকে তাহলে আর নিজের ‘গাছপাকা বউ’ ফেলে শহরমুখী হতে হবে না। শহরও যে বড়ো বিপদের। সেখানে রাঢ়ীরা শাঁখা পরে। তাদের হাতে পান খেলে পুরুষের মনমতি পালটে যায়। কীই মশলা যে মিশিয়ে দেয়! সাবধান! ‘শহরের রাঢ়ী/পিঠকাটা বেলাউজে ঝিলঝিলি শাড়ি।’

কল্পনায় শহর বাদ দিয়ে, জারমণি, এই জঙ্গল পরিবৃত বন্দিজীবন ছেড়ে পাহাড়ি জীবনের কথাই চিন্তা করে। চিন্তা করে সেই টাঁইড়পাইনা গ্রামটি। আহা, মানুষের কোলাহলহীন ছোট্ট সে-গ্রাম! মাঝে মাঝে নিরীহ গবাদির সুরেলা ডাক। সন্ধেয় পাহাড় কোল থেকে ভেসে আসবে যত বাঁইড়া শিয়ালের হক্কা-হুয়া। আর শেষ প্রহরে ঘরে ঘরে আচমকা ডেকে উঠবে গ্রামের খুঁকড়াগুলি। ভরভরির জঙ্গল থেকে উড়ে যাবে ‘চুঁইচুপুস’ পাখি। ভোরের সূর্য উঠবে। দিগন্তের আঙিনায়, হামাগুড়ি দিয়ে। হেলেদুলে, হেলেদুলে। ওহোহোহো!

জারমণি কল্পনা করে, টাঁইড়াপাইনা গ্রামের উদ্দেশে সে অঙ্গদের পেছু পেছু চলেছে। ‘ডেলিকচা’ ছেড়ে। ছেড়ে নয়, পালিয়ে। আশপাশের গ্রামবাসীদের চোখ এড়িয়ে। এখনকার মতো তখনো তাকে অন্ধকারেই বেরিয়ে পড়তে হবে। গভীর জঙ্গলে ঘেরা এই ডেলিকচা গ্রামে সে রেখে যাবে তার অন্তিম ‘পাঁজ’—পায়ের পাতার ছাপ।

ক্যানেলপারে এসে, ডান দিকে অনেকটা গেলে মনোরম মুরগুমা ড্যাম অযোধ্যার পাদদেশে। বাঁদিকে, ওই দূরে পলপল। আর সামনে নির্বিকার দাঁড়িয়ে সেই দৈবথান ‘জিনগা-মাঈ’। ‘ভালডুংরি’। তাকে ছাড়িয়ে ‘চোরনাচা’। পাহাড়ের গায়ে পাহাড়। ছোটো ছোটো। ক্যানেল পেরিয়ে তারা পাহাড়ি সুঁড়ি পথ ধরে উঠতে থাকবে। তবে জিনগা-থানের দিকে যাবে না। দূর থেকে দন্ডবত করবে। তাকে সাক্ষী রেখে, অঙ্গদ, জারমণির কপালে যখন সিঁদুর ঘষে দেবে, তখন সেই সিঁদুরই শক্তিরূপিণী নবোঢ়া হয়ে প্রতিভাত হবে পুবের আকাশে!

সিঁথিতে সিঁদুর ধারণ করতেই, মন কেমন করে উঠবে জারমণির। চোখে জল এসে যাবে। খুশিতে, বিষাদে। নারীর যাবজ্জীবনের আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন রচিত হয় এই সিঁদুর নিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে যার মূল্য এক-আধলাও নয়, তা-ই নারীর কাছে জীবনের যথার্থ ধন। পার্থিব হয়েও যা অপার্থিব। তার কাছে ধেনুগাই-ই বলো আর রজতালংকারই বলো, সবকিছু নশ্বর ও অকিঞ্চন হয়ে যায়— ‘রহি যায় সিঁথার সিঁদুর!’...

জারমণির মনে পড়ে যাচ্ছে। তারও স্বপ্ন ছিল, সেও গ্রামের আর-সব ভূমিজ মেয়েদের মতো সিঁথিতে সিঁদুর নিয়ে বিদায় হবে। ‘অক্ষয় সিঁদুর’। সে পুবমুখে দাঁড়িয়ে থাকবে। মায়ের দিকে আর ঘুরেও তাকাবে না। মায়ের উদ্দেশে সে কাঁধের ওপর দিয়ে আঁজলার চাল ঝিঁটে দিয়ে, চৌকাঠ ডিঙিয়ে চিরতরে চলে যাবে— ‘কামিন খাটতে’।

আর তখন, প্রশ্নোত্তরমূলক বিদায়ের গীত গাইতে গাইতে, আবেগে চোখের জলে ডুকুরে কেঁদে উঠবে বাখৈলের যত মেয়ে। খুঁট দিয়ে চোখ মুছবে মা—

কেহু ত দিল ভালা ঝিলিমিলি শাড়ি

কেহু ত দিল ধেনু গাই

কেহু ত দিল ভালা দুঅ কানে সনা

কেহু ত সিঁথার সিন্দুর।।

মায়ে ত দিল ভালা ঝিলিমিলি শাড়ি

বাপে ত দিল ধেনু গাই

ভাইয়ে ত দিল দুঅ কানে সনা

পরের পুতায় দিল সিঁথার সিন্দুর।

ঝিলিমিলি শাড়ি ভাইরে ছিঁড়িফাড়ি গেল

ধেনুগাই মরে-হারায় ফুরাল

দুঅ কানে সনা ভাইরে বিকে-কিনে খালি

রহি গেল সিঁথার সিন্দুর...

ভোর হবে। ভোরের অনুগ্র আলোয় টিলার মাথা থেকে তারা দেখবে ঘঙের ছাতায় আপাদমাথা ঢেকে থাকা ব্রীড়াবনতা আদিবাসী রমণীর মতো ছোটো ছোটো কতই না গ্রাম। গয়ালিকচা, পড়শিয়া, চেতনবেড়া, ভুঁইঘারা। কত বুনো লতপাত, কত জংলি গাছগাছালি। রাঙ্গোনির কাঁটাঝোপ, চুরচু গাছ, এঁড়রি গাছ। নিষ্কণ্টক ষাঢ়া পুটুসের জঙ্গল পেরিয়ে সিহড়ি গাছের সারি। তাদের পায়ের শব্দে লাটা-পলাশের গাজাড় থেকে ছুটে যাবে প্যাঁড়সা রঙের চাওরা ইঁদুর! তাও দেখবে জারমণি। হঠাৎ চোখ তুলে তাকাতেই তার নজরে পড়ে যাবে—জিনগা-থানের দক্ষিণে একমাত্র পাহাড়টি। তার গা থেকে গড়িয়ে পড়তে গিয়েও যেন দৈবনির্দেশে স্থাবর হয়ে রয়েছে ‘ডেলি’র মতো জগদ্দল পাথরখন্ডটি। ছোটখাটো একটি পাহাড়ই। এরই নাম ‘ডেলিকচা’। এই নাম থেকে গ্রামের নাম হয়েছে ‘ডেলিকচা’। ‘ডেলি’ হল বিশাল মাটির পাত্র।

জারমণি, পাহাড়ের ওপর থেকে দেখবে শণের লুতির মতো আলঢাল পড়ে থাকা সেই ‘ঝরনানদী’টিও। যার তীরে নগ্ন হয়ে অবগাহন করে সাঁওতাল-শবর-ঘাটোয়াল রমণীরা। ভাবতেই জারমণির কেমন লজ্জাবোধ হয়। রোমাঞ্চও হয়। সে কি পারবে? দিগন্ত বিস্তৃত নীল গগন আর প্রকৃতির উদার সান্নিধ্যে অবগাহনের প্রাকমুহূর্তে সম্পূর্ণ বিবসনা হয়ে দাঁড়াতে? এভাবে, এতটা অনাবিল, সে কি কখনো দেখেছে নিজেকে? দেখতে ইচ্ছে হয় বই কী! নদীর চরে জেগে থাকা ‘ঘিয়াখাড়া’র ঝুড় থেকে যদি কেউ তাকে লক্ষ করে? করে, করুক। তবুও...।

আঁচলের তলে টিস-টিস করতে থাকা দমি স্তন দুটি, মুহূর্তে মোচড় দিয়ে টাঁটিয়ে উঠল। আর জারমণি, নাভির একবিঘৎ নীচে বাঁহাতটি চেপে রেখে, ভিজেওঠা যোনিমূলে খোঁচা দিতে দিতে, অনেকটা পথ সে নতুন বর্ষায় ফনফনিয়ে ওঠা চাকন্দা শাক আর মটমটি লত মাড়িয়ে হেঁটে যেতে লাগল। নি:শব্দে। অঙ্গদের কোনো কথারই সে জবাব দিল না তখন।

লন্ঠন দুলিয়ে, আগে আগে চলেছে অঙ্গদ। তালগাছটির কাছাকাছি আসতেই, তালখঁদার ভেতর থেকে ডেকে উঠল ‘সিকরা’ পাখিটি। আর ঠিক তখনি, অঙ্গদের মনে হল, কেউ যেন তালগাছের আড়ালে ছিল। ছপ-ছপ করে ছুটে গেল তাদের ঘরের দিকে।

অঙ্গদ দাঁড়িয়ে পড়ে। হতচকিত হয়ে হাতে লন্ঠন নিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কে বঠিস হে? কে বঠিস?’

ডেকে উঠল কুকুরটিও।

সেদিন রাতে বনে ঢুকে সম্ভাব্য জায়গাগুলি খোঁজাখুঁজি করল আগুয়ান। কিন্তু কোথাও সে খোঁজ পেল না জারমণির। পরনের কাপড়, ঝুড়ি কিছু পড়ে থাকতেও দেখেনি। তাতে একটা ব্যাপারে সে নিশ্চিত হয়ে ফিরে এল যে, জারমণি ঘরে না গেলেও, জঙ্গলে নেই। অন্য কোথাও চলে গেছে। মায়ের ওপর রাগ করে পিসিঘরেও গিয়ে থাকতে পারে, অথবা...

‘অথবা’ কোথায়? এক্ষুণি ভেবে উঠতে পারছে না আগুয়ান। এটাও তার মনে হচ্ছে, চিটিডিতে যদি সে না গিয়ে থাকে, তাহলে যেখানে গেছে, সেখানে নিশ্চয় কারো ‘হাত ধরে’ গেছে। যদিও তাকে কারো সঙ্গে বনে-বাদাড়ে ঘুরতে দেখেনি সে। তাদের গ্রামেরই কোনো কুড়মি ছঁড়া তার সঙ্গে ভেতরে ভেতরে ভাব-ভালোবাসা করে তাকে এথা-অথা ভাগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কই, অন্যের মুখ থেকেও তো এমন খবর তার কানে আসেনি?

তবে নিজের ঘর-সংসার আর বউ-বিটিদের দেখার ফুরসত তার কই। ‘ব্যেবসিক’ কাজে হাপ্তার হাটগুলিতে যায়। ফিরে আসে ভাটি হয়ে। কখনো বগলে খুঁকড়া নিয়ে লড়াই করাতে যায়। কোথাও ছো-খেমটি-ঘেরা নাচের আসর হচ্ছে জানতে পেলে তৎক্ষণাৎ চলতা দিল। তা সে জীবনডি-র মোড়েই হোক কি বাঘবিঁধা-জজলঙ গ্রামে হোক।

আর যদি নাও যায়, তাহলেও ঘরে থাকার লোক আগুয়ান নয়। নামোকুলহিতে কারো ঘরের দুয়ারে পড়ে থাকা গোরুর গাড়ির ‘উদলের’ ওপরে বসে, কিংবা হরিবোল মেলা-মনসা মেলার চাতালে আড্ডা দিয়ে ঘরে আসে ঢের রাতে। আর এমনি পরব-পালি যদি হয়? উপরকুলহি -নামোকুলহিতে চলে ঢোল-ধামসা পিটাপটি? তাহলে সেসব ওস্তাদি আসরে আগুয়ান খুড়া থাকবেই। এরপরেও সে কী করে জানতে পারবে—ঘরে কী ‘হছে-যাছে’?

তবু নিজের বিটির বিপথে যাওয়ার দায় সে নিতে নারাজ। উলটে বউকে সে কুঁচতে লাগল। বারে বারে দোষ দিতে লাগল পার্বতীকে। লন্ঠনটি হাত থেকে ধারীয়ে নামানোর সময়টুকুও সে নিল না। খাটের পঁথাড়ে মাথা রেখে, হতাশ হয়ে দাওয়ায় বসে থাকা পার্বতীর দিকে তার অবনমিত তর্জনি সম্পূর্ণ প্রসারিত করে বলতে লাগল, ‘তোর হতে! তোর হতেই ই-কান্ড ঘটল! হামার বিটি ঘরছাড়া হঁয়ে গেল!’

‘হামার হতে? হামি কী করেছি?’ প্রশ্ন করেও জবাবের অপেক্ষায় থাকল না পার্বতী। কেঁদে ফেলল। নিজেকে নির্দোষ জাহির করতে এবং স্বামীকে তা বিশ্বাস করাতে সে মাটিতে মাথা কুটে কুটে বলতে লাগল, ‘এই গুরুর দিব্যি, কালীর দিব্যি। হামি উয়াকে মারি নাই বকি নাই। কুছু বলি নাই। তাও ইয়ারা সবাই মেলে সাঁট হয়ে হামাকেই দোষ দিছে গোওওও!’ সুর করে কাঁদতে লাগল পার্বতী।

‘হঁ ত, কাঁদছিস ক্যানে তুঁই? না কাঁইন্দে স্যাটা বলা যাছে নাই?’ চঁদাও বকতে থাকে মাকে।

‘না, ক্যানে তরা হামাকে এমন বলছিস? হামি উয়ার সঙে লিয়াই লাইগেছি? হামি বললি—হ্যাঁ জারমণ, তোর যে আইজকাল এতটুকু ঘরের কাজে মন নাই গো। খাছিস-দাছিস আর কাঠ কুড়াতে বনকে যাছিস। এইটুকুই বলা। তাথেই উ না খাঁইয়ে রাগে গনগনায় চলে গেল। আর কিছু যদি হামি বলেছি, ত আমার চৈখগুলা ফুটে যাবেক! হামি কানি হব! বড়োরৈগা হব! যদি মিছা বলেছি...’

সত্যি সে আর কিছু বলেনি জারমণিকে। কিন্তু মায়ের মুখ থেকে ওইটুকু কথা শুনে তার মনে হয়েছে, মেয়ে বলেই মা তাকে এমনিভাবে খোঁটা দিচ্ছে। সে আইবুড়ো। মায়ে-বাপে এখনো তাকে ‘বিকতে’ পারেনি তাই এভাবে অবহেলা-গঞ্জনা সইতে হচ্ছে। তবু, মায়ের ওপরে নয়, মেয়ে বলে নিজের ওপরেই রাগ করে, অভিমান করে, সে না খেয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেছে।

পার্বতীও অবশ্য তাকে ডাকেনি। যতই হোক, মা তো। যদি একবার তাকে হাতটি ধরে বুকের কাছে টেনে নিত! যদি বলত, ‘হ্যাঁ বিটি, মায়ের উপরে রাগ করে ভখা পেটে চলি যাছিস! মা কি তোর দুশমন?’ এটা শোনার পরও কি সে অমন করে চলে যেত? মায়ের কাঁধে থুতনি রেখে হলহল করে কেঁদে ফেলত না?

কিন্তু নাহ। তা হয়নি। পার্বতীর হয়তো মনে হয়েছিল, বনে কি মানুষের ভাত থাকে? যতই হাটালে-বিঠালে ঘুরুক, পেট যখন তাতা-খলার পারা ভোখে পুড়তে থাকবে, তখন ঠিক সে ঢ্যানমেনা বাছুরের পারা গুটি গুটি ঘরে এসে হাজির হবে।

পার্বতী তার কান্না ধরে রাখতে পারল না। মেয়ের প্রতি ভালোবাসায় আফশোসে-অনুতাপে বলে উঠল, ‘বিটির হামার বোড়ো টেক। বাড়া ভাত খাতে আইল নাই।’

ঘরে এসেও ঘরে আর থাকল না আগুয়ান। ব্যাটাদের কাউকে সঙ্গেও নিল না। হাতে লন্ঠন আর কাঁধে কুড়ুলটি চাপিয়ে বলেও গেল না, ‘ভাদির কাছকে যাছি।’

ভাদুরানি আগুয়ানের বোন। বিয়ে হয়েছে চিটিডিয়ে। জারমণি যদি সত্যিই পিসির কাছে রয়েছে? আসছে মনসাপূজায় গুড়পিঠা ছাঁকা হবে। হয়তো লম্পোর মিজমিজে আলোয়, হেঁশেলঘরে, কানি চিটানো ভাঙাকুলোয় টুকুস টুকুস চাল পাছুড়ে দিচ্ছে জারমণি। হাঁটুর ওপরে তার নোলক-পরা থমথমে মুখ। সামনে পিঁড়িতে বসে রয়েছে ভাদু। ঊরুতে কাঁপুনি দিতে দিতে কোলের তন্দ্রাচ্ছন্ন শিশুকে মাই খাওয়াচ্ছে আর ‘রাতকহনী’ বলছে। বলছে সেই ভয়ংকর বড়াম ঠাকুরের পুরাকথা৮ ও—

‘ঠাকুর বলছে, হামি ইটা খাব নাই। স্যাটা খাব নাই। মানুইষের রকৎ খাব। কন ঘরে জিয়ন্ত মানুষই আছে? রা দে। এই বলে বলে ঠাকুর, ইয়ার ঘরের কপাট ঠকঠকাছে। উয়ার ঘরের ‘আঁকদুয়ার’ ধাকলাছে। যদি কেউ ভুল করে রা দিঁয়েছে, তাইলে—বাছাকে—উয়ার ঘাড় মটকাঁয়...’ কেঁদে উঠল কোলের শিশুটি।...

আড়ষা রোড। পিচরাস্তা ধরে একাই হেঁটে চলেছে আগুয়ান। বাতাসের চলাচল নেই। গায়ে ঘাম ফুটছে। অস্বচ্ছ জ্যোৎস্নালোকে ডানদিকে সে দেখতে দেখতে যায়—আল-বাঁধা ধানখেত। এখনো তেমন বর্ষা নামেনি। খেতে কাদা হয়নি। শুরুই হয়নি রুয়ারুয়ি। আফর বাড়ছে। ধানখেতের লাগোয়া ডাঙা জমি। মাঠ। পাকারাস্তা থেকে ঢুকে গেছে গ্রামের মুড়া পর্যন্ত। তারপর ঢালু হতেই দু-পাশাড়ি মাটির ঘর। মাথায় টালি আর খড় চাপানো। রাস্তার ওপারে পাহাড়-ডুংরি। জিনগা-থানের অভিমুখে যত এগিয়ে যাওয়া যায়, তত বাড়তে থাকে গাছগাছালির ঘনত্ব।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ গা ছমছম করে আগুয়ানের। তার মনে হল কেউ তার পেছু নিয়েছে। চিটিডি মৌজায় আড়ষা রোডের কাছে সে তখন ‘ধর্মঘুটু’ পেরিয়ে গেছে। পেরিয়ে গেছে ‘শহর মহুল’ নামের গাছটিও। গ্রামবাসীরা এই গাছটিকে সন্ন্যাসীর ডেরা বলে থাকে। যে-সন্ন্যাসী নিয়ে অতিশয়োক্তিপূর্ণ বহু ঘটনার কথা প্রায় সকলের জানা। সেগুলো মনে পড়তেই কি গা ছমছম করে আগুয়ানের?

একবার ধানরাখা করছিল এক মাহাত। হঠাৎ সে দেখতে পায় ‘ধুরুক ধুসুক’ চেহারার একজন লোক খেতে নেমে সব ধান গাঁজা-থাসা করে নষ্ট করে দিচ্ছে। রাখাদার তাকে বাধা দিতে গেলে তাদের মধ্যে পটকা-পটকি লেগে যায়। শেষে রাখাদারটি ওই অনিষ্টকারীকে খেতের বালি-মাটির মধ্যে চেপে ধরে। তার চোখে-মুখে বালি ঢুকে গেলে সে ‘ঘিষ্টা ঘিষ্টা’ বলতে বলতে ছন্ন হয়ে যায়।

আরেকবার হয়েছে কি, কাড়া নিয়ে একজন মাঠে গিয়েছিল। সন্ধের সময় তার কাড়া ঘরে ফিরে এল কিন্তু সেই লোকটি ফিরল না। গ্রামবাসীরা তিনটি ‘হ্যাস্যাক লাইট’ নিয়ে খুঁজতে বেরোয়। দেখে মহুল বনের ধারে খেতে পড়ে আছে লোকটি।

শিউরে উঠল আগুয়ান। সে যেন দেখতে পায়—দূরের ওই আলটিতে এখনো পড়ে রয়েছে সেই মৃত মুখ। আর স্পষ্ট শুনতে পায় তার পিছনে ধাবমান পায়ের শব্দ। অথচ সাহস করে তাকাতেও পারে না সে। চিটিডির মাঠ এখনো আসেনি। রাস্তা থেকে দূরবর্তী ঘরগুলোকে, আলো-আঁধারিতে ঘুসুর-লাদের মতো দেখায়। চারপাশ নিস্তব্ধ। চিটিডির ঘরগুলো থেকেও গ্রামবাসীদের হাঁকডাক কানে আসে না। কাঁদছে না কোনো আলছ্যেলা। আড়ষা রোড ধরে, পিচরাস্তা বরাবর, ঝালদার দিকে তাকালে কোনো মানুষ নেই, জন নেই। তবু কেন একজোড়া পা তার পেছু নিয়েছে? সে আরো ঘেমে ওঠে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে, পেছু ঘুরতে দেখে কোথাও কিছু নেই। বুকে ধকধকি নিয়ে হাঁপাতে থাকে সে। ঘামে। গলা শুকিয়ে যায়। তারপর, সে একটা পরিচিত শব্দ শুনতে পায়। আশ্চর্য সেই শব্দ! শনশন! চিড়চিড়! যেন সারা তল্লাট জুড়ে কেউ চিতা জ্বালছে।

এই সেই জিনগার ডাক। ধরতে পারা যায় না কোথা থেকে এই ডাক আসছে। এর উৎস কোথায়? ভেলাইডির লোকেরা শুধু বলে ‘শালপাহাড়ি’ ডাকছে। জিনগা-মাঈ কি তাহলে ওই ডুংরিতে ডেরা বেঁধেছে? শালপাহাড়িতে? আগুয়ানের কেমন ডর লাগে। কাঁধে কুড়ুল, হাতে নিবু নিবু লন্ঠন। দীর্ঘ পিচরাস্তা, আশেপাশে একটিও মানুষ নেই। একা। আগুয়ান দূরের উঁচু ডুংরিটির দিকে তাকায়। ওই তো জিনগা-থান। ডাক বেড়েই চলেছে। ভয় পেয়ে যায় সে। স্পষ্ট দেখতে পায় সেই যে সেই সাঁওতাল বুড়িটিকে। জিনগা-থানের একটি শুকনো জায়গা থেকে শালপাতার ডোংলায় জল নিয়ে তার দিকেই নেমে আসছে।

মাঠে নেমে আগুয়ান ছুটতে থাকে। প্রবল দুলুনিতে নিভে যায় হাতের লন্ঠনটি।

টিনের ফড়কি ঠেলে ঘরে ঢুকে গেল অঙ্গদ। জারমণিকেও ঢুকিয়ে দিল তার ঘরটিতে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা ভয় থেকেই গেল। কে ছিল লুকিয়ে তালগাছের আড়ালে? কোথায়ই বা ছুটে গেল সে? এখানে, এই চারপাশ জঙ্গলের মাঝে, ঘর বলতে তো মাত্র চারটি। তবে এই চার ঘর নিয়েই ডেলিকচা নয়। আসল ডেলিকচা গ্রামটি তো এখান থেকে অন্তত আধক্রোশ দূরে। বড়ামের কাছে।

আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে ডেলিকচা গ্রামে, অনাবৃষ্টিজনিত প্রবল খরায় বহু গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়। অনাহারে, রোগে জ্বালায়। গ্রামের সবাই কৃষিনির্ভর বলে, উপার্জনের বিকল্প পথ তাদের জানা ছিল না। দরিদ্র মানুষ চাষের বীজধানও খেয়ে ফেলে। সে-বছরের ভয়াবহ আকালের ধাক্কা সামলাতে পারেনি। বীজ বুনতে পারেনি পরের বছরও।

যদিও বড়ামের গ্রামবাসীরা এই ভয়ংকর আগ্রাসন থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে নিতে পেরেছিল। তারা কাঁসাই নদী পেরিয়ে, খেটে খাওয়ার জন্য চলে গিয়েছিল বিহারের দিকে। চাষ-বোকারোয়। ঘরসংসার ফেলে অথবা পুরো সংসারের ডেরাডাণ্ডা কাঁধে নিয়ে। নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে সেভাবে অনিশ্চয় বিদেশ-বিভুঁই শহরের দিকে আড়কাঠির সঙ্গ ধরে চলে যাওয়ার কথা ডেলিকচার মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি। এখনো তারা শীর্ণকায় ঢ্যানপেটা বলদ দিয়ে নিজস্ব একবিঘৎ খেতে ঝুমুর গেয়ে লাঙল ঘুরিয়ে যায়। অভাবে পড়ে। কিন্তু তবু নিকটবর্তী শহর-ঘেঁষা ইটভাটাগুলিতে পর্যন্ত খাটতে যায় না। তারা স্বাচ্ছন্দ্য পেলেও গ্রামে থাকতে চায়, আকালে পড়লেও গ্রামেই থাকতে চায়। গ্রামই তাদের প্রাণ।

সে-সময়, একই গ্রামে একাধিক মৃত্যু তাদের আতঙ্কিত করেছিল। এই আতঙ্ক থেকে অলৌকিক ভয়-ভাবনা এবং কুসংস্কার তাদের সৃজনাত্মক চেতনাকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। তাই মৃত্যুকে তারা স্বাভাবিক বলে ভাবতে পারেনি। তারা ভেবে বসল, সবকিছু আসলে বড়াম ঠাকুরের কান্ড। প্রতিঘর থেকে রক্তপানের পিপাসা জেগে উঠছে তার। এই ভয় থেকেই, তখন, একটি-দুটি করে পরিবার বড়াম গ্রাম সন্নিহিত ডেলিকচা ছেড়ে দূরে পালিয়ে যায়। পালিয়ে এলেও, চারটি পরিবার নিয়ে যে নতুন বসত গড়ে উঠল জঙ্গলের মাঝে, তা ওই ডেলিকচারই একটি টোলার মতো হয়ে গেল। নতুন নামও হল না।

অঙ্গদদের ঘরটি বাদ দিলে, বাকি তিনটি ঘরের কেউ শবর নয়। তাদের একঘর বাউরি, বাকি দু-ঘর ভূমিজ। জারমণির মতো তারাও ‘সিংসর্দার’। তবে এরা নিতান্তই নিরীহ গোছের। সাতে-পাঁচে থাকে না। গায়ের বর্ণ কালো, চোয়াল একটু লম্বাটে, গোল করে কাটা মাথার চুলে স্বল্পতা। এদের হাতপায়ের জোড়গুলি যেন আংটা দিয়ে আটকানো। টান টান চামড়ায় পায়ের গুলি, হাঁটুর চাকতি প্রকট হয়ে বেরিয়ে থাকে। জঙ্গলে বসবাস করে এরা প্রত্যেকে জংলী ও প্রাকৃতিক উপাদানকে উৎস করে নিয়েছে। অঙ্গদদের মতো এরাও শণ কিনে দড়ি পাকায়, জঙ্গলের কাঠ কেটে হাল, সুতবই, গাঁট-কদালের বাঁট, মই ইত্যাদি বানায়। মেয়েরা খালা টিপে। মুড়ি খেতে সিয়াপাত, চপ-পকড়ি-ভাবরা-মিঠাই-মিষ্টির জন্য পলাশ পাতের দনা তারা জীবনডির মোড়ে এসে দোকানিদের বিক্রি করে। পুরুষরা হাটে বিক্রি করে হাল-মই। এ ছাড়া অবসর সময়ে, বিশেষ করে বৈশাগ-জষ্টি মাসগুলোতে উজাড় জঙ্গলে শুকনো পাতা মাড়িয়ে পাইখ-পাখড় ধরে বেড়ায়। লাঠা-কাঁইড়া নিয়ে। প্রতিটি ঘরে গড়ে চার-ছ-টি করে মানুষ। প্রায় সবার ঘরে মেয়েদের কোলে-কাঁখে আছে বাচ্চা। তবে অঙ্গদ বা পাটনের মতো বাইশ-পঁচিশ বছরের যুবক কোনো ঘরে নেই। তাহলে কে ছুটে পালিয়ে গেল তালগাছের আড়াল থেকে? তার ধাবিত হওয়ার ধ্বনি এত দ্রুতই বা মিলিয়ে গেল কেন? সে কি তাহলে অন্ধকার জঙ্গলের ভেতরে ছুটতে ছুটতে দূরের কোনো গ্রামের দিকে পালিয়ে যায়নি? এই চারটি ঘরের কোনো একটিতে ঢুকে পড়েছে? কোন ঘরটিতে? মনে মনে চিন্তা করে অঙ্গদ। হদিশ পায় না। যে-ক্ষিপ্রতা নিয়ে দৌড়েছে, তাতে তার বয়স বছর বাইশের বেশি হওয়ার কথা নয়। পাটনের বয়সি। কিন্তু এই চারঘরে, পাটনের বয়সি পাটন ছাড়া তো আর কেউ নেই। ভাবতে ভাবতে অঙ্গদের চোখে ঢুল এসে গেল। ঘুমিয়ে পড়ল।

অঙ্গদ ঘুমিয়ে পড়ল কিন্তু ঘুম এল না পাটনের। ঘুম কেন, সে ঈষৎ তন্দ্রাচ্ছন্নও হতে চাইছিল না। একটি অন্তর্নিহিত তাড়না তাকে দু-চোখের পাতা এক করতে দিচ্ছিল না। সেও চাইছিল অন্ধকারে নির্নিমিখ চেয়ে থেকে, তার কল্পনার চরাচরটিকে ক্রমশ ব্যাপ্ত করে তুলতে। কল্পনা আবর্তিত হবে অক্ষরূপ ওই নারীটির ঘূর্ণনে। যে-নারীর সে কেবল রূপই দেখেনি, দেখেছে রূপের বিচ্ছুরণ। মুখ দেখেনি, দেখেছে মুখমন্ডলের অনির্বচনীয় অভিব্যক্তি। অঙ্গসৌষ্ঠব দেখেনি, দেখেছে তার ‘কাঁচা অঙ্গের লাবনি’। ঊরু আর মহাবল নিতম্বের দর্শনে সে অনুভব করেছে মেদিনীর অতীন্দ্রিয় কম্পনও। আর এই অনুভব থেকে, তার ভেতরে ইতিমধ্যে লালিত ভাব-চিন্তনের সমস্তটাই কেমন ওলোট-পালট হয়ে গেল। আদিতে তাকে নিয়ে কী ভেবেছিল সে? আর এখন তাকে নিয়ে কী ভাবতে চলেছে? দুইয়ের মধ্যে ফারাক গাভী-গোষ্পদের।

সে যা ভেবেছিল, সেই ভাবনায় নিজেকে সে ধনুর্ধর বই আর কিছু ভাবেনি। এখন নিজেকেই প্রশ্ন করে, কার স্বার্থে সে ধনুর্ধার হবে? কার নিরাপত্তা দিতে এবং কোন ধন আগলে রাখতে সে শরাসন থেকে লুন্ঠনপ্রয়াসীর দিকে নিক্ষেপ করবে একেকটি অবিবেচক বিষদিগ্ধ তির? বস্তুত, ওই মোহিনীকে প্রত্যক্ষ দর্শনের মুহূর্ত থেকেই তার মন স্বার্থচিন্তায় তমিস্রাচ্ছন্ন হয়ে গেল। যার পক্ষ নিয়ে সে, পৌরুষ তথা মর্যাদার প্রশ্নে, নি:স্বার্থভাবে দাঁড়াতে চেয়েছিল, এখন সে নিজেই হয়ে উঠতে চাইল তার প্রতিপক্ষ। তার আক্রমণকারী এবং তার লুন্ঠনকারীও। বা:! বা-বা! ওই নারীর দর্শন, এভাবেই চকিতে তাকে বিশ্বাসঘাতক করে দিতে চায়? ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতা?

ছি:। কী সব ভাবছে সে? একটি নারীকে জয় করতে সত্যিই কি সে সহোদরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হবে? লড়াই করবে? বয়ঃজ্যেষ্ঠ সহোদর সে তো ধরিত্রীর মতো। যে বৃক্ষরূপ অনুজকে সস্নেহে ধারণ করে থাকে। এই দুইয়ের মাঝে সেই মোহিনী কি এতটাই প্রবলা? মৃত্তিকাপিন্ডের তুলনায় সে ধনুষ্কোটিতে লেগে থাকা তুচ্ছ মাটি নয়? কেন তার এই বোধের বিভ্রম?

কেন? পাটন নিজেও জানে না। সে এটাও জানে না যে, নারীশরীর ও তার রূপলাবণ্যকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব, এই মল্লযুদ্ধ ও বিরোধ কখনো সুখকর হয় না। তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ধ্বংস। তিলোত্তমাকে কেন্দ্র করে সুন্দ ও উপসুন্দের৯ যে গদাযুদ্ধ, মৃত্যুতেই কি তার অবসান হয়নি? নারী জননী। নারী যোনির আধার। নারীই অগ্নিবহ। যোদ্ধৃবেশে না থেকেও, তাকে নিয়ে পুরুষের আকাঙ্ক্ষার লড়াইয়ে যে অপ্রত্যক্ষ অগ্নি সে উদগিরণ করতে পারে, তাতে অবিসংবাদিতভাবে সমুদয় যুযুধান পক্ষই অচিরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যোনি যেমন সৃষ্টির দ্বার, তেমনি তা দহনকুন্ডও। অদ্যাবধি, সমগ্র জগৎ জুড়ে যে ধ্বংসলীলাগুলি সংঘটিত হয়েছে, উল্লেখ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে, যোনিই কি তার প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ কারণ নয়? পাটন জানে না। বস্তুত, পাটনের আত্মপক্ষ সমর্থনের ভাবনা, তাকে কি উত্তরোত্তর হননমেরুর অভিমুখে নিয়ে যেতে চাইছে?

আবেগের বশবর্তী হয়ে, উত্তেজনায় বিমূঢ় হয়ে, প্রলোভনে দুর্বল হয়ে পাটন কোনো একটি মুহূর্তে এটি ভেবেছিল বটে, তবে এই ভাবনার গ্লানি সে তার সহোদরের প্রতি বিশ্বস্ত ও স্নেহপরায়ণ অন্তরে স্পর্শ করাতে চায় না। যদিও, প্রলোভন কী সে-বিষয়ে এখনো সে অজ্ঞ। প্রলোভনের উৎস কোথায় তাও তার অজানা। যে-নারীকে সে দাপটের সঙ্গে একাধিকবার রূঢ় ও অর্বাচীন ভাষায় ধমক দিয়ে উঠেছে, নিষ্ঠাবান দ্বারীর মতোই তাকে প্রহরায় রেখে নিজে নিষ্কাম বিমুখ হয়ে থেকেছে, এখন সেই নারীর প্রতি কেন তার কোমল হবার বাসনা জাগছে? কেন তার মুখাবলোকনের নিমিত্ত সে এমন চঞ্চল হয়ে পড়ছে? প্রলোভনের বীজ কি ওই নারীর ভেতর প্রোথিত? যা অবকাশে উদগত হয়? নাকি সে নিজেই লোভের শিকার? যে লোভ, ছাইয়ের স্তূপে পদাঘাত করার মতো, তার ভেতরে জাগিয়ে দিয়েছে উদগ্র কামনা আর বন্য কৌতূহল? আর তাই এই রাতেই, গৃহস্থরা একে একে ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়ার পর, সে গুটি গুটি পায়ে, বাঁইড়া শিয়ালের মতো এগিয়ে গিয়েছিল ওই শস্যঘরটির দরজার দিকে।...

মাটির বারান্দার এককোণে কানা লন্ঠন। টুরি ব্যাং ডাকছে। আঙিনায় দড়ির খাটে পাটন। খাটের তলায় তিরধনুক। দাওয়ায় তালাই বিছিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে অঙ্গদ। বারান্দা লাগোয়া পাশাপাশি ঘরগুলোয় যে-যার বিছানা করে শুয়ে পড়েছে। নাক ডাকার শব্দ আসছে সহদেবের। শেষঘরটিতে ভুটু শবর। আকাশে খন্ড চাঁদের খেলা। মৃৎশকটের মতো ছুটছে সাদা মেঘ। তালগাছটির মাথায় লেগে থাকা অসহায় শুকনো পাতার কাঁপন। চাঁদের আলো পড়ছে কাঁথা আলুথালু করে উঠে যাওয়া পাটনের খাটটিতে।

উঠোন থেকে বারান্দায় পা রাখে পাটন। দরজার কাছটিতে গিয়ে চোরের মতো সেঁটে দাঁড়িয়ে থাকে দু-দন্ড। নিজের খাটটির দিকে তাকিয়ে সে অঙ্গদকে দেখে। নড়ছে? মুখের ওপর থেকে ছেঁড়া চাদরটি সরিয়ে সে কি অপলক চেয়ে আছে তার দিকেই? ডানহাতটি ঝনকাঠের দিকে বাড়িয়ে, আস্তে আস্তে, শিকলটিকে নামিয়ে দেয়। আবার অঙ্গদের দিকে তাকায়। পাশ ফিরছে? নাহ। দুটো কপাটের ফাঁকে আঙুল ঢুকিয়ে ছিটকিনিটিকে সে আলতো করে তুলে ধরে, তারপর একটু পিছনের দিকে ঠেলে, নি:শব্দে নামিয়ে রাখে। খট করে শব্দ হয়। ভয় পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েই থাকে পাটন। তার পা কাঁপছে। নিজেকে সে অনড় রাখার চেষ্টা করে। আস্তে করে ঠেলে দেয় একটি পাল্লা, তারপর অন্যটি। সামান্য ধাতব শব্দ হলেও, সে-শব্দকে ভয় পায়নি পাটন। সে ভয় পেয়ে যায় কপাট খুলতেই হুমড়ি খেয়ে পড়া জোছনাকে। পড়ন্তবেলার রোদের মতো তা ভাসিয়ে দিতে লাগল ‘তার’ নবনীত-কোমল অঙ্গগুলি। সে ভীত হয়ে পড়তে লাগল এই আশঙ্কায় যে, মুদিত আঁখিপাতে প্রক্ষিপ্ত সেই আলোর তীব্রতায় ঘুম না ভেঙে যায় ‘তার’।

ঘুম ভাঙেনি। পাটন চেয়েই থাকে কাঠের তক্তার ওপরে নিবিষ্ট নিদ্রিত সেই বিস্রস্ত-বসনার দিকে। আর যতই সে দেখে, তার দিদৃক্ষা বাড়তে থাকে। ঘোর লাগে চোখে। এই ঘোর, প্রথমত, বিস্ময়ের। একটু আগে পর্যন্ত তার প্রত্যয়ই ছিল না যে, আঁচলের তলে নারী এমন অখন্ড চাঁদ লুকিয়ে রাখতে পারে।

চিকচিক করছে নাকের নোলক। শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দে মৃদু ফুলে ফুলে উঠছে নাকের পাটা। পদাঘাতের ভঙ্গিতে, একটি পা সরাসরি বাড়িয়ে দিয়েছে পাটনের দিকে। যেন তাকে লক্ষ করেই। পাটনের মাথার বড়ো ছায়া পড়ছে তার তলপেট নাভির ওপরে। পাটন সরে দাঁড়ায়। জ্যোৎস্নালোকের অবাধ প্রক্ষেপণে সে দেখতে চায় সম্পূর্ণ নারী-শরীরটি, তার গোপন অঙ্গও। সে তার পায়ের দিকে তক্তপোষের কাছটিতে মাংসাদ প্রাণীর মতো বসে পড়ে। উঁকি মারে। কিন্তু উন্মুক্ত জঙ্ঘার কাছে গোছ হয়ে থাকা কাপড়টি নীচের দিকে ঝুলে থাকায়,অনুসন্ধানী চাঁদের আলো গুহার ভেতরে ঢুকতে পারে না। পাটন তবু এদিক-ওদিক উঁকি মেরে যায়। শরীর তার কলাপাতার মতো কাঁপছে! বিস্ময় কাটিয়ে, নিজের অঙ্গের জাগরণ টের পায় সে। তার ইচ্ছে হয়, জঙ্ঘার কাছ থেকে কাপড়টিকে ওপরের দিকে তুলে, আলো ঢোকার মতো পরিসর করে দিতে। আর বারান্দা থেকে লন্ঠনটি হাতে নিয়ে...

না, সে সাহস তার হল না। কম্পমান শরীরের উত্তেজনা এবং মুগ্ধতা নিয়ে তার নোলক-বিঁধা মুখমন্ডল পানে সে নিরবচ্ছিন্ন তাকিয়ে থাকে শুধু। রূপ ও অঙ্গভাষার কী অবাঙমনসগোচর অভিব্যক্তি। আহা! কী নিটোল শোভা! কী লাবণ্যপ্রভা! নারী তো নয়, যেন ছোনাচের দুর্গা!

আস্তে আস্তে শ্রীময়ীর মুখের কাছে মুখটি নামিয়ে, পাটন, প্রবল আবেগে শুধু একটিই শব্দ ঘুরে-ফিরে নির্বাক উচ্চারণ করে যেতে লাগল, ‘জারমণি! জারমণি!...’

ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল খবরটি। চিটিডি, পলপল থেকে ডেলিকচা গ্রামেও জানাজানি হয়ে গেল। জীবনডির মোড়ে, দোকানদার ভিয়েনদারের মুখ থেকে পাঁচগাঁয়ের লোক আর হাটুরেরাও জেনে গেল পলপল গ্রামের একটি সিংসর্দার মেয়েকে ‘খাইড়া’রা বাঁহীর জোরেই তুলে নিয়ে গেছে। ‘খাইড়া’ হল শবর, আর ‘সিংসর্দার’ মানে ভূমিজ।

ঘটনাটি এমনভাবে লোকমুখে ছড়ানা হতে লাগল, যাতে এটাকে কেউ প্রেমজনিত ব্যক্তিগত ব্যাপার ভেবে না বসে। অর্থাৎ যা হয়েছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং দলগতভাবেই সংঘটিত হয়েছে। এভাবে প্রচার করাতে, আখিরে, মেয়েপক্ষের সুবিধে। দলবদ্ধতার জিগির তুলে ব্যাপারটিকে তারা দ্বিপাক্ষিক করে তুলেছে। যাতে সম্প্রদায়গত আবেগ নিয়ে, পলপল তো বটেই, এমনকী, অন্যান্য গ্রামের সিংসর্দারেরাও এসে আগুয়ানের হয়ে দাঁড়ায় এবং ‘ঢাঁড়াও শালাকে! ছেঁচৌ শালাকে!’ বলতে বলতে, ডেলিকচায় গিয়ে, পায়ে পায়ে খেত-আবাদ কচটা-কচটি করে খাইড়াদের ‘গুষ্টির তিন খেদে’।

যদিও, আগুয়ান বাদ দিয়ে, জারমণির ঘরের লোকেরা, তার পিসাপিসিরাও, এমনটি করতে চায়নি।

আগুয়ান চায়। সে চায় এক অপরাধীর সূত্র ধরে সমস্ত খাইড়াদের ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে। যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। তার জন্য ‘ঢোল-শোহরত’ থেকে শুরু করে যা-যা করা দরকার, সবকিছু সে করতে প্রস্তুত। খেতে-খামারে, চা দোকানে, হাটের গাদালে, যেখানে সে তার নিজের ‘জানি-চিনহি’ লোক দেখতে পাচ্ছে, তার কাছেই হুঁকে উঠছে, ‘একৌ খাইড়াকে ছাড়ব নাই! গাঁয়ে গাঁয়ে ঢেঁড়া দিঁয়ে আজেই লোক জড় করছি। ভালল করে চিনহায় দিব কাকে বলে ‘কাটুল’ আর কাকে বলে ‘ঢাইড়’।’

‘ঢাইড়-কাটুল’ শব্দের প্রয়োগে, আগুয়ান, তার সংলাপটিকে বড়ৌ চৌখস ও দমদার করে তুলেছে। এর থেকে তার মনের গুরগুরানিও অনুমান করা যায়। দু-দিন ধরে সে মেয়ের হদিশ করতে পারেনি। জানতেও পারেনি, জারমণি, মায়ের সঙ্গে কলহ-কচকচির জেরে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে জিনগা-থানের দিকে চলে গেছে, নাকি ‘ছকরাপাটি’র হাত ধরে ‘পুচকে’ দিয়েছে ঝাড়খন্ডে।

সেদিন রাতে চিটিডি গিয়েও পিসির কাছে দেখতে পায়নি জারমণিকে। উলটে, জারমণির বনে কাঠ কুড়োতে গিয়ে ঘরে না ফিরে আসাটাতেই তার বোহনই বেশি অবাক। আগুয়ানের কথায়, দৈত্যারি, যেন তার ঢঁকলা মাথায় তাল পড়ল, এমনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে, ‘ইও কখনো হয়? সেই য্যা সেই গেল আর ঘরকেই আইল নাই? ইও কখনো হয়?’

‘দূর গুষ্টির গাঁইড়! ইও কখনো হয় আর ইও কখনো হয়!’ ক্যালার বলছি—,’ মনে মনে, আগুয়ান তার এই ‘বকা ভঁ-ড়’ বোহনইটির ওপরে বিরক্ত হয়। কিন্তু কী আর করা যায়। অল্প বয়সি বোনের ভুঁইকুদা ইঁদুরের পারা বুঢ়া বর। সেই যে একটা ঝুমৈরে বলেছে—‘নিমগাছে শিমলত, শিম ধরে বাঁকা/বুঢ়া মরদ বিহা করে দায় হৈল থাকা।’ নিজের বোনের কথা চিন্তা করে, আগুয়ান, কোনো অসন্তোষ প্রকাশ করে না।

ভাদুরানি বলল, ‘হ্যাঁ দাদা, জারমণ ক্যানে এমন করল বল ন?’

‘সেইটাই ত বুদতেই লারছি রে। উয়ার মাঈও ত বলছে, হামার সঙে উয়ার বোলচাল রাগারাগি হয়েই নাই।’

‘আর রাগারাগি অমন কার ঘরে না হয়? কতবার ত হঁয়েছে। নাআ—হামি বলছি কি— পাছে ঐন্য ক-ন ঘটে নাই ত? সঙতিগুলা কী বলছে?’

‘কে? পম্পি, ভানি ইয়ারা?’ আগুয়ান জানায়, জারমণির সঙ্গে যারা বনে কাঠ কুড়োতে যায়, তারা এখনো কেউ কিছু জানে না। সে নিজেই তো জানতে পেরেছে রাতে। যখন সে বাঁকু খুড়ার ঘরে ‘লাচখেলের দলে’ ছিল। তখন হঠাৎ ঘর থেকে তার ডাক এল। আগুয়ান অবশ্য তৎক্ষণাৎ ঘরে যায়নি। কেন না, ঘরের ডাককে খুবেই অপছন্দ করে সে। বিশেষ করে বউ যদি ডেকে পাঠায়। আড্ডায় রসভঙ্গ হয়। অনেক সময় লোকজনের মাঝে, প্রকাশ্যেই, সে চেঁচিয়ে বলে ওঠে, ‘ই শ্লা খেপি বউটাকে নিয়ে ত হামার আচ্ছাআ জ্বালা হঁয়েছে! নিয়ে-দিঁয়ে বলবেক চালভাজার পারা খুঁটটায় বাঁইন্ধে রাখব।’ সবাই হেসে ওঠে। তারা ভালো করেই জানে, আগুয়ান কেমন সংসারী।

ভাদুরানির কিন্তু ব্যাপারটা ভালো লাগছে না। সে অন্য আশঙ্কা করছে। যদি জারমণির আর কোনো খবরই না পাওয়া যায়? গুম হয়ে যায়? কোনো একদিন হয়তো দেখা গেল—মাঝ জঙ্গলে আস্থা গাছের মরাডালে ঝুলছে তার বিবস্ত্রশরীর। কিংবা পাহাড়ের মাথায় জিনগা-থানে...

‘অঃ, যত আলতা-ফালতা চিন্তা।’ দৈত্যারি তাদের মন থেকে কুচিন্তা সরিয়ে দিয়ে বলে, ‘জুয়ান বিটিছ্যেলা কি মরব বলে ঘরের ল্যা যায়? ইও কখনো হয়? মনের অনুরাগে চলে যায়। ফের দু-দিন বাদে সেই ঘরকে, সেই বাপ-মায়ের কাছকেই ঘুরে আসে। ইটা নিয়ে বিকলালে চলে?’

সাধারণভাবে, দৈত্যারির মন্তব্যটির সত্যতা এতটুকুও অস্বীকার করা যায় না। গ্রামে এমনটাই ঘটে থাকে। অভাব, দারিদ্র্য, হতাশা, গঞ্জনা নিয়ে থাকা মেয়েটি এক সময় আর পারে না। তখন ‘পিরিতি সুঁতা’য় সে তার স্বপ্ন বোনে। আর সেই স্বপ্নের তাড়ায়, স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় হঠাৎ সে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। পালানোর ব্যাপারে যে তাকে সবচেয়ে বেশি উসকানি দিয়েছিল, প্ররোচিত করেছিল, বিয়ে করে রঙিন জগৎসংসার গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, দেখা যায়, দু-দিন বাদেই তার পকেটের পুঁজি খতম। তখন, কঠিন অকথ্য অভিজ্ঞতা আর চোখে টলমল অশ্রু নিয়ে, মেয়েটি সকলের নজর এড়িয়ে, মানে মানে, ঘরে এসে ঢোকে। তবু, গ্রামবাসীদের কৌতূহলী চোখ দেখলে বাপ-মাকে বলতে হয়, ‘বিটি হামদের মামাঘরকে গেলছিল। উয়ার মামা ভাগ্নিকে লেগবার হতে দমে জেদাজেদি করতে ছিল। ত হামরাও বললি, যা তাইলে সঙেই।’

এই ধরনের নানান ‘মামাঘৈরা কেস’গুলির জন্য মামাঘরের ভূমিকা রীতিমতো গুরুত্বপূর্ণ। তা সর্ববিপদহর। বিপত্তারণ। যদিও মামাঘৈরা কেসের ভিৎরি ব্যাপারটি কারো অজানা নয়, তবু বলতে হয়। ছলছুতোর কারণে, ধামাচাপা দিতে। জারমণির ব্যাপারেও কি তারা মামাঘরের কথাই বলবে? সাঁওতালডি লাইনে, তুররাডির কাছে সেই কুকুরটাঙা গ্রামে আছে জারমণি?

‘বলতেই হবেক।’ ভাদুরানির কথার জবাবে বলে দৈত্যরি, ‘না বললে ত লোকের আ-র বেশি সন্দেহ হবেক।’

আগুয়ান আপত্তি করে। আশপাশে যাকে এখনো অব্দি খুঁজে পাওয়াই যাচ্ছে না, যার বাঁচা-মরারও খবর কেউ জানে না, সে মামাঘরে আছে বলাটা বোকামি নয়? বরং কোনো গোপনতা না রেখে, প্রতিবেশীদের সবকিছু খুলে বলা দরকার। তাহলে এ ব্যাপারে তারাও উদ্যোগী হবে। তাদের সবাইকে নিয়ে তল্লাশি চালাতে হবে—কোথায়, কার কাছে আছে জারমণি? সে কি আদৌ আছে? কে দিতে পারে তার ভিৎরি খবর?

সেদিন রাতে চিটিডি থেকে পলপলে ফিরে যায়নি আগুয়ান। জিনগার ডাক থেমে গেলেও, ভেতরে ভেতরে একটা ভয়ের ডাক সে শুনতে পাচ্ছিল।

শুরু হল জোর তল্লাশি।

এ ব্যাপারে আগুয়ানের চেয়েও বেশি তৎপর হয়ে উঠল বাঁকুখুড়া। বাঁকুরাম মহাত। সে কোনো কিছু না বলে উপরকুলহি নামোকুলহির সবাইকে একঠিনে জড়ো করল। গ্রামের মালিক-স্থানীয় বয়স্ক লোকেরা যেমন এল, তেমনি এল যত হইচই করা ছকরাপাটি। তাদেরকে বিশেষ করে ডাকা হল। কেন না তারাই তো দৌড়া-ধুপা করবে। হয়তো বলা হল, ‘যাও রে বাবুরা, তুন্তায় যাঁইয়ে ভিৎরে খোবোর লাও দেখি—ক-ন বিটিছ্যেলাকে এই দিনতিনেকের ভিৎরে নদী পাইরায় জয়পুরের দিকে চলে যাতে কেউ দেখেছে কি নাই।’ তখনকে, ছকরা পাটি হলে বগল বজায় বলবেক, ‘চলৌ জীবনডি-মানকিয়ারি-তুন্তা! ভঁঅঅঅঅঅঅ।’ বিহাইলা মরদও অথাকে যাতে মানবেক নাই। বিহা করলেই কমর ভাঙে। মু বেঁকায় বলবেক, ‘তুন্তা? সেই মানকিয়ারি পাইরায় তুন্তা? সাইকেল পামচার।’ লাও, কি ভরসা করবে? তবে হঁ, তাদেরও দলে মেশাতে হবে। চুটি-খাওয়া খকরা বুঢ়া, কুবা বুঢ়া, হ্যালোহ্যাচে বুঢ়া—এই সব ভূশন্ডিরাও ষোলোআনায় উপস্থিত থাকবে কেবল ‘সাতেও হঁ, পাঁচেও হঁ’ দিতে।

ঘটনাটি যথেষ্ট উদবেগের। তবু গ্রামে যেন পালা-পার্বণ লেগেছে এমনি ফুর্তালা ভাব। অল্প বয়সিদের উৎসাহ সেরকমই। মাথায় ঝাঁকড়া চুল, গায়ে ঘিয়া পাঞ্জাবি বিহারীলালকে দেখে মনে হচ্ছে সে বুঝি মাদৈল পিটতেই আসরে নামছে। তেমনি পান চিবাচ্ছে জাবর কাটার ভঙ্গিতে। তার সঙ ধরে এল বলরাম বাউরি, কৈলাশ ধীবর, সঁড়ু মাহাত।

সঁড়ুর নাকে মটা সুঁতা বাঁধা ‘কুয়াশা চশমা’। একদিকের ‘জানলা’য় কাঁচ নেই। সব খবর আগেই নিয়েছে। তবু ল্যাকা চৈতন সাজে। আগুয়ানকে জিগ্যেস করে, ‘কী ব্যাপার আগুখুড়া? সবাইকে হৈরবোল মেলায় ডাকলে?’

আগুয়ান জবাব দেয় না। বিহারীলাল বলে, ‘তুমি কী ভাবছো... খেঁচড়ি ঘাঁটা পর্শিবেক?’

‘নাআ স্যা ভাবি নাই। তবে জড়ুর ক-ন হবিদবি কান্ড।’

‘হঁ। হবিদবি কান্ড।’ বাঁকুরাম তার মুখের শব্দটি প্রায় কেড়ে নেয়। ভিড়ে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করে, ‘পহিলে সবাই ই-কথা স্বীকার কর— আমাদের সবার ঘরেই দুটি-একটি করে বিটিছ্যেলা আছে কি নাই? তুমার ঘরে না থাক, আমার ঘরে আছে? আমার ঘরে না থাক হাও উয়ার ঘরে আছে? আছে কি নাই? হঁ স্বীকার করো।’

বুঢ়া-ছঁড়া সবাই একসুরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘হঁঅঅঅঅঅ!’

‘বাআআআস! ইবার আর কিছু শুনবার নাই—জানবার নাই— বলবার নাই। কিন্তুক তার বাদেও আমার বলার বক্তব্য হৈল—কাল সৈনঝার ল্যা আমাদের গাঁয়ের একটি বিটিছ্যেলা লিখোঁজ হঁয়ে গেছে। আজ এই সকাল তক্কও ঘরে আসে নাই।’

‘কার বিটি? কার ঘরের?’ সঁড়ু ভিড়ের মধ্যে থেকে প্রশ্ন করে।

‘আগুয়ান খুড়ার।’

‘অ, জারমণি?’

‘জারমণি।’ বাঁকুরাম তার মতো করে বুঝিয়ে বলে, এই জারমণিকে এখন কেবল আগুয়ানের বিটি হিসেবে দেখলে হবে না। তাকে দেখতে হবে পলপলের বিটিছ্যেলা হিসেবে। আর বিটিছ্যেলাই হল ‘ঘরের শভা, গ্যারামের ইজ্জত’। গ্রামের সম্মান বাঁচাতে হলে জারমণিকে সসম্মানে ফের এই গ্রামে ফিরিয়ে আনতে হবে। তার কোনোরকম হানি বরদাস্ত করা হবে না। যদিও সে স্বীকার করে নেয়, এই মেয়েছেলেটির লাপাত্তা হওয়ার কারণ তাদের অজানা। তার জন্যই গ্রামের সবাইকে এখন আগুয়ানখুড়ার পাশে দাঁড়াতে হবে। দরকার হলে অন্যান্য গ্রামে যারা সিংসর্দার আছে, তাদের কাছেও এই বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। তাদেরও আসতে হবে ভূমিজদের ইজ্জত রক্ষার্থে।

‘ডেরি করাই চলবেক নাই।’ বাঁকুরাম বলল, ‘আজের ল্যা, এই বেলাডুবু ল্যা, এই এখন ল্যা-ই, যে-যেখিনে পার সিয়াইডিগিরি চলাও। ভিৎরে ভিৎরে খোঁজ-খোবোর লাও। কাকৌ জানতে দিঅ না। যাহ সবাই’—

শুরু হয়ে গেল সিআইডিগিরি। এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি। খোঁজ-খবর নেওয়া। হাটে-বাটে, দোকানে দু-একলোক করে ছড়িয়ে গেল পলপলের গ্রামবাসীরা। জায়গায় জায়গায় ‘ইনিসপ্যাকটার’ আলহাখ্যাপা সেজে ঘুরতে লাগল। একদিকে নয়, তারা ছড়িয়ে গেল বিভিন্ন দিকে। বিশেষ করে, সেই সব রাস্তা বরাবর যে-রাস্তাগুলি চলে গেছে ঝাড়খন্ড বিহারের দিকে, পুরুইলার দিকে। এদিকগুলো নজরদারি করার কারণও আছে।

আজ ভোর-ভোর চিটিডি থেকে পলপলে ফিরে আসার পর, আগুয়ান, জারমণির ‘সখি’দের ঘরে ঘরে গেছে। জারমণির নিখোঁজ হওয়ার খবরটি তাদের জানিয়ে দিয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে জানতে চেয়েছে কোথায় কোথায় যেতে পারে সে? কার সঙ্গে তার ‘ভিৎরি সম্পর্ক’ ছিল? এভাবে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা জারমণি কি আগে থেকেই করে রেখেছিল? এই নিয়ে তাদের কাছে কোনো কথা সে প্রকাশ করেছে কি না ইত্যাদি।

প্রথমে তারা কেউ কিছু জানাতে চায়নি। ভয়ে। জানালে যদি তাদেরই দায়ী করা হয়। যদি বলা হয় যে, সবকিছু আগে থেকে জেনেও কেন এইসব কথা তারা আগুয়ানের ঘরে জানিয়ে দেয়নি। তাই সব কথাতেই তারা বলেছে ‘জানি নাই’। শেষে যখন তাদের অভয় দেওয়া হয়েছে, এই বলে যে, যদি তারা সত্যিই কিছু জানে, তাহলে সেটা এখন জানিয়ে দিলে তাদেরকে কিছু বলা হবে না। কাজটা তো আর তারা করেনি। যদি প্রেমঘটিত কোনো কান্ডে জড়িত হওয়ার ব্যাপার থেকে থাকে, সেটা তো জারমণিরই ব্যাপার। এরজন্য যদি শাস্তি দিতে হয় তো জারমণিকেই দেওয়া হবে। অন্য কাউকে নয়। সত্যিই কি তেমন কিছু ঘটেছিল? কোনো ছ্যেলাছকরার সঙ্গে তার কি ভাবভালোবাসা হয়েছিল?

পম্পি মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছে। ভানি কিন্তু সম্পূর্ণ খুলে না বললেও আভাস দিয়েছে। বলেছে, ‘একটা ব্যাটাছ্যেলাকে একদিন উয়ার সঙে গল্ফ করতে দেখেছি।’

‘কবকে?’

ভানি বানিয়ে বানিয়ে বলে, ‘কাল ন পরশু কবকে কে জানে।’

‘কথায় গল্ফ করতে ছিল?’

‘বনে। কাঠ কুড়াতে কুড়াতে।’

‘কেমন দেখতে ছকরাটা? কন গাঁয়ের?’

‘কন গাঁয়ের হামি কী করে জানব? ঢাঙা পারা। হাতে ‘লাঠা-কাঁইড়া’ ছিল। পাইখ মারতে আইসেছিল।’

‘পাইখ মারতে? গায়ের রং ভুচভুইচ্চা কাল?’

‘হঁ। একবারকেই কাল।’

আগুয়ান ছাড়াও তার সঙ্গে ছিল বিহারী। পাখি শিকার করতে বনে বনে ঘুরে বেড়ায়, গায়ের রং ঘন কালো—এসব শুনে তারা ধরে ফেলে ছোকরাটি শবর। আরো নিশ্চিত হয়ে যায়, যখন সে বলে, ‘উয়ার হাতে লাঠা-কাঁইড়া ছিল’। এভাবে আদিম শিকার পদ্ধতিতে এখনো শবররা ছাড়া আর কেউ পাখি শিকার করে না। তার মানে, তারা নিশ্চয় বনের আশপাশের কোনো গ্রামের। আশপাশে কোন কোন গ্রাম আছে, যে-গ্রামগুলোতে শবরদের বাস?

ডুংরি-ডহর-জঙ্গল ঘিরে গ্রাম তো অনেক। মুষয়াটাঁড়, কনারবেড়া, কালিপুর, ওদিকে রুগড়ি, কদমপুর। ভালডুংরি আর চোরনাচা-ডুংরির ওপারটাও যদি ধরা হয়, তাহলে আছে তিলাইটাঁড়। তারও বাঁয়ে-ডাঁয়ে গোয়ালিকচা, ঝাঁপা, হারাদা, নুন্যদ, তানাসি। অতদূর থেকে কি কেউ এই বনে আসবে? তা ছাড়া সব গ্রামে তো আর খাইড়া-শবর থাকে না। যেমন তিলাইটাঁড়ে একঘর বাদে সবাই সাঁওতাল। কনারবেড়ায় আছে মুদি। কালপুরেও সাঁওতাল। গেয়ালিকচায় মেশামেশি। সাঁওতাল, ঘাটুয়াল বা ভুঁইয়াদের বসবাস ওই গ্রামে। তার মধ্যেও কে বলতে পারে, হয়তো পাহাড়কচায়, ডুংরিকোলে কোনো খাইড়াঘর আছে, যা চোখে পড়েনি। কাজেই খুব বাছাবাছি যাবে না। মোটামুটিভাবে মুদি-মাহাত-কুমার গ্রাম বাদ দিয়ে বাকি সব গ্রামেই নজর রাখতে হবে। আর বিশেষ করে নজর রাখতে হবে—বনের পাখিশিকারিদের।

তবে এই ঘটনা ঘটে যাবার পর, সেই পাইখমারা কি আর বনে আসবে? পাইখ তো সে মেরেই ফেলেছে? তবু যে-যেখানে পারল খোঁজ চালিয়ে যেতে লাগল। যারা কাজের মানুষ, যারা হাটুরে, যারা মাটি চলাচালি করছে, খেতে ভরিত দিচ্ছে, যারা হাল-বলদ নিয়ে খেতকে যাচ্ছে, তারা কাজের ফাঁকে ফাঁকে ‘নিসপ্যাকটারগিরি’ চালাতে লাগল। বাদ বাকিরা ছড়িয়ে পড়ল হাটে-বাটে। তারপরও, যারা বারগাঁয়ে ঘুরে ঘুরে সাইকেল ঠেলে কার-ফিতা-চুড়ি-আংটি, চিড়া-আইসক্রিম ফেরি করে তাদেরও বলে রাখা হয়েছে—দেখবিস ভাইরে টুকু, অমুক গাঁয়ের অমুক বিটিছ্যেলাকে নিয়ে এমনি একটা চোদ্দচুয়াড়ি ঘটে গেছে। ‘ভাঁউরি’ দকানদার, গামছাবিকা জলহা এবং যারা ঘরের বাতায় গুঁজে রাখা মেয়েদের চুলের নুড়ির বদলে বাচ্চার হাতে লজেন্স দেয় তাদের কানেও ফেলা আছে। মানে ক-ন কিছুই বাদ নাই। একবারকেই যাকে বলে ‘ছপলা-ছপলি’কান্ড!

আর আগুয়ানখুড়ার ব্যাপার। আসরের মূলখেড়ি। তার কথায় আসৈরা লোকজন—ছকরাপাটি যারা আছে, তাদের যদি বলা হয়— খাপ্তাভাঙায় গা-টা নুচে-খোঁকৈরে রকৎ বার করে লে, ত তাও তারা করবে। এইসব ‘ডিবটি ওপিসাররা’ রোডে-রোডে ডিবটি করছে।

আড়ষা রোডে জীবনডির মোড়ের দিকে কোনো ‘নাঢ়াবুঢ়া’ যাচ্ছে, পেটে ছাগল-ছা চিপে নিয়ে, তাকে টেকাল। লছনা করে বলল, ‘কি ব, হাটকে লেগছো নকি? বিকবে?’

‘নাআআ ত। হামার এক মাসির ব্যাটার পিসার বড় কুটুমের বউ পুয়াতি আছে। এই আজকালের ভিৎরে খালাস হবেক। ত, তার ওষোধপাতির বহুত খরচা আছে ন? তার হতেই হামাকে গুলিনে বলল, পাঁঠিছা বঠে। লিবে ত লাও। যা মন যায় দিবে। ত হামি দু-কুড়ি দশটাকা হাঁতে দিয়ে এই জীবনটাকে নিয়ে আলি।’

‘ভালোই বঠে। বছরদিন রাখলেই ঢাইড় হবেক।’

‘হঁ, স্যা-বা হবেক।’

‘ত গেছলে কথায়? কন গাঁয়ে?’

‘আমি গেছলি তুমার—আড়ষা মোড়ের ল্যা হাওধারে যে সড়পটা চলে গেছে’, লোকটি পিছন ফিরে হাত দিয়ে দেখায়, ‘উখেনে একটা ছুটুমুটু ডি আছে—’

‘খাইড়ারাও থাকে?’

‘না:, উখেনে খাইড়া কথা পাবে? বরুং খাইড়া আছে তুমার এই ধারে—’ লোকটি ডানপাশে হাত ঘুরিয়ে দেখায়, ‘এই মানকিয়ারি হঁয়ে বড়াম যাতে। আর ওই ডুংরি ধারেও আছে। ভাল-ডুংরির অপারে।’

‘তুমি কন গাঁয়ে থাক? বড়ামে?’

‘নাই। দেলঘাটায় থাকি। বড়াম পাইরায়।’

‘আচ্ছাআ খুড়া—তুমি ক-ন খোবোর ইয়ার-উয়ার মুহে শুনলে? এই হালে হালে—’

‘কী খোবোর?’

‘পলপলের একটা বিটিছ্যেলাকে নকি খাইড়ারা ধরে নিয়ে গেছে। কনগাঁয়ের খাইড়া স্যাটা বাছনিক করে কেউ বলছে?’

‘বিটিছানা? ভাগায় নিয়ে গেছে খাইড়ারা?’ বুঢ়ালোকটি চিন্তিত হয়ে বলে, ‘এমন ত শুনি নাই। আমিও গাঁয়ে ক-দিন ছিলি নাই, লাতির ভুজনা খাতে গেছলি। থাকলে জানতে পারতি। বিটিছ্যেলার ঘটনা যখন। ই-খোবোর চিপা-জাঁকা ত থাকবেক নাই বাবু। ছপলে উঠবেক।’

সত্যিই ‘ছপলে’ উঠল। যেভাবে বাঁধের জল থেকে হঠাৎ ‘উফাল’ মারে শোল মাছ, সেভাবেই দু-একদিন বাদে ছপলে উঠল গোপন খবরটি— কোন গ্রামের লোক ধরে নিয়ে গেছে জারমণিকে। কোথায় কার ঘরে তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। আর এই খবরটি দিল গুজর মুদি। সে ‘ভাঁউরি দকান’ নিয়ে গাঁয়ে-গাঁয়ে ঘুরে বুলে। বিশেষ করে ঘোরে জঙ্গলে, পাহাড়কচায় আদিবাসী গ্রামগুলিতে। এইসব গ্রামের সঙ্গে দোকান-বাজারের তেমন যোগ থাকে না বলে, সে তার মাথায় বিশাল একটা বাঁশের ঝুড়িতে নুন-তেল-মশলা হেরিফেরি নিয়ে ঢোকে। আদিবাসীরা সাধারণত চালচিঁড়ার বিনিময়ে তার কাছ থেকে এই ‘হাটমশলা’ নেয়। দিনের শেষে, গুজর, তার গাঁটবাঁধা চাল জীবনডিতে এনে, ঘরে খাবার চালটা রেখে বাকিটা বিকে দেয়। ‘বোল-বোম’-এর দোকানে। বোল-বোমের কাছ থেকে সে চালের দরুন কিছু নগদ টাকা নেয়, মশলাপাতিও কেনে। পরের দিনের জন্য।

সদরের ফড়কিটি কোনো কারণে খোলাই ছিল। আগেও সে-রকমই থাকত। গুজর তার অভ্যেস মতো, ফড়কি ঠেলে, আঙিনায় ঢোকে। মাথার ভাঁউরি পায়ের কাছে নামিয়ে সে বসে। আর যেই ডাক দিতে যাবে, ‘কই গো, লিবি নকি কিছু’, অমনি মুখ তুলে তাকাতেই, তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায় জারমণির। ভূমিজ বিটিছ্যেলা। দেখেই বোঝা যায়। তাকে কেমন চেনা-চেনাও লাগে। গুজর বলে, ‘তুঁই ইখিনে যে গো?’

জারমণি মুখ আড়াল করে। কোনো জবাব না দিয়ে, শাড়িতে হদহদ শব্দ করে সটসটাঁয় এক ছুটে দাওয়ায় উঠে যায়। ঢুকে পড়ে তার নির্দিষ্ট শস্যঘরটিতে।

বেরিয়ে আসে পাটন। গুজরকে দেখে সে রেগে যায়। বলে, ‘কপাট খুলা ছিল? ফড়কিটা?’

গুজব অবাক হয়। হাসিমুখেই বলে, ‘হ্যাঁ বাপ, সদরের কপাট আর কবে বন্ধ থাকে? ইটা গাঁ বঠে, বাজার-শহর ত লয়—চোর-ছিনারের ভয়ে লোকে দিনেরাতে হুড়কা দিঁয়ে ঘর-ভিৎরে থাকবেক।’

‘কে তকে ডাইকেছে? নাই লিবেক কিছু, যা:।’

‘না লিবি ত না লে।’

গুজব আর কথা বাড়ায় না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সে তার হাটমশলার ভাঁউরি মাথায় তুলে নেয়। তালতলের পাশ দিয়ে বেরিয়ে আবার জঙ্গলে ঢুকে যায়। কুকুরটিও আসে পিছনে।

জীবনডির মোড়ে দেখা হয়ে গেল পলপলের কৈলাশ ধীবরের সঙ্গে। ‘ইনিসপ্যাকটার’। গরম চা বেঞ্চিয়ে রেখে ঠাটসে ‘চহন্দা জাল’ বুনেই যাচ্ছিল। গুজর হাতের ইশারায় তাকে দোকান থেকে রাস্তার ধারে ডাকে। ‘ভাঁউরি’র তলে মাথা ঢোকালে, গুজর ফিসফিস করে বলে, ‘মিলেছে।’

‘কী?’

‘ওইটির খোবোর’

খবর শুনে কৈলাশ ধীবর চনমনে হয়ে ওঠে। তেমনি গরম চা। লম্বা লম্বা ফুঁক দিয়েও সে খেতে পারে না। ছেঁকা লাগে। চায়ের জ্বলন নিয়ে দোকানিকে বলে, ‘আচ্ছা রাঁঢ়ী চা বনাছো। দু-এক মুঠা চিনি দিবে, দুধ দিবে, আদা-গোলমরিচ ছেঁচে ঢুকান দিবে, স্যা নাই। পঁন্দপুড়া গরম!’

ফতুয়ার পকেট থেকে একটা আধুলি সে, রাসমেলায় বাঁশের রিং ছোঁড়ার মতো, ছুঁড়ে দেয় ভিয়েনের বেদিতে। আর পুরুইলা এসপেরেস-এর পারা ঝাঁ করে বেরিয়ে যায় ঝাঁপের তল থেকে। আড়ষা রোড ধরে সিধধা পলপল। ভায়া ‘শহর মহুল’।

গোধূলি লগন। পশ্চিমের আকাশ যেন মাথার ওপরে হেলে পড়া রাজার ছাতার মতো। কী তার অলৌকিক বাহার। রকমারি রঙের মিশ্রণ যেন কেউ কলসি কলসি ঢেলে দিচ্ছে। মন্থর গতিতে গড়িয়ে যাচ্ছে দিগন্ত জুড়ে। তারই নৈসর্গিক বর্ণাভা এখন চরাচর ব্যাপী।

ক্যানেলপারে দাঁড়ালে দেখা যায়, পাহাড়-ডুংরি ঝলমল করছে। রঙে রঙে একাকার। পুবের জঙ্গলে বুড়ো গাছের পাতায় পাতায় তার বিচ্ছুরণ। তেমনি সুষম পোঁচ পড়েছে জিনগা-থানে। ওই ডুংরির উত্তুঙ্গ শিখরে যেন কোনো বিকটাকার শীতলাগ্নির মনোরম শিখা উঠছে। ডানায় ডানায় রং নিয়ে কুলায় ফিরছে কত বিচিত্র নামের পাখির দল। ঝুরাবোনি, রামবোনি, ঢেবচু, ভেলাদাগী। পেছু ধরে আসছে খৈড়কাবোনির ঝাঁক। অনেক উপরে চক্কর খেয়ে ‘টিটরিঙ্গ! টিটরিঙ্গ!’ ডাকছে টিটরিঙ্গা। না, মানুষেরই কোথাও কোনো কন্ঠস্বর নেই এখানে।

তবু মানুষ তো আছেই। এমন রঙের মহিমায় বিহ্বল হয়ে তারও একবার এই জনহীন জঙ্গলের মাঝারে দাঁড়িয়ে উদ্বাহু হবার বাসনা জাগে না? আবেগে চৌচির হয়ে ইচ্ছে হয় না, সবকিছু ভাঙি? ঘর ভাঙি, চাল ভাঙি, প্রাচীর ভাঙি, এমনকী সমাজ-সংসার নামের একটি আদিমকূপকেও ধ্বস্ত করে দিই? যা এই উদার প্রকৃতিকে আড়াল করে রেখেছে, বিতত বিতংসে বদ্ধ করেছে মানুষের মন—সেই সব আড়াল আর প্রতিরোধ ধূল্যবলুন্ঠিত করে ফেলি?

এই মুহূর্তে, জারমণির কি সেটা মনে হয়? নাকি মনে হয় পাটনের?

ধনুকটি বড়ো অবহেলায় পড়ে আছে। এখন আর তা পাটনের হাতে নেই। পড়ে থাকে আঁধার ঘরে, খাটের তলায়। কোনো থাপুথুপু শিশু সেটা নিয়ে ঘরময় ঘষটে বেড়ায়। খেলা করে। পাটনের সেদিকে নজর কই? তিরের গোছাটিও সে গুঁজে দিয়েছে চালে। ষাড়কা ইঁদুর এসে এসে গন্ধ শোঁকে। খড়খড় শব্দে চাল থেকে চালে দাপিয়ে বেড়ায়, মাটিতে নামে না। ঘুরে-ফিরে ওই শস্যঘরটিতে তাদের যত ডেরা।

মাথা তুলে চালের দিকে তাকালে, দেখা যায়, জায়গায় জায়গায় ঝুলছে তাড়িবাঁধা ভুট্টা। নির্জন ঘরে, কখনো, ইঁদুর তার গায়ে লেপটে দোলনার মতো দোল খেয়ে যায়। ভুট্টাও খায়। জারমণি এখন আর ভয় পায় না। এই ক-টি দিনে সে অনেক কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। চিনতে পেরেছে পাটনকেও। কিন্তু নিজেকে সে চেনা দেয়নি।

পাটন, সে-পাটন আর নেই। যেদিন থেকে সে হাতের অস্ত্র নামিয়ে রেখেছে, সেদিন থেকে পালটে গেছে তার মুখ-চোখের অভিব্যক্তিও। এখন তা অনেক গভীর ও ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন হয়েছে। এখন সে জারমণির দিকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে তো থাকেই না, এমনকী তীর্যক দৃষ্টিতেও তাকায় না তার দিকে। সে এখন প্রত্যক্ষ সংযোগে, দু-দন্ড অটল তাকিয়ে থাকতে চায় তার চোখের দিকে। জারমণির চোখে চোখ রেখে, হয়তো সে বলতে চায় তার না-বলা কথা। কী সেই কথা?

তবে সত্যিই কি পাটন হাতের অস্ত্র নামিয়ে রেখেছে? নাকি কদলীপত্রের ন্যায় কম্পমান শরদ্বানের১০ হাত থেকে যেভাবে ধনুর্বাণ ভূতলে পড়ে গিয়েছিল, সেই একই কারণে, মুষ্টিচ্যুত হয়ে গেল পাটনের তিরটিও। যদিও, এখনো সে জারমণির দৌবারিক। তবে নিরস্ত্র। হয়তো সে বুঝেছে, নারী নিজে মহাস্ত্র। প্রদীপের শিখায় চাঁদকে আগলে রাখার মতো, অপরাপর সমস্ত অস্ত্রই তার কাছে তাৎপর্যহীন, অবাঞ্ছিত। বরঞ্চ সেই মহাস্ত্রের কাছে যদি নিজেকে সে সমর্পণ করতে পারত! যদি সে বলতে পারত, আমি দ্বারী হতে চাই না। আমি অস্ত্র ধরতে চাই না। যে-হাত অস্ত্র ধারণ করে, আমি সেই হাতে ধারণ করতে চাই চাঁদ। চন্দ্রকলা। আমি চাঁদের দিকে তাকিয়ে প্লাবিত হতে চাই, আকাশের দিকে তাকিয়ে পরিব্যপ্ত হতে চাই, অরণ্যের দিকে তাকিয়ে দুর্গম। আমি অগ্নির কাছে প্রবল, বায়ুর কাছে তুরগ হতে চাই। কিন্তু তোমার কাছে? তোমার কাছে আমি কীট হতে চাই। চাম উকুন হয়ে কারণ হতে চাই তোমার অবিরাম কন্ডূয়ণের। গাত্রদাহের। এই কি তার অব্যক্ত কথা? অহো পাটন!

জঙ্গল জুড়ে গোধূলির অমল আলো! তার আভায়, ঘরটি কেমন নিঝুম, প্রশান্ত ও রহস্যময় হয়ে রয়েছে। কুকুরটিও এখন আর থেকে থেকে ডেকে ওঠে না। তালতলের পাশ দিয়ে লোক যেতে দেখলে পেছু ধরে। গভীর জঙ্গলের দিকে অনেক দূর চলে যায়। আবার ফিরে আসে একা একা। হয়তো সেও টের পাচ্ছে নি:সঙ্গ জীবনের পীড়ন। অস্থিরতা। হয়তো তাই, হঠাৎ কখনো, রাত গভীর হলে আকাশের গায়ে শকটসদৃশ চলমান মেঘগুলির পানে চেয়ে মানুষের মতো ডুকুরে কেঁদে চলে।

জারমণি এখন আর কাঁদে না। কাঁদবেও না আর। সে নিজের কাছে নিজে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে—যতদিন না সে এই অন্ধকূপ থেকে অনির্বাণ দিব্যালোকে দাঁড়াচ্ছে, ততদিন অশ্রুর একটি ফোঁটাও সে গন্ডূষ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে দেবে না ধরাতলে। বস্তুত, যেদিন তা সম্ভব হয়ে উঠবে সেদিন সেই অশ্রুই হবে তার মুক্তিপণ। আনন্দাশ্রু!

পাটনও তাকে কাঁদতে নিষেধ করেছে। নারীর কান্না শোভা পায় না। শোকের আবহ রচনা করে। সে শোক করবে কেন? যে-নারী পুরুষের আকাঙ্ক্ষিতা, তার আবার শোক কী? যদিও প্রথম-প্রথম এমনটি সে বলেনি। তার সুর ছিল অন্যরকম। ধমক ছিল, শাসানি ছিল। হাতের অস্ত্র দেখিয়ে পরুষ কন্ঠে বলেছিল, ‘ফের যদি চেঁচাস, যদি কাঁদিস, তাইলে—হাই দেখছিস? খতমেই করে দিব! চুপ দিঁয়ে থাক, সুগুম!’

পাটনের সেই দৃপ্ত কন্ঠস্বর আর শোনা যায়নি। যাবেও না। তার হাতের অস্ত্রটিও উধাও হয়ে গেছে কবেই। জারমণি এটাকে তার জয় মনে করেনি। মনে করেনি বলে, পাটনের একটি কথারও সে জবাব দেয়নি সেদিন।...

সেদিন বড়ো অস্থির অস্থির লাগছিল পাটনাকে। নিঝুম দুপুর। সে ঘর-বার করছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে, ত্বরিতগতিতে, চারপাশের ঝুড়জঙ্গল দেখে নিচ্ছিল। অনেক দূর পর্যন্ত দেখছিল সেইসব রাস্তাগুলোও, যেগুলো দিয়ে ঘরের অভিমুখে আসা যায় জঙ্গলে-জঙ্গলে। ডেলিকচা হয়ে বড়াম পেরিয়ে চলে যাওয়া যায় নদীপারে। উঠোনে বসে, পাটন, আনমনে নাড়াচাড়া করছিল বাঁশের ‘দোহাড়ি’টি। নদীতে জল বাড়লে, অনেক বর্ষার রাতে খালি গায়ে মাথায় ঘঙ-এর ছাতা নিয়ে এই পাটনই নদীর বুকে দোহাড়ি পেতে আসে। ভোর-ভোর যায় মাছসুদ্ধু খাঁচাটিকে তুলে আনতে। মাছের বদলে কতবার যে সেই দোহাড়ির ভেতরে, ঘাপটি মেরে বসেছিল সাপ! যে-সাপ পোষ মানে না, দংশনপ্রয়াসী। আঙিনায় পড়ে থাকা দোহাড়িটিকে দেখে তার কেন যে মনে পড়ে গেল সে-কথা! আর মানুষের প্রবৃত্তিও তেমনি। যা পোষ মানে না তার দিকেই হাত বাড়াতে চায়। সরীসৃপের জন্য খুপড়ি বানায়।

সাধারণত দুপুরের দিকে, এসময়, কেউ ঘরে থাকে না। বুড়োবুড়িরা ঘুমোয়। শিশুদের কোলে-কাঁখে নিয়ে বউরা জঙ্গলে বেশিরভাগ সময় পাত ‘টুঙে’ বেড়ায়। শালপাতা, পলাশপাতা ঘরে বসে বসে বাঁশের সরু কুঁচিখাড়ি দিয়ে সেলাই করে। সেইসব ‘সিয়াপাত’ আর ‘দনা’ বেচতে যায় জীবনডির মোড়। চা-পকড়ির দোকানগুলিতে।

দোহাড়িটি হাতে নিয়ে দাওয়ায় উঠে আসে পাটন। কয়েকটা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে, আলগা ও ভাঙা জায়গাগুলো সে নতুন করে মেরামত করতে বসে। হাঁটুর ওপরে লুঙ্গি টেনে। খালি গা। শ্মশ্রুহীন মুখ। হঠাৎ সবকিছু ফেলে রেখে সটান উঠেও পড়ে। জারমণির ঘরের শিকলটি নামিয়ে, ভেতরের ছিটকিনিটি সে নিজে আঙুল ঢুকিয়ে খোলে না। অপেক্ষায় থাকে। আকাঙ্ক্ষা মিশ্রিত গলায় নম্রসুরে ডাক দেয়, ‘জারমণি!’

দরজা খোলাই ছিল। ছিটকিনি চাপায়নি। দু-হাতে দুটোপাল্লা ধরে হাট করে খুলে, জারমণি কঠিন চোখ করে তার দিকে তাকায়। নির্বাক। দৃষ্টিই তার ভাষা।

পাটন কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। কেমন অগোছাল হয়ে যায় তার ভাবনা।। বলে, ‘হামি বঠি, হামি।’ তারপর, দাওয়ায় ফেলে রাখা দোহাড়িটি থুতনির ইঙ্গিতে দেখিয়ে বলে, ‘ইবার লদীয়ে জল বাঢ়বেক। তখনকে দোহাড়িটা ত লাগবেকেই? তার হতেই ইয়াকে অ্যাল্প মেরামত করতে বসেছিলি।’

জারমণি কিছু বলে না। দোহাড়িও দেখে না। শুধু নিরত্যয় চেয়ে থাকে পাটনের মুখের দিকে। চোখে চোখ লাগতেই, পাটনের ক্রমশ ঘোর আসে। কন্ঠস্বর কর্কশ ও অস্পষ্ট হয়ে যায়। মনে পড়ে যায় আগের রাত্রের সেই ঘটনাটি। সেই মায়াবি জারমণিই তো দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সামনে? এই সেই দিব্যাঙ্গনা? শ্রোণীভারা? এই সেই অবিদ্যা? জারমণির এই মুহূর্তের সমস্ত শরীর নিয়ে দন্ডায়মান মুদ্রাটি পাটনের সব ইন্দ্রিয়গুলিকে শানিয়ে দেয়। অভিষঙ্গ জাগে। তার ইচ্ছে হয়, যে-জারমণিকে দেখা তার অসম্পূর্ণ থেকে গেছে সেদিন রাত্রে—ঐন্দ্রজালিক চাঁদের খন্ডিত আলোয়—আজ এই নিরল দ্বিপ্রহরে যদি তাকে সম্পূর্ণ করে দেখা যেত? আহা! যদি একবার! যদি একবার! যদি একবার, সে এই নির্জন চৌকাঠে দাঁড়িয়ে, পরনের বস্ত্র দু-হাতে উত্তোলন করে দেখিয়ে দিত তার সেই অনালোকিত স্ত্রীচিহ্নটি?

ফণা তোলা খরিশের মতো চকচক করে জারমণির চোখ। ক্রোধে, তাচ্ছিল্যে, অবজ্ঞায়। পাটন তৎক্ষণাৎ সংকুচিত হয়ে যায়। এদিক-ওদিক তাকায়। কিছু একটা সে বলতে গিয়ে অন্য কথা বলে ফেলে। শস্যঘরটির চালের লরায় ঝুলতে থাকা ভুট্টাগুলি দেখে বলে, ‘ঘরটায় দমে ইঁদুর! গটারাত উৎপাত করে? ঘুমাতে দেই নাই?’

জারমণি তখনো নির্বাক।

‘সবসময় ঘরটার ভিৎরে ঢুকে থাকতে কারো ভাল লাগে? মনে গেলে টুকু আঙনাটায় খাটটা টাইনে বসবি। ইয়ার-উয়ার সঙে গল্ফ করবি দুটা। সদরের ফড়কিটা ত বন্ধই থাকে।’

কোনো প্রতিক্রিয়া নেই জারমণির। পাটন তবু বলে যায়, ‘আর হামি ত আছিই? তুঁই থাকতে হামি কত্থাও যাব নাই এখন।’

জারমণি খিল দেয় কপাটে। কাপুরুষ!

তখনো সূর্য পুরোপুরি ঢলে পড়েনি। কার্তিকের ‘কাড়াখুঁটায়’ যেভাবে মাটির নীচে ক্রমশ নামতে থাকে ‘মালখাম’, অবিকল তেমনি, ঝাঁকুনি খেতে খেতে, পাটে নামছে ত্বিষাম্পতি। দিনান্তে সূর্যের অধোগমন। আকাশ জুড়ে রঙের মাতন যেন তারই বিদায়োৎসব! মহোল্লাস!

সেই উল্লাসের অংশীদার হতে, পাটন প্রায় ছুটতে ছুটতে ঘরের বাইরে চলে আসে। সঙ্গে হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে জারমণিকেও। অভাবিত! যা সে স্বপ্নেও ভাবেনি, কল্পনা করেনি। তা-ই করতে সমর্থ হয়েছে সে। এতদিনের পুঞ্জীভূত আকাঙ্ক্ষা, অবদমিত অভিলাষ আজ কি তবে তার পূরণ হতে চলেছে? এক-বন্দিনীর দ্বারী হয়ে, দৌবারিক হয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হয়েছে, জারমণি নয়, প্রকৃত বন্দি তো সে নিজে। সেও অন্তরীণ। আর এই অন্তরীণ দশায় যাবতীয় প্রতিকূলতার কাছে তার বন্দিত্ব অসহায়ভাবে, অনন্যোপায় হয়ে অবাঙমস্তকে স্বীকার করে নিতে হয়েছে। কেন সে এমন বন্দি হয়ে থাকবে? কেন তাকে অহরহ ক্রীতদাসের মতো হস্তে ধারণ করতে হবে হাতিয়ার? মেঘে-বাদলে, রৌদ্র-জ্যোৎস্নায় আকাশ যেভাবে নিজের কথা আদিগন্ত ছড়িয়ে বলে, সে কেন তেমনিভাবে বলতে পারবে না তার অন্তরের কথা? তার আকাঙ্ক্ষা আর গূঢ়তম অভীপ্সার কথা? কেন তাকে পদে পদে সংযমের দাসত্ব পালন করে যেতে হবে? ভীরুতায় কাতর হয়ে থাকতে হবে? সে তার পান্ডুর হাতের ওপরে আসমানের চাঁদ চায়। কেন সে বন্দিনীর কাছে বাহু প্রসারিত করে তা ব্যক্ত করতে পারবে না? কেন বন্ধ দরজায় সদম্ভ পদাঘাত করে চিরতরে মুক্ত করতে পারবে না তাকে? কেন সে তার কটিবন্ধন আকর্ষণপূর্বক ঊরুপ্রদেশে হাত রেখে বীরোচিত ভঙ্গিতে বলতে পারবে না, ‘খবরদার! এই ভূমির অধিকার প্রকৃত পুঙ্গবের। আমি পুরুষ। ধরিত্রীতে আমিই লাঙলধারী—এর মালিকানা কেবল আমারই!’

এতদিনে তার অন্তরের একটি সত্যভাষণও সে প্রকাশ করতে পারেনি। সে কিছুই বলতে পারেনি। কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু আজ? যাবতীয় মিথ্যে ছদ্ম আয়োজনকে সে তছনছ করে দিয়েছে। আর এই মুক্ত মনোরম দিব্যালোকে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাকে। চাঁদ নয়, বরং সে অতিপ্রতুল চাঁদ। ধরণী চৌচির করে প্রস্ফুটিত হওয়া সে যে তার নীলাব্জ! হা:! হা:! হা:!

গোধূলির অপার্থিব আলোর বিচ্ছুরণে তামাম জঙ্গল হাসছে। হাসছে গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে দৃশ্য আকাশ। মগডালের পাতায় পাতায় ঝিলিক উঠছে। হাসছে জারমণিও! টিকরি থেকে খসে পড়া সুতোর মতো এই প্রথম হাসি ফোটে তার অচুম্বনচর্চিত ঠোঁটে।

তাৎপর্যময় সে-হাসি ধরতে পারে না পাটন। জঙ্গল জুড়ে শত-সহস্র পাখির কলরব। আবেগে আনন্দে পাটন দিশেহারা হয়ে যায়। ভুলেই যায় সে আদতে দ্বারী। বহি:শত্রুর আচম্বিত আক্রমণ তাকেই প্রতিহত করতে হবে। কোথায় তার সেই হাতিয়ার? কোথায় ধনু? কোথায় তূণ? পাটন জানেই না।

ঠিকরে পড়া গোধূলির প্রসারিত আলোয়, জারমণির মুখমন্ডলের দিকে চেয়ে, তার বিভ্রম হয়। মনে হয়, এই হাসিটুকুই বস্তুত জগতে সত্য। বাকি আর কিছু সত্য নয়। আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই। সকলই নির্বস্তুক। কোথাও কোনো ধনু নেই, তূণ নেই। শত্রু ও প্রতিস্পর্ধী নেই কোথাও। কে কার শত্রু? নিজেকে তার মুক্ত ও আনন্দময় মনে হয়। নির্ভার লাগে। আর এই মুক্তি উপভোগ করতে, সে আবেগ-বিহ্বল উন্মাদ হয়ে পড়ে। গাছ থেকে গাছে লম্বালম্বি চলে যাওয়া, রজ্জুগুচ্ছের মতো চিহড় লতাটির ওপরে সে পাঁজাকোলা করে বসিয়ে দেয় জারমণিকে। আর মানদার গাছটির তলে দাঁড়িয়ে, পিছন থেকে তার নিতম্বে আলতো ঠেলা দিয়ে, সে গেয়ে ওঠে—

পুকুরেতে জল নাই গ

ফুটিল শালুক ফুল...

মুখে ক্ষীণ হাসি নিয়ে, জারমণি দোল খেয়ে যায়! দোল খেয়ে যায়!...

বর্ষার আলভাঙা ক্ষেতের জলের মতো গ্রামবাসীরা হইহই করে এগিয়ে আসতে লাগল।

তাদের এই দলবদ্ধ এগিয়ে আসার রব দূর থেকেই শুনতে পেল ডেলিকচার চারটি ঘরের লোকজন। প্রথম শুনে মনে হল হাতিখেদার শব্দ। শস্যখেতে হয়তো হাতি নেমেছে। মশাল জ্বেলে, টিন-ক্যানেস্তারা বাজিয়ে, প্রবল হাল্লা করে গ্রামবাসীরা কখনো দৌড়ে, কখনো দ্রুতচালে নিয়ে যাচ্ছে সেই হাতিকে। প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও ফসলকে তো আগে বাঁচাতে হবে। কিন্তু একটু পরেই বোঝা গেল হাতির উপদ্রব নয়। তারা রে-রে করে আসছে এই দিকেই। এই ঘরগুলোর দিকে। তাদের কথোপকথনও উত্তেজক। মনে হয়, তারা কোনো গন্ডগোলের জের বয়ে নিয়ে আসছে। কিন্তু এদিকেই বা কেন?

ঘরগুলো থেকে লোকজন বেরিয়ে আসে। কৌতূহলী হয়ে উঠল শবরদের ঘরটি বাদে বাকি তিনটি ঘরের লোকেরা। বাউরি ও ভূমিজরা। তারা পরস্পর মুখ চাওয়াচায়ি করে জানতে চাইল, ‘কী বঠে বল ন? কিস্যার হতে ইয়ারা এমন করে আসছে ইদিকে?’

তাদের কথাবার্তায় মাঝে মাঝেই শোনা যেতে লাগল একটি নাম—অঙ্গা খাইড়া। আর নামটি কানে আসতেই, ভয়ে-ত্রাসে আর অজানা উপদ্রবের আশঙ্কায় সিঁটিয়ে গেল সহদেবের ঘরের মেয়েরা। পুরুষরাও।

বাউরি ঘরের একটি কিশোর সবার আগে ছুটতে ছুটতে এসে, জটলা করা লোকদের উদ্দেশ করে বলতে লাগল, ‘উয়ারা ই-ঠিনকেই আসছে। খাইড়া ঘরকে। বলছে মাইরে মরাব শালাদেরকে!’

‘খাইড়াদেরকে মারবেক? ক্যানে?’ ওই কিশোরটির বাবা হাসুয়া বাউরি বলে, ‘উয়ারা কন গাঁয়ের বঠে।’

‘পলপলের বঠে।’

‘পলপলের? অঅঅ। তাইলে এইটার নিয়েই ঝালদার হাটে শুনতেছিলি রেএএ।’

‘কী শুনতেছিলে হাঁসুখুড়া?’ জিগ্যেস করে রতন সিংসর্দার। হাঁসুয়ার বউও বলে, ‘হাটে কী শুনলে?’

‘পলপলের একটা বিটিছ্যেলাকে নকি ডেলিকচায় খাইড়ারা চুরি করে আইনেছে?’

‘চুরি করে?’

‘হঁ।’ খাইড়া ঘরটি ইশারায় দেখিয়ে হাঁসু বলে, ‘স্যাটা য্যা এই ডেলিকচা তখন ত বুঝি নাই। এখন দেখ কি তক্ক হয়।’

পলপলের উত্তেজিত গ্রামবাসীরাও অবশ্য খবরটি ভুল শুনেছিল। তারাও প্রথমে মনে করেছিল, এই ঘটনা জঙ্গলের প্রান্তে মূল ডেলিকচা গ্রামের কোনো খাইড়ার কীর্তি। সেই বুঝে পলপলের লোকেরা আগে সেখানে গিয়ে চড়াও হয়। হাঙ্গামা শুরু করে দেয়। তাদের হাতে- হাতে ডাং, সাইকেলের ছেঁড়া টায়ার, বাঁশের সাটিক। কেউ কেউ গোরুবাঁধা গলাসিই খুলে এনেছে গোয়াল থেকে। তাদের এই আক্রমণাত্মক ভঙ্গি এবং ডাং-ঠেঙা দেখে গ্রামের মাতব্বররা কুলহি মুড়ায় দলটিকে টেকায়। দু-হাত ওসার করে পথরোধ করে বলে, ‘ডাঁড়াও! রু-ক! আগু খুলে বল, কিস্যার লাইগে তুমরা হামদের গাঁকে আইসেছ? কী ফের ব্যাপার তুমাদের বলতে হবেক।’

‘বলাবলি? কিস্যার বলাবলি? আমাদের গাঁয়ের যে বিটিছ্যেলাটিকে আটক করে তরা রাইখেছিস, তাকে এখনি ঘুরৎ কর। তাবাদে দেখছি শালা আঁইড়া মরদকে! উ কেমন মরদ হঁয়েছে! উয়াকে ভোগুয়া-হারা দহে চবকায় মাত ছাড়াব!’

‘কী কথা বলছ তুমরা? কে তুমাদের বিটিছ্যেলা আইনেছে?’

‘কে আইনেছে? বিটিছ্যেলাটিকে ঘরভিৎরে ঢুকায় রাইখে এখন উদারকলা? বেটিচোদ!’

গালাগালি দিতেই লেগে যায় দু-পক্ষের হাতাহাতি, ঠেলাঠেলি। তা করতে ছুটে আসে গ্রামের অন্যান্য লোকও। মাহাত-কুমাররা। ভিড় ক্রমশ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে হই চই। যদিও, কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে, এটা ভেলিকচার গ্রামবাসীরা কেউ কেউ বুঝতে পারে। আবার কেউ মনে করে, তাহলে কি সত্যিই কেউ পলপলের কোনো ভূমিজ মেয়েছেলেকে এই গ্রামে কারো ঘরে কুলুপ দিয়ে রেখেছে? গোপনে রাখায় যা কেউ জানতে পারেনি? এই সন্দেহ থেকেও তারা পলপলের লোকদের পালটা আক্রমণ করতে সাহসী হয় না।

এমনিতে, দলটিতে পলপলের লোক যে খুব বেশি এসেছে তা নয়। বড়োজোর জনা তিরিশ। অপরাধীকে ঠিক ঠিক ধরতে পারলে তাকে শিক্ষা দেবার পক্ষে এই ক-জন যথেষ্ট। তারা জানে, অপরাধীর পক্ষ নিয়ে সেই গ্রামের সব লোক কেন তাদের বিপক্ষে রুখে দাঁড়াবে? মেয়েটি যেহেতু পলপলের, স্বাভাবিকভাবে পলপলের লোকদের ক্ষোভ এবং ক্রোধ অনেক-বেশি। যা ডেলিকচার লোকদের ভয় পাইয়ে দেয়। যদিও, কুমহাররা কোনো কিছুতে সহজে ভয় পায় না। তারা কথায় কথায় হাতিয়ার বের করতে কসুর করে না। এখানেও, পলপলের গ্রামবাসীদের আক্রমণ ঠেকাতে, তারা যে-যার ঘর থেকে টাঙি-লাঠি আনতে পড়িমরি করে ছুটে যায়।

গন্ডগোল ক্রমশ প্রাণহানিকর হয়ে যেতে পারে দেখে, ডেলিকচার মাহাত এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের কিছু প্রবীণ ও মাতব্বর গোছের লোক অযথা মাথা গরম না করে বিরোধীদের নিরস্ত করে। বলে, ‘থাম, থাম সবাই! হামরা মানছি—’ গোলমাল থামানোর উদ্দেশ্যে ডেলিকচার গদাধর মাহাত, পালোয়ান, লুঙ্গি কোমরে পাট করে, তার মুগুরের মতো হাত সকলের মাথার উপর দিয়ে একপাক ঘুরিয়ে আরো জোরে বলে উঠল, ‘হামরা মানছি, তুমাদের গাঁয়ের বিটিছ্যেলাকে আইনেছি। আর এই গাঁয়ের ভিৎরে আটক করে রাইখেছি। এই ত তুমাদের বলার বক্তব্য? আর কিছু বলবে? বলে ফেল!’

ভিড়ের ভেতর থেকে চশমাধারী সঁড়ু বলে উঠল, ‘কই স্যা বিটছ্যেলাটি? হাজির করে দেখাও।’

‘দেখাছি দেখাছি।’ হরহর মাহাতর কথাতে ডেলিকচার লোকেরা অবাক! কী বলছে হরহর? পলপল থেকে কে মেয়ে এনে এই গ্রামে লুকিয়ে রেখেছে? রাজারাম কুমার বলে, ‘ইটা কী বলছ কাকা? তুমি হামাদের গাঁয়ের নাম ডুবাবে? কে বিটিছ্যেলা ঘরে ঢুকায় রাইখেছে?’

‘চুপ দে, চুপ।’

উত্তেজিত জনতা কিছুটা শান্ত হলে, হরহর বলে, ‘তুমাদের গ্যারামে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, স্যা খোবোর আমাদের কানেও আইসে পড়েছে। হামরা কেউ ই-ঘটনাটা জীবনডির মোড়ে শুনেছি, কেউ জারগো মোড়ে শুনেছি। দু-তিন দিন ল্যা এই নিয়েই ইখেনে-স্যাখিনে খোবোরটার আন্দোলন হছে। ইবার তুমরা হামাদের একটি কথার জবাব দাও—’

‘জবাব দিই আর না দিই, হামরা বিটিছ্যেলাটিকে ঘুরৎ লিতে আইসেছি, ঘুরৎ লিব। তাবাদে অন্য কথা।’ বাঁকু তার হাতের ডাংটা দেখিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়।

হরহর ফের বলে, ‘বলছি ত। ঘুরৎ হামরা দিব। তার আগু তুমারা শুধু বল—তুমাদের বিটিছ্যেলাটি য্যা এই ডেলিকচায় আটক আছে, ই-খোবোরটি তুমাদের কে দিল, ভাইদাদা?’

‘কে দিল মানে? খোবোর না পাঁইয়ে হামরা কি আনখাই ইখিনকে আইসেছি? কী বলছ তুমি?’

‘হামি ঠিকেই বলছি। যে-তুমাদেরকে খোবোর দিঁয়েছে, স্যা লিট খোবোর দিতে পারে নাই। আর যদি হামার কথা তুমাদের বিশ্বাস না হয়, তাইলে যাও তুমরা, এই গাঁয়ের হরেক ঘরে ঢুকে ঢুকে দেখ! চেকিন কর! কারো ঘরে তুমাদের বিটিছানাটিকে পাও কি না পাও। যাও, এখনি দেখ। হামাদের তাথে ক-ন আপত্তি নাই। হামরা সুগুম ডাঁড়ায় আছি। কই যাও?’

এর পরেও ওরা আর কী বলবে? কোনো জবাব দিতে পারে না। সত্যিই যদি পলপলের মেয়েকে এনে তারা এই গ্রামে আটক রেখে থাকে, তাহলে কোন সাহসে তারা সেই সব ঘর ‘চেকিন’ করার কথা বলবে? কোন সাহসে?

বোকা বনে যায় ওরা সকলে। বাঁকু আগুয়ানের মুখের দিকে চায়। বিহারীলাল বলে, ‘বাঁকুদ্দা, ডেলিকচা ছাইড়ে এখনেই চল কণারবেড়া। শ্লা গুজর মুদিকে গাদন দিব। যদি না উয়ার ভাঁউরি কেনেলের জলে ফেলি—’

হঠাৎ বহুদূর থেকে ভেসে আসে, ‘ভুল হঁয়ে গেছে! ভুল হঁয়ে গেছে! বুঝতে ভুল—শুনতে ভুল! বুঝতে ভুল— শুনতে ভুল!’

ভিড়ের লোকজন পিছন ফিরে তাকায়। দেখে, দ্রুত সাইকেলে প্যাডেল মেরে, গাঢ়হা-ঢ়ড়ায় ঝাঁকুনি খেতে খেতে, এগিয়ে আসছে কৈলাশ ধীবর। মাথায় লাল ফেট্টি। হাওয়ায় উড়ছে। ডান হাতটিকে সে একবার এদিক, একবার ওদিক গোত্তা দিতে দিতে ওখান থেকেই দেখায়, ‘ই-ডেলিকচা লয়, উ-ডেলিকচা! ই ডেলিকচা লয়—।’

পলপলের লোকেরা ভিড় ভিড় করে সরে আসে। বাঁকু বলে, ‘নাহ, হামাদেরেই ভুল। চলৌ উ-ডেলিকচা!

রাজারাম দাঁত কিচকিচ করে বলে, ‘শ্লা, কানা পাঁইড়কা!’

মন্তব্যটি শুনেও ওরা অকান করার ভান করে গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসে। ইতিমধ্যে, এই গ্রামের সীমানায় ঢুকতে ঢুকতেই গ্রামবাসীদের কিছু ক্ষতিও যে করে দেয়নি, তা নয়। যখন ঠেলাঠেলি ধাকলা-ধাকলি চলছে তখন কিছু বাঁদর ছেলে কারো কারো খড়ের গাদায় উৎপাত শুরু করেছে। চাকিগাদা থেকে খড় টেনে টেনে গাঁজা-থাসা করে ছড়িয়ে দিয়েছে। কেউ আবার গ্রামে ঢোকার পথে হাতের লাঠি দিয়ে, পায়ে পায়ে নষ্ট করে দিয়েছে ‘আফরগাঢ়ি’র ধানের চারাও। অকারণে এসব করাটা ঠিক হয়নি বলে তারা যত তাড়াতাড়ি পারে এখন সবাই যেন পালাতে পারলে বাঁচে।

এই গ্রাম থেকে বেরোতে না বেরোতে এদের উদ্যম আবার তেমনিই জেগে উঠল। ‘ঠেঙাও শ্লা খাইড়াকে! দুমুইখ্যা ঠ্যাঙাও! উয়ার ললি ছিঁড়!’ যে যা পারে বলতে বলতে ওরা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল চারঘরের ডেলিকচার দিকে। পাথরে চাকা ঘসকে গিয়ে আঁঠু ছুলাল কৈলাশ ধীবরের।

সবার আগে সদরের ফড়কিটা বন্ধ করে দেয় সঞ্চারী। কিন্তু তারপর কী করবে বুঝতে পারে না। গা কাঁপছে! ক্রমশ ধেয়ে আসা মারমুখী গ্রামবাসীদের চিৎকার শুনে। হ্যাঁ, তারা তো এদিকেই আসছে। এই ঘরটিকে লক্ষ করে। ভয়ে কাঠ হয়ে রয়েছে ভুটু শবরের বউও। কপাটের আড়াল ছেড়ে তার বাইরে বেরিয়ে আসতেও সাহস হয় না। ভুটুও তাকে আসতে না করে। প্রতিশোধ নিতে যদি তারা ভুটুর বউকেই চ্যাঙদোলা করে জংগলের ভেতরে নিয়ে চলে যায়? এখানে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কেউ নেই। যারা বাইরে দাঁড়িয়েছিল, নিছক কৌতূহলবশত, মজা দেখার উদ্দেশ্যে, তারাও এখন আর ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে নেই। যে যার বাখৈলে ঢুকে পড়েছে। হুড়কা দিয়েছে আপন আপন ঘরে। তা ছাড়া এই ঘটনায় তাদের হয়ে যে কেউ দুটো কথা বলতেও দাঁড়াবে না, তা ভুটু যেমন বুঝেছে, তেমনি বুঝেছে সহদেবও।

ছোটো ছোটো ছেলেগুলোকেও তারা এঘর-সেঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শিকল তুলে দিয়েছে। ভেতরে থেকে কেউ কেউ কাঁদতে শুরু করেছে ভয়ে। ভুটুর ছোটো ছেলেটি কাঁদছে মায়ের দু-হাঁটুর মাঝে মুখ লুকিয়ে।

বাইরে, বুকে ধকধকি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ভুটুর বড়োছেলেটি। বছর বারো-তেরো বয়স। সহদেব বলে ‘এ গুরা, দৈঁড়ে যা। কথায় আছে উয়ারা খুজে দেখ। বলবিস এখন ঘরকে যেমন না আসে। পালাক উয়ারা! পালাক!’

জঙ্গলে কোথায়, কোনদিকে রয়েছে পাটন আর জারমণি? গুরুধন নিজেও জানে না। তবু আক্রমণ এসে পড়ার আগেই সেও পালিয়ে গেল। তাদের খবর দিতে।

ভয় এবং অস্থিরতা নিয়ে, জঙ্গলের ভেতরে, এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াতে লাগল গুরুধন। ‘পাটনদাদা! হেএই পাটনদাদা!’ সে চিৎকার করে বারে বারে ডাকতে লাগল। কোনোদিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে আরো ভেতরে ঢুকে গেল সে।

আর যতই ঢুকতে থাকে তার কানে স্পষ্ট হয়ে আসতে থাকে গানের একটি কলি—‘ফুটিল শালুক ফুল...’

‘পাটনদাদা..!’ মান্দার গাছটির অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে গুরুধন।

‘কী বঠে?’ জারমণিকে শেষবারের মতো চিহড় লতায় দুলিয়ে দিয়ে পিছনে ফিরে তাকায় পাটন। গুরুধনের আতঙ্কিত মুখ-চোখ দেখে ঘটনা আঁচ করে সে। কপালে ফুটে ওঠে উদবেগের ভাঁজ। বলে, ‘কী হঁয়েছে, কী?’

‘উয়ারা গাঁ-কে আইসছে।’

‘কারা?’

‘পলপল-আইলারা!’ গুরুধন আর কিছু বলার দরকার মনে করে না। ছুটে পালিয়ে যাবার আগে শুধু এক নি:শ্বাসে গড়গড় করে বলে যায়, ‘ঘরকে এখন যাস না। জ্যেঠা ভাগতে বলেছে তরাকে—ভাগ তরা, ভাগ!’ সে নিজেও আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে না। ঝুড়ে-ঝাড়ে লুকিয়ে যায়।

মুহূর্তে পাটনের পরিবেশটিই পালটে গেল। জারমণির উষ্ণ নিতম্বে ঠেলা দেওয়ার রেশ এখনো রয়েছে। তার গতিতে নিজস্ব ছন্দে দুলে চলেছে জারমণি। কোনো বিকার নেই তার। ভয় নেই, চাঞ্চল্য নেই। মুখে মৃদু হাসি। মনে মনে সে কি আউড়ে চলেছে, ‘পুকুরেতে জল নাই গ...?’

পাটন অবাক। তার এই প্রতিক্রিয়াহীনতায়। গুরুধন যে ভয়ংকর সংবাদটি দিয়ে গেল, জারমণি কি তার বিপদ সংকেত একটুও অনুধাবন করতে পারেনি? তার মনে কোনো উদবেগ নেই কেন? কেন ভাবান্তর নেই? নাকি সে বুঝতেই পারেনি, কারা এগিয়ে আসছে তাদের ঘরের দিকে? কেন আসছে? নিজের অস্থিরতার সংক্রমণ ঘটাতেই, সে তার হতচকিত ভাব ফুটিয়ে বলে, ‘জারমণি! জারমণি! আর একডণ্ড লয়। চ পালা—’

জারমণি তখনো দুলছে। ভ্রুক্ষেপহীন, নির্লিপ্ত সে। গোধূলির অন্তিমলগ্নের মতো ক্রমশ বিলীয়মান হাসি তার ঠোঁট জুড়ে। পাটনের বড়ো অসহায় বড়ো একা লাগে নিজেকে। এতক্ষণ যে হাসিটি তাকে আবেগে বিহ্বল করে তুলেছিল, জাগিয়ে তুলেছিল তার অনুভাব, তাকে পৌঁছে দিয়েছিল স্বতন্ত্র একটি নির্বস্তুক জগতে, তার চারপাশে গ্রন্থনা করেছিল নানান স্বপ্নের, সুন্দরের, প্রেমের, এখন বামোরুর সেই রমণীয় হাসিটিই তার অন্তর্দহনের তুচ্ছ অথচ অঘোর শলাকা হয়ে উঠল। যে যুগল নিতম্বে সে তার তৃষিত করতলের অতি মনোহর লঘু ঠেলন দিয়েছিল, এবং ক্ষণেক আগেও অনুভব করছিল তার অনুচ্চার-স্পর্শানুভূতি, এখন তা-ই করাল বোধ হতে লাগল। সন্ধিস্থলকে মনে হল শূকরীযোনি। প্রাক-বরিষণ-মেঘের মতো জারমণির যে ব্যাপ্ত পৃষ্ঠদেশের দিকে মুহুর্মুহু তাকিয়ে সে মগ্নতাবশত অম্বর অবলোকন করেনি, এখন সেই সুঠাম পিঠটি যেন গবাদির ক্ষুরডলা অচর্চিত অঙ্গন। অপ্সরাতুল্য মানবীদেহের আশ্চর্য সন্তুলন নিয়ে যে ‘ডমরুমধ্য ক্ষীণকটি’, তা হয়ে উঠল তার বিরাগ ভাজন। অক্ষয় বটের ঝুরির ন্যায় যে অবনমিত ঝুরুঝুরু কেশগুচ্ছকে নিজ দক্ষিণ হস্তের অঙ্গুষ্ঠে পাকাইয়া তার শিরোপরি টেসোরাজা পাখির ন্যায় একটি বেণী রচনা করার স্বপ্ন দেখেছিল, এখন সেই কেশগুচ্ছ তারই কন্ঠের গলাসিরূপ প্রতীয়মান হল। যে অনাঘ্রাতার মস্তকে, নিত্যপ্রলয়ে, সে একটি দীর্ঘস্থায়ী চুম্বন নিবেদনপূর্বক নিতে চেয়েছিল রজঃস্বলা নারীর অঙ্গসুবাসিত আঘ্রাণ, এখন সেই নারীকেই মনে হতে লাগল বিবরস্থিত কঞ্চুক বিমোচনকারিণী। হায়, কী ভয়ংকর! কী অসহ! কী অনিত্য সৌন্দর্য উদ্রেককারী মুহূর্তগুলি! নাকি, সৌন্দর্যই আসলে প্রতারক, মায়া? যে যুগল ভুরুর নাচনে সে কেলি-কদম্বে লীলার আভাস পেয়েছিল, অবহুঁ, সেই যেন শোনাতে লাগল তাকে আসন্ন আহবের বজ্রনিনাদ! স্তনশঙ্খে উঠিছে ফুকার!

পাটন উত্তরোত্তর অধীর হয়ে পড়ে। বাতাসে তরঙ্গায়িত হয়ে আসছে উত্তেজিত মানুষের অস্পষ্ট কলরব। মেদিনীতে পায়ের ঠেকনে দ্রুতি নিয়ে তখনো দুলতে থাকে জারমণি। দিগন্তের রাঙা আলোর আভা তার ভাঙা খোঁপা জুড়ে। সে এতটাই বিভোর ও আত্মস্থ যে, পাটনের সন্নিকট উপস্থিতিও তার খেয়ালে নেই। এই গভীর বিভোরতা কাটিয়ে দিতে, পাটন আরো চঞ্চল হয়ে বলতে থাকে, ‘হেই! কই শুনছিস?’ বলতে বলতে সে যেই না তার কাঁধ স্পর্শ করেছে, অমনি অন্ধকারে খট্টাসের মতো জ্বলে উঠল তার অগ্নি-উদগারী দৃষ্টি। এতক্ষণ যে ছিল কঞ্জনয়নী, এখন সে-ই হয়ে উঠল দম্ভোলি-নয়না।

তার দৃষ্টিতে যে বজ্রের ক্রোধাভা, তা রীতিমতো সন্ত্রস্ত ও বিমূঢ় করে দিল পাটনকে। সে বুঝেই উঠতে পারে না নারীর এই বহুরূপতাকে, যা ছলনার নামান্তর। তাই অবুঝের মতো কোমল, ভাবময় সুরে ফের বলে, ‘এই ত বতর! জারমণি, এই ত বতর! চ-চ তুঁই হামার সঙে...’

কোথা যাবে সে? পাটন কোথায় নিয়ে যেতে চায় তাকে? কন্ঠনির্গত বাক্যে নয়, চক্ষুনির্গত দৃষ্টিতে যেন স্বতোচ্চারিত হল প্রশ্নগুলি। সুযোগের কথা বলে সে তাকে প্রলোভিত করতে চায়? কার সুযোগ? কীসেরই-বা সুযোগ? কীসের প্রলোভন?

জবাবের অপেক্ষায় চেয়ে থাকে জারমণি। দমকা হাওয়ায় আধখোলা খোঁপাটি পাক খেয়ে মূর্ছা যায় জারমণির পিঠের ওপরে। উড়তে থাকে এলোচুল।

হ্যাঁ, সুযোগ। বতর। জগৎজোড়া মানুষের ধর্মই হল সুযোগের সন্ধান করে বেড়ানো এবং তার সদব্যবহার করা। সুযোগই মানুষের মধ্যে প্রলোভন জাগিয়ে তোলে। পাটন তাই প্রলুব্ধ। জারমণিও কি তার দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েনি?

জারমণি নিরুত্তর। আর এই নিরুত্তর থাকাটাকেই, পাটন, সম্মতি মনে করে, সুযোগ ও প্রলোভনের ভাবনাটি সে বিতং দিয়ে দিয়ে বলে যেতে থাকে। সে জানায়, মানুষের জীবনে সুযোগ আসে কদাচিৎ। সুযোগ সর্বদা সময়ের ওপর নির্ভরশীল। পাটনও এতদিন সময়ের অপেক্ষায় ছিল। আজ সেই চূড়ান্ত মুহূর্ত, যখন সে জারমণিকে অন্ধকার থেকে আলোর ভুবনে নিয়ে আসাটা অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী করে তুলতে পেরেছে। ছলে-বলে-কৌশলে যেভাবেই হোক সে তার অগ্রজ সহোদরকে পথে-বিপথে চলার বিভ্রান্তিকর পরামর্শ দিয়ে, জারমণির থেকে তাকে অধিকাংশ সময় দূরে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যাতে ক্রমশ অঙ্গদের প্রতি জারমণির আকর্ষণ কমে আসে এবং পাটন জারমণির ঘনিষ্ঠ হওয়ার অবকাশ পায়। সে পেয়েওছে। সে তো ঘনিষ্ঠই হয়ে উঠেছে তার? ওঠেনি? সে জারমণির ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলেই না জারমণির মুখে আর একটি বারের জন্যও অঙ্গদের নামটি পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি? সে জারমণির ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলেই না সুযোগ পেয়েও জারমণি শস্যঘরটিতে তার বন্দিত্ব অস্বীকার করে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে অন্যত্র চলে যায়নি? সে জারমণির ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলেই না জারমণি তার প্রতিহারীত্ব সর্বসময়ের জন্য মেনে নিয়েছে, এবং সে জারমণির ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলেই, দ্বার-পালনের দায়িত্ব নিয়েও হাতের অস্ত্র তুচ্ছ জ্ঞানে সে ফেলে দিতে পেরেছে, মাটিতে। এভাবেই তো সে রঙে-রূপে ছলা-কলায় তার মনোময়ীর কাছে নিজেকে অকপটে মেলে ধরতে পেরেছে। সুযোগই মানুষকে তার আত্মপ্রকাশের অবকাশ এনে দেয়। এনে দেয় মহরতের কাঙ্ক্ষিত বার্তা।

এই সেই মহরত। তাদের যুগল-জীবনের। একদিকে মানুষ যখন দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ নিয়ে ব্যস্ত, তখন অন্যদিকে জীবনের সোল্লাস প্রবাহ বইয়ে দিতেই হয়। তা না হলে আর জীবন কী? প্রকৃতিই কি জীবনের যথোচিত শিক্ষা দেয় না? একটি লালশালুক পূর্ণ প্রস্ফুটনের জন্য গভীররাতের অপেক্ষায় থাকে। একটি ঝিঙেফুল মৃত্যুর জন্য সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করে। একটি কৃকলাস কীট ধরার জন্য অনির্দিষ্টকাল ওৎ পেতে নিষ্পলক চেয়ে থাকে। আবার সরীসৃপ সময় বুঝে তৎক্ষণাৎ মারে ছোবল। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যেকে সময়ের প্রেক্ষিতে সদব্যবহার করে চলেছে সুযোগকে।

আজ তাদেরও সময়ের আবর্তন সম্পূর্ণ। এখন এই তো সুযোগ, রণে ভঙ্গ দেবার! বিপদের ক্ষেত্রটি থেকে এই মুহূর্তে পালিয়ে যাওয়ার এবং তাদের নতুন জীবন শুরু করার। এতর পরেও জারমণি কি পাটনের হাত ধরবে না? জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে যাবে না অজ্ঞাত কোথাও? হবে না তার অনুব্রজা?

পাথরে পাথর ঘষা খেলে যেভাবে ছিটকে আসে স্ফুলিঙ্গ, সেভাবে ক্রোধে, আক্রোশে ঝিলিক দিয়ে উঠল না জারমণি। বরং উলটোটাই হল। সে তীক্ষ্ণ ধীশক্তিসম্পন্না বলেই হয়তো ক্রুদ্ধ হল না। বিচলিতও হল না। প্রতিকূল পরিপার্শ্বকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে, বিস্মৃত হয়ে, সে তার অন্তরিত জীবনানুভূতি থেকে পাটনের প্রতিউত্তর দিল। চারিত্রিক দার্ঢ্য-র সঙ্গে উচ্চারিত একটি সংক্ষিপ্ত ঋণাত্মক শব্দে, ‘না।’

‘ক্যানে? ক্যানে জারমণি? ক্যানে তুঁই হামার সঙ্গে যাবিস নাই?’ পাগলের মতো করতে থাকে পাটন। সে ভাবতেও পারেনি, জারমণি এমনভাবে এই তুঙ্গ মুহূর্তে বেঁকে বসতে পারে। তাই কখনো কাতরতা নিয়ে, কখনো অনুনয়ের সুরে সে কেবল জানতে চায় তার এই প্রত্যাখ্যানের কারণ। সে তার সঙ্গী হবে বলেই না বেরিয়ে এসেছে তার সঙ্গে? তার হাত ধরে?

মতিভ্রম হয়েছে পাটনের। টিনের ফড়কি খুলে, পাটনই তাকে কবজি ধরে টেনে নিয়ে এসেছে এখানে। সুঁড়িপথ ধরে জঙ্গলের এই গোপন অথচ মনোমুগ্ধকর অরণ্যখন্ডে। জারমণি কি ভ্রমবশতও একপলের জন্য এই নিঘৃৎ, নির্লজ্জ, বেয়াদব পুরুষটির বাহু স্পর্শ করেছে? একবারও করেছে? তাহলে সে কেন প্রত্যাশা করে, জারমণি তার হাত ধরে জীবনের অনি:শেষ পথে যাবে? জারমণির করিকর উরু, তার কামকূপিত নিতম্ব, অসমতল ও মোলায়েম কটি-পার্শ্বদেশ সু-উচ্চ গ্রীবা তথা অগ্ন্যাধার স্তনদুটিই কি পাটনকে দিনে-দিনে এই প্রলোভনের নিতলে পৌঁছে দিয়েছে? ভাবে-কল্পনায় বিভোর হয়ে রয়েছে এই ভাবিনির সঙ্গে সে ‘নিধুবনে’ মত্ত হবে? আর রমিতা হবে জারমণি? অহো, কী দুরাশা!

পাঁজরগুলি মড় মড় করে ভেঙে পড়ল পাটনের। সে এতটাই হতোদ্যম হয়ে যায়। এতটাই নৈরাশ্যপূর্ণ ও করুণ দেখায় তাকে। যদিও, জারমণি, তাৎক্ষণিক দুর্বলতাবশেও তার দিকে গরজ নিয়ে তাকায় না। নিজের ভেতরে তার প্রতি কোনো অনুকম্পাও সে জাগিয়ে দিতে চায় না। আঁচলের প্রান্তটি তার হাওয়ায় ওড়ে। ক্রমশ নিকটে আসা মানুষের কলরব শোনা যায়।

তখনো জারমণির দিকে তাকিয়ে থাকে পাটন। আক্ষেপ আর অনুশোচনায় পরিপূর্ণ সে-দৃষ্টি। এখনো, যতই সে জারমণিকে দেখে, ততই, তার অন্তর উথলি-পাথলি হতে থাকে। দহনবিনা পুড়তে থাকে মনোভূমি। ‘হৃদয়ে জ্বলত মঝু আগি’। হায়! জারমণির আঙ্গোট থেকে মস্তক অব্দি যে-নারীশরীর, যা অদৃষ্টপূর্ব, যা আরণ্যক আকর্ষণে ভরপুর, যা মাদকতায় বিহ্বল করে, স্বপ্ন দেখতে শেখায়—সেই শরীর অবলোকন করে, তার হৃদয়ে যে অনুভাবের, যে সূক্ষ্ম অগ্নিকণিকার উদ্ভব হয়েছিল, এখন তা-ই দামালদামিনী হয়ে উঠল। তারই অপ্রতিরোধ্য তেজে সে তার যাবতীয় দুর্ভাবনা আর দৌর্মনস্য অবদমন করে, উত্তরোত্তর প্রখর হয়ে উঠতে লাগল জারমণির কাছে। এই মুহূর্তের সব বিপদের কথা ভুলে গিয়ে, কিছু একটা করতে উদ্যত হয়েও, কী খেয়াল হয়, নিজেকে সংযত করে। বাধ্য করে। আর বিস্ময় ও অনুকম্পা মেশানো গলায়, জারমণিকে বলে, ‘তুঁই মরদের সঙে ঘর করবি বলেই ত পালায় আইসেছিস?’

‘নাই। যে হামাকে ভালবাইসেছে, তার সঙে থাকব বলে আইসেছি।’

‘কে? কন মরদে তকে ভালবাইসেছে?’ চেঁচিয়ে উঠল পাটন। এই প্রশ্নের সরল উত্তরটি যেহেতু তার অজানা নয়, তাই বোধহয়, প্রশ্নের সঙ্গে ক্রোধেরও প্রকাশ ঘটে যায়।

জারমণি ততটাই অনুচ্চকিত। গুমর বজায় রেখে স্পষ্ট করে বলে, ‘অ-ঙ্গ-দ।’

‘অঙ্গা?’ চিড়বিড় করে উঠল পাটন, ‘উ মরদ বঠে?’

‘উ তোর ভাই বঠে। বড়ভাই।’

কিন্তু তাতেও তাকে জব্দ করতে পারে না জারমণি, উলটে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল সে। খুলে গেল তার মুখের অর্গল। নিজের সহোদর হলেও, অঙ্গদের নামটি জারমণির মুখে উচ্চারিত হতেই আগুন লাগল পুয়াল গাদায়। বাবলাখাড়ির মতো কাঁপতে লাগল তার সুঠাম বলশালী শরীর। নিজের লোমহীন বুকে বারংবার সশব্দে চাপড় মেরে বলতে লাগল, ‘উ মরদ বঠে? মরদ বঠি হামি, হামি! উয়ার কী আছে? শরীর আছে? বল আছে? কী আছে উয়ার? তুঁই হামাকে দেখ—’

কোমরে লুঙ্গি জড়ানো আদুড় গায়ের অঙ্গসৌষ্ঠব দেখায় পাটন। প্রসারিত কাঁধ, তীবরদের মতো মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল। শ্মশ্রুহীন মুখ কিন্তু বাহুর জোড়ে অবাঞ্ছিত রোমের গুচ্ছ। হাতের পাঞ্জাগুলি কর্কশ। বলিষ্ঠ পায়ের পাতা। বস্তুত, তার এই খাঁজবহুল নিটোল শরীর নিয়ে অঙ্গদের পাশাপাশি দাঁড়ালে, সত্যি অঙ্গদকেই অনুজ মনে হয়। তাকে দুর্বল ও ভীরুচরিত্রসম্পন্ন দেখায়। আপাত নজরে। একটু গভীর নিরীক্ষণ করলে আঁচ করা যায়, অঙ্গদ পাটনের মতো আবেগ-চঞ্চল না হলেও সে ধীর-স্থির। নিরীহও। তাই সে ধানুষ্ক নয়। ধনুক তার হাতে বিসদৃশ। বেমানান।

জারমণি ঘুরেও দেখল না তার পুরুষালি অঙ্গসৌন্দর্য। এলোমেলো বাতাসে পিঠের ওপরে খসে পড়া চুলগুলি বিভাজিত হয়ে, তার কাঁধ উল্লঙ্ঘন করে স্তনের উপত্যকায় এসে পড়ল। কানের পাশ দিয়ে ঢেকে দিল তার গন্ডুষ। গোছা ধরে, মুখ থেকে সেই কেশরাশি উদাসীন সরিয়ে, নি:সঙ্কোচে জারমণি শুধু বলল, ‘উয়ার মনের ভিৎরে ভালবাসা আছে।’

বস্তুত, ভালোবাসা তো সেই বিশ্বস্ত কোটাল, যা চিতা অব্দি সঙ্গী হয়। আর চিতার পরেও সে স্মৃতিতে অমলিন থেকে যায়। তার বিনাশ নেই। আর অঙ্গ? শরীর? অচিরেই তার পচন ধরে। যে-অঙ্গ বিকেলের পড়ন্ত আলোয় ঝিঙেফুলের মতো স্বর্ণাভা বিকিরণ করে, যৌবনের উদ্দীপনা যে-অঙ্গে তালগাছের পাতায় বাবুই পাখির মতো দোল খায়, জীবনসায়াহ্নে সে করুণাপ্রার্থী হয়। প্রতি অঙ্গের লাগি প্রতি অঙ্গ কতদিন কাঁদে? কতদিন?

পাটন দমে যায়। দমে গেলেও জারমণির প্রতি যে সে অভিরত। তাই কিছুতেই সেই অভিরতি থেকে সে নিবৃত্ত হতে পারে না। বুক ফাটিয়ে আর্তনাদ করে। এই জনহীন জঙ্গল জুড়ে প্রতিধ্বনি তুলে বলতে ইচ্ছে হল, ‘শুধুই শরীর নয়! শুধুই শরীর নয়! আমি আমার অগ্রজ সহোদর অপেক্ষা শত-সহস্র গুণ অন্তর্গূঢ় কাম-জাগরণ নিয়ে লুন্ঠিত হচ্ছি! দেখ, দেখ এই বাণ-লিঙ্গ।’

অসভ্য বর্বর প্রজাতির মতো, জারমণির সমক্ষে, তার কোমরে লেপটানো বস্ত্রখন্ডটি বাঁহাতে টান মেরে এক ঝটকায় খুলে ফেলে দিতে চাইল সে। প্রবলভাবে চাইল। কিন্তু তা করতে পারল না। মুখ ফুটে বলতেও পারল না তার কথাগুলি। তবে যেভাবেই হোক, এটুকু সে দৃঢ়তার সঙ্গে নির্দ্বিধায় নি:সঙ্কোচে বলে ফেলল, ‘আমি তেজঃপূর্ণ পরাক্রমশালী পুরুষ, কেন-না, অধোদেশে আমি আজানুলম্বিত বাণ বহন করি।’

‘ছি:!’ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল জারমণি। অপাঙ্গ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, ‘শুধু এইটুকুই পৌরুষের চিহ্ন? তোমার শিক্ষা হওয়া উচিত। প্রলম্বিত পুরুষাঙ্গ ধারণ করলেই যদি সে প্রবল পুরুষ হয়, তাহলে গজই জগতের সর্বশক্তিমান পুরুষ। নিয়ন্তা।’

‘ভুল সে-কথা! গজ ধনাঢ্যের প্রতীক। মানুষই নিয়ন্তা। মানুষই গজারূঢ় হয়। সর্বার্থে সে প্রবল ও বীর্যবান বলে। তাহার উপরে নাই।’

‘ধিক বীর্য! ধিক পৌরুষ! জারমণির ভৎর্সনাপূর্ণ চাহনি পাটনের দিকে। বলে, ‘তাহলে তুঁই পালাতে খুজছিস ক্যানে?’ সে তার বাহু প্রসারিত করে সেইদিকে ক্রুদ্ধ তর্জনি বাড়িয়ে দেয়, যেদিক থেকে মানুষের কোলাহল আসছে। আর বলে, ‘যাও তুমি। তোমার পৌরুষ নিয়ে, বীর্য নিয়ে তাদের সঙ্গে লড়াই করো। লড়াই করো, তোমার হকের জন্য। লড়াই করো, একটি নারীর কারণে আক্রান্ত হতে চলেছে যেসব নিরীহ, নির্দোষ মানুষ তাদের প্রতিরোধের জন্য। আর লড়াই করো তুমি, সর্বাগ্রে, যা তুমি বিশ্বাস করো তার সম্মানার্থে। তবেই এই বিচিত্রবীর্য আস্ফালন তোমার মুখে শোভা পাবে।’

পাটন কী জবাব দেবে? জারমণির উদ্ধত প্রশ্নগুলি তাকে যেন প্রতি পৈঠায় অসাড় করে দিল। সে স্বীকার করতে বাধ্য হল তার অসাড়তা— ‘আমার পৌরুষ আছে, বীরত্ব আছে, দুঃসাহস আছে। কিন্তু তবুও, নারীর কাছে আমি অনিশ্চয়পূর্ণ। আমি দৃঢ়সন্ধ নই। সংকল্প-সিদ্ধান্ত ও অবিচলচিত্ততার প্রশ্নে নারীর কাছে আমি অসার। তোমাকে জয়ের লক্ষ্যে দলবদ্ধ মানুষের সঙ্গে লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়া অপেক্ষা বিজিত হওয়ার ভাবনাতেই আমি কাতর। তাই সমরাঙ্গনে লড়াই করে তোমাকে লাভ করার চেয়ে তোমাকে নিয়ে গোপনে পলায়নের পথই আমাকে এই মুহূর্তে বেছে নিতে হয়েছে। কেন না, নারীর প্রতি আমি দুর্বল। নারীর কাছেই আমি হাতিয়ারহীন হয়ে যাই। আমার হাত থেকে অজান্তে অস্ত্র পড়ে যায় মাটিতে। নারীর কাছে আমার বাগ্মিতা স্তব্ধ হয়ে যায়। হারিয়ে যায় আমার বাকশক্তি। আমি যুক্তিহীন দুর্বল হয়ে পড়ি বলেই, নারীর সম্মুখে দাঁড়ালে তার সম্মোহনী-দীপন আমাকে বিনা-আয়াসে অধোগামী করতে সক্ষম হয়। লোকসমাজে আমি ন্যায়-অন্যায়-সততার কথা বলে বেড়াই, এক পুঙ্ক্ষ পরিমাণ ধূলির ধর্মত অধিকার নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হই, অথচ সেই আমিই এই মায়াবিনীর কাছে দাঁড়ালে আমার নৈতিক প্রতিসরণ ঘটে। আমার বোধিদ্রুমে ঘূণ ধরে—এক ভূখন্ডের ন্যায্য অধিকার নিয়েও তখন আর সরব হতে পারি না।

‘এবার বলো? বলো তুমি? আমি তো আমার সর্বস্ব অকৈতবে উজাড় করে দিলাম তোমার কাছে। আমার আসক্তি, অক্ষমতা, অসহায়তা সবকিছু। চলো, হে সন্তোষ বিধায়িত্রী, চলো। তুমি এই দন্ডে আমার সঙ্গে পলায়ন করো। চলো, সময়াসন্ন। তোমা বিনে আমি যে সত্যিই গৌরবহীন। একা।’

‘নাই।’ জারমণি তার প্রতিক্রিয়াহীন কন্ঠে স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে পলায়ন ঘৃণা করে। জীবন অনিশ্চিত, সংকটাপন্ন জেনেও সে এখানেই অটল থাকতে চায়। সে এও জানাল, পাটন যদি সত্যিই দুর্বল হত, তাহলে সেই দুর্বল পুরুষকেও ভালোবাসা যায়। কিন্তু সে তো কেবল দুর্বল নয়। সে কাপুরুষ। কাপুরুষের সঙ্গে জারমণি যাবে না।

কাপুরুষ? পাটন অবাক হয়ে যায়। সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, গণপ্রহার ও সংঘর্ষকে তোয়াক্কা না করে, নিজের মাতা-পিতা-ভ্রাতা ছেড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, যে ‘সবল হস্তে’ একটি নারীকে নিয়ে অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের অভিমুখে পলায়ন করতে উদ্যত হয়েছে, সে কাপুরুষ?

‘হ্যাঁ, সে-ই কাপুরুষ। প্রকৃত পুরুষ তো সে, প্রতিকূলতায় যে বিমুখ হতে জানে না। প্রকৃত পুরুষ তো সে, আদর্শই যার অস্ত্র। কী আদর্শ তোমার? তুমি নীচ, আদর্শভ্রষ্ট। আদর্শহীন অধমের সঙ্গে জারমণি যাবে না।’

‘আদর্শ? কীসের আদর্শ? যে আদর্শের প্রহরণাঘাতে রক্তক্ষরণ ঘটে সভ্যজগতে, সেই আদর্শ? আদর্শই তো চরিত্রে দ্বিধা আনে। বিবেকের কাছে অধীন করে রাখে মানুষকে। আদর্শের বর্ম পরে, আদর্শের দোহাই দিয়ে কাপুরুষেরা রং বদল করে। বিপদে নিজেকে সুরক্ষিত রাখে। দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয় না, ত্যাগে বিমুখ হয়, নিজকৃত যাবতীয় অসৎকর্ম, অন্ধকার অধর্ম তথা অমাঙ্গলিকতাকে আদর্শের অমৃতবারি সিঞ্চন করে ধর্মাদ্রিত করে। আমি তেমন কপটচারী নই। তাই আদর্শকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে, আমি আমার প্রলোভনের কথা অকম্প্র ব্যক্ত করেছি। কোনো ছলনার আশ্রয় না নিয়ে।’

‘যে পলায়নোন্মুখ, তার আবার ছলনার প্রয়োজন কী?’ কটাক্ষ করে জারমণি। ‘পলায়নই তোমার ভবিতব্য। তোমার অখন্ডনীয় নিয়তি। তবু এই পলায়নের ক্ষেত্র তৈরি করতেও তুমি ছলনা করেছ। তুমি ভন্ডদ্বারী। আমার দ্বারপ্রান্তে থেকে তুমি বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছ, করেছ হাতিয়ারের অসম্মান। এমন বিশ্বাসহন্তার সঙ্গে আমি যাব কোন ভরসায়?’

‘ছলনা করেছি? হামি?’ অপ্রত্যাশিত এই অভিযোগের কারণ জানতেও ব্যাকুল হয়ে পড়ে পাটন।

‘হঁ, তুঁই। তুঁই হামাকে ছল করে ওই ঘর-ভিৎরে আঁধারে আটক করে রাইখেছিলিস। তোর কারণে হামি—’ জারমণি তেজের সঙ্গে পাটনের দিকে তার অবজ্ঞার অঙ্গুষ্ঠ অনড় রেখে বলে যেতে থাকে, অঙ্গদ তাকে জীবনসঙ্গিনী করে তার দারিদ্র্য ও দুর্দশাপূর্ণ জীবন থেকে তাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এই পাটন? পাটন সে-মুক্তির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সে একাই শত্রুর মোকাবিলা করবে, হাতিয়ারি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে তার অগ্রজ সহোদরকে নিরাপত্তা দেবে—এই বুজরুকি দিয়ে সে জারমণির স্থানান্তরে যাওয়া রোধ করে। অথচ এখন? সহোদরকে বঞ্চিত করে, ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের বিশ্বাসের মর্যাদা না দিয়ে, তাকে দাগা দিয়ে, সে কিনা নিয়ে যেতে চায় জারমণিকে? এমন কুচক্রীর সঙ্গে জারমণি যাবে না। কেন যাবে?

‘নাই। অমন না বলিস তুঁই।’ পাটন ক্রুদ্ধ ও সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা জারমণিকে প্রশমিত করতে অগ্রসর হয়। কয়েক পা এগিয়ে, বিনীত হয়ে সে তার করতল স্পর্শ করতে গেলে, জারমণি তাকে কুক্কুরের মতো বিতাড়িত করে, ‘দূর হ তুঁই! দূর হ! তুঁই হামার পাশকে ঠেসিস না। দাগাবাজ। দমবাজ। হামি কিসকে যাব তোর সঙে? অঙ্গদ থাকতে?’

অঙ্গদ! অঙ্গদ! এই নামটি যতবার সে জারমণির মুখ থেকে শোনে, ততবার সে যারপর নাই অসূয়ক হয়ে ওঠে। ক্রোধে, হিংসায়, ঈর্ষায় বন্য উন্মাদের মতো নিজের গা থেকে ছিঁড়ে-নুচে ফেলতে ইচ্ছে হয় লোমরাজি। কিন্তু এখন আর সেভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল না পাটন। নিজের প্রতি তার নিজেরই করুণা হল। কৃপাপ্রার্থী হতে ইচ্ছে হল জারমণির। মনে হল একটি নারীর প্রতি পুরুষের দুর্নিবার আকর্ষণ কীভাবে পুরুষকে মোহাচ্ছন্ন করে দেয়। এবং সেই নারীই হয়ে ওঠে তার নিয়ামক, তার নিস্তারকও। যদি একবার জারমণি তার ওই করতল সাদরে স্পর্শ করে দিত? যদি দমকা বাতাসে তার খসে পড়া খোঁপার শৃঙ্খলহীন কেশগুচ্ছ নিয়ে পাটন একটি নতুন বলখোঁপা করে দিতে পারত? আর ওই ‘আগ্যত’ গাছটির দিকে ছুটে গিয়ে, ‘দুধলাড়ু’র ঝোপ থেকে একটি ছোট্ট ফুল তুলে এনে সে এই মুহূর্তে গুঁজে দিতে পারত তার ওই মনোহারী কবরীটিতে? জারমণিকে নাগকেশরের মতো দেখাত! সুন্দর, বর্ণবহুল! যোজনগন্ধা বৃষলী জারমণি!

কোন্দল শুরু হয়েছে পুরো দমে। লেগেছে লড়াই। সংঘর্ষ। শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে অঙ্গদ কি এখন এসে পড়েছে? পাটন ভাবে না তার কথা। ভাবতে ইচ্ছে করে না। বরঞ্চ যে-জারমণির অনলোদগারী দৃষ্টিতে সে উপেক্ষিত, ঘৃণ্য, প্রত্যাখ্যাত, সেই জারমণির সঙ্গেই নিজেকে জড়িত করে তার ভাবতে ইচ্ছে হয়, এখনো। তাই ক্রোধ নয়, ঔদ্ধত্য নয়, সে শুধু অখন্ডিত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল মদিরাক্ষীর পানে।

জঙ্গল জুড়ে ক্রমশ পড়ে আসছে আলো। ‘ঘুঁইট’, ‘একশিরা’ আর ‘ভুড়কুড়া’ গাছগুলির পাতায় পাতায়, একটু বাদেই, ষাঁড়া হাঁসের মতো থিতিয়ে বসবে আরণ্যক অন্ধকার। ‘আলকুশি’র মগডাল থেকে সরে সরে যাচ্ছে ম্লান, নিষ্প্রভ কিরণ—লুটিয়ে পড়ছে আতুড়ি লতে। ঝোপে ঝোপে চাঁইঘুর্ঘুর করছে পোকা। ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসছে পতঙ্গ।

মন বিষণ্ণ হয়ে যায় পাটনের। উদাস উদাস লাগে। কিন্তু সেই ঔদাস্যের, সেই বিষণ্ণতারও কোনো ক্ষমা নেই জারমণির কাছে। সে তাকে একই কথা বলে যেতে লাগল, আসন্ন বিপদের মুখে দাঁড়িয়েও তার প্রত্যাখ্যানপূর্ণ বক্তব্যে সে অকম্পিত। হয় এই মুহূর্তে তুমি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যাও, অথবা উত্তেজিত গ্রামবাসীদের হাতে প্রহৃত হতে নিজেকে সমর্পণ করো। তুমি কামাসক্ত! রিরংসু! তুমি জারমণির আশা ছাড়ো।

নিরীহ ক্ষমাপ্রার্থীর মতো পাটন জারমণির দিকে এগিয়ে এলেও, জারমণি এতটুকুও দুর্বল হয় না। ক্রোধে, ঘৃণায় সে তখনো বলে চলেছে, ‘অঙ্গদ আমাকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যেতে চায়। আর তুমি? অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকারে নিয়ে যেতে চাও। আমি তোমার সঙ্গে যাব কেন? যে-পুরুষ নারীর আকর্ষণে হাতিয়ার ফেলে দেয়, সে দুর্বল। তাকে ভরসা করা মূঢ়তা। যে-পুরুষ আপন অস্ত্রের কাছে বিশ্বস্ত নয়, সে নারীর কাছেই-বা কেমন করে বিশ্বস্ত হতে পারে? তুমি অন্যের বিশ্বাসের অযোগ্য। তোমার কৃতকর্মের কারণে তুমি আমার ক্ষমারও অযোগ্য।’

জারমণির চোখের কোলে কি কান্নার আভাস ফুটে ওঠে? কাঁদছে জারমণি?

না। এখনো যে তার সময় হয়নি। বরং চোখ ছলছল করে পাটনের। জারমণির কাছে সে এতই নগণ্য? তার ক্ষমা-তিতিক্ষারও যোগ্য নয়? এতই অকিঞ্চন সে? তবু সে তার প্রশ্নবহুল দৃষ্টি দিয়ে, জারমণিকে বলতে চাইল, ‘প্রকৃত বিশ্বাসঘাতিনী তো তুমি? তুমি দুর্বোধ্য ও মায়াবিনী। তুমি অকৃতজ্ঞ। আমি তোমাকে বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করলাম, অথচ এখন তুমি আমাকেই ঘৃণ্য পশুর মতো বিতাড়িত করতে চাইছ। তাহলে কেন বেরিয়ে এলে সেই অন্ধকার কুঠুরি থেকে? তুমি কি অস্ত্রের প্রহরায় বন্দিনী হয়েই থাকতে চাও? কেন বারে বারে অস্ত্রের কথা উচ্চারিত হয় তোমার মুখ থেকে? বলো, বলো তুমি?’

‘এই তুমি পুরুষ? নারীকে যখনি বুঝে উঠতে পারো না, নারী তখনি হয়ে যায় দুর্বোধ্য, মায়াবিনী, ছলনাময়ী? বা:, চমৎকার! আমি বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম আলোর নীচে দাঁড়াব বলে। তুমি শুধু আমার বেরিয়ে আসাটাই দেখতে পেয়েছ, দেখতে পাওনি তার প্রেক্ষিত। তুমি অদূরদর্শী। অবোধও। তা না হলে কেন তুমি হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে নিজের পৌরুষ খোয়াবে? হাতিয়ার স্খলনের কথা আমি বারংবার বলে সেখানেই তোমাকে আঘাত করতে চেয়েছি। তুমি তাও বুঝতে পারোনি।’

‘তুমিও আমার অস্ত্র ভূপতিত হওয়ার গূঢ়তা বুঝে উঠতে পারোনি। জগৎ হবে প্রেমের। অস্ত্র সেখানে প্রতিবন্ধক। অস্ত্রের গায়ে রক্তক্ষরণ, আগ্রাসন, অশ্রুপাত আর সভ্যতার বর্বরতা ও কলঙ্কের ইতিহাস লেখা রয়েছে। আমি অস্ত্র ফেলে দিয়েছি, তোমার প্রতি মুগ্ধতার কারণে, তোমাকে ভালোবাসার কারণে।’

‘মিথ্যে কথা! ভালোবাসা নয়। তুমি মোহগ্রস্ত হয়ে অস্ত্র ত্যাগ করেছ। কামাসক্ত হয়েও। মোহ ক্ষণস্থায়ী। তুচ্ছ। তুমি তুচ্ছ কারণে যেকোনো দিন আমাকেও ত্যাগ করতে পারো। তা ছাড়া সে-অস্ত্র ত্যাগ করার কোনো অধিকার তোমার নেই। দায়িত্বের প্রতীক হয়ে তা তোমার ওপরে ন্যস্ত ছিল। অস্ত্র ফেলে দিয়ে তুমি প্রমাণ করেছ তুমি দায়িত্বহীনও।’

‘আমি দায়িত্বহীন মোটেই নই। দায়িত্বহীন হল সেই পুরুষ তোমার সেই অঙ্গদ, যে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া তোমার বিপদের সংবাদ পেয়েও এখনো অব্দি তোমার বিপন্মুক্তির জন্য এসে পড়ল না।’

‘আমি জানি, সে আসবেই। না এসে থাকতে পারবে না। তারই প্রতীক্ষায় আমি থাকব। আমার জীবন গুণাগার দিয়েও।’

‘থাকো তুমি। নারীর জিদ নিয়ে। হৃদয়হীন জিদ বজায় রেখে যদি তুমি জয়ীও হও, তাহলেও মনে রাখবে, তোমার প্রতিটি জয়-ই পরাজয়ের নামান্তর। নারীর জিদ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়। বাস্তব-অবাস্তব বিবেচনা জানে না। তাই তার পরিণতি হয় ভয়াল। তবে এটাও জানিয়ে রাখি, আমি অস্ত্রের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতেও হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দিয়েছি। অস্ত্র অস্ত্রেরই দাসত্ব শেখায়। প্রেম হৃদয়ের দাসত্ব করে। হৃদয়ের মুক্তি আনে। আমি প্রেমিক। আমি কেন প্রতিটি মুহূর্তে অস্ত্রের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকব?’

‘পুরুষ বলে। এটাই তোমার অভিশাপ। এই অভিশাপের খেসারত দিতে, প্রায়শ্চিত্ত করতে যাবজ্জীবন তোমাকে অস্ত্রের অন্বেষণে হাহাকার করে যেতে হবে। বস্তুত, নারী অপেক্ষা পুরুষই হল প্রকৃত দুর্বল। হাতে অস্ত্র না পেলে পুরুষ কখনো নিজেকে বলীয়ান ভাবতে পারে না। কাজেই অস্ত্র থেকে তোমাদের নিস্তার নেই। তা ছাড়া দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতেও তো অস্ত্রের প্রয়োজন? পুরুষই জগতে দাসত্ব রচনা করে, আবার পুরুষই দাসত্বমোচনে সশস্ত্র হয়ে ওঠে। এরপরেও কি অস্ত্রকে অস্বীকার করতে পারো?’

‘জগতে আমি নারী বই আর কিছুকে স্বীকার করি না। নারী সত্য, নারীই মায়া, নারী জাগরণ আবার নারীই জীবন ও জগতের অদৃশ্য নিয়ামক। পুরুষের সর্বকর্ম-ধর্মের চরমতম ও অভীষ্ট লক্ষ্য হল নারী।’

‘তোমার বিনাশ আসন্ন। ধ্বংসের আগে, পতনের আগে পুরুষ এভাবেই অন্ধ হয়ে যায়।’

‘অন্ধত্বের চক্রনেমিতেই জগৎ-সংসার ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রেম-ভালোবাসা-আবেগ-হাহাকার সবই তো অন্ধ। অন্ধ রিপুর তাড়নায় আবর্তিত হচ্ছে মানুষের পিপাসার্ত জীবন। পিপাসা থেকে যেমন মানুষের চিরকালীন মুক্তি সম্ভব নয়, তেমনি এই অন্ধত্ব থেকেও নয়। অন্ধত্ববিনা জগৎ অসার। অসুন্দর। মনে রেখো, আকাশ অন্ধকার হলে তবেই উজ্জীবনের বার্তা নিয়ে এই মায়াময় বসুন্ধরায় বরিষণ নামে। ফুল ফোটে।’

বা:! চমৎকার! কিন্তু এই ভাব ও যুক্তি সংবলিত চাপান-উতোরের অবকাশ আর নেই। উত্তরোত্তর তীব্র হয়ে আসছে দলবদ্ধ গ্রামবাসীদের কোলাহল। তারা কি এতক্ষণে ধ্বংস-ধ্বস্ত করে দিয়েছে অঙ্গদদের বাসভূমি? সদরের ফড়কি ভেঙে দিয়ে সদলবলে ঢুকে পড়েছে ঘরের ভেতরে? কে তাদের আক্রমণ ঠেকাবে এখন? ঘরে আছে নিষ্পাপ শিশু ও রমণীর দল। আছে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। তাদের পক্ষে প্রতি-আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসা তো দূরের কথা, আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখেও তারা দ্রুত ডেলিকচা থেকে পালিয়ে অন্যত্র কোথাও আত্মগোপন করতেও পারবে না। যদিও, তাদের সম্বল বলতে যেটুকু অস্থাবর ধন আছে, তারা সেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টার্জিত ধন ফেলে কি পালিয়ে যেতে চাইবে? হয়তো তারা হাতিয়ারের কাছে নতমস্তক হয়ে বলবে, ‘হামরা জানি নাই বাপ। কুছু জানি নাই। পরের বিটিছ্যেলাকে ভাগায় আনতে হামরা বলি নাই। তুমরা হামদের ছাইড়ে দাও। যদি ডণ্ড দিবে, ত দাও যে আইনেছে তাকে।’

‘কন ধারে গেছে তোদের বড় ব্যাটা? হামরা উয়াকেও ছাড়ব নাই। আগে বল বিটিছ্যেলেটিকে তরা কথায় রাইখেছিস? বল নাই ত বাছাকে—!’

তারা জবাবের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না। ঘরের ভেতর থেকে মাটির হাঁড়ি-খোলা টেনে টেনে নিয়ে আঙিনায় ছুঁড়ে ভাঙতে শুরু করবে। বগলদাবা করে যে-যা পারবে নেবে তাদের ব্যবহার্য বাসনকোসন। কেউ চালার রলা থেকে ঝুলতে থাকা ভুট্টার গোছ টেনে ঝাঁইক্কে নামাবে। গামছায় বেঁধে পিঠে ফেলে চম্পট দেবে। আর সহদেব? সঞ্চারী? তারা চোখের জল ফেলতে ফেলতে যৎপরোনাস্তি গালিগালাজ করে যাবে কুলাঙ্গার বড়ো ব্যাটাটির নামে। বলবে, ‘অঙ্গারে! তুই শেষতক ঘরসংসার রাইছাই করে দিলি! ই-কানা খালভরা য্যা হামদের সর্বস্ব ভাঁসায় দিল ওই কালকুদরিটার লাইগে। ওই কালযুগনিটা হামার ব্যাটাকে কী খাওয়ায় দিঁয়েছে গোওওও...’ এভাবে অঙ্গদকে নিয়ে গালাগাল করতে করতে জারমণিকেও কি তারা ছেড়ে দেবে?

তারা তো আগেই অনুমান করেছিল এমনই ঘটবে। যে-‘কালকুদরি অপ্সরা’কে অঙ্গদ ঘরে এনে ঢুকিয়েছে, সে আসলে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো ‘কালনাগিনী’। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ হলেও কোথাও লুকিয়ে রেখেছে তার বিষের পুঁটলি। আজ সেই বিষে জরোজরো হয়ে গেল তাদের জীবন। ধ্বংসস্তূপ করে দিয়ে গেল বসতভূমি। এই শ্মশানে তারা আর কীভাবে থাকবে? আশপাশের গ্রামবাসীদের কাছে কী করে মুখ দেখাবে। এমন ছিছিক্কার কান্ড!

ধাবিত মানুষের আরো জোরালো চিৎকার ভেসে আসছে। ক্রমশ তা এগিয়ে আসছে এদিকে। উত্তেজিত কন্ঠস্বরে শোনা যাচ্ছে অঙ্গদের নাম। কোথায় অঙ্গদ? পালিয়েও কি সে বাঁচতে পারবে এই জনরোষ থেকে? কোথায় পালাবে সে? কোথায়?

অঙ্গদ গ্রামে নেই। তবে এই সময় তার তো ডেলিকচাতেই এসে পড়ার কথা। সে কি আসবে?

‘নাই।’ জীবনডির মোড়ে তাকে কয়েকজন দেখতে পেয়ে আটকে দিয়েছে। তার প্রতিবেশী লুলকা বাউরি বলেছে, ‘খোবোড়দার। তোর এখন ডেলিকচায় ঢুকা চলবেক নাই।’

‘ক্যানে?’ ঘটনা অনুমান করেও জানতে চায় অঙ্গদ।

‘পলপলের উয়ারা তোদের ঘর-দুয়ার সোব ভাইঙ্গে-ভুইঙে ছ্যাছরাফুটা করে দিঁয়েছে। খুঁজে বুলছে তকে। মারার লাইগে।’

‘আর জারমণি?’

‘উয়াকে পাওয়া যাছে নাই।’

‘ছাড় হামকে। তরা যাতে দে।’ অঙ্গদ তার গ্রামে যাওয়ার জন্য পীড়াপিড়ি করতে থাকে। শুধু জারমণিই না, সে এই বিপদে ঘরের লোকের পাশে গিয়েও কি দাঁড়াবে না? জারমণিকেও খুঁজে দেখা দরকার। যদি সে কাছাকাছি কোথাও আত্মগোপন করে রয়েছে অঙ্গদের আসা পর্যন্ত?

‘হামাকে যাইতে দে তরা।’ যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে অঙ্গদ। তাকে বোঝানো হয়, এভাবে বোকার মতো নিজেকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেওয়ার তো মানে হয় না। এই মুহূর্তে পলপলের গ্রামবাসীরা মারমুখী। অঙ্গদের ওপরেই উত্তেজিত জনতার যত আক্রোশ। এখন তাকে পেলে কি তারা ছেড়ে দেবে? মারতে মারতে নিয়ে যাবে পলপলে। সেখানে প্রবল ফুর্তিতে তাকে বেধড়ক মারধোর করে বাঁধের ‘পৈন’-এ ফেলে রেখে চলে যাবে। অথবা এই জঙ্গলেই তারা হিসেব পুরা করে দেবে। কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ ‘পড়াশি’র ডাল ভেঙে উপরা-উপরি তার পিঠে বসাতে থাকবে। তাকে আধমরা করে ভিড়ভিড় করে পালিয়ে যাবে সবাই। অঙ্গদ পড়ে থাকবে জঙ্গলেই। একা। এমন পরিণতি জেনেও কি সে ডেলিকচা যাবে?

অঙ্গদ ভয় পেয়ে যায়। ধকধক করতে থাকে বুক। সে কী করবে না করবে তা চিন্তা করারও ফুরসত পায় না। জীবনডির মোড়েই ছিল একটি ভাটার ইট চালানো ট্রাক। ইট নামিয়ে মজুরদের নিয়ে খালি ট্রাকটি ফিরে যাচ্ছে তুলিন গ্রামে। সুবর্ণরেখা নদীর তীরে ইটভাটাটিতে। নদীর ওপারে মুরি, কাঁচ-কারখানা। মোড়ের লোকজন একরকম জোর করেই অঙ্গদকে ট্রাকের ওপরে তুলে দেয়। ট্রাক ঘুরে চলে যায় আড়ষা রোড ধরে। আড়ষা রোড থেকে জারগো মোড়। মাঠারিকে একপাশে রেখে, ঝালদা হয়ে তুলিন।

আর জারমণি? সে কি এখানেই থেকে যাবে? নিজের বিপদের কথাও সে ভেবে দেখবে না? পাটন তাকে নিয়ে যেতে পারে না। পারে না তার দুর্নিবার ক্রোধ প্রশমিত করতেও। দ্যুতিহীন আলোয় আবছা তার মুখ। খোঁপা খুলে যাওয়া মাথার রুক্ষ চুল নদীতে পিটপিটি মাছের ঝাঁকের মতো কেঁপে কেঁপে উড়ছে হাওয়ায়। উড়ছে আঁচল। আর ততই প্রকট হয়ে উঠছে তার সবৃন্ত স্তন। আলো আঁধারিতে আরো বেশি রহস্যময় ও উত্তেজক দেখায় জারমণিকে।

পাটন আর সংযম নিয়ে থাকতে পারে না। ক্রমশ জেগে উঠতে থাকে তার আদিম আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষাই তাকে আরো বেশি বন্য-বর্বর করে তুলল। যুক্তি নয়, প্রেম নয়, করুণা নয়, আকুতিও নয়। তার মনে হল, সবকিছু ব্যর্থ হয়ে গেলে পুরুষকে তার পৌরুষ নিয়েই জেগে উঠতে হয়। সে আর অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে, টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করল জারমণিকে।

তখনো, তার সেই ভয়াবহ লিপ্সার প্রকাশ দেখেও, পালিয়ে এল না জারমণি। সে কয়েক পা পিছিয়ে এসে এদিক-ওদিক তাকায়। ‘লাকড়ামুতা’ গাছটির গায়ে ঝুলতে থাকা ভাঙা শুকনো ডালটি সে হেঁচকা মেরে ছাড়িয়ে নেয়। দু-হাতে সেই ডালটি সাঁওতালের ‘কাপি’র মতো শক্ত করে ধরে। জিনগা-মাঈয়ের শক্তি নিয়ে রণরঙ্গিনী মূর্তিতে ঘুরে দাঁড়ায় তার মুখোমুখি। আর বলে, ‘তোর মাত লাইগেছে? ঘুন্নিয়ে বসবি? আয় আওগা! আওগা তুঁই! হামি এখনি তোর মাত ছাড়াব। আয় তুঁই—’

কামান্ধ পাটন! কোনো সতর্কবাণী তাকে এই মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে পারে না। সে সাহস করে এগিয়েও যায়। জারমণি তার সারাশরীরের বল একত্রিত করে, ঝপাং ঝপাং ঘা মারতে থাকে তার কাঁধে, পিঠে। তার ঘাড়ে, মাথায়। প্রবল উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে এবার সে এমন কিছু কথা বলে ফেলে, যা এতক্ষণ অব্দি গোপন করেই রেখেছিল। আর তার থেকে বোঝা যায়, সেদিন জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রে পাটন যখন দরজা ফাঁক করে ঢুকে পড়ে জারমণির ঘরে, তারমণি তখন মোটেই ঘুমে অচেতন ছিল না। সে জেগেই ছিল। এবং জেগে-জেগেই দেখতে চেয়েছিল এই ঘৃণ্য পুরুষটির স্বরূপ। এখন তার জের টেনে প্রতি প্রহারে বলতে থাকে, ‘দেখবি হামকে? লে দেখ। দেখ তুঁই! আর কী দেখবি? কত দেখবি? দেখ তুঁই—’

আশ্চর্য! এর পরেও পাটনকে সে তেমন কাহিল করতে পারে না। লোভ-লালসা-রিরংসার মৃত্যু কি সহজে হয়? সে যে নাছোড়বান্দা! সে ফের জেগে ওঠে।

ততক্ষণে জারমণিও হাঁপিয়ে উঠেছে। এই সুযোগ বুঝে পাটন তার হাতের নিষ্পত্র শাখাটি ধরে ফেললে, জারমণি অসহায় হয়ে পড়ে। সাহায্যের জন্য এদিক-সেদিক তাকাতে থাকে। কেউ কি নেই? কেউ কি আসবে না? ধাবিত মানুষের কোলাহল শুনতে পায় সে। তাদের দেখতে না পেয়ে দৃষ্টি উচ্চে তুলে সেদিকে তাকায়, যেদিকে জিনগা-ডুংরি। সে বিশাল ব্যাপ্ত আকাশের দিকে তাকায়, যে-আকাশ প্রাক-সায়াহ্নে জঙ্গলের শাখাপ্রশাখায় আড়াল হয়ে রয়েছে। সে দিগন্তের প্রায়াস্তমান সূর্যের দিক তাকায়, সে-সূর্যের অন্তিম আভাটুকুও প্রায় বিলীন হতে বসেছে। সে কলরবরত পাখিদের দিকে তাকায়, অরণ্য পরিবৃত গাছেদের দিকে তাকায়। তারপর তাদের প্রত্যেকের কাছে এই প্রগলভ পুরুষের কৃতকর্মের জন্য বিচার তথা দন্ডভিক্ষা চেয়ে সে উচ্চকিত কন্ঠে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে তীব্রভাষায় বলে যেতে লাগল, ‘আমি এই অরণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে, প্রতিটি মৌন সাক্ষী বৃক্ষের কাছে আমার মিনতি জানাচ্ছি—এই লাম্পট্যের বিচার করো। যে-পুরুষ তার শরীর-বলে অসমকক্ষ নিরস্ত্র নারীকে পরাহত করতে চায়, তাকে সরীসৃপের লাঙুলের মতো নির্বল করো!’ সে বালসায়াহ্নে আচ্ছন্ন আকাশের পানে চেয়ে বলল, ‘আমি এই অসীম পরিব্যাপ্ত গগনতলে আশ্রিতা। হে গুরুগম্ভীর অম্বর, তুচ্ছ কীটের এই ধৃষ্ট আগ্রাসনের নির্মম বিচার করো! যে-কামান্ধ পুরুষ, নারীকে ছলনা করে বিপথে নিয়ে যেতে অভিলাষী, দন্ডস্বরূপ তার চক্ষু উৎপাটিত করো!’ সে ডালে ডালে কলরবপ্রিয় পাখিদের দিকে চেয়ে বলতে লাগল, ‘হে উড্ডীন! হে দলবদ্ধ পক্ষীকুল! এই ঘৃণ্য স্বার্থান্বেষীর বিচার করো। যে সহোদরের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সেই বিশ্বাসহন্তারককে উচিত শিক্ষা দাও। দন্ডস্বরূপ তার কলঙ্কিত অংসদ্বয় ডানার ন্যায় কর্তন করো, যাতে আর কোনোদিনও সে ওই স্কন্ধে ধনুর্বাণ ধারণ করতে না পারে।’ আর সে অস্তগিরির অন্তরালে অদৃশ্যমান সূর্যকে বলে উঠল, ‘বিচার করো—হে অস্তোন্মুখ, হে অস্তাচলগামী! হে বিবস্বান! বিচার করো! বিচার করো—তেজরূপ অহংকারের, বীর্যরূপ আত্মম্ভরিতার, কামরূপ অগ্নির। বিচার করো এই ভন্ড, কপট ও কুচক্রীর! যে রিপুর তেজে মদমত্ত, তাকে তোমার মহাতেজ দেখাও! তাকে লীন করো, ভস্মীভূত করো!’ সে ঘর্মাক্ত কলেবরে উর্ধমুখী হয়ে এবার করজোড়ে বলতে লাগল, ‘হে অষ্টদিকপাল! হে ইন্দ্র বহ্নি যম নৈঋত বরুণ মরুৎ কুবের ঈশান...’

এলোমেলো চুলে প্রায় ঢেকে যাওয়া তার কাতর ও ক্রুদ্ধ মুখটি তুলে সে জিনগা-থানের দিকে করজোড়পূর্বক পাটনকে দেখিয়ে বলে যেতে লাগল, ‘হে ধীরোদ্ধত! হে জিনগা-মাঈ! যদি তুমি চক্ষুষ্মান হও! যদি তুমি অহোরহ নিমিলিত থাকো, যদি এই চরাচরের প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী থেকে থাকো, তাহলে এই বামার প্রতি সংঘটিত অবিচারের ন্যায়পূর্ণ বিচার করো! মৃত্যুতুল্য দন্ড দাও!’

তারপরও সে নির্বাক হতে পারল না। তখনো তার ভেতরে প্রতিশোধের আগুন গসগস করছে। সে বিদ্বিষ্ট নয়নে সেই নিপট নরাধমের দিকে তাকিয়ে, তার বামহস্ত প্রলম্বিত করে বলে যেতে লাগল, ‘তুমি অক্ষম্য! তুমি দন্ডার্হ! তুমি রজোদর্শনকালে অসংবৃতা নারীর যোনিদেশে উঁকি মেরেছ! তুমি পুরুষের ধর্মচ্যুত হয়েছ! তুমি নিন্দ্য! অভিসম্পাতযোগ্য তুমি! পরজন্মে তুমি অন্দরমহলের খোজা-প্রহরী হয়ে করুণ জীবন কাটাবে!—শোনো তোমরা, শোনো। হে ক্রন্দসী, হে আকাশ-আসমান, ডুংরি-পাহাড় আর অরণ্যের প্রতিটি বিরুৎ-গুল্ম-বৃক্ষ। তোমরা প্রত্যেকে শুনে রাখো, আমি অভিসম্পাত দিচ্ছি’, সে পাটনের দিকে তার তর্জনী উঁচিয়ে চিৎকার করে-করে বলতে লাগল, ‘তুঁই নপুংসক হবি! নপুংসক হবি! নপুংসক হবি!’

প্রতিধ্বনি উঠল জঙ্গল জুড়ে। ডালে ডালে কলরব করে উঠল যত পাখির দল। কয়েক দন্ডের জন্য গোটা তল্লাট নিশ্চুপ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর রে-রে করে ছুটে আসতে লাগল মারমুখী গ্রামবাসীরা। সন্ধ্যা নেমে এল।

রাতে হরিবোল মন্দিরের থামে দড়া দিয়ে বেঁধে রাখা হল পাটনকে। রাতভর সে এভাবেই থাকবে। এখানেই। সকালে হবে তার অন্য বিধান। সে-বিধান যে কতটা আদিম, কতটা নিষ্ঠুর এবং ভয়াবহ তা পাটনের অজানা নয়। ভাবতে গেলে তার শরীর ও মন হিম হয়ে আসে। তবু একটি বারের জন্যও সে গ্রামবাসীদের কাছে তার অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করেনি। চিৎকার করেনি, চোখের জল পর্যন্ত ফেলেনি। যদি কখনো অসতর্কতাবশত তার শুকনো চোখের কোল বেয়ে নি:শব্দে একটি অশ্রুর ফোঁটা গড়িয়ে পড়েছে, তবে তা কখনোই গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়ে গিয়ে তাদের অমানবিক প্রহার ও অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য নয়, তাদের অনুকম্পা আদায়ের জন্যও নয়। অপরাধী পাটনের প্রতি তাদের সহানুভূতি উদ্রেকের উদ্দেশ্যেও নয়। ভাষাহীন নীরব সে-অশ্রু একান্তই ছিল জারমণির প্রতি নিবেদিত।

সেই বেদনার্ত অশ্রুবিন্দুটি কি জারমণির চোখ এড়িয়ে গেছে? ভিড়ের ভেতর থেকে যখন তাকে টেনে আলাদা করে নিয়ে চলে গেল, তখন, সেই আবছা অন্ধকারে শেষবারের মতো সে কি তাকিয়ে ছিল? পাটনের অতৃপ্ত, করুণ, বিস্মিত চোখ দু-টির দিকে? যদি একটি বার সে তাকাত...জারমণি! জারমণি!

জারমণি তাকিয়েছিল। তাকিয়েছিল সে তার পাষাণ হৃদয় নিয়ে। ভিড়ে ঠেলাঠেলি করে, কবজি ধরে টেনে তাকে বের করে নিয়ে আসা হচ্ছিল। তারই একফাঁকে, হয়তো শেষবারের মতো, সে দেখে নিতে চেয়েছিল ওই পুরুষটিকে, যে একটি নারীর জন্য শেষমেশ অস্ত্র ধরতে পারল না। ভীরু, কাপুরুষ! যে বীরের মতো লড়াই করে ছিনিয়ে নিতে পারল না তাকে। তার আকাঙ্ক্ষিত রমণীকে। কেবল ‘রমণ’ নয়, ‘রমণী’র মধ্যেই যে রয়েছে অবিচ্ছেদ্য ‘রণ’। তাকে লাভ করতে হলে যোদ্ধৃ-বেশে দাঁড়াতেই হয়। এখনো কি তার সে-শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি?

জগতে কোনো মানুষ পালিয়ে বাঁচতে পারেনি। পারবেও না। এ জগৎ পলাতকদের জন্য নয়। পলায়নকামী মানুষের আকাঙ্ক্ষা কোনোদিনই পূরণ হয় না। তারা অন্যের চোখে উপেক্ষার পাত্র। অবজ্ঞেয়। জারমণিও কি উপেক্ষার দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল পাটনের দিকে? নাকি সে বিদায়-ক্ষণে, অন্তিম মুহূর্তে তার লাঞ্ছিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল—জিনগা-মাঈয়ের কৃপায় যা হয়েছে তাও অহিত হয়নি। অন্তত এই পরাজয় থেকেও তুমি শিক্ষা নাও। জগতে জয় অপেক্ষা পরাজয় মহার্ঘ। জয়ে অধ্যায়ের শেষ, পরাজয়ে অধ্যায়ের সূচনা। জয়ী নিজেকে অহংকারী ও প্রতিপক্ষকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে শেখে। কিন্তু পরাজয়?। মানুষকে শোচ্য অভিজ্ঞতায় ও শাশ্বত নীতিবোধে প্রবুদ্ধ করে তোলে, তাকে লক্ষ্যাভিমুখী করে এবং তার ব্যবহৃত পরিত্যক্ত মরচে ধরা হাতিয়ারে নতুন করে শান দিতে শেখায়। পরাজয়ের সারস্বত অবদান সুদূরপ্রসারী এবং চিরকালীন। চোখের কোলে একটি প্রচ্ছন্ন অশ্রুবিন্দুতে তা ধরে রাখতে হয়।

কেঁদে ফেলেছিল জারমণি। বস্তুত, সে তো কাঁদতেই চেয়েছিল। যথাসময়ে তার অশ্রুর পতন ঘটবে। সিক্ত হবে তার চরণস্পর্শী ধরাতল। বুকের ভেতরে পুঞ্জীভূত, অবদমিত সেই চোখের জল খালাস করতে পেরে সে মুক্তির আনন্দ অনুভব করবে। যেদিন সে তার যাবতীয় বন্দিত্ব থেকে, অন্ধকার থেকে নিজেকে মুক্ত করে আলোয় এসে দাঁড়াবে। এই কান্না কি তার সেই অন্তর্ব্যাপ্ত হর্ষোল্লাসের অভিব্যক্তি? এই কি তার আলোয় এসে দাঁড়ানো?

না-না-না। এ তার সেই কঠোর, নির্মম পণ করা কান্না নয়। এ যে বড়ো ব্যক্তিগত একান্ত অশ্রুপতন। যা অপ্রকাশ্য থেকে গেল। ভিড়ের ভেতর থেকে ঠেলাঠেলি করে বের করে, তাকে তৎক্ষণাৎ পৌঁছে দেওয়া হল ঘরে। সেখানে কারো সঙ্গে একটিও কথা বলল না জারমণি। মায়ের সঙ্গে না। ভাইদের সঙ্গে না। তাদের কৌতূহল ও জিজ্ঞাসাগুলিরও জবাব দিল না কোনো। ঘরের বাইরে থেকে, কারা যেন কলঙ্ক জ্ঞানে, গোচারণ-ভূমি থেকে ফিরে আসা গবাদির মতো পশ্চাদ্দেশে ধাকলানি দিয়ে চৌকাঠের ওপারে ঠেলে দিল তাকে। হেঁশেলের দরজায় গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল জারমণি। আর সেই দরজার গায়ে ঝুলতে থাকা লোহার শিকলটিতে মাথা রেখে, সে আচমকা কেঁদে উঠল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।

সদরের দরজায় হুড়কা দিল তার মা। পার্বতী।

ছাগল চোরের মতো নিয়ে আসা হল পাটনকে। জীবনডির মোড়ে উঠে বাঁদিকে আড়ষা রোড ধরে। চিটিডি পেরিয়ে ওরা ঢুকে গেল পলপলে। গ্রামের হরিবোল মন্দিরটি ঘিরে যত কৌতূহলী মানুষের গাদাগাদি। পাশাপাশি ঘরগুলো থেকে উঁকি মারছে বুড়িরা। কমবয়সি মেয়ে-বউরা কেউ বেরিয়ে সদরের চৌকাঠে দাঁড়ায়নি। অদম্য আগ্রহ নিয়েও তারা ঘরে রয়েছে। ঘটনাটি যে বড়ো কলঙ্কজনক।

কিসের কলঙ্ক? ভালোবাসা কি কখনো কলঙ্কিত হয়? প্রেমাকাঙ্খী ঘটনায় নারী-পুরুষ কাউকেই কি দায়ী করা যায়? সব ক-টি প্রশ্নের জবাবেই জড়িয়ে আছে ‘অন্ধকার’। তাই জারমণি যখন জঙ্গলের ভেতরে ছুটে আসা গ্রামবাসীদের দেখে, হাতে হাতে লাঠি-সাটিক, গাছের ডাল নিয়ে যারা মানুষকে আঘাত করতে প্রবল উদ্যম নিয়ে দৌড়াচ্ছে, এবং তারপরও যখন এই গ্রামে সে তাদের কীর্তিকলাপের সংবাদ পেতে থাকে, তখন তার মনে হয়— ডেলিকচায় যে-ঘরটিতে সে পুরুষের প্রহরায় পুরুষের হাতে বন্দি ছিল, সেই ঘরের ভেতরে দৃশ্যত অন্ধকার থাকলেও, সভ্যতার পরিপন্থী প্রকৃত অন্ধকার আছে মানুষের মনে। দৃশ্য অন্ধকার তো প্রকৃতির সৃষ্টি কিন্তু মানুষের জটিল, কুটিল ও সংস্কারাচ্ছন্ন মনের ভেতরে যে অদৃশ্য লুক্কায়িত বর্বর অন্ধকার থাকে, তা ভয়াবহ। কুঠারাঘাতেও সে-তিমির নিশ্চিহ্ন নির্মূল করা যায় না।

এই ভাবনার সূত্র ধরে, জারমণি, ক্রমশ ফিরে আসতে থাকে তার সংবিত্তি নিয়ে। তার বোধে। চৈতন্যে। তার সূত্রপাতও হয়েছে সেই ব্যক্তিগত গোপন কান্না দিয়ে। ওই কান্না দিয়ে সে ধুয়ে দিয়েছে তার পাষাণ হৃদয়। সে নিজেই প্রশমিত করতে পেরেছে নিজের উগ্রতা ও চিত্তবিভ্রমকে। প্রজ্জ্বলনমুক্ত করেছে তার চন্ড-মুন্ড ক্রোধানল। তাই এখন সে যেমন চিনতে পারছে নিজেকে, তেমনি পাটনকে, আর ওই—ওই—অঙ্গদকেও।

আর অঙ্গদ! এই অঙ্গদের ভরসায় সে বেরিয়ে এসেছিল? অন্ধকার থেকে আলোয় দাঁড়াবে বলে? যার আগমনের প্রতীক্ষা ও প্রত্যাশায় থাকতে থাকতে সে নির্মম হয়ে গেল? সে লাঞ্ছিতা লুন্ঠিতা হচ্ছে জেনেও যে অকুস্থলে এসে পৌঁছল না? নিজের প্রাণের মায়া নিয়ে...বা:। বাহ রে অঙ্গদ। জারমণির মনে হতে লাগল অঙ্গদকে নিয়ে বলে ফেলা তার সুন্দর বাণীগুলি, ভাবনাগুলি যদি সে ফিরিয়ে নিতে পারত! যে-আরশি হাতের চেটোয় রেখে সে নিজের নয়, অহরহ অঙ্গদের প্রতিবিম্ব দেখতে পেত, যদি সেই আরশিটি পাটনের সামনে ভূতলে নিক্ষেপ করে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়ে উদাত্ত কন্ঠে বলতে পারত, অঙ্গদ নয়। কদাপিও নয়। আমার প্রকৃত পুরুষ তো তুমি! পাটন তুমি! তুমি পলায়নের কথা বললেও, স্বার্থপরের মতো একা পালিয়ে যেতে পারনি। সংঘর্ষ অনিবার্য ও আসন্ন জেনেও তুমি নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে অবিচল থেকেছ আমার সামনে। শুনে গেছ আমার ক্রোধোক্তি, কটূক্তি আর ভর্ৎসনা। এখন আমারও জ্ঞান ও চেতনার উন্মেষ ঘটছে। আমি বুঝতে পারছি, অঙ্গদের অনুপস্থিতিই আমাকে এমন হিতাহিত বিবেচনাশূন্য করে দিয়েছিল। তাই তোমার একটি সত্যভাষণকেও আমি সত্যতার মর্যাদা দিইনি। একতরফা শুধু খন্ডন প্রতি-খন্ডন করে গেছি। আমি এমনই অধম—তোমাকে শাপান্ত করতেও ছাড়িনি। আমিই নীচ। আমি ইতর। আমি অক্ষমার্হ। আজ আমার ভুলের জন্যই তোমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে। আমার প্রায়শ্চিত্ত হবে কীসে? জিনগা-মাঈ, আমাকে দন্ড দাও! আমাকে বন্ধ্যাত্বের অভিশাপ দাও! এর চেয়ে নারীর প্রবল অভিশাপ আর কী হতে পারে? তুমি ওই ডুংরির মাথা থেকে একটি পাথরখন্ড গড়িয়ে দিয়ে জানাও—যদি অদৃষ্টগুণে কখনো আমার স্বামীসহবাস হয়, তবে অদৃষ্টদোষে আমার এমন সুন্দর সুডৌল স্তনে যেন কোনোদিন মাতৃদুগ্ধের ক্ষরণ না হয়! সন্তান না আসে পেটে!

দরজায় মাথা কুটে কাঁদতে থাকে জারমণি।

‘বাঁধ ইয়াকে থাম্বাটার সঙে।’ হরিবোল মেলার থামটা দেখিয়ে বাঁকু বলল, ‘দঁড়িয়ে হবেক নাই, মটা দড়া দিঁয়ে বাঁধ। যেইসাকে তেইসা।’

আগুয়ানের মুখে কথা নেই। সে তেমনভাবে এগিয়ে আসছে না। আড়ালে আড়ালে রয়েছে। গ্রামবাসীদের কাছে তার মাথা যে হেঁট হয়ে গেছে। তবে এ ব্যাপারে গ্রামের লোকেরাই যথেষ্ট। তাদের একঘেয়ে বৈচিত্র্যহীন জীবনে নতুন কিছু একটা পেলে হল। হরিবোল মেলায় তাই ঠেলাগুঁতা বেড়েই চলেছে। ভিড়ের ভেতর থেকে ছ্যেলা-ছোকরারা দুষ্টু ও অশালীন মন্তব্যও করে বসে। পাটনকে উদ্দেশ করে।

পাটন নির্বিকার। এখন আর কোনো প্রতিক্রিয়া ফুটে ওঠে না তার মুখে, চোখে। বস্তুত, সে তার ধ্বস্ত ও প্রহৃত অখন্ড শরীর জুড়েই মেলে রেখেছে তার প্রতিক্রিয়া। সাটিকের উপর্যুপরি আঘাতে তার বাঁদিকের চোখটির পাশে কপাল থেকে ভুরুর নীচ অব্দি ফুলে উঠেছে। গাঢ় লাল হয়ে উঠেছে চোখের কোল। সারা পিঠ কেউ যেন দড়কৈচা বালি দিয়ে রগড়ে দিয়েছে। জায়গায় জায়গায় ছড়ে গেছে। পায়ে চাকড়া চাকড়া কাদা। লুঙ্গিতে কাদা। কনুইয়ে, বুকের ওপরেও শুকিয়ে যাওয়া কাদার ছাপ। ঠোঁটের কষে চোঁয়াচ্ছে ক্ষীণ রক্ত। ফুলে ওঠা ভারী চোখ নিয়ে সে যেন তাকাতেও ক্লান্তিবোধ করে। এমন আধমরা শরীরও দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হবে? তাও আবার শক্ত ও মোটা দড়ি?

দড়ি নিয়ে এল সঁড়ু মাহাত। এটাকে ঠিক দড়ি বলা চলে না। নাইলনের মোটা দড়াটা সে তাদের কোঠাঘরে, পাড়নতলে কোথাও খুঁজে পায়নি। হয়তো গোরুর গাড়িতে জেনারেটার তুলতে, বাঁধাবাঁধির জন্য উপরকুলহিতে তার কাকাঘরের কেউ চেয়ে নিয়ে গেছে। সঁড়ু বাঁকুখুড়ার ঘর থেকে একটা বিশ হাতের মরাই বাঁধা ‘বড়’ নিয়ে আসে। ‘সৈরে যাও রে বাবুরা! রক্ত ছিটকিবেক। প্লাও—’ বলে, গোটা নামোকুলহির লোককে হাসিয়ে সেটা ঘষটাতে ঘষটাতে সে হরিবোল মেলার কাছে আনে। বলে, ‘বাঁকুখুড়া, এখন সদ্যম ইয়াতে কাম চলাও। হামদের লাইলন দঁড়িটা কে জানে উপরকুলহিয়ে আছে। এখন এইটা দিঁয়েই শালাকে চোদ্দোপাক ঘুরায় ঘুরায় বড় বাঁধা বাঁধ। তা বাদে কই, পালাক দেখি কেমন পালাবেক। বোড়ৌ মরদ।’

‘পালাবেক? পালায় যাবেক কথায়?’ বাঁকুখুড়া বলল, ‘ইয়ার নামে হামরা ঢোল-শোহরত করে দিব!’

‘কী দরকার ইসোব করার? আমি একটি কথা বলব বাঁকুভাই?’ উপরকুলহির ঘটিরাম রাজোয়াড় আর থাকতে পারল না। সে বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করল বাঁকুখুড়া ছাড়াও অন্যান্যদের। বলল, ‘ইটা করাটা উচিত কাজ হছে নাই। যা করেছে স্যাটা মানুষেই ত করেছে? তাকে ক্ষমা করে দাও। ছাইড়ে দাও।’

‘ছাইড়ে দিব? পাছে তুমার মাথার ইসক্রুপ ঢিলা হঁয়ে গেছে নকি?’ ঘটিরামের প্রস্তাবটি শুনে বাঁকু আসমান থেকে পড়ল। এমনি অবাক হয়ে সে আগুয়ানকে সাক্ষী পুরে বলতে থাকে, ‘শুনলে? কেমন ধারার কথা বলছে আমাদের ঘটি?’

আগুয়ান কোনো মন্তব্য করে না। ঘটিরাম ফের বলে, ‘ঠিকেই বলেছি। যা বলেছি ক-ন বে-ঐন্যায় বলি নাই।’

‘ক্যানে বলো নাই?’

‘ক্যানে বলেছি?’

তর্ক শুরু হয়ে যায়। যোগ দেয় তাতে আরো যত র‌্যাঙহার দল যারা কেবল তামাশা দেখতে ভিড় করেছে। তারাই গলা চড়িয়ে, এলোমেলো তর্জনীর খোঁচা দিয়ে, হাতের ওপরে মুষ্ট্যাঘাত করে বলতে থাকে, ‘না! ক-ন মতেই ছাড়া চলবেক নাই। পলপলের বিটিছ্যেলার ইজ্জত নাই? ইজ্জত যদি থাকে—’

‘আছে। সবারেই ইজ্জত আছে। আমি উ-কথা বলছি নাই। আমি য্যাটা বলছি, তুমরা সোকৈলে একঠিনে হঁয়ে বুঝে দেখ।’

‘বুঝাবুঝির ইয়াতে কী আছে? হামি কি লেপড়া ঘরের বউকে ‘বাঁইচা’ দিতে যাছি?’

‘বউকে বাঁইচা?’ বাঁকুর রসাল উক্তিতে সবার সঙ্গে এবার আগুয়ানও হেসে ফেলে। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত ব্যবহার্য জিনিসপত্রাদি বছর দিনের চুক্তিতে নির্দিষ্ট টাকা অথবা ধানচালের বিনিময়ে অন্যকে দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন ঢোল, মাদল ইত্যাদি। খারাপ হয়ে গেলে তার মেরামতের দায়িত্বও মালিকের। ‘বাঁইচা’ এটাই। বাঁইচার প্রসঙ্গে বউকে টেনে আনাতে ঘটিরামের মানবিক বক্তব্যের গুরুত্বটি অনেকখানি লঘু হয়ে যায়। তবু সে আবার তাদের নিবৃত্ত করতে প্রয়াস চালিয়ে যায়। বলে, ‘আজ ডেলিকচার লোকে ই-কান্ডটা করেছে। কালদিন ত আমাদের পলপলেরও ক-ন ব্যাটাছ্যেলা করতে পারে? তখনকে?’

‘স্যাটা যাতে না হয়, সেই জন্যেই ত এই শাস্তির ব্যবস্থা। তুমার একার মতে চলবেক? গাঁয়ের এতগুলা লোক আছে, মুরুব্বি-মাতব্বররা আছে, সোকৈলে মেলে যেটা বলবেক স্যাটাই করা হবেক। তাথে যদি এমনও রায় হয় যে, ইয়াকে পহনা ছা-য়ের পারা জালের ল্যা বাইর করে হাপায় ছাইড়ে দিয়া হোক, ত হামরা ছাইড়ে দিব। কি ভাইগ্না?’

বাঁকুর মুখ থেকে আন্তরিক সম্বোধনটি শুনে বিহারীলাল চনমনিয়ে উঠল। বাউলদের মতো তার ঝাঁকড়া চুলে একটা ঝটকা মেরে বলল, ‘ছাড়াছাড়ির ক-ন সিন নাই। ই হামাদের বহুত ‘চিন্তার ট্যানস্যানে’ ফেলে দিঁয়েছে। ইয়াকে যদি ছাইড়ে দিয়া হয়, তাইলে ফের এমন কিত্তি করে বসবেক! ইয়ার মনের মতন ডন্ড হওয়া দরকার।’

‘ডণ্ড?’ ভিড়ের ভেতরে ঢুকে পড়ল এক বুঢ়া। কলেবর সিংসর্দার। অনেক দিন ধরে শবরদের প্রতি সে মনগড়া রাগ নিয়ে ছিল। সে দন্ডবিধানের প্রস্তাব শুনে বলল, ‘ডণ্ড দিবার হামরা কে? ডণ্ড দিবেক ওই উ—’ সে হাত বাড়িয়ে ঘোর অন্ধকারে ডুবে থাকা জিনগা-থানটিকে দেখায়। অন্যরাও কয়েক মুহূর্ত সেদিকে উড়াকল দেখার মতো নির্বাক চেয়ে থাকে।

ভোর হতেই বেজে উঠল ঢোল। ডুগু-ডুগু-ডুগু-ডুগু বাজনার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল জারমণির। বড়ো বিষণ্ণ ও মন্থর সে-শব্দ। তাই শুনে দু-জন-একজন করে ভিড় জমতে থাকে মন্দির চত্বরে।

ঘর-ঘর থেকে চৌকাঠ লাফিয়ে বেরিয়ে আসছে গোরু-কাড়া। অলস তাদের গতি। বাছুর হামলায়। গোমূত্র ত্যাগ করে। মন্দিরের পাশ দিয়ে, লাদতে লাদতে, কাঁধে ঘা নিয়ে কাড়া চলে যায়। অংসকুটে মাছি বসছে। খোঁড়া বাগাল তৈলাক্ত লাঠি বগলে নিয়ে মন্দিরে প্রণাম করে। মাটি ছুঁয়ে। উদাসীন তাকিয়ে চলে যায়।

মন্দিরে এখন আর সেই হই-চই নেই। উত্তেজনা থেমে গেছে। কেমন একটা শোকের আবহ। যদিও তাদের ‘সামাজিক’ ক্রিয়াকর্ম থেমে নেই। থামের পাশে অগুন্তি পাক নিয়ে পড়ে রয়েছে ‘বড়’টি। চালার নীচে দু-হাঁটুর মাঝে হেঁটমাথায় বসে আছে পাটন। ভিজে মাথা। ক্ষুর বুলিয়ে কামিয়ে দিচ্ছে বুড়া কিষ্ট লাপিত। বাজনা বেজে চলেছে। থামের পাশটিতে কলাগাছের মতো দাঁড়িয়ে ডমন কালিন্দী। আলতো চাপড় মেরে বাজিয়ে চলেছে তার গলায় ঝোলানো ঢোলটি। একই তালে। বিরক্তিকর!

কিষ্ট এই গ্রামেই থাকে। উপরকুলহিতে তার টালি-খাপরার ঘর। সারা গ্রামে সে ক্ষৌরকর্ম করে বেড়ায়। কাজে-ভোজে সবেতে তার ডাক পড়ে। তার বউও আসে। বিহাঘর, শ্রাদ্ধঘর, লত্তাঘরে এসে মেয়েদের নখ কাটে, সুন্দর করে আলতা পরিয়ে পা রাঙিয়ে দেয়। আর গজগজ গজগজ করে গল্প জুড়ে দেয় গৃহস্থ স্ত্রীদের সঙ্গে। সেই গল্পের বেশিটাই হল গ্রামের দেখতে না পারা ‘বাঁকা চালের’ বউদের নিয়ে। তাদের কত ‘ভিৎরি খোবোর’ যে সে জানে। কত বিচিত্র নিষিদ্ধ সম্পর্ককে তারা চুপে লালন করে চলেছে। ঘরে-বাইরে। বিচারে রায় বেরোলে কিষ্ট লাপিতের ক্ষুর ভোঁতা হয়ে যাবে। গোটা গ্রামটিকেই তখন ঘাটে তুলতে হবে। শুধু পলপল বলে না, প্রায় সব গ্রামেই এমনতর হাজারো উরুকীর্তি। আর প্রকাশ্যে চলছে এমনি ‘লেগ সারা’ বিচার। বিচারের নামে প্রহসন। লোকহাসি। ডুগু-ডুগু বাজনা।

ডমনের ঢোলটি আজকের নয়। বহুদিনের বহু ঘটনার সাক্ষী তার ঢোল। মাঝে-মধ্যে ফেঁসে গেলে ঢোল কাঁধে নিয়ে কণারবেড়া চলে যায়। মুচিঘর থেকে ছাইয়ে আনে। তবে এসব কাজে তো আর ঢোল ফাঁসে না। ঢোল ফাঁসে যখন সে আসরে গাহৈয়াদের দলে বাজায়। তেমন গাহৈয়া থাকিলে তাইড়ে বাজাতে হয়। নিজের কেরামতি না দেখালে লোকে ডাকবে কেন? বলবে, ‘নামহা ইয়াকে। ই কিত্তন পার্টির বাজনদার বঠে!’

এখনকার যুগটাই ঐন্য রকম। তুমি সুরে বাজাছো, ন অসুরে বাজাছো, স্যাটা লোকে নাই দেখবেক। আসরে যদি ধুলা উড়াতে না পারো, তইলে তুমার পেটে ভাত জুটবেক নাই।

তবে ঢোল-শোহরত করেও কিছুটা আয়-উপায় ডমন করে নেয়। সে থাকে মুষয়াটাঁড়ে। ধারেপাশে এ কাজ আর কেউ করে না। তাই ডাক আসে তার। হাটগুলিতে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে তাকে দিনক্ষণ জানিয়ে আসতে বলা হয়। কণারবেড়া, কালপুর, রগড়ি, ঝাঁপা, কদমপুর থেকে শুরু করে হারা, তিলাইটাঁড়—চারোধারের লোক ঝাঁ ঝাঁ তার ঘরকে আসে। ঢোল-শোহরতের বায়না নিয়ে। মাঝি-মাহাত-ভূমিজ সবারেই ডমনকে দরকার। গোরু হারালে, পরব-তিহারের কথা জানাতে হলে, বিচার বসলে—গ্রামে গ্রামে, এমনকী লাগোয়া হাটগুলিতেও ঢোল-শোহরত করে দিতে হয়। হয়তো বৈশাগ পেরিয়ে জষ্টি পড়ে গেল। রোদ-গরম কমছে না, বৃষ্টিরও নাম নেই। তাহলে চাষবাসের কী হবে? কখন আফরগাঢ়ি হবে আর কখন বিচ ফেলবে? লাগাও কীর্তন। ডমন গলায় ঢোল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ‘শুনঅ! শুনহ! শুনঅ!’ কুলহি-কুলহি বাজিয়ে বলে যেতে লাগল, ‘গ্যারামে যাতে জল-বরষাত হয়, জিনগা-মাঈয়ের ডাক শুনা যায়, তার হতে অমুক গ্যারামের ষোলোআনা কমিটি চোদ্দোপহর হরিনাম শুরু করছে। আজ তার ‘গন্ধ’ দিয়া হবেক। গ্যারামবাসীরা দলে দলে হরিমন্দিরে আসিঅঅঅ...’

দেখতে দেখতে হরিমন্দিরটি ঘিরে ভিড় বাড়তে লাগল। চিটিডি, জীবনডির মোড় থেকে দু-দশ জন এসে জড়ো হয়েছে।

কাল ঢের রাতে ডেলিকচা থেকেও লোক এসেছিল। তবে তারা মজা দেখতে আসেনি। এসেছিল পাটনকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। পাটনের বাবা-কাকা আসেনি। ভয়ে। লোক পাঠিয়েছে। প্রতিবেশী হাঁসুয়া বাউরি আর বিনন্দ বাউরি জনা পাঁচেক লোক নিয়ে পলপলে এসে ঢোকে। তখন ঝুরা ঝুরা বৃষ্টি পড়ছে। ‘ঘঙে’১১ ঢাকা তাদের মাথা। তারা অত্যন্ত অনুনয়ী হয়ে বলে, ‘দেখ, যা হবার হঁয়ে গেছে। ছ্যেলা মানুইষ। ভুল করেছে। তুমরা তাখে মাইর-ধোর করে ডণ্ড যা দিবার স্যা ত দিঁয়েছ। ইবার ছাইড়ে দাও। যদি বল, হামরা এখনেই গলায় কাপড় নিয়ে তুমাদের পায়ে পড়ে দিছি। মাফি মাঙছি। তাও হামদের টুকু কথাটা রাখ। বাপে-মায়ে ছ্যেলাটার হতে দমে কাঁদাকাটি করছে। জুয়ান ছ্যেলা।’

কিন্তু না। পলপলের লোকেরা তা মানেনি। উলটো বিনন্দকে ধাকলানি দিয়ে ভিড় থেকে বের করে দিয়েছে। বলেছে, ‘তুঁই ইয়াদের নিয়ে মানে মানে ডেলিকচায় ঘুরে যা। ইয়ার ডণ্ড হবেকেই।’

‘আ-র ডণ্ড?’ হাঁসুয়া বলে, ‘কী ডণ্ড দিবে? পাছে আ-র পিটাপিটি করবে নকি? উ ত এমনেই আধমরা হঁয়ে আছে।

‘না, আর পিটাপিটি লয়।’

‘তবে?’

সেই বুড়া কলেবর সিংসর্দার বলল, ‘ডণ্ড হামরা দিব নাই। হামরা ইয়াকে জিনগা-ডুংরিয়ে আটক রাইখে আসব। তাবাদে বাঁচাক-মরাক যা করার জিনগা-মাঈ করবেক।’

‘জিনগা-মাঈ!’

শুনে তাদের প্রাণ শুকিয়ে যায়। জিনগা-মাঈয়ের থানের পাশে পাটনকে এরা ঘরবন্দি করে রেখে দেবে! ভয়াবহ এবং নির্জন ডুংরিতে সেই পরিত্যক্ত ঘর, যেখানে যত পুরাতন বাস্তুসাপের আড্ডা। কে তাকে দেখবে? কে দেবে জল-পানি? কী করে সে বাঁচবে?

‘বাঁচার থাকলে বাঁচবেক। জিনগা-মাঈয়ের দয়া।’

হ্যাঁ, দয়া। তার মনে দয়া-মায়া নেই, এটা জোরের সঙ্গে কেউ বলতে পারে না। জিনগা-মাঈ যেমন চন্ডিকা, তেমনি করুণাময়ীও। এই নিয়ে এই লোকদেবীটি সম্পর্কে অঞ্চলের গ্রামবাসীদের মধ্যে কিছু লোককথা মুখে মুখে ঘোরে। তার একটি হল পিপাসার্তকে জলদান। বৈশাখ-জষ্টি মাসে একটি লোক নাকি শুকনো কাঠপাত কুড়াতে এসে, ঘুরতে ঘুরতে ডুংরিতে উঠে যায়। সেখানে ওঠামাত্র সে প্রচন্ড তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে। কাছাকাছি কেথাও জল দেখতে পায় না। আরো উঠলে জিনগা-থান। লোকটি ভয় পেয়ে যায়। ওপরে না উঠে কয়েক ধাপ নীচে নামে। পাথর গেঁথে বানানো একটি ঘর তার নজরে পড়ে যায়। দেখতে অদ্ভুত সেই ঘর। চারদিকে কোথাও জানালা নেই। ছোট্ট দরজা। একপাল্লার। কেউ যেন সেটা চেপে রয়েছে, ভেতর থেকে। দরজার গায়ে হাঁটু অব্দি উইঢিপি। দরজাটি খোলা অবস্থায় গ্রামের লোকরা কখনো দেখেনি। রহস্যময় এই ঘরটির ভেতরে কে আছে? কী-ই বা রয়েছে? লোকটি নিছক কৌতূহল বশত দরজাটিতে লাথি মেরে দেয়। খুলে পড়ে যায় দরজাটি। আর তৎক্ষণাৎ একটি বিষধর সাপ ফণা তুলে দাঁড়ায়!

লোকটি দিশা হারিয়ে ফেলে! ছুটে পালাতে গিয়েও পড়ে যায়। হাঁফাতে থাকে। পিপাসায় ছাতি ফাটে তার। এই সময় কোথা থেকে একটি বুড়ি আসে। পলাশপাতের দনায় জল নিয়ে। সেই জল লোকটির দিকে বাড়িয়ে বলে, ‘খাবি? জল তিষ্যাছে?’ লোকটি বুড়ির হাতের জল খায়। ওই টুকু জলে তার তৃষ্ণা মেটে না। বুড়ি বারে বারে জল এনে তার পিপাসা দূর করে।

জলপান করার পর লোকটি ভাবতে থাকে, কে এই বুড়ি। পরে যখন সে আশেপাশে কোথাও কুন্ড তো দূরের কথা, রোদে খরায় পুড়তে থাকা ডুংরিটিতে জলের একটি বিন্দুও দেখতে পায় না, তখন চমকে ওঠে! বুড়ি ততক্ষণে ছন্ন। লোকটি ডুংরি থেকে ছুটতে ছুটতে ক্যানেলপার দিয়ে গ্রামে ঢুকে যায়।

ওই বুড়িই পিপাসানিবারণকারিণী। বিপত্তারিণী। জিনগা-মাঈ। সব শুনে গ্রামবাসীরা ওই লোকটিকে তা-ই বুঝিয়েছিল। এখনো জিনগা-মাঈ বলতে তারা একটি বুড়িকেই কল্পনায় দেখে। সে কখনো শুকনো খটখটে ডাঙা থেকে পলাশ পাতের দনায় জল নিয়ে তৃষ্ণার্তকে দেয়, কখনো আঁধার রাতে পথ চিনিয়ে দিতে সহসা তার আবির্ভাব ঘটে। একলা পথিকের আগে আগে লণ্ঠন দুলিয়ে হাঁটতে থাকে।

জিনগার ডাকে বৃষ্টি আসা থেকে শুরু করে সব ক-টা প্রচলিত লোককথাতে দেখা যায় জীবের পালন এবং সৃজনে এই লৌকিক দেবীর একটি কল্যাণময়ী রূপ ফুটে ওঠে। হয়তো সে বৃষ্টির দেবী। তাকে ‘বরষা-ঠাকরুন’ বলা যেতে পারে। সম্ভবত সে-কারণে তার করালবদনা বা চন্ডিকা রূপ ফুটে ওঠার কোনো উপাখ্যান গ্রামের লোকেরা বলতে পারে না। যদিও তারা বিশ্বাস করে, জিনগা-মাঈয়ের চোখে ঘুম নেই। সে অষ্টপ্রহর বিনিদ্র থেকে মানুষের কর্ম দেখে যাচ্ছে। কর্ম অনুসারে ধর্ম। ধর্ম বুঝে দন্ড। জীবজগতে অধার্মিকের, অত্যাচারীর নিস্তার নেই। তার হাতের ‘বুচা টাঙি’-র চোট ঘাড়ে পড়বেই।

‘বুচা টাঙি’ হল যে-টাঙির মাথা ভেঙে গেছে। লোকে বলে, জিনগা-ডুংরির থানে সেরকমই টাঙি হাতে জিনগা-মাঈয়ের একটি মূর্তি আছে। সেই মূর্তি কেউ দর্শন করেছে বলে দাবি করে না। কখনো সে-কৌতূহলও তাদের হয়নি। তাদের দৃঢ় ধারণা জিনগার ব্যাপারে কৌতূহলী হলে তার পরিণাম অশুভ ও ভয়ংকর হয়। দীর্ঘ-দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ ঘরের রহস্য উদঘাটনের প্রবল আগ্রহ নিয়ে, যে-লোকটি দরজায় পদাঘাত করেছিল, সে কি তা টের পায়নি? তার গর্বিত কৃতকর্মের দরুন তাকে সাবধান করতেই তো দর্শন দিয়েছিল কালনাগিনীর রূপে সাক্ষাৎ দন্ডধর-ধর্মরাজ!

না দেখে থাকলেও গ্রামবাসীরা কেউ কেউ বলে যে, থানে জিনগা-মাঈয়ের মূর্তিটি নাকি ঘনকৃষ্ণ বর্ণের। গড়নটিও আদিবাসী ধাঁচের। তবে বামন বামন। হাত-পা বেঁটে, থ্যাবড়া নাক, পুরু ঠোঁট, হাঁ-করা মুখ। বক্ষদেশ স্বাস্থ্যপূর্ণ। গোল বিস্ফারিত চোখ। নগ্ন সেই মূর্তিটিতে কিছুটা বীভৎস রসেরও ছোঁয়া রয়েছে। যদিও জিনগা-মাঈয়ের কথিত রূপটি একটি বৃদ্ধার। ডুংরির চতুষ্পার্শ্বের গ্রামগুলির লোকজনদের ধারণা, থান থেকে জিনগা-মাঈ যখন নেমে আসে, তখন সে ‘বুঢ়ির ভেক ধরে নামে’।

ডেলিকচার লোকেরা চিন্তায় পড়ে যায়। বিনন্দও বুঝতে পারে, এই একগুঁয়ে জেদি লোকগুলোকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কোনোভাবে তারা বশে আনতে পারবে না। যদি পাটন না হয়ে এই ছেলেটি তাদের কারো হত, তাহলে সন্তানকে এমন নির্মম প্রহার করা এবং তারপরেও তাকে দুর্গম টিলায় রহস্যময় থানে ‘উৎসর্গ’ করার বেদনা তারা উপলব্ধি করতে পারত।

কথা না বাড়িয়ে বিনন্দ নিরাশ হয়ে চলে যায়। যেতে যেতে, শুধু বলে, ‘তুমরা মানুইষ হঁয়ে মানুইষের কাজ করলে নাই।’

‘কী?’

‘তুমাদেরই যদি মনে দয়া না থাকে, তাইলে পাষাণের থাকবেক?’

‘কী বললি? পাষাণ?’ জিনগা-মাঈকে পাষাণ বলে দেওয়াতে রেগে তেড়ে আসে কলেবর। বাঁকু তাকে আটকায়। বলে, ‘অ্যা বুড়া, চুপ মাইরে থাক ত। চুপ মার। বলতে দে যা বলছে। —হঁ, লে বল।’

‘কী বলব ভাই! ইবার বিচার করবেক উপর-আইলা।’

‘শুন—’ বাঁকু বলে, ‘হামাদের মনে দয়া আছে বলেই ইয়াকে হামরা ঠেঙায় মরালি নাই। এখন তক্ক জিয়ন্তই রাইখেছি। আর ইটাও শুনে লে, তদের ওই অঙ্গা খাইড়াকে যেখিনে পাব সেখিনেই উয়াকে ‘কাতু’১২ দিঁয়ে রেচব!’

ওরা চলে যায়। ঝিপঝিপে বৃষ্টির মধ্যে। ঘঙ মাথায়।

ঢোল বেজে উঠল জোরে জোরে!

মাথা-মুন্ডন সম্পূর্ণ। লোকজনও জড়ো হয়েছে ঢের। চাল-পয়সা গামছায় গাঁঠায় নিয়ে পালিয়েছে কিষ্ট লাপিত। যাবার সময় স্বগতোক্তি করে গেছে, ‘ইবার মর শালা তরা! খাওয়া-কামড়া হঁয়ে।’

ডমনের কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। ঢোল বাজিয়েই চলেছে। একঘেয়ে। মন্দির থেকে খড়ের মোটা দড়িটা নিয়ে ছেলের দল হনুমান-হনুমান খেলছে। এ-ওর পিছনে বেঁধে দিচ্ছে ‘মটা ন্যাজ’।

ব্যস্ততার মধ্যেও বাঁকুখুড়ার চোখ এড়িয়ে গেল না। তার ‘বড়’-এর এমন দুর্দশা দেখে খেঁকিয়ে উঠল। বলল, ‘এরেই শ্লারা! বড়টাকে জলে-কাদায় ভিজায় কী করছিস? গাঁইড়টায় বাঁধছিস? একটা বড় বেনাতে ক-পণ পুয়াল লাগে জানিস? ভঁকি দিগেল্লে আসে? এমন ডিংলা পটকান পটকিব!’

অশালীন গালাগাল শুনে ছেলের দল ‘বড়’ ফেলে এদিক-ওদিক ছিটকে পালায়। বাঁকুখুড়া অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে চশমাধারীকে বলে, ‘এ সঁড়ু, যা-যা-যা-যা! খামারটায় ফাবড়ায় দিঁয়ে আয়। নাই ত তোর কাকিকে জানিস ন? বাখান দিঁয়ে পঁন্দের পকা বাইর করবেক।’

‘সৈরে যাও! সৈরে যাও!’ সঁড়ু আবার তেমনিভাবে ‘বড়’ টানতে টানতে ছুটে চলে যায়। বাঁকুর খামারে।

বেলা বাড়ছে। বেলার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে লোকও। কাল শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি পড়াতে কাদা হয়ে গিয়েছিল হরিমন্দিরের চারপাশ। এখন সেই কাদা লোকজনের পায়ে গায়ে কিছুটা শুকিয়ে গেলেও, থানটিকে দেখলে মনে হচ্ছে ঝালদা-হুড়া-বলরামপুরের পশুহাটের একাংশ। পশুতে, মানুষে ক্ষুরডলা করে দিয়েছে। তার ওপরে গোবরের লাদ। লাদগুলি অবশ্য এখন আর নেই। পড়ামাত্র নামোকুলহির দু-তিনটে বিটিছ্যেলা ঝুড়িতে তুলে নিয়েছে। তারা সারাদিন গোরুকাড়ার পেছু পেছু ঘুরে বুলে। মাঠে, গোঠে। বয়স আট-ন বছর। ছেঁড়া-ফাটা ফ্রক, মাথায় তেলবিহীন প্যাঁড়সা চুল, খরখৈসা মুখ। অনেক সময় কাঁখের ঝুড়িটি তারা চলমান গরু-মোষের ল্যাজের কাছে ধরে হাঁটতে থাকে। লাদ বেরিয়ে এসেছে অথচ পড়ছে না দেখলে বলতে বলতে যায়, ‘এ কাড়া, লাদ লাদ। এ গোরু লাদ—’

ভোরে গবাদি মাঠে চলে গেছে বলে এই মেয়েদের হরিমন্দিরের ধারে-কাছে দেখা যাচ্ছে না। তবে তাদের চেয়েও যারা ছোটো, তারা এখানে-সেখানে ল্যাকার পারা ভিড়ের আড়ালে রয়েছে। এমনি এমনি নয়। তাদেরও সরজমিনে ‘ডিবটি’ দেওয়া আছে। কোথায় কী ঘটছে, ঘটনার কতটা-কী অগ্রগতি হচ্ছে সেদিকে তাদের ঝিঙা-ফুইলা দৃষ্টি। কিছুক্ষণ বাদে বাদে একেকজন ‘পিয়ন’ তালিমারা প্যান্ট কিংবা ছিঁড়া ইজের সামলাতে-সামলাতে সাঁ-সাঁ ছুট দিচ্ছে। ঘরের দিকে। কেউ পিসিকে বলছে, ‘অ্যা পিসি, হরিমন্দিরে খাইড়াটাকে বাঁইন্ধে রাইখেছে।’ কেউ আবার বলে, ‘মাঈ গ, মাঈ। কিষ্টা লাপিত উয়ার মুড়টাকে কামায় গটাই নাড়হা করে দিল! ইবার কে-জানে নিয়ে যাবেক। ঢোল দিঁয়ে।’

দুড়দাড় বেজে উঠল ঢোল। গ্রামের সবাইকে জানান দিতে। এতক্ষণ যাদের ভিড়ের মধ্যে দেখা যাচ্ছিল না, তারা এসে পড়ল। অধিকাংশ লোক নামোকুলহির। যেহেতু ঘটনাটি নামোকুলহির। উপরকুলহি থেকে কয়েকজন মাত্র। যারা কোনো বুদ্ধি-বিবেচনা ছাড়াই হুজুগে মেতে যায়।

ঘটিরাম রাজোয়াড়কে দেখা যাচ্ছে না। এই ঘটনাটির সে প্রতিবাদ করে গেছে কাল। তবু শোনা হয়নি। আজ তাই এখানে সে নেই। না-থাকার কোনো অজুহাত দেখায়নি। পরিষ্কার বলে দিয়েছে, ‘গাঁয়ে থাকি বলে কি মাতব্বরদের ডরাব নকি? যে-কাজ করাটা উচিত মানি নাই, স্যা-কাজে সঙ দিব ক্যানে? নাই যাব হামি।’ সে আরো বলেছে, এমন ঘটনার শিকার সাধারণত দুর্বলরাই হয়ে থাকে। ডেলিকচায় ক-ঘর খাইড়া আছে? তাদের হয়ে ডাং ধরবে এমন লোক কোথায়? সে-কারণে ষোলো আনা ডেকে বিচার ফলানো হচ্ছে তাদের ওপরে। এটা যদি ডেলিকচা না হয়ে আড়ষা থানার কোনো কুমারদের গ্রাম হত? পলপলের ভূমিজদের সাহস হত এই কান্ড ঘটানোর? তাদের গ্রামে গিয়ে এমনভাবে মেরে আসতে পারত সেই কুমার যুবককে? হাপচায় বার করত গাঁয়ের ল্যা! আর বেশি বাঢ়াবাড়তি করলে একটাকেও তারা সেখান থেকে জিয়ন্ত ফিরে আসতে দিত না। তাল-ছেঁচা ছেঁচত! কমজোরির উপরেই যত হুমচা-হুমচি, মদ্দানি। কথায় বলে, ‘নাঢ়ামুইড়াকে শাল খাড়া/শিঙ্গীধারীকে ডণ্ডবত’।১৩

জনা পঞ্চাশেক লোক। বেশিরভাগ ভূমিজ। তাতে অন্যান্য গ্রামের জনকতক ভূমিজও এসে যোগ দিয়েছে। পলপলের যারা গোড়া থেকে ছিল, তাদের কেউ কেউ সরে এসেছে। ঘটিরামের চৈখ মিটকানিতে। কৈলাশ ধীবর নেই। বিহাঘরে মাছের বায়না ধরা আছে তার। ঝুড়ি সাইকেল নিয়ে ‘ব্যেবসিক কাজে তুন্তা যাছি’ বলে আঁধার রাতেই বেরিয়ে গেছে। নেই গোবর্ধন মাহাত, ঢেলু মাহাত। তারা হাল-বলদ নিয়ে খেতে লাঙল ঘুরাচ্ছে। ভিড় দেখতেও হরিবোল মন্দিরে যায়নি। বলেছে, ‘ভূমিজরা উসোব যা করছে করুক বাবা। উয়াদের চাষ ন বাস। আমাদের খেতের উপরেই ভরসা। হালের বঁটা না ধরলে খাব কী? চারবার হাল বাইলে তবে কাদা হয়। আষাঢ়টা গটাই ফুরাল। এতদিনে জল পাঁইয়েছি এই বতরে না করলে আর কবকে করব? শাস্তরে বলছেই—

আষাঢ়ে রুয়ে মানকে

শরাবনে রুয়ে ধানকে

ভাদরে রুয়ে বিচকে

আশিনে রুয়ে কিসকে?’

লোকোক্তিটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আর ভেঙে বলেনি। গ্রামবাসী মাত্রেই জানে। যারা সবদিক দিয়ে সমর্থ—যাদের লোকবল আছে, কামিন-মুনিষ খাটালে হাজরি মেটানোর আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা নিজেদের ‘মান’ দেখাতে আগে-ভাগে চাষের কাজ শেষ করে হাল-কদাল ধুয়ে রাখে। তবে ঠিক ঠিক ফলন পেতে হলে শ্রাবণ মাসে অবশ্যই রোয়ারুয়ি সম্পূর্ণ করতে হয়। ভাদ্র মাসে রুইলে যৎসামান্য ফসল পাবে। আর আশ্বিনে রোয়া-না-রোয়া সমান। বিহারীলালকে এই বহুশ্রুত বচনটি নতুন করে শুনিয়ে, ঢেলু বলছে, ‘আমাদের কমরের জোর ত নাই। আষাঢ়ে পারব নাই। শরাবনে ত পুরাতেই হবেক?’

এই ‘শাস্ত্রকথা’ শুনে বিহারীর ঝাঁট জ্বলে যায়। বলে, ‘একেই দিনে তুমার শাস্তরে ‘গাঁধি লাইগে’১৪ যাবেক? আচ্ছাআ চদু বনাছ! বল য্যা ই-কাজে তদের সঙে থাকব নাই। তুমরা গাঁয়ের ‘উনিটি’ ভাইঙে দিছ। কাজে-ভোজে একতা থাকছে নাই।’

‘ওই যেটাই বুঝবি। একপণও যা, কুড়িগন্ডাও তা।’

‘আওগাও! আওগাও সোব!’ মুখে পান আর ঘিয়া পাঞ্জাবি গায়ে বিহারীলাল শোভাযাত্রা বের করার মতো করে। কানের পাশ দিয়ে দু-হাত তুলে, খোলা পাঞ্জা দুটি বারে বারে সামনে থেকে পিছনে ঠেলে লোকজনদের এগিয়ে আসতে বলে। পানের পিক ফেলে ঢুলিদারকে চাগিয়ে দেয়, ‘ঢোল দাও ডমনদা! পুরা ঢোল দিঁয়ে দিঁয়ে চল—যেখিনেই গাঁ দেখবে, সেখিনেই ঢোল দিবে! শোহরত করবে!’

ডমন পেটে ঢোল নিয়ে, বাজাতে বাজাতে, লদপদ করে দৌড়ায়। ভিড়ের পিছনে থেকে সামনে হাত দশেক দূরে ছিটকে চলে যায়। ‘কুলহি মুড়ায় তাঁতিঘর’ পেরিয়ে গেলে গ্রামের বসতি শেষ। আব-ডাব জমি।

কিছুটা চড়াই-উৎরাই পেরোনোর পর খোলামেলা প্রশস্ত মাঠ। সারা মাঠে পুয়া-আধপুয়া ওজনের হাঁসা পাথর বিছিয়ে রাখা। ওই যে বলে, ‘বোম ভলা/ভূতে মারে ঢেলা’, —ভুতের যত ঢেলা, বোধহয়, এখান থেকে জোগান দেওয়া হয়। এখন মাঠময় সেই ছড়ানো পাথরের মাঝে মাঝে বর্ষার জল পেয়ে ফনফনিয়ে উঠেছে যত আগাছা। ঘাসপাতা, চাকুড়া শাগ, পাঁশোতি শাগ। আর অবাক করা সৌন্দর্যে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে ফুটে রয়েছে ছোটো ছোটো ‘টাড়ডিংলা’ ফুল। হালকা হলুদ রঙের এই ফুলগুলি একেকটি সিড়িঙ্গে ডাঁটির মুখে মৃদু বাতাসেও থুরুথুরু কাঁপছে। গ্রাম্য কিশোরীদের কানপাসার মতো। জারমণি যখন নিতান্তই শিশু, যখন সে সাত-আট বছরের, তখন সকাল হতে-না-হতে বাঁশের টুপা হাতে এই মাঠে আসত। সঙতিদের সঙে ছাতু কুড়াতে। আর ছাতুর সঙ্গে বেছে বেছে কুড়িয়ে নিয়ে যেত সুন্দর লুলু পাথরও। খেলাচ্ছলে টাঁড়ডিংলা ফুলের গোছা এ-ওর কানে গুঁজে দিত। তারা বউ সাজত। আর এখন, সেই জারমণি?

রাতে বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে ফুলগুলি, ভোরের দিকে জমেছে শিশির। এখন ‘গাঁইঠা হলৈদের’ মতো মিষ্টি রোদে চুঁইয়ে পড়ছে বেদনার রুপোলি অশ্রু!

কিন্তু কে আর তা লক্ষ করে? ওরা ঢোলের তালে তালে তাও মাড়িয়ে চলে যায়। ভিজে উঠছে ওদের পায়ের পাতা।

মাঠের মাঝখানে দিয়ে পাকদন্ডী সিধা চলে গেছে—মুদি-কুড়মী-সাঁওতালদের গ্রামগুলোর দিকে। ছাড়া ছাড়া দুটি-একটি পলাশ আর তাল-খেজুরের সারি। তারপর গ্রাম ঘিরে রয়েছে তরল বাঁশের ঝাড়।

‘ভালডুংরি’-র পাশ দিয়ে ওরা পশ্চিমমুখে এগিয়ে যেতে থাকে। ভিড়ের মাঝে মাথা কামানো পাটন। তাকে সবাই ঘিরে রয়েছে। ছেড়ে দিলেও ছুটে পালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য তার এই মুহূর্তে নেই। পেট ঢুকে গেছে খিদেয়। গা টাল খাচ্ছে। সারা শরীরে শুকনো কাদার ছোপ। যেন গাজনের ‘ভকতা’—এখনি তাকে শিবমেলায় নিয়ে গিয়ে ‘কালবুদি’ ফুটিয়ে তার পিঠে, কোমরে লোহার মোটা মোটা আংটা ঢোকানো হবে। আর ঝুলিয়ে দেওয়া হবে ‘তারামাচা’য়। চরখির মাথায় ডাং। তাতে সুন্দর ঘুরতে থাকবে পাটন! পাটন ঘুরবে! ঘুরবে...

কেউ মাথায় সবজির ঝুড়ি নিয়ে, কেউ সাইকেলে ভেঁড়া বেঁধে ঠেলতে ঠেলতে যায়। হাটুরে লোকেরা। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে একজন আরেক জনকে জিগ্যেস করে, ‘কী ব্যাপার? ‘হাইলা’১৫ চুরি করেছে?’

‘মাইঞা ছ্যেলার ঘটনা। ওই য্যা ওই পান-খাওয়া ছকরাটার পাশে পাশে যাছে—ভূমিজ বঠে। উয়ারেই বিটিকে—’

‘কী ছ্যেলা বঠে? সদদার?’

‘আহ, সদদার হলে ত কেস ফাইনেল হঁয়ে যাত। শবর বঠে। খাইড়া, খাইড়া।’

‘অ। তার এই ডণ্ড?’ ওরা কথা বলতে বলতে চলে যায়।

ঢোলের শব্দে বাঁশঝাড়ের আড়াল থেকে ভুক-ভাক বেরিয়ে আসে ‘নাংটা-পৈঁন্দা’ শিশুরা। এসে দাঁড়ায় বড়োরাও। জিনগা-ডুংরির কাছাকাছি এলেও তখনি ডুংরিতে ওঠে না। কণারবেড়া, কালিপুরে ঢুকে ঢোল-শোহরত করতে করতে চলে। লোকজন দেখে বেদম জোরে ঢোল ঠুকতে থাকে ডমন। দলের আগে-আগে থেকে সে বলতে থাকে, পলপলের গ্রামবাসীরা সমাজে অন্যায়কে বরদাস্ত করে না। তাদের বিচার কঠিন বিচার। অপরাধ করলে তার শাস্তি হবেই। ডেলিকচার এই খাইড়া ছ্যেলাটিকেও তাই নারীঘটিত অপরাধের জন্য এই দন্ড শিরোধার্য করে নিতে হয়েছে। গ্রাম থেকে বিতাড়িত করে তাকে জিনগা-মাঈয়ের জিম্মায় তুলে দেওয়া ‘হৈতেছেএএএ!’

ডুগু-ডুগু-ডুগু-ডুগু! বাঁশঝাড়ের তলে দাঁড়িয়ে ঢোল দিতে লাগল ডমন, ‘শুনঅ! শুনঅ’...

ঢোল দিতে দিতে ওরা চলে যায় গ্রাম ছাড়িয়ে। বনভাবরি আর ঘিয়াখাড়ার ঝুড় ঠেলে। পাক খেতে খেতে, উঠতে থাকে জিনগা-ডুংরিতে। তখনো ঢোল বেজেই চলেছে।

খাঁ-খাঁ করছে গোটা নামোকুলহি। এখন আর একটিও লোক নেই। হরিমন্দির ঘিরে পায়ে থাসাথাসি কাদা। শুকিয়ে এলেও থেকে গেছে যত পায়ের বিকৃত ছাপ। যেন এই একটু আগে হয়ে গেল কণাপাড়ার নাটানাচ। মেলা ভেঙে গেছে। পরবটাঁড় সুনসান।

একটি ছাগল মন্দির-চত্বরে উঠে শুঁকে দেখছে কামানো চুলগুলি। ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার শব্দ আসছে। ঢেকুর্কুচ! ঢেকুর্কুচ! বড়ো বিষণ্ণ নির্জনতা। বড়ো হৃদয়বিদারক।

ঢোলের শব্দ মিলিয়ে যেতেই জারমণি পাথরের মতো হয়ে গেল। বিস্ময়ে হতবাক! ওরা চলে গেল? পাটনকে নিয়ে? পাটন! পাটন! জাঁতার ওপরে কপাল কুটতে ইচ্ছে হল তার। তার নাম ধরে ডুকুরে কাঁদতে ইচ্ছে হল। কিন্তু এখন সেভাবে আর কাঁদতেও পারে না জারমণি। চোখ তার শুকিয়ে গেছে। উথলে উঠছে না বুকের আবেগ। হায়! নিয়ে যাওয়ার আগে যদি একবার সে তার পায়ে গড় করতে পারত! যদি ফিরিয়ে নিতে পারত তার কটু কথাগুলি! তার অতিকঠিন অভিসম্পাতটি! কিন্তু মুখের কথা আর চোখের জল যে ফিরে আসে না! যেমন ফিরে আসে না নিষঙ্গীর বাণ।

ধনুকের সঙ্গে সঙ্গে হাত থেকে এই বাণ ফেলে দিয়েছিল পাটন। সে চেয়েছিল মুক্ত ও সুন্দর হতে। একটি নারীর প্রতি অবশীভূত আকর্ষণ তাকে এই দিশার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। জারমণি তাও বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারেনি সে আসলে ফেলে দিতে চেয়েছিল মুষ্টিবদ্ধ সেই হাতিয়ার, যা তার হাতকে কলঙ্কিত করে রেখেছিল, যা কলুষিত করে মানুষের অমূল জীবন। আজ কোথায় চলে গেল পাটনের সেই অমূল জীবন! কোথায়!

আর অঙ্গদ? ছি: অঙ্গদ! থু: অঙ্গদ! কেন তার স্মরণে বার বার এই নামটি ফিরে আসছে? তার যেখানে মৃত্যু, সেই ভস্মভূমিতেই তো জন্ম হয়েছে পাটনের? তার যেখানে পরাভব, সেখানেই তো জয়ের সূচনা করেছে পাটন? তার যেখানে স্খলন, পাটন সেখানে উত্তিষ্ঠমান। পাটনই সেখানে জাগ্রত। তাহলে আর কেন অঙ্গদ? কেন? পাটন তার পরম্পর বলে?

না, পরাজয়ের কোনো পরম্পরা হয় না। পরাজয়েই পরাজয়ের অবসান। আগুন যেখানে পরাজিত হয়, ধোঁয়াই সেখানে তার পরাজয়ের ভাষা। নতুন করে আর স্ফুলিঙ্গের উদ্ভব হয় না। নদীর যেখানে পরাজয়, উত্তুঙ্গ চর সেখানে পরাজয়ের অভিব্যক্তি। প্লাবন তাকে নিমজ্জিত করতে পারে না। অবিশঙ্ক বিক্রমের যেখানে পরাজয় ঘটে, দাসত্বের শৃঙ্খলই সেখানে ধূলিলুন্ঠিতের ভাষা। সহস্র তরবারির ঝংকারও তাকে পুনর্বার প্রতিস্পর্ধী করতে পারে না। আর প্রাণের যেখানে যবনিকা পতন, মহিষবাহনই সেখানে...

কাঁদছে জারমণি! অন্ধকার ঘরে। একা একা। নি:শব্দে। চৌকাঠে কাঁদছে তার মা। চোখের জল কি শুকোয়? অশ্রু অনি:শেষ। একেকবার কপাটে ঠেলা দিয়ে পার্বতী বলে উঠছে, ‘এ জারমণ, কপাটটা খুল। আর নাই তকে কেউ কিছু বলবেক। খুল। উয়ারা ত চলে গেছে।’

জারমণি কপাট খোলেনি। সাড়াও দেয়নি। কপাট খুলে বেরিয়ে এসে কী করবে সে? কার কাছে দাঁড়াবে? বাপ-মায়ের হাতে মারধোর কিংবা ভাইদের দুর্বাক্যকে সে আর ভয় পায় না। তার ভয় লোকলজ্জাকে। ছিছিক্কারকে।

সে ধীরে ধীরে মনকে শক্ত করে ফেলছে। নিজেই নিজেকে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করে— কীসের লোকলজ্জা? কোন লোকেরা লজ্জিত হবে তাকে দেখে? কাদের কাছে তার লজ্জা? দুর্বল বলেই এই পাটনকে যারা অবমানিত, প্রহৃত করল দলবলে? যারা এত এত লোক জড়ো করে ক্ষৌরকার ডেকে তার মাথামুন্ডন করল? এখানে ন্যায় নেই, বিচার নেই, প্রতিবাদের সরব ভাষা নেই। এঁরা আত্মকেন্দ্রিক, হিংস্র ও স্বার্থপর। এরা দ্বিপদের বেশে দিতির সন্তান।

হয়তো তাই অসন্তুষ্ট লৌকিক দেবীটিও এই তল্লাট ছেড়ে চলে গেছে। দূরে কোথাও পূজিত হয়। কোনো আদিবাসী গ্রামে। কোথায় তা সঠিক কেউ বলতে পারে না। দীর্ঘদিন হল ডুংরির মাথায় জিনগা-মাঈয়ের পূজা বন্ধ হয়ে গেছে। থানটি পড়ে আছে।

কেন বন্ধ হয়ে গেল সেই পূজা? স্থানীয় গ্রামবাসীরা ভিন্ন একটি ঘটনার কথা জানায়। ডুংরির থানে গিয়ে জিনগা-মাঈয়ের পূজা করে আসত গ্রামের কোনো এক ‘লায়া’। সারাদিন থেকে সূর্যাস্তের পর সে ফিরে আসত ঘরে। আসার সময় সঙ্গে নিয়ে আসত বলির খাঁড়াটি। একদিন খড়্গ আনতে ভুলে যায়। ঘর থেকে সে আবার জিনগা-ডুংরির মাথায় আসে। দেখে সেই খান্ডা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে জিনগা-মাঈ! লায়াকে বলে, ‘কাল থেকে থানে তোর আসা নিষিদ্ধ হল। কাল থেকে আমার পূজাও হবে না এই থানে। বলির এই খড়্গ যেখানে গিয়ে পড়বে, সেখানেই আমি পূজিত হব।’ এই বলে জিনগা-মাঈ পাহাড়ের মাথা থেকে আদিবাসী গ্রামের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল খড়্গটি।

সেদিন থেকেই লায়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ গ্রামবাসীরাও আর জিনগা-মাঈয়ের দর্শন করতে ওপরে ওঠে না। লায়া, দিনভর থাকার জন্য পাথরের চাঁই বসিয়ে যে-ঘরটি বানিয়েছিল, তাও সেদিন থেকে পরিত্যক্ত হয়ে যায়। হয়তো বা তখন থেকে জিনগাকে নিয়ে লৌকিক-অলৌকিক নানান গল্প ও অতিকথা গড়ে উঠতে থাকে, মানুষের মুখে মুখে। ওই ঘরটিকে কেন্দ্র করেও তাদের মনে ঘনীভূত হতে থাকে কত-না রহস্যময় কৌতূহলোদ্দীপক ভাবনা।

কিন্তু কোথায় পড়ল সেই খড়্গ? কার হাতে? নাকি আজও তা লোকচক্ষুর অন্তরালে কোথাও প্রোথিত হয়ে রয়েছে? জারমণির তা পেতে ইচ্ছা করে। বিশেষ করে আজকে, যখন সে এতটাই নির্বল ও অসহায়, তখন ব্যক্তিগত দৌর্বল্য থেকে মনে হয়, যদি ওই নিক্ষিপ্ত খড়্গটি তার হাতে এসে পড়ত! যদি জিনগা-মাঈয়ের থানে গিয়ে সে বিনতি জানাতে পারত! ওই টিলার মাথা থেকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে দেখিয়ে দিতে পারত—দেখো, দেখো কী কী ঘটে চলেছে! কী অনাচার! আর তুমি? মানুষ থেকে, সমাজ থেকে এতটাই উচ্চে আসীন হয়ে রয়েছ? এতটাই অধ্যারূঢ়? এ কেমন তুমি জিনগা-মাঈ? কী করো তুমি অহোরাত্র বিনিদ্রিত থেকে? তোমার কোনো ন্যায় নেই? বিচার নেই? হৃদয়হীন অবিমৃষ্যদের বাড়বাড়ন্ত এভাবেই মেনে নিয়েছ? ধিক তোমার ঔদাসীন্যের! নির্লিপ্ততার! তোমার ডাকে যদি আসমানে মেঘ ঘনীভূত হয়, বৃষ্টি নামে, তাহলে তোমার মর্মভেদী আর্তনাদে কেন দুরাচাররা পক্ষাঘাতপ্রাপ্ত হবে না? কেন উৎপাটিত হবে না তাদের জিহ্বা? চক্ষু? জারমণি ভাবতে থাকে। অন্ধকার ঘরে।

দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সন্ধে গড়িয়ে রাত্রি নেমে আসে। কপাট খুলল না জারমণি।

বাইরে সুন্দর চাঁদ উঠেছে! আষাঢ়ের বর্ষণস্নাত পূর্ণিমার চাঁদ। ঘরে এবং মনে যখন ছাগলচামের মতো অন্ধকার, বাইরে তখন অমলিন আলোর উদ্ভাসন! টুসুর সরা থেকে যেন উপচে পড়েছে চাঁদের দীপ্তি!

দুপুরের পর থেকে খেপে খেপে বৃষ্টি পড়েছে মহুল পড়ার মতো। সন্ধের পর আর বৃষ্টি নেই। বইছে ফুরফুরে হাওয়া। সেই হাওয়ায় বৃষ্টিধোয়া খাপরার চাল একটু করে শুকোচ্ছে। পচাখড়ের চালাগুলি থেকে এখনো দীর্ঘবিরতি নিয়ে টসকে পড়ছে জল। মাটি আর লতপাত থেকে সোঁদা গন্ধ আসছে। জলাজমির ঘাসে ঘাসে, খানাখন্দের আটক জলে, ঘোমটার মতো দোল খাওয়া কলাপাতে আর কুসুম গাছের ঝুপল ঝুপল ডালগুলিতে ঝিলিক দিয়ে উঠছে কৌমুদী।

সারা গ্রাম ঘুমিয়ে পড়েছে। সারা পলপল। গোয়ালে গোয়ালে কাড়া-গোরু, খোঁয়াড়ে শূকরও। এখন নিশুতি। কুলহির কুকুরগুলি খরখর শব্দে ছোটাছুটি করছে। অজস্র ব্যাঙ ডেকে চলেছে তারস্বরে। তারই মধ্যে কোনো একটি ডাকছে নিষ্প্রাণ, কর্কশভাবে। হয়তো সাপে ধরেছে। এখন গলাধঃকরণের অপেক্ষায়।

কী নৈসর্গিক নীরবতা! প্রকৃতির, মানুষের! এই তুষ্ণীভাবও যেন উপভোগ্য। তবু কেউ কি জেগে নেই? নৈ:শব্দ্য কি বাঙময় ভাষা! অনর্গল কত কথা যে বলে চলে!

অনেক দিন পরে আজ আবার উপরকুলহিতে শুরু হয়েছে জাঁতগান। হয়তো কাল থেকে নামোকুলহিতেও ‘ঢুলকিগীতের’ মহলা লেগে যাবে। মনসা পূজারও তো দেরি নেই। এল বলে। তাই ঢের রাত অব্দি চলল তাদের রিহার্সেল। পলপল এখন নিস্তব্ধ। তবু মনে হচ্ছে বাতাসে বাতাসে এখনো দোহারিদের কন্ঠস্বর ধ্বনিত হচ্ছে—‘...মা মনসা যায় লখীন্দরে ছলিবারে...’

জারমণির চোখে ঘুম নেই। থেকে থেকে তার চোখে ভেসে উঠছে জিনগা-থান। ‘লায়াঘর’টিতে একাকী বন্দি পাটন। সে কি এখনো চিৎকার করে চলেছে? কে শোনো তার আর্তনাদ? যে যেখানেই থাকে, অষ্টপ্রহর বিনিদ্র, তার কানেও কি এই করুণ প্রাণভিক্ষার আর্তনাদ পৌঁছবে না? সে মুক্ত করবে না তাকে? এই নিষিদ্ধ নির্জন জিনগা-থানে একা-একা বন্দিদশার ভয় থেকে? বিষাক্ত সাপের দংশনজনিত আতঙ্ক থেকে?

লায়ার ওই পরিত্যক্ত ঘরটিই তো সাপের বাস্তু। না দংশিলেও আতঙ্কেই মৃত্যু হবে তার। কিংবা যদি সে ইতিমধ্যে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছে? পলাশের দনায় সে কি পাবে বুড়ির হাতের জল? যদি নাও পেয়ে থাকে, আতঙ্ক নিয়ে পিপাসা নিয়ে একা-একাও কি বেরিয়ে আসতে পারবে না? দেয়াল ফেলে দিয়ে, দরজা-দুয়ার ভেঙে?

না! পাথরের চাঙ্গড় ধাপে ধাপে বসিয়ে গড়া হয়েছে ওই নিরেট প্রাচীর। ভারী শালের পাটাতনের কপাট। তবু যাতে সেই কপাট সে কোনোভাবে ঠেলে হড়কে দিতে না পারে, তার জন্যও কপাটের আংটার সঙ্গে দড়ির মতো পাকানো চিহড়ের ছাল আটকে, টান টান করে বেঁধে দিয়ে গেছে গাছের সঙ্গে। দরজায় শিকল তুলে কড়ার ফাঁকে ফাঁকে আঁট করে গুঁজে দিয়েছে চেঙ্গি-ডাল। এবার ভেতর থেকে ‘বাপ গৌ! মাঈ গৌ!’ বলে চিৎকার করে ধাকলানি দিয়ে গেলেও ফেঁসে থাকা শিকলটি খুলে পড়বে না। চিৎকারই সার হবে।

শেষতক আর না চেঁচিয়ে থাকতে পারেনি পাটন। ডুংরিতে উঠে, যখন তাকে ওই ঝোপে-লতে জঙ্গল হয়ে থাকা ঘরটির ভেতরে ঠেলে দিতে যায়, পাটন যেতে চায়নি। সে চৌকাঠে পা রেখে প্রাণপণ টিসে রেখেছিল দরজাটিকে। না, সে ভেতরে ঢুকবে না! কিন্তু শেষপর্যন্ত আর পারেনি। যেভাবে ‘টাড়া’ দিয়ে গোরু-মোষ তোলে, সে-ভাবেই তাদের মিলিত তাকত দিয়ে তাকে ঝটকা দিয়ে ফেলে দিয়েছে ঘরের মেঝেতে। তুলে দিয়েছে শিকল। তারপর করে গেছে তাদের বাকি সব কাজ।

ভেতরে কাটাছাগলের মতো ছটফট করছিল পাটন। তবুও একটিবারের জন্যও সে জিনগার কৃপাপ্রার্থী হয়নি। করুণা-ভিক্ষা করেনি। তারা তাকে বন্দী করে যখন ডুংরি থেকে নেমে আসছে, তখনও সে একটিই শব্দ উচারণ করে গেছে—‘জারমণি! জারমণি!’

ভাবতেই জারমণির বুক ফেটে গেল। মরিয়া হয়ে উঠল সে পাটনের কাছে, মৃত্যুর কাছে, জিনগার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে। সে আস্তে করে সরিয়ে দিল দরজার ‘বুক-হুড়কা’টি।

পিছনে ফিরে তাকাল না জারমণি। একবারও না। ঘরের সামনে জমে থাকা জভি-কাদা পায়ে মাড়িয়ে দিয়ে সে চলে গেল। গ্রামের কুলহি থেকে বেরিয়ে পাকা সড়কে। রাস্তার ঢালে নেমে বসতিহীন খোলা প্রান্তর দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে এগিয়ে গেল সেই ডুংরির দিকে।

বাইরে ঢাউস আকাশ! বাঁশের ছাতার মতো। আদিগন্ত জ্যোৎস্নার আলোয় যেন বানভাসি হয়ে উঠেছে বাইদ-বহাল-কানালি। খেতে খেতে পড়ে আছে কত যে পাকা তাল! কত দূর অব্দি স্বচ্ছ দেখা যায় গোরুর গাড়ির পথ! বর্ষায় জবজব করছে আফর রোয়া খেত। ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের আলো। দু-পাশাড়ি ধান খেতের আলগুলিতে, একদিকে খেজুর ও পঙার ঝাড়, আরেক দিকে বকাভেঁড়রি। ডালে লাট খাচ্ছে বেগুনি ফুল। ভরভরি ঝোপের মাঝে, সব প্রতিবন্ধকতা ঠেলে, সরিয়ে, রাতভর মাথা তুলে রয়েছে আদুরে লাউকেশোরী! কী তুচ্ছ, অথচ কী ফুটফুটে ফুলগুলি! একাই হাসছে! টাঁড়ডিংলা ফুলগুলিও জারমণির শাড়ির পাড়ের ঝাপটায় নেচে নেচে উঠছে!

পাথুরে মাঠ। এখানে সেখানে বদ্ধ জল। প্রতিটি জলে খেলা করছে আসমান দাপিয়ে বেড়ানো চাঁদ। বাগালছ্যেলার মতো যেন সে একৈড়া ছোনাচে কিরাতের মহলা দিচ্ছে। রংদার মুখোশ থেকে ছিটকে পড়ছে তারার মালা!

জারমণি আসমানে তাকায় না। জলা বাতাসে তালের গন্ধ। সে তখনো ছুটতে থাকে। বাতাসে উড়ছে ভুসড়ি পোকা। মাঠ থেকে গাজাড়ে ঢুকে যায় শিয়াল। ডাকতে থাকে। জারমণি আগাছার জঙ্গল টালতে টালতে ডুংরিতে ওঠার পথ করে নেয়। চড়াইয়ে ক্রমশ উঠতে থাকে। আর ততোই তার কানে তীব্র হয়ে বাজতে থাকে সকালবেলাকার সেই ঢোলের শব্দ। এই শব্দটিই দিশা হরণ করে নিল তার। সে হয়ে উঠল চন্ডিকা! অকুতোভয়া!

ডুংরির মাথায় উঠে পড়ল জারমণি। লতপাত সরিয়ে সে খুঁজতে চেষ্টা করল কোথায় সেই জিনগা-থান? অবিরাম প্রহরায় রাখা কোথায় সেই যুগল সর্প? অতি কঠোর হয়ে সে জিনগাকেই মনে মনে বলতে লাগল, জিনগার প্রতি কৌতূহলী হওয়ার পরিণাম যদি ভয়াবহ হয়ে থাকে, প্রাণঘাতী হয়ে থাকে তাহলে আমি সেই ভয়াবহতার শিকার হতে চাই! জগতে কৌতূহলই জ্ঞানের স্ফূলিঙ্গ। আমি সেই কৌতূহল নিয়ে জিনগা সম্পর্কে যাবতীয় অজ্ঞানতা কাটিয়ে উঠতে চাই। ভেঙে ফেলতে চাই বহু বছর ধরে তাকে নিয়ে গড়ে ওঠা সব ক-টি প্রবাদ-পুরাণ-অতিকথা। আমি দীর্ঘদিন লালন করা অসত্য থেকে উত্তীর্ণ হতে চাই। আমি দাঁড়াতে চাই সত্যের মুখোমুখি। অন্ধকার থেকে আলোর মুখোমুখি। মৃত্যু থেকে অমৃতের মুখোমুখি।

জারমণি মুখ তুলে তাকাল। চাঁদের মুখে যেন হাসি আর ধরে না। কুলু-কুলু বইছে বাতাস। কত বুনো ফুলের সুবাস নিয়ে। মাথার চুল উড়তে থাকে জারমণির। আহা! প্রাণ জুড়িয়ে গেল! সে দেখে তার চারপাশে এখন আর কোনো অন্ধকার নেই। কাল্পনিক বিষধর সর্প ও জিনগা-মাঈ নেই। অজস্র ফুলের গাছ নিয়ে এখানে কেউ একটি স্বর্গীয় উপবন রচনা করে রেখেছে। এ যেন মর্ত্যের নন্দন-কানন। এখানে-সেখানে হস্তী শাবকের মতো জগদ্দল পাথর। আর কত বিচিত্র সব গাছ। ওইতো অমর-তরু-মন্দার, হরিচন্দন আদি পঞ্চবৃক্ষ। শাখায় শাখায় হলুদ ফুলের ভার নিয়ে দোল খাচ্ছে চাপ-রঙ্গোনী। কোথাও চুরচু আর গর্গটের ঝাড়, শনসিয়াড়ি লত।

চাটান পাথরের ওপরে পড়ে আছে মরচেধরা কতকালের পুরোনো, খন্ডিত টাঙি। মন ফুল্ল হয়ে উঠল জারমণির! এই তবে জিনগা-থান! সে জিনগা-থানের মাথায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেল—ওই দূরে পলপল! জীবনডি! ডেলিকচা! দেখতে পেল তার কল্পনার সেই ‘ঝরনা নদী’টিও!

সে হাতে তুলে নিল জিনগা-মাঈয়ের ‘বুচা টাঙি’। পাটনের আর্তস্বর শুনে, ধাপে ধাপে, নেমে যেতে লাগল সেই ঘরটির দিকে।

_____________________________________________________

১ ডিম ফুটানোর জন্য হাঁস-মুরগির ঘূর্ণিতে বসার প্রবল আকাঙ্ক্ষা

২ কেরোসিনের

৩ তালগাছের পাতা

৪ শিশুকে ভোলানোর জন্য খাটের ওপরে ঝুলিয়ে রাখা চৌকোমতো রঙিন কাগজের খেলনা।

৫ একদা কোনো এক গ্রামবাসী এই দহ-তে ডুব দেওয়ায় তার পরনের কাপড় পুকুরের তলদেশে ভূতে টেনে নিয়েছিল। লোকমুখে প্রচারিত এই গল্প থেকে জলাশয়টির এই নামকরণ

৬ ধ্রুবপদ

৭ অণ্ডকোষ

৮ পুরুলিয়া এবং তার আশপাশের গ্রামাঞ্চলগুলিতে, ঝাড়খন্ডে নানান সম্প্রদায়ের মানুষ এই ভয়াল ঠাকুরের পূজা করে থাকে। এই ঠাকুর নররক্তের পিপাসা নিয়ে থাকে বলে পূজার রাত্রে গ্রামবাসীরা আপন আপন ঘরে খিল এঁটে শুয়ে থাকে। ডাকলেও সাড়া দেয় না।

৯ মহাভারত। আদি পর্ব। দ্বাদশাধিক দ্বিশততম অধ্যায়।

১০ মহাভারত। আদি পর্ব। ত্রিংশঠদধিকশত কম অধ্যায়।

১১ ঘঙ পাতা দিয়ে বানানো বর্ষাতি

১২ একধরনের অস্ত্র

১৩ প্রবাদটির অর্থ—যে প্রতিরোধহীন দুর্বল তাকে বেদম প্রহর, কিন্তু যার প্রতিরোধের ক্ষমতা আছে তার কাছে নতিস্বীকার

১৪ গ্রীষ্মকালে পুকুরের জল গরম হয়ে গেলে মাছের নিস্তেজ হয়ে ভেসে ওঠা

১৫ চাষের বলদ

অধ্যায় ১ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%