সমাপন কান্ড যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর মাঠারি পর্ব

সৈকত রক্ষিত

রাত্রির নি:স্তব্ধতা ভেঙে হাওয়া বইছে। সড়সড় করছে ইরাবতী সরোবরের পাড় ঘিরে থাকা তালগাছের পাতা। আলো-অন্ধকারে বিজুরি হেন ঝিকমিক করছে পুষ্করিণীর জলতল, আর হাওয়ার চলনে অনি:শেষ ফুরফুরে তরঙ্গ ছুটছে সেথায়। আচমকা সেই হাওয়া থেমে গেলে মনে হয়—অখন্ড মাঠারি জুড়ে নৈ:শব্দ্য যেন কতোয়ালের মতো থুম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। যেন বাঁশঝাড়ের আবডালে লুকিয়ে থাকা ত্রস্ত সজারু।

অথচ একটু আগেও, রতিগড় টিলার মালভূমিতে দাঁড়িয়ে অঙ্গদের প্রতিধ্বনিময় দৃপ্ত কন্ঠস্বরে গোটা তল্লাট ঝমঝম করছিল! ভূমন্ডল প্রকম্পিত হচ্ছিল তার দাপটে, তেজে, যখন সে ক্রুদ্ধ হয়ে হুঙ্কার দিচ্ছিল পাটনকে। সেই তেজ ও বিক্রমের সঙ্গে, যুদ্ধের সম্মতিস্বরূপ মশাল হাতে নিয়ে, দোলাতে দোলাতে, কুপিত পদে সে পশ্চিমাভিমুখে প্রস্থান করায় মাঠারি এখন চকিতে নির্বাক হয়ে গেল।

পশ্চিমেও ভরা জঙ্গল ফন-ফন করছে। মস্ত মস্ত প্রাচীন পাথরগুলিকে ছাপিয়ে তা এমনভাবে বেড়ে উঠেছে, যেন যুগের পর যুগ আদিম প্রস্তরখন্ডগুলিকে ছায়াবৃত করে রাখাই এই অরণ্যানীর কাজ। শেষপ্রহর থেকে শুরু হয়ে যায় পাখিদের রকমারি তালমাত্রার কাকলি। এই মহাবনের ভেতর দিয়েই, ডালপাত সরিয়ে, হাজারো জোনাকির চাঁই-চক্কর ভেঙে চলে গেল অঙ্গদ। রেখে গেল তার অনুপস্থিতির মধ্যেও ঘোর উপস্থিতি। রেখে গেল আকুল স্তব্ধতা, বাতাসের মর্মরিত ধ্বনি। অনেকটা পথ অবধি তার জটপড়া মাথায় বসেছিল কত যে জোনাকি!

যে-পথে সে আসে, সে-পথেই প্রস্থান করে। প্রবল গতিবেগ নিয়ে, তিরিক্ষি মেজাজে। মাঠারিতে তার এই নির্ভীক আসা এবং চলে যাওয়া দেখে বোঝা যায় পাটনের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেকে সে কতখানি তৈরি করেছে। সে এখন নির্ভীক, নি:শঙ্ক, আত্মবিশ্বাসেও অটল—ঘোড়ার খুরের মতো কঠিন।

অঙ্গদ চলে যাওয়াতে, শুধু যে মাঠারি নিশ্চুপ হয়ে গেল, তা নয়। প্রতিপক্ষকে মশাল হস্তান্তর করে মৌন হয়ে গেল পাটনও। একদিকে তার উদ্বেগ, দ্বিধা, অন্যদিকে দুরপনেয় দুশ্চিন্তা আর ভয় তাকে এই দন্ড থেকে শৃগালের মতো তাড়া করতে শুরু করল। সম্মতি প্রদান করায় যুদ্ধে তাকে অবতীর্ণ হতেই হচ্ছে। পাটনের চোখের সামনে যেন উত্তরোত্তর বড় হয়ে জ্বলতে লাগল প্রতিপক্ষের হাতে অর্পণ করা অঙ্গদের মশালটি। সেই সঙ্গে তার কানে প্রতিধ্বনি তুলতে লাগল তার তীক্ষ্ণধার বাণীও:

‘পাষন্ড! যে আমাকে এই দুর্বোধ্য লোকজগৎ ও জীবনের চিরকালীন মার্গ দেখাচ্ছে, আমাকে শোক থেকে ধর্ম ও বীতশোকের অভিমুখে নিয়ে যাচ্ছে, আমার আত্মাকে বৈমনস্য থেকে সংকৃপাভিমুখী ও প্রত্যয়ী করছে, যে আমার পীড়ন-সংক্ষোভ-উদ্বেগকে হরণ করে স্থির-প্রাজ্ঞ-লক্ষ্যাভিমুখী তথা রণবিদ্যায় নিষ্ণাত করে তুলছে, তাকে তুমি ভাঙ্গ-সেবনকারী বল? বৃদ্ধ বল? হে নিষ্ঠ্যুত জীব! বাস্তবিকই, তোমার জন্য আমার করুণা হয়। আজও তোমার জ্ঞানচক্ষু কিঞ্চিন্মাত্রও উন্মিলিত হল না। হায়! যে-নারীকে তোমার বিপুল নশ্বর দেহ দেখিয়ে, যৌবন দেখিয়ে, তুচ্ছ পৌরুষ দেখিয়ে প্রতারিত করে এই মাঠারিভূমিতে অন্তরিত করে রেখেছ— কুক্কুরের ন্যায় দিনান্তে, প্রহরে প্রহরে, সংগম করবে বলে, তোমার ধ্যান-চিন্তা-চেতনা অহর্নিশ সেই নারীর কুহক জাগানো অঙ্গগুলিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে! তাই তুমি জগৎকে দেখতে পাও না। তুমি জানো না— জীবন কী সুদূরপ্রসারী! কাল কী উদাসীন ও নিষ্ঠুর দন্ডধারী। তুমি জানো না, যে-যৌবনের মগ্নতায় তুমি স্বপ্নে জাগরণে নায় নারীর গোপন অঙ্গই কেবল দর্শন করো, একদিন জীবন অরণ্যে সেই যৌবন-কুসুমভাতি নিষ্প্রভ হয়ে যায়! আমি মনশ্চক্ষুতে অনাবিল দেখতে পাচ্ছি—কি করুণ দশায় আমার পদতলে তুমি পরাভূত হতে চলেছ। এই পবিত্র মাঠারিভূমিতে ভাণ্ডীর বৃক্ষের ন্যায় তোমার পতন অবশ্যম্ভাবী!’

যুদ্ধের আগেই পতনের ভয়ে পাটনের অন্তর তাঁতের তুরির মতো চঞ্চল হয়ে উঠল।

টিলার শীর্ষদেশ থেকে, জারমণির পার্শ্বে দাঁড়িয়ে পাটন, বিমূঢ় নয়নে তাকিয়েই রয়েছে, পশ্চিমে। সে এতটাই হতবাক, এতটাই দিশেহারা যে, তার হাতের মশালটিও যে দর্দর করে পুড়ছে আর বাতাসের ঝাপটে বারেবারে হেলে পড়ছে তার শিখা, সেদিকে পাটনের ভ্রুক্ষেপ নেই। গর্গট লতা আর কুসুম্ভ বৃক্ষের শাখায় নিদ্রিত পাখিসকল একপ্রস্থ কলরব করে উঠল! মগ্নতা কাটল না তার, তবুও।

জারমণির কোনো মগ্নতা নেই। এতক্ষণ আসন্ন যুদ্ধ সংক্রান্ত যে ধুন্ধুমার বচসা হয়ে গেল অঙ্গদ ও পাটনের মধ্যে, তার আদ্য-উপান্ত সাক্ষী থেকেও কোনো বিস্ময়বোধ জাগেনি তার। এই দুই পুরুষের কথোপকথন চলাকালীন একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি সে। ক্রোধ নয়, দ্বেষ নয়, ঘৃণা নয়, বিমূঢ়তা নয়— কোনো প্রতিক্রিয়াই প্রকট হয়নি এই কঠিন নারীর মধ্যে। সে যেন এই গতিপ্রকৃতির, এই বর্বর ইতিহাসের বাকহীন দর্শক হয়েই থাকতে চায়। যদিও সেভাবে আর থাকা গেল না।

পাটনের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জারমণির মনে হল, যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে যে শলাকাটি তার হাতে জ্বলছে, তা কি পাটনের নৈরাশ্যে, বিষাদে, অনাগত ভবিষ্যৎকে না দেখার অভিপ্রায়ে এই মুহূর্তেই মুষ্টিচ্যুত হবে? কিসের বিষাদ? কিসের নৈরাশ্য? বিমূঢ়তাই বা কিসের? তাছাড়া একবার যখন সে লড়াইয়ের সম্মতি দিয়ে ফেলেছে, সম্মতিস্বরূপ মশালও তারা পরস্পর হস্তান্তরিত করেছে, তখন রণাঙ্গনে তাকে নামতেই হবে। এবং যতদিন না সেই সন্ধিক্ষণ সমুপস্থিত হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত দু-পক্ষকেই মশালের শিখাদুটি জিইয়ে রাখতে হবে। এই শিখাটিই প্রতিমুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দেবে— প্রতিপক্ষের কাছে তার অঙ্গীকারের কথা, যুদ্ধকে মান্যতা দেবার কথা।

জারমণি অবিচল দৃষ্টিতে মুখাবলোকন করতে থাকে পাটনের। বুঝতে চেষ্টা করে তার এই মুহূর্তের অভিপ্রায়। তারপর তার বিষাদাচ্ছন্ন মুখাবয়বে হতোদ্যম টের পেয়ে, সে তাকে উজ্জীবিত করতেই অরণ্যচারী শবর মানুষের ভাষায় শিশুকে বোঝানোর মতো করে যা বলল, তা হল, ‘হে যোদ্ধৃ! আর উন্মনা হইও না। যোধনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো। যে আলোকদন্ড তোমার মুষ্টিবদ্ধ, তাকে নির্বাপিত করিও না। মনে করো, এই অগ্নিশলাকাই তোমার স্পৃহা! তোমার অঙ্গীকার! তোমার আয়ূধ! ইহাকে যুদ্ধান্তকাল অবধি লালন করো। শর ও কার্মূক জ্ঞান করো।’

পাটন জবাব দিল না। এমনকি, জারমণির পানেও চাইল না। সে তখনো নির্নিমিখ চেয়ে থাকল সেদিকেই, যেদিক দিয়ে প্রস্থান করল অঙ্গদ। বীরবিক্রমে যুদ্ধের প্রস্তুতি রচনা করতে মশাল নিয়ে চলে গেল। যুদ্ধে যা হবার তা তো হবেই, কিন্তু তার আগে, অঙ্গদের এই নির্ভয় প্রস্থান অনেকটাই ভাবিয়ে তুলল পাটনকে। তাকে উত্তরোত্তর অভিশঙ্কী করে দিতে লাগল।

জারমণিও তা অনুমান করল। তার মনে হল, পাটন হয়তো সেভাবে এই অগ্ন্যাধারটিকে নাও রক্ষা করতে পারে। যেকোনো মুহূর্তে সে তাকে হস্তচ্যুত করে নিজেকে সমর্পণ করবে শত্রুপক্ষের ডেরায়।

সমর্পণ! এই নপুংশক শব্দটির সঙ্গে কদাপিও পরিচিত হতে চায় না জারমণি। সে জয় চায়। বিজেত্রী হতে চায়। বিজিতা নয়। যে-পুরুষই তাকে বাহুলগ্না করুক না কেন, সে যোদ্ধৃবেশে আসুক। জয়ী হয়ে আসুক। জারমণি তার স্ত্রী-অঙ্গে অভিষঙ্গ সহকারে প্রকৃত বীরের— মহাজাগ্রত হস্তিশিশ্ন-পুরুষের—স্পর্শ অভিলাষ করে। সে-কারণে যুদ্ধবিমুখ পাটনকে সে আত্ম-সমর্পণ ছেড়ে যুদ্ধের তরে উদ্দীপিত করতে চায়। উদবুদ্ধ করতে চায় সমরাঙ্গনে পৌরুষের পরীক্ষায় অবতরণের জন্য।

মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাটনের পাশে জারমণি, বারবার তার উদ্ধত তর্জনি বাড়িয়ে সেই অন্ধকারের মধ্যেই পাটনকে দেখাতে লাগল সমন্তপঞ্চকরূপ বিস্তৃত মাঠারিভূমিকে। যেখানে নিকট ভবিষ্যতে শুরু হতে চলেছে দু-পক্ষের মাঠারিযুদ্ধ। অনির্দিষ্টকাল ব্যাপী এই যুদ্ধে শত্রুপক্ষকে জব্দ করতে অনমনীয় হাতে অস্ত্র ধরতে হবে পাটনকে। কোনো পশ্চাদপদতা নয়, দ্বিধা নয়। আরো কঠিন, কঠোর হতে হবে তাকে। শত্রুপক্ষকে সম্পূর্ণ পরাহত করতে জয়ের লক্ষ্যে ষন্ডামর্ক হয়ে যুদ্ধ করে যেতে হবে। যে তেজ দেখিয়ে গেল অঙ্গদ, পাটনকেও দেখাতে হবে ততোধিক ওজস্বিতা। নচেৎ কার্মূকে যোজিত শরের ন্যায় এই যে ওজস্বিনী নারী— এই জারমণি— চিরতরে হারাতে হবে তাকে।

হে অদৃষ্ট! যাকে সে প্রাণাধিক মনে করে, যে-স্ত্রী বিনা তার পুরুষজীবন বিষবৎ হয়ে উঠবে, তাকে কেমন করে হারাবে পাটন! এই মাঠারিযুদ্ধে যদি সত্যিই তাকে অঙ্গদের কাছে পরাভব স্বীকার করতে হয়, তাহলে কী হবে তার ভবিষ্যৎ? নিধনই তার অখন্ডনীয় ভবিতব্য? অঙ্গদ কি প্রাণদন্ড দেবে পাটনকে? হয়তো অঙ্গদ তার সেই স্মরণাতীত কালে— সেই পুরোনো জীবনে ফিরে গিয়ে অন্য মানুষ রূপে দেখা দেবে। সে তখন আর ভ্রাতৃসুলভ দয়াবান নয়, ক্ষমাশীল নয়। পরস্বধনকে কৌশলে বিশ্বাসঘাতকতাপূর্বক করায়ত্ত করে, এই লোকজগতে যে-পাটন অসত্য ও পাপের অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, চারিবেদরূপ চতুষ্পদ মহিষের তিনটি পদকে কলির পঙ্কে নিমজ্জিত করে যে-পাটন মনুষ্যজীবনকে ক্লেদাক্ত ও পাপাচারী করে তুলেছে, তার সমুচিত দন্ড তাকে দেবে না? এই দন্ডই পাটনের কৃতকর্মের প্রতিদান। দন্ডদানের পুণ্যযোগে তাকে হাহাকার করে যেতে হবে। কখনো নদীর তীরে, কখনো নির্জন পাথুরে মাঠে, কখনো-বা জঙ্গলে জঙ্গলে পিঠে নিষঙ্গভর্তি তির আর দুর্বল স্কন্ধে ধনুকের ভার নিয়ে, জীবনভর বুক চাপড়ে বিলাপ করে যেতে হবে, ‘হা জারমণি! হা জারমণি!’

এমন করুণ এবং মনুষ্যেতর জীবনের কথা ভেবেও কি যুদ্ধের জন্য এবার তৎপর হয়ে উঠবে না পাটন? সে এখনো নিশ্চেষ্ট নির্বাক থাকবে? জারমণির কথার কোনো জবাব দেবে না?

না দিক। তবু ভেঙে পড়ল না জারমণি। সে তাকে উত্তরোত্তর প্ররোচিত করে যেতে লাগল। নানান কথায়, দৃষ্টান্তে, ছলে-বলে-সাধনচাতুর্যে তার মানসপটে প্রতিমায়িত করতে চাইল পাটনের সংঘারক মূর্তি। তার পৌরুষে ঘা দিতে কখনো প্রতিতুলনা করে, লাঞ্ছিত অতীতের প্রসঙ্গ তুলে, কখনো-বা দ্যুতিমান ভবিষ্যতের অলীক স্বপ্নে কুচক্রিনীর মতো সে জাগিয়ে তুলতে চাইল তার পুরুষকার। জারমণি বিরতিহীনভাবে বলতে থাকে :

‘হে উগ্রস্বভাব! এমন কাপুরুষোচিত নির্বাকতা তোমাতে শোভা পায় না। এই জগৎ চরাচরে, যে-জন কাপুরুষ, সে দন্ডে দন্ডে মরে। প্রকৃত যে বীর, সে একবারই মৃত্যুবরণ করে। তোমাকে যদি মরতেই হয়, তাহলে শত্রুকে নির্মূল করে মর। মনে রেখো— বীরের মৃত্যু জগতে যশ ও কীর্তি রচনা করে। কাপুষের মৃত্যু শৃগালতুল্য।

‘হে অগ্নিশলাকাধারী! প্রতিপক্ষের বাচিক দম্ভে তুমি আর বিমর্ষ হইও না। চঞ্চলহইও না। উদবিগ্ন হইও না। প্রত্যয় রাখো তুমি তদপেক্ষা অধিক শক্তিধর। তুমি এই মুহূর্তে তোমার জাড্য হইতে উত্থান করো। ধরিত্রীপৃষ্ঠে অগণিত প্রস্তরখন্ড জড়বৎ অবস্থান করে। তা বলিয়া এমন কখনো মনে করিও না যে, সেই উপলসমূহ শক্তিহীন, অচলনশীল মাত্র। তাহাতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নিহিত আছে, যা ঘর্ষণমাত্র বিধ্বংসী হইয়া ওঠে। হে ধনুর্ধর! আমার এই সঞ্জীবনী বাক্যসুধাই তোমার ঘর্ষণ। তুমি এই দন্ডে তেজ বিকীর্ণ করো। শত্রুকে নিধন করিতে তুমি যার পর নাই পরাক্রমী ও বিধ্বংসী হইয়া উঠ। লোকবল, অস্ত্রবল, অন্নবল সংগঠিত করো। তদেকচিত্ত হইয়া রণাঙ্গনে যাও!

‘হে বলবন্ত! অরাতিকে দমন করার আগে তুমি তোমার দ্বিধা, দৌর্মনস্য, দ্বিচারিতাকে দমন করো। একলক্ষ্যাভিমুখী হও। স্থিরপ্রতিজ্ঞ হও। নিজেকে সংকল্পবদ্ধ করো। কখনোই কোনো কল্পিত ভয়ে নিজের বিস্তারকে কুন্ঠিত করো না। অধিকন্তু, যদি প্রকৃত অর্থৈই তুমি অননুমেয় ত্রাসে উত্তর-উত্তর পাষাণ হয়ে পড়ছো, তাহলে যাও—এই অগ্নিশলাকা নির্বাপিত করে প্রতিপক্ষের হাতে দিয়ে বল— ‘আমি ত্রস্ত! অক্ষম ও অপারঙ্গম আমি। আমাকে বিশ্বাসহন্তার দন্ড দাও। প্রতিশোধ নাও আমার অতীতের কৃতকর্মের আর যথেচ্ছ লুন্ঠিতা করো ওই অলিঙ্গমপশ্যাকে!’ বলতে বলতে ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে পড়ল জারমণি। বিশেষ করে বাক্যের শেষ শব্দটিতে এসে। ‘অলিঙ্গমপশ্যা’!

নারীকন্ঠে উচ্চারিত এমন একটি সুপ্ত জৈবানুভূতি জাগানো শব্দ শুনেও ভাববিহ্বল হয়ে পড়ল না পাটন। কোনো রোমাঞ্চই জাগল না তার। লাঙলের ঈশ-এর মতো যে তীক্ষ্ণধার তৃষ্ণায় সে প্রতিনিয়ত বিদ্ধ হয়ে রয়েছে, তা পুনরপি তাকে তৃষ্ণার্ত করে তুলল না। পাটনের কাছে এটা কি নেহাতই অপ্রত্যাশিত নয়?

জারমণিকে নিয়ে পাটন তো সারা দিনমান— অষ্টপ্রহর বিভোর ও পিপাসার্ত হয়েই থাকতে চায়। যেমনটি সে থেকেছে অগণিত বছরগুলি। থেকেছে এই প্রত্যয় নিয়ে যে, আজ না হোক কাল, কাল না হোক পরশু, তরশু, লরশু—শতবর্ষ বাদে হলেও তার এই পিপাসা— এই অন্তর্দহন প্রশমিত হবেই। একদিন না একদিন কৃকলাশের মতো প্রবল আশ্লেষে সে মিথুনাবদ্ধ হবে ওই কদলীকুসুমস্তনী রমণীর সঙ্গে। তা যদি মিথ্যা, অলীক এবং স্বপ্নসম্ভব হয়ে থাকে, তাহলে কেন এই কঠিন ব্রত, পাটনের?

ফলত, আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল জারমণি। এবার তার সেই উগ্রতায় পাটনের প্রতি ক্রোধ এবং তিরস্কারের সঙ্গে নিজের হতাশাকেও গোপন রাখল না সে। তার সবিস্তার মনে পড়তে লাগল সুদূর অতীতের সেই ঘটনাও— তার সেই অন্তরীণ জীবন। ক্রমশ স্মরণোজ্জ্বল হয়ে উঠতে লাগল সেই গ্রাম, সেই অরণ্য-অঙ্গদ-দলবদ্ধ হাতিয়ারি গ্রামবাসী, টিলার মাথায় বহুকথিত সেই জিনগা-থান আর সেদিনের এই পাটন।

হ্যাঁ, সেদিনের এই পাটন। সেদিনের এই পাটনের সঙ্গে আজকের এই পাটনকে মেলাতে গিয়ে, জারমণির মনে হল, নতুন করে আর মেলানোর কিছু নেই। দুর্ভাগ্য এটাই যে, এত-এত বছরের ব্যবধানেও এই পাটনের সঙ্গে ওই পাটনের কোনোই তারতম্য ঘটেনি। অতীত ও বর্তমানের দুই পাটন ঘটমান এক পাটন হয়েই থেকে গেছে। অথবা, এক-পাটন দুই পাটন হয়নি, আজও।

সেদিন পাটনের হাত থেকেই অস্ত্র খসে পড়ে গিয়েছিল, মাটিতে। অথচ সে-ই কিনা অঙ্গদকে— তার প্রিয় সহোদরকে, ভরসা দিয়েছিল অস্ত্রের স্বপক্ষে। যে-নারীর রূপে আকৃষ্ট হয়ে, অঙ্গদ, তাকে জীবন-সঙ্গিনী করতে পলপল গ্রাম থেকে নিজের ঘরে এনে হাজির করেছিল—পরপুরুষের হাত ধরে আসা সেই নারীকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করার সদম্ভ অঙ্গীকার করেছিল পাটন। এই পাটন। ভিন গাঁয়ের ভিন সম্প্রদায়ের পরিবার থেকে উঠে আসা অজানা-অচেনা ওই শম্বুকবর্ণা রজঃস্বলা নারীকে তৎক্ষণাৎ ঘরের ঝনকাঠ থেকেই বিতাড়িত করা তো দূরের কথা, তার আপৎকালের কথা চিন্তা করে এই নিপট কপট পাটন পরিবারের আপত্তিকে জাঙ চাপড়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। ভবিষ্যতের অবশ্যম্ভাবী বিদ্রোহকেও তুচ্ছ জ্ঞান করে— তাকে আঙিনা থেকে কুঠুরিতে ঢুকিয়েছিল। এই পাটন। এই পাটনই ছনছনায় কুঠুরির শিকল তুলে দিয়ে তার সুরক্ষা দিতে তাকে অন্তরীণ করে রেখেছিল। শুধু নিজস্ব হেফাজতে রাখাই নয়, ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে পলপলের গ্রামবাসীরা যদি সহোদরের এই স্বোপার্জিত স্ত্রীধনকে লুন্ঠন করতে ঝপাং ঝপাং মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হয় কিংবা ডাং-ঠেঙা নিয়ে ‘মারৌ শালাকে! কাটৌ শালাকে!’ বলতে বলতে তাদের ডেলিকচা গ্রামে এসে চড়াও হয়, তাহলে এই-এই-এই পাটনই একা-কুম্ভবীর হয়ে ধনুক এবং শর সহযোগে তাদের মিলিত আক্রমণকে রাম-দুই-তিন করে ঠেকা দিয়ে-দিয়ে যাবে। আমরণ প্রতিহত করবে দুশমনদের। বেবাক স্তব্ধ করে দেবে তাদের ধুন্ধুমার কান্ড। আখিরে, জীবন যদি যায়ও, অগ্রজের কীর্তিকে সে অক্ষয় রাখবে। তার অর্জিত যে-স্ত্রীধন তাকে সে পরহস্তে অর্পণার্থ কুঠুরি থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে আনবে না। একবার যে গৃহাভ্যন্তরে ঢুকে গেছে, সে ঢুকেই গেছে। পরপুরুষের হাতে সে-নারীকে পুনঃলুন্ঠিতা হতে দেবে না! হারগিজ না!

ভাইয়ের এই সপুংসক অঙ্গীকারে, অঙ্গদ, ভরসা করেছিল। বিশ্বাস করেছিল ভাইকে। আর এই বিশ্বাস নিয়েই ডেলিকচা গ্রাম থেকে পালিয়ে গিয়ে সাময়িক আত্মগোপন করেছিল— অনুকূল পরিস্থিতি বুঝে যথাসময়ে আবার ফিরে আসবে বলে। যাবার সময় ঘরের আবছা অন্ধকারে জারমণিব ললাট স্পর্শ করতে গিয়ে তার সু-উচ্চ চুচুকে হাত রেখে সে নিষ্কাম ভরসা দিয়ে বলেও ছিল, ‘ডরাস না তুঁই। ভাভিস না তুঁই। হামি কত্থাও যাই নাই। মনে কর ক্যান্নে— যেখিনেই তুঁই আছিস, হামিও তার ঠায়ে-ঠায়ে আছি। তোর বিপদ দেখলেই হামি বাহরাঁই আসব!’

মাহুর লোকের মতো পাটনই পলায়ন তথা আত্মগোপনের এই পরামর্শ দিয়েছিল দাদাকে। আসন্ন বিপদকে সে আগাম আঁচ করতে পেরেছিল। যদিও বিপদ যাতে না ঘটে তার জন্য হর-হামেশা অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ ছিল পাটন। সতর্কও ছিল। কিন্তু হায়! নারীর যথার্থ রূপ তো সে ইতিপূর্বে কখনো দেখেনি। সে জানেও না, নারীর প্রতি-অঙ্গ লাগি পুরুষের প্রতি-অঙ্গ কীভাবে অঝোর ক্রন্দন করে। সে জানে না, নারী মোহিনী শক্তির অধিকারিণী। তার মোলায়েম অঙ্গ ব্যাপী মায়াগহ্বর ও স্ফীতিগুলি পুরুষ ও পৌরুষের সমাধিভূমি।

সে এও জানে যে, অস্ত্র দিয়ে নারীকে বশম্বদ রাখা যায় না। নারী স্বয়ং কুশ-করাতের ন্যায় একটি উভমুখ কর্তনক্ষম মহাস্ত্র। যেকোনো হাতিয়ার তার কাছে তন্মুহূর্তে সশব্দে ভূপতিত হয়ে যায়। আর অস্ত্রী তার রূপ-যৌবন দর্শনে কামান্ধ হয়ে আত্মসমর্পণপূর্বক বলে ওঠে, ‘হে পয়োধরা! আমি তোমা হেতু তৃষ্ণার্ত বোধ করছি। আর যুদ্ধ নয়। এবে সন্ধি করো। তোমাতে সমাগত করো আমাকে। হে যৌবনপ্রমত্তা! ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে তোমার আবরণগুলি ঘুচাও আর প্রতি অঙ্গে শায়িত কর আমার আকাঙ্ক্ষা।’

প্রকারান্তরে এই অমোঘ পরিণতির সূত্র ধরে, বস্তুত, আমূল পালটে গেল সেই পটভূমি। প্রতিশ্রুত প্রত্যাবর্তনের আর কোনো অবকাশ রইল না অঙ্গদের।

রইল না, কারণ, পাটনও সেই অখন্ডনযোগ্য নিয়তির শিকার হয়ে গেল। প্রতিশ্রুতি মতো সেদিন অস্ত্র দিয়ে নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা তো দূর-ভাবনা— পাটন শিশ্ন দিয়ে প্রেমের উত্থান ঘটাতে চেয়েছিল, আর অঙ্গদের দাসত্ব থেকে, দায়িত্ব থেকে নিজেকে বেকসুর নির্ভার করতে চেয়েছিল, জারমণির কাছে।

কিন্তু কেন অনতিবিলম্বে পাটনের এই পালটে যাওয়া? কেন এই বিবর্তন? তার মনের ভেতরে যে সুন্দর ভ্রাতৃপ্রতিম দায়িত্ববোধকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে সে এতকাল লালন করে রেখেছিল, রাতারাতি কেন তার এমন অভাবনীয় বিপর্যয় ঘটে গেল?

ঘটনাচক্রে, পাটন এই শম্বুকবর্ণা আদিবাসী রমণীর ‘কাঁচা অঙ্গের লাবণী’ দেখে ফেলেছিল। সে দেখেছিল তার মহাভার ঊরুও। বস্তুত, এই অবিশ্বাস্য ‘অতিলোক’ দর্শনই কাল হল তার। এই দর্শনই মুহূর্ত মধ্যে চাকনাচুর করে দিল তার সকল সসজ্জ যুক্তশৃঙ্খলকে। ইতিপূর্বে সে যা-যা ভেবেছিল, তা সবই ছিল তার একপেশে ভাবনা। বীরোচিত ভাবনা। সেই ভাবনায় নিজেকে সে দ্বারী ও আজ্ঞাবহ ধনুর্ধর বৈ কিছুই ভাবেনি। রিরংসু ও তস্কর ভাবা তো দূর অস্ত। এখন আত্মোন্মচনের বাতায়ন খুলে গেল তার। বোধোদয় হল। একটির পর একটি প্রশ্নের উদয় হল মনে। আর সমানে জাগতে লাগল তার বরাহ-বাসনা। আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি খাড়া করে সে দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে লাগল— কার স্বার্থে সে ধনুর্ধারী হবে? কাকে নিরাপত্তা দিতে? কোন ধন, কার ধন এই যক্ষপুরীতে আগলে রাখতে পাটন শবর আত্মত্যাগের পটভূমিতে, ধনুকে-শরে দৈবারিক হয়ে, অনড়-অটল থাকবে? সে কি সেই স্ত্রীধনের স্বপক্ষে তার শরাশন থেকে প্রতিপক্ষের দিকে নিক্ষেপ করবে একেকটি অবিবেচক তির, যার যৌবনগন্ধা তনু ও লাবণ্যময় সৌন্দর্যের কাছে সকল অস্ত্রসম্ভার বিমুখ হয়ে যায়?

এই মোহিনীকে দর্শন করার মুহূর্ত থেকে পাটনের মন এহেন আত্মদর্শনে বিভোর ও তমসাচ্ছন্ন হয়ে গেল। ভাবতে অবাক লাগে, যার পক্ষ নিয়ে সে পৌরুষ তথা মর্যাদার প্রশ্নে নি:স্বার্থভাবে দাঁড়াতে চেয়েছিল, আত্মবলিদানও দিতে চেয়েছিল, এখন সে নিজেই হয়ে উঠল তার প্রতিপক্ষ। তার সংঘারক। তার আক্রমণকারী এবং লুন্ঠনকারীও। তাই সেদিন স্খলিত অস্ত্র ভূমি থেকে পুনর্বার হাতে তুলে নেয়নি পাটন, নিতে চায়নি। আর আজও, যুদ্ধ অনিবার্য জেনেও, অস্ত্র ধরতে যার পর নাই কুন্ঠা বোধ করে সে। বা:! বা: রে পাটন! স্বার্থপর সুবিধেবাদী বিশ্বাসহন্তা পাটন!

অথচ একদিন আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে সে বলেছিল— সে বীর! অঙ্গদের চেয়ে ঢের ঢের গুণ বড় বীর সে! বলেনি? বলেনি সে-কথা? আজ তাহলে কোথায় গেল তার সেই স্বঘোষিত আস্ফালন? সেই বীরত্ব? লড়াইয়ে আপন সম্মতি দিয়েও যে-পুরুষ যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে কাতরতা বোধ করে, সংকুচিত ও পশ্চাদপদ হয়, বাকহীন হয়ে পড়ে, সে কেমন বীর? জারমণি অতীতের ঘটনার সূত্রে, পাটনের মুখের প্রতিটি বাক্য তুলে তুলে উন্মোচিত করতে লাগল তার চারিত্র, আর চপেটাঘাত করে যেতে লাগল তার কাপুরুষতায়। মশালের আলোয় ঝলকে ওঠা পাটনের মুখের দিকে সবেগে তার তর্জনী প্রসারিত করে বলল, ‘তুমিই না বলেছিলে— আমি তেজঃপূর্ণ পরাক্রমশালী পুরুষ! আমি অধোদেশে আজানুলম্বিত বাণলিঙ্গ বহন করি! —তোমার তেজ, তোমার পৌরুষ, তোমার যত হুম্বিতুম্বি তাহলে শুধুমাত্র একটি নারীর কাছেই? ওই আজানুলম্বিত বাণলিঙ্গই তোমার অহঙ্কারের বস্তু? ধিক, ধিক তোমার তেজ আর পরাক্রমকে!...

‘যে-নারীকে দেখে অনির্বচনীয় মুগ্ধতা বশে তোমার হাতের অস্ত্রের ভূমিতে পতন ঘটেছিল, হে বীর, আজ এই দুঃসময়ে সেই নারীর প্রেরণায় তুমি হস্তচ্যুত হাতিয়ারকে আবার তুলে নিতে পার না? বলো, পার না? কেন তুমি এমন শিথিল হয়ে পড়ছো? কেন তোমার মধ্যে শত্রুকে নিধন করার জিঘাংসা জেগে উঠছে না? হায়! হায়! আমি বৃথায় এই নপুংসকের শৈথিল্যকে জাগ্রত করার প্রয়াস চালাচ্ছি! সে বধাভিলাষী হবে না কোনোদিন।...

‘আমি বুঝে গেছি, যেদিন অস্ত্র তোমার হস্তচ্যুত হল, সেইদিন থেকে তোমার পৌরুষেরও পতন ঘটেছে। আর তার জন্য আজ নারী হয়ে নিজেকেই আমার অভিসম্পাত দিতে ইচ্ছে হয়। হ্যাঁ, তুমি নিরস্ত্র-নপুংসক হওয়ার কারণ আমি! আমি—আমি— আমিই সর্বাংশ দায়ী! —হে বিধাতা—’ জারমণি তার দীর্ঘ গ্রীবা শূন্যে আরো দীর্ঘায়িত করে বিলাপের সুরে বলতে লাগল, ‘আমাকে দন্ড দাও! দন্ড দাও! আমার যৌবনসর্বস্ব শরীর দর্শনে এই পুরুষ বিমোহিত হয়েছে। তার স্বকীয় সত্ত্বাকে হারিয়েছে। আমার অঙ্গ-প্রলোভন একে অস্ত্রসম্ভারহীন ও রিক্তহস্ত করেছে! ওঃ! ওঃ! ওঃ!’

জারমণি চোখের জল সংবরণ করে। আবার সে কঠিন হয়ে বলে, ‘আজ কোথায় গেল তোমার সেই উক্তি? স্মরণ করো! তুমি যে বলেছিলে—জগতে নারী বৈ আমি আর কিছুকে স্বীকার করি না। নারী সত্য, নারীই মায়া, নারী জাগরণ আবার নারীই জীবন ও জগতের অদৃশ্য নিয়ামক। পুরুষের সর্ব অর্থ-অনর্থ-ধর্ম-কর্মের অভীষ্ট ও চরমতম লক্ষ্যই হল নারী। তাই যদি হয়, তাহলে সেই নারীর সম্ভ্রম রক্ষার্থে কেন তুমি যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে না? কেন, কেন তোমার এই ভয়? কেন বজ্রমুষ্টিতে আয়ূধ ধারণপূর্বক তুমি এই মাঠারিভূমিতেই ধরাশায়ী করবে না তোমার চিহ্নিত শত্রুকে? তুমি যদি ধর্মত বীর হয়ে থাকো, যদি প্রতিপক্ষের সন্মুখে দক্ষিণ হস্ত দিয়ে ঊরুতে চপেটাঘাত করার দুঃসাহস তোমার থাকে, তাহলে যাও— এই নারীর কাছে তোমার সেই বীরত্বের পরীক্ষা দাও!...

‘এখনও তুমি নিরুত্তর? ধিক, ধিক তোমার প্রতিক্রিয়াহীন মৌনপন্থাকে। তোমার উদাসীন নিষ্ক্রিয়তাকে। আসলে তুমি ভীরু, কাপুরুষ, পলায়নাকাঙ্ক্ষী। প্রতিপক্ষকে ভয় পাও তুমি। তুমি নির্বীর্য! স্ত্রৈণ তুমি!’ জারমণি আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। প্রচন্ড ক্ষোভে, ক্রোধে সে এবার চন্ডালিনী মূর্তি ধারণ করল। পিপলপত্রের মতো কম্পমান তর্জনী তার। ‘চিহড়লতা অলঙ্কৃত’ সুডৌল বাহুটি, বোনি-চটক-ক্যারকেটা-পাঁড়ুক আর টেসোরাজা পাখির কূজনে মুখরিত দূর জঙ্গলের দিকে প্রসারিত করে, পাটনের পক্ষে যা চরম সেই শাস্তি ঘোষণা করল। শেষবারের মতো সে বলে উঠল, ‘তুমি যদি যুদ্ধবিমুখ হয়ে থাকো, যদি এটাই তোমার অবিকল্প সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, যদি তুমি নপুংসক হও, যদি প্রতিপক্ষের ধনুর্বাণ দেখে তোমার হস্তপদযুগল কম্পিত হয়, যদি শত্রুকে তুমি পর্বত মনে করো, যদি প্রতিপক্ষের আক্রমণকে তোমার বারিধিসম বোধ হয়, যদি মৃত্যুকেই মনে হয় সকল জাগরণের স্তব্ধতা—তোমার স্বপ্ন, তোমার কামজ আকাঙ্ক্ষা, নারীকে নিয়ে তোমার সুখ, সম্ভোগ তথা যাবতীয় অভিলাষের সমাপণ, আর সারা জগৎ ব্যাপী সর্বদা ঘটমান এই বিদ্রোহ—অভীস্পিত নারীকে লুন্ঠন, হরণ, নির্যাতন তথা করায়ত্তকরণকে কেন্দ্র করে পুরুষের সঙ্গে প্রতিপুরুষের অথবা নারীর সঙ্গে পুরুষের এই যে অবিরাম সংগ্রাম, এই সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার অর্থ যদি মনে করো তোমার চিরক্ষয় ও কেতন-পতন, তবে হে ভীরু, হে অবিবেচক, হে অবশ্যম্ভাবিতা-বিমুখ, যে-ধরিত্রীর ওপরে আমি এই মুহূর্তে দন্ডায়মান, তুমি তার থেকে শত যোজন তফাতে যাও! খবরদার! আমার মাটিকে তুমি স্পর্শ ও অপবিত্র করো না! যেমন সারমেয় থাকে যজ্ঞস্থান থেকে দূরে, যেমন ভুষন্ডি থাকে ভোজনকারীদের থেকে ঢের তফাতে, তেমনি তুমিও এই নারী থেকে তার নজর-স্পর্শ থেকে প্রভূত ফারাকে থাকো! যাও তুমি, যাও—’

উত্তেজনায় জারমণির চোখ দুটি জ্বলন্ত অগ্নি-কটাহের মতো ঘূর্ণিত হতে থাকে। দৃষ্টি থেকে যেন ত্রসরেণু বিচ্ছুরিত হচ্ছে! সেই বিচ্ছুরণের দিকে তাকিয়ে পাটন বলল, ‘জারমণি! একি তোমার সিদ্ধান্ত? কী ভয়াবহ! নিষ্ঠুর! শত যোজন তো অকল্পনাসাধ্য, তোমার থেকে এক ইক্ষুদন্ড তফাতে যেতেও আমি অপারগ।’

জারমণি দূরে সরিয়ে নেওয়া মুখ ধীরে ধীরে পাটনের দিকে ফেরায়। তার দুর্নিরীক্ষ্য আঁখিজুড়ে আগুনের আভা, তার উত্তেজনা ও তেজস্বিতাও ক্রমশ স্তিমিত হতে লাগল পাটনের করুণ কন্ঠে উচ্চারিত শেষবাক্যটি শুনে। জারমণি নিজেও জানে, এই পুরুষটির পক্ষে তাকে পরিহারপূর্বক ভিন্ন জঙ্গলখন্ডে যাওয়া তো অলীক ভাবনা, আক্ষরিক অর্থেই বিচ্ছিন্নতাবোধ নিয়ে সে দু-ডেগ ফারাকেও থাকতে পারবে না।

পাটন তখনও বলে চলেছে :

‘যে মা-ভূমিকে দুপায়ে পিষ্ট করে তুমি ঔদ্ধত্য নিয়ে স্বমহিমায় বিরাজ করছো, হে ললনা, আমি সেই মাটিতেই শরাহত হতে চাই। আমাকে আর শত অভিযোগে দীর্ণ কোরো না। আমাকে স্থাণু ও মৃত্তিকা জ্ঞান কোরো না। আর অসম্মান করো না আমার পুরুষকারকে। এই বীরভোগ্যা বসমতার ক্রোড় থেকে আমার ধনু ও তূণীর উত্তোলনপূর্বক বীরোচিত মুষ্টিতেই আমি অস্ত্রকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধরতে চাই। হে নারী, হে আমার সর্বচেতনহর, তোমার দিকে তাকালে এখন আর যৌন পৌরুষ নয়, কাম নয়, স্বমেহনের ভাবনা নয়— জেগে উঠছে শত্রু হননের ইচ্ছা! আমি এখন আমার চিহ্নিত শত্রুর সঙ্গে নিষ্কর্ষমূলক সংগ্রাম করতে আর দ্বিধান্বিত নই। যতদিন না এই সংগ্রামে আমার জীবন-মার্গের কণ্টক —আমার ঘোরতর প্রতিপক্ষের নিধন ও অন্ত্যেষ্টি সম্পূর্ণ হয়, ততদিন আমি অস্ত্রচ্যুত হবো না প্রিয়ে। ততদিন, লাগাম যেভাবে অশ্ব-শকটকে সর্বথা নিয়ন্ত্রণে রাখে, আমিও তদ্রুপ শত্রুনিধনের অদৃশ্য সংকল্পরজ্জু দ্বারা আমার অহোরাত্র উদবিগ্ন মনের কাম-তৃষ্ণা এবং নৈরাশ্যপীড়িত অবাধ্য লিঙ্গাশ্বকে, প্রবল বন্ধনপূর্বক, মৃতবৎ নির্বল করে রাখব। তাকে কোনো প্রকারেই জাগ্রত ও উত্থিত হতে দেব না। তবু আমাকে তুমি ভূমি-স্পর্শ থেকে চিরবিচ্ছিন্ন হতে বলো না, বলো না।

‘আমি তোমাকে চাই। তোমাকে চাই বলেই আমি মাঠারির এই দিগন্তবিস্তৃত নিসর্গ —এই নন্দনকাননসদৃশ অপরূপ অরণ্যকে চাই, এই নক্ষত্র-পুষ্প-বৃক্ষরাজিকে চাই, এই ভাবরি-ভালকি-ভরভরি নামের তৃণসকলকে চাই। আমি চাই এই রতিগড় টিলার মাথায় অর্বুদ বর্ষ অধিষ্ঠিত থাকতে। চাই নক্ষত্রভূষিত শুক্ল আকাশ —সেই আকাশের গায়ে রাতভর বিনিদ্র তোমার সবৃন্ত স্তনবলয়ের মতো নীলাভ চাঁদকে হাতে পেতে!

‘তোমাকে চাই বলে আমি চটক-ঘুঘু-ডাহুক-দুর্গাটুনটুনির কূজন চাই, ওই তালবীথি পরিবেষ্টিত স্বর্গলোকের মীন-পদ-মরাল-শোভিত স্বচ্ছতোয়া ইরাবতী সরোবর চাই, যেখানে নিত্য প্রভাতে তোমার প্রতি-অঙ্গ নিমজ্জিত ও বিধৌত হয়েছে। আর, হে মরালগামিনী— হে কুচভারে অলসগমনা, আরো শুনে রাখো— তোমাকে চাই বলে আমি সর্বোপরি মৃত্যুকে চাই, জীবনকে চাই—আমি লড়াই চাই। নাও, এই অগ্নিশলাকা আয়ুষ্মান রাখো তুমি। যতদিন না আমি আপন সহোদরের সঙ্গে বিজয়ী হয়ে সদর্পে তোমার মোহিনী আঁখির সন্মুখে এসে দাঁড়াই!’

‘কিন্তু কতদিন? কতদিনে তোমার প্রত্যাবর্তন ও যুদ্ধের নিস্পত্তি সম্ভব?’

‘হায়! আমি কী করে এই দন্ডে তোমার এমন সুলোলিত প্রশ্নের জবাব দিই? এখন তো যুদ্ধের প্রস্তুতিই শুরু হয়নি। শত্রুপক্ষের অগ্নিশলাকা স্বীকার করে আমি সমরাঙ্গনে অবতীর্ণ হতে সম্মতি জানিয়েছি মাত্র।’

প্রচ্ছন্ন বেদনাবোধ ফুটে ওঠে পাটনের কন্ঠস্বরে। সে বলতে চায়, একবার যুদ্ধ লেগে গেলে কবে যে তার অবসান ঘটবে তা সে নিজেও জানে না। বছর-দু-বছরও লাগতে পারে, আবার দুই বিংশতিবর্ষ ধরেও তা চলতে পারে। অস্ত্রের সঙ্গে অস্ত্রের সংঘাত বিস্তার পেতে চায়। সে কোনো পূর্বাভাষ মানে না। তবে যতদিনই লাগুক না কেন জারমণিকে ততদিন জ্বলন্ত শালখন্ডের মতো বিরহের জ্বালা বক্ষে নিয়ে অপেক্ষা করে যেতে হবে এই পাটনের জন্য।

চোখ ছলছল করে পাটনের। জারমণির না। পাটন আবেগাপ্লুত হয়ে বলতে থাকে, ‘ততদিন তোমার যৌবন-অরণ্যে যেন নতুন করে আর একটিও কলি কুসুমিত না হয়! ইরাবতীর ঘাটে না ফোটে সংবর্তিকা, না ফলে অতি উপাদেয় শৃঙ্গাটক। ততদিনে বনজ পুষ্পে সুগন্ধিত তোমার আ-নিতম্বলম্বিত কেশরাশি আলুলায়িত না করে তুমি শিরোপরি বিনুনি-বন্ধিত রাখো। নচেৎ বিস্রস্ত কেশরাশির বাতাস-বাহিত ঘ্রাণ যুদ্ধক্ষেত্রে আমার ইন্দ্রিয়সকলকে চঞ্চল করে তুলবে আর আমি শত্রুদমনে বারংবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হবো! আমার ভীমভেদী ধনুকনির্গত প্রবল গতিবেগসমপন্ন কাঁড় অন্ধের মতো শত্রুর গো-শকটযানের চক্র নিষ্ফল বিদ্ধ করে যাবে! ততদিন—’ বলতে বলতে পাটন উন্মাদের মতো হয়ে যায়। টিলার শীর্ষ থেকে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অভিরাম প্রকৃতির দিকে অঙ্গুলি বাড়িয়ে, সে, দন্ডাদেশপ্রাপ্ত অপরাধীর মতো অশ্রুবিহ্বল হয়ে বলতে থাকে, ‘হে ধরিত্রী-জননী, ততদিন এই মাঠারিভূমির গাছে গাছে যেন নতুন করে আর একটিও পাখি কলরব না করে, কোকিল গান গেয়ে না ওঠে! ততদিন এখানের মাঠে মাঠে আমার অতি আদরের ভালকি ঘাসে ভোরের শিশিরবিন্দু যেন না পড়ে! ততদিনে জঙ্গলের একটি কোকিলাও যেন তার কোকিলের জন্য কুহু না দেয়! ততদিন সূর্যাস্তলগ্নে দূরবর্তী ওই পাথুরে ডাঙায় উড়ে উড়ে, পাঁড়ুক-পাঁড়ুকি যেন কেলি না করে। ততদিন—জারমণি! জারমণি! জারমণি!...’

পাটন নিজের উদ্বেল আবেগ সংবরণ করতে পারে না। জারমণির হাতে অগ্নিশলাকাটি দিয়ে সে তার পায়ের কাছে অবোধের মতো লুটিয়ে পড়ে। অশ্রুবিহ্বল নয়নে কাতর হয়ে বলতে থাকে, ‘আমি অজ্ঞান, অধম। মেধাহীন আমি, দর্শনে ব্যুৎপত্তিহীন আমি। আমার সহোদরের মতো পান্ডিত্য ও রণকৌশলে দড় ও প্রখর হয়ে উঠতে পারিনি আমি। তথাপি আমি চাই, এই মাঠারিযুদ্ধে তুমি সর্বান্তঃকরণে আমারি পার্শ্বে, আমারি পক্ষাবলম্বন করে এই রতিগড়ের অমানিশাচ্ছন্ন কুঠুরিতে নিরন্তর অবস্থান করো। কাল ও মহাকাল আমি বুঝি না। জয় জানি না, পরাজয় জানি না—রানি! তুমি আমাকে শুধু সংগ্রামের জন্য প্রাণিত করো!’

পাটনের হাতের মশালটি নিয়ে, সে মহীয়সী নারী, সগর্ব হুকুমের সুরে বলে উঠল, ‘যাও! যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু কর। অস্ত্রসম্ভার জোটাও। ধনুক বাঁধো, কাঁড় বানাও, শকট বানাও। কালক্ষয় না করে গ্রাম-গ্রামান্তর ঘুরে শস্য আনো। গোলাঘর বানাও, মজুত করো। শত-শত সৈন্যশিবির গড়। লোকবল সংগ্রহের অভিযান শুরু করো আর অষ্টযাম নিজেকে যুদ্ধকৌশল ও অরিদমনের চিন্তায় আচ্ছন্ন রাখো। গ্রামে গ্রামে —কুলহিতে কুলহিতে —প্রতিটি জনপদের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ো! বনে-বাদাড়ে, শ্মশানে-ডহরে, খেতে-টাঁইড়ে-খামারে। দিন নেই রাত নেই ঘুরতেই থাক। হাড়ি-বাউরি-মুচি-তাঁতি-কামার থেকে শুরু করে বাগাল-মুনিষ-মালহার-চাষি সকল গ্রামবাসীদের মধ্যে ঢুকে পড়ো। বিরোধী পক্ষ এদের সেনানী করতে গ্রামে-ঘরে পৌঁছনোর আগেই তুমি তোমার পক্ষে তাদের সংগঠিত করো। শুরু করো যুদ্ধের প্রস্তুতি! যাও —ত্বরায় যাও —ওঠো!’

পাটন বিলাপমিশ্রিত কন্ঠে জয়োল্লাসে আর্তনাদ করে উঠল, ‘জারমণি! তুমি আমার! তুমি আমার! সহোদরেরর মুন্ড আমি অতি সত্ত্বর তোমার মঞ্জুলচরণতলে এনে হাজির করছি!’

শুরু হল যুদ্ধের প্রস্তুতি।

আর আলস্য নয়, ভয় নয়, কোন সুদূর ভবিষ্যতে স্বপ্নপূরণ হবে সেই প্রত্যাশায় উছলিত যৌবনার অঙ্গমুদ্রা দেখে অকারণ প্রহর গোনাও আর নয়। সব আবেগ ও কল্পনার অতিরঞ্জন থেকে মুক্ত করে, এ যেন অন্য এক পাটন শবরের জন্ম দিল মাঠারি। অথবা বলা চলে, গর্ভে ধারণ না করেও এই পাটনকে সৃজন করল সেই ‘অলিঙ্গমপশ্যা’ নারী, যাকে নিয়ে পাটনের অজগর কাম, অফুরান বাসনা। এই দূরবগম্যা নারীর সঙ্গেই, পাটন, তার অনি:শেষ রিপুর তাড়না নিয়ে, পাহাড়-জঙ্গল-উইঢিবি আর বিকটকায় পাথরের ফাটলগুলিতে ওৎ পেতে থাকা সরীরৃপের মতো, অবিচ্ছেদ্য মিথুনে আবদ্ধ হতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। পারেনি। বহু চেষ্টা, বহু আকুলতা সত্তেÄও পারেনি। অন্তরে-বাহিরে বেদনায় বিদীর্ণ হয়েছে মাত্র।

এই মুহূর্তে, পাটনকে দেখে মনে হয় না সেই না-পারার সংক্ষোভ কী নৈরাশ্য তাকে এক ছোট্ট গর্গট-বীজ পরিমাণও আচ্ছন্ন করতে পেরেছে বলে। জারমণিকে পাশে পেয়ে, মনে হয় যেন, সে পাশে পেয়েছে তার বিশ্বাসকে। যুদ্ধ নিয়ে সে এখন এতোটাই উদ্যোগী ও আত্মাশ্রয়ী। এখন চক্ষু মুদে, অথবা চক্ষু খোলা রেখেও, জারমণিকে নয়, সে দেখে তার এক এবং অদ্বিতীয় প্রতিপক্ষকে। বেনামূলের মতো যার একমাথা চুল। অস্থি-পঞ্জরময় যার দেহ, আজানুলম্বিত যার বাহু। তবু সেই শরীর নিয়ে কী তার তেজ! কী বিক্রম! পাটনের মুখোমুখি দাঁড়ালে মনে হয় যেন পাথরে পাথরে ঘষা লেগে তার দৃষ্টি থেকে মুহুর্মূহু ঠিকরে বেরচ্ছে আগুন।

এতদিনে, পাটন হয়তো বুঝতে পেরেছে, অবিদ্যাহীন লোকায়ত জ্ঞান এবং দার্শনিক ব্যুৎপত্তিই এই স্ফুলিঙ্গ। তবুও তার সঙ্গে সম্মুখ সমরে নামতে পাটন আর ভীত তো নয়-ই, বরং তার জীবনমার্গের এই সুদৃঢ় কণ্টককে চিরতরে উৎপাটিত করতে সে বদ্ধপরিকর। ক-দিন ধরে এখন রীতিমত সেই মারণ-যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে সে। প্রস্তুত হচ্ছে দিকে দিকে তার সমর্থনকারী গ্রামবাসীদের একত্রিত ও সঙ্ঘবদ্ধ করতে। এ যুদ্ধ তো পাটনের একার যুদ্ধ নয়।

যুদ্ধ কখনো ব্যক্তিগত হতে পারে না। তা সর্বদা সামষ্টিক। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বই সর্বজনিক যুদ্ধের আকার নেয় এবং ভৌগোলিক সীমার মধ্যে ঢুকে, মারীর মতো তা সীমাকে লঙ্ঘন করেও ছড়িয়ে যেতে থাকে। ঠিক এই কারণে মাঠারি-যুদ্ধের অভ্যুদয় মাঠারিতে হলেও তা মাত্র এই ক্ষেত্রতে সীমিত থাকবে না। থাকতে পারে না। দিগন্তহীন এই বিশাল ভূমিকে ছাড়িয়ে তা অপরাপর গ্রামে এবং গ্রামবাসীদের ভেতরেও ঢুকে পড়বে। তখন এই যুদ্ধ এই তামাম অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করবে। এই যুদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে তাদের হাল-লাঙল-খেত-কোদাল-জমির সঙ্গে যুদ্ধ। গোরু-কাড়া-ছাগল-খচ্চর-ভেড়া আর হাঁস-খুঁকড়ি-পায়রার সঙ্গেও যুদ্ধ! পাটন কি সেই ভয়াবহতা অনুমান করতে পারে?

আবার এমন প্রশ্নও তো তোলা যায়— যে-নারীকে কেন্দ্র করে সহোদরের সঙ্গে সহোদরের এই বিবাদ, বিবাদ থেকে যুদ্ধ, যুদ্ধ থেকে নিষ্পত্তি, জগতে সেই নারীও কি ব্যক্তিগত? যদি সে ব্যক্তিগত হয়েও থাকে, তাহলেও, তার ওপরে অন্যব্যক্তির হস্তক্ষেপকে প্রতিহত করতে কি এই যুদ্ধ নয়? আর যদি সে-নারী স্বাধীনসত্তা হয়ে থাকে, তবে ব্যক্তির সেই স্বাধীনতা রক্ষার্থে এই সংগ্রাম। এইসব যুক্তির হালা গেঁথে পাটন, মাঠারিভূমিকে কেন্দ্র করে পূর্বদেশভুক্ত যত-যা মৌজা আছে, গ্রাম আছে, ডি-ডহর আছে, প্রতিটি জনপদে তার করজোড় আবেদন নিয়ে যাবে। সে পল্লিগুলিতেও যাবে, বস্তিতে বস্তিতে যাবে, ঘরে ঘরে যাবে। ইতিমধ্যে সে যখন খবর পেয়েই গেছে, তার সহোদরও যুদ্ধকে ছড়িয়ে দিতে পশ্চিমের সমস্ত গ্রামবাসীদের একত্রিত করতে নেমে পড়েছে, তখন সে-ই বা কেন সে-উদ্যোগ নেবে না? অঙ্গদের নেতৃত্বে পশ্চিমাদের আগ্রাসনকে রুখতে সে পূর্বস্থ গ্রামবাসীদের স্বাজাত্যবোধ এবং তাদের ঐক্য ও অভিমানকে জাগিয়ে প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তুলতেও কসুর করবে না।

‘হে কর্মিষ্টি কৃষিভাইরা, হে যুগ-যুগ ধরে ডাং-খাওয়া শবর-সাঁওতাল-হাড়ি-কুড়মি-মুদি ভাইরা!’ শকট থেকে নেমে, এই সম্বোধন দিয়ে শুরু করবে পাটন। গ্রামের প্রতিটি হরিবোল মেলার চত্বরে দাঁড়িয়ে। আচমকা এমন সহৃদয় সম্ভাষণ শুনে, যারা ছাঁচতলে গাছতলে থাকবে, যারা মাঠে ছাগল-গোরু চরাতে কিংবা কাঁধে কোদাল নিয়ে আইড় কদলাতে যাবে, আর যারা ঘরের বাইরে ধারীতে হাঁটু তুলে বসে আলস্যে চুটি টানতে থাকবে, যারা হাঁস-মুরগি খঁহড়াতে ব্যস্ত থাকবে কিংবা হাতে ক্ষুর ধরা নাপিতের কাছে গলা বাড়িয়ে দাড়ি কামাতে থাকবে, তারা হু-হু করে সকলে জড়ো হয়ে যাবে পাটনকে ঘিরে। বিচলিত ও উদবিগ্ন হয়ে পাটন তাদের এমনভাবে বোঝাবে, যেন তারা বুঝতে পারে যে, আসন্ন দুঃসময়ে সে তাদের কাছে ত্রাতার ভূমিকা নিয়ে, যুগে যুগে সম্ভাব্য অবতারের মতোই, আচমকা এই অখ্যাত জনপদে আবির্ভূত হয়েছে। সে তাদের বোঝাবে যে, এক ভয়ংকর সময় সমাসন্ন। যাকে কেবলমাত্র সম্মিলিত শক্তি-প্রচেষ্টায় ঠেকানো সম্ভব। নচেৎ তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন। অতঃপর সংকট থেকে উদ্ধারের জন্য, উপসংহারে, সে গ্রামবাসীভাইদের গাত্রোত্থান করতে জরুরি কালীন আবেদন জানিয়ে বলবে, ‘উঠ তুমরা! ঘুমায় না আর! হাঁতে হাঁতে কাঁড়ধনুক লাও আর চলৌ মাঠারি...!’

এই দুর্দশাগ্রস্ত অসহায় মানুষেরা অতীতে বহু অত্যাচার আর দমন-পীড়ন সহ্য করেছে, কিন্তু নিজের শ্রেণিকে চিনে যথার্থ শোষিত, সর্বনি:স্ব তথা অত্যাচারিতদের নিয়ে দলবদ্ধ হতে পারেনি, উপযুক্ত নেতৃত্ব ও চেতনার অভাবে। অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে স্তব্ধ করে দিতে পারেনি যুদ্ধবাজদের ডম্বরুকে। সে-কারণে যুগ যুগ ধরে তারা অশ্বখুরে দলিতই হয়ে এসেছে। আর বিপন্ন হয়েছে তাদের অস্তিত্ব। কখনো জমির খাজনা কিংবা মালগুজারি দিতে না পেরে, পাইক-পেয়াদার অত্যাচারের ভয়ে মাথার ঝুড়িতে মাটির বাসন-কোসন আর কাঁখে-কোলে দুধের শিশুকে নিয়ে, পরিবারের পিছু ধরে পরিবার ঘরছাড়া হয়ে গেছে। এক বসতভূমি ছেড়ে পালিয়েছে আরেক বসতভূমির দিকে। কখনো-বা জনপদ ছেড়ে জঙ্গলে, নির্জন নদীতীরে। আবার কখনো মহামারীতে শূন্য হয়ে গেছে কত-কত বসতি। কত ডিহি-ডহর। খরায়, আকালে, মন্বন্তরে গ্রাম ছেড়ে কাতারে কাতারে ছিন্নমূল মানুষ একবাটি ফেনের জন্য নিকটবর্তী শহরে পাড়ি দিয়েছে। শুকনো মাই চুষতে থাকা কালো ও অপুষ্ট শিশুকে দেখিয়ে, ততোধিক কৃষ্ণকায় জননী বলেছে, ‘মাগো!...’

এও কি যুদ্ধ নয়? যুদ্ধই, তবে একটু ভিন্ন চেহারায়। যুগে যুগে, কালে কালে, যুদ্ধের চেহারা— তার দলন ও নির্যাতন— পালটে পালটে যায়। বস্তুত, প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সমাজে যুদ্ধ চলতেই থাকে।

কিন্তু কেন তা চলবে? মানুষ যখন আজ আদিম সমাজে থেকেও আদিমতা থেকে মুক্ত হতে চাইছে, তখন কেন এই বর্বরতা? যুদ্ধ প্রতিরোধে বৃহত্তর যুদ্ধ গড়ে ওঠেনি বলেই কি এই অভিসন্ধিমূলক যুদ্ধ? যুদ্ধের নামে এই দমন-পীড়ন আর আগ্রাসন? দুর্বল ও অসহায়কে আরো দুর্বল ও বশংবদ করে রাখাও তো যুদ্ধ?

এই সব বঞ্চিতদের মনে চেতনার উন্মেষ ঘটাবে পাটন। তার সীমিত জ্ঞান ও বুদ্ধিকে সম্বল করে। অতি সরল ও আটপৌরে উপমা দিয়ে, দৃষ্টান্ত দিয়ে সে তার বক্তব্যকে বোধগম্য করে তুলবে তাদের কাছে। অঙ্গদের মতো মার্জিত-সংস্কৃত ভাষায় নয়, আঞ্চলিক রাঢ়ুষ্টা ভাষায় বোঝাবে যে, মানুষ কখনোই যুদ্ধ চায় না। কিন্তু ভবিতব্য এটাই যে, সভ্যতাকে কলঙ্কিত করতে তবু যুদ্ধ হয়। অতীতে তেমন বহুক্ষেত্রে বহু যুদ্ধ হয়েছে, ভবিষ্যতেও মানুষ এই যুদ্ধ নামক অসভ্যতা থেকে নিষ্কৃতি পাবে না। বরং যুদ্ধের নামে আরো বেশি মাত্রায় প্রতিবেশি ভূখন্ডগুলি পরস্পরকে হুমকি দিয়ে যাবে, লিপ্ত হবে মানবহত্যা ও সভ্যতা-সংহারে। এই যুদ্ধ তখনি হয়, যখন তার পিছনে কোনো না কোনো অশুভ উদ্দেশ্য থাকে। লোভ থাকে, হিংসা থাকে, ধ্বংসের প্রবণতা থাকে, কাম থাকে। ঘটনাচক্রে পাটনের ওপর আরোপিত যুদ্ধ আজ পাটনের ওপর আরোপিত যুদ্ধ শুধু নয়। তা এই অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষের যুদ্ধ। সে-কারণে এই যুদ্ধ আজ যখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, তখন তাদের প্রত্যেককে সামিল হতে হবে তাতে। প্রতি ঘর থেকে পুরুষকে ধরতে হবে অস্ত্র। অন্যথায় পশ্চিমাদের দাপট তাদের ক্রীতদাসে পরিণত করবে। সুতরাং আজ সময় হয়েছে একক নয়, যৌথ প্রতিরোধের। এক নয়, সহস্র ধনুকের। একটি তিরের প্রক্ষেপণ নয়, বহু বহু তিরের লক্ষ্যের দিকে ছুটে যাওয়া। যুদ্ধের নামে যে-আগ্রাসন, যে-লুণ্ঠন, যে-ভীতিপ্রদর্শন, পাটন চায় এই মাঠারিযুদ্ধেই সর্বকালের জন্য তার যবনিকা পতন ঘটুক।

শুধু পাটন চায়? জারমণি চায় না? সে কি চায় না এই দ্বিপাক্ষিক কলহের আশু মীমাংসা হয়ে যাক? সে-মীমাংসা যদি ভীতি-প্রদর্শন করে, লুন্ঠন করে, যুদ্ধ করেও হয়— তবে তাই হোক! তবু চিরস্থায়ী মীমাংসা হয়ে যাক। যেন তাকে নিয়ে এই সৃষ্টিশীল সুন্দর ধরণীতে আর কোনোদিন কোনো যুদ্ধের সূচনা না হয়।

বস্তুত, সেই তাগিদেই পাটনকে সে পাটন করে তুলল। যে-পাটন ছিল শুধুই কামের অবতার, তাকে সে ‘যুদ্ধ’ নাম্নী বৃহত্তর কামনিধির অভিমুখে ঠেলে দিল। যে-পুরুষ ছিল অষ্টযাম নারীলিপ্সু, তাকে সে কোদন্ড কাঁধে যোদ্ধৃবেশে জাগিয়ে তুলল। এবং এই মাঠারিভূমি, এই যুদ্ধভূমির পশ্চাদপটে থেকেও, এখনো অব্দি, এই নারীই জুগিয়ে যেতে লাগল পাটনের যুদ্ধের অনুকূলে যাবতীয়-যা বুদ্ধিভরসা। তার বলেই পাটন আজ এতোটা বলীয়ান। এতোটা তৎপর হয়ে উঠল। জারমণি তো এটাই চেয়েছিল।

ঢের অন্ধকার থাকতে ঘুম ভেঙে গেল পাটনের।

ঘুম ভাঙতেই তার মনে হল, সে কোনো আদিম অস্ত্রাগারে একাকী বন্দী! এই ক-দিনে উচ্চতম টিলাটির মাথায় জঙ্গল থেকে বয়ে আনা মোটা মোটা ডালপাত আর ভারী পাথরের চাঁই দিয়ে বর্বর হাতে বানানো তাদের ঝুপড়িটির দশা এখন এমনই। পাথর বসানো দেয়ালের গায়ে ঝুলছে বিশাল বিশাল ধনুক আর বিষ মাখানো কাঁড়ের গোছা, যা এখনো তূণীরে ঢোকানো হয়নি। ঝুপড়ির প্রবেশমুখে রাতভর জ্বলতে থাকা গাছের গুঁড়ির বিচ্ছুরিত আভায় অস্ত্রসকল চকচক করছে। মাঠারি গ্রামের কামারঘর থেকে এই কাঁড়গুলি শুধু বানিয়ে এনেছে পাটন। বাকি সবটাই সে করেছে নিজে। শরের বোঝা কেটে কাঁধে করে এনেছে। দু-হাত দু-হাত করে কেটেছে। প্রতিটি শরের মুখ দা দিয়ে খানিকটা চিরে, সেই মুখে তীরের ধারালো ফলা আটকে চিহড়ের ছাল ঘুরিয়ে শক্ত করে বেঁধেছে, যাতে লক্ষ্যভেদের পরেও বিষাক্ত ফলাটি বিঁধে থাকে, খসে পড়ে না যায়।

নিজের হাতে বানানো এমন অনেক তিরের গুচ্ছ আর ঢাউস ঢাউস ধনুক তো আছেই, সেই সঙ্গে যুদ্ধের সময় জ্বালানির প্রয়োজন মেটাতে ঘরে-বাইরে ডাঁই করা আছে পাহাড়-বন্দি শুকনো গাছের গুঁড়ি। রসদ সংগ্রহের এবং উদ্যোগের এই তো সবে শুরু। এই শুরুটুকু করে দিয়ে সেনানী সংগ্রহের কাজে আজই—এই মধ্যরাত্রেই —অনির্দিষ্টকালের জন্য পূর্বের গ্রামে গ্রামে পাড়ি দিতে বেরিয়ে পড়বে পাটন।

আর জারমণি? সেও বসে থাকবে না। চতুর্দিক থেকে পাথরখন্ড জোগাড় করে, মাথায় মাথায় সে রতিগড়ে বয়ে আনবে। তাদের আস্তানাটির পাশে জমা করে পর্বতপ্রমাণ করবে। এও যুদ্ধেরই কাজে লাগবে। যদিও আস্তানার ভেতরে কিছু ভোঁতা ও ভারী প্রস্তরখন্ড সর্বদা মজুত থাকে। থাকে আরো কিছু আদিম হাতিয়ার-পত্তর, যেগুলো তারা যখন-তখন ফুরসত পেলে নিজেরাই বানিয়ে রেখেছে। সে নেহাত ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা ভেবে। যেমন শিকার ধরার জন্য পাটনকে বানাতে হয় নানাবিধ বিচিত্র প্রাগৈতিহাসিক জালযন্ত্র— লাঠা-কাঁইড়া, ফাঁদিজাল, টেঁটা ইত্যাদি। বন-জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা তুচ্ছ উপকরণ দিয়ে অদ্ভুত বুদ্ধি ও কৌশল প্রয়োগ করে এগুলি তারা সহজে বানাতে পারে। এই বিস্ময়কর গ্রামীণ প্রযুক্তি যুগ যুগ ধরে আজও বহন করে চলেছে এই মানুষগহুলি।

তবে এখন ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা নয়। তাদের ভাবনায় এখন ঢুকে পড়েছে যুদ্ধ। এই বিরাট আয়োজনকে গড়ে তুলতে হবে, যা একার দ্বারা কোনোভাবে সম্ভব নয়। এই কাজে তার পক্ষের সমস্ত মানুষকে উদবুদ্ধ করতে হবে, যাতে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আপন আপন প্রাণরক্ষার তাগিদেও এই আয়োজনের ব্যাপারে উঠেপড়ে লাগে। কিন্তু তারও আগে? তারও আগে দরকার ‘মুষ্টি-অন্ন’।

আস্তানা থেকে মাথা নীচু করে বাইরে বেরিয়ে আসে পাটন। কৃষ্ণপক্ষের রাত। মাথার ওপরে যেন আকাশ নেই স্রেফ ধু-ধু অন্ধকার! মহাশূন্য থেকে টিলার ওপরে নেমে আসতে চাইছে সেই অন্ধকার। জঙ্গল জুড়ে নিশুতি রাতের এই নৈ:শব্দ্য ভেঙে তারস্বরে ডেকে চলেছে চ্যারেঙ পোকাগুলি। হাওয়া বইছে শন-শন। ঝাপটানি খাচ্ছে শাল-শিরীষ-কদম্ব আর তাল গাছের পাতাগুলি। বহু আরণ্যক পুষ্পের মিশ্রসুবাসে পাটনের মন এখন আবার নতুন করে কল্পনাপ্রবণ, উদাসী হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু এই ঘোর বাস্তবভূমিতে দাঁড়িয়ে সুগন্ধের সূত্রে কল্পনার বিস্তারকে তার নিছক বিলাস মনে হল। আর আচমকা কোটরে ও ডালে ডালে নিদ্রিত পাখিদের মিলিত কলরব শুনে তার মনে হল—রাত পোহাতে এখনো তিনপ্রহর বাকি। পাটন জ্বলন্ত গাছের গুঁড়িটির পাশে আরো কয়েকদন্ড দাঁড়িয়ে থেকে তাৎক্ষণিক উপভোগ করে প্রকৃতির অনির্বচনীয় অনুভূতি।

আহা! মাঠারি যেন স্বর্গলোকের নামান্তর। এখানে প্রকৃতি ও মানুষ একাকার। এখানে হিংসা নেই, হিংস্রতা নেই। আর্তনাদ নেই, কোলাহল নেই। এখানে অনাহার নেই, দুর্ভিক্ষ নেই। বশ্যতা নেই, আধিপত্যও নেই। মনুষ্য ও জীবকূলের কোনো হাহাকার এখানে নেই। কারণ কী, এখানে অতৃপ্তি নেই। সর্বত্র সর্বদা শান্তি বিরাজমান। প্রেমের জন্য অস্থিরতা নেই, মিলনও তাই অবারিত। এখানে সমস্ত কিছু যেন এক দৈবলোকের ইশারায় সুরে ও ছন্দে বাঁধা। যেন কোনোদিন এখানে সুরের অভাব ছিল না। ছিল না তাই অস্ত্রের প্রক্ষেপণ, নিকটস্থ গ্রামগুলিতে গার্হস্থ্য ক্রন্দনরোল, ছিল না এখানে রাক্ষসের দাপট। যদি তার সামান্যতমও উদ্ভব ঘটেছে, তবে তা সম্ভব হয়েছে সেইদিন থেকে, যেদিন এই স্বর্গপ্রতিম মাঠারিতে আবির্ভাব ঘটেছে পাটনের। এই রাক্ষসের। সে কাম ও জৈবতৃষার হস্তিক্ষুধা নিয়ে হাজির এখানে।

আর আজ, সেই ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যই, শরে ও ধনুকে সজ্জিত হতে হচ্ছে তাকে। এই যুদ্ধ যেন হিংসার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, তার কাছে এই যুদ্ধ বস্তুত একের ক্ষুধা নিবৃত্তির সংগ্রাম।

কিন্তু অঙ্গদের কাছে তা সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। আর তাই এই যুদ্ধের নিপত্তি মানে কেবল জয়লাভ নয়। এই যুদ্ধের নিপত্তির অর্থ হয় দানবীয় লক্ষ্যের ক্রমবিস্তার, অথবা সত্য-দর্শনের অমোঘ প্রতিষ্ঠা। যদিও, পাটন জানে না সত্য কী, দর্শন কী। সে জানে, যুদ্ধের সমাপন মানে প্রতিপক্ষের বশ্যতা স্বীকার। হায় পাটন! বৃষমূর্খ।

এই মনোরম প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকেও, পাটন, একটিবারের জন্যও মনের মধ্যে দুর্বলতাকে জাগিয়ে তুলতে চায় না। যদিও সে তার প্রকৃতি অনুযায়ী কখনোই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, স্থিতিশীল, লক্ষ্যে অবিচল নয় বলে, প্রায়শ দুর্বলতা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এখনো তার মনে হয়— সে কি আবার ফিরে আসতে পারবে, এই মাঠারিতে? ফিরে আসা মানে তো শুধু ফিরে আসা নয়। তাকে ফিরে আসতে হবে তার পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে এমন বিপুল সংখ্যক লড়াকু মানুষের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। গ্রামবাসীদের জমায়েত করে সে তাদের যুদ্ধে উদবুদ্ধ করবে, আর লড়াইয়ের অঙ্গীকার বাবদ আবেগ-বিহ্বল গৃহস্থের হাত থেকে গ্রহণ করবে ‘মুষ্টি-অন্ন’।

‘মুষ্টি-অন্ন’-র পরিমাণের ওপর নির্ভর করবে তার সেনাবল। এটা মাথায় রেখে পাটন তার কাজে কোনো বিরতি চায় না, বিশ্রাম চায় না। সে অগণ্য গ্রামের উদ্দেশে তার নিরলস যাত্রা অবিচ্ছিন্ন রাখতে চায়। তাতে যদি বর্ষ ঘুরে বর্ষ আসে, তবুও সে তার পরিব্রাজন অসমাপ্ত রেখে যাত্রা-ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে আসবে না মাঠারিতে। জারমণির কাছে তার দেহজ আকর্ষণে। পালিয়ে এলেও জারমণিকে সে পাবে না। যুদ্ধের আগেই হারাতে হবে তাকে। জারমণি তো অতিকঠোর হয়ে বলেইছে, এই যুদ্ধ আসলে তার পৌরুষ-প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। পাটন যদি যুদ্ধের আয়োজন সম্পূর্ণ না করে, যদি সে হতোদ্যম হয়ে পড়ে, তাহলে যে-ভূমির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে এই মহীয়সী নারী, পাটনকে তার স্পর্শ থেকে বহুদূর চলে যেতে হবে, পাটনের পক্ষে যা সম্ভবই নয়। সে-কারণে পাটনের কাছে এই যুদ্ধ আরো কঠিন। তার কাছে এই যুদ্ধ অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলারও যুদ্ধ।

এই গভীর রাতে উচ্চতম ও-ই-ই টিলার মাথায় জ্বলছে অগ্নিশিখা! তার পাশে দন্ডায়মান এক অতিকায় কৃষ্ণ-পুরুষ। যে-কেউ পাটনকে দেখে প্রেতযোনি ভেবে ত্রাসাচ্ছন্ন হয়ে পড়তে পারে। অথবা তার মনে হতে পারে—এই অরণ্যবহুল অদৃষ্টপূর্ব নন্দনকাননের ধ্বংস বুঝি আসন্ন! ধ্বংস আসন্ন এই চিরহরিৎ অরণ্যের, বৃক্ষরাজির, রকমারি লতাগুল্ম, বহুবিধ পক্ষিকূল, সরীসৃপ আর মনোহরণকারী বাহারী কীটপতঙ্গের। এমন অসময়ে তাই অনিষ্টকারী দানবের আবির্ভাব ঘটেছে পাহাড়-শীর্ষে!

পাটন তো দানবই। দিন দিন সে অতিকায় হয়ে উঠছে। তার আচরণও হয়ে উঠছে দানবোচিত। কিন্তু কিসের জন্য? কোন প্রয়োজনে সে নিজেকে, নিজের শরীরকে এভাবে সঞ্চয় করে শান দিয়ে রাখে? কার কাছে সে উৎসর্গ করবে নিজেকে? উত্তর খুঁজতে গিয়ে কখনো কখনো রীতিমত বিমর্ষ বোধ করে পাটন।

আবার কখনো নিজেকে সান্ত্বনাও দেয়— তার এই শরীর, এই রাক্ষস-কাম এবং অমিত বল সে দানা-দানা করে মজুত রেখেছে সেই নারীর জন্য। যে নারী স্বয়ং এক মহাকামের নিধান। এক অগ্নিকুন্ড। তার সঙ্গে লিপ্ত হতে গেলে তাকেও তার উপযুক্ত হতে হবে। তার দানবোচিত শরীরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাই বেড়ে চলেছে তার অন্তর্নিহিত জৈব আক্রোশ আর রিরংসু প্রবণতাও।

যদিও, জারমণিকে নিয়ে এই সংকল্পবিঘ্নকারী ভাবনা এখন ভাবতে চায় না পাটন। এই ভাবনা তার মনে বড়বেশি বিস্তার চায়। ভাবতে ভাবতে তা এতোটাই সুদূরপ্রসারী হয়ে ওঠে যে, পাটনকে তা ক্রমেই অন্যদেশ, অন্যকাল, অন্যপ্রেক্ষিতে নিয়ে চলে যায়। তখন তাকে এটাই মনে করতে বাধ্য করে যে, এই নারীর সর্ব অঙ্গে লিঙ্গবিদ্ধ করতে না পারলে তার জীবন অর্থহীন, তার বেঁচে থাকা বেঁচে থাকা নয়। কিন্তু যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে, পাটনের মনে হয়েছে, এই অলীক কুনাট্যের এখন আর কোনো স্থান নেই তার মনে, তার কল্পনায়। অন্যথায় তাকে চিরকালের জন্য ধূলিসাৎ হয়ে যেতে হবে। শুধু জারমণির কথা ভেবে তার আর বেঁচে থাকাই হবে না এই সুন্দর ভুবনে।

পাটনের চোখে ভুবন সুন্দর, সুন্দর এই ধরণীতল। কেন কী, এই ভুবনে স্বমহিমায় বিরাজ করছে তার ভুবনমোহিনী। তার বিরাজমানতার কথা ভাবলে, তাকে কল্পনা করলে, পাটনের কোনোকিছু আর অসুন্দর প্রতীয়মান হয় না। মনে হয় এই ডুংরি-ডাংরা, এই কুড়চি-পলাশ, ভরভরির ঝোপ, ঘুরঘুইরা পোকা, গিরগিটি, গোসাপ— প্রকৃতির কোনো জীবই অসুন্দর নয়, হিংস্র নয়। তাই কখনো কখনো খেতের আলে, ঝুড়ে-জঙ্গলে-ঢঁড়রে কোনো স্বর্ণগোধিকাকে বধ করতে গিয়েও আচমকা সে থমকে দাঁড়িয়েছে ধনুক হাতে— সে যেন তার মধ্যে কোথাও খুঁজে পেয়েছে জারমণির সৌন্দর্য। সে হত্যা থেকে বিরত থেকেছে আর গর্গট ঝোপের আড়ালে থেকে নি:শব্দে লক্ষ করে গেছে তাদের মিলন। সে তপ্ত হয়েছে, শরীরে, মনে। তারপর অনিবার্যত প্রশমন ঘটিয়েছে নিজের। আবেগাকুল হয়ে গাছে-পাতে ছড়িয়ে দিয়েছে তার ঈষদুষ্ণ বীর্য।

অতঃপর, মুহূর্তের সেই ঘোর কেটে যাওয়ার পর শীতল হয়ে পড়লেও, তার বিষাদ জাগেনি। বরং মনে হয়েছে, প্রকৃতি সুন্দর হয়ে আছে নারী আছে বলে। প্রতিটি সুন্দরই সঙ্গীতময় তার জারমণি আছে বলে। আর যেখানেই জারমণি, সেখানেই বিপরীত লিঙ্গের সহাবস্থানে সে কল্পনা করে নিজেকে। ঠিক যেমন ঢিবিতে উভুপোকা, জঁদা আমে কাঁচা নুন। আর কেউ, আর কোনো কিছু তার আশ্রয় হতে পারে না, তার সঙ্গে সংগত করার উপযুক্ত হতে পারে না— তার যোটক হওয়ার পক্ষে সকলই বেমানান।

কল্পনাই সার। আর কতদিন সে ঘুন-ঘুন করে এই কল্পনার তন্তু বুনে যাবে? তা কি আদৌ বাস্তব হয়ে উঠবে তার জীবনে? কবে সে স্বর্ণগোধিকার মতো গভীর আশ্লেষে জড়িয়ে ধরবে তাকে আর বলবে, ‘হে স্ত্রীলিঙ্গাধিকারিণী অনন্তযৌবনা! আমি যৌবনাগম কাল হইতে তৃষ্ণার্ত, আমাকে তোমার গহীন ভূমধ্যে নিমজ্জিত করো! নিবারিত করো আমার আকন্ঠ পিপাসা।’

এমন অনুনয় করা হলেও, পাটন জানে, জারমণি ভ্রূক্ষেপহীন ও নিশ্চেষ্ট থেকে যাবে। তা হয়তো এই কারণে যে, জারমণি চায় পাটন তার দৃষ্টিকে, তার ভাবনাকে, অন্ধকার থেকে রোশনাই-এর দিকে ফেরাক। দন্ডে দন্ডে কেন সে মিলনের জন্য আকুল হয়ে থাকবে? কেন সে নারীর শরীরে রতির বিস্তার বৈ আর কিছুই দেখতে পায় না? সে চায় তার এই মায়া ও বিভ্রমের অবসান ঘটুক। কাম থেকে সে নিষ্কামের দিকে যাক, ‘ত্রিগুণ’ থেকে মুক্ত হয়ে নিস্ত্রৈগুণ্য হয়ে উঠুক। তবেই জীবনযুদ্ধে সে আলোর দিশা পাবে। অন্যথায় যোনিচিন্তা তাকে থর থর কম্পিত করবে। কম্পিত হবে তার চরণস্পৃষ্ট ভূধর। উথালি-পাথালি তরঙ্গ উঠবে সরোবরগুলিতে। সে আলোড়নে জারমণি জারমণিই থেকে যাবে—নির্মূল হয়ে যাবে পাটন।

সত্যিই কি জারমণি এটা বলতে পারে? যদি বলেও, পাটন কি তা মেনে নেবে? কাম থেকে নিষ্কামের দিকে যেতে হলেও কি কামকে অনাস্বাদিত রেখে যাওয়া সম্ভব? হয়তো পাটন তার প্রত্যুত্তরে বলে উঠবে, ‘নারী, তুমি স্বয়ং কামিনী। তুমি স্রোতস্বিনী স্বরূপা। তোমাতে নিমজ্জিত হইয়া তোমার তরণী না বাইলে কী প্রকারে পারাপার সম্ভব? তোমার ভিতর দিয়াই আমি কেবল নিষ্কাম উপকূলে পৌঁছাইতে পারি।’

কখনো কখনো নিজেকে তার ভীষণ একা, ভীষণ নি:সঙ্গ লাগে। মনে হয়, কুলু কুলু বাতাস বইছে তটে, কিন্তু মন তার বইছে না। সে কামবারিবক্ষে ঝম্প দেওয়ার জন্য ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে উপকূলে।

টিলার পাদদেশ থেকে বাতাসে ভেসে এলো বৃষের হামলানি। সেথায় শকট মজুত রেখেছে পাটন, শকটের সেই জীবটি নিজেরই দেহে ল্যাজের ঝাপটা মেরে তাগিদ দিতেছে তাকে, ‘হে অতিকায়! আর কেন? মহাযুদ্ধের ভিক্ষান্ন সংগ্রহের নিমিত্ত বিলম্ব না করিয়া ত্বরায় বাহির হও। বহু গ্রাম, বহু জনপদ, বহু জনজাতির ডেরায় ডেরায় ভ্রমণে দিবস-মাস-বর্ষ অতিক্রান্ত হইযা যাইবে। এই বতর বাহির হইয়া পড়। মশকের কামড়ে তিষ্ঠানো দায় হইতেছে!’

পাটন যে কেবল শকটটিই মজুত করেছে, তা নয়। সেই শকটে জ্বালানি-আহার্য আর মৃন্ময় কুম্ভও নিয়েছে। যাতে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে নদী-পুষ্করিণী-বাঁধগাভা অথবা ভিন্ন কোনো জলাশয় থেকে সে শীতল জল সংগ্রহ করতে পারে। অন্নক্ষুধা জাগলে কোনো বৃক্ষতলে আগুন জ্বালাইয়া রন্ধনক্রিয়া সমাপন করতে পারে। দিনাবসানে ঘন হবে অন্ধকার। তখন রাতভর মশাল জ্বালিয়ে রাখতে পিপাভর্তি ভেরেন্ডা-তেলও নিয়েছে।

এই তেলের বিশাল ভান্ডার তারা মজুত রেখেছে টিলায়— যুদ্ধেও প্রতিদিন তেলের প্রয়োজন। পাটনের সঙ্গে জারমণিও হাত লাগিয়েছে তেল নিষ্কাশনের কাজে। কাটারি নিয়ে সে দৈনিক ভেরেন্ডার বন কেটেছে, বোঝা বেঁধে মাথায় চাপিয়ে নিয়ে এসেছে টিলায়। সেখানে শিমুল গাছের কান্ড কেটে বানানো কাঠের ঘানিতে ফেলে, মস্ত মাদলা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, মোচড় দিয়ে, ভেরেণ্ডা থেকে নিষ্কাশিত করেছে জ্বালানি তেল। সেই তেল মাটির ঘড়াগুলিতে ভর্তি করে, সরা ঢাকা দিয়ে, খড় বেঁধে, জারমণি সুরক্ষিত রেখেছে রতিগড়ে। এখনো সে-কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। পাটনের অবর্তমানে জারমণি সে-কাজ করে যাবে। করে যাবে যুদ্ধের অনুকূলে আরও যা-যা করে রাখা যায়।

তবে পাটনের এই বৃষ-শকটটি সাধারণ শকটের মতো নয়। এতে বহুবিধ সামগ্রী বোঝাই করে বেরিয়ে পড়তে হচ্ছে তাকে। আরো ধামা ধামা চাল সংগ্রহ করে এই শকটেই নিয়ে ঘুরতে হবে। ঘুরতে হবে মুষ্টি-অন্ন আদায়কে আরো বাড়িয়ে তুলতে। ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচিয়েও রাখতে হবে সংগৃহীত শস্য। সেই বুঝে বড়োমতো ছই বানাতে হয়েছে। ছইয়ের বর্ধিত অংশকে গাড়োয়ানের মাথার আচ্ছাদন করা হয়েছে। শকটের সামনে থাকবে মশাল। হাওয়া অত্যধিক হলে মশাল নিভিয়ে তাকে বাঁশের কুপী জ্বালতে হবে— যা বৃষের চলমান খুরের তালে তালে এবং ছইসুদ্ধু শকটের দুলুনিতে দোদুল্যমান হলেও নিভে যাবে না দমকা বাতাসে। জালির মতো করে মোড়া থাকবে টিনের চাদরায়।

সময় আসন্ন বুঝে জারমণিকে আহ্বান জানায় পাটন। যদিও সে সুসুপ্তা ছিল না। পাটনকে যাত্রাভিমুখী না করে নিদ্রা যাবে না সে।

কুটির থেকে নতমস্তকে বেরিয়ে আসে জারমণি। জ্বলন্ত মশালের সামনে দাঁড়ায়। এই সময় প্রকৃতি এতটাই কাব্যময় এবং কল্পনা উদ্রেককারী যে, যাত্রালগ্নের প্রাক-মুহূর্তে, পাটনের বন্দনা করতে গভীর বাসনা হল ওই নারীকে, এবং এই মাঠারি-বিস্তৃত বিশাল চিরহরিৎ প্রকৃতিকে, যা আসলে জারমণিই। বন্দনা জরুরি এই কারণে যে, পাটন মনে করে, তার এই পরিব্রাজন থেকেই একরকম যুদ্ধের সূত্রপাত। আর সেই যুদ্ধের চালিকাশক্তিকে তুষ্ট করতে না পারলে, পরাজয় তার অনিবার্য। তাকে তুষ্ট করাই নয়, যুদ্ধের জন্য অমিত স্পৃহা এবং অখন্ড পৌরুষও তাকে চেয়ে নিতে হবে এই নারীশক্তি থেকে। সে বলে ওঠে, ‘হে শক্তিরূপিণী! তোমার ঊরুসন্ধিস্থলে যে অনির্বাপণযোগ্য অগ্নিকটাহ ধারণ করে আছো, সৃষ্টির আদিকাল থেকে আজিও, আমাকে সেই অগ্নিবল দাও, যাতে আমি তৎ-দ্বারা বলিয়ান হয়ে উঠি।’

জারমণি : ‘হে বীর! আত্মনিগ্রহ নয়, নিজেকে ঘর্ষণ করো। বুদ্ধি ও কর্মের সংঘর্ষণে অগ্নি সৃষ্টি হয়। তুমি তাকেই সম্বল করে অবতীর্ণ হও। অগ্রগতি তোমার অপ্রতিরোধ্য হউক।’

পাটন : ‘হে অনন্তযৌবনা! আমাকে তাপ দাও। তোমার অগ্নিকুন্ড আমাতে সমর্পণ করো। আর দাও সেই তাপ-বহনের শকতি।’

জারমণি তাকে প্রশ্নানুগ জবাব দেয় না। প্রতিবার তার আর্তি আপাত অকান করার ভঙ্গিতে উপসংহারে একই কথা বলে যায়, ‘অগ্রগতি তোমার অপ্রতিরোধ্য হউক।’

পাটন : ‘হে বৃষাকাঙ্খিণী ! আমিই তোমার পরিপূরক। আমিই বৃষ, আমিই হস্তি! আমিই তোমার উত্তাপদমনে সিঞ্চনবারি। তথাপি তোমার অদর্শনে কভু যেন যাত্রাকালে তোমাহেতু আমার উন্মাদনা না জাগে আমাকে সেই বশীকরণ দাও।’

জারমণি : ‘...অগ্রগতি তোমার অপ্রতিরোধ্য হউক।’

বস্তুত, এই যাত্রালগ্নে জারমণি চায় না পাটন তাকে— তার যৌবনোচ্ছল ও পূর্ণবিকশিত নারীশরীরটিকে স্মরণে রেখে মাঠারি থাকে প্রস্থান করুক। বরং সে তার মন থেকে নারী-ভাবনা দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। জারমণি জানে, বিপরীত লিঙ্গের ভাবে ও কল্পনায় পাটন এতোটাই অবশ হয়ে পড়বে যে, লক্ষ্য ও কর্তব্য ভুলে, লড়াইয়ের প্রস্তুতির কথা ভুলে, সে মত্ত হয়ে উঠবে শরীর জাগরণে। উত্থান ঘটবে তার হস্তিলিঙ্গের, এবং হয়তো সে তার মুষ্টি-অন্ন সংগ্রহের অভিযান অসম্পূর্ণ রেখে আধাপথে কাড়ার গাড়ি রুদ্ধশ্বাসে ছুটিয়ে ফিরে আসবে জারমণির কাছে। নিজেকে সমর্পণ করে বলবে, ‘আমি অকৃতকর্ম, আমি অসম্পূর্ণ, আমার অন্তর্নিহিত তৃষ্ণাই আমার প্রতিবন্ধক। হে নারী! তোমার সাহচর্যে রেখে আমাকে জয়ের বিধান দাও! অন্যথায় আমি অপারঙ্গম।’ এটা বুঝে, জারমণি তাকে সেই অবকাশের কোনো সুযোগ দিল না। বরং সে তাকে শুধু উদ্দীপিত করার জন্য বলল, ‘আমি জানি, তুমি একাগ্রচিত্ত হবে। জয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে তুমি বিচ্যুত হবে না কখনো। গণনার অতীত গ্রামবাসীদের মুষ্টি-অন্নে তুমি তোমার শকট পূর্ণ করে আনতে সক্ষম হবে। আমি জানি তোমার হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবে পূর্বদেশীয় সকল গ্রামবাসী। যাহ তুমি, এই বতর তাহাদের নিশ্চিত সম্মতি লইয়া আইস। যাহ!’

‘হে নারী! আমি অবিচল থাকবো তোমার এই বাণীকে স্মরণে রেখে। কেবল তুমি আমাতে অবিচল থেকো— যতদিন পর্যন্ত না আমার প্রত্যাগমন ঘটে আর প্রবল যুদ্ধের শেষে জয় অর্জনপূর্বক তোমার স্পৃষ্ট ভূমিতে এসে সগৌরবে দন্ডায়মান হই।’

‘তবে তাই।’ জারমণি তার বক্ষ প্রসারিত ও উন্নত করে। তার হস্তগত অগ্নিশলাকাটি পাটনের হাতে দিয়ে শেষবারের মতো বলে, ‘অগ্রগতি তোমার অপ্রতিরোধ্য হউক!’

পাটন আর কিছু বলে না। শস্ত্রে সজ্জিত হয়। পিঠে তূণীর, স্কন্ধে মহাভার ধনু। জ্বলন্ত মশাল নিয়ে, ধাপে ধাপে সে নেমে যাতে থাকে।

শকটের কাছে যেতেই সেই বৃষটি আরো একবার হামলে ওঠে। পাটন শকটের সামনে দাঁড়িয়ে নীচু হয়ে ঢুকে আবার উঁচু হয়— গাড়োয়ানের আসনে বসে। বাঁহাতে অগ্নিশলাকা ধরে সে বৃষের ককুদে আলতো চাপড় মারে। চলতে শুরু করে শকটটি। প্রস্তরময় মালভূমির ওপর দিয়ে চাকা গড়িয়ে যেতেই রাত্রির নীরবতা খন্ডিত হয়।

পাটন চলে যায়। জারমণির দিকে সে আর ফিরেও তাকায় না।

রতিগড়ের মাথায় তখনো নিশ্চল দাঁড়িয়ে জারমণি। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, উদ্ধত তার ভঙ্গি। হাওয়া বইছে। কাঁধের দুপাশে উড়তে থাকা রুক্ষ কেশরাশিকে সে বেণীবন্ধনপূর্বক শিরোদেশে সংকুচিত রাখে, যাতে বনজ পুষ্প সুবাসিত এই চুলের বাস হাওয়ায় তরঙ্গায়িত হয়ে ছড়িয়ে না পড়ে।

পায়ের কাছে শনশন করে জ্বলছে চলহা গাছের গুঁড়িটি। তার উজ্জ্বল শিখায় আলোকিত তার বিভঙ্গপূর্ণ দেহের একাংশ। জারমণি দেখে নিটোল অন্ধকারের মধ্যে একটি চলমান আগুন, যা ক্রমশ হারিয়ে যায় আরো অন্ধকারের ভিতরে। আর তন্মুহূর্তেই একটি শুভ্র পেঁচক অতি সন্নিকট দিয়ে উড়ে চলে যায়।

‘আমি কে? কে এই আমি?’ অঙ্গদ যেন ক্ষিপ্ত হয়ে প্রশ্ন করে গ্রামবাসীদের। অতঃপর লোকমাঝে নিজের অতিশয়শীর্ণ দুবাহু প্রসারিত করে সে নিজেকে তাদের সম্যক দৃষ্টিগোচরে আনে, আর বলে, ‘এই আমি হাজারো বর্ষব্যাপী শোষিত এক মানব! বংশপরম্পরায় আমি শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। আমি দুর্বল, অসহায়। আর সে-কারণে আমি কেবল আমিই নই, আমি তোমাদের সকলের এক প্রতিনিধিত্বমূলক সমাহৃত রূপ। আমার এই অস্থিচর্মশেষ দেহ তোমাদেরও দেহ। এ তোমাদের আরশিস্বরূপ। আমাতেই তোমরা বিম্বিত হও, বিরাজিত হও। আমাতেই তোমরা তোমাদের প্রতিচ্ছবি অবলোকন করো। নিজেকে দেখো। দেখো তোমাদের সাক্ষাৎ দুর্গতিকে।’

দীর্ঘদিন নানান গ্রামে যুদ্ধবার্তা পৌঁছে দিয়ে অঙ্গদ এখন তন্তুবাঈদের গ্রামে। নদীতীরে এক অতি পুরাতন ন্যাগ্রোধ বৃক্ষমূলে একপাল ন্যাংটো শিশুসহ যত তুচ্ছ-দীন গ্রামবাসীরা আজ তার ডাকে একত্রিত হয়েছে। তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বলে চলেছে অঙ্গদ।

গ্রামবাসীরা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখতে থাকে মানুষটিকে। দেখতে দেখতে কেমন পালটে যেতে থাকে তাদের অভিব্যক্তি। যেন অঙ্গদকে নয়, এই মানবের মধ্য দিয়ে, বাস্তবিক, তারা দেখছে তাদের দূর অতীত জীবনকে। দেখছে সবলের হাতে নির্মমভাবে অত্যাচারিত হওয়া তাদের পিতামহ-প্রপিতামহদেরও। যারা কবেই অনাহারে অর্ধাহারে অবহেলায় মরে ধরিত্রীর এই মাটিতে লীন হয়ে গেছে। এখনও খনন করলে বেরিয়ে আসবে তাদের প্রতিবাদমূক কঙ্কাল, তাদের অস্থিখন্ড। বেরিয়ে আসবে কত-কত নারী ও শিশুদের দেহাবশেষ, যারা ক্ষমতা থেকে, চাবুক থেকে, কষাঘাত থেকে, খরা, আকাল আর দুবির্নীত সামন্ত রাজাদের ধাবমান অশ্বরোহীদের থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। তারা লুন্ঠিত হতে চায়নি বলে পালাতে চেয়েছিল। সেদিন তারা ছিল বিচ্ছিন্ন শক্তি। প্রতিবাদের কোনো উপায়, কোনো পথ, স্বেচ্ছাচারী শাসকের বিরুদ্ধে উত্থানের কোনো ধারণাই ছিল না তাদের। গ্রামে গ্রামে সেদিনে এমন করে কেউ তাদের কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সন্দেশ নিয়ে আসেনি। কেউ এসে বলেনি, নিরস্ত্র মানুষের সংঘবদ্ধতাই যথার্থ অপরাজেয় শক্তি।

আজ অঙ্গদ এসেছে তাদের কাছে, সেই বার্তা নিয়ে। তার জ্ঞান নিয়ে, মেধা নিয়ে, গভীর সমাজ দর্শন এবং রাজনৈতিক বীক্ষা ও ব্যুৎপত্তি নিয়ে। সে যেন নিজেই তাদের অবদমিত জীবনের এক চলমান বর্গীয় ইতিহাস, তাদের প্রতিনিধি, তাদেরই একজন।

বাস্তবত, সুদূর অতীতে এই অঙ্গদও কি তাদেরই মতো হারিয়ে যায়নি? সমাজের প্রতি নৈরাশ্যে, হতাশায়, ক্ষোভে সে স্থবির হয়ে যায়নি? শত শত দিবসের আহার-বঞ্চিত জীবনযাপন তার শরীরকে বল্মীক করে তোলেনি? অন্যায় বুঝেও সে অন্যায়ের থেকে নিজেকে অজ্ঞাতদেশে সরিয়ে সেদিন আত্মগোপন করে থাকেনি?

কিন্তু আজ সে তার নৈরাশ্যকে কাটিয়ে উঠেছে। সেই প্রাচীন সুদৃঢ় বল্মীক ভেদ করেই মহাতেজস্বী রূপে বেরিয়ে এসেছে এই অঙ্গদ। তার এই বোধ হয়েছে যে, নৈরাশ্যভোগ ও মৌনাবলম্বন কোনো মার্গ নয়, পন্থা নয়। নৈরাশ্য বোধে নিজেকে মূক ও প্রতিবাদহীন করে রাখলে, তা সমাজের অবিচারকে প্রশ্রয় দেবে। আর প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আগামী যুগেও সমাজে সেই অবিচার চলতে থাকবে, তার দমন ও উচ্ছেদ হবে না কখনো। এই ভাবনা নিয়ে সে আজ গ্রামে গ্রামে। সকল নিপীড়িত অস্তিত্বকে একত্রিত করে সে অবিভাজ্য শক্তিরূপ গড়ে তুলতে চায়। আর নিশ্চিত করতে চায় এই যুদ্ধজয়। অখন্ড দেশের কথা চিন্তা করে সে বোঝাতে চায়, এই যুদ্ধ তার একার নয়, এই জয়ও তার একার হবে না। আদিম ভূখন্ডগুলিতে তার আগমনের উদ্দেশ্য সমাজের কাছে কেবল তার নিজের সুবিচার প্রত্যাশা-ই নয়, সেই সঙ্গে এই পবিত্র ধরিত্রীর বুকে অন্যায় ও অসত্যের বিনাশ ঘটানো। এই বিনাশের আয়োজনই যুদ্ধের আয়োজন।

অঙ্গদ বলে, ‘আমি বার্তা নিয়ে এসেছি শৃঙ্খলমুক্তির। যুগ-যুগ ধরে বর্বরের অত্যাচার তথা দুর্বলের প্রতি শক্তিধরের অবিনয় আজ সহ্যের গণ্ডি লঙ্ঘন করেছে। যুদ্ধের মাধ্যমে এই ঔদ্ধত্যকে শায়েস্তা করা আজ ধর্মীয় বিধান।...

‘যে অন্যায় ও অধর্মের বীজ এই ধরণীর বক্ষে রোপণ করা হয়েছে, তা ক্রমশ মহাবৃক্ষের আকার ধারণ করতে চলেছে। যত শীঘ্র সম্ভব এই বৃক্ষের ভূপাতন জরুরি। জরুরি হয়ে উঠেছে তাকে সমূলে উৎপাটিত করার, ধ্বংস করার। এই কাজ কদাপিও এককের কাজ নহে। চাই সকল গ্রামবাসীদের ঐক্য। আমি জানি, তোমরা স্মরণাতীত কাল থেকে নিপীড়িত, তোমরা কস্মিনকালেও অপরের সহায়তা পাওনি, অপরকে সহযোদ্ধা হিসেবে পাওনি। আজ আমিই তোমাদের সহায়ক, তোমাদের সহযোদ্ধা।

‘কিন্তু কিসের যুদ্ধ? আবার বলি। যুদ্ধ অবশ্যই নারী সম্পদ পুনরুদ্ধারের নয়, সাধারণ গ্রামবাসীদের দৈববিশ্বাসের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভূস্বর্গতুল্য মাঠারিকে দখল করে রেখেছে ওই চন্ডাল, ওই পাষন্ড পাটন! তাকে পরাভূত করে ওই ভূস্বর্গে আমার আধিপত্য কায়েম করতেও এই যুদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ জয়ের জন্য যুদ্ধ নয়, এই যুদ্ধ সম্পদ লুন্ঠনেরও নয়। এই যুদ্ধ বশ্যতা স্বীকারেরও নয়। আর তাই এই প্রবল লড়াই ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির লড়াই নয়, এক পক্ষের সঙ্গে অপর পক্ষের লড়াই নয়। সত্যের সঙ্গে সত্যের সংকটের লড়াই, ধর্মের সঙ্গে অধর্মের লড়াই। এই মনুষ্য সমাজে এত-এত কাল যাবৎ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের সঙ্গে অবিশ্বাসের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াই। সর্বোপরি, এই যুদ্ধ পরিকল্পিতভাবে বিভাজিত দুই মানবপক্ষের যুদ্ধ— এক পক্ষের অবলের সঙ্গে আরেক পক্ষের সবলের যুদ্ধ।’ একথা বলাতে গ্রামবাসীরা চনমন করে ওঠে। তারা ভেতরে ভেতরে শিহরিত হতে থাকে।

‘কিন্তু প্রতিপক্ষ যদি আমাদের দরিদ্র ও অসহায় বলে দুর্বল ভেবে বসে, তা হলে তা ভুল হবে। শতশত দুর্বলকে দিয়েই গ্রন্থিত হয় সবলের শৃঙ্খল। রচিত হয় সবলের ইতিহাস। দুর্বলের একত্রীকরণে সৃষ্টি হয় সবলের অবিচ্ছেদ্য ভূমি। এই মাঠারিযুদ্ধ তাই দুর্বলের সবল ইতিহাস সৃষ্টিরও সংগ্রাম।

‘হে আমার দীন, অসুখী গ্রামবাসীসকল! তোমরা অঙ্গীকার করো। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হও। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উল্লম্ফন দিয়ে মাঠারির রণাঙ্গনে হাজির হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করো। তোমরা এই লড়াইয়ে সামিল হও। শুধু অন্ন-পানি-জ্বালানি নিয়েই নয়, সেখানে হাজির থেকে প্রত্যেককে প্রস্তুতি নিতে হবে লড়াইয়ের।’

গ্রামবাসীরা সমস্বরে বলে উঠল, ‘হামরা হঁ স্বীকার করছি! এই আশপাশের যত-যত গাঁয়ের মানুষ হামরা আছি— যত কামার-কুমার-বাগদি-হাড়ি-বাউরি, যত-যত পুরুষ মানুষ আছি সবকার ঘরের ল্যা জনে জনে মাঠারিকে যাব। হামরা মেহনত দিয়ে, অন্ন দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে শত্রুনিধনে আত্মোৎসর্গ করব এই যুদ্ধে।’

‘তাই যদি হয়, তবে জয় আমাদের সুনিশ্চিত!’

‘জয় আমাদের সুনিশ্চিত!’ সভা জুড়ে প্রতিধ্বনি উঠল জয়ের। প্রবল উৎসাহে কুলকুলি দিল যত গ্রামবাসীরা।

বৃষ-শকট থেকে নেমে গ্রামবাসীদের মন্ডলাকৃত ভিড়ে দাঁড়িয়ে সরাসরি শুরু করে দেয় পাটন। সে যা বলে তা অনেকটা এই রকম যে, ‘হে আমার ভাইবহিনরা! তুমরা ইতিমধ্যে অবগত হয়েছ যে, এই অঞ্চল জুড়ে এক ভয়াবহ যুদ্ধ-পরিস্থিতির সূচনা হতে চলেছে। এই যুদ্ধের সংবাদ পেয়েই আমি আমার সমস্ত গ্রামবাসীদের একতাবদ্ধ ও সতর্ক করতে বেরিয়ে পড়েছি। যদিও, আপাত নজরে, এই যুদ্ধের কারণ কেবলমাত্র এক নারী। কিন্তু বাস্তবত, এই নারীকে ঘিরে যুদ্ধের পশ্চাতে রয়েছে ভিন্ন অভিসন্ধি। ঝালং ডিহি, কপূরডি, রাঙাবেলিয়া, মাচানপুরি, পানিপাথর, রাঙাতোড়িয়া থেকে শুরু করে পশ্চিমের সমস্ত গ্রামের মানুষ আজ আমাদের অতি নির্জন ও মনোমুগ্ধকর মাঠারিকে দখল করতে চায়। তারা দখল নিতে চায় বারো যোজন বিস্তৃত এই সুবিশাল অরণ্যভূমির ও তার খনিজ সম্পদের। আর তা-ই অদূর ভবিষ্যতে তুলে দিতে চায় বৈদেশিক বানিয়াদের হাতে। এই সূত্রেই তারা এখন মাঠারিভূমিতে বসবাসকারী ওই নারীকে দখলের অছিলায় যে যুদ্ধের আয়োজন করতে চলেছে, তা প্রকৃত উদ্দেশ্যকে গোপন রেখে আমাদেরকে স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ করা ও হত্যা করার চক্রান্ত বৈ আর কিছুই নয়। যুদ্ধের নামে এই গণহত্যা ও আগ্রাসনের চক্রান্তকে আমাদের প্রত্যেকের মর্দানি দিয়ে প্রতিহত করতে হবে। ঠেকাতে হবে ওই দুর্বৃত্তদের হাতে এই স্বর্গভূমির লুন্ঠন। গ্রামে-গ্রামে প্রতিটি পরিবারে নারীদের সম্ভ্রম। ওই যে সুদূর টিলার মাথায় প্রায় অদৃশ্য হয়ে অবস্থান করছেন জিনগা-মাঈ, তার স্মরণাপন্ন হয়ে—’ বলতে গিয়েও বাক্য সম্পূর্ণ করার সুযোগ পায় না পাটন। তার আগেই গ্রামবাসীরা ওই লোকদেবীর অদৃশ্য ও মেঘাচ্ছন্ন থানের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তে উজ্জীবিত হয়ে উঠল। তারা হঠাৎ তাদের ভক্তি ও ভীতিপূর্ণ শ্রদ্ধা জানাতেই ওই দেবীর নামোচ্চারণ করে সমস্বরে বলে উঠল, ‘জিনগা-মাঈ! জিনগা-মাঈ!’

পাটন আবার শুরু করে। ‘জিনগা-মাঈ-এর এই স্বর্গভূমি মাঠারি যদি আজ পশ্চিমের শত্রুদের হাতে চলে যায়, তবে দৈব-কুফল ভোগ করতে হবে আমাদের সকলকে। ওই মায়ের রোষানলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে আমাদের বংশ, আমাদের সন্তান-সন্ততি, আমাদের উত্তরপুরুষ সকল।’

আর-সবকিছু বাদ দিয়ে, জিনগার এই অভিশাপের কথা শুনে তারা তটস্থ হয়ে উঠল। সন্দেহ বা অবিশ্বাস করা তো দূরের কথা, তারা পাটনের কাছেই জানতে চাইল এর আগাম বিহিত।

‘বলো, হামরা কী করব? কী করলে হামদের ছ্যেলাপুলা বাঁচবেক, সংসারে হামরা পুঁজি রাখতে পারব?’ তারা উৎকন্ঠিত হয়ে তাদের আরো নানাবিধ দুশ্চিন্তার কথা বলে। যেদিন থেকে তারা বিভিন্ন লোকমুখে এই সংবাদ পেতে আরম্ভ করেছে, সেদিন থেকে তাদের ঘরে ঘরে শান্তি নেই, মনে সুখ নেই, দেহে বল নেই। এখন তারা জানতে চায় কী দিয়ে জিনগার এই আসন্ন করাল গ্রাস থেকে তারা রক্ষা পেতে পারে? বাঁচিয়ে রাখতে পারে তাদের আত্মজদের?

যদিও পাটনের দেওয়া এই যুদ্ধবার্তা আজ আর তাদের অজানা নয়। দুপক্ষই তাদের সৈন্য সংগ্রহাভিযানে লোকবলয়ে বেরিয়ে পড়েছে। শুরু হয়ে গেছে তুমুল হৈচৈ। ব্যাপক প্রচার ও প্রস্তুতি। গ্রামের সাপ্তাহিক হাটগুলিতে, দোকানে, বাজারে, খেতে-মাঠে-খামারে, ভাটিখানায় চলছে তার উত্তপ্ত আলোচনা। আর যতই এই আলোচনা ছড়িয়ে পড়ছে ততই পক্ষে-বিপক্ষে মেরুকরণ হচ্ছে তামাম মাঠারি অঞ্চলের। মাঠারি এবং জিনগা-মাঈকে রেখে পূর্ব আর পশ্চিমের গ্রামগুলি ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে।

বলাবাহুল্য, গ্রামবাসীদের মধ্যে এই বিভাজন নিয়ে আসার ভাবনা প্রথম পাটনের মাথায় আসে। এই বিভাজনকে সে কৌশলী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে মাঠারিযুদ্ধে। এমনকী, খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেও সে বৃহত্তর গ্রামবাসীদের তার হয়ে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে চায়। কিন্তু যুদ্ধ নিয়ে সে যত আস্ফালন করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে, নিজেকে সে এখনও দুর্বল মনে করে। ভীমরূপ দেহ আর হস্তিরূপ কামের অধিকারী হলেও সে কখনোই প্রকৃত বীর নয়। বীরোচিত মনোবলও তার নেই। দুর্বল হয়েও, এবং যুদ্ধের প্রতি তার চিরকালীন ভীতি থাকা সসত্ত্বেও, সে অগ্নিশলাকা হস্তান্তর করেছে। সম্মতি জানিয়েছে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার। শুধু অবতীর্ণ হওয়াই নয়, সেই যুদ্ধে জয় অর্জন করার জন্য সে এখন প্রবল উদ্যমে যেন-তেন প্রকারে তার পক্ষাবলম্বনকারী যোদ্ধাদের একত্রিত করতে নেমে পড়েছে। পাটনের একার পক্ষে যা অতি কঠিন এবং অসাধ্যসাধনও।

শুধু তাই নয়, বলা যেতে পারে, এখান থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে পাটনের। এই প্রারম্ভিক যুদ্ধ পাটনের অন্তরস্থিত এক পাটনের সঙ্গে আরেক পাটনের। এক পাটন চায় সে এই মাঠারিতেই যাবজ্জীবন অবস্থান করুক, যাতে সে ওই ছলনাময়ী নারীটির দর্শন উপভোগ করতে পারে, তার চলন-বুলন দেখতে পায়, যা ক্ষণে-ক্ষণে তাকে এই নারীকে নিয়ে ভাবিয়ে তুলবে। আবার আরেক পাটন চায়, বড় অসহায়ভাবেই চায়, সে এই তাক্ষণিক আবেগ ভুলে গিয়ে তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে এই লগ্নেই সম্মুখ সমরে নেমে পড়ুক, যদি সে জয় করতে চায় তার বহু আকাঙ্ক্ষিত নারীর মন।

জারমণিও সেই মর্মে তাকে জাগিয়ে তুলেছে। তার বহু যুগের জড়তা ভেঙে তাকে যুদ্ধপ্রয়াসে সচল ও পৌরুষময় করে তুলেছে। যদিও তার পিছনে যে কঠিন শর্ত সে আরোপ করেছে তাকে উলঙ্ঘন করার স্পর্ধা পাটনের নেই। যদি সে করে, তাহলে সঙ্গমলিপ্সাহীন জীবন তার বৃথাই বয়ে যাবে মরুখাতে। জারমণিকে সে পাবে না। কোথায় কোন অজ্ঞাত ভূখন্ডে নির্বাসিতের জীবনযাপন করে যেতে হবে তাকে।

এই ভয়াবহ শর্তের কথা শুনে জারমণির পদপ্রান্তে বিবশ-বিহ্বল হয়ে পড়েছিল সে। সে বারে বারে তাকে লেহোর করেছিল, যাতে এমন নিষ্ঠুরতা থেকে সে অব্যাহতি দেয় পাটনকে। কিন্তু জারমণি তো নিষ্ঠুরই। তার কাছে কোনো ক্ষমা নেই— একদা উচ্চারিত বাক্যের পরিমার্জন বা প্রত্যাহরণও নেই। ফলত, বাধ্য হয়ে তার শর্ত মেনে আজ তার পক্ষে যুদ্ধের আবহাওয়া গড়ে তুলতে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে পাটনকে।

ইতিপূর্বে মুষ্টি-অন্ন সংগ্রহে বেরিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু এবার তদ্রুপ অঘটন সে আর ঘটাতে চায় না। সেভাবে জারমণির চিন্তায় চিন্তায় নিজেকে দুর্বল ও বিবশ করে তুলতে চায় না। সে হরবকত নিজেকে, নিজের ভাবাবেগকে জারমণির চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে চায়। তাই এই মুহূর্তে সে যুদ্ধ ও তৎসংক্রান্ত বিপুল আয়োজন ব্যতিরেকে কিছুই ভাবতে নারাজ। পাটনের সঙ্গে পাটনের এই প্রারম্ভিক যুদ্ধে যদি জয়ের কথা বলা যায়, তাহলে এখনো অব্দি এইটুকুই তার জয়। এক ভীরু, কামাচ্ছন্ন, মোহগ্রস্ত পাটনের খোলস থেকে বেরিয়ে আসা এক যুদ্ধাকাঙ্খি পুরুষের। যার স্কন্ধে মহাভার ধনু আর পৃষ্ঠদেশে গুচ্ছ-তির সংবলিত তূণীর— গাড়োয়ান হয়ে সে আজ গ্রাম-গ্রামান্তরের পথে পথে।

কত কত ডি-ডিহাত পেরিয়ে আরো কত জনপদের দিকে সে এগিয়ে চলেছে। একটি বারের জন্যও তার রতিমোহিনী জারমণির কথা না ভেবে। আর তাই বা কী করে বলা চলে? বরং বলা যেতে পারে, যে-মাঠারিভূমিতে এখনো অবস্থান করছে অকুতোভয় সেই নারী, যে নিজেও যুদ্ধ চায় বলে স্বতন্ত্রভাবে সেখানে আয়োজন করে চলেছে যুদ্ধোপকরণের, সেই জারমণিকে ভেবে ভেবেই তো এক জনপদ থেকে আরো এক দূরবর্তী জনপদের দিকে আহার-নিদ্রা-বিশ্রামের কথা ভুলে প্রাগ্রসরমান এই পাটন— এই মহাবাহু, এই বৃষস্কন্ধ, যাকে প্রতিবাক্যে ‘পাষন্ড পাটন’ বলে সম্বোধন করে থাকে অঙ্গদ। সহস্রোচ্চারিত ‘পাষন্ড পাটন’।

দলবল নিয়ে অঙ্গদ এসে ঢুকল ফুলকুসমা গ্রামে। গাছতলগুলি থেকে চেঁচামেচি করে ছুটে ছুটে আসতে লাগল শিশু-কিশোরদের সঙ্গে আদুড় গায়ের বয়স্করাও। ক্ষেতের জভি-কাদায় চরতে থাকা শুয়োরের পালও ছুটল গুড়-গুড় করে। বস্তির দিকে। অঙ্গদরা এগিয়ে গেল তাদের অনুসরণ করে। কুলহিমুড়ায় মহুলতলে। গ্রামবাসীরা সেখানেই পথসভার আয়োজন করল।

সূর্য তখন নিষ্প্রভ হয়ে আসছে। পশ্চিমের বাদাড় পেরিয়ে, দূরে, সার-সার কুসুম গাছের ফাঁকে আকাশ তখন কাঁড়বিদ্ধ ‘খেঁড়া’র রক্তে লালাভ! গ্রামের ঠাকুর-থানকে ঘিরে রাখা গাছগুলির মগডালে একে-একে ডানা গুটিয়ে বসছে কুলায় ফিরে আসা যত টিয়া-বনা, কোয়াক কোয়াক ডাকতে থাকা হাঁসা-বকের দল। উড়ে আসছে রামবোনিও।

উচ্চকন্ঠে অঙ্গদ শুরুই করল এইভাবে, ‘শয়তান কখনো নিষ্ক্রিয় থাকে না। তজ্জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরে ওই পাষন্ড পাটন সংগ্রহ করে চলেছে তার মুষ্টি-অন্ন। জিনগামাঈ-এর নাম নিয়ে সে মিথ্যা প্ররোচিত করছে গ্রামবাসীদের। আর আমি?’

অঙ্গদের কথা শোনার জন্য ইতিমধ্যে ভিড় করে থাকা গ্রামবাসীরা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। যারা খচ্চরের পিঠে নুনের বস্তা নিয়ে সাপ্তাহিক হাটে যাচ্ছিল, তারাও একপাশে পশু নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। শুনতে থাকে বক্তব্য।

‘আমি যুদ্ধ বাধিয়ে দেবার কু-মতলবে এখানে আসিনি। আমি শয়তানের অগ্রগতি রোধের জন্য সমবেত প্রয়াসের আবেদন নিয়ে এসেছি। যতদিন না ওই পাষন্ডের প্রাণনাশ হচ্ছে, ততদিন এই ধরিত্রী নির্মল ও পবিত্র হবে না। ততদিন হিংসা-ঈর্ষা-লোভ ও পরশ্রীকাতরতার বিনাশ অসম্ভব। পৃথিবীকে সুন্দর ও পাপমুক্ত করতে হলে, গ্রামবাসীভাইরা, ওই পাপিষ্ঠকে, যে এখনো নিজেকে আমার সহোদর বলে পরিচয় দিচ্ছে, এবং তার যত সাঙ্গপাঙ্গ, যারা তাকে উসকানি দিচ্ছে, তাদের সকলকে এই মাঠারিযুদ্ধে কবর দাও! যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পরাভূত করো। ঝাড়ে-মূলে তাদের প্রাণবীজকে হত্যা করো। তবেই আগামীদিনে, পাপাত্মার উত্থান ও প্রসার রোধ হতে পারে। অন্যথায় এই সমাজ পাপে, অবিশ্বাসে ও অশালীন যৌনাচারে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের স্নেহ-ভালোবাসা থাকবে না, বিশ্বাস থাকবে না, একের দৃষ্টিতে অন্যের স্ত্রী অঙ্গপ্রমত্তা ও লুণ্ঠনযোগ্যা বৈ আর কিছুই প্রতীয়মান হবে না। এই কুরুচিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, লুন্ঠন-অভিপ্রায় নিয়ে স্বপ্নপূরণের লালসা মূল্যবোধের এই সমাজকে নরকের দ্বার করে তুলবে।’

শীর্ণকায় কিন্তু তেজোদ্দীপ্ত মানুষটি বলতে বলতে হাঁপিয়ে ওঠে। তাকে ঘর্মাক্ত দেখায়। আর এইসব কথা যতই শোনে ফুলকুসমা গ্রামের দিগার ও ঘাটুয়ালরা, ততই শত্রুদের প্রতি উত্তরোত্তর ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। তাদের আক্রোশ বাড়তে থাকে। তারা সমস্বরে চেঁচিয়ে অপবাক্য উচ্চারণ করে। কেউ নিন্দার সুরে বলতে থাকে, ‘ধিক, ধিক! এমন ভাইয়ের মুখদর্শনও পাপ!’

‘আমি জানি। কেবল জানা নয়, আমি স্বয়ং আজ সেই পাপ থেকে মুক্তির তরে আকুল অন্তরে কাঁদছি।’

তারা আবার ছিছিক্কার-ধ্বনি দিল। এহেন ভাইয়ের প্রতি তাদের মনে কেবল ঘৃণারই উদ্রেক হয় না, পরন্তু তারা এখনই যেন তাকে দন্ড দিতে হিংস্র ও উদ্যত হয়ে ওঠে। কেউ কেউ হাতের কুড়ুল, ফার্সা আসমানে উঁচিয়ে ধরে জানতে চায়, ‘কে এই পাপাশয়? সে কি তার আপন সহোদর? দুষ্টকুলোদ্ধব ভ্রাতা?’

‘না-না-না!’

‘সহোদর’ শব্দটি শ্রবণমাত্র অঙ্গদের কোমল হৃদয় চকিতে নাড়া খেয়ে গেল। কী মধুর, কী হৃদয়-নৈকট্য-জ্ঞাপক নিবিড় এই শব্দ! যা একই সঙ্গে গর্ভধারিণী মাতার সহনশীলতা ও স্নেহশীল ভ্রাতৃত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অথচ...

আর বাকস্ফূরণ হয় না অঙ্গদের। দুদন্ড নির্বাক থাকে সে। অতঃপর তার বহু বহু বছরের জটপড়া চুলে ভারি হয়ে থাকা মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে, কিঞ্চিত অবদমিত কন্ঠে স্বগতোক্তির মতো বলে, ‘হায়! আমার সে-ভ্রাতার মৃত্যু হয়েছে কবেই! বহু শতবর্ষ আজ অতিক্রান্ত। আমি দুর্ভাগা, আজও বেঁচে আছি! আমি আজও তার হয়ে নিরলে নিভৃতে কাঁদছি। আকাশে-বাতাসে, ঈশানে-নৈঋতে উদ্বাহু হয়ে হাহাকার করছি। দুঃসহ যন্ত্রণায় আমি কাতর। বিস্ময়ে আমি হতবাক! অনভিপ্রেত আঘাতে আঘাতে আমি ব্যাধের কাঁড়ে রক্তক্ষয়ী বরাহের ন্যায় ধরাশায়ী! আমি বিখন্ডিত, শতধা জীর্ণ। এই মুহূর্তেও আমি তার দুঃখে প্রকাশ্যে অশ্রুপতন থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করছি। হা পাটন! হা পাটন! হায় রে দুর্মতি!’

মুহূর্তের জন্য যার পর নাই শোকে মোহ্যমান হয়ে পড়ে অঙ্গদ। বিচলিত হয় গ্রামবাসীরাও। তারা জানতে চায়, ‘তবে কে এই দুরাচার? কোন সে আদিবাসী সন্তান? কে সেই কুল-কলঙ্ক?’

কী জবাব দেবে অঙ্গদ? আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করেও সে পারে না। ধ্বস্ত অমসৃণ গলায় তার বলতে ইচ্ছে হল, ‘আমি জানি না সে কে! আমি জানি না! কে এই দুরাচার আমি জানি না!’ পরক্ষণে নিজেকে সংযত করে নেয়। তার প্রতি ক্রোধ সঞ্চয় করে উচ্চকিত কন্ঠে বলে ওঠে, ‘ওই দুরাচার এই সমাজে গর্হিত লালসা ও ধ্বংসের প্রতিভূ। সে এক ভীমকায় পুরুষ। দিন-দিন সমাজে-সংসারে পাপের বৃদ্ধি ঘটছে বলেই তার নশ্বর দেহও অবাস্তব স্ফীত হয়ে উঠছে। তবে সেই পাষন্ড এখন আর একা নয়। যুদ্ধ আসন্ন জেনে আজ লোকশক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে গির্দ্ধের মতো ঝুনুক-ঝুনুক লেজ কাঁপিয়ে, পুবদেশে গ্রামে-গ্রামে সে অসাধুদের সঙ্গে সাধুবেশে ঢুকছে! সে বহুরূপী। সে চন্ডাল। সে অসত্যবাদী। যুক্তিহীন কল্পিত আবেগের কথা প্রচার করে গ্রামবাসীদের প্ররোচিত করে চলেছে। আর এই প্ররোচনায় ইন্ধন জোগাচ্ছে একশ্রেণির অপরাধপ্রবণ অত্যাচারী মানুষ। যারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে লাভবান হতে চায়। তথাপি তার দলে পূর্বাভিমুখী কড়াং, হাকিমডি, কুড়মাশোল, ক্যাটলাপুর—এমনি বহু বহু গ্রামের মানুষজন আজ একতাবদ্ধ হয়েছে। পূর্বস্থ অন্যসব গ্রামও সংঘবদ্ধ হতে চলেছে।

‘গ্রামবাসীমিত্রগণ! এই যুদ্ধ এখন এককের যুদ্ধ নয়, একটি-দুটি গ্রামের সঙ্গে তাদের প্রতিবেশী কোনো গ্রামের বিবাদও নয়। এই যুদ্ধ এখন পুবদেশের সঙ্গে পশ্চিমের। ফলত, এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে সকল পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামবাসীদেরও অস্ত্র ধরতে হবে। তাদের বিনাশ ত্বরান্বিত করতে এই ছোট্ট গ্রাম ফুলকুসমার দরিদ্র মানুষদেরও সংগ্রামে সামিল হতে হবে। বল, তুমরা রাজি আছ?’ অঙ্গদ জিজ্ঞেস করে তাদের, ‘রাজি আছ, কি রাজি নাই? হঁ-স্বীকার কর।’

‘হঁ! হঁ!’ হাতের লাঠি, মারণাস্ত্রাদি শূন্যে আলোড়িত করে তারা বলে উঠল, ‘হামরা আছি! আছি!’

কুকুরটাঙা গ্রামের বাউরিরা পালটা প্রশ্ন করে বসল পাটনকে। তারা বলল, ‘আগু তুমিয়েই হামদের বুঝাও ক্যানে হামরা তুমাদের উস্কানিয়ে যুদ্ধ করতে যাব? কিসের লাইগে যাব বুকে কাঁড় বিঁধতে?’

মুষ্টি-অন্ন সংগ্রহাভিযানের শুরু-শুরুতে এ-প্রশ্ন কোনো কোনো গ্রামের মানুষ করেছিল। করাটাই স্বাভাবিক। তবে তাদের যেভাবে সে ভুল বুঝিয়েছিল, এখানেও সেই মিথ্যার আশ্রয় তাকে নিতে হল।

মাঠারি যুদ্ধের জন্য এই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আপাতত অনেকটা সাফল্যও অর্জন করতে পেরেছে সে। বেশ কিছু গ্রামে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ঢুকে মানুষের সনাতন আবেগ ও যুক্তিহীন বিশ্বাসকে খুঁচিয়ে দিয়ে তাদেরকে অন্ধত্বের দিকে ছুটিয়ে দিতে পেরেছে। পৌরুষের লড়াইয়ে তারা যাতে অবিবেচকের মতো সামিল হয়, যাতে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে, নিজেদের মান-সন্মান-পৌরুষ এবং নারীকূলের মর্যাদা রক্ষার কথা ভেবে নিজেরাই এই যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। তির-ধনুক নিয়ে, ঝুন্ড-কে-ঝুন্ড, মাঠারিতে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে টপাটপ ঝাঁপিয়ে পড়ে।

পুবের গ্রাম আর পশ্চিমের গ্রাম জিগির তুলে, এই কুচক্রী পাটন, বিভেদ-বৈষম্যও এনেছে অঞ্চলে অঞ্চলে। তার ফলে পূর্বাপর বিগ্রহ-বিষয় ভুলে অনেক-অনেক গ্রামের কামার-কুমোর-মেটে-তেলি—এমনি সব জনজাতিরা এই ভেবেও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে যে, মাঠারিভূমির দখল নেওয়াকে কেন্দ্রে করে এই যুদ্ধ আদতে পুবের যত গ্রামবাসীদের সঙ্গে পশ্চিমের যত গ্রামবাসীদের তাকতের লড়াই।

ইতিমধ্যে ঘরে ঘরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু হয়ে গেছে আনুষঙ্গিক সামগ্রী তথা হাতিয়ার ইত্যাদি তৈরির উদ্যোগ। কুম্ভকারের ঘরে রন-রন চাক ঘুরছে! চলছে বড় বড় ডেলি-হান্ডা-কলসি বানানো। গাছ কাটা হচ্ছে— চলছে ধনুক বানানো। ঝকাস-ঝকাস হাপর চলছে— কামার বানাচ্ছে তিরের ফলা। বাহরে বা:, মাঠারি যুদ্ধ!

পাটন ভাবতেও পারেনি ধীরে ধীরে সারা অঞ্চল জুড়ে এমনভাবে যুদ্ধের সাড়া পড়ে যাবে। এই যুদ্ধের হাওয়াকে জোরালো করে তুলছে একশ্রেণির অসাধু মানুষ। তারা যুদ্ধ লাগাতেই চায়। পাটন তাদের বলে বলীয়ান হয়ে উঠেছে। তাহলেও সে খুশি। সে তো চেয়েই ছিল গ্রামবাসীদের মনে এই উন্মাদনার সঞ্চার ঘটাতে। তা জারমণির মধ্যে অলৌকিকতা আরোপ করে হোক আর যা-কিছু করেই হোক। শত্রুপক্ষের জারমণি-লুন্ঠন ও তার কৌমার্য হরণ, অথবা তা যদি নাও হয়ে থাকে, যদি ওই স্ত্রী-ঐশ্বর্যকে ছিনিয়ে নেওয়া বা তাকে লুন্ঠিতা করার অভিসন্ধিতে এই যুদ্ধ বেধে থাকে, তাহলেও ওই লুন্ঠনবাজদের প্রতিপক্ষে পাটনের এইসব কলহপ্রিয় হুল্লোড়বাজ লোকেরা অস্ত্র ধরবে সবাই। অঞ্চলে অঞ্চলে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে বলে উভয় ক্ষেত্রেই গ্রামবাসীদের মধ্যে পৌরুষ এবং সন্মানের প্রশ্ন চাগাড় দিয়ে উঠেছে।

তবে এর চূড়ান্ত পরিণতি যে কি ভয়াবহ আকার নিতে পারে, পাটনের তা কল্পনাতে নেই। থাকলেও তার জন্য সে মোটেই চিন্তিত নয়। যা হোক কিছুর বিনিময়ে সে জয় চায়— তার চায় জারমণি। পাটনের কাছে এই যুদ্ধ তাই জারমণিকে কেন্দ্র করে জারমণিকে পাওয়ার যুদ্ধ। যদিও সে বোঝে, সত্যের কাছে সে অসহায়। অসত্যের আশ্রয় তাকে নিতেই হবে।

নিতেই হবে, কেন না, সত্যের জোর তার নেই। জীবনে কখনো সে সত্যাচরণ করতে শেখেনি। সে ভ্রষ্ট হয়েছে তাই বিশ্বাস থেকে, প্রলুব্ধ হয়েছে পর-বাগদত্তায়, আর মত্ত থেকেছে সম্ভোগেচ্ছায়। কিন্নর দেশের ন্যায় অমন মনোরম মাঠারিভূমি পেয়েও সে আজ ভূমিচ্যুত, ভ্রাম্যমান। সে চঞ্চল ও অশান্ত। পুরুষের শরীরে জাগরণ আনার পক্ষে ব্যাপক যে-নারী, সেই অপ্সরা তার থেকেও না-থাকা। সেই নারীর দূরাগত সুবাস সে পায় কিন্তু আস্বাদ পায় না। দুর্ভাগা পাটন!

আর অঙ্গদ? কোনো মিথ্যার আশ্রয় নিতে চায় না সে। মিথ্যা প্ররোচনায় পশ্চিমের গ্রামবাসীদের তার দলে টানতে চায় না। পূর্বাপর ঘটনার উল্লেখ করে প্রকৃত সত্যকেই সে তাদের সামনে তুলে ধরছে। সে তার গ্রামবাসীদের এটাই বলে চলেছে যে, সমাজ কলুষিত হচ্ছে, সত্যের অবদমন ঘটছে, পাপের বিস্তার ঘটে চলেছে মানবমনে। আনন্দের পরিপন্থী এই বাতাবরণকে ধ্বংস করা দরকার। সে এও বলছে, গ্রামবাসীদের কাছে যুদ্ধের জন্য ঘর-ঘর থেকে ভিক্ষা চাইতে আসেনি, মুষ্টি-অন্নও চায়নি, তাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিতেও আসেনি সে। সে সত্যের পক্ষে তাদের বিবেক-বুদ্ধি-চেতনাকে জাগ্রত করতে এসেছে। তারাই স্থির করুক আগামী দিনে সমাজকে তারা কোন রূপে দেখতে চায়। কোন পথে নিয়ে যেতে চায়। যুদ্ধ করা এবং না-করাও তাদের সিদ্ধান্তের অনুকূলে। নি:সন্দেহে অঙ্গদের এই আবেদন অনেক জোরালো। অনেক সৎ। অনেক বেশি দার্শনিক, সার্বজনিক, উদার এবং জনহিতাকাঙ্খি।

যুদ্ধের নামে সে কোনো আড়াল রাখেনি। জনসাধারণের সঙ্গে প্রতারণা করতে, ধোঁকা দিতে চায়নি। এখানে যুদ্ধ লাগিয়ে দেবার পিছনে সমাজের কোনো কায়েমি শ্রেণি নেই, কোনো জোতদার আড়তদার বা বণিক শ্রেণিও নেই। প্রাক-যুদ্ধ তথা যুদ্ধোত্তর পর্বে ব্যক্তিগত লাভ-অলাভের প্রশ্নও পশ্চিমাদের মধ্যে নেই। যদি সে জয়ী হয়, তাহলে জারমণিকে অবশ্যই সে লাভ করবে। কিন্তু এই জয় তার কাছে নেহাতই প্রতীকী জয়। সার্বিকভাবে সমাজের জয়।

যৌবন-প্রমত্তা নারীকে নিয়ে আজ আর কী কাজ তার? তাকে নিয়ে কোন ধুন গাইবে সে? যৌবন তার অতিক্রান্ত। কামশক্তিতে দুর্বল। রতি-রঙ্গিলা, উষ্ণ, ছলনাময়ী তথা কামকলানিধি হস্তিনী নারীও তার কাছে আজ খড়ের আঁটি ভিন্ন কিছু নয়। তা হোক। তৎসসত্ত্বেও ওই স্ত্রীধনকে সে ওই পাপমতি পাটনের সবল গ্রাস থেকে ছিনিয়ে আনতেই চায়। সে জারমণির পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে বিশ্বাসের পুনরুদ্ধার চায়।

যদিও সমাজ-ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে, এমনকি মহাকাব্যেও যেমন ঘটেছে, এখানেও ঠিক তেমনটাই ঘটতে চলেছে। একটি স্ত্রী-সম্পদকে নিয়ে কলহের সূত্রপাত— ক্রমে তাকে দখলের নামে মহাসংগ্রামের আয়োজন। আর এই বিচার-ভাবনা থেকে, এক হিসেবে এটাও বলা যেতে পারে যে, অতীতের বহু যুদ্ধের মতো এই মাঠরিযুদ্ধও আসলে পৌরুষের নামে কাম চরিতার্থতার যুদ্ধ। তফাৎ শুধু এইটুকু, এখানে যূযূধান দু-পক্ষ নারীর দখল নিতে চাইলেও দু-পক্ষই কামুক নয়। একজন বিগত-কাম, সে সমাজে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা চায়। আবার আরেকজন যে, সে উন্মাদ। সে কপট, কামান্ধ। জারমণিই তার লক্ষ্য। মাঠারিতেই আবদ্ধ তার জগৎ ও জীবন। রতিগড় টিলার মাথায় থেকেও যে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখে না, দেখে ওই মায়াবিনীকে। বাঁধভাঙা চাঁদের আলোয় যখন মাঠারি উছলে পড়ে, যখন ছোটো ছোটো হেলকে ঢলমল করে ইরাবতীর জলতল, তখনো, চাঁদের পানে না তাকিয়ে সে সাহড়া গাছের মগডালে বসে তাকিয়ে থাকে জারমণির দিকে। এইসব নিয়েই গুণনিধি পাটন, কামদ্যুতি যার হীরকখন্ডের মতো।

এখানে, এই বাউরি গ্রামে এসেও, তাদের সংস্কারাচ্ছন্ন দুর্বল মনের সুযোগ নিল পাটন। তাদের প্রশ্নের জবাবে সে বলল, এ-যুদ্ধ জিনগা-মাঈয়ের হয়ে মাতা ও মৃত্তিকাকে রক্ষা করার পবিত্র যুদ্ধ। কিন্তু কে মাতা? কে মৃত্তিকা?

পাটন তার বিশ্লেষণে কিছুটা ধোঁয়াশা রেখেই দিল, নেহাৎ প্রয়োজন না হলে যা সে খুলাসা করবে না। তবে হাবেভাবে কিঞ্চিত বুঝিয়ে দিল তার রানি জারমণিই এ-তল্লাটের যত প্রাকৃতজনদের মাতৃস্বরূপা। জিনগা-মাঈয়ের অঙ্গোদ্ভবা সে। রতিগড়ের গরামথানের সেও এক চলতা-ফিরতা প্রখরা দেবী। জয় মাতাদি!

হ্যাঁ, দেবী তো বটেই। নেহাত দৈবশক্তির অধিকারিণী না হলে কি অমন ভূত-প্রেত অধ্যুষিত সুনসান রতিগড়ে কোনো নারী বছরের পর বছর পড়ে থাকতে পারে? আর সে-দেবী অধিষ্ঠান করে আছে যে-ভূমিতে সেই মাঠারি-ই পবিত্র মৃত্তিকা। এই মাতা ও মৃত্তিকা আজ বিপন্ন। ওই যে ওই পশ্চিমের যত জোলা-তাঁতি-মালহার-আদিবাসী আর ভেড়-বকরি চরানোর দল, তারাই আজ মাতৃস্বরূপিণী জারমণিকে লুন্ঠন করে দেবভূমির দখল নিতে চায়। একি কখনো সম্ভব? পুবের গ্রামবাসীদের কোনো যুদ্ধ-প্রতিরোধ— কোনো একটিও তির-ভল্ল ছোঁড়াছুঁড়ি ছাড়াই এই মাঠারি কি একতরফাই তাদের দখলে চলে যাবে? পুবের এই এত-এত গ্রামের মানুষজনদের নপুংসকতাকে মেলে ধরতে পশ্চিমাদের এই আধিপত্য কি বিনাযুদ্ধে মেনে নেবে তারা?

হারগিজ না।

গ্রামের মুখিয়া হাতের ইশারায় থামিয়ে দিল সবাইকে। যা বলার সে-ই বলবে। পাটনের জিজ্ঞাসার জবাব দিতে সটান এগিয়ে এল সে একাই। পাটনের দিকে। হঠাৎ রীতিমত ঔদ্ধত্যের সঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে বলল, ‘লাগাও লঢ়াই! ফসলা যদি করতেই হয়, ত মাঠারিয়েই ইয়ার ফসলা হবেক! হবেকেই!’

বৃষ-শকটের কাছে ঘুঁসুর-ছা-এর মতো ভিড় ভিড় করে এল গ্রামবাসীর দল। আঁচলে আঁচলে মুষ্টি-অন্ন দিতে লাগল পাটনকে। জয় হো! জয় হো! জিনগা-মাঈয়ের জয় হো!

বিগতযৌবন হয়েছে বলে যে অঙ্গদের নারীতে আসক্তি নেই, কৌতূহল নেই, নারীকে কেন্দ্র করে কোনো সংসারজীবনের স্বপ্ন রচনাতেও তার অনীহা, তা অবশ্য নয়। যদিও তা ক্ষীণ সত্য হলেও হতে পারে, সর্বাংশ সত্য বলা চলে না।

অতি-বার্ধক্যে এসেও তো দেখা যায়, উপগমনে অপারঙ্গম হওয়া সসত্ত্বেও বহু পুরুষ নারীসম্ভোগের ভাবনা ও কল্পনা থেকে, নারীর মোহিনী রূপের বিকিরণজনিত আকর্ষণ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণত মুক্ত রাখতে পারে না। অন্তঃসলিলা নদীর মতো রিপুর টান থেকেই যায়। এমনকি, তখনও, আর কিছু না হলেও বিবস্ত্রা রমণীকে কেবল সবিস্ময় ও নিরবচ্ছিন্ন অবলোকনের ভেতর দিয়েও ঈষৎ আত্মসুখ বা যৌন-বিচলন অনুভব করে থাকে। পথে-ঘাটে কুক্কুর-কুক্কুরীর মিথুন গোচরে এলেও তারা তৎক্ষণাৎ নজর ঘুরিয়ে নেয় না, বরং আড়চোখে, কৌশলে তাকিয়ে থাকে, আর তখন হয়তো ভাবে তার অতীত দিনগুলির কথা, নিজস্ব রমণীর সঙ্গে একান্তে তার এমন যৌবনমদমত্ত হওয়ার কথা অথবা হতে না-পারার ব্যর্থতার কথাও।

জগতে যত মানুষ সাংসারিক জীবনে রতিক্রিয়ায় সফল ও সুখী, তদপেক্ষা ঢেরগুণ অসফল, অসুখী ও বিষণ্ণ। হয়তো সে-কারণে, অতৃপ্ত মানুষ তার অন্তিম পাদে এসেও নারীকে নিয়ে তার সুখসন্ধান করার কথা ভাবতে ছাড়ে না, যা কার্যত, অন্ধত্ব ও বিভ্রমের নামান্তর। কারণ, প্রৌঢ়ত্বে দিব্য তথা জাগতিক বাতায়ন উত্তরোত্তর উন্মুক্ত হয়, জগৎ বিষয়ে মানুষকে অধিকতর অবগত করতে। জগৎ ও জীবনের এটাই চিরকালীন ছন্দ। একমাত্র মূঢ়রা বাতায়ন-বিমুখ হয়, যোনি-চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে, অপরের তরে নিরন্তর ঠাট্টা-উপহাস-হিংসা-দ্বেষ পোষণ করে, তুচ্ছ কলহে নিজেকে ব্যাপৃত রেখে আত্মসুখ অনুভব করে। অন্যদিকে তার মহার্ঘ জীবন ক্লেদে ও আস্তাকুঁড়ে গড়াগড়ি খেয়ে নিষ্ফল বয়ে যায়! খেয়াল রাখে না সে।

আশ্চর্য, এই লক্ষণগুলির কোনোটাই অঙ্গদের ক্ষেত্রে কাল্পনিকভাবেও সত্য নয়, বাস্তব তো নয়ই। একসময় সে জারমণিকে নিয়ে যুগল জীবনের কথা ভেবেছিল, সংসারী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু তার বীজ বপনের অবকাশটুকুও সে পায়নি— অঙ্কুরিত স্বপ্নের সফল বৃক্ষরূপ ধারণ তো দূর অস্ত। আজ বহু-বহু বছর হল সে তার যৌবদশা অতিক্রম করে এসেছে। ফেলে এসেছে জীবনের পক্ষে অবাঞ্ছিত বহু আবর্জনা, যেমন সর্বগ্রাসী দামাল প্লাবন পশ্চাতে ফেলে রেখে চলে যায় কত তৃণ, উপলখন্ড, কাষ্ঠশাখা, কত-কত মরা-পচা জীব। আর এভাবে সে নির্ভার ও আতশতুল্য স্বচ্ছ করেছে নিজেকে। একমাত্র নির্ভার নির্লোভ আত্মাস্থলেই জাগতিক জ্ঞানের বীজ বপন সম্ভব, যা কালে-কালে বহু ঝড়ঝঞ্ঝার ভেতর দিয়ে মহীরূহ হয়ে ওঠে।

আজ জীবনের বহু ব্যর্থ বসন্ত অতিক্রম করে আসা এই মানবের দেহপিঞ্জরে অন্য এক পরিশুদ্ধ মানব বিরাজমান। এখন সে তার ফেলে আসা অতীত নিয়ে, যৌবন নিয়ে আদৌ চিন্তিত নয়। সে চিন্তিত শাশ্বতিক সত্যের সন্ধান ও জীবনের সঙ্গে তার সংঘাত নিয়ে। সত্য আসলে কী? কতদূর পর্যন্ত সত্য তার বিস্তার ঘটাতে পারে মানবমনে? এমনকি, তার এটাও মনে হয়, লোকসংসারে নারীকে কেন্দ্র করে যেমন প্রাত্যহিক সংঘর্ষগুলি বাঁধছে, সত্যের সঙ্গেও কি মানবের প্রতিনিয়ত সংঘাত লাগছে না? তাহলে কি কোথাও জীবনের কোনো পর্বে নারী ও সত্য অভিন্ন? একাকার? নারীতেই জগৎ সত্য?

সে অন্য প্রসঙ্গ। আপাতত, অঙ্গদের বিগত যৌবনের সূত্রে বলা যায়, যৌবনকে সে কখনো জীবনের সোনার কাঠি মনে করেনি। বরঞ্চ, এই যৌবনহীন দশায় জীবনদর্শনের যে স্বর্ণোদ্যানের ভেতর দিয়ে সে এগিয়ে চলেছে তার গহীন মার্গে, তাতে সে মানব হয়ে ধন্য মনে করছে নিজেকে। সে-কারণবশত, আজও, তার সেই টনটনে যৌবনকালে নারীশরীরে লিঙ্গ স্থাপন করতে না পারার কোনো হাহাকার, কোনো আক্ষেপ, কোনো দুখদ মর্মর শোনা যায়নি, যা প্রবলভাবে মুহূর্মূহ উচ্চারিত হয়েছে পাটনের মুখ থেকে।

এমনকি, এই তো এই সেদিনও, যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আগেও জারমণিকে নিয়ে পাটনের ভাবের, অভিলাষের, কল্পনার বৈভবের অন্ত নেই। কী জানি, হয়তো, অতীব কল্পনা ও অলীক আবেশের আচ্ছন্নতার ভেতরে দিয়ে সে বাঁচার উপকরণ খুঁজে পায়। হয়তো, সে এটাই চায় যে, জারমণি এমনই থাকুক যেভাবে সে জয়-বিজয় কাঙ্ক্ষা করে একটি যুদ্ধের জন্য অগণিত বর্ষ অপেক্ষা করে আছে— হয়তো আরো-আরো বহু বর্ষ অপেক্ষাতেই থেকে যাবে। সে চায়, জারমণি যত না বাস্তব, তার চেয়ে বেশি অবাস্তব ও কল্পনা হয়েই থেকে যাক তার ভাবনায়। হয়তো সে এটাও চায়, যে, ওই নারী তার স্পর্শ থেকে লেহন থেকে ফারাকেই থাকুক— সে যেন কখনো, কস্মিনকালেও নৈকট্য নিয়ে পাটনের বাহু-দূরত্বে না এসে পড়ে, যাতে এই নারীকে নিয়ে সে তার নিজস্ব ভাবকল্পের জাগরণ ঘটাতে পারে, যাতে নিজের কল্পভূমিতে সে সৃজন করতে পারে অন্য এক জারমণি, যা বাস্তবে থেকেও বাস্তবে নেই, যা বাস্তবে থেকেও দৈব, যা প্রখর এবং যাকে কোনোভাবেই বক্ষলগ্না করা যায় না, কোনো আধারেই ধরা যায় না।

পাটন সে-কাজ মনে হয় যেন অনেকটাই করতে সক্ষম হয়েছে। এটা করে সে তার মতো করে উপভোগ করতে চেয়েছে জীবনকে, হয়তো জারমণিকেও। তার কাছে প্রেমই জীবন, রেতঃপাতই মুক্তি, নরনারীর পারস্পরিক শরীর সংস্থাপনই দেব-আরাধনা। জীবন এখানেই শেষ। ওইটুকুই। জীবনের জন্য, জীবনের প্রয়োজনে আর কোনো জ্ঞান, বিদ্যা, দর্শনচিন্তা, ভবিষ্যৎচিন্তা, বা এককথায় পুঁথি-অধ্যয়ন অবান্তর ও বাহুল্য মাত্র। এছাড়াও বাকি সকলই তার সংজ্ঞায়িত জীবনের পক্ষে বাতুলতা। সে এমন কথা কখনো-কখনো জারমণিকে বলেওছে। জারমণি হাসেনি, মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।

জারমণি হাসেনি, সে হাসবে না বলেই। অন্যথায় এই পাটনের বহু আচরণই তো হাস্যাস্পদ, বিশেষ করে অঙ্গদের সঙ্গে তার প্রতিতুলনায় জারমণির তা মনে হয়। সে এটাও জানে, জ্ঞানচর্চা বা জীবনচর্চার বিরুদ্ধকথা বলে জারমণির মনকে সে অঙ্গদের থেকে ঘুরিয়ে আনতে চায় তার নিজের অভিমুখে। তার নগ্ন লোমশ বক্ষে অঙ্গুলি রেখে যেন বলতে চায়, ‘বাহিরের প্রতি প্রলুব্ধ হইয়ো না, নারী। বাহির সর্বদা প্রতারণামূলক। ভিন্ন পুরুষকে নয়, আমাকে প্রত্যক্ষ করো! অবলোকন করো আমার তেজ, আমার ভীমবিক্রম! আর দেখো কীভাবে আমি এই রতিগড়ে আজও আমার আধিপত্য বজায় রেখেছি!’

এমন সংলাপ পাটন বহুবার ব্যক্ত করেছে, তার নিজের মতো করে নাট্যবলয় ও প্রতিবেশ সৃষ্টি করে।

কিন্তু জারমণি তো জানে তার সীমাবদ্ধতা। ভালোই জানে। বিক্রম আর তেজের কথা বললেও সে আদপে কখনোই জ্ঞান নিয়ে দীপ্যমান হয়ে উঠতে পারে না। পারবেও না। জ্ঞানের ভান্ডার তার শূন্য—তা যোনিচিন্তার অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তার তেজ-বিক্রম সবকিছু তার অস্বাভাবিক ও অতিকায় পুরুষ শরীরকে নিয়ে, তার অতীব প্রিয় যৌনাঙ্গকে নিয়েও। সস্নেহে সোহাগে লালিত এই অঙ্গটি তার কাছে এতটাই আদরণীয় ও বিস্ময় উদ্রেককারী যে, পাটন সময়ে সময়ে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে সন্মোহিত হয়ে পড়ে, তার বহুবিধ বিস্ময় জাগে। এবং সেই বিস্ময় ও সন্মোহনের বশবর্তী হয়ে সে কখনো তাকে লতাপাতা ও সুগন্ধী ফুলের উপর্যূপরি বেষ্টনী দিয়ে সজ্জিত করে, তাকে শিবজ্ঞানে পূজাও করে, আর এই করতে গিয়ে যখন তার মহা-উত্থান ঘটে, তখন অন্তঃশীল কামাগ্নি নিয়ে জারমণির জন্য টিলায় জঙ্গলে ছুটে বেড়াতে হয়। যদিও সে জানে তাতেও তার সুরাহা হবে না। সে তখন বাস্তব জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। আর উন্মদের মতো কখনো প্রস্তরখন্ড দিয়ে, কখনো-বা তার প্রবল মুষ্ট্যাঘাত দিয়ে গভীর আক্রোশে সেই যৌনাঙ্গকেই ঘায়েল করতেও কসুর করে না। এই নিষিদ্ধ কর্ম সম্পাদন করতে করতে সে গভীর আক্ষেপ ও মনস্তাপ প্রকাশ করে, ‘আমি অভিশপ্ত! আমি পাপাচারী! এভাবেই কৃতকর্মের জন্য আমাকে দন্ড ভোগ করে যেতে হবে!!’

কিন্তু তার এই উপলব্ধি খুবই তাৎক্ষণিক। কঠিন এই উপলব্ধির ভেতর দিয়ে গেলেও জারমণিকে নিয়ে তার আবেগ, তার স্বপ্ন-অভিলাষ কখনো চিরতরে বিনাশপ্রাপ্ত হয় না। নৈরাশ্য থেকে উত্তীর্ণ হয়ে সে আবার নিজের প্রতি আস্থা খুঁজে পায়। আবার সে মনে করে তার বিকট শরীরী যাদুদন্ড দিয়ে সে ওই তীক্ষ্ণধার নারীকে আত্মস্থ, বশীভূত ও তৃপ্ত করতে সক্ষম হবে। উদগ্র বাসনা নিয়ে জারমণির অনুকম্পা চেয়ে সে বলেও ফেলে, ‘আমাকে দেখো, একবার দেখো! মুখ ফিরাও মহিমময়ী। আমি পাহাড়ের মাথায় নগ্ন পাহাড় হয়ে দাঁড়াতে চাই! আমাকে একবার দেখো! একবার ভাবো!’

ভাবা তো দূরের কথা, তার অজগর পুরুষাঙ্গ প্রত্যক্ষ করা আরো দূর, জারমণি পাটনের এমনতর আর্ত-সংলাপ শ্রবণে সর্বদাই বিমুখ ও অন্যমনস্ক থেকেছে। নির্বোধ এই নরকাসুর পুরুষকে ভুলে, মনে মনে, সেই বৃদ্ধের কথা ভেবেছে সে। ভেবেছে অঙ্গদকে নিয়ে, যে অস্থিচর্মসার কিন্তু বিদ্যাধর ও মেধাদৃপ্ত।

বাস্তবে, পাটন নিজে অজ্ঞান ও জ্ঞানবিমুখ বলে আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তিকে কখনো কখনো সে সাজায় জ্ঞানের প্রতি তার অবমূল্যায়ন দিয়ে। যদিও এটা সে জানে না, তার পক্ষে জানা সম্ভবও নয় যে, যে-মানুষ বিদ্যার কাছে নিজের ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে, বিদ্যাকে অসম্মান করে এবং জ্ঞানীকে তিরস্কার করে, তার পতন বড়ই গতিশীল ও করুণ হয়ে দাঁড়ায়, এবং জীবনের অন্তিম দশায় এসে সেই কারুণ্যকে বেদনার ভেতর দিয়ে তাকে অনুভব করে যেতে হয়।

জারমণি সিংসর্দার পাটনের সেই দিনগুলিরও অপেক্ষায়। সে দেখে যেতে চায় কালকে, কালের বিচারকে। একমাত্র কালই সর্বজ্ঞ, সর্বজ্ঞানী। অঙ্গদের মতো করেই সে ভাবতে চায়। পাশাপাশি, অঙ্গদের মতো করে সেও পাটনকে অসত্যভাষী ও দ্বিচারী ভাবে। সে জানে, পাটন যতই জ্ঞান অধ্যয়নের সূত্রে পরোক্ষভাবে অঙ্গদকে খাটো করুক না কেন, অজ্ঞানতা তার ভেতরে এক অনবদ্য হাহাকার ও নৈরাশ্যের গহ্বর সৃষ্টি করে রেখেছে। যা সহোদরের সম্মুখে তাকে যার পর নাই হীনম্মন্য ও অধীন করে রাখে। সে-কারণে, পাটন টের পায়, শত আস্ফালন সসত্ত্বেও এখানেই সে হেরে বসে আছে। শোচনীয় সে পরাজয়। সে টের পায় শরীর নিয়ে, যৌবন নিয়ে, পাশবিক বল নিয়েও সে তার অধ্যয়নশীল তথা বাস্তব জীবন থেকে প্রত্যক্ষজ্ঞান আহরণকারী সহোদর অপেক্ষা ঢেরগুণ দুর্বল। এই দুর্বলতা কখনো-কখনো অশ্রু হয়ে আক্ষেপ হয়ে ঝরেছে, এমনকি জারমণিরই কাছে। পাটন কি ভুলে গেছে সেই দিনের কথা, যেদিন সে অকপটে স্বীকার করেছিল :

‘রানি, কখনো-কখনো আমার ক্ষোভ হয়। মনে হয়, আমার সকল অস্ত্রসম্ভার নিয়েও আমি নিরস্ত্র! আমি একা! মনে হয়, বিদ্যা-বুদ্ধি-চেতনা-কৌশল কোনোকিছুতে আমার বিজ্ঞ ও প্রবীণ সহোদরকে আমি পরাস্ত করতে পারব না। কখনোই পারব না। কারণ, তার অস্ত্র চেতনায় আঘাত হানতে পারে, আর আমি স্বয়ং কালির আখরহীন, অ-জ্ঞান, ও অহঙ্কারী বলে আমার সকল হাতিয়ার অদড়, ভোঁতা। তারা কী করে শত্রুপক্ষ দমনে সমর্থ হবে? হায়! কেন আমি লোকালয়ে থেকে পুঁথি না হোক— জীবনচর্চায় নিমগ্ন হলাম না! জীবনচর্চাই জ্ঞানচর্চা। আর জ্ঞান সেই আলো, যা কেবল নিজেকেই প্রকাশ করে না তার প্রতিবেশকেও দেখিয়ে দেয়। আমি আকন্ঠ অন্ধকারে নিমজ্জিত! আমি শুধু কামরজ্জুতে কুন্ডলিকৃত হয়ে তোমার আশে এই পার্বত্যভূমিতেই থেকে গেলাম! মনে হয়, সমরে অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বেই আমি তার কাছে পরাজিত! নারীর প্রতি আমার ব্যতিক্রমী মোহই আজ আমার দুর্দশা ও মৃত্যুর কারণ।’

যুদ্ধের পক্ষে প্রচারাভিযানে এই গ্রামে এসে, অঙ্গদ শবর বেশি করে ভাবতে চায় এবং গ্রামবাসীদেরও ভাবিয়ে তুলতে চায় যুদ্ধের আদিতে নারীকে নিয়ে এই যুদ্ধের ব্যাপারে। যুদ্ধে জয়লাভই তার অনন্য লক্ষ্য নয়, কেননা, এই যুদ্ধকে সে দেখছে অনেকটাই নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে—যুদ্ধে জয়লাভের অনিবার্য এবং একমাত্র প্রাপ্তি ওই নারীকে নিয়ে নয়। ইতিপূর্বে বলাই হয়েছে, নারী নিয়ে সে কী করবে? যখন তার প্রয়োজন ছিল, তখন সে তাকে পায়নি। আজ তাকে পেলেও তা না পাওয়ারই সামিল। নারীকে নিয়ে রঙ্গ করার সময় তার গত হয়েছে। আজ তার দৃষ্টিতে ও ভাবনায় নারী নিয়ে কোনো বিভ্রম নেই, আবেগ নেই, ভাবালুতা নেই, পাহাড়-পাতাল কাব্য নেই। আজ জারমণির দিকে তাকালেও এখন সে আর কোনো জাগরণই অনুভব করবে না। এটা একদিক দিয়ে সেই নারীর প্রতি অবমাননাকর হতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে এই অবস্থান বুঝিয়ে দেয় যে, অঙ্গদ তার জীবনের বাতায়ন খুলে জ্ঞানমার্গের অভিমুখে তাকিয়ে রয়েছে, যা তাকে মুক্তির দিশা দিতে পারে। পশ্চিমের ঢলায়মান সূর্যের দিকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে থাকলে, সে কেবল অস্তমান রবিকেই দেখে না, দেখতে পায় আরো কোনো জগৎ, শুনতে পায় আরো কোনো সংগীত, আর অনুভব করে আরো কত-কত প্রাণের জাগরণ-ধ্বনি! এসবের ভেতরেই নিজের অস্তিত্বকে সে বিলীন করে দিতে পেরেছে। নিজেকে খুঁজতে চেয়েছে অপরের মধ্যে, বহুর ভেতরে। যুদ্ধ জয় করে অঙ্গদ জারমণিকে অর্জন করলেও এ জারমণি তার কাছে শুধুই একটি পার্থিব বস্তু মাত্র। তা কখনোই তার একান্ত কামনার ধন হয়ে উঠবে না।

বয়সের ভার নয়, বহু বহু বছরের অর্জিত জ্ঞানের ভেতর দিয়ে পরিভ্রমণ-হেতু পুরোপুরি রূপান্তর ঘটে গেছে সেদিনের সেই ডেলিকচা গ্রামের বাসিন্দা অঙ্গদ শবরের। আজ সেকথা তার আর মনে নেই। মনে করতেও চায় না। একদিন চেয়েছিল, ফিরে যেতেও চেয়েছিল তার এই আবাস-নিবাসহীন তথা জ্ঞানের তৃষ্ণায় ভ্রাম্যমান জীবন ছেড়ে। কিন্তু ক্রমে ক্রমে জগদ্দর্শনের নেশা এবং বিদ্যা ও ত্যাগের জীবন তাকে এতোটাই কাবু করে ফেলল যে, সে তার নিজের পায়ের বেড়ি খুলতে গিয়ে জগৎ-মাতৃকার শৃঙ্খল খোলার প্রতিজ্ঞায় কঠোর ও আত্ম-মগ্ন হয়ে পড়ল। সে হারিয়ে গেল হাজারো গ্রামবাসীদের ভেতরে, হাজারো জনপদে। আজ সে আর ডেলিকচা গ্রামের নয়, বস্তুত, সে নিজেই জানে না অথবা জানতে চায় না সে কোথাকার, তার মূল কোথায়, ভূমি কোথায়, গন্তব্য কোথায়, আশ্রয় কোথায়—কে তার মাতা-পিতা? কোন জননীর শান্ত-সুশীতল ক্রোড়ে ঠাঁই পেতে সে সতত ধাবমান? সে শুধু জানে তার অঙ্গীকার।

অঙ্গদের এই রূপান্তর, বস্তুতপক্ষে, জ্ঞানের ভেতর দিয়ে তার আত্মনির্মাণ। সে কাম ও বিভ্রমের তামিস্রা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছে, পেরেছে বিষয়-বৈভবকেও অকিঞ্চন জ্ঞান করতে। এসবই সম্ভব হয়েছে একদা সেই মহান গাড়োয়ানের নেকনজরে আসায়। তার অভিজ্ঞান, জীবনবোধ ও সদুপদেশের মাধ্যমে। সে-কারণে এখনও, গ্রামবাসীদের কাছে যুদ্ধের বার্তা পৌঁছে দিতে গিয়ে যখনই সে তাদের সন্মুখে দাঁড়িয়েছে, তখন জারমণিকে নয় সে স্মরণ করেছে তার সেই প্রাতঃস্মরণীয় মহাপ্রবীণকে। আর মনে মনে নিজেকে শুনিয়ে সশ্রদ্ধ উচ্চারণে বলেছে, ‘হে মহাপ্রবীণ! তুমিই লক্ষ্য, তুমিই জ্ঞান, তুমিই সূর্য—অগ্নি তুমি!’

এই উচ্চারণের অর্থ কেবল শ্রদ্ধাজ্ঞাপন নয়, সেই সঙ্গে সে এটাও স্মরণে রাখতে চায়—আমার জীবনে তোমার ভূমিকা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। তুমি এখনও আমাকে তোমার প্রতিচ্ছায়ায় প্রতিপালিত করো, আমাকে অবিচলিত রাখো, নিয়ন্ত্রণে রাখো। তোমার দিব্যদৃষ্টি দিয়ে আমাকে এই বিশাল জগৎ-চরাচর দেখাও, তোমার বাণীই আমার মুখ দিয়ে নি:সৃত করো। জগৎ যে সতত সংগীতময়, আমাকে তোমার বোধ, বীক্ষা, বিবেচনা ও অধীত বিদ্যা দিয়ে তা গ্রহণে ও বোধগম্যকরণে সহায়তা করো। আমার চক্ষুরত্নে তোমার সেই অপাপবিদ্ধ হস্তাবলেপন করো, যাতে আমি ভুবনময় আলো দেখতে পাই, যাতে অজুত সহস্র নিযুত নিপীড়িত গ্রামবাসীদের আমি অন্ধকূপ থেকে আলোয় নিয়ে যেতে পারি!

কিন্তু তৎসসত্ত্বেও ঘটনা এটাই যে, দুই পক্ষে বিভক্ত দুই সহোদরের এই যুদ্ধ ওই নারীকে নিয়ে। জারমণিকে নিয়ে। ঘটনাচক্রে, এই যুদ্ধ এখন দুই ভূখন্ডের মানুষের যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধে, অঙ্গদের জীবনে এখন আর জারমণির প্রয়োজন থাক বা না থাক, সে বীরের মতো সংগ্রাম করেই তাকে অর্জন করতে চায়। ‘অর্জন’ না বলে বলা যায়, পাটন নামের ওই স্ত্রী-অবমাননাকারী, ওই দুষ্ট, দুরাচার, দুবৃর্ত্তের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করে আনতে চায়। অঙ্গীকার তার এটাই। সে বারে বারে উল্লেখ করে—জারমণির পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সে বিশ্বাসের পুনরুদ্ধার চায়। চায় সমাজে সত্য, ন্যায় ও ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

‘সত্য, ন্যায় ও ধর্মের প্রতিষ্ঠা? হা:! হা:! হা:!’ বিকট অট্টহাস্য করে উঠল পাটন। ঝড়ের মুহূর্তে ধুলোর রাস্তা পরিহার করে সে তখন সদলবলে আমবাগানের ভেতর দিয়ে ঈশানকোণে চলেছিল। হাসি থামিয়ে বলে, ‘আমি যে হাসি সংবরণ করিতে পারিতেছি না। এখন আমি টের পাইতেছি মানুষ কেন বলিয়া থাকে যে, অতিবিদ্যা মানুষকে নির্বোধ ও হতবুদ্ধি করিয়া দেয়। সে-মানব তখন অলীক ভবিষ্যতের কথা, অলীক সমাজের কথা ভাবিয়া কল্পনার জগতে বসবাস করিতে থাকে। আমার প্রবীণ সহোদর তেমনি এক কাল্পনিক রাজ্যে বসবাসকারী মনুষ্য। সে বলিয়া বেড়াইতেছে কিনা মাঠারি অধিকার করিয়া সেথায় জারমণিকে লইয়া অখন্ড এক ধর্মরাজ্য স্থাপনা করিবে— যে-রাজ্যের মূল ভিত্তিই হইবে সত্য, ন্যায় ও ধর্ম।’

‘আজ্ঞে, হ্যাঁ, সকল জনপদবাসী সে-ব্যাপারে অবগত আছে। আমাদের চিন্তা হইতেছে, আমরা যত মানুষকে বর্হিশত্রুর আগ্রাসন প্রতিরোধে যুদ্ধের ব্যাপারে উদবুদ্ধ করিব, তাহা অপেক্ষা ঢেরগুণ মানুষ ধর্মরাজ্যের লোভে পূর্বাঞ্চলের অসভ্য, অর্বাচীন তথা অসাংস্কৃতিক গ্রামবাসীদের যুদ্ধে পরাস্ত করিয়া এই অঞ্চল হইতেই ভাগাইবে। আমাদের সখের স্বর্গীয় মাঠারিও পশ্চিমাদের দখলে চলিয়া যাইবে।’

‘হে আমার পারিষদবর্গ! অহেতুক আতঙ্কিত হইও না। যাহা কল্পনা করিতেছ তাহা কখনো বাস্তব হইতে পারে না। তোমরাও সকলে শুনিয়া রাখ—কিসের ধর্মরাজ্য? কে কবে কোথায় ধর্মরাজ্য দেখিয়াছে? পুঁথিতে পড়িয়াছে মাত্র। তাহা সম্পূর্ণত কাল্পনিক। যুগ-যুগ ধরিয়া ধর্মরাজ্যের কথা সমাজে চলিয়া আসিতেছে। কিন্তু কেহ কখনোই তাহা দেখুত করে নাই। তেমন জগৎ, তেমন সমাজ কখনো গড়িয়া তুলা যায় না, তাহা মানুষের কল্পনামাত্র। এই কল্পনা করিতে বিদ্বানশ্রেণি বিশেষ ভালোবাসে। সমাজে বিশুদ্ধ সততা বলিয়া কোনো বস্তু নাই। সমাজে, সংসারে, জীবনে তাহা না কখনো ছিল, না কখনো থাকিবেক। তাহার কারণ, এই জগতে অর্ধেক-অধিক মানুষ অসৎ। অসততা মানুষের সর্বাপেক্ষা প্রিয় তথা গোপনে আচরিত ধর্ম। জগৎ চলিতেছে সেই গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের রায়দানে।

‘তেমতি, অন্যায় সংঘটিত না হইলে জগতে ন্যায়ের কোনো অস্তিত্বই থাকিবে না। সচরাচর যে-মানবের অধিক বল ও সম্পদ থাকে, সমাজে সেই মানবই ক্ষমতাবান। এই ক্ষমতা হইতেই লোভ, হিংসা, আগ্রাসন তথা অন্যায়ের জন্ম। অর্থাৎ বৈষম্য হইতেই ক্ষমতার জন্ম আর ক্ষমতা হইতেই অন্যয়ের জন্ম ও বিস্তার লাভ। সমাজ কখনো, কোনোদিনই, বৈষম্যহীন হইবে না, যেমন ভূ-মৃত্তিকা কোনোদিন মহীলতা১-হীন হইবে না। সেই হেতু, সমাজ হইতে কখনো অন্যায়রূপ বৃক্ষকে উৎপাটিত করা সম্ভব হইবে না। বরঞ্চ দিনে-দিনে উহা মহাবৃক্ষে রূপান্তরিত হইবেক।

‘পরিশেষে, এই সত্য মোটেই ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না যে, যে-সমাজে সত্য নাই, ন্যায় নাই, সে-সমাজে ধর্ম বলিয়া কোনো বস্তু থাকিতে পারে না। উহা একটি অসত্য, অবাস্তব ও অলীক ভাবনা। আমি বিস্মিত হইতেছি এই ভাবিয়া যে, আমার জ্ঞানচর্চা নাই, বিদ্যাচর্চা নাই, আমি বেদবিধি জ্ঞানহীন, তথাপি আমার কাছে উপরোক্ত বিষয়গুলি প্রাঞ্জল হইয়া আছে। অথচ দেখো ওই বিদ্যাহঙ্কারীকে, তার এই সাধারণ ধারণাটুকু অবধি নাই। সে করিবে ধর্ম প্রতিষ্ঠা! প্রকৃত অর্থে, লোভই মানবের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। জিহ্বাই তাহার চালিকাশক্তি। —সহচরগণ, অধিক কালক্ষেপ না করিয়া অগ্রসর হও!’

পাটনের বৃষ-শকট মট-মট শব্দ করে উঠল, যখন সে সেই যানে আরোহণ করে সকলের সঙ্গে আবার এগিয়ে চলল। এই সময়, ঝড়ের গতি কিছুটা কমে যেতে, পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে হাল্লা করে আমকুড়াতে ছুটে এল যত শিশুর দঙ্গল। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পাটন বলে, ‘বৎস ননীলাল, আমাকে ঝুড়িখানেক আম্র আনিয়া দিতে পারো? ওই শিশুদের দেখিয়া আমারও আম্র খাইবার তরে রসনা জাগ্রত হইতেছে। ডাগর ঝুড়ি লইয়া যাও।’

শকট থেকে একটি বেতের মস্ত ঝুড়ি নিয়ে ননীলাল ও মেঘবাহন মাহাত আমবাগানে গেলে, পাটন ভাবতে থাকে, এখন এই ঝড়ের সময় অন্যান্য বছর কত-কত ঝুড়ি আম সংগ্রহ করে আনত জারমণি, আর সেই আম এই অতিকায় ভালুকটি মুহূর্তে সাবাড় করে দিত। যেমন গাছতলে বসে একেকদিন বড়-বড় দুটি-তিনটি পাকা কাঁঠাল খাওয়ার পরেও তার সাধ মিটত না। আজ সে সব কিছু থেকেই সে বঞ্চিত।

পাটন দূরের আমবাগানের দিকে তাকিয়ে দেখে, কয়েকটি শিশুর মধ্যে কলহ শুরু হয়েছে। মেঘবাহনরা ঝুড়িভর্তি আম নিয়ে ফিরে এলে, সে তাদের কাছে জানতে চায় কেন ওই শিশুরা কলহে মত্ত। এখানে বহু আমগাছ, আমেরও তো আকাল নেই।

মেঘবাহন জানায়, ‘মহাশয়, শিশুদের মধ্যে একটি কুহুপাদা আম লইয়া বিবাদ চলিতেছে।’

‘কুহুপাদা আম লইয়া বিবাদ?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, মহাশয়।’

‘বাস্তবিক, উহা যে বড়োই সুমিষ্ট হইয়া থাকে। বিবাদ হওয়াই স্বাভাবিক।’ পাটন ঘাড় নেড়ে বলে। এই সূত্রে বিজ্ঞের মতো করে সে এই সমাজ-দর্শনও আউড়ে দেয়, ‘মনুষ্য চিরকাল সুমিষ্ট বস্তু লইয়াই সংর্ঘষে রত।’

‘কুহুপাদা’ আমের অর্থ, যে-আমের গায়ে কোকিল বাতকর্ম করেছে। এমনটাই বলা হয়ে থাকে। বাস্তবে, একধরনের খুঁতযুক্ত সামান্য ফাটা ও লালচে হয়ে যাওয়া আমকেই তারা কুহুপাদা বলে মনে করে, যা ওই একই গাছেরই অন্য আম অপেক্ষা বেশি সুস্বাদু হয়ে থাকে। আর এই আম নিয়ে বেশ রসালো গপ্পও গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে মজার গপ্পটি হল বেয়াই-বেয়ানের মধ্যে কুহুপাদা আমের ঝুড়ি পাঠানো নিয়ে। বেয়ানের খুব সখ ছিল সেই আম খাওয়ার। তো, বেয়াই একঝুড়ি আমের সঙ্গে একটি পত্র পাঠিয়ে বেয়ানকে দলিল-লেখকদের ভাষায় লিখে জানাল :

তিনঠপ্পা ঠপ্পা মিদং কার্যঞ্চাগে

একঝুড়ি কুহুপাদা আম পাঠাইলাম—

আমার বিহাইনের লাইগে।।

তারপর সেই আম খেয়ে তৃপ্তির কথা জানিয়ে, লোভের বশবর্তী হয়ে আরো কিছু আম চেয়ে বসল বেয়ান :

তিনঠপ্পা ঠপ্পা মিদং কার্যঞ্চাগে

আরেক ঝুড়ি কুহুপাদা আম পাঠাবে

তুমার বিহাইনের লাইগে।।

কিন্তু অত আম বেয়াই পাবে কোথা থেকে? অগত্যা ঝুড়িভর্তি কাঁচা আমের সঙ্গে একটি কোকিল ছানা পাঠিয়ে বেয়াই চিরকুটে লিখল :

তিনঠপ্পা ঠপ্পা মিদং কার্যঞ্চাগে

কোকিলসহ আম পাঠাইলাম

পাদায় পাদায় খাবে।।

গপ্পটি মনে পড়ে যাওয়াতে নিজের মনে হাসতে থাকে পাটন। ননীলাল জিজ্ঞেস করে, ‘মহাশয়, আপনার মুখে স্মিত হাসি লক্ষ করছি। এই হাসির কারণ কী ব্যক্ত করিবেন?’

পাটন কথা ঘুরিয়ে দিয়ে বলে, ‘প্রকৃতপক্ষে, ঋতুরাজ বসন্ত আমার জীবনে অভিশাপ হইয়া রহিয়াছে। আমি সেই অভিশাপ ভুলিয়া তাৎক্ষণিক হাসির ভিতর দিয়া আনন্দ অন্বেষণ করিতেছি। এখন কুহুপাদা আমই আমার আনন্দ-আশ্রয়। হায় রে আমার অদৃষ্ট!’

পথে উঠল প্রচন্ড ঝড়। লেব্বাছাকে!

গাড়িকে বাগ মানাতে পারে না পাটন। তার অতিকায় শরীর নিয়েও বৃষ দুটিকে সামলানো ভার হয় তার পক্ষে। রেগে নিজের শরীরকে নিজেই ‘মাটির অবরা’ বলে ধিক্কার জানায় সে। গাড়ি আড়ে-থাড়ে ঘুরে যায়। এক কদমও এগোয় না। যেন সামনে থেকে ঘটোৎকচ তার শকটের গতিরোধ করে রেখেছে। কিংবা মহাবলী পবনপুত্র বীর হনুমানকে দেখে থমকে গেছে বৃষদ্বয়। সে আবার এমনি আকাট যে কস্মিনকালেও হনুমান চালিশা শোনেনি। কী আওড়াবে? তাকে এই মুহূর্তে ধুতি গুছিয়ে ছুটে এসে সাহায্য করবে এমন কোনো গ্রামবাসীও ধারে-কাছে নেই। গ্রামই তো নেই। শেষ যে কাহারদের টোলাটিকে ছেড়ে এসেছে পাটন, তা কম-সে-কম ক্রোশভর দূরে রয়ে গেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেও নজরে পড়ে না।

দুপাশে দিগন্তবিস্তৃত খেত। ধূসর চক্রবাল। প্রবল হাওয়ার দাপটে লালধুলোয় ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছে ভূমন্ডল। কাহার-টোলা করে এখন সে যাবে ডুব-চড়কা—ওই দূরে, বাঁশঝাড়ে ঘেরা পরবর্তী গ্রাম। চড়াই-উৎরাই নিয়ে এখনো সিকি ক্রোশ পথ। ডুব-চড়কা যাওয়ার আর প্রশ্নই নেই। এই ঘোর দুর্যোগ থেকে নিজেকে আর তার বাহনগুলিকে বাঁচাতে পারলে হয়। পাটন প্রমাদ গোনে।

সোঁ-সোঁ শব্দে পাটনকে নিশানা করেই যেন ধেয়ে আসছে কালবৈশাখী। রাশি রাশি লাল ধুলো নিয়ে আসছে আসন্ন প্রলয়ের বার্তা। দূরবর্তী বাঁশঝাড়, আশেপাশের সুদীর্ঘ বৃক্ষসমূহ, এমনকি টাঁড়ে চরতে থাকা গবাদিও দৃশ্যগোচর হয় না আর। উদবিগ্ন পাক-পাখালি কলরব করে। যত্র-তত্র উড়ে পালায়।

পাটন প্রকম্পিত হয় ত্রাসে। প্রতিসারী বাতাসে উড়ে আসা ধুলো ঢোকে বৃষ দুটির চোখে— তারা এগোতে পারে না, মুড় ঘুরিয়ে নেয়। মনে হয়, ঝড়ের দাপটে গাড়ি বুঝি এই উলটে গেল! পাটন চোখ কচলায়। গাড়োয়ানের আসন থেকে নেমে, মাথা নীচু করে বেরিয়ে, জীবদুটিকে সামলানোর চেষ্টা করে সে। কিন্তু তার মস্ত শরীর আর ক্রুদ্ধ গাড়োয়ানি ধমকে ভয় পেয়ে পিছু হটতে থাকে তারা। হতবুদ্ধি পাটন ক্রমে গতি বাড়তে থাকা ধুলোঝড় থেকে শকটটিকে বাঁচাতে চঞ্চলও মরিয়া হয়ে ওঠে। কোনো ঝড়-ঠাকুরের নাম উচ্চারণ করতে চাইলেও এই মুহূর্তে কোনো নামই স্মরণে আসে না তার। অনভ্যস্ততার কারণে জিহ্বাটি তার পুরু, আড়ষ্ট, ছাগ-তুল্য। অগত্যা সে বৃষদুটিকেই গলকম্বলে চাপড় মেরে নিশ্চল ও নিরীহ হওয়ার জন্য বলতে লাগল, ‘হাই র‌্যাঃ! হাই হাই! লেহে: লেহে:!’ তারা ভিড়কে গিয়ে উলটোদিকে ঘুরে যায়।

বাতাসের অভিমুখে পশুগুলি এভাবে ঘুরে যাওয়ায় আরোই বিপত্তি ঘটে পাটনের। হাওয়ার প্রবল্যে ছইসুদ্ধ বৃষ-শকটটি তীব্রগতিতে ছুটে চলে—বাঁশের ডালার চাল রাস্তায় ছড়াতে ছড়াতে যায়। সীতার অঙ্গ থেকে খসে পড়া অলঙ্কারের মতোই, পথে পথে ছড়িয়ে পড়ে নিভন্ত মশাল, তূণীর ও তিরের গুচ্ছ। পৈনা হাতে ছাগলের পালের সঙ্গে পিছনে পিছনে ছুটতে থাকে পাটন।

কিছুদূর যেতেই, বহাল খেতের ধারে, খালের মধ্যে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে শকটটি।

ঝঞ্ঝার মুখে পড়েও বারে-বারে নিজেকে সামলে নিয়েছে অঙ্গদ। কালবৈশাখীর ঝড় যতই প্রবল হোক, বৃষ্টিবাহিত বাতাস যতই বেগবান হউক, তাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। বড়জোর সে কখনো ঝঞ্ঝার দাপটে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, চোখেমুখে ধুলিকণা ঢুকেছে, এবং মাথাভর্তি চুলের জট ও শীর্ণকায় দেহ ধূলিমলিন হয়েছে মাত্র। কিন্তু তবুও কালবৈশাখীকে ভয় পায়নি সে। অসহায় মনে করেনি নিজেকে। বিবিধ প্রতিকূলতাতেও সে অটল, নির্ভীক ও দৃঢ়চিত্ত থেকেছে।

আশ্চর্যের বিষয় এটাও যে, এতবড় একটি যুদ্ধের ঘোষণা হওয়ার পর এবং তার সার্বজনিক দামামা বেজে ওঠার পরও অঙ্গদের মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই, পশ্চাদপদতা বা সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনার তাগিদ নেই। তার কারণ এটাই যে, নিজের সুচিন্তিত অবস্থানকে সে ইতিমধ্যে নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছে। শত্রুকে সে সূর্যালোকের মতো দিব্যরূপে ও সংশয়হীনভাবে সনাক্ত করতে পেরেছে।

পারিপার্শ্বিকতা নিয়েও তার উদবেগের প্রকাশ নেই, অস্থিরতা নেই। সর্বদা নির্বিকার। প্রকৃতির প্রতিও সে অভিযোগহীন। তার যত ক্রোধ, যত তেজ এবং অখন্ড মনোবল নিয়ে সে একাগ্রচিত্তে নিজেকে অহরহ জাগ্রত রেখেছে ওই দুষ্টশক্তির বিরুদ্ধে।

একথা এখন আর না বললেও চলে যে, অঙ্গদের এভাবে নিজেকে গড়ে তোলার পিছনে সর্বদা, সর্বক্ষণ নজরদারি রয়েছে সেই সর্বজ্ঞের, সেই মহাপ্রবীণের। তিনি তাকে বার-বার সংযমী, স্থিতধী, অচঞ্চল ও লক্ষ্যে স্থির হতে বলেছেন। তিনি তো বলেইছেন, চাঞ্চল্য হল মানুষের অবিজ্ঞানমনস্কতা ও অন্ধকারাচ্ছন্ন লক্ষ্যেরই প্রকাশ।

আজ দীর্ঘবছর ধরে তার জীবনে মহাপ্রবীণের শিক্ষা ও প্রভাব তাকে একদিকে যেমন শোক-সুখ-আঘাত-আনন্দ সবকিছুর হেতু বা উৎসকে যুক্তি ও চিন্তা দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করতে শিখিয়েছে, তেমনি অকারণ আবেগবিহ্বল না হয়ে, তার মানবিক সত্তাকে আরো কঠিন, আরো মজবুত করতেও শিখিয়েছে। সর্বোপরি, তাকে এটাও শিখিয়েছে যে, শত্রু চিহ্নিত না হলে, লক্ষ্য নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট না হলে, কখনো যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়— তেমন যুদ্ধ পাপকর্মেরই সামিল। মনে রাখা দরকার আজকের দিনে ধ্বংসের জন্য আর যুদ্ধ নয়, সৃষ্টির কারণে সংগ্রামের প্রয়োজন। যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে নির্বিচার জীবনক্ষয়ের কথা অঙ্গদ কখনো কোথাও বলছে না। এমনকি, ব্যক্তিগত আক্রোশ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেও যে এই যুদ্ধ নয়, তাও গ্রামে গ্রামে মানুষের কাছে আজ সুবিদিত। বস্তুত, এই যুদ্ধের ভেতর দিয়ে অঙ্গদ জীবনেরই অন্বেষণ করতে চাইছে। উৎপাটিত করতে চাইছে জীবনমার্গের সকল অনভিপ্রেত অস্তিত্ব ও কণ্টককে।

আর এই কাজে সে কখনোই একা নয়। যদিও শুরু-শুরুতে, একা-একাই গ্রামগুলিতে ঢুকেছে, মানুষকে তার কথা পরিষ্কার করে বুঝিয়েছে, কিন্তু সর্বান্তে দেখা গেছে সেই মানুষগুলিকে সে অনায়াসে তার দলে টেনে নিতে সমর্থ হয়েছে। তার প্রেম, তার আন্তরিকতার কারণে।

সত্যকে গোপন করে দল গড়ে তোলার বিপক্ষে থেকেছে অঙ্গদ। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির ভাবনাও সে মাথায় রাখেনি। সে সর্বকল্যাণের আদর্শে সকলকে নিয়ে অগ্রসর হতে চেয়েছে। আর তাতেই মানুষের সমর্থন যেমন পেয়েছে, তেমনি পেয়েছে লড়াইয়ে সামিল হওয়ার ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকারও।

এই অঙ্গীকারের ওপর ভরসা করে সে এখনও ক্লান্তিহীন। এখনো সে তার অভিযান থামিয়ে দেয়নি। সে হাজির হচ্ছে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও বৃত্তি ভুক্ত মানুষের কাছে। পায়ে হেঁটে হেঁটে ঢুকছে একটার পর একটা গ্রামে। তরপরও বহু গ্রাম এখনও বাকি। রূপরঙপুর, তাঁতীডি, ভালুকডি, খাঁদুরডি, রহমতপুর, পানিগ্রাম, বসন্তপুর, বড়োশিয়াশোল, ছোটোশিয়াশোল, নন্দলালবাজার, চকারডি, মুসলপুর, খড়িপাথর, দুয়ারসিনি, পড়াসিনি এমনি কত-কত-কত নামের গ্রাম। সাকুল্যে কয়েক শত। প্রত্যেক জনপদের মানুষের কাছে সে সরাসরি হাজির হতে চায়। কথা বলতে চায় প্রত্যেকের সঙ্গে। শুধু কথা বলে তাদের কাছে তার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই নয়, অঙ্গদ তার বাইরেও এইসব গ্রামবাসীদের, বিশেষ করে যারা প্রান্তিক, তাদের জীবন ও সংস্কৃতিকে জানতে ও বুঝতে চায়, একাত্ম হতে চায় তাদের সঙ্গে তাদেরই একজন হয়ে। কখনো কখনো এমনও হয়েছে, অনেক গ্রামে গিয়ে সে নিজের কথা নতুন করে আর না বলে শুধু তাদের কথা শুনে, তাদের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে দূরবর্তী কোনো জনপদের উদ্দেশে।

বস্তুতপক্ষে, আসন্ন যুদ্ধের বার্তা সারা পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামবাসীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই অভিযানকেও সে জগদ্দর্শনের আরেক অধ্যায় বলে মেনে নিয়েছে। এই কাজ সম্পূর্ণ করে উঠতে আরো কতদিন, কত মাস যে লাগবে, অঙ্গদ নিজেও জানে না। জানে না কখন দু-পক্ষের সহমতের ভিত্তিতে ধার্য হবে যুদ্ধ শুরুর দিন।

অঙ্গদ যেমন গ্রামে গ্রামে যুদ্ধের বার্তা নিয়ে যাচ্ছে, তেমনি তার দলবল আয়োজন করছে যুদ্ধের জন্য যাবতীয় কিছুর— সুগঠিত করছে সেনানী, বন্দোবস্ত করছে তাদের জন্য সমস্ত রকম আহার্য, আশ্রয় ও নৈশকালীন বিনোদনের। যেহেতু তারা এটা অনুভব করতে পেরেছে যে, এই যুদ্ধের ভেতর দিয়ে তাদের সমাজ, প্রকৃত অর্থে, হিংসা-অসূয়াহীন মানবসমাজ হয়ে উঠবে, নানাভাবে নিপীড়িত জীবনের ওপর থেকে অত্যাচারের শিকলভারকে অপসারিত করা হবে, সে-কারণে প্রতিটি গ্রামের মানুষ উৎসাহিত হয়েছে আরো বেশি করে কৃষিকর্মে, তাদের আয়-উপায়ে, এবং যুদ্ধের কথা চিন্তা করে তাদের সবরকমের সহযোগিতা দিয়ে এই লড়াইকে সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে। আসন্ন বর্ষায় তারা বাইদ-বহাল-কানালি, এমনকি দীর্ঘদিনের পতিত জমিগুলোতেও মাটির ধর্মানুযায়ী শস্যবীজ রোপণ করার জন্য যদৃচ্ছাক্রমে উদ্যোগী হচ্ছে। যুদ্ধচলাকালীন এবং যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, কতটা আকাল-মহামারিকে তা ডেকে আনতে পারে, তা কারুর আগাম জানা নেই। মূলত সে-আশঙ্কায়, আগামী দুর্দিনের কথা চিন্তা করেই, তারা নিজেদের জন্য, তাদের পরিবার-পরিজনদের জন্য যেমন খাদ্য মজুত করবে, তেমনি বাধ্যতামূলকভাবে সেই ফসলের একাংশ যুদ্ধের জন্য বানানো গোলাঘরগুলিতে দান করবে।

দু-পক্ষেরই শস্যগোলা বানানোর কাজ অতিশীঘ্র শুরু হয়ে যাবে। বর্ষা এখনও নামেনি। খাল-বিল-নদীনালা শুকিয়ে রয়েছে। ইমারতি তথা ঘরামির কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জল তারা এখন পাবে কোথায়? বর্ষা পেরোতেই চাষবাসের কাজ শেষ করে তারা মাঠারিকে ঘিরে স্থানে-স্থানে নির্মাণ করবে তাদের সেই শস্যগোলাগুলি, যাতে বিপুল পরিমাণে খাদ্যশস্য মজুত করে রাখা হবে অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে। যদিও, একটি ন্যায্য পরিমাণ যুদ্ধ-মাশুলের কথা ঘোষণা করেই নেওয়া হবে সেই শস্য। গ্রামে গ্রামে গো-শকট ঘুরিয়ে গোলাঘরের জন্য শস্যসংগ্রহ অভিযান করা হবে নতুন শস্য খামারে ওঠার পরে-পরেই। যুদ্ধ আরম্ভ হবে তারও পর।

মাছুয়ারদের গ্রামে অঙ্গদ ঢুকতেই প্রাণের রব উঠল। শিশু থেকে বৃদ্ধ কারুরই তার নাম জানতে এখন আর বাকি নেই। বহু বহু গ্রামে ঢুকে সে এতদিন ধরে মানুষজনকে যা-যা বলে চলেছে তা ব্যাপকভাবে অঞ্চল জুড়ে প্রচারিত হয়েছে, দিন-দিন তা অন্যান্য গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে। তার সেইসব কথার প্রভাব যে পড়ছে তাদের ভাবনায় এবং দৈনন্দিন জীবনেও, তা তাদের আচরণের ভেতর দিয়ে কিছুটা হলেও আঁচ করা যাচ্ছে।

এইসব মানুষের মধ্যে আশ্চর্য এক কৌতূহলও তৈরি হচ্ছে তাকে দেখার জন্য। কৌতূহল না বলে উন্মাদনাও বলা চলে। বিশেষ করে সে-উন্মাদনা বেশি-বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে বয়স্ক মানুষদের মধ্যে। তার একটাই কারণ, অঙ্গদের ভাষণের মাধুর্য এবং সারবত্তা। যার ভেতর দিয়ে সে মানুষকে তাদের চারদিকে বেড়ে ওঠা ভয়াবহ পরিস্থিতিকে যেমন যথাযথভাবে তুলে ধরতে পেরেছে, তেমনি মানবিক ন্যায়নীতি, দর্শন, ঔচিত্য-অনৌচিত্যের কথাও প্রয়োজন বুঝে বলছে। যা মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। তারা তো কখনো এমন কথা শোনেনি। সমাজ নিয়ে, জীবন নিয়ে, ভবিষ্যত নিয়ে এবং তাদের চতুস্পার্শ্বে বেড়ে ওঠা শত্রু নিয়েও এমনভাবে ভেবে দেখেনি কখনো। অনেক গ্রামে তাই তার বক্তৃতা শোনার আগেই তার পা স্পর্শ করে প্রণাম নিবেদন করার জন্য গ্রামবাসীদের মধ্যে বিপুল হুড়োহুড়ি পড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে অধিকাংশ গ্রামে তার চরণ ধুইয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাকে সেবা করানো হচ্ছে কোথাও গুড়-জল, কোথাও আখের রস কিংবা গাছতলে বসিয়ে জামভর্তি ফেনভাত দিয়েও।

‘হে আমার শত-শত গ্রামীণ অধিবাসী, আমার আত্মজ, আমার সন্তান-সন্ততি সকল!’ নিজের গায়ে জড়ানো ছেঁড়া গামছায় মুখ মুছে, গ্রামের ইঁদারার পাশে খোলা প্রান্তরে জড়ো হওয়া গরিব মাছুয়ারদের সম্বোধন করে, অঙ্গদ বলে উঠল, ‘আমি জানি, তোমাদের কাছে এমন কিছুই আমার পক্ষে আজ আর জানানো সম্ভব নয়, যা তোমাদের এখনো অজানা। তোমরা ইতোমধ্যে অবগত আছো যে, এই পবিত্র ভূমি থেকে কালের নিয়মেই এক অসুরের উত্থান ঘটেছে এবং দিনে দিনে তার জিহ্বা সর্বগ্রাসী বিস্তার লাভ করে চলেছে। অবিলম্বে সেই জিহ্বার সমূল কর্তন না করলে আমাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। এই জিহ্বা বিনাশ সাধন করবে যতটা না প্রকাশ্যে, তার চেয়ে ঢের বেশি অপ্রকাশ্যে, অন্ধকারে, গোপনে। তা আমাদেরকে আগামীদিনে মনুষ্য থেকে রিপুপ্রবণ জীবের দশায় নামিয়ে আনবে। যখন এই সমাজ আর এই সমাজ থাকবে না, যখন মানুষ তার বান্ধববোধ, সৌহাদ্র, ভ্রাতৃত্ববোধকে অগ্রহ্য করে কেবল জৈবিক আত্মসুখের কথাই ভাববে, এবং কেবল নারী মাংসের সংসর্গের জন্য লালায়িত হয়ে উঠবে পুরুষ। একই সঙ্গে নারীও ব্যাভিচারিণী হবে, তারাও সামাজিক ব্যাভিচারের ভেতর দিয়ে দৈনন্দিন সুখান্বেষণের কথা ভাববে। কিন্তু এই উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কল্পনায় যতটা মুক্তিদায়ক মনে হয়, বাস্তবে আদৌ তা হতে পারে না। কখনো, কোনো ব্যাভিচারই সমাজে সুখের সন্ধান দিতে পারে না। ব্যাভিচার কেবল ব্যাভিচারকে বাড়িয়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত তা জীবনকে আনন্দহীন, বিষাদাচ্ছন্ন ও নৈরাশ্যপূর্ণ করে। সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে যায় আরো বহু হাজার বছর পিছনে। তাই হে সুন্দরাকাঙ্খি মানবসকল, আপন-আপন ঘরের স্ত্রীদের সেই বিপজ্জনক ভবিষ্যতের কথা ভেবে, এই সংগ্রামকে পশুশক্তির বিরুদ্ধে মানবশক্তির দ্রোহ মনে করে, তোমরা গ্রামকে গ্রাম মাঠারি-যুদ্ধে সামিল হও। সামিল হও তোমাদের আপন হাতে বানানো অস্ত্র নিয়ে, বিবেক ও বুদ্ধিরূপ হাতিয়ার নিয়ে...’

জমায়েত চলাকালীন দুড়দাড় করে নামল বৃষ্টি। তার আগে থেকেই মাঝে-মধ্যে মেঘ ডাকছিল, বিজুরি চমকাচ্ছিল। এখন বৃষ্টিপতনের মহাধুমের সঙ্গে পুরো তল্লাট জুড়ে নেমে এল অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে গলা উচ্চপর্দায় তুলে, অঙ্গদ অদৃশ্যমান জিনগা-থানের দিকে বাহু প্রলম্বিত করে ডাক দিতেই, সকল গ্রামবাসী তার সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে চেঁচিয়ে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল, ‘জয়! জিনগা-মাঈকি জয়!’

এবার কাদার মধ্যে ফেঁসে গেল শকটের চাক। তা এমনই বেয়াড়াভাবে আটকে রইল যে, পাটন একা পিছন থেকে ঠেলা দিয়ে আর দুপাশ থেকে দুজন মিলে চাকাকে আবর্তিত করার চেষ্টা করেও তাকে ঘোরাতে পারল না নখাগ্র পরিমাণও। অনেকটা গর্তের ভেতরে ঢুকে গিয়ে একদিকের চাকাটি আটকেই থাকল। যতবার তারা গলদঘর্ম হয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে, ততবারই মনে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ কোনো অলৌকিক শক্তি তার শকটকে টেনে রেখেছে, তাকে নড়তে দিতে চায় না।

পাটনের পাশবিক শক্তিও কোনো কাজে এল না দেখে সে কেবল হতাশই হল না, নিজেকেও তার ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হল। মনে হল, এই তবে আমি? এই আমার অমিতবলশালী দেহের দৃষ্টান্ত? ধিক, ধিক রে নশ্বর দেহ! সে নিজেই নিজের কপাল চাপড়াতে লাগল। তারপর কেউ যেন সপাং করে কশাঘাত করল তাকে। আর বলল, ‘মূর্খ, বাস্তবকে চিনতে ও বুঝতে শিখ!’ অতঃপর তার বোধোদয় হল। মনে হল, তার একার তাকত নয়, সাফল্যের জন্য প্রয়োজন বহু মানুষের একযোগে নিযুক্ত শক্তি ও সমর্থনের। কিন্তু এখন তা কীভাবে সম্ভব?

বৃষ্টির তেজ উত্তরোত্তর বাড়তে লাগল। তেমনি চমকাতে লাগল আকাশ। পাটনের দুই সঙ্গীও আর সেখানে থাকতে চাইছিল না। আবার গাড়ি ছেড়েও তো চলে যাওয়া যায় না। গাড়িতে যে শস্য রয়েছে তা লোক-নজরে না থাকলে চুরি হয়ে যাবে, তাছাড়া সেগুলিকে ঠিকমতো বৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে নষ্ট হয়ে শেষ পর্যন্ত গো-খাদ্যে পরিণত হবে।

দেখতে দেখতে গাড়ির চারপাশ ঘিরে অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠল। অন্ধকারে হারিয়ে গেল এতক্ষণ তল্লাট জুড়ে জটাজুটধারী মানবের মতো দন্ডায়মান বৃক্ষসকল আর ঘর-বসতিও। এমনকি, দূরে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা কোনো বাতিও দেখা গেল না। একবুক আঁধার নিয়ে পাটন একই সঙ্গে ভয় এবং শ্বাসক্লেশ অনুভব করতে লাগল। এই মুহূর্তে, অন্যকিছু নয়, শুধু একছিট আলোকশিখার অতিশয় প্রয়োজন বোধ করল সে।

হাওয়ার দাপট সসত্ত্বেও, নিভে যাওয়া মশালটিকে আবার নতুন করে তারা জ্বালানোর প্রয়াস করতে লাগল। কিন্তু পাটন ক্রমশ হারিয়ে ফেলতে লাগল তার উদ্যম। নিজেকে প্রশ্ন করেও সে কোনো সন্তোষজনক জবাব পেল না—কেন সবকাজেই তাকে বারে-বারে এমন বিপত্তির সন্মুখীন হতে হচ্ছে? প্রকৃতি কেন এত বাদ সাজছে তার? সে অদৃষ্টকে দায়ী করতে গিয়েও করল না। তার মনে হল তার প্রতিটি কর্মের মধ্যে, প্রতিটি উদ্যোগে, অশুভ অদৃশ্য প্রতিবিম্ব হয়ে তবে কি সেই নারীই দাঁড়িয়ে আছে তার আশেপাশে? দাঁড়িয়ে আছে তার নামিয়ে রাখা দক্ষিণহস্তের শক্তমুঠিতে বুচাটাঙি নিয়ে?

কেন এমনটা মনে উদয় হল তার? কেন ওই নারী? কেনই-বা বুচাটাঙি? ওই নারীর মতো এই বুচাটাঙিটিও যেন তার পিছু ছাড়ছে না। সে কোন ভাবনার প্রতীক রূপে এমন জাগ্রত হয়ে সতত দাঁড়িয়ে রয়েছে তার জীবনে? সে কি তার জীবনের বার্তা নিয়ে দন্ডায়মান, নাকি মৃত্যুর? ওই নারীও কি নারী? নাকি অন্যকিছু? পাটনের ভ্রম আর গেল না।

বৃষ্টির ধার কমে এলে, এবং শেষাবধি তা পুরোপুরি থেমে গেলেও, পাটন গাড়ির শস্য খালাস করে তাকে তোলার চেষ্টা করা দূরের কথা, ডানহাতে মশালটি ধরে থেকে ক্রমশ ঘুরে ঘুরে অন্ধকারের মধ্যে খুঁজতে লাগল জারমণিকে। যদি সে-নারী স্বয়ং পিশাচী হয়ে থাকে, তবে তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে সে প্রেতযোনি অন্ধকারে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায়।

সে খুঁজে পেতে চাইল সেই বুচাটাঙিও। যদি এই অস্ত্র হত্যার দূত হয়ে থাকে, বিনাশের প্রতিভূ হয়ে থাকে, তবে তার হাতেই নিজেকে স্কন্ধহীন করতে চায় পাটন। উপদ্রুত, অস্পষ্ট, অনির্দিষ্টকাল ব্যাপী উদ্দেশ্যহীন এ-জীবন উত্তরোত্তর ভারী ও অবহনযোগ্য হয়ে উঠছে। সে জানে না কীভাবে নিজের ভার সে নিজে লাঘব করবে। সে জানে না কোন শক্তির কাছে তার পরাভর স্বীকার করবে, কার কাছে সে হবে অবনতমস্তক।

মশাল হাতে নিয়েও তার মনে হতে লাগল, ব্রহ্মান্ডে অন্ধকার বৈ কোথাও কিছু নেই! সে চিড়চিড় শব্দে প্রজ্বলিত মশালটি হাতে নিয়ে, অন্ধকারে এক চাটান পাথরের ওপরে মূর্ছা যাওয়ার আগে, কাতর কন্ঠে বলতে লাগল, ‘জারমণি! জারমণি! কেন তুমি এমন আঁধারে আটকে রেখেছ আমার শকট? আমাকে প্রাণ দাও, শক্তি দাও নারী, যাতে শস্যভারসহ এই শকট আমি আমার অমিত বলে মায়াময় এই গহ্বর থেকে পলকেই তুলে ফেলতে পারি! কেন নিজেকে আমার শকট অপেক্ষা ভারী, স্থাবর ও অনড় মনে হচ্ছে? আমি কীভাবে যোজনপথ পরিক্রমা করে নিজেকে বয়ে নিয়ে যাব তোমার কাছে? বল, বল, বল! শক্তিরূপিনী, আমাকে শক্তি দাও... ’

কুকপাখি ডাকছে।

অবশেষে বায়ুমন্ডল জুড়ে দিনভর সেই ভয়াবহ উত্তাপ আর থাকল না। বন্ধ হল অবিরাম উষ্ণ বাতাসের হিলি-হিলি প্রবাহ—দ্বিপ্রহর থেকে গোধূলির আগে পর্যন্ত। মানুষের অস্বস্তিও কেটে যেতে লাগল। চৈত্রে হুলপাথর আর বৈশাখে পরপর কয়েকটি উথাল-পাথাল ঝড়ের পরে হুম-হাম করে নামল বৃষ্টি। একটু একটু করে শীতল হতে লাগল মাঠ ফেটে জ্বলে ওঠা ধরণী।

মানুষের মনেও ফিরে আসতে লাগল আনন্দ। যদিও যুদ্ধের অনিবার্য অঙ্কুশটিকে তাদের স্বীকার করে নিতে হয়েছে। তার জন্য অবশ্য তাদের কোনো ক্ষোভ নেই। তারা তো জেনেই গেছে যুদ্ধই তাদের নিয়তি। সবকিছুর মধ্যেও যুদ্ধের জন্য তারা নিজেদের প্রস্তুত রাখতে ভুলে যায়নি। ভুলতে চায়ও না।

গ্রামীণ মানুষজনের বর্ষাকে ঘিরেই যত আনন্দ। বর্ষাই তাদের জীবন। বর্ষাকে অনুসরণ করে চাষবাসের সরঞ্জাম কৃষিক্ষেত্রে নামিয়ে রাখতে না রাখতে পরিমন্ডল জুড়ে সেই আনন্দের বার্তা তাদের অন্তর ছুঁয়ে যায়। রোহিণী আর রথের বাদে দেখা দিতে থাকে লেতাড়-লাগা বঙ্গীয় পরবের হাতসান।

এখনো পুরোপুরি বর্ষা নামেনি। তবে হঠাৎ বড় একটা বৃষ্টি পেয়ে গ্রামবাসীরা তাকে কাজে লাগাতে উঠে-পড়ে লাগল। ক্ষেতিকামে ব্যস্ত হয়ে পড়ল তারা।

হাটগুলিতেও দেখা দিল ভিড়। হাল-লাঙল কেনার ভিড়, বীজ-পুহা কেনার ভিড়। কোথাও কোথাও গাঁইট-কোদাল আর গরু-ছাগল বাঁধার জন্য শনের পাঘাও মাটিতে গাদাবন্দি করে পেতে রাখা হয়েছে। খদ্দের সেখানে বসছে, পাঘা দুহাতে গুলতির মতো করে টেনে যাচাই করে দেখছে তার মজবুতি, তারপর শুরু হচ্ছে দরমূলাই।

অতিরিক্ত রোদ-গরমে এতদিন এইসব হাট ঝিমোচ্ছিল। ক্রেতা-বিক্রেতা এবং কৃষিজাত পণ্যের অভাবে। হারা সবজিরও টান ছিল। এখনও সবজির আমদানি নেই, তবে চাষের উপকরণ আর গ্রামীণ মানুষের মুখর উপস্থিতি সবকিছুকেই কেমন প্রাণবন্ত করে তুলল। কেনাবেচার অবসরে চলছে এক গ্রামের মানুষের সঙ্গে প্রতিবেশী আরেক গ্রামের মানুষের কল্যাণ বিনিময়। আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে যুদ্ধের কথা তারা বুঝি বেমালুম বিস্তৃত হয়েছে। তারা এখন তাদের জীবনের প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি কৃষিকর্মের আয়োজন নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ও বা'য় যে, অন্য কোনোকিছুর প্রতি মোটেও মনোযোগী নয়। কিন্তু ঘটনা তা নয়। তাদের কথোপকথনের মধ্যেই অনিবার্যত এসে পড়ছে মাঠারি-যুদ্ধের প্রসঙ্গ।

অঞ্চলের বড় বড় পশুহাটগুলিও বারিশের ছোঁয়া পেয়ে পুঁই ঝাড়ের মতো সতেজ ও জমজমাট হয়ে উঠল। পৈনা হাতে পাইকাররা হাঁটুর ওপরে পাছা-ফাটা ধুতি কিংবা জোলার ছাপা লুঙ্গি তুলে চাষের গরু-কাড়া নিয়ে রন-রন করে ঢুকছে। স্থানে-স্থানে গ্রামবাসীরা ভিড় করছে তাদেরকে ঘিরে। পিঠে রহিসি চাপড় মেরে গোরু-পাইকারা বেফিকির দাম হাঁকাচ্ছে তার জিনিসের। কেউ তেল-চকচকে শিংগুলি দেখিয়ে বলছে, ‘ইয়ার দুগগা মেড়ের পারা শিং দেখে তাবাদে দাম করো। গোরু ত লয় যেমন আমিরশাহির ঘঁড়া। কাঁধে জুঁয়াল দিয়ে বিঘা-দশবিঘার ক্ষেতে ছাইড়ে দাও, দেখবে মিশিন-গাড়ির পারা দৈঁড়বেক! একবার কিনলে তুমার দশ-বিশ সাল হালবাহা, গবর-মাটি চালা আর ধান বহাবহির চিন্তাই করতে হবেক নাই। সোব দেখে লিবেক। হঁ!’

পাইকারের মুখের দড় ক্রেতাকে ঘোর লাগিয়ে দেয়। তেজি গোরুর দিকে তাকিয়ে থেকে তার এমন কথাতে ক্রেতাদের মনে হতাশাও দেখা দিচ্ছে। বলছে, ‘থাম! দশ-বিশ সালের কথা শুনে কী করব?’

‘ক্যানে?’

‘এখন মাথাসিতানে ধনুক-বল্লম নিয়ে শুতে হবেক। যুদ্ধ ত এই লাইগেই গেল। তাবাদে ক-দিন বাঁচব কে বলতে পারে? এক কাঁড়েই যদি জীবন যায়?’

‘স্যা ডরালে চলবেক? মরতে হলে মরব? একবার ভাল করে চিন্তা করে বলো ন মানুইষ কিস্যার লাইগে বাঁচে?’

‘কিস্যার লাইগে আর? ভখা পেটে খাবার লাইগে!’

‘না:, বলতে লারলে। মানুইষ বাঁচে মরার লাইগে। একদিনকে তুমাকেও মরতে হবেক, হামাকেও মরতে হবেক। সবারেই একেই ঠিকানা। বাউলে-ঝুমৈরে কী বলছে? বলছে—’ একটা হাত গোরুর পিঠে রেখে, অন্য হাতে ধরা ছোট্ট পৈনাটি নাচিয়ে সে শুনিয়ে দেয় :

‘বাঁচিলে তোর কতই না খাওয়ন-দাওয়ন

ভলামনরে, মরিলে ত মাটিতে শুঅন

তখন কিবা দাম মোহনভোগের সোকৈল ইতি সুখভোগের

খাবি রে তুঁই আঙরা-আগুন খেঁচনডাঁড়ির খেচন

ভলামনরে, মরিলে ত মাটিতে শুঅন...’

‘স্যা বা ঠিকেই বলেছ।’

‘ত মরতে যখন হবেকেই তখন যুদ্ধ করেই মরব। কিছু পারি আর নাই পারি দুশমনের পেটে একটা কাঁড় ত ভুঁসে দিতে পারব। বঠে কি নাই?’

‘বঠে।’

কেউ কেউ যেমন যুদ্ধের নামে উৎসাহ প্রকাশ করছে, তাকে স্বাভাবিক এবং অপ্রতিরোধনীয় ভেবে নিচ্ছে, তেমনি আবার অনেকে এই যুদ্ধকে ভয়ও পাচ্ছে। ভয়ের কথা ভেবে নানাভাবে তারা নিজেদের সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি নিয়েও বেশ চিন্তিত।

আবার এমনটাও কেউ ভাবছে যে, এই যুদ্ধের কোনো ভিত্তি নেই, যৌক্তিকতা নেই, এতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। এর নিট প্রাপ্তি বলতে তারা যা পাবে তা হল আকাল এবং গ্রামে গ্রামে, হাটে-বাজারে লুটের রাজত্ব। গ্রামীণ অর্থনীতি এবং সামাজিক গঠনতন্ত্রটাই তখন ভেঙে পড়বে। চলতে থাকবে শুধুই অরাজকতা।

এই আশঙ্কা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে তা ভয়েরই ব্যাপার। যদিচ, এই সম্ভাবনাকে একেবারে নস্যাৎ করা যাচ্ছে না। কেউ কেউ মনে করছে, যুদ্ধের সূত্রপাতের আদি কারণের মধ্যেই নিহিত আছে এই অনিবার্য পরিণতি। তাদের কথায়, যুদ্ধ বাধার কারণ তো স্রেফ একটি নারীর লুন্ঠিতা হওয়ার ঘটনা। একপুরুষের অর্জিত সেই নারীসম্পদকে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিগত কারণে অপর যে-পুরুষের হেপাজতে সাময়িকভাবে রাখা হয়েছিল, সে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং পরনারীকে নিজের বাহুর জোরে নিজের কাছে আটকে রাখে। এও তো পিতৃগ্রাম থেকে লুন্ঠিতা হয়ে আসা সেই নারীর পুনর্বার আরেক বিশ্বাসঘাতক পুরুষের দ্বারা লুন্ঠিতা হওয়ারই সামিল। সেই নারীকে আবার প্রথম লুন্ঠনকারীর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই মাঠারি-যুদ্ধের ডাক।

যদিও এই আদি কারণটি এখন তেমনভাবে আর কারো স্মরণে নেই বললেই চলে। বহু-বহু বছর আগেকার এই ঘটনাটি হালের মানুষজনদের কাছে ইতিহাস হয়ে গেছে, এমনকি তাদের পূর্বপুরুষরাও অনেকে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটির কথা মনে করতে পারে না। তাছাড়া যাদের কারণে এই যুদ্ধ তারা কেউ এই যুদ্ধকে ব্যক্তিগত সমস্যার মীমাংসার উপায় হিসেবে দেখতে নারাজ। তারা কোনোভাবে সেই ঘটনাক্রমের কথা উল্লেখ করলেও, তার সঙ্গে সর্বজনীনতার রং চড়াচ্ছে। কিংবা এক অঞ্চলের মানুষকে আরেক অঞ্চলের মানুষের বিরুদ্ধে এমনভাবে প্ররোচিত করা হচ্ছে, যাতে এই যুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধ মনে করে সকলে এই লড়াইয়ে সামিল হতে পারে। এবং দীর্ঘবছর ধরে চলতে থাকা সেই নজরবন্দি নারীকে নিয়ে এই অসন্তোষজনক সমস্যার চিরসমাধান হয়ে যায়।

মাঠারিযুদ্ধ আজকে সেই চেহারাই পেতে চলেছে। দুজন-দশজন নয়, এই যুদ্ধে দুই অঞ্চলের শত-শত গ্রামের মানুষ যোগ দিতে চলেছে। ইচ্ছায় হোক, কি অনিচ্ছায়। যদিও যুদ্ধবাজদের পক্ষে প্রচার করা হচ্ছে মানুষ আপন মর্জিতে, গৌরবের সঙ্গে এই লড়াইয়ে আত্মোৎসর্গ করতে চলেছে।

কিন্তু বাস্তব ঘটনা এটাই যে, যদি কারো তাতে আপত্তি থেকেও থাকে, সে-আপত্তি এখন আর গ্রাহ্য হবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে তাদেরও যুদ্ধে যেতে হবে। যেতেই হবে। তাদেরও পরিবারের পক্ষ থেকে দিতে হবে যুদ্ধকে চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য যা-যা প্রয়োজন তার সবকিছুই। দিতে হবে ধার্য অনুযায়ী যুদ্ধকর বাবদ এককালীন শস্য, দিতে হবে জ্বালানি, এবং কায়িক শ্রমও, পরিবার পেছু সম্ভবত দশটি রৌপ্য মুদ্রা, এমনকি মাল কেনাবেচার ওপরেও তাদের যে-কর হাটগুলিতে দিতে হয়, তা হাটকমিটি বা তার আয়োজক রাজা-জমিদারদের বংশধরদের না দিয়ে সরাসরি দিতে হবে যুদ্ধের খাতে। সেই কর যথাযথভাবে —অর্থাৎ জুলুমে—সংগ্রহ করার জন্যও থাকবে স্বতন্ত্র দল। থাকবে যুদ্ধের জন্য প্রবর্তিত বিশেষ ধারাকে যারা লঙ্ঘন করবে তাদের চিহ্নিত করা, কোমরে দড়ি বেঁধে ছাড়ঘরে ধরে আনা, এবং সেখানে সালিশি সভায় তাদের কাঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য বিচারকের দলও।

এতদ্ব্যতীত, বিভিন্ন পেশায় জড়িত প্রবীণ এবং শারীরিকভাবে অক্ষম গ্রামবাসীদেরও এই যুদ্ধ থেকে নিস্তার নেই। তাদের সরাসরি ধনুক-তির নিয়ে শত্রু-দমনে যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে না হলেও, আপন-আপন গ্রামঘরে থেকেও তাদের শ্রম দিয়ে যুদ্ধের জন্য কাজ করে যেতে হবে। এই যেমন, মাহালী পুরুষ বনে বনে ঘুরে বাঁশ কেটে আনবে, সে বাঁশ ছুলা-চাঁছা করে তাকে ধনুক বানাবে, তূণীর বানাবে, তির বানাবে। আর কামাররা দিনরাত শালে বসে বসে বানাবে সেই সব তিরের উপযুক্ত ফলা। মাহাতরা গামহার গাছের কান্ড কেটে আনবে, সেই কাঠ দিয়ে বানানো হবে বাদ্যযন্ত্র। ঢোল, কাড়া-নাকাড়া, আদিবাসী বাদ্যযন্ত্রও—রেগড়া, কাহড়া, তুন্তা, তিরিও ইত্যাদি। আর মরা গোরুর চামড়া গা থেকে খুলে নিয়ে তাকে রোদে শুকিয়ে সেই বাদ্যযন্ত্রের ছাউনি বানিয়ে দেবে মুচিঘরের বুড়োরা। প্রতিটি যন্ত্রের গায়ে লিখে দেওয়া হবে নির্মাতার নাম ও সাকিম। যেমন: লুলুরাম সহিস, সাকিম ধনুডি, মৌজা রাঙাটাঁইড়। পাশে লেখা থাকবে এই কথাটিও: যুদ্ধবাবদ দান। ঠিক তেমনি অন্যান্য সামগ্রীর ওপরেও সহযোগিতার স্মারক বাছনিক করা থাকবে, এইভাবে:

নানাবতী কর্মকার, সাকিম চৌকান, মৌজা ভূতামডি। যুদ্ধবাবদ ১ টাঙি

রাইরং সোরেন, সাকিম দুরারসিনি, মৌজা রায়দিঘি। যুদ্ধবাবদ ১ বল্লম

মুনাব্বর সিং, সাকিম রতনপুর, মৌজা হেলাডি, যুদ্ধবাবদ জোড়া শাবল

গোপীনাথ কুইরী, সাকিম উকমানপুর, মৌজা ভেলাগড়া। যুদ্ধবাবদ ১ বাঁটসহ কোদাল

দেহধর মাছুয়ার, সাকিম পাঁড়কিড্ডি, মৌজা পাথরগড়া, যুদ্ধবাবদ ১ কুড়হার

মলমল হেমব্রম, সাকিম মাঝিডি, মৌজা কলাবনি। যুদ্ধবাবদ ১ ধামসা

দাহিলাল মাহাত, সাকিম পাঁইশাগড়া, মৌজা পাটপুর, যুদ্ধবাবদ মালবহনের ১ গো-যান, ইত্যাদি

এই সব সামগ্রী ঢোল-শোহরত মারফৎ ঘোষণা মোতাবেক জমা পড়বে মাল-গুদামে। সেখান থেকে সেগুলি গোরুর গাড়িতে চাপিয়ে পাঠানো হবে মাঠারিক্ষেত্রে। তবে এই সবকিছুই করা হবে যুদ্ধের নিয়ম-নীতি মেনে। সে-ব্যাপারে ইতিমধ্যে কোথাও গাছতলে কোথাও হরিবোল মেলায় বসে প্রাথমিক আলোচনাও শেষের দিকে। এবার দুপক্ষই গঠন করবে তাদের কর্মীবাহিনী, যারা যুদ্ধের সমস্ত দিকগুলি সুচারুরূপে সম্পন্ন করবে। গড়ে তোলা হবে বিভিন্ন গ্রামের বিভিন্ন পেশার মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিয়ে নানান সমিতি, উপসমিতি, উপসমিতির উপসমিতি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধ-পরিচালন সংঘ। এইসব নিয়ে মৌজায় মৌজায় চলছে কত না বৈঠক, যা গ্রামগুলিকে সরব ও উত্তেজনাময় করে রেখেছে।

এসবের পাশাপাশি প্রচার তো চলছেই। জলে-ঝড়েও তার কামাই নেই। একদিকে ছুটছে বৃষ-শকট নিয়ে পাটন শবরের দল, অন্যদিকে অঙ্গদ শবরের দল। যদিও, যুদ্ধ এখন আর তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তার ব্যবস্থাপনা, দিনক্ষণ ঘোষণা, পরিচালনা, যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়া, গ্রামে-গ্রামে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এই সম্যক দায়িত্ব নিয়েছে সমস্ত গ্রামের মুখিয়ারা। তাদের নিয়েই গড়া হচ্ছে সংঘ-সমিতি। আর প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত বা পদাধিকারী সভ্যকে ডাকা হবে তার মূল কাজের সঙ্গে যুক্ত ‘দার, দাতা, রক্ষক, গ্রাহক’ ইত্যাদি শব্দ দিয়ে। যেমন, হাটে-বাজারে ঘুরে ঘুরে যারা ক্রেতা-বিক্রেতার কাছ থেকে কর আদায় করবে, তারা ‘মাশুল গ্রাহক’।

এই হাজার-একটা সংঘ-সমিতি গড়ার প্রস্তুতিই কেবল চলছে, এখনো তা চূড়ান্ত রূপ পায়নি। সেই কাজ শুরু হবে গ্রামবাসীদের কৃষিক্ষেত্রগুলিতে চাষবাস ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর। যদি কোনো কারণে অঞ্চল জুড়ে শুখার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং চাষিরা বীজ-তলা রোপণ করতে না পারে, তাহলে সব পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যাবে— যুদ্ধ শুরুর নিদিষ্ট দিনের কথা ঘোষণা করার পরিবর্তে তখন যুদ্ধকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার সংবাদই গ্রামের মুখিয়ার মাধ্যমে ক্যানেস্তারা বাজিয়ে, চোঙা ফুঁকে, আর ঢোল-ধামসা-লাগড়া বাজিয়ে সমস্ত জনপদগুলিতে চাউর করে দিতে হবে। স্থগিত রাখতে হবে যুদ্ধকর সংগ্রহের অভিযানও।

তবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা, মৃত্যুভয় উপেক্ষা করা, যুদ্ধকর দেওয়া ছাড়াও যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির কথা আন্দাজ করেও, অনেকানেক গ্রামবাসীরা এই যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়াতে নারাজ। যত দিন যাচ্ছে যুদ্ধ নিয়ে তাদের উন্মাদনা বেড়ে চলেছে। অনেকে এই যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পিছনে অলৌকিকতার আভাসও খুঁজে পাচ্ছে। তারা ধরে নিয়েছে, এটা আপাত নজরে পুবের সঙ্গে পশ্চিমের প্রাকৃতজনদের লড়াই হলেও, প্রকৃতবিচারে রতিগড় টিলায় বসবাসকারী এক আসুরিক শক্তির সঙ্গে ভারত ও বেদ-পুঁথি পাঠ করা এক দেবশক্তির সংগ্রাম— যেখানে অযোনিসম্ভবা জারমণি সিংসর্দার উপলক্ষ্য মাত্র।

কারো-কারো ব্যাখ্যায় অঙ্গদ শবর এবং পাটন শবরও দুই শক্তি বা সমাজের দুই বিপরীত বর্গের প্রতিনিধি। এই ভাবনার সূত্রে তাদের মনে হচ্ছে এই যুদ্ধে যোগদান করা এবং আত্মবলিদান দেওয়া একদিকে যেমন গৌরবের, তেমনি পুণ্যেরও। ফলত, আবেগবশত যুদ্ধে যোগদানের স্ফূর্ততাই মাঠারি যুদ্ধের প্রাণ। আর সে-কারণে প্রচার চলাকালীন একপক্ষ আরেক পক্ষের বিনাশের বাণী উচ্চারণ করলেও জয়ধ্বনি উঠছে দেবতার নামে : জয়! জিনগা-মাঈকি জয়!

১০

এবার মৈসানডি গ্রাম। পাটনের দল।

দূর থেকে বৃষ-শকট নিয়ে তাদের উত্তরমুখী উঁচু মাটির পথটি ধরে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। তারা এখনও গ্রাম থেকে ঢের দূরে। কাছাকাছি কোথাও বসতি নেই। বিঘার পর বিঘা জুড়ে বিস্তৃত ধানখেতগুলিকে মাঝামাঝি বিভাজিত করে সোজা গ্রামে এসে ঢুকছে সেই উঁচু কাঁচা রাস্তাটি। রাস্তার উভয় পার্শ্বে বড় ও প্রাচীন গাছপালাও বিশেষ নেই। কোথাও কোথাও দুটি-একটি করে শেওড়া আর ঢেলার ঝাড়, কোথাও ঘাঁটু বা ধুতুরা। জলকাদা ছপছপ করা রাস্তার কিনার সবুজ হয়ে রয়েছে ঘাসপাতে। ফুল ফুটেছে যত পুটুস ঝুড়ে।

আফর বোনা হয়েছে। হালকা সবুজের আভা খেলা করছে আফরগাঢ়িগুলিতে। কাদায় পা ডুবিয়ে, হাঁটুর ওপরে কাপড় তুলে কোনো কোনো খেতে চারা রোপণের কাজ করছে মহিলারা। পাটনের দল গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে তারা সচকিত হয়ে উঠলেও, খেত থেকে উৎসাহ নিয়ে উঠে এল না। দূরে-দূরে থেকেও হাতে আফরের গোছা নিয়ে তাকিয়ে থাকল সেই দলটির দিকে, যতক্ষণ না তারা মূল সড়কটি ধরে গ্রামের ভেতরে চলে না গেল। তারপর আবার মাথা ঝুঁকিয়ে কাজে মন দিল।

একখেত থেকে মাথা তুলে কোনো এক কুড়মি মহিলা পাশের খেতের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘হ্যাঁ গো গুন্ডির মা, যুদ্ধ পাছে সত্যিয়েই হবেক নকি? ইয়াদের য্যা বোড়ো তদ্বির দেখছি।’

‘বলছে ত হবেকেই।’

‘হঁ, হোকেই ধন। বাঁইচে ত সুখ নাই, মরে যদি জি জুড়ায়।’

‘হামরা ক্যানে মরব? যুদ্ধ ত করবেক হামদের মরদগুলান। মাঁঞালোক কি কাঁড় চলাবেক?’

‘স্যা-বা ঠিক কথা। কিন্তুক মরদেই যদি মরল তাইলে মাঁঞালোকের জীবনে আর কী থাকল?’

‘ধান গেলে আগড়া থাকে।’

তাদের কথোপকথন থেকে সারকথা উঠে আসে। নারীর জীবন পুরুষের অধীন। পুরুষকে নিয়েই নারীর বেঁচে থাকা। তাই যুদ্ধ করে তাদের গ্রামীণ জীবনে কী পরিবর্তন আসবে, তারা কী পাবে বা না পাবে, অথবা এই যুদ্ধে আত্মত্যাগও যে পুণ্যাত্মা হওয়ার লক্ষণ, তা নিয়ে মহিলারা যত না ভাবিত, তার চেয়েও তারা উদবিগ্ন এই ভেবে যে, প্রতিঘর থেকে তাদের আপন আপন পুরুষকে যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত করে শঙ্খধ্বনি দিয়ে মাঠারির উদ্দেশে বিদায় জানাতে হবে। এই বিদায় যেন চিরবিদায় না হয় সেই কামনাও করবে তারা। নারীর পক্ষে পুরুষহীন সংসার যাপন অতীব শোকাবহ ও অসহ।

গ্রামের ভেতরে পৌঁছেও পাটনের দল লোকজনের তেমন দেখা পেল না। এখান-সেখান থেকে ছুটে এসে তাদের শকটের কাছে বড় করে ভিড় জমালো না মৈসানডি-র মানুষেরা। এখন খেতিকামের মরশুম। গ্রামগুলিতে পুরুষ মানুষের উপস্থিতি একরকম নেই বললেই চলে। মহিলারাও মাঠের কাজে ব্যস্ত। পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ গ্রামে এই ছবি দেখছে পাটনের দল। নিষ্প্রাণ, খাঁ-খাঁ করছে গ্রাম। কখনো কখনো মনে হয় যুদ্ধ নিয়ে দরিদ্র গ্রামবাসীদের বুঝি কোনো হেলদোল নেই। তাদের কাছে যুদ্ধ তো অকাজ।

গাছতলে শকট রেখে তাদের নিজেদেরই কুলহি-কুলহি ঘুরে লোক ডাকতে হল। অমৃত-ভাষণ শোনানোর জন্য। গো-শকট থেকে গোরু দুটিকে জোয়াল-মুক্ত করে তাদের জন্য মাড়জল চাইতেও এর-তার চালাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হল।

আকাল যেন এখনই শুরু হয়ে গেছে এমনি ভাবগতিক নিয়ে লাঠি হাতে এক কুঁজি বুড়ি আর ঘর-রাখা-করা এক বয়স্ক বধির মানুষ তাদের দিকে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকছে দীর্ঘক্ষণ। তারপর বড় অনিচ্ছাসসত্ত্বে মাটির খাপরিতে বৃদ্ধটি এনে দিল অন্নজল। চোখে-মুখে তার প্রশ্ন থাকছেই, ‘যুদ্ধ লাগাছ, লাগাও। যুদ্ধর বাদে হামদের ঘরের ছানাগুলার পেটে দিতে মাড়টুকুও জুটবেক ন?’

এর কোনো সদুত্তর নেই।

তবে পশ্চিমের ছবি এমনটা নয়। তারাও তো চাষের কাজে মেতে রয়েছে। সেখানের গ্রামবাসীরা যুদ্ধের বার্তা নিয়ে আসা মানুষদের ব্যাপারে উদাসীন তো নয়ই, বরং অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকছে অঙ্গদকে দেখার জন্য, তার মুখ থেকে দুটো কথা শোনার জন্যও। তার দল কোনো গ্রামে ঢুকতে না ঢুকতে আশপাশ থেকে লোক এসে জড়ো হচ্ছে, এমনকি, কোনো কোনো গ্রামে কাদাখেত থেকেও কাজ ফেলে আসছে অঙ্গদের দলের পিছু ধরে।

বৃদ্ধ অঙ্গদকে নিয়ে উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে গ্রামবাসীদের মধ্যে। অনেক সময় সম্পন্ন গ্রামে ঢুকলে তাঁকে সাদর আপ্যায়নও করা হচ্ছে। দ্বিপ্রহরে কোনো গ্রামে এসে পড়লে তাকে সেবা করার জন্য দেওয়া হচ্ছে শালের পতরিতে ঝালরাঁধা-ভাত, মাটির কটোরাতে শীতল পানীয় জল।

এই ধরনের সশ্রদ্ধ আপ্যায়ন কোথাও নেই পাটনের জন্য। তার প্রচার-সঙ্গীরাই এখান-সেখান থেকে তার জন্য গামছায় করে বাসিভাত-মুড়ি আর মাটির মালসা ভর্তি করে কোনো ঘর থেকে নিয়ে আসছে খাপরি ভর্তি লাড়া-ঘাঁটা তরকারি। গাছতলে বসে সেই খাবার চভক-চাভাক করে খেয়ে সদলবলে তাকে বেরিয়ে যেতে হচ্ছে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে। তারপর অন্ধকার নেমে এলে কোনো গাছতলে শকট দাঁড় করিয়ে দিয়ে, তার তলাতেই সে খড় বিছিয়ে নিদ্রা যাচ্ছে, কাঁকড়া বিছাও সরীসৃপের কথা চিন্তা করে রাতভর জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে মশাল। ভোরের ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগলেই সে আবার সফরে মেতে উঠছে। জারমণির চিন্তা মাথায় এলেও সে নিজেকে তা নিয়ে ভাবিয়ে তুলতে চাইছে না আর। তাকে চাপান দিয়ে অনেকটা জোর করেই সে বলে উঠছে, ‘জয় মা জিনগা!’

দুজনের ভাষণের মধ্যেও বিস্তর ফারাক। পাটন কোনো তত্ত্বকথার ধার ধারছে না—তার পক্ষে দর্শন-তত্ত্ব আওড়ানো ততটাই অসম্ভব, যতটা অসম্ভব মহিষ-বাহনের কন্ঠে স্তোত্রপাঠ। সে সরাসরি জানাচ্ছে কীভাবে পূর্বাঞ্চলের গ্রামে গ্রামে তার মতো হাজারো মানুষ আজ অন্যায়ভাবে আক্রান্ত হতে চলেছে। কীভাবে একরকম জোর করেই তাদের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধ। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন তাদের পৌরুষকে বাজিয়ে দেখতে চাইছে, তখন তাদেরও এই যুদ্ধে সামিল না হয়ে উপায় নেই। এখন সময় ক্রমশ এগিয়ে আসছে পশ্চিমাদের কাছে তাদের পাঞ্জা প্রদর্শন করার।

স্পষ্টত, ভাষণে কোথাও দর্শন-চিন্তাফিন্তার বালাই নেই। কোথাও আবার ছত্রিশকোটি লোকদেবতাকেও টানছে। বিশেষ করে আদিবাসী গ্রামগুলিতে। ‘মাতৃকা’ অর্থে গৌরী পদ্মা শচী মেধা সাবিত্রী বিজয়া জয়া দেবসেনা স্বধা স্বাহা শান্তি পুষ্টি ধৃতি আদি ষোড়শ দেবীর নামোচ্চারণও করছে। কোথায় শুনেছে কে জানে! আবার তাদের মনে ঠাকুর-দেবতার প্রতি ভয় এবং বিশ্বাস দুটোই সমান বিদ্যমান বলে, এই যুদ্ধ সংঘটিত করাকে সে দৈব নির্দেশ বলেই জানিয়ে আসছে। তার থেকে তাদের মনে জন্ম নিচ্ছে পাপ এবং পুণ্যের মনগড়া ধারণা। অর্থাৎ যুদ্ধের ব্যাপরে পলায়নী মনোবৃত্তির উদ্রেক মানেই সে পাপী, নরকভোগ তাকে করতেই হবে।

অন্যদিকে, শোষণ-অত্যাচারের ব্যাপারে পাটন বলতে চাইছে, পশ্চিমারা যে কাল্পনিক সমাজ গড়তে যুদ্ধ করতে চাইছে, তা কখনোই কাম্য নয়, কেন না, তারা প্রেমে অবিশ্বাসী। পাটনের বক্তব্য, যে-সমাজে প্রেম নেই, সে-সমাজ কালের ধাক্কায় টিকতে পারে না। পুরুষের কাজ কখনোই স্ত্রীর সঙ্গে কলহে লিপ্ত হওয়া নয়, বরং তার রূপ-যৌবন-সৌন্দর্যকে পূজা করা। নারী সে বিবাহিত, অবিবাহিত, অনূঢ়া, বাকদত্তা, বিধবা, ভাতারছাড়ি যাই হোক না কেন, সে সর্বদাই পুরুষের সপ্রেম আলিঙ্গনের যোগ্য। পাটনের একটাই অভিযোগ, যুদ্ধের নামে ওই অঙ্গদ শবর যা করতে চাইছে তা হল পুরুষের আলিঙ্গন থেকে নারীকে ছিনিয়ে নেওয়া। তার সমর্থনেই যুদ্ধ।

তার এই বক্তব্যও বেশ রসালো হয়ে উঠেছে বহু মানুষের মনে। নিমডি, রসুলডি, বনপুখুরি, লয়াশোল, গামহাইরপুর, শিবগ্রাম এমনি বেশ কয়েকটি গ্রামের বিশেষ করে যারা তরুণ, যারা নারীর প্রতি সর্বদা আসক্ত, এবং যারা মনে করছে, এই যুদ্ধে পশ্চিমাদের পরাস্ত করতে পারলে সর্বত্র এমন একটি মুক্ত সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন হবে, যেখানে একসংসারে এক নারী বহুগামিতার নিয়মে এসে পড়তে বাধ্য হবে। তাতে পুরুষরা যেমন লাভবান হবে, নারীকূলও হবে। এখন এই ব্যবস্থার তারা কিঞ্চিত সংস্কার পূর্বক পুনঃপ্রবর্তন চায়। তারা চায় অন্যভাবে ঘরে-ঘরে আবার ফিরে আসুক দ্রৌপদী, যাকে নিয়ে ঘরের যে-কোনো পুরুষ সদস্য গুছিয়ে নৈশশয্যা পাততে পারে। তবে কেবল ঘরে বা সংসারেই নয়, রমণীকুল সহবাসের স্বীকৃতি পাক বাইরেও, পরপুরুষের সঙ্গেও। অর্থাৎ কিনা, রমণী ফিরে পাক তার আদি অর্থ গৌরব— সে হয়ে উঠুক তার স্বনির্বাচিত পুরুষকুলের রমণভোগ্যা।

সেই প্রসঙ্গ ধরে পাটন বলল, ‘মৈসানডি ভাইয়েরা, মনে রাখবে, হামরা যুদ্ধ লাগাবারও কেউ লই, আর যুদ্ধ থামাবারও কেউ লই। স্বয়ং ভগবান হামদের মাথার উপরে আছে। সে সোব দেখছে। যুদ্ধ লাগতে চলেছে তার হুকুমেই। তুমি পশ্চিমাদের জব্দ করতে যুদ্ধ যদি না-ও কর, যুদ্ধ আপনেই হবেক।’ সে আরো বলেছে, ‘তবে যারা মুষ্টি-অন্ন না দিয়ে যুদ্ধবিমুখ থাকতে চায়, তাদের পাপের ভার বারিপূর্ণ মহাকুম্ভ অপেক্ষা অধিক হবে। আর সেই পাপের ভারে তারা নরক-দরিয়ার অতলে তলিয়ে যাবে। কৃতান্ত কুক্কুটে খুঁটে খাবে মাস!’

এমন ভীতিপূর্ণ ব্যাখ্যান শোনার পরেও তারা কি মুষ্টি-অন্ন না দিয়ে থাকতে পারে? ঘর-ঘর থেকে চাল এসে পড়ছে শকটের ভেতরে বাঁশের ঢাউস ডালার মধ্যে। আর তখনই পাটনের লোক জয়ধ্বনি দিয়ে উঠছে, বল—বল—বল জিনগা মা-আ-আঈ কি—জ্জয়!’

১১

আজ আষাঢ়ের সংক্রান্তি। রথের দিন। সকালের দিকে আকাশ মোটামুটি পরিষ্কার ছিল, কিন্তু একটু বেলা হতেই শুরু হল ঝিপ-ঝাপ। পথে সেই বৃষ্টি পেয়েও পাটনের দল দমে গেল না। তাদের উৎসাহ বেড়ে গেল, যখন বামুনগড়িয়া, সর্বগ্রাম এমনি সব ছোটোখাটো টোলা পেরিয়ে তারা এসে পড়ল লালমোহনপুরে।

গ্রামটি বড়সড়। অবস্থাপন্ন। গোপদের আধিপত্য থাকলেও এখানে মিশ্র সম্প্রদায়ের বাস। কুড়মি, সরাক, কামার, দাস, মাহালি, গোপ, নরসুন্দর নিয়ে রকমারি বৃত্তির হাজার তিনেক মানুষের ঠিকানা এই লালমোহনপুর। হেঁট-লালমোহনপুর ও উপর-লালমোহনপুর এই দুইভাগে বিভক্ত। আর এই দুই অংশের গ্রামবাসীদের মধ্যে সবসময় সবকাজে তুচ্ছ বিরোধ বা ‘পিন-মারা’ লেগেই আছে। সেই বিরোধ, মূলত, নানান কাজে-ভোজে-অনুষ্ঠানে পরস্পরকে টেক্কা দেওয়া নিয়ে। দেখা যায়, উপর-লালমোহনপুর হয়তো আঘন মাসে নামকরা বাই সুশীলা কিংবা মুসরিয়াকে নিয়ে এসে রাতভর ঢোল-ফুলেট আর ঝুমুরের জমজমাট আসর লাগিয়ে দিল। হেঁট-লালমোহনপুর তখনকে কোনো নামজাদা ছৌনাচের দুটি দল বায়না করে চারোতরফের গ্রামগুলিকেও ঢোল-লাগড়ার শব্দে চমচমা করাল, আর বুঝিয়ে দিল তারাও কম যায় না।

উল্লেখ্য, গ্রামের ষোলো আনার কাজগুলিতে তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকে না। যেমন কালী-দুর্গার মেড় বানিয়ে বেশ জমজম করে পূজা করা, বহু ভক্তের সমন্বয়ে ধর্মরাজের মেলা করা, কিংবা হুড়ুম-দুড়ুম করে গ্রামের বহু বছরের ঐতিহ্যশালী রথ বার করা। তখন দুপক্ষই এক হয়ে যায়। কারো সঙ্গে কারো গোঁসাগোঁসি থাকে না।

আষাঢ়ের এমন দিনে পাটনের দল এখানে এসে পড়াতে লালমোহনপুরের বহু মানুষকেই তারা অনায়াসে তাদের দলের সমর্থক করে তোলার সুযোগ পেয়ে গেল। অনেক গ্রামের মতো এই গ্রামেও অতিকায় এই মানুষটিকে দেখতে ভিড় জমতে লাগল। কনুইয়ের খোঁচা মেরে বউ-মানুষরা, কেউ কেউ, আঁচলে মুখ ঢেকে হেসেও ফেলল।

রথের দর্শনার্থীদের মাঝে দাঁড়িয়ে বিশালদেহী পাটন বলতে লাগল, ‘ভাই সব! যুদ্ধের রব দিকে দিকে জোর উঠে গেছে। তা নিয়ে আমরা আর নতুন কোনো কথা বলতে চাই না, নতুন করে আর কিছু বলারও নেই। আমরা এই গ্রামে এসে তোমাদের কাছ থেকে মুষ্টি-অন্ন নিয়ে আসন্ন যুদ্ধে তোমাদের যোগদানের ব্যাপারে সম্মতি আদায় করে নিয়ে যেতে এসেছি, তাই নয়। সেই সঙ্গে আমরা চাই তোমাদের মধ্যে সেই বোধ জাগ্রত হোক, যা তোমাদেরকে অন্যায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রাণ বলি দিতে বলবে। প্রাণকে তখনই উৎসর্গ করা যায়, যখন তার পিছনে কোনো মহৎ এবং সর্বজনীন কারণ থাকে। মাঠারি-যুদ্ধ সেই সর্বজনীনতার তাগিদকে বড় করে দিয়েছে।

‘ভাই সব, মনে রাখবে, কখনো কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত শত্রুকে দমন করতে এত বড় যুদ্ধের ডাক দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু ক্রমে ক্রমে আমরা দেখতে পাচ্ছি এক অঞ্চলে বসবাসকারী কোনো এক ব্যক্তি তার কার্যকলাপ নিয়ে, জ্ঞান-দর্শন-বিদ্যার মিথ্যা অহঙ্কার নিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে সমগ্র একটি অঞ্চলের। ইতিমধ্যে গ্রামে গ্রামে তার বেশকিছু ভক্তও তৈরি হয়েছে। তারা আক্রমণ শানাচ্ছে আমাদের সকলের বিরুদ্ধে। আমরা নিরীহ মানুষ। আমরা যারা পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী, আমরা কখনো প্রতিপক্ষের সম্পদ লুন্ঠনের জন্য যুদ্ধ করতে চাই না। যুগে যুগে সম্পদ লুন্ঠনকারী বৈষয়িক মানুষরা সমাজে নরনারীর প্রেমের বাতাবরণ সৃষ্টিতে বাধার সৃষ্টি করে।

‘আমাদেরকে প্রতিপক্ষ করে পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ এই মাঠারি যুদ্ধে আমাদের পৌরুষের পরীক্ষা নিতে চাইছে। হে আমার লালমোহনপুরের গোপ সমাজ, কুড়মি সমাজ, দাস-মাহালি-সরাক সমাজ! সকল বিভেদ ভুলে তোমরা তৈরি হও তোমাদের সেই পৌরুষের পরীক্ষা দিতে। তোমাদের তেজ ও বিক্রমের পরিচয় দিতে। আমি নিশ্চিত জানি, পূর্বাঞ্চলের মাঝিডি, চড়কাডি, কামার গড়িয়া, বলরামপুর, হিজলা, রহমতপুরের মতো এই লালমোহনপুরের গ্রামবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান পশ্চিমাঞ্চলের সকল শত্রুর বিনাশ ডেকে আনবে। রক্তক্ষয়ী মাঠারি-যুদ্ধের ভেতর দিয়ে বেজে উঠবে শুধুমাত্র আমাদেরই বিজয়ী শঙ্খ, আমাদেরই মদনভেরী, বিজয়-ঢাক!

‘আজকের দিনটির কথা তোমরা বিশেষ করে ভেবে দেখো। যে-রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে আজ আমরা সকলে একত্রিত হয়েছি, গ্রামে, ডি-ডিহাতে মানুষ আনন্দে মেতে উঠছে, মনে রাখবে, সেই রথের জন্মই হয়েছে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার জন্য। মনে রাখবে, শত্রুর অভিমুখে ধাবিত হওয়ার জন্যই রথ। শত্রুকে নিধন করার জন্যই তির-ধনুক-কাঁড়বাঁশ। এই রথের দড়িতে টান দিয়ে তোমরা মনে মনে শত্রু নিধনের অঙ্গীকার কর। সমাজে নির্বিরোধ প্রেম ও অহিংসা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার কর। আর বল—বল—বল—জিনগা-মা-আআ ঈকি—।’

পাটনের সঙ্গে সঙ্গে তার দলবলও এই ধ্বনি দিতেই রথের দড়ি ধরে থাকা হাজারো গ্রামবাসী সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল, ‘জ্জয়!’

‘জিনগা-মাঈকি—’

‘জ্জয়!’

‘জিনগা-মাঈকি—’

‘জ্জয়!’

পাটন বৃষ-শকটে বীরের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে তার স্বপক্ষে এই বিপুল মানুষের জয়ধ্বনি উপভোগ করতে লাগল। একসময় পুণ্যার্জনের কথা ভেবে শকট থেকে সে নেমে এল মাটিতে। ভিড় ঠেলে দড়ির পাশে দাঁড়াল, আর সকলকে টেক্কা দিয়ে সে একাই হিড়হিড় করে টানতে লাগল কাঠের রথের দড়ি। এক সময় পটাং করে ছিঁড়ে গেল সেই রশি!

প্রচন্ড উল্লাস সহকারে কুলকুলি দিতে লাগল গ্রামবাসীরা। ছেঁড়া দড়ি নিয়ে ছুটন্ত রথ গিয়ে দাঁড়াল গ্রামের কুলহি মুড়ায়। বড়তলে।

১২

গ্রামগঞ্জে এখন মনসা পূজার তোড়জোড়। হাটগুলিতে উপচে পড়ছে ভিড়। এই লৌকিক দেবীকে উপলক্ষ্য করে গ্রামীণ বাজার অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠছে। হু-হু করে দৈনিক বাড়ছে হাঁস-পাঁঠার দাম। কোথাও কোথাও শুধু হাঁস-পায়রা-পাঁঠা বিক্রির জন্য জামতলে-জৈড়তলে এখানে-সেখানে নিত্য-নতুন হাটও লাগছে। কাঁধে চাপিয়ে, সাইকেলের ক্রশবারে বেঁধে, আর নয় তো গলায় গামছা জড়িয়ে হাঁটিয়ে, পাঁঠা-ছাগল হাটের ভিড়ে আনা হচ্ছে। ঝুড়ির মুখে কাপড় কিংবা জাল ঢাকা দিয়ে আনা হচ্ছে অনবরত কেড়ে-কেড়ে করতে থাকা নানান জাতের হাঁস। সবই মা মনসার পূজায় বলির জন্য।

যাদের গোটা হাঁস-পাঁঠা কেনার পুঁজি নেই, তারা বলির রাত পেরিয়ে গেলে ভোর-ভোরকে পাঁঠার মাথা কেনার জন্য কালীমন্দিরে গিয়ে হাজির হবে। পুরোহিতের সঙ্গে দরদাম করে কিনে আনবে সেই মাথা। তারপর তার চামড়া ছাড়িয়ে, কুড়ুল দিয়ে ছেঁচে টুকরো করে, ঘিলু সুদ্ধু রান্না করা হবে, আর কানগুলি মচমচ করে চিবিয়ে খাওয়া হবে। নুন-হলুদ মাখিয়ে, কাঠের আগুনে ঝলসে।

হাটগুলিতে ক্রেতার অভাব নেই কোথাও। দলে দলে আসছে গ্রামের মানুষ। শ্রাবণ মাসের যখন-তখন ঝুরুক-ঝারাক বারিশ থেকে বাঁচতে তাদের মাথা ও পিঠ ঢাকা রয়েছে নৌকোর খোলের আদলে বোনা ঘং-পাতার ছাতায়। কারো কারো মাথার ওপরে গোলাকার মস্ত বাঁশের ছাতা। কাছে ঘেঁষলে এখনো কাঁচা বাঁশের গন্ধ পাওয়া যায়। তাকে জুবকানো যায় না—বৃষ্টি আটকাতে সর্বদা খুলেই রাখতে হয়। খুব কম জনের হাতে কাপড়ের ছাতা, তাও আবার ছেঁড়া ও বিবর্ণ।

এইসব দীন-দুর্বল গ্রামবাসীদের কাছেও যুদ্ধের বার্তা পৌঁছে দিতে, হাটবাজারগুলিতেও ঢুকছে অঙ্গদ এবং পাটনের দল। উভয় দলেই প্রচারকের সংখ্যা এখন অনেক। দিনকে-দিন তা বেড়ে চলেছে। এমনকি, বিভিন্ন গ্রামে দুই পক্ষের ছোটো-ছোটো দলও প্রচার কার্য নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে গোটা দিন। যুদ্ধের ব্যাপারে ঢি-ঢি ফেলে দিয়েছে তারা। তারপরেও থেমে নেই।

মনসা পূজার এখনও দিনকতক বাকি। কিন্তু শ্রাবণ মাস পড়তে না পড়তে এ-গ্রামে সে-গ্রামে সন্ধে থেকে সারারাত ধরে চলছে জাঁতমঙ্গল পালা। রাতের খাওয়া-দাওয়া সন্ধের মধ্যে শেষ করে গ্রামের মেয়ে-পুরুষের দল এসে শামিল হচ্ছে মনসা ঠাকুরের মন্দির-চত্বরে। একগ্রামের আসরের ঢোল-বাঁশি-হারমোনিয়ামের সম্মিলিত সুর তরঙ্গায়িত হয়ে চলে যাচ্ছে ঢের দূর। খেত-ডুংরি-মড়াশ্মশান পেরিয়ে প্রতিবেশী কোনো বাউরি, কুইরি, ভূমিজ গ্রামে। উত্তরের গ্রামে পালা শুনতে লোক আসছে দক্ষিণের থেকেও। বাজনার ঝমঝমানিতে মাতন তুলছে মূল গায়েনের সঙ্গে থাকা দোহারিরা :

ও মা, তুমার পায়ে রাখি মাগো জড়া পদ্ম সাদা

বিষহরির কৃপায় বাঁচে...

আসমানে মেঘ জমে আছে। ভ্যাপসা গরম। গাছেপাতে থেমে আছে বাতাসের শনশনানি। যদিও ধানখেতের আল ছেড়ে পাথুরে মাঠের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারহেতু বৃক্ষাদি দৃষ্টগোচর হচ্ছে না তাদের। একটি ডিহি থেকে বেরিয়ে তারা এখন রাত্রিবাসের কারণে ফিরে আসছে এক শুঁড়ি গ্রামে।

অঙ্গদ অকস্মাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। মাথায় জটাভার নিয়ে পিছন ফিরে বলে ওঠে, ‘বনোয়ারি, আমার কানে লঘুস্বরে আসিতেছে লোকবাদ্যের মন-চঞ্চল-করা ধ্বনি।’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, মহারাজ। ওই বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে বিষমঢাকির ধ্বনিই মুখ্যত শ্রবণে আসিতেছে।’

‘বিষমঢাকি?’ অঙ্গদের প্রশ্নবাচক কন্ঠস্বরে কৌতূহল আঁচ করা যায়। দু-দন্ড নির্বাক থেকে সে এবার অপর সহচরকে বলে, ‘মনেশ, এই বিষমঢাকি লোকবাদ্যটি কী? কাহারা উহা বাজাইতেছে?’

মনেশ বলে, ‘মহারাজ, বিষমঢাকি এই অঞ্চলের একটি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র, যাহা কেবলমাত্র বেদিয়া সম্প্রদায় বাজাইয়া থাকে। অধিকন্তু, এখন মনসাদেবীর পূজা সমাসন্ন বলিয়া তাহারা এই বাদ্য বাজাইয়া, দেবীমঙ্গল কাব্য পাঠ করিয়া মনসার রোষ হইতে বাঁচিবার জন্য দেবীর আরাধনা ও স্তবগান করিতেছে। এই পালাগান অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক।’

‘জানি। সেই হেতু আমারও মন তাহা শুনিবার তরে ক্রমেই বেয়াকুল হইয়া উঠিতেছে। কিন্তু কেন আমি এই বিষমঢাকির কথা ইতিপূর্বে শুনি নাই? এই অজ্ঞতাই এই মুহূর্তে আমার দুঃখের কারণ হইয়া দাঁড়াইল, ওহঃ!’ অঙ্গদ বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে বার-দুয়েক তার মাথা ঝাঁকায়, যা তাদের নজরে আসে না। কিন্তু স্পষ্ট অনুমান করা যায় মন তার ব্যথিত। বিষণ্ণ।

এই সময় তারা সকলে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কোনো কথা বলে না, শব্দও করে না। অঙ্গদ তার অজ্ঞতার সূত্র ধরে অন্য ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কী সেই অন্য ভাবনা?

অজ্ঞতাকে দুঃখের কারণ বলাতেই তার যে কেবল মহাপ্রবীণের কথা মনে পড়ে গেল, তা-ই না, উপরন্তু তার মনে হল সে যা বলল তা তো হুবহু মহাপ্রবীণেরই উক্তি। মহাপ্রবীণ তাকে বলেছিলেন, ‘অ-জ্ঞানই অন্ধকার, অন্ধকারই শোক!’

মনে করার চেষ্টা করলেও, অঙ্গদ এই মুহূর্তে কিছুতেই স্মরণে আনতে পারে না, তাকে কোথায় কোন গ্রামে মহাপ্রবীণ এই অমূল্য কথা বলেছিলেন। তবে মনে পড়ে গেল কোন প্রশ্নের জবাবে তিনি তাকে একথা ব্যক্ত করেছিলেন। এবং কোন পরিস্থিতি থেকে তার মনে সেই প্রশ্নটির উদ্ভব হয়েছিল।

আনুমানিক এক দশক বৎসর পূর্বেকার ঘটনা। মহাপ্রবীণের তৃণবোঝাই গাড়িতে আসীন হয়ে, কঠোর মুষ্টিতে মারণাস্ত্র ঊর্ধমুখীধারণ করে, অঙ্গদ তখন জগদ্দর্শনে রত। বেলা দ্বিপ্রহর। খুব সম্ভবত তাদের গো-শকটি তখন শবরদের কোনো গ্রাম অতিক্রম করছিল। সেই সময়, তৃণের উচ্চাসনে বসে থাকাকালীন উভয় পার্শ্বস্থ মৃন্ময় গৃহসকল ও গৃহে বসবাসকারী গ্রামবাসী, তাদের সংসার-আঙিনা-চবুতরা তথা পারিপার্শ্ব নিরীক্ষণ করতে করতে এবং সেই সকল দৃশ্যবস্তু ও ঘটনাবলি নিয়ে ভাবতে ও বিচার-বিশ্লেষণ করতে করতে সে বিভোর হয়েছিল।

তৎসসত্ত্বেও সেই বিভোরতা কেটে যায়, যখন এক নারীকন্ঠের দুঃসহ আর্তনাদ তার শ্রবণেন্দ্রিয়ে এসে তৎক্ষণাৎ তার মনোযোগ আকর্ষণ করে বসে। সে দেখে প্রখর রৌদ্রের মধ্যেও এক মধ্যবয়স্কা রমণী হেঁট মস্তকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। শরীর তার ধূলিলগ্ন, মাথার কেশ ও গায়ের জীর্ণ বসন বিস্রস্ত। তাকে সান্ত্বনা দেবার জন্যও সেখানে তখন কেউ নেই। এক বৃদ্ধ খড়ের চালাটির নীচে বসে, দু-হাঁটুর ওপর দিয়ে তার দুই বাহু প্রসারিত রেখে কেবল নির্বাক উদাসীন তাকিয়ে রয়েছে ভিন্নমুখে। যেন পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে তার কোনো সংস্রব নেই। তার অবস্থান ওই নারী থেকে শতক্রোশ দূরে।

সেদিকে দৃষ্টি ফেরাতেই, অঙ্গদ গাড়োয়ানকে অবিলম্বে গাড়ি থামানোর জন্য অনুরোধ করে। বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি ওই শোকার্ত মহিলাকে অতিক্রম করিয়া যাইতে অসমর্থ। অশক্ত। চিত্ত আমার উৎকন্ঠিত হইয়া উঠিতেছে। আপনি আমাকে সত্বর শকট হইতে অবতরণ করিবার অবকাশ দিন। আমি ওই হতভাগ্য রমণীর হস্ত বক্ষে ধারণ পূর্বক দু-দন্ড তাহাকে সান্ত্বনা দিতে চাহি।’ সেই সঙ্গে, মাথা এপাশ-ওপাশ ঝাঁকিয়ে সে স্বগোতোক্তি করেছিল, ‘চারিদিকে শুধু শোক, শোক আর শোক! জগৎ কেন এমন দুঃখের আধার? শোক কী? কেন আমি বিমুখ হইয়া বসিয়া থাকা ওই বৃদ্ধের মতো সুখ-দুঃখ-শোককে চিরতরে জয় করিতে পারিতেছি না? কেন আমি বারংবার জগতের শোকে আদ্র হইয়া পড়িতেছি? হায় আমার কাতর মন!’

আগদুয়ারে গাড়ি থেমে গিয়েছিল। অঙ্গদ গাড়ি থেকে নেমে, সটান গৃহস্থের ভাঙা কবাট ঠেলে উঠোনে এসে হাজির হয়। সেই রমণীর পার্শ্বে বসে, সে তার রুক্ষ কেশভরা মাথায় তার অচঞ্চল হাতের পরশ দিয়ে বলে, ‘হে মাতঃ, তুমি কিসের তরে শোক করিতেছ? তোমার কি স্বামীবিয়োগ হইয়াছে? তুমি কি পুত্রহারা হইয়াছ? কী হেতু তোমার এহেন বিহ্বল দশা?’

মহাপ্রবীণ ইতিমধ্যে গৃহস্থের মাটির বারান্দার কানায় বেত্র হাতে বসে পড়েছেন। নিবিষ্টমনে তিনি অঙ্গদকে দেখছিলেন, শুনছিলেন তার কথা। অতঃপর সেই রমণী বলে, ‘হে মহাত্মন! আমি পুত্রহারা হই নাই। আমার স্বামীও বর্তমান— ওই তো, উত্তরমুখে চাহিয়া দেখো, উনি কেমন দিব্য বসিয়া আছেন। উহার শোক নাই, নৈরাশ্য নাই, উদবেগও নাই। কেবল অহরহ আমার অন্তর ফাটিতেছে— যখনি আমি অতীতের কথা ভাবিতেছি, যখনি আমি আমার একমাত্র সন্তানের কথা ভাবিতেছি।’

‘কেন অতীত তোমার কাছে দুখদ, কেনই-বা জননী হইয়া আপন সন্তানের কথা ভাবিয়া তোমার অন্তর হর্ষোৎফুল্ল না হইয়া এমন শোকভার হইয়া উঠিতেছে?’

‘হে মহাত্মন, আমি দাম্পত্য জীবনে দীর্ঘদিন বন্ধ্যাত্ব সহিয়া দেব-দেউলে ধর্ণা দিয়া আমার একমাত্র পুত্রকে পেটে ধরিয়াছিলাম। আমরা অনাহারে-অর্ধাহারে দিনযাপন করিয়াও তাহাকে মানুষ করিলাম। আজ সেই পুত্র আপন মতে বিবাহ করিয়া আমাদের ছাড়িয়া ঘর শূন্য করিয়া চলিয়া গেল। সে একবারও ভাবিল না, আমরা কী খাইব, আমরা কেমনে বাঁচিব, কীভাবে আমাদের দিন গুজরান হইবে। আজ আমাদের শরীরে বল নাই, কর্ম করিবার সামর্থ নাই, আমাদের বিপদে-আপদে-অঘটনে পাশে দাঁড়াইবার, ভরসা দিবারও কেহ নাই। তাই প্রতিযামে আমি শোকে আর্ত হইয়া পড়িতেছি আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করিতেছি যে-পুত্র আপন স্ত্রীর কথায় তাহাকে অধিকতর সুখী করিবে বলিয়া আমাদের নির্দয়ভাবে ত্যাগ করিয়া গেল, তাহাকে তুমি অকৃতজ্ঞ স্বার্থপর জ্ঞানে দন্ড দিও না, চেতনা দাও। আর আমাদের দাও অকাল মৃত্যু! আমরা অনাহারজনিত ক্লেশ ও শোকানল হইতে বাঁচি।’

এই কাহিনি শোনার পর অঙ্গদের মুখে আর কথার স্ফূ¨রণ ঘটে না। সে নিজেও কেমন বিস্ময়ে বিমূঢ় ও হতবাক হয়ে যায়। এমনকি সেই রমণীকে সান্ত্বনা দিতেও অপারক হয়ে পড়ে। নিজের বিগলিত অশ্রু গোপন ও বিমর্জন করে সে মহাপ্রবীণের শরণাপন্ন হয়। তারপর শোকসন্তপ্ত মন নিয়ে ফের গো-শকটে অধিরোহণ করে, মহাপ্রবীণের পুনঃপুনঃ প্রদত্ত আদেশ গ্রহণপূর্বক শোক সে কাটিয়ে ওঠে, এবং পুনরায় দু-হাতের শক্ত মুঠিতে গগনমুখী অস্ত্র ধারণ করে।

গো-শকট আবার গ্রাম ছাড়িয়ে বেরিয়ে যায়। চলতে চলতে একসময় অঙ্গদ শোক-বিষয়ক চিন্তায় আকুল হয়ে পড়ে। এমনকি, নিজের স্ত্রীকে শোকাতুরা দেখেও সেই বৃদ্ধ যে কেমন করে শোক ও দুঃখের তাপ থেকে নিজেকে অনিমজ্জিত রাখল, সেই চিন্তাও তাকে আচ্ছন্ন করে। তার যথাযথ কারণ জানতে শেষতক সে মহাপ্রবীণের দ্বারস্থ হয়।

ততক্ষণে গো-শকটটি অগণিত শস্যহীন ধানখেত পেরিয়ে, জাঙ্গাল পেরিয়ে, প্রখর রোদ থেকে ছায়ার রাস্তা ধরেছে। একটি প্রায়-শুষ্ক বিরাট জলাশয়ের পাড় বরাবর অজস্র অর্জুন গাছের হালকা ছায়ার ভেতর দিয়ে চলেছে। কাছেপিঠে গ্রামবাসী নেই বললেই চলে। নির্জন। বহুদূরে দেখা যায় মাথায় জলের কলসি নিয়ে ঘোমটা টানা গ্রাম্যবধূর দল আলপথ দিয়ে দ্রুতপদে ঘরের অভিমুখে ধাবমান। বাতাসে তাদের অস্পষ্ট কলরব ভেসে আসে। অর্জুনের শাখাগুলিতে তখন বিরতিহীনভাবে কিচিরমিচির করে চলেছে যত রামবোনি আর গুয়াশালিখ। কিন্তু তবু, অঙ্গদের প্রাণ জুড়ায় না।

বাঁশঝাড়ে আড়াল হয়ে থাকা দূরবর্তী গ্রামটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে, মুখ ঘুরিয়ে গো-শকটের সম্মুখে চেয়ে বলে ওঠে, ‘হে মহাপ্রবীণ! পশ্চাতে ফেলিয়া আসা শোকার্ত গৃহস্থ রমণীকে আমি সান্ত্বনা দিতে ব্যর্থ হইয়াছি। সান্ত্বনার কোনো ভাষাই আমি খুঁজিয়া পাই নাই, কারণ, ওই মহিলার শোক আমাকেও বিহ্বল করিয়া তুলিয়াছিল। সেই ক্ষণ হইতে আমি শোক লইয়া বিব্রত হইয়া পড়িয়াছি। হে মহাজ্ঞানী, এক্ষণে আমি ইহা জানিতে যার পর নাই চাঞ্চল্য বোধ করিতেছি যে, প্রকৃত অর্থে শোক কী? শোকের কারণই বা কী? জগৎ কেন এমন দুঃখের আধার? কেন আমি বিমুখ হইয়া বসিয়া থাকা ওই বৃদ্ধের ন্যায় দুঃখ-শোককে চিরতরে জয় করিতে পারিতেছি না? কেন আমি ক্ষণে ক্ষণে জগতের শোকে দুর্বল হইয়া পড়িতেছি? এইসকল প্রশ্নাদির মীমাংসা জানাইয়া আমার সন্তপ্ত হৃদয়কে ত্বরায় শীতল ও উদবেগহীন করুন।’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! শোক-বিষয়ক উক্তি শুনিবার লাগি মনঃসংযোগ করো। প্রকৃত অর্থে, শোক হইল হৃদয়ের দুঃসহ কাতর দশা। যে-দশা স্বয়ং অ-জ্ঞান। অজ্ঞানতা হইতে মনের বিচার-বিশ্লেষণী ভাবনা লোপ পায়। জ্ঞানহীন, অন্ধ, অবিচারী মনই তখন শোকের উদ্রেক ঘটায়। এক অর্থে, অ-জ্ঞানই অন্ধকার, অন্ধকারই শোক! সামগ্রিকভাবে বলিতে গেলে, যে-ব্যক্তি চেতনাহীন, বিদ্যাহীন, জ্ঞানহীন তথা পরমুখাপেক্ষী ও প্রত্যাশী, সেই ব্যক্তি সহজেই শোকগ্রস্ত হয়েন। জ্ঞানী ব্যক্তিরা শোক করেন না, তাহারা শোকের কারণ অন্বেষণ করিয়া জগৎ ও জীবনের ধর্মকে এবং নিজেকে জানিবার ও বুঝিবার প্রয়াস করেন।

‘হে গুঢ়াকেশ, তুমি পুনরপি স্মরণে আনো সেই বৃদ্ধকে। দেখ, তাহার স্ত্রী শোকসন্তপ্তা হওয়া সসত্ত্বেও তিনি শোকরোহিত ছিলেন, কেন না, তিনি যথার্থ জ্ঞানী। অধীত বিদ্যার অধিকারী না হইলেও লোকজীবন হইতে আহত অভিজ্ঞতাই তাহার বিদ্যার ভান্ডার। আর এই বিদ্যাকে সর্বদাই অধীত বিদ্যা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর মান্য করিবে, বিদ্যাধরকে সমীহ করিবে ও আন্তরিক সন্মান জ্ঞাপন করিবে। তুমি এখনো সেই বিদ্যা অর্জন করিতে পার নাই বলিয়া ওই বৃদ্ধের ন্যায় শোককেও তুমি জয় করিতে অসফল রহিয়াছ।

‘হে জ্ঞানপিপাসু, তুমি ইহাও সদা স্মরণে রাখিবে যে, মানবের অন্যতম তথা শ্রেষ্ঠ ধর্মই হইল জীবে প্রেম। জীবে প্রেমই হইল ঈশ্বর-প্রেম। প্রেম হইতেই মানুষের সকল প্রত্যাশার জন্ম, যেমন জীব ও প্রকৃতির প্রতি অপ্রেম হইতে আত্মভাবনা ও স্বার্থপরতার জন্ম। প্রত্যাশা হইতে দুঃখের জন্ম, এবং দুর্নিবার দুঃখ হইতে শোকের জন্ম। জগৎ চিরকাল দুঃখের আধার, কারণ, মানবহৃদয় সর্বদা প্রেমাকাঙ্খি ও প্রত্যাশামুখর।’

মহাপ্রবীণ যখন এই অমৃত বাক্যসকল বলে চলেছেন, সেসময় শকটে অধিষ্ঠিত অঙ্গদকে অত্যন্ত চিন্তাকুলিত দেখায়। যেন মহাপ্রবীণের জীবনদর্শন সংক্রান্ত শ্লোকগুলিকে বাস্তবে মিলিয়ে, যাচাই করে দেখার চেষ্টা করে চলেছে সে।

দু-এক দন্ড বাদে অঙ্গদ পুনশ্চ প্রশ্ন করে বসে। তাঁর পূর্বেকার উক্তির জের টেনে বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! প্রেমাকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা কীরূপে দুঃখের হেতু হয়, তাহা এখনও বোধগম্য হইতেছে না। পুনরায় বিশ্লেষণপূর্বক তাহা নিবেদন করিলে আমার ভ্রমের নিরসন হইতে পারে।’

গো-শকটে গাড়োয়ানের আসনে বসে, মহাপ্রবীণ আবার বলে যেতে থাকেন। হাতে পৈনাটি ধরা থাকলেও তিনি গোরু দুটিকে কদাপিও বেত্রাঘাত করেন না, প্রয়োজনে তাদের পিঠে আলতো ছোঁয়া দিয়ে তাদেরকে সঠিক পথ ধরে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেন মাত্র। অঙ্গদের কথায় মনোনিবেশ করে তাকে বোঝার চেষ্টা করেন। তারপর—

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! অনুবর্তন করো। অধিকতর মনোযোগী হও। মনোযোগই সকল দুর্বোধ্যকে সুবোধ্য করিতে সহায়ক হয়। আমি পূর্বে বলিয়াছি মানবহৃদয় প্রেমপ্রত্যাশী। কিন্তু জগতে প্রেম কখনো চিরতরে পূর্ণ হইবার নহে। তাহা মানবহৃদয়কে হ্লাদিত করিলেও সেই আবেশ বড়ই ক্ষণস্থায়ী। মানুষ কখনো চিরকালীন সুখ ও আনন্দ অর্জনে সক্ষম হয় না। জগতে প্রেম বারংবার প্রত্যাখ্যাত হয়। তাহা অপূর্ণতাজনিত তৃষ্ণা ও অসন্তোষের হেতু। মানুষ প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু, কাহারো না কাহারো নিকট প্রত্যাশা করিতেছে। জীবদ্দশায় তাহার বহু প্রত্যাশা অপূরিত থাকিয়া যায়। জগতে প্রতি দন্ডে প্রতিটি মানুষ তাহার অন্তরে সেই প্রেমের তৃষ্ণা ও অসন্তোষ তথা আশা-আকাঙ্ক্ষার অপূরণজনিত হতাশা বহন করিয়া ঘুরিতেছে। জীবনের চরমলগ্নে যা তাহাকে দুঃখ ও শোকের অন্ধকারে আকন্ঠ নিমজ্জিত করে। তাহাকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে বাধ্য করে যে, জগৎ অন্তিমে দুঃখময়, শোকময় এবং নৈরাশ্যের তমিস্রায় আবর্তিত।’

মহাপ্রবীণের এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ শুনে আবারও বাক্যহীন হয়ে যায় অঙ্গদ। তাকে অধিকতর চিন্তাশীল দেখায়। এখন তার কাছে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে অনেক কিছুই। এমনকি, সেই রমণীর দুঃখের কারণও সে এখন অনায়াসে অনুধাবন করতে পারে। তার মনে হয়, বৃদ্ধা রমণীর শোকের মুখ্য কারণ পুত্রের কাছে তার প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা থেকে প্রত্যাখ্যান এবং প্রত্যাখ্যান থেকে দুঃখ ও শোকের উৎপত্তি। অধিকন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত সমাজ ও মানবমনকে সে বুঝে উঠতে পারেনি। সমাজ ভাঙছে। এই ভাঙন সংঘটিত হচ্ছে ভেতর থেকে, কেন না মানুষ স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতার ভূমিতে অধিষ্ঠান করে নিরঙ্কুশ সুখের সন্ধান করছে। এই সুখের অধিকভাগ যৌনতাচ্ছন্ন। তাই নববিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী আরো অধিক, নিষ্কন্টক, নির্ভার ও অংশীদারিত্বহীন সুখের কথা চিন্তা করে উত্তরোত্তর বেহায়া হয়ে উঠছে। পলায়নী মনোবৃত্তি নিয়ে কপোত-কপোতির সংসার পাতছে। তারা সমাজকে এখন আর ভয় পাচ্ছে না, বৃদ্ধ পিতামাতার প্রতি কর্তব্যকেও অবহেলা করতে বা তার দায় থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত করতেও তিলমাত্র দ্বিধা বোধ করছে না।

সেই অতীত থেকে অঙ্গদ ফিরে আসে বর্তমানে, যখন সে তার প্রচারক ও অনুগামীদের নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দিগন্তহীন অনালোকাচ্ছন্ন বিশাল মাঠের মধ্যিখানে। এতোক্ষণে একটু বাতাসের মর্মর শোনা যায়। তাদের ঘর্মাক্ত শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে থাকে মৃদু বায়ু। অঙ্গদের মাথার জটগুলি উড়তে থাকে। মনের সাময়িক বিষণ্ণতা কাটিয়ে সে আবার মনোযোগী হয় বাতাসে তরঙ্গায়িত হয়ে আসা মনসামঙ্গলের সেই বাজনার প্রতি। সেই বিষমঢাকির প্রতিও। তার মনে হর্ষানুভব হয়। কিন্তু ঠিক কোনদিক থেকে এই পালাগান আসছে বুঝতে না পেরে সে পুর্বমুখে কান পেতে কয়েকদন্ড স্থির থেকে সপ্রশংস অভিব্যক্তি সহকারে জিজ্ঞেস করে, ‘আহা, স্তবগানসহকারে এই বাদ্য অতীব মনোহর। বনোয়ারি, কোন পল্লি হইতে এই গান বাতাসে আসিয়া আমাদিগের শ্রবণগোচর হইতেছে?’

‘রাজন, বোধ হইতেছে, রামপুরের ঘুনিয়ারা জাঁতমঙ্গলের আয়োজন করিয়াছে। তবে এ-ব্যাপারে বন্দিলাল আরো নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারে।’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি নিশ্চিত, জাঁতগানের এই আয়োজন ঘুনিয়া সম্প্রদায় করে নাই।’ বন্দিলাল টুডু জানায় রামপুরের আগে বেদে সম্প্রদায়ের একটি গ্রাম আছে। মানগোবিন্দপুর। সেখানে চল্লিশটিরও অধিক পরিবার সাপকে নিয়ে যুগ-যুগ ধরে বেঁচে আছে। তাদের জীবন-জীবিকায় মা মনসাই একমাত্র ভরসা। তারা ঘরে ঘরে সাপ পোষে, সাপের লালন-পালন করে। প্রত্যেক পরিবারে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকাল-সন্ধে এই নিয়ে পড়ে থাকে। এমনকি, শিশুরাও সাপকে দেখে ভয় পায় না, সাপকে নিয়ে অবলীলায় খেলা করে, যেন এই সর্পকূল তাদের পরিবারে বহিরাগত তো নয়ই, বরঞ্চ তাদেরই সদস্য। অথচ প্রতিটি সরীসৃপ মারাত্মক রকমের বিষধর। এখানে নির্বিষ সাপের আদর নেই, আশ্রয় নেই। ফণায় খড়মের চিহ্নযুক্ত খরিশকে তারা মা মনসা বলে পূজা করে। হাঁড়িতে, খুপড়িতে পুষে তাদের খাবার-দাবার, জল-পানি দেয়। সকালের দিকে তারা থাক-থাক করে সাজানো বাঁশের পেড়িতে ছোটো-বড়ো নানান আকারের সাপ, জড়িবুটি বাঁকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সাপের খেলা দেখিয়ে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করে, তাগা-তাবিজ-গদ-মাদুলি বিক্রি করে, তাবাদে বেলাডুবু গ্রামে ফিরে আসে। ঘরে থাকা বাচ্চারা পুকুরঘাটে ঘুরে ঘুরে ব্যাঙ ধরে আনে, সাপের আহারের জন্য।

মানগোবিন্দপুরের এই বেদেরা সাপ ধরে নিকটবর্তী জঙ্গল ও খেতের আল থেকে। আবার কখনো-কখনো কোনো গৃহস্থের বাস্তু থেকেও। বাস্তুঘরে জলের হাঁড়ার তলায়, গোয়ালে, খড়ের গাদায় অনেক সময় সাপ দেখতে পাওয়া যায়। পরিবারের লোকজন ভীত হয়ে সাপ ধরার লোক খুঁজে বেড়ায়। বেদে ডাকে।

তবে সাপের প্রজনন ঋতুতে বেদেরা সাপ ধরে আনে না, ধরে রাখা সাপগুলিকেও তারা আটকে রাখে না। গভীর অরণ্যে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে আসে।

এই গ্রামের বেদেরাই প্রতিবছর বেশ জমকালো করে মা মনসার পূজা করে থাকে। শুধু পূজা করা নয়, সেই সঙ্গে সারা আষাঢ় মাস ধরে চলে মনসামঙ্গলের আসর। এখনো সেই গ্রাম থেকেই ভেসে আসছে বিষমঢাকির বাজনা। পালাগান শুরু হল বলে।

অঙ্গদ বলে, ‘আমার মন সেই আসরে যাইতে উদগ্রীব হইয়াছে। মানগোবিন্দপুর কোন মুখে? কত দূরে?’

বন্দিলাল বলে, ‘রাজন, উহা উত্তরমুখে অর্ধক্রোশ তফাতে।’

‘চল তবে সেই পল্লিতেই যাওয়া যাক।’

তারা শুঁড়ি গ্রামের দিকে না গিয়ে উত্তরের পথ ধরে। সকলের আগে আগে বন্দিলাল। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে তারা মানগোবিন্দপুরের উদ্দেশে এগিয়ে যায়।

গ্রামের ভেতরে ঢুকতেই বাঁদিকে কিছুটা দূরে দৈত্যাকৃতি এক বটগাছ, যা অন্ধকারে চোখে পড়ে না। দেখা গেল একটি সংকীর্ণ পথের দুপাশে খড়ে ছাওয়া কতকগুলি প্রাচীন কুঁড়েঘর। ঘরগুলি অতিশয় নীচু। পচে যাওয়া খড়ও পালটানো হয়নি ঢেরদিন। প্রতিটি ঘরের চালা নেমে এসেছে হাতখানেক উঁচু সুন্দর করে নিকানো মাটির বারান্দার দিকে।

চালার খুঁটি বলতে অসরল কিছু পুরোনো গাছের গুঁড়ি, খুব সম্ভবত জম্বু বৃক্ষ কেটেই তার গদিগুলিকে খুঁটি হিসেবে কাজে লাগানো হয়েছে। এঁকে-বেঁকে থাকা সেই গুঁড়ির গায়ের খঁচে ঝুলছে লন্ঠন। মুধুনে উঁকি মারছে কালো ছোপওলা অবসাদগ্রস্ত বয়স্ক টিকটিকি। ছাই দিয়ে ঝকঝক করে মোছা লন্ঠনের কাঁচ। তার আলো ঠিকরে পড়ছে হলুদ হয়ে থাকা শিলনোড়ায়, ঝাঁট দেওয়া পাথুরে আঙিনায়।

প্রায় প্রতিটি ঘরের চৌহদ্দি বরাবর জবা, কাঠ-টগর কিংবা করবীর ঝাড়। আছে পেঁপে, চালার মাথায় লাউলত, আর লালতুলসীর বেদি। সারা গ্রামে, এমনকি অনেকের ঘরের উঠোনে কিংবা বাড়িধারেও, ইতস্তত ছড়িয়ে ডালপালা মেলে রয়েছে টোপা কুলের গাছ। মনে হয় যেন একদা কুলের জঙ্গলের একাংশ সাফ করেই গড়ে উঠেছে মানগোবিন্দপুরের বসত।

মানগোবিন্দপুরের লাগোয়া আর কোনো ডি নেই। হয়তো এরা সাপের সঙ্গে বসবাস করে বলে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ সাপের প্রতি ভীতির কারণে এদের সন্নিকটে ঘরবসত গড়েনি। উত্তরের দিকে মাইলটাক গেলে ভূমিজদের গ্রাম, ভুঁড়াশোল।

গ্রামে ঢুকতেই বেদেরা ভিড় করল অঙ্গদ ও তার দলবলকে ঘিরে। মদ্যপ বেদেরা লুটিয়ে পড়তে লাগল তার চরণ স্পর্শ করার জন্য। এই গ্রামে বেদেদের মধ্যে যে প্রবীণতম, সর্পবিদ্যায় সকলের গুরু এবং পারদর্শী, তাকেও তৎক্ষণাৎ ডেকে আনতে লন্ঠন হাতে কিশোররা ছুটল এদিক-ওদিক।

অতঃপর এলো সেই চক্রধর বাইদা, খ্যাড়খ্যাড়ে বুড়া। তার সঙ ধরে এলো ডমন বাইদা, কালু বাইদা, রাখো বাইদা, পুনু বাইদা আরো অনেকে। তারা সকলে মিলে একরকম হাত ধরে টেনেই অঙ্গদকে নিয়ে গেল আরো কয়েকটি ঘর পেরিয়ে সেই জায়গায়, যেখানে গ্রামের মাঝে একটি গোল মনসা মেলাকে ঘিরে নিভু-নিভু আলোয় বসেছে আসর। খাওয়া-দাওয়া সেরে গ্রামবাসীরা মিলিত হতে শুরু করেছে সেখানে। দিন কয়েক বাদে এখানেই মূর্তি গড়ে হবে দেবীর পূজা। আষাঢ়ের ৩০ দিনে। বলির জন্য রয়েছে যূপকাষ্ঠও।

পালাগান থামিয়ে অঙ্গদকে বিশেষভাবে সাপের খেলা দেখানোর জন্য আয়োজন শুরু হয়ে গেল। এঘর-সেঘর থেকে আনা হতে লাগল ছেঁড়া ও তৈলাক্ত দড়ির খাট। মূল আসরের সামনে খাটগুলি লাগালাগি করে পেতে বসতে বলা হল অতিথিদের।

তাদের চারপাশে এখন গাদাগাদি ভিড়। দেখতে দেখতে তা মন্ডলাকার চেহারা নিল। ভিড় ঠেলে সাপের পেড়ি হাতে নিয়ে একে-একে ঢুকতে লাগল সাপখেলায় দক্ষ বেদের দল। চেহারা যাদের অনাকর্ষণীয়, বেশভূষা অপরিচ্ছন্ন।

জেগে উঠল বিষমঢাকি। তার দুড়দাড় বাজনা। সুর ও সুরায় মাতাল বেদেদের শরীর-মন দুলতে লাগল সরীসৃপের মতো। মনসা মঙ্গলের গান ধরা হল। দোহারিরা সেই ভিড়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গলা ছাড়তে লাগল। তারপর তেলচিকুটি দড়িতে বাঁধা গোবর ও সিঁদুর লেপা সাপের ঝাঁপিতে মাথা ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে একটার পর একটা ঢাকন খোলা হতে লাগল। খোলামাত্র শনশন শব্দে মাথা তুলতে লাগল কুন্ডলী পাকিয়ে থাকা জাত সাপগুলি। ফোঁশ করে ফণা তুলে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে! কী অপূর্ব তাদের দেহের অলংকরণ! কত রং-এর, কত নকশার নিপুণ ও সুষম কাজ! যেন কোনো প্রতিভাধর দক্ষ শিল্পীর হাতে আঁকা।

অঙ্গদ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে। নিরুত্তেজ, উদবেগহীন তার চাহনি। ক্রুদ্ধ ফণা তুলে দাঁড়িয়ে টলমল করতে লাগল স্বয়ং মা মনসার দল। বেশির ভাগ সাদা রং-এর দুধা খরিশ, যারা রাঢ়ের এই অঞ্চলের আদিবাসিন্দা, সংখ্যায়ও অধিক।

দেখতে দেখতে সেই সাপগুলি বেদেদের উর্ধাঙ্গ জুড়ে বিচরণ করতে থাকে। তাদের মাথায়, গলায়, বগলে পাক দিয়ে খেলায় মেতে উঠ। মাঝে-মাঝেই তাদের মুঠোগুলোতে ব্যর্থ ছোবল মারে, যখন ডুগডুগির মতো করে মুঠো দেখিয়ে বেদেরা উত্তেজিত করে তাদের।

একসময় তাদের মাতন এমন জায়গায় উঠল যে, যে-কোনো মানুষেরই ভয়ে পাথর হয়ে যাওয়ার কথা। অঙ্গদ অবিচল দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। তার জটাল মাথার চতুর্দিকে এমনি অজস্র সাপ শূন্যে ফণা বিস্তার করে দাঁড়িয়ে থাকল, ঠিক যেন দংশনের প্রাক-মুহূর্ত। বাজতে লাগল বাজনা, আর ওস্তাদরা গেয়ে চলল দেবী-বন্দনা:

জয় মা ভবানী ভূতনাথ ভূতেশ্বরী

ভাল করে নাচলে পাবে শাঁখা-শাড়ি

জয় মা ভবানী...

প্রথমে বন্দিলাম আমি ধর্ম নিরঞ্জন

জয় মা ভবানী

আর দ্বিতীয়ে বন্দনা করি লক্ষ্মী-নারায়ণ

জয় মা ভবানী ভূতনাথ ভূতেশ্বরী

ভাল করে নাচলে পাবে শাঁখা-শাড়ি

জয় মা ভবানী...

লোহার আঁচির লোহার পাঁচির লোহার বাসরঘর

জয় মা ভবানী

আর সেই বাসরে দংশাইল সোনার লখিন্দর

জয় মা ভবানী...

আর সেই মড়া ভাসিল কলার ভেলাতে

জয় মা ভবানী ভূতনাথ ভূতেশ্বরী

ভাল করে নাচলে পাবে শাঁখা-শাড়ি

জয় মা ভবানী...

সেই গান, বিষমঢাকির সেই বাজনা আর মাথার চতুর্দিকে ফণাধর সাপগুলির দিকে তাকিয়ে, মনে হল, অঙ্গদও বিভোর হয়ে রয়েছে অন্য কোনো চিন্তার জগতে। হয়তো সে ভাবতে চেষ্টা করছে আজ থেকে শত-দুইশত বৎসর পূর্বে সে কখনো কি এমনভাবে সর্পাবৃত হয়ে পড়েছিল? কখনো? কোনো গ্রামে?

অঙ্গদ সশ্রদ্ধ মনে মহাপ্রবীণকে স্মরণ করে তার মাথা নত করল মা মনসার মস্তকে। আর ঠিক তখনি তুমুল শঙ্খধ্বনির সঙ্গে আবেগে উন্মাদনায় চিৎকার করে উঠল ভিড়ের সকলে, ‘জয়! মা মনসার জয়!’

১৩

শরতের নিসর্গ দেখে পথে যেতে যেতে মোহিত হয়ে পড়ল অঙ্গদ। সে তার সঙ্গীদের পুনড্র নদীর তীরবর্তী এলাকায় হাতের ইশারায় দু-দন্ডের জন্য থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘হে আমার সঙ্গীসাথীগণ, আমাকে কয়েক পলের নিমিত্ত এই পুনড্র অববাহিকার শোভা উপভোগ করিতে দাও। আর দুই গণ্ডূষ বারি সেবন করার অবকাশ দাও। আমি বড়োই তৃষ্ণার্ত।’

পিপাসার কথা বললেও অঙ্গদ তৎক্ষণাৎ রাস্তার ওপর থেকে নদীর দিকে নেমে গেল না। সে পথপার্শ্বে দীর্ঘক্ষণ দন্ডায়মান থেকে ঘুরে ঘুরে দেখে যেতে লাগল চারপাশ। দেখল নীলাকাশ, ভূমন্ডল! দেখল নদী আর দিগন্তহীন অনন্ত বিশ্বপ্রকৃতি। কী অভূতপূর্ব তার শোভা, কী মনোহারিণী সৌন্দর্য ছড়িয়ে রয়েছে সকলদিকে। আকাশে কোথাও থোকা-থোকা মেঘরাশি, কোথাও-বা সেই মেঘ কখনো শূকরশাবক, কখনো অশ্বচালিত রথের সাময়িক অবয়ব নিয়ে একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে মন্থরগতিতে অগ্রসরমান। সে শুনতে লাগল পুনড্র নদীর কলতান। যেন কোন আদি-অন্তহীন কাল ধরে তা বয়ে চলেছে নিজস্ব ধর্মে, নিজস্ব ছন্দে। তার গতিপথের মাঝে জেগে থাকা উপলখন্ডগুলিতে ধাক্কা খেয়েও অবিরাম ভ্রূক্ষেপহীন তার বয়ে চলা দূরস্থ কোন মোহানার অভিমুখে।

নদীর উভয় তট জুড়ে সাদা কাশফুলের প্লাবন। বেগবতী নদীর মতো সেই কাশও দূরস্থ বিস্তৃত। যতদূর চোখ যায়! দমকা বাতাসে মাথা দুলিয়ে নেচে নেচে উঠছে তারা।

গ্রামবাসীদের কুঁড়েঘরগুলি কাশবনের ওপারে। খেজুর-পলাশ আর ঢেলা গাছের জঙ্গলে আড়াল হয়ে থাকে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে কোথাও কোথাও দুটি-একটি ঘরের বিচ্ছিন্ন অবস্থান চোখে পড়ে। আচমকা সড়সড় করে ছুটে যায় ধূসর সোনালি গায়ের বেজি। শোনা যায় আদিবাসী মায়ের ন্যাংটো ও দুরন্ত শিশুর উদ্দেশে প্রলম্বিত ডাক। সবকিছুই কি একাত্ম হয়ে মিলেমিশে রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে! যেমন মিশে থাকে বৈশাখের পাঁকাল পুকুরে পদ্ম-ভ্যাঁট, ভিজাবালিতে ঘুরঘুইরা পোকা, যেভাবে অহরহ কিশোরী-রমণীর নাকের সখ্য নিয়ে পাটায় ডুবে থাকে নাকছাবি।

কাশবনের ওপারে সাঁওতালদের বসতিগুলিকে ঘিরে কোথাও কোথাও ভুট্টার বড় বড় ক্ষেত। লম্বা-লম্বা তার বাইল। দুহাতে ভুট্টা খেতের ঝুড় দুপাশে টালতে টালতে, পাকা-ভুট্টার শুকনো মঁচ ছিঁড়ে, গোঁফের মতো করে নাকে চেপে, মাকে চমকে দিতে বীরপুরুষের ভঙ্গিতে বেরিয়ে আসছে আদুড় গায়ের শিশু। কোমরে ঘুনসি।

ধুঁন্দুল লতের পাশে দাঁড়িয়ে কোলের সন্তানকে স্তন্য দিতে দিতে, ছেলের রঙ্গ দেখে না হেসে পারে না জননী। এই হাসিও যেন প্রকৃতিরই আহ্লাদ। আনন্দ হয়ে, ফুল হয়ে ঝরছে সদাই।

ধরিত্রীপৃষ্ঠ জুড়ে আরো কত কিসিমের যে ফুল! ফুল আর ফুল! আশেপাশে কত-কত পাখির বিচিত্র কূজন! চতুর্দিক ব্যাপৃত সেই মুগ্ধতা নিয়ে, অঙ্গদ, ধাপে-ধাপে, বেগবতী পুনড্র নদীর ঘাটের দিকে নেমে যেতে লাগল। ঘাটের পাথরে দাঁড়িয়ে গন্ডূষভর্তি স্বচ্ছ জল পান করার মুহূর্তে সে বলে উঠল, ‘হে মহাপ্রবীণ!’

বোঝা যায়, মহাপ্রবীণের নামোচ্চারণের ভেতর দিয়ে অঙ্গদ তার এই বিপুল জাগতিক বিশ্বের কাছে এবং সেই সঙ্গে মহাপ্রবীণের কাছেও, তার কৃতজ্ঞতা নিবেদন করল। মহাপ্রবীণই তো তাকে জীবন ও জগতকে চিনতে, জানতে, উপভোগ করতে শিখিয়েছে। শুধু জীবন লাভ করলেই তো জগৎকে জানা ও উপভোগ করা যায় না। শুনতে হয় সেই সংগীত, যা বিশ্বচরাচরকে আত্মহারা ও অনুরণনময় করে রেখেছে। আর একান্তে বলতে হয় প্রতিটি জড় ও জীবের সঙ্গে কথা।

অঙ্গদ আবার অচঞ্চল পদে পাড়ে উঠে এলে তার আরেক ঘনিষ্ঠ পারিষদ, মনেশ, নিজের কৌতূহল তথা বিস্ময় দমন করতে না পেরে বলে, ‘হে রাজন! আপনি জানালেন যে, আপনি বড়ই পিপাসার্ত। অথচ এক গন্ডূষ মাত্র বারি পান করলেন। কেন?’

অঙ্গদ তার প্রিয় পারিষদের জ্ঞাতার্থে বলে, ‘এই অদৃষ্টপূর্ব নিসর্গ দর্শনেই আমার অর্ধেক পিপাসা নিবারিত হইয়াছে। আমার আত্মা যার পর নাই শীতল ও শান্ত হইয়াছে। অধিক বারি গলাধঃকরণের আর কীসের প্রয়োজন?’

অন্য পারিষদরা সবিস্ময়ে তার দিকে তাকায়। তারপর রওনা দেয় দমদহি গ্রামের অভিমুখে। আড়াআড়ি বয়ে যাওয়া নদীকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলে তারা।

যেতে যেতে ইতিপূর্বে অদেখা ও নাম-না-জানা একটি গাছ দেখতে পেয়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় অঙ্গদ। তার কান্ডে সে সস্নেহে হাত বুলিয়ে জানতে চায়, ‘মনে হইতেছে পূর্বে এই বৃক্ষ আমি কোথাও দর্শন করি নাই। তোমরা কি পরিচয় দিতে পার ইহার?’

মনেশ সবিনয়ে জানায়, ‘রাজন! ইহা সাঁই গাছ। কেহ কেহ ইহাকে তপন-তনয়াও বলিয়া থাকে। তবে শমীবৃক্ষ নামেই ইহা অধিক পরিচিত।’

‘শমীবৃক্ষ!’ অঙ্গদ কান্ডের গায়ে দন্ডবত করে বলে, ‘এই সেই বৃক্ষ, যাহার কাষ্ঠ যজ্ঞাগ্নিতে ব্যবহৃত হয়।’

পারিষদরাও মাথা নত করে।

অঙ্গদের নজর থাকে সব দিকে, সব কিছুর প্রতি। কোনো কিছুর ব্যাপারে জানারও তার বিরাম নেই, শেষ নেই। জগতের প্রতিটি জীব ও বস্তুকে সে সমান গুরুত্বের চোখে দেখতে চায়। আর এই প্রচার তথা পরিভ্রমণকালে কত জায়গায় যে তাকে থমকে যেতে হয়! দাঁড়িয়ে পড়তে হয় কত অজানাকে জানার জন্য, কত পরকে আপন করার মহৎ সাধনায়। যদিও, অঙ্গদ মনে করে, জীবকুলে পর বলে কেউ নেই, কিছু নেই। সবাই তার আপন। এক আত্মা হইতেই সৃষ্টি সকল জীবের।

নুড়িপাথর মাড়িয়ে, পায়ে পায়ে মন্থর স্রোত ভেঙে, স্বচ্ছ জলে সুন্দর জলধ্বনি সৃষ্টি করে, তারা যখন দূরবর্তী ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়, তখন জলাভূমিতে চরতে থাকা একপাল পাখি হদহদ করে উড়ে গেল। ঘাটে তখন ঘুগি এড়ে বসেছিল এক শবর পুরুষ। অঙ্গদ তার দিকে এগিয়ে তার কুশল সংবাদ নেয়। মনে পড়ে যায় তার নামও। পুইউ শবর। জগদ্দর্শনকালে অঙ্গদ তার ঘরেও গিয়েছিল, খবরাখবর নিয়েছিল তার জীবন-জীবিকার।

পুইউ শবর, তার বউ ধলামণি শবর, আর তাদের একটিই মাত্র সন্তান রবি শবর বছর আড়াইয়ের গুড়গুইড়া! সে তখন ঝাঁটা বানানোর জন্য ফালি করে রাখা কঞ্চিরগোছা পেটের কাছে চেপে সারা আঙিনায় রোদের মধ্যেও ছুটে বেড়াচ্ছিল। যদিও, তাকে দেখে বা সেই পরিবারের মানুষজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, একটিবারের জন্যও নিজের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতিচারণ করেনি অঙ্গদ, অথবা করলেও তার সেই অতীত জীবনের তরে তাকে বিলাপ করতে দেখা যায়নি। কে জানে, হয়তো বহু বহু বছর আগেকার তার সেই জীবন স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে কবেই।

আত্মা যেভাবে পুরাতন বস্ত্রের মতো দেহকে পরিত্যাগ করে, সেদিনের সেই অঙ্গদও তেমনিভাবেই পরিত্যাগ করেছে আপন প্রাচীনত্বকে, জীর্ণতাকে, অহংকেও। ত্যাগের ভেতর দিয়ে জন্ম হয়েছে এক নবীন জীবনের। বলা যায়, তার এই জন্ম জ্ঞানের ভেতর দিয়ে, আর সেই জ্ঞানের মহৎ আধার মহাপ্রবীণই তার জন্মদাতা। তার পিতা, তার মাতাও। এই অঙ্গদ তাই স্বতন্ত্র এক সত্তা। সে এখন আর কোনো ব্যাধের সন্তান নয় সে পরিপূর্ণ একটি মানবরূপ। সে বেদবিদ্যা অধ্যয়নকারী পন্ডিত, প্রাজ্ঞ ও দার্শনিক। যে দার্শনিক-পুরুষ জীবনের সঙ্গে জীবনের অবিরাম আদান-প্রদান ও ঘর্ষণের ভেতর দিয়ে জীবনের চিরকালীন সৌন্দর্যের অন্বেষণ করে চলেছে। প্রজ্জ্বলিত করতে চাইছে জ্ঞানশলাকা। তার এই পরিব্রাজন, এই ভ্রাম্যমানতার ভেতর দিয়ে অঙ্গদ জেনেছে অন্ধকার বিনাশী এই জ্ঞানই সুন্দর, সৌন্দর্যই জীবনের মানিক্য, জীবনের প্রাণ। সৌন্দর্যই অহিংসা, সৌন্দর্যই শান্তি। সে জেনেছে মানবচর্চাই জ্ঞানচর্চা। সে-কারণে জগদ্দর্শন, মানবদর্শন, কর্মদর্শন তার থেমে নেই। থেমে নেই তুচ্ছতার ভেতর দিয়ে মহৎকে পাওয়ার অমলিন আনন্দ-অভিযানেরও।

আজ পুইউ শবরকে কাছে পেয়ে অঙ্গদের মনে পড়ে গেল সেদিন শবর দম্পতির হাতে বোনা মাছধরা ঘুগিগুলি দেখে কি অবাকই না হয়েছিল সে! জলে ভিজিয়ে রাখা তৃণের শিস দিয়ে বোনা একটি হাত-দেড়েক লম্বা ঘুগি সে বারে-বারে উলটে-পালটে দেখছিল, আর বিস্মিত হচ্ছিল তার বুননের নৈপুণ্যে ও নিখুঁত কারিগরি কৌশলে। শুধু মাছ কেন, এমন ঘুগির ভেতরে সাপ ঢুকে পড়লেও তার পক্ষে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। সেদিন প্রাকৃতজনের মস্তিষ্কে প্রযুক্তিগত অমিতমেধা ও লক্ষ্যবধের দুর্লঙ্ঘ্য শক্তির আঁচ পেয়েছিল সে। অঙ্গদ যখন সেটা পরখ করতে তার হাতটি ঘুগির ভেতরে ঢোকাতে যায়, অমনি পুইউ শবরই তাকে নিষেধ করে বলেছিল, ‘মহাত্মন, আর অধিক দূর যাইবেন না, কৌতূহল সংবরণ করুন, নচেৎ বিপদে পড়িবেন। নিছক কৌতূহলবশত হাত ঢুকাইলে তাহা বাহির করা দুষ্কর হইবে।’

অঙ্গদ নিজেকে নিরস্ত করেছিল। তার মনে হয়েছিল, এই অতীব দরিদ্র ব্যাধ পুরুষটির মাধ্যমে সে বুঝি মহাপ্রবীণের দর্শন পেল, শুনল তাঁরই অব্যর্থ নিষেধ-বাণী। উপরন্তু তার এটাও মনে হয়েছিল, ‘সম্পদে সে দরিদ্র হইতে পারে, কিন্তু লোকবিদ্যায় সমৃদ্ধ।’

অঙ্গদের এতদিন ধারণা ছিল যে, মাহালী সম্প্রদায়ই বাঁশের ফালি থেকে সকল প্রকার ব্যবহার্য সামগ্রী তৈয়ার করে থাকে, এমনকি ঘুগিও তারাই করে। কিন্তু সেদিন সে জানতে পারে, মাহালী কেবল কুলা-ঝুড়ি বোনার কাজ করে, ঘুগি বুনতে তারা জানে না।

বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের বিশেষ বিশেষ কাজে এই কারিগরি দক্ষতা তাকে যেমন ভাবিয়ে তুলেছিল, তেমনি তার নিজস্ব জ্ঞানের দৈন্যও তাকে আবারও নিজের কাছে নিজেকে লজ্জিত করে তুলেছিল। আত্মাজ্ঞতাকে কবুল করে, মনে মনে সে স্মরণ করেছিল মহাপ্রবীণকে, বলেছিল, ‘হে সর্বজ্ঞ! আমার অহংকে চূর্ণ করো, আমাকে আত্মদর্শী করো!’

পুনড্র পেরিয়ে আরো ক্রোশ খানেক পথ পায়দল করার পর তারা ঢুকে পড়ে জঙ্গলে। নদী যেদিকে মোচড় দিয়ে ঘিরে ধরছে বিশাল এই অরণ্যকে, সেই অভিমুখে হাঁটতে থাকে তারা। সারি সারি হরীতকী-তমাল, কোথাও কোষ্টা বৃক্ষের খেত, পথের ধারে বিচ্ছিন্ন বচ, আর ধঁপে-ধঁপে ফুটে থাকা বুনো ফুল। বাতাসে সেসব ফুলের গন্ধ, অর্জুন-কুসুমের আনত শাখায় চাকভাঙা মধুর গন্ধ, পাখির বিষ্ঠার গন্ধ নিয়ে রাগিণীর মতো বেজে উঠছে। মগডালগুলিতে চিটিং-পিটিং নাচছে কত মুনি-মুনি এইটুকুনি পাখি।

ওরা হাঁটতে থাকে। অরণ্যের সীমান্তের দিকে। অতঃপর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পুনরায় সেই নদীর মুখোমুখি। সেই পুনড্র। এখানে নাব্যতাহীন নদীকে ডিঙিয়ে এবার তারা ওঠে একটি হরিজন গ্রামে। শেওড়া গাছের পাশ দিয়ে যেতে যেতে, পারিষদরা শিঙ্গা বাজিয়ে অতিথিদের গ্রামে আগমন জানান দেয়।

শিঙ্গার শব্দ পেয়ে পিছু ঘুরে তাকায় উলঙ্গ একটি শিশু। মুহূর্তকাল থেমে, সবার আগে-আগে জম্বুকের মতো সে রুদ্ধশ্বাসে যুদ্ধের খবর দিতে লোকালয়ের দিকে ছুটে যায়।

১৪

খেতে এখন দুধভরা ধান। বাতাসে ধানের মিষ্টি গন্ধ। বেলা ডুবতে না ডুবতে খেত সন্নিহিত বায়ুমন্ডলে উড়ছে যত ধেনো পোকা, হালি কীট-পতঙ্গ। খেতে পড়ে থাকা ধান রোদ পেয়ে আরেকটু ঝুনঝুনে হলে পরে আঘন থেকে কাটাই শুরু হয়ে যাবে। যে-যার গো-শকটে শস্য বোঝাই করে গ্রামবাসীরা নিয়ে যাবে খামারে। তারপর ধান পিটা, ধান ঝাড়া, রাস্তা জুড়ে বড় পাকানো। সেই ধান আবার মরাইয়ে বাঁধা, আর গাদাবন্দি হয়ে থাকা খড়ের আঁটি চাকি কিংবা বাংলা গাদা করে কোঠাঘরে, খামারে, আঙিনায় হোড় করে রাখা।

খামার নিকানো থেকেই গ্রামবাসীদের মন ফুর্তিতে রিংরিং করতে থাকে। শুরু হয়ে যায় পরবের মাতন। কোথাও খুঁকড়া লড়াই, কোথাও ডাঁইড়-ঝুমুর-খেমটি নাচের আসর, আর কোথাও রাতভর ঝাঁ-গ্যাজাঘ্যান ছৌনাচ! তখন বঁধুয়ার তরে মন কাতর হয়, কথায় কথায় কত রঙের ঝুমুরের কলি বেরিয়ে আসে। হয়তো কোথাও, শুয়োরের পালের সঙ্গে পুকুরের ধারে ধারে জলাভূমি থেকে কেশর২ খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে সদ্য যৌবন নিয়ে আসা কোনো বাগদি কন্যা, এখনো তেমন করে তার উরজকলিও ফোটেনি, তবু গো-পালক যুবকের চোখের আদিরসাত্মক ইঙ্গিতে ভয় পেয়ে সে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে সরে রাহেড়-গাজাড়ে গিয়ে ঢুকল। অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝুক না বুঝুক, তাকে উদ্দেশ করে সেই প্রেমসন্ধানি চৌখস যুবক আপন মনে গেয়ে উঠল :

যে-পথে পিরিতি আইল সেই পথে ফিরে গেল

আসা-যাওয়াই জীবন শুকাল

অমৃত ভুবন মোর গরল ভেল...

পাটন যদিও গামছায় গাঁট বেঁধে রাখা গুড়-চিঁড়ার মতো মনের অন্দরে জব্দ করে রেখেছে তার সকল কাতরতা ও বিরহবোধ। কোনো কিছুই এখন আনুপূর্বিক ভাবনা নিয়ে তার মনে উদয় হয় না। সে দূর ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে পারে না। চারপাশের প্রকৃতিকে দেখেও এতটুকুও আকুলতা জাগে না তার। নিয়ে-দিয়ে কেবলি মনে হয় কত-কত প্রহর, দিন, কত-কত মাস বছর অতিক্রান্ত হল! পেরিয়ে গেল কত ঋতু। এখনো মুষ্টি-অন্ন সংগ্রহের অভিযান শেষ করে উঠতে পারেনি সে। অঙ্গীকারবদ্ধ এই কাজ যথাযথ সম্পন্ন করে তবেই তো সে ফিরে যাবে মাঠারি? তার আগে নয়। মাঠারি থেকে আজও কত যোজন ফারাকে রয়ে গেছে সে। নেহাতই কপালের ফের!

যুদ্ধকে স্বীকার করে নিয়েছে সে। জারমণির ইচ্ছাকেও মান্যতা দিয়েছে। এখন ধাপে ধাপে সব আয়োজন করে তাকে এগিয়ে যেতে হবে। তারপর আবার সেই প্রজ্জ্বলিত মশাল হাতে নিয়ে দু-পক্ষের বৈঠক—ধনুর্ধারীদের নিয়ে কত-কত গো-শকটের তালে-বেতালে ছোটাছুটি। অবশেষে দু-অঞ্চলের মানুষের বাক-বিতন্ডাপূর্ণ আলোচনায় স্থির হবে আসন্ন মহাযুদ্ধের দিনক্ষণ। চলতে থাকবে আনুষঙ্গিক কাজকর্মও। সেসব ভাবতে গেলে ছত্রিশ কান্ডের মাঠারিপর্ব!

পাটন এখন তা ভাবতে চায়ও না। বহু-বহু দিন ধরে পূর্বাঞ্চলের গ্রামগুলিতে ঘুরতে ঘুরতে, বহু বৃষ্টিবাদলা-ঝড় আর ঋতুর সান্নিধ্য নিয়ে মাঠারিযুদ্ধের স্বপক্ষে গ্রামবাসীদের উদবুদ্ধ করতে করতে, এখন একটু যেন থকিত এসে গেছে তার। হয়তো সে-কারণে, দন্ড দুইয়ের তরে, যুদ্ধের কথা বাদ দিয়ে মাঠারির কথা ভাবতেই ইচ্ছে হচ্ছে পাটনের।

বাঁশের ঢাউস ছই-ঢাকা বৃষ-শকটের পাশে চাকায় হাত রাখে, কোনো চুর্চূ-করম-জিলপি গাছের তলে সঙ্গীসাথীহীন একা দাঁড়িয়ে, সে বারেক কল্পনায় দেখতে চায় মাঠারির দিগন্তহীন ক্ষেত্র যার কিনার জুড়ে বহু প্রাচীন বিস্তীর্ণ জঙ্গল, মস্ত-মস্ত টিলা। হাজারো পাক-পাখুড়, পতঙ্গ, সরীসৃপ আর কত-কত সুমিষ্ট ফল ও সুগন্ধী ফুলে শোভিত মর্ত্যের এই স্বর্গভূমি। এখানেই সংঘটিত হতে চলেছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই যুদ্ধ। শত-শত, হাজার-হাজার প্রতিপক্ষ, তির-ধনুক-পরিঘ-টাঙি-বল্লমে সুসজ্জিত হয়ে, এই রণাঙ্গনে পাটনের দলের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। পরস্পরের হানাহানি চলতে থাকবে অনির্দিষ্টকাল ধরে—যতদিন না পাটন-পক্ষের পূর্বাঞ্চলীয় যোদ্ধারা পশ্চিমাদের নির্মূল করছে, অথবা অঙ্গদের দল পূর্বাঞ্চলীয় বর্বরদের ঘিরে ধরে, চুনে চুনে, প্রত্যেককে এই মাঠারিভূমিতেই অস্ত্রবিদ্ধ করে ধরাশায়ী করছে, আর শত্রুপক্ষের কবল থেকে অলৌকিক সুন্দরী তথা চিরযৌবনা জারমণিকে ছিনিয়ে নিয়ে দখল নিচ্ছে এই স্বর্গলোকের। সেই দিন থেকে সে-ই হবে এই অঞ্চলের অধিপতি। কোনো পূর্বাঞ্চল-পশ্চিমাঞ্চল নয়—দুই অঞ্চল মিলে তখন সে-ই হবে অখন্ড মাঠারির রাজা। এক সত্য, সমদর্শী, অহিংস ও উদার নৃপতি।

এভাবেই, মাঠারির কথা মানে শেষতক সেই জারমণিরই কথা। সে মনে করে জারমণি আছে বলেই তার জীবনে এই স্বর্গভূমি আছে, আছে বাতাসে পুষ্পের সুগন্ধ, ভৃঙ্গারিকা ও পাখিদের কলরব, পুষ্করিণীতে মৎস্য ও মরাল-মরালীর সন্তরণ, আর মাঠারির ওপরে ঢাউস আকাশের গায়ে জারমণির মহাস্তনের ন্যায় এক রূপালি চাঁদ, যা প্রেমের গৌরব, যা স্পর্শেরও অতীত। মাঠারির আদিম অধিপতি হয়েও যার দিকে সে হাত বাড়াতেই পারল না। এত পৌরুষ আর ভীমদেহ নিয়েও জারমণির পাশে নিজেকে তার বামন মনে হয়। বিশেষত, যে-মুহূর্তে জারমণির ঠোঁটে সে প্রতিভাত হতে দেখে তার প্রতি উপহাসের অতি ক্ষীণ হাসি।

জারমণির সেই মুখ কল্পনায় দর্শন করতে চায় না পাটন। সে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে চায় এমন এক চিত্রপট, যেখানে সে তার মনশ্চক্ষুতে দেখতে পায় বিদেশ-বিভুঁইয়ে ভ্রমণরত পাটনের লাগি কতই না উদবেগ ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে জারমণির। কাজে তার মন নেই, আহারে তার রুচি নেই, নিদ্রার জন্যও অমন যৌবন-দ্যুতিময় অঙ্গ তার বিবশ হয়ে নেই। প্রহরে প্রহরে জাগরণ নিয়ে, জল পর্যন্ত স্পর্শ না করে, সে অধীর অপেক্ষায় রয়েছে পাটনের। সারা দিনমান সে অরণ্যে বিচরণ করছে, আর একেকদিন রতিগড় টিলার ভৃগুভূমিতে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকছে সেই পথের পানে, যে-পথ দিয়ে অগ্নিদন্ড হাতে মাঠারি থেকে একদিন চলে গেছে পাটন, যে-পথ ধরে ফিরে আসবে সে আবার। তাকে দেখতে না পেয়ে, তার বিরহে, হতাশায়, কিংবা দুর্ঘটনাজনিত দুশ্চিন্তায় সে তার অঙ্গ থেকে কাষ্ঠনির্মিত আভরণগুলি একে-একে নিক্ষেপ করছে ধরার ধূলায়! তার বালা, অবতংস, নাসিকাভূষণ। তারপর, পাটনের তরে ক্রন্দনরত সে নারী একদিন আকস্মিকভাবে দেখবে সেই শকট ক্রমশ মাঠারির অভিমুখে ধাবমান! দেখবে গাড়োয়ানের আসনে সেই বীর, সেই পাটন, বহু মানুষের যোদ্ধৃ হওয়ার প্রতিশ্রুতি স্বরূপ মুষ্টি-অন্ন নিয়ে বৃষ-শকট চালিয়ে ফিরে আসছে তার কাছে। আর টিলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে, উর্ধললাটে, মুক্তকেশী জারমণির দিকে তাকিয়ে, দক্ষিণ হস্তে মশাল ধারণপূর্বক সদর্পে হুঙ্কার ছেড়ে বলছে, ‘রানি! অবশেষ অযুত মুষ্টি-অন্নে আমার শকট পরিপূর্ণ করে আনতে সক্ষম হয়েছি। বহু-বহু সৈন্যবল সংগঠিত করেই আবার আমি ফিরে এসেছি তোমার সমীপে। মাঠারিকে শত্রুপক্ষের আগ্রাসন থেকে রক্ষার কারণে, ওই বৃদ্ধ কুচক্রী মিষ্টভাষী পন্ডিতম্মন্য ও তার ছদ্মবিনয়ী দলবলকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার কারণে, এবং সর্বোপরি তোমার—তোমার—তোমারি কারণে সতেরোশো বাইশ (পাটনের মনগড়া সংখ্যা) গ্রামের অযুত লক্ষ নিযুত গ্রামবাসীকে এই যুদ্ধে ধনুর্ধর করতে সমর্থ হয়েছি আমি। তোমার সুখের কারণে জয় আমি চাই! তোমার দুঃখাবসানের কারণে জয় আমি চাই! রানি, তুমি আমাকে অনুপ্রাণিত করো—যুদ্ধে আমার জয় অবধারিত মেনে নিয়ে তোমার সুলোলিত কন্ঠস্বরে শুধু একবার আমাকে আগাম জয়ী উচ্চারণ করো!’ এই অব্দি ভাবার পর, পাটনের মনে হয়, কেন আমি এভাবে প্রতারিত করছি নিজেকে? কিসের এত বারফট্টাই? সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে থাকে তার সঙ্গীদের। বলে, ‘হে বলদেব বাউরি, মলকান মাহাত, বরজু মন্ডল! চলো, বিশ্রামে আর কাজ নাই। বরং কুমহার-মালহারদের গ্রামগুলিতে ঢুকে পড়ি! আগে তৃষ্ণা নিবারণ করি, পেট-পূজন করি, বাদে যুদ্ধের কথা।’

আর এই ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা স্মরণে আসতেই, তার মনে পড়ে গেল কয়েক মাস আগের মণিহারা গ্রামের একটি ঘটনা। যা অবাস্তব অলৌকিক হওয়া সসত্ত্বে এখনও তাকে সে বাস্তবোচিত বলে মনে করে। মনে করে তা মোটেই কোনো স্বপ্ন নয়, জারমণিকে নিয়ে তার খিল-আঁটা মনের বিভ্রমেরও প্রকাশ নয়। কী সেই ঘটনা?

অপরাহ্নবেলায় পাটন সারা শরীরে ভ্রমণজনিত ক্লান্তি আর দুর্দমনীয় পিপাসা নিয়ে জলের সন্ধানে সম্মুখের কোনো জনপদের দিকে এগিয়ে চলেছিল। রোদে, গরমে মহীতল পুড়তে বসেছিল তখন। জলাশয়গুলি শুষ্ক, কোথাও তৃণগুল্মের লেশমাত্র নেই, ঠায়ে লোকবসতিরও চিহ্ন চোখে পড়ে না। তার যাত্রাপথও সুনসান। ছাতা কিংবা ঘঙপাতা মাথায় পথিকের চলাচল নেই। নি:সঙ্গ পাটন ভুরুর ওপরে হাতের ছাউনি রেখে, দেখতে দেখতে, দীর্ঘপথ এগিয়ে চলেছিল বসতির খোঁজে।

একদা শস্যহীন খেত আর উঁচু-নীচু পাথুরে ডাঙাগুলি থেকে অনেকটা তফাতে সে দেখতে পায় একটি ছোট্ট, নিবিড় বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চল, যা সেই দাবদাহের মধ্যেও দূর থেকে চিরহরিৎ দেখাচ্ছিল। তার মনে হল, নিশ্চয় সেটা কোনো সাঁওতালপল্লি। সেখানেই উলঙ্গ-প্রায় কোনো আদিবাসী রমণীর কাছে সে তার পিপাসা নিবারণার্থ বারি ভিক্ষা করতে পারে। এমনি সময়ে, যখন মাথা তার ঝিমঝিম করছিল, সে একটি কাঁঠাল গাছের নিবিড় ছায়া দেখতে পেয়ে শকট থেকে নেমে বসে পড়েছিল তার বৃক্ষমূলে। অবসাদজনিত কারণে ও সুপক্ক কাঠালের মিষ্ট ঘ্রাণে অচিরেই তন্দ্রা এসে গিয়েছিল, ঘুমিয়ে পড়েছিল বীরবাহু।

কাল অতিক্রান্ত হলে, পাটন তার পুরুষ শরীরে রমণীর কোমল হস্তের পরশ পেয়ে শিহরিত ও নিদ্রোত্থিত হয়। দেখে মৃদু হাসিতে ওষ্ঠ আলোকিত করা এক বামোরু! ফুরফুর করিয়া উড়িতেছে তার কেশরাশি। মাটির মটকায় শীতল জল নিয়ে, কটিদেশ উন্মুক্ত রেখে, সে তার পদপ্রান্তে বসে আছে। তার চোখের শিল্পীত টান, ধনুকের মতো ভুরু, আর হট্টবিলাসিনী হেন চটুল কামুক চাহনি দেখে, সেই ঘটোধ্নীকে সে জারমণি বলেই ঠাওরেছিল। বলে উঠেছিল, ‘হে ঘটোধ্নী, হে আমার হৃৎস্পন্দন, আমার জারমণি! আমি কুড়িগন্ডা নিশ্চিত ছিলাম সহস্র প্রতিকূলতায় বিধ্বস্ত আমার এই অসম্ভব জীবন হইতে তুমি আমাকে ফিরাইয়া লইতে আসিবেই আসিবে। নিভাননী, তুমি আমার স্বপ্নমেধার দৈন্য অনুভব করিয়া আমার চেতনা জাগ্রত করিয়া বলিবে, চলো-চলো-চলো নাগর! যুদ্ধে আর কাজ নাই। যুদ্ধ তো নিছকই গ্রাম-গৃহ-বসতি উজাড় করিয়া প্রাণের বলিদান! চলো, ফিরিয়া চলো! মনে করো, তুমিই জয়ী। নারী যার পক্ষে জয় তো সেই পুরুষের!...মন করো, আপন সহোদরকে তুমি ক্রীতদাস করিয়াইছো। মাথায় সাতমণের মস্ত ঝুড়ি চাপাইয়া দিয়া তুমি তাহাকে ক্রোশ দূরবর্তী শিশ্মল অরণ্যে তুলা সংগ্রহে পাঠাইয়াছো আমার লাগিয়া কোমল বালিশ বানাইয়া দিবে বলিয়া। মনে করো, এই মাঠারি রাজ্যের তুমিই অমিত বলশালী, তুমিই সকল সম্পদের অধিকারী, তুমিই অরণ্য-প্রজাতির দলপতি। সুন্দরী কামাগ্নি নারী যার শয্যাপার্শ্বে, অন্য সকল ভূধর সম্পত্তি যে তার কাছে নিছকই অকিঞ্চিতকর, তুচ্ছ। কোটি একরের ভূস্বামীও তার তুলনায় ভিখারি রাঘব।...আমি জানি, আমি জানি, মানবী, তোমার হৃদয়তন্তুতে আমারই রাগ বাজিতেছে! নারী, তোমা-বিনে প্রভাত আমার প্রভাত নয়, যামিনী আমার দৈত্যসম, কামচিন্তা গদাঘাত! আমি জানিতাম, আমার অবর্তমানে রতিগড়ে মেঘরাশির ন্যায় যে মহাভার নৈ:শব্দ্য নামিয়া আসিবে, তাহা তোমাকে বিচলিত করিবে! ভৃঙ্গপক্ষির ন্যায় তোমার চক্ষুযুগলের পানে চাহিয়া আমি বুঝিয়াছিলাম—আমার ন্যায় ধন্বী তথা দোর্দন্ডপ্রতাপের অনুপস্থিতি হেতু যে-শূন্যতা তামাম মাঠারি ঘিরে মধুমক্ষিকার পারা সদা ঘুনঘুন করিবে, তাহা তোমাকে উত্তরোত্তর ভয়ার্ত ও অসহনীয় করিয়া তুলিবে, পুরুষের অদর্শনে পুরুষের তরে তোমার কামনা জাগিবে! যেভাবে রাত্রি জাগে একাকী। আমি জানিতাম!...’

‘কিন্তু আমি তো জারমণি নই?’

‘তবে কে তুমি, নারী? তুমি কি প্রেতচ্ছায়া? তুমি কি আমার বিভ্রম? মায়া তুমি?’

‘আমিই তোমার ত্রাতা। সহস্রাধিক বৎসরকাল অবধি তোমার অন্তরে পুষে রাখা তোমার সকল তৃষ্ণার কেবল আমিই উপসম ঘটাইতে পারি। লও, এই বারি পান করো! তুমি অনতিবিলম্বে শীতল হইবে।’

‘হায়, শীতলতা!’ মর্মস্থল থেকে এই খেদ উঠে এসেছিল পাটনের। হয়তো, তার মনে হয়েছিল, যে-অগ্নিকে যুগ-যুগ ধরে সে বহন করেই চলেছে তার বুঝি আর কোনো দিনই নির্বাপণ সম্ভব নয়। তাকে এভাবেই তার অন্তরে আগুনের মালসা বয়ে নিয়ে যেতে হবে। তা থেকে কবে যে তার মুক্তি সে জানে না। অধিকন্তু, তার মনে হয়, জারমণি বিনে অন্য কেউ তাকে মুক্তি দিতে পারে না। অন্য কেউ তার ত্রাতা হতে পারে না। পাটন বিরক্ত হয়ে এই নারীকে প্রত্যাখ্যান করে। বলে, ‘তুমি মটকা লইয়া ফিরিয়া যাও, ছুছুন্দরী! আমাকে থাকিতে দাও আমার বহুবর্ষপ্রাচীন পিপাসা লইয়াই।’

‘হে ব্যাধনন্দন, আমাকে কটুবাক্য উচ্চারণপূর্বক প্রত্যাখ্যান করিয়া তুমি পালনীয় কর্ম করিতেছ না। মনে রাখিও, নারীকে প্রত্যাখ্যান করিলে পুরুষের ধ্বংস অপ্রতিরোধনীয়।’

‘তবে তুমিও কি আমার ধ্বংস কামনা করো?’

‘হে বীরদেহী, যদি প্রকৃত সত্য জানিতে চাও, তবে নিবেদন করি আমি তোমার ধ্বংস নহে, তোমাকেই কামনা করি। এই নির্জন বৃক্ষচ্ছায়ে তোমার সুপ্ত মহাশরীর ও তার উত্তেজনা উদ্রেককারী ভঙ্গিমা দর্শন হেতু তোমার প্রতি আমার প্রগাঢ় লিপ্সা জাগিয়াছে। আমার এই পয়োধরযুগল—যাহার আকার-আয়তনের কারণে তুমি আমাকে ঘটোধ্নী বলিয়া সম্বোধন করিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধান্বিত হও নাই—তোমার ওই বলিষ্ঠ হস্তমর্দন কামনা করিতেছে। সেই হেতু, তোমাকে এমন রৌদ্রে এই বিটপীমূলে একাকী শুইয়া থাকিতে দেখিয়া আমি বারি প্রদানের অছিলায় তোমার জৈবিক সান্নিধ্য উপভোগ করিতে আসিয়াছি।’

তার এই কথা শুনে পাটনের স্মরণে এল তার উদ্দেশে জারমণির সতর্কবাণী। পাটন যখন শকট নিয়ে বিদায়ের জন্য প্রস্তুত, জারমণি তখন বলেছিল :

‘আমি জানি, তুমি একাগ্রচিত্ত হবে। জয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্যুত হবে না কখনো। অযুত মুষ্টি-অন্নে তুমি তোমার শকট পরিপূর্ণ করে আনতে সক্ষম হবে। আমি এও জানি, ভিনদেশে পরিভ্রমণকালে যে-কোনো প্রলোভন অথবা যে-কোনো ছদ্দবেশে বিপদ আসুক না কেন, তুমি তার থেকে নিজেকে মুক্ত ও উত্তীর্ণ করতে ব্যর্থ হবে না। তোমার বৃষস্কন্ধে নারীর আকর্ষণ!’

পাটন রমণীকে আবারও প্রত্যাখ্যান করে বলে, ‘আমি ভিন্ন এক নারীর কাছে প্রবাসকালে অপর নারীর সংসর্গ না করার ব্যাপারে বাকবন্দি হইয়া আছি। আমি তাই তোমার রূপের প্রশংসা করিব না, তোমার প্রতি আমার লোলুপতা প্রকাশ করিব না, তোমার সুডৌল বাহু, বল্মিক-উচ্চ স্তন মর্দন কেন—তাহা স্পর্শ পর্যন্ত করিব না, এমনকি, তোমার মৃন্ময় কুম্ভ হইতে বারি গ্রহণে তোমার প্রতি আমার কাম জাগ্রত হইতে পারে বলিয়া আমি তাহাও পান করিব না। নারী, তুমি ফিরিয়া যাও!’

অতঃপর সেই রমণী কিয়ৎক্ষণ কোনো কথা না বলে ক্ষীণ হাসি ঠোঁটে নিয়ে তাকিয়েই থাকল পাটনের দিকে। পাটন তাতে বিব্রত বোধ করে। রমণী বলে, ‘হে পুরুষ, তুমি মিছাই প্রতিশ্রুতি পালনের কথা বলিয়া নিজেকে প্রতারিত করিতেছ। ভাবিয়া দেখো, তুমি ইতোমধ্যে আমার প্রতি আসক্ত হইয়া পড়িয়াছো, তোমার মুখে আমার অঙ্গের গুনগান তাহারই পরিচয়। অথচ, তুমি পণ করিলে আমার রূপকীর্তন হইতে তুমি বিরত থাকিবে। হা:! হায় রে পুরুষ! ধিক তোমার পণ, তোমার ছদ্ম প্রতিশ্রুতি। মনে রাখিও, সুন্দরী, যৌবনপ্রগলভা নারীর কাছে যে-কোনো পুরুষ আদর্শচ্যুত হয়, আর তাহার কাল্পনিক ধনুর্ভঙ্গ পণও অসার ও হাস্যাস্পদ প্রতিপন্ন হয়!’

‘নারী! তুমি আমাকে বিরক্ত করিতেছ।’

‘আমি আপনাকে কিছুমাত্র বিরক্ত করি নাই। যাহা চিরকালীন সত্য তাহাই সততার সঙ্গে উপস্থাপিত করছি। যে-মানুষ সত্যকে স্বীকার করিতে পারে না, সে দুর্বল, ভীরু, কাপুরুষ।’

‘বাক সংযম করো, বামা! তুমি পুরুষের কাছে তোমার কাঙ্খিত মর্যাদা পাইলে না বলিয়া ক্ষুব্ধ হইয়াছ। ক্ষোভ সংবরণ করো!’

‘আপনি ক্রোধ সংবরণ করুন। সন্ধুক্ষিত হইবেন না। মনে রাখিবেন, প্রকৃত পুঙ্গব কখনোই নারীর কাছে আস্ফালন করে না।’

‘স্পর্ধিত হইও না নারী! তুমি আমাকে উপদেশবাণী শুনাইতেছ?’

‘যদি তাহা মনে করিয়া থাকেন, তবে তাহাই। পরিস্থিতিভেদে পুরুষকেও রমণীর উপদেশাবলির অনুবর্তিত হইতে হয়। তাহাতে ক্ষতি কী?’

পাটন এবার ধনুকে শর সংযোজন করে ক্রোধোন্মত্ত হয়ে চিৎকার করে, ‘তোমার প্রতি এই শেষ সতর্কবাণী আমার! তুমি আমাকে অসৎ, ভন্ড, দুর্বল যাহা নয় তাহা বলিয়া আক্রমণ করিয়াছ। আমাকে নির্বোধ জ্ঞান করিয়া উপদেশ দিতেছ। কিন্তু নিজে ভাবিয়া দেখ নাই যে, তোমার এই মোহ সৃষ্টিকারী অঙ্গ, রূপ ও যৌবনকে আমি অনায়াসে অবজ্ঞা করিয়াছি বলিয়াই তুমি হতাশ হইয়া আমাকে দংশন করিতেছ। সাবধান! তোমার উদ্দেশে আমার এই চরম সতর্কবাণী—তুমি যদি পুনরায় তাদৃশ বাক্য উচ্চারণ করো, তাহা হইলে তোমার যোনিদেশে আমার এই প্রবল ধনুষ্কোটি প্রবিষ্ট হবে!’

‘ধিক!’ এমন অমার্জিত দম্ভের কথা শুনে সেই সুন্দরী নিজের সংযম আর ধরে রাখতে পারে না। সে ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, ‘আপনিও আমাকে পুংশ্চলী জ্ঞান করিয়া অশ্রবণযোগ্য ভাষা ব্যবহার করিবেন না। এখন আপনাকে পুরুষ ভাবিতে আমার ঘৃণা বোধ হইতেছে। আপনার প্রতি সমুচ্চ ধিক্কার জন্মাইতেছে। কেবমাত্র দুর্বল ও অজ্ঞানী পুরুষই যোনিদেশে প্রতিপক্ষকে জব্দ করিতে ক্রোধকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করে। নারীকে চূড়ান্ত অবমাননা করিতে স্ত্রীলিঙ্গ তুলিয়া কথা বলে।’

‘উদ্ধতা নারী! এখনো সংযত হও!’

‘আপনি সংযত হউন আর শুনিয়া রাখুন আমার ভবিষ্যৎবাণী—স্ত্রীজাতির যোনি হইতেই এই আলো-অন্ধকারময় জগতের সৃষ্টি। স্ত্রীজাতির যোনিই মানব জীবনের সকল আনন্দ ও শোকের কারণ। প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষরূপে যোনিচিন্তা ও যোনিচর্চায় জগৎ মগ্ন। যে-পুরুষ সৃষ্টির আধারকে ধ্বংস করিতে উদ্যত হয়, সে যোনির অন্ধকারেই লীন হয়ে যায়। মনে রাখিবেন, আপনি কোনোদিনই আপনার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাইতে পারিবে না। আসন্ন যুদ্ধে পতন আপনার অনিবার্য!’

‘চন্ডালিনী! তবে এই দন্ডেই দেখিয়া লও কার পতন—’ বাস্তব জ্ঞানশূন্য হয়ে পাটন ছিলায় টান দিতেই দেখা যায় তার সেই মহাভার ও বিশালাকৃতির ধনুক থেকে না কোনো তির ছুটে গেল, না তার সামনে বিদ্যমান কোনো লক্ষ্যবস্তু। শুধু হাতে ধরা রয়েছে সেই ধনুকটি। চকিতে কোথায় গেল তার সম্মুখবর্তী সেই মুখরা নারী? পাটন বিস্মিত হল না। নিজের অহংভাব ও অযৌক্তিক আত্মবিশ্বাস থেকে সে ভেবে বসল তার তেজের যাদুকরী বলে সে-অধম রমণী ফুৎকারে উড়ে গেছে তাকে শরবিদ্ধ করার আগেই! সেই সঙ্গে এটাও সে সত্য বলে ধরে নিল যে, যে চলে গেল সে অন্য কেউ নয়, স্বয়ং জারমণিই। সে-প্রবলা, অকুতোভয়া, ছলনাময়ী। প্রলোভন দেখিয়ে সে তাকে পরীক্ষা করতেই আবির্ভূত হয়েছিল এখানে। পাটন তাতেও খুশি, এইভেবে যে, সেই মায়াবিনী হরিণীর পরীক্ষায় সে পৌরুষের সঙ্গে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে।

এই আত্মতৃপ্তি উন্মাদ করে তুলল পাটনকে। সে তার মহাধনু থেকে সুদূর মাঠারিকে লক্ষ্য করে শঙ্খচিল অধ্যুষিত আকাশে একটার পর একটা তির নিক্ষেপ করেই যেতে লাগল, আর জারমণির উদ্দেশে গগনভেদী কন্ঠে বলতে লাগল, ‘তুমিই আমার চাঁদমারি! তোমার অভিমুখে ধাবমান আমার প্রতিটি চুম্বিত শর তোমার চরণপ্রান্তে গিয়ে শিশুর তাল-গুড়গুড়ি শকটের ন্যায় নিশ্চল হবে। জানি, তুমি এখন রজস্বলা দশায়! আহা, বাতাসে সেই আমিষ গন্ধ আমি পাচ্ছি! এহেন শুভক্ষণে, আমার স্ত্রীগন্ধভেদী এই তিরসমুচ্চয়ই তোমার কাছে প্রেরিত আমার আনন্দবার্তা!

‘হে ছলনাময়ী, তোমার আশ্চর্য পরীক্ষায় আমি আশাতীত সফল। এই সাফল্যই আমার জয়। আমি জয়ী! আমি জয়ী! নারী, আমার সকল অপবাদ তুমি ফিরাইয়া লও, আর বিনাযুদ্ধে গ্রহণ করো আমাকে! আমার হাতের প্রজ্জ্বলিত মশাল তোমার সবল মুষ্টিতে ধারণ করিয়া, রতিগড় টিলার শীর্ষে দন্ডায়মানপূর্বক তাহাকে বিজয়কেতনের ন্যায় উড়াও, আর আমার অস্থিচর্মসার, জটাজুটধারী, ঘূণধরা পুঁথির পাতায় জীবন অন্বেষণকারী বদ্ধোন্মাদ সহোদরের উদ্দেশে তোমার চূড়ান্ত বয়ান দাও —হে অঙ্গদ, যুদ্ধের যবনিকা টান। যুদ্ধ নিষ্প্রোজন। আমি ইতোমধ্যে অর্জিতা! আমি প্রকৃত বীরের অঙ্কশায়িনী!’

সহোদরকে উপেক্ষা আর জ্ঞানের বিদ্যার অমর্যাদা প্রদর্শন করতে পেরে, রাক্ষসগণে জন্মানো এই নির্বোধ, আকাট, গন্ডমূর্খ কতই না খুশি! একহাতে শরের গোছা ও অন্যহাতে ধনুক নিয়ে, অম্বর পানে তার প্রসারিত বুক চিতিয়ে রেখে, পাটন, দন্তপ্রদর্শনপূর্বক বিজয়ীর হাসি হাসতে থাকে।

খেত থেকে পাক খেয়ে আসা ঘূর্ণি হাওয়ার ঝাপটানিতে ধুলো ও আবর্জনায় ভরে যায় তার লোমশ শরীর।

১৫

হু-হু করে বইছে পৌষের বাতাস। অঙ্গদের শরীরে কোনো শীতবস্ত্র নেই। কিন্তু তবু বিকার নেই তার। সহচরবৃন্দ প্রায় জোর করে তার স্কন্ধে একটি সুতো ওঠা জীর্ণ কাঁথা চড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘হে মহাত্মন, আপনি ইহা অবিলম্বে গাত্রে ধারণ করুন। অন্যথায় অসুস্থ হইয়া পড়িবেন। শীতের প্রকোপ উত্তরোত্তর বাড়িয়াই চলিয়াছে।’

‘কিন্তু আমি ত শৈত্যের প্রাবল্য ততটা অনুভব করিতেছি না। আমাকে তাহা অধিকতর কাতর করিয়া তুলিতে পারিতেছে না।’

‘ইহা কী প্রকারে সম্ভব?’

‘ইহা সম্ভব। কেন না, শৈত্যের প্রতি তিলেক মনোযোগও আমার নাই। আমি ভাবনায়, অনুভূতিতে সর্বথা নিজেকে একমুখী লক্ষ্যে ব্যাপৃত রাখিয়াছি। যে-কোনো কর্মে সিদ্ধি তখনই সম্ভব, যখন মনুষ্য সর্বত্যাগী হইয়া একের সাধনা করে। আদর্শে ও কর্তব্যে আস্থাভাজন হয়। তখন অপরাপর সকলই গুরুত্বহীন, তুচ্ছ ও অনগ্রগণ্য বোধ হয়।’

অঙ্গদের মুখ থেকে এই বাণী শুনে মনেশ প্রশ্ন করে বসে, ‘হে মহানুভব! আমাদের একমুখী লক্ষ্য কী?’

বন্দিলাল বলে, ‘যুদ্ধই কি একমাত্র লক্ষ্য?’

বনোয়ারিও কৌতূহলী হয়ে ওঠে। সে জানতে চায়, ‘হে মনুষ্যবর, আমরা কিসের জন্য যুদ্ধ করিতে চাহিতেছি? পূর্বাঞ্চলের আপামর মানুষদের বিরুদ্ধে আমরা সকল পশ্চিমাঞ্চলবাসীকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে বলিয়াছি। তবে তার কারণগুলির বিষয়ে পশ্চিমের দুই সহস্রাধিক গ্রামে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, সমতলে, মালভূমিতে বসবাসকারী মানুষদের অনেকের কাছে এ-যাবৎ তাহা স্পষ্ট হয় নাই। তাহা আরো পরিষ্কার করিয়া বলা প্রয়োজন। বলা প্রয়োজন যে, কী কারণে আমরা পূর্বাঞ্চলের অসংশোধনযোগ্য ও অক্ষম্য গ্রামবাসীদেরকে বিতাড়িত করিতে চাহিতেছি? তাহাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রধান প্রধান অভিযোগগুলি কী? এই কারণগুলি সম্বন্ধে আমাদের যেমন অবগত হওয়া দরকার, তেমনি আপনার এই ব্যাখ্যান সকলের কাছে পৌঁছানোও অত্যাবশ্যক।’

অঙ্গদ তার পারিষদদের কথা মন দিয়ে শোনার পর বলে, ‘ইহার যথার্থ জবাব দিতে আমি সামর্থ্যানুযায়ী চেষ্টা করিতেছি। আমার দ্বিধার কারণ এই যে, আমি সর্বজ্ঞ নই। যুদ্ধের ফলাফল তথা যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি বিষয়েও আমি এখনও সর্বাংশ নি:সন্দিগ্ধ হইতে পারিতেছি না। তথাপি বলা যাইতে পারে, আমাদের একমুখী লক্ষ্য হইল অসত্য ও অন্যায়ের গতিরোধ করা, যাহার সূত্র ধরিয়া আসিয়া পড়িতেছে শত্রু দমন। এই শত্রু দমনের নিমিত্তই সংগ্রাম।’

একথা বলার পরও, অঙ্গদ জানায়, ‘তবে ইহাও স্মরণে রাখা দরকার যে, যুদ্ধই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। কিন্তু ঘটনাচক্রে দুই অঞ্চলের মানুষের মন ক্রমে ক্রমে আজ যে-পরিস্থিতির সম্মুখীন হইয়াছে, তাহাতে উভয়ের কাছেই যুদ্ধ বিনা বিকল্প নাই। পুনরায় বলি, যেহেতু আমি নিজেকে সর্বজ্ঞ বলিয়া মনে করি না, সেই হেতু আমি যুদ্ধ অর্থাৎ শত্রুপক্ষকে হত্যার মধ্য দিয়া সকল সমাধানের কথা চিন্তা করার বিষয়ে এখনো সর্বাংশ স্থির-নিশ্চয় নই। তথাপি, মাঠারিকে এই মহাযুদ্ধের ভয়াবহতাকে সহ্য করিতেই হইবে, কারণ, দলগতভাবে উভয়পক্ষ মনে করিতেছে যুদ্ধের মধ্যেই উভয়ের সমাধান নিহিত আছে।’

মনেশ পালটা প্রশ্ন করে জানতে চায়, ‘হে মহাত্মন, আপনি নিজে যদি যুদ্ধের ব্যাপারে নিশ্চয় না হইয়া থাকেন, আপনি নিজে যদি মনে করেন যে যুদ্ধ কোনো সমাধানের পথ নহে, তাহা হইলে কেন এখনো আমরা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মধ্য দিয়া যুদ্ধ নামক মনুষ্যহত্যার আয়োজনকে বন্ধ করিতেছি না? অপিচ, ইহাও বিচার্য যে, কোনো একটি প্রদেশের সকল মনুষ্য কখনো কাহারো শত্রু হইতে পারে না। তাহা হইলে কেন তাহাদের উপর আমরা যুদ্ধের দায় চাপাইয়া দিতেছি? কেন তাহারা পরিস্থিতিগত কারণে আমাদের দ্বারা সৃষ্ট হত্যালীলার অসহায় শিকার হইবে? এমতাবস্থায়, আমরা যদি যুদ্ধে জয়লাভও করিয়া থাকি এবং মাঠারি দখল করিয়া থাকি, তবে সে-যুদ্ধ পাপাচারেরই নামান্তর। পাপাচার দ্বারা অধিকৃত লোহিতভূমিতে কখনো ধর্মরাজ্য গড়িয়া উঠিতে পারে না। পাপের বীজ কখনোই চিরতরে বিশুষ্ক ও মৃতপ্রাণ হয় না। একদিন না একদিন এমনকি পাষাণেও তাহার অঙ্কুরোদগম ঘটিবে। এ-বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যান শুনিতে আগ্রহান্বিত বোধ করিতেছি।’

অঙ্গদের অত্যন্ত প্রিয় সঙ্গী এই মনেশ। তার মুখের এই গভীর ও চিন্তাশীল প্রশ্নগুলি তাকে যেন অঙ্গদের আরো প্রিয়পাত্র করে তুলতে সাহায্য করল। বস্তুত, তার প্রশ্নসমূহ যুদ্ধবিষয়ে অঙ্গদকে নিরাশ ও উদ্যমহীন করার পক্ষে যথেষ্ট। এমনকি, এই প্রশ্নসমূহের উত্তর যে প্রত্যাশা করে, তার প্রতিও তার রুষ্ট হয়ে ওঠার কথা। কিন্তু বাস্তবে, অঙ্গদের আচরণে তেমন বিসদৃশ কিছুই ঘটল না। তার মহৎ ও উদার মন এই প্রশ্ন শুনে তাকে সর্বাগ্রে প্রশংসা করল, এই কারণে যে, অঙ্গদ মনে করে প্রশংসনীয় বস্তুর প্রশংসা না করাও পাপ, যেমন পাপ সামগ্রী ক্রয় করে বিক্রেতাকে ন্যায্য মূল্য না দেওয়া।

মনেশের প্রশ্নের জবাব ভাবতে গিয়ে অঙ্গদ টের পায় তার বিদ্যার দৈন্য। সে স্বীকারও করে যে, তার সবকটি জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়া এই মুহূর্তে সম্ভব নয়, ভবিষ্যতে কাবিল হলে সে দিলেও দিতে পারে। তৎসসত্ত্বেও আংশিক উত্তরে সে জানায়, ‘আসন্ন মাঠারিযুদ্ধ এখন সর্বাঙ্গীন ও সর্বজনীন হইয়া উঠিয়াছে। দিকে দিকে, গ্রামে গ্রামে আদিবাসী, অনাদিবাসী জাতি-উপজাতি, এমনকি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গোষ্ঠী-উপগোষ্ঠীতে বসবাসকারী অন্ত্যেবাসীরাও এই লড়াইয়ের নিমিত্ত নিজেদেরকে সবল ও প্রস্তুত করিয়া তুলিতেছে। সারা দেশময় মনুষ্যসকল এখন জানিবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছে যে, আপন-আপন গ্রামের মোড়লরা কখন এই যুদ্ধের তারিখসহ অন্যান্য সকল নিয়মরীতি ও বিষয় সম্বন্ধে জানকারি ঢোলশোহরত মারফত চাউর করিবে। এখন এই চূড়ান্ত মুহূর্তে আচমকা যুদ্ধের বিরতি ঘোষণা করা হইলেও, বহু বহু গ্রামে, পথেঘাটে যুদ্ধের নামে হত্যা, লুন্ঠন ও নানাবিধ অত্যাচার, অনাচারকে রদ করা যাইবে না। বিশেষ করিয়া পশ্চিমাদের নিরস্ত করা সম্ভব নহে। তাহারা পূর্বাঞ্চলবাসীদের দীর্ঘদিন যাবৎ অত্যাচারে এতটাই বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছে যে, এখন আর কোনো তুচ্ছ কারণে এই যুদ্ধ হইতে তাহারা পিছাইয়া আসিতে নারাজ।’

পূর্বাঞ্চলের মানুষ এখনও অনেকটা আদিম গোষ্ঠীবদ্ধ মানসিকতার জীবনযাপন করে থাকে। তাদের সম্পর্কে প্রায়শ বলা হয়ে থাকে যে, তাদের মন এখনও বর্বর ও অসভ্য। আর তাদের দ্বারা বহুকাল ধরে এই বর্বরতা ও অসভ্যতার শিকার হতে হয়েছে পশ্চিমাঞ্চলবাসীদের।

যে-বছর অনাবৃষ্টির কারণে সারা এলাকা ব্যাপী খরার প্রাদুর্ভাব ঘটে, সে-বছর পশ্চিমারা দলকে দল গ্রাম উজাড় করে পয়িযায়ী শ্রমিক হিসেবে গঙ্গানদীর তীরবর্তী নগর ও জনপদে সপরিবারে পাড়ি দিয়ে থাকে। সে-সময় হর-হামেশা পূর্বাঞ্চলের মানুষরা দুর্বত্তের মতো পশ্চিমাদের গ্রামগুলিতে চড়াও হয়। তারা তখন যা পায় যতটুকু পায় ধান-কলাই-চিড়ে, বাসনকোসন, হাঁস-মুরগি, শূকর, এমনকি হাল-কোদাল পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে দলবদ্ধভাবে এসে ঘর থেকে নিয়ে চলে যায়। শস্য তারা আত্মসাৎ করে কিন্তু গবাদি পশুগুলিকে রাতে-রাতেই দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে কোনো পশুহাটে অথবা বিহারের মুসলমান পাইকারের কাছে বিক্রি করে আসে।

শুধু তাই নয়, তারা পশ্চিমা যুবতীদেরকে খেতমাঠ থেকে, বন থেকে, কিংবা নির্জন নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে কাঁধে তুলে মাঠারি পেরিয়ে তাদের গ্রামে ঢুকে যায়। এমন বর্বরোচিত ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। আর একবার তাদের লোকালয়ে ঢুকে গেলে তারা টাঙি-বল্লম-কাঁড়বাঁশ ছাড়া বিরোধীপক্ষের সঙ্গে কথা বলে না। নিজস্ব ধনুকধারীদের নিয়ে এসে মাঠে পড়ে থাকা পাকা ধান কেটে গো-গাড়ি বোঝাই করে চম্পট দেওয়া, খামার কিংবা শস্যগোলা লুঠ করা, একাকী পশ্চিমা স্ত্রীদের নির্জনে পেলে গাজাড়ে ঢুকিয়ে ধর্ষণ কিংবা বিবস্ত্র করা ছাড়াও আরো বহুবিধ ধারাবাহিক অত্যাচারের কারণেই, পশ্চিমের সভ্য, সংস্কৃতিমনস্ক ও মার্জিত মানুষ তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে। তারা চায় এই বর্বরতার চিরকালীন অবসান।

এই জেহাদের শুরু একদিনে নয়, একটু একটু করে উঠতে থাকে। অঙ্গদকে তারা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর থেকে। ক্রমশ জারমণিকে উদ্ধারের নামে অঙ্গদের হয়ে তাদের লড়াই তাদের ভাবনায় ও উদ্যোগে ভিন্ন মাত্রা পেতে থাকে। এটাকে উপলক্ষ করে অঙ্গদকে নেতৃত্বে রেখে তারা সামগ্রিকভাবে ওই বর্বরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে। পাটনও সেটা আগাম আঁচ করতে পেরেছিল। সে-কারণে, সংকটে পড়ে সেও পূর্বাঞ্চলের সমস্ত গ্রামে ঘুরে ঘুরে সকল মানুষকে এই যুদ্ধে তার হয়ে মোকাবিলা করতে ডাক দেয়। তার ফলে, একটি নারীকে নিয়ে দুই সহোদরের বিবাদ আর ব্যক্তিগত কলহ হয়ে থাকে না, তা এক অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অত্যাচার, আগ্রাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আরেক অঞ্চলের নিষ্পত্তিমূলক সংঘর্ষে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

এখন অঙ্গদ ও পাটন নেতৃত্বে থাকলেও যুদ্ধের রাশ আর তাদের হাতে নেই। এমনকি, এই যুদ্ধের আদি কারণ জারমণিকেও, বলা যেতে পারে, দূরদূরান্তে সন্মানের লড়াইয়ের জন্য তৈরি হতে থাকা বহু গ্রামবাসীই জানে না। তারা জানে, মাঠারির আসন্ন যুদ্ধ দুই অঞ্চলের কাছেই তাদের নিজ নিজ বল ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ।

যুদ্ধের ব্যাপারে অঙ্গদের মনে যে কিছুটা হলেও সংশয় রয়েছে তা এই প্রথম সে তার পারিষদদের কাছে প্রকাশ করে। শুরু-শুরুতে, জারমণিকে ফিরে পাওয়াটাই তার কাম্য ছিল। পরে সে বুঝে যায় যে, ভাই হোক আর যা-ই হোক, পরপুরুষের কাছে চলে যাওয়া নারী এমনি-এমনি ফিরে আসে না। অক্ষতযোনি হয়ে তো ফেরেই না। তবুও সেই স্ত্রীধন তাকে পেতে হবে। তার মূল্য সহস্র গাভী দিয়েও পূরণ হবার নয়। ফলত, জারমণির পুনরুদ্ধারই তার জীবনের অনন্যব্রত হয়ে দাঁড়ায়। সে সহোদরের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত হওয়া, প্রয়োজনে তাকে হত্যা করা ও জারমণিকে তার বন্দিত্ব থেকে উদ্ধার করার ব্যাপারে তার কোমল মনকে পাষাণের মতো কঠিন করে গড়ে তুলতে তৎপর হয়। সে উগ্র ও হিংসাপ্রবণও হয়ে উঠতে থাকে।

আর এখন, তার সেই কঠিন, কঠোর ও উগ্র মনোভাব দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মনে হয় যেন কিছুটা হলেও স্তিমিত হয়েছে। তার কারণ, সমাজ ও জনমানসকে দেখতে দেখতে, চিনতে চিনতে, সে হয়ে উঠছে অন্তর্মুখী, জ্ঞানী ও বিচক্ষণ। মনে হয়, এখন সমাজমনস্ক হয়ে সে যা ভাবছে, তা সে এককের কথা ভেবে নয় ভাবছে সর্বজনের ভাবনা নিয়ে, সর্বজনের তরে। এই ভাবনা থেকে, তার মাথায় এসেছে, মাঠারির দখল নিয়ে সেখানে এক ধর্মরাজ্যের গোড়া পত্তন করা। যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো, কোনো গ্রামে, কোনো ঘরেই পাটনের মতো সর্ব অর্থে রাক্ষসের জন্ম না হয়। বিশ্বাসহন্তা নরকাসুরের জন্ম না হয়। যাতে মনুষ্যরূপী কোনো মহীসুত বিদ্যা ও পান্ডিত্যের অবমাননা না করে। পুরুষ মাত্রেই নারীজাতিকে তার প্রাপ্য সন্মান অর্পণ করতে শেখে। যুদ্ধের ভেতর দিয়ে এই ভাবনার বাস্তবায়ন চায় অঙ্গদ। চায় তার সামাজিক বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা।

অঙ্গদ মনে করে, আদিম প্রবৃত্তি থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে হলে এই আদিম, বন্য সমাজের আমূল বিনাশ প্রয়োজন। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উদভিন্ন হউক নতুন মঞ্জরি। যেমন ঘেঁটুর শাখাগুলি ফলে ও বৃতিতে লাল হওয়ার আগে থোকা-থোকা সাদা ফুল সকলই ঝরে যায়।

পথ চলতে চলতে অঙ্গদ লক্ষ করে যাচ্ছিল গ্রামবাসীদের ঘর-বাড়ি, বাহির-উঠান, গাছগাছালি। শিশুদের ছোটাছুটি, একবস্ত্রে থাকা বিবাহিতা রমণীদের গায়ের শাড়ি আর অলংকরণও। কারা রূপোর নোলক ব্যবহার করছে, কারা নাকছাবি, কিংবা কাদের বাহুতে, কলাইয়ে, বক্ষে ও মালভূমিতে উল্কির কাজ। আর কারা আগাগোড়াই নিরাভরণ। কারা কাঁসার থালায় খাচ্ছে, এঁটো বাসনে বালি-মাটি দিয়ে গোড়ালি ঘুরিয়ে মাজছে, আর কারা থালাতে খেয়ে থালাতেই হাত ধুয়ে নিচ্ছে, কুলকুচো করছে না। এইসব দেখে সে নিজের মতো করে চিনে নিতে পারে কোনটা কুড়মি গ্রাম, কোনটা তন্তুবাই, রজক, কুমারদের। মানুষকে দেখে সে যেমন পরিবেশকে চেনার চেষ্টা করে, তেমনি পরিবেশ থেকে চিনতে চেষ্টা করে সেখানকার মানুষদের ধরন-ধারণ। তাদের বহমান সংস্কৃতিও। পাটনের এসবের বালাই নেই। সে নারীদের দিকে তাকালে তাদের স্তন ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না তার। অথচ, কী আশ্চর্য! একই রক্তে দুই মনুষ্য।

এদিকে কোনোদিনই আসেনি অঙ্গদ। তৎসসত্ত্বেও এখন কেন যে তার এদিকের পথ-মাঠ-টাঁড়-টিকর এত চেনা-চেনা লাগে! এই পথ দিয়ে কখনো, কোনোদিন কি সে অতিক্রম করে গেছে? একা-একা, অথবা জগদ্দর্শনকালে মহাপ্রবীণের সমভিব্যাহারে?

মহাপ্রবীণের নাম নিতেই সে আবার ভূমির দিকে তার মস্তক নত করে, চক্ষু নিমীলিত থাকে দু-দন্ড, তখন সশব্দে কিছু উচ্চারিত না হলেও তার ওষ্ঠযুগল কম্পিত হতে দেখা যায়।

আবার সে রাস্তার দু-পাশে তার দৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেয়। তার বলিরেখা কুঞ্চিত হয়, ভাবনায়। সে ভাবতে থাকে। এতক্ষণ ধরে রাস্তাটি ক্রমাগত চড়াইয়ে উঠে যাচ্ছে। বাঁদিকে একটা মাঠ, মনে হয় যেন বহু যুগ ধরে খিল পড়ে আছে—গ্রামবাসীরা এখানে ডাল কিংবা রাই-সরষের চাষও করে না, যা প্রায় কোনো শ্রম ও সেচ ছাড়াই উৎপাদিত হতে পারে।

ভাবতে ভাবতে, সে যখন বাঁদিকে দূরবর্তী ডিহিটির পানে চেয়ে থাকল, তখন আকস্মিকভাবেই তার স্মরণে এল, হ্যাঁ, এই সেই গলাচিপা গ্রাম। গ্রাম না বলে ডিহি বলাই ভালো। মাত্র সাত-আট ঘর। অত্যন্ত মলিন ও জীর্ণ তাদের জীবনযাপন। অঙ্গদ পিছন ফিরে রাস্তার ঢালুর দিকেও চাইল। তার মনে পড়ল, এই পথ ধরেই সে সন্ধ্যার মুখে না, ঢের বেলা থাকতেই, মহাপ্রবীণের খড়বোঝাই শকটে আরোহণ করে চলে গিয়েছিল ত্র্যম্বক নামক একটি কুষ্ঠরোগীদের গ্রামে। ত্র্যম্বকে যাওয়া তো পরের কথা। তার আগেই—অঙ্গদের এখন পরিষ্কার মনে পড়ে গেল—সে অস্থির হয়ে উঠেছিল শকট থেকে অবতরণের কারণে। টঙে বসে থেকে সে চিৎকার করতে করতে বলছিল:

‘মহাপ্রবীণ! মহাপ্রবীণ! এই দন্ডে গো-শকটের গতি রোধ করুন। আমি আপনার সহিত আর এহেন নিষ্ফল ভ্রমণ করিতে ইচ্ছুক নহি। গাড়ি থামাইয়া দিন।’

গাড়ি থেমে গেল। সড়পের ধারে। গাড়োয়ানের আসন থেকে নেমে, মহাপ্রবীণ দেখেন খড়ের গাদার ওপরে অস্ত্রটি রেখে অঙ্গদ পড়িমড়ি করে নেমে আসছে শকট থেকে। তারপর ধান্যহীন ক্ষেত্রের আইল টপকে টপকে চঞ্চল শিশুর মতো সে অশ্ববেগে ছুটতে থাকে।

মহাপ্রবীণ ডাকেন, কিন্তু সে-ডাকেও সাড়া দেয় না সে। একসময় জটাভর্তি মাথা ঝাপটানি দিয়ে, হাত নাড়তে নাড়তে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘আমাকে আর ডাকিবেন না! আপনার সহিত আমার উদমা জগদ্দর্শনে কাজ নাই! তাহাতে আমার শোকতাপ-রূপ অগ্নি মোটেও শীতল হইবে না! কিঞ্চিতও না!’

‘বৎস!!’

অঙ্গদ থমকে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু যেই মহাপ্রবীণ তার সমীপে এগিয়ে যান, অমনি সে আবার ছুটে গিয়ে একটি ল্যাদা গাছে তরতর করে উঠে পড়ে। ডালে বসে শিশুর মতো পা দোলাতে থাকে।

‘উৎশৃঙ্খল হইও না। আইস, অবতরণ করো!’

পাটন কয়েক দন্ড কী যেন চিন্তা করে। তার ভাবান্তর হয়। অতঃপর সে ভূমিতে অবতরণ করে।

১৬

ধীরে ধীরে পালটে যেতে লাগল মাঠারি।

সেই নির্জন নৈসর্গিক, সেই পশু-পক্ষীকূল-শ্বাপদের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে মাঠারি আর থাকতে পারল না। ঢুকে পড়ল মানুষ। শুরু হলো উপদ্রব। সারা দিনমান তাদের আনাগোনা, হৈচৈ। তবে এই হৈচৈ-এর মধ্যে কোথাও ফুর্তির লেশমাত্র নেই—এ নেহাতই কর্মমুখরতা। বরঞ্চ এর পটভূমি ব্যাপী কোথাও যেন একটা বিষণ্ণতার সুর বেজে চলেছে।

কাঁধে কাঁধে, মাথায়, পিঠে লাদিয়ে আর গোরুর গাড়িতে গাড়িতে বোঝাই হয়ে আসতে লাগল কত না উপকরণ। অস্থায়ী ছাউনি গড়ার উপকরণ, গবাদির চালা বানানোর যন্ত্রপাতি, কুমোরশাল-কামারশাল বসানোর সরঞ্জাম। সেনা-ছাউনিগুলির আশপাশে বিভিন্ন জায়গায় বসানো হতে লাগল সেগুলি। মাঠারিক্ষেত্র ক্রমশ রূপান্তরিত হতে লাগল যুদ্ধক্ষেত্রে। তামাম ক্ষেত্র জুড়ে চলতে লাগল তার ধুন্ধুমার আয়োজন।

শুরুতে মনে হয়েছিল বড় কোনো সার্কাস কিংবা মাদারি খেলার জন্য বুঝি খুঁটা পোঁতা হচ্ছে, তাম্বু গাড়া হচ্ছে, আস্তাবল হচ্ছে। বিভিন্ন টিলার মাথায় কলাকুশলীদের রাত্রিবাসের জন্য বাঁশবাতা বেঁধে তার ওপরে খড় বিছিয়ে বানানো হচ্ছে ছাউনি। সেখানে খড়ের আঁটি ফেলে ফেলে ঢালাও বিছানা। এখানেই, প্রতিদিনের যুদ্ধশেষে রণক্লান্ত সৈনিকরা ঘর্মাক্ত দেহে শুয়ে পড়বে। আকন্ঠ চালসিজা, ঝালরাঁধা আর মাটির ঘড়ায় ঘড়ায় রাখা পাহাড়ি ঝোরার জল খেয়ে। তাদের মাথাসিতানে রাখা থাকবে তূণীর, বামবাহুর পাশে শায়িত থাকবে বাঁশের ধনুক।

সকালে তারাই ঘুম থেকে উঠবে ‘জঅঅঅয় জিনগা-মাঈ!’ ধ্বনি দিয়ে। আবার শিঙ্গা বাজবে। শুরু হবে আবার যুদ্ধ!

এখন অঞ্চলভর রব উঠে গেছে যুদ্ধের। এখন শুধু যুদ্ধের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া, আর পিছিয়ে আসা নয়। চেষ্টা করলেও অবশ্যম্ভাবী এই যুদ্ধকে আর আটকানো যাবে না। যদিও এখন যুদ্ধ বেধে যাওয়াতে অঞ্চলের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিস্তর। নানান দিক দিয়ে সংকটে পড়ে যাবে তারা। তার ওপর এখনো পর্যন্ত একটিই মাত্র কালবৈশাখী দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির দেখা নেই। আর এই সময় যুদ্ধ।

ইতিমধ্যে জিনিসপত্রের টান দেখা দিয়েছে, গ্রামীণ বাজার-হাটগুলিতে। জলাশয়-পুষ্করিণী শুকিয়ে আসছে। হুড়লুং নদী, চাকা নদীতে বেরিয়ে পড়েছে ঝুরঝুরে চর। মরা নদীর মতোই মরতে বসেছে হাটগুলি। নদীর তীরে, জঙ্গলের ধারে, ডুংরি-ডহরের আশেপাশে বসা এই সাপ্তাহিক হাটগুলিই তো গ্রামবাসীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিকিকিনির কেন্দ্রস্থল। সেখানে দেখা দিয়েছে আক্রা। হরেক রকম সয়দা-সামান থেকে শুরু করে নুন-গামছারও আকাল। জোলা-তাঁতিরা আসছে না। হাট-মশলার দর উঁচন্তির দিকে। এখনই এই! এখন তো কীচকবধের তিনতালের একতালও পুরেনি। আর এই সময় যুদ্ধের হাঙ্গামা।

বর্ষা পড়েনি এখনো। জেগে ওঠেনি ভরভরির ঝাড়, একটি ফুলও ফোটেনি ভালকি ঘাসে। কুড়চির ডাল কাঁপিয়ে উড়ে এসে বসছে না জল-কাউয়া। গতবছর বাঁদনা পরবের সময় ধুয়ে-মুছে পুজো-আর্চ্চা করে হাল-লাঙ্গলসহ চাষাবাদের যে-সকল উপকরণাদি টঙে তুলে রাখা হয়েছে, তা এখনো তেমনিই আছে। এখনো খেত-পুজো করে মাঠে নামতে ঢের দেরি। নিয়ম মেনে বসমতাকে দন্ডবত করে সেগুলি নামাতে নামাতে সেই রোহিণীর বাসি। আষাঢ়ের তেরো দিনে রোহিণী। সেদিন ছেলেরা মুখে রং-মাটি-কালি-ঝুলি মেখে গ্রামের ঘরে ঘরে ঢুকবে, উঠোনে অগড়-বগড় নাচ আর ডিগবাজি দেবে, টিন বাজিয়ে গাইবে— ‘বারোদিনে বারোনি/তেরো দিনে রোহিণি।’ আর এই সময় যুদ্ধ! আসন্ন মরশুমে চাষের গতি যে কী হবে!

সেকথা ভেবেও লাভ নেই। যুদ্ধ তো আর বলে-কয়ে আসে না। আকাশে ঘনিয়ে ওঠা মেঘের মতো যুদ্ধও পুঞ্জীভূত হয়। তারপর তার অবশ্যম্ভাবী বর্ষণ। অঙ্গদ তো গ্রামবাসীদের জমায়েতগুলিতে সেকথাই বলেছে। যুদ্ধ ঘটানো হচ্ছে না, অপরিহার্যভাবে তা এসে পড়েছে। কালে কালে এভাবেই যুদ্ধ আসে, যুদ্ধ যায়। অঙ্গদ বলেছে, ‘মনে করো, যেভাবে মহামারি আসে, কলেরা আসে, খরা-ঘূর্ণিবাত্য আর ভূকম্প আসে, তেমনভাবেই এসে পড়েছে এই যুদ্ধ। অনভিপ্রেত দুর্যোগের মতো। যেভাবে বাজড়াখেতের ভিতর দিয়ে ভোরের অন্ধকারে জঙ্গলের হুড়াল এসে ঢোকে।’

গ্রামবাসীরা তা মেনেও নিয়েছে। এই যুদ্ধ তাদের ভবিতব্য। তারা প্রস্তুত হচ্ছে সেভাবে। শোনা যাচ্ছে, বৈশাখী পূর্ণিমার শুক্লাতিথি লাগার সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠবে দুন্দভি, মুদগর পড়বে ধামসায়, শোনা যাবে দু-পক্ষের মদনভেরি, ঝাঁ-গুড়গুড় ঢাকের আওয়াজ—লেগে যাবে যুদ্ধ, রন-রন তির ছোঁড়ছুঁড়ি!

তিরন্দাজ সেনারাই শুরু করবে প্রথমে। তবে সে-যুদ্ধ যেমন ভূমিতে, তেমনি আবার টিলায়- টিলায়ও। পুব-পশ্চিমের টিলাগুলির চূড়া থেকে শূদ্ররা পরস্পরকে লক্ষ্য করে বিষাক্ত কাঁড় নিক্ষেপ করবে আর কাঁড়বিদ্ধ যোদ্ধরা লাট খেতে খেতে টিলার গা বেয়ে পড়বে মালভূমিতে।

বারো যোজন পরিমিত সেই বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই চালিয়ে যাবার জন্য উভয়পক্ষেরই মজুত বিশাল সৈন্যবহর। কেবল তিরন্দাজী-ই নয়, থাকছে আরো বহুবিধ সৈন্য-সামন্ত আর তাদের রকমারি অস্ত্রের ব্যবহার। সকল অস্ত্রই লোক-অস্ত্র, যা স্থানীয় গ্রামবাসীদের নিজহাতে নিজস্ব আদিম কারিগরিত্বে তৈরি। লোকনামে তার পরিচয়। এখানে কোনো যাদু-অস্ত্র নেই। তেজস্ক্রিয় বিস্ফোরক পদার্থেরও ব্যবহার নেই।

অনির্দিষ্টকালীন এই যুদ্ধ মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে। যুদ্ধচলাকালীন দু-পক্ষের অস্ত্র এবং শস্ত্র নি:শেষিত হলে শস্ত্ররূপে প্রস্তর নিক্ষেপণ এবং শত্রুনিধন-কৌশল রূপে অগ্নিদহনও স্বীকৃত। চলতে পারে লাঠ্যাঘাত। মূলত শবর-সাঁওতাল-ভূমিজ-কুড়মি থেকে শুরু করে যত দরিদ্র আদিবাসী ও পশ্চাদপদ জনজাতিদের নিয়েই মাঠারিযুদ্ধ।

এখানে যুদ্ধে অশ্বের চল নেই। বড় চাষি, জোতদার-জমিদার আর মহাজনি কারবারি ছাড়া সাধারণ গ্রামবাসীদের ঘরে অশ্ব থাকে না। যুদ্ধের নামোচ্চারণের সঙ্গে যে অশ্বারোহী সৈন্যের কথা মাথায় আসে, এখানে তার দেখা পাওয়া যাবে না। মাঠারিযুদ্ধে অশ্বারোহী সৈনিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ। এতদ্ভিন্ন আছে শতকোটি নিয়ম, যা পূর্ব-পশ্চিমের আদিবাসীদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত দ্বিপাক্ষিক প্রতিনিধিদের কুলহি-দুড়ুপের মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে। ‘রাম-দুই-তিন’ করে গুনে গুনে সেগুলি লিপিবদ্ধও করা হয়েছে।

‘কুলহি দুড়ুপ’-এর অর্থ পথে বসে আলোচনা। মিটিন। যুদ্ধসংক্রান্ত এই আলোচনা হয়েছে ছোট-লিপানিয়া গ্রামের মাঝকুলহিতে জমায়েত হয়ে। অঙ্গদ এবং পাটনের উপস্থিতি ছাড়াই। যুদ্ধ তো এখন অঞ্চলের সঙ্গে অঞ্চলের। পরিচালনার দায়িত্বভারও এখন অঞ্চলবাসীদের হাতে। তারা ঘন ঘন মিটিনে বসছে, আর আলোচনার সিদ্ধান্ত ও অন্যান্য জরুরি বার্তা চাউর হয়ে যাচ্ছে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে—গ্রামের এক আদিবাসী দলপতির হাতে হাতে যাচ্ছে শাল-ডাল, আবার কখনো তার পাতার ওপরে সিঁদুরের আঁক টেনে টেনে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে জরুরি তলব কিংবা বার্তা।

তবে সমরাঙ্গনে লড়াই হবে দুই মহাবলশালী যোদ্ধার নেতৃত্বে। এখন দুপক্ষেরই পুরোদস্তুর কাজ শুরু হয়ে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। মাঠারিকে মাঝে রেখে পশ্চিমের দিকে অঙ্গদের বাহিনী, পূর্বে ‘পাষন্ড পাটন’-এর দল। চারপাশ অরণ্যবেষ্টিত এই সমরাঙ্গনের পূর্ব-পশ্চিম দুই প্রান্তেই আছে ছোটোবড়ো অজস্র টিলা। রতিগড়ের ভূগুতে দাঁড়ালে ছবির মতো বহুদূর অব্দি সবকিছু দৃষ্টিগোচর হয়।

মুষ্টি-অন্নের অভিযান শেষ করে, অবশেষে, পাটন এখন ফিরতি পথে। যেন বহু বর্ষ, বহু যুগ অতিক্রমণের পর তার এই প্রত্যাবর্তন। নিসর্গভূমিতে। সে আবার নতুন করে দেখবে মাঠারি। দেখবে গাছে-গাছে, পত্রশাখায় ফুটে উঠছে বুনোফুল, হালি বর্ষার আকাশে পিড়িং-পাড়াং উড়ছে রং-বেরঙের বাগঢুলু, শুনবে ভ্রমরের গুঞ্জরণ, চ্যারেং ডাকছে ঝুড়ে-লতে। রাতের আকাশে দেখবে তার চোখের দেখুতে উড়ে যাচ্ছে লক্ষ্মী পেঁচা। আর দেখবে রতিগড়ের মাথায় বুচাটাঙি হাতে দাঁড়িয়ে আছে সেই জারমণি।

কত দুর্যোগের অভিজ্ঞতা নিয়ে, কত বিপদ-আপদ কাটিয়ে, কত পথের কত অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হয়ে শেষতক সে ফিরছে। কিন্তু যতদিন মুষ্টি-অন্নের জন্য পথে-পথে ঘুরেছে, ততদিন আর সবকিছু বাদ দিয়েও কি কঠিন সংগ্রাম যে সে করে গেছে! দন্ডে দন্ডে মোকাবিলা করেছে নিজের সঙ্গে নিজের বিরোধের, দ্বন্দ্বের। পথিমধ্যে যেন বারে-বারেই তাকে ছাতার বাঁটে পেছুধারে হেঁচকা টান মেরে বলে গেছে, ‘ঘুরে চল গন্ডমূর্খ! ঘুরে চল!’

শেষতক সে প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, না:! আর পারবে না, সত্যিই সে ফিরে যাবে। আর তখন স্বপক্ষে যুক্তিও সাজিয়ে যাচ্ছিল। সে বোঝাচ্ছিল নিজের মনকে, মনরে! ও আমার পাপী-তাপী মন! বল না ভাই, এই ফিরে যাওয়ার মধ্যে কিসের হতাশা? কিসেরই-বা গ্লানি? কোন পরাজয়ের কলঙ্ক?

পাটন নিজেকে আশ্বস্ত করছিল এই বলে যে, এই পশ্চাদপদতা, প্রকৃত অর্থে, তার বিভ্রম থেকে মুক্তি। তার জ্ঞান, ঔদার্য ও মহসত্ত্বের দিকে সুচারু পদক্ষেপ। সহোদরের সঙ্গে সহোদরের ছাতার মাথা কিসের লড়াই? কিসের বিরোধ? তাও আবার একটি নারীকে নিয়ে। ধিক! নারী তো মায়া, নারী তুচ্ছ, অকিঞ্চন। একটি যোনিদেহ-র জন্য পুরুষের এহেন কৃচ্ছ্রতা সাধনও বেমানান। অগৌরবের। জগতে কত না রকমারি সামগ্রীর সমাহার। চাঁদ-আকাশ-ফুল, নদী-নহর, মিটমিট তারা, ফিঙফিঙ পাখি, চিলশুগনি-কটাস-শিয়াল, চুড়ুপ-চাড়াপ চড়ুই। কতত কিছু। সে-সবের তুলনায় নারী কী এমন? কিছুই না। নারী তো পথেরই ধুল।

এমনটা ভাবতে গিয়েই পাটনের মনে পড়ে গেল একটি ঝুমুরের কলি। যে-ঝুমুরটি দীর্ঘকাল পূর্বে সে লাল-ডুংরি গ্রামে একটি রাতজাগা-আসরে শুনেছিল। আসরে তখন পাশাপাশি গ্রামের শতাধিক কুইরি, কুম্ভকার, বোষ্টম নারী নাকের কাছে ঘোমটা টেনে আবেগে শুঁক-শুঁক কাঁদছে, নাক মুছছে। পাটনও সেই গান শুনে এতোটাই মুগ্ধ হয়ে পড়েছিল যে, বহুদিন অব্দি ঝুমুরটি তার ঠোঁটে চটকের চঞ্চুতে তৃণের মতো লেগে থাকত। যখন-তখন আপন মনে সে গুঞ্জন তুলত। সেখানে সোনার কর্ণফুলের সঙ্গে তুলনা করে কী সুন্দর করেই না স্ত্রীজাতির গুণগান করা হয়েছে। অহো! বলা হয়েছে:

নারী তো সোনারি ফুল

সখি, ভেঙো না ভেঙো না কানেরি দুল!

কিন্তু এখন সে-উপমার প্রয়োগকে তার অনুপযুক্ত, অতিরঞ্জন তথা আপন মনের মাধুরী মিশায়ে সুসজ্জিত মৃতপ্রতিমাকে ঘাটের জলে ‘গাদায় নমঃ বিসর্জনযোগ্য’ বলে মনে হয়। নিজের সম্পর্কেও মনে হয় সে নারীকে নিয়ে বিভ্রমের ঘোরে ছিল। এই বিভ্রমের ঘোর আসলে অতিভাবুকতা। বাস্তবরহিত। তা দিয়ে কোনো কিছুর যথার্থ মূল্যায়ন হয় না। কোনো সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো যায় না। ঘোর মানব মনের ক্ষণস্থায়ী দশা। আইড়-কাটা বহি যেভাবে কানালি জমিতে আপসেই নেমে যায়, ভাবের ঘর থেকে সেই আবেশও অচিরেই উবে যায়। পড়ে থাকে অলংকারহীন, মুগ্ধতাহীন শূন্যতা।

সে মনে মনে ভাবতে ভালোবাসে যে, নারীকে নিয়ে তার সুদীর্ঘকালের বিভ্রম সে কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয়েছে। এখন জারমণির কাছে নয়— দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সটান অঙ্গদের কাছে গিয়ে সে উন্মাদের মতো তির-তূণীর-ধনুক চতুস্পার্শ্বে ছুঁড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করবে। তার ডেরায় গুড়গুড়-গুড়গুড় করে তার বৃষ-শকট তীব্রগতিতে ভিড়িয়ে দিয়ে, গাড়োয়ানের আসন থেকে লাফিয়ে নামবে। আর আবেগবিহ্বল হয়ে বলবে, ‘ভ্রাতঃ! ভ্রাতঃ, তুমি কোথায়! আইস, সন্ধি করো। সংঘাত আমি চাহি না, হত্যা আমি চাহি না, রক্তপাত আমি চাহি না। প্রেম চাহি ভ্রাতঃ, তোমার অতিশীর্ণ পায়রাছাতি বক্ষে আমাকে আলিঙ্গন করো। আর এই দন্ডেই যাহ তুমি রতিগড়ে। বাজুবন্ধ ধরিয়া পার্বত্যভূমি হইতে নিজবলে ছিনিয়া লইয়া আইস সেই অবলারে। এখন তাহাকে তুমি আপন পর্ণকুটিরে লইয়া যথেচ্ছ আদর করো। তাহার স্বর্ণ অঙ্গে আচ্ছা চমচৈম্মা করিয়া কচড়া তেল মর্দন করো। কতদিন তাহার দেহোপরি তোমার করস্পর্শ সে পায় নাই।। তুমি তাহাকে সাধ পুরাইয়া সেই স্পর্শ দাও। মাথা মধ্যে ফুলনতেলের ভাঁড় হড়হড়াইয়া উবড়াইয়া ঢালিয়া তাহার কেশচর্চা করো, বিনুনি করো, অতঃপর ওই দীর্ঘকেশীকে মনোরম বিঁড়াখোঁপা বাঁধিয়া দিয়া তাহা বেলকঁড়ি দিয়া রূপের ডালির পারা সাজাইয়া দাও।

‘ভ্রাতঃ! ভ্রাতঃ রে! ওই চপল নারীরে লইয়া আমি দানবীয় ক্ষুধা-তৃষ্ণা-আকাঙ্ক্ষায় কাতর হইয়া এযাবৎ যাহা-যাহা করিতে পারি নাই, যাহা-যাহা করিতে চাহিয়া ছিলাম, তুমি নিদেনপক্ষে তাহা-তাহা কর। রক্ত-অলক্তক দ্বারা রাতুল করিয়া তাহার চরণ-মঞ্জিরকে বিদ্যুল্লতা করো, তাহার সুন্দর দেহবল্লরীকে বাঁশি-হারমোনিয়াম-ফুলেটের পারা ফুঁক দিয়া বাজন্ত করো, সুর উঠাইয়া আকাশ করো, ঢোল-ধামসা-খোল-নাকাড়ার পারা বজ্র করিয়া বাজাও! পিতলের ঝুমঝুমি কিংবা কাংস্য ঝল্লক আঙুলে ফাঁসাইয়া সেই নারীকে ঘিরিয়া অষ্টপ্রহর বৈষ্ণব হইয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া নৃত্য করো! ভ্রাতঃ! ভ্রাতঃ রে! নারীর রূপের পৌরুষোচিত মর্যাদা দিয়া তাহাকে সাতিশয় তৃপ্ত কর, ভ্রাতঃ! ভ্রাতঃ! ভ্রাতঃ!...’ বলতে বলতে কল্পনায় পাটনের কন্ঠরুদ্ধ হয়ে আসে, কান্নায়। শেষ পঙক্তিতে ‘তৃপ্ত’ শব্দটি উচ্চারণ করতে গিয়েই এই বিভ্রাট। আকাশ এই সময় হঠাৎ বিজলালো! বাজ পড়ল দূরে কোথাও!

বড়ই খেদের বিষয় যে, জারমণিকে নিয়ে তৃপ্তিসূচক কোনো শব্দের সঙ্গে পাটনের কোনো পরিচয়ই হল না। তার জানাই হল না নারীকে নিয়ে পুরুষ কখন, কীরূপে তৃপ্ত হয়। তৃপ্তি আসলে কী জিনিস, কীভাবেই বা তৃপ্তি দিতে হয় শয্যালোকিত যৌবনবতী নারীকে। সে তার জন্য সব করতে প্রস্তুত ছিল, এখনও প্রস্তুত রয়েছে যেকোনো কিছুই তামিল করতে। এমনকি, যদি বলা হয়, সে তপন-তনয়া বৃক্ষমূলে মস্তক উলটা করিয়া স্থাপন করিয়া, তার কুলার ন্যায় পদপত্র সংবলিত যুগলপদ মগডালের দিকে তুলিয়া একপক্ষকাল ‘জারমণি! জারমণি!’ ডাকিয়া নাম-গান করতে পারে, গুণ-পরিকীর্তন করতে পারে, ধ্যান করতে পারে, জারমণিকে পবিত্র জ্ঞান করিয়া প্রতিদিন একপুয়া করিয়া তাহার চরণ-মৃত্তিকা জলে দ্রবীভূত করিয়া দ্রাক্ষারিষ্টের ন্যায় পান করিতে পারে, বাবলা কাঁটায় শয়ন করিতে পারে, আপন শক্তি প্রদর্শন করিতে সে বাহুবল প্রয়োগ করিয়া সজীব ও দৃঢ়-প্রথিত চুর্চু বৃক্ষ ছটকা মারিয়া ভূপৃষ্ঠ হইতে উৎপাটিত করিতে পারে, গাছের গুঁড়ি পাহাড় থেকে মাথায় করিয়া বাতাসের গতিতে উপত্যকায় নামাইয়া আনিতেও পারে। সব, সব! জারমণি হেন পয়স্বিনীর জন্য সে কীই না করিতে পারে?

কিন্তক, হায় রে কপাল! তাম্বু খিঁচাইয়াও সার্কাস সে দেখাইতে পারিল না। সাধনা করিল বটে, সাধ তার মিটিল না! মিটিল না, মিটিল না! তার মনে হল পুরুষ হয়েও তবে সে কেমন ধারার পুরুষ? কার পুরুষ? নারীবিনা এ পুংদেহের অস্তিত্বের যথার্থ মূল্য কোথায়? যে-পুরুষমন নারীমনে মিশল না, যে-পুরুষদেহ নারীদেহে প্রবিষ্ট ও একাত্ম হল না, সপ্রেম আঘ্রাণ নিয়ে বিমোহিত ও আবেগ-উচ্ছলিত হয়ে পড়ল না, সে তবে লোকজীবনে পুরুষের কোন ধর্মকে পালন করল? প্রেমবিনা, আলিঙ্গন বিনা, ধর্ম বিনা জীবন কী জীবন? সে-জীবন তো নিছকই খড়ের আঁটি। শুধুই হাহাকারকে বয়ে নিয়ে যাওয়া।

বৃষ-শকটের চক্রনেমিতে কপাল ঠুকে ঠুকে পাটনের বিলাপ করতে ইচ্ছে হল, ‘জারমণি! কেন তুমি আমাকে ধর্মশিক্ষা দিলে না? অশিক্ষার অমানিশা তোমার চোখে আমাকে চিরদিন কালো ও কদর্য করেই রাখল! নারী, তুমি কপট! তুমি নিঠুর, নিদয়া! তুমি একদিকে গাভীর মুখের কাছে তৃণের বোঝা খুলে রেখেছো, আবার হাতে দন্ড নিয়ে আঘাতের জন্যও রয়েছো সদা উদ্যত হয়ে...’

ফিরতি যাত্রায় এই বিলাপ দিয়েই তার আত্মকথনের ইতি হল না। জারমণি তাকে আরো কতভাবে না আলোড়িত করতে লাগল। যে-নারী তার নিকটে আসা সসত্ত্বেও যার নৈকট্য সে পেল না, তার জীবন-দুয়ারে এসেও যে তার জীবনে এল না, সেই নারীর তরে তার অবদমিত আক্রোশ তাকে দাঁড়ে বসে ঝুরুক-ঝুরুক ল্যাজ ঘোরানো চঞ্চল-নয়ন-পাখির মতো দুরন্ত করে তুলল। হিংস্র পশুর কেশরে হাত রাখার মতো সে আপন মনকে মিষ্টকথায় বুঝিয়ে শান্ত ও প্রবোধিত করতে চাইল। বলল, ‘ধীর হও, যোদ্ধা, ধীর হও!’

অতঃপর মনের তৎকালিক উত্তেজনা কেটে গেলে, সহোদরকে সে সহোদরের যথোচিত মর্যাদা ও হক দিতে চাইল। সে আর আক্ষেপ করতে চায় না। সে চায় তার সেই সাধের, সেই স্বপ্নের ললনাকে লইয়া এখন যা করার করুক তার সহোদর, তার অগ্রজ। সে নারীর লেঠায় নেই। মোহিনী-প্রভাব থেকে সে মুক্ত রাখতে চায় নিজেকে। এতদিনে, সাতমণ ঘি ঢালিয়া রাধাকে নাচাইতে না পারার ব্যর্থতাহেতু তার এই শিক্ষা হয়েছে। চালাক-চম্বক হয়েছে সে। হাজারো জোনাকির আলোকসম্ভার নিয়ে নারীস্তন এখন আর তার ভাবজগতে চায়না-বাতির ন্যায় অহরহ দুপুক-দাপাক করে না।

অধিকন্তু, পাটনের মন জারমণিকে নিয়ে তার সহোদরের সপক্ষে এখন এমনটাও বলতে দ্বিধা করল না, ‘ভ্রাতঃ, যদিচ সে তোমার বার্ধক্যহেতু তোমাকে গ্রহণে কুন্ঠিতা হয়, যদিচ সে কুঁইকাঁই করে, যদিচ সে তোমার হস্তগত হইয়াও তোমার কাষ্ঠবৎ নিরস বাহু হইতে নিজের পেশীবহুল কোমল অঙ্গ সবেগে ঝিকনাইয়া সরাইয়া লয়, সে নিজেকে তোমাতে সমর্পণ করিতে এক ডেগও পশ্চাদপদ হয়, তাহা হইলে তাহার সুডৌল ও চিক্কন হস্ত মচড়াইয়া, বেণী ঘুরাইয়া, তাহার অলংকৃত দেহের সকল লতাপাতা, বিশুষ্ক ফল ও কাষ্ঠনির্মিত আভরণ ছিঁড়িয়া নুচিয়া তোড়ফোড় করিয়া বলপূর্বক তাহাকে হ্যাড়হ্যাচ্চাইয়া তোমা হেন সৎ-সাধুর কুটিরে আনয়ন করো। সে দুষ্টা! কপটিনী! সে প্রবঞ্চনাকারিণী! সে অক্ষতযোনিরক্ষাকারিণী! যে-নারী তাহার প্রতি আমার উত্থিত লিঙ্গকে প্রতিরোধ করিবে বলিয়া সর্বথা বুচাটাঙি সংরক্ষিত রাখিয়াছে, তুমি সেই যোনিধরাকে পশুর ন্যায় লিঙ্গবিদ্ধ করিয়া তাহার দম্ভ চূর্ণ করো! সে কলহদাত্রী। সে আমাদের ভ্রাতৃত্ব নাশ করিয়াছে! আমাদের ছিন্নমূল করিয়াছে। আমরা আজ আর নিজেরাই কেহ জানি না—সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছি—কে আমাদের মাতা-পিতা-বংশধর, কোথায় কোন দেশে ছিল একদা আমাদের বাসভূমি। এমনকি, এই নারীহেতু আমরা ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের প্রেম ও হার্দিক টান অনুভব করি না। আমাদের মাতাপিতা নিশ্চয়ই কবে কোন কস্যকালে গত হইয়াছে। কিন্তু সে-সংবাদ শুনিলে অথবা অনুমান করিলেও তাহাদের তরে আমাদের মন আজ আর কাঁদিয়া উঠে না, আকুল হয় না। তাহারা আমাদের জন্মদাত্রী—তাহারাই আমাদের এমন মনোরম জগৎ ও জীবন দেখাইয়াছে, আকাশ-অগ্নি-সূর্যদেব দেখাইয়াছে, তথাপি তাহাদের তরে আমাদের নয়ন বাস্পাকূল হয় না। ভ্রাতঃ, ভ্রাতঃ রে!...

‘এই নারী আমাদের হৃদয়কে পাষাণ করিয়া দিয়াছে। তথাপি তুমিই তাহার হকদার। সম্ভবত, সেও ন্যায্যত তোমার পাণিপ্রার্থী, তোমার প্রেমপ্রার্থী! বরষ বিতিয়া যাইতেছে তবু সে কভুও আমার বক্ষলগ্না হইল না। তাহার উইঢিবিতুল্য মস্ত চুচুকদ্বয়ে আমার হাজার বছরের পিপাসার্ত করতলকে ক্ষণিকের তরেও স্থায়ী হইতে দিল না, আদর ও নিষ্পেষণ সহিল না সে আমার। অনুমান হয়, সে আজও তোমারি লাগিয়ে প্রতীক্ষারত। আমার লাগি তাহার এক-দসানও প্রেম নাই। নাই, নাই, নাই!

‘এই নারীর পার্শ্বে দাঁড়াইয়া আমি দন্ডে-দন্ডে ‘নাই’ শব্দটির বারিধিসম নিষ্ঠুর ব্যাপ্তি অনুভব করিয়াছি। আর আমার তবে কিসের প্রতীক্ষা? কার তরে? সে তোমার লাগিয়া যুগ-যুগ ধরিয়া অপেক্ষায় রহিয়াছে। তুমি যাহ, ভ্রাতঃ, যাহ তাহার সমীপে। তবে তাহাকে প্রেম-নিবেদন করিবার পূর্বে, ভ্রাতঃ, তাহার অসাধু কৃতকর্মের জন্য অতি-অবশ্য যতপরোনাস্তি দন্ড দাও তাহারে! দন্ড দাও! দন্ড দাও!...’ আত্মকথনে হাঁপিয়ে উঠেছিল পাটন। তারপর নিরীহ নিশ্চল দুই জীবের মাঝে দাঁড়িয়ে, শকটের মহাদেবে মাথা হেঁট রেখে, দীর্ঘক্ষণ ডুকুরে কেঁদেছিল। বাতাস বইছিল শনশন।

কেন এই কান্না? দীর্ঘকাল বাদে ফিরে আসছে জেনেও কেনই-বা সে কাঁদিতে চায় নয়ন-জলে? কার প্রতি অভিমান? সহোদরের, নাকি ওই দুষ্টা-কপটিনীর প্রতি? আর একি নিছক অভিমান, নাকি অসহায় ক্রোধ ও আক্রোশ? হয়তো সবকিছুই। ক্রোধে, অভিমানে, অসহায়তায় সে এতোটাই বিদীর্ণ ও হতবুদ্ধি যে, কখনো নিজেও বুঝে উঠতে পারে না প্রকৃত অর্থে কার প্রতি তার বিদ্রোহী হয়ে ওঠা উচিত, এবং কার প্রতি বৈরিতা নিয়ে সে এই যুদ্ধে অবতরণ করতে চলেছে। একি সত্যিকারের বৈরিতা, নাকি আগাগোড়াই সে ওই নারীর দ্বারা প্ররোচিত?

হ্যাঁ, ওই নারীই। সহোদর নয়। ওই নারীই তাকে উসকানি দিয়ে চলেছে— তাকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করেছে। বস্তুতপক্ষে, তাকে এভাবে এক আবর্তে ফেলে দিয়ে ওই নারী সুরক্ষিত রেখেছে নিজেকে। নচেৎ পুরুষটির এই ভয়ংকর কামের আগুনে সে নি:শেষ হয়ে যাবে। পাটন যাতে তার বিরুদ্ধে ফুঁশে না ওঠে, তার সামনে সে খাড়া করে দিয়েছে এমন এক প্রতিপক্ষ, আর তাকে ঠেলে দিয়েছে এক মরণপণ সংঘাতের পথে। এখন এমনটাও মনে হয় পাটনের।

মনে হওয়ার পরেও, তার ওই নারীর প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠা তো দূরের কথা —সে শিশুর মতো অভিমানী হয়। মনে হয়, আমি কি তবে শুধুই তার রক্ষাকবচ? আজও আমি সেই দৈবারিক? প্রতিহারী তার? ধিক রে পাটন! ধিক! এভাবে নিজেই সে নিজের অবমূল্যায়ন করে। অধমাধম-অপৌরুষেয় বলে। আর তখন, নিজের প্রতি নিজের এই অনাস্থা ও অবিশ্বাস থেকে তার মনে আচমকায় ক্রোধেরও জন্ম হয়।

তেমন অনেকবার ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত হয়ে উঠেছিল সে। মনে হয়েছিল, মুষ্টি-অন্ন সুদ্দু তার অখন্ড শকটটিকেই সে ডুলুং-এর কটিদেশ থেকে বজ্র-পদাঘাতে ঠেলে ফেলে দেবে বিশুষ্ক নদীর চরে! আর সে নিজে, অন্তহীন পাথুরে মাঠে, উন্মাদের মতো নিরন্তর ছুটে বেড়াবে। মাথার ওপরে মস্ত আকাশ নিয়ে, বুকের ভেতরে বিস্তর হাহাকার নিয়ে। কখনো ঠুঁটা পলাশ গাছকে জড়িয়ে, কখনো-বা চাঁদের দিকে উদবাহু হয়ে বিলাপ করে যাবে, ‘হা জারমণি! হা জারমণি!’

এই যদি তার নিয়তি হয়, তাহলে যুদ্ধে সে যাবে না। যুদ্ধে তার কী কাজ? বরং জীবনভর সে তার জারমণির তরে এভাবেই বুক চাপড়ে যাবে। এও-বা কম কি? জারমণিকে পাওয়ার আনন্দকে সে জারমণিকে না-পাওয়ার বিষাদে উপভোগ করতে চায়। জগতে বিরহ-বিষাদও কি কম আনন্দঘন?

কিন্তু বাস্তবে এখন তা কি আর সম্ভব? কী করেই-বা সম্ভব? মুষ্টি-অন্ন গ্রহণ করার পর এখন ফিরে আসার কোনো পথ নেই। ডি-ডিহাত, গ্রামে-গঞ্জে ঢ্যাড়া পড়ে গেছে। সাজ-সাজ রব। যুদ্ধের প্রস্তুতিও তুঙ্গে। এখন আর মুড়-পুচকা দেওয়ার উপায় নেই। আত্মসমর্পণেরও রাস্তা খোলা নেই। পালিয়েও বাঁচতে পারবে না সে। যুদ্ধ তাকে করতেই হবে। ঝুড়ে-জঙ্গলে, ডুংরি-ডহরে যেখানেই সে আত্মগোপন করে থাকুক না কেন, আদিবাসীর দল তাকে বদা-ছাগলের মতো, পাঘায় টান মেরে, ঘষটাতে ঘষটাতে এনে যূপকাষ্ঠে বলি দেবে। এটা পাটনও জানে। হয়তো সে-কারণে যুদ্ধমনস্ক হয়ে ফিরতে হচ্ছে তাকে।

তবে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছে না পাটন। শকট পরিপূর্ণ করে বাঁশের মস্ত মস্ত ডালা আর ধামায় মুষ্টি-অন্ন আদায় করে এনেছে। যুদ্ধের পক্ষে এখন সংগঠিত হয়েছে একটা বড় শক্তি। এমনকি, যুদ্ধ লাগিয়ে দেবার জন্য যারা প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে কাজ করে চলেছে, যুদ্ধের বলগা পাটনের হাত থেকে নিজেদের হাতে তারা কবেই টেনে নিয়েছে। যদিও অতি সাধারণ গ্রামবাসীরা এই যুদ্ধের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে ততটা ওয়াকিবহাল নয়। তারা জানে, মাঠারি দখল করতে এগিয়ে আসা পশ্চিমারা তাদের শত্রু। কিন্তু যাদের হাতের ক্রীড়নক তারা, সেই ঘরের শত্রুদের তারা এখনো চিনতে পারেনি।

চিনতে পারেনি পাটনও। সে এইটুকুতে খুশি যে, তামাম গ্রামবাসী এই সংগ্রামের জন্য তৈরি। তার কাছে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ মুষ্টি-অন্ন তো তারই চাক্ষুস প্রমাণ। এই চাল ঘাড়ে-পিঠে বয়ে পাটন সঞ্চিত রাখবে শস্যঘরে।

জমা হচ্ছে আরো কাঁড়ি কাঁড়ি চাল। গ্রামে গ্রামে নিযুক্ত যুদ্ধকর্মী ও দলপতিরা বারবরদার মারফৎ এই রসদ সংগ্রহ করে চলেছে। গ্রামবাসীরা যে-যার সাধ্য-সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ চাল দিচ্ছে, আলু দিচ্ছে, ধামা ভর্তি করে চিঁড়ে-মুড়ি দিচ্ছে। অনেকে আবার যুদ্ধার্থে প্রদত্ত এই দান দূরদূরান্ত থেকে ধুলো পথে হেঁটে মাথায় করে বয়ে নিয়ে আসছে। জমা করছে শস্যগোলায়। বৃহদাকার সেই একেকটি শস্যগোলা বানানো হয়েছে খড় পাকিয়ে, বাঁশের ফালি বুনে বুনে।

দু-পক্ষেরই আছে আলাদা আলাদা এমন ভাঁড়ার। যতদিন যুদ্ধ চলবে, ততদিন ভাঁড়ারে মজুত রাখা এই রসদ থেকে দু-পক্ষই তাদের যোদ্ধাদের জন্য আহার পাক করবে। পাককর্মের জন্য বানানো হয়েছে এমুড়ো-ওমুড়ো টানা ভাটিচালা। সেখানে মহা উদ্যমে চলছে খোঁড়াখুড়ির কাজ। একদিকের ঝুড়ির মাটি তুলে ফেলা হচ্ছে আরেক দিকে। মস্ত মস্ত গর্ত করে বানানো হয়েছে ভাটি। জ্বালানো হবে রোদে ফেলে রাখা গাছের গুঁড়ি। শিখা উঠবে দাউ দাউ।

জ্বালানির জন্য গাছ কাটা চলছে অকাতরে। পাহাড়ের মতো ডাঁই করে রাখা হচ্ছে সেই জ্বালানি। শুধু জ্বালানির কারণে না, গাছ কাটা হচ্ছে আরো শতেক কাজে। ঝুড়া হচ্ছে যত গভীর বাঁশবন। বাঁশ কেটে চাঁছা-ছুলা করে তৈরি হবে গুচ্ছ-গুচ্ছ ধনুক। শরের বন কেটে করা হচ্ছে তিরের ডাঁড়ি। প্রতিটি ডাঁড়ির আগায় আটকানো থাকবে কামারের হাতে বানানো ফলা। শবররা লেগে পড়েছে সেই কাজে।

এখন যতই সেই শরবন, বাঁশবন আর গাছ কাটাকাটি চলছে, ততই মাঠারিভূমি থেকে ঝাঁকে-ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে পাক-পাখালি। জঙ্গলের শূন্যতা বাড়ছে। দিনে দিনে প্রশস্ত হচ্ছে যুদ্ধভূমি। করাতের ঘর্ষণ, কুড়ুলের কোপ, ঢাঁই-ঢক্কর পাথর ভাঙা আর বহু গো-শকটের পাথুরে ভূমিতে গড়িয়ে যাওয়ার হড়হড়-দড়দড় আওয়াজে কোলাহলমুখর হয়ে উঠছে মাঠারি।

কোলাহলময়, উপদ্রুত এ কোন মাঠারি? আদিম জনজাতির যুদ্ধের আয়োজনে ক্রমশ পালটে যাওয়া এই ক্ষেত্রকে দেখে জারমণি কি হতচকিত? মুগ্ধ? আর পাটন?

গোধূলির আলো জঙ্গলময় ছড়িয়ে পড়তেই সে-দিনের মতো কাজের বিরতি। কোথাও ঝিঁঝির ডাক নেই।

১৭

অবশেষে পাটন এসে পৌঁছল। কিন্তু দীর্ঘকাল বাদে স্বভূমিতে ফেরার যে-আনন্দ, যে-অনুভূতি তার মনের মধ্যে জেগে ওঠা স্বাভাবিক ছিল, তেমনটি আর হল কই?

অথচ এই নিয়ে তার কত যে কল্পনা ছিল, যিস-তিস কত কিছু ভেবেও রেখেছিল— সে এই বলবে, ওই বলবে জারমণিকে। যুদ্ধের ব্যাপারে প্রবল আত্মবিশ্বাসী হয়ে, হর্ষোল্লাস নিয়ে বলবে মুষ্টি-অন্ন সংগ্রহের গপ্প। যুদ্ধের আবেদন নিয়ে দিনের পর দিন কত-কত গ্রামে, কোথায়-না-কোথায় সে ঘুরল, কত গ্রামের চৌরাহায়, হরিমন্দিরে, আমতলে-জামতলে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়ে সে গ্রামবাসীদেরকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদবুদ্ধ করল, আচমকা পথে ভয়াবহ ঝঞ্ঝার মুখোমুখি হয়েও মোকাবিলা করল সেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের। তারপরও তার নিষ্ঠা ও সততার পরীক্ষা নিতে, তাকে বিড়তে, অনি:শেষ শরীরী আকর্ষণ নিয়ে একদিন তার পদপ্রান্তে এসে হাজির সেই মায়াবী নারী! এই সবকিছু নিয়ে পাটন কত কথাই না বলবে ভেবেছিল। কিন্তু সেসব কিছুই হল না বলা! সে-উদ্যম কোথায় যেন উবে গেল। আর একটা গাঢ় বিষাদ তার মুখমন্ডলকে পুষ্করিণীর জলে তমাল-ছায়ার মতো মেঘমেদুর করে রাখল।

সেই বিষাদ থেকে তার পুনঃপুনঃ মনে হতে লাগল আর ক-দিন তার জারমণি? আর ক-দিনই-বা মাঠারি? তার অদৃষ্টের কপাটে উপর্যূপরি করাঘাত করছে তার সহোদর। সেই প্রবল কড়া নাড়ার শব্দ, সেই যুদ্ধের হাওয়া তাকে যেন বলছে—দিন তোমার ঘনিয়ে এল। আর নয়, আর নয়।

দিন ঘনিয়ে আসার অর্থ যুদ্ধ এগিয়ে আসা নয়। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু। পাটন এতদিন ধরে ঘুরতে ঘুরতে এখন অনুমান করতে পারে, জয় নয় যুদ্ধে পরাজয় তার নিয়তি, পরাজয় তার ভবিতব্য। এত সবের পরেও পরাজয়ই তার প্রতিদান।

পরাজয় মানে, সহোদরের কাছে আত্মসমর্পণপূর্বক প্রাণভিক্ষা করে যাজ্জীবন ক্রীতদাস হয়ে থাকা, অথবা সমরাঙ্গনে সহোদরের শল্যাঘাতে অবধারিত মৃত্যু। কেমন সে মৃত্যু? ভাবতে গিয়ে শিহরণ জাগে পাটনের। বিশাল সেই যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝে উভয়পক্ষের অগণিত বীর যোদ্ধাদের শবদেহ কুকুরে ডিঙিয়ে যাচ্ছে। তারই মাঝে নিতান্ত সাধারণ একটি দেহ হয়ে ভূমির অনেক অংশ জুড়ে পড়ে রয়েছে সে। তখনও তার পাশে তার বহু আকাঙ্খিতা জারমণি নেই। আছে সারমেয় আর জম্বুকের পাল। মাংসাশী প্রাণীরা কখনো পরস্পরকে দাঁত দেখিয়ে কলহ করছে, কখনো তাদের অদূরে ডানার মন্থর ঝানটানি দিয়ে বসছে শকুনি। ভনভন মাছি উড়ছে।

আকাশেও ঘূর্ণায়মান চিল-শকুনি। উৎক্রোশ পক্ষী। শৃগালে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পাটনের নাড়িভুড়ি, গলিত অঙ্গ। কুকুরে খুবলে খাচ্ছে তার নাক, যে-নাকের পাটা তার শত্রু-সহোদরকে দেখে কত-কতবার যে ক্রোধে ফুলে উঠেছে, বর্ষার মেঘের মতো গর্জন করেছে মেদিনী কাঁপিয়ে। এসব ভাবলেও তার মন এখন আর আঁতকে উঠল না, তবে নিজেকে তার বড় অভাগা মনে হতে লাগল। বড়োই অভাগা।

সে অভাগা এই কারণে যে, আজ এত কাল অতিক্রান্ত হবার পর সে যখন জারমণির কাছে ফিরে আসছে, তখন জারমণিকে দেখে উজ্জীবনের কথা নয় তাকে ভাবতে হচ্ছে তার করুণ মরণের কথা। এটাও ভাবতে হচ্ছে যে, যুদ্ধে পরাজিত হয়েও সে যদি বেঁচে থাকে, সে-বাঁচার কিবা দাম? মাঠারির আধিপত্য হারিয়ে, বীরযোদ্ধার গৌরব হারিয়ে, পুরুষের দম্ভ হারিয়ে, আখিরে জারমণিকেও হারিয়ে তার জীবনে যা থাকে তা তো জীবনের নামে শুধুই মৃত্যুর ভুড়ভুড়ি।

যদিও এই ভাবনার মুহূর্তে পাটন মাঠারিতে ঢুকে পড়েনি, কিন্তু রতিগড় টিলায় দাঁড়িয়ে থেকে জারমণির চোখে পড়ে যায় দূরের একটা বাঁক নিয়ে পুবের পথ ধরে সোজা এগিয়ে আসা বৃষ-শকট। শকটটি তখনও স্পষ্ট হয় না—শুধু দেখা যায় ক্রমশ অগ্রসরমান একটি ঢাউস মশাল। আর তাতেই জারমণি অনুমান করে পাটনের নিশ্চিত প্রত্যাবর্তন। মশালের আলোয় প্রতিভাত হয়নি তার ঘর্মাক্ত মুখমন্ডল। কিন্তু তবু সেই শকট, আর বাতাসে কম্পমান আলোক শিখা তাকে জানান দেয় পাটনের আগমন।

আশ্চর্য, বৎসরকাল বাদে পাটনকে আবার নতুন করে মাঠারিতে দেখতে পেয়েও জারমণির মধ্যে কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না। যেমন সে অতীতে ছিল —দু-বছর দশ-বছর বিশ-বছর আগেও—অবিকল তেমনি অভিব্যক্তি নিয়ে—ফুরফুরে হাওয়ায় অবিন্যস্ত তার চূর্ণকুন্তল—আলোকদন্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকল এই মহিয়ষী নারী। দাঁড়িয়ে থাকল শৌর্যৈর সঙ্গে। দাপটের সঙ্গে। অবিচল। আদিবাসী সমাজের দলপত্নী যেন। এমনকি, শকটটি কর্কশ শব্দ করে ধীরে ধীরে টিলার পাদদেশে এসে দাঁড়ালেও, কোনো আবাহনসূচক শব্দ দিয়েও—সরীসৃপ বা শৃগালের মতো করে আদিম মানবীর সাংকেতিক চিৎকারেও—জারমণি বুঝিয়ে দিল না যে সে আছে। পাটনের প্রতীক্ষায় থাকুক বা নাই থাকুক—কোনো পুরুষ ছাড়াই অরণ্যমন্ডিত এই স্বর্গভূমিতে সে একাকী বিরাজ করছে।

না:, জারমণি তা করল না। সেখানেও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সে আধিপত্য বজায় রাখল তার। যেন এতদিন বাদে তাদের পরস্পরের দেখা হওয়ার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আনন্দ-বিস্ময়টুকুও একতরফা পাটনকেই প্রকাশ করতে হবে। হয়তো বলতে হবে, ‘জারমণি! দেখ, দেখ! তোমাকে বিস্মিত করে দিয়ে কত-কত ঋতুচক্র সম্পূর্ণ করে তবেই আজ ফিরে এসেছি আমি। এখন এই ফেরা আমার যতাটা না যুদ্ধের নিশ্চিত বার্তা নিয়ে ফেরা, তার চেয়েও বেশি তোমাকে দেখার কৌতূহল নিয়ে।’

হয়তো, এমন কথা পাটনের মুখে শোনার পরেও, এতটুকুও তার ভাবগতিক পালটাবে না, কোমল হবে না সে-নারী। পাটনের জন্য জারমণি তার শরীর তো রাখেইনি, কখনোই অংশীদার করেনি তার আমিষ উৎসবে, এমনকি মনটুকুও সে তাকে উদার হয়ে দিতে পারে না। ঘাড় ওপরের দিকে তুলে, সেই পাষাণময়ীকে দেখতে দেখতে, পাটনের মন কি বিষাদে ভরে ওঠে?

কিন্তু এখন সেই বিষাদ নিয়ে থাকা—বিষাদকে উপভোগ করার সময়ও যে আর নেই। সময় তো চলেই গেল! কত-কত সময়! চলে গেল অবহেলায়, অভিমানে, দুঃখে, তৃষ্ণায়, কাতরতায়, কল্পনায়। কত বিনিদ্র রাত পর্ণকুটিরে বসে চৌহদ্দির তালপাতার ফাঁকে চন্দ্রমা দেখে আর প্রহর মাঝে হঠাৎ-হঠাৎ ডালে-পাতে নিদ্রাচ্ছন্ন পাখিদের কুড়ু-কুড়ু ডাক শুনতে শুনতেই কেটে গেছে তার। কখনো সে নিরাশ মনে একা-একাই সারা মাঠারি ধনুক কাঁধে নিয়ে টহল দিয়েছে—নিজেকে মনে হয়েছে তার প্রেতাত্মা। কিংবা, কোনো জ্যোৎস্নারাতে ইরাবতীর পাড়ে তালগাছের তলায় জানু প্রসারিত করে বসে কেবলি দেখে গেছে জারমণির মস্তকোপরি কেশে গাঁথা নাগকেশরের মতো জলতলে টলটল করতে থাকা নি:সঙ্গ চাঁদ। হু-হু করে উঠেছে তার শুষ্ক তাপিত বক্ষ। এই চাঁদই তো জারমণি? এই পুষ্করিণীই তো প্রেমের আধার? পাটন আসমানের সেই সদাহাস্যময় ইন্দুকে ইন্দুবয়ান-কল্প-মানবী সম্বোধন করে, কত কথা যে বলেছে! কখনো শুধু মনের খেয়ালে তিরের ফলা দিয়ে ধরণীপৃষ্ঠে কোপ মারতে মারতে, তাকে সর্বংসহা সম্বোধন করে বলেছে, ‘হে মাতঃ, হে সর্বংসহা জননী! আমি নারীর জন্য আর অন্তহীন অপেক্ষা করিতে চাহি না, যুদ্ধের জন্যও শত-সহস্র বাণ নির্মাণে আর আগ্রহী নই। আমাকে মুক্তির পথ বলিয়া দাও। তোমার পরিসর ক্রোড়ে দাও আমার শান্তির চিরশয়ান!’ কিন্তু তাও আর হল কই?

পাটন, কখনো-কখনো, বেখেয়ালে এমনও ভাবে যে, যতদিন তার মনে নারীতৃষ্ণা থাকবে, ততদিন সে শান্তি তো পাবেই না—তার জীবন দুর্ভাবনায়, দুর্বিপাকে, পীড়নে, নিগ্রহে জেরবার হবে। হচ্ছেও তাই। সে এটাও ভাবে, সে কামকূপে নিক্ষিপ্ত বলেই জীবন তার অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েই থেকে গেল। বহু-বহু প্রাচীন কূর্মের মতো জীবন অঙ্গনে মুখ বাড়িয়েও তাকে ক্ষণে ক্ষণে মুখ ঢুকিয়ে অন্তরালে চলে যেতে হচ্ছে। সে পাপী! তার জীবন তাই এমন বঞ্চনাময়। সে এও বুঝেছে, তার এই সবকিছুরই মূলে ওই এক মানবী। একশৃঙ্গ গন্ডারণী।

পক্ষান্তরে, যুদ্ধ গায়ে-গায়ে এসে পড়ল বলেই বোধ হয়, সময়ে-সময়ে আবার পাটনের মনে পড়ে যায় তাকে উদ্দেশ করে বলা অগ্রজের তেজোদীপ্ত উক্তিগুলি। অঙ্গদ তাকে কী বলতে ছাড়েনি? এমনকি, দিনে-দিনে অস্বাভাবিক রকম স্ফীত হয়ে ওঠা দেহকেও সে কটাক্ষ করা থেকে রেহাই দেয়নি। শুধু কটাক্ষ নয়, সে তার মধ্যে জগৎসংসারের প্রলয়ের আভাস দেখতে পেয়ে একটি অবাক-করা কথা বলেছে। সে বলেছে, তার এই দৈত্যসদৃশ ভীমকায় শরীর তার একার শরীর নয়—সমগ্র জীবজগতের পাপের প্রতিভূ। তা মানজীবনের আসন্ন দুর্দিনের বার্তা বহন করছে। এই দেহ যতই ফুলেফেঁপে উঠতে থাকবে, বুঝতে হবে পাপে ততই পরিপূর্ণ হতে চলেছে সমাজ। ততই তার ধ্বংস নিকটবর্তী হতে চলেছে। এই ধ্বংস, এই প্রলয় থেকে বসুধাকে বাঁচাতে হলে সবার আগে তাকেই নিধন করতে হবে। নিধন করতে হবে এমনভাবে, যাতে তার শরীরের বিষবাস্প বাতাসকে দীর্ঘসময় কলুষিত করতে না পারে। অঙ্গদ মহাপ্রবীণের কাছ থেকে তাকে হত্যা করার কৌশলও জেনে নিয়েছে। সে তাকে গদাঘাতে মারবে না, তাকে অর্ধমৃত অবস্থায় মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে মাঠারিভূমিতে ফেলেও রাখবে না। তার সর্বাঙ্গে সে উপর্যুপরি এমনভাবে শরবিদ্ধ করবে, যাতে শতধা দীর্ণ হয়ে সে মর্মে মর্মে টের পায়—মৃত্যু কী, যাতনা কী!

অগ্রজের এমন হুঁশিয়ারি শুনে, পাটন, সেদিন বাতাসে তরঙ্গ তুলে উৎকট হাসি হেসেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে যতবার সে-কথা তার মনে এসেছে, হাসির দমক কমে এসেছে তার। এমনকি, একসময় তার মনে তা ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। নিজের প্রতি নিজের সন্দেহ দেখা দিতে থাকে। যে ঐরাবত-করাল দেহ নিয়ে তার পৌরুষ জাহির করার অন্ত ছিল না, তার গৌরবের সীমা ছিল না, সেই দেহকে নগ্নাবস্থায় দেখে সে নিজেই ভয় পেতে শুরু করে। তার মনে হয়, তবে কি সত্যিই সে এক মূর্তিমান পাপের পাহাড়? সেই সঙ্গে সে এটাও ভেবেছে—আর এই ভাবনা যথার্থও—যে, এই পাপকে নির্মূল করতেই অঙ্গদ যুদ্ধে আহ্বান জানিয়েছে পাটনকে। শুধু পাটনকেই-বা কেন? সমগ্র পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামবাসীদের নিয়ে তার জেহাদ তো সমগ্র পূর্বাঞ্চলের বিরুদ্ধেই? তাদের অন্যায়, জুলুম, অত্যাচার, পশুস্বভাব আর লুন্ঠনপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে।

থাক সে-সব কথা। আর অঙ্গদ নয়, জারমণি নয়। তাছাড়া যে-মুখে যে মন নিয়ে সে জারমণির কথা ভাবছে, সে-মুখে সেই মন নিয়ে সে তার সহোদরের কথা ভাবতে চায় না। সেই বিগতযৌবন বৃদ্ধই তার জীবনের সকল দুঃখের দিয়া জ্বেলে দিয়ে গেছে।

সত্যিই কি তাই? এর পিছনে জারমণির ভূমিকা নেই? নাকি, আজও, বহুবর্ষ বাদেও, ওই বৃদ্ধের কারণেই জারমণি তার জারমণি হয়ে উঠল না? পাটন প্রায়শ তার স্ত্রীশরীরের ঘ্রাণ পায়, কিন্তু পায় না তার নাগাল। কখনোই তার বসন উন্মোচন করে সে তার লুকিয়ে রাখা চাঁদের দেখা পায় না। পাবেও না হয়তো কোনোদিন। তার চোখে শুধুই অমাবস্যা।

এখন পাটনের আর নতুন করে ভাবতে ভালো লাগে না যে, ভরা যৌবন ও উত্তাপ নিয়ে যে-নদী কলকল করে বয়ে চলেছে তার সন্নিকটে, তাতে একটা দিনও ডুবকি মারা হল না তার। কামনার জর-জর সারা অঙ্গের বিষ অঙ্গেই রয়ে গেল, তা আর বিধৌত হল না, তাকে নির্বিষ ও শান্ত-শীতল-পবিত্র হতে দিল না। এখন সেই বিষ নিয়েই তাকে প্রতিপক্ষ দমনের তরে ধনুর্বাণ হাতে নামতে হবে মাঠারি-যুদ্ধে। এখন আর জারমণিকে নিয়ে নয়, তার মনকে পরিব্যাপ্ত রাখতে হবে যুদ্ধকে নিয়ে, সহোদরকে নিয়ে—তির-ধনুক-শল্য-শস্ত্র নিয়ে তার দলের দিকে হাজারে হাজারে আসতে থাকা যোদ্ধাদের নিয়ে। নিজেকে অবিরাম রণমুখী ও একাগ্র রাখতে, কল্পনায় শুনতে হবে শত-শত শঙ্খের সম্মিলিত ধ্বনি, কাড়া-নাকাড়া আর রণতূর্যের গগনবিদারী আওয়াজ! শুনতে হবে কাংস্য নির্মিত ঝল্লবীর বেজে চলা! মনে যত হতাশাই আসুক না কেন, তাতে তার ভেঙে পড়া চলবে না। বরং তার মনে সর্বদা গুঞ্জরিত যত নৈরাশ্য ও আক্ষেপ ভুলে গিয়ে প্রকৃত যোদ্ধার মনোভাব নিয়েই এখন তাকে মুখোমুখি হতে হবে জারমণির। অন্যথায় এই মায়াবী নারী তাকে কোথা থেকে কোথায় যে নিয়ে যাবে তা পাটনের ভাবনার অতীত।

এখন সে জেনেই গেছে যুদ্ধেই তার সকল নিষ্পত্তি। অন্য কিছুতে নয়। জারমণিকে পেলেই তার সকল পাওয়া, তার নবজীবন। কিন্তু তার জন্য ভ্রাতৃবধ অনিবার্য। এই অমিত বৈভব, এই অতুল প্রতিমা-নারীকে বাহুপাশে পাওয়ার জন্য সে কেবল কাঁধ থেকে মহাধনুকটি তার পায়ের কাছে নামিয়ে, টিলার শৃঙ্গ থেকে তার তর্জনী ঘুরিয়ে বলতে পারে, ‘এই অখন্ড দেবলোকের কিছুই কাঙ্ক্ষা করি না আমি। হে মোহিনী, আমাকে তুমি শুধু ভ্রাতৃহন্তা হইবার মন্ত্র দাও! আমার হাতে দাও শতঘ্নী!’

কিন্তু এই ভাবনাও তাৎক্ষণিক। স্তনভারে অধিক সুন্দরী জারমণিকে সে-ই বক্ষলগ্না করবে এই দুরাশা পাটনকে উগ্র করে তোলে। কী মনে হল, কাল্পনিক আনন্দে বিহ্বল হয়ে পাদভূমি থেকে চিৎকার করে-করে সে বলতে থাকে, ‘ভামিনি! আমি জানিতাম, তুমি অগ্নিকশলাকা হাতে লইয়া শুধু আমারই তরে অপেক্ষায় থাকিবে! আমি ইহাও জানিতাম, এই মাঠারিভূমিতে যাবৎকাল আমি অনুপস্থিত, তাবৎকাল তুমি কেশচর্চা করিবে না। তোমার অবহেলিত কেশকলাপ আমাকে তৃপ্তি দিতেছে! আমি অবশ্য-অবশ্যই জানিতাম তুমি এই ব্রতে নিষ্ঠাবতী হইয়া থাকিবে, কেনকি, তুমি আমাকে চাহ, তুমি যুদ্ধকে চাহ। কিন্তু রানি, হাতে শলাকা লইয়া আজ আমাকে দেখাইবার কিবা প্রয়োজন? তোমাকে চিরতরে বক্ষলগ্না করিব বলিয়া আমি নিজেই অগ্ন্যাধার হইয়া ফিরিয়াছি আজি। তুমি দেখিয়া লইবে আমার সর্বগ্রাসী শত্রুবিনাশী প্রবল অগ্নি দ্বারা এই মাঠারিতে জীয়ন্তে দগ্ধ হইবে আমার বিদ্যাদাম্ভিক সহোদর! সে মূর্খ, রানি, সে মূর্খ! সে প্রাণঘাতী অস্ত্র অপেক্ষা অধীত বিদ্যাকে ধারালো হাতিয়ার মনে করিয়া থাকে।—রে পাষন্ড!’ পাটন চকিতে পশ্চিমমুখে ঘুরে গিয়ে তার নাটকীয় সংলাপ বলে চলে, ‘জম্বুরাঝাড়ে লুক্কাইয়া থাকা শূক্কর! এই বতর তুই শুনিয়া রাখ—যে-বীরবাহু দেড়মণি ধনুকে জ্যা রোপণ করিতে সক্ষম, যাহার ক্রুদ্ধ পদাঘাতে প্রস্তর চূর্ণ হইয়া যায়, বিদ্যার দর্পও তাহার কাছে প্রভুর পাদদেশে কুক্কুরের ন্যায় মস্তক অবনত করে। যুগে-যুগে, জনমে জনমে, এই ধরাতলে বলই শাসক, বলই রাষ্ট্র, বলই নিয়ন্তা, বলই মহাপ্রভু। কেবল বলশালীই পারে ক্ষমতার দাপটে বিদ্যার ধ্বজাকে আকাশ হইতে টানিয়া নামাইয়া ছিঁড়িয়া-চুঁথিয়া ধরার ধূলায় পদপিষ্ট করিতে। —রানি! আমি যে এখনই বাতাসে শত্রুদহনের সেই কটূ গন্ধ পাচ্ছি!’

কোনো প্রত্যুত্তর এল না অধিত্যকা থেকে। বরঞ্চ, দর্পাভিমান সংবলিত তথা বিদ্যার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনকারী এই সকল সংলাপ শুনে, বলাবাহুল্য, জারমণির বাক্যস্ফূরণ না ঘটলেও তার মুখমন্ডল আরো কঠিন হয়ে উঠল, যা টিলার নিম্নভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকায় দৃষ্টিগোচর হল না পাটনের।

অগত্যা, পাটন, মুষ্টি-অন্নের মস্ত মস্ত বাঁশের ঝুড়ি ও ধামাগুলি কাঁধে নিয়ে-নিয়ে দ্রুতপদে অনায়াসে টিলার মাথায় উঠে যেতে থাকে।

১৮

পাটন বেরিয়েছিল রাতের ঝিপঝিপে অন্ধকার ভেদ করে, ফিরেও এল বহু জঙ্গল-জনপদ পেরিয়ে এক শরীর নিশ্ছিদ্র আঁধার নিয়ে। তার জীবদ্দশা থেকে এই ঘোর অমানিশা কিছুতেই বুঝি অপসৃত হবার নয়। জ্ঞানত সে কখনো অরুণোদয় দেখেছে বলে তো মনে হয় না। সূর্যের স্তব করার কথা জীবনেও ভাবেনি। কোনো কোনো প্রত্যূষে, পরব-তিওহারে, যখন দূরবর্তী আদিবাসী বসতিগুলি থেকে ডাসাই-পাতা ইত্যাদি দং-এনেচের লাগড়ার ধ্বনি, তিরিও-র সুর ভেসে আসে, তখন তা কদাচিৎ তার অসংস্কৃত মনকে উদবেলিত করে। একটি বারের জন্যও তা শতচ্ছদ পাখির মতো তার রঙিন ডানা ছড়ায় না।

জারমণির কাছে থাকলেও জারমণিতে তার আশ্রয় নেই। সে হামেশাই ঝুড়ে-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। কোথাও যেন সে নিজেকে, নিজের অতৃপ্ত-চঞ্চল-হুহু মনকে দু-দন্ড নামিয়ে রাখতে চায়। সেই আশ্রয়ের খোঁজে, কাঁধে ধনুক পিঠে তূণীর নিয়ে, আদুড় গায়ে দুহাত দিয়ে ঝিণ্টী, বাবুই, তুলসী, বল্লকীর ডালপাত টালতে টালতে সে জঙ্গল-ঝাড়ির ভেতরে ঢুকতে থাকে। তখন পালহার মাঝে তাকে স্থলবিহারী জলহস্তির মতো লাগে। যতই সে গাজাড়ে ঢোকে, ততই কত যে অনামী আরণ্যক পুষ্পের সুবাস তার নাকে আসে! ভুনভুন করে উড়ে যায় মধুমক্ষিকা। কিন্তু কখনোই প্রকৃতির এই চমৎকারে মোহিত হয়ে পড়ে না সে। বরং গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে জীবকুলের মিথুন দেখে বেড়ায়, আর সে-সময় নিজের সঙ্গে জারমণিকে কল্পনা করে সে তা উপভোগও করে। দুর্ভাগ্য এটাই যে, রতিক্রিয়াকেই জগতের অন্যতম বিস্ময় মনে হয় তার। রাতে সে নিজেই নিজেকে অশরীরী ভেবে বসে।

এমন পাটনকেও, এই যুদ্ধ, এখন বাস্তবমুখিনতার অভিমুখে পালটে দিয়েছে। তার মনে এই বোধও জাগিয়ে তুলতে পেরেছে যে, যুদ্ধই শেষ আশ্রয়—তাহার উপর নাই।

মনের টানা-পোড়েন তার যে একেবারে ছিল না, তা নয়। তবু মুষ্টি-অন্নের অভিযান যথাযথ শেষ করে ফিরে আসতে পেরেছে সে। আসার পরও নিজেকে সে অলস করে রাখেনি। গোপনে ধুরবুল্লি পাখির মতো ঝুড়েপাতে লুকিয়ে থেকে জারমণির অবারিত অঙ্গের দিকে তাকিয়ে মোহগ্রস্ত হতে চায়নি। এমনকি, বিশেষ কোনো-কোনো মুহূর্তে এই নারীকে দেখে, কিংবা জঙ্গুলে জোৎস্নায় রসবতী চাঁদের দিকে তাকিয়ে, শরীরে জৈব শিহরণ হাওয়া লাগা আখের ক্ষেতের মতো সরসর করলেও, স্বমেহন থেকে নিজেকে সে বিরত রেখেছে। নিজের ভেতরেই সে সঞ্চয়করে রাখতে চায় তার অমিত শক্তিকে। ক্ষণস্থায়িত্বের নেশায় ভুলে এই চূড়ান্ত মুহূর্তে গুরুদায়িত্ব থেকে মনকে সে সরিয়ে নিতে চায়নি।

আশ্চর্যের যা, তা হলো যে, সে এখন তত্ত্ব কথায় ভাবতে শিখেছে—লক্ষ্যচ্যুতি মানবের বিনাশ ঘটায়। এমনটাও সে ভাবে যে, ক্ষণস্থায়িত্বে কোনো সুখ নেই। যুদ্ধজয়ের ভেতর দিয়ে জারমণিকে নিয়ে সে নিজের চিরকালীনতার কথা কল্পনা করে। যা চিরকালীন, তা-ই শোকহীন, বিলাপহীন, সুন্দর! যেদিন তার সেই সুন্দর তার অধিগত হবে, যেদিন হাজার-হাজার আদিবাসী-অনাদিবাসী স্ত্রী-পুরুষ মাথায় রং-বেরং-এর পালক গুঁজে, স্তনে-বাহুতে উল্কি এঁকে, লতপাত-কাঠিমালার আভরণে অলংকৃত হয়ে উদ্দাম নৃত্য করবে, বাঁশের চোং থেকে অকাতরে হাড়িয়া আর মহুলরস ঢেলে নেশায় টঙ হবে, ঢোল-ধামসা-ঝাঁঝ-করতাল বাজিয়ে তার হয়ে জয়োল্লাস করবে, সেদিনই সে ফিরে পাবে তার জীবন! সে ফিরে পাবে তার নিষ্কণ্টক জয়, যেদিন এই দৈব রতিগড়ে তাদের দুঃসাহসিক বসবাসকে ধর্মভীরু, সরল এই গ্রামবাসীরা আরো সমীহ করবে, এই রাজন্যকূলকে স্বয়ং ঈশ্বরপ্রেরিত আদিবাসী সমাজের সর্দার-সর্দারনি হিসেবে গ্রহণ করে পাটনকে সমগ্র মাঠারিভূমির অধিপতি করে তুলবে!

হ্যাঁ, সেই দিন সে সারা রতিগড় টিলাকে ঘিরে ভেরেন্ডা ডালের সহস্র মশাল জ্বালাবে! দড়দড় করে জ্বলতে থাকবে তারা। যুদ্ধক্লান্ত মাঠারিকে আবার নতুন করে প্রাণশক্তিতে সঞ্জীবিত করবে, আর তার চাটান পাথরের মতো লোমশ বুকে সশব্দ করাঘাত করে বলবে, ‘রে পাষন্ড, মানবেতর! তোর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে নতুন করে সূচনা হল আমার জীবনের। আমি আজ এই সমগ্র অরণ্যভূমির আদিবাসী নৃপতি। ক্ষত্রিয় না হইয়াও আমি প্রকৃত ক্ষত্রিয়! আমার ক্ষাত্রতেজে আজ ভূমন্ডল উজ্জ্বল! ধরণীতল রক্তস্নাত! দেখ, যদি মরণোত্তর কালে করুণাবশত ঈশ্বর তোকে নয়ন দিয়া থাকে, তবে দেখ বীরত্বসূচক আমার দক্ষিণস্কন্ধে ভূমি স্পর্শ করিয়া আছে আমার ধনুষ্কোটি, আর আমার বাহুপাশে আবদ্ধ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আরেক মহাস্ত্র—জারমণি! দেখ, কলহাস্যময়ী এই মোহিনী সুন্দরীকে। অন্তিমবারের মতো দেখিয়া লে! তোর বিদ্যাবিভূষিত চর্মচক্ষু দিয়া দেখিয়া লে আমার ঘটোঘ্নীকে, বীর্যখাত-শুষ্ক, অধোশিশ্ন বৃদ্ধপুরুষ হইয়াও যাকে লাভ করিবার তরে যুদ্ধের উসকানি দিয়া বৃথা অযুত নর-নারীকে সমরাঙ্গনে প্রাণ বলি দিতে বাধ্য করিলি! আর আমার এই স্বর্গপ্রতিম চিরহরিৎ অরণ্যভূমিকে রক্তার্প মরাভূমিতে পর্যবসিত করিলি! ইহার জন্য তুই দায়ী! তুই দায়ী! তুই রে কপট-ভন্ড-বিদ্যাহঙ্কারী! বিদ্যাই তোকে নপুংশক করিয়াছে। সেই নপুংশকের অপবিত্র দেহ আমি কাঁড়বিদ্ধ করিয়া ঈশ্বরের পূজা করিয়াছি! আমার যে-দেহ পৌনঃপুনিক স্ফীতিশীল, যা অষ্টপ্রহর বীরত্ব ও পৌরুষের দামামা বাজাইতেছে, নারীর দেহসন্তোষের তরে সদা জাগরুক রহিয়াছে, তাহাকে তুই কিনা ঠাট্টা করিয়া বলিয়াছিলি—পাপের প্রতিভূ! দাম্ভিক, শূক্কর! দেখ কেমন লাগে! আজ তারই নির্মম হাতে তোর মাঠারির ধূলায় চিরশয়ান...’

দম্ভের সঙ্গে, পৌরুষের সঙ্গে দাঁত কিচকিচ করিয়া এমন সব ভাবতে পাটনের বড়োই ভালো লাগে। ভালো লাগে এই কারণেও যে, কাল্পনিক যুদ্ধে সে বরাবর জয়ী হয়। তবে এখন যুদ্ধোত্তর ভাবনার অধিক বিস্তার সে ঘটাতে চায় না। আগে যুদ্ধ, তারপরে তো যুদ্ধোত্তর ভাবনা?

পাটন ভেবেছিল, শকট পরিপূর্ণ করে নিয়ে আসা তার মুষ্টি-অন্নের বহর দেখে জারমণি খুশি হবে। খুশি হবে এই ভেবে যে, পাটন অন্তত শত-সহস্র মানুষকে পশ্চিমাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলতে পেরেছে।

জারমণির আচরণে, বস্তুত, সেই খুশির দৃশ্যত প্রকাশ না থাকলেও, এটা সত্য যে, জারমণি অনেকটাই তৃপ্ত হয়েছে। সর্বদাই যুদ্ধবিমুখ স্বভাবের এই পুরুষটি প্রতিপক্ষের উপযোগী নিজেকে হিংস্র করে তুলতে পেরেছে বলে। জারমণি তো এটাই চেয়েছিল।

তবে, অন্যেরা তাকে চাগিয়ে তুললেও, পাটনকে তার জন্য নিজের সঙ্গেও কম লড়াই চালাতে হয়নি। বলা যায়, সেটাই ছিল তার কাছে সবচেয়ে কঠিন ও কঠোর লড়াই। কারণ এই যুদ্ধে নিজেকে প্রতিপক্ষ হিসেবে সহোদরের মুখোমুখি করার ব্যাপারে মন যেমন তার হঠাৎ-হঠাৎ হিংসায়, আক্রোশে ফুঁশে উঠেছে, তেমনি ভয়ে ও আশঙ্কায় বসেও পড়েছে। এই বসে পড়া মনকে আবার নতুন করে চাঙ্গা করে তোলাই ছিল তার কাছে অদৃশ্য, অন্তর্নিহিত, নিরন্তর এক সংগ্রাম। গোয়ালে কাহিল গবাদি যেমন চতুষ্পদ নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, তাকে তখন পেটের তলে এপাশ-ওপাশ থেকে বাঁশ-খুঁটা ঢুকিয়ে বলপ্রয়োগ করে খাড়া করার প্রয়াস চালানো হয়, তেমনি নিজেকে যুদ্ধের সপক্ষে বাগে আনতে অবিচ্ছন্ন প্রয়াস চালিয়ে গেছে পাটন। মনকে বলেছে, মনরে, জাগো, জাগো!

মন জাগল অনেক পরে, যখন তার না জেগে আর উপায়ও ছিল না।

ধর্মত, তার মনের না-জাগার একটাই কারণ, ভয়। মুষ্টি-অন্ন সংগ্রহাভিযানে তার কেবলি মনে হচ্ছিল সে এখন এক অসম লড়াইয়ের ফেরে পড়ে গেল। এক তো, সারা পূর্বদেশ ঘুরে ঘুরে তাকে মানুষের কাছ থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে তাদের আগাম প্রতিশ্রুতি নিতে হচ্ছে, অথচ অঙ্গদকে তেমন কিছুই করতে হচ্ছে না। পশ্চিমবাসীরা নিজেরাই এগিয়ে এসেছে তার হয়ে। তারা মনে করেছে এই যুদ্ধ আখেরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের চেহারা নিলেও তা তাদেরকে প্রতিবেশী বর্বর সমাজের মানুষদের থেকে মুক্তি দেবে। যদি সে মুক্তি না চাও, তবে চিরকালের জন্য তাদের জুলুমকে মেনে নাও, তাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাহলে আর কোনো কথা বলারও প্রয়োজন নেই।

কিন্তু তারা তা করেনি। অঙ্গদের যুদ্ধকে তাদের মুক্তিযুদ্ধ মনে করে হাজার-হাজার প্রান্তিক মানুষ এখন স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে এই যুদ্ধে সামিল হতে চলেছে।

দুই পক্ষের মনোভাবের এই ফারাক, পাটনকে, বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। সে-চিন্তা যে এখন পুরোপুরি দূরীভূত তাও বলা চলে না। তবে ক্রমে ক্রমে সে যখন দেখতে লাগল যে, পূর্বদেশীরা মুষ্টি-অন্নে ভালোভাবেই সাড়া দিয়েছে এবং তারা এই যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে আসতে বা কোনো রফা-মীমাংসা করতেও রাজি নয়, তখন পাটনও ভরসা পেল, অনেকটাই।

পাশাপাশি আরো একগুচ্ছ আশঙ্কাও তাকে চিন্তাচ্ছন্ন করে তুলছিল। তার মনে হয়েছিল, গ্রামবাসীরা, বিশেষ করে নানান গ্রামের মাতব্বরা,যারা মদ-হাঁইড়া খাওয়ার মতোই এই যুদ্ধকে ফুর্তির সমাহৃত রূপ মনে করে মাঠারির এপার-ওপার দুই ভূখন্ডে বসবাসকারী মানুষকে সম্মান ও পৌরুষের জিগির তুলে এই লড়াইয়ে ঠেলে দিতে চাইছে, প্ররোচিত করছে, তারা এই যুদ্ধকে নিষ্পত্তির পর্যায় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারবে তো? বিভিন্ন ডি-ডিহাতে, বড়তলে-জৈড়তলে-হরিমন্দিরের গোল-চত্বরে কেবল যুদ্ধেরই মিটিং চলছে, কর্মী বাহিনী গঠন করা হচ্ছে। পাটন সেসব আলোচনায় থেকে, বসে, আলোচনা করার পরেও তার মন থেকে এই সন্দেহ পুরোপুরি যায়নি। যতবার সে নিজের মতো করে, কোনো আবেগ ছাড়াই, ঠান্ডা মাথায় ভাবতে চেয়েছে সে-কথা, ততবার তার বুক আঙরার মতো শুকিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেছে, আর তাকে আরো অনেকানেক প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। সে ভেবে কূল পায়নি। শত-শত গ্রাম! হাজারে হাজারে যোদ্ধা! লেলে-মাছির মতো ছুটে আসছে! কত বারশত আয়োজন। সে-সব বাদ দিয়েও, যুদ্ধ চলাকালীন দিনের পর দিন যোদ্ধাদের বিপুল খাদ্য-রসদের জোগান দেওয়া যাবে তো?

আর শুধু যোদ্ধাই-বা কেন? তার সঙ্গে হাজার-একটা পদ নিয়ে দায়িত্বে থাকা আরো অগণিত মানুষও যে জড়িত? গোল-সিপাই, লম্বরদার, পল্টনবাজ, হুকুমদার, তল্লাসীদার, লাটঘরী এমনি কত-কত-কত যে পদ! এই বিরাট লোকলস্করের জন্য দু-বেলা ঝালরাঁধা আর ভাতের ‘ভান্ডারা’ চালু রাখলেই তো হবে না? তাদের জন্য পানি, চুটি, মদ-ভাং-হাঁইড়া-র সদাব্রতও খুলে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, যোদ্ধাদের পেট-পানির খরচার চেয়ে মাদকের খরচা কম নয়, বরং বেশি। নেশায় অচেতন করে তবেই তো তাদের হাতে কাঁড়বাঁশ ধরিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে। যাও, এবার বুকে-পেটে কাঁড় বিঁধিয়ে মর!

খরচের এই বহর দেখে, পাটনের মনে হয়েছিল, জোগান দিতে না পারায় যদি শেষতক তাদের ‘শান্তি-ছতরি’র তলে দাঁড়িয়ে, বিরোধীপক্ষের উদ্দেশে যুদ্ধে আত্মসমর্পণের বার্তা দিতে বহু-বহু দূর ধ্বনি নিক্ষেপকারী সহস্র মদনভেরী বাজাতে হয়? যদি মাঝপথে সাধারণ গ্রামবাসীরা যুদ্ধের দায় নিতে অস্বীকার করে? যদি তারা ‘জঙ-খরচা’ বা যুদ্ধকরসহ অন্য যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকে? যদি কয়েকশো সাপ্তাহিক হাটের ক্রেতা-বিক্রতারা ক্রয়-বিক্রয়বাবদ হাটমাশুলও দিতে আপত্তি জানায়? তারা যদি এই অকারণ রক্তপাতের লড়াইয়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করে বসে? তখন কে তার সামাল দেবে? কিংবা যদি ফলন মার খেয়ে যায়, অথবা মার না খেলেও গরিব চাষিরা যারা নিজেদের পরিবারের সম্বৎসর চালচিঁড়ের জোগান দিতে পারে না, তারা যদি সেই ন্যায্য কারণ দেখিয়ে অবিলম্বে এই যুদ্ধকে বন্ধ করতে বলে? স্থগিত রাখতে বলে? যদি প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করার মতো গ্রামগুলিতে যোদ্ধাই আর না পাওয়া যায়? তখন তো এমনিতেই এই যুদ্ধ তাদের পরাজয় ঘোষণা করে থেমে যাবে। হুকুমদারের নির্দেশ মেনে হড়-গদামে বিশ্রামরত যোদ্ধারা তখন আসমানচুম্বী বাঁশঝাড়ের মাথায় পরাজয়ের কারণে সন্ধির নিশানস্বরূপ মরা ইঁদুর, মরা শুয়োর, খটাস, খেড়, বরা ঝুলিয়ে রেখে শূন্যে ক্রমাগত ঝাঁকুনি দিতে থাকবে, আর এক সঙ্গে করুণ সুর তুলে বাজতে থাকবে হাজারো মনদভেরি! বিক্ষিপ্তভাবে বহু যোজনব্যাপী মাঠারিক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা যুদ্ধ ধীরে-ধীরে থেমে যাবে সূর্যাস্তের আগেই।

শুধু থেমে যাওয়া নয়, তখন বিজয়ীরা দখল নেবে সমগ্র এলাকার। তখন আর পূর্বদেশ-পশ্চিমদেশ বলেও কিছু থাকবে না, নতুন করে গড়ে তোলা হবে ছোটো-বড়ো মিলিয়ে সতেরোশো চুরানব্বইটিরও বেশি গ্রাম নিয়ে অখন্ড মাঠারি রাজ্য। বিভিন্ন আদিম জনগোষ্ঠীর দলপতি ও সর্দারদের নিয়ে প্রবর্তন করা হবে নতুন এক শাসন-ব্যবস্থার।

তার আগে, যুদ্ধ থেমে যাওয়ামাত্র এই মাঠারির প্রতিটি শৃঙ্গে উড়তে থাকবে পশ্চিমাদের বিজয়কেতন, আর পূর্বাঞ্চলের মৃতসৈনিক বাদ দিয়ে যত-যা গ্রামবাসী তখনও বেঁচে থাকবে, তাদের সবাইকে পশ্চিমাদের নিরঙ্কুশ দাসত্ব মেনে নিতে হবে। মেনে নিয়ে তাদের আপন-আপন ধর্ম, সামর্থ্য ও বৃত্তি অনুযায়ী যুগ-যুগ ধরে পশ্চিমাদের ঘরে বাগাল-মুনিষ-রাখাদারের কাজ করে যেতে হবে। যুগ-যুগ ধরে, যতদিন না আবার নতুন করে বিদ্রোহের সূচনা হয়। সে তো পরের কথা। এখন দেখা যাবে, অন্নদাস হয়ে তারা কেউ নিজের ঘর-সংসার হারিয়ে পশ্চিমাদের পরিবার দেখভাল করছে, তাদের ছাগল-ভেড়ির পাল নিয়ে বনে-ডুংরিয়ে যাচ্ছে পাত-পালহা খাওয়াতে, চরাতে। জমিদারদের উপুড় করে শুইয়ে সারা গায়ে কচড়া তেল মালিশ করে দিচ্ছে, তাদের বউমানুষরা পুয়াতি হলে, পুয়াতিদের সেবা করছে, গুহাল ফেলছে, ভোর হতে না হতে আঙিনায় গোবরলাতা দিচ্ছে, প্রসূতিদের কাঁচা পেট তাড়াতাড়ি যাতে শুকিয়ে যায় তার জন্য চিঁড়া কুঁটে দিচ্ছে, সেই চিড়া মাটির খোলায় ভেজে তাদের খাওয়াচ্ছে, আবার রোজ বাঁধের ঘাটে এক ডিড়িং৩ কাপড়-চুপড়ও কাচতে নিয়ে যাচ্ছে। তাবাদে বেলা পড়লে যখন ঘরে আসবে তখনও না তাকে কেউ খেতে ডাকবে, না তার জন্য পেট ভরে খাবার মতো ভাত-বেসাতি অবশিষ্ট থাকবে। হেঁশেলঘরে একাই বসে-বসে অসহায় নারী চোখের জল ফেলবে! বলবে, হায় রে জীবন! পরব-পালিতেও তার গায়ে মাটি ঘষার সময় সে পাবে না, চুলে তেল জুটবে না, পরনের লুগা ছিঁড়া ডুলডুলি।

অথচ, মালিকঘরের সবাই কেমন চিকন-চাকন। পুরুষদের মাথায় আলবেট কাটা, সধবাদের পায়ে আলতা, মলমল করছে তাদের গা-গতর। খাওয়া-মাখা শরীর। হয়তো তখন তার মনের শোক সুর হয়ে বাজতে থাকবে। সে তো ক্রীতদাসী, তবু ওদের পাশাপাশি তার নিজের জীবনের এই করুণ পরিণতি দেখে তার মনে পড়ে যেতেই পারে সেই কুড়মালি গীতটি, যেখানে যৌথপরিবারে পড়া হতদরিদ্র বধূর কামিনেরও অধম জীবন—কী কাব্যময় করেই না নারীর সেই দুঃসহ অসহায় জীবনচিত্রকে পরিস্ফূ¨ট করা হয়েছে:

বড় ঘারেক বহুক বড়ি জ্বালা গ

কামিনী খাটইতে দিন গেলা

খুখড়ি ডাকইতে উঠি ভুখল-ভুখল ধান খাঁচি

কুঁটি-কুঁটি গড় সিঝি গেলা

কামেক খনে রিটি পিটি খায়েক ক্ষণে তেঁতর চাটি

খাটি-খাটি দেহি সিঝি গেলা...

যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে, যে-পক্ষই বিজয়ী হোক না কেন, তারা পরাজিতদের অবশ্যই ক্রীতদাস করবে। ইতিমধ্যে উভয়পক্ষকে নিয়ে তৈরি ‘জঙ-বিধি’তে তা স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে বানানো হয়েছে এই বিধি। মানবিকতার খাতিরে তা লঙ্ঘন করা যাবে না, কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। দু-পক্ষের ‘হুকুমদার’রা ঘোড়া চালিয়ে এসে, মাঠারির পাহাড়ের মাথায় বৈঠক করে চুক্তি করে গেছে।

কিন্তু সেই ক্রীতদাস বা ক্রীতদাসীদের কীভাবে এবং কোন-কোন কাজে তাদের খাটানো হবে, স্বাস্থ্য, বস্ত্র, পরব দেখার হাত-খরচা, নিজের স্বামীর দ্বারা গর্ভবতী মহিলাদের ল-মাসি, পুয়াতি-খরচা থেকে শুরু করে মালিকপক্ষ তাদের কী-কী দায়িত্বভার গ্রহণ করে তাও বাছনিক করে ক্রমানুসারে সেই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে বলা আছে। এমনও বলা হয়েছে যে, ক্রীতদাসীদের কোনোভাবে ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন করা যাবে না। তবে তার সমর্থন থাকলে যে-কেউ তার সঙ্গে মিলিত হতে পারে।

এই মিলনকে তখন আর ধর্ষণ বলা হবে না। মিলিত হবার ফলে সেই নারী যদি গর্ভবতী হয়ে পড়ে, তাহলে প্রকাশ্যে বা গোপনে ভ্রূণহত্যার জন্য তাকে বাধ্য করা চলবে না, উপরন্তু তখন থেকে সন্তানসহ এই ক্রীতদাসীকে সেই ‘চিহ্নিত পুরুষের’ স্ত্রীর মর্যাদা দিতে হবে। দিতে হবে সামাজিক স্বীকৃতিও। সমাজের পাঁচরকম কাজে-ভোজে আর-সকলের সঙ্গে সেও নিমন্ত্রিত থাকবে। তার সন্তানদের বিহা-সাদি-সাঙ্ঘা সবকিছুই সম্পন্ন করতে হবে সামাজিকভাবে, প্রতিবেশীদের ডাকাহাঁকা করে পাঁচটা বুড়াবুড়ির উপস্থিতিতে। যদি আগের পক্ষে একটা-দুটা-তিনটা বউ থেকেও থাকে, তবু তাদের সঙ্গে শুয়োর-খুপড়িতে ঢুকবে আরেকটি। বছর-বছর হলহৈলা সাপের পারা হতে থাকবে বাচ্চাকাচ্চা। ঘর ভরে যাবে ল্যাধেড়পোষে।

পাশাপাশি, ক্রীতদাস-ক্রীতদাসীদের ভৃত্য হিসেবে খাটানোর ব্যাপারে চুক্তিতে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও বলা হয়েছে। সেখানে উল্লিখিত আছে যে, তারা মনিবের এই-এই কাজগুলি করতে বাধ্য থাকবে :

১. পুরুষদের কাজ : গোরু-কাড়া-মোষ চরানো, সময়ে সময়ে বাঁধের জলে চুবিয়ে তাদের কাদা দিয়ে গা মেজে দেওয়া, তাদের জন্য ঘাস কেটে, বোঝা বেঁধে ঘরে আনা, চাষের কাজে হাল চালানো থেকে সবরকম সাহায্য করা, ঘরের খাপরা ও খড়ের চাল ছাওয়া-ছায়ি করা, পাথর বয়ে এনে গারা অর্থাৎ কাদা তৈরি করে দেয়াল তোলা, খাসি কাটা হলে সেই খাসির চামড়া নিয়ে গ্রামে ঘুরে-ঘুরে তা বিক্রি করে মালিকের হাতে পাওনা যথাযথ ধরিয়ে দেওয়া, গাই-ছাগী-ভেড়ি দোহন, ধান ঝাড়া, মরাই বাঁধা, পুড়া বাঁধা, চাষের কাজে বর্ষার আগে গো-শকটে পুকুরের পাঁক বহন করে নিয়ে যাওয়া, গাছ কাটা, কাঠ চ্যালা করা ইত্যাদি।

২. মেয়েদের কাজ : হেঁশেলের বাইরে সংসারের যাবতীয় কাজ। ছ্যেলাপোধরি৪ করা, প্রসূতির সেবাযত্ন করা, স্ত্রীদের পায়ে আলতা পরানো, চুল বাঁধা, গায়ে হলৈদ তেল মাখানো, জঙ্গল থেকে মনিবঘরের জ্বালানির জন্য কাঠপাতের বোঝা আনা, বর্ষাকালে রান্নার জন্য মাঠ, নদীধার বা বনের ধার থেকে ছাতু কুড়িয়ে আনা, ভেড়া-ভেড়ি-বরা-বকরি চরানো, খোঁয়াড় করে তাদের সেবাযত্ন করা, চারা রোপণ করা, খেতের কাজে থাকা মরদদের বাইশাম পৌঁছানো, শুখার সময় দূরবর্তী নদী থেকে কাঁখে হাঁড়ি নিয়ে জল বয়ে আনা, বাঁদনা পরবে গাই-গোরুর শিঙে তেল মাখিয়ে গায়ে কলকে দিয়ে রঙের ছোপ-ছাপ দেওয়া, তাদের মাথায় ধানের মেড় দিয়ে সাজানো, ঘরের দুয়ারে পাইনা লতার আলপনা দেওয়া, রাহেড়-বিরহি বাড়ি দেখা, ডালশস্য রাস্তায় মেলে রাখা, বেলা ডুবলে তা ঝেঁটিয়ে তুলে আনা, কুলায় করে ঝাড়া, পাছুড়া, আগড়া-বাগড়া জ্বালানির জন্য বোঝা বেঁধে গুহালঘরের কুনে রাখা, যে-মনিবের মহুল বন থাকবে চৈতমাসটা রাত থাকতেই ঘুম থেকে উঠে তার গাছের মহুল ঝুড়ি ভর্তি করে কুড়িয়ে আনা, কচড়া-কুসুম-নিমের বিচ ঘানিতে ফেলে তেল বের করা, দৈনিক গো-লাদ তুলে গোয়াল পরিষ্কার করে ঘুঁটে দেওয়া, বর্ষায় গলে যাওয়া কাঁচা দেয়ালে মাটি চাটানে ইত্যাদি।

৩. বৃদ্ধদের কাজ : ঘর রাখা, খেত পাহারা, গো-গাড়ি চালানো, গবাদিকে পাল খাওয়াতে নিয়ে যাওয়া, সবজিবাড়িতে নিড়েন দেওয়া, চালহের ফলন্ত লাউলত-শিমলত আর কুলকুঁড়া করার জন্য রোদে দেওয়া কুলের ঝুড়ির দিকে পৈনা হাতে খেয়াল রাখা, বৃত্তি অনুযায়ী অর্থকরী কাজ করা, কামার হলে সকাল-সন্ধ্যা সঁ-সঁ হাপর চালাও, হাল-বাঁশলা-বাটালি-দা-কাটারি বানাও, আর কুমোর হলে মনিবের হয়ে ‘হাঁড়ি-কলসি-খাপরি বানাও, কালীপূজার সময়ে মাটির খেলনা গড়ে রং করে বিক্রির জন্য হাটে নিয়ে যাও। সেই সঙ্গে মনিবদের শিশুদের কোলে নিয়ে কুলহি বুলানো, রাতে পাটকাঠি জ্বেলে খেলা, আর তখন নিজে বৃদ্ধ হয়েও বৃদ্ধদের উপহাস করা ছড়া বলা (ইঁজোয় রে! পিঁজোয় রে!/বুঢ়াবুঢ়ির পঁন্দ পুড়াও রে!), ভোর হতে না হতে ঘুম থেকে উঠে ঝুড়ি চাপা দিয়ে রাখা হাঁস-খুঁখড়িদের চরতে পাঠানো ইত্যাদি।

দেখতে দেখতে যুদ্ধপ্রস্তুতি অনেক দূর এগিয়ে গেল। কাজের গতিও আশাতীতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে দেখে হুকুমদাররা খুশি। দু-পক্ষেরই হুকুমদারের সংখ্যা শতাধিক করে। এই যুদ্ধের সকল দায়দায়িত্ব তাদের ওপর। আপন আপন অঞ্চলে তারাই ক্ষমতাধর, সেই কারণে এই যুদ্ধের ব্যাপারেও তাদের পদ সর্বোচ্চ। তাদের হুকুমকে অমান্য করার সাহস কারো নেই। তারা যেকোনো ব্যাপারেই হুকুম করার, আদেশ দেবার অধিকারী। অঞ্চলের যে-কেউ তা মানতে বাধ্য, অন্যথায় মধ্যযুগীয় কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা আছে।

যুদ্ধ নিয়ে যাবতীয় আলোচনায় উপস্থিত থাকে কেবলমাত্র উভয়পক্ষের হুকুমদাররা। পরে আলোচনার সারবস্তু দু-দলের কর্মীদের মাধ্যমে একগ্রাম থেকে আরেক গ্রামে চাউর করা হয়। যুদ্ধবিষয়ে অনেক জরুরি ও গোপন তথ্য আদিবাসীরা অনেক সময় সাংকেতিক উপায়ে প্রেরণ করে থাকে। হাতে-হাতে শাল-ডাল পাঠিয়েও তারা বুঝে নেওয়ার মতো বার্তা দূর-দূরান্তে পাঠায়।

হুকুমদারদের গ্রামে ঢুকতে দেখলে গ্রামবাসীরা তটস্থ হয়ে যায়। অনেকে ঝুড়ে-পাতে গা ঢাকা দিয়ে লোকালয় থেকে পালায়। যেকেউ সহজেই হুকুমদারদের দেখে চিনতে পারে। মদ খেয়ে তাদের চোখ সব সময় লাল। রংরং করছে। চোখের কোলে রাত জাগার পিচুটি। নোংরা মাথা, জটপড়া চুল। আর সকল আদিবাসীদের মতো তাদেরও গাত্রবর্ণ ইঁদুরমাটির মতো। ডাকাতদের সমান লম্বাচওড়া শরীর, দুপাশে টেনে রাখা গোঁফ, খিঁচিয়ে পরা খাটো ধুতি, খালি গা, আর বারো হাতের পাগড়ি, যা মাথায় বহু পাক খেয়ে পিঠ ছাড়িয়ে কোমরের নীচে ঝুলছে। তাদের ঘোড়া ছুটতে থাকলে পাগড়ির প্রান্তটি তার পিছনে কয়েক হাত সমান্তরালভাবে উড়তে থাকে। তখন দুঃসাহসী আরব-যোদ্ধার মতোই দেখতে লাগে তাদের।

যদিও পশ্চিমের হুকুমদারদের এমন বর্বর মনে হয় না। তাদের মধ্যে কিছুটা হলেও শিক্ষা-সংস্কৃতি তথা মনুষ্যচেতনার ছাপ আছে। ভাষায়, আচরণে, ব্যবহারে তাদের রুক্ষতা ও ক্রূরতা নেই। পশ্চিমারা তাদের হুকুমদারদের দেখলে প্রাণভয়ে পালিয়ে যায় না, লুকিয়েও পড়ে না। বরং তাদের সঙ্গে গ্রামবাসীদের নিত্য যোগাযোগ রয়েছে। তারা সমগ্র অঞ্চল জুড়ে বসবাসকারী মানুষের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে। যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে, সাধারণ নিরীহ গ্রামবাসীদের অস্ত্রসজ্জিত করে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া তাদের কাজ নয়। তারা নিজেরা নিরাপদে থাকার কথা ভাবে না, কিংবা এই যুদ্ধ থেকে লুন্ঠন, জুলুম, রাহাজানির মাধ্যমে সুযোগ গ্রহণের গোপন মতলবও তাদের নেই।

এমনিতে, পূর্বাঞ্চলের আদিবাসীরা রীতিমত যুদ্ধপটু। তারা যেমন বীরযোদ্ধা, তেমনি আবার গোঁয়ারও। শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছি বুঝলে তারা জীবনের পরোয়া করে না। পুট-পুট করে তির খেয়ে মরে, মারেও।

হুকুমদাররা সর্বত্র ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে। দু-পক্ষের আলোচনার ডাকে ঘোড়ায় চড়েই পাহাড়ে আসছে। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে থাকে একজন করে বল্লমধারী ‘চাহনদার’ বা ‘চক্রপানি’। চক্রপানি কেন তাদের নাম হয়েছে কে-জানে। এরা বংশ পরম্পরায় যোদ্ধার জাত। হয়তো সেই থেকে তারা বিশ্বাস করে যে, তাদের পূর্বপুরুষদের হাতে বিষ্ণুর মতো চক্র থাকতো। বর্তমানে তাদের নামকরণ করা উচিত ‘বল্লমপানি’। এদের কাজ হল হুকুমদারের ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকা এবং হঠাৎ শত্রুর মুখোমুখি পড়ে গেলে হুকুমদারকে আগে বাঁচানো। হুকুমদার বাঁচলে বাপের নাম!

যুদ্ধে অশ্বারোহী সৈনিকের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এই কর্কটক্রান্তি অঞ্চলে ঘোড়া পাওয়া দুষ্কর। কোনো কোনো আদিবাসী সামন্তপ্রভুদের কাছ থেকে যা পাওয়া গেছে তা হুকুমদারদের কাজের জন্য দেওয়া হয়েছে। তাদের ব্যস্ততারও অন্ত নেই। যুদ্ধের দিনক্ষণ স্থির হয়ে গেছে বলে ব্যস্ততা ক্রমবর্ধমান। সময়ও হাতে বিশেষ নেই। যুদ্ধ শুরু আগামী রাস পূর্ণিমায়। এখনো প্রায় সাতমাস বাকি। কিন্তু কাজের তুলনায় সাতমাস সময় বড়োই অল্প। খাদ্যশস্যের পাশাপাশি জোর উদ্যমে চলছে সৈন্য সংগ্রহের কাজও। একেকটি গ্রাম থেকে পাওয়া সেই সৈন্যবলকে মজুত রাখা হবে ছাউনিতে। ঘোড়ার মতোই রথের ব্যবহারও এই যুদ্ধে নেই বলে, পুরাণে যেভাবে পল্টনের হিসেব রাখা হতো এখানে সেভাবে গণনা করা হচ্ছে না। পুরাণে ১ গুল্মে ৯ হস্তী ৯ রথ ২৭ অশ্ব ও ৪৫ পদাতিক ধরা হতো। মাঠারিযুদ্ধে গুল্মের বদলে শতক ধরে গণনা চলছে। যোদ্ধাদের প্রকৃতি বা শ্রেণি বোঝাতে শতক-এর আগে ধুসলা, ধনুর্ধর, দন্ডধারী, বল্লমবাজ ইত্যাদি বলা হচ্ছে। ‘এক ধনুর্ধারী শতক’-এর অর্থ হলো— একশত তীরন্দাজী সেনার একটি পল্টন বা ফৌজ। পাঁজিপুথি দেখে পূর্ণিমা লাগা মাত্র দুপক্ষের হুকুমদাররা আকন্ঠ মাদক সেবন করে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা করবে, অমনি বেজে উঠবে রণদুন্দুভি। লেগে যাবে যুদ্ধ! এদিক-ওদিক দড়দড়-মড়মড় শব্দে ছুটতে থাকবে শত-শত গো-শকট, আর গো-শকটে দাঁড়িয়ে খেড়িয়া, সাঁওতাল, ভূমিজ, কুড়মি, হো, বীরহড়, মুন্ডা, দেশোয়ালি মাঝি সম্প্রদায়ের মহা-মহা যোদ্ধারা শত্রুকে লক্ষ করে ঝাঁকে-ঝাঁকে নিক্ষেপ করতে থাকবে কাঁড়। মাঝে-মাঝেই উভয়পক্ষ থেকে সম্মিলিত রব উঠবে : জয়! জিনগা-মাঈকি—জ্জয়!

সেই জয়ধ্বনির মধ্যেই কেউ লাট খেয়ে পড়বে মাটিতে, কেউ-বা বুকে তিরবিদ্ধ অবস্থায় আকাশের দিকে তাকিয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শেষ শব্দ উচ্চারণ করে বলবে, ‘হেই জিনগা-মাঈ!’

এইভাবেই চলিতে থাকিবে হত্যালীলা। ইহারই নাম যুদ্ধ।

১৯

পাটনের এখন আর আত্মচিন্তা নিয়ে রতিগড়ে থাকার সময় নেই। হর-হামেশা তাকে গ্রামবাসীদের নিয়ে দূরবর্তী কোনো গাছের ছায়ায় বসে শলা করতে দেখা যায়। কখনো-বা কৃষ্ণকায় অর্ধনগ্ন সাঁওতাল-শবর-ভূমিজদের নিয়ে সদলবলে সে এই গ্রাম সেই গ্রামে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় জোর কদমে শুরু হয়েছে যুদ্ধের মহড়া। কোথাও-বা চাঁদমারিকে লক্ষ্য করে নিশানা পাকা করা হচ্ছে। পাটন ঘুরে ঘুরে দেখে আসছে তাদের তীরন্দাজি। কাজ-কর্মের তদারকি করছে।

এই তদ্বির-তদারকির জন্য এখন প্রতি গ্রামে গড়ে উঠেছে বহু বাহিনী। সমস্ত কামারশাল-গুলিতেই বিরামহীন চলছে হাপর টানা। নেহাইয়ে লোহার পাত রেখে, উলটেপালটে পিটাপিটি করে, গড়া হচ্ছে তিরের ফলা। দু-এক কুড়ি নয়, শত-শত কাহন। তেমনই উদ্যম নিয়ে মাহালীদের ঘরগুলিতে ছুলা-চাঁছা চলছে বাঁশ। সাইজ মতো কেটে বানানো হচ্ছে তিরের দন্ড। এই দন্ডগুলির আগায় আটকানো হবে একেকটি করে ফলা। শুধু তির বানালেই তো হল না। চাই ধনুক। তির নিক্ষেপের জন্য, সৈন্যদের হাতে হাতে ধরিয়ে দিতে দরকার অসংখ্য ধনুকের। সেই ধনুক তৈরির জন্য বাঁশ সংগ্রহে নেমে পড়েছে যত ডোম আর মাহালীরা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলছে বাঁশবন খতম অভিযান।

বাঁশই নয়, অকাতরে কসাই-হস্তে কর্তন করা হচ্ছে বহু প্রাচীন বৃক্ষরাজিও। যেকোনো কাজের শুরুতেই দরকার কাঠ। কাঠের পাটা, কাঠের খুঁটা, কাঠের ফালি, সারিবদ্ধ অগণিত অস্থায়ী শিবিরের জন্য জানলা-কবাট, আর যতদিন চলবে পরস্পরের এই শত্রুনিধন-যজ্ঞ, ততদিন দিয়ে যেতে হবে জ্বালানির যোগান। সেই জন্য মাঠারিতে এখন হাজারো মানুষের আগমন। অসংখ্য গো-যানের হড়র-ঘড়র আনাগোনা। মুহূর্তে মুহূর্তে মড়মড় করে ভূপাতিত করা হচ্ছে বনস্পতিও। গাছের গুঁড়ি আর কাটাই করা বাঁশের বোঝা নিয়ে তারা যথাস্থানে চলে যাচ্ছে।

দৈনিক বিঘার পর বিঘা বন সাফাই করা হচ্ছে। তার ওপর মানুষের পায়ে-পায়ে আর শকটের চাকায় পিষ্ট হয়ে মাঠারিতে ঘাস-আগাছা-বনতুলসীও মিলিয়ে যেতে বসেছে। যান-বাহনের অনবরত চলাচলের দরুন মাঠারির আকাশ জুড়ে আঁধির মতো উড়ছে ধূলিকণা। প্রাণভয়ে গুড়গুড় করে পালাচ্ছে যত পশু, সরীসৃপ আর বিচিত্র সব কীটপতঙ্গ। পাক-পাখুড় উড়ে যাচ্ছে কোথায় কোথায়! জঙ্গলের কোনো কোনো অংশে অরণ্যনিধনে নিযুক্ত মানুষের দলও কখনো ছুটে পালিয়ে আসছে হয়তো কোথাও গাছের ডালে বাসা বেঁধে থাকা মস্ত মৌচাক ভেঙে পড়েছে আর দংশনের জন্য চিঙমিঙ করে ছুটে আসছে কঠিন হুলওলা মধুমাছির ঝাঁক!

বনে-জঙ্গলে-হাটে-মাঠে-ঘরে গ্রামবাসীরা এখন উৎকন্ঠা নিয়েও যুদ্ধের কাজে ব্যস্ত। চলছে মানুষের সঙ্গে মানুষের আদিম সংগ্রামের শেষবেলাকার প্রস্তুতি। তারপরেও কত কাজ যে বাকি রয়ে যাচ্ছে। পাটনের ধারণাই ছিল না, শত্রু নিধনের জন্যও এতকিছু আয়োজনের দরকার হয়। প্রতিপক্ষকে আঘাত করা অপেক্ষা আঘাতের বন্দোবস্তের বহর অনেক বড়ো, অনেক সময়সাপেক্ষ, দরকারও হচ্ছে অনেক লোক-লস্করের। সে এটাও ভাবতে পারেনি যে, এত শিগগির শুরু হয়ে যাবে এই উদ্যোগ। কিন্তু এখন তার ভাবনায় কী-বা এসে যায়? সে নিজে মধ্যমণি তথা মূল প্রতিপক্ষ হয়ে থাকলেও, একেক সময় নিজেকেই তার উপলক্ষ্য বলে মনে হয়। যুদ্ধোন্মাদ যত আদিবাসী ও অরণ্যপ্রজাতির মানুষের সঙ্গে সব কাজে, সব আলোচনায় থাকছে সে। তবু যুদ্ধ কিন্তু এখন আর তার মুখাপেক্ষী হয়ে বসে নেই। দুর্মর গতিতে তা নিজেই প্রাগ্রসরমান।

এখন তাকে সামনে রেখে যুদ্ধের সকল দায়িত্ব বর্তেছে গ্রামবাসীদের ওপর। তারাই সামলে নিচ্ছে সবকিছু, ভাবতে হচ্ছে যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয় সকল আয়োজন। তার জন্য গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠা সমিতি, উপসমিতি তাদের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে। আর নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে লেগে পড়েছে আপন-আপন কাজে। কোনো দল মস্ত মস্ত ঘেরওলা বাঁশের ডালা বহুহাতে ধরাধরি করে চাষিদের দুয়ারে নামিয়ে রণংদেহি ধ্বনি তুলছে, ‘জয় জিনগা-মাঈ কি!’ অমনি রব শুনে গরিব চাষিও তড়িঘড়ি তার পুড়া ভেঙে কুলা-ডালায় চাল নিয়ে এসে দাঁড়াচ্ছে। পাই-পৈলার মাপে চাষির সামর্থ্য অনুযায়ী যুদ্ধের জন্য নেওয়া হচ্ছে এই ‘শস্যকর’। তেমনি আছে, ‘নগদ যুদ্ধমাশুল’, ‘ভুক্তান’, ‘খাসিদান’, ‘হাণ্ডাদান’ ইত্যাদি। বিভিন্ন কাজের বিভিন্ন নাম। তেমনি কর্মীদেরও আশ্চর্য-আশ্চর্য হাজার-এক তকমা:

যারা শস্যকর আদায় করে মাথায় মাথায় বয়ে আনছে, তাদের বলা হচ্ছে— বারবরদার।

যুদ্ধক্ষেত্রে যেখানে সেই বিপুল পরিমাণ শস্য এনে জমা করা হবে, তাকে বলা হচ্ছে—গোলঘর।

গোলঘরে বল্লমধারী পাহারাদার, তাদের বলা হচ্ছে—গোল-সিপাই।

যেখানে মাটির বড় বড় উনুন বা ভিয়েনের সারি থাকবে, তাকে বলা হচ্ছে —ভাটিচালা।

রাঁধুনিদের বলা হচ্ছে—পাকোয়ান।

যারা পশুচাষিদের খামার থেকে যোদ্ধাদের জন্য ‘খাসিদান,’ ‘বরাদান’ নিয়ে সেই পশুদের কানে মুষল ঢুকিয়ে ফুটো করে, সেই ফুটোর মধ্যে নম্বরসহ টিনের গোলাকার পাত লাগাচ্ছে এবং কানের রক্ত বন্ধ করার জন্য ধুলো ঢুকিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে, তাদের বলা হচ্ছে—লম্বরদার।

যারা সৈন্য সংগ্রহ করা এবং বাহিনী গঠন করার কাজে রয়েছে, তাদের বলা হচ্ছে—পল্টনবাজ

যুদ্ধে আত্মগোপন করে থাকা অনিচ্ছুক সৈন্যদের যারা খোঁজ করে ধরে আনবে, তাদের বলা হচ্ছে—তল্লাসীদার।

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রাণভয়ে পলাতক সৈন্যদের বলা হচ্ছে— মুড়-পুচকা।

যারা মুড়-পুচকাদের কোমরে দড়ি দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ফের ঠেসাবে, তাদের বলা হচ্ছে—লেলে সিপাই।

যাদের কথায় যুদ্ধের সূচনা এদং বিরতি, তাদের বলা হচ্ছে—হুমুকদার।

গো-শকটে বোঝাই হয়ে আসতে থাকা অস্ত্র-শস্ত্র (লাঠি, বল্লম, ধনুক, তির ইত্যাদি) যেখানে মজুত রাখা হবে, তাকে বলা হচ্ছে—মশলাঘর।

দিনান্তে যুদ্ধবিরতির পর যোদ্ধারা যেখানে বিশ্রাম নেবে, তাকে বলা হচ্ছে—হড়-গদাম।

এমনি বহু বহু কিছু। যুদ্ধের কারণে লোকসমাজে নানাবিধ নব্য শব্দেরও প্রচলন হয়ে চলেছে, যা থেকে আদিবাসীদের মধ্যে এই যুদ্ধের ব্যাপ্তি ও প্রভাবকে অনায়াস অনুমান করা যায়। বোঝা যায়, যুদ্ধ রণাঙ্গন ছেড়ে তাদের জীবনাঙ্গনে কতখানি ঢ়ুকে পড়েছে।

আবার এমন বহু গ্রামবাসী আছে, যাদের কাছে রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে পরস্পরের দিকে মারণাস্ত্র নিক্ষেপণ ত্রাসের ব্যাপার। তারা অতি নিরীহ মানুষ। সাতে-পাঁচে নেই। শত-আকাল সসত্ত্বেও নিজের মতো করে শুধু বেঁচে থাকাতেই তাদের অপার আনন্দ। সে-কারণে এই আত্মবলিদানের উদ্যোগ যতই এগিয়ে আসছে, ততই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে তারা। এই অঞ্চল ছেড়ে কোনোভাবে পালাতে পারলে বাঁচে।

তারা পালাতে চায়, যদিও পালানোর কোনো উপায় নেই। চতুর্দিকের নিষ্ক্রমণের পথগুলি ইতিমধ্যেই আটকে দেওয়া হয়েছে, কোথাও কোথাও সর্বসময়ের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে নজরদারির, মোতায়েন রয়েছে মুঠা-মঁচবালা ‘রাখাদার’, হাতে বুধুয়া ডান্ডা। তাদের চোখ এড়িয়ে কারো পক্ষেই এই রাঢ়ভূমি ছেড়ে গঙ্গানদীর তিরধরে নাবালের দিকে পালিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়।

পূর্বদেশীদের সঙ্গে পশ্চিমাদের সবরকম যোগাযোগও আপাতত বিচ্ছিন্ন। চাষিরা সবজির ঝুড়ি নিয়ে, সাইকেলে হাঁস-মুরগি-খাসি-ভেড়াভেড়ি নিয়ে, কিংবা পর্বতপ্রমাণ খড়ের গাড়ি নিয়েও যেতে পারছে না। তাতে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে দু-পক্ষকেই।

ফলশ্রুতিস্বরূপ গ্রামীণ হাট-বাজারগুলিতে ইতিমধ্যেই যুদ্ধের অন্যরকম প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যেমন, পূর্বদেশের গ্রামগুলিতে উন্নত মানের ভুট্টার চাষ ভালো হওয়ায় তা পশ্চিমে যাচ্ছে না বলে পশ্চিমাদের কাছে তার চাহিদা ক্রমে ব্যাপক হারে বেড়ে চলেছে, তার বাজারদরের সূচক দ্রুত উঠতে শুরু করেছে, যখন পূর্বদেশে ভুট্টার কোনো বাজারদর নেই, চাষীরা লাভের মুখ দেখা তো দূরের কথা হাল-লাঙল ঘুরানো, গোবরগাড়ি আর বীচ-বিহনের দাম সমেত চাষের খরচাটুকুও তুলতে পারছে না।

রাই-সরষে-তিল-তিসি-গুঞ্জা থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের তৈলবীজের চাষ পশ্চিমেই বেশি হয়ে থাকে, সেখানের গ্রামগুলি থেকে সেই বীজ পূর্বাঞ্চলের সাপ্তাহিক হাটগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এখন সেই আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দর হু-হু করে বাড়ছে। এমনকি, কুসুম-কচড়ার নিকৃষ্ট মানের তেলও কিনতে হচ্ছে সরষের দরে।

নুন-লঙ্কা-গুয়াপানের ভালো বাজারদর আছে পশ্চিমে। চুনের উৎপাদন তো ও দেশি গ্রামবাসীরা জানেই না, যে-কাজে পূর্বদেশি শুঁড়ি-মন্ডল-কাহাররা ছাড়াও আদিবাসী রমণীরা বেশ পটু। তারাও এখন, মাথায় মাথায়, ঝিনুকের খোল পুড়িয়ে বানানো চুন ঝুড়িতে নিয়ে সেই গ্রামগুলিতে ঢুকতে পারছে না। ভাটা বন্ধ রেখে তারা উৎপাদনও বন্ধ করে দিয়েছে। দেখা দিচ্ছে আর্থিক মন্দা।

দরিদ্র গ্রামবাসীরা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই যুদ্ধজনিত আকালের আসু সম্ভাবনা আঁচ করতে পারছে। একই সঙ্গে সে-আকালের কথা ভেবে মুনাফাখোর কালোবাজারীরা তাদের সুদিন দেখতে পাচ্ছে। তারা ধরেই নিচ্ছে, অতিশীঘ্র আকাল আরো বেশি-বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়বে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হবে। যে-মাল বাজারে অঢেল এবং জলের দরেও কেউ নিতে চাইছে না, তারা সেই সব মাল তাদের আড়ৎখানায় ‘রাখী’ করছে। যুদ্ধ নিয়ে তাদের চিন্তা নেই, তাদের চিন্তা যুদ্ধের সুফল নিয়ে। তারা জানে, যুদ্ধে গরিবরাই যাবে, গরিবরাই মরবে, মাঝখান দিয়ে কৃত্রিম আকাল সৃষ্টি করে আজকের মজুত করা মালের দাম আগামীকাল তারা দশগুণা বেশি পাবে।

পণ্য-পরিবহণ ব্যবস্থাও ব্যাহত হতে চলেছে। গ্রামবাসীদের কাছে মাটিতে বড়ো বড়ো হাঁড়িতে গুড়, বাঁশের ঝুড়িতে বিবিধ শস্য থেকে শুরু করে মস্ত মস্ত গাঁটরিতে পাট, সুতা, তুলা, তাঁতিঘরের বস্ত্র, জোলার লুঙ্গি, গামছা— এই সমস্ত কিছু পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম গো-যান। এমনকী সপরিবারে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে যাওয়ার জন্যও প্রয়োজন এই শকটগুলির। কিন্তু সেগুলিও এখন দুর্লভ। গ্রামবাসীদের ঘর-ঘর থেকে গো-শকটগুলি যুদ্ধের কাজে প্রায় জোর করে ছিনিয়েই নেওয়া হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে বহু সংখ্যক নতুন গাড়িও। এই গো-শকটই তো মাঠারিযুদ্ধে যোদ্ধাদের একমাত্র বাহন।

এই যুদ্ধ আসন্ন আকাল তথা লোকায়ত জীবন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আগাম বার্তা নিয়ে এলেও যুদ্ধের উদ্যোগ থেমে নেই। থেমে নেই পল্টনবাজদের সৈন্যবাহিনী গড়ার প্রবল উদ্যম। যুদ্ধে যোগদানের জন্য যথাসময়ে পল্টনবাজদের কাছ থেকে গ্রামে খবর এসে পৌঁছবে। পরিবারের প্রত্যেক পুরুষমানুষকে তূণে-ধনুকে সজ্জিত হয়ে, কপালে ‘জিনগা-মাঈয়ের’ নামে সিঁদুর ঘঁষে, যুদ্ধে যেতেই হবে! যে-যেখানেই থাকুক না কেন, পল্টনবাজদের ডাক এলে দিনের দিন মাঠারির উদ্দেশে রওনা দিতেই হবে। দলবদ্ধ হেঁটে অথবা গোরুর গাড়ি করে। লোক-লস্কর, বাদ্য-বাজনা সহকারে।

কোনো পরিবার থেকে পুরুষমানুষের যুদ্ধে যাওয়ার এই মুহূর্তটি রীতিমতো আবেগের এবং বীরত্বেরও। তার বিদায়লগ্নে তাকে উৎসাহিত করতে প্রতিবেশীরাও এসে জড়ো হয়। শঙ্খধ্বনি দেয়। তারপর তার সঙ্গে গ্রামের কুলহি-কুলহি বাজতে বাজতে যায় ঢোল-নাকাড়া, ফুলেট বাঁশি। ঠিক যেমন ধর্মরাজের মন্দিরে জন্মের চুল দিয়ে মানসিক শোধ করতে সাড়ম্বরে যায় কোনো শুঁড়ি-বাউরি মরদ। গ্রামের সীমানা পেরিয়ে গেলে সেই বাজনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসে।

যুদ্ধ লেগে গেলে, এমনিভাবে, বিভিন্ন গ্রাম থেকে যোদ্ধারা মাঠারিভূমির উদ্দেশে দৈনিক রওনা দিতে থাকবে। সে এক দেখার মতো জিনিস। যেন তামাম তল্লাট জুড়ে চলছে সূর্যপূজার মহাসমারোহ। মাঝে-মাঝেই নানান প্রান্ত থেকে বরণ করা যোদ্ধাকে নিয়ে ছোটো-ছোটো দল বাজনাপাটি বাজিয়ে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ বেজে ওঠা এই বাজনার ধ্বনি মানেই বুঝতে হবে আরেক যোদ্ধা চলল মাঠারি। বাজনার সঙ্গে জিনগা-মাঈয়ের ধ্বনি উঠবে।

আর গ্রামগুলি ধীরে ধীরে পুরুষশূন্য ও লঘুবসতি হয়ে পড়বে।

২০

দু-পক্ষেরই অনেক কাজ এগিয়ে গেল। বছর দুয়েকের ভেতরে উজাড় হয়ে গেল তামাম জঙ্গল, সম্পূর্ণ পাল্টে গেল মাঠারিও। এই মাঠারি যেন বহুবর্ষ প্রাচীন সেই আদিম দেবভূমি নয়। সকল স্বর্গীয় মহিমা আর নিবিড় নিরুপদ্রব পরিবেশকে হারিয়ে সে-মাঠারি ধ্বংসই হয়ে গেল! শুধু থাকার মধ্যে থেকে গেল টিলা আর পাহাড়। শৃঙ্গগুলির গায়ে-মাথায় এখনও যৎসামান্য বৃক্ষরাজির চিহ্ন রয়ে গেছে। এছাড়া কোথাও গাছপালা নেই, অরণ্যভূমি বলতে কিচ্ছুটি নেই। একটি গর্গট, পিপ্পলী, শাখোটক কিংবা একহাতের ঝাঁটিফুলের গাছও ঔষধীয় কাজে খুঁজলে পাওয়া যাবে না। নেই কোনো আরণ্যক জীব বা পক্ষীকূল। আর সেই পুষ্করিণী যার ঘাটে ঘাটে ছিল শালুক আর শৃঙ্গাটক? তাও যেন প্রকৃতির রোষেই শুকিয়ে গেল। মাটি ফেলে বুজিয়ে ফেলা হয়েছে ইরাবতীকে।

আগে যখন টিলা-পাহাড় নিয়ে দু-পাশ ঘন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল, তখন মাঠারিকে চোখে দেখলেও তার পরিসরকে অনুমান করা যেত না। কিন্তু এখন বৃক্ষহীন-তৃণহীন এই ভূমি দেখলে মনে হয় উত্তর-দক্ষিণে তা বুঝি দিগন্তহীন ছড়িয়ে গেছে। যতদূর চোখ যায়! এই উজাড় ভূমি আজ কয়েকশত আদিম আরণ্যক উপজাতির যুদ্ধভূমি। মাঠারিক্ষেত্র।

পূর্ণিমার তিথি পড়তে এখন আর মাত্র তিনদিন। পঞ্জিকামতে, তিথি শুরু হচ্ছে প্রাতে। সেই অনুসারে, রতিগড় টিলার শৃঙ্গে সূর্যের প্রথম আলো ঠিকরে পড়তে না পড়তে বেজে উঠবে দুন্দুভি। হাজারো রকমের আদিম বাদ্য। শুরু হয়ে যাবে লড়াই। বহু-বহু বছর বাদে, আবার একটি নারীকে নিয়ে বিবাদের জেরেই বহু মানুষের এই সংগ্রাম। কোনো ভূ-সম্পত্তি নয়, শত-সহস্র গো-ধনও নয়, সহস্র সহস্র পুরুষকে হত্যা করে একটিই মাত্র স্ত্রীধনকে লাভ করার লক্ষ্যে এই যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মাঠারির আকাশে ধ্বনিত হতে চলেছে গদাঘাত, তির-মূর্ছন আর শত শত শকটের কাষ্ঠনির্মিত চক্রের ভূমির ওপরে চঞ্চল হয়ে ওঠার কর্কশ শব্দ, মুহূর্তে মুহূর্তে মৃত্যুমুখী যোদ্ধার আর্তনাদ।

এইসব নিয়ে সূচনা হতে চলেছে যুদ্ধের আরেকটি ইতিহাস, যা প্রকৃতপক্ষে মানব-সভ্যতার কলঙ্ক-কাহিনি। কিন্তু তবু এই দ্রাবিড়ীয় যোদ্ধা জনগোষ্ঠী তাকে সংগ্রামের দৃষ্টিতে দেখে তাতে মহৎ ভাবনা আরোপ করে সমীহ করতে চাইছে। ইতিহাসের পাতায় মহান করে রাখতে চাইছে এই উদ্যোগকে। বস্তুত, যুদ্ধের নামে মানবহত্যার সাড়ম্বর আয়োজন কি কখনো মহৎ হতে পারে?

যুদ্ধ তো চিরদিনই শোকের আবহাওয়া রচনা করে। যুদ্ধের শুরুতে, শেষে যত সহস্র ধর্ম-শঙ্খ বাজুক না কেন, যতই ধর্মোন্মাদদের কন্ঠে ধ্বনিত হোক জিনগা-মাঈয়ের সম্মিলিত ধ্বনি। রক্তপতনের ভেতর দিয়ে কখনোই শান্তি, সাম্য, ধর্ম ও প্রজামঙ্গল প্রতিষ্ঠিত হয় না। তা পবিত্র বসুধাকে কেবল কলুষিত করে। সারা আকাশ জুড়ে ডেকে আনে যত মাংসাশী পক্ষী।

এখনি সেই শোকের সূচনা যেন পরিমন্ডল জুড়ে বিরাজ করছে। পালটে-যাওয়া মাঠারিকে দেখলে তা অনায়াস অনুমান করা যায়। কোথায় হারিয়ে গেল সেই পবিত্র মাঠারিভূমি? সেই স্বর্গ? কোল থেকে সন্তান উজাড় হয়ে যাওয়া জননীর মতো সে যেন আজ নি:স্ব, শোকস্তব্ধ, পাষাণ। কিন্তু তাকে দেখে শোক করার মানুষও আজ নেই। মানুষ আছে, নেই তাদের সেই মন। তাদের মন এখনো হত্যার চূড়ান্ত আয়োজন সারতে ব্যস্ত।

আয়োজন একরকম সম্পূর্ণ হয়ে এসেছে। আর এই সম্পূর্ণ আয়োজন দিয়েই সম্পূর্ণ বদলে ফেলা হয়েছে কত-শত বছরের মাঠারিকে। টিলা-পাহাড়কে পিছনে রেখে দু-পক্ষ একরের পর একর জমি নিয়ে সাজিয়ে নিয়েছে তাদের লোক-লস্কর, কর্মভূমি, তাদের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা। এখন আর কোনো পক্ষেরই বড় কোনো নির্মাণকার্য বাকি নেই। কত-কত কাজের কথা ভেবে গড়ে তোলা হয়েছে কত কী! বানানো হয়েছে বহু হড়-গদাম, বহু গোলঘর, ভাটিচালা, আগুনঘর। আর জলঘরের চালায় শুধু মাটির হান্ডার সারি। তলায় খড়ের বিঁড়া। আবার কোথাও বিরাট পরিধি জুড়ে গো-শকট তো গো-শকটই। প্রশস্ত বহর। বহরের সেইসব শকটের জোড়া-জোড়া বলদগুলিকেও জোয়াল থেকে খুলে বেঁধে রাখা হয়েছে এমুড়ো-ওমুড়ো চালা করা গোয়ালঘরে।

লম্বা লম্বা খাটালগুলিতে বাঁধা আছে বহু গ্রাম থেকে সংগ্রহ করে আনা যত ছাড় গোরু, যাদের আর দুগ্ধবতী হবার সম্ভাবনা নেই, বাচ্চাও হবে না। তেমনি আছে গর্দভ আর খচ্চরের দল। ছাড় গোরুদের জবাই করে ভোজে লাগানো হবে। নৈ:শব্দ্য ভেঙে রাতভর তারা ডেকে চলেছে। এইসব গবাদি পরিচর্যায় ব্যস্ত বহু গ্রামবাসী। অভিজ্ঞ বৃদ্ধদেরই একাজে ঠেসানো হয়েছে। তারা করাত দিয়ে কুটি কাটছে, কাঠের পাটা দিয়ে গোরের নাদ টালছে, পানি দিচ্ছে জাবনায়। গোরুর জন্য পাহাড়ের মতো চুড়ো করে রাখা হয়েছে অসংখ্যা খড়ের গাদা।

এখনো গ্রামে গ্রামে যুদ্ধের জন্য রসদ সংগ্রহাভিযান থেমে নেই, চলছেই। সেই সব রসদ এসে ঢুকছে মাঠারিতে। শস্যঘর, খড়ের গাদা নিয়ে এই বিপুল বন্দোবস্ত দেখলে মনে হয় যে, হুকুমদাররা ধরেই নিয়েছে যুদ্ধ একবার শুরু হয়ে গেলে তা অনতিদীর্ঘকালে থামবে না। কে-জানে, হয়তো তাদের বিবাদের নিষ্পত্তি হতে দশ-বিশ বছরও লেগে যেতে পারে।

তা যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তাহলে যুদ্ধের পরে জীবনের উঠে দাঁড়ানোর আর কোনো সম্ভাবনাই থাকবে না। এখনই বহু বহু গ্রামে যুদ্ধের কর-বাবদ-সম্পদহারা মানুষের হা-হুতাশের অন্ত নেই। কিন্তু কে তাদের কথা শোনে? বহুক্ষেত্রেই ভাঁউরি-বাহকরা গায়ের জোরে শস্য নিয়ে যাচ্ছে, লম্বরদাররা খোঁয়াড় থেকে পাঘায় বাঁধা ছাগল-ভেড়া ঘষটাতে ঘষটাতে গৃহস্থের আঙিনা থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করছে। কান্নার রোল উঠছে বহু আদিবাসী গ্রামে। সেইসব গ্রাম থেকে সম্পদ নিয়ে পথে-পথে উদ্ধত পায়ের ধুলো উড়িয়ে চলে যাচ্ছে বাহিনীর কর্মীরা। আর হঠাৎ হঠাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যেতে দেখা যাচ্ছে হুকুমদারদের। বাতাসে উড়ছে তাদের বারো হাতের পাগড়ি।

মেয়েরা খুরের শব্দ পেয়ে ছুটে আসছে বাখৈলে। কেবল শস্য-সম্পদের লুন্ঠিত হবার ভয়ে নয়, তাদের স্ত্রীশরীরকেও তারা হুকুমদারদের দৃষ্টির সম্মুখে আনতে ভয় পাচ্ছে। এসব দেখে মনে হয়, মাঠারিতে যুদ্ধ লাগার আগেই মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে পূর্বাঞ্চলের গ্রামগুলিতে।

আজ যুদ্ধের আগের রাত, মাঠারিতে। আকাশে জাগর পূর্ণিমার চাঁদ—মস্ত পুয়াল ছাতুর মতো টলটল করছে! কিন্তু কোথাও সেই বৃক্ষরাজি নেই বলে তার ঔজ্জ্বল্য গাছেপাতে লেগে নেই। কেমন যেন অভূতপূর্ব এক বিষন্নতা খড়ের আঁটিতে সরীসৃপের ডিমের মতো নির্জনতায় ভারি হয়ে রয়েছে। রাতটুকু কাটলেই সেই নির্জনতা যুদ্ধের মাতনে খানখান হয়ে যাবে!

এখন কেবল একটি প্রভাতের জন্য অপেক্ষা। যে-প্রভাত জীবনের অথবা মরণের। সংশয়াচ্ছন্ন বলেই রাত্রি এত নিঝুম। যেন একটি মানুষও আর জেগে নেই— এই শেষ প্রহরটুকু তারা ঘুমিয়ে নিতে চায়। আবার এমনটাও হতে পারে, জিগীষার অদম্য উৎসাহ নয়, পরাজয়ের গ্লানিও না— হয়তো যুদ্ধের আতঙ্কেই সন্ত্রস্ত, নির্বাক ও বিনিদ্র তারা। রাত্রি এত নিস্তব্ধ।

জারমণির চোখে ঘুম নেই। কালসর্প যেমন নির্জন গভীর রাতে ঢঁড়র থেকে বেরিয়ে পড়ে, সেও তেমনি বেরিয়ে পড়েছে এখনি। মাঠারির এই অভূতপূর্ব নৈ:শব্দ্যকে অনুভব করতে। যেন সে কোনো অশরীরী আত্মাও। গভীর পর্যবেক্ষণ-দৃষ্টি নিয়ে টিলার ওপর থেকে ঘুরে ঘুরে দেখছে শিবিরগুলি। দেখছে সে সব কিছুই। আর মনে মনে খুশি হচ্ছে দু-পক্ষের এই উদ্যোগ ও আয়োজনে। যেন তার কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। হয়তো সত্যিই নেই। সে কেবল যুদ্ধের পক্ষে। উত্থিত অস্ত্রের পক্ষে।

দূরের চালা থেকে বাতাসে ভেসে আসছে গোরুর হামলানি। তারা জাবর কাটছে। জেগে আছে শিবিরে শিবিরে মানুষ। এখনো ভূমিতে পাত পেড়ে পঙক্তিবদ্ধভাবে নৈশ আহার সারা হয়নি। ভাটিচালাগুলিতে যোদ্ধা ও কর্মীদের জন্য রান্নার কাজ চলছে। যুদ্ধের উদবেগ নিয়ে মানুষ এখন সর্বত্র বিনিদ্র। শস্যঘরের মুখে বল্লমকে কাঁধে ঠেসিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গোল-সিপাই। রয়েছে অতন্দ্র অন্যান্য যুদ্ধকর্মীরাও, নিজ নিজ দায়িত্ব নিয়ে। কিন্তু কোথাও কোনো কোলাহল নেই, উচ্চগ্রামে কথোপকথন নেই। মানুষের কন্ঠস্বরগুলিও অবলা জীবের মতো বাকহীন স্তব্ধ হয়ে রয়েছে।

বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে জ্বলছে অসংখ্য মশাল। এদিক-ওদিক করে খুঁটায় খুঁটায় বাঁধা সেই মশালগুলি কত দূ-উ-উ-র যে চলে গেছে! দৃশ্যত ক্রমশ ছোটো হতে হতে গেছে তাদের শিখা। বাতাসের ঝাপটানিতে কোথাও মশাল নিভে গেলে মশালদাররা আবার নতুন করে জ্বেলে দিচ্ছে। দূরের নির্জন স্থানগুলিতে কোথাও কোথাও ঘুর-ঘুর করছে বিকট চেহারার জংলী কুকুরের দল। পরস্পরকে দাঁত দেখালেই তাদের ক্রুদ্ধ গরগরানি কানে আসে।

এতসবের মধ্যেও বাতাসের প্রতিকূলে কয়েকদন্ড কান পেতে থাকলে শোনা যাচ্ছে তরঙ্গায়িত হয়ে আসা সংস্কৃত শ্লোক ও তার আশ্চর্য বিশ্লেষণ। বহু দূরবর্তী একটি খড়ের চালার মাঝে জ্বলছে বিশাল পরিধি নিয়ে এক অগ্নীকুন্ড। মধ্যস্থলে সেই অগ্নিকে সাক্ষী রেখে মহাপ্রবীণ তাঁর একটার পর একটা ভাবনার কথা উত্থাপন করছেন। সম্মুখে ধ্যানস্থ অঙ্গদ। মহাযুদ্ধের এই আয়োজন দেখে চঞ্চল ও উদবিগ্ন হয়ে পড়া তার মনকে শান্ত, ধীর, স্থির তথা অভিন্নলক্ষ্যাভিমুখী করতে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন মহাপ্রবীণ।

কিন্তু তারপরেও যুদ্ধের জন্য নিজের মনকে আশানুরূপ তৈরি করতে পারল না অঙ্গদ। এদিকে প্রহরে প্রহরে কাটছে রাতের আঁধার। আবছা আলো-আঁধারি ভাব সরে গিয়ে এখনো আলো ফুটতে বাকি। পূর্বের আকাশ আমড়ু-খেতের মতো লাল হয়ে ওঠার অপেক্ষায়!

২১

ভোর হয়ে এল। পক্ষীকুলের কলরব ছাড়াই এমন ভোর ইতিপূর্বে কখনো হয়নি। প্রকৃতি-নীরব শোকাচ্ছন্ন ভোর।

থমথম করছে যুদ্ধক্ষেত্র। বাতাসের শনশনানি বাড়ছে। উড়ছে দু-পক্ষের সারি সারি বাহারি কেতন। পুবে-পশ্চিমে অজস্র গগনচুম্বী বাঁশঝাড় পোঁতা হয়েছে। ঝাড়ে বাঁশপাতা নেই, তার বদলে বাঁদর নেজের মতো লম্বা লম্বা শালু। ফুরফুর করে বাতাসে খেলছে সেগুলি।

তবে শেষতক দু-পক্ষের কেতন তো উড়বে না মাঠারিতে। উড়বে শুধু বিজয়ীর পৌরুষ। হয় পাটনের নেতৃত্বে পুবের, কিংবা অঙ্গদের নেতৃত্বে পশ্চিমের। যুদ্ধান্তে বিজেতার কেতনগুলি ভূপাতিত করে সোল্লাসে দাহ করা হবে। তছনছ করে ভেঙে ফেলা হবে। গ্রামগুলিতে চলবে উৎসব। বেজে উঠবে আদিবাসী বাজবাজনা। বস্তিতে বস্তিতে বলি পড়বে শূকর। ন্যাংটা শিশুরা গড়াঘল্টি খাবে কুলহির ধুলায়। মৌজায় মৌজায় ভালুক নাচ হবে। রাতভর খেমটির আসর বসবে নদীর চরে। পলাশতলে হাঁইড়া খেয়ে উলটে পড়ে থাকবে আদিবাসী মরদ, মেয়েরা ডাঁসাই নাচবে। ঢোল-ধামসা-শাহনাই আর ফুলেট-পেঁপটির সুর কত-কত গ্রাম যে পেরিয়ে যাবে! তারপরেও আরো কত কী!

মাঠারি তৈরি হয়ে আছে যুদ্ধের জন্য। যোদ্ধৃবেশে এত মানুষ! অথচ কোনোদিকে তেমন কলরোল নেই, হাল্লা-তামাশা নেই। যেন সেই দিন কবেই ফুরিয়ে গেছে। সেই অতীতের দিনগুলি। যখন গ্রামে গ্রামে ঢিঢি পড়ছে, যুদ্ধের সাজ পরে চোঙ ফুঁকে একেকটি করে দল শেষবারের মতো গ্রামবাসীদের যুদ্ধের সপক্ষে দাঁড়াতে ঢ্যাঁড়রা পিটে যাচ্ছে, প্রচার চলছে, চলছে সৈন্য ও রসদ সংগ্রহের জোর অভিযান, আর গুজবে কাতর হচ্ছে মানুষ। উল্লাসিতও হচ্ছে। কিন্তু এখন?

দুপাশের টিলার মাথায় মাথায় তির-ধনু হাতে তৈরি দু-পক্ষই। তাদের পিঠের ওপরে কাঁড়ের গুচ্ছভরা তূণীর। বাহুতে, মাথায় ময়ূর পালক। কারো মাথায় ঝাকুড়-ঝুকুড় পাত-পালহা। মুখে, পেটে-পিঠে —সারা শরীর জুড়ে খাদানের খড়িচুনের নকশা আর গেরুমাটির ছোপ। হাতে হাতিয়ার, শরীরে বস্ত্র নেই একছিট। কালো কালো গায়ে একখন্ড করে নেংটি জড়ানো।

নীচে মূল যুদ্ধক্ষেত্রটিতে তৈরি হয়ে রয়েছে মল্লযুদ্ধ ও ধুসলাযুদ্ধের পালোয়ানরা। গোটা মাঠ জুড়ে, যত দূর চোখ যায়। এছাড়াও কিনারে কিনারে আছে আরো বহু কর্মীবাহিনী, ঢোলিদার, শিঙাদার ইত্যাদি। আছে আদিবাসী বাদ্যকার—কেউ বাঁশি হাতে, কেউ ভেরি নিয়ে, কেউ-বা কাঠের মস্ত মস্ত মুদগর নিয়ে তৈরি ধামসায় ঘা মারবে বলে।

বাদ্যযন্ত্রগুলিকেও সাজানো হয়েছে নতুন লালশালু জড়িয়ে। ঢাউস ঢাউস চামড়ার ছাউনিগুলিতে গোল করে লেখা হয়েছে দলের নাম, ওস্তাদের নাম, সাকিম। কত কিসেমের কত যে আদিম বাদ্যযস্ত্র! বাঁশ, কাঠ, পশুচর্ম ও মাটির তৈরি। ছোটো ছোটো দলে, আখড়ায় আখড়ায় তারা ছড়িয়ে গেছে। এখন শুধু প্রহর গুণে বেজে ওঠার অপেক্ষা।

ওই দূরে— রতিগড়ের মাথায় জারমণি। বেণীবন্ধনহীন চুল। ওপরে দাঁড়িয়ে একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত সব লক্ষ করে যায়। ছবির মতো এই দৃশ্য! যদিও জারমণির কাছে এখন এ শুধুই ছবি নয়। এ যেন হাজার বছর স্মরণীয় হয়ে থাকার মতো যে ভয়ঙ্কর প্রলয় ঘটতে চলেছে তার মূর্ত পটভূমি। জারমণি সেই প্রলয়ের প্রমাদ গুনছে। ধ্বংসের প্রাক-মুহূর্তে, শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে অসভ্য-বর্বর এই মানবগুলিকে। দেখে নিচ্ছে মৃত্যুর কী দিগন্তপ্রসারী আয়োজন!

পাটন ভাবতেও পারেনি চূড়ান্ত ক্ষণটি এত অনতিবিলম্বে এসে পড়বে। ভোরের কোকিলও ডাকল না, ডুহু পাখি উড়ল না! অথচ এখনি যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হওয়ার সময় আসন্ন। এখন তার মাত কেটে গেছে। এতদিন যে-মাঠারিকে সে স্বপ্নিল চোখে দেখছিল, জারমণির মতোই যাকে নিছকই মায়া বলে বোধ হচ্ছিল— এখন কোথায় সেই মায়াময়তা? কোথায় সেই যাদুকরী রহস্যময়ী মাঠারি? পাটনের পক্ষে এবং পাটনের বিপক্ষে এত-এত লোক-লস্কর, ভূমিজ-খাইড়া-সাঁওতাল-বাগদি-বাউরি-মুচি-হাড়ি-ডম আদি যত লড়াকু, যত বীরপুঙ্গবের দল! কত তির, কত ধনুক, কত বর্শা, ভল্লম, ধুসলা, টেঁটা! কত বাজনদার, ঢোলিদার, ফুঁকনদার আর ঢোল-ধামসা নিয়ে সারা যুদ্ধক্ষেত্র সম-দম করছে! চোখে দেখেও বিশ্বাসই হতে চায় না! কত-কত গ্রামের দলপতি আর সাধারণ মানুষের যৌথ প্রয়াসে এহেন মহতী আয়োজন। হাজার হাজার গ্রামবাসীর পৌরুষের উন্মাদনা নিয়ে মারণযুদ্ধে যোগদান। এই সবই এখন পাটনের চোখে ধর্মরাজের মতো অতি কঠোর অতি বাস্তব মনে হতে লাগল। মনে হল, এখানে কোনো কল্পনা নেই, কাব্য নেই, ভাবাবেগের স্থান নেই। এখানে মাঠারি আছে, জারমণিও আছে, অথচ তারা যেন অতিরিক্ত কোনো সংকেত নিয়ে নেই। যুদ্ধ ছাড়া কোনো ঈশারা তাদের নেই। তাই জারমণিকে দেখেও, পাটন, শুধু জারমণিকেই দেখল— সে কাতর হল না, স্মৃতিমেদুর হল না। তার মনে, অন্তত এই মুহূর্তে, এই ছলনাময়ীকে ঘিরে কোনো বিলাসী কল্পনা ও আবেগের বিস্তার ঘটল না। এও কি সম্ভব?

শুধু তাই নয়। সে এখন এতোটাই আপন লক্ষ্যে ও কর্তব্যে অনড়, এতোটাই শত্রুর প্রতি অনমনীয় ও জিগীষার জন্য ব্যাকুল যে, জারমণির মনে হল— এই সেই বৃষস্কন্ধ-বীর যাকে এতদিন সে মনে মনে কাঙ্ক্ষা করে এসেছে। যাকে এতদিন কল্পনার রঙে চিত্রিত করেছিল, আজ সে-ই তার সমক্ষে স্বমহিমায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। জারমণি চেয়েছিল পাটনের এই উত্থান।

তবে পাটন তো পাটনই ছিল, যখন জারমণি ডেলিকচায় প্রথম দেখেছিল এই ব্যাধ সন্তানকে। তখন যদিও এতোটা আসুরিক দেহ তার ছিল না, কিন্তু তখনও তার শরীরে-মনে ছিল এমনই অশ্বতেজ, ছিল সে এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ, আগ্রাসী। আর তাই, সেদিন, সহোদরের হয়ে প্রতিপক্ষ দমনে অস্ত্র ধরার আশ্বাস দেওয়া সম্ভব হয়েছিল তার পক্ষে। যদিও, পরবর্তীকালে, অস্ত্র সম্বন্ধে তার নিজস্ব ধারণার আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। তার মনে প্রশ্ন জাগে বিস্তর। সর্বোপরি তার মনে হয়েছিল, যে-নারীর নিরাপত্তা দিতে সে ধনুকে-বাণে নিজেকে সজ্জিত করেছে সে তো স্বয়ং এক ক্ষুরধার অস্ত্র। এই ভাবনার উদ্রেক হওয়ার সাথে-সাথে তার দক্ষিণ হস্ত হইতে ঝাঁমা পাথরে ঘষিয়া ঘষিয়া তীক্ষ্ণমুখ বাণটি টং করিয়া ভূপৃষ্ঠে ভূপতিত হইয়াছিল!

এই সেই ঐতিহাসিক পতন। আর এহেন মহাপতন থেকেই শুরু হয়ে গেল পাটন সিংসর্দারের জীবনের নতুন অধ্যায়। যা বহু ব্যাপ্ত, ঘটনাবহুল এবং কালের বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী। অদ্যপি এই অধ্যায়ের যবনিকা পতন ঘটেনি। পাটন চায় মাঠারিযুদ্ধে তার জয়ের মধ্য দিয়ে এই কেলেকেচের সমাপ্তি ঘটিয়ে জারমণিকে নিয়ে তার জীবনের আরেক বর্ণোজ্জ্বল পর্বের শুরুয়াত করতে।

এই প্রত্যয়ে পাটন আজ বিভোর, দোলাচলচিত্তহীন। আজ পাটনের মনে কোনো উচাটন নেই, দ্বিধা নেই, ভয়ও তার অন্তর্হিত। আজ সারা শরীর জুড়েই, রন্ধ্রে রন্ধ্রে, জয়কে সে পোষণ করে রেখেছে। আঘাত পেলেই প্রত্যাঘাত হানবে। শত্রুপক্ষের জন্য নিজেকে বজ্রসম শাণিত করে রেখেছে পাটন।

তবে কি জয় তার অবশ্যম্ভাবী? জারমণিও কি এই বীরেরই জয় চায়? সে কার পক্ষে? পাটনের, নাকি অঙ্গদের? কার ললাটে সে তিরের ফলায় ক্ষেতমাটি নিয়ে এঁকে দেবে তার বিজয়তিলক? পাটনের, নাকি অঙ্গদের? কার তরে সে সমর্পণ করবে নিজেকে? পাটনের, নাকি অঙ্গদের? কার সাম্রাজ্যের অধীনা হয়ে থাকবে সম্রাজ্ঞী? সে কি এই রতিগড়েই থেকে যাবে তার বৃষস্কন্ধ পাটনের রানি হয়ে? নাকি শেষতক ওই খকরা-বুঢ়া ওই কঙ্কালসার তেজস্বী বৃদ্ধের বক্ষলগ্না হবে? বিজয় অর্জন করে যে-বৃদ্ধ তাকে ‘বাহু মচড়াইয়া, বেণী ঘুরাইয়া, বলপূর্বক হ্যাড়হ্যাচ্চাইয়া’ টানতে টানতে ওই উচ্চতম টিলাটি থেকে সাধুর পর্ণকুটিরে নিয়ে যাবে?

জারমণির মুখে রা নেই। জয় বা পরাজয়ের সমর্থনসূচক অভিব্যক্তিও আঁচ করা যায় না আপাত নজরে তাকে দেখে। সে প্রস্তরবৎ। স্থানু। যেন সে নিজের সঙ্গে নিজেই তলে-তলে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে আছে— যুদ্ধের নিষ্পত্তি না হওয়া তক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি বাক্যও উচ্চারণ করবে না সে। সাধুর পক্ষেও না, শয়তানের পক্ষেও না।

পক্ষান্তরে, পাটন? সে এই পরিবেশ দেখে উত্তেজিত ও প্রগলভ হয়ে উঠেছে। সে ভেঙে ফেলেছে তার ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা পশ্চাদপদতার যত বেড়ি, যত অর্থহীন প্রতিবন্ধকতা। যুদ্ধের অর্থ শুধু যুদ্ধই। যে প্রতিপক্ষ সে প্রতিপক্ষই। সে অগ্রজ, অনুজ হয় না, পিতা-পুত্র হয় না, সহোদর হয় না, মিত্র হয় না। সে গুরু হয় না, চন্ডাল হয় না। সে প্রতিপক্ষ মাত্র। প্রতিপক্ষকে আনুষ্ঠানিক বধের আয়োজন-ই হল যুদ্ধ। আর উপর্যুপরি বাণ নিক্ষেপ করত এই প্রতিপক্ষকে ভূপাতিত করার নামই জয়। জয়ের কোনো বিকল্প হয় না। পাটন এইটুকুই ধ্রুবসত্য বুঝে অঙ্গদকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বৈ আর কোনো চোখে দেখতে চায় না। সহোদর-সহোদর করে আবেগ-তাড়িত হয়ে নিজের স্নায়ুকে দুর্বল করতে চায় না— সে চ্যুত হতে চায় না তার ইপ্সিত লক্ষ্য থেকে, জয়ের চিরকালীন অভিপ্সা থেকে। সে বিচ্ছিন্ন হতে চায় না সেই রম্যভূমি থেকে যে-ভূমিতে লেলিহান আগুনের মতো দাঁড়িয়ে আছে তার জারমণি। এই আগুনের স্বাদই জয়ের স্বাদ। পাটন জয় চায়। আগুন চায়।

আর তাই, যুদ্ধের প্রাক-লগ্নে জারমণি তার হস্তে তার সেই মহাভার ‘রনরনি গান্ডীব’—নামান্তরে ‘ভীমভেদ’—অবলোকন করতেই পাটন অট্টহাস্য করে উঠল। দক্ষিণ জানুতে সশব্দে চাপড় মেরে সে বলে উঠল, ‘রানি! রানি! রনরনি’পরে তোমার দৃষ্টি-স্পর্শই আমার স্নায়বিক বল। আমার প্রেরণা। তুমি স্বীকার করো, রানি! তোমার মুখ-নি:সৃত বাণী ছাড়া আর কোনো কিছুই আমার কাছে সুখশ্রাব্য ও সুমধুর নয়। তুমি স্বীকার করো জিনগা, স্বীকার করো!’

জিনগা! জারমণি চমকে উঠেছিল। পাটন কি সত্যিসত্যি তাকে গরামথানের লোকদেবী মনে করে? তারপরেও পাটনের কোনো বিকার নেই। থাকবেই-বা কেন? গ্রামবাসীদের কাছে জারমণির এই পরিচয় চাউর করে পাটন নিজেও এখন তাকে সেটাই ভাবতে বসেছে। কেবল ভাবাই নয়— সে হয়তো বিশ্বাসও করছে। অসত্যের মধ্যে থাকতে থাকতে মিথ্যাই এখন তার সত্যভূষণ বলে প্রতীয়মান হয়। যদিও এটা সে একবার ভেবেও দেখল না যে, জারমণি যদি জিনগা-মাঈ অথবা তার অঙ্গোদ্ভবা ‘চলতা-ফিরতা দেবী’-জ্বালামালিনী হয়েও থাকে, তাহলেও পাটন কি এই আদিবাসী দেবীকে ঘরণী হিসেবে লাভ করতেই এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চলেছে? দেবীকে দিয়ে কি তার যুগ-যুগ পুষে রাখা গুপ্ত মনোবাসনা চরিতার্থ হবে? দেবীরা তো ‘ওসব’ করে না। পুরুষের সঙ্গে ইচ্ছাপূরণ-টূরণ। ওসব স্বর্গেই হয়। অবশ্য মাঠারিই-বা স্বর্গের চেয়ে কম কিসে?

যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে পাটন চায় তার ভালো লাগবে এমন কথাগুলোই জারমণি বলুক। সে গোঁ ধরে থাকে, ‘বলো, একবার বলো রানি—তোমার স্পর্শই আমার বল। আমার প্রেরণা।’

জারমণি অভিবক্তিহীন কাষ্ঠকন্ঠে স্বীকার করে, ‘আমার স্পর্শই তোমার প্রেরণা। আমিই তোমার তেজ। তোমার বল।’

তারপর কে দেখে! রতিগড়ের প্রান্তভূমিতে দাঁড়িয়ে, পাটন তার সুসজ্জিত দক্ষিণবাহু প্রসারিত করল সমবেত যোদ্ধাদের দিকে। তার প্রলম্বিত বাহু জুড়ে ঘেরানাচের শিল্পীর মতো বাঁধা রঙিন কাপড়ের ফালিগুলি ফুরফুর করে উড়তে লাগল। আর সে তর্জনি সঞ্চালনপূর্বক দেখাতে লাগল তার আহ্বানে কীভাবে সহস্র-সহস্র গ্রামবাসী, অভুক্ত-অর্ধভুক্ত, রুগ্ন ও নির্বস্ত্র মানুষ এই মাঠারিতে এসে তার স্বপক্ষে যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়ে রয়েছে। যদিও এই সত্য সে অব্যক্তই রেখে দিল যে, এদের অধিকাংশ যত না পবিত্রভূমিকে শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার আন্তরিক তাগিদ থেকে এসেছে, তার চেয়ে ঢের-ঢের বেশি এসেছে ভয়ে, অত্যাচারিত হয়ে। আবার এমন বুভুক্ষু গ্রামবাসীও এসেছে, যারা মনে করে যুদ্ধভূমিতে হাতিয়ার ধরলে মরার আগে একপেট ভাত পাবে। যুদ্ধকালীন তাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত হবে। তাদের অনাহারের জীবন-জ্বালা যুদ্ধে হাতিয়ারবিদ্ধ মৃত্যুর চেয়েও জ্বালাময়।

শুধু তাই নয়, যুদ্ধে বিজয়ী হলে ‘পাষন্ড পাটনের’ দল পশ্চিমাদের গ্রামগুলিতে ব্যাপক লুটতরাজ চালাবে, সেই লুটের শস্য-সম্পদ-ঘটিবাটি-টুবকা-বাসনকোসন-এর ভাগও দেওয়া হবে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হা-ভাতে পরিবারগুলিকেও। এরাও সংখ্যায় কম নয়। কাতারে কাতারে এসেছে। এইসব মানুষদের বেঁচে থাকা এতোটাই অর্থহীন, অনিশ্চয়তাপূর্ণ যে, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তারা তাদের অকিঞ্চিতকর অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তুলতে চায়। জীবৎকালে উপকরণহীন বাঁচার মধ্যে যে গ্লানি, যে ধিক্কার, তদপেক্ষা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর হাতে নৃশংস মৃত্যুও শ্রেয়। তা পৌরুষের, গৌরবের।

তবে এ তো স্রেফ কথার কথা। ভুখা-নাঙ্গা মানুষ কি আর গৌরবের কথা ভেবে বাঁচে? অন্নচিন্তা বৈ তারা আর কিছুই ভাবে না। ধর্মক্ষেত্রেও তাই ভাবে, যুদ্ধক্ষেত্রেও তাই, দন্ডার্হ-ভূমিতে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেও সে-কথা ভেবে আক্ষেপ করে। এই তিনক্ষেত্রের মধ্যে কোনো তারতম্য তাদের জানা নেই। তাদের কাছে তিনই সমান। তিনটিই ধর্মক্ষেত্র।

আর ধর্মক্ষেত্রেই যত অধর্ম। যেখানে যুদ্ধ, সেখানেই দারিদ্র্য। যেখানে দেবালয়, সেখানেই পাপাচার। দারিদ্র্য আছে বলে যুগ-যুগ ধরে বেঁচে আছে যুদ্ধ। বেঁচে আছে নারীকে নিয়ে টানাটানি— চূড়ান্ত মাত্রায় যৌন হিংসা ও অপরাধ। অথবা বিপরীতক্রমেও তা সত্য। তা না হলে কেন মাঠারিতে এই অগণন অশক্ত-অনাহারী মানুষের দল?

যুদ্ধ উপলক্ষ্যে বেশ কিছুদিন যাবৎ এন্তার জীবহত্যা ঘটে চলেছে মাঠারিতে, যা আগে কখনো ঘটেনি। গ্রামবাসীদের ঘর-ঘর থেকে জোর করে ছিনিয়ে, ভয় দেখিয়ে, হুজ্জত করে আনা হয়েছে বয়স্ক বন্ধ্যা গোরু, পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়ানো কুলক্ষণা গবাদি, অল্পবিস্তর চর্মরোগগ্রস্ত শূকর, ভেড়া, টুনকি মুরগি। আর যেখানে তা নেই, সেখানে খুঁতহীন গবাদিই গৃহস্থের গোয়াল থেকে লুন্ঠন করে আনা হয়েছে। আনা হচ্ছেও। সদ্য ভাগাড়ে পড়া গোরু-বাছুরও কাক-শুগনি খুঁপে খাওয়ার আগে গো-গাড়িতে চাপিয়ে হিড়-হিড় করে আনা হয়েছে মাঠারি দিকে। রাতের অন্ধকারে চলছে চুরিও। কখনো মাঠে-জঙ্গলে চরতে চরতেই গোরু নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। বাগালের চোখে ধুলো দিয়ে কাঁধে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ছাগল-ভেড়ি। তবু বলার কিছু নেই। কে কার কাছে অভিযোগ জানাবে? একাজ করছে প্রত্যেক গ্রামের দলপতিরা। আর ওই ওরাই হাঁস-মুরগি-গবাদির মতোই খাবারের লোভ দেখিয়ে মাঠারিতে ধরে এনেছে যত দরিদ্র-উপোসী গাঁ-বাসীদের।

পাটন সবই জানে। হয়তো সে এটা জানে না যে, যুদ্ধের হাল বেগতিক বুঝলে এই দলপতিরাই সবার আগে ঝুড়েপাতে গা-ঢাকা দিয়ে থাকবে। ঢের রাতে গাঁ ছেড়ে পালাবে অন্য কোথাও। তবে দূর-ভবিষ্যতের ভাবনা এখনি ভাবতে নারাজ পাটন। তার কাছে এই মুহূর্ত সত্য। সত্য এই মাঠারি। অনাগত কাল তো সদাই অজ্ঞাত। দূরদর্শিতায় সে বিশ্বাস করে না।

পাটন চায় মাঠারিকে দেখে মুগ্ধ হোক জারমণিও। সে উপলব্ধি করুক গ্রামে গ্রামে কী আশ্চর্য সাড়া ফেলে দিয়েছে পাটনের আবেদন, তার রাঢ়ী ভাষণ আর মুষ্টি-অন্নের অভিযান। এ কি কম কৃতিত্ব? একি তার পৌরুষ নয়?

‘স্বীকার করো রানি এই জঙ্গলপ্রদেশ ব্যাপী একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে আমারই। আমিই প্রকৃত ধনুর্ধর। ভূমিজ সন্তান। আমিই বীর। মাঠারিযুদ্ধে জয়ী হবো আমিই।’

জারমণির মুখে কথা নেই।

‘এতদসসত্ত্বেও নির্বাক তুমি? কেন? কেন এ কার্পণ্য তোমার? ত্বরায় স্বীকার করো, রানি, স্বীকার করো —জয় আমার অবশ্যম্ভাবী!’

জারমণি নিরবচ্ছিন্ন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার মুখের পানে। পাটন তার দৃষ্টির ভাষা পড়তে পারে না। অবশেষে জারমণি বলে, ‘জয় তোমার অবশ্যম্ভাবী!’

এবার অবদমিত আবেগ চাড়া দিয়ে উঠল তার। যুদ্ধের জন্য প্রতীক্ষারত সৈন্যবলের দিকে পুনঃপুনঃ বাহু প্রসারিত করে, অপরিমেয় উল্লাস নিয়ে বলতে লাগল, এই সমস্ত বর্বর আদিবাসীদের নিয়ে, যত দরিদ্র-বঞ্চিত-অত্যাচারিত প্রাকৃতজনদের নিয়ে, এক নতুন জঙ্গলখন্ডের পত্তন করবে সে। জারমণিই হবে সেই ভূখন্ডের অধীশ্বরী। তার জয়ের অপেক্ষায় এই যে এই বৃক্ষহীনা মাঠারি সন্তানহীনা হয়ে আছে, এই ক্রন্দসী অরণ্যভূমিকে সে আবার নতুন করে গড়ে তুলবে। পুনরুজ্জীবিত হবে সেই নন্দন-কানন, সেই নিসর্গভূমি। আবার বৃক্ষশাখে বাসা বাধবে পক্ষিকুল, তালের কোটরে দোল খাবে বাবুই, দূরে ক্ষেতের আলে-আলে চরে বেড়াবে স্বর্ণগোধিকা, ফুটবে দ্বিপুটী! আবার স্বচ্ছতোয়া হবে পুষ্করিণী, আবার সেথায় মরাল-মরালির সাথে সন্তরণশীলা হবে চিরযৌবনবতী জারমণি। তার কদলিসদৃশ ঊরু, সুডৌল স্তনযুগল আর সুগঠিত বাহু ঝাপটাইয়া জলকেলি করবে সে—চকিতে ডুব চকিতেই ভেসে ওঠা! তার জলকেলিতে উভুকি-ডুভুকি দোল খাবে ঘাটে-ঘাটে প্রস্ফূটিত লাল শালুকের ঝাড়। মাথার ওপরে উড়বে টিটরিঙ্গা পাখি। আহা!

পাটন জানায়, সে আর জনবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে না। তার সেই জঙ্গলখন্ডকে এমন অবারিত করেও রাখবে না সে। অরণ্য ঘিরে থাকবে শত-শত ধনুর্ধর, যাতে অঙ্গদের মতো বহি:শত্রুরা অকস্মাৎ আক্রমণ করতে না পারে। আর যদি করেও, তাহলে আবার দ্বিতীয় মাঠারিযুদ্ধের আয়োজন করতে পিছপা হবে না এই অমিতবিক্রম পাটন সিংসর্দার। এই ঘোষণা করে সে, দূরে অদৃশ্য সেই ডুংরিটির দিকে মুখ করে আপাদ-মস্তক ভূলুন্ঠিত হয়। জিনগা-মাঈকে দন্ডবত করার উদ্দেশ্যে। আবার নতমস্তক হয় তার গান্ডীব নিয়ে। অতঃপর ‘জঅঅঅঅয়! জিনগা-মাঈয়ের জাঅঅয়!’ ধ্বনি দিয়ে, গান্ডীব হাতে বিশালদেহী পাটন, রতিগড় থেকে ছুটতে ছুটতে অবতরণ করল মালভূমিতে। সম্মুখবর্তী হয়ে আবার উঠল আবার নামল। পায়ে পায়ে বাজতে লাগল তার শতগাছি ঘুঙুর৫, আর পিঠের ওপরে তিরের গুচ্ছসহ তূণীরে হড়-হড় শব্দ করতে করতে একদা প্লুতগতিতে সে পৌঁছে গেল আরেক টিলায়। ডুমুর গাছের ছায়াঘেরা সেই টিলা—টিশুম্ভা। সেখানে দক্ষিণ হাঁটু মাটিতে ঠেকিয়ে, বাম হাঁটু ভূমির সঙ্গে সমান্তরাল রেখে, সে ধনুকে গুণ টেনে বীরবিক্রমে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, ‘কাপুরুষ! বারেক চাহি দেখ! শিয়রে শমন তোর অপেক্ষা করিছে দুন্দুভির লাগি!’

তামাম মাঠারিক্ষেত্র গম-গম করে উঠল! টিলায় টিলায়, আকাশে-বাতাসে, অনুরণিত হতে লাগল সেই আস্ফালন : দুন্দুভির লাগি! দুন্দুভর লাগি! দুন্দুভির লাগি!...

প্রতিধ্বনিময় হুঙ্কার থেমে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র ততোধিক নিস্তব্ধ ও থমথমে হয়ে গেল। দমকা হাওয়া উঠল। একপ্রস্থ পাক খেয়ে সেই হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে গেল মাঠারির লালধুলো। শনশন করে উড়তে লাগল দুপক্ষের যুদ্ধ-নিশানগুলি। টিলায় টিলায় তটস্থ হয়ে উঠল তীরন্দাজ সৈন্যরা। মাঠারিভূমির যত পদাতিক সৈন্য, যত মল্লবীর আর ধুসলা-যোদ্ধারা চেয়ে থাকল আসমানে। নীল আকাশে মন্থরগতিতে ভেসে গেল শ্বেতশুভ্র মেঘরাশি। জহ্লাদের হুঙ্কার! কর্ণগোচর হওয়ামাত্র অবসাদ এসে গেল অঙ্গদের।

টিশুম্ভ টিলার বিপরীতে অবস্থিত কুরুসত্তম টিলা। সেই টিলাটিও রকমারি বৃক্ষে ঘেরা, সুনিবিড়, ছায়াচ্ছন্ন। সুশীতল। এখনো সেখানে কিছু পাখি কলরব করে। কাঠবেড়ালি খেলা করে। আঁধারে বৃক্ষমূলে ছুছুন্দর ঘুরে বেড়ায়। বর্ষায় অর্জুন গাছের ডালে ডালে মস্ত মস্ত চাক বাঁধে মৌ। পেঁচার ডানার ঝাপটানি খেয়ে সহসা সেই চাক ভেঙে গেলে কয়েকদিন ধরে ফোঁটায় ফোঁটায় মধু ঝরে ফুলখাড়ি ঝোপের মাথায়। বেগতিক অঙ্গদকে দেখে সেই পক্ষিকুলও উদবিগ্ন হল। তারা বলতে লাগল, ‘কিমিদমভূত! কিমিদম ভূত!’ একি হল! একি হল!

ততক্ষণে রণসজ্জায় সজ্জিত অঙ্গদ যুগল মুষ্টিতে ধরা ধনুকটি ললাটে ঠেকিয়ে, বসে পড়েছে। হেঁটমুন্ড হয়ে। পিঠে তিরভর্তি তূণ। ধনুকের অপর প্রান্তটি উলম্বভাবে গগনমুখী।

কয়েক দন্ড অতিবাহিত হওয়ার পর, বসা অবস্থাতেই, থুতনি ওপরের দিকে তুলে উদাসীন চেয়ে থাকল অঙ্গদ। ঘোলাটে তার দৃষ্টি, নিস্তেজ তার কন্ঠ। সে জ্ঞিজ্ঞাসিল, ‘হে মহাপ্রবীণ! এ কি দশা হইল আমার! কী হেতু আমি সকলই বিস্মৃত হইতেছি? কে আমি? কেন-ই বা এই মাঠারিক্ষেত্রে ধনুর্বাণ লইয়া যোদ্ধৃবেশে কুরুসত্তম টিলায় অবস্থান করিতেছি? কেন আমি ভূমিতল স্পর্শ করত মূর্ছিত-প্রায়? এই সমুদয় জানিতে আমার মন উত্তরোত্তর ব্যাকুলিত হইতেছে। হে কেশব, আমাকে অতিসত্বর সকল অবগত করুন।’

মহাপ্রবীণ তার নিকট অগ্রসর হইলেন। তার কাঁধে সস্নেহে হাত রাখিলেন। অতঃপর—

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে মহাবাহো! উদবিগ্ন হইও না। এক্ষণে আমি যাহা-যাহা কহিতেছি, তাহা তাহা অতীব নিষ্ঠাবান হইয়া আগ্রহ সহকারে শ্রবণ করো। হে যোদ্ধৃ! তোমার মনে বিচলন দেখা দিয়াছে। ইহা সাময়িকরূপে বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িয়াছে। এই বিক্ষিপ্ত মনই তোমা হইতে তোমার যোদ্ধৃবেশে এই যুদ্ধক্ষেত্রে তদীয় বাহিনীসহিত উপস্থিত থাকার কার্য-কারণ বিষয়ে সম্যক বিস্মরণ আনিয়া দিয়াছে। হে তেজস্বী! যুদ্ধ প্রারম্ভকাল এখনো সমাগত হয় নাই। দুন্দুভি বাজিয়া উঠিতে বিলম্ব আছে। হে বজ্রাধিপ, তৎমধ্যকালে তুমি কিয়ৎকাল ধ্যানস্থ হইয়া তোমার গত-পরিচয় আহরণ করো। উহা হইতেই তুমি প্রাগুক্ত সকল জিজ্ঞাসাদির জবাব পাইবে। উহাই তোমাকে মস্তক উন্নত করিয়া দৃঢ় হইতে সাহায্য করিবে, বজমুষ্ঠিতে ধনুর্বাণ ধরিতে প্রাণিত করিবে, তথা ওই যে হোথায় টিশুম্ভা টিলায় অধিষ্ঠানরত প্রতিপক্ষ তোমাকে বধিবার লাগি সোৎসাহে জাম্বুবানসদৃশ উল্লম্ফন দিতেছে তাহার আক্রমণার্থ তোমার পর্জন্য-ধনুকে বাণ সংযোজিত করিতে তৎপর করিবে।’

মহাপ্রবীণের মুখনি:সৃত বচনান্তে, ধীরে ধীরে, নয়ন-পল্লব নমিত হল অঙ্গদের আর সে ধ্যানস্থ হয়ে গেল। দুই মুঠিতে তেমনি ধরা থাকল তার মহাগুণ সম্পন্ন ‘পর্জন্য ধনু’। পাশে দন্ডায়মান মহাপ্রবীণ।

অঙ্গদের দীর্ঘদিনের ধ্যান ও তপস্যার ফল এই ধনু। এর বৈশিষ্ট্য হল, এই ধনুক থেকে নির্গত বাণটিকে চোখে দেখা যায় না। গতিশীল অবস্থায় তার ওপরে মেঘের ছায়া পড়ে, ফলে প্রতিপক্ষের দৃষ্টিতে ভ্রম জন্মে। মনে হয় যেন তা অতি উর্ধ্বগামী হইয়া আকাশের সহিত মিলিয়া গেল।

অন্যদিকে, পাটনের ‘রনরনি গান্ডীব’, যা তার নিজস্ব উদ্ভাবন। বায়ু ভেদ করে এর বাণগুলি রন-রন শব্দে লক্ষ্যের অভিমুখে প্রবল বেগে ধাবিত হতে থাকে। এই হেতু পাটন তার এই নামকরণ করেছে। বাকি সমস্ত যোদ্ধাদের ধনুর্বাণগুলিতে তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য নেই, কোনো আপাত অলৌকিক চমৎকারও নেই। শরের মুখে ফলা বসিয়ে বানানো হচ্ছে তির, বাঁশবন থেকে ঝাঁকে-ঝাঁকে বাঁশ কেটে এনে ফালি করে, পাবগুলিকে চাঁছাছুলা করে হচ্ছে ধনুক। দু-গন্ডা পাঁচ-গন্ডা করতে করতে কুড়ি গন্ডায় এক পণ, কুড়ি পণে এক কাহন। অহরহ কাজ চলছে। লাট বেঁধে বেঁধে রাখা হচ্ছে একপাশে। তার জন্য দু-পক্ষের ছাউনিগুলিতে বসেছে বহু কামার পরিবার, মাহালী পরিবার। তামুক-চুটি দাঁতে চিবিয়ে রেখে হসর-হসর হাপর টানছে কামার বুঢ়া। কাঠকয়লার ধৌঁয়া উড়ছে।

সারা মাঠারি জুড়ে কত রকমের কাজ যে চলছে! এ যেন অশ্ববিহীন অশ্বমেধ যজ্ঞ। শুধু ওই একটি নারীর জন্য। কত জীবহত্যা, কত বৃক্ষহত্যা, এবং এখনো আরো কত-কত বাকি। শুধু কি তাই? কত লুট, চুরি, জুলুম, ছিনতাই। আর কত পক্ষী ও সরীসৃপের নিরাশ্রয়-করণ। গোধূলি-লগ্ন পর্যন্ত কাজ, তারপর সন্ধে হতে না হতে সবকিছুর বিরতি। তখন মশালদাররা মাঠারিক্ষেত্রের বিশাল পরিসর জুড়ে জ্বেলে দেয় অসংখ্য ভেরেন্ডা ডালের মশাল। চড়চড় শব্দ করে জ্বলতে থাকে সেগুলি। সে এক দৃশ্য! যেন বিস্তীর্ণ প্রান্তর ব্যাপী অকাল দীপাবলি।

অঙ্গদ ধ্যানস্থ হয়েই থাকে। চোখের পাতা নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে হারিয়ে গেছে তার সুদূর অতীতের জীবনেতিহাসের সন্ধানে। কম করে হলেও হাজার বছর আগের সেই বিস্মৃত ইতিহাস উদ্ধার করে সে খুঁজে পাবে তার পরিচয়। ফিরে যাবে তার যুবাবস্থায় আর তার পর থেকে, একটু একটু করে, সে ফিরে পাবে তার চেতনা, পাবে ‘কে আমি’র উত্তর।

মহাপ্রবীণ অবিচ্ছিন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন অঙ্গদের দিকে। কয়েক দন্ড বাদে অস্ফুটস্বরে আপন মনে অনুচ্চ কথন করতে থাকে সে। মহাপ্রবীণ নিশ্চিত হন, অঙ্গদ ফিরে গেছে তার ডেলিকচা গ্রামের জীবনে। তিনি শুনতে পান সহোদর পাটনের সঙ্গে তার উত্তপ্ত সংলাপ বিনিময়। সেই সংলাপে ঘুরে-ফিরে আসে একটিই নাম। জারমণি।

কিন্তু আশ্চর্য! যা ভাবা হয়েছিল তা আদৌ ঘটল না। ভাবা হয়েছিল, অঙ্গদ তার অতীত জীবনের কথা জানতে পারা মাত্র উত্তেজিত হয়ে পড়বে। এখন যে-অঙ্গদ রণসজ্জায় সজ্জিত হয়েও ধনুক হস্তগত করে নির্জীব বসে পড়েছে, সে তখন চাঙ্গা হয়ে দাঁড়াবে, প্রত্যয়-কঠিন মুষ্টিতে কঠিন অস্ত্র ধরবে, আর ওই যে শত্রুকে বাণবিদ্ধ করবে বলে লপং-ঝপং তড়পাচ্ছে যে-পাষন্ড পাটন, অমিতবিক্রমে ধেয়ে যাবে তার দিকে— লাগাতার নিক্ষেপ করবে তার মহাস্ত্র, পর্জন্য। যদিচ, বাস্তবে ইহার কিছুই ঘটিল না। মোটেই ব্যাঘ্রসম হিংস্র হয়ে উঠল না অঙ্গদ।

মহাপ্রবীণ অবাক! এই প্রথম তাঁকে কিঞ্চিদধিক চিন্তিত দেখায়।

অঙ্গদের তাৎক্ষণিক স্মৃতিবিভ্রম ঘটেছিল। তা থেকে সে পুনরায় ফিরে এসেছে সজ্ঞানে। তা কি স্মৃতিবিভ্রম, নাকি গভীর ঔদাস্য? যদি স্মৃতিবিভ্রমই হয়ে থাকে, তাহলেও ক্রমে ক্রমে সে এখন জানতে পেরে গেছে সে কে, কেনই-বা যোদ্ধৃবেশে এই মাঠারিক্ষেত্রে।

বলা অতিরেক, প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যেই সে সদলবলে সামিল এখানে। কিন্তু তৎসসত্ত্বেও যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটার এই প্রাক-মুহূর্তেও তার মধ্যে কোনো বিকার, কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যাচ্ছে না। কেন তার এই দশান্তর? কেন তার আচরণে অভিব্যক্ত হচ্ছে না তাহার ন্যায় প্রতাপশালী বীরের বীর্য ও বিক্রম? মহাপ্রবীণের উদবেগ সেখানেই। তিনি ‘হে মহাবাহো’, ‘হে রণপারঙ্গম’ আদি সম্বোধন উচ্চারণপূর্বক মুহুর্মূহু জানতে চাইলেন এমন কী ঘটে গেল যা তাকে এমতাবস্থায় নিয়ে এল? যে রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ তৈরি হয়ে রয়েছে মাঠারিতে, তা তো শত্রুকে নির্মূল-নিধনের পক্ষেই উৎসাহিত করবে তাকে? তাহলে কোথায় গেল সেই উৎসাহ? কোথায় তার সেই বীরোচিত প্রচন্ডতা?

অঙ্গদ বলিল, ‘হে মহাপ্রবীণ! যুদ্ধে প্রমত্ত হওয়ার পূর্বে আমি অবলোকন করিতে চাহি কাহাদের সহিত আমাকে সংগ্রাম করিতে হইবে। পূর্বদেশীয় শত-শত জনপদের কোন কোন রণকুশল ও মহাযোদ্ধা রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হইয়াছে? আমি নেত্রপাত করিতে চাহি সেইসব সেনানীর প্রতি, যাহারা দুর্মতি-পাটনের প্রিয়চিকীর্ষূ।’ এই উক্তি নিবেদন করে, অঙ্গদ, যুদ্ধক্ষেত্রের চতুর্দিক লক্ষ করে যেতে লাগল।

শুধু সমভূমিই না, অঙ্গদ দেখতে লাগল প্রতিটি টিলাও, যেখানে পাটনের তীরন্দাজ-বাহিনী ধনুর্বাণ নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে বিপরীতদিকে তাক করে। সে দেখল সুকৌশলী জুজুৎসুদের, দেখল ধুসলা-যুদ্ধে অবতীর্ণ তাবড় তাবড় ওস্তাদদের, দেখল বহুদূর বিস্তৃত আখড়ায়-আখড়ায় আরো অজস্র, অগণিত পদাতিক যুদ্ধার্থীকে, যারা ধনুর্ধর, অস্ত্রী, লাঠিয়াল প্রমুখ। সে উভয় সেনাবাহিনীতেই দেখতে পেল তার এতদিনকার ভ্রাম্যমানজীবনের সূত্রে গ্রামে গ্রামে গড়ে ওঠা আত্মীয়াধিক আপনজনদের —খেতমজুর, আখচাষি, তাঁতি, ঘানিঘুরা কলু, নদীর পাড়ে ইট গড়া শ্রমিক, ডোম-কালিন্দী, অরণ্যে কাষ্ঠাহরণকারী শবর, বীরহড় ও সাঁওতাল, হাঁড়িয়া প্রস্তুতকারী সিংসর্দার এমনি আরো বহু দরিদ্র ও নিত্যশঙ্কিত প্রাকৃতজন। এদের সকলের কাছেই সে কৃতজ্ঞ, সে ঋণী। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে, মানুষের নিত্যধর্ম সম্পর্কে, তার জ্ঞান, দর্শন, বুৎপত্তি, বিচারবুদ্ধি যা-কিছুই হয়েছে সবটাই হয়েছে গ্রাম্য জনপদীয় এইসব অসভ্য, মূঢ়, অনালোকিত মনুষ্যদের সংস্পর্শে এসেই। সে-ও তো একদিন তাদেরই একজন ছিল। আজ তার আপন প্রচেষ্টায়, আপন আগ্রহে, নিরন্তর কষ্ট-ক্লেশ সইতে সইতে সেই অন্ত্যজভূমি থেকে বৌদ্ধিক উত্তরণ ঘটেছে তার। জীবন কী— এই বোধও তার ছিল না। জগদ্দর্শনকালে গ্রাম-গ্রামান্তরে তার পরিব্রাজনময় জীবনের সূত্রে সে এদের কাছ থেকেই পেয়েছে সেই শাশ্বতিক অমূল চেতনা। মহাপ্রবীণের খড়বোঝাই গো-শকটের মাথায়, উত্থিত অস্ত্রহাতে বসে, ঘুরতে ঘুরতে, কত শত গ্রাম যে সে ঘুরেছে! ঘুরতে ঘুরতেই জেনেছে অস্ত্রের ভাষা কী, আর জেনেছে মানবপ্রেম অস্ত্রের চেয়েও কতবেশি ধারালো। বস্তুত, এখান থেকেই তার জীবনে মানুষের প্রতি— অখন্ড মানবতার প্রতি— প্রেম ও ভালোবাসার জন্ম। এখান থেকে তার মধ্যে একটি জিঘাংসু হৃদয়ের প্রেমরূপী উত্থান। এখন এই সব মানুষদের বিরুদ্ধে তাকে অস্ত্রচালনা করতে হবে?

আজ এই মুহূর্তে, তাদের বিমর্ষবিধুর মুখগুলি দেখতে দেখতে, তার অতীত জীবনের কত কথাই না স্মরণে আসছে! কতদিন বিপদে-সঙ্কটে সে তাদের আশ্রয় যাচ্ঞা করেছে, কখনো ক্ষুধার্ত হয়ে অন্নসেবা করেছে, কখনো-বা শ্রান্তপথিক হয়ে এইসব অন্ত্যজদের অঙ্গনের তরুমূলে বসে তাদের শ্রীময়ী রমণীদের হাত থেকে মৃন্ময় কলসির শীতল বারি পান করে আত্মার প্রশান্তি লাভ করেছে। এরাই তো তার স্বজন। এরাই তো তার পীড়িত প্রাণকে সঞ্জীবিত করেছে। এখন এদেরকেই সে হত্যা করবে এই যুদ্ধে?

যখন সে তার সহোদরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে জীবন সম্পর্কে বীতরাগ হয়ে পড়েছিল, যখন তার বেঁচে থাকা অর্থহীন মনে হয়েছিল, যখন সে হতাশায় নৈরাশ্যে আর শত-শত দিবসযাম অনাহার-অনশনজনিত কারণে ভগ্নদেহ নিয়ে উদুম্বর বৃক্ষের তলে উপবিষ্ট থাকতে থাকতে বল্মীকগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল, তখন এই গ্রামবাসীরাই তো তার প্রতি সদয় ও করুণাঘন হয়ে তার সম্মুখে আহার্য রেখে দিত। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, আজ না হোক কাল, কাল না হোক শত-দ্বিশতবর্ষ বাদে হলেও জাড্যোত্থিত হবেন তিনি। একদিন তাঁর উত্থান ঘটবেই। বল্মীক ভেঙে বেরিয়ে ক্লেশিত মানুষের কাছে এই মহামানব সত্যের এক আলোকবার্তা নিয়ে আসবেন।

আর আজ? তাকে নিয়ে এই মহান প্রত্যাশা যে নিরীহ মানুষদের, তাদের সঙ্গেই সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হবে তাকে? নিজের দুর্দিনে যাদের কাছে সে আশ্রিত হয়েছিল, যুদ্ধে তাদের নিধন ডেকে এনে তাদেরই পরিবার-পরিজন সমূহকে সঙ্কটাপন্ন ও নিরাশ্রয় করবে সে? প্রেমে, শ্রদ্ধায় যারা তাকে সরল হৃদয়ে, বিশ্বাসে মহামানব করে রেখেছে, তাদের সেই নিষ্পাপ হৃদয়কে, সেই বিশ্বাসকেই যুদ্ধের নামে তিরবিদ্ধ করতে হবে? তাদের আত্মীয়-পরিবার-পরিজনদের নি:সহায় সর্বহারা করবে সে? সে তবে অকৃতজ্ঞ, বিশ্বাসঘাতক!

অঙ্গদ বলিল, ‘হে মহাপ্রবীণ! মাঠারিক্ষেত্রে এইসকল যুদ্ধার্থী-যুযুৎসু স্বজনদের দেখিয়া আমার অঙ্গসকল উত্তরোত্তর অবসন্ন হইতেছে, আমার মুখ পরিশুষ্ক হইতেছে, আমার শরীরে রোমহর্ষ হইতেছে এবং আমি কম্পমান বোধ করিতেছি! দেখুন, আমার হস্ত হইতে পর্জন্য গান্ডীব স্রস্ত হইতেছে, আমি সর্বাঙ্গ পরিদগ্ধ অনুভব করিতেছি। আমি যে আর অবস্থান করিতে পারিতেছে না। অধিকন্তু, আমার মনও বিচলিত হইতেছে। হে মহাপ্রবীণ! আমি এই দন্ডে যাহা-যাহা অনুভব করিতেছি, তাহা-তাহা সকলই জনমানসের পক্ষে অহিতকর, অশ্রেয়। ইহাতে আমি অশুভ লক্ষণসমূহ দেখিতেছি। আমি আর জয়ের আকা´খা করিতেছি না।

‘হে মহাপ্রবীণ! মনুষ্যজগতে ‘জয়’ শব্দটি হিংসাত্মক। উহা বিভেদমূলক ও বঞ্চনা উদ্রেককারী। স্বার্থান্বেষী। আমি হিংসার বিনিময়ে জয় চাহি না, পীড়নের বিনিময়ে পৌরুষ চাহি না, বঞ্চনার বিনিময়ে জনমানসে খ্যাতি চাহি না। আমি গ্রামে গ্রামে শোক ও ক্রন্দনরোলের বিনিময়ে উল্লাস চাহি না। আমি আধিপতা চাহি না, আগ্রাসন চাহি না, বিভীষিকাময় এই জয়োত্তরণ চাহি না। আমাদের মাঠারিভূমির কিসের প্রয়োজন? বিগ্রহের মূল ওই ‘কামোৎপন্না’ নারীতেও আমার প্রয়োজন নাই। ভোগের জীবনই-বা কী জীবন? সহস্র-সহস্র পুরুষ হত্যার বিনিময়ে এক নারীকে লাভ করিবার অদম্য মোহময় বর্বর বাসনা পোষণ করিয়া আমি যুদ্ধ করিতে নারাজ!’

এই কথা বলে অঙ্গদ একে একে তার গা থেকে যুদ্ধের সাজগুলি খুলে ফেলতে থাকে। আর ক্রমশ নির্ভার বোধ করতে থাকে। বারে বারে উচ্চারণ করে, ‘আঃ! আমি কী করিয়া এতক্ষণ আমার অঙ্গোপরি এই মহাভার বহন করিতেছিলাম! এই কিম্ভূত রণসজ্জাই আমার পাপের বোঝা। আমার আত্মার গ্লানি।’

ভূমিতে গান্ডীব নামিয়ে রাখে সে। স্কন্ধ হইতে তূণীরও নামিয়ে দেয়। সে আদিবাসী যোদ্ধাসুলভ অলঙ্কারগুলিও অঙ্গ হইতে একে একে খুলে ফেলতে থাকে।

স্তম্ভিত মহাপ্রবীণ! এ কোন অঙ্গদকে দেখছেন তিনি? এ কোন বীর? এত-এত বৎসরকালব্যাপী জগদ্দর্শন কি তবে নিরর্থক? বৃথা? এ কোন দিব্যজ্ঞান আহরণ করল সে? তিনি ক্ষণস্থায়ী আবেগ দমন করতে উপদেশ দিলেন। বললেন, ‘হে মহাবাহো অঙ্গদ! স্থিত হও! স্থির হও! মনস্থির করো! প্রকৃত পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক আপন কর্তব্য নিরুপণ করো। কাল বড়ো সংক্ষিপ্ত।’

কিন্তু সে-কথাও তার অন্তর স্পর্শ করল না। পরন্তু রণাঙ্গনের দিকে তাকাতেই তার মন আরোই উদবেলিত ও আবেগাকুল হয়ে পড়ল। সে আবার বলল, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমার যে প্রতিপক্ষ যুদ্ধবিনা এক ধনুষ্কোটি ভূমিও ছাড়িতে নারাজ, আমি তাহাদের এক ভূধর ত্যাগ করিতে রাজি। তথাপি যুদ্ধ আমি করিব না! নারী নহে, ভূমি নহে— এমনকি ততোধিক মহার্ঘ পার্থিব কোনো অকিঞ্চিতকর বস্তুর জন্যও আমি ইহাদের হত্যা করিতে অসন্মত। এই সকল নিরীহ-দীন-বুভুক্ষু মানবহত্যা করা আমাদের অলাভ। ইহাতে পাপ বৈ পুণ্য নাই, উদবেগ বৈ শান্তি নাই, অনুশোচনা বৈ সুখ নাই, প্রীতি নাই। হে মহাপ্রবীণ! ইহারাই আমার পরমাত্মীয়, আমার স্বজন। কুটুম্ববধের ন্যায় এই ঘোর অনুচিত কর্ম করিয়া আমি কী করিয়া সুখী হইব?’ ভাবতেই মাথা হেঁট হয়ে গেল তার। সে অনুশোচিত হল। ‘হায়! আমি কী মহাপাপ করিতে চেষ্টিত হইয়াছি! আমি লিপ্সার বশবর্তী হইয়া শত্রুর প্রতি প্রতিশোধ লইতে কুপিত হইয়া, মহীতলে আপন পৌরুষ-কীর্তি প্রতিষ্ঠিত করিবার অসদুদ্দেশ্য লইয়া এই শোনিত-যুদ্ধের আয়োজন করিয়াছি! যদি প্রতিপক্ষের এই শস্ত্রপাণিগণ আমাকে প্রতিকারবিমুখ অশস্ত্র অবস্থায় রণে হত্যা করে তাহাই আমার মঙ্গলতর হইবেক। হায়, এ আমি কী করিয়াছি! সহোদর, আমি কী করিয়াছি!’

সেই পুরাতন আবেগ উথলে উঠল অঙ্গদের। বলতে বলতে সে কুরুসত্তম-এর প্রান্তভূমিতে এসে দাঁড়ায়। তার শস্ত্রহীন দুইবাহু দুইদিকে প্রসারিত করে বলে ওঠে, ‘হে আমার প্রতিপক্ষগণ, হে আমার সহোদর! আমার শীর্ণদেহ বাণবিদ্ধ করো! হত্যা করো আমাকে! আমি সুপ্ত বাসনাকে গোপন রাখিয়া যুদ্ধে সার্বিক হিতের অভিপ্রায় জনপদে প্রচার করিয়াছি। প্রতারক আমি! শঠ আমি! আমাকে হনন করো! এই পবিত্র মাঠারিভূমিকে রক্তস্নাত করার দায়ে লোকসমাজে নিন্দার্হ আমি, দন্ডার্হ আমি। আমাকে—’ বাক্যটুকুও শেষ করতে পারে না অঙ্গদ। আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।

যদিও তার এ বিলাপ কারো কর্ণগোচর হল না। এ তো প্রতিস্পর্ধী আস্ফালন নয়। কিন্ত তার এই অন্তর্দহন, এই আকুল ক্রন্দনে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়া এবং তার পরেও দুহাতে মুখমন্ডল আড়াল করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠা মহাপ্রবীণকে উদবেগে ফেলে দিল। তিনি আবার তার কাঁধে হাত রেখে তার দগ্ধ হৃদয়কে শীতল করতে পুনরায় উদ্যোগী হলেন। তাকে ধীরে ধীরে ন্যাগ্রধ বৃক্ষমূলে এনে বসালেন। অতঃপর—

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে পরন্তপ! ক্ষুদ্র হৃদয়দৌর্বল্য ত্যাগ করো। হতাশ্বাস হইও না। তোমার ন্যায় তেজস্বী পুরুষের চরিত্রে ইহা এক কপর্দকও শোভা পায় না। রণাঙ্গনের পরিবেশ গম্ভীর হইয়া উঠিয়াছে। যুদ্ধের কাল সমাগত। উভয়পক্ষীয় সেনাগণ আপন-আপন ক্ষেত্রে অস্ত্র ও শস্ত্র লইয়া প্রস্তুত। এই সেই মুহূর্ত যখন লোকসমাজে ধর্ম প্রতিষ্ঠা হেতু অধর্মের সহিত সংঘর্ষ অনিবার্য হইয়া পড়িয়াছে। দেশ ও সমাজের এই সংকট-মুহূর্তে, যুদ্ধের এহেন বিষমকালে তোমার এতাদৃশ স্বর্গের প্রতিবন্ধক অকীর্তিকর মোহ কোথা হইতে উপস্থিত হইল? হে ব্যাধনন্দন! ক্লীবত্বগ্রস্ত হইও না। সংঘর্ষের প্রাক্কালে আপন দৌর্বল্য ও বৈক্লব্য শত্রুর সমক্ষে নিজমুখে প্রকাশ করিও না, ইহাতে শত্রুপক্ষ উজ্জীবিত হইয়া উঠিবেক। হে অরিন্দম! ভূমি’পরি কঠোর হইয়া দাঁড়াও। অশ্রু বিমোচন করো, দৃষ্টি স্বচ্ছ ও প্রখর করো।’

অঙ্গদ হাতের তালুতে অশ্রু মূর্ছন করে। তাপিত হৃদয়ে তখনো সে বিচলিত। বিমূঢ়! ফুঁপিয়ে ওঠার রেশ তখনো কিঞ্চিত রয়ে গেছে। নিজেকে যতোটা সম্ভব সংবরণ করে সে ফের বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি বুদ্ধিহীন, জ্ঞানহীন, আবেগাভিভূতচিত্ত। আমি, ধর্মসংশয়ে মূঢ়চিত্ত, আপনাকে প্রশ্ন করিতেছি। যাহা শ্রেয় তাহাই আমাকে নিশ্চিত করিয়া বলুন। আমি আপনার শরণাপন্ন—আমাকে সদুপদেশ প্রদান করুন। যে-শোকে আমার ইন্দ্রিয়সকল আচ্ছন্ন, বিবশ, সেই শোক হইতে আমাকে পরিত্রাণ দিতে পারে এমন কী আছে ইহলোকে? হে মহাপ্রবীণ! গ্রামসূত্রে এই যুদ্ধার্থীগণ সকলেই বয়সের বিচারে না হইলেও শিক্ষা ও জ্ঞানের বিচারে আমার কাকা-খুড়া-জ্যেষ্ঠতাত-খুল্লতাত তুল্য। ইহারাই আমার গুরুজন। এই সরল হৃদয়বান, পরোপকারী তথা মহানুভব গুরুকূলকে হত্যা না করার পরিণতিস্বরূপ যদি আমাকে গ্রামের কুলহিতে-কুলহিতে ভিক্ষাপাত্র হস্তে কৃপান্ন সংগ্রহ করিয়া ঝড়ে-জলে বৃক্ষমূলে বসিয়া তাহাই স্বপাকপূর্বক সায়াহ্নে ভক্ষণ করিতে হয়, তাহাও শ্রেয়। তাহাই আমি করিব। তথাপি হত্যার নামে হঠকারী যুদ্ধ আমি করিব না।’

এই সংকল্প নিয়েই বিষাদগ্রস্ত অঙ্গদ রণাঙ্গন থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আর সে তাকিয়ে থাকে সেদিকে যেদিক থেকে একদা এই অঙ্গদ এসে ঢুকেছিল মাঠারিতে। এক নয়, একাধিকবার। গাছপালায় ঢাকা বড় বড় পাথরের চাঁইগুলিতে কখনো হামাগুড়ি দিয়ে, কখনো-বা লাফিয়ে লাফিয়ে, সে নেমে আসত ইরাবতীর পাড় ধরে রতিগড়ের দিকে—উপত্যকায় দাঁড়িয়ে পাটন, বেশ খানিকটা ফারাকে জারমণি। এখন সেদিকে আর গাছপালা নেই, প্রায় নিশ্চিহ্ন। ইরাবতীও লুপ্তপ্রায়। মাঠারির সে-অংশ চেনাই যায় না। সেদিনের সেই মাঠারির সঙ্গে আজকের এই মাঠারির কী অসম্ভব অমিল!

মিল কি আছে সেদিনের সেই অঙ্গদের সঙ্গে আজকের এই মুহূর্তের সদ্য রণসজ্জা পরিত্যক্ত অঙ্গদেরও? আজ যে-অঙ্গদ শোকে মূর্ছিত প্রায়, সেদিন রতিগড়ের উপত্যকায় দাঁড়িয়ে এই অঙ্গদই হুঙ্কার ছেড়েছিল। পাটনের মুখে শত্রুর প্রতি অবজ্ঞার হাসি দেখে উত্তেজিত হয়ে সে বলেছিল, ‘পাষন্ড! আমার দুর্বল তনু দেখে তোমার হাস্যেদ্রেক হচ্ছে? তোমার পেশীবহুল শরীরের তেজে অবজ্ঞা করছ আমাকে? তুমি ধ্বংস হবে! ধ্বংস হবে! অচিরেই তোমার পতন অনিবার্য হয়ে উঠছে! আর তোমার ধ্বংসলীলার দিনে এমনি করেই পৃথিবী হাসবে আজ যেমন তুমি হাসছ। তোমার অবাঞ্ছিত পদভারে ধরিত্রী আজ ন্যুব্জ ও অসুখী হয়ে আছে। তোমাকে নিধন করে আমি এই ধরিত্রীজননীকে নির্ভার ও হ্লাদিনী করতে চাই, মুক্ত করতে চাই। সেই সাধনায় আমার যুগ-যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। কত-কত বর্ষা-বসন্ত পেরিয়ে গেছে। তবু আমি লক্ষ্যভ্রষ্ট হইনি। রিপুদমনে, সংযম-সাধনায় আমি ক্ষীণতনু। শরীর আমার শুষ্ক কদলীপত্রের ন্যায় লঘু, অনাহারক্লিষ্ট, অথর্ব নাগফণীর ন্যায় কুৎসিতদর্শন। কিন্তু তাই বলে তুমি আমাকে হীনবল ভেবো না।’ সে এও বলেছিল, ‘তোমার মতো একটি কীটের জন্য আমার করুণার উদ্রেক হচ্ছে, এই ভেবে যে, আজও তোমার জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত হল না।’

উত্তেজিত ও প্রতিশ্রুতিময় সেই অঙ্গদ আজ কোথায়?

মহাপ্রবীণের ওষ্ঠযুগলের ফাঁকে উপহাসের হাসি, যা ইতিপূর্বে কখনো প্রতিভাত হয়নি। কোনো উপহাসাস্পদ বাক্যও তাঁর এই প্রিয়পাত্রকে উদ্দেশ করে কখনো বলেননি তিনি। উপহাস তো দূরের কথা, তিনি কখনো তার প্রতি বিন্দুমাত্র অধৈর্য হননি। সর্বদা যেমন স্নেহপ্রবণ ও সহনশীল থেকেছেন, তেমনি নিরন্তর সচেষ্ট থেকেছেন তাকে এই জগৎ ও জীবনকে দর্শন করানোর পরিশ্রমসাধ্য কর্মে। দিন নেই রাত নেই খড়-বোঝাই গাড়ির মাথায় লিকলিকে অস্ত্র হাতে বসিয়ে এই গাড়োয়ান তাকে কোথায় কোথায় যে নিয়ে ঘুরেছেন তার অন্ত নেই। খালডোবের পথ আর ঝড়-ঝাপটা-শিলাবৃষ্টির দুর্যোগ উপেক্ষা করে, গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্র, প্রবহমান তপ্ত বায়ু আর পৌষ-মাঘের শৈত্যপ্রবাহকে অকাতরে সহ্য করে। বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। জগদ্দর্শন থেমে থাকেনি। কত-কত কামার-জলহা-কুমোর-কুড়মি-মাহালীদের গ্রাম। কত বাউরিবস্তি, ধাঙড়পট্টি। স্যাঁকারো, লোহার, কাহার, জুগি আর কত যে আদিবাসী গ্রাম! কখনো তাঁর গাড়ি চলেছে ভরানদী-মরানদীর অববাহিকা ধরে, কখনো গাভীর পালকে ছত্রখান করে, কখনো-পাহাড়-ডুংরির কচায় কচায় জনহীন ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। সে-পরিবেশ দেখে অঙ্গদ কখনো ভীত ও উৎকন্ঠিত হয়ে উঠেছে, আবার কখনো মহাপ্রবীণের সঙ্গে তার এই অন্তহীন অভিযানকে তার মনন ও দর্শনের পরিপন্থী মনে করে সে গাড়োয়ানকে উপেক্ষা করে চুপিসারে অথবা প্রকাশ্যে পালিয়ে যাওয়ারও প্রয়াস করেছে।

পালিয়ে তো যাবেই। সে তো এই বন্দিত্ব চায়নি। বরং মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে, জীবনের প্রতি অনীহায়, অভিমানে কাতর হয়ে সে এই জীবন থেকেই খালাস পেতে চেয়েছিল। তখনও তো সে বোঝেনি এই প্রবৃদ্ধ গাড়োয়ানটি স্বয়ং তার মুক্তিদাতা। সে বোঝেনি জ্ঞানই মুক্তি-মার্গ। জ্ঞানই জীবনদীপন—জীবনের কষ্টক্লেশ ও অসহায় অন্তর্বেদন থেকে মোক্ষলাভের এক এবং অদ্বিতীয় উপায়।

অঙ্গদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মহাপ্রবীণের মনে পড়ে গেল একদিনকার কথা। অগ্রহায়ণ মাস। বেলা অপরাহ্ন। শীতের আমেজ আরামদায়ক হয়ে উঠেছে আকাশভরা ঝলঝলে রোদে। আর সেই রোদ পড়েছে পাথুরে লাল মাটির পথের উভয় পার্শ্বস্থ দিগন্তবিস্তৃত হলুদ সরিষার খেতে। আশেপাশে কোনো মানুষ নেই। সাঁওতালদের পর্ণকুটিরও নজরে আসে না। থাকলেও সরিষার খেতে হয়তো আড়াল হয়ে আছে। কোথাও শকটের শব্দে শস্যভূমি থেকে ঝাঁক-ঝাঁক পাখি শূন্যে চক্র কেটে উড়ে যায়। মাথার ওপরে নীল আকাশের প্রেক্ষিতে ভেসে চলেছে তাড়া-খাওয়া বরাহ-অবতারসদৃশ শ্বেতশুভ্রমেঘরাশি। কী মনোমুগ্ধকর দৃশ্য! চোখ জুড়িয়ে যায়।

গো-শকট চলছে আর শকটের শীর্ষে বসে দুপাশ দেখতে দেখতে মন উত্তরোত্তর প্রফুল্ল হয়ে উঠছে অঙ্গদের। এই দেখতে দেখতে কখন যে সে স্মৃতিমোহিত হয়ে পড়েছে অঙ্গদ নিজেও জানে না। মহাপ্রবীণ তাকে বারংবার ডেকে চলেছেন, ‘হে অর্বাচীন! হে অর্বাচীন!’, কিন্তু শকটের মাথা থেকে কোনো জবাব আসে না।

মহাপ্রবীণ শকট থামিয়ে দেন। চড়াইয়ের পথ। গাভির নড়াচড়ায় শকটটি যাতে খড়ের ভারে পিছনের ঢালে গড়িয়ে না যায় তার জন্য দুটো পাথরখন্ড এনে চাকার তলায় গুঁজে দেন। তারপর দু-পা খেতে নেমে তিনি গো-যানের ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখেন অঙ্গদ নিদ্রায়মাণ, কিন্তু উর্ধ্বমুখী অস্ত্রটি তখনো ধরা আছে তার দু-হাতের মুঠিতে।

মহাপ্রবীণ তাকে বীততন্দ্র হতে বলেন। তাঁর কন্ঠস্বরে যাতে তার তন্দ্রার ঘোর কেটে যায়, তিনি তাকে কিঞ্চিত উচ্চকন্ঠে বলে যেতে লাগলেন, ‘হে অর্বাচীন! চক্ষু উন্মিলিত করো! অবলোকন করো। অভূতপূর্ব নিরুপম সৌন্দর্য! প্রকৃতির অনির্বচনীয় মায়া! দৃষ্টি প্রসারিত করো। জ্ঞানবান হও আর অকুন্ঠ গুণগান করো তাঁর, যাঁর কারণে এই সকল দিব্য এবং প্রকাশমান।’

একথা শুনে তন্দ্রা কেটে গেল অঙ্গদের। তবে আবেশ পুরোপুরি কাটেনি তখনো, তাই মহাপ্রবীণ ক্ষণেক আগে তাকে কী বললেন তাও শ্রুত হয়নি। ওদিকে, এই অবস্থায়, মহাপ্রবীণ কোনো ভূমিকা ছাড়াই তাকে তার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের সদুত্তর দিতে শুরু করেন।

মহাপ্রবীণ উবাচ, ‘ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং...’

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! মায়ার দ্বারা সর্বভূতকে যন্ত্রারূঢ় করিয়া ভ্রমণ করাইতে করাইতে ঈশ্বর সর্বভূতের হৃদয়ে অবস্থান করেন। তুমি সর্বতোভাবে সেই পরমেশ্বরেরই শরণাগত হও। তাঁর কৃপাতেই তুমি পরম শান্তি তথা সনাতন পরমধাম প্রাপ্ত হইবে। চাহিয়া দেখো এই সর্বভূত...’

ভূত! অঙ্গদ সচকিত হয়। চোখ মেলে নীচে চেয়ে দেখে। এমন জনহীন প্রান্তরে পৈনা হাতে একাকী বৃদ্ধকে দেখে আঁতকে ওঠে সে। ভূত! ভূত! সে আর কোনো কিছু না ভেবে গো-শকটের চূড়া থেকে সবেগে ঝপাং করে বিপরীত দিকে একটি লম্ফ দেয়। তারপর খেতের মধ্যে হাতের অস্ত্রটি ফেলে দিয়ে দে দৌড়!

পিছনে পিছনে ছুটতে থাকেন মহাপ্রবীণ, ‘হে অর্বাচীন! তিষ্ঠ! তিষ্ঠ!’

আর অর্বাচীন! অঙ্গদ সরিষাখেতের ভেতর দিয়ে দিগবিদিক জ্ঞানরোহিত হয়ে সমানে ছুটতে থাকে। যদি কোনো গ্রামবাসীদের কুটিরে আশ্রয় মেলে। কিন্তু কোথায় মানুষ? কোথায় আশ্রয়? শেষে কিছু না পেয়ে সে খেতের ধারে একটি কুলবৃক্ষের উচ্চশাখায় আরোহণ করে। ফর্ফর করে একঝাঁক চটক উড়ে যায়। অঙ্গদ ডালের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকে।

কুলতলে দন্ডায়মান মহাপ্রবীণ ঊর্ধ্বপানে তাকান। বলেন, ‘নামিয়া আইস! এখনো তোমার ঢেরপথ যাত্রা বাকি। কাল বিলম্ব না করিয়া ত্বরায় অবতরণ করো।’

অঙ্গদ পদযুগল দোলাতে দোলাতে ভিন্নমুখে নির্বিকার চাহিয়া বলে, ‘কদাপিও না, আমি ভূতের সহিত সমভিব্যহারে যাইব না। আমাকে মার্জনা করিবেন।’

সে তখনো এতোটাই তার স্বপ্নরাজ্যে ছিল যে, মহাপ্রবীণ এবং এই অত্যাশ্চর্য শোভাকে অবিশ্বাস্য ও ভৌতিক বলেই ভ্রম হচ্ছিল। সে বৃক্ষশাখা থেকে নেমে আসতে চায়নি। অকস্মাৎ তার সম্বিত ফিরে আসে। সে ডালপাতের ফাঁকে চারপাশ চেয়ে দেখে বিস্ময়-বিমূঢ় হয়ে প্রশ্ন করে, ‘হে মহাপ্রবীণ! এ আমি কোথায় অবস্থান করিতেছি? কে আমি? কোথা হইতে আসিয়াছি এবং কোথায় আমার গন্তব্য ইহা জানিতে সাতিশয় উদ্বেলিত-চিত্ত। ইহার সদুত্তর দিয়া আমার কৌতূহল দূরীভূত করুন।’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অর্বাচীন! সৃষ্টির আদিতেও তুমি ছিলে, সৃষ্টির অন্তেও তুমি থাকিবে। তোমার মৃত্যু নাই, তোমার ধ্বংস নাই। তুমি অগ্নি হইতে আসিয়াছ, অগ্নিই তোমার গন্তব্য— অগ্নিই সত্য এবং চিরন্তন।’

একথা শোনার পরই অঙ্গদ বাকহীন হয়ে যায়। তাকে ভাবুক ও অন্যমনস্ক দেখায়। পরমুহূর্তেই ধীরে ধীরে সে ভূমিতে অবতরণ করে।

একদিন বড়োবেশি ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিল অঙ্গদ। পথে কোনো দোকান-হাটও পড়েনি। সে শিশুর মতো চঞ্চল হয়ে ওঠে। মহাপ্রবীণ কেবলই তাকে আশ্বস্ত করতে থাকেন এই বলে যে, সামনের গ্রামে হাট বসেছে, আজ হাটবার। সেখানে অবশ্যি খাদ্য-পানীয় মিলিবে, অঙ্গদ যেন অধ্যবসায় রাখে। তখন প্রাক-গোধূলিলগ্ন। সামনের নতুনডিহি গ্রামটি আসতে তখনো ক্রোশখানেক পথ বাকি। চাকায় রট-রট শব্দ করে গো-শকট চলেছে। একসময় দেখা গেল হাটফেরত গ্রামের মহিলারা আসছে। তাদের মাথায় নতুন নতুন মৃন্ময়পাত্র—হাঁড়ি, কলসি, খাপোরি। কারো-বা মাথায় নতুন বাঁশের ঝাঁটা। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ যাবৎ গো-শকটের ওপর থেকে মহাপ্রবীণের উদ্দেশে কোনো প্রশ্ন না আসায় তাঁর সন্দেহ হয়। আম্রকাননের পাশ দিয়ে যেতে যেতে তিনি যান থেকে নেমে পড়েন। দেখেন শকটের মাথা থেকে অঙ্গদ উধাও। তিনি চিন্তিত হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। তারপর কাছে-পিঠে তাকে দেখতে না পেয়ে অঙ্গদের উদ্দেশে ডাক পাড়েন। হঠাৎ দূরে আমবাগানের ভেতর থেকে তার প্রফুল্ল কন্ঠস্বর তরঙ্গায়িত হয়ে আসে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি হেথায় অবস্থান করিতেছি!’

কিন্তু কী করছে সেখানে সে? মহাপ্রবীণ তাকে আবার ডাক পাড়লে অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! ঢের পথভ্রমণ করিয়া অবশেষে আমি হেথায় অমৃতত্ব লাভ করিয়াছি। আঃ! কী ইহার মিষ্টতা! কী ইহার সুগন্ধ! বিঘ্ন ঘটাইও না। আমাকে ইহার স্বাদ লইতে দাও।’

মহাপ্রবীণ বিস্মিত! তিনি বাগানের পাঁচিলের সামনে এসে দেখেন ক্ষুধার্ত অঙ্গদ একটি আম্রবৃক্ষের তলে গুচ্ছেক রসাল আম জড়ো করিয়া ভক্ষণ করিতে ব্যস্ত। আমের রসধারায় তার সারা মুখ সিক্ত, গড়িয়ে পড়ছে কনুই বেয়েও। সেই বৃক্ষমূলে বসে সে বলে চলেছে, ‘হে মহাপ্রবীণ! তোমার শুষ্কং কাষ্ঠং অমৃতবাণী শুনিয়া আমার যার পর নাই ক্ষুধার উদ্রেক হইতেছে। তোমার সহিত ঘুরিলে আমি অনাহার-পীড়িত হইয়া শুকাইয়া মরিব। ঢের হইয়াছে! জগদ্দর্শনে আমার আর কাজ নাই।’

আর আজ? সেই গ্রাম্য চাষাড়ে শবর-সন্তান জ্ঞানী এবং যোদ্ধা। আজ সে সম্বুদ্ধ। আজ মহাপ্রবীণের সঙ্গেও জ্ঞানবিষয়ক তর্কে অংশ নেওয়ার দুঃসাহস তার আছে। মহাপ্রবীণের দৃষ্টিতেও আজ আর সে অর্বাচীন নয়। সে যেমন পন্ডিত, তেমনি আবার বিনয়ীও। আর তাই সে আজ মহাপ্রবীণের অতি প্রিয় তথা স্নেহভাজন।

কিন্তু কী আশ্চর্য, সেই প্রিয় অঙ্গদকেই এই রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ঠাট্টা করলেন তিনি। তার গ্রামস্বজনদের প্রতি দুর্বলতাবশত রণাঙ্গনে অগ্রসর না হয়ে গা থেকে যুদ্ধের পোশাক খুলে ফেলায়। তিনি বললেন, অঙ্গদ একদিকে প্রজ্ঞাবাক্য অর্থাৎ জ্ঞানের কথা বলছে, আবার অন্যদিকে সে যাদের জন্য অনুশোচনায় কাতর হওয়ার কথা নয় তাদের জন্য অনুশোচিত হচ্ছে। ব্যাখ্যাপূর্বক তিনি জানালেন, যে মৃত এবং যার মরণ হয়নি, তাদের জন্য পন্ডিতগণ শোক করেন না। কারণ, এই সত্য তাঁরা অবগত আছেন যে, জীবদেহে আত্মা অবিনশ্বর, দেহ পরিবর্তনশীল। মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আত্মা অপর এক দেহকে লাভ করেন। যে-কারণে মৃত্যুকে বলা হয় ‘দেহান্তরপ্রাপ্তি’। দেহধারী আত্মার দেহে যেমন কৌমার, যৌবন, জরা আসে, তেমনি আসে মৃত্যু। ধীরব্যক্তি বা জ্ঞানী তাতে মোহগ্রস্ত বা বিচলিত হন না। শোকও করেন না। তাঁরা অকাতরে সব সহ্য করেন। অঙ্গদকেও তিনি তাই বলেন, ‘এই সকলই সহ্য করো।’ আর এইসূত্রেই অবতারণা করেন অমৃতত্বলাভের প্রসঙ্গ।

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে পুরুষর্ষভ! যে দুঃখ-শোকে কাতর হয় না, সুখেও আত্মহারা হয় না, সেই পুরুষকে ইন্দ্রিয়লব্ধ বিষয়ানুভূতি প্রভাবিত করতে পারে না। এই পুরুষই অমৃতলাভের যোগ্য। ইহা স্মরণে রাখিও, অসৎ বস্তুর স্থিতি নাই, সৎ বস্তুর বিনাশ নাই। যাঁর দ্বারা এই জগৎচরাচর ব্যাপ্ত, বর্তমান ও প্রকাশমান তাঁকেই অবিনাশী বলিয়া জানিবে। কেহই ইহাকে বিনাশ করিতে পারে না। হে বীর, তুমি ব্যাধনন্দন হইয়াও জীবনবিনাশের ভয়ে ও শোকে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িয়াছ কেন? আইস, অখন্ড দৃষ্টি লইয়া এই মাঠারিক্ষেত্রের দিকে চাহিয়া দেখো। দেখো ওই সব অগণনীয় যোদ্ধাদের। ইহারা প্রত্যেকেই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমাণ। তুমি এই হত্যাকর্ম হইতে বিরত থাকিলেই বা কী হইবে? মৃত্যু ইহাদের অখন্ড, অবধারিত। যাহারা মরিবেকই তাহাদের হত্যা করিতে তোমার মন কাতর কেন? সুতরাং, হে ধনুর্ধর, তুমি যুদ্ধ করো!’ এই বলিয়া মহাপ্রবীণ অঙ্গদের মুখপানে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন।

আর তিনি লক্ষ করতে লাগলেন তার ভাবান্তর। তার মুখচ্ছবি একটু একটু করে কীভাবে পালটে যেতে লাগল। যে-মুখ দন্ডকাল পূর্বে বিমর্ষ ও বিবর্ণ দেখাচ্ছিল, এখন সেই মুখে কিঞ্চিত প্রাণসঞ্চারের আভাস দেখতে পাওয়া গেল। যে-যুগলনেত্র মৃত গৃহগোধিকার চক্ষুর ন্যায় অসার ও ঘোলাটে হয়ে পড়েছিল, তাও আভাপ্রাপ্ত হতে লাগল।

খুশি হলেন মহাপ্রবীণ। এই সকল লক্ষণকে অঙ্গদের যুদ্ধমনস্কতার অভিব্যক্তি মনে করে তার মধ্যে জ্ঞানের ম্রিয়মাণ দীপশলাকাটিকে পুনঃপুনঃ দীপ্তিময় করতে লাগলেন। আর এই সময় তাঁকে শুনিয়ে বলে যেতে লাগলেন একটির পর একটি অশ্রুতপূর্ব শ্লোক :

বাসাংসি জীর্ণানি জথা বিহায়

নবানি গৃহ্নাতি নরোহপরানি।

তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণা

ন্যন্যানি সংয়াতি নবানি দেহী...

অঙ্গদ বিমোহিত। সে বৃক্ষমূল থেকে ধীরে ধীরে গাত্রোত্থান করে। সকৌতূহল হয় মহাপ্রবীণের মুখ থেকে তার শ্লোকগুলির মর্মার্থ শোনার জন্য।

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে বিক্রমশালী! নর যেমন জীর্ণ পরিধেয় ত্যাগ করিয়া নববস্ত্র গ্রহণ করে, তেমতি আত্মাও জীবের মৃত্যুর পর নবদেহ ধারণ করে। এই আত্মাকে কোনো অস্ত্র ছিন্ন বা কর্তন করিতে পারে না, অগ্নি ইহাকে দগ্ধ করিতে পারে না, বারি ইহাকে ক্লিন্ন করিতে পারে না, এবং বায়ু ইহাকে শুষ্ক করিতে পারে না। ইনি অদাহ্য, ইনি অক্লেদ্য তথা অশোষ্য। ইনি নিত্য, সর্বব্যাপী, স্থির, অচল ও চিরন্তন। ইনি অব্যক্ত, ইনি অচিন্ত্য ও ইনি অবিকার্ষ— এইরূপ উক্ত আছে। অতএব ইহার জন্য তোমার কিসের শোক? আবার যদি ইহাকে নিত্য জন্মশীল ও নিত্য মরণশীল বলিয়া ভাব, তাহা হইলেও ইহার তরে তোমার শোক করা উচিত নহে। মনে রাখিও, যে জন্মিয়াছে সে মরিবেই, এবং যাহার মৃত্যু হইয়াছে তাহার পুনর্জন্ম হইবেই। এই নিত্য তথা অনিবার্য বিষয়ে কিসের শোক? কিসের বিলাপ? যুদ্ধহত্যা পাপ নহে, ইহা শোকেরও কারণ নহে। হে নিদ্রাজয়ী, তুমি শোকাচ্ছন্ন হইও না। যুদ্ধে অবতীর্ণ হও।’ এই বলিয়া মহাপ্রবীণ অঙ্গদের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া তাহার ভাবগতিক লক্ষ করিতে লাগিলেন।

অঙ্গদ নিরুত্তর। তাকে ঈষৎ চিন্তাক্রান্ত দেখায়।

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে পরিব্রাজক! জীবসকল আদিতে অজ্ঞাত, মধ্যে ব্যক্ত, নিধনে আবার অজ্ঞাত হইয়া যায়। উপরন্তু, নিধনে দৃশ্যত দেহের নিধন হইলেও অদৃশ্য আত্মা পূর্বাপর অভিন্ন থাকিয়া যায়।

জীবদেহে আত্মা অবধ্য। হে বীর! যাহা অবধ্য যুদ্ধে তাহার নিধন হইবে কল্পনা করিয়া অহেতুক শোকাচ্ছন্ন হইয়া যুদ্ধ পরিহার করিতেছ কেন? তুমি যুদ্ধে ব্রতী হও।

‘মনে রাখিও, যুদ্ধ প্রবৃত্তিগত নহে। ইহা প্রাকৃতিক। যুদ্ধ ধর্মসমর্থিত। ইহা ধর্মসংগ্রাম। তুমি যুদ্ধ করিলে তোমার জন্য স্বর্গের দ্বার উন্মুক্ত হইয়া যাইবে, আর যুদ্ধ পরিহার করিলে তুমি অকীর্তি ও পাপের ভাগীদার হইবে। ধর্মভ্রষ্ট, কাপুরুষ, দুর্বল ও ভীরু বলিয়া লোকসমাজে নিন্দিত হইবে। হে ধনুর্ধর! তোমা হেন বীর, জ্ঞানী ও সন্মানিত ব্যক্তির নিন্দা মৃত্যুসম, কলঙ্কসম। ইহা অপেক্ষা দুঃখতর আর কী আছে? যুদ্ধক্ষেত্রে হত হইলে স্বর্গলাভ হইবে, বিজয়ী হইলে তোমার কাঙ্খিত সম্পদ পাইবে, অধিকন্তু মাঠারিভূমি, গবাদি, যুদ্ধে মৃত অথবা আসন্ন বিপদে জনপদ হইতে পলাতক গ্রামবাসীদের পরিত্যক্ত সম্পদ তথা যুদ্ধের কাজে নির্মিত এই সকল বহুশত গো-যান আদি সম্পদ পাইবে। হে বীর, অন্যথা করিও না। যুদ্ধে মগ্ন হও। জয়-পরাজয়, লাভ-অলাভ, কী সুখ কী দুঃখ সকলই সমান— এইরূপ জ্ঞান করিয়া যুদ্ধ করিলে পাপস্পর্শিত হইবে না। তুমি কৃতনিশ্চয় হইয়া রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হও!’

অঙ্গদ বলিল, ‘হে মহাপ্রবীণ! সম্পদে আমার ভোগ-লালসা বৃদ্ধি পাইবে। মন লুন্ঠনপ্রবণ হইবে। যুদ্ধে যদি আমার জয়ও হয়, তৎসসত্ত্বেও এই জয়ের দ্বারা অর্জিত উক্ত সম্পদ সমূহ— শস্য, নারী, গবাদি, ভূমি, তৈজসপত্রাদি, শকটাদি সকলই রক্তাক্ত হইবে। রক্তাক্ত ভোগ্য সম্পদ আমার দৈনন্দিন শোকের কারণ হইবে। আমি উহা ভোগ করিব না। যুদ্ধেও আমার প্রবৃত্তি নাই। আমার অন্ধত্ব ঘুচিয়া গিয়াছে। যুদ্ধ যে ব্যাপক ধবংস ডাকিয়া আনিবে, জীবলোকে যে হাহাকার উঠিবে, শত-শত গ্রামে যে ক্রন্দনরোল ধ্বনিত হইবে, বিস্তৃত প্রান্তর ব্যাপিয়া যে শোক ও দুর্ভিক্ষের বাতাবরণ সৃষ্টি হইবে উহাতে আমার হৃদয় ব্যথিত ও মন ব্যাকুলিত হইয়া পড়িবে। যুদ্ধ আমি করিব না।’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে প্রিয় অঙ্গদ! যুদ্ধের পরিণতিজনিত ভয় এবং শোক হইতে নিজেকে সুরক্ষিত রাখিতেই তুমি নিষ্কর্মের পথ অবলম্বন করিতেছ। ইহা শ্রেয় নহে। কর্ম না করিলে জগৎ-সংসার অচল ও বন্ধ্যা হইয়া যাইবে। কর্ম না করিলে উহার বন্ধন হইতে মুক্তিলাভ কদাচ সম্ভব। কিন্তু কর্ম করিতে হইলে মনকে নিষ্কাম তথা কর্মফলের প্রতি আসক্তিহীন করিতে হইবে, তবেই তুমি এই শোক ও ভয় হইতে উত্তীর্ণ হইবে। মনে রাখিবে, তোমার কর্মের কারণে যাহা-যাহা ঘটিবে তাহাতে তোমার অধিকারও নাই— কর্মেই তোমার অধিকার। তাহাতেই তুমি অটল থাকিবে...

‘হে বীর! তুমি নিরাসক্ত হইয়া তোমার কর্ম সম্পাদন করো। তুমি কার্যসিদ্ধি এবং অসিদ্ধিতে সমভাবাপন্ন থাকিয়া যোগস্থ হইয়া সকল কর্ম করো। তোমার প্রারব্ধ কর্ম সম্পূর্ণ হইল কি হইল না ইহাতে চিন্তিত হইয়া পড়িও না, ফলের কথাও চিন্তা করিও না। মনকে এইভাবে প্রস্তুত করাই হইল সমত্বরূপ যোগ। এই যোগ হইল কর্মের কৌশল এবং কর্মবন্ধন হইতে মুক্তির উপায়। ইহলোকে তিনিই মহৎ যিনি এই যোগকে অবলস্থন করিয়া কর্ম করিয়া চলেন এবং নিজেকে পাপী বা পুণ্যবান কিছুই মনে করেন না। এই উপলব্ধিই হইল মোহমুক্তি— মন হইতে কামনা-বাসনা ত্যাগ করিয়া স্থিতপ্রাজ্ঞ হওয়া। হে যোদ্ধা, স্থিতপ্রাজ্ঞ হও এবং যুদ্ধার্থ পর্জন্য গান্ডীব ভূমিতল হইতে তুলিয়া লও।’

অঙ্গদ বলিল, ‘হে মহাপ্রবীণ! স্থিতপ্রাজ্ঞ বিষয়ে অধিক কিছু শুনিতে আগ্রহ বোধ করিতেছি। নিবেদন করুন।’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অঙ্গদ! যখন তুমি সর্বপ্রকার মনোগত বাসনা পরিহার করিয়া তোমাতেই তুমি তুষ্ট থাকিবে, কখনোই অপরাপর বিষয়-ভাবনা দ্বারা চঞ্চল ও উদবেলিত হইবে না, তখনই তুমি স্থিতপ্রাজ্ঞ হইবে। দুঃখে অনুদবিগ্নমনা, সুখে বিগতস্পৃহ, অনুরাগ-ভয়-ক্রোধ-বিরহিত সাধকই স্থিতপ্রাজ্ঞ। কূর্ম যে-রূপ প্রতিকূল বুঝিয়া আপন অঙ্গসমূহ তাহার শক্তখোলের ভিতর ঢুকাইয়া লয়, তেমনি যিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়সমূহ হইতে তাঁর ইন্দ্রিয়দের সুরক্ষিত রাখেন, তিনিই স্থিতপ্রাজ্ঞ। ইহা সদা স্মরণে রাখিবে যে, আসক্তিই হইল ইহার নিয়ন্তা। আসক্তি সর্বতোভাবে দূর না হইলে চিত্ত আলোড়নকারী ইন্দ্রিয়সকলের প্রতি যত্নপরায়ণ পন্ডিত পুরুষের মনও ইন্দ্রিয়গণ সবলে হরণ করে। তাহাদের সকলকে সংযত করিয়া যোগযুক্ত হইয়া থাকিতে হইবে। বিষয়সমূহের চিন্তা করিতে করিতে কি পুরুষ, কি নারী—সকলের তাহাতে আসক্তি উৎপন্ন হয়। আসক্তি হইতে কামনা, কামনা পূরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হইলে ক্রোধ উৎপন্ন হয়। অতঃপর ক্রোধ হইতে সন্মোহ বা ভ্রান্ত ধারণা হয়, সন্মোহ হইতে স্মৃতিবিভ্রম, স্মৃতিবিভ্রম হইতে বুদ্ধিনাশ আর বুদ্ধিনাশ হইলে মানুষ বিনষ্ট হয়।’

২২

ইত্যবসরে পুবের দিগন্তে আলোর উদ্ভাসন নিয়ে দিনের প্রথম সূর্য ওঠার অপেক্ষায়। ধুনুরিকে ঘিরে উড়তে থাকা রুইয়ের মতো ঘোলাটে আকাশ। বায়ুমন্ডলে কুয়াশা ফাঁদিজালের মতো ঝুপঝুপ করছে । কিন্তু তবু এই অস্বচ্ছ প্রাভাতিক আলোতেও বোঝা যায় কীভাবে সংগ্রামের জন্য সেজে উঠেছে মাঠারি, যার কিছুই রাতের অন্ধকারে তেমন টের পাওয়া যায়নি। এখন আয়োজনের বিস্তার দেখে আরো বেশি করে মনে হয়—জীবনকে ধরাশায়ী করতে কী আশ্চর্য ও আদিম রণশৃঙ্খলা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগে সাজিয়ে তোলা হয়েছে এই যুদ্ধভূমিকে।

সাজানো হয়েছে রণক্ষেত্রে ইতিমধ্যে অবতীর্ণ হওয়া ছইবিহীন শত-শত গো-শকট। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে যোদ্ধাদের নিয়ে ঠায় পঙক্তিবদ্ধ দাঁড়িয়ে রয়েছে তারা। উত্তর-দক্ষিণে বহুদূর অব্দি চলে গেছে সেই সারি। রাতের ক্লান্তি নিয়ে জোয়াল কাঁধে উদাসীন গাভীরা জাবর কাটছে। আপন মনে। প্রতিটি শকটের পিছনে উড়ছে লম্বা বাঁশের শীর্ষে বাঁধা লাল ধ্বজা, যা পূর্বদেশীদেরই প্রতীক, আর পশ্চিমাদের শকটগুলিতে উড়ছে গেরুয়া কেতন। বিভিন্ন টিলার মাথায় ঢাক-ঢোল-ধামসা নিয়ে অপেক্ষারত বায়েনের দল, যারা বাজনা বাজিয়ে প্রবল হৈ-হুল্লোড় করে নাগাড়ে উৎসাহিত করতে থাকবে তাদের যোদ্ধাদের। তবে পশ্চিমারা তাদের যোদ্ধৃবর্গকে ঢোল-ধামসার নারকীয় শব্দে উৎসাহিত করছে না, তারা টিলার ওপর থেকে বাজিয়ে যাবে কেবল অগণিত ভেরি। ভেরির এই ঐকতানে তারা যোদ্ধাদের বলতে থাকবে, ‘অশুভ শক্তিকে ধ্বংস কর! রাহুমুক্ত করো জীবন! প্রতিপক্ষ যতই বীরবাহু হোক না কেন, প্রত্যয় রাখো—তোমার শরাঘাতে তার প্রাণ ধরাশায়ী হবেই!’

এখনো অব্দি কোনো রণবাদ্যের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে না। যোদ্ধাদের মতো বাদ্যকররাও বিস্ময় নিয়ে প্রতীক্ষায় সেই মাহেন্দ্রক্ষণটির। তারা চেয়ে আছে রতিগড় টিলার দিকে—কখন সূর্যের প্রথম ছটায় ঝলমল করে ওঠে তার শৃঙ্গটি আর তৎক্ষণাৎ পরিমন্ডল জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয় মহাদুন্দুভির ধ্বনি। সারা মাঠারিক্ষেত্র জুড়ে বিরাজ করছে আশ্চর্য এক সরব নীরবতা। পৃথিবীতে কখনো, কোনো যুগেই যেন এমন অভিশপ্ত ধ্বংসগর্ভ নীরবতার সূচনা না হয়। বিনাশের অভিপ্রায় নিয়ে মানুষ যেন কখনোই কাল গণনা না করে।

শত-শত ধ্বজা, যোদ্ধা ও গাড়োয়ানদের নিয়ে মাঠারিক্ষেত্র উদবেগের প্রহর গুনছে। স্থির হয়ে রয়েছে দু-পক্ষের হাজার হাজার শকট। কান ঝাপটাচ্ছে গাভী। সংগ্রামের জন্য সকলেই প্রস্তুত। কিন্তু যতক্ষণ না হুকুমদারদের ঘোষণাকে অনুসরণ করে বেজে উঠছে যুদ্ধ শুরুর দুন্দুভি, ততক্ষণ কোনো পক্ষের কোনো যোদ্ধাই একটি তিরও নিক্ষেপ করবে না শত্রুকে লক্ষ্য করে। এখন তাই সকলে সেই রণধ্বনি শোনার অপেক্ষায়।

বাতাসে উড়ছে তাদের রঙিন ধ্বজাগুলি। কী অপূর্ব তার শোভা! কী দৃষ্টিনন্দন। কত-কত মানুষ, কত বাহন, কত জীব! অখন্ড ভূপষ্ঠব্যাপী এই সাড়ম্বর আয়োজন সসত্ত্বেও কোথাও কোনো কোলাহল নেই। যুদ্ধের ক্ষণ প্রায় সন্নিকটে। সকলের মুখে-চোখে শুধুই উদবেগ। সেই উদবেগ নিয়ে তারা একদিকে যেমন দুন্দুভির ধ্বনি শোনার জন্য অপেক্ষমাণ, অন্যদিকে প্রবল কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে রতিগড় টিলার শৃঙ্গের অভিমুখে, যেখানে দিবসের প্রথম সূর্যালোক প্রতিভাত হবে।

ইতিমধ্যে মহাপ্রবীণ তার শকট মন্থর গতিতে চালিয়ে অঙ্গদকে নিয়ে আসেন রণাঙ্গনে। যুদ্ধস্থলের একেবারে মাঝে তাঁর শকট দাঁড় করিয়ে দিয়ে, তিনি গাড়োয়ানের আসনে অধিরূঢ় থেকে, তাঁর হাতের চাবুকটি চারপাশে ঘুরিয়ে বলতে থাকেন, ‘হে তেজস্বান! তুমি প্রত্যক্ষ করো এই পবিত্র যুদ্ধভূমি মাঠারিকে। আর এক্ষণে তোমার মহান কর্তব্য স্মরণপূর্বক তাহাতে প্রণত হও, অতঃপর অস্ত্র ধরো।’

অঙ্গদ চিন্তিত মুখে মহাপ্রবীণের পানে চেয়ে থেকে বলে ওঠে, ‘হে মহাপ্রবীণ! কীহেতু এই যুদ্ধক্ষেত্রে দন্ডায়মান হইয়া আমি আমার অধীতবিদ্যাকে বিস্মৃত হইতেছি? আমি এই দন্ডে পুনর্বার শুনিতে চাহি এক্ষণে কাহাকে আপনি মহান কর্তব্য বলিয়া আখ্যায়িত করিতেছেন?’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে জ্ঞানপিপাসু, এই মুহূর্তে যাহাকে আমি পবিত্র কর্তব্য বলিয়া আখ্যায়িত করিতেছি তাহা তোমার বোধগম্য হওয়া অত্যাবশ্যক। রাত্রিকালীন সজ্জায় ভার্যার সহিত সহাবস্থানকালে ভার্যাকে সৃজনাত্মক প্রেমনিবেদন যেমন পুরুষের এক পবিত্র ধর্ম ও কর্তব্য, বার্ধক্যকালে মাতাপিতাকে সন্তানের পরিচর্যা প্রদান যেমন আরেক পবিত্র ধর্ম ও কর্তব্য, তেমতি রণাঙ্গনে উপস্থিত যোদ্ধার পবিত্র কর্তব্য হইল অস্ত্রহাতে শত্রুনিধনের তরে নিজেকে প্রস্তুত করত যুদ্ধের সূচনা করা। হে অরিন্দম! আত্মাকে জাগ্রত করো, প্রণত হও, অস্ত্র ধরো! যুদ্ধের ক্ষণ বহিয়া যাইতেছে।’

এমন নির্দেশ শোনার পরেও অঙ্গদের অস্থিরচিত্ততার নিরসন হয় না। পরন্তু, তা উত্তরোত্তর তার মনকেই শুধু না, শরীরকেও বিকল করে দিতে থাকে। তার মাথার মধ্যে বহু ভাবনা, বহু জিজ্ঞাসা ভিড় করে আসে, অস্ত্র ধরা বা না-ধরার আগে সেই সব প্রশ্নের সে যেমন যথাযথ জবাব পেতে চায়, তেমনি তার নিজের অস্পষ্ট ভাবনাগুলিকেও অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ও সংশয়হীন করে তুলতে প্রয়াসী।

মহাপ্রবীণের আদেশ মান্য করার আগে, অথবা তাঁর কথার জবাব দেওয়ার আগে গো-শকটে দাঁড়িয়ে থেকে সে বিরস বদনে ও উদাস দৃষ্টিতে আরো একবার মাঠারিক্ষেত্রকে অবলোকন করতে থাকে। ঝিরি-ঝিরি বাতাসে উড়তে থাকে তার জট-পড়া চুল। শুষ্ক মুখমন্ডল, ততোধিক শুষ্ক ওষ্ঠযুগল। এতদিন সে কখনো আবেগে-উত্তেজনায়, কখনো-বা যুক্তি-বুদ্ধি-মেধা দিয়ে তার লক্ষ্য ও কর্তব্যকে সদাচারী বিশ্লেষণ করে গ্রামে গ্রামে গণ-উত্থানের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, যুদ্ধের রব তুলে এসেছে। বলেছে, যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আজ যখন বহু কাল, বহু বর্ষ অতিক্রান্ত হওয়ার পর, প্রকৃত সেই যুদ্ধের আয়োজন পরিপূর্ণ হল, যখন দু-পক্ষের মানুষই চূড়ান্ত ক্ষণে এসে এই বিশাল রণকান্ডের সূচনার অপেক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে পল-অনুপল গণনা করছে, তাকিয়ে রয়েছে রতিগড়ের দিকে প্রথম সূর্যালোক দর্শনের অভিপ্রায় নিয়ে, তখন তার আবেগ ও ভাবালুতা চকিতে কোথায় অন্তর্হিত হয়ে গেল! বাস্তবভূমিতে দাঁড়িয়ে তার মনে হল যুদ্ধ এক ভয়াবহ দানব। ভয়াবহ এই কারণে যে, তা কালান্তরে, যুগে-যুগে, চিরকাল দাঁড়িয়ে থাকে হত্যার ওপরে, হত্যার রাজনীতির ওপরে।

অঙ্গদ কি তবে শত্রুহত্যাকেই ভয় পাচ্ছে, নাকি বাস্তবের কঠোরতাকে? তার নিজের ভেতরে কি হত্যাবিমুখতার লক্ষণ ক্রমশ প্রকটিত হচ্ছে, নাকি তার এই বিকলনের পিছনে আরো অন্য কোনো কারণ সে অনুভব করছে? তার ভেতর থেকে কি জেগে উঠতে চাইছে স্বতন্ত্র এক মানব যে-মানব তার নিজস্ব দর্শন ও সমজভাবনায় বিকশিত হতে চায় আর মহাপ্রবীণের কঠিন ও অকাট্য যুক্তিরও উর্ধ্বে উঠে দেখতে চায় এই মানবসংসারকে? এখন কেন এই যুদ্ধ-পরাঙ্মুখ চিন্তা? এই চিন্তা কি কোনোভাবে তার অন্তরে সুপ্ত অহংবোধের জাগরণ? মানব মনে অহংবোধের কি তবে বিনাশ সম্ভব নয়? তা যদি না হয়, তাহলে মানুষের জীবনে দুঃখ-দুর্গতিরও তো শেষ নেই। মহাপ্রবীণ তো বলেইছিলেন— ‘মানব-মুকুটের ধূল্যবলুন্ঠিত হওয়ার অন্যতম কারণ তার অহং।’

না, অঙ্গদের মনে হয় না তার এই নব্যচেতনার উত্থানের মধ্যে কোনো অহংভাবের জন্ম হয়েছে বলে। এই কঠোর বাস্তবভূমিই—জীবনের ওপরে যেখানে মৃত্যু আরোপিত হতে চলেছে—তাকে আলোড়িত করে তুলল নানান ভাবনার ভেতর দিয়ে। সংখ্যাতীত প্রশ্নবাণে উৎকীর্ণ এই মহাত্মার মনে হয়, এই এত-এত নিরীহ মানুষকে হত্যা করার জন্যই কি মহাপ্রবীণ তাকে প্ররোচিত করছেন? এই গণহত্যার ভেতর দিয়ে কোন সত্যে উপনীত হওয়া যায়? জীবন যদি রক্ষিত না হয়, জীবনের যেখানে সম্মিলিত বিনাশ ঘটছে, সেখানে আর জীবনকে নিয়ে সত্যের মূল্য কতটুকু? আদৌ কি তার কোনো মূল্য তখন থাকে?

ইতিপূর্বে সে কখনো, মহাপ্রবীণের কোনো কথার পরিপ্রেক্ষিতে ‘প্ররোচনা’ শব্দটি উচ্চারণ করা তো দূরের কথা, ভাবনাতেও আনেনি। কখনোই না। কিন্তু এখন এই একটিমাত্র শব্দ, অনুচ্চারিত থেকেও, মহাপ্রবীণের ভাবনা ও দর্শনের প্রতি তাকে কিঞ্চিত সন্দিগ্ধ করে তুলল। অথবা বলা যেতে পারে, নি:সংশয়তার ব্যাপারে তাকে আরো বেশি সক্রিয়, আরো বেশি অনড় করে তুলল। সে নিজেকে নিজেই বোঝাতে চায় যে, কোনো প্ররোচনার বশবর্তী হয়ে, অথবা কর্ম সম্পাদনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সম্পূর্ণ যুক্তিনির্ভর ও দৃঢ়নিশ্চয় না হয়ে জীবহত্যার তরে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া চরম ও গর্হিত অপরাধ। এই অপরাধ সংঘটিত করার আগে তার সপক্ষের যুক্তিগুলিকে সে আগে যাচাই করে নিতে চায়।

অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি কেমন করিয়া অস্ত্রকে হস্তগত করিব? আমার উভয় হস্তের প্রবল কম্পমান দশা আমি উপলব্ধি করিতেছি। এমতাবস্থায় ধনুর্বাণ গ্রহণ করত বাণ নিক্ষেপ করিলে তাহা কখনোই লক্ষ্যকে অব্যর্থরূপে ভেদ করিতে সমর্থ হইবে না। হে বেদবিজ্ঞ! এক্ষণে আমাকে বলুন, কীহেতু আমার এতাদৃক দশার উপক্রম হইল?’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে তেজস্পতি! ইহা সদা স্মরণে রাখিও যে, সংশয়াচ্ছন্ন মন কদাপিও অস্ত্রধারণের অনুকূল হইতে পারে না।’

অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আপনার মুখনি:সৃত বাণী শুনিয়া আমি যারপর নাই তৃপ্ত বোধ করিতেছি। আমি সত্যই নিজেকে সংশয়াচ্ছন্ন বোধ করিতেছি। এক্ষণে আমার মন সাতিশয় ব্যাকুল হইয়া উঠিতেছে ইহা জানিবার তরে যে, মনুষ্য-মনে সংশয়ের উৎপত্তির হেতু কী? কী উপায়ে তাহাকে দূরীভূত করা সম্ভব?’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অঙ্গদ! এক্ষণে আমি মানবমনে সংশয়ের উৎপত্তির কারণ বিবৃত করিতেছি। নিষ্ঠা ও একাগ্রতা সহকারে তাহা শ্রবণ করো। সংশয়ের মূল কারণ হইল দ্বিধা ও অস্থিরচিত্ততা। দ্বিধার বশবর্তী হইয়া চিত্ত তখনই অস্থির হইয়া ওঠে, যখন ভবিষ্যৎ শঙ্কার দ্বারা তাহা আকুল হইয়া পড়ে। আর শঙ্কা সর্বদাই অমূলক, যদি মানবমনে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার বলভূমি হইতে তাহা জাগ্রত হয়। হে ধানুষ্ক! আমি জানি, তুমি আজ অতীব প্রজ্ঞাবান এবং তৎসহ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। সুতরাং শঙ্কাকে জয় করো, অতঃপর বজ্রমুষ্টিতে অস্ত্র ধারণ করো। শত্রু হত্যার নিমিত্ত মনকে সবল ও আবেগহীন করো। যুদ্ধের ক্ষণ বহিয়া যাইতেছে।’

কিন্তু তারপরেও অঙ্গদের মধ্যে কোনো বিকার লক্ষ করা গেল না। না সে তার মুষ্টির বজ্রকঠিনতা অনুভব করল, না তার মনের সবলতাহেতু নিজেকে আবেগহীন করে তুলতে পারল। পক্ষান্তরে, তার মনে হল, অবদমিত আবেগ তাকে যেন শরৎকালীন মেঘের ন্যায় অতি দ্রুত আচ্ছন্ন করে তুলছে। আর হঠাৎ করে, তার এটাও মনে হল, মানবজীবন থেকে আবেগকে কখনোই দূরীভূত করা যায় না। জীবন থেকেই তো জন্ম আবেগের। যেখানে আবেগ নেই, সেখানে সহানুভূতি নেই, প্রেম নেই, জীবন নেই। তাহলে কেন মহাপ্রবীণ তাকে কঠোর ও আবেগহীন হতে বলছেন? তা কি এই অভিপ্রায়ে যে, অঙ্গদ যাতে বিরোধী পক্ষের শতশত গো-শকটে অবস্থানরত মনুষ্যসকলকে শুধু হননযোগ্য জীব বলে গণ্য করে? কিন্তু কেন? তার ভেতরে সে-বোধ জেগে উঠছে কই? তাহলে তো এটাও মেনে নিতে হয়— যুদ্ধভূমি বধ্যভূমি বৈ কিছু নয়। হত্যাধর্ম ছাড়া এখানে ভিন্ন জীবনধর্ম নেই। তাই যদি হয়, তবে যুদ্ধের প্রয়োজন কী? কিসের জন্য শতশত গ্রামবাসীদের নি:স্ব-উজাড় করে দিয়ে হানাহানি-কাটাকাটির এই বহুবর্ষ ব্যাপি মহতী আয়োজন?

অঙ্গদ ভাবতে থাকে। আর ভাবতে ভাবতে সে নিজেকে প্রশ্ন করে বসে। সে জানতে চায়, ‘বলো, আমি কে? আমি কেন? কী করতে চলেছি আমি? যুদ্ধ? কেন, কেন রে যুদ্ধ? কেন যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই? কেন সহস্র-সহস্র বছর পরেও আদিম সমাজের ভাবনাগুলি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি না?’

সে হাতের তালুতে মস্তক অবনত রেখে নিজের শোকাকুল চিত্তকে যেন দু-দন্ড শোক করার অবসর দেয়। অতঃপর দু-পাশে আলতো করে মাথা বাঁকিয়ে আবার নিজের ভেতরে নিজে সরব হয়ে ওঠে। বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! অন্ধকারের শেষ কোথায়? বলুন! অস্ত্র চালনা করে কি মীন ও বরাহের ন্যায় অন্ধকারকে বিখন্ডিত করা যায়?’ অনুচ্চারিত প্রশ্নের বাতাবরণে সে হারিয়ে ফেলে নিজেকে। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। আর তখন সে যা দেখে তা সে দেখেও দেখে না। কিন্তু মনে হয় সারা-কে-সারা যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে ভেরি-দুন্দুভি-ঢাক-ঢামসার প্রাণঘাতী নিনাদে তার কর্ণপটহ বুঝি চৌচির হয়ে যাচ্ছে! এই অস্থিরতার ভেতরেও সে আবার বিড়বিড় করে, ‘হে মহাপ্রবীণ! মীন ও বরাহাদির ন্যায়...’ বলতে বলতে গো-শকটের ওপরে আচমকা ঢলে পড়ে। তার বাহ্যজ্ঞান লোপ পায়। দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা হুকুমদাররা বিচলিত হয়। কিন্তু মহাপ্রবীণের শকট-সমীপে আসতে সাহস পায় না তারা।

ঘটনার এই আকস্মিকতায় মহাগুঞ্জন ওঠে যোদ্ধাদের মধ্যেও। দূরের টিলা-পাহাড়গুলির ওপরেও উভয় পক্ষের যুদ্ধসমর্থকের দল কৌতূহলী হয়ে পড়ে। শিঙাদাররাও স্তম্ভিত ও নির্বাক।

মহাপ্রবীণের মধ্যে কোনো ভাবান্তর প্রতিফলিত হয় না। কোনো বিচলন নেই। তিনি স্বস্থানে অটল থেকে বলেন, ‘হে উদবিগ্নপ্রাণ! আত্মাকে শীতল করো! মনকে সময় দাও! আত্মক্লেশের ভিতর দিয়া কোনো জাগতিক পরিবর্তন আনা যায় না। আত্মাকে সংবেদী ও সহনশীল করো। নব্যদৃষ্টিতে দেখো জগৎ।’

পরক্ষণে সে যখন তার হুঁশ ফিরে পায়, তখন আশ্চর্য বিপরীত একটি ভাবনা অঙ্গদের মাথায় আসে। সে নিদ্রোত্থিতের ন্যায় অখন্ড মাঠারিক্ষেত্রে মন্থরগতিতে তার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে ভাবে, সত্য প্রতিষ্ঠার নামে ধরাতল কখনো হত্যালীলার ক্ষেত্র হতে পারে না। একমাত্র প্রেমের দ্বারাই জীবনে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, সত্যে জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সব মানুষেরা তার বিরুদ্ধে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরলেও, তারা কেউই তার শত্রু নয়। হত্যারও যোগ্য নয়। সে কেমন করে তাদের নির্বিচারে বধ করবে?

অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমাকে মার্জনা করুন! ভ্রাতৃহন্তা হওয়া তো অতি দূর কল্পনা, এই মাঠারিক্ষেত্রে হাজির আমার স্বজনদের একটিকেও আমি বধ করিতে অপারগ। কেন-কি, ইহারা কেহই আমার বৈরী নহে। ইহাদের আচরণে, কর্মপদ্ধতিতে এ-যাবৎ যাহাকিছু শত্রুভাবাপন্ন বলিয়া বোধ হইয়াছে, তাহার জন্য ইহারা দায়ী নহে। তাহা নিছকই ইহাদের বোধহীনতার কারণে এবং ঘটনাচক্রে সংঘটিত হইয়াছে। আমি মনে করি অবোধ জীবের অপরাধ শতকোটিবার ক্ষমার্হ! যুদ্ধ ক্ষমা নহে, তাহা ততোধিক বৃহৎ অপরাধ। হে তমোহর! আমাকে এই অপরাধক্ষেত্র হইতে ত্বরায় উদ্ধার করুন, আমাকে জনপদে লইয়া চলুন, আমি এই সমুদায় শত্রু ও অপরাধীদের বক্ষোপরি আমার শীতল করতল রাখিয়া ক্ষমা ও প্রেমের বাণী উচ্চারিতে চাই। যে-পাটনকে আমি মুহুর্মূহ পাষন্ড, কামুক, দুর্মুখ আদি বলিয়া সম্বোধন করিয়াছি, এবে তারে আমি শুধু ভ্রাতা বলিয়া ডাকিয়া আলিঙ্গনবদ্ধ করিতে চাই। আপনি অনতিবিলম্বে হুকুমদারদের যুদ্ধ মুলতুবী রাখিতে আদেশ দিন। আমাকে তথায় লইয়া চলুন। মৈত্রীর তরে আমি বিরোধী শিবিরে গমনে উদ্যত।’

মহাপ্রবীণ হতবাক! এমন আশ্চর্য বাণী তিনি তাঁর সর্বাধিক প্রিয় ভাবশিষ্যের মুখ থেকে কোনোদিনই শোনেননি। এমন উদার, অখন্ডমনস্ক তথা জ্ঞানদীপ্তিসংবলিত উচ্চারণ! এই উচ্চারণ, বলাই বাহুল্য, তাঁর মনে যার পর নাই সন্তোষ প্রদান করল বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে মনে হল অঙ্গদের এই যুদ্ধবিমুখতা তাঁর সর্বাঙ্গীন উদ্দেশ্যকেই না বাঞ্চাল করে দেয়। তিনি কিছুটা বিচলিত বোধ করেন। যদিও প্রকটিত হয় না। তিনি তাকে তসত্ত্বের কথা বলেন, আদর্শের কথা বলেন। তিনি আবারো বলেন, যুদ্ধকে অস্বীকার করার অর্থ মীমাংসাকে অস্বীকার করা। মীমাংসাকে অস্বীকার করার অর্থ সত্যকে অস্বীকার করা। সত্যকে অস্বীকার করার অর্থ কাপুরুষোচিত মৃত্যু।

মৃত্যু! মৃত্যু!

কিন্তু মহাপ্রবীণের কন্ঠে উচ্চারিত মৃত্যুভয়ও অঙ্গদকে কাতর করতে পারে না। তার অভিজ্ঞান তাকে এতোটাই মানসিক দৃঢ়তা প্রদান করে। মহাপ্রবীণের থেকে বিমুখ হয়ে সে স্থির তাকিয়ে থাকে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। অপেক্ষমাণ মানুষগুলির মুখের দিকে। কত বিচিত্র অস্ত্রে তারা সজ্জিত। কী বিভীষণ তাদের বীরোচিত অভিব্যক্তি! শকটগুলিতে একই ছন্দে উড়ছে যত পতাকা। শন-শন বেগে বইছে প্রভাতী বাতাস।

মহাপ্রবীণ গাড়োয়ানের আসনে বসে থেকেই, অঙ্গদের দিকে সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চান চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে কেন তার এই বিভ্রম হল? যুদ্ধভূমিতে দাঁড়িয়ে অঙ্গদ কোথায় কী দেখছে? এখানে তো কেউ তার ভ্রাতা নয়, স্বজনও নয়। তাহলে সে কেন এমন বিরূপ সিদ্ধান্তের কথা উচ্চারণ করে?

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে প্রিয়ংবদ! মনবৈকল্যহেতু অসত্যকে তোমার সত্য বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। যেমন সর্পকে রজ্জু ও ধূম্রকে কুটিকা বলিয়া প্রতীয়মান হয়। রণাঙ্গনের অভিমুখে বারেক নির্মোহ দৃষ্টি নিক্ষেপ করো। দেখো সকলেই যুদ্ধ শুরুর অপেক্ষায় রহিয়াছে। দেখো প্রত্যেকের হস্তে শোভা পাইতেছে অস্ত্রশস্ত্র। ঢাল-তরবারি-গদা-ধনু প্রমুখ। এই সকল অস্ত্রধারীকেই কি তুমি স্বজন বলিতেছ? যুদ্ধভূমিতে বিরোধীপক্ষের কেহই কখনো স্বজন হয় না, যুদ্ধক্ষেত্র সর্বকালে সর্বদাই বধ্যভূমি। তুমি অবিচলচিত্তে ইহাদের হনন করো। যুদ্ধের ক্ষণ বহিয়া যাইতেছে।’

রতিগড় টিলার ওপর থেকে, শবরশিশুর গলায় ঝোলানো ঢুলুকটির তালে, নেচে নেচে উঠতে লাগল সূর্য! আকাশ রক্তিম। দেখে মনে হয় পাষন্ড পাটনের পায়ে লেগে গরামথানে উলটে গেছে জিনগা-মাঈয়ের সিঁদুর-চন্দনের থাল! এমন বর্ণোজ্জ্বল প্রভাত বহুদিন দেখেনি মাঠারি। দেখেনি এমন সাজসজ্জাও। টুসু পরবের চৌডলের মতো ঝলমল করছে চতুর্দিকে। শুধু রং আর রং! মেঘহীন আসমান। অপ্রহত বাতাস বইছে ঢুলু-ঢুলু। শিশিরসিক্ত মাটিতে সোঁদা গন্ধ নেই। এখন থেকেই দমকা হাওয়ায় মিহি মিহি লালধুলো উড়ছে যুদ্ধের প্রান্তরে। দুন্দুভি বেজে উঠল বলে।

প্রতীক্ষারত উভয়পক্ষ বুঝতে পারে যুদ্ধের নির্ঘন্ট এবার পিছিয়ে যেতে বসেছে। এমনকি, রতিগড় টিলার শৃঙ্গটি কৌণিকভাবে যে-মুহূর্তে রৌদ্রাভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল, অমনি উৎকন্ঠায় আর্তনাদ করে উঠল তারা জিনগা-মাঈয়ের নামে। তারা সম্ভবত হুকুমদারদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাইল যে, ঠিক এই মুহূর্তে লগ্ন অতিক্রান্ত!

কিন্তু তারপরেও যুদ্ধ-সংকেত শোনা গেল না, বেজে উঠল না দুন্দুভিগুলি। প্রতিটি দুন্দুভির সামনে কাঠের জোড়া জোড়া ভারি মুদগর হাতে করাল বদন নিয়ে আদিবাসীরা তৈরি হয়েই রয়েছে, আদেশের অপেক্ষায়। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে কোল-ভিল-মুন্ডারি-ভূমিজ-খেড়িয়া-চন্ডালসহ সকল সম্প্রদায়ের আদিবাসী ও অন্যান্য মানুষ।

পূর্বদেশী হুকুমদাররা সংকেত দিতে প্রস্তুত থাকলেও, অপরপক্ষ তখনো আসেনি। মিলিত হয়নি তাদের সঙ্গে স্তম্ভের তলায়। তারা ইত্যবসরে আসমানচুম্বী এক শান্তিঝান্ডা তুলে রেখে দিয়েছে, যার অর্থ সময় চেয়ে নেওয়া। লহ-লহ করে উড়ছে সেই ধবল মহাকেতন। এই অবস্থায় তো যুদ্ধ আরম্ভ করার নির্দেশ দেওয়া যায় না। তাছাড়া কোনো যুদ্ধবার্তা এককভাবে, একতরফা ঘোষণা করা যায় না। এখন লড়াই শুরু করার নির্দেশ জারি করার আগে অবশ্যই শান্তিকেতনকে নামিয়ে রাখতে হবে ভূমিতলে। ফলত, সারা মাঠারিক্ষেত্রে বহাল থাকা গো-শকটারোহী যোদ্ধাদের মতো পূর্বদেশী হুকুমদাররাও চেয়ে রয়েছে দূরে। উভয়পক্ষের মধ্যস্থলে দাঁড়িয়ে কথোপকথনরত অঙ্গদ ও পাটনের দিকে, আর তাদের ঘিরে তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা হুকুমদারদের দিকেও। শৃঙ্গ থেকে নামা ধসের প্রাকমুহূর্তের মতো থমথম করছে পরিবেশ, থেমে রয়েছে সংগ্রামের শুরুয়াত।

অঙ্গদও বুঝতে পারে যুদ্ধারম্ভের কাল অতিক্রান্ত হয়ে চলেছে। অধিকন্তু, মহাপ্রবীণ তাকে বারংবার ‘যুদ্ধের ক্ষণ বহিয়া যাইতেছে’ বলাতে সে এটাও বোঝে যে এই বিলম্ব নিয়ে তিনিও স্বস্তিতে নেই। তৎসসত্ত্বেও অঙ্গদ নিরুপায়। যুদ্ধের অজুহাতে এই নরহত্যা লীলায় সন্ত্রস্ত্র হয়ে তার মন দেহাভ্যন্তরে প্রস্তরের মতো অনড় ও অরাজি হয়ে রয়েছে, সে কি করে তার ধনুতে তির সংযোজন করে?

অগত্যা অঙ্গদের মধ্যে যোদ্ধৃ-মনোভাবকে জাগিয়ে তুলতে পূর্বাধিক তৎপর হয়ে ওঠেন মহাপ্রবীণ। এবার একটার পর একটা শ্লোক বলে-বলে তিনি তাকে বোঝাতে থাকেন। আপাত বিবেচনায় মনে হতে পারে, মুষড়ে পড়া শিষ্যকে জীবনদর্শনের পাঠ এবং হিতোপদেশ দ্বারা উজ্জীবিত ও কর্মতৎপর করার এই কি প্রকৃষ্ট সময়? একদিকে যুদ্ধকে সংঘটিত হওয়া থেকে আটকে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে গুরু-শিষ্যের শ্বাশত জ্ঞান অধ্যয়ন? অবশ্যই। একদিকে সহস্র মানুষের উদবেগ ও উৎকন্ঠা, বিপরীতে স্থির ও অচঞ্চল মস্তিষ্কে আচার্যের নিরন্তর বাণী শ্রবণপূর্বক তাকে আত্তীকরণ। কী আশ্চর্য! অভূতপূর্ব! কী অভাবিত, কী অসম্ভব মুহূর্তে, যা একই সঙ্গে জীবন ও মৃত্যুর সংগম, যেখানে বহু-বহু মানবের জীবনের জন্য সম্মিলিত উল্লাস ও মরণের কারণে করুণ আর্তনাদ বায়ূমন্ডলে ধ্বনিত হতে চলেছে, যে নিরঙ্কুশ-মুহূর্তকে নিয়ে রচিত হতে পারে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি।

মহাপ্রবীণ অঙ্গদকে নিয়ে সেই কীর্তিস্থলে দাঁড়িয়ে। তিনি গাড়োয়ানের আসনে। আর অঙ্গদ তার পিছনে শকটোপরি দন্ডায়মান। তার পদতলে নিশ্চল পড়ে রয়েছে তার ধনু, রয়েছে তূণভর্তি তির, শকট বোঝাই তিরের পাহাড়। যা শত্রুবিনাশের তরে মুহুর্মূহ ধাবিত হওয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু বিনাশের ভাবনার মতো যুদ্ধক্ষেত্রে অযুত-লক্ষ তিরের ধাবমানতাও শালমূলে বল্মীকের সুদূর অভ্যন্তরে কুন্ডলী পাকিয়ে অবস্থানরত বিষধর খরিশের মতোই নীরব ও নিশ্চল অবস্থান করছে।

মহপ্রবীণ মনে করেন যথাসম্ভব বাস্তবভূমিতে দাঁড়িয়ে বাস্তবতার শিক্ষা দিতে হয়, যাতে তা কখনোই তত্ত্ব ও প্রয়োগের মধ্যবর্তী দূরতিক্রম্য ফারাকের অবকাশ না রাখে। এই ফারাকই শিক্ষাগ্রহণের তথা ফলিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের অন্তরায়। অঙ্গদের মনকে তিনি তাই ক্ষেত্রসত্যে আবদ্ধ রাখতে চান, যাতে তার মনে বিক্ষেপণ না ঘটে, যাতে সে-মন সত্যের প্রতি আরো বেশি নতমস্তক ও শ্রদ্ধালু হয়, আরো বেশি সচেতন ও একনিষ্ঠ হতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে ছোটোখাটো কর্মমুহূর্তে এই পরিস্থিতি হামেশাই তৈরি হয়, কিন্তু সচরাচর যুদ্ধের মতো এমন বিশাল উদ্যোগ সংঘটিত হওয়ার সময় তার সূত্র ধরে জীবনের মহাঙ্গনে যাওয়ার সেই অবকাশ থাকে না।

কিন্তু এখন ‘সৌভাগ্যক্রমে’ তা সৃষ্টি হওয়ায় মহাপ্রবীণ তার পূর্ণ সদব্যবহার করতেই অতিমাত্রায় উৎসাহী। তিনি বারম্বার অঙ্গদকে যুদ্ধক্ষেত্রে দৃষ্টিনিক্ষেপ করতে আদেশ করেন, তাকে যেন বোধ দিয়ে, তার নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণ ও মেধা দিয়ে এই ভয়াবহতার অবশ্যম্ভাবিতাকে তার দেহে অবিরাম প্রবাহিত প্রতিটি লোহিত রক্তকণিকায় অনুভব করতে বলেন। যাতে সে এই সত্যে উপনীত হতে পারে যে, সত্য স্বয়ং একটি জীবন, তা সর্বদাই নির্বিকার, নির্বিকল্প। তাকে হত্যা বা বিনাশ করা যায় না। উপরন্তু, সে এও জানুক যে, জীবমন্ডলে স্বতন্ত্ররূপে ভয়াবহ বলিয়া কোনোকিছুরই অস্তিত্ব নেই। ভয়াবহতাও অলঙঘনীয় সত্যের আরেক রূপ।

মারণভূমিতে দন্ডায়মান মহাপ্রবীণ বোঝাতে থাকেন— যুদ্ধ কী, জীবন কী, মৃত্যু কী। তিনি বোঝাতে থাকেন আদর্শ মানবমন কীভাবে বিভীষিকার সম্মুখে দাঁড়িয়েও নিজেকে সত্যের কাছে অটল রাখে। বস্তুত, জগতে কঠোর, নিষ্ঠুর, বিভীষিকাময় তথা ভয়ঙ্কর বলে কিছুই নেই। ব্যতিক্রম বলেও কিছু হয় না। সবকিছুই অনিবার্য সত্য তথা অবশ্যম্ভাবিতার প্রকাশ। সবকিছুই পূর্বনির্দিষ্ট। কোনো ক্ষেত্রেই সত্যের ব্যতিরেকও হয় না। অবোধ অপরিণত ও অনভিজ্ঞ মনের কাছে জগতের অনেক ঘটনাবলিকে গ্রহণ অযোগ্য, ভয়াবহ ও বিস্ময়কর বোধ হয়। আদপে, কোনোকিছুই বিস্ময়কর ও যুক্তিহীন আকস্মিক নয়। সেইহেতু, জীবন ও জগৎকে চিনতে, জানতে, বুঝতে হলে প্রতিকূলতা তথা আপাত অসম্ভব ও ভয়াবহতা থেকে পলায়ন না করে তার মোকাবিলা করো, তাকে প্রত্যক্ষ করো এবং স্বাভাবিক বলিয়াই তাকে গ্রহণ করো। এই অনুশীলন ও নিষ্ঠাই মানুষকে প্রবুদ্ধ ও দার্শনিক করে তোলে।

তিনি এও বলেন যে, একজন পন্ডিত অপেক্ষা এক অনাহারী পথের ভিক্ষুক অনেক বেশি জীবনবোদ্ধা, অনেক বেশি জ্ঞানী। কারণ, তার জীবন সতত প্রতিকূলে বইছে। প্রতিবাদহীনভাবে মহাকালের দৃষ্টিতে সে এই মানবসংসারকে দেখছে, চিনছে মানুষের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র মনুষ্যত্বকে। মানবসত্তার স্বরূপকে। এই সনাক্তকরণই জ্ঞান বা বীক্ষা। প্রতিদিন নানাবিধ ঘটনার সরেজমিন সাক্ষ্য এবং তার প্রতি ঘটে যাওয়া বহু মানবিক-অমানবিক আচরণের ভেতর দিয়ে সে দৈনিক বহু প্রত্যক্ষ জ্ঞান আহরণ করে চলেছে। প্রত্যক্ষ জ্ঞানই হল হীরকখন্ড।...

মহাপ্রবীণ বলে যেতে থাকেন। আর প্রতিটি শ্লোকের উপসংহার টেনে সেই একই বাক্যের পুনরুক্তি করেন, ‘হে মহাবল! আপন শক্তির ভরে দন্ডায়মান হও! সংগ্রাম করো! বিমুখ হইও না!’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে অঙ্গদ! ইহা সর্বদা স্মরণে রাখিও যে, জীবমাত্রই বধ্য। যাহাদের জন্ম হইয়াছে, মৃত্যু তাহাদের অখন্ডণযোগ্য। সুতরাং, মৃত্যু যাহার হইবেই, তাহাকে বধ করিতে তুমি সংশয়চিত্ত কেন? দৃঢ়চিত্ত হও, কঠোর হও, মনে করো শত্রুবিনাশ বৈ সৃষ্টি ও সৌন্দর্যের বিকাশ নাই। ধ্বংসের অভ্যন্তরেই নিহিত রহিয়াছে সৃষ্টির শাশ্বত প্রাণধ্বনি। সুতরাং অস্ত্র ধরো। হে মহাবল! আপন শক্তির ভরে দন্ডায়মান হও! সংগ্রাম করো!’

অঙ্গদ স্থির। নতমস্তক।

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে প্রজ্ঞাবান, হে চিন্তক! স্মরণে রাখিও, জীবহত্যার ভিতর দিয়াই জগতে জীবের ভারসাম্য রক্ষিত হইতেছে। যাহারা অযোগ্য, যাহারা দুর্বল, যাহারা সংঘর্ষের প্রতিকূলে তাহাদের জন্য এই পৃথিবী নহে। মৃত্যু বরণপূর্বক তাহাদের বিলীন হইতেই হইবে। এক্ষণে, যুদ্ধ সেই মহতী উপলক্ষ্য মাত্র। সুতরাং, হে অমিত বলশালী! সংগ্রামের ভিতর দিয়া তোমার বীরত্ব, শৌর্য ও বীর্যের পরিচয় দাও। হে মহাবল! আপন শক্তির ভরে দন্ডায়মান হও! সংগ্রাম করো! বিমুখ হইও না! যুদ্ধের ক্ষণ বহিয়া যাইতেছে।’

অঙ্গদ স্থির। নতমস্তক।

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে চিরন্তনপ্রিয়! মনের কাতরতাকে জয় করো। উহাকে দন্ডকালও প্রশ্রয় দিও না। কাতর হৃদয় তোমাকে অনবরত নিষ্ক্রিয় করিয়া রাখিতে চাহিবে। জগতে নিষ্ক্রিয় পুরুষের কস্মিনকালেও সমাদর নাই। সমাদরহীন জীবন মূল্যহীন। হে ধনুর্ধর! জীবনের মাহাত্ম্য রচনা করিতে এই জীবনযুদ্ধে অকুন্ঠে সামিল হও। হে মহাবল! আপন শক্তির ভরে দন্ডায়মান হও! সংগ্রাম করো! বিমুখ হইও না! রতিগড়শৃঙ্গের পানে চাহিয়া দেখো—যুদ্ধের ক্ষণ বহিয়া যাইতেছে।’

অঙ্গদ তখনো মৌন। নতমস্তক হয়েই থাকে। বোঝা যায় না যে, সে আদৌ ভাবিত কি না। সে কি নিজেকে, নিজের ভাবনাকে তার বিচারের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় রত? তাও অনুমান করা যায় না। মহাপ্রবীণের এত কথার প্রত্ত্যুত্তরে তার মুখ থেকে একটি শব্দও ব্যক্ত হয় না। কিন্তু তবু কোনো নৈরাশ্য বা বিরক্তি প্রকাশ না করে, তিনি সমানে এবং অভিন্ন প্রয়াসে তাকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন।

একসময় তাঁর খেয়াল হয় যে, স্বজনসংক্রান্ত যে-প্রশ্ন তিনি অঙ্গদকে করেছিলেন তার জবাবেও নীরব থেকেছে সে। এখন তিনি আবার তা জানতে চাইলেন। আর সেই সূত্রে পুনর্বার তাঁর জেনে নিতে ইচ্ছে হল যারা তার রক্তের সম্পর্কের কেউ নয়, তাদের নিধন করতে সে কেন এমন স্বজনবধজনিত শোকের আশঙ্কায় বিদীর্যমান?

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে প্রেমমহার্নব! যুদ্ধের ভিতর দিয়াই বিনাশকারী-শক্তির পতন হয়। ইহা বুঝিয়াও কী হেতু তুমি বিনাশে অনাগ্রহী ও মৌনাবলম্বী? হে আমার জ্ঞানসাধনরূপ প্রিয় অঙ্গদ, যে-ধনুর্বাণ এখনো তোমার পদপার্শ্বে পতিত হইয়া রহিয়াছে, তাহাকে জয়ধ্বনি দিয়া উত্তোলিত করো। রণবীর মূর্তি ধারণ করো! যুদ্ধের ক্ষণ বহিয়া যাইতেছে।’

অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমি পুনর্বার বলিতেছি যুদ্ধে আমার মতি নাই। এই কাজে আমি সমূহ বিশ্বাস হারাইয়াছি। দিনে দিনে যতই আমি জগৎকে দর্শন করিতেছি, ততই জীবনচর্চাই আমার ব্রত হইয়া উঠিতেছে, মৃত্যু সাধনা নহে। হে প্রবর! আমাকে অধিকবার স্বজনহত্যায় উদবুদ্ধ করিবেন না।’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে ঋদ্ধিমান! আমিও পুনর্বার তোমার নিকট হইতে বিলক্ষণ শুনিতে চাহি স্বজন অর্থে তুমি কাহাদের কথা বলিতেছ? যে-মানবসকলের সহিত তোমার কোনোরূপ রক্তের সংস্রব নাই, আত্মার সংযোগ নাই, তাহারা কী প্রকারে তোমার স্বজন হইতে পারে?’

এই কথার জবাব দেবার আগে অঙ্গদ যেন কিঞ্চিত শোকবিহ্বল হয়ে পড়ল। মহাপ্রবীণের মুখনি:সৃত এহেন প্রশ্নই বোধ হয় সে-শোকের কারণ। যদিও, তার এটাও মনে হল যে, মহাপ্রবীণ বুঝি তার পরীক্ষা নিতে চাইছেন। তৎসসত্ত্বেও, নিজেকে সামলে নিয়ে সে, যুদ্ধক্ষেত্রে পঙক্তি রচনা করে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলির দিকে তাকিয়ে থেকে স্বজনের একটি আশ্চর্য সংজ্ঞা দেয়, যা স্বজন সম্পর্কে চিরাচরিত ও সাবেকি ধারণাকে শুধু অস্বীকার করে না, তাকে অসার প্রতিপন্ন করে।

অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ, আমি আমার জীবন দিয়া উপলব্ধি করিয়াছি যে, রক্তের সম্পর্ক থাকিলেই এক মানব অপরের স্বজন হয় না। যে-জীবের তরে প্রাণ কাঁদে, তাহাই স্বজন। তাহা মানুষও হইতে পারে, কুক্কুরও হইতে পারে। পারস্পরিক প্রেম ও সহবোধের ভিতর দিয়া স্বজন গড়িয়া ওঠে। আত্মার সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রকৃত প্রস্তাবে, স্বজনবোধ এক অনুভূতি।’

এই সূত্র ধরে সে জানায় যে, তার অন্তরে অপরাপর সমগ্র মানবের প্রতি সহমর্মিতা তথা প্রেম ও বেদনাবোধ অতিমাত্রায় সক্রিয়। সে মানব হয়ে কী প্রকারে আরেক মানবের দন্ডদাতা হতে পারে? যারা যোদ্ধা হয়ে তার বিরুদ্ধে অস্ত্রহাতে দন্ডায়মান, তারাও তো বাঁচতেই চায়? জীবজগতে যারা বাঁচার কথা বলে, যারা বাঁচতে চায়, তারা কখনোই বধ্য নয়। অঙ্গদ কেমন করে তাদের হত্যাকারী হবে? তাদেরকে দেখে তার মনে পড়ছে তাদের ঘর-সংসার-পুত্রকন্যাদের কথা। তারা অপেক্ষায় রয়েছে কবে এই মানুষগুলি আবার ফিরে যাবে দূরদূরান্তে তাদের আপন-আপন গ্রামে, আপন-আপন পরিবারে স্ত্রীর কাছে, সন্তানের কাছে, বৃদ্ধ ও অসহায় পিতামাতার কাছে। তাদের অপেক্ষায় উদবেগও রয়েছে। তারা জানে যুদ্ধস্থল থেকে ফেরা কখনো নিশ্চিত হয় না। সেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। শিশু কাঁদছে তার আদরের পিতার জন্য, মাতা কাঁদছে তার সন্তানের জন্য!

ভাবতে ভাবতে অঙ্গদের নয়নযুগল বাষ্পাকুল হয়ে ওঠে। মুখে আর কথা সরে না। তবু সে কোনোক্রমে বলে যে, তার ভেতরে এই বোধ জেগে উঠছে বলেই তারা সকলে শূদ্র-শুঁড়ি চন্ডাল-বীরহড় যা-ই হোক না কেন, জাতি-ধর্ম-দেশকাল নির্বিচারে তার আত্মীয়। আর আত্মীয়বধ কদাপিও সমর্থনযোগ্য নয়, তা পাতকের কুকর্ম!

অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! এই মনুষ্যসকলকে হত্যায় প্রবৃত্ত হলে আমি যার পর নাই পাপাচারী হইব! আপনি হুকুমদারদের আহ্বান করুন। যুদ্ধ প্রত্যাহার ঘোষণা করুন।’

কিন্তু তখনো মহাপ্রবীণ নাছোড়। পাপাচার বিষয়ে সবিশেষ অভয় দান পূর্বক এবার তাকে মনুষ্য আচরণের শাস্ত্রসন্মত বিধির কথা, পাপ-পুণ্যাদির কথা ব্যাখ্যা করে তার হৃদয়ঙ্গমের চেষ্টা করেন। তিনি বলেন যে, বৃহৎ পাপ থেকে ধরিত্রীকে মুক্তি দিতে ক্ষুদ্র পাপাচরণ কখনো পাপ বলিয়া গণ্য হতে পারে না। এমনকি, তারপরেও তিনি আরো বহু-বহু শ্লোক ব্যাখ্যা করে, তাদের অন্তর্নিহিত অর্থ তুলে ধরে জীবের সারবত্তার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। জীবন, মহাকাল ও স্রোতস্বিনী এই ত্রয়ীর ধর্ম এক ও অভিন্ন। আর তা হল বহমানতা। মহাকাল ও স্রোতস্বিনীর ন্যায় মনুষ্যজীবনও সৃষ্টির আদিকাল থেকে অদ্যাবধি সম্মুখে ধাবমান। নানা অভিঘাত ও প্রত্যাঘাতের ভিতর দিয়ে তার এই বহমানতা অবিচল। জীবন ও প্রকৃতি তখনি এই কঠিন অবিচলনের ধর্ম অর্জন করতে পারে, যখন সে জ্ঞানের দ্বারা ঋদ্ধ, স্থিতধী ও শক্তিধর হয়ে ওঠে। জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই গতি, জ্ঞানই বরাভয়। জ্ঞানীপুরুষ তাই কখনো সংস্কারাচ্ছন্ন হয়েন না, কাল্পনিক আশঙ্কায় অহেতুক উৎকন্ঠিত হয়েন না, সত্যহীন, ধর্মহীন, যুক্তিহীন ও বিজ্ঞানহীন কোন কিছুর দ্বারা তাঁর কর্মপন্থাকে পরিচালনা করেন না। জ্ঞানীপুরুষই দিব্য মানব, জ্ঞান ভিন্ন ইহজগতে তিনি অন্য কোনোকিছুর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন না। জ্ঞানই জীবনজ্যোতি, মানবমুক্তির অনন্য মার্গ...

এইসব কথা শুনতে শুনতে অঙ্গদের ভাবনায় পরিবর্তন আসে। একসময় মহাপ্রবীণ তার মনকে দৃঢ় ও পাষাণবৎ অকাতর করে তুলতে সমর্থ হন। অতঃপর, তিনি লক্ষ করতে থাকেন অঙ্গদ কীভাবে তার পায়ের দিকে তাকিয়ে ধনুকের প্রতি তার দৃষ্টি সন্নিবিষ্ট করছে। তাদের বেষ্টন করে রাখা বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে তখন কোথাও একটি কাঠবিড়ালিরও কিচ-কিচ শব্দ নেই। শুধুই নীরবতা!

কিন্তু অকস্মাৎ এই মহানীরবতা ছত্রখান হয়ে যায়, যখন দূর থেকে ভেসে আসে এক জলদগম্ভীর কীচক-হুঙ্কার, ‘কাপুরুষ! তোমার বীরত্ব প্রদর্শন করিতে যুদ্ধের আহ্বান জানাইয়া এখন তুমি রণে ভঙ্গ দিতে চাহ? জ্ঞানচর্চার অজুহাতে এখন পলাইতে চাহ? এই তুমি নাকি বীর? আজি কোথায় গেল তোমার সেই সহোদরবধের দম্ভ? কোথায় সেই আস্ফালন? ক্লীব! নপুংসক! বহুদিন তুমি শাস্ত্র-শিক্ষা-দর্শনের অহমিকায় আমাকে মনুষ্যেতর জ্ঞান করিয়াছ। ঘৃণা করিয়াছ আমাকে। আত্মগরিমায় বিভোর থাকিয়া আমার পৌরুষকে যুগপৎ অস্বীকার ও অবমাননা করিয়াছ। ভন্ড! এখন তত্ত্ব কথা রাখো, আর আইস বীরের ন্যায় বীরের সহিত সংগ্রামে রত হও। কাপুরুষ! কুক্কুর! আমার ন্যায় তোমার গান্ডীব উত্তোলন পূর্বক যুদ্ধ শুরুর বার্তা দাও! দাও, দাও কাপুরুষ! তারপর দেখো! আমি তোমার শত অস্থি-পঞ্জরে শতবাণ যদি বিদ্ধ না করি! তোমার জটাধর মুন্ড ওই নারীর পদতলে যতদিন না আমি উপহার দিতে পারি, ততদিন আমার তপ্ত শোনিত শীতল হইবে না! ততদিন স্ত্রীবিহীন আমার নিশিযাপন প্রতি প্রহরে তোমাকে অভিশাপ দিবে! চন্ডাল!...’

এমন আকাশবাণী শুনে রণসভা মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা অঙ্গদের রীতিমতো চমকে ওঠার কথা। কিন্তু সে তেমনি স্থির ও প্রতিক্রিয়াহীন থেকে, পাটনকে যেন আরো সময় দিল তার বক্তব্য শেষ করতে। সে বলুক যা বলতে চায়। অঙ্গদ যখন শাস্ত্রকথা শুনেছে, তখন সকলপ্রকার অকথা-কুকথা শ্রবণ করার মনও তার তৈরি হয়েই রয়েছে। সে প্রতীত্যসমুৎপাদবাদী প্রাজ্ঞ, বিশ্লেষক, ধৈয্যশীল ও মহাবলী। সে কেন প্রতিপক্ষের বাকস্বাধীনতাকে খর্ব করবে?

অঙ্গদ শুনে যায়, আর টের পায় তার অন্তর-প্রকোষ্ঠে শতশত অস্ত্রের নীরব ঝঙ্কার! পালটে যেতে থাকে তার মুখের অভিব্যক্তি।

নারীর প্রসঙ্গ উত্থাপনকালে পাটন দক্ষিণহস্ত চক্রবেগে পূর্ণ প্রসারিত করে অঙ্গদকে সুউচ্চ রতিগড় টিলাটি দেখায়। নামোল্লেখ না করেও সে তার স্মরণে এনে দিতে চায় জারমণিকে। সে বলতে চায়, ‘জনপদগুলিতে মানুষের কাছে তুমি যুদ্ধের কারণ হিসেবে অত্যাচার ও আগ্রাসনের দোহাই দিয়ে যত বড়-বড় তত্ত্ব কথাই বলো না কেন, যুদ্ধের মূল কারণ কিন্তু—তুমি! তুমি! তুমি! তোমার ওই নারীকে ফিরে পাওয়ার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। তোমার জয়ের বাসনা। তোমার লোভ। সে-লোভ ভোগেরও নয়, নিছক অধিকারের, কারণ তুমি বৃদ্ধ। তোমার জ্ঞানচর্চাই তোমার যৌবনধর্মে অকাল বার্ধক্য ডেকে এনেছে, তোমাকে বিমুখ করেছে নারী সংসর্গ থেকে। তথাপি, বিগতযৌবন হয়েও তোমার বিচিত্র বাসনা থেকে, লোভ থেকে তুমি নিজেকে সরিয়ে আনতে পারোনি। এই যুদ্ধ তাই তোমার সেই লোভের পরিণতি হবে—আমার শরাঘাতে তোমার নির্মম মৃত্যু। যে-শরের প্রত্যেকটিতে মিশে রয়েছে আমার বঞ্চনারনির্মম ইতিহাস ও তজ্জনিত প্রতিশোধ।

‘পুরুষের যৌবদশায় নারীপ্রেমই শ্রেষ্ঠতম অর্জন। কিন্তু আমি আজও তা অর্জনে সক্ষম হইনি কেবল তোমার জন্য। ওই দেখো, অগ্নিশলাকাসম যে-নারী মহাকালের সাক্ষীর ন্যায় সেথায় এখনও দন্ডায়মান, তার একটি নিশ্ছিদ্র চুম্বনের প্রত্যাশায় বর্ষ-বর্ষ প্রতীক্ষায় আমি। এই প্রতীক্ষা আমার অন্তহীন হয়ে গেল কেবল তোমার জন্য। তার বক্ষোপরি মধুভান্ডদ্বয়ে মস্তক রেখে আমি দু-দন্ডের তরে শান্তি চেয়েছিলাম। আমার কপালে সে-শান্তি অদ্যাবধি জুটল না শুধু তোমার জন্য। আমার এই আরণ্যক জীবনে নারী নেই বলে আমার মনে স্বস্তি নেই, সুখ নেই, আনন্দ নেই, সংগীত নেই—জীবন আমার নির্মধু শুধু তোমার জন্য। আমার সকল অভীষ্টলাভে তুমিই অন্তরায়। শুধুই শূন্যতা নিয়ে আমি প্রহর গুনে চলেছি। শাল্মলী বৃক্ষের ন্যায় একজন শক্ত, সুঠাম ও জাগ্রতলিঙ্গের বীরের কাছে এর চেয়ে অধিকতর নৈরাশ্য আর কী হতে পারে?

‘কিন্তু তাই বলে ভেবো না সেই ব্যর্থ অতীতের চিন্তায় আমি এই মুহূর্তেও আচ্ছন্ন রেখেছি নিজেকে। আজ মাঠারির এই যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে কোনো আক্ষেপ-অনুশোচনা নিয়ে আমি ধনুর্বাণ হাতে তুলে নেব না, কারণ বিপন্ন-উদাস-উদবিগ্ন মন আমাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করবে। যুদ্ধের এই শুভ মহরতে আমি তা হতে দেব না। তুমি মাঠারিতে উপদ্রবকারী অঘাসুর। আমার বাণেই তোমার অন্তিম শয়ান হবে! তোমাকে ব্যাধের হাতে পশুর মতো নির্দয় হত্যার ভেতর দিয়েই আমি অভীষ্ট নারীকে চুম্বনের সুখ ও স্তনমর্দনের বহু প্রতীক্ষিত আনন্দ পেতে চাই। আমি সুখ চাই, সুখ! সহোদর, নারীই আমার সকল সুখানুভূতির আশ্রয়! যদি, ঈশ্বর না করুন, তোমাকে হত্যা করেও মৃত্যুবরণ আমার নিয়তি হয়ে থাকে, তবে সে-মৃত্যুর মুহূর্তেও আমার একটি বাহু যেন ওই নারীর নগ্নবক্ষে নিষ্পেষণরত থাকে!’

জারমণি তখন টিলার শৃঙ্গে দাঁড়িয়ে। হাওয়ায় উড়ছে না তার বেণী-আশ্রিত চুল। প্রায় অর্ধনগ্ন। অর্ধ নারীশ্বরও বলা যায় তাকে এখন। শরীরে আবরণ নেই বললেই হয়। এমন সজ্জায় সচরাচর সে নিজেকে সাজায় না। বহুদিন ধরে শুকিয়ে রাখা সামান্য একটি ছাগচর্ম কোমরে এক পাক জড়িয়ে সে যেন তার বিশাল যোনি ও জঙ্ঘাকে আড়াল করে রেখেছে মাত্র। উন্মুক্ত রেখেছে হস্তীশূন্ডতুল্য দুই ঊরু। যাতে যুদ্ধশেষে বিজয়ী পুরুষের হস্তের এক আলতো টানে সে পূর্ণ নগ্ন হয়ে তার সম্মুখে মহাজাগতিক আবেশ নিয়ে দাঁড়াতে পারে। আর নিজের মায়াবী শরীর দেখিয়ে তাকে এই প্রথমবার সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে বলতে পারে, ‘হে ঈশধারী, হে রণক্লান্ত! পৃথিবী নি:স্তব্ধ এখন। আইস, আমাতে সশব্দে অবগাহন করো!’

আর তেমনি সে পরিপাটি করে অলঙ্কৃত করেছে স্তনযুগলও। রঙিন মাটির প্রলেপ দিয়ে। মাথায় তার কেশরাজিতে এখন আর শোভা পায় না কোনো কদম্ব কিংবা কুড়চি ফুলের গুচ্ছ। তবে কাষ্ঠগোলকের মতো শুকনো ফলের মালা এখনো শোভা পাচ্ছে তার গ্রীবাদেশে, কানের লতিতে ও বাজুবন্ধে।। আর এই সামান্য পরিচর্চায় একদিকে তার কামোষ্ণ যৌবন প্রকট হয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে, অন্যদিকে কী যে আদিম মোহিনী রূপ ফুটে উঠেছে তার!

জারমণি সব সময় যেন নিজেকে এই দ্বিবিধতার আবরণে মুড়ে রাখে, আর সে-কারণেই তাকে ধরা যায় না কোনটা তার নিত্য-সত্য? এই যৌবনপ্রমত্ত উগ্রকাম, নাকি তার অঙ্গে অঙ্গ অপ্সরার সৌন্দর্য? তার রূপ আরো অলৌকিক হয়ে ওঠে, যখন বাতাসে উড়তে থাকে তার কেশরাশি আর সে পাটনের কথায় আপন মনে ঠোঁটে জিইয়ে রাখে তার স্মিত হাসি। যে-হাসির ব্যঞ্জনাকে অনায়াস বিশ্লেষণ করা যায় না। মনে হয়, এই হাসি দিয়ে আজ যেন সে যুদ্ধক্ষেত্রে দুই সহোদরের উপস্থিতিতে অনেক কথাই বলতে চায়। অনেক অকথিত কথার মধ্যে এটাও বলতে চায় যে, ‘দেখো, আমার স্বরূপ! দেখো কি ভয়াবহ নারীমূর্তি! আমিই যুদ্ধ, আমিই শান্তি! আমিই প্রেম, আমিই তৃষ্ণা, আমিই সৃষ্টি ও লয়ের অন্ধকার যোনিদ্বার!’ হয়তো তাই সে তার সবকিছুকে সহোদরদ্বয়ের মাঝে কুজঝটিকার মতো অবারিত রাখতেই এমন সাজে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার দখলদারিত্ব নিয়ে। রতিগড়ের শৃঙ্গে দুই উরু ফাঁক করে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকে সে যেন তার ভয়াবহ অন্ধকার অন্তর্দেশও দেখাতে চায়। বুঝিয়ে দিতে চায়, রতিগড়ের মাথায় দন্ডায়মান থাকলেও সে বিরাজ করছে সর্বত্র, সমগ্র যুদ্ধভূমি জুড়ে। বাস্তবিক, জারমণি আছে বলেই যুদ্ধ আছে। যুগে যুগে, সর্বকালে।

ওদিকে রণসাজে সজ্জিত পাটন, দক্ষিণ-পূর্ব কোণের একটি টিলার শীর্ষদেশ থেকে তখনো বলেই চলেছে। প্রত্যয়ের সঙ্গে বলছে, আবারও শুনে রাখো—এই যুদ্ধের জন্য যেমন তুমি দায়ী, তেমনি এই মাঠারিতে হাজার হাজার নিরীহ প্রাণের বলিদানের জন্যও দায়ী থাকবে তুমি। পূর্ব ও পশ্চিমের গ্রামবাসীদের কাছে তোমার ক্ষমা নেই। অন্তেবাসীর ইতিহাস যদি কখনো সত্যবাদী হয়, যদি তা আমার মৃত্যু দিয়েও রচিত হয়, তাহলে সেও তোমাকে মনে রাখবে আদিবাসী সমাজের দুষ্টদলপতি ও কুচক্রী মানুষ হিসেবে। যুদ্ধবাজ হিসেবে। উপসংহারে পাটন বলতে থাকে, ‘হে অক্ষম নারীপিপাসু! হে ভন্ড তাপস! হে ছদ্মজ্ঞানী...’

অনুজের মুখ থেকে এমন কথা শোনার জন্যই বুঝি অঙ্গদ এতক্ষণ মহাপ্রবীণের সঙ্গে কথোপকথনে রত ছিল। সে ব্যথিত হল ঠিকই, কিন্তু তার এটাও মনে হল, তবে কি মহাপ্রবীণই সত্য? তবে কি জগতে সত্যিই যুদ্ধের কোনো বিকল্প নেই? একপক্ষ শান্তি ও নীরবতা কাঙ্ক্ষা করলেও অন্যপক্ষ কি তাকে অস্ত্র ধরতে ও হিংসার পথে নামতে বাধ্য করে? অঙ্গদ আরো অনেকক্ষণ তার বাচনরত সহোদরের দিকে তাকিয়েই থাকল।

ততক্ষণে বাতাস পূর্বাপেক্ষা গতিশীল হয়ে উঠেছে। আর সেই বাতাস তার দৃষ্টির অনুকূলে বইতে থাকায়, অঙ্গদের মাথাভর্তি সুটির মতো পাকিয়ে থাকা জটাগুলি তার কর্ণ ও গন্ডূষ এলোমেলোভাবে ঢেকে দিয়ে অনুভূমিক হয়ে শন-শন বেগে সম্মুখে উড়তে থাকে। তাতে ক্রমশ ক্রমশ ক্রোধোদীপ্ত হয়ে ওঠা অগ্রজের মুখাবয়ব নজরে আসে না পাটনের। সে তখনও ক্ষান্ত হয়নি এমন কুৎসিত ও বর্বর ভাষা প্রয়োগ থেকে। তাকে সে অপমান করেই চলেছে। করেই চলেছে।

অগত্যা, অঙ্গদ সচল হয়। সে ধীরে ধীরে তার পায়ের কাছ থেকে ধনুকটি হস্তগত করে। অতঃপর পৃষ্ঠদেশে তূণীর ও পাথরের পাঞ্জায় ধনুর্বাণ নিয়ে দেখতে দেখতে সে-ও পাটনের ন্যায় ভীমদেহ ধারণ করে। নিজের সেই মহামূর্তি ঈষৎ অবনত করে, মৃদুভাষে বলে, ‘হে মহাপ্রবীণ! আমাকে সতত সত্যমতি রাখুন! আমি যুদ্ধ করিতে আর পিছপা নহি!’

এই কথা বলার পর, মহাপ্রবীণ বরাভয় মুদ্রায় দাঁড়িয়ে পড়তেই মড়মড় শব্দে ধরাশায়ী হল সেই শান্তিকেতন আর প্রবল ধ্বনি নিয়ে সমস্বরে বেজে উঠল শতশত দুন্দুভি। রণতূর্য। শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ!

২৩

যুদ্ধ চলতে লাগল। দিনের পর দিন।

এ এক আশ্চর্য আদিম গোষ্ঠীসংগ্রাম। এই সংগ্রাম সংঘটিত হওয়ার আগে কল্পনাও করা যায়নি যে, এর চেহারা এতখানি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, ছাড়িয়ে যেতে পারে বর্বরতার মাত্রা।

যুদ্ধের প্রয়োজনে পূর্ব-পশ্চিমের জঙ্গল কবেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। বৃক্ষহীন পার্বত্যভূমিতে টিলাগুলিকে এখন দেখতে লাগে মরুভূমি খনন করে পাওয়া অতিপ্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসস্তূপের মতো। দু-দিকের সেইসব টিলা-পাহাড়ের আড়াল থেকে বানর প্রজাতির মতো সশস্ত্র গ্রামবাসীরা বেরিয়ে আসতে থাকে। ঢিলমারা মধুচাকের মাছি কিংবা গোয়ালঘর থেকে হঠাৎ আসা বোরহৈলের পারা দ্রুতগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে তারা। ঝুন্ড-কে-ঝুন্ড। রিঙরিঙায় ছুটে যাচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। জ্ঞানহীন চেতনাহীন উন্মাদনায় মত্ত তারা।

মাদক সেবন করায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর এই মানুষগুলির চোখ ঈষৎ লালাভ। কৃষ্ণকায় বস্ত্রহীন শরীরগুলি সুঠাম ও রুক্ষ। খড়িওঠা। প্রসারিত বুক, পায়ের পাঞ্জাও ওসার। তাদের কারো হাতে তিরধনুক, পাকা তৈলাক্ত লাঠি, কারো হাতে বল্লম-টাঙি, কেউ-বা অস্ত্র করেছে শক্ত চামড়ার বেল্টিতে বাঁধা পাথরের গদা —যা মাথার ওপরে স্বচ্ছন্দে ঘুরিয়ে শত্রুর শরীরে জোরাল আঘাত হানতে সক্ষম। তার সঙ্গে আবার ঢালীরাও নেমে পড়েছে। স্থানে স্থানে চলছে তাদেরও লড়াই —বহুদিনের পুরোনো সব তলোয়ার হাতে নিয়ে। দক্ষিণহস্তে তলোয়ারের সঙ্গে বামহস্তে ধরে রেখেছে কাষ্ঠনির্মিত জব্বর ঢাল। ভারী ও চৌকো। ঢালের বহর দেখে মনে হয়—শত্রুবধের জন্য এই ঢালই তো যথেষ্ট? হাতিয়ারের কী-বা প্রয়োজন? জং ধরা অস্ত্রের ঝং-ঝং শব্দ, গো-শকটগুলির শত্রুর পানে আড়ে-থাড়ে ছুটে যাওয়ার শব্দ, ক্ষণে ক্ষণে ভীত ও অস্থির গাভীর হামলানি আর শৃঙ্গগুলিতে অপেক্ষাধীন পদাতিক, জংলী লাঠিয়াল বাহিনী ও শকটযোদ্ধাদের উৎসাহদানের নিমিত্ত ভয়ংকর উল্লাসমুখর চিৎকারের সঙ্গে বাদ্যকারদের কাড়া-নাকাড়া, ঢোল-মাদল, তূর্য ও মদনভেরীর গগনবিদারী ধ্বনিতে মাঠারির পাহাড়গুলিও যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে! ধুলো উড়ছে বিক্ষিপ্তভাবে। উত্তর-দক্ষিণে ছড়িয়ে যাওয়া যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে অকালে দেখা দিচ্ছে কালবৈশাখী।

দেখতে দেখতে ধূলিকণা বাড়তে লাগল। ছড়িয়ে যেতে লাগল ভূমন্ডল ব্যাপী। মাঠারির আকাশ অপরিচ্ছন্ন, মলিন ও অস্পষ্ট হয়ে উঠল। আর তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল প্রাকৃতজনদের আর্তনাদ। ত্রাহি ত্রাহি রব। কখনো মুমূর্ষুর আর্ত চিৎকার, কখনো-বা ঘাতকের উল্লাস! সবকিছু মিলেমিশে এক হননবন্দি তান্ডব। দিগবিদিক জ্ঞানরহিত হয়ে সকলেই যত্রুত্র ধাবমান। সকলেই প্রমত্ত শত্রু নিধনের নেশায়।

কিন্তু কে কার শত্রু? কে কাকে নিধন করতে চায়? আপাত নজরে মনে হয় শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে মানুষ মারছে মানুষকে। আর কিছু নয়। দেখতে গেলে ঘটনা তো তা-ই। কোথাও বুকে-পাঁজরে তিরবিদ্ধ সাঁওতাল গো-শকট থেকে লাট খেয়ে পড়ছে, কোথাও-বা প্রতিপক্ষের গদার আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে শেষ আর্তনাদ করছে ভূমিজ যুবক! ইহারই নাম যুদ্ধ।

ইতিপূর্বেও এই মাঠারিতে দু-পারে বসবাসকারী আদিবাসীদের মধ্যে লড়াই বেঁধেছে বটে, তবে তা কখনোই এমন বৃহৎ ও সর্বজনীন আকার ধারণ করেনি। সে-যুদ্ধ স্থায়ীও হয়নি দীর্ঘকাল। কিন্তু এবারের যুদ্ধের বহর, আয়োজনের মাত্রা, শুরু থেকে উভয়পক্ষের অনমনীয় মনোভাব এবং গ্রামে গ্রামে যুদ্ধবাজদের দীর্ঘকাল যাবৎ ব্যাপক প্রচারের ফলে তীব্র গণজাগরণ দেখে মনেই হয়েছিল এ-যুদ্ধ একবার শুরু হয়ে গেলে সহজে থামার নয়।

যদিও, যুদ্ধ যে লাগবেই সে-ব্যাপারে কোনো কোনো অঞ্চলের মানুষদের মনে কিছুটা সন্দেহও ছিল। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলত, যুদ্ধ যদি লাগেও, তবে তা হবে মেড়ার লড়াই। অজাযুদ্ধ। কিন্তু শেষতক সেই সন্দেহের অবকাশ আর থাকল না, যখন দেখা গেল চাষিদের ঘর থেকে গোরুর গাড়িগুলি প্রায় জোর করেই নিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যখন দেখা গেল শতশত পাহাড়ি আদিবাসী দড়িদড়া, কুড়ুল, গো-যান নিয়ে ঢুকে পড়েছে মাঠারিতে, কাটাই হচ্ছে জঙ্গল।

আর তখন থেকেই গ্রামের হাট-বাজারগুলিতে আক্রা হতে লাগল আনাজপাতি ও হাটমশলা। বিশেষ করে দাম বাড়তে লাগল সেইসব পণ্যের, যা বহু দূরের গন্ডগ্রাম ও বাজারগুলি থেকে আমদানি করতে হয়। আমদানিও বন্ধ হয়ে গেল। লেগে গেল যুদ্ধ।

এখন এ-যুদ্ধ যে কতদিন গড়ায় তা মাস-দুমাস অতিক্রান্ত না হলে বলা দুরূহ। কে-জানে, অনির্দিষ্টকালব্যাপী হয়তো চলতে থাকবে। ধ্বংসের অনেক পথ অতিক্রম করে তবেই হুকুমদাররা সংঘর্ষহীন শান্তিস্থাপন ও বিবাদ মীমাংসার পথ ভাববে। ততদিনে উভয়পক্ষের এই পাশবিক গর্জন অনেকটাই থেমে যাবে। দিকে দিকে গ্রামবাসী ও যোদ্ধাদের বিরোধ বন্ধের সন্দেশ দিতে কোলাহল স্তিমিত যুদ্ধভূমিতে শ্লথগতিতে উত্তোলিত হবে শান্তির ধবলকেতন!

কিন্তু তখন কী হবে শান্তির নিমিত্ত উড্ডীয়মান ধবলকেতন দিয়ে? তখন গ্রামগুলি কি আর গ্রাম থাকবে? অনুমান করা যায়, প্রবল অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও মৃত্যু নিয়ে জনপদগুলি তখন শস্যহীন খেতে চৈত্রের রোদে মাথায় শূন্যহাঁড়ির ভার নিয়ে থাকা কাকতাড়ুয়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। খাঁ-খাঁ গ্রামের কুলহিতে জিভ বের করা অভুক্ত কুকুর চুপসানো পেটে দোলা দিয়ে-দিয়ে উচ্ছিষ্টের সন্ধানে একা-একা ঘুরতেই থাকবে! দিনে-দিনে এই বন্য-আদিম ভূখন্ডের সংগ্রাম সেই ভয়াল পরিণতির দিকেই যাচ্ছে।

মাঠারির এই যুদ্ধে কেবল আদিবাসীরাই নয়, জড়িয়ে পড়েছে যত অনাদিবাসী মানুষজনও। অজ কৃষক এবং বিভিন্ন শ্রেণির শ্রমজীবি মানুষের দল—কামার, কুমোর, ঘরামি, কাঠ-কপাট মিস্ত্রি, তন্তুবাই, ঘ্যুনা, ডোম-মাহালী থেকে শুরু করে মুচি, বাউরি, লোহার, ক্ষৌরকার, এমনকি যারা ছেলে ভুলানো ফুলঘরা, বিয়ের টোপর ও চৌডোল বানায়, যারা বানা-মাদল-লাগড়া-বাঁশি ইত্যাদি বানিয়ে বিক্রির জন্য হাটে-হাটে ঘোরে, মাটিতে সাজিয়ে বসে, এমনসব দুঃস্থ কারিগরদেরও ছাড়া হয়নি। যুদ্ধ তাদেরও। ভাগ্যহতদের। প্রতি গ্রামেই এইসব শিল্পী-কারিগরদের সংখ্যা নগন্য, কোথাও কোথাও পাঁচ-দশ গ্রাম টাই-টাই করে ঘুরলে তবে তাদের পাওয়া যায়। উপজাতিসহ এইসব মানুষজন, যারা স্বয়ং বলা যায় পদাতিক বাহিনী হিসেবে এই যুদ্ধের মূল জোগানদার বা চালিকাশক্তি, তারা গ্রামসমাজের এক বিরাট হাভাতে শ্রেণি। এই শ্রেণিকে নিয়ে চালানো হচ্ছে যুদ্ধ, দেওয়া হচ্ছে হুঙ্কার!

বলি প্রদত্ত এই গ্রামবাসীরা নিজেরাও জানে না হত্যালীলার শেষে তাদের নিট প্রাপ্তি কী। তারা কি সত্যিই কোনো কিছুর প্রত্যাশা নিয়ে লড়ছে, নাকি হর-হর গ্রামে ঝাঙৈড়াদের মতো দলবদ্ধ হয়ে ঢুকে পড়া অত্যাচারী পল্টনবাজদের সঙ্গে পেরে উঠছে না বলে মাঠারির পথ ধরতে বাধ্য হচ্ছে তারা? তারা এটাও জানে না যে, যুদ্ধকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার তাদের মতো অক্ষৌহিণী সেনার। ধনী, অবস্থাপন্ন ও ক্ষমতাধর মানুষেরা কখনো বিপদের পথে পা বাড়ায় না। তারা অন্যদের ঠেলে দেয়। আর কার্যোদ্ধার হলে প্রকাশ্যে এসে নেতৃত্বের বাহাদুরি দেখায়।

তবে প্রান্তিকজনেরা কী জানে আর কী জানে না, এবং যুদ্ধ ও জঙবাজদের নিয়ে তাদের ভাবনা আদতে কী—কত শত চাবুকের সহনশীলতার জন্য তৈরি তাদের চামড়া—এই সব কথা তুলে ধরার সময় হয়তো এখনো আসেনি। নি:স্ব অসহায় মানুষ একটু বেশিই ধৈর্যশীল হয়। সেই জন্য এই যুদ্ধকে জানার পাশাপাশি তাদেরকেও জানতে-বুঝতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

কেবল নীচুতলার গরিবদেরই নয়, জোতদার-জমিদার-ভূস্বামী আর বড় বড় আড়তদার- ব্যবসায়ীদেরও অংশ নিতে হয়েছে এই লড়াইয়ে। এমনও হতে পারে যে, ভেতরে ভেতরে এদের একাংশের উসকানিতে লাগানো হয়েছে প্রতিবেশী দুই অঞ্চলের মধ্যে যুদ্ধ। আর যুদ্ধ লাগলেও তাদের পরিবারগুলিকে তো মৃত্যুর গুনাগার দিতে হচ্ছে না, উলটে বিশেষ করে অসাধু ব্যবসায়ীরা এর সুফল ভোগ করবে। করতেই পারে। যুদ্ধের মতিগতি তো তা-ই বলছে। যুদ্ধের কারণে হঠাৎ করে শস্যদানাসহ অন্যান্য সব ধরনের নিত্যখাদ্য যে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে, তা কি সবটাই যুদ্ধেরই কারণে? সবকিছুই কি লাটের দরে কিনে গোরুর গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে মাঠারির জঙবাজরা?

প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে যুবককে বেছে নেওয়া হয়েছে লড়াইয়ের জন্য। মুষ্টি-অন্ন দিলেই কি আর না দিলেই কি। সেখানে একমাত্র ছাড় দেওয়া হয়েছে অবস্থাপন্নদের। চাষাভূষা, জমিদার ও তাদের অধীনস্ত কর্ষণযোগ্য ভূসম্পত্তির মালিক, সুদখোর মহাজন, শাখারি মহাজন, অঞ্চলের নামকরা বেপারি ও আড়তদার, লাক্ষা ও গালার কারবারিদের। বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে যুদ্ধ চালানোর জন্য মোটারকম সাহায্য। তারা দশ-বিশ হাজার পণ খড়, বহু ছৈ-বিহীন গো-শকট, চোর-ডাকাতদের কাছ থেকে কেনা ও বহু কালের জমিয়ে রাখা মরচে-পড়া পাঁজা-পাঁজা হাতিয়ার, কত-কত গোরুর গাড়ি, মোটা ভূতমুড়ি ধানের চাল আর মাড়ুয়া, গুন্দলু, কোদো, সেঁওয়া ইত্যাদি নিকৃষ্ট মানের শস্যদানা, বিঁড়াসহ জলের মস্ত মস্ত হান্ডা, কয়েক ঘড়া করে কাঁচা মুদ্রা, হুকুমদারদের কাজের জন্য টাট্টু ঘোড়া ও খচ্চর ইত্যাদি দিয়েছে। চর্মকাররা দিয়েছে গদা বানাতে বান্ডিল-বান্ডিল পশুর চামড়া, শাখারিরা দিয়েছে ঝুড়িভর্তি বাজন্ত শাঁখ, আদিবাসী অঞ্চলে হাতিয়ার ও কৃষিসামগ্রী বিক্রেতারা দিয়েছে শবদেহের কবর খুঁড়তে গাঁইতি-কোদাল, মাথায় করে মাটি বহনের জন্য বাঁশের ঝড়া এমনি বহু-বহুকিছু।

চতুর্দিকের গ্রামগুলি থেকে সৈন্যবাহিনী যেমন গো-শকট বোঝাই হয়ে আসছে, তেমনি আদুড়গায়ের বল্লমধারী মছেল প্রহরীদের নিয়ে কাড়ার গাড়িতে গাড়িতে এখনো আসছেই এইসব রসদ। দূর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই বিপুল পরিমাণ রসদ ও সামগ্রী মাঠারির চালাঘরগুলিতে দৈনিক হোড় করা হচ্ছে। রাতে যেকোনো মুহূর্তে শত্রুপক্ষের সশস্ত্র হানাদারিতে তা লুট হয়েও যেতে পারে এই আশঙ্কায় স্থানে স্থানে রাত জাগছে ত্রিশূল হাতে গোলসিপাই। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে গভীররাত অব্দি চক্কর মারছে ঘোড়সওয়ার হুকুমদারের দল। জ্বলছে অগণিত মশাল। হঠাৎ-হঠাৎ টিলার পাদদেশে দূরবর্তী অগ্নিকুন্ডগুলি থেকে শোনা যাচ্ছে হরিধ্বনি ও খোলকীর্তন।

অঞ্চলের প্রতিপত্তিশালীরা এতকিছু দেওয়ার পরও, তাদের পরিবার থেকে কোনো সদস্য যুদ্ধে সামিল হয়নি বলে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ‘জঙ-ভেজা’ও নেওয়া হচ্ছে।

‘জঙ-ভেজা’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘যুদ্ধের চাঁদা’। বাস্তবে কিন্তু এই চাঁদা হলো অবস্থাপন্ন পরিবারের পক্ষ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো ক্রয় করা যোদ্ধা—কোনো আদিবাসী যুবক। এরা অনেকটা ক্রীতদাসের মতো। চাষাভুষা-জমিদাররা ওই যুবকদেরকে তাদের দরিদ্র বাপ-মায়ের কাছ থেকে শস্যের বিনিময়ে নিয়ে আসে। তাদের হাতে বছরভর খাবার মতো কয়েক মণ ধানের সঙ্গে বাঁশের ঢাউস ঝুড়িতে মুড়ি-চিড়া-ভুট্টা-রমাকলাই-বড়ধনা, মাটির কুমে আখের গুড় আর মালসা ভর্তি কমা নুন—যা কেবল গবাদিকেই খাওয়ানো চলে—পাঠিয়ে দেয়। আর নিয়ে আসে সেই যুবককে। তারপর তাকে পল্টনদারদের হাতে তুলে দেয় তার ‘জঙ-ভেজা’ হিসেবে।

বলাবাহুল্য, জঙ-ভেজাদের যখন পল্টনবাজদের কাছে লড়াইয়ে জন্য পাঠানো হচ্ছে, তখন ঢোল-বাঁশি-শাঁখ বাজিয়ে তাদের জন্য কোনোরকম বিদায় অনুষ্ঠান করা হয় না। এদের ভবিষ্যত পরিণতির কথা চিন্তা করেও কেউ বিদায়-লগ্নে শোক করে না, মনও বিষণ্ণ হয় না কারো। জীবনের স্তব্ধতা নিয়ে এরা নির্বাক ‘চালান-গাড়ি’তে উঠে পড়ে। যুদ্ধে চলে যায়। দু-দশ ক্রোশের পথ। সঙ্গে নেওয়া চিঁড়া-মুড়ি বৃদ্ধ গাড়োয়ানের সঙ্গে গাছতলায় বসে বিরসবদনে খায়। এদের যুদ্ধযাত্রা মানে অগস্ত্যযাত্রা। এরা কখনোই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে জীবিত অবস্থায় আপন পরিবারে ফিরে আসতে পারে না। হয় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ যায়, নতুবা যুদ্ধের কাজে ক্রীতদাসের জীবন তাদেরকে ধুনুরির তুলোর মতো করে ছাড়ে। ডেকে আনে অকাল মৃত্যু।

প্রকৃতপক্ষে, মৃত্যু হলেই বরং ‘জঙ-ভেজা’রা বেঁচে যায়। জীবিতাবস্থায় দিনেরাতে বহু মৃত্যুর সামনা করতে হয় তাদের। বহু অত্যাচার, যৌন-পীড়ন, অনিয়মিত অত্যল্প আহার-নিদ্রায় তাদের দাসত্বের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। মাঠারিযুদ্ধেও তাদের তেমনিই দশা।

‘জঙ-ভেজা’রা আদিবাসী যুবক বলে, তাদের শরীর যেমন বলশালী হয়, কর্মঠ হয়, তেমনি শরীরের গড়নও আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। এই কারণে এরা যুদ্ধক্ষেত্রে হুকুমদার, গোলসিপাই বা পল্টনবাজদের বিশেষ পছন্দের নজরে পড়ে যায়, বিশেষত, প্রতিদিন যুদ্ধের বিরাম ঘোষণা হওয়ার পর অন্ধকার নামতে না নামতে। এই সময় মাঠে অসংখ্য মশাল জ্বেলে দেওয়ার কাজ ‘জঙ-ভেজা’দেরই করতে হয়। করতে হয় সহিসের কাজও। গোরু-ঘোড়ার লাদ ফেলতে হয়, খড় দিতে হয়। মাথায় হান্ডা চাপিয়ে জলাশয় থেকে জলও আনতে হয়। এছাড়াও দিনভর হাজার-একটা কাজ যে তাদের হিল্লেয় ফেলে রাখা হয়! টিলার শীর্ষদেশগুলি থেকে একসঙ্গে বহু শঙ্খের ধ্বনি তুলে যুদ্ধে বিরতি পড়লে তাদের কাজ যেন আরো বেড়ে যায়। তারা দু-দন্ড বসে জিরিয়ে নেবারও ফুরসুৎ পায় না।

চাপাইসিনির রংলাল টুডু মশাল জ্বালতে জ্বালতে অনেক দূর চলে যায়! এখন সে একটু বিশ্রাম নিতে চাটান পাথরে গা এলিয়ে বসে পড়ে। পায়ের কাছে ফেলে রাখে হাতের জ্বলন্ত মশাল, ভেরেন্ডা তেলের পাত্রটিও।

মাঠারিক্ষেত্রের দু-পাশেই দূরে দূরে অবস্থিত কুন্ডগুলি থেকে হলহল করে উঠছে আগুনের শিখা। প্রতিটি কুন্ডকে ঘিরে রয়েছে পাঁচ-দশ জন করে জঙ-ভেজা। বেলা পড়া মাত্র দু-পক্ষের লড়াই থেমে গেলে তারা মৃতযোদ্ধাদের কুকুর-শেয়ালের মতো করে সেই জঙ্গলের ভেতরে টানতে টানতে নিয়ে যায়। এখন যদিও জঙ্গল নেই। সেসব জায়গাগুলোতে এখানে-সেখানে তারা মৃতদের সৎকারের ব্যবস্থা করে। একটি-দুটি নয়, একেক দফায় দশ-বিশটি দেহকে গণচিতায় ফেলে পোড়ানো হচ্ছে। কখনো কখনো কবরও দেওয়া হচ্ছে। কবরের মাটি খোঁড়া বা শ-য়ে চাপানোর ব্যবস্থা করার কাজে লেগে রয়েছে বিভিন্ন দরিদ্র পরিবার থেকে আসা জঙ-ভেজারা। প্রয়োজন পড়লে তাদের কাঁড়বাঁশ নিয়ে শত্রুপক্ষের সঙ্গে লড়াইয়েও নামতে হবে। হচ্ছেও।

রংলাল টের পায় কখন একটি ঘোড়া এসে দূরে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে খুরের শব্দও পায়নি সে। মশালের আলো থেকে মুখ তুলে সে আচমকা যখন সেই অন্ধকারের দিকে চোখ মেলে, দেখে ডাকাতের মতো একটি বলশালী ছায়া এগিয়ে আসছে তার দিকেই। ঘোড়া দেখে বুঝে যায় ছায়াটি হুকুমদারের। এখানে তাদের নির্দেশ মেনেই রংলালদের কাজ করতে হয়। তাই হুকুমদারটিকে দেখে সে চমকে উঠল না। সে আবার মশাল হাতে নিয়ে তার কাজের জন্য উঠে পড়ে। কিন্তু তাকে সে-কাজ আর করতে হয় না। সে দেখে চারপাশের অন্ধকারের মাঝে মশালের সোনালি আভায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠা তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে সেই হুকুমদার।

এই দৃষ্টির সঙ্গে এখনো পরিচিত হয়ে ওঠেনি রংলাল। সে তো এসেইছে কাল। ভয়াবহ অনটনের সংসারে তার বৃদ্ধ বাবা, মা ও বোনকে ফেলে। বোনের নাম লুলকি। গেল বছরই তার বিয়ে হয়েছে। কিন্তু কয়েকমাস সংসার করেই লুলকি বুঝে যায় তার স্বামীর মন বাঁধা আছে অন্য এক প্রতিবেশী বিধবা বউয়ের কাছে। বউটির মুখের গড়ন ভালো, শরীর-স্বাস্থ্যও আছে। তার মরদ তার ভরা শরীরের ভালোবাসা পেয়ে নতুন বউকে সামান্য আদরটুকুও আর করে না। বহু বলাবলি করেও কিছু হয়নি। শেষতক পড়শি ডেকে, থালা-বাসন-গোরোয়া-বাটিঘটি আর হাতের লুহা ফেরত দিয়ে তাকে চাপাইসিনিতেই ফিরে আসতে হয়েছে। বাপের ঘরে। এখন সে দিনভর ঝুড়ি মাথায় জঙ্গলে জঙ্গলে ঘোরে, কাঠপাত কুড়িয়ে বেড়ায়, বেলাডুবু বোঝা মাথায় নিয়ে ঘরে ফেরে।

এখানে আসার পর থেকে সদ্যযুবক রংলালের বোনের জন্য মন খারাপ করতে থাকে। তার মধ্যেও সে যুদ্ধের কাজ করে চলেছে। যদিও, সেই দূর প্রত্যন্ত গ্রামে থাকা তার ঘরের লোকেরা জানে না যুদ্ধের নামে সে কোথায় কোন নরকে এসে পড়েছে। সে নিজেও এখনো তা জানে না।

কিন্তু এখন, এই রাতের অন্ধকারে, হুকুমদারের চাহনিকে তার অন্যরকম মনে হল। তার মধ্যে যদিও কোনো ক্রূরতা নেই, চাঞ্চল্য নেই, এমনকি যা তাদেরকে হুকুমদার বলে চিনিয়ে দেয় সেই ভয়াবহতাও যেন এই মুহূর্তে তার নজর থেকে উধাও। উলটে, তার মধ্যে কোথাও নৈকট্যের আবেদন টের পায় সে। হাতের মশাল হাতে ধরে থেকেই রঙলাল তাকে শুধায়, ‘হুকুমদার, কী খুঁজছ? কী লিবে তুমি?’

হুকুমদার আরো এগিয়ে আসে কিশোরটির অনাহত শরীরের দিকে। অনাহত, কারণ, এখনো তাকে অন্য কোনো হুকুমদার বা গোলসিপাই ছুঁয়ে দেখেনি। সে প্রায় তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, রংলালের কোমল মুখের ওপর থেকে চুলের গোছা সরিয়ে দেয়। তার হাতের জ্বলন্ত মশালটিকেও ছুঁড়ে দেয় তফাতে। মুখ থুবড়ে পড়ে থেকে দরদর করে জ্বলতে থাকে সেটি। তারপর, রংলালের জিজ্ঞাসার কোনো জবাব না দিয়ে সে তাকে টেনে নিয়ে চলে যায়। চলে যায় সেইখানে, যেখানে সে রেখে এসেছে তার ঘোড়াটি।

প্রভুকে দেখে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রাণীটি হ্রেষা রব তোলে।

এবার অন্ধকারে লোকটির শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থেকে কিছুটা যেন অন্যরকম বোধ হয় রংলালের। ভয় নিয়ে সে আবার বলে ওঠে, ‘হুকুমদার! হামাকে ছাইড়ে দাও। কুথাকে নিয়ে যাবে হামাকে? ঢেরগুলা মশাল এখনো জ্বালতে বাকি!’

হুকুমদারের কথা বলতে মোটেই ইচ্ছে হচ্ছিল না। এমনকি, এই আনকোরা যুবকটির মুখ থেকে কোনো কাজের কথা শুনতেও তখন মন চাইছিল না তার। অবশেষে কতকটা ভাঙা গলায় সে অনুচ্চস্বরে বলে, ‘হামি তকে ঘঁড়ায় চাপাব।’

‘হঁ?’

‘হঁ।’

মন বেশ খুশি খুশি হয় রংলালের। বলে, ‘হামদের গাঁয়ে একটাও ঘঁড়া নাই। জমিদার ঘরেও নাই। তার হতে চাপাইসিনির কৌ ঘঁড়া চলাতেও জানে নাই।’

‘হামি তকে শিকাব। ঘঁড়া ছুটাতে। শিকবি তুঁই?’

‘হঁ! ক্যানে নাই শিকব?’

হুকুমদার আর কোনো কথা না বলে রংলালকে তার রাক্ষসের মতো শরীরের বলে ঘোড়ার পিঠে তুলে নেয়। নিজে সে জুত করে বসে তার পিছনে। তারপর মশালের আলোর দিকে না গিয়ে সে কেবল অন্ধকারের মধ্যে মাঠারিকে চক্কর কাটতে থাকে। আর নিজের শরীরে ঢেউ তুলে তুলে সে পিছন থেকে ঢুঁসো মারতে থাকে রংলালকে।

রংলাল হুকুমদারের শরীরের উষ্ণতা অনুভব করে। ভালোও লাগে তার। সে আরো পিছিয়ে আসে। হুকুমদার তার হাতে লাগাম দিয়ে বলে, ‘লে, ধর!’

একসময় তারা আরো অন্ধকারের দিকে চলে যায়। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে।

রংলাল তখনও অবোধ কিশোরের মতো মিষ্টি করে বলে, ‘আর ঘুরবে নাই? ইবার চলে যাবে?’

‘নাই।’

হুকুমদার তাকে নিয়ে ঘাসের ওপরে শুয়ে পড়ে। আদর করতে থাকে। মশালের পর মশাল জ্বলতে থাকা রাতের যুদ্ধক্ষেত্রকে দেখিয়ে বলে, ‘দেখ! এমন কোবৌ দেখেছিস?’

‘নাই দেখি কোবৌ! মনে হছে যেমন দেওয়ালি পরব লাইগেছে!’ মাঠারির যুদ্ধক্ষেত্রে অভূতপূর্ব এই অকাল দীপাবলির শোভা দেখে মুগ্ধ রংলাল।

২৪

দেখতে দেখতে আষাঢ় পেরিয়ে গেল। পেরিয়ে গেল বর্ষা। বৃষ্টি তেমন হল না। বৃষ্টি হোক বা না হোক, যুদ্ধ কিন্তু থেমে নেই। পরব-পালির দিনগুলিতে বিরতি দিয়ে যুদ্ধ চলতে লাগল পুরোদমে।

মৃত্যু, মৃত্যু আর মৃত্যু! জায়গায় জায়গায় কত যে শব দাহ করা হচ্ছে! কত কবর খোঁড়া হচ্ছে। হাঁপিয়ে উঠছে জঙ-ভেজারা। অনেক সময় মৃতযোদ্ধার গায়ে বিঁধে থাকা কাঁড়ও খুলে নেওয়া হচ্ছে না, হয়তো-বা তার আর প্রয়োজন নেই। তিরবিদ্ধ অবস্থাতেই শ-য়ে চাপান হচ্ছে। খোল-কীর্তন চলছে ঢেররাত অব্দি। তারপর আঁচড় কেটে কবরের আলগা মাটি সরাতে আসছে বাঘা-বাঘা কুকুর। এত শিয়ালও যে কোথা থেকে আসছে! ভোরের অন্ধকার কাটলে তবে থামছে তাদের তান। দূর থেকে ভেসে আসা সেই শোকধ্বনি শুনে মনে হয় যেন বহু গ্রাম ইতিমধ্যে উজাড় হয়ে গেছে। পড়ে আছে তাদের কাঠামো। সভ্যতার অক্ষম চিহ্নগুলি।

অখন্ড অঞ্চল ব্যাপী পড়তে লাগল সেই যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব। ক্রমেই তা আরো ভয়াবহতার দিকে যেতে লাগল। এই বিশাল ভূখন্ডে শতশত গ্রামের মধ্যে এমন একটি ডিহিও থাকল না, যেখানে মাঠারির আঁচ পৌঁছলো না। শুধু আঁচ নয়, বলা যেতে পারে সর্বত্র যেন দাবানলের উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে ইতিমধ্যে সংঘটিত হয়ে যাওয়া তিনমাসের এই যুদ্ধের। গ্রামবাসীরা হয়ে উঠছে দিশাহীন।

যুদ্ধের চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে চাষিদের বেশি উদবিগ্ন করে তুলল খরা। এলাকার মানুষ একটিমাত্র চাষের ওপরে সম্বচ্ছর ভরসা করে থাকে। ধানই হল এখানকার মূল অর্থনৈতিক ফসল। এমনিতেই কর্কটক্রান্তি রেখা থাকায় জলবায়ূ অত্যন্ত উষ্ণ, গাছপালাও নি:শেষ করে দেওয়া হচ্ছে বলে সেই উষ্ণতা আরো বাড়ছে, বছর বছর বাড়ছে তাপপ্রবাহ, ব্যাপক হারে কমছে গড় বৃষ্টির পরিমাণ। এলাকাটি খরাপ্রবণ বলে একেক বছর ভয়ঙ্কর জলাভাব দেখা দেয়, খরার কারণে আমন চাষের আশা ছেড়েই দিতে হয়। তখন সেই খরা থেকে বাঁচতে তাদের ভাবতে হয় বিকল্প কিছুর কথা।

যুদ্ধের আগে-আগে মাঠারির যোজন-যোজন বিস্তীর্ণ জঙ্গল প্রায় শেষ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও সমগ্র এলাকা জুড়ে অরণ্যনিধন চলছে বহু বছর ধরে, অসাধু ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে। নতুন করে কোথাও একটি গাছও লাগানো হয়নি। এখন সেই ঘন সবুজ অরণ্য বলতে আর কিছু বেঁচে নেই, জঙ্গলভূমিগুলিতে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে ছাড়া-ছাড়া কিছু পুরোনো গাছ। নদী-পুকুরও মরতে বসেছে। কোথাও আর নদীর কলতান শোনা যায় না। সিঙসিঙ করে তারা যেন এখনো প্রাণের দায়ে বয়ে চলেছে।

যুদ্ধ থেমে নেই। চলছেই।

অনেক বছর পর ফিরে এল সেই পরিস্থিতি। ফিরে এল অজন্মা। হাহাকার পড়ে গেল গ্রামে গ্রামে। যারা একটু সময় থাকতে বতর বুঝে রুয়ারুয়ি শেষ করতে পেরেছিল, তাদের জমিগুলি থেকে শস্য কিছু উঠে এল বটে, কিন্তু ছোটো চাষিরা মার খেয়ে গেল। অন্য বছর চাষ ঠিকঠাক হলে যা ধান পাওয়া যায়, এবার পাওয়া গেল তার অর্ধাংশ। যার ঘরে কামিন-মুনিষকে দিয়েও বছরভর খাওয়ার জন্য পাঁচখন্ডি ধান মজুত থাকে, তার খামারে পুড়া বাঁধার মতো ধানই রইল না।

তবে যারা ধান তুলতে পারল না, তারা শাকসবজি বুনে কিছুটা আয়-উপায় করার চেষ্টা করল। শীতের দিকে আলু-কপি-আখের সঙ্গে সঙ্গে ছোলা-বাদাম পেল। ডাঙা-কানালি জমিগুলি থেকে পেল রাহেড় আর বিরির ডাল। আর বিস্তর ভুট্টার চাষ করে গাড়িবোঝাই করে ঘরে তুলল ভুট্টা। এখন এই ভুট্টার ভরসায় তাদের বছর ঘুরাতে হবে। বাঁচিয়ে রাখতে হবে শিশু-বৃদ্ধ নিয়ে একেক পরিবারের দেড়-দুগন্ডা ক্ষুধাকাতর জীব।

এই পরিস্থিতিতে দোকান-বাজারে জিনিসপত্রের দরে আগুন লেগে গেল। তার চেয়েও বড় কথা, সাপ্তাহিক হাটগুলিতে দিনে-দিনে চাষিদের আসা বনধ হয়ে যেতে লাগল। যাদের হাতে পয়সা আছে, তারা ছ-কড়ার ধন ল-কড়ায় কিনছে। গরিবরা খাচ্ছে আধপেটা, তাও শুদুরুখু।

তবে চাষিরা তার সামান্য পণ্য নিয়েও হাটগুলিতে যে একেবারে আসছে না, তা নয়। অনেকের না এসে তো উপায়ও নেই? তেল-নুন-হাটমশলা কিনতে কাঁচা টাকা পাবে কোথায়? আসলে, তারা গ্রাম ছেড়ে হাটের দিকে আসতে, পথে দাঁড়িয়ে তাদের মাল কিনে নিচ্ছে আড়তদাররা। হাটে গেলে আরো বেশি দামে কিনতে হবে বলে চাষি হাটে ঢোকার অনেক আগেই তার মাথা থেকে চাল-সবজির ঝুড়ি তারা পথের ধারে টেনে নামিয়ে নিচ্ছে। যতটা সম্ভব দরাদরি করে, কখনো-বা জুলুমেও, ধড়িবাজ পাইকার ও আড়তদাররা একরকম ছিনিয়ে নিচ্ছে চাষির মাল। এমনকি, শোনা যাচ্ছে, কোনো কোনো জায়গাতে নাকি লুটও হচ্ছে। কোথাও অভুক্ত অনাহারী গ্রামবাসীর দল, কোথাও আবার যুদ্ধবাজরাই লুটছে যুদ্ধের নামে। এই ভয়েও অনেক-অনেক চাষী গ্রামীণ বাজারগুলিতে আসতে সাহস পাচ্ছে না। কেউ-বা আসতে চাইলেও, হুকুমদারদের গো-যান দূরে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে দেখলে, ঘর থেকেই বেরোচ্ছে না।

এই সুযোগটিকে আপন ভবিষ্যত ও সুদিনের কথা ভেবে প্রবল উদ্যমে কাজে লাগাচ্ছে আড়তদাররা। যতটা পারছে শস্য তারা ধরে রাখছে। মজুত করছে। কোনো কোনো আড়তদার যেখানেই চাষ কিছুটা ভালো হয়েছে খবর পাচ্ছে, সেখানে বস্তা-পাল্লা-বাটখারাসহ গোরুর গাড়ি ছুটিয়ে সবার আগে হাজির হয়ে যাচ্ছে। দূর-দূরান্তের প্রান্তিক গ্রামগুলির দিকে তাদের নজর বেশি। সেইসব গ্রামের মানুষ একদিকে যেমন সরল, নিরীহ, তেমনি অসহায়ও। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহু দুর্দিনের ভেতর দিয়ে গেছে। কখনো জমিদারদের অত্যাচারে, কখনো-বা মহাজনের দাদন নিয়ে দাদন শোধ করতে না পেরে গ্রামছাড়া হয়েছে। শীর্ণকায় অভুক্ত বউ, ছ্যেলা-ছঁড়া, কোলে দুধের শিশু, আর মাথায় পাট-করা বাবোই দড়ির খাট ও কবজিতে গলাসি পাকিয়ে ছাগল-ভেড়ি নিয়ে পালিয়েছে কানা রাতে। বসতি করেছে দূরে কোথাও। সেই জীবনও আবার জীবনে ফিরে এসেছে। জীবন যে বড়ো চুতিয়া!

তো, সেই অভিজ্ঞতা থেকে তারা মনে করে দুর্দিন আসে দুর্দিন কেটে যায়। এই আক্রাও কেটে যাবে। কিন্তু এবারের ছবি যে অন্যরকম। যুদ্ধের কারণে আসন্ন ভয়াবহ দুর্দিনের মাত্রাও তারা অনুমান করতে অপারগ। আকাল আসছে দানবের চেহারায়! ভ্রাম্যমাণ চতুর আড়তদারের দল তাদের খামার থেকে চাল-ধান বোঝাই করে নিয়ে আসছে। সেই সব শস্য ঘরের মেঝেতে ঢেলে কাঁড়ি করছে, বড় কাঁটা ঝুলিয়ে ওজন করছে, তাবাদে মণের হিসেবে বস্তায় রাখছে সুতলি দড়ি দিয়ে মোটা ছুঁচে সেলাই করে। তাদের প্রতিটি ঘরের মেঝে থেকে মুধুন অব্দি লাট লেগে যাচ্ছে সেই বস্তা। ঘর ভরে গেলে শিকল তুলে কুলুপ এঁটে দিচ্ছে। কেবল দিনে নয়, তাদের ঘরগুলিতে রাতেও চলছে এই কাজ। রাতেই বেশি, যতটা সম্ভব গোপন রাখতে। লোকের নজরে যাতে না পড়ে। বাইরের পরিস্থিতি তো ভালো নয়। যুদ্ধ যদি না থামে তবে সামাল দেওয়া মুশকিল হবে। গ্রামগুলিতে এখন আকালজনিত তুষের আগুন পিঙ-পিঙ জ্বলছে।

মাল এভাবে তাদের বাসাঘরে, গুদামে ‘রাখি’ করে ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম আকাল সৃষ্টি করে চলেছে। যুদ্ধ যদি আরো দু-তিনটি চাষের সময় পের করে দিতে পারে, তাহলে মজুত করা মালের যে-দাম তারা পাবে, তাতে সাতপুরুষের বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। তারা দূরদর্শী। বুঝতে পারছে, যুদ্ধ এখনি-এখনি থামার কোনো লক্ষণ নেই। যুদ্ধবাজদের উন্মাদনা কমছে না। আরো প্রবলভাবে রসদ সংগ্রহের অভিযান চলছে, এবং দু-পক্ষই কঠোর অঙ্গীকারে সমানভাবে পরস্পরের শত্রুনিধন করে চলেছে। বেড়েই চলেছে শবদাহ।

ইতিমধ্যে বাজারে অভাবনীয় টান দেখা গেল নুনের। এক পাই নুনের দাম পাঁচ পৈলা ধানের সমান। এমনটা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। এমনকি হাটমশলার বেপারিরাও ভাবেনি। তাই নুন নিয়ে চলছে বেধড়ক কালোবজারি।

কিন্তু নুনের এই কালোবাজারি বেশি দিন চলবে না। গোলদারি বেপারিদের ঘরে দশ-বিশ বস্তার বেশি নুন মজুত থাকে না। তাও সেসব বস্তা দোকানঘরের বাইরেই ফেলে রাখা হয়, ঘরে ঢোকানো হয় না। কিন্তু নুনের বাজার-দরের এই হাল দেখে অনেকে নুন ঘরে ঢুকিয়ে বিক্রিই বন্ধ করে দিল। দুষ্প্রাপ্যতার অজুহাত দেখিয়ে দাম হাঁকাতে লাগল বিশগুণ। কারণ তারা বুঝতে পারছে বহু দূরে দূরে অবস্থিত উত্তরের গ্রামগুলি থেকে নুন আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এক তো, গ্রামবাসীরা যাতে যুদ্ধে যোগ না দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে তাই পালিয়ে যাওয়ার পথগুলি জঙ-সিপাইদের দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ভাড়া করা গোরুর গাড়িতে নুন বোঝাই করে নিয়ে আসে শূদ্রদের সেইসব গ্রামগুলি থেকে। কিন্তু গ্রামের সকল গো-শকট যুদ্ধের কাজে নিয়ে নেওয়ায় বাহনের অভাবেই নুনের বাজারে আগুন! খা কী খাবি।

২৫

যোদ্ধৃ-পরিবেষ্টিত সেই বীরবাহু পাটন, নিদ্রার সময়টুকু বাদে কোনো সময় তার গা থেকে রণসজ্জা খুলে রাখছে না। মাঠারির জ্যোৎস্না যখন ভুবন জুড়ে রয়েছে, তখনও, পাটন কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখেনি তার মহাভার ধনু, আর পিঠের কাঁড়ভর্তি তূণের বোঝা। কতরকম লতাপাতা, শিকড়-বাকড় দিয়ে দক্ষ হাতে সুচারুরূপে বোনা তার আদিবাসী যোদ্ধামুকূটটি। অর্জুন, কাঠকড়ি আদি বিবিধ শুকনো ও শক্ত বুনো ফলের বোঝা তার কন্ঠ-বক্ষ ও পেশীবহুল বাহুর অলংকার। পরনে নিজের হাতে বল্লম ছুঁড়ে বধ করা শৃগালের লোমশ চর্ম, যার দুর্গন্ধ এখনো পুরোপুরি উবে যায় নি। হাওয়া চললে ভুসভুস করে বেরচ্ছে। তাতেও সে ভ্রূক্ষেপহীন। কত-কত শিয়ালকে যে জঙ্গলে পাতপালহা জড়ো করে সে পুড়িয়ে একাই খেয়েছে! মরা-পচা কোনো গন্ধ তার নাকে কটু ঠেকে না। জারমণি ছাড়া মাঠারিলোকের কোনো কিছুতে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। পোশাক তো পোশাক। ভারী পদতলে গিরগিটি-সরীসৃপকেও সে বেকসুর পিষে, মাড়িয়ে চলে যায়। তাকে দেখতে পাহাড়ি সুন্দ থেকে সদ্য বেরিয়ে আসা গুহামানবের মতো লাগছে।

আজ বহুদিন বাদে, কী মনে হল, যুদ্ধকালীন শৃঙ্গ-শিবির থেকে এই চাঁদনি রাতে বেরিয়েও চাঁদের দিকে সে চেয়ে দেখল না লড়াকু মোষের মতো তার মস্ত মাথাটি শূন্যে কাত করে। হাতে মশাল ছাড়া সে শৃঙ্গ থেকে ধাপে-ধাপে নেমে এল মালভূমিতে। আবার উঠল তার লাগোয়া পাশ্ববর্তী চূড়াটিতে। এমনি একটার পর একটা মালভূমি ও মালভূমি থেকে পরবর্তী শৃঙ্গে উঠতে উঠতে একসময় সে এসে দাঁড়াল রতিগড়ে। যদিও, জারমণির পর্ণকুটিরের কাছে ঠেসল না, তার থেকে ঢের তফাতে আবছায় দাঁড়িয়ে পড়ল, হঠাৎ যখন সে দেখল জারমণিকে। দেখল তার সেই কাল্পনিক রূপনগরের নারী, অংশত উদবিগ্ন ও ভিন্নমনস্ক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে আসমানে। সদাহাস্যময় চন্দ্রমার দিকে।

পাটন জারমণির মতো করে সেই আলোকিত ভুবনের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হতে চাইল না। মুগ্ধ ও আত্মহারা হওয়ার সময় তার এখনো আসেনি। এখন এই যুদ্ধই তাকে দিয়েছে উন্মাদনা, দিয়েছে জয়ের স্বপ্ন। তাছাড়াও, সে তো এই নারীর কাছে পূর্বপ্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে রয়েছে—যতদিন না তার জয় ছিনিয়ে এনে এই নারীর পদাম্বুজে নিবেদন করছে, শতশত শঙ্খ বাজিয়ে এই ভয়াল যুদ্ধের যবনিকা টানছে, ততদিন সে না জারমণির কুটিরে ঢুকবে, না তাকাবে ওই চাঁদের দিকে। চাঁদই তো জারমণি। সেই চাঁদের পানে তাকিয়ে সে এখনি নিজেকে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন রাখতে চায়নি, চায়নি অমীমাংসিত যুদ্ধের ভার নিয়ে, ক্ষণিকের অবসরেও এসে রতিগড়ে দাঁড়াতে। সে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, কার্যত, কিছুটা হলেও তার অঙ্গীকার রেখেছে। শাসন করেছে নিজেকে।

আর সেখান থেকেই, খুশিতে-উল্লাসে হাসতে হাসতে, জারমণির হীরকখন্ডের ন্যায় আসমানমুখী নজরকে তার দিকে আকৃষ্ট করতে চাইল সে। গর্বের সঙ্গে তার স্বভাবসিদ্ধ উদাত্ত গলায় বলে উঠল, ‘রানি! আর আসমান নয়! অচিরেই আমি তোমার অতুল-প্রতিমা-আঁখিকে নামিয়ে আনব মর্ত্যে। তুমি দেখবে আমাকে। শুধু আমাকেই! দেখবে আমার মধ্যে তোমার প্রিয় নিভাননকে। আর তখন তোমার সে-নজর প্রহর-পক্ষ-মাসাবধি তুমি সরিয়ে নিতে পারবে ন। আমার এই শিরস্ত্রাণ থেকে বিচ্ছুরিত জয়ের চন্দ্রাভা তোমাকে অহরহ আবিষ্ট করে রাখবে! তুমি তো যুদ্ধ ও জয়ই চেয়েছিলে? ভয়ংকর লেলে-মাছির পাল সরিয়ে তোমার হাতে বাঘা-মৌচক্র তো চাওনি? বহু পাহাড়-জঙ্গল-নদীনহর নিয়ে আদিবাসী সাম্রাজ্য তো চাওনি? তুমি চেয়েছিলে এই অখন্ড সাম্রাজ্যের সর্দারের গর্বিত পত্নী ও অনুবর্তিনী হতে। চেয়েছিলে আদিবাসী-দলপত্নী হতে। আমি তোমার সেই মনোবাঞ্ছা পূরণে আমার প্রসারিত বক্ষে সহোদরের সহস্র তিরের মৃত্যুযন্ত্রণাকেও ভ্রুক্ষেপ করবো না!

‘রানি, সমাজ একথা প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও আমি এটাই সত্য ও ধ্রুব বলে জানি—জগতে সকল দ্বন্দ্বের শুরু অভীষ্ট নারীকে না পাওয়ার অসন্তোষ থেকে, আর সকল অসন্তোষের মীমাংসা জয় দিয়ে। পুরুষের জয় ও নারীর সমর্পণ জগতে এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আর কিছুই হয় না। এই মুহূর্ত-সৃষ্টির আয়োজনে জগৎ চঞ্চল। আমিও সেই মুহূর্তের অপেক্ষায়।

‘জয়! জয়! জয়! কী শ্রুতিমধুর শব্দ! রানি, তোমার হাতে মধুরতা সমর্পণ করতে আমি ভূলোক-দ্যুলোকে এমন কিছু নেই যা করতে পারি না। আমার আসন্ন জয় হবে তার কালজয়ী নিশান! জয় তো আর অধিক দূরবর্তী নয় গো রানি! যতখানি তফাতে আজ আমি তোমার থেকে, তোমার আভরণশোভিত মহাগোধূমতুল্য যোনি থেকে, ততোখানিই তফাতে আজ আমার জয়। একদিন তুমি আমাকে যোজন মাইল দূরে পাঠাতে চেয়েছিলে, যখন আমি যুদ্ধের কারণে তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনি। আর আজ? দেখো, রানি, দেখো! আজ কেমন আমূল পালটে গেছি। আজ সেই যুদ্ধের সূত্র ধরেই আমি তোমার থেকে ভূমিতে পতিত এক শিমুল বৃক্ষ দূরে! মাত্র এক শিমুল বৃক্ষ!’

জারমণি সেই শৃঙ্গের মাথায় দাঁড়িয়ে বাঁদিকে মন্থরগতিতে তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। তাপ-উত্তাপহীন। প্রতিক্রিয়াহীন সে। যেন এই পুরুষটির এত দম্ভবাক্য শুনেও সে শোনেনি। যেন এখন সে তাকে দেখেও দেখছে না। অন্ধকারে অস্পষ্ট কী বিরাট দেহ নিয়ে দন্ডায়মান সে! যুদ্ধ যত তার রোমহর্ষক পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে, যত মৃত্যু হচ্ছে, ধ্বংস যত প্রবল হচ্ছে, ততই যেন কুম্ভকর্ণ-সদৃশ হয়ে উঠছে সে। তার এই ক্রমশ বৃদ্ধিশীল বিষম শরীর দেখে জারমণির কী মনে পড়ছে তাকে উদ্দেশ করে বলা অঙ্গদের সেই উক্তি?

এই অশুভ রাক্ষসবৎ দেহকে উদ্দেশ করে অঙ্গদ একদা বলেছিল, তার এই দেহ অখন্ড সমাজ ও মানবাত্মার পাপের প্রতিভূ। এই দেহ যত ক্রমবর্ধমান হতে থাকবে, যতই সে আস্ফালন করবে, ততবেশি সমাজ কলুষিত হবে। হিংসা ও পাপাচারে ভরে যাবে মনুষ্য সমাজ। তাই এই রাক্ষসদেহ ধ্বংস হবেই! পতন তার অবশ্যম্ভাবী! এমন কথাই তো সে বলেছিল, বলেনি?

হয়তো সেই দৈব আজ্ঞা পালন করতে অঙ্গদকেও শেষতক হতে হয়েছে মহাকায়াধর। মহাপ্রবীণের কাছে শপথ করে, তাঁর বরাভয় নিয়ে, সে তুলে নিয়েছে ধনুর্বাণ, যা দিয়ে সে তাকে চিরকালের জন্য বাকহীন ও নি:শেষ করবে। মাঠারিকে করবে রাহুমুক্ত। তবেই সে ফিরে আসবে মানবদেহে।

জারমণি কী ভাবছে কে-জানে। পাটনের দিকে তাকিয়ে থেকেও সে তাকে দেখছে না। এই প্রথম মাত্রাতিরিক্ত উদবিগ্ন মনে হয় এই দুর্বোধ্য ও মিতবাক নারীকে। মনে হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে জায়গায় জায়গায় প্রতিদিন শনশন করে জ্বলতে থাকা চিতাগুলি থেকে সে এবার তার মুখ ঘুরিয়ে নিতে চায়।

ধর্মত, এখন আর সে চায় না ধরিত্রীর বুকে এত চিতার আগুন জ্বলুক। তাও একটি নারীকে নিয়ে। নারীজীবনের প্রতি যেন তার ধিক্কার জন্মাচ্ছে। আর কেউ কিছু বুঝুক না বুঝুক, মাঠারিক্ষেত্রে পুড়তে থাকা এই জীবনগুলি থেকে জীবনের চিরতরে ধ্বংসের আগাম বার্তা সে পেতে চলেছে। দেখতে পাচ্ছে কালের মহাগ্রাসকে। আর শুনতে পাচ্ছে ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসা জীবনসংগীত।

কিন্তু তবু, তার পক্ষেও এখন আর কিছু করার নেই। হয়তো তাকেও এটা মেনে নিতে হচ্ছে যে, মহাকালই বিচারক। মহাকালই তুলাদন্ডধারী মুদিত-নয়ন। মানুষ তার সেই বিচারের রায় পাবে আপন-আপন কৃতকর্মের প্রেক্ষিতে। তার কর্মাকর্ম ধর্মাধর্ম অনুসারে। যে-পুরুষশাসিত সমাজ অকারণ দম্ভ ও পৌরুষ দেখিয়ে নারীকে স্ত্রীধন বলে, গো-সম্পদের সঙ্গে তুলনা করে তার অবমূল্যায়ন করে, জয়ের নামে যুদ্ধের আয়োজন করতে পারে, সে-সমাজের চিরতরে বিনাশ নারীর কারণে নয়, পুরুষের কারণেই অনিবার্য। জারমণি সেইদিন গুনছে।

মনের বিষণ্ণতাকে কন্ঠস্বরে প্রকাশ করতে চাইল না জারমণি। ক্রোধকেও সে সাপুড়ের মুঠোয় সপাটে ধরা দুধা-খরিশের ফণার মতো অবদমিতই রাখল। পাটনের দীর্ঘকথনের অবসরে সে তাকে বলে, ‘অন্ধকারে কেন, আলোর দিকে দাঁড়াও!’

তার এই কোমল আহ্বান শুনে পাটনের মনে হল কোথাও বুঝি ঝমঝম করে নামল বরিষণ! মনে হল জারমণিরও পরিবর্তন আসছে। সেও হয়তো সরে আসতে চাইছে তার পূর্বের অবস্থান থেকে। যদি তা হয়েও থাকে, পাটন তাকে মনে করল তার আসন্ন জয়ের লাক্ষণিক ফলশ্রুতি। সে খুশি হল।

‘না রানি, আমার জন্য এই ভুবন এখনো প্রভাময় হয়নি। আমি সেইদিন নিজেকে আলোকিত মনে করবো, যেদিন—’ দূরে দৃশ্যমান পশ্চিমের সেনাশিবিরগুলির দিকে তার তর্জনী প্রসারিত করে পাটন হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠল, ‘ওই অন্ধকারকে আমি পাহাড়ের মতো পদাঘাতে অতলে ঠেলে দিতে পারবো! আর সেইদিন তুমি দেখবে আমার প্রকৃত পৌরুষের উত্থান!’

আবার পৌরুষ। পৌরুষ! পৌরুষ! পৌরুষ! কিসের পৌরুষ? কোথায় পৌরুষ? গ্রামগুলিকে দিনে দিনে উজাড় করে হাজার হাজার মানুষকে বধ করাই পৌরুষ? ধিক সে পৌরুষকে।

কিন্তু এই ধবংস দিয়ে পুরুষ যে তার নিজেরও ধ্বংস ডেকে আনছে সেই সত্য সে তার উন্মাদনা কাটিয়ে আর কবে অনুভব করবে? দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যাচ্ছে। যুদ্ধ ইতিমধ্যে তিন-তিনটি বছর অতিক্রম করে গেল। গ্রাম পুড়ছে! গ্রামবাসীরা যে-যনদিকে গোপনে পালাচ্ছে। তারপরেও এই মানুষগুলি তাদের বর্বরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মানুষকে কিছুই দিতে পারেনি এই যুদ্ধ। কেবল নিয়েই চলেছে। আঙিনার তুলসিমঞ্চগুলির অন্তিম আলোটি নিভে যাওয়ার আগে, সে কি এই মাঠারিক্ষেত্র থেকে চোখ সরিয়ে জনপদগুলির দিকে চেয়ে দেখবে না? আসল যুদ্ধ তো কবেই শুরু হয়ে গেছে সেখানে।

কেমন সে-যুদ্ধ?

এখানে মানুষ যুদ্ধ করছে মরার জন্যই, ওখানে গ্রামে-গ্রামে যে ভয়ঙ্কর শিহরণ জাগানো লড়াই চলছে, তাতে গ্রামবাসীরা তাদের তুমুল দারিদ্র্য, অনাহার, আকালের মধ্যেও স্ত্রী-পুত্র-পরিজনদের নিয়ে লড়াই করছে বাঁচার জন্য। তাদের সংগ্রাম বহুমুখী। তারা লড়াই করছে আকালের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে, আবার একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন দুর্বৃত্তদের সঙ্গে, যারা যুদ্ধ লাগিয়ে অঞ্চল জুড়ে অরাজকতা সৃষ্টি করে দিয়ে যুদ্ধের ফায়দা লুটছে।

যুদ্ধ-করের নামে সর্বত্র চলছে ব্যাপক জঙ-মাশুল আদায়। সেই মাশুল আদায়ের এখন আর নির্দিষ্ট কোনো হিসেব নেই, পরিমাপ নেই। ঘরে ঘরে ঢুকে পুড়া ভেঙে, মরাই ভেঙে জোর করে আদায় করা হচ্ছে ধানচাল। ভাঁউরি-বাহকরা মাথায় নিয়ে ছুটছে, গোরুর গাড়িতে তুলছে। লম্বরদাররা জুলুম করে, ভয় দেখিয়ে পাঁঠা-খাসি টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে। বলার নেই। জোটবদ্ধ জোরালো প্রতিবাদ নেই। এই অসহায়তা নিয়ে মানুষ যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে ফুঁশছে। তবু আদায় থেমে নেই। আদায় থামাতে গেলে আগে যুদ্ধ থামাতে হয়। সে-সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না। যোদ্ধা ও রসদের জোগান থেমে গেলে যুদ্ধ আপসেই থেমে যাবে। ততদিনে জীবনের কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না, আকাশের চিল-শুগনি ছাড়া।

তবে দিনে-দিনে রসদে টান পড়ছে। তাকে সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে পল্টন-মুখিয়া থেকে হুকুমদার সবাই। এই সুযোগে যেখানে-সেখানে লুট-রাহাজানিও চলছে। এক গরিবই লুটছে আরেক গরিবকে। আর যুদ্ধবাজদের তৎপরতা যেন উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। মরিয়া হয়ে উঠেছে তারা। মাঠারিতে যোদ্ধার আকাল সামাল দিতে সশস্ত্র পল্টন-মুখিয়া বাহিনী যুবকদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে যুদ্ধ করার জন্য, তেমনি গোলঘরগুলিতেও তো টান দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ যে এতদিন ধরে চলতে থাকবে তা তো হিসেবে ছিল না। সেখানে গোল-সিপাইদের প্রহরায় থাকা বড়ো বড়ো ভান্ডারগুলি খালি হয়ে আসছে। জোর উদ্যমে তাই চলছে শস্য সংগ্রহ অভিযান।

কিন্তু আদায়ীকৃত এই করের সবটা মাঠারি অব্দি পৌঁছচ্ছে না। তার একটা বড় অংশ গোলঘরে জমা না পড়ে, ভাগ-বাখরা হয়ে, ওইসব নিষ্ঠুর নৃশংস পল্টন-মুখিয়া, হুকুমদার, গোল-সিপাইদের ঘরে চলে যাচ্ছে। গ্রামবাসীদের শেষ সম্বল আত্মসাৎ করে সেই ধন তারা আপন আপন ঘরে মজুত করছে। এমনি অবাধ ও বেহিসেবি লুন্ঠন চলছে চতুর্দিকে। চলছে ব্যাপক অরাজকতা। চলছে নারী-নিগ্রহ, ধর্ষণ।

যুদ্ধবাজরা এতোটাই বেপরোয়া ও পাশবিক হয়ে উঠেছে যে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে তারা কিশোরী-যুবতী-বৃদ্ধার বাচবিচার করছে না। কখনো-বা গ্রামের গৃহবধুরা শুধুমাত্র একপেট খাদ্যের লোভে কিংবা একহাঁড়ি জল কিংবা এক কুণকে নুনের জন্য হুকুমদারদের ঘোড়াতে সওয়ার হয়ে তাদের গোপন ডেরাগুলিতে চলে যাচ্ছে। ক্ষত ঢেকে, নোংরা ও ছেঁড়া কাপড় গুছিয়ে তারা ফিরছে রাত করে। আকালের কারণে নারীদের কাছে সম্ভ্রমের আর কোনো মূল্য নেই। প্রয়োজনও নেই। দিনে দিনে বাড়ছে বারবনিতার সংখ্যা। যদিও তাদেরকে একমাত্র যুদ্ধবাজ আর জমিদার-জোতদার-ভূস্বামীরাই ভোগ করছে, গবির মরছে অনাহারে, পিপাসায়। শিশু মরছে অসহায় মাতৃক্রোড়ে। বহু অভুক্ত পীড়িত গ্রামবাসী পথেঘাটে পড়ে থেকে একসময় দুর্বল কোমর নিয়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারছে না। সেখানেই মরে পড়ে থাকছে।

এই অবস্থা থেকে গ্রামবাসীদের বাঁচার এখন আর কোনো পথ নেই। বরঞ্চ খারাপ অবস্থা অতি দ্রুত অধিকতর খারাপের দিকে যাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী খরার সূত্র ধরে ক্রমে ক্রমে নেমে আসা আকাল আরো তীব্র ও মর্মস্পর্শী হয়ে উঠছে। চোখ ঠিকরানো প্রখর রোদে মাথার ওপরে চিল চক্কর কাটছে। ঘন ঘন ডাক শোনা যাচ্ছে তাদের। খামখেয়ালি বৃষ্টির কারণে চাষবাসের আর কোনো সুযোগ নেই। ধূ-ধূ চড়া রোদে ফাটছে খেতের মাটি। বহু গ্রামে জলাশয়গুলিতে তেমন জল নেই। কোথাও কোথাও মানুষ কোদাল-গাঁইতি নিয়ে নেমে পড়েছে নদীগর্ভকে আরো-আরো চিরে অতি নীচে নেমে যাওয়া জলস্তর থেকে দু-এক ঘড়া হলেও জল বের করে আনতে। জলই যে জীবন!

খাদ্যাভাবের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রচন্ড জলাভাবে নাভিশ্বাস উঠতে লাগল মানুষের। পানীয় জলের জন্য তারা কোথায় না কোথায় ছুটে বেড়াতে লাগল। সামান্য জলের সন্ধান যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই হু-হু করে পঙ্গপালের মতো এসে ভিড় জমে যাচ্ছে আশপাশের মানুষের। লাগছে ভাগাভাগি নিয়ে গোলমাল। মারামারি। শেষতক ডাঙ-লাঠি। একগ্রামের মানুষ অন্যগ্রামে গেলে শুরু হয়ে যাচ্ছে ফৌজদারি। সে-কারণে অনেক মানুষ জলের সন্ধানে দলবদ্ধ হয়ে বেরচ্ছে গভীর রাতে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। জলাশয় খোঁজার অভিযানে তাদের হাতে-হাতে থাকছে মশাল।

ধান-চাল গ্রামবাসীদের হাতে যা আছে, তাতে মাথাপিছু একবেলা একমুঠা করে খেলেও ক-মাস তারা বাঁচবে বলা ভার। বাজারেও চাল নেই। থাকলেও বহু চড়া দাম নিয়ে গোপনে বিক্রি করছে কিছু ব্যবসায়ী, দোকানঘরগুলির সামনের ঝাঁপ বন্ধ রেখে। সাপ্তাহিক হাটগুলি কবেই মরে গিয়ে খাঁ-খাঁ করছে। চাষের কাজ বন্ধ। চাষিদের ঘরে শস্য নেই, হাঁস-খুঁখড়ি-শুয়োর-ছাগল কিচ্ছুটি নেই। যার কাছে যা ছিল তা ইতিমধ্যে বেচেবুচে ফুরিয়েছে। জঙ-মাশুলে নিয়ে গেছে—‘খাসিদান’। ঘরে রেখেই-বা কী করবে? গবাদিকে দেবার মতো ঘাসপাত, মাড়জল নেই। খাওয়াবে কী? তার ওপর অতিরিক্ত গরম, দিনভর চলছে তাপপ্রবাহ। মাঠেই মরে পড়ে থাকছে কত গোরু-ছাগল। মানুষও মরছে পাঁকের জল আর যিস-তিস খেয়ে। রোগজ্বালায়, ওলাউঠায়।

যুদ্ধ কিন্তু চলছেই।

মাঠারির সে-যুদ্ধক্ষেত্র থেকে গ্রামগুলির এই সম্মিলিত মহাসংগ্রামের ভয়াবহতা অনুমান করা যাচ্ছে না। সেখানে মনে হয় যেন আর্তনাদ এবার থামছে, কিন্তু গ্রামবাসীদের মধ্যে শুরু হচ্ছে জীবনের জন্য ভয়াবহ আর্তনাদ। মনে হয়, একটু একটু করে এবার তারাও মরিয়া হয়ে উঠতে চাইছে। কেউ ভাবছে, মরতেই যদি হয় তবে জঙবাজদের মেরে মরবো। মাঠারির বাইরেও সমস্ত অঞ্চল ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠছে। তুষের আগুন এখন লেলিহান হওয়ার অপেক্ষায়।...

পাটন আত্মগরিমা নিয়ে পশ্চিমের দূরবর্তী সেনাশিবিরগুলির দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে সেখানেও চিতা জ্বলছে। শত্রুপক্ষের এই চিতার আগুন তার মনকে বড়ই আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটে চলেছে সে-ব্যাপারে সে এখনো ততটা ওয়াকিবহাল নয়। তাই যুদ্ধের গতি ও শক্তি যে কমে আসছে তা জারমণি বুঝতে পারলেও পাটনের তা মনে হয় না।

এখন আর তেমন যুবক যোদ্ধাদের পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ পালাচ্ছে। আত্মগোপন করে থাকছে। দিনভর টহল দিয়ে তল্লাসীদাররা যাকে পারছে পশুর মত টেনে হিঁচড়ে আনছে। এমনকি, যুদ্ধক্ষেত্র থেকেও অনেকে পালিয়ে যাচ্ছে পাহাড় ডিঙিয়ে দূরে কোথাও। সেইসব ‘মুড়-পুচকা’দের খোঁজেও ঘোড়া ছোটাচ্ছে লেলে-সিপাইরা। কিন্তু কতদিকে তারা ছুটবে?

যারা পালিয়ে যাচ্ছে, তারা পাক্কা আড়াই দিনের পথ হেঁটে নিরাপদ কোথাও চলে যাচ্ছে। এই আড়াই দিনের পথটি শাল জঙ্গলের ভেতরে ভেতরে। কিন্তু শালের এখন আর বংশ নেই। এখনো কিছু গাছপালা রয়েছে। এখানে-সেখানে। ভয়াবহ ডাকাতির ভয়ে এই এলাকায় কোনো দিন মানুষের বসতি গড়ে ওঠেনি। একটিও গ্রাম নেই। তবে এখানে সাধারণ মানুষ ডাকাতদের আক্রমণের মুখে পড়ত না। ডাকাতি হত বড় ব্যবসায়ীদের, যারা মূলত নুন, পাত-তামাক আর জোলাদের গ্রামগুলি থেকে মোষের গাড়ি বোঝাই করে শাড়ি-লুঙ্গি-চাদর-গামছা ইত্যাদি থোক মাল নিয়ে যেত। বেপারিদের যাওয়ার বা আসার যেকোনো পথেই ডাকাতের আক্রমণের সম্ভাবনা থাকত। জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতো লেঠেল ডাকাতরা। বেপারিদের যাওয়ার পথে তারা মুদ্রার থলি কেড়ে নিত, আসার পথে তামাক আর কাপড়ের গাঁটরি লুট করে মাথায় মাথায় নিয়ে তারা গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পালিয়ে যেত।

ডাকাতি ঠেকাতে তাই নুন-তামাক-কাপড়ের বেপারিরা কখনো পণ্য খরিদ করতে একা একা আসতো না। আশপাশের গ্রামীণ বাজারগুলি থেকে আরো সব বেপারি ও পাইকারদের নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ তারা দলবদ্ধ হয়ে বেরিয়ে পড়ত। এই জঙ্গল শেষ হলে তবেই সেই নুনের গ্রামগুলি। জোলাদের গ্রামগুলিও তার আশেপাশে। যারা মাঠারি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে, তারা হয়তো ভবিষ্যত জীবিকার কথা ভেবেও পালিয়ে আসছে এদিকে। মুড়-পুচকাদের খোঁজে তল্লাসীদার বা লেলে-সিপাইদের ঘোড়া যে এদিকেও আসছে না তা নয়। তবে জঙ্গল সুদীর্ঘ বলে দূর থেকে তাদের আসতে দেখলে ঝোপঝাড়ে তৎক্ষণাৎ লুকিয়ে পড়া যায়, হামাগুড়ি দিয়ে চলে যাওয়া যায় আরো দূরে কোথাও। লেলে-সিপাইরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। জহ্লাদের জাত। তাদের চোখকে ধুলা দেওয়া কঠিন। আবার তাদের হাতে পড়লে তারা মরা শুয়োরের মতো করে হলেও ওই পালিয়ে আসা যোদ্ধা-যুবককে মাঠারিতে নিয়ে ঢোকাবে।

বহু সাধারণ গরিব লোকজনও দৈনিক তাদের পরিবার নিয়ে পালাচ্ছে, পেটের দায়ে, জীবনের দায়ে, আর যত লম্বরদার, হুকুমদার ভাঁউরি-বাহকদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে। পশ্চিমাদের গ্রামগুলিতে ঢুকে পড়লে শত্রুপক্ষের চর মনে করে তাদেরকে গ্রামের মাঝকুলহিতে দাঁড় করিয়ে ওদিককার পল্টনদাররা তিরবিদ্ধ করে মেরে ফেলছে। অনেকে তাই পালিয়ে যাচ্ছে মাঠারিক্ষেত্র থেকে দক্ষিণ-পূর্বে। সেদিকেও এই কিছুদিন আগেও জঙ্গল ছিল, বিশাল নদী ছিল। কয়েক বছর আগেও সেই জল হামরাম করত। ঝাঁক-ঝাঁক পাখি আসত। বহু বছর হল তা শ্মশানভূমিতে পরিণত হয়েছে। নদী উধাও! পড়ে আছে শুকনো খাত। পলাতক গ্রামবাসীরা এখন তার তপ্তবালুর চর পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে যে-যেখানে পারছে। এই ভূখন্ড ছেড়ে দূরে কোথাও।

যুদ্ধ ও আকাল সামলাতে না পেরে বহু বহু মানুষের মিছিল এগিয়ে চলেছে দামোদরের কিনার ধরেও। নিজের পেট বাঁচাতে, কোলের সন্তান বাঁচাতে তারা গায়ে বল না থাকলেও বালি চালাতে চাইছে, কোথাও-বা মুন্সির ভাটাতে ইট গড়তে চাইছে। কেউ তার আগেই রোদে পুড়ে মরে পড়ে থাকছে পথে। সামনের মানুষ পিছনে তাকিয়ে দেখতে চাইছে না।

পাটনের এসব খবর নেওয়ার তাগিদ নেই। কিন্তু খবর আসছে জারমণির কাছে। নানান প্রান্তের গ্রামগুলি থেকে। লেলে-সিপাই আর কর-সংগ্রহকরা এসে এসে তা জানিয়ে যাচ্ছে। অযাচিতভাবে, কারণে-অকারণে, আসছে হুমুকদাররাও। তাদের তো তার কাছে আসারই কথা নয়। তবু আসছে। সব মিলিয়ে কোনকিছুই ভালো ঠেকছে না জারমণির। রতিগড়ে থেকেই সে দেখতে পাচ্ছে চারপাশের ভয়াবহ চিত্র। বিপদের অশনিসংকেত তার মনকে অস্থির ও উদবেলিত করে তুলেছে। ইদানিং নিজেকেও ততোটা নিরাপদ মনে হচ্ছে না তার। সার্বিক ধ্বংশের দিন এসেই গেল।

তবু মগ্নতা কাটেনি পাটনের। সর্বনাশের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে তার সকল উল্লাস। সে মগ্ন হয়ে আছে তার যুদ্ধজয়ের স্বপ্ন নিয়ে। কী যুদ্ধ, আহা!

তবে তা যা-ই হোক না কেন, এই যুদ্ধেই পাটন তার পৌরুষ প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে। অন্তত সে নিজে তা মনে করে। শত্রুপক্ষের বহু বহু সৈন্যকে নিধন করে তার মনে এখন এই প্রত্যয় জন্মেছে। জারমণির কাছ থেকে তার কথার কোনো জবাব না পেয়ে, পুনরুক্তি করে সে। বলে, ‘রানি! তুমি কি জানো, পশ্চিমাদের গ্রামকে গ্রাম জনহীন হয়ে গেছে। বিধবা হয়ে পরিবারগুলি এখন কোথায় কোথায় পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের রসদ নেই, যোদ্ধা নেই, এমনকি খবর আসছে জ্বালানিরও সঙ্কুলান হচ্ছে না তাদের। এমনটা হবে ভেবে আমরা তো আগেই জঙ্গল কেটে রেখেছি। হা:! হা:! হা:!’ অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল পাটন।

আর জারমণি? সে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেকেই নিজে শুনিয়ে বলে, ‘আমিই অভাগিনী। পৌরুষের এহেন উত্থান আমাকে দেখতে হচ্ছে! হে ঈশ্বর, হে জিনগা-মাঈ! আমার হাতে কেন ধনুর্বাণ নেই?’

জারমণি তার চোখের জল মুছে নেয়।

২৬

হুমুকদার হতভম্ব হয়ে যায়। সে কিছু ভাবার আগে অনেক দূরে চলে যায় রংলাল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক ফারাকে। নির্জন, অন্ধকার। সেখানে কোনো মশালের আলো নেই। সৈন্যদের কোনো শিবিরও নেই। হুকুমদার সেদিকেই তার ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। যেতে যেতে হাতের মুঠোয় লাগাম অনড় রেখে ডাক দেয় রংলালকে। তার প্রতিটি ডাকে এমনি প্রতিধ্বনি ওঠে যে, রংলাল নিজেই ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু এখন আর ভয় পেলে চলবে না। অন্ধকারে, মনে হল যেন কোনো শবদেহকে সে মাড়িয়ে চলে গেল। হতেই পারে। কিন্তু তাতেও সে ভয় পায় না। আরো ছুটতে থাকে। হুকুমদারের ডাক শুনেও সে দাঁড়ায় না, ফিরেও তাকায় না। ছুটতে ছুটতে একসময় অন্ধকারে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

ঘোড়ার গতি একেবারে থামিয়ে দিয়ে, হুকুমদার, তার চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। আর নাম ধরে ডাকে, ‘রংলাল! এ-এ-এ রংলাল! ক্যানে তুঁই আঁধারে ঢুকতে যাছিস? চ, হামি তকে পাকওয়ানের সঙে কাম দিব, ভাটিচালায়। আয় রংলাল!’

সে ডাকতে থাকে। ডাকুক।

রংলালের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সে আর পারছে না। ওই হুকুমদারের হাত থেকে সে এখন পালিয়ে বাঁচতে চায়। অথবা যেভাবেই হোক সে মেরে ফেলতে চায় নিজেকে। এমন চিন্তা বহুদিন ধরে তার মাথায় ঘুরছে। কিন্তু কী করে কী করবে সে ভেবে পায় না। কোথায় পালাবে? ভাবতে ভাবতে এতগুলো বছর চলে গেল।

রংলাল টুডু এখন আর সেই আগের কিশোরটি নেই। এই ক-বছরে কিশোর থেকে সে যুবক হয়ে উঠেছে। অনেকটাই রুক্ষতা এসেছে তার চেহারায়, সেই জৌলুসও হারিয়েছে সে। তবু হুকুমদারদের কাছে তার আকর্ষণ কমে যায়নি। এখনো তেমনিভাবেই সে তাকে ঘোড়ার পিঠে বসাতে চায়। আর এমন কিছু সে করাতে চায় যা করতে মোটেই রুচি নেই রংলালের।

তারচেয়েও বড় কথা তার মন কাঁদছে গ্রামে ফিরে যাবার জন্য। তার মা-বাবা-বোনের ভালো খবর সে পায়নি। সেখানেও ব্যাপক অত্যাচার চালাচ্ছে জঙবাজরা। গ্রামগুলিকে তারা ইতিমধ্যেই নি:স্ব করে দিয়েছে। কোনো আদিবাসী যুবকদের তারা গ্রামে থাকতে দিচ্ছে না। টেনে আনছে মাঠারিতে। সাজিয়ে দিচ্ছে কাঁড়বাঁশ দিয়ে। ব্যাস, এবার যাও মার ওই পশ্চিমাদের।

আদিবাসী মেয়েদের একটিকেও তারা নির্যাতন না করে ছাড়ছে না। অনেক ঘর থেকে তারা যেমন ভুট্টার বোঝা, চালের হাঁড়ি নিয়ে পালিয়ে আসছে, তেমনি আবার কোনো কোনো হুকুমদার চালের গাঁট নিয়েও ঢুকছে। তাদের লোভ দেখাচ্ছে। আর শস্যের গাঁট নামিয়ে সেখানেই রাত্রিযাপন করে আসছে। রাজি না হলে চলছে অত্যাচার।

কয়েকমাস আগে সবচেয়ে খারাপ খবরটি পেয়েছে রংলাল। তাদের পাশের আদিবাসী গ্রাম থেকে আসা দুধকুমার হাঁসদার কাছ থেকে। সে জানিয়েছে এক হুকুমদার নাকি তার বোনকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার যোনিদেশ কামড়ে তাকে ফেলে রেখে গেছে নাথু-ডুংরির ধারে। এই ঘটনায় সে-সময় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। স্বভাবত, এমন একটি নৃশংস ঘটনা রংলালকে উদবিগ্ন, নির্ভীক, এমনকি বেপরোয়াও করে তুলেছে।

রংলাল দুধকুমারের কাছ থেকে কি ওইটুকুই জানতে পেরেছে? তারপরেও সেখানে ঘটে চলেছে আরো অনেক কিছু। বিশেষ করে অত্যাচারের ওই ঘটনাটি যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে, তার থেকে গ্রামে গ্রামে উঠছে গণজাগরণ। শুধু চাপাইসিনি নয়, মাধবডি, কৈলাশ নগর, লছুপুর, হিজুডি সমস্ত গ্রামের মানুষ এখন হুকুমদারদের কোনো গ্রামে ঢুকতে দেখলেই তাদের ওপর আক্রমণ করছে। তাদের তাড়াচ্ছে। বহু জায়গায়, যেখানে আকাল চূড়ান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, সেখানে মানুষ আর কিছুই মানছে না। তারা হুকুমদার, লেলে-সিপাই থেকে শুরু করে জঙবাজ দেখলেই ঘিরে ধরছে। প্রাণে মেরে ফেলছে। নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। তেমনি আবার অস্ত্র হাতে পেয়ে এই মানুষরা এখন প্রবলভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে উঠেছে, যেটা জমিদার, জোতদার আর পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের আতঙ্কের কারণ হয়ে পড়েছে। কোথাও গোদাম লুট করা হচ্ছে, কোথাও আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আকালের বিরুদ্ধে এতদিন বাদে দেখা দিল প্রকৃত গণজাগরণ। হাজারে হাজারে অভুক্ত নিরন্ন, অত্যাচারিত গ্রামবাসীর দল এখন সর্বত্র আড়তদারদের শস্য ভান্ডারগুলির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। শস্য উদ্ধার করে, ভাগাভাগি করে তারা সমাজের এই শত্রুদের বসতবাড়িগুলিও আর অক্ষত রাখছে না। সেগুলিকে ভাঙচুর করে, আগুন লাগিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মেরে ফেলা হচ্ছে মালিকদের। জোতদার ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সকলেই এখন যত্রতত্র পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। কিন্তু সহজে তাদের এখন পালাতেও দেওয়া হচ্ছে না। গ্রামে গ্রামে তাদের ঘিরে আটক করা হচ্ছে।

কে জানে, হয়তো, রংলাল সে-খবর পেয়ে সেও চাইছে তাদের দলে যোগ দিতে। সেও তাদের হারানো সন্মান, ইজ্জত ও বঞ্চনার প্রতিশোধ কি নিতে চায় না? হ্যাঁ, সে চায়, চায়, হাজারবার চায়!

রংলাল একটি টিলার মাথার ওপরে উঠে আনন্দে চিৎকার করে সাড়া দিয়ে উঠল সেই ঘোড়সওয়ারটিকে। বলল, ‘হুকুমদার! হামি নীচকে নাই যাব! তুমিয়েই উপরকে আইস!’

হুকুমদার সত্যিই চমকে ওঠে। এমন জোরালো ও প্রফুল্ল কন্ঠস্বর সে যেমন কোনোদিন কোনো ‘জঙ-ভেজা’ যুবকের কাছ থেকে শোনেনি, হুকুমদারকেই কাছে ডাকছে এমন ঘটনাও বিরল। তার সন্দেহ হয়। কিন্তু যখন তার হাতে আদর করা রংলালের সরল সুন্দর স্নায়বিক উত্তেজনা জাগানো মুখটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন কোনো সন্দেহই তার মনে দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করতে পারে না। তার মন তার দিকে ধাবিত হতে চায়।

আদুড় গায়ের সেই হুকুমদার ঘোড়ায় একই জায়গায় পাক খেতে খেতে, অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে থাকা টিলাগুলির দিকে মাথা তুলে দেখতে দেখতে বলে ওঠে, ‘কন ডুংরিয়ে আছিস তুঁই? রসা ডুংরি?’

‘না!’ সে চূড়ায় দাঁড়িয়ে প্রত্যুত্তর দেয়, ‘হুকুমদার! হামি হাড়ি-ডুংরির টঙে আছি!’

‘নাই নামবি তুঁই, নীচকে?’

‘না! হামি নাই নামব! তুমিয়েই আইস! এইখিনেই দমে ভাল হবেক!’

এমন আমন্ত্রণ পেয়ে হুকুমদার যার পর নাই উত্তেজিত হয়ে পড়ল। বিশেষ করে, রংলালের মুখ থেকে উচ্চারিত শেষবাক্যটি ‘এইখিনেই দমে ভাল হবেক!’ এই কথাটির গোপন আবেদন তাকে অস্থির করে তুলল। সে তার ঘোড়াকে ঝুনুক-ঝুনুক করে সেই অন্ধকারের দিকে নিয়ে গেল। হাড়ি-ডুংরির পাদদেশে ক্লান্ত ঘোড়াটিকে বেঁধে ধীরে ধীরে উঠতে লাগল ওপরে।

হাড়ি-ডুংরির উচ্চতা অনেকটা। উচ্চত্যর বিচারে বলা যায় রাতিগড়ের পরেই হাড়ি-ডুংরি। ডুংরির সামনে দাঁড়িয়ে বাঁদিক দিয়ে একটু ঘুরে ঘুরে তার মাথায় উঠতে হয়। কোথাও কোনো গাছপালা নেই, মাটি নেই এই পুরো পাহাড়টিকে দেখে মনে হয় তা একটি মাত্র পাথরকে নিয়ে গড়ে উঠেছে। তার ঢাল এতোটাই যে, চূড়ায় উঠে নীচের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যায়। তবে এখান থেকে দুপক্ষের ওই সৈন্যশিবিরগুলিকে ঘিরে জ্বলন্ত মশালগুলির শোভা অপূর্ব। যদিও, আগের তুলনায় মশাল এখন অনেক কম। কাঠ নেই, তেলেরও আকাল। তাছাড়া, এখন তেমন আড়ম্বরের আর দরকারও নেই। যুদ্ধ হয়তো এবার তার শেষ কামড় দিয়েই থেমে যাবে।

ডুংরির মাথায় উঠে হাঁপাতে থাকে হুকুমদার। জিরিয়ে নিতে পাথরের ওপরে বসে পড়ে।

রংলালও বসে পাশটিতে। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে, ‘থৈকে গেলে, হুকুমদার?’ হুকুমদার ঘর্মাক্ত মুখ তুলে তাকায়। জবাব পাওয়ার আগেই সে আবার বলে, ‘তাইলে তুমাদেরও আলিস-থকিত আছে? আছে ন? কত গাঁয়ে-গাঁয়ে ঘড়া ছুটাছ! সামান আনছ, মানুষ ধরে ধরে আনছ! মনে হৈত, কে-জানে, তুমাদের বিরাম-বিশ্রামও নাই, আলিস-থকিতও নাই। হ্যাঁহ?’

হুকুমদার জবাব না দিয়ে হাসে। বাহাদুরিকে উপভোগ করার হাসি। রংলালের দিকে হাতটি বাড়িয়ে দেয়। তার আঙুলগুলি নাড়াচাড়া করতে করতে সে জানতে চায়, ‘আজ এত ধূরকে আলিস ক্যানে? কাকে ডরাস?’

‘নাআ, ডর লয়। যদি কৌ দেখে লেই হামদেরকে?’

‘কন শালা দেখতে আসবেক রে?’

‘আর হামার দমে লৈজ্জাও লাগে। হঁ! ইখিনে তুমি যা করবে করো, হুকুমদার। যেমন করে করবে করো ক্যান্নে।’ কোমরে হাত রেখে রংলাল বলে, ‘খসাব, গামছাটা? এই বতর করে লাও। তুমার যেমন হিচ্ছা।’ রঙলাল দুষ্টুমিভরা ইঙ্গিতে তার পুরুষাঙ্গ দেখিয়ে হাসতে থাকে। ঢাকনা খুলে দেখায়। যদিও সে-ইঙ্গিত ততটা স্পষ্ট দেখা যায় না। তাহলেও, নীচে অন্ধকার যতটা জমাট মনে হচ্ছিল, টিলার মাথায় ততটা নয়। হাওয়াও বইছে ফুরফুর।

হুকুমদার রংলালকে আরো কাছে পেতে চাইলে রংলাল তার থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। খেলাচ্ছলে। শৃঙ্গের শেষ মাথায় উঠে যায়। সেখানে একেবারে কানায় সমতল পাথরটি দেখিয়ে হুকুমদারকে সে হাতসান দিয়ে ডাকে। বলে, ‘হুকুমদার! এইখিনে আইসে বৈ-স। ইখিনে চাটানটা তাপল আছে। করতে তুমার জুত হবেক।’

হুকুমদার সেখানে গিয়ে বসে। গপ্প করতে থাকে তার সঙ্গে।

রংলাল বলে, ‘তুমি কী বলতেছিলে? হামাকে ভাটিচালায় কাম দিবে? পাকওয়ানদের সঙে?’

‘হঁ। তাইলে তোর খাটালিও কম হবেক আর তুঁই পেট ভরে খাতে পাবিস। ভখে মরবিস নাই।’

‘ঠিক, ঠিক। কবকে দিবে?’

কথার জবাব দেয় না। হুকুমদারের মন তখন ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে রংলালের শরীরের প্রতি। তাকে আদর করে এখানে-ওখানে চুমু খেতে থাকে সে। রংলাল তার উষ্ণতা টের পায়। সে তার মাথায় হাত বোলায়, হুকুমদার যখন মুখ নামিয়া আনে তার নাভির কাছে। তার মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে, একদিন যে-কথা হুকুমদার রংলালকে বলেছিল, আজ তেমন করে সে হুকুমদারকে বলে, ‘হুকুমদার! এই ডুংরিটার ল্যা কেমন সুন্দর দেখাছে দেখ মশালগুলা। ইখিন ল্যা, তুমি কোবৌ দেখেছ?’

হুকুমদার কোনো সাড়া দিল না। সে তার বহুদিনের আকাচা, ঘোড়ার লোমেভরা, বোঁটকা গন্ধযুক্ত বস্ত্রখন্ডটি আচকা টান মেরে ফস করে খুলে ফেলে। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে যায় রংলালের সামনে। এই তো সুযোগ! রংলাল যা করতে চাইছে, তা হয়তো এখনি সে করতে পারত। কিন্তু না, আরো কিছুটা সময় নিতে চাইল সে। সময় দিতে চাইল হুকুমদারকেও। হুকুমদার রংলালের হাতটি নিজের শরীরের দিকে টানে।

আদর খেতে খেতে রংলাল হঠাৎ সরে যায় অন্ধকারের দিকে। সেখান থেকে মস্ত একটি পাথর খন্ড দুহাত দিয়ে তুলে নেয়। হুকুমদার কিছু বোঝার আগেই সেটা দিয়ে সে তার ঘাড়ের পিছনে সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করে বসে।

আকস্মিক আঘাতে জমিতে মুখ থুবড়ি দিয়ে পড়ে হুকুমদার। তীব্র যন্ত্রণায় আছাড়-পাছাড় করতে থাকে। সে আর ঘাড় তুলে তাকাতেও পারে না। তবু আরো কয়েকবার আঘাত করে যায় রংলাল। হুকুমদার আর্তনাদ করতে থাকে। কিন্তু শিবির থেকে তারা এতোটাই দূরে যে, হুকুমদারের এই আর্তনাদ সেদিকে পৌঁছয় না। আঘাতের পর আঘাত করতে করতে সে হিংস্র হয়ে ওঠে। একসময় মুখে লাথি মারতে মারতে হুকুমদারটিকে সে শৃঙ্গের মাথা থেকে ফেলে দেয়। পাথরের ওপরে আছড়ে পড়ে, লাট খেতে খেতে, হুকুমদার কোন তলায় পড়ে যায়!

ডুংরি থেকে ধাপে ধাপে নেমে আসে রংলাল। প্রতিশোধের আনন্দ নয়, এই একক প্রতিশোধ থেকেই তার মনে জ্বলে ওঠে বৃহত্তর প্রতিশোধের আগুন!

ঘোড়াটি এই সময় ডেকে ওঠে।

অন্ধকারের মধ্যে হ্রেষা শুনে রংলাল ঘোড়াটির দিকে এগিয়ে যায়। লাফ মেরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে। শক্ত মুঠোয় লাগাম ধরে। শিবিরের দিকে কিছুটা এগিয়ে সে ছোঁ মেরে তুলে নেয় একটা মশাল। তারপর প্রবল বিক্রমে ছুটতে থাকে। চাপাইসিনির দিকে।

২৭

গ্রামবাসীদের সার্বিক উত্থান থেকে গণজাগরণের আগুন দেখতে দেখতে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। চেহারা নিল মহাবিদ্রোহের। রংলাল যোগ দিল সেই বুভুক্ষু বিদ্রোহীদের দলে। শবর-সাঁওতাল-বাউরি-ভূমিজ-কুড়মি-চূয়াড় কেউ এই সশস্ত্র বিদ্রোহীদের থেকে দূরে থাকল না। সংঘাত চলতে থাকল নিপীড়িত, অত্যাচারিত ও সর্বহারাদের সঙ্গে জমিদার-জোতদার-ভূস্বামী, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও জঙবাজদের। বিদ্রোহী গ্রামবাসীরা অঞ্চলের প্রতিপত্তিশালী ও জঙবাজদের আলাদা করে দেখল না। তাদের মুখগুলি আলাদা কিন্তু মানুষ তারা এক। তাদের সকলকে শ্রেণিশত্রু ধরে নিয়ে গ্রাম-ডিহি-মৌজাগুলি দুভাগ হয়ে গেল। ঘর-ঘর থেকে হাতিয়ার বেরিয়ে আসতে লাগল। এমনকি, বহু গ্রামে মহিলারা অস্ত্র নিয়ে রাতের অন্ধকারে গণিকা সেজে ঘুরতে লাগল। চালাতে লাগল ব্যাপক আক্রমণ।

আর সেই আক্রমণ ঠেকাতে ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে পড়ল জমিদার-জোতদারদের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী। শুধু লাঠি নয়, তারা টাঙি-বল্লম নিয়ে বিদ্রোহ দমনে অবতীর্ণ হল। তারা একদিকে যেমন সামনে এগিয়ে আসা বিদ্রোহীদের খতম করতে লাগল, তেমনি অকাতরে মুণ্ডু কাটতে লাগল বহু নিরীহ গরিব মানুষের। প্রতিদিন দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল শতশত কুঁড়েঘর, টিন-খাপরার চাল!

কিন্তু এই আগুন থেকে জমিদার-ব্যবসায়ীরাও বাঁচতে পারল না। বলা যেতে পারে, তাদের আগুনেই পুড়তে লাগল তারা। জ্বালিয়ে দেওয়া হতে লাগল বড় বড় কোঠাঘর, গুদামঘর-আড়তখানা। তাদের শস্যঘরগুলি ভস্মীভূত করার আগে যে-পারে লুটে নিতে লাগল শস্যের ভান্ডার। মোটা খড়ের দড়া দিয়ে বানানো চাল-ধানের পুড়াগুলিকে তারা ঠেলেঠেলে গড়িয়ে বের করে আনল রাস্তায়। খামার আর আঙিনা জুড়ে বিশাল বিশাল খড়ের গাদা। কোথাও খড় সমেত খামারে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হতে লাগল। যে-পারে খুলে নিয়ে যেতে লাগল তাদের গোয়ালভর্তি গবাদি। খাসি-ভেড়াভেড়ি সব। কেউ কেউ ধরাধরি করে ঢেঁকিঘর থেকে বের করে নিল বহু পুরোনো ঢেঁকি, মাথায় চাপিয়ে নিয়ে গেল জাঁতা। একদানা লক্ষ্মী কি একটি চঁচ পর্যন্ত রাখল না।

তান্ডব করে ভেঙে তছনছ করে দেওয়া হতে লাগল বাজারের সবকটি করাতকল, কাঠগোদাম, ঘানিঘরও। পাইকারদের আড়তখানা ভেঙে ঢুকে পড়ল উত্তেজিত জনতা। লুট হতে লাগল লাটলাগা নুনের বস্তা। তামাম এলাকা জুড়ে সর্বত্র চলতে লাগল এই লুট-তরাজ আর খুনোখুনি।

ঠিক তেমনিভাবে জঙবাজদের খতম করা হতে লাগল তাদেরই হাতিয়ার দিয়ে। ঘোড়া ছিনিয়ে নিয়ে গ্রামের মাঝকুলহিতে ধুলোয় ফেলে তাদের নৃশংসভাবে, কুচি-কুচি করে কাটতে লাগল এই বুভুক্ষু গ্রামবাসীর দল। কোনো কোনো আদিবাসীগ্রামগুলিতে আবার লেলে-সিপাইদের কাঁড়বিদ্ধ করে মেরে তালগাছে, জৈড়গাছে লম্বা করে ঝুলিয়ে রেখে দেওয়া হল, যাতে দমকা হাওয়ায় দোল খেতে থাকা এই দেহগুলি অন্য জঙবাজদের নজরে আসে, তাদের কানে খবর যায় আর শকুনে তাদের সৎকার করে।

এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে মাঠারি থেকে হুকুমদারসহ অন্যন্য জঙবাজরা আর গ্রামে আসতে সাহস পেল না। অথচ তাদের না এলেও চলে না। জল পাবে কোথায়?

রয়ে-সয়ে থাকতে থাকতে সংঘবদ্ধতার ভেতর দিয়ে তারা সঞ্চয় করল এই শক্তি। তারা হুকুমদার, লেলে-সিপাই, ভাঁউরি-বাহক, লম্বরদারদের যেমন হত্যা করতে লাগল, তেমনি তাদের ঘরে ঘরে গড়ে তোলা হাজার-দুহাজার মণের শস্যভান্ডারগুলিকে ছাড়ল না। ‘জয়! জিনগা-মাঈকি জয়!’ প্রমত্ত ধ্বনি তুলে একেক দল করে বিদ্রোহীরা চড়াও হতে লাগল তাদের ঘরগুলিতে। হত্যার সঙ্গে লুন্ঠন ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সমানে চলতে লাগল। সর্বত্র।

প্রান্তিক এলাকাগুলিতে এতদিন যে-কঠোর নজরদারি ছিল জঙ-সিপাইদের, সেখান থেকে সিপাইরা এখন নিজেরা পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে পালাতে থাকে বহু গ্রামবাসী। বিদ্রোহ চলতে লাগল। যখন-তখন শোনা যেতে লাগল—‘জয়! জিনগা-মাঈকি জয়!’ এমনকি রাতেও, গ্রামের মানুষ অস্ত্রছাড়া হল না। তারা মাথাসিতানে কুড়ুল-কাস্তে-কাটারি রেখে আধোঘুমে থাকল। আর যে-গ্রামে জলাশয় আছে, সেসব গ্রামে তারা জঙবাজদের ওপর বিশেষ নজরদারি বহাল রাখল।

ভূমিজদের গ্রামগুলিতে আবার অন্যপন্থা অবলস্থন করা হতে লাগল। জলচুরি আটকাতে তারা রাতের দিকে পুকুর পাহারায় থাকে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। কিন্তু দিনেরবেলায় পুকুর পাড় নির্জন রেখে দেয়। প্রহরাহীন জলাশয় দেখে সেদিকেই ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যায় জঙবাজরা। তাদের সঙ্গে মস্ত মস্ত চামড়ার ভিস্তি। এই ভিস্তি-মশক নিয়ে যে-ই না তারা জলাশয়ে নামছে, অমনি তাদের লক্ষ্য করে অদৃশ্য উৎস থেকে সাঁই-সাঁই বেগে ছুটে আসছে বাণ। আর গ্রামবাসীরা হৈহৈ করে ধ্বনি দিতে দিতে ধেয়ে আসছে, ‘জয়! জিনগা-মাঈকি জয়!’

ক্রমেই এই শ্লোগানটি এতটাই হত্যা ও প্রতিহিংসার বার্তাবহ হয়ে উঠল যে, আচমকা দূরবর্তী কোনো মহল্লা থেকেও এই ধ্বনি ভেসে এলে ভয়ে হাড় হিম হয়ে যায়! রাতে তা শোনামাত্র প্রত্যেকে সজাগ হয়ে ওঠে। অস্ত্র ধরে। এই উদবেগ নিয়ে থাকায় রাতের দিকে গ্রামবাসীদের চোখে ঘুম নেই। তার ওপর তেমনি গুমট। গরমে হ্যাঁসফ্যাঁস করতে থাকে। স্বস্তি নেই এতটুকু। মেঘ গুড়গুড় করে কিন্তু বারিস হয় না। ঢের রাত অব্দি বায়ুমন্ডল তেতে থাকে। অবস্থা অনুকূল থাকলে গ্রামে গ্রামে এখন চোদ্দপ্রহর নামসংকীর্তন করত হরিবোল মেলাকে ঘিরে। কেউ কেউ তবু মেঘ-বৃষ্টির জন্য সময়ে-অসময়ে হরিকে ডাকছে, আর শাপান্ত দিচ্ছে জঙবাজদের। চাটাই বিছিয়ে শুয়ে থেকেও তারা দু-চোখের পাতা এক করতে পারে না। কখনো চোখ লাগতে না লাগতে কোনো ঘর থেকে আবার আচমকা তারস্বরে মড়াকান্না ভেসে আসে। রাতের নিস্তব্ধতাকে বহুখান করে দেয়।

পূর্ব-সীমান্ত বরাবর তাকিয়ে, বহু দূরে একটি আলোর বিন্দু দেখতে পায় আকুই মাছুয়ার। পুকুর ঘিরে অনড় বসে থাকা অন্যদের সে বলে, ‘এই! ধূরে উটা কী দেখাছে? মনে হছে একটা আগুন জ্বলছে। চিড়কুন লয় ত?’

রাত হলে ডান-ভূত-চিড়কুনের নাম তারা মুখে আনে না। ভয়ে। আকুই তা বলায় তালেবরও ভয় পেয়ে যায়। সে চুপ মেরে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আলোটির দিকে।

এখন বেশি রাত হয়নি। তবু সব কেমন সুনসান। চতুর্দিকেই একটু দূরে-দূরে বসতি আছে, মানুষজনও জেগে রয়েছে, ধুঁকছে, কিন্তু কোনো ঘরে লম্ফ-ডিবি-লালটিন কিছুই জ্বলছে না। দশঘর ঘুরেও একডিবা মাটিতেল মিলবে না। আকালের রাত তাদের আঁধারে কেটে যায়। গ্রামগুলিতে মানুষের এই আঁধার আগলে বসে থাকাকে মনে হয় যেন মৃত্যুর প্রতীক্ষা। মানুষ নির্বাক, ঘরে ঘরে মৃত্যুই এখন সরব।

অন্ধকার এতোটাই ঘুটঘুটে যে পাশের মানুষটিকেও ঠাওর করা যায় না। তবু মাঝিবাঁধকে ঘিরে আজও পাহারায় রয়েছে মাছুয়াররা। ভীম মাছুয়ার, তালেবর মাছুয়ার, অশ্বিনী মাছুয়ার আর আকুই ছাড়াও তাদের সঙ্গে লাঠি-তাবলা-টাঙি নিয়ে আছে আরো কয়েকজন যুবক। তারা সর্বদা সতর্ক। বলা যায় না, কখন কোনদিক থেকে ধেয়ে আসতে পারে ‘পানি-লুঠেরা’র দল।

এলাকার গোটা দশেক গ্রামের মধ্যে একমাত্র শিংশিং গ্রামের মাছুয়ারদের এই একটিমাত্র পুকুরে এখনো কিছুটা জল রয়েছে। অতি স্বচ্ছ, মিষ্টিজল। এই জলটুকু তারা বোকা ও নিরক্ষর গ্রামবাসীদের টিপছাপে ভরা সুদখোরের লাল খাতার মতো জীবনের জীবন করে আগলে রেখেছে। এই জলটুকু একদিকে তাদেরকে যেমন নিশ্চিন্ততা দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি তাদের দুর্ভাবনারও কারণ। সব সময় ভয়ে-ভয়ে থাকতে হয়। অতি নিকটবর্তী তিনটি গ্রাম ছাড়া বাইরের কোনো গাঁয়ের লোককে এই পুকুর থেকে একলোটও জল দেওয়া হয় না। এমনকি, ওই তিন গাঁয়ের লোককেও দেওয়া হয় হিসেব করে, পরিবার পিছু একহাড়ি। তাও রাতের বেলা নয়, শুধু দিনে। রাতে যাতে জল চুরি না হয় তাই পুকুর ঘিরে রাখাদার বসানো হয়েছে। প্রতিদিন পালি করে-করে এই চার গ্রামের মানুষ জলের ওপর নজর রাখছে।

কেবল যে এই গ্রামে এমন ব্যবস্থা, তা নয়। দূর-দূরান্তের যে-গ্রামে কাদাজলটুকুও আছে, সে-গ্রামেও পাহারা। কঠোর নজরদারিতে রাখতে হচ্ছে জল। মারদাঙ্গা-খুনোখুনি চলছে বহু বহু গ্রামে। যখন-তখন পিপাসার্ত বহিরাগত ‘পানি-লুঠেরা’র দল হাতিয়ার নিয়ে চড়াও হচ্ছে, পুকুরের দখল নিয়ে নিচ্ছে। তাদের ঠেকাতে আলোবাতি ছাড়াই গ্রামবাসীরা টাঙি-বল্লম-তিরধনুক নিয়ে পুকুরের পাড় ঘিরে রাতভর পাহারা বসাচ্ছে। গ্রাম পড়ে থাকছে গভীর অন্ধকারে, অবহেলায়। বেলা ডুবতে না ডুবতে শুরু হয়ে যাচ্ছে নিষ্প্রদীপ মহড়া।

আকুই আলোর কথা বলাতে তারা সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে যায়। সেদিকে তাকিয়ে ভালো করে নজর করতে চেষ্টা করে। আলোটিকে দেখতে দেখতে অশ্বিনীরও তাকে চিড়কুনের আলো বলে মনে হয়। চিড়কুন হল একধরনের অশরীরী, যারা রাত হলে মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ায়। তাদের গা থেকে নাকি একধরনের আলোর ছিটে বেরিয়ে আসে। এই বিশ্বাস মনে রেখে গ্রামবাসীরা তাদের নাম শুনলে ভয় পায়। তারা জ্যান্ত মানুষকে ছলনা করে দূরে কোথাও নিয়ে গিয়ে টুঁটি চেপে মেরে ফেলে।

কিন্তু খানিক বাদে তাদের সেই ভ্রম কেটে যায়। তারা আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখে, আলোর বিন্দু একটি নয়, কয়েকটি, এবং সেগুলি ক্রমশ বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে আলোগুলি ধাবমান। সম্ভবত তারা এগিয়ে আসছে এদিকেই। শিংশিং গ্রামের দিকে।

পুব বরাবর বেশ কয়েক মাইল ব্যাপি মানুষের বসতি নেই। শুধু ডাঙা জমি এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত অব্দি ছড়িয়ে গেছে। সে-জমিও আবার পাথুরে, কাঁকুরে। গাছপালা নেই, আগেও ছিল না। আর একটু রাত হলেই শুরু হয়ে যাবে শিয়ালের হুমদুমি। হুক্কারব। বহুদূরের জঙ্গল থেকে শেয়ালের পাল রাত হলে জৈবিক কারণে বসতির দিকে আসে। কুকুরের সঙ্গে মিলিত হতে। এখন তাদের আসা অনেকটাই কমে গেছে। সন্ধে হলে এই মাঠ জুড়ে তাদের সেই উল্কাপাত করা রব আগের মতো শোনা যায় না আর।

হাওয়া চলছিল না। পচা গরম। কিছুক্ষণ বাদে তাদের মনে হল দ্রুত এগিয়ে আসছে আলোগুলি। নিশুতিরাতের নিস্তব্ধতায় উৎকর্ণ থেকে তারা ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের সম্মিলিত শব্দ পায়। আর তখন হইচই পড়ে যায়। হুকুমদার আসছে! হুকুমদার আসছে! গ্রামের লোকজন হাতিয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে। যে-যেখানে পারে আক্রমণ শানিয়ে লুকিয়ে থাকে। খবর চলে যায় পাশের গ্রামগুলিতেও।

ঘোড়সওয়াররা গ্রামের কাছাকাছি আসার অনেক আগে তাদের গতি থামিয়ে দেয়। কথাও বলে নীচুস্বরে, ফিশফিশ করে। ঘোড়াগুলি নজরে আসে না। তাদের হাতের মশালগুলিকে এদিক-ওদিক যেতে দেখা যাচ্ছে। তারা পুকুরটির সঠিক অবস্থান দেখছে। এভাবেই নানান জায়গায় পুকুর খুঁজতে খুঁজতে আসছে তারা। বহু জায়গায় ঘুরছে। এখন এমনি করে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে জলের জন্য ঢু-ঢু করে ঘুরতে হয় তাদের। কোথাও মিললেও সংঘর্ষ বিনা একঘটিও নয়। দিনে জঙবাজ-জোতদার মারো, শস্যগোলা লুট করো, আর রাতে পানি-লুঠেরাদের থেকে জল বাঁচাও! পুকুর বাঁচাও! দিকে দিকে এই চলছে।

একসময় সব আলোগুলিই ঘুরে আসে শিংশিং-এর দিকে। পুকুরের পাড় দেখতে পেয়ে কেউ একজন নেমে পড়ে। ঘোড়া রেখে দিয়ে সে এগিয়ে যায়। উত্তেজিত ইশারায় বাকিদের ডাকে। চারটি ঘোড়া থেকে আরো জনা তিনেক ভিস্তি নিয়ে পুকুর পাড়ে ওঠে।

ঘাটে আলো পড়তেই ঝলমল করে ওঠে মাঝিপুকুরের স্বচ্ছ জল। ‘পানি-লুঠেরা’দের চোখগুলিও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু তারা সেই জলে নামার সুযোগ পায় না। অন্ধকার থেকে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর মতো গ্রামবাসীরা আচমকা এসে আবির্ভূত হয়। লুঠেরা-হুকুমদারদের হুমকি দিতে থাকে। ঘিরে ধরে তাদের। তারপর যেদিক-সেদিক থেকে এলোপাথাড়ি তাদের ওপর আসতে থাকে লাঠির আক্রমণ! শুধু যে তারা পানি-লুঠেরা, তা নয়। তারা জঙবাজ-হুকুমদার বলে গ্রামবাসীরা তাদের একটাকেও জীবিত ছাড়তে চাইল না।

জঙবাজরাও পিছিয়ে আসে না। তাদের অস্ত্র চালায়। কিন্ত ঘায়েল করতে পারে না। গ্রামবাসীরা তাদের হাতিয়ার দেখে আর এগিয়ে যেতে সাহস পায় না। তারা লাঠি ও হাতের অস্ত্র বাগিয়ে থেকে সময় নেয়।

ইতিমধ্যে গ্রামে জঙবাজ পড়ায় পাশের গ্রামগুলি থেকেও রে-রে করে হাতিয়ার নিয়ে ছুটে আসতে থাকে লোকজন। যে-কজন জঙবাজ ইতিমধ্যে ঘোড়া থেকে নামেনি, তারা সঙ্গীদের বাঁচানোর জন্য তাদের সঙ্গে গ্রামবাসীদের লড়াইয়ে সামিল হলো না। দুড়দাড় ঘোড়া ছুটিয়ে পালাতে থাকে তারা।

বাকিদের ছেঁকে ধরে মাছুয়ার এবং পাশের গ্রামের সকলে। তুমুল লড়াই চলতে থাকে। জঙবাজদের একজনকে লাঠির ঘায়ে পুকুর পাড়েই আধমরা করে ফেলে দেওয়া হয়, একজন অন্ধকারে ছুটন্ত ঘোড়াকে লক্ষ্য করে পালাতে গিয়ে বেশিদূর যেতে পারেনি। অস্ত্রের আঘাতে জখম পা নিয়ে মচকে পড়ে যায়। আরেকজনকে গাছের গুঁড়িতে বেঁধে রাখে গ্রামবাসীরা।

সকালে মৃতদেহ দুটিকে তারা পাথুরে ডাঙার ওপর দিয়ে চাকাগাড়ির মতো টানতে টানতে বহুদূরে রেখে দিয়ে আসে, যাতে শেয়ালের পালে খায়। কিন্তু তৃতীয়জন তখনো জীবিত। তাকে একটা বাজ-পড়া ঠুঁটা খেজুর গাছে বাঁধা অবস্থাতেই রেখে দেওয়া হয়। টানা তিনদিন তিনরাত সে আর্তনাদ করতে থাকে, যতটা না ক্ষুধায়, তার চেয়ে বেশি পিপাসায়। সে কাতরাতে থাকে। গ্রামবাসীরা একফোঁটাও জল তার মুখে দেয় না। ধীরে ধীরে সে-কাতরানি থেমে আসে। গোঙানিও কমতে থাকে। পাঁচদিনের দিন নিশ্চল-নির্বাক হয়ে গেল সে।

গ্রামবাসীরা দেখল ভোরের আলো ফোটার আগে তার শুকিয়ে চিমসে যাওয়া নিস্পন্দ শরীর একপাশে হেলে রয়েছে। গন্ধ পেয়ে কাক এসে জড়ো হয়। দড়ির বাঁধন রয়েছে তেমনি। আলগা হয়ে গেছে শুধু।

২৮

সেই ভয়াবহ দৃশ্য শেষদিকে আর চোখে দেখতে পারছিল না জারমণি। নিজেকে সে কয়েকদিন ধরে অন্তরীণ রেখেছে। রতিগড় টিলার মাথায় তার কুঁড়েঘরটিতে। কিন্তু সেখানেও ভয় তাকে সমানে তাড়া করে চলেছে। তাকে কুটির থেকে টেনে বের করে আনতে চাইছে বাইরে—শৃঙ্গের ওপরে দাঁড়িয়ে থেকে সে দেখুক যুদ্ধের কি ভয়ংকর করুণ পরিণতি! দেখুক যেমন সে আগেও প্রায়শ দেখেছে।

কিন্তু না। দিগন্ত প্রসারিত যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সে ধরে রাখতে পারছে না। সে আর দেখতে চায় না। তার শেষ দেখা হয়ে গেছে। শুধু দেখা হল না...আবেগকে সংযমে রাখে জারমণি।

হয়েছে কি তার শেষ দেখা? এখনো হয়নি। এখনো শেষ তারই অপেক্ষায় রয়েছে। হয়তো সে তা না দেখলে এই মাঠারিযুদ্ধের যবনিকা পতন হবে না। শেষ তাকে দেখতেই হবে। মাঠারি জুড়ে স্তিমিত গোধূলির আলোর রেশটুকুও নিয়ে সূর্য চিরতরে অস্তমিত হলে, তবে তো শেষ। জীবন জুড়ে যুদ্ধ তো অন্ধকারই রেখে যায়। রেখে যায় শূন্যতা। হাহাকার। আর্তনাদ।

জারমণির প্রাণ আনচান করে উঠছে। ক্রমশ শিথিল হয়ে আসা কোলাহলের ভেতরেও, এখনো, শত-শত যোদ্ধার রব, অবিরাম তিরনিক্ষেপ, গদার শব্দ আর গো-শকটগুলির কর্কশ চাঞ্চল্য তার কানে বেজে চলেছে। কোথা থেকে যে আসছে! সে কান চাপা দিতে চায়। শুনতে চায় না। বারে বারে সেই একই কথা এখনো সে বলে চলেছে, ‘হে জিনগা-মাঈ! বলো, বলো কেন আমার হাতে ধনুর্বাণ নেই?’ একসময়, হঠাৎ তার চোখে পড়ে যায় চালায় গুঁজে রাখা সেই বুচাটাঙি।

এতদিন পর! এতবছর পর! এত যুগ পর আবার সেই বুচাটাঙি! কবে কোথায় যে রেখেছিল সে! জারমণি ভুলেই গিয়েছিল এই আদিম অস্ত্রটির কথা। এখন সেটাকে দেখে তার চমকে ওঠা মোটেই অস্বভাবিক ছিল না। কিন্তু কই, সে তো চমকে উঠল না? তার জীবনে আর কোনো চমক নেই। আর কোনো বিস্ময়বোধ নেই। সবকিছুই কেমন যুদ্ধক্ষেত্রে অনাদরে পড়ে থাকা জ্যা-মুক্ত তির কিংবা নি:শেষিত তূণের মতো অবস্থান করছে এই ভৌতিক পরিমন্ডল ঘিরে।

জারমণি মনঃসংযোগ করতে লাগল সেই অস্ত্রটির প্রতি। তার সূত্রে কত কথা যে মনে পড়ে যেতে লাগল! কত কথা! যেন বহু সহস্রবর্ষ সে অতিক্রম করে এসেছে, কিন্তু এই অস্ত্র আজও তাকে ছেড়ে যায়নি। অস্ত্র কি কখনো বিশ্বস্ত হয়? যে-ভাবে মানুষ অপেক্ষা কুক্কুর ঢেরগুণ বিশ্বস্ত। প্রভুপরায়ণ।

সে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে তার দিকে। যেন তাকিয়ে রয়েছে সিঁদুরে রঞ্জিত জিনগা-মাঈয়ের মুখপানে। মনে পড়ছে সেই পাহাড়! সেই জিনগা-থান! স্বর্গীয় উদ্যান! পাহাড়ের মাথায় জিনগার হাত থেকে নিয়ে আসা সেই বুচাটাঙি আজ তার চোখের সম্মুখে একমাত্র ভাববিনিময়ের মাধ্যম। আর কোথাও কিছু নেই। জীবন খর্ব হতে হতে সারা মাঠারি জুড়ে রয়ে গেল শুধু পাহাড়-ডুংরিগুলি। শুধু পাথরের স্তূপগুলি। প্রাণ কোথায়? চতুর্দিকে মৃত্যুর ক্রমহ্রাসমান কলরব। থেমে গেছে সকল রণধ্বনি। এখন আর শোনা যায় না ভেরী, দামামা। বেজে ওঠে না শত শত তূর্য! কেবলি বাজছে হাহাকার!

তার সুউচ্চ টিলার শীর্ষদেশে যেমন রাতভর চড়চড় করে জ্বলতে থাকে মশাল, তেমনি কালও জ্বলেছে। বড় হয়ে। চতুর্দিক আলো করে। সেই মশাল এখন ভস্মীভূত। তার স্তূপ থেকে বাতাসে উড়ছে ছাই। ভেতরে থেকেও, জারমণি, কুটিরের গায়ে বাতাসের শনশনানি টের পায়। যেন প্রবল আগ্রাসন নিয়ে বহু দূর থেকে এগিয়ে আসছে দনুর সন্তান!

গাছগাছালিহীন মাঠারির সেই অবারিত বাতাসে ভেসে আসতে থাকে গলা-পচা মৃতদেহের গন্ধ, আক্রমণ আর প্রতি-আক্রমণের ক্ষয়িষ্ণু হুঙ্কার, আর এই শেষ অঙ্কে পীড়িতের মুহূর্মূহ আর্তনাদ! দিন ঢলে পড়ছে।

তখনও চলেছে যুদ্ধ! এই শেষ। এখন আর সারা মাঠারিক্ষেত্রকে নিয়ে নয়—পরিসর ছোটো হতে হতে এখন তা গোস্পদে গিয়ে ঠেকেছে। এই অন্তিমলগ্নেও উভয়পক্ষই তাদের সর্বশেষ ক্ষমতা দিয়ে আক্রমণ করতে চাইছে প্রতিপক্ষকে। একেকবার করে আর্তনাদ উঠছে আর পতন হচ্ছে হাতে গোনা শত্রুর। একের পর এক। সেই ভোর থেকে চলছে। তবে আর নেই। যবনিকা পড়ল বলে!

শেষ আর্তনাদ রেখে অবশেষে চকিতে থেমে গেল সব। যুদ্ধরত পাটন এদিক-সেদিক থেকে আর কোনো লড়াইয়ের শব্দ শুনতে পায় না। সে টের পায় নিস্তব্ধতা। দ্বিপ্রাহরিক বাতাস বইছে বিষাদের সুরে। সূর্য তখনো পাটে যায় নি।

কিন্তু তখনও আত্মসমর্পণের কথা ভাবেনি পাটন। কোনোপক্ষেরই আর কোনো লোকলস্কর নেই, লড়াই নেই, রাজকীয় ঝংকার নেই, বাজ-বাজনাও নেই। বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝে অঙ্গদের বিপক্ষে একা দাঁড়িয়ে ভয়ার্ত বোধ করে সে।

রণবেশে সজ্জিত বিশালদেহী অঙ্গদ পর্বতের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই দৃঢ়নিশ্চয়, অকুতোভয়, ধীর ধনুর্ধরকে দেখে নিজেকে খর্বাকৃতি মনে হয় পাটনের। পদযুগল তার কম্পিত হতে থাকে, মন চঞ্চল হয়ে ওঠে, তবু যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে থাকা অখন্ড নিস্তব্ধতার প্রেক্ষিতে হুঙ্কার দিতে ছাড়ে না। প্রতিটি হুঙ্কারের প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে আসে। যেন ধ্বনি অপেক্ষা প্রতিধ্বনিই অধিকতর সরব এখন। পাটনের মনে হয় সেই প্রতিধ্বনিই যেন উত্তরোত্তর বধির করে তুলছে তাকে। সে দেখতে চাইল শেষবারের মতো জারমণিকে। শুনতে চাইল শেষবারের মতো তার কন্ঠস্বরটি। সে নিজের মধ্যে, অবীরোচিত অশুভ লক্ষণগুলি অনুভব করলেও তার মহাভার ধনু পদতলে নামিয়ে রাখল না। ক্রমশ হেলে পড়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে, করজোড়ে সে এমন কথাও বলল না, ‘হে, দিব্যজ্যোতি বরুণদেব! আমাকে গ্রহণ করো! আমার গতি করো!’

বিপরীতধর্মে, তখনো, নিজেকে সে স্বঘোষিত বীর বলে চলেছে। বাতাসের প্রতিকূলে হ্রেষাসম রব তুলে বলছে, ‘বীর আমিই! আমিই বীর আর তুমি কাপুরুষ। বীরোচিত ধর্মবল আর শৌর্য-বীর্য গুণে দেখো আমি তোমার প্রতিটি শরাঘাত দেহে নিয়েও কেমন তুচ্ছজ্ঞান করছি মৃত্যুকে। তুচ্ছ করছি তোমাকে। কাপুরুষ! দেখাও তোমার শক্তি! আমি তোমার সহস্র শরাঘাতের জন্য তৈরি।

তার সেই আস্ফালনের জবাব আসে আরেকটি শরাঘাতের মাধ্যমে। মহাকায়াধর অঙ্গদও ক্রমে দুঃসাহী হয়ে ওঠে। সে আরো এগিয়ে যায় তার লক্ষ্যের অভিমুখে। শত্রুভূমিতে ঢুকে পড়তে এখন আর এদিক-ওদিক দেখারও প্রয়োজন নেই। অজানা আক্রমণেরও আর কোনো সম্ভাবনা নেই। এখন সবকিছুই উন্মুক্ত, শত্রুহীন।

অঙ্গদ নির্ভীক দাঁড়িয়ে আঘাত হেনে চলে পাটনকে। তার দেহ সে শরে-শরে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে, কিন্তু তবু আস্ফালন তার যায় না। সেই অবস্থাতেও অক্ষম বাহুদ্বয় নিয়েও সমানে লড়াই চালিয়ে যায় পাটন।

এখন আর বহুক্ষেত্র থেকে নয়, সম্মিলিতও নয়, পরস্পরের একক হুঙ্কার আর আক্রোশ প্রতিধ্বনিত হতে থাকে চতুর্দিকে। যখন মাঠারির বিস্তীর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে আর কেউ নেই, আর কারো কোনো সৈন্যবাহিনীও নেই। বাহিনী কেন, একজন শত্রুও আর বেঁচে নাই। দু-একটি হুকুমদার থাকলেও থাকতে পারে। আশেপাশে তেমন কাউকে দেখা যায় না। সর্বত্র জনহীন। ভয়ংকর নিস্তব্ধতা পাথরে গড়া ধাতব মুদ্রার মত ঝনঝন করছে। মাঝে-সাঝে সংক্ষিপ্ত ঘূর্ণিবাতাসে চোঙের মতো করে শূন্যে পাকিয়ে উঠছে মাঠারির ধুলো, বেগ নিয়ে সরে যাচ্ছে স্থানান্তরে।

ইতিমধ্যে পাটনের গাড়োয়ানেরও মৃত্যু হয়েছে। শকটে বসা অবস্থাতে দক্ষিণ পার্শ্বে হেলে রয়েছে তার বিশিখ-বিদ্ধ দেহ। পাটন সেই অনড় গো-যান থেকে চালিয়ে যাচ্ছে তার আক্রমণ। এতদিনকার যুদ্ধে, বিরোধীদের কত-কত সেনাকে যে সে হত্যা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। বহু জখম ও পচন ধরা দেহ আরো অসংখ্য মৃতদেহের সঙ্গে ছড়িয়ে রয়েছে। যা তার অব্যর্থতার সঙ্গে শরক্ষেপণের সাক্ষ্য।

কিন্তু সে-সব দেখেও এখন তার আর প্রাণিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তার বীরধর্ম হেঁটমুন্ড হচ্ছে এই শেষপাদে এসে, অঙ্গদের কাছে। সে বুঝেই গেছে তারও অন্তিম দশা। কিন্তু তবু নিজেকে সে গুটিয়ে নিতে চায় না, পরাজিতও ভাবতে চায় না। বস্তুত, তার তূণে পড়ে থাকা শেষ তিরটি পর্যন্ত সে শত্রুকে আক্রমণ করা থেকে এক ডেগও পিছিয়ে আসবে না।

উলটোদিকে, অঙ্গদের সারা শরীর থেকে সর্বগ্রাসী আগুনের মতো বেরিয়ে আসছে আক্রোশ। পাটনের প্রতিটি হুঙ্কারের জবাবে সে তাকে বিদ্ধ করে চলেছে তাকে চিরতরে বাকহীন করার লক্ষ্যে। প্রতিপক্ষ ভেবে নয়, জয়ের কথা ভেবেও নয়, মাঠারিকে রাহুমুক্ত করার যে কঠোর পণ সে করেছিল, এই চন্ডালকে হত্যার ভেতর দিয়ে সেই পণ সে রক্ষা করতে চলেছে। অশুভ, অপবিত্র, কামগন্ধসর্বস্ব এই ম্লেচ্ছদেহকে সে সুন্দর ও শুভর কাছে দিতে চায় নৈবেদ্য।

গাড়োয়ানের আসনে মহাপ্রবীণ নির্বিকার। অন্তিমলগ্নেও তিনি দেখে যাচ্ছেন যুধ্যমান উভয়পক্ষকে।

জারমণি বিচলিত বোধ করে। সে বিস্মিতও হয় এই ভেবে যে, এখনও কেউ বেঁচে আছে! দূর থেকে তাদের দেখে সে বুঝতে পারে না, কেন কী কারণে ওই মানুষ দুটি উঠে আসছে রতিগড়ের মাথায়। এখন তাদের কাছে আর কোনো বাহন নেই, অস্ত্রও নেই। সব জলুস হারিয়ে এখন তাদের দেখতে লাগে হাটে-বাটে ঘুরে বেড়ানো ছাগলচোরের মতো।

জারমণি চিৎকার করে কারণ জানতে চাইলেও তাদের মুখ থেকে কোনো জবাব আসে না। তাতে আরো বেশি সন্দেহ দেখা দিতে থাকে তার মনে। সে এবার তাদেরকে হুঁশিয়ারি না দিয়ে পারে না। কিছুটা বিষণ্ণতার সুরে আবার বলে, ‘হুকুমদার! কিসের প্রয়োজনে তোমাদের এখানে আসা? কী চাও তোমরা? যখন এই বিশাল বায়ুমন্ডলে শ্বাস নেওয়ার মতো মানুষ আর প্রায় থাকলই না, এমনকি, জীবসমূহেরও মৃত্যু নিশ্চিত হল, আর যুদ্ধেরও যখন যবনিকা পতন আসন্ন, তখন তোমাদের আর কীসের প্রয়োজন? আমার কাছেই-বা এমন অসময়ে তোমাদের আসা কেন?’

অসময়? কথাটা শুনে হুকুমদারদের মনে হাসির উদ্রেক হয়। জীবন ও সমাজের কোনো অস্তিত্বই যখন থাকল না, তখন এই অখন্ড ধ্বংসের বলয়ে সময় কী আর অসময়ই-বা কী?

তারা নিরুত্তর। বুঝতে পারে না কী জবাব দেবে। যদিও, জবাব দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা এখন আর তাদের নেই। কার কাছে বাধ্যবাধকতা? কে আছে? যুদ্ধের সব নিয়মরীতি-শৃঙ্খলারও অবসান হয়েছে। কবেই। মাঠারির চারপাশে ঘিরে থাকা গ্রামগুলিকে যখন খরা, আকাল, রোগ-জ্বালা আর ভয়াবহ জলাভাব মহামারির মতো গ্রাস করে ফেলেছে, গ্রামে-গ্রামে মহাবিদ্রোহের আগুনে যখন দোকানপাট-বাড়িঘর দাউদাউ করে জ্বলছে, অনবরত হাহারব উঠছে মানুষের, শোকাচ্ছন্ন ও অনাহারী পরিবারগুলি জীবনের দিশা খুঁজতে দলে-দলে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে, তখন মাঠারিতে কি তার আঁচ পড়বে না? তখন কোন শৃঙ্খলা দিয়ে তাকে অক্ষত রাখা যাবে?

এখানেও শিবিরগুলি থেকে শস্য-সম্পদ-অস্ত্রশস্ত্র লুট হয়েছে। কোনো নিয়মশৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করে বিরোধীরা, এমনকি স্থানীয় গ্রামবাসীরাও, শিবিরে ঢুকে গোল-সিপাইদের হত্যা করে নিয়ে গেছে চালের বস্তা, নুন, ভুট্টা ইত্যাদি। জলভর্তি বৃহদাকার হান্ডাগুলিকেও তারা রেখে যায়নি। গো-শকটগুলিতে সেইসব সম্পদ বোঝাই করে যে-যেদিকে পেরেছে লুট করে নিয়ে চলে গেছে। নিয়ে গেছে বহু গোরুর গাড়ি, বলদ, ঘোড়া, খচ্চরও।

সে-সময় এই লুঠেরাদের প্রতিরোধ করবে, তাদের বিতাড়িত করবে এমন বৃহৎ সৈন্যবল আর ছিলও না। যারা ছিল, তারা সেই দুর্বৃত্তদের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমেছিল বটে, কিন্তু তাদের একটাও বাঁচতে পারেনি। কীভাবে বেঁচে গেছে এই দুটি হুকুমদার। তারা প্রাণের ভয়ে পালিয়ে নিশ্চয় আত্মগোপন করেছিল টিলার আড়ালে কোথাও।

এখন তারাই আবার চড়াও হতে চাইছে জারমণির ওপরে। তাকে লুন্ঠন করে খুঁজে পেতে চাইছে তাদের হারানো জীবন। বিশৃঙ্খলার মধ্যে ধ্বংস হতে হতে তিনবছর তিনমাস সতের দিন পর যুদ্ধ আজ শেষের মুখে। একটি মানুষও যখন আর নেই, যখন যুদ্ধরত পাটনও অঙ্গদের ঘেরাটোপে বন্দি এবং জীবন নিয়ে তার ফিরে আসার আর কোনো সম্ভাবনাই নেই, তখন জারমণির হুশিয়ারিকে তাদের আর ভয় পাওয়ারই-বা কী আছে?

তবু, আপাত সম্ভ্রম দেখিয়ে হুকুমদাররা বলল, ‘রানি, এই বিরাট মাঠারি নি:সঙ্গ পড়ে আছে, তবু কোথাও আমাদের আশ্রয় নেই। তুমি আমাদের আশ্রয় দাও রানি।’

‘আশ্রয়?’ জারমণি হতবাক হয়ে তাদের কুৎসিত লোলুপ মুখের দিকে তাকায়। ‘কিসের আশ্রয়? এখনও তোমরা আশ্রয়ের কথা ভাবো?’

‘জানি, আমাদের মৃত্যুরও আর বিলম্ব নেই। আমাদের কেউ আজ আর জীবিত নেই। তৎসত্ত্বেও আমাদের শেষ ইচ্ছা—মৃত্যুর আগে তুমি আমাদের পিপাসা নিবারিত করো, রানি! তোমার কুটিরে আমাদের আহ্বান করো। তোমার একান্ত সঙ্গ একবার উপভোগ করতে দাও!’

তাদের মুখ থেকে ‘রানি’ সম্বোধন তার মোটেই ভালো শোনাচ্ছিল না। সে তাদের মতলব বুঝতে পেরে ঝটিতি কুটিরের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

তার এই দ্রুত প্রস্থানে বিচলিত বোধ করল না হুকুমদাররা। তারা তো জানে, ক্রোশ-ক্রোশ ব্যাপী মাঠারির এই উন্মুক্ত ক্ষেত্র পড়ে থাকলেও জারমণির কোথাও পালিয়ে যাবার জায়গা নেই। লুকিয়ে পড়ারও উপায় নেই। কোথাও সে তার নিরাপদ আত্মগোপনের স্থান খুঁজে পাবে না। কাজেই এই তো সুযোগ! এই নারীর কাছ থেকে তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণের।

তারা যখন পুরোপুরি রতিগড়ের ওপরে উঠে এসেছে, তারপরও এগিয়ে আসছে জারমণির কুঁড়েঘরটির দিকে, তখন জারমণিও নিজেকে সুসজ্জিত করে নিয়েছে। মনে মনে জিনগা-মাঈয়ের নাম করে সে বুচাটাঙিটি হাতে নিয়ে ভৈরবীমূর্তিতে তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। হাতের অস্ত্রটি সম্মুখে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘এখন আমাকে নিরুপায় মনে করে যদি তোমরা ছলনা করতে চাও, তবে তাতেও আমি মোটেই কাতর নই। আমি তোমাদের পিপাসা নিবারিত করতে রাজি। আর এই হাতিয়ারকে করতলগত রেখে তোমাদের আশ্রয় দিতেও কুন্ঠিত নই। এগিয়ে এসো এবার!’

ততক্ষণে জারমণিকে এতখানি নিকট থেকে দেখে তারা এতোটাই আত্মহারা ও মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে যে, তার হুঙ্কারের ভেতরে তাদের ধ্বংসের বার্তাটিকে অনুধাবন করতে পারে না। তাদের একজন অংশত ছাই হয়ে যাওয়া একটি কাষ্ঠখন্ড নিয়ে আক্রমণের জন্য এগিয়ে যায় ক্রোধে জ্বলতে থাকা সেই নারীর দিকে। আর সেসময় পিছন থেকে তাকে জাপটে ধরে অপর হুকুমদারটি। এই অবস্থায় তাদের দুজনের সঙ্গে একা লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে জারমণি। সে হাওয়ার বেগে টাঙি ঘুরিয়ে তাদেরকে ঘায়েল করতে থাকে। কিন্তু ইত্যবসরে তারা কোমরে পাকিয়ে রাখা পশুচর্মটুকুতে টান মেরে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে ফেলেছে জারমণিকে। তা করেও বাগে আনতে পারে না এই বীরাঙ্গনাকে। সে কখনো তার অস্ত্রের আঘাতে, কখনো-বা উপর্যুপরি পদাঘাতে যখন তাদের ধরাশায়ী ও নি:সাড় করে ফেলে, তখন পাটনের কন্ঠ থেকে নির্গত শেষ আর্তনাদ তার কানে আসতে থাকে!

জারমণি তার বজ্রমুঠিতে ধরা হাতিয়ার নিয়ে দ্রুত নেমে আসে গিরিনিতম্ব বেয়ে। যুদ্ধভূমির অভিমুখে রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে থাকে সে।

গো-শকট থেকে লম্ফ দিয়ে নামে অঙ্গদ। মেদিনী কেঁপে ওঠে! একটার পর একটা শবদেহ ডিঙিয়ে, ধনুর্বাণ নিয়ে, শিকারীর মতো তাকে তাড়া করে যায় সে।

পাটন তখন নিরস্ত্র। তার তূণীরে আর কোনো তির না থাকায় সে পালাতে থাকে। বহুমুখী আক্রমণে জর্জরিত। রক্তাক্ত। পিঠে, কাঁধে সারা দেহে অগণিত শর। বিঁধে থাকা সেইসব শর নিয়ে সজারুর মত ছুটতে থাকে সে। শিবিরের বিপরীতে। যদিও শিবির বলে এখন আর কিছু নেই। পড়ে আছে শুধু ধ্বংসাবশেষ। ভেঙেচুরে যাওয়া ধাঁচাগুলি। এসবই শত্রুপক্ষের তান্ডবের স্মারক। পাটন ছুটে চলে যায় বহুদূর! যেন সেদিকে কোথাও আশ্রয় নিয়ে বাঁচতে চায় সে। কিন্তু কোথায় পালাবে, এখন? এই অন্তিম সময়ে?

জনহীন প্রান্তরে একা ছুটতে ছুটতে দূরবর্তী সেই ইরাবতীর দিকে যেতে দেখা যায় তাকে। তবে সেদিকেও বেশিদূর সে টেনে নিয়ে যেতে পারে না নিজেকে, নিজের অতিকায় ক্ষত-বিক্ষত শরীরকে। পায়ের গতি কমে আসে। পা টলমল করে, লাটাতে থাকে। যেকোনো মুহূর্তে যেন লাট খেয়ে পড়ে যাবে। শেষবারের মতো ধরাশায়ী হবে তার বিপুল রাক্ষস দেহ। তবু মরিয়া হয়ে এগিয়ে যায় সে। কিন্তু একসময় আর পারে না। থামতে হয়।

তাকে লক্ষ্য করে প্রবল ধুলোর মন্ডলী নিয়ে ধেয়ে আসা ঝঞ্ঝার মতো এগিয়ে আসে মহাবীর অঙ্গদ। পাটন তার দিকে ধনুবিচ্যুত বাহু উত্তোলিত করে ঘুরে দাঁড়ায়। হাঁপাতে থাকে। অতঃপর লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে, বিরতি নিয়ে, সে যা বলতে থাকে তা এই প্রথম তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়। এমন কথাও যে তাকে কখনো বলতে হতে পারে তা কল্পনাও করেনি সে। এতদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে সে কেবল একতরফা জয়ের কথা, জীবনের কথা, আত্মম্ভরিতার কথা বলে এসেছে, কিন্তু আজ?

আজ এই দন্ডে, যখন কোনো পক্ষের কোনো সেনা বেঁচে নেই, যখন আর একটিও ভল্লধারী ধনুকধারী পর্যন্ত নেই, শত্রুর ভয়াবহ আক্রমণের মুখে পড়ে তাকে শেষতক মৃত্যুর কথা বলতে হচ্ছে। কী শোচনীয় পরিণতি! যে-মৃত্যুকে সে তার তেজ, তার দম্ভ ও অহঙ্কারের অন্ধতা নিয়ে বরাহ-জ্ঞানে পদাঘাত করে তার জীবন-অঙ্গন থেকে বহু যোজন তফাতে রাখতে চেয়েছিল, সেই মৃত্যু! সেই মৃত্যু আজ শত-সহস্র ঘুঙুরের শব্দ তুলে ঝন-ঝন করছে তার পায়ে পায়ে। আজ তার কাছেই সমর্পণ করতে হচ্ছে নিজেকে। হায়, পাটন! এখন, এতদিনে, হয়তো তার মনে হচ্ছে, যা অবশ্যম্ভবী তাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তার নেই। এটাও কি তার মনে হচ্ছে না, মৃত্যুই সর্বশক্তিমান? তাকে আঘাত করা তো বাতুলতা, এমনকি আঘাতের কল্পনা করাও নিছক মদমত্ততা বৈ কিছু না?

পাটন হাঁপ টানে। বড় কষ্ট হয় তার। সেই ক্লেশ নিয়েও সে তার অন্তর থেকে যেন প্রতিটি বাক্যকে টেনে আনে। ঘর্মাক্ত বদনে সকাতর গলায় বলে, ‘সহোদর, আমার মৃত্যুর জন্য...আমার মৃত্যুর জন্য দন্ড দুয়েক সময় দাও! আমি আনন্দ নিয়ে বাঁচতে পারিনি, শান্তি নিয়ে মরতে দাও। আমাকে মৃত্যুর তরে অবসর দাও!’

অঙ্গদ থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু লক্ষ্যে অবিচল থাকে সে। পাটনের অনুনয়ের সুর তাকে স্পর্শ করতে পারে না।

‘আমি বীরের মতো বাঁচতে চেয়েছিলাম, আমাকে কুক্কুরের মতো মেরো না। এমন মৃত্যু যেকোনো জীবনের পক্ষে অগৌরব। আমার অন্তিম শ্বাস নির্গত হওয়ার আগে ওই ইরাবতীতে পৌঁছতে দাও আমাকে! পৌঁছতে দাও! আমার মৃত্যু হোক তার ক্রোড়ে। যদিচ, আজ তা বিশুষ্ক, ধূসর ডাঙামাত্র। তথাপি, একদা এই পুষ্করিণীর বক্ষে মরালীর ন্যায় অবগাহন করত আমার জারমণি। আমার সকল ব্যর্থতার ভেতরও অন্তত এই সান্ত্বনাটুকু উপভোগ করতে দাও আমাকে! আমাকে তার ক্রোড়ে স্থান পেতে দাও!

‘আমি মৃত্যু-যন্ত্রণায় কাতর। ছটফট করছি। তাই ছুটে যাচ্ছি ভেবে আমাকে ভীরু, পলাতক মনে করার কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তে আমি নিরস্ত্র হলেও তোমার কাছে আমি প্রাণভিক্ষা করবো না। ভিক্ষার অন্ন নিয়ে বেঁচে থাকিনি, ভিক্ষার জীবন নিয়েও বাঁচতে চাই না। আমার অখন্ড জীবদ্দশায় একমাত্র ভিক্ষাকেই ঘৃণা করে এসেছি। আমি জারমণির কাছে প্রেমভিক্ষা করিনি, আমি তোমার কাছেও জারমণি ভিক্ষা করিনি। আমি ঈশ্বরের কাছে দৈববল ভিক্ষা করিনি, আবার কোনো মন্ত্রণাদাতা কুচক্রী বৃদ্ধের কাছে নতমস্তক হয়ে শত্রুবধের নিমিত্ত মহাশক্তিধর তনুও ভিক্ষা করিনি। আমি আপন গৌরবে বাঁচতে চেয়েছিলাম, সহোদর। এমনকি, জারমণিকে না পেয়েও জারমণির ভূমিদেশকে স্পর্শ করেও বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম। তুমি আমাকে তাও দিলে না। কী অপরাধে, সহোদর? বলো, বলো কী অপরাধে? আমার মৃত্যু যখন তোমার অঙ্গুলির অগ্রে মক্ষিকার মত অবস্থান করছে, তখনও কেন তুমি এমন নির্বাক, নিস্পন্দ, নিরুত্তর? বীরোচিত জবাব দাও!

‘তুমি জ্ঞানী, তবুও তোমাকে বলতে ইচ্ছে হয়, কারণ জ্ঞানীপুরুষ জ্ঞানচর্চায় বিভোর থাকতে থাকতে নিত্য বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞ ও অনভিজ্ঞ থেকে যায়। জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে বড়ো নৈরাশ্য ও ক্ষোভের সঙ্গে বলতে হচ্ছে— হে জ্ঞানতপস্বী, জেনে রাখো, নারী কখনো কোনো পুরুষের আপন হয় না। কোনোদিন তার মন জয় করা যায় না। আবার সে অজেয়ও নয়। পুরুষের কন্ঠনালিতে যাবজ্জীবন অস্থিখন্ড হয়ে সে অবস্থান করে। সে আপন খেয়ালে, আপন স্বার্থে প্রেমসন্ধানী। যদিও তার হৃদয় প্রেমিক হয় না। যুক্তহীন আচরণ তার ধর্ম। সংকীর্ণ মানসজগৎ তার বিচরণভূমি। অসহিষ্ণুতা ও অসংলগ্নতা তার অলঙ্কার। তবু পুরুষ তাকে অন্ধতার বশে, অজ্ঞানতার বশে অধিকারে রাখতে চায়। কেন না, নারী অপেক্ষা পুরুষের প্রেম অনেক বেশি অকৃত্রিম, হৃদয়সঞ্জাত। আমার জীবন দিয়ে, যন্ত্রণা দিয়ে আমি বুঝেছি, নারী অন্তর্মুখী, অসরল কিংবা কুস্বভাবা হলে পুরুষের ধ্বংস অনিবার্য। অতঃপর, নারী সেই ধ্বংসের জন্য যখন অনুশোচনা করে, তখন সে টের পায় সেও নি:স্ব। যদিও, সংসারবাস্তবতায়, নারী ধ্বংসের কারণ হয়েও আপন কৃতকর্মের জন্য ভুল স্বীকার করতে, বিলাপ করতে জানে না। কেন না, জগতে অধিকতর নারী পাষাণহৃদয়। তারা স্নেহশীলা, দয়াময়ী, তথা জননীরূপে আহূত হবার যোগ্য নয়। এহেন নারী সর্বদায় তার ভুলের জন্য অন্যকে দোষারোপ করে, ধবংসের জন্য অপরকে দায়ী করে, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে এরা যেকোনো অসত্য ভাষণের আশ্রয় নিতে দ্বিধান্বিত হয় না। অপরের যে-কর্মকে এরা অপরাধ বলে অঙ্গুলি নির্দেশ করে, ততোধিক অপরাধ এরা মুর্হূমুহ করেও তা স্বীকার করতে জানে না। যারা তা করে না, তারা ব্যতিক্রম নয়। তারা প্রকৃত ও আদর্শগতভাবে মানবী। এমন মানবীর সংখ্যা মুষ্টিমেয়।

‘আর তুমি? তুমিও কি আমার জীবনকে নি:স্ব করে দাওনি? মৃত্যুর আগেও আমাকে কি বারে বারে মারোনি? জানি, তুমি এখন তোমার কঠিনতম শত্রুকে বধের নিস্তরঙ্গ আনন্দে বিভোর, তবু একবার অতীতের কথা ভাবো। ভাবো, তুমি কতভাবেই না আমাকে ওই নারীর সমক্ষে কটুবাক্য ব্যবহার করে নিরন্তর আঘাত দিয়ে গেছ। আজকের মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়ে তা কি কম যন্ত্রণাদায়ক ছিল? আমি যে আজও তা ভুলতে পারিনি। কেমন করে ভুলি বলো? আমি নত হতে শিখিনি বলে তুমি আমাকে চন্ডাল বলেছ। আমি আমার প্রেমাস্পদকে বাহুলগ্না করে তাকে মগ্ন রাখতে চেয়েছিলাম বলে তুমি আমাকে কামুক বলেছ। আমি বেদবিধি, দর্শন-কাব্যজ্ঞানহীন বলে তুমি আমাকে নির্বোধ ও পাষন্ড বলেছ। তুমি আমাকে ঘৃণ্য, বর্বর, পশু, মনুষ্যেতর জীব আদি কতকিছুই না বলেছ। তুমি অষ্টাত্রিংশৎ-বার আমাকে পাষন্ড পাটন বলে সম্বোধন করেছ, কিন্তু কখনোই, ভুলক্রমেও, মানুষ বলোনি। সহোদর আমার, বুকে হাত রেখে বলো দেখি—এইসব গুণের কোনোটিই কি মনুষ্যোচিত নয়? তুমি জ্ঞানী ও পন্ডিত হতে পারো, কিন্তু, যে-মানুষের মধ্যে নারীপ্রেম নেই, এই মৃত্যুলগ্নে দাঁড়িয়েও আমি বলব, সে শয়তান। তুমি যতই পান্ডিত্যের বারি সিঞ্চন করে তোমার কলঙ্ককে ধৌত করো না কেন, তুমি পুরুষের কাছে পার পেয়ে গেলেও নারীর কাছে চিরদিন ক্ষমার অযোগ্য হয়ে থাকবে।

‘আমি কোনোকিছুই গোপন করতে শিখিনি। আমি বিশ্বাস করি না, প্রেম কখনো অজৈব অযৌন হতে পারে। যারা তা বলে থাকে, যারা নারীর কাছে, প্রেয়সীর কাছে নিজেকে ভদ্র ও মার্জিত প্রমাণ করতে চায় তারা দ্বিচারী, তারা অসৎ ও প্রতারক। আমি জারমণির সঙ্গে প্রতারণা করতে চাইনি কখনো। কাম চরিতার্থ করতে বহু ললনার প্রতি প্রলুব্ধ হইনি কখনো। আমার হৃদয়ে তার প্রতি প্রেমের সৃষ্টি থেকে বিনাশ অব্দি আমি তাকেই চেয়েছি। কিন্তু, হায়! দেখো আমার অদৃষ্ট! সেই নারীও আমার অকপট আচরণকে যথোচিত মানবধর্ম বলে স্বীকার করেনি। তার প্রতি আমার অপ্রতিরোধ্য দুর্বলতা টের পেয়ে সে আমাকে ক্রমশ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিল। সহোদরবধ করতে আমাকে ধনুর্বাণে সজ্জিত করল! ক্রমে ক্রমে আমাকে সংশপ্তক করে তুলল। এ কিসের অভিসন্ধি? তা আজও আমার অবোধ্য।

‘আমি প্রেমের মাহাত্ম্য নিয়ে, প্রেমের স্বমহিমায় আমার হৃদয়কে লালন করতে চেয়েছিলাম। আমি আমার সততা নিয়ে, বিশ্বাস নিয়ে, মাত্রাতিরেক আবেগ নিয়ে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতে চেয়েছিলাম সেই নারীকে। আর তুমি তাকে শুধু অধিকার করতে চেয়েছিলে। তোমার অধিকার-ভাবনার সার্থক রূপায়ণ ঘটাতে তুমি আয়োজন করে বসলে এতবড় এক যুদ্ধের। তুমি বাহিরের জয় চেয়েছিলে, আমি অন্তরের জয় চেয়েছিলাম। বাহিরের জয়ে থাকে লোভ, আর অন্তরের জয়ে সমর্পণ ত্যাগ ও প্রেম। তুমি প্রেম থেকে সংঘাতে গেলে, সমর্পণ থেকে আগ্রাসনে গেলে, আর ত্যাগ থেকে লুণ্ঠনে। তুমি যুদ্ধের সপক্ষে তোমার পুঁথিপড়া বিদ্যা দিয়ে তত্ত্ব খাড়া করে, গ্রামে গ্রামে সাধারণ মানুষকে নৈতিকতায় উদবুদ্ধ করে তুললে। ধর্মযুদ্ধের জিগির তুললে। মিথ্যে নৈতিকতার এই জগৎ আমার সততার কোনো মূল্য দিল না। মূল্য দিল তোমার ভন্ডামির, তোমার যুদ্ধের নামে গণহত্যার পরিকল্পনার, তোমার অসার তত্ত্ব ও আগ্রাসনের, আর গালভরা নৈতিকতার। ফলত, জগৎ তোমার পিছনে দাঁড়াল। তারা তোমার হয়ে স্বতঃস্ফূর্ত লড়াই করল, কিন্তু আমার যোদ্ধারা আমাকে দায়ী করল, আমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে কেউ পালিয়ে গেল, কেউ লুন্ঠন করে নিয়ে গেল আমার রসদ। তার ফলশ্রুতি, জগৎ তোমার বাহুতে দিল বল, তোমাকে করল জয়ী। আর বহু বাণে দীর্ণ আমাকে করল শল্লকীতুল্য। আমার অঙ্গজুড়ে জরাজীর্ণতা, শোণিতের ধারা আর দুঃসহ মৃত্যুযন্ত্রণা। পরন্ত, কর্ণপটহে আঘাতের দরুণ আমি ক্রমেই বধিরতাপ্রাপ্ত হচ্ছি। থামো, সহোদর, থামো। জীবদ্দশায় জীবনকে আমি উপভোগ করতে পারলাম না! জারমণির কথা ভেবে অন্তত মৃত্যুকে উপভোগ করতে দাও! আমাকে বলতে দাও!

‘মৃত্যুমুখে পতিত বলেই আমি অনুভব করতে পারছি ইহলোকে বেঁচে থাকার চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। সে-বোধ তোমার এখনও হয়নি। তুমি অহিংস হতে পারোনি তাই। তাহলে আর কিসের পান্ডিত্যের অহংকার তোমার? কিসের এত সুপ্ত দম্ভ? প্রকৃত পন্ডিত সর্বাগ্রে মূর্খের বাণী শোনে। বিনম্র হয়ে তুমিও শোনো —তিনিই লোকবলয়ে সর্বাপেক্ষা বরেণ্য, জ্ঞানী ও মানবিক, যিনি অন্যকেও বাঁচতে দেন। অন্যকে জীবিত রাখা যেমন মানবের শ্রেষ্ঠতম ধর্ম ও অনুষ্ঠান, তেমনি অপরকে উপবাসে রেখে মেরে ফেলা মনুষ্যেতর জীবের লক্ষণ। ঈশ্বর তাদের করুণাবঞ্চিত করবেন। তোমার কারণে আজ বহু মানুষ গ্রামছাড়া, অসংখ্য অনাহারে, দুর্ভিক্ষে মৃত। তার প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে করতেই হবে, অন্যথায় সপ্তস্বর্গ সপ্তপাতাল কোথাও তোমার মুক্তি নেই! তোমার আত্মার শান্তি নেই! এখনও আমি অহংকারের সঙ্গে বলছি, আমি তোমার পুঁথিতে বিশ্বাস করি না। তা আমার কাছে দাহ্য পদার্থ বৈ কিছু নয়। এই দ্বিবিধ কর্মের বিচারে আমি পুণ্য ও পাপ, ঈশ্বর ও শয়তানের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে চাই —অন্যত্র কোথাও ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক। জানি, আমার ন্যায় নির্বোধ, নিরক্ষরের মুখনি:সৃত ঈশ্বরবাণী তোমার গাত্রদাহের হেতু। প্রলাপ বোধ হচ্ছে তোমার। তবু তোমাকে শুনতেই হবে। আমাকে বলতে দাও!’

তিরনিক্ষেপ করতে গিয়ে মুহূর্তের জন্য চমকে ওঠে অঙ্গদ। এ কী কথা সে বলে চলেছে! ‘প্রকৃত পন্ডিত সর্বাগ্রে মূর্খের বাণী শোনে।’ এমন মহার্ঘ অমৃতবচন কি মহাপ্রবীণও কখনো বলেছেন? অঙ্গদ তাকে এখনি হত্যা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। হত্যার আগে পাটনকে সে তার কথাগুলি বলার সুযোগ দিতে চায়, নচেৎ তার প্রতি অবিচার করা হবে। সে পাটনের প্রসারিত বক্ষের দিকে তির সংযোজিত করে অনড় দন্ডায়মান থাকে, যখন পাটন জীবন-মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও তার কষ্ট, যন্ত্রণা, আক্ষেপ ও অভিমানকে শেষবারের মতো উজাড় করে দিয়ে তার অগ্রজের উদ্দেশে বলতে থাকে। বলতে থাকে প্রখর জীবনবোধ সস্বলিত তার বাণী :

‘হে সহোদর! হে আমার প্রিয় অগ্রজ! তুমি আজ সফল। আমিই ব্যর্থ। জীবনে যত-যত বঞ্চনার ভিতর দিয়ে আমি গেলাম, এমন যেন আর কেউ না যায়। যেন আমার মত এমন অপমান, অত্যাচার, লাঞ্ছনা আর কাউকে ভোগ করতে না হয়। কিন্তু তারপরেও আমি বলব, তোমার সাফল্যে আমি খুশি, সহোদর! আমি খুশি! আজ আমি অসূয়াহীন। আজ আমি তোমার মিত্র। আজ তোমাকে নিয়ে, জারমণিকে নিয়ে জগতের কোনো নারীকে নিয়ে আমি বিভ্রমের বশবর্তী হয়ে নেই। সত্য আমার কাছে বায়ু-মরুৎ-অম্বরের ন্যায় স্পষ্ট। সত্য আজ আমার সম্মুখে জারমণির দুর্লভ হাসির ন্যায় উন্মোচিত—অখন্ড মাঠারিক্ষেত্র জুড়ে তা উন্মুক্ত হয়ে রয়েছে। একবার ঘুরে দেখো। শত-সহস্র পচনশীল মৃতদেহ, অজস্র বায়স ও সারমেয়, অম্বরে উড্ডীন শতশত চিল-শকুন-কুরর তোমার সে অনির্বাণ-সত্যকে কী নিদারুণভাবে বহন করে চলেছে। তুমি এই সত্যই চেয়েছিলে, সহোদর? এরই নাম ধর্মযুদ্ধ? ধর্মযুদ্ধে এত হত্যা কেন? জবাব দাও। আমি আবারও জানতে চাইব ধর্মযুদ্ধে এত হত্যা কেন? হিংসা কেন? রক্ত কেন? যদি তার সদুত্তর দিতে না পারো, যদি তুমি মৌনাবলম্বন করে আমার প্রশ্নবাণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাও, আমাকে অগ্রাহ্য করো, তবে বুঝবো তুমি যথার্থই কাপুরুষ।

‘আমাকে হত্যার নিমিত্ত এই দিগন্তহীন পটভূমি রচনা করাই নয়, তোমার প্রতিশোধ নিতে তুমি যা-যা সংকল্প করেছিলে, প্রতিজ্ঞা করেছিলে, তার একটিও আজ অপূর্ণ থাকল না। অথচ, আমার জীবনে আমার একটি সংকল্পও বাস্তব হয়ে উঠল না। কী বিষম অকৃতকার্য আমি। আমি আমার কোনো প্রতিশ্রুতিকে রক্ষা করতে পারিনি, কোনো স্বপ্ন ও কল্পনাকে বাস্তব করে তুলতে পারিনি, যা আমার জারমণির মুখ স্মিতহাসিতে আভামন্ডিত করতে পারত। সহোদর, তুমি সকল কিছুই পেরেছ। এমনকি, গ্রামে-গ্রামে লোকপ্রচারে থাকাকালীন তুমি এমন কথাও বলেছিলে যে, আমার এই দৈত্যকুলোদ্ভূত দেহে এক-কেশ পরিমাণ স্থানও তুমি শরাঘাত থেকে অক্ষত রাখবে না। বাস্তবে, তাও করে দেখালে। হয়তো সে-কারণে মৃত্যু আমার স্থগিত রয়েছে। আমি টের পাচ্ছি, তোমার শেষ এবং চূড়ান্ত তিরটি আমার দেহে বিদ্ধ না হলে আমার মৃত্যু নেই।

‘হায়! যদি মৃত্যুর আগে আমি একবার সেই নারীকে দেখতে পেতাম! জীবদ্দশায় আমাকে সে কখনো দেখার আকা´খা পোষণ করেনি। আমার প্রতি তার কোনোই কৌতূহল ছিল না। তার জীবনে আমার কখনো কোনো আবাহনও ছিল না। কিন্তু তবু আমার মন উত্তরোত্তর চঞ্চল হয়ে উঠছে তার তরে। আমি তাকে উদ্দেশ করে কত ঘটনায় কত কথা না বলেছি। অধিকাংশক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াহীন নীরব থেকেছে সে। এই মুহূর্তে যেমন তুমি। তথাপি মনে হয়, তাকে বোধ হয় ভালোবাসার কথাটাই বলিনি কখনো।

‘সহোদর, আমার মৃত্যু এখন তোমার হাতে একটি তিরের অগ্রদেশে নীরবে অপেক্ষমাণ। তৎসত্ত্বেও এখনো কেন আমার সেই বহু উচ্চারিত কথাগুলি দোহরাতে ইচ্ছে হয়? কেন এখনও সেই নারীকে আগের মতো উদাত্ত গলায় বলতে ইচ্ছে হচ্ছে—’

বলতে গিয়েও পাটন আর বলতে পারে না। তার মুখ, তার সারা লোমশ অঙ্গ ঘর্মাক্ত হয়ে উঠেছে। চুঁইয়ে-পড়া সেই ঘাম স্থানে-স্থানে রক্তের সঙ্গে গড়িয়ে নামছে। রক্ত ঝরছে তার কর্ণ-কুহর থেকেও। পশ্চিমের শেষ আলোয় ঈষৎ বর্ণময় চকচকে দেখাচ্ছে তার শরবিদ্ধ শরীর। ছিন্নভিন্ন রণসজ্জা। এমন সঙ্গিন অবস্থাতেও পাটনের মনে পড়ে যাচ্ছে, যা সে বলতে চাইছিল, যা বহুবার বহু উপলক্ষ্যে জারমণিকে বলেওছিল। সে বলেছিল, ‘রানি! জগতে শেষতক কিছুই থাকে না। থেকে যায় শুধু প্রেম। প্রেমই অবিনশ্বর। কে তুমি? কে আমি? কালের ঘন তমিস্রাচ্ছন্ন গর্ভে সকল উচ্চরব স্তিমিত হয়। সকল অস্তিত্বের অবসান ঘটে। প্রেম চিরকালীন, প্রেম অমলিন। হৃদয়ের তরে হৃদয়ের আকুলতার মৃত্যু নেই। বিনাশ নেই। বিশাল সরোবরের ছোট্ট ঘাটে গান্ধর্ব মহিমা নিয়ে রাতভর ফুটে থাকে যে শালুক, মানুষ সরোবরকে ভুলে গিয়ে ওই পুষ্পটিকেই মনে রাখে। আমি এখনও জানি, আমার দেহান্তের পরেও তুমি তেমনিভাবে মনে রাখবে আমাকে। আজ তুমি যতই প্রত্যাখ্যান করো, তোমার জীবনে-মননে ভাস্বর হয়ে থাকব আমি। একমাত্র আমিই! খরিসের ফণায় খড়মের মতো আমি! ষন্ডের পৃষ্ঠে কোকুদের মতো আমি! চন্দ্রের পৃষ্ঠে কলংকের মত আমি! ঐরাবত-পৃষ্ঠে মাহুতের মত আমি! সর্বদা জাগ্রত আমি!’ আহা! কী অন্তর নিঙড়ানো অভিব্যক্তি! সেই অতীত, সেই সুর এখনো তার কানে অনুরণিত হয়ে চলেছে। সেই আবেশ নিয়ে, সেই ভাবনারই প্রতিধ্বনি তুলে, পাটন আবার অঙ্গদের উদ্দেশে বলে যায়:

‘সহোদর! ভাগ্যের কী বিড়ম্বনা! আজ আমাকে মৃত্যুর কথা ভাবতে হচ্ছে। আমার এই নশ্বর দেহও গলে-পচে পঞ্চভূতে লীন হয়ে যাবে। কিন্তু তারপরেও থেকে যাবে যুদ্ধক্ষেত্রে অসহায় পড়ে থাকা আমার ওই মহাভার কার্মূক। আমার ভীমভেদ। যা এখনো প্রায়াস্তমান গোধূলির আলোয় জানান দিচ্ছে তার বৈভবময় অস্তিত্বকে। শেষমেশ, ওই কোদন্ড আমার প্রসারিত স্কন্ধে নিয়ে, মাঠারিকে নয়, আমি তো জয় করতে বেরিয়েছিলাম জারমণিকে। শুধু জারমণিকেই। আমি দেশে দেশে ঘুরেছি শুধু তার জন্য, আমি দিন-প্রতিদিন হাহাকার করেছি তার জন্য। প্রেমের জন্য —যুদ্ধের জন্য কদাপিও নয়। আমি মাঠারির অধীশ্বর হতে চাইনি, এই আদিবাসী ভূখন্ডের দলপতি হওয়ার বাসনাও ছিল আমার নেহাতই কথার কথা। ধর্মত, আমি স্রেফ ওই নারীকে চেয়েছিলাম। এই মাঠারির বাতাসে বহুকাল, বহুবর্ষ ব্যাপী থেকে যাবে তাকে না-পাওয়ার কারণে আমার সকল ব্যর্থ ও মর্মস্পর্শী অনুনাদ!

‘আর এভাবেই, তুমি জেনে রাখো, আজ তোমার হাতে আমার প্রয়াণ সম্পন্ন হলেও, ইতিহাসে আমিই অমর ও কালজয়ী হয়ে থাকব। কারণ এটাই যে, আমার হৃদয়ে প্রেম হীরকখন্ডের ন্যায় সতত প্রভাময়। তোমার হৃদয়ে হিংসার বহ্নি। তিরোধানকালেও আমি প্রেমের বাণী উচ্চারণ করে চলেছি। আর তুমি? অস্ত্র হাতে সেই ঈশ্বর-কন্ঠকে চিরতরে রুদ্ধ করতে উদ্যত। আমার প্রেম আমাকে প্রতিদিন প্রতিটি মৃত্যু থেকে, নৈরাশ্য থেকে নবজন্ম দিয়েছে। সাহসের সঙ্গে, প্রত্যয়ের সঙ্গে আমার পুনরুত্থান ঘটিয়েছে। আর তোমার হাতের অস্ত্র তোমাকে দন্ডে দন্ডে হত্যার জন্য প্ররোচিত করেছে। তুমি ষড়যস্ত্রকারী। তোমার ক্ষমা নেই। ইতিহাস তোমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না। প্রতিটি হৃদয়বান বিবেকবান মানুষ যুগে-যুগে তোমাকে হত্যাকারী হিসেবে মনে রাখবে। ঈশ্বরের বিচারে তুমি বিনাশকারী হিসেবে দন্ডিত হবে।’ পাটন কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে তার মন এবার কোমল ও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। সে আক্ষেপ নিয়ে বলতে থাকে :

‘সহোদর, এই চূড়ান্ত ক্ষণে পৌঁছেও, মৃত্যুর জন্য নয়, আমার প্রাণ কাঁদছে তার জন্য। আমি হতভাগ্য। বছর বছর ধরে তার পূজা করে, ভৃত্যের ন্যায়, দ্বারীর ন্যায় এই শ্বাপদসংকুল মাঠারিতে তাকে রক্ষা করেও প্রতিদানে কিছুই পেলাম না আমি। সেই অলোকসামান্য কামিনী এক-আকাশ হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস ভিন্ন কিছুই দিল না আমাকে। মন্দভাগ্য আমি। অভিশপ্ত আমি। আমার আর্ত-পীড়িত আত্মার জন্য যদি কখনো একবুঁদ অশ্রুও ফুটে উঠত তার আঁখির কোণে! হায়! সত্যিই আমি অশুভ, সহোদর! আমার জন্য অন্ধকার ছাড়া বিধাতার ঝুলিতে কিছুই নেই...’

বলতে বলতে নিজেকে আর সংযত রাখতে পারে না পাটন। ততক্ষণে, মহাপ্রবীণও অকুস্থলে এসে পড়েছেন। তিনিও তাঁর জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত রেখে তাকিয়ে রয়েছেন পাটনের দিকে। অঙ্গদ তখনও ধনুর্বাণ তাক করে রেখেছে পাটনকে লক্ষ্য করে— নিক্ষেপ শুধু সময়ের অপেক্ষায়।

এতক্ষণ অব্দি বলে যাওয়া ও তার অন্তর্বর্তীকালে প্রশ্ন করে যাওয়া সসত্ত্বেও পাটনের কোনো কথার জবাব দেয়নি অঙ্গদ। শরাঘাত স্থগিত রেখে, সে তাকে একতরফা বক্তব্য প্রকাশের অবকাশটুকু দিয়েছে মাত্র। কিন্তু স্পষ্টত বোঝা যায়, যতই সে নির্বাক ও নিরুত্তর থাকুক না কেন, পাটনের কথাগুলি তার মর্মতল ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যাচ্ছে। অবিসম্বাদিতভাবে তা আলোড়িত করে চলেছে তার অন্তর্দেশ। মৃদু-মৃদু কম্পিত হচ্ছে তার দক্ষিণবাহু, হয়তো-বা পীড়ার কারণে ঘন-ঘন স্ফীতিশীল হয়ে উঠছে তার বক্ষদেশও, যার জেরে তার শেষ বাণটি লক্ষ্যভেদে সফল নাও হতে পারে।

কিন্তু সফল তাকে হতেই হবে। ভ্রাতৃহত্যা থেকে প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ তার নেই। সে নিজ হাতে তাকে হত্যার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল। এখন সেই অঙ্গীকারের কথা মনে পড়ে যাওয়াতেই কি অঙ্গদ এমনভাবে আবেগে, দুর্বলতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে? যদিও সে আরো কিছু মুহূর্ত সময় নিয়ে নিজের মানসিক স্থিতিকে সামলে নিতে চায়, আর বার বার ক্ষমা চায় প্রতিশ্রুতি পূরণে সহোদর হয়ে সহোদরকে হত্যা করতে বাধ্য হওয়ার জন্য। মাঠারি এখন শুষ্ক, কিন্তু কল্পনায় সে তাকে পরিপূর্ণা জ্ঞান করে, তার স্বচ্ছ জলরাশির দিকে করজোড়ে না তাকিয়েও সকাতর কন্ঠে বিড়বিড় করে ওঠে, ‘হে নরাধিপতি! এই ‘নার’ই তোমার আশ্রয় জানি। তাই তুমি নারায়ণ। তোমাকে পুনরায় সকরুণ নিবেদন করি। দেখ, আমার সম্মুখে এই নরাধম মহাপ্রাণ সত্যকে হত্যাপ্রয়াসী হয়েছিল বলে আমি একে নিধনোদ্যত হয়েছি। আমাকে মার্জনা করো আর এই পাপীষ্ঠার জন্য নরকের দ্বার খুলে দাও!’

মনে মনে এই অঙ্গীকারের পুনরুচ্চারণ করতে গিয়ে অঙ্গদ নিজের চিত্তচাঞ্চল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। তা যেন বাঁধ ভেঙে উচ্চকিত হতে চায়। কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। ইচ্ছে হয় হাতের গুণ-টানা ধনুকটি দূরবর্তীক্ষেত্রে নিক্ষেপ করে তার এই অবুঝ ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরতে। আর সাশ্রুনয়নে স্নেহবিজড়িত কন্ঠে পৌনঃপৌনিক উচ্চারণ করতে, ‘তুই কেন এমন কাজ করলি? বল, বল! আমি কেমনে তোরে এখন হত্যা করি!— হে মার্কন্ডেয়, আমাকে নিষ্ঠুর, নির্দয়, হৃদয়হীন, পাষন্ড করো! নরান্তক করো! অকম্প করো। যেন সহোদরের মুন্ডভেদ-কালে আমার দৃঢ়মুষ্টিতে ধারণ করা এই আদিম অস্ত্র বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়। যেন এই অনুজের সঙ্গে আমার বাল্য-কৈশোর-যুবাবস্থার কোনো মনোরম স্মৃতি এই মুহূর্তে আমাকে দুর্বল ও লক্ষ্যভ্রষ্ট না করে। অগ্রজের উদ্দেশে তার মুখনি:সৃত এমন কোনো মধুর সম্বোধন অনুরণিত হয়ে যেন আমাকে তার প্রতি যত্নশীল ও আত্মীক হতে না বলে। বিপদ থেকে বাঁচতে স্নেহের আশ্রয়প্রার্থী হয়ে শৈশবে অগ্রজের কাছে তার ছুটে আসার কোনো একটি ঘটনাও যেন আমার মনে এখন উদিত না হয়! এসবই আমাকে উদবিগ্ন ও বিচলিত করে তুলবে। হে বিধাতা, আমাকে অতীতমুখী করো না। আমাকে স্থিতধি করো! প্রতিজ্ঞাপূরণে সহায়ক হও।’

অঙ্গদ অস্থিরচিত্ত হয়েও নিজেকে নিজের সত্যভূমিতে অটল রাখতে প্রাণপণ প্রয়াস চালায়। নিজের সঙ্গে নিজেই লড়াইয়ে ব্রতী সে। প্রতিশ্রুতির সত্য তাকে পালন করতেই হবে। এই কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে অঙ্গদ নিজেকে দৃঢ় ও অবিচ্যুত রাখতে চায়। সে এমনও মনোস্থির করে রেখেছে যে, সমরাঙ্গন থেকে টানতে টানতে দন্ডার্হকে নিয়ে যাবে সেই দূর জনপদে। অতি-অতি দূরবর্তী ডেলিকচা গ্রামে। যেখান থেকে বিরোধ, বিরোধ থেকে যুদ্ধের সূত্রপাত।

যদিও কল্পনায় সে অনায়াসে অনুমান করতে পারে যুদ্ধের এই ভয়াবহ আঁচ লেগে সে-ভূখন্ডেরও কি করুণ দশা! সেখানে আর কেউ নেই। বহু বহু বছর আগেই পুত্রশোকে গত হয়েছে তার বৃদ্ধ পিতামাতা। যে নিকটাত্মীয়ের উত্তরপুরুষদের বেঁচে থাকার কথা, তারাও আর ইহলোকে কেউ নেই। সর্বগ্রাসী যুদ্ধে গ্রামকে গ্রাম, ডি-ডিহাত সব উজাড় হয়ে গেছে। রোগে-শোকে, জলকষ্টে, অনাহারে আর আকালজনিত মহাবিদ্রোহের আগুনে পুড়ে। জনহীন, বসতিহীন, ধু-ধু প্রান্তর। বিধ্বংসী অগ্নিবায়ূতে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে শূন্য খেত-খামার আর মরাভূমির ধূলি-বালি। মনুষ্যহীন ধ্বস্ত ও বিধ্বস্ত চালাঘর, কুঁড়েঘর আর চুঙিটালির ঘরগুলির মাথায় উড়ছে ভাগাড়ের উদাসী শকুন।

অঙ্গদ ভূমির ওপরে ঘষটানি দিতে দিতে সেই ভাগাড়ে নিয়ে যাবে পাটনকে। সেখানে সে মস্তক অবনত করবে তার পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে। আর বামহস্তে দুর্মতি পাটনের কেশাকর্ষণপূর্বক দক্ষিণহস্তে তার হাতিয়ারটিকে শূন্যে উত্তোলিত করে বলতে থাকবে, ‘মাতঃ! এই সেই কুলাঙ্গার! আমার বিশ্বাসহন্তা সহোদর! তনুদ্ভব তোমার। যে তোমার পীড়নের কারণ, দুঃখের কারণ, শোকের কারণ। যার কামাগ্নির রোষে আজ শ্মশান হয়ে গেল বিস্তীর্ণ জনপদ। এতদিন বাদে আমি তাকে বধ্যভূমি থেকে নিধনপূর্বক তোমার চরণতলে নিয়ে এসেছি—তোমার আত্মার চিরশান্তির উদ্দেশ্যে। শুধু এই বার্তা জেনে রাখো মাতঃ...’

অতঃপর, সেখান থেকেও সে তার সহোদরের শব নিয়ে যাবে অন্যত্র। কত গ্রাম আর ডিহি পেরিয়ে, কত লোকালয় পেরিয়ে, পাহাড়-ডুংরি অতিক্রম করে, অঙ্গদ শেষমেশ পাটনের মৃত, নিশ্চল দেহ নিয়ে হাজির হবে জিনগা-থানে। সেই জিনগা-থান, যেখানে পাটন তার কৃতকর্মের দন্ডস্বরূপ টিলার শীর্ষে জিনগা দেবীর কাছে গ্রামবাসী কর্তৃক নির্বাসিত হয়েও, অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে কোনোক্রমে বেঁচে ফিরেছে। তাও জারমণির সহায়তায়।

কিন্তু এখন? পাটনের শবদেহ নিয়ে সেখানে পৌঁছে সে দেখবে, জিনগা-থানের মাথায় কোনো মানুষ নেই, যুদ্ধ নেই। আর যুদ্ধ নেই বলে ধ্বংসের কোনো স্মারকও নেই। যা আছে সবই সৃষ্টির, জীবনের, সুন্দরের। এখনো তেমনি কুলুকুলু বইছে পাহাড়ি বাতাস। গাছে গাছে দিব্য আনন্দে কলরবরত পাখ-পাখালির দল। ঝুড়ের ভেতরে অলসগতিতে আত্মগোপন করছে নিরীহ, নির্বিষ সরীসৃপ। বুনো গাছের শাখায় শাখায়, লতাগুল্মে উলুর-ঝুলুর ফুল! আহা, কি তার বাহার! সেই সব অনাঘ্রাত বহুরঙ্গী পুষ্পের সুবাসে প্রতিপ্রহর মগ্ন হয়ে রয়েছে মলয়।

মর্ত্যের এই নন্দনকাননে এসে অঙ্গদ কি বিমোহিত হবে? নাকি, টিলার শীর্ষদেশ থেকে অখন্ডিত দৃষ্টিতে চারপাশ দেখতে দেখতে তার শরীর ও মন হিম হয়ে আসবে? তার কি মনে হবে না, এ কী দেখছে সে? শুধু ধ্বংস, ধ্বংস আর ধ্বংস! হায়, কোথায় গেল সেই প্রাণোচ্ছল জনজীবন? কোথায় গেল সেই ‘ঝারনা নদী’? কোথাও কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই, জীবনের স্পন্দন নেই, পশু-পক্ষি-গবাদির কলরব যেন কোন যুগ পূর্বেই স্তব্ধ হয়ে গেছে! এমন দৃশ্য দেখে আক্ষেপ কি জাগবে না তার মনে? সত্যের অবমাননায় মাতৃরূপিণী ধরিত্রীর কি ভয়াবহ দশা!

অঙ্গদ, মহাবিক্রমে, জগদ্দল পাথরের বুকে দাঁড়িয়ে, পাদপিষ্ট করে রাখবে পাটনের গ্রীবা। তারপর জিনগা-থানের অস্ত্র হস্তগত করে, চতুর্দিকে তা ঘোরাতে ঘোরাতে, দিকে দিকে অধিষ্ঠিত দেবদেবীদের উদ্দেশে বলতে থাকবে, ‘হে মহেশ্বর! হে ব্যোমদেব! হে মরুৎ! যে-অসত্যের উত্থানে জগজ্জননী আজ এমন করাল বদনী হয়ে উঠেছে, তাকে নিশ্চিহ্ন করতেই আমি স্বহস্তে অস্ত্র ধারণ করেছি। এই কৃপাণের ক্রমায়ত আঘাতে সেই অসত্যকে অজনহিতকরকে অধর্মকে নি:শেষিতপ্রাণ করা অবধি খন্ডিত-বিখন্ডিত করছি!...’ অঙ্গদের শরীর অসুরের মুখোশে সলমা-চুমকির মতো কাঁপতে থাকে!

তার এই দশা দেখে মহাপ্রবীণ কি বিচলিত বোধ করেন? বোঝা যায় না। তার দিকে তাকিয়ে তিনি তাকে সকল প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ করে একলক্ষ্যাভিমুখী, অবিচল, আত্মতুষ্ট ও ব্রহ্মনিষ্ঠ হতে আদেশ করেন। ভিন্ন ভাবনা থেকে মনকে সরিয়ে আনতে বলেন। কোনো সম্পর্কের সূত্রেই প্রতিপক্ষের প্রতি নিজেকে কোমল না হতে সাবধানবাণী শোনান। তিনি বলেন, ‘হে বীরবাহু, লক্ষ্যভেদের মুহূর্তে কোনো চিন্তাকেই প্রশ্রয় দিও না! মনঃসংযোগ ব্যাহত হইতে দিও না। শত্রুদেহকে নিষ্প্রাণ ও ভূপাতিত না করা পর্যন্ত তাহাকে বিশ্বাস করিও না। শত্রুকে অবসর দেওয়াও মূঢ়তা। হে ধানুষ্ক, নিজেকে ধরিত্রীর বুকে শক্ত করো! অকম্পিত হস্তে বাণ নিক্ষেপ করো! দোলাচলচিত্ত হইও না!’

পাটনের মুখ বিকৃত হতে দেখা যায়। যন্ত্রণায় সে কাতরাতে থাকে। কিন্তু তখনো তার কথা শেষ হয়নি। একসময় নিজের মৃত্যুকে সে যেন নিজেই সংঘটিত হওয়া থেকে আটকে রেখেছে, এমনিভাবে মৃত্যুযন্ত্রণাকে সহ্য করতে থাকে। তারপর, সে আর দাঁড়িয়ে থাকতেও পারে না। হঠাৎ সহোদরের প্রতি প্রগাঢ় প্রেম নিয়ে সে যা বলে, তাও অঙ্গদের মনকে অনেকাংশ বিষাদে আচ্ছন্ন করে দেয়। উপরন্তু, মনে হয়, এতক্ষণ এতকথা বলার পরেও পাটন মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছে না। অঙ্গদকে জিজ্ঞাসার সূত্রে তার সেই বেদনাপ্লুত আর্তি বেরিয়ে আসে। শিশুর মতো করে সে বলে, ‘সহোদর! আমার আবাল্য প্রিয় সহোদর রে! তুমি আমাকে সত্যিসত্যিই হত্যা করার কথা ভাবতে পারলে? তুমি অগ্রজ। তুমি আমার পিতৃপ্রতিম। তোমার কোমল হৃদয়ে আমার প্রতি কি কোনোদিন এতটুকুও স্নেহ-মায়া-মমতা-প্রেম কিছুই ছিল না? যদি এক সরিষাতুল্যও থেকে থাকে, তবু সেই হৃদয় কি তোমাকে এক পলের জন্যও আমার কথা ভাবতে বলেনি? তুমি শুধু জিদের বশে, জয়ের মোহে, তুচ্ছ একটি নারীর কারণে আমাকে এমন নৃশংসভাবে বধ করতে পারলে? এই তোমার জগদ্দর্শন? জগদ্দর্শন শেষে তুমি কিনা মানব-হত্যায় নেমে পড়লে? এতটুকুও অনুকম্পা জাগল না তোমার মনে? ধিক, ধিক এমন জগদ্দর্শনে। তোমার মেধা, শিক্ষা, চেতনা ও জ্ঞানে। যে-জ্ঞান মানুষকে অস্ত্র ধরা থেকে বিরত রাখে না, যে চেতনা অপর হৃদয়কে লালন করতে শেখায় না, সহবোধের জন্ম দেয় না, এমন জ্ঞানীপুরুষ সমাজে থাকার চেয়ে না থাকা ঢের মঙ্গলময়। তারা পাপের বোঝা।

‘উঃ! আমাকে যে কী যস্ত্রণা দিয়ে মারলে! যদি আমার এই পীড়িত বক্ষে তোমার হাত রেখে তা অনুভব করতে, তাহলে আমি নিশ্চিত, তুমি জগতের আর একটি মানুষকেও এভাবে বধ করার কথা কল্পনাও করতে না। একটি পিপীলিকাকেও না। কিন্তু হায়, মৃত্যুর কোলে আমি ঢলে পড়ার আগে তোমার হস্তের পরশজনিত শান্তি পেতে আমি যে তোমাকে শেষবারের মতো আলিঙ্গন করবো, সে-অবকাশও রাখোনি তুমি। সহস্র বিদ্ধ শর দিয়ে তুমি সহোদরের সঙ্গে সহোদরের হৃদয়ের ফারাক রচনা করে দিয়েছ! আমি যে আপন বক্ষে চাপড় মেরে ঈশ্বরের কাছে আমার কৃতকর্মের জন্য বিলাপ জানাবো তার থেকেও আমি বঞ্চিত। হায়! আমার জিহ্বা ক্রমেই আড়ষ্ট হয়ে আসছে। আমি মৃত্যুলগ্নে কোনো একটি অবতারের নামও যে উচ্চারণ করতে পারছি না!

‘কেন এমন কাজ করলে? প্রিয় আমার, প্রণম্য আমার, সহোদর আমার! বলো, বলো আমার প্রাণ, কেন এমন করলে তুমি? যদি ওই নারীই তোমার জীবনে একমাত্র সত্য ও অবিকল্প লক্ষ্য হয়ে ছিল, যদি আমিই তোমার জীবনমার্গের একমাত্র কণ্টক হয়ে বিরাজ করছিলাম, তবে কেন তুমি সে-কথা বললে না? কেন ভাইয়ের বিরুদ্ধে শস্ত্র নিক্ষেপ করার আগে আমার স্কন্ধোপরি তোমার স্নেহময় হাত রেখে...’ বলতে বলতে সংযম হারিয়ে ফেলে পাটন। আকাশের দিকে ললাট তুলে শুধু বিলাপ করতে থাকে সে। তার দুচোখ বেয়ে নামতে থাকে অশ্রুধারা। অঙ্গদের দিকে সেই মুখ নিয়ে তাকিয়ে বড় বেদনাবিহ্বল হয়ে, কাতর হয়ে, বলতে থাকে, ‘সহোদর! আমাকে একবার আলিঙ্গন করে বলো সে-কথা! সহস্র শরাঘাত নিয়েও শান্তি পাব আমি। আমাকে একবার আলিঙ্গন করো! একবার! তপ্তবুকের জ্বালা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। সহোদর আমার! আমাকে ভ্রাতৃপ্রেমে আলিঙ্গন করো...’ বলতে বলতে অঙ্গদকে জড়িয়ে ধরতে সে যেই সম্মুখে ধেয়ে আসে, অমনি শত্রুকে আর সুযোগ না দিয়ে, অঙ্গদ তার শেষ তিরটি পাটনের ললাটে বিদ্ধ করে দেয়।

পাটন আর্তনাদ করে ওঠে। ছটফট করতে করতে সেই পুষ্করিণীর ভূমিতে সবেগে আছড়ে পড়ে। কিন্তু পড়ে গিয়েও সম্পূর্ণ ধরাশায়ী হয় না সে। বিদ্ধ হয়ে থাকা শরগুলির ভরে কাত হয়ে থেকে যায়। আর বারেবারে বলতে থাকে, ‘ধর্মযুদ্ধে এত হত্যা কেন? এত হিংসা কেন? এত রক্ত কেন?’

শেষবাণটি নিক্ষেপ করে, অঙ্গদ, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। স্থির হয়ে। এত বছর ধরে তার সমস্ত উদবেগের, সমস্ত দুশ্চিন্তার, সমস্ত আয়োজনের এই মুহূর্তে, এখানেই, সার্থক যবনিকা পতন ঘটল! সবকিছুর শেষ এখানে! স্তব্ধ হয়ে গেল শতজল ঝর্নার ধ্বনি!

এখন তার সামনে আর কোনো শত্রু নেই, তার পশ্চাতেও কেউ নেই। সে একা। সে অদ্বিতীয়। সে বিজয়ী। যদিও তার জয়ের পক্ষে কোথাও কোনো উল্লাসরব শোনা গেল না। মঙ্গলবাদ্যও বেজে উঠল না। বাজল না দুন্দুভি, ভেরী, শতশত শঙ্খ, ঢাক, পণব, আনক, ধুন্দরী, গোমুখ, ঘন্টাদি। কিছুই বাজল না।

অথচ একদিন এই জয় নিয়ে কত আগাম ভাবনাই না ভেবেছিল পাটন। ভেবে রেখেছিল তার জয়ের মুহূর্তটিকে সে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। সে এতোটাই আস্থাবান ছিল তার জয় নিয়ে। এমনকী, যুদ্ধে গমনের পূর্বে জারমণিকে সে এটাও বলেছিল, ‘রাণী, আমি নিকুম্ভিলায় বিশ্বাস করি না, আমি বিশ্বাস করি তোমাকে। তজ্জন্য মাঠারি-যুদ্ধে জয়ের অভিপ্রায়ে কোনো যজ্ঞ সম্পাদন না করে শুধু তোমার প্রেরণাদাত্রী মুখ দর্শন করেই আমি রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হচ্ছি। জানি, জয় আমার ভবিতব্য!’

এখন কি তার স্মরণে আসে, যা সে একদা ভেবে রেখেছিল? সে কত না আশা করেছিল: যুদ্ধজয়ের ভেতর দিয়ে জারমণিকে নিয়ে সে নিজের চিরকালীনতার কথা কল্পনা করেছিল। সে ভেবেছিল, যেদিন তার সেই সুন্দর তার অধিগত হবে, যেদিন হাজার-হাজার আদিবাসী-অনাদিবাসী স্ত্রী-পুরুষ মাথায় রং-বেরং-এর পালক গুঁজে, স্তনে-বাহুতে উল্কি এঁকে, লতপাত-কাঠিমালার আভরণে অলংকৃত হয়ে উদ্দাম নৃত্য করবে, বাঁশের চোং থেকে অকাতরে হাড়িয়া আর মহুলরস ঢেলে নেশায় টং হবে, ঢোল-ধামসা-লাগড়া-মাদল বাজিয়ে তার হয়ে জয়োল্লাস করবে, সেদিনই সে ফিরে পাবে তার জীবন! সে ফিরে পাবে, ফিরে পাবে! ফিরে পাবে তার নিষ্কণ্টক জয়, যেদিন এই দৈব রতিগড়ে তাদের দুঃসাহসিক বসবাসকে ধর্মভীরু, সরল গ্রামবাসীরা আরো সমীহ করবে, এই রাজন্যকূলকে স্বয়ং ঈশ্বরপ্রেরিত আদিবাসী সমাজের সর্দার-সর্দারনি হিসেবে গ্রহণ করে পাটনকে অখন্ড মাঠারিভূমির অধিপতি করে তুলবে!

হ্যাঁ, সেই দিন সে সারা রতিগড় টিলাকে ঘিরে ভেরেন্ডা ডালের সহস্র মশাল জ্বালাবে! দড়দড় করে জ্বলতে থাকবে তারা। যুদ্ধক্লান্ত মাঠারিকে আবার প্রাণশক্তিতে সঞ্জীবিত করবে, আর তার চাটান পাথরের মতো লোমশ বুকে সশব্দ করাঘাত করে বলবে, ‘রে পাষন্ড, মানবেতর! তোর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে নতুন করে সূচনা হল আমার জীবনের। আমি আজ এই সমগ্র অরণ্যভূমির আদিবাসী নৃপতি।’

নিজেকে নির্ভার বোধ করে অঙ্গদ। দীর্ঘকাল ব্যাপী যুদ্ধের পর এই জয়কে সে উপভোগ করে তার মতো করে। কোনো উদ্দীপনা ও চাঞ্চল্যের বহি:প্রকাশ ছাড়াই। বাম হস্তে ধনুকটি ধরে থেকে, ব্যাধ যেভাবে বাণবিদ্ধ শূকরের দিকে তাকিয়ে থাকে সেভাবেই সে তাকিয়ে থাকল পাটনের কাটা ছাগলের মতো ছটফট করতে থাকা দেহটির পানে। যতই তার দেহ ভূমির ওপরে এপাশ-ওপাশ আছড়ে পড়ে, শরগুলি ততই মজবুত হয়ে গেঁথে যেতে থাকে তার শরীরে। নতুন করে চুঁইয়ে পড়ে রক্ত। অঙ্গদ লক্ষ করে যায়। আত্মার শান্তি অনুভব করে সে।

বেচারা পাটন! যে-প্রশ্নের উত্তর শোনার জন্য সে ব্যাকুল হয়েছিল, সেই প্রশ্ন অন্তিমবারের মতো অঙ্গদের সামনে রেখেও জবাব সে পেল না! —‘ধর্মযুদ্ধে এত হত্যা কেন? এত হিংসা কেন? এত রক্ত কেন?’

বহু দূর থেকে চিৎকার করে ছুটতে ছুটতে আসে জারমণি। বলে, ‘না, না, ওকে হত্যা কোরো না! ওকে মেরে ফেলো না! বাঁচতে দাও ওকে...’

ততক্ষণে সব শেষ! ততক্ষণে অঙ্গদও পাটনবধের নিমিত্ত ধারণ করা তার মহাবলী দেহ পরিত্যাগ করে আবার ফিরে এসেছে আগের চেহারায়। আবার সেই অস্থিসার ও দীর্ঘ তার অঙ্গ। শিকড়ের মতো মাথাভর্তি জটপড়া কেশ। উজ্জ্বল চাহনি। মহাপ্রবীণের চরণ স্পর্শ করে উঠে দাঁড়াতেই ক্রন্দনরত জারমণির নগ্নদেহ দেখে স্তম্ভিত অঙ্গদ। মুখ দিয়ে তার যেন বাক্য সরে না।

জারমণি তখন নিথর হয়ে যাওয়া শরবিদ্ধ পাটনের দিকে চেয়ে পাষাণবৎ দাঁড়িয়ে থাকে। এ কেমন মৃত্যু? এমনভাবেও কেউ বধ করতে পারে তার শত্রুকে? পাটনের এমন করুণ শোচনীয় মৃত্যু দেখবে বলে কল্পনাও করেনি সে। শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ে জারমণি। তার হাত থেকে খসে পড়ে যায় বুচাটাঙিটি। করতলে মুখ ঢেকে আর্তনাদ করে ওঠে সে। নির্জন যুদ্ধক্ষেত্রে তার প্রতিধ্বনি হতে থাকে।

অঙ্গদ শোকগ্রস্ত জারমণিকে দেখে নয়, জারমণির নগ্নরূপ অবলোকনপূর্বক প্রশ্ন করে তাকে, ‘হে নারী! কী হেতু তোমার এহেন দশা? কে তোমাকে এমনভাবে বিবস্ত্রা করল?’

অঙ্গদের মুখ থেকে প্রশ্নটি শুনে জারমণি ঝটকা মেরে তার দিকে তাকায়। উন্মাদিনীর মতো কঠিন তার দৃষ্টি। আকন্দ ফেটে বেরিয়ে আসা তুলোর মতো আগুনের আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে তার চোখ দুটি থেকে। সে কঠোর উচ্চারণে সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়। বলে, ‘তোমার যুদ্ধ!’

এমন জবাব প্রত্যাশিত ছিল না অঙ্গদের। ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধের সঙ্গে জারমণির এই তেজ তার অন্তর্দেশ অব্দি নাড়িয়ে দেয়। সে জারমণির থেকে তার নজর ঘুরিয়ে নিয়ে বলে, ‘নারী! আমার দৃষ্টির সম্মুখ থেকে তুমি তফাতে যাও। আমি নারীকে এমন কদর্য দশায় দেখতে অভ্যস্ত নই। সরে যাও তুমি এই দন্ডে!’

‘না! আমি সরে যাব না। এই নগ্নিকাকেই দিব্যদৃষ্টি নিয়ে তোমায় দেখতে হবে, যাতে তোমার এই জ্ঞান হয় যে, নারী কী ভয়াবহ! কী বীভৎসতার আধার সে! মুখ ঘুরিয়ে নিও না। দেখো আমাকে! দেখো আমার অধম অঙ্গও! দেখো মহাযোনি!’

অঙ্গদ তখনো তার দিকে দৃকপাত করে না। জারমণি এবার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বলে, ‘নগ্ন করতে ভয় পাও না, নগ্নতাকে দেখতে ভয় পাও? তাহলে কেন তুমি নগ্নতাকে জয় করতে চেয়েছিলে? তোমার যুদ্ধ সারা মাঠারিতে সেই নগ্নতারই সাক্ষ্য রেখে দিয়েছে। তোমার যুদ্ধ এই নগ্নতা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি। যে-মাঠারিতে একটি কীট হত্যা হয়নি, সেখানে তুমি সহস্র-সহস্র জীব হত্যা করলে! তোমার যুদ্ধের কারণে আজ শত শত গ্রামে নারীর সম্মান নেই, দরিদ্রের অন্ন নেই, বাসস্থান নেই, বহু পরিবার দেশ-ছাড়া, পলায়নের পথে রোদে-তাপে-অনাহারে- পিপাসায় অগণিত নিরীহ শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, এমনকী গর্ভবতী নারীও বলিপ্রদত্ত। তোমার যুদ্ধের কারণেই আকাল, দুর্ভিক্ষ আর জনপদগুলিতে বিদ্রোহের আগুন এখনও প্রজ্জ্বল্যমান। যুদ্ধের বিনিময়ে তুমি এটাই চেয়েছিলে? চেয়েছিল এমন ব্যাপক রোমহর্ষক ধ্বংস? যা অতীতে কোথাও কোনোদিন ঘটেনি? তুমি খুশি। যা কোথাও ঘটেনি, তুমি তা-ই ঘটাতে পারলে মাঠারিতে। আর এই ধবংস চাক্ষুষ করতে বেঁচে থাকতে হল আমাকে।’

‘না, ধ্বংস আমি চাইনি। যুদ্ধের ভেতর দিয়ে ধ্বংস নয়, সৃষ্টিকে জয় করতে চেয়েছিলাম আমি?’

‘সৃষ্টি? এই তোমার সৃষ্টি? এই সৃষ্টিকেই তুমি জয় করলে? যেখানে একটি মানুষও আর জীবিত রইল না, যুদ্ধক্ষেত্রে সকল বাজনদারকে গাড়োয়ানকেও যেখানে হত্যা করা হল, নিরীহ গাভীকুলকেও আক্রোশ নিয়ে নির্বিচারে বধ করা হল আর মাঠারির বাইরেও বহু গণহত্যা, বহু প্রাণহানি, সম্পদহানি আর শোকের জাগরণ তুলে, তুমি তিনবৎসরাধিক কাল পর তোমার শত্রুকে হত্যা করে, এই মহাশ্মশানে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজেই জয়ী ঘোষিত করলে। এই যুদ্ধই কাম্য ছিল তোমার? ছিল। কারণ ভাইয়ের প্রতি ঈর্শ্বায় এবং তার প্রতিশোধ নিতে তুমি মাঠারির অধীশ্বর হতে চেয়েছিলে। এই জয়ের ভেতর দিয়ে তুমি জয় করতে চেয়েছিলে তোমার জারমণিকে। এতকিছু করার পরেও সত্যিই কি তোমার সে-অর্জন সম্ভব হল? তুমি মনে করো তাই?’

‘নারী!’

‘নারী নয়, বলো জারমণি। কোনো নারীকে উদ্ধারের জন্য তুমি যুদ্ধের আয়োজন করোনি। তুমি উদ্ধার করতে চেয়েছিলে জারমণিকে।’

‘হয়তো চেয়েছিলাম। কিন্তু—’

‘হয়তো কেন? তুমি চেয়েছিলে। স্বীকার করো। স্বীকার করো তোমার লোভ। তুমি এও স্বীকার করো জয়ী তুমি নও, এই যুদ্ধে আত্মোৎসর্গ করেও, পরাজিত হয়েও যদি সত্যিই কেউ জয়ী হয়ে থাকে তবে জয়ী ওই মানুষটি। দেখো তাকে।’ জারমণি তার ক্রুদ্ধ তর্জনি বাড়িয়ে পাটনকে দেখায়। অতঃপর তার সংযোজন, ‘তুমি তাকে নি:শেষ নিধন করে তোমার পৌরুষ প্রতিপন্ন করলে। কিন্তু সে তোমার চোখের সামনে রেখে দিয়ে গেল যে আদিগন্ত ধ্বংসের ছবি, আসলে তা তোমার লোভের, পতনের, আগ্রাসনের খতিয়ান! জগতে লোভী, আগ্রাসী ও চক্রান্তকারীরাই নিজেদের জয়ী মনে করে। ধিক সে জয়!’

জারমণির এমন চোখা-চোখা প্রশ্নবাণে অঙ্গদ যেন তার ভাবনার খেই হারিয়ে ফেলে। সে ভেবে নিয়ে বলে, ‘যুদ্ধতে জড়িয়ে পড়ার পর, এই যুদ্ধ নিয়ে আমার উদ্দেশ্যের পরিবর্তন ঘটে। পুরুষের আধিপত্যে রাখা তোমাকে উদ্ধার করতে না পেরে তোমার বন্দিত্বকে আমি সামাজিক অন্যায়ের দৃষ্টান্তস্বরূপ ভাবতে শুরু করি। মনে হয়, তোমাকে নিয়ে যে অন্যায় ঘটে চলেছে, তাকে একক, বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে না দেখে সমগ্র দেশ ও সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে হবে। মনে হয়েছিল, এই যুদ্ধ কোনো সম্পদ ও ভৌগোলিক ভূখন্ড অধিকারের যুদ্ধ হবে না, তা হবে এক আদর্শ ধর্মযুদ্ধ।’

‘তাহলে এখন তুমি স্বীকার করছো এই তোমার ধর্মযুদ্ধ?’

‘হ্যাঁ, এই আমার ধর্মযুদ্ধ।’ অঙ্গদ স্বীকার করে নির্বাক থেকে যায়।

স্বীকার করে নিলেও, এটা অনুমেয় যে, তার ভেতরে শিহরণ জাগানো এই আদিম যুদ্ধ নিয়ে ইতিমধ্যে দৃঢ় সংশয় জেগে উঠেছে। বিশেষ করে, মৃত্যুর মুখে পাটনের বয়ান, এবং সেই সঙ্গে জারমণির এই তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য শোনার পর। ভয়াবহ এই যুদ্ধ চলাকালীন সে শত্রুহত্যার কথাই শুধু ভেবেছিল, হত্যার পরে মাঠারিকে দেখার কথা ভাবেনি কখনো। সে জয়ের সাফল্য নিয়ে ভেবেছিল, কিন্তু জয়ের ভয়াবহতা নিয়ে ভাবেনি কখনো। সেই ভাবনার দিকগুলি এখন যেন ক্রমেই উন্মোচিত হতে থাকে।

পাটনের সঙ্গে সঙ্গে জারমণিও তার দৃষ্টিকে, তার ভাবনাকে সেই অপার বিস্তৃত বধ্যভূমির দিকে ঘুরিয়ে দিল। তাকে ভাবিয়ে তুলল তার এই তান্ডবলীলা নিয়ে। এখন তার মনে এমন সব প্রশ্ন জাগছে, যা ইতিপূর্বে তার চিন্তাতেই আসেনি।

তার মনে হলো জগদ্দর্শনের ভেতর দিয়ে সে জগৎকে দেখল ঠিকই, কিন্তু সত্য-অসত্য, ধর্ম-অধর্ম নিয়ে মহাপ্রবীণের বয়ানে তার চেতনার জগতে অনড় থাকা ভাবনার অসারত্বকেও প্রকট করে দিয়ে গেল পাটন। তার সেই ভাবনা যে কতকাংশে জেদ এবং গোঁড়ামিতে রূপান্তরিত হয়েছিল, তাও অঙ্গদ নিজের কাছে নিজে স্বীকার না করে পারে না। এমনকী, তত্ত্ব ও প্রয়োগের ফারাকটিও বাস্তবভূমিতে দাঁড়িয়ে বড়ো কঠোরভাবে সে অনুভব করতে থাকে। আর তার জন্যে মহাপ্রবীণের প্রতিটি শ্লোককে সে অকট্য ও অখন্ডণযোগ্য বলে এখন আর অকাতরে মেনে নিতে রাজি নয়। সেই সঙ্গে, সম্পূর্ণ নি:সন্দেহ না হওয়া অব্দি কোনো শিক্ষা, কোনো উপদেশকেই সে আর যথার্থ বলে হৃদঙ্গম করবে না— গণজীবনের মহান ক্ষেত্রে তাদের প্রয়োগ করতেও সে এমন দুঃসাহসী হয়ে উঠবে না। তার শিক্ষা হয়েছে ঢের।

মহাপ্রবীণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল হয়েও তার মনে এখন এই সন্দেহ চাড়া দিতে শুরু করেছে যে, সত্যিই কি তিনি সর্ববিষয়ে অভ্রান্ত? তার তত্ত্বে কি কোনও ত্রুটি নেই? তা কি সর্বদা, সর্বক্ষেত্রে অনন্য ও ভবিতব্য হিসেবে অবশ্য পালনীয়? শাশ্বত সত্য হিসাবে তা গ্রহণের আগে অঙ্গদ তাও আরো যাচাই করতে চায়। তার মনে হয় মানুষ কী কখনো সম্বুদ্ধ হয়ে উঠতে পারে? যিনি সম্বুদ্ধ তিনিই ঈশ্বর। কিন্তু ঈশ্বর কী সম্বুদ্ধ হয়ে উঠতে পারেন? বিজ্ঞানের পরিধি নি:সীম। মানবের সীমিত ক্ষমতা দিয়ে তা কী কখনো বোধায়ত্ত করা সম্ভব? তার কেন যে বারে বারে মনে হয়— ঈশ্বর আদতে একটি ধারণামাত্র, বিজ্ঞানই প্রকৃত ঈশ্বর।

কোনো মানবের পক্ষে যদি কখনো সম্বুদ্ধ হয়ে ওঠা সম্ভব হয়েও থাকে, তবুও অঙ্গদ নিজেকে এখনো তা মনে করে না। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে ভয়াবহতার কাছে, গণক্রোধের কাছে সে কত তুচ্ছ। তার বৌদ্ধিক স্তরের যাবতীয় দৈন্য এবং অদূরদর্শীতাকেও তা প্রকাশ্যে, সর্বজনসমক্ষে এনে দিল। পান্ডিত্য, জ্ঞান, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রনীতির জগতে তার গভীরতার জয়গাটি এখনও সেই স্তরে পৌঁছায়নি, যেখান থেকে সে অখন্ড মানবতার জন্য অতিনিশ্চয় হয়ে শান্তির পথ দেখাতে পারে। তার মনে হয় তার জন্য তাকে আবার নতুন করে আরো গভীরভাবে, এবং আত্মস্বার্থ ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে আরো সততার সঙ্গে যেমন জগৎকে দেখতে হবে, বুঝতে হবে, তেমনি আবার সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ নয়— সমাজে প্রতিটি মানবহৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে প্রেমকে। অহিংসাকে।

মানবপ্রেমই ঈশ্বরপ্রেম, মানবপ্রেমই শেষমেশ শান্তির পথ। এই কথা ভাবতে গিয়ে অঙ্গদের কানের কাছে যেন পাটনের সংলাপই প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তার মাথা হেঁট হয়ে যায়। সকল অপরাধের কেন্দ্রে নিজেকে স্থাপন করে সে মনে মনে তার অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে বলে, ‘আমি জগৎকে দর্শন করতে দূরদূরান্তে পাড়ি দিয়েছি, বছরের পর বছর ধরে এই ভ্রাম্যমানজীবনের ভেতর দিয়ে শত-শত গ্রাম ও জনপদকে দেখেছি, হাজার-হাজার মানবাত্মাকে সাক্ষাৎ করেছি, নানা জাতি নানা সম্প্রদায়ের নানান বৃত্তিজীবিদের সঙ্গে কথোপকথন করেছি, তাদের কথা শুনেছি, তাদের জীবন-জীবিকা, সমস্যা-সংকট, সুখ-দুঃখের সঙ্গে একাত্ম হতে প্রয়াসী হয়েছি, কখনো নদীর বালুচরে নিশিযাপন করেছি, কখনো বৃক্ষমূলে স্থাণ্ডিলশায়ী হয়েছি, শরীরকে সর্বংসহ করেছি, ব্যক্তিত্ব ও আমিত্বকে লীন করেছি, কিন্তু দুর্ভাগ্য— আমার কাছের মানুষটিকেই আমি কখনো আমার জ্ঞান ও মেধার দৃষ্টিকোণ থেকে, আমার অন্তর্গত মানবিক দরদ ও সহানুভূতিশীলতার জায়গা থেকে দেখবার ও বোঝবার প্রয়াস করিনি।’ এই আক্ষেপ মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে অঙ্গদের। আর সেই সূত্রেই অনুজের উপদেশটিকে তার নতমস্তকে স্বীকার করে নিতে হয়— ‘প্রকৃত জ্ঞানী সর্বাগ্রে মূর্খের কথা শোনে।’

পাটনের এই একটিমাত্র মোক্ষম উপদেশ অঙ্গদের পান্ডিত্যের গৌরবকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। তার মনে হয়, এখনো তার ভেতরে সমাজের মূর্খ, ঘৃণ্য ও অপাঙক্তেয়-র প্রতি অবজ্ঞা ও উদাসীনতা আছে বলে, জ্ঞানের ‘সুপ্ত অহংকার’ আছে বলে, সত্যিই সে প্রকৃত পন্ডিত হয়ে উঠতে পারেনি। হয়তো সে-কারণেই এখনো সে সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারেনি মহাপ্রবীণকেও। সে মনে মনে মহাপ্রবীণের প্রতি দুর্বিনয়ের জন্য তার চরণে প্রণত হয়ে সাশ্রুনয়নে বলে উঠল, ‘হে মহাপ্রবীণ!’

তবে যুদ্ধের প্রাক-মুহূর্তে মাঠারিক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে যে-বিষয়টিতে অঙ্গদ নিজেকে স্থির ও অটল রেখেছিল— ‘...হে মহাপ্রবীণ! আমি পুনর্বার বলিতেছি যুদ্ধে আমার মতি নাই।’—তৎপরবর্তীকালে সেই জায়গা থেকে সরে আসার কারণে তার আফসোস হয়। কেন সে যুদ্ধ না করার ব্যাপারে তার অবস্থানে শেষতক অনড় থাকল না? কেন সে পাটনের হুঙ্কারে তাকে শায়েস্তা করতে ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে উঠল এবং হত্যাকারীর ভূমিকায় যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো? এই ঘটনাও তাকে বুঝিয়ে দিল যে, উত্তেজনাকে সে এখনও দমন করতে পারেনি, অহংবোধকেও সে এখনো লয় করতে পারেনি।

মহাপ্রবীণের প্রতি জারমণির যে অভিযোগ, অকপট প্রকাশের দরুন তা ঔদ্ধত্যের মতো শোনালেও, অঙ্গদের মনে হয় তা মোটেই ভিত্তিহীন নয়। মহাপ্রবীণ তাঁর একটি শ্লোকে বলেছিলেন যে, যুগে যুগে সত্যকে, ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এভাবে যুদ্ধ ও স্বজনহত্যায় জড়িয়ে পড়তে হবে। কিন্তু এখন এই বৃহৎ হত্যালীলা সংঘটিত করে এবং তার ভয়াল রূপকে দর্শন করে, অঙ্গদ একদিকে যেমন তাঁর এই তত্ত্বকেই অসমীচিন বলতে চায়, তেমনি আবার এটাও তার মনে হয় যে, যুদ্ধ নামের এই সর্বজনীন হত্যানুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে মহাপ্রবীণ কি দেখিয়ে দিলেন যে, জীবহত্যা কি ভয়ঙ্কর? এর মাধ্যমেই তিনি কী মানবসমাজকে যুদ্ধ ও হত্যার ধর্ম থেকে বিরত থাকতে উপদেশ দিলেন? প্রকৃত বিচারে, তিনি কি সমাজে জীবনকেই সুদৃঢ়রূপেই প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন? বলে গেলেন জীবনপ্রতিষ্ঠাই ধর্মপ্রতিষ্ঠা? মাঠারিযুদ্ধ হত্যার ভেতর দিয়ে সংঘটিত ধর্মযুদ্ধেরই নামান্তর? প্রশ্নের ভেতর দিয়ে অঙ্গদের মনে কেলাসিত হতে থাকে সংশয়। সে সংশয় উত্তরোত্তর ঘনীভূত হতে থাকে যখন সে অবারিত দৃষ্টিতে দেখতে থাকে বহু যোজন ব্যাপী যুদ্ধক্লান্ত মাঠারিক্ষেত্রকে। তাকে এখন না দেখে তার উপায়ও নেই। বাস্তবে সে তো দেখছে তার কৃতকর্মকে। তার চন্ডাল মনকে, তার ক্রোধকে, তার অহংকে, তার পাপকে।

এমনকী যে মনেশ একদা ছিল তার প্রিয়তম অনুচর, সে-ও আজ মৃত। সূর্যাস্তের প্রাককালে তার বিকৃত মুখের ওপরে পড়া ম্লান আলোর ছটায়, অঙ্গদ তাকে চিনতে পারে। তার প্রাণ স্থবির ও ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে শোকে, কান্নায়। তার কাছেও অঙ্গদের অশেষ ঋণ। লোকজীবনের কত উপাদান তার কাছ থেকে নিয়ে সে নিজেকে জ্ঞানে চেতনায় সমৃদ্ধ করেছিল। তার অনুতাপ হচ্ছে এই ভেবেও যে, এই মনেশকে সে তার জিজ্ঞাসিত একটি মহামূল্যবান প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিতে পারল না। সে জানতে চেয়েছিল, ‘হে মহাত্মন, আপনি নিজে যদি যুদ্ধের ব্যাপারে নিশ্চয় না হইয়া থাকেন, আপনি নিজে যদি মনে করেন যে যুদ্ধ কোনো সমাধানের পথ নহে, তাহা হইলে কেন এখনো আমরা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মধ্যে দিয়া যুদ্ধ নামক মনুষ্যহত্যার আয়োজনকে বন্ধ করিতেছি না? অপিচ, ইহাও বিচার্য যে, কোনো একটি প্রদেশের সকল মনুষ্য কখনো কাহারো শত্রু হইতে পারে না। তাহা হইলে কেন আমরা তাহাদের উপরে যুদ্ধের দায় চাপাইয়া দিতেছি? কেন তাহারা পরিস্থিতিগত কারণে আমাদের দ্বারা সৃষ্ট হত্যালীলার অসহায় শিকার হইবে? এমতাবস্থায় আমরা যদি যুদ্ধে জয়লাভও করিয়া থাকি এবং মাঠারি দখল করিয়া থাকি, তবে সে-যুদ্ধ পাপাচারেরই নামান্তর। পাপাচার দ্বারা অধিকৃত লোহিতভূমিতে কখনো ধর্মরাজ্য গড়িয়া উঠিতে পারে না। পাপের বীজ কখনোই চিরতরে বিশুষ্ক ও মৃতপ্রাণ হয় না। একদিন না একদিন এমনকি পাষাণেও তাহার অঙ্কুরোদগম ঘটিবে। এ-বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যান শুনিতে আগ্রহান্বিত বোধ করিতেছি।’

অঙ্গদ সে-ব্যাখ্যান দিতে পারেনি। সে পাটনকেও তার বহুবার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের জবাব দিতে পারেনি।

সর্বোপরি, এই প্রথম সে যেন কোনো বীভৎস বাস্তবতার সম্মুখীন হল। একটি নগ্ননারীর মতোই, যুগে-যুগে সভ্যতা ও মানবিকতা ধ্বংসের বার্তা নিয়ে আসা যুদ্ধও যে এমন বিকৃত, নৃশংস, ভয়ংকর তথা সুদূরপ্রসারী হয়ে লোকজীবনে প্রতি পরতে তার বিষবাস্প ছড়িয়ে দিতে পারে, সে-ব্যাপারে কোনো ধারণা ছিল না অঙ্গদের। এখন সেই বীভৎসতাকে হয় জারমণির বিবস্ত্র দেহের দিকে তাকিয়ে, অথবা যুদ্ধোত্তর মাঠারিক্ষেত্র ঘুরে ঘুরে তাকে দেখে যেতে হবে। তথাকথিত এই ধর্মযুদ্ধ যে-সত্যকে প্রকাশ্যে এনে দিল, তার থেকে ভয়ে, আতঙ্কে সরে এলে চলবে না। তাকে চাক্ষুষ করতেই হবে। আর স্বীকার করতে হবে যুদ্ধ, যুদ্ধই। ধর্মযুদ্ধ বলে কিছু হয় না। এই ইঙ্গিত তো পাটনই দিয়ে গেল। গন্ড, অশিক্ষিত, ‘পাষন্ড পাটন’।

যদিও আত্মপক্ষ সমর্থন করে, অঙ্গদ, সম্ভবত তর্কের খাতিরেই জারমণির জিজ্ঞাসার জবাবে আত্মপ্রতারণামূলক বক্তব্যকে নিবেদন করে। তত্ত্ব আউড়ানোর মতো করে সে বলে, ‘অন্যায়কে দমন করার জন্য ধর্ম ও সত্যকে হাতিয়ার করেছিলাম আমি। জগতের সামনে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম আমি। সে-কারণেই এ-যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ। কেউ বেঁচে থাকুক আর না-ই থাকুক, তাতে নিজেকে আমি কাতর করে তুলতে চাই না। যাদের মৃত্যু হল, তাদের মৃত্যু অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী ছিল। এই মৃত্যুই ছিল তাদের নিয়তি। নিয়তি অখন্ডনীয়।’

জারমণি সবিস্ময় তাকিয়ে থাকে। অঙ্গদের দিকে। বলাবাহুল্য, তার এই জবাবদিহি না জারমণিকে সন্তষ্ট করতে পারে, না তার ভয়ংকর রোষানলকে স্তিমিত করতে সক্ষম হয়। অঙ্গদের উক্তিকে অনুসরণ করে এবার জারমণি যা বলে, তাতে অসহায় বোধ করে অঙ্গদ। সে তার তত্ত্ব কথা নস্যাৎ করে দিয়ে বলে, ‘সহস্র মানুষের নিয়তির দায় গ্রহণ করার এক্তিয়ার কে তোমাকে দিয়েছিল? জীবের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী বলে তোমার স্বার্থে যুদ্ধের আয়োজন করে এই সকল জীবকে নিধন করার অধিকার তুমি কোথায় পেলে? কে তোমাকে এই সংবাদ দিল যে, আমি পুরুষের আধিপত্যে বন্দি ছিলাম? বলো, বলো—’ পাটনের স্পন্দন থেমে যাওয়া দেহটির প্রতি তার নগ্নবাহু প্রসারিত করে উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘কেন তুমি তাকে এমন জঘন্যভাবে হত্যা করলে? কেন তাকে হত্যা করার আয়োজন করে তুমি এই আদিবাসী জঙ্গলখন্ডকে উজাড় করে দিলে? জবাব দাও তুমি! জবাব দাও! হত্যাকারী!’ জারমণি উগ্রমূর্তি ধারণ করে চিৎকার করে ওঠে।

অঙ্গদ কোনো জবাব দিতে পারে না। তার চোখের সামনে বারে বারে উদ্ভাসিত হতে থাকে মহাপ্রবীণের স্মিতহাস্যময় মুখচ্ছবি।

জারমণির কান্না থামে না। অঙ্গদের কাছ থেকে ছুটে গিয়ে সেই রোরুদ্যমানা রমণী পাটনের নিথর দেহের পার্শ্বে বসে পড়ে। শরবিদ্ধ হয়ে থাকা তার কপালে হস্তাবলেপন করতে গিয়ে তার হাত রক্তাক্ত হয়। সেই হাত মমতার সঙ্গে পাটনের মাথায়, চুলে বুলিয়ে দিয়ে সে আরো ভেঙে পড়ে কান্নায়, যখন তার মনে পড়তে থাকে জারমণিকে স্পর্শ করার জন্য পাটনের কাতরতা। তার কানের দুপাশে যেন প্রবল কোলাহল তুলতে থাকে সময়ে-সময়ে বলা পাটনের সংলাপগুলি :

‘শত যোজন তো কল্পনার অতীত। তোমার থেকে এক ইক্ষুদন্ড তফাতে যেতেও আমি অপারগ। যে মা-ভূমিকে দুপায়ে পিষ্ট করে তুমি ঔদ্ধত্য নিয়ে স্বমহিমায় বিরাজ করছো, হে ললনা, আমি সেই মাটিতেই শরাহত হতে চাই।...’

‘আমি চাই মাঠারি যুদ্ধে তুমি সর্বান্তঃকরণে আমারি পার্শ্বে, আমারি পক্ষাবলস্বন করে এই রতিগড়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন কুঠুরিতে নিরন্তর অবস্থান করো। কাল ও মহাকাল আমি বুঝি না, জয় জানি না, পরাজয় জানি না, রানি! তুমি আমাকে শুধু যুদ্ধের জন্যই প্রাণিত করো।...’

‘জয়! জয়! জয়! কী শ্রুতিমধুর শব্দ! রানি, তোমার হাতে মধুরতা সমর্পণ করতে আমি ভূলোক-দ্যুলোকে এমনকিছু নেই যা করতে পারি না। আমার আসন্ন জয় হবে তার কালজয়ী নিশান! জয় তো আর অধিক দূরবর্তী নয় গো রানি! যতখানি তফাতে আজ আমি তোমার থেকে, তোমার আভরণশোভিত মহাগোধূমতুল্য যোনি থেকে, ততোখানিই তফাতে আজ আমার জয়। একদিন তুমি আমাকে যোজন মাইল দূরে পাঠাতে চেয়েছিলে, যখন আমি যুদ্ধের কারণে তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনি। আর আজ? দেখো, রানি, দেখ! আজ কেমন আমূল পাল্টে গেছি। আজ সেই যুদ্ধের সূত্র ধরেই আমি তোমার থেকে ভূমিতে পতিত এক শিলীন্ধ্রে দূরে! মাত্র এক শিলীন্ধ্র!’

জারমণি তার তিরবিদ্ধ দক্ষিণ বাহু তুলে নিজের উন্মুক্ত বামস্তনে প্রতিস্থাপিত করে, বিলাপ করতে করতে বলে, ‘আমাকে ক্ষমা করো! হা ঈশ্বর! মাঠারিতে আমি আজ নি:স্ব! একাকী!’

এই দৃশ্য থেকে বিষাদগ্রস্ত অঙ্গদ তার চোখ ঘুরিয়ে নেয়। গভীর নৈরাশ্য ও হতাশায় সে নিজেকে বলে, ‘কোথায় তবে প্রেম? কেন তবে এই যুদ্ধ? কার জন্য? হে মহাপ্রবীণ...’

অখন্ড মাঠারি জুড়ে চামচিকার ডানার মতো অন্ধকার নেমে আসে। হাঁপ তুলে তুলে কাঁদতে থাকে জারমণি।

২৯

রাঙা হয়ে উঠল পুবের আকাশ। প্রত্যূষের আভা কেটে গিয়ে উঠল মোরগঝুঁটির মতো বর্ণময় রোদ। ছায়া ও ভোরের কুহেলিকায় অস্পষ্ট হয়ে থাকা টিলার নীরব শৃঙ্গগুলিকে অংশত রাঙিয়ে দিয়ে, সেই আলো, অতি ধীর লয়ে, গড়িয়ে গড়িয়ে, লম্বালম্বি পড়ল যুদ্ধভূমিতে। তারপর ক্রমশ তা বহুদূর অব্দি ছড়িয়ে থাকল। আর তাতেই মাঠারির বুকে দানবকীর্তির সাক্ষ্য আরো ভয়ঙ্কররূপে প্রতিভাত হতে লাগল।

বিশুদ্ধ প্রভাতের প্রকৃতিক মগ্নতা কোথাও নেই। হাওয়া বইছে, এলোমেলো। বিষণ্ণতা নিয়ে। যেদিকেই তার গতি, সেদিকেই বাতাসের সঙ্গে ধেয়ে যাচ্ছে ভারি দুর্গন্ধ। শতশত লাশ সৎকারহীন পড়ে রয়েছে। অনেক মরে পচে শুকিয়েও গেছে। এখানে-সেখানে তাদের অস্থি, করোটি আর অঙ্গের অবশেষ চোখে পড়ে। যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে পড়ে আছে কত-কত লাঠি, ধুসলা। পড়ে আছে লাল আর গেরুয়া কেতন। কোথাও কঙ্কাল গড়াগড়ি খাচ্ছে, কোথাও মুন্ডহীন দেহ, কোথাও-বা মাংসহীন পাঁজরাকাঠির ভেতরে শুকিয়ে যাওয়া নাড়িভুড়ির দলা। পোকায় ধরেছে। ভনভন করে উড়ছে মাছি।

যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পর থেকে একটা সময় পর্যন্ত চিতা জ্বেলে, খোলকর্তাল বাজিয়ে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ সহকারে মৃত সৈনিকদের দাহ করা হচ্ছিল, গোর দেওয়াও হচ্ছিল। পরের দিকে তা আর হয়নি। কাঠের আকাল, মাটিতেল দুর্মূল্য। জ্বালানির অভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে লাস টেনে নিয়ে শুধু মাটি চাপা দেওয়ার কাজ চলেছিল। কিন্তু তাও বেশিদিন নয়। যখন যুদ্ধের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়তে লাগল জনপদে, দেখা দিতে লাগল খরা, আকাল, জলের জন্য রাতের অন্ধকারে ভিন্ন ভূখন্ডে সশস্ত্র দলবদ্ধ অভিযান এবং গ্রামে গ্রামে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে সংঘাত-সংঘর্ষ-হত্যা, কালোবাজারী ও যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তখন দ্রুত বিপরীত দিক থেকে আসা গণ-উত্থানের ঢেউয়ের প্রভাব পড়তে লাগল মাঠারিতে। কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা দিয়েই যুদ্ধকে তখন আর যুদ্ধের মতো করে পরিচলনা করা গেল না। শুরু হয়ে গেল অরাজকতা। লুট। শত্রুপক্ষের এই দুর্বলতার সুযোগে পশ্চিমারা এসে ঢুকে পড়ল শিবিরে। আক্রমণ করল কোন নিয়ম না মেনেই। তারা বহু হুকুমদার, লেলে-সিপাই, যুদ্ধকর্মীদের যেমন জবাই করল, তেমনি গোল-সিপাইদেরও তাদের অস্ত্র দিয়েই হত্যা করে শস্যগোলার দখল নিয়ে লুন্ঠন করে নিয়ে গেল যুদ্ধরসদ, শস্যদানা ইত্যাদি। সুযোগ বুঝে বহু যোদ্ধারা পালাতে লাগল, কর্মীরা পালাতে লাগল। পালিয়ে অনেকেই যোগ দিল সশস্র বিদ্রোহীদের দলে। যুদ্ধবাজ, কালোবাজারী ও মাঠারি যুদ্ধের নামে দরিদ্র কৃষকদের শস্য লুণ্ঠনকারীদের হত্যার শপথ নিয়ে। এদিকে তখন মরে পড়ে থাকা সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবারও কেউ নেই, সৎকার করার রসদও নেই। যে-যেখানে মরছে, সেখানেই পড়ে থাকছে তার দেহ। রাত হলে শিয়ালে টানছে, দিনে কুকুরে।

সেইসব লাসের গন্ধ, ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে পড়ে থাকা গোরুর পচা গন্ধ বায়ুমন্ডল জুড়ে আবর্তিত হচ্ছে। যত রোদ বাড়ছে, গন্ধের তীব্রতা বাড়ছে তত। গোটা যুদ্ধক্ষেত্রে, জায়গায় জায়গায়, শুধু তিরবিদ্ধ মৃতদেহ আর মৃতদেহ। কত-কত প্রাণের বলি! যতদূর চোখ যায়। নগ্ন, অর্ধনগ্ন। কারও হাঁ-মুখে দাঁতের পাটি বেরিয়ে রয়েছে, চোখের ডেমি উপড়ে নিয়ে গেছে শকুনে, কেউ পেটে শরবিদ্ধ হয়ে শরীর এলিয়ে চিত হয়ে আছে। চোখ ঘোলাটে, হাতের মুঠোয় তখনো ধরা রয়েছে ধনুক। উলটে পড়ে আছে বহু গো-শকট। কোথাও শকটের তলায় চাপা পড়ে আছে বৃদ্ধ গাড়োয়ান। তার গলিত দেহ থেকে অন্ত্র টেনে বের করছে কুকুর। কোথাও কোথাও সেই অন্ত্র দড়ির মতো কতদূর টেনে নিয়ে গেছে!

ভোর থেকেই কাকের কলরব। প্রতিটি শবের পাশে চিল, শকুনি ঠেলাঠেলি করছে। হঠাৎ হঠাৎ ডানা ঝাপটাচ্ছে। একেকবার তাদের দৌরাত্মে হিংস্র হয়ে উঠছে খেঁকি কুকুর। দাঁত দেখিয়ে গরগর করছে। ঝাঁক বেঁধে সরে যাচ্ছে কাক, ওড়াউড়ি করে ফের মৃতদেহের ঘাড়ে-পিঠে বসছে তারা। তাদের কর্কশ কা-কা রবে মুখর হয়ে উঠছে এই ভয়াবহ পরিবেশ।

মাথার ওপরে যত মাংসাশী পক্ষী বৃত্ত রচনা করে গভীর আলস্যে পাক খাচ্ছে। ভোরের আলো ফুটতেই পালিয়ে যাচ্ছে শিয়ালের দল। রাত হলে তাদের মিলিত হুক্কারব। তারাই জনমনিষ্যিহীন এই প্রান্তরে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শাসন করছে। এই সব নিয়ে এ যেন অন্য এক মাঠারি। একদা যা ছিল স্বর্গভূমি, আজ তা মহাশ্মশান। জীবনের স্তিমিত কলরব। অখন্ড পটভূমি জুড়ে নিরন্তর বেজে চলেছে শোকের রাগিণী।

জারমণির চোখের জল শুকোয় না। কেবল পাটনের জন্য নয়, এই এত-এত নিরীহ, নির্দোষ গ্রামবাসীদের হত্যাকে কোনো তসত্ত্বের সাপেক্ষেই সে সমর্থন করতে পারছে না। করা যায়ও না। পৃথিবীতে কখনো কোনো পরিস্থিতেই জীবহত্যার পক্ষে কোনো ধর্মীয়, কৌম বা সাধারণ আইন, কোনো সামাজিক বিধি ও ঐতিহ্যগত সংস্কারকে মেনে নেওয়া অমানবিক তথা আদিম ও বর্বর মানসিকতার লক্ষণ। তত্ত্ব যতই মহৎ হোক, তাকে ঢাল বানিয়ে গণহত্যা সংঘটিত করা চূড়ান্ত ও গর্হিত অপরাধ।

তাছাড়া, মাঠারির এই যুদ্ধের পিছনে কী এমন কারণ ছিল যার জন্য এতবড় হত্যালীলার আয়োজন? তেমন কোনোই কারণ ছিল না। গ্রামবাসীদের মনোভাব বুঝে নিত্যনতুন কারণ গড়ে তোলা হচ্ছিল। যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলতে ভয়ংকর বিপদের কথা বলা হচ্ছিল। তাদের বোঝানো হচ্ছিল যুদ্ধ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যদিও, এই মানবলোকে, আপাত-মহৎ কারণকে প্রচারে এনে এবং প্রকৃত উদ্দেশ্যকে গোপন রেখে লুন্ঠনবাজ ও স্বৈরাচারী গোষ্ঠী যুদ্ধের নামে গণহত্যার আয়োজন করেই থাকে। সেই অপরাধের কারণেই জারমণি অঙ্গদকে বলেছে হত্যাকারী। বলেছে, ‘ঈশ্বরের কাছেও তোমার কোনো ক্ষমা নেই।’ আর এখান থেকেই ধর্মসংকট শুরু হয়ে গেছে অঙ্গদের।

কিন্তু তারপরেও শান্ত হয়নি জারমণি। স্বাভাবিক হয়নি। বরং সে পাগলিনীর মতো যত ঘুরে ঘুরে দেখছে তার মাঠারিকে, তত হু-হু করছে তার অন্তর। তার মন কাঁদছে বিলয়প্রাপ্ত তার এতদিনের স্বর্গভূমির জন্য, প্রতিটি সজীব, নিরীহ, নির্দোষ প্রাণের জন্য। এর জন্য সে যেমন সরাসরি দায়ী করছে অঙ্গদকে, তেমনি মহাপ্রবীণকেও ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিতে ছাড়েনি। যে-কথা পাটন বলেছিল, জারমণিও তার দৃপ্ত প্রতিধ্বনি তুলে বলেছে, ‘ওই—ওই তাত্ত্বিক চক্রান্তকারী বৃদ্ধের কারণে মাঠারি আজ ধ্বংস হয়ে গেল! নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল—গ্রামের পর গ্রাম, জনপদ আর অগণিত মানুষের প্রাণ। তুমিই এই ষড়যন্ত্রের মূলে। তোমাকে এর দায় স্বীকার করতেই হবে।’

এমন প্রত্যক্ষ ও উচ্চকিত অভিযোগের মুখে পড়ে কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি অঙ্গদ। প্রতিবাদ করার আছেটা কী? এমনকি, তার কাছে মহাপ্রবীণকেও যে-রূঢ় ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে, তা অঙ্গদের কাছে কেবল দুর্ভাগ্যজনক নয়, অকল্পনীয়ও। তবুও কিছু বলার মুখ থাকেনি অঙ্গদের। অতীতে পাটন একদা মহাপ্রবীণের বিরুদ্ধে এমন অর্বাচীন ভাষা ব্যবহার করায় অঙ্গদ সেদিন উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আজ? আজ জারমণির সামনে সবকিছু নীরবে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। প্রতিটি মানুষের জীবনে কখনো না কখনো এমন করুণ ও দুখদায়ী অধ্যায় আসে। প্রকৃত মানব তথা সত্যান্বেষী তাতে ভেঙে পড়ে না। তার থেকে যথোচিত শিক্ষা নিয়ে তাকে সে অতিক্রম করে যায়।

জারমণির এই ধাক্কা, অঙ্গদকে যে কেবল ধর্মসংকটে ফেলে দিল, তা-ই না। তার মধ্যে এই শাশ্বতিক বোধও সঞ্চারিত করে দিল যে, কোনো ব্যাপারে নিজেকে সন্দেহাতীত ভাবা নিরেট মূর্খতা। তাকে উত্তরোত্তর নিবিড় করে ভাবিয়ে তুলল তার কৃতকর্মের জন্য। তাকে করে তুলল শোকগ্রস্ত, অন্তর্মুখী।

সমান্তরালভাবে, এটাও মনে হয় যে, তার এই নীরবতার ভেতর দিয়ে চিন্তাশীল অঙ্গদ নিজের ভেতরে খুঁজে পাচ্ছে আরেক অঙ্গদকে। জীবন ও মৃত্যু, সত্য ও সংঘাতকে নতুন করে জানতে, বুঝতে তার মনে অনেক কিছু ব্যাপারে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। সত্য কী, তা নতুন করে জানতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। অধীত বিদ্যাকে যাচাই করার প্রবণতাও দেখা দিচ্ছে। যা অন্ধতার বশবর্তী হয়ে কিংবা দ্বিধার মধ্যে গ্রহণ করা হয়, তা কখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে না। এমনকি, তার পরিণাম জনহিতকর না হয়ে প্রবল জনবিরোধী হয়ে উঠতে পারে। এই ভাবনা থেকে মহাপ্রবীণকেও সে আলাদা করে দেখতে এখন আর রাজি নয়। চিন্তাশীলতার ক্ষেত্রে, স্বতঃসিদ্ধের সত্যতাকে প্রমাণ ব্যতিরেকে গ্রহণ বা উপলব্ধির ক্ষেত্রে যুদ্ধোত্তর অঙ্গদের এই দৃঢ়তা অর্জনের গুরুত্ব, এক কথায় অসীম।

অঙ্গদের এখন মনে হচ্ছে, জীবদ্দর্শনকালে এমন অনেক শ্লোকের অন্তর্নিহিত সত্যকে অনেক সময় মনে কিঞ্চিত দ্বিধা রেখেও সে মেনে নিয়েছে। ত্রিকালজয়ী মহাপ্রবীণের বিরাট পান্ডিত্য ও তাঁর জীবনদর্শনজনিত প্রজ্ঞার কাছে নিজেকে তার এতোই ক্ষুদ্র মনে হয়েছে যে, সেই ক্ষুদ্রবিদ্যা নিয়ে তাঁর ভাবনার ব্যাপারে সে যেমন সন্দেহ প্রকাশ করতে সাহস পায়নি, কুন্ঠিত বোধ করেছে, তেমনি নিজের ভাবনাকেও সে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়নি। এখন তার মনে হয়, যেখানে তার সংশয় দেখা দেবে, সেখানে সে বারংবার পালটা প্রশ্ন ও তর্ক করতে সংকুচিত হবে না। চাপিয়ে দেওয়া বা আরোপিত সত্যকে গ্রহণের ব্যাপারে সে অসহমত হবে। অধিকন্তু, যে-তসত্ত্বের সঙ্গে জীবনের সংযোগ নেই, কাল্পনিক, তাকে সে খারিজ করবে। একথা ভাবতে গিয়ে, নি:সন্দেহে মন তার ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। তৎসসত্ত্বেও, সে কঠিন হতে চাইছে। বিশ্বস্ত থাকতে চাইছে মানবতার কাছে। এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে তার অসীম শিক্ষা হয়েছে। তবু অনুশোচনা তার থেকেই গেল—জীবনের ভেতর দিয়ে নয়, মৃত্যুর ভেতর দিয়ে শিক্ষা হল তার।

এখনও ধনুর্বাণ সঙ্গে নিয়ে মাঠারি ঘুরে ঘুরে সে যা দেখছে, তাতে তার মন এতোটাই শোকাকূল হয়ে উঠছে যে, মনে হচ্ছে তার ভেতরে তার বিদ্যা, দর্শন, আদর্শ, আত্মবিশ্বাস, বিনয়, বিচারশক্তি ইত্যাদি সবকিছু প্রাচীন বসতভূমির মতো ক্ষণে-ক্ষণে ধ্বসে পড়ছে। আর নীরব আর্তনাদ করে উঠছে অঙ্গদ। সত্যের অন্যথা হলে, তা কি এমনি করে আঘাত হানতে থাকে? অঙ্গদের জানা হয়নি। জানা হয়নি তার আরো অনেক কিছু।

তার এই দশা শুরু হয়েছে কাল থেকে। ধর্মসংকটেরও শুরু কাল থেকে। যখন ক্রন্দনরত জারমণিকে সে শোক করতে দেখল পাটনের শবদেহের পাশে বসে। নিরাশ হয়ে, হতাশ হয়ে সে উচ্চারণ করেছিল, ‘কোথায় তবে প্রেম? কেন তবে এই যুদ্ধ? কার জন্য? হে মহাপ্রবীণ...’

বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তার অন্তর থেকে অকস্মাৎ উৎসারিত এই ক-টি শব্দের ভেতর দিয়ে সে নি:শেষ করে দিয়েছে নিজেকে। সে তার মানসিক স্থিতি ও উদবেগকে, তুমুল নৈরাশ্যকে যেমন প্রকাশ করে ফেলেছে, তেমনি যুদ্ধসংক্রান্ত তার জিজ্ঞাসার ভেতর দিয়ে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও সার্থকতার মূলেও পৌঁছতে চাইছে। আর ‘প্রেম’ শব্দটির উল্লেখ থাকায় তাতে সংপৃক্ত হয়ে রয়েছে তার ব্যক্তিগত অভিলাষও। হয়তো সত্যিই সে এত পঠন-পাঠনের প্রস্তুতি নিয়ে, জগদ্দর্শন করে, মহাপ্রবীণের আলোকশিখার আবর্তে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর থেকে এবং সর্বজনীনতার চিন্তা মাথায় রেখেও জারমণি-উদ্ধার যে এই যুদ্ধে তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। উচ্চারিত শব্দের বুনটেই তার ইঙ্গিত রয়ে গেছে। কিন্তু তার আগেই সেটা কীভাবে যে বুঝে গিয়েছিল জারমণি! বুঝতে পেরে তাকে আক্রমণও করেছিল। অঙ্গদকে সে মারপ্যাঁচ ছাড়াই সরাসরি বলেছে, ‘কোনো নারীকে উদ্ধারের জন্য তুমি যুদ্ধের আয়োজন করোনি। তুমি উদ্ধার করতে চেয়েছিলে জারমণিকে।’

ভাবা যায়! এমন এক মহান ব্যক্তিত্বকে বোঝার ব্যাপারে, তার চারিত্রিক মূল্যায়নের ব্যাপারে, জারমণির প্রত্যয় কতটা দৃঢ়! নি:সংশয়!

কিন্তু, হায়! যুদ্ধ করেও সে-নারী অঙ্গদের অধরা থেকে গেল। রাজ্য সে জয় করল, কিন্তু বাস্তবে শাসন করার জন্য তার হাতে কোনো রাজত্ব থাকল না। প্রজাবর্গ থাকল না। তার জারমণি নেই, মাঠারিও জনমানবহীন। একটি ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠীও থাকল না, যারা তার জয়কে স্বীকৃতি দেবে, তার শিরে শিংয়ের মুকুট, গায়ে পশুচর্মের পোশাক আর হাতে ভল্ল ধরিয়ে, কপালে জয়ের তিলক ঘষে তাকে তাদের দলপতি মেনে নিয়ে উল্লাস করবে! কেউ নেই তার পাশে। একটি মানুষও না। এমনকি, যে-নারীকে বিশেষভাবে মাথায় রেখে অঙ্গদের এই যুদ্ধ, যুদ্ধ শেষে জয় অর্জন করার পরেও সে-নারীই তাকে বিজয়ী বলে স্বীকার করেনি। উলটে, যুদ্ধক্ষেত্রে সহস্র বাণে মৃত্যুমুখে পতিত পাটনকে বলেছে জয়ী। অঙ্গদের হতাশার এটাও একটা কারণ। বড় কারণ।

সন্ধ্যা নামতেই যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে পড়ে থাকা মৃতদেহগুলি ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে গেল। নৈ:শব্দ্যের মতোই ক্রমশ গাঢ় হতে লাগল অমাবস্যার রাত। মাঠে ছড়ানো মৃতদেহগুলি দৃশ্যগোচর হয় না। দূর-দূর জঙ্গলঝাড়ি থেকে আসা শিয়াল-কুকুর ডেকেই চলেছে। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে জমিন-আসমান একাকার মনে হয়। প্রচন্ড গুমটে থমকে রয়েছে হাওয়ার চলাচল। দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশে সময়ের দীর্ঘ অন্তর নিয়ে বিদ্যুল্লতা ফুটে উঠছে, বাজ পড়ছে না কোথাও।

যুদ্ধ নিয়ে হতাশা ও নৈরাশ্যের চাপ আর সহ্য করতে পারছে না অঙ্গদ। তার যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেকের কাছেও সম্পূর্ণ পরাভূত সে। এতবড় এক জীবনদর্শী ও জ্ঞানী পুরুষ সেও কেমন দিশেহারা। কর্তব্যবিমূঢ়। সকল প্রাণশক্তি হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। এই মুহূর্তে কোথায় তার পথ, কী তার লক্ষ্য ও অভিপ্রায় নিজেও জানে না। স্থির করতেও পারে না। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার! তাকে যেন গলাধঃকরণ করতে আসছে!

অন্ধকার যে কতদূর বিস্তৃত হতে পারে, জীবনের কোন মাত্রাকে ছুঁয়ে যেতে পারে, সে-বোধ অঙ্গদের ছিল না। এতদিন জীবনকে সে দেখে এসেছে আলোতে, আবছায়ায়, কিছুটা দূরে থেকেও। এখন দেখছে প্রগাঢ় অন্ধকারে। অন্ধকারের কী ভয়াবহ আগ্রাসন! অঙ্গদ নিজেকে জানতে, চিনতে চাইছে। আত্মজিজ্ঞাসায় ফিরে যেতে চায় সে, প্রশ্ন করে নিজেকে, ‘বলো, তুমি কে? তুমি কী? কোথা থেকে এসেছ আর কোথায় ফিরে যেতে চাও?’

প্রশ্ন করেও নিজের ভেতর থেকে জবাব উঠে আসে না তার। তাকে ঘিরে কেবলই আবর্তিত হয়ে চলেছে বিষাদের সুর। অঙ্গদ উন্মাদের মতো, একাকী, নি:সঙ্গ, অসহায় হয়ে বিচরণ করতে থাকে। মশাল হাতে নিয়ে ঘর্মাক্ত শরীরে সে কি খুঁজে পেতে চাইছে কাউকে? কোনোকিছুকে? কখনো উত্তরে, কখনো পুবে-দক্ষিণে এলোমেলো অনির্দিষ্ট তার বিচরণ। তাকে চমকে দিয়ে হাঁটু ছুঁয়ে সড়সড় করে ছোটাছুটি করছে কুকুর। তাদের হাঁপানির শব্দ তীব্র হয়ে কানে আসে। পরস্পরকে কামড়াকামড়ি করছে তারা। আলোর স্বল্পতাহেতু প্রায়শ শবদেহে হোঁচট খাচ্ছে অঙ্গদ। কখনো পায়ে পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে মাটিতে লুটিয়ে থাকা শকটে সজ্জিত বিজয় কেতনগুলি। তবু সে অন্বেষণরত।

যতই এগিয়ে যায়, তার মনে হয়, ফেলে আসা মৃতদেহগুলির পুনরুত্থান ঘটছে। আবার জেগে উঠছে তারা! প্রলম্বিত হস্ত ও পদযুগল নিয়ে, গ্রাস করতে, পিছন থেকে তেড়ে আসছে অঙ্গদকে। আটকাতে চাইছে তার পথ। এহেন দুঃসময়ে একমাত্র মহাপ্রবীণকে স্মরণ করা যায়। অঙ্গদ মন্ত্রের মতো তাঁর নাম বিড়বিড় করতে করতে দিগভ্রান্ত প্রেতাত্মার মতো ঘুরে বেড়ায়। নিজেই নিজেকে আশ্বস্ত করে বলে, ‘না, না! আমি ভূত নই! প্রেতাত্মা নই! আমি মানব।’

বস্তুত, শোকে নিমজ্জিত এই মাঠারিতে নিজের ক্লেশপ্রাপ্ত, পীড়িত মনকে চতুস্পার্শ্বের অগণিত নিশ্চল জীবনের সান্নিধ্যে রেখে, অঙ্গদ, একদিকে যেমন শোকের তীব্রতাকে অনুভব করতে চাইছে, জনমানবহীন এই এলাকা থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে না, অন্যদিকে তেমনি মরুৎ-বায়ু-অগ্নি তথা মৃত্তিকাপিন্ডের ওপরে তাকে ঘিরে থাকা ভয়ংকর এই প্রতিবেশের সঙ্গেও ভাগাভাগি করে নিতে চাইছে তার জিজ্ঞাসাগুলিকে। সে কথা বলতে চাইছে সকলের সঙ্গে, সবকিছুর সঙ্গে, ভয়ংকরের সঙ্গেও। কিন্তু কেউ নেই। কেউ নেই। কেউ নেই।

নিজেকে তার নির্বাসিত, পরিত্যক্ত মনে হয়। মনে হয় সমগ্র ভূমন্ডলে সে একা! সে অভিশপ্ত। উঃ! একাকীত্বের কী ভয়াবহ অনুভূতি!

বহু দূরে, রতিগড় টিলার মাথায় তখন, এই টুকুনি হয়ে জ্বলছে একটি কুন্ড! জারমণি! সেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অঙ্গদ গলা তুলে উদাস হয়ে চেয়ে থাকে সেদিকে। চেয়েই থাকে। প্রেম কোথায়!

মশাল হাতে ঘুরতে ঘুরতে, একসময়, নীচু হয়ে অঙ্গদ যেন কী দেখে। তারপরই মশালটিকে ভূমিতে ফেলে ডুকুরে কেঁদে উঠতে চাইলেও, পারল না। তার মুখের অতিপ্রচীন রেখাগুলি আবেগের টানে কুঞ্চিত হল, কিন্তু কান্না অবরুদ্ধ হয়ে থাকল তার কন্ঠে। ‘পাটন! পাটন! আমার সহোদর!’ বলতে গিয়েও জড়িয়ে যেতে লাগল শব্দগুলি। সেই নিদারুণ অন্তরদহন নিয়ে সে কয়েক দন্ড মূক হয়ে থেকে যায়। অতঃপর পাটনের পায়ের কাছে নতজানু হয়ে, দুহাত দিয়ে তার দক্ষিণবাহু জড়িয়ে ধরতেই হলহল করে তার বুক ফেটে কান্না আসে। দেহ স্পন্দিত হতে থাকে, আর সে বলে চলে, ‘ভ্রাতঃ! আমি এমনটা কখনোই চাইনি। আমিও তো প্রেমই চেয়েছিলাম, অন্ধকার চাইনি। আমি জয় চেয়েছিলাম, ধরিত্রীকে উজাড় করে দিতে চাইনি। আমি আদিবাসী জীবনে বাঁচার গৌরব আনতে চেয়েছিলাম, দেশ জুড়ে দুর্ভিক্ষ চাইনি। আমি শত্রুর বিনাশ চেয়েছিলাম, কাতারে কাতারে গ্রামবাসীদের স্বভূমি ত্যাগ চাইনি, আমি ঘরে ঘরে অনাহার চাইনি, শোক চাইনি, আগুন চাইনি, এমন দুর্বিনীত বিদ্রোহও চাইনি। তবে কেন এমন হল? কেন সর্বস্ব হারিয়ে হৃদয় আমার নিষ্প্রদীপ হয়ে গেল? অন্ধকার হয়ে গেল মাঠারি? কেন আমার অতিপ্রত্যয়, জ্ঞানের সুপ্ত অহংকার আর অন্ধতা আমাকে এই মুহূর্তে দ্বি-সহস্র শরে বিঁধছে! আমি যে বেঁচেও বাঁচতে পারছি না, মরেও মুক্তি পাচ্ছি না। আমি কোথায় যাব? কার কাছে গিয়ে আমার তপ্তপ্রাণ জুড়াবো? আমি অনুতপ্ত! আমি অনুতপ্ত! সহোদররে, আমি কি ভুল করিলাম...হে মহাপ্রবীণ, দয়াময়! আমাকে নতুন করে পথ দেখাও! জীবহত্যায় আমার আত্মা আজ কলুষিত। জীবহত্যা পথ নয়...

‘তুমি বিশ্বাস করো, বিশ্বাস করো তুমি, আমি তোমাকে শেষমেশ হত্যা করতে চাইনি। প্রাক-যুদ্ধপর্বে আমার মুখ দিয়ে অসংখ্যবার তোমাকে হত্যার কথা দৃঢ় সংকল্পে র ন্যায় উচ্চারিত হয়েছে। তৎসসত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে স্বার্থপরতার বশে আমি তোমাকে বধ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলাম। আমি ভ্রাতৃহন্তা হতে চাইনি, সহোদর! সহোদর আমার, আমি ভ্রাতৃহন্তা হতে চাইনি! এই না-চাওয়া থেকে সহস্রবাণের পরিকল্পনা। তোমাকে লক্ষ করে ধাবিত আমার প্রতিটি বাণ, প্রকৃতপক্ষে, আমার কাছে তোমার ভুল স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনার ইঙ্গিতবাহী আক্রমণ ছিল। মৃত্যুর দূত ছিল আমার শেষ বাণটি। মানতেই হয় তোমার পৌরুষকে। মৃত্যু অব্দি তুমি তোমার ভাবনায়, আদর্শে অবিচল থেকে গেলে। না তুমি ভুল স্বীকার করলে, না জীবনের লোভে ক্ষমা। তুমি কোনো অপরাধ করোনি। তুমি বিশ্বাসঘাতকতাও করোনি। বরঞ্চ ওই নারীর প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে তোমার প্রেমের ভেতর দিয়ে তার পূজা নিবেদন করেছ। আমি কেন যে তোমাকে হত্যা করলাম! কেন শেষ বাণটি নিক্ষেপের মুহূর্তেও আমার বোধোদয় হল না! সহোদর রে! আমার ঔদ্ধত্যের পতন হল! বিদ্যার অবমাননা হল!’

অঙ্গদ কাঁদতে থাকে। তার চোখের জলে পাটনের মৃত, শীতল ও ফুলে ওঠা হাতটি ভিজে যায়। দপদপ করতে থাকা মশালের আলোয় দেখা যায় তার অভিব্যক্তিহীন পান্ডুর মুখ। ঘোলাটে বিবর্ণ চোখ। যার দুকোল বেয়ে নামা অশ্রুর শুকিয়ে যাওয়া রেখা এখনও মিলিয়ে যায়নি। কত আবেগে, কান্নায়, বেদনায় সে অঙ্গদকে বারে বারে সহোদর সম্বোধন করে তার কষ্টের কথা বলে গেছে। অঙ্গদ এখন সেই চোখ সস্নেহে মুছিয়ে দিতে আলতো করে হাত বুলিয়ে বলে, ‘হে আমার প্রাণপ্রতিম অনুজ! তুমি গৌরব নিয়ে বাঁচতে না পারলেও গৌরব নিয়ে মৃত্যুকে বরণ করেছ। আর আমি? ধাতব শৃঙ্খলের ন্যায় ভারি অগৌরবের এ-জীবনকে কীভাবে বয়ে নিয়ে যাব? কতদূর নিয়ে যাব?

‘সহোদর, আমার অদৃষ্টের কি পরিহাস দেখো! আমি জয়ী হয়েও জয় আমার নয়। লোকজগতে জীবন-প্রতিপালনের ভাবনাকে আদর্শ করেও আমি নিসূদক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইলাম। যার জন্য এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম, জয়ী হলাম, সে-ই আমাকে জয়ের মান্যতা দিল না, আমাকে হত্যাকারী আখ্যা দিল। অস্ত্র হাতে আমি তো আজ্ঞাবাহকের ভূমিকা পালন করলাম! হত্যাকারী হয়ে জীবনের অবশিষ্টাংশ আমি কীভাবে অতিবাহিত করব? যে-হাতে ধনুর্বাণ ধরে সহস্র মানবাত্মাকে নিধন করলাম, সে-হাতে আমি জ্ঞানের পবিত্র পুথি স্পর্শ করবো কোন দুঃসাহসে? কুষ্ঠব্যধিতে আমার সকল অঙ্গুলি যে খসে-খসে পড়বে! সহোদর আমার! জ্ঞানচর্চা ছাড়া জীবন যে আমার অচল! আমি বাঁচব কিসের অবলম্বনে? বলো, বলো, বলো...’ অঙ্গদ মৃত ভাইয়ের মাথায় মাথা কুটতে থাকে।

অতঃপর একসময় সে প্রগাঢ় বিলাপের সুরে অন্ধকারকে সাক্ষী রেখে বলে ওঠে, ‘হে মহাপ্রবীণ! জগৎ আদিতে আনন্দময়, মধ্যে দুঃখময়, অন্তে শোকময়। আমার এইরূপ বোধ হইতেছে।’

হাতে মশাল নিয়ে, অঙ্গদ, সেনা-ছাউনিগুলির দিকে আসে। দেখে কীভাবে সেগুলিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। শুধু ছাউনিই না, এখানে প্রশস্ত এলাকা নিয়ে পর পর গড়ে তোলা হয়েছিল যুদ্ধের পক্ষে প্রয়োজনীয় সবকিছু। খাদ্যভান্ডার, অস্ত্রাগার, পানিশালা, আস্তাবল, গো-চালা, খড়ের আড়ত থেকে শুরু করে কোনোকিছু বাকি থাকেনি। কিন্তু এখন সেসবের অস্তিত্ব নেই। আছে সকল অস্তিত্বের ধ্বংসকাব্য। দেখে মনে হয় ঘূর্ণিঝড়ে করুণ-সংগীতমুখর প্রলয় রেখে গেছে। যেভাবে সরীসৃপ রেখে যায় কঞ্চুক, ঐরাবত রেখে যায় নাদপিন্ড।

অন্ধকার ঝমঝম করছে। কোথাও কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। বহুদূর থেকে মাংসভুক প্রাণীগুলির অস্পষ্ট ডাক কানে আসে মাত্র। আশেপাশে জীবনের চিহ্ন নেই। কেউ নেই, কিছু নেই। চুঁইয়ে পড়ছে থৈথৈ নি:স্তব্ধতা। অঙ্গদের মনে ত্রাসের সঞ্চার হয়। গা ছমছম করে। তথাপি সে ঘুরে ঘুরে বিস্ময়বিস্ফারিত নেত্রে দেখতে থাকে, আর ভাবে— উত্তরণের পথ কোথায়? কোথায় কোলাহল? কোথায় জীবন?

ধ্বংসস্তূপগুলি ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে সে এগিয়ে চলে। এদিক-ওদিক ঢোকে, উঁকি মারে। এমন সময় একটা ঝুড়-ঝুড় শব্দ শ্রুতিগোচর হয় তার। শব্দটি একটানা নয়, থেমে থেমে। সে তটস্থ হয়ে পড়ে! কোনো সন্তর্পণ পদধ্বনি বুঝি এগিয়ে আসছে তার দিকে! হত্যার জন্য? সে কি শত্রু? ঘাতক? কেউ কি দেখতে পেয়েছে তাকে? কোথায় মানুষ? না, তেমন কাউকে দেখতে পায় না সে। পাওয়ার কথাও নয়। অঙ্গদ মশাল হাতে অংশত ভেঙে পড়া একটি গোলঘরের সামনে দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে সেই শব্দ আবার শ্রয়মাণ হয়। এবার আরো স্পষ্ট।

মুখমন্ডলে তার ফুটে উঠেছে ঘাম, গড়িয়ে পড়ছে কানের পাশ দিয়ে, গলা বেয়ে। সে নিজেও অবাক হয়ে যায়, তার মনে কি অশরীরী ভীতি জাগছে? ভয়ের অনুভূতি তো কোনোদিন ছিল না অঙ্গদের!

কিছুটা থমথমে মন নিয়ে, নি:শব্দ পদে, ধ্বস্ত গোলঘরটিতে ঢুকে পড়ে অঙ্গদ। ঢুকতেই অবাক! এমনটা আশাও করেনি। তার বিস্ময় এবং খুশির অন্ত থাকে না! আর এতক্ষণ তার শিহরিত হয়ে থাকার রহস্যও তৎক্ষণাৎ উন্মোচিত হয়ে যায়। এই পৈশাচিক নিশীথে সে দেখতে পায়, লাট করে রাখা কয়েকটি চালের বস্তা এখনো তেমনি আছে, ওপরের বস্তাটির ফুটো থেকে ইঁদুরগুলি লাফঝাঁপ করার কালে ঝুরুক-ঝুরুক করে চাল পড়েই চলেছে। নীচে সেই চাল খাচ্ছে একপাল মূষিক! ঈশ্বরের কি অপার মহিমা! সে মনে মনে ভাবল, এই মূষিকের দল যতদিন থাকবে, ধরিত্রী ততদিন শস্যহীন হবে না। এটাই তাঁর লীলা। ইঁদুর নয়, তারা ঈশ্বরের করুণাময় দূত।

পৃষ্ঠদেশে তূণীর সজ্জিত অঙ্গদ মশালটি তুলে ধরতেই, চকচকে দৃষ্টিতে কৌতূহল নিয়ে জীবগুলি তাকিয়ে থাকে। আকস্মিক-আবির্ভূত এই নতুন অতিথির শোকগ্রস্ত, ক্লিশ্যমান মুখের পানে। আহা, কী নিষ্পাপ প্রেমময় তাদের দৃষ্টি!

অঙ্গদ আলোটি দূরে রেখে, দলের মধ্যে প্রবীণতমকে দন্ডবৎপূর্বক বলে, ‘হে মূষিকদেব! হে মহাকাল! হে ঈশ্বর! সকল ধ্বংসের পরেও তুমি থেকে যাও। তুমিই জগতে সৃষ্টি ও লয়ের সাক্ষী। তুমিই বিস্ময়! তুমিই লীলা! তুমিই পূজ্যপাদ! হে করুণাময়, আমাকে তুমি শান্তি দাও! সঙ্গ দাও! আমার অন্তর আলোড়িত করতে থাকা প্রশ্নসমূহের জবাব দাও!’

মূষিকটি অতঃপর বলেন, ‘হে রাজন! বলো, কী জানিতে আগ্রহী তুমি? তুমি যাহা-যাহা জানিতে চাহ, আমি তাহা-তাহা কীর্তন করিব। তোমাকে দেখিয়া বড়োই অনুকম্পা জাগিতেছে। কী চাহ তুমি?’

অঙ্গদ বলে, ‘হে মহাকাল! আমি পার্থিব কিছু চাহি না। পার্থিব বস্তুতে সুখ নাই, উহা কেবলি পিপাসা ও প্রতারণার কারণ, এই সার আমি বুঝিয়াছি। আমি কেবল জানিতে কাঙ্ক্ষা করি, কী কারণে আজি আমার এমনতর জীর্ণদশা হইল? আমার পাশে আজি কেহ নাই, শৃগাল-সারমেয়-শবদেহ পরিবেষ্টিত আমি। কেন আমার নিজেকে শ্মশানবিহারী নরপিচাশ বলিয়া বোধ হইতেছে? কেন আমার মনে গ্লানি অধিক, অনুশোচনা ততোধিক? অতীতে কথিত আমার সদম্ভ বাণীসমূহ আমার অন্তর তোলপাড় করিতেছে। উপহাস করিতেছে প্রতিপদে। আমার পরিতাপের অন্ত নাই! ঈশ্বর, কেন মনে হইতেছে যুদ্ধ করিয়া আমি দেশ নহে, মনুষ্য নহে, হৃদয় নহে— শুধু একাকীত্বকে জয় করিলাম! জয় করিলাম নির্বান্ধবতাকে!’

মূষিক উবাচ...

মূষিক কহিলেন, ‘হে রাজন! মনঃসংযোগসহকারে শ্রবণোন্মুখ হও। তোমার নির্বান্ধবতা, বস্তুতপক্ষে, তোমার আত্মধ্বংসের অনুভূতি। তুমি এখন যাহা কিছু চাক্ষুষ করিতেছ তাহা তোমার ধ্বংস, তোমার পতনের প্রতিরূপ। তোমারই প্রতিচ্ছবি।’

অঙ্গদের চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়ে আসে। সে পরবর্তী প্রশ্ন নিবেদন করে। বলে, ‘হে মহাত্মন! আমার এই পতনের হেতু কী? কেন বিদ্যা-বুদ্ধি-দর্শনের এতবড় ভান্ডার লইয়াও আমি এই পতন আগাম টের পাইলাম না? কেনই-বা তাকে রোধ করিতেও অসমর্থ হইলাম?’

মূষিক উবাচ...

মূষিক কহিলেন, ‘হে রাজন! মনে রাখিও, জগতে কোনো ধ্বংসই অকস্মাৎ আসিয়া পড়ে না। এমনকি, প্রকৃতির কোনো ঘটনাও আকস্মিকভাবে ঘটে না। জায়া ও পতির সংসার-বিচ্ছেদ যেমন দীর্ঘ কলহের ফলশ্রুতি, সন্তানের ভূমিষ্ট হওয়া যেমন জননীর নয়মাসাধিককাল গর্ভধারণের ফলশ্রুতি, বল্মীক যেমন উইয়ের দীর্ঘ স্থাপত্যশ্রমের নিদর্শন, গুটি যেমন তন্তুকীটের বহুদিবস ব্যাপী বুননের ফসল, তেমনি জগতের সকল অনুষ্ঠান আপন-আপন কালচক্রের সম্পূর্ণকরণের প্রকাশ। কিছুই আকস্মিক নহে। সৃষ্টির ন্যায় ধ্বংসেরও দিনেদিনে উৎস ও ভিত্তিভূমি গড়িয়া উঠে। ইহা বিজ্ঞান। তুমি যেদিন হইতে যুদ্ধের ভাবনা ভাবিয়াছ, সেইদিন হইতেই তোমার অজানিতে তোমার পতন শুরু হইয়াছে। তুমি নিজ হস্তে নিজের মধ্যে বপন করিয়াছ সে-বীজ।’

অঙ্গদ স্তম্ভিত।

কিন্তু তবু মনে হয় যেন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সে বলতে চাইল, যুদ্ধ তো সে একা চাইনি? যুদ্ধ চেয়েছিল পাটনও। এমনকি, এই যুদ্ধ সংঘটিত করার ব্যাপারে জারমণির উদ্যোগও কি কম ছিল? তবে কেন সব দায় এসে পড়ল তার ওপর? যদিও আত্মবিশ্লেষণ করে তার মনে সন্দেহ দেখা দিল সত্যিই কি পাটন যুদ্ধ চেয়েছিল? বীরত্ব ও পৌরুষ নিয়ে আস্ফালন করলেও সে তো কখনো নিজে থেকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা অঙ্গদের সামনে উচ্চারণ করেনি। করেছিল কি? জারমণিও এ-ব্যাপারে তার ভূমিকা তেমন করে স্পষ্ট করেনি। সংকটকালে অঙ্গদ যখন তাকে তার পাশে চেয়েছিল, তখনও নিজেকে নির্বাক রেখেছিল জারমণি। অঙ্গদের মনে পড়ে গেল সে-দিনের সেই দীর্ঘ বাক-বিনিময়, যেদিন পাটনের পৌরুষকে অপমান করে, তার বীরত্বকে ঠাট্টা করে সে একরকম জোর করেই আদায় করে এনেছিল যুদ্ধের সম্মতিস্বরূপ অগ্নিশলাকা:

—‘আমি মনশ্চক্ষুতে অনাবিল দেখতে পাচ্ছি—কী করুণ দশায় আমার পদভূমিতে তুমি পরাভূত হতে চলেছ। আজ না হোক কাল, কাল না হোক শত-সহস্র-অযুত-নিযুত বর্ষ পরেও যে-মহারণের সূত্রপাত ঘটবে এই পবিত্র মাঠারিভূমিতে, সেখানে ভান্ডীর বৃক্ষের ন্যায় তোমার পতন অশ্যম্ভাবী!’

—‘তুমি আমাকে উত্তেজিত করছো! এই কি তোমার দূরভিসন্ধি?’

—‘আদপেই দূরভিসন্ধি নয়। আমি তোমাকে উত্তেজিত করতেই এসেছি। যাতে তুমি কালবিলম্ব না করে অতিসত্ত্ব র যুদ্ধে অবতীর্ণ হও। আমি তো আজ প্রস্তুত। আমি আজ সদলবলে তোমাকে রণাঙ্গণে আসতে আহ্বান জানাচ্ছি। হে মহেশ্বাস! যুদ্ধে তোমার বীরোচিত সম্মতিস্বরূপ তোমার মশাল হস্তান্তর করো আর এই মাঠারিভূমি থেকে আমাকে প্রস্থানে আজ্ঞা করো!’

এখনো কাঁসর-ঘণ্টার মতো কানে বাজে কথাগুলি। আর তা উত্তরোত্তর অঙ্গদের মনকে কাতর ও অপরাধী করে তুলতে থাকে। সে যেন এখন তার কৃতকর্মের সমর্থন আদায় করে নিতে চায় তার সম্মুখে বিদ্যমান মহাকালরূপী জীবটির কাছ থেকে। কিন্তু মহাকালও তাকে অপরাধী চিহ্নিত করেন।

মূষিক উবাচ...

মূষিক কহিলেন, ‘হে রাজন! যে বিদ্যাহীন, অবোধ, মানব-রিপুর বশবর্তী হইয়া যে অপরাধ করিয়াছে, তাহাকে তাহার অজ্ঞতাহেতু মার্জনা করা যায়। কিন্তু তুমি জ্ঞানের অহঙ্কার লইয়া যাহা করিয়াছ তাহা ঘোরতর দন্ডযোগ্য। এই দুষ্কর্মহেতু মনঃপীড়ন তোমাকে ভোগ করিতেই হইবে। তুমিই এই ব্যাপক ধ্বংসের জন্য দায়ী! দায়ী তোমার অন্তরে লালন করা জয়ের অসীম আকাঙ্ক্ষা। যত ভয়াবহ ও দুঃস্বপ্নময় তা হোক, এখন তাহা হইতে পলায়ন্মোমুখ হইয়া তুমি বাঁচিতে পারিবে না।’

অঙ্গদের বহুদিনের সুসজ্জিত অভ্রংলিহ ইমারত আজ, এই দন্ডে, প্রবল ভূকম্পন সৃষ্টি করে নীরবে ধরাতলশায়ী হয়ে গেল! সে নিজেকে নি:স্ব, রিক্ত বোধ করতে লাগল। সেই সঙ্গে তার মনে হতে লাগল, সে তবে এতদিন ধরে কিসের প্রস্তুতি নিচ্ছিল? কিসের এত আয়োজন? কোথায় গেল তার সেই জগদ্দর্শন? কী দাঁড়াল তবে বছরের পর বছর ধরে লোকজীবন অধ্যয়ন, শিক্ষা, দর্শনতত্ত্ব ও ফলিত বিদ্যার ভেতর দিয়ে নিজেকে অনুশীলিত করে?

যুদ্ধ! যুদ্ধ! যুদ্ধ! তার কেবলি মনে হত যুদ্ধ সংঘটিত না হলে জনজীবনে শোকের পতন নেই, দুঃখের নিরসন নেই, সুখের উত্থান নেই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এই ভাবনা তার সর্বৈব বিভ্রম ব্যতিরিক্ত কিছু নয়। তাই যদি হয়ে থাকে, তবে কিসের জন্য, কোন উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে মহাপ্রবীণ অঙ্গদকে তার অখন্ড জীবন ব্যাপী জগদ্দর্শনে অনুরক্ত থাকতে বলেন? তবে কি মহাপ্রবীণ ভুল? নাকি, ভুল সে নিজে? হয়তো জগদ্দর্শন কথাটির মাহাত্ম্য, মাত্রা ও বহুমুখী দ্যোতনা হৃদঙ্গম করতে সে এখনো সমর্থ হয়নি। বলাবাহুল্য, অঙ্গদের একথা অজ্ঞাত নয় যে, উদ্দশ্যবিহীনপরিভ্রমণই জগদ্দর্শন নয়। জগৎকে নিরপেক্ষতা ও নিষ্কামের সঙ্গে নিরীক্ষণ করে জীবনের চলিষ্ণুতার সূত্রনিচয় অনুধাবনপূর্বক স্বতঃসিদ্ধ নির্ণয়ই জগদ্দর্শন। জগদ্দর্শন একটি জ্ঞানের আকর। একটি ধারণা ও নিরন্তর তন্বিষ্ট থাকার বিষয়। অঙ্গদের হয়তো সেই স্বতঃসিদ্ধ নির্ণয়ে ত্রুটি থেকে গেছে। হয়তো সেই মেধা, সেই জ্ঞান আহরণে সে এখনো নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারেনি। এখনো বাকি রয়ে গেছে তার নিজেকে জানার, জগৎ, জীবন ও প্রকৃতিকে জানার।

অঙ্গদ বলে, ‘হে ঈশ্বর, আমি তো জ্গ্দ্দর্শন সম্পূর্ণ করিয়া যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়াছি। তথাপি কী হেতু আমার লোকসংসার ধ্বংস হইয়া গেল?’

মূষিক উবাচ...

মূষিক কহিলেন, ‘হে রাজন! পুনরায় অবগত হও, জগদ্দর্শন কখনো সম্পূর্ণ হয় না। জগৎই মহাপুঁথি, জগৎই বিদ্যাধর ও অশেষ। যে-মনুষ্য যত বেশি ইহাকে পাঠ করিয়া থাকে, সে ততবেশি হিংসা, হিংস্রতা, প্রতিশোধ, লোভ আদি হইতে বিরত থাকে। সে সর্বমাংগলিক আনন্দ ও সংকীর্ণতামুক্ত বৃহত্তর জগতের সন্ধান পায়, সূত্রবদ্ধ ও সন্তুলিত যে-জগৎ বহু বিচিত্র রাগ-রাগিণীর মিশ্রণে ধ্রুপদী সংগীতের ন্যায় অহোরাত্র বাজিয়া চলিয়াছে। সে তখন জগতের সকল মনুষ্যকে সহোদর ও আপন ভাবিতে পারে, সে যুদ্ধের পথ পরিহার করিয়া প্রেমের মার্গে ফিরিয়া আসে।’

এই শ্লোক শুনে, অঙ্গদের আবার মনে হল, তাকে প্রবল টান মেরে কেউ মুহূর্তে স্বপ্নভূমি থেকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনল। অপরের কাছে প্রকাশ না করলেও এতদিন ধরে তার ভেতরে যে একটা সূক্ষ্ম বিদ্যা-ধনাঢ্যের গর্ব ছিল, তাও ধুলায় মিশে গেল। তাকে এটাও ভাবতে বাধ্য করল যে, যাকে সে নির্বোধ, আকাট বলে প্রায়শ ঠাট্টা করেছে, অঙ্গদ তার তথাকথিত জ্ঞানবারিধির অধিকারী হয়েও কি তদপেক্ষা কম উপহাসের পাত্র? তার মনে পড়ে গেল, পাটনের সেই বিস্ময়বিমূঢ় উক্তিসমূহ:

—‘তুমি শুধু জিদের বশে, জয়ের মোহে, তুচ্ছ একটি নারীর জন্য আমাকে এমন নৃশংসভাবে বধ করতে পারলে? এই তোমার জগদ্দর্শন? জগদ্দর্শন শেষে তুমি কিনা মানব-হত্যায় নেমে পড়লে? এতটুকুও অনুকম্পা জাগল না তোমার মনে? ধিক, ধিক এমন জগদ্দর্শনে। ধিক তোমার মেধা, শিক্ষা, চেতনা ও জ্ঞানে। যে-জ্ঞান মানুষকে অস্ত্র ধরা থেকে বিরত রাখে না, যে চেতনা অপর হৃদয়কে লালন করতে শেখায় না, সহবোধের জন্ম দেয় না, এমন জ্ঞানীপুরুষ সমাজে থাকার চেয়ে না থাকা ঢের মঙ্গলময়। তারা পাপের বোঝা...

—‘তুমি জেনে রাখো, আজ তোমার হাতে আমার প্রয়াণ সম্পন্ন হলেও, ইতিহাসে আমিই অমর ও কালজয়ী হয়ে থাকব। কারণ এটাই যে, আমার হৃদয়ে প্রেম হীরকখন্ডের ন্যায় সতত দ্যুতিময়। তোমার হৃদয়ে হিংসার বহ্নি। তিরোধানকালেও আমি প্রেমের বাণী উচ্চারণ করে চলেছি। আর তুমি? অস্ত্র হাতে সেই ঈশ্বর-কন্ঠকে চিরতরে রুদ্ধ করতে উদ্যত। আমার প্রেম আমাকে প্রতিদিন প্রতিটি মৃত্যু থেকে, নৈরাশ্য থেকে নবজন্ম দিয়েছে। সাহসের সঙ্গে, প্রত্যয়ের সঙ্গে আমার পুনরুত্থান ঘটিয়েছে। আর তোমার হাতের অস্ত্র তোমাকে দন্ডে দন্ডে হত্যার জন্য প্ররোচিত করেছে। তুমি ষড়যন্ত্রকারী! তোমার ক্ষমা নেই। ইতিহাস তোমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না। প্রতিটি হৃদয়বান বিবেকবান বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ যুগে-যুগে তোমাকে হত্যাকারী হিসেবে মনে রাখবে। ঘৃণা করবে। ঈশ্বরের বিচারে তুমি বিনাশকারী হিসেবে দন্ডিত হবে।’

অঙ্গদের কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। কেউ যেন তার শ্বাস স্তব্ধ করে মারতে চাইছে তাকে। সে ক্ষোভে, হতাশায় উদ্যমহীন কন্ঠে বলে, ‘হে মূষিকদেব! আমার লক্ষ্যও তো ছিল শান্তি ও প্রেম। এই ধর্মযুদ্ধের ভিতর দিয়া তবে কেন আমি তাহা প্রতিষ্ঠিত করিতে ব্যর্থ হইলাম?’

মূষিক উবাচ...

মূষিক কহিলেন, ‘হে রাজন! তুমি যুদ্ধ লইয়া উন্মাদ হইয়াছিলে। তুমি হত্যার ব্যাপারেই নিবিষ্ট ও একমুখী হইয়া ছিলে, জীবনের বিষয়ে নহে। তোমার যুদ্ধে বহু নিরীহ নিষ্পাপ মানুষের প্রাণ বিসর্জিত হইল। যুদ্ধ আয়োজনকারী যে-শক্তি প্রতিপক্ষ বলিয়াই সকল বিরোধীদের নির্মূল করিতে চাহে, সে বাস্তব-বিচারে জহ্লাদ। মনুষ্যকে সে বধ্য জ্ঞান করে। স্মরণে রাখিবে, হত্যার ভিতর দিয়া প্রেম ও শান্তি আসে না। পুনশ্চ, ‘ধর্মযুদ্ধ’ সম্বন্ধেও সত্ত্বর অবগত হও। ‘ধর্মযুদ্ধ’ প্রকৃতপক্ষে একটি ধারণামাত্র। শত্রুধর্ম নিধন করিয়াও নিষ্পাপ রক্তক্ষরণ না ঘটানোর সংকল্পমাত্র। কার্যত, ‘ধর্মযুদ্ধ’ বলিয়া কিছু হয় না। যুদ্ধ সর্বদেশে সর্বকালে নির্বিচার মানবহত্যা, হিংসা ও লুন্ঠন, প্রলোভন তথা আগ্রাসনের গর্হিত অনুষ্ঠান।’

—‘সত্য আজ আমার সম্মুখে। তামাম মাঠারিক্ষেত্র জুড়ে উন্মুক্ত। একবার ঘুরে দেখো। শত-সহস্র পচনশীল মৃতদেহ, অজস্র বায়স ও সারমেয়, অম্বরে উড্ডীন শতশত চিল-শকুন তোমার সে-সত্যকে কী নিদারুণভাবে বহন করে চলেছে। তুমি এই সত্যই চেয়েছিলে, সহোদর? এরই নাম ধর্মযুদ্ধ? ধর্মযুদ্ধে এত হত্যা কেন? জবাব দাও। আমি আবারও জানতে চাইব ধর্মযুদ্ধে এত হত্যা কেন? হিংসা কেন? রক্ত কেন? যদি তার সদুত্তর দিতে না পারো, যদি তুমি মৌন অবলম্বন করে আমার প্রশ্নবাণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে অভিপ্রায় করো, আমাকে অগ্রাহ্য করো, তবে বুঝবো তুমি যথার্থই কাপুরুষ।’

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা এই প্রতিধ্বনি থেকে বাঁচতে, দু-কান চাপা দিয়ে অঙ্গদের বলতে ইচ্ছে হল, ‘হে আমার অনুজ! হে সহোদর! থামো, আর প্রতিশোধ নিও না। আমার নির্বোধ চেতনায় তোমার অবিরাম বেত্রাঘাত আমাকে জর্জরিত করে তুলছে!’

অন্যদিকে, মূষিকের সম্মুখে নিষণ্ণ অঙ্গদ, তাঁর মুখনি:সৃত অমৃতবাণী শ্রবণ করে সন্ধান পাচ্ছে অগাধ জ্ঞানভান্ডারের। মূষিকের প্রতিটি শ্লোক ও টীকা শ্রবণের মুহূর্তে যারপর নাই বিস্মিত সে! তার মনে হল, তাঁর সকল বাণী ধ্রুব, চিরকালীন ও অলঙ্ঘ্য। গভীর, অভিনব তার বিশ্লেষণ। অশ্রুতপূর্ব। যেন তার চোখের সামনে সেই মহাপুঁথির একটার পর একটা পাতা উল্টে যাচ্ছে। আর তাই এই বিদ্যানিধিকে পেয়ে, আরো সংশয়হীন হতে চেয়ে, সে পুনরায় জয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে।

‘হে ঈশ্বর! রক্তপতনের বিরুদ্ধে ততোধিক রক্তপতন ঘটাইয়া যে-জয়, আমি সে-জয়কে গ্রহণ করিতে পারিতেছি না। ধ্বংসকে প্রত্যক্ষ করায় আমার চেতনার উন্মেষ ঘটিয়াছে। এই জয়, বস্তুতপক্ষে, এক অকারণ রক্তক্ষয়ী অনুষ্ঠান বলিয়া বোধ হইতেছে। ধ্বংসের বিনিময়ে অর্জিত জয়কে পাশবিক প্রতীয়মান হইতেছে। হে সর্বজ্ঞ, আপনি আমাকে রাজন বলিবেন না, জয়ী বলিবেন না। আমি যদি জয়ীই হইয়া থাকি, তবে জয়ী পুরুষের এহেন ভয়াবহ পরিণতি কেন?’

মূষিক উবাচ...

মূষিক কহিলেন, ‘হে রাজন! জয় তোমার ললাটের লিখন ছিল। অবশ্যম্ভাবী ছিল। সেই হেতু তুমি জয়ী। সেই হেতু তোমাকে আমি রাজন বলিয়া সস্থোধন করিতেছি। অতঃপর যাহা নিবেদন করি, তাহা এই যে, দেশে-দেশে কালে-কালে জয় সর্বদা ভয়াবহ। কেননা, তাহা আগ্রাসী ও আধিপত্যপ্রয়াসী। সমাজে একমাত্র আত্মসর্বস্ব, আক্রমণপ্রবণ ও রিপুপ্রবল পুরুষই জয়ের কাঙ্ক্ষা করিয়া থাকে। জয়ের প্রত্যাশা রাক্ষসের ধর্ম। ক্ষমতা, বলপ্রয়োগ, অত্যাচার তথা অসহায় জীবহত্যার মাধ্যমে যে একক, অসার্বজনিক ও অপ্রেম জয়, তাহা মানবতার কলঙ্ক। জয়ী পুরুষের পরিণতিও সে-কারণে এতাদৃশ ভয়ংকর অমানিশাচ্ছন্ন হইয়া থাকে। জয়ের নেশা হইতে নৈরাশ্যের জন্ম। জয়ী পুরুষ সর্বকালে নি:সঙ্গ ও দুঃখী। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমাজ হইতে বিচ্ছিন্নতার বেদনা তাহার অন্তিমকালের সঙ্গী। তাহার নিয়তি।’

জয়ের এই আশ্চর্য স্বরূপ-বিশ্লেষণ অঙ্গদের মনোবলকে আরো চূর্ণ করে দেয়। সে হতাশ হয়ে বলে, ‘হে ঈশ্বর, আমি তো এমন জয় চাহি নাই। আমি যুদ্ধান্তে জয়হীন সমাজকে জয় করিতে চাহিয়াছিলাম, যাহা শান্তির ও সাম্যের, যাহা প্রতিযোগিতাহীন, প্রতিপক্ষহীন, নি:শত্রু। আমার অতীব স্নেহশীল সহোদরকে হত্যা করিয়া যে পৌরুষ আমি প্রতিষ্ঠা করিয়াছি, যে নারীকে আমি পূর্বপ্রকল্পিত আত্মপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মুক্ত করিয়াছি, যে ভূখন্ডে আমি নিরঙ্কুশ আধিপত্য কায়েম করিয়াছি —আমার আকাঙ্ক্ষা তো কোনোদিনই এহেন সুদূরপ্রসারী ছিল না? ক্রোধ ও হঠকারিতার বশবর্তী হইয়া উচ্চারণ করিলেও, আমি অন্তর হইতে সহোদরকে হত্যা করিতে চাহি নাই, তাহার চিরতরে বিনাশ চাহি নাই, পৌরুষ ও ভূম্যাধিপতিও হইতে চাহি নাই। তবে কী হেতু আপনি আমাকে রাজন বলিয়া সম্বোধিত করিতেছেন, জয়ী হইয়াও আমি হাহাকার বৈ তো কিছুই লাভ করিতে পারিলাম না?’

মূষিক উবাচ...

মূষিক কহিলেন, ‘হে রাজন, প্রজাপ্রেমহীন জয় শেষাবধি হাহাকার ও নি:স্বতার জন্ম দিয়া থাকে। তুমি নারী চাহিয়াছিলে, আধিপত্য চাহিয়াছিলে, শাসন চাহিয়াছিলে। আমি পুনশ্চ নিবেদন করি, সকল প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করিয়াও তুমি যে অভীষ্ট নারীকে কাঙ্ক্ষা করিয়াছিলে, তাহার অর্থই হইল এই সমগ্র। নারীর সঙ্গেই বিনাশ, রক্তক্ষরণ এবং পৌরুষ অবিচ্ছিন্ন হইয়া আছে।’

‘হায়! আমি তবে এহেন কলঙ্কের প্রতিনিধি! এই আমি রাজন! ধিক সে সম্বোধনে, যা বিনাশকারীর অলংকার! আমি যদি এমন রাজন হইয়া থাকি, তবে এই লহ অস্ত্র—’ অঙ্গদ তার পিঠের ওপরে নিষঙ্গ থেকে একটি তির ঝাঁকিয়া বাহির করিয়া ঈশ্বরের হাতে দিয়ে বলে, ‘হে ঈশ্বর! আপনি এই অস্ত্র দিয়া আমার দেহাংশ, আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খন্ড-অতিখন্ড করিয়া কুক্কুরের আহার করুন।’ একথা বলে, সে চারিদিকে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে, ‘আমি এমনি পাতককর্ম করিয়াছি যে, আমার ঘৃণ্য মাস ভক্ষণ করিবে এমন একটি সারমেয়ও বুঝি বিরল।’ ক্ষোভে, অনুশোচনায় সে এবার বলে, ‘আমি চন্ডাল! কুক্কুর থাকুক না থাকুক, আমিই আমার মহামাস ভক্ষণ করিব!’ এই বলে সে যেই না নিজেই স্কন্ধমূল দংশন করতে যাবে, অমনি মূষিক তাকে নিরস্ত করে বলেন, ‘তুমিই প্রকৃত রাজন! প্রজার অমংগলজনিত কুকর্ম করিয়া যিনি অনুশোচিত হন, যিনি প্রজার শোকে কাতর হন, দুঃখে ব্যথিত হন, তিনিই মহামানব। তিনিই রাজন। তোমার বোধের বিকাশ হইয়াছে, তোমার মধ্যে মানবতার বিস্তার ঘটিয়াছে, তুমি শাশ্বত জ্ঞানের, চেতনার অধিকারী হইয়াছ। হে রাজন, অনুশোচনা হইতে, শোক হইতে, মানবের তরে নিরতিশয় দুঃখ ও বেদনা হইতে উত্থান করো।’

অঙ্গদ কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে সে নিজেকে প্রণত করে তাঁর পদতলে।

বাইরে তখন শুরু হয়ে গেছে প্রচন্ড ধূলিঝড়। অঙ্গদ সেনা-ছাইনিগুলি থেকে বেরিয়ে উঁকি মেরে দেখে আকাশ জুড়ে ভয়াবহ আলোর ঝলকানিতে, হঠাৎ-হঠাৎ চতুর্দিক আলোকিত হয়ে উঠছে। দুর্বার বেগে ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সব কিছু। উড়ে যাচ্ছে ধ্বংসপ্রাপ্ত ছাউনিগুলিও। যেন নতুন করে শুরু হল আবার প্রলয়।

কিন্তু এই আঁধির মুহূর্তে যা সে দেখতে পায় না, তা হল—রতিগড়ের মাথায় উন্মত্ত নগ্নিকা। জারমণি। পিঠে তিরভর্তি তূণীর, কাঁধে পাটনের সেই মহাভার ধনু, আর দক্ষিণ হস্তের মুঠিতে কঠোরভাবে ধরা বুচাটাঙি। মাথার ওপরে বুচাটাঙি দশদিক ঘুরিয়ে সে উন্মাদিনীর নৃত্য করছে, আর জিনগা-মাঈয়ের কাছে প্রার্থনা করে বলে চলেছে, ‘হে জিনগা! তুফান দে, বারিশ আন!’

সারা ভূমন্ডল কেঁপে উঠতে লাগল ঘন-ঘন বজ্রপাতে। তারই মধ্যে পুব থেকে পশ্চিমে বইতে লাগল শীতল বাতাস! দেখতে দেখতে শুরু হয়ে গেল ভয়াবহ বর্ষণ। ঝড়ো হাওয়ার দাপট বৃষ্টিকে কোথায় যে উড়য়ে নিয়ে যায়!

ঝড় সামলে, নিজেকে স্থির রেখে, অঙ্গদ দেখে তার হাতের মশাল কোনোভাবেই ঝড়ের দাপটেও নিভে যাচ্ছে না। সে অবাক! সে আরো অবাক হয়ে দেখতে লাগল দুটি-দশটি করতে করতে হাজারে হাজারে মূষিক উৎফুল্ল হয়ে ছুটে যাচ্ছে খেতে-মাঠে। সৃষ্টির বার্তা পেয়ে।

এল নতুন প্রভাত! ধীরে ধীরে প্রলয়ের ক্ষত মুছে দিয়ে আবার ফিরে এল সেই আগের মাঠারি। বহু সময় নিয়ে ফিরতে লাগল জীবন। পরিপূর্ণ হয়ে উঠল নদীনালা। মাঠে মাঠে ধান, ডাঙাজমিতে মঁচধরা ভুট্টা। ভুট্টার খেতগুলি থেকে একেকবার বনটিয়ার ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে কলরব করে। কদম্বের ডালে ডালে আলো হয়ে ফুটে রয়েছে কত কত ফুল! বরগদের গায়ে লেপ্টে থাকা ছুতোর পাখি কি ক্ষিপ্রতায় বানাচ্ছে কোটর! আহা! চোখ জুড়িয়ে যায় সৃষ্টির এই আনন্দ-আয়োজন দেখে।

পথে-পথে কর্মব্যস্ত মানুষ। হাটগুলিতে ক্রেতা ও পাইকারের ঠাসাঠাসি ভিড়। আর সেই ভিড় ঠেলে জঙ্গলের পথ ধরে রট-রট শব্দ করতে করতে আসা নুনের বস্তা বোঝাই গোরুর গাড়ি ঢুকছে ভেতরে। ভিড়ের কুন্ডলীতে দাঁড়িয়ে ঝুমুর গাইছে রসিক।

জঙ্গলের গাছে গাছে কত যে নতুন ফুল! কত বুনো ফুলের সুবাস! কত-কত বক, দলমুরগি আর রামবোনি উড়ে চলেছে ঈশান থেকে নৈঋতে। ঘুনসি কোমরে আদিবাসী শিশুর মতো ঢলমল করতে লাগল জলাশয়গুলি। লাফাচ্ছে নাচনী-পোকা। চ্যারেং ডাকছে ঝুড়ে-পাতে। ঘাটে-ঘাটে গলা ফুলিয়ে ডাক পাড়ছে কোলা ব্যাঙ। চাঁদের মুখের পানে চেয়ে রাতভর জেগে থেকে হাসতে লাগল শালুক!

আবার সেই গো-শকট, ঘুরতে লাগল চক্রনেমি। আবার গগনচুম্বী খড়ের গাদায় বসে অঙ্গদ। বটের ঝুরির মতো তার মাথাভর্তি জটপড়া চুল ছড়িয়ে রয়েছে পিঠে। কালো, অস্থিসার শরীর। সর্বদা সজাগ দ্যুতিময় চোখ। তার দু-মুঠোয় ধরা আসমান ফুঁড়ে ওঠা হাতিয়ার লিকলিক করছে চাঁদের আলোয়।

সুউচ্চ অবস্থানে বসে, চারপাশ দেখতে দেখতে, বিস্ময়ের ঘোর কাটে না অঙ্গদের। অকস্মাৎ তার মনে প্রশ্ন জাগে। সে জানতে চায়, ‘হে মহাপ্রবীণ, এক্ষণে সৃষ্টিবিষয়ে কৌতূহল আমাকে ক্রমেই উতলা করিয়া তুলিতেছে। সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্যবর্তীকালে ঈশ্বরের অবস্থান কোথায়? তৎকালে উহার কর্ম কী? ধর্ম কী? ইহা জানিতে আমি বড়োই কৌতূহলোদ্দীপক বোধ করিতেছে। সত্ত্ব র আপনার অমৃত বাণী কীর্তন করত আমার এই কৌতূহলের নিরসন করুন।’

মহাপ্রবীণ উবাচ...

মহাপ্রবীণ কহিলেন, ‘হে জ্ঞানান্বেষী! এক্ষণে সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্যবর্তীকালে ঈশ্বরের অবস্থান বিষয়ে কীর্তন করিতেছি। আগ্রহপূর্বক শ্রবণ করো...’

_____________________________________________________

১ কেঁচো

২ এক ধরনের ছোট্টো রসাল কন্দমূল

৩ স্তূপ

৪ সদ্যজাত শিশুদের পরিচর্চা

৫ ঘোড়ার মত লাফিয়ে লাফিয়ে

অধ্যায় ৩ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%