প্রথম পর্ব

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

সমুদ্রের নোনা বাতাস কি রক্তে খুনের নেশা ধরায়? প্রাচীন জাহাজি-মাল্লারা অবশ্য এ-কথাই বলে। সমুদ্র সেদিন শান্ত ছিল, রৌদ্রকরোজ্জ্বল নীল আকাশে ঝড়ের কোন পূর্বাভাস ছিল না। সত্যি কথা বলতে কী, এত শান্ত সমুদ্র বহুদিন দেখেনি অর্ধেক পৃথিবী পেরিয়ে আসা অ্যাডমিরালের বিশাল নৌবহরের লোকজন। জাহাজের খোলও ভর্তি ছিল সোনা-দারুচিনি আর চন্দনকাঠে। ছিল সম্রাট ম্যানুয়েলের আশীর্বাদ। নির্দিষ্ট ছিল গন্তব্যও। তবু কেন হঠাৎ তাঁর রক্তে জেগে উঠল খুনের নেশা? কেন মুহূর্তে অভিযাত্রী আর জলদস্যুর মধ্যে যে ব্যবধান তা মুছে গেল? তা কি ওই নোনা বাতাসের জন্যই? রাজহংসর মতো সাদা পালতোলা জাহাজটা চোখে পড়তেই অ্যাডমিরাল ভাস্কো নির্দেশ দিলেন, 'লুঠ করতে হবে মূরদের ওই জাহাজ। তারপর আগুন লাগিয়ে ডুবিয়ে দিতে হবে। নারী হোক বা শিশু, একটা প্রাণীও যেন জীবিত না থাকে।'—শেষের কথাটা বেশ জোর দিয়েই বললেন অ্যাডমিরাল।

১৫০২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ভোরে টেগাস নদীর মোহনা থেকে দ্বিতীয়বারের ভারত অভিযানের জন্য দুটি নৌবহর নিয়ে সমুদ্রে নেমেছিলেন ভাস্কো। আর তৃতীয় নৌবহরটি এস্টাভাও গামার নেতৃত্বে তাদের অনুসরণ করে তার মাস দুই বাদে। ক্যানারি দ্বীপমালা অতিক্রম করে সে-মাসের শেষেই ভাস্কো পৌঁছেছিলেন ভার্দে অন্তরীপে। তারপর পূর্ব আফ্রিকার অন্যতম বন্দর সোফালা ছুঁয়ে একে একে মোজাম্বিক ছুঁয়ে কিলওয়া দ্বীপ। তারপর ভাস্কো সোজা রওনা হলেন ভারতের দিকে। ভাস্কোর প্রথম যে-তটরেখা চোখে পড়েছিল তা হল 'ক্যাম্বে'। মক্কা থেকে যার দূরত্ব দশ মাইল। ভাস্কোর নৌবহর তাকে পিছনে ফেলে এসে ভিড়ল পরবর্তী বন্দর গোয়াতে। কিছুদিন সেখানে কাটিয়ে অ্যাডমিরালের নৌবহর চলল এক ছোট্ট দ্বীপ, অ্যাঙ্গেডিভার দিকে। সেখান থেকে সংগ্রহ করা গেল চন্দনকাঠ আর পানীয় জল। এখানে অবশ্য দুর্যোগ নেমে এসেছিল তাঁর নৌবহরে। স্কার্ভি রোগে আক্রান্ত হয়ে ক'দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল এক-তৃতীয়াংশ নাবিক। সমুদ্র অভিযানে এমন অবশ্য হতেই পারে। সপ্তাহ দুই বাদে এখানেই এসে ভাস্কোর নৌবহরের সঙ্গে মিলিত হল এস্টাভাও-এর তৃতীয় নৌবহর। তিনভাগে বিভক্ত করা হল সম্মিলিত নৌবহরকে। মূল নৌবহরটি ভাস্কোর নেতৃত্বে দশটি বড় জাহাজ নিয়ে। দ্বিতীয় নৌবহরটিতে জাহাজের সংখ্যা পাঁচ। যার নেতৃত্বে ভাস্কোর কাকা ভিনসেন্ট সোদ্রে। আর তৃতীয় দলে নবাগত এস্টাভাও গামার নেতৃত্বে আরও পাঁচটি জাহাজ। সম্মিলিতশক্তি নিয়ে অ্যাডমিরাল এবার এগোলেন কান্নানোরের দিকে।

আর সাদা পালতোলা 'মেরি' নামের হতভাগ্য জাহাজটা? পশ্চিমদিক থেকে সে ফিরে আসছিল কালিকটে। খোজা কাশিমের ভাইয়ের জাহাজ। মক্কা থেকে তারা ফিরে আসছিল কিছু 'পুণ্য' নিয়ে আর কিছু পণ্য নিয়ে। তীর্থযাত্রীদের এ-জাহাজে যাত্রীসংখ্যা ছিল তিনশো আশি জন। যার অধিকাংশই বৃদ্ধ, নারী ও শিশু। 'নিয়তি কে ন বধ্যতে।' ঘরে ফেরা হল না তাদের। মাঝসমুদ্রে তারা মুখোমুখি হয়ে গেল ভাস্কোর নৌবহরের। একলা হরিণশিশুকে যেমন চারপাশ থেকে হায়নার দল ঘিরে ধরে, তেমনই সাদা পালতোলা ছোট্ট জাহাজটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল ভাস্কোর জাহাজগুলো। খোলের গায়ের গর্তগুলোর আবরণ খসে গেল, আর তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল মেরির দিকে তাক করা সার সার কামানের মুখ।

লড়াইয়ের কোনও প্রশ্নই ছিল না। মেরি কোনও রণপোত নয়। শান্ত-নিরীহ-ধর্মপ্রাণ মানুষদের জাহাজ। সে-জাহাজে সংকেত-কামান অবশ্য একটা ছিল, তবে তা নৌ যুদ্ধের জন্য নয়। সমুদ্রঝড়ে জাহাজ ডুবে যাবার উপক্রম হলে অন্য জাহাজকে সংকেত পাঠাবার জন্যই বসানো হয়েছিল সে-কামান। 'মেরি' আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল এই বিশাল নৌবহরের কাছে। ভাস্কোর জাহাজে বেশ কয়েকজন কুখ্যাত খুনে ছিল। ভাস্কো তাদের চেয়ে এনেছিলেন সম্রাট ম্যানুয়েলের কারাগার থেকে। সম্রাট সেই খুনের দলকে মুক্তি দিয়েছিলেন এই শর্তে যে, তারা ভাস্কোর অভিযানে অংশ নেবে এবং ভাস্কোর যাবতীয় নির্দেশ পালন করবে নির্দ্বিধায়। লোকগুলোও সম্মত হয়েছিল সম্রাটের শর্তে। অচেনা, অজানা কোনও দ্বীপ দেখতে পেলে সেখানে কোনও বিপদ আছে কিনা তা পরখ করার জন্য জাহাজ ভিড়াবার আগে এ-লোকগুলোকে সেখানে পাঠাত ভাস্কো। অথবা কোনও অপরিচিত জাহাজে এদেরই পাঠানো হয় তদন্ত করে আসার জন্য। কারণ, এ-লোকগুলো মারা গেলে সম্রাট বা ভাস্কোর কারোরই কিছু যায় আসবে না। ভাস্কো সে দলটাকেই 'মেরি'-তে পাঠালেন। সমর্থ হজযাত্রীরা দাঁড়িয়েছিল জাহাজের ডেকে। খুনে পর্তুগিজরা জাহাজে উঠেই তাদের প্রশ্ন করল 'সোনা কোথায় আছে বল? মেরির ক্যাপ্টেন বা নাখোদা উত্তর দিল, জিনিসপত্র কিছু আছে বটে, কিন্তু ওসব দামি জিনিস সোনা বা জহরত নেই।'

'মিথ্যে কথা!' চিৎকার করে উঠল পর্তুগিজ। আর তারপরই সে তলোয়ার বিঁধিয়ে দিল দু-জনের বুকে। এরপর আরও একটা কাজ করল হিংস্র পর্তুগিজরা। মেরির প্রধান মাস্তুলের গায়ে সমুদ্রের সমান্তরাল যে দণ্ডগুলোতে পাল গোটানো থাকে তেমনই এক দণ্ডের দুপাশে পায়ে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হল নিহত দুজনের দেহ। বাতাসে তাদের ঝুলন্ত দেহ থেকে রক্তের ছিটে এসে লাগতে লাগল ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা হতভম্ব, আতঙ্কিত হজযাত্রীদের শুভ্র বসনে।

এ-নৃশংসতা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না 'মেরি'র যাত্রীরা। অস্ত্র যা ছিল, পুরুষদের হাতে-কানে-গলায় যা অলঙ্কার ছিল তা তুলে দেওয়া হল পর্তুগিজদের হাতে। ভাস্কোর নাম ইতিপূর্বে শুনেছে মেরিতে থাকা কয়েকজন লোক। ইতিপূর্বে আর একবার এ দেশে এসেছিলেন এই ভাস্কো। ভারতের সমুদ্রবন্দরে কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য-লেনদেনও করেছিলেন। সেই সূত্রে ভাস্কোর নামটা কেউ কেউ শুনেছে। তবে তারা ভাস্কোকে এতদিন সাগরপারের বণিক বলেই জানত। এ ভাস্কোকে তাদের জানা ছিল না!

হয়তো বা ভাস্কো নিজেই চিনতেন না এই ভাস্কোকে!

ভাস্কোর লোকগুলো এরপর তল্লাসি নিল মেরির। সোনা না পেলেও খোল ভর্তি প্রচুর জিনিস আছে জাহাজে। মেরি থেকে ফিরে লোকগুলো সেখবর দিল ভাস্কোকে। অ্যাডমিরাল নির্দেশ দিলেন, 'সব মাল লুটে নাও।'

ছোট ছোট নৌকা নামানো হল অ্যাডমিরালের জাহাজগুলো থেকে। মেরিতে গিয়ে মাল নামানোর কাজ শুরু করল তারা। সূর্য ডুবল এক সময়। তারপর রাত কেটে গিয়ে একসময় ভোরও হল। বিষণ্ণ এক ভোর। আবারও শুরু হল মাল নামানোর কাজ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তাপে পচতে শুরু করল ঝুলন্ত মৃতদেহগুলো। বাসী মড়ার গন্ধে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। আর সেই গন্ধেই মনে হয় কোথা থেকে উড়ে এল একদল চিল। ঝুলন্ত মৃতদেহদুটো নখ দিয়ে আঁকড়ে ধরে তারা ঠুকরে খেতে শুরু করল। ভাস্কোর নাবিকরা তা দেখে উৎফুল্ল ভাবে নিজেদের মধ্যে বাজি ধরতে লাগল, চিলের দল কোন মৃতদেহটা আগে শেষ করে তা নিয়ে। আর মেরির যাত্রীরা কেঁপে উঠতে লাগল, সে-দৃশ্য দেখে। এ দিনটাও কেটে গেল এক সময়। সূর্য ডোবার আগেই চিলের দল শেষ করে দিল দেহদুটো। তবে তারা ফিরে গেল না। নানা জাহাজের মাস্তুলে বসে তারা প্রতীক্ষা করতে লাগল পরদিন ভোরের জন্য। যেন তারা বুঝতে পেরছিল, আরও খাবার, আরও খাবার অপেক্ষা করে আছে তাদের জন্য।

তৃতীয় দিন সকাল বেলা কিছু সময়ের মধ্যেই যাবতীয় মাল তোলা হয়ে গেল ভাস্কোর নৌবহরে। একজন নাবিক অ্যাডমিরালকে জানাল 'খালি হয়ে গেছে মেরির খোল।'

ভাস্কো জানতে চাইলেন, 'আর কিছুই কি নেই?'

মেরিফেরত নাবিকরা বলল—ডেকের নীচে 'দাবোসা' অর্থাৎ যে কেবিনে নারীরা আছে তাদের দেহে কিছু অলঙ্কার থাকতে পারে'।

অ্যাডমিরাল বললেন 'সেগুলোও লুঠে নিতে হবে। একটা বড় দল নিয়ে শেষ একবার অনুসন্ধান চালাও মেরির আনাচে-কানাচে। হয়তো মূরগুলো তাদের সোনা জাহাজের কোনও গোপন জায়গাতে লুকিয়ে রেখে থাকতে পারে।'

এ কাজের দায়িত্ব বর্তাল ভিনসেন্ট সোদ্রের ওপর। তার নৌবহরের বেশ কয়েকটা জাহাজ মেরির গা ঘেঁষে দাঁড়াল। জাহাজগুলো থেকে কাঠের পাটাতন ফেলা হল মেরিতে। সোদ্রের নেতৃত্বে হিংস্র নেকড়েপালের মতো দুর্বার হার্মাদের দল ঝাঁপিয়ে পড়ল মেরির ওপর। যেখানে যা আছে তছনছ করতে শুরু করল তারা। হার্মাদদের উল্লাস আর আতঙ্কিত রমণীদের ক্রন্দন ধ্বনিতে নারকীয় পরিবেশ সৃষ্টি হল চারপাশে। হার্মাদদের একটা দল কুঠার দিয়ে সোনা লুকিয়ে রাখার সম্ভাব্য স্থান গুলো ভাঙতে লাগল। আর একদল সোজা ছুটল মেরির নারী ও শিশুরা যেখানে আছে সেদিকে।

সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে আয়েষা। কালিকটের সম্ভ্রান্ত মণিকার হারুণ যখন তাকে এক দূরে...বন্দর থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল তখন মেয়েটার বয়স মাত্র কয়েক মাস। তাকে কেউ ফেলে গেছিল নদীর ধারে। শিশুর জন্মপরিচয় জানা ছিল না হারুণের। সে যা কিছু হতে পারে, মুসলিম হতে পারে এমনকী বৌদ্ধও হতে পারে। ও-তল্লাটে বেশ কিছু বৌদ্ধও আছে। যাই হোক, হারুণ তাকে তুলে নিয়েছিল তার নৌকোয়। তারপর থেকে মেয়েটাকে পিতৃস্নেহে মানুষ করেছে হারুণ। আব্বু হজ করতে যাবে শুনে তার সঙ্গে যাবে বলে বায়না ধরেছিল আয়েষা। আব্বু কথা ফেলতে পারেনি একরত্তি মেয়ের। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল তাকে। গত দু-দিন ধরে জাহাজের দাবোসাতে বন্দি হয়ে আছে মেয়েটা। অন্য নারীদের কাছে বারবার সে জানতে চেয়েছে তার আব্বু কোথায় গেছে? কেউ তাকে জানায়নি যে জাহাজে ওঠার পরই হার্মাদের দল তার আব্বুর দেহটা ঝুলিয়ে দিয়েছে মেরির মাস্তুলে। বয়স্কা নারীরা কেউ-কেউ 'মুকাল্লা ফিল বাহর'—সমুদ্রর রক্ষাকর্তা—খোজা খিজিরের নাম জপছে আতঙ্কে। কেউ কেউ অবশ্য বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছে। মক্কার উপকণ্ঠে যে মেলা হয় সেখান থেকে আয়েষার খেলার জন্য একটা বাঁদর জাতীয় প্রাণী কিনেছে আব্বু। একটা বড় কাঠের খাঁচার মধ্যে সেটা রাখা। সারাক্ষণ ধরে প্রাণীটা খাঁচার মধ্যে লাফালাফি করে, আয়েষার সঙ্গে খেলা করে, সে-প্রাণীটাও যেন যেন কোন অজানা আতঙ্কে জড়সড় হয়ে বসে আছে খাঁচার অন্ধকার কোনে।

খাঁচাটার সামনে বসে ব্যাপারটা কি ঘটছে তা বোঝার চেষ্টা করছিল আয়েষা। নানারকম চিৎকার ভেসে আসছে বাইরে থেকে। হার্মাদদের পৈশাচিক চিৎকার, মেরির লোকজনের আর্তনাদ, জিনিসপত্র ফেলার শব্দ! মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে জাহাজটা। জাহাজের ডেক থেকে যে ঢালু পাটাতনটা সোজা এসে নেমেছে আয়েষারা দাবোসার যেখানে আছে সেখানে, সেই পাটাতন দিয়ে হঠাৎ কী একটা গড়িয়ে এসে নামল নারীর দল যেখানে বসে ছিল তাদের সামনে। আর সেটা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই নারীর দল প্রচণ্ড আতঙ্কে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করতে শুরু করল। একটা কাটা মুন্ডু। হতভাগ্য লোকটা খোলের বাইরে দাঁড়িয়ে শেষ একবার বাধা দেবার চেষ্টা করছিল, যাতে পর্তুগিজরা জেনেনাদের কাছে না পৌঁছোতে পারে সেজন্য। তার কাটা মাথাটা পাটাতন বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই ঢাল বেয়ে নেমে এল হার্মাদরা। মুহূর্তের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর পরিবেশের সৃষ্টি হল। তারা যে শুধু নারীদের অলঙ্কার খুলে নিতে লাগল তাই নয়, কেউ কেউ আবার তাদের পোশাক ছিঁড়ে পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নিয়ে যেতে লাগল—দাবোসার কোণে—। সেখান থেকে ভেসে আসতে লাগল অসহায় নারীদের যন্ত্রণাকাতর গোঙানির শব্দ।

কাঠের খাঁচাটার সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল আয়েষা। দানবের মতো চেহারার লাল দাড়িওলা একজন পর্তুগিজ তাকে দেখে এগিয়ে এল। এক ঝটকায় সেই হার্মাদ আয়েষার গলা থেকে ছিঁড়ে নিল তার আব্বুর দেওয়া সোনার লকেটটা। তবে সম্ভোগের পক্ষে এ মেয়েটা নেহাতই ছোট বলে মনে হল সেই হার্মাদের। কাছেই পলায়মান এক যুবতীকে দেখতে পেয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। কার পায়ের লাথি খেয়ে যেন সেই কাটা-মাথাটা ছিটকে পড়ল আয়েষার সামনে। এবার আর তার সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হল না। প্রচণ্ড আতঙ্কে আয়েষা প্রাণ বাঁচাবার জন্য কাঠের খাঁচার দরজাটা খুলে হামাগুড়ি দিয়ে তার ভিতর ঢুকে পড়ল। খাঁচার ভিতরে থাকা প্রাণীটাও তাকে দেখে জড়িয়ে ধরল। তারা দুজনেই কাঁপতে থাকল খাঁচার ভিতর বসে।

এক সময় কাজ শেষ হল হার্মাদদের। এবার তারা নিজেদের জাহাজে ফিরবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎই যেন রুখে দাঁড়াল মূরেরা। জাহাজের অনেক পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি অনেক কিছুই এ-দুদিন ধরে সহ্য করছিল তারা। কিন্তু জাহাজের খোলে ঢুকে যেভাবে পর্তুগিজরা অত্যাচার চালাল, তাদের পাশবিক কামতৃষ্ণা চরিতার্থ করল, দ্বাদশ বর্ষীয় কন্যা থেকে আশি বছরের বৃদ্ধা কাউকেই মুক্তি দিল না—এ ব্যাপারটা আর সহ্য করতে পারল না মেরির জীবিত পুরুষরা। হাতের কাছে যে যা পেল তা দিয়ে হঠাৎ তারা আক্রমণ করে বসল হার্মাদদের। এ ঘটনাতে হতচকিত হয়ে গেল পর্তুগিজরা। হার্মাদদের দেহগুলো ছিটকে পড়তে লাগল জলে। সোদ্রে কোনও রকমে পাটাতন টপকে নিজের জাহাজে পৌঁছোলেন। তারপর সেখান থেকে মেরির ডেকে ছোড়া হতে লাগল তেলে-ভেজানো জ্বলন্ত কাপড়ের খণ্ড আর বন্দুকের গুলি। আরবরা সেই জ্বলন্ত কাপড় কাঠের টুকরোগুলো তুলে নিয়ে পাল্টা ছুঁড়ে দিতে লাগল পর্তুগিজদের জাহাজগুলোতে। ভাস্কো এর আগে কোনওদিন এমন মরণপণ প্রতিরোধ দেখেননি। তাঁর নিজের জাহাজগুলোতেই আগুন ধরে যাবার উপক্রম হল। আর নাবিকদের অনেকেই আর ফিরল না মেরি থেকে। অনেক কষ্টে পর্তুগিজরা তাদের জাহাজগুলোকে মেরির কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে এনে একপাশে সার বেঁধে দাঁড় করাল। মেরির ডেকে যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মূরও জীবিত থাকল ততক্ষণ সে লড়ে গেল অন্যায়ের প্রতিশোধ নেবার জন্য।

বিকাল হয়ে গেছে। দিনের শেষ আলো এসে পড়েছে মেরির ক্ষতবিক্ষত দেহে। ডেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে অসংখ্য লাশ। মূরদের, হার্মাদদেরও। তবে তখনও কিছু মানুষ জীবিত ছিল সেই অভিশপ্ত জাহাজের বুকে। সেই ধর্ষিতা নারীর দল আর কিছু শিশু। বাঁচবার জন্য শেষ একটা চেষ্টা করল তারা। জাহাজের অন্ধকার খোল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে তারা এসে প্রথমে সার বেঁধে দাঁড়াল জাহাজের ডেকে। হ্যাঁ, তাদের মধ্যে একজনও সমর্থ পুরুষ নেই, সবাই নারী এবং শিশু। চারপাশে ছড়ানো প্রিয়জনদের অসংখ্য মৃতদেহের মধ্যে দাঁড়িয়ে অস্তাচলগামী সূর্যের আলোতে ভাস্কোর জাহাজের উদ্দেশ্যে নতজানু হয়ে তারা একসঙ্গে জীবনভিক্ষা চাইল—'দোহাই তোমাদের, আমাদের যেখানে খুশি নিয়ে যাও, যা ইচ্ছা করো, শুধু প্রাণে মেরো না...।'

যে সব নারীর কোলে একদম ছোট শিশু ছিল তারা ভাস্কোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য শিশু গুলোকে দু-হাতে মাথার ওপর তুলে ধরল। ভাস্কোও নিশ্চিতভাবেই দেখতে পেলেন তাদের। কিন্তু সেই মুহূর্তে ভাস্কো যেন অভিযাত্রী ভাস্কো নয়, এখন তিনি পরিণত হয়েছেন জলচারী এটিলায়। হুন সম্রাট এটিলার ঘোড়া যেখানে এসে দাঁড়াত সেখানে তার নৃশংসতার আতঙ্কে নাকি পায়ের তলার ঘামও তৎক্ষণাৎ শুকিয়ে হলদে হয়ে যেত। ঠিক তেমনই কি সেই মুহূর্তে ভাস্কোর জাহাজ যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানকার জলতল আতঙ্কে নীচে নেমে গেছিল! ভাস্কোর মন থেকে যেন খসে পড়ল ইওরোপের সভ্যতার যাবতীয় আবরণ। পর্যটক ভাস্কো নয়, অ্যাডমিরাল ভাস্কো নয়, খ্রিস্ট্রের অনুগত ভাস্কো নয়, এ যেন পৃথিবীর ইতিহাসে এক নৃশংসতম মানুষ স্বয়ং এটিলা, চেঙ্গিজও যেন তাঁর সামনে ঠিক এই মুহূর্তে নতজানু হতেন তার বীভৎসতা দেখে।

পাশে দাঁড়ানো এক নাবিকের হাত থেকে বন্দুক নিলেন ভাস্কো। তারপর তা তাগ করলেন মেরির ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা এক রমণীর মাথার ওপর তুলে ধরা শিশুটাকে লক্ষ্য করে। অব্যর্থ লক্ষ অ্যাডমিরালের। হাতের বন্দুকের ধূমউদগিরণের সঙ্গে সঙ্গে সেই শিশু ছিটকে পড়ল সমুদ্রের জলে। সঙ্গে সঙ্গে শিশুর মাও ঝাঁপ দিল জলে। তার আর্তচিৎকার হারিয়ে গেল হার্মাদদের উল্লাসে। এরপর একের পর এক বারুদ ঠাসা বন্দুক ভাস্কোর হাতে তুলে দিতে থাকল তাঁর সঙ্গীরা। ভাস্কোও একের পর এক লক্ষ্য ভেদ করে চললেন। এ যেন নিশানাবাজি খেলা দেখাচ্ছেন অ্যাডমিরাল। একটার পর একটা শিশু ছিটকে পড়ছে জলে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে জান্তব উল্লাসে মেতে উঠল পর্তুগিজরা। মেরির ডেকে দাঁড়ান-মায়েরা কিন্তু শেষ শিশুটাকে পর্যন্ত মাথার ওপর তুলে ধরে রেখেছিল। কারণ, যদি শেষ মুহূর্তে তাকে দেখে থেমে যান ভাস্কো, যদি সামান্য দয়া জেগে ওঠে ভাস্কোর মনে, যদি তিনি শেষ পর্যন্ত প্রাণ ভিক্ষা দেন তাদের। কিন্তু তেমন কিছু হল না। ভাস্কো এখন পরিণত হয়েছেন সমুদ্র-পিশাচে। শেষ শিশুটাকেও গুলিবিদ্ধ করার পর ভাস্কো নির্দেশ দিলেন, 'গোলা দাগো। আগুন লাগিয়ে ডুবিয়ে দাও মেরিকে। কাউকে বাঁচতে দেব না।'

গোলন্দাজরা আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে ছিল। কামানের পিছনের ছিদ্রে জ্বলন্ত মশাল গুঁজে দিল তারা। মুহুর্মুহু আগুনের গোলা আছড়ে পড়তে লাগল মেরির ওপর। প্রথমে তার পালে আগুন লাগল, তারপর তা ছড়িয়ে পড়ল ডেকে, তারপর প্রাণভিক্ষা-চাওয়া সেই হতভাগ্য নারীদের গায়ে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে তারা ছোটাছুটি করতে লাগল ডেকে। কেউ কেউ আগুনের হাত থেকে বাঁচার জন্য ঝাঁপ দিল সমুদ্রের বুকে। মুহূর্তের মধ্যে সমুদ্রর অতল জলরাশি গ্রাস করে নিল তাদের। মেরির লেলিহান অগ্নিশিখা আর বিদায়ী সূর্যের লাল আলো মিলে মিশে একাকার হয়ে যেতে লাগল। ভাস্কো আর তার সঙ্গীরা নিজেদের জাহাজ থেকে উপভোগ করতে লাগল সেই নারকীয় দৃশ্য।

মেরির সারা দেহে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। তার উত্তাপে টগবগ করে ফুঁটতে শুরু করেছে মেরির চারপাশের সমুদ্রের জল। এবার ডুববে জাহাজটা। অতবড় একটা জিনিস জলে ডুবলে যে জলোচ্ছ্বাস হয়ে তা থেকে বাঁচার জন্য পর্তুগিজরা তাদের জাহাজগুলো আরও কিছুটা তফাতে সরিয়ে আনল। সত্যিই এর কিছুক্ষণের মধ্যে একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হল। আকাশের দিকে ছিটকে উঠল মেরির দেহের জ্বলন্ত অংশগুলো। তারপরই প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রর অতলে তলিয়ে গেল মেরি। সূর্যও প্রায় তার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ লুকালো সমুদ্রর গভীরে। ভাস্কোর নৌবহরগুলোতে একটার পর একটা বাতি জ্বলে উঠল। অন্য জাহাজগুলো থেকে ভাস্কোর অভিজাত সঙ্গীরা এসে উপস্থিত হল ভাস্কোর জাহাজে। অ্যাডমিরালের নির্দেশে লাল গালিচা পাতা-কক্ষে ঝাড়বাতির নীচে সুরাপাত্র নিয়ে বিজয় উৎসবে মেতে উঠল তারা। ডেকে রাখা মদের পিপেগুলোও খোলা হল সাধারণ নাবিকদের জন্য। মাঝরাত পর্যন্ত চলল নাবিকদের হইহুল্লোড় মাতলামি। ভাস্কো সিদ্ধান্ত নিলেন পরদিন তার নৌবহরের মুখ ফেরাবেন কান্নোনর বন্দরের উদ্দেশ্যে।

সুন্দর সকাল। সমুদ্রের জলে ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথায় খেলা করছে প্রভাতি সূর্যকিরণ। মাথার ওপর নীল আকাশের চাঁদোয়া, মনোরম বাতাসও বইছে। সে বাতাসে পাল খাটিয়ে ভেসে চলেছে ময়ূরপঙ্খি নাও 'মৃচ্ছকটিক'। নাও বা নৌকো না বলে ওকে জাহাজ বলাই ভালো। নানা রঙের পাল আর একাধিক মাস্তুলশোভিত এ-তরীকে সমুদ্র অভিযাত্রীরা অনেকেই চেনে ও জানে। অনেক দূর থেকেই দেখা যায় এই ময়ূরপঙ্খির সম্মুখভাগে বসানো সোনালি গিল্টি করা ময়ূরের অনেক উঁচু লম্বা গ্রীবাটাকে। তা দেখেই অন্য জাহাজের নাবিকরা এ-জাহাজকে চিনতে পারে। তাকে দেখে ডেকে দাঁড়িয়ে উল্লাস ধ্বনি করে ওঠে 'মৃচ্ছকটিক'! মৃচ্ছকটিক!' বলে। নেচে ওঠে ঘর ছাড়া নাবিকদের মনপ্রাণ। বিশেষত যে সব নাবিকরা দীর্ঘকাল ধরে সমুদ্রযাত্রা করে আসছে সেই সব ইংরেজ ওলন্দাজ পর্তুগিজ নাবিকদের এ জাহাজ দেখলে উল্লাসের সীমা থাকে না। ভাস্কোরও এদেশে আসার পথেও একবার সাক্ষাৎ হয়েছিল মৃচ্ছকটিকের সঙ্গে। ফলশ্রুতি হিসাবে ভাস্কোর যাত্রা দু-দিনের জন্য থমকে গেছিল। না, ভাস্কোর রণপোত মৃচ্ছকটিককে আক্রমণ করেনি, কোনও জাহাজই তা করে না। কারণ এই ঘরছাড়া নাবিকদের দেহের তৃষ্ণা মেটায় এই মৃচ্ছকটিক। আরও এমন কাজে অবশ্য সমুদ্রের ঘুরে বেড়ায় আরবের 'জেবউন্নিসা', জেপাং দ্বীপের বোয়ে; শ্বেতাঙ্গ ইংরেজদের 'কুইন্সি'...কিন্তু জাহাজিরা বলে তাদের চোখে সেরা এই ময়ূরপঙ্খী জাহাজ 'মৃচ্ছকটিক।' কত ধরনের কত দেশের পণ্য আছে জাহাজে। ভারত, সিংহল, জেপাং...আরব থেকে শুরু করে আফ্রিকা এমনকী ইউরোপেরও। তাই যে-কোনও দেশের নাবিক তার পছন্দমতো পণ্য বেছে নিতে পাবে মৃচ্ছকটিক থেকে। হ্যাঁ, নারী তো পণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। ভোগ্যপণ্য। নানা দেশের নানা জাতের নানা বয়সি প্রায় চারশোজন নারী আছে এ জাহাজে। সমুদ্রর বুকে ভাসমান গণিকালয় মৃচ্ছকটিক।

সমুদ্রর বুকে নারীদেহের এ-ব্যবসা মোটেই নতুন নয়। খ্রিস্ট জন্মের অনেক আগে থেকেই এ ব্যবসা চালু ছিল সমুদ্রপথে। এদেশে মৌর্যযুগে যখন বাণিজ্যতরী ভেসে যেত মশলা, রেশমবস্ত্র, হীরক খণ্ড নিয়ে মিশরে অথবা ভারতীয় বাঘ নিয়ে রোমের উদ্দেশ্যে ঠিক সেই সময় থেকেই শুরু হয় জলপথে ভ্রাম্যমান বেশ্যালয়ের এই ব্যবসা। বৈশালী নগরীতে বিশাল গণিকালয় ছিল। সেখান থেকে গণিকাদের সংগ্রহ করে গঙ্গাবক্ষ হয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়ত দেহব্যবসায়ী বণিকের দল। আজও চলে আসছে সে ব্যবসা। সমুদ্রপথেই এখন প্রধান বাণিজ্য হয়। সাগরপার থেকে আসা শুরু করেছে ইংরেজ-ওলোন্দাজ —পতুগির্জ বণিকের দল। তাছাড়া ভারতীয়, আরবীয়, মিশরীয় বণিকের দল তো আছেই। বড় বড় বন্দরগুলোতে নাবিকদের মনোরঞ্জনের জন্য গণিকালয় আছে ঠিকই, কিন্তু যেসব জাহাজ দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে অথবা ইচ্ছা থাকলেও নানা কারণবশত বন্দরে ভিড়তে পারে না তাদের নাবিকদের কাছে মৃচ্ছকটিকের মতো ভ্রাম্যমান বেশ্যালয় এগিয়ে আসে বলেই ভরসা। এ ধরনের জাহাজগুলোকে দেখলেই এগিয়ে আসে নাবিকদের নিয়ে। এক বা দু-দিন মাঝসমুদ্রে নোঙর ফেলে মৃচ্ছকটিকের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে জাহাজগুলো। তারপর দেহকে তৃপ্ত করে আবার রওনা হয় গন্তব্যে। নাবিকদের নিয়ে জাহাজ সওদাগরি জাহাজ হতে পারে, নতুন দেশের খোঁজে বেরোনো ইউরোপীয়দের জাহাজ হতে পারে, এমনকী জলদস্যুদের জাহাজও হতে পারে। ব্যবসায়ীর কাছে ক্রেতার কোনও জাতবিচার হয় না। সবারই মনোরঞ্জন করে মৃচ্ছকটিক। কখনও কখনও অবশ্য মৃচ্ছকটিকও ক্রেতার ভূমিকা পালন করে। যখন কোনও জলদস্যু জাহাজে কোনও সুন্দরী নারীর সন্ধান মেলে অথবা উপকূলবর্তী কোনও বাজারে বা দাসের হাটে খোঁজ পাওয়া যায় ক্রীতদাসীদের, তখন তাদের উপযুক্ত কাঞ্চনমূল্যের বিনিময়ে সংগ্রহ করে মৃচ্ছকটিক। অভিজ্ঞ গণিকারা নবাগতাদের ঝাড়াইবাছাই করে তালিম দিয়ে জাহাজি খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের উপযোগী করে তোলে।

মৃচ্ছকটিকের মালিকের নাম স্বয়ম্ভুনাথ। কালিকটের বাসিন্দা তিনি। কালিকটেও তাঁর একটা স্থায়ী গণিকালয় আছে, বন্দরসংলগ্ন এলাকায়। বছরে আটমাস স্বয়ম্ভুনাথ মৃচ্ছকটিককে নিয়ে ভেসে বেড়ান সাগরে। আর বাকি চারমাস থাকেন কালিকটে। প্রায় আটমাস আগে তার প্রমোদতরীকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন স্বয়ম্ভুনাথ। প্রথমে ভারত মহাসাগর হয়ে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন আফ্রিকায়। এই যাত্রাপথে বেশ বড় গোটা দশেক বাণিজ্যপোতকে খদ্দের হিসাবে পাওয়া গেছিল। লাভও হয়েছে প্রচুর। আফ্রিকায় পৌঁছে মোম্বাসা বন্দরে নোঙর করেছিলেন তিনি। প্রাচীন বন্দর মোম্বাসা। সেখানে বেশ বড় কয়েকটা বেশ্যালয় আছে। নারীদের বেচা-কেনার ব্যবস্থাও আছে সেখানে। মোম্বাসার গণিকালয় থেকে একদল কৃষ্ণাঙ্গ সুন্দরীকে কিনেছেন তিনি। মোম্বাসা বন্দর ছেড়ে মাসতিনেক ভূমধ্যসাগরে ঘোরাফেরা। অন্যবারের চেয়ে অনেক বেশি খদ্দের পাওয়া গেছে এবার। বিশেষত, শেতাঙ্গদের বহু জাহাজ এসে লেগেছিল মৃচ্ছকটিকের গায়ে। সেখান থেকে সোজা ঘরে ফেরার পথ ধরবেন বলে ঠিক করেছিলেন স্বয়ম্ভুনাথ। কিন্তু ফেরার পথে তার দেখা হয়ে গেল ভাস্কোর নৌবহরের সঙ্গে। বাণিজ্য তো হলই, তার সঙ্গে সঙ্গে অন্য একটা কাজের বরাতও পেলেন স্বয়ম্ভুনাথ। ইদানীং পর্তুগিজরা বেশ বড় ডেরা বানিয়েছে কালিকট বন্দরে ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে। ক্রমশ শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের। বছরখানেক আগে ভাস্কো নামের অ্যাডমিরালটা একবার এসেছিল এ দেশে। কিন্তু এবার ভাস্কোর নৌবহর দেখে বহুদর্শী স্বয়ম্ভুনাথের মনে হয়েছে লোকটা এবার শুধু এদেশে গোলমরিচ আর মশলা সংগ্রহ করতে আসেনি। তার সঙ্গে সঙ্গে অন্য কোন উদ্দেশ্যও আছে। ভাস্কোর এক জাহাজের ক্যাপ্টেন নাকি মৃচ্ছকটিকের সমুদ্রসুন্দরীকে বলেছে যে, সম্রাট নাকি অ্যাডমিরালকে এ নির্দেশ দিয়ে এদেশে পাঠিয়েছেন যে, যেভাবেই হোক কালিকটের শাসনকর্তা সামোরিনের থেকে দখলই করে নেবেন বন্দরটা। এসব অবশ্য ভবিষ্যতের ব্যাপার। কিন্তু আপাতত পর্তুগিজ অ্যাডমিরাল তাঁকে বরাত দিয়েছিলেন কিছু জেপাং নারী সংগ্রহ করে দেবার জন্য। কোন অজানা কারণে জেপাং নারীদের সম্ভোগ করতে ভালোবাসে পতুর্গিজরা। দীর্ঘাঙ্গী আফ্রিকান বা আরব নারী নয়, বিম্বস্তন সিংহলী অথবা গুরু নিতম্বের ভারতীয় নারী নয়, পতুর্গিজদের প্রথম পছন্দ ছোটখাট চেহারার জেপাং দেশের রমনীরা। তাদের সংগ্রহ করার জন্য স্বয়ম্ভুনাথকে যেতে হয়েছিল জেপাং দ্বীপে। ও দেশটাকে অনেকে ডাকে 'সূর্যোদয়ের দেশ' বলে। জেপাং দ্বীপ থেকে একডজন নারীকে সংগ্রহ করা হয়েছে। কালিকটে ফিরে ভাস্কোর লোকেদের কাছে হাতবদল হবে তারা। জেপাং দ্বীপের কাজ সেরে এবারের মতো তখন মৃচ্ছকটিকের ঘরে ফেরার পালা।

ঢেউয়ের তালে তালে মৃদুমৃদু ওঠা নামা করতে করতে শান্তভাবে এগিয়ে চলেছে স্বয়ম্ভুনাথের ময়ূরপঙ্খি। প্রভাতি সূর্যের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে জাহাজের সমুখভাগে ময়ূরের দীর্ঘ সোনালি গ্রীবাটা। সেটা ধরেই যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ম্ভুনাথ। বাতাসে উড়ছে তার সাদা দাড়ি, আলখাল্লার মতো দেখতে শুভ্র রেশমবস্ত্রের প্রান্তদেশ। ডেকে ইতি-উতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাল্লার দল। খোলের ভিতর থেকে জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়িয়েছে একদল সমুদ্রসুন্দরী। মাল্লাদের সঙ্গে মশকরা করছে তারা। সালঙ্কারা সেইসব গণিকাদের পরনে কাঁচুলি আর ঘাঘরা। তাদের বক্ষবিভাজিকায় এসে আটকে যাচ্ছে সকালের আলো। কলহাস্যে মুখরিত পরিবেশ চারপাশে। স্বয়ম্ভুনাথের মনটাও বেশ খুশি। নারীদেহের ভালোই বাণিজ্য হল এবার। এই সুদীর্ঘকাল সমুদ্র ভ্রমণে ঝড় ঝঞ্ঝার মতো কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও পড়তে হয়নি মৃচ্ছকটিককে। শুধুমাত্র দুটো ছোট্ট ঘটনা ছাড়া। একবার আরব বণিকদের একটা জাহাজ এসে লেগেছিল মৃচ্ছকটিকের গায়ে। সে সময় এক আরব বণিকের শয্যাসঙ্গিনী হতে গিয়ে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু হয় এক কিশোরীর। অবশ্য এ-ঘটনার জন্য সেই আরব মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণও দিয়েছে স্বয়ম্ভুনাথকে। আর দ্বিতীয় ঘটনাটা হল অপর এক গণিকার ভয়ঙ্কররকম ছোঁয়াচে যৌন রোগ দেখা দিয়েছিল। অন্য কোনও জাহাজ হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে উত্তাল সমুদ্রে ছুড়ে ফেলা হত—এটাই নিয়ম। কিন্তু স্বয়ম্ভুনাথ মানুষটা ভালো। তিনি অতটা নির্দয় হতে পারেননি সে-নারীর প্রতি। হাজার হোক, তার দেহটাই তো এক সময় বেশ কিছু স্বর্ণমুদ্রার যোগান দিয়েছে। মেয়েটার গাত্রবর্ণ রাঙা বলে ইওরোপীয়রা বেশ পছন্দ করত তাকে। হয়তো তেমনই কোনও মাল্লার থেকে রোগটা বাঁধিয়েছিল সে। যাই হোক, স্বয়ম্ভুনাথের নির্দেশে তাকে একটা ছোট নৌকোয় কিছু খাবার আর জল দিয়ে সমুদ্রে নামিয়ে আসা হয়েছিল। যদি অন্য কোনও জাহাজ তাকে তুলে নেয় অথবা ভাসতে ভাসতে অন্য কোনও দ্বীপে গিয়ে যদি সে পৌঁছোয় তবে আরও কিছু দিনের জন্য বেঁচে গেলেও বেঁচে যেতে পারে সে। এই ছোট্ট দুটো ঘটনা ছাড়া তেমন কোনও দুর্যোগের সাক্ষী হতে হয়নি স্বয়ম্ভুনাথ বা তার ময়ূরপঙ্খি নাওকে।

ময়ুরপঙ্খির সমুখ ভাগে দাঁড়িয়ে সুনীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভুনাথ মনে মনে হিসাব করছিলেন আর ক'দিন সময় লাগতে পারে তার কালিকট বন্দরে পৌঁছোতে। বাতাসের যা গতি তাতে সম্ভবত সেখানে পৌঁছোতে আর তিনদিনমতো সময় লাগবে তার। হঠাৎ প্রধান মাস্তুলের গায়ের থাকে বসে থাকা দিগদর্শী মাল্লা চিৎকার করে বলল, 'কী যেন একটা দেখা যাচ্ছে মনে হয়! এই বলে সে মাথার ওপর থেকে মাস্তুলের গায়ে বসে নাবিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল এক দিকে। অমনি সবাই সেদিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল ব্যাপারটা কী?

দিগদর্শীর চিৎকার কানে গেছিল স্বয়ম্ভুনাথেরও। তিনিও তাকালেন সবাই যেদিকে তাকিয়েছে সেইদিকে। সমুদ্রের বুকে বেশ কিছুটা দূরে একটা কালো বিন্দু যেন ঢেউয়ের তালে ওঠা নামা করছে। কী ওটা?

স্বয়ম্ভুনাথ একজন মাল্লাকে তাঁর কক্ষ থেকে কাচ লাগানো সেই দূরদৃষ্টি-যন্ত্রটা আনতে বললেন। মাল্লা, মালিকের নির্দেশ পালন করে পিতলের তৈরি লম্বা-সরু চোঙাটা নিয়ে এল। জিনিসটা খুব কাজের। দূরের জিনিসকে কাছে টেনে আনে। এক ওলন্দাজ নাবিকের থেকে এ যন্ত্রটা কিনেছেন স্বয়ম্ভুনাথ। যন্ত্রটা তিনি চোখে লাগাতেই সেই কালো বিন্দুটা আরও কাছে এগিয়ে এল। স্বয়ম্ভুনাথের মনে হল, সে জিনিসটা একটা বড় বাক্স মতো কিছু হবে। আর সেটা ঢেউয়ের তালে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে তাদের দিকেই! ওটা কোনও জাহাজের সিন্দুক নয়তো? অনেক সময় জলদস্যুদের আক্রমণের মুখে পড়লে মূল্যবান জিনিস সমেত সিন্দুক জলে ভাসিয়ে দেয় নাবিকরা। যাতে নিহত হলেও তাদের কষ্টার্জিত সম্পদ কিছুতেই জলদস্যুদের হাতে না যায়। আবার অনেক সময় এমনও হয় যে, কোনও জলদস্যু দল হয়তো নামহীন কোন অজানা দ্বীপে সিন্দুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল তাদের সোনা- জহরত-লুন্ঠিত সম্পদ। সাধারণত এভাবেই তারা সিন্দুকে ভরে সম্পদ লুকিয়ে রাখে। অনেক সময় সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয় সেই দ্বীপ। কাঠের সিন্দুক বোঝাই সমুদ্র থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ আবার ফিরিয়ে নেয় সমুদ্র। এমন সিঁন্দুক পেয়ে অনেক জাহাজেরই ভাগ্য খুলে যায়। জিনিসটা তেমন কিছু নয়তো? কথাটা মাথায় আসতেই স্বয়ম্ভুনাথ নির্দেশ দিলেন', জাহাজ থামাও।'

পালের কাছিগুলোতে টান দিতে শুরু করল মাল্লার দল। পালগুলো একে-একে গুটিয়ে গেল মাস্তুলের গায়ে। বাতাস আর ঠেলে নিয়ে যেতে পারল না মৃচ্ছকটিককে। থেমে গিয়ে ঢেউয়ের ধাক্কায় মৃদু মৃদু দুলতে লাগল সে। কাচবসানো নলে চোখ রেখে ভাসমান জিনিসটার দিকে তাকিয়ে রইলেন স্বয়ম্ভুনাথ।

সেটা ময়ূরপঙ্খির কাছাকাছি পৌঁছোতেই স্বয়ম্ভুনাথের নির্দেশে একদল লোক মৃচ্ছকটিকের গায়ে ঝোলানো মোটা কাছি বেয়ে নেমে পড়ল সমুদ্রের বুকে। তারপর সাঁতরে গিয়ে জিনিসটাকে ধরল। স্বয়ম্ভুনাথ এবার বুঝতে-পারলেন সেটা সিন্দুক নয়। কাঠের তৈরি খাঁচা-মতো কিছু একটা হবে। তার ওপর-নীচে কাঠের পাটাতন বসানো আছে বলে দূর থেকে জিনিসটাকে সিন্দুক বলে ভ্রম হচ্ছিল। স্বয়ম্ভুনাথ একটু নিরাশ হলেন বটে, কিন্তু জিনিসটা আসলে কী তা ভালো করে বোঝার জন্য হাত নেড়ে-জলে-নামা নাবিকদের নির্দেশ দিলেন জিনিসটাকে ওপরে তোলার জন্য।

কাছি বেঁধে জিনিসটাকে কিছুক্ষণের মধ্যেই ডেকের ওপর তুলে ফেলল মাল্লারা। ডেকে উপস্থিত নাবিকরা সবাই ঘিরে দাঁড়াল জিনিসটাকে। তাদের চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। স্বয়ম্ভুনাথও উপস্থিত হলেন সেখানে। হ্যাঁ, সমুদ্রের বুক থেকে সদ্য তুলে আনা জিনিসটা হল বেশ বড় একটা কাঠের খাঁচা। আর তার ভিতরে দৃষ্টি যেতেই স্বয়ম্ভুনাথও অবাক হয়ে গেলেন। খাঁচার ভিতর রয়েছে সাত-আটবছর বয়সি একটা মেয়ে আর কালো লোমশ বানর জাতীয় একটা প্রাণী!

অন্য নাবিকরা সে-প্রাণীটাকে চিনতে না পারলেও স্বয়ম্ভুনাথ প্রাণীটাকে একবার দেখেছিলেন সুমাত্রাফেরত এক পশু ব্যবসায়ীর জাহাজে। এ খাঁচায় যে প্রাণীটা আছে সে শিশু। বয়সকালে এই প্রাণী প্রায় মানুষের আকৃতির হয়—শিম্পাঞ্জি। বাচ্চা মেয়েটা আর প্রাণীটা পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে খাঁচার মেঝেতে শুয়ে আছে নিশ্চলভাবে। সমুদ্রের জলে দীর্ঘসময় থাকার কারণে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মেয়েটার দেহ। বেশ কিছু মাছও খাঁচার ভিতরে ঢুকে আটকে পড়েছিল। এমন নিস্পন্দভাবে খাঁচার ভিতর দেহদুটো পড়ে আছে যে প্রাথমিক ভাবে তাদের দেখে স্বয়ম্ভুনাথ বুঝতে পারলেন না তারা জীবিত না মৃত। একটা তীব্র আঁশটে গন্ধ নাকে এসে লাগছে! তা কি ওই মরা মাছ থেকেই, নাকি তা আসছে আলিঙ্গনরত মেয়েটা আর প্রাণীটার দেহ থেকে? মরে গেছে তারা?

স্বয়ম্ভুনাথ বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন, কোথা থেকে এই অদ্ভুত খাঁচাটা সমুদ্রের বুকে ভেসে এল? কোনও জাহাজ থেকে কি খাঁচাটাকে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল সমুদ্রের বুকে? সমুদ্রের বুকে জাহাজ থেকে মানুষকে ছুড়ে ফেলে হত্যার ব্যাপারটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই মেয়েটাকে প্রাণীটার সঙ্গে খাঁচা-বন্দি অবস্থায় সমুদ্রে ফেলা হল কেন?

হঠাৎ একজন নাবিক বলে উঠল, 'আরে বাঁদরটা বেঁচে আছে! নড়ছে নড়ছে!'

স্বয়ম্ভুনাথ দেখতে পেলেন সত্যিই প্রাণীটা এবার ঘাড় ফিরিয়ে চোখ পিট পিট করছে! আর এরপরই বাচ্চা মেয়েটার দেহটাও যেন নড়ে উঠল! নাবিকরা তাই দেখে বলে উঠল, 'মেয়েটাও মনে হয় এখনও বেঁচে আছে!'

স্বয়ম্ভুনাথ সঙ্গে সঙ্গে কাছে দাঁড়ানো এক গণিকাকে ডেকে মেয়েটাকে খাঁচার বাইরে বার করতে নির্দেশ দিলেন। মেয়েটাকে বাইরে বার করে কোলে তুলে নিল সেই গণিকা। তার দেহের উষ্ণতা পেয়ে আবারও নড়ে উঠল তার ছোট্ট দেহটা। হ্যাঁ, সত্যি বেঁচে আছে মেয়েটা! স্বয়ম্ভুনাথ বললেন 'ওর শুশ্রূষা করো। জানা দরকার, ও এমনভাবে কোথা থেকে এল?'

স্বয়ম্ভুনাথ মনে মনে ভাবলেন, মেয়েটাকে যদি বাঁচিয়ে তোলা যায় তবে তার লাভ-ই আছে। কোথাও ক্রীতদাসী হিসাবে তাকে বেচে দেওয়া যেতে পারে। কালিকটের অভিজাত পরিবারগুলোতেও এ ধরনের বাচ্চা মেয়ের চাহিদা আছে। আবার এ-মেয়েটাকে পাঁচ-ছ'বছর যদি খাওয়ানো-পরানো যায় তবে তারপর তাকে গণিকাবৃত্তিতে নামানো যাবে।

ডেক সংলগ্ন অনেক ক'টা ঘর আছে, তারই একটাতে মেয়েটাকে নিয়ে গেল গণিকা। তার সারা শরীরে উষ্ণ ঘি মাখিয়ে মালিশ করে, ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা মধু ঢেলে তাকে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা শুরু করল। আরও বেশ কয়েক জন গণিকাও নিয়োজিত হল এ কাজে। ওদিকে ডেকের মাঝখানে রাখা খাঁচার দরজা খোলা পেয়ে বাঁদর গোত্রের সেই প্রাণীটা খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে দড়ি বেয়ে তরতর করে ওপরে উঠে চড়ে বসল মাস্তুলের গায়ে একটা পাটাতনের ওপর। পাল তুলে আবার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ভেসে চলল মৃচ্ছকটিক।

বিকাল নাগাদ, গণিকাদের প্রচেষ্টায় কাজ হল। জ্ঞান ফিরে উঠে বসল মেয়েটা। খবরটা পেয়ে স্বয়ম্ভুনাথ হাজির হলেন সেই কক্ষে। বিস্মিত-ভয়ার্ত চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে মেয়েটা। গালিচার ওপর তাকে ঘিরে বসে আছে গণিকার দল। স্বয়ম্ভুনাথকে দেখেই প্রথমে সে ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল পার্শ্ববর্তী এক গণিকার গলা। সে গণিকা মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে, তার গালে চুমু খেয়ে তার ভয় ভাঙাবার চেষ্টা করতে লাগল। সম্ভবত ব্যাপারটা কাজ দিল। ধীরে-ধীরে মেয়েটা যেন স্বাভাবিক হতে শুরু করল। স্বয়ম্ভুনাথ বেশ অনেককটা ভাষা জানেন তার কাজের সুবাদে। নিজের দেশের বেশ কয়েকটা ভাষা তো জানেনই, এমনকী পর্তুগিজ, ইংরাজি শব্দও কিছুটা বলতে পারেন।

মেয়েটাকে দেখে স্বয়ম্ভুনাথের কেন জানি মনে হল মেয়েটা আরব গোষ্ঠী ভুক্ত হতে পারে। তিনি নরম গলায় বাচ্চা মেয়েটার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন, 'তোমার নাম কী? কোথা থেকে আসছ?'

প্রশ্নটা আয়েষার কানে গেল ঠিকই। প্রশ্নটা সে বুঝতেও পারল কিন্তু কোন জবাব দিতে পারল না সে। কিছুই তার মনে নেই। তার চোখের সামনে শুধু খালি অতল জলরাশি। সেই জলরাশিতে খাঁচাবন্দি অবস্থায় কখনও সে ডুবে যাচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। পরক্ষণেই সে, খাঁচাসমেত আবার ভেসে উঠে ঢেউয়ের দোলায় দুলতে-দুলতে এগিয়ে চলেছে দিকচিহ্নহীন অকূল দরিয়ার পানিতে। তাকে জড়িয়ে ধরে আছে 'রানি'। ওই একজনকেই, একটা নামই মনে আছে তার। নিজের নামও ভুলে গেছে সে। রানির কথা মনে পড়তেই সে চারপাশে তাকিয়ে খুঁজতে লাগল রানিকে।

স্বয়ম্ভুনাথ বেশ কয়েক বার একই প্রশ্ন করলেন মেয়েটাকে। অবশেষে মেয়েটা আরবিতে এক সময় ভয়ে ভয়ে জবাব দিল—

'কিছু মনে পড়ছে না আমার।'

'কিছুই না? নাম-ধাম-কোথা থেকে এলে কিছুই না? জানতে চাইলেন স্বয়ম্ভুনাথ।

'মেয়েটা একটু চুপ করে থেকে বলল—'না, কিছুই মনে পড়ছে না। শুধু রানিকে মনে পড়ছে। রানি কই?'—এই বলে সে চারপাশে তাকিয়ে রানিকে খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল।

'রানিকে? কোন দেশের রানি?' ব্যাগ্রভাবে জানতে চাইলেন স্বয়ম্ভুনাথ।

মেয়েটা জবাব দিল, 'আমার সঙ্গে খাঁচার মধ্যে যে ছিল। সেই বানরটা।'

স্বয়ম্ভুনাথ এবার হেসে ফেললেন। মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে তিনি জবাব দিলেন, 'সে এখন খোশমেজাজে মাস্তুলে বসে নাবিকদের ছুড়ে দেওয়া ফল খাচ্ছে। তা তুমি ওকে কোথায় পেলে? তোমার সঙ্গে ও এল কীভাবে?'

শিম্পাঞ্জিটা নিরাপদে আছে জেনে মেয়েটা একটু আশ্বস্ত হল ঠিকই। কিন্তু সে উত্তর দিল, 'আমার কিছুই মনে নেই।'

যে সমুদ্রবনিতার ওপর স্বয়ম্ভুনাথ মেয়েটার পরিচর্যার ভার দিয়েছিলেন তার নাম ভর্তিকা। তার যৌবন অতিক্রান্ত হতে চলেছে। সাধারণত এখন সে খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের কাজে লাগে না। স্বয়ম্ভুনাথ তাকে মৃচ্ছকটিকে রেখেছেন সদ্য যৌবনা নবাগত গণিকাদের কীভাবে খদ্দেরদের মনোরঞ্জন করতে হয় তার তালিম দেবার জন্য। মেয়েটার জবাব শোনার পর স্বয়ম্ভুনাথ ভর্তিকাকে বললেন, 'ও তো কিছুই মনে করতে পারছে না দেখছি। আপাতত ও তোমার তত্ত্বাবধানেই থাক। কালিকটে ফেরার পর মেয়েটাকে নিয়ে কী করব ভাবা যাবে।'

ভর্তিকা জবাব দিল, 'আচ্ছা প্রভু। আপাতত ওর বিপদের কোনও কারণ দেখছি না, আপনি যেমন চাইবেন তেমনই হবে।'

এ কথা বলার পর ভর্তিকা জানতে চাইল, 'ওর সঙ্গিনী বান্দরীর নাম তো জানা গেল। কিন্তু কী নামে ডাকব ওকে?'

মেয়েটাকে যখন উদ্ধার করে জাহাজের ডেকে তোলা হয়েছিল সেইসময় মাছের গায়ের গন্ধের মতো একটা তীব্র আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছিল মেয়েটার শরীর থেকে। মেয়েটার শরীরে গণিকারা ঘৃত-মধু লেপন করলেও এ কক্ষে ঢোকার পরই সেই আঁশটে গন্ধটা নাকে লেগেছিল স্বয়ম্ভুনাথের। হয়তো বা বাতাসে রয়ে গেছিল গন্ধটা। হয়তো সে জন্যই একটু ভেবে নিয়ে মৃচ্ছকটিকের প্রভু স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'ওর নাম দিলাম—'মৎসগন্ধা।'

'আঁশটে গন্ধের সঙ্গে যৌনতাও মিশে থাকে। অনেকে এ-গন্ধের মধ্যে যৌন গন্ধও খুঁজে পায়। নারী রজস্বলা বলেই কি? হয়তো এ কারণেও প্রভু স্বয়ম্ভুনাথ মেয়েটার নাম 'মৎস্যগন্ধা' দিয়ে থাকতে পারেন। প্রভুর মনের খবর তো আমার জানা নেই। মৎস্যগন্ধাও আর কয়েকবছর পর হয়তো আমাদের মতোই হবে।' স্বয়ম্ভুনাথ চলে যাবার পর সঙ্গিনী সমুদ্র-সুন্দরীদের কাছে এ-মন্তব্য করল ভর্তিকা।

হেসে উঠল সবাই। বাচ্চা মেয়েটা বুঝতে পারছে না দেহোপজীবিনীদের কথাবার্তা। একজন রূপজীবিনী ভর্তিকাকে প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা, প্রভুর ব্যবসা তো নারীদেহ নিয়ে। একথা শুনেছি যে মদ্য কারবারীরা নিজেরা মদ্যপান করেন না, গোয়ালাদের দুগ্ধ পান করার সুযোগ ঘটে না সেহেতু তিনি আমাদের স্পর্শ না-ই করতে পারেন। কিন্তু বিবাহ তো পুরুষের ধর্ম। কামেচ্ছার জন্য না হলেও অন্তত পরলোকের কথা ভেবেও তো বিবাহ করে অনেক পুরুষ।

তার কথা শুনে আর একজন দেহোপজীবিনী জানতে চাইল, 'তার মানে?'

পূর্ববর্তী রূপজীবি জবাব দিল, 'হিন্দুশাস্ত্রে নাকি আছে যে বংশরক্ষা না করলে, অর্থাৎ পুত্রসন্তান লাভ না করতে পারলে নাকি অনন্ত নরকবাস হয়। পুত্র তো পিণ্ডদান করে। আমি আমার স্বামীর তৃতীয় স্ত্রী ছিলাম। প্রথম দুই স্ত্রীর কোনও সন্তান ছিল না। আমার গর্ভে তার সন্তান এল। বাচ্চাটা দুধ ছাড়ার পরই আমার সেই স্বামী কৌশলে তার অন্য দুই স্ত্রীর সঙ্গে আমাকে বেচে দিল বন্দরের বেশ্যালয়ে। আমার বয়স তখন মাত্র ষোলো। রজস্বলা হবার পরই সন্তান ধারণ করেছিলাম। আমার স্বামী লোকটা ছিল ব্রাহ্মণ। এক মন্দিরের পূজারি। আসলে লোকটা কামেচ্ছার জন্য তিন নারীকে বিবাহ করেনি। তাঁর বিবাহের আসল কারণ ছিল বংশরক্ষা। নরকবাসের ভয়ে ভীত ছিল যে। তার মনস্কাম পূর্ণ হতেই মাত্র পাঁচটা স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে আমাকে সে বন্দরে বেচে দিল।'

বারবনিতা সমাগমের মধ্যে একজন ছিল, তার নাম কৈকেয়ী। সার্থক নাম তার। হিংসুটে স্বভাব। নেহাত পুরুষ্ট যৌবনবতী দেহ তার যেজন্য সে রয়েছে এই ময়ূরপঙ্খিতে।

সে প্রথমে মৎস্যগন্ধার দিকে তাকিয়ে বলল, 'প্রভু ওকে রাখতে বলে গেল ঠিকই, কিন্তু ওকে নিয়ে বেশি মাতামাতি করার দরকার নেই। ও তো আর কোনও দিন মহারানি বা বেগম হবে না, আমাদের মতো সমুদ্র বেশ্যা বা বন্দর-বেশ্যাই হবে। ওর কপাল যদি খুব ভালো থাকে তবে কোনও হারেমের দাসী-বাঁদি হবে।'

মেয়েটার ব্যাপারে একথা বলার পর সে একটু আগে যে বনিতা তার সংক্ষিপ্ত জীবনকাহিনি ব্যক্ত করল তার উদ্দেশ্যে কটাক্ষ ছুড়ে দিয়ে বলল, 'তোর স্বামীর আগের দুই মাগি তো সন্তানের জন্ম দিতে পারেনি। তোর সন্তান হল কীভাবে? স্বামী যখন মন্দিরে যেত তখন অন্য কেউ ঘরে আসত নাকি?'

কৈকেয়ীর কথা শুনে সেই নারী বলে উঠল, 'তোর কথা আর জানতে বাকি নেই। আমাকে তো না হয় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। মালিকের সম্পত্তি বলে তাঁর ইচ্ছা অনুসারে পুরুষের সঙ্গে শুতে হয়। তোর তো স্বামী ছিল। তাকে ত্যাগ করে রেশমবস্ত্র আর স্বর্ণালঙ্কারের লোভে স্বেচ্ছাভোগ্যা হলি। নরকেও ঠাঁই হবে না তোর মতো পাপিষ্ঠার।'

এই ভাসমান গণিকালয়ে তিন ধরনের নারী আছে। একদল নারী, যাদের দাসীর হাট বা বন্দরের নানা বেশ্যালয় থেকে কাঞ্চন বা রৌপ্য মূল্যে ক্রয় করে এনেছেন প্রভু। কখনও বা তাদের জলদস্যুদের জাহাজ থেকেও ক্রয় করা হয়। এরা হল প্রভু স্বয়ম্ভুনাথের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তাদের ভরণপোষণের বিনিময়ে তাদের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের সবটুকুই গ্রহণ করেন প্রভু। এ ধরনের গণিকাদের বলা হয় 'দাসী' বা 'কামদাসী'। আর দ্বিতীয় ধরনের সমুদ্রগণিকা হল তারা, যারা প্রভু বা মালিকের সম্পত্তি নয়। স্বেচ্ছায় উঠে এসেছে এই সমুদ্রবেশ্যাদের তরীতে। নাবিকরা তাদের দেহর জন্য যে মূল্য নির্ধারণ করে তা আধাআধি ভাগ হয় বনিতা ও বেশ্যাপোতের অধিপতিদের মধ্যে। কামুক নাবিকদের থেকে প্রাপ্ত উপহারও তারা সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে পারে না, তা তুলে দিতে হয় না প্রভুর হাতে। এরা হল 'স্বেচ্ছাভোগ্য'। সর্বশেষ তৃতীয় ধরনের সমুদ্রসুন্দরীরা পালের কাছিঅলাদের পত্নী বা উপপত্নী। যাদের বলা হয় 'মক্ষিকা'। মধুরূপী অর্থের গন্ধ পেলে এরা অর্থবান নাবিকদের প্রলুব্ধ করে তাদের শয্যাসঙ্গিনী হয়। তাদের আয়ের এক-তৃতীয়াংশ তুলে দিতে হয় জাহাজের প্রভু বা মালিকের হাতে। মোটামুটি এ নিয়মই চলে অন্য বেশ্যাপোতগুলোতেও।

সেই বারবনিতা কৈকেয়ীকে সমুচিত জবাব দেওয়াতে হেসে উঠল অন্য নারীরা। অপমানিত কৈকেয়ী কক্ষ ত্যাগ করল। সে চলে যাবার পর সবাই আবারও পুরোনো আলোচনায় ফিরে এল। প্রথম গণিকার প্রশ্নের জবাবে ভর্তিকা বলল, 'শুনেছি আমাদের প্রভুর বিবাহ হয়েছিল। তখন কালিকট বন্দরে ছোট মশলার দোকান ছিল তার। সেই নারী নাকি অসাধারণ সুন্দরী ছিল। কিন্তু মালিকের কপাল মন্দ। এক রাতে মালিকের স্ত্রী তার যাবতীয় টাকাপয়সা হাতিয়ে নিয়ে এক আরব জাহাজের চড়ে বসল। নারীদের ওপর সম্ভবত একটা বিতৃষ্ণা কাজ করে প্রভুর মনের ভিতরে।'

কথাটা শুনে একজন গণিকা বলল, 'তবে প্রভুর এত সম্পত্তি ভবিষ্যতে কে ভোগ করবে?'

তার এ প্রশ্নর উত্তরে বিভিন্ন তর্ক-বিতর্ক চলতে লাগল উপস্থিত বনিতাদের মধ্যে। ছোট্ট মেয়েটা তাদের কথাবার্তা বুঝতে না পেরে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। নিজের সম্বন্ধে কিছুই মনে করতে পারছে না সে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে শুধু জল, শুধু জল! খাঁচাটা সমেত সে ডুবে যাচ্ছে জলে, আবার ভুস করে ভেসে উঠছে...

কক্ষ থেকে বেরিয়ে ডেকে গিয়ে স্বয়ম্ভুনাথ দেখতে পেলেন জাহাজের নারী-পুরুষদের অনেকেই জড়ো হয়েছে ডেকে। শিম্পাঞ্জিটা কসরত দেখাতে শুরু করেছে। কোনও সময় এক মাস্তুল থেকে অন্য মাস্তুলে ঝাঁপাচ্ছে, আবার কখনও মাস্তুলের আড়কাঠে পা-বিঁধিয়ে মাথা নীচু করে দোল খাচ্ছে। তা দেখে বেশ আমোদ পাচ্ছে নাবিক ও গণিকারা। স্বয়ম্ভুনাথও ওপর দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন তার কারসাজি। তারই মধ্যে আকাশের বুকে একবার একটা জিনিস দেখতে পেলেন তিনি—ছোট্ট একখণ্ড কালো মেঘ। একসময় বিকেল গড়িয়ে অন্ধকার নামল। ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করল ডেক। স্বয়ম্ভুনাথও নিজের কক্ষে ফিরে এলেন। অন্ধকার নামল সমুদ্রের বুকে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে সবার অলক্ষে কিছু একটা ধেয়ে আসতে লাগল জাহাজের দিকে।

প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম ভাঙে স্বয়ম্ভুনাথের। এদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। কক্ষে যে গোলাকার গবাক্ষ আছে তা দিয়ে বাইরে তাকালেন তিনি। কিন্তু বাইরেটা এখনও এত অন্ধকার কেন? আজ কি সূর্যোদয় হতে বিলম্ব হচ্ছে? নাকি তিনি আগেই উঠে পড়েছেন? ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলেন না স্বয়ম্ভুনাথ। অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যে ডেক ছেড়ে বাইরে আসতেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল তার কাছে। গতকাল সূর্যাস্তের আগে তিনি অনেক দূরে যে একখণ্ড মেঘ দেখেছিলেন তা বাড়তে-বাড়তে কালো চাঁদোয়ার মতো সারা আকাশকে গ্রাস করে নিয়েছে। সূর্যদেব তার আড়াল থেকে উঁকি দিতে পারছেন না। আর এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। আকাশ ভাঙা বৃষ্টি।

স্বয়ম্ভুনাথ ভেবেছিলেন বাপ্যারটা হয়তো সাময়িক। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি থেমে যাবে। কিন্তু বেলা যত বাড়তে লাগল তার সঙ্গে বৃষ্টিও বেড়ে চলল। কাঠের বালতিতে জল ছাঁচতে শুরু করল মাল্লারা। আর এরপরই শুরু হল সত্যিকারের বিপদ। বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র বাতাস বইতে শুরু করল। শুরু হল সামুদ্রিক ঝড়। স্বয়ম্ভুনাথ আর নাখোদার নির্দেশে জাহাজের পাল গুটিয়ে ফেলা হল যাতে বাতাস জাহাজটাকে বিপথে নিয়ে যেতে না পারে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ তেমন কিছু হল না। বাতাস ঠেলতে শুরু করল ময়ূরপঙ্খিকে। প্রচণ্ড দুলতে শুরু করল জাহাজটা। এমন দুলুনি যে মাস্তুলের ওপর যে দিকদর্শী বসে ছিল তাকে নীচে নেমে আসতে হল। ধীরে ধীরে এবার আতঙ্ক শুরু হল গণিকাদের মধ্যে। আর তা সংক্রমিত হল কিছু মাল্লাদের মধ্যেও। প্রবল বর্ষণ আর বাতাসের মধ্যেই দলে দলে ডেকে বেরিয়ে আসতে লাগল তারা। কিন্তু বাইরের পরিবেশ দেখে তারা আরও আতঙ্কিত হয়ে উঠল। এরপর সমুদ্রের কালো জলও ফুঁসে উঠতে লাগল। ঢেউগুলো কালনাগিনীর মতো ফণা তুলে ছোবল দিতে শুরু করল জাহাজের গায়ে। গণিকার দল আতঙ্কে কাঁদতে শুরু করল এবার। স্বয়ম্ভুনাথ, নাখোদা আর কয়েকজন মাল্লা মিলে কখনও হাল ধরে, কখনও কাছি টেনে আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে লাগল জাহাজটাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার। কিন্তু সে চেষ্টা ফলপ্রসূ হল না। ক্রমশ জাহাজটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। উত্তাল সমুদ্র যেন লোফালুফি খেলা শুরু করল ময়ূরপঙ্খিটাকে নিয়ে। সমুদ্রজীবনে বহু তুফান দেখেছেন স্বয়ম্ভুনাথ, কিন্তু তিনি এমন দুর্যোগের মুখোমুখি কোনও দিন হননি।

আরও আরও ফুঁসে উঠতে লাগল সমুদ্রের জল। এবার সে নীচ থেকে অজগর সাপের মতো উঠে এসে আছড়ে পড়তে লাগল ডেকের ওপর। সেই জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে ছিটকে পড়তে লাগল ডেকে সাজিয়ে রাখা কাঠের পিপেসহ অন্য সব জিনিস। অজগরের মতো ঢেউগুলো এবার যেন জাহাজটাকে সমুদ্রের জলের নীচে টেনে নিয়ে যাবার প্রস্তুতি শুরু করল। প্রচণ্ড এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হল ডেকে। আতঙ্কিত গণিকার দল এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করল, আর তার সঙ্গে শুরু হল মাল্লাদের চিৎকার। স্বয়ম্ভুনাথের চোখের সামনেই এক গণিকা আতঙ্কে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ডেকের কাঠের প্রাচীর টপকে ঝাঁপ দিল জলে। মুহূর্তের মধ্যে সে হারিয়ে গেল সমুদ্রর গভীরে। এসবের মধ্যেই হঠাৎ একজন গণিকা চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল, 'কেন এমন ঝড় উঠল! কেন আমরা ডুবে যাচ্ছি?'

তার কথার প্রত্যুত্তরে অপর এক নারীকণ্ঠ চিৎকার করে উঠল, 'নিশ্চই ওই মেয়েটার জন্য।'

স্বয়ম্ভুনাথ তাকিয়ে দেখতে পেলেন, গণিকা কৈকেয়ীকে। অন্যরাও ফিরে তাকাল তার দিকে।

কৈকেয়ী তারপর বলে উঠল, 'আকাশে তো মেঘ ছিল না, তবে হঠাৎ তুফান উঠল কেন? নিশ্চই ওই মেয়েটার জন্য। সামলে, ও সমুদ্র-শয়তান! মেয়ের রূপ ধরে এসেছে। বাঁদরটাও অদ্ভুত বাঁদরি। শয়তানের অনুচর। নইলে ওরা ভাসতে ভাসতে কোথা থেকে এল? কীভাবে এল? ওদের জন্যই তীরের কাছাকাছি এসে ডুবতে বসেছি আমরা। এ-জাহাজ সমুদ্রের নীচে টেনে নিয়ে যাবার জন্যই ও জল থেকে জাহাজে উঠে এসেছে। ও আমাদের সবাইকে মারবে।'

সত্যিই তো! বাচ্চা মেয়েটা ওভাবে কোথা থেকে ভেসে এল, তার কোনও উত্তর মেলেনি। তাছাড়া সমুদ্র তো শান্তই ছিল এতদিন। ঝড়ের কোনও পূর্বাভাসই ছিল না। মেয়েটাকে জল থেকে তোলার পরই তো এই দুর্যোগ নেমে এল! মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাপারটা সংক্রামিত হল কুসংস্কারগ্রস্ত নাবিকদের মধ্যে। একজন বলে উঠল, 'তাহলে ওদের এখনই জলে ছুঁড়ে ফেল!'

অন্যরাও সমস্বরে বলে উঠল, 'ফেলে দাও, জলে ফেলে দাও ওদের। সবাই তাদের জলে দেবার জন্য ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।

নাখোদা বা ক্যাপ্টেন আর স্বয়ম্ভুনাথ বুঝতে পারলেন, মাল্লা-নাবিকদের বুঝিয়ে কোনও লাভ হবে না। মৃত্যুভয়ে তারা এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে যে তাদের বাধা দিতে গেলে তারা হয়তো ক্যাপ্টেন আর স্বয়ম্ভুনাথকেই উত্তাল সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলবে। ইতিপূর্বে এমন নানা ঘটনার কথা শোনা গেছে। ক্রুদ্ধ নাবিকদের হাতে নিহত হয়েছেন ক্যাপ্টেন বা জাহাজের প্রভু। কাজেই তারা নাবিকদের বাধাদান করা সমীচীন বোধ করলেন না। নাবিকদের দল ছুটল খোলের ভিতর থেকে মেয়েটাকে বার করে আনার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেয়েটাকে বের করে আনল তারা। ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মেয়েটার মুখ। জাহাজটা এখন দুলতে দুলতে উল্কার গতিতে ছুটতে শুরু করেছে দিকচিহ্নহীন সমুদ্রে। মেয়েটাকে তারা ডেকের রেলিং-এর দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। জাহাজটা এত গতিতে ছুটছে আর দুলছে যে টাল সামলানো মুশকিল। অসতর্ক হলে নিজেদেরই সমুদ্রে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা। মেয়েটাকে একলা টেনে আনতে দেখে একজন বলল, 'ওর অনুচর বাঁদরীটা কই? ওকেও তো জলে ফেলতে হবে।'

তার কথার প্রত্যুত্তরে অন্য একজন নাবিক বলল, 'সে শয়তানীটা ওই দেখো মাস্তুলের মাথায় বসে আছে। মেয়েটাকে জলে ফেললে নিশ্চয়ই সে ও জলে ঝাঁপ দেবে। তাড়াতাড়ি ওকে জলে ফেলো। তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি।'

দ্বিতীয় লোকটার কথা কানে যেতেই স্বয়ম্ভুনাথ আর ক্যাপ্টেন তাকালেন মাস্তুলের দিকে। জাহাজটার দুলুনির সঙ্গে সঙ্গে বিশাল মাস্তুলটাও ঠিক দোলকের মতো দুলছে। মনে হচ্ছে প্রবল ঝড়ের দাপটে এই বুঝি সেটা মড়মড় করে ভেঙে পড়বে। আর প্রবল ঝঞ্ঝার মধ্যেও দু-পায়ে মাস্তুলটা আঁকড়ে তার মাথায় বসে আছে প্রাণীটা। চিৎকার করছে সে। যদিও এতক্ষণ তার শব্দ লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচি আর ঝড়ের শব্দের জন্য কানে পৌঁছোয়নি। স্বয়ম্ভুনাথের যেন মনে হল শিম্পাঞ্জিটা মানুষের মতোই হাত দিয়ে সমুদ্রে কী যেন একটা জিনিস নীচের ডেকে দাঁড়িয়ে-থাকা লোকেদের দেখাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে!

একই কথা মনে হল ক্যাপ্টেনেরও। তার তাকালেন সমুদ্রের দিকে। এবং তাঁদের চোখে ধরা দিল ব্যাপারটা। কিছুটা দূরেই সমুদ্রর ভিতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কোন মহাদানবীয় কচ্ছপের পিঠের মতো দেখতে একটা বস্তু। সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি তার ওপর আছড়ে পড়ে তার চারপাশে প্রবল ঘূর্ণির সৃষ্টি করেছে। মৃচ্ছকটিক উল্কার গতিতে এগিয়ে চলেছে সেদিকেই! ডুবো পাহাড়! এবার কী ঘটতে চলেছে তা বুঝতে অসুবিধা হল না তাঁদের দুজনের। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই নীল ঘূর্ণি জাহাজটাকে তুলে নিয়ে আছড়ে ফেলবে পাহাড়টার গায়ে। মুহূর্তের মধ্যে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে জাহাজটা!

মৃচ্ছকটিককে বাঁচানোর জন্য শেষ একটা চিৎকার করলেন স্বয়ম্ভুনাথ আর ক্যাপ্টেন—'বাঁ দিকে হাল মারো সবাই, বাঁ দিকে হাল মারো!'

সৌভাগ্যবশত এই দুর্যোগের মধ্যেও হালিরা তখনও হাল ধরে বসেছিল। স্বয়ম্ভুনাথ আর ক্যাপ্টেনের চিৎকার তাদের কানে গেল। এই সামান্য কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানেই উল্কার গতিতে ছুটে চলা জাহাজটা মৃত্যুঘূর্ণির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তাদের চিৎকার কানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হালিরা হাল ঘোরাল। একসঙ্গে অনেকগুলো হাল ঘোরানোতে জাহাজটা বাঁ দিকে একেবারে কাত হয়ে গেল। ডেকে যা যা ছিল সবকিছু ছিটকে পড়ল জলে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন মনে হল যে, বাঁ দিকে কাত হয়ে হয়ে সোজা পাতালপ্রবেশ করছে জাহাজটা। কয়েকজন হতভাগ্য গণিকা আগাম আঁচ করতে পারেনি ব্যাপারটা। ডেক থেকে তারা ছিটকে পড়ল সমুদ্রের জলে। জাহাজটার সঙ্গে ডুবো পাহাড়ের নিচের দিকের একটা অংশের সংঘর্ষে জাহাজ থেকে ডানপাশে বাইরে বেরিয়ে থাকা সার সার দাঁড়গুলো কাঠির মতো ভেঙে গিয়ে, আকাশের ছিটকে উঠল ঠিকই, কিন্তু জাহাজের মূল কাঠামোকে স্পর্শ করতে পারল না মৃত্যু। কাত হয়ে ডুবো পাহাড়টাকে তিরবেগে পাশ কাটিয়ে ডুবতে-ডুবতেও এক সময় আবার সোজা হয়ে গেল জাহাজটা। আর এর কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎই যেন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল সেই ভয়ঙ্কর তুফান। মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে শুরু করল সূর্য। সারা জাহাজ জুড়ে উল্লাসধ্বনি শোনা গেল—'বেঁচে গেছি! বেঁচে গেছি! ঝড় থেমে গেছে! ঝড় থেমে গেছে!

কিন্তু সেই বাচ্চা মেয়েটা কই? সমুদ্রে ছিটকে পড়ল নাকি? কিছুক্ষণের মধ্যে অবশ্য মেয়েটাকে দেখতে পেল তারা। জাহাজ যখন কাত হয় তখন তাকে যারা জলে ফেলতে যাচ্ছিল, মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে এটা-ওটা আঁকড়ে ধরেছিল নিজেদেরকে বাঁচাবার জন্য। আর মেয়েটা ছিটকে পড়েছিল জাহাজের ডেকের এক কোণে কুণ্ডলীকৃত যে কাছিগুলো রাখা আছে তার মধ্যে। সেখানে আটকে যাওয়াতেই সে জলে পড়েনি। বেঁচে গেছে মেয়েটা! ইতিমধ্যে তার পোষ্যটাও মাস্তুল ছেড়ে তার কাছে নেমে এসেছে। দড়িদড়ার মধ্যে তারা জড়াজড়ি করে বসে আছে! আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যে নাবিকদের দল কিছুক্ষণ আগে মেয়েটাকে জলে ফেলতে যাচ্ছিল তাদেরই মধ্যে একজন এবার হঠাৎ বলে উঠল, 'ওর জন্যই তো আমরা বেঁচে গেলাম। ওর বাঁদরীটাই তো ডুবোপাহাড়টা দেখাল! নইলে কেউ বাঁচতাম না আমরা! সমুদ্র দেবতা আমাদের রক্ষা করার জন্যই ওদের পাঠিয়েছিলেন।'—এই বলে সে ছুটে গিয়ে কোলে তুলে নিল তাকে। মেয়েটাকে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠল নাবিকরা। এর পর হঠাৎই একজন বলল, 'কিন্তু সে শয়তানীটা কই? যে মেয়েটাকে জলে ফেলে আমাদের সবাইকে মারতে চেয়েছিল? আর একটু হলেই তো ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে মরতাম আমরা!'

কৈকেয়ী এখন ডেকের ধারে একটা খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। নাবিকদের দৃষ্টি পড়ল তার ওপর। তারা বলে উঠল, 'জলে ফেলে দাও, জলে ফেলে দাও ওই পিশাচীকে।'

কথাটা শোনামাত্রই কৈকেয়ী ডেক ছেড়ে ছুটে পালাতে যাচ্ছিল খোলের ভিতরে। কিন্তু একজন নাবিক গিয়ে ধরে ফেলল তাকে। অন্যরাও ঘিরে ফেলল তাকে। নাবিকদের মাথায় যখন খুনের নেশা চাপে তখন তাদের নিরস্ত করা কঠিন হয়। বাচ্চা মেয়েটাকে তারা জলে ফেলতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু সেই খুনের ভাবনাটা তখনও রয়ে গেছে তাদের অবচেতনে। যতক্ষণ না তারা কাউকে খুন করতে পারছে ততক্ষণ তাদের শান্তি হবে না। কাজেই ব্যাপারটা দেখে চুপ করে রইলেন স্বয়ম্ভুনাথ। কয়েকজন নাবিক পাঁজাকোলা করে উঠিয়ে নিল সেই বারবনিতাকে। তারপর ডেকের রেলিং-এর কাছে নিয়ে গিয়ে তার হাত-পা ধরে বেশ কয়েকবার দোল খাইয়ে তাকে জাহাজ থেকে ছুড়ে ফেলল সমুদ্রের বুকে। কৈকেয়ীর আর্তচিৎকার গ্রাস করে নিল সমুদ্র। হয়তো বা শাপমুক্তি ঘটল সেই নারীর। দুর্যোগ থেকে পুনর্জন্ম লাভ করে ডেকে বেরিয়ে আসতে লাগল বনিতাদের দল। ভর্তিকাও আছে তাদের মধ্যে। তার হাতে মেয়েটাকে আবার তুলে দিল নাবিকরা। সবাই ধীরে ধীরে উঠে এল ডেকে। বৃষ্টি থেমে গেল। মেঘের আবরণ সরে গিয়ে দেখা দিল নীল আকাশ আর ঝলমলে সুন্দর রোদ। যেন কোনও সময়েই কিছু হয়নি। একইভাবে আগের মতো ভেসে চলছে ময়ূরপঙ্খি জাহাজ। ঝড়ঝঞ্ঝার ব্যাপারটা যেন নিছকই দুঃস্বপ্ন ছিল। শিম্পাঞ্জিটা আবার মাস্তুলের ওপরে চড়ে কসরত দেখাতে শুরু করল নাবিকদের।

জাহাজের সব নাবিক ও গণিকাদের গুনতি করলেন স্বয়ম্ভুনাথ। কৈকেয়ী ছাড়া চারজন গণিকা আর একজন দাঁড়িকে পাওয়া যাচ্ছে না। সমুদ্র গ্রাস করে নিয়েছে তাদের। স্বয়ম্ভুনাথ হিসাব করে দেখলেন এছাড়া ক্ষয়ক্ষতি বলতে জাহাজের একপাশের দাঁড়গুলো ভেঙে গেছে আর ডেকে রাখা পিপে আর আসবাবগুলো হারিয়ে গেছে। সামান্য কিছু জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সামুদ্রিক ঝড়ে। স্বয়ম্ভুনাথ আর ক্যাপ্টেন আলোচনা করে পাল খাটানোর নির্দেশ দিলেন। জাহাজে যে কাঠ আছে তা দিয়ে দাঁড় বানানোর নির্দেশও দেওয়া হল। এবার যে-যার কাজে লেগে পড়ল নাবিকমাল্লার দল। মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে ডেক ছেড়ে ভিতরে চলে গেল গণিকারা। মৃচ্ছকটিক শান্ত ভাবে ভেসে চলল আগের মতোই। দিকদর্শী চুম্বককাঁটা জানিয়ে দিয়েছিল যে মৃচ্ছকটিক সমুদ্রঝঞ্ঝার কবলে পড়ে তার যাত্রাপথ থেকে বেশ কিছুটা দক্ষিণে সরে এসেছে। জাহাজের অভিমুখ বদলে তাই গন্তব্যে পৌঁছতে বাড়তি অনেকটা সময় লাগল জাহাজের। চারদিন পর এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালে দেখা দিল তটরেখা। মৃচ্ছকটিক তার নাবিক, গণিকা আর মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ফিরে এল কালিকটে।

সম্পদশালী বন্দরনগরী কালিকট। পার্শ্ববর্তী মালাবার ও অন্যান্য বন্দরগুলো থেকে সে আজ ছিনিয়ে নিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। অথচ সমুদ্রব্যবসায়ীদের কাছে অনেক বেশি সুবিধাজনক ছিল মালাবার বন্দরই। ভৌগোলিক সুবিধার দিক থেকেও, নিরাপত্তার দিক থেকে কালিকট বন্দর জাহাজ ভেড়াবার পক্ষে উপযোগী ছিল না। উপকূলে কাদামাটির চরায় এই তো সেদিনও গাছের গুড়ির মতো পড়ে থাকত কুমিরের দল। অসতর্ক কোনও নাবিক জাহাজ বা নৌকো থেকে নেমে কর্দমাক্ত তটরেখা অতিক্রম করে নগরীতে প্রবেশ করতে গিয়ে কুমিরের খাদ্যে পরিণত হত। মৌসুমী বায়ুর ধাক্কায় প্রবল জলোচ্ছাস প্লাবিত করত নগরীকে, তাছাড়া জলদস্যুর উৎপাত তো ছিলই। কিন্তু এসব প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করতে পেরেছে শাসক সামোরিন ও কালিকটের বণিকদের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি। শাসক সামোরিন বাণিজ্য প্রসারের জন্য ও নগরীর উন্নতির জন্য নানা নীতি গ্রহণ করেছেন। জলোচ্ছ্বাস থেকে নগরীকে বাঁচাবার জন্য ঘোড়সওয়ারের কোমর সমান উঁচু প্রাচীর গড়েছেন উপকূল নগরীর চারপাশে। বন্দর অঞ্চল ঘিঞ্জি হলেও নগরীকে একটু ভিতর দিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে সেখানে চওড়া রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছেন। মালাবারসহ আশেপাশের বেশ কয়েকটা বন্দরে নিয়ম আছে যে, কোনও জাহাজ যদি মিষ্টি জল সংগ্রহের জন্য বন্দরে ভেড়ে তবে তাকে শুল্ক দিতে হবে। অথবা কোনও জাহাজ, যার গন্তব্য ছিল অন্য কোনও জায়গা, সে যদি সামুদ্রিক ঝঞ্ঝা বা অন্য কোনও বিপদের সন্মুখীন হয়ে বন্দরে ভেড়ে, অথবা উপকূল অঞ্চলে ভেঙে পড়ে বা সমুদ্র-যাত্রার অনুপযুক্ত হয় তবে সেই পণ্য-জাহাজগুলোর যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারেন সেখানকার শাসক। কিন্তু সম্রাট সামোরিন এসব শুল্ক বা বাজেয়াপ্তকরণের নীতি তুলে দিয়েছেন কালিকট থেকে, কড়া হাতে দমন করেছেন জলদস্যুদের। উপকূল অঞ্চলে কোনও নৌকো বা জাহাজের বিরুদ্ধে জলদস্যুতার অভিযোগ প্রমাণিত হলেই ততক্ষণাৎ তাদের শূলে চড়ানো হয়। একই নিয়ম প্রযোজ্য বন্দর অঞ্চলে চুরি-ছিনতাইয়ের ক্ষেত্রেও। অপরাধী হিন্দু নায়ার, ইসলাম আরব, কনফুসিয়াস চীনা, পাহাড়ি বৌদ্ধ বা শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী, যে জাত-ধর্ম বা বর্ণের মানুষই হোক না কেন চুরি বা লুণ্ঠনের সাজা হল মৃত্যুদণ্ড। শুল্ক মকুব বা এ-ধরনের নিরাপত্তা দেশী-বিদেশি বণিকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলেছে এ বন্দরকে। আর কালিকটের ব্যবসায়ীদের উদ্যমের কথা তো বলাই বাহুল্য। প্রচলিত একটা কথাই আছে যে 'কালিকটের ব্যবসায়ীরা এমন কোনও দিন নেই যেদিন ব্যবসা করে না।' বন্দর অঞ্চলে গুদামজাত মশলা-কাপড়-শুকনো ফলের ব্যবসা তো আছেই, আছে মরুশুমি নানা জিনিসপত্রের ব্যবসা। এমনকী সেসব ব্যবসা যেদিন থাকে না সেদিন তারা বাড়ির সামনে বা রাজপথের পাশে শামিয়ানা টাঙিয়ে বসে যায় পান বিক্রি করতে। হতদরিদ্র ভিক্ষুক বা মাল্লা থেকে শুরু করে সম্রাট সমোরিন, পানের খিলিতে সুপারিকুচি ভরে খাবার অভ্যাস এ নগরীর প্রত্যেক মানুষের। স্বয়ম্ভুনাথও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। অবসরে পান বিক্রি করা-ব্যবসায়ীদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যাদের বৈভব বলতে গেলে সম্রাট সমোরিনের কাছাকাছি। কিন্তু তাঁদের শামিয়ানার নীচে বসে পান বিক্রি করতে আত্মসম্মানে বাধে না। কারণ তাঁদের কাছে সবচেয়ে সম্মানের কাজ হল ব্যবসা। তা সে সামান্য পান বিক্রিই হোক অথবা স্বয়ম্ভুনাথের মতো রূপাজীবীদের ব্যবসায়ী হোন না কেন। যে কারণে স্বয়ম্ভুনাথও সম্মানের আসনে আসীন। অন্য বড় ব্যবসায়ীদের মতো তাঁকেও যথেষ্ট সম্মান দেন সম্রাট সমোরিন। কারণ স্বয়ম্ভুনাথ একজন বড় ব্যবসায়ী। রাজা সমোরিন জানেন যে অন্য সব বন্দরকে পিছনে ফেলে কালিকট নগর-বন্দরের উৎকর্ষতার ভিত্তি হল ব্যবসায়ীরা। যদিও হিন্দু ব্যবসায়ীর সংখ্যা নগণ্য। স্বয়ম্ভুনাথের মতো দু-চারজন বড় ব্যবসায়ী হিন্দু হলেও অধিকাংশ বড় ব্যবসায়ী হলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী আরব জনগোষ্ঠীর লোক। তাঁরাই কালিকট বন্দরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল কারণ, যেজন্য ওই পর্তুগিজ অ্যাডমিরাল ভাস্কো যখন প্রথমবার কালিকটে এসে এ-বন্দরে ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা করেছিলেন তখন আরবদের আপত্তিতেই তাঁকে কালিকট

ছাড়ার নির্দেশ দেন সম্রাট সামোরিন। অবশ্য ভাস্কো আর তাঁর লোকজন সামোরিনের কাছে নিজেদের বণিক-ধর্মপ্রচারকের পাশাপাশি মাঝদরিয়ার জলদস্যু বলেও প্রচার করেছিল কালিকটবাসী নাবিকদের ভয় দেখাবার জন্য। সেটাও অবশ্য কালিকট থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়নের আর একটা বড় কারণ জলদস্যুদের কোনও স্থান নেই কালিকটে। তবে গতবার আরব বণিকদের বিরোধিতার ব্যাপারটা সম্যক জানা আছে পর্তুগিজ ভাস্কোর। তাই তার জাতক্রোধ আছে আরবদের প্রতি। স্বয়ম্ভুনাথ যদি হিন্দু না হয়ে আরব হতেন তবে তার মৃচ্ছকটিককে মাঝসমুদ্রে ডুবিয়ে দিতেন ভাস্কো। স্বয়ম্ভুনাথের গণিকাপোতের সঙ্গে ভাস্কোর রণতরীর প্রথম সাক্ষাতের পর যে কারণে পর্তুগিজরা প্রথমেই জানতে চেয়েছিল যে এই বেশ্যাপোতের মালিক আরব নাকি হিন্দু?

বন্দর বা নগরীর বেশ্যাপতিদের বেশ খাতির করেন সামোরিন বা নগরবাসীরা। তার কারণ শুধু এই নয় যে এসব গণিকালয়গুলো নাগরিকদের মনোরঞ্জন ঘটায়, নাবিকদের তৃপ্তিদান করে সেজন্য। নগরীতে গণিকাপল্লী থাকলে নগরীর সম্ভ্রান্ত অথবা গৃহস্থনারীরা পুরুষের কাম-লালসার শিকার হয় না বলেই সম্রাট সামোরিন ও নগরবাসীর ধারণা। বহুদেশের বহু জাতের মানুষ আছে এই বন্দরনগরী কালিকটে। দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রযাত্রার কারণে তাদের অনেকেই নারীসঙ্গ থেকে বঞ্চিত থাকে। কিন্তু তারাও তো রক্তমাংসের মানুষ। যৌনতা তো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের দেহের তৃষ্ণা মেটায় সমুদ্রসংলগ্ন কালিকট নগরীর বন্দরসুন্দরীরা।

শুধু নারীরাই নয়, ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের কিছু মানুষেরা উপযুক্ত প্রণামী পেলে নারীদেরও কামতৃষ্ণা মেটায়। তবে সে নারীকে হতে হবে তাঁর সমগোত্রীয়। সম্রাটের আসনে যিনি অধিষ্ঠিত হন তিনি পুরুষ হলেও মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রচলিত কালিকটে। নারীরা সম্পত্তির মালিক হন। তিনিই নির্ধারণ করেন পারিবারিক সম্পত্তির হস্তান্তর কার কাছে কীভাবে হবে। একজন নারী আইনসম্মতভাবেই তিনজন পুরুষের সঙ্গে সহবাস করতে পারে এবং তা করে থাকে। তবে এক দ্বিপ্রহর থেকে দ্বিতীয় দ্বিপ্রহরের মধ্যে দ্বিতীয় কোনও পুরুষের সঙ্গে মিলন নিষিদ্ধ। পুরুষের মতো নারীও বহুগামিনী। কালিকটের জনসাধারণের যে ব্যক্তিস্বাধীনতা আছে তা ইউরোপের কোথাও নেই। বর্ধিষ্ণুএই জনপদের লোকজন বেশ শৌখিনও বটে। সাধ্যমতো সোনারুপোর অলঙ্কার, সিন্ধু ছেঁচে আনা পারসিক মুক্তো ধারণ করে তারা। ফুল তাঁদের বিশেষ প্রিয়। গোলাপ আর হাস্নুহানা ফুলের বহু বাগিচা আছে এখানে। সূর্য ডোবার পর যখন সমুদ্র থেকে ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসে নগরীর ভিতর, তখন ফুলের সুবাসে ভরে ওঠে চারপাশ। চাঁদের আলো রাতের বেলা মায়া ছড়ায় এ-নগরীর ওপর, আবার দিনের আলোতে উদ্ভাসিত হয় কর্মচঞ্চল ব্যস্ত কালিকট নগরী। মন্দিরের মাথার ওপর বসানো স্বর্ণ-কলসগুলো দ্যুতি ছড়ায় সূর্যালোকে। এ-নগরীতেই জন্মেছেন স্বয়ম্ভুনাথ। শৈশব-কৈশোর-যৌবন-মধ্যবয়স অতিক্রম করে তিনি এখন বার্ধক্যের সীমানায় উপনীত। এই নগরীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বয়ম্ভুনাথের জীবন। কালিকট বন্দর চোখে পড়তেই উদ্বেল হয়ে উঠল স্বয়ম্ভুনাথের মন। কতদিন পর তিনি আবার ফিরে এলেন তাঁর প্রিয় নগরীতে।

পাড় থেকে কিছুটা তফাতে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল ময়ূরপঙ্খি। জলের নাব্যতা কম। তাই আর এগোনো যাবে না। কিন্তু বন্দরে পৌঁছোবার পর চারপাশের পরিবেশ কেমন যেন অদ্ভুত মনে হল স্বয়ম্ভুনাথের। কোনও জাহাজকে তীরের দিকে আসতে দেখলেই লোকজন পাড়ের কাছে ভিড় করে দাঁড়ায়, জাহাজ কী নিয়ে এসেছে তা দেখার জন্য। ছোট ছোট শালতিগুলো পিলপিল করে ছুটে এসে ঘিরে ফেলে জাহাজকে, পণ্য অথবা যাত্রী পরিবহনের জন্য। হতে পারে মৃচ্ছকটিক পণ্যবাহী জাহাজ নয়, তবুও সমুদ্রজীবন কাটিয়ে সে যতবার ঘরে ফিরেছে ততবার তাকেই ঘিরে ধরেছে কিছু মানুষ। পতিতাদের দালাল, জাহাজকে কাদামাটির ওপর দিয়ে যে প্রশিক্ষিত হাতিরা পাড়ে টেনে তোলে তার মালিকরা, জাহাজ যে উদ্বৃত খাবার-রসদ নিয়ে ফিরেছে তা কম দামে কিনে নেবার লোকেরা এবং অবশ্যই শুল্ক দপ্তরের লোকজন। কিন্তু আজ তাদের কারোরই দেখা মিলল না। মৃচ্ছকটিককে স্বাগত জানাবার জন্য কেউ ভিড় জমাল না তার গায়ে। বন্দরে খুব সামান্য কয়েকজন লোক চোখে পড়ছে। স্বয়ম্ভুনাথের ময়ূরপঙ্খি যেখানে এসে থেমেছে তার কাছাকাছি আরও কয়েকটা জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকলেও তা জনশূন্য বলেই মনে হচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ সময় অপেক্ষা করার পরও যখন তাঁকে আপ্যায়নের জন্য কেউ এগিয়ে এলনা তখন জাহাজ থেকে দুটো নৌকো নামালেন স্বয়ম্ভুনাথ। গণিকা আর ক্রিতদাসীদের ময়ূরপঙ্খিতে নাখোদা বা ক্যাপ্টেনের তত্ত্বাবধানে রেখে কয়েকজন অনুচরকে নিয়ে সে-দুটো নৌকাতে চেপে বসলেন তিনি।

চড়ায় এসে আটকে গেল নৌকো। সামনের বেশ কিছুটা জমি নোংরা কাদামাটি ভরা। জোয়ারের সময় জলে ঢেকে যায় জায়গাটা। মাটির ওপর লাল কাঁকড়ার গর্ত। সিগাল আর লম্বা হাড়গিলে পাখির দল ঘুরে বেড়াচ্ছে খাদ্য অন্বেষণে। জাহাজের নানা আবর্জনাও জমা হয় সেখানে। নৌকা থেকে নেমে সেই নোংরা-কর্দমাক্ত-পূতিগন্ধময় জায়গাটা অতিক্রম করে স্বয়ম্ভুনাথ উঠে দাঁড়ালেন শক্তমাটিতে।

অঞ্চলটা অত্যন্ত ঘিঞ্জি। চারপাশে ছোট-বড় ঘর-বাড়ি। নীচু-শ্রেণির মাল্লা-মাঝি-জাহাজ মেরামতকারী, পণ্য ব্যবসায়ী, ফড়ে, দালালদের বাসস্থান। আছে অসংখ্য শুঁড়িখানা আর ছোট বড় বেশ্যালয়। আর তারই মাঝে দাঁড়িয়ে আছে পন্য মজুতের জন্য ইটের তৈরি বিরাট বিরাট গুদামঘর। এইসব গুদামঘরে সারাবছর সুতি আর রেশমের কাপড়ের গাঁটরি উপচে থাকে। এছাড়াও থাকে মন মন এলাচ, লবঙ্গ, গোলমরিচ, দারুচিনিসহ নানা ধরনের মশলা, চন্দনকাঠ থেকে শুরু করে হাতির দাঁতও। এছাড়া নারকেল আর ছোবড়ার স্তূপ তো আছেই। কত বিচিত্র ধরনের মানুষ যে বন্দর অঞ্চলে ঘোরাফেরা করে পেটের জন্য তার হিসেব নেই। হিসেব নেই কত জাতের মানুষ এখানে আছে! হিন্দু, নায়ার, আরব তুর্কি, পারসিক, সিরীয়, চৈনিক থেকে শুরু করে আফ্রিকান কাফ্রিরাও। এখানে যেমন দেখা মেলে সবুজ পাগড়ি-পরা হজযাত্রীদের আর তেমনই দেখা মেলে সাদা ধুতি-পৈতেধারী, কপালে বাহুতে চন্দনলেপা, ব্রাহ্মণদের। যাঁরা সমুদ্রে জাহাজ ভাসার আগে তার মঙ্গলকামনায় পূজা-অর্চনার কাজ করে, গণৎকারের কাজ করে। আর অবশ্যম্ভাবী রূপে আছে অগণিত মাতাল-জুয়াড়ি-বেশ্যারা। যে-কোনও বন্দরেই যাদের দেখা মেলে।

বন্দরের বাইরের অংশে কোনও মানুষজন না থাকলেও ঘিঞ্জি অঞ্চলটার ভিতরে ঢুকতেই লোকজনের ভিড় দেখতে পেলেন স্বয়ম্ভুনাথ। স্থানে স্থানে উত্তেজিতভাবে জটলা করছে তারা। তিনি তাঁর ডেরার পথ ধরতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁকে দেখতে পেয়ে পরিচিত এক ব্রাহ্মণ এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন তাঁর সামনে। মৃচ্ছকটিক সমুদ্রে যাত্রা করার আগে এ-ব্রাহ্মণই পূজা-অর্চনা করেছিলেন। স্বয়ম্ভুনাথ ভেবেছিলেন যে ব্রাহ্মণ হয়তো জানতে চাইবেন তাঁর জাহাজ কোনও ম্লেচ্ছদেশে গেছিল কিনা? যদি গিয়ে থাকে তবে নগদ অর্থের বিনিময়ে তার জন্য প্রায়শ্চিত্য করবেন ব্রাহ্মণ। কিন্তু ব্রাহ্মণ সেসব প্রশ্ন করলেন না। তিনি উত্তেজিতভাবে বললেন, 'কবে ফিরলেন? খবর শুনেছেন কিছু?'

স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'আজই ফিরলাম। এখনই। কী খবর?'

ব্রাহ্মণ বললেন, 'বছরখানেক আগে যে পর্তুগিজ বণিকটাকে রাজা তাড়িয়ে দিয়েছিলেন সে আবার ফিরে এসেছে। এবার আর বণিকের বেশে নয়, সে এসেছে এখানকার বাণিজ্যের দখল নিতে। অ্যাডমিরাল ভাস্কো নামের লোকটা অনেক যুদ্ধ জাহাজ সঙ্গে এনেছে। হজযাত্রীদের মক্কা ফেরত একটা জাহাজকে সে মাঝসমুদ্রে পুড়িয়ে দিয়েছে। তারপর কন্নোনর হয়ে উপস্থিত হয়েছে এখানে। বন্দরের উত্তরে মাইল তিনেক দূরে সমুদ্রের মধ্যে সেই নৌবহর অবস্থান করছে। রাজা সামোরিনকে তারা বার্তা পাঠিয়েছে যে অবিলম্বে সব আরব ব্যবসায়ীদের তাড়িয়ে দিতে হবে। এবং তাদের হাতে কালিকট বন্দরের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে হবে! নইলে নাকি তারা নিজেরাই বন্দরের দখল নেবে!'

ভাস্কো যেদিন হজযাত্রীদের জাহাজটা ধ্বংস করেছিলেন তার তিনদিনের মাথায় সেই বাচ্চা মেয়েটাকে উদ্ধার করেছিলেন স্বয়ম্ভুনাথ। তারপর ঝঞ্ঝার কবলে পড়ে যাত্রাপথ পরিবর্তন হওয়ায় মৃচ্ছকটিকের বন্দরে ফিরতে সময় লেগেছে আরও চারদিন। অর্থাৎ হজযাত্রীদের জাহাজে আগুন লাগার পর একটা সপ্তাহ কেটে গেছে। তার মধ্যে ভাস্কো কন্নোনরে পৌঁছে সেখানকার রাজার থেকে সামোরিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি আদায় করে তিনদিন আগে কালিকট বন্দরের কাছে ঘাঁটি গেড়েছেন। এ-ব্যাপারগুলো জানা ছিল না স্বয়ম্ভুনাথের! অবশ্য জানা থাকার কথাও নয়। ভাস্কোর সঙ্গে স্বয়ম্ভুনাথের দেখা হয়েছিল মাস খানেক আগে মাঝসমুদ্রে। তাঁর সঙ্গে সেই সাক্ষাতের কথা ব্রাহ্মণকে জানানো সমীচীন মনে করলেন না স্বয়ম্ভুনাথ। ব্যাপারটা চেপে গিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, 'তারপর?'

ব্রাহ্মণ বললেন, 'রাজা অ্যাডমিরালের প্রস্তাবে রাজি নন। হওয়া সম্ভবও নয়। যুগ যুগ ধরে আরব ব্যবসায়ীরা এখানে আছে। কালিকটের সমৃদ্ধির মূলে তো ওরাই। কিন্তু পর্তুগিজ অ্যাডমিরালও তাঁর প্রস্তাবে অনড়। দফায় দফায় আলোচনা চলছে। রাজা সামোরিন আজ দুই সঙ্গী সহ এক ব্রাহ্মণকে পর্তুগিজদের জাহাজে পাঠিয়েছেন আলোচনার জন্য। রাজা তাঁদের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছেন যে, পর্তুগিজদের দাবি তাঁর পক্ষে মানা সম্ভব নয়। তাঁদের অন্য কোনও দাবি বা প্রস্তাব থাকলে তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু দু-পক্ষই যদি নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে তবে মনে হয় যুদ্ধ বাধবে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বন্দর ছেড়ে সবাই শহরের ভিতরে চলে যাচ্ছে। মালপত্রর গুদামও খালি করে ফেলা হবে। সবাই এখন অপেক্ষা করছে যে তিনজন লোককে পর্তুগিজদের কাছে পাঠানো হয়েছে তারা ফিরে এসে কী সংবাদ দেয় তার জন্য। তবে পরিস্থিতি খুব একটা সুবিধার নয় বলেই মনে হচ্ছে!' কথাগুলো বলে এরপর আর দাঁড়াল না ব্রাহ্মণ। নতুন কোনও খবরের প্রত্যাশায় একটা ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেল।

ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে অসুবিধা হল না স্বয়ম্ভুনাথের। তিনি তো নিজের চোখেই দেখেছেন ভাস্কোর নৌবহরকে। সার সার কামান বসানো আছে তার ডেকে। ওসব কামানসম্মিলিত জাহাজ নিয়ে কেউ বাণিজ্য করতে বেরোয় না, যুদ্ধ করতে বেরোয়। তাছাড়া ভাস্কোর কালিকটে দুর্গ তৈরির কথাটা এক গণিকার মাধ্যমে শুনেছেন তিনি। রাজা সামোরিন হিন্দু। স্বয়ম্ভুনাথও হিন্দু বলে রাজার আস্থাভাজন। রাজা বেশ কয়েকবার কুমারী কন্যা কিনেছেন স্বয়ম্ভুনাথের কাছ থেকে। যতই ভাস্কোর কাছ থেকে তিনি জেপাং নারী সরবরাহের বরাত পান, রাজা সামোরিনের পাশেই দাঁড়াতে হবে তাঁকে। স্বয়ম্ভুনাথ তাঁর পার্শ্বচরদের বললেন, 'দ্রুত নৌকার ব্যবস্থা করে গণিকাদের-ক্রীতদাসীদের আমার গনিকালয়ে নিয়ে এসো। আর নাবিকদেরও বন্দরে উঠে আসতে বলো। নাখোদাও যেন জাহাজ ত্যাগ করেন।'

একথা বলার পর স্বয়ম্ভুনাথের হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেই ছোট্ট মেয়েটার কথা। ডুবোপাহাড়ের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরার পর কেন জানি স্বয়ম্ভুনাথের মনেও ধারণা জন্মেছে যে-ওই বালিকা দৈবপ্রেরিত। তার জন্যই রক্ষা পেয়েছে সবাই। স্বয়ম্ভুনাথের কথা শুনে তাঁর নির্দেশ পালনের জন্য এগোচ্ছিল অনুচরেরা, কিন্তু তারা যাবার আগে তিনি তাদের নির্দেশ দিলেন 'শুধু ওই বাচ্চা মেয়েটা তার সঙ্গিনী বাঁদরীটা আর গণিকা ভর্তিকাকে আমার গৃহে আনবে। ওরা ওখানেই থাকবে।'

তাঁর লোকজন চলে গেল ময়ূরপঙ্খি খালি করার ব্যবস্থা করার জন্য আর স্বয়ম্ভুনাথ এগোলেন তাঁর বাড়িতে ফেরার জন্য। বন্দর থেকে একটু এগোলেই তার বিশাল গণিকালয়। অনেক কক্ষসম্মিলিত বিশাল বাড়িটা। রাস্তার ধারে সার সার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে খদ্দের-প্রত্যাশী গণিকারা। সরু গলিটাতে সবসময় জাহাজিদের ভিড় লেগে থাকে। কিন্তু আজ সেখানে খদ্দেরের ভিড় নেই। গণিকারাই শুধু দাঁড়িয়ে আছে। প্রভুকে দেখতে পেয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল তারা।

স্বয়ম্ভুনাথ একবার শুধু তাকালেন বাড়িটার দিকে। কিন্তু সেখানে থামলেন না। সর্পিল পথটা এগিয়ে গিয়ে মিশেছে পাকা সড়কের সঙ্গে। সে-সড়ক আরও এগিয়ে প্রধান সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়ে থেমেছে রাজা সামোরিনের প্রাসাদের সামনে। পাকা সড়কের দু-পাশ থেকে শুরু হয়েছে ধনী ব্যবসায়ীদের বাসস্থান। স্বয়ম্ভুনাথের বাসস্থানও সেখানেই। নারকেলগাছঘেরা অনেকটা জমি নিয়ে তার বাড়ি। দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার শেষে অবশেষে এক দুর্যোগপূর্ণ দিনে ঘরে ফিরলেন স্বয়ম্ভুনাথ।

ওদিকে তাঁর অনুচরেরা ময়ূরপঙ্খি থেকে নামিয়ে আনল সবাইকে। নামল সেই বাচ্চা মেয়েটাও। এই কালিকট বন্দর থেকেই আব্বুর কোলে চেপে একদিন জাহাজে উঠেছিল সে। রৌদ্রকরোজ্জ্বল সে-দিনটা কী সুন্দর ছিল। অনেক লোকের ভিড় ছিল চারপাশে। বহু মানুষ যাত্রীদের বিদায় দেবার জন্য উপস্থিত হয়েছিল বন্দরে। সবুজ পতাকায় সাজানো হয়েছিল সারা বন্দর। জরিদার ঝলমলে নিশানও উড়ছিল চারদিকে। লোকজনের ব্যস্ততা, চিৎকার- চেঁচামেচিতে মুখরিত ছিল বন্দর।

সেদিনের সেই বন্দরের সঙ্গে আজকের এ-বন্দরের কোনও মিল নেই। চারপাশে সব ফাঁকা হয়ে গেছে। অশুভ কোনও ঘটনার আশঙ্কায় নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে আছে কালিকট বন্দর। অবশ্য বন্দরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও হয়তো তাকে চিনতে পারত না মেয়েটা। তার চোখে শুধু জেগে আছে সেই দৃশ্য—অকূল দরিয়ায় খাঁচাবন্দি অবস্থায় সে ভেসে চলেছে। ঢেউয়ের তালে সে উঠছে-নামছে-ডুবছে-ভাসছে! চারপাশে শুধু জল আর জল, দিকচিহ্নহীন অসীম জলরাশি! প্রভু স্বয়ম্ভুনাথের নির্দেশ মোতাবেক বাচ্চা মেয়েটাকে তার বাঁদরী আর গণিকা ভর্তিকার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া হল স্বয়ম্ভুনাথের বাসস্থানে। ভর্তিকার তত্ত্বাবধানে সেগৃহেই থাকার ব্যবস্থা করা হল মৎস্যগন্ধা ও তার পোষ্যের।

দীর্ঘদিন পর ঘরে ফিরেছেন মালিক। স্বাভাবিকভাবেই নিজ গৃহে বেশ কিছু কার্য সম্পাদন করতে হল তাঁকে। অনেক দিন পর সমুদ্রের নোনা জলের পরিবর্তে কূপের মিষ্টি জলে স্নান করে বেশ আরামবোধ করলেন তিনি। সমুদ্রের নোনা বাতাস দেহের চামড়াকে রুক্ষ করে তোলে, ফাটিয়ে দেয়। তার ওপর নোনা জলে স্নান করলে যে জ্বলুনি হয় তার থেকে মুক্তি পেলেন তিনি। তারপর খাওয়া সেরে পালঙ্কে শুয়ে পড়লেন। পর্তুগিজদের ব্যাপারটা নিয়ে তাঁর মনের মধ্যে উৎকণ্ঠা জেগেছে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ক্লান্তিতে ঘুম নেমে এল তাঁর চোখে।

স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন স্বয়ম্ভুনাথ। তার ময়ূরপঙ্খি নাও নিয়ে অকূলপাথারে ভাসছেন তিনি। ধীরে ধীরে মেঘ জমতে শুরু করল। এক সময় তা ঘন-গাঢ় হয়ে সূর্যকে ঢেকে দিল। কালো হয়ে উঠল সমুদ্রের জলও। দিনেরবেলাই যেন রাতের অন্ধকার নেমে এল সমুদ্রের বুকে! তারপর শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি। আর বাতাস। সমুদ্রর জলও এরপর ফুঁসে উঠতে লাগল। সমুদ্রের ঢেউগুলো পাতাল থেকে উঠে আসা লক্ষ ফণাঅলা নাগিনীর মতো ছোবল মারতে শুরু করল জাহাজের গায়ে। ডেকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বয়ম্ভুনাথ। একসময় তিনি বুঝতে পারলেন, জাহাজের ওপর আর কারও নিয়ন্ত্রণ নেই, উল্কার গতিতে অজানার উদ্দেশ্যে ছুটে চলেছে তাঁর প্রমোদতরী। মাল্লারা সব চারপাশে ছোটাছুটি, চিৎকার শুরু করেছে, নারীদের আতঙ্কিত ক্রন্দনধ্বনি শুরু হয়েছে খোলের ভিতরে। প্রধান মাস্তুলটা এমনভাবে কাঁপছে যে এখনই হয়তো সেটা মড়মড় করে ভেঙে পড়বে! হঠাৎ দিগদর্শী চিৎকার করে উঠল 'ডুবো পাহাড়! ডুবো পাহাড়!' এ কথায় মুহূর্তের মধ্যে আরও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। নাবিকরা পাগলের মতো কেউ কেউ আর্তনাদ করে উঠল। স্বয়ম্ভুনাথ, দিগদর্শীর চিৎকার শুনে সামনে তাকিয়ে দেখতে পেলেন অন্ধকার জলতলের ভিতর থেকে জেগে-ওঠা সেই পাহাড়টাকে। সমুদ্রের জল ঘূর্ণির সৃষ্টি করেছে তার চারপাশে। আর সেদিকেই বিদ্যুতগতিতে ছুটে চলেছে ময়ূরপঙ্খি। স্বয়ম্ভুনাথ চিৎকার করে উঠলেন, 'বামে হাল মারো! হাল মারো!'—কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে গেল সমুদ্রগর্জনে। ডুবো পাহাড়ের ঘূর্নির মধ্যে এসে পড়ল জাহাজটা। আর কয়েক মুহূর্ত মাত্র, আর তার পরই ডুবো পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে ময়ূরপঙ্খি। জাহাজের সমস্ত মানুষ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে একযোগে চিৎকার করে উঠল! চিৎকার করে উঠলেন স্বয়ম্ভুনাথও। আর বুঝি শেষ রক্ষা হল না! আর মাত্র কয়েক কাছি ব্যবধান ডুবোপাহাড়ের সঙ্গে জাহাজটার...

ঠিক এ-পর্যন্ত স্বপ্নটা দেখে ঘুম ভেঙে গেল স্বয়ম্ভুনাথের। বিছানায় উঠে বসলেন তিনি। তাঁর কানে তখনও বেজে চলেছে নাবিকদের চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ! স্বয়ম্ভুনাথের ধাতস্থ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। তারপর তিনি বুঝতে পারলেন তিনি স্বপ্নই দেখছিলেন। কিন্তু উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে বাইরের রাস্তার দিক থেকে সত্যিই যেন একটা শোরগোলের শব্দ ভেসে আসছে! একজন ভৃত্য স্বয়ম্ভুনাথের কক্ষে প্রবেশ করেছে। স্বপ্নের মধ্যে জাহাজ ডুবোপাহাড়ে আছড়ে পড়তে দেখে স্বয়ম্ভুনাথ আতঙ্কে যে চিৎকার করে উঠেছিলেন ঘুমের ঘোরে, তা কানে যাওয়াতেই লোকটা কক্ষে প্রবেশ করেছে। স্বয়ম্ভুনাথ জানতে চাইলেন 'বাইরে ও কীসের শব্দ?'

ভৃত্য বলল, 'মালিক, বন্দরে মনে হয় কিছু একটা ঘটেছে! ওদিক থেকে সব লোকজন নগরীর ভিতরে প্রবেশ করছে।'

কথাটা শোনামাত্রই শয্যাত্যাগ করলেন স্বয়ম্ভুনাথ। তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ঘোড়ায় চেপে রাজপথে এসে দাঁড়ালেন। সত্যিই বন্দরের দিক থেকে দলে দলে মানুষ নগরীর অভ্যন্তরে এগোচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। আরব, আফ্রিকান, পারসিক, চৈনিক, নানা ধরনের, নানা জাতের মানুষ পালাচ্ছে শহরের দিকে। স্বয়ম্ভুনাথ একজনকে জিগ্যেস করল, 'ব্যাপারটা কী ঘটেছে?'

সে জবাব দিল, 'শুনেছেন নিশ্চই যে রাজা সামোরিন, পর্তুগিজদের সঙ্গে আলোচনার জন্য পুত্রসহ এক ব্রাহ্মণকে ও অপর এক ব্যক্তিকে তাদের জাহাজে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পর্তুগিজ দস্যুরা সামোরিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ব্রাহ্মণকে তারা মুক্তি দিয়েছে রাজার কাছে এ-সংবাদ প্রেরণের জন্য যে, আগামীকাল সূর্যাস্তের মধ্যে পর্তুগিজদের দাবি না মানলে তারা কালিকট ধ্বংস করবে। ব্রাহ্মণকে তারা মুক্তি দিলেও রাজপুত্র ও অপর সঙ্গীকে হত্যা করেছে তারা। শুধু তাই নয়, একদল ধীবর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেছিল, তাদেরও পর্তুগিজরা হত্যা করেছে। সামোরিন কী সিদ্ধান্ত নেবেন তা কারও জানা নেই, পর্তুগিজরাও হয়তো আজই আক্রমণ করে বসল বন্দর! কিছুই বিশ্বাস নেই ওদেরকে। ওদের জাহাজগুলো পাক খেতে শুরু করেছে বন্দরে। তাই সবাই বন্দর ছেড়ে পালাচ্ছে।'

কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ম্ভুনাথ ব্যাপারটা চাক্ষুস করার জন্য অশ্বপৃষ্ঠে এগোলেন বন্দরের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে জায়গায় পৌঁছে গেলেন তিনি। এখন বিকেল। সবাই পালিয়েছে। জনশূন্য হয়ে গেছে বন্দর। একটা গুদাম ঘরের আড়াল থেকে তিনি তাকালেন সমুদ্রের দিকে। দেখতে পেলেন পর্তুগিজ জাহাজগুলোকে। পর্তুগিজ নৌবহরের মাঝারি আকৃতির ও জাহাজগুলোকে আগে তিনি দেখেছেন। হাঙরের ঝাঁক যেমন শিকারের সন্ধানে উপকূলে পাক খায়, তেমনই ঝাঁক বেঁধে উপকূলের গা ঘেষে পাক খাচ্ছে রণতরীগুলো। তাদের পালগুলোকে সত্যিই সমুদ্রের ওপর জেগে থাকা হাঙরের পাখনার মতো দেখাচ্ছে। জাহাজের ডেকে বসানো কামানগুলোর মুখ সব বন্দরের দিকে ফেরানো। ভালো করে সেই রণপোতগুলোর দিকে তাকাবার পর তীর ঘেঁষে জাহাজগুলো কেন ঘুরছে তা বুঝতে পারলেন স্বয়ম্ভুনাথ। পর্তুগিজ জাহাজগুলোর প্রত্যেকটার মাস্তুলগুলোর গায়ের আড়কাঠ থেকে ঝুলছে মানুষের লাশ! সম্ভবত ওগুলো সেই ধীবরদের দেহই হবে। বন্দর নগরীর মানুষদের ব্যাপারটা দেখাবার জন্যই, পর্তুগিজদের বিরুদ্ধাচরণ করলে কী ফল হবে তা বোঝাবার জন্যই লাশগুলো ঝুলিয়ে কূলের গা ঘেঁষে পাক খাচ্ছে পর্তুগিজ নৌবহর। কালিকটের বুকে যে চরম দুর্যোগ ঘনিয়ে আসতে চলেছে তা এবার আর অনুমান করতে অসুবিধা হল না স্বয়ম্ভুনাথের। পরিত্যক্ত বন্দরে নিঃসঙ্গভাবে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ম্ভুনাথের সাধের ময়ূরপঙ্খি নাও। আর তার গা ঘেঁষে হাঙরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে রণপোতগুলো। পর্তুগিজরা তার জাহাজটাকে চেনে। হয়তো তাই তারা চট করে ডুবিয়ে দেবে না ময়ূরপঙ্খিকে। কিন্তু স্বয়ম্ভুনাথ মনে মনে ভেবে নিলেন তার নারীদের নিয়ে পরদিন চলে যাবেন বন্দর অঞ্চল ছেড়ে নগরীর ভিতর দিকে।

বন্দর থেকে নিজের বাসস্থানে ফিরে এলেন স্বয়ম্ভুনাথ। তাঁর অনুচরদের ডেকে পাঠিয়ে আলোচনায় বসলেন পরদিন সকালে, তাঁর গণিকালয়ের নারীদের শহরের অভ্যন্তরে কোথায়, কীভাবে স্থানান্তরিত করা হবে, সে ব্যাপারটা নিয়ে। অন্ধকার নামল কালিকট বন্দরের বুকে। অন্য দিনের মতো এদিন আর বন্দরে আকাশপ্রদীপ জ্বালালো না কেউ। সার সার সুউচ্চ দন্ডের মাথায় যে আলোগুলো দেখে জাহাজ, নৌকোগুলো বন্দরের অবস্থান বোঝে। নিকষকালো অন্ধকারে নিমজ্জিত হল বন্দর। অন্ধকার নামল সমুদ্রতেও। তবে কেউ কেউ দেখতে পেল, অন্ধকারে সমুদ্রের কূল ঘেঁষে শ্বাপদের চোখের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে পর্তুগিজ রণতরীর মশালের আলো।

অনুচরদের সঙ্গে আশু কর্তব্য নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলেন স্বয়ম্ভুনাথ। পরদিন নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নিয়ে একসময় চলে গেল তারা।

লোকগুলো চলে যাবার পর সামান্য কিছু আহার গ্রহণ করে বিছানায় শুতে যাচ্ছিলেন স্বয়ম্ভুনাথ। পরদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে করতে হবে বনিতাদের স্থানান্তরকরণের কাজে। বেলা দ্বিপ্রহরের মধ্যে সে-কাজ সম্পন্ন করে নিজেও এ গৃহের লোকজনকে নিয়ে চলে যাবেন নগরীর অভ্যন্তরে। এ বন্দোবস্ত করা হয়েছে। ঘরের কুলুঙ্গিতে জ্বলতে থাকা বড় প্রদীপটা নিভিয়ে ফেলতে যাচ্ছিলেন তিনি। ঠিক সেইসময় বাইরে রাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে স্বয়ম্ভুনাথের কানে এল অশ্বখুরের শব্দ। সে-শব্দ এসে থামল বাড়ির সদর দরজার সামনে।

এত রাতে কে এল? কোন জরুরি প্রয়োজনে তাঁর অনুচররা আবার ফিরে এলো নাকি?

না, তারা নয়, এক ভৃত্য এসে খবর দিল, 'সম্রাট সামোরিনের দরবার থেকে তাঁর এক পার্শ্বচর আর কয়েকজন সৈনিক এসেছে আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।'

খবরটা পাবার সঙ্গে সঙ্গেই সেই কক্ষ থেকে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলেন স্বয়ম্ভুনাথ। ফ্যাকাসে চাঁদের আলোতে তার সামনে অশ্বপৃষ্ঠে সম্রাটের এক ঘনিষ্ঠ পার্শ্বচর কোটকেশ্বর ও একদল অশ্বারোহী সৈনিক। সামোরিনের এই পার্শ্বচরের সঙ্গে কিঞ্চিৎ পরিচয় আছে স্বয়ম্ভুনাথের। যুবা বয়সে এই কোটকেশ্বর তার বেশ্যালয়ের গ্রাহক ছিলেন। তাকে দেখতে পেয়ে স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'আসুন, ভিতরে এসে আসন গ্রহণ করুন।'

কোটকেশ্বর বেশ উদ্বিগ্নভাবে বললেন, 'না, আজ আর সেই সময় নেই বণিক। কাল সকালে সম্রাট তাঁর প্রাসাদে আপনার সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খবরটাই জানাতে এলাম।'

সম্রাটের ইচ্ছা মানে তো আদেশ। কাজেই স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'আমি সম্রাটের আজ্ঞাবাহী দাস। তাঁর নির্দেশমতো যথাসময়ে তাঁর প্রাসাদে উপস্থিত হব।'

কোটকেশ্বর তাঁর জবাব শুনে বললেন, 'ধন্যবাদ।' তারপর স্বয়ম্ভুনাথকে আর কোনও প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে দলবলসমেত চলে গেলেন।

স্বয়ম্ভুনাথ ঘরে ফিরে এসে অনুমান করার চেষ্টা করতে লাগলেন, এই দুর্যোগে সম্রাট সামোরিন তাঁর মতো একজন বণিককে হঠাৎ ডেকে পাঠালেন কেন?

সকাল হল। সারারাত প্রবল উৎকণ্ঠার মধ্যে কেটেছে স্বয়ম্ভুনাথের। অনুচরেরা সকাল হতেই উপস্থিত হল তার বাড়িতে। আগেরদিনই কর্মপন্থা ঠিক করা ছিল। তবুও তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় কিছু সময় ব্যয় করতে হল তাঁকে। তারপর পোশাক পরিবর্তন করে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি। হঠাৎ তার চোখ পড়ল বাগিচার এক কোণে। সেখানে একটা গাছের ডাল ধরে দোল খাচ্ছে সেই শিম্পাঞ্জিটা। আর গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছোট্ট মেয়েটা—মৎস্যগন্ধা। কাজের চাপে উত্তেজনায় তাদের কথা যেন ভুলতেই বসেছিলেন তিনি। গাছের নীচ থেকে স্বয়ম্ভুনাথের দিকে তাকিয়ে যেন আবছা হাসি ফুটে উঠল মৎস্যগন্ধার মুখে। স্বয়ম্ভুনাথ অনুমান করলেন, সম্ভবত মেয়েটার ভয় কাটতে চলেছে। সে কি সুস্থ হয়ে আত্মপরিচয় দিতে পারবে? অবশ্য ওসব নিয়ে স্বয়ম্ভুনাথের বিশেষ কিছু ভাবার অবকাশ নেই। তাঁর মাথায় কেবলই ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজা সামোরিনের আহ্বানের কথা। স্বয়ম্ভুনাথ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। একজন পরিচারক ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়েছিল। স্বয়ম্ভুনাথ ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়লেন। গৃহসংলগ্ন বাগিচা ত্যাগ করে তিনি রাজপথে নেমে পড়লেন সামোরিনের প্রাসাদে যাবার জন্য।

দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই নগরবাসী পথে নেমে পড়েছে। কিন্তু সবার চোখে মুখেই কেমন যেন উত্তেজনার ভাব। ভোরবেলা হতেই যে ফেরিওলারা গোলাপ আর হাস্নুহানা ফুলের ডালি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে প্রতিদিনের মতো রোজগারের ধান্দায়, যাদের মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকে, তাদের ঠোঁটেও যেন হাসি নেই। জনতা কেউ পদব্রজে, কেউ অশ্বপৃষ্ঠে, কেউ বা গো-শকট অথবা পালকিতে চেপে এগিয়ে চলেছে নগরীর অভ্যন্তরে। তাদের সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ম্ভুনাথও এগিয়ে চললেন চারপাশে ভালো করে তাকাতে-তাকাতে।

এই ছ'-সাত মাস স্বয়ম্ভুনাথের অনুপস্থিতকালে নগরীর তেমন কিছু পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই রাস্তার পাশে রয়েছে নারকেলের পাহাড়, ছোবরার স্তূপ, রাশিকৃত বস্তাবন্দি পণ্য। মাঝে মাঝেই রয়েছে ফলের বাজার। সেখানে বিক্রি হচ্ছে আম, লেবু, শুকনো নারকেলের শাঁস। মিঠাইয়ের দোকানে বিক্রি হচ্ছে রঙবেরঙের মিঠাই। তাছাড়া সর্বত্র শামিয়ানার নীচে পান-সুপুরির দোকানতো আছেই।

চলতে-চলতে স্বয়ম্ভুনাথ এসে উপস্থিত হলেন পশু পাখির বাজারে। খাঁচাবন্দি অবস্থায় সেখানে বিক্রি হচ্ছে পায়রা, কথা বলা বড় বড় টিয়াপাখি, বানর, বেজি সহ নানারকম পশুপাখি। নাবিক ও জাহাজিদের কাছে কথা বলা পাখির প্রচুর চাহিদা। এখান থেকেই পাখি সংগ্রহ করে তারা। বাঁদর কিনে নিয়ে গিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অনেকে নারকেল পাড়ায়। গৃহস্থবাড়িতে বেজি পোষে অনেকেই। কালিকটে পশু পাখির বাজার থাকলেও খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া এখানে কোন ধরনের প্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ। এমনকী দংশক সর্পকেও হত্যা করা যাবে না। আইনভঙ্গকারীকে সামোরিনের নায়ার সৈনিকরা হাজতে পোরে। অন্যদিন এ-জায়গা ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে সরগরম থাকে, কিন্তু আজ যেন তেমন ভিড় নেই।

পশুপাখির বাজার থেকে রাস্তা বাঁক নিয়েছে কেন্দ্রের দিকে। আরও কিছুটা এগিয়েই ওষুধের বাজার। নানা ধরনের জড়িবুটি, শেকড়বাকড়, অদ্ভুত জিনিস বিক্রি হয় এখানে। যা শুধু রোগ নিরাময়ের জন্যই নয়, অন্যান্য নানা কাজে লাগে। নাবিকরা এবং যারা নিয়মিত গণিকালয়ে যায় তারাও এখানে আসা যাওয়া করে। দোকানগুালোতে রুপোর থালায় সাজানো থাকে ছোট ছোট পুরিয়াতে চুম্বকচূর্ণ আর গন্ডারের খড়গচূর্ণ। এ দুটোই মহার্ঘ্য জিনিস। দামে এবং কাজেও। খাদ্যের সঙ্গে চুম্বকচূর্ণ মিশিয়ে ভক্ষণ করলে নাকি বৃদ্ধ মানুষেরও যৌন ক্ষমতা ফিরে আসে। এ বাজারেই একমাত্র পাওয়া যায় নেপাল থেকে আনা সর্বরোগহরা বিশল্যকরণীর শিকড়। সোনার বিনিময়ে বিক্রি হয় তা। এসব অদ্ভুত জিনিস ছাড়াও এখানে বিক্রি হয় হরতকি- হলুদ-সর্পগন্ধা, যা ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে। রাস্তার পাশে ঝুড়িতে রাখা আছে চকচকে নিমফল। নিমতেল চর্মরোগ দূর করে, সমুদ্রর নোনা বাতাস লেগে নাবিকদের খসখসে হয়ে যাওয়া চামড়াকে আবার মসৃণ করে তোলে। স্বয়ম্ভুনাথ নিজেও নিমতেল মাখেন। আর তাঁর গণিকালয়ে এ-বাজার থেকেই নিমফল সরবরাহ করা হয়। বাজার সংলগ্ন রাজপথের ধারে রমণীরা বসে আছে ঘৃতকুমারী পাতার ঝাঁকা নিয়ে। শ্লেশসর্দিতে যা খুব উপকারী। এখানে কিন্তু লোকজনের ভিড় আগের মতোই মনে হল স্বয়ম্ভুনাথের। অসুখ আর যৌনতা, এ-দুটোর কোনওটাই তো আর দিনকাল বুঝে আসে না। কাজেই এখানে লোকজনের ভিড় লেগে থাকা স্বাভাবিক। পার্থক্য বলতে এখানে তিনি কয়েকজন অশ্বারোহী সৈনিককে দেখতে পেলেন।

চারপাশ দেখতে-দেখতে নগরীর মধ্যস্থলে পৌঁছে গেলেন স্বয়ম্ভুনাথ। এবার পরিবেশটা সত্যিই বেশ অন্যরকম মনে হল তাঁর। জনসাধারণের ভিড় তো আছেই কিন্তু সংখ্যায় তাদের থেকেও যেন অনেক বেশি অস্ত্রধারী সৈনিকের দল। অশ্বারোহী-সৈনিক, পদাতিক সৈনিক এমনকী হস্তিযূথে আসীন সৈনিকদেরও দেখা যাচ্ছে নানা সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘুরে বেড়াতে। সতর্ক চাহনি তাদের, চোয়াল কঠিন। যেন যুদ্ধর দামামা বাজতে চলেছে। এই সৈনিকরা অধিকাংশই নায়ার গোষ্ঠীর। দৃঢ় মজবুত শরীর তাদের। চুলগুলো মাথার ওপর ঝুটি করে বাঁধা। লোহার গহনা পরে তারা। এছাড়া সৈন্যদলে কিছু আরব যুদ্ধ ব্যবসায়ীও আছে। তারা নায়ারদের মতো কৃষ্ণকায় নয়, গাত্রবর্ণ তাদের শুভ্র। কোমরবন্ধনী থেকে তাদের দীর্ঘ তলোয়ার ঝোলে। সৈন্য ও জনতার ভিড় অতিক্রম করে স্বয়ম্ভুনাথ একসময় পৌঁছে গেলেন সম্রাট সামোরিনের প্রাসাদের সামনে। ঘোড়া থেকে নেমে সংলগ্ন আস্তাবলে ঘোড়া রেখে প্রাসাদের প্রবেশপথে উপস্থিত হলেন তিনি। প্রবেশতোরণের পাশেই খড়ের ছাউনির নীচে রয়েছে বিরাট বিরাট পিতলের জালা। জলসত্র। কাঠের বারকোশে রয়েছে নারকেলের টুকরো। প্রাসাদে প্রবেশের আগে ঠান্ডা জল ও নারকোলের টুকরো দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হয় সেখানে। অন্যদিনের মতো প্রাসাদের প্রবেশপথে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে আছে। তাদেরকে এদিনও ঠান্ডা জল আর নারকোল দিয়ে আপ্যায়ন করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রাসাদের প্রবেশমুখে রাজকীয় সৈনিকের দল তার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে 'আজ আর সম্রাট সাক্ষাৎপ্রার্থীদের দর্শন দেবেন না, জরুরি কাজে আজ ব্যস্ত আছেন তিনি।'

অনেকটা জমি নিয়ে সম্রাট সামোরিনের বিশাল প্রাসাদ। কিন্তু ইট, কাঠ, পাথর নির্মিত সম্রাটের প্রাসাদ কেমন যেন ছিরিছাদহীন। পরিকল্পনা করে এ প্রাসাদ বানানো হয়নি। যখন যেমন প্রয়োজন হয়েছে তখন তেমনভাবে কক্ষ বানানো হয়েছে প্রাসাদে। নান্দনিক ভাবনা বা শিল্প সুষমার ব্যাপারটায় তেমন জোর দেওয়া হয়নি। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের রাজপ্রাসাদগুলো দেখলে যেমন চোখ জুড়িয়ে যায়, এ-প্রাসাদের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়। সর্বত্র কেমন যেন রুক্ষতা ফুটে আছে। ভারতীয় স্থাপত্যের তুলনায় এ স্থাপত্যের অনেক বেশি মিল আছে আরবের রুক্ষ মরুঅঞ্চল বা আফ্রিকার স্থাপত্যের। প্রাসাদের বহিগাত্রের দেওয়ালগুলো অলঙ্করণহীন শুষ্ক-কঠিন-নিষ্প্রাণ। প্রাসাদের চারপাশ তিনটে স্তরে খুঁটির বেড়া দিয়ে ঘেরা। প্রতিটা খুঁটির সামনে ভীষণাকায় শূল হাতে দাঁড়িয়ে আছে ধাতু বা কচ্ছপের শক্তখোলের বর্ম-আঁটা সৈন্যরা। কোমরবন্ধ থেকে ঝুলছে আভূমিলম্বিত তলোয়ার। কারও পিঠে তিরধনুকও আছে। মুখমণ্ডল ভাবলেশহীন, শুধু তাদের অক্ষিগোলক ঘুরছে চারপাশে। সৈনিকদের এই ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা বিনা অনুমতিতে অতিক্রম করে মাছিও প্রবেশ করতে পারে না এ প্রাসাদে। নিরাপত্তা বলয়ের তিনটে তোরণ অতিক্রম করে তারপর উপস্থিত হতে হয় প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশ তোরণের সামনে।

স্বয়ম্ভুনাথ পথপার্শ্বে বহিঃতোরণের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই এক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মচারীর নেতৃত্বে রক্ষীদল তাঁর চারপাশে ব্যূহ রচনা করল। পদস্থ রাজকর্মচারী স্বয়ম্ভুনাথের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে প্রশ্ন করলেন 'কি চাই?'

স্বয়ম্ভুনাথ জবাব দিলেন, 'আমি সম্রাটের সাক্ষাৎপ্রার্থী।'

রাজসৈনিক বললেন, 'সম্রাট আজ কাউকে দশর্ন দেবেন না। কবে দর্শন দেবেন তাও এখন বলা যাবে না। ফিরে যান। রাজ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আসবেন।'

স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'আমি কোনও আবেদন নিবেদন নিয়ে সম্রাটের সাক্ষাৎ প্রার্থী নই। তিনি নিজেই আমাকে কোনও জরুরি প্রয়োজনে সাক্ষাতের জন্য তলব করেছেন। আমার নাম স্বয়ম্ভুনাথ। পেশায় সমুদ্রবণিক। কালিকটেরই বাসিন্দা।'

স্বয়ম্ভুনাথের কথা শুনে সেই পদস্থ রাজসৈনিক আর একবার ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন তাঁকে। সম্ভবত বণিক স্বয়ম্ভুনাথের অভিজাত চেহারা ও পোশাক দেখে তাঁর কথা কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হল প্রবেশতোরণের সৈনাধ্যক্ষের। তবুও তিনি একটু ইতস্তত করে বললেন, 'আপনি এখানে অপেক্ষা করুন। আমি খোঁজ নিচ্ছি যে সম্রাট বর্তমানে আপনার সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী কিনা?'

দ্বারপ্রান্তে সৈনিকদের ঘেরাটোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলেন বনিক। আর দলনেতার নির্দেশে একজন বয়স্ক সৈনিক এগোল প্রবেশতোরণের ভিতর দিকে আগন্তুকের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য।

বেশ কিছুক্ষণ বাদে লোকটা ফিরে এসে দলনেতাকে কী যেন বলল। সৈনাধ্যক্ষ, স্বয়ম্ভুনাথকে বললেন, 'আপনার প্রাসাদে প্রবেশের অনুমতি মিলেছে। রক্ষীরা আপনাকে সেখানে পৌঁছে দেবে।'

তোরণের অভ্যন্তরে প্রবেশের আগে অবশ্য প্রথামাফিক কয়েকজন সৈনিক স্বয়ম্ভুনাথের পোশাকে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে নিল যে তার শরীরে কোনও লুকোনো অস্ত্র আছে কিনা। স্বয়ম্ভুনাথ যে অস্ত্রবিহীন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পর দুজন সৈনিক তাঁকে নিয়ে চলল প্রাসাদের দিকে। প্রাসাদের মূল প্রবেশদ্বারে পৌঁছোবার আগে আরও দুটো তোরণ অতিক্রম করার সময় একইভাবে তল্লাসী চালানো হল তার দেহে। অবশেষে প্রাসাদের অভ্যন্তরে প্রবেশতোরণের সামনে ফাঁকা জমিতে স্বয়ম্ভুনাথকে পৌঁছে দিয়ে গেল সে দুজন রক্ষী। তারা বহির্দ্বারের রক্ষী। ভেতরে প্রবেশ করার অধিকার নেই তাদেরও। প্রাসাদের ভিতর ও প্রাসাদ সংলগ্ন এ অঞ্চলের নিরাপত্তার ভার বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সম্রাটের দেহরক্ষীদের। জায়গাটা থিক থিক করছে তাদের ভিড়ে। দীর্ঘাকার চেহারা তাদের, পরনে রক্তবর্ণের পোশাকের ওপর ধাতু বা গন্ডারের চামড়ার বর্ম। মাথায় শিরস্ত্রাণ, পায়ে হাঁটু পর্যন্ত ফিতে দিয়ে বাঁধা চর্মপাদুকা। চওড়া কোমরবন্ধ থেকে ঝুলছে দীর্ঘ তলোয়ার। কাঁধে ধনুক আর তুণীর। শুধু ধারালো অস্ত্রই নয়, একমাত্র এদের কাছেই বারুদ-ঠাসা বন্দুকও আছে। এই বন্দুকগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে চীনা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। সৈনিকদের ভিড়ের মাঝে কিছু উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীও আছে। তাদের অনাবৃত ঊর্ধাঙ্গে চুনি-ফিরোজা-নীলকান্তমনিখচিত স্বর্ণালঙ্কার তাদের পরিচয় জানিয়ে দিচ্ছে। জায়গাটাতে পৌঁছে একটু থমকে দাঁড়ালেন স্বয়ম্ভুনাথ। কিন্তু সৈনিক আর রাজকর্মচারীদের জটলার মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সম্রাটের পার্শ্বচর কোটকেশ্বরও। তিনি স্বয়ম্ভুনাথকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে বললেন, 'প্রাসাদের ভিতরে চলুন, সম্রাট আপনার জন্য প্রতীক্ষা করছেন।'

কোটকেশ্বর সঙ্গে থাকায় সৈনিকরা আর স্বয়ম্ভুনাথকে প্রাসাদে প্রবেশে বাধা দিল না। তবে ভিতরে ঢুকে এক জায়গাতে একটু থামতে হল স্বয়ম্ভুনাথকে। প্রাসাদে প্রবেশ করতেই দেখা গেল অলিন্দের দু-পাশে সার সার ঘর। রাজকর্মচারীরা সেখানে বসে কাজ করেন। প্রাসাদে যারা প্রবেশ করে একটা ঘরে তাদের নাম নথিভুক্ত করা হয়। তালপাতার ওপর শক্ত লোহার কলম দিয়ে নাম লেখা হয়। এ কলমে কোন কালি থাকে না। তালপাতার গায়ে তীক্ষ্ন-শক্ত-সরু কলমের মুখ দিয়ে আঁচড় কেটেই অক্ষর ফুটিয়ে তোলা হয়। কোটকেশ্বর সঙ্গে থাকলেও নিয়মানুসারে সেখানে নাম পরিচয় নথিভুক্ত করতে হল স্বয়ম্ভুনাথকে। তারপর কোটকেশ্বরের সঙ্গে তিনি চললেন সম্রাটের দরবারের দিকে।

সামোরিনের প্রসাদের বাইরেটা ছিরিছাঁদহীন হলেও ভিতরটা কিন্তু একে বারেই তা নয়। ঝকঝকে শীতল শ্বেতপাথরের মেঝে। দেওয়ালগাত্রেও মসৃণ পাথর বসানো। তার ওপর খোদাই করা রুপোর পাতের অলঙ্করণ। অলিন্দের প্রতিটা কোনায় নানা ধরনের পাথর অথবা পিতলের মূর্তি বসানো। আর কুলুঙ্গিগুলোতে রাখা ঝকঝকে তকতকে বিরাট বিরাট পিতলের প্রদীপ। সারা প্রাসাদ গোলাপের পাপড়ির সুগন্ধে আমোদিত। সপ্তাহে একদিন গোবরজল দিয়ে সারা প্রাসাদ জীবাণুমুক্ত করা হয় সনাতন রীতিতে। তারপর গোলাপের পাপড়ি আর গোলাপজল ছিটানো হয় সারা প্রাসাদ জুড়ে। প্রাসাদের ভিতর পরিচারিকার দল ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা সবাই উচ্চবর্ণের হিন্দু নারী। তারা কেউ প্রদীপে তেল ঢালছে, আবার কেউ দেওয়ালগাত্রের অলঙ্করণ বা মূর্তিগুলো ঘষামাজা করছে। সেইসব পরিচারিকা ও ঝলমলে পোশাক পরা রাজরক্ষীদের পাশ কাটিয়ে বেশ কয়েকটা কক্ষ অলিন্দ অতিক্রম করে কোটকেশ্বর, স্বয়ম্ভুনাথকে নিয়ে প্রবেশ করলেন রাজদরবারে।

সোনা-রুপোর কাজ করা দরবারকক্ষ। রুপোর সার সার প্রদীপদানের ওপর বসানো বিরাট বিরাট প্রদীপ থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে দরবারকক্ষে। দেওয়াল, স্তম্ভর গায়ে বসানো সোনার অলঙ্করণগুলো ঝিলিক দিচ্ছে সেই আলোতে। সোনার সিংহাসনের ওপর বসে আছেন রাজা সামোরিন। তাঁর কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত শুভ্র রেশমবস্ত্রে আচ্ছাদিত। কৃষ্ণবর্ণের ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। না, অনাবৃত ঠিক নয়। তার কণ্ঠ থেকে বুক পর্যন্ত স্বর্ণছটায় মোড়া। সেই হারের ছড়ায় বসানো আছে রক্তের ছটার মতো লাল ব্রহ্মদেশের চুনি, গাঢ় সবুজ পান্না, ফিরোজা, নীলকান্ত মণি আর অবশ্যই চোখধাঁধানো হীরকখণ্ড। এছাড়া বাজুবন্ধ, অঙ্গদ আর পায়ে মোটা বালার মতো সোনার মল তো আছেই। সম্রাটকে ঘিরে দাঁড়িয়ে তিনজন সুন্দরী বাঁদি। তাদের একজন সিংহাসনের পিছনে দাঁড়িয়ে সোনার হাতলঅলা চমরিগাইয়ের চামর দোলাচ্ছে। আর অপর দুজন সিংহাসনের দুপাশে দাঁড়িয়ে। একজনের হাতে লম্বা নলঅলা রূপোর জলপাত্র। রাজার তৃষ্ণা লাগলে সে ওই লম্বা-বাঁকানো নল দিয়ে জল ঢেলে দেয় রাজার মুখে। আর একজন একটা রুপোর রেকাবিতে পানের খিলি সাজিয়ে দাঁড়িয়ে। কালিকটবাসীদের মতো রাজা সামোরিনও পান পছন্দ করেন। যে-বেদির ওপর সম্রাটের সিংহাসন তার নীচে মাটির ওপর চৌকোনো ছোট ছোট পাথরের বেদির ওপর বসে আছেন প্রধান সেনাপতিসহ সামোরিনের কয়েকজন ঘনিষ্ট পার্শ্বচর। আর দেওয়ালের ঘা ঘেঁষে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সম্রাটের একান্ত বিশ্বাসী জনা দশেক অঙ্গরক্ষক।

সামোরিনের সামনে উপস্থিত হলে তাঁকে নজরানা দিতে হয়। সোনা ছাড়া কোনও নজরানা গ্রহণ করেন না সামোরিন। নজরানা এক কণা হোক তাতে তেমন ক্ষতি নেই, কিন্তু সেটা সোনা হতে হবে। স্বয়ম্ভুনাথ শুনেছিলেন এর আগেরবার ওই পর্তুগিজ অ্যাডমিরালটা যখন এদেশে প্রথম এসেছিল তখন নাকি সে সামোরিনের নজরানা হিসেবে তার চাকরদের হাতে বেশ কিছু রঙিন কাপড়ের টুকরো, প্রবালের মালা, এক পাত্র চিনি, তেল আর মধু দিতে চেয়েছিল। হয়তো পর্তুগিজরা আফ্রিকার উপকূলে যে উপজাতি রাজারা থাকেন তাঁদের সঙ্গে কালিকটের রাজা সামোরিনকে গুলিয়ে ফেলেছিল। স্বাভাবিক নিয়মেই ভাস্কোর নজরানা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং খবরটা সামোরিনের কানে যাওয়াতে প্রাথমিক অবস্থাতেই যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হন ভাস্কোর প্রতি।

স্বয়ম্ভুনাথ, সম্রাটের সিংহাসনের নীচে দাঁড়িয়ে প্রথমে নতজানু হয়ে তাঁকে প্রণাম করে বেশ কয়েকটা স্বর্ণমুদ্রা নজরানা স্বরূপ তাঁর পায়ের কাছে নামিয়ে কিছুটা পিছু হটে দাঁড়ালেন। সিংহাসনে বসা সামোরিন মৃদু দৃষ্টিপাত করলেন তাঁর পায়ের সামনে রাখা স্বর্ণমুদ্রাগুলোর দিকে। সামোরিন এরপর তাঁর পরিচর্যারত দাসী ও সৈনিকদের চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন কক্ষ ত্যাগ করার জন্য। ধীরে ধীরে কক্ষত্যাগ করল তারা। একজন দাসী অবশ্য যাবার আগে স্বর্ণমুদ্রাগুলো উঠিয়ে নিয়ে গেল। দরবারসংলগ্ন বেশ কিছু ছোট ছোট কক্ষ আছে। সেসব কক্ষের দরজাও দরবারে প্রবেশ দরজাও বন্ধ হয়ে গেল তারপর।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে স্বয়ম্ভুনাথের দিকে তাকিয়ে রইলেন সামোরিন। তারপর স্বয়ম্ভুনাথকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন 'দেশে ফেরার সময় ওই পর্তুগিজ জলদস্যু ভাস্কোর সঙ্গে সমুদ্রে আপনার সাক্ষাৎ হয়েছিল?'

প্রশ্নটা শুনে স্বয়ম্ভুনাথ বুঝতে পারলেন, যে-নাবিকরা তার মৃচ্ছকটিকে সঙ্গী হয়েছিল তারাই মাটিতে নামার পর খবরটা ছড়িয়েছে এবং কোনওভাবে অতি দ্রুত সে-সংবাদ পৌঁছে গেছে সম্রাটের কানে। যে গুপ্তচরের দল বন্দর অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় তাদের মাধ্যমেও হয়তো এ-সংবাদ পেয়ে থাকতে পারেন সামোরিন। এ ঘটনার জন্য কি তাঁকে শাস্তি দেবেন তিনি?

কিন্তু ব্যাপারটা অস্বীকার করার আর কোনও উপায় নেই। কাজেই স্বয়ম্ভুনাথ, মাথা নীচু করে জবাব দিলেন 'হ্যাঁ, মাসাধিক কাল আগে আফ্রিকা উপকূলের কাছাকাছি মাঝসমুদ্রে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। আমার মৃচ্ছকটিককে দেখতে পেয়ে তারাই আমাদের ঘিরে ধরেছিল চারপাশ থেকে।'

'পর্তুগিজ জলদস্যুটা আপনার ময়ূরপঙ্খিতে পা রেখেছিল?' জানতে চাইলেন সামোরিনের এক পার্শ্বচর।

স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'না, সে মৃচ্ছকটিকে আসেনি। তবে বহু পর্তুগিজ নাবিক আমার ময়ূরপঙ্খিতে সময় কাটিয়েছে। আমাকে ভাস্কোর জাহাজে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করানোর জন্য।'

'কী কথাবার্তা হয়েছিল আপনাদের মধ্যে? সে কী কারণে এখানে আসছে তার কোনও ইঙ্গিত পেয়েছিলেন আপনি?' অপর একজন পার্শ্বচর প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন পাশ থেকে।

এ-প্রশ্নের জবাব দেবার সময় স্বয়ম্ভুনাথ মৃদু মিথ্যার আশ্রয় নিলেন। কারণ, তার জানা নেই যে, সেই পর্তুগিজ নৌবহরের দলপতি ভাস্কোর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারটা সামোরিন অপরাধ হিসাবে গণ্য করেছেন কিনা? স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'পর্তুগিজরা জেপাং নারীদের পছন্দ করে। অ্যাডমিরাল আমাকে তার নাবিকদের জন্য জেপাং নারী জোগাড় করার বরাত দিয়েছিল। তাঁর কথাবার্তা শুনে আমার মনে হয়েছিল যে সে মহামান্য রাজার অতিথি হয়ে এদেশে আসছে। আর সেজন্য আমি তার প্রস্তাবে সম্মত হই এবং জেপাং থেকে নারী সংগ্রহ করে এনেছি।'

পার্শ্বচর বললেন, 'কিন্তু কালিকটে নামার পর নিশ্চই বুঝতে পারছেন যে সেই ধূর্ত-শয়তান-পর্তুগিজটা কেন আবার ফিরে এসেছে এখানে? আগের বার সে এসেছিল বণিকের ছদ্মবেশে সরেজমিনে তদন্ত করতে। আর এবার এসেছে এ-দেশটার দখল নিতে। তার সঙ্গে অত নৌবহর দেখে আপনার মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়নি?'

স্বয়ম্ভুনাথ জবাব দিলেন, 'আমার সঙ্গে যখন তার সাক্ষাৎ হয় তখন তার সঙ্গে একটা নৌবহর ছিল ঠিকই, তবে এত বড় নৌবহর ছিল না। সম্ভবত অন্য নৌবহরগুলো পরবর্তীকালে তার সঙ্গে সমুদ্রপথে মিলিত হয়। আমি বনিক। বছরের সাত-আট মাসই আমি সমুদ্রে কাটাই আমার ভাসমান গণিকালয় নিয়ে। স্থলে যে-কয়মাস কাটাই তখন আমার গণিকালয় নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে, রাজনীতির খুঁটিনাটি ব্যাপার আমার তেমন জানা হয় না। একটা ব্যাপারই শুধু আমি জানি, আমাদের বণিকদের মাথার ওপর সম্রাট সামোরিন আছেন, তাই আমরা বিপদমুক্ত। বন্দরে নামার পর লোকমুখে পর্তুগিজদের হুমকির ব্যাপারটা শুনলাম। আর তাদের নৃশংসতাও প্রত্যক্ষ করলাম। নিরীহ ধীবরদের হত্যা করে মাস্তুলে টাঙিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা। শুনলাম সম্রাট যাদের পর্তুগিজদের জাহাজে দৌত্যকার্যে পাঠিয়েছিলেন তাদেরও কাউকে কাউকে নাকি হত্যা করেছে তারা।'

পার্শ্বচর বললেন, 'ঠিকই শুনেছেন। পর্তুগিজরা শর্ত দিয়েছে, কালিকটের সমৃদ্ধিমূলে যে আরব ব্যবসায়ীরা আছেন তাঁদের বিতাড়িত করতে হবে, কোনও আরব জাহাজকে বন্দরে আশ্রয় দেওয়া যাবে না। বন্দরের বাণিজ্যের সম্পূর্ণ অধিকারও তাদের দিতে হবে। কালিকটে দুর্গ নির্মাণ করবে তারা। যেসব শর্তর কোনওটাই মানা সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। তাই যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী।' এ কথা বলার পর অমাত্য মৃদু হেসে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি জপাং নারীদের নিয়ে কী করবেন এখন? মাঝসমুদ্রে গিয়ে পর্তুগিজদের কাছে তাদের তুলে দেবেন?'

স্বয়ম্ভুনাথ মাথা নীচু করে বললেন, 'তার আর কোনও প্রশ্নই নেই। আমি তো আগেই নিবেদন করলাম যে, ওই পর্তুগিজ অ্যাডমিরালের উদ্দেশ্য জানলে আমি কখনই তার প্রস্তাবে রাজি হতাম না। আপনারা চাইলে আমি আপনাদের হাতে জেপাং নারীদের তুলে দিতে পারি।'

এতক্ষণ রাজা সামোরিন মনোযোগ দিয়ে তাঁর পার্শ্বচরদের সঙ্গে স্বয়ম্ভুনাথের কথোপকথন শুনছিলেন। তিনি এবার বলে উঠলেন, 'আপনি ওই পর্তুগিজদের হাতেই জপাং রমণীদের তুলে দেবেন।'

সম্রাট কি তাঁকে ব্যঙ্গ করলেন? এরপরই কি শত্রুপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগে রাজদণ্ড ঘোষিত হতে চলেছে? সামোরিনের কথা শুনে একটু ভীতভাবে স্বয়ম্ভুনাথ তাকালেন সামোরিনের দিকে। সামোরিন তাকালেন তাঁর বেদির ঠিক নীচেই উপবিষ্ট সেনাপতির দিকে। সেনাপতি, স্বয়ম্ভুনাথকে প্রশ্ন করলেন, আপনি বৃশ্চিক দ্বীপে আগে একবার গেছিলেন, তাইনা?'

কালিকট থেকে দক্ষিণে সমুদ্রপথে একদিন সময় লাগে সে দ্বীপে যেতে। বছর কুড়ি আগেও সে দ্বীপ জনমানবহীন ছিল। বড় বড় বিছার দল সে দ্বীপে ঘুরে বেড়ায়, যার একটা দংশনে বিরাট আরবি ঘোড়াও মারা যায়। যে-কারণে সে দ্বীপে কেউ বসতি স্থাপন করেনি। কিন্তু সামোরিন যখন সিংহাসনে বসলেন তখন মন দিলেন উপকূল সংলগ্ন অঞ্চলে জলদস্যু দমনের কাজে। তাদের বহু নৌকো জাহাজ ডোবানো হল। বহু জলদস্যুকে শূলে চড়ানো হল, মুণ্ডচ্ছেদ করা হল। একসময় ভীত-সন্ত্রস্ত জলদস্যুরা দলে দলে আত্মসমর্পণ করতে লাগল কালিকট বন্দরে এসে। সংখ্যাটা প্রায় হাজারের মতো। সামোরিন পড়লেন সমস্যায়। এতগুলো লোককে নিয়ে তিনি কী করবেন? একে তো এতগুলো লোককে রাখার বড় কয়েদখানা নেই কালিকটে। যদি কোনওভাবে তাদের কোথাও রাখার ব্যবস্থাও করা যায় তবে প্রচুর অর্থ রাজকোষ থেকে বেরিয়ে যাবে তাদের ভরণপোষণের জন্য। আবার তাদের স্বাধীন ভাবে নাগরিক সমাজে ছেড়েও রাখা যাবে না। কারণ, তাদের রক্তে অপরাধপ্রবণতা আছে, নরহত্যার নেশা আছে। তারা জনজীবনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে পারে। অবশেষে সামোরিনের এক পার্শ্বচরের পরামর্শে সমাধানসূত্র মিলল।

জলদস্যুদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে যাদের দলপতি নির্বাচন করা হয়েছিল তাদেরকে বলা হল দলবল নিয়ে ওই জনহীন বৃশ্চিকদ্বীপে চলে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষআবাদ-মাছ শিকার করে জীবনধারণ করবে তারা। সামোরিন অবশ্য তাদের ঘরবাড়ি তৈরি করার জন্য, পরিকাঠামো তৈরির জন্য প্রতিবছর তাদের কিছু অর্থ সাহায্য করবেন। আর তার পরিবর্তে প্রয়োজন হলে সামোরিনের পক্ষ অবলম্বন করে উপকূল অঞ্চলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে সে লোকগুলো। সামোরিন অবশ্য এ-কথাও জানিয়েছিলেন যে, দস্যুপতিরা যদি 'তার শর্ত না মানে তবে সবাইকে একটা বড় জাহাজে তুলে মাঝসমুদ্রে সেই জাহাজকে তিনি ডুবিয়ে দেবেন। কাজেই শর্ত মানতে বাধ্য হয়েছিল জলদস্যুরা। বেঁচে থাকার কিছু উপকরণসহ তাদের নামিয়ে আসা হয়েছিল সেই বৃশ্চিক দ্বীপে। সামোরিন হয়তো এও ভেবে থাকতে পারেন যে-ওই দ্বীপে গেলে বিছের কামড়ে, সাপের কামড়ে বা দ্বীপের স্যাঁতস্যাঁতে জলবায়ুতে রোগে ভুগে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে দলটা। আর কোনও দুর্ভাবনা থাকবে না কালিকটবাসীর।

কিন্তু তা হয়নি। কিছু লোক ওভাবে মারা গেছিল ঠিকই, কিন্তু বাকিরা বেঁচে গেছিল। কাজেই সামোরিনকেও শর্তমতো তাদের সাহায্য পাঠাতে হয়। তবে কাজটা করে যে তিনি ভালোই করেছেন তা তিনি বুঝতে পেরেছেন বছর সাতেক আগে। রাজা যখন অতর্কিতে কালিকট বন্দরে হামলার জন্য সমুদ্রে নৌ সমাবেশ ঘটাচ্ছিলেন তখন সে খবর পেয়ে কালিকট অধিপতি দ্বীপবাসী জলদস্যুদের সাহায্য চেয়েছিলেন। সামোরিনের ডাকে সাড়া দিয়েছিল তারা। নারকেল গুড়ির তৈরি একধরনের কেনো থেকে ওরা দূরগামী তীর ছোড়ে। সেই তীরের ডগায় বাঁধা থাকে জ্বলন্ত পিণ্ড। যেখানে সেই তীর এসে পড়ে মুহূর্তে সেখানে আগুন ধরে যায়। তাদের নীল রং করা নৌকা আর নীল পোশাক সমুদ্রের জলের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে যে-চট করে তাদের উপস্থিতি বোঝা যায় না। সামোরিনের ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে ঝাঁকে ঝাঁকে কেনো নৌকো নিয়ে বেরিয়ে ঘিরে ধরেছিল কন্নোনরের রণপোত গুলোকে। তারাও কিছু কামানের গোলায় মারা পড়েছিল ঠিকই কিন্তু তির ছুড়ে আগুন লাগিয়ে কন্নোনরের জাহাজগুলোকে ডুবিয়ে দিয়েছিল। ব্যর্থ হয়েছিল কন্নোনরের কালিকট অধিকারের ইচ্ছা। আর তারপর থেকে সামোরিন ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সেই বৃশ্চিক দ্বীপবাসীকে খুশি রাখার চেষ্টা করেন। তাদের আবদার রক্ষা করার চেষ্টা করেন প্রায়শই। বিভিন্ন জাতির মানুষ আছে সেখানে। বিভিন্ন ধর্মেরও। মলাক্কা, সিংহলি, চৈনিক, পারসিক এবং অবশ্যই আরবীয়। কিছু শ্বেতাঙ্গও আছে। তবে তাদের এখন একটাই পরিচয়। তাদের সেই দ্বীপের নামানুসারে বৃশ্চিক বলে ডাকা হয়। প্রাক্তন জলদস্যুদের বর্তমান সর্দারের নাম মারীচ। জাতে যে সিংহলী। ঘোর কৃষ্ণবর্ণের দানবাকৃতী চেহারা তার। এখনও যদি সে কারও দিকে তাকায় তার রক্ত জল হয়ে যায়। রাজ নির্দেশেই একবার তার সঙ্গে বৃশ্চিক দ্বীপের তটরেখায় সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছিল স্বয়ম্ভুনাথের। সেনাপতির প্রশ্নের জবাবে স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'হ্যাঁ, রাজনির্দেশেই সে-দ্বীপের তটরেখায় পাঁচ বছর আগে পদার্পণ করেছিলাম আমি। কিছু নিম্নশ্রেণির নারীকে তাদের হাতে তুলে দিয়ে এসেছিলাম, তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য। রাজকোষ থেকেই তার ব্যয় মেটানো হয়েছিল।'

সেনাপতি বললেন, 'হ্যাঁ, সে কথা স্মরণ করেই আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সম্রাট। এই কালিকটের যাবতীয় সমৃদ্ধির মূলে আপনারা অর্থাৎ নানা শ্রেণির বনিক সম্প্রদায়। সম্রাট আপনাদের বিশ্বাস করেন। এবং এও বিশ্বাস করেন যে এই কালিকটকে আপনারা নিজের মায়ের মতোই ভালোবাসেন। এ-ব্যাপারে কোনও সন্দেহের কোনও অবকাশ আছে কি?'

স্বয়ম্ভুনাথ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন। 'না, নেই। কালিকট আমার মায়ের সমান। এখানেই আমি জন্মেছি, বড় হয়েছি, আমার এই যাবতীয় সমৃদ্ধির মূলে এই কালিকট বন্দর। এ দেশকে আমি মায়ের মতোই শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি।'

সেনাপতি ও অন্যান্যরা স্বয়ম্ভুনাথের জবাব শুনে সন্তুষ্ট হলেন। এমনকী এই দুর্যোগের সময়ও আবছা হাসি ফুটে উঠল যেন রাজা সামোরিনের ঠোঁটের কোণে।

সেনাপতি বললেন, 'কাল সূর্যোদয় পর্যন্ত পর্তুগিজরা তাদের শর্তপালনের চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। কাল সকাল থেকেই হয়তো তারা গোলাবর্ষণ করবে বন্দরে। কারণ, তাদের শর্ত মানার কোনও প্রশ্নই নেই। আমার নায়ার সেনারা যথোপযুক্ত জবাব দেবে তাদের। আপনি জানেন যে নায়ার সেনারা মরতে ভয় পায় না। ইতিপূর্বে বিভিন্ন ঘটনায় তা প্রমাণিত। কিন্তু পর্তুগিজরা এবার দলে ভারী হয়ে এসেছে। অনেক রণপোত, অনেক কামান তাদের। দু-দিক থেকে অর্থাৎ বন্দরের দিক থেকে এবং সমুদ্রপথে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করলে তাদের পরাস্ত করা সহজ হবে। সেজন্য বৃশ্চিক দ্বীপের অধিবাসীদের সাহায্য প্রয়োজন। কিন্তু সে দ্বীপে যেতে হলে যে-কোনও জাহাজকে বা নৌকোকে পর্তুগিজদের রণপোত অতিক্রম করে যেতে হবে। যা কেবলমাত্র আপনার দ্বারাই সম্ভব। সম্রাট আপনার কাছে একটা পত্র ও পেটিকা তুলে দেবেন দ্বীপের দলপতি মারীচের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য। আপনি তারপর সে-দ্বীপেই অবস্থান করবেন। দুর্যোগ কেটে গেলে, পর্তুগিজরা ধ্বংস হলে বা পালিয়ে গেলে সেই পেটিকা নিয়ে আপনি আবার ফিরে এসে তা তুলে দেবেন সম্রাটের হাতে...

সেনাপতির কথা শেষ হবার আগেই স্বয়ম্ভুনাথ বিস্মিতভাবে বললেন, 'পর্তুগিজরা তাদের নৌবহরের ব্যূহ অতিক্রম করে আমাকে বৃশ্চিকদ্বীপে যেতে দেবে কেন?'

সেনাপতি বললেন, 'সম্ভবত যেতে দেবে। তার জন্য কৌশল অবলম্বন করতে হবে। কী কৌশল তা আমরা ভেবে রেখেছি। আপনি বলবেন যে, পর্তুগিজদের সঙ্গে মাঝসমুদ্রে সাক্ষাতের ব্যাপারটা, তাদের জন্য জপাং নারী সংগ্রহের ব্যাপারটা সম্রাট জেনে গেছেন। তিনি এ হেন ব্যাপার জেনে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে আপনার বন্দরস্থিত গণিকালয়ের নারীসমেত সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছেন এবং জেপাং নারীসমেত আপনাকে কাল সূর্যোদয়ের পূর্বেই কালিকট ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অগত্যা আপনি পর্তুগিজদের হাতে জেপাং নারীদের তুলে দিয়ে দক্ষিণের কোনও বন্দরে চলে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, অর্থাৎ পর্তুগিজরা যদি কালিকটে আধিপত্য কায়েম করতে পারে, তবে আপনি আবার ফিরে আসবেন। আপনি জেপাং নারীদের পর্তুগিজদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছেন দুটো কারণে। প্রথম কারণ, আপনি ব্যবসায়ী। যে-কোনও মূল্যে ব্যবসায়িক চুক্তি পালন করা আপনার ধর্ম। আর দ্বিতীয়ত, আপনি আশা রাখছেন যে, এ-কাজ সম্পন্ন করার জন্য ভবিষ্যতে পর্তুগিজদের আশ্রয় পাবেন আপনি।'

কথাটা শুনে স্বয়ম্ভুনাথ একটু আমতা আমতা করে বললেন, 'কিন্তু তাদের কি বিশ্বাস করানো যাবে ব্যাপারটা?'

সম্রাটের একজন পার্শ্বচর বলে উঠলেন, 'আপনার তাৎক্ষণিক উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে ব্যাপারটা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। আমরা মূল পরিকল্পনাটা কষেছি। ব্যাপারটা সামাল দেবার দায়িত্ব আপনার।'

তার কথা শুনে স্বয়ম্ভুনাথ চুপ করে গেলেন।

এরপর মুখ খুললেন স্বয়ং সামোরিন। তিনি বললেন, 'কালিকটের স্বার্থে এ কার্য সম্পাদনের জন্য আমি আপনাকে অনুরোধ জানাচ্ছি। আশা করি আপনি আমার এ অনুরোধ রক্ষা করবেন।'

রাজ অনুরোধ মানে তো রাজনির্দেশ। হাজার বিপদ আসলেও এ-নির্দেশ অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয় সাধারণ মানুষের পক্ষে। অগত্যা স্বয়ম্ভুনাথ সম্রাটের উদ্দেশ্যে বললেন, 'আপনার আদেশ শিরোধার্য। কখন, কবে আমাকে রওনা হতে হবে পর্তুগিজদের সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্য?'

জবাব দিলেন সেনাপতি। তিনি বললেন, 'আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। আজ সূর্যাস্তের আগেই আপনাকে ময়ূরপঙ্খি ভাসাতে হবে সমুদ্রে। তবে জেপাং নারীদের, নাখোদা আর দাঁড়ি-হালি ছাড়া লোক নেবেন না আপনার জাহাজে। কারণ তাতে পর্তুগিজদের সন্দেহের উদ্রেক ঘটতে পারে। তাছাড়া কারও মুখ থেকে বেঁফাস কথাও বেরিয়ে আসতে পারে। আপনি দ্রুত ফিরে গিয়ে যাত্রারম্ভের প্রস্তুতি শুরু করুন। পর্তুগিজদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের ব্যূহ অতিক্রম করে কাল সকালের মধ্যেই আপনাকে যথাস্থানে সম্রাট সামোরিনের পেটিকা আর পত্র পৌঁছে দিতে হবে। প্রয়োজনে আমরা কিছু লোকও দেব আপনার যাত্রা শুরুর প্রস্তুতির জন্য। আর অর্থের জন্যও কোনও কার্পণ্য করবেন না। যাত্রা শুরুর প্রাকমুহূর্তে সেই পেটিকা আর চিঠি আমি আপনার হাতে পৌঁছে দেব।'

কথাবার্তার পর্ব সাঙ্গ হল এবার। স্বয়ম্ভুনাথ এরপর সামোরিনের প্রাসাদ ত্যাগ করলেন। অবশ্য তার আগে রাজা সামোরিনের পার্শ্বচর কোটকেশ্বর একটা রেশমের থলে তুলে দিলেন স্বয়ম্ভুনাথের হাতে। তার মধ্যে রয়েছে স্বর্ণমুদ্রা। সেই থলে নিয়ে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে স্বয়ম্ভুনাথ ঘোড়া ছোটালেন ফেরার জন্য। ইতিমধ্যে স্বয়ম্ভুনাথের অনুচররা বন্দরস্থিত গণিকালয় থেকে গণিকাদের স্থানান্তরিত করার কাজ শুরু করেছিল। মাঝপথে সেই বলদের গাড়িগুলোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল স্বয়ম্ভুনাথের। বলদের গাড়িগুলোর মধ্যে যে-গাড়িগুলোতে সেই জেপাং নারীরা ছিল, যে-গাড়িগুলোকে তিনি আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবার আদেশ দিলেন।

স্বয়ম্ভুনাথ সামোরিনের প্রসাদ থেকে যথাসম্ভব দ্রুত নিজের গৃহে ফিরে এলেন। লোক পাঠিয়ে তিনি প্রথমেই ডেকে আনলেন নাখোদাকে। স্বয়ম্ভুনাথের মুখ থেকে সব শোনার পর নাখোদা বললেন, 'সম্রাটের অনুরোধ মানে তা আসলে নির্দেশ। তাই যেতে হবে আমাদের। কাজটা অতিমাত্রায় বিপজ্জনক কোনও সন্দেহ নেই। ঝড়ের মুখে পড়ে আমরা তো মরতেই বসেছিলাম। বাচ্চা মেয়েটা আর তার বাঁদরির জন্য সে-যাত্রায় রক্ষা পেয়েছি। কিন্তু বার বার তো এভাবে মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া যাবে না।'

স্বয়ম্ভুনাথ জবাব দিলেন, 'কী আর করা যাবে? জলস্থল দু-জায়গাতেই বিপদ ঘিরে ধরেছে। সামোরিনের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে হয়তো পর্তুগিজদের হাতে মরতে হবে। আর তাঁর নির্দেশ পালন না করলে সামোরিন হয়তো শূলে চড়াবেন।'

নাখোদা বিষণ্ণ হেসে বললেন, 'আমি তো নাবিক। তাই যদি সমুদ্রে আমার মৃত্যু হয় তবে তা আমার কাছে অপেক্ষাকৃত গৌরবের হবে। দেখা যাক আমাদের ভাগ্যে কী লেখা আছে?'

স্বয়ম্ভুনাথ তার হাতে সামোরিনের দেওয়া স্বর্ণমুদ্রার থলিটা তুলে দিয়ে বললেন, 'আপনি এবার দাঁড়ি-মাঝিদের দ্রুত জোগাড় করুন।' তবে পোশাক বা চেহারা দেখে আরব বলে চেনা যায় এমন কোনও লোককে নির্বাচন করবেন না।'

নাখোদা সেই স্বর্ণমুদ্রার থলি নিয়ে রওনা হলেন বন্দরের দিকে। বন্দরচত্ত্বর পর্তুগিজদের আক্রমণের ভয়ে প্রায় জনশূন্য হয়ে গেছে। কাছাকাছি পৌঁছে নাখোদা শুনতে পেলেন, ভোরবেলা নাকি একটা নৌকো ভেসে এসেছে চরে। পর্তুগিজরা সেই হতভাগ্য ধীবরদের মুন্ডুগুলো কেটে পাঠিয়ে দিয়েছে সেই নৌকোয়। এভাবে কালিকটবাসীদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে তারা। সামোরিন যদি তাদের প্রস্তাবে রাজি না হন তবে নগরবাসীদের কপালেও এমন ঘটনা লেখা আছে।

বন্দর ফাঁকা হয়ে গেলেও, কিছু লোক তখনও সে জায়গা ছেড়ে যায়নি। সত্যি কথা বলতে কী, তাদের যাবারও তেমন কোনও জায়গা নেই। প্রত্যেক বন্দরেই এমন বেশ কিছু লোক দেখা যায়। বিভিন্ন দেশের মানুষ সব। জাহাজে জাহাজে ভবঘুরের মতো এ বন্দর-সে বন্দর ঘুরে বেড়ায় তারা। বছরের অধিকাংশ সময়, তারা জলেই কাটায়। আর বাকি সময়টা কাটায় বন্দরের বেশ্যালয়, ভাটিখানায় বা জুয়ার আড্ডায়। ঘর, বাড়ি, পরিজন না থাকার কারণে এ লোকগুলো একটু দুর্ধর্ষ প্রকৃতির হয়। পয়সা পেলে তারা কোনও কাজ করতে পিছপা হয় না। এমনকী নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে পা বাড়াতেও পিছুপা হয় না এই ভবঘুরে নাবিকরা। নাখোদা গিয়ে হাজির হলেন তেমনই এক শুঁড়িখানায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি জোগাড় করে ফেললেন জনা কুড়ি দাঁড়ি-হালিকে। তাদের নিয়ে কাজে নেমে পড়লেন নাখোদা।

ওদিকে স্বয়ম্ভুনাথও নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কীভাবে যে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেল তা মালুমই পেলেন না স্বয়ম্ভুনাথ। যাত্রা আরম্ভর সময় হয়ে এল। বিকেলবেলা একটা গো-শকট এসে উপস্থিত হল তাঁর সদর দরজার সামনে। রক্ষী পরিবৃত গো-শকট। তার নেতৃত্বে স্বয়ং সেনাপতি। শকট থেকে লোহার চওড়া পট্টি দেওয়া একটা ছোট কাঠের সিন্দুক নামানো হল। তাতে একটা বড় তালা ঝুলছে। তালার ওপর কাপড় জড়িয়ে গালা দিয়ে সম্রাটের মোহর বসানো হয়েছে। সেই সিন্দুক নিয়ে সেনাপতি প্রবেশ করলেন স্বয়ম্ভুনাথের গৃহে। স্বয়ম্ভুনাথের কাছে সিন্দুকটা তুলে দিয়ে তিনি বললেন, 'আপনার প্রস্তুতি সম্পন্ন তো?'

স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'হ্যাঁ। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি রওনা হব বন্দরের দিকে। নাখোদা ইতিমধ্যে যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। সূর্যাস্তের আগেই মৃচ্ছকটিকের নোঙর তুলে ফেলা হবে। জেপাং নারীদেরও জাহাজে তুলে ফেলার কথা।'

সেনাপতি পেটিকাটার দিয়ে তাকিয়ে বললেন, 'এটা কিন্তু খুব যত্নে রাখবেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার এই সিন্দুকটা ফিরিয়ে এনে তুলে দেবেন সম্রাটের হাতে। মনে রাখবেন আপনার যাবতীয় সম্পত্তি, গণিকালয় এ-সবই কিন্তু কালিকট বন্দরে ফেলে রেখে যাচ্ছেন।'

এ কথাটার মাধ্যমে সেনাপতি কী বলতে চাইলেন তা বুঝতে অসুবিধা হল না স্বয়ম্ভুনাথের। অর্থাৎ এই পেটিকা যদি তিনি ফিরিয়ে আনতে না পারেন তবে তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবেন সম্রাট সামোরিন। সেনাপতি আর কোনও কথা না বাড়িয়ে এরপর স্বয়ম্ভুনাথের গৃহ ত্যাগ করলেন। পেটিকাটা তাঁর শয়নকক্ষের মেঝেতে রেখে স্বয়ম্ভুনাথ চলে গেলেন স্নান সেরে পোশাক পরিবর্তনের জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে সব কাজ সমাধা হল। এবার তাঁকে বেরিয়ে পড়তে হবে। পেটিকাটা সঙ্গে নেবার জন্য তিনি শয়নকক্ষে প্রবেশ করেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন। মৎস্যগন্ধা আর তার শিম্পাঞ্জিটা কখন যেন তাঁর অনুপস্থিতিতে কক্ষে প্রবেশ করে সিন্দুকটার ওপর বসে আছে!

সরলতা মাখানো দৃষ্টিতে বাচ্চা মেয়েটা তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। তাকে দেখে স্বয়ম্ভুনাথের মনে হল, তিনি যদি আর কোনদিন কালিকটে ফিরে আসতে না পারেন তবে মেয়েটার ভাগ্যে কী হবে? এই মেয়েটার জন্যই তো তাঁর আর মৃচ্ছকটিকের অতগুলো মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছিল। আর এরপরই স্বয়ম্ভুনাথের মনে হল বাচ্চামেয়েটার সিন্দুকের ওপর এভাবে বসা কোনও ইঙ্গিতবাহী নয়তো? যে-কাজে এবার তিনি গৃহত্যাগ করতে যাচ্ছেন তাতে বিপদের সম্ভাবনা প্রচুর। মেয়েটি পয়মন্ত। সে সঙ্গে থাকলে হয়তো তিনি বিপদমুক্ত হবেন। কথাটা মনে হতেই তিনি মেয়েটার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে বসলেন, 'তুমি যাবে আমার সঙ্গে?'

মৎস্যগন্ধা, স্বয়ম্ভুনাথের প্রশ্ন শুনে কী বুঝল কে জানে! সে জবাব দিল, 'হ্যাঁ।'

কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বয়ম্ভুনাথ সেই পেটিকাসমেত, মৎস্যগন্ধা, তাঁর পোষ্য আর গণিকা ভর্তিকাকে তাঁর সঙ্গে গো-শকটে উঠিয়ে নিয়ে গৃহত্যাগ করে রওনা হলেন বন্দরের দিকে।

নাখোদা বন্দরেই অপেক্ষা করছিলেন। সূর্য এবার ঢলতে শুরু করেছে সমুদ্রে। দিনের শেষ আলো ছড়িয়ে পড়েছে নির্জন-বিষণ্ণ কালিকট বন্দরের বুকে। নাখোদা আর তাঁর সঙ্গী দুজন মাল্লা ছাড়া কেউ কোথাও নেই। একদল হাড়গিলে পাখি শুধু কর্দমাক্ত চরে আবর্জনা খুঁটে খাচ্ছে। স্বয়ম্ভুনাথ মিলিত হলেন তার সঙ্গে। তিনি তাকালেন চড়ায় আটকে থাকা মৃচ্ছকটিকের দিকে। তার প্রধান মাস্তুলে সাদা পাল টাঙানো হয়েছে যাতে তার ওপর পর্তুগিজ জাহাজগুলো আক্রমণ না হানে। পর্তুগিজ নৌবহরগুলোকেও তিনি দেখতে পেলেন। অন্ধকার নামলে বন্দর থেকে কালিকটবাসীরা আক্রমণ হানতে পারে এই আশঙ্কায় বেশ কিছুটা দূরে সরে গেলেও তারা দৃষ্টিপথের একেবারে আড়ালে চলে যায়নি। হাঙরের মতো সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে পর্তুগিজ নৌবহরের ঝাঁক। নিশ্চয়ই তারা আতস কাচ লাগানো নল দিয়ে নজর রাখছে বন্দরের ওপর। মৃচ্ছকটিককে তারা দেখতে তো পাচ্ছেই, হয়তো বা পাড়ে দাঁড়ানো স্বয়ম্ভুনাথদেরও দেখতে পাচ্ছে। একটাই ভরসা, মৃচ্ছকটিককে তারা চেনে। হয়তো তারা চট করে গোলা দাগবেনা। জেপাং নারীরা ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। স্বয়ম্ভুনাথের মনে হল, তার সঙ্গে মৎস্যগন্ধাকে দেখে যেন খুশি হলেন নাখোদা। তাঁর মনেও হয়তো বিশ্বাস জন্মেছে মেয়েটার শুভশক্তির ব্যাপারে। কারণ, মুখে তিনি কিছু না বললেও মেয়েটাকে কোলে তুলে নিলেন। তাঁর দুজন অনুচর তুলে নিল সিন্দুকটা। কর্দমাক্ত জমিটা পেরিয়ে তাঁরা এগোলেন মৃচ্ছকটিকের দিকে। জাহাজটার কাছে পৌঁছে দড়ির মই বেয়ে উঠে এলেন মৃচ্ছকটিকের ডেকে। মাল্লাদের সবাইকে প্রথমে পাল খাটাবার নির্দেশ দিলেন নাখোদা। স্বয়ম্ভুনাথ নিজের কাঁধে তুলে নিলেন সেই পেটিকা। তারপর ভর্তিকা, মৎস্যগন্ধা আর তার পোষ্যকে নিয়ে ডেক ছেড়ে জাহাজের খোলের ভিতর নামলেন। মৃচ্ছকটিকের খোলের ভিতর একটা গোপন কক্ষ আছে। বাইরে থেকে কাঠের পাটাতন সরিয়ে তাতে ঢুকতে হয়। তার মধ্যে একটা ছোট নৌকোও আছে। সমুদ্রর জলতলের প্রায় সমান্তরালে সে কক্ষের অবস্থান। ঘরের উল্টোদিকের দেওয়ালের গায়ের পাটাতন সরিয়ে নৌকো নিয়ে ভেসে পড়া যায় সমুদ্রে। নাখোদা আর স্বয়ম্ভুনাথ ছাড়া যে মাল্লারা এখন মৃচ্ছকটিকে আছে তাদের এই গুপ্ত কক্ষের অবস্থান জানা নেই। সেই কক্ষের মধ্যে প্রবেশ করে সেখানে তিনি সিন্দুকটা রাখলেন। ভর্তিকাকে বললেন মৎস্যগন্ধা আর তার পোষ্যকে নিয়ে সেখানে লুকিয়ে থাকতে। তারা যেন একমাত্র স্বয়ম্ভুনাথের গলার শব্দ শুনলে তবেই ভিতর থেকে সাড়া দেয়। তাদের সেই কক্ষের ভিতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে কাঠের পাটাতন টেনে দিয়ে খোল ছেড়ে আবার ডেকে উঠে এলেন স্বয়ম্ভুনাথ।

পাল খাটানো হচ্ছে। সাদা পালে দিনান্তের সূর্য লাল আভা ছড়াচ্ছে, সমুদ্রেও ছড়িয়ে পড়ছে আবিরের রং। ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দূর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে জেপাং-মেয়েগুলো। হয়তো তারা ভাবছে সমুদ্রের ওপারে তাদের দেশের কথা, যেখানে দ্বীপমালার কোনও নিভৃতপল্লীতে এই সূর্যাস্তের সময় তাদের কথা ভাবছে, তাদের ফেরার প্রতীক্ষা করছে তাদের প্রিয়জনেরা। কিন্তু তাদের আর কোনওদিন ফেরা হবে না সমুদ্র-ঘেরা সেই দেশে। সমুদ্র বড় নিষ্ঠুর। তাদের জীবন থেকে সব কিছু কেড়ে নিয়ে অকূল দরিয়ায় এনে ফেলল তাদের। সমুদ্র এই জেপাং নারীদের ভাসাতে ভাসাতে কোথায় নিয়ে যাবে তা একমাত্র সমুদ্রই জানে। চোখের জল বহুদিন আগেই শুকিয়ে গেছে এই নারীদের। শুধু এক স্থায়ী বিষণ্ণতা গ্রাস করেছে ওদের মুখমণ্ডলকে। তারা তাকিয়ে আছে ডুবন্ত সূর্যের দিকে। ওই সূর্যটা যেন তাদের জীবনেরই প্রতিবিম্ব। মহাসমুদ্র ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে তাকে।

পাল খাটানো হয়ে গেল। নাখোদা, স্বয়ম্ভুনাথের মুখের দিকে তাকালেন নির্দেশের অপেক্ষায়। স্বয়ম্ভুনাথ নির্দেশ দিলেন, 'নোঙোর তোলো।'

কাছিতে টান পড়ল। নোঙর উঠে এল। ময়ূরপঙ্খি একটু কেঁপে উঠল ঠিকই, কিন্তু তক্ষুনি সমুদ্রে ভাসল না। স্বয়ম্ভুনাথদের আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল জোয়ারের জল আর একটু বাড়ার জন্য। যতক্ষণ না মৃচ্ছকটিক জলে ভাসল ততক্ষণ একদৃষ্টে বন্দরের দিকে চেয়ে রইলেন স্বয়ম্ভুনাথ। তাঁর জীবনের সবটুকু জুড়েই তো রয়েছে এই কালিকট নগরী। প্রত্যেকবার মৃচ্ছকটিককে সমুদ্রে ভাসাবার সময় এই নগরীর প্রতি একটা টান অনুভব করেন স্বয়ম্ভুনাথ। কিন্তু আজ যেন সেই টান বড় বেশি অনুভব করলেন তিনি। আস্তে আস্তে এক সময় সূর্য ডুবে গেল সমুদ্রের জলে। আর তারপর ধীরে ধীরে স্বয়ম্ভুনাথের চোখের সামনে থেকে মুছে গেল কালিকট। আজ আর কেউ বন্দরের আকাশপ্রদীপ জ্বালাল না। নিকষ কালো অন্ধকার গ্রাস করে নিল কালিকট বন্দরকে।

সম্বিত ফিরে পেয়ে স্বয়ম্ভুনাথ এরপর ফিরে তাকালেন সমুদ্রের দিকে। কালিকট বন্দর অন্ধকারে ডুবে গেলেও সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভুনাথ দেখতে পেলেন অনেক দূরে বিন্দু বিন্দু আলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। পর্তুগিজ নৌবহরের আলো।

জোয়ারের জল বাড়ছে। ছোট ছোট ঢেউয়ের ধাক্কায় প্রথমে কাঁপতে শুরু করল মৃচ্ছকটিক। তারপর ধীরে ধীরে সে ভাসতে শুরু করল। হালিরা হাল মেরে সমুদ্রর দিকে ঘুরিয়ে নিল মৃচ্ছকটিকের মুখ। ময়ূরপঙ্খি ভেসে পড়ল অন্ধকার সমুদ্রে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা আলোকবিন্দুগুলোর দিকে।

একটা সময় পর্তুগিজ রণপোত গুলোর খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেল। স্বয়ম্ভুনাথ প্রথমে মশাল জ্বালাবার নির্দেশ দিলেন। আলোকিত হয়ে উঠল মৃচ্ছকটিকের ডেক। তারপর তা ধরিয়ে দেওয়া হল ডেকের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা জেপাং মেয়েগুলোর হাতে। যাতে দূর থেকেই তাদের চোখে পড়ে পর্তুগিজদের।

মৃচ্ছকটিক, নৌবহরের কাছাকাছি পৌঁছোতেই চাঞ্চল্য শুরু হল রণপোতগুলোর মধ্যে। স্বয়ম্ভুনাথ দেখতে পেলেন পর্তুগিজ জাহাজগুলোর কামানের মুখ ঘুরে যাচ্ছে মৃচ্ছকটিকের দিকে। নড়তে শুরু করেছে জাহাজগুলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশ থেকে নৌবহরের বেশ কয়েকটা হালকা রনপোত ঘিরে ধরল মৃচ্ছকটিককে। পর্তুগিজ জাহাজ থেকে কাঠের পাটাতন এসে পড়ল মৃচ্ছকটিকের ডেকে। সেই কাঠের পাটাতন বেয়ে পর্তুগিজরা লাফিয়ে নামতে লাগল ময়ূরপঙ্খির ডেকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পর্তুগিজদের সূচিমুখ তলোয়ারের ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে গেল মৃচ্ছকটিকের নাবিকরা।

লম্বা-চওড়া চেহারার একজন পর্তুগিজ পিস্তল হাতে এসে দাঁড়াল স্বয়ম্ভুনাথ আর নাখোদার সামনে। পাশাপাশি তাঁরা দুজন দাঁড়িয়েছিলেন। যে পর্তুগিজটা সামনে এসে দাঁড়াল তার নাম না জানলেও লোকটা সেবার সম্ভোগের জন্য মৃচ্ছকটিকে এসেছিল। তাই লোকটার মুখ চেনা আছে স্বয়ম্ভুনাথের। স্বয়ম্ভুনাথ লোকটার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। লোকটা কিন্তু হাসল না। হাতের পিস্তলটা তাঁদের দিকে উঁচিয়ে ধরে কর্কশস্বরে বলল, 'তোমাদের কি সামোরিন পাঠিয়েছে?'

স্বয়ম্ভুনাথ জবাব দিলেন, 'না, তিনি আমাকে কালিকট থেকে বিতাড়িত করেছেন। আমি অ্যাডমিরালের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।'

লোকটা জবাব শুনে ধমকের স্বরে বলে উঠল, 'মিথ্যে কথা বলছ। নিশ্চই ওই বুনো সামোরিন কোনও ফন্দি করে তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে। সত্যি বলো, নইলে এখনই তোমার মুন্ডু কেটে মাস্তুলের আড়কাঠে ঝুলিয়ে দেব। একটা লোকও বাঁচবে না।'

ঘাবড়ালে চলবে না। স্বয়ম্ভুনাথ বেশ দৃঢ়ভাবে বললেন, 'বললাম তো তিনি আমাদের কালিকট থেকে বিতাড়িত করেছেন।'

নাখোদা জেপাং মেয়েগুলোকে দেখিয়ে বললেন, 'এই জেপাং মেয়েগুলোকে আমরা অ্যাডমিরালের কাছে দিতে এসেছি। তার সঙ্গে আমাদের তেমনই কথা হয়েছিল।'

পর্তুগিজ এবার তাকাল সার বেঁধে মশাল-হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ভীতসন্ত্রস্ত জেপাং রমণীদের দিকে। মনে মনে সে কী যেন ভাবল কয়েক মুহূর্ত। তারপর সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বলল, 'তল্লাসী নাও জাহাজের।

তাঁর নির্দেশ পালন করে একদল লোক ছুটল জাহাজের খোলের দিকে। স্বয়ম্ভুনাথ তাঁর মুখভঙ্গিতে কোনও উত্তেজনার ভাব প্রকাশ না করলেও যতক্ষণ না পর্তুগিজদের দলটা খোল ছেড়ে উপরে উঠে এল ততক্ষণ আশঙ্কায় কাঁপতে লাগল তাঁর বুক। যদি কোনওভাবে পর্তুগিজরা সেই গুপ্ত কক্ষের সন্ধান পেয়ে যায় তবে ভয়ঙ্কর বিপদ ঘটবে।

তবে তেমন কিছু ঘটল না। পর্তুগিজদের দলটা খোল থেকে ফিরে এসে জানাল, না, তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। তাদের কথা শুনে দলপতি যেন কিছুটা আশ্বস্ত হল। স্বয়ম্ভুনাথকে সে বলল, 'এই সামান্য ব্যাপারে এখন অ্যাডমিরালকে বিরক্ত করা যাবে না। এই নৌবহরের দায়িত্বে আছেন এস্তাভাও-ডা-গামা। তাঁকে আমরা খবর পাঠাচ্ছি। তিনি এসে তোমাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। মনে রেখো, তোমরা যদি কোনও চালাকির চেষ্টা করো তবে মৃত্যু নিশ্চিত।'

এ কথা বলার পর লোকটা তার এক অনুচরকে কিছু একটা বললেন, দলপতির নির্দেশে লোকটা একটা মশাল নিয়ে তরতর করে উঠে গেল মলচ্ছকটিকেরও প্রধান মাস্তুলের মাথায়। তারপর সমুদ্রের এক অন্ধকার অংশের দিকে মশাল নাড়িয়ে সংকেত দিতে শুরু করল। কিছু সময়ের ব্যবধান। আর তার পরই সমুদ্রের অন্ধকারের মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল বিরাট এক রণপোত। এতক্ষণ তা অন্য জাহাজগুলোর থেকে কিছুটা তফাতে অন্ধকারের মধ্যে আত্মগোপন করে ছিল। ঠিক যেমন আরও বেশ কিছুটা দূরে অন্ধকারে আত্মগোপন করে আছে ভাস্কোর মূল নৌবহর। শুধু মৃচ্ছকটিককে যে-চারটে জাহাজ ঘিরে ধরেছে তাতেই শুধু মশালের আলো জ্বালানো ছিল।

অন্ধকার থেকে আবিভূর্ত জাহাজটা এসে দাঁড়াল মৃচ্ছকটিকের অন্য পাশে। এবার সে জাহাজেও সার সার মশাল জ্বলে উঠল। তার ডেকভর্তি সশস্ত্র পর্তুগিজ সেনা। সে জাহাজ থেকেও পাটাতন ফেলা হল মৃচ্ছকটিকে। পাটাতনের ঢাল বেয়ে একদল পর্তুগিজকে সঙ্গে নিয়ে মৃচ্ছকটিকের ডেকে পা রাখলেন এস্তাভাও। তাঁর পরনে ঝলমল করছে রাজকীয় পোশাক। বুকে আড়াআড়িভাবে আটকানো চামড়ার বেল্ট থেকে ঝুলছে রুপোর বাঁট আর লম্বা নলঅলা পিস্তল, কোমর থেকে ঝুলছে দীর্ঘ তলোয়ার। তিনি মৃচ্ছকটিকে পদার্পণ করতেই পূর্বোক্ত সেই পর্তুগিজ দলপতি তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে মাথার টুপি খুলে সম্ভাষণ জানাল তাঁকে। কিছুক্ষণ কথাবার্তা হল তাদের দুজনের মধ্যে। তারপর ডাক পড়ল স্বয়ম্ভুনাথের। দুজন পর্তুগিজ তলোয়ারের খোঁচা দিয়ে স্বয়ম্ভুনাথকে এনে দাঁড় করাল এস্তাভাওর সামনে। মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিলেন স্বয়ম্ভুনাথ। এবার তাঁকে জীবন-মৃত্যুর পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে।

ভাস্কোর ভাইপো, তাঁর তৃতীয় নৌবহরের সেনাপতি এস্তাভাও ভালো করে একবার দেখলেন স্বয়ম্ভুনাথকে। তারপর তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন। 'তোমাকে জেপাং নারী সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঠিক। কিন্তু এই যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে তুমি এখন তাদের আমাদের হাতে তুলে দিতে এলে কেন? বিশেষত যখন আমরা এখন তোমার শত্রুপক্ষ?

স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'অ্যাডমিরালের কথামতো জেপাং দ্বীপ থেকে নারী সংগ্রহ করে গতকালই আমি ফিরেছিলাম কালিকটে। কিন্তু বন্দরে পৌঁছোবার পর নাবিকেরা হয়তো কারও কাছে গল্প করেছিল মাঝসমুদ্রে অ্যাডমিরালের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের কথা, তাঁর জন্য জেপাং থেকে নারী সংগ্রহের কথা। এবং এসব কথা গুপ্তচর মারফত পৌঁছে যায় সামোরিনের কানে। তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। সামোরিন ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ হয়েছেন অ্যাডমিরালের জন্য নারী সংগ্রহের ব্যাপারে। তিনি আমাকে আগামীকাল সূর্যোদয়ের পূর্বে জেপাং নারীসমেত কালিকট বন্দর ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি বন্দর ত্যাগ না করলে আমার মুন্ডুচ্ছেদ করা হত।'

এস্তাভাও বললেন, 'তুমি তো গণিকালয়ের ব্যবসা করো। গণিকা সংগ্রহ করা তোমার পেশা। তাছাড়া তোমার সঙ্গে যখন আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল তখন আমরা কালিকটে পৌঁছোইনি। বুনো সামোরিনের সঙ্গে আমাদের ঝগড়াও শুরু হয়নি। তোমার দোষটা কোথায় ছিল? সামোরিনকে এ-কথা বোঝাওনি?'

স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'সে চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। আসলে আমার সঙ্গে কয়েকজন ব্যবসায়ীর ব্যবসায়িক কারণে বিরোধ আছে। আমার অনুপস্থিতিকালে বেশ কয়েকবার বন্দরস্থিত আমার বেশ্যালয় দখল করার চেষ্টা করেছিল। সেই আরব ব্যবসায়ীরা এবার অ্যাডমিরালের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের ব্যাপারটাকে হাতিয়ার করে সামোরিনকে ভুল বুঝিয়েছে। তারা সামোরিনকে বলেছে, আমি নাকি তোমাদের গুপ্তচর। ইতিমধ্যেই সামোরিন আমার গণিকালয় ও সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এক আরব ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেবার নির্দেশ দিয়েছেন।'

'আরব' শব্দটা শুনে এস্তাভাও যেন প্রচণ্ড ঘৃণায় বলে উঠলেন, 'তোমার জাহাজে কোনও আরব নেই তো?'

স্বয়ম্ভুনাথ জবাব দিলেন 'না, নেই। আপনি খুঁজে দেখতে পারেন। আমি অনেক কষ্টে কয়েকজন ভিন্ন ধর্মের নাবিক সংগ্রহ করে ময়ূরপঙ্খি জলে ভাসিয়েছি।'

এস্তাভাও প্রথমে স্বগতোক্তি করলেন, 'আরবরাই বুনো সামোরিনের ধ্বংসের কারণ হবে।' তারপর তিনি বললেন, 'তুমি এখন আমাদের কাছে কী চাও? আশ্রয়?'

স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'না, আশ্রয় নয়। আমি বণিক। ব্যবসা আমার কাছে সবচেয়ে বড় ধর্ম। অ্যাডমিরাল আমাকে এই নারীদের জন্য অর্থ দিয়েছিলেন। তাই তোমাদের কাছে এলে আমার বিপদ হতে পারে জেনেও আমি জেপাং নারীদের তোমাদের হাতে তুলে দিতে এসেছি। আমি কখনও ব্যবসায়িক চুক্তির খেলাপ করি না। এদের তোমাদের হাতে দিয়ে আমি অন্যত্র চলে যাব। পরিস্থিতি যদি কোনও দিন স্বাভাবিক হয় তবে আবার কালিকটে ফিরব।'

এস্তাভাও বললেন, 'তুমি তো তোমার সঙ্গে এই নারীদের নিয়ে যেতে পারো? পরিস্থিতি খুব দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আমাদের ধারণা। কালিকট দখল করতে আমাদের দু-তিন দিনের বেশি সময় লাগবে না। তারপর ফিরে এসে এই নারীদের আমার হাতে তুলে দিতে পারো।'

স্বয়ম্ভুনাথ জবাব দিলেন, 'আপনারা তিনদিনে ব্যাপারটার নিষ্পত্তি ঘটাবেন বললেও মাসাধিক কালও কিন্তু লাগতে পারে। বিশেষত আরব ব্যবসায়ীরা আপনাদের প্রতিরোধ করার জন্য তৈরি হচ্ছে। আমি নিঃসম্বল অবস্থায় জলে জাহাজ ভাসিয়েছি। দক্ষিণে কোথায়, কোন বন্দরে আশ্রয় পাব জানা নেই। এতজন নারীকে বহন করা বা তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।'

স্বয়ম্ভুনাথের কথা শুনে এস্তাভাও-এর চোখের সামনে ভেসে উঠল মেরি জাহাজের সেই দৃশ্য! জ্বলন্ত মেরির ডেকে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত কীভাবে লড়াই চালিয়েছিল আরব মেয়েরাও! এস্তাভাও মুখে তিনদিনে কালিকট দখল করার কথা বললেও কতদিনে তারা এই বন্দরনগরী দখল করবেন তা নিয়ে স্বয়ং অ্যাডমিরাল ভাস্কোর মনেই সন্দেহ আছে। এস্তাভাও জানতে চাইলেন, 'নগরীতে সৈন্যসংখ্যা কত?'

সামরিক ব্যাপারে কোনও খোঁজ রাখেন না স্বয়ম্ভুনাথ। তবে তিনি জবাব দিলেন, 'দশ হাজার।'

'কামানের সংখ্যা?'

'একশো।'

'তিরন্দাজ?'

আর বানিয়ে না বলতে পেরে স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'আরব তিরন্দাজ আছে। তবে সংখ্যা জানা নেই।'

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবলেন এস্তাভাও। হয়তো তিনি মনে মনে হিসাব কষলেন যে, লোকটার কথা যদি সত্যি হয় তবে কালিকটের সামরিক শক্তির সঙ্গে ভাস্কোর নৌবহর এঁটে উঠতে পারবে কিনা। লোকটা যা বলল সে-খবর দ্রুত ভাস্কোকে পৌঁছে দেওয়া দরকার।

এস্তাভাও এরপর শেষ প্রশ্ন করলেন, 'যদি আমরা এখন জেপাং-নারীদের না নিই তবে তুমি কী করবে?'

'ওদের সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে। এছাড়া আমার আর কিছু করার নেই।' স্পষ্ট জবাব দিলেন স্বয়ম্ভুনাথ।

জেপাং নারী পর্তুগিজ নাবিকদের কাছে খুব আকর্ষণীয়। ইতিমধ্যেই ডেকে দাঁড়ানো পর্তুগিজ নাবিকরা লোলুপদৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করেছে ডেকে দণ্ডায়মান নারীদের দিকে। মুখে কিছু না বললেও তাদের একান্ত ইচ্ছা, এই নারীদের তুলে নেওয়া হোক পর্তুগিজ জাহাজে। তাছাড়া স্বয়ং অ্যাডমিরালও এই নারীদের সংগ্রহ করার জন্য টাকা লগ্নি করেছেন। কাজেই এস্তাভাও শেষ পর্যন্ত বললেন, 'ঠিক আছে, আমরা ওদের আমাদের জাহাজে তুলে নিচ্ছি। তবে একটা কথা মনে রেখো, এ ব্যাপারে যদি কোনও চাতুরী থেকে থাকে তবে আমাদের সঙ্গে তোমার তৃতীয় সাক্ষাৎই কিন্তু শেষ সাক্ষাৎ হবে।'

স্বয়ম্ভুনাথ হেসে বললেন, 'আমাকে তো তৃতীয়বারের জন্য সাক্ষাৎ করতে হবেই। অ্যাডমিরাল যে অর্থ আমাকে প্রদান করেছিলেন তার থেকে অধিক অর্থমূল্যে এই জেপাং নারীদের ক্রয় করেছি আমি। আমি সেই অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের জন্য তো আসবই।'

স্বয়ম্ভুনাথের কথা শুনে হেসে ফেললেন এস্তাভাও। সত্যি লোকটার সাহস আছে! অথবা লোকটার মাথায় গন্ডগোল আছে! নারীদের নিজেদের জাহাজে তোলার পর লোকটাকে যে তিনি মেরে ফেলছেন না, এটা তার পরম সৌভাগ্য। তার ওপর আবার লোকটা বকেয়া অর্থর দাবি জানিয়ে রাখছে!

এস্তাভাও অবশ্য মুখে কিছু বললেন না। জেপাং-নারীদের তাঁর জাহাজে তোলার নির্দেশ দিয়ে মৃচ্ছকটিকের ডেক ত্যাগ করে কাঠের পাটাতন বেয়ে জাহাজে উঠে পড়লেন।

লোলুপ পর্তুগিজ নাবিকের দল সেই নারীদের মহা-উৎসাহে নিয়ে চলল এস্তাভাওর জাহাজে। না, তরোয়ালের খোঁচায় নয়। জাপ্টে ধরে। পর্তুগিজ নাবিকদের কর্কশ হাত সেইসময়টুকুর মধ্যেই ছুঁয়ে যেতে লাগল জেপাং রমণীদের অর্ধ বিম্বের মতো চাপা বর্তুল স্তন, নিজস্ব স্পর্শ সুখের জন্য। শেষ নারীকে পর্তুগিজ জাহাজে তুলে ফেলার পর মৃচ্ছকটিক ত্যাগ করল পর্তুগিজ নাবিকরা। দু-পাশের রণপোত থেকে ফেলা কাঠের পাটাতনও সরিয়ে ফেলা হল। প্রথমে এস্তাভাওর রণতরী রওনা হল যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে। তারপর একে একে অন্য চারটে জাহাজও সরে দাঁড়াল মৃচ্ছকটিকের পাশ থেকে। নাখোদা নোঙর তুলে ফেলার নির্দেশ দিলেন। বাতাসে ফুলে উঠতে শুরু করেছে পাল। মৃচ্ছকটিক ভেসে পড়ল সমুদ্রে। মশালগুলো নিভিয়ে দেওয়া হল।

এস্তাভও এগোচ্ছিলেন ভাস্কোর জাহাজের দিকে। কিন্তু হঠাৎ তাঁর একটা ব্যাপার মনে হল। গণিকা ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হল? অ্যাডমিরালের সামনে তাকে হাজির করানো উচিত ছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা তিনিই নিতেন। কথাটা মনে হবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ভাবলেন, ময়ূরপঙ্খিটা নিশ্চই এখনও বেশি দূরে যেতে পারেনি। তাঁর দ্রুতগামী রণপোত নিশ্চই ধরে আনতে পারবে তাকে। সেটা করাই ভালো। এস্তাভাও তাঁর রণতরীর মুখ ঘোরাবার নির্দেশ দিলেন মৃচ্ছকটিককে ধরার জন্য।

চাঁদ উঠে গেছে। নক্ষত্ররাজী ঝিকমিক করতে শুরু করেছে সমুদ্রর আকাশে। তারাঘেরা-রাতে বেশ অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। পালেও বাতাস লেগেছে। বাতাস মৃচ্ছকটিককে নিয়ে চলেছে নির্দিষ্ট দিকে। ছোট ছোট ঢেউ-এর দোলায় মৃচ্ছকটিক উঠছে-নামছে। দাঁড় বাইতে হচ্ছে না। হালিরা শুধু হাল ধরে বসে আছে সঠিক দিশায় ময়ূরপঙ্খিকে চালিত করার জন্য।

স্বয়ম্ভুনাথ আর নাখোদা পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিলেন ডেকে। নাখোদা বললেন, 'যাক, এ-যাত্রায় রক্ষা পাওয়া গেল। আশা করি কাল সূর্যোদয়ের প্রাক মুহূর্তেই আমরা বৃশ্চিক দ্বীপে নোঙর করতে পারব। বাতাসের গতি তেমনই ইঙ্গিত বহন করছে।'

স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'দেখা যাক, বৃশ্চিক দ্বীপের অধিবাসীরা আমাদের কেমন আপ্যায়ন করে? তবে কালিকটে আর কোনওদিন ফিরতে পারব কিনা কে জানে!'

এরপরই স্বয়ম্ভুনাথের খেয়াল হল মৎস্যগন্ধার কথা। সত্যিই কি এবারও তিনি ওই মেয়েটার জন্য দুর্যোগমুক্ত হলেন? মৎস্যগন্ধার কথা মনে পড়তেই তিনি ভাবলেন এবার তাদের সেই গোপন কক্ষ থেকে বাইরে বের করে আনা যাক। খোলে নামবার সিঁড়ির দিকে এগোতে যাচ্ছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময় প্রধান মাস্তুলের ওপরে বসে থাকা একজন মাল্লা চিৎকার করে উঠল, 'জাহাজ, একটা জাহাজ আসছে!'

লোকটার দৃষ্টি অনুসরণ করে স্বয়ম্ভুনাথ আর নাখোদা তাকালেন সেদিকে। চাঁদের আলোতে অনেকদূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হ্যাঁ, একটা জাহাজ খুব দ্রুত দূর থেকে এগিয়ে আসছে তাঁদের দিকে!

জাহাজটার গতি আর চার থাক পাল দেখে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই নাখোদা বলে উঠলেন, 'আরে, ওটা তো পর্তুগিজ রণপোত! সম্ভবত পর্তুগিজ সেনাপতি এস্তাভাওর জাহাজ ওটা!'

স্বয়ম্ভুনাথও একই অনুমান করলেন। তিনি বলে উঠলেন, 'সম্ভবত ওরা কোনও কিছু সন্দেহ করেছে। আমাদের ধরে নিয়ে যাবার জন্য আসছে অথবা জাহাজ ডুবিয়ে দেবার জন্য আসছে! পালাতে হবে!

নাখোদা সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন, 'দাঁড় মারো, দাঁড় মারো! পর্তুগিজরা আমাদের ধাওয়া করেছে!'

নাখোদার নির্দেশে একসঙ্গে অনেকগুলো দাঁড় পড়তে লাগল জলে। যথাসম্ভব দ্রুত জল কেটে এগোতে লাগল মৃচ্ছকটিক। পর্তুগিজরাও বুঝতে পারল যে ময়ূরপঙ্খিটা পালাচ্ছে। নৌপোতের গতিবেগ বাড়িয়ে দিল তারা। ডেকে দাঁড়িয়ে এস্তাভাও নির্দেশ দিলেন, 'গোলা সাজাও। কিছুতেই ওদের পালাতে দেওয়া যাবে না। নিশ্চই ওরা কোনও ব্যাপারে ফাঁকি দিয়েছে! নইলে আমাদের দেখে ওরা পালাচ্ছে কেন?'

মৃচ্ছকটিক যথাসম্ভব ক্ষিপ্রগতিতে পালাবার চেষ্টা করলেও দ্রুত কমে আসতে লাগল পর্তুগিজদের সঙ্গে তাদের ব্যবধান। মৃচ্ছকটিকের থেকে অনেক বেশি দ্রুতগামী পর্তুগিজ রণপোত। একসময় পর্তুগিজ রণতরীর কামানের পাল্লার মধ্যে এসে গেল ময়ূরপঙ্খি। যদি ময়ূরপঙ্খিটাকে আত্মসমর্পণ করানো যায় সেজন্য প্রথমে সমুদ্রে গোলা নিক্ষেপ করতে বললেন এস্তাভাও। গর্জে উঠল পর্তুগিজ কামান। জ্বলন্ত অগ্নি গোলক মৃচ্ছকটিকের মাথায় ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সমুদ্রে পড়ল। ব্যাপারটাতে মুহূর্তের জন্য হতচকিত হয়ে দাঁড় টানা বন্ধ করল দাঁড়িরা। তাই দেখে নাখোদা আবার চিৎকার করে উঠলেন 'দাঁড় টানো, দাঁড় টানো। আত্মসমর্পণ করলেও ওরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।'

কথাটা শুনেই দাঁড়ি নাবিকরা তাদের উল্কি-আঁকা পেশিবহুল হাত দিয়ে আরও দ্রুত দাঁড় ফেলতে লাগল। তাই দেখে এস্তাও বুঝতে পারলেন, ময়ূরপঙ্খিটা ধরা দেবে না। তাই তিনি পলায়মান জাহাজ লক্ষ্য করতে গোলা ছোড়ার নির্দেশ দিলেন।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে একসঙ্গে তিনটে কামান গর্জে উঠল। দুটো গোলা লক্ষ ভ্রষ্ট হলেও একটা গোলা প্রধান মাস্তুলের পালে এসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে পালে আগুন লেগে গেল। মাস্তুলের আড়কাঠে যে বসেছিল সে জ্বলন্ত অবস্থায় ছিটকে পড়ল জলে। মৃচ্ছকটিকের ডেকে একটাই ছোট কামান ছিল জলদস্যুদের আটকাবার জন্য। কিছু গোলাও মজুত ছিল। এক নাবিক সেই কামান দেগে দিল পর্তুগিজ রণপোতকে লক্ষ্য করে। এবং কাকতালীয়ভাবেই সে-গোলা গিয়ে আছড়ে পড়ল একবারে এস্তাভাও-এর ডেকের মাঝখানে। তার আঘাতে শেষ হয়ে গেল দু-জন পর্তুগিজ। ছোট কামানের গোলা এর থেকে বেশি ক্ষতি না করতে পারলেও এই প্রত্যাঘাতে কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলেন এস্তাভাও। ময়ূরপঙ্খির কামানের পাল্লার বাইরে যাবার জন্য তিনি প্রথমে তাঁর জাহাজের গতি কিছুটা মন্থর করে দিলেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই একসঙ্গে বেশ কয়েকটা কামানের গোলা আছড়ে পড়ল মৃচ্ছকটিকে। তার মধ্যে একটা গোলা ময়ূরপঙ্খির সামনের অংশের ময়ূরের গ্রীবাটা ভেঙে দিল। মৃচ্ছকটিক থেকে আবারও গোলা ছোড়া হল বটে কিন্তু সে-গোলা পর্তুগিজ রণতরী পর্যন্ত পৌঁছোল না। ভগ্নগ্রীবা ময়ূরপঙ্খির ডেকে এবার আগুন ধরে গেল। গোলার আঘাতে কিছুক্ষণের মধ্যে ভেঙে গেল মাস্তুলও। স্লথ হয়ে গেল মৃচ্ছকটিকের গতি।

নাখোদা পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্বয়ম্ভুনাথকে বললেন, 'শেষ রক্ষা আর হল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ ডুবে যাবে। আপনি খোলে গিয়ে গুপ্তকক্ষ থেকে নৌকো নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়ুন। তাতে যদি কোনওভাবে বাঁচতে পারেন।'

স্বয়ম্ভুনাথ বললেন, 'আপনিও চলুন।'

নাখোদা বিষণ্ণ হেসে বললেন, 'না, আমি জাহাজ ছেড়ে যাব না। আমি জাহাজের নাখোদা। দাঁড়ি-হালিদের ছেড়ে আমি যাব না। এরা যত খারাপই হোক না কেন, নাখোদা কখনও জাহাজের অন্য কর্মীদের ফেলে পালায় না। আমি শেষ পর্যন্ত ওদের সঙ্গে ডেকে দাঁড়িয়ে থাকব। নাখোদাদের সমুদ্রের বুকে মৃত্যু গৌরবের ব্যাপার।'

নাখোদার কথা শুনে তবুও ইতস্তত করতে লাগলেন স্বয়ম্ভুনাথ। একটা কামানের গোলা এসে আছড়ে পড়ল তাঁদের কাছেই। নাখোদা এবার বলে উঠলেন, 'আর দেরি করবেন না। যা বলছি, তাই করুন। এরপর খোলেও আগুন ছড়াচ্ছে। আর দেরি করলে আপনি বাঁচবেন না। অনেক বছর নুন খেয়েছি আপনার। দোহাই আপনার, পালান।'

স্বয়ম্ভুনাথ আর দেরি করলেন না। শেষবারের জন্য তিনি একবার হাত রাখলেন নাখোদার কাঁধে। তারপর ছুটলেন খোলের ভিতর। ধোঁয়া তখন ডেকের ওপর থেকে খোলেও প্রবেশ করেছে। সব কিছু অস্পষ্ট হয়ে আসছে। হাতড়ে হাতড়ে স্বয়ম্ভুনাথ পৌঁছে গেলেন নির্দিষ্ট জায়গাতে। দেওয়ালের গায়ের পাটাতন সরিয়ে ফেললেন। সেই গুপ্তকক্ষের ভিতর তিনটে প্রাণী তখন ধোঁয়াতে দম বন্ধ হয়ে মরতে বসেছিল। স্বয়ম্ভুনাথ সেই কক্ষে প্রবেশ করেই উল্টোদিকের গুপ্ত দরজা খুলে ফেললেন। বাইরেই সমুদ্র। সামোরিনের সেই পেটিকা আর মৎস্যগন্ধাকে তিনি তুলে ফেললেন নৌকোতে। বানরটাও চড়ে বসল তাতে। তারপর স্বয়ম্ভুনাথ আর ভর্তিকা দুজনে মিলে নৌকোটাকে ঠেলে খোল থেকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিলেন। তাঁরা নিজেরাও এরপর বাইরে বেরিয়ে কয়েক হাত সাঁতরে সেই ছোট নৌকোতে গিয়ে উঠলেন। মুহুর্মুহু গোলা এখন আছড়ে পড়ছে মৃচ্ছকটিকের গায়ে, তার আশেপাশের সমুদ্রে। একটা গোলা ছোট্ট নৌকাটার গায়ে এসে পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সেটা। ময়ূরপঙ্খির ডেকে তখন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। কালো ধোঁয়ার বলয় সৃষ্টি হয়েছে তার চারপাশ ঘিরে। সেই ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে স্বয়ম্ভুনাথ আর ভর্তিকা সেই ছোট্ট নৌকার দাঁড় টানতে শুরু করলেন গভীর সমুদ্রের দিকে। মৃচ্ছকটিক থেকে দূরে সরে যাবার আগে স্বয়ম্ভুনাথ শেষ একবার তাকালেন তার সাধের ময়ূরপঙ্খির দিকে। গোলাবর্ষণের মধ্যেই ডেকের রেলিং ধরে অগ্নিকুণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে স্থির অবিচল একটা অবয়ব। আসন্ন মৃত্যুকে যেন সে ব্যঙ্গ করছে। ধন্য নাবিকের জীবন, ধন্য নাখোদার জীবন। তিনি মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও মাথা নত করলেন না। ধোঁয়া আর অন্ধকারের মধ্যে পর্তুগিজদের অলক্ষ্যে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল নৌকাটা। অনেকটা দূরে চলে যাবার পর হঠাৎ স্বয়ম্ভুনাথের পিছনের আকাশটা হঠাৎ যেন লাল হয়ে উঠল, একটা অস্পষ্ট জলোচ্ছ্বাসের শব্দও যেন শোনা গেল। স্বয়ম্ভুনাথ বুঝতে পারলেন বিষ্ফোরণ ঘটার পর সমুদ্রে তলিয়ে গেল তাঁর সাধের মৃচ্ছকটিক। দাঁড় বাইতে লাগলেন স্বয়ম্ভুনাথ। তবে সেই বৃশ্চিক দ্বীপের দিকে নয়, যা অবস্থা তাতে সে-পথ ধরলে আবার পর্তুগিজদের হাতে তাঁদের ধরা পড়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি এগোলেন মাঝ-সমুদ্রের দিকে। কিন্তু শেষ রাতের দিকে স্বয়ম্ভুনাথের হাতদুটো যেন অবশ হয়ে আসতে লাগল। প্রচণ্ড যন্ত্রণাও শুরু হল তাঁর বুকে।

পরদিন দুপুরে একটা ছোট জাহাজ উদ্ধার করল তাদের। বৌদ্ধ তীর্থযাত্রীদের জাহাজ সেটা। জাহাজ না বলে তাকে বড় নৌকা বলাই ভালো। বৌদ্ধ তীর্থস্থান দর্শন করে ঘরে ফিরছেন তাঁরা। এক মঠাধ্যক্ষ ও তার কয়েকজন শিষ্য। চারটে প্রাণী আর সিন্দুকটাকে বৌদ্ধদের নৌকায় তুলে নেওয়া হলেও স্বয়ম্ভুনাথ তখন মৃত্যুপথযাত্রী। কথা বন্ধ হয়ে গেল তাঁর। শেষ ক'টা দিন কোন অজানা আত্মীয়তায় তাঁর পাশে সবসময় বসে থাকত মৎস্যগন্ধা। বোবা দৃষ্টিতে তারা দুজন চেয়ে থাকত দুজনের দিকে। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা তাঁদের সাধ্যমতো আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন স্বয়ম্ভুনাথকে বাঁচাবার জন্য। ঘৃত-ওষধী লেপন করেছিল তাঁর বুকে। কিন্তু তাদের চেষ্টা বিফলে গেল। শেষক্ষণ ঘনিয়ে এল স্বয়ম্ভুনাথের জীবনে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মঠাধ্যক্ষ বৌদ্ধ ভিক্ষু তাঁকে জিগ্যেস করলেন, 'আপনি কিছু বলে যেতে চান?'

প্রশ্ন শুনে স্বয়ম্ভুনাথ তাঁর কাঁপা কাঁপা হাতটা তুলে প্রথমে নির্দেশ করলেন তাঁর শয্যার পাশে রাখা সামোরিনের সেই পেটিকার দিকে, তারপর অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন মৎস্যগন্ধার দিকে। আর এরপরই স্বয়ম্ভুনাথের হাতটা খসে পড়ল। চোখ বন্ধ হয়ে গেল তাঁর। পরমুহূর্তেই একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল মৎস্যগন্ধার গলা থেকে।

স্বয়ম্ভুনাথ হিন্দু। হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী তাঁকে দাহ করারই নিয়ম। কিন্তু মাঝসমুদ্রে যে কাজ সম্ভব নয়। তাই তার মুখে একটা জ্বলন্ত কাঠকয়লা পুরে দেহটাকে ভাসিয়ে দেওয়া হল সমুদ্রে। হয়তো বা জলের নীচে আবার তাঁর মিলন হবে মৃচ্ছকটিকের সঙ্গে। স্বয়ম্ভুনাথের আর কালিকটে ফেরা হল না। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি জেনে যেতে পারলেন না যে, শেষ পর্যন্ত ভাস্কো কালিকট দখল করতে পারেননি। তাঁর সঙ্গে এস্তাভাও-এর সাক্ষাতের পরদিন সকাল থেকে পর্তুগিজরা কালিকট বন্দরের ওপর গোলা বর্ষণ শুরু করেছিল ঠিকই, হয়তো তারা দখলও করে নিত কালিকট, কিন্তু ভাস্কো, এমনকী স্বয়ং সামোরিনেরও জানা ছিল না যে, মেরি জাহাজের নিরীহ হজযাত্রীদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে আরবদের এক বিশাল নৌবহর এগিয়ে আসছে। সেই নৌবহরের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা পর্তুগিজ নৌবহরের ছিল না। তারা প্রায় চক্রব্যুহে বেঁধে ফেলেছিল পর্তুগিজ অ্যাডমিরালকে। সহকারী ভিনসেন্ট সোদ্রের বুদ্ধিমত্তায় ভাস্কো শেষ মুহূর্তে প্রাণে বেঁচে গিয়ে রওনা হয়েছেন পর্তুগালের দিকে, বলা ভালো পালিয়ে যাচ্ছেন। এদেশে তার এই দ্বিতীয় অভিযানের শেষে জনাকুড়ি আরবকে মাঝসমুদ্রের এক জাহাজ থেকে বন্দি করে পর্তুগাল নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর তেমন কিছুই নিয়ে যেতে পারছেন না ভাস্কো এমনকী জেপাং নারীদেরও নয়; সে জাহাজের দখল নিয়েছে আরবরা। আর ফিরে যাবার সময় ভাস্কো এদেশের মানুষের কাছে রেখে গেলেন তাঁর উন্মক্ত-হিংস্র-নিষ্ঠুর এক মূর্তি। যে দানবীয় মূর্তি মেরির নিরপরাধ শিশুদের মৃত্যু দেখে অট্টহাস্য করেছিল, ধীবরদের মুন্ডু কেটে দেহগুলোকে পর্তুগিজ জাহাজের মাস্তুলের আড়কাঠে টাঙিয়েছিল, দখল করার চেষ্টা করেছিল কালিকট বন্দর।

স্বয়ম্ভুনাথের দেহ অন্তিম সংস্কারের পর বৌদ্ধ শ্রমণদের নৌকাটা মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে যাত্রা শুরু করল। না, সে-জায়গা কালিকট বন্দর নয়, কালিকট থেকে বহু দূরে হাজার বছরের প্রাচীন এক বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হল তাঁরা। যেখানে আছে তাঁদের প্রাচীন মঠ। সে-মঠ সেই প্রাচীন বন্দরের থেকেও প্রাচীনতম।

অধ্যায় ১ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%