দ্বিতীয় পর্ব

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

'নাবিকদের বন্দরে বন্দরে স্ত্রী থাকে'—এ প্রবাদ নাবিকদের সম্বন্ধে চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। স্ত্রী অর্থাৎ শয্যাসঙ্গিনী-বন্দর সুন্দরী—বন্দর-বেশ্যার দল। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার শেষে যখন বন্দরে জাহাজ এসে ভেড়ে তখন যারা নাবিকদের রোদে পোড়া, সমুদ্রের নোনা বাতাসে মৃতমানুষের দেহের মতো চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া দেহগুলোকে আলিঙ্গন করে, নাবিকদের দেহগুলোকে তৃপ্ত করে। কখনও কখনও বন্দর সুন্দরীরা ক্ষণিকের তরে কোনও অচেনা অজানা নাবিককে ভালোওবেসে ফেলে, অথবা ভালোবাসার অভিনয়ও করে। অভিনয় হলেও অবশ্য তাতে তেমন কোনও ক্ষতি হয় না নাবিকদের। সে তো আর সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবে না বন্দর সুন্দরীকে। কিছুদিনের জন্য নাবিকের দেহ, হয়তো বা মনও বিনিময় হয় সেই বন্দর সুন্দরীর সঙ্গে। তারপর নাখোদা বা জাহাজের মালিক-নায়ক একদিন জানিয়ে দেন, 'কাল ভোরে জাহাজ ছাড়বে।' ভিনদেশী নাবিক তার সঙ্গিনীর আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে আবার জলে নেমে পড়ে। নাবিকের কাছে সমুদ্রের ডাক অগ্রাহ্য করা বড় কঠিন। হয়তো দিনের শেষে জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে নাবিকের প্রথম কয়েকটা দিন মনে পড়ে তার বন্দর কালের কথা, সেই বন্দর সুন্দরীর কথা; তারপর ধীরে ধীরে সমুদ্রর নোনা বাতাস আর নাবিকের কঠিন পরিশ্রমের জীবন নাবিকের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলে সেই বন্দর সুন্দরীকে। জাহাজ এগিয়ে চলে, পাড়ি দেয় নতুন কোনও বন্দরের উদ্দেশে। যেখানে অচেনা অজানা কোনও বন্দর সুন্দরী প্রতীক্ষা করে আছে তার জন্য।

আর সেই বন্দর সুন্দরী, যাকে ছেড়ে এল সেই নাবিক? সে যদি নাবিককে ক'দিনের জন্যেও সত্যি ভালোবেসে থাকে তবে বন্দর ছেড়ে চলে যাওয়া, সমুদ্রর বুকে ক্রমশ ছোট হতে হতে হারিয়ে যাওয়া জাহাজটার দিকে তাকিয়ে গোপনে একবার চোখ মোছে। বন্দর সুন্দরীদের কাঁদতে নেই। তাই সবার অলক্ষ্যে চোখ মুছে সে আবারও সুন্দরী হয়ে ওঠে। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে নতুন কোনও নাবিকের প্রতীক্ষায়।

'যে বন্দরে বেশ্যালয় নেই সেটা কোনও বন্দরই নয়'। একথা নাবিকদের মুখে মুখে ফেরে। 'বন্দর' আর 'বেশ্যালয়' শব্দদুটো তাদের কাছে সমার্থক। তাই প্রতি বন্দরেই অসংখ্য না হলেও অন্তত একটা বেশ্যালয় থাকবেই। বন্দর-গণিকাদের এই আস্তানাগুলো যেমন ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠে, তেমন কোথাও কোথাও ওঠে রাজা বা স্থানীয় জমিদারের অর্থানুকুল্যে। কারণ এ ব্যবসায় মুনাফা প্রচুর। নাবিকের জীবন পদ্মপাতায় জলের মতো। একবার সমুদ্রে ভাসলে আবার কোনওদিন মাটিতে পা রাখতে পারবে কিনা জানা থাকে না কারোরই। যে-কোনও মুহূর্তে সমুদ্রে ঝড় উঠতে পারে, জলদস্যু বা শত্রুজাহাজ হানা দিতে পারে, সামুদ্রিক রোগ কেড়ে নিতে পারে জীবন। সমুদ্রের নোনা বাতাসও অনেক সময় হিংস্র করে তোলে নাবিকদের। মুহূর্তের মনোমালিন্যে জাহাজের ডেকে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে পড়ে দুজন নাবিক। যারা একটু আগেই হাতে হাত মিলিয়ে পালের দড়ি খাটিয়েছিল বা পাশাপাশি বসে দাঁড় টানছিল, মুহূর্তের বচসায় তারা হয়ে ওঠে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। আস্তিনের নীচ থেকে বেরিয়ে আসে তীক্ষ্ন জাহাজি ছুরি অথবা বুকে ঝোলানো খাপ থেকে লম্বা চোঙার মতো নলঅলা বারুদ-ঠাসা পিস্তল। অন্য নাবিকরা যুযুধান দু-পক্ষের চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করে এ-লড়াই। যতক্ষণ না একজন নাবিকের মৃতদেহটা ডেক থেকে সমুদ্রের জলে ছুড়ে ফেলে দেবার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে ততক্ষণ লড়াই চলতে থাকে। এভাবে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদেও অনেকের মৃত্যু ঘটে। কাজেই যতক্ষণ তারা বন্দরে থাকে ততক্ষণ তারা জীবনটাকে চেটেপুটে উপভোগ করে নেয়। তারা তখন শুধু বর্তমানের কথা ভাবে, ভবিষ্যতের কথা ভাবে না। বিশেষত, সেই সব নাবিকরা, যাদের কোথাও কোনও ঘরবাড়ি নেই, পরিজন বলে কেউ কোথাও নেই, শুধু সমুদ্র আর এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে ভাসতে ভাসতে জীবনটাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়াই যাদের কাজ তারা অনেক সময় জাহাজ থেকে পাওয়া সর্বস্বও তুলে দেয় বন্দরের গণিকালয়ের মালিক বা মালকিনদের কাছে।

পালতোলা পর্তুগিজ জাহাজটা এগিয়ে চলছিল বন্দরের দিকে। এ-বন্দর পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বন্দর। এতটাই প্রাচীন যে এই বন্দরের কথা পুরাণগ্রন্থেও উল্লেখ আছে। এখানকার রাজা তাম্রধ্বজ নাকি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবপক্ষ অবলম্বন করেছিলেন। চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙা ছুঁয়ে গেছিল এ-বন্দর, এখান থেকেই একদিন বোধিবৃক্ষের চারা নিয়ে সিংহলে যাত্রা করেছিলেন অশোক সন্তান। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ মহাবংশে উল্লেখিত, চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাঙ যার টানে ছুটে এসেছিলেন, যার নাম তিনি তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন 'তান-মো-লি-তি' নামে, গ্রিক ভৌগোলিক টলেমির মানচিত্রে 'তমালিটিস' বলে উল্লেখ করা হয়েছে যে বন্দরকে, সে বন্দরে আজ কোনও দুঃসাহসী জাহাজ না ভিড়লেও কিছু জাহাজ কিন্তু আজও ভেড়ে এ বন্দরে। এ বন্দরকে আজ কেউ ডাকে তাম্রলিপ্তি বলে। কেউ বলে তমালিকা বন্দর।

বন্দর যখন তখন তো সেখানে বেশ্যালয় থাকবেই। এ বন্দরেও আছে। বলতে গেলে এই বেশ্যালয়টাই বর্তমানে অনেকাংশে এ মৃতপ্রায় বন্দরের কৌলিন্য ধরে রেখেছে। সাতগাঁও বা সপ্তগ্রামে যেসব ভিনদেশি বণিকের দল বাণিজ্য করতে যায় তারাও আসাযাওয়ার পথে একবার ছুঁয়ে যায় এ বন্দর। কারণ, ওই বন্দরস্থিত গণিকালয়ের আকর্ষণ। ভারতীয়, সিংহলি, জেপাং, আরব, এমনকী নীলনয়না শ্বেতাঙ্গ সুন্দরীদেরও দেখা মেলে এই তমালিকা বন্দরে। নাবিকদের দেহ-মনের ক্ষুধা মেটায় তারা। এই গণিকালয় ব্যক্তি মালিকানাধীন। স্থানীয় জমিদারকে করের বিনিময়ে এই গণিকালয় পরিচালনা যে করে সে পুরুষ নয়, এক নারী। তার নাম 'মৎস্যগন্ধা'। দীর্ঘাঙ্গী, চাঁপাফুলের মতো গাত্রবর্ণ, হরিণ নয়না সেই তন্বী তমালিকা বন্দরের গণিকালয়ের সর্বময়ী কর্ত্রী। বয়স তার তিরিশ ছুঁই ছুঁই। কিন্তু রূপলাবণ্যে সে যে-কোনও অষ্টাদশী তরুণীকেও হার মানায়। লোকে বলে তমালিকা বন্দরের গণিকালয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী সে-ই। তবে সাধারণ নাবিকরা তার স্পর্শসুখ থেকে বঞ্চিত থাকে। ধনী ব্যবসায়ী, জাহাজের নায়ক অর্থাৎ মালিক—এ ধরনের লোককেই মোটা অর্থের বিনিময়ে স্পর্শদান করে সে। এমনকী জাহাজ যদি বড় না হয় তবে তার নাখোদা বা ক্যাপ্টেনকেও সে তার ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। তার কটিদেশে থাকে এক তীক্ষ্ন ছুরিকা। বেশ কয়েকবার কয়েকজন অবাধ্য নাবিক সেই ছুরিকার স্বাদ গ্রহণ করেছে। আরও একজন সবসময় তার সঙ্গে থাকে। মানুষের মতো আকারের বিশাল এক ভিনদেশি বাঁদরি—একটা শিম্পাঞ্জি। মৎস্যগন্ধা আর তার বাঁদরি কবে কোন দেশ থেকে এই তমালিকা বন্দরে এসে উপস্থিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা নেই কারও। শুধু তারা আজ একটা কথাই জানে, মৎস্যগন্ধাকে বাদ দিয়ে তমালিকা বন্দরের কথা ভাবা যায় না। মৎস্যগন্ধা আর তমালিকা বন্দর এ শব্দদুটো এখন প্রায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বন্দরবাসীর কাছে।

মোহনা ছেড়ে চওড়া নদীপথ ধরে তমালিকা বন্দরের দিকে এগোচ্ছিল পর্তুগিজ জাহাজ 'সান্টা মারিয়া'। সকালের বাতাসে তার প্রধান মাস্তুলের মাথায় পতপত করে উড়ছিল রক্তবর্ণের ক্রশ আঁকা পর্তুগিজ পতাকা। না, তবে এ জাহাজ পর্তুগিজ রণপোত নয়। ডেকে বসানো একটা আবশ্যিক কামান ছাড়া কোনও অস্ত্র বহন করছে না এই ছোট বাণিজ্যপোত। অস্ত্র থাকলে তাদের সম্বন্ধে সন্দেহ জাগতে পারে বন্দরবাসীর মনে। এমনিতেই পর্তুগিজদের সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সুখকর নয় এদেশের মানুষের কাছে। ভাস্কোর দ্বিতীয় অভিযান, তারপর আলবুকার্কের ভারত অভিযান, তারও নৃশংসতা, কালিকট বন্দর দখল না করতে পারলেও গোয়াতে পর্তুগিজ উপনিবেশ স্থাপন করা এসব ভালোভাবে দেখেনি ভারতের অন্য অঞ্চলের মানুষও। একুশ বছর পর ভাস্কো আবার ভারতে আসছেন। এবার তিনি এদেশে আসছেন পর্তুগালের নতুন সম্রাট তৃতীয় জন-এর সনদ নিয়ে পর্তুগিজ উপনিবেশ গোয়ার শাসক অর্থাৎ ভাইসরয়ের দায়িত্ব সামলাবার জন্য। তাঁর এই তৃতীয় অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাঁকে ভারতের মাটিতে থাকতে হবে অন্তত বেশ কয়েকটা বছর। তাই এবার অনেক বেশি সতর্ক ভাস্কো। লিসবন বন্দর থেকে ইতিমধ্যে তিনি তাঁর দুই পুত্র ডম পাওলো, ডম এস্তাভাও আর তিন হাজার নাবিকের চোদ্দোটি বড় জাহাজের নৌবহরকে নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন ঠিকই কিন্তু সান্টা মারিয়ার মতো বেশ কিছু ছোট বাণিজ্যতরীকে দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন বন্দরগুলোতে তাঁর নৌবহরের যাত্রা শুরুর আগেই পাঠিয়ে দিয়েছেন। সান্টা মারিয়ার মতো জাহাজগুলোর কাজ হবে এসব বন্দরে বাণিজ্য করার সঙ্গে সঙ্গে বন্দরের হাল হকিকত সম্বন্ধে খোঁজ নেওয়া এবং তা গোয়াতে ভাস্কোর কানে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষত এ অঞ্চলের গাঙ্গেয় বন্দর সম্বন্ধে বেশ আগ্রহ জেগেছে ভাস্কোর মনে। তমালিকা বন্দর থেকে বেশ কিছুটা দূরে মোহনার অন্য অংশে ছোট একটা বাণিজ্যকুঠি নির্মাণ করেছে এক পর্তুগিজ বণিক। সে পর্তুগালের খবর পৌঁছে দিয়েছে যে, ভারতের দূরবর্তী এই অঞ্চল নাকি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ। আরবদের আক্রমণের ভয় সেখানে নেই। আর স্থানীয় জমিদাররাও তেমন সামরিক ক্ষমতাসম্পন্ন নন। কাজেই এ তল্লাটে দ্বিতীয় এক উপনিবেশ গড়ে তোলা যায় কিনা সে-ভাবনা খেলা করছে ভাস্কোর মনে। নিদেনপক্ষে সমুদ্রে ভাসার নিরাপদ কোনও পথ।

ভোরের সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে নদীর জলে। নদীর দু-পাশে সবুজ ধানের খেত, আম-কাঠালের বন। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে শনের চালঅলা মেটে বাড়ি, নদীর পাড়ে বাংলার শান্ত পল্লীগ্রাম। মাঝে-মাঝে মোরগের অস্পষ্ট ডাক ভেসে আসছে সেখান থেকে। দুইতলা পালতোলা জেলে নৌকা ভাসছে নদীর কূল ঘেঁষে। ডেকে দাঁড়িয়ে এসব দেখতে দেখতে এগোচ্ছিল এস্তাদিও। এই পর্তুগিজ বাণিজ্যতরীর সর্বাধিনায়ক সে। তাকে যুবকই বলা যায়। বয়স মাত্র তিরিশ। বংশগরিয়াত ভাস্কোর আত্মীয় সে। তবে এস্তাদিও জানে তার এ-পরিচয় দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তার এখন একমাত্র পরিচয় হবে, সে একজন পর্তুগিজ বণিক। এদেশের তমালিকা বন্দরে প্রথম বারের জন্য সে পা রাখছে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে।

বেশ লাগছিল এস্তাদিওর। এদেশে সম্বন্ধে সে যতটুকু শুনেছে তা মূলত কালিকট বন্দর এবং সংলগ্ন অঞ্চলের ব্যাপার-স্যাপার। গঙ্গার মোহনায় অবস্থিত এই জায়গা সম্বন্ধে তার স্বদেশিরা খুব বেশি তথ্য দিতে পারেনি তাকে। কাজেই একেবারে অচেনা অজানা ভিনদেশি বন্দরে পদার্পণ করার আগে একটা উৎকণ্ঠা জাগা স্বাভাবিক। ডেকে দাঁড়িয়ে নিজের দেশের কথাও মনে পড়ছিল তরুন এস্তাদিওর। বার কয়েক জাহাজ নিয়ে মোম্বাসা বন্দরে গেলেও এতদূরে কখনও সে আসেনি। অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন 'জেনোয়ার কাঁটা' অর্থাৎ কম্পাসের ওপর নির্ভর করে এতটা পথ পাড়ি দিয়েছে। এক-এক সময় মনে হচ্ছিল, জেনোয়ার কাঁটা ঠিক পথ নির্দেশ করেছিল তো? সে ঠিক জায়গাতে পৌঁছেছে তো?

নানা কথা ভাবছিল এস্তাদিও। একসময় মাস্তুলে বসে থাকা নজরদার হাঁক দিল, 'বন্দর! বন্দর দেখা যাচ্ছে!' সঙ্গে সঙ্গে এস্তাদিও আতসকাচ লাগানো পিতলের নলটা নিয়ে তাকাল সেদিকে। তার চোখে অস্পষ্টভাবে ভেসে উঠল তমালিকা বন্দর। নজরদারের হাঁক শুনে নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন পেরো, নলটা চোখে দিয়ে দেখে নিয়ে তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, অবশেষে আমরা পৌঁছে গেছি!'

এস্তাদিও ক্যাপ্টেনকে বলল, 'সব নাবিকদের ডেকে উপস্থিত হতে বলুন। তাদের উদ্দেশ্যে কিছু নির্দেশ দিতে হবে বন্দরে পৌঁছোবার আগে।'

এস্তাদিওর নির্দেশমতো ক্যাপ্টেন পেরো কিছুক্ষণের মধ্যেই সার বেঁধে সবাইকে দাঁড় করালেন জাহাজের ডেকে। যেখানে নোঙরের শিকল বাঁধা থাকে সেই ক্যাপস্টেনের ওপর উঠে দাঁড়াল এস্তাদিও। তারপর সমবেত নাবিকদের উদ্দেশ্যে বলল, 'আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নতুন দেশের মাটিতে পদার্পণ করতে যাচ্ছি। ওই যে বন্দর দেখা যাচ্ছে। এ জায়গা সম্বন্ধে আমাদের কিছুই জানা নেই। আশা করি তারা আমাদের সঙ্গে সৌহাদ্যপূর্ণ আচরণ না করলেও দুর্ব্যবহার করবে না। যদি তা করেও তবে আমাদের সবাইকে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, এ বন্দরে কিছুকাল অবস্থান করা আমাদের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি। যদি বন্দরে আমরা পা রাখতে পারি তবে সেখানে অবস্থানকালে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কোনও বিতর্ক বিবাদে জড়ানো চলবে না। বিশেষত, পানশালা বা গণিকালয়গুলোতে যতদিন অনুমতি না দেব ততদিন যাওয়া চলবে না। জুয়ার আড্ডা এড়িয়ে চলাই বাঞ্ছনীয়, কারণ সেখান থেকে গন্ডগোলের সূত্রপাত হয়। আমাদের জাহাজের অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্বন্ধে কোনও আলোচনা স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে করা চলবে না। কোনও সন্দেহজনক ব্যাপার দেখলে বা ঘটনা শুনলে সঙ্গে সঙ্গে তা আমাকে বা ক্যাপ্টেনকে জানাতে হবে। প্রয়োজনবোধে আমাকে হয়তো বন্দরেই আশ্রয় নিতে হবে। ক্যাপ্টেন জাহাজেই থাকবেন। সূর্যাস্তের পূর্বে সব নাবিককে জাহাজে ফিরে আসতে হবে। ক্যাপ্টেন গুনতি করবেন। স্থানীয় কোনও লোককে সঙ্গী করে জাহাজে আনা চলবে না। কোনও দেহোপজীবিনীকে নয়ই। এ নির্দেশ অমান্য করলে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। যা বললাম সবাই মনে রাখবে। আশা করি মাতা মেরির আশীর্বাদে আমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। মাতা মেরি আমাদের আশীর্বাদ করুন। জয় পর্তুগালের জয়। জয় পর্তুগাল সম্রাট তৃতীয় জনের জয়।'

এস্তাদিও সঙ্গে গলা মেলাল নাবিকরা—'জয় মাতা মেরির জয়, জয় পর্তুগাল সম্রাটের জয়!' এরপর তারা লেগে গেল যে-যার কাজে—ক্যাপস্টেনের থেকে নোঙরের শিকল খোলার কাজে, জাহাজ থেকে নৌকা নামাবার প্রস্তুতিতে।

ক্রমশ এগিয়ে আসছে তাম্রলিপ্তি—তমালিকা বন্দর।

এস্তাদিও-ও তার কেবিনে গিয়ে ঢুকল। পোশাক পাল্টে নিল সে। গায়ে লাল সাদা ডোরাকাটা পিতলের বোতাম আঁটা, কাঁধে রঙিন পটি আঁটা লম্বা পোশাক, মাথায় নীল রঙের বাঁকানো জাহাজি টুপি, হাঁটু পর্যন্ত ঝকঝকে চামড়ার জুতো, রুপোর গুলআঁটা চওড়া কোমরবন্ধে তলোয়ার ঝুলিয়ে জাহাজের ডেকে বেরিয়ে এল সে! জাহাজের ক্যাপ্টেনসহ বেশ কিছু উচ্চপদস্থ কর্মীও তাদের পদমর্যাদা অনুযায়ী নিজেদের পোশাকে সজ্জিত হয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

নদীর পাড় বরাবর বেশ কয়েক মাইল বিস্তৃত তমালিকা বন্দর। তবে তার অধিকাংশই এখন পরিত্যক্ত।

বাংলার প্রধান বন্দরের মর্যাদা সে হারিয়েছে অন্তত চারশো বছর আগে। সাতগাঁও আর চট্টগ্রাম এখন বাংলার দুই প্রধান বন্দর। শ্বেতাঙ্গ জাহাজ এখন আর এ বন্দরে বেশি আসে না। বিদেশি জাহাজ বলতে এখানে আসে কিছু সিংহলী জাহাজ, আরব ধাও আর চীনা জাঙ্ক। বন্দরে মালতে আর স্থানীয় বড় বড় নৌকার ভিড়ই বেশি। তবুও আজও টিকে আছে এ-বন্দর। বর্তমান জাহাজঘাট আর বন্দর একটা ছোট অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পণ্যমজুতের গুদামঘর, নাবিকদের খোলার ঘর, সব মিলিয়ে জায়গাটা বেশ ঘিঞ্জি। বন্দরের কাছে পৌঁছে মাঝনদীতে নোঙর করল পর্তুগিজ জাহাজ। বেশ কয়েকবার শঙ্খধ্বনি শোনা গেল বন্দর থেকে। এ শঙ্খধ্বনির অর্থ হল, বন্দরে নতুন জাহাজের আগমন ঘটল, তা আশেপাশের সবাইকে জানিয়ে দেওয়া। পর্তুগালের লিসবন বন্দরে যখন কোনও জাহাজ ভেড়ে তখন ঘণ্টাধ্বনি দিয়ে সে সংবাদ বন্দরবাসীকে জানিয়ে দেওয়া হয়। আর আফ্রিকার মোম্বাসা বন্দরে এ-কাজ করা হয় শিঙা অর্থাৎ মহিষের শিং-এর ভেঁপু বাজিয়ে।

এস্তাদিওর জাহাজ নোঙর ফেলার কিছুক্ষণের মধ্যেই ছইঅলা ছোট-বড় নৌকা এসে ঘিরে ধরল জাহাজটাকে। যেমন অন্য জাহাজ বন্দরে ভিড়লে ঘিরে ধরে নৌকার দল। এইসব নৌকাগুলো কিছু পণ্য ব্যবসায়ীদের দালালদের, আর কিছু নৌকা আসে জাহাজের নাবিকদের পাড়ে পৌঁছে দেবার জন্য। এস্তাদিওর জাহাজে পাঁচটা ছোট নৌকা আছে। সেগুলো জলে নামানো হল। এস্তাদিও কিন্তু সে নৌকাগুলোতে না চেপে জনা সাতেক সঙ্গীকে নিয়ে চেপে বসল স্থানীয় এক নৌকাতে। উদ্দেশ্য, পাড়ে ওঠার পথে স্থানীয় মাঝির থেকে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া। চারজন মাঝি দাঁড় টানছে নৌকার। তাদের মধ্যে বয়সে যে প্রবীন তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল এস্তাদিও। বড় বড় বন্দরগুলোতে বিভিন্ন দেশের নাবিকরা আসে বলে সেখানে এক ধরনের মিশ্র ভাষা গড়ে ওঠে। সে ভাষা আর আকার ইঙ্গিতে মোটামুটি কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। আর বড় বন্দরগুলোতে এক-আধজন স্বদেশীয়র দেখা মিলেই যায়, যে স্থানীয় ভাষা জানে। তখন তাকে দিয়ে দোভাষীর কাজ করানো হয়। এস্তাদিও প্রথমে জানতে চাইল, 'এ বন্দর থেকে কী কী মাল ওঠে?'

মাঝি জবাব দিল, 'প্রধানত কাপড়, রেশম, চাল, দারুচিনি, গোলমরিচসহ বিভিন্ন ধরনের মশলা। মল্লাকা থেকেও এখানে মশলা এসে জমা হয়, তারপর বিভিন্ন দেশে যায়।

জবাব দিয়ে লোকটা জানতে চাইল, 'তোমাদের জাহাজে কী আছে? কী কিনতে এসেছ তোমরা? দরকার হলে আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারি।'

এস্তাদিও বুঝতে পারল, এ লোকটারও দালালী করে দু-পয়সা কামিয়ে নেবার ইচ্ছা আছে।'

এস্তাদিও বলল, 'কাচ আর রুপোর বাসনপত্র। হাতির দাঁত আর মোষের সিং-এর লণ্ঠন সঙ্গে এনেছি। ইচ্ছা আছে এখান থেকে রেশম কেনার।'

লোকটা আবারও বলল, 'স্থানীয় বণিকদের সঙ্গে আমি তোমাদের যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি।'

এস্তাদিও বলল, 'সে প্রয়োজন যখন হবে তখন তোমাকে নিশ্চই বলব। আচ্ছা, এখানে বাণিজ্য করতে হলে শুল্ক দিতে হয় নিশ্চই? কাকে দিতে হয়?'

মাঝি জবাব দিল, জমিদারকে। বন্দরে শুল্ক-দারোগার দপ্তর আছে। সেখানে গিয়ে আগে জাহাজের নাম, নায়কের নাম এসব নথিভুক্ত করে বন্দর-বাণিজ্যের অনুমতি নিতে হবে। তারপর সেই অনুমতিপত্র দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ শুরু করা যাবে।'

এস্তাদিও জানতে চাইল, 'বন্দরে চোর-ডাকাতের উপদ্রব নেই তো?'

লোকটা বলল, 'ডাকাতের উপদ্রব নেই, তবে চোর-জোচ্চোর মাতালের উপদ্রব তো সব বন্দরেই থাকে। এখানেও কিছুটা আছে। তবে তেমন ভয়ের কিছু নেই। জমিদারের একদল রক্ষীবাহিনী বন্দর অঞ্চলে টহল দেয়। তাদের একটা চৌকিও আছে বন্দরে।'

'তোমাদের জমিদারের নাম কী?' জানতে চাইল এস্তাদিও।

'মহারাজ যদুনাথ ভুইঞ্যা রায়। বন্দর থেকে কিছুটা ভিতরে জমিদার- বাড়ি'—জানাল মাঝি।

'তোমাদের এই তমালিকা বন্দরে কী কী দর্শনীয় স্থান আছে? প্রশ্ন করল পর্তুগিজ যুবক।

দাঁড় টানতে টানতে বৃদ্ধ মাঝি বলল, 'জমিদারবাড়ি, বর্গভীমার মন্দির। আর একটা প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ। মন্দির আর মঠ এ-দুটোই অবশ্য ঠিক বন্দরে নয়, বেশ খানিকটা ভিতর দিকে। তবে বন্দর এলাকাতে অন্য একটা জিনিস আছে যার জন্য বহু জাহাজ এসে ভেড়ে এই বন্দরে।'—এই বলে থেমে গেল লোকটা।

'কি জিনিস?' জানতে চাইল এস্তাদিও।

মুহূর্তখানেক চুপ করে রইল। তারপর আবছা হাসি ফুটে উঠল বৃদ্ধের ঠোঁটের কোণে। সে বলল, 'মৎস্যগন্ধার কোঠাবাড়ি। বেশ্যালয়। সব জাতের, সব ধরনের মেয়ে পাবে সেখানে। তুমি যেমনটা চাও। বিরাট বাড়ি সেটা। একসঙ্গে তিনশ জন পুরুষ সেখানে রাত কাটাতে পারে।'

'মৎস্যগন্ধা' শব্দটা বুঝতে না পেরে এস্তাদিও বলল, 'মৎস্যগন্ধা কী?'

মাঝি জবাব দিল 'ওই বেশ্যালয়ের পরিচালিকার নাম 'মৎস্যগন্ধা।'

কথাটা শুনে একটু আশ্চর্য হল এস্তাদিও। তার নিজের দেশে কয়েকজন নারী পানশালার ছোট গণিকালয়ের দায়িত্বে থাকে ঠিকই, কিন্তু এ-দেশের মতো কোন জায়গাতে কোনও নারী বন্দর অঞ্চলে বেশ্যালয় চালাতে পারে তা তার ধারনার মধ্যে ছিল না। আরও সামান্য কিছু কথা বলতে বলতেই নৌকা তীরে এসে ভিড়ল। তমালিকা বন্দরের মাটিতে পা রাখল পর্তুগিজ যুবক।

বন্দর অঞ্চলটা বাজারের মতো। বড় বড় গুদাম তো আছেই, তার সঙ্গে সঙ্গে আছে কাঠ অথবা খড়ের ছাউনিঅলা ছোট-বড় দোকান। রাস্তার ধারে বসে টাটকা ফল-শাকসবজি-মাছ বিক্রি করছে কেউ কেউ। নানা জাতের নানা মানুষের ভিড় লেগে আছে। জোব্বা-পরা আরব বণিক, সিল্কের রঙিন পোশাক, মাথার সামনের অংশ কামানো কিন্তু পিছনে লম্বা বেণিঅলা চীনা জাঙ্কের নাবিক, কৃষ্ণবর্ণের সিংহলি শ্রমিক বা পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে নিয়োজিত আফ্রিকান মানুষের সংখ্যাই তাদের মধ্যে বেশি। আর আছে স্থানীয় মানুষেরা। তাদের পরনে সুতির কাপড়, গায়ে উড়নি বা সুতির কাপড়ের ঢিলা জামা, কার মাথায় কাপড়ের পাগড়িও আছে। এছাড়া অন্য সব বন্দরের মতো এখানেও ঘুরে বেড়াচ্ছে নোংরা-ছিন্ন বসন পরা ভিখারি আর ভবঘুরে নাবিকের দল। নানা মানুষের চিৎকার চেঁচামেচিতে সরগরম জায়গাটা।

এই নতুন শ্বেতাঙ্গ আগন্তুক বন্দরে পা রাখতেই আবার তাকে ঘিরে ধরল একদল ফড়ে-দালাল। সে কী পণ্য কিনতে চায়, কী পন্য বেচতে চায়, নানা প্রশ্ন তাদের। এস্তাদিওকে প্রথমে ব্যবসার জন্য অনুমতিপত্র নিতে হবে। তাই একজনকে জিগ্যেস করে সে চলল শুল্ক দারোগার দপ্তরের দিকে। স্থানীয় লোকগুলোও তাকে ঘিরে চলতে লাগল। তাদের নানা প্রশ্নের জবাবে এস্তাদিও এমন ভাব দেখাতে লাগল যেন তাদের কথা সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে দারোগার দপ্তরের কাছাকাছি এসে থেমে গেল তারা।

ইটের দেওয়ালের একটা লম্বা বাড়ি। মাথায় খড়ের চাল। বাড়িটার সামনে কয়েকজন রক্ষী দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় পাগড়ি, পরনে সুতির কাপড় চওড়া কোমর বন্ধ দিয়ে বাঁধা। হাতে বল্লম। এ-বাড়িটাই দারোগার দপ্তর। রক্ষীরা এই ভিনদেশীকে দেখে পথ ছেড়ে দিল। একজন সঙ্গীকে নিয়ে বাড়িটার ভিতর প্রবেশ করল এস্তাদিও। দলিল দস্তাবেজ ঠাসা বেশ অনেকক'টা ঘর বাড়িটার ভিতরে। জনা কুড়ি লোক বসে কাজ করছে। তাদের মধ্যে একজন এস্তাদিওকে নিয়ে হাজির করাল দারোগার সামনে। বিশাল বপু একটা লোক। মাথায় পাগড়ি, গায়ে সুতির পোশাক। তার বুকের কাছে সোনার বোতাম বসানো, ঝোলা গুম্ফ। লোকটা সন্দিগ্ধভাবে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, 'তুমি কোন দেশের লোক? কোথা থেকে আসছ?'

এস্তাদিও জবাব দিল, 'পর্তুগাল থেকে। আমি এস্তাদিও। বণিক এস্তাদিও। সান্টা মারিয়া নামের বাণিজ্যপোতের মালিক। কিছুক্ষণ আগেই সান্টা মারিয়া নোঙর ফেলেছে এখানে। এ বন্দরে আমি বাণিজ্য করতে চাই।'

লোকটা শুনে বলল, 'পর্তুগিজ! তারা তো শুনেছি যেখানে যায় সেখানেই ঝামেলা বাঁধে। এখানে আবার ঘাঁটি গেড়ে বসার ইচ্ছা নেই তো তোমার?'

দারোগার কথা শুনে এস্তাদিও বুঝতে পারল যে, এদেশের লোকেরা পর্তুগিজদের সম্বন্ধে কী ধারণা পোষণ করে! লোকটাকে খুশি রাখতে হবে। এস্তাদিও তাই বলল, 'আমি সাধারণ বণিকমাত্র। ব্যবসা করতে এসেছি। ওসবের পরিকল্পনা বা ক্ষমতা আমার নেই।' এ কথা বলার পর সে তার পোশাকের ভিতর থেকে একটা ছোট ভেলভেটের কৌটো বের করল। তার মধ্যে রাখা আছে লাল চুনীপাথর বসানো একটা সোনার আংটি। বাক্সটা খুলে শুল্ক দারোগার দিকে সেটা বাড়িয়ে দিয়ে এস্তাদিও বলল, 'পর্তুগিজ বণিক তোমাকে এই ছোট উপহারটা দিচ্ছে। গ্রহণ করলে খুশি হব।'

জিনিসটা হাতে নিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল শুল্ক দারোগার মুখ। বেশ কিছুক্ষণ জিনিসটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বাক্সটা পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল লোকটা। তারপর সোজা হয়ে বসে বলল, 'ঠিক আছে, ব্যবসা করতে এসেছ যখন তখন করো। তবে বিক্রিত মালের ওপর তিন শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। আগামী একমাসের জন্য এ-বন্দরে তোমাকে বাণিজ্যের অনুমতি দেওয়া হবে। তোমার সম্বন্ধে কোনও অভিযোগ জমা না পড়লে ভবিষ্যতে সেই সময়সীমা বাড়ানোর কথা ভাবা যেতে পারে। কিন্তু এসময়কালের মধ্যে শুল্ক ফাঁকি বা অন্য কোনও নালিশ এলে এবং তা প্রমাণিত হলে তৎক্ষণাৎ অনুমতিপত্র প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। তাছাড়া অগ্রিম পঞ্চাশ টাকা অথবা সমমূল্যের সোনা বা রুপো জমা রাখতে হবে। জাহাজের সমস্ত লোকের নামের তালিকা, আর পণ্যর ব্যাপার নথিভুক্ত করতে হবে।' এস্তাদিও বলল, 'তোমার শর্তে আমি রাজি।'

দারোগা এবার একজন লোককে নির্দেশ দিলেন প্রধান করনিকের কাছে এস্তাদিওকে নিয়ে যাবার জন্য। তাঁর কাছে কাজ সারতে অনেকটা সময় লেগে গেল এস্তাদিওর। নানা তথ্য লিপিবদ্ধ করাতে হল সেখানে। এখনও স্থানীয় টাকা বাট্টা করা হয়নি এস্তাদিওর। কাজেই সে পঞ্চাশ টাকা মূল্যের সোনা জমা রাখল সেখানে। অবশেষে জমিদার আর শুল্ক বিভাগের ছাপ দেওয়া অনুমতিপত্র হাতে এল এস্তাদিওর। সেটা হাতে নিয়ে সে যখন বাইরে বেরিয়ে এল তখন মাঝদুপুর। মাথার ওপর চড়া রোদ। বেশ খিদেও পেয়ে গেছে এস্তাদিও আর তার সঙ্গীদের। বন্দর অঞ্চলে বেশ বড় একটা সরাইখানা নজরে পড়ল এস্তাদিওর। সঙ্গীদের নিয়ে ঢুকল সেখানে। লম্বা লাম্বা কেঠো টেবিল। তাতে বসে নানা জাতের মানুষ খাচ্ছে। গরম ভাত অথবা আটার রুটি। তবে এ-রুটি দেখতে এস্তাদিওর দেশের রুটির মতো নয়। গোল গোল পাতলা রুটি। বিশাল উনোনের পাশে বসে একদল লোক হাতে বানানো রুটি সেঁকছে। ঘরের এক জায়গায় দেওয়ালের হুক থেকে ঝুলছে ঝলসানো মুরগি, ভেড়ার ঠ্যাং। মোটা সোটা চেহারার একজন আরব পয়সার বাক্স নিয়ে বসে আছে সরাইখানার প্রবেশ মুখের দরজার পাশে। সেই সম্ভবত সরাইয়ের মালিক। সে পয়সার হিসাব নিচ্ছে খদ্দেরদের কাছ থেকে। ঘরের ঠিক মাঝখানে বেশ বড় একটা মাটির জালা রাখা। তার ভিতর থেকে ফেনা-ওঠা মিষ্টি পানীয় মাটির ভাড়ে নিয়ে খাচ্ছে অনেকে। একজনকে জিনিসটা সম্বন্ধে জিগ্যেস করাতে সে বলল, ওটা এক প্রকার স্থানীয় মদ, খেজুরের রস থেকে তৈরি হয়। ওকে বলে তাড়ি। খেলে পেট ঠান্ডা থাকে আবার নেশাও হয়। এ দেশের সস্তা মদ। যারা এখানে খেতে আসে তাদের বিনাপয়সায় তা পরিবেশন করা হয়। সরাইখানার মালিকের সামনে গোটা একটা রুপোর টাকা রাখতেই মালিকের নির্দেশে কর্মচারীরা একটা টেবিলে বেশ সমাদর করে বসাল এস্তাদিওদের।

আশেপাশের টেবিলগুলোতে যারা বসে খাচ্ছে তারা অধিকাংশই সাধারণ মাল্লা শ্রেণির লোক। দলবেঁধে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছে তারা। বন্দর অঞ্চলের এই সরাইখানাগুলো হল নানা ধরনের খবরের আড়ত। এস্তাদিওদের সামনে পরিবেশিত হল কাঠের পাত্রে হাত রুটি আর ভেড়ার ঠ্যাং। খেতে খেতে আশেপাশের লোকদের কথাবার্তা শোনা, বোঝার চেষ্টা করতে লাগল এস্তাদিও। বন্দর থেকে পরদিন একটা বড় দেশী জাহাজ পণ্য নিয়ে রওনা হবে, তা নিয়েই আলোচনা করছে লোকজন। শুধু একবার অন্য ধরনের একটা আলোচনা কানে এল এস্তাদিওর। কয়েকদিনের মধ্যেই একটা জাহাজ আসবে বন্দরে। দিল্লি থেকে নাকি একদল নারী আনা হচ্ছে সে জাহাজে। দিল্লি জায়গাটার নাম শোনা এস্তাদিওর। এদেশের সবচেয়ে বড় সুলতান নাকি সেখানে থাকেন। তবে সে-জায়গা কোথায় তার সম্বন্ধে সম্যক ধারণা নেই এস্তাদিওর। চারপাশের লোকেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছেও নবাগত পর্তুগিজদের দিকে। নিশ্চুপভাবে উদরপূর্তি করে চলেছিল এস্তাদিওরা। হঠাৎ তাদের উদ্দেশ্যে কে-একজন পর্তুগিজ ভাষায় বলে উঠল, 'মাতা মেরির জয় হোক। পর্তুগাল সম্রাটের জয় হোক।'

কথাটা কানে যেতেই বিস্মিত এস্তাদিও মাথা তুলে তাকিয়েই দেখতে পেল তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ভবঘুরে চেহারার একজন মাঝবয়সি লোক। তার পরনে নাবিকের জীর্ণ পোশাক, মাথায় ছেঁড়া, কান-ভাঙা জাহাজি টুপি। এদেশের প্রখর সূর্য তার গায়ের রংকে কিছুটা পুড়িয়ে দিলেও লোকটা যে একজন শ্বেতাঙ্গ, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

লোকটার দিকে এস্তাদিও তাকাতেই সে টুপি খুলে মাথা ঝুঁকিয়ে এস্তাদিওকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলল, 'আমি পেড্রো পর্তুগালের লোক। জাহাজঘাটায় খবর পেলাম পর্তুগাল থেকে জাহাজ এসেছে। দেখতেও পেলাম জাহাজটাকে। তারপর আপনাদের খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এলাম।' কথাগুলো বলে লোকটা লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাল ভেড়ার মাংসের অবশিষ্টাংশের দিকে।

এস্তাদিও লোকটাকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে তাদের টেবিলে বসতে বলল।

বসল লোকটা। এস্তাদিও তার দিকে কয়েকটা মাংসের টুকরো আর রুটি এগিয়ে দিয়ে জানতে চাইল, 'তুমি এখানে কবে থেকে আছ? কী করো?'

পেড্রো নামের লোকটা ক্ষুধার্তভাবে মাংসের টুকরোতে কামড় বসিয়ে বলল, 'দু বছর হল আমি এই তাম্রলিপ্তি বন্দরেই আছি। আমার বাড়ি পর্তুগালের টেগাস নদীর মোহনার কাছে এক গ্রামে। দু-বছর আগে। 'ইভোরা' নামের ছোট এক পণ্যবাহী জাহাজে এদেশে এসেছিলাম আমি এখানে এসে আমার সিফিলিস ধরা পড়ল। জাহাজ থেকে নামিয়ে বন্দরের এক জায়গায় আমার থাকার ব্যবস্থা করা হল। তারপর একদিন রাতে ইভোরা আমাকে এখানে ফেলে রেখেই রওনা হয়ে গেল পর্তুগালের দিকে। তখন থেকে আমি এখানেই আছি।' কথাগুলো বলে মাংস চিবোতে শুরু করল লোকটা।

সিফিলিস রোগটা পর্তুগাল থেকেই ভারতসহ অন্যদেশে ছড়িয়েছে, এদেশে যত পর্তুগিজ এসেছে তাদের মধ্যে দশ শতাংশ মানুষকে পর্তুগিজরা এ দেশেই ছেড়ে রেখে গেছিল সিফিলিস রোগের কারণে। ভয়ঙ্কর ছোঁয়াচে এই যৌন রোগ। সেই ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলোর অধিকাংশ মারা পড়ত। ভাগ্যক্রমে দু-চারজন হয়তো বেঁচে যেত। পেড্রো বলে লোকটা তাদেরই একজন।

এস্তাদিও প্রশ্ন করল, 'তোমার রোগ এখন কেমন?'

পেড্রো জবাব দিল, 'সিফিলিস সেরে গেছে স্থানীয় এক বৈদ্যর চিকিৎসাতে। তবে শরীরে বল পাই না। তাই ভারী কাজ করতে পারি না। পেটে খাবার থাকে না তো।'

'তুমি দেশে ফেরার চেষ্টা করোনি?' জানতে চাইল এস্তাদিওর এক সঙ্গী ফ্রান্সিস। পেশায় সে জাহাজের চিকিৎসক। ভারতীয় জাহাজে চিকিৎসক না থাকলেও প্রতিটা ইওরোপীয় জাহাজে একজন চিকিৎসক থাকা আবশ্যিক। নইলে সে জাহাজকে বন্দর ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয় না।

ফ্রান্সিসের কথার জবাবে লোকটা বলল, 'গত দু-বছরে কোনও পর্তুগিজ জাহাজ ভেড়েনি এ বন্দরে। দূরে সাতগাঁও বলে একটা বড় বন্দর আছে। সেখানে একটা পর্তুগিজ জাহাজ এসেছিল। কিন্তু আমি সে খবর পাবার আগেই সে জাহাজ বন্দর ছেড়ে চলে যায়।'

এস্তাদিও বলল, 'তুমি এখানকার স্থানীয় ভাষা জানো?'

পেড্রো বলল, 'মোটামুটি জানি। এখানকার ভাষার নাম বেঙ্গালা বা বাংলা।'

'এখানকার লোকরা পর্তুগিজ শব্দ বুঝতে পারে?'

পেড্রো বলল, 'কিছু খাঁটি পর্তুগিজ শব্দ এরা বুঝতে পারে। যেমন বারান্দা, ছবি, পেরেক, বালতি, ইস্ত্রি, আলমারি, সাবান, বোতাম এসব শব্দ। আর আমাদের দেশ থেকে আসা যেসব ফল-ফসল এদেশে জনপ্রিয় হয়েছে, ইদানীং যাদের চাষও হচ্ছে এখানে, তাদেরকে এরা পর্তুগিজ নামেই ডাকে। যেমন পেঁপে, পেয়ারা, কামরাঙা, আলু...।'

এস্তাদিও একটু ভেবে নিয়ে বলল, 'তোমাকে আমরা কাজ দিতে পারি। তোমার কাজ ভালো হলে পর্তুগালেও ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি। করবে? তবে তার আগে তোমাকে পরীক্ষা করে দেখে নেব যে তুমি সিফিলিস থেকে মুক্ত হয়েছ কিনা?'

এস্তাদিওর কথা শুনে উজ্জ্বল হয়ে উঠল পেড্রোর মুখ। উঠে দাঁড়িয়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাত দুটো ওপরের দিকে তুলে ধরে বলল, 'করব হুজুর, করব। খ্রিস্টের অসীম কৃপা যে আপনারা এখানে এসেছেন। আমাকে পরীক্ষা করে দেখে নিতে পারেন যে আমি রোগমুক্ত কিনা।'

এস্তাদিও বলল, 'আচ্ছা। আপাতত তুমি খাওয়া শেষ করো।'

সবার খাওয়া শেষ হবার পর ফ্রান্সিস লোকটাকে সরাইখানার পিছনে নিয়ে গেল। সেখানে পেড্রোর যৌনাঙ্গ ভালো করে পরীক্ষা করে তাকে নিয়ে ফিরে এসে এস্তাদিওকে জানাল যে লোকটা বর্তমানে সিফিলিস মুক্ত। এদিনের মতো কাজ শেষ হয়েছে এস্তাদিওর। পরদিন সকাল থেকেই অবশ্য কাজে নেমে পড়তে হবে এস্তাদিওকে। প্রথমে থাকার জন্য একটা বাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে। খোঁজখবর নিতে হবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের থেকে। সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই পেড্রো সাহায্য করতে পারবে এস্তাদিওকে। সরাইখানা থেকে বেরিয়ে এস্তাদিওরা এগোল নদীর পাড়ের দিকে। সেখানে যেতে যেতে এস্তাদিও, পেড্রোর মুখ থেকে জানতে পারল যে এ বন্দরের বড় ব্যবসায়ীরা সব ধর্মে বাঙালি মুসলিম। পর্তুগিজদের তারা খুব একটা পছন্দ করে না। যে কারণে তাদের কাছে কাজ জোটেনি পেড্রোর। তবে মুনাফার সম্ভাবনা থাকলে ব্যবসায়ীধর্ম মেনে পর্তুগিজদের সঙ্গে কারবার করতে তাদের আপত্তি নেই। তমালিকা বন্দর অঞ্চলের সব থেকে ক্ষমতাশালী মানুষ ভূস্বামী মহারাজ যদুনাথ ভুইঞা। তবে তিনি সঙ্গীত আর ধর্মকর্ম নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। পেড্রো শুনেছে তমালিকার রাজবংশ নাকি এদেশের প্রাচীনতম রাজবংশগুলোর মধ্যে একটা। মহারাজার হয়ে সম্পত্তির দেখভাল করে তাঁর নায়েব গোলকনারায়ণ নামের এক হিন্দু। আর নগরের বন্দরের আইনশৃঙ্খলা দেখার মূল দায়িত্বে আছে কোতোয়াল। তার নাম কোকনদ। সে লোকটা ধর্মে হিন্দু।

এস্তাদিও জানতে চাইল, 'এখানে কোনও গির্জা নেই?'

পেড্রো বলল, 'এখানে মন্দির আছে, আরবদের প্রার্থনাগৃহ মসজিদ আছে, এমনকী ''বুদ্ধ'' নামের এদেশের এক প্রাচীন সন্ন্যাসীর একটা প্রাচীন মঠও আছে। কিন্তু কোনও গির্জা নেই।

কথা বলতে বলতে তারা যখন নদীর তীরে এসে পৌঁছোল এখন বিকেল হয়ে এসেছে। ভাটা চলছে তখনও। জল সরে গেছে। ঘাটে বেশ ভিড়। বন্দরের কাজ শেষ করে রাত্রিবাসের জন্য নিজেদের জাহাজে ফিরছে অনেকে। এস্তাদিওর নিজেদের নৌকাগুলো কাদায় আটকে ছিল। সেগুলোকে বেশ কিছুটা ঠেলে জলে নামিয়ে তাতে চেপে বসা হল। বড় বড় জাহাজগুলোর ফাঁক গলে সান্টা মারিয়ায় পৌঁছে গেল তারা। দড়ির মই বেয়ে জাহাজের ডেকে উঠে এল এস্তাদিও। সেই পেড্রোকেও জাহাজে উঠিয়ে কয়েকজন নাবিকের হাতে তুলে দেওয়া হল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করবার জন্য।

এস্তাদিও নিজের কেবিনে ঢুকে কিছু কাজ সেরে পোশাক পরিবর্তন করে যখন ডেকে এসে বসল তখন নদীর জলে আবির ছড়িয়ে সূর্য অস্তাচলে যেতে বসেছে। এস্তাদিওর জাহাজের মাস্তুলে বাতাসে পতপত করে উড়ছে ক্রুশলাঞ্ছিত রক্তবর্ণের পর্তুগাল পতাকা। কিন্তু আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা যেসব নৌকা বা জাহাজে সাদা পাল খাটানো, সেগুলোও রক্তবর্ণ ধারণ করেছে বিদায়ী সূর্যের লাল আলোতে। তা দেখে এস্তাদিও মনে মনে ভাবল, একদিন হয়তো এ দেশের সব পতাকাই লাল হয়ে যাবে। পর্তুগিজরা তার গায়ে এঁকে দেবে পবিত্র ক্রুশ চিহ্ন। কোথায় পর্তুগাল আর কোথায় এই সুদূর ইন্ডিয়া! কিন্তু পর্তুগিজরা নিজেদের বাহুবলে, বুদ্ধিবলে এদেশের গোয়াতে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করতে পেরেছে। একদিন হয়তো বা এদেশের শাসনভার হাতে তুলে নেবে পর্তুগিজরাই। নিজের দেশ, জাতির জন্য বেশ গর্ববোধ হয় এস্তাদিওর।

বেশ মনোরম বাতাস বইছে। সব জাহাজের ডেকগুলোতেই জাহাজিদের ভিড়। সারাদিন অনেক জাহাজের নাবিকরাই পণ্য ওঠানো নামানোর কাজে ব্যস্ত ছিল। কাজ শেষ করে জাহাজে উঠে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠেছে তারা। দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজগুলো থেকে বাদ্যযন্ত্র, হইহুল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসছে। সান্টা মারিয়ার নাবিকরাও সব ডেকের রেলিং-এর ধারে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ ছই তোলা একটা বেশ বড় নৌকা এসে দাঁড়াল সান্টা মারিয়ার গা ঘেঁষে। দুজন মাঝি ছাড়াও আরও একজন দেশীয় পোশাক পরা লোক নৌকাতে দাঁড়িয়ে আছে ছইয়ের সামনে পাল খাটাবার দন্ডটা ধরে। তাদের জাহাজের কাছে আসতে দেখেই এস্তাদিও রেলিং-এর ধারে উপস্থিত হল। নৌকার দণ্ড ধরে যে লোকটা দাঁড়িয়ে, সে এস্তাদিওর উদ্দেশ্যে বলল, 'ভালো মাল আছে। লাগবে নাকি?'

লোকটা বার কয়েক কথাটা বলার পর এস্তাদিও প্রশ্নটা বুঝতে পেরে বলল, 'কি মাল? দেখি?'

সে লোকটা ছই-এর দিকে তাকিয়ে দেশীয় ভাষায় কী যেন বলল। তার কথা শুনে ছই-এর পর্দা ঠেলে বাইরে এসে সার বেঁধে দাঁড়াল কয়েকজন নারী। একটাই সুতির কাপড় হাঁটুর ওপর থেকে বুক পর্যন্ত জড়ানো। বাহুতে গলায় ফুলের সাজ। বন্দরবেশ্যা। মালিক তাদের নিয়ে এসেছে রাতে নাবিকদের মনোরঞ্জনের জন্য। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এস্তাদিও বলল, 'না, আমাদের এ-মালের দরকার নেই।' যদিও তার জাহাজের নাবিকদের বেশ কয়েকজনের চোখ-মুখ চকচক করে উঠেছিল তাদের দিকে তাকিয়ে। এস্তাদিওর কথা শুনে তবুও একবার নৌকার লোকটা বলল, 'কম দামে দেব। সারারাতের জন্য এদের জাহাজে রাখতে পারো তোমরা।'

কিন্তু এস্তাদিও কিছুটা দৃঢ়স্বরে জানিয়ে দিল,—'না, দরকার নেই। তুমি অন্য জাহাজে যাও।'

আশাহতভাবে অন্য জাহাজের দিকে রওনা হল লোকটা। কিছুক্ষণ পর এস্তাদিও দেখতে পেল, দূরে নোঙর-করা একটা জাহাজে তুলে নেওয়া হল মেয়েদের।

এর কিছু সময়ের পরই সূর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার নামল। এস্তাদিও ডেকেই বসে রইল। নাবিকরা ডেক ছেড়ে ফিরে গেল যে-যার কাজে। ডেকে বসে এস্তাদিও দেখতে পেল কয়েকটা আলো জ্বলে উঠছে তমালিকা বন্দরে। লম্বা দণ্ডের মাথায় আকাশপ্রদীপও জ্বালানো হচ্ছে, দূর নদীপথে কোথাও কোনও জাহাজ থাকলে তাকে বন্দরের অবস্থান জানানোর জন্য। তবে বন্দরের কাজকর্ম অন্ধকার নামার পর স্তিমিত হয়ে এসেছে বলেই মনে হল এস্তাদিওর। বন্দরে লোকজনের হাঁকডাক অনেকটা ভ্রমরের গুঞ্জনের মতো শোনায় দূর থেকে। সে-শব্দ শোনা যাচ্ছে না। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে যেন সে ঘুমিয়ে পড়েছে। আশেপাশের জাহাজগুলোতে কোথাও একটা-দুটো ক্ষীণ আলো জ্বলছে, আবার কোনও জাহাজ ডুবে আছে অন্ধকারের মধ্যে। অন্ধকার জলের মধ্যে কয়েকটা ছোট দেশী নৌকা জোনাকির মতো মিটমিটে আলো নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওগুলো জেলে-নৌকা অথবা সেই বারবনিতাদের নৌকা।

অন্ধকারের মধ্যে ডেকে বসে এসব দেখতে দেখতে ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা ভাবছিল এস্তাদিও। হঠাৎ একজন লোক তাঁর সামনে এসে টুপি খুলে মাথা ঝুঁকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। লোকটাকে চিনতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল এস্তাদিওর। কারণ পেড্রো বলে লোকটার চুল-দাড়ি কামিয়ে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক জুতো টুপি দেওয়া হয়েছে। তাই তাকে দেখতে অন্যরকম লাগছে। পেড্রো, এস্তাদিওর উদ্দেশ্যে বলল, 'আমায় কী কাজ করতে হবে হুজুর?'

এস্তাদিও বলল, 'মূলত দোভাষীর কাজ। আর বন্দরের খুঁটিনাটি খবর সংগ্রহ করে আমার কাছে পৌঁছে দেবে। আমি বন্দর অঞ্চলে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকব। তাতে আমার কাজের সুবিধা হবে। তুমি আমার সঙ্গে সেখানে থাকবে। আর একটা কথা, আমি কী করছি বা না করছি তা নিয়ে স্থানীয় লোকদের সঙ্গে কোনও আলোচনা করবে না। বিশ্বাসভঙ্গ হলে তোমাকে সঙ্গে সঙ্গে বরখাস্ত করা হবে। দেশে ফেরার পথ তোমার বন্ধ হবে। বাকি জীবনটা তোমাকে এই তমালিকা বন্দরেই আগের মতো কাটাতে হবে।'

এস্তাদিওর কথা শুনে পেড্রো বলল, 'যিশু সহায়। আমার ওপর আপনি ভরসা রাখতে পারেন।'

এস্তাদিও বলল, 'কাল সকালেই আমি বন্দরে যাব। তুমি সঙ্গে যাবার জন্য তৈরি হয়ে থেকো। আপাতত তুমি যাও।'

পেড্রো আবার মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে ফেরার জন্য পা বাড়াতে যাচ্ছিল হঠাৎই প্রায়, ঘুমিয়ে পড়া, বন্দরের মধ্যে বেশ একটা উজ্জ্বল অংশ চোখে পড়ল এস্তাদিওর। বিন্দু বিন্দু আলো নয়, জেগে আছে এক উজ্জ্বল আলোকরেখা। একসঙ্গে অনেক প্রদীপ জ্বালানো আছে যেন। সেটা চোখে পড়তেই এস্তাদিও কৌতূহলী হয়ে পেড্রোকে বলল 'এই শোনো। বন্দরের অন্ধকারের মধ্যে ওই উজ্জ্বল অংশটা কী? কোন প্রাসাদ বা মন্দির?'

সেদিকে তাকিয়ে পেড্রো জবাব দিল, 'না মালিক, ওটা মন্দির বা প্রাসাদ নয়, বন্দর সুন্দরীরা থাকে ওখানে। ওটা বেশ্যালয়। এত বড় বেশ্যালয় কোথাও নেই। সাতগাঁও বা কালিকট বন্দরেও নেই। সবদেশের মেয়ে পাওয়া যায় ওখানে। ওর টানে বহু জাহাজ নোঙর ফেলে এ-বন্দরে। নাবিকরা ছাড়াও নগরবাসীরাও ওখানে আসা-যাওয়া করে। ধনী ব্যক্তি থেকে সাধারণ মানুষ। পয়সা ফেললে সবার জন্য দরজা উন্মুক্ত।'

কথাটা শুনে এস্তাদিও মনে মনে ভাবল, 'নানা জাতের নানা দেশের মানুষ যেখানে যায় সে-জায়গা, বিশেষত এই বেশ্যালয়, নানা খবরের আখড়া হয়।' যদিও এস্তাদিও অবিবাহিত, তবে স্বদেশে বা বিদেশে এস্তাদিও এপথ মাড়ায়নি কোনওদিন। এ জন্য দেশের বন্ধুমহলে হাসি-ঠাট্টাও হয়। আবার অনেকটা এ কারণেই অ্যাডমিরাল ভাস্কো তমালিকা বন্দরের খবর সংগ্রহ করার গোপন দায়িত্ব এস্তাদিওর ওপর দিয়েছেন। অনেক নাবিক আবেগের বশে বা অসতর্ক অবস্থায় গোপন খবর দিয়ে ফেলে বারবনিতাদের। যা গুপ্তচরদের মাধ্যমে পৌঁছে যায় শত্রুশিবিরে। এস্তাদিও শুনেছে ভাস্কো অনুমান করেন যে, এদেশে তাঁর দ্বিতীয় অভিযানের সময় কালিকটে তাঁর দুর্গনির্মাণের বাসনার কথা এভাবেই নাকি আগাম পৌঁছে গেছিল কালিকটের শাসকদের কাছে। যে-কারণে এবার ভারত অভিযানে তার নৌবহরে কোনও দেহোপজীবিনী তোলা যাবে না, যতদিন না তাঁর নৌবহর গোয়াতে এসে পৌঁছোবে ততদিন পথমধ্যে কোনও বন্দরে গণিকালয়ে নাবিকরা যেতে পারবে না—এ কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। যাত্রা শুরুর আগে ব্যাপারটা শুনে এসেছে এস্তাদিও।

এস্তাদিও, পেড্রোকে প্রশ্ন করল, 'তুমি ওখানে গেছ কোনওদিন?'

পেড্রো একটু ইতস্তত করে বলল, 'এখানে আসার পর অন্য নাবিকদের মতো আমিও সেখানে কয়েকবার গেছিলাম। অসুখ হবার পর আর যাইনি।'

এস্তাদিও তার জবাব শুনে বলল, 'ঠিক আছে। তুমি এবার যেতে পারো।'

ডেকের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল লোকটা। তমালিকা বন্দরের সেই আলোক- মালার দিকে তাকিয়ে আরও বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর নিজের কেবিনে ফিরে গেল এস্তাদিও। তার খাস ভৃত্য লন্ঠন জ্বালিয়ে দাঁড়িয়েছিল কেবিনে। এস্তাদিও কেবিনে প্রবেশ করার পর টেবিলে রাখা বালিঘড়িটা উল্টে দিয়ে এস্তাদিওর জন্য রাতের খাবার আনতে গেল সে। তমালিকা বন্দরে প্রথম দিনটা পর্তুগিজ নাবিক এস্তাদিওর নির্বিঘ্নেই কেটে গেল।

চারদিকে শুধু জল আর জল। তার মধ্যে একটা কাঠের খাঁচায় বসে আছে সে। ঢেউয়ের তালে দুলছে খাঁচাটা। কখনও ডুবে যাচ্ছে সমুদ্রের জলে। দমবন্ধ হয়ে আসছে তার, অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে সব কিছু। মনে হচ্ছে এই বুঝি সব শেষ! পরক্ষণেই আবার ঢেউয়ের নীচ থেকে চোখে জ্বালা ধরানো সূর্যের আলোতে ভুস করে ভেসে উঠছে খাঁচাটা। সমুদ্র যেন কোন নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠেছে একটা মেয়েকে নিয়ে। ওই যে ওই! পাহাড়ের মতো একটা ঢেউ এবার এগিয়ে আসছে! নির্ঘাৎ এবার সে খাঁচাটাকে টেনে নিয়ে যাবে সমুদ্রের গভীরে! সব শেষ!

আসছে সে আসছে! সহস্র ফনা তুলে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভয়ঙ্কর দুলে উঠল খাঁচাটা। মুহূর্তর জন্য চোখের সামনে হারিয়ে গেল সবকিছু!—আর এরপরই ঘুমটা ভেঙে গেল মৎস্যগন্ধার।

চোখ মেলে ব্যাপারটা বুঝতে, ঘোর কাটতে আরও একটু সময় লাগল। কারণ সে এখন দুলছে। এরপর আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারল সে। তার বিশাল পালঙ্কের ছত্রী ধরে দোল খাচ্ছে রানি। খাটটা তাই দুলছে।

মৎস্যগন্ধা উঠে বসল পালঙ্কে। ব্যাপারটা তবে স্বপ্নই ছিল! এ স্বপ্ন অবশ্য ছোটবেলা থেকে বহুবার দেখে এসেছে। তবে এবার দেখল বহু দিন পর। উঠে বসার পর মৎস্যগন্ধা বুঝতে পারল তার সারা শরীর ভিজে গেছে। না, সমুদ্রের জলে নয়, ঘামে। সে উঠে বসতেই বুড়ি শিম্পাঞ্জিটা তার কাছে এসে গলা জড়িয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। মৎস্যগন্ধার মনে হয় এই একটা মাত্র প্রাণী হয়তো পৃথিবীতে আছে, যে তাকে ভালোবাসে, বোঝে। বোবাদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে। মৎস্যগন্ধা ঘুম ভেঙে উঠে বসার পর তার মুখ চোখ দেখে হয়তো সে কিছু অনুমান করতে পেরেছে। তাই সে মৎস্যগন্ধাকে ভরসা দেবার জন্য এত ঘনিষ্ঠভাবে তার কাছে এসে বসল। তার মনের ভাবটা এই— ভয় কী? আমি তো আছি।'

হ্যাঁ, গত কুড়ি বছর ধরে ছায়ার মতো সে সঙ্গে রয়েছে মৎস্যগন্ধার। দুজন দুজনকে আত্মার মতো আগলে রাখে সুখে-দুঃখে। একবার দানবীয় চেহারার মাতাল নাবিক মৎস্যগন্ধার ঘরে ঢুকে তাকে জাপটে ধরে চিৎ করে ফেলেছিল পালঙ্কে। বাঘের মতো হাতের থাবা দিয়ে মুখ চেপে ধরেছিল মৎস্যগন্ধার, যাতে মাঝরাতে সে চিৎকার করে কাউকে ডাকতে না পারে। সেই অসহায় মুহূর্তে রানি এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মৎস্যগন্ধার শরীরের ওপর চেপে বসা লোকটার ওপর। পিছন থেকে কামড় বসিয়েছিল লোকটার ঘাড়ে। ধারালো নখ দিয়ে ফালাফালা করে দিয়েছিল মুরটার শরীর। রক্ষা পেয়েছিল মৎস্যগন্ধা। আবার একবার জীবন সংকট হয়েছিল রানিরও। বিশাল এ বাড়িটার সর্বত্র ঘুরে বেড়ায় রানি। এখানে আসা খদ্দেরদের নানারকম কসরতও দেখায় সে। খদ্দেররাও মাঝে মাঝে মশকরা করে তাকে নিয়ে। নানা ধরনের ফলের ওপর লোভ আছে রানির। এটা তার স্বাভাবিক জন্মগত প্রবৃত্তি। কসরত দেখালে তাকে অনেক সময় ফল খেতে দিত খদ্দেররা। তেমনই একবার এক ভিনদেশি নাবিক একটা লাল টুকটুকে পেয়ারার মতো ফল খেতে দিয়েছিল রানিকে। মাত্র একদিনের জন্য তমালিকা বন্দরে এসে ভিড়েছিল সেই জাহাজ। সে-ফলটা ছিল বিষফল। নাবিক জেনে বুঝেই বিষফলটা রানিকে খেতে দিয়েছিল কিনা তা জানা নেই মৎস্যগন্ধার। কারণ, ফলটা খেয়ে রানি অসুস্থ হয়ে পড়ার আগেই সেই নাবিকের জাহাজ বন্দর ছেড়ে যায়। লোকটাকে আর ধরতে পারেনি মৎস্যগন্ধা।

যাই হোক, সেই বিষফল খেয়ে সাতদিন সাতরাত মড়ার মতো পড়ে ছিল রানি। বুকের ধুকপুকানিও ক্ষীণ হয়ে এসেছিল তার। নেহাত মোটা অর্থের বিনিময়ে রাজবৈদ্যকে ডেকে আনা হয়েছিল বলে শেষ পর্যন্ত রানি বেঁচে যায়। রানিকে বাঁচাবার জন্য তার সব সম্পত্তি রাজবৈদ্যর হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত ছিল মৎস্যগন্ধা। এমনকী তার সেই সম্পত্তিও যার খোঁজ সে আর একজন লোক ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ জানে না। ওই সাত দিন সাত রাত সবকিছু ছেড়ে রানির কাছে বসে ছিল মৎস্যগন্ধা। ওই ক'দিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছিল এই গণিকালয়ের দরজা। দেশি-বিদেশি বহু খদ্দের ব্যর্থ মনোরথে ফিরে গেছিল এখান থেকে। হাজার প্রলোভনেও কেউ দরজা খোলার জন্য টলাতে পারেনি মৎস্যগন্ধাকে। 'বেশ্যালয়ের দরজা কোনওদিন বন্ধ হয় না' বলে একটা প্রবাদ আছে। কিন্তু রানির জন্য এ-দরজাও বন্ধ হয়েছিল সেদিন।

বিধাতার অসীম করুণা যে, শেষ পর্যন্ত প্রাণ ফিরে পেয়েছিল রানি। সেই ঘটনার পর থেকে অবশ্য খদ্দেরদের রানিকে খাবার দেবার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে। আর সেই মর্মে একটা বিজ্ঞপ্তিও লেখা আছে গণিকালয়ের প্রধান প্রবেশপথের গায়ে। ইদানীং অবশ্য রানিও আর খদ্দেরদের কাছে বিশেষ যায়না। বাড়ির দ্বিতলে একপাশে মৎস্যগন্ধার যে-তিনটে কক্ষ আছে সেখানে নদীর দিকে কক্ষসংলগ্ন অলিন্দেই ঘোরাফেরা করে। বাড়ির অন্যত্র যায় না।

এই নিষ্ঠুর পরিজনহীন পৃথিবীতে রানি ছাড়া আর শুধু দুজন মানুষের কাছে মৎস্যগন্ধার কৃতজ্ঞতার কোনও শেষ নেই। তাদের একজন এখনও জীবিত। সেই বৃদ্ধ বৌদ্ধ মঠাধ্যক্ষ নিশাদপাদ। তাঁর মতো নির্লোভ মানুষ পৃথিবীতে আর কেউ আছেন কিনা তা মৎস্যগন্ধার জানা নেই। আর দ্বিতীয় জন কয়েকবছর আগে প্রয়াত হয়েছে। স্বয়ম্ভুনাথ যার হাতে সঁপে দিয়েছিলেন মৎস্যগন্ধাকে। মৃচ্ছকটিক ময়ূরপঙ্খির গণিকা ভর্তিকা। স্বয়ম্ভুনাথের কথা রেখেছিল ভর্তিকা। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সে আগলে রেখেছিল মৎস্যগন্ধাকে। আজ এই যে বিশাল গণিকালয়, যার টানে ছুটে আসে দেশ বিদেশের নাবিকরা, তার পত্তন তো মাত্র দুটো ঘর নিয়ে শুরু করেছিল ভর্তিকাই। অন্য ব্যবসায় সে যায়নি কারণ এ ব্যবসা ছাড়া অন্য কোনও ব্যবসার কৌশল জানা ছিল না সেই নারীর। শিশু মৎস্যগন্ধাকে, কিশোরী মৎস্যগন্ধাকে কতবার, কত সময়ে সে আড়াল করেছে খদ্দেরদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে। মৎস্যগন্ধার নিজের মা থাকলে তিনিও হয়তো এতটা করতেন না তার জন্য। শেষ ক'টা বছর অবশ্য মাথাটা খারাপ হয়ে গেছিল বুড়ির। পুরুষ দেখলেই প্রচণ্ড আক্রোশে খেপে উঠত সে। পোশাক ছিঁড়ে ফেলে নগ্ন হয়ে চিৎকার করে উঠত, 'আয়, আয়, আমাকে খাবি আয়।' আর তার সঙ্গে সঙ্গে অশ্রাব্য গালিগালাজ করত খদ্দেরদের প্রতি। খদ্দেররা বিচলিত হত তাতে। বাধ্য হয়ে তাকে দোতলার অলিন্দ সংলগ্ন ঘরে আটকে রাখতে হয়েছিল মৎস্যগন্ধাকে। আজকাল এক-এক সময় মৎস্যগন্ধার মনে হয়, কাজটা সে না করলেই পারত। তাহলে হয়তো আরও কয়েকটা দিন না হয় পাগল হয়েই বেঁচে থাকত সে-নারী।

ভর্তিকার মৃত্যুর ঘটনাটা বেশ অদ্ভুত। সেদিন ভোরবেলাই শ্যামদেশ থেকে একটা জাহাজ এসে ভিড়েছিল তমালিকা বন্দরে। ভর্তিকা যে-কক্ষে আটক থাকত তার অলিন্দের নীচেই জোয়ারের সময় নদীর জল এসে ছুঁয়ে যায়। অলিন্দে দাঁড়ালে বন্দরের অনেকাংশ দেখা যায় সেখান থেকে। হয়তো বা মাস্তুলে টাঙানো পতাকা দেখে সে চিনতে পেরেছিল ওই শ্যামদেশের জাহাজটাকে। জাহাজটাকে দেখে ভর্তিকা বার বার তার ঘরের ভিতর থেকে বলছিল, শ্যামদেশ থেকে জাহাজ এসেছে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। দরজা খোল। যেতে দে আমাকে।'

ভর্তিকা কোন দেশের মেয়ে ছিল তা জানা নেই মৎস্যগন্ধার। সে একবার তাকে প্রশ্নটা করায় ভর্তিকা জবাব দিয়েছিল, 'আমার কোনও দেশ নেই। আমার একটাই পরিচয় আমি নারী, আমি রূপজীবীনী-বারবনিতা। পুরুষকে তৃপ্ত করার জন্য আমার যোনী আছে। এটাই আমার পরিচয়। মৃচ্ছকটিক ময়ূরপঙ্খিই আমার দেশ ছিল।'

সে কি তবে শ্যামদেশের মেয়ে ছিল? নইলে সে অমন কাণ্ড ঘটাল কেন?'

যাই হোক, বন্ধ ঘরের মধ্যে থেকে বলা বুড়ি ভর্তিকার কথাগুলোকে পাগলের প্রলাপ বলেই ধরে নিয়েছিল মৎস্যগন্ধা। এমন কত কথাই তো বুড়ি আজকাল বলে। তাই ব্যাপারটাতে আমল দেয়নি সে। সেদিন ছিল পূর্ণিমা তিথি। পূর্ণিমা তিথিতে খদ্দেরের আসা-যাওয়া বেশি হয় এ বাড়িতে। চাঁদের মধ্যে একটা আদিমতা আছে। সেই চাঁদ পুরুষের আদিম প্রবৃত্তিকে আরও জাগিয়ে তোলে কিনা তা জানা নেই মৎস্যগন্ধার। তবে ব্যাপারটা সে খেয়াল করে দেখেছে।

সেদিনও খদ্দেরদের ভিড় আছড়ে পড়েছিল এই গণিকালয়ে, তার মধ্যে শ্যামদেশের জাহাজের কিছু নাবিকও ছিল। সন্ধ্যা থেকে তাদের সামলাতে সামলাতে মৎস্যগন্ধার রাত কেটে গেছিল। পূর্ণিমাতে জোয়ারের জলও বাড়ে। তা এসে ছুঁয়ে যায় বাড়ির একটা অংশকে, সেই অলিন্দের নীচের অংশকে। সেদিন মাঝরাতে আকাশে যখন গোল সোনার থালার মতো চাঁদ তখন নাকি বাড়ির ওই অলিন্দের অংশ থেকে ঝপ করে জলে কিছু একটা পড়ার শব্দ শুনেছিল এক গণিকা। তার ঘরে তখন খদ্দের। কাজেই ঘর থেকে বেরিয়ে ব্যাপারটা কী ঘটেছে তা দেখার সুযোগ ছিল না তার। যাই হোক, পরদিন ভোরবেলা মৎস্যগন্ধা, ভর্তিকার ঘরের দরজা খুলে দেখেছিল, সে ঘরে নেই। জোয়ারে জল তখন দূরে সরে গেছে। মৎস্যগন্ধা তখনই তাকে খোঁজার জন্য লোক পাঠিয়েছিল চারদিকে। খবর অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই পাওয়া গেল। ভর্তিকার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তার দেহটা নাকি জড়িয়ে ছিল শ্যামদেশের সেই জাহাজটার নোঙরের কাছির সঙ্গে। তবে কি সে সত্যিই চলে যেতে চেয়েছিল শ্যামদেশে? ভর্তিকা কোন দেশের কোন ধর্মের মেয়ে ছিল, তা জানা ছিল না মৎস্যগন্ধার। তাকে দাহ করা হবে, না গোর দেওয়া হবে তা বুঝে উঠতে না পেরে শেষে মৎস্যগন্ধা একটা কাজ করেছিল। ভর্তিকার দেহসমেত একটা ছোট নৌকাকে ফুল-মালায় সাজিয়ে মোহনায় নিয়ে গিয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছিল সেই নৌকাটাকে। সে মনে মনে বলেছিল, 'এই সমুদ্র যেন তোমাকে তোমার দেশে, শান্তির দেশে পৌঁছে দেয়।' আর সঙ্গীদের উদ্দেশে মৎস্যগন্ধা বলেছিল, 'আমি মারা গেলে আমার দেহটাও তোরা এমনভাবে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দিস।'

একটু ধাতস্থ হবার পর রানির দিকে তাকিয়ে মৎস্যগন্ধা তার উদ্দেশ্যে বলল, 'আচ্ছা, আমরা দুজন কোথা থেকে এসেছিলাম রে? ভর্তিকা তো বলত, একটা কাঠের খাঁচায় সমুদ্রর বুক থেকে ভাসতে ভাসতে নাকি আমরা দুজন এসেছিলাম। মৃচ্ছকটিক উদ্ধার করে আমাদের। কিন্তু আমরা কোথা থেকে এলাম তুই জানিস? আমি আজও সেই স্বপ্নটা দেখলাম!'

বোবা প্রাণী কোনও কথা বলতে পারে না। মৎস্যগন্ধার কথায় সে কী বুঝল কে জানে! গলা দিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ করে রানি তার গলা জড়িয়ে ধরল। রানিকেও জড়িয়ে ধরল মৎস্যগন্ধা।

বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল তারা দুজন। খোলা গবাক্ষ দিয়ে বাইরের আলো আসছে। বেশ বেলা হয়েছে। সূর্য ঠিক মাথার ওপর। ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করেছে বাড়িটা। নানারকম শব্দ কানে যাচ্ছে। ভোর নয়, সূর্য মাথার ওপর উঠলে তবে এ-বাড়ির ঘুম ভাঙে। কারণ, রাতটাই এ বাড়ির দিন, আর দিনটাই রাত। কারণ সারা রাত-ই তো এবাড়িতে খদ্দেরের আনাগোনা চলে। শেষরাতে বাইরের পৃথিবীতে যখন দিনারম্ভের প্রস্তুতি শুরু হয়, নদীর জলে চাঁদের ছায়া মুছে গিয়ে আকাশে শুকতারা ফুটে ওঠে, জমিদারবাড়ির দিক থেকে বাতাসে বয়ে আসে সানাইয়ের আশাবরী রাগ, ঠিক সেই সময় খদ্দেরদের বিদায় দিয়ে ঘুমাতে যায় এ বাড়ির বাসিন্দারা। দ্বিপ্রহরের কিছুটা সময় শুধু এ বাড়ির মানুষদের নিজেদের জন্য বরাদ্দ থাকে। এসময়ে তারা তাদের ব্যক্তিগত কাজ সারে, ঘরদোর পরিষ্কার করে। তারপর মেয়েরা দল বেঁধে স্নান সারে এ বাড়ির সংলগ্ন নদীর ঘাটে। সে-ঘাট তাদের জন্যই নির্দিষ্ট। মৎস্যগন্ধাই বানিয়েছে সে ঘাট। স্নান সেরে ফিরে এসে গণিকার দল খাওয়া সেরে সামান্য বিশ্রাম নেয়। তারপর বিকাল হতে না হতেই শুরু হয়ে যায় তাদের অঙ্গসজ্জার প্রস্তুতি।

নদীর বুকে সূর্য যখন ডুবতে শুরু করে তখন এ বাড়িতে একটা- একটা করে জ্বলে উঠতে থাকে প্রদীপের আলো। বিশাল এ বাড়ির প্রতিটা কক্ষ, অলিন্দ, গবাক্ষ, ছাদের খিলান সেজে ওঠে আলোকমালায়। দুজন বিগত যৌবনা গণিকা আছে, যাদের কাজই হল শুধু প্রদীপের সলতে পাকানো, তেল ঢালা, প্রদীপ জ্বালানো। বহুদূর থেকে দেখা যায় সেই প্রদীপমালা। একবার এক ক্যাপ্টেন, মৎস্যগন্ধাকে বলেছিল, বন্দরে বিরাট উঁচু দণ্ডের মাথায় যেখানে আকাশপ্রদীপ জ্বালিয়ে জাহাজদের বন্দরের উপস্থিতি জানান দেওয়া হয়, সেটা দেখে নয়, ক্যাপ্টেন এই তমালিকা বন্দরের অবস্থান বুঝতে পেরেছিল মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের প্রদীপমালা দেখে। ঝড়-বৃষ্টিতে লম্বা দন্ডের মাথায় বসানো আকাশদীপ অর্থাৎ তেলের মশালের আলো অনেক সময় নিভে যায় কিন্তু নদীতীরে অবস্থিত মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের আলো কোনদিন নেভে না, যা আকৃষ্ট করে, প্রলুব্ধ করে জাহাজিদের।

খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল মৎস্যগন্ধা। তার ঘরের জানলা দিয়েও বন্দরের অনেকটা দেখা যায়। সেদিকে তাকিয়ে নদীবক্ষে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা নৌকাজাহাজগুলোর মধ্যে পর্তুগিজদের জাহাজটাও দেখতে পেল। জাহাজটার সামনের মাস্তুল অর্থাৎ 'ফোর মাস্টের' মাথায় উড়তে থাকা উজ্জ্বল লাল পতাকাটার মাস্তুলের দঙ্গলের মাঝে আলাদা করে চিনিয়ে দিল সে-জাহাজকে। দু-দিন আগে জাহাজটা এসে নোঙর করেছে তমালিকা বন্দরে। তবে সে জাহাজ থেকে এখনও কোন নাবিক পদার্পণ করেনি মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ে। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লেগেছে মৎস্যগন্ধার কাছে। সে খবর পেয়েছে, এক শ্বেতাঙ্গ যুবক সওদাগর নাকি পর্তুগাল থেকে ওই বাণিজ্যতরী নিয়ে এসেছে।

রানির বন্ধনমুক্ত হয়ে পালঙ্ক ছেড়ে নেমে উন্মুক্ত গবাক্ষের সামনে এসে দাঁড়াল মৎস্যগন্ধা। পর্তুগিজ জাহাজটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে সে ভাবল, 'তেমন হলে তার গণিকালয়ে আমার আমন্ত্রণ জানিয়ে লোক পাঠাতে হবে ওই জাহাজটাতে। অনেক দূর দেশ থেকে জাহাজটা এসেছে। হয়তো নাবিকরা পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে খুব ব্যস্ত। তাই তারা খবর সংগ্রহ করে উঠতে পারেনি মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের ব্যাপারে। খবরটা তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

আর এরপর মৎস্যগন্ধা নদীতীরের ডাইনে-বাঁয়ে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজের ভিড়ে অন্য নতুন কোনও জাহাজ চোখে পড়ছে কিনা, অথবা মোহনার দিক থেকে কোনও জাহাজ ভেসে আসছে কিনা। দিল্লিদেশের একদল মেয়েকে নিয়ে বারানসী থেকে একটা বজরা আসার কথা। তারা কেউ কেউ নাকি সুলতানের হারেমেরও বাসিন্দা ছিল। এক ব্যবসায়ী তাদের কিনেছে। তার ব্যবসা হল গণিকালয়ে নারী সরবরাহ করা। তার থেকে মেয়েগুলোকে কেনার কথা মৎস্যগন্ধার। তার এই গণিকালয়ে নারীদের বয়স চল্লিশ অতিক্রান্ত হয়ে গেলে তাদের আর এখানে রাখে না মৎস্যগন্ধা। তাদের সে অন্য কোনও গণিকালয়ের মালিকদের মতো বিক্রি করে না। মুক্তি দিয়ে দেয়। তারা কেউ কেউ বন্দরের কিছুটা তফাতে নদীর ধারে খোলার ঘরে কোনও লোকের উপপত্নী হয়ে জীবন কাটায়। সাধারণত বন্দরের নিম্নশ্রেণির লোকেরাই তাদের গ্রহণ করে। কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে বেশ্যাবৃত্তিও করে। আবার কেউ কেউ হয়তো প্রলোভনে বা অন্য কোনও বিশ্বাসে চড়ে বসে বন্দরে ছেড়ে যাওয়া কোনও জাহাজে। তাদের কাউকে আর কোনওদিন এই তমালিকা বন্দরে ফিরে আসতে দেখেনি মৎস্যগন্ধা। চল্লিশবছর বয়সি বেশ কয়েকজন গণিকাকে ক'দিন আগে মুক্তি দিয়েছে। দিল্লির নারীদের দিয়ে মৎস্যগন্ধা সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে। মৎস্যগন্ধা অবশ্য দুজন লোককে বন্দরে নিয়োজিত করেছে যারা সেই বজরা এলেই সংবাদ দেবে মৎস্যগন্ধাকে।

তার চিন্তার কিছু নেই। তবুও সে একবার দেখে নিল, নারী-পণ্যবাহী বজরা বন্দরে এসেছে কিনা। আরও একটা জিনিস খেয়াল হল তার। ওই নারীদের মূল্য চোকাবার জন্য বনিককে সোনা দিতে হবে। সোনা বা অর্থের অবশ্য কোনও অভাব নেই মৎস্যগন্ধার। শুধু নির্দিষ্ট জায়গা থেকে তা সংগ্রহ করে আনতে হবে তাকে। এই বন্দরনগরীতে কেউ কেউ এমন কথাও বলে যে জমিদারের থেকেও নাকি বেশি বিত্তশালী মৎস্যগন্ধা। নইলে সে বছরখানেকের মধ্যে বানিয়ে ফেলেছিল ইটের তৈরি বিশাল এই গণিকালয়? তখনও তার গণিকালয়ের এত রমরমা হয়নি? কী ভাবে সে দেশবিদেশের জাহাজ থেকে চড়া দামে সংগ্রহ করেছিল বন্দর সুন্দরীদের? তবে মৎস্যগন্ধার সম্পদের উৎস সত্যিই এই গণিকালয় নাকি অন্যকিছু, তা সঠিকভাবে বলতে পারে না কেউ।

মৎস্যগন্ধা অবশ্য নদীতে স্নান করতে যায় না। তার দ্বিতল শয়নকক্ষ সংলগ্ন এক কক্ষেই তার স্নানের ব্যবস্থা। জল, চন্দন, সুগন্ধী আর প্রসাধনের যাবতীয় সামগ্রী মজুত থাকে সেখানে। মৎস্যগন্ধা তো আর সামান্য গণিকা নয়, এই গণিকালয়ের কর্ত্রী। তার জন্য আলাদা ব্যবস্থা তো থাকবেই।

সে-কক্ষের দিকেই পা বাড়াতে যাচ্ছিল মৎস্যগন্ধা। কিন্তু সে কক্ষ ত্যাগ করতে চলেছে অনুমান করে কক্ষে প্রবেশ করল একজন। শ্যামা তার নাম। কৃষ্ণাঙ্গ বন্দর সুন্দরী। খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে সে মৎস্যগন্ধার পরিচারিকার দায়িত্বও সামলায়। বছর বাইশ বয়স তার। জাতে সিংহলি, তবে স্থানীয় বাঙালা ভাষা সে খুব ভালো শিখে নিয়েছে বছরখানেকের মধ্যেই। নিজের দেশের সমুদ্র উপকূলে সঙ্গিনীদের সঙ্গে মাছ ধরতে বেরিয়েছিল সে। জলদস্যুরা তাদের ধরে বেচে দেয় এক আরব জাহাজে। তারপর এ-জাহাজ সে-জাহাজ ঘুরে বেশ ক'বার হাতবদল হবার পর তমালিকা বন্দরে আসা এক জাহাজ থেকে তাকে কিনে নেয় মৎস্যগন্ধা। মেয়েটার গাত্রবর্ণের জন্য মৎস্যগন্ধা তার নাম রাখে শ্যামা। মেয়েটা বেশ চালাক আর বুদ্ধি সম্পন্নও। এবং একইসঙ্গে বিশ্বস্তও। এই গণিকালয়তে হাতে-গোনা যে-ক'জন গণিকার গণিকালয়ের বাইরে বেরবার অনুমতি আছে তার মধ্যে শ্যামা একজন। বিভিন্ন কার্যপলক্ষ্যে বন্দরের নানা স্থানে তো বটেই, এমনকী নগরীর ভিতরেও তাকে পাঠায় মৎস্যগন্ধা।

শ্যামা ঘরে ঢুকে মৎস্যগন্ধাকে বলল, 'আপনার স্নানের জন্য যা প্রয়োজন তা সব আমি সাজিয়ে রেখেছি। কাপড়, জলপাইয়ের তেল, চন্দনচূর্ণ—প্রসাধনের সব কিছু। তাছাড়া অন্য কোনও দ্রব্যের প্রয়োজন আছে?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'না, প্রয়োজন নেই।' তারপর প্রশ্ন করল, 'ভিনদেশি যে জাহাজটা বন্দরে নোঙর করেছে তার সম্বন্ধে কোন খোঁজ পেলি?'

শ্যামা জবাব দিল, 'ওই পর্তুগিজ বণিকটা শুনলাম বন্দরে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। পেড্রো নামে যে সাদা চামড়ার ভিখারিটা এখানে থাকে, সে এখন নাকি নতুন জামাকাপড়-গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই বণিকের সঙ্গে। তবে জাহাজের নাবিকরা এখনও বন্দর অঞ্চলে তেমনভাবে ঘোরাফেরা শুরু করেনি।'

কথাটা শুনে মৎস্যগন্ধা বলল, 'তেমন হলে ওই বণিককে, নাবিকদের এখানে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে আসতে হবে। ওদের ব্যাপারে খোঁজ রাখিস। এখন তুই যা। প্রয়োজন হলে ডেকে নেব।'

কিন্তু কথাটা শুনেও দাঁড়িয়ে রইল শ্যামা। তাই দেখে মৎস্যগন্ধা বলল, 'তুই কিছু বলবি?'

শ্যামা একটু ইতস্তত করে বলল, 'একটা আর্জি ছিল।'

'কী আর্জি?'

শ্যামা জবাব দিল, 'সন্ধ্যাবেলায় জমিদারবাড়িতে একটা নাটকের পালা হবে। আপনি অনুমতি দিলে দেখতে যেতে পারি।'

জমিদার বাড়িতে নামসংকীর্তন, নাটক, পালাগান এসব লেগেই থাকে। মাঝে মাঝে মৎস্যগন্ধার থেকে অনুমতি নিয়ে সেসব দেখতে যায় শ্যামা। আসলে শ্যামার ঘরে এক নাগর আসে। হংসরাজ তার নাম। জমিদারের সেরেস্তায় কাজ করে আর পালায় অভিনয়ও করে। তার আমন্ত্রণেই মাঝে মাঝে নাটক পালা দেখতে যায় শ্যামা। মৎস্যগন্ধা ব্যাপারটা সম্বন্ধে অবগত। সে হেসে বলল, 'তোর ওই হংসরাজ নিশ্চই অভিনয় করবে নাটকে?'

শ্যামা মৃদু লজ্জিতভাবে বলল 'হ্যাঁ, চারুদত্ত নামের এক বণিকের চরিত্রে সে অভিনয় করবে। নাটকের নাম নাকি ''মৃচ্ছকটিকম''।'

'মৃচ্ছকটিকম!'—'মৃচ্ছকটিক'! এ শব্দদুটো তো খুব কাছাকাছি! শব্দটা শুনেই মৃদু চমকে উঠল মৎস্যগন্ধা। তাকে যে ময়ূরপঙ্খি উদ্ধার করেছিল তার নাম ছিল মৃচ্ছকটিক!

সে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করল, 'নাটকটা কী নিয়ে রে?'

শ্যামা বলল, 'হংসরাজ বলেছে এ-নাটক নাকি আমাদের নিয়ে। বসন্তসেনা নামের এক নগরনটী এ নাটকের নায়িকা।

কথাটা শুনে আরও চমকে গেল মৎস্যগন্ধা। স্বয়ম্ভুনাথের মৃচ্ছকটিক তো ভ্রাম্যমান গণিকালয় ছিল! এমন নয়তো, সেই মৃচ্ছকটিককে নিয়ে এ নাটক রচিত হয়েছে? হয়তো বা তার কাহিনিও আছে এ নাটকে! মৎস্যগন্ধা কোথা থেকে এল, তার আসল পরিচয়ও বলা হয়েছে এ-নাটকে?

মৎস্যগন্ধা জমিদারবাড়িতে পা রাখে বছরে দু-বার। একবার বৎসরান্তে জমিদারের সেরেস্তায় সে খাজনা দিতে যায়। আর একবার যায় দুর্গাপূজার আগে একটা রুপোর ঘটে করে এখানকার মাটি দিতে। বেশ্যারা সমাজ থেকে ব্রাত্য হলেও বেশ্যালয়ের মাটি দুর্গাপূজার উপচার। তবে সে জমিদারবাড়িতে কোনও দিন কোনও উৎসবে যায়নি। যাবার কথাও নয়। কিন্তু 'মৃচ্ছকটিকম' শব্দটা আর তার প্রধানা নায়িকা একজন নটী-গণিকা—এই ব্যাপারটা মৎস্যগন্ধাকে আকৃষ্ট করে ফেলল। যদি মিলে যায় তার অজানা প্রশ্নর উত্তর? আজ-ই তো আবার সে সেই স্বপ্নটা দেখল! আর সেই স্বপ্নটা দেখলে খালি তার মনে হয় 'আমি কোথা থেকে এলাম?'

শ্যামা তার মুখের দিকে চেয়ে অনুমতির প্রত্যাশায় দাঁড়িয়ে আছে। একটু ভেবে নিয়ে শ্যামাকে অবাক করে দিয়ে মৎস্যগন্ধা বলল, 'হ্যাঁ রে, আমি যদি যাই তবে সে নাটক দেখতে পাব? আমাকে ওরা মহলে ঢুকতে দেবে?'

তার কথা শুনে শ্যামা উৎফুল্লভাবে বলল, 'আপনি যাবেন? নাটক তো মহলের ভিতর হয় না। হয় দেউড়ি পেরিয়ে মহলের গায়ে মাঠের মধ্যে। বাইরের অনেক লোক দেখতে যায়। কিছু মেয়েও থাকে। তাদের সঙ্গে বসেই আমি পালা দেখি। যদি মহলের ভিতরে হত তবে আমি কি দেখতে পারতাম?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'যদি আমাকে কেউ চিনে ফেলে?'

শ্যামা তাকে আশ্বস্ত করে বলল, 'কীভাবে চিনবে? আমাদের মুখ তো কাপড়ে ঢাকা থাকবে। যেখানে আমরা বসি সে-জায়গাটাও অন্ধকার থাকে। তাছাড়া আমি তো আপনার সঙ্গে থাকছি। চিন্তার কোনও কারণ নেই।'

তার যাওয়াটা সমীচীন হবে কিনা তা বুঝে উঠতে পারল না মৎস্যগন্ধা। সে বলল, 'ঠিক আছে, আমি ভেবে দেখি। আর আমি যদি না-ও যাই, তুই নাটক দেখে এসে সঙ্গে সঙ্গে গল্পটা বলবি।'

মৎস্যগন্ধার কথা শুনে, 'আচ্ছা' বলে চলে গেল শ্যামা।

মৎস্যগন্ধা প্রবেশ করল স্নানঘরে। এঘরে দারুকাঠ দিয়ে বাঁধানো বিশাল এক আয়না আছে। মাথা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত দেখা যায় তাতে। ভিনদেশি এক শ্বেতাঙ্গ বণিক দারুকাঠের এই মুকুর উপহার দিয়েছিল মৎস্যগন্ধাকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চন্দন লেপনের জন্য প্রতিদিনের মতো ধীরে ধীরে পোশাক খসাতে শুরু করল মৎস্যগন্ধা। আয়নায় ধরা দিতে লাগল তার প্রতিচ্ছবি। শঙ্খের মতো উন্নত তার ধবল স্তনযুগল, জামফলের মতো বাদামি স্তনবৃন্ত, ক্ষীণ কটিদেশের মাঝখানে তৈলকূপের মতো গভীর নাভি, কদলীকান্ডর মতো ঊরু, গোলাপের পাপড়ির ভাঁজের মতো যোনীদেশ সবকিছুই উন্মুক্ত হয়ে গেল আয়নার সামনে। লোকে বলে এ গণিকালয়ের সেরা সুন্দরী নাকি মৎস্যগন্ধা। সে মনে মনে নিজেও বিশ্বাস করে কথাটা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেই অবাক হয়ে যায় নিজের অঙ্গরূপ দেখে। স্নানের আগে প্রত্যেকদিন আয়নার সামনে বেশ কিছুক্ষণ নিজের শরীরটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মৎস্যগন্ধা। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা তার বৃন্তযুগল কি মৃদু আনত হল, দেহের চামড়ায় কোথাও কুঞ্চন জাগেনি তো? কোথাও জেগে ওঠেনিতো বাড়তি মেদ? শরীর-ই তো শ্রেষ্ঠ সম্পদ, মৎস্যগন্ধার মতো নারীর কাছে। যার টানে পতঙ্গের মতো ছুটে আছে পুরুষের দল। মৎস্যগন্ধা অবশ্য সবার সঙ্গে পালঙ্কে যায় না। জাহাজের নায়ক, ক্যাপ্টেন বা নগরীর সম্ভ্রান্ত বণিকরা উপযুক্ত কাঞ্চনমূল্য দিলে তবে মৎস্যগন্ধকে পায়। সেক্ষেত্রেও কিছু শর্ত রাখে মৎস্যগন্ধা। তার শরীরে কোথাও সামান্য কোনও ত্রুটি যাতে না হয় তার জন্য সর্বদা সজাগ থাকে মৎস্যগন্ধা। যে-কারণে বয়স তার তিরিশ হতে চললেও শরীর তার অষ্টাদশী নারীর মতোই।

আজও নগ্নিকা হয়ে আয়নার সামনে নানা ভঙ্গিতে নিজের শরীরের বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল সে। কিন্তু একসময় সে বুঝতে পারল, এ-ব্যাপারটাতে অন্যদিনের মতো মনোসংযোগ করতে পারছে না। তার মাথায় শুধু ঘুরপাকে খাচ্ছে 'মৃচ্ছকটিকম', 'মৃচ্ছকটিক'—এ-শব্দগুলো। তার চোখের সামনে ফুটে উঠতে লাগল সেই দৃশ্য। অকূল পাথারে সে খালি ভাসছে! ভাসছে! আর তার সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে খালি উঁকি দিতে লাগল সেই প্রশ্নগুলো—'আমি কে? কোথা থেকে এলাম? কোন নর-নারী সৃষ্টি করেছিল আমার এই শরীরটাকে?'

'মৃচ্ছকটিকম' নাটকে কি এ প্রশ্নের কোনও উত্তর মিলতে পারে? মৎস্যগন্ধা এক সময় সিদ্ধান্ত নিল, নাটকটা সে দেখতে যাবে। এই সিদ্ধান্ত নেবার পর অন্যদিনের মতোই শরীরে চন্দনচূর্ণ-লেপন শুরু করল মৎস্যগন্ধা।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল এক সময়। তমালিকা বন্দরে দাঁড়িয়ে আজ জাহাজগুলোর ডেকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল বেলাশেষের আলো। পণ্যবাহী জাহাজগুলোর ডেকে এ সময়টাতে নাবিকরা নানা আমোদে মেতে উঠলেও কেমন যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে ক্ষয়িষ্ণুএই বন্দরের বুকে। একটা সময় ছিল যখন সারারাত জেগে থাকত এই বন্দর। সে অবশ্য বহু যুগ আগের কথা। কয়েক শত বছর তো হবেই। আর এখন বিকেল গড়াবার সঙ্গে সঙ্গেই বন্দর ফাঁকা হতে শুরু করে। একটা জায়গাতেই শুধু ভিড় জমে, মৎস্যগন্ধার বেশ্যালয়ের সামনে।

অন্ধকার নামা শুরু হতেই একটা-একটা করে প্রদীপ জ্বালানো শুরু হল গণিকালয়ে। নীচ থেকে ভেসে আসতে লাগল মৃদু শোরগোলের শব্দ। খদ্দেরদের আগমন শুরু হয়েছে। নিজের ঘরেই প্রস্তুত হয়ে বসেছিল মৎস্যগন্ধা। ছদ্মবেশ ধারণের জন্য পুরানো জেল্লাহীন পোশাক তার পরনে। অলঙ্কারও সব খুলে রেখেছে সে। শুধু ছুরিটা গোঁজা আছে তার কোমরে। শ্যামা এসে ঘরে প্রবেশ করতেই পালঙ্কে রাখা কালো চাদরটা তুলে নিল সে। সদর দরজায় খদ্দেরদের ভিড়। তাই নীচে নেমে কালো চাদরে নিজেকে মুড়ে নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে শ্যামার সঙ্গে সে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।

লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচিতে যে-জায়গাগুলো একসময় মুখরিত ছিল সে- জায়গাগুলো এখন শুনশান। মালটানা গো-শকটের বলদগুলো অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে। অন্ধকার গুদামঘর সংলগ্ন দু-একটা গদিঘরে শুধু টিম টিম করে আলো জ্বলছে। দিনশেষে ঘরে ফেরার আগে ব্যবসার হিসেব নিকেশ মিলিয়ে নেওয়া হচ্ছে সেখানে। সে আলোগুলোও আর কিছুক্ষণের মধ্যেই নিভে যাবে। বন্দর অঞ্চলের সর্পিল গলিপথ বেয়ে প্রধান সড়কে উঠে এল মৎস্যগন্ধা। সে রাস্তা সোজা চলে গেছে রাজবাড়ির দিকে। যে রাস্তায় সামান্য কিছু লোকজন থাকলেও দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে। তমালিকা বন্দর-কেন্দ্রিক এই নগর। বন্দরের কাজ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই নগরীও আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে। তবে মাঝে মাঝে ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ছোট-বড় নানা মন্দির আছে এ নগরীতে। সন্ধ্যারতি হচ্ছে সেখানে। বেশ কিছুটা এগোবার পর জমিদারবাড়ির সিংহতোরণের মাথার মশালের আলো দেখতে পেল তারা। সেখানে পৌঁছে মৎস্যগন্ধা দেখতে পেল দেউড়ির সামনে ছোটখাটো একটা ভিড় জমেছে। জমিদারের দুজন পাইক সেখানে মাথায় পাগড়ি এঁটে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকলেও ফটক উন্মুক্ত। বাইরের লোককে তারা ভিতরে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছে না। লোকজন যাওয়া-আসা করছে। দু-চারজন নারীও আছে তার মধ্যে। মৎস্যগন্ধা ব্যাপারটা দেখে আশ্বস্ত হল। তার আর শ্যামার, দুজনেরই মুখ চাদরে ঢাকা। ভিড়ের সঙ্গে মিশে সিংহদুয়ার অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করল তারা।

বিশাল রাজবাড়ি প্রদীপের আলোয় আলোকিত। বিশেষত, দ্বিতল রাজবাড়ির একতলার যে অলিন্দে বসে জমিদার পালা দেখবেন সে-জায়গা ঝাড়বাতির আলোতে ঝলমল করছে। মখমলের গালিচা পেতে ফুল-মালা দিয়ে সাজানো হয়েছে সে-জায়গা। আর তার ঠিক মাথার ওপরের অলিন্দ ঘেরা হয়েছে স্বচ্ছ কাপড়ের পর্দা দিয়ে। যেখানে বসে পালা দেখবে অন্তঃপুরবাসীরা। শামিয়ানার নীচে কাঠের মঞ্চ বানানো হয়েছে জমিদার যেখানে বসবেন সেদিকে মুখ করে। আর মঞ্চর দুপাশে কিছুটা তফাতে বাঁখারির ঘেরাটোপের মধ্যে মাটিতে বহিরাগত সাধারণ মানুষদের বসার স্থান। এক পাশে পুরুষ, অন্যপাশ মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট। রাজবাড়ি আর মঞ্চটা প্রদীপের আলোতে আলোকিত হলেও মঞ্চের দুপাশে আমজনতার বসার স্থান অন্ধকারই বলা চলে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু জনসমাগম হয়েছে সেখানে। শ্যামার সঙ্গে গিয়ে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গাতে ঘাসের ওপর বসল মৎস্যগন্ধা। সে খেয়াল করে দেখল, আগেপাশে যারা বসে আছে পালা দেখার জন্য তারা সবাই নিম্ম শ্রেণির শ্রমজীবী মহিলা। এটাই স্বাভাবিক। গৃহস্থবাড়ির নারীরা এভাবে বসে পালা দেখে না।

সময় এগিয়ে চলল। লোক সমাগমও বেড়ে চলল। তার সঙ্গে শুরু হল জমিদার বাড়ির কর্মচারীদের ব্যস্ততা। দুটো পালকি এসে সোজা চলে গেল জমিদারবাড়ির ভিতর। নিশ্চই কোনও সম্ভ্রান্ত বণিক পরিবারের নারীরা আছে পালকির ভিতর! রাজপরিবারের নারীদের সঙ্গে পর্দার আড়ালে বসে নাটক দেখবে তারা। অন্ধকারে বসে চারপাশের সবকিছু লক্ষ করতে লাগল মৎস্যগন্ধা। বুকের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে তার।

অবশেষে একসময় নির্দিষ্ট ক্ষণ উপস্থিত হল। মঞ্চের ঠিক নিচে বসা বাদ্যকরের দল বাজনা বাজাতে শুরু করল। একটা চাপা গুঞ্জন শুরু হল— 'জমিদার আসছেন! জমিদার আসছেন!'

আর তারপরই উঠে দাঁড়াল সবাই। মৎস্যগন্ধাও উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বিতল জমিদারবাড়ির সিঁড়ি বেয়ে নেমে পাত্র-মিত্র-সভাসদ-পরিবৃত হয়ে অলিন্দে আসন গ্রহণের জন্য উপস্থিত হলেন জমিদার যদুনাথ রায়। উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে একবার তিনি হাত নাড়লেন। জনতাও যে-যেখানে দাঁড়িয়েছিল তারাও হাতজোড় করে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল তাঁকে। তাকিয়াতে ঠেস দিয়ে বসলেন তিনি। একজন রুপোর গড়গড়ার নল তুলে দিল তাঁর হাতে।

ঢং করে নাটক শুরুর ঘণ্টা বাজল। প্রথমে মঞ্চে উঠে কুশীলবরা সার বেঁধে দাঁড়াল। বসন্তসেনাসহ বেশ কিছু নারীচরিত্রও আছে নাটকে। বলা বাহুল্য পুরুষরাই নারীর পোশাকে সেসব চরিত্রে অভিনয় করবে। প্রথমে তারা সমবেত হয়ে জমিদারকে প্রণাম জানিয়ে মঞ্চ ছেড়ে নেমে গেল। শুধু রয়ে গেলেন সূত্রধর। তিনি জানালেন, 'মৃচ্ছকটিকম' নামের এই সংস্থা নাটকের রচয়িতা হলেন শূদ্রক। মৃচ্ছকটিকম এই সংস্কৃত শব্দের অর্থ হল মৃৎ শকট—মাটির তৈরি গাড়ি।

শুরু হয়ে গেল নাটক মৃচ্ছকটিকম। মৎস্যগন্ধা উত্তেজিত ভাবে চেয়ে রইল মঞ্চর দিকে। গল্পের মূল বিষয় হল বণিক চারুদত্তের সঙ্গে নগরনটী বসন্তসেনার প্রেমকাহিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য মৎস্যগন্ধা বুঝতে পারল, এ-নাটক স্বয়ম্ভুনাথের মৃচ্ছকটিককে নিয়ে নয়। এ এক সম্পূর্ণ অন্য কাহিনি। ব্যাপারটাতে মৎস্যগন্ধা আশাহত হলেও মজে গেল নাটকের মধ্যে।

এগিয়ে চলল নাটক। ভাগ্য বিপর্যয়ে প্রায় নিঃস্ব বণিক চারুদত্ত ও তার স্ত্রী ধূতা। নগরনটী বসন্তসেনা ভালোবাসে চারুদত্তকে। একদিন চারুদত্তর শিশুপুত্র প্রতিবেশী এক বালকের কাছে একটা স্বর্ণ শকট দেখে পিতার কাছে তেমন একটা স্বর্ণ শকট দাবি করে বসে। স্বর্ণ শকট দিতে অক্ষম চারুদত্ত তাকে একটা মৃৎশকট 'মৃচ্ছকটিকম' এনে দেয়। মাটির তৈরি শকটের কোনও মূল্য নেই। কাজেই সেই শকট উপহার দিয়ে চারুদত্ত পুত্রকে শান্ত করতে পারে না। এ-সংবাদ জানতে পেরে বসন্তসেনা তার সব স্বর্ণালঙ্কার খুলে তুলে দেয় চারুদত্তর হাতে। যাতে সে স্বর্ণ শকট গড়ে দিতে পারে তার পুত্রকে। নিজের স্বর্ণালঙ্কারের থেকে প্রেমিকের মুখে ফুটে ওঠা হাসিকেই বেশি দামি মনে করে গণিকা বসন্তসেনা। কিন্তু বণিক চারুদত্তর সঙ্গে বসন্তসেনার প্রেম মেনে নেয় না সমাজ। কারণ, বসন্তসেনা যে নগরনটী—গণিকা। পুরুষ তার শরীর স্পর্শ করতে পারে কিন্তু সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সে অচ্ছুত। রাজার শ্যালক কামাতুর কোটাল 'শকার' বসন্তসেনার থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে চক্রান্ত শুরু করে বসন্তসেনার বিরুদ্ধে। বিপর্যয় নেমে আসে বসন্তসেনার জীবনে। এক সময় বসন্তসেনার জীবনটাই, তার ভালোবাসা-আত্মত্যাগ-প্রেম—সব কিছুই মৃচ্ছকটিকমের মতোই মূল্যহীন হয়ে গেল। নাটকের শেষ দৃশ্যে যখন বাঁশির সুরে বসন্তসেনার হাহাকার বেদনা ছড়িয়ে পড়ছে নাট্যমঞ্চে, তখন আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারল না মৎস্যগন্ধা। নাটক দেখতে দেখতে কখন যেন সে একাত্ম হয়ে গেছিল বসন্তসেনার সঙ্গে। আর সত্যিই তো, যুগে যুগে বসন্তসেনাদের মতোই তো আজকের মৎস্যগন্ধাদেরও জীবন। সমাজের চোখে মৎস্যগন্ধাদের কোনও মন নেই, শুধু দেহ আছে। সমাজের কাছে তারা ব্রাত্য। দুর্গাপুজোতে গণিকালয়ের মাটি পুজোর উপচার হিসাবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু তাদের পায়ের স্পর্শে নাটমন্দির অপবিত্র হবে বলে মৎস্যগন্ধাদের প্রবেশাধিকার থাকে না সেখানে।

নাটক ভেঙে গেল। জমিদার গাত্রোত্থান করে অন্দরমহলে চলে যাবার পর সমবেত জনতাও জমিদারবাড়ি পরিত্যাগ করল। মৎস্যগন্ধাও রাজবাড়ির সিংহতোরণের বাইরে এসে শ্যামাকে নিয়ে ফেরার পথ ধরল।

চাঁদ উঠেছে আকাশে। পথ চলতে অসুবিধা নেই। চলতে চলতে শ্যামা বেশ উৎফুল্লভাবে জানতে চাইল, 'নাটক কেমন দেখলেন? হংসরাজের অভিনয় কেমন লাগল?'

শ্যামা যে তার নাগরের অভিনয়ের ব্যাপারে জানতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক। মৎস্যগন্ধা জবাব দিল, 'ভালো। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে বসন্তসেনার চরিত্রে যে অভিনয় করেছে তাকে। কী অপূর্ব অভিনয়! সে যে নারী নয়, তা বোঝাই যাচ্ছিল না!'

একথা বলার পর একটু চুপ করে থেকে মৎস্যগন্ধা শ্যামাকে প্রশ্ন করল 'তুই ওই হংসরাজ বলে লোকটাকে খুব ভালোবাসিস, তাই না? যে কারণে উপার্জন ফেলে তার পালা দেখতে ছুটে আসিস?'

শ্যামা মৃদু লজ্জিতভাবে জবাব দিল, 'হ্যাঁ। তাকে শরীর দিয়ে কোনও অর্থ আমি নিই না। আপনার হাতে যা তুলে দিই তা অন্য খদ্দেরদের থেকে পাওয়া আমার সঞ্চিত অর্থ।'

কথাটা শুনে মৎস্যগন্ধা বলল, 'ঠিক আছে, ওই লোকটা তোর ঘরে এলে এরপর থেকে তার জন্য কোনও পয়সা দিতে হবে না তোকে। ওর জন্যেই তো এত চমৎকার পালাটা দেখতে পেলাম।'

মৎস্যগন্ধার কথায় চাঁদের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল শ্যামার মুখ। সে বলে উঠল, 'জমিদারবাড়িতে তো মাঝে মাঝেই এমন পালা হয়। হংসরাজ অভিনয় করে। আপনি আবার দেখতে আসবেন?'

শ্যামার এ-প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মৎস্যগন্ধা অন্য একটা প্রশ্ন করল তাকে। মৎস্যগন্ধা বলল, 'আচ্ছা, তুই তো লোকটাকে ভালোবাসিস, নিশ্চই লোকটার কাছে তোর সর্বস্ব দিতে পারিস। ধর, আমি তোকে মুক্তি দিলাম। হংসরাজকে যদি তুই বিয়ে করতে চাস তবে কি সে রাজি হবে?'

প্রশ্নটা শুনেই উজ্জ্বলতা মুছে গেল শ্যামার চোখ থেকে। শ্যামা জবাব দিল, 'না করবে না। শুনেছি তার স্ত্রী কলহপ্রিয়, লোভী চরিত্রা। যৌবনও অতিক্রান্ত হয়েছে তার। কিন্তু হংসরাজ আমার সঙ্গে রাত কাটালেও, আমি তাকে ভালোবাসলেও, সে আমাকে বিবাহ করবে না। কারণ সমাজ তা মেনে নেবে না। আমি তো বারবনিতা।'

মৎস্যগন্ধা আর কোনও কথা বলল না তাকে। নাটকটা দেখার পর থেকেই বিষণ্ণতা গ্রাস করেছে তার মনকে।

চাঁদের আলোতে পথ চলতে চলতে সে ভাবতে লাগল সত্যি তো বারবনিতার জীবন মাটির শকটের মতোই মূল্যহীন। আর সেজন্যই কি স্বয়ম্ভুনাথ তাঁর গণিকাবাহী সমুদ্র-শকটের নাম রেখেছিলেন 'মৃচ্ছকটিক?' সে ময়ূরপঙ্খীর নারীরাও তো ছিল মাটির ঢেলার মতো মূল্যহীন।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনশূন্য হয়ে গেছে পথ। আসার পথে যে দু-চারজন লোকের দেখা মিলছিল এখন তা-ও নেই। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিও আর শোনা যাচ্ছে না। শুধু পথের পাশে যে বড় বড় আম-কাঠালের বাগান আছে তার ভিতর থেকে মাঝে মাঝে শিয়ালের ডাক। সে শব্দ রাত্রির নির্জনতাকে আরও যেন বাড়িয়ে তুলছে।

নিশ্চুপ ভাবে চলতে চলতে একসময় তারা পৌঁছে গেল বন্দর অঞ্চলে। ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে জায়গাটা। বড় বড় গুদামঘরগুলো থাকায় চাঁদের আলো প্রবেশ করছে না সর্পিল পথে। তবে মৎস্যগন্ধাদের তেমন অসুবিধা নেই। চেনা রাস্তা, চেনা গলি। দুজন প্রবেশ করল অন্ধকার গলিপথে।

তারা তখন গণিকালয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বড় বড় বাড়িগুলোর আড়াল থেকে মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছে মৎস্যগন্ধার বনিতাগৃহের ছাদে বসানো প্রদীপ মালা। সেদিক থেকে লোকজনের অস্পষ্ট শব্দও ভেসে আসছে। আগের মতোই বাড়িটার পিছন দিয়ে সেখানে প্রবেশ করার জন্য যে-পথে তারা আসছিল সে-পথ ছেড়ে অন্য একটা গলিতে বাঁক নিল তারা। আর বাঁক নিতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল তাদের। গুদামঘরগুলোর ফাঁক গলে কীভাবে যেন একফালি চাঁদের আলো এসে পড়েছে পথের মাঝে। সেই আলোতে মৎস্যগন্ধারা দেখতে পেল, রাস্তার পাশের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে দুজন লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল একজন লোকের ওপর। একটা ঝটাপটি শুরু হল। যে লোকটা আক্রান্ত হল তার কোমরে একটা তলোয়ার থাকলেও আকস্মিক আক্রমণে সেই তলোয়ার খোলার সুযোগ পেল না সে। একটা লোক পিছন থেকে কাষ্ঠদন্ডর ঘা বসিয়ে দিল তার মাথায়। বিজাতীয় ভাষায় আর্তনাদ করে মাটিতে ছিটকে পড়ল লোকটা। তার কোমরের গেঁজ থেকে একটা থলে পথের মাঝে পড়ে ঝনঝন শব্দে প্রথমে বেজে উঠল, তারপর তার থেকে মুদ্রা ছড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। আক্রান্ত লোকটা সম্ভবত জ্ঞান হারাল। আর আক্রমণকারীরা উদ্যত হল সেই থলে আর মুদ্রাগুলো সংগ্রহ করার জন্য।

ব্যাপারটা মৎস্যগন্ধাদের চোখের সামনে ঘটে গেল কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই। ব্যাপারটা কী ঘটল, বুঝতে অসুবিধা হল না তাদের। নির্জন পথে সম্ভবত কোনও বিদেশিকে একলা পেয়ে আক্রমণ করেছে বন্দর-তস্করদের দল। বন্দর অঞ্চলে জমিদারের পেয়াদারা টহল দিলেও মাঝে মাঝে এ ঘটনা ঘটে। ব্যাপারটা বুঝে ওঠামাত্রই মৎস্যগন্ধা চিৎকার করে ছুটল সেদিকে। এমনওতো হতে পারে, যে-লোকটা মাটিতে পড়ে গেল, সে তাদের খদ্দের? টাকার থলি নিয়ে সে তার গণিকালয়েই যাচ্ছিল আনন্দলাভের জন্য? এ-ঘটনা প্রচারিত হলে ক্ষতি হবে মৎস্যগন্ধার। তস্করলুটেরাদের ভয়ে রাতে অনেকে এ পথ মাড়াতে চাইবে না। এসময় হঠাৎ মৎস্যগন্ধাদের উপস্থিতি আশা করেনি লুঠেরারা। তাই প্রাথমিক অবস্থায় একটু চমকে উঠল তারা। কিন্তু যে-দুজন তাদের দিকে ছুটে আসছে, তারা নারী, দেখে কাষ্ঠদণ্ডধারী এগিয়ে এল তাদের দিকে। কিন্তু লোকটা দণ্ড দিয়ে মৎস্যগন্ধাকে আঘাত করার আগেই সে কোমর থেকে ছুরিটা খুলে নিয়ে চালিয়ে দিল লোকটার বাহু লক্ষ্য করে। লুঠেরা আর্তনাদ করে উঠল। দণ্ড খসে পড়ল তার হাত থেকে। দ্বিতীয় তস্কর-লুঠেরা প্রথমজনকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই চাদরটা খসে গেল মৎস্যগন্ধার গা থেকে। মৎস্যগন্ধাকে বন্দর অঞ্চলে সবাই চেনে। মৎস্যগন্ধা তস্কর দুজনকে না চিনলেও দ্বিতীয় আক্রমণকারী চিনে ফেলল তাকে। আহত সঙ্গীর উদ্দেশ্যে সে বলে উঠল, 'আরে, এ যে গণিকা মৎস্যগন্ধা! পালাও!'

আর এর পরক্ষণেই ভোজবাজির মতো রাস্তার পাশের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল লুঠেরারা। মৎস্যগন্ধা আর তাদের পিছু ধাওয়া না করে মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার কাছে গিয়ে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। অজ্ঞান হয়ে গেছে লোকটা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাথা। তার চামড়ার রং আর পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছে, লোকটা এদেশের লোক নয়। শ্যামা বলল, 'সম্ভবত এ-লোক ওই পর্তুগিজ জাহাজেরই কেউ হবে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'আমারও তাই মনে হয়। এ লোকটাকে তুলে নিয়ে যেতে হবে। তুই একটা কাজ কর তাড়াতাড়ি গিয়ে কয়েকজন লোক ডেকে নিয়ে আয়।'

মৎস্যগন্ধার নির্দেশ পালন করে শ্যামা ছুটল গণিকালয়ের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন লোককে নিয়ে ফিরে এল সে। ততক্ষণে মৎস্যগন্ধা মাটি থেকে রুপোর টাকাগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আবার থলেতে ভরে ফেলেছে। আহত লোকটাকে তুলে নিয়ে সবাই এগোল গণিকালয়ের দিকে। পিছনের দরজা দিয়েই সেখানে তারা প্রবেশ করল। খদ্দেরদের ভিড়ে জমজমাট গণিকালয়। একতলার এক-একটা অংশে এক এক জাতের গণিকারা থাকে। খদ্দেররা নিজেদের পছন্দমতো নির্বাচন করে তাদের। দোতলার একটা অংশতেও তারা থাকে। তবে মৎস্যগন্ধা যে-অংশে থাকে সে-জায়গাটা পৃথক। সেখানে ওঠার জন্য পৃথক একটা সিঁড়িও আছে। আহত-রক্তাক্ত লোকটাকে দেখলে খদ্দেরদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে ভেবে মৎস্যগন্ধা নির্দেশ দিল সংজ্ঞাহীন লোকটাকে সেই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠাবার জন্য। লোকটাকে তুলে এনে শোয়ানো হল মৎস্যগন্ধার শয়নকক্ষ সংলগ্ন এক কক্ষে। এ কক্ষগুলো অনেক সময় তার নিজের খদ্দেরদের জন্য ব্যবহার করে থাকে মৎস্যগন্ধা। তাকে পালঙ্কে শোয়ানোর পর প্রদীপের আলোতে ভালো করে দেখল মৎস্যগন্ধা। আহতব্যক্তি যে ভিনদেশি তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সুপুরষ চেহারা, গাত্রবর্ণ রক্তাভ, মাথার চুল, গোঁফের রংও লালচে। যদিও তার চোখের পাতা বন্ধ, তবুও লোকটার মুখমণ্ডলে একটা সম্ভ্রান্ত ভাব আছে। মৎস্যগন্ধা অনুমান করল, এ যুবকের বয়স সম্ভবত বছর তিরিশ হবে।

রক্তপাত এখনও কমেনি। মৎস্যগন্ধার নির্দেশে এরপর লোকটার পরিচর্যা শুরু করল শ্যামা আর একজন গণিকা। প্রাথমিক চিকিৎসার নানা উপকরণ মজুত থাকে এই গণিকালয়ে। খোলে জড়িবুটি আর পাথরকুচি পাতা থেঁতো করে ক্ষতস্থানে তার পুরু প্রলেপ দিতেই রক্তপাত বন্ধ হল। তারপর পরিষ্কার কাপড়ের পটি জড়ানো হল লোকটার মাথায়। এসব করতে করতেই মধ্যরাত অতিক্রান্ত হয়ে গেল।

তবে যুবকের জ্ঞান ফিরল না। তাকে সেই ঘরে রেখে ঘর ছাড়ল সবাই। মৎস্যগন্ধাও ফিরে এল তার নিজের কক্ষে। সেই রেশমের থলেটা মৎস্যগন্ধার কাছেই ছিল। পালঙ্কের ওপর থলেটা উপুড় করে মুদ্রাগুলো ঢালল মৎস্যগন্ধা। গুনে দেখল একশো মুদ্রা আছে সেখানে। মৎস্যগন্ধা যদি এ মুদ্রাগুলো সরিয়ে ফেলে তবে তার দায় পড়বে সেই লুঠেরাদের ওপর। অন্য কেউ হলে হয়তো অর্থ লাভের এ সুযোগ হাতছাড়া করত না। নিদেন পক্ষে কিছু মুদ্রা সরিয়ে রাখত। কিন্তু মৎস্যগন্ধা বারবনিতা হলেও শঠ-প্রতারক-তস্কর নয়। পরদ্রব্যে তার কোনও লোভ নেই। আর এ শিক্ষা যে ও পেয়েছে সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী নিশাদপাদের কাছ থেকে। ইচ্ছা করলেই তো তিনি...।

মুদ্রাগুলো আবার সেই রেশমের থলের মধ্যে ভরে ফেলল মৎস্যগন্ধা। রানি পালঙ্কের একপাশে শুয়ে চোখ পিটপিট করে দেখছে আর লম্বা লম্বা হাত দিয়ে পেট চুলকাচ্ছে। এর একটা ইঙ্গিত আছে। বাচ্চা শিশুদের যেমন গায়ে হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতে হয় তেমনই মৎস্যগন্ধাকেও হাত বুলিয়ে দিতে হয় রানির পেটে। তাতে আরাম পায় প্রাণীটা। এক অর্থে রানিও তো শিশু। সে তো শিশুর মতোই সরল। সে কি বলতে চাইছে বুঝতে পেরে মৎস্যগন্ধা তার দিকে তাকিয়ে হাসল তারপর তেলের প্রদীপটা নিভিয়ে রানির পাশে শুয়ে তার পেট চুলকে দিতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরাম পেয়ে রানি ঘুমিয়ে পড়ল। সাপের মতো ফোঁস ফোঁস শব্দ হতে শুরু করল তার স্ফীত নাসারন্ধ্র দিয়ে।

কিন্তু মৎস্যগন্ধার ঘুম আসছে না। তার চোখে আবার ভেসে উঠতে লাগল নাটকের দৃশ্যগুলো। আর তার সঙ্গে সঙ্গে আবারও এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা গ্রাস করতে লাগল তাকে। খালি মনে হতে লাগল, তার জীবনটাও কি 'মৃচ্ছকটিকম' হয়ে থাকবে? তার জীবনের শেষ পরিণতিও কি তবে ভর্তিকার মতো অজানা সমুদ্রে ভেসে যাওয়া? বসন্তসেনার মতো সে-ও কি তবে কোনওদিন ঘর পাবে না?

অর্থের অভাব নেই মৎস্যগন্ধার। একটা জাহাজ কিনে নেবার মতো সম্পদ তার আছে। অন্য কোথাও চলে গিয়ে মহল বানিয়ে বাকি জীবনটা সেখানে অতিবাহিত করার মতো টাকাও তার আছে। এক-এক সময় মনে হয়, এই গণিকালয় ছেড়ে, এই তমালিকা বন্দর ছেড়ে সে চলে যাবে অন্য কোনও দেশে। যেখানে সে ঘর বাঁধবে অন্য কারও সঙ্গে। সে লোক যেকোনও বর্ণের যে-কোনও ধর্মের মানুষ হলেও আপত্তি নেই মৎস্যগন্ধার। সে একটাই শুধু দাবি জানাবে সেই পুরুষের কাছে। লোকটা যেন মৎস্যগন্ধার শরীরটাকেই শুধু ভালো না বাসে। মনটাকেও যেন ভালোবাসে।

রাত এগিয়ে চলল। আর তার সঙ্গে বিষণ্ণতা যেন আরও ঘিরে ধরতে লাগল তাকে। না ঘুমিয়ে সে নানা কথা ভাবতে ভাবতে পালঙ্কে ছটফট করতে লাগল। রাত যত ভোরের দিকে এগোতে লাগল তত স্তিমিত হয়ে আসতে লাগল বাড়িটার একতলা থেকে ভেসে আসা খদ্দেরদের আনাগোনার, মেয়েদের চপল রঙ্গতামাশার শব্দ। একসময় নীচ থেকে গণিকালয়ে প্রবেশের ভারী দরজাটা বন্ধ হবার পরিচিত শব্দ কানে এল মৎস্যগন্ধার। অর্থাৎ শেষ খদ্দের গণিকালয় ত্যাগ করল।

মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। পালঙ্কে আর শুয়ে থাকতে ভালো লাগল না মৎস্যগন্ধার। উঠে গিয়ে সে দাঁড়াল গবাক্ষের সামনে। বাইরে এখন বুড়ি চাঁদ মরে গেছে। তার আবছা আলোতে নদীর মাঝখানে সার বেঁধে নোঙর করে আছে ঘুমন্ত জাহাজগুলো। কোথাও কোনও শব্দ নেই। বন্দর এখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তবে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই জেগে উঠবে বন্দর। নদীর দিক থেকে মৃদু ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে। সেই বাতাসে আরামবোধ হল মৎস্যগন্ধার। একসময় পুব আকাশে শুকতারা ফুটে উঠল। ভোরের সংকেতধ্বনি। সেই শুকতারার দিকে তাকিয়ে শীতল বাতাসের স্পর্শে ধীরে ধীরে মৎস্যগন্ধার মনের বিষণ্ণতা কেটে গেল। পুবের আকাশ লাল হতে শুরু করল তারপর। এই তমালিকা বা তাম্রলিপ্তি বন্দরের নামের পিছনে যে ভিন্ন ভিন্ন গল্পগুলো আছে তার মধ্যে একটা হল, পূর্ব ভারতের এই বন্দরেই নাকি প্রথম সূর্যালোক এসে পড়ে। তাম্রবর্ণের প্রথম সূর্যালোক লেপিত হয় এই বন্দরে। আর তার থেকেই এ বন্দরের নাম তাম্রলিপ্তি। 'লিপ্তি' শব্দের অর্থ লেপন।

আলো ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীর বুকে। নদীবক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা সারসার নৌকা জাহাজগুলোর বুকে। এবার শুরু হবে বন্দরের কর্মব্যস্ততা। যদিও এই গণিকালয়ের ঘুম দুপুরের আগে ভাঙবে না। নদীর দিকে তাকিয়ে মৎস্যগন্ধা ভাবল, আজ নিশ্চই বারানসী থেকে আসা সেই বজরা বন্দরে ভিড়বে।'

আর এর পরই মৎস্যগন্ধার খেয়াল হল, গত রাতে তুলে আনা সেই লোকটার কথা। তার জ্ঞান ফিরল কি? যদি না ফেরে তবে পর্তুগিজ জাহাজে খবর পাঠাতে হবে, লোকটা যদি তাদের হয় তবে তাকে নিয়ে যাবার জন্য।

কথাটা মনে হতেই মৎস্যগন্ধা তার ঘর ছেড়ে অলিন্দ দিয়ে প্রবেশ করল পাশের সেই ঘরে।

খোলা জানলা দিয়ে সে-ঘরেও আলো প্রবেশ করেছে। অন্ধকার কেটে গেছে। ঘরে পা দিয়েই মৎস্যগন্ধা দেখতে পেল মৃদুমৃদু নড়ছে লোকটা। জ্ঞান ফিরেছে কি তবে? মৎস্যগন্ধা তাড়াতাড়ি গিয়ে দাঁড়াল তার পালঙ্কের সামনে। ভোরের প্রথম আলো এসে পড়েছে যুবকের মুখমণ্ডলে। বন্ধ চোখের পাতা মৃদু মৃদু কাঁপছে। আর এরপরই চোখের পাতা খুলল সেই যুবক। চোখের দৃষ্টি ছাদ, ঘরের দেওয়ালগুলো ছুঁয়ে স্থির হল মৎস্যগন্ধার চোখের দিকে। মৎস্যগন্ধা স্থির দৃষ্টিতে তাকাল যুবকের চোখের দিকে। মৃদু বিস্মিতও হল মৎসগন্ধা। এত সুন্দর ঘন নীল চোখ এর আগে কোনওদিন কারও দেখেনি মৎস্যগন্ধা। ঠিক যেন সমুদ্রর মতো ঘন নীল চোখ তার!

কয়েক মুহূর্ত এভাবেই কেটে গেল। তারপর যুবকের চোখেও বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠল। ঈষৎ যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে সে বলল, 'এ কোন জায়গা? আমি এখানে এলাম কী ভাবে?'

পর্তুগিজ ভাষাটা বন্দরে থাকার সুবাদে একটু-আধটু বলতে ও বুঝতে পারে মৎস্যগন্ধা। যেমন সে আরও বেশ কয়েকটা ভাষা কিছুটা বলতে ও বুঝতে পারে।

যুবকের কথার জবাবে মৎস্যগন্ধা মৃদু হেসে জবাব দিল, 'এটা একটা গণিকালয়।'

'গনিকালয়!' শব্দটা শুনে আরও বিস্মিত হল সেই পর্তুগিজ যুবক। হাতে ভর দিয়ে সে পালঙ্কে উঠে বসে জানতে চাইল, 'আমি এখানে কীভাবে এলাম?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'গত রাতে তস্করের দল তোমাকে আক্রমণ করেছিল। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলে তুমি। ভাগ্যিস আমরা সেসময় উপস্থিত হই সেখানে! সংজ্ঞাহীন অবস্থাতে তোমাকে এখানে তুলে আনা হয়েছে।'

এবার সব মনে পড়ে গেল পর্তুগিজের। সে বলে উঠল, 'আমার টাকা? সেগুলো কি তারা নিয়ে গেছে?'

মৎস্যগন্ধা তাকে আশ্বস্ত করে প্রথমে বলল, 'না, নিতে পারেনি। সেগুলো আমার কাছেই আছে।'

এ কথা বলার পর মৎস্যগন্ধা জানতে চাইল, 'তুমি নিশ্চই নতুন আসা পর্তুগিজ জাহাজটার নাবিক?'

মৎস্যগন্ধাকে বিস্মিত করে পর্তুগিজ বলল, 'আমার নাম এস্তাদিও। ওই জাহাজটা আমারই। আমি পর্তুগিজ বণিক। ক'দিন হল বন্দরে এসেছি।'

খবরটা শুনে বেশ খুশি হল মৎস্যগন্ধা। সে যার খোঁজ করেছিল ঘটনাচক্রে লোকটা নিজেই এখন উপস্থিত এঘরে! মৎস্যগন্ধা হাতজোড়ে করে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, 'মৎস্যগন্ধা তার গণিকালয়ে বণিককে স্বাগত জানাচ্ছে।'

এই তবে সেই মৎস্যগন্ধা! যুবক তাকিয়ে রইল মৎস্যগন্ধার মুখের দিকে। সত্যি এ-নারী অপরূপা! এত সুন্দর নারী এর আগে বিশেষ দেখেনি এস্তাদিও।

ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মৎস্যগন্ধা চপল হেসে বলল, 'ওভাবে আমার দিকে তাকিয়ে তুমি কী দেখছ?'

প্রশ্নটা শুনে যেন মৃদু লজ্জা পেল যুবক। অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে সে বলল, 'কিছু না।'

'কিছু না?' হেসে ফেলল মৎস্যগন্ধা।

এস্তাদিও এবার অস্বস্তিকর প্রসঙ্গটা কাটাবার জন্য বলল, 'ব্যাপারটা এমন ঘটবে আমি ভাবিনি। বণিকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধার জন্য কাছেই একটা ঘর ভাড়া নিয়েছি আমি। সেখানে একটা রাতও কাটিয়েছি। এক বণিককে কিছু পণ্য বিক্রি করেছি। তার গুদাম সংলগ্ন বাড়ি। লোকটার কাছে সেসময় টাকা মজুত ছিল না। বলেছিল রাতে এসে টাকা নিয়ে যেতে। তাই তার বাড়ি গেছিলাম। সে আমাকে সেখানে রাতের খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাল। তার সঙ্গে আমার আরও কিছু ব্যবসায়িক আলোচনাও ছিল। সেসব মিটিয়ে টাকা নিয়ে পথে নামতে বেশ রাত হয়ে গেছিল। তারপর এই ঘটনা।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'নতুন জায়গা। তোমার একটু সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত ছিল।'

এস্তাদিও সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বলল, 'হ্যাঁ, তবে আমি শুনেছিলাম তমালিকা বন্দর খুব শান্ত জায়গা।'

মৎস্যগন্ধা হেসে বলল, 'হ্যাঁ, অন্য বন্দরের তুলনায় এ বন্দর শান্ত ঠিকই। তবে কিছু তস্কর-লুঠেরা তো সব জায়গাতেই থাকে।'

একথা বলার পর মৎস্যগন্ধা একটা ব্যবসায়িক প্রশ্ন করল তাকে—'এ বন্দরে যেসব জাহাজ আসে তাদের নাবিকরা অন্তত একবার হলেও আমার এই গণিকালয়ে পা রাখে। কিন্তু তোমার জাহাজ থেকে কোনও নাবিক আসেনি কেন? তোমার কোনও নিষেধ আছে?'

এস্তাদিও বলল, 'না, নিষেধ ঠিক নয়। তবে নতুন জায়গা তো, এখানকার সব খবর আমি এখনও সংগ্রহ করে উঠতে পারিনি। অনেক সময় গণিকালয়ে নাবিকদের সঙ্গে নানা ঝঞ্ঝাট হয় টাকা নিয়ে। তাই এ-জায়গা সম্বন্ধে আমার কাছে কোনও খবর ছিল না বলে আমি তাদের এখানে আসার অনুমতি দিইনি। অবশ্য কেউ এখনও সে অনুমতি চায়ওনি। জাহাজের নাবিকরা নিজেরাও এখন পণ্য নামাবার কাজে খুব ব্যস্ত।'

মৎস্যগন্ধা হেসে বলল, 'এখন নিশ্চই বুঝতে পারছ এ জায়গাটা খারাপ নয়? ইচ্ছুক নাবিকদের তুমি নিশ্চিন্তে আসতে দিতে পারো।'

তার কথা শুনে এবার এস্তাদিও-ও হাসল।

জানলার বাইরে তাকাল এস্তাদিও। দূরে নদীবক্ষে নৌকা-জাহাজগুলোর ভিড়ে পর্তুগালের পতাকাটা দেখতে পেল সে। তার মনে পড়ে গেল, এক ব্যবসায়ীকে তার জাহাজে পণ্য দেখাতে নিয়ে যাবার কথা এস্তাদিওর। লোকটার বন্দরে আসার কথা। সকালে অনেক কাজ আছে এস্তাদিওর। যদিও শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছে তবুও এখানে থাকলে চলবে না তার। তাই পালঙ্ক থেকে নেমে দাঁড়িয়ে এস্তাদিও এরপর বলল, 'এবার আমাকে যেতে হবে।'

মৎস্যগন্ধা তাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে বলল, 'এত তাড়া কীসের? তোমার শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। এখানে অন্তত দিনের বেলাটা বিশ্রাম নিয়ে, শরীরটা সুস্থ করে বিকেলে বেরিও। ভয় নেই, এখানে থাকার জন্য কোনও পয়সা দিতে হবে না।'

এস্তাদিও হেসে ফেলে বলল, 'না, ব্যাপারটা তা নয়। কয়েকজন বণিক আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। তাছাড়া গতরাতে আমি ঘরে না ফেরায় আমার সঙ্গীরা নিশ্চই দুশ্চিন্তা করছে।'

এ কথা শোনার পর মৎস্যগন্ধা আর তাকে বাধা দিল না। পাশের ঘর থেকে সেই টাকাভর্তি রেশমের থলেটা এনে এস্তাদিওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে হেসে বলল, 'এই নাও। একশোটা রুপোর টাকা আছে। রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছিল। আমি কুড়িয়ে গুনে-গেঁথে রেখেছি। গুনে নাও। আমাদের, বেশ্যাদের তো কেউ বিশ্বাস করে না। টাকার জন্য আমরা শরীর বিক্রি করি।'

মৎস্যগন্ধা কথাগুলো হেসে বললেও এস্তাদিওর মনে হল মৎস্যগন্ধার কথার মধ্যে মুহূর্তের জন্য একটা বেদনার অনুভূতিও যেন উঁকি দিয়ে গেল।

এস্তাদিও হেসে বলল, 'তার কোনও প্রয়োজন নেই। একশো মুদ্রাই ছিল। আমি তোমাকে বিশ্বাস করছি।'

কথাটা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল মৎস্যগন্ধা। তা দেখে এস্তাদিও অবাক হয়ে বলল, 'তুমি হাসলে কেন?'

মৎস্যগন্ধা হেসেই জবাব দিল, 'ওই যে বললে, 'বিশ্বাস করছি!' বারবনিতাদের আবার কেউ বিশ্বাস করে নাকি? তোমার এই কথা শুনে মজা পেলাম, তাই হাসলাম।' মৎস্যগন্ধা পালঙ্কের পাশে রাখা এস্তাদিওর তলোয়ারটা তুলে দিল তার হাতে।

বাইরের পৃথিবী জেগে উঠলেও এবাড়ি এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এস্তাদিওকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে অন্ধকার অলিন্দ, সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামল মৎস্যগন্ধা। সদর দরজা খুলল সে। এস্তাদিও পথে নামার মুহূর্তে মৎস্যগন্ধা শুধু বলল, 'আবার এসো।'

কথাটা শুনে পথে পা রেখে এস্তাদিও শেষবারের জন্য ফিরে তাকাল তার দিকে। গণিকালয়ের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে মৎস্যগন্ধা। তার পিছনে গাঢ় অন্ধকার হলেও সকালের আলো এসে পড়েছে তার মুখে। অপরূপ সৌন্দর্য যেন ঝরে পড়ছে মৎস্যগন্ধার মুখমণ্ডল থেকে। সে দিকে তাকিয়ে এস্তাদিওর মনে হল তার সামনে যেন দাঁড়িয়ে আছে বাইবেলবর্ণিত কোনও পরি। তার মুখে কোনও পাপ, ক্লেদের চিহ্ন নেই। এস্তাদিও এরপর সে-জায়গা ছেড়ে এগোতে শুরু করল।

জেগে উঠছে বন্দর। লোকজনের হাঁকডাক ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। গদিঘরগুলোর ঝাঁপ খুলছে, গুদাম-ঘরগুলোর সামনে মাল নেবার জন্য উপস্থিত হচ্ছে বলদে-টানা গাড়িগুলো। কিছুটা এগিয়ে এস্তাদিও দেখা পেয়ে গেল পেড্রোর। এস্তাদিওকে খুঁজতে বেরিয়েছিল সে। দুজনের সাক্ষাতের পর তাকে গতরাতের কাহিনি বলতে বলতে এস্তাদিও এগোল জাহাজঘাটার দিকে।

এস্তাদিওকে বিদায় দিয়ে ওপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে একটা জিনিস দেখতে পেল মৎস্যগন্ধা। রানি একটা টুপি নিয়ে লোফালুফি খেলছে। এস্তাদিওর জাহাজি টুপি। জিনিসটা ফেরত দেওয়া হয়নি তাকে। এস্তাদিও-ও নিতে ভুলে গেছে। হয়তো সে সেটা ফেরত নিতে আসবে, অথবা টুপিটা তাকে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করতে হবে। রানি অবলা প্রাণী। সে নষ্ট করে দিতে পারে টুপিটা। মৎস্যগন্ধা তাই টুপিটা নিয়ে নিল রানির কাছ থেকে। ঘন নীল রঙের একটা জাহাজি টুপি। নানা রঙের ছোট একটা পতাকার ছবিও আঁকা আছে কান উঁচু চামড়ার টুপিটাতে। টুপিটার রং দেখে মৎস্যগন্ধার মুহূর্তের জন্য মনে পড়ে গেল পর্তুগিজ নাবিকের ঘন নীল চোখের কথা। টুপিটাকে সযত্নে একটা দেরাজের মধ্যে তুলে রেখে জানলার সামনে এসে দাঁড়াল সে। চোখে পড়ল বিরাট একটা বজরা পাল তুলে রাজহংসীর মতো এগিয়ে আসছে বন্দরের দিকে। বজরাটা চেনা মৎস্যগন্ধার। তারা এসে গেছে।

১০

সেদিন ভোরবেলা জাহাজে নিজের কেবিনে ঘুম ভাঙল এস্তাদিওর। আগের দিন সূর্যডোবার পর অনেক সময় পর্যন্ত জাহাজ থেকে মাল খালাসের কাজ হয়েছে। বলতে গেলে খোল প্রায় ফাঁকাই হয়ে গেছে। সেই কাজ মেটার পর ক্লান্ত লাগছিল এস্তাদিওর। তার আর ইচ্ছা করছিল না বন্দরে ফিরে যেতে। কাজেই সে জাহাজেই রয়ে গেছিল। বন্দরে আক্রান্ত হবার সেই ঘটনার পর আরও সাতটা দিন কেটে গেছে। ইতিমধ্যে বন্দর অঞ্চলটা বেশ কিছুটা চিনে নিয়েছে সে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মোটামুটি একটা পরিচয়ও হয়েছে। হিন্দু হোক বা আরব, এখানকার লোকজনকে মোটামুটি শান্তিপ্রিয় বলেই মনে হয়েছে। ধর্মীয় ভেদাভেদও নেই হিন্দু আর আরবদের মধ্যে। বেশ কিছু প্রাচীন বৌদ্ধ মঠও আছে এ অঞ্চলে। একসময় নাকি বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান স্থান ছিল এই তমালিকা বন্দর। তবে এখন বৌদ্ধমঠগুলো নাকি অধিকাংশই জীর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সিংহলে পাড়ি দিয়েছে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। দু-একটা মঠে শুধু কয়েকজন সন্ন্যাসী থাকেন। জাহাজঘাটায় তাঁরা বড় একটা আসেন না। নিজেরা নিজেদের মতো মঠেই আবদ্ধ থাকেন। তবে অনেক অনুসন্ধান করেও এস্তাদিও কোনও খ্রিস্ট উপসনাগৃহ অর্থাৎ চার্চের সন্ধান পায়নি। এ ব্যাপারটা একটু হতাশ করেছে তাকে। তবে একটা ব্যাপারে তার মন বেশ খুশি। উচিত মূল্যে প্রায় সমস্ত পণ্যই বিক্রি হতে চলেছে।

ঘুম ভাঙার পর এস্তাদিওর চোখ পড়ল তার কেবিনের দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো 'দিন সারণী'র দিকে। বারোটা মাসসহ তিনশো পয়ষট্টি দিনের হিসেব ধরা আছে ওতে। খোলগুলোতে রোজ একজন দাগ কেটে দিয়ে যায়। এভাবেই দিনের হিসাব রাখা হয়। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে এস্তাদিও হিসেব করে দেখল আজ সেপ্টেম্বরের পনেরো তারিখ। হয়তো বা ভাস্কোর জাহাজ এদেশের মাটি ছুতে চলেছে। ভাস্কো যে-কাজের দায়িত্ব তাকে দিয়েছেন সে-কাজ এবার শুরু করতে হবে তাকে। তমালিকা বন্দরের একটা মানচিত্র তৈরি করতে হবে। লিপিবদ্ধ করতে হবে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বিন্যাস। এ বন্দরের আনুমানিক আয়, কত জাহাজ এখন এই ক্ষয়িষ্ণুবন্দরে যাওয়া-আসা করে সে তথ্য এবং আবশ্যিকভাবে স্থানীয় শাসকদের সামরিক ক্ষমতার পরিমাপ সম্বন্ধে খবর সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এস্তাদিওকে। এবং এই খবরগুলো কৌশলে সংগ্রহ করার জন্য স্থানীয় বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে এস্তাদিওকে কথাও বলতে হবে। আজ তার বিশেষ কোনও কাজ নেই বাণিজ্য সংক্রান্ত ব্যাপারে। এস্তাদিও তাই ভেবে নিল, দিনটা সে খবর সংগ্রহের ব্যাপারে কাজে লাগাবে।

বিছানা থেকে উঠে কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়াল এস্তাদিও। চারপাশে বেশ ঝলমলে পরিবেশ। এস্তাদিও দেখতে পেল কাছেই একটা ছোট জাহাজ থেকে দড়ির মই বেয়ে নৌকাতে নামছে কয়েকজন লোক। তারা কৃষ্ণবর্ণের। মুণ্ডিত মস্তক। গলা থেকে পা পর্যন্ত পীত বস্ত্র জড়ানো। সম্ভবত তারা সিংহলি বৌদ্ধ। জাহাজটা ভোরবেলা এসে নোঙর করেছে। এস্তাদিও গতকালও এ জাহাজটাকে দেখেনি। বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে এখানে পা রাখার আগে কিছুই জানা ছিল না এস্তাদিওর। এমনকী এইনামে যে একটা ধর্ম আছে তাও তার অজানা ছিল। তমালিকা বন্দরে একজন বণিক আছে। সে নিজে বৌদ্ধ না হলেও তার কাছে কয়েকজন সিংহলি শ্রমিক কাজ করে। ধর্মে তারা বৌদ্ধ। কর্মোপলক্ষ্যে এস্তাদিও ক'দিন আগে সেই বণিকের সঙ্গে সাক্ষাত করতে গেছিল। সেই বাঙালী বনিকের থেকেই কথাপ্রসঙ্গে এ-ধর্মের ব্যাপারে কিছুটা জেনেছে এস্তাদিও। হাজার বছরেরও আগে এদেশে সম্রাট অশোক নামে নাকি এক সম্রাট ছিলেন। তিনি ছিলেন বৌদ্ধ। সেই বৌদ্ধ সম্রাট নাকি এই তমালিকা বন্দর থেকেই সিংহলে লোক পাঠিয়েছিলেন বৌদ্ধধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। সেই বাঙালি বণিক গর্ব ভরে আরও একটা কথা বলেছে তাকে। বহু শতাব্দী আগে বিজয় সিংহ নামের এক বাঙালি নাকি সিংহল জয় করেছিলেন। সেই বিজয় সিংহও নাকি সিংহল যাত্রা করেছিলেন এ-বন্দর থেকেই। সিংহলের সঙ্গে এই তমালিকা বন্দরের সম্পর্ক কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন।

এস্তাদিওকে ডেকে এসে দাঁড়াতে দেখে ক্যাপ্টেন তার কেবিন ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন এস্তাদিওর কাছে। দুজনের মধ্যে 'সুপ্রভাত' বিনিময়ের পর ক্যাপ্টেন পেরো বলল, 'সান্টা মারিয়ার খোল তো কাল প্রায় খালি হয়ে গেল। আপনার ইচ্ছা পূর্ণ হল মাতা মেরির কৃপায়। জাহাজে নতুন কী মাল তুলবেন?'

এস্তাদিও হেসে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, বিক্রি ভালোই হয়েছে। কয়েকজন বস্ত্র-ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলোচনা চলছে সুতিবস্ত্র কিনে জাহাজে তোলার জন্য। তবে দরকষাকষি করে সিদ্ধান্তে আসতে আরও দুটো-তিনটে দিন সময় লাগবে।'

পেরো জানতে চাইল 'আজ আপনার কাজ কী?'

এস্তাদিও বলল, 'আজ তেমন কাজ নেই আমার। তবে কিছু স্থানীয় লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলব ভাবছি। কিছু খোঁজখবর নেব এ-জায়গা সম্বন্ধে।'

এস্তাদিওর কথা শুনে ক্যাপ্টেন পেরো বললেন, 'একটা কথা বলার ছিল আপনাকে। এ-দশ দিন ধরে নাবিকরা প্রচুর পরিশ্রম করেছে। আজ কাজ না থাকলে ডাঙায় নামতে দেবার অনুমতি দেব? ডাঙায় নামতে চাচ্ছে তারা।'

এস্তাদিও কথাটা শুনে বলল, 'আমি তো নাবিকদের ডাঙায় নামতে নিষেধ করিনি? তারা তো নেমেওছে!'

ক্যাপ্টেন পেরো হেসে বললেন, 'এ-নামা, সে-নামা নয়, ওরা 'নামা' বলতে বোঝাচ্ছে গণিকালয়। একসঙ্গে কাজ করার সময় স্থানীয় শ্রমিকদের কাছে তারা শুনেছে সেই গণিকালয়ের ব্যাপারে। তাছাড়া ওই যে দূরে কাঠের ঘরঅলা পালতোলা বিরাট নৌকাটা দিন সাতেক আগে উপস্থিত হয়েছে সেখান থেকেও ওই গণিকালয়ের জন্য নারীদের নামিয়ে নিয়ে যেতে দেখেছে ওরা।'

নাবিকদের ওপর এবার আর নিষেধ বজায় রাখার কোনও কারণ নেই। এস্তাদিও তাই বলল, 'ঠিক আছে, ওদের ডাঙায় নামতে দিন।'

এস্তাদিওর কথা শুনে ক্যাপ্টেন পেরো তার থেকে বিদায় নিয়ে খবরটা দিতে চলে গেল নাবিকদের। কিছুক্ষণের মধ্যে জাহাজের খোলের ভিতর থেকে নাবিকদের উল্লাসধ্বনি কানে এল এস্তাদিওর।

গণিকালয়ের ব্যাপারটা নিয়ে কথা হবার ফলে এস্তাদিওর মনে পড়ে গেল মৎস্যগন্ধার কথা। সে গণিকা হলেও তার ব্যবহারে, কথাবার্তায় তাকে কেমন যেন একটু অন্যরকম মনে হয়েছে এস্তাদিওর। তার আচরণও যেন ঠিক গণিকাসুলভ নয়। নিজে গণিকালয়ে না গেলেও বন্ধুদের কাছে, নাবিকদের কাছে গণিকাদের সম্বন্ধে নানা গল্প শুনে তাদের সম্বন্ধে একটা ধারণা ছিল এস্তাদিওর মনে। গনিকা মানেই শঠ, চাতুরী করে, অভিনয় করে কীভাবে তারা মানুষের গাঁট কাটবে, সে ফিকির নাকি তারা সবসময় খুঁজে বেড়ায়। মৎস্যগন্ধাকে দেখে কিন্তু এসব কিছু মনে হয়নি এস্তাদিওর। বরং মৎস্যগন্ধার ব্যবহারে এই স্বল্পপরিচিত নাবিকের প্রতি কর্তব্যবোধই প্রকাশ পেয়েছে, যে ব্যবহার আশা করা যায় ভদ্র নারীদের কাছ থেকে। মৎস্যগন্ধার ব্যবহারে, আচরণে এস্তাদিও কৃতজ্ঞ তার কাছে।

আরও সাত দিন কেটে গেছে। এর মধ্যে কাজের ফাঁকে ফাঁকে বেশ কয়েকবার মৎস্যগন্ধার কথা মনে পড়েছে এস্তাদিওর। বিশেষত, সেদিন ভোরে বিদায়বেলায় প্রথম সূর্যের আলো-লাগা মৎস্যগন্ধার অপাপবিদ্ধ মুখটা।

জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সে-মুখটা আবার ভেসে উঠল এস্তাদিওর চোখে।

এস্তাদিওর মনে হল, 'আচ্ছা, মেয়েটার থেকেও তো এই বন্দর-এলাকার সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করা যায়? গণিকালয় তো খবরের আখড়া হয়। নানা ধরনের মানুষ যায় ওখানে। এ বন্দরের খুঁটিনাটি সব খবরই নিশ্চই ওই গণিকার কাছে আছে।'

তাছাড়া এস্তাদিওর মনে হল, মৎস্যগন্ধার সঙ্গে একবার দেখা করে কৃতজ্ঞতাও জানিয়ে আসা উচিত। অতগুলো টাকা তার জন্যই ফিরে পেয়েছে সে। বারবনিতা হলেও টাকাটা ফেরত দেবার সময় সে কোনও কিছু দাবিও করেনি। সে-দাবিটা অস্বাভাবিক ছিল না। কাজেই তাকে কিছু উপহারও দেওয়া উচিত।

ব্যাপারটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল এস্তাদিও। তারপর সে সিদ্ধান্ত নিল, জাহাজ থেকে নেমে সে প্রথমে যাবে শুল্ক দারোগার দপ্তরে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যদি কোনও খবর সংগ্রহ করা যায়, সেজন্য। আর তারপর সে দেখা করতে যাবে মৎস্যগন্ধার সঙ্গে, তার জন্য ছোট একটা উপহার নিয়ে।

ডেক ছেড়ে আবার নিজের কেবিনে ফিরে এল এস্তাদিও। আলমারি খুলে তার মধ্যে থেকে বের করে আনল হাতির দাঁতের সূক্ষ্ম কারুকাজ করা খাপে বসানো একটা 'বালি ঘড়ি'। খুব সুন্দর দেখতে জিনিসটা। সেটাকে যত্ন করে রেশমের থলেতে নিয়ে কেবিন থেকে বেরোল এস্তাদিও। পেড্রো তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছিল তার জন্যে। দড়ির মই বেয়ে জাহাজ থেকে নেমে ছোট একটা নৌকাতে তারা এগোল বন্দরের দিকে।

বন্দরের একটা অংশে আজ বেশ ভিড়। আজ একটা জাহাজ রওনা হচ্ছে সেখান থেকে। ক'দিন ধরেই মাঝে মাঝে ভেঁপু বাজছিল সেজন্য। এস্তাদিওরা শুনেছে সে শব্দ। এ অঞ্চলে এটাই রীতি। কোনও বাণিজ্যতরী যখন বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে তখন তা লোকজনকে জানাবার জন্য দিন সাতেক আগে থেকে ভেঁপু বাজানো হয়, নদীতটে আগুন জ্বালানো হয়। নানারকম দেবদেবীর ছবি আঁকা পতাকা জাহাজে টাঙিয়ে পূজা-অর্চনা করা হয়। যাত্রা শুরু করার জন্য মাঝারি আকৃতির যে জাহাজটা দাঁড়িয়ে আছে, সে জাহাজটাও নানা পতাকাশোভিত। জাহাজের ডেকে, নীচে ছোট ছোট নৌকাতে অনেক লোকের ভিড়। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় ব্যাপারটা দেখার জন্য একটু থামল এস্তাদিও। জাহাজ থেকে কলসি কলসি দুধ, দই, চাল, মালা নিবেদন করা হচ্ছে নদীবক্ষে। পেড্রো এ-বন্দরে দীর্ঘদিন থাকার কারণে এসব ধর্মীয় উপচার সম্বন্ধে কিছু জানে। সে বলল, 'জাহাজ সমুদ্রযাত্রা শুরু করার আগে আবশ্যিকভাবে নদী বা সমুদ্রবক্ষে নিবেদন করা হয় এসব জিনিস। জলদেবীকে তুষ্ট করা হয় এভাবে। আর ওই দেখুন কিছু লোক নৌকাতে দাঁড়িয়ে বা দড়ির মই বেয়ে জাহাজের গায়ে, খোলের গায়ে, জোড়াগুলোতে হাতের ছাপ দিচ্ছে। এটাও একটা ধর্মীয় প্রথা বা বিশ্বাস। জোড়গুলোতে হাতের ছাপ দিলে নাকি সমুদ্রযাত্রার সময় জোড় খুলে জাহাজডুবি হয় না।'

এস্তাদিও বলল, 'জাহাজটার সামনের দিকে একটা 'ফেরানো চোখ'-এর ছবি আঁকা দেখছি! শুধু জাহাজে নয়, অনেক নৌকার গায়েতেও ওই ফেরানো চোখের' ছবি আঁকা দেখেছি! এর অর্থ তুমি জানো?'

পেড্রো বলল, 'জানি মালিক। ওই চোখকে জাহাজের বা নৌকার পথপ্রদর্শক ও রক্ষাকর্তা বলে মনে করা হয়। চোখ আঁকার পর পুরোহিতরা মন্ত্র পড়ে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন। মাল্লারা ওই চোখকে জীবন্ত বলে মনে করে। তারা সবসময় সতর্ক থাকে যাতে ওই চোখের গায়ে কখনও পা না লাগে। দৈবাৎ যদি এ-অঘটন ঘটে তবে সেই মাঝি বা মাল্লাকে জাহাজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

পেড্রোর কথা শুনে এস্তাদিও মনে মনে তারিফ করল তাঁর। এদেশ সম্বন্ধে সত্যিই অনেক কিছু জানে পেড্রো। জাহাজ-নৌকার ভিড় কাটিয়ে এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকা নিয়ে ডাঙায় পৌঁছে গেল তারা।

কাদামাটি পেরিয়ে ডাঙায় উঠেই এস্তাদিও দেখতে পেল সামনেই ফুলমালা দিয়ে সাজানো একটা মণ্ডপ রচনা করা হয়েছে। তার মধ্যে বিরাট বিরাট পিতলের জালা রাখা। কয়েকজন লোক মাটির ভাঁড়ে জালা থেকে জল নিয়ে পথচারীদের দিচ্ছে, আর পথচারীরাও সেই ভাঁড় প্রথমে মাথায় ঠেকিয়ে সে জল পান করছে। ব্যাপারটা দেখে এস্তাদিও, পেড্রোর দিকে তাকাতেই সে বলল, 'এখানে হিন্দুদের দেবী বর্গভীমার এক প্রাচীন মন্দির আছে। এ হল সেই মন্দিরের পবিত্র জল। তমালিকা বন্দর থেকে যখন কোনও জাহাজ যাত্রা শুরু করে তখন জাহাজের মঙ্গল কামনায় এই পবিত্র জল পান করানো হয়।'

পেড্রোর কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই একজন লোক জলপূর্ণ মাটির ভাঁড় এনে দাঁড়াল তাদের সামনে। যদিও এস্তাদিও হিন্দুদেবীর উপাসক নয়, তারা আরাধ্যা দেবী মেরি। শুধু স্থানীয় ধর্ম সংস্কারকে সন্মান দিয়ে লোকটার হাত থেকে ভাঁড় নিয়ে জলপান করল এস্তাদিও। কর্পূর মেশানো ঠান্ডা জল পান করে বেশ তৃপ্তিবোধও হল তার। স্থানীয় লোকটাও খুশি হল ব্যাপারটাতে। জলপানের পর পেড্রোকে নিয়ে এস্তাদিও চলল শুল্ক দারোগার দফতরে।

জায়গাটাতে আজ বেশ ভিড়। কয়েকজন স্থানীয় পরিচিত বণিকের সঙ্গেও সেখানে দেখা হয়ে গেল এস্তাদিওর। তাদের কাছে এস্তাদিও জানতে পারল, জম্বুদ্বীপ থেকে আসা 'বনবিবি' নামের একটা ছোট জাহাজের মালপত্র নাকি শুল্ক ফাঁকি দেবার অভিযোগে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সে ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য সেখানে হাজির হয়েছে বণিকেরা। বেশ অনেকটা সময় এস্তাদিওকে সেখানে অপেক্ষা করতে হল। কারণ, বণিকদলের সঙ্গে আগে কথাবার্তা সারলেন শুল্ক দারোগা। এস্তাদিওর যখন ডাক এল তখন প্রায় দুপুর হতে চলেছে। পেড্রোকে বাইরে রেখে দারোগার দপ্তরে প্রবেশ করল সে। নিজের আসনেই বসেছিলেন দারোগা। এস্তাদিওকে দেখে তিনি গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলেন 'কী দরকার?'

এস্তাদিও মাথার টুপি খুলে তাঁকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলল, 'দরকার তেমন কিছু নেই। তোমার সঙ্গে এমনি সাক্ষাৎ করতে এলাম। সেদিনতো কথা বলার তেমন সুযোগ ঘটেনি।'

'এমনি?' ইশারায় এস্তাদিওকে আসন গ্রহণ করতে বললেন দারোগা।

তারপর একটু চুপ করে থেকে দারোগা বললেন ব্যবসা তো ভালোই হচ্ছে শুনলাম। বিশেষত, ওই সিংঅলা লণ্ঠনটা। মানে মোষের সিং-এর ছাউনি অলা মোমবাতি। জিনিসটা এর আগে এখানে আসেনি।'

এস্তাদিও বলল, 'হ্যাঁ, তা হচ্ছে। ওই লণ্ঠন প্রায় পুরোটাই বিক্রি হয়ে গেছে।'

দারোগা একটা পালক দিয়ে কান চুলকোতে চুলকোতে বললেন, 'জিনিসটা বেশ সুন্দর আর কাজেরও। আমাকে অনেক সময় দপ্তরে বা বাড়িতে রাত জেগে কাজ করতে হয়। আমাকে অমন লণ্ঠন একটা দিও তো।'

এস্তাদিও হেসে বলল, 'একটা কেন, বেশ কয়েকটা পাঠিয়ে দেব।'

কথাটা শুনে খুশি হলো দারোগা। তিনি বললেন, 'এক সময় কত বিদেশি জাহাজ কত নতুন নতুন পণ্য নিয়ে আসত এখানে। কোথায় গেল সেসব দিন! আর পাঁচশো বছর আগেও এ-বন্দরই ছিল প্রধান বন্দর। তখন অবশ্য মোহনা অনেক কাছে ছিল। রোজই বিদেশি জাহাজ নানারকম পণ্য নিয়ে ভিড় জমাত তমালিকা বন্দরে। এত জাহাজ আসতো যে বেশ কিছু জাহাজকে নাকি সমুদ্রে অপেক্ষা করতে হত বন্দরে নোঙর করার জায়গা খালি পাবার জন্য। এখন তো সাতগাঁও-ই প্রধান বন্দর। সেখানেই জাহাজ ভিড় করে। সেখানকার শুল্ক দারোগাকে দেখলে ব্যাপারটা তুমি বুঝবে। সারা দেহে তাঁর সোনার গহনা!' শেষ কথাটায় মৃদু আক্ষেপের সুর শোনা গেল তাঁর গলায়।

তবে দারোগা এ-কথা বলাতে তাঁকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে গেল এস্তাদিও। সে বলল, 'এ বন্দরে এখন আর তেমন জাহাজ আসে না বলছ? বছরে কত জাহাজ ভেড়ে এ বন্দরে?'

দারোগা বললেন, 'না, আসে না। সবই তো সাতগাঁও বন্দরে চলে যায়। খুব বেশি হলে বছরে ছোট আর মাঝারি মিলিয়ে গোটা পঞ্চাশেক দিশি জাহাজ, আর গোটা পাঁচেক বিদেশি জাহাজ আর চীনা জাঙ্ক। আরবদের ধাও-ও আসে হাতে-গোনা। তোমাদের মতো শ্বেতাঙ্গদের জাহাজ আসে না বললেই চলে। তার মধ্যে এখানে বেশ কিছু জাহাজ নোঙর করে বাণিজ্য করার জন্য নয়। তারা আসে বন্দরের বেশ্যালয়ের টানে। সেখান থেকে তো আর আমরা শুল্ক সংগ্রহ করতে পারি না।'

এস্তাদিও প্রশ্ন করে বসল, 'এ বন্দর থেকে কেমন শুল্ক আয় হয়?'

প্রশ্নটা শুনে কিন্তু সতর্ক হয়ে গেল শুল্ক দারোগা। সোজা হয়ে বসে এস্তাদিওর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'তুমি এ-খবর জানতে চাচ্ছ কেন?'

এস্তাদিও বুঝতে পারল, লোকটা সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, 'না, এ প্রশ্নের পিছনে তেমন কোনও কারণ নেই। নিতান্ত কৌতূহলবশত জানতে চাইলাম।'

শুল্ক দারোগা বললেন, 'আচ্ছা। এবার আমাকে বেরোতে হবে। একটা গুদাম পরিদর্শনে যেতে হবে। পরে একদিন এসো। আর লণ্ঠনগুলো পাঠিয়ে দিও।'

এস্তাদিও তাঁকে লন্ঠন দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দপ্তর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বন্দর থেকে কত শুল্ক আয় হয় তা না জানতে পারলেও কত জাহাজ এ বন্দরে আসা-যাওয়া করে সে তথ্যটা সংগ্রহ করতে পারল সে। যে কোনও বন্দর সম্পর্কে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। দারোগার দপ্তর থেকে বাইরে বেরোবার পর পেড্রো জানতে চাইল, 'এবার কোথায় যাবেন?'

মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ে যাবার কথা পেড্রোর জানা নেই। এস্তাদিও ভেবেছিল সে দুপুরের মধ্যেই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ সেরে নেবে। কিন্তু এখানেই অনেক দেরি হয়ে গেছে তার। মাথার ওপর চড়া রোদ, তার ওপর খিদেও পাচ্ছে। এস্তাদিও সিদ্ধান্ত নিল, বন্দরস্থিত ঘরে ফিরে খাওয়া সেরে তারপর মৎস্যগন্ধার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবে। সেইমতো সে পেড্রোকে বলল, এখন ঘরে ফিরে খাওয়া সেরে তারপর একলা আমি একজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাব।

এস্তাদিও আর পেড্রো এগোল ঘরে ফেরার জন্য। শুল্ক দারোগা তার ঘরের জানলা দিয়ে তাকিয়েছিলেন তাদের দিকে। এস্তাদিওরা দূরে চলে যাবার পর দারোগা তাঁর এক কর্মচারীকে ডাকলেন। লোকটার কাজ হল বন্দর অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে নানা খবর সংগ্রহ করা। শুল্ক দারোগা তাকে বললেন, 'এস্তাদিও নামের ওই পর্তুগিজ বণিকটার ওপর একটু নজর রাখবে। বিনা কারণে কেন সে হঠাৎ দেখা করতে এল বুঝলাম না! তার ওপর বন্দরের ব্যাপারে নানারকম খোঁজখবর নিচ্ছিল!

এস্তাদিও যখন দুপুরবেলায় ঘরে ফেরার পথ ধরল ঠিক সেইসময় ঘুম ভাঙল মৎস্যগন্ধার। তার মনে পড়ল, দিল্লি থেকে আসা মেয়েগুলোকে দিয়ে আজ থেকে কাজ শুরু করানো হবে। এই গণিকালয়ে নতুন মেয়ে এলে প্রথম সাতদিন খদ্দেরদের সামনে হাজির করানো হয় না। তাদের নানা ধরনের তালিম দেওয়া হয় এসময়। গর্ভরোধের জন্য, যৌনরোগ যাতে না হয় সেজন্য নানা জড়িবুটি ব্যবহারের তালিম, অঙ্গসজ্জার তালিম, খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের জন্য ছলা-কলা এসব তালিম দেওয়া হয় তাদের। গণিকালয়ের নানা নিয়ম নীতির সঙ্গেও পরিচিতি ঘটানো হয় সদ্য আগত নারীদের। তারপর তাদের উপস্থিত করা হয় খদ্দেরদের সামনে।

মেয়েগুলো আসার পর সাতদিন কেটে গেছে। সেই আরব বজরামালিক, যে মেয়েগুলোকে মৎস্যগন্ধার হাতে তুলে দিয়েছে সে এখনও বন্দরেই আছে। দামদর চূড়ান্ত হলেও এখনও সে মূল্য গ্রহণ করেনি। বলেছে আগামী কাল বজরা ছাড়ার আগে এসে সে তার প্রাপ্য নিয়ে যাবে। ঘুম ভাঙার পর মৎস্যগন্ধার এও খেয়াল হল—মেয়েগুলোর দাম মেটাবার জন্য সোনা আনতে রাতে তাকে এক জায়গায় যেতে হবে। কারণ স্থানীয় রৌপ্য মুদ্রার বিনিময়ে সে আরব বণিক দাম নেবে না। সোনা বা স্বর্ণমুদ্রায় তাকে মেয়েগুলোর দাম মেটাতে হবে।

মেয়েগুলোকে খদ্দেরদের হাতে তুলে দেবার আগে তাদের মধ্যে একজনকে তার সামনে হাজির করতে শ্যামাকে বলে রেখেছে মৎস্যগন্ধা। সে মেয়েটা বাঙলা জানে। দলের অন্য মেয়েরা নাকি বেশ মানে তাকে। তাই তার সঙ্গে মৎস্যগন্ধার একটু কথা বলে নেওয়া দরকার।

পালঙ্ক থেকে নেমে চটপট স্নান সেরে নিল মৎস্যগন্ধা। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই নবাগতা সেই মেয়েটাকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল শ্যামা। ভিনদেশী মেয়েটার বয়স বছর কুড়ি হবে। পরনে কাঁচুলি আর ঘাগরা, পায়ে রুপোর মল। গাত্রবর্ণ পরিষ্কার। ক্ষীণ কটি, ভারী নিতম্ব, নাভিকূপ গভীর। চোখমুখও বেশ সুন্দর। কাঁচুলি ঢাকা বুকে বেশ যৌন আবেদন আছে।

পালঙ্কে বসেছিল মৎস্যগন্ধা। মেয়েটা তার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে ডান হাতটা মাথার কাছে তুলে ধরে আরবদের ভঙ্গিতে কুর্নিশ করল মৎস্যগন্ধাকে। মেয়েটার চোখে একটা ভয়-ভক্তি মেশানো আছে। মৎস্যগন্ধাই তো এখন তার মালকিন। একটা জিনিস খেয়াল করল মৎস্যগন্ধা। মেয়েটার সারা বাহুতে মেহেন্দির সূক্ষ্ম নকশা আঁকা।

মৎস্যগন্ধা প্রশ্ন করল, 'তোমার নাম কী?'

মেয়েটা জবাব দিল, 'আগে নাম ছিল লক্ষ্মী, হারেমে নিয়ে যাবার পর নাম হয়, হুরী।'

হুরী শব্দের অর্থ জানা আছে মৎস্যগন্ধার। শব্দটার অর্থ হল 'পরী'। মৎস্যগন্ধা জানতে চাইলে, 'তুমি তো ভিনদেশী। বাঙলা জানলে কীভাবে?'

হুরী জবাব দিল আমার মা এদেশের মেয়ে ছিল। জলদস্যুরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। দিল্লির এক হিন্দু মণিকারের ক্রীতদাসী ছিল আমার মা।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'কিন্তু তুমি সুলতানের হারেমে পৌঁছোলে কীভাবে?'

হুরী বলল, 'মায়ের এক প্রেমিক ছিল। মনিকারের বাড়িতে আসা-যাওয়া করত সে। মাকে নিয়ে সে পালাল। সঙ্গে আমিও ছিলাম। আমার তো তখন তেরো বছর বয়স। কিন্তু সে লোকটা আমাদের নিয়ে বেচে দিল আগ্রার দাসের হাটে। সেখান থেকে নানা হাত ঘুরে পৌঁছোলাম সুলতানের হারেমে।

হারেম ব্যাপারটা সম্বন্ধে মৎস্যগন্ধার এইটুকুই জানা যে সেখানে সুলতানের ভোগের জন্য অনেক নারী এনে রাখা হয়। ব্যাপারটা সম্বন্ধে সম্যক কোনও ধারণা নেই তার। কৌতূহলী হয়ে মৎস্যগন্ধা জানতে চাইল, 'যেখানে ছিলে সেই হারেম জায়গাটা কেমন দেখতে হয়?'

হুরী জবাব দিল, সে-জায়গা শ্বেতপাথরের তৈরি বিরাট একটা প্রাসাদ। বাগান আর উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বাগানে ফোয়ারা আছে, ময়ূর আছে, হরিণ আছে। হাবশি খোজারা পাহারা দেয় সেই হারেম। মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনও পুরুষ প্রবেশ করতে পারে না সেখানে। ধরা পড়লেই মৃত্যুদণ্ড। সুলতান আর তার ঘনিষ্ঠদের অমন অনেক হারেম আছে দিল্লিতে। নানাদেশের, নানা জাতের মেয়ে থাকে। আমি যেখানে ছিলাম সে-হারেমেই দুশোজন মেয়ে ছিল।'

মৎস্যগন্ধা এবার জানতে চাইল, 'তুমি সুলতানকে দেখেছ? শুয়েছ তার সঙ্গে?'

মৎস্যগন্ধা প্রশ্নটা করল, কারণ, এ মেয়ে যদি স্বয়ং সুলতানের সঙ্গে বিছানায় গিয়ে থাকে তবে ব্যাপারটা খদ্দেরদের কাছে বিজ্ঞাপনের কাজ করবে।

কিন্তু হুরীর কথা শুনে মৃদু হতাশ হল মৎস্যগন্ধা। মেয়েটা জবাব দিল, 'না আমি সুলতানকে চোখে দেখিনি। তাকে দেখা ভাগ্যের ব্যাপার। শুনেছি, আমি সে হারেমে যাবার অনেক আগে তিনি একবার সেখানে পা রেখেছিলেন। তারপর তিনি ওই হারেম দান করে দেন মানি খিলজী নামের এক অনুচরকে। তিনিই আমাদের মালিক ছিলেন। তার সঙ্গে অবশ্য বেশ কয়েকবার বিছানায় গেছি। তার ছেলে আর আত্মীয়দের সঙ্গেও গেছি।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'তা সেই হারেম থেকে তোমাদের বের করা হল কেন?' মেয়েগুলোর পিছনের ইতিহাসটা একটু জেনে রাখতে চায় মৎস্যগন্ধা। কারণ ভবিষ্যতে তা কাজে লাগে। কোনও মেয়ে যদি আগে কোনও গণিকালয় বা হারেম থেকে পালিয়ে থাকে তবে সে প্রবণতা তার এখনও থাকতে পারে।

হুরী বলল, 'দিল্লির অবস্থা ভালো নয়। বাবর নামে এক তুর্কি নাকি দিল্লি দখল করতে চাচ্ছে। সম্রাট লোদীর সঙ্গে নাকি যুদ্ধ হবে তার। সেজন্য সম্রাট ঘোড়া, সৈন্য সংগ্রহ করছেন। আমাদের মালিকের কাছে তিনি দশটা ঘোড়া চেয়েছেন। মালিক তাই তার হারেমের দুশোজন মেয়ের বদলে দশটা আরবি ঘোড়া কিনলেন। যে আমাদের কিনল সে আমাদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে বিভিন্ন ডেরাতে পাঠাল আবার বিক্রি করার জন্য। আমরা ছিলাম বেনারসে। তারপর সেখান থেকে...।

হুরীর জবাব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল মৎস্যগন্ধা। তারপর সে তাকে বলল, 'তোমাদের এখানে আনা হয়েছে খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের জন্য। এখানে হয়তো তোমরা হারেমের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য পাবে না। তবে ভাত-কাপড় পাবে। আয়ের একটা অংশও তোমাদের জন্য বরাদ্দ হবে। কিন্তু খদ্দেরদের সঙ্গে আচরণে বা এই এখানকার অন্য মেয়েদের সঙ্গে ব্যবহারে যেন কোনও সমস্যা তৈরি না হয়। কলহ আমি মোটেই পছন্দ করি না। তাতে ব্যবসার ক্ষতি হয়। তেমন হলে কিন্তু আমি ঘরে কয়েদ করে শাস্তি দিই। কোনও অভাব-অভিযোগ থাকলে আমার কাছে সরাসরি এসে বলতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু তোমাদের নিয়ে যেন বিশৃঙ্খলা না ঘটে। আমার এ কথা গুলো তোমরা যারা একসঙ্গে এসেছ তাদেরও সবাইকে জানিয়ে দেবে।'

কথাগুলো শুনে হুরী বলল, 'আচ্ছা মালকিন। আপনি আমাদের মা।'

মৎস্যগন্ধা বলল,'বাকি কথা নিশ্চই তোমাদের শ্যামা আর এখানকার পুরোনো মেয়েরা জানিয়ে দিয়েছে। সেইমতো চলবে।' মৎস্যগন্ধাকে আবারও একবার কুর্নিশ করে শ্যামার সঙ্গে ঘর ছাড়ল হুরী।

এক পরিচারিকা এসে খাবার দিয়ে গেল। খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নেবার জন্য মৎস্যগন্ধা পালঙ্কে শুয়ে পড়ল। বিকেল যেতেই খদ্দের আসা শুরু হবে। তাদেরকে তদারকিতে ব্যস্ত থাকতে হবে মৎস্যগন্ধাকে। তার ওপর মধ্যরাত্রে তাকে গণিকালয় ছেড়ে এক জায়গায় যেতে হবে। বেশ কিছুটা দূর সে জায়গা। কাজ সেরে আবার ভোরের মধ্যে ফিরেও আসতে হবে তাকে। সকালবেলা তার প্রাপ্য নিতে আসবে বজরা মালিক। তাকে সোনা দিয়ে বিদায় জানাবার আগে বিশ্রামের আর ফুরসত হবে না তার। কাজেই মৎস্যগন্ধার একটু বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন।

মৎস্যগন্ধা পালঙ্কে শুতেই রানি তার পাশে এসে বসে তার গায়ে মাথায় হাত বোলাতে শুরু করল। রানির হাতের স্পর্শে কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুম নেমে এল তার চোখে। একটু পরেই সে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। সেই একই স্বপ্ন আবারও! উত্তাল সমুদ্রে কাঠের খাঁচায় বন্দি হয়ে সে আর রানি ভাসছে। মোচার খোলার মতো ঢেউয়ের দোলায় সে উঠছে আর নামছে। নিষ্ঠুর সমুদ্র লোফালুফি খেলছে তাদের নিয়ে। কখনও আকাশের দিকে ছিটকে উঠছে খাঁচাটা। তার পরমুহূর্তেই আবার হারিয়ে যাচ্ছে জলের নীচে। দমবন্ধ হয়ে আসছে মৎস্যগন্ধার। আর পারছে না সে।

আসছে! আসছে! এগিয়ে আসছে পাহাড়ের মতো ঢেউ! এ ঢেউ নিশ্চই মৎস্যগন্ধাকে টেনে নিয়ে যাবে পাতালের গভীরে! শেষ, সব শেষ! আর কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান মাত্র! এসে পড়েছে সে! আতঙ্কে চিৎকার করে চোখ বুজে মৎস্যগন্ধা জড়িয়ে ধরল রানিকে।

কিন্তু ঢেউ তাকে স্পর্শ করল না। সে যাকে জড়িয়ে ধরেছিল সে মানুষের স্বরে বলে উঠল, 'ভয় কী মৎস্যগন্ধা? আমি তো আছি। চোখ খোলো, দেখো তুমি তোমার দেশে পৌঁছে গেছ।'

মৎস্যগন্ধা চোখ মেলল। সে দাঁড়িয়ে আছে এক সোনালি বালুতটে। সামনে সবুজে ছাওয়া এক অজানা দেশ। তার মধ্যে চোখে পড়ছে পাতায় ছাওয়া শান্ত কুটির, ঘর বাড়ি। মৎস্যগন্ধা যাকে ধরে দাঁড়িয়েছিল যে এবার বলল, 'আমি তোমাকে তোমার দেশে ফিরিয়ে আনলাম।'

রানি তো কথা বলতে পারে না। তবে সে কাকে জড়িয়ে আছে! মৎস্যগন্ধা তাকাল তার দিকে। আর তারপরই সে ভীষণ অবাক হয়ে গেল। সে রানি নয়, সেই পর্তুগিজ নাবিক, এস্তাদিও! সমুদ্রের মতো গভীর নীল চোখে সে তাকিয়ে আছে মৎস্যগন্ধার দিকে!

এ পর্যন্ত স্বপ্নটা দেখে ঘুম ভেঙে গেল মৎস্যগন্ধার। দেখল নিজের পালঙ্কে রানিকে জড়িয়ে শুয়ে আছে সে। এ-স্বপ্ন তো আগেও দেখেছে মৎস্যগন্ধা বহু বার। কিন্তু স্বপ্নের শেষ অংশটা কোনও দিন দেখেনি। যদিও আজ কখন যেন মনে হয়েছিল সেই পর্তুগিজ যুবকের কথা। টুপিটা রয়ে গেছে তার। সেটা কাউকে দিয়ে তার কাছে ফেরত পাঠাবে বলে ভেবেছিল। কিন্তু তাই বলে সে এভাবে আসবে তার স্বপ্নের মধ্যে!

বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে থেকে মৎস্যগন্ধা স্বপ্নটার ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। পালঙ্কে উঠে বসল মৎস্যগন্ধা।

ঠিক সেইসময় শ্যামা প্রবেশ করল তার ঘরে। বলল, 'এস্তাদিও নামের সেই পর্তুগিজ বণিক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। ওপরে নিয়ে আসব না চলে যেতে বলব? বাড়ির পিছনের দরজায় সে দাঁড়িয়ে আছে।'

শ্যামার কথা শুনে চমকে উঠল মৎস্যগন্ধা। এ কি সমাপতন, নাকি অন্যকিছু! একটু আগেই সে স্বপ্নে দেখল সেই পর্তুগিজ যুবককে। আর সে এসে হাজির!

প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটার পর মৎস্যগন্ধা বলল, 'হ্যাঁ, তাকে আমার ঘরে নিয়ে আয়।

১১

কিছুক্ষণের মধ্যেই মৎস্যগন্ধার কক্ষে শ্যামার সঙ্গে প্রবেশ করল এস্তাদিও। রানিও উঠে বসেছিল খাটের ওপর। এস্তাদিওকে দেখে দাঁত বের করল সে। ভাবখানা এমন যে, এস্তাদিওকে সে যেন বলল, 'খারাপ মতলব থাকলে কিন্তু সাবধান। আমি আছি।' নতুন লোক দেখলেই রানি প্রথমে এমন একবার করে। এস্তাদিও আগে রানিকে দেখেনি। সে বেশ হকচকিয়ে গেল তাকে দেখে। মৎস্যগন্ধা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তাকে আশ্বস্ত করে বলল, 'ভয় নেই। ও কিছু বলবে না।'

তারপর সে শ্যামাকে বলল, 'রানিকে তুই অন্যখানে নিয়ে যা।'

রানিকে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বাইরে থেকে দরজার পাল্লাটা ভেজিয়ে দিল শ্যামা। তারা চলে যাবার পর এস্তাদিও মৃদু বিস্মিতভাবে বলল, 'নাবিকরা জাহাজে বাঁদর-শিম্পাঞ্জি পোষে ঠিকই, কিন্তু বাড়িতে খোলা অবস্থায় এত বড় প্রাণী পুষতে দেখিনি।'

কথাটা শুনে মৎস্যগন্ধা বলল, 'ও-ই আমার একমাত্র আপনজন। একসঙ্গে জল থেকে ডাঙায় উঠেছিলাম আমরা।'

এস্তাদিও বলল, 'তার মানে?'

মৎস্যগন্ধা জবাব দিল, 'তখন আমার বয়স খুব কম। আমি কোথা থেকে ভেসে এসেছিলাম জানি না। তবে একটা কাঠের খাঁচায় ভাসছিলাম আমরা। তারপর কালিকট বন্দরের এক ভাসমান গণিকালয়, ময়ূরপঙ্খি মৃচ্ছকটিক আমাদের উদ্ধার করে।'

এস্তাদিও বেশ আশ্চর্য হল মৎস্যগন্ধার কথা শুনে। তারপর সে জানতে চাইল, 'তারপর সেখান থেকে তুমি এখানে এলে কীভাবে? নিছক কৌতূহলবশতই প্রশ্নটা করল এস্তাদিও।

ব্যাপারটার ভিতর বিশেষ এক গোপনীয়তা লুকিয়ে আছে। তাই এ-প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব মৎস্যগন্ধা কাউকে দেয় না। সে হেসে বলল, 'কীভাবে এলাম আবার? ভাসতে ভাসতে।'

এস্তাদিও আর এ প্রসঙ্গে গেল না। সঙ্গে আনা রেশমের কাপড় জড়ানো জিনিসটা বাড়িয়ে দিল মৎস্যগন্ধার দিকে। মৎস্যগন্ধা জিনিসটা হাতে নিয়ে প্রশ্ন করল, 'কী এটা!'

এস্তাদিও বলল, 'খুলে দেখো। উপহার।'

মোড়কটা খুলতেই বেরিয়ে পড়ল বালিঘড়িটা। এমন একটা বালি ঘড়ির অনেক দিনের শখ মৎস্যগন্ধার। জমিদারের সেরেস্তায় বালিঘড়ি দেখেছে মৎস্যগন্ধা। তবে তার হাতে যে জিনিসটা রয়েছে সেটা আরও সুন্দর। জিনিসটা নেড়েচেড়ে দেখে মৎস্যগন্ধা মজার ছলে বলল, 'জিনিসটা খুব সুন্দর নিঃসন্দেহে। কিন্তু মৎস্যগন্ধার দেহের বিনিময়মূল্য হল সোনা। আর সেটা দিলেও সবার সঙ্গে যে আমি বিছানায় যাই এমন নয়।'

মৎস্যগন্ধার মশকরা ধরতে না পেরে এস্তাদিও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, 'না, না, সে জন্য নয়, আমি এমনি এই উপহারটা দিলাম।'

মৎস্যগন্ধা মৃদু হেসে বলল, 'আসলে বারবনিতাদের এমনিতে তো কেউ কোনও উপহার দেয় না তাই বললাম।'

এস্তাদিও জবাব দিল, 'তুমি সেদিন আমার জন্য যা করেছ তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।'

মৎস্যগন্ধা এবার তাকাল এস্তাদিওর চোখের দিকে। কী গভীর সুন্দর নীল চোখ! মৎস্যগন্ধার মনে পড়ে গেল কিছুক্ষণ আগে দেখা স্বপ্নটার কথা। আর এরপরই তার মনে হল, 'আচ্ছা, এ স্বপ্ন কি সত্যি হতে পারে না?'

সে প্রশ্ন করল, 'নাবিক, তোমার বাড়ি কোথায়?'

এস্তাদিও বলল, 'পর্তুগালে টেগাস নামের মোহনার কাছে এক গ্রামে। ছবির মতো সুন্দর এক গ্রাম। খড়ের ছাউনির কাঠের বাড়ি।' জায়গাটার সম্বন্ধে কোনও ধারণা নেই মৎস্যগন্ধার। মনে-মনে সে কল্পনা করার চেষ্টা করল সেই গ্রাম। তারপর জানতে চাইল 'কে আছ তোমার সেখানে?'

'কেউ নেই। বাবা-মা, দুজনেই প্রয়াত। তবে আমাদের একটা বংশগরিমা আছে।' ভাস্কো যে তার সম্পর্কিত কাকা হন, সে-কথা আর একটু হলেই বলে ফেলছিল এস্তাদিও। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল সে।

'বিয়ে করো নি কেন? অবশ্য নাবিকদের বন্দরে বন্দরে বউ থাকে।'—কথাটা হেসেই বলল মৎস্যগন্ধা।

এস্তাদিও বলল, 'না, আমি কোনও দিন কোনও গণিকালয়ে যাইনি। ঘটনাচক্রে এখানে এলাম।'

কথাটা শুনে মৎস্যগন্ধা খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, 'তুমি বড় অদ্ভুত লোক তো! নাবিক অথচ বেশ্যালয়ে যাওনি!'

কিছুক্ষণ চুপ করে রইল এস্তাদিও। তার কিছু খবর সংগ্রহের প্রয়োজন। সে বলল, 'তুমি যে এই গণিকালয় চালাও, তার জন্য জমিদারকে কর দিতে হয়?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'হ্যাঁ, দিতে হয়। আমি জমিদারের সেরেস্তায় গিয়ে কর দিয়ে আসি। রাজবাড়ি শহরের একটু ভিতর দিকে।'

'বিরাট বাড়ি নিশ্চই?'

'হ্যাঁ, বিরাট বাড়ি। অনেক মহল, নাটমন্দির, দেবমন্ডপ সব আছে।'

'পরিখা দিয়ে ঘেরা?'

'প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। পরিখা কেন হবে?' হেসে বলল মৎস্যগন্ধা।

এস্তাদিও বুঝে নিল, রাজবাড়িটা তবে দুর্গ ধরনের নয়। সে বলল, 'আমাদের দেশের ধনী ভূস্বামীদের বাড়িগুলো পরিখা ঘেরা হয় তাই বললাম। নিশ্চই সেখানে অনেক সৈন্য, কামান, গোলন্দাজ আছে?'

মৎস্যগন্ধা জবাব দিল, 'লাঠিয়াল আছে জনা পঞ্চাশ। বিসর্জনের শোভাযাত্রায় তারা লাঠিখেলা দেখায়। আর বর্শাধারী কিছু দারোয়ান আছে, তারা দেউড়ি পাহারা দেয়। হ্যাঁ, কামান আছে বটে, তবে একটাই। দুর্গাপুজোর সময় তোপ দাগা সেখান থেকে।'

এস্তাদিও, মৎস্যগন্ধার কথায় মোটামুটি একটা ধারণা লাভ করল জমিদার বাড়ি সম্পর্কে। এ-সংবাদগুলো তাকে লিখে রাখতে হবে ভাস্কোকে দেবার জন্য।

মৎস্যগন্ধা এরপর প্রশ্ন করল, 'নাবিক, তুমি কতদিন থাকবে এখানে?'

এস্তাদিও বলল, 'সম্ভবত আরও দিন পনেরো। জাহাজে যা মাল এনেছিলাম তা সবই প্রায় বিক্রি হয়ে গেছে। কিছু কাপড় কেনার কথা আছে। সে-কাজ মিটলেই রওনা হব।'

'কোথায় তোমার দেশে?'

গোয়াতে গিয়ে এ অঞ্চলের খবরাখবর ভাস্কোকে দেবার কথা এস্তাদিওর। কিন্তু সে-কথা বলা যাবে না মৎস্যগন্ধাকে। তাই সে বলল 'দেখা যাক। নাবিকের জীবন তো। ঘরে ফিরতে চাইলেও ঘরে ফেরা হয় না অনেক সময়। এ-বন্দর সে-বন্দর করেই জীবন কেটে যায়। তার ওপর নানা বিপদও অপেক্ষা করে থাকে সমুদ্রে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'আমাদের নারীদের জীবনের সঙ্গে তোমাদের নাবিকদের জীবনের বেশ মিল আছে। খালি ভেসে চলা আর ভেসে চলা। শেষ পর্যন্ত যে কোথায় গিয়ে মাটি পাওয়া যাবে তা কেউ জানে না।'

এ-কথা বলার পর মৎস্যগন্ধা বলে বসল, 'আচ্ছা, তোমার ঘর বাঁধতে ইচ্ছা করে না? এমনভাবে ভেসে বেড়াতে ভালো লাগে তোমার?'

প্রশ্নটা শুনে মৃদু চমকে উঠে এস্তাদিও তাকাল মৎস্যগন্ধার দিকে। এ-প্রশ্ন এস্তাদিওকে আগে কেউ করেনি, কোন নারী তো নয়ই। খোলা জানলা দিয়ে বেলা শেষের আলো এসে পড়েছে মৎস্যগন্ধার মুখে। সেই মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে এস্তাদিওর মনে হল কোনও অপ্সরা যেন বসে আছে তার সামনে। এই প্রথম যেন কোনও নারীর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করল এস্তাদিও।

না সে আকর্ষণ মৎস্যগন্ধার বক্ষ আবরণীর ভিতর থেকে ঈষৎ উঁকি দেওয়া শঙ্খের মতো স্তন বা স্বচ্ছ কাপড়ের আড়ালে দৃশ্যমান গভীর নাভির জন্য যৌন আকর্ষণ নয়, অন্যরকম ভালো লাগার এক আকর্ষণ। বিকেলের সোনারোদ ছুঁয়ে যাচ্ছে মৎস্যগন্ধার দীর্ঘ কেশরাশি, গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট, চিবুক। তবে এক মৃদু বিষণ্ণতা যেন জেগে আছে মৎস্যগন্ধার চোখের পাতায়। বেশ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে চেয়ে রইল এস্তাদিও। তারপর বলল, 'তোমাকে ঠিক সেরিয়ার মতো দেখতে লাগছে।'

পর্তুগিজ শব্দ, 'সেরিয়া' শব্দটার অর্থ না বুঝতে পেরে মৎস্যগন্ধা বলল, 'তার মানে?'

এস্তাদিও বলল, 'সেরিয়া' মানে হল 'মৎস্যকন্যা'। অপরূপ দেখতে হয় তারা। দেহের ঊর্দ্ধাঙ্গ মানবীর, কোমর থেকে নীচের অংশ মাছের মতো। গভীর সমুদ্রে তাদের দেখতে পায় অনেকে। হাতছানি দিয়ে তারা ডাকে নাবিকদের, কাছে গেলেই তারা দূরে সরে যায়। তাদের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে কত যে জাহাজডুবি হয়েছে তার হিসাব নেই।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'এবার বুঝলাম। আমি শুনেছি তাদের গল্প। তবে ভরসা রাখতে পারো, আমি তোমাকে ডোবাব না।' কথাগুলো বলে হাসল সে।

এস্তাদিও হাসল।

মৎস্যগন্ধা এরপর বলল, 'আমার প্রশ্নের জবাব কিন্তু পেলাম না। ইচ্ছা করে না ঘর বাঁধতে?'

একটু চুপ করে থেকে এস্তাদিও বলল, 'করে। কিন্তু কাউকে নিয়ে ভালো করে ঘর বাঁধতে অর্থের প্রয়োজন। সে-অর্থ আমি এখনও সংগ্রহ করে উঠতে পারিনি। আমি খুব সাধারণ বণিক। এই প্রথম এত দূরে বাণিজ্য করতে এসেছি। এই যে জাহাজটা দেখছ সেটা কিন্তু আমার নয়। ভাড়াতে এনেছি। একজনের সুপারিশে রাজকোষ থেকে কিছু ঋণ দেওয়া হয়েছে আমাকে। এখানে এসে পণ্য বিক্রি করে আমার বেশ কিছু মুনাফা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জাহাজের ভাড়া মেটাতে আর দেনা শোধ করার পর খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকবে আমার হাতে।'

কথাটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবল মৎস্যগন্ধা। তারপর বলল, 'ধরো, হঠাৎ করে তুমি একসিন্দুক সোনা-ধনরত্ন পেলে। ধনী হয়ে গেলে। তবে কি ঘর বাঁধবে তুমি?'

প্রশ্নটা শুনে হেসে ফেলে এস্তাদিও বলল, 'তুমি কি জলদস্যুদের গুপ্তধনের কথা বলছ? নির্জন দ্বীপে লুকিয়ে রাখা বা সমুদ্রে ভেসে আসা সিন্দুকের কথা? হ্যাঁ, অমন সিন্দুক কোন কোনও নাবিক পায় বলে শুনেছি। কিন্তু আমার তেমন ভাগ্য নেই।'

মৎস্যগন্ধা আর কথা বলল না এ-প্রসঙ্গে। কী যেন ভাবতে লাগল যে।

বিকাল হয়ে গেছে। দিনশেষের আলো গায়ে মেখে নদীতে দাঁড়িয়ে আছে সার সার জাহাজ-নৌকাগুলো। খোলা জানলা দিয়ে নদীবক্ষের সে জায়গা চোখে পড়ছে এস্তাদিওর।

চুপ করে বসে আছে মৎস্যগন্ধা। এস্তাদিওর মনে হল, 'এবার যাবার সময় হয়েছে। পালঙ্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে বলল 'এবার চলি।'

মৎস্যগন্ধার চোখে তখন ভাসছিল স্বপ্নে দেখা সেই ছবি। সূর্যকিরণে উদ্ভাসিত অজানা দ্বীপের সোনালি বালুতটে দাঁড়িয়ে আছে মৎস্যগন্ধা। সামনে ছবির মতো ছোট্ট সুন্দর একটা গ্রাম। সেটা কি মৎস্যগন্ধার দেশ? নাকি এস্তাদিওর ফেলে আসা গ্রাম? সেই স্বপ্নের দেশে মৎস্যগন্ধাকে কি নিয়ে যেতে পারবে এই বণিক?'

এস্তাদিওর কথায় চিন্তাজাল ছিন্ন হল মৎস্যগন্ধার। সে পালঙ্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'তোমার একটা জিনিস আছে আমার কাছে। ভেবেছিলাম পাঠিয়ে দেব। তুমি যখন এলেই তখন জিনিসটা নিয়ে যাও।'

'কী জিনিস?' জানতে চাইল এস্তাদিও।

মৎস্যগন্ধা বলল, 'তোমার টুপিটা। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছিলাম। দেওয়া হয়নি।'

এস্তাদিওর নিজের মাথায় এখন একটা নতুন টুপি। সে বলল, 'তাই নাকি? আমার খেয়াল ছিল না। অবশ্য ওটা তোমার কাছে রয়ে গেলেও সমস্যা ছিল না আমার। বেশ ক'টা টুপি আছে আমার।'

দেরাজটা খুলতে গিয়েও থেমে গেল মৎস্যগন্ধা। সে বলল, 'টুপিটা কি আমি তবে রেখে দিতে পারি?'

কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল এস্তাদিও। মেয়েটা অদ্ভুত তো! তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল, 'রেখে দাও।'

দরজার দিকে এগোতে যাচ্ছিল এস্তাদিও। মৎস্যগন্ধা তার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, 'আবার এসো।'

এস্তাদিও মৃদু হেসে বলল, 'কিন্তু আমি তো তোমার খদ্দের নই। আমি এলে সময় নষ্ট হবে তোমার। সে-সময়টা অন্য কাউকে সঙ্গ দিলে অর্থ উপার্জন হবে।'

মৎস্যগন্ধা তাকাল নাবিকের চোখের দিকে। কী গভীর নীল চোখ! সে-চোখের মধ্যে যেন সে দেখতে পাচ্ছে সেই অজানা দেশের সোনালি শান্ত বালুতট, যেখানে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে তারা দুজন। যেন একটা ঘোর কাজ করছে মৎস্যগন্ধার মধ্যে। সে হাত ধরল এস্তাদিওর। নাবিকের রুক্ষ হাতে মৎস্যগন্ধার কোমল হাতের স্পর্শে যেন শিহরণ খেলে গেল এস্তাদিওর শরীরে। এ স্পর্শ সে কোনও দিন পায়নি। তার হাত স্পর্শ করে তার দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক নারী। গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁটগুলো যেন উন্মুখ হয়ে আছে এস্তাদিওর সঙ্গে মিলিত হবার জন্য। নিজেকে যেন আর ধরে রাখতে পারল না এস্তাদিও। নিজের অজান্তেই যেন মাথাটা নামিয়ে আনল এস্তাদিও। তার এত দিনের সব সংস্কার যেন মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। এস্তাদিওর ঠোঁট স্পর্শ করল বন্দর সুন্দরীর ঠোঁট। এ এক আশ্চর্য অনুভূতি! সত্যি শিহরন খেলে যেতে লাগল তার শরীরে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁট সরিয়ে নিল এস্তাদিও। মৎস্যগন্ধা তখনও চেয়ে আছে তার দিকে। অস্পষ্টভাবে কোন এক ঘোরের মধ্যে সে যেন বলল, 'আবার এসো। তুমি এলে কোন ক্ষতি হবে না আমার।'

এস্তাদিও হেসে বলল, 'হ্যাঁ আসব।' তারপর বলল, 'তবে মনে হয় ব্যবসায়িক ক্ষতিটা তোমার কিছুটা পুষিয়ে যাবে।'

মৎস্যগন্ধাও এবার ধীরে ধীরে হুঁশ ফিরে পাচ্ছে। সে বলল, 'এ কথার মানে?'

এস্তাদিও বলল, 'আমার নাবিকদের আজ থেকে এখানে আসার কথা। হয়তো তারা ইতিমধ্যে ভিড় জমাতে শুরু করেছে তোমার দরজায়।'

কথাটা শুনে একটা ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল মৎস্যগন্ধার ঠোঁটে। এস্তাদিও আর দাঁড়াল না। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল সে। এস্তাদিও ঘর ছাড়তেই পালঙ্কে শুয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল মৎস্যগন্ধা। সে ভাবতে লাগল, কেন সে এমন করল ওই পর্তুগিজ যুবককে দেখে! তাকে দেখেই কেন সে অন্যরকম হয়ে গেল! মৎস্যগন্ধা যেন নিজেই নিজেকে চিনতে পারছে না। মৎস্যগন্ধার এতদিনের চরিত্রের কাঠিন্য যেন ভেঙেচুরে দুমড়ে- মুচড়ে যাচ্ছে! কেন এমন হল? কেন এমন হচ্ছে?

সূর্য ডুবতে চলেছে। কোনও এক জাহাজ থেকে শিঙা বাজছে। দিনশেষে নাবিকদের বন্দর থেকে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে জাহাজ। জাহাজের শিঙা অথবা শঙ্খধ্বনি সাধারণ মানুষের কানে সব জাহাজের ক্ষেত্রে এক মনে হলেও নাবিকরা শব্দের সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরতে পারে। চিনতে পারে নিজ নিজ জাহাজের শিঙার ডাক। জানলা দিয়ে ভেসে আসা সেই শব্দে হুঁশ ফিরল মৎস্যগন্ধার। উঠে বসল সে। তাকে এবার নীচে নামতে হবে। খদ্দেরদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। নতুন মেয়েগুলোর আজ প্রথম দিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তৈরি হয়ে নীচে নেমে এল মৎস্যগন্ধা। অন্য খদ্দেরদের সঙ্গে সে দেখতে পেল পর্তুগিজ নাবিকদের একটা বেশ বড় দলকে। খবরটা তাকে ঠিকই জানিয়ে গেছিল এস্তাদিও। জনাকুড়ি পর্তুগিজ নাবিক। তিন ধরনের মেয়েদের পছন্দ করল তারা। জেপাং নারী, মোম্বাসা কৃষ্ণাঙ্গ নারী, আর কেউ কেউ বেছে নিল নবাগত মেয়েদের। নতুন নাবিকদের থেকে পয়সা আগাম গুনে গেঁথে নিয়ে মেয়েদের সঙ্গে নির্দিষ্ট কুঠুরির মতো সার সার ঘরগুলোতে ঢুকিয়ে দিল মৎস্যগন্ধা। তার আগে অবশ্য নবাগত নাবিকদের জানিয়ে দিল যে নারীদের সঙ্গে কোনও বিকৃত পীড়াদায়ক যৌন সংস্রব করা চলবে না। কোনও অভিযোগ এর সম্বন্ধে এলে সেই নাবিককে আর গণিকালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। কারণ ভিনদেশি অনেক নাবিকের মধ্যে যন্ত্রণাদায়ক পায়ুসঙ্গমের প্রবণতা থাকে। আর তা সহ্য করতে না পেরে মেয়েরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই এই সাবধানবাণী, পর্তুগিজ নাবিকদের প্রতি।

সন্ধ্যারাত আর তার পরও অনেকটা সময় খদ্দেরদের সামলাতে আর নানা কাজে কেটে গেল মৎস্যগন্ধার। এবার বাইরে বেরোতে হবে তাকে। মৎস্যগন্ধা একাই যায় সেই জায়গাতে। যে কাজে সে যায়, যেখানে সে যায়, তার সাক্ষ্য প্রমাণ রাখতে চায় না মৎস্যগন্ধা। সঙ্গী বলতে শুধু থাকে তার কোমরে লুকোনো তীক্ষ্ন ছুরিটা। বাইরে বেরোনোর আগে সে শুধু বলে যায় শ্যামাকে। তবে কোথায়, কী কাজে যাচ্ছে, বলে না। শ্যামার অবশ্য ধারণা, তার মালকিনের কোনও গোপন প্রেমিক আছে। তার অভিসারেই এভাবে বাইরে বেরোয় মৎস্যগন্ধা। এ ধারণাটা থাকা অবশ্য মৎস্যগন্ধার পক্ষে ভালো। সব কাজ সামলে ওঠার পর গণিকালয়ের বাকি রাতের দায়িত্ব শ্যামার কাছে সঁপে দিয়ে কালো চাদরে নিজেকে আবৃত করে পিছনের দরজা দিয়ে গণিকালয় ত্যাগ করল মৎস্যগন্ধা। বন্দর অঞ্চল থেকে বেরিয়ে এল সে। রাস্তায় কোথাও কোনও জনপ্রাণী নেই। মাথার ওপর জেগে আছে ক্ষীণ চাঁদের আলো। যে জায়গাতে তাকে যেতে হবে তা শহরের বাইরে। দিনের বেলাতেও সাধারণত নগরবাসী সেদিকে বিশেষ যাওয়া-আসা করে না। সে জায়গা বেশ খানিকটা দূরস্থানও বটে। ক্ষীণ চাঁদের আলোতে মৎস্যগন্ধা দ্রুত পায়ে এগোতে লাগল তার গন্তব্যের দিকে। মাঝে মাঝে শুধু সে পিছন ফিরে দেখে নিতে লাগল কেউ তাকে অনুসরণ করছে কিনা।

এগিয়ে চলল মৎস্যগন্ধা। গন্তব্যস্থল অতিপ্রাচীন এক বৌদ্ধমঠ।

হাজার বছর আগে বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান তীর্থক্ষেত্র ছিল এই তমালিকা বন্দর। এই বন্দর থেকেই একদিন ভারতসম্রাট অশোক তাঁর পুত্র-কন্যা মহেন্দ্র ও সঙ্ঘমিত্রাকে লঙ্কায় পাঠিয়েছিলেন। এই বন্দর থেকেই রাজা গুহসীব তাঁর কন্যা হেমমালা ও জামাতাকে দিয়ে ভগবানের দন্তধাতু লঙ্কাদেশে পাঠিয়েছিলেন নানা দুর্যোগ উপেক্ষা করে। বলা ভালো, পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারপর থেকেই এ-অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমতে থাকে। ভাস্কোর ভারত অভিযানের প্রায় ন'শো বছর আগে চৈনিক পরিব্রাজকরা এ দেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন। তখনও কিন্তু এ-তল্লাটে বেশ কিছু বৌদ্ধ বিহার টিকে ছিল। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে লিখে গেছেন—''সমতট থেকে পশ্চিম দিকে ন'শো লি পথ পাড়ি দেওয়ার পর এসে পৌঁছলাম 'তান মো লি তি' বা তাম্রলিপ্তি রাজ্যে। রাজ্যটি আকারে পনেরোশো লির মতো। রাজধানীর আয়তন দশ লি।...নিয়মিত চাষবাস চলে। প্রচুর ফল ও ফুলের ছড়াছড়ি এখানে।...এখানে দশটির মতো বৌদ্ধবিহার আছে, হাজার খানেক ভিক্ষুর বাস।...দেশটির উপকূলভাগ একটি সমুদ্র খাঁড়ি দিয়ে বেষ্টিত। জল ও ভূমি যেন একে অপরকে আলিঙ্গন করেছে এখানে। প্রচুর দামি দামি জিনিস এবং রত্নসামগ্রী এখান থেকে সংগৃহীত হয়। এজন্য এলাকার অধিবাসীরা বেশ ধনী।...''

সাঙ বর্ণিত সেই সংঘারাম গুলোর অস্তিত্ব আজকের এই তমালিকা বন্দরশহরে নেই বললেই চলে। সময় বড় নিষ্ঠুর। একদিন যে সংঘারাম-মঠগুলো থেকে শোনা যেত ভিক্ষুদের সম্মিলিত 'বুদ্ধং শরনম গচ্ছামি' ধ্বনি, অন্ধকার নামলেই সার সার প্রদীপমালাতে উদ্ভাসিত হত মঠগুলো, সেসব মঠ আজ ধুলো হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে অথবা তাদের ধ্বংসস্তূপে এখন শেয়াল-কুকুরের বাসস্থান। তবু তারই মাঝে একটা মঠ তার নড়বড়ে চেহারা নিয়ে আজও যেন অকারণে টিকে আছে। মাত্র একজন অতিপ্রাচীন ভিক্ষু সেখানে বাস করেন।

বেশ অনেকটা পথ অতিক্রম করে মৎস্যগন্ধা এক সময় পৌঁছে গেল সে- জায়গাতে। ঝোপঝাড়-জঙ্গলাকীর্ণ একটা জায়গার মাঝখানে ক্ষীণ চাঁদের আলোতে ভৌতিক অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায়-ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাচীন মঠটা। কয়েকটা কক্ষ কোনওরকমে আজও টিকে আছে। মৎস্যগন্ধা সেই প্রাচীন মঠের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই কয়েকটা আলোকবিন্দু তার সামনে দিয়ে ছুটে গেল। শিয়ালের চোখ। অন্য কেউ হলে এ দৃশ্য দেখলে হয়তো ভৌতিক ব্যাপার ভেবে আতঙ্কিত হত। কিন্তু এখানকার পরিবেশ মৎস্যগন্ধার চেনা। এমন রাত্রিতে, এমনকী ঝড়-জলপূর্ণ দুর্যোগের রাত্রিতেও বহুবার এ জায়গাতে এসেছে মৎস্যগন্ধা। তবুও একটু সতর্কভাবে চারপাশে একবার কেউ আছে কিনা দেখে নিয়ে খণ্ডহর মঠের অন্ধকারে প্রবেশ করল মৎস্যগন্ধা।

চেনা পথ। সর্পিল অলিন্দ পেরিয়ে এক কক্ষে উপস্থিত হল সে। একটা প্রদীপ জ্বলছে সেই কক্ষে।

ঘি আর ধূপের মৃদু সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। দেওয়ালের একপাশে একটা প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি দণ্ডায়মান। তার পায়ের কাছে ধূপের ছাই জমা হয়ে একটা ঢিপি মতো তৈরি হয়েছে। কত যুগ ধরে যে সেই ছাই জমা হয়ে আছে কে জানে! তার কিছুটা তফাতে ধ্যানস্থ ভঙ্গিতে বসে আছেন মুণ্ডিতমস্তক অস্থিচর্মসার এক অতিপ্রাচীন ভিক্ষু। নিশাদপাদ।

মৎস্যগন্ধা সেই কক্ষে প্রবেশ করতেই সম্ভবত তার পায়ের রিনিরিনি শব্দে চোখ মেললেন নিশাদপাদ। মৎস্যগন্ধা তাঁর সামনে গিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে প্রণাম জানাল তাঁকে। আশীর্বাদের ভঙ্গিতে ডান হাত তুললেন প্রাচীন।

মৎস্যগন্ধা তাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু শ্রমণ তাকে থামিয়ে দিয়ে চাপাস্বরে বললেন, 'সিংহল থেকে কিছু লোক এসেছেন আমার কাছে। পাশের কক্ষে তাঁরা নিদ্রামগ্ন। চলো সে জায়গায় গিয়ে কথা বলি।'

মৎস্যগন্ধা মৃদু আশ্চর্য হল কথাটা শুনে। এখানে কোনও লোক কোনওদিন এসেছে বলে শোনেনি সে।

দুজনেই এরপর উঠে দাঁড়াল। কুলুঙ্গি থেকে একটা প্রদীপ নিয়ে সেটা জ্বালিয়ে নিয়ে কক্ষত্যাগ করলেন শ্রমণ। তাঁকে অনুসরণ করল মৎস্যগন্ধা।

অন্ধকার ধ্বংসস্তূপ, নানা কক্ষ-অলিন্দ অতিক্রম করে তারা প্রথমে উপস্থিত হল মঠের পিছন দিকের এক কক্ষে। তার মেঝের ওপর একটা পাথরের পাটাতন রাখা আছে। শ্রমণ ইশারা করলেন পাটাতনটা সরিয়ে দেবার জন্য। আগে কাজটা তিনি নিজেই করতেন এখন আর বয়সের ভারে পারেন না। মৎসগন্ধা পাটাতনটা সরিয়ে দিতেই তার নীচ থেকে উন্মোচিত হল একটা সিঁড়ি। ধীরে-ধীরে সেই সিঁড়ি বেয়ে ভূগর্ভস্থ সেই গোপন কক্ষে উপস্থিত হল তারা।

ছোট্ট একটা কক্ষ। তার এক কোণে রাখা আছে ছোট একটা পেটিকা বা সিন্দুক। শ্রমণ প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন আর মৎস্যগন্ধা এগিয়ে গিয়ে খুলল সামোরিনের সেই সিন্দুক। অবশ্য ও-সিন্দুক কার ছিল তা মৎস্যগন্ধা বা ভিক্ষু নিশাদপাদের জানা নেই। স্বয়ম্ভুনাথ মৃত্যুর আগে তীর্থযাত্রাফেরত বৌদ্ধ ভিক্ষু নিশাদপাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছিলেন এই পেটিকা আর মৎস্যগন্ধাকে।

মৎস্যগন্ধা পেটিকার ডালা খুলতেই যেন আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। হীরক, মরকতমণি, পান্না, আরও নানা দামি-দামি দুর্মূল্য পাথর আর স্বর্ণখণ্ডে ঠাসা সেই পেটিকা। মৎস্যগন্ধা অতি সামান্য জিনিসই নিয়েছে এই সিন্দুক থেকে। আর তাতেই তার কাজ চলে গেছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল পেটিকার দিকে। তারপর ছোট একটা স্বর্ণখণ্ড তুলে নিয়ে সিন্দুকের ডালা বন্ধ করে দিল।

এবার ফেরার পালা। মৎস্যগন্ধা ঘুরে দাঁড়াতেই নিশাদপাদ তার উদ্দেশ্যে বললেন, 'দীর্ঘদিন তোমার এই রত্নপেটিকা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছি আমি। এবার এ-পেটিকা তুমি নিজের কাছে নিয়ে যাও।'

এমন কথা শুনে বেশ অবাক হয়ে গেল মৎস্যগন্ধা। বিস্মিতভাবে সে বলল, 'কেন? আমি কি কিছু অন্যায় করলাম?'

স্মিত হেসে শ্রমণ বললেন, 'সেকথা নয়। সিংহলের দন্ত মন্দির থেকে লোক এসেছে আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে। আর ক'দিনের মধ্যেই আমি তাদের সঙ্গে যাত্রা শুরু করব সিংহলের উদ্দেশ্যে।'

তাঁর কথা শুনে মৎস্যগন্ধা আরও বিস্মিতভাবে বলল, 'আপনি চলে যাবেন? আপনি ছাড়া আমার যে ভরসা করার মতো, বিশ্বাস করার মতো কোনও লোক নেই এ পৃথিবীতে।

বৃদ্ধ শ্রমণ শান্তস্বরে বললেন, 'এ পৃথিবীতে কোনও কিছুই কোনওদিন থেমে থাকে না। আমার জন্যও নয়, তোমার জন্যও নয়। পৃথিবী তার নিজের নিয়মে চলে। জরা আমাকে গ্রাস করেছে। মৃত্যুর পদধ্বনিও আমি শুনতে পাচ্ছি। আমি ভগবানের ডাক শুনতে পাচ্ছি। বাকি যে-ক'টা দিন আমি বাঁচি সে-ক'টা দিন ওই দন্তমন্দিরে রক্ষিত ভগবান বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতুর পদতলে কাটাতে চাই।'

মৎস্যগন্ধার চোখ বেয়ে এবার টপটপ করে জল পড়তে শুরু করল। তাতে যেন মৃদু বিচলিত হলেন শ্রমণ নিশাদপাদ। তিনি বললেন, 'এ জায়গা ছেড়ে যেতে আমারও বেশ কষ্ট হচ্ছে। বিশেষত, এই ঘরটার জন্য। তবে তা এই ঘরে এই রত্নপেটিকা রক্ষিত আছে বলে নয়। এঘর অত্যন্ত পবিত্র স্থান। তোমাকে কোনওদিন বলিনি, এ গুপ্ত-কক্ষ কেন নির্মাণ করা হয়েছিল তা জানো? ভগবান বুদ্ধের পবিত্র দাঁত গোপনে তমালিকা বন্দর থেকে সিংহলে নিয়ে যাবার আগে ব্রাহ্মণরা যাতে সে-দাঁত ধ্বংস করতে না পারে সেজন্য দন্তপুর থেকে এনে শেষে ক'দিনের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এই কক্ষে। কোন ছোট বয়সে আমি এখানে এসেছিলাম তা আমার নিজেরই মনে পড়ে না। মারাঠা জীবনটাই তো আমার এখানে কেটে গেল...

শ্রমণ এরপর বললেন, 'হয়তো তোমার সঙ্গে এটাই আমার শেষ দেখা। এরপর এই মঠ হয়তো বা তস্কর-ডাকাত-ভবঘুরেদের আস্তানা হবে। তারা হয়তো খুঁজে পাবে এই গুপ্তকক্ষ, তোমার এই পেটিকা। তুমি যত দ্রুত সম্ভব এই রত্নপেটিকা নিয়ে গিয়ে নিজের কাছে রাখো।'

মৎস্যগন্ধা বুঝতে পারল, শ্রমণ মনস্থির করে নিয়েছেন এই মঠ ত্যাগ করার ব্যাপারে, তাঁকে আর নিবৃত্ত করা যাবে না। চোখের জল মুছে মৎস্যগন্ধা তাঁকে বলল, 'দূর দেশের যাত্রী আপনি। পথে, অচেনা জায়গাতে অর্থের প্রয়োজন হতে পারে আপনার। এই পেটিকা থেকে কিছু জিনিস নিয়ে যান আপনি।'

মৎস্যগন্ধার কথা শুনে শ্রমণ স্মিতহেসে বললেন, 'নিলে তো আমি অনেক আগেই এ-সম্পদ পুরোটাই আত্মসাৎ করতে পারতাম। এই ছিন্ন বেশের পরিবর্তে রাজবেশ পরিধান করতাম। এমনকী আমি তোমার অনুপস্থিতিতে স্পর্শ করিনি ওই পেটিকা। ভগবান বুদ্ধ একদিন রাজবেশ, রাজকোষ পরিত্যাগ করে পথে নেমেছিলেন মানবমুক্তির জন্য। আমি তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করি। পরিধানের এই চিবর আর কাঠারি অর্থাৎ কাঠের ভিক্ষাপাত্র ছাড়া ভিক্ষুদের আর কোনও কিছুরই প্রয়োজন নেই।'

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৎস্যগন্ধা বলল, 'যাবার আগে আমার প্রতি কোনও নির্দেশ দেবেন না আপনি?'

প্রশ্নটা শুনে শ্রমণও বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন তার দিকে। তারপর বললেন, 'তুমি যখন এ-প্রশ্ন করলে তবে বলি। নির্দেশ নয়, পরামর্শ। গণিকালয়ের ব্যবসা বন্ধ করো তুমি। হতভাগ্য নারীদের এই জীবনযন্ত্রণা থেকে তুমি মুক্তি দাও। সাত রাজার ধন আছে ওই রত্নপেটিকার মধ্যে। তোমার বেঁচে থাকার জন্য কোনওদিন অর্থাভাব হবে না। এ তমালিকা বন্দর সময় সময় বড় নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। এ-বন্দর যেমন অনেককে অনেক কিছু দিয়েছে তেমনই অনেকের জীবন কেড়েও নিয়েছে। গণিকালয় বন্ধ করলে গুপ্ত শত্রুরা তোমাকে ঘিরে ধরবে এ-ও জানি। কারণ, তোমার ক্ষমতা প্রতিপত্তির উৎস ওই গণিকালয়। তা বন্ধ করার পর তুমি কোনও দূর দেশে চলে যেও, যেখানে তোমাকে কেউ চিনবে না। সেখানে গিয়ে তুমি ঘর বসাও। নতুন করে জীবন শুরু করো। গরিব দুঃখীদের দান ধ্যান করো। আর যদি কোনও কষ্ট নেমে আসে তবে তথাগতকে স্মরণ কোরো।'—তাঁর কথা শেষ করলেন প্রাচীন ভিক্ষু নিশাদপাদ।

ভিক্ষুর কথাগুলো শুনে মাথা নীচু করে ভাবতে লাগল মৎস্যগন্ধা। তাই দেখে নিশাদপাদ বললেন, 'আমাকে তোমার কোনও কথা দিতে হবে না। শুধু আমার কথাগুলো তুমি ভেবে দেখো।'

বাইরে শিয়াল ডেকে উঠল। শেষ প্রহর শুরু হল। এবার ফিরতে হবে মৎস্যগন্ধাকে। নইলে ফিরতে ফিরতে সূর্যোদয় হয়ে যাবে।

মৎস্যগন্ধা এগিয়ে এসে নতজানু হয়ে পাদস্পর্শ করল নিশাদপাদের। ভিক্ষু তার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, 'করুণাময় ভগবান বুদ্ধ তোমার মঙ্গল করুন।'

এরকিছুক্ষণের মধ্যেই সেই প্রাচীন বুদ্ধমঠ ত্যাগ করল মৎস্যগন্ধা।

১২

তমালিকা বন্দরে আরও সাতটা দিন কেটে গেছে এস্তাদিওর। ইতিমধ্যে স্থানীয় বণিকদের কাছ থেকে কাপড় কিনে জাহাজে মজুত করাও হয়ে গেছে তার। বন্দর এলাকা থেকে আরও নানা তথ্য সংগ্রহ করে তা লিপিবদ্ধও করেছে অদূর ভবিষ্যতে অ্যাডমিরাল, গোয়ার হবু গভর্নর ভাস্কোর হাতে পৌঁছে দেবার জন্য। খবরটা না পেলেও এস্তাদিওর অনুমান, পথে কিছু না ঘটে থাকলে এতদিনে নিশ্চই ভাস্কো পা রেখেছেন এ দেশের মাটিতে। এস্তাদিও যাত্রা শুরু করার সপ্তাহখানেক পরই ভাস্কোর এদেশে রওনা হবার কথা ছিল। সেই অর্থে রাজার পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছিল লিসবন বন্দরে। তাছাড়া ভাস্কোর নৌবহর এস্তাদিওর ছোট বাণিজ্যপোতের থেকে অনেক বেশি দ্রুতগামী। তাই কোনও অঘটন না ঘটে থাকলে আর নির্দিষ্ট দিনেই যদি অ্যাডমিরাল রওনা হয়ে থাকেন তবে নিশ্চিতভাবেই এদেশের মাটিতে পৌঁছে যাবার কথা।

কিন্তু এ-ক'দিন নানা কাজের মাঝে বারবারই এস্তাদিওর মনে পড়ছে একজনের কথা। চোখে ভেসে উঠছে তারই মুখ। সেদিন মৎস্যগন্ধার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যাপারটা কিছুতেই এস্তাদিও মন থেকে সরিয়ে ফেলতে পারছে না। কেমন যেন এক অচেনা অমোঘ আকর্ষণ সে অনুভব করছে সেই বন্দর সুন্দরীর প্রতি। শুধু কি সে-নারীর গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁটের আহ্বান? তার উষ্ণতার স্পর্শ? এস্তাদিও ব্যাপারটা নিয়ে নিজেও ভেবে দেখেছে। তার মনে হয়েছে, এ শুধু মৎস্যগন্ধার শরীরী আকর্ষণ নয়। তার কিছু কথাও যেন গভীরভাবে দাগ কেটেছে এস্তাদিওর মনে। হয়তো বা সেটাই মৎস্যগন্ধার প্রতি তার আকর্ষণের মূল কারণ। এস্তাদিওর তমালিকা বন্দরের বন্ধনকাল শেষ হতে চলেছে। কাজ শেষ বললেই চলে। আর ক'টা দিন পরই তাকে রওনা দিতে হবে। আর হয়তো কোনও দিনই সে এ-বন্দরে ফিরবে না। তবু কেন এমন টান সে অনুভব করছে বুঝতে পারছে না এস্তাদিও।

সেদিন ভোরের প্রথম আলো যখন ঘরে প্রবেশ করল তখন চোখ মেলতেই এস্তাদিওর আবারও মনে পড়ল মৎস্যগন্ধার কথা। চোখের সামনে ভেসে উঠল কখনও মৎস্যগন্ধার চপলতা, আবার কখনও তার চোখে জেগে থাকা করুণ আর্তি। মৎস্যগন্ধার কথা ভাবতে-ভাবতে এস্তাদিও একসময় সিদ্ধান্ত নিল, সে শেষ একবারের জন্য তার সঙ্গে দেখা করে আসবে। আজ তার কোনও কাজ নেই। দুপুরের দিকে সে যাবে।

সান্টা মারিয়ার নাবিকরা নিয়মিত যাওয়া-আসা শুরু করেছে মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ে। এমনকী ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে এস্তাদিও খবর পেয়েছে, জাহাজের চিকিৎসক ফ্রান্সিসেরও নাকি পদার্পণ ঘটেছে সেখানে। বিকেলের পর সেখানে গেলে তাদের কারও চোখে যদি এস্তাদিও ধরা পড়ে যায়, তবে তার অস্বস্তি বোধ হবে। এতদিন তারা জেনে এসেছে যে নারীদেহের প্রতি কোনও আসক্তি নেই এস্তাদিওর। তাই এস্তাদিওকে গণিকালয়ের আশেপাশে দেখলে নিশ্চই ব্যাপারটা নিয়ে হাসাহাসি করবে। জাহাজ-ঘাটার দিক থেকে মাঝে-মাঝে শিঙার শব্দ ভেসে আসছে। নিশ্চই কোনও জাহাজ বন্দর ছেড়ে রওনা হবে দূর দেশের উদ্দেশ্যে। তারই সংকেতধ্বনি ওই শব্দ।

আলস্যে গা ডুবিয়ে বিছানায় শুয়ে মৎস্যগন্ধার কথা ভাবতে লাগল এস্তাদিও। বিশেষত, মৎস্যগন্ধার একটা প্রশ্ন—'ইচ্ছা করে না ঘর বাঁধতে?'

মৎস্যগন্ধার এ-প্রশ্নটাই সবচেয়ে বেশি মনে হয় তার। কোন ছেলেবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে এস্তাদিও। টোগাস নদীর মোহনার কাছে ছোট্ট বাড়িটাতে সে একলাই থাকে। কিশোর বয়সে পেট চালানোর জন্য প্রথমে সে কাজ নিয়েছিল জেলে- ডিঙিতে। তারপর মোম্বাসাগামী এক বাণিজ্যপোতে কাজ। স্পেনসহ পর্তুগালের প্রতিবেশী দেশগুলোতে এরপর ছোট জাহাজ নিয়ে পণ্য সরবরাহের কাজ। আর সব শেষে অ্যাডমিরল ভাস্কোর পরামর্শে, বলা ভালো, নির্দেশে সুদূর এই ভারতবর্ষে বাণিজ্য করতে আসা। খালি ভাসা, ভেসেই চলেছে সে। কিন্তু সত্যিই যদি তার তেমন কোনও ঘর থাকত তবে কি এমনভাবে ভেসে বেড়াত সে? এস্তাদিও যখন জলে থাকে তখন মাঝে মাঝে তার মনে হয় ঘরের কথা। মনে হয় কবে ফিরব গ্রামে? কিন্তু ঘরে ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই সে আবার হাঁপিয়ে ওঠে। ভাবে, এই নিঃসঙ্গতার থেকে নাবিকের জীবন অনেক ভালো। কত নতুন দেশ নতুন মানুষ দেখা যায়। নিঃসঙ্গতা তেমনভাবে ঘাঁটি গেড়ে বসতে পারে না মনের মধ্যে। পর্তুগিজ শব্দ মানেই তো আর নাবিক নয়, নাবিক আর কয়জন হয়? এদেশের অধিকাংশ মানুষ-ই তো পেঁপে, আনারস, আলু, গমের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ঘর সংসার প্রতিপালন করে। যদি সত্যি এস্তাদিওর ঘরে কেউ থাকত, যে তাকে ভালোবাসা দেবে, মানসিক আশ্রয় দেবে তবে কি ঘর ছাড়ত এস্তাদিও? মৎস্যগন্ধার কথা ভাবতে-ভাবতে এসব কথাও ভাবতে লাগল সে।

বেলা একটু বাড়ার পর পেড্রো ঘরে এসে ঢুকতেই বিছানা ছেড়ে উঠে বসল এস্তাদিও। পেড্রো মাথার টুপি খুলে সম্ভাষণ জানিয়ে বলল, 'আমরা কবে তমালিকা বন্দর ত্যাগ করছি বলুন তো?'

আজকাল মাঝে মাঝেই এই প্রশ্ন করে পেড্রো। আর এখানে তার থাকতে ইচ্ছা করছে না। দেশে ফেরার অপেক্ষায় সে দিন গুনছে।

তার কথা শুনে এস্তাদিও বলল, 'যাব। ঠিক সময়েই যাব। আর মাত্র কিছুদিন। ধৈর্য হারিয়ো না।'

পেড্রো বলল 'না, ধৈর্য হারাবার প্রশ্ন নয়। একজন আমাকে আজ এই প্রশ্নটা করল। আমার ধারণা, তার এই প্রশ্নর পিছনে কোনও উদ্দেশ্যে আছে।'

'লোকটা কে?' জানতে চাইল এস্তাদিও।

পেড্রো বলল, 'স্থানীয় লোক। শুল্ক দপ্তরে কাজ করে। এর আগেও কয়েকদিন আমি লোকটাকে আমাদের আশেপাশে ঘুরতে দেখেছি। যেদিন আপনি আমাকে শুল্ক দপ্তরে লণ্ঠন দিতে পাঠিয়েছিলেন সেদিনও লোকটা নানা প্রশ্ন করছিল।

পেড্রোর কথায় এস্তাদিও বলল, 'হয়তো শুল্ক দারোগা আমাদের পিছনে তাকে লাগিয়েছে। তবে সমস্যার কারণ হবে না। পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সঠিক হিসেব আমার কাছে আছে। কথাটা জানিয়ে ভালো করলে। আমি আজই তার সব হিসেব মিটিয়ে দিচ্ছি। দলিল- দস্তাবেজ নিয়ে তুমিও আমার সঙ্গে যাবে।'

এস্তাদিও ভেবেছিল দুপুরবেলা মৎস্যগন্ধার সঙ্গে দেখা করতে যাবে। কিন্তু বাণিজ্যকরের ঝামেলাটা মেটাবার জন্য খাতাপত্র-রসিদ দস্তাবেজ কাঁধে চাপিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই শুল্ক দারোগার দপ্তরের পথে রওনা হল সে। কিছুটা পথ এগোবার পরই একটা শোভাযাত্রার সামনে পড়ে গেল সে। মুণ্ডিত মস্তক, পীতবসন পরিহিত একদল কৃষ্ণবর্ণের বৌদ্ধ শিঙা, ঝাঁঝর বাজাতে বাজাতে এগোচ্ছে জাহাজঘাটার দিকে। শোভাযাত্রার ঠিক মাঝখানে গো-শকটে বসে আছেন এক অতিপ্রাচীন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। শকটটা ফুলের মালা দিয়ে সাজানো।

পেড্রো বলল, 'সিংহলি জাহাজটা আজ ফিরে যাচ্ছে। গো শকটের ওপর যে বসে আছে সেই সন্ন্যাসী এখানকার এক বৌদ্ধ মন্দিরে থাকত। ওকে ওরা সিংহলে নিয়ে যাচ্ছে।

শোভাযাত্রাটা থেকে একজন লোক পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের হাতে কী যেন একটা জিনিস গুঁজে দিচ্ছে। এস্তাদিওকে দেখতে পেয়ে লোকটা এগিয়ে এসে তার হাতেও জিনিসটা দিল। কড়ে আঙুলের মতো আকারের চন্দনকাঠের ওপর এক পুরুষমূর্তি খোদিত আছে। খুব সুন্দর জিনিসটা। কাঠের মাথায় একটা ছিদ্রও আছে। সম্ভবত জিনিসটা সুতো দিয়ে গলায় ঝোলানো যায়। পেড্রো বলল, কাঠের গায়ে খোদিত ছবিটা হল বুদ্ধমূর্তির। এস্তাদিও চন্দনকাঠের টুকরোটা পোশাকের মধ্যে রেখে দিল। শোভাযাত্রা এস্তাদিওদের পাশ কাটিয়ে চলে গেল। এস্তাদিওরা এগিয়ে চলল তাদের গন্তব্যে।

শুল্ক দপ্তরে গিয়ে এস্তাদিও জানতে পারল, যে দারোগা আজ দপ্তরে আসবেন না। তবে শুল্ক জমা দেওয়া যেতেই পারে। এস্তাদিওর সঙ্গে কাগজপত্র নিয়ে বসে গেল তারা। যাবতীয় রসিদ-দলিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল তারা দীর্ঘ সময় ধরে। কিন্তু এস্তাদিওর নিখুঁতভাবে মেলানো হিসেব কিছুতেই যেন মিলতে চাচ্ছে না তাদের কাছে। দুপুর হয়ে গেল তবু হিসেব মিলল না। এস্তাদিওর যাওয়ার কথা মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ে। অবশেষে হিসেব কেন মিলছে না তা অনুমান করতে পারল সে। দশটা রৌপ্যমুদ্রা বের করে এস্তাদিও গুঁজে দিল প্রধান হিসাবপরীক্ষকের হাতে। সঙ্গে সঙ্গে হিসেব মিলে গেল তাদের। এরপর শুল্ক জমা দিয়ে রসিদ নিতে আরও কিছুটা সময় লাগল তার। কাজ মিটিয়ে এস্তাদিও যখন শুল্ক দপ্তরের বাইরে এসে দাঁড়াল তখন মাঝদুপুর। ভারমুক্ত হল এস্তাদিও। এখন আর কোনও চিন্তা নেই তার। যে-কোনও সময় সান্টা মারিয়াকে নিয়ে সে ভেসে পড়তে পারে সমুদ্রের দিকে। তার আগে মৎস্যগন্ধার সঙ্গে দেখা করে যাবে সে। পেড্রোর সঙ্গে কিছুটা পথ হেঁটে তার কাছে দলিল-দস্তাবেজ দিয়ে এস্তাদিও সেগুলো নিয়ে তাকে ঘরে ফিরে যেতে বলল। পেড্রো সে সব নিয়ে চলে যাবার পর এস্তাদিও রওনা হল মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের দিকে।

মন ভালো নেই মৎস্যগন্ধার। সেদিন রাতে বৃদ্ধ ভিক্ষু নিশাদপাদের মুখ থেকে তাঁর চলে যাবার ব্যাপারটা শোনার পর থেকেই বিষণ্ণতা কাজ করছে তার মনে। একইসঙ্গে বিপন্নতাও যেন ঘিরে ধরেছে তাকে। তাহলে শেষ মানুষটাও ছেড়ে যাচ্ছে তাকে। এ-তমালিকা বন্দরে আর এমন কোনও মানুষ রইল না যাকে বিপদে ভরসা করতে পারে মৎস্যগন্ধা। তবে এসবের মাঝে তার মনে হয় এস্তাদিওর কথাও। মৎস্যগন্ধা ভেবেছিল খুব তাড়াতাড়ি আবার সে আসবে। কিন্তু এক সপ্তাহ হয়ে গেল, নাবিকের দেখা নেই। এ ব্যাপারটাও যেন তার বিষণ্ণতাকে আরও বেশি বাড়িয়ে তুলেছে। রোজই ঘুম ভাঙার পর জানলা দিয়ে তাকিয়েছে বন্দরের দিকে, এস্তাদিওর জাহাজটার লাল পতাকাটা তাকে আশ্বস্ত করেছে যে, এস্তাদিও তমালিকা বন্দরেই আছে। মনে মনে সে ভেবেছে যে, আজ নিশ্চই নাবিক একবার আসবে। কিন্তু তার প্রতীক্ষায় সারা দিন থাকলেও নাবিক আসেনি। এইভাবেই সাত-সাতটা দিন কেটেছে তার। শ্রমণের শেষ কথাগুলোও গভীরভাবে দাগ কেটেছে মৎস্যগন্ধার মনে। সে তো চলে যেতেই চায় তমালিকা বন্দর ছেড়ে। নিশাদপাদ তাকে পরামর্শ দেবার আগেও তো সে ভেবেছে এ কথা বহুবার। কিন্তু কোথায় যাবে? কার সঙ্গে যাবে?

গত তিনদিন বিশেষ প্রয়োজন না হলে ঘর ছেড়ে বেরোয়নি মৎস্যগন্ধা। গণিকালয়ের দেখভাল শ্যামাই করেছে। শ্যামা বুঝতে পেরেছে, কিছু একটা হয়েছে মৎস্যগন্ধার। সে বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছে ব্যাপারটা। মৎস্যগন্ধা শুধু সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েছে 'মন ভালো নেই।'

এদিন ঘুম ভাঙার পর স্নান সেরে নিজের কক্ষে রানিকে নিয়ে বসেছিল মৎস্যগন্ধা। জানলা দিয়ে নদীতটে নোঙর করা জাহাজগুলো দেখা যাচ্ছে। নির্জন দুপুর। একটা শঙ্খচিল পাক খাচ্ছে বন্দরের মাথায় আর মাঝে মাঝে করুণ স্বরে ডাক ছাড়ছে। তার কান্না ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে। সেদিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে ছিল মৎস্যগন্ধা। খাবারের থালা নিয়ে ঘরে ঢুকল শ্যামা। তাকে দেখে মৎস্যগন্ধা বলল,'ওটা এখন নিয়ে যা। আমার খিদে নেই। পরে খাব।'

প্রবল এক বিষণ্ণতা যে মৎস্যগন্ধাকে ঘিরে রেখেছে তা বুঝতে অসুবিধা হল না শ্যামার। একটু ভেবে নিয়ে সে বলল, 'ওই হুরী নামের মেয়েটাকে আপনার কাছে কিছু সময়ের জন্য পাঠাব?'

'কেন?' জানতে চাইল মৎস্যগন্ধা।

শ্যামা বলল, 'মেয়েটা নানা অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প বলতে পারে। দিল্লির সুলতান-আমীর-ওমরাহদের গল্প, হারেমের গল্প। হয়তো গল্প শুনলে মন ভালো হয়ে যাবে।'

তার কথা শুনে মৎস্যগন্ধা কিছুটা আনমনেই বলল, 'আচ্ছা পাঠাও দেখি, যদি মন ভালো হয়।'

কিছুক্ষণের মধ্যেই কক্ষে প্রবেশ করল হুরী। মৎস্যগন্ধাকে কুর্নিশ করে পালঙ্কের ঠিক যেখানে মৎস্যগন্ধা ছত্রীতে হেলান দিয়ে বসে আছে সেখানে তার পায়ের নীচে মেঝেতে বসল হুরী।

যথারীতি হুরীকে দেখে একবার দাঁত বার করল রানি।

তার দিকে তাকিয়ে হুরী একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল, 'এই প্রাণীটাকে কি এখানে রাখা হয়েছে যাতে আপনার খাবারে কেউ বিষ মেশাতে না পারে অথবা সাপ ঢুকতে না পারে সেজন্য?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'না, রানি আমার বন্ধু-বাবা-মা-ভাই-বোন সবকিছু। কিন্তু এ প্রশ্ন করলি কেন? তুই আমাকে বিষ খাইয়ে মারতে চাস নাকি?'

হুরী কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে দু-কানের লতিতে আঙুল ছুঁইয়ে বলল, 'তওবা তওবা! আপনি আমাদের মা হন। আমি অন্য কারণে কথাটা জানতে চাইলাম। অপরাধ নেবেন না। সুলতানের হারেমের ব্যাপারে এ নিয়ে আমি গল্প শুনেছি।

'মৎস্যগন্ধা নিজের মনের বিষণ্ণতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য বলল, 'বল তবে সে-গল্প শুনি।'

হুরী বলতে শুরু করল সে গল্প—'সুলতানের নানা জায়গাতে হারেম থাকলেও প্রধান হারেম যেখানে সুলতান নিয়মিত যাওয়া-আসা করেন তার পাশেই থাকে। দিল্লি ও আগ্রাতে দু-জায়গাতে সম্রাটের প্রাসাদ আছে আর তার পাশে হারেমও আছে। বিরাট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা শ্বেতপাথরে মোড়া সুলতানের হারেম। অনেক কক্ষ থাকে সেই হারেমে, সোনায় মোড়া শয়নকক্ষকে ঘিরে। হারেমের চারপাশে বিরাট বাগিচা সাজানো থাকে নানা ফুল-ফলের গাছে। সুলতান ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের সেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ। বহিঃপ্রাচীর ও ফটক সার বেঁধে ঘিরে রাখে সুলতানের সেনারা। তাদের চোখ এড়িয়ে মাছিও প্রবেশ করতে পারে না ভিতরে। আর হারেমের প্রবেশদ্বারগুলোতে পাহারা দেয় খড়গ হাতে দানবের মতো দেখতে হাবশি ক্রীতদাসরা। তাদের জিভ কাটা থাকে, কথা বলতে পারে না। যাতে তারা হারেমের খবর বাইরে প্রকাশ না করতে পারে সেজন্য এই ব্যবস্থা। এছাড়া হারেমের ভিতর নজরদারি চালায় বৃহন্নলারা। মূলত তারাই হারেমের ভিতরের ব্যবস্থাটা দেখভাল করে। সুলতান বেশ নির্ভর করেন তাদের ওপর। নিজের প্রাণের ব্যাপারে সবসময় সজাগ থাকেন সুলতান। অনেক শত্রু থাকে তাঁর। যে-কোনও মুহূর্তে প্রাণ সংশয় হতে পারে তাঁর। না হয় হারেমে বাইরের কোনও লোক প্রবেশ করতে পারে না, কিন্তু যদি কেউ বিষ প্রয়োগ করে তাঁর খাবারে? অথবা প্রাচীরের বাইরে থেকে বিষধর সাপের ঝাঁপি ভিতরে ছুড়ে দেয় তখন কী হবে? এসব ব্যাপার আটকাবার জন্য পশু-পাখির সাহায্য নেওয়া হয়। হারেমের বাগিচায় বেজি তো থাকেই কিন্তু যে ময়ুর আর চিতল হরিণ থাকে তা শুধু নিছক মনোরঞ্জনের জন্য নয়। বেজির মতোই এ-দুই প্রাণীও সাপের চরম শত্রু। হারেমের ভিতর প্রতিটা অলিন্দে মাথার ওপর থাকে রুপোর দাঁড়ে বসানো সারিকা ভৃঙ্গরাজ ইত্যাদি পাখি। সাপের উপস্থিতি টের পেলেই তারা কর্কশভাবে ডেকে ওঠে। শ্বেতা, মুগ্ধক ইত্যাদি গাছও তামার পাত্রে বসানো থাকে হারেমের আনাচে-কানাচে। আর সুলতানকে যে-খাদ্য পরিবেশন করা হয়, পানীয় পরিবেশন করা হয় তাতে বিষ মেশানো আছে কিনা তা দেখে নেওয়ার জন্য পরিবেশনকারিনীদের তা খাওয়ানো হয় ঠিকই কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্যও নানা পশু-পাখি বিশেষত, পাখিদের সাহায্য নেওয়া হয়। যে-জায়গায় সুলতানদের খাবার রাখা হয় সেখানে সুলতানদের চোখের সামনে এনে রাখা হয় চারধরনের পাখির খাঁচা। ক্রৌঞ্চ, জীবঙ্গ-জীবক, মত্ত কোকিল আর চকোর। প্রকৃতি এদের এক অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়েছে। বিষের উপস্থিতি বুঝতে পারে এরা। আশেপাশে বিষাক্ত কিছু থাকলে নানা অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া হয় তাদের মধ্যে। চকোরের চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করে, জীবক অবসন্ন হয়, ক্রৌঞ্চ মূর্চ্ছা যায় আর সুরাপান করানো-কোকিলের মৃত্যু হয়। তাই ভেবেছিলাম আপনার সঙ্গিনীকেও হয়তো বা এ কারণেই এখানে রাখা হয়েছে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'তুই এত সব কথা জানলি কীভাবে? সে হারেম দেখেছিস নাকি?'

হুরী বলল, 'না, নিজে দেখিনি। সুলতানের হারেমে ছিল এমন একজনের মুখে গল্প শুনেছি। সুলতানদের খাস হারেমে কি সব মেয়ে প্রবেশ করতে পারে? কুমারী মেয়ে ছাড়া কাউকে গ্রহণ করেন না সুলতান। আমার মায়ের শয়তান প্রেমিক তো আমারও কুমারীত্ব নষ্ট করে দিয়েছিল। যত সুন্দরী মেয়েই হোক না কেন, সুলতানের সামনে তাকে হাজির করাবার আগে তার কুমারীত্ব পরীক্ষা করে বৃহন্নলারা। পদ্ধতিটা খুব ভয়ঙ্কর। মাথায় রক্ত উঠে মৃত্যুও হয় অনেকের।'

'সে কেমন পদ্ধতি?' জানতে চাইল মৎস্যগন্ধা। অনেক সময় মৎস্যগন্ধাকে জেনে নিতে হয় তার গণিকালয়ে আসা নবাগতা মেয়েটি কুমারী কিনা।'

মৎস্যগন্ধার কথা শুনে হুরী একটু ইতস্তত করে বলল, 'মেয়েদের দু পা দুপাশে ফাঁক করে দড়ি বেঁধে মাথা মাটির দিকে করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। তারপর যোনিতে তৈল সিঞ্চন করে সুতো-বাঁধা একটা স্বর্ণগোলক স্থাপন করা হয় সেখানে। তৈল সিক্ত পিচ্ছিল যোনিগহ্বরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে থাকে সেই গোলক। দীর্ঘক্ষণ এভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয় সেই মেয়েকে। তারপর সুতায় টান দিয়ে সে-গোলক বের করে আনলে বোঝা যায় ওই গোলক যোনিগহ্বরে কত দূর প্রবেশ করেছিল। আর তা দেখেই অভিজ্ঞরা বুঝতে পারে যে, ইতিপূর্বে মেয়েটার কুমারীত্ব নষ্ট হয়েছে কিনা।'

মৎস্যগন্ধা শিউরে উঠল ব্যাপারটা কল্পনা করে। তার গণিকালয়েও অনেক সময় মেয়েদের কুমারীত্বর পরীক্ষা নেওয়া হয়। কারণ অনেক সময় খদ্দেররা কুমারী মেয়ে চায়। কিন্তু এমন ভয়ঙ্করভাবে কুমারীত্বর পরীক্ষা নেওয়া হয় না এখানে। মৎস্যগন্ধা কিছু একটা কথা জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল হুরীকে। কিন্তু ঠিক সেইসময় ঘরে প্রবেশ করল শ্যামা। সে বলল, 'পর্তুগিজ জাহাজের নায়ক আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তাকে নিয়ে আসব তো?'

শ্যামা খেয়াল করল যে, কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল মৎস্যগন্ধার মুখটা। মৎস্যগন্ধা পালঙ্ক থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলল, 'হ্যাঁ, তাকে নিয়ে আয়। আর সে যতক্ষণ ঘরে থাকবে ততক্ষণ কোনওভাবেই আমাকে বিরক্ত করবি না। রানিকেও সঙ্গে করে নিয়ে যা।'

রানিকে অবশ্য নিতে হল না। সেইসময় সে কক্ষসংলগ্ন অলিন্দে চলে গেল। আর হুরীকেও সে বলল, 'তুই এখন যা। পরে অন্য সময় তোর গল্প শুনব।'

শ্যামা আর হুরী সেই কক্ষ ত্যাগ করার পর পাশের স্নানাগারে ঢুকে দ্রুত চোখে-মুখে জল সিঞ্চন করে দেহে সুগন্ধী মেখে পোশাক পরিবর্তন করে নিজের কক্ষে ফিরে এল মৎস্যগন্ধা।

এস্তাদিও পা রাখল মৎস্যগন্ধার ঘরে। তাকে দেখে উজ্জ্বল হয়ে উঠল মৎস্যগন্ধার চোখ-মুখ। সে ইশারায় এস্তাদিওকে পালঙ্কে বসতে বলল। তারপর দরজায় খিল তুলে দিয়ে এসে এস্তাদিওর পাশে পালঙ্কে বসল। সে তাকাল এস্তাদিওর চোখের দিকে। কী সুগভীর নীল চোখ! তার মধ্যে রয়েছে নিজেকে হারিয়ে ফেলার হাতছানি!

এস্তাদিও তাকে প্রশ্ন করল, 'কী দেখছ?'

মৎস্যগন্ধা প্রথমে জবাব দিল, 'তোমার চোখদুটো'। তারপর মৃদু অনুযোগের সুরে বলল, 'তোমার জন্য রোজ অপেক্ষায় থাকতাম। আসতে এত দেরি করলে কেন?'

এস্তাদিও মৃদু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বলল, 'খুব ব্যস্ত ছিলাম এ-ক'দিন। আজ দুপুরে সব কাজ মিটল। তারপর এলাম।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'জানো, রোজ ঘুম ভাঙার পর আমি নদীর দিকে তাকিয়ে একবার করে দেখি তোমার জাহাজের লাল নিশানটা দেখা যাচ্ছে কিনা। ওটা দেখেই আমি বুঝতে পারতাম তুমি তমালিকা বন্দরেই আছ।'

কথাটা শুনে এস্তাদিও মৎস্যগন্ধার মনের অনুভূতিটা বুঝতে পারল। এস্তাদিওকে তো আজ নয় কাল তমালিকা বন্দর ছেড়ে চলে যেতেই হবে। মৎস্যগন্ধার কথা শুনে একটা বেদনাবোধ জেগে উঠল এস্তাদিওর মনের ভিতর। কী অপরূপা এই নারী! কত বিত্তশালী! কিন্তু কী একাকীত্ববোধ লুকিয়ে আছে তার মধ্যে! শেষের ব্যাপারটার সঙ্গে এস্তাদিওর নিজেরও মিল আছে। সে নিজেও তো একা। মৎস্যগন্ধার মতোই তারও ঘর থেকেও ঘর নেই।

বেশ কিছুক্ষণ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে তারা চুপচাপ বসে রইল। যেন কী বলবে সে-কথা খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। অবশ্য নিস্তব্ধতারও একটা ভাষা থাকে। ভালোবাসার ভাষা। হয়তো বা এটুকু সময়ের জন্য এ-ভাষাতেই কথা বলল তারা। এরপর মৌনতা ভঙ্গ করে মৎস্যগন্ধা প্রথমে বলল, 'এভাবেই কি চুপ করে থাকব আমরা?'

এস্তাদিও হেসে বলল, 'আমি তো তোমার সঙ্গে কথা বলতেই এলাম।'

মৎস্যগন্ধা মজা করে তাকে প্রশ্ন করল, 'আজ তুমি আমার জন্য কোনও উপহার আনোনি?'

মৎস্যগন্ধা তাকে ঠাট্টার ছলে প্রশ্নটা করলেও এ-প্রশ্নে মৃদু লজ্জাবোধ করল এস্তাদিও। ব্যাপারটা তার মাথায় আসেনি। আসলে সে খুব একটা অভ্যস্ত নয় এই ব্যাপারগুলোতে।

মৎস্যগন্ধা বলল, 'না, না, আমি মণি-মুক্তার কথা বলছি না। অন্তত একটা গোলাপ আনতে পারতে।'

এরপর সে বলল, 'জানো, একবার এক নাবিক আমাকে বসরা বন্দরের গোলাপ উপহার দিয়েছিল। কী সুন্দর গন্ধ তার! সে আমাকে গল্প করেছিল, বসরার গোলাপবাগগুলোতে সন্ধেবেলায় যখন একসঙ্গে গোলাপকুঁড়িগুলো ফুটে উঠতে শুরু করে তখন বহুদূর থেকে নাকি শোনা যায়, ভ্রমর-গুঞ্জনের মতো গোলাপের ডানা মেলার শব্দ!' কথাটা বলে মুহূর্তের জন্য থামল মৎস্যগন্ধা, তারপর চোখ বন্ধ করল। হয়তো মনে মনে সে কল্পনা করার চেষ্টা করল গোলাপকুঁড়ি ফুটে ওঠার ব্যাপারটা। জানলা দিয়ে আসা বিকেলের রক্তিম আলোতে বসরার গোলাপের মতই সুন্দর দেখাচ্ছে বন্দর সুন্দরীর মুখ। সে-মুখের দিকে তাকিয়ে এস্তাদিওর হঠাৎ মনে পড়ল, একটা জিনিস তো তার কাছে আছে। জিনিসটা ক্ষুদ্র হলেও খুব সুন্দর। ব্যাপারটা খেয়াল হতেই সে বলল, 'দাঁড়াও, তোমাকে একটা জিনিস উপহার দিচ্ছি।'—এই বলে সে সেই শোভাযাত্রা থেকে পাওয়া চন্দনকাঠের টুকরোটা পোশাক থেকে বের করে তুলে দিল মৎস্যগন্ধার হাতে।

জিনিসটা হাতে নিয়ে খুশিতে ভরে উঠল মৎস্যগন্ধার মুখ। সামান্য জিনিস হলেও সেটা উপহার বলে কথা। মূর্তিখোদিত কাঠের খণ্ডটা নেড়েচেড়ে দেখে মৎস্যগন্ধা বলল, 'এ তো সিংহলের জিনিস! বৌদ্ধ সিংহলি নাবিকরা গলায় পরে। এ জিনিস তুমি কোথায় পেলে? সে দ্বীপে তুমি গেছিলে?'

এস্তাদিও বলল 'না, যাইনি। আজ সকালে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এক শোভাযাত্রার মুখে পড়েছিলাম। সিংহলি বৌদ্ধ তারা। পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারীদের তারা এই কাষ্ঠখণ্ড উপহার দিচ্ছিল। এখানকার কোনও এক মঠ থেকে প্রাচীন এক সন্ন্যাসীকে শোভাযাত্রা করে জাহাজঘাটায় নিয়ে গেল, তাঁকে নিয়ে সিংহলে পাড়ি দেবার জন্য।'

কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মৎস্যগন্ধা পালঙ্ক ছেড়ে নেমে এগিয়ে গেল জানলার দিকে। ভালো করে দেখার চেষ্টা করতে লাগল নৌকা-জাহাজগুলোর ভিড়ে কোনও সিংহলি জাহাজের সোনালি মাস্তুল চোখে পড়ে কিনা। না, সে দেখতে পেল না সেই সোনালি মাস্তুল। ভিক্ষু নিশাদপাদকে নিয়ে তমালিকা বন্দর তারা অনেক আগেই ত্যাগ করে যাত্রা শুরু করেছে গভীর সমুদ্রের দিকে। এস্তাদিওর মনে হল, বন্দরের দিকে তাকিয়ে মৎস্যগন্ধা যেন অস্পষ্টভাবে একবার বলল, 'তিনি সত্যিই তবে চলে গেলেন! আমার আর কেউ রইল না।'

এস্তাদিওর দিকে পিছন ফিরে নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল মৎস্যগন্ধা। হরিণির মতো চোখ বেয়ে জল নামতে শুরু করল। খালি তার মনে হতে লাগল, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তার কেউ নেই, কোথাও কেউ নেই। সে কেন নিশাদপাদকে বলল না, তাকে তাঁর সঙ্গী করে সিংহলে নিয়ে যেতে? মন্দিরে তো দেবদাসী থাকে। সে নাহয় দেবদাসীর মতোই জীবন কাটাত সেই মন্দিরে। নিশাদপাদের বলা শেষ কথাগুলোও কানে বাজতে লাগল তার, তমালিকা বন্দর বড় নিষ্ঠুর। এ বন্দর যেমন অনেককে অনেক কিছু দিয়েছে তেমনই অনেকের জীবন কেড়ে নিয়েছে। এ বন্দর ছেড়ে চলে যাও তুমি...কিন্তু মৎস্যগন্ধা কোথায় যাবে? কার সঙ্গে?

মৎস্যগন্ধাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে এস্তাদিও প্রশ্ন করল, 'কী হল মৎস্যগন্ধা?'

মৎস্যগন্ধা কোনও জবাব দিল না। প্রচণ্ড একটা কষ্ট, যন্ত্রণা গলা থেকে কান্না হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে তার। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে সেটাকে আটকাবার।

উত্তর না পেয়ে এস্তাদিও এবার অনুমান করল যে, কিছু একটা হয়েছে মৎস্যগন্ধার। একটু ইতস্তত করে এস্তাদিও পালঙ্ক থেকে নেমে মৎস্যগন্ধার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর আলতো করে হাত ছোঁয়াল মৎস্যগন্ধার পিঠে। মৎসগন্ধা ফিরে দাঁড়াল এস্তাদিওর দিকে। জলে ভেসে যাচ্ছে তার চোখ। ঠোঁটগুলো তিরতির করে কাঁপছে।

সামান্য একটা বুদ্ধমূর্তিকে কেন্দ্র করে কী ঘটনা ঘটল তা বুঝে উঠতে পারল না এস্তাদিও। এস্তাদিও আবারও তাকে প্রশ্ন করল, 'তোমার কী হয়েছে?'

মৎস্যগন্ধা এবার আর এতদিন ধরে যত্নে লালিত নিজের কাঠিন্যকে ধরে রাখতে পারল না। এস্তাদিওকে জড়িয়ে ধরে সে কেঁদে উঠল, 'তুমি কি আমাকে তোমার সঙ্গী করতে পারো না নাবিক? আমাকে নিয়ে চলে যেতে পারো না কোনও দূর দেশে? যেখানে আমাকে কেউ চিনবে না। আমার যা আছে আমি তোমাকে সব দেব, সব দেব...

মৎস্যগন্ধার কথা শুনে প্রথমে চমকে উঠল এস্তাদিও। এ কীসের ডাক? কীসের ডাক শুনতে পাচ্ছে সে?

মৎস্যগন্ধা তাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল, 'পারবে না? পারবে না তুমি আমাকে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি দিতে? ভালোবাসা ছাড়া আমার কোনও কিছুর অভাব নেই। রূপ আছে, সম্পদ আছে। ভালোবাসা ছাড়া আর কোনও কিছু আমি চাই না তোমার কাছে। আমার যা আছে সব আমি তোমার হাতে তুলে দেব। তার বিনিময়ে তুমি আমাকে শুধু একটু ভালোবাসা দাও...

মৎস্যগন্ধার কান্না, সমর্পণের আকুতি যেন পাক খেতে লাগল বাতাসে। একসময় এস্তাদিওরও মনে হতে লাগল, এ নারী যেন যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করেছিল তার জন্য, আর সে-ও অপেক্ষা করেছিল এমনই কোনও নারীর জন্য। এস্তাদিওর মনের গভীরে যে সুতোগুলো নাবিক এস্তাদিও থেকে প্রেমিক এস্তাদিওকে আড়াল করে রেখেছিল সেই সুতোর আবরণ যেন একটার পর একটা করে ছিঁড়ে যেতে লাগল। খসে পড়তে লাগল নাবিক এস্তাদিওর আবরণ, যে-এস্তাদিও উত্তাল সমুদ্রে জাহাজ ভাসায় নতুন দেশের খোঁজে, যে-এস্তাদিওর ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে দুধর্ষ অভিযাত্রী নাবিক ভাস্কোর রক্ত। মৎস্যগন্ধার কান্না জাগিয়ে তুলল অন্য এক এস্তাদিওকে। প্রেমিক এস্তাদিওকে।

মৎস্যগন্ধা বলে চলেছে, 'বলো নাবিক, বলো? তুমি কি আমাকে নিয়ে যাবে সেই অজানা দেশে? যেখানে ঘর বাঁধব আমরা? আমার একমাত্র অপরাধ কি আমি বন্দরসুন্দরী? আমি গণিকা? তাতে তো আমার কোনও হাত ছিল না। সমুদ্রই আমাকে ভাসিয়ে এনে বন্দর সুন্দরী বানিয়েছে। আমার কি শুধু দেহই আছে? সমুদ্রের মতো গভীর কোনও মন কি নেই আমার?'

এস্তাদিও এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। জোয়ারের সময় জাহাজ যেমন অনেক সময় নোঙর ছিঁড়ে সমুদ্রে ভেসে যায় ঠিক তেমনই এস্তাদিও ছিঁড়ে ফেলল তার অন্য সব ভাবনা। সমুদ্রের জলোচ্ছাসের মতোই সে প্রচণ্ড আবেগে মৎস্যগন্ধাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, 'হ্যাঁ, নিয়ে যাব, নিয়ে যাব। তোমাকেই তো আমি এতদিন খুঁজছিলাম। তোমার জন্যই তো আমি জাহাজ ভাসিয়েছিলাম এই অজানা দেশে।'

মৎস্যগন্ধা বলে উঠল, 'সত্যি! নাবিক তুমি সত্যি বলছ?'

এস্তাদিও বলল, 'হ্যাঁ, সত্যি।'

প্রচণ্ড আবেগে ভালোবাসায় এস্তাদিওকে জড়িয়ে ধরে তার জামার ফাঁকে লোমশ বুকে মুখ ঘসতে লাগল মৎস্যগন্ধা। কিছুক্ষণের মধ্যে অন্য এক অনুভূতি শুরু হল এস্তাদিওর শরীরে। যুগ যুগ ধরে এস্তাদিওর শরীরে ঘুমিয়ে থাকা আদিম অনুভূতিও জেগে উঠতে শুরু করল। সে অনুভূতি মিশে থাকে প্রত্যেক নর-নারীর রক্তে, প্রত্যেক প্রাণীর রক্তে। এস্তাদিওর মনে হল মৎস্যগন্ধার দেহেও যেন জেগে উঠেছে সেই আদিম সত্তা। নইলে সে ওভাবে একটানা এস্তাদিওর বুকে মুখ ঘসে চলেছে কেন? আলিঙ্গনরত মৎস্যগন্ধার নখগুলো যেন প্রচণ্ড উত্তেজনায় এস্তাদিওর পিঠে বসে যাচ্ছে!

এস্তাদিও নিজের অজান্তেই যেন মৎস্যগন্ধাকে টেনে এনে পালঙ্কে শুইয়ে দিল। বাধা দিল না মৎস্যগন্ধা। বরং এস্তাদিওর মুখটা আরও চেপে ধরল নিজের মুখের ওপর।

বাইরে সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। কোনও এক জাহাজ যেন বন্দর ছেড়ে সমুদ্রে যাত্রা শুরুর আগে ঘন ঘন শঙ্খ বাজাচ্ছে। কিন্তু বন্দর ছাড়ার, সমুদ্রের দিকে ভেসে পড়ার সেই আহ্বান আর যেন কানে পৌঁছোল না এস্তাদিওর। তার ঠোঁটে তখন মৎস্যগন্ধার গোলাপ-ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ। নাবিকের কাছে সমুদ্রের আহ্বানের থেকেও অনেক বেশি গাঢ় সেই আদিম আহ্বান। ধীরে-ধীরে শরীর থেকে পোশাক খসিয়ে চুড়ান্ত মিলনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করল মৎস্যগন্ধা। না, এ কোনও গণিকার তার খদ্দেরের কাছে নিজেকে সমর্পণ নয়, আর তাকে সমর্পণ বলেও না। এতদিন মৎস্যগন্ধা যেসব পুরুষের সঙ্গে শুয়েছে সেসব ছিল নিছকই শরীরী মিলন, কোনও আবেগ বা ভালোবাসার স্পর্শ ছিল না তাতে। এই প্রথম নিজেকে কোনও পুরুষের কাছে সত্যি সমর্পণ করল মৎস্যগন্ধা। পয়সার বিনিময়ে নয়, ভালোবাসার বিনিময়ে। শরীর ও মনের এক আশ্চর্য তৃপ্তি অনুভব করতে পারছে মৎস্যগন্ধা। মৎস্যগন্ধার শরীর উন্মোচিত হল এস্তাদিওর সামনে। সে শরীরে কোনও ক্লেদ নেই, পাপ নেই। মৎস্যগন্ধার শরীরের প্রতিটা রোমকূপ, প্রতিটা রন্ধ্র যেন এস্তাদিওর স্পর্শ পাবার জন্য উন্মুখ। নাবিকের পোশাক খসিয়ে ফেলল এস্তাদিও। তার ঠোঁট মৎস্যগন্ধার ঠোঁট ছুঁয়ে নামতে শুরু করল তার গলায়, বুকের মাঝে, দু-পাশে পদ্মের মতো প্রস্ফুটিত দুই স্তনে, তারপর আরও নীচে গভীর নাভিকূপে। সেখানে কিছুক্ষণ থেমে তারপর আরও নীচে।

সূর্য ডুবে গেল, অন্ধকার নামল। তারপর চাঁদও উঠল এক সময়। খোলা জানলা দিয়ে সেই চাঁদের আলো এসে ছড়িয়ে পড়ল পালঙ্কে, আলিঙ্গনরত এস্তাদিও আর মৎস্যগন্ধার নগ্ন শরীরে। যেন মিথুনরত পৃথিবীর প্রথম নারী-পুরুষ তারা।

১৩

প্রায় মাঝরাত, ক্ষয়াটে চাঁদের আলোতে সান্টা মারিয়ার ডেকে দাঁড়িয়েছিলেন ক্যাপ্টেন পেরো। তমালিকা বন্দরের আকাশপ্রদীপের আলো বহুক্ষণ আগে নিভে গেছে। শুধু এক জায়গাতেই উজ্জ্বল আলো দেখা যাচ্ছে বন্দরের দিকে। সে জায়গা হল মৎস্যগন্ধার গণিকালয়। সান্টা মারিয়াকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজ-নৌকাগুলোও ঘুমিয়ে পড়েছে। জাহাজের খোলের গায়ে জলের ধাক্কার মৃদু শব্দ ছাড়া কোথাও কোনও শব্দ নেই। চিন্তামগ্ন হয়ে ক্যাপ্টেন তাকিয়েছিলেন ঘুমন্ত বন্দরের জেগে থাকা একমাত্র আলোকিত অংশর দিকে। সান্টা মারিয়ার নাবিকরা প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। নিজের কেবিন থেকে ক্যাপ্টেনকে একলা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জাহাজের চিকিৎসক ফ্রান্সিস কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে ক্যাপ্টেনের পাশে এসে দাঁড়াল। আলো অস্পষ্ট হলেও ক্যাপ্টেনের মুখে যে স্পষ্ট চিন্তার ভাব ফুটে উঠেছে তা বুঝতে অসুবিধা হল না ফ্রান্সিসের। সে ক্যাপ্টেনকে প্রশ্ন করল, 'নতুন কিছু খবর হল?'

ক্যাপ্টেন হতাশভাবে মাথা নেড়ে বললেন, 'না, আজও তিনি এলেন না। আমি তো নিজে আজও সকালে তার সঙ্গে গিয়ে দেখা করলাম। এই নিয়ে বেশ কয়েকবার। অন্যদিনের মতো তিনি কথা দিয়েছিলেন, আজ তিনি জাহাজে আসবেন, কথা বলবেন নাবিকদের সঙ্গে; কিন্তু এলেন না। এদিকে নাবিকদের মধ্যেও চাপা অসন্তোষের সৃষ্টি হচ্ছে। মৎস্যগন্ধার বেশ্যালয়ে গিয়ে তাদের পকেট খালি হয়ে গেছে ক'দিনের মধ্যেই। তাদের হাতে কোনও কাজও নেই। জাহাজে একঘেয়ে জীবন কাটাচ্ছে তারা। নাবিকরা বারবার জানতে চাইচ্ছে কবে জাহাজ আবার বন্দর ত্যাগ করে সমুদ্রে ভাসবে?'

ফ্রান্সিস জানতে চাইল, 'ঠিক কতদিন আমরা এ বন্দরে নোঙর করে আছি বলুন তো?'

পেরো হিসাব করে জবাব দিলেন, 'প্রায় দুমাস। আটান্ন দিন। যেমন অনেক সময় সমুদ্রে বাতাস আর স্রোতের অভাবে জাহাজ দিনের পর দিন একই জায়গায় আটকে থাকে, এ অঞ্চলে লোকেরা যাকে ''কাফিন দরিয়া'' বলে, এক-এক সময়ে মনে হয় আমরা সেই ''কাফিন দরিয়া''-তে আটকে পড়েছি।'

ফ্রান্সিস বলল, 'হঠাৎ এস্তাদিওর মনে এমন নারী আসক্তি হল কীভাবে কে জানে! এতদিন তো জেনে এসেছিলাম, তিনি এ ব্যাপারে একদম বিপরীত চরিত্রের লোক। যে কারণে অনেক সময় নাবিকদের তাঁকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসিও করতে দেখেছি। হঠাৎ তিনি এমন হয়ে গেলেন কেন?'

বন্দরের যেখানে আলো জ্বলছে সেদিকে চোখ রেখেই ক্যাপ্টেন বললেন, 'পেড্রো বলছিল প্রতিদিন বিকেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে সোজা সেই গণিকালয়ে চলে যান তিনি। কোনও দিন মধ্যরাতে ফিরে আসেন আবার কোনওদিন ফিরতে তাঁর ভোর হয়ে যায়। এস্তাদিওকে মুখে কিছু বলতে না পারলেও পেড্রোও বেশ অধৈর্য হয়ে উঠেছে আমাদেরই মতো। তার অবশ্য অন্য একটা ধারণা হয়েছে ব্যাপারটা নিয়ে...

'কী ধারণা?' জানতে চাইল ফ্রান্সিস।

পেরো বললেন, 'ভারতীয়রা অনেক তুকতাক জানে। পেড্রোর ধারণা, মৎস্যগন্ধা নামের ওই বেশ্যা তেমনই কিছু একটা করেছে তাকে। নইলে এ ঘটনা হবার নয়। ক'দিনের মধ্যে একটা মানুষ এমন আমূল বদলে যেতে পারে না। বন্দর এলাকার লোকজনও নাকি এই একই কথা বলছে।'

ফ্রান্সিস বলল, 'তাহলে এ অবস্থায় আমাদের কী কর্তব্য বলে আপনার মনে হয়?'

ক্যাপ্টেন বলল, 'চাপটা আমার ওপরই সব থেকে বেশি। কারণ নাবিকরা আমাকেই এসে ধরছে। আবার এস্তাদিও কিছু বলছেন না। ভাবছি কাল আমি তাঁর কাছে গিয়ে সরাসরি জানতে চাইব ব্যাপারটা। প্রয়োজনে আপনিও আমার সঙ্গী হতে পারেন।'

ফ্রান্সিস বলল, 'আমার কোনও আপত্তি নেই। এবার এস্তাদিও কী চাইছেন তা সরাসরি জেনে নেওয়াই ভালো।'

কথা বলছিলেন তাঁরা। হঠাৎ তাঁদের নজর পড়ল অন্ধকার নদীবক্ষে একটা লণ্ঠনের আলো ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছে। মাঝারি আকারের একটা নৌকা। ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস প্রথমে সে নৌকাটাকে নদীতে ভ্রাম্যমান বেশ্যাদের নৌকা ভেবেছিলেন, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের সে ভুল ভেঙে গেল। আশেপাশে নোঙর করা জাহাজগুলোর ফাঁক গলে নৌকাটা এসে দাঁড়াল সান্টা মারিয়ার গায়ে। অবাক হয়ে পেরোরা ডেকের প্রান্ত থেকে ঝুঁকে পড়ে নৌকাটার দিকে তাকালেন। জনা পাঁচেক লোক সে নৌকাতে। তাদের মধ্যে একজন লোক উঠে দাঁড়িয়ে লণ্ঠনটা ওপরে তুলে ধরল। তারপর পেরোদের দেখতে পেয়ে পর্তুগিজ ভাষায় বলল, 'যিশুর জয় হোক, মাতা মেরির জয় হোক। আমি বণিক এস্তাদিওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। জরুরি দরকার আছে।'

পেরো জানতে চাইলেন, 'আপনি কে?'

লোকটা জবাব দিল, 'আমি একজন পর্তুগিজ বণিক। মোহনার দিকে আমার একটা ছোট বাণিজ্যকুঠি আছে।'

ক্যাপ্টেন বললেন, 'আপনি ওপরে উঠে আসুন।'

দড়ির মই বেয়ে ওপরে উঠে এল লোকটা। মাঝবয়সি এক পর্তুগিজ। চেহারাতে বণিকসুলভ আভিজাত্যের ছাপ আছে। লোকটা বলল, 'আমি দিয়াগো। বাণিজ্যকুঠির মালিক। জরুরি প্রয়োজনে এস্তাদিওর সঙ্গে সাক্ষাত করতে এসেছি। তিনি কোথায়?'

পেরো বললেন, 'আমি এ জাহাজের ক্যাপ্টেন পেরো। এস্তাদিও তো জাহাজে থাকেন না, তিনি বন্দরে থাকেন।

দিয়াগো বললেন, 'আপনাদের বন্দরের কাজ শেষ হয়নি এখনও?'

পেরো এ প্রশ্নের জবাবে কী উত্তর দেবেন তা বুঝতে পারলেন না। একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, 'আপনি কোনও সংবাদ দিলে তা আমি কাল তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে পারি। নচেৎ আপনি জাহাজে রাত্রিবাস করুন। কাল ভোরে আমি তাঁর কাছে নিয়ে যাব।'

পর্তুগিজ নাবিক বললেন, 'না, রাত্রিবাস সম্ভব নয়। একটা জরুরি বার্তা আছে। কাল সকালেই সেটা তাঁর কাছে পৌঁছে দেবেন।'

এরপর তিনি একটু থেমে বললেন,'আপনারা জানেন কিনা জানি না, অ্যাডমিরাল ভাস্কো প্রায় একমাস হতে চলল গোয়ায় পদার্পণ করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি এখনও ভাইসরয়ের দায়িত্ব গ্রহণ না করলেও গোয়ার শাসনভার তিনি নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। শুধু গোয়া নয়, এদেশে যত পর্তুগিজ ঘাঁটি আছে, যত বাণিজ্যকুঠি আছে তার সর্বময় কর্তা করে তাঁকে এদেশে পাঠিয়েছেন রাজা। যে-কোনও পর্তুগিজ বা পর্তুগিজপোতও রাজার সনদ বলে তাঁর নিয়ন্ত্রাণাধীন। আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছিলাম গোয়াতে। সেখান থেকেই ফিরে সোজা এখানে এসেছি। কারণ, হবু ভাইসরয় এস্তাদিওকে দ্রুত গোয়াতে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। ক্যাপ্টেন কোহেলোর নেতৃত্বে তিনি একটা ছোট দ্রুতগামী রণতরী এদিকে পাঠিয়েছেন। সে জাহাজেই আমিও ফিরেছি। মোহনা ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে সমুদ্রে অপেক্ষা করছে কোহেলোর জাহাজ। এস্তাদিও যেন যথাসম্ভব দ্রুত কোহেলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি এস্তাদিওকে নিয়ে গোয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। আর তাঁদের পিছন পিছন আপনারাও রওনা হবেন সেদিকেই।'—একটানা কথাগুলো বলে থামলেন বণিক।

তার কথাগুলো শুনে মৃদু চোখাচোখি হল পেরো আর ফ্রান্সিসের মধ্যে। পেরো আগন্তুককে বললেন, 'কাল ভোরেই আমরা খবরটা পৌঁছে দেব এস্তাদিওর কাছে।'

দিয়াগো বললেন, 'হ্যাঁ, দেবেন। মনে রাখবেন এটা স্বয়ং অ্যাডমিরালের নির্দেশ।'

পেরো বললেন, 'যদি কিছু মনে না করেন তবে গোয়ার অবস্থা কেমন তা একটু বলবেন?'

বণিককুঠির মালিক বললেন, 'শেষ কয়েকবছর পর্তুগিজদের মধ্যে বেশ উচ্ছৃলঙ্খলতা দেখা দিয়েছিল। মেয়ে আর জুয়া নিয়ে মেতেছিল তারা। কিছু সরকারি সম্পত্তিও বেহাত হয়েছে সে কারণে। অ্যাডমিরাল অবশ্য এসে কড়া হাতে সেসব দমন করতে শুরু করেছেন। শৃঙ্খলা আবার ফিরে আসছে। চিন্তার কিছু নেই। আর ক'দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।'

একথা বলার পর দিয়াগো বললেন, 'এখন আমাকে যেতে হবে। আপনাদের কাছে যে খবরটা পৌঁছে দিয়েছি সে খবরটা আবার ক্যাপ্টেন কোহেলোর কাছে পৌঁছে দিতে হবে।'

ক্যাপ্টেন পেরোদের থেকে বিদায় নিয়ে এরপর জাহাজ থেকে নেমে গেলেন দিয়াগো। তাঁর নৌকার আলো মিলিয়ে গেল মোহনার দিকে।

তিনি চলে যাবার পর ফ্রান্সিস হেসে বলল, 'এবার সমস্যা কাটল বলে মনে হয়।'

পেরো বললেন, 'হ্যাঁ, কাল সকালে খবরটা পৌঁছে দিতে হবে তাঁর কাছে। ঈশ্বর মঙ্গলময়।'

পরদিন ভোরে এস্তাদিওর যখন ঘুম ভাঙল তার অনেক আগেই সূর্য উঠে গেছে। গতকাল মাঝরাতে ঘরে ফিরেছিল সে। ঘুম ভাঙার পর প্রতিদিনের মতোই তার মনে পড়ল মৎস্যগন্ধার কথা। এস্তাদিওর শয়নে স্বপনে এখন শুধু জেগে থাকে মৎস্যগন্ধা। এক অপূর্ব প্রেমের মায়াজালে সে আবদ্ধ হয়ে গেছে মৎস্যগন্ধার সঙ্গে। আর মৎস্যগন্ধাও। তারা দুজনেই যেন একটাই সত্তা। মৎস্যগন্ধার কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ এস্তাদিওর মনে হল, গতরাতে তাকে বিদায় দেবার সময় মৎস্যগন্ধা তাকে বলেছে আজ সে একটা অত্যন্ত জরুরি আর গোপনীয় কথা বলবে এস্তাদিওকে।

কী সেই কথা? বিছানায় শুয়ে ব্যাপারটা অনুমান করার চেষ্টা করতে লাগল এস্তাদিও। কিছু সময়ের মধ্যেই ঘরে ঢুকল পেড্রো। সে বলল, 'ক্যাপ্টেনা পেরো আর চিকিৎসক ফ্রান্সিস আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।'

কথাটা শুনে এস্তাদিও বিছানায় উঠে বসল। তার মনে পড়ল গতকাল তার জাহাজে যাওয়ার কথা থাকলেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। আসলে দুপুরের পর খাওয়া সেরে পথে নামলেই এস্তাদিও সব কিছু ভুলে যায় । তার মনে হয় মৎস্যগন্ধা নিশ্চই অপেক্ষা করে বসে আছে তার জন্য। আর এ-কথাটা মনে হতেই প্রতিদিন এস্তাদিও রওনা হয় মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের দিকে। ব্যাপারটা অবশ্য সত্যিও। মৎস্যগন্ধাও প্রতীক্ষা করে থাকে তার জন্য। পেড্রোর কথা শুনে এস্তাদিও বলল, 'ওদের ভিতরে নিয়ে আয়।'

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে প্রবেশ করলেন ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস। টুপি খুলে তারা প্রথমে প্রভাতি শুভেচ্ছা জানাল এস্তাদিওকে। এস্তাদিও তাদের আসন গ্রহণ করতে বলল।

তারা দুজন বসার পর এস্তাদিও আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বলল, 'গতকাল যাব ভেবেছিলাম ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আটকে গেলাম। আজ অথবা কাল নিশ্চই যাব।'

পেরো কথাটা শুনে বললেন, 'আজ আমরা একটা জরুরি খবর নিয়ে এসেছি। হয়তো আজই আমাদের তমালিকা বন্দর ত্যাগ করতে হবে। তবে সমস্যা কিছু হবে না। নাবিকরা সব প্রস্তুতই আছে। শুধু নোঙর তুলে ফেললেই হল।'

কথাটা শুনে এস্তাদিও বিস্মিত ভাবে জানতে চাইল, 'কী এমন খবর, যার জন্য আজই এ-বন্দর ত্যাগ করতে হবে?'

প্রশ্ন শুনে ক্যাপ্টেন পেরো গতকাল রাতে বণিক দিয়াগোর জাহাজে আসার কথা ও তাঁর বলা-কথা সবিস্তারে ব্যক্ত করলেন তাকে।

কথাগুলো শুনে চুপ করে কী যেন ভাবতে লাগল এস্তাদিও।

তাকে চুপ করে থাকতে দেখে ক্যাপ্টেন ভাবলেন এবার এস্তাদিও নিশ্চই বলবেন যে, 'ঠিক আছে, তবে জাহাজ ছাড়ার প্রস্তুতি শুরু করুন।'

তাই পেরো এরপর বললেন, 'দুজন নাবিককে তবে ফিরে গিয়ে আপনার এখানে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারা আপনার মালপত্র জাহাজে নিয়ে যাবে।'

কিন্তু পেরোর কথা শুনে এস্তাদিও তাদের বেশ অবাক করে দিয়ে বলল, 'এখনই তাদের পাঠাবার দরকার নেই, আমি ব্যাপারটা সম্বন্ধে একটু ভেবে নিয়ে আপনাদের জানাচ্ছি।'

স্বয়ং অ্যাডমিরাল নির্দেশ পাঠিয়েছেন তবু তা নিয়ে ভাববেন বলছেন এস্তাদিও! এরপর তাকে আর কী বলবেন তা বুঝে পেলেন না ক্যাপ্টেন পেরো। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর তিনি বললেন, 'তাহলে আমরা এখন জাহাজে ফিরে আপনার নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছি।'

কথাগুলো বলে ক্যাপ্টেন এস্তাদিওকে বিদায় জানিয়ে ফ্রান্সিসকে নিয়ে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ালেন। ফ্রান্সিস তাকে প্রশ্ন করলে, 'কী বুঝলেন?'

ক্যাপ্টেন বললেন, 'অ্যাডমিরালের কথা শুনেও এস্তাদিও বললেন তিনি ভাববেন! ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না! আমি জাহাজের ক্যাপ্টেন। শেষ পর্যন্ত না আমাকেও ভবিষ্যতে শাস্তি পেতে হয় অ্যাডমিরালের কথা অমান্য করার জন্য। এমনকী আপনাদেরও অর্থাৎ অন্য নাবিকদেরও শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।'

কথাটা শুনে ফ্রান্সিস চিন্তিতভাবে বলল, 'তেমন হলে আমাদের ক্যাপ্টেন কোহেলোর কাছে গিয়ে সবকিছু জানিয়ে আসা উচিত।'

এ কথা বলার পর ফ্রান্সিস বলল, 'আচ্ছা এমন নয়তো যে, ওই বারবনিতার জন্য নয়, অন্য কোনও কারণে তিনি রয়ে যাচ্ছেন এখানে? প্রতিদিন রাতে তিনি অন্যও কোনও জায়গায় যান? কোনও রাজনৈতিক ব্যাপারও থাকতে পারে তার মধ্যে?'

পেড্রো দাঁড়িয়েছিল বাড়ির দরজাতে। এস্তাদিওর সঙ্গে ক্যাপ্টেনদের কথোপকথন সে-ও শুনেছে। এস্তাদিওকে মুখে কোনওদিন কিছু না বললেও ভিতরে ভিতরে দেশে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে সে। ফ্রান্সিসের কথা শুনে ক্যাপ্টেন পেরো ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, 'তুমি নিশ্চিত তো যে, প্রতিরাতে এস্তাদিও ওই গণিকালয়েই যান? অন্য কোথাও যান না?'

পেড্রো জবাব দিল, 'আমি তো জানি তিনি ওই মৎস্যগন্ধার কাছেই যান। তবে সে জায়গা হয়ে অন্য কোথাও যান কিনা বলতে পারব না। আমি তো বাড়িতেই থাকি।'

জবাব শুনে ক্যাপ্টেন পেরো একটু ভেবে নিয়ে বললেন, 'দেখো পেড্রো, জাহাজ ছাড়তে অনেক দেরি হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। ঠিক সময়ে যাত্রা শুরু করলে এতদিনে হয়তো গোয়া হয়ে পর্তুগালের দিকে যাত্রা শুরু করতাম আমরা। আমি জাহাজের ক্যাপ্টেন। মনে রেখো, আমি তোমাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। আমি আপত্তি করলে এস্তাদিও তোমাকে জাহাজে তুলতে পারবেন না। কারণ সান্টা মারিয়ার নাবিকতালিকাতে তোমার নাম নেই। তোমাকে নিয়ে যেতে আমি বাধ্য নই। আর তেমন হলে তোমাকে বাকি জীবনটা এই মরা বন্দরে আগের মতোই ভিখারি হয়ে কাটাতে হবে।'

ক্যাপ্টেনের কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে পেড্রো ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, 'না, না, আমি যথাসম্ভব দ্রুত দেশে ফিরতে চাই। তার জন্য আমাকে কী করতে হবে বলুন?'

ক্যাপ্টেন তার পোশাকের ভিতর থেকে দশটা রৌপ্যমুদ্রা বের করে পেড্রোর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, 'এমন হতে পারে যে তিনি গণিকালয়ে যাবেন বলে বাড়ি ছাড়েন ঠিকই, তবে তারপর সেখান থেকে অন্য কোথাও যান। আজ থেকে বিকেলে বা সন্ধেয় তিনি ঘর ছাড়লেই তুমি গোপনে অনুসরণ করবে তাকে যতক্ষণ না তিনি ঘরে ফিরে আসেন, ততক্ষণ পর্যন্ত। আর তেমন কিছু দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা আমাদের জানাবে। আর এ কথা যদি এস্তাদিওর কাছে কোনওভাবে ফাঁস হয় তবে তোমার দেশে ফেরার পথ চিরজীবনের জন্য বন্ধ, এটুকু জেনে রেখো। কথাগুলো বলে ক্যাপ্টেন পেরো তার সঙ্গীকে নিয়ে পা বাড়ালেন জাহাজঘাটার দিকে।

মুদ্রাগুলো পকেটে ভরে নিল পেড্রো।

ক্যাপ্টেন পেরো ঘর ছেড়ে যাবার পর এস্তাদিও মনে মনে ভাবল, স্বয়ং ভাস্কো তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এ-ডাক যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এভাবে সে কী করে মৎস্যগন্ধাকে ফেলে চলে যাবে?

না, এখন আর তা সম্ভব নয়। বেশ কিছুক্ষণ ব্যাপারটা নিয়ে ভাবার পর এস্তাদিও সিদ্ধান্ত নিল, বিষয়টা নিয়ে মৎস্যগন্ধার সঙ্গে আলোচনা করে তারপর যা করার করবে সে। বেলা বেড়ে চলল। বিছানাতে আধশোয়া অবস্থায় মৎস্যগন্ধার কথা ভাবতে লাগল এস্তাদিও। মৎস্যগন্ধা আজ কী বলবে তাকে?

সূর্য ঢলতে শুরু করেছে পশ্চিমে। বিকেল হয়ে আসছে। জানলায় দাঁড়িয়ে বাড়ির পিছনে গলিপথের দিকে তাকিয়ে এস্তাদিওর প্রতীক্ষা করছিল মৎস্যগন্ধা। ও- পথ ধরেই এস্তাদিও রোজ পিছনের দরজা দিয়ে এবাড়িতে প্রবেশ করে। তাকে আজকাল আর কেউ বাধা দেয় না। তেমনই নির্দেশ দেওয়া আছে মৎস্যগন্ধার। পিছনের সিঁড়ি বেয়ে সে সোজা চলে আসে দ্বিতলে এই ঘরে। এঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যায় তারপর। রাতে খদ্দেরদের ভিড় আজকাল শ্যামা আর কিছু বয়স্থা গণিকারাই সামলায়। আর তাতে তাদের বাড়তি রোজগারও হয় বেশ কিছু।

মৎস্যগন্ধা কিছু সময়ের মধ্যেই দেখতে পেল তার প্রত্যাশা মতই এস্তাদিও বাড়ির দিকে আসছে। যে গোপন কথাটা এতদিন কাউকে মৎস্যগন্ধা জানায়নি সে-কথাটা আজ এস্তাদিওকে জানাবে বলে ভেবে রেখেছে মৎস্যগন্ধা। কিন্তু এস্তাদিওকে দেখতে পেয়েই মৎস্যগন্ধা ভাবল, আগে একটু মজা করে নেওয়া যাক তার সঙ্গে, তারপর সেই গোপন ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে।

এস্তাদিও দেখতে পায়নি তাকে। সঙ্গে সঙ্গে জানলা থেকে সরে এল মৎস্যগন্ধা। রানি পালঙ্কে শুয়ে আছে। ঘুমাচ্ছে সে। অন্যদিন এস্তাদিওকে ওপর থেকে আসতে দেখলেই রানিকে ঘরের বাইরে পাঠিয়ে দেয় মৎস্যগন্ধা। আজ মৎস্যগন্ধা সে-কাজ না করে নিজে যে পশমের চাদরটা গায়ে দিয়ে ঘুমায় সেটা দিয়ে ঢেকে দিল রানির শরীর। রানিকে আপাদমস্তক ঢেকে দেবার পর ঘরের জানলার পাল্লাগুলোও সামান্য একটু ফাঁক রেখে বন্ধ করে দিল যাতে বেশি আলো ঘরে প্রবেশ না করতে পারে, সেজন্য। তারপর দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করতে লাগল এস্তাদিওর জন্য।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই আধো অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করল এস্তাদিও। বিছানার মধ্যে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে একজন। মৎস্যগন্ধার পালঙ্কে সে ছাড়া আর কে ঘুমাবে? এস্তাদিও মাথা থেকে টুপি আর কোমর থেকে তলোয়ারটা খুলে সে জিনিসদুটো ঘরের এক জায়গাতে রেখে পালঙ্কের দিকে এগোল। তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জাপটে ধরল রানিকে। আকস্মিক এ ঘটনায় রানি ভয় পেয়ে খাট ছেড়ে লাফিয়ে উঠল প্রচণ্ড চিৎকার করে। এস্তাদিওও ঘাবড়ে গিয়ে ছিটকে সরে এল তার কাছ থেকে। ঠকে গেছে এস্তাদিও! মৎস্যগন্ধা দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে খিলখিল করে হাসতে লাগল এস্তাদিওর বোকা বনে যাওয়া মুখ দেখে। রানি খোলা দরজা দিয়ে একলাফে বাইরে বেরিয়ে গেল। বেচারাও কম ঘাবড়ায়নি!

বেশ কিছুক্ষণ পর হাসি থামল মৎস্যগন্ধার। এস্তাদিওরও চমক ভাঙল। সে বুঝতে পারল পুরো ব্যাপারটাই আসলে মৎস্যগন্ধার কারসাজি ছিল।

মৎস্যগন্ধা দোরের খিল দিতে দিতে বলল, 'তুমি শেষে রানির সঙ্গে শুতে যাচ্ছিলে! তবে প্রেমিকা হিসাবে সে-ও মন্দ হবে না। তার-ও তো শরীরের চাহিদা আছে। জানো, একবার আমি অনেক চেষ্টা চালিয়েছিলাম রানির একটা পুরুষসঙ্গী খোঁজার জন্য। কিন্তু পেলাম না।'

এস্তাদিও বলল, 'একী বলছ! শেষে রানির সঙ্গে মিলন? মানুষ কি ইতর প্রাণীর সঙ্গে মিলিত হয়?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'রাগ কোরো না। আমি মজা করে বললাম। তবে একটা কথা বলি তোমাকে। মানুষ কিন্তু ইতর প্রাণীর সঙ্গেও মিলিত হয়।'

এস্তাদিও জানতে চাইল, 'কেমন ব্যাপারটা?'

মৎস্যগন্ধা, এস্তাদিওর গলা জড়িয়ে বলল, 'হ্যাঁ, আমি শুনেছি। বেনারস থেকে আসা যে মেয়েগুলোকে আমি কিনেছি তার মধ্যে হুরী নামের একটা মেয়ে আছে। সুলতানের হারেমের মেয়ে। সে অনেক গল্প জানে। সে আমাকে বলছিল যে এ-দেশের এক রাজপুরুষ নাকি প্রাচীনকাল থেকেই ঘোটকীর সঙ্গে সঙ্গম করে। ঘোটকী নাকি কামের প্রতীক। কিন্তু সে সহজে তৃপ্ত হয় না। তৃপ্ত হলে ঘোটকী যে শব্দ করে তাকে বলে হ্রেষাকাম । যে-পুরুষ ঘোটকীকে তৃপ্ত করতে পারে সে একসঙ্গে দশজন নারীকে তৃপ্ত করতে পারে। যৌন ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যই নাকি ঘোটকীর সঙ্গে সঙ্গম করার প্রাচীন রীতি এদেশে। মধ্য ভারতে, 'খর্জুরবাহক' নামে এক জায়গাতে নাকি অতিপ্রাচীন বেশ কিছু মন্দির আছে। তার দেওয়ালগাত্রেও বেশ কিছু যৌন ভাস্কর্য খোদিত আছে। সেখানে নাকি ঘোটকীর সঙ্গে মানুষের সঙ্গমদৃশ্য খোদিত আছে!'

এস্তাদিও বেশ অবাক হয়ে গেল এ ঘটনা শুনে। বহুদূরের এই অচেনা পৃথিবী। পাহাড় থেকে সমুদ্র, ধূসর মরু অঞ্চল থেকে গভীর অরণ্যময় বিশাল বিচিত্র পরিধির এই দেশ। এ-দেশ সম্বন্ধে এস্তাদিও আর কতটুকুই বা জানে! সে তো জানে শুধু এই ক্ষয়িষ্ণুতমালিকা বন্দরকে।

এস্তাদিওর মনে হল, আগে জরুরি কথাগুলো সেরে নেওয়া ভালো। নইলে মৎস্যগন্ধার বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে হয়তো সে ভুলেই যাবে কথাটা। তাই সে বলল, 'তোমাকে একটা জরুরি ব্যাপার জানাবার আছে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'আমারও তো আছে। বেশ তুমি আগে বলো, তারপর আমার কথা শুনো।'

একটু চুপ করে থেকে এস্তাদিও বলতে শুরু করল, 'তুমি হয়তো পর্তুগিজ দুঃসাহসী নাবিক ভাস্কো ডা গামার নাম শুনে থাকবে। এই তাম্রলিপ্ত বন্দরে তিনি কোনওদিন না এলেও এদেশের কালিকট বন্দরে তিনি এর আগে দু-দুবার এসেছিলেন। শেষ এসেছিলেন একুশ বছর আগে। সম্পর্কে তিনি আমারও আত্মীয় হন। এদেশে যেখানে যত পর্তুগিজ বসতি আছে, বাণিজ্যকুঠি আছে তার কোনও কিছুই থাকত না যদি-না তিনি এদেশ আমাদের চেনাতেন। আমি যখন এ দেশে পাড়ি দিলাম তখন তিনি আমাকে রাজকোষ থেকে অর্থ সাহায্যেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। বলতে গেলে তাঁর নির্দেশেই অন্য কোনও বন্দরে না গিয়ে এই তমালিকা বন্দরে আসি। গোয়া বলে এদেশে সমুদ্র তীরবর্তী একটা অঞ্চল আছে। সে জায়গা পর্তুগিজদের দখলে। গোয়ার শাসক অর্থাৎ ভাইসরয় হিসাবে একুশ বছর পর তিনি আবার এদেশে ফিরে এসেছেন। শুধু তাই নয়, পর্তুগিজদের দন্ডমুন্ডের কর্তা হিসাবেই আমাদের দেশের রাজা তাঁকে এখানে পাঠিয়েছেন। এদেশে যত পর্তুগিজ আছে তাদের পুরস্কার, তিরস্কার এমনকী মৃত্যুদণ্ড দেবার ক্ষমতাও তাঁকে ন্যস্ত করা হয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে দেশে ভাস্কোই আমাদের রাজা। আমরা সবাই তার নিয়ন্ত্রাণাধীন। এখানকার কাজ মিটিয়ে গোয়াতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবার কথা ছিল আমার। কিন্তু আমি যাইনি। তিনি একটা জাহাজ পাঠিয়েছেন এদিকে। নির্দেশ দিয়েছেন, আমি যেন যথাসম্ভব দ্রুত সে-জাহাজে গোয়ার দিকে রওনা হই।'

এ পর্যন্ত শোনার পর মৎস্যগন্ধা ব্যগ্রভাবে জানতে চাইল, 'সেখানে যাবার পর আবার কবে ফিরে আসতে পারবে তুমি?'

এস্তাদিও চিন্তিতভাবে বলল, 'সেখানে যাবার পর আমাকে ভাস্কোর নির্দেশ মানতে হবে। হয়তো তিনি আমাকে সেখানেই রেখে দিলেন বা অন্য কোনও নতুন জায়গাতে পাঠিয়ে দিলেন কোনও দায়িত্ব দিয়ে। আবার এমনও হতে পারে যে তিনি আমাকে আবার দেশে পাঠিয়ে দিলেন।'

কথাটা শুনেই বিবর্ণ হয়ে গেল মৎস্যগন্ধার মুখ। এস্তাদিওর গলা আঁকড়ে ধরে কাতর কণ্ঠে সে বলল, 'তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না এস্তাদিও। দোহাই তোমার।'

জলের ধারা নামতে লাগল তার চোখ বেয়ে। এস্তাদিও এবার তাকে আবেগে জড়িয়ে ধরল। তারপর বলল, 'না, তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। আমার জাহাজকে আমি ফিরে যেতে বলব। জানি, তার জন্য দেশে ফেরার পথ চির জীবনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। বা ফিরলেও অ্যাডমিরালের আদেশ অমান্য করার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে ফাঁসি অথবা কারাবাস। কিন্তু সমস্যা হল আমি এই তমালিকা বন্দরেই বা আজীবন থাকব কীভাবে? এখানকার লোকেরা আমাকে সন্দেহ করতে পারে, থাকতে নাও দিতে পারে ভবিষ্যতে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'আমিও আর এখানে থাকতে চাই না। এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে চাই। নাবিক তুমি তো আমাকে বলেছিলে যে আমাকে তুমি নতুন দেশে নিয়ে যাবে?'

এস্তাদিও মৎস্যগন্ধার কেশরাশিতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, 'কিন্তু তার জন্য তো টাকার দরকার। ছোট হোক ক্ষতি নেই, কিন্তু সমুদ্রের বুকে ভাসবার জন্য অন্তত শক্তপোক্ত জাহাজের দরকার। আমার কাছে যে টাকা আছে তা দিয়ে হয়তো মাঝিমাল্লা জোগাড় করা যেতে পারে। কিন্তু জাহাজ কিনব কীভাবে?'

কথাটা শুনে মৎস্যগন্ধা সোজাসুজি তাকাল এস্তাদিওর চোখের দিকে। তারপর বলল, 'তোমাকে আমি যে গোপন খবরটা আজ দেব, তার মধ্যেই তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর পাবে। গল্পটা তবে শোনো।

সমুদ্র থেকে শিশুবয়সে আমাকে আর রানিকে একটা ভাসমান খাঁচা থেকে উদ্ধার করেছিলেন স্বয়ম্ভুনাথ নামে এক বেশ্যাপোতের মালিক। যতদূর শুনেছি সেই ময়ূরপঙ্খিনাও আমাদের নিয়ে কালিকট বন্দরে যায়। কিন্তু কোনও অজানা কারণে পরদিনই আবার সেই বন্দর ত্যাগ করি আমরা। সমুদ্রে ময়ূরপঙ্খির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় পর্তুগিজ রণপোতের। তারা ডুবিয়ে দেয় আমাদের ময়ূরপঙ্খি। স্বয়ম্ভুনাথ কোনওরকমে আমাকে, রানিকে আর ভর্তিকা নামের গণিকাকে নিয়ে অন্ধকারে ভেসে পড়েন সমুদ্রে। আমাদের ক'দিন পর উদ্ধার করেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী নিশাদপাদ, যাকে তুমি সিংহলে ফিরে যেতে দেখেছিলে। আমাদের যখন তিনি উদ্ধার করেন তখন স্বয়ম্ভুনাথের মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। মৃত্যুর আগে তিনি আমাদের সঁপে দেন ভিক্ষু নিশাদপাদের হাতে। তিনিই আমাদের এই তমালিকা বন্দরে নিয়ে আসেন। শুধু তিনি আমাদেরই নিয়ে আসেননি আরও একটা জিনিস স্বয়ম্ভুনাথ তুলে দিয়েছিলেন তার হাতে। সেটাও তিনি এতদিন গোপনে রক্ষা করছিলেন তাঁর প্রাচীন মঠে। এখনও সে-জিনিসটা সেই পরিত্যক্ত মঠে লুকোনো আছে। তবে সেটা আর অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না। আগামীকাল রাতে গিয়ে আমরা সেটা নিয়ে আসব...।'

এস্তাদিও বলল, 'কী জিনিস?'

মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে সে বলল, 'একটা পেটিকা। সেটা স্বয়ম্ভুনাথের নিজের ছিল নাকি অন্য কেউ দিয়েছিল তা জানা নেই। তার মধ্যে রয়েছে রাশি রাশি হীরে-জহরত-আর স্বর্ণখণ্ড। এত সম্পদ জমিদারদেরও নেই। হয়তো একশোটা জাহাজ কেনা যাবে তা দিয়ে...

এস্তাদিও আশ্চর্য হয়ে গেল তার কথা শুনে।

মৎস্যগন্ধা বলে যেতে লাগল, 'জাহাজে করে সে সম্পদ নিয়ে আমরা চলে যাব কোনও অচেনা দেশে, যেখানে আমাকে কেউ চিনবে না। তোমার কোনও খোঁজ পাবে না পর্তুগিজরা। আমরা সেখানে ঘর বাঁধব...

মৎস্যগন্ধা বলে যেতে লাগল তার কথা, আর তার সঙ্গে সঙ্গে এস্তাদিওর চোখের সামনেও যেন ভেসে উঠতে লাগল এক অজানা দেশের আশ্চর্য সুন্দর ছবি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%