তৃতীয় পর্ব

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

১৪

সারা রাত বেশ পরিশ্রম গেছে এস্তাদিও আর মৎস্যগন্ধা দুজনেরই। বন্দর অঞ্চল থেকে সেই প্রাচীন মঠ কম দূর নয়। সঙ্গে একটা খচ্চর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঠিকই, তবে তা চড়বার জন্য নয়। কাপড়ের আচ্ছাদন দিয়ে ভালো করে ঢেকে পেটিকাটা খচ্চরের পিঠে দড়ি দিয়ে বেঁধে বহন করে আনা হয়েছে গণিকালয়ে। ছোট হলেও পেটিকাটা অত্যন্ত ভারী। সিন্দুকটা দ্বিতলে অবস্থিত মৎস্যগন্ধার কক্ষে স্থানান্তরিত করাও যথেষ্ট পরিশ্রমের কাজ ছিল। সেই প্রাচীন মঠ থেকে ফেরার পথে তাদের মনে এ আশঙ্কাও কাজ করছিল যে, রাজপথে যদি নৈশ প্রহরীদের সঙ্গে তাদের সাক্ষাত হয়? যদি তারা খুলে দেখতে চায় পেটিকা, তখন কী হবে? কাজেই যথাসম্ভব দ্রুত, প্রায় ছুটতে ছুটতেই তারা ফিরেছে। মৎস্যগন্ধার ঘরে একবার পেটিকাটা খোলা হয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে যেন আলোকিত হয়ে গেছিল এস্তাদিওর চোখ। তার নিশ্চিত ধারণা, এ-সম্পদ স্বয়ং ভাস্কোরও নেই। একটা জাহাজ কেন পুরো একটা নৌবহর কিনে নেওয়া যায় তা দিয়ে!

মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ে জিনিসটা পৌঁছে এস্তাদিও যখন নিজের বাসায় ফেরার জন্য পথে নামল তখন পুবের আকাশ লাল হতে শুরু করেছে। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে এস্তাদিও আধো অন্ধকারের মধ্যে যেন দেখতে পেল একটা লোক তার বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করল। ব্যাপারটা দেখে মৃদু বিস্মিত হল সে। কিন্তু যখন বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়াল তখন দেখতে পেল ভিতর থেকে সে দরজা বন্ধ। এস্তাদিও ঘা দিল দরজায়। অন্য দিনের থেকে আজ যেন বেশ কিছুটা দেরিতেই দরজা খুলল পেড্রো। এস্তাদিও তাকে প্রশ্ন করল, 'কেউ এখন এল নাকি? নাকি তুমি এখন বাইরে থেকে ফিরলে?'

মৃদু হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল পেড্রো। জবাব দিল, 'না, কেউ আসেনি তো। আর আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম।'

এস্তাদিও ভাবল, আধো অন্ধকারে ক্লান্ত শরীরে সে হয়তো ভুল দেখেছে। পেড্রোর সঙ্গে আর বাক্যালাপ না করে এস্তাদিও তার ঘরে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়ল। বাইরে তখন সূর্যের প্রথম কিরণ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে তমালিকা বন্দরে। ঘুমিয়ে পড়ল এস্তাদিও।

স্বপ্ন দেখছিল এস্তাদিও। এক নতুন দেশের স্বপ্ন। নারকেল গাছের ছায়া-ঘেরা এক দ্বীপ। ছবির মতো সাজানো ঘরবাড়ি সেখানে। ঊর্মিমালা এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে রৌদ্রকিরণে উজ্জ্বল সোনালি বালুতটকে। আকাশে বড় বড় রঙিন টিয়া পাখির দল ওড়াউড়ি করছে। আর সেই বালুতটে জলছোঁয়া-শঙ্খর মতো সাদা একটা পাথরের ওপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে মৎস্যগন্ধা। সমুদ্রর জলগুলো এসে ঝাপটা দিচ্ছে তার পায়ে। সাদা ফেনায় ঢেকে যাচ্ছে তার কোমর থেকে নীচের অংশ। দূর থেকে দেখতে লাগছে সাপের মতো। ঠিক মৎস্যকন্যার মতো দেখতে লাগছে তাকে। ওপরটা মানবীর, দেহের নিচের অংশটা মাছের মতো। মৎস্যকন্যার মতোই সুন্দর দেখতে তাকে। সমুদ্রের বাতাসে তার খোলা চুল উড়ছে। এস্তাদিও তার উদ্দেশ্যে বলল, 'ওভাবে বসে থেকো না তুমি। তোমাকে মৎস্যকন্যার মতো লাগছে, নির্ঘাত কোনও জাহাজ ডুবিয়ে ছাড়বে তুমি!

মৎস্যগন্ধা তার কথার জবাবে কী যেন একটা বলল। কিন্তু সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের শব্দে এস্তাদিও তার কথা শুনতে পেল না। এস্তাদিও আবার তাকে জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল, 'তুমি কী বলছ?'

কিন্তু এ পর্যন্ত স্বপ্নটা দেখেই হঠাৎ যেন ঘুম ভেঙে গেল তার। সুখস্বপ্ন স্থায়ী হল না। চোখ মেলে সে দেখতে পেল পেড্রো এসে দাঁড়িয়েছে। সে বলল, ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস আবার এসেছেন। মনে মনে নিদ্রাভঙ্গ, বলা ভালো, স্বপ্নভঙ্গর জন্য অসন্তুষ্ট হলেও এস্তাদিও বলল, 'ওদের নিয়ে এসো।' এস্তাদিও উঠে বসল।

ঘরে ঢুকে টুপি খুলে এস্তাদিওকে সম্ভাষণ জানাবার পর ক্যাপ্টেন বললেন, 'দুটো দিন হয়ে গেল আপনি কোনও খবর জানালেন না, তাই খোঁজ নিতে এলাম।'

এস্তাদিও জবাব দিল, 'আমি এখনও ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে উঠতে পারিনি।'

পেরো বললেন, 'কিন্তু ক্যাপ্টেন কোহেলো তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন?'

এস্তাদিও আলগোছে জবাব দিল, 'দেখি কী করি?'

কথাটা শুনে ফ্রান্সিস অনেকটা কৈফিয়ত চাইবার ঢঙেই বলে উঠল, 'স্বয়ং অ্যাডিমিরাল আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, আর আপনি বলছেন, ''ভাবছি''?'

ফ্রান্সিসের কথা শুনে এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল এস্তাদিওর। জাহাজের মালিক আর ক্যাপ্টেন যখন আলোচনা করেন তখন তৃতীয় ব্যক্তির নাক গলানোর অধিকার নেই সেখানে। ডাক্তার হলেও ফ্রান্সিস পদমর্যাদায় তাদের অনেক নীচে। ফ্রান্সিসের কথা শুনে এস্তাদিও বলল, 'অ্যাডমিরাল যে আমাকে ডেকেছেন তা আমি শুনেছি। বারবার কথাটা আমাকে স্মরণ করাবার দরকার নেই। আমার সিদ্ধান্ত আমি যথাসময়ে জানিয়ে দেব। আপনারা এখন জাহাজে ফিরে যান। আর একান্তই যদি আপনারা আমার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে না পারেন, নাবিকরা যদি আর এখানে থাকতে না চায় তবে আপনারা জাহাজ নিয়ে ফিরে যেতে পারেন। তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই। জাহাজের খোলে যা মাল তোলা হয়েছে তা গোয়া বা অন্য কোনও বন্দরে গিয়ে বিক্রি করলে নাবিকদের পাওনাগন্ডা, জাহাজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার খরচ উঠে যাবে।'

এরপর আর কোনও কথা হয় না। ক্যাপ্টেন পেরো বললেন, 'ঠিক আছে। যদি বন্দর ছাড়ি তবে যাবার আগে শেষ একবার আপনাকে জানিয়ে দিয়ে যাব।'

এস্তাদিওর বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতেই পেড্রো এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। চাপাস্বরে সে বলল, 'একটা খবর আছে।'

'কী খবর?' জানতে চাইলেন ক্যাপ্টেন।

পেড্রো বলল, 'গতকাল বিকাল নাগাদ তিনি এ-বাড়ি ছাড়তেই আপনাদের কথামতো আমি তার পিছু নিলাম। তিনি প্রথমে গেলেন সেই গণিকালয়ে। আমি নদীর পাড়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বেশ রাতে মৎস্যগন্ধা নামে বেশ্যালয়ের সেই মালকিন আর একটা খচ্চর নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে রাস্তায় নামলেন তিনি। আমিও তাঁদের পিছু নিলাম। বন্দর এলাকা থেকে বেশ দূরে একটা প্রাচীন মঠ আছে। বর্তমানে সেখানে কেউ থাকে না। এক বৃদ্ধ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী থাকত সেখানে। সে লোকটা ক'দিন আগে সিংহলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। তারা গিয়ে উপস্থিত হল সেই বৌদ্ধ মঠে। তারপর তারা সেখান থেকে একটা ছোট সিন্দুক বার করে এনে খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে ভোর রাতে বেশ্যালয়ে ফিরে এল। যে ভাবে তারা দুজন কষ্ট করে সিন্দুকটা তুলছিল তাতে মনে হয় জিনিসটা খুব ভারী, খচ্চরটাও প্রথমে পিঠে নিতে চাচ্ছিল না পেটিকাটা।'

কথাটা শুনে বেশ আশ্চর্য হয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস।

পেরো তাকে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু সেইসময় বাড়ির ভিতর থেকে এস্তাদিওর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। পেড্রোর নাম ধরে হাঁক দিচ্ছে এস্তাদিও। ডাকটা শুনেই পেড্রো বলল, 'আমি এখন যাই। তেমন কিছু হলে খবর দেব আপনাদের। কথাগুলো বলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল, আর ক্যাপ্টেন পেরোরা চললেন জাহাজে ফিরে যাবার জন্য। পথ চলতে চলতে ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল, 'ওই সিন্দুকে কী থাকতে পারে বলে মনে হয়?'

ক্যাপ্টেন একটু ভেবে নিয়ে বললেন, 'সম্ভবত কোনও মূল্যবান জিনিস। এমনকী ধনরত্ন সোনাদানাও থাকতে পারে। নইলে সেটা উদ্ধার করার জন্য এত গোপনীয়তা কেন? দিনেরবেলা বের করেও তো তা আনা যেত। নিশ্চই ওই পেটিকা উদ্ধারের কোনও সাক্ষী রাখতে চায়নি তারা।'

এ কথা বলার পর ক্যাপ্টেন বললেন, 'শুনুন, আমাদের কর্তব্য আমি ভেবে নিয়েছি। যা মনে হচ্ছে তাতে এস্তাদিও সহজে নড়বেন না এ বন্দর ছেড়ে। আমাদের একটা দ্রুতগামী নৌকা জোগাড় করতে হবে সমুদ্র অভিযানের উপযোগী। সে নৌকা নিয়ে আমরা আজই যাত্রা করব মোহনার দিকে ক্যাপ্টেন কোহেলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। তিনিই তো ভাস্কোর নির্দেশ নিয়ে এসেছেন। আমরা তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব, তাঁর পরামর্শমতো। যাতে পরবর্তীকালে আমাদের কোনও জবাবদিহির মুখে পড়তে না হয়।'

'ফ্রান্সিস বলল, 'হ্যাঁ, অতি উত্তম ভাবনা। এটাই করা দরকার।'

কথা বলতে-বলতে তারা এগোল জাহাজের দিকে।

ক্যাপ্টেনরা চলে যাবার পর পেড্রোকে হাঁক দিল এস্তাদিও তার স্নানের জল আর খাবার দেবার জন্য। তারা আসায় ঘুমটা নষ্ট হয়ে গেছিল তার। এস্তাদিও তাই ভেবেছিল যে স্নান খাওয়া সেরে একেবারে ঘুম দেবে। যাতে তাকে বিকেলে বাইরে বেরোবার আগে ঘুম থেকে উঠতে না হয়।

সেইমতো স্নানও সেরে নিল এস্তাদিও। তারপর এস্তাদিও যখন খাবার মুখে তুলতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় পেড্রো ঘরে ঢুকে বলল, 'একজন স্থানীয় লোক এসেছে। বলছে আপনি তাকে চেনেন। ভীষণ জরুরি দরকার আপনার সঙ্গে, তবে নাম বা কোথা থেকে এসেছে তা কিছুই বলছে না।'

কথাটা শুনে এস্তাদিও বাড়ির বাইরে এসে যাকে দেখল সে লোকটার নাম না জানলেও এস্তাদিও তাকে চেনে। লোকটা মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের দরজা পাহারা দেয়। এস্তাদিওকে দেখেই সে বলল, 'মালকিন এখনই আপনাকে একবার যাবার জন্য সংবাদ পাঠিয়েছেন।'

খবরটা শুনে এস্তাদিও মৃদু শঙ্কিত ভাবে জানতে চাইল, 'কী হয়েছে?'

'তাড়াতাড়ি আসুন। এলেই বুঝতে পারবেন।' সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে লোকটা আর দাঁড়াল না। প্রায় ছুটতে ছুটতেই সে ফেরার পথ ধরল।

পোশাক পাল্টাতে ঠিক যতটুকু সময় লাগে ঠিক ততটুকু সময় নিল এস্তাদিও। তারপর সে দ্রুত রওনা হল মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের দিকে।

বাড়িটাতে পা রেখেই এস্তাদিও বুঝতে পারল, কিছু একটা ঘটেছে। অন্যদিন দিনের বেলা এসময় বাড়িটা ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু গণিকার দল এখন ঘর ছেড়ে হঠাৎই যেন বাইরে বেরিয়ে এসেছে। চাপাস্বরে নিজেদের মধ্যে কী সব যেন আলোচনা করছে। চোখ-মুখের ভাবও বেশ উত্তেজিত। এস্তাদিও সিঁড়ি দিয়ে উঠে সোজা মৎস্যগন্ধার ঘরের সামনে হাজির হল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শ্যামা চোখ মুছছিল। এস্তাদিওকে দেখে সে নিঃশব্দে দরজা খুলে দিল। এস্তাদিও ভিতরে ঢোকার পর আবার পিছন থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

জানলা দিয়ে দিনের আলো ঢুকছে ঘরে। এস্তাদিও দেখল পালঙ্কের ওপর শুয়ে আছে রানি। আর তার মাথায় পরম মমতায় হাত বোলাচ্ছে মৎস্যগন্ধা। জল গড়িয়ে পড়ছে তার চোখ বেয়ে।

পালঙ্কের কাছে গিয়ে দাঁড়াল এস্তাদিও। রানির দিকে তাকিয়ে এস্তাদিও বুঝতে পারল, মৎস্যগন্ধার দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী, সহচরী আর বেঁচে নেই। বিস্মিতভাবে এস্তাদিও জানতে চাইল, 'ওর কী হয়েছিল?'

প্রথমে মৎস্যগন্ধা মুখে কোনও কথা না বলে ইঙ্গিত করল ঘরের এক কোণে মেঝের দিকে। একটা কালো হিলহিলে সাপ সেখানে ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে আছে!

মৎস্যগন্ধা এরপর ধরা গলায় বলতে লাগল, 'তুমি চলে যাবার পর শুয়ে পড়েছিলাম আমি। রানি অলিন্দ থেকে কখন ঘরে ঢুকেছিল জানি না। ওর চিৎকারে ঘুম ভেঙে দেখি সে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ছে সাপটাকে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। যাবার আগে সাপটা শেষ কামড় দিয়ে গেল রানির লোমহীন হাতের পাতায়।'

এস্তাদিও বিস্মিতভাবে বলল, 'এঘরে সাপ ঢুকলো কীভাবে?'

কান্না-ভেজা গলায় মৎস্যগন্ধা ফিসফিস করে বলল, 'আমরাই নিয়ে এলাম। রানিকে যখন মাটি থেকে তুলছি তখন দেখলাম পালঙ্কের নীচে সিন্দুকের ডালাটা আধখোলা। রানির অভ্যেস হল ঘরে কোনও নতুন জিনিস এলেই সে সেটাকে নেড়েচেড়ে দেখে। তেমনই হয়তো পেটিকাটা নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে খুলে ফেলেছিল সে। কোনওভাবে সাপটা ঢুকে ছিল পেটিকার ভিতর। অথবা ছোট্ট সাপটা কাঠের সিন্দুকের লোহার পেটির খাঁজেও লুকিয়ে থাকতে পারে। অন্ধকারে খেয়াল করিনি আমরা। এ সাপ হল কালনাগিনী। ওই বৌদ্ধ মঠে এ-সাপ আমি একবার দেখেছিলাম।'

এস্তাদিও বলল, 'এবার আমি অনুমান করতে পারছি যে, ভারবাহী খচ্চরটা কেন প্রথমে পেটিকাটা পিঠে নিতে রাজি হচ্ছিল না। সম্ভবত প্রাণীটা সাপের উপস্থিতি বুঝতে পেরেছিল। হয়তো নিছক কৌতূহলের জন্য নয়, রানিও বিজাতীয় প্রাণীর উপস্থিতি বুঝতে পেরেই পেটিকার দিকে এগিয়ে গেছিল।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'হতে পারে। রানি নিজের প্রাণ দিয়ে বাঁচিয়ে গেল আমাকে।'—এই বলে সে এস্তাদিওকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। এস্তাদিও তাকে সান্ত্বনা দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।

মৎস্যগন্ধাকে যখন অনেক বুঝিয়ে এস্তাদিও শান্ত করতে পারল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। শ্যামাকে ডেকে মৎস্যগন্ধা নির্দেশ দিল, 'পূবদিকে আমার জানলার ঠিক নীচের জমিতে রানির কবরের ব্যবস্থা কর। যাতে নীচে তাকালেই আমি তাকে দেখতে পারি। প্রতিদিন সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়বে রানির কবরের ওপর। আর জ্যোৎস্নারাতে জোয়ারের জল এসে স্নান করিয়ে দেবে রানির কবরটাকে। আর একটা কথা, আমি যতদিন-না নির্দেশ দিচ্ছি ততদিন এ বাড়ির দরজা খদ্দেরদের জন্য বন্ধ থাকবে।'

মৎস্যগন্ধার নির্দেশমতোই কাজ হল। কবরের গর্ত খোঁড়া হল সেই নির্দিষ্ট জায়গাতেই। মৎস্যগন্ধা নিজের হাতে চন্দন বেটে লেপে দিল রানির কপালে। মালা দিয়ে সাজানো হল রানিকে। তারপর নতুন কাপড় আর চাটাইতে মুড়ে রানির দেহটা নীচে নামিয়ে কবরে শোয়ানো হল। গণিকার দল সার বেঁধে এসে ফুল আর-একমুঠো করে মাটি দিতে লাগল কবরে। তারপর ঝপাঝপ করে মাটি ফেলা শুরু হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢেকে গেল রানির দেহ। কবর মাটি দিয়ে ঢেকে দেবার পর তার ওপর বসানো হল চকমেলানো পাথরের টুকরো। সব শেষে নির্বাক মৎস্যগন্ধা কবরের ওপর একগোছা ধূপ জ্বালিয়ে দিল।

সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। বিদায়ী সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল রানির কবরের ওপর। বাড়ির ভিতর ঢোকার আগে একবার নদীর দিকে তাকাল এস্তাদিও। মাঝনদীতে নোঙর করা তার জাহাজটা দেখতে পেল এস্তাদিও। মাথার ওপর ক্রুশ আঁকা পর্তুগালের লাল পতাকাটা পত পত করে উড়ছে। ম্যানুয়াল-পুত্র রাজা তৃতীয় জনের পতাকা, ভাস্কো ডা গামার পতাকা! সেদিকে তাকিয়ে রইল এস্তাদিও। হাজার হোক ওই পতাকাটা সম্বল করেই তো এতটা দূরের পথ পাড়ি দিয়েছিল এস্তাদিও। সব টান তো আর মুছে ফেলা যায় না। কে যেন পতাকাটা নামাতে শুরু করল। প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় পতাকা নামানো হয় আবার সূর্যোদয়ের মুহূর্তে পতাকা ওঠানো হয়। তার জন্য জাহাজে লোক থাকে। সব পর্তুগিজ জাহাজেই একই নিয়ম। আর তারপরই যেন মনে হল জাহাজ থেকে কয়েকজন লোক নামল, তার গায়ে লাগান নৌকাতে। তারপর দ্রুতগামী সেই নৌকাটা জল কেটে রওনা হল যেদিকে মোহনা সেদিকে। এস্তাদিওর দেখাটা অবশ্য ভুল ছিল না। ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্যাপ্টেন পেরো, ফ্রান্সিস আর কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে রওনা হলেন মোহনার কাছে সমুদ্রে অপেক্ষমান ক্যাপ্টেন কোহেলোর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।

পরদিন ভোরবেলা মোহনা অতিক্রম করে সাগরে পৌঁছোল তারা। কিছুটা পথ অতিক্রম করেই ক্যাপ্টেন পেরো তার দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখতে পেলেন একটা জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে দরিয়াতে। তার মাস্তুলে উড়ছে লাল পতাকা। নির্ঘাত ওটা পর্তুগিজ জাহাজ। ক্যাপ্টেন পেরো নৌকো নিয়ে এগোলেন সেদিকে।

জাহাজটার কাছে উপস্থিত হবার আগে সান্টা মারিয়ার বুদ্ধিমান ক্যাপ্টেন পেরো নৌকাতে একটা পর্তুগিজ পতাকা টাঙিয়ে দিলেন যাতে কোনও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয় সেজন্য।

ক্যাপ্টেন পেরো পৌঁছে গেলেন সেই জাহাজের কাছে। জাহাজটার অগ্রবর্তী মাস্তুল। প্রধান মাস্তুল তার সংলগ্ন ও মাস্তুলে কোথাও পাল খাটানো নেই। সমুদ্রেস্রোত থাকলেও পালহীন, নোঙর করা মাঝারি আকারের জাহাজটা জগদ্দল পাথরের মতো আটকে আছে মোহনার নিকটবর্তী সমুদ্রে। রণপোতের ডেকের ওপর বসানো আছে সার সার কামাল।

ক্যাপ্টেন পেরোর নৌকাটা সেই জাহাজের কাছাকাছি আসতেই ডেক থেকে একজন হাঁক দিল, 'তোমরা কারা? কোথা থেকে আসছ?'

পেরো জবাব দিলেন, 'আমরা পর্তুগিজ। তমালিকা বন্দর থেকে আসছি। ক্যাপ্টেন কোহেলোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমি হলাম ক্যাপ্টেন পেরো। তমালিকা বন্দরে নোঙর করা পর্তুগিজ জাহাজ ''সান্টা মারিয়ার'' ক্যাপ্টেন।'

জবাব শুনে লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল সেই রণপোতের কিনারা থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডেক থেকে একটা দড়ির মই নেমে এল পর্তুগিজ জাহাজে ওঠার জন্য। সেই মই বেয়ে জাহাজে উঠে এলেন ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস।

ডেকে বেশ ভিড়। অনেক লোক জড়ো হয়েছে সেখানে। ক্যাপ্টেন পেরো দেখতে পেলেন, একজন নাবিককে জাহাজের ডেকে নোঙরের শিকল বা কাছি জড়াবার লোহার স্তম্ভ অর্থাৎ ক্যাপস্টেন-এর সঙ্গে পিছমোড়া করে বাঁধা রয়েছে। আর তার পাশেই কাঠের মদের পিপের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে আর একজন নাবিক। তারা দুজনেই রক্তাক্ত।

ক্যাপ্টেন পেরোরা ডেকে উঠে আসতেই ডেকের জটলার মধ্যে থেকে বেরিয়ে একটা লোক এসে দাঁড়াল ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিসের সামনে। লোকটা দানবাকৃতির। লাল দাড়ি, মাথার চুল কালো কাপড়ের ফেট্টি দিয়ে বাঁধা। লোকটার চেহারার মধ্যে প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে তা হল, তার কপাল থেকে সুতো দিয়ে বাঁধা কালো কাপড়ের একটা ঠুলি ঝুলছে বাম চোখের ওপর। মুখমণ্ডল, বাহুসহ লোকটার যেসব অংশ অনাবৃত, সেসব জায়গায় অসংখ্য প্রাচীন ক্ষতচিহ্ন সাক্ষ্য দিচ্ছে লোকটার কোনও দুর্দমনীয় অতীতের। হয়তো বা বর্তমানেরও। তার হাতে-ধরা একটা চামড়ার চাবুক। চাবুকের মাথার কাছে সিসার টুকরো বাঁধা। সম্ভবত এ লোকটাই এতক্ষণ চাবকাচ্ছিল ক্যাপস্টেন আর মদের পিপেতে বাঁধা লোক-দুজনকে। লোকটা এক চোখে পেরোদের দুজনকে তীক্ষ্নদৃষ্টিতে দেখে নিয়ে কর্কশভাবে বলল, 'আমি এ জাহাজের ক্যাপ্টেন কোহেলো। আপনাদের মধ্যে বণিক এস্তাদিও কোন জন? যাকে আমার গোয়াতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার কথা?'

পেরো জবাব দিলেন, 'তিনি আমাদের সঙ্গে নেই। আমি সান্টা মারিয়া জাহাজের ক্যাপ্টেন পেরো, আর আমার সঙ্গী ডাক্তার ফ্রান্সিস। বাণিজ্যকুঠির মালিক দিয়াগো আমাদের আপনার এখানে আসার সংবাদ দিয়েছেন। আমরা আপনার সঙ্গে জরুরি পরামর্শ করতে এসেছি।'

ক্যাপ্টেন কোহেলো বললেন,'এস্তাদিও আসেননি। কিন্তু আর তো অপেক্ষা করতে পারব না আমি। আজই আমাকে জাহাজ ছাড়তে হবে। অ্যাডমিরাল ভাস্কো আমাকে এখানে এস্তাদিওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য চারদিন অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। সে সময় অতিক্রান্ত।'

ফ্রান্সিস বলল, 'সে ব্যাপারেই আলোচনা করতে এসেছি আমরা।'

ক্যাপ্টেন কোহেলো বললেন, 'ঠিক আছে, আমার কেবিনে চলুন।'

ক্যাপ্টেন পেরোদের নিয়ে নিজের কেবিনে পা বাড়াবার আগে ক্যাপ্টেন কোহেলোও একটু থেমে মাস্তুলগুলোর দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে ডেকে জমায়েত হওয়া নাবিকদের উদেশ্যে বললেন, 'ওদেরকে এবার নীচে নামিয়ে জলে ছুড়ে ফেল। সমুদ্রের নীচে ওরা খদ্দের ধরতে থাক।'

কোহেলোর দৃষ্টি অনুসরণ করে মাস্তুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন পেরো মৃদু চমকে উঠলেন। গ্যালন মাস্তুলের থেকে দড়ি বাঁধা অবস্থায় দুটো মেয়ে ঝুলছে। সম্পূর্ণ নগ্ন। মাঝে মাঝে ছটফট করছে তারা!

ক্যাপ্টেন পেরোদের চোখ সেদিকে গেছে বুঝতে পেরে তাদের নিয়ে নিজের কেবিনের দিকে এগোতে এগোতে ব্যাপারটা যেন কিছুই না এমনভাবে কোহেলো বললেন, 'অ্যাডমিরাল ভাস্কোর নির্দেশ, তাঁর কোনও জাহাজে কোনও নারী তোলা যাবে না। এখানে আসার পথে একটা ছোট বন্দরে জল নিতে থেমেছিলাম। কোন ফাঁকে যেন দুজন মাল্লা ওই দুটো বেশ্যাকে জাহাজে তুলে ফেলেছিল। কিন্তু আমার একটা চোখ হলেও সে-চোখকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। ঠিক ধরে ফেলেছি। মেয়েদুটোকে তাই জলে ফেলে দিতে বললাম, আর নাবিক দুজন আপাতত কয়েদ থাকবে। গোয়াতে ফিরে ওদের ব্যবস্থা হবে। তবে প্রদীপের নীচেও অন্ধকার থাকে। এ-দেশে আসার পথে স্বয়ং-হবু ভাইসরয়ের জাহাজ থেকেই দুজন মেয়ে ধরা পড়েছে। গোয়ার রাস্তায় প্রকাশ্যে তাদের চাবকাবার ফরমান জারি করেছেন ভাস্কো।

ক্যাপ্টেন পেরোদের নিজের কেবিনে এনে বসালেন কোহেলো। তার খাস ভৃত্য এসে দু-পাত্র ফেনা ওঠা মদ রেখে গেল অতিথি আপ্যায়নের জন্য। কোহেলো জানতে চাইলেন 'এবার বলুন ব্যাপারটা কী?'

মদের পাত্রে চুমুক দিতে দিতে ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস বলতে লাগল তাদের কথা। এমনকী শেষে সেই পেটিকা উদ্ধারের কথাও বাদ দিল না। যতটা সম্ভব বিস্তৃতভাবে তারা কথাগুলো বলল।

সব কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর ক্যাপ্টেন কোহেলো বলল, 'দেখুন, আমি ইচ্ছা করলেই গোলা দেগে অরক্ষিত তমালিকা বন্দরের ওই বেশ্যালয় ধ্বংস করতে পারি। অ্যাডমিরালের নির্দেশ অমান্য করার জন্য এস্তাদিও নামের লোকটাকে বন্দিও করে আনতে পারি বন্দরে নেমে। আমি জলদস্যু ছিলাম। আমার জাহাজে যাদের দেখছেন সেই মানুষগুলো অনেকেই আমার সহকর্মী ছিল। অ্যাডমিরালের হাতে ভূমধ্যসাগরে ধরা পড়েছিলাম আমরা। তিনি বললেন যদি আমরা তাদের ভারতগামী নৌবহরে যোগ দিই তবে তিনি ফাঁসি দেবেন না। আমি আমার দলবল নিয়ে যোগ দিলাম তাঁর সঙ্গে। জানেন-ই তো আমাদের মতো অনেক খুনেকে সঙ্গে করে তিনি এদেশে এনেছেন। কারণ আমাদের দিয়ে যে-কাজ হবে সবার দ্বারা তা হবে না। লোকটাকে আমি ধরে আনতেই পারি কিন্তু অ্যাডমিরালের নির্দেশ ছাড়া আমি কিছু করব না। আপনারা বন্দরে ফিরে যান। আমি গোয়া ফিরে অ্যাডমিরালকে সব জানাচ্ছি। পরবর্তী নির্দেশ নিশ্চই আপনাদের কাছে দ্রুত পৌঁছে যাবে। ততদিন অপেক্ষা করুন।'

ক্যাপ্টেন কোহেলের পরামর্শ নিয়ে তমালিকা বন্দরে ফেরার জন্য জলে নামলেন ক্যাপ্টেন পেরো।

১৫

মালখানার মধ্যে তালিকাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে সব কিছু মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলেন ভাস্কো। সামনে মাটিতে রাখা স্তূপাকৃতি বন্দুকগুলো গুনতি করছিল ভাস্কোর নিজস্ব একজন লোক। এই সরকারি অস্ত্রাগারের করনার বা হিসাবরক্ষক পর্তুগিজ কিছুটা তফাতে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল।

যে লোকটা গুনতি করছিল সে বন্দুকগুলো একপাশে সরিয়ে রাখতে রাখতে বলছিল—'দুশো পাঁচ, দুশো ছয়...।' কিন্তু দুশো ছাব্বিশে এসে থেমে গেল লোকটা। অর্থাৎ দুশো ছাব্বিশটা বন্দুক আছে এই অস্ত্রাগারে।

এরপর র্যাকে রাখা পিস্তলগুলো গোনার পালা। গুনে দেখা গেল, একশো ছাব্বিশটা পিস্তল আছে।

বিতৃষ্ণায় অ্যাডমিরাল মাথা নাড়লেন। তারপর হিসাবরক্ষককে প্রশ্ন করলেন, 'সরকারি হিসাবমতো চারশো বন্দুক আর দুশো পিস্তল থাকার কথা। বাকি অস্ত্রগুলো গেল কোথায়?'

প্রশ্ন শুনে হিসাবরক্ষক মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ভাস্কো এবার বলে উঠলেন, 'বলো কোথায়? নইলে সরকারি অস্ত্র চুরির অপরাধে তোমাকে ফাঁসি দেব।'

লোকটা এবার কাঁপতে-কাঁপতে বলল, 'আগের ভাইসরয়ের নির্দেশে স্থানীয় কয়েকজন শিকারি আর ব্যবসায়ীর কাছে অস্ত্রগুলো বেচে দেওয়া হয়েছে।'

আগের ভাইসরয় অর্থাৎ 'ডম ডুয়ার্তে দে মোনেজেস'। এদেশে আগে যে পাঁচ-জন ভাইসরয়কে পাঠানো হয়েছিল তার মধ্যে কমবেশি সবাই যে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধি করেছেন এ-তথ্য পর্তুগাল রাজসভা জানে আর ভাস্কোও জানেন। দু-দশকও হয়নি, তাঁরা ছিবড়ে করে ছেড়ে দিয়েছেন এই পর্তুগিজ উপনিবেশকে। এদেশে প্রথম ভাইসরয় হিসাবে পাঠানো হয়েছিল ফ্রান্সিসকো দ্য আলমিডাকে। যুদ্ধবাজ মানুষ ছিলেন তিনি। মূর নৌবহরকে পরাস্ত করতেই তাঁর সময় কেটে যায়। দ্বিতীয় ভাইসরয় ছিলেন আলবুকার্ক। এদেশের বুকে তিনি চরম নৃশংসতার ছাপ রেখে গেলেও তাঁর পরম কৃতিত্ব গোয়াতে পর্তুগিজদের এই উপনিবেশ স্থাপন। আর এর পরবর্তী তিনজন ভাইসরয় ছিলেন যথাক্রমে লোপো সোরেম সে অলবেরগরিয়া, দিয়াগো লোপেস দে মেকিরা ও ডম ডুয়ার্তে দে মোনেজেস। এই শেষোক্ত তিনজন গোয়াকে মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর কোনও চেষ্টা তো করেননি, উপরন্তু পরিবেশটাকে একদম ধ্বংস করে ফেলছেন। ইউরোপ থেকে এদেশে আসার পর সভ্যতার শেষ চিহ্নটুকুও যেন নিজেদের শরীর থেকে খসিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা। এমনকী অর্থের লোভে এখানে দাসবাজারেরও অনুমতি দিয়েছেন তাঁরা। ডিরিটা নদীর ধারে সেই দাসবাজারে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় নারী-পুরুষ বিক্রি করা হয়।

হিসাবরক্ষক সত্যি বলছে কিনা তা তখন জানার উপায় নেই ভাবী ভাইসরয়ের। কারণ, ভাস্কো গোয়াতে পদার্পণ করার কিছুদিন আগেই পূর্বতন ভাইসরয় দায়িত্ব ত্যাগ করে পারস্য উপসাগরে পাড়ি দিয়েছেন। হয়তো তিনি এটা করেছেন ভাস্কোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান না বলেই। তবে ভাস্কোর মনে হল হিসাবরক্ষক সত্যি কথাই বলছে। তিনি এরপর হিসাব রক্ষককে বললেন, 'তোমাকে একমাস সময় দিলাম। তার মধ্যে ওইসব ব্যবসায়ীদের থেকে সব মাল ফিরিয়ে আনতে হবে। অস্ত্র বিক্রির সময় নিশ্চই তাদের রসিদ দেওয়া হয়নি? অস্ত্র ফেরত না দিলে চোরাই মাল কেনার অপরাধে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।'

হিসাবরক্ষককে নির্দেশ দিয়ে কীভাবে গোয়াতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় তা ভাবতে ভাবতে তাঁর বাসস্থানের পথ ধরলেন অ্যাডমিরাল।

গোয়ার পরিবেশ যে ভালো নয় তা বণিকদের মাধ্যমে পৌঁছেছিল রাজা তৃতীয় জনের কাছে। গোয়ার পুনর্গঠনের জন্যই ভাস্কোর সব শর্ত মেনে নিয়ে পর্তুগালের রাজা ভাস্কোকে পাঠিয়েছেন এখানে। কিন্তু গোয়ার পরিস্থিতি যে এতটা অরাজক তা ধারণা করতে পারেননি ভাস্কো। দুদিন আগে স্থানীয় হাসপাতাল পরিদর্শন করতে গেছিলেন ভাস্কো। সেখানে শুধু যৌনরোগ সিফিলিস-আক্রান্ত রোগী আর মাতাল ভবঘুরের ভিড়! শেষোক্ত লোকগুলো রোগী না হয়েও হাসপাতাল কর্মীদের উৎকোচের বিনিময়ে সরকারি খরচে খাওয়া আর মাথা গোঁজার স্থান জুটিয়ে নিয়েছে। সেখানে বেশ্যাদেরও নিয়মিত আনাগোনা আছে। ভাস্কো সেখানকার অধ্যক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আগামী তিনদিনের মধ্যে অবাঞ্ছিত লোকদের তাড়িয়ে হাসপাতাল খালি করতে হবে। আর রাস্তায় মারপিট করে আহত অবস্থায় কেউ এলে সরকারি খরচে তার চিকিৎসা চলবে না। আসলে মদ খেয়ে নাবিকদের মধ্যে রাস্তায় মারপিট করা প্রায় নিত্য-দিনের ঘটনা এখানে। উশৃঙ্খলতাই যেন গোয়ার জনজীবনের প্রধান অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ভাস্কোকে এগুলো বন্ধ করতে হবে। এদেশের স্থানীয় পরিবেশকে অবশ্য এ-ব্যাপারে দোষ দেওয়া যায় না। রোগটা অবশ্য এসেছিল পর্তুগাল থেকেই। এদেশে এ পর্যন্ত তিরিশ হাজার পুরুষ এসেছে পর্তুগাল থেকে। তার মধ্যে মাত্র দশ হাজার ফিরে গেছে পর্তুগালে। বাকি কুড়ি হাজার এদেশেই রয়েছে অথবা মারা পড়েছে যৌনরোগে বা নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায়। পর্তুগাল থেকে যে-মানুষগুলোকে এদেশে আনা হয়েছিল তাদের মধ্যে সিংহভাগই ছিল পর্তুগাল সমাজে অতি নিম্নশ্রেণির মানুষ অথবা ভারতে আসার শর্তে মুক্তি পাওয়া জেলবন্দি চোর-বদমাশ-খুনেদের দল। এদেশে এসে ভাইসরয়দের দুর্বল শাসনের সুযোগ নিয়ে উদ্দাম উচ্ছৃঙ্খলতায় মেতে উঠেছে লোকগুলো। সরকারি সম্পত্তি চুরি, মদ-জুয়া আর অবশ্য অবশ্য ভাবে নারীসঙ্গ ছাড়া আর কোনও কাজ নেই তাদের। বেশ্যালয়ে যাওয়া-আসা তো আছেই, যাদের একটু পয়সা আছে তারা এক-একজন চার-পাঁচজন করে উপপত্নী রেখেছে। তবে উপপত্নীরা কেউ পর্তুগিজ নয়। পর্তুগিজ মেয়েদের চরিত্র তাদের পুরুষদের থেকে একদম উল্টো। পর্তুগিজ পুরুষদের যেমন ঘরের প্রতি দেশের প্রতি কোনও টান থাকে না, তেমনই আবার পর্তুগিজ নারীরা ঘরকুনো। এত দূর দেশে আসার কোনও প্রশ্নই নেই তাদের।

এদেশে পর্তুগিজরা যাদের উপপত্নী রাখে তার অধিকাংশই স্থানীয় নারী অথবা আফ্রিকান। রাস্তায় চলতে চলতে যেসব শিশুদের ভাস্কো ভিক্ষা করতে দেখছেন অথবা যেসব কিশোর-কিশোরীদের দোকান-বাজারে কাজ করতে দেখছেন তাদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, তারা সঙ্কর গোত্রের। স্থানীয় নারীদের গর্ভে পর্তুগিজ ঔরসে তাদের জন্ম। পর্তুগিজদের লাগামহীন যৌনক্ষুধা-কামেচ্ছা ইতিমধ্যেই এদেশে বেশ কয়েকটা সঙ্কর প্রজন্ম সৃষ্টি করেছে। পর্তুগিজ ঔরসে জন্ম বলে পর্তুগিজদের বদগুণগুলো এদের মধ্যে যথেষ্ট সঞ্চারিত হয়েছে। এই সঙ্কর গোত্রের ছেলেমেয়েরাও ইতিমধ্যে ছোটখাটো চুরি-ছিনতাইয়ে হাত পাকাতে শুরু করেছে। ব্যাপারটা যদিও মোটেও ভালো না তবে এদের দেখে একটা কথা মনে হয়েছে। হয়তো বা কালের নিয়মে একদিন পর্তুগিজদের এদেশ থেকে চলে যেতে হবে। কিন্তু এই সঙ্কর জাতের মানুষগুলো গোয়ার মাটিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলবে পর্তুগিজ রক্তের ধারা।

ভাস্কো পৌঁছে গেলেন তাঁর আস্তানায়। এখনও ভাইসরয়ের জন্য নির্দিষ্ট বিশাল বাড়িটাতে পা রাখেননি ভাস্কো। সমুদ্রতীরবর্তী সাদা রঙের এই ছোট্ট বাড়িটাকেই মাথা গোঁজার স্থান হিসাবে বেছে নিয়েছেন। থামওয়ালা টানা বারান্দাতে বসলে অনেকটা সমুদ্র দেখা যায়। সমুদ্রের বাতাস আর নারকেলগাছের ছায়াঘেরা বাড়ির পরিবেশটা বেশ নিরিবিলি। শান্তিতে কাজ করার সুবিধা। প্রতিদিন মাঝরাত অব্দি নানা দলিল- দস্তাবেজ ঘাঁটতে হচ্ছে ভাস্কোকে। বিভিন্ন ধরনের দলিল। সরকারি বিভিন্ন হিসেব থেকে শুরু করে, নানান রসিদ, এমনকী পর্তুগিজ জাহাজগুলোর দিনলিপির খাতা বা লগবুক পর্যন্ত। এ কাজটা অবশ্য একটু ভালোই লাগে ভাস্কোর। তাঁর দ্বিতীয় অভিযান শেষ করে পর্তুগালে ফিরে যাবার পর এদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে যে দলিল দস্তাবেজ বা তার অনুলিপি পর্তুগালে পাঠানো হত তা রাজার অনুমতি নিয়ে মহাফেজখানায় গিয়ে নিয়মিতভাবে দেখতেন ভাস্কো। এদেশের প্রতি আকর্ষণ তাঁর কোনও দিনই কমেনি। এবার এদেশে আসার সময় তিনি তাঁর দ্বিতীয় অভিযানের সময়কার বেশ কিছু দলিল- দস্তাবেজও সঙ্গে করে এনেছেন। বাড়িতে বসে খাওয়া সেরে সরকারি গুদামের হিসাবের খাতা নিয়ে দুপুরবেলা কাজ করতে বসলেন ভাস্কো। খাতাটা দেখা শুরু করতেই ভাস্কো বুঝতে পারলেন, ছত্রে ছত্রে গরমিল আছে তার হিসেব। সর্বত্রই খালি চুরি করা হয়েছে। খাতার সে জায়গাগুলো লাল কালি দিয়ে দাগাতে লাগলেন তিনি। যখন কাজ শেষ হল তখন সূর্য ডুবতে শুরু করেছে সমুদ্রের বুকে। তার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রের জলে। দলিল দস্তাবেজের ফিতে বাঁধতে বাঁধতে ভাস্কো তাকালেন সেদিকে। আর তখনই তিনি দেখতে পেলেন দূর থেকে একটা জাহাজ যেন তীরের দিকে এগিয়ে আসছে। পাশে রাখা আতসকাচ লাগানো পিতলের নলটা উঁচিয়ে ধরে চোখে লাগালেন তিনি। অমনি জাহাজটা কাছে এগিয়ে এল। মাঝারি আকারের একটা পর্তুগিজ রণপোত। তার মাথায় উড়ছে পর্তুগিজ পতাকা।

জাহাজটা চিনতে পারলেন ভাস্কো। দূরবিনটা নামিয়ে রেখে ভাস্কো মনে মনে ভাবলেন, 'এস্তাদিও ছোকরাটাকে নিয়ে কোহেলো তবে ফিরে আসছে।'

তবে এস্তাদিও ফিরতে এত দেরি করল কেন তা বোধগম্য হচ্ছে না ভাস্কোর। বণিক দিয়াগো যখন ভাস্কোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিল তখনই সে জানিয়েছিল, সে শুনে এসেছে যে এস্তাদিও নামের এক পর্তুগিজের জাহাজ নোঙর করেছে তমালিকা বন্দরে। তার মানে এস্তাদিও ভাস্কোর নির্দেশমতো সঠিক সময়ই তমালিকা বন্দরে পৌঁছেছিল। এস্তাদিওর ওই অঞ্চল সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করতে এত দেরি হল কেন তা তার মুখ থেকেই শোনা যাবে—মনে মনে ভাবলেন ভাস্কো। ইতিমধ্যে অবশ্য নদীর মোহনায় ওই অঞ্চল সম্বন্ধে বেশ কিছু খুঁটিনাটি তথ্য বণিক দিয়াগোর মাধ্যমে পেয়েছেন ভাস্কো। এস্তাদিওর কাছ থেকেও নিশ্চিতভাবে আরও তথ্য পাওয়া যাবে। এখন পর্যন্ত ভাস্কো যতটুকু শুনেছেন তমালিকা বন্দর সম্পর্কে তাতে তিনি জেনেছেন ক্ষয়িষ্ণুতমালিকা বন্দর বেশ শান্ত অঞ্চল। ভাস্কো ভেবে রেখেছেন, তেমন হলে স্থানীয় জমিদারের থেকে অনুমতি নিয়ে একটা বড় বাণিজ্যকুঠি সেখানে তিনি বানিয়ে রাখবেন। আর সে কাজের দায়িত্ব তিনি এস্তাদিওকেই দেবেন। নামে বাণিজ্যকুঠি হলেও সেটা আসলে হবে ছোটখাটো একটা দুর্গ আর পালানোর পথ। দৈবাৎ যদি গোয়াতে কোনও দিন দুর্যোগ নেমে আসে তখন যাতে সেখানে আশ্রয় নেওয়া যায় আর প্রয়োজনবোধে সেখান থেকে পর্তুগালের দিকে যাত্রা শুরু করা যায় তার সব ব্যবস্থা সেই বাণিজ্যকুঠিতে করা থাকবে। এদেশে শেষবারের অভিজ্ঞতা থেকে এবার বেশ সাবধানী ভাস্কো। আর একটু হলেই গতবার আরব নৌবহরের হাতে মৃত্যু হতে পারত তাঁর। তাই এবার নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে বেশ সাবধানী অ্যাডমিরাল।

বারান্দা থেকে উঠে পড়লেন অ্যাডমিরাল। নিজের শয়ন কক্ষে সাময়িক বিশ্রাম নিতে যাবার আগে খাসভৃত্যকে তিনি নির্দেশ দিয়ে গেলেন যদি কেউ আসে তবে যেন তাঁকে ডেকে দেওয়া হয়।

ডাক এল সন্ধ্যা নামার অনেক পরে। ভাস্কো তখন নিজের ঘরেই দ্বিতীয় দফার কাজ শুরু করার জন্য কাগজপত্র নিয়ে বসতে যাচ্ছিলেন। ভৃত্য এসে জানাল যে, ক্যাপ্টেন কোহেলো তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। খবরটা শুনে বাইরে বেরিয়ে এলেন গামা। কোহেলো তাঁকে দেখে টুপি খুলে অভিবাদন জানিয়ে বলল, 'সন্ধ্যাবেলায় ফিরেছি। আর বন্দর থেকে সোজা চলে এলাম আপনাকে বিরক্ত করতে। আমাকে মার্জনা করবেন অ্যাডমিরাল।'

ভাস্কো নিজের গদি আঁটা আসনে বসতে বসতে কোহেলোর উদ্দেশ্যে বললেন, 'জাহাজটা আসতে দেখেছিলাম। না, আমি বিরক্ত হইনি। বরং তোমাদের প্রতীক্ষাই করছিলাম।'

কথাগুলো বলে ইশারায় কোহেলোকে সামনের আসনটায় বসতে বললেন ভাস্কো। ভাস্কো তাকে বসতে বললেন বটে কিন্তু কোহেলো বসল না। ভাস্কোকে ধন্যবাদ জানিয়ে সম্মান প্রদর্শনের জন্য টুপি-বগলে দাঁড়িয়ে রইল। ভাস্কো মনে মনে খুশিই হলেন এ ব্যাপারটাতে। এই কোহেলো বলে লোকটা একসময় জলদস্যু সর্দার ছিল। জীবনে বহু নরহত্যা লুঠতরাজ করেছে। ভাস্কো তার শাস্তি মকুব করার পর ভাস্কোর প্রতি চরম আনুগত্য প্রকাশ করে লোকটা। ভাস্কোর কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। ইতিমধ্যে ভাস্কোর আস্থাও অর্জন করে ফেলেছে সে। এদেশে এই তিনবারের অভিযানে বহু দাগী অপরাধীকে নিজের সঙ্গী করেছেন ভাস্কো। কিন্তু তাদের কাউকেই কোনও দিন বিশ্বাস করে কোনও বড় দায়িত্ব দেননি। ব্যতিক্রম এই ভূতপূর্ব জলদস্যু সর্দার কোহেলো। তাকে তিনি একটা রণপোতের ক্যাপ্টেন বানিয়েছেন। এ লোকটা যদি ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করে চলে তবে ভবিষ্যতে তাকে আরও বড় দায়িত্ব দেবার ইচ্ছা আছে ভাস্কোর। এই উপনিবেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে কোহেলোর মতোই কিছু কঠিন লোকের প্রয়োজন ভাস্কোর; যারা অক্ষরে অক্ষরে নতুন ভাইসরয়ের নির্দেশ মেনে চলবে। এবং ভাইসরয়ের প্রয়োজনবোধে তাঁর নির্দেশক্রমে চরম নৃশংস হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। ভাস্কো কোহেলোকে জিগ্যেস করলেন, 'এস্তাদিও কোথায়? সে কি তোমার জাহাজেই এসেছে? নাকি তোমাদের পিছনে তাঁর নিজের বাণিজ্যপোত নিয়ে আসছে?'

কোহেলো জবাব দিল 'না, তিনি আমার জাহাজেও আসেননি। পিছনের জাহাজেও আসছেন না।'

ভাস্কো কথাটা শুনে বিস্মিতভাবে বললেন, 'কেন? আমার নির্দেশ কি তার কাছে পৌঁছোয়নি? নাকি সে অসুস্থ?'

কোহেলো জবাব দিল, 'আপনার নির্দেশ তাঁর কাছে পৌঁছেছে। এবং তিনি অসুস্থও নন।'

'তার মানে? তবে ঘটনাটা কী?' উত্তেজিত হয়ে জানতে চাইলেন ভাস্কো।

কোহেলো বলল, 'বণিক এস্তাদিও আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না এলেও তাঁর জাহাজের ক্যাপ্টেন পেরো আর জাহাজের চিকিৎসক ফ্রান্সিস নামের একটা লোক আমার কাছে এসেছিলেন সাক্ষাৎ করতে ও পরামর্শ করতে।'

ভাস্কো জানতে চাইলেন, 'কী বলল তারা?'

কোহেলো এরপর বেশ কিছু সময় ধরে ভাস্কোকে বিবৃত করল তাদের সঙ্গে কোহেলোর কথোপকথন। খবরটা শুনে বেশ আশ্চর্য হয়ে গেলেন ভাস্কো। এস্তাদিও তাঁর দুঃসর্ম্পকে আত্মীয় হয়। সেই সুবাদে প্রায় এস্তাদিওর ছেলেবেলা থেকেই ভাস্কোর পরিচিত। তাকে স্নেহও করেন তিনি। পর্তুগিজদের শরীরে যৌনক্ষুধা একটু বেশি ঠিকই, কিন্তু এস্তাদিওকে ছেলেবেলা থেকে চেনার সুবাদে ভাস্কো এতদিন জেনে এসেছিলেন যে, অন্য পর্তুগিজ নাবিকদের থেকে এস্তাদিওর চরিত্র ভিন্ন প্রকৃতির। নারীদেহের প্রতি এস্তাদিওর কোনও আসক্তি নেই। বেশ্যা সঙ্গ তো অনেক দূরের ব্যাপার। যে কারণে এস্তাদিও একটু নরম স্বভাবের হলেও ভাস্কোর প্রিয় পাত্র ছিল সে। ভাস্কো ভরসা করেছিলেন তার ওপর। আর সেই এস্তাদিও কিনা সামান্য একজন বন্দরবেশ্যার জন্য স্বয়ং ভাস্কোর আদেশও অমান্য করতে দ্বিধা করছেনা! এর পিছনে অন্য কোনও কারণ নেই তো? এ প্রশ্নটা নিয়ে ভাবতে লাগলেন ভাস্কো। একসময় সে-প্রশ্নর উত্তর খোঁজার জন্য এক সময় ভাস্কো, কোহেলোকে প্রশ্ন করলেন, 'আর কিছু? আর কিছু তোমাকে বলেছে সান্টা মারিয়ার ক্যাপ্টেন?'

কোহেলো মাথা চুলকে বলল, 'না, আর তেমন কিছু নয়। তবে একটা জিনিস তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় ভেবে আপনাকে বলিনি। তা হল ক্যাপ্টেন পেরো বলছিল যে, বণিক এস্তাদিও আর বেশ্যা মৎস্যগন্ধা নাকি একটা প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ থেকে একটা সিন্দুক উদ্ধার করে গণিকালয়ে এনে রেখেছে।'

'সিন্দুক, কীসের সিন্দুক?' সোজা হয়ে বসলেন অ্যাডমিরাল।

কোহেলো বলল, 'তা ক্যাপ্টেনও বলতে পারেনি। তবে সিন্দুকটা নাকি বেশ ভারী। খচ্চরের পিঠে বহন করে গণিকালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটা প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ আছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী থাকত সেখানে। সেই অতিবৃদ্ধ সিংহলে ফিরে যাবার পর বণিক এস্তাদিও আর গণিকা রাতের অন্ধকারে পরিত্যক্ত মঠ থেকে সেই সিন্দুক উদ্ধার করে আনে। এটুকু কথাই শুধু আমাকে জানিয়েছেন ক্যাপ্টেন পেরো।'

কোহেলোর বলা এস্তাদিওর সিন্দুক উদ্ধারের কথাটা এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল ভাস্কোর মনে। তাঁর যেন মনে হতে লাগল, কী একটা ব্যাপার যেন তিনি মনে করেও করতে পারছেন না, বুঝে উঠেও বুঝে উঠতে পারছেন না। তবে একটা কথা ভাস্কোর মনে হতে লাগল, যে-ব্যাপারটা তিনি মনে করেও ঠিক মনে করতে পারছেন না, সে ব্যাপারটা যেন তার গতবারের ভারত অভিযানের সঙ্গে যুক্ত। বারবণিতার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে এস্তাদিওর ভাস্কোর নির্দেশ অমান্য করার ঘটনার চেষ্টার থেকেও এস্তাদিওর সিন্দুক উদ্ধারের ঘটনাটা ভাস্কোর মনে বেশি আলোড়ন তৈরি করল। এবং ব্যাপারটা যে কী তা বুঝেও বুঝে উঠতে না পেরে একটা অস্বস্তিবোধ কাজ করতে লাগল ভাস্কোর মনে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি কোহেলোকে বললেন, 'তুমি এখন যাও। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছ, বিশ্রাম নাও। প্রয়োজন হলে তোমাকে ডেকে পাঠাব।'

কোহেলো বলল, 'আমি জাহাজেই রাত্রিবাস করব।'—কথাটা বলে মাথা ঝুঁকিয়ে ভাস্কোকে অভিবাদন জানিয়ে চলে গেল কোহেলো। সে চলে যাবার পর ভাস্কো তাঁর খাস ভৃত্যকে বললেন, 'আমার ঘরে একটা বড় মোমবাতি জ্বালিয়ে দাও। যতক্ষণ না আমি বলব ততক্ষণ যেন আমার ঘরে কেউ না ঢোকে, আমাকে বিরক্ত না করে। এমনকী রাতের খাবার দেবার জন্যেও না ডাকে।'

ভাস্কোর নির্দেশ পালিত হল। তাঁর শয়নকক্ষে টেবিলের ওপর একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে গেল ভৃত্য। ভাস্কো সে ঘরে প্রথমে দরজাতে খিল দিলেন। শয়নকক্ষেরই একপাশের দেওয়ালের গায়ের খোপে সার সার রাখা আছে নানা নথি, জাহাজের লগবুক, সেখানে ধরা আছে ভাস্কোর ইতিপূর্বে ভারত অভিযানের সময়কার নানা তথ্য। ভাস্কো তাক থেকে সেসব নামিয়ে রাখলেন টেবিলে। তারপর সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলেন। খোলা জানলা দিয়ে সমুদ্রর বাতাস প্রবেশ করছে ঘরে। মোমবাতির শিখাটা মাঝে মাঝে কাঁপছে। তার আলোতে নথিগুলোর পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে চললেন ভাস্কো। রাত বেড়ে চলল।

এক সময় তাঁর হাতে উঠে এল এস্তাভাওর জাহাজের লগবুকটা । সেখানে স্বয়ম্ভুনাথের জাহাজ ধ্বংসের ব্যাপারটার বিবরণ লেখা আছে ঘটনার শুরু থেকেই। অর্থাৎ গণিকা নারীদের নিয়ে স্বয়ম্ভুনাথের এস্তাভাও-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ, তাঁর পালানো থেকে শুরু করে তাঁর ময়ূরপঙ্খি ধ্বংস করার ঘটনা পর্যন্ত। একথাও সেখানে লেখা আছে যে পরদিন সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজটার আশেপাশে অনেক মৃতদেহ ভেসে থাকতে দেখা গেলেও তার মধ্যে স্বয়ম্ভুনাথের মৃতদেহ ছিল না। সমুদ্রের সেই অংশের জল স্থির ছিল। তাই মৃতদেহগুলো জাহাজটার থেকে বেশি দূরে যেতে পারেনি।

সমকালীন 'ডি কোস্টা' নামের একটা জাহাজের লগবুক থেকে ভাস্কো এরপর জানতে পারলেন, যে-রাত্রে স্বয়ম্ভুনাথের ময়ূরপঙ্খিকে ডোবানো হয় তার পরদিন পর্তুগিজ পণ্যবাহী জাহাজের সঙ্গে একটা ছোট জাহাজের সাক্ষাৎ হয়। সে জাহাজে কিছু বৌদ্ধধর্মাবলম্বী মানুষ ছিল। তারা নাকি তমালিকা বন্দরে ফিরছিল!

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সেখান থেকে সংগ্রহ করলেন। সেটা অবশ্য জাহাজের লগবুক ঘেঁটে নয়, এদেশ থেকে পর্তুগালে পাঠানো একটা রিপোর্ট সেটা। কালিকট বন্দর থেকে শেষবার ভাস্কোকে পালাতে হয়েছিল ঠিকই কিন্তু কন্নোরে তিনি কয়েকজন অনুচর ছেড়ে গেছিলেন। সামোরিনের শত্রু কন্নোররজ, রাজনৈতিক কারণেই শত্রুশিবিরের খবর রাখার চেষ্টা করতেন। তাঁর মাধ্যমেই রিপোর্টটা পৌঁছেছিল পর্তুগালে। সে রিপোর্টে নানা কথার মধ্যে লেখা আছে যে, ভাস্কো চলে যাবার পর কালিকট শান্ত হলে সামোরিনের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তি টাঙানো হয় বন্দরে। তাতে বলা হয় 'মৃচ্ছকটিক গণিকাপোতের মালিক স্বয়ম্ভুনাথের সন্ধান কেউ দিতে পারলে তাকে একশো স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেওয়া হবে।' খোলা জানলা দিয়ে আসা সমুদ্র-বাতাসে মোমবাতির শিখাটা মৃদু মৃদু কাঁপছে। যে-তথ্যগুলো দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে সংগ্রহ করলেন এতক্ষণ, তার ওপর ভিত্তি করে অতীতের ছেঁড়া সুতোগুলো নতুন করে গাঁথবার চেষ্টা করতে লাগলেন ভাস্কো।

সামোরিন হঠাৎ স্বয়ম্ভুনাথের খোঁজে বিজ্ঞাপন দিতে গেলেন কেন? এমন হয়নি তো যে, সামোরিনই ওই সিন্দুক স্বয়ম্ভুনাথকে দিয়েছিলেন? স্বয়ম্ভুনাথের জাহাজ-ডুবি হলেও এটা তো হতেই পারে যে, রাত্রির অন্ধকারে তিনি ওই সিন্দুকসমেত পালিয়ে ছিলেন এবং ওই বৌদ্ধ জাহাজে সেটা পৌঁছে দিয়েছিলেন, যা নিয়ে বৌদ্ধরা চলে যায় তমালিকা বন্দরে। সারারাত ভাবার পর ভাস্কো এমনই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন। আর যদি এমন না-ও হয়ে থাকে তবুও ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে ক্ষতি কী? কী আছে ওই সিন্দুকে? সোনা? নাকি কোনও গোপন দলিল দস্তাবেজ?

রাত্রিশেষে একসময় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন ভাস্কো। ব্যাপারটা তাঁকে তদন্ত করে দেখতে হবে। সকাল হতে না হতেই তিনি লোক পাঠালেন কোহেলোকে ডেকে পাঠাবার জন্য।

ভাস্কোর ডাক পেয়ে যথাসম্ভব দ্রুত হাজির হয়ে গেল কোহেলো। ভাস্কো তাকে বললেন, 'কালই আবার তোমাকে রওনা হতে হবে তমালিকা বন্দরের দিকে। গ্রেপ্তার করে আনতে হবে এস্তাদিওকে। তবে কৌশলে। এ নিয়ে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কোনও বিবাদে যাওয়া চলবে না। কারণ ওই অঞ্চলে আমার একটা বাণিজ্যকুঠি নির্মাণের ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে বিবাদ উপস্থিত হলে সে কাজ ব্যাহত হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এস্তাদিওদের কাছে যে-সিন্দুক আছে সেটা উদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে তোমাকে। তার জন্য যা করার তা করবে। তবে সবটাই কৌশলে। প্রয়োজনে সান্টা মারিয়ার ক্যাপ্টেন আর বণিক দিয়াগোর সাহায্য নেবে তুমি। সিন্দুকটা যদি উদ্ধার করতে পারো তবে সেটা খুলবে না। তার ভিতরে কী আছে তা কাউকে দেখতে দেবে না। কাপড়ে মুড়ে গালা দিয়ে মোহর করে সেটা আমার কাছে নিয়ে আসবে। ভাবতে পারো এ-কাজের দায়িত্ব তোমাকে দিয়ে তোমার একটা পরীক্ষা নিচ্ছি আমি। কাজটা যদি ঠিকভাবে তুমি করতে পারো তবে তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আর কোনওদিন চিন্তা করতে হবে না তোমাকে।'

ভাস্কোর নির্দেশ শুনে কোহেলো বলল, 'আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব আপনার নির্দেশ পালন করার।

ভাস্কো এরপর খাজাঞ্চিকে ডেকে কোহেলোকে তার সমুদ্রযাত্রার খরচ দিয়ে দিতে বললেন। পরদিন ভোরবেলা কোহেলো তার রণপোত নিয়ে গোয়া ছেড়ে সমুদ্রে ভাসল তমালিকার উদ্দেশ্যে।

১৬

রানির মৃত্যুর পর প্রায় একমাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে। তার মৃত্যশোকে বেশ কিছুটা কাটিয়ে উঠেছে মৎস্যগন্ধা। এবং তা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রতিনিয়ত তাকে সঙ্গ দিয়েছে এস্তাদিও। যৌনতা নয়, প্রতিনিয়ত সে মৎস্যগন্ধাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছে যা ঘটবার তা ঘটে গেছে। আর তারা দুজনে তো নতুন জীবন তৈরি করতে চলেছে। এটা ঠিকই যে রানির মৃত্যু মৎস্যগন্ধার জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু শোক আঁকড়ে ধরলে তো মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। জীবনে দুঃখ আছে, কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। এগিয়ে চলার নামই জীবন। আর মৎস্যগন্ধা মোটেই একা নয়। এস্তাদিও তার সঙ্গে আছে। আমৃত্যু সে তার সঙ্গে থাকবে। যে কারণে ভবিষ্যত জীবনের ঝুঁকি নিয়েও সে অগ্রাহ্য করেছে স্বয়ং ভাস্কোর নির্দেশ। জীবনে-মরণে মৎস্যগন্ধার সঙ্গী এস্তাদিও। আর কিছুদিনের মধ্যেই তো সে মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে নতুন দেশে চলে যাবে। যেখানে তারা দুজন ঘর বাঁধবে। রানির মৃত্যুর পর মৎস্যগন্ধা সবার সঙ্গে কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। এমনকী এস্তাদিও যখন তার ঘরে আসত তখনও সে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত তার জানলার নীচে রানির কবরের দিকে। মর্মর সেই কবরের ওপর সমুদ্র-বাতাস পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেয়, রাতের চন্দ্রিমা স্নিগ্ধ আলো ছড়ায়, সমুদ্রের জল জোয়ারের সময় স্নান করিয়ে দিয়ে যায় রানির কবরকে। জানলায় বসে নিশ্চুপভাবে এসবই শুধু দেখত মৎস্যগন্ধা। তবে এস্তাদিওর প্রচেষ্টায় আবার সব কিছু স্বাভাবিক হতে চলেছে। বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকার পর গণিকালয়ের দরজা আবার খুলেছে, খদ্দেরের আনাগোনা আবার শুরু হয়েছে। অবশ্য খদ্দের সামলানো থেকে শুরু করে গণিকালয়ের মেয়েদের দেখভালের কাজ এখন শ্যামাই করছে। অত্যন্ত জরুরি কোনও বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন হলে তবেই সে মৎস্যগন্ধাকে বিরক্ত করে।

সেদিন বিকেলে এস্তাদিওর জন্য নিজের কক্ষে অপেক্ষা করছিল মৎস্যগন্ধা। আজ এস্তাদিওর এক বণিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারপর মৎস্যগন্ধার কাছে আসার কথা। সে বণিকের বেশ কয়েকটা জাহাজ আছে। রঘুপতি নামে সেই বণিক এক সময় মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের খদ্দের ছিল। লোকটা বৃদ্ধ হয়েছে এখন। আর সমুদ্রযাত্রায় যাবে না সে। জাহাজগুলো বেচে দিতে চায়। তারই একটা কেনার ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনা করতে যাওয়ার কথা এস্তাদিওর। নতুন জাহাজ আর তমালিকা বন্দরে বানানো হয় না। কারণ এই ক্ষয়িষ্ণুবন্দরে জাহাজ কেনার লোক আজকাল আর পাওয়া যায় না। যারা জাহাজ বানায় তারা চার-পাঁচ পুরুষ আগেই পাড়ি দিয়েছে সাতগাঁও বা চট্টগ্রামে। বাংলার প্রধান বন্দর তো এখন সেগুলোই। তাছাড়া নতুন জাহাজ বানাতে অন্তত চারমাস সময় লাগে। ততদিন আর এ-বন্দরে থাকতে রাজি নয় মৎস্যগন্ধা।

পালঙ্কে বসেছিল প্রতীক্ষারত মৎস্যগন্ধা। শ্যামা এসে প্রবেশ করল তার ঘরে। মৎস্যগন্ধা তাকে দেখে জানতে চাইল, 'কিছু বলবি?'

মৎস্যগন্ধার কথার জবাবে শ্যামা বলল, 'গত রাতে হংসরাজ এসেছিল আমার ঘরে।'

হংসরাজ, অর্থাৎ শ্যামার সেই নাগর।

কথাটা শুনে মৎস্যগন্ধা বলল, 'ও, তুই নাটক দেখতে যেতে চাস বুঝি?'

শ্যামা জবাব দিল, 'না।' তারপর হঠাৎ সে প্রশ্ন করল, 'আচ্ছা, পর্তুগিজরা নাকি ভালো লোক হয় না?'

প্রশ্নটা শুনে মৎস্যগন্ধা বেশ অবাক হয়ে গেল। কার ব্যাপারে আশঙ্কিত হয়ে প্রশ্নটা করছে তা অবশ্য বুঝতে অসুবিধা হল না মৎস্যগন্ধার। সে বলল, 'ভালো, খারাপ সব জাতের মানুষের মধ্যেই আছে। তোর মনে হঠাৎ এ-প্রশ্ন জাগল কেন? নাবিককে কি তোর খারাপ লোক বলে মনে হয়?'

শ্যামা বলল, 'আমার তো তাকে ভালো মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু হংসরাজের কাছ থেকে কাল একটা ব্যাপার শুনলাম।'

'কী শুনলি?' কৌতূহলের সঙ্গে জানতে চাইল মৎস্যগন্ধা।

শ্যামা বলল, 'জমিদারের সেরেস্তায় নাকি আলোচনা হচ্ছিল আপনার নাবিককে নিয়ে। সেখানে জমিদার ছিলেন, নগরপাল ছিল, শুল্ক দারোগা ছিল, আরও অনেকেই ছিল। হংসরাজ বলল, তারা নাবিকের এখানে এতদিন থাকা নিয়ে আলোচনা করছিল। তাদের ধারণা নাবিক নাকি শুধু আপনার জন্য নয়, আসলে অন্য কোনও মতলবে এ-বন্দরে পড়ে আছেন। আপনার কাছে যাওয়া-আসা নাকি শুধুমাত্র বাইরের লোককে ধোঁকা দেবার জন্য। শুল্ক দারোগা জমিদারকে বলেছে যে, নাবিক নাকি একদিন তার দপ্তরে গিয়ে নানা ব্যাপারে খোঁজখবর করছিল। বন্দরে কত জাহাজ আসে? কত আয় হয়? ইত্যাদি ব্যাপারে। আরও কয়েকজন স্থানীয় বণিকও নাকি একই ব্যাপার জানিয়েছে তাঁকে...

শ্যামার কথা শুনে মৎস্যগন্ধার মনে পড়ে গেল, এস্তাদিও যখন প্রথমবার তার কাছে এসেছিল তখনও এমন নানা প্রশ্ন করেছিল তাকে।

শ্যামা বলল, 'ব্যাপারটা নিয়ে জমিদার খুব চিন্তিত। কারণ পর্তুগিজরা নাকি এদেশের যে সবজায়গাতে গেছে সেখানেই স্থানীয় লোকদের সঙ্গে তাদের লড়াই-ঝগড়া হয়েছে। এদেশে তারা নাকি ইতিমধ্যে বেশ কিছু জায়গা দখল নিয়েছে, প্রচুর মানুষকে খুনও করেছে। আসলে এরা জলদস্যু। নেতার নাম ভাস্কো ডা গামা। সে নাকি ভয়ঙ্কর লোক। জমিদার ভয় পাচ্ছেন এই কারণে যে, হঠাৎ যদি পর্তুগিজরা এসে হামলা করে তখন কী হবে? তারা নাকি নারীদের ধরে নিয়ে যায়। ছোট ছোট ছেলেদের ধরে নিয়ে যায় বীভৎসভাবে। একটা সরু লম্বা শিক ছেলেদের হাতের তালু ফুটো করে তার মধ্যে ঢুকিয়ে একসঙ্গে গেঁথে তারপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। ক্রীতদাস হিসাবে তাদের দূরদেশে বিক্রি করার জন্য। সেরেস্তার কারো কারো ধারণা, এমনও হতে পারে যে, নাবিকের পিছনে নৌবহর আছে, তারা সমুদ্রে অপেক্ষা করছে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'আর কী আলোচনা হয়েছে?'

শ্যামা বলল, 'যতটুকু শুনলাম তাতে তারা হয়তো কথা বলবে নাবিকের সঙ্গে। হয়তো বা নাবিককে বন্দর ছেড়ে চলে যেতে বলবে।'

'আর কিছু জেনেছিস এ-ব্যাপারে?'

শ্যামা বলল, 'না, আর কিছু নয়।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'হংসরাজকে বলবি, এ ব্যাপারে আর কিছু শুনলে যেন সঙ্গে সঙ্গে তোকে জানায়। এর জন্য তাকে পয়সাও দেব আমি।'

শ্যামা হেসে বলল, 'না, তাকে পয়সা দেবার দরকার হবে বলে মনে হয় না। লোকটা আমাকে ভালোবাসে। আমি বললে সে কথা রাখবে। আমি তাকে বলে রাখব।

শ্যামা চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই মৎস্যগন্ধার কাছে এসে উপস্থিত হল এস্তাদিও। একেবারে ঘেমে নেয়ে এসেছে সে। পালঙ্কে বসে টুপি খোলার পর মৎস্যগন্ধা তাকে হাতপাখার বাতাস করতে করতে বলল, 'কী কথা হল বণিকের সঙ্গে?

এস্তাদিও বলল,'হ্যাঁ, সে আমাকে জাহাজ বিক্রি করতে রাজি। জাহাজটা ছোট হলেও বেশ শক্তপোক্ত। সমুদ্রযাত্রার উপযোগী। শুধুমাত্র একটা পাল নাকি একটু মেরামত করতে হবে। বৃদ্ধ বণিক শেষজীবনে এক রূপসিকে বিয়ে করেছে। তরুণী তার কাছে বায়না করেছে একটা হীরকখণ্ডের জন্য, যেটা সে কণ্ঠহারে পরবে। লোকটার টাকা চাই না। একটা হীরকখণ্ড চাই। লোকটাকে হীরে দিলেই সে জাহাজটার কাগজ আমার হাতে দিয়ে দেবে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'তুমি দ্রুত সব কাজ সেরে ফেলো। বিপদ অন্য দিক থেকেও আসতে পারে বলে মনে হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের তমালিকা বন্দর ছেড়ে চলে যাওয়া দরকার।'

এস্তাদিও বিস্ময়াভূত হয়ে জানতে চাইল, 'অন্য দিকের বিপদ মানে?'

মৎস্যগন্ধা, এস্তাদিওকে বলল শ্যামার মুখে সদ্য শোনা কথা গুলো।

খবরটা শুনে এস্তাদিও বলল, 'পেড্রো আমাকে কিছুদিন আগে বলেছিল বটে যে, শুল্ক বিভাগের একটা লোক নাকি আমার ব্যাপারে খোঁজখবর করছিল তার কাছে। এবার বুঝলাম ব্যাপারটা।'

এরপর একটু থেমে সে বলল, 'এবার বাকি রইল জাহাজের চালক আর নাবিকদের সংগ্রহ করার ব্যাপারটা। তাতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে বলে মনে হয় না। কর্মহীন, বেকার, ভবঘুরে, নাবিকের দল তো সব বন্দরেই ঘুরে বেড়ায়, এখান থেকে বেরিয়ে আমি সন্ধ্যাবেলায় তাদের আড্ডায় যাব।'

সব যদি ঠিক থাকে তবে হয়তো এ-বন্দর ছাড়তে এক সপ্তাহের বেশি দেরি হবে না?

মৎস্যগন্ধা জানতে চাইল, 'আমাকে নিয়ে কোন দিকে পাড়ি দেবে তুমি?'

খোলা জানলা দিয়ে বন্দরের দিকে তাকিয়ে এস্তাদিও বলল, 'যদিও এখনও তা নির্দিষ্টভাবে ঠিক করিনি। কিন্তু ভাবছি ভূমধ্যসাগরের দিকে কোনও দ্বীপে চলে যাব। নানা, ছোট ছোট দ্বীপ আছে ওদিকে। শান্ত, চারপাশে সমুদ্রঘেরা দ্বীপগুলো। স্থানীয় লোকজনও খুব নিরীহ প্রকৃতির। চাষবাস আর পশুপালন নিয়ে থাকে। কারও সঙ্গে কোনও বিবাদে যাব না। কোনও সময় যদি কোনও জাহাজ সেখানে ভেড়ে তবে তাদের মিষ্টি জল সংগ্রহ করে দেবার বিনিময়ে টাকাপয়সা নয়, কাপড় ইত্যাদি কিছু জিনিসপত্র পায়। তাতেই তারা খুশি। আমি একবার এমনই এক দ্বীপে মিষ্টি জল সংগ্রহের জন্য নেমেছিলাম। অলিভ আর নারকেলগাছে ঘেরা ছবির মতো সুন্দর দ্বীপ। সমুদ্রের ঊর্মিমালা এসে চুম্বন করে যায় তার সোনালি বালুতটকে। গাছে গাছে কত পাখি। স্থানীয় দ্বীপবাসীরা ছোট ছোট জেলে ডিঙি নিয়ে মাছ ধরে। আমার খুব ভালো লেগেছিল সেই দ্বীপটা। ইচ্ছা হলে সেখানেও যাওয়া যেতে পারে। আমি চিনতে পারব সে জায়গা।'

মৎস্যগন্ধা, এস্তাদিওর হাতদুটো জড়িয়ে ধরল। তার চোখে ভেসে উঠল তার স্বপ্নে দেখা সেই দ্বীপের ছবি। সেখানে সূর্যকিরণে উদ্ভাসিত সোনালি বালুতটে দাঁড়িয়ে আছে সে আর এস্তাদিও। মৎস্যগন্ধা বলে উঠল, 'যেন আমি এমন একটা দ্বীপের ছবি স্বপ্নে দেখেছি। তাহলে চলো আমরা সেখানেই যাই?'

এস্তাদিও বলল, 'তবে তাই হবে। ওর কাছাকাছি আরও বেশ কিছু ছোট ছোট দ্বীপ আছে। তেমন হলে ওখানে যাবার পর আশেপাশের কোনও দ্বীপেও বসতি গড়ে তুলতে পারি আমরা।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'হ্যাঁ, আমাদের কাছে যা অর্থ আছে তা দিয়ে অনায়াসে আমরা একটা দ্বীপ কিনতে পারি।'

এস্তাদিও বলল, 'কেনার দরকার নেই। এসব মালিকানাহীন দ্বীপ। শুধু দখল নিলেই হবে। সে-দ্বীপে বসতি স্থাপন করে দ্বীপের একটা নতুন নামকরণ করব।'

'কী নাম? জানতে চাইল, মৎস্যগন্ধা।

এস্তাদিও হেসে বলল, 'দ্বীপের নাম হবে ''মৎস্যগন্ধা''। দ্বীপের পাশ দিয়ে যখন কোনও জাহাজ ভেসে যাবে তারা তখন দূর থেকে দ্বীপটাকে দেখিয়ে বলবে, 'ওই দেখো, ওই দ্বীপের নাম হল ''মৎস্যগন্ধা''। কালের নিয়মে আমরা হয়তো একদিন থাকব না। কিন্তু দ্বীপের নামটা থেকে যাবে।'

এস্তাদিওর কথা শুনে মৎস্যগন্ধার খুব ভালো লাগলেও সে এস্তাদিওর মুখে আঙুল চাপা দিয়ে বলল, 'এখনই এসব মৃত্যুর কথা বোলোনা। আমার পুনর্জন্ম হতে চলেছে। তোমাকে নিয়ে আমার আরও হাজার বছর বাঁচার ইচ্ছে।'

এস্তাদিও হেসে ফেলল তার কথা শুনে। এ যেন তমালিকা বন্দরের গনিকালয়ের মালিকিণী মৎস্যগন্ধা নয়, যে প্রয়োজনবোধে রাস্তায় কোমর থেকে ছুরি খুলে ঝাঁপিয়ে পড়তেও পিছপা হয় না, যে অক্লেশে শায়েস্তা করতে পারে নাবিক-খদ্দেরদের। এ-মৎস্যগন্ধা যেন শিশুর মতো সরল এক মেয়ে। নিষ্পাপ এক নারী।

বেশ কিছুক্ষণ পরস্পরকে আলিঙ্গন করে সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে রইল তারা দুজন। আলো সরে আসতে লাগল বাইরে। একসময় এস্তাদিও বলল, 'আমাকে এবার উঠতে হবে। নাবিকদের মহল্লা হয়ে ঘরে ফিরতে হবে। নইলে দেরি হয়ে যাবে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'হ্যাঁ, যাও। তবে যাবার আগে হীরকখণ্ডটা নিয়ে যাও। সম্ভব হলে কালই সেই বনিকের কাছে গিয়ে তার বিনিময়ে জাহাজের দখল নাও। বলা যায় না মানুষের মন কখন ঘুরে যায়!'

এস্তাদিও বলল, 'হ্যাঁ, দাও।'

মৎস্যগন্ধা পালঙ্কের নীচে গিয়ে ঢুকল পেটিকা খুলে হীরকখণ্ড বের করে আনার জন্য। এস্তাদিও গিয়ে দাঁড়াল জানলার সামনে। বাইরে সূর্য ডুবে গেছে। অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। তারই মধ্যে বন্দরে নোঙর করা জাহাজ- নৌকাগুলোর ভিড়ে তার জাহাজটাকেও দেখতে পেল এস্তাদিও। সেদিন ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিসকে ফিরিয়ে দেবার পর থেকে তারা আর কেউ দেখা করতে আসেনি এস্তাদিওর সঙ্গে। আর এস্তাদিও-ও তাদের ব্যাপারে কোনও আগ্রহ দেখায়নি। মৎস্যগন্ধা একদিন বলছিল যে, সান্টা মারিয়ার নাবিকরাও নাকি আর এখন গণিকালয়ে আসে না। হয়তো বা ক্যাপ্টেনের নির্দেশেই তারা এখানে আসা বন্ধ করেছে। তবে একটা দিক থেকে সে ব্যাপারটা ভালোই। তাতে চরবৃত্তির সুযোগ কম। ক্যাপ্টেন পেরো নিশ্চই এস্তাদিওর খবরাখবর রাখার ব্যাপারে আগ্রহী। তার জাহাজটার দিকে তাকিয়ে এস্তাদিও ভাবল, জাহাজটা এখনও বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে কেন? তার জন্যই কি ক্যাপ্টেন এখনও সত্যি অপেক্ষা করছেন? নাকি এখনও তাদের বন্দর ত্যাগ না করার পিছনে অন্য কোনও কারণ আছে?'

সিন্দুক থেকে বেশ কয়েকটা হীরের টুকরো বের করে আনল মৎস্যগন্ধা। এস্তাদিও বলল, 'এতগুলো কী হবে?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'আরও কয়েকটা রেখে দাও। যদি হঠাৎ করে কোনও প্রয়োজন পড়ে তখন কাজে লাগবে।'

নাবিকরা মূল্যবান জিনিস লুকিয়ে রাখার জন্য নানারকম ফন্দিফিকির করে রাখে। এস্তাদিওর জামার ওপর হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঝুলের যে জামাটা চাপানো আছে তার বড় বড় বোতামগুলো আসলে ফাঁপা, মূল্যবান রত্ন লুকিয়ে রাখার জন্য। সেই বোতামগুলোর প্রতিটাতে একটা করে হীরের টুকরো ভরে নিল এস্তাদিও। তারপর মৎস্যগন্ধার কপালে চুমু খেয়ে কক্ষ ত্যাগ করল।

এস্তাদিও যখন পথে নামল তখন অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। বন্দর অঞ্চল ফাঁকা হতে শুরু করেছে। ঝাঁপ বন্ধ হতে শুরু হয়েছে গুদামঘরগুলোর। কিছুটা এগিয়ে নদীর পাড় বরাবর চলতে শুরু করল সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে জায়গাটাতে পৌঁছে গেল। তমালিকা বন্দরের সবচেয়ে ঘিঞ্জি আর নোংরা অঞ্চল এটা। ঢুকলেই নাকে পূতিগন্ধ লাগে। চারপাশে শুধু আবর্জনার স্তূপ এখানে। তমালিকা অঞ্চলের সবচেয়ে সহায়সম্বলহীন মানুষদের বসবাস এখানে। কর্মহীন নাবিক, মাতাল আর ভবঘুরের দল। নদী বরাবর গেছে সার সার খোপের মতো খোলার ঘর। দারিদ্র এতটাই যে অনেক ঘরের দরজা পর্যন্ত নেই। অবশ্য হয়তো বা তার দরকারও নেই। হয়তো সম্পত্তি বলতে কোনও ঘরে আছে খড়ের বিছানা। শুধু রাতে ঘুমোবার জন্যই এই ঘরগুলো ব্যবহার করা হয়। দিনেরবেলা এখানকার পুরুষরা কাজের আশায় সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে বন্দরে, যেভাবে বেশ্যারা দাঁড়িয়ে থাকে খদ্দেরদের আশায়। তবে এখানকার লোকগুলোর অবস্থা বেশ্যাদের থেকেও খারাপ। দৈবাৎ যদি কোনও কাজ মিলে যায় তবে দিনের শেষে তারা সেই টাকা দিয়ে মদ আর রুটি কেনে। এভাবেই তাদের খেয়ে না-খেয়ে দিন কেটে যায়। এসব নাবিকদেরই দরকার এস্তাদিওর। যাদের কোনও ঘরসংসার বা পিছুটান নেই। পয়সা দিলে যারা এস্তাদিওর সঙ্গে সমুদ্রে ভেসে পড়তে দ্বিধা করবে না।

অন্ধকার রাস্তায় কোথাও কুকুরের দল খাবারের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, গরু বা ষাঁড়েরা রাস্তা আটকে কোথাও শুয়ে জাবর কাটছে। খোলার ঘরগুলো অধিকাংশই অন্ধকারে ডুবে আছে। দু-একটা ঘরে হয়তো বা টিমটিমে বাতি জ্বলছে। এদেশের নাবিকদের মধ্যে তেঁতুলবিচি দিয়ে এক ধরনের জুয়া খেলা হয়, হয়তো তেমনই খেলা হচ্ছে সেখানে। এসবের পাশ কাটিয়ে এস্তাদিও উপস্থিত হল মহল্লার শেষপ্রান্তে বেশ বড় একটা কাঠের ঘরের সামনে। এখানে এস্তাদিও কখনও না এলেও স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর মুখ থেকে সে শুনেছে এই জায়গার কথা। বিরাট ঘরটার জানলার ভিতর থেকে আলো আর লোকজনের কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসছে। এস্তাদিও প্রবেশ করল ঘরটাতে। বেশ বড় একটা ঘর। অনেক লোক সেখানে বসে আছে মদের পাত্র নিয়ে। দু-একজন লোক আবার মাতাল হয়ে গড়াগড়িও দিচ্ছে মেঝেতে। এঘরে যারা বসে আছে তাদের পোশাক দেখলেই বোঝা যায়, তারা সমাজের নিম্নবর্ণের লোক। মাঝে মাঝে ঘরের একোণ-ওকোণ থেকে ভেসে আসছে মাল্লাসুলভ অশ্লীল গালিগালাজও। দরজার পাশেই এই নিকৃষ্ট পানশালার মালিক বসে আছে একটা কাঠের আসনে। তার চারপাশে থরে থরে রাখা নানা আকারের কাঠের তৈরি সস্তা মদের পিপে। কর্মচারীদের সে নানারকম নির্দেশ দিচ্ছে। এস্তাদিও সে-ঘরে প্রবেশ করতেই দোকান মালিক একটু বিস্মিত হয়ে গেল। সাধারণত ভদ্রজনের পদার্পণ ঘটে না তার এই শুঁড়িখানায়। ব্যাপারটা কী?'

এস্তাদিও সটান গিয়ে হাজির হল তার সামনে। তারপর প্রশ্ন করল, 'তোমার এখানে ভালো মদ আছে?'

লোকটা বলল, 'এখানে ভালো মদ তো থাকে না। কেনার লোক কই? হ্যাঁ, তবে অনেকদিন আগে এক ভিনদেশি নাবিক আমাকে কিছুটা দামি মদ দিয়েছিল। সেটা আমি আপনাকে দিতে পারি।'

এস্তাদিও বলল, 'হ্যাঁ, দাও।' কথাটা বলে একটা চকচকে রুপোর টাকা ঠক করে রাখল দোকানদারের সামনে। এতটা আশা করেনি দোকানদার। টাকাটা নিয়ে সে তার উঁচু আসনের নীচে হাত ঢুকিয়ে মদপূর্ণ একটা ছিপি-আঁটা কাচের বোতল বের করে তার সামনের কাঠের পাটাতনের ওপর রাখল।

এস্তাদিও বলল, 'সুরাপানের জন্য দুটো পাত্র আনো।'

দোকানির নির্দেশে দুটো পাত্রও চলে এল। রংচটা দুটো মাটির বাটি। মদ পরিবেশনের জন্য এর চেয়ে ভালো পাত্র তাদের কাছে আর নেই। অন্য যারা এখানে খাচ্ছে তারা সব মাটির ভাঁড়েই খাচ্ছে।

দুটো পাত্রে নিজের হাতেই মদ ঢালল এস্তাদিও। তারপর একটা পাত্র দোকানদারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, 'নাও। তুমিও পান করো।'

বেশ খুশি হল পানশালার মালিক। একে তো সে না চাইতেই একটা গোটা রুপোর টাকা পেয়েছে, তার ওপর আবার মদের ভাগও পাচ্ছে!

সুরাপূর্ণ বাটিটা হাতে নিয়ে এস্তাদিওকে ধন্যবাদ জানিয়ে পানশালার মালিক বলল, 'আমি কী আপনাকে কোনও সাহায্য করতে পারি?'

এস্তাদিও প্রশ্ন করল, 'তোমার এখানে কি কোনও নাখোদা আসে যে সমুদ্রে জাহাজ চালাতে পারে?'

পানশালার মালিক বলল, 'হ্যাঁ, একজন আছে। ওই যে ওই কোনায় বসে পান করছে। ওর নাম আব্বাস। একসময় ও বড় বড় জাহাজ নিয়ে জাভা, মরক্কো এমনকী মোম্বাসা বন্দর পর্যন্ত গেছে। তবে বেশ কয়েক বছর কোনও কাজ নেই।'

এস্তাদিও জানতে চাইল, 'ওর সঙ্গে কথা বলা যাবে?'

পানশালার মালিক বলল, 'হ্যাঁ, কথা বলুন।'

এস্তাদিও পানপাত্র আর সুরাপূর্ণ পাত্রটা নিয়ে হাজির হল ঘরের কোনায় বসে থাকা লোকটার সামনে। প্রায় বৃদ্ধ হতে চলেছে সেই লোকটা। তবে নাখোদা বা নাবিক যত বেশি বয়সি হয় ততই তাদের অভিজ্ঞতাও বেশি হয়। লোকটার মাথায় একটা ছেঁড়া জাহাজি টুপি আর পরনে লম্বা ঝুলের নোংরা পোশাক। তবে তার শিরাওঠা পেশিবহুল হাতগুলো যে এখনও সক্ষম তা দেখলে বোঝা যায়।

এস্তাদিও তার সামনে পাত্রটা নামিয়ে রেখে বসল। লোকটা একবার তাকাল এস্তাদিওর দিকে। তারপর চীনামাটির বাটিটা গলায় ঢেলে দিয়ে বলল, 'ফলের রসের তৈরি খাঁটি মদ বলে মনে হচ্ছে। কতদিন পর এ মদ খেলাম। শেষ এমন মদ খেয়েছিলাম মনে হয় মোম্বাসা বন্দরে বছর দশেক আগে।'

এস্তাদিও বলল, 'তুমি ভূমধ্যসাগরে জাহাজ চালিয়েছ?'

লোকটা হেসে বলল, 'তবে মোম্বাসা বন্দরে গেলাম কীভাবে?'

এস্তাদিও জানতে চাইল, 'এখন আর জাহাজে ওঠো না কেন তুমি?'

আব্বাস নামের প্রাক্তন নাখোদা বলল, 'এখন আর এ বন্দর থেকে তেমন জাহাজ ছাড়ে কই? আমি যে জাহাজের নাখোদা ছিলাম তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন আগে। অবশ্য কেউ কেউ আমাকে বড় নৌকাতে কাজ করার কথা বলেছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। যে একদিন বড় বড় জাহাজ নিয়ে দূর দেশে বন্দরে বন্দরে ঘুরে বেড়িয়েছে সে কিনা আজ কাপড়ের গাঁটরি পৌঁছে দিতে যাবে সাতগাঁ বন্দরে? যত বড় নৌকাই হোক, আসলে তো সেটা নৌকাই। আমি রাজি হইনি। নাখোদার পদমর্যাদার আত্মাভিমান ফুটে উঠল লোকটার গলাতে। এর পর সে তাকাতে লাগল মদপূর্ণ কাচপাত্রের দিকে। তা দেখে এস্তাদিও বলল, 'এটা তোমার জন্যই। নিঃসংকোচে পান করতে পারো।'

বোতলটা তুলে নিয়ে লোকটা সটান মদ ঢালল গলাতে। তারপর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলল, 'তুমি কে বলো তো? কোন দেশের লোক?'

এস্তাদিও বলল, 'আমি পর্তুগিজ বণিক এস্তাদিও। বেশ কিছুদিন তমালিকা বন্দরে আছি।'

ভূতপূর্ব নাখোদা তার পরিচয় পেয়ে সম্ভ্রমের সঙ্গে বলল, 'ও, আপনি সেই পর্তুগিজ বণিক! আপনার কথা শুনেছি। তবে আজ প্রথম দেখলাম।'

এস্তাদিও তাকে প্রশ্ন করল, 'তোমার সমুদ্রে আবার জাহাজ নিয়ে ভাসতে ইচ্ছা করে না?'

আব্বাস বলল, 'করে তো। আজও আমাকে সমুদ্র ডাকে। কিন্তু জাহাজ কই? কত দূর দূর দেশে আমি গেছি। এখন তো চোখ বন্ধ করে সেসব দিনগুলোর কথাই ভাবি।'

এস্তাদিও এবার বললে, 'শোনো আব্বাস। খুব দ্রুত আমি একটা ছোট জাহাজ নিয়ে ভূমধ্যসাগরে পাড়ি দেব। তুমি সে জাহাজের দায়িত্ব নেবে? মোটা টাকাও দেব তার জন্য।'

আব্বাস আবার কাচপাত্র থেকে সুরা ঢালতে যাচ্ছিল মুখে, কিন্তু এস্তাদিওর কথা শুনে তার হাত নেমে গেল। বিস্মিত ভাবে সে বলে উঠল, 'আপনি সত্যি বলছেন? মশকরা করছেন না তো? জাহাজ আর তার সঙ্গে টাকা পেলে এই আব্বাস পৃথিবীর যে কোনও জায়গায় যেতে পারে। তা আপনার জাহাজটা কই? চলুন, এখনই একবার দেখে আসি।' কথাগুলো বলে প্রচণ্ড উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়াল লোকটা।

এস্তাদিও তাকে বসতে বলে বলল, 'জাহাজটা বন্দরেই আছে। তবে এখনও আমার হস্তগত হয়নি। সম্ভবত কালই হয়ে যাবে। তারপর তোমাকে জাহাজ দেখাতে নিয়ে যাব। সামান্য কিছু মেরামতিও করতে হতে পারে। সে-কাজের তদারকিও তোমাকেই করতে হবে। আরও একটা বড় ব্যাপার আছে। জনা কুড়ি মতো নাবিকও তোমাকে সংগ্রহ করতে হবে। সে কাজ তুমি পারবে তো?'

আব্বাস বলল, 'নিশ্চই পারব। নিশ্চই পারব। কত নাবিক এখানে কাজের জন্য ঘুরে বেড়ায়। কাজের কথা শুনলে তারা বর্তে যাবে।'

এস্তাদিও হেসে বলল, 'ঠিক আছে। এই মুহূর্ত থেকেই তোমাকে আমি আমার জাহাজের নাখোদা বা ক্যাপ্টেন পদে বহাল করলাম।' কথাটা বলে এস্তাদিও উঠে দাঁড়িয়ে পোশাকের ভিতর থেকে একটা রেশমের থলি বার করে বাড়িয়ে দিল তার দিকে। বেশ কিছু টাকা আছে তাতে।

এস্তাদিও বলল, 'কাল সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর, তখন তুমি জাহাজঘাটায় আসবে। আমি তোমার সঙ্গে সেখানে দেখা করব।'

আব্বাসও উঠে দাঁড়াল। মাথার থেকে টুপি খুলে অভিবাদন জানিয়ে সে বলল, 'আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আর আমি আজ রাত থেকেই নাবিক সংগ্রহের কাজে নেমে পড়ছি। কাল সূর্য মাথার ঠিক ওপরে ওঠার অনেক আগেই আমি জাহাজঘাটায় উপস্থিত থাকব।'

এস্তাদিও এরপর শুঁড়িখানা ছেড়ে বাইরে যাবার জন্য দরজার দিকে তাকাল। ঠিক তখনই সে দেখতে পেল পেড্রো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে বিস্মিত হয়ে গেল এস্তাদিও। সে এখানে কেন? পেড্রোর সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়ে গেল। পেড্রোও বুঝতে পারল তার, তথাকথিত মনিব তাকে দেখেছেন। সে হাসি ফুটিয়ে তুলল তার মুখে। পানশালার মালিককে ধন্যবাদ জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল এস্তাদিও। পেড্রোকে প্রশ্ন করল 'তুমি এখানে?'

পেড্রো ভালোমানুষের মতো বলল, 'প্রভু যিশুর দয়ায় আর মাতা মেরির আশীর্বাদে আপনি আশ্রয় দেবার আগে আমি তো এই ভবঘুরে নাবিকদের আস্তানাতেই থাকতাম। এখানে এক পরিচিত বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। হঠাৎ দেখলাম আপনি এখানে এলেন। তাই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। যদি আপনি আমার সঙ্গে ঘরে ফেরেন।'

এস্তাদিও তার কথা বিশ্বাস করল। তারপর তাকে নিয়ে এগোল ঘরে ফেরার জন্য।

ঘরে ফিরে এল এস্তাদিও। তাকে খাবার পরিবেশন করার সময় পেড্রো জানতে চাইল। 'আপনি কী আবার বাইরে বেরোবেন?'

পেড্রোর কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে অসুবিধা হল না এস্তাদিওর। অন্যদিন সে মৎস্যগন্ধার কাছেই রাত কাটায়। তাই কথাটা জানতে চাইছে পেড্রো।

সে জবাব দিল 'না। ঘরেই থাকব। আজ সারা দিন অনেক পরিশ্রম গেছে।'

নৈশ আহার শেষ করে বিছানাতে শুয়ে পড়ল এস্তাদিও। কিছু সময়ের মধ্যেই ঘুম নেমে এল তার চোখে। পেড্রো কিন্তু ঘুমোল না। বাতি নিভিয়ে সে প্রতীক্ষা করতে লাগল কারও জন্য।

একসময় তার প্রতীক্ষার অবসান হল। রাত্রির প্রথম প্রহরে নদীর পাড় থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে আসার পরই দরজায় কে যেন মৃদু টোকা দিল। পরপর তিনবার। এটাই সংকেতধ্বনি। শব্দটা শোনামাত্রই পেড্রো উঠে গিয়ে নিঃশব্দে পাল্লা দুটো একটু ফাঁক করে তার মধ্যে দিয়ে গলা বের করল। তার সামনে অস্পষ্ট চাঁদের আলোতে কালো কাপড়ে নিজেকে মুড়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন। যদিও টুপি আর নাক পর্যন্ত কাপড়ে ঢাকা তার দেহ, তবুও তাকে চিনতে অসুবিধা হল না পেড্রোর। লোকটা সান্টা মারিয়া জাহাজের চিকিৎসক, ক্যাপ্টেন পেরোর বিশ্বস্ত অনুচর ফ্রান্সিস। মাঝে মাঝেই লোকটা এস্তাদিওর ব্যাপারে খবর নিতে আসে তার কাছে। তাকে দেখে পেড্রো চাপা স্বরে বলল, 'তিনি কিন্তু আজ ঘরেই আছেন।'

ফ্রান্সিস বলল, 'তাই নাকি! কোনও খবর আছে?'

পেড্রো বলল, 'আজ তিনি স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর কাছে গেছিলেন। আমি তাঁকে অনুসরণ করেছিলাম। সে ব্যবসায়ী নাকি তার জাহাজ বিক্রি করবে বলে শুনলাম। তা কেনার জন্যই সম্ভবত এস্তাদিও কথা বলতে গেছিলেন। কারণ, তারপর তিনি মৎস্যগন্ধার গণিকালয় হয়ে ভবঘুরে নাবিক-মাল্লাদের পানশালাতে গেছিলেন। সেখানে আব্বাস নামের এক আরব নাখোদার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলতে দেখেছি। আমার ধারণা তিনি জাহাজ কিনে তমালিকা বন্দর ত্যাগ করে অন্য কোনও বন্দরে চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।'

'ফ্রান্সিস জানতে চাইল, 'কোন বন্দরে?'

পেড্রো বলল, 'তা আমার জানা নেই। এবার আপনি যান, তিনি জেগে উঠতে পারেন।'

ফ্রান্সিস বলল, 'আচ্ছা। তবে নতুন কোনও খবর হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জানাবে।'

পেড্রো দরজা বন্ধ করে দেবার পর ফ্রান্সিস দ্রুত এগোল নদী পাড়ের দিকে। আজই একজন কোহেলোর অনুচর নৌকা নিয়ে এসে খবর দিয়ে গেছে, কোহেলো ফিরেছেন। ফ্রান্সিসের জন্য অপেক্ষা করছেন ক্যাপ্টেন পেরো। ফ্রান্সিস ফিরলেই তিনি তাকে নিয়ে রওনা হবেন ক্যাপ্টেন কোহেলোর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।

১৭

শেষপর্যন্ত দুটো হাতি ভাড়া করে আনতে হল এস্তাদিওকে। যদিও জায়গাটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে নদীবক্ষে, তবুও দীর্ঘদিন চড়াতে থাকার ফলে মকরবাহিনীর নীচের অংশটা বেশ কিছুটা গেঁথে আছে কাদার মধ্যে। হ্যাঁ, জাহাজটার নাম 'মকরবাহিনী'। এস্তাদিওকে, মৎস্যগন্ধা বলেছে এটা নাকি এক হিন্দু জলদেবীর নাম। দিন তিনেক আগেই জাহাজটা হস্তগত হয়েছে এস্তাদিওর। কোনও সমস্যা হয়নি। দুদিন ধরে কিছুটা মেরামত করা হয়েছে জাহাজটা। আরও কোনও কাজ আছে কিনা তা বোঝা যাবে জাহাজ জলে ভাসার পর। আর এইসব কাজেরই তদারকি করছে নাখোদা আব্বাস। লোকটা কর্মঠ। এস্তাদিও ভুল লোককে নির্বাচন করেনি।

সকালবেলা। বন্দর অঞ্চলে বেশ লোকজন আছে। যদিও জাহাজটা যে জায়গাতে আছে সেটা জাহাজঘাটার থেকে বেশ কিছুটা তফাতে। তবুও হাতিদুটো আসার সময় তাদের পিছু পিছু বেশ কিছু লোক হাজির হয়ে গেছে জাহাজটার কাছে। কর্মহীন ভবঘুরের দল আর কিছু বাচ্চাকাচ্চা। যাদের কোনও কাজ নেই। বন্দর এলাকায় ঘুরে ঘুরে নানা জিনিস দেখে বেড়ায় তারা।

জাহাজটার কাছেই দাঁড়িয়ে এস্তাদিও। আজ পেড্রোকেও সে সঙ্গে এনেছে। আব্বাসের নির্দেশে জাহাজের বিভিন্ন অংশে কাছি বাঁধা চলছে। সে নির্দেশ দিচ্ছে, 'বড় কাছিটা ফোরমাস্টের সঙ্গে বাঁধো। ক্যাপ্টেনের রশিটা একটু হালকা করো, দেখো, রশি টানতে গিয়ে জাহাজ হেলে না যায়'—ইত্যাদি ইত্যাদি।

একসময় রশি বাঁধার কাজ শেষ হল। হাতিদুটো টানতে শুরু করল জাহাজের রশি। আর দুপাশে মজুরেরা রশি ধরে রেখেছে যাতে জাহাজ কোনও দিকে হেলে না যায়। হাতিগুলো বেশ কয়েকবার হ্যাঁচকা টান দেবার পর দীর্ঘদিনের ঘুম ভেঙে প্রথমে কেঁপে উঠল জাহাজটা। তারপর মড়মড় করে নেমে গেল জলে। ভালো করে তাকে জলে ভাসাবার জন্য নদীর ভিতর বেশ আরও কিছুটা টেনে নিয়ে যাওয়া হল তাকে। এবার সত্যিই জলে ভাসল মকরবাহিনী। উল্লাসধ্বনি করে উঠল সবাই। আব্বাস জলের মধ্যে ভাসতে থাকা জাহাজটাকে এপাশ-ওপাশ থেকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বলল, 'সব ঠিকই আছে মনে হয়। খোলের গায়ে বা পাটাতনের জোড়ে যদি কোনও ছিদ্র থাকে তবে তা তামা আর আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবে। পালও সেলাই হচ্ছে, চিন্তার কোনও কারণ নেই।' আব্বাসের নির্দেশে কয়েকজন নাবিক এবার সাঁতরে উঠে পড়ল জাহাজে। জোয়ারের জলে যাতে জাহাজটা ভেসে না যায় সেজন্য জলে নোঙর ফেলে দিল তারা।

আব্বাস এরপর বলল, 'আমি এখন থেকে জাহাজেই থাকব। এমনকী রাতেও। যাত্রা শুরুর আগে খুঁটিনাটি নানা জিনিস পরীক্ষা করে নিতে হবে। আপনি রসদপত্তর জাহাজে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন। সেগুলো আমি তুলে নেব।'

এস্তাদিও বলল, 'ঠিক আছে, আমি এখন ফিরে যাই। ঘরে ফিরে আবার কাজে বেরোতে হবে।' কথাগুলো বলে পেড্রোকে নিয়ে নদীর পাড় বরাবর হাটতে শুরু করল বন্দরে ফেরার জন্য। চলতে চলতে পেড্রো এবার তাকে জিগ্যেস করল, 'জাহাজটা কিনলেন কেন? কোথায় যাবেন এ-জাহাজ নিয়ে?'

এস্তাদিও বলল, 'শোনো পেড্রো, তোমাকে এবার কথাটা জানাই। আমি মনস্থির করেছি, আমি আর পর্তুগালে ফিরব না। সে-দেশে আমার কেউ নেই। হয়তো বা অতি দ্রুত আমি এ-বন্দর ছেড়ে চলে যাব। আমার সঙ্গে থাকলে তোমার দেশে ফেরা হবে না। সান্টা মারিয়া এখনও বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো বা আমার জন্যই অপেক্ষা করে আছে তারা। তুমি তাদের কাছে চলে যাও। তাদের জানিয়ে দিও আমার জন্য তারা যেন অপেক্ষা না করে তোমাকে নিয়ে ফিরে যায়। তুমি এতদিন আমাকে সঙ্গ দিলে। ঘরে ফিরে তোমার প্রাপ্য বেতন আমি মিটিয়ে দিচ্ছি।'

তার কথা শুনে পেড্রো তার কণ্ঠে ছদ্ম দুঃখের ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল, 'ঠিক আছে, তবে তাই হবে। ভেবেছিলাম, আপনার সঙ্গেই সারাজীবন থাকব। কিন্তু তা আর হল না। আমি নিরুপায়। দীর্ঘদিন আমি দেশছাড়া, আমাকে দেশে ফিরতেই হবে।'

ঘরে ফিরে এল তারা দুজন। পেড্রোকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিল। কুম্ভীরাশ্রু মোচন করে এস্তাদিওর থেকে বিদায় নিয়ে পেড্রো এগোল বন্দরের দিকে।

পেড্রোর ইচ্ছা ছিল যে, নৌকা ধরে সান্টা মারিয়াতে গিয়ে উঠবে। কিন্তু তার আর প্রয়োজন হল না। যে দেখতে পেল নৌকা থেকে বন্দরে নামছেন ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস। সে তাড়াতাড়ি গিয়ে হাজির হল তাদের সামনে। ক্যাপ্টেন কোহেলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আগের রাতেই সান্টা মারিয়াতে ফিরেছে তারা। বণিক দিয়াগোও ছিলেন সেখানে। কোহেলো তাদের ভাস্কোর নির্দেশের কথা জানিয়েছিলেন। ধূর্ত জলদস্যু কোহেলো একটু বাড়িয়েই ক্যাপ্টেনকে বলেছে কথাগুলো। যাতে কাজটা করার জন্য চাপ তৈরি হয় ক্যাপ্টেনের মনে। তাদের কোহেলো বলেছে যে, এস্তাদিওকে যদি বন্দি করে গোয়াতে নিয়ে যাওয়া না যায়, বিশেষত, যদি ওই সিন্দুক উদ্ধার না করা যায়, তবে ক্যাপ্টেন পেরোদের পক্ষে পর্তুগালে ফেরার ব্যাপার তো দূরের কথা, ভবিষ্যতে এস্তাদিওকে সাহায্য করার অপরাধে সান্টা মারিয়ার সব নাবিকদের জাহাজের মাস্তুল থেকেও ঝুলিয়ে দেওয়া হতে পারে, যেমন ভাস্কোর নির্দেশে বহু মানুষকে ঝোলানো হয়েছে।

ব্যাপারটা শুনে বেশ ঘাবড়ে গেছেন ক্যাপ্টেন পেরো আর তার সঙ্গীরা। কীভাবে কাজটা সম্পন্ন করা যায় তা নিয়ে সারারাত ধরে উপায় খোঁজার চেষ্টা করেছেন দুজন মিলে। উপায় অবশ্য তেমন মেলেনি। আর তাই সকালবেলা তারা চলে এসেছেন পেড্রোর খোঁজে, যদি তার থেকে কোনও সংবাদ পাওয়া যায় আর তার থেকে যদি কোনও পথ বার করা যায় সেজন্য।

পেড্রোর কাঁধে তার বিছানাপত্তর দেখে অবাক হলেন ক্যাপ্টেন পেরো। জানতে চাইলেন, 'তুমি চললে কোথায়?'

পেড্রো জবাব দিল, 'আপনাদের জাহাজেই উঠতে যাচ্ছিলাম।'

ফ্রান্সিস বলল, 'কেন? এস্তাদিও কী তোমাকে তাড়িয়ে দিল?'

তার প্রশ্ন শুনে পেড্রো নদীর ধারে মাঝি-মাল্লাদের ঝড়-বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাবার জন্য যে ফাঁকা ছাউনিগুলো আছে সেগুলো দেখিয়ে বলল, 'চলুন, ওর নীচে বসে কথা বলা যাক।'

তিনজনে কোলাহল থেকে দূরে সরে গিয়ে ছাউনির নীচে বসল। পেড্রো খুলে বলল সব কথা। ক্যাপ্টেন শুনে প্রশ্ন করলেন, 'কবে সে এ-বন্দর ছাড়ছে, আর কোথায়ই বা যাচ্ছে?'

পেড্রো জবাব দিল, 'সম্ভবত খুব দ্রুত। কারণ যা বুঝলাম তাতে আজ-কালের মধ্যেই জাহাজে রসদ ওঠানো শুরু হবে।

কোথায় যাচ্ছেন তা তিনি আমাকে বলেননি। তবে নদীপথে গেলে তো বড় নৌকা হলেই চলতো। তাছাড়া বন্দর অঞ্চলে নাবিক মহল্লাতে থাকার সুবাদে আমি ওই নাখোদা আব্বাসকে চিনি। এস্তাদিও যদি সমুদ্রযাত্রা না করতেন তবে সে কিছুতেই রাজি হত না তাঁর সঙ্গে যেতে। সমুদ্রে জাহাজ চালাত বলে লোকটার মধ্যে একটা অহংবোধ আছে। লোকটা বন্দর অঞ্চলে প্রায় না খেয়ে এতদিন ঘুরে বেড়িয়েছে কিন্তু নদীপথে কোনওদিন জাহাজ বা নৌকা চালায়নি। আমার ধারণা, নদীপথ দিয়ে মোহনায় গিয়ে তারা সাগরে পাড়ি দেবে।'

পেড্রোর কথা শুনে চকিতে একটা ভাবনা খেলে গেল ক্যাপ্টেন পেরোর মাথায়। তিনি বললেন, 'তোমাকে আবার ফিরে যেতে হবে এস্তাদিওর কাছে। তারপর যা করতে হবে তা তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। যা বলব তা যদি তুমি করতে পারো তবে দেশে ফেরার বন্দোবস্ত তোমার পাকা। আর তার সঙ্গে আর্থিক পুরস্কার জুটে যাবার সম্ভবনাও প্রচুর। একটা কথাই শুধু মনে রেখো যে, আমরা যা করছি, তোমাকে যা করতে বলছি, তা আমাদের সর্বময় কর্তা অ্যাডমিরাল ভাস্কোর নির্দেশেই করছি।'

একথা বলার পর ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস মিলে পেড্রোকে বুঝিয়ে দিলেন তাকে কী কী করতে হবে। সবকিছু বুঝে নেবার পর পেড্রো আবার রওনা হয়ে গেল এস্তাদিওর আস্তানায় ফেরার জন্য। আর ক্যাপ্টেন পেরোও রওনা হয়ে গেলেন জাহাজে ফেরার জন্য। পেড্রো যখন এস্তাদিওর বাড়িতে পৌঁছোল তখন অবশ্য এস্তাদিও ঘর ছেড়ে আবার রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। পেড্রো অপেক্ষা করে রইল এস্তাদিওর ফিরে আসার জন্য।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বন্দর সংলগ্ন বাজারের পথে হাঁটছিল এস্তাদিও। অনেক রসদ সংগ্রহ করতে হবে তাকে। তারপর সেগুলো বলদের গাড়িতে চাপিয়ে পাঠাতে হবে নদীর পাশে। যেখান থেকে নৌকাতে রসদ তোলা হবে জাহাজে। শেষ কাজটা অবশ্য আব্বাস-ই করবে।

বাজারের পথে হাঁটতে হাঁটতে এস্তাদিও একটা চালের আড়তে ঢুকতে যাচ্ছিল, ঠিক সেইসময় হঠাৎই একদল অশ্বারোহী এসে ঘিরে ধরল তাকে। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা লোকগুলোর মধ্যে দুজনকে সে চিনতে পারল। একজনের সঙ্গে তার পরিচয় আছে। শুল্ক দারোগা। আর অন্যজনের সঙ্গে এস্তাদিওর পরিচয় না থাকলেও লোকটাকে সে বন্দর অঞ্চলে রক্ষীবাহিনী নিয়ে টহল দিতে দেখেছে। লোকটা নগরপাল। এস্তাদিও তাদেরকে এভাবে ঘিরে ধরতে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল। শুল্ক দারোগা আর নগরপাল এস্তাদিওর মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তারপর দারোগা তাকে প্রশ্ন করল, 'তোমার কাজ তো অনেকদিন হয়ে গেছে? কবে তমালিকা বন্দর ছাড়বে তুমি?'

প্রশ্নটা শুনে এস্তাদিও হেসে বলল, 'আপনাদের আর আশঙ্কিত হবার কোনও কারণ নেই। আমি নতুন একটা জাহাজ কিনেছি—'মকরবাহিনী'। যথাসম্ভব দ্রুত তমালিকা বন্দর ছেড়ে চলে যাব আমি। আর যে-জাহাজটায় আমি এসেছিলাম সে জাহাজকে আমি অনেক দিন আগেই ফিরে যেতে বলেছিলাম। তারা ফেরেনি কেন বা কবে ফিরবে সেটা তাদের ক্যাপ্টেন বলতে পারবেন। সে ব্যাপারে আমার আর কোনও দায় নেই। সান্টা মারিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে।

শুল্ক দারোগা বললেন, 'তুমি দ্রুত ফিরে যাবে বলতে কী বোঝাচ্ছ তা আমরা জানি না। জমিদারের নির্দেশ আগামী তিন দিনের মধ্যে বন্দর ত্যাগ করে চলে যেতে হবে তোমাকে। নইলে নৌকায় চাপিয়ে মোহনায় নিয়ে গিয়ে তোমাকে আমরা ছেড়ে আসব।'

এস্তাদিও বলল, 'আচ্ছা, তাই হবে।'

শুল্ক দারোগা জানতে চাইলেন, 'নতুন জাহাজে এখান থেকে কী কী পণ্য নিয়ে যাচ্ছ তুমি?'

এস্তাদিও জবাব দিল, 'ব্যবসার জন্য কোনও পণ্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। শুধু নাবিকদের খাবারের জন্য রসদ নিয়ে যাচ্ছি।'

জবাবটা শুনে শুল্ক দারোগা তাকালেন নগরপালের দিকে। একটা কৌতুকের হাসি যেন ফুটে উঠল দারোগার ঠোঁটের কোণে। কোটাল এবার তাঁর গোঁফ চুমড়ে বললেন, 'আমরা শুনতে পাচ্ছি, গণিকা মৎস্যগন্ধাও নাকি তোমার সঙ্গে যাচ্ছে? তার গণিকালয় নাকি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আগামীকাল থেকে?'

দারোগারা ব্যাপারটা কী করে অনুমান করল তা আন্দাজ করতে পারল এস্তাদিও। সে তার গণিকালয় ত্যাগ করার কথা ঘোষণা না করলেও আগামীকাল থেকে যে দরজা বন্ধ থাকবে তা জানিয়ে দিয়েছে। যাত্রা শুরুর আগে তারও কিছু প্রস্তুতির দরকার। যাতে সে-কাজে কোনও বিঘ্ন না ঘটে সেজন্যই মৎস্যগন্ধা এ-নির্দেশ দিয়েছে, আর মৎস্যগন্ধার সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা তো বন্দর অঞ্চলে এখন সবাই জানে।

নগরপালের কথা শুনে চুপ করে রইল এস্তাদিও। কিন্তু কোটাল এরপর যা বললেন তাতে চমকে উঠল এস্তাদিও। তিনি বললেন, 'এ ব্যাপারটা কিন্তু আমরা হতে দেবনা। এ বন্দর এখন মরে গেছে বললেই চলে। তেমন জাহাজও আর আসে না। সব চলে যায় সাতগাঁ বা চট্টগ্রামে। যে-ক'টা জাহাজ এখানে আসে তার মধ্যে বেশিরভাগই আসে ওই মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের টানে। সে যদি ব্যবসা বন্ধ করে চলে যায় তবে জাহাজ আসবে না। সে-ব্যাপারটা আমরা হতে দেব না। কাল থেকে আমাদের লোক থাকবে জাহাজের কাছে। তুমি যদি মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে জাহাজে ওঠার চেষ্টা করো তবে জমিদারের নির্দেশে সঙ্গে সঙ্গেই তোমাদের দুজনকে কয়েদ করা হবে। কথাটা মনে থাকে যেন।'

কথাগুলো বলার পর তাঁরা আর দাঁড়ালো না। এস্তাদিওকে হুঁশিয়ারি দিয়ে তারা ঘোড়া নিয়ে রওনা হয়ে গেল অন্যদিকে।

খবরটা মৎস্যগন্ধাকে তাড়াতাড়ি দিতে হবে। বাজারে যে-কাজ ছিল তা দ্রুত সেরে ফেলার চেষ্টা করল এস্তাদিও। সে বুঝতে পারল, পণ্য কেনার ব্যাপারে তার তাড়াহুড়ো দেখে বাড়তি দর হাঁকছে দোকানীরা। কিন্তু দরদাম করে নানা আড়ত ঘুরে মাল কেনার সময় আর এস্তাদিওর হাতে নেই। ফলে কিছুটা চড়া দামেই রসদ সংগ্রহ করে তার জাহাজ যেখানে আছে সেদিকে বলদের গাড়ি করে পাঠাতে পাঠাতেই বিকেল হয়ে গেল। আর তারপরই সে ছুটল মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ে।

ঘর্মক্লান্ত এস্তাদিও মৎস্যগন্ধার ঘরে ঢুকল। তাকে দেখেই মৎস্যগন্ধা প্রশ্ন করল, 'জাহাজের খবর কী?'

এস্তাদিও ঘাম মুছতে মুছতে জবাব দিল, 'জাহাজ জলে ভেসেছে আজ।'

কথাটা শুনেই মৎস্যগন্ধার মুখে হাসি ফুটে উঠল ঠিকই কিন্তু এর পরক্ষণেই এস্তাদিওর মুখমণ্ডলে চিন্তার ভাব ফুটে উঠতে দেখে সে জানতে চাইল, 'জাহাজ জলে ভেসেছে। কিন্তু তোমার মুখ গম্ভীর কেন?'

এস্তাদিও বলল, 'জমিদারের লোকজন তোমাকে বন্দর ছেড়ে যেতে দেবে না বলছে। তুমি বেশ্যালয় বন্ধ করলে জাহাজ আসা বন্ধ হয়ে যাবে, তাই।' এস্তাদিও এরপর দারোগা আর কোটালের সঙ্গে তার সাক্ষাতের কথাটা বিস্তারিত ভাবে জানাল তাকে।

কথাগুলো শুনে ফ্যাকাসে হয়ে গেল মৎস্যগন্ধার মুখ। সে এস্তাদিওর হাতদুটো আঁকড়ে ধরে বলল, 'তবে কী হবে? আমার কী মুক্তি নেই এই পাপপুরী থেকে? সারাজীবন কী আমাকে বন্দর সুন্দরী হয়েই কাটাতে হবে? আমাকে রেখেই কী চলে যেতে হবে তোমাকে? ওরা তো তোমাকে এ-বন্দরেও আর থাকতে দেবে না বলছে!'

এস্তাদিও মৎস্যগন্ধার মাথায় আশ্বাসের হাত রেখে বলল, 'তুমি চিন্তা কোরো না। কোনও একটা উপায় বেরü করতে হবে আমাদের। সমস্যা একটাই, হাতে সময় বড় কম। আর তোমার এই গণিকালয়ের দরজা খোলা রাখো। তাহলে জমিদারের লোকজনের সন্দেহ একটু কাটতে পারে। তুমি গণিকালয় ত্যাগ করার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত কেউ যেন বুঝতে না পারে, তুমি এ-জায়গা ত্যাগ করে চলে যাচছ।'

মৎস্যগন্ধা এবার বলল, 'আরও একটা কাজ করা যেতে পারে। আমাদের গণিকাদের দেবতা কার্তিকেয়। আমার এ গণিকালয়ে খুব ধূমধাম করে কার্তিকেয়র পুজো করা হয়। গরিব দুখীকে পেট পুরে খাওয়ানো হয়। ঢেড়া পিটিয়ে সে-খবর জানিয়ে দেওয়া হয় বন্দরের ভবঘুরে মহল্লায়। এখানে এ পুজোর জন্য কোনও গ্রহ-নক্ষত্র-তিথি আমার মানি না। সুবিধামতো পুজো করি। আমি কালই ঢেরা পিটিয়ে দিচ্ছি যে, সাতদিন পর কার্তিকেয়র পুজো হবে এখানে। তবে আমি দেবতার নাম করে লোক ঠকাব না। পুজোর সব ব্যবস্থা করেই যাব। নির্দিষ্ট দিনেই পুজো হবে। কেবল আমিই থাকব না সেদিন। কাল ঢেড়া দিলেই সবাই ভাববে আমার চলে যাবার ব্যাপারটা নেহাতই গুজব ছিল।'

কথাটা শুনে এস্তাদিও বলল, 'ব্যাপারটা মন্দ নয়। তবে তুমি সে-ব্যবস্থাই করো।'

এস্তাদিও এরপর জানলার কাছে গিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল মৎস্যগন্ধাকে কীভাবে জমিদার লোকদের চোখ এড়িয়ে জাহাজে তোলা যায়, সে ব্যাপারে। সে-চিন্তা করতে করতেই হঠাৎ একটা জিনিস চোখে পড়ল এস্তাদিওর। শেষ বিকালে সান্টা মারিয়া নোঙর তুলে ধীরে ধীরে নদীপথ ধরে এগিয়ে চলেছে মোহনার দিকে। এস্তাদিওর মনে হল, হয়তো বা কোটাল আর শুল্ক দারোগা তাদের বন্দর ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন, তাই তারা বন্দর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ক্যাপ্টেন পেরো যাবার আগে তার সঙ্গে দেখা করে যাবেন বললেও হয়তো শেষে আর তার প্রয়োজন বোধ করেননি। ক্রুশলাঞ্ছিত পর্তুগালের রক্তপতাকাটা যতক্ষণ এস্তাদিওর চোখে পড়ল ততক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল সে। এক সময় সান্টা মারিয়া হারিয়ে গেল তার দৃষ্টিপথের বাইরে। এস্তাদিও বুঝতে পারল, জন্মভূমির সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল তার। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাকে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঠিক সেই মুহূর্তে এসে মৎস্যগন্ধা তার গলা জড়িয়ে ধরল। সান্টা মারিয়াকে চলে যেতে দেখে, স্বদেশের সঙ্গে সব সম্পর্কের চিহ্ন মুছে যাওয়াতে এস্তাদিওর বুকে কয়েক মুহূর্তের জন্য একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হচ্ছিল, মৎস্যগন্ধা তার গলা জড়িয়ে ধরতে তা মুছে গেল। এস্তাদিওর চোখের সামনে এখন শুধু মৎস্যগন্ধা আর কল্পনায় ভূমধ্যসাগরের সেই স্বপ্নের দ্বীপ। যেখানে এস্তাদিও হারিয়ে যাবে মৎস্যগন্ধার সঙ্গে। ধীরে ধীরে এস্তাদিওর ঠোঁট নেমে এল মৎস্যগন্ধার ঠোঁটের ওপর। সে এক দীর্ঘ চুম্বন। যেন দুটো দেহ, দুটো মন এক হয়ে গেল সে চুম্বনে। এক অপূর্ব ভালোবাসার অনুভূতি যেন সঞ্চারিত হল দুজনেরই মনে।

এক সময় হুঁশ ফিরল এস্তাদিওর। এখন সুখবিলাসে ডুবে থাকার সময় নয় তার। হাতে মাত্র তিনদিন সময়। যা ব্যবস্থা করার তাকে এর মধ্যেই করতে হবে। মৎস্যগন্ধার ঠোঁট থেকে সে ঠোঁট সরিয়ে নিয়ে বলল 'এবার আমাকে যেতে হবে। নদীর পারে যেখানে জাহাজটা আছে সেখানে গিয়ে দেখি, রসদগুলো ঠিকমতো সেখানে পৌঁছোল কিনা?'

মৎস্যগন্ধা এস্তাদিওকে আলিঙ্গনমুক্ত করে বলল, 'ঠিক আছে, তুমি যাও। আজ আর তোমাকে আটকাব না।'

এস্তাদিও এরপর তার থেকে বিদায় নিয়ে গণিকালয় ত্যাগ করে রওনা হল নদীতটের দিকে।

এস্তাদিও যখন তার জাহাজ যেখানে নোঙর করেছে সে জায়গাতে পৌঁছল তখন পৃথিবীর বুকে অন্ধকার নেমেছে। জলের মধ্যে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে তার জাহাজটা। তবে তার ডেকে একটা বাতি জ্বলছে। যেটা জানান দিচ্ছে যে জাহাজে কেউ আছে।

নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আব্বাসের নাম করে বারকয়েক হাঁক দিল এস্তাদিও। জাহাজের ডেক থেকে আব্বাসের গলা শোনা গেল, 'কে? মালিক? আমি আসছি।'

কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ থেকে নেমে একটা নৌকা নিয়ে পাড়ে এসে উঠল আব্বাস।

এস্তাদিও তাকে প্রশ্ন করল, 'রসদ ঠিকমতো পৌঁছেছে তো?'

আব্বাস জবাব দিল, 'হ্যাঁ, মালিক। শুধু জল সংগ্রহ করা বাকি। সেটা আমি কাল তুলে নেব। জাহাজটা ভালোই। খুব সামান্য কাজ বাকি আছে। আশা করছি আগামী কালের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যাবে।'

আব্বাস বলে লোকটা বহুদর্শী। এস্তাদিওর কেন জানি মনে হল যে, ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে তার সঙ্গে। একটু ভেবে নিয়ে তাই সে আব্বাসকে বলল, 'আচ্ছা, তোমাকে আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারি তো?'

নাখোদা আব্বাস হেসে বলল, 'তিনদিনের জন্য হলেও আপনার নুন খেয়েছি। আর যাই হোক বিশ্বাসভঙ্গের কোনও কাজ আমি করব না।'

এস্তাদিও এবার খুলে বলল নগরপাল আর শুল্ক দারোগার ব্যাপারটা। মৎস্যগন্ধাকে তারা বন্দর ছেড়ে যেতে দেবে না। আর মৎস্যগন্ধাকে রেখে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব।

আব্বাস বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পর বলল, 'একটা কাজ করা যেতে পারে। মৎস্যগন্ধা আমাদের সঙ্গে বন্দর থেকে জাহাজে উঠবে না। আমরা এখান থেকে গিয়ে মোহনায় দাঁড়াব। মৎস্যগন্ধা রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে নদীর পাড় বরাবর মোহনার দিকে এগিয়ে নৌকাতে উঠবে। সে নৌকা তাকে পৌঁছে দেবে আমাদের জাহাজে। একবার মোহনার কাছে পৌঁছে গেলে জমিদারের লোকজন আমাদের কিছু করতে পারবে না।'

এস্তাদিও শুনে বলল, 'কিন্তু কার ভরসায় আমি তাকে ছেড়ে যাব? বিশ্বাস করার মতো লোক আমার কই? হয়তো সে মৎস্যগন্ধাকে মোহনায় পৌঁছে দিল না, অথবা জমিদারের লোকের হাতে তাকে ধরিয়ে দিল পুরস্কারের লোভে, অথবা নির্জন নদীতটে রাতে একলা নারীকে পেয়ে আরও খারাপ কিছু করল, তখন? আমার তো আর ফেরার উপায় নেই।'

এস্তাদিওর কথা শুনে আব্বাস আবারও বেশ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, 'আপনি অনুমতি দিলে আমি সে দায়িত্ব নিতে পারি। এখান থেকে দু-ক্রোশ দূরে নদীর পাড়ে এক প্রাচীন বটগাছ আছে। মকরসংক্রান্তিতে মেলা বসে সেখানে। বছরের বাকি সময় সে-জায়গা নির্জনই থাকে। মৎস্যগন্ধা নিশ্চই জায়গাটা চেনে। মকরবাহিনীকে পরশু সূর্যাস্তের সময় বন্দর ত্যাগ করতে হবে। জাহাজ এগিয়ে যাবে। আর আমিও অন্ধকার নামলে নৌকা নিয়ে ওই গাছের তলায় অপেক্ষা করব মৎস্যগন্ধার জন্য।'

এস্তাদিও বলল, 'কিন্তু তবে জাহাজ মোহনা পর্যন্ত চালিয়ে নিয়ে যাবে কে?'

নাখোদা আব্বাস বলল, 'ও নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। ইসমাইল নামে আমার যে সহকর্মী আছে, সে মোহনা পর্যন্ত জাহাজ চালিয়ে নিতে পারবে। পাল খাটালেই তর তর করে মোহনার দিকে বয়ে যাবে জাহাজ। হাল ধরে বসে থাকা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। তারপর মোহনার থেকে সাগরে ভাসার সময় আমি দায়িত্ব নেব।'

এস্তাদিও এরপর একটু ইতস্তত করে বলল, 'আচ্ছা, এই জাহাজে জিনিস লুকিয়ে রাখার মতো কোনও গোপন জায়গা পাওয়া যাবে?'

আব্বাস প্রশ্ন করল, 'কতটা জায়গা?'

এস্তাদিও হাত দিয়ে পেটিকার আকারটা দেখাল।

আব্বাস বলল, 'চিন্তা নেই। জাহাজের গায়ে যে ফেরানো চোখ আঁকা আছে তার আড়ালে আমি অমন একটা খোপ বানিয়ে দেব। ভিতর থেকে তো সেটা খোলাই যাবে আর বাইরে থেকেও ঠিক ওই চোখের মাঝখানে কাঠের পাটাতনে ধাক্কা দিলেও সেটা পড়ে যাবে। আসলে ওই চোখের জায়গাটা এদেশের মাঝি-মাল্লারা স্পর্শ করে না, দেবতা ভেবে। আমি আগে যে-বণিকের জাহাজ চালাতাম, সে-ও ওখানে খোপ বানিয়ে টাকাকড়ি নিয়ে যেত। আজ রাতেই তবে খোপটা বানিয়ে ফেলব। কেউ জানতে পারবে না।'

এস্তাদিও বলল, 'কাজগুলো যদি সব তুমি করতে পারো তবে তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার সীমা থাকবে না। আমাকে ঠিক জায়গামতো পৌঁছে দেবার পর আমি তোমাকে এই জাহাজটা দিয়ে দেব। কিছু অর্থও দেব। যাতে তুমি বাকি জীবনটা তোমার ইচ্ছামতো নিজের জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে, বন্দরে বন্দরে ঘুরে বেড়াতে পারো।'

নাখোদা হেসে বলল, 'আমি কোনও প্রত্যাশা নিয়ে ও-কাজ করব না। আপনি যে ভরসা করে, বিশ্বাস করে আমার মতো লোককে কাজের দায়িত্ব দিচ্ছেন সে জন্যই করব। রাত বাড়ছে। নদীতট নির্জন হয়ে আসছে। তস্কর লুঠেরা আছে। এবার আপনি ফিরে যান।'

নাখোদা আব্বাসের থেকে বিদায় নিয়ে নির্জন নদীতট থেকে ঘরে ফেরার পথ ধরল এস্তাদিও।

কিন্তু বাড়ির সামনে এসে তার দরজার সামনে পেড্রোকে বসে থাকতে দেখে এস্তাদিও বেশ অবাক হয়ে গেল। তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে টুপি খুলে অভিবাদন জানাল পেড্রো। এস্তাদিও বিস্মিতভাবে বলল, 'তুমি যাওনি! আজ বিকালেই তো সান্টা মারিয়া তমালিকা বন্দর ছেড়ে সমুদ্রের দিকে রওনা দিল!

পেড্রো তার কণ্ঠে কাতরতা ফুটিয়ে বলল, 'তারা আমাকে জাহাজে উঠতে দিল না। ক্যাপ্টেন পেরো বললেন, তিনিই এখন জাহাজের মালিক। আমি পর্তুগিজ হলেও জাহাজের নাবিকদের তালিকাতে আমার নাম নেই। তিনি আমাকে তার জাহাজে নিতে বাধ্য নন। তাছাড়া আপনার ওপর রাগের কারণে আমাকে তারা যথেচ্ছ গালিগালাজ করল, আপনাকেও করল।'

এরপর এস্তাদিওকে পেড্রো বলল, 'আমি বুঝতে পেরেছি দেশে ফেরা আমার কপালে নেই। দোহাই আপনার, আপনি আমাকে তাড়াবেন না। এই তমালিকা বন্দরে আমার আর কেউ নেই। আপনি আমাকে আশ্রয় দিন। আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে চলুন। বাকি জীবনটা আমি আপনার সেবা করেই দিন কাটাতে পারব। পর্তুগালে ফিরতে না পারি, নিজের দেশের লোকের সঙ্গে তো অন্তত জীবনটা কাটাতে পারব।' এই বলে কাঁদতে শুরু করল সে।

পেড্রোর কথা শুনে আর তার অবস্থা দেখে বেশ মায়া হল এস্তাদিওর। পেড্রো এতদিন সঙ্গ দিয়েছে তাকে। সত্যি লোকটাকে এভাবে ফেলে যাওয়া উচিত হবে না তার। কাজেই এস্তাদিও, পেড্রোকে বলল, 'ঠিক আছে, তোমাকে আমার সঙ্গী করে নিয়ে যাব। আমার সঙ্গেই যাবে তুমি। আমি এখন খুব পরিশ্রান্ত। দ্রুত আমার জন্য রান্নার ব্যবস্থা করো। কাল আমার অনেক কাজ আছে। ভোরবেলা বেরোতে হবে।'

তার কথা শুনে পেড্রো চোখের জল মুছে বলল, 'আপনার অসীম করুণা। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুক।'

রাতে তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে বিছানায় চলে গেল এস্তাদিও। সারা দিনের ক্লান্তিতে মৎস্যগন্ধার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুম নেমে এল তার চোখে।

পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর ঘর ছেড়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল এস্তাদিও। আজ তার অনেক কাজ। বিশেষত, একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। মৎস্যগন্ধা তো সেই ভারী সিন্দুকটা বহন করে নদীতটে একলা নিয়ে যেতে পারবে না। আজই তাকে সে-সিন্দুকটা বহন করে জাহাজে নিয়ে তুলতে হবে। পরদিনই তমালিকা বন্দর ছেড়ে চলে যাচ্ছে তারা। যা কাজ করার তা আজই সেরে ফেলতে হবে।

প্রথমে বাজার অঞ্চলে গিয়ে হাজির হল এস্তাদিও। জাহাজে রসদ পৌঁছে গেছে। কিন্তু তার ব্যক্তিগত কিছু জিনিস কেনা প্রয়োজন। যা সেই অনামী দ্বীপে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাছাড়া সেই দ্বীপবাসীদের জন্য কিছু উপহারও কিনতে হবে তাকে। যাতে সেই দ্বীপবাসীরা খুশি হয়। ছোট ছোট আয়না, সস্তার অলঙ্কার, কিছু পোশাক, এসব জিনিস।

বাজারে ঢুকেই এস্তাদিও ঢেঁড়া পেটার শব্দ শুনতে পেল। মৎস্যগন্ধা ঢেঁড়া পিটিয়ে সবাইকে খবরটা জানাচ্ছে। প্রথমে একটা ছইঅলা বলদের গাড়ি জোগাড় করল এস্তাদিও। তারপর নানা দোকান ঘুরে মালপত্র বস্তাবন্দি করে বলদের গাড়িতে বোঝাই করতে লাগল। সে কাজ মিটতে মিটতে বেশ দেরি হল। সে-গাড়ি নিয়েই এস্তাদিও রওনা হল মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ের দিকে। গণিকালয়ের পিছনের দরজাতে গিয়ে দাঁড়াল বলদের গাড়িটা।

গতকাল এস্তাদিও কথাগুলো বলে যাবার পর আশঙ্কায় দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি মৎস্যগন্ধা। সারা বাড়িটা এখন ঘুমিয়ে থাকলেও সে জেগে বসেছিল। তার খালি মনে হচ্ছিল যে, যদি জমিদারের লোকদের চোখ এড়িয়ে পালাতে না পারে, তখন কী হবে? এস্তাদিওকে তো জমিদারের নির্দেশে কাল বন্দর ছাড়তেই হবে। তার ফিরে আসার পথও বন্ধ। শেষ মুহূর্তে বিপদটা যে এদিক থেকে আসতে পারে তা জানা ছিল না মৎস্যগন্ধার।

এস্তাদিও তার কক্ষে প্রবেশ করতেই সে ব্যগ্রভাবে জানতে চাইল, 'সমস্যা সমাধানের কিছু উপায় মিলল?'

এস্তাদিও বলল, 'বন্দর থেকে দূরে একটা প্রাচীন বটগাছ আছে নদীর পারে, যেখানে মেলা বসে, সে জায়গা তুমি চেনো?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'হ্যাঁ, চিনি।'

পালঙ্কে বসে এস্তাদিও এরপর তাকে নাখোদা আব্বাসের পরিকল্পনার কথা খুলে বলল।

মৎস্যগন্ধা শুনে বলল, 'হ্যাঁ, আমি পৌঁছে যেতে পারব সেখানে।'

এস্তাদিও বলল, 'খুব সাবধানে। কেউ যেন টের না পায়। তোমার গণিকালয়ের দরজা কিন্তু আগের মতোই খোলা রাখবে। প্রতিদিনের মতো আজও, কালও সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপমালায় সাজিয়ে তুলবে গণিকালয়। সূর্যাস্তের সময় নোঙর তুলব আমি। আমার জাহাজ বন্দর ছেড়ে চলে যাবার পর যখন তোমার গণিকালয়ে একটার পর একটা প্রদীপ জ্বলে উঠবে তখন সবাই জেনে যাবে যে, তুমি এখানেই রয়ে গেলে। আর তারপর...

মৎস্যগন্ধা বলল, 'ব্যাপারটা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সিন্দুকটা তো আমি বহন করে নিয়ে যেতে পারব না।'

এস্তাদিও বলল, 'সেটা আমি আজই জাহাজে নিয়ে তুলব।'

মৎসগন্ধা বলল, 'কিন্তু কোনও কারণে যদি জমিদারের লোকরা জাহাজে তল্লাসী চালায়? খোঁজ পেয়ে যায় সেই সিন্দুকের?'

এস্তাদিও বলল, পাবে না। সেটা গোপন স্থানেই থাকবে।'

এস্তাদিও এরপর মৎস্যগন্ধাকে জানাল সেই ফেরানো চোখের আড়ালে গোপন জায়গার ব্যাপারটা।

মৎস্যগন্ধা আশ্বস্ত হল তার কথা শুনে।

এস্তাদিও বলল, 'আজ এই সিন্দুকটা নিয়ে চলে যাবার পর আমি কাল আর তোমার সঙ্গে এখানে দেখা করতে আসব না। লোকজনের সন্দেহ হতে পারে। তোমার সঙ্গে আবার আমার দেখা হবে কাল মধ্যরাতে জাহাজের ডেকে। তারপর আমরা ভেসে যাব সমুদ্রে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'সেই নতুন দেশের দিকে, তাই না?' কথাটা বলে চোখের পাতা মুদল মৎস্যগন্ধা। চোখ বন্ধ করে সে যেন দেখার চেষ্টা করল সেই নতুন দেশটাকে। সবুজ একটা দ্বীপ, সোনালি বালুতট, ঊর্মিমালা এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে...

এস্তাদিও মৃদু স্বরে বলল, 'হ্যাঁ। সেই নতুন দেশের দিকে।' তারপর সে ঠোঁট নামিয়ে আনল চোখ বন্ধ করা মৎস্যগন্ধার ঠোঁটের ওপর। মৎস্যগন্ধাও প্রবল আবেগে জড়িয়ে ধরল এস্তাদিওকে। এস্তাদিওর ঠোঁট এরপর ছুঁয়ে যেতে লাগল মৎস্যগন্ধার স্তনবৃন্ত, নাভিকূপ..। মিলেমিশে যেতে লাগল তাদের দেহ-মন। এই তমালিকা বন্দরে এটাই শেষমিলন তাদের।

এস্তাদিও যখন আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে উঠে বসল তখন সূর্য ডুবে গেছে। এবার পেটিকাটা নিয়ে ফিরতে হবে তাকে। পালঙ্কের নীচ থেকে বাইরে বের করা হল পেটিকাটা। তারপর সেটাকে কাপড়ে মুড়ে ফেলা হল ভালো করে। এবার বিদায় নেবার পালা। সিন্দুকটা কাঁধে তুলে নেবার আগে এস্তাদিও বলল, 'এই যে সিন্দুকটা আমাকে দিচ্ছ এটা নিয়ে যদি আমি তোমাকে ফেলে পাড়ি দিই এখন?'

মৎস্যগন্ধা এ-কথার জবাবে শুধু তার ঠোঁট তুলে ধরল এস্তাদিওর ঠোঁট স্পর্শ করার জন্য। এস্তাদিও সে ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াল শেষবারের জন্য। গভীর ভালোবাসা আর বিশ্বাসের চুম্বন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই এস্তাদিও বলদের গাড়িতে সিন্দুকটা নিয়ে রওনা হয়ে গেল নদীর পাড় বরাবর যেখানে তার জাহাজ আছে, সেদিকে। যতক্ষণ তার বলদের গাড়িতে ঝোলানো বাতিটা অন্ধকারের মধ্যে দেখা গেল, ততক্ষণ মৎস্যগন্ধা চেয়ে রইল তার যাত্রাপথের দিকে।

জাহাজটা যেখানে রাখা আছে তার কাছাকাছি পৌঁছে সে-জায়গাতে নদীর চরে বেশ কয়েকটা মশালের আলো ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখতে পেল এস্তাদিও। বলদের গাড়ি নিয়ে এস্তাদিও মশালের আলোকে আলোকিত স্থানে পৌঁছোতেই সেই আলোগুলো ঘিরে ধরল তাকে। জনাদশেক বর্শা আর তলোয়ারধারী লোক। এস্তাদিও গো-শকট থেকে নামতেই তাদের মধ্যে একজন বলল, 'আমরা জমিদারের পেয়াদা। গাড়ির ছইয়ের ভিতর কোনও মেয়ে আছে নাকি আমরা দেখব।'

এস্তাদিও বুঝতে পারল যে, মৎস্যগন্ধারই খোঁজ করছে তারা। যাতে সে রাতের অন্ধকারে জাহাজে উঠে লুকিয়ে থাকতে না পারে তাই পাহারা দেবার জন্য লোক নিয়োগ করা হয়েছে ইতিমধ্যে।

এস্তাদিও বলল, 'দেখো।'

তার মশালের আলো দিয়ে ভালো করে প্রথমে দেখে নিল যে ছইয়ের ভিতরে কেউ আছে কিনা? তারপর নদীর পাড় থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে লক্ষ করতে লাগল এস্তাদিওকে।

এস্তাদিওকে জাহাজ থেকে দেখতে পেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকা নিয়ে পাড়ে চলে এল আব্বাস। দূরে দাঁড়ানো জমিদারের পেয়াদাগুলোকে দেখিয়ে সে বলল, 'আজ ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই ওরা এখানে হাজির হয়েছে। সম্ভবত, কাল আমরা নোঙর তুলে চলে না-যাওয়া পর্যন্ত তারা এখানেই থাকবে। তবে চিন্তার কিছু নেই। সব ঠিক আছে। আলোচনামতোই কাজ হবে।'

গাড়োয়ান, এস্তাদিও আর নাখোদা মিলে এরপর মালপত্রগুলো উঠিয়ে ফেলল নৌকাতে। গাড়োয়ানের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতেই সে ফেরার পথ ধরল। নৌকা নিয়ে জাহাজের গায়ে পৌঁছোল এস্তাদিওরা। আব্বাস প্রথমে জাহাজে উঠে রশি ফেলে নৌকা থেকে জিনিসগুলো ডেকে টেনে তুলল। কাপড়-মোড়া সিন্দুকটাও জাহাজে তোলা হল। এস্তাদিও সবশেষে উঠে পড়ল জাহাজে। প্রথমেই সিন্দুকটাকে নামিয়ে আনা হল খোলের ভিতর। কাপড়ের আবরণ খুলে ফেলা হল তার গা থেকে। জাহাজের বাইরের গায়ে চোখটা যেখানে আঁকা তার ভিতরের দিকের পাটাতন সরিয়ে খোলের বাইরের আর ভিতরের পাটাতনের মাঝে রাখা হল সিন্দুকটাকে। চমৎকার জায়গা। ভিতরদিকের পাটাতন আটকে দিলে বোঝাই যাবে না কিছু। দু-দিকের পাটাতন খোলা যায়। বিপদের সময় এই পাটাতন দুটো সরিয়ে জলেও ভেসে যাওয়া যায়।

সিন্দুকটা লুকিয়ে ফেলে ডেকে ফিরে এল তারা। আব্বাস নৌকা করে পাড়ে পৌঁছে দেবার সময় বলল, 'কাল ইসমাইল থাকবে এখানে। চিন্তার কিছু নেই। সে আপনাকে মাঝি-মাল্লাসমেত মোহনায় পৌঁছে দেবে। মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে সেখানে আপনার সঙ্গে মিলিত হব আমি।'

আব্বাসের থেকে বিদায় নিয়ে ফেরার পথ ধরল এস্তাদিও। ঘরে ফিরে সে পেড্রোকে বলল, 'কালই এই তমালিকা বন্দর ছেড়ে চলে যাব আমরা।'

১৮

প্রতিদিনের মতোই এদিনও ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ল প্রাচীন এই তমালিকা বন্দরে, স্পর্শ করল মৎস্যগন্ধার ঘরের জানলা। ভোর হল বন্দরনগরীর বুকে। মৎস্যগন্ধা জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নতুন সূর্য উঠেছে নদীর বুকে, স্নিগ্ধ বাতাস বইছে। নদী পাড়ের গাছগুলোর মাথায় ঘুম ভেঙে পাখির দল ওড়াউড়ি করছে। কুয়াশার আবরণ ধীরে ধীরে সরে গিয়ে ফুটে উঠছে তমালিকা বন্দর। নতুন সূর্যের দিকে তাকিয়ে মৎস্যগন্ধার মনে হল, জীবনে প্রথম এত সুন্দর সূর্যোদয় দেখল সে। মৎস্যগন্ধার জীবনের অন্ধকার মুছে গিয়েও আজ সূর্যোদয়ের সূচনা হতে চলেছে। এই গণিকালয়, এই প্রাচীন বন্দর ত্যাগ করে সে আজ পাড়ি দেবে নতুন এক দেশের খোঁজে, যে-দেশে রোজই এমন সুন্দর সকাল হবে।

মৃদু বিষণ্ণতাও যেন ছুঁয়ে যাচ্ছে মৎস্যগন্ধাকে। এই প্রথম যেন এই মৃত বন্দরের প্রতি একটা টান অনুভব করছে মৎস্যগন্ধা। কোন ছেলেবেলায় সে ভর্তিকার হাত ধরে উঠে এসেছিল এখানে। এই তমালিকা বন্দরই তাদের সেদিন তার বুকে আশ্রয় দিয়েছিল। এখানেই তার বেড়ে ওঠা। তারপর অনেক কষ্ট দুঃখ সহ্য করে এই গণিকালয়কে গড়ে তোলা। ভালো-মন্দ যাই হোক না কেন এই গণিকালয়, এই তমালিকা বন্দরের সঙ্গে এতদিন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল মৎস্যগন্ধার জীবন। কত স্মৃতি তার জড়িয়ে আছে এই বন্দরের সঙ্গে। সবচেয়ে তার কষ্ট হচ্ছে রানির জন্য। তার প্রিয় সহচরীকে এই তমালিকা বন্দরে মৎস্যগন্ধা ফেলে রেখে যাচ্ছে। গতকাল মাঝরাত পর্যন্ত নীচে নেমে বহুদিন পর খদ্দেরদের নিজে আপ্যায়ন করেছে সে। খদ্দেরদের অনেকে জানতে চেয়েছে যে, মৎস্যগন্ধা এ-বন্দর ছেড়ে চলে যাচ্ছে কিনা? তার গণিকালয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিনা? কারণ খবরটা বেশ ছড়িয়েছে বন্দরে।

মৎস্যগন্ধা তাদের এই বলে আশ্বস্ত করেছে যে, তেমন কোনও ব্যাপার নয়। তার বন্দর ছেড়ে চলে যাবার ব্যাপারটা নেহাতই গুজব। সে খদ্দেরদের আমন্ত্রণও জানিয়েছে কার্তিক পুজোর দিন তার গণিকালয়ে উপস্থিত থাকার জন্য। মাঝরাত পর্যন্ত সবার সঙ্গে কথা বলার পর সে ফিরে এসেছিল নিজের ঘরে। খুব সুন্দর চাঁদ উঠেছিল গত রাতে। সেই চাঁদের আলো আর জোয়ারের জল এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল রানির কবর। প্রায় সারা রাতই সেই কবরের দিকে তাকিয়ে মৎস্যগন্ধা ভেবেছে রানির কথা, ভর্তিকার কথা, এ-বন্দরে সে যাদের ছেড়ে রেখে যাচ্ছে তাদের কথা...

সূর্যোদয়ের পর নদীর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মৎস্যগন্ধা। এক সময় কুয়াশা মুছে গিয়ে জেগে উঠল তমালিকা বন্দর। মৎস্যগন্ধা এরপর জানলা থেকে সরে এসে ভাবতে লাগল এস্তাদিওর কথা।

এস্তাদিওর অবশ্য ঘুম ভাঙল বেশ বেলা করে। বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য তার অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। এস্তাদিওর আজ সকালে আর কোনও কাজ নেই। বিকেল হলে সে রওনা হবে বন্দরের দিকে। আজই এই তমালিকা বন্দরে তার শেষ দিন। এস্তাদিও এ-বন্দরে তার জাহাজ ভিড়িয়েছিল ভাস্কোর নির্দেশে বাণিজ্য করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জন্য খবর সংগ্রহ করতে। বন্দরে জাহাজ ভিড়িয়ে মূল্যবান পণ্য সংগ্রহ করে নাবিকরা। কিন্তু এ-বন্দর থেকে এস্তাদিও যা নিয়ে যাচ্ছে তা অমূল্য। হীরা-চুনী-পান্না দিয়ে তার পরিমাপ করা যায় না। সে নিয়ে যাচ্ছে মৎস্যগন্ধাকে। সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে তার ভালোবাসাকে। তমালিকা বন্দরের শ্রেষ্ঠ সম্পদকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছে এস্তাদিও।

ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছেড়ে উঠল না এস্তাদিও। আলস্যে গা ডুবিয়ে সে ভাবতে লাগল মৎস্যগন্ধার কথা, তার সঙ্গে এস্তাদিওর প্রথম সাক্ষাতের কথা। এখানে সে যে-বন্দরজীবন অতিবাহিত করে গেল তার কথা।

সময় এগিয়ে চলল।

সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর তখন বিছানা ছাড়ল এস্তাদিও। স্নানাহার শেষ করে ঘরে যা জিনিসপত্র ছিল, গুছিয়ে নিল। বাড়ির মালিককে দ্বিপ্রহরে আসতে বলেছিল এস্তাদিও। সে এসে ভাড়ার টাকা বুঝে নিয়ে গেল। সব কাজ মিটে যাবার পর সে পেড্রোকে একটা বলদের গাড়ি ডেকে আনতে বলল। গাড়ি নিয়ে হাজির হল পেড্রো। তখন বিকাল হতে চলেছে, ঘরে সামান্য যা কিছু মালপত্র ছিল তা বলদের গাড়িতে উঠিয়ে পেড্রোকে নিয়ে নদীতটের দিকে রওনা হয়ে গেল এস্তাদিও।

তারা যখন নদীর পাড়ে পৌঁছোল তখন বিকেল হয়ে গেছে। মনোরম বিকেল। সূর্যদেব সারাদিন ধরে আকাশ পরিক্রমার শেষে এগোচ্ছে নদীর বুকে এদিনের মতো আশ্রয় নেবার জন্য। জোয়ার শুরু হবার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। মৃদুমৃদু কাঁপছে নদীর জল। সার সার পালতোলা দিশি নৌকা দাঁড়িয়ে আছে বন্দরে। দু-চারটে জাহাজও। বন্দরে নামা নাবিক, মাঝি-মাল্লার দল পাড় থেকে ছোট ছোট নৌকাতে ফিরে যাচ্ছে জাহাজ বা বড় বড় নৌকাতে রাত্রিবাসের জন্য। কিছু নৌকা আবার নাবিকদের নিয়ে পাড়ের দিকেও আসছে। হয়তো বা তারা রাত্রিবাস করবে নারীসংসর্গে, মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ে। সব মিলিয়ে চারপাশের পরিবেশে কোনও অস্থিরতা নেই। দিনের শেষে বেশ সুন্দর বাতাস ভেসে আসছে মোহনার দিক থেকে।

তবে নদীর পাড়ে জাহাজ যেখানে আছে সেখানে আজও জমিদারের পেয়াদাদের উপস্থিতি দেখল এস্তাদিও। জায়গা ছেড়ে তারা নড়েনি। এস্তাদিও বেশ কৌতুক বোধ করল তাদের দেখে। গো-শকট থেকে নেমে সে নিজেই তাদের উদ্দেশ্যে বলল, 'গাড়িতে কোনও মেয়ে এনেছি কিনা দেখে যাও।'

তার কথা শুনে একজন প্রহরী এল ঠিকই। কিন্তু সে একবার দায়সারা ভাবে গাড়ির চারপাশে পাক খেয়ে তার সঙ্গীদের কাছে ফিরে গেল। স্পষ্টতই বিমর্ষ দেখতে লাগছে পেয়াদাগুলোর মুখ। তারা হয়তো ভেবেছিল যে তারা পাকড়াও করতে পারবে মৎস্যগন্ধাকে। আজ সেই সুবাদে কিছু অর্থ লাভ হবে।রাত্রি জাগরণ তাদের বৃথা গেল। তবুও যতক্ষণ না জাহাজ ছাড়ছে ততক্ষণ তাদের ওই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। বলা যায় না, জাহাজ ছেড়ে যাবার মুহূর্তেই হয়তো মৎস্যগন্ধা জাহাজে উঠে পালিয়ে গেল! তখন তাদের গর্দান যাবে।

এস্তাদিও দেখতে পেল তার ছোট্ট জাহাজের মাস্তুলগুলোর গায়ে ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে ফেলেছে দিশি নাবিকরা। কয়েকজন নাবিক আবার দুধ-কলা ইত্যাদি নিক্ষেপ করছে নদীর জলে। এসব করার নির্দেশ এস্তাদিও দেয়নি। জাহাজের মঙ্গলকামনায় দীর্ঘদিনের সংস্কারবশত তারা এ-কাজ করছে।

এস্তাদিওকে দেখতে পেয়ে ইসমাইল নামের নাবিক এগিয়ে এসে সেলাম ঠুকলো। এস্তাদিও জানতে চাইল। 'সব ঠিক আছে তো?'

ইসমাইল বলল, 'হ্যাঁ, মালিক। নাখোদা আমাকে সব নির্দেশ দিয়ে গেছেন। আপনার কোনও চিন্তা নেই।'

বলদের গাড়ি থেকে পেড্রো মালপত্র নামিয়ে ফেলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মালপত্র নিয়ে নৌকা করে জাহাজে পৌঁছে গেল সবাই। মকরবাহিনীর ডেকে উঠে দাঁড়াল পেড্রো। ডেকে দাঁড়িয়ে এস্তাদিও একবার দেখার চেষ্টা করল মৎস্যগন্ধার গণিকালয়টা। মৎস্যগন্ধাও নিশ্চই এখন তার জানলা দিয়ে বন্দরের দিকেই তাকিয়ে আছে। ঘর-বাড়ির ভিড়ে এস্তাদিও মৎস্যগন্ধার গণিকালয়টা জাহাজের ডেক থেকে দেখতে না পেলেও মৎস্যগন্ধা হয়তো বা দেখতে পাবে এই জাহাজটাকে। ইসমাইলের লোকজন রশি টেনে পাল খাটাতে শুরু করল। নাখোদা আব্বাসের অনুপস্থিতিতে ইসমাইল-ই এখন নাখোদা।

দিনের শেষে বন্দর ফাঁকা হতে শুরু করেছে। দিনশেষের আলো এসে পড়েছে জনশূন্য হয়ে যাওয়া বন্দরের ওপর। সেদিকে তাকিয়ে এস্তাদিওর মনে হল, কেমন যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে সারা বন্দর জুড়ে। মৎস্যগন্ধা চলে যাবার পর কাল থেকে আরও শূন্য, নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে এ-বন্দর। তারপর এক সময় হয়তো আর কোনও জাহাজই ভিড়বে না এ-বন্দরে। ইতিহাসের পাতায় শুধু লেখা হয়ে থাকবে তাম্রলিপ্ত বন্দরের নাম।

পাল খাটানো হয়ে গেল। বেশ বাতাসও আছে। ফুলে উঠছে পাল। উল্টো দিক থেকে ভেসে আসা বাতাস জাহাজটাকে ঠেলে নিয়ে যাবে মোহনার দিকে। নদীর জলে সূর্য অর্ধেক ডুবে গেছে। তার লাল আভা রাঙিয়ে দিচ্ছে ফুলে ওঠা সাদা পালকে। যাত্রা শুরু করতে হবে এবার। একজন নাবিক এস্তাদিওকে নিয়ে এসে দাঁড় করাল ডেকের মাঝে যে-লোহার স্তম্ভ বা ক্যাপস্টেন বসানো থাকে তার সামনে। জাহাজের নাবিকরা ঘিরে দাঁড়াল এস্তাদিওকে। তার হাতে তুলে দেওয়া হল একটা নারকেল। নাবিকদের কথামতো এস্তাদিও ক্যাপস্টেনের গায়ে নারকেলটা আছড়ে ফাটাতে ইসমাইল হাঁক দিল, 'নোঙর তোলো।'

ক'জন নাবিক মিলে কাছি টেনে নোঙরটা তুলে ফেলল। প্রথমে একটু দুলে উঠল জাহাজটা, তারপর পাল তাকে তরতর করে ঠেলে নিয়ে চলল নদীবক্ষে। সমুদ্র-দেবতার নামে, নিজেদের ইষ্টদেবতার নামে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল নাবিকরা। তমালিকা বন্দর ছেড়ে রওনা হল মকরবাহিনী। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এস্তাদিওর চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গেল তমালিকা বন্দরের মাটি। মোহনার দিকে এস্তাদিও ভেসে চলল আবার সমুদ্রে পাড়ি দেবার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নামল তমালিকা বন্দরের বুকে।

মৎস্যগন্ধাও ঠিক সেই সময় দাঁড়িয়েছিল তার জানলার সামনে। বিকেল থেকেই সে অমনভাবেই দাঁড়িয়েছিল জানলার ধারে, এস্তাদিওর জাহাজটাকে দেখার প্রতীক্ষায়। জাহাজটা যেখানে নোঙর করা ছিল সে জায়গাটা মূল বন্দর থেকে বেশ কিছুটা তফাতে মৎস্যগন্ধার দৃষ্টির বাইরে। বেশ অনেকক্ষণ প্রতীক্ষার পর জাহাজটা যখন নোঙর তুলে মোহনার দিকে রওনা হল, তখন দিনের শেষ আলোতে শেষপর্যন্ত জাহাজটা চোখে পড়ল মৎস্যগন্ধার। সাদা পাল তোলা ছোট্ট জাহাজটা রাজহংসীর মতো এগিয়ে চলেছে নদীপথ ধরে। যতক্ষণ সেই জাহাজটা বিন্দুর মতো ছোট হতে হতে হারিয়ে না-গেল, ততক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল মৎস্যগন্ধা। আর এরপরই সূর্য ডুবে গিয়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করল। মৎস্যগন্ধা ডাক দিল শ্যামাকে।

শ্যামা ঘরে ঢুকতেই মৎস্যগন্ধা বলল, 'আজ অন্য দিনের থেকে অনেক বেশি প্রদীপ জ্বালানোর ব্যবস্থা কর। একটা অলিন্দ-গবাক্ষও যেন বাদ না যায়। যেন দূর দূর থেকে দেখা যায় এই আলো।'

শ্যামা বলল, 'আচ্ছা। সে ব্যবস্থা করছি।'

এরপর শ্যামা বলল, 'জমিদারের দুজন পাইক সকাল থেকেই সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝেই তারা খোঁজখবর নিচ্ছে আপনি বাড়িতে আছেন কিনা? বাড়ির ভিতর ঢোকার সময় তারা দু-চারজন খদ্দেরকেও বলেছে যে, আপনি বাড়িতে আছেন কিনা বাইরে বেরিয়ে তা তাদের জানাতে।'

মৎস্যগন্ধা ব্যাপারটা শুনে হেসে বলল, 'তুই তাড়াতাড়ি সারা বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর ব্যবস্থা কর। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি নীচে নামছি, সদর দরজায় দাঁড়িয়ে খদ্দেরদের আপ্যায়ন করব আমি, ওই দুজন লোককেও করব। সন্দেহভঞ্জন হবে তাদের।'

শ্যামা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল নির্দেশ পালন করতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধীরে ধীরে প্রদীপ জ্বলে উঠতে শুরু করল সারা বাড়িটা জুড়ে। চারপাশের অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে ঝলমল করে উঠল মৎস্যগন্ধার গণিকালয়। বহু দূর থেকে দেখা যেতে লাগল সে-আলোর রোশনাই। যারা ভেবেছিল মৎস্যগন্ধার গণিকালয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তারা এই আলো দেখে গণিকালয়ে আসার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল।

এক সময় মৎস্যগন্ধাও তৈরি হয়ে নীচে নেমে এল। আজ খুব সুন্দর সেজেছে মৎস্যগন্ধা। পরণে রেশমের স্বচ্ছ পোশাক। মাথায় টায়রা, গলায় নয় প্যাঁচের মুক্ত মালা। হাতে অঙ্গদ, পায়ে নূপুর। বন্দর সুন্দরীর এ-রূপ দেখলে লজ্জা পেত ঊর্বশী, রম্ভার মতো সুরসুন্দরীরাও।

দুজন চপলা স্বভাবের গণিকাকে নিয়ে সদর দরজায় এসে দাঁড়াল মৎস্যগন্ধা। খদ্দেরদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। মৎস্যগন্ধা দেখতে পেল বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা জমিদারের সেই দুজন পেয়াদাকে। তাদের দেখে মজা করার ইচ্ছা হল মৎস্যগন্ধার। সে তাদের উদ্দেশ্য বলল, 'নাগরেরা শুনলাম সকাল থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আছ? তা বাইরে কেন? ভিতরে এসো।'

লোকদুটো তার কথার কোনও জবাব দিল না।

মৎস্যগন্ধা আবারও তাদের বলল, 'এসো, এসো, ভিতরে এসো, লজ্জা কোরো না। তোমাদের পয়সা দিতে হবে না আজ।'

এবার সে দুজনের একজন বলল, 'আমরা জমিদারের পাইক। আমরা ভিতরে যাব না।'

এবার মৎস্যগন্ধা তার সঙ্গিনীদের উদ্দেশ্যে বলল, 'ওরে, এ-লোকগুলো জমিদারের পাইক বলে কথা। আমার দরজার সামনে যখন এসেছে তখন একটু আদর আপ্যায়ন না করে কী ছাড়া যায়! যা, তোরা গিয়ে ওদের আদর করে ভিতরে নিয়ে আয়।'

মৎস্যগন্ধার কথা শুনে তার সঙ্গিনী দুজন চপলস্বভাবা গণিকা গিয়ে জাপ্টে ধরল সেই পাইক দুজনকে।

শুরু হল তাদের নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া। মুহূর্তের মধ্যে তাদের ঘিরে আগত খদ্দের আর পথচারীদের ভিড় জমে গেল গণিকালয়ের সামনে। গণিকা দুজন খিল খিল করে হাসতে-হাসতে নানা চটুল কথা বলে জাপ্টে ধরে টানাটানি করছে পেয়াদা দুজনকে। জমিদারের পাইক বরকন্দাজদের অপদস্থ হতে দেখলে সবাই আমোদ পায়। জনতাও সেই মজাদার দৃশ্য দেখে খুব আমোদ উপভোগ করতে লাগল। একসময় মৎস্যগন্ধার নির্দেশেই দুজনকে ছেড়ে দিল গণিকারা। পাইকরা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না। এরপর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো রাস্তাতেই তাদের পোশাক খুলে নেবে লজ্জাহীনা গণিকারা। তাছাড়া যার খোঁজে তারা এখানে এসেছিল তাকে তো নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছে তারা। আর তাদের এখানে থাকার প্রয়োজনও নেই। কাজেই গণিকাদের বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হতেই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল সে জায়গা ছেড়ে চলে যাবার জন্য। জনতার মধ্যে আরও একবার হাসির রোল উঠল গণিকাদের ভয়ে পলায়মান পাইকদের দেখে। মৎস্যগন্ধা নিশ্চিন্ত হল।

এদিন খদ্দেরদের আনাগোনা যেন একটু বেশিই মনে হল মৎস্যগন্ধার। সম্ভবত কিছু লোক জানতে এসেছিল যে গণিকালয় সত্যি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিনা? দরজা খোলা দেখে তারাও ভিতরে ঢুকে পড়েছে। খদ্দেরদের হাঁকডাক, তাদের সঙ্গে গণিকাদের রঙ্গতামাশায় মুখরিত হয়ে উঠল মৎসগন্ধার গণিকালয়। বাইরে চাঁদ উঠতে শুরু করল। একসময় শ্যামার সেই নাগর, জমিদারের সেরেস্তোর কর্মচারীও উপস্থিত হল গণিকালয়ে। শ্যামা তাকে নিয়ে হাজির হল মৎস্যগন্ধার সামনে। হংসরাজ মৎস্যগন্ধাকে বলল, 'আমি সেরেস্তা থেকে সোজা এখানে আসছি। জমিদারমশাই নিশ্চিন্ত হয়েছেন আপনি এখানে আছেন বলে। জমিদারবাড়ির ছাদ থেকে গণিকালয়ের আলো দেখা গেছে। সবাই ভয় পেয়ে গেছিল আপনার এই গণিকালয় বন্ধ হয়ে যাবে ভেবে।'

মৎস্যগন্ধা হেসে জবাব দিল, 'আমার কী আর কোথাও যাবার মতো কোনও জায়গা আছে? এখানেই আছি, এখানেই থাকব।'

শ্যামার সঙ্গে এরপর অন্যত্র চলে গেল লোকটা।

চাঁদ যত মাথার ওপর উঠতে লাগল, তত জমে উঠতে লাগল গণিকালয়ের পরিবেশ। একসময় মৎস্যগন্ধা যখন বুঝতে পারল যে, সমবেত নারী-পুরুষরা নিজেদের নিয়ে মেতে উঠেছে, তাকে তেমন কেউ খেয়াল করছে না, তখন ওপরে উঠে এল মৎস্যগন্ধা। গায়ের আবরণ খুলে দ্রুত সাধারণ পোশাক পরে নিল সে। তারপর কালো চাদরে নিজেকে আবৃত করে পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে যেতেই শ্যামার মুখোমুখি হয়ে গেল। শ্যামার একই সঙ্গে ঠোঁটের কোণে হাসি আর চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। শ্যামা তার উদ্দেশ্যে বলল, 'আমি এমনই আন্দাজ করেছিলাম। আপনি আর নাবিক কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচবেন না। জমিদারের লোকরা আপনাকে আটকাতে পারবেন না। আপনারা যেখানেই থাকুন সুখে থাকুন, ভগবান আপনাদের মঙ্গল করুন।'—এই বলে ঝুঁকে পড়ে মৎস্যগন্ধার পা স্পর্শ করল শ্যামা।

মৎস্যগন্ধার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গিনী শ্যামা। এই শেষসময় আর তাকে মিথ্যা বলতে ইচ্ছা হল না মৎস্যগন্ধার। শ্যামার উদ্দেশ্যে সে বলল, 'তোরাও ভালো থাকিস। এই পাপজন্ম থেকে সবাইকে মুক্তি দিয়ে গেলাম। কিন্তু কাল সকালের আগে আমার অনুপস্থিতির খবর যেন কেউ জানতে না পারে। আর কার্তিকপুজোটা যেন হয়। গরিব দুঃখীরা যেন সেদিন খেতে এসে ফিরে না যায়।'

মৎস্যগন্ধা এরপর আর দাঁড়াল না। অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নেমে পিছনের দরজা দিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়ল। আকাশে চাঁদ আছে। তবে মেঘও আছে। সে মেঘ মাঝে-মাঝে উড়ে যাচ্ছে চাঁদের গা বেয়ে। চারপাশ কয়েক মুহূর্তের জন্য ঢেকে যাচ্ছে অন্ধকারে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে নদীর পাড় বরাবর দ্রুত এগোতে লাগল মৎস্যগন্ধা। রাস্তা বলতে যা বোঝায় এটা ঠিক তা নয়। চারপাশে অসংখ্য ঝোপঝাড়, তারপর কর্দমাক্ত নদীতট নেমে গেছে জলের দিকে। এদিকে কোনও বসতি নেই, কোথাও কোনও লোকজনও নেই। নদীবক্ষে জেলে নৌকার দু-একটা টিমটিমে আলো ছাড়া কোথাও কোনও আলোকরেখা নেই। সঙ্গে আনার মধ্যে দুটো জিনিস শুধু এনেছে মৎস্যগন্ধা। তার বুকের মধ্যে রাখা আছে সেই বুদ্ধমূর্তিখোদিত চন্দনকাঠের টুকরোটা,যেটা এস্তাদিও তাকে উপহার দিয়েছিল। আর রয়েছে তার সর্বক্ষণের সঙ্গী কোমরের আড়ালে গোঁজা ছুরিটা। এ-দুটো জিনিস নিয়ে এগিয়ে চলল মৎস্যগন্ধা।

বেশ অনেকক্ষণ চলার পর যখন সে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছোল তখন শিয়ালের দল ডেকে উঠল নদীপাড়ের শুকনো কাশবন থেকে। রাত্রি এক প্রহর হল। মৎস্যগন্ধা দেখতে পেল নদীর দিকে হেলে পড়া বিশাল বুড়ো বটগাছটার ঠিক নীচেই দাঁড়িয়ে আছে একটা নৌকা। মৎস্যগন্ধা হাজির হল তার সামনে। আব্বাস লোকটা অপেক্ষা করছিল সেখানে মৎস্যগন্ধার জন্য। তমালিকা বন্দরের অন্য সবাইয়ের মতো আব্বাসও মৎস্যগন্ধাকে চেনে। ছোট একটা নৌকা। তবে তার পাল থাকলেও সেটা গোটানো আছে দণ্ডের গায়ে। নদীর স্রোতে নৌকা ভাসিয়ে আব্বাস বলল, 'চিন্তা করবেন না। আর এক প্রহরের মধ্যেই আমরা মোহনায় পৌঁছে যাব। আমি নাখোদা আব্বাস। উত্তাল সমুদ্রে তিরিশ বছর জাহাজ চালিয়েছি। দরকার হলে আমি এই ছোট নৌকা নিয়েই সাগরে নামতে পারি। সে হিম্মত আমার আছে। এ তো সামান্য নদী।'

মৎস্যগন্ধা আশ্বস্ত হল তার কথা শুনে।

পিছনে পড়ে রইল তমালিকা বন্দর, পড়ে রইল তার গণিকালয়। অস্পষ্ট চন্দ্রালোকে সবাইকে পিছনে ছেড়ে মোহনার দিকে এগিয়ে চলল নৌকা। মৎস্যগন্ধা ভাবতে লাগল কতক্ষণে তারা পৌঁছোবে মোহনায়। সেখানে মকরবাহিনীর ডেকে তার জন্য প্রতীক্ষা করে আছে এস্তাদিও। কাল যখন তমালিকা বন্দরে সূর্যোদয় হবে তখন মৎস্যগন্ধা আর এস্তাদিও সমুদ্রে ভেসে চলেছে এক নতুন পৃথিবীর দিকে।

সত্যিই রাত্রির দুই প্রহরে মোহনার কাছে পৌঁছে গেল মৎস্যগন্ধার নৌকা। বেশ অনেক ক'টা ছোট-বড় নদী এসে মিশেছে এই মোহনাতে। তারপর তাদের সন্মিলিত জলধারা গিয়ে মিশেছে সাগরে। অনেক কটা খাঁড়িমুখও আছে সে- জায়গাতে। ঠান্ডা বাতাস আর জলোচ্ছ্বাসের অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসছে সমুদ্রের দিক থেকে। তেমনই একটা খাঁড়ি বেয়ে নৌকা নিয়ে এগোতে লাগল আব্বাস। তাহলে তাড়াতাড়ি পৌঁছোনো যাবে মোহনা সংলগ্ন সমুদ্রর মুখে, যেখানে অপেক্ষা করে আছে মকরবাহিনী। খাঁড়িতে ঢোকার পরই টিপটিপ করে বৃষ্টিপাত শুরু হল। ভিজতে ভিজতেই এগোল তারা। খাঁড়িটা যেখানে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে ঠিক সে জায়গাতে পৌঁছে সাগরে নামতে গিয়েও হঠাৎ লগি মেরে আব্বাস নৌকা থামিয়ে দিল। মৎস্যগন্ধা জানতে চাইল, 'এখানে থামলে কেন?'

আব্বাস আঙুল তুলে দেখাল সামনের দিকে, যেখানে কিছু দূরে চাঁদের আলোতে নদী আর সমুদ্র পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে।

১৯

এস্তাদিওরা তমালিকা বন্দরকে পিছনে ফেলে এগোবার পরই সূর্য ডুবে গেল। সন্ধ্যা নেমে এল নদীর বুকে। ডেকে দাঁড়ানো এস্তাদিওর চোখের সামনে থেকে মুছে যেতে লাগল দু-পাশের নদীর চর। অন্ধকার গ্রাস করে নিল সব কিছু। তারপর ধীরে ধীরে আবার আকাশে চাঁদ উঠতে শুরু করল। দেখা যেতে লাগল দু-পাশের জনহীন চরাচর। বাতাসই জাহাজটাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে মৃদু-মন্দ গতিতে। শুধু হাল ধরে বসে আছে হালিরা। মোহনাতে পৌঁছোবার খুব বেশি তাড়া নেই এস্তাদিওর। কারণ, মোহনাতে গিয়ে তাকে তো মৎস্যগন্ধার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে। এস্তাদিও মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করতে লাগল, এসময় মৎস্যগন্ধা কী করছে? নিশ্চই এতক্ষণে তার গণিকালয়ের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। খদ্দেরদের আনাগোনাও শুরু হয়ে গেছে। হয়তো মৎস্যগন্ধা তাদের তদারকিতে ব্যস্ত, নাকি ইতিমধ্যে অন্ধকার নামতেই সে বেরিয়ে পড়েছে তার গণিকালয় ছেড়ে? মাঝে-মাঝে একটা আশঙ্কাও কাজ করছে এস্তাদিওর মনে। শেষ মুহূর্তে যদি সে গণিকালয় ছেড়ে বেরোতে না পারে? অথবা জমিদারের লোকেরা যদি গণিকালয় ছেড়ে বেরোবার পর মৎস্যগন্ধাকে ধরে ফেলে, তখন? এস্তাদিও মনকে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করতে লাগল—'না, না, এমন কিছু ঘটবে না। মৎস্যগন্ধা ঠিক পৌঁছে যাবে নদীপাড়ের সেই বটগাছের কাছে, তারপর আব্বাস তাকে নিয়ে আসবে তার জাহাজে।'

আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ আছে, তারা মাঝে মাঝে চাঁদকে ঢেকে দিচ্ছে। অন্ধকার নেমে আসছে চারপাশে। পরক্ষণেই আবার মেঘমুক্ত হয়ে আলো ছড়াচ্ছে চাঁদ। ঠিক তেমনই মাঝে-মাঝে আশঙ্কার আলো-অন্ধকার খেলা করাতে লাগল এস্তাদিওর মনে। এগিয়ে চলল মকরবাহিনী।

রাত্রির প্রথম প্রহরের অনেক আগেই মোহনাতে পৌঁছে গেল এস্তাদিও। বিভিন্ন দিক থেকে নদী এসেছে মিশেছে এখানে। অনেকগুলো খাঁড়ি। নদীর জলপ্রবাহগুলো পাক খেতে খেতে মিশে গেছে সমুদ্রের জলরাশির সঙ্গে। চাঁদের আলোতে জেগে আছে বিশাল মহার্ণব। মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে এস্তাদিও পাড়ি দেবে সেই মহাসমুদ্রে। তার জলোচ্ছ্বাসের শব্দ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে এস্তাদিওকে। মোহনায় প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ জলরাশির ঠিক মাঝখানে নোঙর করল মকরবাহিনী। অপেক্ষা করতে হবে তাদের। বাতাস পালটাকে ঠেলে সমুদ্রের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে জাহাজটাকে। তাই পাল নামিয়ে ফেলা হল। পেড্রোও ডেকে ঘোরাঘুরি করছিল। সে এস্তাদিওর কাছে এসে জানতে চাইল, 'এখানে জাহাজ থামালেন?'

এস্তাদিও বলল, 'কাল ভোরে আমরা সমুদ্রযাত্রা করব। তাছাড়া নাখোদা আব্বাস একটা কাজে আটকে গিয়ে আমাদের সঙ্গে আসতে পারেনি। তার জন্য তমালিকা বন্দরে আমাদের অপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। কারণ, জমিদারের নির্দেশে সূর্যাস্তের পর আমরা আর বন্দরে থাকতে পারতাম না। নাখোদা আব্বাস এখানে এসে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবে। তারপর সে আমাদের নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি দেবে।'

এস্তাদিওর কথা শুনে ফিরে গেল পেড্রো।

শুরু হল প্রতীক্ষা। এস্তাদিও ভাবতে লাগল, এতক্ষণে নিশ্চয়ই মৎস্যগন্ধা আব্বাসের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নৌকা নিয়ে তারা এগিয়ে আসছে মোহনার দিকে। ডেকে দাঁড়িয়ে সে দিকেই তাকিয়ে রইল এস্তাদিও। আর এরপরই হঠাৎ খণ্ড খণ্ড মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ। প্রথমে টিপ টিপ করে, তারপর মুষলধারে বৃষ্টি নামল। মোহনা অঞ্চলে এ-ধরনের বৃষ্টিপাত মাঝে মাঝেই হয়। ডেক ছেড়ে নাবিকরা প্রবেশ করল খোলের মধ্যে। এস্তাদিও বৃষ্টির হাত থেকে মাথা বাঁচাবার জন্য ডেক সংলগ্ন কেবিনে গিয়ে ঢুকল। একটা মোমবাতি জ্বলছে কেবিনে। ঘরে রাখা বালি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে মৎস্যগন্ধার আসার প্রতীক্ষা করতে লাগল সে। বালি ঘড়ি থেকে একটু একটু করে বালি ঝরে পড়তে লাগল, সময় এগিয়ে চলতে লাগল। ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠতে লাগল এস্তাদিও। মাঝে মাঝেই সে জানলা দিয়ে বাইরে ডেকের দিকে তাকাতে লাগল। হঠাৎই ডেকের এক কোণে একটা আলো চোখে পড়ল এস্তাদিওর। নড়ছে আলোটা। মৎস্যগন্ধারা তবে পৌঁছোল নাকি? কেবিন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল এস্তাদিও। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। নাবিকরা ডেকে কেউ নেই। আর বৃষ্টির মধ্যে ডেকের কোণের কার্নিশে দাঁড়িয়ে লণ্ঠন দোলাচ্ছে একটা লোক!

'কে ওখানে? কী করছে?'

এস্তাদিও হাঁক দিতেই লোকটা তাড়াতাড়ি কার্নিশ ছেড়ে এগিয়ে এসে এস্তাদিওর সামনে দাঁড়াল। পেড্রো!

এস্তাদিও অবাক হয়ে বলল, 'বৃষ্টির মধ্যে লন্ঠন নিয়ে ওখানে তুমি কী করেছিলে?'

পেড্রো বলল, 'আমার বেতন বাবদ আপনি যে রুপোর মুদ্রাগুলো দিয়েছিলেন সেগুলো কোমরে গেঁজের মধ্যে রেখেছিলাম। গেঁজ ছিঁড়ে কয়েকটা মুদ্রা পড়ে গেছে। সম্ভবত ডেকের ও-জায়গার আশেপাশেই কোথাও পড়েছে। ওখানেই তো সন্ধ্যা থেকে দাঁড়িয়েছিলাম আমি। যদি মুদ্রাগুলো অন্য কেউ কুড়িয়ে নেয় তাই বৃষ্টির মধ্যেই সেগুলো খুঁজছিলাম আমি।'

এস্তাদিও বলল, 'খুঁজে পেলে?'

বিষণ্ণমুখে পেড্রো বলল, 'একটা পেলাম। যাই, এবার খোলের ভিতর খুঁজি গিয়ে।' এই বলে সে কিছুটা এগিয়ে খোলের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।

এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি ধরে এল। যদিও বৃষ্টি একদম থামল না। তার মধ্যেই এস্তাদিও ডেকের ধারে এসে দাঁড়াল। যে-পথে মৎস্যগন্ধার আসার কথা সেই নদীপথের দিকে তাকিয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। আরও দু-চারজন নাবিকও ডেকে এসে দাঁড়াল। সময় এগিয়ে চলল।

এক সময় এস্তাদিও অনুমান করল, রাত্রি প্রায় দুই প্রহর হতে চলল। এবার নিশ্চই যে-কোনও মুহূর্তে দেখা দেবে মৎস্যগন্ধার নৌকা। এস্তাদিও জাহাজের ডেকের কার্নিশে ঝুঁকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করতে লাগল নদীর দিকটা।

হঠাৎ ডেকে দাঁড়ানো একজন নাবিক চিৎকার করে উঠল, 'আরে! ওটা কী?'

তার চিৎকার শুনে পিছন ফিরল এস্তাদিও। একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল তার। সমুদ্রের দিকের কুয়াশার আবরণ ভেদ করে ভূতের মতো একটা জাহাজ ধেয়ে আসছে মকরবাহিনীর দিকে! দুটো জাহাজের মধ্যে কয়েকরশি মাত্র ব্যবধান!

ব্যাপারটা ভালো করে কেউ বুঝে উঠতে না উঠতেই সেই জাহাজটা হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ল তাদের ওপর। দুটো জাহাজের সংঘর্ষে থরথর করে কেঁপে উঠল মকরবাহিনী। দু-একজন নাবিক পড়ে গেল নিজেদের সামলাতে না পেরে। এর পরমুহূর্তেই একসঙ্গে অনেক ক'টা মশালের আলো জ্বলে উঠল সেই জাহাজটার থেকে। আর সেই মুহূর্তেই এস্তাদিও চিনতে পারল জাহাজটাকে। আরে, এ যে 'সান্টা মারিয়া'!

কিন্তু তার ডেকে যে লোকগুলো দাঁড়িয়ে তারা সান্টা মারিয়ার নাবিক নয়। তাদের মাথায় ফেট্টি বাঁধা, কোমরবন্ধের নীচে ঢিলে পাজামা, গায়ে হাতকাটা জামা। হিংস্র অভিব্যক্তি তাদের চোখে-মুখে। কারও হাতে খাপ-খোলা তলোয়ার, কারও হাতে লম্বা নলঅলা হাত-বন্দুক, যা সাধারণত জলদস্যুরা ব্যবহার করে!

এস্তাদিওর ডেক থেকে কোনও এক নাবিক চিৎকারও করে উঠল, 'জলদস্যু! জলদস্যু!'

তবে কি মোহনা থেকে সমুদ্রে প্রবেশ করার পর জলদস্যুর কবলে পড়েছিল সান্টা মারিয়া? জলদস্যুরা দখল নিয়েছে জাহাজটার? এস্তাদিও তলোয়ার খুলে ফেলল। ইসমাইলও ডেকে বেরিয়ে এল একটা তলোয়ার নিয়ে। সান্টা মারিয়া থেকে কাঠের পাটাতন ফেলা হল এস্তাদিওর জাহাজের ডেকে। আর সেই কাঠের পাটাতন বেয়ে মকরবাহিনীর ডেকে লাফিয়ে নামতে লাগল অস্ত্রধারী লোকগুলো। এস্তাদিওর জাহাজ থেকে কোনও প্রতিরোধ আসতে পারে তা হয়তো ভাবেনি লোকগুলো। প্রথম যে লোকটা পাটাতন বেয়ে নেমেছিল, ইসমাইল ছুটে গিয়ে তরোয়াল বিঁধিয়ে দিল তার পেটে। আর্তনাদ করে ডেকে গড়িয়ে পড়ল লোকটা। একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল ডেক জুড়ে। দু-পক্ষের চিৎকার, তলোয়ারের ঝনঝনানি, বন্দুকের শব্দ আর বারুদের ধোঁয়াতে ধোঁয়াতে ভরে উঠল ডেক। এস্তাদিওর দিকেও এগিয়ে এল কয়েকজন। তাদের সঙ্গে শুরু হল তলোয়ারের লড়াই। ভালোই লড়ছিল ইসমাইল। সাহস আর শক্তি দুটোই আছে তার দেহে। আরব রক্ত প্রবাহিত তার দেহে, যে রক্তের ভয়ে একদিন স্বয়ং ভাস্কোকেও পালাতে হয়েছিল ভারত মহাসাগর ছেড়ে। আক্রমণকারীদের মধ্যে আরও দুজন ধরাশায়ী হল তার তুর্কি তলোয়ারের আঘাতে। কিন্তু অসম লড়াই বেশিক্ষণ চলে না। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে ধরতে লাগল সান্টা মারিয়ার লোকগুলো। হঠাৎ-ই একটা গুলি এসে ফুঁড়ে দিল ইসমাইলের বুক। ডেকে গড়িয়ে পড়ল তার দেহটা। এরপর তারা এগোল এস্তাদিওর দিকে। এস্তাদিও পাকা তলোয়ারবাজ নয়। কিছুক্ষণ সে লোকগুলোকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করল ঠিকই। কিন্তু একসময় তার হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে পড়ল। টাল সামলাতে না পেরে নিজেও মাটিতে পড়ে গেল এস্তাদিও। তলোয়ার-হাতে লোকগুলো একটা বৃত্ত রচনা করে এগিয়ে আসতে লাগল এস্তাদিওর দিকে। ক্রমশ সেই বৃত্ত ছোট হয়ে আসতে লাগল। লোকগুলোর চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে হিংস্র উল্লাস। মশালের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে উদ্যত তলোয়ারগুলো। বেশ কয়েকটা লোক একসঙ্গে তলোয়ার ওঠাতে যাচ্ছিল এস্তাদিওকে গেঁথে ফেলার জন্য। ঠিক সেইসময় একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, 'থামো, ওকে মেরো না।'

সেই কণ্ঠস্বর শুনে লোকগুলো থেমে গেল।

ভিড় ঠেলে এরপর যে-দুজন লোক এস্তাদিওর সামনে এসে দাঁড়াল তাদের দেখে বিস্মিয়ে উঠে বসল এস্তাদিও!

সান্টা মারিয়ার ক্যাপ্টেন পেরো আর চিকিৎসক ফ্রান্সিস!

এস্তাদিও ক্যাপ্টেন পেরোকে প্রশ্ন করল, 'এসব কী হচ্ছে? এ লোকগুলো কারা?'

পেরো জবাব দিল, 'এরা সব প্রাক্তন জলদস্যু! পর্তুগিজ রণপোতের ক্যাপ্টেন কোহেলোর অনুচর। আপনাকে গ্রেপ্তার করা হল।'

'গ্রেপ্তার! কেন? কার নির্দেশে?' প্রশ্ন করল এস্তাদিও।

ফ্রান্সিস এবার জবাব দিল, 'এদেশে আমাদের সর্বময় কর্তা, পর্তুগালের মহামান্য সম্রাট দ্বিতীয় জনের প্রতিনিধি ভাস্কোর নির্দেশে। অ্যাডমিরালের নির্দেশ অমান্য করেছেন আপনি।'

পেরো এরপর বলল, 'আপনাকে আমরা ক্যাপ্টেন কোহেলোর হাতে তুলে দেব। তারপর আপনাকে গোয়া নিয়ে যাওয়া হবে। ভাইসরয় ভাস্কো-ডা-গামার দরবারে আপনার বিচার হবে।'—কথাগুলো বলে ক্যাপ্টেন পেরো তার লোকদের নির্দেশ দিলেন, 'ওকে বেঁধে ফেলো। তারপর খোলের কয়েদঘরে নিয়ে যাও। সারা জাহাজটার তল্লাসী নাও। আর যে-ক'টা লোক বেঁচে আছে তাদেরও বেঁধে ফেলো।

তার নির্দেশে দুজন লোক দড়ি নিয়ে এসে বাঁধতে শুরু করল এস্তাদিওকে। আর অন্য লোকগুলোও নানা দিকে ছুটল কর্তব্য সম্পাদনের জন্য। এরপর হঠাৎ ফ্রান্সিস বলল, 'পেড্রো কোথায় গেল? তাকে দেখছি না কেন?'

ফ্রান্সিস এরপর হাঁক দিল পেড্রোর নাম ধরে।

মাথার ওপর থেকে সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল, 'এই যে আমি। আসছি।'

এস্তাদিও ওপরদিকে তাকিয়ে দেখতে পেল জাহাজের প্রধান মাস্তুল বেয়ে নীচে নেমে আসছে পেড্রো। ডেকে যখন লড়াই চলছিল তখন সম্ভবত মাস্তুলে উঠে পড়েছিল পেড্রো।

দড়ি-বাঁধা অবস্থায় এস্তাদিওকে দাঁড় করানো হল। পেড্রোও নীচে নেমে সেখানে এসে দাঁড়াল। তাকে দেখে এস্তাদিও ক্যাপ্টেন পেরোদের বলল, 'পেড্রোর কোনও দোষ নেই। ওর কোনও ক্ষতি তোমরা কোরো না।'

কথাটা শুনেই হেসে উঠল ফ্রান্সিস। সে বলে উঠল, 'না, করব না। ওকে আমরা পুরস্কৃত করব ঠিকমত কাজটা করার জন্য। পেড্রোই তো লণ্ঠন নেড়ে আমাদের সংকেত দিল এখানে আসার জন্য।'

ফ্রান্সিসের কথায় হতভম্ব হয়ে গেল এস্তাদিও। কথাগুলো বলার পর ক্যাপ্টেন পেরো, পেড্রোকে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেলেন। দুজন লোক এবার এস্তাদিওকে টানতে টানতে জাহাজের খোলের ভিতর নামিয়ে আনল। অবাধ্য নাবিকদের শাস্তি দেবার জন্য প্রত্যেক জাহাজের খোলেই একটা করে লোহার গরাদ দেওয়া খোপ থাকে। যাকে গরাদঘর বলে। সেই ঘরেই আটক করা হল এস্তাদিওকে। পুরো জাহাজের দখল নিল ক্যাপ্টেন পেরোর লোকরা। সারা জাহাজের আনাচে কানাচে তল্লাসি শেষ হলে বেশ অনেকক্ষণ পর সেই গরাদঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস। পেরো গরাদের বাইরে থেকে এস্তাদিওকে প্রশ্ন করলো, 'সেই সিন্দুকটা কই?'

'কোন সিন্দুক?' পাল্টা প্রশ্ন করল এস্তাদিও।

পেরো জবাব দিল, 'যে সিন্দুকটা মাঝরাতে পেড্রো তোমাকে আর মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে আসতে দেখেছিল।'

ক্যাপ্টেনের কথা শুনে চমকে উঠল এস্তাদিও। তার মানে পেড্রো অনুসরণ করত তাকে!

এস্তাদিও বলল, 'ওসব আমি জানি না। পেড্রো বানিয়ে বলেছে সিন্দুকের কথা।'

ক্যাপ্টেন বিশ্বাস করলেন না কথাটা। তিনি বললেন, 'কী ছিল ওই সিন্দুকে?'

এস্তাদিও বলল, 'বলছি তো ওই সিন্দুকের কথা আমার জানা নেই।'

ফ্রান্সিস বলল, 'সে সিন্দুক কি তবে মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ে আছে?'

তার কথার কোনও জবাব দিল না এস্তাদিও।

ফ্রান্সিস ক্যাপ্টেনকে এরপর বলল, 'উনি যখন কিছু আমাদের বলতে চাইছে না তখন থাক। আমরা ওকে ক্যাপ্টেন কোহেলোর সামনে হাজির করাই। আশা করি তার কাছে উনি সব কিছু খুলে বলবেন। আমার ধারণা কথা বের করার কৌশল তিনি জানেন।'

ক্যাপ্টেন পেরো এরপর সে জায়গা ত্যাগ করে খোল ছেড়ে ডেকে উঠে এলেন ফ্রান্সিসকে নিয়ে। পেড্রো ডেকেই দাঁড়িয়েছিল। তাকে হাঁক দিলেন পেরো। পেড্রো তাদের সামনে এসে দাঁড়াতেই ক্যাপ্টেন বললেন, 'বণিক তো বলছে সিন্দুকের ব্যাপারটা তোমার বানানো গল্প?'

পেড্রো টুপি খুলে বলল, 'যিশুর দিব্যি। এটা বানানো গল্প নয়। আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম সিন্দুক খচ্চরের পিঠে চাপিয়ে তুলে আনতে। আমার কথা মিথ্যা হলে আমাকে আপনারা সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দেবেন।'

ফ্রান্সিস, পেরোকে বলল, 'সারা জাহাজ, মালপত্র ইত্যাদি তল্লাসী করেও তো কোনও পেটিকা বা সিন্দুক পাওয়া গেল না। ওটা যদি মৎস্যগন্ধার গণিকালয়ে থেকে থাকে তবে তা উদ্ধার করা মুশকিল হবে।'

পেড্রো এবার বলল, 'আমার একটা ধারণা হচ্ছে ক্যাপ্টেন।'

'কী ধারণা?' জানতে চাইলেন পেরো।

পেড্রো বলল, 'এখানে আমাদের জাহাজ নোঙর করা হয়েছিল নাখোদা আব্বাসের জন্য। রাতেই তার এসে আমাদের সঙ্গে মিলিত হবার কথা। সে আমাদের সঙ্গে এল না কেন সে ব্যাপারে আমার এখন সন্দেহ জাগছে। যে মৎস্যগন্ধার জন্য বণিক আপনাদের ত্যাগ করল, সবচেয়ে বড় কথা, স্বয়ং অ্যাডমিরালের নির্দেশও অমান্য করল, তার পক্ষে কি এত সহজে সেই বেশ্যাকে ত্যাগ করা সম্ভব? এমনও হতে পারে যে, নাখোদা আব্বাস জমিদারের লোকজনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মৎস্যগন্ধাকে এখানে নিয়ে আসছে! হয়তো সেই সিন্দুকও তাদের সঙ্গে আছে। সেই সিন্দুকে যদি সত্যিই মূল্যবান কিছু জিনিস থেকে থাকে তো নিশ্চই তারা সেই সিন্দুক বা তার ভিতরের জিনিসগুলো সঙ্গে করেই আনবে।'

পেরো কথাগুলো শুনে নিয়ে তাকে বললেন, 'ঠিক আছে। এবার তুমি যাও।'

পেড্রো চলে যাবার পর ফ্রান্সিস বলল, 'ওর কথায় কিন্তু যুক্তিও আছে। আমরা বরং অপেক্ষা করি এখানে। দেখা যাক তারা এখানে এসে পৌঁছোয় কিনা? রাত শেষ হতে তো আর একটা মাত্র প্রহর বাকি।'

ক্যাপ্টেন বললেন, 'কিন্তু দুটো জাহাজকে একসঙ্গে দেখলে যদি ওরা আমাদের কাছে না ঘেঁষে?'

ফ্রান্সিস বলল, 'দেখুন, এস্তাদিওর ফেরা-না-ফেরা নিয়ে আমাদের সঙ্গে তর্ক হলেও সেভাবে লড়াই-ঝগড়া হয়নি। এমনও তো তারা ভাবতে পারে যে, মোহনায় এসে এস্তাদিওর সঙ্গে দেখা হয়েছে আমাদের। দু-পক্ষর মধ্যে সমস্যা মিটে গেছে। তাই আমরা একসঙ্গে আছি। অপেক্ষা করেই দেখা যাক না কী হয়?'

ক্যাপ্টেন পেরো বললেন, 'তবে তাই হোক।'

প্রতীক্ষাপর্ব শুরু হল ডেকে। আর খোলের অন্ধকার ঘরে বন্দি এস্তাদিও ভাবতে লাগল ডেকে কী ঘটছে? মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে আব্বাস কী হাজির হয়েছে এ-জাহাজে? তাদের কী বন্দি করা হয়েছে? কী ঘটছে মৎস্যগন্ধার সঙ্গে? অন্ধকার কক্ষে বসে এস্তাদিও মৎস্যগন্ধার কথা ভেবে অসহায়ের মতো ছটফট করতে লাগল।

ক্যাপ্টেন পেরোদের অপেক্ষাই সার হল। রাত কেটে গিয়ে ভোর হল এক সময়। দিগন্তবিস্তৃত জলরাশিকে উদ্ভাসিত করে সূর্যদেব একসময় উদিত হলেন। সারা ডেক জুড়ে ছড়িয়ে আছে গতরাতের লড়াইয়ের চিহ্ন। ক্ষতবিক্ষত সব লাশ। জনা কুড়ি নাবিক ছিল এ-জাহাজে। তার মধ্যে তিন-চারজন বেঁচে আছে দড়ি-বাঁধা অবস্থায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তাপে আর নোনা বাতাসে লাশগুলো ফুলে উঠতে লাগল। শেষপর্যন্ত যখন সূর্য ঠিক মাথার উপর উঠল তখনও দেখা মিলল না মৎস্যগন্ধার। ক্যাপ্টেন কোহেলোর লোকগুলোর মধ্যে দলনেতা এসে ক্যাপ্টেন পেরোকে বলল, 'তিনদিন ধরে আপনাদের সঙ্গে আছি। এবার আমরা জাহাজে ফিরতে চাই। আপনারা বলেছিলেন কোনও প্রতিরোধ হবে না এ-জাহাজ থেকে। অথচ আমাদের তিনজন লোক মারা পড়ল। বেশ কয়েকজন আহত। ক্যাপ্টেন কোহেলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এরপর যা করার করবেন।'

কিছুটা দূরেই সমুদ্রের মধ্যে নোঙর করে আছে ক্যাপ্টেন কোহেলোর রনপোত। এ জাহাজদুটো যেখানে আছে তাদের দৃষ্টিশক্তির বাইরে হলেও বেশি দূরে নয় সে জায়গা। তিনদিন আগে ক্যাপ্টেন পেরো সমুদ্রের বুকে মিলিত হয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে। সান্টা মারিয়ার নাবিকরা কেউ প্রয়োজনবোধে লড়াইতে পারদর্শী নয়। তাদেরকে জাহাজে ক্যাপ্টেন কোহেলোর কাছে রেখে কোহেলোর ভূতপূর্ব জলদস্যু সঙ্গীদের নিয়ে এসে তিনদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন ক্যাপ্টেন পেরো। এ-লোকগুলো সাধারণ নাবিক নয়। নৃশংসতা এদের রক্তে। বলা যায় না, অধৈর্য হয়ে এরা হয়তো শেষপর্যন্ত হামলা করে বসল ক্যাপ্টেন পেরোর ওপরেই।

ফ্রান্সিসের সঙ্গে আলোচনা করে ক্যাপ্টেন পেরো সিদ্ধান্ত নিলেন, ক্যাপ্টেন কোহেলোর সঙ্গে দেখা করাই ভালো। তারপর এস্তাদিওকে তার হাতে তুলে দিয়ে তার কথামতো যা সিদ্ধান্ত নেবার নেওয়া যাবে।

দুটো জাহাজেরই নোঙর তোলার নির্দেশ দিলেন ক্যাপ্টেন পেরো।

নোঙর তোলার মুহূর্তে যে ঝাঁকুনি হয় তা অনুভব করে অন্ধকার কক্ষে বন্দি এস্তাদিও বুঝতে পারল জাহাজ আবার চলতে শুরু করেছে। কিন্তু মৎস্যগন্ধা কোথায়? সে কি এল না? নাকি তাকে নিয়েই চলতে শুরু করেছে এ-জাহাজ? ভাবতে লাগল শঙ্কিত এস্তাদিও। ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস মকরবাহিনীর ডেকেই রইলেন। সান্টা মারিয়ার পিছন পিছন এগিয়ে চলল মকরবাহিনী।

সমুদ্রের একটু ভিতরেই নোঙর করা ছিল পর্তুগিজ রণপোতটা। বেশিক্ষণ লাগল না সে জায়গাতে পৌঁছতে। রণপোতের দু-পাশে দাঁড় করানো হল সান্টা মারিয়া আর মকরবাহিনীকে। রণপোত থেকে গায়ে লাগানো দুটো জাহাজের মধ্যেই কাঠের পাটাতন ফেলা হল। একসঙ্গে জুড়ে গেল তিনটে জাহাজ। মকরবাহিনীর ডেকে ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিসকে দেখতে পেয়ে ক্যাপ্টেন কোহেলো পাটাতন বেয়ে নেমে এলেন মকরবাহিনীর ডেকে।

ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ক্যাপ্টেন কোহেলোর কাছে বিবৃত করল সব কথা। সব শুনে ক্যাপ্টেন কোহেলো বললেন, 'চলুন, আগে বণিক এস্তাদিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসি। আর এ-জাহাজের যে-লোকগুলো বেঁচে আছে, তাদের আর বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। ওদের কে খাওয়াবে? ওদের বরং হাঙরের খাদ্য করা হোক।'

ক্যাপ্টেন কোহেলোর পিছন পিছন আরও কয়েকজন লোক নেমেছিল মকরবাহিনীর ডেকে। কোহেলোর কথা শোনামাত্রই তারা ছুটে গিয়ে রজ্জুবদ্ধ তিনজন মাল্লাকে উঠিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল সমুদ্রে। জলরাশির মধ্যে হারিয়ে গেল তাদের আর্তনাদ। ক্যাপ্টেন কোহেলোকে নিয়ে ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস এরপর এগোল খোলের ভিতর।

বাইরে দিনের আলো আছে। খোলের গায়ে যে ছোট ছিদ্র বা গবাক্ষগুলো আছে তা দিয়ে কিছুটা আলো ঢুকছে খোলের ভিতর। সেই আলোতে ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিসের সঙ্গে এক চোখে কালো পট্টিবাঁধা যে-লোকটা এস্তাদির গরাদঘরের সামনে হাজির হল তাকে চিনতে পারল না এস্তাদিও।

ক্যাপ্টেন পেরোই তার পরিচয় দিলেন। তিনি বললেন, 'ইনি হলেন ক্যাপ্টেন কোহেলো। অ্যাডমিরাল ভাস্কোই ক্যাপ্টেন কোহেলোকে রণপোত দিয়ে পাঠিয়েছেন আপনাকে গ্রেপ্তার করার জন্য। উনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন।'

ক্যাপ্টেন কোহেলো এরপর এস্তাদিওর উদ্দেশ্যে হেসে বললেন, 'আমি দুঃখিত, এভাবে আপনাকে গ্রেপ্তার করতে হল বলে। কিন্তু এছাড়া উপায় ছিল না।'

এস্তাদিও ব্যঙ্গের সুরেই জবাব দিল, 'আমাকে সমবেদনা জানাবার জন্য আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাই।'

কোহেলো বললেন, 'আশা করি আমার কথা শুনে চললে গোয়া পর্যন্ত যাত্রাপথে আমি এ সৌজন্য বজায় রাখতে পারব।'

'সেই সিন্দুকটা এখন কোথায়?' সরাসরি প্রশ্ন করলেন কোহেলো।

এস্তাদিও বলল, 'আমি ক্যাপ্টেন পেরোকে আগেই বলেছি এখন আপনাকেও বলছি, ওই সিন্দুকের কোনও অস্তিত্ব নেই। পেড্রো মিথ্যা বলেছে।'

ক্যাপ্টেন কোহেলো ধূর্ত হেসে বললেন, 'দেখুন এস্তাদিও, আপনি যতটা আমাকে বোকা ভাবছেন আমি ততটা নই। যদি ধরেও নিই যে, সিন্দুকের গল্পটা বানানো ছিল, তবে ওই বানানো গল্প শুনেই কি অ্যাডমিরাল আমাকে সিন্দুকটা উদ্ধারের জন্য পাঠালেন? তাঁকে কি আপনি এতটা শিশুসুলভ মনে করেন? নিশ্চিত অমন কোনও সিন্দুকের অস্তিত্ব আছে, যে-ব্যাপারটা আমরা না জানলেও অ্যাডমিরাল জানেন। পেড্রো কথাটা বানিয়ে বলেনি। কারণ সে জানে যে, এই মিথ্যা বলার জন্য আমরা তাকে হাঙরের মুখে ফেলে দিতে পারি বা মাস্তুল থেকে ঝুলিয়ে দিতে পারি। আর একটা ব্যাপার। আপনি বলতেই পারতেন যে সে-রাতে আপনারা অমন একটা সিন্দুক উদ্ধার করেছিলেন ঠিকই কিন্তু তা খোলার পর দেখেছেন তার মধ্যে পাথরের মূর্তি বা পুঁথির মতো কিছু বাজে জিনিস ছিল। কিন্তু আপনি সরাসরি অস্বীকার করছেন ব্যাপারটা। এটাই প্রমাণ করছে ওই সিন্দুকে মূল্যবান কিছু জিনিস আছে।'

একটানা কথাগুলো বলে এক চোখের তীক্ষ্নদৃষ্টি দিয়ে ক্যাপ্টেন কোহেলো এস্তাদিওর মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনের ভাব পাঠ করার চেষ্টা করলেন।

এস্তাদিও নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

ক্যাপ্টেন কোহেলো প্রশ্ন করলেন, 'সেই সিন্দুক বা তার ভিতরের জিনিসগুলো কোথায়? সেগুলো কি নাখোদা আব্বাস আর মৎস্যগন্ধা নামের গণিকা বহন করে আনছে?'

এবারও তার কথার জবাব দিল না এস্তাদিও।

ক্যাপ্টেন কোহেলো বললেন, 'ঠিক আছে, আপনি একটু ভেবে নিন কথাগুলো বলবেন কিনা? তারপর দেখি কী করা যায়?'

এরপর খোল ছেড়ে ডেকের ওপর উঠে এলেন কোহেলো।

ক্যাপ্টেন পেরো বললেন, 'ও যদি কথাগুলো বলতে না চায় তবে কী করবেন?'

কোহেলো বললেন, 'অন্য কেউ হলে রোজ ওর হাতের আঙুল একটা করে কেটে নিতাম। এভাবে অনেকেরই পেট থেকে কথা আদায় করেছি আমি। একসময় কাটা-আঙুল জমানো নেশা ছিল আমার। কিন্তু ওকে সেটা করা যাবে না। কারণ অ্যাডমিরাল ওকে তাঁর সামনে হাজির করানোর নির্দেশ দিয়েছেন।'

ফ্রান্সিস বলল, 'তবে কী আমরা এখানে অপেক্ষা করব মৎস্যগন্ধারা আসে কিনা তা দেখার জন্য?'

ক্যাপ্টেন কোহেলো বললেন, 'ওই সিন্দুকটা আমাদের উদ্ধার করতেই হবে। এমন হতে পারে যে আপনারা যখন বণিকের জাহাজ আক্রমণ করলেন তখন ওরা কাছেই ছিল। ব্যাপারটা ওরা দেখেছে। এমনও হতে পারে ওরা এদিকেই আসছে। ওদেরকে টোপ দিয়ে এখানে আমাদের কাছে আনতে হবে।'

'কী টোপ?' জানতে চাইলেন ক্যাপ্টেন পেরো।

একটু ভাবার পর ক্যাপ্টেন কোহেলোর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, 'লোকটার বুকে দড়ি বেঁধে রয়াল মাস্ট থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া যাক। তারা যদি এদিকে আসে তবে নিশ্চই দূর থেকে দেখতে পাবে মাস্তুলে ঝুলন্ত-এস্তাদিওকে। আর ওই বন্দর সুন্দরী যদি সত্যি বণিককে ভালোবাসে তবে নিশ্চয়ই ব্যাপারটা দেখামাত্রই ছুটে আসবে তাকে বাঁচাবার জন্য।'

এরপর ক্যাপ্টেন কোহেলোর নির্দেশে কিছুক্ষণের মধ্যেই এস্তাদিওকে উঠিয়ে আনা হল ডেকে। কোহেলো তাকে বললেন, 'ভাবলেন কিছু? বলুন সেই সিন্দুক কোথায়?'

এস্তাদিও জবাব দিল না তার কথায়।

কোহেলো হেসে বললেন, 'তাহলে আপাতত আপনাকে মাস্তুল থেকে ঝুলিয়ে দিচ্ছি আমরা। ঝুলতে ঝুলতে সিন্দুকটার কথা ভাবুন আপনি। মনে পড়লে বলবেন, আমরা আপনাকে আবার নীচে নামিয়ে আনব। খোলের গরাদঘরটা বড় স্যাঁতস্যাঁতে আর অন্ধকার। আপনার আলো-বাতাসের মধ্যে থাকা প্রয়োজন।'

এস্তাদিওর হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা। তার ফাঁক দিয়ে কাঁধের কাছে একটা শক্ত লম্বা লাঠি চালান করে দেওয়া হল। তারপর সেই শক্ত লাঠিটার দু-প্রান্তে রশি বেঁধে তাকে টেনে তোলা হল রয়াল মাস্টে। মাস্তুলের মাথা থেকে ঝুলতে লাগল এস্তাদিও।

২০

ক্যাপ্টেন কোহেলোর অনুমানই ঠিক। খাঁড়ি থেকে সমুদ্রে প্রবেশ করার সময় নাখোদা আব্বাস হঠাৎ নৌকা থামিয়ে সামনের দিকে আঙুল তুলে দেখাতেই মৎস্যগন্ধা দেখতে পেল সেই দৃশ্য। জলের মধ্যে একটা অংশ মশালের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠেছে। এস্তাদিওর জাহাজটার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে একটা জাহাজ। মশাল হাতে পাশের জাহাজ থেকে লোক ঝাঁপিয়ে পড়ছে এস্তাদিওর জাহাজের ডেকে। আর এরপরই চিৎকার-চেঁচামেচি আর বন্দুকের শব্দ ভেসে আসতে লাগল সেখান থেকে।

দৃশ্যটা দেখেই মৎস্যগন্ধা অবাক বিস্ময়ে বলে উঠল, 'কী হচ্ছে ওখানে?'

আব্বাস তাড়াতাড়ি খাঁড়ির একপাশে ছোট নৌকাটা সরিয়ে নিয়ে বলল, 'সম্ভবত জলদস্যু জাহাজ আক্রমণ করেছে।'

কথাটা শুনেই কেঁপে উঠল মৎস্যগন্ধা। সে বলে উঠল, 'এস্তাদিও যে ওখানে আছে!'

নাখোদা বলল, 'এখন ওখানে গেলে আপনারও বিপদ অবশ্যম্ভাবী। দেখা যাক কী হয়?'

মৎস্যগন্ধার মনে পড়ল তার বুকের মধ্যে রাখা বুদ্ধমূর্তিটার কথা। বুকের ভিতর থেকে চন্দনকাঠের টুকরোটা বের করে সেটা বুকে চেপে ধরে মৎস্যগন্ধা মনে মনে বলতে লাগল, 'হে ভগবান, তুমি নাবকিকে রক্ষা করো, রক্ষা করো।' এর কিছুক্ষণের মধ্যেই চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে মশালের আলোগুলোও নিভে গেল। ক্ষয়াটে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে রইল নিস্তব্ধ জাহাজ-দুটো।

আব্বাস বলল, 'রাত শেষ হতে আর বেশি বাকি নেই। ভোরের আলো ফুটলে হয়তো ব্যাপারটা বোঝা যাবে।'

চন্দনকাঠের টুকরোটা বুকে চেপে ধরে আগের মতোই ভগবানকে ডাকতে থাকল মৎস্যগন্ধা।

ভোর হল এক সময়। চারপাশে আলো ছড়িয়ে পড়লেও এ যেন কেমন বিবর্ণ বিষণ্ণ ভোর। সকাল হবার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মমতো পতাকা ওড়ানো হল এস্তাদিওর পাশের জাহাজটাতে। ক্রুশ আঁকা রক্তবর্ণের পতাকা। তাই দেখে মৎস্যগন্ধা বলে উঠল, 'আরে! ও পতাকাটা আমি চিনি। পর্তুগালের পতাকা। ওটা জলদস্যুদের জাহাজ নয়, সান্টা মারিয়া! যে জাহাজ নিয়ে বণিক এসেছিল তমালিকা বন্দরে। তিনদিন আগে জাহাজটা বন্দর ছেড়েছিল।'

আব্বাস তার কোমর থেকে একটা আতসকাচের নল বের করে জাহাজদুটোকে দেখল। কিন্তু তেমন কিছু দেখতে পেল না। আব্বাস বলল, 'তাহলে সম্ভবত ওরা তাকে ধরার জন্যই এখানে অপেক্ষা করছিল। আবার এমনও হতে পারে যে হঠাৎই সাক্ষাৎ হয়ে গেছে দুটো জাহাজের।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'আমার ধারণা ওকে ওরা মারবে না। অ্যাডমিরাল ভাস্কোর কাছে ধরে নিয়ে যাবে।'

বেলা বেড়ে চলল। কিন্তু জাহাজদুটো একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল। আব্বাস একসময় বলল, 'কিন্তু বুঝতে পারছি না ওরা এখানে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেন?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'এমন তো নয় যে, এস্তাদিও জানিয়েছে যে আমরা আসছি। আমাদের জন্যই ওরা অপেক্ষা করছে? চলো তবে জাহাজে যাই। তারপর যা হবার হবে।'

নাখোদা বলল, 'চট করে ওখানে যাওয়া বিপদ হতে পারে। আর একটু সময় অপেক্ষা করি।'

সময় যত এগোতে লাগল এস্তাদিওর কথা ভেবে তত অস্থির হয়ে উঠতে লাগল মৎস্যগন্ধা।

সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর উঠল তখন হঠাৎই জাহাজদুটো নড়ে উঠে চলতে শুরু করল। তাই দেখে মৎস্যগন্ধা বলে উঠল, 'চলো চলো। ওরা যে চলে যাচ্ছে!'

খাঁড়ি থেকে নৌকা বের করল আব্বাস। সামনেই নদী প্রবল জলস্রোতে মিলে মিশে ঘূর্ণির সৃষ্টি করেছে। চারপাশে পাক খাচ্ছে পাটকিলে রঙের জলস্রোত। ছোট নৌকাকে সেখানে সামলে রাখা মুশকিল। আব্বাশ দক্ষ হাতে সে জায়গাটাকে যখন সামলাল ততক্ষণে অনেক দূরে সরে গেছে জাহাজদুটো। জাহাজের গতিবেগের সঙ্গে নৌকা পাল্লা দিতে পারে না। ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে একসময় বিন্দুর মতো মিলিয়ে গেল জাহাজদুটো। মৎস্যগন্ধা বলে উঠল, 'ওদিকে চলো। আমাকে যেভাবেই হোক পৌঁছোতে হবে এস্তাদিওর কাছে। নিশ্চই সন্ধ্যা নামলে জাহাজ কোথাও নোঙর করবে। যেভাবেই হোক আমাকে তার কাছে পৌঁছোতে হবে। পৌঁছোতেই হবে। যে-কোনও কিছুর বিনিময়ে রক্ষা করতে হবে নাবিককে।'

নাখোদা আব্বাস বলে উঠল, 'মুকাল্লাফ ফিল বাহর।'

সমুদ্রের রক্ষাকর্তার নাম নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়ল নাখোদা আব্বাস। জাহাজদুটো যেদিকে গেছে সেদিকে এগোতে লাগল সে। সমুদ্রর তরঙ্গরাশিতে মোচার খোলের মতো দুলতে লাগল তাদের ছোট্ট ডিঙি নৌকাটা। এ-নৌকা নিয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়ার সাহস বা ক্ষমতা হয়তো বা শুধু আব্বাসেরই ছিল। নদীতে যারা নৌকা চালায় এ সাহস তাদের হোত না। মৎস্যগন্ধার চোখদুটো ব্যাকুলভাবে খুঁজতে লাগল যদি কোনও কালো বিন্দু দেখা যায় দিকচিহ্নহীন মহার্ণবের বুকে! যদি দেখা মেলে জাহাজ-দুটোর!

শেষপর্যন্ত অবশ্য দেখা মিলল তাদের। তখন প্রায় বিকেল হতে চলেছে। সমুদ্রের বুকে দেখা দিল সেই কালো বিন্দু। জাহাজ! জায়গাটা সমুদ্রের ভিতরে হলেও মোহনা থেকে খুব বেশি দূর নয়। কিন্তু ছোট নৌকা নিয়ে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ভেঙে সে জায়গাতে পৌঁছোতে অনেক সময় লেগেছে মৎস্যগন্ধাদের। জাহাজদুটো নিশ্চই অনেক আগেই সেখানে পৌঁছে গেছিল বলে অনুমান হল আব্বাসের। সে এগোল সেই কালো বিন্দুর দিকে। একসময় তারা বুঝতে পারল, দুটো নয়, তিনটে জাহাজ আছে সেখানে। একটা বেশ বড় জাহাজ। আর তার দুপাশে দুটো ছোট জাহাজ। ক্রমশই তাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হতে লাগল সবকিছু। বড় জাহাজটার মাস্তুলেও পর্তুগালের পতাকা উড়ছে। ডেকে বসানো সার সার কালো কালো জিনিসগুলো যে কামান তা বুঝতে অসুবিধা হল না অভিজ্ঞ নাখোদা আব্বাসের। আরও একটু এগিয়ে জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎই যেন একটা জিনিস ধরা দিল তার চোখে। নৌকার হাল ছেড়ে দিয়ে কোমর থেকে নলটা বের করে চোখে লাগাল সে। তারপর বলে উঠল, 'হায় খোদা!'

মৎস্যগন্ধা বলে উঠল, 'কী হল?'

নলটা মৎস্যগন্ধার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আব্বাস বলল, 'আমাদের জাহাজের মাস্তুলগুলো দেখুন। মৎস্যগন্ধা চোখ লাগান আতসকাচ পরানো নলে। কাছে এগিয়ে এল জাহাজের মাস্তুলগুলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে থরথর করে কেঁপে উঠল মৎস্যগন্ধা। মকরবাহিনীর মাস্তুল থেকে ঝুলছে একটা লোক। আর তাকে চিনতে পেরেছে মৎস্যগন্ধা। এস্তাদিও!!!

নাখোদা বলল, 'এবার আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'না, ফিরব না। এস্তাদিও জীবিত হোক বা মৃত, ওর কাছে যেতেই হবে আমাকে। আর দেরি কোরো না। তাড়াতাড়ি চলো।'

নাখোদা বলে উঠল, 'যা মনে হচ্ছে, একবার ওখানে গেলে আর ফেরা যাবে না। মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে ওখানে।

মৎস্যগন্ধা বিহ্বলভাবে তিরস্কার করে বলল, 'আমি যদি নারী হয়ে মৃত্যুভয় না পাই তবে তুমি পুরুষ হয়ে মরতে ভয় পাচ্ছ? শুনেছি নাবিকরা সাহসী হয়, তারা মরতে ভয় পায় না। আজ বুঝলাম সে-কথা ভুল। এস্তাদিও তোমার ওপর ভরসা করেছিল। নিমকহারাম তুমি। নৌকা না এগোলে আমি সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে জাহাজের কাছে যাব।'

মৎসগন্ধার বলা 'নিমকহারাম' শব্দটা যেন চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল নাখোদার ওপর। মুহূর্তের মধ্যে তার চোয়াল কঠিন হয়ে উঠল। সে বলল, 'হ্যাঁ, আমি এ-ক'দিন মালিকের নুন খেয়েছি। তবে আমি নিমকহারামও নই, মরতেও ভয় পাই না। আমি আপনার বিপদের কথাই ভাবছিলাম। চলুন তবে। কিন্তু আপনি কী দিয়ে ওদের মোকাবিলা করবেন আমি জানি না। ''মুকাল্লাফ ফিল বাহর'' আমাদের রক্ষা করুন।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'লোকে বলে বন্দর সুন্দরীদের কোনও মন থাকে না, শুধু দেহ থাকে। দেখি এই দেহটাকেই আজ ওদের মোকাবিলা করার জন্য কাজে লাগানো যায় কিনা?'

আর এরপরই মৎস্যগন্ধা নলটা চোখে লাগিয়ে বলল, 'ও নড়ছে! নড়ছে! এখনও বেঁচে আছে নাবিক! হ্যাঁ ও বেঁচে আছে! ওকে বাঁচাতে হবে। তাড়াতাড়ি চলো, তাড়াতাড়ি।'

নাখোদা আব্বাস আর কথা না বাড়িয়ে সমুদ্রের ঢেউ পেরিয়ে এগোল জাহাজগুলোর দিকে।

বেশ অনেকক্ষণ ধরে মাস্তুল থেকে ঝুলছে এস্তাদিও। পিঠ আর কাঁধের মাংসপেশি যেন ছিঁড়ে যেতে চাইছে। শরীর অসাড় হয়ে আসছে। ওপর থেকে যতদূর চোখ যায় চারদিকে শুধু কালো জলরাশি। জীবনের কোনও স্পন্দন দেখা যাচ্ছে না কোথাও। পায়ের নীচে আছে মৃত নাবিকদের লাশগুলো। এ যেন এক মৃত্যুসমুদ্র। মৃত্যু যেন হাতছানি দিচ্ছে এস্তাদিওকে। তারই মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় এস্তাদিও ভাবছিল মৎস্যগন্ধার কথা। সে কি তবে আবার তমালিকা বন্দরে ফিরে গেল? ভালোই করেছে সে। জীবনটা অন্তত তার বেঁচে গেল। আর হয়তো তার কোনওদিন মৎস্যগন্ধার সঙ্গে দেখা হবে না। তবে যেখানেই থাকুক যেন ভালো থাকে মৎস্যগন্ধা।

ঝুলতে ঝুলতে এসবই ভাবছিল এস্তাদিও। কিন্তু হঠাৎই তার চোখ পড়ল নীচের দিকে। একটা ছোট নৌকা এগিয়ে আসছে তার জাহাজটার দিকে। নৌকার আরোহীদের দেখে চিনতে পারল এস্তাদিও। আব্বাস নৌকা বাইছে আর মৎস্যগন্ধা নৌকা থেকে তার দিকে হাত নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। তাকে দেখামাত্র এস্তাদিও চিৎকার করে বলতে থাকল, 'ফিরে যাও তোমরা। পালাও পালাও। এখানে এলে বাঁচবে না। পালাও পালাও।'

কিন্তু তার কথায় কর্ণপাত করল না মৎস্যগন্ধা। নৌকাটা ক্রমশ জাহাজের গায়ে এগিয়ে আসতে লাগল। ক্যাপ্টেন কোহেলো তার রণপোতের কেবিনে বসে মদ্যপান করছিলেন ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিসকে নিয়ে। মাস্তুলের ওপর থেকে এস্তাদিওর চিৎকার শুনে তারা বাইরে বেরিয়ে পাটাতন বেয়ে উপস্থিত হলেন মকরবাহিনীর ডেকে। ততক্ষণে মৎস্যগন্ধার নৌকা এসে ভিড়েছে জাহাজের গায়ে। ওপর থেকে এস্তাদিও শেষ একবার চিৎকার করে উঠল, 'পালাও মৎস্যগন্ধা, পালাও। জাহাজে উঠো না।'

সে চিৎকার শুনে হাসি ফুটে উঠল ধূর্ত কোহেলোর ঠোঁটে। তার পরিকল্পনা সফল হয়েছে। কোহেলোর নির্দেশে দড়ির মই নামিয়ে দেওয়া হল জাহাজের গায়ে। আর সেই মই বেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই মকরবাহিনীর ডেকে উঠে এল মৎস্যগন্ধা আর নাখোদা আব্বাস।

ক্যাপ্টেন কোহেলো বেশ অবাক হয়ে গেলেন তাকে দেখে। তিনি শুনেছিলেন, এ গণিকা নাকি খুব সুন্দরী। কিন্তু মৎস্যগন্ধা যে এত সুন্দরী তা তার ধারণা ছিল না। তার দেহের প্রতিটা অংশে যেন জেগে আছে যৌনতার হাতছানি। যেন সমুদ্রের বুক থেকে জাহাজের ডেকে উঠে এল কোনও জলপরি!

ক্যাপ্টেন কোহেলো কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে মৎস্যগন্ধার সামনে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, 'আমি ক্যাপ্টেন কোহেলো। তোমাকে স্বাগত জানাচ্ছি। এই তিনটে জাহাজই এখন আমার নিয়ন্ত্রানাধীন। আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। কিছু কাজের কথা আছে তোমার সঙ্গে।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'সব কথা হবে। কিন্তু তার আগে এস্তাদিওকে মাস্তুল থেকে নামাও।'

ধূর্ত কোহেলো বরাবরই কৌশলে কাজ হাসিলের পক্ষপাতী। তিনি তার অনুচরদের বললেন, 'ওকে ওপর থেকে নীচে নামিয়ে খোলে নিয়ে যাও। খাবার আর জল দাও।'

ক্যাপ্টেন কোহেলোর নির্দেশ পালিত হল সঙ্গে সঙ্গে। এস্তাদিওকে নামিয়ে আনা হল। তারপর তাকে টানতে-টানতে নিয়ে যাওয়া হতে লাগল খোলের দিকে। এস্তাদিও আর্তনাদ করে উঠল, 'তুমি এখানে কেন এলে মৎস্যগন্ধা? শয়তানগুলো তোমাকেও ছাড়বে না।'

মৎস্যগন্ধা বলে উঠল, 'ওকে নিয়ে যেও না। এখানেই রাখো।'

ক্যাপ্টেন কোহেলো বলে উঠলেন, 'তোমার চিন্তা নেই বন্দরসুন্দরী। ওর কোনও ক্ষতি হবে না। আগে তোমার সঙ্গে আমার কথাবার্তা মিটে যাক। তারপর নিশ্চই কথা বলার সুযোগ পাবে ওর সঙ্গে।'

এস্তাদিওকে নিয়ে খোলের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল ক্যাপ্টেন কোহেলোর লোকগুলো।

মৎস্যগন্ধা ক্যাপ্টেন কোহেলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাপ্টেন পেরো বা ফ্রান্সিসের পরিচয় জানে না। সে তাদের কোনও দিন দেখেনি। শুধু এস্তাদিওর মুখে নামই শুনেছে এদের। তবে পেড্রোকে সে দেখে চিনতে পারল। কারণ পেড্রো এক সময় বেশ কয়েকবার গণিকালয়ে গেছিল। মৎস্যগন্ধা কিছুটা তফাতে ভিড়ের মধ্যে চিনতে পারল তাকে। আর তার ঠোঁটের কোণে হাসি দেখে এ-ও বুঝতে পারল যে, পেড্রো যোগ দিয়েছে এ-লোকগুলোর সঙ্গে। আরও একটা জিনিস সে বুঝতে পারল যে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা চোখে কালো টুপি পরা লোকটাই এখানকার সর্বময় কর্তা। কারণ সে-ই সব নির্দেশ দিচ্ছে। আর বাকিরা তা পালন করছে।

মৎস্যগন্ধা এরপর ক্যাপ্টেন কোহেলোকে জিগ্যেস করল, 'তোমার কী জানার আছে বলো?'

এতজন লোকের সামনে সিন্দুকের কথাটা পাড়া উচিত মনে করলেন না বিচক্ষণ কোহেলো। হাজার হোক তার সঙ্গীরা সব তারই মতো একসময় জলদস্যু ছিল। তাদের তিনি বিলক্ষণ চেনেন। নেহাত ফাঁসি এড়াতে তারা তারই মতো অ্যাডমিরাল ভাস্কোর অনুগামী হয়েছে। কাজেই ক্যাপ্টেন কোহেলো মৎস্যগন্ধাকে বলল, 'চলো, আমরা আমার রণপোতের কেবিনে যাই। সেখানে বসেই কথা হবে।'

এমনই একটা সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিল মৎস্যগন্ধা। সে বলল, 'আমিও একান্তেই তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই। দ্বিতীয় কেউ যেন সেখানে না থাকে।'

যে-কোনও মূল্যে সেই সিন্দুকের খবর করাই তার আসল কাজ। আর সেটা যদি মসৃণভাবে হয়ে যায় তবে আপত্তি কী? ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস একটু হয়তো অসন্তুষ্ট হবে জেনেও কোহেলো বললেন, 'ঠিক আছে, তাই হবে।'

ক্যাপ্টেন কোহেলোর পিছন পিছন পাটাতন বেয়ে রণপোতে উঠে এল মৎস্যগন্ধা। তারপর প্রবেশ করল গালিচা মোড়া ক্যাপ্টেন কোহেলোর খাস কামরায়। ঘরে ঢুকে কোহেলো কেবিনের দরজা বন্ধ করে দিলেন। ঘরটা বেশি বড় নয়। গদি- আঁটা একটা ছোট পালঙ্ক আর একটা চারপায়া ঘিরে ক'টা কেঠো আসন রাখা আছে সেখানে। টেবিলের ওপর রাখা আছে পানীয় বোতল আর ক'টা স্বচ্ছ পাত্র। কিছু সময় আগে ক্যাপ্টেন কোহেলো সেগুলো নিয়ে বসেছিলেন ক্যাপ্টেন পেরোদের সঙ্গে। বাইরে বিকেল হয়ে গেছে। সূর্য এবার ঢলতে শুরু করবে সমুদ্রে। চারপায়ার সামনে মুখোমুখি দুটো আসনে বসল ক্যাপ্টেন কোহেলো আর মৎস্যগন্ধা।

কোহেলো কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মৎস্যগন্ধার রূপের দিকে। তারপর সরাসরি প্রশ্ন করলেন, 'তুমি আর এস্তাদিও মিলে গভীর রাতে বুদ্ধমন্দির থেকে যে সিন্দুকটা উদ্ধার করেছিলে সেটা কোথায়? অ্যাডমিরাল ভাস্কো সেটা নিয়ে যাবার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন।'

কথাটা শুনে মৎস্যগন্ধা প্রচণ্ড বিস্মিত হলেও মুখে তা প্রকাশ করল না। মুক্তোর মতো হাসি ছড়িয়ে সে জানতে চাইল, 'এ খবর তোমরা পেলে কোথায়?'

কোহেলো জবাব দিলেন, 'পেড্রো তোমাদের অনুসরণ করেছিল সে-রাতে। সে বলেছে।'

মৎস্যগন্ধা বুঝতে পারল যে ব্যাপারটা অস্বীকার করে লাভ নেই। অন্য কৌশল অবলম্বন করতে হবে মাথা ঠান্ডা রেখে। সে বলল, 'বলব, বলব, সব বলব তোমাকে। আমি কি জানি না যে, এখানে এলে তোমার প্রশ্নের জবাব না দিলে পার পাওয়া যাবে না। তাছাড়া তুমি কিন্তু বেশ সুপুরুষ। এমন পুরুষ আমার ভালো লাগে। আমি অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। আমাকে একটু বিশ্রাম নিতে দাও। আর তুমিও এই ফাঁকে একটু পান করে মনটাকে সতেজ করো।' এই বলে একটা পাত্র নিয়ে তাতে মদ ঢেলে মৎস্যগন্ধা সেটা বাড়িয়ে দিল কোহেলোর দিকে।

কোহেলো বেশ বিস্মিত হলেন ব্যাপারটাতে। সাক্ষাৎ জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়েও এমন শান্ত থাকতে পারে কোনও নারী, তা কোহেলোর জানা ছিল না। মদপূর্ণ পাত্রটা নিয়ে কোহেলো ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে দিলেন।

এরপর তিনি চেয়ে রইলেন মৎস্যগন্ধার দিকে। মৎস্যগন্ধা এরপর কোহেলোর হাত থেকে পাত্রটা নিয়ে তাতে মদ ঢেলে পরিপূর্ণ করল। কড়া জাহাজি মদের গন্ধে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে ঘরটা।

বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। তারপর মৎস্যগন্ধা মদের পাত্রটা কোহেলোর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'বেশ গরম লাগছে এখানে। হাওয়া-বাতাস নেই।' কথাগুলো বলে মৎস্যগন্ধা হঠাৎই গরম লাগার ভান করে ওড়নাটা সরিয়ে নিল। উন্মুক্ত হয়ে গেল তার শরীরে সামনের বহিঃ আবরণ। কোহেলোর চোখে ধরা দিল মৎস্যগন্ধার আঁটসাঁট বক্ষ-আবরণীর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসা দুই শুভ্র স্ফীত স্তনের মাঝে গিরিখাদের মতো ঘন সন্নিবিষ্ট, তরমুজের ফালির মতো বক্ষ বিভাজিকা, মেদহীন সরু কোমরের ঠিক মাঝখানে রুপোর কাঁচা টাকার মতো সুগভীর নাভি। সেদিকে চেয়ে ঘোর লেগে গেল কোহেলোর। দ্বিতীয় পাত্রটাও দ্রুত গলধঃকরণ করে নিলেন ক্যাপ্টেন কোহেলো। আগে ক্যাপ্টেন পেরোর সঙ্গে বসে বেশ কয়েক পাত্র মদ্যপান করেছেন। আরও দু-পাত্র মদ্যপানের পর মৎস্যগন্ধার অর্ধ উন্মুক্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন ধাঁধা লাগতে লাগল ক্যাপ্টেন কোহেলোর।

তবুও নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে কোহেলো বললেন, 'এবার সিন্দুকটার কথা বলো।'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'বলছি। এখনই তার সন্ধান দেব তোমাকে।' কথাগুলো বলে মৎস্যগন্ধা চারপেয়ের ওপর থেকে বোতলটা তুলে এনে দাঁড়াল কোহেলোর সামনে। তারপর কোহেলোর গলা জড়িয়ে বলল, 'সেটা কাছাকাছি আছে। আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি যেখানে। কিন্তু আমি-তুমি ছাড়া কেউ থাকবে না সেখানে। সেই পেটিকা, আমার শরীর সবই আজ তোমাকে দেব আমি। চলো, এবার আমরা বণিক এস্তাদিওর জাহাজে যাই। তার আগে আর একটু পান করে নাও।'

কোহেলো চমকে উঠে বলল, 'সেটা তবে ওই জাহাজেই আছে?'

মৎস্যগন্ধা বোতলটা কোহেলোর ঠোঁটের সামনে ধরে বলল, 'হ্যাঁ, সেখানেই।'

ঠোঁট ফাঁক করলেন কোহেলো। মৎস্যগন্ধা বোতলের বাকি অংশটাই প্রায় সবই তাঁর মুখে ঢেলে দেবার পর কোহেলো উঠে দাঁড়ালেন। মৎস্যগন্ধা বলল, 'মকরবাহিনীর খোল ফাঁকা করে দিতে হবে। আমরা যতক্ষণ সেখানে থাকব কেউ যেন সেখানে না ঢোকে। সে-ঐশ্বর্য আমি অন্য কাউকে দেখাতে চাই না।'

রণপোত ছেড়ে কাঠের পাটাতন বেয়ে মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে কোহেলো আবার ফিরে এলেন মকরবাহিনীর ডেকে। ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস দাঁড়িয়েছিলেন ডেকে। তিনি তাদের বললেন, 'তোমাদের কোনও লোক খোলের মধ্যে থাকলে বেরিয়ে আসতে বলো।'

যে দু-চারজন লোক খোলের মধ্যে ছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বাইরে বেরিয়ে এল। কোহেলোর নির্দেশে একটা লোক একটা মশাল জ্বালিয়ে এনে তার হাতে দিল। কোহেলো, মৎস্যগন্ধাকে নিয়ে পা বাড়াল খোলে নামার জন্য। আর তা দেখে ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিসও তাদের পিছনে পা বাড়াতে গেলেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ক্যাপ্টেন কোহেলো পিছনে তাকিয়ে ক্যাপ্টেন পেরোকে বললেন, 'পেরো, আপাতত আপনারা এখানেই থাকুন। আমি খোল থেকে ঘুরে আসছি।'

মৎস্যগন্ধা এবার বুঝতে পারল এই লোকটাই তবে ক্যাপ্টেন পেরো আর তার সঙ্গী নিশ্চই সেই ফ্রান্সিস হবে। পেরোর নির্দেশে থমকে গেল তারা দুজন। সমুদ্রের বুকে তখন সূর্য ডুবতে শুরু করেছে, ক্যাপ্টেন কোহেলো আর মৎস্যগন্ধা প্রবেশ করল অন্ধকার খোলের ভিতর।

মকরবাহিনীর খোলের বহির্দেশে যেখানে ফেরানো চোখের ছবি আঁকা আছে, খোলের ভিতর ঠিক সে জায়গাতে গিয়ে থামল মৎস্যগন্ধা। এ-জায়গাতে যে পেটিকাটা লুকানো থাকবে তা এস্তাদিওই জানিয়েছিল তাকে। মশালের আলোতে সে জায়গা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতেই পাটাতনের গায়ে একটা প্রায়-অদৃশ্য জোড় চোখে পড়ল তার। আর সে জায়গাতে একটু টানাটানি ধাক্কাধাক্কি করতেই সরে গেল কাঠের পাটাতনটা। উন্মোচিত হল গোপন গহ্বর। হ্যাঁ, তার মধ্যেই রাখা আছে হাত-চারেক চওড়া, একহাত মতো লম্বাটে ধরনের কাঠের পেটিকা বা সিন্দুকটা! ধীরে ধীরে তার ডালাটা খুলল মৎস্যগন্ধা। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের অন্ধকার মুছে গেল। সেদিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না ক্যাপ্টেন কোহেলো। বাক্সর মধ্যে থরে থরে সাজানো আছে মূল্যবান পাথর আর স্বর্ণখণ্ড! এত সম্পদ এর আগে কোনওদিন দেখেনি জলদস্যু সর্দার কোহেলো।

মৎস্যগন্ধা বলে উঠল, 'এ সম্পদ তোমার অ্যাডমিরাল ভাস্কো কোনও দিন চোখে দেখেননি। তার কাছে থাকা তো দূরের কথা। এ-সম্পদ তোমার হতে পারে। শুধু এই পেটিকাই নয়, আরও এমন এক সিন্দুক লুকোনো আছে দূরের এক জায়গাতে। আমি তোমাকে সে-জায়গাতে নিয়ে যেতে পারি।'

কোহেলো জানতে চাইলেন, 'সে জায়গা কোথায়?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'চলো আবার তোমার কেবিনে ফিরে যাই। সেখানে ফিরে বলব।' সিন্দুকটা এখানেই আপাতত থাক।' এই বলে পাটাতন ঠেলে ফোকরটা বন্ধ করে দিল মৎস্যগন্ধা।

কিছুটা টলতে টলতেই বাইরে বেরিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন কোহেলো। একে তো মদের নেশা, তার ওপর তিনি যা দেখলেন তাতে তার মাথা ঝিমঝিম করছে। বাইরে তখন সূর্য ডুবে গেছে। অন্ধকার নামতে শুরু করেছে সমুদ্রের বুকে। ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস দাঁড়িয়েছিলেন ডেকে। তাদের সঙ্গে কোনও কথা না বলে মকরবাহিনীর ডেক ছেড়ে সোজা এগোলেন তার জাহাজে ফেরার জন্য।

ফ্রান্সিস, পেরোকে বলল, 'ব্যাপারটা কী হচ্ছে বলুন তো?'

ক্যাপ্টেন পেরো বললেন, 'ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে এস্তাদিও আর মৎস্যগন্ধা যখন দুজনেই ধরা পড়ে গেছে তখন আমরা অনেকটাই দায়মুক্ত। দেখা যাক কোহেলো কী করেন? আমরা এখন সান্টা মারিয়াতে ফিরে যাই।'

ক্যাপ্টেন পেরো আর ফ্রান্সিস তার দলবল নিয়ে মকরবাহিনীর ডেক ছেড়ে রণপোত টপকে এগোল সান্টা মারিয়াতে। তারা কেউ খেয়ালই করল না, একজন রয়ে গেল মকরবাহিনীর ডেকে। সে সবার অলক্ষে গিয়ে সেঁধিয়েছে ডেকের এক কোণে রাখা মোটা কাছিগুলোর গহ্বরের ভিতর।

নাখোদা আব্বাস।

অন্ধকার নামল মহাসমুদ্রের বুকে।

ক্যাপ্টেন কোহেলোর কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল মৎস্যগন্ধা। কেঠো পালঙ্কের ওপর গিয়ে বসলেন কোহেলো। ঘোর কাটছে না তার। মৎস্যগন্ধা তার সামনে গিয়ে জড়িয়ে ধরল তার গলা। কোহেলোর চোখের সামনে জেগে উঠল মৎস্যগন্ধার শঙ্খের মতো স্তন, গভীর স্তনবিভাজিকা। কোমরের ঠিক মাঝখানে জেগে থাকা নাভিকূপ। কদলীবৃক্ষের মতো ঊরুদুটো স্পর্শ করে আছে কোহেলোর হাঁটু।

অনেক দিন পরে নারীদেহের স্পর্শ তার শরীরে। বেশ কয়েক বছর আগে জলদস্যু জীবনে একটা জাহাজ লুঠ করার সময় এক অষ্টাদশী তরুণীকে ধর্ষণ করেছিলেন কোহেলো। সেই শেষ তার নারীদেহ পাওয়া। তারপর তিনি বন্দি হলেন অ্যাডমিরালের হাতে। তাঁর শর্ত মেনে তিনি যোগ দিলেন অ্যাডমিরালের সঙ্গে।

এবার ভারত অভিযানের সময় ভাস্কোর কঠোর নির্দেশ ছিল, কোনও নারী তোলা যাবে না পর্তুগিজ রণপোতে। কাজেই কোহেলোর শরীর অভুক্তই রয়ে গেছে। কোহেলো তাকিয়ে রইলেন মৎস্যগন্ধার দেহের দিকে। আর মৎস্যগন্ধা তার গলা জড়িয়ে বলতে শুরু করল, 'শোনো কোহেলো। এস্তাদিও আমার প্রেমিক নয়। আমি তার সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করে এসেছি। এস্তাদিও তমালিকা বন্দরে এসেছিল এই গুপ্তধনের খোঁজেই। কোনও এক প্রাচীন নাবিক তাকে খোঁজ দিয়েছিল এই গুপ্তধনের। কোনও এক রাজা নাকি এই গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছিল তমালিকা বন্দর আর ভূমধ্যসাগরের এক দ্বীপে। এস্তাদিও সে দ্বীপেরও সন্ধান জানে। তমালিকা বন্দর থেকে এই গুপ্তধন উদ্ধারের পর আমি এস্তাদিওর সঙ্গে যাচ্ছিলাম সেই দ্বীপে। সেটা পাওয়ার পর আমি তার যা ব্যবস্থা করার করতাম। শোনো কোহেলো, তুমি সুপুরুষ, সাহসী। তোমার মতো পুরুষই আমার কাম্য। এস্তাদিওর মতো নরম স্বভাবের বণিক আমাকে ভবিষ্যতে রক্ষা করতে পারবে না তা আমি জানি। ইচ্ছা করলে এ সম্পদ তোমার হতে পারে।'

কোহেলো এবার কুমিরের চামড়ার মতো খসখসে হাত দিয়ে মৎস্যগন্ধার নিতম্ব স্পর্শ করলেন। মৎস্যগন্ধা মনে মনে শিউরে উঠলেও আরও ঘনিষ্ঠভাবে কোহেলোকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'চলো, এই সিন্দুকটা নিয়ে আমরা পালিয়ে যাই। এস্তাদিওকে আমরা এখন মারব না। দ্বিতীয় সিন্দুকটা উদ্ধার করার পর আমরা তাকে শেষ করব।'

কোহেলোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই অতুলনীয় নারীদেহ, মকরবাহিনীর খোলে দেখে আসা রাজার ঐশ্বর্য্য, ভূমধ্যসাগরের কোনও দ্বীপে লুকিয়ে রাখা এমনই এক সিন্দুকের গল্প—এসব মিলিয়ে মিশিয়ে মাথার ভিতরটা কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যেতে লাগল কোহেলোর। তবু তারই মধ্যে তিনি বললেন, 'কীভাবে বুঝব তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না?'

মৎস্যগন্ধা এবার তার কোমরের আড়াল থেকে তীক্ষ্ন ছুরিটা বের করে আনল। সেটা দেখেই চমকে উঠলেন কোহেলো। মুহূর্তের জন্য আতঙ্ক ফুটে উঠল কোহেলোর মুখে। মৎস্যগন্ধা হেসে বলল, তোমার ভয় নেই। তুমি যখন খোলের মধ্যে ঝুঁকে পড়ে সিন্দুকটা দেখছিলে তখনই আমি ছুরিটা তোমার পিঠে বসিয়ে দিতে পারতাম। অথবা এখনই বসিয়ে দিতে পারি। কিন্তু তোমার মতো পুরুষকেই আমার দরকার। যে আমার দেহকে তৃপ্ত করতে পারবে, ভবিষ্যতে আমাকে রক্ষা করতে পারবে।'—এই বলে মৎস্যগন্ধা ধারালো ছুরির একটানে তার বক্ষবন্ধনীর ফাঁসটা কেটে দিয়ে ছুরিটা ছুঁড়ে ফেলল ঘরের এক কোণে। আর অবিশ্বাসের কোনও কারণ নেই এখন। কোহেলোর চোখের সামনে জেগে আছে মৎস্যগন্ধার শঙ্খের মতো স্তনযুগল। চেরিফলের মতো স্তনবৃন্ত থেকে যেন চুঁইয়ে পড়ছে মোমের আলো। কোহেলোর পক্ষে এবার আর নিজেকে ধরে রাখা সম্ভব হল না। মৎস্যগন্ধাকে জাপ্টে ধরে সে পালঙ্কে পেড়ে ফেলল।

কোহেলো বন্যজন্তুর মতো ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে শুরু করল মৎস্যগন্ধার নরম শরীরটাকে। মৎস্যগন্ধার দেহের প্রতিটা গহ্বর স্পর্শ করছে কোহেলোর খসখসে হাত, শ্বাপদের জিভের মতো খসখসে ধারালো জিভ। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে সারা শরীরে, কিন্তু তার মধ্যেই মৎস্যগন্ধা বলে যেতে লাগল, 'এ সবই তোমার হতে পারে। ভাস্কোর সঙ্গে থেকে তুমি জীবনে কী পাবে সামান্য পদমর্যাদা আর পরাধীনতা ছাড়া? শুধু মাত্র ওই একটা পেটিকাতেই যা আছে তা দিয়ে তুমি একটা নৌবহর কিনতে পারো। অথবা কোনও দেশে গিয়ে ভাস্কোর থেকে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন কাটাতে পারো। এই পেটিকা তুমি ভাস্কোর হাতে তুলে দিয়ে কী পাবে? হয়তো সামান্য কিছু অনুকম্পা। তুমি কি এই দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন জীবনে ফিরে যেতে চাও না?

মৎস্যগন্ধার কথাগুলো যেন ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে লাগল সম্ভোগরত কোহেলোর মনের গভীরে। সত্যিই তো! এই নারীদেহ, এই রাজ ঐশ্বর্যর থেকে বেশি কিছু ভাস্কো দিতে পারবে না তাকে।

দীর্ঘক্ষণ পর সম্ভোগপর্ব শেষ হল কোহেলোর। উঠে বসলেন কোহেলো। উঠে বসল মৎস্যগন্ধাও। তার সারাদেহ তখন ক্ষতবিক্ষত। রক্তধারা বইছে যোনিপথ বেয়ে। কিন্তু প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যেও মুখে হাসি ফুটিয়ে মৎস্যগন্ধা কোহেলোর গলা জড়িয়ে বলল, 'তবে আমরা যাচ্ছি তো?'

একটু চুপ করে রইলেন কোহেলো। হ্যাঁ, এই অতুল সম্পদ যখন তার হাতের মুঠোয় তখন ভাস্কোর কাছে ফিরে যাওয়া এখন অর্থহীন। তাছাড়া ভাস্কো গোয়ার দায়িত্ব নিতে চলেছেন। তিনি সে কাজ ফেলে আর কোহেলোর পিছু ধাওয়া করতে পারবেন না। আর এতবড় সমুদ্রে কোন দিকেই বা তিনি তার সন্ধান চালাবেন? সব দিক থেকেই এখন কোহেলোর সুবিধা। তবে কোহেলো একথাই মনে মনে ভেবে নিলেন যে, সে দ্বীপে গিয়ে গুপ্তধন উদ্ধারের পর এস্তাদিও তো বটেই, এই নারীকেও আর বাঁচিয়ে রাখবেন না তিনি। যতই সুন্দর হোক এই নারীদেহ কিন্তু ততদিনে নিশ্চই এ-দেহের প্রতি তার আকর্ষণ চলে যাবে। পেটিকা দুটো সংগ্রহ করার পর কোনও গুপ্তস্থানে লুকিয়ে রেখে তিনি আবার সমুদ্রের বুকে বেছে নেবেন তার বেপরোয়া মুক্ত জীবন। কোহেলোর মনের ভিতর ঘুমিয়ে থাকা জলদস্যু সত্তা যেন এতদিন পর আবার জেগে উঠতে শুরু করল।

মৎস্যগন্ধা বলল, 'তুমি আবার সান্টা মারিয়ার লোকগুলোকেও সঙ্গে নেবে নাকি? ওদের তো কোন প্রয়োজন নেই। তাছাড়া ওদের মাধ্যমে ভাস্কোর কানে ব্যাপারটা পৌঁছে যেতে পারে।'

কোহেলো বললেন, 'না, ওদের আর কোনও প্রয়োজন নেই আমার। শুধু আমার নিজস্ব লোকেরাই থাকবে। তবে ওদের ছেড়ে দিলে ওরা ভাস্কোকে গিয়ে সব জানাবে। ওদের শেষ করে যাবার আগে জাহাজটা ডুবিয়ে দেব।' কোহেলোর মধ্যে যে হিংস্র জলদস্যু লুকিয়ে ছিল সে এবার আত্মপ্রকাশ করল।

মৎস্যগন্ধা বলল, 'তবে আজ রাতেই কাজটা শেষ করতে হবে। দেরি করলে চলবে না। কারণ, এ জায়গা মোহনা থেকে বেশি দূরে নয়। জমিদারের লোকজন এতক্ষণে নিশ্চই জেনে গেছে যে আমি পালিয়েছি। তারাও নিশ্চই জাহাজ নিয়ে আমাকে ধরার জন্য বেরিয়েছে। তারা এসে পড়লে তাদের সঙ্গে লড়াইয়ে আরও বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হবে।'

কথাটা শুনে কোহেলো বললেন, 'হ্যাঁ, আজ রাতেই কাজটা শেষ করে সূর্যের আলো ফোটার আগেই গভীর সমুদ্রে রওনা হয়ে যাব। আর কাজটা যতক্ষণ শেষ না হয় ততক্ষণ তুমি আমার কেবিনেই থাকো।'

কথাগুলো বলে কেবিনের কাঠের দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো লম্বা নলঅলা পারকাসন পিস্তল আর তলোয়ারটা নামিয়ে নিয়ে ক্যাপ্টেন কোহেলো কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এলেন। তবে ক্যাপ্টেন কোহেলো ধূর্ত লোক। মৎস্যগন্ধাকে পরিপূর্ণ বিশ্বাস করার মতো কারণ নেই তার। কেবিনের বাইরে বেরিয়ে তিনি দরজায় শিকল তুলে দিলেন।

মৎস্যগন্ধার পরিকল্পনা সঠিকভাবেই এগোচ্ছিল, কিন্তু এবার তা ধাক্কা খেল। মৎস্যগন্ধা ভেবেছিল যে, কোহেলো তাকে অরক্ষিতভাবে রেখে যাবে। আর দু-পক্ষের গোলযোগের সুযোগ নিয়ে সে এস্তাদিওকে মুক্ত করে রাতের অন্ধকারে ছোট নৌকাটা নিয়ে সমুদ্রে ভেসে যাবে। কোহেলো বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়ায় মৎস্যগন্ধা হতাশ হয়ে ভাবতে লাগল এবার সে কী করবে? আর কোহেলো তার জলদস্যু সঙ্গীদের একটা ঘরে ডেকে নিয়ে গোপনে শলাপরামর্শ করতে বসল, কীভাবে সান্টা মারিয়ার লোকগুলোকে খুন করা যায়, সেজন্য।

বেশ রাত হয়েছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন বলে চাঁদের আলো ক্ষীণ। দীর্ঘক্ষণ পাকানো রশির আড়ালে আত্মগোপন করে বসেছিল নাখোদা আব্বাস। তার ভিতরে বসেই বাইরের সব কথোপকথন শুনেছে সে। শেষপর্যন্ত সে যখন নিশ্চিত হল যে মকরবাহিনীর ডেকে কেউ নেই, তখন কাছির আড়াল থেকে মাথা তুলল সে। না, চারপাশে কেউ নেই, এমনকী পাশের পর্তুগিজ রণপোতটার ডেকেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বুকে হেঁটে সে এগোল জাহাজের খোলে নামার জন্য। সে যখন খোলে প্রবেশ করতে যাচ্ছে ঠিক তখনই যেন একটা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হল রণপোতের যে-পাশে সান্টা মারিয়া দাঁড়িয়ে আছে সেদিক থেকে। আব্বাস আর দেরি করল না। দ্রুত সে নেমে এল খোলের ভিতর। খোলেও কেউ নেই। শুধু গরাদঘরের সামনে আলো জ্বলছে। আব্বাস তাড়াতাড়ি গরাদঘরের দরজা খুলে এস্তাদিওর বাঁধন খুলতে শুরু করল। তাকে দেখে বিস্মিত এস্তাদিও প্রথমেই জানতে চাইল, 'মৎস্যগন্ধা কোথায়?' বাঁধন খুলতে খুলতে আব্বাস জবাব দিল, 'তিনি সম্ভবত রণপোতে ক্যাপ্টেন কোহেলোর কেবিনে আছেন।'

এরপর আব্বাস বলল, 'যেদিকে সান্টা মারিয়া দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে কোন একটা গন্ডগোল শুরু হয়েছে। এমনও হতে পারে যে সান্টা মারিয়া আর রণতরীর নাবিকদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়েছে। এখন ওরা ওই নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে কেউ নেই। এই সুযোগ। চলুন আমরা ফোকর বেয়ে সিন্দুকটা নিয়ে নৌকাতে উঠে পড়ি। কেউ আমাদের আর ধরতে পারবে না।

বন্ধনমুক্ত হয়ে গরাদঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল এস্তাদিও। নাখোদা পালাবার জন্য কয়েক পা এগিয়ে খেয়াল করল এস্তাদিও একই জায়গায় আছে, দাঁড়িয়ে। নাখোদা তাকে তাড়া দিয়ে বলল, 'তাড়াতাড়ি আসুন! বলা যায় না, যে-কোনও মুহূর্তে কেউ চলে আসতে পারে!'

এস্তাদিও জবাব দিল। 'আমি মৎস্যগন্ধাকে ছেড়ে যাব না। তাতে যা হয় হবে।'

এস্তাদিওর কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা আব্বাসকে জানিয়ে দিল, এস্তাদিও তার সিদ্ধান্তে অবিচল। আব্বাস তার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারবে না।

আব্বাসও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রবীন নাখোদা। জাহাজ নিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবার সুবাদে সে নানা জাতের, নানা দেশের মানুষ দেখেছে। দেখেছে তাদের ঘৃণা, লোভ এমনকী তাদের ভালোবাসাও দেখেছে। কিন্তু এমন ভালোবাসা কোনও দিন সে দেখেনি। যে-ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করতে পারে সাত রাজার ঐশ্বর্যকে, সব থেকে বড় কথা, নিজের জীবনকেও উপেক্ষা করতে পারে। মৎস্যগন্ধার কথাও এবার মনে পড়ে গেল আব্বাসের। নিজের মৃত্যুকে উপেক্ষা করে এস্তাদিওকে বাঁচাবার জন্য পর্তুগিজ রণতরীতে তার উঠে আসার কথা।

দিকচিহ্নহীন সমুদ্রের মতোই নাখোদা আব্বাসের জীবন। কোনও দিশা নেই তার জীবনে। শুধু লক্ষ্যহীনভাবে ভেসে চলেছে সে। তার জন্য যদি দুটো জীবন বেঁচে যায় তবে সেটাই পরম প্রাপ্তি হবে তার জীবনে। মরতে তো একদিন হবেই। দেখা যাক যদি কিছু করা যায়! একথা ভেবে নিয়ে আব্বাস বলল, 'আপনার ওপরে যাওয়া ঠিক হবে না। আপনি এখানেই থাকুন। আমি ওপরে গিয়ে দেখি যদি কোনওভাবে তাকে মুক্ত করে আনা যায়।'

কথাগুলো বলে আব্বাস আর দাঁড়াল না। সে ছুটল ওপরে ওঠার জন্য।

মকরবাহিনী থেকে পাটাতন বেয়ে নাখোদা যখন পর্তুগিজ রণপোতের ডেকে উঠল ততক্ষণে জোর লড়াই শুরু হয়ে গেছে ক্যাপ্টেন কোহেলো আর ক্যাপ্টেন পেরোর নাবিকদের মধ্যে। পেরো হয়তো কোনওভাবে আঁচ করেছিলেন যে এমন কিছু ঘটতে পারে তাই তিনিও প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। তার জাহাজের নাবিকরা সঙ্ঘাতে কম হলেও আপ্রাণ লড়ে যাচ্ছে তারা। কারণ তারা জানে যে তাদের আর কিছুক্ষণের মধ্যে মরতে হবে। কাজেই মরার আগে প্রতিপক্ষের কয়েকজনকেও সঙ্গী করে নিয়ে যেতে চায় তারা। পেরোর জাহাজটা কোহেলোর জাহাজের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বলে রণপোতে থেকে কামানও দাগা যাচ্ছে না। কারণ, সান্টা মারিয়াতে গোলা দেগে আগুন লাগালে সে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে রণপোতের ডেকেও। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে লড়াই চালাচ্ছেন ক্যাপ্টেন পেরো আর তার সঙ্গীরা। লড়াই চলছে তলোয়ার আর বন্দুক দিয়ে। তলোয়ারের সংঘর্ষের শব্দ, বন্দুকের গুলির শব্দ, নাবিকদের হুংকার আর আর্তনাদের বীভৎস শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। তার মধ্যেই সেখানে উপস্থিত হল নাখোদা আব্বাস। অভিজ্ঞ নাবিক আব্বাস জানে ক্যাপ্টেনের কেবিন কোথায় হয়। সেই লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই কোনওরকমে নিজেকে বাঁচিয়ে আব্বাস উপস্থিত হল কোহেলোর কেবিনের দরজাতে। দরজা খুলে ফেলল সে। বাইরে লড়াইয়ের শব্দ শুনে যে-কোনও পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য মৎস্যগন্ধা ছুরি-হাতে দাঁড়িয়েছিল। তবে আব্বাস যে দরজা খুলবে সে ভাবেনি! ছুরিটা চালাতে গিয়েও সে শেষ মুহূর্তে সামলে নিল। আব্বাস তাকে বলল, 'বাইরে লড়াই হচ্ছে। তার ফাঁক গলে পালিয়ে আমাদের পৌঁছোতে হবে মকরবাহিনীর খোলে। এস্তাদিও সেখানে অপেক্ষা করছেন। ফোকর গলে সিন্দুক নিয়ে আমরা ভেসে পড়ব।'

মৎস্যগন্ধা বেরিয়ে এল কেবিন থেকে। মশালের আলোতে চারপাশে লড়াই চলছে। তার মধ্যে দিয়ে মৎস্যগন্ধা ছুটতে শুরু করল রণপোতের ডেক টপকে মকরবাহিনীতে যাবার জন্য। কিছুটা এগিয়েই কিছু একটাতে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল মৎস্যগন্ধা। আব্বাস সঙ্গে সঙ্গে টেনে তুলল তাকে। যে জিনিসটাতে মৎস্যগন্ধা হোঁচট খেল সে জিনিসটার দিকে একবার তাকাল মৎস্যগন্ধা। একটা সদ্য-কাটা নরমুণ্ড। মশালের আলোতে তার চোখদুটো যেন তখনও বিস্মিতভাবে তাকিয়ে আছে মৎস্যগন্ধার দিকে। সে মুন্ডুটাকেও চিনতে পারল মৎস্যগন্ধা। পেড্রোর কাটা- মাথা! সেটা চিনতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই মৎস্যগন্ধা ঘৃণাভরে এক লাথিতে মুন্ডুটাকে সরিয়ে আবার ছুটতে শুরু করল।

কিন্তু কিছুটা এগোতেই এবার তাদের পালাতে দেখে ফেলল একদল জলদস্যু। একপাশ থেকে তারা ছুটে আসতে লাগল তাদের দিকে। আব্বাস মৎস্যগন্ধাকে বলল, 'আপনি পালান। আমি ওদের আটকাচ্ছি। নইলে কেউ পালাতে পারব না।' মৎস্যগন্ধা ছুটল আর আব্বাস একটা তলোয়ার নিয়ে রুখে দাঁড়াল জলদস্যুদের দিকে। জনা চারেক দস্যু। আব্বাস তলোয়ারবাজি কিছুটা জানে। সে লড়ে যেতে লাগল তাদের সঙ্গে। একজনের মাথা উড়িয়ে দিল আব্বাস। জলদস্যুরা বুঝল, লোকটার সঙ্গে লড়াই করতে গেলে হয়তো আরও কয়েকজনের প্রাণ যাবে। তাই হঠাৎ একজন জলদস্যু একটা জ্বলন্ত মশাল ছুঁড়ে মারল আব্বাসকে লক্ষ্য করে। সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে গেল আব্বাসের শরীরে। আরও লোকজন চারপাশ থেকে ছুটে আসছে তাকে মারার জন্য। আব্বাস বুঝতে পারল তার সময় শেষ হয়ে আসছে। হঠাৎ কিছুটা তফাতে রণপোতের ডেকে সাজিয়ে রাখা একটা জিনিসের ওপর নজর পড়ল আব্বাসের। মৃত্যুপথযাত্রী নাখোদা আব্বাসের ঠোঁটে শেষহাসি ফুটে উঠল। আব্বাসের সারাদেহ তখন জ্বলছে। আব্বাস জলদস্যুদের ব্যূহ ভেদ করে ছুটল সেদিকে। তারপর ডেকে রাখা সার সার কামান দাগার জন্য রাখা বারুদের পিপেগুলোর একটাকে জাপ্টে ধরল তার জ্বলন্ত শরীর দিয়ে। আব্বাস খুলে ফেলল পিপের মুখ। পরক্ষণেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটল বারুদের পিপেতে। আব্বাসের দেহটা ছিন্নভিন্ন হয়ে ডেক থেকে উড়ে গিয়ে সমুদ্রে পড়ল ঠিকই, কিন্তু রণপোতের ডেকে আগুন ধরে গেল। বিস্ফোরণ শুরু হল একটার পর একটা বারুদের পিপেতে। প্রাণভয়ে ছোটাছুটি করতে শুরু করল পর্তুগিজ রণপোতের নাবিকরা। সে আগুন ছড়িয়ে পড়ল রণপোতের গায়ে লাগানো সান্টা মারিয়ার ডেকেও। ততক্ষণে অবশ্য সে জাহাজের একজন নাবিকও জীবিত নেই। আগুন এগোতে থাকল রণপোতের অন্যপাশে দাঁড়ানো মকরবাহিনীর দিকেও।

জাহাজের খোলের ভিতর দাঁড়িয়ে বিস্ফোরণের শব্দগুলো শুনছিল এস্তাদিও। সে বুঝে উঠতে পারছিল না তার কী করা উচিত? ঠিক এমন সময় খোলে নেমে এল মৎস্যগন্ধা। তাকে দেখে উদ্বেলিত হয়ে উঠল এস্তাদিও। সে গিয়ে মৎস্যগন্ধাকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'তুমি ঠিক আছ? কিন্তু আব্বাস কই?'

মৎস্যগন্ধা বলল, 'সম্ভবত সে মৃত। রণপোত আর সান্টা মারিয়াতে আগুন ধরে গেছে। আগুন এদিকেও আসছে। দেরি করলে চলবে না। এখনই পালাতে হবে।'

এরপর তারা আর সময় নষ্ট করল না। তারা গিয়ে হাজির হল খোলের যেখানে সিন্দুকটা আছে সে-জায়গাতে। কাঠের পাটাতনটা সরিয়ে ফেলল মৎস্যগন্ধা। ভিতরের রাখা আছে সিন্দুকটা। তার এপাশের পাটাতনটা সরালেই সমুদ্র। ছোট নৌকাটাও সেখানেই রাখা আছে। তবে ওপাশের পাটাতন খোলার জন্য সিন্দুকটা নামাতে হবে আগে। এস্তাদিও আর মৎস্যগন্ধা খোপ থেকে ধরাধরি করে সিন্দুকটা মেঝেতে নামাল। ঠিক সেই মুহূর্তে কাছেই একটা অস্পষ্ট পদশব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়াল এস্তাদিও। তার কিছুটা তফাতে উদ্যত পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন ক্যাপ্টেন কোহেলো! হয়তো মৎস্যগন্ধাকে অনুসরণ করে অথবা তার জাহাজ ডুবতে চলেছে বুঝতে পেরে সিন্দুকটা নিয়ে পালাবার জন্য ওই খোলে এসে উপস্থিত হয়েছেন কোহেলো। তারপর তিনি দেখতে পেয়েছেন পলায়মান এস্তাদিও আর মৎস্যগন্ধাকে। তার পিস্তলের প্রথম লক্ষ্য মৎস্যগন্ধা। কারণ তার এক হাতে এখনও ছুরিটা ধরা আছে।

মৎস্যগন্ধাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাবার মুহূর্তেই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এস্তাদিও আড়াল করে দাঁড়াল মৎস্যগন্ধাকে। এরপরই ক্যাপ্টেন কোহেলোর দো-নলা পিস্তলের গুলি-দুটো ছিটকে এসে লাগল এস্তাদিওর বুকে। সিন্দুকটা ওপর ঢলে পড়ল এস্তাদিও। ক্যাপ্টেন কোহেলো আবার তার পিস্তলে গুলি ভরতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাকে সে সুযোগ আর দিল না মৎস্যগন্ধা। কোহেলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ছুটে গিয়ে তার তীক্ষ্ন ছুরিটা বিঁধিয়ে দিল তার বুকে। মাটিতে পড়ে গেলেন কোহেলো। মৎস্যগন্ধা তাতে ক্ষান্ত হল না। সে প্রচণ্ড আক্রোশে ছুরিটা চালিয়ে যেতে লাগল কোহেলোর মুখে, তার দেহের সর্বত্র। মৎস্যগন্ধা যখন নিজেকে সংযত করল তখন আর কোহেলোকে দেখলে কেউ চিনতে পারবে না। তার একটা চোখও উপড়ে পড়ে আছে মাটিতে। তার দেহের এমন কোনও অংশ নেই যেখানে মৎস্যগন্ধার ছুরির আঘাত নেই।

মৎস্যগন্ধা এরপর এগিয়ে এল মাটিতে পড়ে থাকা এস্তাদিওর দিকে। তার মাথাটা নিজের মুখের কাছে তুলে ধরে সে বলল, 'চোখ মেলো এস্তাদিও। কথা বলো, কথা বলো। আমরা কি সেই দেশে যাব না?'

শেষবারের জন্য চোখ মেলে এস্তাদিও জড়ানো স্বরে বলল, 'হ্যাঁ, যাব মৎস্যগন্ধা। তুমি আমাকে সেখানে নিয়ে চলো...।'

কথাগুলো বলার পরই মুদে এল এস্তাদিওর চোখের পাতা। নিথর হয়ে গেল তার দেহ। মৎস্যগন্ধা তার ঠোঁটটা নামিয়ে আনল তার ঠোঁটের ওপর।

আগুন গ্রাস করেছে মকরবাহিনীর ডেকও। সে আগুন নামতে শুরু করেছে মরকবাহিনীর খোলেও। আলোকিত হয়ে উঠেছে অন্ধকার খোল। মৎস্যগন্ধাকে এবার এস্তাদিওকে নিয়ে বেরোতে হবে এ জাহাজ ছেড়ে।

ফোকর গলে বাইরে বেরিয়ে মৎস্যগন্ধা প্রথমে নৌকাটাকে টেনে আনল খোলের বাইরে আঁকা ফেরানো-চোখের কাছে। প্রথমে এস্তাদিওকে বের করে এনে সে নৌকাতে রাখল। তার পর একটু চেষ্টা করে সিন্দুকটাকেও সে নৌকাতে তুলে ফেলল। তারপর ভেসে পড়ল সমুদ্রে। সে কিছুটা এগোবার পরই পিছনে প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসের শব্দ হল। অগ্নিদগ্ধ পর্তুগিজ রণপোত তার দুপাশের দুটো জাহাজ সান্টা মারিয়া আর মকরবাহিনীকে সঙ্গী করে ডুব দিল সমুদ্রের গভীরে।

মেঘ কেটে গেছে। চাঁদ যেন মাথার ওপর থেকে হাসছে মৎস্যগন্ধা আর এস্তাদিওর দিকে চেয়ে। শান্ত সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউয়ের মাথায় অগণিত চাঁদের প্রতিচ্ছবি। হীরকখণ্ডের মতো অগণিত তারার আকাশ। ছোট্ট নৌকাতে এস্তাদিওর গলা জড়িয়ে বসে মৎস্যগন্ধা। কী অপূর্ব এই সমুদ্র! মৎস্যগন্ধা খুলে ফেলল সিন্দুকের ডালাটা। তারপর মনের আনন্দে মুঠো মুঠো রত্নরাজি, সোনা নিয়ে ছড়াতে লাগল তাদের যাত্রাপথে সমুদ্রের বুকে। মৎস্যগন্ধা সেগুলো ছড়াতে ছড়াতে এস্তাদিওকে নিয়ে এগিয়ে চলল তার স্বপ্নে দেখা দ্বীপের দিকে।

ভূমধ্যসাগরের কোনও দ্বীপ নয়। ভারত মহাসাগরেরই কোনও দ্বীপ হবে সেটা। তবে সে-দ্বীপ মৎস্যগন্ধা আর এস্তাদিওর স্বপ্নের সেই দ্বীপের মতোই দেখতে। সবুজ গাছে ছাওয়া দ্বীপ। ছোট ছোট শান্ত বাড়িঘর। সূর্যকিরণে উদ্ভাসিত সোনালি বালুতটকে ছুঁয়ে আছে ঊর্মিমালা। দ্বীপবাসীরা একদিন ভোরে দেখতে পেল সেই সমুদ্রতটে এসে ভিড়েছে একটা নৌকা। সেই নৌকার মধ্যে শুয়ে আছে দুটো কঙ্কাল। তাদের পোশাক দেখে তারা বুঝতে পারল সে দুটোর একটা নারী, আর একটা পুরুষের কঙ্কাল। নারী যেন পরম মমতায় জড়িয়ে আছে পুরুষের গলাটা। আর একটা শূন্য সিন্দুকও আছে নৌকাতে। তার গায়ে ছুরি দিয়ে কী যেন লেখা আছে!

লেখাটা অবশ্য পড়তে পারল না দ্বীপবাসীরা। সেখানে লেখা ছিল দুটো নাম—মৎস্যগন্ধা আর এস্তাদিও। কঙ্কালদুটো নৌকা থেকে যত্ন করে তুলে এনে দ্বীপবাসীরা কবর দিল সমুদ্রতটে।

এস্তাদিও, মৎস্যগন্ধা, কোহেলো বা সেই সিন্দুক বহু প্রতীক্ষার পরও আর গোয়াতে ফিরল না। কিছুদিন তাদের অপেক্ষায় থাকার পর ১৫২৪ খ্রিস্টাব্দের ৫ ফেব্রুয়ারি মহাসমারোহে এ দেশের পর্তুগিজ উপনিবেশ গোয়ার ভাইসরয় হিসাবে শপথ নিলেন ভাস্কো ডা গামা।

অধ্যায় ৩ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%