কবীরা গুনাহ – ৬০

৬০. জেনেশুনে অন্যায়ের পক্ষে তর্ক, ঝগড়া ও দ্বন্দ

আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “মানুষের মধ্যে অনেকে এমন আছে, পাথিব জীবন সম্পর্কে যার কথাবার্তা তোমাকে চমৎকৃত করে, এবং তার অন্তরে যা আছে, সে সম্বন্ধে সে আল্লাহকে সাক্ষী রাখে। অথচ সে কট্টর দুশমন।”

ইমাম গাযযালী (রহ) বলেছেন ইসলামী শরীয়াতে তর্ক তিন প্রকারের এবং তিনটিই নিন্দনীয়। একটি হচ্ছে “মিরা”এর অর্থ হলো, কারো কথায় নিছক ভাষাগত খুঁত ধরে আপত্তি জানানো। এর উদ্দেশ্য বক্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা ও নিজেকে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা ছাড়া আর কিছু হয়না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে “জিদাল”। এর অর্থ হলো, মতের বিভিন্নতা প্রকাশ করা এবং নিজের মতকে অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা। আর তৃতীয়টি হলো “খুশুমাত।” এর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে অর্থ বা অন্য কোন ধরনের স্বার্থ উদ্ধার করা। এটি কখনো গায় পড়ে বাধানো হয়। আবার কখনো অপরের কথার সূত্র ধরে বলা হয়। প্রথমটি অর্থাৎ “মিরা”কখনো প্রথমে গায়ে পড়ে করা হয় না, অন্য কোন বক্তব্যের ছুঁতে ধরেই করা হয়। আর শেষের দুটি প্রথমেও করা হয়। পরে করা হয়। তবে তিনটিরই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে অসৎ ও অন্যায়।

ইমাম নবাবী বলেনঃ তর্ক দু’রকমই হতে পারে অন্যায়ের পক্ষে অথবা ন্যায়ের পক্ষে। আল্লাহ কলেছেনঃ “তোমরা আহলে কিতাবের সাথে সুন্দরতম উপায় ব্যতীত তর্ক করোনা।” “আল্লাহর আয়াতগুলো নিয়ে তর্ক করা কাফিরদের ছাড়া আর কারো কাজ নয়। তর্কের উদ্দেশ্য যদি হয় সত্যকে জানা ও প্রতিষ্ঠা করা তবে তা প্রশংসনীয়; আর সত্যকে প্রতিহত করার জন্য তর্ক করা এবং অজানা বিষয়ে তর্ক করা নিন্দনীয়। এই ব্যাখ্যার আলোকেই কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত তর্ক সংক্রান্ত উক্তিগুলো বুঝতে হবে।

ন্যায়সংগত দাবীর পক্ষেও যদি তর্ক করা হয় তবে তা মিথ্যাচার, কষ্টদায়ক কথাবার্তা ও অশালীন কথাবার্তার রূপ ধারণ করে, তাহলে তাও নিন্দনীয় ও পরিত্যাজ্য

রাসূল (সা) বলেছেনঃ এক নাগাড়ে তর্ক চালিয়ে যাওয়া গুনাহে লিপ্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। (তিরমিযী) রাসূল (সা) আরো বলেছেন: “যে ব্যক্তি জানা-বিষয়ে তর্ক করে সে ঐ তর্ক পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট থাকবেন।” (তিরমিযী) রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি যখনই বিপথগামী হয়, তখন সে ঝগড়াটে স্বভাবের হয়ে যায়। তিরমিযী) রাসূ (সা) আরো বলেছেনঃ “তোমাদের সম্পর্কে আমি তিনটে জিনিসের সবচেয়ে বেশী ভয় করি : যাদের মধ্যে কুরআন ও হাদীসের পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে তাদের পদস্খলন। মুসলিম নামধারী মুনাফিক কর্তৃক কুরআন নিয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়া এবং দুনিয়ার লোভ-যা তোমাদের মধ্যে খুনোখুনীর প্ররোচনা দেবে।” (তাবরানী)

রাসূল (সা) বলেছেনঃ “কুরআন নিয়ে তর্ক করা কুফুরী।” (আবু দাউদ)

রাসূল (সা) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি নিজের মতের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তর্ক থেকে বিরত হয়, তার বাসস্থান জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে হবে। আর যে নিজের মতের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই তর্ক পরিহার করে, তাকে জান্নাতের সাধারণ জ্ঞায়গায় বাসস্থান দেয়া হবে।

.

৬১. উদ্বৃত্ত পানি অন্যকে না দেয়া

আল্লাহতায়ালা বলেনঃ “তোমরা কি ভেবে দেখেছ, তোমাদের পানি যদি তৃগর্ভে শুকিয়ে যায়, তাহলে কে তোমাদেরকে প্রবহমান পানি দেবে?” (সূরা আল মুলক)

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন :

“তোমরা উদ্বৃত্ত পানি দানে কুণ্ঠিত হয়োনা, যাতে আল্লাহ তোমাদেরকে ফসল দানে কুষ্ঠিত না হন।” মুসনাদে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন “যে ব্যক্তি তার উদ্বৃত পানি ও উদ্বৃত্ত ঘাস দিতে অস্বীকার করে আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন আপন অনুগ্রহ দিতে অস্বীকার করবেন।”

সহীহ মুসলিম ও সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল(সা) বলেছেনঃ তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বললেন, তাদের দিক তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি নির্দিষ্ট রয়েছেঃ যে ব্যক্তির উদ্বৃত্ত পানি আছে, কিন্তু পথিককে দেয়না, যে ব্যক্তি নিছক দুনিয়ার স্বার্থের জন্য কোন নেতার আনুগত্যের অংগীকার করে, নেতা যদি তাকে তার স্বার্থ দেয় তবে সে অংগীকার বজায় রাখে, নচেত ভংগ করে, আর যে ব্যক্তি কোন জিনিসকে চড়া দামে বিক্রি করার জন্য কসম খেয়ে বলে যে, এটা আমি এত দামে কিনেছি, অথচ আসলে সে সেই দামে কেনেনি, আর ক্রেতা তাকে বিশ্বাস করে।” সহীহ আল বুখারী প্রথম ব্যক্তির বর্ণনা দিয়েছে এইভাবেঃ “যে ব্যক্তি তার উদ্বৃত্ত পানি অন্য কাউকে দেয় না, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে বলবেন, তুমি যে জিনিস নিজের হাতে তৈরী করোনি, তার উদ্বৃত্ত অংশ যেমন কাউকে দাওনি, তেমনি আমি আজ আমার অনুগ্রহ তোমাকে দেবনা।”

.

৬২. মাপে ও ওজনে কম দেয়া

আল্লাহ বলেনঃ”যারা ওজনে ও মাপে কম দেয়, তাদের জন্য সর্বনাশ। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে আনার সময় ঠিকমত অনে, আর মেপে দেয়ার সময় কম দেয়।” ইমাম সুদী বলেনঃ রাসূল (সা) যখন হিযরত করেন তখন সেখানে আবু জুহায়না নামক একজন ব্যবসায়ী ছিল। তার দুটো পাল্লা ছিল। একটা দিয়ে নিজের জিনিস মেপে নিত, অপরটি দিয়ে অন্যের জিনিস মেপে দিত। তার প্রসংগে এ আয়াত নাযিল হয়।

রাসূল (সা) বলেছেনঃ “পাঁচটি জিনিসের ফলে পাঁচটি জিনিস অনিবার্য : কোন জাতি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে আল্লাহ তার ওপর তার শত্রুকে চাপিয়ে দেবেন। কোন জাতি আল্লাহর বিধান ছাড়া মনগড়া বিধান দ্বারা দেশ শাসন করলে তাদর মধ্যে দরিদ্র ছড়িয়ে পড়বে, কোন জাতিতে অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেলে তাদের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, মাপে ও ওজনে কম দিলে ফসল কম হবে ও দুর্ভিক্ষ হবে, আর যাকাত দেয়া বন্ধ করলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে।”

লক্ষণীয় যে, মাপে কম দেয়া ব্যক্তি প্রকৃত পক্ষে তিল তিল করে অলক্ষ্যে চুরি করে এবং হারাম উপার্জন করে।

.

৬৩. আল্লাহর আযাব ও গযব সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়া

আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “তাদেরকে যে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল, তা যখন তারা ভুলে গেল, তখন আমি তাদের জন্য সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম (অর্থাৎ প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির দুয়ার খুলে দিলাম) অতপর তারা যখন তাদেরকে দেয়া সম্পদের জন্য আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল, তখন আমি আকস্মিকভাবে তাদেরকে পাকড়াও করলাম। তখন তারা চরম হতাশায় নিমজ্জিত হলো। অতঃপর যালিমদের মূলোৎপাটন করা হলো। এখানে আকস্মিকভাবে পাকড়াও করার অর্থ হলো, তারা টের পায়না এমনভাবে পাকড়াও করা। ইমাম হাসান বসরী বলেনঃ আল্লাহ কাউকে অঢেল সম্পদ দেয়ায় সে যদি মনে করে যে, তাকে পরীক্ষা করা হবে না, তাহলে সেটা তার বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়। আবার কাউকে চরম দৈন্যদশায় নিক্ষেপ করা হলে সে যদি মনে করে যে, তাকে পরিত্যাগ করা হয়েছে এবং তার দিকে কোন দৃষ্টি দেয়া হচ্ছেনা, তবে সেও ভ্রান্ত ধারণীয় লিপ্ত।

রাসূল (সা) বলেছেনঃ “যখন দেখতে পাও যে, আল্লাহ কোন বান্দাকে সে যা পছন্দ করে তা দিয়ে যাচ্ছেন, অথচ সে আল্লাহর নাফরমানী অব্যাহত রেখেছে, তখন বুঝতে হবে যে, তাকে সময় দেয়া হচ্ছে এবং তার ওপর আযাব নাযিল হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।” অতঃপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করেন।

বর্ণিত আছে যে, ফিরিশতাদের দলভুক্ত হওয়া সত্বেও যখন ইবলীস আল্লাহর কোপানলের শিকার হলো, তখন জিবরীল ও মিকাইল কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেনঃ তোমাদের কি হয়েছে যে কাঁদছো? তারা বললেনঃ হে প্রভু, আমরা তোমার পরীক্ষার ভয়ে ভীত। আল্লাহ বললেনঃ “এভাবেই থাক। অামার পরীক্ষা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়োনা।” জামে তিরমিযীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) এই দোয়াটি খুব ঘন ঘন পড়তেনঃ “হে হৃদয় পরিবর্তনকারী। আমাদের হৃদয়কে তোমার দীনের ওপর স্থির রাখো।” তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো হে রাসূল, আমাদের ঈমান নিয়ে কি আপনি শংকা বোধ করেন? রাসূল (সা) বললেনঃ “হৃদয়গুলো আল্লাহর দুই আংগুলের ভেতরে রয়েছে, তিনি যখন যেভাবে চান এগুলোকে ঘোরান।”

সহীহ আল বুখারীতে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি জান্নাতবাসীর মত কাজ করতে করতে এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে, তার মধ্যে ও জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক হাত দূরত্ব অবশিষ্ট থাকে। ঠিক এই মুহূর্তে তার ওপর ভাগ্যের লিখন কার্যকর হয় এবং সে জাহান্নামীর মত কাজ করে জাহান্নামে চলে যায়। অনুরূপ সে জাহান্নামবাসীদের মত কাজ করতে করতে জাহান্নামের কাছাকাছি পৌছে যায়। ঠিক এই সময় তার ওপর তার ভাগ্যের লিখন কার্যকর হয় এবং সে জান্নাতের কাজ করে জান্নাতবাসী হয়। মানুষের শেষ কাজগুলো দ্বারাই তার পরিণাম নির্ধারিত হয়।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র আল কুরআনে বালয়াম বাউরার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ ও শরীয়তের পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করার পরও তার ঈমান নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। অনুরূপভাবে রবসীসা নামক দরবেশ কাফির হয়ে মরেছেন। সুতরাং প্রত্যেকের নিজ ঈমান সম্পর্কে সাবধান হওয়া উচিত এবং এই দোয়া বেশী করে পড়া, উচিত “রাব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাবলানা মিন লাদুনকা রহমাতান ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।” “হে আমাদের রব! একবার যখন আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন, তখন আমাদের মনকে আর বক্র করে দেবেননা, আর আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন। নিশ্চয় আপনি মস্ত বড় দাতা।”

হযরত আয়িশা (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসুল (সা) প্রায়ই এই দোয়া করতেনঃ “হে হৃদয় পরিবর্তনকারী, আপনি আমার হৃদয়কে আনুগত্যের ওপর অবিচল রাখুন।”

আমি জিজ্ঞাসা করলাম : হে রাসূল! আপনি তো এই দোয়াটা খুব ঘন ঘন করেন। আপনি কি ভয় পান? তিনি বললেনঃ হে আয়িশা, বান্দাদের মন যখন আল্লাহর দুই আঙ্গুলের মধ্যে এবং তিনি যেভাবে চান, তা ঘুড়ান, তখন আমি নিশ্চিন্ত থাকি কিভাবে? সুতরাং হিদায়াত আল্লাহর কাছ থেকেই আসে, তার ইচ্ছার ওপরই যখন সৎ পথে অবিচুল থাকা নির্ভরশীল, মনুষের শেষ ফল যখন অজানা এবং ইচ্ছার দৃঢ়তা যখন অনিশ্চিত, তখন নিজের ঈমান, সৎকর্ম ও নামায রোযা নিয়ে গর্বিত হওয়া অনুচিত। মনে রাখতে হবে, ঈমান ও নেক আমল বান্দার উপার্জিত হলেও তার ক্ষমতা, প্রেরণা ও সুযোগ আল্লাহই দিয়ে থাকেন।

এ প্রসংগে নিম্নের কথাগুলো সব সময় মনে রাখতে হবেঃ

(১) দুনিয়ার কোন সম্পদ সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে অহংকারী হওয়া নিজের চেয়ে ক্ষুদ্র ও বঞ্চিতদেরকে হেয় ও তুচ্ছ জ্ঞান করার কারণে যেমন আল্লাহ উক্ত সম্পদ ছিনিয়ে নিতে পারেন এবং কারূণ প্রমুখের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন ও তেমনি ঈমান, নেক আমল তথা আখিরাতের সম্পদের জন্যও অহংকারী হওয়া ও অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তুৱের লোকদেরকে ঘৃণা করা, হেয় করা ও হিংসা করার কারণে উক্ত নেক আমল বাতিল হয়ে যেতে পারে এবং ঈমানও ছিনতাই হয়ে যেতে পারে। যেমন, ইবলীসের এবং বরসীসা ও বালয়াম বাউরার হয়েছিল। সুতরাং নিজের ঈমান খোদাভীতি ও সততার জন্য প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া  জা
নানো এবং তার স্থায়িত্বের জন্য দোয়া করা কর্তব্য।

(২) হিংসা-বিদ্বেষ, রিয়া ও নিয়তের গেলমালের কারণে ঈমান ও নেক আমল বাতিল হয়ে যায়। রাসূল (সা) বলেছেনঃ হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে গ্রাস করে, যেভাবে আগুন শুকনো কাঠকে গ্রাস করে। সুতরাং এই সব জিনিস এসে নিজের বহু কষ্টের অর্জিত অমূল্য সম্পদ ঈমান ও আমল যেন নষ্ট করে না দেয়, সে জন্য মনকে সব সময় পাহারা দেয়া উচিত এবং আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া উচিত।

.

৬৪. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া

আল্লাহ তায়লা বলেছেনঃ ” বল হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের জীবনকে হেলায় নষ্ট করেছে, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়োনা। আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দিয়ে থাকেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াশীল।” (সূরা আয যুমার) কাফিররা ছাড়া কেউ আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ হয়না।” (সূরা ইউসুফ)

এক হাদীসে আছে যে, কিয়ামতের দিন আরশের দিক থেকে জনৈক আহবানকারী উচ্চস্বরে বলতে থাকবে “অমুক কোথায় অমুক কোথায়?” “এই ডাক যে ব্যক্তি শুনবে সে ভয়ে ঠক ঠক করে কাপতে থাকবে। আল্লাহ তাঁকে বলবেনঃ তোমাকেই ডাকা হয়েছে। তুমি আকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টার নিকট নিজেকে পেশ কর।” এই সময় আল্লাহর বান্দারা ভয়ে চক্ষু বিস্ফরিত করে আরশের দিকে তাকবে। আর যার নাম ধরে ডাকা হয়েছে, সেই ব্যক্তি আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে। তখন আল্লাহ নিজের নূর দিয়ে তাকে অন্য সকলের দৃষ্টির আড়ালে ফেলবেন। অতঃপর তাকে বলবেনঃ “হে আমার বান্দা! তুমিকি জানতে না যে, আমি পৃথিবীতে তোমার যাবতীয় কার্যকলাপ দেখতাম? সে বলবেঃ “হা, আমার মনিব! আমি তা জানতাম। আল্লাহ বলবেনঃ হে আমার বান্দা! তুমি কি শোননি যে, আমার অবাধ বান্দাদেরকে আমি কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকি? সে বলবেঃ হা শুনেছি। আল্লাহ বলবেনঃ আমার অনুগত বান্দার জন্য আমার কত পুরস্কার রয়েছে, তা কি শোননি? সে বলবেঃ হা শুনেছি। আল্লাহ বলবেনঃ হে আমার বান্দা, তুমি কি আমার নাফরমানী করেছ? সে বলবে! হাঁ কখনো কখনো করেছি।” আল্লাহ বলবেনঃ আজ আমার সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? সে বলবেঃ হে আমার প্রভু! আমার ধারণা এই দে, অপনি আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ বলবেনঃ হে আমার বান্দা! তুমি কি নিশ্চিন্ত ছিলে যে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। সে বলবেঃ হা, কেননা আপনি আমাকে গুনাহের কাজ করতে দেখেছিলেন, কিন্তু আপনি লুকিয়ে রেখেছিলেন। আল্লাহ বলবেনঃ তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম, এবং তোমার ধারণা সত্য প্রমাণিত করলাম। এই নাও, তোমার আমলনামা ডান হাতে নাও। এতে তোমার যে কাজ আছে তা আমি কবুল করে নিয়েছি। আর যত খারাপ কাজ আছে তা মাফ করে দিয়েছি। আমি মহানুভব ও দয়ালু।”

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূল (সা) এর কাছে কিছু সংখ্যক বন্দীকে আনা হলো। দেখলেন বন্দিদের মধ্য থেকে এক মহিলা স্বীয় শিশু সন্তানকে দেখেই তাকে কোলে তুলে নিল এবং দুধ খাওয়াতে  লাগলো। রাসূল (সা) সাহাবীদের বললেনঃ

তোমরা কি মনে কর যে, এই মহিলা স্বীয় সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে সাহাবীগণ বললেনঃ না। তখন রাসূল (সা) বললেনঃ এই মহিলা তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি তার চেয়েও বেশী দয়ালু।”

সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত এ হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেনঃ “আমার প্রতি আমার বান্দা যেমন ধারণা করে আমি তেমনি। সে যেখানে আমাকে স্মরণ করে, আমি সেখানেই তার সাথে থাকি। আল্লাহ তার গুনাহগার বান্দার তওবায় সেই ব্যক্তির চেয়েও বেশী খুশী হন, যার উট মরুভূমিতে হারিয়ে গেছে এবং হতাশায় সে যখন মৃত্যুর মুখোমুখী, তখন সেই উটকে ফিরে পেয়েছে। যে ব্যক্তি আমার দিকে এক হাত এগেয়, আমি তার দিকে দুই হাত এগেই। আর সে যখন আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তখন তার দিকে দৌড়ে যাই।”

সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “মুমিন যদি জানতো আল্লাহর কাছে পাপের কি শান্তি নির্দিষ্ট রয়েছে, তাহলে তার জান্নাতের প্রত্যাশা কেউ করতোনা। আর সে যদি জানতো আল্লাহর কাছে কত দয়া ও করুণা রয়েছে, তাহলে তার জান্নাত থেকে কেউ নিরাশ হতোনা।”

শুধু আখিরাতের মুক্তির ব্যাপারেই নয়, দুনিয়ার সুখ শান্তির ব্যাপারেও হতাশ হওয়া উচিত নয়। আল্লাহ সব রকমের হতাশাই নিষিদ্ধ করেছেন। কেননা হতাশা মানুষকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। গুনাহগারকে আরো গুনাহগার হতে প্ররোচিত করে এবং বিপদ মুসিবত ও অভাব পীড়িত ব্যক্তিকে আত্মহত্যা, মৃত্যু কামনা ও অবৈধ উপায়ে অর্থোপার্জনের মত পাপকাজে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষ যত দুরবস্থায়ই পতিত হোকনা কেন, আল্লার রহমতের আশার ওপর নির্ভর করে ধৈর্য সহকারে বৈধ পন্থায় সব রকমের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কর্তব্য।

[১. আলোচা ৬৪তম কবীরা গুনাহ মূল গ্ৰন্থে অসম্পূর্ণ অবস্থায় ছিল। এর প্রথম হাদীসটি ব্যতীত আর কিছুই সেখানে ছিলনা। এমনকি শিরোনামও ছিলনা। কেবল প্রথম হার্দীসটির বিষয়বস্তুর আলোকে ৬৪তম কবীরা গুনাহর শিরোনাম, বাদবাকী আয়াত, হাদীসসমূহ সংযোজিত করে অনুবাদক কর্তৃক পূর্ণতা দান করা হয়েছে।]

.

৬৫. বিনা ওযরে জামায়াত ত্যাগ করা ও একাকী নামায পড়া

সহীহ মুসলিম ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) জামায়াত ত্যাগে অভ্যস্ত একদল লোক সম্পর্কে বলেছেন : “আমার ইচ্ছা হয়, অন্য কাউকে নামায পড়ানোর দায়িত্বে নিয়োজিত করে জামায়াত ত্যাগকারীদের ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দিয়ে আসি।” সহীহ মুসলিমের আর একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেনঃ “যারা জামায়াত ত্যাগে অভ্যস্ত, তাদের এই অভ্যাস ত্যাগ করতেই হবে, নচেত আল্লাহ তাদের হৃদয়ে অবশ্যই মোহর মেরে দেবেন এবং তারা অবশ্যই শিথিল হয়ে যাবে।”

সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অবজ্ঞার মনোভাব নিয়ে তিনটি জুময়া ত্যাগ করবে, আল্লাহ তার হৃদয়ে সিল মেরে দেবেন। রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি বিনা ওরে ও কোন ক্ষতির আশংকা ব্যতীতই জুময়ার নামায ত্যাগ করে, তাকে এমন এক খাতায় মুনাফিক লেখা হয়, যে খাতা থেকে কিছুই মোছা হয়নি এবং কোন কিছুই রদবদল করা হয়না।”

সুনানে নাসায়ীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ওপর জুময়ার নামায পড়া অবশ্য কর্তব্য”

সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আযান শুনলো এবং কোন ওযর ছাড়াই জামায়াতে যাওয়া থেকে বিরত থাকলো, তার (ঘরের মধ্যে পড়া) নামায কবুল হবে না।”

.

৬৬. ওসিয়তের মাধ্যমে কোন উত্তরাধিকারীর ক্ষতি সাধন

জামে তিরমিযী, সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “কোন পুরুষ ও স্ত্রী ষাট বছর ব্যাপী আল্লাহর পূর্ণ আনুগত্য করে অতঃপর মৃত্যুর সম্মুখীন হয় এবং ওসিয়তের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি সাধন করে। এর ফলে জাহান্নাম তার জন্য অনিবার্য হয়ে যায়।”

সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কারো উত্তরাধিকার হরণ করে, আল্লাহ তা’য়ালা তার জান্নাতের উত্তরাধিকার হরণ করবেন।”

জামে তিরমিযীতে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের জন্য তার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছেন। সুতরাং কোন উত্তরাধিকারীর জন্য ওসিয়ত করা চলবেনা।”

.

৬৭. ধোকাবাজি, ছলচাতরী ও ষড়যন্ত্র করা

আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “খারাপ ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্রকারীকেই চারদিক থেকে ঘেড়াএ করে।” রাসূল (সা) বলেছেনঃ “ষড়যন্ত্রকারী ও ধোকাবাজের স্থান জাহান্নামে।” রাসূল (সা) বলেছেনঃ “কোন ধোকাবাজ, কৃপণ ও খোটাদানকারী জান্নাতে যাবে না।”

পবিত্র আল-কুরআনে অাল্লাহ তা’য়াল ধোকাবাজিকে মুনাফিকদের স্বভাব বলে অভিহিত করেছেনঃ “ধারা (মুনাফিকরা) আল্লাহ ও মুমিনদেরকে ধোকা দিয়ে থাকে।”

সহীহ মুসলিমের হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি করো ধন-সম্পদ ও পরিবার পরিজনের ব্যাপারে ধোঁকা দেয় সে জাহান্নামী।

(পণ্য দ্রব্যের নকল, ভেজাল, মুদ্রা, সার্টিফিকেট পাসপোর্ট ও অন্যান্য দলীল জাল করা এবং ভিন্ন পেশার লোকের পোশাক পরে ছদ্মবেশ ধারণ পূর্বক অসদুদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করাও প্রতাশা ও জালিয়াতীর অন্তর্ভুক্ত। — অনুবাদক)

.

৬৮. কৃপণতা, অপচয় ও অপব্যয় তথা অবৈধ ও বিশৃংখল ব্যয়

আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ”তোমার হাত কাধের সাথে বেঁধে রেখনা এবং তা পুরোপুরিভাবে ছড়িয়ে দিওনা।” অর্থাৎ কৃপণতাও করোনা অপচয় অপব্যয়ও করোনা। আল্লাহ আরো বলেনঃ “অপব্যয় করেনা। অপব্যায়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা বনী ইসরাইল)

রাসূল (সা) বলেনঃ “কৃপণ কখনো জান্নাতে যবেনা।” আল্লাহ বলেনঃ “যারা আল্লাহর দেয়া সম্পদ নিয়ে কর্পণ্য করে, তারা যেন মনে না করে যে, এই কার্পণ্য তাদের জন্য ভালো। রবং এটা তাদের জন্য খারাপ। যে জিনিস নিয়ে তারা কার্পণ্য করে তা কিয়ামতের দিন তাদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে। আল্লাহ আরো বলেনঃ “যারা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ধার দেয়না তাদের জন্য ধ্বংস।” (সূরা মাউন)

এক কথায় সম্পদ উপার্জনে যেমন শরীয়তের বিধাম মেনে চলতে হবে তেমনি তা ব্যয়েও শরীয়তের বিধান অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় ও শরীয়ত নির্দেশিত ক্ষেত্রে ব্যয় না করা কম ব্যয় করা (কৃপনতা), প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করা (অপব্যয়) এবং অর্থ নষ্ট করা (অপব্যয়) এ সবই অবৈধ ও বিশৃংঙ্খল ব্যয়ের আওতাভুক্ত এবং কবীরা গুনাহ। বিলাসিতাও এক ধরনে অপব্যয়।

.

৬৯. মুসলমানদের গেপনীয় বিষয় শত্রুর নিকট ফাঁস করা

বিশিষ্ট সাহাবী বদরযোদ্ধা হাতিব ইবনে আবি বালতায়া মক্কায় অবস্থানরত নিজের পরিবার পরিজনের নিরাপত্তার খাতিরে রাসূল (সা) এর মক্কা বিজয়ের পরিকল্পনা ফাঁস করে দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। সময়মত ওহীর মাধ্যমে এ বিষয়টি জানতে পেরে রাসূল (সা) ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়ায় তার চিঠি মক্কা পর্যন্ত পৌছতে পারেনি। হযরত উমর এ ঘটনার নায়ক উক্ত সাহাবীকে মুনাফিক আখ্যায়িত করে হত্যা করার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল (সা) অনুমিত দেননি। তিনি হাতিবের ওযর ও ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন। তবে এ কাজটি যে অন্যায় ছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। শুধুমাত্র বদরযোদ্ধা হওয়ার কারণে তিনি ক্ষমার যোগ্য বিবেচিত হয়েছিলেন। এমন কাজ অন্য কারো বেলায় ক্ষমার যোগ্য হবেনা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%