আল্লাহতায়ালা বলেছেনঃ “শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, যারা মানুষের ওপর যুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে বেড়ায়। যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরই জন্য নির্ধারিত রয়েছে।” (সূরা আশূরা)
রাসূল (সা) বলেছেনঃ “আল্লাহ তায়ালা আমার কাছে এই মর্মে ওহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা বিনয়ী হও, যাতে একজন অপরজনের ওপর আগ্রাসন না চালায় ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন না করে।” (সহীহ মুসলিম, সুনানু আবীদাউদ ও সুনানু ইবনে মাজা)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন : “বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের মত এমন অপরাধ আর নাই যা আখিরাতের আযাব ছাড়াও দুনিয়াতেও আযাব অনিবার্য করে তোলে।” (জামে তিরমিযী ও সুনানু ইবনু মাজাহ)
এই অপরাধের সবচেয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেয়েছিল কারূন। সে ছিল হযরত মূসা (আ) এর আপন চাচাতো ভাই এবং ফিরাওনের অন্যতম উপদেষ্টা। তার বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের শাস্তি স্বরূপ আল্লাহ তাকে তার সমস্ত সহায় সম্পদসহ জ্যান্ত মাটিতে পুতে ফেলেন। এই ঘটনার বিবরণ সূরা আল কাসাসে নিম্নরূপ দেয়া হয়েছেঃ
“নিশ্চয় কারূন মূসার গেত্রের লোক ছিল। সে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলো। আমি তাকে এমন ধনভান্ডার দিয়েছিলাম, যার চাবিগুলি বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, তার গেত্র তাকে বলেছিল যে, দম্ভ করোনা, আল্লাহ দাম্ভিকদেরকে পসন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যা কিছু দিয়েছেন, তাদ্বারা আখিরাতের বাসস্থান খুঁজে নাও। তবে দুনিয়া থেকে তোমার প্রাপ্য অংশ ভূলনা। অন্যের প্রতি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না। সে বললোঃ এ সম্পদ তো আমি নিজের জ্ঞানের সাহায্যে অর্জন করেছি। সে কি জানতোনা যে, আল্লাহ তার পূর্বে তার চেয়েও অধিক শক্তিশালী ও ধনশালী বহু মানবগেষ্ঠীকে ধ্বংস করে দিয়েছেন? আর অপরাধীদেরকে তো তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবেনা। (কেননা তাদের আমলনামায় সবই লেখা থাকবে।) কারন জাকজমক সহকারে আপন সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থিত হয়েছিল। তখন যারা পার্থিব জীবনের জন্য লালায়িত ছিল। তারা বলতে লাগলোঃ আহা কারূনকে যেরূপ সম্পদ দেয়া হয়েছে, দ্রুপ আমাদেরকেও যদি দেয়া হতো! সে সত্যই খুব ভাগ্যবান। পক্ষান্তরে যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছিল, তারা বললো ধিক, তোমাদেরকে! যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারই উত্তম। ধৈর্যশীল ব্যতীত আর কেউ তা পাবেনা। অতঃপর আমি কারূনকে ও তার প্রাসাদকে মাটির নিচে পুতে ফেললাম। আল্লাহর শাস্তি থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে-এমন কোন দল তার পক্ষে ছিলনা, এবং সে নিজেও আত্মরক্ষায় সক্ষম ছিলনা। আগের দিন যারা কারুনের মত হবার অভিলাষ পোষণ করেছিল, তারা (কারূনের পরিণতি দেখে) বলতে লাগলো, আসলে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা জীবিকা বাড়িয়ে দেন, যাকে ইচ্ছা কমিয়ে দেন। আল্লাহ আমাদের ওপর সদয় না হলে আমাদেরকেও তিনি মাটির নিচে পুতে দিতেন। আসলে কাফেররা সফলকাম হয়না।”
ইমাম ইবনুল জাওসী বলেনঃ কারূন কিভাবে ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহ প্রকাশ করেছিল, সে সম্পর্কে একাধিক উক্তি রয়েছে। হযরত ইবনে আব্বাসের মতে, সে জালিয়াতির মাধ্যমে জনৈকা দুশ্চরিত্রা মহিলাকে হযরত মূসার (আ) এর বিরুদ্ধে এই মর্মে দুর্নাম রটাতে প্ররোচিত করে যে, তিনি তার সাথে ব্যভিচার করেছেন। হযরত মূসা (আ) ঐ মহিলাকে শপথপূর্বক সত্য কথা বলতে বাধ্য করলে সে ফাঁস করে দেয় যে, কারূনের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই তাকে এই অপবাদ রটাতে প্ররোচিত করেছে। যুহহাকের ও কাতাদার মতে, কারূন আল্লাহর নবীকে অস্বীকার করে কুফরীতে লিপ্ত হয়। মাওয়ার্দীর মতে, সে ফেরাউনের দরবারে চাকুরী করতো এবং সেই খুটির জোরে আপন গেত্র বনী ইসরাইলের ওপর নির্যাতন চালাতো।
হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত মূসা (আ) এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটনায় তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বদদোয়া করলে আল্লাহ বলেনঃ হে মূসা! আমি মাটিকে নির্দেশ দিয়েছি তোমার আদেশ মানতে। তুমি তাকে যা ইচ্ছা আদেশ দাও। মূসা (আ) আদেশ দিলেনঃ হে মাটি, কারূনকে গ্রাস কর। তৎক্ষণাৎ কারুনের খাট মাটিতে অদৃশ্য হয়ে গেল। এ অবস্থা দেখে কারূন মূসা (আ) এর দয়া ভিক্ষা করলো। কিন্তু মূসা (আ) পুনরায় মাটিকে আদেশ দিলেনঃ ওকে গ্রাস কর। এবার তার পা মাটির নিচে তলিয়ে গেল। এভাবে তিনি বারবার আদেশ দিতে দিতে কারূন সম্পূর্ণরূপে মাটির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল।
(পবিত্র আল কুরআনে বর্ণিত উপরোক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে কারুনের বিদ্রোহ ও ঔদ্ধত্যের যে দিকগুলো প্রকাশ পেয়েছে, তো হলো : (১) ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুর সাথে যোগসাজশ করে মুসলমানদের ও স্বজাতির স্বার্থের ক্ষতি সাধন (২) নিজের অর্জিত সম্পদকে আল্লাহর অনুগ্রহের দান মনে করার পরিবর্তে নিজের জ্ঞানের ফল ভেবে বাহাদুরী প্রদর্শন (৩) নিজ সম্পদে সমাজের দরিদ্র জনগণের যে অধিকার রয়েছে, তা উপলব্ধি না করা ও দিতে অস্বীকার করা, উপরন্তু জনগণকে নিজের বিত্তবৈভবের জৌলুস দেখিয়ে বেড়ানো, যাতে বঞ্চিতদের মানসিক যন্ত্রণা আরো বেড়ে যায় এবং তাদের বঞ্চনার অনুভূতি আরো তীব্রতর হয়। (৪) কার্পণ্য লাগামহীন পুঁজিবাদ, দাম্ভিক সুলভ ও একচেটিয়া ভোগবাদী মানসিকতা। – অনুবাদক)
.
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন : “তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তার সাথে কাউকে শরীক করোনা, এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর, আরো সদ্ব্যবহার কর আত্মীয়স্বজনদের সাথে, এতীমদের সাথে, দরিদ্রদের সাথে, আত্মীয় প্রতিবেশীর সাথে, অনাত্মীয় প্রতিবেশীর সাথে, সফরসংগীর সাথে, পথিকের সাথে এবং দাসদাসীর সাথে। আল্লাহ দাম্ভিক ও গর্বিত লোককে পছন্দ করেন না।” (সুরা আন নিসা)
রাসূল (সা) তাঁর ইন্তিকালের পূর্ব মুহূর্তেও তাকিদ দিয়েছেন যে, “নামায ও অধীনস্থদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।” (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)
রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ “অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহার সৌভাগ্যের উৎস আর তাদের সাথে দুর্ব্যবহার দুর্ভাগ্যের উৎস।” (মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবুদাউদ)
হযরত আবু মাসউদ (রা) বলেনঃআমি একজন ভূত্যকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছিলাম। এই সময় আমার পশ্চাতে একটা শব্দ শুনলামঃ “জেনে রেখ, হে আবু মাসউদ, আল্লাহ তায়ালাই তোমাকে এই ভূত্যের ওপর কর্তৃত্ব দিয়েছেন।” আমি বললামঃ হে রাসূলুল্লাহ! আমি আর কখনো দাসদাসী ও চাকর চাকরানীকে প্রহার করবেনা। আমি ওকে স্বাধীন করে দিলাম। রাসূল (সা) বললেনঃ “এই কাজটি না করলে আগুন তোমাকে কিয়ামতের দিন ভস্মীভূত করে দিত।” (সহীহ মুসলিম)
রাসুল (সা) বলেছেন। যারা দুনিয়াতে মানুষকে নির্যাতন করে, আল্লাহ তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেবেন। জামে তিরমিযী ও সুনানে আবু দাউদে আছে যে, “রাসূলকে (সা) জিজ্ঞাসা করা হলো, অধীনস্থদেরকে কতবার ক্ষমা করবো। রাসূল (সা) বললেনঃ প্রতিদিন ৭০ বার।”
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) তাঁর এক ভৃত্যকে ডাকলেন। সে অনেক দেরীতে এল। তখন রাসূল (সা) নিজের হাতের মেসওয়াক দেখিয়ে বললেন, “কিয়ামতের দিন বদলা পাওয়ার ভয় না থাকলে তোমাকে এই মেসওয়াক দিয়ে পিটাতাম।”
এক হাদীসে আছে যে, এক মহিলা রাসূল (সা) কে এসে বললোঃ হে রাসূল! আমি নিজের বাদীকে “ব্যভিচারিনী” বলে গাল দিয়েছি। রাসূল (সা) বললেনঃ তুমি কি ব্যভিচারের কোন লক্ষণ তার মধ্যে দেখেছ? মহিলা বললোঃ না। রাসূল (সা) বললেনঃ “সাবধান, এই মেয়েটি কিয়ামতের দিন তোমার কাছ থেকে বদলা নেবে।” মহিলা তৎক্ষণাত তার বাদীর কাছে গেল এবং তাকে একটা লাঠি দিয়ে বললো আমাকে মারো। বাদীটি রাযী হলোনা। তখন ঐ মহিলা তাকে স্বাধীন করে দিল। তারপর সে রাসূল (সা) এর কাছে এসে বাদীকে স্বাধীন করার খবর জানালেন। রাসূল (সা) বললেনঃ “আশা করা যায়, তোমার গুনাহ মাফ হবে”
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে যে রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে তার অর্ধেস্তনের ওপর কোন মিথ্যা অপবাধ আরোপ করবে, সে কিয়ামতের দিন অপবাদের জন্য নির্ধারিত বেত্রদত্ত ভোগ করবে। রাসূল (সা) বলেছেনঃ “চাকর চাকরানী বা দাসদাসীকে প্রয়োজনীয় খাদ্যবস্ত্র দিতে হবে এবং তার ক্ষমতার অতিরিক্ত দায়িত্ব তার ওপর চাপানো যাবেনা। নিতান্তই যদি চাপাতে হয়, তবে তার সাথে নিজে কাজ করতে হবে। আল্লাহর সৃষ্টিকে কষ্ট দিওনা। তিনি তোমাদেরকে তাদের মালিক বানিয়েছেন, যদি চাইতেন তবে তাদেরকে তোমাদের মালিক বানাতে পারতেন।” (সহীহ মুসলিম, তাবরানী)
অধীন মানুষ বা পশুকে ক্ষুধায় কষ্ট দেয়া এবং সন্তান ও পিতামাতাকে বিচ্ছিন্ন করা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ধরনের কবীরা গুনাহ। রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মা ও সন্তানকে বিচ্ছিন্ন করবে, আল্লাহ তাকে তার প্রিয়জন থেকে কিয়ামতের দিন বিচ্ছিন্ন করবেন। (জামে তিরমিযী)
রাসূল (সা) আরো বলেছেন : “মানুষের নিজের অধীনস্থ মানুষ বা পশুকে ক্ষুধায় কষ্ট দেয়ার মত বড় গুনাহ আর হতে পারেনা।” (সহীহ মুসলিম) অনুরূপভাবে পালিত জীবজন্তুকে সজোরে প্রহার করা, সব সময় খাঁচায় আবদ্ধ রাখা, যথাসময়ে খাবার না দেয়া অথবা তার ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য করা জায়েয নয়। রাসূল (সা) বলেছেনঃ “একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে অনাহারে মেরে ফেলার কারণে একমহিলা আযাব ভোগ করবে।” বলাবাহুল্য যে, এ কথা সকল প্রাণীর বেলায়ই প্রযোজ্য। সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে যে, রাসূল (সা) কোন জীবজন্তুকে তার স্বাভাবিক কাজ ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহার করতে এবং তার ক্ষমতার অতিরিক্ত কাজে খাটাতে নিষেধ করেছেন। কোন জন্তুকে যবাই করতে হলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে যবাই করতে বলেছেন এবং যে জন্তুকে হত্যা করতে হবে, তাকে বন্দী না রেখে প্রথম সুযোগেই হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সাপ, বিচ্চু, ইদুর, পাগলা কুকুর প্রভৃতি কষ্টদায়ক জন্তুকে পুড়িয়ে হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (সা) কোন জীবজন্তুকে নিছক চিত্তবিনোদন অথবা সখের বশে এবং কোন উপকারিতা ছাড়া হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।
দাসদাসীকে মুক্তি দেয়া খুবই সওয়াবের কাজ। রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার দাসদাসীকে মুক্তি দেবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি দেবেন।
.
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসূল (সা) বললেনঃ “সে মুমীন নয়। সে মুমীন নয়।” সবাই জিজ্ঞাসা করলোঃ হে রাসূল! কে? রাসূল (সা) বললেন, “যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টকর কাজ থেকে নিরাপদ নয়।” প্রতিবেশী তিন রকমঃ প্রথম মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী। এ ধরনের প্রতিবেশী তিনটি অধিকার পায়। একটি আত্মীয় হিসাবে, একটি মুসলমান হিসাবে এবং একটি প্রতিবেশী হিসাবে। দ্বিতীয় মুসলিম অনাত্মীয় প্রতিবেশী। এই প্রতিবেশী দুইটি অধিকার পাবেঃ একটি প্রতিবেশী হিসাবে ও একটি মুসলমান হিসাবে। তৃতীয় অমুসলিম প্রতিবেশী। এ ধরনের প্রতিবেশী স্রেফ প্রতিবেশীত্বের অধিকার পাবে।
রাসুল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তৃপ্তি সহকারে আহার করে এবং তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে, সে মুসলমান নয়। রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ জিবরীল আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে এত সতর্ক করে যে, কখনো কখনো ভাবি, প্রতিবেশীকে হয়তো আমার উত্তরাধিকারী বানানো হবে। (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে ইবনে মাজা)।
রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ দরিদ্র প্রতিবেশী কিয়ামতের দিন ধনী প্রতিবেশীকে জাপটে ধরে বলবেঃ হে প্রভুঃ আমার এই ভাইকে তুমি সচ্ছল বানিয়েছিলে এবং সে আমার নিকটেই থাকতো, কিন্তু আমি ভুখা থাকতাম আর সে পেট পুরে খেত। ওকে জিজ্ঞাসা কর, কেন আমার ওপর দরজা বন্ধ করে রাখতো এবং আমাকে বঞ্চিত করতো।” রাসূল (সা) বলেনঃ তিনটি গুনাহ সবচেয়ে ভয়াবহঃ আল্লাহর সাথে শিরক করা, সন্তানকে অভাবের ভয়ে হত্যা করা এবং প্রতিবেশীর স্ত্রীর শ্লীলতাহানি করা। (সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে নাসায়ী, জামে তিরমিজী)
হযরত ইবনে উমরের একজন ইহুদী প্রতিবেশী ছিল। যখনই তার বাড়িতে ছাগল যুবাই হতো, বলতেন, আমাদের ইহুদী প্রতিবেশীকে কিছু গেশত দিয়ে এস।” (সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজী)
প্রতিবেশীর উচিত অপর প্রতিবেশীর কষ্টদায়ক আচরণ যতদূর সম্ভব সহ্য করা। এমনকি সে যদি অমুসলিম হয় তবুও। কেননা এটাও তার প্রতি উপকার ও অনুগ্রহের অনুর্ভুক্ত। একবার এক ব্যাক্তি রাসূল (সা) এর কাছে এসে বললোঃ হে রাসূল! আমাকে এমন একটি কাজ বলে দিন, যা করলে আমি জান্নাতে যেতে পারবো। রাসূল (সা) বললেনঃ পরোপকারী হও। সে বললোঃ “আমি কিভাবে বুঝবো পরোপকারী হয়েছি কিনা? রাসূল (সা) বললেনঃ তোমার প্রতিবেশীর কাছে জিজ্ঞাসা কর সে যদি বলে যে, তুমি পরোপকারী, তাহলে তুমি পরোপকারী। আর সে যদি বলে যে, তুমি পরের অনিষ্টকারী, তাহলে তুমি অনিষ্টকারী।” (বায়হাকী)
অপর এক হাদীসে রাসূল (সা) বলেনঃ প্রতিবেশীর অধিকার এই যে, সে যখন সাহায্য চাইবে তাকে সাহায্য করতে হবে, সে যখন ঋণ চাইবে তাকে ঋণ দিতে হবে। যখন সে কোন কিছুর মুখাপেক্ষী হয়, তাকে তা দিতে হবে, যখন সে রুগ্ন হয় তাকে দেখতে যেতে হবে, যখন সে কল্যাণ লাভ করে তখন তাকে অভিনন্দন জানাতে হবে, যখন সে বিপদে পড়ে তখন তাকে সমবেদনা জানাতে হবে, যখন সে মারা যায়, তার জানাযা পড়তে ও তাকে সমাহিত করতে কবরের কাছে যেতে হবে, তার অনুমতি ছাড়া উঁচু বাড়ি বানিয়ে বাতাস বন্ধ করা যাবেনা। ডেগচিতে যে খাদ্য সামগ্রী রাখা হয়, তার ঘ্রাণ যদি সে পায়, তবে তা থেকে তাকে কিছু দিতে হবে, ফল কিনলে তাকে হাদিয়া পাঠাতে হবে, নচেত তার খোসা বাইরে ফেলা যাবেনা, যাতে সে দেখতে না পায়।”
রাসূল (সা) বলেন, প্রতিবেশী একজন নারীর শ্লীলতা হানি করা অন্য দশজন নারীর শ্লীলতা হানি করার সমান। অনুরূপ একজন প্রতিবেশীর বাড়ীতে চুরি করা অন্য জায়গায় দশজনের বাড়ীতে চুরি করার সমান।
প্রতিবেশীর প্রতি সহিষ্ণুতার পরিচয় দেয়া খুবই মহৎ কাজ—যদিও সে বিরোধী হয়। কথিত আছে যে, হযরত সাহল বিন আবদুল্লাহ তাসতারী (রহ) এর একজন অগ্নি উপাসক প্রতিবেশী ছিল। প্রতিবেশীর গৃহ থেকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ ময়লা আবর্জনা তার অলক্ষ্যে হযরত সাহলের ঘরে এসে পড়তো। কিন্তু তিনি সে জন্য প্রতিবেশীর কাছে কোন অভিযোগ করতেন না। দিনের বেলা আবর্জনা জমা করে ঢেকে রাখতেন এবং রাত্রে বাইরে ফেলে দিতেন। একদিন সাহলের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো। তিনি তার প্রতিবেশীকে ডেকে আবর্জনার স্তুপ দেখিয়ে বললেন, “আমার মৃত্যু ঘনিয়ে না আসলে আপনাকে এটা দেখাতাম না। আমার আশংকা যে, আমার মৃত্যুর পর আমার পরিবারের আর কেউ আমার মত সহনশীলতা দেখাতে পারবেনা। তাই আপনাকে দেখলাম। আপনি যা ভালো মনে হয় করুন।” প্রতিবেশী অগ্নি উপাসূকের বিস্ময়ের অবধি রইলনা। সে বললো, আপনি এত দীর্ঘকাল ব্যাপী এই বিরক্তিকর ব্যাপারটা সহ্য করে আসছেন।” এই বলে সে সাহলের হাতে হাত দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলো আর সাহল তৎক্ষণাত্ ইন্তিকাল করলেন।
.
আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ “হে মুমীনগণ! তোমরা একদল আর এক দলকে উপহাস করোনা। কেননা যাদেরকে উপহাস কথা হয় তারা উপহাসকারীদের চেয়ে ভালোও হতে পারে। তোমরা এক দল মহিলা আর এক দল মহিলাকে উপহাস করোনা। কেননা যাদেরকে উপহাস করা হয় তারা উপহাসকারীদের চেয়ে ভালো হতে পারে। অর তোমরা পরস্পরের দুর্নাম ও কুৎসা রটিওনা ও পরস্পরকে খারাপ নামে ডেকনা। খারাপ নামে ডাকা খুব জন্য কাজ, যারা ঐ নামে ডাকে তারা যালিম” (সূরা আল হুজরাত)
আল্লাহ আরো বলেছেনঃ “একে অপরের দোষ খুঁজে বেড়িওনা এবং অসাক্ষাত নিন্দা করোনা।” সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে ধিকৃত হধে সেই ব্যক্তি, যার অশালীন ও অশ্রাব্য কথাবার্তা শোনার ভয়ে জনগণ তার সংগ ত্যাগ করে।
রাসূল (সা) আরো বলেছেন হে আল্লাহ বান্দাগণ! আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে সংকীর্ণতা দূর করে দিয়েছেন। তবে যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাই এর মনসভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তার কথা ভিন্ন। সে সংকীর্ণতার শিকার হবে।
সহীহ মুসলিম ও সুনানে তিরমিযীতে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষে অপর মুসলমনের জান, মাল, সম্ভ্রমেন ক্ষতি করা হারাম।” সহীহ মুসলিমে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ মুসলমান মুসলমানের ভাই। কেউ কারো ওপর যুলুম করেনা। কেউ কাউকে অপমান করেনা এবং ঘৃণা করেনা। কোন মুসলমাত্র পক্ষে এ চলে খারাপ কাজ আর কিছু হতে পারেনা যে, তার মুসলমান ভাইকে ঘৃণা বা অবজ্ঞা করে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, মুসলমাকে গালি দেয়া ফাসেকী এবং তার সাথে যুদ্ধ বাধানো কুফরী।
হাকেম ইবনে হাব্বান, আহমাদ ও বায়যার বর্ণনা করেন যে, একবার রাসূলকে (সা) বলা হলো যে, “অমুক মহিলা রাত জেগে নামায পড়ে এবং দিনের পর দিন রোযা রাখে, কিন্তু তার পার্শ্ববর্তী লোকজনকে কটু কথা দ্বারা কষ্ট দেয়। রাসূল (সা) বললেনঃ তার কোন ভালাই হবে না। সে জাহান্নামে যাবে।” হাদীসে আরো আছে যে, “তোমরা তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের শুধু গুণাবলী বর্ণনা কর এবং দোষ বর্ণনা থেকে বিরত থাক। কেননা সে তো তার কর্মফলের জায়গায় পৌছে গেছে।” (হাকেম) রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কাউকে “কাফের” অথবা “আল্লাহর দুশমন” বলে আখ্যায়িত করে অথচ আসলে সে তা নয়, তার আরোপিত উক্ত আখ্যা তার কাছেই ফিরে আসবে।” অর্থাৎ সে নিজেই কাফের ও আল্লাহর দুশমন হয়ে যাবে। (সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিম) সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “মিরাজের রাত্রে আমি একদল লোক দেখেছি, যাদের হাতে তামার নখ ছিল এবং তা দ্বারা তারা নিজেদের মুখমন্ডল খামচাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলামঃ হে জিবরীল, এরা কারা? তিনি বললেনঃ “যারা মানুষের নিন্দা ও কুৎসা রটিয়ে বেড়াতো এবং তাদের মানসম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলতো।”
বস্তুতঃ মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য ও গেলযোগ সৃষ্টি এবং জীবজন্তুর মধ্যে লড়াই বাধানো ভয়ংকর কবীরা গুনাহ। রাসূল (সা) বলেনঃ “শয়তান এখন আর এ আশা করেনা যে, আরব উপদ্বীপের মুসলমানরা তাকে পূজা করবে, তবে তাদের মধ্যে বিভেদ অনৈক্য ও কোন্দল সৃষ্টির আশা সে এখনও পোষণ করে।” এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, দুই ব্যক্তি বা দুই দলের মধ্যে যে গন্ডগেল ও কলহ সৃষ্টি করে এবং তাদের মধ্যে কষ্টদায়ক ও উস্কানীমূলক কথার আদান প্রদান করে, সে শয়তানের দলভূক্ত চোগলখোর ও নিকৃষ্টতম মানুষ। অনুরূপভাবে স্বামীস্ত্রীর মধ্যে, চাকর ও মনিবের মধ্যে এবং শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সম্পর্ক বিনষ্টকারীও শয়তানের দলভুক্ত চোগলখোর। চাই তা যতই ভালো কাজের মোড়কে করা হোকনা কেন। রাসূল (সা) বলেছেনঃ “সেই ব্যক্তি অভিশপ্ত, যে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ও চাকর মনিবের মধ্যে বিভেদ ও কোন্দল বাধায়।” (সুনানে আবু দাউদ) অনুরূপভাবে আমোদ প্রমোদের উপকরণ হিসাবে মোরগ লড়াই, কুকুর লড়াই, ষাঁড় লড়াই ইত্যাদি অনুষ্ঠিত করতে রাসূল (সা) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। (একই কারণে মুষ্টিযুদ্ধ এবং দৈহিক ক্ষতি ও আর্থিক অপচয়ের ঝুঁকিপূর্ণ যাবতীয় খেলা ও প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। অনুবাদক)
পক্ষান্তরে দুই পক্ষের বিবাদ মীমাংসা করে দিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা অত্যন্ত মহৎ কাজ। এরূপ মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গেপন শলাপরামর্শ করতেও ক্ষতি নেই। নচেৎ গেপন শলাপরামর্শ সন্দেহ সংশয় ও বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে। সূরা আন নিসার এক আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ “তাদের বহু গেপন সলাপরামর্শে কোন কল্যাণ নেই, তবে যে ব্যক্তি সদকা, সৎকাজ কিংবা জনগণের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উদ্দেশ্যে এটা করে তার কথা স্বতন্ত্র। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এরূপ কাজ করে তাকে আমি বিরাট প্রতিদান দেব।” রাসূল (সা) মানুষের বিবাদ মীমাংসা, কোন্দল নিরসন, ঐক্য সংহতকরণ ও সম্পর্ক ঘনিষ্টকরণে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি হযরত আবু আইয়ুব আনসারীকে বলেছিলেনঃ তোমাকে লাল উটের পাল অপেক্ষা ভালো এমন সদকার সন্ধান দেব কি? তিনি বলেনঃ হ্যা, হে রাসূল। রাসূল (সা) বললেনঃ মানুষের মধ্যে যখন পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় তখন তা শুধরে দেবে, এবং তারা যখন পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়, তখন তাদেরকে পরস্পরের ঘনিষ্ঠতর করে দেবে।”
পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এত বড় মহৎ কাজ যে, এ জন্য রাসূল (সা) প্রয়োজনে মিথ্যা কথা বলারও অনুমতি দিয়েছেন। সহীহ আল বুখারীতে আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “সেই ব্যক্তি মিথুক নয় যে মানুষের সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করে, ফলে সে যা বলে তার ফলাফল ভালো হয়ে থাকে।” সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে আছে যে, হযরত উম্মে কুলসুম বলেছেনঃ যুদ্ধ, পারস্পরিক সম্পর্ক শুধরানো এবং স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে ও স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে কিছু বলা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই শুধু রাসূল (সা) মিথ্যার অনুমতি দিয়েছেন।
সহীহ আল বুখারীতে আছে যে, রাসূল (সা) বনু আমরের মধ্যে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়েছে শুনে সাহাবীদের একটি দল নিয়ে সেখানে চলে যান এবং উত্তেজনা প্রশমিত করেন। রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি দু’জনের গেলমাল মিটিয়ে দেয়, আল্লাহ তায়ালা তার সকল কাজ বিশুদ্ধ করে দেবেন, তার প্রতিটি কথার বিনিময়ে একটি গেলাম মুক্ত করার সওয়াব দেবেন এবং তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।
.
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “যারা মুমিন নরনারীদেরকে তারা যা করেনি, তাই প্রচার করে কষ্ট দেয়, তারা অপবাদ রটায় এবং সুস্পষ্ট গুনাহর কাজ করে।” (সূরা আল আহযাব) “তোমরা অনুগত মুমিনদের প্রতি যত্নশীল থাক।” (সূরা আল-হিজর) হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার কোন বন্ধুকে কষ্ট দেয় তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছি।” অপর এক হাদীসে আছে যে, একবার সালমান ফারসী, সুহাইব ও বিল্লাল (রা) এক জায়গায় বসেছিলেন। এ সময় তাদের কাছে আবু সুফিয়ান এল। তাকে দেখে তারা বললেনঃ “আল্লাহর তরবারীগুলো আল্লাহর শত্রুদের কাছ থেকে উপযুক্ত প্রতিশোষ নেয়নি।” সেখানে উপস্থিত হযরত আবু বকর (রা) বললেনঃ “কুরাইশ বংশের প্রবীণ নেতা সম্পর্কে তোমরা এই মন্তব্য করলে?” অতপর তিনি রাসূল (সা) এর কাছে এসে তাকে পুরো ব্যাপারটা জানালেন। রাসূল (সা) বললেনঃ “হে আবু বকর! তুমি সম্ভবত ঐ তিন সাহাবীর মনে ক্রোধের সঞ্চার করেছ এবং আল্লাহকেও ক্রুদ্ধ করেছ।” (অর্থাৎ, তুমি ভালো করনি) হযরত আবু বকর (রা) তৎক্ষনাত ঐ তিন সাহাবীর নিকট গেলেন এবং বললেনঃ ” আমার কথাই কি তোমরা রাগ করেছ ভাইয়েরা?” তারা বললেনঃ “না ভাই, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন।”
উল্লেখ্য যে, রাসূল (সা) এর প্রতি সর্বপ্রথম যারা ঈমান এনেছিল তারা দরিদ্র শ্রেণির লোক ছিল। শুধু তার প্রতি নয়, সকল নবীর প্রতিই সর্বপ্রথম দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরাই ঈমান এনেছিল। রাসূল (সা) প্রায় তার এই সব দরিদ্র সাহাবী যথা সালমান ফারসী, সুহাইব, বিল্লাল ও আম্মার প্রমূখের কাছে বসতেন। মুশরিকরা ইহুদি আলেমদের কাছ থেকে জানতে পারলো যে, নবী রাসূলদের আলামতই এই যে, তাদের প্রথম অনুসারী দরিদ্র লোকদের মধ্য থেকে হয়ে থাকে। তাই তারা দরিদ্রদেরকে তার কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কৌশল তৈরি করলো। মুশরিকদের কতিপয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এসে রাসূল (সা) কে বললোঃ হে মুহাম্মদ! তোমার চারপাশ থেকে দরিদ্রদেরকে সরিয়ে দাও। কেননা ওদের সাথে বসতে আমাদের ঘৃণা করে। ওদেরকে সরিয়ে দিলে সমাজের শ্রেষ্ঠ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ তোমার ওপর ঈমান আনবে। এর জবাবে আল্লাহ নাযিল করলেনঃ “যারা তাদের প্রতিপালককে খুশী করার জন্য সকাল বিকাল তাকে ডাকে, তাদেরকে তুমি তাড়িয়ে দিয়না।” (আল আনয়াম)
মুশরিকদের এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর তারা বললোঃ হে মুহাম্মদ! ওদেরকে যদি তুমি তাড়াতে না চাও তাহলে আমাদের জন্য একদিন এবং ওদের জন্য একদিন নির্ধারণ কর। এর জবাবে আল্লাহ তায়ালা নাযিল করলেনঃ
“যারা তাদের প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে সকাল বিকাল তাকে ডাকে, তুমি ধৈর্য ধারণ করে তাদের সাথে থাকো, দুনিয়ার জাকজমকের আকাঙ্খায় তোমার নজরে তারা যেন উপেক্ষিত না হয়।” ( সূরা আল কাহফ)
এরপর রাসূল (সা) দরিদ্র সাহাবীদের প্রতি অধিকতর যত্নশীল হন এবং তাদেরকে অধিকতর গুরুত্ব ও মর্যাদা দেন। সেই থেকে এটা ইসলামের চিরস্থায়ী নীতি হয়ে দাড়ায় যে, মর্যাদা ও ভক্তি শ্রদ্ধার মাপকাঠি হবে সমান, সৎকর্মশীলতা, তাকওয়া ও খোদাভীতি। পার্থিব জাকজমক, ধন সম্পদ, শান শওকত ও প্রভাব প্রতিপত্তি নয়। যারা তাকওয়া ও খোদাভীতিতে অগ্রসর ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী তারা দরিদ্র হলেও তাদেরকে অবজ্ঞা, অবহেলা ও উপেক্ষা করা যাবেনা এবং কোনভাবেই তাদেরকে কষ্ট দেয়া যাবেনা।
.
সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ ” টাখনুর নিচে পর্যন্ত যে পোশাক পরবে সে জাহান্নামে যাবে।” মুয়াতায়ে ইমাম মালেক, সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, জামে তিরমিযী, সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “যারা পোশাক অহংকারবশত টাখনুর নিচে গড়িয়ে পড়ে, আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না।” সুনানে আবু দাউদে আছে যে, এক ব্যক্তি টাখনুর নিচে গড়ানো পোশাক পড়ে নামাজ পড়ছিল। এই সময় রাসূল (সা) তাকে বললেনঃ যাও অযু করে এস। সে অযু করে এলে আবার বললেনঃ যাও অযু করে এস। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলোঃ হে রাসূল! আপনি ওকে অযু করতে বললেন কেন? রাসূল (সা) চুপ করে রইলেন। কিছক্ষণ পর বললেনঃ সে টাখনুর নিচে গড়ানো পোশাক পড়ে নামাজ পড়ছিল। এ ধরণের নামাজ আল্লাহ কবুল করবেন না।
সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) যখন বলেলেনঃ যার পোশাক অহংকারবশত টাখনুর নিচে গড়ায়, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দিকে তাকাবেন না, তখন আবু বকর (রা) বললেনঃ হে রাসূল! আমার পাজামা আমি শক্ত করে না বাধলে ঢিল হয়ে গড়িয়ে পড়ে। রাসূল (সা) বললেনঃ ” যারা অহংকার বশে এ কাজ করে, তুমি তাদের অন্তর্ভূক্ত নও।”
[উল্লেখ্য, এই সম্পর্কিত বেশী কিছু হাদীস “দাম্ভিকতা ও আভিজাত্য প্রদর্শনার্থে” কথাগুলো নেই — অনুবাদক]
.
সহীহ আল বুখারী, সহীহ মুসলিমে, বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি দুনিয়ায় রেশম ব্যবহার করবে, সে আখিরাতে রেশম ব্যবহার করতে পারবেনা।” সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে নাসায়ীতে বর্ণিত আছে যে, স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহার আমার উম্মতের পুরুষদের ওপর হারাম করা হয়েছে।” সামরিক ও বেসামরিক উভয় প্রকারের লোকদের বেলায় এটা প্রযোজ্য।
সহীহ আল বুখারীতে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করতে, রেশমী পোশাক পরিধান করতে ও রেশমী বিছানায় বসতে নিষেধ করেছেন।
যে ব্যক্তি পুরুষের রেশম ব্যবহার করাকে হালাল মনে করে অথবা অন্য কোন হারামকে হালাল মনে করে সে কাফের। শুধুমাত্র রোগগ্রস্ত ব্যক্তি (ডাক্তারের মতে অনিবার্য হলে) এটা ব্যবহার করতে পারে। আর যুদ্ধ ক্ষেত্রে সৈনিকরাও প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতে পারে। নিছক সখ ও সৌন্দর্যের জন্য পুরুষের পক্ষে রেশম ও স্বর্ণ ব্যবহার করা সর্বসম্মত ভাবে হারাম। অনুরূপভাবে যে বস্ত্রের অধিকাংশ সূতো রেশমী তাও পুরুষের ব্যবহার করা হারাম। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) এক ব্যক্তির হাতে সোনার আংটি দেখে তা খুলে ফেললেন এবং বললেনঃ “তোমাদের এই ব্যক্তির নিজ হাতে জাহান্নামের আগুন পরার সখ হয়েছে।” অনুরূপভাবে স্বর্ণ ও রেশমের নকশা এবং এমব্রয়ডারীও পুরুষের জন্য হারাম। তবে শিশুদের স্বর্ণ ও রেশম ব্যবহার করানো সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলসহ অধিকাংশ ইমামের মতে পুরুষ শিশুদের জন্যও এটা হারাম।
.
ইসলামী শরীয়তে তিন ধরনের কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব বৈধ এবং যে ব্যক্তি এর কোন একটির অধীন হবে, তার পক্ষে একতরফাভাবে উক্ত কর্তৃত্বের আনুগত্য পরিত্যাগ করা ও সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম। প্রথমতঃ যখন প্রচলিত রীতিপ্রথা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কারণে কেউ কারো দাসদাসীতে পরিণত হয়, তখন উক্ত মনিব তার দাসদাসী বা ভৃত্যের প্রতি অত্যাচার নির্যাতন না চালালে সেই মনিবকে একতরফাভাবে পরিত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়া অবৈধ। তবে অত্যাচারী মনিবকে ছেড়ে পালালে তা বৈধ হবে এবং হিজরতে পরিগণিত হবে। দ্বিতীয়তঃ স্ত্রীর ওপর স্বামীর কর্তৃত্ব। স্বামী যতক্ষণ স্ত্রীর ভরন পোষণ চালাবে এবং আইন সম্মত সকল দাম্পত্য অধিকার প্রদান করতে থাকবে, ততক্ষণ স্বামীর আনুগত্য পরিত্যাগ করা, সম্পর্ক ছিন্ন করা ও অবাধ্য হওয়া স্ত্রীর পক্ষে অবৈধ। (৪৭তম কবীরা গুনাহ দ্রষ্টব্য) তৃতীয়তঃ এমন কোন নেতা বা দলের আনুগত্য, যে নেতা বা দল শরীয়ত সম্মত উপায়ে নির্দেশ প্রদান করে। এ ধরনের নেতা বা দলের আনুগত্য পরিত্যাগ করা ও সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম ও কবীরা গুনাহ। এই তিন ধরনের কর্তৃত্বের আনুগত্য সম্পর্কে নিম্নে কতিপয় হাদীস বর্ণনা করা যাচ্ছে।
রাসূল (সা) বলেছেনঃ “কোন দাসদাসী বা ভৃত্য যখন পালিয়ে যায়, তখন সে ফিরে না আসা পর্যন্ত, যে স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য, সে স্বামীর অনুগত না হওয়া পর্যন্ত এবং মদ খেয়ে মাতাল হওয়া ব্যক্তি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাদের নামায ও অন্য কোন সৎকর্ম কবুল হয়না।” (সহীহ মুসলিম, তাবরানী, সহীহ ইবনে খুযায়মা) রাসূল (সা) আরো বলেছেনঃ তিন ব্যক্তির পরিণামের জন্য কেউ দায়ী নয়। (অর্থাৎ তারা নিজেরাই দায়ী) যে ব্যক্তি আপন জামায়াত বা সংগঠ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে ও নেতার অবাধ্য হয়, যে ভৃত্য মনিবকে ছেড়ে পালিয়ে যায় ও অবাধ্য অবস্থায় মারা যায় এবং স্বামী কর্তৃক যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করা সত্বেও যে স্ত্রী স্বামীর অনুপস্থিতিতে বেপর্দা চলাফেরা করে ও অনৈসলামিক পন্থায় সৌন্দর্য প্রদর্শন করে ঘুরে বেড়ায়। (সহীহ ইবনে হাববান, তাবরানী ও হাকেম)
.
সূরা আল আনয়ামে আল্লাহ বলেনঃ “যে জন্তুকে আল্লাহর নাম নিয়ে যবাই করা হয়নি, তা খেয়োনা, এটা গুরুতর পাপ। …..” হযরত ইবনে আব্বাস, কালবী, আতা প্রমুখ ইমাম এ আয়াতের তাফসীর প্রসংগে বলেছেন যে, এ দ্বারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কাফির ও মুশরিকদের যবাই করা জন্তুকে বুঝানো হয়েছে। নচেৎ মুসলমানদের যবাই করা জন্তু সর্ব সম্মতভাবে হালাল, চাই তাতে আল্লাহর নাম নেয়া হোক বা না হোক। তাবরানী বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলোঃ হে রাসূল! আমাদের কেউ যদি যবাই করার সময় আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যায়, তা হলে কি হবে? রাসূল (সা) বললেনঃ “প্রত্যেক মুসলমানের মুখে আল্লাহর নাম থাকে।
মুয়াত্তায়ে ইমাম মালিক ও সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, কিছু মুসলমান বললোঃ হে রাসূল, লোকেরা আমাদেরকে গেশত দিতে আসে। কিন্তু আমরা জানি না, ঐ সব জন্তু আল্লাহর নাম নিয়ে যবাই করা হয়েছে কিনা। রাসূল বললেনঃ তোমরা আল্লাহর নাম নাও এবং খাও।”
.
সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি নিজের পিতা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, তার জন্য জান্নাত হারাম। সহীহ আল বুখারীর অপর হাদীসে এরূপ ব্যক্তিকে কাফির বলা হয়েছে এবং অভিশাপ ও লানত বর্ষণ করা হয়েছে। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন “যে ব্যক্তি নিজের পিতা ব্যতীত অন্য কাউকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, অথচ সে জানে যে, সে তার পিতা নয়; সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং সে কাফির। যে ব্যক্তি নিজে যা নয় তাই দাবী করে সে ক্ষমার উম্মতের অন্তুর্ভুক্ত নয়, তার উচিত জাহান্নামে নিজের বাসস্থান গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি কাউকে কাফির বা আল্লাহর দুশমন বলে অভিহিত করে, অথচ আসলে সে তা নয়, তার উক্তি তার ওপরই প্রযুক্ত হবে। অর্থাৎ সে নিজেই কাফির ও আল্লাহর দুশমনে পরিণত হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন