হেডমাস্টার

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সংসারে তো সেঁধিয়ে গেছি, এখন কি করলে কি হবে! বেরবার পথ? ঠাকুর, বেরব কেমনে?

“কোথায় বেরোতে চাও?”

‘সংসারের বাইরে। মুক্তি চাই।’

“মুক্তি চাও!” তাহলে শোন-

“আমি মুক্তি দিতে কাতর নই
শুদ্ধাভক্তি দিতে কাতর হই।
আমার ভক্তি যেবা পায়, তারে কেবা পায়,
সে যে সেবা পায়, হয়ে ত্রিলোকজয়ী।”

তোমার মনে যে মুক্তির বাসনা, সে কিন্তু পলায়নের মনোবৃত্তি। তুমি কর্তব্য ছেড়ে পালাতে চাইছ। বেহিসাবী, অলস হতে চাইছ। পায়রার গলায় মটরের দানার মতো সংসার গজগজ করছে, তুমি চাইছ মুক্তি! তুমি কি জান, সংসারীর কর্তব্য কি কি! গৃহস্থের কর্তব্য আছে, ঋণ আছে, দেব-ঋণ, পিতৃ-ঋণ, ঋষি- ঋণ আবার পরিবারদের সম্বন্ধে ঋণ আছে। সতী স্ত্রী হলে তাকে প্রতিপালন; সন্তানদিগকে প্রতিপালন যতদিন না লায়েক হয়।

“প্রতাপের ভাই এসেছিল! এখানে কয়দিন ছিল। কাজকর্ম নাই। বলে, আমি এখানে থাকব। শুনলাম, মাগ- ছেলে সব শ্বশুরবাড়িতে রেখেছে। অনেকগুলি ছেলেপিলে। আমি বকলুম, দেখ দেখি ছেলেপিলে হয়েছে; তাদের কি আবার ও-পাড়ার লোক এসে খাওয়াবে-দাওয়াবে, মানুষ করবে? লজ্জা করে না যে, মাগছেলেদের আরেক জন খাওয়াচ্ছে, আর তাদের শ্বশুরবাড়ি ফেলে রেখেছে। অনেক বকলুম, আর কর্মকাজ খুঁজে নিতে বললুম। তবে এখান থেকে যেতে চায়।”

সার কথা শোন বাপু-

“মনে বাসনা থাকিতে      কি হবে বল না
জপিলে তুলসী মালা।
চিতে কামনা থাকিলে      নাকে তিলক কাটিলে
ভোলে কি চিকন কালা।।”

আগে বেশ করে বস, স্থির হও, এইবার বল তো, তুমি কোন্ মুক্তি চাও? প্রতাপের ভাইয়ের মুক্তি! সংসারের ধাক্কায় বেসামাল, তাই একটু হাত-পা ছড়িয়ে নির্ঝঞ্ঝাটে বাঁচার বাসনা! খাব দাব ফূর্তি করব! মনে যার সংসার, মনে যার ভোগবাসনা তার মুক্তি কোথায়! ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙবে, বাবা!

বিজয়কৃষ্ণকে আমি বলেছিলুম, মনে পড়ছে! সংসারীর সংসার প্রতিপালন করতে হয়। তাই সঞ্চয়ের দরকার হয়! পন্হী আউর দরবেশ সঞ্চয় করে না। কিন্তু পাখির ছানা হলে সঞ্চয় করে। ছানার জন্যে মুখে করে খাবার আনে।

আবার সাধু হলেই কি হয়, বিজয়!

দেখ বিজয়, সাধুর সঙ্গে যদি পুঁটলি-পাটলা থাকে, পনেরটা গাঁটওয়ালা যদি কাপড়-কুঁচকি থাকে তাহলে তাদের বিশ্বাস করো না।

ঐ দেখ বটতলায় সব বসে আছে। যাও গিয়ে শুনে এস কি আলোচনা করছে!

আমি দেখেছি। কেউ ডাল বাছছে, কেউ কেউ কাপড় সেলাই করছে, আর বড়মানুষের বাড়ির ভাণ্ডারার গল্প করছে—’আরে ও বাবুনে লাখো রূপেয়া খরচ কিয়া, সাধু লোককো বহুৎ খিলায়া, পুরি, জিলেবী, পেড়া, বরফী, মালপুয়া, বহুৎ চিজ তৈয়ার কিয়া।’

তাহলে মুক্তিটা কি হলো বাপু! গেরুয়া নিয়ে লাভটা কি হলো! সার কথাটি শোন—মনটি দুধের মতো। সেই মনকে যদি সংসার-জলে রাখ, তাহলে দুধেজলে মিশে যাবে। তাই দুধকে নির্জনে দই পেতে মাখন তুলতে হয়। যখন নির্জনে সাধন করে মনরূপ দুধ থেকে জ্ঞান-ভক্তিরূপ মাখন তোলা হলো, তখন সেই মাখন অনায়াসে সংসার-জলে রাখা যায়। সে মাখন কখনো সংসার-জলের সঙ্গে মিশে যাবে না—সংসার-জলের ওপর নির্লিপ্ত হয়ে ভাসবে।

এই ভাসমানতাই হলো মুক্তি। একধরনের সাঁতার। ঢং করে ঘণ্টা বাজিয়ে স্কুলের ছুটি নয়। ওরে! সবেতেই আছি অথচ নেই, এই তো মুক্তি।

রামপ্রসাদ বলছেন :

“অহঙ্কার অবিদ্যা তোর পিতামাতায় তাড়িয়ে দিবি।
যদি মোহগর্তে টেনে লয়, ধৈর্য খোঁটা ধরে রবি।।
ধর্মাধর্ম দুটো অজা, তুচ্ছ খোঁটায় বেঁধে থুবি।
যদি না মানে নিষেধ, তবে জ্ঞান খড়ো বলি দিবি।।”

কোস্তাকুস্তি করলে মুক্তি আসে না। মুক্তি হলো ম্যাথামেটিক্স। দুই আর দুইয়ে চার, আবার দুই দু-গুণেও চার। ক-এর সঙ্গে খ-এর গ-এর মাধ্যমে যোগ, তারপরেই ঘ—ঘরসংসার, তারপরেই দোমড়ানো মোচড়ানো! তখন চ- এর চলচল, ছ-এর এত কিসের ছল! জ-এর ভীষণ জ্বালা, ঝ-এর যেমন ঝড়ের দাপট। ঞ-র কী ভীষণ গোঁসা। ট-এর টাকার ঠ-এ এসে ঠনঠনানি, ড এসে ভয় দেখাচ্ছে ডাকাতির। ঢ কেন পেটায় অহঙ্কারের ঢাক! ণ-এর যতেক খোঁচা। ত বলছে তবে রে, থ তোর এমন থাবা, দ বলছে দান করে দে ধ-এর যত ধন-দৌলত। ঐ দেখ ন বলছে ‘নাহং নাহং, তুঁহু তুঁহু।’

তাই বলছি, ঈশ্বরের প্রতি প্রেম আসলে কর্মত্যাগ আপনি হয়ে যায়। যাদের ঈশ্বর কর্ম করাচ্ছেন, তারা করুক। আগে প্রেম, আগে ভক্তি, পরে মুক্তি। প পেরিয়ে ফ। সব ফক্কিকারি। তারপর ব–বন্ধনে টান, ভ-এ পড়ল অভী, ম বাজাল ঘণ্টা। আমার হেডমাস্টার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ চৌকি থেকে হাঁক মারলেন, যাও তোমার ছুটি। কালী-কল্পতরুমূলে এইবার বেড়াতে যাও।

সকল অধ্যায়
১.
উট হবে না হাঁস হবে!
২.
প্ৰতিধ্বনি
৩.
পদ্মলোচনের শাঁখ
৪.
একটু চেষ্টা
৫.
ঠাকুরের কাছে দরবার
৬.
কেন
৭.
সেই আবেগে
৮.
চিরগুরু
৯.
কৃপা
১০.
রামকৃষ্ণদাস
১১.
স্বামীজীর ধর্ম
১২.
গৃহীর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ
১৩.
হাসছে কেমন!
১৪.
“পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে”
১৫.
পুরুষ সাবধান
১৬.
অংশে অংশ মিলে পূর্ণ
১৭.
সাধনা
১৮.
লজ্জা
১৯.
পথ ও পথিক
২০.
“ভক্তি যেন ভয়ে নাহি হয়, পদানত পৃথিবীর কারো কাছে”
২১.
ডুডুও খাব টামাকও খাব
২২.
কনফুসিয়াস
২৩.
“খণ্ডন-ভব-বন্ধন জগ-বন্দন বন্দি তোমায়”
২৪.
দস্তুরমতো পথ
২৫.
শয়নে স্বপনে জাগরণে
২৬.
আপনি আর আমি
২৭.
হনুমান
২৮.
চাকা
২৯.
সরষে পেষাই
৩০.
“চাঁদামামা সকলের মামা”
৩১.
রামকৃষ্ণ নামের মাস্তুল
৩২.
এগিয়ে চল
৩৩.
“পাশবদ্ধ জীব পাশমুক্ত শিব”
৩৪.
“মন-মত্তকরী”
৩৫.
“নরেন শিক্ষে দিবে”
৩৬.
দু-ফোঁটা চোখের জল
৩৭.
মহাভাব
৩৮.
মাপো আর জপো
৩৯.
ভাব-ভালবাসা
৪০.
বাহাদুর
৪১.
আমার কুরুক্ষেত্র
৪২.
মুখে বলি ‘হরি’
৪৩.
ধর্মকর্ম
৪৪.
“আপনাতে আপনি থেকো মন”
৪৫.
মূর্ত মহেশ্বর
৪৬.
গুরু-চৈতন্য বিজ্ঞান-বিচারী
৪৭.
তত্র সর্বাণি তীর্থানি
৪৮.
হাঁস
৪৯.
হেডমাস্টার
৫০.
বিশ্বাস! বিশ্বাস! বিশ্বাস!
৫১.
“কপটতা ছাড়ো”
৫২.
কবে হবে
৫৩.
তোমাদের কী হবে
৫৪.
বাছুর
৫৫.
‘সা-রে-মা’তে
৫৬.
অরূপরতন
৫৭.
বাক্সটাকে সাজাও
৫৮.
“আধা-ছানার মণ্ডা”
৫৯.
“ডাক ডাক ডাক্তার ডাক”
৬০.
নারী ও শ্রীরামকৃষ্ণ
৬১.
ভবরোগবৈদ্য
৬২.
জ্ঞান ও বিজ্ঞান
৬৩.
শ্রীরামকৃষ্ণ-কমণ্ডলু
৬৪.
শ্রীরামকৃষ্ণের দণ্ড
৬৫.
ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের আসন
৬৬.
জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে
৬৭.
প্রাণের লণ্ঠনে চৈতন্যের আলো
৬৮.
আগে বিশ্বাস তারপর কর্ম
৬৯.
সব ফেলে দাও, সব ছেড়ে দাও, উঠে এস
৭০.
কেউ দশে, কেউ ছয়ে, কেউ পাঁচে
৭১.
“মন্মনা ভব মদ্ভক্তো”
৭২.
শ্রীরামকৃষ্ণের বিবেকানন্দ
৭৩.
শুধু তোমাকেই চাই
৭৪.
সুধাসাগর
৭৫.
হাত ধর
৭৬.
ব্যাকুলতা
৭৭.
দুজনেই মার সখী
৭৮.
শ্রীরামকৃষ্ণ বিজ্ঞানীও
৭৯.
কাতরে কর করুণা
৮০.
ধ্রুবতারা
৮১.
কলকাতা এবং রামকৃষ্ণলোক
৮২.
প্ৰণাম
৮৩.
প্রশ্ন
৮৪.
সাবধান
৮৫.
কেন চোখের জলে
৮৬.
মনের মতো পাগল পেলাম না
৮৭.
“যেমন আমড়া, কেবল আঁটি আর চামড়া”
৮৮.
মানুষ
৮৯.
অমৃতের সন্ধানে
৯০.
শরণাগত
৯১.
সাধন দুর্গ
৯২.
স্বামীজী আসছেন
৯৩.
উচ্ছ্বাস থেকে শ্বাসে
৯৪.
গানে গানে শ্রীরামকৃষ্ণ
৯৫.
রামকৃষ্ণ মিশন
৯৬.
পাথরের দেয়ালে পেরেক
৯৭.
সার্জেন সাহেব
৯৮.
বসে আছি
৯৯.
রামকৃষ্ণ ভগবান
১০০.
অঙ্কট-বঙ্কট
১০১.
“আমি মলে ঘুচিবে জঞ্জাল”
১০২.
‘আমি’ এক ঢিপি
১০৩.
আমার জীবনে ‘উদ্বোধন’
১০৪.
অনুলোম বিলোম
১০৫.
মন্ত্র
১০৬.
বারটা বাজাও
১০৭.
চাকর রাখ
১০৮.
খানদানী চাষা
১০৯.
আত্মার আত্মহত্যা
১১০.
শ্রীরামকৃষ্ণের মথুর
১১১.
বিবেকের ছাঁকনি
১১২.
‘রামকৃষ্ণ মেল’
১১৩.
“মাতাদেবী, আপনি হন আমাদিগের কালী!”
১১৪.
“আমি দেখব”
১১৫.
চির নবীন, চির নূতন, ভাস্বর বৈশাখ
১১৬.
কুরুক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণ
১১৭.
শ্রীরামকৃষ্ণের ‘অস্ত্রভাণ্ডার’
১১৮.
গাজীপুরে শ্রীরামকৃষ্ণ
১১৯.
বিদ্রোহী ভগবান
১২০.
ইঁদুর
১২১.
শরণাগতি
১২২.
“আমি খাই-দাই আর থাকি, আর আমার মা সব জানেন”
১২৩.
“আপনার পূজা আপনি করিলে, এ কেমন লীলা তব!”
১২৪.
“ভক্ত্যা মামভিজানাতি”
১২৫.
প্ৰেম
১২৬.
মা
১২৭.
কে তুমি বিবেকানন্দ
১২৮.
ভগবানের মুখ
১২৯.
‘হলো না’-টাই ‘হলো’
১৩০.
সংস্কার
১৩১.
রামকৃষ্ণ-শক্তি
১৩২.
এক জোড়া জুতো
১৩৩.
বেদভূমিতে শ্রীরামকৃষ্ণ
১৩৪.
শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামকৃষ্ণ
১৩৫.
অখণ্ডের ঘরের কথা
১৩৬.
“কে মা তুমি?”
১৩৭.
নিজেকে দেখ
১৩৮.
“আমি জানি তুমি কে”
১৩৯.
পথের ধর্ম, ধর্মের পথ
১৪০.
শ্রীরামকৃষ্ণ-সূর্যালোক
১৪১.
মরে গিয়ে বেঁচে ওঠা
১৪২.
ভয়ঙ্কর ঠাকুর
১৪৩.
মা জানেন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%