“কপটতা ছাড়ো”

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

“কপটতা ছাড়ো”

সংসার মায়া। মায়ার সংসার। জ্ঞানীর কথা। ব্রহ্ম-তত্ত্বে যিনি প্রতিষ্ঠিত তাঁর বোধে এই দর্শন সত্য। ঈশ্বরদর্শন যাঁর হয়েছে এই মায়ার সংসার তাঁকে কাবু করতে পারে না। ঈশ্বরকে কেমন দেখা! না, এই যেমন গাছ দেখছি।

মায়া হলো কাম-কাঞ্চন। কাম-কাঞ্চন বড় জঞ্জাল। ঠাকুর বলছেন এই কথা। বড় জঞ্জাল। ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার বলছেন জঞ্জাল না থাকলে তো সবাই পরমহংস। সত্য কথা। সবাই তো আর পরমহংস নন। সংসারী জীব। সংসারী হলেও ঈশ্বরে মন আছে, এমন মানুষের যে অতিশয় যন্ত্রণা। মুক্তি কোথায়!

ঠাকুর বলছেন : “স্ত্রীলোক নিয়ে মায়ার সংসার করা! তাতে ঈশ্বরকে ভুলে যায়।”

হ্যাঁ যায়। অবশ্যই যায়। কাম-কাঞ্চনই সংসার। অনেকে টাকা গায়ের রক্ত মনে করে। তবে উপায় একটা আছে। মনে রাখতে হবে, “যিনি জগতের মা, তিনিই এই মায়ার রূপ। স্ত্রীলোকের রূপ ধরেছেন। এটি ঠিক জানলে আর মায়ার সংসার করতে ইচ্ছা হয় না। সব স্ত্রীলোককে ঠিক মা বোধ হলে তবে বিদ্যার সংসার করতে পারে। ঈশ্বরদর্শন না হলে স্ত্রীলোক কি বস্তু বোঝা যায় না।”

কাশীপুরের বাগান। ঠাকুর বসে আছেন। শরীর আজ সামান্য ভাল। ভক্তরা ঘিরে আছেন। সমাবেশে অনেকেই আছেন—মহেন্দ্র ডাক্তার, রাজেন্দ্র ডাক্তার, নরেন্দ্রনাথ, মাস্টারমশাই, রাখাল, শশী, ভবনাথ, সুরেন্দ্র। ঠাকুর মাস্টারমশাইকে উদ্দেশ করে বলছেন : “এরা কামিনী-কাঞ্চন না হলে চলে না, বলছে। আমার যে কি অবস্থা তা জানে না। মেয়েদের গায়ে হাত লাগলে হাত আড়ষ্ট, ঝনঝন করে। যদি আত্মীয়তা করে কাছে গিয়ে কথা কইতে যাই, মাঝে যেন কি একটা আড়াল থাকে, সে-আড়ালের ওদিকে যাবার জো নেই। ঘরে একলা বসে আছি, এমন সময় যদি কোন মেয়ে এসে পড়ে, তাহলে একেবারে বালকের অবস্থা হয়ে যাবে; আর সেই মেয়েকে মা বলে জ্ঞান হবে।”

তাহলে মা সারদার সঙ্গে ঠাকুরের সম্পর্কটা কি দাঁড়াবে! সহধর্মিণী; কিন্তু মাতৃসমা। আমার সাধনার সমস্ত ফল, এমনকি জপের মালাটিও তোমাকে সমৰ্পণ করে দিলাম। মন্দিরের মা আর নহবতের মা—দুজনেই এক হয়ে গেলেন। মৃন্ময়ী আর চিন্ময়ী। অচল আর সচল এক হয়ে গেলেন। তুমি সারদা, তুমি জগন্মাতা।

“যারা কামিনী-কাঞ্চন নিয়ে থাকে, তারা নেশায় কিছু বুঝতে পারে না। যারা দাবা-বোড়ে খেলে, তারা অনেক সময় জানে না, কি ঠিক চাল। কিন্তু যারা অন্তর থেকে দেখে, তারা অনেকটা বুঝতে পারে। স্ত্রী মায়ারূপিণী। নারদ রামকে স্তব করতে লাগলেন, ‘হে রাম, তোমার অংশে যত পুরুষ; তোমার মায়ারূপিণী সীতার অংশে যত স্ত্রী। আর কোন বর চাই না—এই কর যেন তোমার পাদপদ্মে শুদ্ধাভক্তি হয়, আর যেন তোমার জগৎমোহিনী মায়ায় মুগ্ধ না হই!’”

মায়ার দুটি রূপের কথা ঠাকুর বলেছেন, অবিদ্যা আর বিদ্যা। অবিদ্যা মায়া কুহকে জড়ায়। সত্যকে দেখতে দেয় না। নিগড়ে জড়ায়। ঈশ্বরকে ভোলায়। দুঃখ, দারিদ্র্য, সংশয়, ভীতিতে আচ্ছন্ন করে। অবিদ্যাকে বিদ্যায় পরিণত করতে হবে। শক্তিকে জাগাতে হবে। প্রার্থনা করতে হবে। নারদের মতো বলতে হবে—তোমার জগৎমোহিনী মায়ায় মুগ্ধ না হই। তোমার কৃপা বিনা সত্য স্বরূপের দর্শন অসম্ভব। শক্তি! তোমার হাত ধরেই আমি সাধনমার্গে এগুবো।

লোকশিক্ষার জন্য ঠাকুরের বিবাহ করা। আদর্শ গৃহী কেমন করে হতে হয়, উপদেশে সে-শিক্ষা নাও হতে পারে, এই দেখ আমি করে দেখাই। সন্ন্যাসীর আদর্শে স্ত্রীসঙ্গ নিষিদ্ধ। তফাত যাও। তুমি না যাও, আমি যাই। সাধন-ভজন আর হলো কই! মনে মনে নারীবাসনার সঙ্গে কোস্তাকুস্তি করেই সময় গেল!

“অমেধ্যপূর্ণে কৃমিজালসঙ্কুলে স্বভাবদুর্গন্ধনিরন্তকান্তরে।
কলেবরে মূত্রপুরীষভাবিতে রমন্তি মূঢ়া বিরমন্তি পণ্ডিতাঃ।।”

আবার কখনো বলছে : “কামিনী নরকস্য দ্বারম্।”

ধস্তাধস্তির শেষ নেই। তবু যে মন মানে না প্রবোধ।

রাখাল মহারাজ বরানগর মঠে বসে মাস্টারমশাইকে বলছেন : “অনেকে মনে করে, মেয়েমানুষ না দেখলেই হলো। মেয়েমানুষ দেখে ঘাড় নিচু করলে কি হবে? নরেন্দ্র কাল রাতে বেশ বললে, যতক্ষণ আমার কাম, ততক্ষণই স্ত্রীলোক; তা নাহলে স্ত্রী-পুরুষ ভেদবোধ থাকে না।”

ঠাকুর পরিষ্কার বলছেন : “আমি জানি যে, যদি কেউ পর্বতের গুহায় বাস করে, গায়ে ছাই মাখে, উপবাস করে, নানা কঠোর করে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে বিষয়ে মন—কাম-কাঞ্চনে মন–সে-লোককে আমি বলি—ধিক; আর যার কাম-কাঞ্চনে মন নাই—খায়-দায় বেড়ায় তাকে বলি ধন্য।”

আগামী কালের গৃহীদের জন্য এই আমি রেখে গেলাম—আমার আদর্শ সংসারের মডেল। ছাড়তে তোমরা পারবে না, কারণ, “এটি জগন্মাতার ভুবনমোহিনী মায়া।” তাহলে করবেটা কি! ভেসে যাবে? তলিয়ে যাবে? না, তা কেন? দেহ নয়, আত্মাকে ভালবাসতে শেখ, স্ত্রীসঙ্গ মানেই ভোগসুখ কেন হবে? শ্রদ্ধা কেন আসবে না? ভক্তি কেন আসবে না? বন্ধুবোধ কেন আসবে না? চোখ খোল। নারীর মধ্যে মা আছে ভাবতে পার না? নারীর মধ্যে বোন আছে ভাবতে পার না? আর স্ত্রী মানেই কি নর্মসঙ্গিনী? স্ত্রী যে প্রধানত ধর্মসঙ্গিনী। সহধর্মিণী। সব থাকবে, পালটাতে হবে তোমার দৃষ্টি। শুধু মোড় ফেরাও।

শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা যুগল মূর্তি। পুরুষ ও প্রকৃতি। শিব ও শক্তি। শেষ কথা—একমাত্র কথা—”কপটতা ছাড়ো।”

সকল অধ্যায়
১.
উট হবে না হাঁস হবে!
২.
প্ৰতিধ্বনি
৩.
পদ্মলোচনের শাঁখ
৪.
একটু চেষ্টা
৫.
ঠাকুরের কাছে দরবার
৬.
কেন
৭.
সেই আবেগে
৮.
চিরগুরু
৯.
কৃপা
১০.
রামকৃষ্ণদাস
১১.
স্বামীজীর ধর্ম
১২.
গৃহীর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ
১৩.
হাসছে কেমন!
১৪.
“পঞ্চভূতের ফাঁদে ব্রহ্ম পড়ে কাঁদে”
১৫.
পুরুষ সাবধান
১৬.
অংশে অংশ মিলে পূর্ণ
১৭.
সাধনা
১৮.
লজ্জা
১৯.
পথ ও পথিক
২০.
“ভক্তি যেন ভয়ে নাহি হয়, পদানত পৃথিবীর কারো কাছে”
২১.
ডুডুও খাব টামাকও খাব
২২.
কনফুসিয়াস
২৩.
“খণ্ডন-ভব-বন্ধন জগ-বন্দন বন্দি তোমায়”
২৪.
দস্তুরমতো পথ
২৫.
শয়নে স্বপনে জাগরণে
২৬.
আপনি আর আমি
২৭.
হনুমান
২৮.
চাকা
২৯.
সরষে পেষাই
৩০.
“চাঁদামামা সকলের মামা”
৩১.
রামকৃষ্ণ নামের মাস্তুল
৩২.
এগিয়ে চল
৩৩.
“পাশবদ্ধ জীব পাশমুক্ত শিব”
৩৪.
“মন-মত্তকরী”
৩৫.
“নরেন শিক্ষে দিবে”
৩৬.
দু-ফোঁটা চোখের জল
৩৭.
মহাভাব
৩৮.
মাপো আর জপো
৩৯.
ভাব-ভালবাসা
৪০.
বাহাদুর
৪১.
আমার কুরুক্ষেত্র
৪২.
মুখে বলি ‘হরি’
৪৩.
ধর্মকর্ম
৪৪.
“আপনাতে আপনি থেকো মন”
৪৫.
মূর্ত মহেশ্বর
৪৬.
গুরু-চৈতন্য বিজ্ঞান-বিচারী
৪৭.
তত্র সর্বাণি তীর্থানি
৪৮.
হাঁস
৪৯.
হেডমাস্টার
৫০.
বিশ্বাস! বিশ্বাস! বিশ্বাস!
৫১.
“কপটতা ছাড়ো”
৫২.
কবে হবে
৫৩.
তোমাদের কী হবে
৫৪.
বাছুর
৫৫.
‘সা-রে-মা’তে
৫৬.
অরূপরতন
৫৭.
বাক্সটাকে সাজাও
৫৮.
“আধা-ছানার মণ্ডা”
৫৯.
“ডাক ডাক ডাক্তার ডাক”
৬০.
নারী ও শ্রীরামকৃষ্ণ
৬১.
ভবরোগবৈদ্য
৬২.
জ্ঞান ও বিজ্ঞান
৬৩.
শ্রীরামকৃষ্ণ-কমণ্ডলু
৬৪.
শ্রীরামকৃষ্ণের দণ্ড
৬৫.
ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের আসন
৬৬.
জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে
৬৭.
প্রাণের লণ্ঠনে চৈতন্যের আলো
৬৮.
আগে বিশ্বাস তারপর কর্ম
৬৯.
সব ফেলে দাও, সব ছেড়ে দাও, উঠে এস
৭০.
কেউ দশে, কেউ ছয়ে, কেউ পাঁচে
৭১.
“মন্মনা ভব মদ্ভক্তো”
৭২.
শ্রীরামকৃষ্ণের বিবেকানন্দ
৭৩.
শুধু তোমাকেই চাই
৭৪.
সুধাসাগর
৭৫.
হাত ধর
৭৬.
ব্যাকুলতা
৭৭.
দুজনেই মার সখী
৭৮.
শ্রীরামকৃষ্ণ বিজ্ঞানীও
৭৯.
কাতরে কর করুণা
৮০.
ধ্রুবতারা
৮১.
কলকাতা এবং রামকৃষ্ণলোক
৮২.
প্ৰণাম
৮৩.
প্রশ্ন
৮৪.
সাবধান
৮৫.
কেন চোখের জলে
৮৬.
মনের মতো পাগল পেলাম না
৮৭.
“যেমন আমড়া, কেবল আঁটি আর চামড়া”
৮৮.
মানুষ
৮৯.
অমৃতের সন্ধানে
৯০.
শরণাগত
৯১.
সাধন দুর্গ
৯২.
স্বামীজী আসছেন
৯৩.
উচ্ছ্বাস থেকে শ্বাসে
৯৪.
গানে গানে শ্রীরামকৃষ্ণ
৯৫.
রামকৃষ্ণ মিশন
৯৬.
পাথরের দেয়ালে পেরেক
৯৭.
সার্জেন সাহেব
৯৮.
বসে আছি
৯৯.
রামকৃষ্ণ ভগবান
১০০.
অঙ্কট-বঙ্কট
১০১.
“আমি মলে ঘুচিবে জঞ্জাল”
১০২.
‘আমি’ এক ঢিপি
১০৩.
আমার জীবনে ‘উদ্বোধন’
১০৪.
অনুলোম বিলোম
১০৫.
মন্ত্র
১০৬.
বারটা বাজাও
১০৭.
চাকর রাখ
১০৮.
খানদানী চাষা
১০৯.
আত্মার আত্মহত্যা
১১০.
শ্রীরামকৃষ্ণের মথুর
১১১.
বিবেকের ছাঁকনি
১১২.
‘রামকৃষ্ণ মেল’
১১৩.
“মাতাদেবী, আপনি হন আমাদিগের কালী!”
১১৪.
“আমি দেখব”
১১৫.
চির নবীন, চির নূতন, ভাস্বর বৈশাখ
১১৬.
কুরুক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণ
১১৭.
শ্রীরামকৃষ্ণের ‘অস্ত্রভাণ্ডার’
১১৮.
গাজীপুরে শ্রীরামকৃষ্ণ
১১৯.
বিদ্রোহী ভগবান
১২০.
ইঁদুর
১২১.
শরণাগতি
১২২.
“আমি খাই-দাই আর থাকি, আর আমার মা সব জানেন”
১২৩.
“আপনার পূজা আপনি করিলে, এ কেমন লীলা তব!”
১২৪.
“ভক্ত্যা মামভিজানাতি”
১২৫.
প্ৰেম
১২৬.
মা
১২৭.
কে তুমি বিবেকানন্দ
১২৮.
ভগবানের মুখ
১২৯.
‘হলো না’-টাই ‘হলো’
১৩০.
সংস্কার
১৩১.
রামকৃষ্ণ-শক্তি
১৩২.
এক জোড়া জুতো
১৩৩.
বেদভূমিতে শ্রীরামকৃষ্ণ
১৩৪.
শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামকৃষ্ণ
১৩৫.
অখণ্ডের ঘরের কথা
১৩৬.
“কে মা তুমি?”
১৩৭.
নিজেকে দেখ
১৩৮.
“আমি জানি তুমি কে”
১৩৯.
পথের ধর্ম, ধর্মের পথ
১৪০.
শ্রীরামকৃষ্ণ-সূর্যালোক
১৪১.
মরে গিয়ে বেঁচে ওঠা
১৪২.
ভয়ঙ্কর ঠাকুর
১৪৩.
মা জানেন

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%