দ্বাদশ অধিকরণ (আবলীয়স)

দ্বাদশ অধিকরণ। প্রকরণ ১৬২–১৭০।

আবলীয়স (বলবান শত্রু নৃপতির বিরুদ্ধে রাজার করণীয়) নামক দ্বাদশ অধিকরণের নয়টি প্রকরণ বা আলোচ্য বিষয় হলো—

১. দূতদের মাধ্যমে কূটনৈতিক উদ্যোগ ২. মন্ত্রযুদ্ধ তথা প্রজ্ঞাবলে শত্রুকে পরাভূতকরণ ৩. বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের সেনাপতি নিধন ৪. আত্ম রক্ষার্থে রাষ্ট্রবৃত্তে উদ্দীপনা সৃষ্টি ৫. অস্ত্র, অগ্নি ও বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে শত্রুর বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ পরিচালনা

৬. শত্রুর রসদ সরবরাহ পথে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং সম্পদ আহরণ নস্যাৎকরণ ৭. কপট উপায়ে শত্রুপক্ষকে প্রবঞ্চিতকরণ ৮. সৈন্যদের মাধ্যমে শত্রুপক্ষকে অবদমন ৯. একবিজয় তথা উপরোক্ত উপায়ে বলবান শত্রুকে দুর্বল করত রাজার বিজয় অর্জন।

প্রথম অধ্যায় ॥ ১৬২ প্রকরণ ॥

এই অধ্যায়ে বলবান নৃপতির সমীপে দুর্বল রাজার সমর্পণ, বিভিন্ন প্রকৃতির বলশালী নৃপতি কর্তৃক আক্রান্ত হলে দুর্বল রাজার করণীয়, সন্ধির শর্তাবলি, আত্মরক্ষার তাৎপর্য, ইত্যাকার বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

১২-০১-০১ বলবান নৃপতির সঙ্গে দুর্বল রাজার সম্পর্ক বিষয়ক বিতর্ক প্রসঙ্গে আচার্য ভারদ্বাজ বলেন—বেত যেমন নদীর স্রোতের গতির অনুকূলে বিনত হয়ে থাকে, বলবান নৃপতি কর্তৃক আক্রান্ত হলে দুর্বল রাজাও তেমনিভাবে বলবানের প্রতি বিনত হয়ে থাকবেন। সবলের প্রতি দুর্বলের এহেন সমৰ্পণ দোষণীয় কিছু নয়, অধিকন্তু তা অনেক সময় গৌরবজনক হয়ে থাকে। যে রাজা শক্তিমান নৃপতির সমীপে অবনত হয়ে থাকেন তিনি প্রকারান্তরে দেবতা ইন্দ্রের সমুখেই প্রণত হয়ে থাকেন।’

এক্ষেত্রে আচার্য বিশালাক্ষ মনে করেন—দুর্বল রাজা বলবান নৃপতি কর্তৃক আক্রান্ত হলে, তিনি তার সমস্ত শক্তি নিয়ে বলবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে আক্রমণ প্রতিহত করবেন। কারণ, পরাক্রম প্রদর্শনই হলো ক্ষত্রিয়দের আবশ্যিক কর্তব্য। হয় জয়লাভ নয়তো যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুবরণই হলো ক্ষাত্রধর্ম।

কৌটিল্য উপরোক্ত দুজন আচার্যের অভিমতের সঙ্গে একমত নন। তার মতে—বলবান নৃপতির পদতলে সমর্পিত হলে রাজাকে দলছুট মেষের মতো নৈরাশ্যের গহ্বরে নিপতিত হতে হয়। অন্যদিকে স্বল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে বলবান নৃপতিকে প্রতিরোধ প্রাক্কালে দুর্বল রাজাকে নৌকাবিহীন অবস্থায় সমুদ্র পারি দেওয়ার মতো দুরবস্থায় নিপতিত হতে হয়। এসব কারণে, দুর্বল রাজা কখনো সবল নৃপতি কর্তৃক আক্রান্ত হলে, তিনি আক্রমণকারীর চেয়ে অধিক বলবান কোনো নৃপতির আশ্রয়গ্রহণ করে অথবা শত্রু কর্তৃক অভেদ্য কোনো দুর্গে আশ্রয়গ্রহণ করে নিজেকে রক্ষা করবেন।

১২-০১-০২ দুর্বলের উপর তিন প্রকৃতির বলশালী নৃপতি আক্রমণ করতে পারে। এদের প্রথমজন ধর্ম বিজয়ী, দ্বিতীয়জন লোভার্ত বিজয়ী এবং তৃতীয়জন হতে পারে অসুর বিজয়ী। এক্ষেত্রে ধর্ম বিজয়ী নৃপতি অনমণীয় রাজার আত্মসমর্পণেই পরিতুষ্ট থাকেন, এ কারণে রাজা শুধু উক্ত নৃপতির ভয়েই নয় বরঞ্চ অন্যান্য শত্রুর কোপানল থেকে নিজেকে রক্ষার স্বার্থেও এ ধরনের নৃপতির সমীপে সমর্পিত হতে পারেন। লোভার্ত বিজয়ী নৃপতি শুধু ধন, সম্পদ ও ভূমি পেলেই পরিতৃপ্ত হয়ে থাকে, এ কারণে রাজা এ ধরনের নৃপতিকে ভূমি ও ধন- সম্পদ প্রদানের মাধ্যমে তুষ্ট করে তার সমীপে সমর্পিত হবেন। অসুর বিজয়ী নৃপতিরা শুধু ধন-সম্পদ এবং ভূমি লাভ করেই পরিতুষ্ট হয় না, তারা আক্রান্ত রাজ্যের রাজাসহ পুরো রাজপরিবারকে বিনাশ করতে উদ্যত হয়। এ কারণে এ ধরনের বলশালী নৃপতি কর্তৃক আক্রান্ত হলে রাজা তাকে ধন সম্পদ এবং ভূমি প্রদানের মাধ্যমে তুষ্ট করার প্রয়াস গ্রহণ করবেন কিন্তু নিজেকে কখনো তার সমীপে সমর্পিত করবেন না। অতঃপর তিনি উক্ত বলবান নৃপতির আক্রমণ প্রতিকারের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

১২-০১-০৩ উপরোক্ত তিন প্রকৃতির বলবান নৃপতিদের কেউ আক্রমণ করতে উদ্যত হলে, আক্রমণীয় দুর্বল রাজা কূটনৈতিক তৎপরতা, মিত্রতার সন্ধি বা আন্তর্ঘাতমূলক প্রতি আক্রমণের মাধ্যমে তা প্রতিরোধে সচেষ্ট হবেন। তিনি আক্রমণে উদ্যত বলশালী নৃপতির শত্রুদের সাম ও দানের মাধ্যমে স্বপক্ষে আনয়নের প্রয়াস গ্রহণ করবেন এবং উক্ত বলশালী নৃপতির অমাত্যবর্গকে ভেদ ও দণ্ড প্রয়োগের মাধ্যমে স্বপক্ষভুক্তকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে তাকে বিপন্ন করবেন অথবা গুপ্তচরদের দিয়ে বিষ প্রয়োগ, সশস্ত্র আঘাত এবং অগ্নিসংযোগের মতো অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে উক্ত নৃপতির দুর্গ, জনপদ এবং সেনাশিবির বিধ্বংস করাবেন অথবা পশ্চাদদিক হতে উক্ত নৃপতির রাজ্যে আক্রমণ চালিয়ে তাকে বিপর্যস্ত করবেন অথবা অরণ্যবাসীদের দিয়ে উক্ত রাজ্যে আক্রমণ চালাবেন অথবা উক্ত নৃপতির পুত্র বা স্বজনদের অপহরণ করিয়ে তাকে বিপর্যস্ত করবেন।

১২-০১-০৪ এভাবে নানাবিধ উপায়ে ক্ষতিসাধনের পর দুর্বল রাজা উক্ত বলশালী নৃপতির সমীপে দূতের মাধ্যমে সন্ধির প্রস্তাব প্রেরণ করবেন। তপ্ত লৌহকে যেমন ইচ্ছেমতো অবনত করানো যায় এহেন পরিস্থিতিতে উক্ত বলশালী নৃপতিও বিপন্নাবস্থায় নিরূপায় হয়ে সন্ধির প্রস্তাবে সম্মতিজ্ঞাপন করতে পারেন। এক্ষেত্রে দুর্বল রাজা যদি উপরোক্ত উপায়ে অপকার সাধনে অসমর্থ হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে তিনি বিনত হয়ে বলশালী নৃপতির সমীপে সন্ধি প্ৰাৰ্থনা করবেন। অতঃপর অর্থ-সম্পদ এবং সৈন্য সমর্পণের বিনিময়েও যদি বলশালী নৃপতি সন্ধি সম্পাদনে সম্মত না হন, সেক্ষেত্রে দুর্বল রাজা প্রতিশ্রুত অর্থ- সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে তাকে সন্ধি সম্পাদনার্থে প্রলুব্ধ করবেন।

এপর্যায়ে দুর্বল রাজা যদি সেনাঙ্গ প্রদানের শর্তে সন্ধি সম্পাদনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন, সেক্ষেত্রে তিনি বলশালী নৃপতিকে ক্ষয়িষ্ণু হাতি ও অক্ষম প্রকৃতির অশ্বপ্রদান করবেন। রাজাকে যদি একান্তই তেজস্বী প্রকৃতির হাতি ও ঘোড়া প্রদান করতে হয়, সেক্ষেত্রে তিনি উক্ত প্রকৃতির হাতি ঘোড়ার শরীরে এমনভাবে বিষপ্রয়োগ করে বলশালী নৃপতির সমীপে সমর্পণ করবেন যাতে করে সেগুলো সমর্পিত হবার পর অচিরেই মৃত্যুমুখে নিপতিত হয়।

দুর্বল রাজা যদি পদাতিক সৈন্য প্রদানের শর্তে সন্ধি প্রার্থনা করেন, সেক্ষেত্রে সন্ধি সম্পাদনের শুরু তিনি সন্দেহজনক বিশ্বাসঘাতক সৈন্য, অমিত্র সৈন্য এবং অরণ্য সৈন্যদের বলশালী রাজার সমীপে সমর্পণ করবেন। এতে করে রাজা যেমন ভারমুক্ত হবেন, তেমনি এই সৈন্যদের নিয়ে বলশালী নৃপতিও বিপত্তিতে নিপতিত হবে এবং এদের উভয়েই এক-পর্যায়ে বিপর্যস্ত হবে। অথবা রাজা তার উগ্রস্বভাবের সৈন্যদের সমর্পিত করবেন যাতে করে বলশালী নৃপতি যে কোনো সময় এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অথবা রাজা তার একান্ত অনুগত মৌল সৈন্যদের উক্ত নৃপতির সমীপে সমর্পণ করবেন, যাতে করে রাজানুগত সৈন্যরা দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে বলশালী নৃপতির অপকার সাধনে সমর্থ হতে পারে।

১২-০১-০৫ দুর্বল রাজা যদি সম্পদ প্রদানের শর্তে বলশালী নৃপতির সমীপে সন্ধির প্রার্থনা করেন, সেক্ষেত্রে তিনি সন্ধি সম্পাদনের পর উক্ত নৃপতিকে এমন প্রকৃতির মূল্যবান রত্ন-দ্রব্য প্রদান করবেন যা তিনি সমর্থ ক্রেতার অভাবে বাজারে বিক্রয় করতে পারবেন না। অথবা তিনি তাকে এমন হীনপ্রকৃতির দ্রব্যাদি প্ৰদান করবেন যা তার কোনো কাজেই লাগবে না। দুর্বল রাজা যদি ভূমি প্রদানের শর্তে এরূপ সন্ধির প্রস্তাব প্রেরণ করে থাকেন, সেক্ষেত্রে সন্ধি সম্পাদনের পর তিনি বলশালী নৃপতিকে এমন প্রকৃতির ভূমি হস্তান্তর করবেন যা শত্রু কর্তৃক উপদ্রুত, নিরাপদ দুর্গহীন, জনপদ সৃজনের প্রতিকূল এবং এসব কারণে যা সহজেই প্রত্যাদেয় বা ফেরতযোগ্য। বলশালী নৃপতি দুর্বল রাজার কোনোকিছু বলপূর্বক অপহরণে উদ্যত হলে রাজা তা সন্ধির উসিলায় তাকে প্রদান করবেন। তিনি কখনো জীবনবিপন্ন করে সম্পদ রক্ষায় সচেষ্ট হবেন না। কারণ, বেঁচে থাকলে কোনো একসময় তিনি হৃতরাজ্য ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে সক্ষম হবেন।

দ্বিতীয় অধ্যায় ॥ ১৬৩ প্রকরণ ॥

এই অধ্যায়ে আলোচিত বিষয়কে বলা হয়েছে মন্ত্রযুদ্ধ। এক্ষেত্রে মন্ত্র বলতে প্রজ্ঞা বা বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কূটকৌশলকে বোঝানো হয়েছে। দুর্বল রাজা কীভাবে প্ৰজ্ঞা প্রয়োগ করে বলশালী রাজার আগ্রাসন প্রতিরোধ করবেন, কীভাবে তাকে প্রভাবিত করে আক্রমণ হতে নিরোধ করবেন, কীভাবে বিভিন্ন অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে বলশালী নৃপতিকে নিঃশেষিত করবেন, ইত্যাকার বিষয়াদির উপর এ অধ্যায়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

১২-০২-০১ অনুরোধজ্ঞাপন সত্ত্বেও বলশালী নৃপতি যদি সন্ধি সম্পাদনে অনাগ্রহ প্রদর্শন করেন, সেক্ষেত্রে দুর্বল রাজা তার দূতের মাধ্যমে কাম, ক্রোধ, লোভ, মান, মদ ও হর্ষের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে যে সকল বলশালী নৃপতি ইতিপূর্বে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদের কথা উদ্ধৃত করে বলবান নৃপতিকে অসংযত পথ পরিহার এবং ধর্ম ও অর্থ রক্ষাকল্পে উপদেশ্য জ্ঞাপন করবেন। তিনি বলশালী নৃপতির জ্ঞাতার্থে এ কথাও নিবেদন করবেন যে যারা আজ তার সঙ্গে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধের ভূমিকায় অবতীর্ণ, তারা বস্তুতপক্ষে শত্রু হওয়ার যোগ্য, তারা তাকে অধর্ম পালনে প্রলুব্ধ করবে এবং অর্জিত উত্তম বস্তু পরিত্যাগে প্ররোচিত করবে।

এছাড়াও দুর্বল রাজা দূতের মাধ্যমে বলশালী নৃপতির সমীপে এ কথাও নিবেদন করবেন যে যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে আজ যে মিত্রদের তিনি সবল করে তুলবেন একদিন তারাই তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে। এছাড়া তিনি (দুর্বল রাজা) এখনো মধ্যম, উদাসীন এবং রাজমণ্ডলের রাজাদের কাছে পরিত্যক্ত হননি কিন্তু তিনি (বলশালী নৃপতি) তার আক্রমণাত্মক ভূমিকার কারণে তাদের কাছে ইতিমধ্যে পরিত্যক্ত হয়েছেন। তারা তার অবক্ষয়ের অপেক্ষায় আছেন, এই পরিস্থিতিতে তিনি (বলশালী নৃপতি) অচিরেই বিপর্যস্ত হবেন, মিত্র কর্তৃক বিচ্ছিন্ন হবেন এবং রাজধানী ছেড়ে অন্যত্র যুদ্ধ যাত্রায় প্রবৃত্ত হলে সহজেই অন্যের দ্বারা উৎপাটিত হবেন। এসব কারণে মিত্রভাব প্রদর্শনকারী প্রকৃত অমিত্রদের উপদেশ শ্রবণ করা, প্রকৃত মিত্রগণকে উদ্বিগ্ন করা, শত্রুর উপকার করা এবং নিজেকে বিপদের দিকে নিক্ষেপ করা তার জন্য সমীচীন হবে না। এ সমস্ত কূটনৈতিক প্রচারণার প্রভাবে বলশালী নৃপতি প্রভাবিত হলে, দুর্বল রাজা তার কাছে প্রতিশ্রুত অর্থপ্রেরণ করবেন এবং সন্ধি সম্পাদনের মাধ্যমে নিজেকে সম্ভাব্য আক্রমণের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করবেন।

১২-০২-০২ উপরোক্তভাবে উপদেশ অনুরোধ জ্ঞাপনের পরও যদি বলশালী নৃপতি আক্রমণাত্মক ভূমিকা হতে নিজেকে নিবৃত না করেন, সেক্ষেত্রে দুর্বল রাজা শত্রুর অমাত্যদের মধ্যে ভেদ সৃষ্টি করাবেন এবং বিদ্রোহের পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে উক্ত নৃপতিকে প্রতিহতকরণে সচেষ্ট হবেন। তিনি তার তীক্ষ্ণ নামক গুপ্তচরদের বলশালী নৃপতির রাজ্যে প্রেরণপূর্বক অন্তর্ঘাতমূলক হত্যাযজ্ঞে নিযুক্ত করে তাকে বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে নিপতিত করবেন।

এছাড়াও গুপ্তচররা বলবান নৃপতির সেনাঅধিনায়কদের মনোরঞ্জনের জন্য পরমাসুন্দরীদের লেলিয়ে দিয়ে তাদের উম্মাদিত করাবে, অতঃপর এ সমস্ত যৌনাবেদনময়ী যুবতীদের সান্নিধ্য লাভের প্রতিযোগিতায় সেনাঅধিনায়করা যখন পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে বিবাদে লিপ্ত হবে তখন গুপ্তচররা পরাজিত বা বঞ্চিত পক্ষকে সুকৌশলে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে দুর্বল রাজাকে সহায়তার জন্য প্ররোচিত করবেন এবং বলবান নৃপতির পক্ষচ্যুত করিয়ে তাদের দুর্বল রাজার পক্ষভুক্ত করাবেন।

১২-০২-০৩ এক্ষেত্রে সে-সব সেনাঅধিনায়ক উক্ত প্রকৃতির পরমাসুন্দরী যুবতীদের প্রতি কামাসক্ত হয়ে পড়বে, সাধুর ছদ্মবেশধারী গুপ্তচররা তাদের নারীদের বশীভূতকরণের ঔষধ সেবন করানোর ছলে বিষমিশ্রিত পানীয় সেবন করিয়ে হত্যা করাবেন। এছাড়াও বণিকের বেশধারী গুপ্তচররা প্রচুর অর্থকড়ি খরচা করে রাজমহিষীর অন্তরঙ্গা পরিচারিকাদের মন জয় করে এক পর্যায়ে তুচ্ছ কারণে তাদের পরিত্যাগ করবে, অতঃপর সাধু বেশের অন্য গুপ্তচররা উক্তরূপ পরিচারিকাদের পুরুষ বশীভূতকরণের ঔষধ প্রদান করে সেই বণিককে বশীভূত করতে প্ররোচিত করবে এবং বণিক বেশধারী গুপ্তচরও ওই ঔষধের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পরিচারিকার প্রতি সমর্পিত হওয়ার অভিনয় করবে, এভাবে সাধু পুরুষের প্রদত্ত ঔষধের প্রতি উক্ত পরিচারিকা আস্থাশীল হয়ে পড়লে গুপ্তচররা তার মাধ্যমে রাজমহিষীকে দিয়ে ওই ঔষধ শত্রু নৃপতির উপর প্রয়োগ করণার্থে প্ররোচিত করবে। এভাবে রাজমহিষীকে দিয়ে স্বামীকে বশীভূত করানোর ছলে গুপ্তচররা বিষমিশ্রিত ঔষধ সরবরাহ করে তার মাধ্যমেই তার স্বামী তথা বলবান নৃপতিকে ঘাতিত করাবে। চাতুরির আশ্রয়ে এভাবেই দুর্বল রাজা তাকে আক্রমণে উদ্যত বলবান নৃপতির বিনাশ করবেন।

১২-০২-০৪ এছাড়াও অন্য তরিকা হিসেবে দুর্বল রাজার নিযুক্ত কাৰ্তান্তিক তথা জ্যোতিষীর ছদ্মবেশী কোনো গুপ্তচর ছলনার মাধ্যমে শত্রু নৃপতির কোনো এক মহামাত্র’র (উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা) বিশ্বাসভাজনরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে, অতঃপর নিজেকে তার হিতৈষী হিসেবে উপস্থাপন করে বলবে, ‘আপনি তো রাজলক্ষণযুক্ত, আপনি একদিন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবেন।’ একইভাবে ভিক্ষুনীর বেশধারী অন্য এক নারী গুপ্তচর তার স্ত্রীকেও অনুরূপভাবে বলবে, ‘আপনি রাজপত্নীর লক্ষণযুক্তা, একদিন আপনি রাজমহিষী হবেন এবং আপনার গর্ভজাত সন্তানও সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবেন।’ এভাবে গুপ্তচররা ছলনার মাধ্যমে উক্ত মহামাত্রের মনে রাজত্ব লাভের লোভ সঞ্চারিত করে তার সঙ্গে স্বীয় নৃপতির দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের সৃষ্টি করিয়ে পরস্পরকে বিভাজিত করাবে। অথবা কোনো গুপ্তচর জাল প্রেমপত্র প্রদর্শনপূর্বক মহামাত্রকে এ কথা বলবে যে বলশালী নৃপতি তার স্ত্রীর প্রতি কামাসক্ত হয়ে তাকে রাজান্তঃপুরে একান্তে কামনা করেছেন, এতে করে উক্ত মহামাত্র স্বীয় নৃপতির প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে এবং তাদের চলমান সম্পর্কেরও অবনতি হবে।

১২-০২-০৫ মহামাত্রদের সঙ্গে নৃপতির বিভেদ সৃষ্টির জন্য আরও বিবিধতরিকা অনুসৃত হতে পারে। এক্ষেত্রে পাচক এবং মাংস পরিবেশনকারীর ছদ্মবেশধারী গুপ্তচররা মহামাত্রদের সমীপে একথা প্রকাশ করবে যে বিপুল অর্থপ্রাপ্ত হয়ে তারা তাদের খাদ্যে বিষ মেশানোর জন্য বলশালী নৃপতি কর্তৃক আদিষ্ট হয়েছেন। বিষ বিক্রেতার বেশধারী গুপ্তচররা উপরোক্ত বক্তব্যের সমর্থনে মহামাত্রদের এ কথা জানাবে যে তারা নৃপতির নির্দেশ মোতাবেক উক্ত পাচক এবং মাংস পরিবেশনকারীদের কাছে মানুষ ঘাতক বিষ বিক্রি করেছেন কিন্তু বিষের ব্যবহারের বিষয়ে তারা অজ্ঞাত। এভাবে নানাবিধ তরিকায় দুর্বল রাজার গুপ্তচররা বলশালী নৃপতির সঙ্গে তার অমাত্যদের বিভেদ সৃষ্টি করিয়ে প্রকারান্তরে তাকে বিপত্তিতে নিপতিত করাবে।

১২-০২-০৬ আক্রমণকারী বলশালী নৃপতির অনুপস্থিতিতে নগর যখন শূন্যপালের দায়িত্বে বহাল থাকবে তখন দুর্বল রাজা কর্তৃক প্রেরিত সত্রী নামক গুপ্তচররা এ কথা নগরের সর্বত্র প্রচার করবে যে, ‘শূন্যপাল নগরস্থ রাজপুরুষদের এ কথা জানাচ্ছেন যে যুদ্ধে গিয়ে নৃপতি বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে নিপতিত হয়েছেন, তার পক্ষে ফিরে আসা সম্ভব নাও হতে পারে, এ অবস্থায় আপনারা শত্রুদের ধনসম্পদ লুণ্ঠন এবং তাদের হত্যা করুন।’ এই গুজব নগরের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার পর রাত্রিতে গুপ্তচররা পাইকারীহারে নগরের স্বনামধন্যদের হত্যা করবে এবং লুণ্ঠনযজ্ঞ চালাবে। অতঃপর এর সমুদয় দায় শূন্যপালের উপর আরোপ করে নগরের লোকদের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে নিপতিত করবে এবং আক্রমণকারী নৃপতির সঙ্গে নগরের লোকদের বিভেদ সৃষ্টি করিয়ে তাকে বিপর্যস্ত করাবে।

১২-০২-০৭ এছাড়াও তীক্ষ্ণ নামক গুপ্তচররা শত্রু রাজ্যের জনপদে ও গ্রামে ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশ করে রাত্রিতে আচমকা অধস্তন রাজকর্মচারীদের হত্যা করে এ কথা সর্বত্র প্রচার করাবে যে যারা অন্যায়ভাবে এলাকার লোকদের উপর উৎপীড়ন করে তাদের পরিণতি এমনটাই হয়ে থাকে। অতঃপর এ ধরনের হত্যার সমুদয় দায় পদস্থকর্তা তথা সমাহর্তাদের উপর আরোপ করে তাদের বিরুদ্ধে জনপদবাসির ক্ষোভ সঞ্চারিত করাবে। পরবর্তী পর্যায়ে জনগণকে প্রজা বিদ্রোহের জন্য প্ররোচিত করে তাদের দিয়ে শূন্যপাল এবং সমাহর্তাদের হত্যা করাবে এবং কোনো অবরুদ্ধ রাজপুত্র বা নৃপতির বিরুদ্ধ ব্যক্তিকে রাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করাবে। অতঃপর গুপ্তচররা প্রজা বিদ্রোহের সুযোগে নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নগরদ্বার, অন্তঃপুর, খাদ্য গুদাম, ভাণ্ডার ও অন্যান্য স্থাপনা আগুন জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করবে, রক্ষীদের হত্যা করবে এবং এ সমস্ত ধ্বংসযজ্ঞের সমুদয় দায় বিদ্রোহী প্রজাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য আফসোসকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে লোক দেখানো সন্তাপ প্রকাশ করবে।

তৃতীয় অধ্যায় ॥ ১৬৪-১৬৫ প্রকরণ ॥

এই অধ্যায়ে সন্ধি সম্পাদনে অনিচ্ছুক আক্রমণে উদ্যত বলশালী নৃপতির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বাহিনীর সেনাধ্যক্ষসহ অমাত্যবর্গকে হত্যা এবং রাজমণ্ডলে উদ্দীপনা সৃষ্টির উপায়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

১২-০৩-০১ দুর্বল রাজা কর্তৃক প্রেরিত গুপ্তচররা বলবান নৃপতির রাজ্যে অবস্থানকালে পদাতিক, রথসেনা, অশ্বসেনা এবং হস্তিসেনার অধিনায়কদের স্থানীয় মিত্রদের সঙ্গে কৌশলে বন্ধুত্বস্থাপন করে বিশ্বস্ত হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবে এবং তাদের মধ্যে এই অপ্রচার চালাবে যে চতুরঙ্গ বাহিনীর সেনাপতিগণ বলবান নৃপতির বিরাগভাজনে পরিণত হয়েছে। এই অপপ্রচার সর্বত্র প্রচারিত হওয়ার পর কোনো এক রাত্রিতে সাধারণের চলাচলের নিষিদ্ধ সময়ে গুপ্তচররা উক্ত সেনাপতিদের অবস্থানস্থলে উপস্থিত হয়ে নৃপতির আদেশক্রমে বাহিরে বের হওয়ার আহ্বান জানাবে, অতঃপর গৃহের বাহিরে এনে পথিমধ্যে তাদের হত্যা করবে এবং এ কথা প্রচার করবে যে তারা বলবান নৃপতির নির্দেশক্রমে ঘাতিত হয়েছে। কতিপয় সেনা মুখ্যকে এই প্রক্রিয়ায় হত্যা করার পর অন্যদের পালিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে। এভাবে গুপ্তচররা বলশালী নৃপতির সেনাবাহিনীকে নেতৃত্বশূন্য করে তাকে বিপত্তিতে নিপতিত করবে।

১২-০৩-০২ বলবান নৃপতির কোনো মহামাত্র তার কাছে অর্থ প্রার্থনা করে যদি না পেয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে উপরোক্ত প্রকৃতির গুপ্তচররা নৃপতির উদ্ধৃতিক্রমে এ কথা সর্বত্র প্রচার করবে যে স্বীয় নৃপতির কাছে যাচিত অর্থ না পেয়ে উক্ত মহামাত্র শত্রুপক্ষে যোগদান করেছে। এ কথা বহুলভাবে প্রচারিত হওয়ার পর গুপ্তচররা কৌশলে সেই মহামাত্রকে হত্যা করবে এবং শত্রুপক্ষে যোগানের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি স্বীয় নৃপতি কর্তৃক ঘাতিত হয়েছে বলে সর্বত্র প্রচার করাবে।

এক্ষেত্রে যেসব মহামাত্র যাচিত অর্থ যথাযথভাবে প্রাপ্ত হবে, গুপ্তচররা তাদের ব্যাপারে একইভাবে একথা প্রচার করবে যে নৃপতি কর্তৃক চাহিত অর্থপ্রাপ্তির পরও কিছু মহামাত্র শত্রুপক্ষে যোগদান করেছে। এ কথা প্রচার করার পর তাদেরও গুপ্তচররা উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় হত্যা করবে এবং একই প্রক্রিয়ায় প্রচারণা চালাবে।

১২-০৩-০৩ অন্যদিকে যেসব মহামাত্র নৃপতির কাছে কখনো কোনো অর্থ বা বস্তু চাইবে না, তাদের সম্পর্কে গুপ্তচররা নৃপতির উদ্ধৃতিক্রমে এ কথা প্রচার করবে যে তারা শত্রুর সঙ্গে সম্পৃক্ততাজনিত কারণে শঙ্কিত হয়ে নৃপতির কাছে কখনো কোনোকিছু প্রার্থনা করে না। অতঃপর এই প্রকৃতির মহামাত্রদের ও পূর্বোক্ত কায়দায় হত্যা করে গুপ্তচররা এ কথা প্রচার করবে যে শত্রুর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অপরাধে তারা নৃপতি কর্তৃক ঘাতিত হয়েছে।

১২-০৩-০৪ শত্রু নৃপতির সান্নিধ্যে অবস্থানরত দুর্বল রাজা কর্তৃক নিযুক্ত বিশ্বাসভাজন গুপ্তচররা এ কথা বলে নৃপতির কানভারী করবে যে, তার কিছু কিছু মহামাত্র শত্রু রাজার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। এ কথায় আস্থাজ্ঞাপন করলে গুপ্তচররা এ ধরনের কিছু জাল (নকল) পত্র নৃপতির সম্মুখে উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট মহামাত্রগণকে নৃপতির বলয় থেকে বিচ্যুত করাবে।

অথবা গুপ্তচররা শত্রু নৃপতির সেনামুখ্যদের ভূমি বা অর্থপ্রদানের লোভ দেখিয়ে পরস্পরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে নিজ রাজ্য থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাবে। অথবা গুপ্তচররা শত্রু নৃপতির দূরবর্তী সীমান্ত প্রদেশে বা নিকটবর্তী স্থানে বসবাসরত কোনো অবরুদ্ধ রাজপুত্রকে এ কথা বলে প্ররোচিত করবে যে বর্তমান যুবরাজের তুলনায় অনেক বেশি সাত্মগুণসম্পন্ন হয়েও তিনি অবরুদ্ধ হয়ে আছেন, এ অবস্থায় বলপ্রদর্শনপূর্বক তার সিংহাসন দখল করা উচিৎ, অন্যথায় এক সময় তিনি তার আত্মগুণের কারণে যুবরাজ কর্তৃক ঈর্ষান্বিত হয়ে ঘাতিত হতে পারেন।

১২-০৩-০৫ অথবা গুপ্তচররা শত্রু নৃপতির কোনো স্বজন বা অবরুদ্ধ সন্তানকে অর্থপ্রদানের প্রলোভন দেখিয়ে সেনাবাহিনীকে ধ্বংসের নিমিত্তে প্ররোচিত করাবে বা অটবিকগণকে ধন-সম্পদ প্রদান করে শত্রুর রাজ্যে অন্তর্ঘাতমূলক ধ্বংসযজ্ঞ চালনার্থে নিযুক্ত করাবে।

১২-০৩-০৬ অথবা দুর্বল রাজা পশ্চাদের শত্রু নৃপতিকে একথা বলে তাকে সহায়তা করতে উৎসাহিত করবে যে বলবান নৃপতি তাকে আক্রমণ করার পর তার দিকেও আগ্রাসী থাবা প্রসারিত করবে। এ অবস্থায় তিনি যদি বলবান নৃপতিকে পেছন থেকে আক্রমণে উদ্যত হন, সেক্ষেত্রে তিনিও তাকে সহায়তা প্রদান করবেন। এছাড়া আক্রমণে উদ্যত বলবান নৃপতির মিত্রদের উদ্দেশে দুর্বল রাজা এ কথা বলবেন যে তিনিই তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের সেতু, বিপত্তির সময় তিনিই তাদের রক্ষাকর্তা হবেন, শত্রু নৃপতি কর্তৃক তিনি আক্রান্ত হলে পর্যায়ক্রমেও তারাও একইভাবে আক্রান্ত হবেন এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হবেন।

অথবা দুর্বল রাজা আক্রমণকারী নৃপতির মিত্রদের এ কথা বলবেন যে সমন্বিতভাবে আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হবে। যে কারণে সকলের জোটবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করা আবশ্যক। এ ছাড়াও তিনি মিত্র-অমিত্র সকল নৃপতিকে আক্রমণদ্যোত নৃপতির ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে পত্র প্রেরণ করবেন। দুর্বল রাজা আক্রমণদ্যোত বলশালী নৃপতির আগ্রাসন থেকে নিজেকে রক্ষা করার নিমিত্ত প্রয়োজনে সন্নিকটস্থ মধ্যম বা উদাসীন নৃপতির সমীপে নিজেকে সমর্পিত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করবেন এবং এভাবে আক্রমণকারীর চেয়ে অধিক বলশালী নৃপতির অধীনে আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে রাজ্য ও নিজেকে রক্ষার্থে সচেষ্ট হবেন।

চতুর্থ অধ্যায় ॥ ১৬৬–১৬৭ প্রকরণ ॥

এই অধ্যায়ে আক্রমণে উদ্যত নৃপতির রাজ্যে দুর্বল রাজার গুপ্তচররা কীভাবে সশস্ত্র আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ এবং বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে অন্তর্ঘাতমূলক ধ্বংসযজ্ঞ সম্পাদন করবে, কীভাবে খাদ্যভাণ্ডার, অন্যান্য সম্পদের সংরক্ষণাগার এবং শত্রুর সরবরাহ পথ বিধ্বস্ত করবে, সেসব বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

১২-০৪-০১ আক্রমণে উদ্যত বলশালী নৃপতির রাজ্যস্থ নগরে দুর্বল রাজা কর্তৃক নিয়োজিত বণিকের ছদ্মবেশধারী গুপ্তচর, গ্রামসমূহে গৃহস্থের বেশধারী গুপ্তচর এবং জনপদে গোরক্ষক ও তাপসবেশী গুপ্তচররা নৃপতির সামন্ত

আটবিক ও বিরুদ্ধ মনোভাবাপন্ন অবরুদ্ধ পুত্রদের পণ্য সম্ভার প্রেরণের সময় এ বার্তাও প্রেরণ করবে যে নৃপতির দেশটি বহুলভাবে দুর্বল অবস্থায় বিপদাপন্ন, তারা ইচ্ছে করলে সে রাজ্য অনায়াসে দখল করতে পারবে। এই বার্তাপ্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে ওই সমস্ত সামন্ত, আটবিক বা অবরুদ্ধ রাজকুমার কর্তৃক আক্রমণকারী গুপ্তচর প্রেরিত হলে দুর্বল রাজার গুপ্তচররা তাদের সম্মান প্রদর্শনপূর্বক অর্থকড়ি দান করে বলশালী নৃপতির দুর্বল দিকগুলো দেখিয়ে দিবে এবং তাদের দিয়ে উক্ত নৃপতির বিভিন্ন দুর্বল স্থাপনায় অন্তর্ঘাতমূলক আক্রমণ করাবে।

১২-০৪-০২ অথবা উক্ত নৃপতির সেনাশিবিরে মদ্যবিক্রেতার ছদ্মবেশধারী কোনো এক গুপ্তচর নিজপুত্র হিসেবে ঘোষিত (এরূপ ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বেছে নেওয়া হয়) কাউকে কৌশলে বিষপ্রয়োগে হত্যা করবে, অতঃপর উক্ত মৃতপুত্রের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান উপলক্ষে সেই গুপ্তচর প্রথম রাতে সেনা মুখ্যদের বিশুদ্ধ মদ্য পান করাবে, এর পর দ্বিতীয় রাতে বিষাক্ত মদ্য পান করিয়ে তাদের হত্যার ব্যবস্থা করবে।

১২-০৪-০৩ অথবা দুর্বল রাজার নিয়োজিত গুপ্তচররা ভাত বিক্রেতা, মাংসের কারি বিক্রেতা, মদ্য বিক্রেতা বা পিঠা বিক্রেতার ছদ্মবেশে শত্রুপক্ষের লোকদের কাছে সস্তায় এবং ধারে উক্ত প্রকার বিষমিশ্রিত খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করে তাদের হত্যা করার ব্যবস্থা করবে। অথবা নারী বা বালকের ছদ্মবেশধারী গুপ্তচররা মদ, ক্ষীর, দই, ঘৃত বা তেল বিক্রেতাদের কাছ থেকে উক্ত প্রকৃতির দ্রব্য ক্রয় করে তাতে বিষ মিশিয়ে বিক্রেতাকে ফেরত প্রদানের ছলে বিশুদ্ধ দ্রব্যের সাথে মিশিয়ে দিবে, এভাবে পুরো পণ্যদ্রব্য বিষাক্ত করিয়ে বিক্রেতাদের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের সেনাদের কাছে তা বিক্রির ব্যবস্থা করাবে এবং এই প্রক্রিয়ায় কৌশলে বিষাক্ত খাবার খাইয়ে তাদের হত্যা করাবে।

১২-০৪-০৪ অথবা বণিকের বেশধারী গুপ্তচররা শত্রুপক্ষের হস্তির খাবারে তথা ভাতে বা ঘাসে কৌশলে বিষ মিশিয়ে দিয়ে হস্তিরনাশ করাবে। অথবা মজুর বা কর্মকরের বেশধারী গুপ্তচররা বিষমিশ্রিত জল বা ঘাস হাতিদের খেতে দিয়ে তাদের নাশ করবে। অথবা বিশ্বস্ত গরুর ব্যাপারির বেশধারী গুপ্তচররা যুদ্ধাভিযানকালের শত্রুর সেনা সমাবেশে গরু, ছাগল বা মেষের পাল ছেড়ে দিয়ে তাদের উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিবে। অথবা অশ্ব বণিকের বেশধারী গুপ্তচররা দুষ্টু প্রকৃতির অশ্ব, উট, গাধা বা মহিষের চোখে বিষাক্ত ইঁদুরের রক্ত মেখে সেনা সমাবেশে ছেড়ে দিয়ে তাদের বিপত্তিতে নিপতিত করাবে। অথবা শিকারির বেশধারী গুপ্তচররা খাঁচাবদ্ধ হিংস্র প্রকৃতির প্রাণীগুলো অবমুক্ত করে, সাপুড়ের বেশধারী গুপ্তচররা বিষাক্ত সাপ ছেড়ে বা মাহুতের বেশধারী গুপ্তচররা উন্মত্ত হাতি ছেড়ে দিয়ে শত্রুর সেনাসমাবেশে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করাবে যাতে করে শত্রু সেনাদের যুদ্ধাভিযান বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং এই সুযোগে দুর্বল রাজা তাদের উপর সহজে প্রতিআক্রমণ চালাতে পারে। অথবা আগ্নিজীবীর বেশধারী গুপ্তচররা রাত্রিতে শত্রুশিবিরে আগুন লাগিয়ে তাদের বিপদগ্রস্ত করবে।

১২-০৪-০৫ অথবা গুপ্তচররা শত্রুপক্ষের পদাতিক, অশ্ব, রথ বা হস্তিবাহিনীর মুখ্যদের পলায়িত অবস্থায় পেছন থেকে আক্রমণ করে হত্যা করবে। অথবা তাদের অবস্থান স্থান পুড়িয়ে দিবে। তারা শত্রু নৃপতির বিশ্বস্তজন হিসেবে নিজেদের উপস্থাপিত করে পেছন থেকে আক্রমণ চালিয়ে তার সৈন্যদের হত্যা করবে। অথবা শত্রুর প্রান্তদেশে অবস্থানরত সৈন্যদের নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করে সুযোগমতো হত্যা করবে।

১২-০৪-০৬ অথবা শত্রুপক্ষের খাদ্য, মিত্র সেনা, তৃণকাষ্ঠাদি যখন সংকীর্ণ পথ ধরে পরিবাহিত বা চালিত হবে, তখন গুপ্তচররা তা ধ্বংস করে দিবে। অথবা রাত্রিকালীন যুদ্ধে গুপ্তচররা তুর্যধ্বনির মাধ্যমে এই মর্মে ঘোষণা প্ৰদান করবে যে তারা শত্রু নৃপতির রাজধানীতে অনুপ্রবেশ করেছে এবং শত্রুরাজ্য জয় করেছে এ ধরনের ঘোষণার পর শত্রুর সৈন্যরা যখন রাজধানী রক্ষার্থে ধাবিত হবে তখন গুপ্তচররা তাদের ধ্বংস করবে। অথবা গুপ্তচররা শত্রু নৃপতির অবস্থান স্থানে উপস্থিত হয়ে নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে শত্রু নৃপতিকে হত্যা করবে।

অথবা ম্লেচ্ছ বা আটবিক সেনার বেশধারী গুপ্তচররা পলায়নপর শত্রু নৃপতিকে আশ্রয় প্রদানের ছলে মরুদুর্গ, বনদুর্গ বা অন্যকোনো দুর্গে আশ্রয় প্রদানের ছলনায় ডেকে নিয়ে হত্যা করবে। অথবা শিকারিবেশী গুপ্তচররা শত্রু নৃপতির অবস্থানস্থানে গোলমাল সৃষ্টি করে গোপনে তাকে হত্যা করবে।

১২-০৪-০৭ অথবা শত্রু নৃপতি যখন একজনের চলাচলযোগ্য সংকীর্ণ পথ ধরে চলাচল করবে, পাহাড়ি পথ ধরে চলাচল করবে বা গাছের গুড়ি দিয়ে নির্মিত আবেষ্টনিতে অবস্থান করবে, তখন গুপ্তচররা নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে শত্রু নৃপতির উপর আঘাত হানবে। অথবা তারা নদী বা সরোবরের বাঁধ ভেঙে দিয়ে পানির স্রোতে শত্রুপক্ষের সৈন্যদের ভাসিয়ে দিবে। অথবা তারা মরুদুর্গে, বনদুর্গে বা জলদুর্গে অবস্থানরত শত্রু সেনাদের উপর আগুন বা বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে তাদের ঘাতিত করবে। অথবা শত্রু নৃপতি দুর্ভেদ্য স্থানে অবস্থানকালে হত্যায় পারদর্শী তীক্ষ্ণনামক গুপ্তচররা তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করবে, মরুদুর্গে অবস্থানকালে বিষাক্ত ধোঁয়ায় এবং নিজ প্রাসাদে অবস্থানকালে বিষপ্রয়োগ করে হত্যা করবে। শত্রু নৃপতি জলে অবস্থানকালে গুপ্তচররা তাকে কুমির দিয়ে ঘায়েল করাবে। এসব বিপদ থেকে নিষ্কৃতির জন্য শত্রু নৃপতি পলায়নে উদ্যত হলে গুপ্তচররা তাকে নিগৃহীত করবে। অথবা শত্রু নৃপতি যখন উপরোক্ত অবস্থানে থেকে নিজেকে রক্ষার্থে সচেষ্ট হবেন, গুপ্তচররা তখন উপরোক্ত প্রকৃতির কোনো একটি কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে তাকে স্ববশে এনে হত্যা করবে।

পঞ্চম অধ্যায় ॥ ১৬৮–১৬৯-১৭০ প্রকরণ ॥

এই অধ্যায়ে কপট উপায়ে শত্রু সেনাদের আটক ও হত্যা, স্বীয় সেনাবাহিনীর মাধ্যমে শত্রু সেনাদের আটক ও হত্যা এবং দুর্বল রাজা পরাভূত হয়েও কীভাবে বলশালী নৃপতিকে হত্যা করবেন, সেসব বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

১২-০৫-০১ দেবতার মন্দিরে প্রবেশ প্রাক্কালে শত্রু নৃপতির উপর মন্দিরের উপরি কাঠামোর কোনো ভারী বস্তু বা দেয়াল বা ওজনদার পাথর নিপাতিত করিয়ে রাজা তাকে হত্যা করাবেন। অথবা ভবনের শীর্ষ অবস্থান থেকে বৃহৎ পাথর বা অস্ত্র নিক্ষেপ করিয়ে তাকে ঘাতিত করাবেন। অথবা কৌশলে তার উপর প্রবেশের দরজা বা দরোজার ওজনদার অর্গল নিপাতিত করিয়ে তাকে হত্যা করাবেন। অথবা মন্দিরস্থ দেবতার প্রহরণগুলো তার উপর নিপাতিত করিয়ে হত্যা করাবেন। অথবা তার অবস্থান স্থানে, উপবেশন স্থানে বা গমন পথে গোময়, সুগন্ধি বা দেবতার প্রতি উৎসর্গকৃত পুষ্পচূর্ণের সাথে বিষমিশ্রিত করে সেই বিষক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে হত্যা করাবেন। অথবা সুগন্ধি ধোঁয়ার সাথে বিষ মিশিয়ে তা শত্রুকে গ্রহণ করিয়ে হত্যা করাবেন। অথবা তার শয্যার নিচে তীক্ষ্ণ শলাকা সংস্থাপন করে শয়নকালে তাকে ঘাতিত করাবেন। জনপদের উপর যদি শত্রু নৃপতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকে, সেক্ষেত্রে তার নিয়ন্ত্রণাধীন শৈলদুর্গ, অরণ্যদুর্গ, জলদুর্গ বা অরণে বিভাজিত প্রদেশে শত্রুনৃপতির বিরোধী লোকদের রাজা নিজ পক্ষভুক্ত করে সেসব দুর্গ বা প্রদেশে প্রতিষ্ঠিত করাবেন।

১২-০৫-০২ দুর্গ বা প্রাসাদের চারিদিকের কাঠ ও ঘাসের উপযোগিতা থেকে বঞ্চিত করার জন্য রাজা তার শত্রু নৃপতির দুর্গ বা প্রসাদের চারিদিকের একযোজন পরিমাণ কাঠ ও ঘাস জ্বালিয়ে দিবেন। তিনি শত্রু দেশের পানিতে বিষমিশিয়ে তা দূষিত করাবেন এবং জলাধারের বাঁধ বিধ্বস্থ করিয়ে জল বাহিরে প্রবাহিত করিয়ে দিবেন। শত্রুর দুর্গের চারিদিকে কণ্টকিত কূপ খনন করিয়ে স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করাবেন। শত্রুর প্রাসাদ অভিমুখে একাধিক সুড়ঙ্গ খনন করিয়ে হত্যা করার জন্য শত্রু নৃপতিকে তাতে কৌশলে প্রবিষ্ট করাবেন। শত্রু নৃপতি যদি নিজেই রাজার প্রাসাদে অনুপ্রবেশের অভিপ্রায়ে সুড়ঙ্গ খনন করিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে রাজা সুড়ঙ্গ পথ অকার্যকর করার জন্য একইভাবে গভীর সুড়ঙ্গ খনন করিয়ে জল সঞ্চালনের মাধ্যমে তা পানিতে পূর্ণ করিয়ে অকার্যকর করে দিবেন। অথবা অনুরূপ প্রতি সুড়ঙ্গ খনন করাবেন অথবা শত্রু কর্তৃক খননকৃত সুড়ঙ্গপথ বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিষময় করে দিবেন।

১২-০৫-০৩ অথবা দুর্বল রাজা নিজ পুত্রকে রাজধানী রক্ষার্থে নিয়োগ করে শত্রুর প্রতিরোধকল্পে সম্ভাব্য আক্রমণের পথে ধাবিত হবেন। কিংবা তিনি সেদিকে যাত্রা করবেন, যেদিকে অগ্রসর হলে কাঙ্ক্ষিত মিত্র, বন্ধু বা আটবিকদের সহায়তা লাভ সম্ভব হবে বা অপকারে সমর্থ শত্রুর বিরোধী অমাত্যদের সঙ্গে মিলিত হতে পারবেন বা শত্রুর মিত্রদের নিরোধ করতে সমর্থ হবেন বা শত্রুকে পেছন থেকে আক্রমণ করতে সমর্থ হবেন বা শত্রুর রাজ্য দখল করতে সক্ষম হবেন বা শত্রুর খাদ্যশস্য ও রসদ সরবরাহের পথ ধ্বংস করতে সক্ষম হবেন বা প্রতারক পাশা খেলোয়াড়ের মতো শত্রুকে প্রতারিত করতে পারবেন বা নিজ রাজ্যের সুরক্ষা বিধানে সক্ষম হবেন বা নিজের রাজধানীকে সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবেন বা শত্রুর সঙ্গে সন্ধি সম্পাদনে সক্ষম হবেন।

১২-০৫-০৪ অথবা দুর্বল রাজার নিয়োগকৃত গুপ্তচররা আক্রমণে উদ্যত বলশালী নৃপতির কাছে দূত মারফত এ বার্তা প্রেরণ করবে যে তার শত্রুরা তাদের হাতে আটক হয়েছে, এমতাবস্থায় তিনি অর্থ ও সবল সৈন্যদের পাঠিয়ে আটককৃত শত্রুদের জীবিত বা মৃত অবস্থায় তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারেন। এ ধরনের প্রস্তাবে সম্মত হয়ে শত্রু নৃপতি কর্তৃক অর্থ ও সৈন্য প্রেরণ করা হলে দুর্বল রাজা তা আত্মসাৎ করবেন। অথবা দুর্বল রাজার বিশ্বস্ত সীমান্ত অধিনায়করা বলবান নৃপতির সৈন্যদের একাংশকে নিজেদের দুর্গে অবস্থানের সুযোগ প্রদান করে তাদের আস্থা অর্জন করবে, অতঃপর সুবিধা মতো সময়ে কৌশলে তাদের হত্যা করবে অথবা সীমান্ত অধিনায়করা জনপদের প্রজা বিদ্রোহ দমনের প্রেক্ষাপটে সহায়তা কামনার ছলে শত্রু সেনাদের আস্থাঅর্জন করবে, অতঃপর তাদের কোনো এক দুর্গমস্থানে নিয়ে হত্যা করবে।

১৫-০৫-০৫ অথবা দুর্বল রাজার নিয়োগকৃত গুপ্তচররা শত্রু নৃপতির মিত্ররূপে তাকে দূত মারফত জানাবে, ‘আপনার নগরের খাদ্যদ্রব্য, তৈল, ঘৃত ও লবণ ইতিমধ্যে নিঃশেষিত হয়েছে, এ অবস্থায় অমুক পথ দিয়ে অমুক সময় অমুক দেশের খাদ্য সম্ভার প্রেরিত হবে, আপনি ইচ্ছে করলে সেগুলো লুণ্ঠন করতে পারেন।’ একই সময় দুর্বল রাজা পরিকল্পনার ছক অনুযায়ী কথিত পথে বিষাক্ত খাদ্যদ্রব্য পরিবহন করাবে, অতঃপর শত্রু নৃপতির লোকেরা সেগুলো লুণ্ঠন করে ভোগ প্রাক্কালে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। এই প্রক্রিয়ায় দুর্বল রাজা সবল নৃপতির শক্তি ক্ষয় করে তাকে বিপর্যস্ত করবেন।

১২-০৫-০৬ অথবা দুর্বল রাজা সন্ধির শর্তানুসারে প্রদেয় অর্থের একাংশ আক্রমণে উদ্যত সবল নৃপতিকে প্রদান করবেন এবং অবশিষ্ট দেনা পরিশোধের জন্য সময়ক্ষেপণ করবেন। ইত্যবসরে তিনি শত্রু নৃপতির আস্থা অর্জন করে দুর্গাদি সংস্কার বা নির্মাণের কাজ উপেক্ষা করার জন্য প্ররোচিত করবেন। আগুন, বিষ ও অস্ত্রাঘাতের মাধ্যমে সঙ্গোপনে তার স্থাপনাসমূহ বিনষ্ট করাবেন এবং শত্রুর প্রিয়জনদের উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে বশীভূত করে তাদের দিয়েই শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করাবেন। এ সমস্ত নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সবল শত্রুকে পরাভূত করতে ব্যর্থ হলে দুর্বল রাজা আত্মরক্ষার্থে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে দুৰ্গ থেকে পালিয়ে যাবেন।

১২-০৫-০৭ রাত্রিতে শত্রু শিবিরে আচমকা আক্রমণ পরিচালনা করে দুর্বল রাজা যদি কৃতকার্য হন, সেক্ষেত্রে তিনি স্বীয় দুর্গে বা নগরে বহাল তবিয়তে অবস্থান করে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। এক্ষেত্রে তিনি ব্যর্থ হলে পাষণ্ডের ছদ্মবেশে, মৃত লাশের বেশে বা কোনো শবদেহ অনুসরণকারীর ছদ্মবেশে নগর পরিত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যাবেন। দুর্গ বা নগর পরিত্যাগ প্রাক্কালে তিনি দখলদার শত্রুকে হত্যার জন্য দেবতার পূজার উপকরণে, উদ্যান ভোজনের খাদ্যে ও অন্যান্য খাদ্য—পানীয়ে বিষ মিশিয়ে রাখবেন। অতঃপর তিনি তার নিয়োগকৃত গুপ্তচরদের দিয়ে শত্রুর আস্থাঅর্জন করাবেন এবং গোপনীয়তা বজায় রেখে গুপ্তচরদের সঙ্গে মিলিত হয়ে শত্রুকে ঘায়েল করতে প্রবৃত্ত হবেন।

১২-০৫-০৮ দুর্বল রাজার একক প্রচেষ্টায় শত্রু নৃপতিকে পরাভূতকরণ— শত্রু নৃপতি কর্তৃক দুর্বল রাজার নগর অধিকৃত হলে, তিনি পর্যাপ্ত খাদ্যসম্ভার নিয়ে কোনো মন্দিরে আশ্রয়গ্রহণ করবেন এবং বৃহদাকৃতির দেবপ্রতিমার অভ্যন্তরে নিজেকে লুকিয়ে রাখবেন। অথবা শত্রুর অজ্ঞাতসারে প্রাসাদস্থ কোনো গোপন কুঠুরিতে আত্মগোপন করবেন। অতঃপর শত্রু নৃপতি প্রাসাদে অবস্থানকালে যখন রাজার বৃত্তান্ত সম্পর্কে বিস্মৃত হবেন, তখন তিনি সন্তর্পণে গোপন আস্তানা থেকে বেরিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় শত্রুকে হত্যা করবেন। অথবা কৌশলে প্রাসাদের কোনো স্থাপনা তার উপর নিপাতিত করিয়ে ঘায়েল করবেন। অথবা বিষ, বিষাক্ত ধোঁয়া প্রয়োগ করে বা আগুনে পুড়িয়ে তাকে হত্যা করবেন।

১২-০৫-০৯ অথবা প্রমোদ বা ক্রীড়াদিতে আসক্ত শত্রু নৃপতি যখন প্রমোদ বিহারের জন্য কোথাও অবস্থান করবেন তখন রাজার নিযুক্ত তীক্ষ্ণনামক গুপ্তচররা তাকে হত্যা করবে। অথবা গুপ্তচররা শত্রু নৃপতির খাদ্যে বিষমিশিয়ে তাকে ঘাতিত করবে। অথবা সাধারণের অপ্রবেশ্য স্থানে শত্রুনৃপতি যখন নিদ্রিত থাকবেন তখন নারীর ছদ্মবেশধারী গুপ্তচররা বিষাক্ত সাপ, বিষাক্ত আগুন বা বিষাক্ত ধোঁয়ার মাধ্যমে তাকে হত্যা করবে। অথবা শত্রু নৃপতি দখলকৃত প্ৰসাদে অবস্থানকালে পরাভূত দুর্বল রাজা সন্তর্পণে প্রাসাদের অভ্যন্তরে বিচরণ করবেন এবং পরিস্থিতির আলোকে উপরোক্ত উপায়ের যে কোনো একটি উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে শত্রুকে হত্যা করে সন্তর্পণে প্রাসাদ পরিত্যাগ করবেন এবং গুপ্ত সংকেতের মাধ্যমে নিজের লোকদের সমবেত হতে আহ্বান জানাবেন। অতঃপর নিজের লোকদের দিয়ে শত্রু নৃপতির অন্যান্য পরিজন ও সহায়কদের হত্যা করিয়ে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করবেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%