চিন্তনের দিগন্ত

উন্মেষের ঊষালগ্নে অন্যান্য প্রাণীর মতো মানুষেরাও ছিল প্রকৃতির সন্তান। ক্রমশ টিকে থাকার প্রয়োজনে মানুষকে হতে হয়েছে অনিসন্ধিৎসু। বেঁচে থাকবার এই অনুসন্ধিৎসাই মানুষকে করেছে কৌতূহলপ্রবণ। এই কৌতূহলই প্রকারান্তরে সমৃদ্ধ করেছে মানুষের ভাবনা জগৎ। প্রকৃতির বহুমাত্রিক উৎস থেকে শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে মানুষ উদ্ভাবন করেছে উৎপাদনের নানাবিধ কলাকৌশল। নিত্যনতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে জীবনযাত্রায় সাধিত হয়েছে গুণগত পরিবর্তন। ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি হয়েছে পরিবার সমাজ রাষ্ট্র। আদিমসমাজ, সামন্তসমাজ, শিল্পসমাজের কালপর্ব পেরিয়ে অতঃপর আজকের এ বিশ্বসমাজ দাঁড়িয়ে আছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বাঁকে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রয়োজনে যতই বিকশিত হয়েছে মানুষের চিন্তা জগৎ, একে একে ততই উন্মোচিত হয়েছে রহস্যের অনাবিল আধার। অন্ধবিশ্বাস কুসংস্কার পরাজিত হয়েছে যুক্তির কাছে। কার্যকারণ সম্পর্কের আলোকে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে মানুষ হয়েছে উদ্বুদ্ধ। একই সাথে সরলপথের পরতে পরতে জমা হয়েছে জটিলতার ধূলিকণা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র হয়েছে জটিল থেকে জটিলতর।

এ সমস্ত গুণগত উৎকর্ষতার সময়কাল হিসেব করলে দেখা যাবে, খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, মানুষের প্রজ্ঞার প্রসারতার বয়স নিতান্তই খুব অল্পদিনের। মাত্র পাঁচ থেকে দশ হাজার বছর আগে শুরু হয়েছে চিন্তনের এই অভিযাত্রা এবং আজ থেকে আড়াই তিন হাজার বছর পূর্ব থেকে তা প্রাতিষ্ঠানিক আকারে পথচলা শুরু করেছে। এক্ষেত্রে প্রায় একই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে চিন্তাজগৎ জ্যোতি ছড়ালেও বিকাশমানতার ধারাবাহিকতা সমানতালে বিস্তৃত হয়নি। ক্ষেত্রবিশেষে ভাবাদর্শের মত ও পথও ছিল ভিন্নতর। ফলে একই বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকশিত হতে পারেনি ভাবাদর্শের ভাবনাজগৎ। কোনো কোনো সভ্যতা পিছিয়ে পড়েছে, কোনোটি অবলুপ্ত হয়ে গেছে। কোথাও আবার সভ্যতার ধারা নানাবাকে বিশ্রাম নিয়ে এগিয়ে গেছে কাঙ্ক্ষিত অভীষ্টে। ইনকা, সুমেরিয়সহ নদী তীরবর্তী সভ্যতাসমূহের আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই। হারিয়ে গেছে হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো এমনকি আমাদের পুণ্ড্রনগর এবং উয়ারী বটেশ্বরও। অন্যদিকে রোমান, গ্রিক সভ্যতার প্রজ্ঞার প্রবাহ নানাবাঁক ঘুরে রেঁনেসাস-এর উন্মেষ ঘটাতে সমর্থ হয়েছে। এর প্রভাবে পাশ্চাত্য সমাজে বিজ্ঞান হয়েছে বিকশিত। এই বিজ্ঞানের সুবাদে অর্জিত সুবিধার পুরোটাই কব্জা করেছে পশ্চিমের দুনিয়া। প্রজ্ঞার সাথে পেশিশক্তির দোস্তালিতে দুর্বিপাকে পড়েছে পৃথিবীর প্রান্তজনেরা।

পাশ্চাত্যের জ্ঞানান্বেষণের উৎস সন্ধানকালে অপরিহার্যভাবে কতগুলো ঐতিহাসিক চরিত্র এসে পড়ে, যাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সূচিত হয়েছিল ভাবনার নবদিগন্ত। এদেরই একজন ছিলেন প্রেটোগোরাস (খ্রিঃপূঃ ৪৮৬-৪১৫)। তিনি মনে করতেন সব কিছুর উপর মানুষই সত্য। তার মতানুযায়ী, দেবতারাও কোনো বিশেষত্বসম্পন্ন নয়, মানুষই সকল কিছুর নিয়ামক। বস্তুবাদীতার নিরিখেই আবর্তিত হয়েছিল তাঁর চিন্তনজগৎ। এরই ধারাবাহিকতায় এসেছেন মহান সক্রেটিস (খ্রিঃপূঃ ৪৬৯-৩৯৯)। সকলের কাছে তিনি সুপরিচিত, সম্মানিত একজন দার্শনিক। নিজের প্রকাশিত কোনো গ্রন্থ নেই। তার দার্শনিক চিন্তা ভাবনা প্লেটোর মাধ্যমে প্রকাশিত। তিনি কোনো কিছুকেই বিনাপ্রশ্নে মেনে নিতেন না। তার সব কিছুতেই ছিল যুক্তির অনুসন্ধিৎসা। জিজ্ঞাসার অমিত তরঙ্গ। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার ব্যাপারেও ছিল অনন্ত প্রশ্ন। মুখ্যত তিনি ছিলেন জ্ঞানের অন্বেষক। প্রশ্নোত্তরের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতেই সত্য উদঘাটনে নিবিষ্ট হতেন। তিনি বলতেন, আমরা যা সম্পর্কে জ্ঞাত বলে দাবি করে থাকি, বস্তুতপক্ষে তার কতটুকু জানি? এক্ষেত্রে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘জ্ঞানীদের সাথে আমার পার্থক্য এই যে, আমি জানি, আমি কিছু জানি না, কিন্তু তারা জানে না যে তারা কিছু জানে না’। তিনি বরাবরই মনে করতেন, মানুষের জ্ঞানের পরিধি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। তরুণ সমাজে তার প্রজ্ঞার প্রসারণ দেখে শাসকগোষ্ঠী তাকে মন্দতার্কিক হিসেবে অভিহিত করে এই মর্মে অভিযোগ উত্থাপন করে যে, তিনি তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং অশ্রদ্ধার ভাব সৃষ্টি করছেন। তার বিবেচিত ন্যায় অন্যায়ের প্রশ্নেও শাসকমহলে প্রবল আপত্তি উত্থাপিত হয়, যে কারণে তাকে দোষি সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ দেওয়া হলেও তিনি সে সুযোগ গ্রহণ না করে নিশঙ্কচিত্তে চিরন্তন সত্য হিসেবে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করেন। এখনো এ মহান সক্রেটিস দর্শন জগতের নক্ষত্র হিসেবে সর্বত্র সমাদৃত।

হিপোক্রাটিস (খ্রিঃপূঃ ৪৬০-৩৭৫) ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের চিকিৎসাবিদ। তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক বলা হয়ে থাকে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে সততার সাথে চিকিৎসা প্রদানের যে উপদেশ তিনি আড়াই হাজার বছর আগে দিয়েছিলেন, তা আজও আধুনিক সমাজে অনুসৃত হয়ে থাকে। আজও পৃথিবীব্যাপী চিকিৎসকেরা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মহৎ উদ্দেশ্যে হিপোক্রাটিসের শপথ গ্রহণ করেন। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের বিজ্ঞানসম্মত কার্যকারণসম্পৃক্ত রোগ নির্ণয় পদ্ধতির উদ্যোক্তা। রোগের ক্ষেত্রে অলৌকিকতার অসারতা খণ্ডন করে বাস্তবসম্মত কারণ সন্ধানের উপর জোর দিয়ে চিকিৎসা শাস্ত্রকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাবার পটভূমি সৃষ্টি করেছিলেন। প্লেটো (খ্রিঃপূঃ ৪২৮- ৩৪৭) ছিলেন সক্রেটিসের শিষ্য। মূলত তার লেখনির মাধ্যমেই সক্রেটিস উদ্ভাসিত 1 তার পূর্ববর্তী দার্শনিকেরা ছিলেন প্রকৃতিবাদী। তিনি তার পূর্ববর্তী দার্শনিকদের মতাদর্শের সমালোচনা করে ভাববাদী দর্শনের অবতারণা করেন। তিনি মনে করতেন, দৃষ্টিগ্রাহ্য সত্তাই সর্বসত্য নয়-এর পেছনে আছে ভাব জগৎ। তিনি বহুল আলোচিত ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থের প্রণেতা। তার মতানুসারে, রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্ণিত হয় দাসশ্রমে। তিনি যে শ্রম বিভাজনের কথা বলেছেন তাতে শাসনের কাজটিকেই সর্বোত্তম কর্ম বলে মনে করতেন। শ্রমভিত্তিক উৎপাদনের কাজকে তিনি বরাবরই অধম কর্ম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। মনে করতেন, রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য সকলে উপযুক্ত নয়। যেহেতু দার্শনিকগণ প্রজ্ঞাবান, সেহেতু তারাই শাসনকার্য পরিচালনার উপযুক্ত। এ কারণে দার্শনিকদের তিনি রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে বিবেচনার পক্ষপাতি ছিলেন। তার বিবেচনায় দার্শনিক শাসকদের রুটি রুজির জন্য কোনো চিন্তা করতে হবে না। তাদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তিও থাকবে না। রাষ্ট্রের উন্মেষ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ব্যক্তির প্রয়োজনেই রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে। প্রয়োজনের তাগিদেই ব্যক্তির সমন্বয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা কী রূপ হবে, সে সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, এ ব্যাপারে সর্বাগ্রে আমাদেরকে শাসনের নীতি কি এবং ন্যায়শাসন কাকে বলে তা স্থির করতে হবে। যে কারণে ব্যক্তি চরিত্র বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। এ পর্যায়ে তিনি ব্যক্তি চরিত্রের তিনটি দিক চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা, বিক্রম এবং প্রবৃত্তির উপর আলোকপাত করেন। ব্যক্তি পর্যায়ের শাসনের নীতির ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, প্রজ্ঞা প্রবৃত্তিকে শাসন করে আর প্রজ্ঞাকে সহায়তা করে বিক্রম। ব্যক্তি পর্যায়ের শাসননীতির মতো রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোকে তুলনা করে বলেন, রাষ্ট্রীয় চরিত্রেরও তিনটি ভাগ। যার একভাগে প্রজ্ঞার আধিক্য, একভাগে বিক্রম এবং একভাগে প্রবৃত্তির আধিক্য। এখানে প্রজ্ঞার আধিক্য জ্ঞানীজন অভিজাতদের মধ্যে বিরাজমান। বিক্রমের আধিক্য শক্তিধরদের মধ্যে বিরাজমান এবং প্রবৃত্তির আধিক্য শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যে বিরাজমান। এভাবে তিনি প্রজ্ঞাবান দার্শনিক শাসকদের শাসনের স্বপক্ষে তার মতবাদ উত্থাপন করেছিলেন। তার চিন্তাধারা পরবর্তীতে ভাববাদী দর্শনের জগতে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। আজকের দিনে তার নির্দেশিত তত্ত্বসমূহ অনেকটা অলীক হিসেবে বিবেচিত হলেও ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থটি জ্ঞানান্বেষণের জন্য একটি অপরিহার্য জ্ঞানকোষ হিসেবে স্বীকৃত এবং চর্চিত।

এ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিঃপূঃ) আধুনিক সমাজে এখনো সদম্ভে বিরাজমান। তার প্রজ্ঞার কাছে পলিটিক্যাল জগৎ এখনো ঋণী। তিনি ছিলেন ইতিহাসখ্যাত গ্রিক সম্রাট আলেকজাণ্ডার দ্য গ্রেট-এর কিশোর বয়সের শিক্ষক। তার সময়েই গ্রিকদর্শনের চরম উৎকর্ষতা সাধিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন প্লেটোর উপযুক্ত শিষ্য। তাকে বলা হয় যুক্তিশাস্ত্রের পিতা। সত্তা, গুণ, সংখ্যা, সম্পর্ক, স্থান, কাল, অবস্থান ইত্যাদির জ্ঞান সূত্রগুলোর দার্শনিক ব্যাখ্যা তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন। দর্শন, প্রকৃতিবিদ্যা, যুক্তিশাস্ত্ৰ, জীববিদ্যা, মনোবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র, রাষ্ট্রনীতি এবং কাব্যরীতির সর্ব ক্ষেত্রেই অবাধে বিচরণ করেছেন এ মহামানব। তার রচিত ‘এথিকস’ এবং ‘পলিটিক্স’ সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে সর্বমহলে আজকের দিনেও সমাদৃত। ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে রাষ্ট্রের প্রকৃতি, রাষ্ট্রের উদ্ভব, উপাদান, নাগরিকদের শ্রেণিবিন্যাস, শাসনব্যবস্থা, সংবিধান, শাসনব্যবস্থার প্রকারভেদ, শাসক শাসিতের সম্পর্ক ও সংজ্ঞা, দাস ব্যবস্থার স্বপক্ষে যুক্তি, শাসন ব্যবস্থার অস্থিরতা, বিদ্রোহের সম্ভাব্য কারণ, বিদ্রোহ প্রতিরোধের উপায় ইত্যাকার বহুবিদ বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। তার বিধৃত মতবাদ আজও আধুনিক সমাজের জন্য অনেকক্ষেত্রে অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বিশেষত আইন সম্পর্কে তিনি যেমন বলেছেন, আইন যেখানে শাসন করে না, সেখানে কোনো শাসন ব্যবস্থার অস্তিত্বই থাকে না। তিনি মনে করতেন, সকলের উর্ধ্বে আইনের শাসন অত্যাবশ্যক। একটি আদর্শ রাষ্ট্রের অন্তরায় হিসেবে তিনি অসাম্যের কথা বলেছেন। অসাম্য প্রসঙ্গে সংখ্যাগত এবং গুণগত অসাম্যের কথা বলেছেন। এ অসাম্যের কারণে যে বিদ্রোহের সূচনা হয় সে কথাও তিনি যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৫ সালে এ্যারিস্টটল এথেন্সের লাইসিয়াম বাগিচায় তার দর্শনাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রায় আটশত বছর এ প্রতিষ্ঠান তার শিষ্যদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল। পরবর্তীতে গ্রিক সাম্রাজ্যের পতনের পর এ প্রতিষ্ঠানেরও অবলুপ্তি ঘটে। সে সাথে থমকে দাঁড়ায় জ্ঞানচর্চার প্রবহমান ধারা।

এপিক্যুরাস (খ্রিঃপূঃ ৩৪১-২৭০) ছিলেন বস্তুবাদী দার্শনিক এবং সুখবাদের প্রবক্তা। খ্রিস্টপূর্ব ৩১০ সালে তিনি মাইটিলেন নামক স্থানে তার দর্শনাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এপিক্যুরাস মনে করতেন, এমন পদ্ধতিতে জ্ঞানার্জন বাঞ্ছনীয় যদ্বারা সত্যিকার শান্তিময় জীবনধারণ সম্ভব। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণরূপেই নিরীশ্ববাদী, যে কারণে মনে করতেন মানুষের মন থেকে ঐশ্বরিক এবং পরকালের ভীতি দূর করা সম্ভব হলে সত্যিকার অর্থে সহিমানুষ এবং প্রশান্তির সমাজ গঠন সম্ভব। তিনি আরও মনে করতেন, পরকালের আত্মার শান্তির দুশ্চিন্তাজনিত কারণে মানুষ ইহকালের সুখ শান্তি বিনষ্ট করে দেয়।

ইউক্লিড (খ্রিঃপূঃ ৩৩০-২৭৫) জন্মেছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ায়। তিনি ছিলেন অঙ্কশাস্ত্রবিদ, জ্যামিতিক পণ্ডিত। গণিতশাস্ত্রের বিকাশে তার অবদান অপরিসীম। আজকের দিনে গণিতের যে বিকাশ তার ভিত্তিমূলে ইউক্লিডের ‘এলিমেন্ট অব জিওমেট্রি’। সিসেরো (খ্রিঃপূঃ ১০৬-৪৩) প্রাচীন রোমের একজন দার্শনিক এবং রাজনীতিক ছিলেন। সুবক্তা হিসেবেও তার সুনাম ছিল। তিনি ছিলেন সন্দেহবাদের সমর্থক। তিনি মনে করতেন, সত্য মিথ্যা নির্ণয়ের কোনো উপায় নেই। সিসেরো শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং গণতন্ত্রের সমন্বিত রূপকে উত্তম শাসনব্যবস্থা বলে মনে করতেন। জুলিয়াস সিজারের হত্যাকাণ্ডের পর হতভাগা সিসেরো রাজনৈতিক নৈরাজ্যের মধ্যে নিপতিত হয়ে ক্ষিপ্ত জনতা কর্তৃক নির্মমভাবে নিহত হন। এই প্রজ্ঞা প্রবাহের আর একজন অন্যতম অংশীদার ছিলেন মিশর দেশীয় হাইপেশিয়া। জন্মেছিলেন ৩৫১-৩৭০ খ্রিস্টাব্দের কোনো এক সময়, মৃত্যু হয়েছিল ৪১৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চে। এ মহিষীর বহুমাত্রিক প্রজ্ঞা, মুক্তচিন্তা, ধ্যান ধারণা কট্টরপন্থী ধর্মান্ধ পাদ্রীদের ক্ষুব্ধ করেছিল। তিনি তার পোটোনিক বিদ্যায়তনে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, দর্শন, যুক্তিবিদ্যার বিষয়ে শিক্ষা দান করতেন। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র নারী গণিতজ্ঞ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ধর্মের কল্পিত মতবাদগুলোকে তিনি যুক্তির মাধ্যমে অন্তঃসারশূন্য বলে প্রমাণ করতেন। পুরোহিতদের অবাস্তব বিষয়াদীর উপর আলোকপাত করে তিনি বিজ্ঞানের পথে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। তার ধর্মবিরোধী বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা চেতনার স্ফূরণের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মান্ধ পুরোহিতরা তার উপর যারপর নাই ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ধর্মীয় ষণ্ডারা এ মহিষীর অসম্ভব রূপবতী শরীরের চামড়া তুলে, পুরো দেহ টুকরো টুকরো করে আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করেছিল। ধর্মান্ধদের দ্বারা হাইপেশিয়ার হিরন্ময় মৃত্যুর সাথে সাথে নিভে গিয়েছিল গ্রিকো রোমান প্রজ্ঞাধারার শেষ আলোকবর্তিকা। একইসাথে পরবর্তীপর্যায়ে বর্বর গোথদের কোপানল থেকে নিজেদের রক্ষার্থে এথেন্স ও রোমের রোদেলা জ্ঞানবানরা মাতৃভূমি ত্যাগ করে আশ্রয় নিয়েছিল কনস্তান্তিনোপল ও বাগদাদে। এ সমস্ত প্রাজ্ঞদের পদচারণার প্রভাবে একদিকে বাগদাদে উদ্ভাসিত হয়েছিল প্রদীপ্ত প্রহর, অন্যদিকে হাজার বছরের জন্য পাশ্চাত্য হারিয়ে গিয়েছিল অন্ধকারের গহীন গহ্বরে।

গ্রিক, রোমান এবং আলেকজান্দ্রিয়ার বোধিবৃক্ষ উৎপাটিত হবার পর এ বৃক্ষ শাখা প্রশাখার ডানা মেলেছিল এশিয়ার পশ্চিম প্রান্তের অন্তরীক্ষে। এরও বহু আগে তাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস তীরবর্তী জনপদে উন্মেষ ঘটেছিল এক মহান সভ্যতার। সুমেরিয় এ সভ্যতার উর্বর মাটিতে বিকশিত হয়েছিল জেরোয়াস্ত্রবাদ (খ্রিঃপূঃ ৬০০ শতক)। এটি ছিল প্রচীন পারস্যের অন্যতম ধর্মীয় মতবাদ। এ মতবাদের তত্ত্বগত মৌলিক দিক ছিল সৎ এবং অসৎ-এর দ্বন্দ্ব। এই মতবাদীরা মনে করতেন, সৎ এবং অসৎ-এর দ্বন্দ্ব চিরন্তন। এই ঘরানার ধারকদের মতানুযায়ী আলো সততার প্রতীক এবং অন্ধকার হচ্ছে অসততার প্রতীক।

পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক ধর্মে এর প্রভাব লক্ষ্যণীয়ভাবে পরিদৃষ্ট হয়েছে। সময়ের কালপর্ব পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একে একে প্রবর্তিত হয়েছে আসমানি কিতাবভিত্তিক ইহুদি, খ্রিস্ট এবং ইসলাম ধর্মের। এ সমস্ত ধর্ম দর্শনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে সর্বসাধারণের জীবনাচার এবং চিন্তাজগৎ। ইসলাম ধর্মের বিকাশের কিয়ৎকাল পরে একে একে জন্ম নিয়েছেন বহুমাত্রিক প্রজ্ঞার অধিকারী অসংখ্য চিন্তাবিদ। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জাবির ইবনে হাইয়ান (৭২১-৮১৫ খ্রিঃ)। জাবের রসায়নের জনক হিসেবে সুবিখ্যাত। তিনি ছিলেন একাধারে রসায়নবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ, দার্শনিক এবং চিকিৎসক। আজকের বিজ্ঞানের বিকাশে তার অবদান অসামান্য। এ সময় জন্মেছিলেন আল ফারাবি (৮৭৩-৯৫০ খ্রিঃ)। আল ফারাবির পুরো নাম, আবু নসর মুহাম্মদ আল ফারাবি। ইসলামি দর্শন জগতে আল ফারাবিকে সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক বলে অবিহিত করা হয়। নবম এবং দশম খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে যে গ্রিক দর্শনের সূচনা হয়েছিল তার পুরোধা ছিলেন আল ফারাবি। তিনি প্লেটোর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’ এবং ‘লজ’-এর উপর নিজের চিন্তা চেতনা, অভিমতের সমন্বয় করেছিলেন। সে- সময়কালের পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা এবং সংগীতের উপর পারদর্শিতা অর্জন করে তিনি জ্ঞানের জগতে আলো ছড়িয়েছিলেন। এ ধারারই আরেকজন প্রাণপুরুষ ছিলেন আলবেরুনি (৯৭৩-১০৫০ খ্রিঃ)। আলবেরুনি পৃথিবীর অন্যতম বিজ্ঞানী, গবেষক এবং জ্ঞানসাধক হিসেবে সর্বমহলে সমাদৃত। তার প্রকৃত নাম, আবু রায়হান মুহম্মদ বিন আহমদ। জন্মেছিলেন মধ্য এশিয়ার খারিজমের খিবায়। রচিত পুস্তকের সংখ্যা ১৩৫- এর অধিক। তার লেখনির বিষয় ছিল—জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন দেশের ভৌগলিক তথ্য, গণিত পদ্ধতি, ধর্মবিশ্বাস ও আচরণ। এ ছাড়াও কাব্য উপন্যাস সাহিত্যের বহুমাত্রিক দিক তার লেখনিতে উদ্ভাসিত হয়েছে। এ সময় চিকিৎসা বিজ্ঞানে অর্জিত হয়েছিল অভাবিত সাফল্য। এ সাফল্যের চালিকাশক্তি ছিলেন ইবনে সিনা (৯৮০- ১০৩৭ খ্রিঃ)। বুখারায় জন্মেছিলেন অনন্য প্রতিভাধর এই চিকিৎসা শাস্ত্রবিদ। ‘পাশ্চাত্য জগতে তিনি ‘দি প্রিন্স অব দি ফিজিসিয়ান’ হিসেবে খ্যাত। সফল চিকিৎসক হিসেবেই শুধু নয়, তিনি ছিলেন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পথিকৃৎ। চিকিৎসাশাস্ত্র ছাড়াও কাজ করেছেন ফিজিক্স, লজিক, মেটাফিজিক্স এবং ম্যাথামেটিক্স-এর বলয়ে। এ ক্ষেত্রগুলোও তার গবেষণার প্রভাবে হয়েছিল উদ্ভাসিত। এ সময়কার আল গাজ্জালি (১০৫৮-১১১১ খ্রিঃ) নামটিও সর্বজনবিদিত। মুখ্যত ইসলামি বুজুর্গ হিসেবে সমাদৃত হলেও যুক্তি জগতে তার অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। আল গাজ্জালির পরিপূর্ণ নাম, আবু হামিদ মুহম্মদ আল গাজ্জালি। জন্মেছিলেন অধুনা ইরানস্থ তুশ-এর গাজলা গ্রামে। ধর্মীয় পণ্ডিত হিসেবে আবির্ভূত হয়েও অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির মাধ্যমে ধর্মকে ব্যাখ্যা করে এতদ্‌সংশ্লিষ্ট কুপমণ্ডুকতা দূরীভূতকরণে তিনি সরব ছিলেন। সে আঙ্গিকেই আবর্তিত হয়েছিল তার যুক্তিভিত্তিক ভাবনার জগৎ।

কাব্যিক ব্যঞ্জনার বদৌলতে যার নামটি আমাদের সমাজের সর্বত্র সমাদৃত, তিনি হলেন ওমর খৈয়াম (১০৪৮-১১৩১খ্রিঃ)। জন্মেছিলেন আধুনিক ইরানের নিশাপুরে। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গণিতজ্ঞ, দার্শনিক এবং জ্যোতির্বিদ। এ সমস্ত চিন্তাবিদেরা যে মুক্ত পরিবেশে সব কিছু ভাবতে পেরেছিলেন এমনটা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই অনেককে প্রবল প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। রাজকোপানল থেকে নিজেকে রক্ষার্থে অনেককে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। ওমর খৈয়ামের জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষণের মানমন্দিরটি মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধ শক্তির দ্বারা নির্মম তরিকায় ভস্মীভূত হয়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে তাকে তার গবেষণাগার ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। শত প্রতিকূল পরিবেশেও এই মুসলিম মনীষীদের জ্ঞানের জাহাজ এগিয়ে চলছিল প্রগতির পথে। অতঃপর ক্রসেডের কোপানলে পড়ে একে একে ধ্বসে পড়ে বিদ্যার স্তম্ভ। এর সাথে রাজশক্তির কুপমণ্ডুকতা যুক্ত হয়ে অবরুদ্ধ করে দেয় প্রজ্ঞার প্রবাহ। ক্রমে ক্রমে এথেন্সের মতো বাগদাদও একদিন আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে অন্ধকার চাদরের রুদ্ররোষে। প্রাচ্যের ম্যাচের কাঠি দিয়ে অন্ধকার দূর করে পাশ্চাত্য, সে আলোতে জন্ম নেয় রেঁনেসাঁস নামের আধুনিকতার পরিপুষ্ট শিশু। ধর্ম, বিজ্ঞান এবং যুক্তির দ্বান্দ্বিক প্রবাহে এগিয়ে চলে প্রগতির তরণী। আখেরে জয় হয় প্রগতির। ধর্মান্ধতার অন্তরালে জ্যোতিগৃহে জন্মগ্রহণ করেন গিওর্দানো ব্রুনো (১৫৪৮-১৬০০) প্রচলিত ধর্মীয় অপচেতনার বিরুদ্ধে ব্রুনোর চিন্তাধারা প্রবল চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছিল। তিনিই প্রমাণ করেছিলেন যে, সূর্য স্থির নয়। পৃথিবী ছাড়াও সৌরজগতে অসংখ্য জগতের অস্তিত্ব বিরাজমান বলে তিনি তত্ত্ব দিয়েছিলেন। তার এ সমস্ত বিজ্ঞানসম্মত ভাবনার সাথে ধর্মান্ধরা একমত হতে পারেনি, যে কারণে তাকে ধর্মীয় আদালতে বিচারের প্রহসনের মাধ্যমে কারারুদ্ধ করা হয় এবং দীর্ঘ আট বছর কারাবাসের পর পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। তারপরেও থেমে থাকেনি বিজ্ঞানের চিরায়ত সত্যতার সুতীক্ষ্ণ জ্ঞানধারা।

ইউরোপে, বিশেষ করে এথেন্সে এবং রোমে যে সময় জ্ঞানচর্চার অমিতধারা প্রবহমান ছিল, সে-সময় ভারতের অবস্থা কেমন ছিল, সেদিকে দৃপাত করলে দেখা যায়, এখানেও সে-সময় প্রজ্ঞার প্রবাহ কোনো অংশে কম ছিল না। আলোচনার প্রয়োজনে এদিকে একটু দৃষ্টি ফেরানো যেতে পারে। বাংলায় আজকে আমরা দর্শন বলতে যা বুঝি, তার উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত ‘দৃশ’ ধাতু হতে। এর অর্থ দেখা। এ দেখার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে আছে ইন্দ্রিয়জ্ঞান, প্রত্যক্ষণ এবং ধারণাগত জ্ঞান। দর্শনের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘ফিলসফি’ এবং আরবির অর্থ ‘হিকমত’। আভিধানিক অর্থ সমার্থক হলেও ইংরেজি ফিলসফির সাথে বাংলা দর্শনের কিছু মৌলিক প্রভেদ বিদ্যমান। মুখ্যত ফিলসফির গূঢ়ার্থ হলো, প্রজ্ঞার আলোকে সত্যানুসন্ধান, অনিসন্ধিৎসু কৌতূহলের সন্তুষ্টি সাধন। অপরদিকে ভারতীয়দর্শন সত্যের ব্যবহারিক উপলব্ধি প্রসূত। তদুপরি ভারতীয়দর্শনও জ্ঞানবিদ্যা, তত্ত্ববিদ্যা, নীতিবিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, মনোবিদ্যা সম্পর্কিত সমস্যাদির আলোকে আবর্তিত হয়েছে।

ভারতীয় চার্বাকদর্শন অতীব প্রাচীনদর্শন। প্রাচীন ভারতের বেদ, রামায়ন, মহাভারত এবং বৌদ্ধ মতবাদে এ দর্শনের উদ্ধৃতির দেখা পাওয়া যায়। এই চার্বাকদর্শনই আবার লোকায়তদর্শন নামে সমধিক পরিচিত। এ দর্শনের মাধ্যমে ইহজাগতিক সুখ ভোগের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। ইহলোকে যত বেশি সুখ লাভ করা যায়, ততই মঙ্গল বলে এ ঘরানার ভাবুকদের দৃঢ়ধারণা ছিল। এই লোকায়ত দর্শনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছিল মানুষের কামনা বাসনা সম্পৃক্ত চিন্তা চেতনার বৃত্ত। এ ঘরাণার দার্শনিকদের মতে, প্রত্যক্ষণই দর্শনের ভিত্তিমূল। চার্বাকরা কার্যকারণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। তাদের মতানুযায়ী, জগতে যা কিছু ঘটে থাকে তা আকস্মিকভাবেই ঘটে। কোনো ঘটনার মাধ্যমে অপর ঘটনা সৃষ্টি হতে পারে না। তারা দেহের অন্তঃস্থ চেতনার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। তারা মনে করতেন, আত্মা বলে কোনো কিছু নেই। তাদের মতানুযায়ী, পুরোহিতরা নিজেদের জীবিকার তাগিদে উপার্জনের নিমিত্ত ঈশ্বরকে সৃষ্টি করেছে। তারা এও মনে করতেন, মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে আত্মাসহ সকল সত্ত্বার বিনাশ সাধিত হয়। যে কারণে স্বর্গ, মুক্তি, আত্মা, পরলৌকিক ফলভোগ, ইত্যাকার ধারণা বা বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে অবান্তর। পুনর্জন্মেও তাদের কোনো আস্থা ছিল না। প্রত্যক্ষণই যেহেতু জ্ঞানের একমাত্র উৎস সেহেতু তার সত্ত্বাও শুধু জড়জগৎ। চার্বাকদর্শন মানুষের অন্ধবিশ্বাস এবং কু সংস্কারের বিরুদ্ধে কুঠারাঘাত করেছিল। পুরোহিততন্ত্রের প্রতারণার খপ্পর থেকে এ দর্শন সাধারণ মানুষকে মুক্তির পথ দেখাতে চেয়েছিল, কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এ মত ও পথের অনুসারীরা এ উপমহাদেশে ব্যাপক প্রভাববিস্তার করতে পারেনি। যদি পারত, তাহলে বিশ্বের ইতিহাস আজকে হয়তো বা অন্যভাবে লিখিত হত।

উপমহাদেশের উর্বর মাটিতে ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে জন্ম নিয়েছে বিভিন্ন ধর্ম এবং মতবাদ। বিভিন্নাঞ্চল থেকে আগত আগ্রাসী শক্তি কলুষিত করেছে এখানকার চিরায়ত জীবনধারা। পদানত করেছে এখানকার সহজ সরল জনগোষ্ঠীকে। রামরাজত্বের নামে সৃষ্টি করেছে বিভাজিত সমাজ। যে সমাজে ধিকৃত হয়েছে সৃষ্টিশীল শ্রমিকেরা, বাহুবল এবং চাতুর্যের মাধ্যমে পরজীবীরা হয়েছে সমাজের সম্ভ্রান্ত সন্তান। জন্ম দিয়েছে Rent Seekar Class. ভাবনা জগতকে বোঝার জন্য উপমহাদেশের ধর্মীয় চিন্তাচেতনার দিকে আলোকপাত করা আবশ্যক।

এতদঞ্চলে পুরো প্রজ্ঞার ধারাই পরবর্তীতে আবর্তিত হয়েছে ধর্মকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে যে সমস্ত ধর্মমত এ সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছিল, তার অন্যতম ছিল জৈন ধর্ম। জৈনদর্শনের প্রবক্তা মহাবীরের জন্ম হয় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। ‘জিন’ শব্দ থেকে জৈন শব্দের বুৎপত্তি। জিন বলতে বোঝানো হয়েছে বিজয়ী। এ বিজয় রাগ, দ্বেষ, কামনা, বাসনা জয়ের। যদ্বারা মানুষ অপার আনন্দের অধিকারী হতে পারে বলে তাদের বিশ্বাস। জৈনরা বস্তু জগতের সত্ত্বায় বিশ্বাসী বলে তারা বাস্তববাদী। কালক্রমে জৈনরা শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর, এ দু ধারাতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শ্বেতাম্বরেরা ছিলেন উদার প্রকৃতির। তারা মনে করতেন সন্ন্যাসীদের শ্বেত বস্ত্রপরিধান করা উচিৎ। অপরদিকে দিগম্বরেরা মনে করতেন, সন্ন্যাসীদের নগ্ন থাকা উচিৎ। তাদের কোনো সম্বল থাকা উচিৎ নয়। জৈনদের মতানুযায়ী, যে ধারণায় কোনো সন্দেহ সংশয় থাকে তা যথার্থজ্ঞান নয়। এ ঘরানার তাত্ত্বিকেরা মনে করতেন, জ্ঞাতবস্তুর সাথে যখন জ্ঞাতার যথার্থ পরিচয় ঘটে, তখনই প্রকৃতজ্ঞানের উৎপত্তি ঘটে। জৈনরা বরাবরই অহিংসপন্থার ধারক, বিস্তৃত পরিসরে তারা অহিংসার ধারণা অনুসরণের প্রত্যাশী। তারা মনে করতেন, প্রত্যেক জীবেরই তার নিজের মতো করে অন্যের মূল্যায়ন করা উচিৎ। এ কারণেই তারা আলেকজান্ডারের সঙ্গে তর্কে অবতীর্ণ হতে দুঃসাহস দেখাতে পেরেছিল। ঐতিহাসিক আরিয়ানের বিবরণে জানা যায়, আলেকজান্ডার একদিন একদল জৈনদার্শনিককে এইমর্মে প্রশ্ন করেছিলেন যে কেনো তারা তার মতো একজন বিশাল রাজ্যজয়ীর প্রতি এত কম মনোযোগ প্রদান করছেন। এর উত্তরে জৈন দার্শনিকরা বলেছিল, ‘রাজা আলেকজান্ডার! প্রতিটি মানুষের অধিকারে ততটুকু ভূমি থাকে, যতটুকুর উপর সে দাঁড়িয়ে আছে। তুমিও আমাদের মতো একজন মানুষ ছাড়া কিছু নও। শুধু তফাৎ এই যে, তুমি সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাক কিন্তু তোমার দ্বারা কোনো মঙ্গল হয় না, তুমি তোমার নিজের দেশ ছেড়ে বহুপথ অতিক্রম করে এসেছ, কিন্তু তুমি নিজের কাছেও এক আপদ, অন্যদের কাছেও…তুমি শীঘ্র মারা যাবে, তখন তুমি ততটুকু জমিই পাবে যতটুকু তোমাকে সমাধিস্থ করতে লাগবে। এত উন্নত ভাবধারার ধারক হয়েও চূড়ান্ত পর্যায়ে জৈনরা এ সমাজে তেমন কোনো প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়নি। বৌদ্ধ এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রভাবে একসময় তারা ম্রিয়মান হয়ে যায়। বলা যেতে পারে, প্রজ্ঞার প্রবাহ থেকে এক পর্যায়ে এরা অপসৃত হয়েছে বা হারিয়ে গেছে।

বৌদ্ধ ধর্মের মর্মবাণীও অনেকটা জৈন ধর্মের মতো, এখানেও অহিংসার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কঠোর সাধনার পর বৌদ্ধ চারটি চিরন্তন সত্যের সন্ধান লাভ করেন। এ চারটি সত্য হলো—১. জীবনে দুঃখ আছে ২. দুঃখের কারণ আছে ৩. দুঃখের নিবৃতি আছে ৪. দুঃখ নিবৃত্তির উপায় বা পথ আছে। দুঃখ নিবৃত্তির উপায়সমূহকে বৌদ্ধরা বলে থাকেন অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এ অষ্টাঙ্গিক মার্গ হলো—১. সম্যক দৃষ্টি ২. সম্যক সংকল্প ৩. সম্যক বাক ৪. সম্যক কর্মান্ত ৫. সম্যক আজীব ৬. সম্যক ব্যয়াম ৭. সম্যক স্মৃতি ৮. সম্যক সমাধি। এ আটটি উপায় অনুসরণের মাধ্যমে অজ্ঞতা দূরীকরণের মাধ্যমে নির্বাণ লাভ সম্ভব বলে তারা মনে করতেন। মূলত নৈতিকতাকে কেন্দ্র করেই বৌদ্ধের দর্শনজগৎ আবর্তিত। ঐশ্বরিক অস্তিত্বের প্রসঙ্গে গৌতম বুদ্ধ সবসময় নিশ্চুপ থেকেছেন। যে কারণে অনেকের বিবেচনায় বৌদ্ধ মতবাদ নিরিশ্বরবাদী বলে মূল্যায়িত হয়েছে। পরবর্তীকালে বৌদ্ধদের একটি অংশ গৌতম বুদ্ধকেই ভগবান হিসেবে চিহ্নিত করে, সে মোতাবেক ভক্তি প্রদর্শন করতে থাকে। এ ধারার অনুসারীরা নিজেদের মহাযান বলে আখ্যায়িত করে বিপরীত গোষ্ঠীকে হীনযান হিসেবে আখ্যায়িত করে। সার্বিক বিবেচনায় দেখা যায়, বিশ্বপ্রেম এবং বৈশ্বিক কল্যাণই বৌদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে প্রতিভাত। সর্বজীবে দয়া প্রদর্শনের উপদেশের মাধ্যমে একটি অহিংস পৃথিবীর স্বপ্নই ছিল এ দর্শনের মূলভিত্তি। এদের মাধ্যমেই বিকশিত হয়েছে ন্যায়দর্শন। পরিতাপের বিষয় শ্রেণি বিভাজিত সমাজে এরা টিকে থাকতে পারেনি। সনাতন ধর্মাম্বলম্বী এবং পরবর্তীকালের মুসলিম শাসকদের কোপানলে পড়ে এদেরকে স্বীয় ভূমি পরিত্যাগ করে চলে যেতে হয়। আজকের আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের বৃহদাংশে এক সময় যে সমৃদ্ধ বৌদ্ধসভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তার ছিটেফোঁটাও আজ আর অবশিষ্ট নেই। ভারত এবং বাংলাদেশেও তারা এখন নগণ্য সংখ্যালঘু হিসেবে কালাতিপাত করছে। স্বদেশে ঠাঁই না হলেও চায়না, জাপান, কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ায় এখনো এ ধর্মমত প্রাধান্যবিস্তারকারী অন্যতম অহিংস ধর্ম হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

এছাড়াও উপমহাদেশে ব্যাপক পরিসরে বিস্মৃতি লাভ করেছিল, বহুবিদধারার বেদান্ত দর্শন, এ সমস্ত দর্শনে জগৎ, আত্মা, সত্যতা, ভ্রান্তি, আত্মার বন্ধন, আত্মার মুক্তি কর্মযোগ জ্ঞানযোগ-এর উপর আলোকপাত করা হয়েছিল। সার্বিকভাবে ভারতীয় দর্শনে—ব্যবহারিক দিকের উপর গুরুত্বারোপ, দুঃখবাদ এবং আশাবাদ, সনাতন নৈতিক নিয়মে বিশ্বাস, অজ্ঞানতা হেতু দুঃখ লাভ, সত্য উপলব্ধির নিমিত্ত ধ্যানমগ্নতা, আত্মসংযম, মোক্ষের সম্ভাবনায় আস্থা, জন্মান্তরবাদে আস্থা, আধ্যাত্মিকতায় আস্থা ইত্যাকার বিষয়াদির সাক্ষাৎ মেলে। এখানে আস্তিকতা ও নাস্তিকতা দুটি পরস্পর বিরোধী ধারা হিসেবে চিহ্নিত। বস্তুত চার্বাকদর্শন ব্যতীত ভারতীয় সকল দর্শনই আধ্যাত্মিকতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত। এ প্রভাবেই রচিত হয়েছে উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, মনুসংহিতা, ঋগবেদ জাতীয় ধর্মীয়দর্শনভিত্তিক পুস্তকাদি। গ্রিক দাস সমাজের মতো এখানকার বর্ণভিত্তিক বিভাজিত সমাজে শ্রমজীবী শূদ্ররা হয়ে পড়ে অবহেলিত, ঘৃণিত এবং সমাজের দৃষ্টিতে অপাঙ্ক্তেয়।

রোম, এথেন্স এবং ভারতীয় উপমহাদেশ যে সময় জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন ছিল, সে-সময় হিমালয়ের ওপারেও চলছিল জ্ঞানান্বেষণ। এই জ্ঞানান্বেষণের পুরোধা ছিলেন কনফুসিয়াস (খ্রিঃপূঃ ৫৫১-৪৭৯)। যার মতবাদ আজও কনফুসিয়াজম বলে বিশ্ববলয়ে সুপরিচিত। কনফুসয়াস নামটি পর্তুগিজদের দেওয়া। তার প্রকৃত নাম প্রভু খুং। তার উপদেশাবলিই তার মতবাদ হিসেবে সমাদৃত। প্রাচীন চীনের অচল সমাজ ব্যবস্থার নৈরাজ্য থেকে মুক্তিলাভের প্রত্যয়ে তিনি যে সমস্ত উপদেশ দিয়েছিলেন তা আজও চীনাদের সমাজে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ইন্দোচীন এলাকার আর্থসামাজিক জীবন ব্যবস্থায় তার প্রভাব এখনো অপরিসীম। মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনাচার কি হওয়া উচিৎ, সে সম্পর্কে তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন—রাজা, প্রজা, পতি, পত্নী, পিতা-পুত্র, জ্যেষ্ঠ-কণিষ্ঠের ভিত্তিতেই এ সমাজ ব্যবস্থা আবর্তিত। একাদশ এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে এসে চুশি নামের এক কনফুসিয়াস অনুসারী নব আঙ্গিকে তার মতবাদ প্রচার করেন। এই নব্য কনফুসিয়াসপন্থীরা মনে করতেন—’লি’ এবং ‘চি’-এর দ্বন্দ্বের প্রভাবেই সমাজ জীবন আবর্তিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ‘লি’ বলতে বোঝানো হয়েছে ভাব এবং ‘চি’ বলতে বোঝানো হয়েছে বস্তু।

তাদের মতানুয়ায়ী ‘লি’-এর কারণেই মানুষের মধ্যে মহত্বের সৃষ্টি হয় আর ‘চি’-এর কারণে মানুষ লোভ, মোহ এবং জাগতিক সুখের কাছে নিজেকে সমর্পিত করে থাকে।

জ্ঞানপ্রবাহের এই ধারাবাহিকতায় চীনের মাটিতে জন্মেছিলেন সুনজু (খ্রিঃ পূঃ ২৮৯-২৩৮)। তিনি ছিলেন চীনের অন্যতম বস্তুবাদী দার্শনিক। প্রচলিত চিন্তাধারার বিরুদ্ধে তিনি বলেছিলেন, ইন্দ্রিয়লব্ধ অনুভূমির মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে থাকে। তিনি মনে করতেন, শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ শুধু মুক্তিলাভ করতে পারে। চীনের আর্থসামাজিক জীবনে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তার দর্শনের প্রভূত প্রভাব বিরাজমান ছিল। এ ধারারই আরেকজন ছিলেন ইয়াং চু (খ্রিঃপূঃ ৩৯৫-৩৩৫)। তিনি মনে করতেন, জন্ম এবং মৃত্যু মানব জীবনের অনিবার্য পরিণতি। যা কিছুর জন্ম আছে তার মৃত্যু হবেই, এমনটাই তিনি মনে করতেন। মৃত্যুর পরে কি ঘটবে সে অজ্ঞাত বিষয়ের প্রতি আলোকপাত না করে বর্তমানের কামনা বাসনার আলোকে জীবনকে উপভোগের পন্থার উপরই তিনি সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন।

মেং জু (খ্রিঃপূঃ ৩৭২-২৮৯) ছিলেন কনফুসিয়াসের অনুসারি। তিনি মনে করতেন, জ্ঞানের উন্মেষ হয় যুক্তি এবং প্রজ্ঞায়। মানুষকে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছিলেন। তার বিবেচনায় সকল মানুষই উত্তম। তিনি বিশ্বাস করতেন জন্মগতভাবে মানুষ মহৎ। ওয়াং চুং ( ২৭-১০৪) ছিলেন প্রাচীন চীনের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক। তিনি ভাববাদী সত্ত্বা পরিহারকল্পে ঐশ্বরিক চিন্তা চেতনার পরিবর্তে বস্তু সত্ত্বার উপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন মানুষই সভ্যতার নিয়ামক শক্তি, যার উত্থান পতনের দিকটিও তিনি উল্লেখ করেছিলেন। তার মতানুযায়ী, সভ্যতার উন্মেষ সমৃদ্ধি এবং ক্ষয় অনিবার্য। এ চক্রাবর্তেই মানবসমাজ প্রতিনিয়ত আবর্তিত। এছাড়াও চৈনিক সমাজে জন্ম নিয়েছিল তাওইজম। আস্তিক নাস্তিক বিতর্কে এখানেও দ্বন্দ্বমুখর হয়েছিল ভাবনা জগৎ

এতসব বর্ণিল ঐতিহ্যের পরেও চূড়ান্ত পর্যায়ে এশিয়সমাজ এগিয়ে যেতে পারেনি। কেন, কোন কারণে এশিয়সমাজ বিজ্ঞানের নাগাল পায়নি তা নিয়ে আজও বিস্তর গবেষণা চলছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে এখনো কোনো স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্তে ঐকমত্য হতে পারেনি। এ সমস্ত বিতর্কের সারবত্তা যা-ই থাকুক না কেন বাস্তবতা হলো, ইউরোপ বিজ্ঞানের স্ফূরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল এবং সে নিরিখেই পরবর্তী পৃথিবী আবর্তিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।

পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতে যখন মহেঞ্জোদারো, হরপ্পার মতো জনপদের বিকাশ ঘটেছিল, তখন ইউরোপের অনেক অঞ্চলের মানুষ বনে-বাদাড়ে আদিম জীবনযাপন করত। সমাজ বিবর্তনের ধারায় পশুশিকার করে জীবন-ধারণের পর্যায়ে ছিল ওখানকার কোনো কোনো এলাকার সামাজিক অবস্থান। পরবর্তী পর্যায়ে উপমহাদেশের মৌর্যরা যখন বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল তখন ইউরোপের এক বিশাল এলাকা ছিল রোমানদের উপনিবেশ। এছাড়া ভারতে যখন বৌদ্ধদের বিশ্ববিদ্যালয়তুল্য বিহারগুলোতে জ্ঞানের চর্চা হত তখন পশ্চিমের সংকীর্ণ পরিসরে বিদ্যালয়েরও অস্তিত্ব ছিল না। সামাজিক ব্যবস্থাসহ উৎপাদনের নানাবিধ উপকরণের ক্ষেত্রে উপমহাদেশ ছিল অনেক অগ্রগামী। গ্রিক সাম্রাজ্যের কর্ণধার খোদ আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এ উপমহাদেশ আক্রমণের পর নানা ধরনের রত্ন সম্ভার নিয়ে ফিরে যাবার সময় ২৩০০০০ উন্নতমানের গরু নিয়ে দেশের পথে ফিরেছিলেন। লুণ্ঠনকৃত ষাঁড়ের মধ্যে যেগুলো সর্বোৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত হয়েছিল, সেগুলো চাষাবাদের কাজে ব্যবহার করার জন্য নিজের দেশ মেসিডোনিয়ায় প্রেরণ করেছিল। শিক্ষা দীক্ষা ব্যবসা বাণিজ্য এবং জ্ঞান গরিমাতেই শুধু নয়, এ উপমহাদেশ যে কৃষিকাজের অত্যাবশ্যকীয় পশু তথা ষাঁড়ের ক্ষেত্রেও পাশ্চাত্যের চেয়ে অগ্রসর ছিল, এই গরু চুরি তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। সেই সুদূর অতীত থেকে সূচিত হয়েছে উপমহাদেশকে লুণ্ঠন করার মচ্ছব। মাঝের হাজার বছর বিরতি দিয়ে পরবর্তী হাজার বছর পশ্চিমের আক্রমণকারী আগ্রাসীরা শুধু নিয়েই গেছে। কখনো আর্য, কখনো পাঠান, কখনো তুর্কী, কখনো মোগল, কখনো পর্তুগীজ, কখনো আর্মেনিয়রা এদেশে এসেছে আর অবাধে লুণ্ঠন করেছে এখানকার ধন সম্পদ। কেউ কেউ এ মাটিতে গ্রোথিত করেছে নিজেদের ঠিকানা। এ চলমান প্রক্রিয়ারই এক পর্যায়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এখানে এসে হাজির হয়েছে ইংরেজের দল।

আজকের তথাকথিত সুসভ্য ইংরেজ জাতির আদি পূর্বপুরুষেরা দ্রয়িত নামে পরিচিত ছিল। তারা ছিল প্রকৃতি পূজারি হিদেন ধর্মাবলম্বী। বনে জঙ্গলে তাদের বিচরণ সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যান্য আদিম জনগোষ্ঠীর মতো এদের সমাজেও চালু ছিল নরবলি প্রথা। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫ সালে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের ব্রিটেন দখলের পর থেকে এখানে সভ্য জীবনের সূত্রপাত হয়। পরবর্তী সময়ে সন্ত আগাস্টাইন খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য ক্যান্টারবেরিতে আস্তানা গাড়েন এবং হিদেনদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেন। এভাবে রোম সাম্রাজ্যের প্রভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করে এবং খ্রিস্ট ধর্মের সান্নিধ্যে এসে মনোজগতের বিকাশ সাধন করে, আদিম জীবনযাপনে অভ্যস্ত দ্রয়িতরা ক্রমান্বয়ে সভ্য জগতের মানুষে পরিণত হয়।

আমাদের উপমহাদেশে সম্রাট অশোক যখন বিশাল এক সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে রাজ্য শাসন করতেন। কালিঙ্গায় যখন বিকশিত রাজশক্তি প্রজাপালনের রাজধর্মের মাধ্যমে শাসনকার্যে নিমগ্ন, তখন ইউরোপের অনেক এলাকায় সাম্রাজ্য তো দূরের কথা কোনো ক্ষুদ্র রাজশক্তিও বিকশিত হয়নি।

তার পরও রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপের লোকেরা বিভিন্ন ঘাত- প্রতিঘাত পেরিয়ে একটি শাসন কাঠামো বা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। প্রাচ্য অনেক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য নিয়েও স্থায়ী শাসনকাঠামো, রাষ্ট্র এবং আধুনিক সমাজ গড়ে তুলতে পারেনি। বাংলার শাসকদের ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে দেখা যায়, মহাভারতে বর্ণিত দ্রৌপদীর স্বয়ংম্বর সভায় বঙ্গের চন্দ্র সেন, পুণ্ড্রের বাসুদেব ও তাম্রলিপির রাজা উপস্থিত ছিলেন। এতে প্রতীয়মান হয় যে মহাভারতে বিধৃত ঘটনাবলি সংঘটনকালেও বাংলায় শাসক এবং রাজসিংহাসনের অস্তিত্ব পুরো মাত্রায় বিরাজমান ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর ভারত আক্রমণের সময়ও গঙ্গাঋদ্ধি রাষ্ট্রের সরব উপস্থিতি সর্বজনবিদিত। এরপর ৫০৭ সালে সামন্তরাজা বৈন্যগুপ্ত, ষষ্ঠ শতকে শশাঙ্ক, সপ্তম শতকে কুমিল্লাঞ্চলে দেব বংশের শাসকদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। সনভিত্তিক শাসনকালের খতিয়ান পাওয়া যায় পরবর্তী শাসক গোপালের (৭৫৬-৭৮১) শাসনকাল থেকে। পালদের শেষ রাজা মদন পাল ১১৭০ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। পালদের সময় বাংলায় সমৃদ্ধি উৎকর্ষের শিখরে উপনীত হয়েছিল। এক্ষেত্রে যে বিষয়টি আমাদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো, ভারতীয় সংস্কৃতির যে প্রভাবের কথা ইতিহাসে বিধৃত, তা ছিল প্রকৃতঅর্থে বাঙলার প্রভাব। কারণ, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তৎকালীন ভারতের বঙ্গ দেশেরই নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সে-সময় পালরাজাদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ধর্মপ্রচারের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। পশ্চিমের দিকে খলিফা হারুন উর রশিদের সাথে পালরাজারা যেমন বাণিজ্যিক ও কূটনেতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, তেমনি তিব্বতসহ পূর্বাঞ্চলের চীন, জাপান এবং সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সাথে গড়ে তুলেছিল সামাজিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। এ সমস্ত এলাকায় সওদাগররা যেমন উড়িয়েছিল বাণিজ্যিক তরণীর রাঙাপাল, তেমনি ভিক্ষুরা নিয়ে গিয়েছিল বুদ্ধের অহিংসার বাণী। এ সবই সাধিত হয়েছিল পালদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। এই অগ্রাভিযানের কালপর্বে এক সময় তারা উপনিবেশও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। শ্রী বিজয়া বা শৈলেন্দ্ৰ সাম্ৰাজ্য বলয়ের জাভা, সুমাত্রা এবং মালয় ছিল পালদের ঔপনিবেবেশিক এলাকা। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, নিজ দেশের বিদ্যার্থীদের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ প্রদানার্থে শৈলেন্দ্ররাজ বালপুত্র দেবকর্তৃক পাল রাজাকে অনুরোধ জ্ঞাপন করা হয়েছিল। সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে রাজা দেবপাল শৈলেন্দ্ররাজের বিদ্যার্থীদের অনুকূলে পাঁচটি গ্রাম বরাদ্দ দিয়ে তাদের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যার্জনের সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

এত সমৃদ্ধির অধিকারী হয়েও পালরা এক সময় ইতিহাসের ঘূর্ণাবর্তে ছিটকে পড়ে, পালদের পদানত করে ১১৬০ সালে বল্লাল সেন এসে সেন যুগের সূচনা করেন। সনাতন ধর্মাবলম্বী সেন শাসকগণ বেশিদিন রাজ্যশাসন করতে পারেননি। সেন বিদ্বেষী বৌদ্ধ শ্রমণদের পরোক্ষ মদদে আফগান ভবঘুরে বখতিয়ার খিলজি ১০ মে ১২০৫ সালে সেন রাজ্য দখল করে মুসলিম জমানার সূচনা করেন। এর পরের ইতিহাস মোটামুটি সকলের জানা।

ইউরোপে যখন ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং পিউরিটানদের হানাহানি কাটাকাটি চলছিল, তখন উপমহাদেশে শিয়া সুন্নিদের রাজত্ব চললেও আন্তঃধর্মীয় সংঘাত কিংবা হিন্দু, বৌদ্ধ এবং মুসলিমদের কোনো ধর্মীয় বিবাদ বিসম্বাদ হয়নি। এখানে একটি স্বতন্ত্রধারার শাসক শ্রেণির বিকাশ ঘটেছিল। এখানকার শাসনকাজ বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন জবর দখলকারী নবাক-সুলতান-বাদশাহদের দ্বারা পরিচালিত হলেও, দুর্ভাগ্যজনক যে ইউরোপের মতো রাজতত্তের এবং রাজরক্তের ধারাবাহিকতা কখনো সংরক্ষিত হয়নি।

স্থান কাল পাত্র ভেদে ইউরোপে বরাবরই রাজরক্ত বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে বা বিবেচিত হয়েছে। স্কটল্যান্ড, নেদারল্যান্ড বা জার্মান থেকে আমদানিকৃত রাজারাও নির্দ্বিধায় ইংল্যান্ডের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে। ফলে রাজতন্ত্র একটি সংগঠন হিসেবে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিকশিত হতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু আমাদের উপমহাদেশে এমনটা ঘটেনি। কে কখন সিংহাসনে বসবে, আর কে কখন উৎখাত হবে তা অনেকটা অনিশ্চিত ছিল। সে কারণে দেখা যায়, ক্ষৌরকার কিংবা তার পুত্র কর্তৃক যে নন্দবংশের উন্মেষ ঘটেছিল, সেই রাজবংশের মহাপ্রতাপশালী মহাপদ্ম নন্দের মতো রাজাকে অমাত্য কৌটিল্যের কোপানলে পড়ে সবংশে নিশ্চিহ্ন হতে হয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে পুরো ভারতের একচ্ছত্র অধীশ্বর হয়েও মৌর্যরা মাটির সাথে মিলিয়ে গিয়েছিল। সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পরে ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে গেছে মৌর্যরা। মাঝে মাঝে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে দাসগণও বীরদর্পে রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণ জনগণ এ নিয়ে কখনো মাথাও ঘামায়নি। কে কখন রাজা হলো, কে রাজত হারিয়ে পথের ফকির হলো, এ নিয়ে প্রজা সাধারণের মধ্যে কখনো কোনো উদ্বেগ উদ্দীপনা কাজ করেনি। ইতিহাসের এই উৎক্রমণের সময়, প্রাচ্যের চিন্তা চেতনার পরিধি ও বিকাশও ছিল অনেকটা ভাববাদী ধারায় আচ্ছন্ন। ফলে বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক ধ্যান ধারণা বিকশিত হতে পারেনি। যতটা প্রজ্ঞা নিয়ে পণ্ডিততেরা কামশাস্ত্র বিষয়ক বিতর্কে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছিল, ততটা প্রজ্ঞার ছিটেফোঁটা দিয়েও জ্যোতিষশাস্ত্র কিংবা অঙ্কশাস্ত্র সাধনা করতে পারেনি। মুষ্টিমেয় যারা জ্ঞানের লণ্ঠন জ্বালিয়েছিল তারাও কালের প্রবাহে হারিয়ে গেছেন।

অন্যদিকে সিংহাসন নিয়ে দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম, ধর্ম নিয়ে বিবাদ চলাকালেও পশ্চিমের জ্ঞান বিজ্ঞান, পড়াশোনার কোনো ব্যঘাত ঘটেনি। প্রগতির চাকা তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে গেছে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কবে থেকে যাত্রা শুরু করেছে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলা বেশ কঠিন। তবে সাক্ষ্য প্রমাণে প্রমাণিত যে, ১২০৯ সালেও এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি রাজন্যদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। সে হিসেবে এর প্রাচীনত্ব নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ইংল্যান্ডে যখন রাজতন্ত্র অনিশ্চিত পথে হাঁটছিল। শক্তভিত্তির উপর দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। তখনো সেই ১২৯৪ সালের কাল পর্বে অক্সফোর্ডের কুইন্স কলেজ, মডলিন কলেজ, মার্টন কলেজসহ আরও অন্যান্য কলেজে গ্রামার, লজিক, মিউজিক, জিওমেট্রি, ফিলসফি, এ্যাস্টোনমি, ম্যাথামেটিকস, আইন, চিকিৎসা, মরালিটি ও ধর্মসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানচর্চা হত। এ সমস্ত বিদ্যা শেখার জন্য শিক্ষার্থীদের সাত বছরের কোর্সসম্পন্ন করতে হত। যেহেতু এসব বিদ্যার বেশিরভাগ বই পুস্তক ছিল ল্যাটিন ভাষায় রচিত, সেহেতুে পড়াশোনার মাধ্যম ছিল ল্যাটিন এবং স্থানীয় ছাত্রদের বিশেষ বিষয় অধ্যয়নের প্রারম্ভে ল্যাটিন ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করতে হত। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে বিদ্যায়তনগুলোতে ল্যাটিনের পরিবর্তে ইংরাজি ভাষার চল প্রবর্তিত হয়। অথচ এ সময়কালের অনেক আগে থেকে ভারতবর্ষের কান্দাহার থেকে আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় বৌদ্ধদের শত শত মঠ ও বিহার ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এ সমস্ত মঠ ও বিহারগুলো ধর্মীয় ধ্যান-সাধনার সাথে সাথে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারেও অনবদ্য ভূমিকা পালন করত। তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন নানাজাতি, ধর্ম, বর্ণের ছাত্ররা বিদ্যার্জনের জন্য পদার্পণ করত। ওখানে পাঠগ্রহণের জন্য সীথিয়ান, ইউয়েচি, ইরানি, বাকট্রিক, গ্রিক, তুরানি এবং চৈনিক শিক্ষার্থীরা নিয়মিত হাজির হত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভিন্ন ধর্মের শাসককুলের কোপানলে পড়ে গৌরবময় এ সমস্ত স্থাপনা কালের কালো স্রোতে ধ্বংস হয়ে যায় বা ধ্বংস করা হয়। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আলোকপাত করলে দেখা যায়, গুপ্ত শাসনামলে সম্রাট দ্বিতীয় কুমার গুপ্তের সময় ৪২৭ খ্রিস্টাব্দে অধুনা পাটনার ৮৮ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্ব প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বমানের এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মশাস্ত্র ছাড়াও পড়ানো হত চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত, রাজনীতি, চিত্রকলা এবং সমরবিদ্যা। এখানে শিক্ষা প্রদানে নিয়োজিত ছিলেন নাগার্জুন, অশোরা, সন্তরক্ষিত, রাহুল ভদ্র, কমলশীল, পদ্মসম্ভবা এবং অতীশ দীপংকরের মতো আলোকিত পণ্ডিতগণ। বলাবাহুল্য অতীশ দীপঙ্কর ছিলেন এ বদ্বীপের গৌরব। তিনি জন্মেছিলেন বঙ্গদেশের বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলায়। এ সমস্ত পণ্ডিতদের কাছে দীক্ষা গ্রহণার্থে তিব্বত, চীন, জাপান, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, গ্রিক, তুরস্ক এবং পারস্য হতে শিক্ষার্থীরা নালন্দাতে পদার্পণ করত। প্রখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এই বিদ্যায়তনে পাঁচ বছর অবস্থান করে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। ১৪ হেক্টর জমিতে গড়ে উঠেছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো স্থাপনা। অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই বিশ্ববিদ্যালটি ছিল সম্পূর্ণরূপে আবাসিক। এখানে অধ্যয়ন করত প্রায় ১০ হাজার বিদ্যার্থী, শিক্ষকের সংখ্যা ছিল দুই হাজার। আটটি স্বতন্ত্র ক্যাম্পাসে বিভক্ত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল নয়তলা বিশিষ্ট সুবিশাল লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরিতে শিক্ষার্থীদের জন্য মজুদ ছিল নয় লক্ষ পুস্তক এবং পাণ্ডুলিপি।

ভারতে জাতিভেদ প্রথা তথা বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল বৌদ্ধদের, ফলশ্রুতিতে উন্মেষকাল থেকেই বৌদ্ধদর্শনের অহিংসার পথিকৃৎদের প্রবল প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে অগ্রসর হতে হয়েছিল। এহেন পরিবেশে জ্ঞানার্জনের এ পবিত্র স্থাপনাটি উন্মেষের উষালগ্ন থেকেই কট্টর ব্রাহ্মণদের কোপানলে পড়েছিল এবং ৪৫৫- ৪৬৭ খ্রিস্টাব্দে আগ্রাসী মিহিরাকুলার হামলার শিকার হয়েছিল। এ পর্যায়ে গুপ্ত সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় এটিকে পুনর্নির্মিত করা হয়। পরবর্তী সময় বিদ্যায়তনটি ৬০৬-৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে আগ্রাসী গৌরাসের দ্বারা আবারও বিধ্বস্ত হলে রাজা হর্ষবর্ধনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পুনর্নির্মিত হয়েছিল। অতঃপর এ স্থাপনায় চুড়ান্তভাবে আঘাত হানা হয় মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক ১১৯৭ সালে। বখতিয়ারের নির্মম আক্রমণে সংরক্ষিত সমস্ত পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এই ধ্বংসযজ্ঞে দীর্ঘ তিন মাস আগুনের ধোঁয়া আকাশকে করে রেখেছিল অন্ধকার, জ্ঞানের সমস্ত উপাদান পুড়ে হয়েছিল ছাই-ভস্ম। এই মর্মান্তিক আক্রমণে জীবন্তদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এক হাজার ভিক্ষু, সমসংখ্যককে নির্মমভাবে কতল করা হয়। এ পর্যায়ের ধ্বংসলীলার পর নালন্দা আর কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যায় পণ্ডিত, ভিক্ষুগণ। প্রতিষ্ঠানের শেষ কর্ণধার শাক্য শ্রী ভদ্র ১২০৪ সালে পালিয়ে যান তিব্বতে। একই সাথে যৎসামাসান্য পুস্তকাদি সমেত বিপুলসংখ্যক ভিক্ষু আশ্রয়গ্রহণ করেন তিব্বতে। এককালের ছাত্রদের কলতানে মুখরিত ক্যাম্পাস হয়ে পড়ে পরিত্যক্ত বিরান ভূমি। সমসাময়িককালে বাংলাদেশের পাহাড়পুর, শালবন বিহারসহ পুরো উপমহাদেশেই অসংখ্য বিহার বিকশিত হয়েছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে এ সমস্ত আলোকিত প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে, তরবারীর যাঁতাকলে নিভে যায় আলোকিত সমস্ত লণ্ঠন। হিন্দু বা মুসলিমরা সিংহাসন নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকলেও বৌদ্ধদের মতো বিস্তৃত পরিসরে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেনি। ফলে বৌদ্ধদের উৎখাতের সাথে সাথে নিরীশ্বরবাদী পার্থিব শিক্ষার সমস্ত দুয়ার রুদ্ধ হয়ে যায়। প্রসারিত হয় ধর্মান্ধতার কালো থাবা।

তদুপরি বৈদিকশাস্ত্র প্রভাবিত বহুবিদ জ্ঞানধারা হতে পারত শিক্ষার পাথেয়, কিন্তু পরিতাপের বিষয় বর্ণ প্রভাবিত সমাজে তাও কখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ম্যাকেয়াভেলির জন্মের অনেক আগে এদেশে জন্ম নিয়েছিল জনাব চাণক্য। ‘দি প্রিন্স’, রিপাবলিক বা পলিটিক্স-এর চেয়ে ক্ষেত্র বিশেষে অনেক সমৃদ্ধতর পুস্তক ‘অর্থশাস্ত্র’ রচিত হয়েছিল উপমহাদেশে। এ সমস্ত বিজ্ঞতাত্ত্বিকদের সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি বিষয়ক পাঠ্যক্রম এদেশের ভিন্ন মতাবলম্বী ধর্মীয় সন্তুদের কাছে এবং পরদেশি শাসকদের কাছে কোনোদিন সমাদৃত এবং মূল্যায়িত হয়নি, চর্চিতও হয়নি। বানভট্টও জ্বলে উঠে হঠাৎ করে কোন্ আঁধারে হারিয়ে গেছে, কেউ তার খোঁজ করেনি। কালের আবর্তনে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে যে সব শাসকেরা এদেশে এসে, এদেশের সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হয়েছিল তারাও আর বৌদ্ধদের শিক্ষায়তনগুলোতে আলোক প্রজ্বলনের তাগিদবোধ করেনি। পুরোনো বৈদিক পণ্ডিতগণও পুনরুজ্জীবিত হননি। হতভাগা যুবরাজ দারাশিকো উপনিষদ অনুবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিজের বিনাশের পথ প্রশস্থ করেছিলেন। নতুন মত ও পথের শাসকদের দ্বারা নতুনধারার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি। সিংহাসনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে অস্থিরতা এবং রক্তাক্ত অধ্যায়।

সামাজিক প্রগতির দিকে দৃকপাতের প্রয়োজনে আবারো পশ্চিমের দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায়, মধ্যযুগের সূচনাকাল থেকে রেনেসাঁস সময়কাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৫০০ বছরে ডাইনি আখ্যা দিয়ে প্রায় ০৫ লক্ষ নারীকে সারা ইউরোপে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ১৫৯২ সালে ইটালির ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিজ্ঞানী ব্রুনোকে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ১৬৩৩ সালে ২২ জুন সত্তর বছরের বৃদ্ধ বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত মতামত প্রদানের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। তার পরও ওখানকার ঝলসে যাওয়া পোড়া মাটিতে জন্ম নেয়—টমাস ম্যুর, বাতিচেলি, দ্য ভিঞ্চি, সেক্সপিয়ার এবং পেত্রার্ক-এর মতো ক্রিয়েটিভ ব্যাক্তিত্বরা। ১৬৪২ সালে ইংল্যান্ডের উলসথোপে জন্মগ্রহণ করেন বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন। বিদ্যমান ধর্মান্ধতাসহ সব সংকীর্ণতা পায়ে দলে এগিয়ে চলে প্রগতির নৌকা। মানুষের অধিকারের প্রশ্নটি আলোচনায় উঠে আসে। ১৬৮৯ সালে ইংল্যান্ডে যখন ‘বিল অব রাইটস’র মাধ্যমে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উন্মেষ ঘটে, তখনো ভারতের দিল্লিশ্বরেরা প্রবল প্রতাপের সাথে রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কোলাপুরের বিদ্রোহী শাসন কর্তাসহ নিজ ভ্রাতুষ্পুত্রকে তখনো আওরঙ্গজেবের ধারালো তরবারির নিচে গর্দান দিতে হয়।

১৭০৭ সালে যখন ইউনিয়ন এ্যাক্টের মাধ্যমে স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্ট ইংল্যান্ডের সাথে একীভূত হয়ে শক্তিশালী ব্রিটেন গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, তখন মারাঠাদের আক্রমণে মোগল বাহিনী প্রায় পর্যুদস্ত। রাজকোষ অর্থশূন্য। দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা। সেনাবাহিনীর বেতন দেওয়ার মতো সামর্থও কেন্দ্রীয় সরকার হারিয়ে ফেলেছিল। এ ধরনের এক অনিশ্চিত অবস্থায় উত্তরসূরিদের রেখে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৭০৭ সালে প্রবল দাপুটে সম্রাট আওরঙ্গজেব বেহেস্তে গমন করেন। মৃত্যুর আগে দিল্লিতে রেখে যান দুর্বল প্রজন্ম। ক্ষয়িষ্ণু মোগলদের রাজততের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় দস্যু নাদির।

১৭৪০ সালে নাদির শাহ দিল্লিতে আক্রমণ চালিয়ে শেষ সম্পদটুকু লুটে নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। দিল্লিতে রেখে যান লাখো লাশের স্তুপ। পরবর্তী পর্যায়ে ১৭৬১ সালের ০৬ জানুয়ারি পানি পথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের সঙ্গে আহমেদ শাহের লড়াইয়ে মারাঠারা দুই লক্ষ সৈন্য হারিয়ে পরাজয়বরণ করে পিছু হটে গেলেও দিল্লি তার গৌরব আর কখনো ফিরে পায়নি। এই ভয়াবহ যুদ্ধে একদিকে যেমন মোগলসহ আফগান শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়, অন্যদিকে তেমনি ভারতের উদীয়মান জাতিয়তাবাদী মারাঠা শক্তিও চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করে। এ জন্য অনেকে বলে থাকেন, ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে আহমেদ শাহ আবদালির প্রতি ইংরেজদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে, সেদিনকার পানিপথের যুদ্ধে মারাঠারা বিজিত হলে কোনো ইউরোপিয় শক্তির পক্ষে কখনোই ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার সম্ভব হয়ে উঠত না। উপমহাদেশের এ ধরনের অনিশ্চিত অবস্থায় একদিকে ব্রিটেন শক্তিশালী ইউনাটেড কিংডমের পথে এগিয়ে যায়। অন্যদিকে ভারত বিদ্রোহ ও আন্তঃরাজ্যের দ্বন্দ্ব কলহে খণ্ড বিখণ্ড হয়ে অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত হতে থাকে। দিল্লি মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে অন্ধকার গলিপথে।

আমরা নিজেদের জৌলুস প্রকাশের জন্য, পৃথিবীকে চমকে দেওয়ার জন্য, রাজকোষাগারের সম্পদ খরচা করে প্রিয়তমার কবরে তাজমহল বানিয়েছি। ঐশী গ্রন্থের সারবত্তায় অনুপ্রাণীত হয়ে স্বর্গের আদলে নির্মাণ করেছি শালিমার বাগ। চন্দ্রালোকিত রাতে আকণ্ঠ শরাব গিলে নারী সম্ভোগের মাধ্যমে পৃথিবীর সৌন্দর্য সুধার সন্ধান করেছি। কিন্তু কোনো সংহত শাসন কাঠামো নির্মাণ করতে পারিনি। পারিনি আলোকিত মানুষ সৃষ্টি করতে। ময়নামতি, পাহাড়পুর, তক্ষশিলা কিংবা নালন্দাকেও করেছি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য। কারণে এ মাটিতে জন্ম নেয়নি কোনো ভলতেয়ার, হবস, লক, রুশো বা দান্তে। কেউ জনগণকে শোনাতে আসেনি স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বের অমিত বাণী। ‘সবার উপর মানুষ সত্য’ মুখে মুখে বলেছি কিন্তু কবি চণ্ডী দাসের এ মহান বাণী হৃদয়ঙ্গম করতে পারিনি। পারিনি সমাজের সংকীর্ণ কাঠামো ভেঙে সার্বজনীন সমাজ গড়তে। জ্ঞানদুগ্ধের ঝর্নাধারায় অবগাহন করতে।

এক সময় এদেশের প্রাচুর্য, ঐশ্বর্য, জটিলতাহীন সহজিয়া সংস্কৃতি ইউরোপিয়দের মোহিত করেছে, মুগ্ধ করেছে, প্রলুব্ধ করেছে। ইউরোপিয়দের আগমনের প্রাথমিক পর্যায়ে তাই পাশ্চাত্যের লোকদের সঙ্গে প্রাচ্যের ব্যাপক সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। স্বতঃস্ফূর্ত শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টিও হয়েছে সামাজিকভাবে সমাদৃত। দেখা গেছে পর্তুগিজরা ভারতীয়দের মতো পান শুপারি হুকো’তেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। ক্ষেত্র বিশেষে তারা ভারতীয়দের মতো হাত দিয়েও ভাত খেত। এদেশের সাংস্কৃতিক ভাবধারায় ওরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে কেউ কেউ ভারতীয়দের মতো করে মাথায় ও শরীরে সুগন্ধি তেলও মাখত। কেউ’বা প্রাচীন আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের প্রেশক্রিশন অনুযায়ী দিনে তিন বার গো মূত্রও পান করতে দ্বিধা করত না। খাদ্য হিসেবে কেউ কেউ নিরামিষের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়েছিল। এই সোসালাইজেশন প্রক্রিয়ায় ইংরেজরা ভারতীয় নারীদের সান্নিধ্যে এসে নিয়মিত গোসলের অভ্যাস গড়ে তোলে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি মনোযোগী হতে থাকে। আজকের দিনের ইংরেজদের শ্যাম্পু শব্দটিরও উৎপত্তি হয়েছে সুগন্ধি তেলের মাধ্যমে। মাথা ধোলাই ও ম্যাসেজ সম্পর্কিত ‘চ্যাম্পু’ শব্দ থেকে। এদেশের ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, শিল্প, বিজ্ঞান এবং সাহিত্য সম্পর্কেও ওরা, বিশেষ করে ইংরেজরা অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছিল। এক পর্যায়ে ১৭৮৪ সালের দিকে হিন্দুধর্ম সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করতে গিয়ে বাংলার গভর্ণর হেস্টিংস বলেছিলেন, ‘সত্যিকার অর্থে আমি ভারতকে আমার নিজে দেশ থেকে একটু বেশি ভালবাসি’।

মোগলদের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে, হাজার হাজার ইউরোপিয় ভাগ্যান্বেষী উপমহাদেশের বিভিন্ন রাজন্যদের দরবারে কিংবা সামরিক বাহিনীতে চাকুরি করে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করত। এদের অনেকে এদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাবার জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, এদেশের নারীদের বিয়ে শাদি করে, নতুন ঠিকানাও গড়ে তুলেছিল। ইংরেজদের মধ্যে ধর্মান্তরিত হওয়ার ধারা ছিল ব্যাপকতর। অনেকে স্বেচ্ছায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে সম্পর্ক চুকিয়ে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে, এদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাবার এন্তেজাম করত। এ প্রবণতা কোন্ পর্যায়ে পৌঁছেছিল তা জানার জন্যে এখানে একটি পত্রের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৬৪৯ সালের ৫ এপ্রিল ফ্রান্সিস বেটন নামের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সিনিয়র কর্মকর্তা লন্ডনস্থ অফিসে প্রেরিত এক পত্রে লিখেছিল, ‘আমি ইচ্ছে করছি যে, এখানেই আমার কলম থেমে যাবে। আমাদের জন্য বেদনার বিষয় হচ্ছে যে আপনাদের একটি দুঃখজনক খবর শোনাতে হচ্ছে। এটি শুধু একজন ব্যাক্তিকে হারানোর ঘটনা নয়, আমাদের জাতির জন্য অসম্মানের ব্যাপার এবং খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসের প্রতিও অমর্যাদাকর। আগ্রায় অবস্থানকালে আপনাদের একজন অফিসার ‘জসুয়া ব্লাক ওয়েল’ স্বধর্ম পরিত্যাগ করেছেন’। কার্ল মার্কস যেমন বলেছিলেন, যুগে যুগে বাহিরের আগ্রাসীশক্তি ভারতে এসে এখানকার মহান সভ্যতায় লীন হয়ে গিয়েছিল। তেমনি প্রাথমিক অবস্থায় ইউরোপের লোকেরাও বস্তুতপক্ষে উপমহাদেশের এই সরল সভ্যতার ধারায় নিজেদের অনেকটা বিলীন করে দিয়েছিল। ইংরেজদের স্বপক্ষ ত্যাগের এ ধরনের প্রবণতায় শঙ্কিত হয়ে ১৬১৬ সালে স্যার টমাস রো মোগলদের সঙ্গে প্রথম চুক্তি সম্পাদনকালে, চুক্তির অষ্টম ধারায় শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, ‘মোগলরা ইংরেজ পক্ষত্যাগী বা পলাতকদের কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে ফেরত পাঠাবে। কিন্তু তখনকার মোগল সম্রাট ইংরেজ দূতের এ ধরনের আবদারে সাড়া দেননি। এই ভারতীয়করণ প্রক্রিয়ার কারণে উপমহাদেশে ইউরোপিয়দের আধিক্য এতটাই বেড়ে যায় যে পরবর্তীকালে মোগল সম্রাটকে দিল্লিতে আলাদা একটি ফিরিঙ্গি রেজিমেন্ট গড়ে তুলতে হয়েছিল, যার সেনাপতিও ছিলেন ফারাশিশ খান নামের একজন নও মুসলিম ফরাসি নাগরিক। এছাড়া এ সমস্ত ফিরিঙ্গিদের বসবাসের জন্য দিল্লিতে ফিরিঙ্গাপুরা নামে একটি আলাদা উপশহরও গড়ে তুলতে হয়েছিল। আমাদের চট্টগ্রামেও গড়ে উঠেছিল ফিরিঙ্গি বাজার। ঢাকায় গড়ে উঠেছিল আরমানিটোলা, ফ্রেঞ্চগঞ্জ বা আজকের ফরাশগঞ্জ।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে ইউরোপিয় বা ইংরেজদের এই ভারতীয়করণ প্রবণতা বেশিদিন টিকতে পারিনি। ১৭৮৬ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিস এক আইনের মাধ্যমে ভারতীয় স্ত্রী গ্রহণকারি ইংরেজদের সন্তানদের জন্য কোম্পানির চাকুরির সুযোগ সুবিধা বন্ধ করে দেয়। ১৭৯৫ সালে কোম্পানির এক আইন বলে, কোম্পানির কর্মচারীদের যে সমস্ত সন্তানের বাবা মা উভয়ে ইংরেজ নয়, সে-সমস্ত ছেলেদের পাইপ বাদক, ড্রাম বাদক, নৌকা চালকের মতো ছোট চাকুরি ছাড়া অন্যান্য পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে অপদস্ত হয়ে ১৩ টি ব্রিটিশ কলোনি হারিয়ে, কর্ণওয়ালিস তার পরাজয়ের ক্ষোভ মেটায় ভারতীয় ব্রিটিশদের ওপর। তার এই আগ্রাসী নিয়ম-কানুনের ফলে এই উপনিবেশে ক্রমান্বয়ে গাণিতিক হারে কমে যেতে থাকে আন্তঃদেশিয় মিথষ্ক্রিয়া এবং জ্যামিতিক হারে বিকশিত হতে থাকে বর্ণবাদের কালো ছায়া। অতঃপর ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের পর থেকে শাসক শোষকের মেরুকরণ চূড়ান্ত রূপধারণ করে দু’টি জাতি দু’টি স্বতন্ত্র ধারায় প্রবাহিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে ডিভাইড অ্যান্ড রুল এর কোপানলে পড়ে সর্বভারতীয় অস্তিত্ব হারিয়ে তামাম জনগোষ্ঠী হিন্দু মুসলিম দু’টি ধারায় বিভাজিত হয়ে যায়।

ইতিহাসের এইকাল পর্বে ইউরোপিয় রেনেসাঁস-এর সূচনা হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে। কেউ কেউ মনে করেন ১৩২১ সালে দার্শনিক দান্তের মৃত্যু পরবর্তীকাল থেকে রেনেসাঁস-এর পথচলার সূচনা। ইউরোপে রেনেসাঁস প্রথমে পরিদৃষ্ট হয় ইতালিতে এরপর পর্যায়ক্রমে ফরাসি, ইংল্যান্ড, জার্মানি হয়ে তা সারা ইউরোপে বিকশিত হয়। এই রেনেসাঁস-এর শেকড় সন্ধান করতে হলে তাকাতে হয় অনেক পেছনে। মূলত ৪১০ সালে প্রাচীন জার্মান উপজাতি ‘গোথ’রা রোম আক্রমণ ও লুণ্ঠন করে রোমান সাম্রাজ্যের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছিল। গোথা, বারবারদের বর্বর আক্রমণে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটার পর গ্রিক পণ্ডিততেরা ব্যাপকহারে পালিয়ে গিয়ে কনস্তান্তিনোপলে আশ্রয়গ্রহণ করেন। ফলে পুরো ইউরোপ নিমজ্জিত হয় গভীর অন্ধকারে। প্রাচ্যের কনস্তান্তিনোপল এবং বাগদাদ হয়ে ওঠে হেলেনিক সংস্কৃতি, জ্ঞান চর্চার অন্যতম পীঠস্থান। এর প্রভাবে জন্ম নেয় এক আলোকিত বাগদাদ। (ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে) পরবর্তীতে ক্রসেড- এর সময় ইউরোপিয়রা জেরুজালেম এর পথে চলাচলের সুবাদে জ্ঞানবানদের সংস্পর্শে এসে আলোকিত পথের সন্ধান খুঁজে পায়। সময়ের আবর্তনে পঞ্চদশ শতকের এক পর্যায়ে, ১৪৫৩ সালে তুর্কীরা কনস্তান্তিনোপল পুনর্দখল করে নিলে পণ্ডিত শ্রেণি আবারও ব্যাপকহারে জ্ঞানের গাট্টি-বোঁচকা নিয়ে ইতালিতে পালিয়ে গিয়ে নতুন আস্তানা গড়ে তোলেন। এ সমস্ত জ্ঞানবানদের চিন্তা-চেতনার প্রভাবে এক পর্যায়ে রেনেসাঁস-এর উন্মেষ ঘটে। রেনেসাঁস এর বিকাশের ফলে অন্ধকার, মরচে পড়া ট্রাডিশনাল সমাজ কাঠামোর গর্ভে জন্ম নেয় জীবনমুখিতা, মানবতাবাদ এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ। তিরোহিত হতে থাকে ধর্মান্ধতাসহ কুসংস্কার আর কুপমণ্ডুকতা।

এই রেনেসাঁসের আলোয় আলোকিত হয়ে, ব্রিটেনসহ সারা ইউরোপ বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্যে উদ্দীপ্ত হয়ে ধর্মান্ধতার শেকল ভেঙে মানুষের মুক্তির সিঙা ফুঁকিয়েছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের পর্ব পেরিয়ে রকেট বানিয়েছে, পাড়ি দিয়েছে চাঁদ থেকে মঙ্গলে। স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের গান গেয়ে মানুষের সাথে মানুষের বৈষম্য লোপ করতে সচেষ্ট হয়েছে। অসততার অনেক কিছুই পেছনে ফেলে এসেছে কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে ধনসম্পদের প্রশ্নে বরাবরই এরা থেকেছে সংকীর্ণ। নিউটন, ব্রুনো, গ্যালিলিওদের বিজ্ঞানের সুফল দিয়ে শক্তিশালী করেছে নিজেদের শোষকশ্রেণির পেশীশক্তি। ইউরোপের দেশে দেশে সাধারণ মানুষেরা বিজ্ঞানের কল্যাণে ঘরে আলো জ্বালিয়েও পুঁজির প্রাসাদে হয়েছে অবরুদ্ধ। আর সমগ্র পৃথিবী নিপতিত হয়েছে অন্ধকার গহ্বরে। পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর তুলনায় নিজেদের অনেক বেশি আলোকিত করেও প্রকৃত মানবমুক্তির জন্য নিজেদের নিষ্কলুষভাবে গড়ে তুলতে পারেনি ব্রিটেনসহ সারা ইউরোপের শাসকশ্রেণি। সম্পদের প্রশ্নে উন্নত মানুষেরা থেকে গেছে বর্বর সমাজে। সমাজ বিকাশের এ স্তরে এসে মানবসভ্যতা দারুণভাবে ঝাঁকুনি খেয়েছে, অনেক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে মানুষ হয়েছে মানুষের দাস, এক দেশ হয়েছে আরেক দেশের পদানত। মুনাফার শেকলে বন্দি হয়েছে মানবাত্মা। নৈতিকতার দিকটি এক্ষেত্রে উপেক্ষিতই থেকে গেছে। ফলে প্রগতির চাকা সামনের দিকে যতটা এগিয়েছে শোষণের মাত্রাও হয়েছে ততটাই শানিত। এ পর্যায়ে নতুন জীবনের আলোকিত মশাল নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডারিক এঙ্গেলস (১৮১৮-১৮৮৩ খ্রিঃ ও (১৮২০-১৮৯৫ খ্রিঃ) নামের দুই মহান বস্তুবাদী দার্শনিক। তাদের পূর্বে কেউ পৃথিবীটাকে এভাবে ঝাঁকুনি দেয়নি। এনারাই প্রথম দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের আলোকে পৃথিবীর আর্থসামাজিক পরিবর্তনের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দাঁড় করিয়ে আগামীদিনের সাম্যবাদী সমাজের রূপকল্প প্রণয়ন করেছিলেন। ১৯৪৮ সালে তাদের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’। শ্রম শোষণের বিরুদ্ধে উচ্চকিত হয় শ্রমিকের কণ্ঠ। পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের ভাঙা দুয়ারে উঁকি দেয় এক নতুন পৃথিবীর সূর্য। মার্কস বলেন, “এ যাবৎ কাল দার্শনিকরা শুধু এ জগতের ব্যাখ্যাই করেছেন, আজ আর ব্যাখ্যা নয়, প্রয়োজন পৃথিবীটাকে পরিবর্তন করা’। তিনি প্রথম ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণার উপর আঘাত হানেন। উদ্বৃত্তমূল্য তত্ত্বের মাধ্যমে শ্রম শোষণের বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় কীভাবে আদিমসমাজ থেকে সমান্তসমাজ পেরিয়ে পুঁজিবাদী সমাজ বিকশিত হয়েছে এবং পুঁজিবাদী সমাজ থেকে কীভাবে সাম্যবাদী সমাজে মানবজাতি উপনীত হবে, সে সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বিশেষিত হয়েছে মার্কস, এঙ্গেলস এবং এ ঘরানার দার্শনিকদের লিখনিতে। তার পরেও তারা বিদ্যমান শোষণ ভিত্তিক সমাজ কাঠামোতে চিড় ধরাতে পারেনি। ১৮৭১ এর প্যারি কমিউন মাত্র ৬২ দিনের মতো টিকে থেকে আবারও পুরনো গহ্বরে লীন হয়েছিল। সম্পদের প্রশ্নে হয়নি কোনো যৌক্তিক সমাধান। সম্পদভিত্তিক ব্যক্তিমালিকানাধীন সমাজ ব্যবস্থায়, আজকের বিশ্বের সাথে বিগত বিশ্বের তেমন মৌলিক পার্থক্য এখনো পরিদৃষ্ট হয় না। সময়ের সাথে সাথে শুধু খোলস পরিবর্তিত হয়েছে। খাসিলত তথা পেশীশক্তি, শোষণ এবং নিপীড়নের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি।

উপমহাদেশের লোকদের দুর্ভাগ্য যে, তারা নিজেদের স্বকীয় ধারার বিদ্যাচর্চা ধরে রাখতে পারেনি। পশ্চিমের মুসলিম শক্তিও সে জমানার আলোকিত পণ্ডিতদের প্রজ্ঞারভিত্তিতে সমাজ সংস্কৃতি বিনির্মাণে গুরুত্বারোপ করেনি। ইউরোপিয়রাও প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক ফোঁটা জ্ঞান বা প্রযুক্তিও এখানে চর্চার সুযোগ করে দেয়নি। ফলে উপমহাদেশকে এক প্রকার মূর্খতার তকমা নিয়ে পাড়ি দিতে হয় ঝঞ্জা বিক্ষুদ্ধ অসীম সমুদ্র। কল্যাণমূলক সমাজের স্বপ্ন অধুরাই রয়ে যায়। আমাদের গ্রামীণ জনপদে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ হলো—’তোলা দুধে পোলা বাঁচে না। আদতেও তাই, জ্ঞানচর্চার দৈন্য হেতু আমরা আজও কোনো দার্শনিক জন্ম দিতে পারিনি, সৃষ্টি করতে পারিনি স্বকীয়ধারার জীবনব্যবস্থা। এখন আমাদের আর্থসামাজিক জীবন আমাদের মৃত্তিকা উদ্ভূত কোনো দর্শন দ্বারা প্রভাবিত নয়, এই বিশ্বায়নের যুগের পুরোটাই পরনির্ভর। যে কারণে তোলা দুধে যেমন পোলা বাঁচে না, তেমনি পরনির্ভর আর্থসামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণেও আমরা জাতিগতভাবে পঙ্গুত্বের পরিধি অতিক্রম করতে পারছি না। আমাদের সমাজকে চিনতে হলে, নদী তীরবর্তী সভ্যতারস্বরূপ উন্মোচন করতে হলে, এ কারণেই ফিরে যেতে হবে কৌটিল্যের কাছে। তার নির্দেশিত নেতিবাচক দিকগুলো পর্যালোচনা করে যেমন এর নিগূঢ় উদ্‌ঘাটন করতে হবে, তেমনি ইতিবাচক দিকগুলো করতে হবে পুনরুজ্জীবিত। এহেন প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটেই কৌটিল্যকে পাঠ করা আবশ্যক। পরিশেষে সিঙ্গাপুরের স্বপ্নদ্রষ্টা আজকের দিনের সার্থক শাসক লি কুয়ান ইউ-এর একটি উক্তি উদ্ধৃত করছি, তিনি তার আত্মজীবনিতে লিখেছেন, ‘আগামী দিনের পৃথিবী অজ্ঞ এবং প্রাজ্ঞ, এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে। যারা প্রজ্ঞার কাতারে থাকবে তারাই হয়তোবা টিকে থাকবে অজ্ঞরা স্বক্ষমতা হারিয়ে হয়তো বা অবলুপ্ত হয়ে যাবে।’ এই অবস্থায় ভবিষ্যতে আমরা কোন্ কাতারে দাঁড়াব তা আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%