পঞ্চম অধিকরণ (গুপ্তহত্যা)

পঞ্চম অধিকরণ। প্রকরণ ৮৯-৯৫।

যোগবৃত্ত (গুপ্তহত্যা) নামক পঞ্চম অধিকরণের সাতটি প্রকরণ বা আলোচ্য বিষয় হলো-

১. দাওকার্মিক তথা অপরাধের মানদণ্ডে গোপনীয় হত্যাযজ্ঞ ২. কোষাভিসংহরণ তথা রাজকোষের জন্য বাড়তি আয়ের উপায় ৩. ভৃত্যভরণীয় তথা রাজকর্মচারী ও পরামর্শদাতাদের ভরণপোষণ ৪. অনুজীবীবৃত্তি তথা রাজকীয় সভাসদদের স্বভাব ৫. সময়াচারিক তথা আচার, অনুষ্ঠান ও ব্যবহার সম্পর্কিত বিধি-বিধান ৬. রাজ্যপ্রতিসন্ধান তথা রাজার বিপত্তিকালে মন্ত্রী, অমাত্যদের করণীয় কর্তব্য ৭.একৈশ্বর্য তথা রাজ্যের সংহতির স্বার্থে রাজকুমারের একক কর্তৃত্বের অপরিহার্যতা।

প্রথম অধ্যায় ॥ ৮৯ প্রকরণ ॥

এই অধ্যায়ের নামকরণ করা হয়েছে ‘দাণ্ডকর্মিস্’। দণ্ড বলতে এখানে গোপনে হত্যা করাকে বোঝানো হয়েছে। আর এর প্রয়োগকে বলা হয়েছে দণ্ডকর্ম। এই অধ্যায়ে রাজা তার অধীনস্থ অমাত্যদের মধ্যে জ্ঞাত ও অজ্ঞাত বিরুদ্ধবাদী কিংবা শত্রুকে কীভাবে চিহ্নিত করবেন, কীভাবে শায়েস্তা করবেন বা নিধন করবেন, সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। রাজা যেমন প্রজার সুখ শান্তির জন্য কণ্টক শোধনের মাধ্যমে সমাজ থেকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অন্যায় অবিচার উৎপাটন করবেন, তেমনি তার সিংহাসন সংরক্ষণের জন্য রাজ অমাত্যদের কণ্টক শোধনের নিমিত্ত গ্রহণ করবেন কার্যকর ব্যবস্থা। এ সব বিষয়ই এই পর্যায়ে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।

০৫-০১-০১ রাজকার্যে নিযুক্ত যে সমস্ত মুখ্য ব্যক্তিত্ব তথা মন্ত্রী, পুরোহিত, সেনাপতি, বিভিন্ন কর্ম বিভাগের উর্ধ্বতন প্রশাসক ও যুবরাজ, রাজাকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে রেখে রাজকার্য পরিচালনা করবেন অথবা যে সমস্ত আমলা-অমাত্য শত্রুপক্ষের সঙ্গে মিলিত হবেন, তাদের প্রভাব নস্যাৎ করতে হলে বা তাদের শাস্তি প্রদান করতে হলে রাজাকে তা গুপ্তচরদের মাধ্যমে অত্যন্ত সন্তর্পণে সম্পাদন করতে হবে।

০৫-০১-০২ প্রিয়ভাজন কোনো অমাত্য যদি আস্থা ভঙ্গ করে রাজার বিরোধিতায় নিমগ্ন হয় অথবা রাজদ্রোহী হিসেবে অভির্ভূত হয় বা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় এবং এক্ষেত্রে যদি উক্ত অমাত্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে রাজ্যের হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বিবেচ্য রাজা উক্ত অমাত্যকে গুপ্তচরদের মাধ্যমে সুকৌশলে হত্যা করাবেন।

০৫-০১-০৩ উপরোক্ত ধরনের রাজবিদ্রোহী মহামাত্র বা পদস্থ অমাত্যের কোনো ভ্রাতা যদি কখনো তার দ্বারা অপমানিত হয়ে থাকে, তাহলে রাজার গোয়েন্দারা উক্ত অমাত্যের অপমানিত ভ্রাতাকে রাজার সম্মুখে উপস্থিত করাবে, রাজা উক্ত ভ্রাতাকে ওই অমাত্যের মৃত্যুর পর তাকে তার ভ্রাতার পদে নিযুক্তিসহ সমুদয় সম্পত্তি ভোগের প্রলোভন দেখিয়ে অমাত্য ভ্রাতাকে হত্যা করার জন্য পরোক্ষভাবে প্ররোচিত করবে, অতঃপর ওই ভ্রাতা কর্তৃক বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে উক্ত অমাত্য নিহত হলে রাজার নিয়োজিত গূঢ়পুরুষেরা (গোয়েন্দারা) ভ্রাতৃ হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে একইস্থানে তাকেও তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করবে। রাজার গোয়েন্দারা একই তরিকায় উপরোক্ত ধরনের রাজবিদ্বেষী মনোভাবাপন্ন অমাত্যদের নীচপত্নী, দাসী বা সেবিকার গর্ভজাত সন্তানদেরও এ কাজে নিয়োজিত করবে এবং হত্যাকাণ্ডের কাজে উৎসাহিত করে একই পদ্ধতিতে উদ্দেশ্য হাসিল করবে।

০৫-০১-০৪ এছাড়াও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রাজার নিযুক্ত গোয়েন্দারা উক্ত প্রকৃতির অমাত্যের ভ্রাতাকে তার সম্পত্তির অংশ আদায়ের জন্য প্ররোচিত করবে এবং এক পর্যায়ে গোয়েন্দারা অমাত্যের পক্ষ হয়ে সম্পত্তির বিবাদে জড়িয়ে পড়ে উক্ত ভ্রাতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করবে বা সন্তর্পণে গোপনে হত্যা করে এই মর্মে প্রচার চালাবে যে, সম্পত্তির অংশ দাবি করায় উক্ত অমাত্য কর্তৃক তার ভ্রাতা ঘাতিত হয়েছে, অতঃপর গোয়েন্দারা উক্ত অমাত্যের বিরুদ্ধে ভ্রাতৃ হত্যার অভিযোগ উত্থাপন করত হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাকেও রাজার আদেশে হত্যা করবে।

০৫-০১-০৫ এ ধরনের (রাজ বিদ্বেষী) অমাত্যদের ভ্রাতারা যদি রক্ত সম্পর্কিত ভ্রাতা হয় এবং তাদের কেউ যদি একে অপরের স্ত্রীর উপর কখনো ব্যাভিচার করে থাকে বা এ ধরনের কোনো পিতা যদি পুত্রের স্ত্রীর উপর বা পুত্র যদি পিতার অন্য স্ত্রীর উপর কোনো ব্যাভিচার করে, তাহলে কাপটিক নাম গুপ্তচররা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে কলহ বাধিয়ে দিবে এবং একজনকে দিয়ে অপরজনকে হত্যা করাবে, অতঃপর হত্যাকারীর উপর ভ্রাতৃ, পিতৃ বা সন্তান হত্যার অভিযোগ উত্থাপন করে রাজার আদেশে তাকেও হত্যা করবে।

এ ধরনের রাজবিদ্বেষী অমাত্যের কোনো পুত্র যদি শৌর্যবীর্যে বলীয়ান হয়ে থাকে, তাহলে গোয়েন্দারা তাকে রাজার সমীপে উপস্থিত করাবে, অতঃপর রাজা তাকে সঙ্গোপনে এই কথা বলে উক্ত অমাত্যকে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করবেন যে, তিনি তাকে যুবরাজ পদে অধিষ্ঠিত করতে ইচ্ছুক কিন্তু উক্ত অমাত্যের (ঐ পুত্রের পিতা) বিরোধিতার ভয়ে তিনি তা করতে পারছেন না। এরপর গোয়েন্দারা উক্ত সন্তানকে সুকৌশলে পিতার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে হত্যাকাণ্ড সম্পাদন করাবেন এবং হত্যার প্রমাণ নিশ্চিহ্নকরণের জন্য পিতৃহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে রাজার আদেশে তাকেও তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করবে।

০৫-০১-০৬ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভিক্ষুকের ছদ্মবেশধারী গুপ্তচররা এ ধরনের সন্দেহভাজন অমাত্যের পত্নীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে এবং এক পর্যায়ে পতিকে বশ করার কাজে ব্যবহার্য ঔষধের অন্তরালে বিষযুক্ত নির্যাস সরবরাহ করবে এবং এভাবেই ছলনার মাধ্যমে বিষপ্রয়োগ করে উক্ত অমাত্যকে স্বীয় পত্নীর সহায়তায় হত্যা করাবে।

সন্দেহভাজন অমাত্যকে এসব তরিকায় নিধন করা সম্ভব না হলে, রাজা তাকে স্বল্পসংখ্যক দুর্বল সৈনিকসহ কোনো নগর বা জনপদের বিদ্রোহী জনতাকে শায়েস্তা করার জন্য বা সীমান্ত প্রদেশে ভূমি উদ্ধারের জন্য বা বণিকদের চলাচল সড়কের নিরাপত্তা বিধানের জন্য বা অরণ্য প্রদেশে সীমান্ত চৌকি স্থাপনের জন্য প্রেরণ করবেন। অতঃপর উক্ত অমাত্যের সঙ্গে সম্ভাব্য শত্রুর বিবাদ উপস্থিত হলে পূর্ব থেকে আয়োজনকৃত গুপ্তচরেরা দস্যুর বেশে ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে উক্ত অমাত্যকে আক্রমণ করে হত্যা করবে এবং তিনি যুদ্ধে নিহত হয়েছেন বলে সর্বত্র প্রচারণা চালিয়ে হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করবেন।

০৫-০১-০৭ এছাড়াও রাজা সন্দেহভাজন আমলা-অমাত্যকে সুকৌশলে নিধনের অভিপ্রায়ে কোনো উৎসব, পার্বণ বা শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযান প্ৰস্তুতি প্রাক্কালে রাজদর্শনের নিমিত্ত প্রাসাদে তলব করবেন, অতঃপর উক্ত অমাত্য রাজপ্রাসাদে প্রবেশকালে পূর্ব নির্ধারিত আয়োজন মোতাবেক তার সঙ্গে দেহরক্ষীর বেশধারী তীক্ষ্ণ পদবির গুপ্তচরেরাও অস্ত্রসমেত প্রাসাদে প্রবেশ করবে, অনুসন্ধান পর্যায়ে প্রাসাদরক্ষীদের দ্বারা অমাত্যের সশস্ত্র দেহরক্ষীরা জিজ্ঞাসিত হলে তারা এই মর্মে বক্তব্য পেশ করবে যে, অমাত্যের উদ্যোগে রাজাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তারা সশস্ত্র অবস্থায় প্রাসাদে প্রবেশ করেছে, অতঃপর গুপ্তচরেরা বিষয়টি সর্বত্র প্রচারিত করে লক্ষ্যীভূত অমাত্যকে রাজার বিরুদ্ধে হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আরোপ করে তাকে হত্যা করবে এবং অমাত্যের দেহরক্ষীর বেশধারী গুপ্তচরদের কৌশলে সরিয়ে দিয়ে পূর্ব থেকে আটককৃত কতিপয় হত্যা মামলার আসামিকে অমাত্যের দেহরক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করে রাজাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে সহায়তার অভিযোগে অভিযুক্ত করে হত্যা করবে।

০৫-০১-০৮ অথবা এ ধরনের আমলা-অমাত্যকে হত্যা করার অভিপ্রায়ে নগর বা গ্রাম পরিদর্শনের উসিলায় রাজা তার পরিষদসহ দুর্গের বাহিরে কোথাও সাময়িকভাবে আস্তানা স্থাপন করবেন, অতঃপর সন্দেহভাজন অমাত্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সাক্ষাৎ করে কুশল বিনিময় করবেন, তার জন্য সুস্বাদু খাদ্যসামগ্রী প্রেরণ করবেন, তার প্রতি আন্তরিকতা ও সম্মান প্রদর্শন করবেন। অতঃপর কোনো এক রাত্রিতে উক্ত অমাত্যের অবস্থান স্থানে রাজরানির ছদ্মবেশধারী কোনো কুলটা নারীকে প্রেরণ করবেন, এরপর রাজার নিযুক্ত গুপ্তচরেরা রানির অন্বেষণে উক্ত অমাত্যের আবাসনে প্রবেশ করত রানির বেশধারী উক্ত নারীকে গ্রেফতার করবেন এবং ঐ অমাত্যের বিরুদ্ধে রানির প্রতি কাম অভিলিপ্সার অভিযোগ উত্থাপন করে পূর্বোক্ত কায়দায় তাকে হত্যা করবে।

এছাড়াও এ ধরনের হত্যার ক্ষেত্রে রাজা সন্দেহভাজন অমাত্যের খাদ্য রন্ধনকারী ও খাদ্য প্রস্তুতকারীর ভূয়সী প্রশংসা করে তার কাছে খাদ্য ও পানীয় চেয়ে নিয়ে কৌশলে বিষ মিশিয়ে তা প্রথম (পরীক্ষমূলক) আস্বাদনের জন্য উক্ত অমাত্যকে খেতে দিবেন, অতঃপর বিষাক্ত ওই খাদ্য ও পানীয় খেয়ে অমাত্যের মৃত্যু হলে, রাজার নিযুক্ত গুপ্তচররা এ কথা প্রচার করবে যে, রন্ধনকারী ও খাদ্য প্রস্তুতকারীর বিষমিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলে অমাত্যের মৃত্যু হয়েছে। অতঃপর হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে ওই রন্ধনকারী ও খাদ্য প্রস্তুতকারীকেও তারা হত্যা করবে।

০৫-০১-০৯ সন্দেহভাজন অমাত্যরা যদি তন্ত্রমন্ত্রে আস্থাশীল হয়, তাহলে গুপ্তচরেরা এই মর্মে তাদের প্ররোচিত করবে যে, তারা যদি উত্তম লক্ষণযুক্ত গিরগিটি, কচ্ছপ, কাঁকড়া বা ভগ্নশিংযুক্ত হরিণকে শ্মশানের আগুনে পুড়িয়ে ভক্ষণ করেন, তাহলে তাদের কাঙ্ক্ষিত মনোবাঞ্ছা পরিপূর্ণ হবে। এভাবে প্ররোচিত হয়ে অমাত্যরা যখন কোনো শ্মশানে এ ধরনের কাজে নিমগ্ন হবে, তখন গুপ্তচররা সুকৌশলে তাদের খাদ্যের সঙ্গে বিষ প্রয়োগ করে বা লৌহশলাকা দিয়ে আঘাত করে তাদের হত্যা করবে এবং এ কথা জনারণ্যে প্রচার করবে যে উক্ত অমাত্যরা শ্মশানে তান্ত্রিককর্ম করতে গিয়ে পিশাচদের কোপানলে পড়ে নিহত হয়েছে।

অথবা চিকিৎসকরা সন্দেহভাজন অমাত্যদের চিকিৎসাকালে প্রতারণাপূর্বক এ কথা নিশ্চিত করে ঘোষণা প্রদান করবে যে তারা প্রতিকারহীন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। অতঃপর চিকিৎসার ছলে চিকিৎসকরা খাদ্য বা ঔষধের সাথে বিষ মিশিয়ে উক্ত অমাত্যদের মৃত্যুর ব্যবস্থা করবে।

০৫-০১-১০ অথবা মাংস বা ভাত রাঁধার দায়িত্বে নিয়োজিত পাচকের ছদ্মবেশধারী গুপ্তচরেরা সন্দেহভাজন অমাত্যদের খাদ্যে বিষ মিশিয়ে তাদের হত্যার আয়োজন করবে। এক সন্দেহভাজন অমাত্যকে দিয়ে অন্য সন্দেহভাজন অমাত্যকে হত্যা করার মাধ্যমে দুজনকেই নিপাত করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে রাজা একজন অমাত্যকে কতিপয় দুর্বল সৈন্য ও গুপ্তচর দিয়ে সৈন্য সংগ্রহ, অর্থ সংগ্ৰহ, কোনো প্রশাসকের কন্যাকে বলাৎকারপূর্বক অপহরণ, দুর্গ নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণ, খনি খনন, হস্তিবন নির্মাণ, বণিকদের চলাচল পথ নির্মাণ, বিরান ভূমিতে আবাসন নির্মাণসহ এ জাতীয় কর্ম সম্পাদনের দায়িত্ব অর্পণ করে নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রেরণ করে এহেন কর্মে বিরোধিতাকারীদের বন্দি করে ধরে আনবার আদেশ প্রদান করবেন।

অতঃপর রাজা উক্ত অঞ্চলের সন্দেহভাজন অমাত্যকে প্রেরিত অমাত্যের এ সমস্ত ক্রিয়াকর্ম প্রতিরোধের জন্য প্ররোচিত করবেন। এভাবে যখন উভয় সন্দেহভাজন অমাত্যের মধ্যে দ্বান্দ্বিক পরিবেশ উদ্ভূত হবে, তখন রাজার গুপ্তচরেরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে কোনো এক অমাত্যকে কৌশলে হত্যা করবে এবং সেই হত্যার দায় অপর অমাত্যের উপর চাপিয়ে দিবে, অতঃপর এক অমাত্যকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে রাজার আদেশক্রমে অপরকেও হত্যা করবে। এভাবে এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো রাজবিদ্বেষী দুই অমাত্যকেই বিনাশ করবে।

০৫-০১-১১ কোনো সন্দেহভাজন অমাত্যের সঙ্গে নগর, গ্রাম, সীমান্ত এলাকা, ফসলের ক্ষেত, ফসল মাড়াইয়ের ক্ষেত, গৃহের সীমানা, দ্রব্য, উপকরণ, বস্ত্র, বাহন, উৎসব, বিবাহ ইত্যাকার বিষয়ে অন্য কোনো সন্দেহভাজন অমাত্যের বিবাদ উপস্থিত হলে, সেই সুযোগে গুপ্তচররা এক অমাত্যকে গোপনে হত্যা করে অন্য অমাত্যের উপর এই হত্যাকাণ্ডের দায় চাপিয়ে দিবে। অতঃপর উক্ত অভিযুক্ত অমাত্যও রাজার আদেশে ঘাতিত হবে।

০৫-০১-১২ এ ধরনের অমাত্যদের পারস্পরিক শত্রুতা যদি অত্যন্ত প্রকট হয়ে থাকে, তাহলে গুপ্তচররা সেই নৈরাজ্যকর সুযোগ কাজে লাগিয়ে একপক্ষের হয়ে অন্যপক্ষের ফসলের ক্ষেত লোপাট করবে বা বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিবে বা অমাত্যের বন্ধু-স্বজনদের বাহনসমূহ বিনষ্ট করে পূর্বোক্ত তরিকায় এ কথা প্রচার করবে যে তারা উক্ত অমাত্যের নির্দেশক্রমে এহেন কর্মে নিযুক্ত হয়েছে, অতঃপর অপরপক্ষ দ্বারা এ পক্ষের অমাত্য ঘাতিত হলে হত্যার অভিযোগ উপস্থাপনপূর্বক রাজার আদেশে তথাকথিত হত্যাকারী অমাত্যকেও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিতকরণের মাধ্যমে হত্যা করতে হবে।

অথবা এ ধরনের দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে সত্রী নামক গুপ্তচররা অমাত্যদ্বয়ের বিরোধ নিষ্পত্তির অভিপ্রায় ব্যক্ত করে একজনের গৃহে অন্যজনের নিমন্ত্রণের আয়োজন করাবে, অতঃপর বিষ প্রয়োগকারী গুপ্তচরের মাধ্যমে খাদ্যের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে আমন্ত্রিত অমাত্যকে হত্যার ব্যবস্থা করে নিমন্ত্রণকারী অমাত্যের উপর হত্যার দায় চাপিয়ে দিবে, অতঃপর হত্যাজনিত অপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করে রাজার আদেশক্রমে নিমন্ত্রণকারী অমাত্যকেও তাৎক্ষণিকভাবে হত্যা করবে।

০৫-০১-১৩ অন্য তরিকা অবলম্বন করেও এ ধরনের সন্দেহজনক পদস্থ অমাত্যদের বিনাশ করা যেতে পারে, এক্ষেত্রে বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীর ছদ্মবেশধারী কোনো এক গুপ্তচর প্রথম অমাত্যের কাছে এই মর্মে বার্তা পেশ করবে যে দ্বিতীয় অমাত্যের স্ত্রী, কন্যা বা পুত্রবধূ তার প্রতি কামভাব পোষণ করেছে, প্রথম অমাত্য এই প্রলোভনে প্রলুব্ধ হলে সন্ন্যাসিনী উক্ত নারীদের প্রদানের জন্য অমাত্যের কাছ থেকে কিছু স্বর্ণালঙ্কার চেয়ে নিবে, অতঃপর গুপ্তচর ওই স্বর্ণালঙ্কার দ্বিতীয় অমাত্যকে প্রদর্শন করে জানাবে যে কামোন্মাদ অমাত্য স্বর্ণালঙ্কার প্রদানের মাধ্যমে তার স্ত্রী, কন্যা এবং পুত্রবধূর প্রতি কামভাব প্রকাশ করেছে। এই পদ্ধতিতে গুপ্তচররা উভয় অমাত্যের মধ্যে তিক্ততার সৃষ্টি করাবে এবং এ নিয়ে কোনো এক রাতে পারস্পরিক বিবাদকালে গুপ্তচররা সুকৌশলে একজনকে হত্যা করে অপরজনের উপর এর দায় দায়িত্ব চাপিয়ে দিবে এবং পরবর্তী সময় হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে অপরজনকেও রাজার নির্দেশক্রমে হত্যা করবে।

০৫-০১-১৪ রাজবিরোধী সন্দেহজনক রাজপুত্র এবং সেনাপতিদের বিরুদ্ধেও একই তরিকায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রেও গুপ্তচররা হত্যাকাণ্ডের চালিকাশক্তি হিসেবে নিভৃতে কলকাঠি নাড়বে। সেনাপতিকে দুর্বল বাহিনী দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য প্রেরণ করে কৌশলে সবল শত্রুর মাধ্যমে হত্যা করাবে। রাজপুত্র স্বয়ং রাজবিদ্বেষী হলে রাজা বা সেনাপতি তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করবে। অতঃপর যে রাজপুত্র কখনো রাজার প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করবে না, রাজা তাকেই তার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করে তার অনুকূলে সিংহাসন অর্পণ করবেন।

০৫-০১-১৫ এ ধরনের বহুরৈখিক প্রক্রিয়া পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে রাজা তার বিরুদ্ধবাদী, বিদ্বেষী, বিশ্বাসঘাতক তথা শত্রুদের নিপাত করে নিজেকে সুরক্ষিতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং সকল দিক হতে শঙ্কামুক্ত হয়ে নিঃশঙ্কচিত্তে প্রজাপালনে মনোনিবেশ করবেন।

দ্বিতীয় অধ্যায় ॥ ৯০ প্রকরণ ॥

এই অধ্যায়ে রাজার কোষ তথা খাজাঞ্চির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মুখ্যত রাজার সকল শক্তির উৎস হলো সম্পদ। যে রাজা যত সম্পদশালী হবেন তিনি তত বলশালী হবেন। এ পর্যায়ে রাজার খাজাঞ্চি বা সম্পদ হ্রাস পেলে কোন কোন তরিকায় তা বৃদ্ধি করা সম্ভব, সেসব বিষয়ে এখানে আলোকপাত করা হয়েছে। ০৫-০২-০১ যুদ্ধের কারণে রাজার অর্থসম্পদের সংকট উদ্ভূত হলে তিনি তা বৃদ্ধিকল্পে সচেষ্ট হবেন। এক্ষেত্রে যে সমস্ত এলাকা কৃষিসম্পদে সমৃদ্ধ অর্থাৎ যেখানে বৃষ্টি বা সেচ সুবিধার বদৌলতে উত্তম প্রকৃতির চাষাবাদ ও ফসল উপন্ন হয়, রাজা সে-সমস্ত এলাকার কৃষকের উপর কোনোপ্রকার বলপ্রয়োগ না করে উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশ বা এক চতুর্থাংশ হারে কর চেয়ে নিবেন। মাঝারি এবং নিম্নমানের ভূমি অঞ্চলের উৎপন্ন ফসলের অংশ বিবেচনা মতো চেয়ে নিবেন। কিন্তু তিনি দুর্গ নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণ, সড়ক নির্মাণ, নতুন আবাসন নির্মাণ, খনি খনন, বনজ সম্পদ ও হস্তিবনসহ এ জাতীয় প্রজাহিতকর খাত থেকে কোনো অর্থসম্পদ গ্রহণ করবে না বা সীমান্তবর্তী জনপদের জনগণের উপর কোনো অতিরিক্ত করারোপ করবেন না। এর অন্যথা হলে যেমন জনঅসন্তুষ্টি দেখা দিতে পারে, তেমনি সীমান্তবর্তী এলাকার লোকেরা বিক্ষুব্ধ হয়ে পাশ্ববর্তী শত্রুরাজের শরণাপন্ন হতে পারে।

রাজকোষের সংকটাবস্থা বিরাজ সত্ত্বেও রাজা নতুন জনপদ স্থাপনকারীদের কৃষি উৎপাদনে সহায়তার জন্য ধান, শস্য, পশু ও নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য করবেন। অন্যান্য অঞ্চলের নজির অনুসরণ না করে তিনি উক্ত অঞ্চলে উৎপাদিত শস্যের এক চতুর্থাংশ নগদ অর্থে ক্রয় করবেন। তদুপরি তিনি এমনভাবে ধান ও অন্যান্য শস্য ক্রয় করবেন, যাতে করে কৃষককে ধান বীজ বা খোরাকির সংকটে নিপতিত হতে না হয়। বনাঞ্চলে প্রকৃতিগতভাবে উৎপাদিত ধান এবং বেদাজ্ঞ ব্রাহ্মণদের যজ্ঞাদির জন্য সংরক্ষিত ধান থেকে রাজা কোনো অংশগ্রহণ করবেন না। প্রয়োজনে তিনি এ সমস্ত ধানের অংশ নগদ টাকায় ক্রয় করবেন।

০৫-০২-০২ বেদ অধ্যয়নকারীরা যদি চাষাবাদের তদারকিতে সক্ষম না হয়, তাহলে রাজকর্মচারীরা তাদের তত্ত্বাবধানে বীজবপনের কাজ সম্পাদন করবে, এক্ষেত্রে শিথিল তত্ত্বাবধানের কারণে যদি বীজ বিনষ্ট হয়, তাহলে উক্ত কর্মচারীদের উপর বীজের দ্বিগুণ জরিমানা প্রযুক্ত হবে। দেবপূজা, দান খয়রাত বা গো-খাদ্য ব্যতীত এ ধরনের উৎপাদিত ফসলের কোনো অংশ কেউ প্রাপ্ত হবে না। রাজকর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে ধান কাটার সময় ভিক্ষুক, গ্রাম ভৃত্য, ধোপা, নাপিত ও কর্মকরদের জন্য পতিত ধান পরিত্যাগ করতে হবে।

০৫-০২-০৩ কোনো কৃষক যদি কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য উৎপাদিত শস্যের অংশবিশেষ লুকিয়ে রাখে, তাহলে তাকে লুকায়িত শস্যের আটগুণ জরিমানা প্রদান করতে হবে। একই গ্রামে বসবাসরত কেউ যদি অপরের ক্ষেতের ফসল চুরি করে, তাহলে তাকে চুরিকৃত ফসলের ৫০ গুণ জরিমানা প্রদান করতে হবে। অন্য গ্রামের কেউ যদি এ ধরনের ফসল চুরিতে যুক্ত হয়, তাহলে শাস্তি হিসেবে তার উপর মৃত্যুদণ্ড প্রযুক্ত হবে।

অধিক ধান উৎপাদিত হলে রাজকর্মচারীরা রাজকোষের জন্য উৎপন্ন ধানের এক চতুর্থাংশ গ্রহণ করবে। বনজদ্রব্য, তুলা, লাক্ষা, রেশম বস্ত্র, বৃক্ষের বাকল, কার্পাস, উল, ঔষধি দ্রব্য, চন্দন কাঠ, ফুল, ফল, শাক-সব্জি, কাঠ, বাঁশ, মাংস, ইত্যাদির ক্ষেত্রে এক ষষ্ঠাংশ কর হিসেবে গ্রহণ করবে। হাতির দাঁত এবং পশুর চামড়ার অর্ধাংশ কর হিসেবে আদায় করবে। এসব দ্রব্য রাজার অনুমতি ব্যতিরেকে বিক্রয় করা যাবে না, এর অন্যথা পরিদৃষ্ট হলে অপরাধীর বিরুদ্ধে ২৫০ পণ জরিমানা প্রযুক্ত হবে।

০৫-০২-০৪ স্বর্ণ, রৌপ্য, হীরক, মণি-মুক্তা, প্রবাল, হাতি ও ঘোড়া ব্যবহারের জন্য ব্যবহারকারীকে ৫০ পণ কর প্রদান করতে হবে। সুতা, বস্ত্র, তামা, ইস্পাত, কাঁসা, সুগন্ধি, ঔষধ ও সুরা বিক্রেতা ব্যবসায়ীদের ৪০ পণ করে কর প্রদান করতে হবে। ধান, তেল, ঘৃত, লৌহজাত পণ্যের ব্যবসায়ী এবং শক্‌ট ক্রয় বিক্রয়কারীকে ৩০ পণ করে কর প্রদান করতে হবে। কাচ ব্যবসায়ী এবং বৃহৎ কর্মের কারিগরদের ২০ পণ করে কর প্রদান করতে হবে। ছোট কারিগর, বন্ধকী কারবারী এবং কুলটা নারীদের দিয়ে উপার্জনকারীদের ১০ পণ করে কর প্রদান করতে হবে। কাঠ, বাঁশ, পাথর, মৃৎপাত্র এবং ভাত তরকারির ব্যবসায়ীদের কর প্রদান করতে হবে পাঁচ পণ করে। নট, নর্তকী এবং বেশ্যাবৃত্তিতে নিয়োজিতরা আয়ের অর্ধেক কর হিসেবে প্রদান করবে। বাণিজ্যিক কর্মে বিরত বণিকরা কর্মে বিরতি হেতু জরিমানা হিসেবে এক পণ করে কর প্রদান করবে।

০৫-০২-০৫ মুরগি ও শূকর পালকরা তাদের উৎপাদনের অর্ধেক কর হিসেবে রাজার সমীপে সমর্পণ করবে। ছাগল এবং ভেড়া জাতীয় পশু পালকরা ষষ্ঠাংশ হারে কর প্রদান করবে এবং গরু, মহিষ, অশ্ব, গাধা ও উটের মতো মহাপশু পালকরা কর প্রদান করবে দশ ভাগের এক ভাগ হারে। বন্ধকী বা কুলটা নারী লালনকারীরা পরমা সুন্দরীদের মাধ্যমে রাজকোষের জন্য বাড়তি অর্থের যোগান দিবে।

০৫-০২-০৬ এক্ষেত্রে প্রজা সাধারণের স্বার্থের দিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে, তারা যেন বিক্ষুব্ধ হয়ে না ওঠে সে নিরিখে এ ধরনের কর শুধু একবারই আদায় করতে হবে। উপরোক্ত উপায়ে যদি পর্যাপ্ত কর সংগ্রহ করা সম্ভব না হয়, তাহলে কর প্রশাসকগণ বিভিন্ন কাজের কথা বলে চাতুরির মাধ্যমে নগর ও জনপদের লোকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করবে। এক্ষেত্রে গুপ্তচররা প্রতারণামূলক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে স্বপ্রণোদিত হয়ে রাজার খাজাঞ্চিতে অর্থ সমর্পণ করে অন্যদেরও অর্থ প্রদানের জন্য উৎসাহিত করবে। যারা রাজকোষে পর্যাপ্ত অর্থ সমর্পণ করবে না, সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য গুপ্তচররা তাদের বিরুদ্ধে জনগণের কাছে নিন্দাজ্ঞাপন করবে। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সক্ষমতার আলোকে রাজার অভিপ্রায় অনুযায়ী অর্থ সমর্পণ করবে। তারা ইতিপূর্বে রাজা কর্তৃক উপকৃত হওয়ার বিষয়টি স্মরণ করে সাধ্যমতো অর্থ সহায়তা প্রদান করবে। রাজা ধনাঢ্যদের কাছ থেকে অর্থগ্রহণ প্রাক্কালে বিভিন্ন দ্রব্য ও রাজকীয় পদ প্রদান করে তাদের সম্মানিত করবেন। রাজার গুপ্তচররা বিভিন্ন ছলনার মাধ্যমে নাস্তিক ও বৌদ্ধসংঘের সম্পদ এবং দেব মন্দিরস্থ বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের ভোগের অযোগ্য দ্রব্য-সম্পদ হাতিয়ে নিয়ে রাজকোষে সমর্পণ করবে।

০৫-০২-০৭ মন্দিরের অধীক্ষক তথা প্রশাসকরা সকল প্রকৃতির মন্দিরের সম্পদ একস্থানে জড় করে সম্পদসমূহ শত্রুদের দ্বারা লুণ্ঠিত হবার আশঙ্কার কথা চাতুর্যের সাথে জনারণ্যে প্রচার করবে, অতঃপর সেসব সম্পদ হেফাজতের জন্য অন্যত্র সংরক্ষণের কথা বলে রাজার সমীপে সমর্পণ করবে।

গুপ্তচরেরা উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে কোনো এক পুণ্যভূমিতে শিবলিঙ্গ উত্থানের কথা সর্বত্র প্রচার করবে, অতঃপর উক্তস্থানে রাত্রিকালে একটি বেদি নির্মাণ করে তার উপর ঐ কথিত শিবলিঙ্গ স্থাপন করে সেখানে উৎসব বা মেলার আয়োজন করে দেবপূজা উপলক্ষে পুণ্যার্থী বা জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্ৰহ করবে এবং সংগৃহীত অর্থ সন্তর্পণে রাজার কাছে প্রেরণ করবে।

অথবা মন্দিরের প্রশাসকরা চাতুরির মাধ্যমে মন্দির সংলগ্ন উপবনে অঋতুতে কোনো বৃক্ষে পুষ্পের পরিস্ফুটন বা ফলের ফলন প্রদর্শন করে উক্ত বৃক্ষে দেবতার আবির্ভাব হয়েছে বলে সর্বত্র প্রচারণা চালাবে এবং দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য জনগণকে অর্থদানের নিমিত্ত প্ররোচিত করবে, অতঃপর জনগণ ভক্তিভরে ঐ কথিত দেবতার সমীপে যে অর্থ দান করবে, অধীক্ষক তা গোপনে রাজার কাছে পাঠিয়ে দিবেন। অথবা সিদ্ধপুরুষের ছদ্মবেশধারী গোয়েন্দারা রাক্ষসের বেশ ধারণ করে শ্মশানে অবস্থান করবে এবং প্রতিদিন তার খোরাকির জন্য একজন করে জ্যান্ত মানুষ দাবি করবে, অন্যথায় সবাইকে একে একে ভক্ষণ করার হুমকি প্রদান করবে। এভাবে ভীতি উৎপাদন করে উক্ত রাক্ষস মানুষকে ভক্ষ্য হওয়া থেকে পরিত্রাণের বিনিময়ে অর্থসম্পদ আদায় করে তা রাজার সমীপে সমর্পণ করবে।

অথবা গোয়েন্দারা সুড়ঙ্গযুক্ত কূপে চাতুর্যের সাথে একটি কৃত্রিম নাগমূর্তি স্থাপন করে ধর্মবিশ্বাসী জনতার অনুভূতিকে প্রতারিত করে দান গ্রহণ করবে এবং দেবতাকে উৎসর্গীকৃত সংগৃহীত অর্থ সঙ্গোপনে রাজার কাছে পাঠিয়ে দিবে। কোনো মন্দির অঙ্গনে বা উঁইঢিবিতে সর্পের উপস্থিতি পরিদৃষ্ট হলে মন্ত্র বা ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে উক্ত সাপের নিষ্ক্রমণ নিরুদ্ধ করতে হবে, অতঃপর সাপটিকে দেবতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত বলে প্রচারণা চালিয়ে মানুষের ধর্মানুভূতিকে প্রতারিত করে অর্থ উৎসর্গ করার জন্য প্ররোচিত করতে হবে। এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণকারীদের পানীয় বা খাবারের সঙ্গে সুকৌশলে স্বল্প পরিমাণ চেতনানাশক বিষ প্রয়োগ করে তাদের বিভ্রান্ত ও শঙ্কিত করতে হবে এবং এদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য কোনো অপরাধী থাকলে তাকে রাত্রিতে বিষাক্ত সাপ দিয়ে দংশন করিয়ে হত্যা করাতে হবে, অতঃপর তা দেবতার অভিশাপ বলে প্রচার করতে হবে, এভাবে নানা তরিকায় সর্পের দেবশক্তির ব্যাপারে জনগণকে আস্থাশীল করতে হবে এবং ছলনার মাধ্যমে সংস্থাপিত সর্পকে উৎসর্গীকৃত জনগণের সমুদয় অর্থ রাজার হাতে তুলে দিতে হবে।

০৫-০২-০৮ বণিকদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য বণিকের বেশে কোনো এক গুপ্তচর বিপণন এলাকায় অন্যান্য বণিকের সঙ্গে মিলিত হয়ে বেঁচা-কেনায় নিমগ্ন হবে এবং সকলের আস্থা অর্জন করবে। অতঃপর ওই গুপ্তচর বিপুল সম্পদের অধিকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সকলের মনে বিশ্বাস উৎপাদন করাবে। এভাবে বিশ্বাস উৎপাদনের পর ব্যবসায়ীরা যখন তার কাছে ধন সম্পদ গচ্ছিত রাখা শুরু করবে, তাকে সুদ প্রদানের শর্তে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া শুরু করবে এবং এভাবে সে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়ে উঠবে, তখন রাজা অন্য গুপ্তচরদের দিয়ে তার সমুদয় অর্থসম্পদ চুরির মাধ্যমে আত্মসাৎ করে নিজের রাজকোষ বৃদ্ধি করবেন।

এই একই প্রক্রিয়ায় মুদ্রা যাচাইয়ের জন্য মুদ্রা পরীক্ষকদের কাছে জনগণ কর্তৃক প্রেরিত মুদ্রার মজুদ এবং স্বর্ণকারদের কাছে অলঙ্কার তৈয়ারির জন্য জনগণ কর্তৃক প্রদত্ত স্বর্ণ, রাজা তার গুপ্তচরদের দিয়ে ছলনার মাধ্যমে অপহরণ করে রাজকোষের সমৃদ্ধি ঘটাবেন। অথবা অভিজ্ঞ বণিকের বেশধারী কোনো এক গুপ্তচর ভোজন উৎসবের কথা বলে অন্যদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্যের মূল্যবান থালা, বাসন ও বিভিন্ন পাত্র চেয়ে নিবে বা ভাড়া হিসেবে গ্রহণ করবে, অতঃপর এ সমস্ত মূল্যবান সামগ্রি ভোজন উৎসবে আগত অতিথিদের সম্মুখে প্রদর্শন করে নিজেকে ধনশালী হিসেবে জাহির করবে এবং সময়মতো পরিশোধের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও স্বর্ণদ্রব্য ঋণ হিসেবে গ্রহণ করবে, এরপর সুকৌশলে অন্য গুপ্তচরদের দিয়ে তার সমুদয় সম্পদ ডাকাতি করিয়ে রাজকোষ বৃদ্ধিকল্পে সংগৃহীত সম্পদ পরোক্ষভাবে রাজার সমীপে নিবেদন করবে।

০৫-০২-০৯ রাজকোষ বৃদ্ধিকল্পে সাধ্বী নারীর ছদ্মবেশধারী নারী (বেশ্যা গুপ্তচররা রাজার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী সন্দেহজনক লম্পট অমাত্যদের ছলনার মাধ্যমে উন্মাদগ্রস্ত করে কাম চরিতার্থের জন্য স্বীয়গৃহে আহ্বান জানাবে, অতঃপর লাম্পট্যের অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করিয়ে সমস্ত সহায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করাবে। অথবা গুপ্তচররা এ ধরনের অমাত্যদের পরিবারে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে বিবাদের সূত্রপাত ঘটিয়ে সুকৌশলে একপক্ষকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করিয়ে অন্যপক্ষের উপর এই হত্যার দায় চাপিয়ে তাদের সর্বস্ব হরণ করে রাজার সমীপে সমর্পণ করবে।

০৫-০২-১০ গুপ্তচরদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে কোনো সাজাপ্রাপ্ত হত্যাযোগ্য ব্যক্তি উপরোক্ত ধরনের সন্দেহভাজন অমাত্যের কাছে হাজির হয়ে অত্যন্ত আস্থার সাথে এমনভাবে তার পাওনা টাকা, বন্ধকী সম্পত্তি, গচ্ছিত ধন বা উত্তরাধিকারের অংশ দাবি করবে, যেন তা সকলের কাছে সত্য বলে প্রতিভাত হয়। এ ছাড়াও উক্ত ব্যক্তি ঐ অমাত্যকে নিজের প্রাক্তন দাস এবং তার স্ত্রীকে দাসী বা নিজের স্ত্রী বলে দাবি করে অপপ্রচার চালাবে। অতঃপর রাত্রিতে সে যখন অমাত্যের ঘরের দরজায় বা অন্য কোথাও নিদ্রামগ্ন থাকবে তখন গুপ্তচররা কৌশলে তাকে হত্যা করবে এবং এই হত্যার সমস্ত দায়ভার উক্ত অমাত্যের উপর চাপিয়ে লোকালয়ে তা প্রচার করবে। এভাবে হত্যার দায় চাপিয়ে গুপ্তচররা ঐ অমাত্যের সমুদয় সম্পত্তি গ্রাস করবে এবং তা রাজার সমীপে সমর্পণ করবে।

০৫-০২-১১ সাধু পুরুষের ছদ্মবেশধারী গুপ্তচররা লোলুপ অমাত্যকে এই মর্মে প্ররোচিত করবে যে তারা অধিবিদ্যার মাধ্যমে রাজপ্রাসাদের দ্বারন্মোচন, নারীর হৃদয়হরণ, আয়ুবর্ধক, শত্রু বিনাশক, সম্পদ আহরণ ও পুত্র সন্তান জন্মদান বিদ্যায় সম্যক পারদর্শী। সংশ্লিষ্ট অমাত্য তাদের কথায় আস্থাস্থাপন করলে তারা কোনো এক শ্মশানে উপস্থিত হয়ে তাকে দিয়ে দেবতার নৈবদ্য হিসেবে মদ, মাংস ও চন্দন সমর্পণ করাবে এবং পূর্ব আয়োজন মোতাবেক কোনো ব্যক্তি বা মৃত শিশুর কবর থেকে কিছু জাল মুদ্রা উদ্ধার করে তার সম্মুখে উপস্থাপন করে বলবে, যেহেতু তিনি অল্প উপহার প্রদান করেছেন সেহেতু তিনি স্বল্প অর্থ পেয়েছেন, বেশি উপহার প্রদান করলে তিনি এভাবে অধিক অর্থের অধিকারী হবেন। এ ধরনের কথায় আস্থাজ্ঞাপন করে অমাত্য যখন প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে অধিক উপহার ক্রয়ের জন্য বাজারে গমন করবেন, তখন অন্য গুপ্তচররা তাকে জাল মুদ্রা দিয়ে পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের অভিযোগে অভিযুক্ত করে গ্রেফতার করাবে এবং তার সর্বস্ব অপহরণের ব্যবস্থা করে সেসব সম্পদ রাজকোষে সমর্পণ করবে।

০৫-০২-১২ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্দেহজনক অমাত্য যখন রাত্রিকালীন যাগযজ্ঞে বা বনক্রীড়ায় ব্যস্ত থাকবে তখন গুপ্তচররা কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে হত্যা করে তার অবস্থান এলাকায় ওই মৃতদেহ ফেলে রাখবে, অতঃপর কোনো নারী গুপ্তচর নিজেকে উক্ত মৃতব্যক্তির মাতা হিসেবে উপস্থাপন করে ওই অমাত্যকে পুত্র হত্যার জন্য দায়ী করে বিলাপ করতে থাকবে এবং এই প্রক্রিয়ায় রাজকোষ বৃদ্ধিকল্পে গুপ্তচররা উক্ত অমাত্যের সর্বস্ব অপহরণের ব্যবস্থা করবে।

অথবা ওই অমাত্যের অধীনস্ত নফরের ছদ্মবেশধারী গুপ্তচর বেতন হিসেবে প্রাপ্ত মুদ্রার সাথে কিছু জাল মুদ্রা মিশিয়ে অমাত্যের বিরুদ্ধে জালমুদ্রা প্রদানের অভিযোগ উত্থাপন করে রাজার কাছে এর প্রতিকার প্রার্থনা করবে, রাজা উক্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অমাত্যের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা হিসেবে তার সর্বস্ব অপহরণ করবে।

অথবা সন্দেহভাজন অমাত্যের বাড়িতে কর্মরত সেবকের ছদ্মবেশধারী গুপ্তচররা কৌশলে তার বাড়িতে জাল মুদ্রা তৈরির উপকরণ রেখে অমাত্যকে জাল মুদ্রা প্রস্তুতকারী হিসেবে অভিযুক্ত করবে এবং এই প্রক্রিয়ায় তার সর্বস্ব হরণ করে রাজ কোষাগারে জমা প্রদানের ব্যবস্থা করবে।

অথবা চিকিৎসকের ছদ্মবেশধারী গুপ্তচররা সন্দেহভাজন অমাত্যকে চিকিৎসা প্রদান প্রাক্কালে সঠিক ঔষধের পরিবর্তে অসুখ বৃদ্ধির ঔষধ সেবন করিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিবে এবং মৃত্যুর পর তার সর্বস্ব হরণ করে রাজকোষে জমা করবে।

০৫-০২-১৩ অথবা সত্রী নামক গুপ্তচররা সন্দেহভাজন অমাত্যের বন্ধু তথা কাছের মানুষ হিসেবে বিশ্বাস স্থাপনের পর সুকৌশলে তার বাড়িতে রাজার অভিষেকের উপকরণ বা শত্রু রাজার কোনো পত্র রেখে আসবে, অতঃপর কাপটিক নামীয় গুপ্তচররা পত্রটি উদ্ধার করে উক্ত অমাত্যকে শত্রুরাজের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে অভিযুক্ত করবে এবং তৎপ্রেক্ষিতে রাজা তার সর্বস্ব হরণ করবে।

এভাবে রাজা সন্দেহভাজন অমাত্য এবং নীতিহীন অমাত্যদের বিরুদ্ধে বহুরৈখিক কলাকৌশল প্রয়োগ করে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে তার খাজাঞ্চিখানার সংকট দূর করবেন। কিন্তু কোষ বৃদ্ধিকল্পে রাজা কখনো সাধারণ প্রজা বা ধার্মিক ব্যক্তিদের উপর এ ধরনের কোনো ছলা-কলা-কৌশল প্রয়োগ করবে না। বাগান থেকে যেমন পরিপক্ক ফল সংগ্রহ করা উচিৎ, রাজাও তেমনি কলুষিত ব্যক্তিদের কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় ধন সম্পদ সংগ্রহ করবেন। বাগান হতে অপক্ক ফল সংগ্রহ করা যেমন সমীচীন নয়, রাজাও তেমনি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে কখনো সাধারণ প্রজাদের কাছ থেকে বাড়তি কিছু আদায় করবে না। এর ব্যত্যয় হলে প্রজা বিদ্রোহের সম্ভাবনা দেখা দিবে, যা রাজার জন্য কখনো প্রত্যাশিত নয়।

তৃতীয় অধ্যায় ॥ ৯১ প্রকরণ

এই অধ্যায়ে রাজার মন্ত্রী, অমাত্য, বিচারক, ধর্মযাজক, সেনাধ্যক্ষসহ রাজকার্যে নিয়োজিত সকল প্রকার কর্মকর্তা, কর্মচারী, ভৃত্য, কুশীলবের ভরণ-পোষণের নিমিত্ত প্রদেয় বেতন সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। এ পর্যায়ে কোন প্রকৃতির রাজ-কর্মচারী কি পরিমাণ বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার অধিকারী হবে, তা যৌক্তিকতাসহ বিধৃত হয়েছে।

০৫-০৩-০১ রাজা নগর ও জনপদ থেকে আহরিত রাজস্বের এক চতুর্থাংশ প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় করবেন।

রাজকার্যে দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের প্রয়োজনে এর অধিক ব্যয় আবশ্যক হলে রাজা তা নির্বাহ করবেন। রাজা অবশ্যই তার আয় খাতের উপর সর্বদা দৃষ্টি রাখবেন। রাজভৃত্য তথা কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন প্রদান করতে গিয়ে তিনি কখনো ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও জনহিতকর কার্য ব্যাহত করবেন না।

বেতনের ক্ষেত্রে ঋত্বিক, আচার্য, মন্ত্রী, পুরোহিত, সেনাপতি, যুবরাজ, রাজমাতা এবং রাজমহিষীরা প্রত্যেকে বাৎসরিক ৪৮,০০০ পণ হারে বেতন লাভ করবে। এই পরিমাণ বেতন লাভের ফলে তারা অতি স্বাচ্ছন্দে পরিতৃপ্তিকর জীবনযাপন করতে পারবে এবং এর ফলে রাজার উপর তাদের কোনো ক্ষোভও থাকবে না।

০৫-০৩-০২ দ্বার অধীক্ষক, অন্তঃপুরের অধীক্ষক, অধিনায়ক, রাজকোষের অধীক্ষক এবং ভাণ্ডার অধীক্ষকদের বাৎসরিক বেতন হবে ২৪ ০০০ পণ। এই পরিমাণ বেতন পেলে এরা সন্তুষ্ট চিত্তে কর্মের জন্য নিবেদিত হবে। কুমার তথা অন্যান্য রাজপুত্র, কুমারমাতা তথা মুখ্যরানি ব্যতীত অন্যান্য রাজরানি, রক্ষীদের মুখ্যকর্তা, পৌর বিচারক, কারখানা সমূহের তত্ত্বাবধায়ক, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রাদেশিক কর্মকর্তা এবং সীমান্ত কর্মকর্তারা প্রত্যেকে ১২ ০০০ পণ হারে বাৎসরিক বেতন লাভ করবে। এই পরিমাণ বেতন পেলে তারা রাজার প্রতি অনুগত থাকবে এবং রাজাকে শক্তিশালীকরণে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে।

০৫-০৩-০৩ একই শ্রেণিভুক্ত শিল্পীদের নিরীক্ষক, হস্তির অধীক্ষক, অশ্বের অধীক্ষক, রথের অধীক্ষক এবং কণ্টক শোধনের দায়িত্বে নিয়োজিত বিচারকরা প্রত্যেকে বাৎসরিক ৮ ০০০ পণ হারে বেতন লাভ করবে। এই পরিমাণ বেতন লাভ করলে তারা তাদের কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণে রেখে কাজ করাতে সক্ষম হবে। পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক, অশ্বারোহী বাহিনীর অধিনায়ক, হস্তি বাহিনীর অধিনায়ক, বনজদ্রব্য উৎপাদনের দায়িত্বে নিয়োজিত বনপাল এবং হাতি চারণের হস্তিবন পালগণ বাৎসরিক ৪,০০০ পণ হারে বেতন লাভ করবে। রথিক তথা রথ চালনার প্রশিক্ষক, রথারোহী যোদ্ধা, হাতির প্রশিক্ষক, চিকিৎসক, অশ্বের প্রশিক্ষক, প্রধান ছুতার এবং ক্ষুদ্র প্রাণী তথা মুরগি ও শূকর পালনের তত্ত্বাবধায়করা বাৎসরিক ২০০০ পণ হারে বেতন লাভ করবে।

০৫-০২-০৪ ভবিষ্যত বক্তা, জ্যোতিষ, হস্তরেখাবিদ, শকুন বিদ্যাবিদ, পৌরাণিক কথক, পুরাণবিদ, মন্ত্রপাঠক এবং কসাইখানার তত্ত্বাধায়করা ১০০০ পণ হারে বাৎসরিক বেতন লাভ করবে। চিত্রকর, গণনাকারী, লিপিকার প্রকৃতির লোকেরা ৫০০ পণ হারে বাৎসরিক বেতন লাভ করবে। অভিনেতা, অভিনেত্রী ও নর্তকী জাতীয় কুশীলবরা ২৫০ পণ হারে বার্ষিক বেতন লাভ করবে। এদের মধ্যে প্রধান বাদ্যকররা বেতন পাবে দ্বিগুণ হারে এবং কারিগর শ্রেণির কর্মীদের বাৎসরিক বেতন হবে ১২০ পণ।

০৫-০৩-০৫ গরু, মহিষ জাতীয় মহাপশুর পরিচারক, মানুষ, পাখিসহ দ্বিপদ প্রাণীর পরিচারক, প্রসাধনের কর্মে নিযুক্ত পরিচারক, সেবক পুরুষ, গবাদি পশুর রক্ষক এবং শ্রমিক সংগ্রহকারী কর্মচারীরা বার্ষিক ৬০ পণ হারে বেতন পাবে। রাজার সঙ্গে সম্পর্কিত সদ্বংশজাত ব্যক্তি, দক্ষতাসম্পন্ন অশ্ব বা হস্তি চালক, বেদ অধ্যায়ী শিক্ষার্থী, প্রস্তর শিল্পী, সংগীত শাস্ত্রের গুরুসহ সকল প্রকৃতির প্রশিক্ষক, অর্থশাস্ত্র বা ধর্ম শাস্ত্রের পণ্ডিতেরা যোগ্যতা অনুসারে বার্ষিক ৫০০ থেকে ১০০০ পণ হারে সম্মানী লাভ করবে। একজন মাঝারিমানের দূত প্রতি যোজন দৌত্যকর্মের জন্য দশ পণ হারে বেতন লাভ করবে। দশ যোজনের বেশি কিন্তু অনধিক শত যোজনের মধ্যে দৌত্যকর্মে নিয়োজিত দূতরা এর দ্বিগুণ হারে বেতন পাবে।

০৫-০৩-০৬ রাজসূয়াদি কর্ম সম্পাদনের জন্য নিয়োগকৃত পুরোহিতরা তাদের সমমানের পুরোহিতদের বাৎসরিক বেতনের চেয়ে তিনগুণ অধিক বেতন লাভ করবে। রাজাকে যজ্ঞের কাজে আনয়নকারী রথের সারথি বা হাতির চালকরা বেতনের অতিরিক্ত ১০০০ পণ পাবে। কাপটিক তথা ছাত্রের বেশধারী গুপ্তচর, উদাস্থিত তথা সন্ন্যাসীর বেশধারী গুপ্তচর, গৃহপতিকব্যঞ্জক তথা কৃষকের বেশধারী গুপ্তচর, বৈদেহক তথা বণিকের বেশধারী গুপ্তচর এবং তাপসব্যঞ্জন তথা জটাযুক্ত তপস্বীর বেশধারী গুপ্তচররা প্রত্যেকে ১০০০ পণ হারে বার্ষিক বেতন লাভ করবে। গ্রাম ভূতক তথা গ্রামের ভৃত্য, ধোপা, নাপিত, সত্রী তথা বিবিধ শাস্ত্রে অধ্যয়নকারীর বেশধারী গুপ্তচর, তীক্ষ্ণ তথা হত্যাকাণ্ডে বিশেষ পারদর্শী গুপ্তচর, রসদ তথা বিষ প্রয়োগকারী গুপ্তচর এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুনীর বেশধারী গুপ্তচররা ৫০০ পণ হারে বার্ষিক বেতন লাভ করবে। গুপ্তচরদের অধীনস্থ সহায়তাকারীরা ২৫০ পণ হারে বাৎসরিক বেতন লাভ করবে অথবা তারা তাদের কর্ম প্রয়াসের পরিপ্রেক্ষিতে এর অধিক বেতনও লাভ করতে পারে।

০৫-০৩-০৭ একজন অধীক্ষক বা তত্ত্বাবধায়কের অধীনে একশ বা এক সহস্র বেতনভোগী ভৃত্য বা কর্মচারী দায়িত্ব পালন করবে। তত্ত্বাবধায়করা এই কর্মচারীদের দিয়ে সুনির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদন করাবেন। কখনো সুনির্দিষ্ট কাজ না থাকলে তত্ত্বাবধায়করা তাদের দিয়ে রাজবাড়ির অন্তঃপুরের কাজ বা দুর্গের কাজ বা পর্যবেক্ষণের কাজ করাবেন। তবে ভৃত্য প্রকৃতির কর্মচারীরা তত্ত্বাবধায়কের অধীনে থেকে ভৃত্যের কাজ করবে। রাজকার্যে নিযুক্ত কোনো কর্মচারী কর্তব্যরত অবস্থায় মৃত্যুমুখে পতিত হলে তার পরিবার পরিজন রাজার কাছ থেকে ভরণপোষণ বাবদ নিয়মিত বেতন পাবে। এ ধরনের মৃত কর্মচারীর শিশু সন্তান, বৃদ্ধ ও পীড়িত ব্যক্তিদের প্রতি রাজা সহমর্মিতার হাত প্রসারিত করবেন। তাদের কারো মৃত্যু হলে, অসুখ হলে বা সন্তান প্রসবিত হলে রাজা আর্থিক সাহায্য প্রদান করবেন এবং তাদের প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করবেন।

০৫-০৩-০৮ রাজকোষে নগদ অর্থের সংকট প্রাক্কালে রাজা বেতন হিসেবে বনজ সম্পদ, পশু এবং ভূমিদান করে সাহায্য করবেন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্বল্পপরিমাণ নগদ অর্থ প্রদান করবেন। কোনো বিরান এলাকায় কর্মচারীরা আবাসন গড়তে ইচ্ছুক হলে রাজা তাদের ভূমি না দিয়ে অর্থ দিয়ে সহায়তা প্রদান করবেন। তিনি কখনো কোনো কর্মচারীকে স্থায়ী গ্রামে নয়াবসতি স্থাপনের অনুমতি দিবেন না, এতে করে উক্ত গ্রামের বিন্যাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে যা প্রকারান্তরে রাজস্ব আদায়ে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে। প্রয়োজনে রাজা তার স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মচারীদের কর্মযোগ্যতার নিরিখে নগদ অর্থে বেতন প্রদানের পরিবর্তে খাদ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। এক্ষেত্রে বার্ষিক ৬০ পণ বেতনধারী কর্মচারীরা দৈনিক এক আঢ়ক পরিমাণ চাউল পাবে।

০৫-০৩-০৯ সূর্যোদয় হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পদাতিক, অশ্বারোহী, রথারোহী ও গজারোহী বাহিনীর সদস্যরা নগরের বাহিরে কোথাও বিচিত্রধর্মী অস্ত্র চালনার নিয়মিত অনুশীলন করবে। রাজা এই চতুরঙ্গ বাহিনীর অনুশীলনের সাথে প্রতিনিয়ত সম্পৃক্ত থাকবেন এবং নিয়মিত অনুশীলন পর্যবেক্ষণ করবেন। অনুশীলন শেষে রাজকীয় মোহরযুক্ত করে প্রতিটি অস্ত্র রাজকীয় অস্ত্রাগারে সংরক্ষণ করাবেন। অনুমতি ব্যতীত কেউই বিশেষ মোহরযুক্ত রাজকীয় অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না। কোনো সৈনিক অস্ত্র বা আবরণ বিনষ্ট করলে তাকে শাস্তি হিসেবে দ্বিগুণ অস্ত্র রাজার অস্ত্রাগারে প্রদান করতে হবে।

০৫-০৩-১০ অস্ত্র সমেত অন্য দেশ থেকে আগত বণিকদের রাজানুমতি তথা আনীত অস্ত্রে রাজকীয় চিহ্ন প্রদর্শন করতে হবে, এর অন্যথা হলে সীমান্ত কর্মকর্তারা এ ধরনের অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করবে। যুদ্ধাভিযান প্রাক্কালে গুপ্তচররা যুদ্ধ সমাপ্তির পর দ্বিগুণ মূল্যে ব্যবহৃত অস্ত্র পুনঃক্রয়ের প্রতিশ্রুত ব্যক্ত করে অস্ত্রহীন যোদ্ধাদের কাছে যুদ্ধাস্ত্র বিক্রয়ের ব্যবস্থা করবে, এর ফলে উৎপাদিত অস্ত্র বিক্রয় যেমন নিশ্চিত হবে তেমনি যোদ্ধাদের বেতন প্রদানজনিত আর্থিক সংকটও হবে দূরীভূত। সত্রী পদবির গুপ্তচর, বেশ্যা, কারুশিল্পী, গায়িকা, নায়িকা, অভিনেতা এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যরা যোদ্ধাদের চারিত্রিক মনোবল, শুদ্ধতা, অশুদ্ধতা সম্পর্কে পরিজ্ঞাত হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

চতুর্থ অধ্যায় ॥ ৯২ প্রকরণ

এই অধ্যায়ে রাজার মন্ত্রী এবং অমাত্যদের অনুজীবী হিসেবে সম্বোধিত করে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এ পর্যায়ে মন্ত্রী এবং অমাত্যরা রাজাকে কীভাবে উপদেশ প্রদান করবে, রাজকর্মে সহায়তা প্রদান করবে কিংবা কীভাবে নিজেকে রাজার সমীপে উপস্থাপন করবে, ইত্যাকার বিষয়সহ কোন পরিস্থিতিতে অনুজীবীরা রাজার অধীনে কর্তব্য পালনে ব্রতী হবে না, সেসব বিষয় আলোচিত হয়েছে।

০৫-০৪-০১ যে রাজার মন্ত্রী অমাত্যরা বিশ্বজগতের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবহিত, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, আত্মগুণসম্পন্ন, মহাকুলীন ও দৈব ক্ষমতাসম্পন্ন, সে রাজার অধীনে অনুজীবী তথা মন্ত্রী অমাত্যরা নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব কর্তব্য পালনার্থে আশ্রয় গ্রহণ তথা চাকুরি গ্রহণ করতে পারে। কোনো রাজার যদি এহেন গুণসম্পন্ন মন্ত্রী অমাত্য না থাকে কিন্তু উক্ত রাজা যদি নিজেই বিদ্বান, মহাকুলীন, বৃদ্ধসংযোগপ্রার্থী, চিত্তাকর্ষক ও দৈবগুণসম্পন্ন হয়ে থাকেন তাহলেও তার নিয়ন্ত্রণাধীনে দায়িত্ব কর্তব্য পালনার্থে চাকুরি গ্রহণ করা যেতে পারে।

কিন্তু রাজা যদি আত্মসম্পদহীন হন তাহলে তার অধীনে কর্তব্য পালন তথা চাকুরি করা সমীচীন হবে না। কারণ, এ ধরনের আত্মসম্পদহীন রাজা অজ্ঞতাজনিত কারণে অর্থশাস্ত্রের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করে থাকেন, রাজনীতির প্রতি তার অনুরাগ থাকে না এবং তিনি পাশা, মৃগয়া এবং নারীসঙ্গের আসক্তির কারণে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিশাল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েও আখেরে সবকিছু বিনাশ করে দেন।

০৫-০৪-০২ আত্মসম্পদযুক্ত রাজার অধীনে নিযুক্তি লাভের প্রাক্কালে সুযোগ পেলেই মন্ত্রী অমাত্যরা অর্থশাস্ত্র বিষয়ক আলোচনার সূত্রপাত করবেন। এক্ষেত্রে কোনো অনুজীবী যদি রাজার জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের সঠিক উত্তরদানে সক্ষম হন, তাহলে তিনি স্থায়ী পদে নিয়োগের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। কোনো করণীয়ের ব্যাপারে রাজা কর্তৃক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নের অবতারণা করা হলে নিয়োগ প্রত্যাশী অমাত্য ভরা মজলিসে বিজ্ঞ ব্যক্তির মতো সপ্রতিভস্বরে-নির্ভয়ে সে প্রশ্নের উত্তর প্রদান করবেন এবং সে বিষয়ের বর্তমান ও ভবিষ্যত ফলাফল সম্পর্কে প্রবীণ ব্যক্তির মতো উপদেশ প্রদান করবেন। অতঃপর রাজা যদি প্রাপ্ত উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে অমাত্য বা মন্ত্রী পদে নিযুক্ত করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন তাহলে উক্ত অনুজীবী নিম্নোক্ত শর্তে রাজকার্যে যোগদানের সম্মতি প্ৰদান করবেন—(ক) প্রজ্ঞাহীন মূর্খের সঙ্গে রাজা কখনো ধর্ম ও অর্থশাস্ত্র বিষয়ক কোনো আলোচনা করতে পারবেন না (খ) যতই বলবান হোক না কেন দুষ্টু ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে নিরোধ করতে হবে (গ) রাজা যখন ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কাউকে শাস্তি প্রদানার্থে উদ্যত হবেন তখন তাকে উক্ত কর্ম হতে নিরোধ করণার্থে আকার ইঙ্গিতে বাধা প্রদান করা হলে, তিনি তাতে অসন্তুষ্ট বা রাগান্বিত হবেন না।

০৫-০৪-০৩ রাজা কর্তৃক উপরোক্ত শর্তে সম্মতিজ্ঞাপন করা হলে উক্ত অমাত্য নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনের দায়িত্বে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে রাজার অনুমতি সাপেক্ষে দরবারে প্রবেশ করবেন। দরবারে আসন গ্রহণের সময় অমাত্যরা রাজার পাশে বা সম্মুখে আসন গ্রহণ না করে সম্মানজনক দূরত্বে উপবেশন করবেন। দরবারে অবস্থানকালে তারা—শ্রেষ্ঠ আসন দখলের জন্য উদগ্রীব হবেন না, মারমুখী ভঙ্গিতে কথা বলবেন না, অমার্জিত কথা বলবেন না, পরনিন্দা করবেন না, আজগুবি বা মিথ্যে কথা বলবেন না, অন্যের বক্তব্যকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবেন না, অকারণে অট্টহাসিতে ফেটে পড়বেন না, বায়ু ত্যাগ করবেন না, উচ্চস্বরে হাসবেন না, কফ্ থুতু নিক্ষেপণ থেকে বিরত থাকবেন, অন্যের সঙ্গে কানাঘুষা করবেন না, কোনো উস্কানিমূলক বক্তব্য পেশ করবেন না, কোনো বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করবেন না, ইন্দ্রজালিকের মতো পোষাক পরিধান না করে রাজকীয় পোষাক পরিধান করবেন, রাজার কাছে প্রকাশ্যে অতিমূল্যবান কিছু প্রার্থনা করবেন না, ওষ্ঠ বা চোখ বাঁকাবেন না, রাজা বক্তব্য প্রদানকালে নিশ্চুপ থাকবেন, এছাড়াও তারা বলবান শত্রুর সঙ্গে বিরোধ, নারী দর্শন, রাজার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী, উদাসীন, তিরস্কৃত ব্যক্তি, নট-নর্তকী এবং দরবারের আন্তঃকোন্দল হতে নিজেদের দূরে রাখবেন, এ সবের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করবেন না।

০৫-০৪-০৪ অমাত্যরা কোনো সময়-ক্ষেপণ না করে অত্যাবশ্যকীয় বিষয় সম্পর্কে রাজাকে অবহিত করবেন। নিজের প্রয়োজনীয় বিষয় অবহিতকরণ আবশ্যক হলে তা রাজার প্রিয়ভাজন অমাত্যের মাধ্যমে পেশ করবেন। অন্যের আবশ্যকীয় বিষয় পরিবেশ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে রাজার সমীপে নিবেদন করবেন। রাজার সমীপে নিবেদিত বিষয়বস্তু অবশ্যই অর্থসঙ্গত এবং ধর্মসম্মত হতে হবে অর্থাৎ অন্তঃসারশূন্য কোনোকিছু রাজার সমীপে পেশ করা যাবে না। রাজার সম্মতি প্রাপ্তির পরই অমাত্যরা সন্তর্পণে তার প্রিয় ও হিতকর কথা উপস্থাপন করবেন, রাজার সম্মুখে কখনো অপ্রিয় বক্তব্য পেশ করবেন না কিন্তু রাজার জন্য কল্যাণকর বলে প্রতীয়মান হলে প্রয়োজনে অপ্রিয় বক্তব্য উপস্থাপন করতে দ্বিধা করবেন না। প্রশ্নের উত্তর প্রদানকালে এ ধরনের হিতকর বক্তব্য দেওয়া যদি ভীতিকর বলে অনুমিত হয় তাহলে অমাত্যরা তা উপস্থাপন না করে মৌনতা অবলম্বন করবেন। রাজার সম্মুখে কখনো রাজবিদ্বেষীদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা সমীচীন হবে না, এ ধরনের লোকেরা অতিশয় দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও রাজার অপ্রিয় ও বিরাগভাজন হয়ে থাকে।

০৫-০৪-০৫ রাজার মনোভাব সম্পর্কে যারা সম্যক অবহিত থাকে তারা নট- নর্তকীর মতো পেশাদারী হলেও রাজার প্রিয়ভাজন হয়ে থাকে। রাজা যখন হাসবেন অমাত্যরা তখন গাম্ভীর্য পরিহার করে তার মতো হাসবে। কিন্তু রাজার সম্মুখে সব সময়ের জন্য তারা অট্টহাসি পরিহার করবে। রাজাকে কোনো ভয়াবহ বিষয় জ্ঞাতকরণ আবশ্যক হলে, অমাত্যরা তা অন্যের মাধ্যমে তার সমীপে পেশ করবে। নিজের সম্পর্কে কোনো ভয়াবহ সংবাদ শ্রুত হলে অমাত্যরা তা পৃথিবীর মতো সহনশীল হয়ে সহ্য করবে। অমাত্যরা সদাসর্বদা সর্ববিষয়ে জ্ঞান লাভ করে নিজের অবস্থান সংহতকরণে সচেষ্ট থাকবে। কারণ, অমাত্যদের বৃত্তি তথা চাকুরি সব সময় অগ্নিসেবনতুল্য বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। আগুন শরীরের অংশবিশেষ বা ক্ষেত্র বিশেষে পুরো শরীর জ্বালিয়ে দেয় কিন্তু রাজা যদি বিরাগ হন, তাহলে অমাত্যের পুরো পরিবার নাশ তথা জ্বালিয়ে ছারখার করে দিতে পারে। আবার রাজা প্রসন্ন হলে অমাত্যকে সংবর্ধিতও করতে পারে।

পঞ্চম অধ্যায় ॥ ৯৩ প্রকরণ ॥

এই অধ্যায়ের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘সময়াচারিক’। এ পর্যায়ে রাজার খাজাঞ্চি সমৃদ্ধকরণের নিমিত্ত অমাত্যরা কি প্রক্রিয়ায় নিজেদের উপর আরোপিত কর্ম সম্পাদন করবে, সে বিষয়সহ অমাত্যদের বিভিন্ন আচার-আচরণের ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে। এছাড়াও এখানে বিভিন্ন লক্ষণ ও ইঙ্গিতের মাধ্যমে সতর্ক সংকেত প্রাপ্তির পর কীভাবে মন্ত্রী অমাত্যরা সতর্কতা অবলম্বন করে নিজেদের রক্ষা করবে, কীভাবে রাজার ক্ষোভ প্রশমিত করবে, স্বীয় অপরাধ মার্জনার ব্যবস্থা করবে, সেসব বিষয়ও বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।

০৫-০৫-০১ রাজকার্যে নিযুক্ত মুখ্য অমাত্যগণ সকল প্রকার ব্যয় নির্বাহের পর প্রকৃত আয় রাজার সমীপে উত্থাপন করবে। তারা জনপদ সম্পর্কিত বাহ্যকাজ, অভ্যন্তরীণ কাজ, গোপনীয় কাজ, প্রকাশ্য কাজ, ব্যয়বহুল কাজ এবং তুচ্ছ কাজের ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণী রাজার অবগতির জন্য পেশ করবে এবং এসব ব্যয়ের হিসেব নিবন্ধন পুস্তকে লিপিবদ্ধ করবে। রাজা যদি শিকার, জুয়া, মদ্য এবং নারী সম্ভোগে আসক্ত হয়, সেক্ষেত্রে দায়িত্বরত অমাত্যরা তাকে অনুসরণ করবে, তার এসব কাজ চাটুকারের মতো সমর্থন করবে এবং ক্রমশ রাজার ঘনিষ্ঠ হয়ে কৌশলে তাকে এসব কু-কর্ম থেকে নিবৃতকরণে সচেষ্ট হবে। দায়িত্বরত অমাত্য রাজাকে শত্রু প্রযুক্ত কু-মন্ত্রণা, প্রবঞ্চণা এবং গুপ্তচরের কবল থেকে রক্ষার্থে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অমাত্যরা প্রজ্ঞাবলে রাজার ইঙ্গিত, অনুভূতি, অনুরাগ, প্রতিক্রিয়া, সন্তুষ্টি কিংবা পরিতৃপ্তি পর্যবেক্ষণ করবে।

০৫-০৫-০২ রাজা কারো প্রতি প্রীত হলে যে লক্ষণগুলো পরিদৃষ্ট হবে তা হলো—সে ব্যক্তিকে দেখামাত্র তিনি প্রসন্ন হবেন। আন্তরিকভাবে তার বক্তব্য শ্রবণ করবেন। আসন গ্রহণের আহ্বান জানাবেন। নির্জনেও সাক্ষাতের অনুমতি প্রদান করবেন। শঙ্কার কারণ থাকলেও তাকে দেখে শঙ্কিত হবেন না। তার সঙ্গ উপভোগ করবেন। অন্যের বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করবেন। তার রূঢ় কথাও সহ্য করবেন। তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করবেন। শরীর স্পর্শ করে তার সঙ্গে হাসি ঠাট্টা করবেন। তার প্রশংসা করবেন। ভোজনের সময় তাকে স্মরণ করবেন। প্রমোদ ভ্রমণে তাকে সঙ্গে রাখবেন। বিপদগ্রস্ত হলে তাকে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসবেন। উক্ত ব্যক্তির অনুরক্তদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন। তাকে গোপনীয় কথা বলবেন। তার সম্মান বৃদ্ধিকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তাকে ঈপ্সিত অর্থ প্রদান করবেন। যার সঙ্গে রাজা উক্তরূপ আচরণ করবেন, বুঝতে হবে তার উপর তিনি প্ৰীত।

০৫-০৫-০৩ অন্যদিকে রাজা যদি কাউকে দেখা মাত্র—ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন, তার কথায় মনোযোগ না দেন, কথা বলতে বারণ করেন, আসন গ্রহণের জন্য আহ্বান না জানান, তার দিকে না তাকান, তাকে দর্শন মাত্র মুখাবয়ব ও কণ্ঠস্বর বদল করেন, চোখ ও ঠোঁট বাঁকা করেন, শরীরে ঘাম ছোটে, মুখে ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফোটান, তাকে উপেক্ষা করে অন্যের সঙ্গে কথা বলায় নিমগ্ন হন, তাকে দেখেই শরীর চুলকাতে শুরু করেন, অন্য মানুষকে ধমকাতে শুরু করেন, তার বিদ্যা- বর্ণ-জাতির নিন্দা করেন, তার সঙ্গে অন্যদের দোষের তুলনা করেন, তার কাজের নিন্দা করেন, তার বিরুদ্ধ কপট লোকের প্রশংসা করেন, তার ভালো কাজও প্রশংসিত না হয়, তার কৃত দোষ সর্বত্র প্রচার করেন, তার চলে যাওয়া পেছন থেকে পর্যবেক্ষণ করেন, কর্ম সম্পাদনের পরও একই কাজের জন্য বারংবার প্রেরণ করতে থাকেন, তার সঙ্গে উদাসীনভাবে কথা বলেন, অন্যান্যদের মতো তার সঙ্গে সমআচরণ না করেন, এসব লক্ষণ পরিদৃষ্ট হলে বুঝতে হবে, রাজা উক্ত ব্যক্তি বা অমাত্যের প্রতি প্রসন্ন নন।

০৫-০৫-০৪ অমাত্যদের সদাসর্বদা মানুষ এবং পশু পাখির আচরণ ও ইঙ্গিতের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। কারণ, মানুষ ও পশু পাখির ইঙ্গিত ও আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সময় অনেক বার্তা দেওয়া হয়ে থাকে। নিজের সুরক্ষার জন্য অমাত্যদের সেসবের অর্থ অনুধাবন করা আবশ্যক। এ সংক্রান্ত কিছু উদাহরণ হলো—জল সেচককে স্বাভাবিক জল সেচন পরিহার করে উপরের দিকে জল সেচ করতে দেখে পৌণ্ড্র দেশের সোমদত্ত রাজার মন্ত্রী কাত্যায়ন রাজাকে পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলেন।

এ ঘটনার প্রেক্ষাপট হিসেবে বলা হয়েছে—উক্ত রাজা সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগে নিজ পুত্রকে কারারুদ্ধ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে বিষয়টি তার মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন, রাজপুত্রের বন্ধুরা এই বিষয়ে অবগত হয়ে তাকে অন্যত্র সরিয়ে রাখে, এ ব্যাপারে রাজা উক্ত মন্ত্রীর প্রতি সন্দেহপোষণ করত তাকে হত্যার আদেশ প্রদান করেন, জলসেচক রাজার এই গোপন আদেশটি শুনে ফেলেন এবং ওই মন্ত্রীকে রাজবাড়ি অভিমুখে গমন করতে দেখে তাকে সতর্ক করার জন্য অস্বাভাবিকভাবে উপরের দিকে জলসেচন করতে থাকে।

জলসেচনের এই অস্বাভাবিকতা দেখে মন্ত্রীর মনে প্রশ্ন জাগ্রত হয় এবং তিনি রাজবাড়ির দিকে অগ্রসর না হয়ে রাজাকে পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন।

০৫-০৫-০৫ কোশল দেশের পরন্তপ রাজার মন্ত্রী কণিষ্কের বামদিক দিয়ে ক্রৌঞ্চ পাখি অস্বাভাবিকভাবে উড়ে যাওয়ায় তিনি রাজাকে পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলেন। এ ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলা হয়েছে—

ভারদ্বারাজ বংশীয় কণিষ্ক ছিলেন কোশল দেশের পরন্তপ রাজার বিশিষ্ট মন্ত্রী। তিনি অর্থশাস্ত্রের বিশেষ পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন। মন্ত্রী যখন রাজপ্রাসাদে গমন করতেন তখন ক্রৌঞ্চ পাখিটি সব সময় তার ডানদিক দিয়ে উড়ে যেত। কোনো একদিন রাজা অন্তঃপুরে নারীদের সঙ্গে অবস্থানকালে মন্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন, মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর রাজা তার আচরণে ক্রুদ্ধ হয়ে তার প্রতি নিন্দা প্রকাশ করেন, ক্রৌঞ্চ পাখিটি রাজার সেই নিন্দা বাক্য শ্রবণ করে মন্ত্রীর জন্য শঙ্কাবোধ করে, পরদিন মন্ত্রী কণিষ্ক যখন রাজবাড়ি অভিমুখে যাত্রা করেন তখন সতর্ক করার জন্য পাখিটি তার বামদিক দিয়ে উড়ে যায়, পাখিটির উড়ে যাওয়ার এই অস্বাভাবিকতা পর্যক্ষেণ করে মন্ত্রীর মনে শঙ্কা জাগ্ৰত হয়, তিনি বুঝতে পারেন যে রাজা তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, অতঃপর তিনি রাজাকে পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন।

০৫-০৫-০৬ মগধের নাবালক রাজার দীর্ঘনামীয় এক শ্রদ্ধাভাজন মন্ত্রী দীর্ঘদিন রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন, একদিন আহারের সময় ভাতের সঙ্গে তৃণের মিশ্রণ দেখে তিনি বিপদাশঙ্কা অনুভব করেন এবং রাজাকে পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলা হয়েছে-

মগধ দেশের মন্ত্রী দীর্ঘ, সে দেশের বালক রাজার পিতার শাসনামলেও অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন মন্ত্রী ছিলেন, এ কারণে রাজমাতা এই মন্ত্রীকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। মন্ত্রী রাজপ্রসাদে উপস্থিত হলে রাজমাতা সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তার সেবায় প্রবৃত্ত হতেন। বালক রাজা সাবালকত্ব অর্জনের পর মন্ত্রীর প্রতি মাতার এই মাত্রাতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা মেনে নিতে পারেননি। এ ব্যাপারে রাজমাতাকে প্রশ্ন করা হলে, মাতা পুত্রকে এই বলে উপদেশ প্রদান করেন যে মন্ত্রী দীর্ঘ তার পিতারও অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন, এ কারণে তার প্রতি তারও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা উচিত এবং তাকে অন্ন বস্ত্র দান করে তার পূজাও করা উচিত। এ ধরনের কথা শ্রবণের পর রাজা উক্ত মন্ত্রীর খাবারে তৃণ মিশিয়ে তাকে খেতে দেন। রাজার এহেন কৃতকর্ম যে তার প্রতি অশ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ একথা অনুধাবন করতে পেরে মন্ত্রী রাজাকে পরিত্যাগ করেন।

০৫-০৫-০৭ বস্ত্র খুব শীতল অনুভূত হচ্ছে, এ কথা শুনে অবন্তি দেশের রাজা অংশুমানকে পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিল সে দেশের মন্ত্রী ঘোটমুখ। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলা হয়েছে—

রাজা অংশুমান তার পুত্রকে নীতিবিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষক হিসেবে ঘোটমুখকে নিযুক্ত করেছিলেন, শিক্ষা প্রদানের কোনো এক পর্যায়ে ঘোটমুখের প্রতি রাজা অপ্রসন্ন হন। বিষয়টি সংকেতের মাধ্যমে শিক্ষককে অবহিত করার জন্য গুরুভক্ত রাজকুমার প্রতিদিনের মতো স্নান শেষে কাপড় নিংড়ে তা স্কন্দে ধারণ করে গৃহে প্রবেশের পরিবর্তে কাপড়টি শীতল বলে স্নানের স্থানে রেখে গৃহে প্রবেশ করেন। এই সংকেতের মাধ্যমে ঘোটমুখ তার উপর রাজার অপ্রসন্নতার বিষয়টি অনুভব করতে পেরে রাজাকে পরিত্যাগ করে চলে যান।

০৫-০৫-০৮ হাতিকে তার দিকে জল সিঞ্চন করতে দেখে আচার্য কিঞ্জল্ক বঙ্গদেশের রাজা সতানন্দকে পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলা হয়েছে

আচার্য কিঞ্জল্ক বঙ্গরাজ শতানন্দের সঙ্গে থাকতেন। প্রতিদিন রাজার কাছে উপস্থিত হওয়ার সময় তিনি রাজাকে বহনকারী হাতিটিকে আদর করে প্রাসাদে প্রবেশ করতেন। কোনো একদিন রাজা হাতির পিঠে ওঠার সময় অন্য এক ব্যক্তির কাছে আচার্যের বিরুদ্ধে ক্রোধমূলক মন্তব্য করেন। অতঃপর পরবর্তী দিবসে আচার্য যখন রাজপ্রাসাদে প্রবেশের পথে প্রতিদিনকার মতো হাতিটিকে আদর করতে এগিয়ে যান, তখন হাতিটি শুঁড় দিয়ে আচার্যের শরীরে জল ছিটিয়ে দেয়। এ ধরনের কোনো ঘটনা ইতিপূর্বে না ঘটায় আচার্যের মনে বেশ খট্‌কা লাগে এবং এর হেতু সন্ধান করে তিনি রাজার ক্ষোভের বিষয়টি জানতে পারেন, এরপর আচার্য রাজাকে পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যান।

০৫-০৫-০৯ রাজপুত্র কর্তৃক নিজের রথের ঘোড়াকে দ্রুতগামী হিসেবে প্রশংসা করায় আচার্য পিশুন উজ্জয়িনীর রাজা প্রদ্যোতকে পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যান। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলা হয়েছে—

উজ্জয়িনীর রাজা প্রদ্যোত রাজকুমারকে রাজনৈতিক বিদ্যাশিক্ষা দেওয়ার জন্য আচার্য পিশুনকে নিয়োগ করেছিলেন। শিক্ষা সমাপ্তির পর রাজা একদিন রাজকুমারের সঙ্গে আচার্যের সম্পদ অপহরণের বিষয়ে আলোচনা করেন। রাজকুমার বিষয়টি ইঙ্গিতের মাধ্যমে আচার্যকে জানানোর জন্য অশ্বযুক্ত রথে আরোহণ করে তার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘আমার রথের অশ্বরা অত্যন্ত দ্রুতগামী, তারা একদিনে ৩০০ যোজন পথ পাড়ি দিতে পারে’। এই ইঙ্গিতপূর্ণ কথার মাধ্যমে আচার্য পিশুন তার উপর রাজার অপ্রসন্নতার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন এবং রাজা প্রদ্যোতকে পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যান।

০৫-০৫-১০ কুকুরের ডাক শুনে আচার্য পিশুনের পুত্র রাজাকে পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলা হয়েছে—

আচার্য পিশুনের পুত্র নাবালক অবস্থাতেই নীতিশাস্ত্র অধ্যয়নের মাধ্যমে সম্যক প্রজ্ঞার অধিকারী হয়েছিল। রাজাও তাকে বিদ্বানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর বলে বিবেচনা করতেন। একদিন রাজা তার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, পিশুনপুত্র নিতান্ত বালক, তাই তাকে মন্ত্রিত্বের পদে আসীন করা সমীচীন নয়, সাবালকত্ব অর্জনের পর তাকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ করা যেতে পারে, এহেন অবস্থায় সাবালকত্ব অর্জন না করা অবধি তাকে অবরুদ্ধ করে রাখতে হবে। এই মন্তব্য শ্রবণের পরই একটি কুকুর পিশুন পুত্রের সম্মুখে চিৎকার করতে থাকে। কুকুরের এই অস্বাভাবিকতা দেখে পিশুন পুত্র শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং বুঝতে পারেন যে তার প্রতি রাজার বিকারগ্রস্ততা দেখা দিয়েছে। অতঃপর তিনি রাজাকে পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যান।

এভাবেই বিভিন্ন সময় ইঙ্গিত বা সংকেত প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে অমাত্যরা বিপদাশঙ্কা অনুভব করে রাজাকে ত্যাগ করেছিল, বর্তমানকালের অমাত্য বা রাজার অধীনস্থ রাজপুরুষরাও একইভাবে এ ধরনের ইঙ্গিত বা সংকেত প্রাপ্তির পর নিজেকে সুরক্ষার স্বার্থে রাজাকে পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবেন।

০৫-০৫-১১ রাজা কর্তৃক যদি কোনো রাজ-কর্মচারী তথা অমাত্যর সম্পদ ও সম্মান বিনষ্ট করা হয়, তাহলে উক্ত অমাত্য রাজাকে পরিত্যাগ করে চলে যাবে। কিংবা উক্ত অমাত্য রাজার ইতিবাচক দিকগুলো মূল্যায়ন করে নিজেদের দোষ ও দুর্বলতাগুলো খতিয়ে দেখে রাজার ক্ষোভ প্রশমিত করতে সচেষ্ট হবে এবং রাজার সঙ্গে থেকে যাবে।

রাজা যদি কোনো অমাত্যের প্রতি ক্রুদ্ধ হন, তাহলে উক্ত অমাত্য রাজার কোনো মিত্র রাজার কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে তার মাধ্যমে রাজার ক্ষোভ প্রশমিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। রাজা যদি তার দোষ মার্জনা করেন তাহলে অমাত্য স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে স্বীয় দায়িত্বে পুনরায় নিয়োজিত হবে। অথবা উক্ত অমাত্য অন্য কোথাও না গিয়ে নগরেই অবস্থান করবে এবং নিজের মিত্রদের সহায়তায় রাজার কাছে কৃত অপরাধ মার্জনার জন্য প্রয়াস গ্রহণ করবে।

ষষ্ঠ অধ্যায় ॥ ৯৪-৯৫ প্রকরণ ॥

এই অধ্যায়ে রাজ্যের সংহতি ও সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের নিমিত্ত করণীয় সম্পর্কিত বিষয় আলোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে উত্তরাধিকারের প্রশ্নে দ্বন্দ্ব উপস্থিত হলে কোন তরিকায় তার সমাধান করতে হবে। রাজার সঙ্গে অমাত্যদের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে করণীয় কি হবে, ইত্যাকার বিষয়সহ প্রধান অমাত্যের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে।

০৫-০৬-০১ রাজার কঠিন অসুখ বা মৃত্যুজনিত কারণে বিপত্তি উত্থিত হলে অমাত্যরা তা সুরাহাকল্পে পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় সম্পর্কিত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। রাজা মরণাপন্ন অবস্থায় উপনীত হওয়ার পূর্বেই অমাত্যরা তার প্রিয় ব্যক্তিদের সমবেত করবে এবং তাদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এক বা দুই মাসের ব্যবধানে দর্শনেচ্ছুক ব্যক্তিদের রাজ-দর্শনের ব্যবস্থা করাবে। রাজার সংকটাবস্থা গোপন রাখার জন্য তারা চাতুরির আশ্রয় গ্রহণ করবে এবং বিলম্বিত রাজ-দর্শনের কারণ হিসেবে বলবে যে রাজা দেশের শত্রু বিনাশের ব্যাপারে ব্যস্ত আছেন বা দীর্ঘায়ু পুত্র লাভের জন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিমগ্ন আছেন।

প্রয়োজন হলে প্রধান অমাত্য রাজ-দর্শনের নির্দিষ্ট দিনে রাজার কোনো এক প্রতিরূপকে প্রকৃত রাজা হিসেবে দর্শনার্থী প্রজা, মিত্রপক্ষীয় দূত এবং অমিত্রপক্ষীয় দূতদের সম্মুখে হাজির করাবে। উপস্থাপিত এই নকল রাজা সরাসরি প্রজাদের সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না, অমাত্যরা তার হয়ে প্রজাদের সঙ্গে কথা বলবেন। তিনি প্রজাদের প্রত্যাশার নিরিখে অপকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করবেন এবং উপকারী ব্যক্তিদের প্রতি তার প্রসন্নতা প্রকাশ করবেন।

০৫-০৬-০২ প্রয়োজন হলে প্রধান অমাত্য চাতুর্যের মাধ্যমে নগরস্থ ও সীমান্ত এলাকাস্থ রাজকোষ ও সেনাবাহিনীকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় স্থানান্তর ও সন্নিবেশ করাবেন। একই সাথে তিনি ছলনার মাধ্যমে রাজকুলের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, রাজকুমার এবং রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একত্রিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এক্ষেত্রে কোনো দুর্গ বা অরণ্যের অধিকর্তা যদি নেতিবাচক আচরণ প্রদর্শন করে তাহলে তাকে ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন করাতে হবে অথবা তাকে বিপদশঙ্কুল এলাকায় যুদ্ধ করতে বা শত্রু দমন করতে পাঠাতে হবে অথবা মিত্ররাজ্যে সহায়তা কর্মের জন্য প্রেরণ করতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে প্রধান অমাত্য যদি কোনো সামন্তরাজের পক্ষ থেকে আক্রমণের শঙ্কা অনুভব করেন, তাহলে তিনি ছলনামূলক উৎসব, বিবাহঅনুষ্ঠান, হস্তিবন্ধন-অনুষ্ঠান, অশ্ব বিপণন-অনুষ্ঠান বা ভূমিপ্রদান-অনুষ্ঠানের আয়োজন করে কৌশলে কোনো মিত্রের মাধ্যমে তাকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত করাবেন, অতঃপর উক্ত মিত্রের সঙ্গে সামন্ত রাজের সন্ধি করিয়ে তার হুমকির প্রতিকার করবেন। অথবা উক্ত সামন্ত রাজের সঙ্গে অরণ্য প্রধানের বিরোধ বাধিয়ে দিয়ে তাকে নিরস্ত্র করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অথবা উক্ত সামন্তরাজের পুত্রদের ভূমি প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে তার দ্রোহ বা হুমকি স্তিমিত করাবেন।

০৫-০৬-০৪ রাজা জীবন সংকটের সন্ধিক্ষণে উপনীত হলে বা মৃত্যুবরণ করলে, প্রধান অমাত্য রাজকুলের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, রাজকুমার এবং রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমর্থন আদায়পূর্বক কোনো এক রাজকুমারকে সিংহাসনে আরোহণকারী হিসেবে উপস্থাপন করাবেন। কোনো সামন্তরাজ যদি এধরনের সিদ্ধান্তে তুষ্ট না হয়ে বিরোধিতায় অটল থাকে, তাহলে তাকে সিংহাসন প্রদানের প্রলোভন দিয়ে ডেকে এনে হত্যা করতে হবে বা অন্য তরিকায় তাকে অবদমিত করতে হবে।

০৫-০৬-০৫ যুবরাজের অনুপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণীয় হবে। এক্ষেত্রে রাজ্যে যদি পূর্ব থেকেই যুবরাজের উপস্থিতি বিদ্যমান থাকে, তাহলে রাজার জীবিতকালেই উক্ত যুবরাজকে পর্যায়ক্রমে রাজ্য শাসনের উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং তাকেই রাজাসনে বসিয়ে রাজার মৃত্যুর কথা প্রকাশ করতে হবে।

কোনো শত্রু রাজার মাধ্যমে বিপত্তি উত্থিত হলে, মিত্র রাজার মাধ্যমে উক্ত শত্রুরাজের সঙ্গে সন্ধি স্থাপনের মাধ্যমে তার সুরাহা করতে হবে। সামন্তদের বিদ্রোহের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে বিদ্রোহ দমন করে তার অধীনে দুর্গ ও খাজাঞ্চিখানা রক্ষার ভার-অর্পণ করতে হবে। অথবা যুবরাজকে বিদ্রোহীর দুর্গের ভার-অর্পণ করে শত্রুর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযান চালাতে হবে। এক্ষেত্রে প্রধান অমাত্য শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণের প্রকৃতি নিরূপণ করে আক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এভাবেই প্রধান অমাত্য রাজার অনুপস্থিতিতে উদ্ভূত বিপত্তি উৎক্রমণের উদ্যোগ গ্রহণ করে রাজ্যের সংহতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সচেষ্ট হবেন।

০৫-০৬-০৬ কৌটিল্যের মতানুযায়ী উপরোক্ত উপায়ে প্রধান অমাত্য রাজবংশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজ্যের সার্বভৌমত্বের ধারাবাহিকতা সংরক্ষণ করবেন। কিন্তু আচার্য ভারদ্বাজ কৌটিল্যের উক্ত অভিমত সমর্থন করেন না। তিনি মনে করেন—প্রধান অমাত্যরা কখনোই সিংহাসনের উপর রাজপুত্রদের একচ্ছত্র অধিকার সংরক্ষণে সচেষ্ট হবে না। তার মতে— রাজা মৃত্যুর দুয়ারে উপনীত হলে সিংহাসনের উত্তরাধিকারের প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট অমাত্য রাজকুলজাত ব্যক্তি, রাজকুমার এবং রাজ্যের মুখ্য ব্যক্তিদের মধ্যে বিবাদ বাধিয়ে দিবেন এবং প্রজা বিদ্রোহ উস্কে দিয়ে রাজ্য আক্রমণকারীকে হত্যা করাবেন।

অতঃপর বিবাদরত রাজকুলজাত, রাজকুমার এবং রাজ্যের মুখ্য ব্যক্তিদের গোপনে হত্যা করে সিংহাসন নিষ্কণ্টক করে নিজেই সিংহাসনে আরোহণ করবেন। দেখা যায়, সিংহাসনের জন্য পিতা পুত্রের বিরুদ্ধে এবং পুত্র পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধে মত্ত হয়। এক্ষেত্রে প্রধান অমাত্যের তো কোনো কথাই নেই, তিনিই তো বাস্তবক্ষেত্রে রাজ্যের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারী। সুতরাং তিনি সুযোগ হাতছাড়া করবেন কেন, এ কারণে রাজ্য যখন নিজ থেকে প্রধান অমাত্যের সম্মুখে উপস্থিত হবে তখন তাকে লুফে নেওয়াই সমীচীন হবে। বলা হয়ে থাকে, রমণের নিমিত্ত কোনো নারী যদি কোনো পুরুষের সান্নিধ্যে এসে প্রত্যাখ্যাত হয় তাহলে উক্ত পুরুষ ওই নারী কর্তৃক অভিশপ্ত হয়। এই দৃষ্টান্তের আলোকেই কোনো অমাত্যের দরজায় রাজসিংহাসন কড়া নাড়লে তা প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়।

০৫-০৬-০৭ আচার্য ভারদ্বাজের উপরোক্ত অভিমতের সাথে কৌটিল্য সহমত পোষণ করেন না। তিনি মনে করেন এভাবে রাজকুলজাত ব্যক্তি, রাজ্যের মুখ্যব্যক্তি এবং রাজকুমারদের হত্যা করে সিংহাসন দখল করা হলে, রাজ্যে প্রজা অসন্তোষ ও বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। এছাড়াও এ ধরনের কাজ যেমন ধর্মসম্মত নয়, তেমনি এর পরিণতিও থাকে অজ্ঞাত। এ কারণে উক্ত প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ না করে আত্মগুণসম্পন্ন কোনো রাজকুমারের অনুকূলেই রাজ্যের সার্বিক ভার-অর্পণ করা উচিৎ।

এক্ষেত্রে যদি আত্মগুণসম্পন্ন রাজকুমারের সংকট পরিদৃষ্ট হয়, তাহলে নারী ও মদ্যে অনাসক্ত কোনো রাজকুমারকে রাজ্যের ভার-অর্পণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রধান অমাত্য এক্ষেত্রে সম্ভাব্য রাজাকে অন্যান্য অমাত্য, রাজমাতা এবং রাজ্যের মুখ্য ব্যক্তিদের সম্মুখে হাজির করে তাকে রাজ্যের আমানত হিসেবে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবেন। তিনি এ সময় সমবেতদের উদ্দেশে বলবেন—এই রাজা নামকাওয়াস্তে রাজা, প্রকৃতঅর্থে রাজ্য তো আপনারাই পরিচালনা করবেন, আপনারাই তো প্রকৃত অর্থে রাজা। এই রাজাকে আপনাদের কাছে আমানত হিসেবে গচ্ছিত রাখা হলো, এখন আপনারাই এর হেফাজত করবেন।

০৫-০৬-০৯ প্রধান অমাত্য কর্তৃক উপরোক্ত বক্তব্য প্রদানের পর তিনি উপস্থিত বিশিষ্টজনদের কাছে রাজার প্রতি সমর্থন প্রার্থনা করবেন। এ পর্যায়ে পূর্ব আয়োজন মোতাবেক বিশিষ্টজনের ছদ্মবেশধারী গুপ্তচররা সমস্বরে রাজার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করবে এবং উক্ত রাজার মাধ্যমেই যে তাদের ধর্ম সংরক্ষিত হবে সে কথা আস্থার সাথে ব্যক্ত করবে। অতঃপর প্রধান অমাত্য উক্ত রাজাকে রাজাসনে আসীন করে তার সঙ্গে নিকটজন, আত্মীয় কুটুম্ব, অমাত্য, রাজপুরুষ এবং দূতদের পরিচয় করিয়ে দিবেন।

০৫-০৬-১০ নবনিযুক্ত রাজা অমাত্য, রাজপুরুষ, সেনাপতি এবং সৈনিকদের আস্থা অর্জনের জন্য তাদের প্রদেয় ভোজনদ্রব্য ও বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা প্রদান করবেন এবং ভবিষ্যতে আরও বেতন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি প্ৰদান করবেন। অতঃপর প্রধান অমাত্য নবনিযুক্ত রাজার ব্যাপারে শত্রু ও মিত্র পক্ষীয় রাজাদের সঙ্গে যথাযথভাবে আলোচনার জন্য অমাত্যদের নির্দেশনা প্রদান করবেন। তিনি রাজাকে উপযুক্ত শিক্ষা প্রদানেরও ব্যবস্থা করবেন।

রাজকুমারের পরিবর্তে যদি রাজকন্যাকে রাজাসনে অভিষিক্তকরণ আবশ্যক হয়, সেক্ষেত্রে উক্ত রানির সঙ্গে সমজাতীয় পুরুষের বিবাহ সম্পন্ন করে তার গর্ভজাত পুত্রকে পরবর্তীসময়ে রাজাসনে অভিষিক্তকরণের জন্য রানিকে রাজদায়িত্ব পরিত্যাগের প্রতিশ্রুত প্রদান করতে হবে। সিংহাসনত্যাগী এরূপ রাজমাতার যাতে চিত্ত-চাঞ্চল্য বা বৈকল্য না ঘটে সেজন্য প্রধান অমাত্য তাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য অল্প তেজস্ব সৎকুলজাত ব্রাহ্মণকে নিয়োগ প্রদান করবেন, উক্ত ব্রাহ্মণ দেবপূজা, দেববিগ্রহের সেবা এবং পুরাণ কাহিনি বর্ণনা করে রাজামাতার মনের ক্ষোভ বা চাঞ্চল্য দূর করবে। ঋতুকালে তিনি যেন আরও সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য গর্ভধারণের সুযোগ পান, সে ব্যাপারে প্রধান অমাত্য বিশেষভাবে সচেতন থাকবেন। প্রধান অমাত্য ও অন্যান্য অমাত্যরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনোপ্রকার ভোগ্যদ্রব্য বা বিলাসদ্রব্য সংরক্ষণ করবে না। কিন্তু রাজার জন্য বস্ত্র, নারী, শয্যা, গৃহ, বাহনসহ সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা ও বিলাস দ্রব্যের যোগান নিশ্চিত করতে হবে।

০৫-০৬-১১ নবনিযুক্ত নাবালক রাজা যৌবনপ্রাপ্ত হলে প্রধান অমাত্য বা অন্য অমাত্যরা তার মনোভাব জানার জন্য দায়িত্ব পরিত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করবেন, এতে যদি রাজা সম্মতিজ্ঞাপন করেন, তাহলে বুঝতে হবে রাজা তাদের প্রতি প্রসন্ন নন, সেক্ষেত্রে তারা দায়িত্ব হতে অব্যাহতি গ্রহণ করবেন। রাজা যদি সম্মতিজ্ঞাপন না করেন, তাহলে বুঝতে হবে রাজা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, সেক্ষেত্রে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন। রাজার কাজে যদি প্রধান অমাত্য বা অন্য কোনো অমাত্য বিরক্তবোধ করেন বা রাজা যদি কোনো অমাত্যের উপর অপ্রসন্ন হন, তাহলে সংশ্লিষ্ট অমাত্য সেবাকর্মে নিয়োজিত সেবকদের রাজকুমারকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা প্রদান করে তপস্যার জন্য অরণ্যে চলে যাবেন।

০৫-০৬-১২ অথবা সংশ্লিষ্ট অমাত্য রাজার কোনো প্রিয়ভাজন অমাত্যের আশ্রয়ে অবস্থান করত মাতৃকুলের মুখ্যগণের দ্বারা প্রভাবিত রাজাকে সঠিক পথে চালনার জন্য অর্থশাস্ত্র, ইতিহাস বা পুরাণ সাহিত্য সম্পর্কিত জ্ঞানদান করবেন। এভাবে জ্ঞানদানে অসমর্থ হলে, সংশ্লিষ্ট অমাত্য সাধু পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করে কপট বৃত্তির মাধ্যমে রাজাকে বশীভূত করবেন, অতঃপর তার উপর প্রভাব বিস্তার করে সন্দেহভাজন রাজঅমাত্যদের চিহ্নিত করবেন এবং দমননীতির আলোকে তাদের দমন করে রাজাকে শঙ্কা মুক্ত করবেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%