এই মিলনমেলা প্রাঙ্গণে বইমেলা চলে আসার পর থেকে আমার সুবিধেই হয়েছে৷ বেশ ক-বছর হল আমি গড়িয়া স্টেশনের কাছে বাড়ি করে চলে এসেছি৷ আগে ভবানীপুরে বেণীনন্দন স্ট্রিটে ভাড়া থাকতাম৷ তখনও সুবিধে হত বইমেলায় যেতে৷ তখন তো বইমেলা বসত ময়দানে৷
সাত বছর হল রিটায়ার হয়েছি৷ হাতে এখন সময়ও অঢেল৷ তাই বইমেলা চলাকালীন বেশ কয়েকটা দিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বইমেলাতেই কাটাই৷
এবার নিয়ম করে প্রতিদিনই আসছি বইমেলায়৷ বই একটাও কেনা হয়নি বটে, কিন্তু ঘুরে ঘুরে বই দেখার খামতি নেই৷ আজ একটু তাড়াতাড়ি মেলায় এসে গেছি৷ টং টং করে হাঁটছিলাম৷ হঠাৎ একটা স্টলে ঢুকেই আমি অবাক হয়ে গেলাম৷ দেখি কী, ওই স্টলের একটা তাক থেকে বই পাড়ছে অবিনাশ৷ ভালো করে দেখলাম, হ্যাঁ, অবিনাশই তো! ইউনিভার্সিটিতে বাংলা নিয়ে পড়ত৷ লম্বা, ফরসা, ছিপছিপে চেহারা৷ মাথায় কোঁকড়া চুল৷ চোখে চশমা৷
আমি এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে ওর পিঠে হাত রাখলাম, 'অ্যাই অবিনাশ! কী বই দেখেছিস?'
চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল অবিনাশ৷ তারপর জিজ্ঞেস করল, 'আপনি, মানে... আপনাকে তো ঠিক চেনা...'
আমি ওর ডান হাতটা চেপে ধরে বললাম, 'আরে, আমি নীলকান্ত৷ ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে বাংলা পড়তাম৷'
হা-হা করে হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরল অবিনাশ৷ বলল, 'আরে তুই নিলু? তাই বল! বড্ড বুড়ো লাগছে রে তোকে৷ কতদিন পর দেখা৷'
আমি বললাম, 'হ্যাঁ, তা ধর তিরিশ বছর তো হবেই৷ তোর সঙ্গে লাস্ট দেখা হয়েছিল কবে, তোর মনে আছে?'
অবিনাশ বলল, 'হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন? হাওড়া স্টেশনে৷ তুই যেন কোথায় বেড়াতে যাচ্ছিলি, তোর কলেজের ভূগোলের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে৷ আর আমি সবে ট্রেন থেকে নেমেছি৷'
আমি বললাম, 'হ্যাঁ, মনে পড়েছে৷ ওদের নিয়ে সেবার সাংলা কল্পা বেড়াতে যাচ্ছিলাম৷ আর তুই অসম থেকে হাওড়ায় এসে নেমেছিলি৷ ওসব কথা থাক৷ তোর বই কেনা হয়েছে? তাহলে চল, কোথাও একটু চা খাই৷' অবিনাশ বলল, 'দাঁড়া৷ আরও ক-টা বই কিনতে হবে৷ এই স্টলে খুব ভালো ভালো ভূতের গল্পের বই পাওয়া যায়৷ আচ্ছা চল, আগে চা খেয়ে আসি৷'
আমি আর অবিনাশ একটা চায়ের স্টলে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে গল্প জুড়ে দিলাম৷ এ কথা, ও কথা, সে কথা৷ গল্প যেন আর ফুরোয় না৷ শেষে আমি বললাম, 'শোন অবিনাশ, তোর যদি আপত্তি না থাকে, আজ তুই আমার বাড়ি চল৷ দুই বুড়োতে জমিয়ে গল্প হবে৷'
অবিনাশ বলল, 'রিটায়ার্ড মানুষ৷ তা আমার আর আপত্তি কী? তবে আরও ক-টা ভূতের বই কিনি, তারপর৷' অবিনাশ প্রচুর ভূতের গল্পের বই কিনে ফেলল৷ ওর পিছন পিছন আমি ঘুরতে লাগলাম৷ একসময় ক্লান্ত হয়ে বললাম, 'এত ভূতের বই নিয়ে কী করবি বল তো? তুই কি ভূতের বইয়ের লাইব্রেরি করছিস বাড়িতে?'
জোরে হেসে উঠল অবিনাশ, 'আরে না না৷ তুই তো জানিস, আমার যত কারবার ভূত নিয়েই৷'
আমি অবাক হয়ে বললাম, 'তোর ভূতের আগ্রহের কথা আবার জানি না? সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সময় একবার এক অমাবস্যার রাতে তোরা হাইকোর্টে ভূত আছে কি না দেখতে গিয়েছিলি৷ কে কে যেন ছিল তোর সঙ্গে?'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিনয়, সুদীপ আর মৃগাঙ্ক ছিল,' বলল অবিনাশ৷
'আমার স্পষ্ট মনে আছে৷ অত রাতে হাইকোর্টের কাছে ঘুরছিলি বলে তারপর তোদের পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল৷ অবশ্য পরের দিন তোদের ছেড়ে দিয়েছিল৷ তা তোর সেই ভূত-বাতিক এখনও আছে?'
'নেই আবার? কলকাতা ছেড়ে অসমের একটা কলেজে বাংলা পড়াতে চলে গেলাম৷ বছর তিরিশ পর রিটায়ার করলাম৷ তার পর থেকে এই ভূত নিয়েই তো আমার রোজগার৷'
আমি চোখ নাচিয়ে বললাম, 'ও মা, তাই নাকি? কীরকম, কীরকম?'
অবিনাশ বলল, 'চল, তোর বাড়ি গিয়ে সব গল্প করব৷ আগে একটা ট্যাক্সি নে৷ এত বই নিয়ে কি হাঁটা যায়?'
আমরা বইমেলা থেকে বেরিয়ে অনেকক্ষণ একটা ট্যাক্সি ধরার জন্যে দৌড়াদৌড়ি করলাম৷ কলকাতায় ট্যাক্সি ধরা লটারির টিকিট পাওয়ার মতো৷ আমরা হাল ছেড়ে দিয়ে একটা বাসেই উঠলাম৷
অবিনাশ জিজ্ঞেস করল, 'তোরা এই সব নিয়ে বেশ আছিস কলকাতায়? আমার তো আর অসম থেকে কলকাতা আসাই হয়ে উঠল না৷ ওখানেই থেকে গেলাম৷'
'বাড়ি করেছিস, না ভাড়া বাড়িতেই?'
'বিয়ে থা করলাম না, তো বাড়ি করে কী হবে? আমি থাকি গুয়াহাটি থেকে বেশ কিছুটা দূরে৷ তা প্রায় কুড়ি কিলোমিটার তো হবেই৷ জায়গাটার নাম আমিনগাঁও৷ শহরতলি বলতে পারিস৷ তবে জায়গাটা আমার বেশ পছন্দের৷ তুই বিয়ে করেছিস?'
আমি হেসে বললাম, 'তোরই মতো৷ বিয়ে করে ওঠার সময়ই পেলাম না৷ ছাত্র পড়াতে পড়াতে কখন যে বয়স হয়ে গেল৷'
'আমিও বলি, আর ঝামেলা বাড়ানো কেন? একলা খাওদাও, ঘুরে বেড়াও৷ সময় হলে টুক করে কেটে পড়ো৷' বলে অবিনাশ ওর একটা বইয়ের ব্যাগ আমার কাঁধে চাপিয়ে দিল, 'ধর তো! বড্ড ভারী৷'
বাসটা গড়িয়া স্টেশন হয়ে সোনারপুর যাবে৷ আমরা স্টেশনের কাছে নেমে পড়লাম বাস থেকে৷ পূর্ণিমার এখনও দিন সাতেক বাকি৷ আকাশে চাঁদ উঠেছে৷ চারদিকে গাছগাছালি দেখে অবিনাশ বলল, 'পূর্ণিমা হলে দারুণ হত৷ তোর এখানে প্রকৃতির একটা আলাদা রূপ আছে৷ জানিস তো, আমাদের আমিনগাঁও অনেকটা এরকম৷'
মিনিট পাঁচেক হেঁটে আমার বাড়ি চলে এলাম৷ আমার ছোট্ট একতলা বাড়িটা দেখে অবিনাশ বেজায় খুশি, 'বাঃ! তোর বাড়িটা দিব্যি একটা খেলনা বাড়ির মতো৷'
বারান্দার তালা খুলে ভিতরে ঢুকলাম৷ আলো জ্বালতে অবিনাশ চেঁচিয়ে উঠল, 'আরে, তোর টেবিলেও তো দেখছি ভূতের বই৷ তুইও লুকিয়ে লুকিয়ে ভূতচর্চা করিস নাকি?'
আমিও তাকিয়ে ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম৷ তাই তো! সত্যিই একটা ভূতের গল্প সংকলন আমার টেবিলে৷ কিন্তু আমি তো ভূতের গল্প একেবারেই ভালোবাসি না৷ বইটা তো কারও কাছ থেকে পড়ার জন্যে কখনো চেয়েও আনিনি৷ তাহলে...?
অবিনাশকে বসতে বলে আমি খাবার আনতে বেরোতে যাচ্ছি, ও আমার পথ আগলে দাঁড়াল, 'কোথায় যাচ্ছিস? খাবার আনতে তো?'
আমি অবাক হয়ে গেলাম, ও জানল কী করে? ওকে এখন খাবার আনতে যাওয়ার কথা কিছু তো বলিনি? আমি বললাম, 'হ্যাঁ, রাতে খেতে হবে না?'
অবিনাশ বলল, 'তোর খাওয়ার দরকার হলে, তুই নিয়ে আয়৷ আমি কিন্তু রাতে কিছু খাই না৷'
আমি অবাক হয়ে বললাম, 'সে কী রে? আমার বাড়িতে এলি, না খেয়ে সারারাত থাকবি?'
অবিনাশ আমার হাত ধরে বিছানার উপর বসিয়ে দিয়ে বলল, 'কাল দু-জনে মিলে সকাল সকাল বাজারে যাব৷ তারপর রান্না করব দু-জনে৷ তোর এখন আর এই ঝড়-বাদলায় বেরোবার দরকার নেই৷'
তবু আমি নাছোড় হয়ে বেরোতে যাচ্ছি, দেখি কী, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল৷ ঘন ঘন বাজ পড়ছে৷
অবিনাশ হেসে বলল, 'কী, এবার হল তো? শোন, জামাকাপড় ছাড়৷ জমিয়ে গল্প করি৷'
এমন মুষল ধারায় বৃষ্টি, তাও আবার জানুয়ারি মাসে? কিন্তু একটু আগে তো কিছুই ছিল না৷ আকাশে চাঁদও মুখ তুলেছিল৷ আমি আলমারি থেকে আমার নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি বের করে অবিনাশকে দিয়ে বললাম, 'যা, জামা-প্যান্ট ছেড়ে আয়৷ আমি একটু চা করি?'
অবিনাশ হা-হা করে উঠল, 'তুই আতিথেয়তা করার জন্যে অমন উঠে পড়ে লেগেছিস কেন বল তো? বইমেলায় তো চা খেলাম?'
আমি বললাম, 'তুই অমন করিস না তো অবিনাশ! বইমেলায় সেই কখন চা খেয়েছিস৷ আমি চা করছি৷ তুই হাতমুখ ধুয়ে আয়৷'
আমি জামা-প্যান্ট ছেড়ে চা করে নিয়ে এসে দেখি, অবিনাশ হাতমুখ ধুয়ে, আমার নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি পরে পরিপাটি হয়ে চেয়ারে বসে আছে৷ বইমেলা থেকে কেনা একটা ভূতের বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছে একমনে৷ আমি বললাম, 'নে, বই রাখ৷ সত্যি বলতে অত বইমুখো লোকদের আমার একদম ভালো লাগে না ভাই৷ বল, চা খেতে খেতে তোর গল্প শুনি৷'
অবিনাশ চায়ে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, 'হ্যাঁ, আমার বেঁচে থাকাটা সত্যি গল্পের মতো রে৷'
আমি মৃদু হেসে বললাম, 'কীরকম?'
অবিনাশ ফের চায়ে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলল, 'সেই কতদিন আগে কলকাতা ছেড়ে অসমে চলে গেলাম একটা কলেজে বাংলা পড়াতে৷ তারপর একসময় রিটায়ারও করলাম৷ এবার সমস্যা হল, সময় কাটাই কী করে? একদিন আমার এক বন্ধু গুয়াহাটির একটা বড়ো ক্লাবের ফাংশানে আমাকে টেনেটুনে নিয়ে গেল৷ আমাকে নাকি মঞ্চে উঠে পারফর্ম করতে হবে৷ কলেজের ডায়াসে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়ানো ছাড়া আমার মঞ্চে ওঠার এর আগে কোনো রেকর্ড নেই৷ আমার অবস্থা তখন ছেড়ে দিলে বেঁচে যাই৷ বন্ধুটি বলল, আমাকে ওই ফাংশানে কিছু একটা করতেই হবে৷ নিদেন পক্ষে কিছু বক্তব্য তো রাখতেই হবে৷'
আমি বললাম, 'তোর তো কলেজে পড়ানোর অত দিনের অভিজ্ঞতা৷ দু-কথা বলে দিলেই তো চুকে যেত?'
অবিনাশ একটু চুপ করে থেকে বলল, 'শোন না৷ সত্যি যখন মঞ্চে তোলা হল আমাকে, তখন আমি ঠিক করলাম, আমি শ্রোতাদের একটা ভূতের গল্প শোনাব৷ বড়ো বক্তার ভঙ্গিতে আমি উদ্যোক্তাদের বললাম, হলের আলো একটু কমিয়ে দিতে৷ তারপর একটা আগড়ম-বাগড়ম ভূতের গল্প শুনিয়ে দিলাম৷ শ্রোতারা একদম চুপ৷ আমার ইঙ্গিতে উদ্যোক্তারা যখন সব আলো ফের জ্বালিয়ে দিল, প্রচুর হাততালি পেলাম৷ আমার বন্ধুটি তো আমাকে জড়িয়ে ধরে তার উচ্ছ্বাস জানাল৷ সে যাত্রায় মঞ্চে পারফর্ম করে কোনো রকমে বেঁচে গেলাম৷'
বাইরে বৃষ্টির দাপট একটু কমেছে বলে মনে হল৷ আমি উঠতে যাচ্ছিলাম, অবিনাশ জোর করে আবার আমাকে বসিয়ে দিয়ে বলল, 'দুর, ওসব খাওয়া-টাওয়া ছাড় তো৷ তারপর বলি শোন, একদিন বিকেল বেলা আমার ভাড়াবাড়িতে বসে আছি৷ এমন সময় তিনটে লোক এল আমার বাড়িতে৷ বলল, ওরা এসেছে কাজিরাঙা থেকে৷'
আমার গলায় বিস্ময় ঝরে পড়ল, 'কেন?'
অবিনাশ বলল, 'তোর মতো আমিও সেদিন ভীষণ অবাক হয়েছিলাম রে৷ ওরা কী বলল জানিস? ওরা নাকি গুয়াহাটির ওই ক্লাবের ফাংশানে আমাকে দেখেছে৷ তাই ওরা এসেছে ভূতের গল্প বলার জন্যে আমাকে ভাড়া করে নিয়ে যেতে৷ কাজিরাঙা ফরেস্ট বাংলোয় কলকাতা থেকে একদল লোক এসেছে৷ ভূত নিয়ে তাদের খুব কৌতূহল৷ সেদিনই রাতে আমাকে ভূতের গল্প বলার জন্যে ওরা কাজিরাঙা নিয়ে যাবে৷ আমি এ কথা ও কথা বলে কাটাতে চাইছিলাম৷ ওরা ভাবল আমি বুঝি বিনে পয়সায় যেতে চাইছি না৷ তাই ওরা বলল, আমাকে গাড়ি করে নিয়ে যাবে৷ ফের কাল গাড়ি করে আমার বাড়িতে ছেড়ে দেবে৷ আর এর জন্যে আমাকে দেবে তিন হাজার টাকা৷'
আমি আরও অবাক হয়ে বললাম, 'সত্যি? তারপর কী করলি?'
অবিনাশ চোখ দুটো একটু ছোটো করে বলল, 'কী আর করি? শেষে রাজি হয়ে গেলাম৷ না, টাকা পাব বলে নয়, ভূত আমার প্রিয় বিষয়৷ একটা রাত তো কয়েকজনের সঙ্গে ভূত নিয়ে কাটানো যাবে৷ মন্দ কী? বলে ওদের গাড়িতে চড়ে বসলাম৷ গুয়াহাটি থেকে কাজিরাঙা তা ধর প্রায় দু-শো কিলোমিটার রাস্তা৷ রাত আটটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ফরেস্ট বাংলোয়৷ গিয়ে দেখলাম, পাঁচ জন লোক গুটিসুটি মেরে পাঁচটা চেয়ারে গুম মেরে বসে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে৷ ঘরে একটা হালকা আলো জ্বালানো৷ আমি হাতমুখ ধোওয়ার পর রাতের খাবার দেওয়া হয়ে গেল৷ এবার ভূতের গল্প শোনাতে হবে৷ সে রাতে পর পর চারটে ভূতের গল্প বললাম৷ দুটো গল্প বইয়ে পড়া৷'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'বাকি দুটো?'
অবিনাশ হেসে নিল খানিক৷ তারপর বলল, 'বাকি দুটো ভূতের গল্প আমি বানিয়ে বানিয়ে বললাম৷ দেখলাম, বেশ জমল ব্যাপারটা৷'
আমি বললাম, 'তোর কী মনে হল তখন?'
'কিছু না৷ তবে মনে হল, চলে আসার সময় ওই লোকগুলো যেন কেমন চোখে আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল৷'
'ওরা কি তোকেই ভূত বলে মনে করেছিল নাকি?'
অবিনাশ হো-হো করে মিনিট খানেক হাসার পর বলল, 'অনেকটা সেরকম৷ যে লোকগুলো আমাকে নিয়ে গিয়েছিল, সকালে তারা এসে তিন হাজার টাকা আমার হাতে গুঁজে দিল৷ গাড়ি করে পৌঁছেও দিল গুয়াহাটিতে৷ বাড়ি ফিরে ঠিক করলাম, না, আর কোনোদিন এরকম ভূতের গল্প বলতে কোথাও যাব না৷ দূর, এটা কি কোনো কাজ হল নাকি? কিন্তু কিছুদিন পর থেকে মনে হতে লাগল, কারা যেন ঘুমের মধ্যে আমাকে ভূতের গল্প বলে বেড়ানোর জন্যে পীড়াপীড়ি করছে৷ যখন ঘুম ভাঙছে, দেখছি, আমি ঘেমেনেয়ে একশা হয়ে গেছি৷ এর পর দু-একদিন আমার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কারা যেন আমাকে ভয়ও দেখাচ্ছে বলে মনে হল৷ এরকম দু-তিন মাস কাটার পর কেমন যেন নেশার মতো পেয়ে বসল আমাকে৷ তখন একদিন ঠিক করলাম, না আমাকে ভূতের গল্পই বলে বেড়াতে হবে৷ তা না হলে এর হাত থেকে নিস্তার নেই৷ তাই একদিন অসমের একটা বাংলা খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দিলাম:
ভূতকথা
ভূতের গল্প বলার বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান! গা ছমছমে ভূতের গল্প শুনতে চাইলে সত্বর এই ঠিকানায় বা ফোন নম্বরে যোগাযোগ করনু৷ ভয় পাওয়ানোয় ব্যর্থ হলে সমূহ মূল্য ফেরত৷
'নীচে আমার আমিনগাঁওয়ের বাসার ঠিকানা আর আমার মোবাইল ফোন নম্বর৷ তারপর থেকে যারা আমাকে ঘুমের মধ্যে ভয় দেখাচ্ছিল, তারা কেমন সব চুপ করে গেল৷ তার বদলে নানা ক্লাব বা সংস্থা থেকে আমার মোবাইলে ঘন ঘন ফোন আসতে লাগল৷ আসতে লাগল কুরিয়ারে চিঠিও৷ নামি ডাক্তারের চেম্বারে যেমন লোক হয়, তেমন লোকের ভিড়ের কমতি থাকল না আমার বাড়িতে৷ আর আমি রাতের পর রাত এখানে ওখানে ভূতের গল্প বলে বেড়াতে লাগলাম৷ আজ বর্ণাডি ফরেস্ট গেস্ট হাউসে অতিথিদের ভূতের গল্প শোনালাম তো কাল চক্রশিলা ফরেস্ট বাংলোয়৷ একদিন গরমপানি ফরেস্ট বাংলোয় গল্প শোনালাম তো ফের পরদিন চললাম নামেরি ন্যাশনাল পার্কে৷ গল্প শোনাতে শোনাতে এমন হয়ে গেল যে, আমি যা-ই বানিয়ে বলি না কেন, তা-ই গা ছমছমে ভূতের গল্প হয়ে যাচ্ছে৷ টাকাও রোজগার হচ্ছে ভালো৷ আমার ভূতের গল্প বলার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারদিকে৷ ও রাজ্যের মানুষ আমাকে 'অসম বিভূষণ' সম্মানও দিল৷ আর কত যে পুরস্কার পেলাম, সে তুই একবার যদি আমার আমিনগাঁওয়ের বাড়িতে আসিস, তাহলে নিজের চোখেই দেখতে পাবি৷'
আমি বললাম, 'আমার দেখতে লোভ হচ্ছে বই কী৷ এতদিন পর যখন তোর সঙ্গে দেখা হল তখন নিশ্চয়ই একবার তোর বাড়ি যাব৷'
জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, বৃষ্টির বেগ বাড়ছে বই কমছে না৷ উঠে রান্নাঘরে গেলাম৷ দুটো ভাতে-ভাত অন্তত করতে তো হবে৷ কত দিনের পুরোনো বন্ধু এল, আর আমি চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকব? আমি যেই রান্নাঘরে গিয়ে সবে গ্যাস জ্বালাচ্ছি, এমন সময় অবিনাশ পিছন থেকে এসে আমাকে জাপটে ধরল৷ তারপর টানতে টানতে বিছানায় এনে ফেলল, 'তোকে বলেছি না আমি রাতে কিছু খাই না৷ তাও তুই...'
অগত্যা থামতেই হল৷ অনেক অনুরোধ করার পরও অবিনাশ রাতে কিচ্ছু খেল না৷ তাই আমারও খাওয়া হল না কিছু৷ এক সময় লুকিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে চুপিচুপি চারটে বিস্কুট আর এক গ্লাস জল খেয়ে এলাম৷ এসে দেখি অবিনাশ বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েছে৷ আমি একা থাকি বলে একটাই শোওয়ার ঘর আর একটাই খাট৷ আলো নিভিয়ে ওর পাশে আমিও শুয়ে পড়লাম৷ শুয়ে ভাবছিলাম, কাল সকালে উঠে দু-বন্ধু মিলে বাজার করে আনব৷ জমিয়ে রান্না করব দু-জনে৷
বৃষ্টির বেগ যেন থামতেই চাইছে না৷ তার উপর ঘন ঘন বাজ পড়ছে৷ একটু পরে আমার জানলার পাশের কদম গাছটার মাথার উপর কড় কড় শব্দে একটা বাজ পড়ল৷ ভয় পেয়ে বাজ পড়ার আলোয় পাশে তাকিয়ে দেখলাম, বিছানায় অবিনাশ নেই৷ কোথায় গেল অবিনাশ? ভাবলাম, বাথরুমে গেছে হয়তো৷ বাজ পড়ার শব্দে অত খেয়াল করিনি৷ প্রায় আধ ঘণ্টা হয়ে গেল, তবু অবিনাশ আসছে না দেখে আমি উঠে আলো জ্বালতে গেলাম৷ অন্ধকারে হাতড়ে টর্চটা খুঁজে জ্বালালাম৷ দেখি, বাথরুমের দরজা হাট করে খোলা৷ তবু বাথরুমের কাছে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম৷ না, অবিনাশ বাথরুমে নেই৷ কোথায় গেল অবিনাশ? ফের ঘরে ফিরে আসতে আসতে ডাকলাম, 'অবিনাশ, অবিনাশ, কোথায় গেলি?'
বাইরে আবারও একটা বাজ পড়ল৷ দেখি, বিছানায় পাশ ফিরতে ফিরতে অবিনাশ ঘুম জড়ানো গলায় বলল, 'অত চেঁচাচ্ছিস কেন? দিলি তো আমার ঘুমটা কাঁচিয়ে? আর হয়তো সারারাত ঘুমই আসবে না৷'
আমি বললাম, 'তুই ঘুমোচ্ছিস, আর আমি তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি গোটা ঘরময়৷ কী কাণ্ড!'
অবিনাশ হেসে বলল, 'কাণ্ড তো প্রকাণ্ড! এবার ঘুমো তো!'
বেশ একটা ভয় মেশানো সন্দেহ নিয়ে ফের অবিনাশের পাশে শুয়ে পড়লাম৷ একটু পরেই অবিনাশের নাক ডাকার আওয়াজ পেলাম৷ আমার মোটেও ঘুম আসছে না৷ কেউ যেন আমার চোখের পাতা থেকে ঘুম কেড়ে নিয়েছে৷
রাতে কতটুকু ঘুমোলাম, নাকি ঘুমোলাম না, নিজেই মনে করতে পারলাম না৷ বাইরে আর ঝড়বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে না৷ চোখ খুললাম৷ জানলা দিয়ে শীতের ঝকঝকে রোদ এসে পড়েছে আমার জানলার ধারের পড়ার টেবিলে৷ পাশ ফিরে অবিনাশকে ডাকতে গিয়ে দেখলাম, অবিনাশ বিছানায় নেই৷ ঃউ, একে নিয়ে তো আর পারা যায় না৷ ও ভূতের গল্প বলার সঙ্গেসঙ্গে ইন্দ্রজালও শিখেছে নাকি? ধড়ফড় করে উঠে পড়লাম বিছানা থেকে৷ দেখলাম, 'বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভূত' নামে একটা বইয়ের পাতা খোলা৷ তবে কি খুব ভোর বেলা উঠে অবিনাশ বই পড়ছিল? আচ্ছা ভূতগ্রস্ত লোককে নিয়ে পড়া গেল তো দেখছি৷
বাথরুমের কাছে গিয়ে খুঁজলাম, বারান্দায় খুঁজলাম৷ না অবিনাশ কোত্থাও নেই৷ লোকটা গেল কোথায়? বারান্দার কোলাপসিবল গেটে কাল যেমন করে তালা দিয়েছিলাম, তেমনই ভিতর থেকে তালা দেওয়া৷ শীতের সকালে হু-হু করে ঘামতে লাগলাম৷ ঘরে ফিরে ধপাস করে বিছানায় বসে পড়লাম৷ হঠাৎ চোখে পড়ল, ওকে আমার নতুন যে পাজামা-পাঞ্জাবি পরতে দিয়েছিলাম, সেটার পাট না ভাঙা অবস্থায় চেয়ারে রাখা আছে৷
হঠাৎ আমার চোখে পড়ল, টেবিলের নীচে একটা ভাঁজকরা কাগজ পড়ে আছে৷ উঠে গিয়ে কাগজটার ভাঁজ খুলে দেখলাম, ও মা! এটা তো অবিনাশেরই 'ভূতকথা'র একটা লিফলেট৷ নীচে ওর মোবাইল নম্বর লেখা৷ তক্ষুনি আমার মোবাইল থেকে ওর মোবাইল নম্বরে ফোন করলাম৷ ফোনে ক্রমাগত বেজে চলল 'নট রিচেবল, নট রিচেবল৷'
সেই থেকে অবিনাশকে আমি খুঁজে চলেছি৷ কোত্থাও তার কোনো খবর পাইনি৷ সেই লিফলেটটা এখনও আমার পড়ার টেবিলে পড়ে আছে৷ পড়ে আছে অবিনাশের কেনা ভূতের বইগুলোও৷
শুধু রোজ রাত বারোটার পর আমার মোবাইলে অবিনাশের ওই নম্বর থেকে প্রতিদিনই একটা এস এম এস আসে 'ভূতের গল্প শুনতে চাইলে আমাকে ডাকিস৷'