শেষমেষ আমি ভূত হয়ে গেলাম৷ কিন্তু ভূত হতে আমার কখনোই ভালো লাগত না৷ মনে হত, কেন আমি ভূত হব? মারা গেলেই যে ভূত হতে হবে তার কী মানে আছে? কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভূতই হলাম৷ এখন আমার ভূত-জীবনের বয়স হল সতেরো বছর৷
এক ঝড়বাদলের রাতে শেষ ট্রেন ধরে যখন আগরপাড়া স্টেশনে নেমেছিলাম, তখন লোডশেডিং চলছে৷ স্টেশন থেকে হাঁটাপথে আমার বাড়ি পনেরো মিনিট৷ কিন্তু ঝড়-বৃষ্টিতে অটো অনেক আগেই মুখ লুকিয়েছে যে-যার গ্যারাজে৷ রিকশাও নিত্যদিনের মতো উধাও৷ ছাতা মাথায় দিয়ে, হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে আমি নিশ্চিন্দিপুরের যাত্রী হয়ে হাঁটছিলাম৷ হঠাৎ এক ঝলক তীব্র আলো, তারপর কড়াৎ শব্দ৷ আর কিচ্ছু মনে নেই৷
ছেলেবেলায় যেমন অনেক কিছু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিয়ে বড়ো হতে হতে মানুষ যেমন-তেমন একটা কিছু হয়, আমার এই ভূত-জীবনের বেলায়ও তাই হল৷ মরে গিয়ে হয়তো অনেক কিছু হতে পারতাম৷ কিন্তু বাজ পড়ে অপঘাতে মৃত্যু হলেই কি মানুষ ভূত হয়? আমার আজও জানা হয়ে উঠেনি৷
কিন্তু এখন ভূত হয়েই ঘুরে বেড়াই৷ অবশ্য ঘুরে বেড়াই না বলে উড়ে বেড়াই বলা ভালো৷ ভূত হয়েছি বলে শরীরটাও বেশ হালকা হয়ে গেছে৷ ফুরফুর করে যেখানে খুশি উড়ে যেতে পারি৷
এই তো ক-দিন আগে কলকাতার মিলনমেলা প্রাঙ্গণে বইমেলায় গিয়েছিলাম৷ বইমেলায় নেমে যেদিকেই হাঁটি মানুষের সঙ্গে ধাক্কা লাগে৷ এ কনুই দিয়ে ঠেলে তো আর একজন দেয় পিছন থেকে ধাক্কা৷ একটা স্টলে আমাদের মানে ভূতেদের নিয়ে লেখা একটা বই দেখলাম৷ বইটার নাম 'ভূতপতরির দেশ৷' লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ টুক করে ঢুকে শাঁ করে একটা বই বগলদাবা করে উধাও৷ না, এখনও বইটা পড়া হয়নি৷ আগরপাড়া স্টেশনের থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে মহানিমগাছটার বড়ো কোটরে রেখে দিয়েছি৷ ক-দিন ধরে পড়ব পড়ব করছিলাম৷ কিন্তু সেদিন আমার গ্রামের নবজীবনপুর হাই স্কুলের নিত্যানন্দস্যারের কথা মনে পড়ে গেল৷
নবজীবনপুর হাই স্কুলের সামনে ছিল মস্ত বড়ো একটা বাগান৷ একদিকে ছিল ফুলের গাছ, আর একদিকে শাকসবজির৷ মাটি কুপিয়ে বাগানটাকে ছোটো ছোটো ভাগে ভাগ করা হত৷ ওগুলোকে আমরা বলতাম 'বেড'৷ ছাত্রদের দশজন করে এক-একটা দলে ভাগ করে দিতেন স্যাররা৷ সেই সব দলের নামও ছিল খুব সুন্দর৷ কোনোটা 'সবুজ দল,' 'নতুন দল,' 'রবিকিরণ,' 'রামধনু' ইত্যাদি৷ তারপর এক-একটা দলকে ভাগ করে দেওয়া হত এক-একটা বেড৷
ভূত হয়ে আছি বটে, এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে, একবার আমরা ছিলাম রবিকিরণ দলে৷ আমরা যে বেডটা পেয়েছিলাম, সেখানে মনপ্রাণ ঢেলে আমি ঘাস বাছতাম, গাছ লাগাতাম, জল দিতাম৷ তন্ময়, অরুণাংশু, দীপঙ্করদের নিয়ে ছিল আমাদের রবিকিরণ দল৷ ওদের ফুলগাছ নিয়ে অত কিছু ভালো লাগাই ছিল না৷ প্রত্যেকের বেডে ফুল ফোটানোর উপর বছরের শেষে একটা নম্বরও দেওয়া হত আমাদের৷ আমাদের বেডে যখন বড়ো বড়ো গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা ফুটেছে, একদিন নিত্যানন্দস্যার দেখতে এলেন৷ নিত্যানন্দস্যার আমাদের বাগান পরিচর্যার উপর নম্বর দিতেন৷ বন্ধুরা দাঁড়িয়ে ছিল আর আমি ডালিয়া গাছের গোড়ায় মাটি কোপাচ্ছিলাম৷ নিত্যানন্দস্যার ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোরা কেউ ফুল ভালোবাসতে শিখিসনি৷ তোরা এক-একটা ভূত হবি৷' তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'বিপুল কিন্তু ভূত হবি না৷ তুই তো ফুল ভালোবাসিস৷ যারা ফুল ভালোবাসে তারা ভূত হয় না৷'
সেদিন খুব ভালো লেগেছিল নিত্যানন্দস্যারের কথা৷ স্যারকে বেশ দেবতা দেবতা মনে হচ্ছিল৷
কিন্তু একদিন নিত্যানন্দস্যারের ভবিষ্যৎবাণী বিফল হয়ে গেল৷ শেষমেষ আমি ভূতই হয়ে গেলাম৷ আর ভোর রাতে উঠে নিমগাছের ডালে দাঁত মেজে বেরিয়ে পড়েছি নবজীবনপুর যাব বলে৷ আমাদের এখন সকালের রোদ সহ্য হয় না তো! সব সময় মনে হয়, এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম মানুষের কাছে৷ বেশ কিছুদিন ধরে মনে পড়ছে নিত্যানন্দস্যারের কথা৷ স্যার আমাকে খুব ভালোবাসতেন৷ পড়াশোনায় আমি তেমন ভালো ছিলাম না বটে, কিন্তু স্কুলে বাগান করা আর খেলাধুলোয় আমি ছিলাম এক নম্বরে৷ নিত্যানন্দস্যার আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলতেন, 'বিপুল, পড়াশোনায় না-ই বা ভালো হলি৷ সকলের বুদ্ধি তো আর সমান হয় না৷ আরও অনেক অনেক বিষয় আছে, সেসবেও সেরা হওয়া যায়৷' আমি মুখ তুলে তাকাতাম স্যারের দিকে৷ স্যার বলতেন, 'খেলাধুলো কর, সমাজসেবা কর, দেশ গড়ার কাজ কর৷ যা করবি, তোকে সেরা হতে হবে৷ এমনকী, ফুল ফোটানোতেও তুই দেশের মধ্যে সেরা হতে পারিস৷'
আজ স্যারকে বলতে যাচ্ছি, 'স্যার, অনেক চেষ্টা করছি, আমি কোনো বিষয়েই সেরা হতে পারিনি৷ টেন পাশ করার পরের বছরই বাবা মারা গেলেন৷ তার পরের বছর মা৷ জীবনের চাকায় ঘুরতে ঘুরতে গ্রাম থেকে কলকাতা৷ তারপর একটা ছোটো কোম্পানিতে কেরানি৷ মাধুরীর সঙ্গে সাদামাটা ভাবে বিয়ে৷ টিনের ঘরে ভাড়া থাকা৷ তারপর সাত বছরের দীপিকাকে রেখে ভোকাট্টা৷ তবে এখনও নিত্যানন্দস্যারের কথাটা আমার কানে মন্ত্রের মতো বাজে৷ এখনও আমি সেরা হওয়ার চেষ্টা করি, ভূতেদের মধ্যে সেরা ভূত হওয়ার৷ নিত্যানন্দস্যার যে বলেছিলেন, সেরা হতে হবে৷
আজ স্যারের সঙ্গে দেখা করে সেই কথাটাই বলতে যাচ্ছি, 'স্যার, আপনার কথা তো মিথ্যে হতে পারে না৷ আমি এখনও সেরা হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি৷ ভূত-জীবন নিয়ে আমি সেরা ভূত যদি হতে পারি!'
নবজীবনপুর গ্রামের খিরিশ গাছটায় এইমাত্র এসে নামলাম৷ দেখি কী, এ যে চেনাই যায় না৷ সে নবজীবনপুর গ্রাম আর নেই৷ হ্যাঁ, এই তো এখানেই ছিল সাপের মতো সরু একটা মজা খাল৷ মিনমিনে জোয়ারের সময়ও আমরা খাল পেরিয়ে স্কুলে যেতাম৷ সাঁকো-টাকো কিচ্ছু ছিল না৷ আর এখন মস্ত কংক্রিটের ব্রিজ৷ আমাদের গ্রামে একটাও পাকাবাড়ি ছিল না৷ আর এখন দেখছি বেশ কয়েকটা পাকাবাড়ি হয়েছে৷ গ্রামে এখন মোরাম রাস্তা৷ তার দু-ধারে পঞ্চায়েত থেকে বুঝি আকাশমণি গাছ লাগিয়েছে৷ বেশ লাগছে দেখতে৷ এই গাছ লাগানোর সময় হয়তো নিত্যানন্দস্যারও হাত লাগিয়েছেন৷ যা গাছপাগল মানুষ!
আর একটু এগিয়ে গেলাম৷ ও মা, এখানে বেশ বড়ো একটা পদ্মদিঘি ছিল৷ তার জায়গায় একটা দোতলা পাকাবাড়ি৷ হ্যাঁ, সাইন বোর্ডও আছে দেখছি, 'নবজীবনপুর সমবায় কৃষি উন্নয়ন সমিতি৷' বাঃ, তা গ্রামটার বেশ উন্নতি হয়েছে বলতে হবে৷
কিন্তু নিত্যানন্দস্যারকে পাই কোথায়? যা ভবঘুরে মানুষ! হয়তো কারও উপকার করতে শহরে গিয়েছেন৷ ফিরবেন হয়তো সন্ধ্যে পেরিয়ে৷ খুঁজে খুঁজে নিত্যানন্দস্যারের বাড়ির দিকে এগোলাম৷ গ্রামটা এত পালটে গিয়েছে যে, তার মাঝখান থেকে স্যারের বাড়িটা খুঁজে বের করা কঠিন৷ উড়ে উড়ে বেশ ক্লান্তও লাগছে৷ কারা যেন বলত, ভূতেদের ক্লান্তি নেই৷ কিন্তু আমার তো বেশ ক্লান্তিই লাগছে৷ যাই, গিয়ে বসি ওই দূরের তেঁতুল গাছটায়৷ একটু তো জিরিয়ে নেই৷ তারপর ফের খোঁজা যাবে৷ ওখানেই তো ছিল নিবারণ দণ্ডপাটদের বড়ো পুকুর৷ অনেক লাল-সাদা শালুক ফুটে থাকত বলে আমরা বলতাম 'শালুকদিঘি'৷ তার একটা শান-বাঁধানো ঘাটও ছিল৷ যাই, ফুরফুরে হাওয়ায় দু-দণ্ড গাছের ডালে বসে দোল খাই৷
তেঁতুল গাছটায় বসেই তো আমি থ মেরে গেলাম৷ ও মা, ওই তো নিত্যানন্দস্যার ভাঙা ঘাটের পাটায় পা ঝুলিয়ে বসে আছেন৷ বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন৷ সেই আগের মতো ঘি রঙের হাফহাতা পাঞ্জাবি আর ধুতি৷ মাথায় চুল প্রায় নেই বললেই চলে৷ দূর থেকে দেখে মনটা ভরে গেল৷ ইনিই সেই স্যার, যিনি আমাকে সেরা হতে বলতেন৷ আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন৷
আমি চুপিসাড়ে গাছ থেকে নেমে স্যারের সামনে গিয়ে বললাম, 'স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন?'
স্যার বললেন, 'না তো বাবা, ঠিক চিনতে পারলাম না তো৷ কী নাম তোমার?'
আমি মাথা নীচু করে বললাম, 'আমি বিপুল, সেই যে স্কুলে 'রবিকিরণ' বেডে ফুল ফুটিয়ে সেবার স্কুলে সেরা হয়েছিলাম৷ আপনি সবচেয়ে খুশি হয়েছিলেন আমাদের ফুলগাছ দেখে?'
নিত্যানন্দস্যার খুশি হয়ে আমার মুখের দিকে তাকালেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিপুল, মনে পড়েছে৷ তুমি পড়াশোনায় কাঁচা ছিলে বলে তোমাকে অন্য বিষয়ে সেরা হতে বলতাম৷ তা এখন কী করো তুমি?'
স্যারের সামনে মিথ্যে বলতে নেই জানি৷ তাও মিথ্যে কথা বলতেই হল৷ আমি মরে গিয়ে এখন ভূত হয়েছি এ কথা স্যারকে বললাম না৷ এই ভূত-জীবন তো আমার একার৷ বললাম, 'কলকাতায় একটা ছোটো কোম্পানিতে কেরানির কাজ করি৷ থাকি আগরপাড়ায়৷'
একবার ভাবলাম, স্যারকে বলি, 'স্যার, আপনার সব কথা ভুল প্রমাণ করে আমি এখন ভূত-জীবন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি৷ আমি কিচ্ছুতেই সেরা হতে পারিনি স্যার৷' তারপর ভাবলাম, যা হতে পারিনি তার দায় তো পুরোটাই আমার৷ স্যারকে এ কথা বলে কী লাভ? স্যার ভয় পেয়ে হয়তো দৌড়ে পালাবেন৷ ভূত দেখে হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাবেন৷ স্যার কি সামনে থেকে কখনো ভূত দেখেছেন?
আমি বললাম, 'স্যার, আপনি এখন কেমন আছেন? নবজীবনপুরে এসে অনেক খুঁজলাম৷ আপনার বাড়িটা কোত্থাও খুঁজে পেলাম না৷ গ্রামটা এত পালটে গেছে৷'
স্যার বললেন, 'তেমন করে আর বাড়ি করতে পারলাম কই? জীবনে বিয়েই করলাম না, তায় বাড়ি৷ এই এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াই৷ তোমার মতো পুরোনো ছাত্রদের সঙ্গে খুব একটা দেখা তো হয় না৷ কথা বলার মতো লোকজনও এখন বড়ো কম৷ কার সঙ্গেই বা কথা বলি? তা বাবা, তুমি অত দূর থেকে নবজীবনপুর এলে, কোনো কাজ নিয়ে এসেছে?'
আমি বললাম, 'না স্যার, কাজ তেমন কিছু নয়৷ ক-দিন ধরে আপনার কথা খুব মনে পড়ছিল৷ তাই ভাবলাম, যাই, একবার আপনার সঙ্গে দেখা করে আসি৷'
'তা বাবা, বেশ করেছ৷ আমি কি আর দেখার মতো কোনো মানুষ? সাদামাঠা জীবন৷ এখন আর কেউ বিশেষ কথাও বলে না আমার সঙ্গে৷'
আমি বললাম, 'কেন স্যার, গ্রামে বুঝি এখন খুব পার্টি-টার্টি নিয়ে টানাটানি হয়?'
'না বাবা, সে অন্য পার্টি৷ তুমি বুঝবে না৷ আমি এমন এক পার্টিতে নাম লিখিয়েছি যে...৷ থাক সে কথা৷ তোমার কথা বলো শুনি৷'
একবার মনে হল, স্যার ধরতে পারেননি তো, আমি ভূত? স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বললাম, 'স্যার, আপনি কিন্তু বড্ড রোগা হয়ে গেছেন৷ কোনো অসুখ-টসুখ করেছিল কি?'
'না বাবা, এখন আমার আর কোনো অসুখই করে না৷ দিব্যি ঘুরে বেড়াই এখানে-ওখানে৷ গ্রামেই থাকি তো, তাই এক-একটা সংসারে উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখি, কে কেমন আছে, কেমন করে ঘরসংসার করছে৷ বেশ লাগে দেখতে৷ আমি একবার তোমার সংসারও দেখতে যাব বিপুল৷ তোমার ঠিকানাটা বলে যেয়ো যাওয়ার সময়৷'
আমার তো মাথায় ফের বাজ পড়ার উপক্রম হল৷ চোখের সামনে সেই তীব্র আলোর ঝলকানি, সেই কড়াৎ শব্দ৷ আমাকে অন্যমনস্ক দেখে স্যার বললেন, 'ভয় পেলে বুঝি? আচ্ছা বাবা আচ্ছা৷ নাহয় যাব না তোমার বাড়ি৷ ব্যস, হল তো?'
আমি ভয়ে মরি অন্য কারণে৷ ভূতের আবার বাড়ি কী যে মানুষকে নিমন্ত্রণ করব? আর স্যার ভাবলেন বুঝি আমি আপ্যায়নের ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি৷ স্যারকে তো আর আসল কথাটা বলা যাবে না৷
আমি বললাম, 'না না স্যার, ভয় পাব কেন? তবে আমার যা টানাটানির জীবন, সেখানে আপনাকে নিয়ে যেতে আমার লজ্জা করবে৷ আপনি আমাকে নানা বিষয়ে সেরা হওয়ার কথা বলতেন, কিন্তু আমি যে স্যার কোনো বিষয়েই সেরা হতে পারিনি!'
স্যার বললেন, 'তা হোক, চেষ্টা করবে বিপুল৷ সারাজীবন চেষ্টা করে যেতে হবে সেরা হওয়ার৷'
আমার চোখে জল এসে গেল৷ স্যারের চোখ এড়িয়ে চোখের জল মুছে বললাম, 'স্যার, আমি সেরা হওয়ার চেষ্টা করে যাব৷ আপনাকে সেই কথাটাই বলতে এসেছি৷ বলতে এসেছি, আপনি সেই স্কুলজীবনে আমার মতো খাটো বুদ্ধির এক ছাত্রকে সেরা হওয়ার যে মন্ত্র শুনিয়েছিলেন, আমি তা আজও ভুলিনি স্যার!'
দেখলাম, স্যারের চোখের কোণ দুটো চিকচিক করে উঠেছে৷ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন, 'বাবা বিপুল, কোনো দিন সেরা হতে পারলে আমাকে জানিয়ে যেয়ো কিন্তু! আমাকে এখানেই পেয়ে যাবে৷ আমি তোমার আসার অপেক্ষায় থাকব বাবা! যাও, অনেক দূর যেতে হবে তো৷ অতখানি পথ! সাবধানে যেয়ো!'
আমি স্যারের জলে ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, 'আসি স্যার! আমি সেরা হয়ে আপনাকে জানিয়ে যাব স্যার!' বলে আমি ভাঙা ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে দু-পা উঠে আসার পর মনে হল, ও মা, ছিঃ ছিঃ! স্যারকে তো প্রণাম করলাম না! আবার দুটো ধাপ নেমে গিয়ে নীচু হয়ে স্যারকে প্রণাম করতে গিয়ে চমকে উঠলাম৷ স্যারের দুটো পায়েরই গোড়ালি যে আমারই মতো সামনের দিকে! সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, নিত্যানন্দস্যার নেই৷