শৈলেন ঘোষ
কে জানত যে খাঁচার দরজাটা খুললেই পাখিটা অমন আচমকা উড়ে পালাবে/ আজ যে পাখিটা তক্কে-তক্কে ছিল, সে-কথা ঘুণাক্ষরেও টোরা জনাতে পারেনি/পাখি পেটে-পেটে কী বুদ্ধি ফেঁদে রেখেছে, তা মানুষে জানবে কেমন করে/ পালাবি, পালা, কে বারণ করছে/ তাই বলে টোরার হাতের ফাঁক দিয়ে/ কে বলেছিল ওই ছোট্ট মেয়েটাকে অমন বিপদে ফেলতে/
অবশ্য টোরার কোনো দোষ ছিল না। সকাল থেকে নতুন মায়ের হুকুম শুনেতে শুনতে যেন আর শরীর বইছে না। ভারি ক্লান্ত। আজ সে ভারি আনমনা। কোন সকালে সে বাদশাকে ইস্কুলে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। তারপর ঘর পরিষ্কার করেছে। বাসন মেজেছে। দোকান ছুটেছে। বাদশার জামা কেচেছে। কাজের কি আর শেষ আছে। এত কাজ ওই একফোঁটা মেয়ে যে মুখ বুজে করতে পারছে সেইটাই বাহাদুরি। কাল বাবা বাদশার জন্যে একটা রঙিন ছবির বই কিনে দিয়েছে। কী সুন্দর বইটা। কত ছবি। একটা ছবি অবশ্য বাদশা ওকে দেখিয়েছে। এক পেটমোটা ভোম্বল সর্দার তরোয়াল নিয়ে লড়াই করতে গিয়ে দুম-ফট/ পা পিছলে আলুর দম/ ছবিটা দেখে কী হাসিই না পাচ্ছিল টোরার। কিন্তু সব ছবি তো আর দেখা হয়নি। হয়তো পাতায়-পাতায় আরও কত মজার মজার ছবি আছে। কখন থেকে ভাবছে বইটা দেখবে, এখনও পর্যন্ত ফুরসুত পেল না। টোরার ভারি ইচ্ছে, অনেক পড়বে সে। অনেক পড়তে-পড়তে ও ছোট্ট ভাই বাদশাকে দেখাবে রাতের অন্ধকারে নীল আকাশের কোন পারে সপ্তঋষি তারার আলো জ্বেলে ধ্যান করছেন। নয়তো কোন পথটি পেরিয়ে-পেরিয়ে চাঁদের দেশে মানুষ যাচ্ছে। কিংবা শীতের ভোরে কোন পাখিটি অনেক পাহাড় অনেক বন পাড়ি দিয়ে এই বনেতে বাসা বেঁধে গান গাইছে/
সে না হয় হল। বই না হয় না-ই দেখা হল। কিন্তু পাখিটি যে উড়ে পালাল, তার কী হবে/ রোজ সকালে টোরা পাখিকে চান করাবে। খাঁচাটা পরিষ্কার করবে। একবাটি ছাতু দেবে, খাবার জল দেবে। তারপর খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আদর করে বলবে, 'পাখি, পাখি, বলো তো বাদশা-দাদা ঘরে এসো, আমার কাছে একটু বসো।'' কিন্তু পাখি ছাতু খাবে আর টোরার দিকে চেয়ে-চেয়ে ল্যাজ নাড়বে/ কথা বলবে না/ কথা বলে না বলে টোরা ধমক দেয়, পাখি অমনি খাঁচার ভেতর ঝটপটিয়ে কপচায়/ কিন্তু আজ/ পাখি ফুড়ুত/ অবশ্যি টোরা যে চেষ্টা করেনি, তা নয়/ ধড়ফড়িয়ে হাত বাড়িয়ে ধরতে গেছল পাখিটাকে/ কিন্তু ফোক্কা/ পাখি পগারপার/ উলটে টোরার হাতে ঠ্যালা খেয়ে খাঁচাটা গোঁত মেরেছে। ছাতুর বাটি ছিটকে ছড়িয়ে নৈরেকার/
নতুন-মা তো আর কালা নয়/ শব্দ শুনেই চেঁচিয়ে উঠেছে, 'কী হল রে টোরা?'
নতুন-মায়ের মুখখানা চোখে ভেসে উঠতেই ভীষণ ভয়ে কেঁপে উঠল টোরার বুকখানা/
হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে নতুন মা, 'কী ফেললি, কী?'
টোরার মুখে রা নেই। খাঁচাটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে কাঁপছে সে/
টোরার মুখে রা না-থাক, নতুন মায়ের চোখে তো আর ঠুলি বাঁধা নেই। ছিটকে-পড়া খাঁচাটার হাঁ-করা দরজটা দেখলে কাণ্ডটা যে কী হয়েছে, সে তো আর জানতে বাকি থাকে না। চিৎকার করে আঁতকে উঠেছে নতুন-মা, 'পাখি কোথা গেল?'
আমতা-আমতা করে কাঁপা-গলায় উত্তর দিলে টোরা, "উড়ে গেল।"
তারপর যে কী হবে, সেসব টোরার জানা। নতুন-মা চিল-চেঁচিয়ে পাড়া মাত করবে। টোরাকে বককে-বকতে পাঁচশোবার বলবে, 'আহ্লাদী মেয়ে, আমার হাড়মাস কালি করে দিলে। কাজ তো কত করছ, শুধু অকম্ম/ এবার তোকে দূর করে দেব। দেখি এবার তোকে কে রক্ষে করে/'
টোরা আর একটি কথাও বলবে না। নিজের ঘরে গিয়ে চুপটি করে বসে থাকবে। তারপর বাবা যখন আসবে, টোরাকে ডাকবে। লুকিয়ে-লুকিয়ে আদর করবে। তখন টোরার ভয় ভাঙবে।
কিন্তু আজ তো তা হল না। আজ তো নতুন-মা ওকে শুধু গাল পেড়ে ক্ষান্ত হল না। হঠাৎ টোরার গালে চড় মারল। নরম তুলতুলে গালটা ওর লাল হয়ে গেল। ওর কানটা ধরে হিড়হিড় করে টানতে-টানতে সত্যিই বার করে দিল। বার করে দিল ঘর থেকে রাস্তায়। অভিমানে মুখটা ফুলে উঠেছে টোরার/ নিমেষে সে যেন বে-বাক হয়ে গেল/ সত্যিই কি নতুন-মা আজ তাকে দূর করে দিল/
টোরাকে কেউ মারে না। কোনোদিনও না। আজই প্রথম ও মার খেল। মার খেল নতুন-মায়ের হাতে। কেন? ও তো কোনো দোষ করেনি। ও তো ছোট্ট। পাখিটা তো ও আর ইচ্ছে করে আকাশে উড়িয়ে দেয়নি। পাখিটা যে পেটে-পেটে অমন মতলব এঁটে বসেছিল, খাঁচা খুললেই পালাবে, সে আর টোরা জানবে কেমন করে/ তাই বলে টোরাকে এমন করে মারবে/ঘর থেকে বার করে দেবে নতুন-মা/ সবাই দেখছে টোরাকে। ভাবছে, না জানি কী অন্যায় করেছে টোরা/ কী লজ্জা/
না, সবাই জানে টোরা কোনো অন্যায় করেনি। সবাই জানে নতুন-মা টোরাকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না। রাতদিন হেনস্তা করবে। সৎ-মেয়ে তো/ দু-বেলা নাকে দড়ি দিয়ে খাটাবে। ওর কি এখন খাটবার বয়েস/ আহা/ খাটতে-খাটতে মেয়ের কী দশা হয়েছে এখন/ ওর মা যখন বেঁচে ছিল, তখন কী যত্নেই না ছিল টোরা/ দেখতেও ছিল তেমনি। যেমন গায়ের রং, মুখখানাও তেমনি মিষ্টি। ভারি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে/
টোরাকে ভালোবাসে সবাই। সবাই জানে, লক্ষ্মী মেয়ে টোরা। ভারি নরম। নরম তার মনটি, মনের ভেতরটি/
ঘরের দরজা বন্ধ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে এখন কী করবে টোরা ভেবে পাচ্ছে না। লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে টোরা। ভয় হচ্ছে, সত্যিই যদি নতুন-মা ওকে আর ঘরে ঢুকতে না দেয়/ তবে যাবে কোথা সে? জানে না টোরা, কোথায় তার আপনজন আছে। কে তাকে আদর করবে বাবার মতো। ভালোবাসবে ছোট্ট ভাই বাদশার মতো।
খুব ভালোমানুষ টোরার বাবা। নতুন-মা টোরাকে বকলে বাবার মনের ভেতরটা ভীষণ কষ্টে গুমরে ওঠে। বাবা তবু মাকে কিছু বলবে না। বাবা তো জানে কিছু বললেই নতুন-মা চেঁচিয়ে-মেচিয়ে পাড়া মাত করবে। কী দরকার। একটা কথা বললে খ্যাঁক-খাঁক করে যে দশটা কথা শুনিয়ে দেয়, তার সঙ্গে লেগে কী লাভ/ মেয়েকে বকলে দুঃখে বুকটা ভরে যায় বাবার/ আর তাই সেই ভার নামাতে সে মেয়েকেই বুকে জড়িয়ে আদর করে।
সত্যি, বাবার জন্যে টোরাও ভীষণ খারাপ লাগে। আগে বাবা কত গল্প বলত, মুখখানা সব সময় হাসি-খুশি। আর এখন? ভারি চুপচাপ বাবা/ খুব মেঘ করলে আকাশটা যেমন অন্ধকার হয়ে যায়, বাবার মুখখানাও তেমনি অন্ধকার/ টোরা সব বোঝে। কিন্তু কী করবে ওই এক-ফোঁটা ছোট্ট মেয়ে/ মাঝে-মাঝে ভাবে, বাবার হাত ধরে চলে যাবে কোথাও। অনেক দূরে। না, পারে না। সে-কথা ভাবলেই ওর ভাইটির কথা মনে পড়ে যায়। বাদশা এত ভালোবাসে তাকে। ভাবতেই পারে না টোরা তার ভাইকে ছেড়ে সে অনেক দূরে চলে যাবে। বাদশা তার সৎ-ভাই। কিন্তু টোরার কোনোদিনই তো সে-কথা মনে হয় না। বাদশাও জানে টোরা তার দিদি। দিদির আবার পর-আপন আছে নাকি/ দিদির সঙ্গে বাদশা ইস্কুলে যায়। ইস্কুলে যাবার আগে দিদি ওকে জামা-প্যান্ট পরিয়ে দেবে। বই-খাতা গুছিয়ে দেবে। জুতোয় ফিতে বেঁধে দেবে। ইস্কুল তো খুব দূরে নয়। তবু দিদির হাত ধরে ইস্কুলে যেতে বাদশার খুব ভালো লাগে। ওইটুকু রাস্তা যেন কত মজার/ দিদির সঙ্গে কথা, শুধু কথা। গল্প আর গল্প। যেন শেষ নেই তার। এ-মজা যেন শেষ হবে না কোনোদিনও। বাদশা দিদির সঙ্গে না খেলে ওর যেন খিদে মেটে না। একসঙ্গে খেলবে, ঘুমুবে, নয়তো রাত্তিবেলা মোমবাতির আলো জ্বেলে দু-জনে গুনগুন করে ছড়া পড়বে, কিংবা গান গাইবে। তারপর যখন মোমের আলো জ্বলতে জ্বলতে নিভে আসবে, আগুনের ছোঁয়ায়-ছোঁয়ায় মোমের ফোঁটা গলতে-গলতে ফুরিয়ে যাবে, তখন হাই উঠবে বাদশার। দিদি বলবে, 'বাদশা, এবার ঘুমো।'
বাদশা উত্তর দেবে, 'তুই ভাবছিস আমার ঘুম পাচ্ছে?'
দিদি বলবে, "অনেক রাত হল।"
বাদশা দিদির দিকে চাইবে অন্ধকারে। তারপর বলবে, 'রাত কই রে। এখনও রেলগাড়িটা গেল না।'
রেলগাড়িটা রোজ যায়। রোজ যায় এমনি সময় এই রাতে, ওই দূরের অন্ধকার ছুঁয়ে-ছুয়ে। কু/ জেগে থাকলেই বাদশা ছুটে যাবে জানলার ধারে। জানলার গরাদে গাল দুটি ঠেকিয়ে দেখবে। দেখবে, রেলকাম ঝমাঝম করতে-করতে রাতের গাড়ি ছুটছে। অন্ধকারে গাড়ির সঙ্গে আলোর ঝিকিমিকি রোশনাইটাও যখন ছুটতে থাকে, তখন বাদশারও মন ছুটে চলে। মন চলে যায় অ-নে-ক অনেক দূরে। হয়তো কোনো পাহাড়ের দুর্গম চূড়ায়, নয়তো গাছগাছালি ভরা কোনো গহন বনের গভীরে। কিংবা ঢেউভাঙা উচ্ছল কোনো সমুদ্রের তীরে-তীরে।
অবশ্যি কোনোটাই দেখেনি বাদশা। দেখেনি পাহাড়, জানে না সমুদ্র কেমনতর। কে জানে, গহন বনের গভীরে সূর্যের আলো যায় কি না-যায়। ও শুনেছে, পাহাড়ের চূড়া আকাশের ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। পাহাড়ের চূড়ায় তুষারের মুকুট সূর্যের আলোয় ঝিকমিকিয়ে উঠলে চোখ ঝলসে যায়। সে নাকি ভারি ভালো লাগে দেখতে। ও দিদিকে বলে, 'দিদি, বড়ো হলে রেলগাড়ি চেপে আমরা দুজনা অনেক দূরে চলে যাব। পাহাড় ডিঙিয়ে, বন পেরিয়ে সমুদ্দুরে পাড়ি দেব। যাবি না তুই?'
টোরা হাসে।
হাসতে দেখলেই বাদশা দিদিকে জড়িয়ে ধরবে। দিদির হাসিটা এত ভালো লাগে বাদশার।
হাসতে-হাসতেই দিদি বলবে, 'আমি গেলে মাকে দেখবে কে?'
বাদশা বলে, 'দিদি, তুই ভারি বোকা/ মা-র কাছে তো রাতদিন বকা খাচ্ছিস, তবু মা-র জন্যে তোর এত ভাবনা/'
টোরা চাপা সুরে ধমক দেবে বাদশাকে। বলবে, 'ছিঃ, ও কথা বলতে আছে/ দোষ করলে মা বকবে না?'
'তুই দোষ না করলেও তো মা তোকে বকে। আমি যেন জানি না।'
'চুপ/' টোরা ভয় পায়। তাড়াতাড়ি বাদশার মুখখানা দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে। বলে, 'মা জানতে পারলে আস্ত রাখবে না'
'টোরা।'
কে ডাকল এমন আদর করে/ এতক্ষণ সে তো রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। মা তাকে বার করে দিয়েছে। ডাক শুনে চমকে গেছল টোরা। পেছন ফিরে দেখে বাবা।
'কী হয়েছে মা?' বাবা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
টোরা কিছু বলতে পারল না।
'মা বকেছে?' বাবা আবার জিজ্ঞেস করল।
ঘরের ভেতর থেকে মা চেঁচিয়ে উঠল, 'না, মেয়েকে পুজো করবে। ধিঙ্গি মেয়ে আমার পাখিটাকে উড়িয়ে দিলে। রথ দেখতে গিয়ে আমি শখ করে কিনে এনেছিলুম। আমার ময়না। সবে কেষ্ট-কেষ্ট বলতে শিখেছে। তা আমার সাধ-আহ্লাদ করবার জো নেই/ মেয়েছেলের অত নাচন-কোঁদনের কী আছে। কাজের নামে অষ্টরম্ভা। শুধু লোকসান করছে/'
বাবার বুঝতে বাকি রইল না কী হয়েছে। টোরার হাত ধরে বললে, 'চ মা।'
বাবার হাত ধরে ঘরে ঢুকল টোরা।
বাবা মাকে বলল, 'পাখি গেছে আবার হবে। কিন্তু তাই বলে বাচ্চা মেয়েকে অমন করে ঘর থেকে বার করে দিতে আছে/'
'বাচ্চা' শুনে ঘরের গিন্নি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। বলল, 'বলি, বাচ্চাটা তুমি দেখলে কোথায়? তোমার আহ্লাদী মেয়ে তোমার কাছেই বাচ্চা থাক। আমার দরকার নেই অমন মেয়ের। তুমি থাকো মেয়েকে নিয়ে। আমি কালই বাপের বাড়ি চলে যাব।' চিৎকার করে পাড়া মাত করলে নতুন-মা।
চিৎকার শুনলে যেন বুক শুকিয়ে যায় বাবার। আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কথা বলে লাভ কী। যে বোঝে না, তার সঙ্গে কথা বললে কথা বাড়বেই শুধু। থামবে না।
টোরার চোখ দুটি ছলছল করছে। নিজের ঘরে গিয়ে জানলায় মুখ বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল টোরা। যখন অনেক ব্যথায় ওর মন ভরে যায়, তখন এই জানলাটি যেন আপনজনের মতো ওকে ভালোবেসে আদর করে। আর তখন টোরার চোখের জল গাল বেয়ে উপচে যায়। ভাগ্যিস, এখন বাদশা ইস্কুলে গেছে/ নইলে বাদশা দেখে ফেলে যদি জিজ্ঞেস করত, 'দিদি তুই কাঁদছিস কেন?' তখন কিছুই যে উত্তর দিতে পারত না টোরা/ দু-হাতের মুঠি দিয়ে চোখের পাতা আড়াল করলেও কি তখন সে কান্না লুকোতে পারত?
টৌরাকে কেউ কাঁদতে দেখেনি। কোনোদিনও না। অনেক দুঃখে যখন ওর বুকে ভার হয়ে যায়, তখনও ঠোঁট দুটিতে মিষ্টি হাসির আলতো-ছোঁয়া লেগে থাকবে। হাসলেই কেমন টোল খেয়ে গাল দুটি ভেঙে যায়/ তখন এত ভালো লাগে মেয়েটাকে। অবিশ্যি এখন তো বড়ো হয়েছে। যখন আরও ছোট্ট ছিল, ছোট্ট হাত দুটি এলোমেলো নাড়তে-নাড়তে ছুটত, ওই সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে ছুটতে-ছুটতে নাচত কিংবা হাসত, মনে হত, যেন একটি রঙিন পাখি উড়ছে অথবা গান গাইছে। আচ্ছা বলো, এখন কি ওর কাজ করার বয়েস? এখন তো ও খেলবে, গল্প শুনবে, নয়তো গান শুনবে। নদীর ওপার থেকে যে-গান ভেসে আসে সোনালি রাতে আলোর পাল তুলে। বাদশার মতো টোরারও তো ইচ্ছে যায় ইস্কুলে যেতে, বই পড়তে। কিন্তু সে তো আর হল না।
আজ রাত এসেছিল চুপিচুপি। ওই আকাশ উপচে পড়া রাতের তারারা কেমন যেন টোরার অজান্তে আকাশের বুক জুড়ে জেগে উঠেছে। আজ সারাদিন দিদির সঙ্গে কথা হয়নি বাদশার। আজ ও ইস্কুল থেকে ফিরেছে বাবার সঙ্গে। বাদশা সব শুনেছে। শুনেছে পাখিটা উড়ে গেছে। মা দিদিকে মেরেছে। কান ধরে ঘর থেকে বার করে দিয়েছে। কী জানি কেন, দিদির দিকে চেয়ে ওর ভারি দুঃখ হচ্ছিল। ও ভেবে পায় না, কেন যে মা দিদিকে দেখতে পারে না। অথচ দিদি মা বলতে অজ্ঞান। দিদি মাকে এত ভালোবাসে, অথচ মা যেন দিদির ওপর তিরিক্ষি হয়েই আছে। রাগ ধরে মায়ের ওপর। আচ্ছা, সববার মা-ইতো মেয়েকে আদর করে, যত্ন করে। আর বাদশার মা দিন রাত উঠতে-বসতে দিদিকে কেন বকাবকি করে? দিদি তো লক্ষ্মী, দিদি তো কারো সঙ্গে লাগে না। মুখ বুজে তো মায়ের হুকুমই শুনছে সারা দিন।
ভাবতে-ভাবতে কেমন অবাক হয়ে যায় বাদশা। ওর ভাবনার সঙ্গে ঘরের অন্ধকারটা মোমের আলোয় যেন কেবলই কেঁপে উঠছে। আজ রাতে বাদশা দিদিকে বলতে পারল না, 'দিদি, একটা গল্প বল।' বলতে পারল না, 'দিদি একটা গান শোনা।'
আলো নিভে আসছে। বাদশা চুপচাপ শুয়ে ছিল বিছানায়। টোরা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল জানলায় রাতের অন্ধকারে চোখ মেলে। টোরা হয়তো ভাবছিল, পাখিটার কথা। কিংবা দেখছিল, অসংখ্য জোনাকির আলোর উড়ন্ত বিন্দুগুলি। ওর জ্বলে উঠে হারিয়ে যায়। হারিয়ে গিয়ে আবার জ্বলে ওঠে। এ যেন অন্ধকারের সঙ্গে আলোর লুকোচুরি খেলা/
হঠাৎ বাদশাই প্রথম কথা বলল, 'দিদি, শুবি না?'
দিদি উত্তর দিলে, 'ঘুম পাচ্ছে না।
বাদশা আবার বলল, 'সত্যিই তো, অমন করে মারলে কখনও মানুষের চোখে ঘুম আসে?'
টোরা চেয়ে দেখল বাদশার দিকে একবারটি। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'তুই ঘুমুবি না?'
কোনো উত্তর দিল না টোরা। আবার নিস্তব্ধ, আবার নিঃঝুম চারদিক। থমথম করছে ঘরের ভেতরটা, বাইরের আকাশটা। হঠাৎ গাছের বাসায় হয়তো ঘুমের ঘোরে একটি পাখি ডানা ঝাপটাল। চমকে উঠল টোরা। যেন ভয়ে বুকটাও থমকে গেল তার।
'দেখ দিদি, পাখিটা উড়ে গেছে ভালোই হয়েছে।' হঠাৎ যেন দিদিকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে বললে বাদশা। 'একটা নিরীহ জীবকে ধরে এনে খাঁচায় রাখার কী দরকার/ বল, আমায় যদি কেউ খাঁচায় বন্দি করে রাখে?'
এবারও কোনো উত্তর দিল না টোরা। ওর মন বারবার শুধু ভাবছে একটি কথা। একটি পাখির কথা। সত্যি এমন অকৃতজ্ঞ পাখিটা/ কেন, টোরা কি তাকে ভালোবাসেনি? না, যত্ন-আত্তি করেনি? রোজ নিজের হাতে সে খাবার দিয়েছে। খাঁচার ভেতর হাত গলিয়ে, গায়ে হাত বুলিয়ে কত আদর করেছে। আর পাখিটা কিনা তাকেই ফ্যাসাদে ফেলে, তারই হাতের ফাঁক দিয়ে উড়ে পালাল। যাক, যাক/ টোরার খারাপ হোক, যত পারে হোক/ তাতে তোর কী/ তোর মনের বাসনা তো পূর্ণ হয়েছে, তুই তো মুক্তি পেয়েছিস, তা হলেই হল। এখন টোরাকে কেউ মারুক কি ঘর থেকে বার করে দিক, তাতে তোর তো আর কিছু এসে যাচ্ছে না। মা-দুগ্গা তোকে রক্ষা করেছেন, এই দেখেই টোরার চক্ষু সার্থক/ ভাবতে-ভাবতে টোরার চোখ দিয়ে আবার জল গড়িয়ে পড়ল।
মোমবাতিটা নিভে গেছে। কখন যে বাদশা ঘুমিয়ে পড়েছে, খেয়াল করেনি টোরা। চোখের জল মুছতে-মুছতে বাদশার পাশে সেও শুয়ে পড়ল। মনটা খুব খারাপ-খারাপ লাগলেও দিনটা তবু কেটে যায় এক রকম। কিন্তু রাত যখন ঘনিয়ে আসে, যখন সব নিশ্চুপ হয়ে যায়, সাড়া শব্দ শোনা যায় না, তখন যেন দুঃখের ভাবনাগুলো পেয়ে বসে মানুষকে। অন্ধকার রাতটা যেন ভাবনার পালতোলা নৌকো নিয়ে ভেসে যায়। থামতে বলো, কিছুতেই শুনবে না। নৌকো দুলবে। আর দুলতে-দুলতে বয়ে যাবে।
দুলছিল টোরার মনও। দুলতে-দুলতেই টোরার চোখের পাতা দুটি ঘুমের ছোঁয়ায় বুজে গেল। ওর ক্লান্ত মুখখানি ঘুমের আবেশে কেমন শান্ত হয়ে গেছে। এখন আর টোরার কিচ্ছু মনে পড়বে না। মনে পড়বে না, নিজের মায়ের মুখখানি। মা তো কবে তাকে একা ফেলে চলে গেছে। মা নেই বলেই এত অপমান তাকে সইতে হয়। ওরও তোমন বলে, আর সবার মায়ের মতো ওরও মা ওকে আদর করুক। ইচ্ছে করে নতুন মায়ের মতো ওর কপালেও কেউ লাল চুমকির টিপ পরিয়ে দিক। রাঙা টুকটুকে পা দুটিতে লাল টকটকে আলতা দিয়ে সাজিয়ে দিক। কে দেবে? ওর ওই ছোট্ট ভাইটি? ধ্যাৎ/
বাদশা কবে যে বড়ো হবে কে জানে/ টোরা ভাবে, বাদশা বড়ো হলে অনেক লেখাপড়া শিখবে। অনেক নাম-যশ হবে। লোকের মুখে মুখে বাদশার নাম শুনতে-শুনতে টোরার বুকখানা গর্বে ভরে উঠবে। কিন্তু সে তো এখনও অনেক দেরি। বাদশা যা ছোটো/ বাদশা যদি টোরার চেয়ে বড়ো হত, তাহলে বেশ হত। তখন যা মজা হত না, টোরা তখন খালি ডাকাডাকি করত, 'বাদশা-দাদা।'
'বাদশা-দাদা।' সত্যিই হঠাৎ কে ডাকল না?
'বাদশা-দাদা।'
হ্যাঁ তো, আবার ডাকল/ এত রাত্তিরে কে ডাকছে বাদশাকে? কিন্তু সাড়া দেবে কে? অঘোরে ঘুমোচ্ছে বাদশা। ঘুমিয়ে পড়েছে টোরা। ওই ডাক কি এই ঘুমের ঘোরে ওরা শুনতে পাবে?
শুনতে পেল। ডাক না। রাত-পহরের রেলটা কু বাজিয়ে ঝিকঝিক করতে করতে ছুটে চলেছে। সেই শব্দে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল বাদশার। চমকে উঠেছে। ঘুম জড়ানো চোখে বিছানায় শুয়ে-শুয়েই ও চেয়ে দেখল জানলাটার দিকে। কান পেতে রইল, যতক্ষণ শোনা যায়, কু-কু ঝিক-ঝিক। ওই শব্দ শুনলেই বাদশার যেন মনে হয়, রেলগাড়িটা বাজনা বাজিয়ে নাচতে-নাচতে লাইনের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। তারপর রাতের অন্ধকারে সেই বাজনার রেশটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে, আরও দূরে। যেতে-যেতে একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল সেই বাজনা। পাশ ফিরল বাদশা। মুখে তুলে দেখল, দিদি ঘুমোচ্ছে। এখন অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু দিনেরবেলা ও স্পষ্ট দেখছে, কেঁদে-কেঁদে দিদির চোখ দুটি ফুলে গেছে। মা যে কেন এমন নির্দয় হয়, ভেবে পায় না বাদশা। আহা/ অমন করে মারতে আছে? আচ্ছা, না হয় মেরেছে, তারপর তো একটু আদর করবে? তা নয়, দিদির দিকে একবার চেয়েও দেখল না। এ কী রাগ বাবা? রাগের কি শেষ নেই/ না কি রাগ শেষ হয় না?
'বাদশা-দাদা।'
চমকে উঠলে বাদশা। এবার শুনতে পেয়েছে সে। কে ডাকল? বাদশার বুকটা চমকে ধড়ফড়িয়ে উঠল।
'বাদশা-দাদা।'
আবার ডেকেছে। বাদশা তাড়াতাড়ি উঠে বসল।
'বাদশা-দাদা।'
আরে, এ কী/ তাদের সেই উড়ে-যাওয়া পাখিটা ডাকছে নাকি/ এত রাত্তিরে পাখি এল কোত্থেকে?
বাদশা চুপি-চুপি ডাকল, 'দিদি, এই দিদি।'
টোরার ঘুম ভেঙে গেল, 'কী রে?'
বাদশা চাপা-গলায় বলল, 'পাখি/'
টোরা উঠে পড়ল, 'কই?'
বাদশা উত্তর দিলে, 'কী জানি। আমার নাম ধরে ডাকল।'
বলতে না বলতেই আবার ডেকেছে, 'বাদশা-দাদা।'
হ্যাঁ, তাই তো। সত্যিই তো তাদের পাখির গলা/ ঠিক তেমনি অস্পষ্ট, ভাঙা-ভাঙা ডাক/ টোরার বুকটা কেঁপে উঠল। বাদশার কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় ডাকছে বল তো?'
বাদশা দিদির চেয়েও আরও আস্তে বলল, 'মনে হচ্ছে জানলার ধারে ওই জামগাছটায়। যাবি? চ, ধরে আনি।'
ধরতে পারলে তো খুব ভালো। কিন্তু উড়ন্ত পাখিকে ধরবে কেমন করে টোরা জানে না। তাই ছোট্ট ভাইকে জিজ্ঞেস করল, 'কেমন করে ধরবি?'
বাদশা উত্তর দিলে, 'চ না, বাইরে গিয়ে দেখি।'
'যাবি কেমন করে?' ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করল টোরা।
'দরজা খুলে।'
'মা জানতে পারলে?'
'পারলেই বা। আমরা তো চুরি করতে যাচ্ছি না। মায়ের জন্যেই তো পাখি ধরতে যাচ্ছি।' সাফ উত্তর দিলে বাদশা।
সায় দিতে ভয় করল না টোরার। কেননা, পাখিটা ধরে আনতে পারলে, নতুন-মা যে খুব খুশি হবে, এটা টোরা ঠিক জানে। কিন্তু এও জানে টোরা, এই রাতের অন্ধকারে পাখিটাকে খুঁজে পাওয়া খুব শক্ত। তাই টোরা অনেকটা সন্দেহ-ভরা মনেই জিজ্ঞেস করল, 'কিন্তু বাদশা, অন্ধকার যে/'
অন্ধকারকে ভয় পায় না বাদশা। তাই দিদিকে সাহস দিয়ে বলল, 'অন্ধকার তো কী হয়েছে/ তুই ঘাবড়াচ্ছিস কেন? হাত বাড়িয়ে ডাকলেই দেখবি, পাখি লক্ষ্মীটির মতো হাতের ওপর নেমে আসবে। আমি বলছি, ওর ঠিক মন কেমন করছে। মন কেমন করছে বলেই তো আমাদের জানলার ধারে কেঁদে বেড়াচ্ছে।'
বাদশার কথা শুনে টোরারও মনটা অভিমানে ঝাপসা হয়ে গেল। হবেই তো। বলো, পাখিটার জন্যে টোরা কি কম করে/ আর তুই এমন স্বার্থপর, কিছু না-বলে না-কয়ে টোরাকে এমন একটা বিপদে ফেললি? তোর তো বোঝা উচিত ছিল, তুই পালালে নতুন-মা টোরাকে আস্ত রাখবে না। কাউকে যে দুঃখ দিতে নেই এ-কথাটা বুঝবি কবে? অন্যকে দুঃখ দিলে নিজেকেও যে দুঃখ পেতে হয়, এখন হাড়ে-হাড়ে বোঝ/ যাকগে যাক, যখন সুমতি হয়েছে, যখন আবার ঘরে ঢোকার জন্যে অন্ধকারেই ডাকাডাকি শুরু করেছে, তখন আর কিছু না-বলাই ভালো। তাই টোরা বাদশাকে বললে, 'চ তাহলে।'
পাখিটা আবার ডেকেছে, 'বাদশা-দাদা।'
ঘরের দরজাটা খুলবে বলে খিলটায় হাত দিল টোরা।
বাদশা বললে, 'দেখিস, মা না উঠে পড়ে। তাহলে সব মজা মাটি/ পাখিটা ধরে চুপচাপ খাঁচায় রেখে দেব। তারপর কাল মা যখন দেখবে, তাক লেগে যাবে। দেখি তখন মা তোকে কেমন না আদর করে/'
টোরার মুখখানা আনন্দে উছলে উঠল। টোরা নিঃশব্দে খিলটা খুলে ফেলল। তারপর বাদশা আর টোরা আলতো পায়ে নিঃসাড়ে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়লে।
'বাদশা-দাদা।' ওদের বাইরে দেখেই পাখিটা যেন দ্বিগুণ খুশিতে ডেকে উঠল। জামগাছের নীচে এসে টোরা চাপা গলায় পাখিটাকে ডাকল, 'আয়, আয়।'
এবার পাখি হঠাৎ ডেকে উঠল, 'টোরা-দিদি।'
অবাক কাণ্ড/ পাখিটা তো এর আগে কোনোদিনই টোরার নাম ধরে ডাকেনি। আজ হঠাৎ ডাকল কেমন করে/
টোরা আবার ডাকল, 'আয় টু টু পাখি আয়/'
পাখি আবার ডাকল, 'টোরা-দিদি।'
কিন্তু আশ্চর্য/ কোথায় যে লুকিয়ে আছে দুষ্টুটা গাছের ফাঁকে, ওদের একদম নজর যাচ্ছে না। ওপরে তাকালেই ওরা দেখছে, পাতার ঝিলিমিলির আড়াল থেকে আকাশটা উঁকি মারছে। আকাশ ভরতি আলোর তারাগুলো যেন এক-একটা অবাক গল্পের ছবি।
"ফুড়ুত/"
টোরা আর বাদশা স্পষ্ট দেখল জামগাছ থেকে পাখিটা উড়ে গেল। ইশ/ এত কাণ্ড করে শেষে এই/ টোরার মুখখানা হতাশায় চুপসে গেল/ কিন্তু বাদশা দমবার পাত্র নয়। বাদশা বললে, "পালাবে কোথায়/ আয় দেখি/'
পাখি এবার অন্ধকারে উড়তে-উড়তে, ঘুরতে-ঘুরতে দুষ্টুমি করে ডাকল, 'বাদশা-দাদা, টোরা-দিদি।'
বাদশা ছুটল পাখির পেছনে/ ডাক দিল, 'আয় পাখি, পাখি আয়।'
টোরা ডাকল, 'পাখি, পাখি আয়, আয়।'
পাখি উড়ছে, বাদশাও ছুটছে।
পাখিও ডাকছে টোরাও ডাকছে।
আঁধার রাতে অমন করে যে একা-একা ছুটতে নেই, এ-কথা বুঝতে পারেনি টোরা। বোঝেনি বাদশা। বোঝা যায়ও না। কেননা, টোরা জানে পাখিটার জন্যে নতুন-মা ভারি কষ্ট পেয়েছে। আবার যদি ফিরে আসে পাখি, খুব খুশি হবে নতুন মা। নতুন-মাকে খুশি দেখলেই টোরাও খুশি/ অবিশ্যি বাদশা ভাবছে অন্য কথা/ ভাবছে, একবার পাখিটাকে ধরতে পারলে হয়। মাকে যা কথা শোনাবে না বাদশা/ ছিঃ ছিঃ দিদিকে শুধুমাত্র মারাটা কি ঠিক হয়েছে/ দিদির দোষটা কী শুনি?

বাদশা তাই না দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠলো, ‘দিদি/’
সত্যিই পাখিটার লোভে টোরা আর বাদশা কেমন যেন ভুলে গেল সব কিছু। ভুলে গেল, যে-পাখি উড়ন্ত তার পেছনে ধাওয়া করলে তাকে ধরা যায় না। তাই ছুটতে-ছুটতে এমন জেদ বেড়ে গেল যে, খেয়ালই করল না কোথায় চলেছে তারা।
এ কী/ হঠাৎ পাখিটা যেন ওদের সঙ্গে চোর-চোর খেলা শুরু করে দিলে/ হাওয়ায় ভাসছে পাখি। ভাসতে-ভাসতে হঠাৎ-হঠাৎ নেমে আসছে একেবারে ওদরে হাতের নাগালে। যেই বাদশা আর টোরা ধরতে যাচ্ছে, পাখি ভড়কি দিয়ে ফুড়ুত করে উড়ে পালাচ্ছে। আশ্চর্য কথা/ বলে, পাখি নাকি রাত-দুপুরে চোখে দেখে না। কিন্তু এখন ওই উড়ন্ত পাখির কসরতের কাণ্ডকারখানা দেখলে কে বলবে এ-কথা/ উলটে অন্ধকারে টোরা আর বাদশারই চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছে। ধাঁধা যতই লাগছে, ওদের গোঁ ততই বাড়ছে। যেমন করে হোক পাখি তারা ধরবেই ধরবে/
হাঁপিয়ে গেছে বাদশা। টোরাও হাঁপাচ্ছে। টোরা বাদশাকে চেঁচিয়ে বললে, 'বাদশা, তুই আর ছুটিস না। দাঁড়া। আমি দেখছি।'
বাদশা উত্তর দিলে, 'তুই একা পারবি না।'
তাই বাদশাও পাখিটাকে ধরবে বলে হাত পাকাচ্ছে, লাফ মারছে, ভড়কিও খাচ্ছে। উড়ন্ত পাখি ধরা কি আর বাদশার কম্ম। না, বাদশার কম্ম নয়। কিন্তু দিদির মুখ তাকে রাখতেই হবে। দিদির জন্যে কোনো কাজই তার কাছে অসাধ্য নয়/
পাখিটা উড়তে-উড়তে এবার একদম আচমকা মেরেছে এক ঝটকা। মেরেছে একেবারে টোরার হাতের মধ্যে। হয়তো পাখিটা ভেবেছিল টোরার হাতে ঠুকরে দিয়ে পালাবে। টোরা তো থতমতো খেয়ে গেছে/ কিন্তু ঘাবড়াল না। চোখ-কান বুজে হাতের মুঠি পাকিয়ে ছোঁ মারতেই বাছাধন পাখি হাতের মধ্যে সড়াত/ ধরা পড়েছে/ আর কোনো কথা আছে/ টোরা একেবারে প্রাণপণে চেপে ধরলে পাখিটাকে/ পাখি চিল্লিয়ে ডেকে উঠল, 'ক্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ/' তারপরেই থেমে গেল।
বাদশা তাই না দেখে খুশিতে লাফিয়ে উঠল, 'দিদি/'
কিন্তু দিদি? দিদির তো মুখখানি খুশিতে উছলে পড়ল না। হাতের পাখি হাতে নিয়ে টোরা কেমন যেন থমকে গেল। পাখিটা চিৎকার করেই অমন ঠান্ডা হয়ে গেল কেন/ টোরা তাড়াতাড়ি হাতের মুঠিটা খুলে ফেলতেই পাখিটা হাত ফসকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। যাঃ টোরার হাতের চাপে পাখিটা মরে গেছে/
কিন্তু পাখিটা মরেছে কি মরেনি, এ-কথাটা বুঝতে না বুঝতেই, হঠাৎ আর এক কাণ্ড/ মরা পাখিটা টোরার হাত থেকে যেই মাটিতে পড়েছে, সঙ্গে-সঙ্গে প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল। বিদ্যুৎ ঝলকে উঠল আকাশে। থরথর করে মাটি কেঁপে যেন সব কিছু ভেঙে ভেঙে চুরমার করে ফেলছে। গাছের পাতায়-পাতায় এতক্ষণ যে-হাওয়া ঝুরুঝুরু বয়ে চলেছিল, সেই হাওয়া হঠাৎ ঝড়ের বেগে লাফিয়ে-লাফিয়ে মাতামাতি লাগিয়ে দিল। সঙ্গে কী ধুলো/ টোরা আর বাদশার চোখেমুখে সেই ধুলো ঝাপটা মেরে ঝড়ের সঙ্গে লুটোপুটি খাচ্ছে/ প্রচণ্ড সেই ঝঞ্ঝার মধ্যে বাদশা চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠল, 'দিদি/'
টোরাও অন্ধকারে দু-হাত বাড়িয়ে ডাক দিল, 'বাদশা।' কে কাকে খুঁজে পাবে এই দুর্যোগে/ টোরা আর বাদশা ঝড়ের ধাক্কায় এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল। অন্ধকারে অন্ধের মতো হাবুডুবু খেতে লাগল। কখনো বিদ্যুৎ, কখনো বজ্রপাত, প্রচণ্ড ঝড় আর মুঠোমুঠো ধুলো, সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর বিপদে পড়ে গেল টোরা আর বাদশা। চিৎকার করে কেঁদে উঠল বাদশা, 'দিদি, আমার কাছে আয়/'
দিদি চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলে, 'বাদশা, তুই কোথা?'
বাদশা উত্তর দিলে, 'আমি এখানে।'
কিন্তু কোনদিকে যাবে টোরা? কোথায় আছে বাদশা? চোখ তো চাইতেই পারছে না। চোখ চাইলেই ঝাঁক-ঝাঁক ধুলো উড়ে এসে চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ছে। কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না। তবু ডাক দিল টোরা, 'বাদশা, আমি এখানে আছি, আমার কাছে আয়/ আমি তোকে দেখতে পাচ্ছি না/'
বাদশা উত্তর দিলে, 'আমি দেখতে পাচ্ছি না। তুই কোনদিকে?'
'এই দিকে/'
এই ভয়ংকর দুর্যোগে এইদিকে একঝাঁক পাখি ঝড়ের সঙ্গে ঘূর্ণি খেতে-খেতে টোরার মাথার ওপর পাক খাচ্ছে/ কী সাংঘাতিক বিকট দেখতে সেই পাখিগুলোকে। বীভৎস কুচ্ছিত কালো মিশমিশে তাদের গায়ের রং/ বলতে পার, যেন এক-একটা দানব। ঝড়ের আকাশ কালো করে তেড়ে আসছে টোরার দিকে। কালো রাতে তাদের হিংস্র চোখগুলো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। ঠোঁট যেন ধারালো ছুরির মতো তীক্ষ্ণ/ হঠাৎ মস্ত মস্ত ডানাগুলো আগুনজ্বালা হাপরের মতো ঝটপটিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল টোরার ঘাড়ের ওপর। তারপর ডানা জাপটিয়ে টোরাকে থাবড়াতে লাগল। নোখ দিয়ে খামচাতে লাগল। ঠোঁট দিয়ে ঠোকরাতে লাগল। টোরা যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে ককিয়ে উঠল, 'বাদশা/'
ঝাঁকে ঝাঁকে দানব পাখি টোরাকে খামচে-ছিঁড়ে নাস্তানুবুদ করে ছাড়লে। টোরা ঝড়ের সঙ্গে ঘুরপাক খেতে-খেতে পাখির হাত থেকে বাঁচার জন্যে হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু কে শুনবে সেই চিৎকার? ঝড়ের দামামা আর পাখিদের কর্কশ চেঁচানি ছাপিয়ে সে-চিৎকার কার কানে যাবে?
পারেনি টোরা। পারেনি পাখির সঙ্গে লড়াই করে ওই দানব পাখির হাত থেকে বাঁচতে। টোরার যেন দম আটকে আসছে। ছুটতে-ছুটতে, লাফাতে-লাফাতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল টোরা। তারপর আর কিছু জানবার কথা নয় ওর। ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল মাটির ওপর।
ঝড় থেমে গেছল। হয়তো অনেক আগেই। কত আগে টের পায়নি টোরা। কেননা, যখন ও চোখ চাইল, দেখল কেমন সব থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। না আছে ঝড়ের দাপাদাপি, পাখিদের কিচিমিচি। কিন্তু চারদিকে এত কুয়াশা কেন? যেদিকে চায় সে, শুধু কুয়াশা আর কুয়াশা। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না টোরা। ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ল টোরা। উঠতে গিয়ে মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কী ব্যথা সার দেহ জুড়ে। কেটে গেছে, ছড়ে-ছিঁড়ে গেছে হাত-পা/
কিন্তু এ কোথায় সে? কোথায় এসে পড়েছে টোরা? জায়গাটা যেন ভয়ংকর চুপসি মেরে থমকে আছে। ভীষণ অস্বস্তিতে দম আটকে আসছে। দাঁড়িয়ে পড়ল টোরা। সেই কুয়াশার জালের মধ্যে কানামাছির মতো হাতড়াতে লাগল। পথ কোনদিকে? কোনদিকে যাবে সে?
হঠাৎ যেন চমক দিয়ে ওর মনের ভেতরটা শিউরে উঠল/ বাদশা/ তাই তো, বাদশা কোথা গেল/ ঘন কুয়াশায় চারদিকটা এমন ছেয়ে আছে যে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশার মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেছে বাদশা?
টোরা নরম-গলায় চুপিসারে ডাকল, 'বাদশা।'
বাদশার সাড়া পেল না।
আবার ডাকল, 'বাদশা।'
তবুও সাড়া নেই।
কেন সাড়া নেই/ বুক শুকিয়ে গেল টোরার। কী হবে এখন? এই কুয়াশার মধ্যে বাদশাকে সে কোথায় খুঁজবে? এবার মরিয়া হয়ে চিৎকার করে ডেকে উঠল, 'বা-দ-শা—'
এবারও ভোঁ-ভাঁ/ শুধু তার ডাকের সুরটা প্রতিধবনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সেই কুয়াশার মধ্যে। কেঁদে টোরা ফেলল হাউ-হাউ করে।
তার সেই কান্না শুনে হঠাৎ যেন কারা হেসে উঠল, 'হো-হো-হো/'
হাসির শব্দে কান্নাটা আচমকা থমকে বুকের মধ্যে আটকে গেছে টোরার। ভয় পেয়ে গেল টোরা। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল/ অমনি সঙ্গে-সঙ্গে বাতাস বইতে শুরু করল। যেন কার জাদুর ছোঁয়ায় সেই গাঢ় কুয়াশাটা ধীরে-ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছে টোরা। দেখছে, কুয়াশা মিলিয়ে যাবার সঙ্গে-সঙ্গে তার চোখের সামনে ভেসে উঠল রাজবাড়ির দরবারের মতো একটা বিরাট ঘর। বহুদিনের পুরোনো। ভাঙা, জীর্ণ। যেদিকে চাও, বড়ো বড়ো থাম। ফেটে গেছে, ইঁট ঝুলছে। উঁচু উঁচু দেওয়াল। খসে পড়েছে চুনবালি। মাথার ওপর খাড়া মস্ত এক গম্বুজ। মনে হচ্ছে এই বুঝি হুড়মুড় করে ঘাড়ে পড়ে/ গম্বুজের নীচে একলা দাঁড়িয়ে টোরা। হঠাৎ বিকট শব্দ করে গম্বুজের ডালাটা যেন খুলে গেল/ হ্যাঁ/ সেই খোলা ডালার ভেতর থেকে ওর চোখের সামনে ভাসতে-ভাসতে বেরিয়ে এল এক বিকট মূর্তি/ কালো অন্ধকারের মতো সে ভয়ংকর/ বীভৎস তার মুখের হাঁ-টা। হাঁ-এর ভেতর জিবটা তার লকলক করছে। যেন গিলতে আসছে টোরাকে। চোখ দুটো ভাঁটার মতো। হাত-পায়ের নোখগুলো লম্বা আর খোঁচা-খোঁচা/ তার মাথায় ঝাঁকড়া খসখসে একরাশ চুল। পিঠে ছড়িয়ে আছে উড়ন্ত পাখির ডানা। সেটা ঝটপট করে ঝাপটা মারছে, হাওয়ার ঢেউ উঠছে সারা ঘরে/ এ যেন এক উড়ন্ত দানব/
আতঙ্কে চেয়ে দেখল টোরা। 'কে/'
'গর-র-র' করে গর্জে উঠল দাবনটা। তার গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে থরথর করে কেঁপে উঠল দরবারটা। মনে হল, তার মুখ দিয়ে এক ঝলক আগুন বেরিয়ে এসে টোরার মুখের সামনে ঝলসে উঠল।
টোরা ভয়ে পিছিয়ে গেল/ ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে জিজ্ঞেস করলে, 'কী চাই তোমার?'
তখন সেই দানব তার বিরাট মাথাটা নাড়তে-নাড়তে প্রচণ্ড হুংকার ছেড়ে বললে, "হাতের মুঠিতে চেপে পাখি মেরেছিস তুই/'
টোরা তেমনি ভয়ে জড়সড়ো হয়ে বললে, 'না, আমি ইচ্ছে করে মারিনি। আমি হাত দিয়ে ধরতেই পাখিটা মরে গেল।'
"আমিও যদি আমার পায়ের নোখ দিয়ে তোর গলাটা চেপটে ধরে মেরে ফেলি/ কিংবা খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে তোর মাথাটা ফুটো করে দিই। তখন তোর কেমন লাগে/'
'ওটা আমার মায়ের পাখি। দুষ্টুমি করে আমার হাত ফসকে পালিয়েছিল। পাখিটার জন্যে মায়ের মন কেমন করছে বলেই আমি ধরতে গেছলুম।'
'মায়ের জন্যে তোর তো ভারি দরদ।' ধমকে দিলে দানবটা।
'মায়ের কষ্ট দেখলে আমি থাকতে পারি না।' উত্তর দিল টোরা।
দানবটা ভীষণ লাফিয়ে উঠল। সাংঘাতিক তর্জন-গর্জন শুরু করে দিলে। তারপর রক্ত-বর্ণ চোখ দুটো বার করে বললে, 'আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি পাখিটাকে জীবন্ত দেখতে চাই। তুই যদি পাখির প্রাণ ফিরিয়ে দিতে না পারিস, তোর ভাইকে ফিরে পাবি না।'
টোরা শিউরে উঠল/ তাহলে এই দানবটা বাদশাকে লুকিয়ে রেখেছে/ টোরা বুঝে উঠতে পারছে না, এখন সে কী করবে/ যে-পাখি মরে গেছে, তার প্রাণ সে কী করে ফিরিয়ে দেবে/ তাই টোরা এবার কাকুতি-মিনতি করে বললে, 'পাখির প্রাণ আমি দেব কী করে? প্রাণ তো ভগবানের। কিন্তু তুমি আমার ভাইকে ফিরিয়ে না দিলে মায়ের কাছে আমি মুখ দেখাব কেমন করে?'
এবার প্রচণ্ড চটে গেল দানবটা। বললে, 'আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। বল, তুই পাখির প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারবি কি না।'
টোরা বললে, 'আমি যা পারি না, তা পারব কেমন করে বলি?'
'বেশ/ তবে তোর মাকে ভুলতে হবে।'
টোরা চিৎকার করে উঠল, 'না, মাকে আমি ভুলতে পারি না, পারব না। মা আমার ভালোবাসার।'
'মাকে না ভুললে, ভাইকেও ফিরে পাবি না।'
তেমনি আকুল হয়ে টোরা উত্তর দিলে, 'ভাইকে ফিরিয়ে দাও, ভাই আমার আদরের।'
'আবার ভাই-ভাই করলে আমি তোকে বেঁধে রাখব।'
'আমাকে বাঁধ, আমি মেনে নেব। তাহলে তুমি আমার ভাইকে ছেড়ে দেবেতো?'
দানবটা হুংকার ছাড়লে, 'ফের ওকথা বললে তোর মুখখানা আমি আগুনে ঝলসে দেব।'
খুব শান্ত-গলায় টোরা উত্তর দিলে, 'বেশ তো, তোমার যদি তাই ইচ্ছা যায়, ঝলসে দিয়ো আমার মুখখানা। কিন্তু ভাইকে আমার ছেড়ে দিতে হবে।'
দানব আরও রেগে গেল। বললে, 'তোর ভাইকেও আমি পুড়িয়ে মারব।'
টোরার শান্ত গলাটা ভীষণ শব্দে ফেটে পড়ল। চিৎকার করে উঠল টোরা, 'না, যে বলে এমন কথা, সে যেন বোবা হয়ে যায়।'
'তোর এতদূর আস্পর্ধা, আমাকে তুই শাপান্ত করছিস/ তুই পাখি মেরেছিস। তুই খুনি।' বলে সেই কালো দানবটা হঠাৎ এক মুঠো ধুলো নিয়ে টোরার মুখে ছুঁড়ে মারল। মেরেই হো হো করে হাসতে-হাসতে নৃত্য শুরু করে দিলে।
টোরার চোখ দুটি ভীষণ জ্বলে উঠেছে। টোরা যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে কাতরে উঠল, 'আ—আ।'
দানবটা বললে, 'এই তোর শাস্তি। তোর এই মুখে আমি জাদু মেরেছি। এখন তোর ওই মুখ যে দেখবে, সে জন্তু হয়ে যাবে/ তোর মা হবে, তোর ভাই হবে, তোর বাবা হবে/ এমন কী, অজানা অচেনা যে দেখবে সে-ই হবে/ তারপর সেই জন্তু তোকে ছিঁড়ে খাবে/'
চিৎকার করে উঠল টোরা, 'না' টোরার তীক্ষ্ণ গলার স্বর ধবনি-প্রতিধবনি তুলে ওই বিশাল দরবারের গম্বুজে গমগম করে উঠল। এমন সময় হঠাৎ যেন আকুল স্বরে বাদশা ডেকে উঠল, 'দিদি/'
প্রথমটা বুঝতে পারেনি টোরা। তারপর আবার যখন ডেকেছে, সে-ডাক চিনতে ভুল হয়নি টোরার। ও চেঁচিয়ে সাড়া দিলে, 'বাদশা/'
দানব বিচ্ছিরি মুখ খিঁচিয়ে হেসে উঠে বললে, 'ওই দ্যাখ, ওই তোর ভাই আসছে/ এবার তোর মুখ দেখবে। তারপর তোর ভাই হবে জন্তু/ হা হা হা/'
ভয়ে কুঁচকে গেল টোরা। প্রথমটা বাদশার ডাক শুনে, খুশিতে ওর চোখের পাতা দুটি নেচে উঠেছিল। কিন্তু তারপর? দিদি বলে বাদশা সেই দরবার-ঘরে ছুটে আসতেই, টোরা, দু-হাত দিয়ে নিজের মুখটা ঢেকে ফেললে। এ-মুখে জাদু মেরেছে দানব পাখি/ এ-মুখ দেখলে তার ভাই জন্তু হয়ে যাবে যে/ না, তার ভাইকে সে জন্তু হতে দেবে না। কিছুতেই না। মুখ চেপেই টোরা ছুট দিল। বাদশাকে পিছনে ফেলে পালাল।
বাদশা টোরাকে ছুটতে দেখে চেঁচিয়ে ডাকলে, 'দিদি, আমি।'
টোরা তখন ছুটতে-ছুটতে দরবার-ঘরের বাইরে চলে গেছে। বাদশা দিদির কাছে যাবার আগেই, দরবারের দরজা ডিঙিয়ে দিদি আকাশের নীচে পৌঁছে গেছে। দিদিকে ডাকতে-ডাকতে বাদশাও ছুটল। আর দানবটা ঠ্যাং ছুঁড়ে, ডানা ঝাপটিয়ে খুশিতে সিটি মারলে, টি-টি/ সিটি দিতে দিতে দরবারের ধুলো-বালির ওপর নাচন-কোঁদন শুরু করে দিলে। ধুলোয়-ধুলোয় ভরে গেল দরবার-ঘর। সেই ধুলোর সঙ্গে ঝটাপটি করতে করতে কোথায় যে ফুস করে লুকিয়ে পড়ল সেই দানব, আর দেখাই গেল না।
'দি—দি।' যত জোর ছিল গলায়, বাদশা চেঁচিয়ে উঠল।
তবু টোরা দাঁডাল না। দাঁড়াবেও না। ভাইয়ের জন্যে তার মন ভেঙে খানখান হয়ে গেলেও ভাইয়ের দিকে ও একবার ফিরেও দেখবে না। ও মুখ ঘুরিয়ে ছুটবে। বাদশা যেন ওর মুখখানা দেখে না ফেলে।
বাদশাও ছুটল দিদির পিছু। প্রাণপ্রণে ছুটেও সে পৌঁছতে পারল না দিদির নাগালে। টোরা ছুটতে ছুটতে এগিয়ে যায়, বাদশা দেখতে-দেখতে হারিয়ে যায়। বাদশা কেঁদে ফেলে, 'দিদি, দাঁড়া দিদি।'
দিদি দাঁডাবে না।
কাঁদতে-কাঁদতে আবার ডাকে বাদশা, 'দিদি, দিদি, ফিরে চা।'
দিদি ফিরেও চাইবে না।
তখন বাদসার সেই কান্না যেন আকুল হয়ে বেজে ওঠে। বেজে ওঠে গাছের পাতায়, ফুলের রঙে, আকাশের নীলে। সে যেন এক কান্না-ভরা সুরের ঢেউ। সে-সুর বাজতে-বাজতে হাওয়ায় ছড়িয়ে যায়।
তবু থামল না টোরা। তবু শুনল না সেই কান্নার সুর/ সে ছুটল।
ছুটতে ছুটতে হঠাৎ কী দেখে এমন আঁতকে ওঠে টোরা? ওর যেন ধাঁধা লেগে গেল চোখে/ ও যেন দেখে সেই সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওর পিছু-পিছু ছুটে আসছে, রাস্তার দু-পাশের ছোটো-বড়ো ঘর-বাড়ি, মস্ত-মস্ত গাছ-গাছালি/ লাফিয়ে-লাফিয়ে ছুটছে ওরা, কিংবা, ছুটতে-ছুটতে হাসছে ওরা/
টোরা থমকে গেল/ ও তো কোনোদিন শোনেনি, গাছ ছোটে, ঘর হাঁটে/ এ আবার কেমনতর কাণ্ড/
ভাবতে-না-ভাবতেই আর-এক ধাঁধা। টোরা দেখে গাছগুলো আর গাছ নেই। গাছগুলো সব মানুষ হয়ে গেছে/ মানুষগুলো টোরার পেছনে ছুটে আসছে/
তারা ছুটছে, তাদের ঢলঢলে প্যান্ট পায়ের কাছে ল্যাকপ্যাক, ল্যাকপ্যাক করছে। তারা বুঝি ধরবে টোরাকে/ হ্যাঁ, ওই তো তারা হাত বাড়িয়েছে/ ওই তো, লম্বা, লম্বা হাত বাড়িয়ে পেছন থেকে টোরার ঘাড়টা খপাত করে ধরে ফেললে/ টোরা আর ছুটতে পারল না। টোরাকে ওরা ঘাড়ে তুলে নিলে/ ঘাড়ে নিয়ে, বিকট চেঁচিয়ে গান গাইতে লাগল, আর ধে-কেটে-ধিন নাচতে লাগল/
টোরার প্রাণ যায়/ সে-রকম নাচ টোরা জন্মে দেখেনি/ কখনো তারা হাত-পাগুলো প্রচণ্ড কাঁপাতে-কাঁপাতে বসে পড়ছে, আবার দাঁড়াচ্ছে। পা ছুঁড়ছে, হাত বেঁকাচ্ছে।
এমন সময় হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেল টোরার চোখের সামনে। হঠাৎ টোরা দেখল কী, মানুষগুলোর মুখ আর মানুষের মতো নেই। এক-একটা হিংসুটে জন্তুর মতো তাদের মুখের চেহারা। গায়ে তাদের লম্বা-লম্বা লোম। হাতের থাবায় খাড়া-খাড়া নোখ/
আঁতকে উঠে চিৎকার করে টোরা বললে, 'আমায় ছেড়ে দাও/'
ছাড়ল না তারা। উলটে তাদের ধারালো নোখ দিয়ে যেন টোরাকে ছিঁড়ে কুটোকুটি করে ফেলতে চাইল।
টোরা জানে, এবার তার বাঁচার কোনো রাস্তা নেই। দানবের অভিশাপ সত্যি-সত্যি ফলে গেল। এই মানুষগুলো ওর মুখ দেখে জন্তু হয়ে গেছে/ ওর মুখ দেখলে যদি মানুষে জন্তু হয়ে যায়, বেঁচে লাভই-বা কী/ আর তাই মিছিমিছি বাঁচবার জন্য টোরার কাঁদতেও মন চাইল না। এই জন্তুগুলোর কথা ছেড়েই দাও/ যে-মাকে সে এত ভালোবাসে, সেই মা-ই যখন তাকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না, তখন আর পরকে কী বলবে/
'দি—দি/' ওই বাদশা ছুটে আসছে।
চমকে উঠেছে টোরা। কী হবে? এই অপয়া মুখ সে কেমন করে দেখাবে বাদশাকে? ও কেমন করে চেয়ে দেখবে বাদশার মুখের দিকে?
ওই জন্তু-মুখো মানুষগুলো বাদশার ডাক শুনেই নাচতে-নাচতে থমকে দাঁড়াল। ওরা টোরাকে ঘাড় থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল। টোরাকে ছেড়ে ওরা বাদশার দিকে ছুটে গেল। যেন-এক-একটা জীবন্ত শয়তান।
টোরা নিশ্চিত জানত, এই জন্তুগুলোর হাত থেকে তার ভাই আর রেহাই পাবে না। তা হলে এখন তোমরাই বলো, কী করবে টোরা? এখন কেমন করে বাঁচাবে তার ভাই বাদশাকে?
টোরা থাকতে পারল না। চেঁচিয়ে ফেলল, 'বাদশা, এদিকে আসিস না।'
বাদশা নিশ্চয়ই শুনতে পায়নি। ওই তো বাদশা এদিকেই আসছে/ টোরা চক্ষের নিমেষে লুকিয়ে পড়ল একটা ঝোপের আড়ালে/
বাদশা এখন জন্তুগুলোর মুখোমুখি/ দাঁড়িয়ে পড়ল ভয়ে/ কী বীভৎস দেখতে জন্তুগুলোকে। এমন অদ্ভুত জীব বাদশা দেখেইনি কোনোদিন। সামনা-সামনি দেখা তো দূরের কথা, ওর অমন যে নানান ছবির বই আছে, তাতেও দেখেনি। আর দাঁড়ায় বাদশা/ মার ছুট/
কিন্তু পালাতে পারল না বাদশা। জন্তুগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। জন্তুগুলো মারল লাফ। লাফিয়ে পড়ল বাদশার ঘাড়ে। ওকে ধরে ফেলেছে। তারপর ওকে নিয়ে লোফালুফি শুরু করে দিলে। ওঃ/ বাদশার নড়াটা বুঝি ছেঁড়ে/ প্রাণ বুঝি যায়-যায়/
লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখছে টোরা। ওর বুকের ভেতরটা গুমরোচ্ছে। এখন কেমন করে সে বাঁচাবে তার ছোট্ট ভাইটিকে?
বাদশা যখন আর পারছিল না, হাঁপাচ্ছিল বে-দম হয়ে, আর ওর চোখে-মুখে বিন্দু-বিন্দু ক্লান্তির ছোঁয়া ফোঁটা-ফোঁটা হয়ে গড়িয়ে পড়ছিল, তখন আর চুপ থাকতে পারেনি টোরা। টোরা যেন মুখ ফসকে আপনা থেকেই ডেকে উঠেছিল 'বাদশা/'
ইশ/ এখন কী হবে/ বাদশা যদি শুনে ফেলে থাকে।
না, খুব রক্ষে/ বাদশা শোনেনি। শুনেছে ওই জন্তুগুলো।
ওরা দেখতে পেয়েছে, ভয়ে টোরা ওই ঝোপের আড়াল থেকে ছুটে পালাচ্ছে। হ্যাঁ, টোরা ছুটেছে/ আগু-পিছু কিচ্ছু না ভেবে একেবারে তিরবেগে ছুটেছে। একবার পিছনে ফিরেও তাকাল না। দেখল না, তার পালানো দেখে, জন্তুগুলো হাসতে-হাসতে ডিগবাজি মারছে আর তুড়তুড়ি কাটছে/ ওর পেছনে ছুটছে না, তাড়াও মারছে না।
এক নিশ্বাসে অনেকটা পথ চলে এসেছে টোরা। অনেক ঝোপ ডিঙিয়েছে সে, অনেকটা বন। এতক্ষণ যে চিৎকার ওর কানে তালা ধরিয়ে দিয়েছিল, সে চিৎকার আর শোনা যাচ্ছে না। নিস্তব্ধ, নিঃঝুম চারদিক। তাই আর ছুটল না সে। থামল। ওই গাছের আড়ালে মুখ লুকিয়ে ওর যেন ইচ্ছে হচ্ছিল একটু বসে-বসে কাঁদে। কিংবা ওই খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, সে কী পাপ করেছে যে তার কপাল এত মন্দ। এ অলক্ষুনে মুখ নিয়ে সে কোথা যাবে? এই অলক্ষুনে মুখ নিয়ে সে কেমন করে ভাইকে নিয়ে মায়ের কাছে ফিরবে?
যখন কেউ থাকে না নিজের কাছে, যখন মনে হয় ওই আকাশই আপনজন, তখন ভারি ভালো লাগে টোরার। যখন কথা বলার কেউ চাকে না, তখন যেন আকাশই কথা বলে টোরার সঙ্গে। ওই রহ্যস্যঘেরা আকাশ ওকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। আকাশের তারারা চোখ টিপে ওর সঙ্গে লুকোচুরি খেলে/
আঃ। কী মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছে/ এ তো ফুল না/ ফুলের মধু না/ কোথা থেকে ভেসে আসছে এই সুগন্ধ বাতাস? এত ভালো লাগছে টোরার। কেমন যেন আনমনা হয়ে সেই গন্ধের পথ চিনে-চিনে এগিয়ে চলল টোরা। সামনে পাহাড়। মস্ত উঁচু পাহাড়ের গায়ে-গায়ে নানা গাছ-গাছালি। গাছ-গাছালির সবুজ পাতায় মিষ্টি হাতের ছোঁয়া বুলিয়ে আদর করছে ঝুরুঝুরু বাতাস। টোরা পাহাড়ের কাছাকাছি যতই এগোচ্ছে, সে-গন্ধ ততই কাছে আসছে। টোরা পাহাড়ের পায়ের কাছে, পাথরের গায়ে-গায়ে পা ফেলে খুঁজতে লাগল। ও ভাবল, এখানে নিশ্চয়ই কেউ আছে। হয়তো এমন কেউ, যে ওকে ভালোবাসবে। ওর দুঃখ বুঝবে।
সামনে একটা মস্ত গুহা। অন্ধকার। সেই মিষ্টি সুবাস এই গুহার ভেতর থেকেই আসছে যেন/ কে আছে গুহার ভেতরে?
ভয়ানক নিস্তব্ধ। ওর নিশ্বাসের শব্দটুকু ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। ওর নরম পায়ের ছন্দটুকু পাথরের গায়ে-গায়ে যে শব্দ তুলছে, তা টোরার নিজের কানেই নিতান্ত অস্পষ্ট বেজে যাচ্ছে। টোরা গুহার ভেতরে এগিয়ে গেল।
সামনে আলো। অভিভূতের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল টোরা/ প্রদীপ জ্বলছে। কেবল একটি প্রদীপ। অন্ধকারে একটি শিখা। প্রদীপের আলোয় স্পষ্ট দেখল টোরা এক দেবতার মূর্তি। এই অন্ধকার গুহার ভেতরে এ মূর্তির পায়ের কাছে কে জ্বেলেছে প্রদীপের শিখা/ কে দিয়েছে আলোর ছোঁয়া/
কেঁদে ফেলল টোরা। ওর চোখের পাতা বেয়ে কান্নার ফোঁটাগুলি মুক্তোর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। হয়তো আনন্দে। এই অজানা জায়গায় ও একা। একাকী একটি ছোট্ট মেয়ে। ও জানে না, কী করবে এখন/ ও জানে না, কেমন করে তার ভাইকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে। জানে না, কেমন করে ভাইকে মায়ের কাছে পৌঁছে দেবে। এই দেবতা কি টোরাকে দয়া করবে না? দেবতা কি শুধুই পাথর/
আকুল হয়ে দেবতার পায়ের কাছে প্রণাম করল টোরা। মনে মনে বললে, 'ঠাকুর, বলো তুমি, ভাইকে কেমন করে ফিরে পাব? বলো ঠাকুর, আমার মায়ের কাছে কেমন করে যেতে পারব? তুমি তো ঠাকুর। তোমার তো অজানা কিছুই নেই। তুমি তো জানো ঠাকুর, আমার এ অলক্ষুনে মুখ যে দেখবে, সে-ই জন্তু হয়ে যাবে/ আমি কী করব? আমি কী করব ঠাকুর?' বলে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল টোরা/
এ কী/ হঠাৎ প্রদীপটা পিলসুজের ওপর থেকে পড়ে গেল কেন/এই দ্যাখো, প্রদীপ যে মাটিতে পড়ে নিভে গেল/ বুঝতে পারেনি টোরা, অসাবধানে তার আঁচলের ছোঁয়া লেগেছে প্রদীপের গায়ে। তাই পড়ে গেল/ কী হবে/
সঙ্গে সঙ্গে উঃ/কী জমাট অন্ধকার/ কিচ্ছু দেখা যায় না/ ওই সুন্দর দেবতার মূর্তিটি পর্যন্ত অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
আর টোরা? টোরা কোথায় গেল? অন্ধকারে সে কোথায় হারিয়ে গেল?
দ্যাখো, দ্যাখো, টোরা হাওয়ার সঙ্গে হাওয়া হয়ে গেছে। অন্ধকারের সঙ্গে অন্ধকার হয়ে মিশে আছে যে/ একী/ ওই প্রদীপ নিভে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে টোরাও যে অদৃশ্য হয়ে গেল/ টোরা নিজে দেখতে পাচ্ছে, সে আছে। কিন্তু তুমি দেখছ, সে নেই। দেখা যাচ্ছে না, তার সেই ফুটফুটে মুখটি। সেই ডাগর-ডাগর চোখ দুটি। লাল টুকটুক ঠোঁট দুটি কিংবা আলতা-ছোঁয়া পা দুটি/ কী হল তার? আবার তার কি অভিশাপ লাগল?
টোরা কাঁদছে/ তুমি শুনছ টোরা কাঁদছে, কিন্তু দেখছ না তার কান্নার জল। তুমি শুনছ টোরার পায়ের শব্দ, কিন্তু বুঝছ না কোথায় সে চলছে/ তার হাতের চুড়ি বেজে যায় ঠুং-ঠুং, কিন্তু দেখছ না কোথায় সে বেজে পড়ছে/ ডুকরে-ডুকরে কেঁদে ওঠে টোরা, 'এ আমার কী হল?'
এই অন্ধকার গুহায়, অজানা দেবতার ঘরে অদৃশ্য টোরা কাঁদছে/
হঠাৎ কে যেন কথা বলল, 'কেঁ কাঁদে রে, কে কাঁদে?'
টোরার অদৃশ্য মূর্তি অদৃশ্য চোখে এদিক ওদিক চাইল।
সে-ই আবার বলল, 'কী তোর নাম?'
'আমি টোরা।'
'কী করে প্রদীপ নিভল?'
'আমার আঁচল লেগে প্রদীপ নিভে গেল।'
তখন সেই না-দেখা মানুষ গম্ভীর গলায় বললে, 'যারা অসাবধানী তারাই বারবার ভুল করে।'
টোরা মুখ ফুটে একটি কথাও বলতে পারল না।
আবার সে বললে, 'তুই অসাবধানী। তোর অসাবধনতার জন্যে খাঁচার থেকে তোদের পাখিটা উড়ে পালাল। তোরই অসাবধানতার জন্যে সেই পাখি তোরই হাতের চাপে মারা গেল। আর এখন তোরই অসাবধনতার জন্যে দেবতার প্রদীপ নিভল। আর সেই পাপে তুই-ও অদৃশ্য হয়ে গেলি/ তুই সবাইকে দেখতে পাবি, কিন্তু তোকে আর কেউ দেখতে পাবে না। তারপর একদিন তোর অদৃশ্য শরীরটা নিয়ে হাওযার সঙ্গে হাওয়া হয়ে নীল আকাশে মিশে যাবি। সেদিন তুই আর কাঁদতেও পারবি না।'
'না—।' চিৎকার করে কেঁদে উঠল টোরা, 'আমাকে তুমি বাঁচাও। আমি না থাকলে, কে আমার মাকে দেখবে/ কে তার ঘরকন্নার কাজ করে দেবে। কে আমার বাবাকে যত্ন করবে। ভাইকে গল্প বলে ঘুম পাড়াবে।'
'তোর মা তো তোকে দেখতে পারে না। তবু মায়ের জন্যে তোর এত ভাবনা কেন?'
'কে বললে মা আমায় দেখতে পারে না। মা আমার ভালোর জন্যেই তো আমাকে বকে। কার মা তার মেয়েকে বকে না? আবার ভালোও বাসে না?'
'তোর মা তো পর। ও তো বাদশার মা।'
'মা কখনো পর হয়? বাদশা তো আমার ভাই।'
সেই কণ্ঠস্বর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আর টোরার অদৃশ্য চোখ দুটি ইতিউতি ঘুরে ঘুরে তাকে খুঁজে বেড়াল। কিন্তু তাকে দেখতে পেলে না। না পেয়ে, টোরাই আবার বললে, 'চুপ করলে কেন? তুমি আমায় বলে দাও কেমন করে আমি ফিরে পাব আমার সব কিছু/'
হয়তো সেই না-দেখা মানুষের মন টোরার কথা শুনে খুশি হয়েছিল। হয়তো মনে হয়েছিল অনেক দুঃখেও যে অন্যের মাকে আপন করে নেয়, সে লক্ষ্মী মেয়ে। তা দুঃখ ঘোচাতেই হবে। তাই সেই না-দেখা মানুষের কণ্ঠস্বর আবার শুনতে পেলে টোরা। সে বললে, 'তুই যদি আবার সব কিছু ফিরে পেতে চাস, তবে যে তোকে এই প্রদীপ আবার জ্বালতে হবে/
টোরা বললে, 'আমি জ্বালব।'
'কিন্তু এ যে বড় শক্ত কাজ। তুই যে ছোটো। তুই তো পারবি না।'
টোরা ব্যাকুল হয়ে বললে, 'হ্যাঁ, আমি পারব। আমি রোজ সন্ধ্যায় আমার ঠাকুরের কাছে প্রদীপ জ্বেলে দিই।'
তখন সেই কণ্ঠস্বর বললে, 'তবে শোন। এই গুহার ওপরে যে পাহাড়, সেই পাহাড়ের চূড়ায় তোকে যেতে হবে। সেই পাহাড়ের চূড়ায় খোলা আকাশের নীচে জ্বলছে আর এক প্রদীপ। এই নিভন্ত প্রদীপের শিখাটি সেই জ্বলন্ত প্রদীপের শিখায় জ্বালাতে হবে। যদি পারিস, তুই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবি।'
টোরার কণ্ঠস্বর আনন্দে চিৎকার করে বলে উঠল, 'পারব, পারব, পারব।'
আবার সেই না-দেখা মানুষ বললে, 'বেশ তবে তুলে নে ওই প্রদীপ।'
টোরা অন্ধকারে তার অদৃশ্য হাত বাড়িয়ে হাতড়ে-হাতড়ে মাটি থেকে সেই প্রদীপটা তুলে নিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠল। এ যে সোনার প্রদ্বীপ/
সে তখন বললে, 'শুধু প্রদীপ নিলেই তো হবে না।'
'টোরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে, 'তবে?'
'জ্বলবে কেমন করে?'
'কেন জ্বলবে না?'
'প্রদীপের শিখা তো শুকিয়ে গেছে। ওকে ভিজিয়ে নিতে হবে/'
'কেমন করে? কী দিয়ে ভেজাব?'
'ভেজাতে হবে একটি ফুলের কান্নার জলে/'
অবাক হল টোরা। 'ফুল কাঁদে?'
'হ্যাঁ, ফুল কাঁদে। যেমন তুই কাঁদিস। একটি ফুলের এক ফোঁটা চোখের জলে এর শিখাটি ভিজিয়ে নিলে, তবেই প্রদীপ জ্বলবে।'
টোরা হতাশ হয়ে চেয়ে রইল সেই কালো অন্ধকারের দিকে। কালো অন্ধকারে ও আলোর দেবতাকে দেখতে পাচ্ছে না একটুও। ও বুঝতে পারছে না এ কার কণ্ঠস্বর, দেবতার না অন্য কারও। তবু অন্ধকারেই অন্ধের মতো হাত জোড় করে বললে, 'ঠাকুর, তুমি যখন এত দয়াই করলে, তখন বলে দাও কোথায় কাঁদছে সেই ফুল? কোথায় গেলে তার দেখা পাব?'
তখন সেই কণ্ঠস্বর আবার বললে, 'যেখানে জলও আছে, স্থলও আছে। হাসিও আছে, খুশিও আছে। পাখিও আছে, ফুলও আছে। শুধু সেখানে নেই টোরা। সেখানেই তোকে যেতে হবে।'
টোরা উঠে দাঁড়াল। প্রদীপটা হাতে নিলে। সে অদৃশ্য, কিন্তু প্রদীপ তো নয়/ তাকে না-দেখা গেলেও এই প্রদীপ তো সবাই দেখতে পাবে, সোনার প্রদীপ দেখলে, কেউ নিয়ে নেয় যদি। ভয় হল। কিন্তু ভয় পেলে তার চলবে না। তাকে বেরিয়ে আসতে হবে গুহার অন্ধকার থেকে বাইরে। তারপর ও হাঁটবে। ওর পায়ের ছন্দে-ছন্দে প্রদীপও দুলে-দুলে এগিয়ে যাবে। মনে হবে, একটি আশ্চর্য সোনার পাখি শূন্যে একা-একা ভেসে যাচ্ছে।
টোরা গুহার অন্ধকার হাতড়ে-হাতড়ে আকাশের আলোয় বেরিয়ে এল। তারপর একটু দাঁড়াল। ভাবল, কোনদিকে যাবে সে/ কোনদিকে জল আছে, স্থল আছে? হাসি আছে, খুশি আছে? পাখি আছে, ফুল আছে? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ কেমন যেন অবাক লাগল টোরার। ওর মনে হল, এসব তো সবখানেই আছে/ তা ঠিক। তাহলে? সে কোনখানে যাবে? কেমন করে যাবে?
'টোরা, টোরা, টোরা/' কে যেন ফিসফিসিয়ে টোরার নাম ধরে কানে কানে ডেকে গেল। ও তো কাউকে দেখতে পেল না। শুধু ওর চারপাশে হাওয়া বয়ে চলেছে ঝুর-ঝুর করে/ আঃ/ কী মিষ্টি। তবে কি হাওয়ার সঙ্গে গলা মিলিয়ে কেউ ডাকল তাকে?
টোরা মিষ্টি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, 'কে তুমি, ডাকছ আমায়?'
'টোরা, টোরা, আমিও তোমার মতো অদৃশ্য। আমার সঙ্গে যাবে তুমি?'
'কোথায়?'
'যেখানে ফুল কাঁদে? কাঁদতে-কাঁদতে ফুলের চোখে জল গড়ায়?'
'তুমি সেখানে আমায় নিয়ে যাবে?' আনন্দে টোরার মন নেচে উঠল। উৎসাহে উচ্ছল হয়ে সে জিজ্ঞেস করলে, 'তুমি কে? তোমায় দেখছি না তো?'
সে বললে, 'আমি হাওয়ার দোলনা।'
অমনি টোরার পা দুটি দুলে উঠেছে।
হাওয়া বলল, 'অবিশ্যি ভয় কিছু নেই। কেননা, আমি তোমায় আমার দোলনায় নিয়ে যাব/'
টোরার চোখ দুটি ভয়ে কুঁচকে গেল। বললে, 'যদি পড়ে যাই/'
'যারা ভয় পায়, তারা পড়ে। পড়তে-পড়তে মরে। কিন্তু তুমি আর পড়বে কী/ তুমি তো অদৃশ্য/'
দুঃখে টোরার গলাটা ভার হয়ে গেল। টোরা উত্তর দিলে, 'ও হ্যাঁ, আমি তো অদৃশ্য। বেশ তুমি নিয়ে চলো, আমি ভয় পাব না/'
অমনি ঝুরঝুরে হাওয়া ফুরফুর করে বয়ে চলল। সেই হাওয়ার সঙ্গে হাওয়া হয়ে টোরা ভেসে যায়, হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় ওই আকাশে।
হাওয়া জিজ্ঞেস করলে, 'টোরা ভয় পাচ্ছ?'
টোরা বলল, 'ভালো লাগছে/'
পাহাড়টা পেরিয়ে-পেরিয়ে নদী এল। ওই নীল আকাশের ওপার থেকে চোখ মেলে দেখতে-দেখতে টোরার মনে হল, নদী যেন সবুজ বনের কপালে রূপালি আলোর টায়রা/ ঝিকমিক করছে/
টোরা হাওয়ার দোলনায় ভাসতে-ভাসতে জল দেখল, স্থল দেখল। হাসি দেখল, খুশি দেখল। পাখি দেখল, ফুল দেখল।
দেখল আর অবাক হয়ে গেল। মাটিতে হেঁটে হেঁটে দেখা একরকম। আর আকাশে উড়ে-উড়ে দেখা আরেক রকম। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয়, পৃথিবটা যেন একটা খেলাঘর/ কেমন এইটুকু-টুকু হয়ে গেছে সব/
তারপর?
তারপর হাওয়া বলল, 'টোরা, নামতে হবে।'
টোরা জিজ্ঞেস করলে, 'এইখানে?'
হাওয়া বলল, 'এই বনে।'
'এই বনে ফুলের কান্না পাব?'
'কান্নার জল পাবে।'
'তবে নামি।' সায় দিল টোরা।
টোরার কথা শেষ হতে না হতেই, হাওয়া হুস-হুস করে টোরাকে নিয়ে সেই বনের গভীরে নেমে এল।
টোরা বনের ঘাসে পা ফেলে হাওয়াকে বলল, 'ভীষণ গহন বন।'
হাওয়া বলল, 'বন যদি না গহন হয়, মজা কিসের?"
টোরা জিজ্ঞেস করলে, 'বাঘ আছে?'
'বাঘ আছে, বাঘের মাসিও আছে।'
'এখানেই কান্না খুঁজতে হবে?'
হাওয়া উত্তর দিলে, 'হ্যাঁ।'
'কিন্তু খুঁজতে-খুঁজতে গভীর বনে হারিয়ে গেলে?'
'হারিয়ে গেলেই খুঁজে পাবে।' বলে হাওয়া হা-হা-হা করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে ঝড়ের বেগে ঘুরপাক খেতে লাগল। ঘুরতে-ঘুরতে গাছের পাতায়, গাছের ডালে হুটোপাটি লাগিয়ে দিলে। তারপর যে হঠাৎ কোথায় লুকিয়ে পড়ল, টোরা আর দেখতে পেল না।
টোরা চেঁচিয়ে ডাকলে, 'কোথা লুকালে?'
কে উত্তর দেবে? হাওয়া তখন হাওয়া হয়ে গেছে। আর ঠিক তক্ষুনি টোরার যেন শীত-শীত পাচ্ছে। মনে হল উত্তুরে হাওয়া ঝির ঝির করে বয়ে-বয়ে বনের পাতা ঝরাচ্ছে। গাছের শুকনো পাতাগুলো ঝরতে-ঝরতে যখনই ওর পায়ের ওপর উড়ে আসছে, তখন ওর মনে হচ্ছে এখন সে ভারি একলা। হাওয়াটা যে তাকে এমন একটা না-চেনা, না-জানা জায়গায় একলা ফেলে পালাবে, এটা তো সে ঘুণাক্ষরে বুঝতে পারেনি/ বলো, এখন এই গা-ছমছম বনে একা-একা সে কী করব? কোথায় খুঁজবে ফুলের কান্না?
একদল পাখি পাইন গাছের পাতায়-পাতায় খেলা করছে আর খুব গান গাইছে। এক-একটা পাখি গাইতে-গাইতে কেমন শিস দেয়/ কেউ-কেউ নাচে আবার। হাসে আবার। যাই বলো, টোরা কোনোদিন পাখিকে হাসতে দেখেনি/ ওরা তো আর টোরাকে দেখতে পাচ্ছে না। তাই ভয়ও পাচ্ছে না। খুব হাসছে, খুব গাইছে, ধিনিক-ধিনিক নাচছে।
দেখছে টোরা। যতই দেখছে, ভালো লাগছে। আর মনে-মনে ভাবছে, এই বন ভরতি সব পাখি যদি মায়ের জন্যে নিয়ে যেতে পারি/ না, না, এখন ওসব কথায় না যাওয়াই ভালো। এখন কান্নার কথা। ফুলের কান্না/
হঠাৎ টোরার মনে হল, আচ্ছা পাখিরা তো সারা-রাজ্যি উড়ে বেড়াচ্ছে, ওরা তো জানতে পারে কান্না-ঝরা ফুলের কথা/ আচ্ছা, একবার পাখিদের যদিও ডাকে, যদি জিজ্ঞেস করে?
তাই হ্যাঁ, দেখাই যাকে না। এই ভেবে ভারি মিষ্টি সুরে পাখিদেরই ডাকল টোরা .
গহন বনের রঙিন পাখি,
বল না আমায় বল
কোথায় আমি খুঁজে পাব
ফুলের চোখের জল?
ওমা/ এ কী হল/ টোরার গলার স্বর শুনে যেন ভীষণ ভয় পেয়ে গেল পাখির দল/ ভাবল হয়তো, কীরে বাবা/ মানুষের দেখা নেই কোথাও, অথচ মানুষের গলা শোনা যায় কোত্থেকে/ পাখিরা আর থাকে ওখানে? গান থামিয়ে, নাচ থামিয়ে ভো-কাট্টা/ এ-গাছে, ও-গাছে যত পাখি ছিল, সব গাছ ছেড়ে, গাছের ডাল ছেড়ে একেবারে টোরার দৃষ্টির বাইরে হাওয়া/
টোরা সেইদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ভাবতে লাগল 'তাই তো, পাখিরা পালাল কেন?'
এমন সময় এক ঝলক হাওয়া গাছের পাতার ওপর দিয়ে ভেসে গেল। আর ঠিক তক্ষুনি মনে হল, যেন পাতাদের গায়ে কে সুড়সুড়ি দিয়ে দিয়েছে/ এ-পাতা ও-পাতার গায়ে লুটোপুটি খেয়ে খিলখিল করে হেসে কুটোকুটি/ টোরা ভাবল, গাছের পাতাও হাসে/ যখন হাসে, তখন নিশ্চয়ই টোরার কথাও বুঝতে পারবে/ তাই টোরা এবার গাছের পাতাদের ডাকলে .
গহন বনের সুবজ পাতা,
বল না আমায় বল,
কোথায় আমি খুঁজে পাব
ফুলের চোখের জল?
চোখের পলকে তখন এক কাণ্ড। টোরার মুখের কথা তখনও শেষ হয়নি/ দেখে কী, সেই বন ভরতি গাছ, গাছ ভরতি সবুজ পাতা নিমেষের মধ্যে সব ঝুর-ঝুর করে ঝরে পড়ল। ঝরে পড়ে হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারা বনে ছোটাছুটি, হাঁটাহাঁটি শুরু করে দিল। সে এক তাজ্জব ব্যাপার/ গাছ আছে পাতা নেই। ডাল পালা খাঁ-খাঁ/ কঙ্কালসার/ মনে হচ্ছে যেন, কোমরভাঙা একশো দুশো বছরের হাড়-জিরজিরে এক-একটা বুড়ি, কিংবা বুড়ো, লিকলিকে হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ল্যাকপ্যাক করছে।
পাতা ঝরল বলে, সেই গহন বন আর গহন রইল না। সারা বন আলোয় আলো হয়ে গেল/ সেই কাণ্ড দেখে বনের যত জীব সবাই তো থ বনে গেছে। যে যেদিকে পারল, দে চম্পট/ আর টোরা? কোনদিকে যাবে, কাকে ডাকবে, কিছুই ভেবে না পেয়ে শুকনো গাছের, শুকনো পাতার দিকে হাঁদার মতো চেয়ে রইল/ পথ যে কোথায়, ঠাওরই করতে পারছে না টোরা। সে যেন সত্যিই অলক্ষুনে/ না হলে এমন হবে কেন? এমন যে পখ-পাখালি, গাছ-গাছালিতে ভরা সুন্দর বন, তার দৃষ্টি লেগে সে-বনও ঝরে গেল/ এখন আর কিচ্ছু ভাবতে পারছে না টোরা। এখানে ফুলের চোখে জল পাওয়া তো দূরের কথা। এখন যেন এ-বনের মরুর দশা। যেদিকেই চাও খাঁ- খাঁ করছে/
ভারি দুঃখ লাগছে টোরার। সেই সোনার প্রদীপটি হাতে নিয়ে এখন সে এখানে একা/ ডাকলেও কেউ সাড়া দেবে না। সাড়া দিলেও কেউ টোরাকে দেখতে পাবে না।
কেঁদে ফেলল টোরা/ শূন্য এই বনে ওর কান্না কেউ শুনতে পাচ্ছে না। কেউ জানছে না, কে কাঁদে, কেন কাঁদে। টোরা যেমন হাওয়ার সঙ্গে হাওয়ার মতো অদৃশ্য, টোরার কান্নাও তেমনি হাওয়ার সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে ভেসে ভেসে ফিরে যাচ্ছে। ফিরে যায়, অনেক কাছে আবার অনেক দূরে। ধীরে-ধীরে পা ফেলে টোরা। ধীরে ধীরে সেই কান্নার সুর যেন একটি মিষ্টি গানের ঢেউয়ের মতো উছলে পড়ে/ অনেক ব্যথা, অনেক সুরের মুক্তা হয়ে হাহাকার করে ছড়িয়ে পড়ছিল/ এ কি কান্না? না, কান্নার গান? কে বলবে, টোরা কাঁদছিল, না কান্নার ছলে গাইছিল এই শূন্য বনে একা?
এই শূন্য বনে একটু আগে কত না প্রজাপতি রঙিন পাখনা ছড়িয়ে নেচে বেড়িয়েছে। কত না মৌমাছি ফুলের কানে গুন-গুনিয়ে গান শুনিয়েছে। গাছের ডালে বহুরূপী কত রূপের বাহার দেখিয়ে ছুটে বেড়িয়েছে। হয়তো ছাপ-ছাপ চিতাবাঘ ঝোপে-ঝাড়ে লুকিয়ে বসে শিকার খুঁজেছে। কিংবা লয়া-লয়া সাপ লতায়-পাতায় জড়িয়ে-মড়িয়ে অঘোরে নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়েছে। কিন্তু এখন? সব শূন্য। এখন এই শূন্য বনে টোরার এ-কান্না কে শুনবে, শুধু ওই শূন্য আকাশ ছাড়া?
হঠাৎ বুকটা ছ্যাঁত করে চমকে উঠল টোরার। কেন? কাকে দেখলে টোরা? কে যায় তার চোখের সামনে দিয়ে? এ কী/ এ যে বাদশা/
বাদশা? হ্যাঁ, সত্যিই তো/ কিন্তু ওর এমন দশা কেন? কী হয়েছে তার? কেন গাধার মতো গাড়ি টানছে? কার গাড়ি টানছে? ও কে বসে আছে গাড়ির ওপর/
গাড়িটার দুটো চাকা। মাথা ঢাকা। ঠিক যেন এক্কাগাড়ি। গাড়ির সওয়ার একটা বুড়ি/ দ্যাখো, কেমন ঠ্যাং ছড়িয়ে আরাম করে বসে আছে বুড়িটা/ লজ্জা নেই তো/ একটা ছোট্ট ছেলে গাধার মতো গাড়ি টানছে আর বুড়ি কিনা তার পিঠে চাবুক মেরে হ্যাট-হ্যাট করছে/ এ কী রে/ বাদশাকে কি সত্যিই গাধা পেয়েছে/ ওইটুকু ছেলে বাদশা পারবে কেন ওই একটা ইয়া পেল্লাই গাড়ি টানতে/ পারছে না বলেই হোঁচট খাচ্ছে। হোঁচট খেলেই, বুড়িটা চাবুক হাঁকড়াচ্ছে/ আর বাদশা 'বাবা গো' বলে কেঁদে উঠছে/

হোঁচট খেলেই,বুড়িটা চাবুক হাঁকড়াচ্ছে/
যে টোরা এতক্ষণ কাঁদছিল, বাদশাকে দেখে তার চোখের জল চোখেই শুকিয়ে গেল। কী করবে এখন টোরা? কাকে ডাকবে? বাদশা তার এত কাছে থেকেও কত দূরে/ এ দুর্দশা থেকে সে কেমন করে বাঁচাবে বাদশাকে? কী দোষ করেছে বাদশা যে একটা বুড়ি নিষ্ঠুরের মতো তার কাঁধে গাড়ি জুতে আরাম করে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর হাওয়া খাচ্ছে/ এ কেমন করে হয়? জন্তু-মার্কা মানুষগুলোর হাত থেকে তবে কি এখন বাদশা এই বুড়িটার হাতে পড়েছে।
থাকতে পারল না টোরা। এখন তো আর বাদশার সামনে যেতে টোরার ভয় নেই। টোরা জানে এখন আর বাদশা তার মুখখানা দেখতে পাচ্ছে না, যে দেখলেই জন্তু হয়ে যাবে/
'আ—/' আর্তনাদ করে উঠল বাদশা। ওর পিঠে বুড়িটা আবার চাবুক মেরেছে। কেননা, ও যে পারছে না। পারছে না গাড়ি টানতে/
টোরা দাঁড়াল না। প্রদীপটা হাতে নিয়েই ছুটে গেল। ছুটে গেল গাড়িটার পেছনে। আহা/ ভাইয়ের কষ্ট সে যে আর দেখতে পারছে না। টোরা পেছন থেকেই তার অদৃশ্য হাত দিয়ে ঠেলা দিল গাড়িটায়। গাড়ির গায়ে টোরার হাতের ধাক্কা লাগতেই গাড়ি হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে গেল। বাদশার ছুটতে আর কষ্ট নেই। বাদশা ছুটল আর বুড়িটা দাঁত ছরকুট্টে হেসে উঠল।
বাদশা নিজেই অবাক হয়ে গেল/ বেড়ে মজা তো/ এতক্ষণ যে-গাড়িটা টানতে তার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল, সেই গাড়ি হঠাৎ এত হালকা হয়ে গেল কী করে? কেউ ঠেলছে নাকি পেছন থেকে? কই, না/ সামনে-পিছে ডাইনে-বাঁয়ে, কই, কেউ নেই তো/
আরও জোরে ঠেলল টোরা। আরও জোরে ছুটল বাদশা। ওর পিঠে চাবুক মেরে বুড়িটা আর হ্যাট-হ্যাট করে তেড়ে উঠল না। উলটে সেই দাঁত-খিঁচুনি বুড়ি, নাক-খিঁচুনি দিয়ে গাড়ির ওপর সটান দাঁড়িয়ে উঠে নৃত্য শুরু করে দিল/ ব্যস/ এবার উলটো বিপত্তি/ বাদশা পারবে কেন টাল সামলাতে? বাদশা তো বাদশা/ অমন একশোটা বাদশা এলেও কি অমন বিচ্ছিরি বুড়িকে সামাল দিতে পারে? বাদশার হাত ফসকে গাড়ি দুমফট/ আর বুড়িও পা হড়কে চিত-ফট/ বুদ্ধি দ্যাখো বুড়ির/ ওই একটা দুধের ছেলের ঘাড়ে গাড়ি জুতে তুই গাড়ির ওপর নাচানাচি করছিস কোন আক্কেলে/ তোর দয়া-মায়া নেই, না বুদ্ধির মাথা খেয়ে বসে আছিস? ছিঃ, ছিঃ/
তুমি তো বলছ, ছিঃ, ছিঃ/ এদিকে ডিগবাজি খেয়ে বুড়ির যে কোমর গেল/ বুড়ির এমন লাগা লেগেছে না/ মাটিতে চিৎপাত তো হলই তার সঙ্গে চিৎকার শুরু করে দিলে বুড়ি, 'উরি বাবা রে/'
বাদশা একদম থ হয়ে দাঁডিয়ে পড়ল। কী যে করবে, কিছু ঠাওরই করতে পারল না। কিন্তু বুড়ি, সে তো আর ছেড়ে দেবার পাত্তর নয়/ মাটি খামচে লেংচে-লেংচে উঠে দাঁড়ালে। রক্তচক্ষু ড্যাবডেবিয়ে, খপাত করে বাদশার কানটা ধরে ফেলল। তারপর এমন টান দিলে, এই দ্যাখো, বাদশার কান বুঝি ছিঁড়ে যায়/ সঙ্গে সঙ্গে চিল্লিয়ে উঠেছে, 'পাজি, হতচ্ছাড়া/ তোর এত বড়ো বুকের পাটা/ তুই আমায় ফেলে দিয়ে মারতে চাস/ তোর আমি মুণ্ডুপাত করব।' বলেই এমন প্যাঁ—অ্যাঁ করে কেঁদে উঠল যে, দেখেশুনে বাদশা ভ্যাবাচাকা। যাচ্চলে/ এত বড়ো বুড়িটা নাকি সুরে কেমন কাঁদছে দ্যাখো/ কাঁদবে না? কোমরে কি কম লাগাটা লেগেছে/ কেঁদে একেবারে পাড়া মাথায় করে চেঁচাতে লাগল, 'ওগো, তোমরা কে কোথায় আছ গো, এই শয়তান ছেলেটা আমার কোমর ভেঙে দিল গো/'
অবিশ্যি এখানে আর আসবে কে? কেউ তো আর কাছেপিঠে নেই/ যতই চেঁচাও, ফক্কা/ শেষে বুড়িটা রেগে-মেগে বেমক্কা এক চড় কষিয়ে দিলে বাদশার গালে। তারপর কানটা ধরে হিড়হিড় করে টানতে শুরু করে দিলে/
থাকতে পারল না টোরা। বুড়িটার তো আস্পর্ধা কম নয়। তার ভায়ের গায়ে হাত তোলা/ ছুটে গেল টোরা একেবারে বুড়ির পেছনে। পেছন থেকে বুড়ির নুটি বাঁধা ঝুঁটিটা হ্যাঁচকা মেরে নুড়োনুড়ি করে দিলে। বুড়ি হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠে, পেছন ফিরে দেখে ভোঁ-ভাঁ/ কেউ তো নেই/ বুড়ি একেবারে হাঁ/ কে তার ঝুঁটি ধরে নেড়ে দিল/
টোরা তো নেড়ে দিয়েই লুকিয়ে পড়েছে/ সামনে থাকলেই বা কী/ ওকে তো আর দেখতে পেত না। কিন্তু মুশকিল ওই যে, হাতে তার প্রদীপ/ সেটা তো দেখে ফেলতে পারে/
বুড়ি পেছনে কাউকে দেখতে না পেয়ে ভয় পেল, না রেগে গেল, তা জানি না। উলটে বাদশার দিকেই তেড়ে গিয়ে বাদশাকেই গালপাড়া শুরু করে দিলে/ বাদশা বেচারি কী যে হল, কিছুই বুঝতে না পেরে হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বুড়ির গাল খেতে লাগল।
টোরা চুপি-চুপি আবার এসেছে বুড়ির পেছনে। এবার বুড়ির কোমরে দিয়েছে এক রামচিমটি/ বুড়ি চিমটি খেয়ে, হাত-পা ছুঁড়ে গলা ফাটাল, 'বাবা গো, মা গো/' বুড়ি যতই চিল্লাচ্ছে, টোরা ততই খামছে ধরছে/
টোরার এই রামচিমটি বুড়ি কতক্ষণ সহ্য করবে? শেষমেশ ঠ্যাং ছুঁড়ে লাফালাফি শুরু করে দিলে/ থাক পড়ে তোর ঠেলাগাড়ি/ বাদশাকে ঝপাং করে জাপটে ধরে মার ছুট/ বাবা রে বাবা/ এই ল্যাকপ্যাকে-মার্কা বুড়িটার কী শক্তি দেখো। ভেবেছিলাম, বুঝি ফুঁ দিলে ফুস হয়ে যাবে/ ও হরি/ এখন দেখছি সে-গুড়ে বালি/ বাদশাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে দৌড়ুচ্ছে দ্যাখো, যেন শ্যাওড়াগাছের ডাইনি।
বুড়িটা ছুটতে ছুটতে একটা আঁধার-আঁধার জায়গায় এসে দাঁড়াল। হাঁপাচ্ছে। পেছন ফিরে দেখলে/ না, জন-মনুষ্যি নেই/ আঁধার জায়গায় মস্ত ঝোপের আড়ালে একটা ঘুপচি-মতো ঘর। বুড়ি চুপি-চুপি ঘরের চাবি খুলে, বাদশার ঘাড়টা ধরে ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দিলে। তারপর আর একবার ভালো করে বাইরের আঁদাড়-পাঁদাড়টা লক্ষ করে নিজেও ঘরে ঢুকে গেল। ভেতর থকে ঘরের হুড়কো এঁটে দিলে/ এদিকে টোরাও হাজির/ সে-ও যে তার পেছনে-পেছনে ছুটে এসেছে, বুড়ি সে-কথা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি/
টোরা ছুটে এল ঠিকই, কিন্তু ঘরে আর ঢুকতে পারল না/ ও ছুটে আসার আগেই দোর বন্ধ/ অবিশ্যি হুট করে ঘরে ঢোকাও তো যাবে না। ওর হাতে প্রদীপ/ প্রদীপ নিয়েই তো যত মুশকিল/ বুড়িটা একবার যদি দেখে ফেলে তা ব্যাস/ তখন কি-আর ছেড়ে কথা বলবে?
হাঁ বুড়ি সত্যিই ছেড়ে কথা বলেনি। বলেনি বাদশাকে। ঘরের মধ্যে তখন তুলকালাম শুরু হয়ে গেছে। কী চিৎকার আর দাঁতখিঁচুনি/ বাদশাকে ধরে এমন মার দিলে যে, বাদশা ককিয়ে উঠল/ বাইরে থেকে টোরার তো আর শুনতে কিছু বাকি থাকছে না। ছটফটিয়ে উঠল টোরার মন। এখন সে কী করবে? কেমন করে তার ভাইকে সে রক্ষা করবে?
ছুটে গেল টোরা দরজাটার কাছে। কান পাতলে/ তারপর ওর ছোট্ট হাতে যত শক্তি ছিল সব শক্তি দিয়ে দরজায় ঠেলা দিলে। দরজা কেঁপে উঠল, খট-খট-খট।
নিশ্চয়ই শুনতে পেয়েছিল বুড়িটা। নইলে চেঁচাতে-চেঁচাতে হঠাৎ অমন থামবে কেন? একদম চুপচাপ/ বুড়ির গলায় আর টুঁ শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছে না টোরা/ কীরে বাবা/ বুড়ি ভড়কে গেল নাকি/
আবার দরজায় ঠেলা দিলে টোরা।
বুড়ি গলায় খেঁকরি মেরে ক্যারকেরিয়ে সাড়া দিলে, 'দরজায় ঠেলা মারে কে র্যা?'
টোরা সাড়া না দিয়ে আবার ঠেলা দিলে।
বুড়ি দরজার হুড়কো খুললে।
শুনতে পেয়েছিল টোরা হুড়কো খোলার শব্দটা। তাই আবার চটপট লুকিয়ে পড়েছে/
দরজা খুলে, একটুখানি ফাঁক করে উঁকি মারলে বুড়ি। বাইরে তো কেউ নেই। কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না। দরজা আর-একটু ফাঁক করে গলা বাড়াল/ কই, জন-মানুষের তো চিহ্ন নেই/ তাহলে বোধ হয় বাতাসে ঠেলা মেরেছে। তবু নিশ্চিন্ত হবার জন্যে বাইরে পা বাড়িয়ে রা কাড়লে, 'দরজা ঠেললি কে? কাকে চাই?'
এখনও কোনো সাড়া নেই/
বুড়ি এবার দরজা ডিঙিয়ে একেবারে বাইরে বেরিয়ে এসেছে/ দ্যাখো, দ্যাখো, বুড়ির চোখ দুটো দ্যাখো/ কী সাংঘাতিক দেখতে/ দেখলেই মনে হয়, কুচুটেপনায় ভরতি একেবারে/ আড়চোখে টেরিয়ে-টেরিয়ে ইদিক-ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ, বলব কী, টোরার হাতের সোনার প্রদীপটার দিকে তার নজর পড়ে গেছে/ এই রে/ এ কী করল টোরা। আবার অসাবধানীর মতো কাজ করে বসল/
বুড়ি প্রথমটা বুঝতেই পারেনি/ বুঝতে পারেনি ওটা কী/ তারপর কাছে আসতেই সোনা যখন ঝকমক করে চোখের সামনে ঠিকরে উঠল, তখন কি আর বুড়িকে বলে দিতে হবে এটা কী/ বুড়ির তো চক্ষু চড়কগাছ/ আরি ব্যাস? এ যে একটা সোনার প্রদীপ, হাওয়ায় ভাসছে/ এ-কেমনতর আজবকাণ্ড/ বুড়ি তখন করল কী, হাত বাড়াল/ এই সেরেছে/ ধরে ফেলল নাকী/
হুঃ/ অতই সোজা/
টোরার অবিশ্যি প্রথমটা বাদশার কান্না শুনে ভারি মন খারাপ লাগছিল/ কিন্তু বুড়ি প্রদীপটা ধরবার জন্যে হাত বাড়াতেই আর দেখতে হয়। টোরা চটপট হাতটা সরিয়ে নিলে/ বুড়ির হাতে ফোক্কা/
বুড়ি তো থ/ ভাবলে, এ কীরে, এপিকিস উড়াতে উড়তে ভাগে দেখি/
এবার বুড়ি গুটি-গুটি পা ফেলে এগিয়ে গেল। একেবারে প্রদীপটার সামনে। তারপর আঙুল দুটো শক্ত করলে। যেমন করে ফড়িং ধরে, তেমনি নিঃসাড়ে আঙুল পাকিয়ে যেই ধরতে গেছে, অমনি ফুড়ুত/
আর থাকতে পারল না। এবার বুড়ির চোখ দুটো লোভে জ্বলজ্বল করে উঠল। চোখের তারায় সোনার ছায়া/ বুড়ি এখন মরিয়া/ কাপড়ের আঁচলটা কোমরে বেশ করে জড়ালে। মাথার চুলে নুটি বেঁধে শক্ত করে প্যাঁচ কষল। তারপর ধাঁই ধপাধপ শুরু করে দিলে।
প্রদীপ এদিক যায়।
বুড়িও এদিক ছোটে।
প্রদীপ ওপরে ওঠে।
বুড়িও লেংচি মেরে হাত তোলে।
প্রদীপ মাটিতে গড়ায়।
বুড়িও গড়াগড়ি খায়।
শেষে ঘেমে-নেয়ে, কেশে-হেঁচে বুড়ি একশা/ বুড়ির বুকের ধুকধুকি এই বুঝি ঠান্ডা মেরে যায়/
না, তা হল না। উলটে, টোরার হাত থেকেই যে প্রদীপটা ফসকে গেল/ ফসকে যেতেই মাটিতে পড়েছে। আর দেখতে/ বুড়ি একেবারে প্রদীপটার ওপর হুমড়ি খেয়ে কাঁপিয়ে পড়ল। মারলে ছোঁ/ ব্যাস/ ওই দ্যাখো, প্রদীপ সটান বুড়ির হাতের মুঠোর মধ্যে।
ইস/ এ কী হল/ প্রদীপটাও টোরার হাত ফসকে গেল/ সত্যিই/ এখন তুমিও না-বলে পারবে কি, মেয়েটা অসাবধানী, মেয়েটা বোকা?
না, মোটেই না/ এখন টোরাকে যে বলবে বোকা, আমি বলব সে-ই বোকা/ আমি যদি বলি, প্রদীপটা টোরা ইচ্ছে করে বুড়িকে দিয়েছে, তাহলে নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবে না/
ইচ্ছে করেই তো/ এই দ্যাখো না এবার মজাটা/ প্রদীপটা যেই না হাতে পাওয়া, অমনি সেই সুঁটকি বুড়ির তখন সে কী ধেইধেই নাচুনি/ নাচুক বুড়ি। যত পারে নাচুক। সেই তক্কে টোরা যে তার ঘরে ঢুকে পড়েছে/ সাধ করে কি-আর প্রদীপটা হাতছাড়া করেছে টোরা/
নাচ শেষ করে হাঁপাতে-হাঁপাতে বুড়ি যখন ঘরে ঢুকল, তখন টোরা বাদশার সামনে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। টোরাকে যেমন বুড়িও দেখতে পাচ্ছে না, তেমনই বাদশাও দেখতে পাচ্ছে না, দিদি তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে।
বুড়ি ঘরে ঢুকেই আঁচলে বাঁধা চাবি দিয়ে কাঠের সিন্দুক খুলে প্রদীপটা ঝটপট লুকিয়ে ফেললে। আর মনে-মনে ভাবলে, অ্যাদ্দিনে বোধ হয় কপাল খুলল/
বাদশা আর কাঁদছে না। বুড়িকে দেখে ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাদশা। বুড়ি একবাটি তেল আনলে। তারপর বাদশার কাছে এসে ওর গালে ঠাস করে চড় মারল মেরে বলল, 'দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে ন্যাকামি হচ্ছে/ এই নে, এই তেল দিয়ে আমার কোমর মালিশ কর/ হতচ্ছাড়া ছেলে আমায় এমন ফেলে দিয়েছে যে, কোমরের যন্ত্রণায় আমি মরতে বসেছি/' বলে আবার বাদশার গালে একটা ঠোনা মেরে মাদুরের ওপর শুয়ে পড়ল। বাদশা তেল দিয়ে বুড়ির কোমর মালিশ করতে বসল। এ-কম্ম কি বাদশা পারে? না, করেছে কোনোদিন? সে-কথা বললে কে শুনছে? না পারলেও উপায় নেই। করতেই হবে/
বাদশা পারছে না। ওর তো আর গায়ে তেমন শক্তি নেই যে খুব জোরে দলাই-মলাই করবে/ বাদশা যতই পারছে না, বুড়ি ততই খ্যান-খ্যান করে খেঁকিয়ে উঠছে।
টোরা এতক্ষণ চুপচাপ দেখছিল। তারপর চুপিসারে বুড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াল/ হয়তো কিছু ভাবল। ওর মাথায় তখন কী বুদ্ধি খেলছে, ও ছাড়া আর কেউ জানে না। আর তাই বুড়ি যখন আবার বাদশাকে খ্যাঁক-খ্যাঁক করে উঠল, টোরা করল কী, দু-হাত দিয়ে বুড়ির কোমরটা তেড়েমেড়ে টিপতে লাগল। বাদশা জানতেও পারল না, পাশে তার দিদি। তার সঙ্গে দিদিও বুজির কোমরে তেল মালিশ করছে।
কী খুশি বুড়িটা/ আরামে বুঁদ হয়ে বললে, 'এই তো ভাল ছেলের কাজ/ লক্ষ্য করে আমার সেবা-যত্ন কর, খেতে দেব, পরতে দেব। তবে হ্যাঁ, বেয়াড়াপনা করলেই কিন্তু মুণ্ডুপাত করব।'
টোরা শুনছে বুড়ি কথা।
বুড়ি আবার নিজের মনেই বিড়বিড় করতে শুরু করলে, 'এমন উদ্ভুট্টি কাণ্ড কখনো দেখিনি/ আমার তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, কিন্তু পিলসুজের পিদিম যে এমন ভড়কি মেরে আকাশে ওড়ে, এই পেত্থম দেখলুম/ উঃ/ একটা আস্ত সোনার পিদিম/ এখন আমি কী করব, বেচব না রাখব? না, বেচব না, রাখব/ পয়মন্ত প্রদীপ যখন ধরা দিয়েছে, তখন কে জানে, ভাগ্যে আমার আরও কী আছে/'
বুড়ি এবার আয়েশ তরতাজা হয়ে বললে, 'বাঃ, ছেলেটা তো বেশ দলাই-মলাই করতে পারে/'
টোরা মনে-মনে 'বললে দাঁড়াও, তোমার আয়েশ করাচ্ছি/' বলেই টোরা হঠাৎ বুড়ির কোমরে এমন কাতুকুতু দিয়ে দিলে যে, বুড়ি একেবারে হাসতে-হাসতে যায় আর কী/ বুড়ি খিলখিলিয়ে হেসতে হাসতে চিৎকার করে উঠল, 'এই ছাড়, ছাড়।'
টোরা ছেড়ে দিল। বুড়ির হাসি থামল। দেখেশুনে বাদশা তো একদম হাঁদা/ বাদশা ভাবল, তাই তো, হলটা কী/ বুড়ি এমন পাগলের মতো হাসে কেন?
কাতুকুতুর রেশ জুড়াতে তো আর সময় লাগল না/ এবার দ্যাখো, বুড়ির মুখের ছিরি/ রেগে কাঁই/ রাগটা দপ করে জ্বলে উঠতেই বুড়ি খপ করে বাদশার চুলের মুঠি ধরল। তেড়েমেড়ে বলে উঠল, 'একরত্তি ছেলে গালা টিপলে দুধ বেরোয়, আমার সঙ্গে ফুককুড়ি/ আমায় তুই কাতুকুতু দিস/ আমি তোর ঠাট্টার যুগ্যি/' বলে চুলের মুঠি ধরে এমন নাড়ানাড়ি করে দিলে যে, বাদশার প্রাণ বুঝি গেল-গেল/ তারপর বুড়ি বাদশার চুল ছেড়ে খেঁকিয়ে উঠে বললে, 'কুয়ো থেকে জল তোল, আমি চান করব।'
বাদশা এতক্ষণে কথা বললে, 'পাতকুয়োর জল অনেক নীচে।'
'নীচে থাকবে না তো কি তোমার মাথার ওপর থাকবে?' বুড়ি তেমনি তিরিক্ষি হয়েই বললে।
'অত নিচু থেকে জল তুলতে আমি পারব না।'
আর দেখতে/ বুড়ি গলার সুর পঞ্চমে তুলে চেঁচিয়ে উঠল, 'আমার মুখের ওপর চাটাং-চাটাং কথা/ হাড়বজ্জাত ছেলে/ পারব না/ তোল জল/'
বাদশা তখন কী করে, অগত্যা কুয়োর কাছে এসে, দড়ি বাঁধা বালতিটা সড়াত করে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিলে। বালতি জলের মধ্যে গোঁত্তা খেয়ে ভরতি হয়ে গেল। ভরতি তো হল, কিন্তু আর টেনে তুলতে পারে না বাদশা/
কিন্তু বাদশা তো জানে না, তার দিদি তার পাশেই দাঁড়িয়ে/ বাদশা বালতি-বাঁধা দড়িটা টানতে-টানতে যখন হিমশিম, তখন হঠাৎ বাদশার মনে হল, দড়ি টানতে এখন তো বেশ হালকা লাগছে/ বালতি যেন আপনা থেকে উঠে আসছে। কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো তার/ অবাক হয়ে গেল বাদশা/
অবাক হবার তো কিছু নেই/ বাদশার দিদিও যে টেনে তুলছে বাদশার সঙ্গে দড়িতে হাত দিয়ে, এ তো আর সে জানতে পারছে না। বাদশা কেমন জল তুলে, বালতি নিয়ে সটান বুড়ির সামনে এসে দাঁড়াল/ বুড়ি ততক্ষণে কুয়োতলায় হাজির। মাথায় তেল চাপড়াতে-চাপড়াতে বললে, 'ঢাল।'
হুশ/ বাদশা বুড়ির মাথায় জল ঢেলে দিল।
বার-বার তিনবার। তিন বালতি জল ঢেলে, যখন চার বালতি ঢালবে, তখন টোরার মাথায় একটা দুষ্টু মতলব জুড়ে বসল। টোরা করল কী, কুয়োর জলে বালতিটা ডুবিয়ে, একেবারে যখন খুব গভীরে নেমে গেল বালতিটা, তখন টেনে তুলল। কুয়োর খুব গভীরে তো পেঁকো-জল/ সেই পেঁকো-জলের জলটুকু ফেলে, পাঁক ভরতি বালতিটা ওপরে তুলে আনল। অবিশ্যি কষ্ট হল খুব/ টেনে তুলেই হুশ/ একেবারে বুড়ির মাথায়/ ঈশ/ এ যে সেই দোলখেলার ছ্যাররা-র্যাররা/ বুড়ির মাথায় পাঁক, মুখে পাঁক/ বুড়ির সববশরীরে পাঁকে পাঁকে পাঁকাক্কার/ ম্যাগো মা/ কী যাচ্ছেতাই গন্ধ/
বুড়ি তো গন্ধের চোটে নাকে আঙুল টিপে এই বমি করে তো সেই বমি করে। বুড়ি ওয়াক থু ওয়াক থু করতে-করতে পাড়া মাত করে চেঁচিয়ে উঠল, 'হতচ্ছাড়া ছেলে/ আমার গায়ে তুই পাঁক ঢাললি/ আয়, তোকে কুয়োয় পুঁতি।' বলে বুড়ি যেই বাদশাকে ধরতে যাবে, অমনি টোরা করেছে কী, পেছন থেকে বুড়ির ঠ্যাং ধরে দিয়েছে টেনে/ বুড়ি সড়াত/ একেই তো পাতকো-তলায় শ্যওলা। তার ওপর কুয়োর পাঁক/ আর দেখতে/ বুড়ি ডিগবাজি খেয়ে সেই জলে-পাঁকে জ্যান্ত সাপের মতো কিলবিল করে হাত পা ছোড়াছুড়ি লাগিয়ে দিলে/ ভয়ে বাদশা কেঁদে উঠল, 'আমি করিনি।'
কিন্তু কে শুনছে সে-কথা/ বলি, বুড়িটা কি চোখের মাথা খেয়ে বসে আছে/ দেখতে পাচ্ছে না বাদশা তার সামনে দাঁড়িয়ে/
সে আর কে দেখে/ বুড়ি কোঁকাতে-কোঁকাতে কোনো রকমে উঠে দাঁড়িয়ে বাদশার ঘাড়ে-পিঠে দে দমাদ্দম। বাদশা কেঁদে উঠল। বুড়ি খ্যানখ্যানে গলায় তেড়ে উঠল, পাজি ছেলে, শয়তানি করার জায়গা পাসনি/ আয় তোকে যমের ঘরে দিয়ে আসি।' বলে বাদশার কানটা ধরে হিড়হিড় করে টানতে লাগল। টানতে-টানতে একটা অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘরে ঠেলেমেলে ঢুকিয়ে দিয়ে, ঘরের দোরে শেকল তুলে দিল। বললে, 'থাক এইখানে। পড়ে-পড়ে যত পারিস কাঁদ। যমে এসে নিয়ে গেলে তবে ঘরের দোর খুলব।' বলে বুড়ি গজগজানি আর গাল-পাড়ানির সে কী ছি-চি কাণ্ড/
অন্ধকার ঘরে, এক কোণে বাদশা লুটিয়ে পড়ে কাঁদছে আর ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে গজরাচ্ছে, 'অ্যাঁ-অ্যাঁ। আমায় শুধু-মুধু মারতে এসেছে। নিজে পা পিছলে পড়ে গেল, আবার কথা বলছে/ গায়ের জোর দেখাবার জায়গা পায়নি। দিদি যদি থাকত, তোমার জোর দেখান ঘুচিয়ে দিত।'
তা সে-কথা তো আর বুড়ি শুনতে পাচ্ছে না। রেগে ফোঁস-ফোঁসিয়ে বুড়ি তড়িঘড়ি ক-বালতি জল ঢেলে, গায়ে ল্যাপটানো পাঁক ধুয়ে ফেললে। তারপর চিঁড়ে-মুড়কির ফলার চটকে গপগপ করে গিলতে বসল। গেলা-টেলা হলে, আবার দেরাজের চাবি খুললে। চুপি-চুপি প্রদীপটা বার করে, পাঁশুটে চোখ ড্যাবডেবিয়ে দেখতে লাগল। কী লোভ দ্যাখো বুড়ির চোখ দুটোতে/ দেখতে-দেখতে নিজের মনেই বলল, 'বলি তোর তো ডানা নেই, ঠ্যাং নেই। তা কেমন করে ফুরফুরিয়ে উড়ছিলি বাছা? দেখিস আবার যেন উড়ে পালাস না/ বলে প্রদীপটাকে আদর করার সে কী বহর ছিরি/ আদর করে নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে চুমু খেলে, 'সোনা আমার, মানিক আমার।' আহা/ দ্যাখো কেমন রোশনাই ঝকঝকাচ্ছে প্রদীপের গা বেয়ে/ মুছে-টুছে, আবার দেরাজের মধ্যে যত্ন করে রেখে দিয়ে দেরাজের চাবি এঁটে রাখলে। তারপর নিজের কাপড়ের খুঁটে সেই চাবির তাড়া বেশ করে বেঁধে, চ্যাটাই বিছিয়ে, একটা তেল চিটচিটে বালিস মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়ল। আঃ/ তখন পাতকো-তলায় পড়ে গিয়ে কোমরে যা লেগেছে না/ ব্যথাটা এখনও টনটনাচ্ছে। বুড়ো হাড় তো/ বুড়ি টনটনে ব্যথা নিয়ে একবার এপাশ একবার ও-পাশ করতে করতে ভাবতে লাগল সোনার প্রদীপটার কথা। তাই তো, এখন সে সোনার প্রদীপটা নিয়ে কী করবে/ বাজারে বেচে আসবে, না প্রদীপ ভেঙে একটা বিছে হার গড়াবে/ হুঃ. খেপেছ/ এ প্রদীপ কখনো ভাঙে, না বেচে/ এ বাবা কপালের ধন। কপাল না ফিরলে এমন ধারা ঘটনা ঘটে কখনো/ এ সব ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছে। তারপরই বুড়ি চোখ দুটো কপালে তুলে বললে, 'আহা ঠাকুর, তুমি বাঁচালেই আমি বাঁচি।' বলে, কেঠো-কেঠো হাত দুটো ঠকাস করে কপালে ঠেকিয়ে ঠাকুরকে নমস্কার করল।
হঠাৎ বুড়ির মনে হল, আচ্ছা আমি প্রদীপটা নিয়ে তো পাঁচজনকে ভেলকি দেখাতে পারি। আরে বাবা, এ কী শুধু প্রদীপ/ এ যেন সেই ডানাকাটা উড়ুক্কু পাখি। হাওয়ায় ছেড়ে দাও, ফুরফুর করে উড়তে শুরু করে দেবে। ওঃ/ সে যা হয় না/ যে দেখবে তারই চক্ষু চড়কগাছ/ ধরো, হাটের লোক দেখল। তারপর মনে করো না মাঠের লোক দেখল। শহরগঞ্জের লোক দেখল। তারপর মনে করো, আমার খুব নাম-ডাক হল। পয়সা-কড়ি হল। ধরো, এই ভাঙা বাড়িটা মস্ত বাড়ি হয়ে গেল। অনেক ঝি-চাকর হল। হাতি-ঘোড়া হল। আরিববাস/ তখন আমায় দেখে কে/ মখমলের গদির ওপর ঠ্যাং ছড়িয়ে গড়াগড়ি খাব আর হাই তুলব। তখন যদি রাজার ব্যাটা এসেও আমার পায়ে ধরে সাধাসাধি করে, বলে, 'ঠাকমা, ঠাকমা, প্রদীপটা একবার দেখাও' ভেবেছ আমি গলে যাব? উঁহু/ সেটি হচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, রাজা যদি নিজে এসে কান্নাকাটি করে, তখন না হয় দেখা যাবে/ কিন্তু তখন কি আমি ছেড়ে কথা বলব/ কেন ছাড়তে যাব/ বলো, আমার ক্ষেমতা রাজার চেয়ে কম কীসে? রাজা, রাজবাড়িতে রাজা/ আর আমি? আমার আছে সোনার পিদিম। ডানা নেই, ঠ্যাং নেই, অথচ হাওয়ায় উড়ছে/ এমন ধন রাজার আছে/ আর দেখতে চাইলেই কি আমি রাজাকে দেখাচ্ছি/ আগে রফা হোক। রাজা যদি বলে অর্ধেক রাজত্ব দেব? ফুস, ওতে, টলব আমি? তারপর যদি বলে, অর্ধেক রাজকোশ দেব? নিতে বয়ে গেছে আমার/ একটুও নড়ছি না। যদি বলে, হাতি দেব, ঘোড়া দেব, ময়ূরপঙ্খি নাও দেব? আমি সঙ্গে-সঙ্গে হেসে উঠব। তখন যদি রাজা রেগেমেগে চেঁচিয়ে-মেচিয়ে বলে ওঠে, তবে তোমার কী চাই? তখন আমি বলতে ছাড়ব, আমার গোটা রাজত্ব চাই। তারপর রাজত্বটা আমার হাতে তুলে দিলে, আমি ফিকফিক করে হাসব আর বলব, সবই ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছে/ তখন কি আর কোমরের এই ব্যথা মালিশ করার জন্যে লোক খুঁজতে হবে? তখন তো খোদ রাজবাড়ির রানিই আমার খাসমহলের দাসী। দাসী যখন পায়ের কাছে নত হয়ে বলবে, মাসি, মাসি, তোমার জন্যে দাওয়াই এনেছি কাসির। তখন আমি গম্ভীর গলায় বলব, কোথাকার দাসী রে তুই? কে বললে আমার কাসি/ তখন দাসী নিশ্চয়ই ঠকঠক করে কাঁপবে ভয়ে। কাঁপতে কাঁপতে তখন দাসী আবার জিজ্ঞেসা করবে, মাতা, মাতা, তোমার ধরেছে বোধ হয় মাথা? তখন আমি ধমকে উঠে বলব, তুই একটা যা-তা। দেখতে পাচ্ছিস না, আমার কোমরে ব্যথা? মালিশ কর। তখন আমি মখমল বিছানো সোনার পালঙ্কে মটকা মেরে পড়ে থাকব, আর দাসী আমার সেবা করবে/ ওঃ/ সে কী আরাম/ বলে যেই না বুড়ি আনন্দে হাত-পা ছুঁড়ে তড়াং করে উঠে বসতে গেছে, ব্যস/ বুড়ির কোমরে লেগেছে হ্যাঁচকা/ উঁহু-হু-হু/ বুড়ি যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠল। তারপর চাটাইয়ের ওপর কাতরাতে-কাতরাতে আবার বাদশাকে গাল পাড়তে লাগল।
কিন্তু বাদশা? ভাগ্য মন্দ না হলে ও কখনো এই বুড়ির পাল্লায় পড়ে/ সেই ঢলঢলে প্যান্ট -পরা জন্তুমুখো মানুষগুলোর খপ্পর থেকে বাঁচতে গিয়েই তো আজ এই বিপদ। দোষের মধ্যে কী, না জন্তুগুলোর তাড়া খেয়ে বাদশা ভয়েময়ে বুড়ির ঘরে ঢুকে লুকিয়ে পড়েছিল। তাই বলে বুড়িটা তাকে একেবারে চোর ঠাওরাবে/ অবিশ্যি এ-কথা সত্যি, বাদশা বুড়িকে জিজ্ঞেস করে তার ঘরে ঢোকেনি। ঠিক আছে, মানলুম বাদশার দোষ। কিন্তু তাকে চোর ঠাওরাবার আগে, জিজ্ঞেস তো করবি, কী হয়েছে তার। ভালো রে ভালো, সে সব জিজ্ঞেস করা নেই, উলটে কোন আক্কেলে বুড়ি বাদশার ঘাড়ে জোয়াল চড়িয়ে গাড়ি টানায়/ তা বলি, লাজ-লজ্জা বলে তো একটা কথা আছে। না কি বুদ্ধি-সুদ্ধিও লোপাট হয়ে গেছে বুড়ির মগজ থেকে। একেই বলে মরণদশা/
বলবেই তো/ তিন কুলে তো বুড়ির কেউ নেই। থাকার মধ্যে এই ভাঙা-ফুটো বাড়িটা আর ছ্যারছ্যারে গাড়িটা। তাও বা কী। এতদিন তো গাড়িটা মুখ থুবড়ে পড়েই ছিল। বুড়ির কাঁখে যে-দিন বাতের ব্যথা ধরল, সেদিন থেকেই চিন্তা। সেদিন থেকেই উনি খোয়াব দেখছেন। আর দেখতে-দেখতে ভাবছেন, আহা রে, একটা যদি ঘোড়া থাকত, তবে গাড়িতে জুতি। গাড়ি চেপে হাওয়া খাই, আরাম করি। মাটিতে পা ফেললে কাঁখে লাগে। ঠ্যাংয়ে-ঠ্যাংয়ে ঠোক্কর লেগে ভারি রাজে/ তা ঘোড়া ছেড়ে একটা ভেড়াও কি বুড়ির ঘরের ধারে কাছে আসে/ জন্মাবার সময় মা বোধ হয় মুখে মধু দিতে ভুলে গেছল। নইলে মশায়, অমন মুখ হয়/ কাছে-পিঠে কাউকে দেখেছে কি, ব্যস/ আর রক্ষে নেই। মুখে যেন তুবড়ি ফুটছে। তাও যদি জানতুম বুড়ির ঘর ভরতি টাকাকড়ি, গয়না-গাটি ঝনঝন করছে/ তবেই হয়েছে। সে-কথাটি ভুলে যাও। টাকা থাকলেও কি বুড়িকে দেখে তুমি বুঝতে পারবে/ কেননা, তিনি পরেন ছেঁড়া কাপড়। তিনি খান চিঁড়ে-মুড়কি। আর তিনি শোবেন ছেঁড়া চাটাইয়ে। এক নম্বরের কঞ্জুস। আমায় বলতে হবে কেন, সে তো তোমরা নিজেরাই দেখলে। নিজে গাণ্ডে-পিণ্ডে গিলল, কিন্তু কই, বাদশাকে একটু দিল/ বয়ে গেছে। নিজের নিয়েই বুড়ি মত্ত। নিজের হলেই ইচ্ছে। নিজে খাব, নিজে পরব, নিজে গাড়ি চড়ব। অন্যে মরলে বুড়ির কী/
আর এদিকে বাদশা যে কী করে রক্ষে পেয়েছে সেই জন্তুমুখো মানুষগুলোর হাত থেকে, তা সে নিজেই জানে। ও তো ভেবেই পায় না, অত করে ডাকতেও দিদি কেন একবারও ফিরে তাকাল না। কী বলে দিদি তাকে এই বজ্জাত লোকগুলোর হাতে ফেলে পালাল/ কী কুচ্ছিত তাদের মুখগুলো/ হিংসুটে চোখগুলো যেন লোভে জ্বলছে/
কিন্তু দিদির যে কোনো দোষ নেই, বাদশা যে তার মুখ দেখলে জন্তু হয়ে যাবে, সে তো আর বাদশা জানে না। না পালিয়ে কী করবে দিদি?
ওই জন্তুমুখো মানুষগুলোর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যে বাদশাও কী কম চেষ্টা করেছে/ কেননা, ওরা বাদশার চেয়ে অনেক বড়ো। লম্বা-লম্বা পা ফেলে বাদশাকে ধরা এমন কী শক্ত কাজ/ ভাগ্যিস জায়গাটা ঝোপে-ঝাড়ে ভরতি ছিল। বাদশা ওদের তাড়া খেয়ে এক ফাঁকে ঝুপ করে ওই ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল, তারা দেখতেও পেলে না। তন্নতন্ন করে খুঁজে সেই জন্তুমুখো মানুষগুলো একেবারে হদ্দ হয়ে গেল। তারপর সন্ধে যখন হয়ে গেল, তখন অন্ধকারে শিকার ভো-কাট্টা/ বাঁচবার জন্যে, একেবারে বুড়ির ঘরে ঢুকে পড়েছে। ঢুকে লুকিয়ে পড়েছিল বাদশা। কিন্তু ধরা পড়তে তো আর সময় লাগেনি। বয়েস হলে কী হবে/ সেই অন্ধকার রাত্তিরেও বুড়ির চোখ জ্বলছে। বুড়ি বাদশাকে দেখে ফেলেছে/ তেড়ে উঠল, 'কে রে, ওখানে ঘাপটি মেরে বসে আছে?'
বাদশা প্রথমটা থতমত খেয়ে চমকে উঠেছিল। তারপর বুড়িকে দেখে ওর যেন ধড়ে প্রাণ এল। বলল, 'আমাকে চোরে তাড়া করেছে/'
বুড়ি কোথায় ওই ছোট্ট ছেলেটার কথায় বিশ্বাস করে ওকে আশ্রয় দেবে, তা নয়, উলটে বলে কী, 'তোকে চোরে তাড়া করেছে, না তুই নিজে চোর?' বলে বুড়ি ক্যাঁক করে বাদশার ঘাড়টা খাবলে ধরলে।
বাদশা কাকুতি-মিনতি করে চেঁচিয়ে উঠল, 'আমি চোর না, চোর না, আমি বাদশা/'
বুড়ি উত্তর দিল, 'ঠিক কথা। যারা চোর, তারাই বাদশা। চ, তোকে পুলিশে দেব।'
বাদশা বললে, 'বিশ্বাস করো, আমি চোর নই।'
চোরকে কে বিশ্বাস করে? তাই বুড়ি বাদশার ঘাড়টা ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জিজ্ঞেস করলে, 'বল, কী চুরি করেছিস? দেখি তোর পকেট/'
বাদশা পকেট দেখাল। ট্যাঁক দেখাল। হাত দেখাল। কিচ্ছু পেল না বুড়ি। তাহলে আর চটবে না? তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বুড়ি বলল, 'বল, কোথায় রেখেছিস চোরাই মাল/'
'চুরি করিনি।' উত্তর দিলে বাদশা।
'চ তবে/'
'কোথায়?'
'পুলিশে/'
বাদশা এবার ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। বুড়িকে জড়িয়ে ধরে বললে, 'না, আমায় পুলিশে দিয়ো না। পুলিশ বড়ো মারে।'
বলতেই বুড়িটা খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বললে,
আহা মরি, ডালের বড়ি
শুক্ত দিয়ে খাই,
চোরের ব্যাটা ভয় পেয়েছে
হেসেই মরে যাই/
ছড়া-পড়া বুড়ির ফোকলা দাঁতের দিকে বাদশা হাঁ করে তাকিয়ে রইল ঠায় একদৃষ্টে। হঠাৎ যেন বাদশার মনে হল, বুড়ির চোখের ভেতর একটা কুমতলব কিলবিল করে ঘুরপাক খাচ্ছে।
হ্যাঁ, যা ভেবেছি ঠিক তাই। বুড়ি বাদশার মুখের দিকে চেয়ে বলে উঠল, 'পুলিশে যদি না যেতে চাস, তো আমার সেবা কর। ঘর-কান্নার কাজ করতে পারিস?'
বাদশা জিজ্ঞেস করলে, 'কী কাজ?'
'বাসন মাজতে পারিস?'
বাদশা উত্তর দিলে, 'কোনোদিন মাজিনি।'
'বাটনা বাটতে?'
'কোনোদিন বাটিনি।'
'ফল কুটতে?'
'কোনোদিন কুটিনি।'
'জল তুলতে?'
'কোনোদিন তুলিনি।'
'গাড়ি চালাতে?'
গাড়ির নাম শুনেই বাদশার চনমন করে উঠল। ঠিক কথা/ তখন বুড়ির ঘরের দোর-গোড়ায় একটা এক্কা-গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে বাদশা। ভাবল, সেই এক্কা-গাড়িতে ঘোড়া জুতে ওকে হয়তো হ্যাট-হ্যাট করে চালাতে হবে। আর কিছু না হোক, পুলিশের ঘর করার চেয়ে সে অনেক ভালো। তাই আর দোনোমনো না করে সে ঝট করে বলে বসল, 'হ্যাঁ, পারি।'
বললে তো পারি। কিন্তু বুঝতে তো পারেনি, ঘোড়া না আর কিছু। বুড়ি ঘোড়ার বদলে তার ঘাড়েই গাড়ি জুতে, তাকে দিয়েই গাড়ি ঠেলাবে। কী নিষ্ঠুর বুড়ি দ্যাখো/
রাত এল। এতক্ষণ টোরার যে কী কষ্টে সময় কেটেছে, তা ভগবানই জানে/ এতক্ষণ টোরা বোবার মতো চুপচাপ সব দেখেছে। দেখেছে, বুড়িটা নিষ্ঠুরের মতো মারতে-মারতে তার ভাইকে ঘরের মধ্যে ফেলে দিয়ে শিকল তুলে বন্দি করে রেখেছে/ দেখেছে, বুড়িটা একলসেঁড়ের মতো নিজে গাণ্ডেপিণ্ডে গিলেছে, কিন্তু ভাইকে একফোঁটা জলও দেয়নি। দেখেশুনে কী কষ্ট যে হয়েছে টোরার, তা সে-ই জানে। কিন্তু টোরা আর কী করবে/ ওর আর কতটুকু ক্ষমতা বলো/ ও যেন এই রাতটুকুর জন্যেই সময় গুনছিল। ভেবেছিল, এই রাতের অন্ধকারে ওর আদরের ভাইটির কাছে সে যাবে। সে তার চোখের জল মুছিয়ে দেবে। কিন্তু তার আগে তো প্রদীপটা আবার ফিরে পেতে হবে/ মুশকিল, সেটা যে দেরাজে চাবি এঁটে লুকিয়ে রেখেছে বুড়ি/ তা হলে?
সারাক্ষণ বুড়ি চাবিটা আঁচলেই বেঁধে রেখেছিল। কিন্তু রাত্তিরে শোবার সময় বুড়ি সেই চাবি আঁচল থেকে খুলে বালিশের তলায়, মাথার নীচে লুকিয়ে রাখল। সেটা স্পষ্ট দেখেছিল টোরা। দেখলে কী হবে/ এখন সেটা পাবে কী করে টোরা?
টোরা জানে, যদিও বুড়ি তাকে দেখতে পাচ্ছে না, তবু হুট করে কিছু না করাই ভালো। বুড়ি যদি একবার টের পেয়ে যায়, তাহলে সব মতলব ভেস্তে যাবে। বরং ঘুমিয়ে পড়ুক, তারপর যা করবার করবে টোরা।
অবিশ্যি ঘুম পাড়াবার জন্যে, বুড়িকে তো আর ঘুম-পাড়ানি গান শোনাতে হবে না। বিছানায় শুয়ে পড়ে একবার এপাশ, আর একবার ওপাশ করেই তিনি নিদ্রা গেলেন। বাবা/ নাক ডাকানির বহর দ্যাখো/ যেন বর্ষার জলে কোলা ব্যাঙ গাল ফুলিয়ে ভ্যাঙাচ্ছে/
এই তাল। টোরা চুপচাপ তার অদৃশ্য হাতটা বুড়ির বালিশের তলায় সেঁদিয়ে দিলে। বালিশটা নড়ে গেছে/ এই রে/ টোরা চটপট হাতটা সরিয়ে নিলে বালিশের তলা থেকে। না, তেমন কিছু ভয় পাবার মতো কাণ্ড ঘটল না। বুড়ি শুধু এপাশ থেকে ওপাশে ফিরে শুল। একটু পরে বুড়ি আবার ঘুমে অচৈতন্য/ এবার আর ব্যাঙের ভ্যাঙচানি নয়। বুড়ির নাকে ভিমরুলের ভ্যানভ্যানানি/
আবার হাত বাড়াল টোরা। আবার হাত সেঁদিয়ে দিল বালিশের নীচে। এবার খুব সামলে। বালিশ যেন না নড়ে/ তা বললে কে শুনছে। বালিশ নড়বেই। নড়ুক। তবু রক্ষে, এবার বুড়ির নাকডাকানি থামেনি/ একেবারে মড়ার মতো নেতিয়ে পড়েছে বুড়ি। সেই তক্কে নিঃসাড়ে চাবিটা বালিশের নীচ থেকে বার করে আনল টোরা। কিছু বুঝতেই পারল না বুড়ি।
দেরাজ খুলে ফেলল টোরা। সামনেই প্রদীপ। হাত বাড়াতেই প্রদীপ ওর হাতের মুঠোয়।
প্রদীপ পেয়েই টোরা তাড়াতাড়ি আবার বন্ধ করে দিলে দেরাজটা। যদি বুড়ির আচমকা ঘুম ভেঙে যায়/ বলা তো যায় না/ বন্ধ করেই চাবির গোছাটা বুড়ির পাশেই রেখে দিল। কারণ বালিশের তলায় হাত ঢুকিয়ে বুড়ির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে আর সাহস নেই টোরার। প্রদীপ নিয়ে টোরা ছুটল ভাইয়ের কাছে।
ঘরে বন্দি তার ভাই। দরজায় শিকল তোলা। এত উঁচু, হাত যাবে না টোরার। হাত যে যাবে না, টোরা সে আগেই জানে। তাই কেমন করে ঘরের শিকল খুলবে, সে বুদ্ধি আগেই ঠাউরে রেখেছিল টোরা। টোরা কুয়ো-তলায় ছুটল। বুড়ির চান করার বালতিটা খুঁজে বার করলে। নিয়ে এল সেটা ওই বন্ধ ঘরের সামনে। উপুড় করে তার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ল। হাত বাড়াল। টোরার হাতের নাগালে দরজার শিকল। শিকল খুলে ফেললে। ঘরে ঢুকে গেল টোরা।
ভাই তার ঘরের মেঝের ওপর পড়ে আছে। ঘুমোচ্ছে। নিশ্চুপ, নিঃসাড়। আহা/ কী চেহারা হয়েছে বাদশার। মুখখানা শুকিয়ে যেন এইটুকু হয়ে গেছে।
টোরা থাকতে পারল না। এত অনাদর তো তার ভাইকে কেউ কোনোদিন করে না। এত কষ্ট বাদশা কখনো সইতে পারে/ তাই সে আলতো হাতের ছোঁয়া দিয়ে ভায়ের কপালের চুলগুলি সরিয়ে দিল। একটি চুমু খেল ওর কপালে। তারপর কান্নার জল ছলছলিয়ে উপছে গেল টোরার দু-চোখে।
তারপর আপন মনে ফিসফিস করে বলে উঠল, 'বাদশা, তুই আর আমায় দেখতে পাবি না রে। অসাবধানে ঠাকুরের প্রদীপ নিভিয়ে ফেলে আমি যে অদৃশ্য হয়ে গেছি। আমায় আর কেউ-ই দেখতে পাবে না। আমি যতদিন না ফুলের কান্না খুঁজে পাব, যতদিন না সেই কান্নার জল দিয়ে প্রদীপ জ্বালতে পারব, ততদিন যে আমি অসহায়/ আমার যে সব হারিয়ে গেছে বাদশা। কে জানে, আমি কোথায় সে-ফুল পাব, যে কাঁদে/'
হঠাৎ এত হাওয়া আসে কেন ঘরের দরজা ঠেলে? ঝড় উঠল নাকি বাইরে?
না তো। হাওয়া শুধুই বয়ে যায়। যেতে-যেতে যেন কথা কয়/
চমকে উঠল টোরা। সত্যিই তো। হাওয়া যেন টোরার কানে ফিসফিসিয়ে বলে যায়, 'ওই তো ফুল কাঁদছে, ওই তো ফুল কাঁদছে/'
টোরা আপন মনেই জিজ্ঞেস করে, 'কই তো ফুল কাঁদছে?'
হাওয়া হু-হু শব্দে বইতে-বইতে বললে, 'চোখ থাকলেই দেখতে পাবে, দেখতে পাবে, দেখতে পাবে।'
টোরা তখন দু-চোখ মেলে ঘরের অন্ধকারে ফুল খুঁজতে লাগল।
হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে টোরা। ওর চোখের তারা দুটি স্থির হয়ে চেয়ে রইল বাদশার চোখের দিকে।
অমনি হাওয়া খিলখিল, খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বললে, 'হ্যাঁ, ঠিক দেখেছ, ঠিক দেখেছ। ওই তো ফুল, কান্না ফুলের/'
ঠিক তক্ষুনি টোরার যেন মনে হল, বাদশার কান্নার জল, অন্ধকারে ঝলমল করে একটি একটি মুক্তার মতো গড়িয়ে-গড়িয়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
টোরা বললে, 'ও তো আমার ভাই, বাদশা/'
হাওয়া উত্তর দিলেঃ
যার মনে পাপ নেই,
দ্বেষ নেই, দোষ নেই,
রাগ নেই, রোষ নেই,
তার নাম রং/
যার রঙে আলো আছে,
হাসি আর খুশি আছে,
সুর-ভরা বাঁশি আছে,
তার নাম ফুল।
'সত্যি।' বুকের আনন্দ চেপে রাখতে পারল না টোরা হাওয়ার কথা শুনে।
হাওয়া বললে, 'সত্যি, সত্যি, সত্যি/' বলতে-বলতে হাওয়া দোর ডিঙিয়ে, ঘর ছাড়িয়ে নাচতে লাগল।
আর টোরা? খুশিতে হাত বাড়িয়ে বাদশার চোখের জল সোনার প্রদীপে ভরে নিল। ভরে নিয়ে বাদশার চোখ দুটি মুছে দিল। তারপর শেষবারের মতো ওর মুখটি দেখতে-দেখতে আনমনা হয়ে যায় টোরা। নরম গলায় ডেকে ওঠে 'বাদশা।'
ঘুমন্ত বাদশা চমকে উঠেছে। চোখের ঘুম তার ছুটে গেল। ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ল। কে ডাকল তাকে? এ যেন তার দিদির গলা/ বাদশাও ডাক দিল, 'দিদি।'
বাদশার ডাকে কে সাড়া দেবে/ ততক্ষণে দিদি ঘর ছেড়ে বাইরে। সে যখন ফুলের চোখের জল পেয়েছে, তখন এই অন্ধকার রাত্তিরেই তাকে যেতে হবে ওই পাহাড়ের চূড়ায়। মন্দিরে। এ প্রদীপ তাকে জ্বালাতেই হবে। নইলে সে যে কিছুই ফিরে পাবে না।
'দিদি/' ব্যাকুল হয়ে ঘর থেকে ডাকতে-ডাকতে বেরিয়ে এলে বাদশা। কিন্তু দিদির দেখাও পেল না। দিদি সাড়াও দিল না।
আবার চেঁচাল বাদশা, 'দিদি, আমি এখানে।'
ডাকতে-ডাকতে বাইরে বেরিয়ে এসেছে বাদশা।
এদিকে বাদশার চেঁচামেচিতে বুড়ির ঘুম গোল্লায় গেল। আঁকপাকিয়ে উঠে পড়ল। তরতরিয়ে তেড়ে এল। আর যেই না বুড়িকে দেখা, বাদশাও মার ছুট/
বুড়ি তো আর বাদশার মতো ছুটতে পারে না/ তাই ধরতেও পারে না। তার ওপর কোমরে কনকনানি টনটনাচ্ছে। তাই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই চেঁচিয়ে উঠল, 'চোর, চোর, ধর, ধর/'
বাদশা তখন কোথায় চলে গেছে। কত দূরে। আর ধরতে হচ্ছে না। বাদশা হাওয়ার চেয়ে আগে ছুটেছে।
তখন বুড়ি আর কী করবে, ঘরের চৌকাঠে ঠ্যাং ছড়িয়ে চিল্লা-চিল্লি করতে-করতে মাথা খুঁড়তে লাগল।
ছুটছে বাদশা। ডাকছে দিদিকে, খুঁজছে দিদিকে, 'দিদি, দিদি, কই তুই?' সেই ডাক অন্ধকারকে খানখান করে ফিরে-ফিরে ঘুরছে।
হঠাৎ এ কী/ সেই অন্ধকারটা যেন আরও অন্ধকার হয়ে গেল/ হ্যাঁ সেই আরও অন্ধকারে, আবার সেই কালো-ডানার দানো-পাখিদের ভয়-জাগানো পতপতানি আওয়াজ বাতাসে ভেসে আসছে। ওরা দেখতে পেয়েছে বাদশাকে। ওরা বাদশাকে ধরবে।
বাদশা সেই পতপতানি শব্দ শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল। আকাশের দিকে চাইল। কিন্তু এবার ভয় পেল না বাদশা। সেই ভয়ঙ্কর পাখিগুলোর দিকে হাত উঁচিয়ে সে বললে, 'ওরে দানব, ভয় দেখাবি কাকে? আমাকে? আমাকে যে ভয় দেখায়, সে এখনও জন্মায়নি।'
পাখিগুলো নেমে আসছে।
না, আজ আর কিছুতেই ধরা দেবে না বাদশা। বাদশা স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তাদের দিকে।
এবার পাখিগুলো বাদশাকে ছোঁ মারবে।
বাদশাও ঘুষি পাকালে।
পাখিগুলো ছোঁ মারল।
বাদশা লড়াই শুরু করে দিলে। অসংখ্য পাখি আর বাদশা একা/
বাদশা লড়ছে। ওরা মস্ত-মস্ত ডানার খোঁচা দিয়ে ঝাপটা মারছে বাদশাকে। বাদশা রুখছে সে মার।
ওরা খোঁচা-খোঁচা ঠ্যাং দিয়ে খামছে দিচ্ছে বাদশাকে।
বাদশা ওদের ঠ্যাংয়ের আঙুলগুলো মচকে দিচ্ছে।
ওরা লম্বা-লম্বা ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে দিচ্ছে বাদশার মাথা, বাদশার হাত, বাদশার পিঠ। তখন দারুণ লড়াই শুরু হয়ে গেল।
যে ডানা মারে, তার ডানা ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে দেয় বাদশা। যে খামচে দেয়, তার ঠ্যাং ভেঙে দেয় বাদশা। যে ঠোক্কর মারে, তার ঠোঁট উপড়ে ফেলে বাদশা। কেউ মরল, কেউ ছটফটিয়ে কাতরাতে লাগল। নয়তো মারের চোটে বৃন্দাবনে পালাল। কিন্তু ওই দানবের দল তো ছোটো নয়, একটা যায় তো দশটা আসে। আসুক/ বাদশার সঙ্গে আজ কেউ পারবে না। বাদশা সবাইকে আজ খতম করে ছাড়বে। দে মার, দে মার/ কী বাহাদুর ছেলে, দ্যাখো/
সত্যি/ শেষকালে পালা-পালা। দানব-পাখিগুলো বাদশার মারের চোটে যে যেদিকে পারল রণে ভঙ্গ দিয়ে একদম ভাগলবা/
বাদশা জিতে গেছে/ বাদশার গা কেটে গেছে। রক্ত পড়ছে। পড়ুক। জয়ের আনন্দে ওর বুকটা ফুলে উঠেছে। কিন্তু দিদি? দিদি কোথা? দিদি নইলে তার এই বীর ভাইকে কে আদর করবে? গায়ের রক্ত মুছে দেবে?
বাদশা আবার ডাকল, 'দিদি।'
তখন দিদি অনেক দূরে। দিদি অনেক দূরে ওই পাহাড়ের পাথর ডিঙিয়ে সেই চূড়ায় যাবে। সেখানে প্রদীপের আলো জ্বলছে। তার হাতের এই প্রদীপটি টোরা জ্বালবেই সেই প্রদীপের আলোতে।
কিন্তু টোরা যে জানে না, আর এক ভয়ঙ্কর বিপদ তার সামনে ওঁত পেতে দাঁড়িয়ে আছে/ কে জানত দানো-পাখিদের সেই যে সর্দার, সে তার পিছু নিয়েছে। ওই তো সে টোরার মাথার ওপর উড়ে-উড়ে এগিয়ে আসছে ওর হাতের প্রদীপটির দিকে লক্ষ রেখে। দেখতে পায়নি টোরা। দেখা সম্ভবও না। কেননা, রাতের কালোর সঙ্গে, দানোর ডানার কালো মিশে একাকার হয়ে আছে।
কত উঁচু পাহাড়টা/ ওর ছোট্ট-ছোট্ট পা দুটি পাথরের গায়ে-গায়ে লাফ দিয়ে কত কষ্টে এগিয়ে আনমনে চলেছে। কত সাবধানে, সোনার প্রদীপে কান্নার জলটি সে সামলে রেখেছে। যেন চলতে গিয়ে ছলকে পড়ে না যায়/ যেন তার পা দুটি হোঁচট খেয়ে ছিটকে না পড়ে। চোখ তার সেই দিকেই সজাগ। না, অসাবধানী সে আর হবে না। কিছুতেই না।
অনেক উঁচুতে উঠে এসেছে টোরা। এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, ওই দূরে পাহাড়ের চূড়ায় একটি ছোটো মন্দির। মন্দিরের ভেতর সেই প্রদীপের আলো জ্বলছে। ছোট্ট একটি প্রদীপ, কিন্তু তার আলোর ঝিলিমিলি উছলে ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে। টোরার দৃষ্টি এখন ওই আলোর দিকে। ওই আলোয়, প্রদীপের শিখাটি ও জ্বেলে নিলেই অদৃশ্য টোরা ফিরে পাবে নিজেকে। নিজেকে ফিরে না পেলে ভাইকে সে কেমন করে ফিরে পাবে/
আঃ/ কী শান্ত নিশ্চুপ চারিদিক। নিশ্চুপ আর ভারি স্থির ওই নীল আকাশের চাউনিটাও। ওই আকাশ যেন পাহাড়কে ডাকছে চোখ টিপে। আর পাহাড় মুখ বাড়িয়ে হাতছানি দিচ্ছে আকাশকে। একাকী জ্বলতে-জ্বলতে পাহাড়ের এই প্রদীপটি তা-ই দেখে দুলছে, নাচছে। নাকি হাসছে?
দাঁড়াল টোরা। তার অদৃশ্য চোখ দুটি স্থির হয়ে। দেখে। ধীরে-ধীরে এগিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল টোরা। হাতের সোনার প্রদীপটা পাহাড়ের সেই জ্বলন্ত প্রদীপের শিখায় ছোঁয়াল। দ্যাখো-দ্যাখো ওই তো/ প্রদীপ জ্বলে উঠেছে/
দকী আশ্চর্য, প্রদীপ জ্বালার সঙ্গে-সঙ্গে টোরার শরীরটাও তো আবার ফুটে উঠেছে/ ওই তো আলোয় তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে/ ওই দেখা যাচ্ছে, মুখটি/ ওই তার চোখ দুটি/ প্রদীপটি হাতে নিয়ে ওই তো টোরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে/
আনন্দে বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে নেচে উঠল টোরার। সে নিজেকে দেখতে পেয়েছে। এ কেমন করে হয়/ একি জাদু? না দেবতার বর/
এত আনন্দেও এবার কিন্তু টোরা একটুও অসাবধানী হল না। জ্বলন্ত প্রদীপের শিখাটি সে বুক দিয়ে আড়াল করে রাখল। না, এ-প্রদীপ সে আর নিভতে দেবে না। কিছুতেই না। এ প্রদীপ যে-দেবতার, তার পায়ের কাছে সে আবার রেখে আসবে।
শেষবারের মতো দেবতাকে প্রণাম করে বেরিয়ে এল টোরা মন্দিরের দরজা পেরিয়ে। বাইরে, এই পাহাড়ের চূড়ায়-চূড়ায় ধীরে ধীরে হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ার দোলায় প্রদীপের শিখাটির মতো টোরার মনটিও দুলছে। এবার ওকে ফিরতে হবে। ফিরতে হবে, এই পাহাড়ের পায়ের কাছে, সেই গুহার মন্দিরে। পা বাড়াল। কিন্তু টোরা দেখতে পেল না। সামনে তার কে দাঁড়িয়ে/ কিসের বিপদ/
থতমত খেয়ে আচমকা চিৎকার করে উঠেছিল টোরা/ দেখতে পেয়েছে টোরা। একটা ভয়ঙ্কর জীব। থুপসি মেরে উপুড় হয়ে পড়ে সে তার দিকে চেয়ে আছে। টোরা স্পষ্ট দেখছে, তার আটটা ঠ্যাং। সাপের মতো কিলবিল করছে। তার বুকের একটা গর্তের ভেতর থেকে কালো মেঘের মতো ধোঁয়া বেরুচ্ছে। সেই ধোঁয়া টোরার মুখে-চোখে লেগে কেমন যেন সব ঝাপসা করে দিচ্ছে। তারপর সেই আটটা ঠ্যাং নড়ে উঠল। নড়তে-নড়তে টোরার দিকে এগিয়ে এল। হয়তো এক্ষুনি সে তার ওই আটটা ঠ্যাং দিয়ে টোরাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরবে/ তাহলে টোরা কী করবে তখন?
টোরা ভীষণ ভয়ে কাঁপতে-কাঁপতে চিৎকার করে বলে উঠল, 'আমায় মেরো না।'
সেই আট-ঠ্যাঙে তখন আটটা ঠ্যাং নাচিয়ে নাচিয়ে হেসে উঠল, হা-হা-হা। তার হাসির শব্দে পাহাড়ের পাথরগুলো টলতে টলতে ছিটকে পড়ল। মেঘ ডেকে উঠল গুড়গুড় করে/
টোরা প্রদীপটা হাতের আড়ালে লুকিয়ে বলল, 'আমার এ-প্রদীপ তুমি নিভিয়ে দিয়ো না/'
এবার সেই আট-ঠ্যাঙে কথা বলল, 'তুই কার হুকুমে মন্দিরে ঢুকেছিস? এই মন্দির আমার/ তার গলার শব্দ শুনে মনে হচ্ছে, কে যেন ঢাক পেটাচ্ছে তার গলার ভেতর।
টোরা বললে, 'মন্দির তো দেবতার। সেখানে তো সবাই যেতে পারে।'
এবার সে গর্জন করে উঠল। বলল, "আমি মন্দিরের দেবতাকে রক্ষা করি। যারা মন্দিরে চুরি করতে ঢোকে, তাদের আমি পাহাড়ের ওপর থেকে নীচে ফেলে দিই।'
'আমি তো কিছু চুরি করিনি।' উত্তর দিলে টোরা।
'তুই আলো চুরি করেছিস। প্রদীপের আলো।'
'আলো কি চুরি করা যায়? তা তো আমি জানতুম না।' টোরা কাঁদো-কাঁদো গলায় বললে, 'আমি আর কখনো করব না। এবারটি আমায় ছেড়ে দাও।'
'না।' সেই আট-ঠ্যাঙে এবার হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে। টোরা শেষবারের মতো কেঁদে উঠল, 'আমায় ছেড়ে দাও, আমায় দয়া করো।'
এতক্ষণ আর কে তাকিয়ে ওই আকাশের দিকে। ওই দ্যাখো সেই দানো-পাখিটা টোরার মাথার ওপর পাক খাচ্ছে। তার কালো ছায়াটা হঠাৎ টোরার মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। পড়ার সহেগ সঙ্গে ছোঁ মারল পাখিটা। সে টোরার হাত থেকে প্রদীপটা ছিনিয়ে নেবে। কিন্তু পারল না। দেখে ফেলেছে পাহাড়ের এই আট-ঠ্যাঙে জন্তুটা আকাশের ওই কালো-ডানার দানোটাকে। ছোঁ মারার সঙ্গে সঙ্গে সে-ও তার আটটা ঠ্যাং দিয়ে ধরে ফেলেছে দানোটার কালো ডানা। আর দানোটা অমনি তার মস্ত ধারালো ঠোঁট দিয়ে ঝাড়লে এক বোম্বাই ঠোক্কর আট ঠ্যাঙের গর্দানে। তারপর যা লেগে যা ঝটাপটি। আট-ঠ্যাঙের গায়ে যত ক্ষমতা, দানোর গায়েও তত শক্তি। আট-ঠ্যাঙে তার ঠ্যাং দিয়ে জড়িয়ে ধরে দানোটাকে যতই চটকাচ্ছে, দানো-পাখিটাও ততই ঠুকরে-ঠুকরে রক্তারক্তি করে ছাড়ছে। কী ভীষণ লড়াই। আর কী প্রচণ্ড আর্তনাদ পাহাড়ের মাথার ওপর। যেন একশোটা ঢাকের শব্দ কান ফাটিয়ে একসঙ্গে বেজে উঠছে। তাদের ধস্তাধস্তিতে পাহাড়, কাঁপছে।
টোরা তো দেখেশুনে থ। এতক্ষণ আড়ষ্ট হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল টোরা। তারপর যখন ভয়ানক তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল, তখন ভাবল, এই সুযোগ। টোরা ওদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পাহাড়ের ওপর থেকে তরতর করে নামতে শুরু করে দিলে।
কিন্তু এই যাঃ/ দানব-পাখিটা দেখে ফেলেছে/ তার সেই মস্ত-মস্ত ডানা দুটোর বেদম এক ঝটকায় আট-ঠ্যাঙেকে কুপোকাত করে সে ছুটল টোরার দিকে। টোরাকে পেছন থেকে আঁকড়ে ধরলে। ততক্ষণে আট-ঠ্যাঙেও সেখানে হাজির। সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল দানো-পাখির ঘাড়ে। তারপর পাহাড়ের ওপর টোরাকে নিয়ে টানামানি করতে করতে শুগু হল সে আবার আর এক লড়াই। পাহাড়ের ওপর থেকে তিনজনেই, এই পড়ে, কি সেই পড়ে/ আর ওই রকম সাংঘাতিক টানামানি করলে টোরাই বা কেমন করে সামলাবে তার হাতের প্রদীপ/ বেমক্কা হল কী, প্রদীপের আগুনে দানো-পাখির ডানায় লেগে গেছে ছেঁকা/ সঙ্গে সঙ্গে ডানাটা দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠেছে। দানোটা পুড়তে-পুড়তে বিকট চিৎকার করে উঠল। চিৎকার করে টোরাকে মারল এক ধাক্কা। টোরা টাল সামলাতে পারল না। পিছলে পড়ল সে পাহাড়ের চূড়া থেকে নীচে, পাহাড়ের খাদে। খাদ থেকে সে আরও অন্ধকারে হাবুডুবু খেতে খেতে-পড়তে আরও গভীরে ডুবে গেল টোরা।
কিন্তু আশ্চর্য/ পা ফসকে আছাড় খেয়ে পড়ল না টোরা। কোনো আঘাত তো তার লাগল না/ কে যেন ধীরে ধীরে ওকে নামিয়ে নিয়ে এল এই অন্ধকার গহ্বরে/ না, আঘাত তার লাগবে না। তার হাতে যে দেবতার জ্বলন্ত প্রদীপ। এত বিপদেও সে তার হাতের প্রদীপটি শক্ত হাতে ধরে রেখেছে। সে নিভতে দেয়নি তার শিখাটি। আঃ/ এই গভীর অন্ধকারে এ-প্রদীপটি যেন টোরার বন্ধু। ওকে পথ দেখাবে/
তবু ভীষণ ভয় লাগছে টোরার। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। কেউ নেই, কিছু নেই। এ-কোথায় পড়ল সে। এখান থেকে ও কেমন করে উদ্ধার পাবে/ পৃথিবীর নীচটা কী ভয়ানক অন্ধকার/
না, সে হয়তা আর পারবে না, পারবে না বাঁচতে। এই জমাট অন্ধকার গহ্বরে সে বুঝি তিলে-তিলে শুকিয়ে মরবে/ ভয়ে বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল টোরার। ওর মনে হচ্ছে, এখনই খুব চিৎকার করে কেঁদে ওঠে/ কিন্তু পারল না। মনের ভেতরটা ছটফট করে উঠলেও ওর গলা কথা বলতে পারছে না। অথবা মনে হয়, ও যেন কথা বলতে ভুলে গেছে/ সত্যিই, কথা বলতে ভুলে যাওয়ারই কথা। এখানে আকাশ নেই, আকাশের আলো নেই। গাছ নেই, পাখি নেই। শুধু অন্ধকার। টোরার যেন দম আটকে আসছে। আর মনে হচ্ছে, ওর হাতের প্রদীপ-শিখায় ওর নিজেরই ছায়াটা যেন একটা ভয়ঙ্কর মূর্তি হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে কটমট করে।
হঠাৎ কেমন যেন শিউরে উঠল টোরা/ অমন চমকে কার দিকে চাইল সে/
টোরা দেখতে পেল, অন্ধকারে কালো-কালো ছায়ার মতো কারা যেন এদিক-ওদিক থেকে ছুটে পালাচ্ছে/ মনে হল, গহ্বরের আশে-পাশে, এবড়ো-খেবড়ো গর্তগুলোর মধ্যে তারা ঢুকে পড়ল। টোরার চোখে ধাঁধা লেগে গেছে/ তুমি দেখলে কী করতে জানি না। কিন্তু টোরা ভয় পেল না। বরঞ্চ মনে ভরসা পেল। হয়তো ভাবল, এই নিথর অন্ধকারে ও শুধু একা নয়। এখানেও প্রাণ আছে। কে বলতে পারে, এ বিপদ থেকে ওই প্রাণ টোরাকে রক্ষা করবে না/
'শি-স-স-স।' ঝড় উঠলে যেমন শিস বেজে ওঠে, ঠিক তেমনি ভীষণ শব্দ শুনতে পেল টোরা হঠাৎ। তারপর কী ভয়ঙ্কর জোরে সেই শিসের সঙ্গে সত্যি-সত্যি ঝড় উঠল সেই অন্ধকার গহ্বরে। এলোমেলো ধাক্কা দিয়ে সেই ঝড় ছুটে আসছে টোরার দিকে। এই বুঝি তার হাতের প্রদীপ নিভে যায়/ এইরে, কী করবে টোরা/ না-বলে, না-কয়ে এমন ঝড় ওঠে কোত্থেকে, এই গহ্বরে। ঝড়ের ধাক্কায় নিজেই টাল সামলাতে পারছে না, প্রদীপ সামলাবে কেমন করে/ এ কী বিপদ আবার/ মনে হচ্ছে, এক্ষুনি সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবে। কিংবা হুস করে শুকনো পাতার মতো শূন্যে উড়ে যাবে/ টোরার আর কোনো নিস্তার নেই। রাক্ষুসী ঝড় হাঁ বাড়িয়ে তেড়ে-মোড়ে ছুটে আসছে। তাকে গিলে খাবে/ টোরা পালাতেও পারছে না। যেদিকে ও পা বাড়ায়, সেদিকেই ঝড়। ও যদি সমান যায়, ঝড়ও আসে সমানে থেকে। ও যদি পিছন হাঁটে, ঝড়ও হাঁটে পিছন দিকে। নাস্তানাবুদ হয়ে গেল টোরা। টোরা আর দাঁড়াতে পারল ন। বসে পড়ল। তারপর দু-হাতের মুঠি দিয়ে আড়াল করলে প্রদীপের শিখাটি। কিন্তু কে শুনছে, কার কথা/ হুস-স-স, হুস--স-স। ঝড় বইবে, ঝড় বইছে।
হঠাৎ থরথর করে কেঁপে ওঠে ওর চোখের পাতা দুটি/ আঁতকে ওর বুকের ভেতরটা যেন থমকে যায়/ টোরা সেই প্রদীপের আলোছায়ার অন্ধকারে দেখে কী, অগুনতি ভাঁটার মতো লাল টকটকে চোখ তার দিকে প্যাটপ্যাট করে চেয়ে আছে। কী ভয়-জাগানো তাদের চোহারা/ তারা যেন না-মানুষ, না-জন্তু। টোরা প্রদীপের আলোয়, স্পষ্ট দেখল তাদের মাথাগুলো হাঁড়ির মতো হেঁড়ে। ঝুলের মতো ছন্নছাড়া চুলের ছিরি/ ঠ্যাঙগুলো সব ধনুকের মতো বেঁকাবেঁকা। হাতগুলো নাটা-নাটা, খাটো-খাটো/ নীচের ঠোঁট, নীচের দিকে ঝুলে আছে। নাল গড়াচ্ছে। আর ডাববা-ডাববা নাকের গর্তগুলো হাঁপাতে হাঁপাতে হাঁসফাঁস করছে। তাদের মুখ দিয়েই তো ঝড় ছুটছে/ বাবা/ তারা দিচ্ছে ফুঁ, উঠছে ঝড়। এবার টোরা ঠিক দেখতে পেয়েছে। তারা ফুঁয়ের ঝড় বইয়ে প্রদীপটা নিভিয়ে ফেলতে চাইছে। সর্বনাশ তো তাহলে/

কী-ভয় জাগানো তাদের চেহারা/তারা যেন না-মানুষ,না-জন্তু।
না, সর্বনাশ না। আশ্চর্য ব্যাপার/ তারা যতই ফুঁ দিচ্ছে, প্রদীপ নেভা দূরে থাক, ততই তার আলোর রোশনাই বাড়ছে। প্রদীপ যেন আলোয় আলো করে দিচ্ছে সেই অন্ধকার।
নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছে টোরা, এ কেমন করে হয়। ঝড় উঠলে, গাছ পড়ে, ঘর ভাঙে, তুফান ওঠে, গাঙ ছোটে, জাহাজ ডোবে, হাতি মরে। অথচ তার হাতে তো একটা সামান্য প্রদীপ। সে তো নিভছে না। উলটে আরও যে সে ঝলমল করে ওঠে/
সত্যিই/ প্রদীপ আর নিভবে না। টোরা তো জানে না, ওই পাহাড়-চূড়ার মন্দিরে যে প্রদীপ জ্বলছে, সেই জ্বলন্ত প্রদীপের স্পর্শে আর-একটি প্রদীপ জ্বলে উঠলে সে আর কোনোদিন নেভে না। আর তাই শত চেষ্টা করেও সেই না-মানুষ, না-জন্তুরা তাদের ঝড়ের মতো ফুঁয়ের তেজে নেভাতেই পারছে না প্রদীপের আলো।
আচ্ছা, থাকলেই বা আলো। অন্ধকারে আলো জ্বললে ভালোই তো/ ওদের মতলবটা কী বলো তো? টোরার হাতের প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ে ওকে কি মারবে? নাকি, অন্ধকারে যারা থাকে, তাদের অন্ধকারটাই আলো আর আলোটা অন্ধকার/ হবেও বা।
সেই হাঁড়ির মতো হেঁড়ে-হেঁড়ে মাথাগুলো এবার হেলে-হেলে টোরার দিকে এগিয়ে আসছে। টোরাও ভয়ে চোখ ঘুরিয়ে দেখছে তাদের। তারপর তারা যখন খুব কাছে চলে এসেছে, লাফিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'না, তোমরা আমার প্রদীপ নিভিয়ে দিয়ো না।'
নিমেষের মধ্যে ফুঁয়ের ঝড় থেমে গেল। থামতেই সব ভোঁ ভাঁ/ কোথায় গেল সেই মুখগুলো? লাল-টকটক চোখগুলো? টোরা দেখতে পাচ্ছে না তো/ কোথায় মিলিয়ে গেল?
ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে পড়ল টোরা। এখন প্রদীপের আলো জ্বলজ্বল করছে। চারিদিক নিস্তব্ধ। টোরার চোখে ভয়-জড়ানো অবাক চাউনি। তার চোখ খুঁজছে। আলতো-আলতো পা ফেলে হাঁটছে। কিন্তু আশ্চর্য, কেউ নেই। এগিয়ে যায় টোরা। উঃ বাবা/ গহ্বরের গায়ে-গায়ে এবড়ো-খেবড়ো গর্তগুলো যেন রাক্ষসের মতো হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। এই গর্তগুলোর মধ্যে লুকিয়ে পড়েনি তো/ কে জানে/ দেখি/ উঁকি মারলে টোরা। আর ঠিক তক্ষুনি তার যেন মনে হল, ভয়ঙ্কর এই গর্তগুলোর ফাঁকে-ফাঁকে ভয়-জড়ানো রহস্য তাকে চোখ টিপে ডাকছে। কেঁপে উঠল টোরার বুকখানা। কিন্তু এখন ভয় পেলে তো চলবে না তার। এই বিপদে টোরাকে সাহসে বুক বাঁধতে হবে। এই ভয়ঙ্কর না-মানুষ না-জন্তুগুলো যদি তাকে মারতে চায়, মারুক। তবু এ-প্রদীপ টোরা প্রাণ থাকতে নিভতে দেবে না।
হঠাৎ থতমত খেয়ে গেলে টোরা। সে একটা গর্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল কেন চট করে? ওই তো/ তারা যেন ওকে দেখে এই গর্তের সুড়ঙ্গ দিয়ে চোঁ-চাঁ দৌড় দিচ্ছে।
টোরা গর্তের সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ল। সামনে খাদ। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু। বিশ্রী খানা-খন্দ। লাফ মারল টোরা। হ্যাঁ, এখন টোরা দেখবে ওরা কারা। তাই লাফাতে-লাফাতে গভীর অন্ধকারে হারিয়ে গেল/ টোরা একবার ভাবলও না, ঢুকছে তো, কিন্তু অন্ধকার থেকে বাইরে সে বেরুবে কেমন করে/
'আঃ—/' ঠিক যা ভেবেছি তাই/ বেসামাল হয়ে টোরার পা পিছলে গেছে। ঈশ, মেয়েটা একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে। যা লাগান লেগেছে না/ প্রদীপটা গেল নাকি? না, সেটি তার হাতছাড়া হয়নি। উঠতে গেল টোরা।
'গ্যাঁও, গ্যাঁও/' হঠাৎ অমন বিশ্রী সুরে দারুণ জোরে গোঙাচ্ছে কারা? গোঙাচ্ছে, না টোরাকে ভেঙাচ্ছে/
টোরা তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছে।
ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে যন্ত্রণায় ভীষণ আর্তনাদ করে উঠল, 'উঃ/' খুব লেগেছে ওর কপালে।
এ কী/ হঠাৎ ওর কপালে ঢেলা ছুড়ে মারল কে। টোরা ঘুরে দাঁড়াল। সঙ্গে-সঙ্গে চাঁই চাঁই ঢেলা চারিদিক থেকে ঝাঁকে-ঝাঁকে উড়ে আসছে। ওর গায়ে লাগছে, মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে। টোরা প্রাণপণে সামাল দিচ্ছে। কিন্তু পারবে কেন/ সামলাতে না পেরে টোরা চেঁচিয়ে উঠল, 'আমায় মেরো না।'
টোরার মিষ্টি গলার প্রতিধবনি কাঁপতে-কাঁপতে গহ্বরের অন্ধকারের মধ্যে কার কানে পৌঁছয় কে জানে/ সাত্যিই, নিমেষের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল সেই ঢেলা ছোড়া। আবার নিঝুম চারিদিক। সারা গায়ে আঘাত লেগেছে টোরার। কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এ নিঝুম অন্ধকারে ও কাকে ডাকবে। ওর যে বড্ড জল তেষ্টা পেয়েছে।
'আলোটা নিভিয়ে ফেল/' হঠাৎ গম্ভীর গলায় হুংকার ছেড়ে কে ডেকে উঠল/ টোরার চোখ দুটি চনমন করে এদিক ওদিক তাকাল। সঙ্গে-সঙ্গে আরও অনেক গলা চেঁচিয়ে উঠল, 'আলোটা নিভিয়ে ফেল।'
'নিভিয়ে ফেল/'
'নিভিয়ে ফেল/'
'নিভিয়ে ফেল/'
চেঁচানিতে টোরার কান ঝালাপালা হয়ে যায়। সইতে পারছে না টোরা সে-চিৎকার। টোরা তারস্বরে ডেকে উঠল, 'থামো/'
আশ্চর্য/ আবার সব নিশ্চুপ/ গলার সেই অদ্ভুত আর ভীষণ শব্দগুলো থেমে যেতেই, ভয় মেশানো সেই কালো অন্ধকারে প্রদীপের আলো কেমন যেন থমথম করছে। টোরা এগোতে পারছে না। পিছনে কিছু দেখতেও পাচ্ছে না। ওর হাত-পাগুলো থরথর করে কেঁপে-কেঁপে চমকে উঠছে । তারপর ওর অজান্তেই চোখের পাতা বেয়ে জল গড়ায়। টোরা বোধহয় কাঁদছে। কাঁদছে কার জন্যে? কাঁদছে বাদশার জন্যে? না, মা আর বাবার জন্যে? আজ সবার জন্যে কাঁদবে টোরা। এখন যেন সবার কথা আপনা থেকে ওর মনে এসে বাসা বাঁধছে। টোরা জানে, আর কাউকে সে দেখতে পাবে না। কোনোদিনও না।
'গ্যাঁও-গ্যাঁও-গ্যাঁও/ '
হঠাৎ আবার কর্কশ-গলার হুংকার শোনা যায়/ কে ও? আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলজ্বলে চোখ জ্বেলে টোরার দিকে চেয়ে আছে?
'কে?' টোরার গলায় ভয়-মেশানো স্বর।
সেই কর্কশ-গলার হুংকার বললে, 'আলোটা নিভিয়ে ফেল, নইলে তোকে মেরে ফেলব/'
টোরা সেই আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলন্ত চোখ দুটোর দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলে, 'কেন নিভিয়ে ফেলতে বলছ, আলোর কী দোষ?'
'আমাদের চোখ জ্বলে যাচ্ছে, আমরা অন্ধ হয়ে যাচ্ছি। আলো আমাদের শত্রু।
'তোমরা কারা?'
"আমরা এই অন্ধকারে থাকি। পৃথিবীতে থাকতে-থাকতে আমাদের দিন শেষ হয়ে গেলে, এই মাটির নীচে আমরা চলে আসি। সবাই বলে এর নাম মৃত্যু-পুরী। আমরা বলি অন্ধকার। দেখছি, তুই তো মরিসনি/ তুই এখানে এলি কেমন করে? তুই কেন আলো এনেছিস? এক্ষুনি নিভিয়ে ফেল। আমরা সহ্য করতে পারছি না।" সে বললে।
টোরা উত্তর দিলে, 'এ দেবতার আলো। এ আলোয় কেউ অন্ধ হয় না।'
এবার যেন সেই কর্কশ-স্বর গর্জন করে উঠল, 'ফের কথা বলছিস/'
টোরা বলল, 'দেবতার আলো নেভাতে নেই।'
টোরার কথা শুনে সে রেগে জ্বলে উঠেছে। সে লাফ মারল টোরার সামনে। টোরা এবার স্পষ্ট দেখতে পেল, একটা বিকট চেহারার, কিম্ভূতকিমাকার সেই না-মানুষ না-জন্তুটাকে। টোরার সামনে দাঁড়িয়ে সাংঘাতিক জোরে সে ফুঁ দিল প্রদীপের শিখায়/ নিভছে না প্রদীপ। আলো আরও ঝলমলিয়ে উঠছে/
যখন সে প্রাণপণে ফুঁ দিয়েও নেভাতে পারল না প্রদীপের আলো, তখন ধাঁই করে ধাক্কা মেরেছে টোরার প্রদীপে। আর দেখতে আছে/ প্রদীপের শিখা ঝলকে উঠে ওই না-মানুষ না-ভান্তুটার মুখের ওপর ছিটকে পড়ল। আগুনের জ্বালায় প্রচণ্ড চিৎকার শুরু করে, দশ হাত দূরে সে সরে দাঁড়াল।
টোরা তাই দেখে নিজেই কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। কিন্তু আর দেরি নয়। এখানে আর দাঁড়ানো উচিত নয়। কিম্ভূত জীবটার হাত থেকে বাঁচতে হলে ওকে পালাতে হবে। কিন্তু কোথায় পালাবে? টোরা পিছন ফিরল।
সর্বনাশ/ পিছনে এই দ্যাখো একটা কত বড়ো সাপ/ ফোঁস-ফোঁস করে এগিয়ে আসছে। সাপটাও কি মরা? সেও কি এই মৃত্যু-পুরীর বাসিন্দা/ তা যদি হয়, মরে গেলে তো সব শান্ত হয়ে যায়/ এমন নিষ্ঠুর কেন ওরা? সাপটার জলজ্যান্ত ফণাটার দিকে তাকিয়ে টোরা হতাশ হয়ে ভাবলে, এইবার তার শেষ। শেষকালে বোধহয় সাপই তাকে খাবে/
একপাশে দাঁড়িয়ে টোরা থরথর করে কাঁপছে। সাপ সড়সড় করে টোরার দিকে এগিয়ে আসছে। টোরা ভয়ে পাথর হয়ে গেল। সাপ টোরার সামনে ফণা তুলে খাঁড়া দাঁড়িয়ে পড়ল। টোরার মুখের কাছে মুখ এনে ফোঁস-ফোঁস করে বললে, 'কথা কানে নিচ্ছিস না কেন/ আলোটা নিভিয়ে ফেল/' সাপটা যেন ধমক মারছে।
টোরা তাড়াতাড়ি প্রদীপটা তার পিছনে আড়াল করে লুকিয়ে রেখে, ভয়ে-ভয়ে বললে, 'না—।'
শেষ হয়নি টোরার মুখের কথা। তার আগেই সাপটা লাফিয়ে উঠে টোরাকে জড়িয়ে ধরল। জড়িয়ে ধরে আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে ফেললে টোরাকে। টোরার দম আটকে আসছে। মনে হচ্ছে, বাঁধনের চাপে ওর হাড়গোড় গুঁড়িয়ে টুকরো-টুকরো হয়ে যাবে এক্ষুনি। ও আর পারছে না। ও চেঁচিয়ে কাউকে ডাকবে, সে-শক্তিও আর নেই তার। এই বুঝি তার শেষ/
না, শেষ কেন হবে/ ও তো কোনো অন্যায় করেনি। আর তা ছাড়া দেবতা তার সঙ্গে আছেন। তার হাতে দেবতার প্রদীপ জ্বলছে। ওর কে ক্ষতি করবে/ তাই টোরার ওই ছোট্ট প্রাণটুকু প্রচণ্ড ক্ষমতায় ঝলকে উঠল। জ্বলন্ত প্রদীপের শিখাটি সে ঠেকিয়ে দিল, সাপের মুখে। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল তার মুখখানা। যন্ত্রণায় দিকবিদিকজ্ঞান হারিয়ে টোরাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল সেই সাপটা গহ্বরের গর্তে। টোরা প্রাণপণে আগলে ধরল প্রদীপটা দু-হাত দিয়ে/ প্রদীপ রক্ষা পেল, কিন্তু টোরা সামলাতে পারল না তার মাথাটি। গহ্বরের পাথরে ধাক্কা খেয়ে টোরা নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল।
তুমি হয়তো ভেবেছিলে, এই অন্ধকারের অন্ধকূপে টোরার চোখ দুটি চিরদিনের মতো নিভে গেছে। ওর হয়তো আর কোনো দিন ঘুম ভাঙবে না।
কিন্তু না। ওই দ্যাখো, নিস্তেজ ওর হাতের আঙুলিগুলি ধীরে ধীরে কেমন কাঁপছে আবার। ক্লান্ত চোখ দুটি কেমন অনেক কষ্টে জেগে উঠেছে। চোখের পাতা দুটি মেলে ধরার চেষ্টা করছে টোরা। ওই তো টোরা চাইল।
কিন্তু এ কী/ এত আলো এল কোত্থেকে? যে অন্ধকার গহ্বর এতক্ষণ কালো অন্ধকারে ঢাকা ছিল হঠাৎ তার এ কী রূপ/ আলোয় ঝলমল করছে চারদিক। উঠে বসল টোরা। কই তার প্রদীপ? এই তো/ দ্যাখো, দ্যাখো, প্রদীপের শিখাটি আলোয় আলো ছড়িয়ে, এই গহ্বরের অন্ধকারকে চোখ মটকে যেন ঠাট্টা করছে। এত কষ্টেও খুশিতে উছলে পড়ল টোরার মন। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল টোরা। ওর মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করছে। পা দুটি টলে-টলে পড়ে যাচ্ছে। তবু দাঁড়িয়ে উঠে প্রদীপটি হাতে তুলে নিল। হঠাৎ একটি ঝুনঝুনি বেজে উঠল, 'ঝুন-ঝুন, ঝুন-ঝুন।'
ভারি মিষ্টি তো ওই শব্দটি। কে আবার পায়ে মল বাজিয়ে নাচছে এখানে?
আঃ/ কী ভালো লাগছে/ আনন্দে প্রাণভরে নিশ্বাস নিল টোরা। না, এখন সাপও নেই, সেই কিম্ভূতকিমাকার না-মানুষ না-জন্তুও নেই।
কিন্তু কে বাজাচ্ছে? আশে-পাশে তো কাউকে দেখতে পাচ্ছে না টোরা।
তাহলে তো দেখতে হয়।
একটি-একটি পা ফেলে, এক-পা এক-পা এগিয়ে যায় টোরা। এগিয়ে যাচ্ছে প্রদীপটি হাতে নিয়ে। ফিরে-ফিরে এদিক ওদিক মিটিমিটি চাইছে আর গহ্বরের আরও গভীরে নেমে যাচ্ছে।
চলতে-চলতে হঠাৎ থমকে যায় টোরা। দাঁড়িয়ে পড়ে। আরে/ আরে/ একটি পাখি কেমন ঝুনঝুনি বাজিয়ে দোলনায় দুলছে/ ও/ টোরা তাহলে এতক্ষণ দোলনায় বাঁধা এই ঝুনঝুনির শব্দটাই শুনতে পাচ্ছিল। হ্যাঁ। এখন পাখিটা, দোলনাটা আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে টোরা। পাখিটা কি তার দিকে চেয়ে-চেয়ে হাসছে? বুঝতে পারে না টোরা।
'টোরাদিদি।' হঠাৎ দোলনা থামিয়ে পাখিটা ডাকল।
চমক ভাঙল টোরার। তাইতো, পাখিটা তার নাম জানল কেমন করে/
'আমাকে চিনতে পারছ?' পাখি জিজ্ঞেস করলে।
টোরার মুখে কথা ফুটল না।
'আমি ময়না।'
ময়না/ টোরার বুকটা ছমছম করে ওঠে। গায়ে কাঁটা দেয়।
'মাকে খুশি করার জন্যে তোমায় কত কষ্ট করতে হল বলো তো?' পাখি বললে।
টোরা ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই রইল পাখির দিকে। চেয়েচেয়ে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, একি সত্যি/ তাদের ময়না তার সঙ্গে কথা বলছে/
'মায়ের জন্যে এই পাতালের গহ্বরে তুমি বন্দি হয়ে আছ। তোমার ভয় করছে না?' পাখি জিজ্ঞেস করলে।
এবার টোরা কথা বললে। অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলে, 'আমি বন্দি?'
পাখি বলল, 'হ্যাঁ, তুমি বন্দি। যেমন আমায় বন্দি করে রেখেছিলে তোমাদের খাঁচায়।'
'আমরা তো তোমাকে বন্দি করিনি। আমরা তো তোমাকে ভালোবেসেছি। আদর করেছি। বন্দিকে কেউ আদর করে, ভালোবাসে?' টোরা উত্তর দিলে।
পাখি বললে, "আচ্ছা ধরো, তুমি যদি আর কোনোদিন এ গহ্বর থেকে বেরিয়ে যেতে না পার? আর কোনোদিন মাকে দেখতে না পাও? দেখতে না পাও তোমার ওই ছোট্ট ভাই বাদশাকে বা তোমার বাবাকে? যদি তুমি কোনোদিন মাকে আর তোমাদের বাড়ির জানলায় মুখ বাড়িয়ে কু ঝিক ঝিক রেলের শব্দ শুনতে না পাও? কিংবা ওই শব্দ শুনতে শুনতে তুমি গান গাইলে, তোমার গলায় গলা মিলিয়ে তোমার সঙ্গে বাদশা গান না গায়? তোমার সঙ্গে বাদশা খেলে না করে? রাতেরবেলা মোমের আলো জ্বেলে তোমার কাছে গল্প না শোনে? তার বদলে চিরদিন তুমি যদি এখানে বন্দি থাকো, আর আমরা সবাই তোমাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসি, তোমাকে আদর করে, গান শোনাই, তোমার ভালো লাগবে?
'কেন একথা বলছ?' কেমন ভয়-জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলে টোরা।
'কেন বলছি জানো? আমি মানি তোমরা আমাকে খুব ভালোবাসতে। তোমার নরম মিষ্টি হাতের আঙুল আমার মাথায় ঠেকিয়ে তুমি রোজ আমায় কত আদর করতে। তুমি কত যত্ন করে আমায় খাবার দিতে। কিন্তু তুমি কি দেখেছিলে কোনোদিন আমার চোখ দুটি? দেখেছিলে আমার চোখে জল? তুমি তো কোনোদিন দেখনি আমি মায়ের জন্যে কাঁদি কিনা। তোমার মতো আমারও ভাই আছে টোরাদিদি। তোমার মতো আমিও তাদের গান শোনাতুম। তাদের সঙ্গে কত খেলা করেছি। ভোরের আকাশে সূর্যের ঝিকিমিকি আলোয় ডানা মেলে কতদিন আমি আমার ভাইয়ের সঙ্গে উড়ে বেরিয়েছি। ওই খোলা আকাশই যে আমাদের বাড়ি।'
পাখির কথা শুনতে-শুনতে টোরার চোখের পাতা দুটি ছলছল করে উঠল। টুপ করে এক ফোঁটা জল মাটিতে পড়ল।
পাখি বলল, 'কাঁদছ টোরাদিদি?'
টোরা বলল, 'তোমাদের যে এত দুঃখ, সে তো আমি জানতুম না।'
'টোরাদিদি, নিজে দুঃখ না-পেলে, অন্যের দুঃখ বুঝবে কেমন করে?' পাখি উত্তর দিলে।
টোরা কাঁদতে-কাঁদতেই বললে, 'পাখি, আমি যখন তোমায় দুঃখ দিয়েছি, তখন তুমি আমায় শাস্তি দাও/'
পাখি বলল, 'না টোরাদিদি, তোমার কোনো দোষ নেই। তুমি যা করেছ সে তো তোমার মাকে সুখী করার জন্যে। তুমি এই যে এত কষ্ট করলে, সেও তো তোমার মায়ের জন্যে। মাকে সুখী করার জন্যে যে এত কষ্ট সহ্য করে, সে কখনো শাস্তি পায়? সে সবার ভালোবাসা পায়।'
'তাহলে তুমি আমায় ভালোবাস?' জিজ্ঞেস করল টোরা।
'হ্যাঁ টোরাদিদি, আমি তোমায় ভালোবাসি? ভালবাসি বলেই তোমাকে আমি এখান থেকে বেরিয়ে যাবার পথ দেখিয়ে দেব।'
টোরার মুখখানা খুশিতে উছলে গেল। বললে, 'পাখি, তুমি যে এত ভালো, আমি তা বুঝতে পারিনি।'
পাখি বললে, 'টোরাদিদি, তোমার হাতে প্রদীপ। তাই তোমাকে যাবার আগে একটি কাজ করতে হবে, পারবে?
টোরা জিজ্ঞেস করলে, 'কী কাজ, পাখি?'
'ওই দ্যাখো, তোমার মাথার ওপর একটি লণ্ঠন দুলছে।'
চকিতে চোখ তুলল টোরা। জিজ্ঞেস করল, 'আমায় কী করতে বলছ?'
'তোমার ওই প্রদীপের আলো দিয়ে ওই লণ্ঠনটি জ্বালিয়ে দাও। অন্ধকারে থাকতে আমার বড্ড কষ্ট হয়।'
'কেন, তুমি আমার সঙ্গে যাবে না? আমি কথা দিচ্ছি পাখি, তোমাকে আর আমি বন্দি করব না।'
পাখি উত্তর দিল, 'না টোরাদিদি, আমি তো এখান থেকে আর যেতে পারব না। আমি তো মরে গেছি। এখন আমি এই অন্ধকার গহ্বরেই থাকব। এই অন্ধকার গহ্বরই এখন আমার স্বর্গ/ এখান থেকে আর আমি কোথাও যাব না। তুমি আলোটা জ্বেলে দাও। ওই আলোই হবে আমার বন্ধু।'
পাখির কথা শুনে টোরার বুকটা কেমন ভার হয়ে গেল। হ্যাঁ, সত্যিই তো/ ওরই তো হাতের মুঠির চাপে পাখি প্রাণ হারিয়েছে/ আড়ষ্ট চোখে পাখির মুখের দিকে চাইল টোরা/ চোখ সরিয়ে ধীরে ধীরে ওপরে তাকাল। ওই ঝুলন্ত লন্ঠনটার দিকে। না অনেক উঁচু না। সামনে ওই পাথরের চাঁইটার ওপর দাঁড়ালেই ওর হাত যাবে। ওখানে দাঁড়িয়ে টোরা হাত বাড়িয়ে, তার হাতের প্রদীপের আলো দিয়ে লণ্ঠনের আলো জ্বালাতে পারবে।
টোরাকে অমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাখি জিজ্ঞেস করল, 'কী ভাবছ? জ্বালবে না?'
টোরা উত্তর দিল, 'হাঁ, জ্বালব।'
টোরা হাত বাড়ল। ওর প্রদীপের শিখাটি দুলতে-দুলতে লন্ঠনের শিখাটি ছুঁয়ে গেল। লণ্ঠন জ্বলে উঠল। ভেসে গেল সেই গহ্বর আলোর বন্যায়। যেখানে যত আলো ছিল সব যেন ছড়িয়ে পড়েছে সেই অন্ধকার গহ্বরে। স্বর্গের রঙিন ছবির মতো সেই গহ্বর ঝলমলিয়ে উঠল। পাখির মনের অনেক, অনেক সুখ ওর দু'চোখের পাতায় ছড়িয়ে পড়েছে। পাখি আনন্দে বলে উঠল, 'আঃ/'
হঠাৎ টোরা দেখে কী, গহ্বরে সেই রঙিন স্বর্গে ঝাঁকে-ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ে আসছে। ফুল ফুটেছে। মৌমাছি নাচছে। ফুলে ফুলে গান গাইছে। টোরা অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে, 'এরা কোথায় ছিল? এরা কারা?'
'এতদিন অন্ধকারে এরা অন্ধ হয়ে ছিল। এরা আমার বন্ধু। আমার আনন্দ।' পাখি খুশিতে উছলে উঠে বলল।
টোরা বললে, 'আমিও এদের সঙ্গে আনন্দ করব।'
পাখি উত্তর দিলে, 'না টোরাদিদি, না। তোমার আনন্দ তোমার বাড়িতে। তোমার আনন্দ তোমার মা, তোমার বাবা, তোমার ভাই। তোমার আনন্দ এই গহ্বরের অন্ধকারে নয়, ওই নীল আকাশের নীচে। সে-আনন্দ তোমায় ডাকছে।'
পাখির কথা শুনে টোরার দু-চোখ আবার জলে ভরে গেল।
পাখি বলল, 'এখানে কাঁদতে নেই টোরাদিদি।'
টোরা তাড়াতাড়ি তার চোখ দুটিতে আঁচল চাপা দিলে। বলল, 'না পাখি, আমি কাঁদছি না। তোমায় দেখছি।'
পাখি বলল, 'টোরাদিদি, এবার তোমার যাওয়ার পালা/ ওই দ্যাখো তোমার পথ।'
'কই?'
'ওই যে পাথরের দরজা খুলে গেছে।'
টোরা অবাক হয়ে চাইল। হ্যাঁ, সত্যিই তো/ জিজ্ঞেস করল, 'ওখান দিয়ে আমায় যেতে হবে?'
'ওখান দিয়ে তোমায় ওপরে উঠতে হবে। এই পাথরে পাথরে পা ফেলে।'
'তবে আমি যাই পাখি।'
পাখি আবার সেই দোলনায় দুলতে দুলতে, দোলনার ঝুনঝুনিটা বাজাতে-বাজাতে বললে, 'টোরাদিদি, তুমি সুন্দর।'
টোরা দুহাত বাড়িয়ে পাখিকে বললে, 'তুমি আরও সুন্দর।'
পাখি আনন্দে টুটুর-টুটুর করে ডেকে উঠল। অমনি সুন্দর সেই আলো-ঝলমল গহ্বরের স্বর্গে অনেক, অনেক আনন্দ একসঙ্গে গান গেয়ে উঠল। আর সেই গান শুনতে শুনতে টোরা গহ্বরের দরজা ডিঙিয়ে পা ফেললে, একটি একটি পাথরের ওপর। একা-একা সে এগিয়ে চলল। গহ্বর থেকে আকাশের দিকে। তার সঙ্গী শুধু তার হাতের এই প্রদীপ। আর সঙ্গী তার এই প্রদীপের আলোয় নিজের ছায়া।
তারপর হঠাৎ মুখ ফেরাল টোরা তার পিছনে। দেখে, এ তো শুধু তার ছায়া নয়। ওর পিছনে-পিছনে ওরা কারা আসছে দল বেঁধে/ সেই কিম্ভূতকিমাকার না-মানুষ না-জন্তুগুলো না? ওরাই তো ওকে ঢেলা মেরেছিল/ ওরা কি আবার তাকে মারবে?
না। টোরা যে-পথ দিয়ে যাবে, সে-পথে ওরাও যাবে। টোরা যদি পথে বিপদে পড়ে, ওরা সে-বিপদ দূর করবে। তারপর টোরা যখন এই পাথরের পাহাড় পেরিয়ে ওপরে উঠে যাবে তখন ওরা বলবে হয়তো, 'আমরা জানতুম না, তুমি এত লক্ষ্মী। তাই তোমার গায়ে আমার হাত দিয়েছি। তোমায় মেরেছি। তুমি আমাদের ক্ষমা করো।' তারপর পাথরের ওপর গড়াতে-গড়াতে ওরা আবার গহ্বরে নেমে আসবে। তখন কেউ জানতেও পারবে না, প্রাণহীন সেই পাখির সঙ্গে আরও কত প্রাণহীন জীবন গহ্বরের স্বর্গে, আলোর নীচে বসে-বসে টোরা নামে একটি মেয়ের জন্যে কাঁদছে। কেননা, সে যে তাদের জন্যে অন্ধকারে আলো জ্বেলে গেছে /
টোরা পৌঁছে গেল। পৌঁছে গেল পাতালের অন্ধকার থেকে পাহাড়ের পায়ের কাছে। আকাশের দিকে চাইল টোরা। আঃ/ শেষ রাতের আকাশ ভারি শান্ত। কে যেন খুব সাবধানে শান্ত আকাশের গা থেকে তারার চুমকি গাঁধা ওড়নাখানি ধীরে ধীরে সরিয়ে নিচ্ছে। একটু পরেই ভোরের মুখখানি দেখতে পাবে টোরা।
ঘন্টা বেজে উঠল। কোথায়? ভারি গম্ভীর সেই ঘন্টার ধবনি। সেই গম্ভীর সুর হাওয়ায় যেন কেঁপে কেঁপে নাচতে-নাচতে, দূরে আরও দূরে ছড়িয়ে যাচ্ছে। শিউরে উঠল টোরা। হয়তো আনন্দে কিংবা ভাবনায়/ তাড়াতাড়ি পা ফেলল টোরা। ওকে যে এখুনি পৌঁছুতে হবে দেবতার কাছে। যতক্ষণ না এ-প্রদীপ তাঁর সামনে রাখতে পারছে টোরা, ততক্ষণ ওর নিস্তার নেই। ঠাকুর বলেছেন, তারপরেই টোরা সব ফিরে পাবে।
এসে গেছে টোরা। দেবতার সেই গুহার সামনে এসে দাঁড়াল। ওহো/ ঘন্টা যে গুহার ভেতর থেকেই ভেসে আসছে/ তা হলে এ তো দেবতার ঘন্টা/
হ্যাঁ, দেবতার ঘন্টা। এই ঘন্টা যেন ডাক দিচ্ছে টোরাকে। বলছে, 'এসো। এখানে তোমার জন্যে আনন্দ লুকোনো আছে/'
ধীরে ধীরে ঢুকে গেল টোরা গুহার মন্দিরে। তারপর দেবতার সামনে এসে দাঁড়ায় টোরা। ওই সেই দেবতা। দেবতার মুখের দিকে তাকিয়ে টোরার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল দু'চোখ দিয়ে। টোরা সোনার প্রদীপটা দেবতার পায়ের কাছে রাখলে। তারপর হাঁটু গেড়ে বসে হাতজোড় করে বললে, 'ঠাকুর, আমি তোমার কথা রেখেছি। ফুলের চোখের জল দিয়ে তোমার সোনার প্রদীপ আবার জ্বেলে এনেছি। এবার তুমি আমার ভাইকে ফিরিয়ে দাও।' বলে টোরা মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে ঠাকুরের পায়ে প্রণাম করল। আর ঠিক তক্ষুনি ঘন্টার বাজনা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
টোরা বুঝতে না-বুঝতেই কে যেন ওর গায়ে হাত দিল/ গায়ে হাত দিয়ে ডাকল, 'দিদি/'
চমকে উঠল টোরা। এ কী/ এ যে বাদশার গলা।
হ্যাঁ, বাদশাই আবার ডাকল, 'দিদি/'
দিদি চকিতে মাথা তুললে। তার চোখ দুটি অবাক-বিস্ময়ে চেয়ে রইল বাদশার মুখের দিকে।
'দিদি, আমি।'
'বাদশা/' হঠাৎ চিৎকার করে উঠল টোরা। এমন চিৎকার সে যেন জীবনে আর কোনোদিন করেনি। জড়িয়ে ধরল বাদশাকে। তারপর কেঁদে ফেলল, হাউ-হাউ করে।
বাদশা দিদির চোখের জল মুছতে-মুছতে বললে, 'কাঁদিস না দিদি। আমি জানতুম তুই এখানে আসবি। ঠাকুর আমায় বললেন যে। বললেন, ঘন্টা বাজাতে। ঘন্টা বাজালেই তুই শুনতে পাবি। তাইতো, আমি সারারাত ঘন্টা বাজিয়েছি।
'সারারাত/' টোরা বাদশার চিবুকটি ধরে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করলে।
'তাতে কী হয়েছে। ঘন্টা বাজাতে আমার বেশ লাগছিল/'
দিদি জিজ্ঞেস করল, 'তুই এখানে কেমন করে এলি বাদশা?'
'তোকে খুঁজতে-খুঁজতে।'
''আহা/ কত কষ্ট হল তোর/
'না রে/ আমার একটুও কষ্ট হয়নি। দ্যাখ, না, আমি কি তোর মতো কাঁদছি? কষ্ট হলে তো মানুষ কাঁদে।'
টোরা বাদশার কপাল থেকে এলোমেলো চুলগুলি সরিয়ে দিল ভারি যত্নে। তারপর ভাই-বোন শেষবারের মতো ঠাকুরের পায়ে প্রণাম করল। উঠে দাঁড়াল। সোনার প্রদীপের আলোয় ওরা এবার স্পষ্ট দেখতে পেলে ঠাকুরের মুখখানি। ঠাকুরের চোখ দুটিতে হাসি ফুটেছে।
দিদির হাত ধরল বাদশা। ধীরে ধীরে গুহার মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে এল দুজনে। বাইরে, আকাশে রাত কেটে আলো এসেছে।
বাদশা দিদির চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলে, 'বাড়ি যাবি না?'
দিদি বললে, 'চ'।
'কোনদিকে?'
'ওই তো, ওই দিকে।' আঙুল দেখাল টোরা, 'ওই যেদিক দিয়ে রেলগাড়ি যায়, ওই পথ ধরে হাঁটব।'
যেদিকে দিদি আঙুল দেখাল, সেইদিকে বাদশা চোখ তুলে দেখলে। তাই তো/ ওই দ্যাখো, পাহাড়ের গা বেয়ে-বেয়ে রেল লাইনটা কেমন এঁকেবেঁকে চলে গেছে/ ছুটে গেল বাদশা সেই দিকে। লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে হেঁকে উঠল, 'কু-কু, ঝিক-ঝিক।' তারপর চেঁচিয়ে দিদিকে ডাক দিয়ে বলল, 'দিদি, আজ আমি নিজেই রেলগাড়ি হয়েছি। তোকে বাড়ি নিয়ে যাব। ছুটে আয়, নইলে গাড়ি ইসটিশান ছেড়ে যাবে।'
বাদশার কথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল টোরা। তারপর সত্যিই ছুটে গেল। বাদশার হাত ধরলে। গাড়ি ছুটল কু-কু, ঝিক-ঝিক।
ভোরের সোনার আলোর মতো, যেন দুটি সোনার টুকরো গড়িয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের গা বেয়ে। দুটি ভাই-বোন, টোরা আর বাদশা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন