শৈলেন ঘোষ
খুব সম্প্রতি ইতিমিচিসাহেব গান ছেড়েছেন। কালামাটা শহরে গলা-আঁটা কোট পরে তিনি যখন তিন হাজার গান-পাগল লোকের সামনে শেষ গানটি গাইলেন, তখন সমবেত শ্রোতা 'ওহো-ওহো' করতে করতে চোখের জলে ভিজে গেল। অবশ্য এ-কথা বলা খুবই শক্ত যে, শ্রোতারা তাঁর গান শুনে চোখের জলে ভাসল না, তিনি গান ছাড়লেন বলে তাদের এ-কান্না।
ইতিমিচিসাহেব গাইয়ে কোনোদিনই ছিলেন না। ইতিপূর্বে তিনি সার্কাস পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। সাইকেলে খেলা-দেখানোর চাকরি নিয়ে নানান দেশ ঘুরতে-ঘুরতে তিনি যখন এ-দেশে এলেন, তখনই তাঁর মাথায় গান চাগাড় দিয়ে উঠল। অবশ্য তার আগে খেলা দেখাতে গিয়ে, তিন দেশে, তিনবার তিনি সাইকেল থেকে ডিগবাজি খেয়ে কোনোরকমে প্রাণে বেঁচেছেন। কিন্তু শেষবার যখন বেটাল হয়ে চিতপাত হলেন, তখনই তাঁর আক্কেল গুড়ুম। তাঁর জোড়া-পা খোঁড়া হল এবং তিনি চার মাস খোঁড়া-পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে পড়ে রইলেন।
ইতিমিচিসাহেব যে কোন দেশের লোক এ-কথা কেউ জানে না। তিনিও কাউকে জানতে দেন না। হঠাৎ বুঝি একবার তিনি কবুল করেছিলেন, দেশ তো একটাই, আর সে-দেশের নাম, তামাম দুনিয়া এবং তখনই তিনি ভূত দেখলেন। না, না, ঠিক বলা হল না, তিনি ভূতের নাম শুনলেন। শুনলেন, এই দুনিয়ায় মানুষের সঙ্গে যেমন গোরু-ভেড়া বাস করে, তেমনি বাস করে ভূত/ আশ্চর্য কথা এই, ইতিমিচিসাহেব তো আর কচি-খোকাটি নন, অথচ ভদ্রলোক ভূতের নাম শুনলেন এই প্রথম/ শুনতে-শুনতে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। তিনি শুনলেন, ভূত দেখা যায়, অথচ ধরা যায় না। কথা বলে, অথচ শোনা যায় না। তিনি আরও শুনলেন, ভূত এমন একটি চিজ তার সুনজরে পড়লে দেখে কে/ রকেট ছুড়ে চাঁদে যেতে হবে না/ হুকুম করলেই হল, ভূত নিজেই চাঁদটিকে বগলদাবায় তুলে এনে তোমার হাতে সঁপে দেবে। আর যদি ভূত একবার চটিতং, তবে হাজারটা হ্যাপা/ তখন তিনি ঘুমের ঘোরে নাকে চিমটি কাটবেন। নয়তো পেটে কাতুকুতু দেবেন। আর তা নইলে মুখে হেঁচে দেবেন। ইস/
ঠিক এই কারণেই ইতিমিচিসাহেব গান ছাড়লেন এবং তিনি ঠিক করলেন, ভূত ধরবেন। চাঁদ তাঁর চাই না। তিনি ভূতের সঙ্গে দোস্তি করে তার পিঠে চেপে ঘুরে-ঘুরে হাওয়া খাবেন।
অবশ্য একদিক থেকে ইতিমিচিসাহেবের খুব বাঁচোয়া, পিছু টানের, বালাই নেই। মানুষটি এক্কেবারে একা। বউ নেই, ছেলেপুলে নেই, আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। যাকে বলে ঝাড়া হাত-পা। বিয়ে অবিশ্যি করেছিলেন তিনি, কিন্তু অকালেই যে বউটি তাঁকে ছেড়ে স্বগ্গে চলে যাবে, এ-কথা তিনি আগে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি। শুধু যাবার সময় তার শেষ ইচ্ছেটি জানিয়ে গেছে, 'আমি মরলে তুমি কেঁদো না গো/ তাতে আমার দুঃখ বাড়বে বই কমবে না। তারচেয়ে বরং আমি মরে গেলে তুমি পদ্য লেখা শুরু কোরো। যত লিখবে, তত নাম হবে। তাতেই আমার শান্তি।'
জন্মে ইস্তক পদ্য লেখার কথা ইতিমিচিসাহেবের মগজে কোনোদিনই ঠাঁই পায়নি। পদ্য যে কেমন, কী করে লিখতে হয় কস্মিনকালেও এ-কথা তিনি ভাবেননি। কিন্তু ভদ্রলোক করেন কী/ আহা/ যতই হোক মরণকালে বউ-এর ইচ্ছা, সে কি আর ফেলা যায়/
সুতরাং পদ্য লিখতে-লিখতে ইতিমিচিসাহেবের ফর্সা চামড়া হলদে হয়েছে। গোঁফ ঝুলেছে, দাড়ি গজিয়েছে। চাই কি, মাথার ঠিক মাঝ-বরাবর একটি টাক পড়ব-পড়ব করেছে। শেষকালে অনেক কসরত করতে-করতে একটি পদ্যের একটি লাইন তিনি লিখে ফেললেন। লিখে, তাঁর সে কী নিজের মনে মুচকি-মুচকি হাসি/ আনন্দে নিজেই 'ওহো' করে উঠলেন। তারপর নাকের ভেতর খড়কে গুঁজে হাঁচতে-হাঁচতে পড়তে লাগলেন/ যাই বলো আর তাই বলো পদ্য লিখে একটু হাঁচতে না-পারলে যেন লেখাটা জমে ওঠে না/
হাঁচির আরামটা ঠায় তিনদিন নাকের ভেতর সুড়সুড়ি দিল। আর সে এমনই সুড়সুড়ি যে, শেষমেশ পদ্য লেখা তাঁর মাথায় উঠল। সুড়সুড়ির ঠেলায় তিনি সুড়সুড় করে খাতা-কলম গুটিয়ে রেখে শুধু হাসতেই লাগলেন। হাসতে-হাসতে বেদম হয়ে ভাবতে লাগলেন, 'ঘাট হয়েছে বাবা, আর কাজ নেই। এক লাইন লিখেই যখন সুড়সুড়িনির এত ঠেলা, তবে না-জানি দশ লাইন লিখলে কী হয়/' এই কথা ভেবেই তিনি পদ্য লেখায় ক্ষান্তি দিলেন।
কিন্তু থাক সেসব কথা। বলতে গেলে আরব্য রজনীর আর এক সহস্র গল্প-কাহিনি লেখা হয়ে যাবে। তবে কিনা শেষকালে যে ইতিমিচিসাহেব একটি আস্ত ভূত-পাগল হয়ে উঠবেন, এই কথাটা ভাবলেই গা শিরশির করে ওঠে। যেন বিশ্বাসই করতে চায় না মন। তা বাপু বিশ্বাস না করলে আমি আর কী করতে পারি/ কথাটা তো চেপে রাখা যায় না/ কেননা, ব্যাপারটা তো আর হেঁজিপেঁজি বলে উড়িয়ে দেবার নয়, একেবারে স্বয়ং ভূতকে নিয়ে অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানা/ মশাই, পাগল বলে পাগল/ শেষকালে ভূতের খোঁজে তিনি খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনই দিয়ে বসলেন। বিজ্ঞাপনে বেরুল .
একটি ছোটোখাটো ভূত অথবা মোটাসোটা ভূত অথবা ঢেঙা-বেঁটে ভূতের সঙ্গে দোস্তি করিতে চাই। আমার দোস্তি নকল না বিকল এটি পরখ করিবার জন্য আমার ভূত-দোস্ত প্রথমেই আমার নাকে চিমটি কাটিতে পারেন, কিছু বলিব না। পেটে কাতুকুতু দিতে পারেন, হাসিব না। মুখে ফ্যাঁচ করিয়া হাঁচিয়া দিতে পারেন, নাক সিঁটকাইব না। এবং এইসব কাজের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে পারিশ্রমিক দিতেও অপ্রস্তুত থাকিব না। সত্বর যোগাযোগ করিলে, কাজটিও চটপট হইতে পারে।
সত্যি কথা বলতে কী, খবরের কাগজে এমন ভূতের বিজ্ঞাপন দেখে অদ্ভুত সেই লোকটির খোঁজে কত লোকই না হা-পিত্যেশ করেছে। কিন্তু লোকটির হদিশই কেউ করতে পারল না। কেননা, ইতিমিচিসাহেব বিজ্ঞাপন করলেন বটে, কিন্তু কাগজে তাঁর নাম-ঠিকানা দিতেই ভুলে গেলেন। সুতরাং কারো-কারো ভূতের খোঁজ জানা থাকলেও, তাঁকে সেই খোঁজ দিতে কেউ এল না এবং কাউকে তাঁর খোঁজে আসতে না দেখে, ইতিমিচিসাহেব নিজেই কেমন যেন মিইয়ে গেলেন। অথচ তাঁর নিজেরও একবার খেয়াল হল না, 'হায়/ হায়/ বিজ্ঞাপনে এই ঠিকে ভুলটা করে বসেছি/'
আহা/ ভদ্রলোকের বড্ড আশা ছিল, খবরের কাগজে প্রথম যেদিন বিজ্ঞাপন বেরুবে, সেইদিনই তিনি ভূত দেখবেন। দেখতে দেখতে একটি পছন্দমতো ভূতকে তিনি সঙ্গী করবেন। তারপর তার পিঠে চেপে হাওয়া খাবেন। কিন্তু সব গুবলেট হয়ে গেল। তিনি মনে মনে বড্ড যাতনা পেলেন। যাতনাটা যখন বড্ড হতে হতে আরও বড্ড হল, তখন তিনি সহ্য করতে পারলেন না। 'কী করা যায়, কী করা যায়', ভাবতে-ভাবতে হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে দেওয়ালে মাথা খুঁড়তে লাগলেন। এমন করে মাথা খুঁড়লে যে মাথাটি ফেটে-ফুটে ফুটি-ভাটা হতে পারে, এ-কথাটি তিনি ভাবলেন না। তিনি খুঁড়েই চললেন। মাথা যখন তাঁর ঠিক ফাটব-ফাটব করছে, তখনই তাঁর দরজায় ঠেলা পড়ল। দেওয়াল ছেড়ে তিনি দরজায় ছুটে গেলেন। দরজা খুলে দেখেন, একজন পোস্টম্যান। পোস্টম্যান হাতটি এগিয়ে বলল, 'চিঠি'। ইতিমিচিসাহেবের তর সইল না। ধাঁ করে পোস্টম্যানের হাত থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নিয়ে আনন্দে খলখলিয়ে বলে উঠলেন, ভূতের চিঠি, ভূতের চিঠি।'
পোস্টম্যানের তো চক্ষু কপালে। চিঠি-ফিটি ফেলে দে-লম্বা/
ইতিমিচিসাহেব ঝটপট চিঠির খাম খুলে ফেলে চটপট পড়তে লাগলেন .
প্রিয় বিজ্ঞাপনদাতা মহাশয়,
খবরের কাগজে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে আপনার কোনো ঠিকানা না থাকায়, আপনার সহিত যোগাযোগে বিলম্ব ঘটিল। অনেক হাঁটাহাঁটি, খাটাখাটি ও লাঠালাঠির পর আপনার ঠিকানাটি দৈবক্রমে জোগাড় করিতে পারিয়াছি। আপনি ভূতের সহিত দোস্তি করিতে চান জানিয়া যারপরনাই উৎসাহিত হইয়াছি। শুনিয়া নিশ্চয়ই সুখী হইবেন, আমরা ভূতের কারবার করিয়া থাকি। ভূত সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের প্রভূত অভিজ্ঞতা। আপনার কী ধরনের ভূতের প্রয়োজন সে-সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করিবার জন্য আমাদের কারবারস্থলে আপনাকে একটি ইন্টারভিউ দিবার জন্য আহ্বান করিতেছি। আগামী রবিবার সকাল দশটায় অতি অবশ্যই উপস্থিত থাকিবেন। মনে রাখিবেন, শনি-মঙ্গলবারে কোনো ইন্টারভিউ আমরা নিই না। কারণ ওইদিনে ভূতেদের মেজাজের ঠিক থাকে না। কারণে, অকারণে ঘাড়ে চাপিয়া বসে এবং একবার চাপিলে নামিতে চায় না। যাহা হউক, অবস্থা বুঝিয়া ব্যবস্থা করিতে অনুরোধ করা যাইতেছে।
ধন্যবাদ,
ইতি
নাম ও ঠিকানা ইত্যাদি
চিঠি পেয়ে ইতিমিচিসাহেব আহ্লাদে আট দুগুণে ষোলোখানা হয়ে নাচলেন, হাসলেন, চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করলেন। তারপর যথাদিনে তিনি যথাস্থানে ছুটলেন।
তাঁকে বেশি কষ্ট করতে হল না। ঠিকানাটা তাঁকে ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিল। এবং দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন, পাঁচ-পাঁচজন লোক তাঁর জন্যে ঘরের মধ্যে হাঁ করে বসে আছেন। ঢুকেই তিনি মধ্যিখানে যে লোকটিকে দেখলেন, মনে হল, ইনিই দলের কর্তা। কেননা, ইতিমিচিসাহেব ঘরে ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গে কর্তা-ব্যক্তিটি চোখের চশমা খুলে ফেলতেই, তার দেখাদেখি সবাই চশমা খুলে ফেলল। কর্তা-ব্যক্তিটি ইতিমিচিসাহেবের মুখের দিকে কটমট করে তাকাতে, সবাই কটমট করে চাইল। তারপর কর্তা-ব্যক্তিটি আচমকা দাঁত বার করে হি-হি করে হেসে উঠলেন। অমনি সবাই দাঁত বার করল, হি-হি করে হেসে উঠল। হঠাৎ হাসি শুনে ইতিমিচিসাহেব হকচকিয়ে গেলেন। এবং অনেকটা হাঁদার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন তাদের মুখের দিকে। তারপর তাঁর নিজেরই হাসি পেয়ে গেল। তিনিও হেসে ফেললেন। হি-হি করে না হেসে তিনি হো-হো করে হেসে উঠলেন। একঘর অচেনা লোকের সামনে, এভাবে হাসাটা উচিত, না অনুচিত, সঠিক, না বেঠিক এ-সব কথা তিনি না-ভেবেই হো-হো করতে লাগলেন। হঠাৎ কর্তা-ব্যক্তিটির মুখের হাসি দাঁতের ফাঁকে আটকে গেল। তিনি ভীষণরকম ধমক মেরে লাফিয়ে উঠলেন। ইতিমিচিসাহেব ধমক খেয়ে ভড়কে গেলেন। যাঃ বাবা/
কর্তা-ব্যক্তিটি তেমনি করে আবার ধমক মেরে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইন্টারভিউ দিতে এসে অমন হ্যা-হ্যা করে হেসে, নাচন-কোঁদন করতে আপনার লজ্জা করছে না?'
ইতিমিচিসাহেব কাঁচুমাচু হয়ে উত্তর দিলেন, 'আপনারাও হাসলেন তো, তাই/'
কর্তা-ব্যক্তিটি তেমনি খ্যাঁকখেঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমাদের হাসির কারণটা জানা আছে?'
ইতিমিচিসাহেব চটপট উত্তর দিলেন, 'আছে বইকি/ হাসি পাচ্ছে বলেই তো হাসছেন।'
কর্তা-ব্যক্তিটি নাকের ভেতর দিয়ে ফোঁস করে একটা শব্দ বার করে বললেন, 'অতই সোজা/ এ কী মশাই রসগোল্লার হাঁড়ি। খিদে পাচ্ছে আর টপটপ করে গালে পুরছি। হাসি পেলে তো সবাই হাসে। কিন্তু শুনে রাখুন, হাসি পাচ্ছে না বলেই আমরা হাসছি।'
ইতিমিচিসাহেব একেবারে সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠলেন, 'আমারও বোধ হয় তাই। যতক্ষণ হাসি পাচ্ছিল, হাসিনি। যেই পেল না, হেসে ফেললুম।'
'চোপ/' হঠাৎ কর্তা-ব্যক্তিটি ভয়ংকরভাবে চোখ রাঙিয়ে কড়কে উঠলেন।
ইতিমিচিসাহেব কড়কানিটা সামলাতে গিয়ে চমকে উঠলেন। অতগুলো লোকের সামনে ধমক খেয়ে চমকে ওঠাটা খুবই লজ্জার কথা/ সুতরাং তাঁর চমকানোর বহরটা কেউ দেখে ফেলল কি না, এইটা দেখার জন্যেই তিনি ঠারে-ঠারে এর-ওর মুখের দিকে উঁকি মারলেন। তিনি হঠাৎ দেখলেন, ওই পাঁচজনের একজন, ইতিমিচিসাহেবের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। লোকটা নিজের গালদুটো ফুলকো লুচির মতো ফুলিয়ে একেবারে ভোম্বলদাস হয়ে আছে। ইতিমিচিসাহেব তাকে দেখে তো অবাক। ও বাবা/ বলা নেই, কওয়া নেই লোকটা ইতিমিচিসাহেবেরই মুখের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর গাল-ফোলা ভোম্বলদাসমশাই ফোলা গালের হাওয়াটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ফুস-ফুস করে ছাড়তে-ছাড়তে মুখে এমন একটা বিটকেল শব্দ করে উঠল, যেন মনে হল, মাঝ-রাস্তায় এই মাত্তর একটা মিনি বাসের চাকা ফেটেছে/ ইতিমিচিসাহেবের তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া/ তিনি ভীষণ আঁতকে উঠেছেন। আঁতকে উঠে সেই কর্তা-ব্যক্তিটির একেবারে কোলের ওপর হুমড়ি খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
যে কর্তা-ব্যক্তিটি এতক্ষণ তিরিক্ষি মেজাজে ছিলেন টং, ইতিমিচিসাহেব তাঁর কোলের ওপর হুমড়ি খেতেই, তিনি কোলের দোলনা দুলিয়ে-দুলিয়ে গান ধরলেন। যেমন করে মায়েরা ছেলেকে ঘুম পাড়ান তেমনি করে, তেমনি সুরে .
দোল দোল দুলুনি,
যেন হাই তুলুনি,
দুধ খাবে এখুনি,
ঝোলে ঝাল মেখুনি।
মারব গাঁট্টা,
করলে ঠাট্টা/
ইতিমিচিসাহেব দুলতে-দুলতে গান শুনতে লাগলেন এবং বেশ খানিকটা অবাক হয়েই ভাবতে লাগলেন, 'এ কী রে বাবা, এ আবার কী ধরনের ইন্টারভিউ/'
কর্তা-ব্যক্তিটি যতই গান গাইছেন, অন্য সবাই ততই তালি বাজাচ্ছে। সেইসব দেখতে দেখতে ইতিমিচিসাহেবের হঠাৎ এমন সুড়সুড়ি লেগে গেল/ লাগল-লাগল একেবারে গোঁফের খাঁজে। ইতিমিচিসাহেব গোঁফটাকে খামচে ধরে চুলকাতে যাবেন কী, কর্তা-ব্যক্তিটি গান থামিয়ে তাঁর হাতটা ধরে ফেললেন। তারপর ইতিমিচিসাহেবের দাড়ির ভেতর আঙুল গলিয়ে আদর করলেন, 'ও আমার ফুলকপি রে, ওরে আমার বিশ্বনাথের—'
ইতিমিচিসাহেব আদরের ঠেলায় পাগল হলেন প্রায়। চিৎকার করে বলে উঠলেন, 'থামুন মশাই, আমার গোঁফ চুলকাচ্ছে।'
কর্তা-ব্যক্তিটি ইতিমিচিসাহেবের হাতটা তেমনি চেপে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, 'কতখানি?'
ইতিমিচিসাহেবের মেজাজ গেল বিগড়ে। বললেন, 'কতখানি কী মশাই/ ভীষণ চুলকাচ্ছে।'
তবু কর্তা-ব্যক্তিটি ইতিমিচিসাহেবের হাত ছাড়লেন না। জিজ্ঞেস করলেন, 'ভীষণটা কেমনতর? জলের মতন তরল, না, বরফের মতো ঠান্ডা?'
ইতিমিচিসাহেব আরও রেগে গেলেন। বললেন, 'কী সব আলতু-ফালতু বলছেন/'
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'আলতু-ফালতু কত বড়ো?'
থাকতে না পেরে ইতিমিচিসাহেব বলে বসলেন, 'আপনার নাকটা যত বড়ো।'
'আমার নাকের ওজন ক- হাত, জানেন?'
''আপনার নাকটা কি মশাই মার্কিন কাপড় যে পাল্লা দিয়ে ওজন করে হাত দিয়ে মাপব? পাগলামির জায়গা পাননি। হাত ছাড়ুন, গোঁফ চুলকাই।'
অমনি একঘর লোকের মাথায় যেন বাজ পড়ল। একসঙ্গে সব কজন কর্তা-ব্যক্তিটিকে চিৎকার করে নালিশ করল, 'স্যার, আপনাকে পাগল বলল/'
কর্তা-ব্যক্তিটি অমনি ইতিমিচিসাহেবের দাড়ির ভেতর থেকে হাত সরিয়ে লম্বা গোঁফটা খচাং করে খামচে ধরলেন। তারপর তেড়েমেড়ে টানতে-টানতে বললেন, 'ইন্টারভিউ দিতে এসে পাগল বলা/'
একঘর লোক হই-হই করে উঠল। ইতিমিচিসাহেব গোঁফের টানে দাঁড়িয়ে উঠে, তিড়িং তিড়িং লাফাতে লাগলেন আর যন্ত্রণায় চেঁচাতে লাগলেন। এমন হাল হল, মনে হল, এই বুঝি তাঁর গোঁফজোড়া উপড়ে পড়ে। শেষে থাকতে না পেরে লোকটার পেটে ধাঁই করে এক ঢুঁ মারলেন। লোকটা যেই না ঢুঁ খাওয়া, আর দেখতে/ পলকে ইতিমিচিসাহেবের গোঁফ ছেড়ে, নিজের নাক টিপে বসে পড়লেন। অমনি সঙ্গে-সঙ্গে অন্য কজন হা হা করে উঠল। কর্তা-ব্যক্তিটির ঘাড়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে চেঁচাতে লাগল, 'কী হয়েছে স্যার, কোথা লাগল স্যার, কী টিপব স্যার, কোথা টিপব স্যার?' ঢুঁ খেয়ে লোকটা যদিও বাঁচে, কিন্তু তার সাঙ্গোপাঙ্গদের ন্যাকামির ঠেলায় ভদ্রলোকের প্রাণপাখিটি এই বুঝি খাঁচা ছেড়ে উড়ে পালায়।
প্রাণপাখি না পালালেও তাল বুঝে ইতিমিচিসাহেব পালাবার ফাঁক খুঁজতে লাগলেন। ফাঁক তিনি পেলেন এবং পালাতেও গেলেন। কিন্তু পারলেন না। কেননা, যাঁর পেটে তিনি ঢুঁ মারলেন, সেই কর্তা-ব্যক্তিটিই তাঁকে দেখে ফেললেন। তিনি সঙ্গে-সঙ্গে নিজের নাক ছেড়ে ইতিমিচিসাহেবের প্যান্টের পকেটটা খপ করে খামচে ধরলেন। তারপর লেগে গেল টানাটানি।
এ-কথা কে না জানে, ইতিমিচিসাহেব এখন পালাবার যতই চেষ্টা করুন তিনি পালাতে পারছেন না। একঘর লোক যখন হুড়মুড় করে তাঁর ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে তাঁকে পাকড়াও করে ফেলল, তখন তাঁর ট্যাঁ-ফুঁ করার ক্ষমতাই রইল না। তিনি বিনা বাধায় ধরা পড়লেন এবং ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন, তারপর ভাবতে লাগলেন, 'এরপর বোধ হয় তাঁর গর্দান যাবে/'
তাঁর গর্দান অবিশ্যি গেল না। কিন্তু সেই কর্তা-ব্যক্তিটি যে খুব ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন, সে কথা বোঝা গেল/ লোকটার মুখখানা দেখেই তো ইতিমিচিসাহেবের চক্ষু কপালে/ তিনি যেন ফুঁসছেন/ সববশরীর থরথর করে কাঁপছে/ রক্ত-রাঙা চোখ দুটো তাঁর কটমট করছে/ লোকটা ঝট করে ইতিমিচিসাহেবের গলাটা খামচে ধরে বলে উঠলেন, 'আমার পেটে মারিস ঢুঁ—থু/ তোর মাথায় মারব গাঁট্টা—চোট্টা/'
চোট্টা বলতেই ইতিমিচিসাহেব তো ভীষণ খাপ্পা। তেড়ে-ফুঁড়ে বলে উঠলেন, 'খবরদার/ চোট্টা বললে থাপ্পড় মেরে গালে দোক্তা পুরে দেব।'
'দে/ দেখি কত ক্ষমতা/'
'দেবই তো/'
তারপর আবার ধস্তাধস্তি লেগে গেল। ধস্তাধস্তি করতে-করতে নিজেদের মধ্যে কথার তুবড়ি ছুটতে লাগল।
ইনি বলেন, 'তবে রে/'
উনি বলেন, 'কী করবি তুই/'
ইনি বলেন, 'আমায় চোট্টা বলা/'
উনি বলেন, 'আমার পেটে ঢুঁ মারা/'
'ধুত তেরি/' বলে, ধাঁ করে ইতিমিচিসাহেব গলার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'ইস্টুপিট, চোরাকারবারি করার জায়গা পাস না/ ভূতের লোভ দেখিয়ে আমায় ছিনতাই করতে চাস/ দেব ঠাস করে এক চড়। যত সব অসভ্য ছেলে/'
অসভ্য বলতে কর্তা-ব্যক্তিটি ভীষণ অপমানিত বোধ করলেন। তিনি গলা ফাটালেন, 'কী, আমরা অসভ্য ছেলে/ কোলে বসিয়ে আদর করে গান শোনালুম, এই তার পুরস্কার/ এই তোর ঘাড় মটকালুম/'
ইতিমিচিসাহেবও ছাড়বার পাত্তর নন, তিনিও চেঁচালেন, 'এই তোর নাক কামড়ালুম/'
আবার শুরু হয়ে গেল চেল্লাচেল্লি।
ওদের ঝগড়াটা যখন সাংঘাতিক হয়ে উঠেছে, মুখ থাকতে যখন আবার হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল, তখন হল আর এক কাণ্ড। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে একজন ভদ্রলোক ঢুকলেন। তিনি ঢুকেই ধমক দিলেন, 'থামোশ, থামোশ।'
কেউ থামল না। তাঁর কথাটা কেউ কানেই নিল না।
তখন তিনি আবার হাঁকলেন, 'অর্ডার, অর্ডার।'
তাঁর ইংরিজি-হাঁক শুনে ঘরসুদ্ধ লোক চটপট শান্ত হয়ে গেল। ইতিমিচিসাহেব নতুন লোকটির দিকে তাকিয়ে অনেকটা ক্ষিপ্ত বাঘের মেসোর মতো চক্ষু রক্তবর্ণ করে হাঁপাতে লাগলেন। সেই রক্ত-চক্ষুর ফাঁক দিয়ে ইতিমিচিসাহেব দেখলেন, নতুন এই লোকটির সারা গায়ে কালো রঙের জোববা ঝোলানো। মাথায় ঝাঁকড়া চুল আঁটা একটা টুপি।

আই অ্যাম জজসাহেব।আই লাইক নো মারামারি।
তিনি ঘরের মাঝখানের চেয়ারটায় বসে পড়লেন। তারপর আবার ইংরিজিতে বলতে শুরু করলেন, 'হোয়াট কাণ্ডকারখানা/ আই অ্যাম জজসাহেব। আই লাইক নো মারামারি। ডোনট ঘাবড়াও/ আই ডু সব ঠিকঠাক/'
জজসাহেরের ইংরিজি শুনে ইতিমিচিসাহেবের তো চক্ষুচড়কগাছ। তিনি তো সারা দুনিয়ায় ঘুরেছেন, কত ইংরিজি শুনেছেন, কত বলেছেন/ সুতরাং জজসাহেবের মুখে এই খিচুড়ি-মার্কা ইংরিজি শুনে তিনি বোমফাটার মতো হা-হা করে হেসে উঠলেন।
একঘর লোক সেই হাসি শুনে তো ভয়ে তটস্থ। এই রে, সববনাশ করেছে/ মাননীয় জজসাহেবের সামনে হাসছে/ নিশ্চয়ই এক্ষুনি লোকটার ফাঁসির হুকুম হয়ে যাবে/ হবে কী, এই হল বলে/
জজসাহেব সত্যিই ধমক দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'এই, হোয়াই আমার সামনে হাসি?'
ইতিমিচিসাহেব একটুও ভয় না-পেয়ে বলে ফেললেন, 'ইউ আর যে স্যার ইংরিজির কাঁসি/'
জজসাহেব বসে ছিলেন, তিড়িং করে স্প্রিং-এর মতো লাফিয়ে উঠলেন। বললেন, 'হোয়াট, আই কাঁসি/ দেন ইউ আর একটি রাধাকেষ্টর বাঁশি।'
ইতিমিচিসাহেব তেমনি ঠান্ডা মাথায় বললেন, 'আপনি তা হলে স্যার বাঁশির ফুটো/'
এবার জজসাহেব রেগে আগুন, তেলে বেগুন। রাগটা এমন সাংঘাতিক আকার ধারণ করল যে, জজসাহেবের মুখ দিয়ে আর কথা বেরয় না। কথা বলতে গিয়ে ''আই-আই'' করে তাপ্পি খেতে লাগলেন আর ইতিমিচিসাহেবের দিকে আঙুল উঁচিয়ে মুখ-চোখ লাল করে ফেললেন। আঁতে ঘা লেগেছে তো/ যতই হোক জজসাহেব বলে কথা। তাঁকে ফুটো বলা/
জজসাহেবের সেই রেগে কাঁই চেহারা দেখে ইতিমিচিসাহেব আরও হেসে উঠলেন। আর দেখতে, জজসাহেবও উত্তেজনায় ফটফট করতে লাগলেন। এই রে, এই বুঝি ফেটে পড়েন/ এক্ষুনি বুঝি মুচ্ছো যান/ মুখের কথা মুখে আটকে গিয়ে তাঁর যেন দম ফুরিয়ে যাচ্ছে। জজসাহেবের উদবেগজনক অবস্থাটা দেখতে পেয়েই সেই কর্তা-ব্যক্তিটি জজসাহেবকে জাপটে ধরতেই জজসাহেব সিধে বাংলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, 'লোকটার নাম কী রে?'
'ইতিমিচি।'
'লোকটার বাড়ি কোথা রে?'
'ধাপার মাঠ।'
'লোকটা শোয় কোথা রে?'
'চিড়িয়াখানায়।'
'লোকটা খায় কোথা রে?'
'স্পেশাল বাসের ছাতে।'
এই না-শুনে জজসাহেব নিজের জিবটি একবার বার করেন, আবার মুখের ভেতর টেনে নেন। আবার বার করেন, আবার টানেন। পাঁচবার এমনি করে জিব দেখিয়ে, জিব ঢুকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন। করতে-করতে জজসাহেবের মুখখানা ভয়ে চ্যাপটা হয়ে গেল। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, 'লোকটা ভূত রে/' বলেই চৈতন্য হারালেন।
অমনি সবাই সঙ্গে-সঙ্গে ভয়ে ইতিমিচিসাহেবের দিকে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল, 'ভূত/ ভূত/'
ইতিমিচিসাহেব ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন।
'ভূত/ ভূত/'
ইতিমিচিসাহেবের চোখ দুটো ভূতের মতো চাকা-চাকা হয়ে গেল।
'ভূত/ ভূত/'
ইতিমিচিসাহেব আঁতকে উঠলেন।
'ভূত/ ভূত/'
ইতিমিচিসাহেব যতবারই ভাববার চেষ্টা করলেন, তিনি ভূত না, ততবারই লোকগুলো তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠছে, 'ভূত/ ভূত/'
ইতিমিচিসাহেবের কেমন যেন সব তালগোল পাকিয়ে গেল। হঠাৎ যেন তাঁর বুকের ভেতরটা গুড়গুড় করে উঠল। মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করতে লাগল। ভূত যে কী, তা তিনি আগে দেখেননি বলে তাঁর মনে হল, হয়তো-বা হবে তিনিও একটি ভূত/ তাঁর মনে হল, তিনি বোধ হয় এখন ভূতের মতোই ভাবছেন। তিনি হেসে উঠলেন। ভাবলেন, ভূত বোধ হয় এমনি করেই হাসে। তিনি নাচলেন। তাঁর হাত-পাগুলো কিলবিল করে উঠল। তিনি হাত-পা ছুড়ে চিৎকার শুরু করে দিলেন, হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ/ আপাতত তিনি যেন সতি-সত্যি ভূত হয়ে গেলেন। তাই না দেখে ঘরসুদ্ধ লোক, ভয়ে মারল হাঁক, 'ভূত/ ভূত/'
ইতিমিচিসাহেব ছাড়লেন ডাক, 'আমি ভূত/ আমি তোদের পেট খামচাব, পিলে ফাটাব, নাকের ভেতর লঙ্কা গুঁজে দেব/'
আর যায় কোথা/ চিৎকার-চেঁচামেচিতে হঠাৎ জজসাহেবের চৈতন্য ফিরে এসেছে। 'ওরে বাপ রে, মা রে' বলে দিলেন ছুট। ছুটতে-ছুটতে চেঁচালেন, 'ঘরে শেকল এঁটে ভূতটাকে আটকে রাখ, নইলে ঘাড় মটকাবে/'
অমনি সবাই পড়িমরি ঘর থেকে দুমদাম বেরিয়ে পড়ে, বাইরে থেকে শেকল তুলে, ইতিমিচিসাহেবকে বন্দি করে ফেলল। ইতিমিচিসাহেব ঘরের মধ্যে আটকা পড়ে ধাঁই-ধপাধপ ঘরের দোরে ধাক্কা মারতে লাগলেন, আর গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগলেন।
এখন তিনি খুবই ঘাবড়ে গেলেন। কেননা, ভূতের খোঁজ নিতে এসে তিনি নিজেই এখন ভূত হয়ে ধরা পড়েছেন। একেই বলে কপাল/ অবিশ্যি তিনি যদি জ্যোতিষঠাকুর হতেন তবে নিজের ভূত-ভবিষ্যৎ আগেই জেনে ফেলতেন/ যাকগে যাক, সে যা হবার তাই হয়েছে। কিন্তু এখন তিনি ঘর-বন্দি হয়ে কী করেন। তিনি বন্দি-ঘরে হাঁপিয়ে উঠলেন। একবার ঘরের দোর ঠেলেন। একবার জানলায় কান পাতেন। টেবিলের ওপর লাফিয়ে ওঠেন। চেয়ার টানেন। মাটির ওপর শুয়ে পড়ে গড়াগড়ি খান। কিছুতেই কিছু হল না। শেষে তাঁর খিদে পেয়ে গেল। এবং তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, 'দরজা খোলো, আমার খিদে পেয়েছে।'
কোনো সাড়া নেই, শব্দও নেই। কারো রা-ও নেই, ফিসফাসও নেই। তিনি বুঝলেন, তাঁকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে সবাই কেটে পড়েছে/ তখন তাঁর হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল। কিন্তু তিনি কাঁদলেন না। ভাবলেন, কাঁদাটা কি ঠিক হবে/ একটা এত বড়ো সমর্থ-ভূত ঘরের মধ্যে কাঁদছে, এটা শুনলেই বা লোকে বলবে কী। সুতরাং তিনি না-কেঁদে ঘরের মধ্যে নাচতে-নাচতে হাসতে লাগলেন।
কতক্ষণ তিনি নাচানাচি আর হাসাহাসি করলেন তিনি নিজেই জানেন না। তিনি শুধু মালুম পেলেন তাঁর খিদেটা বেড়েই যাচ্ছে। অগত্যা তিনি থামলেন এবং শিউরে উঠলেন। তিনি যেন হঠাৎ শুনতে পেলেন ফুটফাট শব্দ। তিনি কান খাড়া করলেন। শব্দটা আবার শুনতে পেলেন। তিনি দরজার দিকে চমকে তাকালেন। কেউ বুঝি দরজা খুলছে/ তিনি ঝুপ করে ঘরের কোণে লুকিয়ে পড়লেন। আর ঠিক তক্ষুনি টুপ করে তাঁর মাথার ওপর একটি টিকটিকি পড়ল। ও হরি, ইনিই সেই অকম্মের ধাড়ি/ টিকটিকিটা তাঁর মাথায় পড়তেই তাঁর বুকের ভেতরটা ভয়ে ধক করে কেঁপে উঠল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, 'ওরে বাবা রে/' তারপর টিকটিকিটা মাথা থেকে মাটিতে লাফিয়ে পড়তেই তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। অবিশ্যি টিকটিকিটাকে দেখে তাঁর বুকের ধকধকানিটা রাগে ফোঁসফোঁসিয়ে উঠল। তিনি টিকটিকিটাকে ধরতে গেলেন। টিকটিকিটা মাটি ছেড়ে দেওয়ালে মারল ছুট। তারপর ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে ভোঁ-কাট্টা/ তিনিও টেবিলের ওপর মারলেন লাফ। লাফ মেরে ঘুলঘুলির ভেতর চোখ গলিয়ে দিলেন। যাঃ চ্চলে/ একী কাণ্ড/ এ যে রাত হয়ে গেছে/ তিনি তোথ। মানে, তিনি তাহলে ঘরের ভেতর অতক্ষণ আটকে আছেন/ সেই সকাল থেকে এখন রাত কটা হল তিনি জানেন না। নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ। তবে কতক্ষণ হলে যে অনেকক্ষণ হয় তিনি তার হিসাবও করতে পারছেন না। তাই তিনি হিসাব না-করে, ঘুলঘুলির ফাঁকে চোখ গলিয়ে বাইরেই চেয়ে রইলেন। এতক্ষণ চোখদুটো তাঁর চার দেওয়ালের বন্ধ ঘরে অন্ধকারে আটকে ছিল। যাক, যাক, তবু ভালো, এখন একটু খোলা হাওয়ার ফুরফুরুনি নাকের গর্তে খেলতে পারছে। আঃ/ কিন্তু খিদে সে তো বাগ মানছে না। ভূতের খিদে তো/ খোলা আকাশের বাতাস নাকের গর্তে ধাক্কা মারলেই, পেটের ভেতরটাও খাই-খাই করে ওঠে। তিনি ঘুলঘুলিতে মুখ ঠেকিয়ে খিদের চোটে উঁঃ/ উঁঃ/ করে কোঁকাতে লাগলেন। কিন্তু কপাল এমন, আশ-পাশের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি সবই ঠাওর হচ্ছে, অথচ একটিও প্রাণী নজরে পড়ছে না। আর নজরে পড়লেই-বা কী/ ডাকলে যে সাড়া দেবে, তারই-বা ভরসা কোথায়/ ভূতের নাম শুনলেই লোকের হাত-পা সেঁধোয় পেটের মধ্যে, ডাক শুনলে আর রক্ষে আছে/ তাই বলে তো আর পেটে খিদে আর মুখে লাজ নিয়ে বসে থাকা যায় না।
দ্যাখো, বলতে-বলতেই রাস্তা দিয়ে একটি ছেলে যাচ্ছে/ হায়/ হায়/ গেল-গেল শেষকালে একটা এঁটকুলে ছেলে গেল। মানে নেহাতই বাচ্চা ছেলে/ ছেলেটা বেঁটকুলে হলেও কথা ছিল। অন্তত খানিকটা তো কাজে আসত/ তাই বলে তো আর গাছের পক্ষী হাতে বসলে শখ করে কেউ ভোর আকাশে উড়িয়ে দেয় না। তাই তিনি এঁটকুলে ছেলেটাকে ডেকেই বসলেন, 'ও ভাই এঁটকুলে—থুড়ি/ ও ভাই, ও ভাই।'
ও-ভাই চমকে ঘুরে দাঁড়ায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে সবদিক ফাঁকা। সুতরাং সে আবার চলতে শুরু করল।
তিনি সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, 'আমি ইদিকে, ইদিকে।'
ছেলেটি আবার দাঁড়াল। বলল, 'কোন দিকে? কোন দিকে?'
'আমি এই যে।'
'দেখতে পাচ্ছি না।'
'আমি এই যে ঘুলঘুলি/'
যে-ঘুলঘুলির ফাঁক দিয়ে তিনি ডাকছিলেন, ছেলেটি সেই ঘুলঘুলির দিকে তাকাল। তিনি এবার ছেলেটির মুখখানা স্পষ্ট দেখতে পেলেন। না, ছেলেটিকে নেহাতই এঁটকুলে মনে করে তিনি বোধ হয় এতক্ষণ ভুল করে এলেন। তিনি স্পষ্ট দেখলেন, ছেলেটি এঁটকুলেও নয়, বেঁটকুলেও নয়। ছেলেটি ছেলেরই মতো। তাঁর ভারী ভালো লাগল। তিনি ভাবলেন, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ছেলেটিকে ভোলালে, নিশ্চয়ই তাঁর কথা শুনবে। তাই তিনি নিজের হাতটা ঘুলঘুলির ফোঁকর দিয়ে বার করে বললেন, 'আমায় দেখা যাচ্ছে?'
ছেলেটি খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, 'ও-হো-হো, তাই বলুন/ ওখানে কী করছেন?''
'হাওয়া খাচ্ছি।'
'ঘুলঘুলি দিয়ে?'
তিনি বললেন, 'এখানকার হাওয়াটা বেশ ইয়ে, মানে, হাওয়ার মতন/'
ছেলেটি হাসতে-হাসতেই বলল, 'ঘুলঘুলির হাওয়া তো/ সে-হাওয়া ঘুলঘুলির মতনই তো হবে। তা ডাকছেন কেন?'
ইতিমিচিসাহেব এবার আমতা-আমতা করে বললেন, ''ইয়ে, আমি তো ভূ—' বলতে গিয়েই থমকে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'না—।' ইস/ এক্ষুনি তিনি বলে ফেলেছিলেন, তিনি ভূত।
ছেলেটি বলল, 'ওকি/ অমন 'না' বলে আঁতকে উঠলেন কেন?'
তিনি এবার কাঁচুমাচু হয়ে উত্তর দিলেন, 'ও আমার এমনি মাঝে-মাঝে হয়।'
'অসুখ?' ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।
'না।' তিনি উত্তর দিলেন।
'তবে?'
তিনি কথাটা ঘোরাবার জন্যে অন্য কথা বললেন, 'না, আমি তো ঘরে ঢুকলুম।'
ছেলেটি বলল, 'তাতে কী হয়েছে?'
তিনি বলেই চললেন, 'আমি চেয়ারে বসলুম।'
ছেলেটি বলল, 'চেয়ার থাকলে, তো সবাই বসে।'
'আমি বইপত্তর পড়তে লাগলুম। তারপর হঠাৎ হল কী, আমার ঘরের দরজায় শেকল আটকে গেল। আর আমি এই ঘরে আটকা পড়ে গেলুম।'
ছেলেটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'শেকলটা আপনা-আপনি আটকে গেল/'
তিনি বললেন, 'তাই তো।'
ছেলেটি বলল, 'এ যে তাহলে দেখছি ভূতুড়ে কাণ্ড/'
'ভূতুড়ে কাণ্ডই তো/ নইলে আমার খিদে পেয়ে যায়/' তিনি উত্তর দিলেন।
ছেলেটি এবার হেসে ফেলল। জিজ্ঞেস করল, 'খিদে পেলে সেটা আবার ভূতুড়ে কাণ্ড হতে যাবে কেন?'
তিনি আবার বলে ফেলছিলেন, 'আমি যে ভূ—' থমকে গেলেন। তারপর জিব কেটে নিজের মনেই বিড়বিড় করলেন, 'ইস/ আর একটু হলেই আবার মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়েছিল/'
ছেলেটি তাঁকে থামতে দেখে আবার জিজ্ঞেস করল, 'কী হল? আবার থামলেন কেন?'
তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'না তো, থামিনি তো। জিব কামড়ে ফেলেছি।'
'কেটে গেল নাকি?'
'না, না।'
'তাহলে কী বলছিলেন?'
'বলছিলুম,' ইতিমিচিসাহেব একটু থামলেন, ভাবলেন, তারপর আবার বললেন, 'বলছিলুম, তুমি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবে?'
'কী সাহায্য?'
'ঘরের শেকলটা যদি একটু খুলে দাও/'
'তাতে আমার কী লাভ?'
'তুমি হেঁটে যাচ্ছ, কষ্ট হচ্ছে। তোমায় পিঠে নিয়ে পৌঁছে দেব।'
'আপনার কষ্ট হবে না?'
'ও আমার অভ্যেস আছে।'
'ঠিক তো?'
'মিথ্যে বলি না আমি।'
'তবে দেখি, খুলতে পারি কি না।' বলেই ছেলেটি দরজা খুলতে ছুটে এল।
ইতিমিচিসাহেব টেবিল থেকে নীচে লাফিয়ে দাঁড়ালেন। দরজার শেকল ঝনাত করে খুলে গেল। তিনি দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে পড়লেন। বাইরে বেরিয়ে তিনি ছেলেটির দিকে একবার তাকালেন, তারপর মারলেন দৌড়।
ছেলেটি চেঁচিয়ে উঠল, 'ও মশাই, ও মশাই, পালাচ্ছেন কেন?'
মশাই-এর বয়ে গেছে। ঊর্ধ্বশ্বাসে দে-লম্বা/
ছেলেটিও ছুটল। কিন্তু ধরতে পারল না। তবু থামলও না।
ইতিমিচিসাহেব অনেকটা ছুটে এসে ভাবলেন, 'যাক, বাঁচা গেল। ঘর থেকে মুক্ত হলুম, ছেলেটাকেও ভড়কি দিলুম।' ভেবে তিনি দম নিলেন। কেননা, এতটা ছুটে এসে তিনি হাঁপিয়ে পড়েছেন। একটু জিরোবেন বলে দাঁড়ালেন।
'কী মশাই?' আচমকা ছেলেটির গলার স্বর।
ইতিমিচিসাহেব চমকে উঠেছেন। ঘুরে দেখেই তিনি আবার পালাতে গেলেন। ছেলেটি ঝট করে তাঁর মুখের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, 'আমি তো জানি, ভদ্রলোকের এক কথা। তা আপনি কেমন ভদ্রলোক মশাই? আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালাচ্ছেন?'
তিনি গলাটাকে একটু চড়িয়ে, একটু খিঁচুনি-খিঁচুনি সুরে বলে উঠলেন, 'কে বলেছে আমি ভদ্রলোক/ আমি ভূত/'
ছেলেটি হেসে ফেলল।
তিনি চটে উঠলেন। এতক্ষণ তিনি ছেলেটিকে 'তুমি-তুমি' করছিলেন, এবার 'তুই-তুই' করতে শুরু করে দিলেন। এবং ধমকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমি যে এমন খিঁচিয়ে খিঁচিয়ে কথা বলছি, তোর ভয় করছে না? তুই ঘুমোস কখন?'
সে বলল, 'যখন ঘুম পায়।'
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কখন তোর ঘুম পায়?'
সে উত্তর দিল, 'তা কী করে বলব, ঘুম পেলেই ঘুম পায়।'
তিনি বললেন এবং বেশ ভয় দেখিয়ে বললেন, 'তুই এক্ষুনি ঘুমো, আমি তোর নাকে চিমটি কাটব। আমি ভূত/'
'আপনি মশাই ভারী চালাক। ভয় দেখিয়ে কথা ঘুরুচ্ছেন।'
'হিঁ-হিঁ-হিঁ/' হঠাৎ দন্ত বিকশিত করে, নাকিসুরে হেসে উঠলেন।
ছেলেটি একটুও ঘাবড়ে না-গিয়ে জিজ্ঞেস করলে, 'একি মশাই/ ভূতেরা বুঝি এমনি করে মুখ ভ্যাংচায়?'
তিনি লাফিয়ে উঠলেন, 'আলবত। তোর পেটে কাতুকুতু দেব। সরে যা আমার সামনে থেকে/'
ছেলেটি বলল, 'না সরব না। আপনার ব্যাপার-স্যাপার দেখে মনে হচ্ছে, আপনি আমার সঙ্গে হুড়কুষ্টি করতে চাইছেন। কথা ছিল, আপনার ঘরে শেকল খুলে দিলে আপনি আমায় পিঠে করে নিয়ে যাবেন। কিন্তু এখন আপনি উলটো-পালটা কথা বলছেন। আমাকে পিঠে নিন।'
'না নেব না,' বেশ ঝাঁঝিয়ে তিনি উত্তর দিলেন। 'এখন আমার খিদে পেয়েছে, আমি খাবার খুঁজব।'
ছেলেটিও তেমনি টরটরিয়ে উত্তর দিল, 'খুঁজতে হবে না। আপনি আমায় পিঠে নিয়ে চলুন। খাবার আমার কাছে আছে।'
'সত্যি নাকি রে,' বলে তিনি একেবারে খুশিতে লাফিয়ে উঠলেন। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কই? কই?'
ছেলেটি বলল, 'এই তো, আমার থলিতে।'
সত্যিই তাই। তার পিঠে যে একটা থলি বাঁধা ছিল, এতক্ষণ সেটার দিকে তাঁর নজরই পড়েনি। ছেলেটি থলির ভেতর হাত পুরতেই দুটো ডালপুরি উঁকি মেরেছে/ তিনি খপ করে খামচে নিয়েই। গপগপ করে গিলতে লাগলেন।
ছেলেটি মুচকি-মুচকি হাসতে-হাসতে বললে, 'ও কী করছেন? ও কী করছেন?' অমন হ্যাংলার মতো গিয়েছেন কেন?'
একটা ডালপুরি পুরে হাউ-হাউ করে তিনি বললেন, 'ভূতেরা এমনি করেই খায়/'
ছেলেটি বলল, 'আপনি যেরকম ছটফট করে খাচ্ছেন, গলায় না আটকে যায়/ আপনার স্থির হয়ে বসে ধীরে-সুস্থে খাওয়া উচিত।'
''খিদে পেলে ওসব উচিত-অনুচিত মনে থাকে না। যদি আর এক-আধখানা তোর থলিতে থাকে তো দিতে পারিস। ডালপুরিটা হয়েছেও ভালো, আর খিদের মুখে লাগছেও দারুণ।'
ছেলেটি বলল, 'থাকতে পারে, দেখছি।' বলে থলিতে হাত গলিয়ে আর একটি ডালপুরি বার করে আনল, বলল, 'এই নিন।'
ইতিমিচিসাহেব আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'ভেরি গুড। বাঁচালি/ উঃ/ যা খিদে পেয়েছিল।' বলে তিনি ডালপুরিটা তারিয়ে-তারিয়ে খেতে লাগলেন।
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার বলুন তো?'
'কীসের?'
'ওই ঘরটায় আটকা পড়লেন কেমন করে?'
'আসলে কী জানিস, আমি একটা ভূতের খোঁজে এসেছিলুম এখানে। যাদের কাছে এসেছিলুম, তারা ভূতের কারবার করে। কিন্তু এসে জানতে পারলুম, আমি নিজেই ভূত। এখন তারা আমায় ঘরে বন্দি করে ফেলল। আমাকে নিয়ে ব্যবসা করার মতলব ছিল তাদের, বুঝলি না/'
ছেলেটি হি-হি করে হেসে উঠল।
হাসি শুনে ইতিমিচিসাহেব বললেন, 'এবার তোর নিশ্চয়ই ভয় লাগছে।'
'মোটেই না।' ছেলেটি উত্তর দিল।
'না আবার/ ভয়টাকে চাপবার জন্যে হাসছ বাছা, সে যেন আর আমি বুঝছি না/'
ছেলেটি তেমনই হাসতে-হাসতে বলল, 'আপনি ভূত হলেও, আপনাকে ভয়-পাওয়া ভূতের মতো মনেই হচ্ছে না/'
'আমি যদি এক্ষুনি তোর ঘাড়ের ওপর চেপে বসি/'
'বসবার আগেই আপনার হাতে আর একটি ডালপুরি ধরিয়ে দেব।'
বলতেই তিনি হেসে উঠেছেন, ছেলেটিও হেসে উঠল। তারপর তিনি হাসতে-হাসতেই বললেন, 'থাকে যদি তবে তাই দে। আর একখানা ডালপুরি খাওয়া যাক।'
আর একখানা ডালপুরি থলি থেকে বার করে, তার হাতে তুলে দিয়ে ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, 'জানতে পারি, আপনি কী ধরনের ভূত? প্রেত, না পেঁচো? বিশাচ, না দানোব?'
তিনি ছেলেটির প্রশ্ন শুনে থতমত খেয়ে গেলেন। মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, 'উঁ' সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বলে উঠলেন, 'আমি ইতিমিচিভূত/'
ছেলেটি এবার হো-হো করে হেসে উঠে বলল, 'এমন ভূতের কথা আমি কখনও শুনিনি।'
তিনি তখনও ডালপুরিটা চিবুচ্ছেন। চিবুতে-চিবুতে বললেন, 'তুই ছোটো ছেলে তো। সব ভূতের কথা সব ছোটোদের জানার কথা নয়/'
ছেলেটি ঘাড় নাড়ল। বলল, 'তাই বুঝি/' তারপর একটু থেমে ইতিমিচিসাহেবের মুখের দিকে চেয়ে বলল, 'হয়তো তাই হবে। সে যাই হোক, পেট ভরেছে?'
'খানিকটা। ভয় নেই আর চাইছি না।' বলে হাসলেন ইতিমিচিসাহেব।
'চাইলেও আর পাচ্ছেন না। থাকলে তবে তো/'
'তুই খাবি না?'
'কী আক্কেল আপনার/ নিজের পেট ভরে যাবার পর জিজ্ঞেস করছেন/ আপনিই তো সব খেয়ে নিলেন।' বলেই ছেলেটি হেসে উঠল।
তিনি লজ্জা পেলেন। তারপর লজ্জায় 'ছিঃ ছিঃ' করে উঠলেন।
ছেলেটি তেমনি হাসতে-হাসতেই বলল, 'আপনার লজ্জার কিছু নেই। আমি আগে খেয়েছি। আমার পেট ভরতি।'
'সত্যি বলছিস?'
'সত্যি।'
'তবে এবার আয়, আমার পিঠে চাপ। আমি তোকে পৌঁছে দিই।'
'পারবেন?'
'যাঃচ্চলে/ আমি ভূত পারব না কী রে/ চাপ না/'
ছেলেটি বলল, 'বেশ দেখি তবে। দেখবেন, আবার ফেলে দেবেন না যেন/' বলে, তাঁর পিঠের ওপর ছেলেটি লাফিয়ে বসল। বসতেই তিনি আচমকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন।
'কী হল?'
'কাতুকুতু লেগে গেছে।'
ছেলেটি তড়াং করে পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে বলল, 'ভূতের আবার কাতুকুতু লাগে নাকি? আপনি তো আচ্ছা ভূত/'
তিনি তখনও খিলখিল করছিলেন। খিলখিল করতে-করতেই বললেন, 'তুই যে আমার সুড়সুড়ির জায়গাটা খামচে ধরলি/ নে, আবার ওঠ/'
আবার ছেলেটি উঠল। উঠতে-উঠতে বলল, 'দেখবেন, হাসতে-হাসতে আমায় আবার ধপাস করে না দেন/'
না, এবার আর তেমন কিছু হল না। তিনি আর হাসলেন না। ছেলেটিকে পিঠে নিয়ে হাঁটলেন। ছেলেটি বলল, 'আপনার কষ্ট হচ্ছে না তো?'
'দুর, তুই একদম ফুরফুরে হালকা।'
মনে হচ্ছিল, অনেক রাতই হয়েছে। কারণ অনেক রাতের মতোই এখন চারিদিক নির্জন, শুনশান। কেউ যেমন নেই, কোনো সাড়াও তেমন নেই। তবে চাঁদ উঠেছে। আকাশ ভরতি আলো মাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। ছেলেটিই আবার কথা বলল। জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কবে মরলেন?'
প্রশ্নটা শুনে ইতিমিচিসাহেব থতমত খেয়ে গেলেন। বললেন, 'আমি মরিনি তো/'
ছেলেটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে, 'সে কী, না-মরলে ভূত হলেন কী করে?'
তিনি হেসে উঠলেন। বললেন, 'এই জন্যেই তোদের কচি-কাঁচা শিশু বলে। আরে বাবা, মরলেই কি মানুষ ভূত হয়? ভূত হয়েও তো মানুষ মরতে পারে।'
ছেলেটি মুচকি হেসে উত্তর দিল, 'ও, তাই বুঝি/'
'তাই।'
'তাহলে ভূত হবার আগে আপনার নাম কী ছিল?'
'ইতিমিচি ইত্যাদি।'
'সে আবার কী ধরনের নাম/ বিশ্রী।'
'তোর নামের ধরনটা শুনি?'
'আমি রিগি।'
তিনি এবার হো-হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, 'তোর নামের ধরনটাই বা কী এমন সুশ্রী/'
'আমার নামটা ভালো লাগল না আপনার?'
'তুই ছেলেটা যত সুশ্রী, তোর নামটা ততই ছিঃ-ছিরি/'
ছেলেটি গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, 'আমার মা রেখেছে।'
ইতিমিচিসাহেব থমকে গেলেন। তারপর হেসে উঠলেন। বললেন, 'না রে, তোর নামটা খুব ভালো। মায়ের দেওয়া নাম কখনো বিশ্রী হয়/ বল, এখন কোথায় যাবি?'
'আপনি তো আমায় কিছু জিজ্ঞেস না করে নিজের মনেই হেঁটে চলেছেন/'
'তাও তো বটে।'
ছেলেটি হেসেই বলল, 'আপনি শুধু ভূত না, পাগল।'
তিনি বললেন, 'এই তো, দুমফট করে মন টক-করা কথা বলে বসলি/ ভূতকে ভূত বল, তাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু ভূতকে পাগল বললে আমার ভীষণ খেপে যাবার কারণ থেকে যাচ্ছে।'
'আচ্ছা বাবা আর মন টক-করা কথা বলছি না। আপনার খেপে কাজ নেই/ কিন্তু কোথায় চলেছেন, সেটা তো ঠিক করতে হবে।'
'চাঁদে যাবি?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
ছেলেটি যেন আকাশ থেকে পড়ল, 'চাঁদে?'
'হ্যাঁ রে বাবা।'
'চাঁদে মানে ওই আকাশে?'
'আকাশে নয় তো, চাঁদ কি তোমার শোবার ঘরে পাশ বালিশে পা জড়িয়ে হাই তুলছে?'
ছেলেটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'যেতে পারবেন?'
'হুঃ/' এমনভাবে হুঃটি তিনি উচ্চারণ করলেন, যেন তাঁর কাছে চাঁদে যাওয়াটা কিচ্ছু না। তুড়ি মারছেন আর উড়ে যাচ্ছেন। 'তা' ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, 'চাঁদে যাওয়ার রাস্তা জানেন?'
'তুই একদম বোকা/ চোখের সামনে তো দেখতে পাচ্ছিস, জ্বলজ্বল করছে। মারব লাফ, ধরব চাঁদ।'
ছেলেটি হি-হি করে হেসে উঠল।
'হাসলি কেন?' একটু যেন রেগেমেগেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
'না', ছেলেটি বলল, 'তাহলে লাফ দিন।'
'দেবই তো/ আমার গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে থাকবি। আমি মারছি লাফ। এই মারলুম, ওয়ান, টু, থ্রি।' বলেই ছেলেটিকে পিঠে নিয়ে তিনি লাফালেন। ছেলেটি সিঁটিয়ে উঠল—'ই-ই-ই।' কিন্তু লাফিয়ে মাটি থেকে তাঁর পা দুটি বড়ো জোর এক হাত ওপরে উঠল। তিনি একটুও ঘাবড়ে না-গিয়ে বললেন, 'ইস/ একদম মাটি করে দিলি। অমন চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠলি কেন? চেঁচালি বলেই তো আমার পা ফসকে গেল। নে, এবার সামলে ধরে শান্ত হয়ে বস। আমি আবার লাফ মারছি, ওয়ান—'
ছেলেটি হঠাৎ ব্যস্ত-গলায় বলে উঠল, 'দাঁড়ান, দাঁড়ান।'
'আবার কী হল?'
'দেখছেন না, চাঁদ মেঘে ঢেকে গেছে?'
'তাই তো/' তিনি মেঘের দিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন, তারপর একটু চিন্তান্বিত হয়েই বললেন, 'লক্ষণটা ভালো ঠেকছে না।'
'কেন?'
'মনে হচ্ছে, আমাদের চাঁদে যাওয়াটা চাঁদ পছন্দ করছে না।'
'তাহলে?'
'চ, আজকের রাতটা তোর বাড়িতেই কাটিয়ে আসি।'
ছেলেটি বলল, ''মুশকিল তো সেইটাই।''
'কেন?'
'কদিন হল আমি বাড়ির পথ হারিয়ে ফেলেছি। রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরছি।'
'বলিস কী রে, পথ হারিয়ে ফেলেছিস? পথটা কোনদিকে হারাল?'
'এবার কিন্তু আপনি সত্যিই ভূতের মতো প্রশ্ন করেছেন/'
'কেন? কেন?'
'পথটা কোনদিকে হারিয়ে গেছে সেটাই যদি বলতে পারব, তবে বাড়িটা কোনদিকে হারিয়ে আছে, সেটাও তো খুঁজে পাব।'
তা বটে/ বলে ইতিমিচিসাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, 'তবে এখন কী করা?'
'চলুন তো এগিয়ে যাই?'
'তাই চ। বলে তিনি ছেলেটিকে পিঠে নিয়েই এগিয়ে চললেন। চলতে চলতে নিজেই বললেন, 'তোর বাপ-মা না জানি কত ভাবছে/'
'কার না-ভাবে বলুন? আপনার?'
'দুর বোকা/ আমি তো ভূত/'
'ভূতের বুঝি বাপ-মা থাকে না?'
'আমার তো নেই। অন্য ভূতের কথা বলতে পারব না/'
'কোনোদিন আপনি মাকে 'মা' বলে ডাকেননি?'
ইতিমিচিসাহেব কেমন যেন চমকে উঠলেন। দাঁড়ালেন।
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, 'দাঁড়ালেন কেন? পিঠে লাগছে? নামব?'
তিনি একটু থেমে আবার হাঁটতে শুরু করলেন। বললেন, 'না রে লাগছে না। হঠাৎ মনে পড়ে গেল।' তাঁর গলায় যেন বিষণ্ণতার সুর।
'কী মনে পড়ে গেল?'
'আমার সেই ছোটোবেলার কথা। হ্যাঁ, হ্যাঁ দ্যাখ, আমার চোখের ওপর ভেসে আসছে আমার সেই ছোটোবেলার দিনগুলি।' হাঁটতে-হাঁটতে কেমন যেন ছটফট করে উঠলেন ইতিমিচিসাহেব। আবেগে গলা তাঁর ভার হয়ে গেছে। তিনি বলেই চললেন, 'ওই দ্যাখ, তখন আমি তোর মতো ছোট্ট। দ্যাখ, সোনার আলো-ভরতি আকাশের নীচে আমি কেমন আমার বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করছি/ দেখতে পাচ্ছিস, কী দুরন্ত আমার আনন্দ? দ্যাখ, দ্যাখ, আমি কেমন হাসছি, দ্যাখ আমি কেমন আনন্দে লাফাচ্ছি। আমি যেন একটা জীবন্ত হরিণ। দেখতে পাচ্ছিস না, আমার মাকে? ওইতো আমার বাবা। ওই তো তারা দাঁড়িয়ে আছে বর্ষায় জল-ছোঁয়া ধান খেতের ওপর। ধানের চারাগুলি দ্যাখ, আকাশ-আলোয় মাথা তুলে কেমন দুলছে/ মাঠের ওপর লাঙল চালিয়ে বাবা-আমার জমি চষেছে। সেই মাটিতে সোনা-ধানের চারা বুনেছে আমার মা একটি-একটি করে। চারাগুলি আজ কত বড়ো হয়েছে দ্যাখ। আমার মা, আমার বাবার মুখ দুটি কেমন খুশিতে উছলে উঠেছে/ কদিন পরে ওই সবুজ-চারায় ধানের ফসল ভরে উঠবে। আরও কদিন পরে পাকা ধানে মরাই ভরে যাবে। তাদের আশা পেট ভরে দুটো খেতে পাবে তাদের ছেলে। ছেলের জন্যে নতুন জামা কিনবে তারা। নতুন জামা পরে ছেলে তাদের স্কুলে যাবে। নতুন ধানের গন্ধ বুকে নিয়ে সে বই পড়বে। পড়তে-পড়তে বড়ো হবে। তারপর বাপ-মা যেদিন বুড়ো হবে, সেদিন তাদের ছেলে এসে বলবে, 'মা, বাবা, তোমরা সারা জীবন যুদ্ধ করেছ মাটির সঙ্গে, মেঘের সঙ্গে। এবার আমি বড় হয়েছি। এবার তোমাদের হাতের অস্ত্রগুলি আমার হাতে এগিয়ে দাও। আমার যুদ্ধ শুরু হল। বর্ষার জল ডিঙিয়ে তোমাদের আর মাঠে যেতে হবে না। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আর তোমাদের কষ্ট করতে হবে না। এবার তোমাদের মুখে খাবার দেব আমি। তোমাদের নতুন পোশাকে সাজিয়ে দেব আমি। আমি তোমাদের ছেলে। আমি না দেখলে, বুড়োবয়সে মা-বাবাকে কে দেখবে?' বলতে-বলতে ইতিমিচিসাহেব একটু থামলেন। উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগলেন। শরীর কাঁপছে তাঁর।
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, 'থামলেন যে? বলা শেষ হয়ে গেল?'
'না, এ বলা শেষ হয় না।' তিনি একটু সামলে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
ছেলেটি বলল, 'তবে বলুন?'
'না থাক। ভূতের মুখে গল্প তো/ হয়তো ভাবছিস, যত সব অদ্ভুতুড়ে, আজগুবি।'
ছেলেটি যেন এই কথায় কষ্ট পেল। সে বলল, 'ওকথা কেন বলছেন? আমি জানি আপনার সব কথা সত্যি। আজগুবি কথাকে বানিয়ে-বানিয়ে সত্যি বলে চালিয়ে দেওয়া খুব সোজা। তবুও সেটা আজগুবি। কিন্তু সত্যিকথাকে আজগুবি বলে চালালেও সেটা কোনোদিনই মিথ্যে হয় না।'
ছেলেটির মুখে এ-কথা শুনে তাঁর চোখ ছলছল করল। অবশ্য ছেলেটি তা দেখতে পেল না। কারণ সে তো পিঠের ওপর বসে আছে। তিনি আবার বলতে শুরু করলেন। বললেন, 'তবে বলি/'
ছেলেটি বলল, 'হ্যাঁ বলুন।'
'তারপর একদিন আমাদের দেশে যুদ্ধ এল। কতদিন ধরে শুনে আসছি, শত্রুরা আমাদের দেশ আক্রমণ করবে। কিন্তু যুদ্ধ যে কী, আমি তা জানতুম না। জানার মতো আমার তো তখন বয়েস হয়নি। কিন্তু একদিন গভীর রাত্রে ঝাঁকে-ঝাঁকে শত্রুপক্ষের উড়োজাহাজ উড়ে এল। আমি দেখলুম আকাশ থেকে মাটিতে বোমা পড়ছে বুক-কাঁপিয়ে। আগুন জ্বলে উঠেছে চারিদিকে। আমি শুনতে পেলুম অসংখ্য মানুষের চিৎকার, কান্না। আমি দেখতে পেলুম, ভীষণ আতঙ্কে আমার বাবা-মা আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। তারা আমাকে বাঁচাতে চায়। তারপর শুনতে পেলুম, সেই পাকাধানের খেতের ওপর দিয়ে মেশিনগানে গুলি ছুড়তে-ছুড়তে ঘড়ঘড় করে দানবের মতো ট্যাংক ছুটে আসছে। আমার বাবা আমার মা আমাকে নিয়ে ছুটল। তারা ভুলে গেল, আকাশের ওই উড়ন্ত দানবগুলোর কোনো দয়া নেই। তারা শুধু ছিনিয়ে নিতে পারে প্রাণ। নিরীহ মানুষের শেষ সম্বল।
'অনেকটা ছুটে এসে থমকে দাঁড়াল আমার বাবা। আমার মা-ও। হাঁপাচ্ছে তারা। কী করবে তারা ভেবে পাচ্ছে না। দানবের কালো হাত এক্ষুনি হয়তো গুঁড়িয়ে ফেলবে আমাদের। সেই আতঙ্কে শিউরে উঠছে তারা। আমার মা শিয়রে হাত দিল। তারপর কেঁদে ফেলল।
বাবা চাপা-গলায় বললে, 'আঃ/ এখন কান্নার সময় নয়। বিপদের সময় বল-ভরসা হারালে ছেলেকে বাঁচাব কেমন করে? এসো, যতক্ষণ পারি ছুটে চলি।' বলে, বাবা এক হাতে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে, আর এক হাত মায়ের হাতে রেখে আবার ছুটল।
'এবার আমি নিশ্চিত দেখতে পেলুম, ওই যুদ্ধদানবগুলো আকাশে অনেকখানি গোল হয়ে ঘিরে-ঘিরে বোমা ফেলছে। আমাদের পালাবার আর পথ নেই। সামনের ধানখেতের মধ্যে আমাকে আড়াল করে আমার আমার-বাবা লুকিয়ে পড়ল। বাঁচার শেষ চেষ্টা।

বাবা চাপা-গলায় বললে, ‘আঃ/এখন কান্নার সময় নয়...’
'কিন্তু হঠাৎই বোমার শব্দ থেমে গেল। মনে হল, আকাশের ওই দানবগুলো বোধ হয় নিস্তার দিল কিছুক্ষণের জন্যে। তখন সেই ধানখেতের জলকাদা ডিঙিয়ে বেরিয়ে এলুম আমরা। আর একটু এগিয়ে গেলে, মনে হয় যেন একটা উঁচু জমিতে আমরা দাঁড়াতে পারব। অনেকটা লুকিয়ে-ছাপিয়ে আমরা সেইদিকেই এগিয়ে গেলুম। পৌঁছেও গেছি। সামনে একটা গর্ত দেখা গেল। বাবা তাড়াতাড়ি সেই গর্তের মধ্যে আমায় লুকিয়ে ফেলল। তারপর সেই গর্তের পাশে নিজেরা মাটির সঙ্গে মাটি হয়ে লুটিয়ে রইল।
'আমিও ভয়ে বোবা হয়ে গেছি। এই ভীষণ অন্ধকার গর্তটার মধ্যে বসে থাকতে-থাকতে যেন আমার দম আটকে আসছিল। আমি ডাকলুম, 'মা।'
'কী বলছ বাবা?' মা চুপিসারে জিজ্ঞেস করল।
আমি বললুম, 'আমার কাছে এসো।'
মা বলল, 'এই তো বাবা, কাছেই আছি।'
আমি বললুম, 'এখানে ভীষণ অন্ধকার।'
বাবা হাত বাড়িয়ে আমার মাথাটা ছুঁয়ে বলল, 'ভয় কোরো না বাবা। আমরা এখানেই আছি।'
'আমি চুপটি করে গর্তের মধ্যেই বসে রইলুম। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়লুম জানি না।
'কী ঘুম যে পেয়েছিল আমার/ যখন জেগে উঠলুম, তখন রোদ উঠে গেছে। আমি ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়লুম। দাঁড়ালুম। মুখ বাড়ালুম। তারপর শিউরে উঠলুম। এ কী/ আমার মা, বাবা কাউকে দেখছি না তো/ কোথা গেল তারা? আমি চিৎকার করে লাফ মারলুম গর্তের ভেতর থেকে বাইরে। দেখতে পেলুম, গর্তের বাইরে এবড়ো-খেবড়ো জুতোর ছাপ। দেখতে পেলুম, খালি পায়ের চিহ্ন আর ধস্তাধস্তির খাবলা-ওঠা মাটি। আমি বুঝতে পারলুম আমার মা-বাবার কী হয়েছে/ বুঝতে পারলুম, ওই যুদ্ধ-পিশাচগুলোর শিকার হয়েছে তারা। আমি দিশেহারা হয়ে ছুটলুম। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগলুম আর কেঁদে উঠলুম, 'মা-মা-আ/ বাবা-আ-আ/'
'আমি খুঁজে পেলুম না তাদের। আমি অনেকদিন ধরে তাদের খুঁজে বেড়ালুম। কতদিন, তা বলতে পারব না। তারপর আমি নিজেই একদিন হারিয়ে গেলুম।
'একদিন হঠাৎ-ই এক ভদ্রলোকের নজরে পড়ে গেলুম। হয়তো আমার চেহারা দেখে, অথবা আমায় রাস্তার ছেলের মতো একা-একা ঘুরতে দেখে তাঁর দয়া হল। লোকটি অনেকক্ষণ ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে লক্ষ করছিলেন আমাকে। শেষমেশ লোকটি আমার কাছে এলেন। ভদ্রলোকটিকে কাছ থেকে দেখে মনে হল বেশ কেতা-দুরস্ত। বয়সে যে খুব বেশি, তা মনে হল না। তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। আমার নাম ছাড়া আমি আর কিছুই বলতে পারলুম না। লোকটি বললেন, 'ঠিক আছে, আমি তোকে কাজ দেব।'
'আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'কী কাজ?'
'তিনি বললেন, 'জাহাজের কাজ?'
'আমি চমকে তাঁর মুখের দিকে তাকালুম।'
'তিনি বললেন, 'বিশ্বাস হচ্ছে না? হ্যাঁ রে, আমার অনেক জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আলাপ আছে। আমি তো গোল্ড মার্চেন্ট, মানে সোনার ব্যবসায়ী। ব্যবসার জন্যে আমায় প্রায় জাহাজে চেপে দেশ-বিদেশে যেতে হয়। সেই কারণেই আলাপ আর কি/'
'জাহাজের কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা আনন্দে লাফিয়ে উঠল। জাহাজ, সমুদ্র, দিনের পর দিন ভেসে চলা সবই কেমন যেন রোমাঞ্চে-ভরা রহস্যময়। আমি সঙ্গে-সঙ্গে রাজি হয়ে বললুম, 'ঠিক আছে।'
'তখন তিনি বললেন, 'বেশ তাহলে চ আমার সঙ্গে। কালই আমি জাহাজে চেপে আর এক দেশে যাব। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তোর পরিচয় করে দেব।'
'পরের দিন সত্যিই আমি জাহাজে চাপলুম। আশ্চর্য কথা এই, আমি যখন জাহাজের ভেতরে ঢুকলুম, দেখলুম কী বিরাট সেই জাহাজ। নীচে ইঞ্জিন চলছে, কত বড়ো বড়ো মেশিন। ওপরে কত থাকবার কেবিন, ডেক। একেবারে এলাহি কাণ্ড। কিন্তু ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে যখন সমুদ্রের দিকে তাকালুম, তখন মনে হল, এই অনন্ত সমুদ্রের বুকে এই বিরাট জাহাজটা যেন একটা খড় কিংবা কুটো। জাহাজের একটা কেবিনে ছিলেন সেই সোনার ব্যবসায়ী। আমি অবশ্য ছিলুম ডেকে। ব্যবসাদার বলেই বোধ হয় তাঁর কেবিনটাও ছিল ভারী ছিমছাম। ডেকে তো আমি একা নই, আরও কত লোক। আমি ছোটো বলে আমাকে কেউ কেয়ারই করত না। তাই আমি বড়ো একা। আমি অবাক হয়ে যাই, অত যাত্রীর কেউ একজনও এসে আমার নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করল না। নাই করুক। আমার একা-একা এই সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকতে খুব ভালো লাগত। ভেসে চলে জাহাজ। আর নতুন অচেনা দেশের কথা ভেবে আমার মনে দোলা লাগে।'
এই পর্যন্ত বলে ইতিমিচিসাহেব থামলেন। তাঁর পিঠের ওপর ছোট্ট বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী রে, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি?'
ছেলেটি বলল, 'না, না, ঘুমুব কেন? শুনছি। বলুন/'
ইতিমিচিসাহেব আবার বলতে শুরু করলেন, 'সেই সোনার ব্যবসায়ী দিনে অন্তত পাঁচ-সাতবার আমায় তাঁর কেবিনে ডাক দিতেন। এটা-ওটা কত কথা বলতেন। বোধ হয় দেখতেন আমার মনখারাপ লাগছে কি না। তাই মাঝে-মাঝে জিজ্ঞেস করতেন, 'কী রে, কেমন লাগছে?' যেহেতু আমার খারাপ লাগছে না, সেইকারণে আমার খারাপ লাগছে এ-কথা তো বলতে পারি না।
'কথা ছিল, সোনার ব্যবসায়ী ভদ্রলোক জাহাজের ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে একটি কাজ জুটিয়ে দেবেন। কিন্তু এখনও তিনি তা করেননি। ইতিমধ্যে একদিন আমাদের জাহাজ এক নতুন পোর্টে এসে ভিড়ল। সেই পোর্ট থেকে আর এক ভদ্রলোক উঠলেন। এবং তিনি সোজা ওই সোনার ব্যবসায়ীর কেবিনে ঢুকে কী যে কথাবার্তা শুরু করলেন, আমি জানি না।
'সেই নতুন ভদ্রলোকটি আসার পর আরও তিনদিন কেটে গেল। অবশ্য ভদ্রলোকটির সঙ্গে আমার তেমন আলাপ না-হলেও প্রায়ই দেখতুম তিনি আমায় দূর থেকে লক্ষ করছেন। এমন সময় হঠাৎ একদিন আমার ডাক পড়ল সেই সোনার ব্যবসায়ীর কেবিনে। এ আর এমন কী কথা/ ডাক তো রোজই পড়ে। আজ কিন্তু তাঁর ঘরে ঢুকে দেখি, তিনি একা নন, সেই নতুন ভদ্রলোকটিও রয়েছেন। ঘরে ঢুকতেই সেই সোনার ব্যবসায়ী ভদ্রলোকটি বললেন, 'শোনো ইতিমিচি, আমি তোমাকে জাহাজের যে-ক্যাপ্টেনের কথা বলেছিলুম, ইনিই সেই ক্যাপ্টেন। তোমার কাজ পাকা হয়ে গেছে। তুমি কালই ওঁর সঙ্গে চলে যাবে। কাল ভোরবেলাতেই জাহাজ নতুন পোর্টে পৌঁছুবে। উনি তোমাকে নিয়ে যাবেন। ঠিক আছে?'
'আমি ঘাড় নাড়লুম। সেই ভদ্রলোকটির দিকে তাকালুম। এতদিন ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দূর থেকে চোখাচোখি হয়েছে। আজ একেবারে কাছ থেকে দেখলুম। আমার কেমন ভালো লাগল না ভদ্রলোকটিকে।
'সোনার ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমি কথা শেষ করে বেরিয়ে এলুম। বেরিয়ে আসতেই তিনি কেবিনের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এখন কেবিনের মধ্যে তিনি আর সেই নতুন ভদ্রলোকটি। যাকে আমি জেনেছি জাহাজের ক্যাপ্টেন বলে। হয়তো দুজনের মধ্যে এখন কিছু গোপন কথাবার্তা হবে। কিন্তু কী সে-কথা/ আমাকে নিয়েই কি? আকাশ-পাতাল কিছুই ভেবে পেলুম না। ঠিক একদিন আগে এরকম একটা সন্দেহজনক ঘটনা আমার যেন সব কিছু গোলমাল করে দিল। যেতে-যেতে আমি দাঁড়িয়ে পড়লুম। লোকটা কি সত্যিই জাহাজের ক্যাপ্টেন, না, অন্য কেউ? তাকে আর একবার দেখার জন্যে আমার মনটা ছটফট করে উঠল। তাকে অন্তত আর একবার চোখের দেখা দেখতে পেলেও মনটা শান্ত হয়। সুতরাং আর অন্য কিছু না-ভেবে, সোনার ব্যবসায়ী সেই ভদ্রলোকের কেবিনের দরজায় ঠেলা দিলুম। কিন্তু দরজা খুলল না। ভেতর থেকে বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আমার কানে এল, দুজনে ভেতরে তখন অস্পষ্ট স্বরে ফিসফিস করে কথা বলাবলি করছে। আমার তখনই ঝট করে মাথায় এল, কী কথা হচ্ছে, শুনলে তো হয়/ আমি কৌতূহল সামলাতে পারলুম না। কেবিনের দরজায় কান ঠেকালুম। এতক্ষণ যে-কথাগুলো খুবই অস্পষ্ট শোনাচ্ছিল, কানে আড়ি পাততেই অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমি শুনতে পেলুম সেই সোনার ব্যবসায়ী এবং অন্য লোকটির আলোচনা।
'সোনার ব্যবসায়ী লোকটির গলা, 'দেখুন, আমাদের সমস্ত কাজ খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে।'
'অন্য লোকটি উত্তর দিল, 'আমি স্যার যথাসাধ্য চেষ্টা করব।'
'ছেলেটি আমার পরিচয় জানে, আমি একজন সোনার ব্যবসায়ী বলে। ঘুণাক্ষরে না-জানতে পারে আমরা ডাকাত।'
'সে জানার কোনো সম্ভাবনা নেই।'
'কাল পোর্টে জাহাজ ভেড়ার পর একদম সময় নষ্ট করবেন না। ছেলেটিকে নিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে জাহাজ ছেড়ে বেরিয়ে যাবেন।'
'স্যার, যদি শেষ মুহূর্তে আমার সঙ্গে যেতে না চায়?'
'ভয় নেই। আমি এতদিন যা দেখেছি, তাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে, ছেলেটি ধূর্ত নয়।'
'আমারও তাই মনে হয়েছে।'
'আপনি পোর্ট থেকে একটা ট্যাক্সি ধরে সিধে রেল স্টেশনে হাজির হবেন। আপনি জানেন, সেখান থেকে সকাল আটটা নাগাদ একটা ট্রেন ছাড়ে। সম্ভবত তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে। তবু আপনি সঠিক সময় আর প্ল্যাটফর্ম নম্বরটা একবার চেক করে নেবেন। আমাদের গন্তব্য স্টেশনে পৌঁছুলে ছেলেটি একটু ভয় পেতে পারে। কারণ চারিদিকে পাহাড় আর জঙ্গলে-ঘেরা এই জায়গাটা দেখলে ছোটোদের ভয় পাওয়াটা এমন কিছু অস্বাভাবিক নয়। সময় নেবেন না। স্টেশনে পৌঁছেই জঙ্গলে ঢুকে পড়বেন। ওখান থেকে আমাদের আস্তানা যাবার সোজা পথটা কখনোই ধরবেন না। পথটা চিনে ফেললে, ভবিষ্যতে পালাতে পারে। আস্তানায় পৌঁছাবার আগে জঙ্গলে হাঁটতে-হাঁটতে ও আপনাকে হাজারটা প্রশ্ন করতে পারে। এমনও হতে পারে ছেলেটি জঙ্গলে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে। ওকে সব সময় বলবেন, আপনি জাহাজের ক্যাপ্টেন। বলবেন, সমুদ্রের জাহাজে চাকরি করতে গেলে, জঙ্গলে ট্রেনিং নিতে হয়।'
ঠিক এই সময় সেই নতুন লোকটি একটু সন্দিহান গলায় বলল, 'যদি স্যার এ-কথাটা বিশ্বাস না করে? যদি জিজ্ঞেস করে জাহাজ তো জলে ভাসে, ট্রেনিংটা জঙ্গলে কেন?'
'সোনার ব্যবসায়ী হেসে উঠলেন। বললেন, 'আরে মশাই ছোটোদের ছেলেমানুষ বলে কি এই বড়োমানুষি প্রশ্ন করবে বলে?'
'অন্যজন বলল, 'তা অবশ্য ঠিক।'
'তবে যদি ছেলেটি একান্তই বেঁকে বসে, তবে এই নিন, এই পিস্তলটা। আপনার কাছে রাখুন। মনে হয় না দরকার লাগবে, তবু তৈরি থাকাই ভালো। আমার এই ছেলেধরার উদ্দেশ্যটা আজ আর আপনার কাছে গোপন রাখব না। যেহেতু আপনি আমার ঘনিষ্ঠ অনুচর। আমার উদ্দেশ্য এইসব ছোটোদের খুব কম বয়সে ধরে নিয়ে গিয়ে ডাকাত তৈরি করা। বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে এরা যখন পাকা ডাকু হয়ে উঠবে, তখন আমাদের দল হবে ভারী। আর আমাদের কাজও তখন হবে হালকা। এই ডাকুদলকে কাজে লাগিয়ে আমরা আরামে আর নিরাপদে দিন কাটাতে পারব। ওরা ডাকাতি করবে, আর আমরা ওদের ওপর করব সর্দারি। আমাদের জীবনের ভয় কমবে, অথচ বাড়বে অর্থ। ছেলেটি যেন ঘুণাক্ষরেও টের না-পায় আমাদের উদ্দেশ্য। আমাদের জঙ্গলের আস্তানায় পৌঁছেই, ও সব কিছু আঁচ করার আগেই, ওকে অন্ধকার ঘরটায় বন্দি করে ফেলবেন। তারপর যা করার আমি গিয়ে করব। আমার যেতে হয়তো দু-চারদিন দেরি হবে। কারণ এ-কদিন আরও কজন ছেলেকে ধরে আমাদের আস্তানায় চালান করার জন্যে আমি বিশেষ ব্যস্ত থাকব। সুতরাং যতদিন না আমি যাই, ততদিন খুব সাবধান। ঠিক আছে?'
'ঠিক আছে স্যার।'
'আমি ভীষণ ভয়ে আঁতকে উঠলুম। সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, আমার পায়ের থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। হঠাৎ কেবিনের দরজা খোলার শব্দ আমাকে সজাগ করে দিল। আমি চকিতে লুকিয়ে পড়লুম কেবিনের আড়ালে। আমি কাঁপছি। লোকটা বেরিয়ে চলে গেল। আমার দৃষ্টি তার মুখের দিকে নয়, তার প্যান্টের পকেটে। কেননা, আমার মনে হয়েছিল পিস্তলটা প্যান্টের পকেটে রাখা ছাড়া, এখন সে অন্য কোথাও রাখতে পারে না। বুঝতে পারলুম, সোনার ব্যবসা করার মিথ্যে পরিচয় দিয়ে লোকটা আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। লোকটা ডাকাত। এতক্ষণে আমি বুঝতে পারলুম, আমি ভয়ংকরের কবলে পড়েছি। লোকটার ওপর আমার যেমন ঘৃণা হল, তেমনি রাগ। রাগে বুকের ভেতরটা আমার ফুঁসতে লাগল। আমি ঠিক করলুম আমাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে ধরে আনার আমি প্রতিশোধ নেব এবং আজই। সুতরাং আমার ওই পিস্তলটা চাই।
'চাই বললেই তো আর আমার হাতে সেটি কেউ তুলে দিচ্ছে না। আমাকে সেটি ছিনিয়ে নিতে হবে। আমি ছেলেমানুষ বলে অবিশ্যি একটা বিশেষ সুবিধা আছে। এখানে-ওখানে ঘোরাঘুরি করলেও চট করে কেউ সন্দেহ করে না। সেই সুযোগটাই আমায় কাজে লাগাতে হবে। মনে-মনে মতলব আঁটলুম ওই লোকটার সঙ্গে আলাপ করতে হবে এবং ফাঁক বুঝে পিস্তলটা গাপ করতে হবে। এই ভেবেই আমি কেবিনের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে, আমার রাগ আর ভয় দুটোকেই মুখ থেকে মুছে ফেললুম। দিব্যি সহজ হয়ে ঘোরাফেরা, খাওয়া-দাওয়া করতে লাগলুম।'
আবার ইতিমিচিসাহেব থামলেন।
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, 'থামলেন কেন?'
'বোধ হয় তোর ভয় করছে,' ইতিমিচিসাহেব উত্তর দিলেন।
'ভয় করবে কেন?'
'মনে হচ্ছে।'
'ধ্যাত/ আপনি বলুন তো/'
ইতিমিচিসাহেব আবার বলতে শুরু করলেন, 'এখন উঠতে-বসতে আমার ভাবনা পিস্তলটা হাতাব কেমন করে/ অনেক ভেবে ঠিক করলুম, যার কাছে পিস্তলটা আছে, তার কেবিনেই আমি যাব। তার সঙ্গে আলাপ করব। সেই তক্কে সে পিস্তলটা কোথায় রেখেছে সেটারও হদিস করে নেব। যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। আমি ছুটলুম তার কেবিনে।
'কেবিনের বাইরে হঠাৎ আমায় দেখতে পেয়ে ভদ্রলোক যেন একটু থতমত খেয়ে গেল। তারপর চোখের পলকে নিজেকে সামলে নিল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল, 'হ্যালো, এসো, এসো।'
'আমিও ঠোঁটে হাসি টেনে বললুম, 'এসে পড়লুম। সারাদিন একা তো। আপনার কাছে গল্প শুনতে এলুম। আপনি তো জাহাজে চেপে অনেক দেশ ঘুরেছেন।'
'তা ঘুরেছি। তবে তোমাকে বলার মতো আমার গল্প তেমন জানা নেই।'
'একটাও না?' আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'সমুদ্র, জাহাজ?'
'জাহাজ/ সমুদ্র/' সে যেন তোতলাতে লাগল।
'আমি বললুম, 'আপনি জাহাজের ক্যাপ্টেন অথচ সমুদ্রের গল্প জানেন না?'
'সে চট করে কথাটা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, 'তুমি কিছু গল্প জান না?'
'আমি উত্তর দিলুম, 'আমি ম্যাজিক জানি।'
'ম্যাজিক/' লোকটা যেন অবাক হয়ে গেল।
'হ্যাঁ।'
'একটা দেখাবে নাকি?' সে জিজ্ঞেস করল।
'আপনার পকেটে একটা টাকা হবে? একটা টাকার ম্যাজিক দেখাব।'
'লোকটা বলল, 'দেখছি আছে নাকি।' বলে লোকটা প্যান্টের পকেটে হাত পুরল। এবং যে-পকেটে পিস্তলটা ছিল, সেই পকেটটাই হাতড়াতে লাগল। আমি পিস্তলটা দেখতে না পেলেও বুঝতে পেরেছি, এই পকেটেই সেটি আছে। আমি হুট করে বলে বসলুম, 'কী আছে আপনার পকেটে?'
'লোকটা থতমত খেয়ে আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চাইল। তারপর ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কেন? কেন?'
'দেখছি পকেটটা ঝুলে আছে। মনে হয় কোনো ভারী জিনিস পকেটে রেখেছেন। এক্ষুনি ছিঁড়ে যাবে।'
'লোকটা বলল, 'না, তেমন কিছু না।' বলেই সে দু-পকেটের দু-পাশটা একটু নেড়েচেড়ে বলল, 'না, টাকা নেই। কটা খুচরো পয়সা পড়ে আছে।'
'আমি বললুম, 'তাহলে আর কী করা?' বলে আমি আর কথা না-বাড়িয়ে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলুম। এবং এখন আমি নিশ্চিত যে, পিস্তলটা প্যান্টের পকেটেই আছে।
'আমার ছটফটানি কমল না। কিন্তু পিস্তলটা যে কেমন করে হাতানো যায় সেটা আমি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না। আমি জানি, এরপর লোকটা পিস্তলটা পকেট থেকে বার করে তার স্যুটকেসের মধ্যে লুকিয়ে ফেলবে। তখন মুশকিল। অবশ্য তখন স্যুটকেসটা হাতাতে পারলেও কাজ হয়। তখনই আমার মনে হল, এ-কাজটা করতে গেলে আমায় গভীর রাতের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। তখন লোকটা ঘুমিয়ে পড়বে, আমিও সহজে কাজটা হাসিল করতে পারব। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে আর একটা সমস্যার কথা আমার মনে উঁকি দিয়ে উঠল, লোকটা রাতে যখন শোবে তখন তো সে কেবিনে দরজা এঁটেই শোবে/ ঢুকব কেমন করে?
'এই কথাটা মনে হতেই, সঙ্গে-সঙ্গে একটা মতলব আমার মাথায় এসে গেল। আমি আবার ছুটে গেলুম সেই লোকটার কাছে। দেখলুম, সে তখন কাগজ-কলম নিয়ে কী লিখছে। আমায় দেখে লেখা থামিয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলে, 'কী ব্যাপার? আবার?'
'আমি বললুম, 'আপনাকে একটা কথা বলতে এলুম।'
'কী কথা?'
'কাল তো ভোরবেলাতেই আমরা পোর্টে পৌঁছে যাব?'
'হ্যাঁ, সকাল ছটা।'
'এখন থেকে তো আমিই আপনার সঙ্গী।'
'সে যেন আমায় একটু মিথ্যে তারিফ করেই বলল, 'সঙ্গীটি আমার খুবই ভালো।'
'কী করে বুঝলেন?'
'যে-সঙ্গীকে ভালো লাগছে, তাকে খারাপ বলি কেমন করে?'
আমিও সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর দিলুম, 'আমারও খুব ভালো লাগছে আপনাকে।'
'তাই নাকি?'
'আজ রাতটা আপনার কেবিনেই আপনার সঙ্গে থাকব। গল্প শুনব।'
'লোকটা একটু হকচকিয়ে গেল আমার এই প্রস্তাবে। আমার মুখের দিকে চট করে তার চোখদুটো বুলিয়ে নিয়ে বললে, 'গল্প শুনবে?'
'হ্যাঁ, যতক্ষণ ঘুম না-আসে।'
'ঠিক আছে।' সে সায় দিল।
'সে এত সহজে রাজি হয়ে গেল দেখে, আনন্দে আমার হাত-পাগুলো কেমন যেন শিরশির করে উঠল। আমি বললুম, 'আমার তাহলে জিনিসপত্তরগুলো এখানে নিয়ে আসি?'
'লোকটার মনে ইচ্ছে না-থাকলেও, আমার কাছে সেই অনিচ্ছা লুকিয়ে রেখে খুব সহজভাবেই বলল, 'হ্যাঁ, নিয়ে এসো।'
'আমি ছুটলুম এবং আমার সম্পত্তি বলতে দু-একটা যা জামা-প্যান্ট ছিল, নিয়ে চলে এলুম। কিন্তু আসল ব্যাপারটাই এতক্ষণ আমার মনে আসেনি। আমি যদি পিস্তলটা তার প্যান্টের পকেটে না পাই, যদি সেটা স্যুটকেসেই রাখে, তবে স্যুটকেসটা নিয়ে আমি যাব কোথায়/ এই জাহাজেই তো আমায় থাকতে হবে/ স্যুটকেসটা চাবি দেওয়া থাকলে, সেটা ভেঙে পিস্তলটা বার করতে গেলে সময় তো লাগবেই। তখন যদি ধরা পড়ি/ সুতরাং এই জাহাজেই এমন একটা জায়গা খুঁজে রাখতে হবে, যেখানে আমি লুকিয়ে থাকতে পারব। এই উদ্দেশ্যে তখনই আমি জাহাজের এ-কোণ, ও-কোণ ঘোরাঘুরি করতে লাগলুম। এ তো খুবই স্বাভাবিক যে, আমাকে এভাবে ঘুরতে দেখলে লোকে সন্দেহ করবেই। সুতরাং আমি যতদূর সম্ভব, সেই লুকিয়ে থাকার গোপন জায়গাটা খুঁজতে-খুঁজতে এর-তার সঙ্গে কথা বলে আমার মতলবটা গোপন রাখার চেষ্টা করলুম। কিন্তু এত করেও একটা লুকিয়ে থাকার মতো জায়গা আমি পছন্দ করতে পারছি না। হঠাৎ আমার খেয়াল হল, কদিন আগে, জাহাজের গায়ে একটা খুব মোটা চেন ঝুলে থাকতে দেখেছি। ওই চেনটা জাহাজের নোঙর করার সময় কাজে লাগায় ওরা। আমার মনে হল, বিপদে পড়লে, জলের ওপর জাহাজের গায়ে ঝুলে থাকা ওই চেনটা ধরে আমিও ঝুলে-ঝুলে লুকিয়ে থাকতে পারব। আমায় কেউ দেখতে পাবে না। তারপর জাহাজ পোর্টে ভেড়বার আগেই আমি জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ে পালাতে পারব।
'সমস্ত ব্যবস্থা ঠিকঠাক রেখে আমি রাতে লোকটার কেবিনেই শুয়ে পড়লুম। সত্যি কথা বলতে কী, লোকটার সঙ্গে গল্প করার মতো আমার মনের অবস্থা তখন মোটেই ছিল না। আমি ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে ভাবছিলুম, লোকটা কখন ঘুমুবে/ যখন দেখলুম, সে কিছুতেই ঘুমুচ্ছে না, তখন আমি নিজেই ঘুমের ভান করে মটকা মেরে পড়ে রইলুম। দেখি, খানিক বাদে লোকটা সত্যি-সত্যিই নাক ডাকাতে শুরু করে দিল। আমি নিঃশব্দে উঠে পড়লুম। অত্যন্ত সতর্ক হাতে কেবিনের দরজাটা খুলে রাখলুম। কারণ লোকটার যদি অতর্কিতে ঘুম ভেঙে যায়, আমার পালাবার পথটা তো পরিষ্কার রাখতে হবে/ লোকটা তার প্যান্টটা কোথায় খুলে রেখেছে, সেটা আমি আগেই দেখে রেখেছি। সুতরাং প্রথমেই আমি নিঃসাড়ে, তার প্যান্টের পকেটেই হাত পুরে দিলুম। যাঃ/ আমি যেটা ভয় করছিলুম ঠিক তাই হল, পিস্তল পকেটে নেই। এখন যে সেটা স্যুটকেসেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে, সে সম্বন্ধে আর কার সন্দেহ থাকে/ আমি স্যুটকেসটাই হাতে নিয়ে ধীর পায়ে ডিঙি মেরে কেবিনের দরজা ডিঙিয়ে পালাতে গেছি, আর ঠিক সেই সময়েই আচমকা চিৎকার, 'হলট'। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছি। বুকের ভেতরটা চমকে ধক করে উঠল। ঝটপট পিছু ফিরে তাকিয়ে দেখি, লোকটা আমার পেছনে পিস্তল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি নিশ্চল হয়ে থমকে রইলুম। লোকটা যে মোটেই ঘুমোয়নি, নিজের কাছে পিস্তলটা রেখে আমার ওপর যে সে নজর রাখছিল, এখন সেটা বুঝতে আমার কোনো কষ্ট হল না। আমি আরও বুঝতে পারলুম, বড়োদের বুদ্ধির কাছে, আমি সত্যিই ছেলেমানুষ/ ধরা তো পড়েই গেছি/ সুতরাং ভয় পেয়ে আর লাভ কী/ বাঁচা-মরার ভাবনা না ভেবে, অন্য ভাবনা আমার মাথায় এসে গেল ঠিক তক্ষুনি। লোকটা চোখের পলক ফেলার আগেই, আমিই স্যুটকেসটা ধাঁই করে ছুড়ে দিলুম লোকটার মুখের ওপর। ছুড়ে দিয়েই কেবিন থেকে দে-ছুট/ গভীর রাত বলে সবাই ঘুমুচ্ছে। কিন্তু জাহাজ সে তো থেমে নেই। সে তো যথারীতি গভীর সমুদ্রে ঢেউ তুলে দ্রুত ভেসে চলেছে। লোকটা প্রথম চোটের ধাক্কাটা সামলেই বেরিয়ে এসেছে। আবার চিৎকার করে উঠল, 'হলট।' তখন কে আর তার কথার ধার ধারে। আমি থামলুম না। তার পিস্তল থেকে গুলি ছুটল, দুম/ লক্ষ্য তার ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু উদ্দেশ্য তার সফল হয়েছে। তার চিৎকারে আর পিস্তলের আওয়াজে ঘুমন্ত সেই জাহাজটা হঠাৎ যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। শুরু হয়ে গেল, হইচই, হুল্লোড়/ আমি কোনোরকমে সকলের চোখকে ধুলো দিয়ে যেকানে জাহাজর চেনটা ঝুলছে সেই জায়গাটায় এসে পড়লুম। তারপর ঝটপট সেই মোটা চেনটা ধরে, তরতর করে জাহাজের কিনারায় পা দিয়ে ঝুলে পড়লুম বাইরে, গভীর সমুদ্রের জলের ঠিক ওপরে। আমি এখন মৃত্যুর মুখোমুখি পৌঁছে গেছি। বুঝতে পারছিলুম, এখন জাহাজের ওপর তোলপাড় চলছে। এবং আমাকে খুঁজে বার করার জন্যে এখন গোটা জাহাজটা তন্ন-তন্ন করে নিশ্চয়ই তল্লাশি চালাচ্ছে সবাই। শেষ পর্যন্ত আমার কী হবে, আমি জানি না।'
ইতিমিচিসাহেবের পিঠের ওপর বসে এগোতে এগোতে সেই ছেলেটি এবার যেন খানিকটা উত্তেজনায় বলে উঠল, 'তারপর কী হল আপনার?'
ইতিমিচিসাহেব হেসে ফেললেন। বললেন, 'ভাবছিস বোধ হয় মরে গেলুম?'
'তবে কী হল?' সে তেমনি উত্তেজিত স্বরেই জিজ্ঞেস করল।
ইতিমিচিসাহেব বললেন, 'না, মরিনি। তবে সেই ঝুলন্ত অবস্থায় আমি যে বেশিক্ষণ থাকতে পারব না, সেটা আমি হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছিলুম। আমার নিজের ভারটাই আমার নিজেরই কাছে তখন ভীষণ অসহ্য লাগছিল। আমি পারছি না। তবু প্রাণপণে আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করছি। আমার মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো এখুনি গভীর সমুদ্রে হাত ফসকে পড়ে তলিয়ে যাব। তখন কী হবে/ সাঁতার আমি জানি বটে, কিন্তু কতক্ষণ?
'সেই ঝুলন্ত অবস্থাতেই আমার যেন হঠাৎ নজরে পড়ল, দূরে সমুদ্রের কিনারে দু-একটা বিন্দুর মতো আলোর রেখা চিকচিক করছে। আমার চোখে ধাঁধাঁ লেগে গেল। আমি কি ঠিক দেখছি/ তবে কি সমুদ্রের কিনারা দিয়ে জাহাজটা বয়ে চলেছে/ হ্যাঁ, ঠিক তাই। এখন আমি নিশ্চয়ই ঝাপসা দেখছি না। আলোর স্পষ্ট বিন্দুগুলি আমার চোখের তারায় উছলে উঠছে। তাহলে জাহাজটা বোধ হয় পোর্টের কাছাকাছি এসে পড়েছে। আনন্দে আমি প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলুম। আর ঠিক তখনি কী যে হল, সেই লোহার চেন ফসকে আমি সমুদ্রের জলের ওপর ছিটকে পড়লুম। অতল সমুদ্রে হাবুডুবু খেয়ে বাঁচার তাগিদে সাঁতার কাটতে লাগলুম। সমুদ্র-জলে ভাসতে-ভাসতে আমি দেখবার চেষ্টা করলুম, জাহাজটা এখন কোথায়/ জাহাজ আমায় পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, এখন তীরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমি জাহাজের ঢেউ আর সমুদ্রের জল মাথায় নিয়ে ভেসে-ভেসে এগিয়ে চললুম তীরের দিকে। সেই শয়তানদের হাত থেকে বাঁচলুম বটে, কিন্তু এখন সমুদ্রের হাত থেকে কেমন করে বাঁচব, জানি না। কেননা, যতই আমি তীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, সমুদ্রের ঢেউ ততই উত্তাল হয়ে উঠছে। আমার মনে হচ্ছে, কখনও আমি পাঁচতলা, সাততলা ওপরে উঠে যাচ্ছি, আবার ঢেউয়ের সঙ্গে ঘুরপাক খেতে-খেতে নীচে নামছি। আতঙ্কে ভাবছি, আর বোধ হয় বাঁচা হল না আমার।
'আমি এমনি করেই এগিয়ে এসেছিলুম, সমুদ্রতীরের অনেকখানি কাছেই। মনে হচ্ছিল, অন্ধকারটা অনেকখানিই কেটে গেছে। ভোরের আলো ফুটছে সমুদ্রের বুকে। আমি নিশ্বাস নিচ্ছি ভোরের বাতাসে। তারপর কেমন যেন ধীরে-ধীরে আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। আমি আর সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর বাঁচার জন্যে ছটফট করত পারছি না। আমার যেন দম ফুরিয়ে আসছে। আমি বোধ হয় হারিয়ে গেলুম। আর কিছুই মনে নেই।'
এমন সময় হঠাৎ ছেলেটি ইতিমিচিসাহেবকে জিজ্ঞেস করল, 'সত্যি আপনি হারিয়ে গেলেন?'
ইতিমিচিসাহেব হেসেই বললেন, 'তুই একদম বোকা, হারিয়ে গেলে এখন তোকে পিঠে নিয়ে কে হাঁটত?'
ছেলেটিও হেসে ফেলল। জিজ্ঞেস করল, 'তাহলে তারপর কী হল'?
'তারপর? তারপর হয়তো অনেকক্ষণ কেটে গেছে। হঠাৎ আমি চোখ চাইলুম। আমার মুখের ওপর সূর্যের তাপ। আমি যে এখন জলের ওপর হাবুডুবু খাচ্ছি না, সেটা বুঝতে পারলুম। উঠতে গেলুম, কষ্ট হল। আমার দেহের অর্ধেকটা বালির নীচে চাপা পড়েছে। এমন অবস্থা কী করে হল, বুঝতে পারছি না। তারপর কোনোরকমে বালি সরিয়ে, আমি উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলুম। তখন আবার সমুদ্রের গর্জনটা ধীরে-ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল আমার কানে। আমি বুঝতে পারলুম, আমি পড়ে আছি সমুদ্রসৈকতে। ওই ঢেউয়ের সঙ্গে ঘুরপাক খেতে-খেতে হয়তো আমি এখানেই আছড়ে পড়েছি। তারপর—'
'দাঁড়ান, দাঁড়ান।' ইতিমিচিসাহেবের কথা শেষ হবার আগেই ছেলেটি ভীষণ ব্যস্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল।
থতমত খেয়ে চুপ করে গেলেন ইতিমিচিসাহেব। দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর তিনিও ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হল রে?'
ছেলেটি তেমনি ছটফট করে বলল, "আমায় নামিয়ে দিন আপনার পিঠ থেকে। এ আমার চেনা জায়গা/'
ইতিমিচিসাহেব বললেন, 'এখানে তোদের বাড়ি?'
তেমনি অস্থির হয়ে সে বলল, 'না।' তারপর ইতিমিচিসাহেবের পিঠ থেকে প্রায় লাফিয়ে নেমে পড়ল। তাঁর হাতটা চেপে ধরে ছুটতে-ছুটতে বলল, 'আপনি আসুন আমার সঙ্গে/'
এতক্ষণ একটি নদীর বাঁধ ধরেই হাঁটছিলেন ইতিমিচিসাহেব। তিনি এতক্ষণ খেয়াল করেননি যে, নদীর চারদিকে ঘন জঙ্গল। জঙ্গল-ঘেরা সেই নদীর বাঁধের ওপর দিয়েই ছেলেটি তাঁর হাত ধরে ছুটল। ইতিমিচিসাহেব কিছু বলার আগেই ছেলেটি একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল। যেন এক অজানা উত্তেজনায় সে ভীষণ হাঁপাচ্ছে। মাটিতে উপুড় হয়ে বসে পড়ল। তারপর সেই অন্ধকার রাতে, আবছা চাঁদের আলোয়, চোখের দৃষ্টিটাকে মাটির ওপর স্থির রেখে তীক্ষ্ণভাবে কী যেন দেখতে লাগল।
ইতিমিচিসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, 'কী দেখছিস?'
ছেলেটি কান্না-ভরা গলায় উত্তর দিল, 'আপনিও দেখুন/' বলে ইতিমিচিসাহেবের হাত ধরে টান দিল। ইতিমিচিসাহেবও বসে পড়লেন।
সে কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, 'দেখতে পাচ্ছেন?'
'হ্যাঁ, 'রক্ত/'
'এবার আসুন আমার সঙ্গে/'
'কোথায়?'
'কাছেই।' বলে ছেলেটি একটু এসে আবার দাঁড়াল।
ইতিমিচিসাহেব দেখতে পেলেন, দূরে একটা ভাঙাচোরা কোঠাবাড়ি। জঙ্গলের গাছ-পালার আড়াল থেকে খানিকটা দেখা যাচ্ছে।
ছেলেটি রোষে গুমরে উঠে বলল, 'ওরা ওইখানেই থাকে/'
ইতিমিচিসাহেব জিজ্ঞেস করলেন, 'কারা?'
ছেলেটির মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। প্রতিহিংসায় চোখদুটো জ্বলে উঠল। তার গলার স্বরটা চাপা-গর্জনে ফুঁসে উঠল, 'ওরাই তো, ওরাই তো আমার বাবাকে, আমার মাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।'
ইতিমিচিসাহেবের বুকের ভেতরটা কে যেন মুচড়ে দিল মুহূর্তে। তিনি প্রায় চিৎকার করেই বলে উঠলেন, 'কেন?'
'ওরা যে খুনি, লুটেরা।' বলতে-বলতে ছেলেটির গলা কাঁপতে লাগল। সেই কাঁপা-গলায় সে বলল, 'আশ্চর্য লাগছে ভাবতে, আপনার গল্প শেষ হবার আগেই আমার গল্প এসে গেছে। সেদিন তখন গভীর রাত। আমরা ঘুমুচ্ছি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। বাবা ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। শুনতে পেলেন, পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর আর্তনাদ। দেখতে পেলেন, ওই দুশমনের দল তাদের সর্বস্ব লুঠ করে পালাচ্ছে। তাদের হাতে বন্দুক। বাবা ভয় পেলেন না। দুর্জয় সাহস বুকে নিয়ে তিনি তাদের পেছনে ধাওয়া করলেন। তারা গুলি ছুড়ল। সেই ভীতু পলাতকের দল বাবাকে আঘাত করতে পারল না। ভয় পেলেন না বাবা। তাদের তিনি ধরবেনই এবং নিশ্চিত বিপদকে তুচ্ছ করে তিনি একজনকে ধরেও ফেললেন। তার হাতেও বন্দুক ছিল। কিন্তু বন্দুকটা কাজে লাগাবার মতো, তখন আর তার ক্ষমতা নেই। বাবা তার ঘাড়টা ধরে টান মারতেই সে একটা ভীত মেষশাবকের মতো চিৎকার করে উঠল, তার সঙ্গীদের সাহায্যের জন্যে। কিন্তু সেই কাপুরুষের দল সঙ্গীর বিপদে সাড়া দিল না। তারা পালাল দিগবিদিকজ্ঞান হারিয়ে। তবু এই দুশমনটা বাঁচার তাগিদে বাবার সঙ্গে লড়াই শুরু করে দিল। কিন্তু বাবার এক প্রচণ্ড ঘুষিতে সে ছিটকে পড়ল মাটিতে। ছুটে গিয়ে বাবা তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ভীষণ রোখ চেপে গেছে বাবার। মনে হল, বুঝি-বা লোকটাকে মেরেই ফেলেন। রক্ষে, ঠিক এই সময়েই পুলিশ এসে পড়েছিল। লোকটাকে পাকড়াও করে নিয়ে চলে গেল পুলিশ।
'আসলে এতেই হল ওই দুশমনদের বাবার ওপর আক্রোশ। তাদের সে-আক্রোশের কথা আমরা জানতে পারিনি। আমরা জেনেছিলুম, গোটা দলটাকে পাকড়াও করার জন্যে পুলিশ জোর তল্লাশি চালাচ্ছে। জেনেছিলুম, যে-লোকটা ধরা পড়েছে, সে কবুল করে ফেলেছে সবকিছু। সুতরাং তাদের দিন এগিয়ে এসেছে। ধরা তারা পড়বেই।
'কিন্তু ঘটনা ঘটল উলটো। একদিন গভীর রাত্রে সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে অতর্কিতে আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল এই শয়তানের দল। নিঃশব্দে তারা আমাদের শোবার ঘরে গিয়ে, ঘুমন্ত আমার মাকে, বাবাকে আর আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছিল। তারপর ধরে নিয়ে এসেছিল ওই ভাঙা বাড়িটায়। ওইখানে তিনদিন আমাদের ফেলে রেখেছিল। তারপর যে কী করেছিল তার সাক্ষ্যি তো ওই-রক্তই।' বলে ছেলেটি কেঁদে ফেলল।
ইতিমিচিসাহেব উত্তেজনায় হঠাৎ নিজেই ছেলেটির হাত চেপে ধরলেন। বললেন, 'কাঁদিস না। তুই এখানে একটু দাঁড়া আমি আসছি।'
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, 'কোথা যাচ্ছেন?'
'সেই দুশমনের চেহারাগুলো একবার দেখতে যাচ্ছি/'
'আপনাকে খতম করে ফেলবে/'
'খতম হওয়ার আগে আমি বুঝতে চাই, আমি সত্যিই ভূত, না, মানুষ/'
ছেলেটি কোনো কথা বলল না। ইতিমিচিসাহেব অন্ধকারে একাই এগিয়ে গেলেন। একটু গিয়েই ক্ষণেক থামলেন। তারপর আবার বললেন, 'এখান থেকে যাস না কোথাও। আমি এক্ষুনি ফিরে আসছি। সাবধান ওরা না তোকে দেখতে পায়/'
ছেলেটি এবারও মুখ খুলল না।
ইতিমিচিসাহেব চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে ভাঙা বাড়িটার দিকে এগিয়ে চললেন। যেতে-যেতে তিনি বুঝলেন, দুশমনের আস্তানা গড়ার এটা উপযুক্ত জায়গাই বটে/
এই ঘন-জঙ্গল-ঘেরা অন্ধকারে দৃষ্টি যতই সতর্ক হোক, পাশে যদি কেউ ওত পেতে বসে থাকে, টের পাওয়া খুবই মুশকিল। সুতরাং বিপদ প্রতি পদে-পদে। এতক্ষণ ছেলেটির মুখে তার দুর্ভাগ্যের যে-কথা তিনি শুনলেন, তা শুনে তিনি যে শুধু মনে মনে জ্বলে উঠেছেন, তা-ই নয়/ প্রতিজ্ঞা করেছেন, তিনি দুশমনের মুখোমুখি দাঁড়াবেন, তাদেরও রক্ত দেখবেন। সুতরাং এই অন্ধকারটা, অথবা অন্ধকারে এই ভয়াবহ জঙ্গলটা এখন তাঁর বুকের মধ্যে ভয়ের কামড় ফোটাবার ফুরসত পাচ্ছে না। তিনি ভাঙাবাড়ির সামনে পৌঁছে গেলেন। দেখলেন, বাড়ির মধ্যে একটা অস্পষ্ট আলো। তিনি পিছনদিকে চলে গেলেন। পিছনে বাড়ির দেওয়ালে একটা ফাটল দেখতে পেলেন। ফাটল দিয়ে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। তিনি ফাটলে চোখ রেখে উঁকি মারলেন। দেখতে পেলেন, চারজন লোক মুখোমুখি বসে জমিয়ে গল্প করছে। আর থেকে-থেকে হো-হো করে হেসে উঠছে। তাদের চেহারা দেখলে মনে করা খুবই শক্ত তারা লুটেরা বা দুশমন। অবশ্য চারজনের পাশেই চারটি বন্দুক দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এই অন্ধকার রাতে, জঙ্গলের মধ্যে একটা ভাঙাবাড়িতে বন্দুক নিয়ে যারা গজাল্লি করছে, তারা নিশ্চয়ই ধোয়া তুলসীপাতা নয়/ দেখতে-দেখতে হঠাৎ ইতিমিচিসাহেবের চোখটা যেন ধাঁধিয়ে গেল। ওই চারজন লোকের মধ্যে একজনকে যেন তাঁর খুবই চেনা লাগছে/ লোকটাকে যেন কোথায় তিনি দেখেছেন/ তাঁর মাথাটা ঘুরে গেল/ এ যে সেই লোকটা/ সেই যে সোনার ব্যবসায়ী বলে মিথ্যে পরিচয় দিয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল জাহাজে করে। তিনি আরও ভালো করে দেখলেন। আরও খানিকক্ষণ। হ্যাঁ, এবার তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর চিনতে কোনো ভুল হল না। লোকটার চেহারায় অবিশ্যি বয়সের ছাপ পড়েছে। পাক ধরেছে চুলেও। ধরবেই/ কেননা, যখন কার কথা এখন তাঁর মনে পড়েছে, তখন ইতিমিচিসাহেব কত ছোটো। খুব বেশি হলে তখন ইতিমিচিসাহেবের বয়স ছিল এগারো। এখন কদিন পরে তিনি চল্লিশের ঘরে পা দেবেন। সুতরাং তখন লোকটার বয়েস যদি খুব বেশি ধরি তিরিশ, তাহলে এখন তারও তো প্রায় ষাট হতে চলল। কিন্তু দেখে বোঝা ভার। যদিও বয়েস হয়েছে, তবুও বলতে পারা যায় না, শরীরটা ভেঙে পড়েছে। এখনও বেশ শক্তপোক্ত তরতাজাই লাগছে। তাহলে ইনিই সেই কীর্তিমান দুশমন/ ইনিই এখানে সেই ছোট্টো ইতিমিচিকে ধরে আনার মতলব এঁটেছিলেন/
তাকে চিনে ফেলার সঙ্গে-সঙ্গে ইতিমিচিসাহেবের দেহের রক্ত যেন একসঙ্গে টগবগ করে ফুটে উঠল। সেই অন্ধকারে ভাঙাবাড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে রাগে তিনি ফুঁসতে লাগলেন। অবশেষে ঠিক করলেন লোকটার সামনে তিনি যাবেন। দরজাটার কাছে এলেন আবার। আলতো-হাতে ঠেলা মারলেন দরজায়। অবশ্যই দরজা বন্ধ। শয়তান কি আর অতই মুখ্যু যে, রাতদুপুরে ঘরের দরজা হাট করে খুলে, খোশগল্প করবে। তাহলে এখন ইতিমিচিসাহেব কী করেন? জোরে দরজায় ঠেলা মারবেন, না, অন্য কোনো পথের খোঁজ করবেন?

খবরদার/বন্দুক নেবার চেষ্টা কোরো না, খতম করে ফেলব/
ইতিমিচিসাহেব তাই করলেন। খুঁজতে লাগলেন, ভিতরে ঢোকার অন্য পথ। কিন্তু ভাঙাবাড়ির চারকোণে চক্র মেরেও তিনি কোনো পথেরই হদিস করতে পারলেন না। সুতরাং ঝুটমুট চোরের মতো ঘুরঘুর না করে, বুকে সাহস এনে তিনি দরজাতেই ধাক্কা দেবেন ঠিক করলেন।
ইতিমিচিসাহেব তাই করলেন। খুঁজতে লাগলেন, ভিতরে ঢোকার দরজা।
এমনই সময় হঠাৎ হাঁটতে গিয়ে একটা গর্তের মধ্যে তাঁর পা পড়ে গেল। তিনি হোঁচট খেলেন। গর্তটা তিনি একদম ঠাওর করতে পারেননি। গাছ পাতায় এমনভাবে ঢাকা পড়ে আছে যে, খেয়াল করাই শক্ত। ঠিক বাড়ির গায়ে লাগোয়া গর্তটা দেখে তাঁর কেমন যেন সন্দেহ হল। এটা কোনো সুড়ঙ্গ নয়তো/ দুর্বৃত্তদের পালাবার পথ/ এটা মনে হতেই তিনি ভাবলেন, তাহলে তো একবার পরখ করে দেখতে হয়/
কিন্তু এই অন্ধকারে সুড়ঙ্গ পরখ করা কেমন করে সম্ভব? এ-কথা জেনেও তিনি অন্ধকার মানলেন না। প্রথমে তিনি গর্তটার মধ্যে উঁকি দিলেন। তারপর ধীরে ধীরে নিজের পাদুটিকে এগিয়ে দিলেন গর্তের গহ্বরে। কোমরটা ভেঙে তিনি ঘাড় হেঁট করলেন। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চললেন। হ্যাঁ, এখন মনে হচ্ছে, সত্যিই এটা সুড়ঙ্গ। কেননা, এগিয়ে চলতে তিনি কোনো বাধা পাচ্ছেন না। অবিশ্যি ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে কিছু দেখাও যাচ্ছে না। সুতরাং হাতড়ে-হাতড়ে তাঁকে হামাগুড়ি দিতে হচ্ছে। এবং অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারে ঢুকে পড়ছেন।
হং, শেষমেশ সত্যি-সত্যিই তিনি সেই ভাঙাবাড়ির অন্দরমহলে ঢুকে পড়তে পারলেন। ইতিমিচিসাহেব ওই দুশমনদের মুখোমুখি দাঁড়াবার আগে আর একবার উঁকি মারলেন। তিনি এখন পরিষ্কার চিনতে পারছেন সেই ভুয়ো সোনার ব্যবসায়ীকে। তিনি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। চার দুশমনের কেউ টেরও পেল না। গল্পে মশগুল তারা। এই তক্কে তিনি তাদের পাশে রাখা একটা বন্দুক তুলে নিলেন নিঃশব্দে। তাদের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে আচমকা চিৎকার করে উঠলেন, 'হ্যালো, গোল্ড-মার্চেন্ট/'
চার দুশমনের বুকের ধুকধুকি আঁতকে উঠল। চমকে তাকাল সেই রাতের অতিথিটির দিকে। দেখল, অতিথিটি তার হাতের বন্দুক তাক করে তাদের দিকে চেয়ে হাসছে/ প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিয়েই চার দুশমন প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা বন্দুক তুলতে গেল। ইতিমিচিসাহেব আবার চিৎকার করে উঠলেন, 'খবরদার/ বন্দুক নেবার চেষ্টা কোরো না, খতম করে ফেলব/'
তারা থমকে ইতিমিচিসাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে।
ইতিমিচিসাহেব তেমনি হাসি-হাসি মুখে বললেন, 'আমাকে মারবার দরকার হবে কি? আমি তো আপনার খুবই চেনা। চিনতে পারছেন না আমাকে?'
ইতিমিচিসাহেবকে তার পক্ষে এখন চেনা কেমন করে সম্ভব/ তাঁর বয়সও হয়েছে, একটি-দুটি চুলে পাকও ধরেছে, গলার স্বরও ভারী হয়েছে। তাছাড়া সেই ছেলেবেলার মুখখানা তাঁর এখন দাড়ি-গোঁফে ঢাকা পড়ে গেছে। তাঁর গলার স্বরটাও আর সেই ছেলেমানুষি সুরে ফিনফিন করছে না। অনেকটা গম্ভীর। চেহারাটাও ভারিক্কি হয়েছে। সুতরাং শত চেষ্টা করলেও তাঁকে এখন চেনা যাবে না। দুশমন তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে ফ্যালফ্যাল করে। ইতিমিচিসাহেব হো-হো করে হেসে উঠলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, 'কী চেনা যাচ্ছে? আপনার ভয় পাবার কিছু নেই। মনে পড়ছে না, সেই ছোটো-ছেলেটির কথা? জাহাজে চাকরি করে দেবার লোত দেখিয়ে যাকে নিয়ে আপনি ভাগছিলেন? হ্যাঁ, আমিই সেই ছোটোবেলার ইতিমিচি, এখন আপনার যম।'
সেই লোকটি বোবা-মুখে ইতিমিচিসাহেবের চোখের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চাইল। তারপর কাঁপা-গলায় জিজ্ঞেস করল, 'কী চাও তুমি?'
'যদি বলি আপনার রক্ত/' উত্তর দিলেন ইতিমিচিসাহেব।
লোকটা বোধ হয় এতক্ষণ মনে-মনে আঁটছিল কী করবে। তাই মুহূর্তে গলা ফাটিয়ে হুংকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল। ইতিমিচিসাহেব থতমত খেয়ে গেছেন। আচমকা তো/ আর ঠিক সেই তক্কে চার দুশমন দরজা খুলে মারল ছুট।
ইতিমিচিসাহেবের চোখে যেন ধাঁধা গেলে লেদা। তিনি যদিও নিজেকে চোখের পলকে সামলে নিয়ে বন্দুক তুলে তাক করেছিলেন, কিন্তু তার আগেই তারা হাওয়া। তিনি ধাওয়া করলেন। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে সাবধান করলেন, 'দুশমন, পালালে গুলি করব/'
কিন্তু সে-কথা কখনও শোনে তারা/ তারা ছুটল জঙ্গল-ঢাকা সেই নদীর বাঁধের ওপর দিয়ে। ইতিমিচিসাহেবও বাঁধের ওপর ছুটে এলেন। তিনি আন্দাজেই একটি গুলি ছুড়লেন। নিস্তব্ধ বনটা বন্দুকের শব্দে যেন শিউরে উঠল। তাদের কারো গায়েই যে লাগেনি, এটা ইতিমিচিসাহেব খুব ভালোই বুঝেছিলেন। আর একবার বন্দুক ছুড়লেন। এবার তিনি শুনতে পেলেন, নদীর জলে ঝপ করে যেন কী আছাড় খেয়ে পড়ল। তিনি দাঁড়ালেন না। কারণ তিনি বুঝলেন, নির্ঘাত গুলি খেয়ে নদীর জলে ডুবেছে এক দুর্বৃত্ত। তিনি চেঁচালেন, 'দুশমন, তোমরা আমার নিশানার মধ্যে আছ। সুতরাং মিথ্যে পালাবার পথ খুঁজছ/ দাঁড়াও, নইলে সবকটাকে খতম করে ফেলব।' এখন তিনি প্রায় তাদের কাছাকাছি চলে এসেছেন। সেই দুর্বৃত্তের দল বুঝতে পারল, তাদের সময় হয়ে এসেছে। কিন্তু তারা মৃত্যুর হাতছানি দেখতে পেয়েও দাঁড়াল না। কিন্তু তারা যখন বুঝল, ছুটে আর রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়, তখন সেই দুশমন-সর্দার, মানে সেই নকল সোনার ব্যবসায়ী দাঁড়িয়ে পড়ল। মনে হয়েছিল, হয়তো বা বয়সের ভারে সে ক্লান্ত, তাই বুঝি সে ইতিমিচিসাহেবের কাছে আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু না, ছুটতে-ছুটতে ইতিমিচিসাহেব তার মুখোমুখি হতেই, লোকটা একেবারে অতর্কিতে ইতিমিচিসাহেবের মুখের ওপর ঘুষি চালিয়ে দিল। ইতিমিচিসাহেবে টাল খেলেন। তাঁর হাতের বন্দুকটা নিশান থেকে ছুটে গেল। তবু কেমন আশ্চর্য সাহসে বন্দুকের গুলি তিনি ছুড়তে পারলেন। ছুড়েই তিনি গড়িয়ে পড়লেন নদীর জলে ওই বাঁধের ওপর থেকে। শুনে মনে হচ্ছে, না-জানি কী মস্ত ঘটনা কিন্তু ঘটে গেল চোখের পলকে। সেই ভারী বন্দুকটা এরই মধ্যে ইতিমিচিসাহেবের হাত থেকে ছিটকে গেছে এবং তিনি জলের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন। তিনি জানতেও পারলেন না, সেই দুশমন সর্দারটার কী হল/
বাঁধের ঢালু দেওয়ালে গড়াতে-গড়াতে যদিও ইতিমিচিসাহেবের হাত পা কেটেছে, তবু মারাত্মক কিছু হয়নি। তিনি নদীর স্রোত কাটিয়ে আবার বাঁধে উঠতে পারলেন ঠিকই, কিন্তু জলে ভিজে ভারী অস্বস্তি লাগছে তাঁর। তিনি উঠে প্রথমেই বন্দুকটা খুঁজলেন। কিন্তু সে কী আর পাওয়া যায়/ সেটাও বোধ হয় নদীর জলে ডুবেছে। তবু তিনি তন্ন-তন্ন করে খুঁজতে লাগলেন। খুঁজতে-খুঁজতে তিনি চমকে উঠলেন। দেখলেন, বন্দুকের গুলি সেই দুশমনের বুকেই লেগেছে। দুশমন মাটির ওপর মুখ গুঁজে পড়ে আছে। দেখে ইতিমিচিসাহেবের বুকখানা যেন দশ হাত ফুলে উঠল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, না আর দরকার নেই বন্দুকের। তিনি আনন্দে উদবেল হয়ে ছুটে গেলেন সেই ছেলেটির কাছে। গেলেন, যেখানে সে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু থমকে গেলেন ইতিমিচিসাহেব/ কই এখানে তো ছেলেটি নেই/ ইতিমিচিসাহেব এধারে-ওদারে ঘুরে ফিরে দেখলেন। না, তবু দেখতে পেলেন না। তখন চাপা গলায় তার নাম ধরে ডাকলেন, 'রিগি।' তিনি সাড়া পেলেন না। তিনি আরও একটু দূরে, আরও একটু দ্রুত হেঁটে গেলেন। খুঁজলেন, এবারও দেখতে পেলেন না। আবার ডাকলেন, তবুও সাড়া পেলেন না। তিনি তখন কেমন যেন, ভয় পেলেন। তবে কী দুশমনের হাতে ধরা পড়ল। তিনি তখন ভর্য়াত-কণ্ঠে চিৎকার করে ডাকলেন, 'রি—গি/ দুশমন খতম হয়েছে। তুমি কোথায় গেলে? রি—গি/'
'আমি হারিয়ে গেছি/' যেন একঝলক হাওয়ার শব্দে ভেসে এল সেই ছেলেটির কণ্ঠ।
চমকে তাকালেন ইতিমিচিসাহেব। জিজ্ঞেস করলেন, 'এ কী বলছ রিগি?'
'ঠিক বলছি সাহেব/' আবার হাওয়ার শব্দে ভেসে এল তারই উত্তর, তখন ওই যে দেখলেন একঝলক রক্ত, আমার মা-বাবাকে আমার কাছ থেথে কেড়ে নিয়ে, এখন বলি, ও রক্ত আমার। আমি মৃত। আমাকেও হত্যা করেছে ওই দুশমন। এতদিন আমার আত্মা ওই দুশমনের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ছটফট করে ঘুরেছে খালি। আজ আমি তৃপ্ত। আজ আমি জেনেছি, আমার সাহসী বন্ধু সে কাজটা করেছে। আজ আমার ভালোবাসা, শুধুই ভালোবাসা ছাড়া আর তো কিছুই দিতে পারব না আপনাকে। এর জন্যে যে-দুঃখ, সে তো আমারই। আজ শুধু বলে যাই, সত্যিকারের বন্ধু আপনি, সত্যিকারের মানুষ। আমার সঙ্গে আর দেখা না হলেও মনে রাখব বন্ধু আপনাকে। আপনার সাহসকে আপনার ভালোবাসাকে।' বলে হারিয়ে গেল সেই শব্দ।
নিমেষে যেন আকাশ থেকে বাজ পড়ল ইতিমিচিসাহেবের বুকের ওপর। সমস্ত বিশ্বাসটা যেন তাঁর খান-খান হয়ে গেল একমুহূর্তে। তিনি আর কথা বলতে পারেন না। কী যে করবেন, তা-ও ভেবে পান না। ধীর-পায়ে তিনি এগিয়ে যান সেই রক্ত-চিহ্নের সামনে। নিশ্চল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন সেইদিকে চেয়ে। তারপর মাথা হেঁট করেন। হঠাৎ যেন দু-ফোঁটা চোখের জল উপছে পড়ে ছড়িয়ে গেল সেই রক্তের ওপর। অভিমানে তাঁর গলাটা সেই মুহূর্তে আকুল কণ্ঠে বলে উঠল, 'তবে কেন এসেছিলি? তবে মিথ্যে কেন দুদণ্ডের এই হাসি, এই আনন্দ/ এই ভালোবাসা?'
উত্তর পাননি ইতিমিচিসাহেব।
কিন্তু হঠাৎ একটি পাখির ডাক শুনতে পেয়েছিলেন ইতিমিচিসাহেব। চমক ভাঙল তাঁর। চোখের জল মুছে আকাশের দিকে তাকালেন। এ কী/ আকাশে যে ভোরের আলো ফুটেছে। সেই আলো নদীর জলে ভাঙা ভাঙা ঢেউয়ের ওপর দোল খাচ্ছে। তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন সেই জলের দিকে। নদীর জলে নিজের মুখের ছায়া দেখলেন। তারপর আঁজলা ভরে জল নিয়ে সেই মুখে ছড়িয়ে দিলেন। আবার হাঁটলেন। হাঁটতে-হাঁটতে হারিয়ে গেলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন