আবু ও দস্যু-সর্দার

শৈলেন ঘোষ

একদিন আমার মা আমার চিবুক ছুঁয়ে আদর করতে-করতে আমার বাবাকে বলছিল, 'দেখো, দেখো, আবু আমার কত বড়ো হয়ে গেছে!'

বাবা আমার মুখের দিকে চেয়ে হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, 'হ্যাঁ, তাই তো! দেখতে-দেখতে সত্যিই কত বড়ো হয়ে গেছে আবু। আর ক-দিন পরে পাশার পিঠে চেপে আবুও আমার মতো কাজে বেরোবে।'

সে-কথা শুনে, সত্যি বলছি, আমি আনন্দে শিউরে উঠেছিলুম। কেননা, আমি যে এই স্বপ্নই দেখি। স্বপ্ন দেখি, দিনে-রাতে, ওই বালির সমুদ্র যেন আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এ-সমুদ্রের শেষ নেই। বালি, বালি, যেদিকে চাইবে, দেখবে শুধু বালি। ওই দূরে, অনেক দূরে, আকাশ যেখানে পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছে, সেখানে এই সমুদ্রও হারিয়ে গেছে। সূর্যের কিরণে এ-সমুদ্র জ্বলন্ত আগুন। মন বলে, বারবার বলে, পাশার পিঠে চেপে আমিও হারিয়ে যাই ওই জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে।

হ্যাঁ, এখন আমি সত্যিই বড়ো হয়েছি। জানি না, তোমার চেয়ে বড়ো কি না। তবে এখন আমি জানি, এই যে রাশি-রাশি বালির রাজত্ব, এই যে ধু-ধু মরুভূমি, এইখানেই আমার দেশ। আমি জানি, ওই যে লম্বা-চওড়া রোদে-পোড়া মানুষগুলি, যারা দুঃখ আর কষ্টের সঙ্গে লড়াই করে প্রতিদিন উঠের পিঠে চেপে নানান কাজে ওই সমুদ্রে পাড়ি দেয়, তারা আমার দেশের মানুষ। এই মানুষেরা কেউ আপন, কেউ পর। কেউ দূরের, কেউ কাছের।

তুমি হয়তো ভাবছ পাশা কে!

পাশা আমাদের উট।

আমি বড়ো হয়েছি বলে এখন আমি পাশার পিঠে চেপে রাশি-রাশি বালির ওপর দিয়ে খানিকটা বেড়িয়ে আসতে পারি। এখন পাশার পিঠে বসে, পড়ন্ত সূর্যের সামনে দাঁড়িয়ে আমার দেখতে ভালো লাগে বালির ওপর রক্ত-আলোর দোলন। এখন আমি জানি, মাথার পাগড়িটা কেমন করে মুখে-নাকে জড়িয়ে নিলে সূর্যের ঝলসানো আগুনে আমার কিচ্ছু হবে না। এই সূর্য, এই বালি, এই আকাশ, সব আমার চেনা। আমার আপনার। ওই যেখানে একটুখানি জায়গা ঘিরে খেজুর-গাছের ছায়ারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, ওই ছায়ার নীচে আমাদের ঘর। তুমি আমাদের ঘরটা যদি একটু দূর থেকে দেখ, তোমার মনে হবে, যেন একটি চৌকো-মতো খেলনার বাক্স। এরকম ঘর পর-পর তোমার আরও নজরে পড়বে। তবে যারা বড়োলোক, যাদের পাঁচ-দশটা উট আছে, তাদের ঘরগুলো সব ভেড়ার চামড়া দিয়ে তৈরি। ভারি সুন্দর দেখতে।

শুনি তোমরা খুব সুখে আছ। আমাদের মতো তোমাদের কোনো কষ্টই নেই। আমি শুনেছি, তোমাদের মাঠ ভরতি সবুজ গাছগাছালি। শুনেছি, সে-গাছে ফুলে-ফলে ছড়াছড়ি। কত নদী-নালা। বর্ষার দিনে মেঘে মেঘে আকাশ ছেয়ে যায়। ঝমঝমিয়ে বিষ্টি নামে। মাঠ-ঘাট সব জলে-জলে থই থই! অবাক হয়ে যাই একথা শুনে। কেননা, এখানে এসব কিচ্ছু নেই। তবে হ্যাঁ আমি কী আর বলছি এখানে বিষ্টি হয় না। হয়, এখানে হঠাৎ যেমন আকাশ ভেঙে বিষ্টি নামে, তেমনি আবার হঠাৎ-ই থামে। হলে কী হবে। মরুর এই আগুনের রাজ্যে আকাশের ওই জলটুকু কিচ্ছু কাজে লাগে না। রাক্ষুসে বালি যেন তেষ্টায় হাঁ করে ধুঁকছে! জল একবার পড়লে হয়। নিমেষের মধ্যে ঢক-ঢক করে গিলে খেয়ে ফেলবে! তাই দেখে ভাবি, মরুর তেষ্টা বুঝি কোনোদিন মেটে না। মিটবেও না।

কিন্তু আমার সবচেয়ে অবাক লাগে পাশার কথা ভেবে। আমি দেখেছি, পাঁচ-পাঁচটা দিন এক ফোঁটা জল মুখে না দিয়েও দিব্যি আছে! পিঠে ভারী-ভারী মাল-পত্তর নিয়ে, দিনের পর দিন ওই বালির ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে। তবু তেষ্টা নেই! অথচ আমাদের? জল না হলে আর রক্ষে আছে! কী ছটফটানি!

রক্ষে, আমাদের ঘর থেকে দু-পা এগোলেই জলের ইঁদারা। তোমাদের যেমন পাতকুয়ো, তেমনি। এখানে এই একটিই ইঁদারা। তারপর তুমি মাইলের পর মাইল খুঁজে বেড়াও, একটু জল পাবে না। আমি দেখি রোজ কত মানুষ এখানে আসে। কত দূর-দূরান্ত থেকে। সঙ্গে সারি-সারি উট। তাদের পিঠে কত কী জিনিসপত্তর। এই মরুর সীমানা পেরিয়ে বাণিজ্য করতে চলেছে। একটু জলের জন্যে ওরা এখানে থামবে। তাঁবু ফেলবে। বিশ্রাম নেবে। তারপর আবার চলো। চলো ওই মরুর জাহাজে চড়ে। জাহাজ? অবাক হলে? জানো না বুঝি আমরা উটকে বলি জাহাজ? ওই যে উট, দেখো না কেমন চলেছে দলে-দলে সার বেঁধে দুলতে-দুলতে ওই বালির সমুদ্রের ওপর দিয়ে!

আমার বাবাও এই কাজ করে। পাশার পিঠে বেঁধে নিয়ে যায় কত দামি-দামি সওদা। সার বেঁধে চলে বালির ওপর দিয়ে। মাথার ওপর সূর্য। কী অসহ্য তার তেজ। শরীর যেন জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যায়। তবু থামলে চলবে না। একটু ছায়ায় যে জিরিয়ে নেবে, সেই ছায়াই বা কই এই শূন্য মরুভূমিতে! যেদিকে চাইবে, খালি বালির ঢেউ আর ভয়ংকর নিস্তব্ধতা! ওই নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু চলেছে ওরাই, ওই বোবা উটের দল। বালির ওপর ওদের পায়ের শব্দ ভারি নরম, ভারি অস্পষ্ট!

আমার বাবার পোশাকটা দেখলে তোমার ভালো লাগবে কি না জানি না। একদম পায়ের নীচ অবধি একটা লম্বা জামা। সেই জামা কোনোটা নীল, কোনোটা সাদা। কোমরে আঁট-সাঁট বাঁধা একটা শক্ত কাপড়ের বেল্ট। সেই বেল্টে গোঁজা একটা ঝক-ঝকে ছোরা। কোমরের বাঁ পাশে তরোয়াল ঝোলানো। মাথায় পাগড়ি আর পায়ে চপ্পল।

আমার পোশাকও এমনি। তবে, আমার একটা এত সুন্দর নীল ডোরা-কাটা জামা আছে যে, দেখলেই তোমার ভালো লাগবে। তোমার ইচ্ছে হবে এখুনিই গায়ে দাও। আমি মনে-মনে ভাবি আমি যেদিন প্রথম বাবার মতো একা-একা পাশার পিঠে চেপে মরুতে পাড়ি দেব, সেইদিনই ওই জামাটা গায়ে পরব।

আমি জানি তুমি ঠিক ভাবছ, আমার বাবার কোমরে কেনই-বা ছোরা আঁটা আর কেনই-বা তরোয়াল ঝোলানো। এই কথাটা তোমরা জিজ্ঞেস করতেই পারো। কারণ তোমরা তো মরুভূমির মানুষ নও। ধরো, তুমি চলেছ তোমার উটের পিঠে চেপে একা-একা ওই মরুভূমির ওপর দিয়ে নির্জন দুপুরে কিংবা গভীর রাত্রে। হয়তো তোমার সঙ্গে রয়েছে এমন কিছু মূল্যবান ধনরত্ন যেগুলি কালই তোমাকে এই মরুভূমি পেরিয়ে শহরে পৌঁছে দিতে হবে। তুমি চলেছ, তোমার উটের গলায় ছোট্ট একটি ঘন্টা বেজে যায়, টিং-লিং, টিং-লিং। সেই শব্দ মরুভূমির নিস্তব্ধতা ভেঙে যতই বেজে-বেজে উঠছে, ততই যেন ওই রাশি-রাশি বালির বুকেও শিহরণ জাগছে।

ঠিক এমনই সময়ে তুমি যদি হঠাৎ দেখতে পাও, দূরে, তোমার চোখের সামনে বালির মেঘ উড়িয়ে একদল ঘোড়সওয়ার ছুটে আসছে! যদি দেখ তাদের চোখে-মুখে কালো কাপড় ঢাকা! তাদের হাতে ঝকঝকে তরোয়াল! তবে তোমার কি বুঝতে বাকি থাকবে যে ওরা এই মরুর দস্যু! ওরা তোমার এই ধনরত্ন লুঠ করবে! তখন বলো, তুমি কী করবে? ভীতুর মতো কাঁপতে-কাঁপতে ওদের হাতে ধনরত্ন তুলে দিয়ে নিজে বাঁচবে? না, তোমার ওই কোমরে-বাঁধা চকচকে ছোরা হাতে নিয়ে মুখোমুখি রুখে দাঁড়াবে?

আমরা মরুর দেশে বাস করি। বুক্ষ মরুভূমি আমাদের সাহসী হতে শিখিয়েছে। শিখিয়েছে বিপদের মুখোমুখি কেমন করে দাঁড়াতে হয়। ওই সূর্যের ঝলসানো আগুন মাথায় নিয়ে আমরা বড়ো হয়েছি। আমরা জানি, কষ্টকে যে জয় করতে পারে সে-ই তো বীর।

সত্যি, তুমি আমার বাবাকে দেখলে, একথা বিশ্বাস না করে পারবে না। কী সাহস আমার বাবার! তুমি তরোয়াল নিয়ে লড়াই করতে বলো, বাবা পিছপা হবে না। তুমি তির-ধনুক ছুড়তে বলো, চোখের নিমেষে দূরের লক্ষ্য ভেদ করে দেবে। বাবার কাছে কষ্ট-টষ্ট কিচ্ছু না। দিনের পর দিন ওই মরুভূমির ওপর দিয়ে চলেছে বাবা। কত ঝঞ্ঝা, কত বিপদ, কত কালো অন্ধকার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে। বুক পেতে সব সহ্য করেছে। ভয়? ভয় পেলে চলে! বিপদকে নিয়েই তো আমরা বেঁচে আছি! আর সত্যি বলছি, বিপদ না-থাকলে বাঁচার মজাই নেই!

কেমন করে তির-ধনুক ছুড়তে হয়, আমিও শিখে ফেলেছি। আমি শিখে ফেলেছি, কেমন করে তরোয়াল ঘোরালে শত্রু আমার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারবে না। ওই সূর্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এখন আমি গান গাইতে পারি। আগুনের গান। আর এই গান, এই আনন্দ, এই হাসি, আর দুঃখ নিয়ে মরুর মানুষ আমরা, আমি, আমার মা, আমার বাবা!এই পৃথিবীতে তোমাদেরই মতো।

আজ ঘুম থেকে উঠে আমি তোমাদের আনন্দের কোনো খবর দিতে পারছি না। ভালো লাগার কোনো কথা আমার মুখে আজ শুনতে পাবে না তুমি। মনটা যেন আপনা থেকে থমকে গেছে। চমকে গেছি আমি এখনও বাবাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে। মা কেন বসে আছে বাবার মাথার কাছে? আমি দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'কী হয়েছে মা?'

বাবা ভারি কষ্টে হাতটি নেড়ে আমায় কাছে ডাকল।

আমি ছুটে গেলুম, 'কী হয়েছে বাবা?' বাবার কপালে আমার হাত রাখলুম। ইশ! বাবার জ্বর! গা যে পুড়ে যাচ্ছে। আমি তো কক্ষনো বাবার জ্বর হতে দেখিনি। হঠাৎ কেন হল!

হঠাৎ-ই। কারণ কালও বাবা সারাদিন ধরে সাত-পাঁচ কত কাজ করেছে। করতেই হয়েছে। কেননা, আজ বাদে কাল বাবাকে শহরে যেতে হবে। শহরে যেতে হবে উট-পাখির পালক নিয়ে। শহর মানে সে কোথায়! এই মরুর বালি ভাঙতে-ভাঙতে সেই শেষ প্রান্তে। যেতে দশদিন, আসতে তদ্দিন। আমি জানি এই পালক যদি ঠিক দিনে না পৌঁছয়, মুখ রক্ষা হবে না বাবার। কেননা, বাবা যে কথা দিয়েছে পালকের সওদাগরকে! এখন কী হবে? যা হোক হবে। আগে তো মানুষের শরীর। তারপর কাজ! কিন্তু সে-কথা শোনার মানুষ নয় আমার বাবা। এই তো এখনও আমি দেখছি কষ্ট হচ্ছে, তবু বাবা হাসছে আমায় দেখে। আমি জিজ্ঞেস করছি, 'বাবা তোমার কষ্ট হচ্ছে?'

বাবা ঘাড় নাড়ছে। ঘাড় নেড়ে বলছে, 'আমার কিচ্ছু হয়নি। কাল সকালে শহরে যাব আমি।'

আমি বললুম, 'কাল না-ই বা গেলে। দুদিন পরে একটু ভালো হয়ে তারপরে যাবে।'

বাবা আমার চোখের দিকে চাইল। ধীরে-ধীরে হাতটি আমার মুখের কাছে তুলে, আমার গালের ওপর হাতটি রেখে বলল, 'আমি যে কথা দিয়েছি আবু।'

'কিন্তু এই জ্বর-গায়ে তোমার কষ্ট হবে বাবা। তুমি পারবে না।'

'পারব।' বাবার গলায় কঠিন স্বর।

আমি জানি, বাবাকে রাজি করানো কারো সাধ্য নয়। কিন্তু যে মানুষটার অসুখ, তাকে আমরাই বা ছাড়ি কোন সাহসে! না জানি কোন অজানা বিপদ বুঝি এগিয়ে আসে! এই ভয়ে আজ সারাদিন আমি বাবার কাছছাড়া হইনি। বাবার বিছানার পাশটিতে বসে সারাদিন আমি বাবার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছি। আর নয়তো কপালে হাত রেখে বলেছি, 'বাবা, পালকগুলো অন্য কাউকে দিয়ে পৌঁছে দিলে হয় না?'

আমার মুখের কথা শেষ হবার আগেই বাবার ঠোঁট দুটি ভারি কষ্টে কেঁপে উঠল। তারপর বলল, 'যার কাজ তাকেই যে করতে হয় বাবা। আমার বোঝা অন্যের কাঁধে চাপালে আমি যে শান্তি পাব না।'

আমি আর কিছু বলিনি। এরপর আমার বলারই বা কী আছে! হ্যাঁ, আমি বলতে পারতুম যদি আমি আরও একটু বড়ো হতুম। তখন আমি পাশার পিঠে পালকের বোঝা চাপিয়ে নিজেই পাড়ি দিতুম ওই বালির ওপর। বাবা বিছানায় শুয়ে-শুয়ে শুনত পাশার গলার ঘন্টা বাজছে, আর নয়তো ঘরের ওই জানলাটায় মুখ ঠেকিয়ে দেখত, তার ছেলে বাণিজ্যে চলেছে। দেখত, দূর থেকে দূরে পাশা হেঁটে চলেছে। তার মস্ত উঁচু মাথাটা দুলছে খুশিতে। আমি তার পিঠে বসে দুলতে-দুলতে হারিয়ে যাচ্ছি বালির রাজ্যে। আহা! সত্যি যদি এমন হত! সত্যি-সত্যি যদি আমি ওই আগুনের সমুদ্রে হারিয়ে যেতুম! যদি আমি সত্যি-সত্যি পারতুম ওই উটপাখির পালক পাশার পিঠে বেঁধে শহরে পৌঁছে দিতে!

কে বলেছে আমি পারি না। কে বলেছে ওই আগুনের সমুদ্রে হারিয়ে যেতে আমার ভয় করে! না, আমি ভয় পাই না। আমি যদি চিৎকার করে বলে উঠি, হ্যাঁ, আমি পারি। যদি বলি, ওই পালকের বোঝা পাশার পিঠে বেঁধে আমি পৌঁছে দিতে পারি শহরে, সেকথা কি শুনবে কেউ? শুনবে আমার মা? আমার বাবা? জানি না। শুধু জানি, আমি তাদের একমাত্র ছেলে। এই একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তাদের মনে হয়তো কত স্বপ্ন। হয়তো তারা দেখতে পাচ্ছে, সে-স্বপ্নের মণিমুক্তাগুলি যেন আমার গলায় ঝিকমিকিয়ে উঠছে। হয়তো তাদের স্বপ্নের রাজপুত্তুর হয়ে উঠছি আমি!

‘পারব।’বাবার গলায় কঠিন স্বর।

না, রাজপুত্তুর হবার ইচ্ছা আমার নেই। আমি চাই না, আমাদের এই চৌকো ঘরখানা আজ, এখনই রাজপ্রাসাদ হয়ে গড়ে উঠুক। আমি যেন আমার মা আর বাবাকে বলতে পারি, 'আমি যা আছি সেই তো ভালো! তোমাদের ওই হাসি, ওই আদর, এই ভালো, এই মন্দ নিয়ে আমাকে তোমাদের কাছে-কাছে রাখো। মা আর বাবার চেয়ে আমার কাছে কী-ই বা সুন্দর! কে-ই বা বড়ো!'

হ্যাঁ, বাবার কষ্ট দেখে তাই আজ সারাদিন আমি ছটফট করেছি। তবু পারিনি আমার মনের কথা বলতে! পারিনি বলতে, 'বাবা, এই দেখো, তোমার আবু বড়ো হয়েছে। তোমার আবু পারবে, ঠিক পারবে ওই উটপাখির পালক শহরে পৌঁছে দিতে। তোমার জ্বর হয়েছে বাবা! তুমি কদিন এই ছোট্ট ঘরের ছায়ায় শুয়ে বিশ্রাম নিলে, তোমার ছেলে কি তোমায় দেখবে না? নাকি, সে পারবে না তোমার বোঝা বইতে?'

কিন্তু কেন একথা আমি বাবাকে বলতে পারিনি। কারণ, একথা শুনলে বাবা যে খুশি হয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরবে না, তা আমি জানি। আমি ঠিক জানি, একথা শুনলেই বাবা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়বে। যত কষ্টই হোক পাশার সামনে গিয়ে ওর পিঠের ওপর পালকের বস্তা ঝুলিয়ে হাসতে-হাসতে বলবে, 'আমি ভালো হয়ে গেছি। আমি চললুম শহরে।' তখন শত চেষ্টা করেও যে কেউ বাবাকে রুখতে পারবে না!

এই ভয়েই বোবা হয়েছিলুম সারাদিন। ভীষণ কষ্টে মনটা আমার বারবার শিউরে উঠছিল, তবু কাউকে বলতে পারছি না আমার মনের কথা। শেষে, কিছুতেই থাকতে না পেরে আমি ছুটে গেছি পাশার কাছে। বসে ছিল পাশা। ওর পিঠের ওপর লুটিয়ে পড়লুম। আমার দু-হাত দিয়ে ওর গলাটা জড়িয়ে ধরলুম। তারপর জিজ্ঞেস করলুম, 'পারবি না পাশা, পারবি না আমায় শহরে নিয়ে যেতে? পারবি না ওই পালকের বোঝা শহরে পৌঁছে দিতে?'

পাশা আমার কথা শুনল। কী বুঝল জানি না। ঘাড় হেলিয়ে আমার দিকে চাইল। তারপর ভীষণ জোরে মাথাটা নাড়তে-নাড়তে আমাকে পিঠে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর হাঁটা দিল। ক-পা দূরে খেজুর গাছটার সামনে দাঁড়িয়ে সে মুখ বাড়াল। এক থোকা পাকা খেজুর মুখে ছিঁড়ে এনে আমার দিকে ঘাড় ফেরাল। যেন সে বলতে চাইল, 'খাও!' আমি আনন্দে চিৎকার করে লুফে নিলুম সে খেজুর। মুখে দিলুম। সঙ্গে-সঙ্গে পাশা হাঁটল। ফিরল সে ঘরের দিকে। আমার মায়ের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল পাশা। মা জিজ্ঞেস করল, 'কী রে?'

বসে পড়ল পাশা। পাশার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে মায়ের কাছে ছুটে গেলুম। মাকে জড়িয়ে ধরলুম। মায়ের গায়ের চাদরে আমার মুখখানা হারিয়ে গেল।

মা অবাক হল। মা আমার মুখখানা চাদরের আড়াল থেকে সরিয়ে এনে জিজ্ঞেস করল, 'কী বলছিস?'

আমি বললুম, 'মা, তুমি তো বলেছ আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি!'

মা বলল, 'হ্যাঁ, আমার সেই সেদিনের ছোট্ট আবু এখন কত বড়ো!

'তুমি তো জানো মা, এখন আমি তির ছুড়তে পারি। তরোয়াল ঘোরাতে পারি।'

'হ্যাঁ, আবু যে আমার বীর ছেলে।'

'তুমি তো দেখেছ মা, একটু-একটু করে এখন কত দূর অবধি পাশার পিঠে চেপে আমি বালির ওপর হাঁটতে পারি!'

মা বলল, 'এরপর আবু আমার বালি পেরিয়ে শহরে যাবে। শহরে গিয়ে আমার জন্যে রেশমি সুতোর কামিজ আনবে।'

আমি লাফিয়ে উঠলুম। মায়ের হাত দুটি আরও জোরে চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলুম, 'আনব, আনব মা, তুমি যা চাইবে তাই-ই আনব। তবে মা শহরে আমায় এখনই যেতে দাও,' বলে মাকে আবদার করে জড়িয়ে ধরলুম।

মা চমকে উঠল। আমায় আরও কাছে টেনে নিয়ে বলল, 'এ কী সববনেশে কথা!' ভয়ে মায়ের গলা কেঁপে উঠল।

আমি বললুম, 'না মা, সববনাশ নয়! বাবার অসুখ। তুমিই বলো, বাবার কি এখন ওই বালি ভেঙে শহরে যাওয়া ঠিক হবে। আমি যাব। আমি পারব। আমি ওই উটপাখির পালক শহরে পৌঁছে দিয়ে আসব।'

আমার কথা শুনে মায়ের বুকটা কেঁপে উঠছিল কি না আমি জানি না। কিন্তু মায়ের হাত দুটি আমার মাথা ছুঁয়ে অস্থির হয়ে শিউরে উঠছিল। মা কেমন অদ্ভুত চোখে চাইল আমার মুখের দিকে। তারপর মায়ের চোখ দুটি নিমেষে সামনের ওই খেজুর গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে, দূরে ওই সোনা-রং বালির রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ল। মা কথা বলল না।

আমি মায়ের চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে খুব নরম সুরে জিজ্ঞেস করেছিলুম, 'যাব না মা?'

মা আমায় টেনে নিয়েছিল তার কাছে, আরও কাছে। তারপর অস্ফুট স্বরে বলেছিল, 'যাবি।'

ইচ্ছে হল আমি আনন্দে চিৎকার করে উঠি। কিন্তু পারিনি। হঠাৎ আমার নজর পড়ল মায়ের চোখ দুটি যেন ছলছলিয়ে উঠেছে। চোখ দুটিকে লুকিয়ে নিয়ে মা ছুটে গেছল বাবার কাছে। আমি অবাক হয়ে গেলুম! ভাবলুম, মা আমার কাঁদছে কেন! মা কি আমার কথায় দুঃখ পেল!

না, হয়তো ছেলের কথা শুনে মায়ের বুকখানা গর্বে ভরে উঠেছিল। হয়তো মা ভেবেছিল, যাদের এমন ছেলে ঘর আলো করে, তাদের বুঝি দুঃখ থাকে না কোনোদিন।

আমি তো জানি, মা আমার কথা বাবাকে বলবে। বাবা শুনলে, যদি রাজি না হয়! এই কথা ভাবতে-ভাবতে সারাদিন আমি ছটফট করেছি। সারাদিন আমার চোখ দুটি মায়ের পিছু-পিছু এ-ঘর ও-ঘর করেছে। আমি ভেবেছি মা কখন আমার কথা বাবাকে বলবে! কখন?

বলেছিল মা। বলেছিল, যখন দিনের আলো ছিল না। রাতের অন্ধকারটা তখন নিঃসাড়ে গুটি-গুটি নেমে এসেছিল। নেমে এসেছিল ওই বালির ওপর, ওই খেজুর গাছের ছায়ায়, আমাদের এই ছোট্ট ঘরে। রাত কত গভীর আমি জানি না। শুধু জানি, আজ আর আমার চোখে ঘুম ছুঁই-ছুঁই করছে না। এই যে ঘরের ভেতর ছোট্ট ঘরটা দেখছ, এটা আমার। ঘরের দেওয়ালে ওই যে আঁকাবাঁকা লাইনটানা ছবিটা দেখছ, ওটা আমি এঁকেছি। ছবির আকাশে এক ফালি চাঁদ। কটা তারা। নীচে বালির পাহাড়। এক পাশে তাঁবু। পাশে দুটো উট। ছবিটা কতদিন আগে এঁকেছি, এখনও একটুও আবছা হয়ে যায়নি। তবে, আমার আঁকা এই ছাবিটা দেখলে যে তোমরা না-হেসে থাকতে পারবে না, তা আমি জানি! কিন্তু জানো, এখন ওই রাত্রে চুপটি করে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ওই ছবিটাই আমার এত দেখতে ভালো লাগছিল। দেখতে-দেখতে আমার মনে হচ্ছিল, সত্যি যেন ওই ছবির চাঁদ আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে আমার এই ছোট্ট ঘরখানা। মনে হচ্ছিল, ওই ছবির তারারা বুঝি এখন স্পষ্ট হয়ে কোনোদিনই ঝলমলিয়ে ওঠেনি। ভালো লাগছে, হয়তো এই কারণে যে, আজ আমি বলতে পেরেছি, বাবার কাজ আমি মাথা পেতে নিতে পারি। বাবার বয়েস বাড়ছে, এবার বাবা আয়েস করুক। আমি ছেলে। ছেলে যদি বাপ-মাকে না দেখে, কে দেখবে?

কিন্তু জানো, এই মুহূর্তে আমার সমস্ত স্বপ্ন যেন এক ঝটকায় ভেঙে গুঁড়িয়ে তছনছ করে দিল কে! সে-কথা বলতে আমার বুকের পাঁজরগুলো দুমড়ে-মুচড়ে উঠছে। সে-কথা আমি কেমন করে বলি তোমাদের! শোনো না, ওই তো বাবাকে আমার কথা বলছে মা। শুনতে পাচ্ছ আমার মায়ের গলা? আমি পাচ্ছি। শোনো শোনো, ওই তো মা বলছে, 'আবু বলছে তোমার গায়ে জ্বর। এই জ্বর নিয়ে শহরে যাওয়া তোমার ঠিক হবে না। কাজটা যখন খুব দরকারি, উটপাখির পালকগুলো যখন তাড়াতাড়ি পৌঁছে না-দিলেই নয়, তখন, ও বলছিল, তুমি যদি বলো, তবে আবুও পাবে তোমার এই কাজটা করে দিতে।'

মায়ের মুখে ওই কথা শুনে বাবা থমকে গেছল কি না জানি না। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্যে সারা ঘরখানা কেমন যেন থমথম করে কাঁপছিল?

প্রচণ্ড উত্তেজনায় আমি কান পেতে আছি। কিন্তু কথা নেই, শব্দ নেই। তবে কি বাবা মায়ের কথার কোনো উত্তর দেবে না? নাকি মায়ের কথা শুনে বাবার শরীর আরও মুষড়ে পড়ল।

না, বাবা কথা বলেছিল। হঠাৎ নিস্তব্ধ ঘরে বাবার গলা কেঁপে উঠেছিল। কাঁপতে-কাঁপতে সেই স্বর মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'কী বলছ তুমি? এ যে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমার আবু তোমাকে এ-কথা বলেছে! গর্বে যে আমার বুকখানা ফুলে উঠছে। আমার যে চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি আমার আবুকে আমার মতো করে গড়ে তুলতে পেরেছি। হ্যাঁ, আবু আমারই ছেলে।' বলে বাবা থামল। একটুখানি চুপ। তারপর বাবার গলার স্বর যেন অনেক, অ-নে-ক দিন আগের কোনো এক হারানো দিনে ফিরে গেছে। বাবা জিজ্ঞেস করল মাকে, 'তোমার সেদিনের কথা মনে আছে?'

মা বলল, 'সে-কথা কি ভোলার কথা। আমার বোনের বিয়েতে তুমি আর আমি গেছি শহরে, আমাদের বাড়িতে। বিয়ের পর ফিরে আসছি। তখনও মাঝ-বরাবর পথে আমরা। রোদ ঝাঁ-ঝাঁ দুপুর। বালির ওপর বালি। হাওয়া নেই। শুধু গরম হলকা বইছে মরুর ওপর দিয়ে। মাথার পাগড়িটা খুলে ফেলে তুমি মুখে-চোখে জড়িয়ে ফেলেছ। আমি তোমার পেছনে পাশার পিঠে বসে আছি। তোমার পিঠের ছায়ায় আমার মুখখানা আড়াল করেছি। আড়াল থেকে দেখছি, আর কত দূর? কোথায় গেলে একটু জল পাব! আর যে পারছি না!'

মায়ের মুখের কথা যেন কেড়ে নিয়ে বাবা বলে উঠল, 'হ্যাঁ এমন সময়, ঠিক এমনি সময়ে শুনতে পেলুম কান্না।'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ, কান্না! কে যেন কাঁদছে!' মা বলে উঠল।

বাবা বলল, 'এ যে নিতান্ত নরম কচি একটি শিশুর কান্না! আমি নিমেষে পাশার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়লুম। লাফিয়ে ছুটলুম। বালির ওপর ছুটতে-ছুটতে কখনো আমি হুমড়ি খাই। কখনো আমি থমকে দাঁড়াই। চিৎকার করি, কে কাঁদে? কার ছেলে কাঁদে? কাউকে দেখতে পেলুম না। তারপর হঠাৎ আমার নজরে পড়ল, সামনে রক্ত-মাখা একটা তরোয়াল! তারপর দেখলুম বালির ওপর এদিক-ওদিক ছড়ানো-ছেটানো জুতো, জামা, পাগড়ি! তারই পাশে ওই তো শুয়ে-শুয়ে হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে একটি শিশু! একেবারে এইটুকু। আমি ছুটে গিয়ে তাকে বুকে তুলে নিলুম। তপ্ত বালির ঝাপটা লেগে তার মোমের মতো নরম গায়ে ফোসকা পড়ে গেছে। আমি ছুটে এসে তোমার কোলে তাকে তুলে দিলুম।'

বলতে-বলতে বাবা থামল। বাবার কথার রেশ টেনে মা এবার বলল, 'হ্যাঁ, তাকে আমি বুকে তুলে নিলুম। আহা রে! তার সারা গায়ে চোখে-মুখে বালি। চোখ দুটি চাইতে তার যেন কত কষ্ট হচ্ছে! যেন এতক্ষণ বালিতে ডুবে-ডুবে সে হাবুডুবু খাচ্ছিল। আমি আমার ওড়না দিয়ে ভারি আলতো করে ওকে জড়িয়ে নিলুম। তখনও কাঁদছে! তুমি ছুটলে ওর মাকে খুঁজতে!'

বাবার গলায় এবার ক্লান্ত স্বর। বাবা বলল, 'ওর মাকে আমি খুঁজলুম। সেই শূন্য মরুভূমির এ-প্রান্ত ও-প্রান্তে আমি দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটেছি। ওর মাকে আমি দেখতে পাইনি। দেখতে পেয়েছিলাম সেই রক্তমাখা তরোয়ালটা। তুলে এনেছিলুম সেটা। ভারি ক্লান্ত তখন আমি। তোমার কাছে যখন ফিরে এসেছিলুম, তখন তোমার কোলে ও ঘুমিয়ে পড়েছে। যেন সূর্যের আলোয় নিস্তেজ একটি ফুলের মতো তার মুখখানি। আঃ! তোমার কোলে যেন ছড়িয়ে আছে সেই ফুলের রং-ছোঁয়া পাপড়িগুলি! আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, 'এখন কী করবে?' তুমি বলেছিলে, 'এখানে তো করার কিছু নেই। এ যে নির্জন মরুভূমি। চলো ফিরে যাই।' আমরা ফিরে এসেছিলুম। কিন্তু কেউ ফিরিয়ে নিতে এল না আমাদের কুড়িয়ে-পাওয়া ছেলেকে। তাকে আমরা বুকে নিয়ে বড়ো করেছি। তাকে রোদের সঙ্গে রোদ হয়ে, বালির সঙ্গে বালি হয়ে লড়াই করতে শিখিয়েছি। দেহটাকে তার লোহার মতো শক্ত করেছি। তাকে শিখিয়েছি কেমন করে ভালোবাসতে হয় বন্ধুকে। কেমন করে রুখে দাঁড়াতে হয় শত্রুর বিরুদ্ধে।'

আমি শুনতে পেলুম মা কাঁদছে। কান্নার ফোঁটাগুলি মায়ের কথা হয়ে যেন বেজে-বেজে ঝরে পড়ছে। মা বলছে, 'তাই সে আজ শিখেছে কেমন করে মা-বাবার দুঃখ ঘোচাতে হয়। তাই বুঝি তোমার দুঃখ ঘোচাতে সে এগিয়ে এসেছে তোমার কাজের বোঝা কাঁধে নিতে!'

বাবা বুঝি আর থাকতে পারল না। আমি শুনতে পেলুম, বাবা চিৎকার করে উঠেছে, 'শাবাশ! শাবাশ আবু! এই তো চাই। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আবু যাবে। উটপাখির পালক নিয়ে ও শহরে যাবে। আমি জানি ও পারবে! আমার ছেলে কখনো হারবে না। হারতে পারে না।' বলেই বাবা, ভীষণ জোরে হাঁক দিল, 'আবু-উ-উ!'

আমি চমকে উঠলুম। এতক্ষণ মা আর বাবার কথা শুনতে শুনতে আমি যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলুম। বাবার ডাক শুনে সামলে নিলুম নিজেকে। তাড়াতাড়ি দরজা পেরিয়ে বাবার ঘরে ঢুকলুম। বাবার মুখের দিকে চেয়ে দেখি, চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। আমি শান্ত হয়ে দাঁড়ালুম বাবার সামনে। অনেক কষ্টে নিজের চোখের জল সামলে নিলুম। কিন্তু কথা বলতে গিয়ে গলা আমার কথা বলতে পারে না। ধরা গলায় আলতো-স্বরে জিজ্ঞেস করলুম, 'ডাকলে বাবা?'

বাবা বিছানায় শুয়ে-শুয়েই হাত দুটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। বলল, 'হ্যাঁ, আমার কাছে আয়।'

আমি এগিয়ে গেলুম।

বাবা জড়িয়ে ধরল আমায়। জড়িয়ে ধরে হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে-কাঁদতে বলল, 'তুই আমার সাত রাজার ধন এক মানিক। তুই আমার ছেলের মতো ছেলে।'

আমি বাবার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ডুকরে-ডুকরে কেঁদে উঠলুম। কোনো কথাই বলতে পারলুম না।

তুমি শুনলে হয়তো অবাকই হবে, আমার জীবনে আমি আজই প্রথম বাবাকে কাঁদতে দেখলুম। আর সে-কান্না দেখে আমারও বুকের কান্না চোখের জলে আজই প্রথম উপচে পড়েছিল।

আজ আমি সারা রাত ঘুমোইনি। ঘুমোতে পারিনি। তুমি কি বিশ্বাস করবে, আজ সারা রাত আমি কেঁদেছি একা-একা। কাঁদব না? এতদিন আমি যাদের মা আর বাবা বলে জেনেছি, তাদের যে আমি কুড়িয়ে-পাওয়া ছেলে! আমি এদের পর। এদের দয়ায় আমি বেঁচেছি। তাহলে কে আমার সত্যিকারের বাবা? কে আমার মা? এই কথা ভাবতে-ভাবতে আমি ছটফট করেছি আর ভেবেছি, সেদিন যারা এই বালির সমুদ্রে আমায় ফেলে গেছল, তারাই বুঝি আমার মা? আমার বাবা?

শুনতে পাচ্ছ, আর কোনো শব্দ? না, এখন রাত গভীর। ছেলে তার বাপের বোঝা কাঁধে নিতে চেয়েছে, এ ভেবে বাবা ভারি শান্তিতে খুমিয়ে পড়েছে! না এখন বুঝি আর কোনো ভাবনা নেই তার। তাই কষ্টও নেই। আমি একা। একা আমি অন্ধকারে। অন্ধকারের সঙ্গেই এখন আমি লড়াই করছি। কেননা, এই অন্ধকারেই যে আমি হারিয়ে গেছি। হারিয়ে গিয়ে ভাবছি শুধু আমি কে? কে আমি? কে উত্তর দেবে? ওই বোবা অন্ধকারটা?

ঘুম না পেলে রাত তো আর তোমার জন্যে ঘুমের কাজল হাতে নিয়ে বসে থাকবে না। সে সময় হলেই পগার পার। তার পেছনে ছুটতে-ছুটতে ভোরের আলো যখন পৌঁছে যাবে মাটিতে, তখন কোথায় ঘুম আর কোথায় রাত!

চোখে ঘুম ছিল না বলেই আজ খুব সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলুম। খুব সকালে বাবার ঘরে উঁকি মেরে দেখেছিলুম, তখনও ঘুমুচ্ছে বাবা। ঘুমোক। মা তো অনেক আগেই উঠেছে। মায়ের মুখখানা ঘুমের আমেজে তখনও ফুলে আছে। কে জানে কেন, মাকে দেখে আজ আমি খুশিতে হাসতে পারলুম না। আমি বুঝি হারিয়ে ফেলেছি আমার হাসি, আমার কথা, আমার আনন্দ! আমি কি বোবা হয়ে গেলুম?

মায়ের চোখকে আমি ফাঁকি দিতে পারিনি। হয়তো আমার মুখে হাসি না দেখেই মা আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, 'আবু, মান খারাপ করছে?'

আমি বললুম, 'মন? কেন খারাপ করবে?'

মা বলল, 'তবে কথা বলছিস না?'

আমি ও-কথায় আর কথা না বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'বাবা কেমন আছে মা?'

'ঘুমোচ্ছে।'

'আমি তবে শহরে যাবার জন্যে তৈরি হই মা?'

মা কথা বলল না। ঘাড় নাড়ল।

আমি সেজে নিলুম। আমার সাদা পায়জামার ওপর সেই নীল ডোরা-কাটা জামাটা গায়ে দিতে দিতে আমি ভাবছিলুম, কবে থেকে আশা করে আছি যেদিন প্রথম মরুতে পাড়ি দেব, সেইদিন এই জামাটা পরব। আজ সেইদিন এসেছে। নীল পাগড়িটা এখন মাথায় দিয়েছি বটে, কিন্তু খানিক পরে সে কি আর মাথায় থাকবে। নাকে মুখে নেমে আসবে। উটপাখির পালকগুলো দুটো টুকরিতে সাজিয়ে, আলতো করে বেঁধে পাশার পিঠের দু-পাশ দিয়ে ঝুলিয়ে দিলুম। তারপর খেতে দিলুম পাশাকে, খানিকটা শুকনো কাটা ঘাস। অনেকটা খেজুর পাতা। আর বেশ খানিকটা জল। কারণ ক-দিন উপোস করে থাকতে হবে কে জানে! তোমরা শুনলে অবাক হবে, পাশা দিনের পর দিন না খেয়েও থাকতে পারে! পিঠের ওপর ওই যে কুঁজটা দেখছ, দেখো এখন কত মোটাসোটা! চর্বিতে ভরতি। মরুভূমির গভীরে চলে গেলে, ক-দিন পরে দেখবে কুঁজটা শুকিয়ে একেবারে চিপসে গেছে। কেন বলো তো? কুঁজের ভেতরে যে পাশা খাবার ভরে রাখে। বিশ্বাস হচ্ছে না তো? তা হলে বলছি শোনো। পাশা খাবার খায় তো মুখ দিয়ে। যতই খায় ততই চর্বি জমে ওই কুঁজের মধ্যে। তারপর যখন খাবার জোটে না, জল পায় না, তখন ওই কুঁজের চর্বি গলে গলে পেটের খিদে মেটায়, তেষ্টা মেটায়। কী মজা বলো তো?

হ্যাঁ, একথা শুনতে তোমাদের মজাই লাগবে। কিন্তু আমার? অন্যদিন এই সকালে এই বাড়ি আমার। একেবারে আমার নিজের। আমার রাজত্ব। এখানে আমি হাসব, খুশিতে নাচব। নয়তো খেলব, গান গাইব। কিছু না পারি, মায়ের গলা জড়িয়ে দোল খাব।

কিন্তু আজ? দেখবে এসো না একবার আমাকে? আমি আজ অন্য মানুষ! একেবারে অন্য। এ-মানুষটার আজ আর কোনো পরিচয় নেই। আজ আমি শীতের রাতের মতো থমকে আছি। কেন? ভয়ে? না। আমি যে আজ বিশ্বাস করতে পারছি না, যাদের আমি এতদিন মা আর বাবা বলে জেনেছি, তারা আমার কেউ না, কেউ না!

'আবু-উ-উ!' বাবার ঘুম ভেঙেছে। ডাকল আমায়। এমনিতে বাবার গলাটা খুব গম্ভীর। তার মানে এই নয়, সেই গলার আওয়াজ শুনলে তুমি ভয় পাবে। ভারি আদর-মাখানো সেই ডাক। ওই ডাক শুনলে আমার মতো তুমিও হয়তো ভাববে, তোমার খুব কাছের মানুষ, এক আপনজন ডাকছে। সে-ডাকে সাড়া না দিয়ে তুমি থাকতে পারবে না। সেই ডাক শুনে তুমি নিশ্চয়ই ছুটবে। ছুটতে-ছুটতে সাড়া দেবে, 'যাই-ই-ই।'

আমিও তাই করি।

কিন্তু আজ? না, পারলুম না ছুটতে। আমার পা-দুটি আজ আনন্দে লাফিয়ে উঠল না। ধীরে-ধীরে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। বাবা বিছানায় বসে আছে। বাবার মুখের দিকে তাকালুম। বাবার ঠোঁট দুটিতে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। আজ বোধহয় বাবা ভালো আছে। কিন্তু মুখখানি বড্ড শুকিয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'ভালো আছ বাবা?'

বাবা হেসে উঠল হো-হো করে। হাসতে-হাসতে বলল, 'হ্যাঁ, ভালো আছি, খুউব ভালো।'

আমি আবার তেমনি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলুম, 'আমায় ডাকলে, কিছু বলবে?'

'হ্যাঁ বলব।' বলে বাবা একটু চুপ করে রইল। যেন কিছু ভাবল। তারপর ভাবনায় ডুবে থাকা চোখ দুটি আমার দিকে ফিরিয়ে বলল, 'আবু, তোমার মতো বয়সে আমিও আমার বাবার কাজ মাথায় নিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছিলুম। আমার বাবা আমায় শিখিয়েছিল কেমন করে বিপদ মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। আজ আমিও তোমায় সেই কথাই বলতে ডেকেছি আবু।'

'আমি তোমার কথা শুনব বাবা।' খুব আলতো গলায় উত্তর দিলুম আমি। বাবার মুখখানি খুশিতে উছলে পড়ল। বলল, 'তা আমি জানি।' বলে আমায় কাছে টেনে নিল বাবা। আমার পিঠে হাত রাখল। তারপর আবার বলল, 'আমি আর তোমার মা তোমাকে বুকে-পিঠে করে মানুষ করেছি। আমাদের কষ্টের দিন এসেছে, তোমাকে সে কষ্ট ছুঁতে দিইনি। আমাদের দুঃখ এসেছে, সে-দুঃখ তোমাকে বুঝতে দিইনি। তোমাকে আমরা সব সাধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছি আবু!'

আমি তেমনি নরম-সুরে জিজ্ঞেস করলুম, 'কেন একথা বলছ বাবা, আমি কি তোমাদের কোনোদিন দুঃখ দিয়েছি?'

হঠাৎ মায়ের মুখখানি আমি দেখে ফেলেছি। ছলছল করছে। চোখের কান্না সামলে নিয়ে মা বলল, 'না বাবা, দুঃখ কেন দেবে! যে-ছেলে দুঃখ দেয়, তুমি তো সে-ছেলে নও।'

বাবা আবার বলল, 'তুমি তো জানো আবু, এই মরুর সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। মরুর তপ্ত আগুনের ভেতর দিয়ে কখনো আমরা ছুটি, কখনো বসি, কখনো ঘুমোই। এর নিশ্বাসে-নিশ্বাসে বিপদ। আজ প্রথম মরুর বুকে তুমি পাড়ি দিচ্ছ। তাই তোমাকে বলি, ভয় পেয়ো না বাবা। বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে বিপদের সামনে। যে বীর তাকে দেখলে শয়তানেরও যে বুক কাঁপে!'

আমি বললুম, 'বাবা, তুমি আমাকে তোমার বীর ছেলের মতো গড়েছ। তুমি আমাকে সাহসী হতে শিখিয়েছ। অন্যায়ের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখিয়েছ। যতই বিপদ আসুক, সে-বিপদ আমি জয় করবই। যত কষ্টই আসুক, আমি বুক পেতে দেব।'

বাবা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, 'শাবাশ! শাবাশ!'

আমি বললুম, 'এবার বিদায় নিই বাবা।'

বাবা বলল, 'আবু, যাবার আগে তোমাকে আমি একটি জিনিস উপহার দেব।' বলে বাবা মাকে বলল, 'সিন্দুক থেকে সেই তরোয়ালটা এনে দাও তো আমায়!'

মা তরোয়ালটা বার করে নিয়ে এল। খাপে ঢাকা। বাবা তরোয়ালটা হাতে নিয়ে, খাপ থেকে সেটা বার করতেই আমার চোখ ঝলসে গেল। আমি বুঝতে পেরেছি, এই সেই তরোয়াল। সেই রক্তমাখা তরোয়াল। সেই যেদিন আমায় কুড়িয়ে পেল বাবা, সেইদিনই তো এই তরোয়ালটাও কুড়িয়ে পেয়েছে। অবিশ্যি এখনও কি আর রক্ত লেগে আছে! না, না। তরোয়ালের ঝকমকি জৌলুস ঠিকরে পড়ছে চারদিকে।

বাবা তরোয়ালটা হাতে নিয়েই বলল, 'আবু, তুমি যখন খুব ছোটো, তখন এই তরোয়ালটা আমি কুড়িয়ে পাই। এতদিন যত্ন করে তুলে রেখেছিলুম। মনে-মনে ভেবে রেখেছিলুম, যেদিন তুমি বড়ো হবে, যেদিন তুমি একা একা ওই মরুর পথে পাড়ি দেবে, সেদিন তোমার হাতে তুলে দেব এই তরোয়াল। আজ আমার সেই স্বপ্নের দিন এসেছে, আবু। নাও।'

আমি বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দু-হাত তুলে সেই তরোয়াল হাতে নিয়ে মাথা হেঁট করলুম, 'এবার তবে আসি বাবা?'

বাবা আমার চিবুকে হাত দিল। আমার কপালে চুমু খেয়ে বলল, 'এস।'

আমি মায়ের কাছে গেলুম। মায়ের বুকের ওপর মাথা রেখে এবার আমি কেঁদে ফেললুম। কাঁদতে-কাঁদতে বলে ফেললুম, 'মা, বিদায়!'

মা আমার মুখখানি নিজের মুখের কাছে টেনে নিয়ে বলল, 'বিদায়।' বলে মাও আমার কপালে চুমু খেল। তারপর কেঁদে ফেলল।

আমি তরোয়ালটা খাপের মধ্যে ঢুকিয়ে, কোমরে বেঁধে, অনেকটা কাঁদতে-কাঁদতে, খানিকটা ভাবতে-ভাবতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লুম। তারপর পাশার পিঠে চেপে কোন না-দেখা জগতের দিকে এগিয়ে চললুম।

তুমি হয়তো ভাবছ, আমি বুঝি একাই চলেছি। বুঝি একাই পাশাকে নিয়ে মরুতে পাড়ি দেব! না, না, তা কেন হবে। আরও অন্তত তিরিশটা উটের পিঠে মাল বোঝাই করে, আরও তিরিশ জন চলেছে শহরে। চলেছে মাল কেনাবেচা করতে। এমনি করে দল বেঁধেই তো যেতে হয়। এমনি করে দল বেঁধে যেতে-যেতে মরুর ওপর কেটে যায় দিনের পর দিন। দল বেঁধে না গেলে, কে বলতে পারে কার কখন কী বিপদ আসে। ওই শোনো উটের গলায় ঘন্টা বাজছে, টিং-লিং, টিং-লিং! সার বেঁধেছে ওরা। সারে-সারে আকাশে ঘাড় উঁচিয়ে, পা ফেলছে। দেখলে তুমি চোখ ফেরাতে পারবে না। এত ভালো লাগবে! মনে হবে উটের পিঠে চেপে তুমিও মরুতে পাড়ি দাও!

আমি চলেছি। আমি এখনও দেখতে পাচ্ছি, মা আমার অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে আমার দিকে চোখ মেলে। দেখতে পাচ্ছি, বাবাও বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছে। একটি হাত ওপরে তুলে বাবা আমায় বিদায় জানাচ্ছে। আমি এতদূরে চলে এসেছি যে ঠিক দেখতে পাচ্ছি না, যে-হাতটা তুলে আমায় বিদায় জানাচ্ছে, সে হাতটি বাবার কাঁপছে কি না। তবু যতক্ষণ পারলুম, আমিও হাত তুলে রইলুম। তারপর দুজনেরই চোখের দৃষ্টি থেকে দুটি হাত হারিয়ে গেল। আমার চোখের ওপর ভেসে উঠল বালি আর বালি। আমাদের মাথার ওপর খোলা আকাশ, নীল। আগুনের গোলার মতো সূর্যের তেজ। এই সময় তুমি এখানে থাকলে তোমার মন বলত, আকাশটা যদি শুধুই আকাশ হত! আকাশের গায়ে যদি ওই জ্বলন্ত সূর্যটা না থাকত!

কতদূর চলে এসেছি! ক-ত দূর! এখন পাশার পিঠে দুলতে দুলতে বারবার আমার চোখে নেমে আসছে কাল রাতের না-ছোঁয়া ঘুমটা। তা বলে ঘুম আমায় জড়িয়ে ধরতে পারছে না। কেননা, যতবারই সে আমার চোখের পাতায় বসি-বসি করছে, ততবারই যেন আমার বুকটা চমকে-চমকে উঠছে। মন বলছে, কেমন করে মনে করি এই পৃথিবীতে আমার কেউ নেই!

আমরা বোধহয় কয়েক ঘন্টা হেঁটেছি। আকাশের সূর্য এখন ঠিক আমাদের মাথার ওপর। ওই দেখো, দূরে দেখা যাচ্ছে মরূদ্যান! ওখানে ইঁদারা আছে। ওখানে আমরা থামব! যার সঙ্গে তাঁবু আছে, সে তাঁবু খাটাবে। ইঁদারার জল চোখে-মুখে দিয়ে কিছু খেয়ে নেব আমরা। মা আমার জন্যে কত খাবার যে দিয়েছে, একা খেয়ে শেষ করতে পারব না। খেয়ে-দেয়ে একটু বিশ্রাম নেব। তারপর সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে মাথা হেলাবে, আমরা আবার চলব।

এমনি চলতে-চলতে দুদিন কেটে গেল আমাদের। দুদিনে আমরা কতখানি পথ চলে এসেছি। কত অজানা মানুষের সঙ্গে আমার কত পরিচয় হল। ওরা গল্প বলে। কত না-জানা কথা শোনায়। কত নিশ্চিন্ত আমি। ভাবলুম, বুঝি এমনি করেই পৌঁছে যাব শহরে।

কিন্তু হল না। তিনদিনের দিন পথে আবার আমরা হাঁটা শুরু করলুম। শুরুতে কি জানতাম এক ভয়ংকর বিপদ আমাদের মাথার ওপর ওত পেতে আছে। আমরা অনেকটা এসেছি। এতক্ষণ পর্যন্ত দেখেছি ঝরঝরে আকাশ। হঠাৎ দেখি কোথাও কিছু নেই, আকাশ মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে। উটের পিঠের মানুষরা আতঙ্কে চুপসে গেল।

ওরা চেঁচিয়ে উঠল, 'থামো, থামো, ঝড় উঠবে!'

সে-চিৎকার শুনে ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল আমার। ঝড় উঠবে! কী হবে তা হলে! তোমরা তো জানো না মরুর বুকে ঝড় ওঠা মানে এক সাংঘাতিক ব্যাপার! আমাদের মাথার ওপর ঝড়ের মেঘ! এখন মরুভূমির এই শূন্য ভূমিতে কোথাও আশ্রয় নেই যে সেখানে ছুটে যাবে।

হ্যাঁ, সত্যি-সত্যি ঝড় উঠল। ওই দ্যাখো রাশি-রাশি অসহ্য গরম বালি ঝড়ের ঝাপটায় উড়ে আসছে! নিমেষের মধ্যে বেগুনি নীল অন্ধকারে ঢেকে গেল সারা দিগন্ত। মনে হচ্ছে, ওই রাশি-রাশি বালি যেন এক-একটা আগুনের ফুলকি! ঝাঁকে-ঝাঁকে গায়ে-মুখে ছিটকে আসছে। ওঃ! জ্বলে যাচ্ছে শরীর! যন্ত্রণায় ছটফট করতে-করতে আর সবার মতো আমিও সারা মুখ ঢেকে ফেললুম! তপ্ত হাওয়ায় যেন ফুটন্ত লোহার ছেঁকা! কোথায় পালাব! একটু যদি আশ্রয় পাই! আশ্রয় কোথা এখানে! আমি লাফিয়ে পড়লুম পাশার পিঠ থেকে। নিজেকে ওই ঝড়ের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে বালির ওপরই মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লুম। তবু নিস্তার নেই। চেয়ে দেখি, ভয়ে কুঁচকে সবাই শুয়ে পড়েছে ওই বালির ওপর। যত মানুষ, যত উট, সব। আমার মতো সবাই কাতরাচ্ছে বালির ওপর। হঠাৎ ঝড়ের প্রচণ্ড শোঁ-শোঁ শব্দ! আচমকা চোখ মেলে চেয়ে দেখি, রাশি রাশি বালি যেন এক বিরাট জাল বিছিয়ে শূন্যে উড়তে-উড়তে ভেসে আসছে! আমি চিৎকার করে উঠলুম! আমি দেখতে পাচ্ছি, ওই জাল যেন কাঁপতে-কাঁপতে ধেয়ে আসছে আমারই দিকে! আমি ঝড়ের সঙ্গে ঝড় হয়ে ছোটা দিলুম! কোনদিকে ছুটব! আর কেমন করেই বা ছুটব! পা যেন ছুটতে পারছে না! আমার সমস্ত শক্তি ওই আগুনের তেজে যেন ছাই হয়ে গেছে! তবু ও শেষ শক্তিটুকু উজার করে পালাচ্ছি আমি। কিন্তু না। পারলুম না। চক্ষের নিমেষে ওই বালির জাল আমার ঘাড়ের ওপর ছিটকে পড়ল। আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠতে গেলুম, 'বাঁচাও, বাঁচাও।' কিন্তু স্বর বেরোল না আমার। আমি বালির জালে চাপা পড়ে গেলুম। মনে হল, কে যেন আমায় আগুনের গহ্বরে ঠেলে ফেলে দিল। আমি তারপরে আর জানতেও পারলুম না, সেই গহ্বরে তখন আমি বেঁচে আছি কি না! কেননা, আমি তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি!

অনেকক্ষণ পর, কতক্ষণ পর বলতে পারি না, আমার নিজেরই নিশ্বাসের শব্দটা আমার কানে ভেসে এসেছিল। আমি তখনও বুঝতে পারিনি, আমি বালির নীচে মুখ থুবড়ে পড়ে আছি। আমার সারা দেহ বালির নীচে চাপা পড়েছে। রক্ষে এই, মুখখানা কেমন করে যেন বেঁচে গেছে! যদি মুখখানাও বালিতে চাপা পড়ত, তখন আমিও শেষ হয়ে যেতুম! তখন এই গল্প কি আর তোমাদের বলতে পারতুম আমি! মরুর শেয়াল হয়তো বালি খুঁড়ে বেরিয়ে এসে আমার দেহটা নিয়ে ভোজ বসাত!

আমি বাঁচলুম। অনেক কষ্টে ওই বালির গহ্বর থেকে বেরিয়ে এলুম। কিন্তু আমার চোখে যেন সব ঝাপসা ঠেকছে! এখনও হামাগুড়ি দিচ্ছি। দাঁড়াতে পারব কি না বুঝতে পারছি না। নিশ্বাস নিতে ভারি কষ্ট হচ্ছে আমার। দম আটকে আসছে। বালির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে, ওই বালির ওপরই আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতে পারতুম যদি!

হঠাৎ আমার খেয়াল হল, আরে! দলের আর কারও গলা শুনছি না কেন! তাই তো! এত নিস্তব্ধ কেন চারদিক! ওই তো ঝড় থেমেছে! ওই তো আবার রোদ উঠেছে! তবে কি সবাই আমার মতো বালির ভেতর চাপা পড়েছে!

আতঙ্কে শিউরে উঠলুম আমি। ঝাপসা চোখেই চেয়ে দেখলুম এদিক-ওদিক, চারদিক। কই, কেউ তো নেই! দেখি চারদিকে শুধু উঁচু-উঁচু বালির পাহাড় খাড়া হয়ে আছে। এতক্ষণ যে জায়গাটা খোলামেলা ছিল এখন সেখানে শুধু বালির পাহাড়। কী শক্তি ওই মরুর ঝঞ্ঝার! চক্ষের নিমেষে স্তূপ-স্তূপ বালি উড়িয়ে এনে পাহাড় তৈরি করে ফেলেছে! কিন্তু পাশা! পাশা কোথা? দেখতে পাচ্ছি না তো! আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি! খুব জোরে চিৎকার করে হাঁক পাড়লুম, 'পাশা-আ-আ-।'

কোনো সাড়া নেই। শুনতে পেলুম না আমি পাশার গলার সেই ঘন্টার চেনা শব্দ! কী ভীষণ ভয় পেয়ে গেছি! বুকের ভেতরটা ঢিপ-ঢিপ করে কেঁপে উঠল! নিমেষের মধ্যে আমার কষ্ট-টষ্ট যেন হাওয়ায় উবে গেল। আমি বালির ওপর চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে দিশেহারা হয়ে ছোটাছুটি লাগিয়ে দিলুম। আকাশ ঝকঝকে নীল। সূর্য আবার তেমনি ভয়ংকর! মরু আবার আগুনে ঝলসাচ্ছে! কিন্তু যে-কষ্টে এতক্ষণ আমি নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলুম, যে-কষ্ট এতক্ষণ আমায় দগ্ধে মারছিল, এখন যেন সে-কষ্ট আর কষ্টই নয় আমার কাছে। কেননা, পাশাকে যে আমি দেখতে পাচ্ছি না। তবে কি পাশাও ডুবে গেছে বালির তলায়!

আমার ভীষণ ধাঁধা লেগে গেল! আমি যে বাবাকে কথা দিয়েছি, যেমন করে হোক ওই উটপাখির পালক শহরে পৌঁছে দেব। কিন্তু এখন কী হবে!

আমি স্তূপ স্তূপ বালির পাহাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লুম। দুহাত দিয়ে খামচাতে লাগলুম ওই বালি। খামচে-খামচে খুঁজতে লাগলুম পাশাকে। আমি এ-পাহাড় থেকে ও-পাহাড়ে যাই। এদিক থেকে ওদিক। কিন্তু কই, পাশা তো নেই! ভয়ে আমার হাত-পা যেন সিঁটিয়ে গেল! কী করি আমি! কোনদিকে যাই! আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আমি ক্লান্ত! উঃ! কী ভীষণ তেষ্টা পাচ্ছে! একটু জল দাও! তোমরা আমায় একটু জল দাও! আমি যে আর পারছি না! কিন্তু কে দেবে জল! এখানে কেউ নেই। চিৎকার করে মরে গেলেও কেউ আমার কথা শুনতে পাবে না। শূন্য! চারদিক শূন্য! খাঁ-খাঁ! কই, আকাশে একটা কাক-পক্ষীও যে দেখা যায় না!

তেষ্টার জ্বালায় এখন আমি ওই বালিগুলোকেই মুঠো-মুঠো চেপে ধরছি! নিঙড়ে নিঙড়ে একফোঁটা যদি জল বার করতে পারি! ভুলে গেলুম আমি এগুলো শুধুই বালি! রোদে পোড়া ঝলসানো পাথরের গুঁড়ো! এর বুকে জল নেই, জল নেই!

হঠাৎ চোখের ওপর ভেসে উঠল, জলের ঢেউ! চিকচিক করছে? তখন আমি বুঝতে পারলুম না এ মরীচিকা! এ আমার চোখের ভুল! মরীচিকা আমি কত দেখেছি! মরীচিকা দেখে আমি কত হেসেছি। আমি জানি, বালির ওপর রোদের এ ঝিলিমিলি শুধুই হেঁয়ালি! কিন্তু আজ আমার মনে হল, এ সত্যি! এ তেষ্টার জল! একফোঁটা জলের জন্যে যখন মানুষের বুকের ভেতরটা ছটফটিয়ে ওঠে, তখন বুঝি মরীচিকা মানুষকে বোকা বানায়! তার বুদ্ধি কেড়ে নিয়ে তাকে ছোটায় তারই দিকে!

আমিও ছুটলুম, দু-হাত বাড়িয়ে ছুটলুম। ভাবলুম ছুটলে বুঝি নাগাল পাব ওই জলের! কিন্তু না, নাগাল আমি পেলুম না। শুধু ছুটছি আর হাঁপাচ্ছি। আমার প্রাণ বুঝি বেরিয়ে যায়! গলায় আমার কথা নেই! হারিয়ে গেছে! পা আমার চলছে না! টলছে যেন! আমার চোখের পাতা বুজে এল। পড়ে গেলুম।

বেশ কিছুক্ষণ পরে আমার যেন মনে হল, কাদের গলার শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি। মনে হল, কারা যেন অনেকদূর থেকে এদিকেই আসছে। আমি খুব সম্ভব অসহ্য যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিলুম। মনে হচ্ছিল, এখনই আমার নিশ্বাস বুঝি ফুরিয়ে যাবে।

হ্যাঁ, স্পষ্ট শুনছি ওরা ছুটে আসছে বালির ওপর দিয়ে, ঘোড়ায় চেপে। ওরা আমায় দেখতে পেয়েছিল। থামল। ওদের কাছে জল ছিল। আমায় কাতরাতে দেখে তাড়াতাড়ি আমার মুখে জল দিল। আঃ! যেন প্রাণ ফিরে পেলুম। আমি চোখ চাইলুম। হাত বাড়ালুম। ওরা আমায় তুলে ধরল। বসতে পারলুম আমি। তারপর ওদের অস্পষ্ট গলায় বললুম, 'আমায় বাঁচান।'

ওদের কেউ-ই আমার সঙ্গে কথা বলল না। এমন কী নিজেদের মধ্যেও কোনো কথা কইল না। ওরা আমায় ধরাধরি করে দাঁড় করাল। আমি হাঁটতে পারলুম। ওরা আমায় ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে আমাকে নিয়ে ছুটল। বসেছি আমি একজনের পেছনে, তাকে জড়িয়ে ধরে। হয়তো তখন আমি বিশ্বাস করতে পারছিলুম, আমি বেঁচে আছি। কে জানে এরপর আমার কী হবে! যতবারই ভাবছি সে-কথা, ততবারই যেন শিউরে উঠছিলুম।

হঠাৎ আমি চমকে উঠছিলুম এই ঘোড়াসওয়ারদের দেখে। হ্যাঁ দেখছি আটটা কালো ঘোড়ার পিঠে চেপে আটটা লোক ছুটছে। কোমরে তাদের তরোয়াল আর ছোরা আঁটা। পোশাকগুলোও কালো। এই কালো পোশাকের আড়ালে কী মতলব লুকনো আছে আমি জানি না। তবু আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিল। আচ্ছা, মরুর দস্যু নয় তো! এ-কথা মনে হতেই আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। কেননা, আমি জানি এরা ভীষণ নির্দয়, ভয়ংকর হিংস্র! বাবার মুখে এদের কত গল্প আমি শুনেছি। শুনেছি অতর্কিতে এরা মরুযাত্রীদের আক্রমণ করে তাদের সর্বস্ব লুঠ করে নেয়। তবে কি এরাও তাই! এরাও কি তবে লুঠ করে ফিরছে! সামনে ওই যে লোকটা চলেছে, ওর কোলে-বাঁধা ওই পুঁটলিটাতে কী আছে! তবে কি কারো লুঠের মাল! হবেও বা! কিন্তু তাহলে আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এরা! এরা তো মানুষকে খুন করে! তবে কি আমাকেও খুন করবে!

করুক খুন। আমি এত ভীতু! আমার কোমরেও তরোয়াল আছে। আমাকে মারার আগে ওদেরও ছেড়ে দেব না আমি! কাপুরুষের মতো ওদের তরোয়ালের সামনে মাথা পেতে দেব, তেমন ছেলে আমি নই। আমিও জানি দুশমনকে কেমন করে শায়েস্তা করতে হয়!

কিন্তু ছিঃ ছিঃ, আমি এ-কথা আগেই কেন ভাবছি। ওরা যদি অতই নিষ্ঠুর হয় তবে আমায় বাঁচাবে কেন! ওই বালির ওপর একটু জলের জন্যে আমি যদি ধুঁকতে-ধুঁকতে মরি তাতে দস্যুর কী! এদের মনে দয়া কেন হবে?

হ্যাঁ, আমি তো মরেই গেছলুম! আর একটু দেরি করে এই ঘোড়সওয়ারের দল এখানে যদি আসত! ওরা যদি আমায় দেখতে না পেত! অবিশ্যি আমি মরলেই বা কী! এখন তো আমি জানি এই মরুভূমিতে আমি কুড়িয়ে-পাওয়া এক অনাথ ছেলে! আমি জানি না, নিজের বাবা-মা কেমন হয়। কিন্তু এরা? যাদের আমি এতদিন মা বলে ডেকেছি বাবা বলে জেনেছি, তারা? কোনোদিনই তো জানতে পারিনি এরা আমার কেউ নয়! কুড়িয়ে-পাওয়া ছেলেকে যারা আপন করে নিতে পারে, তারা কি শুধুই মানুষ না মহাপুরুষ!

হঠাৎ মায়ের মুখখানি আমার চোখের সামনে কেমন ভেসে উঠল! আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মাকে! দেখতে পাচ্ছি, মা আমার মুখের দিকে চেয়ে হাসছে। আমি ওই মুখখানি জড়িয়ে ধরে কতদিন যে খেলা করেছি। মায়ের গলায় দু-হাত রেখে দুলতে-দুলতে মাকে কত আদর করেছি। না এ হতে পারে না। মা আমার পর না। কক্ষনো না। আমার মা আমারই। আমার আপনার!

'এ খোকা, এখানে কোত্থেকে এসেছিস?' হঠাৎ আমি যার ঘোড়ার পিঠে বসেছিলুম সে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।

আমি প্রথমটা থতমত খেয়ে গেছলুম। তারপর ভয়ে-ভয়ে উত্তর দিলুম, 'আমি এখানে আসতে চাইনি। আমার সঙ্গে আমার উট ছিল। আমি উটপাখির পালক নিয়ে শহরে যাচ্ছিলুম। ঝড় উঠে আমি হারিয়ে গেছি।'

'কোথা থাকিস?'

'জানজি।' আমি বললুম। অবিশ্যি তোমাদেরও বলতে ভুলে গেছি, আমরা যেখানে থাকি, সে-জায়গাটার নাম জানজি।

সে জিজ্ঞেস করল 'বাড়ি যাবি?'

আমি বললুম, 'আমার বাবাকে বলে এসেছি, শহরে উটপাখির পালক পৌঁছে দিয়ে ফিরব।'

'পালক পাবি কোথায়?'

'আমার উটের পিঠে বাঁধা আছে।'

আমার কথা শুনে লোকটা কোনো কথা বলল না। বিচ্ছিরি সুর করে হেসে উঠল। আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'হাসলেন কেন?'

সে বলল, 'আজ প্রথম বেরিয়েছিস?'

আমি বললুম, 'হ্যাঁ।'

'একা-একা?'

'আমার বাবার যে অসুখ করেছে!'

'তোর বাবার আক্কেল নেই।'

এ-কথা শুনেই আমার যেন গায়ের রক্ত গরম হয়ে উঠল। আমি প্রতিবাদ করে উঠলুম, 'এ-কথা কেন বলছেন? তিনি তো আপনার কোনো ক্ষতি করেননি।'

আমার এই কথায় লোকটা যে অমন হুট করে চটে উঠবে, আমি বুঝতে পারিনি। হঠাৎ ঘোড়ার লাগাম ধরে সে ঝপ করে থেমে দাঁড়াল। ঘোড়ার পিঠের ওপর বসে-বসেই আমার বুকের জামাটা খামচে ধরে টান মারল। চেঁচিয়ে উঠল, 'কী বলছিস?'

আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেলুম!

লোকটা আবার হাঁক পাড়ল, 'কী বলছিস, আর একবার বল!' বলেই ঘোড়ার পিঠ থেকে আমায় নীচে ফেলে দিল। আমি কী করি, কী বলি ভাবতে-ভাবতেই লোকটা তার কোমরে ঝোলানো খাপ থেকে তরোয়ালটা বার করে ফেলেছে। সঙ্গে-সঙ্গে দেখি, তার আরও সাতজন সঙ্গী দাঁড়িয়ে পড়েছে! আমি কিছু বলার আগেই লোকটা আমাকে মারবার জন্য তরোয়াল তুলল। লোকটা যে এমন তুচ্ছ কথায় হঠাৎ চটে উঠে আমাকে একেবারে কেটে ফেলার জন্যে তরোয়াল তুলেছে, সত্যি বলছি, এটা আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। আসলে আমি তো রেগে যাবার মতো অন্যায় কথা বলিনি। উলটে লোকটাই তো বলল, আমার বাবার আক্কেল নেই! তোমরাই বলো, বাবার নামে এমন কথা বললে কোন ছেলে সহ্য করে!

আমায় ঘিরে ফেলল ওরা। ওরা আটজনই একসঙ্গে তরোয়াল বার করল। কোথা থেকে যে কী হল, তখন আমার কোত্থেকে যে সাহস এল, বলতে পারব না। আমিও ঝটপট খাপ থেকে তরোয়াল বার করে ফেললুম। আমি মনে-মনে ভাবলুম, মরতে হয় মরব, তবু ভীরুর মতো কেন মরব! তাই, যেই ওরা তরোয়াল চালিয়েছে, ওদের তরোয়ালের বুকে ঘা মেরে আমার তরোয়ালও ঝনঝনিয়ে উঠল। আমি আটজনের সঙ্গে একাই মুখোমুখি লড়াই শুরু করে দিলুম। তুমি যদি তখন আমায় দেখতে, হলপ করে বলতে পারি, তুমি অবাক হয়ে যেতে। আমি তখন আর সে আবু নই। তখন আমি যোদ্ধা। এই নিঃশব্দ, নিজঝুম বালির সমুদ্রে আমি এখন একা-একা যুদ্ধ করছি আটজন দস্যুর সঙ্গে। জানি না, কে আমায় এত শক্তি দিল। একটু আগে যে-আমি মরতে-মরতে বেঁচেছি, সে-ই আমি এখন শত্রুর তরোয়ালের আঘাত আটকাবার জন্যে কখনো সামনে লাফাচ্ছি। পেছনে হাঁটছি। ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। প্রচণ্ড শব্দে তরোয়াল বেজে উঠছে, ঝনাত, ঝনাত!

কিন্তু এ তো অসম্ভব ব্যাপার! একা আমি এতজনের সঙ্গে কতক্ষণ লড়ব? আমি জানি, এক্ষুনি আমার হাতের মুঠির থেকে তরোয়াল ছিটকে পড়বে। আমি জানি, আমার মরণ নিশ্চিত! এখনই আমার বুক দিয়ে রক্ত গড়াবে। তারপর হয়তো আমার ক্ষত-বিক্ষত দেহটা এইখানে ফেলে রেখে ওরা দুরন্ত বেগে ছুটে পালাবে। তখন এই তপ্ত বালির ওপর দেহটা পড়ে-পড়ে শুকিয়ে-শুকিয়ে শেষ হয়ে যাবে!

না, আমি আর পারছি না। আমার হাতটা অবশ হয়ে আসছে। আমি ঘুরন্ত চরকির মতো ছিটকে পড়ছি। নিমেষের মধ্যে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছি। লাফাচ্ছি, কিন্তু টাল খাচ্ছি। বালির ওপর আমার পা স্থির রাখতে পারছি না। ঠিক এমন সময় হঠাৎ আটটা তরোয়ালই এক সঙ্গে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি শেষবারের মতো লাফিয়ে উঠেছি। কী বলব, কোত্থেকে যে শক্তি পেলুম জানি না। চোখের পলকে আমি একজনের পেটে তরোয়াল চালিয়ে দিয়েছি। লোকটা চিৎকার করে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে দেখি, সবাই থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। একজন প্রাণের ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'ভাগো, ভাগো, ওরা আসছে।'

আমিও চমকে গেলুম। একেবারে চোখের পলক পড়তে-না পড়তেই দেখি, লোকগুলো পিছু ফিরেছে। আমিও পিছু ফিরেছি। দেখি, দূরে বালির ধুলো উড়িয়ে আর-একদল লোক ঘোড়ার পিঠে ছুটে আসছে। আর দেখতে! এরা সঙ্গে-সঙ্গে আহত লোকটাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়ে তির-বেগে ছুট মারল। আমি তো থ। কিচ্ছু ভেবে না পেয়ে, একবার এদের দিকে আর একবার ওদের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখতে লাগলুম! আমার হাতে তরোয়াল রক্তমাখা। তাড়াতাড়ি সেটা খাপে পুরে ফেললুম। বলব কী, সঙ্গে-সঙ্গে অন্তত পঞ্চাশটা ঘোড়সওয়ার আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি তাদের কিছু বলার আগেই একজন ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ঝটপট আমার মুখখানা একটা কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলল। তারপর একটা শক্ত দড়ি দিয়ে আমার হাত দুটো আর কোমরটা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ঘোড়ার পিঠে চাপল সে। আমার কোমরে দড়ি বাঁধা, আমি বালির ওপর দাঁড়িয়ে। আমার কোমরে বাঁধা লম্বা দড়িটা লোকটার হাতে। লোকটা ঘোড়ার ওপর বসে। ঘোড়া ছুটল। আমার দড়িতে টান পড়ল। আমিও ছুটলুম বালির ওপর দিয়ে ঘোড়ার পিছু-পিছু। কিন্তু তোমরা তো জানো ঘোড়ার সঙ্গে ছোটা আমার সাধ্য নয়। যতই টান খাচ্ছি, ছুটতে ছুটতে উলটে পড়ছি। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছি। কখনো পারছি, কখনো হারছি। শেষে লুটিয়ে পড়লুম বালির ওপর। ঘষটাতে ঘষটাতে গড়িয়ে চললুম। আমি বুঝতে পারছি আমার গা-হাত-পা ছড়ছে। আমি জ্বলে যাচ্ছি। রোদের জ্বালার চেয়ে এ যে আরও ভয়ংকর! আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, লোকগুলো আমাকে এমনি করে বাঁধল কেন! এমন করে বেঁধে টানতে টানতে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! ওরা কি বালির ওপর ঘষতে-ঘষতে এমনি করে আমায় মেরে ফেলবে! আমি তো কোনো দোষ করিনি। আঃ! আমি যে আর পারছি না। একটার পর একটা বিপদ এসে কেন বারবার আমায় জড়িয়ে ধরছে! আমার এখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, 'হে মরু, তুমি আমায় বাঁচাও! একদিন তোমার বুকে জানি না কারা আমায় ফেলে যায়! তুমি আমায় বাঁচিয়ে রেখেছিলে বলেই না আমি পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলে দেখেছি, কী সুন্দর এ পৃথিবী! দেখেছি তাদের, ওই যারা তোমার বুক থেকে তুলে এনে, তাদেরই বুকের ছায়ায় আমায় বড়ো করেছে। আমি জেনেছি, এরাই আমার মা, আমার বাবা। এই সুন্দর পৃথিবীতে এরা যে আমার কাছে আরও সুন্দর। আরও আপন। হে মরু, যারা আমাকে প্রাণ দিল, তাদের কথা ভেবে, আমার প্রাণ তুমি কেড়ে নিও না! আমি যদি মরে যাই কে তাদের দেখবে! হে মরু, বলো তুমি, ছেলে যদি মা-বাবাকে না দেখে কে দেখবে?'

ঘোড়া ছুটতে-ছুটতে থামল। আমিও থামলুম। কিন্তু দাঁড়াতে পারলুম না। ওরা নেমে এল ঘোড়ার পিঠ থেকে। আমার মুখের কালো কাপড়ের ঢাকনাটা আর হাতের বাঁধনটা ওরা খুলে ফেলে দিল। আমার চোখে অন্ধকার! ওরা আমার ঘাড়টা ধরে টান মারল। আমি উঠতে গিয়েও পড়ে গেলুম। কিন্তু ওরা ছাড়বে না। আমাকে দাঁড়াতেই হবে। অনেক কষ্টে কাঁপতে-কাঁপতে আমি দাঁড়ালুম। কী প্রচণ্ড যন্ত্রণা আমার সারা দেহে।

ওরা আমার কোমরের দড়ি ধরে টানতে-টানতে নিয়ে চলল। কোথায় নিয়ে চলল, জানি না। শুধু জানি, আমার চোখের সেই কালো অন্ধকারটা ধীরে-ধীরে সরে যাচ্ছে! আমি একটু-একটু করে চাইতে পারছি। মনে হচ্ছে, হয়তো বা মরুভূমির বালির কোলে আর এক নতুন জায়গায় এসেছি আমি। কেননা, আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার সামনে একটা পুরোনো বাড়ির ভাঙা ফটক। কেমন যেন রহস্য-ঘেরা! ওর আমায় টানতে টানতে ফটকের মধ্যে নিয়ে গেল। আমি একটা শান-বাঁধানো ঘরের মধ্যে ঢুকলুম। একটা সুন্দর পালঙ্ক। মখমলের গদির ওপর ভেলভেটের বালিশে হেলান দিয়ে যে লোকটা বসে আছে, তার মাথায় লম্বা চুল। দাড়ি আর গোঁফের সঙ্গে চুলে পাক ধরেছে। তবু তীক্ষ্ণ তার চোখের দৃষ্টি। লম্বা আর শক্ত সমর্থ মানুষ। ওরা আমায় তার সামনে দাঁড় করাল। আমি বুঝলুম ইনিই বোধহয় পালের গোদা! ইনিই বোধ হয় সর্দার! বিদ্যুৎ যেমন চমকে যায় তেমনি তার চোখ দুটো হঠাৎ ঝলসে উঠল আমার মুখের ওপর। তারপর স্থির আর গম্ভীর তার গলার স্বর বলে উঠল, 'এই বাচ্চাটাকে কোত্থেকে ধরে আনলে?'

আমায় যারা ধরে এনেছিল তাদের পান্ডা যে লোকটা, সে বলল, 'হুজুর ছেলেটা দলে ছিল।'

আবার সে বলল, 'এত কম বয়সে দস্যুগিরিতে নেমেছে! ছেলেটার কাছ থেকে লুঠের মাল কিছু উদ্ধার করতে পারলে?'

'আজ্ঞে না। ছেলেটাকে ফেলে রেখে ওরা মাল নিয়ে ভাগল!'

এবার রেগে যেন সেই সর্দার গর্জন করে উঠল, 'তোমরা এতগুলো লোক কী করছিলে? এতজনের চোখের ওপর দিয়ে ভাগে কেমন করে?'

এবার আর কোনো উত্তর বেরোল না তার মুখ দিয়ে। মনে হল ভয় পেয়েছে।

সর্দার আবার জিজ্ঞেস করল, 'ছেলেটার কাছে কিছুই পাওয়া গেল না?'

'আজ্ঞে না।'

সর্দার তখন আমার দিকে আবার ফিরে চাইল। ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় তোদের আস্তানা?'

আমি অনেক কষ্টে কথা বলতে পারলুম, 'জানি না।'

সে অমনি সঙ্গে-সঙ্গে চিৎকার করে উঠল, 'না বললে মরবি!'

আমি আবার বললুম, 'আমি দস্যু নই। আমি জানি না।' লোকটার তীক্ষ্ণ চোখের চাউনি এবার কেমন ভয়ানক চকচক করে জ্বলে উঠল। সে আরও চড়া গলায় চেঁচিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করল, 'কোনখানে তোদের আস্তানা?'

আমি তেমনি শান্ত গলায় উত্তর দিলুম, 'আমি দস্যুগিরি করি না।'

লোকটা এবার হো-হো করে হেসে উঠল। কী হিংসুটে সে হাসির শব্দ। হাসতে-হাসতে আচমকা থেমে পান্ডাকে বলল, 'চাবুক লাগাও!'

এ-কথা যদি আমার আপনজন কেউ বলত, তবে নিশ্চয়ই আমার দু-চোখ বেয়ে জল গড়াত। কিন্তু এই লোকটার হুকুম শুনে মাথা তুলে, বুক ফুলিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলুম, 'কেন তোমরা আমায় চাবুক মারবে? আমি মিথ্যে বলি না। খবরদার! আমার গায়ে হাত তুলবে না!'

লোকটা বোধহয় থতমত খেয়ে গেছল আমার কথা শুনে। শুধু এই লোকটা কেন যে-লোকটাকে চাবুক মারতে বলেছিল সে-ও বোধহয়। কেননা, তার হাতের চাবুক হাতেই থমকে গেছল। কিন্তু নিমেষের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে চাবুক হাতে লোকটা আমাকে মারবে বলে যেই আবার চাবুক তুলেছে, সঙ্গে সঙ্গে সেই সর্দার পালঙ্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'থামো!'

চাবুক আমার পিঠে না পড়ে, মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এবার সে নিজেই চাবুকটা ছিনিয়ে নিয়ে, আমাকে ভয় দেখাবার জন্যে প্রচণ্ড জোরে সেই চাবুক শূন্যে ঘোরাল। কিন্তু তার আগেই আমি আমার কোমরে বাঁধা তরোয়ালটা খাপ থেকে বার করে চাবুকের ওপর চালিয়ে দিয়েছি। চাবুকের দড়ি ছিঁড়ে ছিটকে পড়ল। আমার হাতের তরোয়াল খাপের মধ্যে ঢুকে গেল। লোকটা তার হাতের চাবুকের ভাঙা টুকরোটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে পাগলের মতো লাফিয়ে উঠে আমার গলাটা দু-হাত দিয়ে চেপে ধরল। কিন্তু আশ্চর্য! আমার চোখের ওপর তার চোখ পড়তেই লোকটা যেন কেমন চমকে গেল। তাড়াতাড়ি আমায় ছেড়ে দিল। তারপর আমার মুখের দিকে ফ্যালফাল করে বেবাক তাকিয়ে রইল। কেন যে লোকটা এমন করল, কেন যে আমায় মারতে-মারতেও ছেড়ে দিল, আমি বুঝতে পারলুম না। আমি কেন, ঘরসুদ্ধ অত লোক সবাই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে।

লোকটা কেমন হাঁপাতে লাগল। হাঁপাতে-হাঁপাতে চেঁচিয়ে উঠে বিছানায় ছুটে গেল। মাথার বালিশটাকে খামচে ধরে হুকুম করল, 'ছেলেটার কোমর থেকে তরোয়ালটা কেড়ে নাও। ছেলেটাকে বন্দি করে রাখো। যাও, নিয়ে যাও ওকে আমার সামনে থেকে।'

ওরা আমায় টানতে-টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে চলে গেল। তারপর আমার কোমর থেকে তরোয়ালটা কেড়ে নিয়ে, আমাকে একটা গরাদ-আঁটা ঘরে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে, ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। আমি কয়েদ হয়ে রইলুম। আমি জানি না, আমার ভাগ্যে এখন কী আছে। তবে একথা ঠিক, এখন আমি ভয়ংকর কিছুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভাবছি, তবে কি এবার এরা আমায় মেরে ফেলবে!

হ্যাঁ, এখন আমি কয়েদ হয়েই আছি। আমি ভয় পেয়েছি কি না জানি না। কিন্তু আমার মা আর বাবার মুখ দুটি বারবার আমার চোখের ওপর ভেসে উঠছে। আর যখনই ভাবছি, হয়তো আমি আর তাদের দেখতে পাব না, তখনই আমার চোখ দুটি ছলছলিয়ে উঠছে। আমি জানি, আমার নিস্তার পাওয়ার আর কোনো রাস্তা নেই। হয়তো বেঁচে আছি কিছুক্ষণের জন্যে। কিন্তু সে কিছুক্ষণ যে কতক্ষণ, তা জানি না।

ঘরটা অন্ধকার। আমি যেন অন্ধকারে ডুবে আছি। ভাবছি, আমার মা আর বাবা এখনও হয়তো ঘুমোচ্ছে। হয়তো ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে আমারই স্বপ্ন দেখছে। কিংবা জেগে-জেগে ভাবছে, আজকের রাত কি কালকের চেয়েও বড়ো! তা না হলে, এ-রাত কাটে না কেন! শেষ হয় না অন্ধকার! এমন মানুষ ক-জন হয়। পথের ছেলেকে ঘরে তুলে এনে, নিজের ছেলে বলে বুকে তুলে নিতে পারে ক-জন! আমি তাদের কাছে যা চাইনি, তাই-ই পেয়েছি। মা-েমানে যা চেয়েছি, তাও যে আমার চাইবার আগেই তারা ভালবেসে আমার হাতে তুলে দিয়েছে। তাই আজ এই কয়েদখানার অন্ধকারে বসে-বসে মন আমার বারবার কেঁদে-কেঁদে বলে উঠছে, আমি যদি কোনো দোষ করে থাকি, তোমাদের যদি কষ্ট দিয়ে থাকি, সে-দোষ তোমরা নিয়ো না। আমায় ক্ষমা কোরো!

হয়তো এখন গভীর রাত্তির। মনে হচ্ছে, ঠান্ডা হাওয়ার আমেজ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে! আমার তরোয়ালটা এরা কেড়ে নিয়েছে। বাঁচোয়া, আমার গায়ের ছেঁড়া জামাটা আরও ছিঁড়ে দেয়নি। তুমি এখন এই অবস্থায় আমায় দেখলে, ঠিক বলছি, 'ছিঃ ছিঃ' করে উঠবে। কারণ রোদে আর বালিতে, ঝড় আর ঝঞ্ঝায় আমার যা অবস্থা হয়েছে। আমার গায়ে কত জায়গা যে কেটেছে, না দেখলে বুঝতে পারবে না। সঙ্গে-সঙ্গে পোশাকগুলোও ফর্দাফাঁই হয়ে ঝুলঝুল করছে। এ তবু ভালো। ছিঁড়ুক। গায়ে তো আছে। কিন্তু মাথার পাগড়িটা যে কোথায় গেল, আমি খেয়ালই করতে পারছি না।

এরা আমায় খেতে দিল না। না-ই দিক। এখন কী আর খিদের কথা মনে আসে! আমার ভারি ক্লান্ত লাগছিল। তাই ঘুম পাচ্ছিল। চোখ দুটো যেন আপনা থেকে ঘুমে ঢুলে পড়ছিল। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানেই বসে পড়লুম। বসে-বসে আমার মুখখানা দুটো হাঁটুর মধ্যে চেপে ঢুলতে লাগলুম। তারপর যে কখন আমি আপনা-আপনি লুটিয়ে পড়েছিলুম ঘরের মেঝেয়, জানি না। এখন আমি বলতে পারব না, কখন আমার চোখ দুটি অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

হঠাৎই হয়তো ঘরের দরজাটা খুলে গেছল। হঠাৎই ঝনাত করে একটা আলতো শব্দ আমার কানে বেজে উঠেছিল। আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি চমকে চিৎকার করে উঠেছিলুম, 'কে?'

আলো। কার হাতে যেন আলো জ্বলছে। আমি আলো দেখছি, কিন্তু যার হাতে আলো তাকে দেখছি না। আলো-ছায়ায় দেখছি, পা থেকে মাথা অবধি একটা কালো জোববায় সে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। আমার দিকে সে এগিয়ে আসছে। আমি ভাবলুম, আর ভয় পেয়ে, চিৎকার করে কিচ্ছু লাভ নেই। এবার বোধহয় আমায় এই লোকটার হাতেই মরতে হবে। তাই লোকটা আমার মুখের সামনে এসে দাঁড়াতেই, আমি তাকে আর অন্য কোনো কথা না জিজ্ঞেস করে বললুম, 'তুমি বুঝি আমায় মারবে?'

সে তখনই কোনো কথা বলল না। হয়তো ওই কালো কাপড়ের আড়াল থেকে আমার মুখের দিকে চেয়ে-চেয়ে দেখছিল। ভয়ে যেন নিথর চারদিক। শুধু নিজেদের বুকের নিশ্বাস ছাড়া কোনো সাড়া নেই। আমি হাত বাড়ালুম তার দিকে। অস্ফুষ্ট স্বরে বললুম, 'চলো। কোথায় নিয়ে যাবে আমায়।'

দেখলুম লোকটার হাত কাঁপছে। তার হাতের ওই আলোর শিখাটিও কাঁপতে-কাঁপতে নিভু-নিভু হয়ে আবার জ্বলে উঠছে।

আমার কথা শুনে সে কথা বলল। খুব চাপা সে গলার স্বর। সে বলে উঠল, 'তোকে আমি মরতে দেব না।' বলেই একটা হাত আমার মাথায় রাখল। আমি অবাক হয়ে গেলুম। অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলুম, 'কে তুমি?'

আমার মাথায় রাখা তার হাতটা যেন গড়িয়ে-গড়িয়ে আমার গাল দুটির ওপর নেমে এল। তার হাতের পুরুষ্টু আঙুলগুলো আনন্দে আমার গালের ওপর নাচতে লাগল। আর তখনই আমি তার মুখখানি দেখার জন্যে ছটফটিয়ে উঠলুম। কিন্তু দেখতে পেলুম না। সে আবার তেমনি চাপা-স্বরে বলল, 'আহা! তোর খুব লেগেছে, না?'

আমি বললুম, 'কই, না!'

সে তখন আমার গাল থেকে হাতটি সরিয়ে এনে, প্রদীপের আলোয় আমার ক্ষত জায়গাগুলি হাত বুলিয়ে দেখতে লাগল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন আপন মনেই বলে ফেলল, 'ভারি নিষ্ঠুর আমরা, ভারি নির্দয়!'

আমার আরও অবাক লাগছে। এই অন্ধকারে কোনো মানুষ যে আমায় আদর করতে পারে, এ আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। আমি তো এদের হাতে বন্দি। আমাকে নিশ্চয়ই আদর করার জন্যে এরা বন্দি করে রাখেনি। কিন্তু এ লোকটা তাহলে কে? আমায় আদর করে এমন সব অদ্ভুত কথা বলছে! আমি তাই আবার তাকে জিজ্ঞেস করলুম, 'তুমি কে? অমন করে নিজেকে কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছ কেন? তোমার মুখখানা আমায় দেখতে দিচ্ছ না কেন?'

সে বলল, 'না, দেখিস না, দেখিস না এ-মুখ। আমি বড়ো পাপী! কিন্তু তুই বিশ্বাস কর, আমি পাপ করতে চাই না। আমি দস্যু হতে চাইনি। একদিন আমার সব ছিল। আমার ছেলে ছিল, আমার মেয়ে ছিল, আমার ঘর-সংসার সবই ছিল। একে-একে সব চলে গেছে। মানুষ বড়ো নিষ্ঠুর। বড়ো হিংস্র! তারাই আমার সব কেড়ে নিয়েছে। আজ তাদের জন্যেই আমি একজন খুনি দস্যু!'

আমি চুপ করে গেছি। মনে-মনে ভাবছি, যে হাত দিয়ে মানুষ খুন করে, সেই হাত দিয়ে আবার আদরও করে! তাই আমি তাকে আবার বললুম, 'তুমি আমাকে এত কথা বলছ কেন?'

সঙ্গে-সঙ্গে সে আমার একটা হাত চেপে ধরল। চেপে ধরে বলল, 'তুই আমাকে বাঁচা। তোকে দেখে আমার মন বলছে, আমি আর দস্যু হয়ে থাকতে চাই না। এদের কবল থেকে আমায় তুই মুক্ত করে নিয়ে যা। এদের জালে জড়িয়ে গেছি আমি। এরা আমায় ছাড়বে না।'

আমি বললুম, 'তুমি তো ভারি আশ্চর্য কথা বলছ। আমি তো নিজেই বন্দি।'

হঠাৎ সে চুপ করে গেল। 'ওই শোন, বাইরে কারা যেন ফিস-ফিস করে কথা বলছে।' তাড়াতাড়ি সে প্রদীপটা নিবিয়ে ফেলে আমার মুখখানা তার হাত দিয়ে চেপে ধরল। তারপর আমার হাত ধরে টানতে-টানতে ঘরের বাইরে নিয়ে চলল।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'কোথায় যাব?'

সে বলল, 'বাইরে।'

'কেন?'

'ওরা আসছে।'

'এলেই বা।'

সে জিজ্ঞেস করল, 'মরতে তোর ভয় করে না?'

আমি বললুম, 'না।'

ততক্ষণে ওর হাত ধরে অনেকটা ছুটে এসেছি। ছুটতে ছুটতেই লোকটা আমার উত্তর শুনে বলল, 'তুই মরে গেলে তোর বাপকে দেখবে কে?'

আমার বুকটা দুরু-দুরু করে কেঁপে উঠল। সত্যিই তো, আমি মরে গেলে আমার বাবাকে দেখবে কে? কে দেখবে আমার মাকে। আর তখনই আমার মনের মধ্যে যেন কে চেঁচিয়ে উঠল, না, আমি মরব না, কিছুতেই না। আমাকে বাঁচতেই হবে আমার বাবার জন্যে, আমার মায়ের জন্যে। এ-কথা মনে হতেই আমি তার হাত ধরে আরও জোরে ছুট দিলুম। ছুটতে-ছুটতে জিজ্ঞেস করলুম, 'কোনদিকে যাবে? আমি তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।'

সে বলল, 'তোকে দেখতে হবে না। আমি দেখছি। আমার হাতটা ভালো করে ধরে থাক। আমি তোকে বাইরে নিয়ে যাব।'

আমি তার কথামতো, তার হাতটা ভালো করে জাপটে ধরলুম। তারপর ছুটতে-ছুটতে ফটক পেরুতেই সে বলল, 'এসে গেছি।'

'কোথায়?' আমি জিজ্ঞেস করলুম।

'বাইরে।' বলে হাঁপাতে-হাঁপাতে লোকটা আবার জিজ্ঞেস করল, 'আলো দেখতে পাচ্ছিস?'

আমি বললুম, 'ঘরের চেয়ে এখানে কম অন্ধকার।'

সে জিজ্ঞেস করল, 'এবার যেতে পারবি?'

আমি বললুম, 'পারব।'

বলতে-বলতেই আমি শুনতে পেলুম, কারা যেন চেঁচিয়ে উঠল, 'ভাগল, ভাগল।'

সে যেন ভয় পেল। আমায় আড়াল করে সে বলল, 'ওরা তোকে দেখতে পেয়েছে!'

আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'কী করব?'

সে আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে তেমনি চাপা-গলায় বলল, 'লুকিয়ে পড়।' বলেই সে কোথায় গা ঢাকা দিল। বোধহয় সেও লুকিয়েই পড়ল। কেননা, আমি তাকে আর দেখতেই পেলুম না। সে যে চট করে এইটুকু সময়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়তে পারে, তা আমি ভাবতেই পারিনি। কিন্তু এখন আমি কী করব! কোথায় লুকোই! আর ভাববার সময়ই নেই। তাই আমিও ঝটকরে সামনের ফটকটার আড়ালেই ঢুকে পড়লুম। উঃ! কী ভাগ্য আমার! আর একটু হলেই ওরা দেখে ফেলত। আমার বুকটা কী প্রচণ্ড উত্তেজনায় ধক-ধক করছে। বুকটাকে দুহাত দিয়ে চেপে ধরে ফটকের আড়ালে পাথরের মতো চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলুম।

হঠাৎ আমি আঁতকে উঠেছি। আমার গায়ের ওপর কী যেন একটা ছিটকে পড়ল! বোধহয় একটা পোকা। সুড়সুড় করে উঠতেই আমি ঝটপট হাত দিয়ে সরিয়ে ফেলতে গেছি। তক্ষুনি আমার হাতে ঠকাস করে কী একটা ঠেকল। চেপে ধরেছি। টান পড়তেই আমার মনে হল, আমার গলায় যেন কী একটা ঝোলানো। আশ্চর্য তো! কোত্থেকে এল। আমার গলায় তো কিছু ছিল না। আমি তো কিছুই পরিনি। তবে? তবে কি সেই লোকটা কিছু পরিয়ে দিল আমার গলায়?

আমি অন্ধকারেই সেটা পরখ করছিলুম। করতে-করতে ভাবছিলুম, এটা আমার গলায় রাখব, না ছুড়ে ফেলব! কিন্তু হঠাৎ আমার চোখ দুটো ঝলসে উঠল। চোখের ওপর এক ঝলক রুপোলি আলো ঠিকরে পড়ল আমার। নিমেষে চোখ বুজে ফেলেছি। আমি থ হয়ে গেছি! একটু পরে ভয়ে-ভয়ে আবার চোখ খুলে ভাবছি, এ কি তবে এক টুকরো হিরে! আমার গলায় মালা হয়ে ঝুলছে! ঝুলতে ঝুলতে অন্ধকার ঝলমলাচ্ছে! আমি আবার দেখলুম! বারবার দেখলুম। তারপর চমকে উঠলুম! কেননা ওরা হল্লা করতে-করতে ছুটে আসছে। পাছে আমার বুকের এই আলোটা ওরা দেখতে পায় তাই চটপট আমি মালাটা আমার জামার ভেতর বুকের মধ্যে গলিয়ে ফেললুম। গলিয়ে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে রইলুম।

একটু পরে যখন আর ওদের গলার স্বর শোনা গেল না, যখন মনে হল, লোকগুলো বোকা বনে গেছে, তখন আমি এই ফটকটার আড়াল থেকে একবার উঁকি মেরেছিলুম। কাউকে দেখতে পেলুম না। আরও একটু নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্যে আর একবার উঁকি মেরেছি। না, সত্যিই কেউ নেই। আমি বেরিয়ে পড়েছি। ছুট দিয়ে পালাতে গেলে যদি নজরে পড়ে যাই, তাই না-ছুটে, ডিঙি মেরে পা ফেললুম। একটাই ভয়। সামনেটা শুনসান ফাঁকা। ঝট করে কারও নজরে পড়ে যেতে পারি! একবার দেখে ফেললে কী হতে পারে সে তো তোমরা বুঝতেই পারছ। তার ওপর আমার তরোয়ালটাও ওরা কেড়ে নিয়েছে। ধরতে এলে বুঝব কেমন করে! খালি হাতে কি লড়াই করা যায়! অগত্যা দু-হাত তুলে ওদের হাতে আবার ধরা দিতে হবে!

এমনি করে ডিঙি মেরে দু-চার পা হেঁটেছি হয়তো। হয়তো, থেমে-থেমে দু-একবার এ-পাশ ও-পাশ দেখেছি। হঠাৎ আমার গা-টা কেমন শির-শির করে উঠল। পেছনে শত্রু। এমনি করে হাঁটলে ধরা পড়তে কতক্ষণ! সুতরাং ছোটো! আর বলতে। আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করে দিলুম!

বালির ওপর ছুটতে গিয়ে আমার পা ফসকাচ্ছে! হোঁচট খাচ্ছি। গায়ের কাটা-ছেঁড়ার ব্যথাগুলো টনটন করে উঠছে। তবু ছুটছি। আমি জানি, এখন বাঁচতে গেলে ছুটতেই হবে।

অনেকটা ছুটে এসেছি। না, মনে হচ্ছে, আর দেখতে পাবে না। গাঢ় অন্ধকারে চারিদিক ঢেকে আছে। সেই অন্ধকারের মধ্যে দূর থেকে দূরে আমি যতই ছুটে যাচ্ছি, ততই যেন হারিয়ে যাচ্ছি। অবিশ্যি আকাশে যদি পূর্ণিমার চাঁদ থাকত, চাঁদের আলো যদি ছড়িয়ে পড়ত মরুভূমির ওপর, তখন যদি আমায় দেখতে, তবে তোমার নিজেরই এত ভালো লাগত! দেখতে আকাশের ওই আলোর ঝর্নায় ভাসতে-ভাসতে একটি ছোট্ট ছেলে হারিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে একটি বিন্দুর মতো।

কিন্তু ওরা কি দেখে ফেলেছে? শুনতে পাচ্ছি, ঘোড়ার পিঠে কারা যেন ছুটে আসছে। পিছু ফিরে দেখলুম। হ্যাঁ, সত্যি তো! কী করি এবার! ওই তো সামনে বালির পাহাড়। উঁচু-নীচু পাহাড় থরে-থরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি জানি বাঁচার আর কোনো পথ নেই। তাই পড়ি-মরি বালির পাহাড়ের আড়ালেই আমি লুকিয়ে পড়লুম!

কিন্তু দস্যুর চোখকে তো আর ফাঁকি দেওয়া যায় না। তার ওপর একজন হলে কথা ছিল। অতজন! আমি যে কোথায় লুকিয়ে পড়লুম, তারা ঠিক দেখে ফেলেছে!

সুতরাং এই বালির পাহাড়ের সামনেই তাদের ঘোড়া থামল। ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝটপট নেমেই আমায় খুঁজতে শুরু করে দিল। সত্যি বলতে কী, এই আঁধার রাতে বালির পাহাড়ে তখন তাদের সঙ্গে আমার লুকোচুরি খেলা শুরু হয়ে গেল। ওরা বাঁয়ে গেলে, আমি সামনে পালাই। ওরা সামনে গেলে আমি ওপরে উঠি। মজা কী, আমি ওদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমি যে কোথায় আছি, ওরা টেরই পাচ্ছে না। দেখতে না-পাওয়ার কারণও তো আছে! তোমাদের বললুম বটে বালির পাহাড়, কিন্তু তোমরা হয়তো বুঝতেই পারছ না, সে-পাহাড় কেমন পাহাড়। সে-পাহাড় মরুর ঝড়ে গড়ে ওঠে। একদিন নয়, দুদিন নয়, দিনের পর দিন ঝড়ের বালি জমে-জমে এই পাহাড় গড়ে উঠেছে। কোনোটার মাথা উঁচু, কোনোটা নীচু। কোনোটা বড়ো, কোনোটা ছোটো। কোনোটা শক্ত, কোনোটা আবার বালির মতোই ঝুরঝুরে। সুতরাং আমার লুকিয়ে পড়তে কষ্ট নেই।

অনেকক্ষণ ধরে ওরা আমায় খুঁজল। আমিও অনেকক্ষণ ধরে ওদের চোখে ধুলো দিয়ে লুকিয়ে বেড়ালুম। শেষমেশ আমাকে দেখতে না পেয়ে কী যে ভাবল তারা কে জানে! রণে ভঙ্গ দিল। আমি দেখতে পেলুম, ওরা ঘোড়া ছুটিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে। যাক! এ-যাত্রায় বোধহয় রক্ষে পেলুম।

কিন্তু রক্ষে পেলেও, এখনই হুট করে এই আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়াটা ঠিক হবে না। তাই আরও কিছুক্ষণ এই আড়ালেই বসে রইলুম। বসে-বসে ভাবতে লাগলুম, সেই লোকটার কথা। যতই ভাবছি, অবাক হয়ে যাচ্ছি। কে লোকটা? কে আমার প্রাণ বাঁচাল অমন করে? আমার গলায় হিরের মালা পরিয়ে দিল!

হ্যাঁ, তাই তো! আমি ভুলেই গেছলুম। আমার জামার বুকে মালাটা তো এখনও লুকোনো আছে! ভাগ্যিস! দস্যুগুলোর সঙ্গে ছুটোছুটি করতে গিয়ে হারিয়ে যায়নি! আমি হলপ করে বলতে পারি, তোমরা ভাবছ, এই ফাঁকে আমি একবার বার করে দেখি মালাটা! কী, তোমাদেরও দেখতে ইচ্ছে করছে বুঝি?

তবে তাই ভালো। এসো আমার কাছে! আরও কাছে! এই দেখো, আমি বার করছি। চুপ! একদম কথা বোলো না! এখানে কেউ না থাকলেও, কে বলতে পারে বালিরও কান নেই! ওই আকাশের দিকে চেয়ে দেখো! তারাগুলো কেমন মিটমিট করে চাইছে! দেখুক! ওরা তো আর আকাশ থেকে নেমে এসে আমায় ছুঁতে পারছে না!

এই দেখো, আমি বার করেছি! আরে, এ কী! হঠাৎ অন্ধকার যে কেটে যাচ্ছে! ভোরের আলো আকাশে যেন উঁকি মারছে! ওই তো দেখো না, আকাশ থেকে তারার আলো একটি একটি করে নিবে যাচ্ছে। মরুর বুকের ওপর থেকে অন্ধকার রাত্তিরটা কেমন মুছে যাচ্ছে একটু-একটু। দেখো, দেখো, আমার বুকের ওপর আকাশের আলো কেমন ঝলমলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আঃ! ঠিকরে পড়ছে হিরের রোশনাই! সে রোশনাই তোমার চোখে ছড়িয়ে পড়ছে না? দেখতে পাচ্ছ না, আমার গলার এই হিরের হারটি? আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি দেখতে-দেখতে। ভোরের আকাশ যখন লাল হল, আমার বুকের আলোও যে রঙিন হয়ে ছড়িয়ে গেল। যখন লাল আকাশে রোদ উঠল, আমার গলার হিরে রুপোর আলোয় উছলে উঠল। আমি এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমাকে। দেখতে পাচ্ছি, এই বালির পাহাড়ের কোন চূড়াটা সবচেয়ে উঁচু। কোনটা নিচু। ইচ্ছে করলে, আমি এখনই বালি ডিঙিয়ে ওই উঁচুতে উঠতে পারি। আবার নামতে-নামতে ছুটতে পারি। কিংবা এই স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকতে পারি, 'পাশা, পাশা, পাশা-আ-আ।'

আমি ডাকতেই যাচ্ছিলুম। থমকে গেলুম। অবাক হয়ে চেয়ে দেখলুম, আমার চোখের সামনে একটা উটপাখির পালক পড়ে। এ কি তবে সেই পালক! যে-পালক আমি পাশার পিঠে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিলুম! তবে কি পাশা এই বালির নীচে চাপা পড়েছে! আমি ছুটে গিয়ে হাত বাড়ালুম। হাতের মুঠোয় ধরতে গেলুম পালকটা। কিন্তু আশ্চর্য! পারলুম না। পালকটা আমার হাতের নাগাল থেকে ছিটকে হুশ-শ-শ করে উড়ে গেল! উড়ে গেল আরও উঁচুতে।

আমি উঁচুতে উঠে গেলুম। আবার হাত বাড়ালুম। আবার সেই পালক চরকি খেয়ে আকাশে উড়ল। আমি হাঁ করে চেয়ে রইলুম সেইদিকে। ব্যাপারটা কী! আমি ধরতে গিয়েও ধরতে পারছি না কেন? ধরতে গেলেই আকাশে উড়ছে! এ কী আজব কাণ্ড! পালক তো আর পাখি নয়! তবে পাখির মতো উড়ছে কী করে!

আরে! আরে! দেখো, দেখো! একটা নয়, অন্তত আরও একশোটা পালক হঠাৎ কোত্থেকে উড়ে এসে শূন্যে ভাসতে শুরু করে দিয়েছে যে! শুধু ভাসছে না, ভাসতে-ভাসতে আমার গায়ে খোঁচা দিচ্ছে। আমি ভীষণ ঘাবড়ে গেছি। হাত-পা ছুড়ে পালক তাড়াতে শুরু করে দিয়েছি। আমি জানি এখানে একরকম একটা উদ্ভুট্টি ব্যাপার বেশিক্ষণ চললে, কারো-না-কারো নজরে পড়বেই। অত কী! যদি দস্যুদলের নজরে পড়ে যায়! তখন কী হবে! সেই ভেবে আমি নিজেই শিউরে উঠলুম। কিন্তু কী করব ছুটে পালাব? না পালক তাড়াব? এই কথা ভাবতে-না ভাবতেই দেখি পালকগুলো হঠাৎ যেন একটা গর্তের ভেতর সুড়ুত-সুড়ুত করে ঢুকে পড়ছে। আমি ছুটলুম সেইদিকে। শুনলে অবাক হবে, ওই যে অত পালক এই যে এতক্ষণ ধরে ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল আমার চোখ, এখন সেই পালকের একটিও আমি দেখতে পাচ্ছি না। তাজ্জব ব্যাপার তো! তবে কি পালকগুলো সব বালির ভেতর লুকিয়ে পড়ল!

আমি এই অদ্ভুত কাণ্ডটা দেখার জন্যেই পালকগুলোকে খুঁজতে-খুঁজতে হঠাৎ কেমন থতমত খেয়ে গেলুম! আচমকা আমার নজরে পড়ল, উঁচু ওই বালির স্তূপের মধ্যে ডুবে-ডুবে যেন উঁকি মারছে, একটা ভাঙা গম্বুজ! আরও একটু ভালো করে দেখার জন্যে, আমি আরও ক-পা এগিয়ে গেলুম। হ্যাঁ, সত্যিই তো গম্বুজ! তবে কি বালির তলায় কোনো প্রাসাদ লুকিয়ে আছে! অথবা কোনো কেল্লা ! আমি শুনেছি, মরুর বালি-ঝঞ্ঝার দুর্যোগে কোথাও-কোথাও এমনি নাকি বড়ো-বড়ো প্রাসাদ, কিংবা যুদ্ধজয়ের কেল্লা ধবংস হয়ে বালির নীচে তলিয়ে গেছে! আমি এগিয়ে গেলুম। মাথা-ভাঙা গম্বুজের ভেতরটা দেখার জন্যে হেঁট হলুম। হতেই দেখি, গম্বুজ বেয়ে ওপর থেকে নীচের দিকে সিঁড়ি নেমে গেছে। সেদিকে চেয়ে আমি মনে-মনে যেই ভেবেছি, সিঁড়ি দিয়ে নেমে একবার ভেতরটা দেখলে হয়, অমনি এক অজানা ভয়ে আমার গা ছমছম করে উঠল। জানি না ভেতরে কী আছে! কী রহস্য উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে! ভয়ের রহস্য যেখানে উঁকি দেয়, সেখানেই যেন মন টানে বেশি। নিজেকে সামলে নিয়ে, বুকে সাহস আনলুম। ভাবলুম, আমি তো হারিয়েই গেছি! মরতে আমার ভয় কী! কে বলতে পারে, গম্বুজ বেয়ে নীচে নামলে অজানা কোনো গোপন রহস্যের সন্ধানও তো মিলে যেতে পারে! এই কথা ভেবেই আমি গম্বুজের ভেতরে ঢুকে পড়লুম। গম্বুজের সিঁড়ি ডিঙিয়ে নামতে শুরু করে দিলুম। প্রথমটা ভয় ছিল, সিঁড়িগুলো বুঝি ভাঙা, এবড়ো-খেবড়ো। কিন্তু নামতে-নামতে দেখি, একেবারে উলটো। আমি বলছি না যে, একেবারে নতুনের মতো তকতকে ঝকঝকে। তবে ভাঙা-বাড়ির সিঁড়ি যেমন ধসে যায়, তেমন নয়। সিঁড়িটা সাপের মতো পাক খেতে-খেতে নেমে গেছে নীচের দিকে। অবিশ্যি অন্ধকার। গম্বুজের ভাঙা-চূড়াটার ফাঁক দিয়ে যেটুকু আবছা আলো এসে পড়ছে, সেটুকুই দেখা যাচ্ছে। তা-ও আবার যতই নামছি, আলোও ততই হারিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ আমার বুকের হিরেটা ঝলসে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি সেটাকে আবার বুকের মধ্যে লুকিয়ে ফেললুম। বলা যায় না, নীচে যদি কেউ থাকে! কেউ যদি দেখে ফেলে!

হ্যাঁ, নীচে জমাট অন্ধকার। মনে হচ্ছে, সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতে আমি একটা মস্ত চত্বরে এসে থেমে গেছি। এখন কোনদিকে যাই আমি, ওপর থেকে মনে হয়েছিল, ভেতরটা বুঝি শুধুই ধবংসস্তূপ। কিন্তু এখন তা মনে হচ্ছে না। কারণ আমার তো এদিক-ওদিক পা ফেলতে কোনো কষ্ট হচ্ছে না। কিন্তু অন্ধকারে হাতড়ে-হাতড়ে তো আর কোনো কিছুর হদিস করা যাবে না। তাই মনে হল, হিরের মালাটা বার করি। হিরের টুকরো-আলোয় যদি কিছু দেখতে পাই! তাই আমি আমার বুকে হাত দিলুম!

চুপ! চুপ! শুনতে পাচ্ছ, অন্ধকারে কে যেন কেঁদে উঠল! এ যে একটি মেয়ের কান্না! এই ভয়ংকর নির্জনতা হঠাৎ যেন ভেঙে খানখান হয়ে গেল! আমার বুকের ভেতরটা ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে উঠল! কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে আমি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। হ্যাঁ, আমার কানে ভেসে আসছে সেই কান্না! খুব নরম সেই কান্নার শব্দ! একটি মেয়ের গলায় সেই কান্না যেন ঝিরি-ঝিরি বিষ্টির মতো ঝুর-ঝুর করে ঝরে পড়ছে। আমার চোখের দৃষ্টিকে খুব সাবধানে এ-পাশ ও-পাশ হেলাতে লাগলুম! অন্ধকারে থাকতে-থাকতে আমার চোখ দুটো যেন এখন আর তেমন অন্ধ হয়ে নেই। দেখতে পাচ্ছি, আবছা-আবছা। দেখছি, আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে বড়ো-বড়ো থামের ছায়া। মনে হচ্ছে, থামের গা ছুঁয়ে-ছুঁয়ে একটা লম্বা বারান্দা সিধে ভেতরে চলে গেছে! আমি চট করে একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়লুম। আগে যা মনে হয়েছিল, এখন দেখছি তা তো নয়! এটা তো বালির তলায় লুকিয়ে থাকা ভাঙা স্তূপের জঞ্জাল নয়। এখানে কান্না শুনি কার! নিশ্চয়ই কেউ আছে। নিশ্চয়ই আছে প্রাণ! ভেবে পাচ্ছি না, এখন কী করব আমি। ধরো, যে-মেয়েটি কাঁদছে, সে যদি কোনো বিপদে পড়ে থাকে! আমার কি উচিত নয় তাকে বাঁচানো?

এ কথা মনে হতে, আমি আর লুকিয়ে থাকতে পারলুম না। কিন্তু এই অচেনা জায়গায় তাড়াহুড়ো করে কিছু করে ফেলা ঠিক না। তাই হুট করে আড়াল থেকে বেরিয়ে না-পড়ে এই থাম থেকে ছুটে ওই থামে, তারপর ওই থাম থেকে আর-এক থামে লুকিয়ে পড়লুম। লুকিয়ে-লুকিয়ে সেই কান্নার খোঁজ করতে লাগলুম। আমার যেন কেমন সব এলোমেলো হয়ে গেল। কেননা, যখন আমি ভাবছি কান্নাটা সামনে থেকে আসছে, আর সেই ভেবে যেই সামনে যাচ্ছি, অমনি যেন সেই কান্না পিছন দিক থেকে ভেসে আসছে। পিছনে গেলে সেই কান্না পাশে শুনি। পাশ থেকে আরও ভেতরে আরও অন্ধকারে।

এখন কোনদিকে যাই আমি

হঠাৎ দেখি, কোথাও কিচ্ছু নেই, কান্নার শব্দ ছাপিয়ে হাওয়ার শব্দ উঠল। হাওয়ার সঙ্গে ঝাঁক-ঝাঁক ধুলো উড়ে এসে আমার চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ছে! আমি তাড়াতাড়ি চোখ সামলে, মুখ নিচু করে বসে পড়লুম। ভাবলুম, একী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড!

অনেকক্ষণ পর যখন মনে হয়েছিল, হাওয়ায় দাপটটা কমেছে, হয়তো চোখের ভেতরে আর ধুলো-বালি পড়বে না, তখন খুব সাবধানে চোখ থেকে হাত সরালুম। উঠে দাঁড়ালুম। দাঁড়াতেই আমার পা থেকে মাথা অবধি আতঙ্কে শিউরে উঠল। আমি দেখি, এই দরদালানটা শেষ হয়েছে যেখানে, সেখানে একটা দরজা। দরজা দিয়ে সরু রুপোলি মতো এক টুকরো আলো ছিটকে এসে কার যেন মুখে ছড়িয়ে পড়েছে! আমি খুব ভালো করে দেখব বলে চোখ দুটো আলোর দিকে স্থির রাখলুম। রাখতেই আমার নজর পড়ল, একটি ছোট্ট মেয়ের দিকে। আমি আর এই থামের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারলুম না। আমি বেরিয়ে এলুম। দেখলুম, দরজাটার দুপাশে দুটো বড়ো-বড়ো জানালা। খোলা। একদিকের একটি জানালার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে আছে মেয়েটি! আমার চেয়ে একটু বড়ো। ভারি স্থির। একেবারে নিশ্চল। মুখখানি কী মিষ্টি! কেঁদে-কেঁদে ফুলে আছে। তার দু-চোখ বেয়ে কান্নার ফোঁটাগুলি ঝরতে-ঝরতে যেন গালের ওপর মুক্তোর মতো দোল খাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলুম। যতই তাকে দেখছি, ততই যেন আমার মনে হচ্ছে তার চোখ দুটি আমাকে তার কাছে ডাকছে! আমায় বুঝি দেখে ফেলেছে সে! নইলে অমন করে চেয়ে আছে কেন! আমি তার কাছে না গিয়ে পারলুম না। এদিক-ওদিক দেখে যখন নিশ্চিন্ত হলুম আমার আশে-পাশে কেউ নেই, তখন খুব সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেলুম মেয়েটির দিকে। মেয়েটির কাছে। আরও একটু কাছে। কিন্তু আশ্চর্য, এখন তো ও আমায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, তবুও ছোট্ট পা দুটি তার ছুটে-ছুটে লুকিয়ে তো পড়ল না। চোখ দুটি তার অবাক হয়ে চেয়ে তো দেখল না! ঠোঁট দুটি তার হেসে-হেসে কাঁপল না তো! আমি আরও এগিয়ে গেলুম। জানালার সামনে এসে দাঁড়ালুম, একেবারে তার মুখোমুখি। তবু সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মুখখানি তার গরাদে ঠেকিয়ে। আমি বুঝতে পারছি না, কী করব। তবু অজান্তেই যেন আমার ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠে জিজ্ঞেস করল, 'কে তুমি?'

সে উত্তর দিল না।

আমি একটু থামলুম। একটু দেখলুম। আবার জিজ্ঞেস করলুম, 'আমাকে তোমার ভয় করছে?' তবু সে যেমন ছিল তেমনি স্থির।

আমি বললুম, 'ভয় পেও না। আমাকে তোমার ভয় নেই। আমি যদি তোমাকে দিদি বলে ডাকি , তবে তুমি মনে করো আমি তোমার ভাই আবু। বলো, এখানে তুমি এমন করে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কাঁদছ কেন? কীসের দুঃখ তোমার?'

সে বলল না কিছুই।

তখন আমি হাত বাড়ালুম ওই জানালার মধ্যে। আমার হাত ওর হাতটি ছুঁয়ে থমকে গেল। এ কী! এ যে পাথর! আমি খানিক অবাক হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকালুম। দু হাত বাড়িয়ে তাকে স্পর্শ করলুম আরেকবার। অনেকবার। হ্যাঁ, ঠিক তাই। ঠিকই পাথর! কঠিন পাষাণ। তখন আমি সেই পাথরের চোখের পাতা দুটিতে আমার হাতটি ঠেকালুম। ঠিক তখুনি, হঠাৎ আচমকা আমার দু-কানের দু-পাশে বিচ্ছিরি আওয়াজ করে কে যেন শিস দিয়ে উঠল। কী তীক্ষ্ণ সে আওয়াজ! শিস-স-স! একটানা। কান আমার ঝালাপালা হয়ে গেল। বুঝিবা কানের পর্দা আমার ফেটে যায়! আমার দু-হাত দুই কানে চেপে ধরলুম আমি। কিন্তু কে কার কথা শুনছে! সেই শব্দ আমার কানের গর্তে ঢুকে তোলপাড় শুরু করে দিল! উঃ! অসহ্য সেই শব্দ। আমার মাথা ঘুরে পড়ছে! আমি বোধহয় এক্ষুনি মুখ থুবড়ে পড়ব আবার। আমাকে পালাতে হবে। আমি ছুটলুম। কিন্তু কোনদিকে ছুটব! কোনদিকে সেই ভাঙা গম্বুজের সিঁড়ি! আমি জানি না। অন্ধকারে আমার সব এলোমেলো হয়ে গেছে। আমি যেন গোলকধাঁধায় চরকি খাচ্ছি। কিন্তু এ কী! অন্ধকারে আমার মাথার ওপর ওটা কী ঝুলছে! যেন একটা কাঁটার জাল! ওই শিসের ভয়ংকর শব্দের তালে-তালে দুলতে-দুলতে যেন আমার মাথার ওপর নেমে আসছে। এ-জাল বুঝি আমায় জড়িয়ে ধরবে! বুঝি, কাঁটাগুলো আমার সারা গায়ে বিঁধে-বিঁধে রক্তে আমায় ভাসিয়ে দেবে! এবার বোধহয় সত্যি-সত্যি আমায় মরতে হবে! সুতরাং ভাবলুম, মরতেই যখন হবে, তখন শেষ চেষ্টা করতে বাধা কোথায়? এই অন্ধকারে কি লুকিয়ে পড়তে পারি না আমি? কিন্তু হায়! কিছুই দেখতে পাচ্ছি না সামনে, পেছনে। নিজেকে লুকিয়ে ফেলব যে কোথায়, ঠাওর করে উঠতে পারলুম না। অগত্যা আনিমানি ছুটছি আমি। ছুটছে মাথায় কাঁটার জাল। ঘুরছি আমি। পড়ছি আমি। আমি ঘেমে, নেয়ে হয়রান হয়ে গেলুম।

আমি আর কতক্ষণ পারব! এই দেখো, আমার দম আটকে আসছে। আমার গলা শুকিয়ে আসছে। চিৎকার করতে গিয়েও আমার গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। আমি বোধহয় এবার মরে যাচ্ছি! হঠাৎ যেন সেই তীব্র শব্দ থমকে গেল। কী এক অদ্ভুত রহস্যের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারদিক। আমার হাত-পা কেমন নিস্তেজ হয়ে গেল। আমি টলছি। টলতে-টলতে কীসে যেন ঠোক্কর খেলুম। পড়তে-পড়তেও কী একটা ধরে ফেললুম! ধরে হাঁপাতে লাগলুম! হাঁপাতে-হাঁপাতে ভাবছি, আমি কি এখনও বেঁচে আছি!

'ছেলেটা কি বেঁচে আছে?' এমন সময় কে যেন হঠাৎ কঠিন গলায় বলে উঠল।

সেই কথা শুনে আমার নিস্তেজ চোখের পাতা দুটি বুজেও বুজতে পারল না। এ কী! আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি! কার গলায় আমি হাত রেখেছি। ওরা কারা? দাঁড়িয়ে আছে! জীবন্ত মানুষ নাকি! না, না, এ যে পাথরের মূর্তি! নিশ্চল।

'ছেলেটা কী মরে গেল?' আবার সেই কঠিন গলা চিৎকার করে উঠল!

'না।' আমি যার গলা জড়িয়ে ছিলুম, সেই পাথরের মূর্তি চেঁচিয়ে উত্তর দিল। বলল, 'মরেনি, আমার গলা জড়িয়ে আছে।'

আমি অবিশ্য যার গলা জড়িয়ে ছিলুম, সে কথা বলতেই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। আমি তখনই বুঝতে পারলুম, এই অন্ধকারে ওই পাথরের মূর্তিরাই কথা বলছে! আমি অবাক চোখে তাদের দিকে তাকাতে-তাকাতে ভাবছি, একী সত্যি! পাথর কথা বলছে!

হ্যাঁ সত্যি! আমি আবার শুনতে পেলুম তাদের কথা। কে যেন বলল, 'মরু-দানবের খপ্পরে আমাদের মতো আর-একজন নতুন বন্দি ধরা পড়ল।'

আর একজন উত্তর দিল, 'দুঃখের কথা, বন্দিটি বয়সে নিতান্তই ছোটো। আহা রে, কোন মা-বাবার বুকের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এল শয়তান মরু-দানব, কে জানে! একটু পরেই আমাদের মতো পাথর হয়ে যাবে!'

সে-কথা শুনে আমার নিশ্বাস যেন আটকে এল। আমিও তবে পাথর হয়ে যাব! তবে কি মরু-দানবই আমায় কাঁটা জালে বাঁধতে চায়!

'ছেলেটির গলায় সোনার লকেটে-গাঁথা একটি হিরে কেমন অন্ধকারে জ্বলছে দেখো!'' একজন বলে উঠল।

আমি থতমত খেয়ে গেছি তার কথা শুনে। কেননা, হিরেটা তো আমি বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলুম। কখন বেরিয়ে পড়েছে সেটা! হয়তো ছোটাছুটি করতে গিয়ে অসাবধানে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে! আমি তাড়াতাড়ি সেটা আবার বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে গেছি, আর একজন মূর্তি বলে উঠল, 'হয়তো মা পরিয়ে দিয়েছে। কিংবা বাবা।'

'মা!' দীর্ঘশ্বাস ফেলল একজন পাথরের মূর্তি, তারপর ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে-কাঁদতে বলল, 'আমার মা, আমার বুড়ি-মা এখন কী করছে, তোমরা কেউ বলতে পারো? মা আমার হয়তো পাগলের মতো কেঁদে-কেঁদে পথে-পথে আমায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। জানতেও পারছে না, তার ছেলে মরু-দানবের মায়ায় পাথর হয়ে এখন এই ভাঙা-প্রাসাদের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কাঁদছে! জানো, তোমরা জানো, আমি ছাড়া মায়ের আর কেউ নেই! মরুর পথে পা বাড়াবার আগে মা আমার কপালে চুমু খেয়ে আমাকে বলেছিল, 'তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস বাবা। সাবধানে যাস!' মা আমার জানে না, তার ছেলে আর কোনো দিনই ফিরবে না। না না, আমি আমার মাকে আর কোনো দিনই দেখতে পাব না!' বলে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।

'আহা! কেঁদো না, কেঁদো না।' ওই কোণ থেকে আর একজন মূর্তি সান্ত্বনা দিল। বলল, 'কান্না আমারও পাচ্ছে, কিন্তু আমি কি কাঁদছি! জানো, আমি যখন পথে পা বাড়াচ্ছি তখন আমার ছোটো ছেলেটা ছুটে এসে আমায় জড়িয়ে ধরল। আমি তাকে কোলে তুলে আদর করলুম। জিজ্ঞেস করলুম, 'কী হয়েছে বাবা? আমি শহর থেকে তোমার জন্যে ভালো দেখে একটা কাঠের ঘোড়া কিনে আনব। যাও, মায়ের কাছে যাও।' বলে যখন তাকে মায়ের কোলে তুলে দিতে গেছি, সে তখন আমার বুকের ওপর মাথা রাখল। যেন সে আমায় যেতে দেবে না। সে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। একটা অজানা ভয়ে আমার বুকটা কেঁপে উঠল। আমি তার মুখখানি আমার মুখের কাছে টেনে আনলুম। তার চোখদুটি মুছিয়ে দিতে গিয়ে, আমারও চোখ ছলছলিয়ে উঠেছিল। তারপর তাকে আমি ফেলেই চলে এসেছি। তার মুখখানি আমার চোখে এখনও স্পষ্ট ভাসছে। আহা! সে এখন কী করছে? এখনও কি কাঁদছে?'

অমনি চারদিক থেকে চিৎকার ভেসে উঠল। পাথরের কঠিন স্বর তাদের গলা দিয়ে ছিটকে পড়ছে। তারা আর্তনাদ করছে :

আমার মা কাঁদছে!

আমার বাবা কাঁদছে!

আমার ছেলে কোথায়!

আমার মেয়ে কোথায়!

আমার বোনকে এনে দাও!

আমার ভাইকে ডেকে দাও!

আমাদের বাঁচাও!

আমাদের বাঁচাও!

আমাদের বাঁচাও!

হঠাৎ একটি বৃদ্ধ পাথর গম্ভীর গলায় হাঁক দিল, 'থামো, থামো!'

অমনি নিমেষের মধ্যে সবাই চুপ করে গেল!

বৃদ্ধ বলল, 'অমন করে চেঁচালেই কি আমরা বাঁচব। আমরা তো পাথর। আমরা তো মরেই গেছি! শুধু আমাদের মনটা মরেনি বলেই আমাদের সব মনে পড়ে যাচ্ছে! কিন্তু যা শেষ হয়ে গেছে, তাকে মনে এনে দুঃখ করে লাভ কী?'

হঠাৎ একটি মূর্তি বলে উঠল, 'তাহলে আমাদের বাঁচার আর পথ নেই?'

'না।'

'আমরা আর কাউকে দেখতে পাব না?'

'না, না, না। আমরা ভগ্ন-প্রাসাদের বালির নীচে বন্দি। এই বালির নীচে থাকতে-থাকতে আমরা আরও নীচে নেমে যাব। নামতে-নামতে চাপা পড়ব আরও বালির নীচে। তারপর গুঁড়িয়ে-গুঁড়িয়ে মরুর বালির সঙ্গে মিশে আমরাও মরুভূমি হয়ে যাব!'

একজন আর্তনাদ করে উঠল, 'না।'

সঙ্গে-সঙ্গে আর-সকলেও ভীষণ ভয়ে চিৎকার করে উঠল, 'না, না, না।'

সবাই চুপ করে গেল হঠাৎ! হঠাৎ কানে এল আবার সেই কান্না, সেই মেয়েটির কান্না! হয়তো এখান থেকে একটু দূরে সে দাঁড়িয়ে আছে। তাই ভারি অস্পষ্ট হয়ে ভেসে আসছে সেই কান্নার শব্দ!

'শোনো, শোনো, সেই মেয়েটি আবার কাঁদছে।' একটি পাথরের মূর্তি ব্যস্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

সবাই চুপ করে থাকল খানিকক্ষণ। শুধু তার কান্নার শব্দটাই শুনছি। শুনছি যেন খাঁচার ভেতর বন্দি একটি ভয়-পাওয়া পাখি থমকে-থমকে কেঁদে উঠছে।

'আহা! কদিন ধরে শুধুই কাঁদছে মেয়েটা!' একজন বলল।

আর একজন উত্তর দিল, 'ও বোধহয় জানে না, চোখের কান্না ছড়িয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা যায় না। মৃত্যুকে রুখতে হলে বীরের মতো বুকের রক্ত ঝরাতে হবে। কিন্তু কোথা সে বীর!'

'তুমি ওকে বাঁচাতে পারো না? ওই মেয়েটিকে?' হঠাৎ বৃদ্ধ বলল।

আমি চমকে গেছি! কাকে বলছে বৃদ্ধ?

'তুমি, তুমি! তোমাকে বলছি। তুমি তো এখনও পাথর হয়ে যাওনি। তুমি ওর জন্যে একটু আলো আনতে পারো না?'

হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। বৃদ্ধ-পাথর আমাকেই বলছে। কিন্তু আমি তাকে উত্তর দেবার আগেই, 'আলো, আলো' বলে সবাই আর্তনাদ করে উঠল। আকুল হয়ে তারা চেঁচাতে লাগল, 'আমাদের জন্যে একটু আলো এনে দাও। একটু আলো।'

বৃদ্ধ আবার বলল, 'চুপ করে দাঁড়িয়ে আছ কেন? সময় বয়ে যাচ্ছে। খানিক পরে এই অন্ধকারটা তোমায় যখন জাপটে ধরবে, তখন আমাদের মতো তোমাকেও এখানে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। যদি পারো, তাড়াতাড়ি করো। পারবে না আমাদের জন্যে একটু আলো আনতে? এই অন্ধকারটা ভেঙে টুকরো করে দিতে পারো না তুমি?'

হঠাৎ আমার বুকের ভেতর থেকে আমার সাহস যেন চিৎকার করে উঠল, 'হ্যাঁ আমি পারি। হ্যাঁ, আমি পারব। আমি তোমাদের বাঁচাব। না পারি, তোমাদের মতো আমিও পাথর হয়ে, তোমাদের সঙ্গে এখানেই থাকব।'

হঠাৎ যেন সেই মেয়েটি ডাক দিল 'আবু-উ-উ!' বাঁশির সুরের মতো তার গলার স্বর কান্নায় দোল খেতে-খেতে আমার কানে বেজে উঠল। আমি চমকে উঠেছি। তখনও ভাবছি আমি, সে কি ডাকল? 'আবু-উ-উ!'

হ্যাঁ, সত্যিই ডেকেছে। আমার চমক ভাঙল। আমিও সাড়া দিলুম, 'আমি আবু এখানে'।

বৃদ্ধ-পাথর বলল, 'তোমায় ডাকছে মেয়েটি। সময় নষ্ট কোরো না। জীবন শেষ হয়ে যাবার আগে, সেটাকে কাজে লাগাও। নইলে বেঁচে থাকার মানে কী!'

হ্যাঁ, ঠিক বলেছে বৃদ্ধ। আমি আবার অন্ধকারে পা বাড়ালুম। আমি তার কান্নার ডাক শুনে তাকে আবার খুঁজে পেলুম। সে কাঁদছে। কাঁদতে-কাঁদতে আমায় দেখছে। আমিও তাকে দেখছি। শান্ত মুখখানি তার এখনও জানালার গরাদ ছুঁয়ে স্থির হয়ে আছে। ডাগর-ডাগর চোখ দুটি তার ভ্রমরের মতো উড়তে-উড়তে যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এত ভালো লাগছে! আমি তার কাছে এগিয়ে গেলুম। বললুম, 'এই তো আমি এসেছি। আমি, তোমার ভাই আবু। বলো, ডাকছ কেন? বলো, কেমন করে তোমার দুঃখ আমি ঘোচাব!'

আমার কথা শুনে, এবার সে কথা বলল। অস্থির হয়ে সে বলল, 'আবু, তুমি তো ছোট্ট। আমার দুঃখ তুমি কেমন করে ঘোচাবে। আমার একটি কথা শোনো তুমি। এখান থেকে এক্ষুনি চলে যাও। নইলে তুমিও পাথর হয়ে যাবে।'

আমি বললুম, 'আমি পাথর হই সে-ও ভালো। কিন্তু আমি জানতে চাই, কে তোমায় পাথর করল।'

সে বলল, 'সে-কথা তোমার শুনে কী লাভ! তুমি চলে যাও আবু।'

'আমি যাব। তুমি শুধু বলো, কে তোমায় এখানে নিয়ে এল! তাকে আমি দেখে যাব।'

'না, না, সে আমি বলতে পারব না।' বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।

'আমি আবু। মরুর বুকে আমার জন্ম। তোমার কান্না আমারও কান্না। তুমি যদি না বলো, তবে জেনে রাখো, আবু এখানেই থাকবে, এই অন্ধকারে পাথর হয়ে। তবু তো কেউ বলতে পারবে না, দিদিকে এই বালির গহ্বরে একা ফেলে ভীতুর মতো পালিয়েছে আবু। ভয় পেয়ে বাঁচতে আমি চাই না। যে তোমায় পাথর করল তাকে আমি দেখতে চাই। বলো, বলো আমাকে, একটিবার বলো কে তোমায় পাথর করল!' বলতে-বলতে আমি তার হাতে হাত রাখলুম।

সে দ্বিগুণ জোরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে-কাঁদতে বলল, 'কোন দেশের, কোন বিভুঁইয়ের আবু তুমি, আমি জানি না। কোথায় তোমার মা থাকেন, কোথায় তোমার বাবা আছেন, আমি তাও জানি না। তবু একবার যদি তোমার মাকে মা বলে ডাকতে পাই! যদি বলতে পারি, মাগো, তোমার বুকের ধন আবু আমার বীর ভাই। সে যে আমার আপন।' বলতে-বলতে তার কান্না থেমে এল। তার পাথরের ঠোঁট দুটি যেন কাঁপছে।

ধীরে-ধীরে সে বলতে শুরু করল তার নিজের কথা। সে বলল, 'আমার মা নেই। আমি জানি না কখন মা আমায় ছেড়ে চলে গেছে। হয়তো তখন আমি খুব ছোটো। আমার বাবাও আমাকে সে-কথা কোনো দিনই বলেনি। আমাদের বাড়িটা দেখলে তুমি অবাক হয়ে যাবে। খুব মস্ত। আর অনেক পুরোনো। আমাদের অনেকগুলো ঘোড়া আছে। কটা উট আছে। কিছু না-চাইলেও বাবা আমায় কত কিছু দিয়েছে। কী সুন্দর একখানা ঘর আমার! কী সুন্দর সাজানো! কত পুতুল! কত রঙিন ছবি! কত পোশাক। বাবা সারাদিন ঘরে থাকে না। কী যে করে বাবা তাও আমার জানার কথা নয়। কারণ আমি তো ছোটো। আমি একা-একা থাকি। ঘরের ছায়ায় বসে-বসে খেলা করি। নয়তো, গান গাই। আর যখন কিছুই ভালো লাগে না, জানালার ফাঁকে চোখ রেখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকি। বাবা হঠাৎ আসে। হঠাৎ এসে আমাকে আদর করে। আমাকে গল্প শোনায়। তারপর সময় হলে আবার চলে যায়!

'এমনি করে দিন যায়। হঠাৎ একদিন বাবার আসতে দেরি হল। বাবার দেরি দেখে, ভারি ছটফট করছিল আমার মন। কখনো বার, কখনো দোর করছি আমি। কিন্তু অনেকক্ষণ পরেও যখন বাবা এল না, বাবার পথের দিকে চেয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে রইলুম। দাঁড়িয়ে, দূরের দিকে চেয়ে রইলুম। কিন্তু অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও যখন বাবাকে আসতে দেখলুম না, তখন আমি বাইরে বেরিয়ে পড়লুম। হাঁটা দিলুম এই বালির ওপর। কেউ আমায় দেখতে পেল না। আমিও জানি না, হাঁটতে-হাঁটতে কোথায় চলেছি আমি। জানি না, কোন পথে গেলে বাবাকে খুঁজে পাব।

'হঠাৎ আমার চোখে জল এসে গেল। আমি কেঁদে ফেললুম। চিৎকার করে ডেকে উঠলুম, 'বাবা-আ-আ'। কিন্তু কে শুনবে আমার ডাক!

'এমন সময় আচমকা আমার মনে হল, এই শূন্য মরুভূমির কোথাও যেন কারা নূপুর পরে নাচছে। রুনু-রুনু ঝিনি-ঝিনি নানান সুরে নূপুর বেজে যায়, আমি শুনতে-শুনতে খুঁজি তাই। তারপর আমি যেন কেমন আনমনা হয়ে গেলুম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই নূপুর শুনতে-শুনতে আমি কোথায় চললুম, নিজেও জানি না। কিন্তু আশ্চর্য, যতই খুঁজে পাচ্ছি না, ততই যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে সেই নূপুরের রিনি-ঝিনি! বেজে যায়, শুধু বেজে যায়। আমার মনও তত ভরে যায়।

'একসময় হঠাৎ আমার মনে হল, বালির পাহাড়ের ওপরে যেন সেই সুর ঘুরে-ঘুরে নেচে বেড়াচ্ছে। আমি অন্ধের মতো পাহাড়ের ওপরে উঠে পড়লুম। এদিক-ওদিক দেখতে-দেখতে হঠাৎ আমার নজর পড়ল, একটা ভাঙা-গম্বুজের দিকে। মনে হল, এই গম্বুজের নীচেই যেন কারা নেচে-নেচে গান গাইছে। আমি আনমনে গম্বুজের সিঁড়ি বেয়ে এই অন্ধকারেই নেমে এলুম। কিন্তু কাউকেই খুঁজে পেলুম না। কেউ-ই তো দেখা দিল না।

'কিন্তু তারপর হঠাৎ নূপুরের শব্দ থেমে গেল। হঠাৎ গানের সুর হারিয়ে গেল। আমার মনে হল, আমার চারপাশে কে যেন ঘনঘন নিশ্বাস ফেলছে। আমি ভয় পেয়ে। চিৎকার করে উঠলুম, 'কে-এ-এ!'

'সঙ্গে-সঙ্গে দেখি আমার সামনে ভাঁটার মতো দুটো জ্বলন্ত চোখ নিবছে, জ্বলছে! জ্বলতে-জ্বলতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে! আমি ছুটে পালাতে গেলুম। পারলুম না। চারিদিকে অন্ধকার। ভীষণ জোরে হোঁচট খেয়েছি। টাল সামলাতে না-পেরে ছিটকে পড়লুম। সেই জ্বলন্ত চোখ দুটো ভয়ংকর দৃষ্টিতে আমায় তেড়ে এল। কী জানি তখন কী যে মনে হল আমার, কিছু না-পেয়ে সেই জ্বলন্ত চোখ দুটোকেই খামচে ধরেছি। সে আর্তনাদ করে উঠল। আমার হাত দুটোকে প্রচণ্ড শক্তিতে দুমড়ে দিল! উঃ! কী ভীষণ যন্ত্রণা! আমার এই হাত দিয়েই তাকে আমি একটা বেদম জোরে ঘুঁষি মারলুম। দেখলুম, সে আরও হিংস্র হয়ে উঠেছে। আমাকে খামচে ধরল। আমাকে টেনে তুলল। তারপর আমার চুলের ঝুঁটি ধরে এমন হ্যাঁচকা মারল যে মনে হল, আমার শরীরটা উড়ন্ত চাকির মতো উড়তে-উড়তে গোঁত খাচ্ছে! আমি হুমড়ি খেয়ে একটা ঘরের মধ্যে যেন ছিটকে এলুম। হ্যাঁ, সত্যিই তাই! কেননা, তারপরেই দেখতে পেলুম, এই ঘরের দরজাটা দড়াম করে কে যেন বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল! আমি চকিতে লাফিয়ে উঠে দরজায় ধাক্কা মেরে চেঁচালুম, 'দরজা খোলো, দরজা খোলো!' কিন্তু কেউ খুলল না, সাড়াও দিল না। আমি কেঁদে ফেললুম।

'আমি জানি না, কতদিন এই বন্ধ ঘরে বন্দি হয়ে আছি। জানি না, ঘরের এই খোলা জানালার গরাদ ধরে কাঁদতে-কাঁদতে কতদিন বয়ে গেছে। আমি জানি না, কেমন করে আমার পা দুটি নিশ্চল হয়ে গেল। আমার হাতের আঙুলগুলি ভয়ে কাঁপতে-কাঁপতে কবে যে কঠিন হয়ে গেল আমি টের পেলুম না। বুঝতে পারলুম না, কেমন করে দৃষ্টি আমার স্থির হয়ে গেছে! আমার বুকের ভেতরটা শক্ত কঠিন হয়ে থেমে আসছে। আমি যেন পাথর হয়ে যাচ্ছি! একটি কঠিন পাথরের মূর্তি!

'হ্যাঁ, সত্যিই আমি পাথর হয়ে গেলুম!

'তারপর হঠাৎ একদিন ওই দরজা খুলে গেল। আমি ছুটে দরজার কাছে যেতে পারলুম না। কেননা, আমার পা দুটি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু অবাক কাণ্ড! আমি চিৎকার করতে পারলুম। আমার পাথরের গলার স্বর চিৎকার করে বলে উঠল, 'কে-এ-এ।'

'বুঝতে পারলুম, আমি দেখতে পাচ্ছি। চোখে দেখে মনের ভেতর কাঁদতে পারছি। কথা কইতে পারছি। ভাবতে পারছি আমি পাথর। নিশ্চল।'

সে থামল। এবার আমি মেয়েটির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠলুম, 'আমার নাম আবু। যে তোমায় পাথর করেছে, তাকে আমি শেষ করে তবে ছাড়ব। কে, কে সে শয়তান, যে তোমায় এমন করল?' বলে আমি চিৎকার করে উঠলুম। আমার চিৎকার ঘুরপাক খেতে-খেতে সেই অন্ধকারে মিশে গেল। অমনি সঙ্গে-সঙ্গে শুনতে পেলুম আমার চিৎকারের চারগুণ জোরে কে যেন হেসে উঠল। আমিও তৈরি। বুক ফুলিয়ে, কোমরে হাত রেখে আমি হুকুম করলুম, 'যদি তোর সাহস থাকে বেরিয়ে আয়! ভীতুর মতো লুকিয়ে-লুকিয়ে যে হাসে, তাকে আমি বলি কাপুরুষ! মুরদ থাকে দেখা দে! বল, কে তুই?'

অমনি হাসি থেমে গেল। এবার যেন বাজ পড়ল তার গলায়। প্রচণ্ড জোরে হেঁকে উঠল, 'এই দেখ, এই আমি!'

বলতেই আমি চোখের পলকে ফিরে তাকিয়েছি। দেখি, আমার সামনে অন্ধকারে কী যেন একটা দোল খাচ্ছে। দেখি তালগোল পাকানো উদ্ভট চেহারার একটা জীব!

সেটা না ছোটো, না বড়ো,

না বেঁটে, না ঢ্যাঙা,

না সাদা, না কালো।

দাঁতগুলো ভ্যাংচানো,

হাত দুটো চ্যাপটানো।

চোখ দুটো জ্বল-জ্বল,

নোলায় জল টলটল!

আমি তার সামনে এগিয়ে যেতেই সে গর্জন করে বলে উঠল, 'আমি যদি ছোটো হতুম, পিটিয়ে তোকে লম্বা করতুম। আমি যদি বেঁটে হতুম, ঠেঙিয়ে তোকে ঢ্যাঙা করতুম। আমি যদি সাদা হতুম, কিলিয়ে তোকে কালো করতুম। কিন্তু তা আর আমায় করতে হবে না। এক্ষুনি তোর ঠ্যাঙদুটো বালির তলায় সেঁদিয়ে যাবে। তারপরে তুই পাথর হয়ে অন্ধকারে গুমরে-গুমরে মরবি।'

আমি তার সামনে এগিয়ে যেতেই সে গর্জন করে বলে উঠল,....

'তবে রে, এত বড়ো কথা!' এই বলে চিৎকার করে আমি তালগোল-পাকানো দানবটাকে ধরতে গেলুম। অমনি সে আমার গায়ে এমন জোরে ফুঁ দিয়ে দিল যে, আমি সাত হাত দূরে ছিটকে গেলুম! আমি তাড়াতাড়ি উঠে যেই আবার তেড়ে গেছি, সে এমন ঠ্যাঙ ছুড়লে যে, আমি সাত দুগুণে চোদ্দো হাত দূরে পটকে গেলুম। তখনই আমার মনে হল, একে তো সামনে থেকে ঘায়েল করা যাবে না। তাই, একফাঁকে পেছনে গিয়েই তার পিঠের ওপর মেরেছি লাফ! কিন্তু আশ্চর্য, তাকে আমি ধরতে পারলুম না। কেমন যেন পিছলে তার পিঠ ফসকে মাটিতে জিগবাজি খেলুম। আমি জিগবাজি খেতেই ফ্যা-ফ্যা করে কে হেসে উঠল। তাই শুনে জ্বলে গেল আমার সারা শরীর। এতক্ষণ খেয়াল ছিল না, আমার গলায় হিরের মালা! মনে ছিল না, লড়াই করতে গেলে এ-মালা হারিয়ে যাবে। তাই আমি চটপট আমার গলার মালা খুলে ফেলে, ওই মেয়ের গলায় পরিয়ে দিয়ে বলে উঠলুম, 'এই মালা তোমার কাছে রইল। যদি মরি তো মনে রেখো, তোমার ভাই তোমার গলায় পরিয়ে দিয়েছে।' বলে আমি আবার ঘুরে দাঁড়ালুম। কিন্তু আচমকা সে খপাত করে আমার একটা হাত ধরে ফেলল। হাত ধরে আমায় শূন্যে বাঁই-বাঁই করে ঘোরাতে লাগল। আমি হকচকিয়ে গেছি। চরকির মতো পাক খেতে-খেতে আমি হাত-পা ছুড়তে লাগলুম। ঘুরতে-ঘুরতে আমার মনে হল, এইবার হয়তো মুণ্ডুটা আমার উপড়ে পড়বে। হাতটা আমার ছিঁড়ে যাবে। নয়তো পা-দুটো লটকে গিয়ে ছিটকে পড়বে!

উঃ! খুব বেঁচে গেছি! মরতে-মরতে সুযোগ এসে গেল। হঠাৎ আমি দু-পা জড়িয়ে সাঁড়াশির মতো তার গলাটা জাপটে ধরলুম! কেমন করে যে পারলুম, তা এখন কিছুতেই বলতে পারি না। গলায় চাপ পড়তেই সে কেঁদে ককিয়ে উঠল। ঝটপটিয়ে আমার হাতটা ছেড়ে দিল। আমি তার গলা জড়িয়ে ঝুলে পড়লুম। আমার পায়ের চাপে তার চোখ দুটো ঠিকরে বেরোচ্ছে। সে আমায় খামচে দিল। আমিও তেড়েমেড়ে গলাটা আরও জোরে পেঁচিয়ে ধরলুম। তখন সে এমন জোরে হাঁসফাঁস করতে লাগল, আমি ভাবলুম, এবার সে মরবে। কিন্তু মরল না। হঠাৎ মনে হল, তার মুখের ভেতর থেকে যেন একটা আগুনের গোলা বেরিয়ে আসছে। আমার গায়ের ওপর পড়ার আগেই আমি তার গলা ছেড়ে মেরেছি এক ডিগবাজি! তারপর দে ছুট! কিন্তু আজব ব্যাপার! দেখি, তার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়া আগুনের গোলাটা আমার পেছনেই ছুটে আসছে! যেন আমায় পুড়িয়ে সে শেষ করবে। আমি কী করি, কোনদিকে ছুটব? এবার আমার নির্ঘাত মরণ! কেননা, বালি-চাপা এই প্রাসাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে যাবার পথ আমার এখন আর জানা নেই। আগুনের তাড়া খেয়ে আমায় ছুটতে দেখে ঠিক সেই সময়ে সেই দানবটাও এমন বিচ্ছিরি সুরে হেসে উঠল যে, আমার ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল! হাসতে-হাসতে সেও তেড়ে এল! রক্ষে এই যে, আগুনের গোলায় এই অন্ধকারটা আলোয় ভরে গেছে। সুতরাং আমি এদিক-ওদিক দেখে ছুটতে পারছি। কিন্তু জানি বাঁচার জন্যে আমার এ-ছোটা মিথ্যে! আগুনের গোলা এমন জোরে তেড়ে আসছে যে, আমায় মরতেই হবে। তবু যদি কোথাও লুকিয়ে পড়তে পারতুম ! এদিকে দেওয়াল, ওদিকে ঘর। চারপাশে লম্বা-লম্বা থাম। কিন্তু আগুনকে আমি ফাঁকি দেব কেমন করে! আগুনের সঙ্গে আমি কতক্ষণ পারব! সামনেই একটা ঘর। এই তালে যদি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে দরজাটা বন্ধ করে দিতে পারি।

হয়তো বন্ধ করতে পারতুম। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই এমন একটা বিশ্রী গন্ধ আমার নাকে এল! যেন একটা বিষাক্ত গ্যাস! আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। কী অসহ্য জ্বালা করে উঠল আমার চোখ দুটো। জ্বলে উঠল সারা শরীর। হয়তো আর একটু হলেই জ্ঞান হারাতুম। কোনোরকমে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছি। আর ঠিক সেই সময় আগুনের গোলাটা ঢুকে পড়েছে ঘরের মধ্যে। পেছনে-পেছনে সেই দানবটা। সে চিৎকার করে হাসছে! সে জানে, আমার শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে!

কিন্তু বলব কী, সেই আগুনের গোলাটা যেই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, অমনি সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের মধ্যে দাউ-দাউ করে আগুন লেগে গেল। তারপর, 'দুম-ম-ম।' প্রচণ্ড আওয়াজ। আমার মনে হল আমি আর নেই। সেই শব্দের সঙ্গে আমিও বোধহয় শেষ হয়ে গেছি! আমি ছিটকে গেলুম। এক ঝলক জমাট ধোঁয়া আমায় ঢেকে ফেলল! রক্ষে, আমি ঘরের মধ্যে ছিলুম না। তা হলে এতক্ষণে আমি ছাই হয়ে যেতুম! কিন্তু আবার সেই বুক-কাঁপানো শব্দ দুম-ম-ম! দুম-ম-ম!

হঠাৎ দেখি সেই বালি-চাপা প্রাসাদের চারপাশের পাঁচিল জ্বলতে জ্বলতে ভেঙে পড়ছে। আমি উঠে পড়লুম। প্রাসাদের ছাদের পাথরগুলো আগুনে ফেটে-ফেটে আকাশে ছিটকে যাচ্ছে। নিজেকে বাঁচাবার জন্যে আমি দূরে ছুটলুম! দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি সেই আগুনের শিখা সামনে যা পায়, তাই গিলে খাবার জন্যে লক-লক করছে।

তারপর আবার দুম-ম-ম! ঈশ! দেখো দেখো, প্রাসাদের ছাতটা চৌচির হয়ে উড়ে যাচ্ছে! দেখো, ছাতের চাঁই-চাঁই পাথরের সঙ্গে লটকাতে-লটকাতে সেই দানবটাও যে উড়ে যায়। শুনতে পাচ্ছ তার মরণ-কান্না! হ্যাঁ, শূন্যে ঝুলতে-ঝুলতে নিজের আগুনে সে নিজেই দাউদাউ করে জ্বলছে। কী ভয়ংকর তার চেহারা! কী বীভৎস সেই দৃশ্য!

আবার দুম-ম-ম! প্রাসাদটা ভেঙে খান-খান হয়ে গেল। আমি দেখতে পেলুম, আকাশ ভেঙে মুঠো-মুঠো আলো নেমে এসেছে প্রাসাদের ভেতরে। আমি ছুটলুম। এমন সময় শুনতে পেলুম কে যেন ডাকল আমায়, 'আবু-উ-উ!'

কে ডাকে?

'আবু-উ-উ!'

এ যেন সেই মেয়েটির গলা! সেই পাথর!

আমি সাড়া দিলুম, 'আমি এখানে।'

সে আমার কাছে ছুটে এল। এ কী ! সে কেমন করে ছুটে এল! সে তো পাথর! আমি অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলুম। জিজ্ঞেস করলুম, 'তুমি!'

সে উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে। তার মুখে হাসি। সে বলল, 'হ্যাঁ, আমি। অন্ধকারে দানব আমায় পাথর করে রেখেছিল। কিন্তু জানো আবু, আকাশের আলো আমার গায়ে পড়তেই, সে পাথর গলে গেল। আবু, এখন আমি তোমার মতো!' বলে সে আমার হাত দুটি জড়িয়ে ধরল।

আর অমনি সঙ্গে-সঙ্গে আরও অসংখ্য মানুষের চিৎকার শুনতে পেলুম। সেই অসংখ্য মানুষেরাও আনন্দে চিৎকার করছে। আকাশের আলোয় তাদেরও পাথর গলে গেছে। তারা জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

উত্তেজনায় থর-থর করে কাঁপতে-কাঁপতে সেই মেয়েটি তার গলায় পরিয়ে দেওয়া আমার হারটি হাতে ধরে বলল, 'আবু, এ-হার তুমি কোথায় পেলে?'

আমি বললুম, 'এ-হার যে আমায় দিয়েছে, সেই তো আমায় মরণের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। এখন তাকে আমায় বাঁচাতে হবে।'

শোনা গেল সেই জীবন্ত মানুষেরা আবুর নাম ধরে উল্লাস করছে। তারা খুঁজছে আবুকে। সেই মেয়েটি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আবু, আবু, যে তোমায় ওই হার দিয়েছে, তাকে কেমন দেখতে?'

আমি বললুম, 'তাকে তো আমি দেখিনি। কালো কাপড়ের আড়ালে নিজেকে সে লুকিয়ে রেখেছিল।'

সেই জীবন্ত মানুষেরা এগিয়ে আসছে।

মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করল, 'সে কি বলল তার মেয়ে হারিয়ে গেছে?'

'কেন এ-কথা বলছ?' আমি জিজ্ঞেস করলুম! সেই মানুষদের কণ্ঠস্বর এখন কাছে এগিয়ে এসেছে।

সেই মেয়েটি আবার বলল, 'জিজ্ঞেস করছি, কারণ, আবু, এ-হার আমার। আমার বাবার কাছে ছিল। আমার মনে হয় আবু, এ-হার তোমায় যে দিয়েছে, সে আমার বাবা।'

আমি কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম। তারপর জিজ্ঞেস করলুম, 'সত্যি?'

মেয়েটি বলল, 'সত্যি! সত্যি! সত্যি!'

'তবে এসো।' আমি তার হাত ধরে ডাক দিলুম।

ততক্ষণে সেই জীবন্ত মানুষেরা আনন্দে চিৎকার করতে করতে সেখানে পৌঁছে গেল। তারা আমাকে বুকে তুলে নিল। বুকে তুলে আত্মহারা হয়ে নাচতে লাগল।

তারপর তাদের বুক থেকে নামলুম আমি। বললুম, 'শোনো বন্ধুগণ, মরু-দানবের জাদু-প্রাসাদ ভেঙেছে। মরু-দানব নিজের আগুনে নিজেই পুড়েছে। আমরা সবাই মুক্তি পেয়েছি। এবার আমাদের আর একজনকে মুক্ত করতে হবে। তোমরা কি সে-কাজে আমার সঙ্গী হবে?'

সবাই চেঁচিয়ে উঠে হাত তুলল, 'যে আমাদের মুক্ত করেছে, তার জন্যে আমরা প্রাণ দেব।'

ওদেরই মধ্যে কেউ একজন চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, 'সে একজন কে? কোথায় তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে?'

আমি বললুম, 'জানি না সে কে!'

তখন সেই মেয়েটি বলে উঠল, 'এ-মালা যদি আবু তার কাছ থেকে পেয়ে থাকে, তবে এ-মালা আমার। আর এ-মালা যদি আমার হয়, তবে সে আমার বাবা!'

তখন আবার সবাই চেঁচিয়ে বলে উঠল, 'আমরা তাকে মুক্ত করব, আমরা তাকে মুক্ত করব!'

আমি বললুম, 'তবে এসো আমার সঙ্গে।'

অমনি সবাই সেই ভাঙা প্রাসাদের জঞ্জাল ডিঙিয়ে মরুর বালির ওপর উঠে এল। এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, চারদিকে বিরাট উঁচু-উঁচু বালির স্তূপ। সেই স্তূপের চড়াই-উতরাই ভাঙতে-ভাঙতে আমরা চলেছি সেইখানে, সেই দস্যুদের আস্তানায়। আমার হাতটি ধরে আছে সেই মেয়েটি। আমরা এখন নতুন প্রাণ পেয়েছি, তাই মরুর অসহ্য উত্তাপ আমাদের বাধা দিতে পারল না। আমরা বাধা মানবও না।

আমরা অনেকখানি পথ ফেলে চলে এসেছি। এখান থেকে অনেকটা দূরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বালির পাহাড়ের আড়ালে একটা বাড়ি উঁকি মারছে। আমি বুঝতে পারছি না, কাল আমি যেখানে বন্দি হয়েছিলুম, এই বাড়িটাই সেই বাড়ি কি না! বোঝা তো সম্ভব নয়। কাল ছিল অন্ধকার রাত, আর আজ এখন স্পষ্ট দিন!

ওরা চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আবু, আমরা কি ওইখানে যাব?'

আমি বললুম, 'আগে যা দেখা যায়, সেইখানেই আগে চলি।'

কিন্তু আমরা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারিনি, ওই দূর কোঠার অলিন্দ থেকে ওই বাড়ির বাসিন্দারা আমাদের দিকে সতর্ক নজর রেখেছে। আমরা জানবই বা কী করে! কেননা এখান থেকে অত দূরে সেই নজরদারের দিকে আমাদের নজর যেতেই পারে না। কে জানে কোথায় চলেছি আমরা!

যতই কাছে এগোচ্ছি, মনে হচ্ছে ওই বাড়িটা যেন একটা সাদামাটা বাড়ি নয়। মনে হচ্ছে ঠিক একটা ভাঙা কেল্লা! বালির পাহাড়ের অনেকটা ওপর থেকে বেশ খানিকটা নীচে নেমে গেছে তার শক্ত পাঁচিল। চট করে নজর পড়বে না। পড়লেও মনে হবে, এখানে কি আর মানুষ বাস করতে পারে! কিন্তু ভাবছি, এখানে এই কেল্লা এল কোথা থেকে? এখানে কি তবে আগে মরু ছিল না! সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে তবে কি মরুর বালি এই কেল্লাটাকেও গিলে খেয়েছে! হবেও বা।

আমরা ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালুম। মেয়েটি বলল, 'আবু, এখানে তো আমার বাবা থাকে না। এ তো আমার চেনা নয়!'

আমিও বুঝতে পারলুম না, এই ফটক, সেই ফটক কি না। বুঝতে পারলুম না, এরই আড়ালে কাল আমি লুকিয়েছিলুম কি না! যাই হোক, আমরা ফটকের ভেতর ঢুকে গেলুম। আমরা সবাই চিৎকার করে উঠলুম। কেল্লার চত্বরটা গমগম করে উঠল। কিন্তু কারো সাড়া পেলুম না। তবু চিৎকার থামল না। তবু আমরা আরও ভেতরে ঢুকে যাচ্ছি। বুঝতে পারছি না, আরও ভেতরে গেলে সেই মানুষটাকে আমরা উদ্ধার করতে পারব কি না! সেই মানুষটার কথাই আমার বারবার মনে পড়ছে। সে আমাকে বাঁচিয়েছিল। কথা ছিল তাকে আমি বাঁচাব। আমরা ছড়িয়ে পড়লুম চারদিকে। আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। এই খালি হাতেই আমরা কেল্লা দখলের লড়াইয়ে নেমেছি। জানি না বরাতে কী আছে।

আমরা এখনও কাউকে দেখতে পাইনি। আমরা এখনও বুঝতে পারিনি, যতই ভেতরে চলেছি বিপদ ততই গুটিগুটি আমাদের পেছনে হেঁটে আসছে! আমরা একটুও ধারণা করতে পারিনি, আমাদের ঘিরে ফেলে একদল দস্যু তরোয়াল উঁচিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে! আমরা অজানতে তাদের হাতে ধরা দিতে চলেছি! আমি বলব না এটা আমাদের বোকামি। কেননা, অজানা এই কেল্লার গোপনে লুকিয়ে থাকার জায়গাগুলো তো আমাদের নজরে পড়ার কথা নয়! সুতরাং আমরা এগিয়ে চলেছি।

হঠাৎ থমকে গেলুম আমরা। চমকে চেয়ে দেখি, কোন গোপন-পথ দিয়ে বেরিয়ে এসে দস্যুদল একেবারে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। আমাদের ঘিরে ফেলেছে। খাপ থেকে তরোয়াল খুলে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে তারা। আমাদের চিৎকার থমকে গেছে। আমরা জানি, এই শূন্য হাতে ওদের সঙ্গে আমরা লড়াই করতে পারব না! এবার দস্যুদের হাতে আমাদের মরতে হবে। মরতেই যদি হয় তবে মাথা তুলেই মরব আমরা। তাই আমি চিৎকার করে বললুম, 'ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো।'

'না-আ-আ!' সামনে ছুটে এসে এবার চিৎকার করে উঠল সেই মেয়েটি। বলল, 'আবু, অনেক কষ্টে যখন আমরা জীবন ফিরে পেয়েছি, তখন এমন করে কেন প্রাণ দেব? আবু, এসো আমরা ধরা দিই! আমরা যদি কোনো অন্যায় না করে থাকি, তবে আমাদের মিথ্যে-মিথ্যে মারবে কে! মারতেই যদি চায় ওরা, তখন শেষ রক্তটুকু দিয়ে তো লড়াই করতে পারব। এখন দেখি না ওরা কী বলে।'

আমি ভাবলুম, ঠিক কথাই বলেছে মেয়েটি। আমরা এগোলুম না। আমরা বন্দি হলুম ওদের হাতে। ওরা আমাদের নিয়ে চলল কেল্লার ভেতর। আরও ভেতরে একটা ঘরের সামনে।

হ্যাঁ, এই ঘরেই বোধহয় ওদের সর্দার আছে। এই ঘরেই সেই সর্দারের সামনে হয়তো দাঁড় করাবে। আমাদের বিচার হবে।

'বাবা-আ-আ!' ঘরের দরজা ডিঙোতে আচমকা ডেকে উঠল সেই মেয়েটি। আমরা তো সবাই থ। এমনকী, যারা আমাদের ধরে নিয়ে এসেছে. সেই দস্যুদল, তারাও থতমত খেয়ে চমকে উঠেছে! কী ব্যাপার! মেয়েটি বাবা বলে ডাকল কাকে!

নিমেষে ওদিক থেকে অবাক-কণ্ঠে সাড়া এল, 'রুবানা-আ!'

চেয়ে দেখে আমি হতবাক হয়ে গেছি। কেননা, যাকে বাবা বলে মেয়েটি ডাকল,তাকে আমি চিনি। এ সেই দস্যু-সর্দার! এ-ই তো আমাকে বন্দি করে রেখেছিল অন্ধকার ঘরে, এই লোকটাই তো আমার গলা টিপে মারতে চেয়েছিল! সে হয়তো এখনও আমাকে ভালো করে দেখেনি। কিন্তু আমি তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, দু-হাত বাড়িয়ে সে আবার ডাক দিল, 'রুবানা-আ!'

সেই মেয়েটি আবার খুশির সুরে চিৎকার করে উঠল, 'বাবা-আ-আ!'

আমার বুঝতে বাকি রইল না, এতক্ষণ যার হাত ধরে এই পথ আমি হেঁটে এসেছি তার নাম রুবানা। আর সামনে ওই যে দাঁড়িয়ে আছে দস্যু-সর্দার, সে ওর বাবা!

ওর বাবা মেয়েকে অমন আচমকা দেখতে পেয়ে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই সে ছুটল বাবার দিকে। কেউ তাকে বাধা দিল না। কেউ তাকে মানা করল না। কিন্তু আমি? হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলুম সেইখানে! দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলুম, এই দস্যু-সর্দার ওর বাবা! আমার মনটা কেমন যেন মুষড়ে গেল।

ওরা আমাকে দাঁড়াতে দিল না। আমার গলায় ধাক্কা মারল। আমি ঠোক্কর খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলুম আর একটু হলে। ঠিক সেই সময়ে সর্দারের নজর পড়ল আমার দিকে। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল।

ভয় পেল হয়তো মেয়েটি। তাই সে তার বাবাকে শান্ত করার জন্যে বলল, 'বাবা, এই হার তো তুমি ওকে দিয়েছ!'

এ-কথা শুনে আমি চমকে উঠলুম। চিৎকার করে বললুম, 'না, এ-হার আমায় যে দিয়েছে সে-জন দস্যু নয়।'

দস্যু-সর্দার হারটা ছিনিয়ে নিল মেয়ের কাছ থেকে। তারপর ভয়ংকর হুংকার ছেড়ে বলল, 'ধরে আনো ছেলেটাকে আমার কছে!'

আমি বুক ফুলিয়ে চেঁচিয়ে বললুম, 'ধরে নিয়ে যাবার কী দরকার। আমি নিজেই যেতে পারি। আমি দস্যুকে ভয় পাই না।' বলে, আমি নিজেই এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'কী বলতে চান আপনি?'

'এ-হার তুই কোথা পেলি?' ভারী গম্ভীর-গলায় সর্দার জিজ্ঞেস করল।

আমি উত্তর দিলুম, 'জানি না।'

'মানে!' অবাক হল সর্দার।

'মানে, আমি যা জানি না তা আপনাকে বলব কেমন করে।' সর্দার বলল, 'তোকে আমি বন্দি করেছিলুম। তুই এই হার চুরি করে পালিয়েছিস!'

আমি বললুম, 'মিথ্যে কথা। আমার বাবা আমায় চুরি করতে শেখায়নি। শিখিয়েছে চোরের মুখোমুখি বুক ফুলিয়ে কেমন করে দাঁড়াতে হয়!'

আমার এই উত্তর শুনে দস্যু-সর্দার হয়তো থতমত খেয়ে গেল। কেননা, কেমন যেন অপ্রস্তুতের মতো ঘাড় দুলিয়ে এদিক-ওদিক চেয়ে দেখল। আমার মুখ থেকে যে তাকে এমন উত্তর শুনতে হবে এটা ভাবতেই পারেনি দস্যু-সর্দার। কিন্তু নিজেকে সামলাবার জন্যেই হয়তো আচমকা চিৎকার করে সে তার পাশেই রাখা তরোয়ালটা হাত দিয়ে উঁচিয়ে ধরল। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'এ তরোয়াল কার?'

আমি প্রথমটা ঠিক বুঝতে পারিনি। কিন্তু একটু দেখেই চিনতে পেরেছি এ আমার সেই তরোয়ালটা। এরা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল, তাই আমি উত্তর দিলুম, 'আমার তরোয়াল আপনারা কেড়ে নিয়েছেন!'

'এ-তরোয়াল তুই কোথা পেয়েছিস?'

'আমার বাবা দিয়েছে!'

'তবে তোর বাবাই সেই তস্কর, সেই শয়তান!'

দস্যু-সর্দারের সব কথা না-শুনে, শুধু এইটুকু শুনেই আমার সারা শরীর রাগে থরথর করে কেঁপে উঠল। আমিও তার গলার ওপর গলা চড়িয়ে বললুম, 'এখন এই তরোয়াল আপনার হাতে না থেকে যদি আমার হাতে থাকত, তবে আপনাকে আমি বুঝিয়ে দিতুম তস্কর কে! আপনি, না আমার বাবা!'

আমার এই দুঃসাহসী কথা কোনো দস্যু কি আর সহ্য করতে পারে! তার ওপর সে- দস্যু যদি হয় দলের সর্দার! সুতরাং দস্যু-সর্দার তরোয়াল চালাল। ভয় কী! মরতে হয় মরব। তবু আমার বাবাকে যে তস্কর বলেছে, তার কাছে মাথা নিচু করব না। আমি বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম।

কিন্তু সে পারল না। আমার বুকে তরোয়ালের আঘাত লাগার আগেই তার মেয়ে বাবার সামনে দুহাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চিৎকার করে সে বলল, 'না, তুমি আবুকে মারতে পারবে না। যার বুকে তুমি তরোয়াল তুলেছ বাবা, সে যে তোমার মেয়ের প্রাণ বাঁচিয়ে, তোমার কাছে ফিরিয়ে এনেছে। আমি ওকে ভাই বলে ডেকেছি। তুমি যদি আবুকে মারতে চাও, তবে আমাকেও মারো।'

দস্যু-সর্দারের তরোয়াল আমার বুক ছুঁতে পারল না। তরোয়াল হাতের মুঠো থেকে আবার খাপে ঢুকে গেল। আমি দেখতে পেলুম, দস্যু-সর্দারের মুখখানা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে থমকে গেছে। আমার মুখের দিকে চেয়ে দস্যু-সর্দার হঠাৎ হাঁক পাড়ল তার সাঙ্গোপাঙ্গদের। তারা ছুটে আসতেই হুকুম করল, 'আমি এই ছেলেটার বাবার কাছে যাব। তোমরাও চলো আমার সঙ্গে। ঘোড়া তৈরি করো। ছেলেটাকেও নিয়ে যেতে হবে। এক্ষুনি!'

হ্যাঁ, ঘোড়া তৈয়ার হল। আমাকেও একটা ঘোড়ার পিঠে বসাল ওরা। দাঁড়িয়ে ছিল রুবানা-বোন। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখছিল। আমাকে একা ঘোড়ার পিঠে দেখে, হঠাৎ সে ছুটে এসে ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠে ঘোড়ার লাগাম ধরে টান মারল, 'হ্যাট হ্যাট।' ঘোড়া তির বেগে ছুটতে শুরু করে দিল। সে আমায় নিয়ে পালাল।

আচমকা এমন একটা কাণ্ড দেখে একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে সবাই! কী করবে, কী না-করবে ভাবতে না ভাবতেই দস্যু-সর্দার চেঁচিয়ে উঠল, 'রুবানা-আ-আ।'

ততক্ষণে আমাদের পিঠে নিয়ে ঘোড়া অনেক দূর চলে এসেছে! সঙ্গে সঙ্গে সর্দারেরও ঘোড়া ছুটল। সর্দারের লোকেদের যেন এতক্ষণে চমক ভাঙল। তারাও ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠে আমাদের পিছু নিল। চেঁচিয়ে উঠল, 'ভাগল, ভাগল!' শুরু হয়ে গেল মরুর বুকে সে আর এক আজব ঘোড়-দৌড়! একটি ঘোড়ার পিঠে একটি ছোট্ট ছেলে আর একটি ছোট্ট মেয়ে ছুটে চলেছে ধু-ধু মরুর বুকের ওপর দিয়ে। আর তাদের ধরতে তাদের পেছনে ছুটে আসছে একদল মরু-দস্যু! ভয়ংকর হিংস্র তারা! নির্দয়, নিষ্ঠুর!

আমি এখন ঠিক মনে করতে পারছি না, কেমন করে রুবানা-বোনের সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে চেপে দুরন্ত বেগে আমাদের সেই ছোট্ট ঘরে আমি আবার ফিরে এসেছিলুম। শুধু জানি দস্যু-সর্দারের সাঙ্গোপাঙ্গরা শত চেষ্টা করেও আমাদের ধরতে পারেনি। তাদের নাগালের অনেক—অ-নে-ক বাইরে ছুটে চলেছিল আমাদের ঘোড়া। যখনই সুযোগ পেয়েছে, তখনই সে ছুটতে ছুটতে থেমেছে যতক্ষণ না সে দেখতে পেয়েছে দূরে দস্যুদলকে। তখনই সে একটু করে জিরিয়ে নিয়েছে। দম নিয়ে আবার ছুটেছে। হ্যাঁ, ছুটতে-ছুটতে যখন সে আমাদের ঘরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছল, তখনই হঠাৎ দস্যু-সর্দার তিরের মতো ছুটে এসে আমাদের প্রায় ধরে! কিন্তু পারেনি। এখন বেশ মনে আছে, তার আগেই ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আমি আর রুবানা-বোন ঘরের ভেতর ছুটে গেছলুম। আমি চেঁচিয়ে উঠেছিলুম, 'মা-আ-আ! বাবা-বা-আ!' তাদের চোখগুলি আমাকে খুঁজে -খুঁজে আর কেঁদে-কেঁদে ক্লান্ত হয়ে গেছে! হঠাৎ আমার ডাক শুনে থমকে গেছল আমার মা, আমার বাবা। তারা দুজনেই আমাদের দুজনকে দেখে হতবাক। তারপর মা ছুটে আমায় জড়িয়ে ধরতে এলেন। আমি তখন হাঁপাচ্ছি। বললুম, 'মা, ওই দেখো সামনে শত্রু!'

হ্যাঁ, সামনে শত্রু! ততক্ষণে দস্যু-সর্দার ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে মাটিতে পা রেখেছে। তার হাতে আমার সেই তরোয়াল। আমার বাবার দিকে এগিয়ে আসছে সে ধীর পায়ে। আমি বাবাকে আড়াল করে দাঁড়ালুম। রুবানা-বোন ছুটে এসে তার বাবাকে রুখে দাঁড়াল। বলল, 'আমি যেমন তোমার মেয়ে, তেমন এদেরও মেয়ে আমি। তোমার হাতে এদের আমি মরতে দেব না।'

দস্যু-সর্দার কোনো কথা বলল না। আমার বাবার মুখোমুখি দাঁড়াল সে। বাবার চোখের ওপর চোখ রেখে নিজের হাতের তরোয়ালটা দোলাতে লাগল। বাবা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে একবার সেই তরোয়ালের দিকে আর একবার দস্যু-সর্দারের মুখের দিকে ফ্যাল-ফাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎই দস্যু-সর্দার কথা বলল, 'এই তরোয়াল তোমার ছেলের কাছ থেকে আমি পেয়েছি। তোমার ছেলে বলেছে, এই তরোয়াল তুমি ওকে দিয়েছ। আমি কি জানতে পারি, এ তরোয়াল তুমি কোত্থেকে পেলে?'

'আমি মরু থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি।' বাবা উত্তর দিল।

দস্যু-সর্দার বাবার উত্তর শুনে গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কুড়িয়ে পেয়েছ, না আজ থেকে অনেক বছর আগে মরুর বুকে দস্যু-গিরি করে এই তরোয়াল তুমি লুঠ করেছ?'

বাবা বলল, 'আমি কখনো দস্যুগিরি করিনি।'

এবার যেন দস্যু-সর্দার ধমকে উঠল, 'যে মিথ্যে বলে, তাকে আমি আস্ত রাখি না!'

বাবা এতক্ষণ শান্ত-স্বরে কথা বলছিল। এবার একটু কঠোর-স্বরে বলল, 'তবে শুনুন! আপনি কে আমি জানি না। একটা তুচ্ছ তরোয়ালের জন্য আপনাকে মিথ্যে বলতে যাব কোন দুঃখে? আমি দস্যু নই! আমি আবার বলছি, অনেক দিন আগে এ তরোয়াল আমি কুড়িয়ে পেয়েছি!'

'তুমি কি জানো, এ তরোয়াল আমার?'

'হতে পারে!'

'এই দেখো, তরোয়ালের হাতলের নীচে আমার নাম লেখা!' বলে দস্যু-সর্দার তরোয়ালের হাতলের নীচে গোপনে লেখা নিজের নামটা স্পষ্ট করে বাবার চোখের সামনে তুলে ধরল।

বাবা দেখতে-দেখতে বলল, 'আপনার নাম যদি মনসুর হয়, তবে, এ তরোয়াল আপনার।'

'হ্যাঁ, আমার নাম মনসুর। আর তুমি যদি এ তরোয়াল পেয়ে থাকো, তবে তুমিই সেই দস্যু-দলের একজন। তারা আমার বউকে মেরেছে, আমার ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।'

বাবা যেন চমকে উঠল দস্যু-সর্দারের কথা শুনে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আপনার ছেলে?'

বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আমিও চমকে উঠলুম। সেদিনের সব কথা আমার মনে পড়ে গেল। সেই সেদিন, যেদিন আমি মরুতে পাড়ি দেব প্রথম, তার আগের রাত্রে বাবা আর মা যে এই কথাই বলছিল। সেদিনই যে আমি জেনেছিলুম, বাবা আমায় মরু থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে। এখন ভাবছি, তবে কি আমি এই দস্যু-সর্দারেরই ছেলে!

বাবা এবার ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা, আপনার মনে আছে কতদিন আগে এ-ঘটনা ঘটেছিল?'

'দশ বছর আগে।' উত্তর দিল দস্যু-সর্দার। উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কেন এ কথা বলছ তুমি?'

'কোনো কারণ নেই। এমনি জিজ্ঞেস করছি।' বলে বাবা চকিতে মায়ের দিকে চাইল। মায়ের মুখখানা কেমন যেন অজানা ভয়ে শিউরে উঠল। হয়তো এই কথা শুনে আমার মা আর বাবা ভুলে গেল, তাদের ছেলে ঘরে ফিরেছে। এখন তাদের আনন্দ করার সময়। কিন্তু দস্যু-সর্দারকে বাবা আবার জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা, কেমন করে এ-ঘটনা ঘটেছিল আপনার মনে আছে?'

'কেন থাকবে না!'

'বলবেন সেই ঘটনার কথা?' জিজ্ঞেস করল বাবা।

'বলতে আপত্তি নেই।' উত্তর দিল দস্যু-সর্দার।

'তবে দয়া করে যদি বলেন!' জিজ্ঞেস করল বাবা।

দস্যু-সর্দার তখন বলতে শুরু করল, বলল, 'আজ থেকে সেই দশ বছর আগে, একদিন আমার বউ, আমার ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে শহর থেকে মেলা দেখে ফিরছিলুম মরুর পথ ধরে। তখন বেলা পড়ছে। আমরা দলে ছিলুম আরও অনেকে। কেউ বা যাচ্ছে ঘোড়ার পিঠে। কেউ বা উটে। আমার বউ আর ছেলে-মেয়ে চলেছিল উটের পিঠে, আর আমি চলেছি ঘোড়ায় চড়ে। হঠাৎ কোথাও কিছু নেই, অতর্কিতে মরু-দস্যু আমাদের আক্রমণ করল। আমাদের ওই অতবড়ো দলটা নিমেষে ছত্রভঙ্গ হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে পালাতে শুরু করল , দস্যুদল লক্ষ করল আমাদের। ভেবেছিল আমাদের কাছে বুঝি অনেক সোনা-দানা আছে। তারা আমার বউকে আক্রমণ করল। আমার বউয়ের কোলে ছিল আমার ছোট্ট ছেলে। তখনও সে হাঁটতে জানে না। কথা জানে না। মায়ের কোলটি ছাড়া কিচ্ছু জানে না। দস্যুরা আমার ছেলেকে ছিনিয়ে নিল তার মায়ের কোল থেকে। কিন্তু তার মায়ের কাছে লুকানো ছিল ধারালো একটা ছোরা। ছেলেকে কেড়ে নেবার আগে, সেই ছোরা দিয়ে সে আঘাত করতে ছাড়েনি সেই শয়তানটাকে! সেই শয়তান মরল কি না জানি না। কিন্তু আমার বউয়ের বুকে তারা তরোয়াল মারল। পড়ে গেল সে মাটির ওপর। আমার ছেলেটাকে তার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কী যে করল আমি দেখতে পেলুম না। কেননা, তখন তারা আমার ওপর চড়াও হয়েছে। হবেই তো! আমি যে তখন কোনোরকমে আমার মেয়েকে ওদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছি। নিয়ে ঘোড়ার পিঠে দৌড় দিচ্ছি। ওরা আমায় প্রথমে ঘিরে ফেলল। আমি তখন জানি আমার নিশ্চিত মৃত্যু। কিছু আর ভেবে না-পেয়ে এই তরোয়ালটা দিয়েই আমি ওদের সঙ্গে একা-একা লড়াই শুরু করে দিলুম। ভাবলুম, আমি মরি মরব, আমার মেয়েকে আমি বাঁচাবই! এক হাতে আমার মেয়ে, এক হাতে আমার তরোয়াল। আমি এই অবস্থায় ঘোড়ার পিঠে বসে-বসে জীবন-মরণ লড়াই করছি। আমার তরোয়াল ওদের বুকে বিঁধছে। রক্ত ছুটছে। তাদের কেউ মরছে, কেউ ভাগছে। কিন্তু হঠাৎ একজন দস্যু পিছন দিক থেকে আমাকে আক্রমণ করে বসল। আমার হাতের ওপর প্রচণ্ড জোরে সে ঘোড়ার চাবুক দিয়ে আঘাত করল। আমার হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে পড়ল। আমার কাছে আর কোনো অস্ত্র ছিল না। সুতরাং আমার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে আমি ঘোড়া ছোটালুম। আমি পালালুম। ওরা আমার পিছু নিয়েও আমার নাগাল পেল না। পালালুম আমার মেয়েকে বাঁচাবার জন্যে। না, আমি মরলেও আমার মেয়েকে আমি মরতে দেব না।

'হ্যাঁ, আমার মেয়েকে আমি মরতে দিইনি। কিন্তু আমার বউ আর ছেলের কথা ভেবে-ভেবে বুকের ভেতরটা আমার প্রতিহিংসায় জ্বলে উঠত। ভাবতুম, যারা আমার বউকে মেরেছে, যারা আমার ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়েছে, তাদের যতক্ষণ না মারছি, ততক্ষণ বুঝি আমার শান্তি নেই। কিন্তু তাদের আমি মারতে পারিনি। কেনা শত চেষ্টা করেও তাদের আমি খুঁজে পাইনি আর।

'কিন্তু তারপর হঠাৎ একদিন আমার আর-এক সর্বনাশ হয়ে গেল। আমার মেয়েও হারিয়ে গেল! আমি ছিলুম না। সেদিন কী একটা জরুরি কাজে বাইরে গেছলুম। ঘরে ফিরে দেখি, আমার মেয়ে নেই! আমি পাগলের মতো আমার মেয়ের খোঁজে ছুটে বেড়ালুম। কিন্তু কই আমার মেয়ে? তাকে আমি কোথাও খুঁজে পেলুম না। তখনই আমার মনে হল, এ বুঝি সেই মরু-দস্যুরই কাণ্ড। এ-কথা মনে হতেই প্রচণ্ড হিংস্র হয়ে উঠলুম আমি। প্রতিজ্ঞা করলুম, যদি মরতে হয় তবু ভালো, আমার মেয়েকে আমি যেমন করে হোক উদ্ধার করব। তাই আজ আমি দস্যু হয়েছি। আমি অস্ত্র ধরেছি। আমি বুঝেছি, দস্যুকে শায়েস্তা করতে হলে, আমাকে দস্যু হতেই হবে। আমি আজ এক শক্তিশালী দস্যু-দলের সর্দার। আমি যা পাই, তাই লুঠ করি। আমি যাকে পাই, তাকে খুন করি। আর তাই তোমার ছেলেও একদিন আমার দলের লোকের হাতে ধরা পড়ে। এক দস্যু-দলের সঙ্গে তোমার ছেলে ভাগছিল। আমার লোকেরা তোমার ছেলেকে ধরে নিয়ে এল আমার কাছে। তরোয়ালটা আমি ওর কাছ থেকে কেড়ে নিলুম। তখনও আমি জানতুম না এই তরোয়ালই আমার সেই হারিয়ে যাওয়া তরোয়াল। আমি জানতুম না এই তরোয়ালের গায়ে আমারই নাম খোদাই করা আছে। আমি তোমার ছেলেকে শত্রু ভেবেই তাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে গেছি। পারিনি।

'তোমার ছেলেকে মারতে গিয়ে আমারই ছেলের কথা মনে পড়ে গেছে! কেমন যেন অজানা ভয়ে আমার বুকের ভেতটা কেঁপে উঠেছিল ওকে দেখে। কী জানি কেন, তোমার ছেলের মুখখানি দেখে আমার চোখের জল আমি আটকে রাখতে পারিনি। কিন্তু কান্না কি আমার সাজে! কেননা, আমি দস্যু। তরোয়ালের ঝনঝনানি শব্দ শুনে আমার ঘুম ভাঙে। শত্রুর রক্ত দেখে আমার মন ভরে। কিন্তু তবু গোপনে আমি কেঁদেছি। তোমার ছেলের জন্যে আমার মনটা ব্যথায় ডুকরে উঠছিল বলেই গভীর-রাতে ওর কাছে আমি গেছি। গেছি সেই ঘরে, যে-ঘরে আমি বন্দি করে রেখেছিলুম। আমি ওকে বুঝতে দিইনি, আমি সেই দস্যু-সর্দার। সারা গায়ে কালো কাপড়ের ঢাকায় নিজেকে লুকিয়ে রেখে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। ওকে গোপনে সেই বন্দি-ঘর থেকে বাইরে নিয়ে গেছি। ওর অজান্তে ওর গলায় একটি হার পরিয়ে দিয়েছি। এই হারটি ছিল আমারই মেয়ের। তারপর ওকে হাত ধরে গেটের বাইরে নিয়ে গিয়ে ওকে মুক্ত করে দিয়েছি। ওকে দেখে আমার মন বার-বার বলে উঠেছে, ছিঃ ছিঃ আমি কেন দস্যু! আমি কেন খুন করি! কেন আমি লুটেরা! আমি চাই না দস্যু থাকতে! আমি এই জঘন্য জীবন থেকে মুক্তি চাই, তাই আমি ওর হাত ধরে বলেছিলুম, পারিস তো আমায় নিয়ে যাস এখান থেকে। আমায় মুক্ত করিস!'

বলতে বলতে দস্যু-সর্দার হাত দিয়ে নিজের চোখ ঢাকল। আমার চোখেও জল এসে গেল। ভাবলুম, তা হলে এই সর্দারই সেদিন আমায় মুক্ত করে দিয়েছিল! এই কথা ভাবতে-ভাবতে আমি লুকিয়ে ফেলেছিলুম আমার চোখ দুটিকে। কেউ না দেখে ফেলে! কিন্তু দেখতে পেয়েছিল। দেখেছিল রুবানা-বোন। সে আমার কাছে এগিয়ে এসে আমায় চুপি-চুপি জিজ্ঞেস করেছিল, 'তুমি কাঁদছ, আবু?'

আমি উত্তর দিইনি। । মুখ নিচু করে ভেবেছিলুম, আমিই কি তবে সেই কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে।

'কী ভাবছ, আবু?' রুবানা-বোন খুব আলতো-স্বরে আবার জিজ্ঞেস করেছিল আমায়। আমি বলেছিলুম, 'ভাবছি, তোমার বাবার কথা। ভারি দুঃখী!'

আমি এতক্ষণ যে-মানুষটাকে দেখলুম নিজের কথা বলতে-বলতে দুঃখে ভেঙে পড়ছে, চোখে জল টলটল করছে, সেই মানুষটাই আবার দেখি হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠল। সেই জলে-ভেজা চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে তার। বাবাকে শাসিয়ে বলল, 'তুমি যদি সত্যি করে না-বলো এ-তরোয়াল তুমি কোথা থেকে পেলে, তবে সামনে চেয়ে দেখো আমার লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে। হুকুম পেলেই ওরা তোমার ঘরে আগুন লাগিয়ে দেবে।'

হ্যাঁ, সত্যিই! সামনে চেয়ে দেখি, অন্তত পঁচিশটা ঘোড়ার ওপর আরও পঁচিশজন দস্যু অস্ত্র উঁচিয়ে বসে আছে। বাবাও তাদের দিকে তাকিয়ে দেখল। তারপর দস্যু-সর্দারকে নরম গলায় বলল, 'আপনি আমার অতিথি। আপনাকে মিথ্যে আমি বলছি না। ওই তরোয়াল আমি মরুর বুক থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি।'

দস্যুসর্দার এবার যেন ভয়ংকর রেগে গেল। চিৎকার করে তার দলের লোকদের হুকুম করল, 'আগুন লাগাও।' 'না--আ-আ।' ওরা ছুটে আসার আগেই রুবানা-বোন দু-হাত আড়াল করে ওদের পথ আটকাল। সর্দার ধমকে উঠল, 'রুবানা!'

তবু রুবানা-বোন নিশ্চল।

দস্যুরা এগোতে পারল না। আমি এগিয়ে গেলুম দস্যু-সর্দারের কাছে। আমি বললুম, 'সর্দার, আপনারা দলে অনেক। আমাদের আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে আপনাদের কষ্ট করতে হবে না। কিন্তু সর্দার, দস্যু বলেই কি আপনি আমার বাবাকে বিশ্বাস করবেন না? দস্যুরা কি শুধু নির্দয়ই হবে? দস্যুরা কি শুধু মানুষের প্রাণই নেবে? তাদের ধন-সম্পত্তি লুঠ করবে? ঘরে আগুন দেবে? তবে শুনুন সর্দার, আমার বাবা মিথ্যে বলেন না। আমি জানি, ওই তরোয়াল বাবা কুড়িয়ে পেয়েছেন। সেই সঙ্গে আর একটা কথা শুনলে আপনি নিশ্চয়ই চমকে উঠবেন, ওই তরোয়ালের সঙ্গে বাবা আমাকেও ওই মরুর বুক থেকে কুড়িয়ে পেয়েছেন।'

বুঝতেই পারছ এ-কথা শোনার সঙ্গে-সঙ্গে আমার মা, আমার বাবার মনের অবস্থা কী হয়েছিল। সে-কথা শুনে দস্যু-সর্দারের গলার স্বর নিমেষের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেছল! আর রুবানা-বোনের চোখ দুটি অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে ছিল।

কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা একটুক্ষণের জন্য। কেননা, হঠাৎ আমার মা ছুটে এসেছিল আমার কাছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, 'অমন কথা বলিস না আবু, অমন কথা বলিস না। তুই যে আমার বুকের মানিক!' বলে মা কেঁদে উঠল।

মাকে জড়িয়ে আমিও কেঁদে ফেললুম। কাঁদতে-কাঁদতে বললুম, 'জানি মা, জানি আমি তোমাদের বুকের মানিক। জানি মা, তুমি আর বাবা আমাকে মরুর বুক থেকে তুলে এনে আমার প্রাণ দিয়েছ। তোমাদের সব আদর ঢেলে, তোমাদের সব ভালোবাসা দিয়ে আমাকে বড়ো করে তুলেছ। মাগো, তোমরা আমাকে কোনোদিনই বুঝতে দাওনি, আমি তোমাদের পর। কোনোদিনই তোমরা মনে করোনি, আমি তোমাদের কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। তাই আমি যখন কেঁদেছি, তোমরা আমায় কোলে তুলে নিয়েছ। আমার চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছ। তোমাদের কাছে কিছু না চাইতেই তোমরা আমায় সব কিছু দিয়েছ। মাগো, তোমরা যদি আমায় কুড়িয়ে না-পেতে, তবে যে আমি কোনোদিনই তোমাকে মা বলে ডাকতে পারতুম না। কোনোদিনই যে বাবাকে আমি আপন বলে চিনতে পারতুম না। তোমাদের মতো এমন মানুষের ঘরে যে আগুন লাগাতে চায়, তাকে আমি কী বলে ডাকি! বলবে মা, তাকে আমি কী বলে ডাকব?' বলে আমি ডুকরে-ডুকরে কেঁদে উঠলুম।

বাবা আমার এতক্ষণ বোবার মতো চুপটি করে দাঁড়িয়েছিল। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমার কথা শুনছিল। যেন পাথর। আমায় এমন করে কাঁদতে দেখে এবার আমার পাশে এসে দাঁড়াল বাবা!

দস্যুসর্দার এবার যেন ভয়ংকর রেগে গেল।

আমার মাথায় হাত রাখল। বলল, 'কেঁদো না আবু। আজ তো আমার আনন্দের দিন। আজ তুমি তোমার আপনজনকে ফিরে পেয়েছ! আবু, আমরা তোমার পর। আমরা তোমাকে কুড়িয়ে পেয়ে শুধু বড়ো করেছি, এর বেশি আর কী।' বলতে-বলতে আমি দেখলুম আমার বাবারও দু-চোখ ছলছল করছে।

চোখের জল সামলে নিয়ে বাবা এগিয়ে গেল দস্যু-সর্দারের দিকে। তারপর বলল, 'সর্দার, আবু যা বলেছে সব সত্যি! ও আমার কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। কিন্তু বিশ্বাস করুন সর্দার আপনার ছেলেকে আমরা কোনোদিন অযত্ন করিনি। নিজের ছেলের মতো গড়ে তুলেছি। সর্দার, ওকে আমরা কোনোদিনই বুঝতে দিইনি ও আমাদের কেউ না। ও জেনেছে, ও যাকে মা বলে ডেকেছে, সে তারই মা। আমি ওর বাবা। আমি ওকে সাহসী হতে শিখিয়েছি সর্দার। বিপদ মাথায় নিয়ে বাঁচতে শিখিয়েছি। শিখিয়েছি, দুঃখকে কেমন করে জয় করতে হয়। আর ওর মা তার মনের সব স্নেহ ঢেলে দিয়ে ওকে সুন্দর করেছে। সর্দার, আবু আমাদের প্রাণ, আবু আমাদের আলো।' বাবার গলা যেন আর কথা বলতে পারল না। একটু থামল বাবা। তারপর আবার বলল, 'সর্দার, আপনার ছেলেকে আপনি নিয়ে যাবেন, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! আবু যাবে বইকি তার আপনজনের কাছে। কিন্তু সর্দার, বিশ্বাস করুন, দস্যুগিরি করে আপনার ছেলেকে আমরা ছিনিয়ে আনিনি। সর্দার, আপনার ছেলেকে আমরা চুরি করিনি।'

আমি দেখলুম, বাবার কথা শুনতে শুনতে সর্দার যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। বাবা এবার আমার চিবুকটি হাতে রেখে বলল, 'আবু তোমার আপনজন তোমায় নিতে এসেছেন। আবু, তুমি ওঁর সঙ্গে ফিরে যাও! যেমন করে তুমি আমাদের ভালোবেসেছ, তেমন করে ওঁকে ভালোবাসবে। যেমন করে আমাদের কথা শুনেছ তুমি, তেমনি করে ওঁকে মান্য করবে। আবু, ফিরে যাও! তুমি এখন আর একা নও। ওই তোমার দিদি, তোমার বোন রুবানা। দিদির সঙ্গে আনন্দে, খুশিতে হেসে-খেলে তুমি সুখে থাকবে। এর বেশি আমরা আর কী চাই!' বাবার কথা আবার থেমে গেল। আমি বাবার বুকে মাথা রাখলুম।

এতক্ষণ যে-সর্দার স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এতক্ষণ যে-সর্দারের চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছিল, হাতের তরোয়াল সূর্যের পড়ন্ত আলোয় ঝলসে উঠছিল, এখন সেই দস্যু-সর্দারের মুখখানা আমাকে দেখতে-দেখতে কেমন যেন থমথম করছে।

আমি বাবার বুকের থেকে মুখ তুলে মায়ের কাছে গেলুম। মায়ের চোখের জল মুছতে-মুছতে বললুম, 'মা, দুঃখ কোরো না। আমি যাচ্ছি মা। আবু তার মাকে ভুলবে না কোনোদিন, কোনোদিনও না।'

মা আমার কপালে চুমু খেয়ে তবুও কাঁদল।

এবার আমি এগিয়ে গেলুম দস্যু-সর্দারের কাছে। বললুম, 'কোথায় যেতে হবে আমাকে? কোথায় নিয়ে যাবেন? চলুন।'

আমার কথা শেষ হল না। হঠাৎ সেই দস্যু-সর্দার যেন চাপা-কান্নায় গুমরে উঠল। যেন কতদিন জমাট মেঘের মতো সেই কান্না একসঙ্গে আকাশ ভেঙে অঝোরে ঝরে পড়তে চাইছে। সর্দার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আমি বুঝতে পারছি, প্রচণ্ড উত্তেজনায় সর্দারের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে সর্দার যে কেমন করে তার বুকের সব ভালোবাসা আমাকে উজাড় করে দেবে, বুঝি ভেবে পাচ্ছে না। মুখের কথা যেন মুখেই হারিয়ে গেছে সর্দারের। শুধু চোখের জল উপচে পড়ে, আমার কপাল ছুঁয়ে বার-বার যেন বলছে, 'এতদিন তুই কোথা ছিলি, কোথা ছিলি আবু? তুই যে আমার বুকের ধন, তুই আমার স্বপ্নের রাজপুত্তুর। তোর জন্য এতদিন ধরে মনের ভেতর শুধুই কেঁদেছি আমি। বল, বল, আমাকে একবার বাবা বল। একটিবার আমায় বাবা বলে ডাক!'

সর্দারের সেই কান্না-ভেজা মুখখানা একদৃষ্টে অবাক হয়ে দেখছিলুম আমি। দেখতে-দেখতে আমারও চোখ ছলছলিয়ে উঠল। আমার মুখ দিয়ে আপনা-আপনি অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, 'বাবা!'

কী বলব, সঙ্গে-সঙ্গে কী জোরে হেসে উঠল সর্দার! হাসির সঙ্গে আর চোখের জলের সঙ্গে সর্দারের সেই ভীষণ গম্ভীর মুখখানা কেমন যেন একটি ছোট্ট ছেলের মতো আনন্দে উছলে উঠল। আমায় দু-হাত দিয়ে কোলে তুলে নিল সর্দার। তারপর প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে হেঁকে উঠল, 'আমার ছেলেকে আমি ফিরে পেয়েছি! আমার ছেলেকে আমি ফিরে পেয়েছি।' সর্দার যেন পাগল হয়ে গেল!

রুবানা-বোন এতক্ষণ বোবার মতো অবাক চোখে চেয়ে-চেয়ে দেখছিল সব। এবার তার চোখেও জল গড়াল। শুধু কাঁদতে-কাঁদতে থমকে গেছে আমার মা। রুবানা-বোন আমার মায়ের কাছে এগিয়ে গেল। বলল, 'মন খারাপ কোরো না মা। আবু তোমায় মা বলে ডেকেছে। তুমি আমায় মেয়ে বলে ডেকো।'

বাবা এগিয়ে গেল সর্দারের কাছে। বলল, 'সর্দার, আপনি আপনার ছেলে ফিরে পেয়েছেন। এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে! আপনি এবার ছেলে নিয়ে ঘরে যান। তাকে নিয়ে আপনার স্বপ্নের রাজত্ব গড়ে তুলুন। এবার আমাদের ছুটি।'

সর্দার আমাকে তার কোল থেকে নামাল। নামিয়ে বাবার হাত জড়িয়ে ধরে বলল, 'বন্ধু আমি তোমাদের চিনতে পারিনি। আমাকে তোমরা ক্ষমা কোরো। কে বলেছে, তোমাদের ছুটি। কে বলেছে, আবু আমার ছেলে। যারা তাকে মরুর বুক থেকে তুলে এনে তার প্রাণ বাঁচিয়েছে, যারা তাকে তাদের বুকের রক্ত দিয়ে বড়ো করে তুলেছে, তারা তার আপন, না আমি? আমি দস্যু! আমি হিংস্র! আমি নিষ্ঠুর। বন্ধু, ছুটি তোমাদের না, ছুটি আমার। আবু তোমাদের ছেলে। আবু তোমাদেরই থাকবে। আবুকে আমি নিয়ে যেতে আসিনি। আবুকে তোমাদের কাছে দিয়ে যেতে এসেছি।'

আমরা সবাই কেমন থ হয়ে গেলুম সর্দারের এই কথা শুনে।

তারপর সর্দার আবার বলল, 'আর একটি জিনিস তোমাদের কাছে আমি রেখে যেতে চাই, তোমরা কি তা রাখবে?'

আমরা অবাক হয়ে চেয়ে রইলুম তার মুখের দিকে। ভাবলুম, কী জিনিসের কথা বলছে সর্দার!

সর্দার রুবানা-বোনের দিকে চাইল। তাকে ডাকল, 'রুবানা!' সর্দারের এ-ডাকে সে-হুংকার আর নেই। ভারি মিষ্টি, ভারি নরম।

রুবানা-বোন এগিয়ে গেল সর্দারের দিকে। সর্দার তার মাথায় হাত রাখল। রুবানা মুখ তুলে চাইল বাবার দিকে। সর্দার বলল, 'এই আমার মেয়ে। আমি কোনোদিনও পারিনি আমার মেয়ের মনটি আমার সব আদর দিয়ে ভরিয়ে তুলতে। আমি পারিনি আমার বুকের যত্নে তাকে গড়ে তুলতে। আমি দস্যু। তোমরাই বলো, এই একটা হিংস্র দস্যুর আস্তানায় এমন একটি গোলাপ-কুঁড়ির মতো মেয়ে, সে কি ফুল হয়ে ফুটে উঠতে পারে?' বলতে-বলতে চুপ করে গেল দস্যু-সর্দার। তারপর মেয়ের হাতটি ধরে আমার মায়ের কাছে গেল। মাকে বলল, 'বোন, আবুকে যেমন তোমরা বুকে-পিঠে করে গড়ে তুলেছ, আবুকে যেমন মনে করেছ তোমাদেরই ছেলে, তেমনি আমার মেয়েও আজ থেকে তোমাদেরই। তোমাদেরই হাতে আমার রুবানাকে তুলে দিয়ে গেলুম। তোমরা কি তাকে আপন করে নিতে পারবে না?'

মা সে-কথা শোনার সঙ্গে-সঙ্গে বোনকে জড়িয়ে ধরল। রুবানা-বোন মাকে জড়িয়ে ডুকরে-ডুকরে কেঁদে উঠে ডাক দিল, 'মা!'

মা-ও যেন বুকের সব আদর উজাড় করে ডেকে উঠল, 'রুবানা।'

'আঃ!' দীর্ঘশ্বাস পড়ল সর্দারের। রুবানা-বোনের মা-ডাকার সঙ্গে-সঙ্গে তার যেন মনের সব বোঝা হালকা হয়ে গেল।

'আবু!' সর্দার এবার ডাকল আমায়। আমি এগিয়ে গেলুম। সর্দার তার খাপে ঢাকা সেই তরোয়ালটি বার করল। আমার হাতে তুলে দিল। বলল, 'আবু, এই তরোয়াল তোমারই। আমি তোমায় ফিরিয়ে দিলুম। এ-তোমার বীরত্বের পুরস্কার। আমি জানি, এই তরোয়াল নিয়ে তুমিই পারবে শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়াতে, তাকে জয় করতে। তারপর রুবানা-বোনের কাছে এগিয়ে গেল সর্দার। বলল, 'এই নাও তোমার সেই হার। এই হারই তোমায় ফিরিয়ে দিয়েছে তোমার ভাইকে। রুবানা, আমি এবার যাব। যাবার আগে বলে যাব, তোমার ভাইকে নিয়ে তুমি আনন্দে থাকো। তোমার খুশি দিয়ে, তুমি এ-বাড়ি ভরিয়ে রাখো। রুবানা, তোমরা আরও সুন্দর হও।' তারপর বাবাকে বলল, 'বন্ধু, এবার আমি যাই।' মাকে বলল 'বোন, বিদায়।' বলতে-বলতে দস্যু-সর্দার হাত তুলল। রুবানা-বোনের হাত ধরে আমি ছুটে গেলুম তার কাছে। আমরা র্দজনে তার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে মাথা নোয়ালুম। আমাদের মাথায় হাত রাখল দস্যু-সর্দার, তারপর ছুটে ঘরের বাইরে চলে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে ঘোড়া। উঠে পড়ল তার পিঠে। ঘোড়া পা ফেলল। বাইরে অপেক্ষা করছিল পঁচিশটা ঘোড়ার পিঠে আরও পঁচিশজন দস্যু। তারাও চলল সর্দারের পেছনে-পেছনে।

দূরে পড়ন্ত সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি বালির ওপর। সর্দারের ঘোড়া বালির গভীরে, আরও গভীরে হারিয়ে যায় একটু-একটু করে। আমরা দাঁড়িয়ে রইলুম। চেয়ে রইলুম সেই পথের দিকে। তারপর কেঁদে ফেললুম আমরা র্দজনে, আমি আর আমার বোন রুবানা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%