বুদ্ধদেব গুহ

অদ্য মুসলমানদিগের কোনো তেওহার হইবে।
দলে দলে তাহারা কুর্তা-পাজামা পরিধান করিয়া পদব্রজে, রিকশায়, সাইকেল-রিকশায় ডিজেল লোকোমোটিভ ওয়ার্কসের দিকে চলিয়াছে। তাহাদের কলকন্ঠে, সাইকেলের টুং-টাং ঘণ্টা-ধ্বনিতে সামনের পথটি মুখরিত। যেইরূপ শব্দ ভাসিয়া আসিতেছে, তদ্রূপ ধুলা।
গতকল্য মহাধুমধামের সহিত দশেরা উৎসব সম্পাদিত হইয়াছে।
বর্ধমানের মহারাজার অধুনা-জীর্ণ ও প্রায় নিষ্প্রদীপ বিশাল প্রাসাদের গাত্র-ঘেঁষিয়া একাদশীর চন্দ্রটিও ভীরু লজ্জাবতী দ্বিধাগ্রস্ত বালিকার ন্যায় সবেমাত্র উঁকি দিয়াছে। পথের গন্ডগোল সত্ত্বেও এই ভগ্নপ্রায় পুরাতন গৃহের দ্বিতলের বহুথামবিশিষ্ট প্রশস্ত বারান্দায় কী এক বিষণ্ণ নিথর নিস্তব্ধতা বিরাজ করিতেছে।
গৃহে এক্ষণে কেহই উপস্থিত নাই।
মুরতেজা পর্যন্ত তেওহার উপলক্ষে ছুটি লইয়া চলিয়া গিয়াছে।
বারান্দার এককোণে অপুষ্ট একটি শ্বেত মার্জার নিজেকে সম্পূর্ণ গুটাইয়া গোলাকৃতি করিয়া একটি পাপোশের উপর ঘুমাইয়া রহিয়াছে। ধৃতিকান্তর ন্যায় এই মার্জারটিও এমন-ই একটি বয়সে আসিয়া পৌঁছিয়াছে যে, যেখানে পৌঁছাইলে সংসারে আর কাহারও নিকট হইতে কিছুই প্রত্যাশার থাকে না।
ধৃতিকান্তও এই মার্জারটির ন্যায় আরামকেদারাতে হেলান দিয়া ফুটি-ফুটি চন্দ্রালোকলিপ্ত আকাশপানে চাহিয়া আছেন। তাঁহার দৃষ্টি কোনো বস্তুবিশেষে নিবদ্ধ নাই। এই দৃষ্টি সুপ্ত-রাতের স্মৃতিচারণের দৃষ্টি। যে-দৃষ্টি মেলিয়া কোনো নি:সঙ্গ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা একা চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে পারেন এবং থাকেন।
মার্জারটি একটি দীর্ঘনি:শ্বাস ফেলিল। হাই তুলিল। দক্ষিণ হস্ত দক্ষিণ কর্ণের নিকট তুলিয়া লইয়া কিছুক্ষণ মৃদু খস-খস আওয়াজে কান চুলকাইল। তাহার পর আবার ঘুমাইয়া পড়িল।
ধৃতিকান্তরও ঘুম-ঘুম পাইতেছিল। যেন তাঁহার গাত্রোত্থান করিবার সময় হইয়াছে। কিছুক্ষণ পর-ই রথযাত্রা চৌমহনী পার হইয়া গোধূলিয়ার মোড় অতিক্রম করিয়া চওকের পথ ধরিয়া তিনি সেই ঠাণ্ডাই-এর দোকানে গিয়া দাঁড়াইবেন। তিলের নাড়ুর আকৃতির একটি ভাঙের গুলিসহযোগে একগ্লাস বাদাম-পেস্তার শরবত সেবন করিবেন। এবং তাহার পর তাঁহার দুই-যুগ পূর্বের অতিপরিচিত এক তাম্বুলওয়ালার দোকান হইতে প্রায় বিবর্ণ চার খিলি মঘাই তাম্বুল, গিলা-সুপারি ও খুশবুভরা পিলাপাত্তি জর্দাসহযোগে মুখে পুরিয়ে হাঁটিতে হাঁটিতে অথবা টলিতে টলিতে আবার গৃহাভিমুখে ফিরিয়া আসিবেন।
দাঁত দুই-একটি পড়িয়াছে, অন্যগুলি নোটিশ দিয়াছে; তাই ইদানীং গিলা-সুপারি ব্যতীত পান খাওয়া সম্ভব হয় না ধৃতিকান্তর।
তিনি এমন-ই এক শারীরিক অবস্থায় রেশমির নিকট আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন যে, সে অবস্থাতে ডাক্তারেরা শয্যাত্যাগ করিতে পর্যন্ত নিষেধ করেন।
এ সংসারে আপনার বলিতে ধৃতিকান্তর কেহই অবশিষ্ট নাই। শারীরিকভাবে অনেকেই আছেন। কিন্তু তাঁহাদের কাহারও সহিতই আর আত্মিক কোনো যোগাযোগ নাই। সেই অর্থে রক্তসূত্রে বা ব্যাবহারিক সূত্রেও আত্মীয় বলিতে আজ আর তাঁহার কেহই নাই।
রেশমির কাছে আসিয়া ভালো করিয়াছেন কী মন্দ করিয়াছেন তিনি জানেন না। এইটুকু জানিয়াই খুশি আছেন যে, রেশমি সত্যই আনন্দিত হইয়াছে। তাঁহার দর্শন লভিয়া বা সঙ্গ পাইয়া যে, কেহ আনন্দিত হইতে পারে এই বিশ্বাস আজ আর তাঁহার নাই। যাহা বিশ্বাসের বাহিরে, তাহা সত্য বলিয়া জানিয়া জীবনের অন্তিম সময়ে বড়োই আনন্দলাভ করিয়াছেন ধৃতিকান্ত।
কিন্তু অদ্য গৃহে ফিরিয়াই বা কী হইবে?
অদ্য রেশমি নাই। মির্জাপুরে তাহার বহুপুরাতন এক বান্ধবীর অসুস্থতার সংবাদ পাইয়া সে চলিয়া গিয়াছে। মোটরগাড়িতেই রওয়ানা হইয়াছে প্রত্যুষে।
এযুগে সেইসব বিচিত্র ‘ঝম-ঝম’ শব্দের ঘোড়ার গাড়ির আর কদর নাই। সেইসব অশ্বকুলের বেশিই মরিয়া গিয়াছে, কেহ কেহ পিঁজরাপোলে, কেহ বা ভাড়ার টাঙা টানিতেছে।
ধৃতিকান্তর হঠাৎ-ই মনে হইল যে, কিছুই আর নাই। সেই শরীর নাই, সেই কামনা নাই, সেই ঐশ্বর্য নাই, সেই তীব্র ভালোবাসা নাই। সেযুগের সেই ধৃতিকান্তর আজ আর কিছুমাত্রই অবশিষ্ট নাই।
তবুও রেশমিকে এখনও ক্কচিৎ-কদাচিৎ মুজরায় বাহির হইতে হয়।
যে চিকন পক্ষীর স্বরে একদিন বসন্তের সকালের আমেজ লাগিত, সেই স্বরে আজ শীতের ধোঁয়াশার অস্পষ্টতা। তবুও বিন্ধ্য পাহাড়ের উপর বাদামি চিঁকারা হরিণের পালের ন্যায় পায়ে পায়ে ধুলা উড়াইয়া প্রেম-প্রেম খেলা, অবশ অভ্যাস, কৃতজ্ঞতাবোধ সব মিলিয়া-মিশিয়া এখনও ক্বচিৎ-কদাচিৎ রেশমিকে পা মুড়িয়া বসিয়া কানের উপর হাত চাপিয়া দিয়া গান গাহিতেই হয়।
সারেঙ্গির ছড় আজিও কাঁদিয়া কত কী কহে।
পুরাতন সারেঙ্গিওয়ালা আসগর তাহার নীল চোখ, তীক্ষ্ণনাসা ও মেহেন্দি-রাঙানো শ্মশ্রুসমেত কবে কবরে চলিয়া গিয়াছে। তাহার ভাতিজা মুনাব্বর-ই আজকাল সারেঙ্গিবাদক।
মুনাব্বরের কবজিতে জোর আছে—আওয়াজ ভোরের আলোর ন্যায় স্পষ্ট, কিন্তু আসগরের মধ্যে হৃদয়ের সঙ্গে সারেঙ্গির ছড়ের যে, যোগসূত্রটি ছিল তাহা ধৃতিকান্ত মুনাব্বরের মধ্যে দেখিতে পান নাই।
ইদানীংকার এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের অনেক কিছুই গুণাবলি আছে যাহা ধৃতিকান্তদের কখনো কুক্ষিগত ছিল না। কিন্তু ধৃতিকান্তর বারংবার-ই মনে হয় যে, তাঁহাদের প্রজন্মের স্ত্রী-পুরুষের মধ্যেও বহুকিছু গুণাবলি ছিল, যাহা এই প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তিনি একেবারেই দেখেন না।
ধৃতিকান্ত অত্যন্ত ক্লান্তির সঙ্গে লক্ষ করিয়াছেন যে, ইহাদের যশের জন্য কাঙালপনা আছে, জীবনে তামসিক, জাগতিক ও রাজসিক সব কিছুকেই মুষ্টিবদ্ধ ও কুক্ষিগত করিবার তীব্র বাসনা আছে, কিন্তু সেই বাসনার সুষ্ঠু পরিপূর্ণতা ও তাহাদের তাবৎ জাগতিক ও অজাগতিক প্রার্থনার পরিপ্লুতির নিমিত্ত যে, সাধনা ও কৃচ্ছ্রসাধনের প্রয়োজন, সেই ক্লেশ স্বীকার করিবার মনোবৃত্তি বা অবকাশ তাহাদের আদৌ নাই।
তাহারা বিনা-মহড়াতেই মঞ্চে উপস্থিত হইয়া বাজিমাত করিতে বদ্ধপরিকর। বিনা-পরিশ্রমে সচ্ছল হইতে অতি-আগ্রহী। ভোগের আনন্দর প্রকৃত রসাস্বাদনের নিমিত্ত যে, পূর্ববর্তীকালীন ত্যাগের প্রয়োজন তাহাতে তাহারা সম্পূর্ণ বিমুখ। তাই তাহাদের মানসিক কাঠামোগুলি বড়োই নড়বড়ে বলিয়া প্রতীয়মান হইয়াছে তাঁহার চক্ষে। অনবধানে ঠেলা মারিলেই সেই কাঠামো, ইহাদের চারিত্রিক কাঠামো যেন রামলীলার রাবণের প্রজ্বলিত মূর্তির ন্যায় মড়মড় শব্দে খসিয়া পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আলো নিবিয়া যায়, অন্ধকার ছাইয়া ফেলে, নাসিকা ধূম্র ও ভস্মর কটুগন্ধে ভরিয়া উঠে।
ধৃতিকান্ত ঠিক জানেন না।
হয়তো তিনি ভুল।
হয়তো জীবনের চবুতরার শেষ সীমানায় পৌঁছাইয়া যৌবনকে অথবা যৌবনের যা-কিছু সুন্দর, সাবলীল, অনায়াসলব্ধ ধর্ম তাহাকেই অবজ্ঞা করিবার, তাচ্ছিল্য করিবার একটা স্বাভাবিক নীচ অথবা অন্যায় প্রবৃত্তি তাঁহার মধ্যে উদিত হইয়াছে।
এইসব যোগাযোগহীন পরম্পরা বিবর্জিত নানা কথা ভাবিতে ভাবিতে ধৃতিকান্তর মুখে এক আশ্চর্য হাসি ফুটিয়া উঠিল। এইরূপ হাসি বুঝি অভিজ্ঞ, মূলত সৎ ও সরল মনুষ্যের অধরেই ফোটে।
এইপ্রকার অকারণ হাসির মাধ্যমে ধৃতিকান্তর ন্যায় সাধারণ রক্তমাংসর মানুষ-ই অন্যকে ক্ষমা করিয়া নিজের শত্রু-মিত্র বন্ধু-পরিজন সকলের সব নীচতা, ইতরতা নি:শর্তে ক্ষমা করিয়া নিজের অজ্ঞাতেই নিজের পারিপার্শ্বিকের আবিল আবহাওয়া হইতে নিজেকে এক অনাবিল ঐশ্বরিক স্নিগ্ধ মমতায় অভিষিক্ত করিতে সক্ষম হন।
তেওহারের শারদসন্ধ্যায় বিষণ্ণ বিরক্ত ইদানীং নিস্পৃহ ধৃতিকান্তর মুখমন্ডলের কার্নিশে সেই ক্বচিৎ দেবদুর্লভ হাসি অনেকক্ষণ ধরিয়া একাদশীর চন্দ্রের ন্যায় ঝুলিয়া রহিল।
রেশমি বাইজিকে কবে প্রথম ধৃতিকান্ত দেখিয়াছিলেন আজ তাহা মনে পড়ে না।
সন, তারিখ ইত্যাদি আর কিছুই মনে নাই, মনে আছে শুধুই ক্ষণটি।
চূনারের দুর্গে দাঁড়াইয়া যাঁহারা গঙ্গামাইয়ের দুর্গ-নিম্নবর্তী শান্ত, বক্র, বড়ো উদাস রূপটি প্রত্যক্ষ করিবার সুযোগ কখনো পাইয়াছেন, তাঁহারা সকলেই দূর বিন্ধ্যপর্বতশ্রেণির শীর্ষে একটি ভগ্নপ্রায় ডাকবাংলা দেখিয়া থাকিবেন। দুর্গের পথপ্রদর্শক পাঠককে নিশ্চয় ইহাও বলিয়া থাকিবে যে, ওই বাংলা কোনো নৃপতির ছিল। নৃপতি যখন মৃগয়ায় আসিতেন তখন ওই বাংলায় উঠিতেন। তৎকালে ওই দুর্গ ও দুর্গ-পাশ্ববর্তী সমস্ত অঞ্চলসমূহ ও বিন্ধ্যপর্বতশ্রেণি ঘন অরণ্যানী পরিবেষ্টিত ছিল। তৎকাল বলিতে পাঠক কী বুঝিলেন জানি না। কিন্তু ধৃতিকান্ত যে-সময়ের কথা ভাবিতেছিলেন তাহা অদ্য হইতে কমপক্ষে ত্রিশ বৎসর পূর্বেকার কথা।
সেই রাত্রি, সেই ক্ষণটি ধৃতিকান্তর মনে আমৃত্যু বাঁচিয়া থাকিবে।
কৈশোরের টাট্টু ঘোড়া যখন পুরুষের শরীরের সকল অস্বস্তি লইয়া মুখের গুটিকয় সেই অস্বস্তির সিলমোহর মোহরাঙ্কিত করিয়া বাহককে মধ্য-যৌবনের তেজোময় বল্গাহীন শ্বেত অশ্বে স্থানান্তরিত করিয়া নিষ্কৃতি পায় সেই যমাদমি মুহূর্তের বেশ কিছুকাল পর ধৃতিকান্তর সহিত রেশমির প্রথম সাক্ষাৎকার।
পূর্ণিমার রজনি। আদিগন্ত গঙ্গামাইর সর্পিল মসৃণ শরীর চন্দ্রালোকে চিক চিক করিতেছিল। দিবাবসানে মৃগয়া সাঙ্গ করিয়া একটি শ্বেত ‘ওয়েলার’ অশ্বপৃষ্ঠে আসীন হইয়া ঢিলা বলগা হস্তে ধৃতিকান্ত ধীরে ধীরে তাঁহার আবাল্য বন্ধুর সেই বাংলাভিমুখে ফিরিতেছিলেন। নিম্নে প্রবাহিত গঙ্গামাইয়ের অপরূপ শোভা আর সুনীল আকাশের পটভূমিতে দর্পভরা চূনার দুর্গের অন্ধকার ছায়া ধৃতিকান্তর চক্ষে এক আশ্চর্য সৌন্দর্য-ছবি রচনা করিয়াছিল।
এমন সময় হঠাৎ, একেবারেই হঠাৎ সেই বাংলা হইতে নারীকন্ঠের সুর সারেঙ্গির আওয়াজ, তবলা ও ঘুঙুরের আওয়াজের সহিত মিশ্রিত হইয়া ধৃতিকান্তর কর্ণে প্রবেশ করিল।
কোনো চিকনকন্ঠী তওয়ায়েফের সুরেলা মাজা আওয়াজ সেই চন্দ্রালোকিত সান্ধ্য প্রকৃতিকে কী এক ঐশ্বরিক আনন্দে ভরিয়া দিতেছিল।
তওয়ায়েফের গলা, তম্বুরার আওয়াজ, জোড়া সারেঙ্গির সুরে দূর হইতে হোরি ধামারের বাঁট আর ঢোঁড়ন আর মোড়ন আর লচাও ধৃতিকান্তর সমস্ত সত্তা আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছিল।
অদেখা তওয়ায়েফের গলার সুর পুরাপুরি কায়েম ছিল আর তারসঙ্গে ছিল ঘষা-মাজা বাঢ়ত-বহলাওবার পারিপাট্য।
সেই নির্জন নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় বিন্ধ্যপর্বতশ্রেণির অরণ্যানী গঙ্গামাইয়ের লচক, সমস্ত মিলিয়া তওয়ায়েফের বিলমপদ আস্তাইতে ধৃতিকান্তকে ফিরদৌসি ইত্বরের খুশভরা এক ধ্যানমগ্নতায় নিমগ্ন করিয়া ফেলিল।
কখন যে, সহিসের হস্তে বলগা সমর্পণ করিয়া বন্দুক-বাহকের হস্তে ভারী দোনলা রাইফেল তুলিয়া দিয়া ধৃতিকান্ত ম্যায়ফিলে প্রবেশ করিলেন, তাঁহার হুঁশ ছিল না। কখন যে, শিকারের পোশাক-পরিহিত অবস্থাতেই তিনি ম্যায়ফিলের তাকিয়ায় হেলান দিয়া বসিয়া পড়িয়াছিলেন তাহাও ধৃতিকান্তর স্মরণ নাই।
ধৃতিকান্ত সবেমাত্র আসন লইয়াছেন, এমন সময়ে তওয়ায়েফ এক নূতন তির ছুড়িলেন।
সেই তিরের আন্দাজ আর চমকে ধৃতিকান্ত তিরবিদ্ধ শিঙাল হরিণের ন্যায় অবশ হইয়া জাজিমের একপার্শ্বে অর্ধশায়ীন অবস্থায় তাকিয়ায় মুখ গুঁজিয়া পড়িয়া রহিলেন।
তওয়ায়েফ হঠাৎ দাঁড়াইয়া উঠিয়া বিদ্যুৎচমকের ন্যায় নাচিয়া একখানি দরবারি রাগের তেরাণা গাহিয়া ম্যায়ফিলে সকলকে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধ ও চমৎকৃত করিয়া ফেলিল। সেই গান ও নাচের চমক সেই বিজলির খেলে, সেই বাইজির জাদুকরীর ন্যায় অঙ্গ-ভঙ্গিমায় ম্যায়ফিলের তাবৎ মুর্দা-দিল আদমিদের মুহূর্তমধ্যে জিন্দা-দিল আদমিতে রূপান্তরিত করিয়া দিল।
যখন গান থামিল তখন রাত কত কেহই জানেন না।
ম্যায়ফিল নিস্তব্ধ হইলে ধৃতিকান্ত বলিয়া উঠিলেন, সব ঝুট হ্যায়।
তওয়ায়েফ এতাবৎকাল দীর্ঘকায় অত্যন্ত সুদর্শন ধৃতিকান্তর ম্যায়ফিলে উপস্থিতি তেমন করিয়া লক্ষ করে নাই, কারণ সে বড়ো সুন্দর এক গভীরতার সাধনায় লিপ্ত ছিল।
‘সব ঝুট হ্যায়’ —বাক্যটিতে ম্যায়ফিলে উপস্থিত প্রত্যেকে একইসঙ্গে ধৃতিকান্তর পানে চাহিলেন।
ধৃতিকান্ত কাহারও দিকে দৃকপাত না করিয়া তওয়ায়েফের কুঞ্চিত যুগল-ভ্রূ ও সুরমাচর্চিত চক্ষু লক্ষ্য করিয়া আবার বলিলেন, সব ঝুট হ্যায়।
নবীনা তওয়ায়েফের পার্শ্বে উপবিষ্ট তাহার মাতা তাহার বিস্মিত বিব্রত অভিজ্ঞা চোখ মেলিয়া বাম হস্তের তর্জনী দ্বারা বাম গন্ডে আঘাত করিয়া বলিলেন, ঝুট হ্যায়?
কিঞ্চিৎকাল পর আবারও কহিলেন, ক্যা ঝুট হ্যায়?
বিন্ধ্যপর্বতোপরি সেই বাংলার অধীশ্বরও আবাল্য বন্ধুকে উদ্দেশ করিয়া কৌতুক ও বিস্ময়ের চক্ষে ধৃতিকান্তকে শুধাইলেন: ঝুট ক্যা হ্যায় ইয়ার? ইয়ে গানা ঝুট হ্যায় ক্যা তেরি খোয়াব ঝুট হ্যায়; না ইয়ে হুসন ঝুট হ্যায়?
ম্যায়ফিলে উপস্থিত প্রত্যেকের অধরপ্রান্তে হাসির রেখা ফুটিল।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, তাহা নহে। যে উর্দুশায়ের আমি এতাবৎকাল সত্য বলিয়া জানিতাম, তাহা আজ মিথ্যা বলিয়া প্রতিপন্ন হইল।
দোস্ত বলিলেন, শুনাও তো সাহি!
ধৃতিকান্ত আবৃত্তি করিলেন:
মাশুম নজরকা ভোলা পন
উও দিল লুভানা ক্যা জানে?
যো খুদ নিশানা বনতি হ্যায়
উও তির চালানা ক্যা জানে?
অর্থাৎ যাহাদের মন কাড়িবার নিমিত্ত পুরুষরা সদাই ব্যস্ত, তাহারা পুরুষের হৃদয় কাড়িবার কীই বা জানে? যাহারা নিজেরাই লক্ষ্য, তাহারা শর সন্ধানের কী জানিবে?
‘উমদা, উমদা। ওয়াহ; ওয়াহ’ ইত্যাদি ধ্বনি উঠিল চতুর্দিক হইতে।
রেশমি তওয়ায়েফ ঘাড় ঝুঁকাইয়া ধৃতিকান্তর রসবোধের প্রতি কুর্নিশ জানাইয়া, রসিককে নজরানা দিলেন।
এই সময়ে ধৃতিকান্তর বন্ধু কহিলেন, তুম ভি কুছ শুনাও ইয়ার। গানা কুছ তো শুনাও।
পানপাত্র হস্তে রাখিয়া হাসিয়া হাসিয়া কহিলেন। আসর এতক্ষণ নারীসুলভ বসন্তের নরম আমেজে মাখামাখি হইয়াছিল। এক্ষণে পুরুষসুলভ বর্ষার ঘনঘটা কিছু তো আমদানি করো বন্ধু।
ধৃতিকান্ত মস্তক নীচু করিয়া বসিয়া রহিলেন। নিরুত্তর।
কিয়ৎক্ষণ পর হঠাৎ রেশমি বাইজিকে উদ্দেশ করিয়া ধৃতিকান্ত কহিলেন, ম্যায় ঔর কিসিকো ইলতিমাস না মানুঙ্গা, না কিসিকি কাতর করুঙ্গা, মগর স্রিফ আপ ইলতিমাস করেঙ্গে ঔর ফরাময়েঙ্গে ত মৈ’ গানে বৈঠঙ্গে।
অর্থাৎ, অন্য কারও অনুরোধেই আমি গাহিব না, আর কাহাকেও খাতির করিব না, শুধু আপনাকেই, হে সুন্দরী, সুগন্ধি সুতনুকা গায়িকা, শুধু আপনার-ই অনুরোধে, আপনার-ই আদেশে, আমি গাহিতে পারি।
রেশমি বাইজি তখন সপ্তদশী। সেই বয়সেই সে, বহুমুজরা লইয়াছে, বহুমাল্য পাইয়াছে, বহুরহিস পুরুষের চিত্ত জয় করিয়াছে—কিন্তু সেই কৃষ্ণসার হরিণীর মতো চঞ্চলা, আসকলপক্ষীর ন্যায় স্তন্যসম্পন্না ও কোকিলকন্ঠী কৃষ্ণকলি গানেওয়ালি নাচনেওয়ালির সেই সপ্তদশী জীবনে এতবড়ো সম্মান, এমন সরল আন্তরিকতার সঙ্গে আর কখনো তাহার কস্তুরীসম হৃদয়ে বর্ষিত হয় নাই।
পাঠক! ‘প্রেম’ চিনিয়া লইতে পুরুষের প্রায়শই ভুল হয়, কিন্তু নারীর হয় না। মোহ, কাম ও প্রেমের মধ্যে যে, সূক্ষ্ম পার্থক্য তাহা নারীরা যেমন করিয়া বোঝে, তেমন করিয়া কোনো মূর্খ পুরুষ কখনোই বুঝিবে না।
রেশমি বহুক্ষণ ধৃতিকান্তর সুন্দর সুপুরুষ মুখাবয়বে চাহিয়া বলিয়াছিল। আজ মুঝকো আপনে বড়ি ইজ্জত দিয়ে হেঁ।
ধৃতিকান্ত আপন কোলের উপর তানপুরা টানিয়া লইয়াছিলেন। একপার্শ্বে আসগর মিয়া, অন্যপার্শ্বে আমজাদ সারেঙ্গি লইয়া প্রস্তুত। তবলচি রেহমানও তবলা বাঁধিয়া লইল।
তওয়ায়েফের সাথ-সঙ্গীরাই সংগত করিবে। কিন্তু এইস্থলে ধৃতিকান্ত তো গান গাহিতে আসেন নাই, আসিয়াছিলেন মৃগয়ায়। মৃগয়ায় আসিয়া এমন নিপুণ শিকারির হাতে যে, নি:শেষে শিকার হইবেন, তাহা তিনি একবারও ভাবেন নাই।
ধৃতিকান্তর এত বৎসর পরও সেই সন্ধ্যায় গীত কলি কয়টির কথা ঘুরিয়া ফিরিয়া মনে পড়ে। এমন করিয়া, এ জীবনে ধৃতিকান্ত আর কখনো সমস্ত হৃদয় ঢালিয়া গাহিতে পারেন নাই। জীবনের যে, সামান্য ফালিটি অবশিষ্ট আছে, তাহাতে তেমন করিয়া গাহিবার সম্ভাবনাও আর দেখেন না।
সেই কলিটি রেশমি বাইজির হয়তো আরও বেশি করিয়া মনে পড়ে। রেশমিই জানে।
ধৃতিকান্ত গাহিয়াছিলেন:
ইস ইশককে মখতবমে মিলতা হ্যায় সবখ পহলে
গর বসলকি খবায়িশ হো তো হসতিকো ফনা কর না।
অর্থাৎ পেয়ারের পাঠশালার প্রথম যে পাঠ সে পাঠ এই-ই। যদি মিলন-পিয়াসী হইয়া থাকো যদি প্রত্যাশা করো সত্য মিলনের; তবে তোমার ‘আপন’ বলিতে যা কিছু তোমার, আপনার সমস্ত মমত্ব, আপনার প্রতি সব ভালোবাসা, অহং সমস্ত কিছু ধুলায় ফেলিতে হইবে। মিটাইয়া দিয়া সবকিছু নিশ্চিহ্ন করিতে হইবে।
এই-ই প্রেমের সর্বপ্রথম পাঠ।
সেই চন্দ্রালোকিত যৌবনমন্ডিত ইত্বরগন্ধি রাত্রিতে, যে-গান ধৃতিকান্ত গাহিয়াছিলেন তাহার স্বর—বড়োই খুশবুভরা, সুরখোয়াবি সাচ্চা স্বর।
পাঠক! প্রেমের স্বর তো চিরদিন-ই সাচ্চাই হইয়া থাকে। সাচ্চাইয়ের পুরস্কার তো সাচ্চাইতেই মিটে, আর ঝুটাই-এর পুরস্কার ঝুটাইতে।
নীচে একটি গাড়ি থামিবার আওয়াজ হইল।
ধৃতিকান্ত ঝুঁকিয়া পড়িয়া দেখিলেন যে, গাড়ি হইতে দাসীসহ রেশমি নামিল।
বাগানের বৈদ্যুতিক আলোয় রেশমি লঘুপায়ে হাঁটিয়া আসিতেছিল। অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়াইয়া ধৃতিকান্ত অপলকে রেশমির অলক্ষ্যে তাহার পানে চাহিয়া রহিলেন।
পাঠক! জীবনে যদি আপনি কাহাকেও তেমন করিয়া ভালোবাসিয়া থাকেন নিজের সমস্ত ‘আমিত্ব’ নিভাইয়া দিয়া মিটাইয়া দিয়া বিনিময়ে ভালোবাসার জনের নিকট হইতে কিছুমাত্র প্রত্যাশা না করিয়াই ভালোবাসিয়া থাকেন, তাহা হইলে আপনি হয়তো রেশমির প্রতি ধৃতিকান্তর সেই প্রগাঢ় মমতাসম্পন্ন চাহনির তাৎপর্য কিছুমাত্র বুঝিলেও বুঝিতে পারিবেন।
ধৃতিকান্ত সিঁড়ি বাহিয়া নামিয়া অসিয়া দ্বারের নিকট পৌঁছাইলেন।
দ্বারের শিকলে শিঞ্জিনী রব উঠিল।
ধৃতিকান্ত ইচ্ছা করিয়া মজা দেখিবার নিমিত্ত কহিলেন, কে?
এখনও এই বয়সেও মজা করিবার ও মজা দেখিবার সাধ ধৃতিকান্তর মিটে নাই। মনে মনে ধৃতিকান্ত এখনও মাঝে মাঝে কিশোর হইয়া উঠেন।
দ্বারে পুনর্বার আওয়াজ হইল।
উত্তরে রেশমি কহিল, আমি।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, আমি? আমি কে? সকলেই তো আমি!
দ্বারের অপর প্রান্ত হইতে চাপা দীপ্ত হাসির আভাস ভাসিয়া আসিল।
এমন করিয়া একমাত্র রেশমিই হাসিতে জানে।
রেশমি কহিল, দরজা খোলো। আমিই। তোমার আমি।
ধৃতিকান্ত দ্বার খুলিয়া কপাট মেলিয়া দাঁড়াইলেন।
দাসী বুদ্ধিমতীর ন্যায় দ্রুতপদে উপরে উঠিয়া গেল।
রেশমি তখনও হাসিতেছিল।
তাহার দুই চক্ষু এবং অধরপ্রান্ত হইতে সেই হাসি মুছিয়া যাইবার পর সে কহিল—এখনও একইরকম রইলে তুমি। একটুও কি বদলাবে না?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, না। বদলাবার কারণ খুঁজে পাই না যে। আমাদের চারধারের সব কিছু এত ভীষণরকমভাবে বদলে গেল যে, আমাদের নিজেদেরও বদলালে চলবে কী করে?
রেশমি কহিল, চলো ওপরে যাই।
ধৃতিকান্তর পাশ কাটাইয়া যাইবার মুহূর্তে ধৃতিকান্তর হস্তে রেশমির বাহুর স্পর্শ লাগিল।
রেশমি ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া কহিল, এ কী! তোমার যে, অনেক জ্বর।
জ্বর? কই জানি না তো! এই বলিয়া ধৃতিকান্ত হাসিলেন।
বলিলেন, কতরকম জ্বর হয় তুমি জান? এ কোন জ্বর?
রেশমি রাগিয়া কহিল, তোমার সব কিছুতে এই ছেলেমানুষি আমার ভালো লাগে না। কহিয়াই, ধৃতিকান্তকে সঙ্গে করিয়া ধীরে ধীরে সিঁড়ি বাহিয়া উপরে উঠিতে লাগিল।
এক্ষণে রেশমি আসিয়া পড়িয়াছে। ধৃতিকান্তর অসুস্থ শরীরের এবং মেজাজের সমস্ত ভার-ইবর্তমানে রেশমির। ধৃতিকান্ত যত বড়ো দাম্ভিক পুরুষ-ই হউন না কেন, এই একটি অন্য আর একটি মাত্র স্থান ব্যতীত এই স্থানে তাঁহার সমস্ত জারিজুরিই পন্ড হইয়াছে। ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে।
যথাসম্ভব সত্বর বেশভূষা বদলাইয়া লইয়া স্নান করিয়া ধৃতিকান্তর ঘরের শয্যা স্বহস্তে পুনর্বার ঠিক করিয়া দিয়া রেশমি একপ্রকার জোর করিয়াই ধৃতিকান্তকে শোওয়াইয়া দিল। কক্ষের উজ্জ্বল বাতি নিভাইয়া দিয়া নীল ঘেরাটোপের অভ্যন্তরে নরম বাতি জ্বালাইয়া দিল।
তাহার পর শয্যাপার্শ্বে একটি মোড়া টানিয়া লইয়া আসিয়া বসিল।
ধৃতিকান্তর কপালে হাত দিয়া চিন্তিত কন্ঠে কহিল, জ্বর তো অনেক দেখছি। আবার বুঝি অত্যাচার করেছ?
ধৃতিকান্ত হাসিয়া কহিলেন অত্যাচার? একমাত্র তোমার উপর ছাড়া কোনোদিনও কোনোরকম অত্যাচার-ই তো আর কারও উপরেই করিনি।
রেশমি বলিল, তোমার উকিল হওয়া উচিত ছিল। তোমার সঙ্গে কথায় পারিনি কখনো; পারবও না।
—চেষ্টাও কোরো না।
—তোমার উদ্দেশ্যটা কী বলতে পারো? মরতেই যদি চাও তাহলে আমার কাছে আসা কেন? মরার সময়েও কি আমাকে জ্বালাবে এমন করে?
—তুমি জ্বলো কেন? আমার জন্যে জ্বলার দরকার কী? তুমি তো এমনিতেই সবসময়ে উজ্জ্বল।
—এসব থিয়েটারি কথা তোমাদের বাংলাদেশের শরৎবাবুর নাটক-নভেলের লোকেরা বলত। শ্রীকান্তর পিয়ারী তার জন্যে বোকার মতো সব কিছু করেছিল বলে তুমি ভেবো না, আমি তোমার পিয়ারী হতে যাব। ওসব দিন আর এখন নেই।
আছে—আছে। ধৃতিকান্ত কহিল।
না। নেই। রেশমি কহিল।
ধৃতিকান্ত কহিল, কলকাতা ছেড়ে বেনারসে কেন এলাম জান এবার?
—কেন?
—কলকাতায় ছইওয়ালা একটাও গোরুর গাড়ি পাওয়া গেল না বলে।
—তার মানে?
—তার মানে ডাক্তার ভৌমিক আমার লিভার টিপে যেদিন বললেন যে, তোমার সময় হয়ে গেছে ধৃতি, এবার একটা দামি শাল গায়ে জড়িয়ে কোনো ছইওয়ালা গোরুর গাড়ি চড়ে তোমার যদি কোনো পার্বতী-টার্বতী থাকে তাহলে তার বাড়ির সামনে গিয়ে নিরুপদ্রবে মরতে পারো।
—তা গোরুর গাড়ি পেলে না, না হয় ট্যাক্সি করেই যেতে। পার্বতী তো সেখানেই ছিল। উষ্মার সহিত রেশমি কহিল।
—ছিল না, ছিল না। পার্বতী সে হতে পারল কই?
তারপর ধৃতিকান্ত একটু থামিয়া কহিলেন, কলকাতায় কি খোঁজ করলে ছইওয়ালা গোরুর গাড়ি পাওয়া যেত না; যেত। সেখানে খোঁজ করলে বাঘের দুধ পাওয়া যায়, আর গোরুর গাড়ি! আসলে পার্বতীই পাওয়া গেল না।
তারপর একটু থামিয়া কহিলেন, তুমিই বলো পার্বতী কি সকলে হতে পারে—না হতে জানে?
রেশমি কহিল, আমি তা বলব কী করে? তোমার অনেক প্যায়েরভি শুনেছি, হরকত দেখেছি—এখন দয়া করে একটু চুপ করে থাকো। মুরতেজাকে পাঠিয়েছি ডাক্তার জয়সওয়ালকে নিয়ে আসতে, তিনি এসে যা বলবেন, তার নড়চড় হবে না। যা করতে বলবেন তাই-ই করতে হবে। কোনোরকম বেয়াদবি চলবে না তোমার। আমি আর কেউ নই। তোমাকে কী করে ঢ্ঢি করতে হয় তা আমি জানি।
—তা আবার জান না! হাসিয়া ধৃতিকান্ত কহিলেন।
ধৃতিকান্তর জ্বরটা এক্ষণে বেশ বেশিই আসিয়াছে। বর্তমানে পেটে সবসময়েই ব্যথা করে! শারীরিক ও নানারূপ মানসিক কারণে ধৃতিকান্ত বেশ কয়েক বৎসর হইল নিজের মৃত্যুকামনা করিয়া আসিতেছেন, কিন্তু ‘মৃত্যু’ কাহারও কামনার তোয়াক্কা করে না। যে তাহাকে কামনা করে, তাহার কামনা পূরণ করে না। যে তাহাকে ভয় পায়, তাহার নিকট বিনা-নোটিশেই আসিয়া উপস্থিত হয়।
মুখে যে-প্রকার লঘুবাক্যই কহুক না কেন, ধৃতিকান্তর মুখপানে চাহিয়াই রেশমি বুঝিতে পারিয়াছিল যে, তাঁহার শরীরাভ্যন্তরে নিদারুণ কোনো যন্ত্রণা বোধ হইতেছে।
ধৃতিকান্তর যন্ত্রণার ছাপ রেশমির কুঞ্চিত ভ্রূতে প্রতিবিম্বিত হইল।
রেশমি ধৃতিকান্তর বাম হস্তটি স্বীয় ক্রোড়ে তুলিয়া লইয়া তাহার দুই নরম করকমলে ধরিয়া রহিল।
ধৃতিকান্ত যেন স্বপ্নমধ্যে কহিলেন, বড়োভালো লাগে জান।
—কী?
—তোমার কাছে একটু থাকতে পেলে। তুমি কাছে থাকলে বড়োশান্তি লাগে।
—শান্তির দাম কী? অন্য জন তোমাকে শুধু বাইরের শান্তিই দিতে পারে। অন্তরের শান্তি তো তোমার নিজেকে পেতে হবে। সে শান্তি তো বাইরের কেউই তোমাকে দিতে পারে না। এমনকী তোমার রেশমিও না।
অন্তরের ‘শান্তি’ বলতে তুমি কী বলতে চাইছ?
কী আবার? বিরক্ত গলায় রেশমি কহিল, তুমি বুঝতে পারো না কী বলতে চাইছি?
—না। সত্যি পারি না। কী?
—যে তোমার সবচেয়ে কাছের লোক তার কাছ থেকেই শান্তি পেলে না। না পেয়ে শান্তি দিতেও পারলে না তাকে। সেই একজনের-ই মন পেলে না তুমি! তোমাকে শান্তি দেব আমি কী করে? আমি তো একজন সস্তা সহজলভ্যা তওয়ায়েফ। সে সাধ্য আমার কি আছে? আমার সাধ্য কতটুকু?
ধৃতিকান্তর কপালে বলিরেখা ফুটিয়া উঠিল। এতাবৎকাল যে, শারীরিক যন্ত্রণা তাঁহার মুখমন্ডলে অঙ্কিত ছিল, সে যন্ত্রণা ছাপাইয়া উঠিয়া গভীরতর কোনো যন্ত্রণার ছায়া তাঁহার সমস্ত মুখমন্ডল অন্ধকার করিয়া তুলিল।
বড়ো বেদনার সহিত ধৃতিকান্ত কহিলেন, আঃ রেশমি আর কেন? এক-ই কথা কতবার আর কতরকম করে বলবে? শান্তি চাই না। তোমার কাছেও শান্তি চাই না। তুমি যাও!
অভিমানভরে ধৃতিকান্তর হস্ত স্বীয় ক্রোড় হইতে শয্যামধ্যে নিক্ষেপ করিয়া রেশমি মোড়া ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।
কহিল, ডাক্তার আসতে এতদেরি করছে কেন তা টেলিফোনে জিজ্ঞেস করতে হবে।
বলিয়াই, রেশমি দ্রুতপদে কক্ষ ছাড়িয়া চলিয়া গেল।
সে চলিয়া গেল বটে কিন্তু কক্ষমধ্যে তাহার সদ্যস্নাতা শরীরের সুগন্ধ রাখিয়া গেল।
কিয়ৎক্ষণ পরে একটি সাইকেল-রিকশা থামিবার শব্দে ধৃতিকান্ত বুঝিলেন যে, ডাক্তার আসিলেন।
রেশমি ডাক্তারকে সঙ্গে লইয়া কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিল।
তাহার মনের উদবেগ মিথ্যা-বিরক্তি দ্বারা ঢাকিয়া কহিল, ভালো করে দ্যাখো তো জয়সওয়াল ভাইয়া। শক্ত হাতে এঁর চিকিৎসা করো। নইলে আমাকে খুনের দায়ে পড়তে হবে।
ডাক্তার জয়সওয়াল ধৃতিকান্তকে বহুবৎসর হয় জানিতেন।
কহিলেন, ওঁর চিকিৎসা ওঁর নিজের হাতে। আমি নিমিত্তমাত্র। আমি ওষুধ লিখে দিতে পারি, পথ্য বলে দিতে পারি; কিন্তু বাঁচামরা ওঁর নিজের হাতে।
আরও বিরক্ত হইয়া রেশমি কহিল, তাহলে আর ডাক্তারি করো কেন? ছেড়ে দিয়ে পিপুলতলায় বসে ফকির হয়ে গেলেই পারো। বক্তৃতা রেখে চিকিৎসা যাতে ভালো করে হয়, তাই-ই করো।
ডাক্তার কোনো উত্তর দিল না। সে রেশমিকে ভালো করিয়াই জানে। রেশমির সহিত ধৃতিকান্তর সম্পর্কের কথাও তাহার অজানা নহে। কিন্তু এই সম্পর্ককে সে কখনো ব্যাখ্যা করিতে পারে নাই। এই সম্পর্কের সঙ্গে পৃথিবীর অন্য অনেকানেক সম্পর্কর কোনোই মিল নাই। এই সম্পর্কর কোনো ব্যাখ্যা হয় না বলিয়া তাহার বোধ হয়।
ডাক্তার ধৃতিকান্তকে পরীক্ষা করিয়া কক্ষ হইতে বাহিরে আসিয়া সিঁড়ির নিকটে দাঁড়াইলেন।
রেশমির মুখ গম্ভীর।
রেশমি নিম্নকন্ঠে শুধাইল, কী বুঝলে ডাক্তার?
জয়সওয়াল নিম্নস্বরে কহিল, একেবারেই ভালো নয়। দিন আর বেশি বাকি নেই। বড়োজোর মাস দুই। সিরোসিস অফ লিভারের এমন খারাপ কেস আমি এতদিন ডালকা-মন্ডিতে, যেখানে শরাবিদের ম্যায়ফিল, যেখানে আমার পশার, সেখানেও দেখিনি। সত্যিই বলছি, আর দিন বেশি নেই।
রেশমি তাহার ঘনকৃষ্ণ অক্ষিপল্লব তুলিয়া গভীর বিষণ্ণতার সহিত জয়সওয়ালের পানে তাকাইল। তাহার পর মুখ আনত করিয়া কহিল, কিছুতেই বাঁচানো যায় না?
—না। কিছুতেই না।
তাহার পর জয়সওয়াল কহিল, এখন উনি যাতেই আনন্দ পান, তাই-ই করতে দেওয়া উচিত। শেষ দিন ক-টি যাতে আনন্দে থাকেন, শুধু তাই-ই করা দরকার। এ ছাড়া করার কিছুই দেখি না।
বুঝলাম। রেশমি কহিল।
ডাক্তার জয়সওয়ালের রিকশা পথের ধুলায় ‘কির কির’ শব্দ তুলিয়া চলিয়া গেল।
ধৃতিকান্ত শয্যায় শুইয়া সেই শব্দ শুনিলেন।
সেই শব্দ মিলাইতে-না মিলাইতে বাহিরে একটি গাড়ি থামিবার আওয়াজ হইল। গাড়ি হইতে একইসঙ্গে একাধিক ব্যক্তির নামিবার আওয়াজ শুনা গেল।
‘ধপ ধপ’ শব্দে গাড়ির দরজা খুলিবার ও বন্ধ হইবার আওয়াজও শুনা গেল।
ধৃতিকান্ত ভাবিলেন, হয়তো কেহ রেশমির নিকট আসিয়া থাকিবে।
দ্বারের শিকলে আবার শিঞ্জিনী রব উঠিল।
মুরতেজা সিঁড়ি বাহিয়া নামিয়া দ্বার খুলিয়া দিল, সে আওয়াজও ধৃতিকান্তর কর্ণে আসিল। দ্বার খুলিয়া দিতেই একইসঙ্গে সিঁড়িতে অনেকগুলি পদধ্বনি শুনিলেন ধৃতিকান্ত।
আগন্তুকেরা সিঁড়ি বাহিয়া উঠিতেছে।
কে যেন জড়িত কন্ঠে ডাকিল, রেশমি—কাঁহা হ্যায় তু রেশমি? মেরি পেয়ারি।
সঙ্গে সঙ্গে আরও দু-তিনজনের কন্ঠে একইসঙ্গে রেশমির নাম ধ্বনিত হইল।
রেশমি বোধ হয় তাহার কক্ষ হইতে বাহিরে আসিয়া অভ্যন্তরের বারান্দায় দাঁড়াইল।
তাহার কন্ঠস্বরে বিরক্তি ও ক্রোধের আভাস ফুটিল।
রেশমি কহিল, কা বাত রঘুনন্দনবাবু?
যাহাকে উদ্দেশ করিয়া রেশমি প্রশ্ন ছুড়িল, সে অত্যন্ত জড়িত কন্ঠে কহিল, বাত ক্যা? গানা শুনেগি জারা।
রেশমি কহিল, এখন আমার পক্ষে গান গাওয়া সম্ভব নয়। অন্যের ইচ্ছামতো আমি আর গান গাই না।
কে একজন কহিয়া উঠিল, দেহ বেচে আর গলা বেচে বেশ ভালোই রেস্ত করে নিয়েছ বলো?
রেশমি কহিল, তাতে আপনার কী? জবান সামহালকে বাত কিজিয়ে।
রঘুনন্দন কহিল, তোকে রাগালে ভারি ভালো দেখি আমি মাইরি রেশমি। ঠিক আছে। গান নাই বা শোনালি, একটু গল্প তো কর। শুধু তুই আর আমি। খাটে শুয়ে একটু গল্প-টল্প; একটু আদর-টাদর।
তাহার পর-ই কহিল, এখুনি বুঝি চান করলি? লা-জওয়াব দেখাচ্ছে তোকে, যদিও সাজুগুজু করিসনি—বলিয়াই, জড়িত কন্ঠে আবৃত্তি করিল:
উলঝি সুলঝি রহনে দেও
কিঁউ শরপর আফৎ লাতি হো।
দিলকা ধড়কান বাড়তি হ্যায়
যব বাঁলোকো সুলঝাতি হো।
ধৃতিকান্ত শয্যায় শুইয়াই মনে মনে শায়েরের বাংলা তর্জমা করিয়া লইলেন। অর্থাৎ উশকোখুশকোই থাকো। বিনা সাজেই ভালো। এমনিই তো তোমাকে দেখে মরে থাকি। তার ওপর চুলটুল আঁচড়ে আমার বুকের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে তোমার লাভ কী?
তারপর পুনরায় কহিল সেই আগন্তুক, দেখ স্বপ্নের মধ্যে তোকে বহুবার পেয়েছি— একবারটির তরে জীবনে পেতে চাই।
রেশমি বলিল, আপনাদের জোড়হাত করে বলছি, আপনারা যান। আমি আজকাল আর গান গাই না। কারও সামনেই না। তা ছাড়া আমার ঘরে বিমারি রিস্তাদার আছে।
একজন বলিল, এমন জওয়ানি এমন খুশবু—এমনিই মাঠে মারা যাচ্ছে?
অন্যজন আবার শায়ের আওড়াইল :
সামা জ্বলতি হ্যায় যিসমে কোই উজালা হি নেই।
হুসন বেকার হয় যিসকা কোই চাহনেওয়ালা হি নেহি।
অর্থাৎ সে প্রদীপের কী দাম, যে প্রদীপ উজ্জ্বল হয়ে নাই-ই জ্বলল—? সুন্দরীও তো বেকার—যার কোনো চাহনেওয়ালাই নেই।
রঘুনন্দন কহিল, রিস্তাদার? কে রিস্তাদার?
এইবারে রঘুনন্দনের স্বর রুক্ষ হইয়া উঠিল।
ধৃতিকান্তর উদরের যন্ত্রণা অত্যন্ত তীব্র হইয়াছিল। জ্বরও অনেক। তবুও তিনি শয্যা ছাড়িয়া উঠিয়া ধীরে ধীরে দুয়ার ঠেলিয়া আসিয়া বারান্দায় দন্ডায়মান হইবার পূর্বেই রেশমির ওপর বলপ্রয়োগ করিয়া রঘুনন্দন রেশমিকে তাহার সাঁড়াশির ন্যায় হস্তদ্বারা টানিয়া হ্যাঁচড়াইয়া শয্যাকক্ষে পৌঁছিয়াছে।
রেশমির চিৎকার, মত্ত লোকগুলির হায়নার ন্যায় অট্টহাস্য, সমস্ত মিলিয়া ধৃতিকান্ত তাঁহার মস্তিষ্কমধ্যে এমন-ই উত্তেজনা বোধ করিলেন যে, অত্যন্ত অসুস্থতা ও বার্ধক্য সত্ত্বেও আপনাকে সামলাইতে পারিলেন না।
রেশমির বন্ধ দুয়ারে তিনি সজোরে পদাঘাত করিলেন।
একদিন ছিল, যখন ধৃতিকান্ত একাই এই সবকয়টি নীচ ইতর কামিনা মনুষ্যদিগকে ঠাণ্ডা করিয়া দিতে পারিতেন খালিহাতেই। কিন্তু এক্ষণে, ধৃতিকান্তর সে যৌবন নাই, শরীর অবসন্ন; অসুস্থ। এক্ষণে কি তিনি রেশমির ইজ্জত বাঁচাইবার জন্যে কিছুমাত্রও করিতে পারিবেন?
ধৃতিকান্তকে রেশমির দুয়ারে পদাঘাত করিতে দেখিয়া দুইটি লোক ছুটিয়া গিয়া ধৃতিকান্তর উদরে যুগপৎ সজোরে পদাঘাত করিল।
একজনের আঘাত ধৃতিকান্তর যকৃত-এ লাগিল। প্রায় জ্ঞান হারাইয়া ধৃতিকান্ত ভূমিতে পতিত হইলেন।
ভিতর হইতে রেশমির চাপা ক্রন্দনের সহিত মিশ্রিত হইয়া কোনো জানোয়ারের আদিম স্বর ভাসিয়া আসিতেছিল।
মুরতেজা কোথা হইতে একটি যষ্টি লইয়া আসিয়া আগন্তুকদের মধ্যে একজনের মস্তকে সজোরে আঘাত করিল।
সে তৎক্ষণাৎ ‘হ্যায় রাম’ বলিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল।
সে পড়িয়া যাইবামাত্র অন্য সকলে মুরতেজার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া, তাহার-ই হস্তের যষ্টি কাড়িয়া লইয়া তাহাকে আঘাতের পর আঘাত করিয়া রক্তাক্ত ও অর্ধমৃত করিয়া ফেলিল।
কতক্ষণ পর ধৃতিকান্তর জ্ঞান ফিরিয়া আসিয়াছিল তিনি জানেন না।
একদিন যিনি সবল ছিলেন কিন্তু আজ যিনি অসহায় দুর্বল, তাঁহার পক্ষে নিষ্ক্রিয় দাঁড়াইয়া প্রিয়জনের অসম্মান নিজচক্ষুতে প্রত্যক্ষ করার ন্যায় তীব্র ঘৃণাময় অনুভূতি আর বোধ করি কিছুই হইতে পারে না।
তিনি ধীরে ধীরে দুয়ার ধরিয়া উঠিয়া দাঁড়াইতেছিলেন এমন সময়ে ভিতর হইতে দ্বার খুলিয়া গেল।
ধৃতিকান্ত দ্বারের সম্মুখে দন্ডায়মান রঘুনন্দনের বক্ষের উপরে ঝুঁকিয়া প্রায় তাহার বক্ষোপরিই পড়িয়া গেলেন।
রঘুনন্দন তাঁহাকে এক ঠেলা মারিয়া পুনর্বার মাটিতে ফেলিয়া দিল।
ধৃতিকান্ত ভালো করিয়া এই প্রথম ধুতি ও পাঞ্জাবি পরিহিত রঘুনন্দনের পানে চাহিলেন। তাহার প্রতি চাহিয়া থাকিতে থাকিতে ধৃতিকান্তর এই প্রত্যয় জন্মিল যে, এই পৃথিবীতে এক ধরনের ‘মনুষ্য’ নামক জানোয়ার বাস করে তাহাদের অবয়ব, কথোপকথন, চাল-চলন কিছুই মনুষ্যোচিত নয়। তাহারা যেন-তেন প্রকারেণ প্রচুর জনবল ও অর্থের অধিকারী হইয়া এই দেশের সমুদয় প্রাপ্তব্য ও অপ্রাপ্তব্য বস্তুকেই নিজেদের কুক্ষিগত করিয়া ফেলিতে ফেলিতে এই বিশ্বাস জন্মাইয়া ফেলিয়াছে যে, পৃথিবীতে এমন কিছুই নাই যাহা অর্থের বা প্রতিপত্তির বা বাহুবলের বিনিময়ে পাওয়া যায় না।
ধৃতিকান্ত উন্মুক্ত কবাটের মধ্য দিয়া চাহিয়া দেখিলেন, রেশমি উদ্ভ্রান্ত বিস্রস্ত অবস্থায় উপুড় হইয়া শয্যামধ্যে পড়িয়া আছে। তাহার কবরী খসিয়া ভাঙিয়া পড়িয়াছে। শ্রাবণের মেঘরাশির ন্যায় তাহার কেশভার তাহার পৃষ্ঠ ছাইয়া আছে।
রঘুনন্দন দুয়ারে দাঁড়াইয়া পাঞ্জাবির পকেট হইতে একটি মোটা দশটাকার নোটের পুলিন্দা বাহির করিয়া হতবুদ্ধি অপমানিতা রেশমির দিকে নিক্ষেপ করিয়া হাস্যমিশ্রিত ঘৃণাভরে কহিল, সব গুড় গোবর হোয়ে গ্যাও। লেরে রেশমি, গোবরকি কিম্মত।
ধৃতিকান্ত উঠিয়া দাঁড়াইলেন।
কহিলেন, জবান সামহালকর বাত কিয়া করো কামিনা। তেরা আঁখ উখাড় লেগা ম্যাঁয়।
রঘুনন্দন ধৃতিকান্তকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়াই রেশমিকে উদ্দেশ করিয়া কহিল, ই গন্ধা জাগেমে ইয়ে গোবরকা লিয়ে তেরি পাস ঔর কভভি না আউঙ্গা।
ধৃতিকান্ত কিছুমাত্র বলিবার বা করিবার পূর্বেই রঘুনন্দন কোমর হইতে একটি চাকচিক্যময় ছয়-ঘরা রিভলবার বাহির করিল।
কহিল, পহচান্তা তু মুঝকো? ক্যা রে বাঙ্গালি বাবু, দেখোগে মেরি জবান?
ধৃতিকান্ত ম্লান হাসিলেন।
কহিলেন, নিশ্চয়ই দেখব। তবে আজ নয় রঘুনন্দন। আজ তুমি মাতাল হয়ে আছ। আর একবার অন্তত আসতে হবে তোমাকে এই গন্ধা জায়গায়। সাবধানে থেকো রঘুনন্দন। ভেট তুমসে হোগা। জরুর হোগা।
ধৃতিকান্তর কথা শেষ হইতে না হইতেই রঘুনন্দনের সুরামত্ত অনুচরেরা পুনরায় আসিয়া তাঁহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল। তাঁহার উদরে পুনরায় পদাঘাত করিল।
একজন যষ্টির বাড়ি মারিল। তাহা ধৃতিকান্তর মস্তকে না পড়িয়া স্কন্ধে পড়িল।
ধৃতিকান্তর ধারণা হইল, তাঁহার বাম স্কন্ধটি যেন, চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া গেল।
মুহূর্তমধ্যে আগন্তুক রঘুনন্দন তাহার বশংবদদিগের সহিত যেমন-ই ঝড়ের বেগে আসিয়াছিল, তেমন-ই ঝড়ের মত্ততায় ফুল ঝরাইয়া পাতা উড়াইয়া চলিয়া গেল। একবারও পশ্চাতে চাহিয়া দেখিল না।
ধৃতিকান্তর তখন নিজের বা রেশমির কথা ভাবিবার অবকাশ ছিল না। তাঁহার অন্তর-শরীর ও বাহির-শরীরের সমুদয় যন্ত্রণার কথা বিস্মৃত হইয়া দাসীকে দিয়া একখানি গাড়ি ডাকাইয়া সত্বর বেহুঁশ মুরতেজাকে লইয়া ডাক্তার জয়সওয়ালের গৃহাভিমুখে চলিলেন।
দাসী এতক্ষণ তাহার কক্ষমধ্যে শিকল তুলিয়া দিয়া বসিয়াছিল। রঘুনন্দনের অনুচরবর্গের চাহনি নাকি আদৌ পছন্দ হয় নাই।
আগন্তুকেরা চলিয়া যাওয়ামাত্রই, সে কক্ষ হইতে নির্গত হইয়া উচ্চকন্ঠে ক্রন্দন জুড়িয়া দিল।
মুরতেজাকে হাসপাতালে লইয়া যাইলেই উত্তম হইত। কিন্তু তৎক্ষণাৎ লইয়া গেলে পুলিশে ডায়ারি করিতে হইবে।
ডায়ারি করিতে অসুবিধা ছিল না কোনো। কিন্তু ধৃতিকান্তর এরূপ জ্ঞান ছিল যে, কোতোয়ালির পুস্তকমধ্যে সমস্ত অন্যায় নথিভুক্ত করার সহিত, সেই অন্যায়ের আশু প্রতিবিধান ও শাস্তির আদৌ কোনো সংযোগ নাই। এতদব্যতীত রেশমির ইজ্জৎ-এর কথা ভাবিয়া, ধৃতিকান্ত তাহা না করাই মনস্থ করিলেন। সেই মুহূর্তে ধৃতিকান্তর মনে রেশমির ইজ্জৎ-এর ভাবনা ব্যতীত অন্য কোন ভাবনা ছিল, তাহা ধৃতিকান্তই জানেন।
পাঠক! আপনার মনে হইতে পারে যে, রেশমির বৃত্তি নৃত্যগীত, অতএব রেশমির ন্যায় নাচনেওয়ালি-গানেওয়ালির আবার ইজ্জত কী?
এই প্রশ্ন আপনার মনে আসা অস্বাভাবিক নহে। কিন্তু যাঁহারা তৎকালীন তওয়ায়েফদের জানিতেন তাঁহারা বিলক্ষণই জ্ঞাত ছিলেন যে, ইজ্জত তাঁহাদের নিশ্চয়ই ছিল।
প্রকৃত তওয়ায়েফ শুধু গীত-ই গাহিতেন নৃত্যই করিতেন। বংশপরম্পরায় নৃত্য করিতে করিতে তাঁহাদের পায়ের অঙ্গুলিসমূহ একটি বিশেষ গড়ন পাইত। তাঁহারা যত্র-তত্র যাহাকে তাহাকে শরীর দান করিতেন না। আদৌ যদি-বা করিতেন ভালোবাসিয়াই করিতেন, কিন্তু কাহাকে যে, করিতেন তাহা তওয়ায়েফের খাস দাসীরাও পর্যন্ত বহুসময় জানিতে পারিত না।
যে তওয়ায়েফের শরীরের খবর রাখাই দুরূহ ছিল তাহার মনের খবর রাখা তো ততোধিক দুরূহ হওয়াই স্বাভাবিক। এতদবতীত ইজ্জত এমন-ই এক বস্তু যে, কেহ কেহ তাহা লইয়াই জন্মায় এবং তাহা লইয়াই কবরে যায়।
আবার কেহ-বা এ বস্তু যে, কী তাহা জন্ম হইতে মৃত্যু পর্যন্ত কখনো জানিবার সুযোগ পর্যন্ত পায় না।
পাঠক নিশ্চয়ই স্বীকার করিবেন যে, ভিক্ষা লওয়া যাহার বৃত্তি, সেই ভিখারিনিরও ইজ্জত বলিয়া কোনো বস্তু থাকে। কখনো বা কোনো দুর্বিনীত দাতার ঔদ্ধত্যে ভিখারিনির ইজ্জতও আহত হইতে পারে। এবং হৃদয়ের অভ্যন্তরস্থ সেই অতিকোমল গোপন অসূর্যম্পশ্যা স্থানটিতে আঘাত লাগিলে ভিখারিনিও ভিক্ষালব্ধ মূল্যবান ধন অবহেলাভরে ধুলায় ফেলিয়া দর্পভরে চলিয়া যাইতে পারে।
কিন্তু রেশমি কখনো ভিখারিনি ছিল না। কোনো বাবদেই না। ধৃতিকান্ত এ জীবনে রেশমির ন্যায় আত্মসম্মান-জ্ঞানসম্পন্ন গরবিনি অভিমানিনী কোনো নারীই দেখেন নাই।
ডাক্তার জয়সওয়াল যে-রোগীকে কিয়ৎক্ষণ পূর্বে জবাব দিয়া আসিয়াছিলেন তাঁহাকেই একজন আহত ব্যক্তির জিম্মাদারি লইয়া গাড়ি করিয়া তাঁহার নিকট আসিতে দেখিয়া যারপরনাই বিস্মিত হইলেন।
ডাক্তার জয়সওয়াল মুরতেজাকে লইয়া তাঁহার দাওয়াখানার অভ্যন্তরস্থিত ক্ষুদ্র কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন।
দাওয়াখানার বারান্দায় একটি চৌকিমধ্যে বসিয়া ধৃতিকান্ত পথবাহিত অবিরাম জনস্রোত, সাইকেলরিকশা ও গাড়ির স্রোতের দিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে চাহিয়া নানা কথা ভাবিতেছিলেন।
এই জীবনে ধৃতিকান্ত অনেক ভোগ করিয়াছেন, দুই চক্ষু মেলিয়া অনেক সৌন্দর্য দেখিয়াছেন, কান ভরিয়া শুনিয়াছেন নূপুরের ঝুমঝুম, চুড়ির নিক্কণ, অবশ-করা সংগীত। সমস্ত স্পর্শেন্দ্রিয় দ্বারা এ সংসারে যাহা কিছু রেশম-পেলব স্পর্শিতব্য সপ্রাণ ও নিষ্প্রাণ বস্তু আছে তাহা, স্পর্শ করিয়াছেন, ঘ্রাণেন্দ্রিয় দ্বারা তাবৎ সুগন্ধ নি:শেষে শুঁকিয়া লইয়াছেন।
এ জীবন সম্বন্ধে তাঁহার কোনোই খেদ নাই।
খেদ এইটুকুই যে, কোনো একজনের অঙ্কশায়িনী হইয়া, অঞ্চলাশ্রিত হইয়া তিনি বাধ্য কুকুরের ন্যায় বাঁধা থাকিতে অপরাগ হইলেন।
তাঁহার এই অপারগতা যেমন, তাঁহাকে বন্ধনহীনভাবে মুক্তির উদার আনন্দে অভিষিক্ত করিয়াছে, তেমনি তাঁহাকে ব্যথাও দিয়াছে। নিজে যত-না ব্যথা পাইয়াছেন তাহা হইতে বেশি ব্যথা পাইয়াছেন অন্যরা। অন্যের ব্যথা তাঁহাকে বরাবর-ই পীড়িত করিয়াছে।
ঈশ্বর তাঁহাকে অনেক সৌভাগ্য দিয়াছেন। অনেক মহামূল্যবান বস্তুতে ও প্রাণে তিনি মাল্যবান হইয়াছেন। কিন্তু কোনো কিছুই চিরতরে ধরিয়া রাখা তাঁহার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। যাহা কিছুই এ জীবনে পাইলেন তাহার মূল্যায়ন সম্পূর্ণ করিবার পূর্বে-ই তাহা তিনি হারাইয়া বসিয়াছেন।
ইদানীং শরীর অত্যন্ত পীড়িত হওয়ার পর একা থাকিলেই পুষ্করিণীর ঘাটে ডুবাইয়া-রাখা উচ্ছিষ্ট পাত্রমধ্যে ক্ষুদ্র মৎস্যের ঝাঁক যেরূপ ভিড় করিয়া আসে, তাঁহার মস্তিষ্কমধ্যে অতীতের ভাবনা তেমন-ই ভিড় করিয়া আসে।
বাঁধাইয়া রাখা ফ্রেমের মধ্যের মৃত ব্যক্তির ফোটো-বদ্ধ মূর্তি হঠাৎ জীবনপ্রাপ্ত হইয়া সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলে, যেমন অনুভব হইত, তেমন-ই এক অনুভূতির মধ্যে তাঁহাকে নিমগ্ন করিয়া তাঁহার সমস্ত অতীত তাঁহার চোখের সম্মুখে বারংবার আসিয়া দাঁড়ায়।
ধৃতিকান্ত অস্বস্তি বোধ করেন। ভবিষ্যৎ-এর দিকে চাহিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই বুঝিতে পারেন যে, তাঁহার ভবিষ্যৎ নাই। বর্তমানও প্রায় সম্পূর্ণ ক্ষয়প্রাপ্তির পথে।
ধৃতিকান্তর নাম কে রাখিয়াছিলেন তাহা তাঁহার স্মরণ নাই কিন্তু এতবড়ো পরিহাস আর কেহই তাঁহার সহিত অদ্যাপি করেন নাই। তাঁহার চরিত্র ও অবয়বে বুদ্ধি, ঔদার্য, প্রেম ও পৌরুষ যাহাই থাকুক না কেন ‘ধৃতি’র কণামাত্র কখনো ছিল না।
তাঁহার ন্যায় সদাচঞ্চল যাযাবর মনোবৃত্তিসম্পন্ন মানুষ এই চর্মচক্ষে তিনি নিজেও এ-সংসারে কখনোই দেখেন নাই।
কোনো বিশেষ সুখের ঘরে ঘোড়া বাঁধিতে না বাঁধিতেই ঘোড়া খুলিয়া লইয়া দ্রুতবেগে ধূলি ছিটাইয়া পথ-মধ্যস্থ প্রস্তরে অশ্বক্ষুরের অগ্নি চমকাইয়া তিনি দূর হইতে দূরান্তরে চলিয়া গিয়াছেন। পূর্বমুহূর্তের সুখটিকে অবহেলায় স্বহস্তে ভাঙিয়া ফেলিয়াছেন।
অতএব খুব-ই স্বাভাবিক কারণে তাঁহাকে কেহই বোঝে নাই। কাহাকেও তিনি নিজসম্বন্ধে কিছু বুঝাইবার চেষ্টা হইতেও সর্বদা নিশ্চেষ্ট ছিলেন। কারণ তাঁহার চরিত্রে ‘ধৈর্য’ বলিতেও কিছুই ছিল না। যে-সময় ব্যয় করিলে, তিনি নিজেকে বুঝিবার মুহূর্তের নিকটে আসিতে পারিতেন, সে-সময় ব্যয়কে ‘অপব্যয়’ ছাড়া অন্য কিছুই তিনি কখনো মনে করেন নাই।
অশ্বের ক্ষুর, তাঁহার দুর্দম ‘জেদি’ পৌরুষ তাহাকে যেস্থানে লইয়া গিয়াছে, সেস্থানেই তিনি পৌঁছিয়াছেন। একদন্ড স্থির হইয়া থাকিয়া ভাবিয়া দেখিবার অবকাশ তাঁহার জীবনে কখনো আসে নাই।
যাঁহারা পশ্চাতে চাহিয়া দেখেন এবং নিজের জীবনের কর্ম ও গতি সম্বন্ধে অনুশোচনা অথবা আত্মশ্লাঘা বোধ করিয়া থাকেন, ধৃতিকান্ত সেই সংখ্যাগরিষ্ঠদের দলে কদাপি নাম লিপিবদ্ধ করেন নাই। তিনি যূথবদ্ধতায় কোনো শর্তেই বিশ্বাস করেন নাই—করেন নাই দাসত্ব বা বন্দিত্বে—সে বন্দিদশা কোনো রাজগৃহেই হউক অথবা কোনো সুন্দরী নর্মসহচরীর শয্যাতেই হউক।
ধৃতিকান্ত এ জীবনে নারীচরিত্র যেমন বুঝিয়াছিলেন তেমন করিয়া পুরুষচরিত্র বোঝেন নাই। নারীচরিত্রের এই নীড়-বাঁধিবার, সংসারের প্রাত্যহিকতা, সন্তান-সন্ততি, ঠাকুর-দেবতা, দাস-দাসী সমভিব্যাহারে এই ‘কূপমন্ডূক’ মনোবৃত্তি তাঁহাকে বড়োই পীড়িত করিয়াছে। এ জীবনে কোনো কোনো নারীর দানে তাঁহার জীবন সুষমামন্ডিত হইয়াছে সন্দেহ নাই, কিন্তু চরিত্রের গভীর অন্তস্তলে ঈর্ষাসঞ্জাত যে-দৈন্য থাকে—যে, পুরুষকে তাহারা পাইল, তাহাকে চিরদিনের ন্যায় বন্দি করিয়া রাখিবার যে-প্রবৃত্তি থাকে, সেই প্রবৃত্তিকে তিনি চিরদিন-ই করুণা করিয়া আসিয়াছেন।
অনেকানেক পুরুষের মধ্যে অন্যের চিত্ত অথবা শরীর জয়ের যে, অতিনীচ ও অন্যদিগের প্রতি পরম-অবমাননাকর আত্মশ্লাঘা থাকে তাহা তাঁহার মধ্যে কখনো পরিলক্ষিত হয় নাই। যাঁহার নিকট হইতে যাহাই পাইয়াছেন, তাহার জন্য ঈশ্বরের নিকট তাঁহার কৃতজ্ঞতার শেষ ছিল না। যাহা কিছুই যাহাকেই দিতে পারিয়াছেন, তাহা দিতে পারিয়াই এই অনাবিল আনন্দ বোধ করিয়াছেন। আর যাহা দিতে পারেন নাই, তাহা না দিতে পারার জন্যে অন্তরের অন্তস্তলে তিনি চিরদিন এক সুতীব্র মূককষ্ট বোধ করিয়াছেন।
এ-সংসারে ধৃতিকান্তর ন্যায় অতি স্বল্প ব্যক্তিই, এমন মর্মে উপলব্ধি করিয়াছেন যে, দাতার কোনো ভূমিকাই নাই, সমস্ত তাৎপর্য ও কৃতিত্বই গ্রহীতার। যে দেয় তাহার সেই দানের মধ্যে কোনোই মহত্ত্ব নাই, যে তাহা স্বকীয় আত্মমর্যাদার সঙ্গে, স্মিতহাস্যে কোনোরূপ হীনম্মন্যতা বা উচ্চমন্যতা ব্যতীত গ্রহণ করিবার ক্ষমতা রাখে, সব কৃতিত্ব তাহার-ই। শুধুমাত্র তাহার-ই একার। এ, সংসারে উদ্দেশ্যহীনভাবে দেনা-পাওনার নীচ মনোবৃত্তির ঊর্ধ্বে উঠিয়া যাঁহারা কাহাকেও কিছু দিয়াছেন ও দিয়া অথবা কাহারও নিকট হইতে কিছু পাইয়া ধন্য হইয়াছেন তাঁহারাই একথা অন্তরে অন্তরে পরমসত্য বলিয়া জানেন।
ধৃতিকান্ত জীবনে কখনো পরাজয় স্বীকার করিতে চাহেন নাই।
এই পরাজয়ের সঙ্গে বিত্ত বা শারীরিক সামর্থ্যের কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু সংসারে এমন কেহই নাই, যিনি পরাজয় স্বীকার করিতে বাধ্য হন নাই, জীবনের কোনো-না-কোনো ক্ষেত্রে। সেই অর্থে পরাজিত তিনি নিশ্চয়ই হইয়াছেন। পরাজিত হইয়া যে-কোনো জয়ই যে, অনেকানেক পরাজয়ের মূল্যেই লভিতে হয়— সেকথা তিনি মর্মে মর্মে বুঝিয়াছেন।
সব বুঝিয়াও কখনো-কখনো মন অবুঝ হইয়া উঠিয়াছে—কিছুতেই বুঝ মানিতে চাহে নাই।
একদিন অপরিমেয় অর্থ ছিল বলিয়াই আজ কর্পদকহীন অবস্থায় তিনি ‘অর্থই অনর্থের মূল’ একথা স্বীকার করেন নাই। অথবা এই আর্থিক কারণের দুর্দশাকে অর্থের অনর্থতার সম্বন্ধে চাপাইয়া নিজের মনকে প্রবোধও দেন নাই। অর্থশালী অবস্থাতেই ‘অর্থের অনর্থতা’ সম্বন্ধে তাঁহার বিশ্বাস আজিকার ন্যায়-ই দৃঢ় ছিল। অর্থ মনুষ্যদিগের দৃষ্টিভঙ্গি আবিল করিয়া ফেলে, কিন্তু ধৃতিকান্তর দৃষ্টি কখনো অর্থের কারণে আবিল হয় নাই। কোনোরূপ জাগতিক ঐশ্বর্যই তাঁহার অন্তরের চিরন্তন অপার্থিব ও অনাবিল সৌন্দর্যকে ম্লান করিতে সক্ষম হয় নাই। যখন ভোগ করিয়াছেন, তখন চূড়ান্ত করিয়াছেন। যখন ত্যাগ করিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে, তখন সহাস্যে সর্বস্ব ত্যাগ করিয়াছেন।
অর্থ বা প্রতিপত্তির নিক্তিতে ধৃতিকান্তর বিচার কখনোই সম্ভব নহে। যদি সে-বিচার কেহ কখনো করিতে উদ্যোগীও হন।
ডাক্তার জয়সওয়াল অনেকক্ষণ ধরিয়া বিশেষ যত্নপূর্বক মুরতেজার ক্ষতস্থানগুলির কেশ মুন্ডন করিয়া ক্ষতস্থানে ঔষধ লাগাইয়া সেলাই করিয়া দিলেন। ধৃতিকান্তর স্কন্ধ ভালোমতন পরীক্ষা করিয়া কহিলেন যে, হাড় ভাঙে নাই। প্রলেপ দিবার নিমিত্ত একটি মলম দিয়া কহিলেন যে, প্রলেপ দিলে যন্ত্রণার উপশম হইবে।
অতঃপর সমস্ত কাজ সমাপন করিয়া নিজে মুরতেজাকে লইয়া গাড়িতে বসাইয়া দিলেন।
মুরতেজার ততক্ষণে জ্ঞান ফিরিয়া আসিয়াছিল।
বাটীতে ফিরিবার পথে মুরতেজার সহিত ধৃতিকান্তের নিম্নস্বরে কীসব কথোপকথন হইল।
তাহা এতই নিম্নস্বরে হইল যে, গাড়ির চালক পর্যন্ত শুনিতে পাইল না। গাড়ির পশ্চাৎপটের আরশিতে সে শুধুই দেখিতে পাইল, একজন শীর্ণ, দীর্ঘ, বয়স্ক মানুষের একজোড়া চক্ষু অন্ধকারে ব্যাঘ্রের চক্ষুর ন্যায় জ্বলিতেছে।
ধৃতিকান্ত যখন মুরতেজাকে লইয়া বাটীতে ফিরিয়া আসিলেন, তখন রাত্রি অনেক।
কোনো কক্ষেই কোনো সাড়াশব্দ নাই। রেশমির ঘরে তখনও বাতি জ্বলিতেছে। দাসী সেই কক্ষের সম্মুখের বারান্দায় মেঝের উপর অঞ্চল বিছাইয়া শুইয়া পড়িয়াছে।
এইমুহূর্তে বাহিরের ম্যায়ফিলের ঘরে ঢাকনাবিহীন তম্বুরার উপরে কোনো উড়ন্ত মাছি ক্ষণকালের জন্য বসিয়াই বোধ করি উড়িয়া গেল। তাহাতে একটি ‘পিড়িং’ ধ্বনি উঠিল।
সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে সেই সামান্য ঝংকৃত আওয়াজ নিস্তব্ধতাকে যেন, আরও গভীর করিয়া তুলিল।
ধৃতিকান্ত নি:শব্দে রেশমির কক্ষে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, রেশমি, যেমনভাবে শুইয়াছিল তেমন-ই শুইয়া আছে।
ধৃতিকান্ত রেশমির পৃষ্ঠে হস্ত রাখিয়া ডাকিলেন, রেশমি, ও রেশমি।
রেশমি প্রথমে উত্তর করিল না।
কিন্তু অমন মমতাময় সমবেদনায় ভারাক্রান্ত স্বরের উত্তরে কাহারও পক্ষে নিরুত্তর থাকা সম্ভব নহে।
রেশমি কহিল, উঁ।
রেশমি ওঠো। ধৃতিকান্ত কহিলেন।
রেশমি তথাপি উঠিল না।
তখন ধৃতিকান্ত স্বহস্তে রেশমির দুই বাহু ধরিয়া তাহাকে শয্যাপরি উঠাইয়া বসাইলেন।
ধৃতিকান্ত দেখিলেন, রেশমির মুখ কাঁদিয়া ফুলিয়া গিয়াছে, সুরমা মুখময় মাখামাখি হইয়া রহিয়াছে। অশ্রুর নামকিন গন্ধের সহিত ইত্বরের গন্ধ মিশ্রিত হইয়াছে। তাহার মুখমন্ডলে এমন-ই এক হতাশা এবং বিষণ্ণতার ছায়া ঘনাইয়াছিল যে, তাহা দেখিয়া ধৃতিকান্তর বক্ষ ভাঙিয়া যাইতে লাগিল।
ধৃতিকান্ত এ জীবনে একাধিক নারীকে ভালোবাসিয়াছেন। বিনিময়ে ভালোবাসা পান নাই, একথা বলিলে কৃতঘ্নতা হইবে। কিন্তু রেশমি তাঁহার ভালোবাসা যেরূপ দাবিহীন স্নিগ্ধ প্রশান্ততায় স্বীকার করিয়াছে এবং তাহার জীবনে প্রত্যর্পণ করিয়াছে, তাহার কোনো তুলনা তিনি দেখেন নাই।
যাহাকে ভালোবাসিয়াছেন, তাহার চক্ষু জলে ভরিয়া রহিয়াছে, তথাপি তাহার এইমুহূর্তের যন্ত্রণার সমব্যথী হওয়া ছাড়া, বর্তমানে বয়স্ক অশক্ত, অর্থহীন, প্রসার প্রতিপত্তিহীন ধৃতিকান্তর আর কিছুই করিবার নাই।
মূক ধৃতিকান্ত স্বীয় চক্ষের চাহনি দিয়া রেশমির চক্ষের সমস্ত কষ্ট শুষিয়া লইতে চাহিলেন।
অনেক, অনেকক্ষণ নীরব মর্মবেদনা ও সমবেদনায় স্তব্ধ দুইজন মানুষ একে অপরের চক্ষে চাহিয়া বসিয়া রহিল।
ধৃতিকান্ত বহুক্ষণ পর নিস্তব্ধতা ভাঙিয়া বলিলেন, ওঠো। খাবে চলো।
রেশমি কহিল, আমি খাব না।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, তুমি কি চাও আমি এখুনি তোমার বাড়ি ছেড়ে চলে যাই?
না। জোরের সঙ্গে অনুচ্চারিত অথচ বহুগভীরে প্রোথিত কোনো দাবির স্বরে তাহার সমস্ত সত্তা আবারও কহিল, না, তুমি যাবে না।
শয্যা হইতে উঠিতে গিয়া রেশমির হস্ত আবার ধৃতিকান্তের শরীরে লাগিল।
রেশমি উৎকণ্ঠিত হইয়া কহিল, তোমার গা যে, এখনও জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। একটুও কমল না যে জ্বর।
পরক্ষণেই দাসীর নাম ধরিয়া ডাকিয়া ধৃতিকান্তের পথ্য তৈয়ার করিতে বলিয়া, আদেশের স্বরে ধৃতিকান্তকে কহিল, তুমি গিয়ে তোমার ঘরে শোবে কি শোবে না!
—শোব। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না আর। —বসে থাকতেও না। যদি তুমি উঠে খাও, তাহলে এখুনি যাই!
যাচ্ছি। বলিয়া রেশমি ধীর পায় শয্যাকক্ষ হইতে বাহির হইয়া গেল।
ধৃতিকান্ত কোনোক্রমে টলিতে-টলিতে আসিয়া নিজকক্ষে শুইয়া পড়িলেন। ঘেরাটোপের মধ্যের ক্ষীণ বাতিটুকুও নিভাইয়া দিলেন।
উন্মুক্ত বাতায়ন দিয়া দশমীর চন্দ্রের আলো ঘরময় ও তাঁহার শয্যায় লুটাইয়া পড়িয়াছিল।
মাহমুরগঞ্জের এই অঞ্চলটি বেশ নির্জন। পূর্বে আরও নির্জন ছিল। ইদানীং সম্মুখের বহুবিস্তৃত কোনো মহারাজার বাটীর চত্বরে বহুঅট্টালিকা উঠিয়াছে। ইদানীং রাজা মহারাজারা ভিখারি হইয়াছেন, তাঁহাদের স্থলে রঘুনন্দনরা তাঁহাদের আসনে আসীন হইয়াছে। ইহারা তাঁহাদের সমস্ত গুণাবলি সযত্নে বর্জন করিয়া, তাঁহাদের সমস্ত দোষের উপর-ই সম্পূর্ণ জবরদখল লইয়াছে।
এই বৎসরে ঠাণ্ডা এখনও তেমন পড়ে নাই। দিনে কিঞ্চিৎ গরম বোধ হয়। সন্ধ্যার পর নদীর দিক হইতে একটি মিষ্ট বাতাস উঠে। ধৃতিকান্তর কক্ষলগ্ন মালতীলতার পাতায়-পাতায় সে বাতাস ফিসফিস শব্দ তোলে।
যে-স্থলে নূতন অট্টালিকাসমূহ উঠিয়াছে, সেই চত্বরে কোনো পাহারাদার বাঁশি বাজাইয়া সারারাত্র পাহারা দেয়। মধ্যে-মধ্যে সেই বাঁশির স্বরকে কোনো রাত-চরা পাখির স্বপ্ন বলিয়া ভ্রম হয়।
ধৃতিকান্ত শয্যাকক্ষের দুয়ারে কুলুপ লাগান নাই, কিন্তু বন্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন।
এখন বাটীর অভ্যন্তরে কোনো শব্দ নাই, বাহিরেও নহে।
কোনো পুরুষকন্ঠে বহুদূর হইতে আশাবরী রাগে কে যেন, আলাপ করিতেছে। সারেঙ্গির শব্দ নাই, তম্বুরাও নাই। কিংবা হয়তো আছে বহুদূর হইতে আওয়াজ ভাসিয়া আসিতেছে বলিয়া শুধু কন্ঠস্বরই কর্ণে বাজিতেছে।
এই গভীর প্রায়-নিস্তব্ধ চন্দ্রালোকিত রাত্রের আশাবরির কোমল স্বরটি ধৃতিকান্তকে সমস্ত শারীরিক যন্ত্রণার কাতরতা হইতে এক আনন্দময় মানসিক অবস্থায় ধীরে ধীরে উন্নীত করিতেছিল।
এমতাবস্থায় কতক্ষণ কাটিয়া গিয়াছে ধৃতিকান্ত জানেন না।
হঠাৎ দ্বারের শিকলে কোনো শব্দ হইল।
ধৃতিকান্ত শয্যায় উঠিয়া বসিলেন।
সেই শব্দ আবারও হইল।
কোনো অভিসারিণীর কোমল হস্তে বড়োআদরে সোহাগে, বড়োদ্বিধায় সেই কোমল শব্দ মাখামাখি হইয়াছিল।
ধৃতিকান্তর সমস্ত পুরাতন কথা মনে পড়িয়া গেল।
এই সেই শব্দ।
কত বৎসর অতীত হইয়া গিয়াছে, এই কক্ষে এই দ্বারে এমন-ই চন্দ্রালোকিত এক রাত্রিতে তিনি এই শব্দ শুনিয়াছিলেন।
এই শব্দ ভুল করিবার নহে।
ধৃতিকান্ত উঠিয়া আসিয়া দ্বার খুলিলেন।
দেখিলেন, চতুর্দিকের বারান্দার বাতি নিভানো।
চন্দ্রালোকে বারান্দার একটি দিক ভরিয়া রহিয়াছে।
অর্গলমুক্ত দ্বারের সম্মুখে রেশমি দাঁড়াইয়া। দীর্ঘাঙ্গী, তন্বী; রেশমি।
সে তাহার শারীরিক কালিমা মুছিয়া ফেলিবার নিমিত্ত আবারও স্নান করিয়াছে। কোন ইত্বর মাখিয়াছে তাহা সেই-ই জানে। পৃষ্ঠোপরি উন্মুক্ত তাহার কেশরাশি।
রেশমি আসিয়া ধৃতিকান্তের বক্ষে মস্তক রাখিয়া দুই বাহুতে তাহার স্কন্ধ বেষ্টন করিয়া অনেকক্ষণ নির্বাক দাঁড়াইয়া রহিল।
ধৃতিকান্ত ধুতি ও পাঞ্জাবি পরিয়াছিলেন।
রেশমি ধৃতিকান্তর বক্ষদেশে একবার অস্ফুটে চুম্বন করিল।
ধৃতিকান্ত স্বগতোক্তি করিলেন।
—কুড়ি বছর পর। তাই না? কুড়ি বছর পর হবে না?
শায়ীন ধৃতিকান্তর দক্ষিণ বাহুতে মস্তক রাখিয়া তাঁহার দক্ষিণ পার্শ্বে শুইয়া পড়িয়া রেশমি তর্জনীর দ্বারা ধৃতিকান্তর অধর স্পর্শ করিয়া কহিল, হিসেব করো না।
তাহার পর কহিল, কুড়ি বছর হয়ে গেল এরই মধ্যে! আমার যেন মনে হয় সেদিন।
—সেদিন-ই তো।
ধৃতিকান্ত কিঞ্চিৎ নীরব থাকিয়া কহিলেন, হিসেব করতে আমারও ভালো লাগে না। সত্যিই সেদিন। কিন্তু আমার জীবনের রেওয়া-মিল বানানোর সময় হয়েছে যে, রেশমি! খতিয়ান, জাবেদা সমস্ত কিছুতেই দাগ কেটে, হিসেব মিলিয়ে দিয়ে সকলের কাছ থেকে ছুটি নেওয়ার সময় হয়েছে। হিসেব-নিকেশ পাওনা-দেনা, বাকি-বকেয়া এসব কিছু একদিন না একদিন মেটাতে তো হয়-ই। সকলকেই হয়।
কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিলেন, তোমার কাছে যে, শুধু দেনাই রইল রেশমি। কিছুই তো শুধতে পারলাম না। শোধবার সময়ও বুঝি আর নেই। সময় থাকতে থাকতে সে দেনাটুকু অন্তত স্বীকার করে যেতে দাও।
—ওসব কথা এখন থাক। অন্য কথা বলো। পুরোনো কথা। পুরোনো দিনগুলো কত ভালো ছিল তাই না?
পরমুহূর্তেই রেশমি কহিল, ইশ তোমার জ্বরটা যে, এখনও একটু কমল না। জয়সওয়ালের ওপর ভারি রাগ হচ্ছে আমার।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, মিছিমিছি রাগ করো কেন? আমার এই জ্বর এখন আমার নিত্যসঙ্গী। একে বন্ধুভাবে মেনে নিয়েছি। এরজন্যে আমার বিশেষ কোনো অসুবিধে নেই, যতটুকু অসুবিধে তা, গা গরম থাকলেও আছে, না-থাকলেও আছে। আজকাল এক পা হাঁটলেও লিভারে ব্যথা করে। আমাকে নিয়ে আলোচনা বন্ধ করো। অন্য কথা বলো।
তাহার পর বলিলেন, আজকের রাতটা ভারি শান্ত সুন্দর, তাই না? হয়তো সব রাত-ই সুন্দর, কিন্তু সব রাতে সে-সৌন্দর্যের রূপ বুকের মধ্যে গড়িয়ে আসে না। হয়তো বহুবছর পরে তুমি আমার কাছে আছ, কাছে এসেছ তাই এই রাতের সৌন্দর্য এমন করে ধরা পড়েছে।
পরক্ষণেই ধৃতিকান্ত কহিলেন, জানো, কে একজন আশাবরিতে আলাপ করছিল একটু আগে। বড়োভালো লাগছিল। একটু চুপ করো, শুনতে পাবে।
রেশমি উৎকর্ণ হইয়া শুনিল।
তাহার পর বলিল, এ যে, সে লোক নয়। ছেলেটি সময়কালে বড়ো গাইয়ে হবে। বড়োমিষ্টি আওয়াজ। একেবারে খোলা জোয়ারি। নাড়া বেঁধেছে শিউপ্রসাদজির কাছে।
পুনরায় কহিল, ভালো করে শোনো—গানটিও তোমার জানা।
ধৃতিকান্ত মনোযোগ সহকারে শুনিতে লাগিলেন।
কিয়ৎক্ষণ শুনিবার পরে বলিলেন, চেনা-চেনা মনে হচ্ছে কিন্তু পদগুলি মনে করতে পারছি না। কতদিন গান-বাজনা ছাড়া।
রেশমি পুলকভরে শুধাইল, মনে পড়ে? পড়ে না?
তুয়া চরণ কমল পর মন-ভ্রমর ভাল ভাণ যাঁউ চন্দ্রচকোর।
—পড়েছে পড়েছে। মনে পড়েছে।
ধৃতিকান্ত কহিলেন।
এখনও যে, তাহার স্মৃতিশক্তি সম্পূর্ণ লুপ্ত হয় নাই একথা জানিয়া ধৃতিকান্ত বড়োই আহ্লাদিত হইলেন।
বহুদিন পর গানের কথাগুলি ধৃতিকান্তর মনে বিস্মৃতির দিগন্ত হইতে কোনো পেলব পক্ষীর ন্যায় দ্রুতপক্ষে স্মৃতির পিঞ্জরে ফিরিয়া আসিতেছিল।
রেশমি কহিল, মনে আছে? এ গান নিয়ে একদিন খুব বচসা হয়েছিল তোমার, আমার ও আসগরের মধ্যে। আসগর বলেছিল আশাওরির এই পদটা ধ্রুপদের ঢংয়ে গাইলেই এর মহিমা সত্যিকারের ফুটে ওঠে। আসলে, এটা যাঁর গান, তিনি নাকি ধ্রুপদ ভেবেই একে বেঁধেছিলেন। কিন্তু সেই সময় বানারসে ও অন্যান্য জায়গায় এই গান অনেকেই গাইত আর অনেক গায়ক একে খেয়ালের ধাঁচে ফেলে গাইত বলে আশাওরির মেজাজ বাঁচত না। আসলে খেয়ালের ঢংয়ে এই গান নিয়ে এদিক ওদিক হিললেই ওই গানটার মধ্যে ভৈরবী কী জৌনপুরীর খাদ এসে পড়ত। মনে পড়ে?
ধৃতিকান্তর মুখমন্ডল উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
তিনি কহিলেন, ঠিক ঠিক।
পুনরায় কহিলেন, আসগরের কথাও প্রায়-ই মনে পড়ে। সেদিনও একা বসে ওর কথা মনে করছিলাম। চলো কাল আমরা ওর কবরে গিয়ে ফুল আর মোমবাতি দিয়ে আসি। বহুদিন যাওয়া হয়নি।
চলো। রেশমি অস্ফুটে কহিল।
ধৃতিকান্ত হঠাৎ-ই কহিলেন, রেশমি একটু সরে শোও না।
রেশমি অভিমানভরে দ্রুত সরিয়া গেল।
কহিল, শোনো, তুমি আমাকে ঘেন্না করো, না? চিরদিন-ই তুমি আমাকে ঘেন্না করেছ। আমি চলে যাচ্ছি তোমার ঘর থেকে।
ধৃতিকান্ত নিরুত্তর রহিলেন।
অনেকক্ষণ পর সে নিজেই আবার কহিল, কী করব বলো? আমাদের পেশা এমন যে, এমন অপমানিত হওয়াটার ঝুঁকি বুঝি এই পেশার সঙ্গে জড়ানো থাকেই। আমি আওরত মানুষ—কী করতে পারতাম বলো?
ধৃতিকান্ত হাসিয়া উঠিলেন। কহিলেন, তুমি এখনও বড়ো হলে না? যা করার তা আমিই করব। তুমি দেখো।
তাহার পর কহিলেন, এখন অন্য কথা বলো।
রেশমি পুনর্বার কহিল, এজন্যে তোমাকে কিছুই করতে হবে না। কিন্তু সরে শুতে বললে কেন তা বলো?
ধৃতিকান্ত কিঞ্চিৎ নীরব রহিলেন। তাহার পর অনিচ্ছা সহকারে কহিলেন, পেটে ব্যথা লাগছিল। লিভারের অবস্থাটা এমন হয়েছে যে, পেটে হাত ছোঁওয়ালেই লাগে। তোমার রঘুনন্দনের পদাঘাতের ফলে সঙ্গে সঙ্গে মরে গেলাম না কেন তাই ভাবি, লোকে মণিকর্ণিকাতে মরতে আসে, আমি এসেছিলাম সেই আশায়। কিন্তু মরা হল কই? এইভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভালো।
রেশমি অনুশোচনার সহিত কহিল, ইশ। তোমার কত কষ্ট! কিন্তু এমন দশা করলে কী করে শরীরটার? তোমাকে তো আগে কখনো শরাব ছুঁতে পর্যন্তও দেখিনি আমি। এ নিয়ে তোমার দোস্তরা তোমাকে কত মজাক করেছে। তুমি শেষে শরাবি হবে, এ আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, কেন হলাম, তাই জিজ্ঞেস করছ?
তাহার পর কহিলেন, আমি নিজেও নিজেকে শুধিয়েছি, প্রায়-ই শুধোই।
পরক্ষণেই হঠাৎ কহিলেন, জানলার কাছে একটা খাতা আছে নিয়ে আসবে?
রেশমি বিস্মিত হইয়া শয্যাপরি উঠিয়া বসিল।
কহিল, কী হবে? কী আছে খাতায়?
ধৃতিকান্ত হাসিলেন।
কহিলেন, আজকালকার ছেলেরা বলে, লিভার না পচলে নাকি মগজ খোলে না। তোমার খুদা, আমার ঈশ্বরের কৃপায় এই চোখ মেলে এই কিমতি দুনিয়ায় যা দেখলাম, যা শিখলাম তাই-ইলিখতে শুরু করেছি।
পুনর্বার কহিলেন, আমি শায়ের লিখছি। শেষসময়ে তোমার চোখে গুণী হওয়ার চেষ্টা করছি।
রেশমির দুই চক্ষু উজ্জ্বল হইয়া উঠিল।
কহিল, তুমি তো তুমিই। তোমার আবার বিশেষ গুণের দরকার কী? আমি তো তার প্রয়োজন দেখি না কোনো। আমার কাছে তোমার ‘তুমি’ হওয়াটাই সবচেয়ে বড়োগুণ। অন্য কেউই যে, আমার চোখে ‘তুমি’ হতে পারল না।
ধৃতিকান্ত সস্নেহে রেশমির বাহু স্পর্শ করিয়া কহিলেন, সবার তো তোমার চোখ নেই। সবাই তো আর আমাকে তোমার চোখে দেখল না।
রেশমি কহিল, যারা দেখল না, খুদা তাদের মাপ করুন। সে বেচারাদের চোখ-ই নেই; কী করবে?
পরক্ষণেই রেশমি কহিল, আনছি খাতা। শায়ের শোনাবে তো?
আমি ভাবতে পারছি না যে, তুমি শায়ের লিখবে? মির্জা গালিবের মতো? জিগর মোরাদাবাদীর মতো?
ধৃতিকান্ত সস্নেহে কহিলেন, তুমি কি পাগল? কাদের সঙ্গে কার তুলনা? তা ছাড়া, এ তো বাংলা কবিতা। বাংলায় কবিতাই হল ‘শায়ের’। যদিও কবিতা আর শায়ের ঠিক এক নয়। তুমি কি বুঝতে পারবে?
রেশমি বাতায়ন নিকটস্থ মেজ হইতে খাতাখানি লইয়া আসিয়া ঘেরাটোপের মধ্যবর্তী স্নিগ্ধ বাতিটি জ্বালাইয়া কহিল, নাও এনে দিলাম। পড়ো, না শুনি।
ধৃতিকান্ত সম্বন্ধে বহুবৎসর হয় কেহই এত ঔৎসুক্য দেখায় নাই।
জীবনের শেষ অঙ্কে পৌঁছাইয়া, যে-অঙ্কের নিমিত্ত কাহারও কোনো কামনা থাকে না, জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী দাবিদারহীন এইসময়ের ছত্রতলে দাঁড়াইয়া কম্পমান দুর্বল ধৃতিকান্তর আজি এই গভীর রজনিতে হঠাৎ-ই মনে হইল যে, তিনি বুঝি নিভিয়া যাইবার পূর্বে নিজেকে সেই পুরাতন জরাজীর্ণ আপনাকে হয়তো প্রথমবার ভালোবাসিতে শুরু করিয়াছেন।
তাঁহার জীর্ণ রং-চটা বহুবৎসরের পুরাতন খাতাখানি উন্মুক্ত করিতে করিতে ধৃতিকান্ত ভাবিতে লাগিলেন যে, মনুষ্যমাত্রই আপনাকে যেরূপ ভালোবাসিয়া থাকে সেরূপ বোধ হয় আর কাহাকেও ভালোবাসিতে পারে না। ইহার কারণও নিশ্চয়ই আছে। কারণ হয়তো তাহার নিজের অস্তিত্ব-অনস্তিত্বর ওপর-ই তাহার পারিপার্শ্বিক সমগ্র জগতের অস্তিত্ব অনস্তিত্ব নির্ভরশীল—হয়তো সে নিজেই সেই জগতের কেন্দ্রবিন্দু। সেই কেন্দ্রবিন্দুর যখন কেন্দ্র হইতে বিচ্যুত হইবার সময় উপস্থিত হয়, সেইক্ষণে বুঝি, আপনার প্রতি প্রেম অত্যন্ত প্রগাঢ় হইয়া উঠে।
এইকথা চিত্তে উদিত হইবামাত্রই ধৃতিকান্তর আপনাকে বড়োই নীচ ও দীন বলিয়া বোধ হইল।
ধৃতিকান্ত একটি দীর্ঘনিশ্বাসত্যাগ করিয়া ভাবিলেন, রেশমি তাঁহাকে যে-প্রকার স্বার্থহীন ভালোবাসা এ জন্মে বাসিল তেমন করিয়া তিনি কখনোই রেশমিকে ভালোবাসিতে পারেন নাই। রেশমিই তাঁহার একমাত্র অচঞ্চল নিষ্কম্ন প্রেমিকা। অথচ উহার সহিত-ই তাঁহার কোনো শারীরিক সংসর্গ কখনো ঘটে নাই। একসময় রেশমি তাহা কামনা করিয়াছিল, তিনিই বিমুখ ছিলেন। কেন যে, ছিলেন তাহা আজিও বুঝিয়া উঠা সম্ভব হয় না। বর্তমানে এ প্রসঙ্গ অবান্তর। বড়োই দেরি হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এই কারণে তাঁহার চিত্তে কোনো ক্ষোভ নাই। তিনি ইহাও জানেন যে, আজ রেশমিরও ক্ষোভ নাই। নারীশরীরের প্রতি তাঁহার যে, অনাসক্তি ছিল এমন নহে, কিন্তু রেশমির সান্নিধ্যে, রেশমির চক্ষুর চাহনিতে, তিনি এ জীবনে যাহা পাইলেন ও চিরদিন পাইয়া আসিয়াছেন সেই প্রাপ্তির সহিত তুলনা করিলে তাঁহার জীবনের অন্য সমস্ত প্রাপ্তিই তুচ্ছ বলিয়া প্রতীয়মান হয়।
ধৃতিকান্ত ভাবিলেন আশ্চর্য। ঈশ্বরের কী অপার করুণা! খুদার কী দোয়া। তাহা না-হইলে এমন জাগতিক অপ্রাপ্তির মধ্যে এমন সুগভীর প্রাপ্তি লুক্কায়িত থাকা ও সেই প্রাপ্তিকে বহুযুগব্যাপী বিকশিত রাখা কী করিয়া সম্ভব হয়?
পাঠক! এই অপ্রাপ্তির মধ্যের শান্ত স্নিগ্ধ অফুরান আনন্দ শুধু তাঁহারাই বুঝিবেন— যাঁহাদের জীবনের এইরূপ গভীর প্রশান্তি লভিবার সৌভাগ্য ঘটিয়াছে।
রেশমি অধৈর্য হইয়া উঠিয়াছিল।
শয্যাপরি পা মুড়িয়া বসিয়া বাতায়নের দিকের দেওয়ালে হেলান দিয়া সে পুনর্বার কহিল, কী হল? শোনাবে না? এতবার করে বলছি, শোনাও-না বাবা!
ধৃতিকান্তর দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হইয়াছে। বালিশের তল হইতে পড়িবার চশমা বাহির করিয়া বক্ষোপরি খাতা উন্মুক্ত করিয়া কহিলেন, কেন শরাবি হলাম শোনো।
তাহার পর হঠাৎ-ই কহিলেন, এ কবিতা তুমিই প্রথম শুনবে এবং হয়তো তুমিই শেষ। এই খাতা আমি তোমাকেই দিয়ে যাব। তোমাকে দেওয়ার মতো আজ তো আমার কিছুই আর নেই।
রেশমি কহিল, ‘কিছুই’ বলতে কী বলছ জানি না। অনেক কিছুই তো দিয়েছ একদিন। যদিও সেই হিরে-জহরত-এর কোনো দাম ছিল না আমার কাছে। একথা তোমাকে বরাবর বলেছি। সেদিন তোমার কাছে এসব কিছু অনেক ছিল, তাই হয়তো আমাকে সেদিন বিশ্বাস করতে পারোনি পুরোপুরি। হয়তো ভেবেছ, আমার সেকথা তওয়ায়েফের বাঁধা বুলি। মন-রাখা কথা।
কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া রেশমি কহিল, কিন্তু আজ? আজকেও কি সন্দেহ যায়নি তোমার? এতদিনেও কি প্রমাণ পাওনি যে, তোমাকে সেই প্রথমদিন দেখার পর থেকে শুধু তোমার জন্যেই তোমাকে ভালোবেসেছিলাম!
রেশমি পুনরায় কহিল, তুমি বড়োবোকা। সব পুরুষ-ই বোকা। কিন্তু তোমার মতো এতবড়ো বোকা আমি দেখিনি!
তাই তো! ধৃতিকান্ত কহিলেন।
তাই—তো! রেশমি হাসিয়া কহিল।
তাহার পর কহিল, নইলে তুমি রেশমিকে ভালোবাসতে যাবে কেন? আর একজন তওয়ায়েফকে ভালোবেসে নিজের এ-হালই বা করবে কেন? ঘর পেলে না, সংসার পেলে না, ছেলে-মেয়েও পেলে না, আমার-ই মতো। নিজেকে নিয়ে কেউ কি এমন খেলা খেলে?
তাহার পর কথা ঘুরাইবার জন্যে রেশমি পুনরায় কহিল, তুমি কি পড়বে, না পড়বে না?
পড়ছি শোনো। ধৃতিকান্ত কহিলেন :
বোতল ছুঁয়ে করছে শপথ
প্রতিটি দিন, আর খাবে না—
দিন ঝরে যায়, দিনের মনে
কথার খেলাপ যখন তখন।।
ছিলে মিয়া অন্যরকম
হয়ে গেলে বেহেড মাতাল
কারণ কি কেউ বলতে পারে?
মিয়ার এমন অধঃপতন।।
কার্য হলে কারণ থাকেই
একটা কিংবা অনেকগুলো,
কারণগুলো ধুনে ধুনে—
বুক করেছে পেঁজা তুলো।।
পারল না তো একলহমায়
থামিয়ে দিতে কলজেটাকে
তাইতো মিয়া মরছে রোজ-ই
কিস্তিবন্দি পহচান—মরণ।।
কাঁধ ঝুঁকেছে সামনে দিকে
মাথার মধ্যে স্মৃতির পাহাড়
এই দুনিয়ার বুঝল স্বরূপ
শেয়ালকাঁটার ন্যাবার বাহার।।
উড়িয়েছিল অনেক ধুলো
নানা মুদি, হরেক জন,
ফেলে-দেওয়া ভুলের খেরো,
ঠগের হাসি, বিজ্ঞাপন।।
অনেক দূরে আসল মিয়া
আর শোনে না হাটের গোল
নদীর পাড়ে হিঁদুর মড়া
দিচ্ছে কারা হরির বোল।।
ভাবনা ভুলে ঢালল মিয়া
আওয়াজ হল : ডাবুক-বুক
হাসল মিয়া আপন মনে,
বোতল বলল? কী উজবুক!
রেশমি উচ্ছ্বসিত কন্ঠে কহিল, বা: কী সুন্দর লিখেছ তুমি! যদিও সব বাংলা কথা বুঝি না আমি, তবু মানে বুঝতে অসুবিধে হল না কোনো।
তাহার পর কহিল, আর একটা শোনাও না।
ধৃতিকান্তর পান্ডুর ক্লান্ত বলিরেখাঙ্কৃত মুখমন্ডলে এক উজ্জ্বল আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটিল। ধৃতিকান্ত স্বভাবে কবি ছিলেন, কিন্তু কখনো ‘কবি’ বলিতে যাহা বুঝায় তাহা ছিলেন না। তাঁহার এই অভিজ্ঞতাহীন ও হাস্যকর লিখন যে, রেশমির সত্য-সত্যই ভালো লাগিয়াছে—ইহা জানিয়া তিনি যারপরনাই আত্মশ্লাঘা বোধ করিলেন। যদি রেশমির ভালো লাগিয়া থাকে, তবে তাহাই ধৃতিকান্তর পক্ষে যথেষ্ট পুরস্কার। অন্য কাহারও প্রশংসার জন্য কাঙালপনা করিবার স্পৃহা অথবা সময় কিছুই তাঁহার অবশিষ্ট নাই।
রেশমি ধৃতিকান্তর গন্ডে নিজ গন্ড স্পর্শ করিয়া তাঁহার ঘন শ্বেত ও কৃষ্ণ কেশরাশির অভ্যন্তরে তাহার অঙ্গুলি চালনা করিতে করিতে কহিল, আরও শোনাও।
বহু-বহু বৎসর পর ধৃতিকান্তর অকস্মাৎ-ই মনে হইল, এত সত্বর না মরিলেও হয়তো চলিত। তিনি যে, এখনও কিছুমাত্র আনন্দ সৃষ্টি করিতে পারেন এবং সংগীতের ন্যায় অন্য কোনো সৃষ্টির দ্বারা তাহা যৎসামান্যই হউক না কেন অন্যকে আনন্দিত করিতে পারেন, এই ধারণা তাঁহার অন্তরস্থ সিন্দুকের মধ্য হইতে বহু পূর্বেই লোপাট হইয়া গিয়াছিল।
ধৃতিকান্ত সেই মুহূর্তে সমস্ত শারীরিক অস্বস্তির কথা ভুলিয়া অর্ধশায়ীন অবস্থায় উত্থিত হইলেন, তাহার পর দুই হস্তে চক্ষুসম্মুখে খাতাখানি ধরিয়া পড়িতে লাগিলেন:
কসম খেয়ে বলছে মিয়া
এই দুনিয়া চশমখোর,
ভালোই যদি ভুলেও করো,
করছ যার, সে ভাঙবে গোড়।।
ঘর্মে-কর্মে ওয়াক্ত ওসুল
মৎ-পুছো ভাই খাল-খরিয়াত
চবুতরার ঘুঘুর মতন।
মেহনতিতেই খাস-তবিয়ত।।
ভুলেও যদি খোঁজ নিতে যাও
ফায়দা কীসে, পরের আরাম,
ভাই-বিরাদর পাড়বে গালি :
মিয়া শারা সুরতহারাম।।
বলছে মিয়া দুঃখে অনেক
আপনা নিয়ে আলগা থাকো,
পরের ভাবনা পরকে ভাবাও
ট্যাঁক আর দিনের হিসেব রাখো।
রেশমি রীতিমতন উত্তেজিত হইয়া উঠিল।
কহিল, এটা আরও বেশি বুঝলাম, কারণ অনেক উর্দু কথা আছে।
তাহার পর কহিল, তুমি একটা বই ছাপাও তোমার শায়েরির।
ধৃতিকান্ত হাসিয়া উঠিলেন। কহিলেন, তুমি পাগল বলে তো আর অন্যরা পাগল নয়। অন্যদের কথা ছাড়ো, তাদের কাছে বই ছাপিয়ে নাম জাহির করে কী হবে? তুমি যে, ইনাম দিলে—তাই-ই আমার সবচেয়ে বড়ো শিরোপা। এর বেশি কী হবে? তারা তো মন্দও বলতে পারে? খামোখা আমার মনের আনন্দটা তাদের নোংরা হাতে ধুলোয় ফেলে দেওয়ার জন্য তুলে দিয়ে লাভ কী?
রেশমি সোজা হইয়া বসিয়া কহিল, কথা বোলো না, আরও শোনাও।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, সব শুনলে তো, রাত কাবার হয়ে যাবে।
যাক না! রেশমি কহিল। রাত তো কাবার হওয়ার জন্যেই। অন্য সব রাত তো বরবাদির রাত। জীবনের কত রাত তো ঘুঙুর পায়ে নেচে-নেচে আর রঘুনন্দনের মতো কত লোকের নোংরা চোখের শিকার হয়ে বরবাদ করলাম। এই একটি রাত বেহেস্ত হয়ে থাকবে। আজ সারারাত শায়েরি শুনব আমি। বরি খুশবু পাচ্ছি তোমার শায়েরিতে।
তাহার পর-ই কহিল, একটু দাঁড়াও, পানের কৌটোটা নিয়ে আসি।
কিয়ৎক্ষণ পর হংসসদৃশ রৌপ্যনির্মিত তাম্বুলকরঙ্ক হস্তে লইয়া রেশমি পুনর্বার আসিল। তাহা হইতে মঘাই পান বাহির করিয়া সুগন্ধি জর্দা সহযোগে মুখে পুরিল। মুখ খুলিয়া কথা কহিতেই সেই জর্দার খুশবু ঘরময় ছড়াইয়া পড়িল।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, আমাকে দুটো দাও।
চক্ষু রাঙাইয়া শাসনের স্বরে রেশমি কহিল, একেবারেই না। তোমার এত অসুখ, জর্দা পান খায় না।
দাও বলছি। ধৃতিকান্ত কহিলেন।
রেশমি তাঁহার চক্ষে অনেকক্ষণ পূর্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া কহিল, কোনো কথা শোনো না তুমি, ভারি বেয়াদপ। কোনোদিন-ই শুনলে না, তো আজ। বলিয়া করঙ্গ খুলিয়া তাম্বুল বাহির করিয়া দিল।
তাম্বুল মুখে পুরিতে পুরিতে ধৃতিকান্ত কহিলেন, তোমার মতো মিষ্টি করে এ-জীবনে আর কেউ আমাকে বকল না। যখন বকো তখনও মনে হয় আদর করছ। তোমার মতো আর কেউ ভালোবাসতে জানে না, কেন বলো তো রেশমি?
রেশমি কথা ঘুরাইয়া কহিল, শুরু হল তোমার প্যায়েরভি। আমি তো তোমার ব-খিদমতে রেশমিই। আমি এমনিতেই তো তোমার-ই আছি। আমাকে এত প্যায়েরভি কেন?
পরক্ষণেই কহিল, নাও, কথা বোলো না, শোনাও।
ধৃতিকান্ত পৃষ্ঠা উলটাইয়া পড়িতে শুরু করিলেন :
মিয়ার মুখোশ, বিবির মুখোশ,
ছেলের মুখোশ, মুখোশ চাই?
মুখোশওয়ালা যাচ্ছে হেঁকে
লেঙ্গে মুখোশ? হাতেমতাই।।
‘পাকড়ো’ ‘পাকড়ো’ বলল মিয়া
পাকড়াবে কে? পাকড়ায়েব?
হর-ঘড়ি সব মুখোশ বদল
বেগর-মুখোশ মুখ গায়েব।।
আসলি সুরত কেউ যে ইয়ার,
দেখতে চায় না এই দুনিয়ার,
ছিঁড়লে মুখোশ দেখবে গিধ্বর
শিস দেবে না আর মুনিয়ায়।।
আব্বাজানের মুখোশ উদার
কামিনাদের মুখোশ হাসে,
মুখোশ যখন খোলে মাশুক
আসিক তখন পালায় ত্রাসে।।
দেছে খুদা একটাই মুখ
কিন্তু মিয়া দেখায় কাকে?
গোসলখানার আয়না ছাড়া
দেখানো যায় শুধুই মাকে।।
মুখোশভারে কেটেছে মুখ
বলছে মিয়া হায় কী জুলুম—
নাঙ্গা সকল যেই বেরুল
উঠবে আওয়াজ; হালুম-হুলুম।।
যে উষ্ণ মুখ গর্ভে ঘুমোয়
সেই ঘুমোবে হিম কবরে,
জিন্দগিতে বেগল-মুখোশ
পুছল না কেউ এই শহরে।।’
পাঠ থামাইয়া ধৃতিকান্ত কহিলেন, হয়েছে?
রেশমি পানের পিক গিলিল মরালী গ্রীবা ঘুরাইয়া।
সেকালের গহরজান বাইজি পানের পিক গিলিলে তাঁহার শ্বেতশুভ্র মসৃণ গন্ডদেশের অভ্যন্তরে যখন সেই রক্তিম পিক গড়াইয়া নামিত তখন নাকি তাহা দৃষ্টিগোচর হইত।
রেশমির গাত্রচর্ম কালো, কিন্তু বড়োই উজ্জ্বল কালো। ধৃতিকান্ত তাহার গন্ডদেশে চাহিয়া রহিলেন। কিন্তু সেই ঘেরাটোপের ক্ষীণ আলোকে সমস্ত রেশমিকে একটি কোমল উজ্জ্বল পক্ষী বলিয়া তাঁহার ভ্রম হইল। তাহার গন্ডদেশে পানের রক্তিম পিকের সঞ্চরণ ধৃতিকান্তর গোচর হইল না।
পানের পিক গিলিয়া রেশমি আবদারের সুরে কহিল, আরও শোনাও। থামলে কেন?
তাহার পর কহিল, আমার কিন্তু ভারি আনন্দ হচ্ছে। এত আনন্দ হচ্ছে যে, বোঝাতে পারব না। তোমাকে কী করে ইনাম দেওয়া যায় বল তো?
ধৃতিকান্ত অন্যমনস্কভাবে কহিলেন, তুমিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ইনাম। এর চেয়ে বড়ো ইনাম তো আর কিছুই হতে পারে না। ভাবতেও পারি না আমি।
রেশমি অধৈর্য কন্ঠে কহিল, কথা বলে সময় নষ্ট হচ্ছে। পড়ো, পড়ো।
ধৃতিকান্ত পুনরায় পৃষ্ঠা উলটাইয়া পাঠ করিতে লাগিলেন :
পেল অনেক ভালোবাসা
নিজেও অনেক বাসল ভালো,
ভাঙতে গিয়ে অন্ধকারকে
ভুল করে সে ভাঙল আলো।।
সইত না তার কোনো আলোই
চোখ ধাঁধত রোশনাইতে
একলা ঘরে অন্ধ মিয়া
ইচ্ছেও নেই চোখ চাইতে।।
অন্ধকারে দেখতে না পায়
উজল আলোয় আরোই তো নয়;
খোদার কাছে মাঙল সে বর
মরে যেন জোনাকি হয়।।
পাঠশেষে রেশমির উদগ্রীব, উৎসুক মুখপানে ধৃতিকান্ত চাহিয়া রহিলেন।
রেশমি কহিল, একটা কথা বলব?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, বলো।
সমস্ত জীবন তুমি সত্যি সত্যিই যার জন্যে বাউন্ডুলে হয়ে গেলে, কোথাও ঘর বাঁধতে পারলে না, শ্যাওলার মতো ভেসে বেড়ালে এখানে ওখানে, তাকে নিয়ে কিছু লিখেছ?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, শ্যাওলার মতো আমি কখনো ভাসিনি জীবনে। ভাসতে পারলে জীবনের সহজ সুখের জলে সুখী হওয়া যেত। যেমন করে বেশির ভাগ লোককে সুখী হতে দেখি। কিন্তু জীবনের জলে যে, আমি নিজের ইচ্ছেমতো সাঁতরাতে চেয়েছিলাম স্রোতের বিপরীতে; আমার ইচ্ছেমতো গন্তব্যে যেতে চেয়েছিলাম। তাই-ই তো আমার হাড়-গোড় সব ভেঙে চুরচুর হয়ে গেল, পাথরে পাথরে ঠোক্কর খেয়ে, ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত হয়ে গেল আমার সমস্ত আমি।
তাহার পর কিঞ্চিৎ থামিয়া, দম লইয়া কহিলেন, তুমিও যদি আমাকে শ্যাওলা বলো, তাহলে বড়ো দুঃখ হয়।
রেশমি দুঃখিত স্বরে কহিল, আমি অত মানে বুঝে বলিনি। আমি বেগর পড়ে-লিখে আওরত। মুখ্যু তওয়ায়েফ। আমি কি তোমার মতো অত ভাষা-টাষা জানি? আমার মনে হল, তাই-ই বললাম। কিছু মনে কোরো না। আমার কথার মানে আমার মুখের কথায় ধোরো না। মনের কথা বুঝে নিয়ে ধোরো।
পরক্ষণেই রেশমি কহিল, তুমি আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলে। বললে না; লিখেছ কি না?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, তা জেনে তোমার লাভ কী?
লাভ কিছু নেই। কিন্তু তোমাকে যে, দুঃখ দিল, অথচ যে, এমন করে তোমার ভালোবাসা পেল, তার সম্বন্ধে তোমার মনের কথা জানতে ইচ্ছে করে না? তাকে দেখিনি কখনোও, তার সম্বন্ধে তোমার কাছে কখনোও কিছু শুনিওনি। কিন্তু তোমাকে যতদিন ধরে দেখছি, ততদিন-ই বুঝেছি যে, তুমি আমার কাছে থাকলেও কখনোও থাকোনি। কথা বলতে বলতে, হঠাৎ উদাস হয়ে গেছ, গভীর রাতে তোমার ঘর থেকে ঘুমের মধ্যে তোমার যন্ত্রণাভরা অবোধ্য স্বগতোক্তি শুনেছি। শুনে তোমার জন্যে কষ্ট পেয়েছি। তোমার কলজেতে তার জন্যে শূন্যতা, তা আমার সব কিছু দিতে চেয়েও ভরাতে পারিনি। কখনোও পারিনি।
ধৃতিকান্ত চুপ করিয়াছিলেন।
তাঁহার ক্লান্ত, নিস্পৃহ, বয়স্ক মুখাবয়বে সেই ক্ষীণ আলোকে অকস্মাৎ যেন কোনো বিষণ্ণতা ছাইয়া আসিল। যাহাকে চিরদিন ভুলিতে চাহিয়াছেন, অথচ পারেন নাই, যতই ভুলিতে চেষ্টা করিয়াছেন, ততই তাহাকে যেন বেশি করিয়া মনে পড়িয়াছে—সেই তাহার-ই মুখটি ধৃতিকান্তর বুকের অভ্যন্তরে পুনর্বার ফিরিয়া আসিল।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, অন্য কথা বলো।
—না।
জোরের সঙ্গেই রেশমি কহিল, অন্য কথা বলব না। সেই একজনের জন্যেই এ জীবনে তোমাকে আমি কখনো যেমন করে পেতে চেয়েছিলাম, তেমন করে আমার কখনোও পাওয়া হল না। রাগ বলব না, ঘৃণাও নয়, তার সম্বন্ধে নিজে একজন আওরত হয়ে আমার ঔৎসুক্য থাকা স্বাভাবিক। তুমি নিজে কখনোও কিছু বলোনি, আমি শুনতেও চাইনি। কিন্তু না-বলা কথা অনেক বলা-কথার চেয়ে আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই-ই এত করে বলছি যে, যদি তাকে নিয়ে কোনো কিছু লিখে থাকো, তবে একটু পড়ে শোনাও। তোমার মনের ভেতরে একবারের জন্যে আমায় একটু উঁকি মেরে দেখতে দাও।
ধৃতিকান্ত হাসিলেন। অন্যমনস্ক স্বরে কহিলেন, আজ তুমি সারারাত এমন হুরির মতো আমার সঙ্গে থাকবে জানলে, মুরতেজাকে বলে একটু তামাকের বন্দোবস্ত করে রাখতাম। আলবোলাতে টান দিতাম শুয়ে শুয়ে।
রাগতস্বরে রেশমি কহিল, থাক আর ওসব খেয়ে কাজ নেই। ডাক্তারদের কথা যদি একটাও না শুনবে, তবে আমি ডাক্তার ডেকে মরি কেন?
ডাকো কেন? ধৃতিকান্ত কহিলেন।
তাহার পর কহিলেন, তুমি ছাড়া আমার মতো মারিজের ইলাজ করতে পারে এমন ডাক্তার তো আমার জানা নেই।
রেশমি ধৃতিকান্তর বক্ষোপরি তাহার চিকন মুখ রাখিয়া চোখ বুজিয়া পোষা বিড়ালের ন্যায় সোহাগে নিস্তব্ধ হইয়া রহিল।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, তুমি আমার মনের মধ্যে উঁকি দিতে চাও, কিন্তু কখনো কোনো গভীর ইঁদারার মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখেছ?
রেশমি মুখ না তুলিয়াই কহিল, দেখেছি।
—কী দেখতে পেয়েছে?
—অন্ধকার।
—শুধু অন্ধকার-ই নয়, ভালো করে চেয়ে দেখলে দেখতে পেতে পচা পাতা, কুৎসিত ব্যাং, আবর্জনার বৃত্ত—এসব জলের ওপর। যেখানে জল-ই ভালো করে দেখা যায় না, তাই জলের ভেতরে কী তা দেখারও উপায় থাকে না কোনো।
তাহার পর, ধৃতিকান্ত পুনরায় কহিলেন কখনোও নিজেকে ডেকেছ ইঁদারার মধ্যে মুখ নামিয়ে? অন্য কাউকেও কি ডেকেছ? আমি ডেকেছি, বার বার। তার নাম ধরে ডেকেছি—আমার মাথার মধ্যে তার নাম গমগম করে বেজেছে। শুধু বেজেছে আমার-ই ডাক। সাড়া পাইনি তার। তারপর নিজের নাম ধরে ডেকেছি। মনে হয়েছে, নিজের নামটাও বুঝি হারিয়ে গেল, সেই অন্ধকার স্যাঁতসেতে, গভীরতার মধ্যে।
রেশমি মুখ তুলিয়া কহিল, এমন করে বলছ কেন? আমার ভালো লাগে না। অন্য কথা বলো।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, লিখেছি তাকে নিয়ে। এত তোমার শোনার ইচ্ছে—শোনো। কিন্তু তুমি তার চেয়ে অনেক বড়ো, তুমি তুমিই! তোমার সঙ্গে তার তুলনা করো কেন?
তাহার পর কহিলেন, আমাদের রবিঠাকুরের একটা কবিতা আছে জান?
কী কবিতা? রেশমি শুধাইল।
তুমি যে তুমিই ওগো সেই তব ঋণ
আমি মোর প্রেম দিয়ে শুধি চিরদিন।
বা:! রেশমি কহিল।
তাই বলছিলাম তোমার সঙ্গে অন্যের তুলনা কেন করো? ধৃতিকান্ত কহিলেন।
—সে তুমি বুঝবে না। তুমি আওরত হলে, শুধু আওরত-ই নয়, তোমার যদি আমার মন থাকত, তাহলে বুঝতে পারতে। পরক্ষণে কহিল থাক, আর কথা বলব না। পড়ো এবারে।
ধৃতিকান্ত যেন অতীতের ধূসর পান্ডুলিপিতে, অনেক চেষ্টা করিয়া, ঘষা কাচের চশমার ভিতর দিয়া দুই চক্ষু-গোলক বারংবার সঞ্চারণ করিয়া অতিকষ্টে সেই লিপি খুঁজিয়া বাহির করিলেন।
ছিল সে এক কালো মেয়ে
মিয়া তারে বাসল ভালো
চান করে সে আসলে ঘরে
আঁধার মনে ফুটত আলো।।
অনেক ভালো বেসেছিল
দিয়েছিল কিছু টাকাও
টাকার কোনো দাম ছিল না
ফুল দে’ছিল থোকা থোকা।।
সেই মেয়েটা এমনি বোকা
ফুলগুলো সব ফেলল ছিঁড়ে।
পা-ছড়িয়ে গুনল টাকা
আয়নাতে সে দেখল হিরে।।
কেটে গেল বছরগুলো
খেলতে খেলা ভালোবাসার
কলকাত্তা শহর ঢুঁড়ে
জুটাল বর অনেক আশার।।
তারপরে সে বলল মিয়ায়
বরের সঙ্গে যুক্তি করে
ফিরিয়ে দেবই টাকা তোমার
পাই-পয়সার হিসেব করে।।
তাই শুধু না, বলল আরও
ধান্দা তোমার বুঝনু শালা
আর এসো না আমার বাড়ি
আসো যদি, জুতোর মালা।।
ভাবল মিয়া ধান্দা যদিই—
বুঝল সে কি যুগের পরে?
ধান্দাতে আর ভালোবাসায়
তফাত ও কি বুঝতে নারে?
বলল মেয়ে খেলার শেষে,
দেবই ফেরত, ফেরত সব,
কাঁদতে কাঁদতে বলল মিয়া,
অতীত পতিত অতীত সব।।
তারপরেতে রাঙাল চোখ
বলল, শুধব তোমার ধার
টাকাই যেন এই দুনিয়ায়
মানব-ধর্ম সারাৎসার।।
ভাবছে মিয়া একলা বসে
টাকার ঋণ তো শোধাই যায়,
যে-ঋণগুলি যায় না শোধা
থাকবে জমা বকুল ছায়।।
একটা ছিল বড়ো বকুল
গন্ধ মিষ্টি কী রমরম
কালো-চোখে চাইত মিয়া
বাইরে বৃষ্টি ঝমর-ঝম।।
বুঝল মিয়া স্বরূপটা তার
ইন্তেজারেই শেষ হল সে
হল খতম তামাম ওয়াক্ত
ফায়দা কী গো হিসেব কষে?
পয়সা-টাকা পাওনা দেনার
কিম্মত কি এই দুনিয়ায়?
বুকের মধ্যে নাই-যদি পাও
চাইলে যারে; সেই মুনিয়ায়?
রেশমি কহিল আরও শোনাও। রেশমি কী যেন ভাবিতেছিল।
ধৃতিকান্তর একবারে পার্শ্বে থাকিয়াও সেই ক্ষণে সে যেন, বহুদূরে চলিয়া গিয়াছিল। রেশমির মুখমন্ডলে কী এক অসীম বেদনার রং মাখামাখি হইয়াছিল।
ধৃতিকান্ত বুঝিতে পারিলেন না যে, এই বেদনা কাহার নিমিত্ত? ইহা কি ধৃতিকান্তর নিমিত্ত। না তাহার নিজের-ই নিমিত্ত!
ধৃতিকান্ত সম্পূর্ণভাবে কোনো নারীকেই এতাবৎ বুঝিয়া উঠিতে পারেন নাই। এইমুহূর্তে রেশমিকে তাঁহার সম্পূর্ণ অপরিচিত বলিয়া মনে হইল।
রেশমি, অন্যমনস্কতার সহিত অস্ফুটে কহিল শোনাও, শোনাও।
ইলতিমাস হলই যদি
তবে একটা গান-ই গাও
মিয়ার গানে আবেগ বেশি
কম সেখানে সুরের ভাও।।
মোড়ন, ঢোঁড়ন, সুরের লচক
আছে তবু মিয়ার গানে,
সেই গানেতেই ফুটবে বকুল
খুশবু উড়বে তাহার পানে।
যার চোখে সে গাইল চেয়ে
জিন্দগি তামাম; তামাম শোধ
গাইল গজল দিলরুবাতে
দিল না মানে কোনোই বোধ।।
সেই যে মেয়ে, রইল চেয়ে
গাইল না সে দ্বৈত গান
একলা জীবন; একলা মরণ
জিন্দগি নয়; গোরস্থান।
দিয়ে যাবে শেষের দিনে
আঁজলা ভরে লাজুক প্রাণ;
‘সুখে থাকো আমার প্রিয়া’
বাঁধল মিয়া শেষের গান।।
এই শায়েরি পাঠ শেষ হইবামাত্র রেশমি হঠাৎ কহিল, তুমি এবার শুয়ে পড়ো। তোমার শরীর ভালো না। আমি যাই। রাত অনেক হল।
এইপর্যন্ত বলিয়াই ধৃতিকান্তের পানে আর একবারও না-চাহিয়া, তাহার জলের পাত্র শয্যাপার্শ্বের তেপায়ায় বসাইয়া, রেকাবি দ্বারা তাহা চঞ্চল হস্তে ঢাকিয়া রেশমি দ্রুতপদে ধৃতিকান্তের কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেল।
ধৃতিকান্ত চক্ষু হইতে চশমা নামাইলেন। নামাইয়া শয্যাপার্শ্বের তেপায়ার উপর রাখিলেন। রাখিয়া, বাতি নিভাইয়া দিলেন।
কক্ষমধ্যে অন্ধকার ধাইয়া আসিল। রাত্রি মধ্যযামে। এক্ষণে আর চন্দ্রালোক কক্ষমধ্যে প্রবেশ করিতেছে না।
বাহিরে তখনও সেই পাহারাদার তাহার বাঁশি বাজাইয়া ফিরিতেছে। বন্যপক্ষীর দূরাগত করুণ স্বরের ন্যায় সেই স্বর গভীর রাত্রির অখন্ড নিস্তব্ধতা বহুগুণ বৃদ্ধি করিয়াছে।
ধৃতিকান্ত হাঁটু মুড়িয়া, পাশ ফিরিয়া শুইলেন।
ধৃতিকান্তর মস্তিষ্কমধ্যে কে যেন, ক্ষীণস্বরে কহিল, পাহারাদার। তুমি কি পাহারা দিতেছ? কাহার ধন? এক্ষণে তুমিও ঘুমাইয়া পড়ো; যেমন ধৃতিকান্ত ঘুমাইতে যাইতেছেন।
প্রৌঢ় ধৃতিকান্ত যেন যুবক পাহারাদারকে কহিলেন, এ জীবনে যতই পাহারা দাও না কেন যাহার চুরি হইবার, যাহা হারাইবার, তাহা হারাইয়াই যায়। কোনো পাহারাদারের-ই ক্ষমতা নাই যে, সে ক্ষতি রুধিতে পারে। যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে এই মিথ্যা পাহারার প্রহসন আর কেন?
ধৃতিকান্ত ভাবিতেছিলেন, তিনি নিজেও তো জীবনের দিন ও রাত্রির অনেক প্রহর পাহারাদারি করিয়াছেন। তাহাতে লাভ কিছুমাত্র হয় নাই। যাহা থাকিবার শুধু তাহামাত্রই থাকে; আর যাহা চুরি হইবার তাহা প্রহরী অতন্দ্রসজাগ থাকিলেও চুরি হয়-ই। যাহা চুরি হইবার নিমিত্ত পূর্বনির্দিষ্ট অদৃষ্ট-নির্ধারিত আছে, তাহা চুরি হইবেই।
ধৃতিকান্ত আবারও কহিলেন, নিরুচ্চারে, পাহারাদার, ও পাহারাদার! তোমার বাঁশি থামাও।
অতিপ্রত্যূষে ধৃতিকান্তর নিদ্রাভঙ্গ হইল। তখনও আকাশে চন্দ্র রহিয়াছে। বাহিরে কোনো আওয়াজ নাই। দুই-একটি ক্ষুদ্রপক্ষী তাঁহার কক্ষসংলগ্ন মালতীলতায় উড়িয়া বেড়াইয়া ‘কিচ-কিচ’ করিয়া চিকন গলায় ডাকাডাকি করিতেছে।
মাহমুরগঞ্জ মহল্লাটি জনবিরল ও অপেক্ষাকৃত নির্জন। গতকল্য তেওহারের দিন বলিয়াই পথ দিয়া ডিজেল লোকোমোটিভ ওয়ার্কস-এর প্রতি ধাবমান জনপ্রবাহে পথ ভরিয়া ছিল।
পূর্বে এ-অঞ্চলে বহু রাজন্যবর্গের প্রকান্ড উদ্যানসংলগ্ন অট্টালিকাসমূহ ছিল। মহল্লাটি ভদ্র ও অভিজাত। যে-বাটীতে বর্তমানে ধৃতিকান্ত আছেন তাহা রেশমির মাতা নুরুন্নেসা কোনো রাজন্যর সংগীতপ্রীতির নিদর্শনস্বরূপ পাইয়াছিলেন। সেই রাজন্যর নুরুন্নেসাপ্রীতিও সংগীতি-প্রীতি হইতে কম ছিল না। লোক-পরম্পরায় ধৃতিকান্ত শুনিয়াছিলেন যে, রেশমি সেই রাজন্য ও নুরুন্নেসার মিলনের-ইমধুর স্বীকৃতি। সেই কারণেই হয়তো রেশমির ব্যবহার ‘কথোপকথন’ চাল-চলন রাহান-সাহান তমদ্দুন সমস্ত কিছুতেই এক বিশেষ আভিজাত্য পরিলক্ষিত হয়।
গতযৌবনা অবস্থায় নুরুন্নেসাকে ধৃতিকান্ত প্রথম দেখিয়াছিলেন। তিনি তখনও অত্যন্ত রূপবতী ছিলেন। তাঁহার মৃত্যুর সময়েও তাঁহার রূপলাবণ্যে কিছুমাত্র ঘাটতি পড়ে নাই। সেই রাজন্যের গাত্রচর্ম কৃষ্ণ হইলেও ধৃতিকান্ত শুনিয়াছিলেন যে, তিনি নাকি অত্যন্ত রূপবান ও সুদেহী পুরুষ ছিলেন। রেশমি তাঁহার মাতার গাত্রবর্ণ পায় নাই সত্য, কিন্তু এক গাত্রচর্মের বর্ণ ব্যতীত নুরুন্নেসা এবং সেই রাজন্যর সমস্ত রূপ ও গুণ-ই রেশমির মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে বর্তাইয়া ছিল।
ধৃতিকান্ত মুখ-হাত ধুইয়া প্রথমেই মুরতেজার কক্ষে গিয়া উপস্থিত হইলেন।
রাত্রিতে নাকি তাহার সামান্য জ্বর আসিয়াছিল। এক্ষণে নাই। মুরতেজার নিকট হইতে ধৃতিকান্ত শুনিলেন যে, রাত্রিতে তিনবার আসিয়া রেশমি তাহার সেবা করিয়া গিয়াছে এবং ঔষধ সেবন করাইয়া গিয়াছে। রেশমি মাত্র কিয়ৎক্ষণ হইল মুরতেজার তত্ত্বতালাশ সম্পন্ন করিয়া গিয়া শুইয়াছে।
দাসী উঠিয়াছিল। সে ধৃতিকান্তকে সত্বর চা তৈয়ার করিয়া দিল।
ধৃতিকান্তর আজিকাল কিছুই খাইতে ইচ্ছা যায় না। কোনো খাদ্য বা পানীয়ই গলাধঃকরণ করিতে পারেন না। কোনো কিছুই আর পরিপাক করিবার ক্ষমতা নাই। যাহা তিনি কাহাকেও কহেন নাই তাহা এই যে, ইদানীং ঔষধের ক্যাপসুল যে-অবস্থায় তিনি সেবন করেন, ঠিক সেই অবস্থাতেই মলের সহিত তাহা নির্গত হয়। তাহার পরিপাক যন্ত্রের ক্ষমতা এতই সীমিত হইয়া পড়িয়াছে যে, ঔষধের বহিরাবরণটি গলাইবার শক্তিও সে-যন্ত্রের আর নাই। এই কারণেই ধৃতিকান্ত ইদানীং ঔষধ সেবনও বন্ধ করিয়া দিয়াছেন।
বহুবৎসরের কু-অভ্যাস বলিয়া সকালে চা লইয়া বসেন। সামান্যই পান করেন। উষ্ণ চা উদরে পৌঁছিবামাত্র উদর জ্বলিয়া যায়, যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত হইয়া উঠে।
মুরতেজার নিকট হইতে রঘুনন্দনের ঠিকানা সংগ্রহ করিয়া ধৃতিকান্ত পাঞ্জাবিটি গলাইয়া লইয়া বাটীর বাহির হইয়া পড়িলেন।
রথযাত্রা চৌমহনীর পূর্বে সাইকেলরিকশা মিলিবার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু অতখানি রাস্তা তাঁহার পক্ষে পদব্রজে যাওয়াও বড়োই কষ্টকর। তথাপি শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করিয়া তিনি চৌমহনী পর্যন্ত অতিধীর পদক্ষেপে আসিলেন। সাইকেলরিকশায় উঠিয়াই চালককে সর্বপ্রথম একবার বিশ্বনাথ গলির উদ্দেশে যাইতে বলিলেন।
ধৃতিকান্ত চিরদিন-ই ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন কিন্তু কখনোও পৌত্তলিকতা বা কোনো বিশেষ ধর্মে বিশ্বাস করেন নাই। বারাণসীতে এতবার আসিয়াছেন তবুও কদাপি বিশ্বনাথজিকে দর্শন করেন নাই। আজিও তিনি বিশ্বনাথজিকে দর্শন করিবার নিমিত্ত যাইতেছেন না।
জীবনে নিজ বুদ্ধি-বিচার ও মতানুসারে যেইদিন হইতে চলিতে আরম্ভ করিয়াছেন সেইদিনের পর কোনো মন্দিরাভ্যন্তরে প্রবেশ করেন নাই। তথাপি যখন-ই চিত্তে অশান্তি বোধ করিয়াছেন অথবা কাহারও নিমিত্ত কিছু প্রার্থনা করিবার প্রয়োজন হইয়াছে, কোনো মন্দির বা মসজিদ বা গির্জার চত্বরে অথবা কোনো নির্জন স্থানে একাকী নিশ্চুপে বসিয়া থাকিয়াছেন। পুণ্যার্থী বহুলোকের মুখপানে চাহিয়া থাকিয়া দেবালয়ের নিকটস্থ স্নিগ্ধ সুগন্ধি ও সৌম্য শান্তিতেই তাঁহার বক্ষ ভরিয়া উঠিয়াছে। উহাপেক্ষা অধিক পুণ্যর প্রত্যাশা তিনি কখনোই করেন নাই।
গতরাত্রে অকস্মাৎ রেশমি তাঁহার কক্ষ ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাওয়ার পর হইতেই তিনি রেশমির কারণে এক নীরব অব্যক্ত কষ্ট বোধ করিতেছেন।
ঘুমের মধ্যেও বোধ করি সেই কষ্ট তাঁহাকে মথিত করিয়াছে।
অদ্য রেশমিকে দিতে পারেন, এমন কিছুই তাঁহার নাই। রেশমি তাঁহাকে নিকটে রাখিতে চাহিয়াছিল। চাহিয়াছিল যে, ধৃতিকান্তর জীবনের যে-সময়টুকু অবশিষ্ট আছে তাহা রেশমিকেই তিনি দান করেন। রেশমিকে—ঠিক যেমন করিয়া সে চাহে—তেমন করিয়াই শুধু তাহাকেই তিনি ভালোবাসেন।
ধৃতিকান্ত নিজে রেশমিকে জানাইতে চাহেন নাই যে, তাঁহার সময় আর সামান্যই অবশিষ্ট আছে। এ জীবনে অন্য একজনকে যেমন করিয়া ভালোবাসিয়াছেন তেমন করিয়া আর কাহাকেও ভালোবাসিবার সম্ভাবনা ও উপায় নাই। ভালোবাসার বিচার নিক্তিতে কখনোই হওয়া সম্ভব নহে। জীবনের প্রতিটি সম্পর্কই অন্য সম্পর্ক হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এক সম্পর্কের সহিত অন্য সম্পর্কের কোনো তুলনা হয় না। তুলনা করার চেষ্টাও বাতুলতা মাত্র। তথাপি যে ভালোবাসে এবং যে ব্যক্তি সেই ভালোবাসার পাত্র হয়, একমাত্র তাহারা দুইজনেই জানে যে, সেই সম্পর্কের গভীরতা কতখানি—সেই সম্পর্কের শিকড় তাহাদের নিজ নিজ মনোজগতের কতখানি গভীরে প্রোথিত হইয়াছে।
ধৃতিকান্তর বড়োই দুর্ভাগ্য যে, অন্যজনকে যাহা দিয়াছিলেন তাহা বুঝিবার বা এমনকী তাহার মূল্যায়ন করিবার ন্যায় মানসিক ক্ষমতাটুকু পর্যন্ত ঈশ্বর সেই নারীকে দেন নাই, তাহাকে দেন নাই। সকলের মনের কাঠামো এক নহে। তাহার মনোমন্দিরে ধৃতিকান্তর প্রেমের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করা সেই নারীর পক্ষে সম্ভব হয় নাই। হয়তো ইহা ঈশ্বরের কারসাজি। যাহাকে হৃদয়ের সর্বস্ব দিয়া এ জনমের ন্যায় নি:স্ব হইয়াছেন, সে এই দানের কদর করিল না। এইকথা ভাবিয়া তিনি আশ্চর্য হন যে— এমনকী সেই দানের গভীরতা বুঝিবার ক্ষমতা পর্যন্ত বিধাতা তাহাকে দিলেন না। অথচ সেই দান যে, পাইলে মস্তকে ধারণ করিয়া রাখিত, সেই-ই বুঝিল সেই দানের মহিমা—অথচ তাহাকেই বঞ্চনা করিয়া যে, সেই প্রাপ্তির যোগ্য নহে সেই নারীকেই ধৃতিকান্ত সর্বোচ্চ সম্মান দিলেন।
জীবনের অক্ষের ছকে চাল একবার চালা হইয়া গেলে তাহা বোধ হয় আর ফেরত হয় না। কেহ সঠিক চাল দিয়া যাহা চাহিয়াছিল তাহা পায়; কেহ বা পায় না। এবং যাহা পায় সেই প্রাপ্তিকে যে, চালিত চাল ফেরত লইয়া মহিমান্বিত ও সম্পূর্ণ করিবে তাহারও আর কোনো উপায় অবশিষ্ট থাকে না।
এক্ষণে প্রৌঢ়ত্বের শেষসীমায় পৌঁছাইয়া ধৃতিকান্ত অনেক বুঝেন। তাঁহার বুদ্ধি এখন অনেক পরিপক্ব। কিন্তু যৌবনের খেলায় সদম্ভ নির্বুদ্ধিতার সহিত যে-ভুল করিয়াছেন তাহার প্রায়শ্চিত্ত প্রৌঢ়ত্বের সমস্ত বুদ্ধি একত্র করিয়াও আর করিতে পারা যায় না।
চবুতরায় যেইরূপভাবে কবুতর ধান্য খুঁটিয়া খায়, ধৃতিকান্তর মনে হয় প্রত্যেক মনুষ্যও জীবনের এই চিরায়ত চবুতরায় সেইরূপভাবেই খুঁটিয়া খাইয়া বাঁচিয়া থাকে।
যে যেরূপ ভাগ্য লইয়া আসে—যাহার অদৃষ্টে যেরূপ লিখন; সেইরূপ ধান্যই তাহার জোটে।
কেহ ঘৃণায় খুঁটিয়া খায়; কেহ বা প্রেমে। কেহ কৃতজ্ঞতায় খুঁটিয়া খায় কেহ বা অকৃতজ্ঞতায়। খাইতে-খাইতে লোভী পক্ষীর ন্যায় কেহ ডানা ঝাপটায়, চঞ্চুদ্বারা অন্য ভাগীদারকে অন্যায় আঘাত করে। কেহ-বা অভিমানভরে সরিয়া আসিয়া জীবনের সস্তা-সহজ-দীন প্রতিযোগিতা হইতে নিজেকে দূরে রাখিয়া অভুক্তই থাকে।
এই চবুতরায় স্থান বড়ো অকুলান।
এইকথা এতদিনে সার বুঝিয়াছেন ধৃতিকান্ত যে, এ চবুতরায় কর্কশ, চিৎকৃত, স্থূল-নিম্নরুচি পক্ষীরাই পেট ভরিয়া খায়। যাহারা অভিমানভরে সম্মান লইয়া সরিয়া থাকে, তাহারা অভুক্ত থাকিতে থাকিতে একদিন শুকাইয়া মরিয়া যায়। ধৃতিকান্তর মনে হয় যে, এই সত্য জীবনের তাবৎ শারীরিক মানসিকক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।
সরিয়া থাকিতে থাকিতে একদিন সেই সংখ্যালঘিষ্ঠ পক্ষীর দল সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে বলিয়াই তাঁহার ধারণা। এক্ষণে ধৃতিকান্তর এমত বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে—সেই অভিমানী পক্ষীকুলের নিশ্চিহ্ন-প্রায় অস্তিত্বর শেষ প্রতিভূদিগের মধ্যে বুঝি তিনিও একজন।
ইদানীং যুবক-যুবতীরা তাঁহার সহিত কথোপকথনকে সময়ের অপব্যবহার বলিয়া মনে করে যে, শুধু তাহাই নহে, তাঁহাকে এবং তাঁহার সমবয়স্ক সকলকেই তাহারা এড়াইয়া চলে। যদি তাহা না চলিত তাহা হইলে ধৃতিকান্ত তাহাদের ডাকিয়া কহিতেন যে, পরমভ্রান্তিতেও কখনোও অভিমানী হইও না।
কিন্তু যৌবনের দম্ভে ও নির্বুদ্ধি উচ্চমন্যতায় মনুষ্যমাত্রই যে-ভুল করিয়া থাকে, সেই ভ্রান্তির মাশুল স্বীয়-স্বীয় জীবনের দিনান্ত বেলায় আসিয়া তাহাদের দিতেই হয়। ধৃতিকান্তর প্রপিতামহ, পিতামহ, পিতা এবং ধৃতিকান্ত নিজেও সেই এক-ই ভ্রান্তির শিকার হইয়াছেন। তাঁহার পুত্র থাকিলে তাহার ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিত না।
বিশ্বনাথ গলির সম্মুখে আসিয়া রিকশামধ্যে বহুক্ষণ তিনি বসিয়া রহিলেন। সেই প্রত্যূষে দোকান-পাট তখনও খোলে নাই। কিন্তু পুণ্যার্থীদের ভিড় শুরু হইয়া গিয়াছে। তিনি একবার ইচ্ছা করিলেন যে, রিকশা হইতে অবতরণ করিয়া গলিমধ্যে কিয়দ্দূরে অগ্রসর হইবেন।
কিন্তু শরীরের অনুমতি পাইলেন না।
রিকশা ঘুরাইয়া মহল্লার নাম দেখিয়া যখন রঘুনন্দনের বাটীর রাস্তায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন তখন বেশ বেলা হইয়া গিয়াছে।
রিকশায় বসিয়া-বসিয়াই ঠিকানা লক্ষ করিতে করিতে চলিলেন ধৃতিকান্ত। রিকশাওয়ালাকে কহিলেন ধীরে ধীরে চলিতে। পাছে রিকশাওয়ালা তাঁহার উদ্দেশ্য কিছুমাত্র বুঝিয়া ফেলে, সে কারণে ধৃতিকান্ত তাহাকে ঠিকানা বলিলেন না বা রঘুনন্দনের নামও বলিলেন না।
দূর হইতে বাটীটি প্রতীয়মান হইল। ঠিকানা চিনিয়া লইতে একটুও ভুল হইল না। ফটকের উপরে প্রকান্ড অক্ষরে তাহা লিখিত রহিয়াছে। রঘুনন্দনের প্রচন্ড স্থূলরুচির বিজ্ঞাপনস্বরূপ।
যেমনটি ভাবিয়াছিলেন তেমনটিই দেখিলেন। স্বর্ণমুদ্রার অকৌলীন্যর ছাপ বাটীটির সর্বাঙ্গে পরিস্ফুট। রুচি বা পরিমিতিজ্ঞানের বিন্দুমাত্র চিহ্নও কোথাও নাই। বেগল-মেহনতে অর্জিত অর্থ যে, কী নিদারুণ কদর্যতার সহিত ব্যয় করা যাইতে পারে রঘুনন্দনের বিরাট অট্টালিকা তাহার প্রকৃষ্ট নিদর্শন।
যাহাই হউক ধৃতিকান্ত এইবার রিকশা ঘুরাইয়া রামপুরা অভিমুখে চলিলেন। সেই মহল্লায় তাঁহার এক পুরাতন জিগরিদোস্তের বাটী ছিল।
এই বৎসর আসিবার পর তাঁহার সহিত দেখা করা হইয়া উঠে নাই। শারীরিক সংগতি ছিল না। তিনবৎসর পূর্বেও যখন আসিয়াছিলেন তখনও নহে। তাহার পূর্বেও নহে। অর্থাৎ ধৃতিকান্ত মনে-মনে গণনা করিলেন যে, তাহার সহিত প্রায় দশবৎসরকাল দেখা হয় নাই। ছত্রপাল সিং তাহার যৌবনের মৃগয়ার দোস্ত। বিন্ধ্য-পর্বতশ্রেণিতে, মির্জাপুর জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে উইণ্ডহাম ফলসের নিকট যে, স্থলে সাম্প্রতিককালে রিহাণ্ড বাঁধ এবং রেণুকোটের অ্যালুমিনিয়ামের কারখানা হইয়াছে সেইসমস্ত অঞ্চলে এই বন্ধুর সহিত ধৃতিকান্ত রাইফেল স্কন্ধে চষিয়া ফেলিয়াছিলেন। এই সমস্ত অঞ্চল তাঁহাদের দুইজনের-ই নিজ-নিজ হস্তরেখার ন্যায় পরিচিত ছিল।
ছত্রপালের চরিত্রের সহিত ধৃতিকান্তর চরিত্রের একদিকে যেমন মিল ছিল, অন্যদিকে তেমন-ইঅমিল ছিল।
ছত্রপাল সেই মুষ্টিমেয় মনুষ্যদিগের মধ্যে অন্যতম, যাঁহারা পারিপার্শ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বদলাইতে পারেন; যাঁহাদের মধ্যে সূক্ষ্মতা-স্থূলতার এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ দেখিতে পাওয়া যায় এক ভূমি-রাজত্ব থাকিতে-থাকিতেই অন্য কলকারখানার রাজত্ব স্থাপন করিবার ন্যায় দূরদৃষ্টি ছত্রপালের ছিল। বহির্জগতে তাহার রাজত্বের রূপ বদলাইয়াছে সন্দেহ নাই, কিন্তু তাহার অন্তর্জগতের কোনোই বদল হয় নাই। ছত্রপালকে শেষবার যখন দেখেন ধৃতিকান্ত দশবৎসর পূর্বে, তখনও তাঁহাকে দিলখোলা খুশ মেজাজেই দেখিয়াছেন। যৌবনের ছত্রপালে আর সেদিনের ছত্রপালে বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ করেন নাই।
ছত্রপালের প্রকান্ড অথচ অত্যন্ত সুন্দর বাটীর নিকট রিকশা পৌঁছাইবার পর-ই ধৃতিকান্তর মনে দ্বিধা উপস্থিত হইল।
দশবৎসর পূর্বের ধৃতিকান্ত এবং এই প্রভাতের ধৃতিকান্ত এক ব্যক্তি নহেন। যদি ছত্রপাল চিনিতে না পারেন, যদি যথাযোগ্য আন্তরিকতার সহিত তাঁহাকে গ্রহণ না করেন? আজ তো তিনি ভিখারি!
এই ভাব মনে উদিত হইবার পরমুহূর্তেই ধৃতিকান্ত নিজের নীচতার দরুন নিজেকে তিরস্কার করিলেন।
ফুলের কেয়ারি পার হইয়া ধৃতিকান্ত অভ্যন্তরের প্রধান দ্বারের সম্মুখে রিকশা হইতে কোনোক্রমে অবতরণ করিলেন।
একটি যুবক গ্যারাজ হইতে সাদা রঙের একখানি গাড়ি বাহির করিতেছিল। তাহার দেহের গড়ন ও মুখাবয়ব দেখিয়া ধৃতিকান্তর ধারণা হইল সে ছত্রপালের পুত্রই হইবে।
ধৃতিকান্তকে দেখিয়া ধনী পিতার উদ্ধত পুত্রর পক্ষে স্বাভাবিক রুক্ষস্বরে সে প্রশ্ন করিল, আগন্তুক কী চাহেন? এই বাটীতে কাহাকে তাঁহার প্রয়োজন?
যুবকটি শুধাইল পূর্বাহ্নে কি ছত্রপালবাবুকে সংবাদ দেওয়া আছে? না দেওয়া থাকিলে তাঁহার পক্ষে সাক্ষাৎ করা সম্ভব নয়।
ধৃতিকান্ত লজ্জিত হইয়া কহিলেন যে, পূর্বে সংবাদ পাঠাইতে পারেন নাই, তবে ছত্রপালবাবু গৃহমধ্যে থাকিলে তাঁহার নাম বলিলে হয়তো সাক্ষাৎ করিতেও বা পারেন।
যুবকটি কহিল, আপনার এ নিশ্চয়ই অনুমান। সাক্ষাৎ করিবার সময় পাইবেন কি বলা শক্ত!
ইহা বলিয়া একজন ভৃত্য মারফত সে ভিতরে সংবাদ পাঠাইল।
ধৃতিকান্ত যুবকটির ব্যবহারে দুঃখিত হইলেন না। কারণ তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, ছত্রপালের ন্যায় ব্যক্তির বাটীতে শত-শত প্রকারের উমেদার যে, পূর্বাহ্নে না বলিয়া-কহিয়া চলিয়া আসে এবং ইঁহাদের বিরক্ত করে তাহা সহজেই অনুমেয়। তিনি নিজে যখন ধনী ও প্রতিপত্তিশালী ছিলেন তখন তাঁহার নিকটও মলিনবেশ ও দীন চেহারা লইয়া বহুব্যক্তি আসিয়া উপস্থিত হইয়া তাঁহার অনুচরদের বিরক্তির সঞ্চার করিতেন। আজ অর্থ নাই, প্রতিপত্তি নাই, আজ আর কেহই আসে না। নিজে আজ অর্থহীন হইয়া অর্থবান বন্ধুর বাটীতে বন্ধুপুত্রের এবংবিধ রূঢ় ব্যবহারকে তিনি নৈর্ব্যক্তিকভাবেই গ্রহণ করিলেন।
এতদিনে মূল্যহীন মিথ্যা অভিমানের খাদ তিনি ঝরাইয়াছেন, ঝরাইতে পারিয়াছেন বলিয়া যারপরনাই আনন্দিত বোধ করিলেন।
ইতিমধ্যে সংবাদ পাইয়া ভৃত্যের সহিত ছত্রপাল স্বয়ং দৌড়াইয়া বাহিরে আসিলেন এবং বন্ধুকে বক্ষে জড়াইয়া ধরিয়াই তাহার শারীরিক অবস্থা বুঝিতে পারিলেন। অপেক্ষমান সাইকেলরিকশা দেখিয়া তাঁহার আর্থিক অবস্থাও বুঝিতে তাঁহার একমুহূর্তও বিলম্ব হইল না।
তৎক্ষণাৎ পুত্রকে ডাকিয়া পরিচয় করাইয়া দিলেন।
ভৃত্যকে কহিলেন ভাড়া দিয়া রিকশাওয়ালাকে বিদায় করিতে।
ছত্রপালের পুত্র করজোড়ে তাঁহাকে নমস্কার জানাইল। ধৃতিকান্তর পরিচয় পাইয়া তাহার মুখের রুক্ষভাব কিঞ্চিৎ নম্র হইল। কিন্তু কোনোরূপ বাড়াবাড়ি রকমের ভক্তি দেখাইল না, সে পিতৃবন্ধুকে।
ধৃতিকান্তর বড়োই ভালো লাগিল ছত্রপালের পুত্রকে, যে, যাহাকে-তাহাকে পদস্পর্শ করিয়া প্রণাম করে না, অহেতুক শ্রদ্ধা-ভক্তি দেখায় না।
ধৃতিকান্ত ছত্রপালের সহিত অন্দরে যাইতে যাইতে ভাবিলেন যে, বিবাহ করিলে এবং যথাসময়ে বিবাহ করিলে তাঁহারও হয়তো এই যুবকটির ন্যায় একটি পুত্র থাকিতে পারিত।
ছত্রপালের পুত্রের নাম যশপাল। তাহাকে ধৃতিকান্তর ভালো লাগিল এই কারণে যে, সে উদ্ধত ও স্বাধীনচেতা প্রকৃতির। ধৃতিকান্তর প্রকৃতিও যৌবনে অবিকল এই রূপই ছিল। নিজের বিচার-বিবেচনায় যাহাকে ভক্তি করিতে ইচ্ছা করিত—করিতেন, নচেৎ অন্য কাহারও বাক্যে, এমনকি স্বীয় পিতার বাক্যেও যাহা তিনি নিজ-বিবেচনায় না করিতে চাহিতেন তাহা করেন নাই।
ছত্রপাল চিৎকার করিয়া স্ত্রীকে ডাকিলেন। হুলস্থুল কান্ড বাধাইয়া দিলেন।
ধৃতিকান্তর স্কন্ধে সজোরে চপেটাঘাত করিয়া কহিলেন, এতদিন আসিসনি কেন? দোস্ত নেহি, তু শালে দুশমন হো।
চপেটাঘাত, যে-স্কন্ধে গতরাত্রে রঘুনন্দনের যষ্টি পড়িয়াছিল, সেই বাম স্কন্ধে পতিত হইবামাত্র অস্ফুটে আওয়াজ করিয়া ধৃতিকান্ত গালিচাপোরি পতিত হইলেন।
ধৃতিকান্তর শরীরের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অবস্থা যে, নিতান্তই শোচনীয় তাহা ছত্রপাল বুঝিতে পারিলেন।
ছত্রপাল ইতিমধ্যে বহুপ্রকার খাদ্যের ফরমাশ করিয়া দিয়াছিলেন, যাহা-যাহা তাহারা খাইতে ভালোবাসিতেন, যৌবনে। যাহা-যাহা করিতে ভালোবাসিতেন, তাহার সব-ই এক নি:শ্বাসে বলিয়া ফেলিয়াছিলেন তিনি। কহিয়াছিলেন, আরে দোস্ত আয়া ঘরপর, আভভি সিরিফ আরাম দো-চার মাহিনা কমসে কম, ডাঁটকে খানা কমসে কম দো-চার বোত্তল হুইস্কি, কমসে-কম ওর দো-চার তওয়ায়েফকা গানা—রেশমি কমসে-কম।
রেশমিকে ছত্রপাল জানিতেন। ধৃতিকান্ত ও ছত্রপাল সেই এক-ই মৃগয়ায় ছিলেন, সেই রাজন্য বন্ধুর বাংলোয়। কিন্তু ছত্রপালের রেশমি ও ধৃতিকান্তর সম্পর্কের গভীরতা সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান ছিল না।
ধৃতিকান্ত অত্যন্ত ক্লান্তি বোধ করিতেছিলেন।
কহিলেন, দোস্ত তুমসে ম্যায় জারা একেলা মিলনে চাহতা হুঁ! কুছ বাতে হ্যায়।
জরুর জরুর বে-ফিককর। বলিয়াই, ছত্রপাল সকলকে করতালি নির্দেশে কক্ষ হইতে বাহিরে যাইতে নির্দেশ করিলেন। উহারা নিষ্ক্রান্ত হইবামাত্র স্বহস্তে দ্বার রুদ্ধ করিয়া দিলেন।
ছত্রপালের পুত্র কক্ষ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইবার সময়, ধৃতিকান্তর মুখপানে এমন-ই দৃষ্টিতে তাকাইল যে, ধৃতিকান্তর বুঝিতে ভ্রম হইল না যে, যশপাল ভাবিতেছে যে, এই দুঃস্থ পিতৃবন্ধু পুরাতন দোস্তির সূত্র ধরিয়া কিঞ্চিৎ অর্থসাহায্য লইবার আশায় আসিয়াছে।
ধৃতিকান্ত এক্ষণে ভাবিলেন, তিনি বিবাহ করেন নাই উত্তম হইয়াছে। তাঁহার যদি যশপালের ন্যায় একটি পুত্র থাকিত, তাহা হইলে সে-ও তো তাঁহার কোনো আবাল্য-বন্ধুকে এমন-ই তাচ্ছিল্যের চক্ষে দেখিত। তাঁহার কেহই যে নাই, পুত্র-কন্যা কিছুই নাই একথা বিবেচনা করিয়া আশ্বস্ত হইলেন।
ছত্রপালকে সব বলিলেন ধৃতিকান্ত। আদ্যোপান্ত। তাঁহার নিজের শারীরিক অসহায়তায় কথা এবং রেশমির অপমানের কথা।
সর্বশেষে কহিলেন, ভাই তোকে একটা রিভলবার বা পিস্তল জোগাড় করে দিতে হবে আমায়। অন্তত একদিনের জন্যে। আমার যা ছিল, কিছুই আর নেই। যৌবনে তো অনেক-ই শিকার করেছি। এখন শেষজীবনের শেষ শুয়োর মেরে শিকারের খতিয়ান বন্ধ করব।
ছত্রপাল কহিলেন, তুই তো বললি রঘুনন্দনকে বলেছিলি রেশমির কাছে এনে ক্ষমা চাওয়াবি। তারজন্যে ওকে জানে মারবার কী দরকার? জানে মারলে বাড়াবাড়ি হবে। আমি তোর কথা ভেবেই, তারপরে ওর সাঙ্গোপাঙ্গরা তোর ওপর বদলা নিতে পারে বলেই বলছি।
ধৃতিকান্ত ক্লান্তকন্ঠে কহিলেন, আমার কী-আর বাকি আছে যে, বদলা নেবে? নিলে তো এই প্রাণটাই নেবে? প্রাণের অবস্থা তো দেখছিস? যেকোনো মুহূর্তে এমনিতেই নিভে যাবে, তা রঘুনন্দন নিতে চাইলে নিক না। রেশমির বে-ইজ্জতির প্রতিকারের জন্যে যদি যায়, তো যাক এই ফালতু প্রাণ। ক্ষতি দেখি না তাতে কোনো।
ছত্রপাল কহিলেন, তোর শরীরের যা অবস্থা, তুই হাঁটতে পর্যন্ত পারছিস না—তুই কি করে কী করবি? কত শিকার আমরা একসঙ্গে করেছি। তুই এই শুয়োরটাকে আমার হাতে ছেড়ে দে। তোর পেয়ারের রেশমিকে অপমান করেছে, শালাকে আমি শিখলিয়ে দেব। রঘুনন্দন ভূমিহার আর আমি ক্ষত্রী। ক্ষত্রীর বাচ্চাকে চেনেনি এখনও।
ধৃতিকান্ত বাধা দিয়া কহিলেন, না তুই সংসারী লোক, তোকে এরমধ্যে একেবারেই জড়াব না। আমার কোনো পিছুটান নেই; কিছুমাত্র হারাবার ভয় নেই, তাই যা করার আমি একাই করব।
একাই করবি? বলিয়া ছত্রপাল কিয়ৎক্ষণ কী ভাবিলেন।
পুরুষমানুষ হিসাবে, যে অপমানিত হইয়াছে বা যাহার প্রিয়জন অপমানিত হইয়াছে, বদলা যে তাহার নিজের-ই লওয়া দরকার এই ন্যায্য কথাটাই অন্য পুরুষ হইয়া তাহা বুঝিতে বিলম্ব হইল না।
কিন্তু তিনি বলিলেন, যো-ভি-হো, ওকে শিক্ষা দেওয়ার সব বন্দোবস্ত আমি করে দেব। তুই নিজেই শিক্ষা দিবি। কিন্তু প্রাণে মারা চলবে না। আমার সামনে তোকে কোতোয়ালির পুলিশে খুনের দায়ে ধরে নিয়ে যাবে, তা হতে দেব না।
তাহার পর কী ভাবিয়া কহিলেন, এই ব্যাপারটা আমার ওপর-ই ছেড়ে দে। আমাকে সাতটা দিন সময় দিস। আমি ব্যাটার খাল-খরিয়াত রাহান-সাহান সব খোঁজ করে নিই আগে। তারপর তোকে জানাব। রেশমির অপমান, আমারও অপমান। এ-ব্যাপারে তুই নিশ্চিন্ত থাক। আমি জবান দিচ্ছি।
এমন সময় বন্ধ দুয়ারে করাঘাতের শব্দ হইল।
ছত্রপাল ধৃতিকান্তর মুখপানে তাকাইয়া কহিলেন, তোর ভাবি।
তাহার পর অনুমতি চাহিয়া কহিল, খুলি?
ধৃতিকান্ত মস্তক হেলাইয়া সম্মতি জানাইলেন।
ছত্রপাল উঠিয়া দ্বার খুলিলেন।
ভাবি দাসীর হস্তে নানারূপ খাদ্যদ্রব্যাদি সাজাইয়া আনিয়া দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াইয়া ছিলেন।
কহিলেন, দুই বন্ধুতে মিলে কোন হুরি-পরির আলোচনা হচ্ছিল দরজা বন্ধ করে শুনি?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, যার ঘরে এমন পরি, তার চোখে কি অন্য কোনো হুরি-পরি লাগে?
ভাবি ছত্রপালের প্রতি অপাঙ্গে একবার তাকাইয়া বলিলেন, পুরুষমানুষের জাতকে বিশ্বাস নেই। আপনারাই-না বলেন যে, ‘ঘরকা-মুরগি ডাল বরাবর’।
তওবা-তওবা—বলিয়া ধৃতিকান্ত দুই কর্ণ দুই হস্তে চাপা দিলেন।
বলিলেন, ভাবি—যে-ধৃতিকান্ত খেতে ভালোবাসত, সে এ-লোক নয়।
আমার ওয়াক্ত শেষ। মরার আগে আপনাকে একবার দেখে গেলাম। মরার সময় যেন, আপনার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকতে পারি।
ভাবি খিলখিল শব্দে হাসিয়া উঠিলেন।
তাঁহার সুন্দর মুখশ্রী হাসিতে সুন্দরতর হইল।
কহিলেন, পুরুষমানুষমাত্রই মিথ্যেবাদী। তবে আপনি মিথ্যে কথাগুলো এমন সুন্দর করে বলেন যে, বিশ্বাস করে ফেলতে ইচ্ছে হয়।
এই কথায় তিনজন-ই বহুক্ষণ ধরিয়া হাসিতে লাগিলেন।
ধৃতিকান্তর শরীরে আর শক্তি ছিল না। মাহমুরগঞ্জ গিয়া কখন নিজকক্ষে শুইয়া পড়িবেন সেকথাই ভাবিতেছিলেন।
কিয়ৎক্ষণ গল্পগুজব করিয়া ছত্রপাল নিজে স্বপুত্র ধৃতিকান্তকে পৌঁছাইবার নিমিত্ত বাহির হইলেন।
যশপাল গাড়ি চালাইতেছিল। দুই বন্ধুতে পশ্চাতে বসিয়াছিলেন।
যশপাল অত্যন্ত বেগে বেপরোয়াভাবে এবং ঝুঁকি লইয়া বিভিন্ন যানবাহন ও পদাতিকের স্রোতমধ্যে গাড়ি চালাইতেছিল।
ছত্রপাল তাহাকে মৃদু তিরস্কার করিয়া ধীরে গাড়ি চালাইতে কহিলেন। যৌবনে যে, বাহাদুরি-প্রবণতা সকলের মধ্যেই দৃশ্যমান হয় যশপালের মধ্যে তাহাই ধৃতিকান্ত দেখিতে পাইলেন।
ছত্রপালের কথা শুনিবামাত্র যশপাল সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামাইয়া দিয়া পিতাকে কহিল, তোমার পছন্দ না হলে তুমি চালাও গাড়ি।
ছত্রপাল পুত্রের মুখপানে বারেক তাকাইয়া বলিলেন, ঠিক আছে, আমিই চালাব।
তাহার পর কহিলেন, আমি যতদিন বেঁচে আছি, আমার ইচ্ছামতোই সব কিছু চলবে। আমার গাড়ি, আমার ব্যাবসা, সব কিছুই।
যশপাল নৈর্ব্যক্তিক উত্তেজনাহীন স্বরে কহিল, তোমার ইচ্ছামতো নিশ্চয়ই তোমার গাড়ি চলবে। সেটাই ন্যায্য। আমিও তাই চাই। কিন্তু আমি যখন আমার নিজের গাড়ি চালাব, তখন তুমিও আমার ইচ্ছাকে মেনে নেবে। তোমার নিজের মতামত আমার ওপর জোর করে চাপাবে না। কখনোই এক ড্রাইভারের গাড়ি চালানো অন্য ড্রাইভারের পছন্দ হতে পারে না। হয় না। এটা যেন মনে রেখো।
ছত্রপাল ধৃতিকান্তের মুখপানে তাকাইয়া কহিলেন, আজীব লেড়কা।
তাহার পর স্বগতোক্তির ন্যায় কহিলেন, দুনিয়া কিতনা বদল হো যা রহি হ্যায়।
ধৃতিকান্ত হাসিয়া ঘটনাটা লঘু করিলেন।
বলিলেন, যশপাল তো অন্যায্য কিছু বলেনি। খুব-ই ন্যায্য কথা।
যশপাল বাম পার্শ্বে সরিয়া যাইবামাত্র ছত্রপাল চালকের আসন গ্রহণ করিলেন।
এক্ষণে ছত্রপাল গাড়ি চালাইতেছিলেন।
ধৃতিকান্ত আবারও ভাবিলেন, তাঁহার পুত্র না থাকিয়া ভালোই হইয়াছে। থাকিলে, সে যৌবনের ধৃতিকান্তর ন্যায় একরোখা ও স্বাধীনতাপ্রিয় হইত। এবং তাহা হইলে ধৃতিকান্তর সহিত তাহার প্রচন্ড মতবিরোধ যে, হইত তাহাতে কোনোই সন্দেহ নাই।
যশপালের মধ্যে ধৃতিকান্ত তাঁহার যৌবনের মূর্তি দেখিতে পাইলেন। যশপালের ন্যায় স্বাধীন ও স্বীয় তীব্র মতামতের কারণে পিতাকে তিনি মানেন নাই, স্বেচ্ছায় পৈতৃক সম্পত্তির কোনো অংশই গ্রহণ করেন নাই। পৈতৃক সম্পত্তি যে, গ্রহণ করেন নাই তাহাতে তাঁহার আত্মাভিমান অক্ষুণ্ণ রহিয়া ছিল সন্দেহ নাই, কিন্তু যতদিন তাঁহার পিতা জীবিত ছিলেন, ততদিন সেই বৃদ্ধ এ-কারণে বড়োই মর্মপীড়া বোধ করিয়াছিলেন। ধৃতিকান্তর অনুমান সত্য কী নহে—তাহা আজ আর জানিবার উপায় নাই। এক্ষণে ধৃতিকান্ত তাঁহার পিতার তৎকালীন বয়সে ও মানসিকতায় পৌঁছাইয়া তাঁহার পরলোকগত পিতার নিমিত্ত দুঃখ বোধ করেন। বর্তমানে তাঁহার পিতা জীবিত থাকিলে ধৃতিকান্তর কারণে যেসব দুঃখ তিনি পাইয়াছিলেন, সেই দুঃখ মুছাইবার চেষ্টা ধৃতিকান্ত অবশ্যই করিতেন। যদিও নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিমতো কোনো অন্যায়-ই তিনি তাঁহার পিতার প্রতি করেন নাই। ইহা অন্যায়ের প্রশ্ন নহে, ন্যায়েরও নহে। ভুল বুঝাবুঝির প্রশ্ন, আত্মাভিমানের প্রশ্ন।
কিন্তু এক্ষণে আর কিছুমাত্রই করিবার নাই।
এ সংসারে অনেক অন্যায় ঘটে ও ঘটানো হয়। একে অন্যের উপর অনেক অবিচার করেন। কিন্তু সময় থাকিতে কেহই স্ব-স্ব অভিমান ত্যাগ করিয়া সেই অন্যায় স্বীকার করিতে বা মকুব করিতে পারেন না। যখন তাহা স্বীকার বা মকুব করিবার ন্যায় মানসিক অবস্থায় পৌঁছানো যায়, তখন প্রায়শই দেখা যায় যে, একপক্ষ অপর পক্ষের নিমিত্ত আর অপেক্ষা করিয়া বসিয়া নাই।
ধৃতিকান্ত ভাবিলেন, জীবন বড়ো জটিল ও বক্র। ইহামধ্যে সূক্ষাতি-সূক্ষ্ম টপ্পার কাজের ন্যায় এতই খোঁজ-খাঁজ যে, উহা টানাটানি করিয়া সমান্তরাল করিতে করিতে জীবন-ই ফুরাইয়া যায়।
ধৃতিকান্তর বোধ হইল যে, দুঃখের বিষয় ইহাই যে, একজীবনে, সমস্ত জীবনের ঠেকিয়া, ধাক্কা খাইয়া কাঁদিয়া-কাটিয়া যাহা কিছু শিখা যায়, সেইসব দুঃখময় অভিজ্ঞতা হইতে যে, শিক্ষালব্ধ জ্ঞান সঞ্চিত হইয়া উঠে, তাহা পরবর্তী জীবনে কোনো উপকারেই লাগানো যায় না। সমস্ত ভুলিয়া বসিয়া স্লেট মুছিয়া পুনরায় নূতন করিযা জমাট-বদ্ধ অন্ধকার অজ্ঞানতা হইতে জ্ঞানের ‘অ, আ, ক, খ’ দিয়া পুনরায় আরম্ভ করিতে হয়।
মাহমুরগঞ্জে পৌঁছাইয়া ছত্রপাল কহিলেন আজ আর নামব না রে। অফিসের তাড়া আছে। একদিন অফিস ফেরত আসব।
যশপাল সঙ্গে থাকায় ছত্রপাল রেশমির নামও উচ্চারণ পর্যন্ত করিলেন না।
ধৃতিকান্ত মনে মনে দুঃখিত হইলেন।
মুখে কহিলেন, আচ্ছা, তাই আসিস।
ছত্রপালের গাড়ি ধুলা উড়াইয়া চলিয়া গেল।
পাশাপাশি আসনাসীন দুই বিবদমান প্রজন্মর দুই প্রতীক পিতা ও পুত্রকে গাড়ির কাচের মধ্য দিয়া পশ্চাৎ হইতে দেখিয়া বহুকাল পূর্বের ধৃতিকান্তর নিজের যৌবনবয়সের মূর্তি ও তাহার পরলোকগত পিতার মুখাবয়ব হঠাৎ-ই চক্ষের সম্মুখে ভাসিয়া উঠিল।
ধৃতিকান্তর চক্ষুদ্বয় অকস্মাৎ জ্বালা করিয়া উঠিল।
হয়তো গাড়ির চাকায় উড্ডীন পথের ধুলা চক্ষুমধ্যে প্রবেশ করিয়া থাকিবে।
দ্বিপ্রহরে আহারাদি সারিবার পর শয্যায় গা এলাইয়া শুইয়া কোনক্ষণে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলেন তাহা ধৃতিকান্তর স্মরণ নাই।
যখন নিদ্রাভঙ্গ হইল, তখন বেলা আর নাই। বাহিরে অন্ধকার ছাইয়া আসিয়াছে। উন্মুক্ত বাতায়নের মধ্য দিয়া বাহিরের হিমভাব কক্ষে প্রবেশ করিতেছে। বাটীর বাহিরে পথে কাহারা কথা কহিতেছে, তাহাদের খন্ড খন্ড অসংলগ্ন সংলাপ কর্ণে আসিতেছে।
নিদ্রা চক্ষে এখনও জড়াইয়া আছে। ধৃতিকান্তর এমন কোনো রাজকর্ম অথবা শূদ্রকর্মও নাই যে, এক্ষণেই তাঁহাকে উঠিয়া পড়িতে হইবে।
ধৃতিকান্ত পাশ ফিরিয়া শুইলেন।
বহুদিন পর মুনাব্বর, মৃত আসগরের ভাতিজা অদ্য আসিয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে। যে কক্ষে রেশমি নৃত্যগীতের রেওয়াজ করিয়া থাকে ও ইদানীং ক্বচিৎ-কদাচিৎ কাহাকেও গান শুনাইয়া থাকে সেই কক্ষ হইতে সারেঙ্গির সুর ভাসিয়া আসিতেছে। তৎসঙ্গে তবলার আওয়াজও ভাসিয়া আসিতেছে।
এখন পর্যন্ত গান শুরু হয় নাই। তবলা ও সারেঙ্গি বাঁধিয়া লইতেছে, উহারা রেশমির সহিত সংগত করিবার নিমিত্ত!
ধৃতিকান্ত বোধ হয় পুনরায় ঘুমাইয়া পড়িয়া থাকিবেন।
কিন্তু রেশমির সুর-কায়েমি আওয়াজ ধীরে-ধীরে তাঁহার অচেতন মস্তিষ্কে প্রবেশ করিয়া তাঁহাকে অতিসযতনে অবচেতন হইতে চেতনমধ্যে ফিরাইয়া আনিল।
রেশমিকে যেন পুরানো দিনের স্মৃতিসকল পাইয়া বসিয়াছিল। ইদানীং ধৃতিকান্ত উপস্থিত থাকাকালীন যে-গানই সে গাহিতেছিল তাহা ধ্রুপ দ, ধামার, গজল, ঠুংরি বা খেয়াল যাহাই হউক না কেন, সব-ই বহুপরিচিত অনেকানেক স্মৃতি-বিজড়িত পদের গীত।
ধৃতিকান্ত অন্ধকার কক্ষে একাকী শুইয়া ভাবিতেছিলেন যে, অতীতের কোনো মূহূর্তে একটি গানের সহিত কত কিছুই না মাখামাখি হইয়া থাকে। এক-এক কলি গাহিলে স্মৃতিপটে যেন কোনো অদৃশ্য ব্যক্তি একটির পর একটি অতীতদিনের ছবি প্রক্ষিপ্ত করে। সুরের আরোহণ অবরোহণের সহিত কতদিনের কত সুখ-স্মৃতি দুঃখ-স্মৃতি, উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের ন্যায় আজিকার অন্ধকার বর্তমান মহাকাশে জ্বলিয়া উঠিয়াই পরক্ষণেই কক্ষচ্যুত তারকার ন্যায় নির্বাপিত হইয়া যায়।
রেশমি একটি গজল শুরু করিয়াছে। বহুগীত বহুশ্রুত সেই গজলটি। তথাপি যেন, তাহা কখনোই পুরাতন হইবার নহে।
রকিব সে যে, উয়ো বসো
কনার করতে হ্যায়।
জ্বলা জ্বলাকে হামে বেকারার করতে হ্যায়।।
ভীমপলশ্রী রাগের উপক্রমণিকা ভর করিয়া পদবদ্ধ এই গজলটি একসময়ে ধৃতিকান্তর বড়োপ্রিয় গান ছিল।
শুধুমাত্র যে, গজলটিই প্রিয় ছিল তাহাই নহে। জীবনসায়াহ্নে পৌঁছাইয়া রেশমির সুরেলা, মাজা, সাবলীল কন্ঠে গীত এই গজলের পদগুলি ধৃতিকান্তর বক্ষে বড়োই বিষণ্ণতার ভাবের উদ্রেক করিল। এতাবৎকাল এই গজলটিকে তিনি স্রেফ একটি গজল বলিয়াই জানিতেন, তাহার পদগুলির তাৎপর্য ও ব্যাখ্যা ধৃতিকান্ত রেশমির উজালা জবানে যেন এত বৎসর পরে এই প্রথম স্পষ্টভাবে হৃদয়ংগম করিলেন।
এই গজল কোনো ব্যর্থ প্রণয়ীর সাম্প্রতিকতম দুঃখ ও ক্ষোভের ভাষা সুরের মাধ্যমে বড়োই প্রাঞ্জলভাবে ব্যক্ত করিতেছে।
পদগুলির অর্থ এই—যে, লোক-পরম্পরায় ব্যর্থ প্রেমিকা এই খবর পাইয়াছেন যে, তাঁহার প্রেমিক, তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বীকে না করিতে পারিয়া অবশেষে সেই মর্মঘাতী সংবাদটি প্রেমিকার কর্ণে পৌঁছাইলেন।
গজলের সুর ধীরে-ধীরে সমস্ত বাটী ভরাইয়া তুলিতেছিল। প্রতিকক্ষে, প্রশস্ত অলিন্দর খিলানে-খিলানে ধৃতিকান্তর শূন্য হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন তাহা কাঁদিয়া ফিরিতেছিল।
ধৃতিকান্ত সেই সুরের মধ্য দিয়া, পদের মধ্য দিয়া, ভীমপলশ্রীর মধ্য দিয়া রেশমি এক বৎসর তাঁহাকে যাহা বলে নাই, হয়তো বলিতে পারে নাই বলিয়াই বলে নাই, যাহা সে নিজমুখে কখনোই বলিতে পারিত না; সেই বক্তব্য বড়োই আনন্দ এবং বড়োই বেদনার সহিত বুঝিলেন।
রেশমির কারণে, রেশমিকে যাহা চাহিত তাহা দিতে না পারিয়া দিনান্ত বেলায় তিনি যারপরনাই ক্লিষ্ট বোধ করিতে লাগিলেন।
গজলের কলিগুলি ঘুরিয়া-ফিরিয়া তাঁহার মস্তিষ্কের কোশে-কোশে পাতিবদ্ধ চাতকপক্ষীর ন্যায় তীক্ষ্ম চঞ্চুদ্বারা ঠোকরাইতে লাগিল।
সেই দুঃখময় আনন্দের বেদনাতে ধৃতিকান্ত তাঁহার দুই পোড়া চক্ষুতে বড়োই জ্বালা অনুভব করিতে লাগিলেন।
কিয়ৎকাল পর ধৃতিকান্ত শয্যা ছাড়িয়া উঠিয়া চটি-গলাইয়া প্রায় নি:শব্দে বাটীর বাহিরে চলিয়া গেলেন।
একটি রিকশা লোকোমোটিভ ওয়ার্কস-এর দিক হইতে আসিতেছিল। রিকশায় উঠিয়া তিনি প্রয়াগ ঘাটে পৌঁছাইয়া এক ঘণ্টার কড়ারে একটি নৌকা ভাড়া করিয়া গঙ্গাবক্ষে ভাসিয়া পড়িলেন।
মাঝি একজন বৃদ্ধ। হয়তো ধৃতিকান্তর-ই সমবয়সি হইবে।
ধৃতিকান্ত তাঁহার নিজের প্রতিকারহীন বিষণ্ণতা ভুলিবার নিমিত্ত মাঝির সহিত কথোপকথন শুরু করিয়া তাহার সুখ-দুঃখের সংবাদ লইতে লইতে ভাসিয়া চলিলেন।
দুঃখ সকলের-ই থাকে। ধনী, দরিদ্র, ভাগ্যবান, অভাগা সকলের-ই। মনুষ্য জন্ম লইলেই প্রত্যেককে বহুবিধ দুঃখের শরিক হইতেই হয়। সেই সমস্ত দুঃখ হইতেও বেশি দুঃখময় এই সত্য যে, প্রত্যেকের-ই দৃঢ় ধারণা জন্মায় যে, তাহার ন্যায় দুঃখী অন্য কেহই আর এ সংসারে নাই। তাহার দুঃখ বুঝিবার মতন মনুষ্যও এ ধরাধামে সে ব্যতীত আর দ্বিতীয় কেহই নাই। কিন্তু ধৃতিকান্ত অন্যজনের, সে যেই-ই হউক না কেন, দুঃখের খোঁজ করিয়া তাহা চিরদিন-ই বুঝিবার চেষ্টা করিয়াছেন। শুধু তাহাই নহে, অন্যের দুঃখ বুঝিয়া, সেই দুঃখে আন্তরিকভাবে দুঃখিত হইয়া নিজ জীবনের সমুদয় অপসারণযোগ্য ও অনোপসারণযোগ্য দুঃখের ভার লাঘব করিয়া লইতে পারিয়াছেন।
ইহা তাঁহার বড়ো কম লাভ নহে।
ধৃতিকান্তর ন্যায় খুব কম ব্যক্তিই জানিয়েছেন যে, অন্যের দুঃখের আরশিতে নিজের দুঃখ প্রতিবিম্বিত করিলে স্বীয় দুঃখের ভার ও রং অনেকটাই ফিকা হইয়া আসে।
মাঝি পুরানো দিনের বারাণসীর কথা কহিতেছিল। তাহার যুবক পুত্র যে, গতবৎসর, বসন্ত রোগে আক্রান্ত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল তাহার প্রসঙ্গে কহিল যে, তাহার যুবক-পুত্র থাকিলে তাহাকে নদীবক্ষে আজ অশক্ত শরীরে বইঠা বাহিতে হইত না।
ধৃতিকান্ত ভাবিলেন, সেই যুবক-পুত্র বাঁচিয়া থাকিলে যে, এই বৃদ্ধ মাঝিকে অন্য প্রকার দুঃখ দিত না, তাহার-ই নিশ্চয়তা কী ছিল?
উত্তরবাহিনী গঙ্গার বারিরাশি ছলাৎ-ছলাৎ করিয়া নৌকার সম্মুখভাগে লাগিতেছিল। দূরে-দূরে বিভিন্ন ঘাটের প্রতিফলিত আলো দৃশ্যমান হইতেছিল জলের উপর। বাতাস বহিতেছিল।
সেই মুহূর্তে ধৃতিকান্তর অকস্মাৎ মনে হইল যে, মৃত্যুর ন্যায় মহান আর কিছুই হইতে পারে না। এই বৃদ্ধ মাঝির যুবক-পুত্র কখনো জানিবে না যে, সে মরিয়া গিয়া তাহার পিতার স্মৃতিতে কী অম্লান নিষ্কলুষ অমরত্বর আসনে আসীন রহিয়াছে। ‘মৃত্যু’ সাধারণকে বড়োই অসাধারণত্ব দান করে। সমস্ত সমালোচনা, ভুল বুঝাবুঝি এবং গ্লানির ঊর্ধ্বে পৌঁছাইয়া মৃত ব্যক্তি পরমশান্তিতে নিদ্রা যায়। জীবিতাবস্থায় যাহারা তাহাকে জীবন্মৃত করিয়া রাখিয়াছিল, সেই তাহারাই মৃতের শোকের হাহাকারে আকাশ-বাতাস মথিত করিয়া তোলে।
নদীবক্ষে ভাসিতে ভাসিতে ধৃতিকান্তর স্মৃতিতে তাঁহার যৌবনকালের বারাণসীর কথা উদিত হইল।
সেই বিন্ধ্যপর্বতোপরি অবস্থিত বাংলায় ধৃতিকান্তর সহিত রেশমির যে-সাক্ষাৎকার ঘটিয়াছিল তাহাই যে, শেষসাক্ষাৎকার নহে, তাহা পাঠককে বলা নিষ্প্রয়োজন।
সেই সাক্ষাৎকারের কয়েক বৎসর পরের কথা।
ধৃতিকান্ত মাতৃপূজার সময় বারাণসীতে উপস্থিত ছিলেন। প্রতিমা বিসর্জনের দিবস দশাশ্বমেধ ঘাট, প্রয়াগ ঘাট ইত্যাদি ঘাটের পথে গোধূলিয়ার মোড় হইতে প্রতিঘাট পর্যন্ত আলোয়-আলোয় আলোকিত পথ বাহিয়া যে, লক্ষ লক্ষ সহাস্য কলকন্ঠ, নারী, শিশু ও পুরুষের স্রোত উৎসাহিত আনন্দের সহিত প্রবাহিত হইত সেই বিচিত্র ও অনি:শেষ জনরাশির দিকে উদ্দেশ্যহীনভাবে চাহিয়া থাকিতে ধৃতিকান্তের বড়োই ভালো লাগিত।
বারাণসীতে অবস্থানকালে প্রভাতে উঠিয়া তিনি কুস্তির আখড়ায় উপস্থিত হইতেন। বারাণসীর নামি নামি পালোয়ানের সহিত কুস্তি লড়িতেন। স্বেদ ঝরাইয়া, নৃত্যগীতজনিত রাত্রি জাগরণের কারণে যে, শারীরিক স্থবিরতা তাহা হইতে মুক্ত হইবার নিমিত্ত প্রত্যহই ব্যায়াম করিতেন।
পাঠক! হয়তো জানিবেন যে, আজিকার বারাণসী এবং তৎকালীন বারাণসীতে আশমান-জমিন ফারাক ছিল।
আনন্দময়ী মায়ের ঘাট হইতে আরও বহুদক্ষিণে আসিয়া এই নদীবক্ষে যেরূপ এক নদী আসিয়া মিশিয়াছে, সেইরূপ উত্তরে মোগল সরাইয়ের নিকট আসিয়া মিশিয়াছে আর একটি নদী। অসী এবং বরুণা। প্রাকৃতিক বিধানকে লঙ্ঘন করিয়া যেস্থলে গঙ্গা উত্তরবাহিনী হইয়াছেন, সেই নদীর মধ্যবর্তী অংশ ‘বারাণসী’ নামে অভিহিত।
গঙ্গা, বরুণা ও অসী আজিও যেমন প্রবাহিত হইতেছে, সেদিনও তেমন-ই প্রবাহিত হইত। কিন্তু সেদিনের বারাণসীর রহিস আদমিদিগের জীবনযাত্রা অন্যপ্রকার ছিল।
তৎকালে যাঁহাদের নিকট অর্থ ছিল, তাঁহাদের ধমনি বাহিয়া বহুদোষের সহিত একটি, হয়তো বা একটিমাত্রই গুণ বাহিত হইত। যাহার নাম খানদান।
পূর্বেই বলিয়াছি যে, অভিজাত মনুষ্যদিগের দোষের অন্ত ছিল না, কিন্তু তাঁহাদের ধমনিবাহিত খানদান-এর মধ্যে তাহাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে এমন-ই কিছু পরিলক্ষিত হইত যাহা আজিকার ধনী চূড়ামণিদিগের কোনোক্রমেই কবলিত হইবার নহে।
তৎকালে চওকের পথে পদব্রজে যাইয়া ডাল-কা-মন্ডির গলির নিকটস্থ হইলেই তৎক্ষণাৎ ঘুঙুর ও সারেঙ্গির আওয়াজ কর্ণে ভাসিয়া আসিত।
ইত্বরের দোকানিরা বেলজিয়ান কাটগ্লাসের ডিকানটারে খসস-চম্পা-জুঁই-মুসক-ফিরদৌসি ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার ইত্বরে-ইত্বরে ছয়লাপ করিয়া করিয়া সূচ্যগ্র গুম্ফ নাড়িয়া স্বচ্ছ আদ্দির পাঞ্জাবি পরিধান করিয়া চোস্ত বারাণসীর ভাষায় মৃদুকন্ঠে কথোপকথন করিতেন।
প্রতিচওকে ও চবুতরায় এবং মোড়ে-মোড়ে মঘাই পানের দোকানগুলিতে দেওয়াল বিস্তৃত আরশিতে পথ-বাহিত নর-নারীর ছবি ফুটিয়া উঠিত। খুশবু-ভরা জর্দা সহযোগে তাম্বুল চর্বণ করিতে করিতে সেযুগের অলস সন্ধ্যায় রসিকের মন ফুলের সুবাসে ভাসিয়া তরণী-তন্বী তওয়ায়েফদের ঘুঙুরের শব্দের দিকে নির্দ্বিধায় ধাবিত হইত।
রুপোপজীবিনী, দেহ-পসারিনি ও প্রকৃত তওয়ায়েফে সেদিন আশমান-জমিন ব্যবধান ছিল। তাঁহারা বংশ-পরম্পরায় সংগীতকে এক মোহময় সুগন্ধি পরিবেশে এমনভাবে কোনো নম্র পেলব পক্ষীর ন্যায় পিঞ্জরাবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, তাহা বলিবার নহে।
যে-বৎসরের কথা ধৃতিকান্ত ভাবিতেছিলেন সেই বৎসরের এক চন্দ্রালোকিত পূর্ণিমার রাত্রি। গঙ্গাবক্ষে সেই রাত্রিতে শত শত বজরা ভাসিয়া বেড়াইতেছে। প্রতিবজরায় ফরাশ বিছানো হইয়াছে। তাকিয়া, ইত্বরদানি, গড়গড়া, রৌপ্যনির্মিত তাম্বুলকরঙ্ক, বিচিত্র গন্ধী বহুরঙা ফুল, তম্বুরা, তবলা, সারেঙ্গি, শরাব, নদীমধ্যের মিঠা বাতাস সব মিলিয়া-মিশিয়া কী যে, এক অমরাবতীর আবহাওয়া সৃষ্টি করিয়াছে তাহা বলিবার নহে।
কোনো বজরায় তওয়ায়েফ কেবলমাত্র আলাপ শুরু করিয়াছেন। চন্দ্রালোক গঙ্গাবক্ষে প্রতিফলিত তাঁহার তিলফুলসদৃশ নাসিকার হীরকখন্ডে প্রতিবিম্বিত হইয়া কোমল ঝিকিমিকি আভা ছড়াইতেছে। কোথাও বা আলাপ সমাপনান্তে তান শুরু হইয়াছে। কেহ-বা দ্রুতলয়ে মিঠা ও ভরাট জবানে গজল গাহিতেছেন। কেহ-বা বিলম্বিত লয়ে ধামার অথবা ধ্রুপ দ। দূর হইতে সেই ধামারের ঠাঁট নদীবক্ষে ভাসিয়া-ভাসিয়া না জানি কোন অচেনা দেবলোকের পানে চলিয়াছে।
কোনো বজরা সুরের নেশায় বেদম বুঁদ, শব্দহীন, উৎসাহের, উৎসারের পর স্তব্ধ।
কোথাও-বা শ্রোতারা শরাবের নেশায় অচেতন শয্যাসীন, তথাপি তওয়ায়েফ নাচিয়া-গাহিয়া একাকী সাথসংগতিদিগের সহিত আপন কর্তব্য করিয়া যাইতেছেন।
ধৃতিকান্ত সেই রাত্রে বন্ধুবর্গের সহিত একটি বজরামধ্যে বসিয়া ভাবিতেছিলেন যে, এ বিচিত্র দেশে সাম্যবাদ যদি কোথাও কখনো থাকিয়া থাকে, তাহা প্রথমদিন হইতে সংগীত জগতেই ছিল এবং আছে।
এই নিক্কণিত শিহরিত শব্দের জগতে কেহ কখনো অন্যকে বঞ্চনা করিয়া একেলাই সমস্ত আনন্দ চুরি করিয়া নিজের পেটিকাবদ্ধ করিবার চেষ্টা করে না। কেহ যদি-বা সেই চেষ্টা করিয়াও থাকে, তাহা হইলেও অন্যদের সহিত কখনো আঁটিয়া উঠে নাই। এই ছন্দ-বদ্ধ মধুর শব্দময় জগতে সকলেই দাবিদার। প্রত্যেকের-ই সমান অধিকার। নদীবক্ষে সেই শান্ত সুন্দর সন্ধ্যায় যে-আনন্দ উৎসারিত বিকীরিত হইতেছিল তাহার ভাগ সকলেই সমানভাবে বাঁটিয়া লইয়া নিজ নিজ অন্তর কোমল-গান্ধার বা শুদ্ধ রেখাবের ইত্বরে মাখামাখি করিয়া লইয়াছে।
এই আনন্দধামের অনি:শেষ যাত্রায় কোনো যাত্রীই একে অন্যের পশ্চাতে পড়িয়া নাই। প্রত্যেকেই হস্তে হস্ত রাখিয়া, এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের যোগসূত্র স্থাপন করিয়া, এক-ই সঙ্গে এই অনির্বচনীয় অনিন্দ্যসুন্দরের ঈপ্সিত গন্তব্যে অলস মন্থরতায় যতিহীন ভাসিয়া চলিয়াছে।
ধৃতিকান্ত যেন একাকী আবেশের ভিতর ছিলেন।
মাঝি একাকী স্বগতোক্তির ন্যায় কথা বলিয়া যাইতেছিল। হয়তো বাতাসের সহিত, হয়তো-বা জলের সহিত।
এক বৃদ্ধ অন্য বৃদ্ধর সঙ্গ পাইলে যেরূপ সোচ্চার হইয়া উঠে, সেরূপ আর কাহারও সঙ্গলাভে হয় না। অভিজ্ঞ বৃদ্ধব্যক্তিমাত্রের-ই বলিবার ন্যায় অনেকানেক বক্তব্য বক্ষমধ্যে জমা হইয়া থাকে; কিন্তু বলিবার লোকের অভাবে সেই জমার ঘর শূন্য হয় না।
ধৃতিকান্তর অনাড়ষ্ট ব্যবহারে তাহার বদ্ধ-বক্তব্যের উৎসমুখ খুলিয়া যাওয়ায় সেই বৃদ্ধ মাঝির অব্যক্ত সমস্ত কথা স্বতঃস্ফূর্ত উৎসারে উৎসারিত হইয়া বাহিরে আসিতেছিল।
ধৃতিকান্ত শুধাইলেন, মাঝি, বহুদূরে আসিয়া পড়িলাম। এক্ষণে তরী ফিরাও।
ধৃতিকান্তর কন্ঠস্বরে মাঝির স্বগতোক্তির ঘোর কাটিয়া গেল। ধৃতিকান্তর স্বপ্নাবেশও।
তরীখানি একে একে মণিকর্ণিকা ঘাট, চৈতসিং ঘাট, অহল্যাবাই ঘাট, দশাশ্বমেধ ঘাট হইয়া প্রয়াগ ঘাটের দিকে ধীরে-ধীরে আগাইতে লাগিল।
অকস্মাৎ দূরাগত গুম-গুম শব্দে ধৃতিকান্ত দূরে তাকাইয়া দেখিলেন মুঘলসরাইয়ের সেতুর উপর দিয়া একটি যাত্রীবাহী রেলগাড়ি কলিকাতা অভিমুখে যাইতেছে। বোধ হয় দিল্লি-কালকা মেল হইবে। বহুদূর হইতে আলোকিত কামরাগুলি দিয়াশলাই-এর খোলের ন্যায় দেখাইতেছিল।
ওই অপস্রিয়মাণ আলোকিত রেলগাড়ির প্রতি চাহিয়া সহসাই ধৃতিকান্তর দীর্ঘশ্বাস পড়িল। কেন যে পড়িল তাহা, নিজেও তিনি বুঝিলেন না। কলিকাতায় তাঁহার আপনজন বলিতে কেহই নাই, পৃথিবীর অন্যত্রও হয়তো নাই। যে একমাত্র জন ছিল সে নিজহস্তে তাঁহাকে দূরে ঠেলিয়া পর করিয়া দিয়াছে বহুবৎসর পূর্বেই।
ধৃতিকান্তর বক্ষের অভ্যন্তর হইতে কে যেন অকস্মাৎ কহিল যে, এ জীবনে তাঁহার আর কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করা সম্ভব হইবে না।
রিকশা হইতে অবতরণ করিয়া ধৃতিকান্ত যখন মাহমুরগঞ্জের বাটীতে আসিয়া পৌঁছিলেন, তখন রাত্রি গভীর হয় নাই; কিন্তু সমগ্র মহল্লা নিস্তব্ধ হইয়া গিয়াছে।
মুরতেজা আসিয়া দ্বার উন্মুক্ত করিয়া দিল।
সিঁড়ি উঠিতে-উঠিতে ধৃতিকান্ত বুঝিতে পারিলেন যে, গান থামিয়া গিয়াছে। মুনাব্বর সারেঙ্গিওয়ালা ও তবলচিও বিদায় লইয়াছে।
দ্বিতলে পদার্পণ করিয়াই ধৃতিকান্ত দেখিলেন, রেশমি বারান্দায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছে।
রেশমির তাৎক্ষণিক অভিব্যক্তি ধৃতিকান্তর একেবারেই অপরিচিত বলিয়া বোধ হইল। এই প্রকার ভঙ্গিমায় ও এইপ্রকার অভিব্যক্তির সহিত তিনি রেশমিকে কখনো দাঁড়াইয়া থাকিতে দেখেন নাই।
রেশমি উষ্মাভরে কহিল, তুমি ভেবেছ কী? এটা কি সরাইখানা?
একমুহূর্তে ধৃতিকান্তর মুখমন্ডল ভস্মপ্রায় হইয়া গেল।
উত্তর করিবার পূর্বেই রেশমি কহিল, যখন ইচ্ছা হবে তখন ফিরবে; আমি তোমার কে যে, নিজের শান্তি নষ্ট করে না-খেয়ে, না-দেয়ে তোমার খিদমদগারি করব? কী ভেবেছ তুমি আমাকে?
ধৃতিকান্ত জবাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করিতে চাহেন নাই, কিন্তু কিছু একটা বলিতে যাইতেছিলেন, এমন সময়ে রেশমি পুনর্বার চিৎকার করিয়া কহিল, কলকাতায় তোমার এতসব পেয়ারের লোক থাকতে মরার সময়ে আমার এখানে জ্বালাতে এলে কেন?
রেশমি যে, এমন করিয়া কখনো ভাবিতে বা বলিতে পারে তাহা ধৃতিকান্ত কদাপি স্বপ্নেও ভাবেন নাই।
ধৃতিকান্তর বাকরোধ হইয়া গেল, কী বলিবেন ভাবিয়া পাইলেন না। বলিবার যোগ্য তাঁহার কোনো কথা ছিলও না।
কেবল অস্ফুটে কহিলেন, আমাকে মাপ করে দিয়ো।
কহিয়াই, ধৃতিকান্ত নিজকক্ষে গিয়া দ্বার ঠেলিয়া দিয়া, শয্যায় গিয়া শুইয়া পড়িলেন।
রিকশা করিয়া ঘাটে গমন, নৌকায় বসিয়া থাকা এবং পুনরায় রিকশায় সজোরে আন্দোলিত হইতে-হইতে ফিরিয়া আসিয়া এবং সিঁড়ি-ভাঙিয়া উঠিয়া ধৃতিকান্ত বড়োই পরিশ্রান্ত বোধ করিতেছিলেন।
ইদানীং একটুকুতেই তিনি শ্বাসহীন হইয়া পড়েন। উদরে অত্যন্ত বেদনা বোধ করেন।
তিনি তেপায়ায় রক্ষিত জলের পাত্র হইতে জলপান করিয়া কক্ষের বাতি নিবাইয়া দিলেন।
কী করিবেন, কী করা উচিত ভাবিয়া না পাইয়া বারংবার ঘুমাইয়া পড়িবার চেষ্টা করিলেন।
কিন্তু নিদ্রা অত সহজে আসিল না।
ধৃতিকান্ত বহুবার এই পার্শ্ব হইতে ওই পার্শ্বে ফিরিলেন, এক হইতে একশত অবধি গণনা করিলেন, যূথবদ্ধ বহুমেষকে বহুবার লম্ফ প্রদানপূর্বক প্রাচীর অতিক্রম করিতে দেখিলেন।
তথাপি নিদ্রা আসিল না।
বাহিরে পাহারাদারের বাঁশি বাজিয়াই যাইতে লাগিল। সেই বাঁশির স্বর পুনরায় রাত-চরা পক্ষীর স্বরের ন্যায় ধৃতিকান্তর চেতনামধ্যে কত কী কহিতে লাগিল।
ধৃতিকান্ত শয্যাপরি চক্ষু মুদিয়া শুইয়া রহিলেন।
কতক্ষণ যে, ওইভাবে শুইয়াছিলেন স্মরণ নাই।
বহুক্ষণ পর যেন মনে হইল যে, বাহির দ্বারের ভারী পর্দায় খসখস শব্দ হইল।
ধৃতিকান্ত চক্ষু মেলিয়া দেখিতে পাইলেন যে, রেশমি একটি রেকাবিতে পেঁপে কাটিয়া লইয়া, স্বহস্তে শরবত তৈয়ার করিয়া কক্ষে প্রবেশ করিল।
জলের পাত্রটি বাতায়নের নিকটস্থ মেজ-এর উপর রাখিয়া সেই রেকাবি ও শরবত-এর পানপাত্র তেপায়ার উপর নামাইয়া রাখিল।
তাহার পর ধৃতিকান্তকে কিছুমাত্র বলিবার সুযোগ না দিয়া ও নিজেও কিছুমাত্র বলিবার চেষ্টা না করিয়া শয্যাপার্শ্বের মেঝেতে হাঁটু মুড়িয়া বসিয়া পড়িয়াই শায়ীন ধৃতিকান্তর বক্ষে মস্তক নামাইয়া উচ্চস্বরে ক্রন্দন করিয়া উঠিল।
ধৃতিকান্ত তাহার মস্তকে ও পৃষ্ঠে তাঁহার দুই হস্ত রাখিলেন। সস্নেহে তাহার পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিলেন।
সেই মুহূর্তে আপনাকে বড়োই নীচ, ইতর, অপদার্থ ও অকৃতজ্ঞ বলিয়া মনে হইল ধৃতিকান্তর। তথাপি তিনি কিছুই কহিলেন না।
রেশমি তাহার বক্ষমধ্যে পিঞ্জরাবদ্ধ বহুবৎসরের নিরুদ্ধ আবেগকে এক্ষণে এত বৎসর পর নি:শেষে অর্গলমুক্ত করিতে পারিল দেখিয়া তিনি আশ্বস্ত বোধ করিলেন।
রেশমি বহুক্ষণ ধরিয়া ক্রন্দন করিল।
কখন যে, সেই উচ্ছ্বসিত ক্রন্দনের বেগ প্রশমিত হইয়া এক ক্ষীণ গুঞ্জরণের স্বরে নামিয়া আসিয়া ধীরে ধীরে স্তিমিত হইয়া স্তব্ধ হইয়া গেল তাহার হিসাব দুইজনের কেহই রাখিলেন না ও রাখিল না।
রেশমি শান্ত হইলে ধৃতিকান্ত কহিলেন, আমি সরে যাচ্ছি, তুমি আমার পাশে শোও।
রেশমি পঞ্চদশী বাধ্য বালিকার ন্যায় ধৃতিকান্তর বাক্যানুসারে তাঁহার পার্শ্বে শুইয়া পড়িল, কিন্তু ধৃতিকান্তর প্রতি মুখ ফিরাইল না।
ধৃতিকান্ত দক্ষিণ হস্তে তাহার কটি বেষ্টন করিয়া কহিলেন, আজ কীসের জন্য এত কষ্ট পেলে তুমি রেশমি? আমি তো নতুন করে কোনো কষ্ট তোমাকে দিইনি।
রেশমি কোনো উত্তর করিল না।
—কথা বলবে না?
ধৃতিকান্ত শুধাইলেন।
তথাপি রেশমি নিরুত্তর রহিল।
ধৃতিকান্তও কথা বলিবার জন্য আর তাহাকে পীড়াপীড়ি করিলেন না। তাহার কটি বেষ্টন করিয়া তাঁহার নিজের ক্ষয়িষ্ণু বক্ষে যতখানি উত্তাপ ও উষ্ণতা অবশিষ্ট ছিল তাহা দ্বারা পরমস্নেহে রেশমিকে ঘিরিয়া রহিলেন।
কেহই আর কোনো কথা কহিলেন না বা কহিল না।
বহুক্ষণ পর, রেশমি আবেগকম্পিত কন্ঠে শুধাইল, তোমার-ই জন্যে গান গাইছি শুনেও, তুমি কেন আমাকে না বলে চলে গেলে?
ধৃতিকান্ত উত্তর দিলেন না।
রেশমি পুনরায় কহিল, উত্তর দেবে না?
ধৃতিকান্ত তাহাকে অধিকতর নিবিড়ভাবে বেষ্টন করিয়া কহিলেন, না।
—কেন দেবে না উত্তর?
যুগপৎ আশ্চর্য এবং বিরক্ত হইয়া গ্রীবা ঘুরাইয়া রেশমি ধৃতিকান্তকে শুধাইল।
—দেব না। কারণ দেওয়ার মতো কোনো উত্তর নেই বলে।
ধৃতিকান্ত এ-জীবনে যাহা কখনো কাহাকে মুখ ফুটিয়া শুধান নাই, যাহা বাক্যে প্রকাশ করা কখনো পছন্দও করেন নাই, অকস্মাৎ তাহাই কহিয়া বসিলেন।
কহিলেন, তুমি আমাকে বড়োবেশি ভালোবাসো, না রেশমি?
রেশমি উত্তর করিল না।
কিন্তু ধৃতিকান্তর বক্ষসংলগ্না রেশমির মহুল-ফুল শরীরে এক আশ্চর্য কম্পন উঠিল বলিয়া তাঁহার বোধ হইল। রেশমির সমস্ত শিহরিত সত্তা নিরুত্তরে, নিরুচ্চারে ধৃতিকান্তর অন্তরে এক অভূতপূর্ব আবেগের সঞ্চার করিল। এই আবেগের সমতুল কোনো আবেগ ধৃতিকান্তর সান্নিধ্যে ও প্রেমে অন্য দ্বিতীয় নারীতে সঞ্চারিত হইতে ইহজীবনে তিনি দেখেন নাই।
ধৃতিকান্ত অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত বোধ করিলেন।
বাহিরে পাহারাদারের বাঁশি বাজিয়া যাইতে লাগিল।
যিনি জীবনে প্রায় সমস্ত কিছুকেই হারাইয়া বসিয়াছেন, সেই ধৃতিকান্ত যাহাকে তাহার বক্ষমধ্যে জীবনের অন্তিমকালে নি:সংশয়ে ও বিনা চেষ্টাতেই পাইলেন, তাহাকে পাহারা দিয়া বসিয়া থাকিবার কোনোরূপ প্রয়াস করিলেন না। কিন্তু তাহাকে বড়ো সোহাগে সমস্ত অন্তরের নীরব শুভেচ্ছা ও প্রীতিতে অভিষিক্ত করিলেন।
রেশমি জানিল না, ধৃতিকান্ত পূর্বেও যেরূপ বিশ্বাস করিতেন, এক্ষণেও সেইরূপ করেন যে, পাহারাদারির ন্যায় এরূপ অর্থহীন বৃত্তি আর কিছুই হইতে পারে না।
এক গভীর সুখময়তার আবেশের বৃত্ত পরিক্রমা করিতে-করিতে অকস্মাৎ সেই বিহ্বল বৃত্তের ব্যাস হইতে বাহিরে আসিয়া রেশমি কহিয়া উঠিল, তোমাকে সঙ্গে নিয়ে একবার চূনার আর বিন্ধ্যাচলে যেতে বড়ো ইচ্ছে করে।
ধৃতিকান্ত অস্ফুটে কহিলেন, হঠাৎ এই ইচ্ছে?
—এমনিই। তুমি আসার পর থেকেই এ-কথা ভাবছি।
তাহার পর কহিল, যাবে তো?
—তুমি যদি খুশি হও তো যাব।
—তবে শিগগির-ই একদিন চলো।
—আমাকে নিয়ে গিয়ে কী লাভ? না পারব অতক্ষণ গাড়িতে বসে থাকতে না পারব হাঁটতে।
—সব পারবে। আমি তোমার পাশে থাকলে তুমি সব পারবে।
ধৃতিকান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন।
যাহার মুখে এ-কথা তিনি শুনিলে আনন্দে বিবশ হইতেন, সে তাঁহাকে কখনো এরূপ করিয়া কহিল না। একবারও কহিল না যে, আমি তোমার পার্শ্বে থাকিয়া তোমার সব দুঃখ হরণ করিব।
অথচ, যে তাহা কহিল, তাহার নিকট হইতে ভালো ব্যবহার ব্যতীত আর কিছুর-ই প্রত্যাশা তাঁহার ছিল না।
সংসারে বোধ হয় এইরূপ-ই ঘটে। যাহার নিকট হইতে যাহা বড়ো তীব্র বেদনার সহিত কামনা করা যায়, সে তাহা কখনোই দেয় না। আর যে, অন্যজনে তাহা দেয়, বড়োই আনন্দমিশ্রিত বেদনার সহিত; সেই অন্যজনের নিকট হইতেও তাহা গ্রহণ করা যায় না।
ধৃতিকান্ত চুপ করিয়া রহিলেন।
রেশমি পুনর্বার কহিল, তাহলে বৃহস্পতিবার খাওয়া-দাওয়া করে বেরিয়ে পড়ব আমরা, বুঝেছ? সকালে উঠেই মুরতেজাকে বলে গাড়ির বন্দোবস্ত করে রাখব। তুমি কিন্তু ‘না’ বলতে পারবে না।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, বেশ যাব। তোমার যখন ইচ্ছে হয়েছে।
রেশমি ধৃতিকান্তর বক্ষলগ্না হইয়াই শুইয়া রহিল।
উঠিয়া আর নিজকক্ষে গেল না।
রেশমি বড়োই শান্তিতে ঘুমাইল সে রাত্রিতে, বড়োনিবিড় আনন্দে।
কিন্তু ধৃতিকান্তর চক্ষে কোনোক্রমেই নিদ্রা আসিল না। সমস্ত রাত্রি বাহিরের সেই পাহারাদারের বাঁশি তাঁহার মস্তিষ্কমধ্যে অনুরণিত হইয়া ফিরিতে লাগিল।
প্রত্যূষে উঠিয়াই রেশমি স্নান সারিয়া লইল। তাহার পর দাসীকে আনাজ কুটিতে বলিয়া ধৃতিকান্তর নিমিত্ত নিজহস্তে রন্ধন করিল।
ভোজনে বসিয়া ধৃতিকান্ত কিছুই ভোজন করিতে পারিলেন না।
রেশমি তাঁহার সম্মুখে মেঝেতে বসিয়া ধৃতিকান্তর ভোজনের তদারকি করিতেছিল।
অদ্য তোরঙ্গ হইতে বহুপুরাতন একটি হরিদ্রাবর্ণ টাঙাইল তাঁতের শাড়ি বাহির করিয়া রেশমি তাহা পরিধান করিয়াছিল। পূর্বে ধৃতিকান্ত যখন-ই কলিকাতা হইতে আসিতেন রেশমির নিমিত্ত বহু তাঁতের শাড়ি লইয়া আসিতেন।
কহিতেন, তোমাকে তাঁতের শাড়ি পরলে বড়োভালো দেখি আমি।
রেশমি উত্তর-প্রদেশীয় মুসলমান। বঙ্গরমণীরা যেরূপ করেন, সে সেরূপ তাঁতের শাড়ি, পছন্দ করিত না। কিন্তু ধৃতিকান্ত তাঁহাকে তাঁতের শাড়িতে ভালো দেখেন বলিয়া, ধৃতিকান্তর উপস্থিতিতে সে প্রায়ই তাঁতের শাড়ি পরিধান করিত। সেসব আজি হইতে বহুবৎসর পূর্বের কথা।
এতবৎসর পরেও যে, রেশমি ধৃতিকান্তের পছন্দ-অপছন্দর কথা এমন করিয়া মনে করিয়া রাখিয়াছে, তাহা স্বচক্ষে দেখিয়া ধৃতিকান্ত বড়োই খুশি হইলেন।
রেশমি কহিল, আমাকে ভালো দেখাচ্ছে?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, তোমাকে সব সময়েই ভালো দেখায়।
হলে কী হয়? রেশমি কহিল।
তাহার পর অভিমানভরে কহিল, যতই ভালো দেখাক, তোমার সেই তার মতো তো কখনো দেখলে না আমাকে!
ধৃতিকান্ত কহিলেন, আবারও সেই কথা কেন? সে দোষ এ পোড়াচোখের। তোমার নয়।
কিয়ৎ পরে কহিলেন, অন্যের সঙ্গে চিরজীবন নিজের তুলনা করে বার বার নিজেকে ছোটো করো কেন? তোমার জায়গা তোমার-ই। আমার হৃদয়ে তোমার যে, আসন আছে তাতে অন্য কেউ কখনো বসতে পারে না; পারেনি। তোমার নিজের আসনে তুমি বসতে চাও না কেন?
রেশমি দুষ্টামিভরা চক্ষে ইশারা করিয়া হাসিয়া কহিল, অন্যের আসনে যে, আমার বড়ো লোভ। নিজেরটা তো নিজের বলেই জানি। আর জানি বলেই তো যা নিজের নয়, হবে না—হল না কখনো; তাতেই আমার এত লোভ। আমি যে মেয়ে।
ধৃতিকান্ত হাসিয়া কহিলেন, বললেই তো আর হল না। আমি জানি তুমি লোভীর চেয়ে অনেক বড়ো। তুমি তাকে বারবার হারিয়ে দিয়েছ। তোমার লোভকে পায়ে মাড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গে সেই একজনকেও পায়ে মাড়িয়েছ। এ শুধু তুমি বলেই পেরেছ; পারলে।
রেশমি হাসিয়া কহিল, হয়তো হারিয়েছি। কিন্তু হার-জিত তো কতরকমের-ই আছে। তাই তো ভাবি, তাকে হারিয়ে তবুও তার কাছে চিরদিন হেরেই রইলাম। খুদার কি ‘তামাশা’ বলো?
ধৃতিকান্ত কিছুই না বলিয়া বারান্দাসংলগ্ন গোসলখানায় হস্ত ধুইবার নিমিত্ত উঠিয়া গেলেন।
ছয়
শরৎ চলিয়া গিয়াছে। হেমন্তও যাই-যাই করিতেছে। শীতের আগমনি গান নিক্কণিত প্রকৃতিতে ধ্বনিত হইতেছে।
উড়ন্ত ধুলায় শীতের শুখা খুশবু ভাসিতেছে। বাতাসে রুক্ষ টান টান ভাব। পথিপার্শ্বের কর্ষিত ভূমিতে কিতারি ও বাজরার সমারোহ। বাজরা এই বৎসর বড়োই ভালো ফলিয়াছে। বাজরার খেতে কাকতাড়ুয়া। চাষিপুত্র ক্যানেস্তারা পিটাইয়া অনধিকার প্রবেশকারী, তাহাদের পরিশ্রমে ফলানো বাজরার ভাগীদার বগারী পক্ষীর ঝাঁককে খেদাইতেছে। বগারীর ঝাঁক, ঝাঁকি দিয়া দিয়া মুহূর্তমধ্যে এক-ই কম্পমান শরীরে, দিক হইতে দিক পরিবর্তন করিয়া, দিকচক্রবালে বিন্ধ্যপর্বতশ্রেণির উদ্দেশে উধাও হইয়া যাইতেছে।
নিকটেই কোনো গ্রামে গম-ভাঙা-কল মধ্যাহ্নের মন্থর শীতার্ত বাতাসে পুপ-পুপ-পুপ-পুপ স্বরের একঘেয়েমি ছড়াইয়া দিতেছে। কোথাও বা প্রান্তরের মধ্যে ঊর্ধ্বমুখে উট চলিয়াছে, না-জানি কোন বিষণ্ণ চিন্তায় বুঁদ হইয়া। খুঁটাবদ্ধ লম্ব-কর্ণ শ্বেতচর্ম বকরির শরীরে শীতের রোদ পিছলাইয়া যাইতেছে। সে উজ্জ্বল চোখ তুলিয়া পটাপট শব্দে কান নাড়াইয়া মহানন্দে খড় খুঁটিয়া খাইতেছে।
বকরি-ইদের বিশেষ দেরি নাই। সে জানে না যে, তাহার দিন ঘনাইয়া আসিয়াছে।
গাড়ি চলিতেছে। মুরতেজা চালকের পার্শ্বে। রেশমি ও ধৃতিকান্ত পশ্চাতের আসনে।
ধৃতিকান্তর যাহাতে কোনোরূপ কষ্ট না হয় তাহার নিমিত্ত রেশমি বন্দোবস্তর ত্রুটি করে নাই। তাকিয়া, পানীয় জল, বহুক্ষণ ধরিয়া ভিজাইয়া রাখা চিঁড়ার সহিত বিশেষ দোকানের দধিও লইয়াছে। নিজের জন্য লইয়াছে কেবলমাত্র সেই রৌপ্যনির্মিত হংসসদৃশ তাম্বুলকরঙ্গ এবং সূক্ষ্ম কারুকার্যময় নরম বাদামি মলিদা! ফিরিবার পথে শীতের মোকাবিলা করিবার নিমিত্ত জর্দাসহযোগে ঘন ঘন তাম্বুল চর্বণ করায় অভিমানী ওষ্ঠদ্বয়ে এক সুন্দর রক্তিমাভা ফুটিয়া উঠিয়াছে।
গাড়ি চলিতেছে।
গাড়ি ক্রমশ বিন্ধ্যপর্বতশ্রেণির নিকটবর্তী হইল।
বিন্ধ্যাচল বারাণসী হইতে মাত্র পঞ্চাশ মাইল। মির্জাপুর হইয়া যাইতে হইবে।
ধৃতিকান্তর মনে পড়িয়া গেল সেই প্রবাদটি, ‘কথানাম মির্জাপুরি বগলমে ছুরি।’
এক সময়ে উত্তরপ্রদেশের এই জেলার অত্যন্ত দীর্ঘ লোকেরা দীর্ঘতর তৈল-মর্দিত বংশদন্ড হস্তে লইয়া সদাসর্বদা ঘুরিয়া বেড়াইত এবং সেই দন্ডের ব্যবহারে বিন্দুমাত্র বিলম্বের বা আইন-কানুনের ধার ধারিত না।
গাড়িতে দুই ঘণ্টার পথ। রেশমি কহিয়াছে পথে চূনারে থামিবে। তাহার পর বিন্ধ্যবাসিনীর মন্দির ও অষ্টভুজার মন্দির দর্শন করিবে।
সে জাতিতে মুসলমান। কিন্তু হিন্দুর দেব-দেবীর প্রতিও তাহার সমান ভক্তি। হিন্দুধর্মের প্রতি তাহার আকর্ষণ ধৃতিকান্তর কারণে হয় নাই। প্রকৃতপক্ষে রেশমি আধা-হিন্দু—আধা মুসলমান। তাহার রাজন্য পিতা হিন্দুই ছিলেন। সে কারণেই হয়তো তাহার মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান দুই ধর্মের প্রতিই সমান মমত্ব জন্মিয়াছে। তদব্যতীত নুরুন্নেসার যৌবনকালে মুসলমান গুণগ্রাহী এবং হিন্দু-গুণগ্রাহী তাঁহার প্রায় সমান-ই ছিল।
রেশমির এই মনোভাব প্রথম হইতেই ধৃতিকান্ত জ্ঞাত আছেন। কিন্তু তিনি নিজে যেহেতু কোনো ধর্মই মানেন না—রেশমিকে এ বাবদে কখনোও উৎসাহিত অথবা নিরুৎসাহ করেন নাই।
দেখিতে-দেখিতে চূনারে পৌঁছানো গেল। চূনার দুর্গের অভ্যন্তরে গাড়ি রাখিয়া যে-স্থলে পূর্বে বন্দিশালা ছিল, সে-স্থলে পৌঁছাতে ধৃতিকান্তর সবিশেষ কষ্ট হইল। মুরতেজা, রেশমি, তাঁহাকে প্রায় বহন করিয়াই সে-স্থলে লইয়া গেল।
সেই দুর্গপ্রাচীরে বসিয়া বিন্ধ্যপর্বতোপরি অধুনা পরিত্যক্ত বাংলাটি পড়ন্ত আলোয় দৃশ্যমান হইতেছিল।
রেশমি ও ধৃতিকান্ত নির্বাক দৃষ্টিতে সেইদিকে তাকাইয়া বসিয়া রহিলেন। কেহই কোনো কথা কহিলেন না।
পাঠক! এইরূপ মুহূর্ত সকলের জীবনেই কখনো-কখনো আসে। কে আর না জানে যে, সেইসব মুহূর্তের বাক্যহীনতা বড়োই বাঙময় রূপ লইয়া চিত্তমধ্যে প্রকাশিত হয়!
বহুনিম্নে গঙ্গামাইর বক্রশান্ত হেমন্তর অপরাহ্ণের রৌদ্রালোকিত রূপটি চক্ষু কাড়িয়া লয়। বহুদূরে নদীপার্শ্বে সেচ-বিভাগের তত্ত্বাবধানে জল তুলিবার নিমিত্ত যন্ত্র লাগানো হইয়াছে। সেই যান্ত্রিক শব্দ জলের উপর দিয়া ভাসিয়া আসিতেছে। নদীবক্ষে ও পিঙ্গল বালুচরের উপর চক্রাকারে যুগলে চক্রবাক উড়িতেছে। তাহাদের ‘কোঁয়াক-কোঁয়াক’ স্বর এতউচ্চ হইতে শুনা যাইতেছে না সত্য, কিন্তু ধৃতিকান্ত কল্পনায় তাহা শুনিতে পাইতেছেন।
দুর্গের অপর পারে যে, পেলব পিঙ্গল বালুচর দৃশ্যমান হইতেছে তাহামধ্যে তিনি একবার চক্রবাক শিকার করিতে গিয়া চোরাবালিতে পড়িয়া প্রায় সমাধিস্থই হইয়াছিলেন।
কত কথাই-না মনে আসিতেছিল। খন্ড-খন্ড, পরম্পরা-বিবর্জিত কত-শত স্মৃতি যে, এই হেমন্তের পড়ন্তবেলায় মস্তিষ্কের মধ্যে জলজ বালুচরের গন্ধের সহিত স্বর্ণবর্ণ চক্রবাকের মৎস্যগন্ধী ডানা বাহিয়া ভাসিয়া আসিয়া তাঁহার সমস্ত বোধকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিতেছিল তাহা একমাত্র ধৃতিকান্তই জানেন।
ইদানীং কালে ধৃতিকান্ত গান একেবারেই গাহেন না। তথাপি এইক্ষণে তাঁহার বড়োপ্রিয় বহুগীত রবিবাবুর সেই বহুপুরাতন গানটির কথা মনে পড়িতেছিল—
ও গান গাস নে, গাস নে,
যে দিন গিয়েছে চলে,
সে আর ফিরিবে না,
তবে ও গান আর গাস নে।
রেশমি স্বগতোক্তি করিল, কত কী মনে পড়ছে জান?
ধৃতিকান্ত নি:শব্দে হাসিলেন।
নি:শব্দে কহিলেন জানি; জানি।
এই দিগন্ত-বিস্তৃত ঘন অরণ্যানী বেষ্টিত, সূর্যদেবের অনুরোধানুসারে আনত পর্বতশ্রেণির মধ্যে অশ্বপৃষ্ঠে ধাবমান তাঁহার সেই যৌবনের তেজোদীপ্ত দিনগুলির কথা বারংবার মনে পড়িতে লাগিল ধৃতিকান্তর।
দুর্গের ফটকের নিকট একদল যুবক উচ্চস্বরে কী কারণে না-জানি হাসিতেছিল।
অকস্মাৎ সেই হাস্যরব ধিক্কারের ন্যায়, এক প্রচন্ড সুতীব্র পরিহাসের ন্যায় তাঁহার বক্ষে আসিয়া বিঁধিল।
ধৃতিকান্ত অতীত হইতে চক্ষু ফিরাইয়া সেই যূথবদ্ধ যৌবন-গরবী অনভিজ্ঞ যুবকদের পানে তাকাইলেন।
ধৃতিকান্তর ধারণা হইল, উহারা জানে না যে, কী মহামূল্য অথচ ক্ষণস্থায়ী ধন উহারা বক্ষমধ্যে, ধমনিমধ্যে বহিয়া বেড়াইতেছে। এক্ষণে গত হইয়াছে বলিয়াই ধৃতিকান্ত বুঝিতে পারেন, ‘যৌবন’ কী সম্পদ! ওই যুবকদের তাহা পুরামাত্রায়ই আজিও বিদ্যমান আছে। হয়তো আছে বলিয়াই উহাদের পক্ষে এই অমূল্য সম্পদের মূল্যায়ন করা অদ্য সম্ভব নহে। তিনি যখন যুবক ছিলেন, তখন তিনি ভাবিয়াছিলেন যে, চিরদিন তিনিও যুবক-ই রহিবেন।
ধৃতিকান্তর মনোভাব বুঝিতে পারিয়া হঠাৎ রেশমি কহিল, উঠবে?
চলো। ধৃতিকান্ত কহিলেন।
মুরতেজা ও রেশমি যখন তাঁহাকে ধরিয়া ওই দুর্গশিখর হইতে অবতরণ করিতে সাহায্য করিতেছিল, সেই সময় ওই যুবকদিগের মধ্যে হইতে একজন এমনকিছু কহিল যে, ধৃতিকান্ত বুঝিতে পারিলেন তাঁহার শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও এই বেড়াইবার শখ সম্বন্ধে সেই যুবক কটাক্ষ করিল।
ধৃতিকান্ত শুনিয়াও শুনিলেন না।
কিন্তু রেশমি শুনিল।
রেশমির যৌবন ও রূপ লইয়াও উহাদের মধ্যে কেহ কিছু বলিল। বৃদ্ধ, অশক্ত ধৃতিকান্তর পার্শ্বে সুন্দরী এবং যৌবনবতী রেশমি যে, সম্পূর্ণই বেমানান, ইহাই তাহারা বুঝাইতে চাহিল।
রেশমি অত্যন্ত বিরক্তকন্ঠে চালককে কহিল, গাড়ি সত্বর চালাইয়া চলো। আমরা অষ্টভুজার মন্দিরে যাইব।
সেই উদ্দাম, অসভ্য, গর্বিত যুবকেরা যাহা কহিয়াছিল, তাহা বিন্দুমাত্র মিথ্যা নহে।
এবং মিথ্যা নহে বলিয়াই তাহা ধৃতিকান্তকে বড়ো বাজিল।
বহুক্ষণ তিনি নিশ্চুপ রহিলেন।
তাহার পর রেশমিকে কহিলেন, তুমি আমাকে নিয়ে এসে ভালো করোনি।
রেশমি কহিল, সে আমার ব্যাপার। আমি বুঝব।
বলিয়াই, মুরতেজা ও চালকের অলক্ষ্যে ধৃতিকান্তর শিরা-বহুল শীর্ণ শীতল দক্ষিণ হস্তখানি নিজের কোমল ভরন্ত উষ্ণ হস্তে লইয়া নিজক্রোড়ে স্থাপন করিল।
তাহার পর ফিস-ফিস করিয়া প্রায় ধৃতিকান্তর কর্ণকুহরে মুখ লইয়া কহিল, ওরা চেঁচিয়ে যা বলল, তাই-ই তুমি শুনলে, আর যা-আমি না-চেঁচিয়ে চিরদিন বলে এলাম, তা কি কখনোই শুনতে পেলে না?
ধৃতিকান্ত উত্তর না দিয়া রেশমির হস্তে স্বীয়হস্ত দ্বারা মৃদু চাপ দিলেন।
রেশমি ধৃতিকান্তের অঙ্গুলিগুলি লইয়া স্বীয় অঙ্গুলিসমূহে একীভূত করিল।
গাড়ি চলিতে লাগিল।
বেলা পড়িয়া আসিয়াছিল। খাদের সুরে বাঁধিয়া-লওয়া কোনো বাদ্যযন্ত্রের তারের ন্যায় প্রথম শীতের ভীরু বাতাস পড়ন্ত বেলার রোদকে তাহার অঙ্গুলিতে লঘুভাবে স্পর্শ করিয়া যাইতেছে।
সেই অদৃশ্য তারবাহিত শীতার্ত ধ্বনি এই বিধুর অপরাহ্ণে চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে।
মির্জাপুর শহরকে দক্ষিণে রাখিয়া গাড়ি সোজা এলাহাবাদের পথে ছুটিয়া চলিল।
বাম দিকে রেণুকোটের পথ চলিয়া গিয়াছে বিন্ধ্যপর্বতশ্রেণিকে অতিক্রম করিয়া। অতীতের যে, সময়কার বিভিন্ন ঘটনা, বন্ধু-বান্ধবদের মুখাবয়ব, এই সায়াহ্নে ধৃতিকান্তর মনে পড়িতেছিল সেই সময়ে এই সমস্ত পটভূমি কত না ভিন্ন ছিল। অসংখ্য পিচরাস্তা ছিল না, অগণ্য মনুষ্য ছিল না। পৃথিবীতে এমন কোলাহল, দৌড়াদৌড়ি শুধুমাত্র জীবিকান্বেষণের নিমিত্তই সূর্যোদয় হইতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এমন চক্ষু-লজ্জাহীন হুড়াহুড়ি ছিল না।
তখনও ধনী-দরিদ্র-মধ্যবিত্ত সকলেই নিজ-নিজ সামর্থ্য ও কর্মের মাধ্যমে জীবন নির্বাহ করিত। কিন্তু সে সময়ে ‘জীবিকা’ই আজিকার ন্যায় জীবনের সব কিছুকেই অধিকার করিয়া মনুষ্যের সমস্ত অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে নাই। তৎকালে কখনো-সখনো ক্বচিৎ-কদাচিৎ এই অনি:শেষ দৌড় হইতে নিজেকে কিয়ৎক্ষণের জন্য থামাইয়া কিছু ভাবিবার থাকিলে তাহা আপনমনে ভাবিবার অবকাশ হয়তো ছিল। শহর, এমনকী গ্রামেরও জীবনযাত্রা লক্ষ করিয়াও আজিকাল ধৃতিকান্তের প্রায়শই মনে হয় যে, এক্ষণে সমাজের বিভিন্ন স্তরের অনেকের-ই অনেক কিছু হইয়াছে, হাওয়াই গাড়ি হইয়াছে, টেরিলিনের ট্রাউজার হইয়াছে, প্রচন্ড শব্দময়তার মস্তকপীড়ার উদ্রেককারী সভ্যতার নবতম অবদান ট্রানজিস্টার রেডিয়ো পৌঁছিয়াছে গ্রাম-গ্রামান্তরে কিন্তু নিস্তব্ধতার শব্দে নিবিড় কাকলিমুখর সেই বিধুর সায়াহ্নগুলি এই পৃথিবী হইতে কে বা কাহারা যেন, সজোরে নির্মূল করিয়া চিরতরে উপড়াইয়া লইয়া গিয়াছে।
দেখিতে দেখিতে গাড়ি শিউপুরার লেভেলে ক্রসিং-এর নিকট আসিয়া পড়িল। দক্ষিণপার্শ্বে পথের কিছু অভ্যন্তরে বিন্ধ্যাচল রেলস্টেশনের সবে জ্বলিয়া-উঠা বাতি দৃশ্যমান হইতেছে।
সামান্য আগাইয়া বামে ঘুরিয়া পর্বতের পাদদেশে অষ্টভুজার মন্দিরের নীচে পৌঁছিয়া গাড়ি দাঁড়াইল।
ধৃতিকান্তর স্মরণ হইল যে, পূর্বে এস্থলে বহুবানর দেখা যাইত। কালীকুঁয়া হইতে যখন প্রত্যহ ভৃত্য পানীয় জল আনিতে যাইত তখন প্রায়শই বানরেরা উপদ্রব করিত।
রেশমির সহিত পাথরের সিঁড়ি উঠিতে উঠিতে ধৃতিকান্ত চতুর্দিকে তাকাইতে লাগিলেন। পূর্বে এ-স্থান অনেক বেশি নির্জন ছিল। এক্ষণে মন্দিরের পথের পার্শ্বে ঘর-বাড়ি দোকান-পাট ইত্যাদি হইয়াছে কিছু কিছু।
পর্বতোপরি মন্দিরের প্রায় মধ্যপথে একটি ভুজিয়া ও পেঁড়ার দোকান।
ধৃতিকান্ত রেশমিকে কহিলেন, তুমি ঘুরে এসো, আমি এখানে বসে একটু জল খাই। কত বছর ‘কালীকুঁয়ার’ জল খাইনি।
রেশমি কহিল, আচ্ছা।
ধৃতিকান্ত হঠাৎ শুধাইলেন, দেবীর কাছে কী চাইবে?
রেশমি গ্রীবা ফিরাইয়া হাসিল।
সেই আসন্ন সায়াহ্নের হরিদ্রা এবং স্বর্ণমিশ্রিত আলোক, রেশমির সুন্দর মুখশ্রী, তাহার হাসির আশ্চর্য পবিত্র ভাবটি ধৃতিকান্তর বড়োই মধুর লাগিল। তাঁহার মনে হইল, এরূপ মনোযোগের সঙ্গে গত দুই যুগের মধ্যে রেশমির প্রতি তিনি কখনো তাকাইবার অবসর পান নাই। অথবা তাকাইতে ইচ্ছা করেন নাই।
রেশমি হাসিয়া কহিল, তা বলব কেন! আমার চাওয়া আমার-ই।
তাহার পর কহিল, একটা কথা বলব, বিশ্বাস করবে?
—কী কথা?
—কোনো মন্দিরে বা অন্য কোথাওই আমি নিজে কখনো নিজের জন্যে কিছুই চাইতে যাইনি। কখনো না।
ধৃতিকান্ত বিস্ময়ে শুধাইলেন, তাহলে কী চাও?
রেশমি কহিল, বিশ্বাস করো, কোনো বিশেষ কারও জন্যে নয়। সকলের জন্যে। আমার চারপাশের সমস্ত লোক, আমার বারান্দায় খাঁচার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা ময়নাটার জন্যে, আমার বুড়ো-হয়ে যাওয়া বেড়ালটার জন্যে, প্রত্যেকের যাতে ভালো হয়, যাতে তারা ভালো থাকে, শুধু এইটুকুই বলি।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, তোমার সব কটা বুড়ো-হওয়া বেড়ালের কথাও মনে থাকে? যেটা খুব বেশি বুড়ো ও অথর্ব হয়ে পড়েছে, সেটার কথাও বলো?
রেশমি রাগ কহিল। করিল, চুপ করো।
কহিয়াই, পাহাড়ের প্রায় খাড়াই সিঁড়ি বাহিয়া উঠিতে লাগিল।
ধৃতিকান্ত সেইদিকে অনেকক্ষণ তাকাইয়া রহিলেন।
রেশমিকে বড়োই সুন্দর দেখাইতেছিল।
সত্য কথা বলিতে কী, রেশমির ন্যায় শারীরিক ও আত্মিক সৌন্দর্যবতী কোনো নারী তিনি ইহজীবনে দেখেন নাই। কিন্তু তথাপি রেশমিকেও সহজে হারাইয়া দিয়া একজন অতিসাধারণ মোটামুটি সুশ্রী নারী কেমন করিয়া কোন নিরুচ্চারিত মন্ত্রবলে যে, তাঁহার সমস্ত জীবনের উপর এরূপ জবরদখল লইল, কোন অস্ত্রে যে, সে রেশমিকে পর্যন্ত পরাস্ত করিল, তাহা ধৃতিকান্ত ভাবিয়া পাইলেন না।
এক্ষণে সূর্যাস্তকালে এই দেবমন্দিরের সম্মুখস্থ রক্তকায় প্রস্তরাবৃত সিঁড়িতে বসিয়া, মাছরাঙার ন্যায়, আকাশের পানে তাকাইয়া ধৃতিকান্তর এমন বোধ হইল যে, এ-জীবনে রেশমিকে অন্যজনের ন্যায় ভালোবাসিতে পারিলে, তাঁহার জীবনের সূর্যাস্তর রং হয়তো এইরূপ না-ও হইতে পারিত।
পরক্ষণেই তিনি দোকানির হস্ত হইতে জল লইয়া, পান করিয়া তাহার সহিত আলাপ জমাইয়া তুলিলেন।
নানকু পানওয়ালা নামে এক পানওয়ালা ছিল বহুবৎসর পূর্বে নীচের শিউপুর বস্তিতে। সে কি এক্ষণেও আছে? ধৃতিকান্ত দোকানিকে শুধাইলেন।
দোকানি কহিল, সে কোনো পারিবারিক কারণে পরম-অভিমানভরে তাহার দীর্ঘ পঞ্চাশ বৎসরের ব্যাবসা ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে স্বগ্রামে।
কেন? ধৃতিকান্ত শুধাইলেন।
দোকানি কহিল, নানকু বৃদ্ধবয়সে জুয়াড়ি হইয়া পড়িয়াছিল।
ধৃতিকান্ত অবাক হইলেন।
যে, সূর্যোদয় হইতে মধ্যরাত্র পর্যন্ত সটান বসিয়া থাকিয়া পেঁড়া ও মঘাই পান বিক্রয় করিয়া এতকষ্টের, এতস্বেদের রৌপ্যমুদ্রা সঞ্চিত করিল, সেই কিনা শেষবয়সে জুয়াড়ি হইয়া সেই রৌপ্যমুদ্রা নিজহস্তে বরবাদ করিয়া ফেলিল!
ধৃতিকান্ত তৎক্ষণাৎ নিজের শরাবি হইবার কথা স্মরণ হইল। নানকুকে অত সহজে বাতিল করিতে তাঁহার মন চাহিল না।
কার্য হলে কারণ থাকেই।
একটা কিংবা অনেকগুলো,
কারণগুলো ধুনে ধুনে
বুক করেছে পেঁজা তুলো।
ধৃতিকান্তর মনে পড়িল।
মনে মনে তিনি কহিলেন, নানকু ভাইয়া তুমি যেখানেই থাকো না কেন, তোমাকে আমি ভুল বুঝিনি। তোমার বাইরেটা দেখেই দুনিয়া তোমার বিচার করল। তোমার সঙ্গে আমার আর এ-জন্মে দেখা হবে না। দেখা হলে তোমার বাইরের অভিমানের ছাই টুসকি দিয়ে ঝেড়ে ফেলে তোমার অন্তরের আগুনের আসল চেহারাটা হয়তো দেখতে পেতাম।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনাইয়া আসিল।
অমাবস্যার আর দেরি নাই। স্তব্ধ মহাকাশে নীহারিকামন্ডলী একে-একে আপন শরীরের বিবিধরঙা ঔজ্জ্বল্য লইয়া প্রকাশিত হইতে লাগিল।
ধৃতিকান্ত গাছগাছালিতে, পর্বতমালার প্রস্তরে-প্রস্তরে ফিস-ফিস শব্দে হিমকণা ঝরিয়া পড়িবার শব্দ অভ্যস্ত কর্ণে শুনিতে পাইতেছিলেন।
বহুক্ষণ হইয়াছে রেশমি গিয়াছে। তাহার ফিরিয়া আসিবার লক্ষণমাত্র নাই।
দোকানি পেঁড়া প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত, কড়াইয়ের দুগ্ধ জ্বাল দিতেছিল। কাষ্ঠের উনানে দাউ-দাউ করিয়া প্রজ্বলিত অগ্নিতে সেই দুগ্ধ ফুটিবার শোঁ-শোঁ এবং জ্বলন্ত কাষ্ঠের ফুটফাট আওয়াজ সেই অন্ধকার-সন্ধ্যার নির্জনে শৈত্য বহুগুণ বাড়াইয়া তুলিয়াছিল।
দোকানির আবক্ষ ঘোমটা প্রলম্বিত স্বাস্থ্যবতী যুবতী স্ত্রী, একটি শিশুকে সঙ্গে লইয়া অগ্নির পার্শ্বে আসিয়া আসন্ন শীতের প্রকোপ হইতে রক্ষা পাইবার নিমিত্ত কুন্ডলী পাকাইয়া বসিল। তাহার রন্ধনকর্ম বোধ হয় ইতিমধ্যে সম্পন্ন হইয়াছে। সে তাহার স্বামীকে হাতা-খুন্তি ইত্যাদি আগাইয়া দিয়া সাহায্য করিতে লাগিল।
নৃত্যরত অগ্নিশিখা ধৃতিকান্তর মস্তিষ্কমধ্যে, এক ঘোরের সৃষ্টি করিয়াছিল। ধৃতিকান্ত সেই লেলিহান অগ্নিশিখার প্রতি এবং এই শীতের রাত্রে বড়ো কাছাকাছি ঘেঁষাঘেঁষি হইয়া বসিয়া থাকা দম্পতি ও শিশুটিকে লক্ষ করিয়া ভাবিতেছিলেন, ইহাকেই বোধ হয় ‘সংসারসুখ’ বলে। সংসার কি এমন-ই নৈকট্য ও উষ্ণতায় ভরাট রহে? নিরবধিকাল?
শিশুটি আবদার করিয়া দোকানিকে কী কহিল।
তাহার মা তাহাকে তিরস্কার করিল। কিন্তু দোকানি হাত বাড়াইয়া লাড্ডুর থলি হইতে একটি লাড্ডু তুলিয়া সস্নেহে পুত্রের হাতে দিল।
সেইমুহূর্তে পিতা, শিশু ও মাতা তিনজনের মুখমন্ডল-ই এক স্বর্গীয় মধুর হাসিতে ভরিয়া উঠিল।
হঠাৎ-ই ধৃতিকান্তর সমস্ত সত্তা বাহিরের সেই অন্ধকার রাত্রির ন্যায়, এক অন্ধকার বায়বীয় শূন্যতায় ভরিয়া উঠিল। ধৃতিকান্ত ভাবিলেন, এইরূপ গৃহলগ্না স্ত্রী, বড়ো কাছাকাছি উষ্ণ জীবন, পুত্র-কন্যার আন্তরিক প্রীতি তাঁহারও কি কাম্য ছিল? তাঁহার দ্বারা, এই সুখের ভাগীদার হওয়া এজন্মে হইল না। কিন্তু কেন?
অকস্মাৎ চোখ তুলিয়া ধৃতিকান্ত দেখিলেন যে, রেশমি তাঁহার পার্শ্বে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে এবং তাঁহার-ই দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া অপলকে সেই দরিদ্র দোকানির জীর্ণ দোকানের মধ্যে যে-ঐশ্বর্য তাহার পানে লুব্ধদৃষ্টিতে চাহিয়া আছে।
ধৃতিকান্ত অন্যদিকে মুখ ফিরাইয়া রহিলেন।
রেশমি তাঁহার স্কন্ধোপরি হাত রাখিয়া কহিল, যাবে না?
ধৃতিকান্ত অস্ফুটে কহিলেন, চলো।
মন্দিরের সিঁড়ি বাহিয়া রেশমির হাতে হাত রাখিয়া অন্ধকারে পথ দেখিয়া নামিতে নামিতে ধৃতিকান্ত ভাবিতে লাগিলেন— সুরের আরোহণ-অবরোহণের ন্যায়-ই মনুষ্যজীবনেও আরোহণ-অবরোহণ থাকে। পদের অস্থায়ী অন্তরা এবং আভোগের ন্যায়, মনুষ্যজীবনেরও ধাপে-ধাপে এই মন্দিরের সিঁড়ির ন্যায়, কোনো অদৃশ্য বিধাতা যেন, মাপ-জোক করিয়া রাখিয়াছেন। একদিন-না-একদিন যতই বিলম্বিত লয়ে তান বিস্তার করা হউক না কেন, এই জীবনে ‘সম’-এ সকলকেই ফিরিয়া আসিতেই হয়। যে, সময়ে ‘সম’-এ না ফিরে, সে হারাইয়াই যায়। তাহার আর ফিরিবার কোনোই পথ থাকে না।
অনেক রাত্রি হইয়া যাওয়ায় রেশমি কহিল, বিন্ধ্যবাসিনীর মন্দিরে আজ আর নাই-বা গেলাম।
পরক্ষণেই ধৃতিকান্তকে শুধাইল, নাকি যাবে?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, মন্দিরে গেলেও, আমি তো আর ঢুকতাম না। তোমার ইচ্ছে না হলে গিয়ে লাভ কী?
—তাই-ই ভালো। তোমার শরীর ভালো না। এ পথও ভালো না। এতরাত হবে ফিরতে ভাবতে পারিনি। চলো ফিরেই যাই।
এই বলিয়া চালককে, বারাণসী ফিরিয়া যাইতে আজ্ঞা করিয়া রেশমি গাড়ির শার্সি উঠাইয়া মলিদা মুড়িয়া বসিল। মলিদার একভাগ ধৃতিকান্তর হাঁটুর উপর বিছাইয়া দিয়া কহিল, তোমার শীত করছে না তো?
রেশমি পার্শ্বে থাকিলে অদ্যাবধি যে, ধৃতিকান্তর কখনো শীত করে নাই একথা এইমুহূর্তে ধৃতিকান্ত বড়ো নিবিড় আনন্দের সহিত বুঝিলেন। কিন্তু মুখে কিছুই কহিলেন না। সমস্ত বাক্যই প্রকাশ করিবার নিমিত্তও নহে। প্রকাশ করিলেই যে, সব কিছু প্রকাশিত হয় এমনও নহে। বরঞ্চ এমন অনুভবের শরিক কখনো-কখনো হইতে হয় যাহা, অপ্রকাশিত রাখিলেই বড়োবেশি প্রকাশিত হয়। বরং প্রকাশ করিলেই, সেই অনুভবকে যথার্থ মূল্য দেওয়া হয় না।
ধৃতিকান্ত বড়োই আশ্চর্যান্বিত বোধ করিতে লাগিলেন। রেশমি সম্বন্ধে এতকথা এমন করিয়া এ-জীবনে কখনোই তিনি ভাবেন নাই। কখনো যে, ভাবিবেন; তাহা ভাবেন নাই।
গাড়ির মধ্যে রেশমির বড়োকাছ ঘেঁসিয়া বসিয়া, তাহার মুখ নি:সৃত ইত্বরের খুশবুর মধ্যে বুঁদ হইয়া বসিয়া ধৃতিকান্ত ভাবিতেছিলেন যে, বুঝিলেন তিনি সমস্ত কিছুই; কিন্তু বড়োই বিলম্বে বুঝিলেন।
কথায়-কথায় কখন যে, গাড়ি মোগলসরাইয়ের ব্রিজের উপর উঠিয়া আসিল কেহই খেয়াল করে নাই।
পার্শ্ববর্তী রেলের ব্রিজের উপর দিয়া ঝমঝম শব্দে একটি যাত্রীবাহী গাড়ি চলিয়া যাইতেছিল।
রেশমি চালককে শুধাইল, ই কওনসি গাড়ি যা রহি হ্যায়?
চালক কহিল, ‘দেল্লি-কালকা’ মেল। কলকাত্তা যা রহি হ্যায়।
ধৃতিকান্ত সেই আলোকিত কামরাগুলির প্রতি হঠাৎ মুখ ফিরাইলেন।
অকস্মাৎ-ই তিনি অন্যমনস্ক হইয়া পড়িলেন।
পাঠক! আপনি কি জানেন? কলিকাতা বারাণসী হইতে কতদূর?
আপনি তাহা যদি না জানেন, তাহা হইলে আমি বলি, বারাণসী হইতে কলিকাতা যত দূর, কলিকাতা হইতে বারাণসী ঠিক ততটাই দূর।
—ততটাই দূর!
ধৃতিকান্ত একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিলেন। কলকাতার গাড়ি আলো জ্বালাইয়া, বাঁশি বাজাইয়া ঝমঝম শব্দে তাঁহার সমস্ত স্নায়ুতন্ত্রে ‘ঝমঝম’ আওয়াজ তুলিয়া মিলাইয়া গেল।
ধৃতিকান্তর নাসারন্ধ্র বকুল ফুলের গন্ধে ভরিয়া উঠিল।
হঠাৎ ধৃতিকান্ত রেশমিকে কহিলেন, তুমি একদিন বলেছিলে, তুমি আমার আগে মরে গেলে তোমার কবরে আমি যেন, রোজ রোজ লাল গোলাপ দিই। কিন্তু তোমার আগে আমি মরে গেলে কী ফুল দেবে; তা তো কখনো শুধোওনি তুমি।
পরক্ষণেই কহিলেন, শুধোবে না?
রেশমি বহুক্ষণ ধৃতিকান্তর চক্ষে চাহিয়া রহিল।
অনেক—অনেকক্ষণ পর কহিল, আমি জানি, তাই কখনো জিজ্ঞেস করিনি।
মোগলসরাই ব্রিজ হইতে নামিয়া বাম দিকে ফিরিয়াই গাড়ি দ্রুত বারাণসীর পথে ছুটিয়া চলিল।
সন্ধ্যা হইবার কিয়ৎক্ষণ পূর্বেই ধৃতিকান্ত মাহমুরগঞ্জের বাটীর সম্মুখ হইতে একটি রিকশা লইয়া রথযাত্রা চৌমহনীর দিকে চলিয়া গেলেন।
যাইবার পূর্বে রেশমিকে কহিয়া গেলেন যে, তুমি কোথাও যেয়ো না। তোমার জন্যে কচুরিগলি থেকে রাবড়ি আর গোধূলিয়ার মোড় থেকে পান নিয়ে আসছি।
দাসী রেশমির চুল বাঁধিয়া দিতেছিল। বাহিরের বারান্দায় মোড়ার উপর বসিয়া রেশমি পথের দিকে চাহিয়াছিল।
বারান্দা পথ হইতে কিঞ্চিৎ দূরে। সম্মুখে একফালি বাগান। নুরুন্নেসা শখ করিয়া নানারূপ গাছগাছালি লাগাইয়া ছিলেন। কোনো গুণগ্রাহী লখনউয়ের নার্সারি হইতে গোলাপ আনিয়া দিয়াছিলেন। কেহ-বা আলমোড়া হইতে ম্যাগনোলিয়া গ্ল্যাণ্ডিফ্লোরার চারা। অত্যুৎসাহী কেহ-বা উটকামন্ড বা কালিম্পং হইতে রডোডেনড্রন ও অন্যান্য দুষ্প্রাপ্য অর্কিডও আনিয়া উপহার দিয়াছিলেন।
বলা বাহুল্য, বারাণসীর আবহাওয়ায় উটকামন্ড বা কালিম্পং-এর অর্কিড ফুল দেয় নাই— শুকাইয়া মরিয়া গিয়াছিল। দাতার প্রেমের ফুলও তাহার সহিত শুকাইয়া ঝরিয়াছিল কি না তাহা নুরুন্নেসাই কহিতে পারিতেন।
যাহাই হউক, প্রত্যহ প্রত্যূষে উঠিয়া রেশমি নিজহস্তে এইসকল গাছগাছালিতে বারি সিঞ্চন করে, ময়নাকে সস্নেহে দানা খাওয়ায়, বিড়ালটিকে দুগ্ধ সেবন করায়। মালতীলতা বা মাধবীলতা গতরাত্রের ঝোড়ো হাওয়ায় হেলিয়া পড়িয়া থাকিলে, তাহাদের সুবিন্যস্ত করিয়া রাখে।
এই সকল-ই প্রত্যূষে।
বৈকালে এ সমস্ত ভার দাসী ও মুরতেজার। যেদিন রেওয়াজ করে না (আজকাল সে রেওয়াজ বা তালিম খুব কম-ই করে বা নেয়) রেশমি বারান্দায় বসিয়া উহাদের কাজের তদারকি করে। দাসী কাজ সারিয়া আসিয়া হাত ধুইয়া লইয়া নানারূপ পুষ্পের আরক ও বহুপ্রকার হাকিমি দাওয়াই দ্বারা সুরক্ষিত কিন্তু অতিসুগন্ধি তৈল লইয়া মেঝেতে বসিয়া রেশমির কেশচর্চা করে। দিনের এই সময়টুকুতে রেশমি সম্পূর্ণ নিরালা হইয়া যায়। মনে-মনে পথের দিকে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে কত কী-ই সে ভাবে।
চক্ষু পথের উপরেই নিবদ্ধ থাকে কিন্তু কে যায়, না-যায় তাহা, তাহার চক্ষে পড়ে না। তাহার মনের চক্ষু ততক্ষণে স্মৃতির অলিন্দে-অলিন্দে ঘুরিয়া বেড়ায়।
বাটীর সম্মুখের চবুতরায় প্রথমপ্রত্যূষে এবং সন্ধ্যার প্রাক্কালে কবুতরেরা ভিড় করিয়া আসে। দাসী তাহাদের জন্য যে-গেহুঁ, বাজরা বা ধান্য দিয়া আসে তাহারা তাহা খুঁটিয়া খায়। প্রত্যেকটি কবুতরকে রেশমি বিশেষরূপে জানে। কোনোদিন উহাদের মধ্যে একজনও অনুপস্থিত থাকিলে দাসী বা মুরতেজা মারফত হাসান সাহেবের বাগানবাটীতে তাহার অসুখ করিয়াছে কি না, সে খবর লইয়া আসিতে পাঠায়। কবুতরগুলি বড়োই প্রিয় রেশমির।
অদ্য ধৃতিকান্ত এক্ষণে বাহির হইলেন বলিয়াই বারান্দার রেলিংয়ের ফোকর দিয়া ধৃতিকান্তর সাইকেলরিকশা আসীন মূর্তিটি যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যায়, ততক্ষণ রেশমি সেই দিকে চাহিয়া রহিল।
পথের বাঁকে সাইকেলরিকশাটি মিলাইয়া যাইবার পর, রেশমি বারান্দার অভ্যন্তরে চক্ষু ফিরাইয়া লইল।
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিল। অপস্রিয়মাণ ধৃতিকান্তর সাইকেলরিকশায় বসিবার অসহায় ভঙ্গিটি তাহার বক্ষে বড়োই বাজিল! কী ধৃতিকান্ত, কী হইয়াছেন! সত্য সত্যই তাহার বর্তমানে বিবশ মার্জারটির প্রতি রেশমির যেরূপ স্নেহ ও মমতা, ধৃতিকান্তের প্রতিও ঠিক সেইরূপ এক মমতা বোধ করে সে ইদানীং। এরূপ অবস্থায় সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় ধৃতিকান্তকে বাঁচিয়া থাকিতে দেখিয়া রেশমির মনে একইসঙ্গে উষ্মা, অভিমান, সমবেদনা এবং ক্রোধ আসিয়া দাপাদাপি করে। ধৃতিকান্তই একমাত্র পুরুষ যাঁহার কাছে রেশমি তওয়ায়েফকেও আজীবন হার স্বীকার করিতে হইল। কখনো এমনকী আজিকার ধৃতিকান্তর অসহায়তার মধ্যেও সে, তাঁহাকে পরাজিত করিতে পারিল না। তাঁহার সর্বস্বহৃত অবস্থাতেও তাঁহাকে ‘তাহার’ করিয়া পাইল না। কিংবা অন্তর্যামীই জানেন; হয়তো ধৃতিকান্তর সর্বস্ব এখনও খোয়া যায় নাই। হয়তো এখনও বাকি আছে কিছু।
এই পরাজয়ে রেশমির গ্লানি বোধ করার-ই কথা ছিল। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে গ্লানি বোধ না করিয়া রেশমি এক অতীন্দ্রিয় আনন্দ অনুভব করে সর্বক্ষণ তাহার বক্ষমধ্যে। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আনন্দর স্বরূপ রেশমি তওয়ায়েফের ন্যায় আর কে জানিবে? সে আনন্দ তো সুন্দরী মানবী শরীর লইয়া যাহারাই জন্মায় তাহারাই জানে। কিন্তু ‘অতিন্দ্রীয়’ প্রেমের মধ্যে যে, দেবদুর্লভ আনন্দ তাহার স্বাদ সকলের ভাগ্যে জোটে না। এ বাবদে রেশমি নিজেকে পরমভাগ্যবতী বলিয়া মনে করে। ধৃতিকান্ত ইন্দ্রিয়সুখ বলিতে যাহা জাগতিক অর্থে বুঝায়, তাহা দেন নাই তাহাকে ইহা সত্য, কিন্তু যাহা দিয়াছেন, তাহা নিক্তির একপার্শ্বে রাখিয়া, জীবনের সমস্ত অন্যান্য ইন্দ্রিয়সুখকে অন্যপার্শ্বে রাখিয়া সে দেখিয়াছে যে, প্রথম দিকের ওজন চিরদিন-ই বেশি।
পাঠক! পূর্বেই বলিয়াছি যে, রেশমি ধৃতিকান্তের নিকট হইতে যে, সহজপ্রাপ্তি চাহে নাই এমন নহে। কিন্তু যে-কারণেই হউক, সেই দানের প্রতি ধৃতিকান্তর বিমুখতা এবং ধৃতিকান্তর সমস্ত সত্তা আর একজন নারী (যাহাকে রেশমি কখনো দেখে নাই) আচ্ছন্ন করিয়া ছিল বলিয়াই হয়তো এই অপ্রাপ্তির প্রাপ্তির, পরমপ্রকৃতি রেশমি যেমন বুঝিল, তেমন করিয়া আর কোনো তওয়ায়েফ কখনো বুঝিবে না।
ধৃতিকান্ত রথযাত্রা চৌমহনী ছাড়াইয়া গোধূলিয়ার বাঁকে পৌঁছিয়া তাঁহার পরিচিত দোকানির দোকান হইতে দুই খিলি পান লইলেন।
এই দোকানি তাঁহাকে যৌবনে দেখিয়াছে, তাঁহার অতীত সম্বন্ধে সে, বিশেষরূপে জ্ঞাত আছে। এই ব্যক্তি ছাদ-খোলা বিদেশি গাড়িতে করিয়া কুর্তা ও গিলা করা পাঞ্জাবি পরিধান করিয়া তাহার দোকানের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইতেন, উর্দিপরা চালক ও খিদমদগার গাড়ি হইতে আসিয়া রৌপ্যনির্মিত করঙ্কমধ্যে তাম্বুল ভরিয়া লইয়া যাইত, সেই করঙ্কর নীচতলায় বরফ রহিত। সেই বরফের উপর গোলাপ জল ছিটাইয়া দেওয়া হইত। তাম্বুল থাকিত উপরের তলায়।
ধৃতিকান্ত, সেই ঐশ্বর্য ও মহিমার দিনে যেরূপ আন্তরিক ও উদার ব্যবহার করিতেন, এই দোকানির সহিত আজিও সেইরূপ-ই করেন। কিয়ৎদিন পূর্বে সেই দোকানির পুত্র অত্যন্ত অসুস্থ হওয়ায় ধৃতিকান্ত মধ্যাঙ্গুরীয়র হীরকখচিত শেষ অঙ্গুরীয়টি পানওয়ালাকে দিয়া কহিয়াছিলেন যে, এইরূপ শত-শত অঙ্গুরীয়র বিনিময়েও, তোমার পুত্রের জীবনের মূল্য দেওয়া যায় না, তাই এই একটি অপ্রয়োজনীয় অঙ্গুরীয়র বিনিময়ে যদি তাহাকে সুস্থ করিয়া তুলিতে পারো, তাহা হইলে এই হীরকখন্ড যথার্থ সার্থক হইবে।
পুত্র সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়া উঠিয়াছে। সেই সন্ধ্যায় সে দোকানে উপস্থিতও ছিল। দোকানি ও স্বীয়পুত্র ধৃতিকান্তকে দেখিয়া যারপরনাই আনন্দিত হইল। দোকানি রেশমির নিমিত্ত সযত্নে তাম্বুল সাজিতে লাগিল। কহিল, পুত্র মারফত সে তৎক্ষণাৎ মাহমুরগঞ্জে পান পাঠাইয়া দিতেছে।
এ-জীবনে ধৃতিকান্ত বহুব্যক্তির জন্য, বহুসংসারের জন্য তাঁহার যৎসামান্য সামর্থ্যনুসারে অনেক কিছুই করিয়াছেন—যখন তাঁহার সে সামর্থ্য ছিল। কিন্তু শিক্ষিত ও সচ্ছল ব্যক্তিদের মধ্যে যে-অসীম অকৃতজ্ঞতা ও স্বার্থপরতা তিনি দেখিয়াছেন, তাহাতে চিত্ত বড়োই ব্যথিত হইয়াছে। কিন্তু অশিক্ষিত দরিদ্র ব্যক্তিমাত্রই তাঁহাকে চমৎকৃত করিয়াছে। তাহারা কিছু ভোলে না; কদাপি না। সেই শিক্ষিত সচ্ছলদের মধ্যে, কেহ-কেহ কোনো দুর্দিনে-প্রাপ্ত সাহায্যে তৎকালীন আর্থিক মূল্য বহুবৎসর পর ধৃতিকান্তকে ছুঁড়িয়া দিয়া গর্বভরে কহিয়াছেন, সব-ই শোধ করিলাম। যেন ধৃতিকান্ত রৌপ্যমুদ্রাই দিয়াছিলেন, তৎসঙ্গে কাহাকেও অন্যকিছুই দেন নাই। যেন রৌপ্যমুদ্রা শোধ করিলেই তামাম-শোধ হইয়া যায় এই সংসারে। কেহ-বা কিছুমাত্র শোধ না করিয়া অথবা শোধ করিবার চেষ্টামাত্র না করিয়া ধৃতিকান্তের দুর্নাম করিয়া বেড়াইয়াছেন, কহিয়াছেন; উহার আছে, তাই দেয়, ইহাতে বাহাদুরির কী? যাহার আছে সে না দিবে কেন?
সকলেই এবং প্রত্যেকে ধৃতিকান্তর অর্থ ও প্রতিপত্তিকে ভালোবাসিয়াছেন, ধৃতিকান্তকে তাঁহার নিজের জন্য, তাঁহার অন্তরের উষ্ণতার জন্য, অন্যকে সুখী দেখিয়া, আনন্দিত দেখিয়া তিনি যে, স্বার্থহীন আন্তরিক আনন্দ পাইতেন; সেই আনন্দের স্বরূপকে কেহই কখনোই কণামাত্রও দাম দেন নাই। মনুষ্যচরিত্রের এই নগ্নভাবে প্রকট ও হৃদয়-বিদারক রূপটি তাঁহাকে বড়োই ব্যথিত করিয়াছে। অনেক দেখিয়া শুনিয়া, ভাবিয়া, বহুদিন যাবৎ কাহারও নিকট হইতে তাঁহার আর কোনোই ‘প্রত্যাশা’ নাই। তিনি দূর হইতে অন্যকে ভালোবাসিয়া, অন্যের শুভকামনা করিয়াই বহুদিন যাবৎ খুশি আছেন।
সে কারণেই, এই দরিদ্র পানওয়ালা ও তাহার পুত্রের এবংবিধ আচরণ তাঁহাকে মুগ্ধ করিল। তিনি পুনর্বার বুঝিলেন যে, কে কতখানি দিতে পারেন জাগতিকার্থে, তাহার উপর কিছুই নির্ভর করে না, কে কেমনভাবে তাহা দেন, কেমনভাবে তাহা প্রত্যর্পণ করেন, তাহার উপর-ই সমস্ত কিছু নির্ভরশীল।
ধৃতিকান্ত যখন রিকশা ঘুরাইয়া লইয়া অন্যত্র চলিলেন, তখন সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে।
রঘুনন্দনের বাটী অতিক্রম করিয়া আসিয়া তিনি রিকশা ছাড়িয়া দিলেন।
তাহার পর পদব্রজে রঘুনন্দনের বাটী ছাড়াইয়া আরও কিছুদূর আগাইয়া গেলেন।
পূর্ব নির্দেশানুসারে একটি নীলরঙা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি অন্ধকার পথের অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানে পথিপার্শ্বস্থ একটি ঘোড়া-নিমের অন্ধকারতর ছায়ায় দাঁড়াইয়াছিল।
ছত্রপাল গাড়ির নম্বরপ্লেট বদলাইয়া লইয়াছে। গাড়ির গায়ে স্থানে-স্থানে জমি ঘষিয়া রং চটাইয়া ফিকা-বাদামি-রঙা প্রাইমার লাগানো হইয়াছে। ছত্রপাল কহিয়াছে যে, কার্য সমাধা হইলেই, গাড়ি পুনর্বার রং করাইয়া লইবে।
ধৃতিকান্ত ধীরে পায়ে হাঁটিয়া গাড়িটিকে একবার অতিক্রম করিয়া গেলেন। তাহার পর ফিরিয়া আসিয়া চালককে ফিসফিস করিয়া কী কহিলেন।
চালক সম্মুখের বাম দিকের দরজা খুলিয়া দিল।
ধৃতিকান্ত ভিতরে উঠিয়া কিছুক্ষণ দম লইয়া কহিলেন, ছোটন কেমন আছে?
চালক হাসিয়া উত্তর দিলেন, ভালো আছে।
ধৃতিকান্ত আবারও কহিলেন, আজকাল কি শিকার-টিকার খেলে?
চালক হাসিল। কহিল, না:। এখন কাজকর্মে, সংসারের চাপে আর সময় হয় না। বয়সে তো হয়েছে।
ধৃতিকান্ত ভাবিলেন, তাহা ঠিক। বয়স তো হইয়াছেই! ছোটন তাঁহার সমবয়সিই হইবে।
তাহার পর শুধাইলেন, তোমার নাম কী?
—আমার নাম লোটন!
—তুমি কী কাজ করো?
—আমার মোটর মেরামতের গ্যারাজ আছে।
লোটন একবার ঘড়ি দেখিল।
কহিল, সময় হয়েছে তো?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, হয়েছে। তবে তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। রঘুনন্দন বেরোক—বেরিয়ে ও এদিকেই আসবে। প্রায় আধ ঘণ্টা এই নির্জন জায়গায় পায়চারি করবে। তখন যা করার আমিই করব। তুমি ছোটনের ভাই, ছেলেমানুষ; তোমাকে কোনো হুজ্জোতি পোয়াতে হবে না।
‘ছেলেমানুষ’ আখ্যা দেওয়াতে, লোটন কিছুটা ক্ষুব্ধ হইল।
মুখে কিছুই কহিল না।
ছোটন ধৃতিকান্ত ও ছত্রপালের বহুপুরাতন শিকার-সঙ্গী।
ছোটনকে একবার মির্জাপুর জেলার এক বনমধ্যে আক্রমণোদ্যত ভল্লুকের হাত হইতে ধৃতিকান্ত রক্ষা করিয়াছিলেন। ছোটন বলিয়াছিল ‘ইয়াদ রহে গা। তুমহারা কোই কামমে আনেসে ইয়াদ করনা ইয়ার।’
ছোটনের ন্যায় এত সত্বর কেহই জানোয়ারের চামড়া ছাড়াইতে পারিত না। যেকোনো জানোয়ার-ই হউক না কেন, বাঘ হইতে শম্বর চামড়া ছাড়ানো তাহার পক্ষে কোনোই দুরূহ কর্ম ছিল না।
ধৃতিকান্তর মনে পড়িল যে, ছোটন কহিত, আমি যেমন জানোয়ারের ছাল ছাড়াতে পারি, তেমন মানুষেরও পারি; মনে রেখো ইয়ার। কখনো জরুরত হলে বলবে। জিন্দেগি ভর ইন্তেজার করব!
জরুরত বহুবৎসর পর হইয়াছে, তাই ছত্রপাল মারফত ধৃতিকান্ত ছোটনকে সংবাদ দিয়াছিলেন।
বর্তমানে বয়স্ক ছোটন নিজ অপেক্ষাও জবরদস্ত ও জোয়ান অনুগত সহোদরকে পাঠাইয়াছে, যাহাতে ছাল ছাড়ানোর কোনো ত্রুটি না হয়।
ধৃতিকান্ত লোটনের প্রতি হাত বাড়াইয়া দিলেন।
লোটন এদিক-ওদিক চাহিয়া পাঞ্জাবির পকেট হইতে একটি পিস্তল বাহির করিল।
—গুলি ভরা আছে?
ধৃতিকান্ত শুধাইলেন।
—আছে। সাতটি ম্যাগাজিনে, একটি চেম্বারে।
বহু বহুদিন পর শীতল কালো পিস্তলটির বাঁট হাতে করিয়া ধৃতিকান্ত বড়োই খুশি হইলেন।
হাতে জোর নাই, হাত একটু-একটু কাঁপে ইদানীং। তবুও হাতে পিস্তল থাকিলে, রঘুনন্দনকে মারিতে যতটুকু জোরের প্রয়োজন হইবে; ততটুকু জোর এখনও ধৃতিকান্তের অবশিষ্ট আছে।
সময় বহিয়া যাইতেছে।
লোটন আরও একবার ঘড়ি দেখিল।
কহিল, খবর পায়নি তো আগে?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, সেকথা তো তুমি জানবে। ইন্তেজাম তো সব তোমার।
লোটন পুনরায় ক্ষুব্ধ হইল।
কহিল, আমার ইন্তেজামে কোনো গড়বড়ি নেই। আপনাকে দেখে ফেলেনি তো?
ধৃতিকান্ত কহিলেন, আমাকে পথের মধ্যে রিকশায় দেখলেও চিনতে পারার কথা নয়। কিন্তু দেখেতোনি।
আরও প্রায় দশ মিনিট কাটিয়া গেল।
ধৃতিকান্ত পশ্চাতে দেখিবার আরশিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া স্থির হইয়া বসিয়া রহিলেন।
হঠাৎ লোটন কহিল, ছত্রপাল ভাইয়া কিন্তু বার বার বলে দিয়েছে, যে প্রাণে মারা চলবে না।
ধৃতিকান্তর চোয়াল শক্ত হইয়া উঠিল।
কহিলেন, জানি। জানে মারলে তোমাদের উপরও হামলা হতে পারে।
তাহার পর কহিলেন, আজকাল সকলেই ভীতু হয়ে গেছে। অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন। ‘জান’-এ না মারলে হামলা তো আরও বেশি হবে। আমার উপর হবে; রেশমির উপর হবে।
লোটন কহিল, আমরা বানারসে থাকতে ওই হারামজাদা যাতে মাহমুরগঞ্জের বাড়িতে আর কখনোও পা না দেয়, তা আমাদের জিম্মাদারি। আপনাকে জবান দিলাম। ভয় রেশমি বহিনের জন্য নয়; ভয় আপনাকেই নিয়ে। আপনার শিগগির কলকাতা চলে যাওয়া উচিত। আজ এ ব্যাপারটা ভালোমতো মিটে গেলে, কালকের গাড়িতেই আপনার চলে যাওয়া উচিত।
ধৃতিকান্ত কোনোই উত্তর করিলেন না।
ভাবিতে লাগিলেন, কলিকাতায় যাইয়া তিনি কী করিবেন! প্রথমত, সে-স্থলে তাঁহার থাকিবার ন্যায় কেহই নাই, দ্বিতীয়ত, রঘুনন্দনের চেলারা ভাবিবে যে, তিনি ভীরু। তাঁহার শরীর অশক্ত, দুর্বল হইয়াছে বলিয়া তাঁহার মনও দুর্বল হইয়াছে, একথা ভাবিয়া থাকিলে বলিতে হইবে যে, ধৃতিকান্তকে এখনও তাহারা সম্যক চিনে নাই।
হঠাৎ ধৃতিকান্ত সোজা হইয়া বসিলেন।
আরশিতে রঘুনন্দনকে আসিতে দেখা গেল।
প্রকান্ড মেদবহুল গোলাকৃতি অবয়ব। আজ পরনে মিলের মিহি ধুতি এবং বেনারসি সিল্কের পাঞ্জাবি।
চকিতে মস্তক ঘুরাইয়া ধৃতিকান্ত চতুষ্পার্শে দেখিয়া লইলেন। আশ্বস্ত হইলেন, রঘুনন্দনের সহিত চেলা-চামচা আর কেহ নাই দেখিয়া।
থপথপ করিয়া একটি অতিকায় কোলাব্যাঙের ন্যায় রঘুনন্দন আগাইয়া আসিতেছিল।
দেখিতে দেখিতে রঘুনন্দন গাড়ির নিকটবর্তী হইল।
ধৃতিকান্ত দেখিলেন, সম্মুখ হইতে জনাকয় লোক একইসঙ্গে আসিতেছে। তাহাদের প্রায় প্রত্যেকের হস্তেই প্রকান্ড-প্রকান্ড বংশদন্ড।
এতক্ষণে রঘুনন্দন একেবারে গাড়ির পার্শ্বে চলিয়া আসিয়াছে। কিন্তু ওই লোকগুলিকে দেখিয়া ধৃতিকান্ত চিন্তিত হইলেন। পরমুহূর্তেই লক্ষ করিলেন যে, রঘুনন্দন নিজেও ওই লোকগুলিকে আসিতে দেখিয়া ধৃতিকান্ত হইতেও বেশি চিন্তিত।
লোকগুলি তাহাদের প্রতি দৃকপাত না করিয়া আপনাদিগের মধ্যে গল্প করিতে-করিতে গাড়িকে অতিক্রম করিয়া চলিয়া গেল।
কিন্তু ততক্ষণে রঘুনন্দন অনেকখানি আগাইয়া গিয়াছে।
ধৃতিকান্ত জানিতেন যে, রঘুনন্দনের পাঞ্জাবির নীচে ছয় ঘরা রিভলবার লুক্কায়িত নিশ্চয়ই আছে। তাই সম্মুখ হইতে তিনি উহার সহিত মোকাবিলা করিতে চাহিলেন না।
লোটন কহিল, গাড়িটা একটু এগিয়ে নিয়ে যাই ওর পিছুপিছু।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, না না। এখানেই ভালো আছে। গাছটার জন্য এখানে অন্ধকার। ও আবার ফিরে আসবে। তখন আমি যা করার করব।
লোটন তাঁহার দিকে চাহিয়া কহিল, ‘যা-করার’ মানে কিন্তু প্রাণে মারা নয়।
ধৃতিকান্ত পুনর্বার কহিল, সেকথা তো আগেই বলেছ। বারবার এককথা কেন?
শীর্ণ ও অশক্ত ধৃতিকান্তর কঠিন স্বরমধ্যে যে-ব্যক্তিত্ব ঝরিয়া পড়িল, লোটন তাহাতে যারপরনাই আশ্চর্যান্বিত হইল।
রঘুনন্দনকে ফিরিয়া আসিতে দেখা গেল। থপ-থপ করিয়া সে আসিতেছিল।
রঘুনন্দনকে দেখিবামাত্র ধৃতিকান্ত নি:শব্দে বাম দিকের দ্বার খুলিয়া নামিয়া গাড়ির পশ্চাতে চলিয়া গেলেন এবং পশ্চাতেই লুকাইয়া রহিলেন।
রঘুনন্দন গাড়ির নিকটবর্তী হইয়াই অকস্মাৎ গাড়ির পার্শ্বে দাঁড়াইয়া লোটনকে উদ্দেশ করিয়া সন্দিগ্ধ স্বরে কহিল, কিসকা গাড়ি হ্যায় ই?
লোটন তাচ্ছিল্যভরে দুই হস্ত মস্তকোপরি তুলিয়া একটি আড়মোড়া ভাঙিল।
তাহার পর কহিল, আপ কেয়া পুলিশ-সার্জেন্ট হ্যায়?
রঘুনন্দন কহিল, এ্যাইসেহি পুছ রহা হ্যায় ম্যায়। জবাব দেনেমে আপকো তকলিফ ক্যা হ্যায়?
লোটন মুহূর্তমধ্যে দরজা খুলিয়া নামিয়া পড়িল কহিল, আরে মোটু, ইয়ে তেরা বাপকা গাড়ি হ্যায়!
অস্বাভাবিকতার গন্ধ পাইয়াই সঙ্গে সঙ্গে রঘুনন্দন নিজেকে গুটাইয়া লইল। তাহার চাতুর্য তাহাকে ‘মূর্খ’ হইতে কহিল।
সে এতবড়ো অপমানটা হজম করিয়াই দ্রুতপদে তাহার বাটী অভিমুখে রওয়ানা হইল।
রঘুনন্দন সবেমাত্র গাড়িটি অতিক্রম করিয়াছে, অমনি ধৃতিকান্ত পিস্তল বাহির করিয়াই তাহার পৃষ্ঠদেশে ঠেকাইয়া তাহাকে হস্তদ্বয় উপরে তুলিতে কহিলেন।
ব্যাপার বুঝিবার পূর্বেই লোটন আসিয়া রঘুনন্দনের ট্যাঁক হইতে রিভলবারটি ছিনাইয়া লইল।
ধৃতিকান্ত রঘুনন্দনকে ঘাড়ে লইয়া আসিয়া গাড়ির পশ্চাতের দ্বার খুলিয়া দিয়া একধাক্কায় তাহাকে পিছনের সিটে ঢুকাইয়া দিলেন।
লোটন অবাক হইয়া লক্ষ করিল যে, রঘুনন্দনের অতিবড়ো দেহটি ধৃতিকান্তর হস্তের এক ধাক্কায় হুড়মুড় করিয়া পশ্চাতের সিটের উপর হুমড়ি খাইয়া পড়িল।
ধৃতিকান্ত নিজেও অবাক কম হন নাই। কিন্তু রঘুনন্দনকে ঢুকাইয়া তিনি নিজেও প্রায় হুমড়ি খাইয়া পড়িবার ন্যায় পশ্চাতের সিটে রঘুনন্দনের পার্শ্বে গিয়া বসিয়া পড়িলেন।
লোটনকে কহিলেন, মাহমুরগঞ্জ।
রঘুনন্দন কহিল, ব্যাপারটা কী?
বাম হস্তে পিস্তল ধরিয়া, দক্ষিণ হস্ত দ্বারা রঘুনন্দনের মাংসল গালে ‘ঠাস’ শব্দে এক চপেটাঘাত কষাইয়া দিয়া ধৃতিকান্ত কহিলেন, মুখ নীচু করে পাদানিতে মুখ ঢুকিয়ে বসে পড়ো। কথা বলেছ কী তোমার জান নিয়ে নেব।
লোটন পুনর্বার কহিয়া উঠিল, জানে মেরো না, জানে মেরো না।
ধৃতিকান্ত লোটনকে ধমকাইয়া কহিলেন, চুপ করো তুমি।
লোটন বিস্ময়ান্বিত হইয়া একবার ঘাড় ফিরাইয়া ধৃতিকান্তকে দেখিয়া লইয়া তাহার মুখের আশ্চর্য দৃঢ় ভাব ও জ্বলন্ত চক্ষু লক্ষ করিয়া আর কিছু কহিল না।
মাহমুরগঞ্জের বাটীর গেটের ভিতর গাড়ি ঢুকিবার পর গাড়ি গ্যারাজের নিকটে আসিলে, ধৃতিকান্ত অন্যপার্শ্বের দ্বার খুলিয়া রঘুনন্দনকে নামিতে কহিলেন ও তাহার ঘাড়ে পিস্তলের নল ঠেকাইয়া, মুরতেজা দ্বার খুলিবামাত্র, তাহাকে দ্বিতলে লইয়া চলিলেন।
লোটনকে কহিলেন, তুমি গাড়িতেই থাকো।
দাসী রঘুনন্দনকে দেখিবামাত্র চিৎকার করিয়া উঠিল।
ধৃতিকান্ত তাহাকে চুপ করিতে কহিলেন।
রেশমি অন্ধকার বারান্দায় বসিয়া ছিল। ধৃতিকান্ত ডাকিলেন রেশমি। এই তোমার রাবড়ি এনেছি।
রেশমি বারান্দা হইতেই কহিল, গেলে রিকশায়। কিন্তু গেটে কার গাড়ি ঢুকতে দেখলাম? কার গাড়ি?
ধৃতিকান্ত রঘুনন্দনকে রেশমির ঘরে লইয়া গিয়া মাটিতে হাঁটু গাড়িয়া বসিতে কহিলেন।
রেশমি উত্তর না পাইয়া বারান্দা হইতে ভিতরে আসিয়াই দাসীর উত্তেজিত চোখ-মুখ লক্ষ করিয়া নিজকক্ষে প্রবেশ করিল।
ঘরে প্রবেশ করিয়া আতঙ্কিত স্বরে কহিল, এ কী? এ কে?
তাহার পর ধৃতিকান্তর হস্তে পিস্তল দেখিয়া ভীতস্বরে কহিল, একে ধরে এনেছ কেন?
ধৃতিকান্ত হাসিলেন।
কহিলেন, একে বলেছিলাম যে, আর একবার তোমার কাছে আসতে হবে। তাই-ই নিয়ে এলাম।
স্থূলকায় রঘুনন্দনের মাটিতে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া থাকিতে কষ্ট হইতেছিল। তাহার চোখে-মুখে জানোয়ারসুলভ এক অভিব্যক্তি ফুটিয়া উঠিয়াছিল।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, মাপ চাও রঘুনন্দনবাবু।
রেশমির পায়ে হাত দিয়ে মাপ চাও।
রঘুনন্দন কহিল, কভভি নেহি।
নেহি? ধৃতিকান্ত শুধাইলেন।
—নেহি!
আতঙ্কিত রেশমির সম্মুখে মুহূর্তমধ্যে ধৃতিকান্তর জুতাসুদ্ধ দক্ষিণ পদ সজোরে রঘুনন্দনের মুখে আঘাত করিল।
রঘুনন্দন মাটিতে লুটাইয়া পড়িয়া গেল।
কিন্তু ভূলুন্ঠিত অবস্থা হইতে উত্থিত হইয়া কহিল, হাতে পিস্তল নিয়ে বাহাদুরি করছ, নইলে শুকনো ইঁদুর তোমাকে আমি দেখে নিতাম।
ধৃতিকান্তর মুখে এক শীতল, হিমেল হাসি ফুটিয়া উঠিল।
তিনি কহিলেন, সেদিন তোমার হাতেও রিভলবার ছিল এবং সঙ্গে তোমার শাগরেদরা ছিল। আজ আমার দিন––বলিয়াই পুনরায় সজোরে তাহার মুখে পদাঘাত করিলেন।
রঘুনন্দন পুনর্বার পড়িয়া গেল।
থাক থাক, অনেক হয়েছে,––বলিয়াই রেশমি ধৃতিকান্তকে থামাইতে গেল।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, রেশমি, পুরুষের ব্যাপারে মেয়ে হয়ে মাথা ঘামাতে এসো না। চুপ করে খাটে বোসো, পা ঝুলিয়ে। ও আজ মাপ না চাইলে, ওকে সত্যিই জানে খতম করে দেব। ও আমাকে চেনে না। ও ভেবেছে, আমি একেবারে শেষ হয়ে গেছি। শেষ হয়ে যাবার আগে ওকে শেষ করে যাব।
রঘুনন্দন একবার ঝাঁপাইয়া পড়িয়া ধৃতিকান্তর হস্ত হইতে পিস্তলটি ছিনাইয়া লইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু ধৃতিকান্ত ক্ষিপ্র চিতাবাঘের ন্যায় লাফাইয়া সরিয়া গিয়া পিস্তলের নল দিয়া রঘুনন্দনের মস্তকে সজোরে আঘাত করিলেন।
রঘুনন্দন যন্ত্রণায় চিৎকার করিয়া উঠিল।
তাহার কপাল গড়াইয়া রক্ত পড়িতে লাগিল। বেনারসি সিল্কের পাঞ্জাবি রক্তে ভাসিয়া যাইতে লাগিল।
রঘুনন্দন প্রথমে ভাবিয়াছিল, ধৃতিকান্ত সত্য সত্যই তাহাকে জানে মারিবার ন্যায় দুঃসাহসী হইবেন না, কিন্তু নিজরক্ত দেখিয়া তাহার মনোবল কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ণ হইল।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, তাড়াতাড়ি রেশমির পায়ে ধরে মাপ চাও। তোমাকে ছুটি দিয়ে দেব।
রঘুনন্দন ইতস্তত করিতেছে দেখিয়া, ধৃতিকান্ত কহিলেন মাপ চাইবে না তুমি? তাহলে চলো, তোমাকে এখুনি শেষ করে তোমার মরা হাত জোড়া করে, বেঁধে আমি মাপ চাওয়াব। কামিনা, তোমার মতো অনেক জানোয়ারের রক্তে আমার হাত ভরে গেছে। তোমাকে মারতে আমার হাত একটুও কাঁপবে না।
রঘুনন্দনের আর্তনাদ শুনিয়া ইতিমধ্যে লোটন আসিয়া কক্ষমধ্যে দাঁড়াইল।
রেশমি ভয় পাইয়া কহিল, এ কে?
ধৃতিকান্ত সংক্ষেপে কহিলেন, এ আমার লোক।
লোটন পুনরায় কহিল, জানে কিন্তু মারবেন না।
ধৃতিকান্ত রাগতস্বরে কহিলেন, তুমি বড্ড বাড়াবাড়ি করছ ছোকরা। বেশি কথা বললে তোমাকেও শেষ করে দেব। যেকোনো লড়াইতে নেতা একজন-ই থাকে––তুমি চুপ করো, আমি যা বলছি––তাই করো।
লোটনের মুখমন্ডলে অপমানের ছাপ লাগিল।
ধৃতিকান্ত পুনরায় রঘুনন্দনের মুখে পদাঘাত করিলেন। ধৃতিকান্তর জুতায় রক্ত লাগিয়া গেল।
লোটন কহিল, এখনও পায়ে ধরো, নইলে তোমাকে কিন্তু আমিও বাঁচাতে পারলাম না।
লোটনের কথাতে রঘুনন্দন সত্য সত্যই ভয় পাইল।
রেশমি খাটের বাজু ধরিয়া বসিয়া ভাবিতেছিল, যে-ব্যক্তিকে, সে ও মুরতেজা দুইজনে মিলিয়াও চূনারের দুর্গে উঠাইতে কষ্ট পাইতে দেখিয়াছিল, সে ব্যক্তির জীর্ণ অসুস্থ শরীরে এত বল কোথা হইতে আসিল।
রঘুনন্দন উঠিয়া দাঁড়াইয়া রেশমির নিকট আগাইয়া আসিতে লাগিল।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, না। হেঁটে নয়, হামাগুড়ি দিয়ে এসো।
কহিয়াই পুনরায় তাহাকে আরও এক চপেটাঘাত করিলেন। চপেটাঘাতে এমন জোর শব্দ হইল যে, দাসী ও মুরতেজা বারান্দা হইতে কক্ষমধ্যে ছুটিয়া আসিল।
রঘুনন্দন এক্ষণে হামাগুড়ি দিয়া ধীরে-ধীরে রেশমির দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। মেঝেতে রক্ত পড়িয়া তাহা ভাসিয়া যাইতে লাগিল। কপালবাহিত রক্তস্রোতে রঘুনন্দনের দুই চক্ষু বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। সে কোনো রক্তাক্ত বদবু জানোয়ারের ন্যায় আসিয়া রেশমির দোদুল্যমান দুই পদতল দুই হস্তে ধরিল।
ধৃতিকান্ত কহিলেন, বলো-যে, আমাক মাপ করো রেশমি। বলো-যে, এ বাড়ি জীবনে আর কখনো ঢুকবে না। বলো, জোরে জোরে বলো।
রঘুনন্দন বাঁধা-বুলির ন্যায় ধৃতিকান্তর শিখাইয়া দেওয়া কথা কয়টি কহিল।
মাপ চাওয়া হইতেই ধৃতিকান্ত কহিলেন, এবার চলো।
রেশমি আলমারি খুলিয়া সেদিনের দশ টাকার নোটের বাণ্ডিলটি ধৃতিকান্তের হস্তে তুলিয়া দিল।
ধৃতিকান্ত তাহা ভূতলে নিক্ষেপ করিয়া জুতা দিয়া মাড়াইয়া মেঝেতে ঘষিয়া রঘুনন্দনের রক্তে মাখামাখি করিয়া ফেলিলেন।
তাহার পর রঘুনন্দনকে কহিলেন, উঠিয়ে নে কুত্তা, গোবর কি কিম্মত।
রঘুনন্দন ইতস্তত করিতেছে দেখিয়া ধৃতিকান্ত তাহার দিকে পিস্তল উঁচাইলেন।
রঘুনন্দন যখন রক্তমাখা টাকার বাণ্ডিলটি উঠাইতেছিল, ঠিক সেই সময় লোটন এক লম্ফে আসিয়া ধৃতিকান্তর হস্তধৃত পিস্তলটি ছিনাইয়া লইয়া কহিল, যা করণীয় ছিল; করা হয়েছে। বেইজ্জতির বদলা নিয়েছেন। এখন একে আমার হাতে ছেড়ে দিন।
রেশমি ভয়ে আর্তনাদ করিয়া উঠিল।
ধৃতিকান্ত আশ্চর্যান্বিত চক্ষে লোটনের পানে তাকাইলেন।
ঠিক সেইমুহূর্তে রঘুনন্দন ধৃতিকান্তর প্রতি ধাইয়া আসিল।
লোটন মুহূর্তমধ্যে তাহার পথ রোধ করিয়া দাঁড়াইবার জন্য ছুটিয়া গেল কিন্তু তাহার পূর্বেই ধৃতিকান্ত নিজেই রঘুনন্দনের দিকে আগাইয়া আসিয়া অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতার সহিত রঘুনন্দনের তলপেটে সজোরে একটি পদাঘাত করিলেন।
রেশমি বিস্ময়ে হতবাক হইয়া আবারও ভাবিতে লাগিল যে, এত জোর, এত শক্তি এই মুমূর্ষ লোকটির মধ্যে আসিল কীরূপে? কোথা হইতে আসিল?
ধৃতিকান্ত লোটনকে নাম ধরিয়া না ডাকিয়া কহিলেন, এবারে চলো। আমার কাজ শেষ!
রঘুনন্দন কহিল, আমার সঙ্গে শত্রুতা করলে বাঙ্গালিয়াবাবু এর দাম দিতে কিন্তু তুমি দেউলে হয়ে যাবে।
ধৃতিকান্ত হাসিলেন। কহিলেন, জানি। কিন্তু তাতে তোমার আজকের এই কুকুরের মতো অপমান মুছে যাবে না। তুমি যদি মানুষ হও রঘুনন্দন, যদি সত্যিকারের জানোয়ার না হও, তাহলে আমাদের এই পুরুষদের কাজিয়াতে রেশমিকে আর জড়িয়ো না কখনো। ও আওরত। বদলা নিতে হয় যদি, নিতে পারো; তাহলে আমার উপরেই নিয়ো। রেশমিকে ওর ইজ্জত নিয়ে বাঁচতে দিয়ো।
রঘুনন্দন কোনো কথা কহিল না।
লোটন কহিল, কী হল? এর উত্তর পাওয়া আমার দরকার। এই উত্তরের ওপর তোমার জীবন নির্ভর করছে রঘুনন্দন। যদি এই কথা এক্ষুনি না মানো, মরদের বাচ্চার মতো যদি জবান না দাও এই ব্যাপারে, তাহলে পিস্তল আমি ওঁকে আবার ফিরিয়ে দেব। তারপর তোমাকে নিয়ে যাব ডিজেল লোকোমোটিভ ওয়ার্কাস-এর ময়দানে। ভেবে বলো।
রঘুনন্দন রেশমির প্রতি একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল। সে চাহনিতে কোনো বিদ্বেষ ছিল না, কিন্তু বেদনা ছিল বলিয়াই বোধ হইল ধৃতিকান্তর।
পাঠক! কে বলিতে পারে? রঘুনন্দন হয়তো রেশমিকে সত্যসত্যই ভালোবাসিত। এ সংসারে সকলের ভালোবাসার প্রকাশ তো একরূপ নয়! সকলেই কিছু রুচিসম্মত ও ভদ্র শিষ্টভাবে ভালোবাসিতে জানে না। হয়তো রঘুনন্দনের ভালোবাসার প্রকাশটাই জঘন্য। হয়তো রেশমিকে তীব্রভাবে ভালোবাসিয়াও তাহার শরীর অথবা মন কিছুই না পাইয়া রেশমির উপর তাহার স্থূল বুদ্ধি অনুসারে সে প্রতিশোধ লইয়াছিল! সে জানোয়ার হইতে পারে, কিন্তু জানোয়ারেরাও তো ভালোবাসে––তাহারাও তো ভালোবাসা চায়।
রঘুনন্দন রেশমির প্রতি পুনরায় চক্ষু তুলিয়া চাহিল। আধা জমাট বাঁধা রক্তে চক্ষু তাহার বুজিয়া গিয়াছে।
রঘুনন্দন স্থির, নিষ্কম্প কন্ঠে কহিল, তোমার কোনো ক্ষতি আমার দ্বারা হবে না রেশমি। তোমাকে আমি ভালোবাসি।
লোটন পশ্চাৎ হইতে তাহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া কহিল, ভালোবাসি! ভালোবাসার আর জায়গা পেলে না?
রঘুনন্দন জবাব দিল না।
ধৃতিকান্তর হঠাৎ মনে হইল যে, রঘুনন্দনের চক্ষু বাহিয়া শুধু রক্তই নহে, কিঞ্চিৎ অশ্রুও যেন গড়াইয়া পড়িল।
আশ্চর্য! কতরকম মনুষ্যই-না সংসারে দেখা যায়।
স্থূল কদাকার শরীর, কদর্য রুচিসম্পন্ন রক্তাক্ত রঘুনন্দন সিঁড়ি বাহিয়া টলিতে টলিতে অবতরণ করিতে করিতে ভাবিতে লাগিল যে, রেশমিকে সে যথার্থই ভালোবাসিয়াছিল কিন্তু তাহার প্রতি ঘৃণা ব্যতীত রেশমির আর কিছুই দেয় ছিল না। কিন্তু অপর পক্ষের সাড়া না মিলিলেও তাহার নিকট হইতে কিছুমাত্র উৎসাহ না পাইয়াও তো কেহ কাহাকে এক তরফের ভালোবাসা বাসিতেও পারে। রঘুনন্দন রক্তাপ্লুত অবস্থায় তাহার সমস্ত বুদ্ধি জড়ো করিয়াও বুঝিতে পারিল না যে, কাহাকে ভালোবাসিবার শাস্তি এইরূপ হয় কেন? তাহার সেই মুহূর্তের জানোয়ারসুলভ স্থূল অন্তরের বেদনা তাহার সমস্ত শারীরিক বেদনাকে ছাপাইয়া ফেলিল।
রঘুনন্দনকে তাহার বাটীর নিকটস্থ সেই ঘোর-নিমের ছায়ায় নামাইয়া দিয়া ধৃতিকান্ত কহিলেন, এক্ষুনি ডাক্তার ডেকে চিকিৎসা করাও। নইলে মাথার ক্ষত বিপদ ডেকে আনতে পারে।
অপস্রিয়মাণ গাড়িটির পশ্চাতের লাল আলো মিলাইয়া যাইতে দেখিতে দেখিতে রঘুনন্দন ভাবিল, রেশমির এই বাঙ্গালিয়া রিস্তাদার বড়োই রহস্যময় ব্যক্তি। ক্ষতর সৃষ্টি করিতেও তাহার দ্বিধা হইল না, আবার ক্ষতর চিকিৎসার জন্য চিন্তান্বিত হইতেও বিলম্ব হইল না।
অদ্য দেওয়ালি।
বারাণসীর প্রতি গৃহে-গৃহে আজ আলোকসজ্জা। কক্ষে কক্ষে তিনপাত্তি খেলিবার ধুম পড়িয়া গিয়াছে। আকাশে নানারূপ আতশবাজির কারসাজি। চতুর্দিকে দুমদাম শব্দে কর্ণে তালা ধরাইয়া পটকা ফাটিতেছে। ধৃতিকান্ত গোধূলিয়ার বাঁকের দিকে চলিয়াছেন একটি সাইকেলরিকশা চড়িয়া, উদ্দেশ্য তাম্বুল সেবন করা এবং কচুরিগলি হইতে অদ্য সত্যসত্যই রেশমির নিমিত্ত রাবড়ি লইয়া যাওয়া।
রঘুনন্দনকে নামাইয়া দিয়া সেইদিন যখন ধৃতিকান্ত মাহমুরগঞ্জে ফিরিয়া ছিলেন তখন রেশমি কাঁদিয়া কাটিয়া তাঁহাকে অনেক অনুযোগ করিয়াছিল। কহিয়াছিল, তোমার কী দরকার ছিল গুণ্ডা বদমায়েশদের সঙ্গে মারামারি করার। আমার ইজ্জত-এর কথা আমি বুঝতাম। ঘরের বউয়ের ইজ্জত আর তওয়ায়েফের ইজ্জত তো একরকম হয় না। আমার জন্য তুমি নিজে এতবড়ো ঝুঁকি নিতে গেলে কেন?
ধৃতিকান্ত হাসিয়া কহিয়াছিলেন, একমাত্র তোমার জন্যই তো ঝুঁকি নেওয়া যায়। একমাত্র তুমিই তো আমার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে রইলে। তোমার বুকে যতটুকু ভালোবাসা ছিল, সব তো একমাত্র আমাকেই নিংড়ে দিলে। অন্য কেউই তো আমার হাতে তাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তাদের মান-অপমান তোমার মতো এমন নি:শেষে তুলে দেয়নি। আমি চাইলেও দেয়নি। আমার ওপর তুমি ছাড়া আর কারুর-ই ভরসা ছিল না এককণা। তোমার জন্য ঝুঁকি নেব না তো কার জন্য নেব বলো?
রেশমি খুব-ই উত্তেজিত ও চিন্তিত হইয়াছিল।
শুধাইয়াছিল, তোমাকে রঘুনন্দন যদি কিছু করে?
করলে করবে। ধৃতিকান্ত সহজভাবে কহিয়াছিলেন।
তাহার পর কহিয়াছিলেন, তুমি ছাড়া এই মুহূর্তে আমার হারাবার মতো আর কিছুই তো অবশিষ্ট নেই। না হয় ‘তোমার’ কারণেই তোমাকে হারাব। এতে দুঃখের কী আছে? তা ছাড়া যেভাবে বেঁচে আছি তার চেয়ে রঘুনন্দন যদি তাড়াতাড়ি বৈতরণী পার করাবার বন্দোবস্ত করে তাহলে তার কাছে কৃতজ্ঞই থাকব। আমার জন্য ভেবো না। আমার জন্য এমন করে ভেবে এই প্রয়োজনহীন জীবনটার প্রতি মিথ্যে মমত্ববোধ বাড়িয়ে দিয়ো না। তাহলে মরবার সময়ে বড়োকষ্ট পাব।
রেশমি ধমকাইয়া কহিয়াছিল, তুমি কি চুপ করবে?
গোধূলিয়ার বাঁকের আলো ও পুলিশচৌকি দেখা যাইতেছে। আর একটু আগাইলেই ধৃতিকান্তর সেই পরিচিত পানের দোকানির দেওয়াল-বিস্তৃত আরশি চক্ষে চমকাইবে।
ক্যাঁচোর-কোঁচোর শব্দে রিকশা চলিতেছে––লোকজন, নানারূপ যানবাহনের ভিড় ঠেলিয়া।
এমন সময়ে অকস্মাৎ রিকশাটিকে প্রায় ধাক্কা মারিয়া একটি জিপগাড়ি রিকশাটিকে অতিক্রম করিয়া গিয়া রিকশার সম্মুখে ব্রেক কষিয়া দাঁড়াইল।
ধৃতিকান্ত দেখিলেন যে, মস্তকে পট্টি লাগানো রঘুনন্দন ও চারিপাঁচজন লোক তাঁহার রিকশা ঘিরিয়া ফেলিয়াছে।
রঘুনন্দন জিপ হইতে অবতরণ করিয়া হাতজোড় করিয়া ধৃতিকান্তকে কহিল, দিওয়ালি মুবারক।
পথবাহিত জনস্রোত ও অন্যান্য যানবাহনের মধ্যে এই প্রীতি বিনিময়ের ঘটনা অত্যন্ত স্বাভাবিক বলিয়াই প্রতিপন্ন হইল। কাহারও কোনোই সন্দেহের উদ্রেক হইল না।
ধৃতিকান্ত কিছু বুঝিবার পূর্বেই তাঁহাকে জিপগাড়ির পশ্চাতে গিয়া উঠিতে হইল। উহাদের মধ্যেই কেহ রিকশাওয়ালাকে পাওনা মিটাইয়া দিল, যাহাতে তাহার চিত্তেও কোনোরূপ সন্দেহের উদ্রেক না হয়।
পথে বিশেষ কথাবার্তা হইল না। ধৃতিকান্তকে দুইপার্শ্ব হইতে দুইজন বলিষ্ঠ গুণ্ডা প্রকৃতির লোক চাপিয়া বসিয়াছিল। ধৃতিকান্ত পলাইবার বা বাধা দিবার চেষ্টমাত্র না করিয়া যাহা প্রত্যাশা করিয়াছিলেন, সেই পূর্ব-নির্ধারিত অন্তিম সময়ের অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। বাঁচিবার এবং আরও দীর্ঘকাল বাঁচিয়া থাকিবার কোনোরূপ স্পৃহা তাঁহার ছিল না। বরঞ্চ মনের অভ্যন্তরে রঘুনন্দনের প্রতি এক দুর্বোধ্য কৃতজ্ঞতাবোধ করিতেছিলেন তিনি।
জিপ গোধূলির মোড় পার হইয়া দশাশ্বমেধ ঘাটের দিকে চলিল।
ঘাটে দেওয়ালির রাত্রে বেশ ভিড়। অনেকে জলে প্রদীপ ভাসাইতেছেন, মৃত আত্মীয়-পরিজন ও জীবিতদের মঙ্গলকামনায়। ঘাটে যাঁহারা ছিলেন, তাঁহারা সকলেই নিজ-নিজ কর্মে ব্যস্ত! জলপুলিশ নৌকায় টহল দিতেছে। কিন্তু কাহারও কোনো সন্দেহ হইল না। ধৃতিকান্তও কাহারও মনোযোগ আকর্ষণের জন্য কিছুমাত্র চেষ্টা করিলেন না।
বোধ হয় পূর্ব হইতেই নৌকা ঠিক করা ছিল। নৌকার মাঝিরা ইহাদের দেখিয়াই নৌকা ত্যাগ করিয়া তীরে উঠিয়া আসিল। রঘুনন্দনের দলের দুইজনে দাঁড় লইয়া বসিল, একজন হালে।
রঘুনন্দন আর ধৃতিকান্ত সামনাসামনি বসিলেন।
নৌকা ছাড়িয়া দিল।
উত্তরবাহিনী গঙ্গার জল ‘ছলাৎ-ছলাৎ’ শব্দে নৌকার গায়ে আসিয়া লাগিতেছিল। শীতের দক্ষিণাভিমুখী হাওয়ায় জলের উপর প্রচন্ড শীত লাগিতেছিল। ধৃতিকান্ত তাঁহার চাদর মুড়িয়া সেই হিমেল হাওয়া হইতে বাঁচিবার জন্য গা-ঢাকিয়া বসিলেন। যতক্ষণ বাঁচেন, ভালো করিয়াই বাঁচা উচিত।
ভালো করিয়া বাঁচা হইল না বলিয়াই তো মরিতে তাঁহার বিন্দুমাত্র খেদ নাই।
রঘুনন্দন কহিলেন, কিছু বলবে বাঙ্গালিয়াবাবু?
ধৃতিকান্ত স্বাভাবিক কন্ঠে কহিলেন, কী বলব? কিছুই বলার নেই।
—প্রাণভিক্ষা করবে না?
রঘুনন্দন ঠাট্টার স্বরে শুধাইল।
—...না:।
ধৃতিকান্ত পুনরায় সহজকন্ঠে কহিলেন।
জন্ম হইতে এতাবৎকাল কাহারও নিকট হইতে কিছুমাত্র ভিক্ষা করেন নাই, তাই এই শেষসময়ে রঘুনন্দনের নিকট হইতে কিছু ভিক্ষা মাগিতে তাঁহার সম্ভ্রমে বাধিল। ভিক্ষা জীবনে তিনি মাত্র একজনের নিকট হইতেই চাহিয়াছিলেন, ভিক্ষা চাহিয়া, তাহা না পাওয়ার গ্লানি যে, কী তাহা তিনি ভালোরূপেই জানেন। সেই গ্লানির কথা মনে পড়ায় নিজের প্রাণভিক্ষা করিতেও তাঁহার প্রবৃত্তি হইল না।
তীর হইতে পটকার শব্দ জলের উপর দিয়া ভাসিয়া আসিতেছিল। অদ্য চতুর্দিকেই দুমদাম আওয়াজ। তন্মধ্যে রঘুনন্দনের রিভলবারের শব্দ কাহারও বিস্ময় বা দৃষ্টি আকর্ষণ করিবে না। এই দেওয়ালির দিনে হয়তো সে-কারণেই পূর্ব হইতে সমস্ত কিছু পরিকল্পনা করিয়া রঘুনন্দন বদলা লইতে আসিয়াছে।
নদীর অপর পারের বিস্তীর্ণ তীরকে অন্ধকার রাত্রিতে অন্ধকারতর যমসদৃশ যবনিকার ন্যায় দেখাইতেছিল।
নৌকা মাঝ-নদীতে আসিয়া উপস্থিত হইল।
রঘুনন্দন কহিল, তোমাকে আমার একটা কথা বলার ছিল।
কী? সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করিলেন ধৃতিকান্ত। বিরক্ত ও নিস্পৃহ কন্ঠে।
—তোমাকে কেন মারছি জান?
—জানি।
—কেন?
—তোমার সেদিনকার অপমানের শোধ তোলার জন্য।
রঘুনন্দন হাসিয়া উঠিল।
তাহার মেদবহুল শরীরে সেই হাসি তরঙ্গ তুলিল।
রঘুনন্দন কহিল, না সেজন্য নয়।
তাহার পর একটু থামিয়া কহিল, আমি যাকে আজ কুড়ি বছর ধরে ভালোবেসে আসছি, যাকে পাবার জন্য করিনি এমন কিছু নেই; সেই রেশমি তোমাকে সব দিয়ে বসে আছে। বদলাটা সেদিনের মারধরের নয়। বদলাটা এইজন্য। তোমার মধ্যে কী-এমন আছে, যা আমার নেই, তা তোমাকে মেরে ফেলে কেটে কুটে আমার দেখতে বড়ো ইচ্ছা হয়। লাশ-কাটা ঘরে ফেলে তোমাকে চিরে-চিরে দেখতে ইচ্ছা করে।
ধৃতিকান্ত কিঞ্চিৎ ভাবিয়া কহিলেন, ‘যোগ্যতা’র বিচার করে কেউ কাউকে কি কখনো ভালোবাসে রঘুনন্দন? ভালোবেসে ফেলে কেউ কাউকে। —ভালো লেগে যায় এই-ই!
কিঞ্চিৎ থামিয়া কহিলেন, এই ভালোবাসা ব্যাপারটা যুক্তি, তর্ক, মারামারির নয়। এ বরাতের ব্যাপার। আমারও হাত নেই; তোমারও না।
বলিয়াই ভাবিলেন, এইসব ইহাকে বলিয়া লাভ কী? এই রঘুনন্দন এসবের মূল্য বা অর্থ কী বুঝিবে?
কিন্তু ধৃতিকান্ত যাহা বলিলেন, তাহা রঘুনন্দনকে ভাবিত করিয়া তুলিল বলিয়া ধৃতিকান্তর ধারণা হইল। এমন কথা এ-জীবনে এমন করিয়া কেহই বোধ করি আর তাহাকে বলে নাই।
রঘুনন্দনের অনুচরেরা কহিল, ওস্তাদ আর দেরি নয়। মাঝনদীতে নৌকো দেখলেই জল-পুলিশের নৌকো এসে পড়তে পারে।
রঘুনন্দন ঘোর কাটাইয়া উঠিয়া কহিল, ঠিক, আর দেরি নয়।
তাহার পর কহিল, তোমার রেশমির মুখ শেষবারের মতো মনে করো বাঙ্গালিয়াবাবু। সেই মুখের জলছবি তোমার সঙ্গে সেঁটে স্বর্গে যাবে।
একটি মুখ মনে সত্যই করিলেন ধৃতিকান্ত, কিন্তু সে মুখ রেশমির নহে। উজ্জ্বল চক্ষুবিশিষ্ট অতিসাধারণ এক বাঙালিনির কালো নরম মুখটি, এই সমস্ত কালো পটভূমির কালিমা মুছিয়া দিয়া সন্ধ্যাতারার প্রসন্নস্নিগ্ধ দ্যুতিতে ধৃতিকান্তর সমস্ত চিত্তাকাশ জুড়িয়া জ্বলজ্বল করিতে লাগিল। তাঁহার নাসারন্ধ্রে কোথা হইতে রাশ-রাশ বকুলফুলের গন্ধ ভাসিয়া আসিল।
ঠিক এমত সময় ঝমঝম শব্দে ‘দিল্লি-কালকা’ মেলটি মোগলসরাইয়ের ব্রিজের উপর দিয়া কলিকাতা অভিমুখে আলো জ্বালাইয়া বাঁশি বাজাইয়া ছুটিয়া চলিতেছিল।
গুমম-ম-ম করিয়া রিভলবারের গুলি ছুটিবার শব্দ হইল।
ধৃতিকান্তর চক্ষে শেষবারের ন্যায় কলিকাতাগামী সেই আলোকিত ট্রেনটির সমস্ত কামরার আলো কয়টি একইসঙ্গে জ্বলিয়া উঠিয়াই পরমুহূর্তে নিভিয়া গেল।
রঘুনন্দনের যে-অনুচর হাল ধরিয়া বসিয়াছিল, সে কহিল, ওস্তাদ শত্রুর শেষ রাখতে নেই। আরও একটা লাগাও। যদি কোনোক্রমে বেঁচে যায়।
রঘুনন্দন জানিত, অর্ধহস্ত দূর হইতে রিভলবারের গুলি কাহারও বক্ষে লাগিলে, সে কখনোই বাঁচে না, তবুও রঘুনন্দন অর্ধশায়ীন গুলিবিদ্ধ ধৃতিকান্তর কপাল লক্ষ্য করিয়া আরও একটি গুলি করিল।
ধৃতিকান্তর কপালে কে যেন টিপ পরাইয়া দিল।
গলগল করিয়া ললাট ও নাসিকা বাহিয়া উষ্ণ রক্ত বাহির হইয়া আসিতে লাগিল।
গুলির শব্দ, রেলগাড়ির শব্দে একাকার হইয়া অন্ধকারে জলের উপর দিয়া কোন দূর-দূরান্তরে কাঁপিতে-কাঁপিতে ভাসিয়া যাইতে লাগিল।
রঘুনন্দনের অনুচরেরা ধৃতিকান্তর পদযুগল ধরিয়া তাঁহাকে সজোরে এবং দূরে নিক্ষেপ করিল, যাহাতে নৌকামধ্যে রক্তবিশেষ না পড়িতে পায়। তাহার পর যেটুকু রক্ত পাটাতনে পড়িয়াছিল তাহারা তাহা আঁজলা ভরিয়া জল লইয়া নিশ্চিহ্ন করিয়া ধুইয়া ফেলিল।
রঘুনন্দন ধৃতিকান্তর ধুলা-মলিন ও ক্ষয়প্রাপ্ত চটি-জোড়াও জলে নিক্ষেপ করিল।
সঙ্গে সঙ্গে রূপ-রস-গন্ধ স্পর্শ-শব্দভরা পৃথিবী হইতে ‘ধৃতিকান্ত’ নামক এক ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের মনুষ্যটিরও আর কোনো চিহ্নমাত্রই অবশিষ্ট রইল না। এমনকী তাঁহার কোনো চিতাভস্ম অথবা কবরও এই ধরিত্রীর মৃত্তিকাতে রহিল না যে, ভুলক্রমে কেহ তাহাকে স্মরণ করিতে চাহিলেও স্মরণ করিতে পারিবে। কৃষ্ণবর্ণ অমাবস্যার রাত্রি সাক্ষী রহিল, নক্ষত্র-খচিত আকাশ সাক্ষী রহিল; উত্তরবাহিনী গঙ্গাই শুধুমাত্র ধৃতিকান্তর নিশ্চিহ্ন হইবার সাক্ষী রহিল।
শীতল জলরাশি মুহূর্তমধ্যে ধৃতিকান্তর রক্তাক্ত শবকে গ্রাস করিয়া লইল। এই জলেই একদিন এই শব ফুলিয়া, পচিয়া, গলিয়া এই জলমধ্যেই বিলীন হইয়া যাইবে, যদি না, মৎস্য ও কুম্ভীরে তাঁহার শরীরকে টুকরা-টুকরা ছিন্ন-ভিন্ন করিয়া খাইয়া ফেলে।
পূর্বে আলো ফুটিয়াছে। শিউপ্রসাদজির নিকট যে-যুবকটি নাড়া বাঁধিয়াছিল, সে তম্বুরা সহযোগে ভৈরবীতে আলাপ করিতেছে। ভৈরবীর কোমল রেখাব ও কোমল গান্ধারের স্বর কী এক বিষণ্ণ সুরে প্রভাতের মাহমুরগঞ্জের আকাশ-বাতাস ভরিয়া তুলিয়াছে।
দেওয়ালির রাত্রি শেষ হইয়াছে। প্রভাতে হিমে পোড়া বারুদ আতশবাজি এবং তিনপাত্তির হার জিতের মালা কেহ বা কিছু জিতিয়াছে; কেহ বা হারিয়াছে।
কিন্তু রেশমির ন্যায় এরূপ সর্বস্বান্ত বোধ করি গতরাত্রে আর কেহই হয় নাই।
সমস্ত রাত্রি রেশমি ঘুমাইতে পারে নাই। পরিচিত, অর্ধপরিচিত সমস্ত লোকের নিকট বারংবার মুরতেজাকে পাঠাইয়াছে। তথাপি ধৃতিকান্তর সংবাদ মিলে নাই।
অদ্য রেশমির সময় হয় নাই চবুতরার কবুতরদিগের জন্য ধান্য ছিটাইবার। ভুলিয়াও গিয়াছিল সে। কিন্তু দাসী ভোলে নাই। সে ধামা লইয়া গিয়া ধান্য ছিটাইয়া দিল বাঁধানো চত্বরের-চবুতরায়।
একে-একে সব কয়টি কবুতর ডানা মেলিয়া উড়িয়া আসিল। তাহার পর ‘বকম-বকম’ রবে গ্রীবা ফুলাইয়া, চক্ষু ঘুরাইয়া ধান্য খুঁটিয়া খাইতে লাগিল।
নিদ্রাহীন ক্রন্দনকাতর চক্ষে কবুতরগুলির পানে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে অকস্মাৎ তীক্ষ্ণফলার ন্যায় সুতীব্র কোনো বেদনা রেশমিকে আমূল বিদ্ধ করিল। সে নিশ্চিত বুঝিতে পারিল যে, তাহার বড়ো সোহাগের কবুতরটি আর কোনো দিনও রেশমির খুশি-ভরা প্রেমকাতর চক্ষের সম্মুখে ঘুরিয়া-ফিরিয়া কোনো কিছুই খুঁটিয়া খাইবে না। রেশমির অন্তরমধ্যস্থ নির্জন চবুতরায় বিচরণকারী সেই কবুতরটি অমাবস্যার নিকষ-কালো অন্ধকারে কোথায় না-জানি চিরতরে নিরুদ্দেশ হইয়া গিয়াছে।
এ-সংসারে আপনার বলিতে ধৃতিকান্তর কেহই ছিলেন না। যাঁহারা ছিলেন, তাঁহারা কেহই তাঁহাকে আপনজন বলিয়া স্বীকার করেন নাই। সে ত্রুটি ধৃতিকান্তর অথবা তাঁহাদের; তাহা বিচার করিয়া লাভও আজ আর কিছুই নাই।
পাঠক! যদি কখনো বারাণসীতে যাওয়া হইয়া উঠে, এবং যদি অবকাশ ঘটে, তাহা হইলে দশাশ্বমেধ ঘাটে একটি প্রদীপ জ্বালাইয়া ধৃতিকান্তর উদ্দেশ্যে গঙ্গাবক্ষে ভাসাইয়া দিবেন। সেই দুঃখী কাঙাল মানুষটির আত্মা যেখানেই থাকুক না কেন, ইহা জ্ঞাত হইয়া সেই আত্মা নিশ্চয়ই শান্তি লাভ করিবে যে, আপনজনে তাহাকে পর করিলেও যাঁহারা তাহার আপনজন নহেন, তাহাদিগের মধ্যে কেহ তাঁহাকে ‘আপন’ জ্ঞান করিয়াছিলেন।
ইহা জানিয়াও সেই আত্মা তৃপ্ত হইবে যে, তাহার অতৃপ্ত ইহজীবনে, যাহাকে তিনি ভালোবাসিয়াছিলেন, তাহার ভালোবাসা তিনি পান নাই সত্য, কিন্তু যাহাদের তিনি ভালোবাসিবার বা জানিবার সুযোগমাত্রও পান নাই, তাহাদিগের অনেকের ভালোবাসার ও সমবেদনার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তিতে তাহার পরজীবন এই পরমপূর্ণতায় অভিষিক্ত হইয়াছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন