বুদ্ধদেব গুহ

তারা কোথায় গেল বলো তো? পেছনে নেই তো?
চিকরাসি স্বগতোক্তি করল, মুম্বই রোডে গাড়ি চালাতে চালাতে, সামনে তাকিয়ে।
পেছনে থাকতেই পারে না। ওরা কত আগে বেরিয়েছে।
জারুল বলল।
সবে সন্ধে নামছে। ওদের গাড়িটা বিদ্যাসাগর সেতু পেরিয়ে কলকাতার চক্কর এড়িয়ে এসে মুম্বই রোড ধরে প্রায় কোলাঘাটের কাছাকাছি চলে এসেছে।
চিকরাসির গাড়ি চালাচ্ছে চিকরাসিই। সামনে বাঁ-দিকে বসে আছে গামহার। পেছনে জারুল। জারুল চিকরাসির বান্ধবী। আজকালকার বান্ধবী। তুই-তোকারি করে একে অন্যকে। বিয়ে এখনও হয়নি। তবে যেকোনো সময়েই হতে পারে। ওরা আজকালকার ছেলেমেয়ে বলেই আবার কোনোদিনও নাও হতে পারে। চিকরাসির স্টিভেডর বাবা নেপাল ব্যানার্জি প্রতিমাসে গাড়ি পালটাতেন। পুরোনো দিনের রাজা মহারাজাদের যেমন আস্তাবল আর পিলখানা থাকত তেমন-ই ব্যানার্জির গাড়ির গ্যারাজ ছিল দেখবার মতো। দশ-বারোখানা নতুন গাড়ি এবং পাঁচ-ছ-টি অ্যান্টিক গাড়িও থাকত। The Statesman-এর Vintage Rally-তে প্রথমদিন থেকে যোগ দিতেন নেপাল ব্যানার্জি। নেপাল ব্যানার্জির ছেলে চিকু ব্যানার্জি বাবার ব্যাবসাতে যায়নি। সে সফটওয়্যারের ব্যাবসা করে। ইনফরমেশান টেকনোলজি নিয়ে পড়াশুনো করেছে। সে তার বাবার মতো প্রতিমাসে গাড়ি পালটায় না কিন্তু প্রতি ছ-মাসে বান্ধবী পালটায়। তবে বান্ধবীরা পিলখানা অথবা গ্যারাজে থাকে না বলেই, তাদের তার বাবার গাড়িগুলোর মতো একইসঙ্গে দেখা যায় না একজায়গাতে পাশাপাশি।
চিকরাসি ওরফে চিকু ব্যানার্জি নামকরা প্লে-বয়। প্লে-বয় যদিও কিন্তু চল্লিশেই তার গভীরতা, ব্যক্তিত্ব এবং বুদ্ধি অনেক পরিণত বয়স্ক মানুষের থেকেও বেশি। এটা অন্য অনেকের-ই মতো গামহার ঘোষ-এরও মতো।
গামহার, বয়েসে চিকরাসির চেয়ে অনেক-ই বড়ো। ওরা যদিও গামহারকে দাদা বলে, সে বয়েসের দাবিতে ওদের কাকাও হতে পারত সহজেই। গামহার আর্টিস্ট। জলরং তার মাধ্যম। অ্যাকোয়ার কাজও করে। আজকাল জল ছেড়ে অ্যাক্রিলিক-এ গেছে। স্বভাবে বোহেমিয়ান। এতদিন তার আঁকা ছবি, ছবির বাণিজ্যিক জগতে কলকে পায়নি। ক্রিকেটারদের-ই মতো, অ্যাড মডেলদের-ই মতো, এখন চিত্রকরদের বাজারও খুব-ই ভালো। প্রৌঢ়ত্বের শেষে পৌঁছে গামহার অর্থ এবং স্বীকৃতি দুই-ই পেয়েছে। তবে তাতে সে অভিভূত বা উত্তেজিত হয়নি। জাগতিক অসাফল্য এতবছর তাকে যেমন পীড়িত করেনি, সাম্প্রতিক অতীত থেকে অর্থ ও যশের এই চকিত উৎসারও তাকে আদৌ বিচলিত বা উত্তেজিত করেনি। যেমনটি ছিল, তেমনটিই আছে। ব্যর্থতা ও সাফল্য এক-ই পর্দাতে তার মনে বেজেছে, সে প্রকৃত আর্টিস্ট বলেই। কবিতা লিখলে বা ছবি আঁকলে বা গান গাইলেই শুধু, সে-কারণেই সৃষ্টিশীল শিল্পীসত্তা কোনো মানুষের মধ্যে বর্তে যায় না। তার লক্ষণ আলাদা।
বিয়ে একটা করেছিল গামহার অতিঅল্প বয়েসে। বিয়ের মানে না জেনেই। সে নিজেও ঠিক করেনি পাত্রী। তার বিধবা মা-এর একজন সঙ্গী ও খেলার পুতুলের প্রয়োজন ছিল বলে তিনিই পছন্দ করে এনেছিলেন লালিকে। গামহার-এর মানসিকতা ও রুচির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। থাকবার মধ্যে তার সুস্পষ্ট লক্ষণ-যুক্ত একটি নারীশরীর ছিল। ক্যাটক্যাটে লাল রং পছন্দ করত। রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করত না। এবং একসঙ্গে চারটে হাঁসের ডিমের ওমলেট খেত। গামহারকে পৌনঃপুনিকভাবে সাহেবদের মতো আদর করতে উপদেশ দিত বলে বিয়ের দেড় মাস পর-ই তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়। নৈকট্য তেমন কখনোও যেমন হয়নি, বিচ্ছেদটা তাই আদৌ বুঝতে পারেনি গামহার।
গামহার ঘোষ অত্যন্তই সূক্ষ্মরুচির শিল্পীমানুষ। তার সূক্ষ্মতাটা লোক-দেখানো নয়। শুধু অন্য সূক্ষ্মমানুষ-ই তার সূক্ষ্মতাটা বুঝতে পারত। নিজেকে অন্যের কাছে জাহির করবার বা নিজেকে বোঝানোর কোনো তাগিদও তার ছিল না কোনোদিনও। তার নিজের নিজস্ব একটা পৃথিবী ছিল। সেখানে সে একা-একাই সুখী ছিল নিরন্তর। এবং এখনও আছে। এই অতি-সূক্ষ্মরুচির কারণেই অনেক স্থূলরুচি পুরুষ তাকে মেয়েলি বলে এসেছে। তার চেহারাটা একটু নরম-সরম। তার জাগতিক সাফল্যর অভিঘাত তার ওপর পড়েনি যে, তার আরও একটা কারণ এই যে, নিজের নাম-যশ-অর্থের জন্যে কখনো কাঠ-খড় পোড়ায়নি। যারা তা পোড়ায়, তাদের সে তার শিল্পীসুলভ মানসিকতাতে ঘেন্না করে। সে ঘেন্নাটা প্রকাশ করার নয় বলেই, সেই ঘেন্নাটা তার অভ্যন্তরে সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত হতে হতে তা পুঞ্জীভূত হয়ে গেছে। কোনোরকম ঘেন্না প্রকাশ করাতেই সব ভদ্রলোকের-ই জন্মগত অনীহা, তাই সেই ঘেন্নার প্রকাশ ঘটেনি। কোশবৃদ্ধি-হওয়া পুরুষের মতো অন্যের চোখের আড়ালে এই ঘৃণার ভার স্ফীত-অন্ডকোশের মতোই বয়ে বেড়িয়েছে গামহার। এবং বয়ে বেড়াচ্ছে।
বছর তিনেক হল, বলতে গেলে হঠাৎ-ই একজন ফরাসিনির চোখে পড়াতে গামহার ঘোষের ছবির কদর হয়েছে সারাপৃথিবীতে এবং ক্রমশ আরও হচ্ছে। এই বিলম্বিত সাফল্যে তেমন আনন্দিত বা আলোড়িত হতে পারেনি গামহার। যে-মানুষের সৃষ্টি দেশের মানুষের চোখেই পড়ল না গত তিরিশ বছর, সেই মানুষ-ই এখন পাদপ্রদীপের আলোর সামনে চলে এল শুধুমাত্র একজন বিদেশিনি সমালোচকের প্রশংসাতে, এটা মনে করেই গামহার-এর লজ্জা হয়। এই লজ্জা নিজের কারণে যতটা না হয়, তার চেয়ে অনেক-ই বেশি হয় দেশের মানুষদের-ই কারণে। লজ্জার কারণটা বুঝিয়ে বলতে পারে না সকলকে। বোঝাবার বোধ হয় প্রয়োজনও তেমন বোধ করে না।
—কী ভাবছ গামহারদা। চুপচাপ কেন?
জারুল বলল।
—ভাবছি, জুনিপারকে নিয়ে এলে বেশ হত। জঙ্গল না দেখলে তো ভারতবর্ষকে দেখা হয় না। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরুতে আর যাই হোক আসল ভারতবর্ষ তো নেই।
—তা ঠিক। তা, নিয়ে এলেই পারতে। ও-গাড়িতে তো অনেক-ই জায়গা ছিল।
—ও যে পরশুই চলে গেল মনট্রিয়ালে। আবার আসবে পুজোর পরে, প্যারিস হয়ে।
—ঠিক আছে। তখন একবার জঙ্গলে নিয়ে চলো। শীতে ওঁর কষ্টও কম হবে।
—কষ্ট কীসের? এখনকার গাড়ি তো সবই এয়ার-কণ্ডিশানড। এপ্রিলই হোক, কী মে।
—তা বটে। তবে জঙ্গল তো আর এয়ার-কণ্ডিশানড নয়। তা ছাড়া মে মাসে পাগল আর চোরাশিকারি ছাড়া কেউই জঙ্গলে যায় না।
জারুল বলল, এই এপ্রিলের প্রথমসপ্তাহেও গরম কম পাবে না গামহারদা। জঙ্গলের গরমটা অনেকটা প্রেমে পড়ার মতো। হঠাৎ, কখন যে, ব্যাপারটা ঘটে যায়, বোঝা পর্যন্ত যায় না! গভীরে ঢুকে যাওয়ার পরে, অবশ্য গরম কম লাগে, তবে রাতে তো খুব-ই প্লেজেন্ট। কম্বল গায়ে দিয়ে শুতে হবে। মার্চ মাসেই ভীষণ গরম পড়ে যায় ওড়িশাতে।
—দেখি! নাম শুনেছি এত সিমলিপালের। কেমন জায়গা দেখা যাবে। তোমাদের-ই কল্যাণে।
জারুল বলল, তুমি আর কোন কোন জঙ্গল দেখেছ গামহারদা?
—আমি? না, না। কোনো জঙ্গল-ই প্রায় দেখিনি। মামাবাড়ি ছিল কেষ্টনগরের নেদেরপাড়াতে। ছেলেবেলাতে সে-পাড়ার সব বাড়িতেই প্রায় বড়ো বড়ো বাগান ছিল। আম-জাম-কাঁঠালের। জঙ্গল বলতে ওই। আর খুব ছেলেবেলাতে একবার গেছিলাম হাজারিবাগে। সেখানে খুব-ই জঙ্গল ছিল। আবছা আবছা মনে আছে। বড়োমামার সঙ্গে গেছিলাম মামার এক বন্ধুর বাড়িতে। ওঁরা ওখানকার-ই বাসিন্দা। মামা খুব-ই ভীতু মানুষ ছিলেন। বাঘ দেখার কোনো ইচ্ছাই তাঁর ছিল না কিন্তু কলকাতা থেকে এসেছি শুনে বাঘ-ই আমাদের দেখবার জন্য রামগড়ের ঘাটের পথের মাঝে বসেছিল। সবে সন্ধে হয়েছে তখন। বাঘ দেখে তো বড়োমামা তাঁর বন্ধুকে আলোয়ানসমেত এমন-ই জড়িয়ে ধরেন যে, গাড়ি প্রায় খাদে চলে যায় আর কী। আর আমার মা নাকি বাঘ দেখে গাড়ির মধ্যে অজ্ঞান-ই হয়ে গেছিলেন। কথায়-ই বলে, ‘নরানাং মাতুলক্রমঃ’। যার বড়োমামা এত ভীতু তার ভাগনে সাহসী হয় কী করে বলো?
চিকরাসি আর জারুল হেসে ফেলল গামহার-এর সরল স্বীকারোক্তিতে।
ওরা দু-জনে হাসতেই পারে। জঙ্গলের পোকা ওরা দু-জনেই। জারুল জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বন্যপ্রাণী ও পাখির ছবি তোলে। পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে একটি কাগজও করার ইচ্ছে আছে। কানহার জঙ্গলেই গতশীতের আগের শীতে ওদের দু-জনের আলাপ হয়। তারপর-ই ঘনিষ্ঠতা। তারপর থেকে চিকরাসি আর জারুল জঙ্গলে গেলে একইসঙ্গে যায় দু-জনে। কলকাতাতেও প্রায় প্রতি উইক-এণ্ডেই দেখা-সাক্ষাৎ হয়। চিকু ব্যানার্জির এই বান্ধবী প্রায় বছর দুই টিকে যে গেল, এ নিয়ে কলকাতার হাই সোসাইটিতে গুজ-গুজ ফুস-ফুস-এর শেষ নেই।
জারুল তার তোলা ওয়াইল্ড-লাইফ-এর ছবি বিক্রি করে দেশি-বিদেশি নানা পত্র-পত্রিকায়। আজকাল ওয়াইল্ড-লাইফ ফোটোগ্রাফি রীতিমতো একটি লাভজনক পেশা হয়ে গেছে। বন ও বন্যপ্রাণী নিয়ে লেখালেখি তো প্রফেশন হয়েছেই। পেশা হয়ে উঠছে বলেই ভালোবাসা কমছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তো আর পয়সার জন্য অরণ্যকে ভালোবাসেননি।
ক্যালকাটা স্যুইমিং ক্লাবে শুক্রবার রাতে ক্যাণ্ডল-লাইট ডিনার খায়, ‘তাজ’-এর কফিশপে টুকটাক, ওবেরয়ের নতুন থাই-রেস্তরাঁতে শনিবার রাতে ডিনার। পয়সা রোজগারটা ওদের কাছে কোনো সমস্যাই নয়, পয়সা কীভাবে খরচ করবে সেইটাই সমস্যা। যত টেনশান, তা নিয়েই।
গামহার ঘোষের যৌবন চলে গেছে বলেই যৌবনের দাম সে বোঝে। বোঝে যে যৌবন, দাঁত অথবা জন্মদাত্রী মায়ের-ই মতো। থাকতে, কম মানুষ-ই কদর করে তার, প্রকৃত দাম বোঝে।
নিজের যৌবন চলে গেছে অবশ্যই। তবে সেটা শরীরের-ই যৌবন। মনে মনে গামহার ঘোষ অনেক যুবকের চেয়েও অনেক-ই বেশি যুবক। এবং সেকারণেই সে প্রায়-ই ভুলে যায় যে, সে যুবক নয়। ফলে, নানারকম বিপদ-আপদ-এরও সম্মুখীন হতে হয়। ছোটো-বড়ো। শারীরিক এবং মানসিক।
—ওই তো ঝাঁঝিরা!
জারুল, গামহারকে চমকে দিয়ে পেছন থেকে বলে উঠল।
চিকরাসিদের গাড়ি ততক্ষণে কোলাঘাটের ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে নামছে।
হারিত আর ঝাঁঝি ওদের মারুতি এস্টিম গাড়ি থেকে নেমে, গাড়িটা পথের বাঁ-দিকে দাঁড় করিয়ে গাড়িতে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছিল চিকরাসিদের জন্যে। সাদা গাড়ি।
চিকরাসি ঘাড় নীচু করে গামহার-এর কাঁধের পাশ দিয়ে হারিতকে বলল, কী? তোমরা কতক্ষণ?
—মিনিট পনেরো।
—এগিয়ে গেলে না কেন?
—বা:। একটা রাঁদেভু পয়েন্ট ঠিক না করে এগিয়ে যাওয়া কি ঠিক হত? বলো, কোথায় দাঁড়াব?
—চলো, সোজা গ্রিনফিল্ডস-এ গিয়ে দেখা হবে। খড়্গপুরের গোলাই-এর পরে।
—ওখানে যাবে? শুনেছি জায়গাটা খারাপ হয়ে গেছে। মালিকে মালিকে কেস চলছে।
—সে কী! সর্দারজিরাও বাঙালি হয়ে গেল কবে থেকে?
—আরে এতদিন এখানে আছে, জল-হাওয়া তো লেগেছে।
—তা ঠিক।
—চলোই না দেখা যাক। শুনেছি একটা নতুন হোটেলও হয়েছে গ্রিনফিল্ডস-এর আগে। পথের বাঁ-দিকে।
—কোথায় যাব তাহলে? ঠিক করে বলো।
—না। গ্রিনফিল্ডস-এই চলো। আ নোন ডেভিল ইজ বেটার দ্যান অ্যান আননোন ওয়ান। ওখানেই খেয়ে-দেয়ে রাতটা কাটিয়ে ভোরে এককাপ করে চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ব। তাহলে চাহালাতে দশটা নাগাদ পৌঁছে যাব।
—ঠিক আছে। তাহলে এসো তোমরা।
আমরা এগোই। বলে, ওরা এগিয়ে গেল।
চিকরাসি স্টিয়ারিংয়ে গিয়ে বসল।
হারিত আর ঝাঁঝির সঙ্গে গামহার-এর একবার-ই আলাপ হয়েছে চিকরাসির বাড়ির এক পার্টিতে। প্রথমদর্শনেই এই ঝাঁঝি মেয়েটিকে ভারি ভালো লেগেছিল গামহার ঘোষের। এই ভালোলাগাটার মধ্যে এক বিশেষত্ব আছে। এই ভালো লাগার রকমটা সকলের বোঝার নয়। হোসেইন-এর যেমন মাধুরী দীক্ষিতকে ভালো লাগে, হিমতোষ-এর কাজলকে, গামহার-এর তেমন-ই ভালো লেগেছে ঝাঁঝিকে। একজন সাহিত্যিক যেমন কোনো নারীকে ভালো লাগলে তাকে তাঁর উপন্যাসের নায়িকা করেন, নাম-ধাম, গায়ের রং, সামাজিক প্রতিবেশ বদলে দিয়ে। একজন শিল্পী কিন্তু তা করেন না। হয়তো পারেনও না। তাঁর ভালোলাগার নারীকে রক্তমাংস ধার দেন তিনি তুলি আর রং দিয়ে, তাঁর কামনা আর কল্পনা দিয়ে। কারওকে ভালোলাগার ঝুঁকিটা তাই একজন শিল্পীর, একজন সাহিত্যিকের কোনো নারীকে ভালোলাগা বা ভালোবাসার ঝুঁকির চেয়ে অনেক-ই বেশি। সাহিত্যিক নিজেকে আড়াল করতে পারেন, ক্যামোফ্লেজ করতে পারেন কিন্তু শিল্পী সহজেই ধরা পড়ে যান। সেকারণেই হয়তো একজন শিল্পীর ভালোবাসা নারীরা সহজে বুঝতে পারেন এবং অনেকক্ষেত্রেই সেই ভালবাসার প্রতিদানও দেন। সাহিত্যিক তাঁর নিজের সৃষ্টির জালে নিজেই ঢাকা পড়ে যান। তাঁর ভালোলাগা বা ভালোবাসা তাঁর ভালোলাগার নারীর কাছে অনেক সময়ে পৌঁছোয়ই না পর্যন্ত। সে-নারীর বই-টই পড়ার অভ্যেস না থাকলে বা সেই নারী বুদ্ধিহীন বা কম বুদ্ধিমতী হলে তো পৌঁছোয় নাই-ই।
লম্বা, কালো, ছিপছিপে, ভারি সুন্দর করে সাজাতে জানে নিজেকে ঝাঁঝি। সাধারণে ‘সুন্দরী’ বলতে যা বোঝান তা সে আদৌ নয়। ফিগারটি সুন্দর। ব্যক্তিত্বময়ী। মুখটি যে, খুব একটা সুন্দর তাও নয়। বরং সাধারণ। এই সাধারণের মধ্যেই অসাধারণত্ব খুঁজে পায় সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক অথবা শিল্পীর চোখ। তাঁরা যে, তাঁদের কলম এবং তুলি দিয়ে ভিখারিনিকে রানিতে পর্যবসিত করতে পারেন মুহূর্তে— সেকথা তাঁদের নিজেদের মতো আর কেউই জানেন না। জানেন না বলেই, তাঁদের এই ঐশী ক্ষমতাতে তাঁরা ন্যায্যত গর্ববোধ করেন। বাস্তবকে তুচ্ছ করার ক্ষমতা, নস্যাৎ করার ক্ষমতা, একমাত্র বিধাতার আছে আর আছে সাহিত্যিক ও শিল্পীদের। তাই তো তাঁরা দ্বিতীয় বিধাতা। গামহার আসলে সঠিক বুঝতে পারে না ব্যাপারটা ঠিক কী? ঝাঁঝিকে দেখলেই তার মধ্যে ঝাঁঝিকে শারীরিকভাবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে। গামহার যে, এখনও এতখানি যুবক আছে, তা ঝাঁঝিকে যতবার-ই দেখে ততবার-ই বুঝতে পারে। কোনো পুরুষ অথবা কোনো নারীই যেকোনো নারী বা পুরুষকে দেখে শারীরিক আকর্ষণ বোধ করেন না। এই ব্যাপারটা আগে থাকতে বোঝা পর্যন্ত যায় না। যখন বোঝা যায়, তখন শরীরে বৈদ্যুতিক শক লাগে।
নিজের ভাবনার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে গামহার একটু কেশে, গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল, একটু চা খেলে হত-না চিকু?
এয়ার-কণ্ডিশানড গাড়িতে গামহার-এর গলা ধরে যায়। গামহার-এর আবার সায়নাসাইটিস আছে। এয়ার-কণ্ডিশানার থেকে যে-ধুলো বেরোয়, তা থেকে অনেক সময়ে ন্যাজাল অ্যালার্জিও হয়। চিকরাসির গাড়ি রীতিমতো ফ্রিজের মতো ঠাণ্ডা।
চিকরাসি বলল, তুমি যা বলবে দাদা। অলওয়েজ অ্যাট ইয়োর সার্ভিস।
বলেই, বলল, চলো। সামনে ডান দিকে একটা ভালো ধাবা আছে। সেখানে খাব।
—শুধু চা-ই তো?
—হ্যাঁ। আবার কী?
—লেড়ো বিস্কুট পাওয়া যাবে না?
জারুল বলল।
ওর কথাতে হেসে উঠল চিকরাসি আর গামহার।
একটু পরেই গাড়ি থামাল চিকরাসি।
—আমার কিন্তু কম দুধ কম চিনি।
গামহার বলল।
—আমার শুধুই পাতলা লিকার। দুধ-চিনি ছাড়া।
জারুল বলল।
—আমার বেশি দুধ বেশি চিনি।
চিকরাসি দরজার কাছে এসে-দাঁড়ানো ধাবার ছেলেটিকে বুঝিয়ে দিল তিনরকম চায়ের কথা।
জারুল বলল, লেড়ো বিস্কিট হ্যায় ভাই?
—কী বিস্কিট বইলতেচেন মা?
—লেড়ো।
—নাই। ব্রিটানিয়া আচে।
—দু-স। শুধু চা-ই দাও।
চিকরাসি হেসে উঠল।
বলল, ঠিক আছে। জঙ্গলে তোমাকে লেড়ো বিস্কিট খাওয়াব।
—কী করে?
—বা:। চপ-এর ক্র্যাম-এর জন্য আনিনি বুঝি সঙ্গে? চিকু ব্যানার্জির বন্দোবস্তে কিছুমাত্র খুঁত-খামতি পাবে না। বুঝেছ ম্যাম?
—সেইজন্যেই তো তোমার ওপরে এমন-ই নিশ্চিন্তে বডি ফেলে দিই।
হাসতে হাসতে বলল জারুল।
চা খেতে খেতে গামহার ভাবছিল, ‘ঝাঁঝি’ নামটাও খুব সুন্দর। একবার ওদের পাড়ার লেবুদার সঙ্গে মল্লিকপুরের বিলে তালের ডোঙা করে মাছ ধরতে গিয়ে নৌকো উলটে দমবন্ধ হয়ে মারা যেতে বসেছিল ও। সেই জলজ গন্ধের হালকা ও গাঢ় উজ্জ্বল সবুজ ও হলুদ-রঙা গোছা গোছা মসৃণ ঝাঁঝির কথা গামহার কখনো ভুলবে না। সেই ঝাঁঝিজনিত বিপদে ও মারাত্মকভাবে জড়িয়ে গেছিল। তাই ‘ঝাঁঝি’ শব্দর উচ্চারণেই ও বিপদের গন্ধ পায় নাকে। সত্যি ঝাঁঝি নয়, মানবী ঝাঁঝিকে দেখলেও সেইরকম অনুভূতিই হয়। মৃত্যুর গন্ধ আসে নাকে।
প্রথমবার যখন দেখা হয়, তখন সেই রাতে চিকরাসির বাড়ির পার্টিতে সামান্যক্ষণ-দেখা ঝাঁঝিকে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনি। তারপরেও বার তিনেক দেখা হয়েছে। যতই দেখেছে ততই সেই মল্লিকপুরের বিলের ঝাঁঝির-ই মতো ঝাঁঝিতে জড়াচ্ছে গামহার, বুঝতে পারে।
একে অন্যকে সঠিকভাবে বোঝাবুঝির জন্যে প্রকৃতিই সবচেয়ে ভালো জায়গা বোধ হয়। মনে হয়, গামহার ঘোষ প্রকৃতি নিয়ে এ-পর্যন্ত তেমন কিছু আঁকেইনি। চিকরাসিই বলতে গেলে, জোর করেই ওকে নিয়ে চলেছে এবারে। বলেছে, বসন্তর বন-ই না দেখে তুমি এতবছর ছবি আঁকলে কী করে গামহারদা তা তো, আমি বুঝেই উঠতে পারি না। ন্যাংটো মেয়ে এঁকে এঁকে কি আর্টিস্ট হওয়া যায় সত্যিকারের! তোমাদের ওইসব আর্ট কলেজের শিক্ষা-পদ্ধতিটাই ভুল। আর্টিস্টের মতো আর্টিস্ট তৈরি করতে হলে তাদের প্রথমেই সবসেরা আর্টিস্টের স্টুডিয়োতে নিয়ে যাওয়া উচিত।
—সেটা কোথায়? কার স্টুডিয়ো?
অন্যমনস্ক গামহার জিজ্ঞেস করেছিল।
জারুল বলল, সত্যি তুমি গামাদা! সেটা ‘প্রকৃতি’। ঈশ্বরবাবুর স্টুডিয়ো। সেখানেই তো নিয়ে যাচ্ছি তোমায় আমরা। একবার গেলে, বার বার যেতে হবে, হিমালয়ের-ই মতো টানবে বন-জঙ্গল তোমাকে। যেকোনো পর্বতারোহী আর ট্রেকারদের জিজ্ঞেস করে দেখো তুমি, তারা তোমাকে বলবে সেই ‘টান’-এর কথা। যারা জানে, তারাই জানে।
গামহার বলল, ডাকো ছেলেটাকে। পয়সাটা দিই। তারপর যাওয়া যাক।
তুমি পয়সা দেবে কী? তুমি আমাদের গেস্ট। তোমার সঙ্গে যে, পার্স আছে সেকথাটাই ভুলে যাও। তুমি বরং পরে আমাদের একবার বেড়াতে নিয়ে যেয়ো, তখন আমরা আমাদের পার্স বাড়িতে রেখে আসব। এ যাত্রা তোমার পার্স-এ তুমি হাত-ই ছোঁয়াতে পারবে না।
—যা বলো তোমরা। ‘পড়েছি যবনের হাতে খানা খেতে হবে সাথে’।
—সুন্দরীমাত্রই বিপজ্জনক। কে যে কার চোখে সুন্দরী, কার জন্যে কে বিপজ্জনক, তা ঈশ্বর-ই জানেন। এক ঝাঁঝি-জনিত বিপদের কথা ভেবেই আতঙ্কিত গামহার ঘোষ তার ওপর আবার Mummy of All Mummies—প্রকৃতি। এক অজানা, নিরাবয়ব, অপ্রত্যক্ষ ঝাঁঝি টু দ্যা পাওয়ার এন-এর ভয়ে গামহার-এর মন জঙ্গলে পৌঁছাবার অনেক আগে থেকেই ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল।
চিকরাসি যখন গাড়িটা ঢোকাল ন্যাশনাল হাইওয়ে থেকে ডানদিকে কিছুটা গিয়ে গ্রিনফিল্ডস-এর হাতাতে তখন রাত হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। তবে চাঁদ ওঠেনি তখনও। চতুর্থী কী পঞ্চমী। চাঁদ উঠতে এখনও দেরি আছে।
হারিতরা ততক্ষণে পৌঁছে গিয়ে চেয়ার-টেয়ার বাইরে বের করিয়ে লন-এ পাতিয়েছে। গ্রিনফিল্ড লজ-এর একটা অংশ কোনো ব্যাঙ্ককে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। গামহাররা গাড়ি পার্ক করে নামতে নামতে ব্যাঙ্কের আলোগুলো সব নিভে গেল এক এক করে। লন-এ একটা আলো আছে। কয়েকটা রোগা-রুখু ইউক্যালিপটাস গাছ। ওরা গিয়ে বসতে না বসতেই মশা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। গামহার যেদিকে বসেছে, সেদিকটা আধো-অন্ধকার। আলোটা আটকে যাচ্ছিল ইউক্যালিপটাসের ডালে। কামড়াতে লাগল মশা। গামহার জিনস পরে রয়েছে, তাই পায়ের পাতা গোড়ালি, মুখ এবং হাত ছাড়া অন্যত্র অবশ্য কামড়াতে পারছিল না। ঝাঁঝি ঠিক গামহার-এর উলটোদিকের চেয়ারে বসেছিল। একটা ঝাঁঝি-রঙা ফিকে হলুদ শিফনের শাড়ি পরেছিল সে। গায়ে সবুজ ব্লাউজ-এর সঙ্গে হাতে সবুজ ব্যাণ্ডের হাতঘড়ি। তার মুখের একটা দিকে আলো পড়ে তাকে আরও ব্যক্তিত্বময়ী দেখাচ্ছিল। পাছে ঝাঁঝির মুখটাকে দু-চোখ ভরে দেখতে না পায়, তাই যথেচ্ছ মশা কামড়ানো সত্ত্বেও ওই চেয়ার ছেড়ে গামহার বেশি আলোতে পাতা অন্য চেয়ারে উঠে গেল না। ও যে, আর্টিস্ট। ওর দেখার চোখ-ই আলাদা, ও ফুল দেখে, প্রজাপতি দেখে, সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখে যেমন আনন্দ পায় তেমন-ই এক অতীন্দ্রিয় আনন্দ পাচ্ছিল ঝাঁঝির মুখের দিকে চেয়ে। একজন আর্টিস্ট বা কবির চোখ যা দেখে, তা কি সাধারণে কখনোও দেখতে পায়?
গ্রিনফিল্ডস-এ খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত নেই। হাইওয়ের ওপরে সর্দারজিদের ভালো ধাবা আছে। সেখান থেকে খেয়ে আসেন অনেকেই। এদের বললে, এরাও এনে দেয়। তবে চিকরাসি সঙ্গে করে চারটি বড়ো ক্যাসারোল নিয়ে এসেছে। গাড়ি নিয়ে গিয়ে ও গরম গরম খাবার নিয়ে আসবে।
গামহার বলল, আমাকে কী করতে হবে বলো?
—তোমাকে কিছুই করতে হবে না। রিল্যাক্স করো। এনজয় করো। আমরা ছোটোভায়েরা আছে কী করতে!
গামহার-এর কোনো ভাই নেই। এক দিদি। দিদি তো স্পেইন-এ থাকতেই মারা গেছেন। বড়ো জামাইবাবু ফরেন সার্ভিসে ছিলেন। তিনিও আর নেই। রিটায়ার করার পরেই মারা গেছেন। গামহার লক্ষ করেছে যে, অধিকাংশ চাকরিসর্বস্ব চাকরিজীবীরাই রিটায়ার করার পরপর-ই চলে যান। যাদের চাকরি ছাড়াও অন্য কোনো শখ, বা নেশা, বা ধ্যান থাকে তারাই চাকরি ছাড়ার পর বাঁচেন এবং আনন্দেই বাঁচেন। গামহার যেহেতু চাকরি করে না, ছবি আঁকে, ওর রিটায়ারমেন্ট নেই। যতদিন শরীরে কুলোবে, ইচ্ছে করবে, ততদিন ছবি এঁকে যাবে। তবে চিকরাসির কথাতে মনে পড়ল যে, ওর ভাই-বোন না থাকার দুঃখ চিকরাসির মতো অগণ্য ভায়েরা পূর্ণ করে দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলতেন না যে, যে-ই আত্মার কাছে থাকে সে-ই তো আত্মীয়। রক্তসূত্রের আত্মীয়তার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। যে-আত্মীয়তা মানুষে জীবনের পথে, চলতে চলতে অর্জন করে নিজের ব্যবহারে, গুণে, রুচিতে, মানসিকতাতে সেই আত্মীয়তাই আসল ‘আত্মীয়তা’। সেই অর্থে এই চিকরাসি তার আসল ভাই-এর চেয়েও হয়তো আপন। আপন ভাই থাকলে হয়তো তুলনা করে দেখতে পারত। নেই বলে, সেই তুলনা করার উপায় নেই। ভাগ্যিস নেই।
জারুল গাড়ি থেকে নেমেই বাথরুমে গেছিল। তিনটি ঘর খুলে দিয়েছে এরা। উজ্জ্বল আলো জ্বলছে ঘরে। হারিত হুইস্কি ও রাম-এর বোতল এনে টেবিলের ওপরে রাখল। গ্লাসগুলো, কলকাতা থেকে আনা ন্যাপকিন দিয়ে ভালো করে মুছল। আইস-বক্সে করে বরফও এনে দিল বেয়ারা।
চিকরাসি বলল, দাদার জন্যে ‘স্কচ’ এনেছি। দাদা স্কচ-ই খান। বুঝলে, হারিত।
গামহার বলল, তোমাদের জন্যে একটি জ্যাপানিজ হুইস্কি এনেছি আমি। ‘সানটোরি।’ টুয়েলভ ইয়ার্স ওল্ড। আমার ছবির একজন অ্যাডমায়রার তপন মিত্র টোকিয়ো থেকে নিয়ে এসেছেন। টোকিয়োতে ওঁদের কোম্পানির ব্রাঞ্চ আছে। প্রায়-ই যেতে হয় কাজে।
হারিত বলল, ওটা জোরাণ্ডাতে গিয়ে খোলা হবে।
চিকরাসি কী একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময়ে প্রচন্ড আর্তনাদ করে প্রায় লাফাতে লাফাতে জারুল ঘর থেকে বাইরে এল দড়াম করে দরজা খুলে।
ওরা সকলেই দাঁড়িয়ে উঠল, কী হল? কী হল? বলে। দম নিতে কষ্ট হচ্ছিল জারুল-এর। সে বিবর্ণ মুখে বলল, ইঁদুর।
—কোথায়?
ঝাঁঝি শুধোল।
—কোথায় নয় বলো? ঘরে, বাথরুমে। এত বড়ো বড়ো ইঁদুর যে, নাক-কান খেয়ে ফেলবে মুহূর্তের মধ্যে।
চিকরাসি বলল, সেজন্যে এমন চিৎকার করবে! আমি তো ভাবলাম ঘরের মধ্যে কেউ লুকিয়ে থেকে তোমাকে রেপ-ই করতে গেল বুঝি। প্রত্যঙ্গ খেয়ে ফেলার ভয় তো তোমাদের থেকে আমাদের, মানে পুরুষদের-ই বেশি।
ঝাঁঝি মুখ ফিরিয়ে নি:শব্দে হাসল।
জারুল চিকরাসির কথাটার মানে প্রথমে বুঝতে পারল না, পরক্ষণেই বলল, এত অসভ্য না তুমি!
গামহার বলল, চলো তো ঘরগুলো একটু দেখে আসি। থাকার মতো না হলে কিন্তু রাতে থাকব না। তার চেয়ে সারারাত গাড়ি চালিয়ে চলি চলো, এখানে খাদ্য-পানীয়র শ্রাদ্ধ করে।
তারপর হারিতের দিকে চেয়ে বলল, জঙ্গলে প্রথমে আমরা যেখানে যাব সেখানে পৌঁছোতে ক-ঘণ্টা লাগবে?
—এখান থেকে কখন বেরোব আমরা তার-ই ওপর ডিপেণ্ড করছে।
—এখন বাজে সাড়ে ন-টা প্রায়। যদি এখানে না থেকে রাত এগারোটা নাগাদ বেরোই তবে আস্তে আস্তে চালিয়ে গেলে যোশীপুরের আগেই বাঁ-দিকে ঢুকে গিয়ে চাহালা পৌঁছে যাব সকালেই।
—তাহলে তো ভালোই।
—তার আগে ঘরগুলো তো দেখা যাক। বলে, ওরা তিন-জনেই গেল ঘর দেখতে। বিছানা, বেডকভার, বালিশের তেলচিটে ও মর্দিত চেহারা দেখে হারিত বলল, এসব ঘর তো দেখছি ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়।
গামহার বলল, ইঁদুর কেন? এখানে বাঘ থাকাও আশ্চর্য নয়।
চিকরাসি বলল, তার চেয়েও বড়োকথা এই বিছানাতে রাত কাটালে এইডস হবে নির্ঘাত।
যে-বেয়ারা বরফ নিয়ে এসেছিল, সে বলল, ভালো করে স্প্রে মেরে গুডনাইট জ্বালিয়ে দেব স্যার। মচ্ছর লাগবে না।
—গুডনাইটে কি ইঁদুর মরবে?
—ইঁদুর কোথায়? মাঠ থেকে হয়তো জানলার ভাঙা কাচ দিয়ে একটা হঠাৎ-ই ঢুকে এসেছিল।
তার কথা শেষ হতে না হতেই বাথরুম থেকে একটা এবং খাটের তলা থেকে আর একটা বেড়ালের মতো ইঁদুর লাফ মেরে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে ওদিকের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
হারিত বলল, দ্যা ডিসিশন ইজ মেড। চলো, খেয়ে-দেয়ে বেরিয়ে পড়ি। সারারাত গাড়ি চালালে রাফিং হবে। ছেলেবেলায় জি টি রোড দিয়ে গাড়ি চালিয়ে বার্নপুরে বড়োপিসের বাড়ি যেতাম। রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর বেরোতাম। ধীরেসুস্থে গিয়ে গরম গরম শিঙাড়া-জিলিপি কিনে নিয়ে পিসি-পিসেকে হল্লাগুল্লা করে ঘুম থেকে তুলতাম সকালে।
—ছেলেবেলা আবার কী! তুমি তো এখনও ছেলেমানুষ-ই।
—আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক গামহারদা। আমার বউকে শুনিয়ে আর একবার বলুন। এই যে শুনছ!
—শুনেছি। আমি তো জানিই যে, তুমি ছেলেমানুষ। তুমি যেটাকে গুণ ভাবছ, আমি তোমার মধ্যে সেটাকেই দোষ বলে মনে করি। সব বুড়োমানুষি সব, ছেলেমানুষকে যেমন মানায় না, সব ছেলেমানুষি তেমন-ই সব বুড়োমানুষকে মানায় না। সব ফুলদানিতে কি সব ফুল মানায়? আধারে আধারে তফাত থাকেই।
হারিত বলল, দেখলেন স্যার। একটা সরল কথার পিঠে কী দার্শনিক এবং গোলমেলে তত্ত্ব আওড়াল আমার বউ।
—আবার স্যার-ট্যার কেন ভাই? গামহারদাই বোলো।
—তাই বলব।
—কে কী খাবে বলো। আমি অর্ডারটা দিয়ে আসি তারপর সময়ে গিয়ে নিয়ে আসব।
—যা হয় বলো কিন্তু সকলের জন্যে এক-ই মেনু বলো। একি জামাইষষ্ঠী নাকি? অত ঝামেলা করার কী দরকার?
—নাই বা কেন? নানারকম জিনিস যখন পাওয়া যায়, তখন আপরুচিসে খানার অসুবিধা কোথায়? মেয়েদের অন্তত ওই সম্মানটা দেওয়া যাক।
—সবসময়ে মেয়ে মেয়ে কোরো না তো। আমরা মানুষ তো। অনেক ব্যাপারে তোমাদের চেয়েও আমরা এগিয়ে, তবু সবসময়ে এমন করো যেন, আমাদের সত্যি সত্যিই তোমরা মাথায় করে রাখো। লোক-দেখানো ভড়ং না করাই ভালো।
ঝাঁঝি বলল, ঝংকার তুলে।
গামহার-এর ভালো লাগল। ঝাঁঝির গ্রীবা উঁচু করে কথা বলার ভঙ্গি, তার গলার ভরা-কলসের মতো স্বর, তার বক্তব্য— সবকিছুই। যাকে ভালো লেগে যায় গামহারের এমন-ই সব কিছুই ভালো লাগে আর যাকে পছন্দ হয় না তার চরণও বাঁকা লাগে।
চিকরাসি গাড়ি স্টার্ট করে বেরিয়ে গেল। হারিত ‘স্কচ’-এর বোতলটা খুলে একটা গ্লাসে ঢেলে বলল, টেল মি হোয়েন টু স্টপ।
—এটা কী?
—জন হেইগ।
—বাস। বাস।
বলে উঠল গামহার।
—জল না সোডা?
—জল। জল। বিদেশ বিভুঁই-এ সোডা পাওয়া যায় না। তাই জল দিয়েই খাই, যখন খাই।
—বরফ?
—হ্যাঁ বরফ দেবে বেশি করে।
—যখন খান মানে? রোজ খান না? সে কী?
—না।
—তবে যেদিন খাই সেদিন গুনে গুনে খাই না।
—তাই?
—হ্যাঁ। যারা গুনে গুনে ড্রিঙ্ক করে, তারা মানুষ খুন করতে পারে, সুদের কারবার করে। সেইসব মানুষকে কখনো বিশ্বাস করবে না।
ঝাঁঝি বলল, উনি কিন্তু তোমার মতো হিসেবি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নন। উনি একজন আর্টিস্ট। হিসেব আর আর্ট কখনোও সহাবস্থান করে না। করলে, দু-টির একটিরও মঙ্গল হয় না।
—বা:।
খুশি হয়ে বলল, গামহার।
তারপর বলল, ঠিক সেজন্যেও নয়। ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথের ‘তিনসঙ্গী’র একটি গল্প পড়েছিলাম। ‘রবিবার’। তার নায়ক অভীকের মুখে একটা সুন্দর কথা ছিল। এই কথাটি অবশ্য আমি প্রায়-ই বলি। তোমরাও হয়তো আগে আমার মুখেই শুনে থাকবে....
—শুনে থাকলেও আবার শুনব।
জারুল বলল।
অভীক বলেছিল, আমি কোনো নেশাকে পেতে পারি কিন্তু কোনো ‘নেশা’ আমাকে পাবে সেটি হচ্ছে না। বা এইরকম-ই কিছু।
—বা:। সত্যিই ভারি সুন্দর কথা। তোমরা গামহারদাকে দেখে শেখো। সন্ধে হলেই ‘আজ কোথায় বসা যায়’ নইলে ‘বাড়িতেই বসা যাক’ এই বাক্য শুনে শুনে তো কান পচে গেল। যেদিন বৃষ্টি পড়ে তোমরা সেদিনও খাও, যেদিন বৃষ্টি পড়ে না সেদিনও। কোনোদিন আনন্দ হলে খাও, অন্যদিন দুঃখ হলে। কোনো কিছুতেই নেশাগ্রস্ত হলে, তাতে তার আনন্দ থাকে না।
জারুল বলল।
—ঠিক। কোনোরকম কম্পালসিভনেস-ই আনন্দর মধ্যে গণ্য নয়।
—নেশার-ই মতো একজন নারীতে অভ্যস্ত হওয়াটাও অনুচিত। তাতে নারী বা পুরুষ কারোর-ই গৌরব বৃদ্ধি হয় না, যে-কারণে বিয়ে ব্যাপারটাই শিক্ষিত, সচ্ছল সমাজে বাতিল হয়ে যেতে বসেছে। বিয়েটা একঘেয়েমির সংজ্ঞা হয়ে গেছে। যুগ বদলাচ্ছে, কাল বদলাচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সমাজব্যবস্থা বদলাতে বাধ্য।
ঝাঁঝি বলল।
—তা ঠিক। একঘেয়েমির মতো এতবড়ো অভিশাপ, আধুনিক মানুষের জীবনে সম্ভবত আর নেই। তাই হয়তো অসচ্ছল সমাজেও বাতিল হতে বসেছে।
—এই যে। নিন গামহারদা।
—তোমার?
তারপর ঝাঁঝিদের দিকে ফিরে বলল, তোমরা খাবে না কিছু?
ঝাঁঝি বলল, মদ-এর চেয়েও অনেক বেশি নেশা হয়, আমি তেমন, তেমন নেশাতে বিশ্বাস করি।
সে কেমন নেশা? গামহার বলল।
আমরা কোক খাব। জারুল বলল।
—যেমন প্রকৃতি, যেমন পূর্ণিমারাত, যেমন মনের মতো পুরুষ, ভালো লাগার গান, বহুদিন মন-খারাপ অথবা মন-ভালো করে-রাখা সাহিত্য। সেটাই আমার হ্যাঙ-ওভার।
—বা:। তুমি ভারি ভালো কথা বলো তো। ঝাঁঝি বলল।
—সেটা বুঝি একমাত্র আপনাদের-ই প্রেরোগেটিভ করে রাখতে চান? ভালো কথা বলি বুঝি আমি? পারলে তো ভালোই তো। একসঙ্গে এত কথা আমার মনে আসে, নানা শেডস-এরই মতো যে, surealistic ছবি আঁকতে গিয়ে নিতান্তই daub হয়ে যায়।
হারিত জারুলকে কোক-এর সঙ্গে রাম মিশিয়ে দিয়ে নিজে জলের সঙ্গে রাম নিল। ঝাঁঝিকে শুধু কোক দিল গ্লাসে ঢেলে।
তারপর চেয়ারে বসে বলল, একটু ব্যাখ্যা করে বলুন দাদা। ঝাঁঝির বাবা আর্টিস্ট ছিলেন। আমার বাবা তো ছিলেন না। এইসব আর্টিস্টিক টার্মস আমরা জানি না।
ঝাঁঝি বলল, হ্যাঁ। আমি চিত্রীর-ই মেয়ে। তবে আমার বাবাদের প্রজন্ম আপনাদের মতো অর্থ, যশ, প্রচার কিছুই পাননি। বরং সমাজের উপেক্ষাই পেয়ে গেছেন। আমার মা বড়োলোকের মেয়ে ছিলেন। চালচুলোহীন, ফাইন-আর্ট করা আর্টিস্টকে ভালোবাসার অপরাধে তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন বাড়ি থেকে বিপুল অর্থবান, হাওড়ার ঢালাইওয়ালা দাদু। মাকে নিয়ে বাবা বস্তিতে গিয়ে উঠেছিলেন। তখন শিল্পীদের জনগণায়নও হয়নি। সরকার অথবা মিডিয়ার তাঁবেদারি করে তখনকার শিল্পীরা কিছুই পেতে চাইতেন না। সেই সময়ের কবি, সাহিত্যিক, গায়ক, বাদক, নাচিয়ে, চিত্রী সকলের-ই আত্মসম্মানজ্ঞান ছিল প্রখর। কোনো প্রলোভনেই ‘নিজস্বতা’কে তাঁরা বিকোতেন না।
একটু চুপ করে থেকে বলল, তবে আপনার বেলাতে এইসব নিন্দামন্দ যে, খাটে না, তা জানি। কিন্তু চারদিকে যা দেখি! কবি সাহিত্যিক গাইয়ে চিত্রীদের যে-পরিমাণ তৈলমর্দন করতে দেখি, মন্ত্রী ও মিডিয়াদের তাতে, তাঁদের আর শ্রদ্ধা করতে পারি না। আমার বাবা তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন। সাহিত্য-শিল্পি-সংগীতের এমন পণ্যায়ন, জনগণায়ন, তাঁকে দেখে যেতে হল না!
গামহার বলল, চিয়ার্স।
জারুল বলল, ইশ, তোমাদের বরফ লাগবে কি না জিজ্ঞেস করতে একদম ভুলে গেছি। আপনাকে আরও কি দেব গামহারদা?
দাও। আই লাইক প্লেন্টি অফ আইস। তারপর বলল, আউ গুট্টে দিয়ন্তু।
জারুল বলল, আপনি ওড়িয়া বলতে পারেন?
—সামান্য।
—কী করে শিখলেন?
—একটি ওড়িয়া মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম।
—কোথায়? কটকে?
—না, না। কটকে নয়, কলকাতাতেই। আমাদের পাশের বাড়ি তার বাবা ভাড়া নিয়েছিলেন। কাস্টমস-এর বড়ো অফিসার ছিলেন বাবা। অমন নরম, সুশ্রী, সভ্য, ভদ্র, সুগায়িকা মেয়ে আর দেখিনি। সুনন্দা পট্টনায়কের ছাত্রী ছিল। ওদের পরিবারের সঙ্গে আমি উটি, ভুবনেশ্বর, সম্বলপুর, সাতকোশিয়া, গন্ড সব ঘুরেছি।
—তাহলে বিয়েটা হল না কেন?
—ওই এক-ই কারণ।
—কী কারণ?
—ওই ঝাঁঝির বাবার-ই মতন আমার চালচুলো ছিল না। আমাকে কুমুদিনী বিয়ে করতে চায় শুনে তার প্রতিষ্ঠিত বাবাও কুমুদিনীকে তাড়িয়ে দেবেন বলেছিলেন।
—তা আপনি কুমুদিনীকে নিয়ে চলে গেলেন না কেন?
গ্লাসে, গামহার একটা বড়ো চুমুক দিয়ে বলল, আসলে আমার সাহস কম ছিল। বেশ কম। তা ছাড়া, সেই সংকটে পড়ে দুটো জিনিস হৃদয়ংগম করেছিলাম। দুটোই গ্রেট রিভিলেশান। জীবনে খুব-ই কাজে লেগেছিল, পরে।
—কী? কী?
ঝাঁঝি তার দু-চোখের মণি গামহার-এর দু-চোখের মণিতে না-ছুঁইয়ে, ছুঁইয়ে রাখল এমন করে, যেন একফোঁটা চাউনিও উপচে না পড়ে যায় বাইরে।
ঝাঁঝি বলল, বলুন, কী? কী?
হারিত একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ঝাঁঝির দিকে। ঝাঁঝির মধ্যে কী যেন, একটা পরিবর্তন লক্ষ করেছিল ও। এই গামহার ঘোষ লোকটার মধ্যে, এমন কিছু আছে যাতে মেয়েরা দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়। লোকটা ডেঞ্জারাস। লেখক-শিল্পীদের মধ্যে বেশ কিছু আছেন ওরকম। গোলমেলে। এই কিছুটা যে, কী? তা সিমলিপালে পৌঁছে জঙ্গলের মধ্যে গামহার ঘোষকে মশলা বেটে দেখতে হবে। সেটার উপাদানগুলিকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। বলল, হারিত মনে মনে। চলো জঙ্গলে মক্কেল, তোমার আক্কেল গুড়ুম করব। তোমার মধ্যে কী ডেবিট, কী ক্রেডিট হয়ে আছে দেখব ইনসাইড আউট করে।
—বললেন না, কী কী?
—হ্যাঁ। বলছি।
—প্রথমটা হল, ভালোবাসার শেষ, প্রাপ্তিতে নয়, হারানোতেই।
—চলো, হারানো আরও বোঝাব ভালো করে।
মনে মনে আবারও বলল হারিত। রাম-এর গ্লাসে একচুমুক দিয়ে।
—আমি যে, সত্যিই কুমুদিনীকে ভালোবেসেছিলাম। ও যে, বড়ো আদরে মানুষ হয়েছিল। ওড়িয়া সমাজে আমার চেয়ে হাজারগুণ ভালো ভালো ছেলেরা ওর জন্যে পাগল ছিল।
গামহার বলল।
—কুমুদিনী তাহলে আপনাকে ভালোবাসেনি আসলে?
—না, না, সেও বেসেছিল বই কী। অমন ভালোবাসা এ-জীবনে আমাকে আর কেউই বাসেনি। জানি না, বললে তোমরা বিশ্বাস করবে কি না, তার সঙ্গে কোনোরকম শারীরিক সম্পর্কই হয়নি আমার। একমাত্র হাতে হাত রাখা ছাড়া।
ন্যাকা ব্যাটা! নেকু-পুষু-মুনু! না বলে বলল, হারিত।
—তাতেই যেন ইলেকট্রিক শক লাগত—ভালোলাগার। ওকে ভালোবেসেছিলাম আমি, ও আমাকে ভালোবেসেছিল। ওর গায়িকা-সত্তা, আমার শিল্পী-সত্তাকে ভালোবেসেছিল। তাই ওর কষ্ট হোক তা আমি হতে দিইনি। তা ছাড়া, আমাকে বিয়ে করলে ওর গান নষ্ট হয়ে যেত। বাঙালিসমাজে ওড়িশি সংস্কৃতির প্রভাব কম। সেটা আমাদের-ই উচ্চম্মন্যতা আর কূপমন্ডূকতার-ই দোষ। নইলে অসম আর ওড়িশা থেকে আমরা অনেক কিছু নিয়ে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি-সংগীতকে অবশ্যই আরও অনেক সমৃদ্ধ করতে পারতাম।
ওরা চোখ বড়ো বড়ো করে গামহার-এর কথা শুনছিল।
ব্যাঙ্কের দারোয়ান বোধ হয় চৌপাইটা টানল শান-বাঁধানো বারান্দার ওপরে। কর্কশ শব্দে নিস্তব্ধতা খান খান হল। এমন সময়ে চিকরাসি ফিরল। গাড়ি থেকে নেমে এসে বলল, কী ব্যাপার! তোমাদের সকলের ঠোঁটে আঠা কেন?
—আঃ চুপ করো তো। তোমার ড্রিঙ্কটা নিয়ে এসে বসো। আমরা গামহারদার কথা শুনছি।
—এই তো। সাব্বাস দাদা! শুরু করে দিয়েছ তোমার Spell!
চিকরাসি বলল, গামহারকে।
তারপর ঝাঁঝি আর হারিতকে বলল, তোমরা তো গামহারদার সঙ্গে বাইরে কোথাও আসোনি। ইটস অ্যান এক্সপিরিয়েন্স। তোমার প্রফেশান চুজ করাই ভুল হয়ে গেছে গামহারদা। মেয়েদের তুমি যেরকম, চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে পারো তাতে, তোমার কোনো গুরুটুরু হয়ে যাওয়াই উচিত ছিল। দেশে এখন প্রফেশান বলতে তো মাত্র দুটো। এক রাজনীতি আর দ্বিতীয় গুরুগিরি।
—প্রফেশান চুজ করার কথাই যখন ওঠালে তখন, একটা গল্প মনে এল। গল্পটা অনেককেই বলেছি আগে। বয়েস হলে এককথাই বার বার বলে সবাই এক-ই জনকে। ভাবে, আগে কখনো বলেনি বুঝি।
চিকরাসি বলল, আমি শুনেছি, ওরা তো শোনেনি। বলেই ফ্যালো আর একবার।
—এক ভদ্রলোক উদবাস্তু হয়ে এসেছেন রাজশাহি থেকে। বরেন্দ্র ব্রাহ্মণ। এল. এম. এফ. ডাক্তার কিন্তু খুব ভালো ডাক্তার। চার ফিট দশ ইঞ্চি হাইট। মুখে বসন্তের দাগ। ওজন দু-মন। রং সেভেন্টি-এইট রেকর্ডের মতো কালো।
—রাজশাহিতে অনেক মাড়োয়ারি রোগী দেখতে দেখতে চমৎকার মাড়োয়ারি বলতে পারতেন তিনি। তাই উদবাস্তু হয়ে এসে, মধ্য কলকাতার এমন একটি জায়গাতে বাড়ি ও চেম্বার করলেন যেখানে মাড়োয়ারিদের বাস বেশি। অল্প ক-দিনেই পসার জমে গেল। তবে খাটতে হত প্রচুর। অবসর বলতে, বিনোদন বলতে কিছুমাত্রই ছিল না।
—তারপর?
—যে, সময়ের ঘটনার কথা বলছি, তখন উত্তমকুমারের একেবারে রমরমে দিন চলেছে। ডেট পাওয়াই মুশকিল। একদিন সেই ডাক্তার ভদ্রলোক তাঁর ছেলেদের জিজ্ঞেস করলেন, তোরা যে, উত্তমকুমার উত্তমকুমার কইর্যা লম্ফ-ঝম্ফ করিস তা লোকটা মাসে কত রোজগার করে রে? পাঁচ হাজার টাকা হইব?
বড়োছেলে রেগে গিয়ে বলল, তুমি কও কী বাবা! আমাদের কইল্যা কইল্যা, বাইরের কাউরে যেন, কখনো কইও না। মানষে শুইন্যা হাসব।
—ক্যান? হাসব ক্যান?
—আরে পাঁচ হাজার তো তার ঘণ্টার রোজগার।
ডাক্তার একটা ধাক্কা পেলেন জোর।
তারপর বললেন, দুস শালা। লাইন চুজ করাই ভুল হয়্যা গিছে।
—যেন উনি ইচ্ছে করলেই উত্তমকুমার হতে পারতেন!
ওরা সকলেই হো হো করে হেসে উঠল। আগে শোনা থাকলেও চিকরাসিকেও হাসতে হল নতুন করে গামহার-এর কথা বলার সরস ভঙ্গির কারণে।
বলতে বলতে ও রাম ঢালল গ্লাসে, কোক মেশাল। তারপর এসে বসল।
জারুল বলল, তুমি দিলে রসভঙ্গ করে। বলুন তো গামহারদা, যা বলছিলেন।
—বলি! কিন্তু কেমন করে বলি! আমি তো লেখক নই। আমি যে, চিত্রী! রবীন্দ্রনাথের কথা ধার করতে বলতে পারি ‘সংসারে মোরে রাখিয়াছ যেই ঘরে, সেই ঘরে রব সকল দুঃখ ভুলিয়া/করুণা করিয়া নিশিদিন নিজ করে, রেখে দিয়ো তার একটি দুয়ার খুলিয়া।’ আসলে ভালোবাসা যত বেশি গভীর হয়, তার দুঃখও তত গভীর। ভালোবাসা আর ভালো লাগাতে চিরদিন-ই তফাত ছিল। ভালোবাসা, ভালোবাসার ধনকে না পেলেই বেঁচে থাকে চিরদিন।
—আর দ্বিতীয়টা?
ঝাঁঝি বলল।
দ্বিতীয়টা বুঝিয়ে বলা একটু মুশকিল। টি. এস. এলিয়টের কথাতে বললে কি তোমরা বুঝবে?
—কী কথা?
—‘Time present and time past
Are both perhaps present in time future,
And time future contained in time past.’
যে যার মতো করে বুঝে নাও এখন।
চিকরাসি বলল, তাহলে কী ঠিক হল? খাওয়া তো আধ ঘণ্টার মধ্যে হয়ে যাবে। ড্রিঙ্ক-টিঙ্ক করে খাওয়া-দাওয়ার পরে সারারাত গাড়ি চালিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?
ঝাঁঝি বলল হারিতকে, তুমি কিন্তু বেশি ড্রিঙ্ক কোরো না। ড্রাইভ করবে সারারাত। মনে থাকে যেন।
—আরে না, না।
—তোমার কষ্ট হবে গামহারদা সারারাত জেগে বসে যেতে। ‘ZEN’ তো আর বড়োগাড়ি নয়!
আরে, জারুলের গান শুনতে শুনতে চলে যাব।
জারুল বলল, আর তুমি গান গাইবে না?
—চিকরাসির ঘুম পেয়ে গেলে, ঘুম তাড়াবার জন্যে গাইতে পারি।
হারিত আর ঝাঁঝি হেসে উঠল গামহারের কথায়।
জারুল আর চিকরাসি সমস্বরে বলল, হেসো না। গামহারদা কিন্তু বেশ ভালো গান করেন।
—তাই? বাবা:। কোন গুণ নেই আপনার?
—কোনো গুণ-ই নেই। আমি ‘Jack of all trades master of none.’
বেরোতে বেরোতে সাড়ে এগারোটা হয়ে যাবে।
—ক-টা বাজে এখন?
—পৌনে দশটা।
—আমি আর পনেরো মিনিট পরে গিয়ে ধাবা থেকে খাবারটা নিয়ে আসি।
—চালাতে চালাতে চোখ লেগে গেলে গাড়ি রাস্তার ধারে লাগিয়ে ঘুমিয়ে নেবে। তখন কিন্তু একদম-ই চালাবে না গাড়ি।
চিকু বলল, হারিতকে।
—আরে জানি রে বাবা জানি। হোল-নাইট ড্রাইভ কি করিনি নাকি? একসময়ে র্যালি করতাম তা কি জান?
—ফাস্ট রেসিং?
গামহার জিজ্ঞেস করল।
—না না, এনড্যুরেন্স র্যালি। চব্বিশ ঘণ্টায় কলকাতা থেকে দিল্লি। রাতে রেস্ট। পরদিন দিল্লি-মুম্বাই। তার পরদিন মুম্বাই-চেন্নাই এবং তার পরদিন চেন্নাই-কলকাতা। আমরা সেকেণ্ড হয়েছিলাম।
—আমরা মানে?
—আমরা মানে বিশ্বজিৎ ইন্দ্রজিৎ ছিল। গুহ ব্রাদার্স।
—ননিও।
—মানে? কোন ননি?
—ননিগোপাল চন্দ। এখন পাকপাড়ার রানির বেয়াই। এই তো সেদিন বিয়ে হল। রুপোর মিনিয়েচার কুলোতে নেমন্তন্নর চিঠি করেছিল। দেখার মতো। সারাকলকাতা শহরেরই নেমন্তন্ন ছিল।
—রানি কে? রীতা? দেবাশিস সিনহার স্ত্রী তো।
—হ্যাঁ। ও আপনি চেনেন?
—চিনতাম বই কী। অল্প বয়সে দুম করে চলে গেল। রীতা তো নর্থ ক্যালকাটা রাইফেল ক্লাবে রাইফেলও ছুড়ত। ন্যাশনালেও গেছিল। তাই না?
—হ্যাঁ। আপনি তো সব-ই জানেন দেখছি।
—ওই ক্লাবে আমার কিছু চেলা আছে। তাদের মাধ্যমেই চিনতাম।
—আপনি খেপুখেনু ‘ক্লাব’-এ যান কি? আপনাকে তো কখনো দেখিনি!
—না আমি যাই না।
—কেন?
—ভালো লাগে না। তা ছাড়া আমি পায়জামা-পাঞ্জাবি পরি। তা পরে তো, যাওয়া বারণ। কিছু মানুষ মূর্খের স্বর্গে বাস করে, প্রকৃত মূর্খজনোচিত আনন্দ ও শ্লাঘা বোধ করেন। তাঁদের আহ্লাদ নিয়ে তাঁরা থাকুন। বকমধ্যে হংস হতে যাবই বা কেন? এসব ক্লাব-এর চেয়ে অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনও ভালো। মেম্বারদের সঙ্গে সাহিত্য, সংগীত, ছবি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা যায়। ওইসব ক্লাবের অধিকাংশ মেম্বার-ই তো বড়োলোক বাবার ঢ্যাঁড়শ ছেলে। নিজেরা জীবনে করেছেটা কী?
—আপনি কি কখনো Black-balled হয়েছিলেন? এত রাগ কেন? দ্রাক্ষাফল টক?
—Apply করলে তো Black-balled হবার প্রশ্ন! আমার কি ল্যাজ গজাবে, সেখানের মেম্বার হলে?
হারিত বলল, যাই বলো চিকু, গামহারদা একজন ওরিজিনাল মানুষ।
—তা ঠিক। কলকাতা শহরটাই ভরে গেছে প্রোটোটাইপ-এ আর দু-নম্বরিতে।
—অতসব জানি না। আমি আজে-বাজে মানুষের সঙ্গে মেশার চেয়ে, ভালো গান শুনতে, ভালো বই পড়তে ভালোবাসি। ছবি আঁকি নিজের মনে। চানঘরে গান গাই। মেশার মতো মানুষ নইলে মিশে লাভ কী?
—তা ঠিক। দু-ঠ্যাঙে মাত্রই তো আর মানুষ নয়।
চিকু বলল।
—আমি পুরোনো দিনের মানুষ। কত ‘কল্লোল-যুগ’, ‘কৃত্তিবাস-যুগ’ হেজে-মজে গেল। রবীন্দ্রনাথ, লেসার মর্টালসদের সব নিন্দামন্দ সত্ত্বেও এখনও রবীন্দ্রনাথ-ই। কোনো বিকল্প হয়নি আজ অবধি। হবে কি না, তাও জানি না। এখনও তিনি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মৃত্যুর পরে পাঁচ যুগ পেরিয়ে এসেও।
বলেই, আবৃত্তি করল গামহার,
প্রলয় সৃজন না জানি এ কার যুক্তি
ভাব হতে রূপে অবিরাম যাওয়া আসা
বন্ধ ফিরিছে খুঁজিয়া আপন মুক্তি
মুক্তি মাগিছে বাঁধনের মাঝে বাসা।
—আমরাই তাহলে আগে যাচ্ছি?
—যেমন বলবে।
—তাই যাও।
হারিত বলল, চিকুকে।
হারিত একটু বেশি রাম খেয়ে ফেলেছে মনে হল। আণ্ডা-তড়কা আর চিকেন-ভরতি দিয়ে রুটিও কম খায়নি। স্বাস্থ্যও খুব ভালো হারিতের। তা ছাড়া রীতিমতো সুদর্শন। ফ্রেঞ্চকাট দাড়িসমেত ‘মড’ চেহারা। প্রাইস ওয়াটারহাউসের রূপেন রায় রূপেন রায়, দেখতে অনেকটা, তবে রূপেনের চেয়ে অনেক লম্বা এবং ওয়েল-বিল্ট হারিত। দেখে মনে হয় না চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, মনে হয়, ইন্টারন্যাশনাল এয়ার লাইনস-এর পাইলট বুঝি।
কতরকম মুহুরিই যে আছে! ভাবছিল গামহার। ছেলেবেলাতে মুহুরিদের দেখেছে, ধুতির সঙ্গে হাতের বোতাম না-আটকানো ফুলশার্ট পরতে আর লাগাতার নস্যি নিতে। তাঁদের এক এক-জনের হাতের লেখার রকম আবার আলাদা আলাদা ছিল হিগলোগ্রাফির মতো। নিজস্ব হরফ উদ্ভাবন করতেন এক এক-জনে, পাছে তাঁর হাতের লেখা ইনকাম-ট্যাক্স বা সেলস-ট্যাক্স অফিসারের সামনে অন্য কোনো মুহুরি পড়ে গিয়ে তার চাকরিটি খেয়ে দেয়। মালিককে তাঁবে রাখার ওই একটা উপায় ছিল মুহুরিবাবুদের, মালিকদের যেমন ছিল অজস্র উপায়, তাঁদের তাঁবে রাখবার।
ভাবছিল গামহার, হারিতও একজন মুহুরি আর গামহারদের পাশের বাড়ির তেলকল ধানকলের মালিক হরিপদ খাঁ-এর কর্মচারী প্রসন্নবদনও মুহুরি-ই ছিলেন, অথচ দু-যুগের দুই মুহুরির মধ্যে কত তফাত। প্রসন্নবদন দলুই-এর কোনো ডিগ্রি-টিগ্রি ছিল না। হারিত এম. কম এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। প্রসন্নবদন খেতে পেতেন না, হারিতের সল্টলেক-এ বাড়ি, মারুতি এস্টিম গাড়ি, সে ‘খেপুখেনু’ ক্লাবের মেম্বার। তাকে দেখলে এবং তার কথাবার্তা-হাবভাব দেখলে মনে হয়, তার জীবনে সব-ই পাওয়া হয়ে গেছে। মনুষ্যজীবন কানায় কানায় সার্থক। মানুষ অথবা ঈশ্বর কারও কাছেই চাইবার কিছুমাত্রই আর নেই।
—যুগ ও কাল সত্যিই পালটেছে। গামহারদের যুগ শেষ হয়ে গেছে। সত্যিই যুগান্তর ঘটেছে সব কিছুর। যুগান্তর-ই নয়, এখন তো নতুন শতাব্দীরও মুখোমুখি এসে পৌঁছোল ওরা। যন্ত্রপাতি, ইনফরমেশন-টেকনোলজি সবেতেই অভাবনীয় সব পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তন এসেছে মানুষের চেহারায়, সাজ-পোশাকে। তার চেয়েও বেশি এসেছে ধ্যান-ধারণাতে, চাওয়া-পাওয়ায়, মানসিকতাতে এবং চরিত্রে। মানুষের সঙ্গে গাড়ির শক-অ্যাবসরবার বা কম্পিউটারের ফ্লপির তফাত নেই আর কোনো। কথা ছিল যে, বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি যন্ত্রকে দাস বানিয়ে মানুষকে সম্রাট বানাবে। বিজ্ঞান, মনে হয়, মানুষকে শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর-ই গড়ে ফেলল। মানুষ শিব হল না বাঁদর, তা আর কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা যাবে।
—কী হল গামহারদা? ঘুম পাচ্ছে নাকি?
চিকু বলল, গাড়ি চালাতে চালাতে।
—না:।
—তবে? একেবারে চুপচাপ কেন!
—ভাবছি।
—কী এত ভাবো বলো তো সবসময়ে?
—তাই তো। কত কী। কেটে-যাওয়া ঘুড়ির মতো ভাবনা আমার ভেসে যায় নিরুদ্দেশে। কারও কাছে জবাবদিহির দায়িত্ব নেই। তুমিও জবাবদিহি চেয়ো না।
—একজনের ভাবনা অন্যে দেখতে পেলে বেশ হত। না?
জারুল বলল, পেছন থেকে।
—তা হত। তবে তা বেশ না হয়ে, বিপদও ডেকে আনতে পারত নানারকম।
গামহার-এর এই কথাতে ওরা তিনজনেই হেসে উঠল একইসঙ্গে।
গামহার বলল, একটা গান শোনাবে নাকি জারুল?
—আমার গান আর কী শুনবেন, জঙ্গলে পৌঁছে ঝাঁঝির গান শুনবেন। চন্ডীদাস মালের কাছে পুরাতনি গানের তালিম নিচ্ছে। নিধুবাবু, শ্রীধর কথক, গোপাল উড়ে, গিরীশ ঘোষ, বর্ধমানের মহারাজা আরও কত-জনের গান যে, তুলেছে কী বলব! আশ্চর্যময়ী দাসী, আঙুরবালা, গহরজান, ইন্দুবালা এঁদের নানা পুরোনো রেকর্ড থেকেও অনেক গান তুলেছে। সেসব গান শুনলে অবাক হয়ে যাবেন।
—সে কী! ঝাঁঝি না ছায়া সেনের কাছে রবীন্দ্রসংগীত শিখত?
চিকু বলল অবাক হয়ে।
—তা শিখত। তবে কবে ছেড়ে দিয়েছে!
—কেন?
—হারিতও রবীন্দ্রসংগীত শিখছে ছায়া সেন-এর কাছে। তাই রবীন্দ্রসংগীত গাওয়াই ঝাঁঝি ছেড়ে দিয়েছে।
চিকু বলল, সে কী! এ যে চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া। বেচারি রবীন্দ্রনাথ কী দোষ করলেন! বা ছায়া সেন?
আঃ তুমি একটু চুপ করবে। চিকুকে বকে বলল জারুল।
—চাঁদটা উঠেছে। দু-পাশের মাঠপ্রান্তর কী চমৎকার দেখাচ্ছে! জঙ্গলও।
—আমি ছিন-ছিনারি দেখলে গাড়িকে কে দেখবে?
—কোথায় চুপ করে দেখবে না, বকর বকর করেই চলেছ।
—আমরা বিসোই-এর ঘাট-এ পৌঁছোব কখন?
—দেরি আছে। বঙ্গভূম ছেড়ে লাল্লুভূমে পড়েই বেশ কয়েক কিমি পথের এমন-ই অবস্থা যে, মনে হবে চাঁদে বাইচুং চাষ করছ।
—শব্দটা বাইচুং না ভাইচুং। প্রথমটি ভাইচুং ফুটবলার, দ্বিতীয়টি বাইচুং ধান।
—ওই হল।
—সামনের ওই রাস্তাটুকুর নাম গিনেস বুক অফ রেকর্ড-এ অবশ্যই উঠতে পারে। দৈত্যর মতো মার্সিডিস ট্রাকগুলো পর্যন্ত হালে পানি পায় না আর আমার তো মারুতি জেন-ই। রাজপথের-ই মধ্যে এমন পথ-ভোলানো ব্যাপার-স্যাপারের কথা ভাবাই যায় না।
—তবে কী হবে?
উদবিগ্ন গলাতে বলল জারুল।
—‘যা হবার তা হবে। যে আমারে কাঁদায় সে কি অমনি ছেড়ে রবে?/পথ হতে যে ভুলিয়ে আনে পথ যে কোথায় সেই তা জানে,/ঘর যে ছাড়ায় হাত সে বাড়ায়—সেই তো ঘরে লবে।’
চিকু বলল।
জারুল বলল, এটা কার কবিতা? তুমি ক-টা হুইস্কি খেয়েছ? থুরি, রাম? কবিতা আওড়াচ্ছ যে, বড়ো! কোন কবির এত সৌভাগ্য?
—সরি। এটা গান। রবি ঠাকুরের। সৌভাগ্য না বলে দুর্ভাগ্য বলো। নইলে চিকুতে গান গায়? তোমরা তো সব রিমেক আধুনিকের আর্টিস্ট। রবিঠাকুরকে তোমরা তথাকথিত শিক্ষিতরা দল বেঁধে ছাড়লে বলেই তো, পীযূষকান্তির মতো কুমিরেরা এসে তাঁকে ঠ্যাং কামড়ে ডোবাতে ডুবিয়ে মারার মতলব করেছে।
—গানটা জানেন গামহারদা?
—না।
—তবে অন্য একটা গান করুন।
—প্লিজ! চিকুর এই ভ্যাজভ্যাজানি আর সহ্য হচ্ছে না।
—গামহার ধরে দিল বিনা ওয়ার্নিং-এ ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে তখন ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন অন্যমনে।’
গামহারের গান গাওয়া শেষ হলে জারুল বলল, হোয়াট আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ! কী সুন্দর ভাব আপনার গলাতে, কী দারুণ গলা। গান শেখাবেন আপনি আমাকে?
—স্টুডিয়োর দরজা বন্ধ করে নগ্না মডেলদের কী শেখান গামহারদা, তা তিনিই জানেন। দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পরও, তুমি কি শুধু গান-ই শিখবে?
—অন্য অনেক কিছুই শিখতে পারি। সেটা আমার ব্যাপার। সিরিয়াস কথার মধ্যে ইয়ার্কি আমার ভালো লাগে না।
—সিরিয়াসলি বলছি গামহারদা। শেখাও না জারুলকে রবীন্দ্রনাথের গান। রুচিটা ভালো হয়ে যাবে।
—‘রুচি’ তুলে কথা বলবে না চিকু। মানা করছি।
গামহার ওদের ঝগড়া বন্ধ করার জন্যে ধরে দিল হঠাৎ, ‘ও যে মানে না মানা, আঁখি ফিরাইলে বলে, না, না, না।/যত বলি নাই রাতি—মলিন হয়েছে বাতি/মুখপানে চেয়ে বলে, না, না, না।/বিধুর বিকল হয়ে খ্যাপা পবনে/ফাগুন করিছে হা-হা ফুলের বনে।/আমি যত বলি তবে এবার যে যেতে হবে/দুয়ারে দাঁড়ায়ে বলে, না, না, না।’
তারপর বলল, গানের বাণী শুনলে? রবীন্দ্রনাথের গানের কথাই শুনবে? না সুর। কথা ও সুরের মধ্যে এমন সুষম প্রতিযোগিতা সম্ভবত আর অন্য কোনো গানেই পাবে না। এমন বসন্তের মধ্য-রাত, চাঁদে ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী, চলেছ এমন চাঁদ-চকচক বনের মধ্যে দিয়ে আর এখন-ই কি তোমাদের খুনশুটি করার সময়! ছি:। চুপ করো দুজনে-ই।
জারুল বলল, সত্যি। কী সুন্দর কথা আর কী দারুণ সুর। এটাও কি রবীন্দ্রসংগীত?
—হ্যাঁ। বাঙালি হয়েও রবীন্দ্রনাথকে পড়লে না, তাঁর গান গাইলে না, তোমরা সত্যিই জানো না তোমরা কী হারালে!
—এইবার দ্যাখো, আরম্ভ হল লাল্লুজি কি খেল। বিহারে পড়েছি আমরা।
চিকু বলল। গামহার কী বলল তা না শুনেই।
—এ কী! এই পথ দিয়ে যেতে হবে আমাদের? একে কি পথ বলে! বলো গামহারদা?
জারুল বলল আতঙ্কিত গলায়।
—গতবছর আমাদের ওয়েস্ট-বাংগালকি রাস্তা এর চেয়েও খারাপ ছিল। অসীম দাশগুপ্ত, ক্ষিতি গোস্বামীকে বে-ইজ্জত করার জন্যে টাকা ছাড়ছিলেন না, তাই বেচারি পূর্তমন্ত্রী গভীর খাদে ছিলেন। নিজে উঠবেন, তবে না রাস্তা মেরামত হবে। এতদিনে হয়েছে।
জারুল বলল, এবারে চুপ করে গাড়িটা চালাও। জানি না, এ পথ পেরোবে কী করে? খুব মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাও। উলটো দিক থেকে লাইন দিয়ে আসা ট্রাকগুলোর হেডলাইটে চোখ যে, ঝলসে যাচ্ছে। কিছু একটা করা যায় না?
চিকু বলল, মাইক স্যাটো, ফাস্ট রেসিং-এর ড্রাইভার এক জায়গাতে লিখেছিলেন, উলটোদিকের হেডলাইট থেকে নিজের চোখ এবং গাড়ি বাঁচাবার ফর্মুলা।
—কী?
—‘ডোন্ট লুক অ্যাট দ্যা হেডলাইট। ডোন্ট লুক অ্যাট দ্যা হেডলাইট। ডোন্ট লুক অ্যাট দা হেডলাইট।’ শুধু তোমার বাঁ-দিকে কতটুকু জায়গা আছে, তা দেখে চোখ নামিয়ে গাড়ি চালাও।
—বা:।
বেশ কিছুক্ষণ তটস্থ হয়ে সোজা বসে থেকে, ওই পথটুকু পেরিয়ে বহড়াগড়ার দিকে যখন গাড়ি এগোল তখন গামহার বলল, ‘মনে হল যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ।’
—বহড়াগড়াতে একটু চা খাবার জন্যে দাঁড়াবে নাকি? হারিত যতগুলো রাম খেল, একটা কান্ডই না বাধায়।
—মন্দ বলোনি। চা খাবার সঙ্গে সঙ্গে ওর অবস্থাটাও একটু চেক করে নেওয়া দরকার। হাওয়া ঠিক আছে কী নেই!
—গাড়ির চাকার হাওয়া?
—আজ্ঞে না। হারিতের।
—চলো, বহড়াগড়ার মোড়ে দাঁড়াব ধাবাতে।
—তারপরে কোন কোন জায়গা পড়বে?
—বহরাগড়াতে গিয়ে পথের একটা হাত ডান দিকে চলে গেছে ধলভূমগড়, ঘাটশিলা, টাটা, ঝুন্ডু হয়ে রাঁচি। আর সোজাপথটি গেছে মুম্বই। ওড়িশা এবং আরও নানা রাজ্য পেরিয়ে। বাংরিপোসির আগে ন্যাশনাল হাইওয়ে ফাইভ আর সিক্স মিলেছে...
—বাংরিপোসি! নামটা চেনা চেনা লাগছে যেন।
জারুল বলল।
গামহার বলল, ‘বাংরিপোসির দু-রাত্তির’ নামের একটা উপন্যাস আছে। ইনফ্যাক্ট, শুনেছি যে, ওই উপন্যাসটিই বাংরিপোসিকে এক বিখ্যাত ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত করেছে।
—কার লেখা?
জারুল জিজ্ঞেস করল।
জারুলের কথার উত্তর না দিয়ে চিকু বলল, ওরা তো আবার চিন্তায় ফেলল।
—কারা?
—আরে হারিতরা।
—কেন?
—পেছনে তো ওদের দেখছি না। কোনো মার্সিডিস ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি ভিড়িয়ে দিল না তো!
উদবিগ্ন হয়ে বলল জারুল।
—খারাপ রাস্তাতে কখনো অ্যাকসিডেন্ট হয় না। প্রত্যেক ড্রাইভার-ই তখন তীব্রতীক্ষ্ণ সজাগ থাকে। রাতের বেলা অ্যাকসিডেন্টের ভয় দারুণ থাকে ভালো রাস্তাতে। কখন যে, চোখ জুড়ে আসে তা আগের মুহূর্তেও বোঝা যায় না। আর সেই ঘুম-ই চিরঘুম হয়ে যায়। চলো তো, চায়ের অর্ডার দিই। আশা করি এসে যাবে।
—আসবে না তো যাবে কোথায়?
চিকু বলল।
গামহার ঝাঁঝির মুখটিকে মনে করল। ওর মুখটি যেন, কোনো দূরের নদীর হাঁসুলি বাঁক। জলজ গন্ধমাখা তার ঠোঁটদুটিতে, বুনোহাঁসের ডানার আঁশটে গন্ধ, আর তলপেটের মসৃণ নরম পালকের ওম। মনে মনে বার বার আঁকল, বার বার মুছল সেই মুখের ছবিটি কিন্তু তবু ঠিকঠাক সেই মুখের ভাবটি কিছুতেই ফুটল না। কখন যেন চুরি হয়ে গেছে।
গামহার ভাবল, এবার ওরা এসে পৌঁছোলে, অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে ঝাঁঝির মুখটার ছবি, নিজের চোখের তারাতে জলছবির মতো সেঁটে নেবে।
দেখতে দেখতে হারিতরা এসে পড়ল।
বলল, এক ব্যাটা ট্রাক কিছুতেই সাইড দেবে না। হর্ন দিয়ে দিয়ে আঙুল ব্যথা হয়ে গেল। সেজন্যেই দেরি হয়ে গেল।
চা খাওয়ার সময়ে দেখা গেল হারিত একেবারে Fit as a fiddle! ঝাঁঝিও নামল গাড়ি থেকে। বলল, বাবা:, পা দুটো একটু ছাড়িয়ে নিই। ধরে গেছে একেবারে।
চিকু বলল, পা টিপে দেব?
—অসভ্য।
বলল ঝাঁঝি।
মেয়েরা এই ‘অসভ্য’ শব্দটা যে, কত কী-ই বোঝাতে ব্যবহার করে, তা বলা যায় না। বিরাট রেঞ্জ।
হারিতের ইচ্ছে করল ঝাঁঝির পা-টা সত্যি সত্যিই টিপে দেয় একটু।
চুপ করে ঝাঁঝির মুখের দিকে চেয়ে রইল গামহার। ছবিটার যেখানে যেখানে রং ফিকে হয়ে গেছিল, অদৃশ্য কল্পনার তুলি দিয়ে, সেখানে সেখানে রং লাগিয়ে দিল। ঝাঁঝিকে আজ সন্ধে থেকে গামহার একজন চিত্রীর চোখ দিয়েই দেখছে। যে-চোখের কথা শুধু আর্টিস্টরাই জানেন।
চা খাওয়ার পরে চিকুরাই এগিয়ে গেল। যেমন গ্রিনফিল্ডস ছাড়ার পর থেকেই এগিয়েছিল। ঝাড়ফুকুরিয়ার মোড় হয়ে বাংরিপোসি হয়ে বিসোই-এর ঘাটে উঠতে লাগল গাড়ি। পাহাড়ের ওপরে ঘুরে ঘুরে উঠেছে পথ। ডানদিকে একটা মন্দির পড়ল। চিকু গাড়ি থামিয়ে সেখানে পুজো দিতে গেল।
গামহার বলল, চিকু এসব মানে নাকি?
—ও তেমন মানে না। তবে একেবারে মানে না যে, তাও নয়। কিন্তু হারিত বার বার করে বলে দিয়েছে এই বাংরিপোসির ঠাকুরানি নাকি খুব-ই জাগ্রত। পুজো না দিলে অ্যাকসিডেন্ট হবেই।
জারুল বলল।
—তাই? ‘ইনফোটেক’ এক্সপার্ট আর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদেরও এত কুসংস্কার।
—কুসংস্কার এমন-ই একটা ব্যাপার গামহারদা যে, It runs in the blood. বাইরের ইংরেজিয়ানাতে ভেতরের এইসব ব্যাপারগুলো আনএফেক্টেড থাকে। তবে আমি বাধা দিই না। আমি নিজে বিশ্বাস করি না বলেই, আমার অবিশ্বাস জোর করে কারও ওপরে চাপাব কেন? সেই অধিকার তো আমাকে কেউ দেয়নি। যে যা ভালো মনে করবে, করবে। এসব জিনিস এতই ব্যক্তিগত যে, এতে কোনো জোর চলে না। চালানো উচিতও নয়।
—তা অবশ্য ঠিক-ই।
চিকু পুজো দিয়ে এল। তারপর গাড়ি স্টার্ট করল।
বিসোই জায়গাটা একটা মালভূমির মতো। সমতল। দু-পাশে বন। ভারি ভালো লাগল গামহার-এর।
—এগুলো কী গাছ জারুল? চাঁদের আলোতে চকচক করছে পাতা।
—এগুলো সব শালগাছ। চলুন সিমলিপালে। আপনাকে গাছ চেনাব। পাখি চেনাব।
—বেশ। মানুষ চেনার চেয়ে, গাছ-পাখি-প্রজাপতি চেনা অনেক-ই ভালো, তাই না? তবু মানুষকে যদি চেনা যেত নিশ্চিত। মানুষকে হাড়ে-হাড়ে চেনার চেয়ে, এদের চেনা হয়তো অনেক সহজও। তাই না?
—তারপর-ই বলল, ঝাঁঝিও কি গাছ-টাছ চেনে? তোমার মতো?
—চেনে কিছু কিছু হয়তো। তবে ওরা তো, আমাদের দু-জনের মতো জঙ্গলের পোকা নয়। জঙ্গলে জঙ্গলে ঘোরে না। এই রাস্তা দিয়ে একবার রাইরাংপুরে গেছিল নাকি, তাই বিসোইর ঘাটটা চেনে। ওরাও তো এই প্রথমবার যাচ্ছে সিমলিপালে। তবে ঘাটশিলা যায় প্রায়-ই। বহড়াগড়া অবধি তো রাস্তা এক-ই। তাই গ্রিনফিল্ডস-টিল্ডস চেনে। ঘাটশিলাতে ওদের একটা বাড়ি আছে একেবারে সুবর্ণরেখার ওপরে।
—তাই? তা ঘাটশিলাতে তো বিভূতিভূষণের ডেরা ছিল। ধারাগিরি পাহাড়। সেখানের জঙ্গল দেখেনি ওরা?
—হা:। ওদের এসব ব্যাপারে ইন্টারেস্ট তো নেই। ঝাঁঝির কথা বলতে পারব না। তবে হারিতের নেই। যখন যায়, তখন খায়, ড্রিঙ্ক করে, তাস খেলে, ঘুমোয়। নিজেকে আনওয়াইল্ড করতেই যায়। এ-পর্যন্ত ধারাগিরিতেও নাকি যায়নি একবারও। তবে হারিত এখানে Stag-Party নিয়েই আসে। ঝাঁঝি বিশেষ আসে না। দু-জনের মধ্যে অনেক-ই অমিল। ঝাঁঝি খুব গভীর মেয়ে। ও যে সুখী নয় আদৌ, তা বোঝা যায়।
গামহার বলল, সংসারে হান্ড্রেড পার্সেন্ট সুখী আর ক-জন মানুষ? তা ছাড়া অধিকাংশ সুখী মানুষেরাই স্থূল হয়, সাধারণত হয়। সুখ সকলকে মানায়ও না।
অন্য অ্যাকাউন্ট্যান্টরা, ওর বন্ধুস্থানীয়, ইনকাম ট্যাক্সের কমিশনাররা আসেন বলে শুনেছি ওর সঙ্গে। ওঁরা নির্মল প্রশ্বাস নিয়ে যান আর কী। গাছপালা পাখিতে তো সকলের ইন্টারেস্ট নেই।
আধঘণ্টার মধ্যে ওরা গভীর জঙ্গলের মধ্যে চলে এল। এখন রাস্তা চমৎকার। চওড়া এবং মসৃণ। চাঁদের আলো দু-পাশের জঙ্গলে যেমন চকচক করছে, মনে হচ্ছে পথের ওপরে যেন আলোছায়ার ডোরাকাটা শতরঞ্জি বিছিয়ে দিয়েছে কেউ।
আপনি আর্টিস্ট, আপনার ভাবনাচিন্তা অন্যরকম। আমি সাধারণভাবে কথাটা বলেছিলাম।
গামহার এককলি ওড়িয়া গান গেয়ে উঠল, ‘ওরে মোর সজনী ছাড়ি গল্বা গুণমনি/কা কর ধরিবি?’’
বা:। জারুল বলল।
—মানেটা তো বলবে। আমরা কি ওড়িয়া জানি?
চিকু বলল।
—মানে হল, ও আমার প্রিয়া, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, আমি কার হাতে হাত রাখব এখন?
—বা:। ভারি সুন্দর তো!
—তোমার কাছে সুন্দর। যার প্রিয়া ছেড়ে গেল তার পক্ষে প্রাণান্তকর।
হেসে বলল, গামহার। ওরাও হেসে উঠল।
—ওড়িশার রাস্তা দেখছ গামহারদা? গতসপ্তাহে চারমল-এর জঙ্গলে গেছিলাম ঝাড়সুগুদা থেকে সম্বলপুর হয়ে। একটা রাস্তা বানিয়েছে ওড়িশা সরকার রাউরকেল্লা থেকে সম্বলপুর, দু-শো কিমি, দেখার মতো। সব গাড়ি ও বাস থেকে টোল নিচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যেই খরচা উঠে আসবে। সেই পয়সাতে আবার অন্যত্র রাস্তা করা যাবে। ও রাজ্যে সেন্ট্রাল রোডওয়েজ কর্পোরেশনের পথঘাটও বেশ ভালো।
—আমাদের পশ্চিমবঙ্গে এমন করা যায় না?
—আমি কী করে বলব বলো। এম এল এ-দের বলো, মন্ত্রীদের বলো। পশ্চিমবঙ্গে যা করা সবচেয়ে সোজা তা হচ্ছে নাম বদল। এতদিনের ওল্ড বালিগঞ্জ রোড হয়ে গেল, আশুতোষ চৌধুরী অ্যাভিনিউ।
—তিনি কে? কোনো বড়োলোক অবশ্যই।
—শুনেছি প্রমথ চৌধুরীর দাদা, যিনি ছোটোভাই-এর সঙ্গে কম্পিটিশনে নেমে নাকি হেরে গেছিলেন।
—কোন প্রমথ চৌধুরী? বীরবল?
—ইয়েস!
—কীসের কম্পিটিশন?
—ইন্দিরা দেবীকে বিয়ে করার।
—স-ও-ও-ত্যি, বলে বড়োহেঁচকি তুলল একটা জারুল।
—সত্যি।
—ডালহাউসি স্কোয়ার যে, বিবাদী বাগ হল, আজকালকার ছেলেমেয়েরা তাকে জানে বাদী-বিবাদীর বিবাদী বলেই। কে যে, বিনয়? কে যে, বাদল? আর কে যে, দীনেশ তা কি তারা জানে?
—তাও ভালো যে, লেনিন-স্ট্যালিন মার্গ হয়ে যায়নি নাম।
—বলা যায় না, এখনও হতে পারে যেকোনো দিন।
—তা অবশ্য ঠিক।
একটু দাঁড়িয়ে, চাঁদনি রাতের জঙ্গলের ছিন-ছিনারি একটু ভালো করে দেখে গেলে হত না? চাঁদনি রাতের জংলি রূপ।
—এখানে কি দাঁড়াবে গামহারদা? জঙ্গলের রূপ দেখাতেই তো, তোমাকে নিয়ে এসেছি এবার। এই মহিলার প্রেমে তুমি একবার পড়লে আর কোনো মহিলাকেই চোখে ধরবে না।
চিকু বলল।
—কার প্রেমে? ঝাঁঝির?
অন্যমনস্ক হয়ে-যাওয়া গামহার বলল।
জারুল আর চিকু একসঙ্গে জোরে হেসে উঠল।
চিকু বলল, তুমি ঝাঁঝির প্রেমে পড়েছ মনে হচ্ছে।
গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে গামহার বলল, ঠিক প্রেম নয়। Artist’s Interest। ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। তা ছাড়া প্রেমে পড়লেই বা কী? প্রেম কি দোষের? একেবারেই দোষের নয়।
—আমার তো মনে হয় প্রেম একটা আঙ্গিক যা, নইলে ব্রহ্মা জগন্নাথ হতেন। তা ছাড়া, গামাদা তোমাকে বলি, হারিত, প্রেম যে, কাকে বলে, তা আদৌ বোঝে না। ঝাঁঝি মেয়েটা ভীষণ-ই লাভ-সিক। সর্বার্থে। Artist’s Material হিসেবে আইডিয়াল।
বলেই, হাসল চিকু।
—হারিত বুঝি ভীষণ আনরোমান্টিক? জানি না, সব অ্যাকাউন্ট্যান্টরাই কি এমন হন?
—বা:। তা হবে কেন? বেরসিক সব প্রফেশনেই থাকে। অধ্যাপক, গায়ক, এঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার। জেনারালাইজ করা যায় না কখনোই অমন করে।
—তুমি যদি আধমরা হয়ে থাকো তো, ঝাঁঝির গান শুনলে যে, একেবারেই মরবে। মরে ভূত হয়ে যাবে। বাঁচার কোনো পথ-ই থাকবে না।
জারুল বলল।
—মরতে দুঃখ নেই। যদি তেমন মরণ হয়।
ক-টা হল, রাত এখন? দেখো তো তোমার ঘড়িটা।
চিকু জিজ্ঞেস করল জারুলকে।
—দুটো। ঠিক দুটো।
—বা:। ভাবতেই ভালো লাগছে। বহুবছর বাদে এমন সারারাত গাড়ি চালিয়ে কোথাও চলেছি। আগে তো রাতেই বেরোতাম খাওয়া-দাওয়া করে। এখন ল অ্যাণ্ড অর্ডার সিচুয়েশন যা।
—ওড়িশা কিন্তু সেফ।
—তাই?
আমরা সাড়ে-চারটে পাঁচটা নাগাদ যোশীপুরে পৌঁছে যাব। যদি চা খেতে চাও গামহারদা, তবেই যোশীপুরে যাব নইলে আগেই আমরা ঢুকে যাব জঙ্গলে বাঁ-দিকের পথ দিয়ে।
বলল, জারুল।
—বা:! যোশীপুরে তো যেতে হবেই ফরেস্ট অফিসে। পাস নিতে হবে না? আমাদের রিজার্ভেশন তো ফোনে করা আছে। সেখানে কোনো গন্ডগোল হলেই কেলো।
—ও তাই তো! ভালোই হল তাহলে। গরম গরম চা-শিঙাড়া খেয়েই যাওয়া যাবে চাহালাতে।
গাড়ি চলেছে মসৃণ চওড়া পথ বেয়ে পাহাড়-বনের মাঝের চন্দ্রালোকিত রাতে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো বন-অনভিজ্ঞ গামহার চেয়ে আছে বাইরে। গাড়ির ড্যাশবোর্ডের প্যানেলের বহুরঙা নরম আলোগুলিকে যেন, দূরের আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র বলে মনে হচ্ছে। কেউই কোনো কথা বলছে না। সবাই অনেকক্ষণ চুপচাপ। অনেকক্ষণ। যে-যার ভাবনায় মগ্ন।
প্রত্যেক মানুষ-ই সামাজিক বেষ্টনীর মধ্যে থেকেও যে আলাদা, একেবারেই আলাদা তা বোঝা যায় মানুষ যখন একা থাকে, একা ভাবে।
ভাবছিল গামহার। স্বামী-স্ত্রী, লিভ-টুগেদারের পার্টনার, প্রেমিক-প্রেমিকা, বাবা-ছেলে, মা-মেয়ে, ভাই-বোন সকলের সঙ্গে সকলের যোগসূত্র একটা থাকলেও, তারা প্রত্যেকেই মূলত আলাদা আলাদা মানুষ। তাদের এই একলা থাকা, একলা ভাবা যতদিন থাকবে, মানুষের মনুষ্যত্বও ততদিন-ই থাকবে। জারুল যেমন বলেছিল, একজনের ভাবনা অন্যে দেখতে পেলে বেশ হত, তা কোনোদিন-ই সম্ভব হবে না। ভাগ্যিস হবে না।
দীর্ঘ নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে চিকু বলল, তোমরা এমন চুপ মেরে গেলে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে যাবে যে। এই শেষ-রাতটাই বিপজ্জনক। নাও জারুল এবার একটা গান শোনাও তো। মৃণাল চক্রবর্তীর একটা গান গাও।
—গামহারদার সামনে গান গাইতে ভয় করে। ভোর হয়ে আসছে, একটা ভৈরবী ধরো-না গামহারদা, বড়ে গুলাম আলি খাঁ নয়তো ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের।
—ভোর এখনও হয়নি।
—তুমি কেমন গাইয়ে? গান গেয়ে মিয়া তানসেন আগুন জ্বালাতেন, বৃষ্টি নামাতেন, বৈজু বাওয়ারা পাথরের মূর্তির চোখে জল আনতেন আর তুমি সূর্য ওঠাতে পারবে না?
—আমি তো আর পরশুরামের থুরি, সত্যজিৎ রায়-এর ‘পরশ পাথর’-এর সাধু নই যে, ‘ওঠ ওঠ’ বলব আর সূর্য লাফিয়ে লাফিয়ে উঠবে।
তারপর বলল, সকালের রাগের মধ্যে কী রাগ ভালো লাগে তোমার?
—ভালো গাইলে, সকালের সব রাগ-ই ভালো লাগে। ভীমসেন যোশীজি অথবা রশিদ খাঁর মতো যদি কেউ গায় তো চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে যায়। অজয় চক্রবর্তীর মেয়ে কৌশিকীর গান শুনেছেন আপনি গামহারদা?
—শুনেছি। ভারি মিষ্টি মেয়ে। একদিন ভারতের একনম্বর গাইয়ে হতে পারে। ওর বাবাই ওর ভরসা এবং ওর বাবাই ওর বিপদও বটে। মেয়েকে প্রকৃত ক্ল্যাসিকাল আর্টিস্ট করে তুলতে হলে অজয়বাবুর উচিত, ওকে তাঁর নিজের সবরকম প্রভাবমুক্ত করা। আমার মতে, অজয়বাবুর ওপরেও ঈশ্বরের অনেক আশীর্বাদ ছিল কিন্তু তিনি হয়তো সস্তা খ্যাতি আর অর্থের জন্যে দলেবলে নিজেকে বাণিজ্যিক করে ফেলেছেন। জানি না, আমার ভুলও হতে পারে। খাঁটি উচ্চাঙ্গ সংগীত গাইয়ে আর মায়ের মন্দিরের পূজারিতে কোনো তফাত থাকলে তো চলবে না। পবিত্রতা, সততা, ঋজুতা এবং একনিষ্ঠ পূজারির পুজোতেই দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়।
জারুল বলল।
গামহার বলল, আমার কিন্তু তা মনে হয় না। সব উচ্চাঙ্গ সংগীত গাইয়ে কি সবরকম গান গাইতে পারেন? অজয়বাবু পারেন। আমার তো এটাকে দোষ মনে হয় না, গুণ-ই মনে হয়।
তারপর একটু থেমে গামহার বলল, তা সকালের কোন রাগ তোমার সবচেয়ে ভালো লাগে তা তো বললে না জারুল।
—ললিত, যোগিয়া, কুকুভ-বিলাওল, বিভাস, দেশকার ভালো লাগে সব-ই।
তারপর-ই জারুল চিকুকে বলল, গাড়িটা একটু দেখেশুনে থামাবে।
—কেন?
—থামাও না।
—আরে কেন তা বলবে তো? গাড়ির বনেটে বসে গান গাইবে?
—আরে না।
—শুশু করবে?
—আঃ ভারি অসভ্য তুমি।
—ইশ কী অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স। কোথায় হচ্ছিল ললিত আর যোগিয়ার কথা তারমধ্যে শুশু।
তারপর বলল, দাঁড়াও। সামনে দাঁড় করাচ্ছি। চড়াইটা উঠে। এখানে জঙ্গল বেশ গভীর। তোমাকে ডাকাতে ধরে নিয়ে গেলে? বিয়ে-করা বউ তো নও। ঝামেলার একশেষ হবে।
—তা ঠিক।
গামহার বলল।
—বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, ডাকাতে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।
—আর পুলিশ ছুঁলে বাহাত্তর ঘা।
চিকু বলল।
—ওড়িশার পুলিশও কি আমাদের পশ্চিমবাংলার পুলিশের মতো ভালো?
—পশ্চিমবাংলো নয়, বলো ‘বাংলা’।
—ওই হল!
—পুলিশ হচ্ছে ঘোড়ার পুরীষ। ক্ষততে লেগেছে কী ধনুষ্টংকার।
—পিনাকেতে লাগে টঙ্কার। অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলাতে শুনেছ?
গামহার বলল।
চিকু বলল, অশোকদা ভারিভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু গলাটা টাল-খাওয়া চাকার মতো দুলত অনেক সময়ে তাই না?
ওরা সকলেই হেসে উঠল চিকুর কথাতে।
গামহার বলল, পুলিশের কোনো রকম-ফের নেই। পুলিশ হচ্ছে অর্শর যন্ত্রণা। সব দেশেই, সব প্রদেশেই একইরকম।
—আমাদের ভয় কী? তুমি তো ওড়িয়া বলতে পারো।
—টিক্কে টিক্কে কহু পারুচি। এব্বে প্র্যাকটিস ছাড়ি গল্বা।
চিকু হেসে বলল, কেন যে, সেই সুন্দরী ওড়িয়া মহিলার সঙ্গে প্রেমটা চালিয়ে গেল না বল তো? তাহলে তো প্র্যাকটিস ছাড়ত না!
আমার ওই প্রেম নিয়ে ঠাট্টা কোরো না। বড়ো পবিত্র ছিল সে-প্রেম। পুরো ওড়িশা আর ওড়িশাবাসীই আমার চোখে এক বিশেষ স্থানে বসে আছে শুধু ওর-ই জন্যে।
—নাও। নামো এবারে। পাহারাদার লাগবে?
গাড়ি থামিয়ে, চিকু বলল, জারুলকে।
—না।
বিরক্ত হয়ে বলল জারুল।
—তবু একজনের নামা উচিত।
গামহার বলল।
—চলো, দু-জনেই নামি। মুক্ত বায়ুতে সিগারেট খাই একটা। তুমি খাবে নাকি?
—দাও। বিনা পয়সাতে দাদের মলম পেলেও খেতে বলেছিল আমার গুরু।
হেসে উঠল, চিকু।
জারুল, পথের ডান দিকের ঢালুতে বড়ো বড়ো গাছ আর ঝোপ যেখানে সেখানে নেমে গেল। পুবের আকাশ সাদা হতে আরম্ভ করেছে। সাদা ঠিক নয়, সাদার আভাস লেগেছে সবে আর পশ্চিমাকাশে অস্তগামী চাঁদের হালকা রুপোর জল লাগিয়েছে। এখানে জঙ্গল নেই তেমন।
সিগারেট শেষ হতে হতে জারুল ফিরে এল।
বলল, ম্যাগো! ভয়ে প্রায় মরেই গেছিলাম।
—কেন?
—একটা কুমির!
—ডাঙায় কুমির?
—হ্যাঁ। তবে ছোটো।
গামহার ডাঙায় কুমির শুনে বিভ্রান্ত হয়ে গেছিল।
—গো-সাপ হবে। কোথায় ছিল?
চিকু বলল।
—কোথায় আবার? ঠিক আমার সামনেই?
—ব্যাটা জাতে নিশ্চয়ই পুরুষ।
চিকু বলল।
সবাই একটুক্ষণ চুপ।
গামহার বলল, সেই মিয়া-বিবির কী হল বলত? তুমি তো এমন কিছু জোরেও চালাচ্ছিলে না, রাস্তায় মাঝেমধ্যে দু-একটা ট্রাক ছাড়া কোনো ট্রাফিকও নেই, অথচ তাদের এখনও পাত্তা নেই কেন?
এসে যাবে।
নিরুদবেগ গলাতে বলল চিকু।
জারুল বলল, দাঁড়ালাম-ই যখন, তখন আরও মিনিট দশেক দেখে নিয়েই এগোনো ভালো। কী বলো? গাড়ি খারাপ হল না তো?
—মারুতি-এস্টিম। মাস দুয়েক হল নিয়েছে। খারাপ হবে কী? তবু ভোর তো হয়েই গেল। চলো একটু মর্নিং-ওয়াক করে নিই।
—তার চেয়ে একটা গান শোনাও তুমি গামহারদা।
গামহার ধরে দিল ভীষ্মদেব-এর গাওয়া বিখ্যাত গানটি, রামকেলিতে, ‘জাগো, আলোক লগনে..’
গান শেষ হলে জারুল বলল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল গো! সত্যি বলছি গামহারদা। তোমার গলাতে সুর-লয় তো আছেই, এমন ভাব আছে না! তুমি গায়ক হলেই ভালো করতে।
—কোনো গুণকেই পেশা করে ফেললেই সরস্বতী চটে যান। সরস্বতী ভাঙিয়ে লক্ষ্মীর আরাধনা কি সহ্য হয়?
—সেকথা হয়তো ঠিক। লেখাই বলো, গান-ই বলো, ছবি আঁকাই বলো, পেশা করে ফেললেই তাতে আনন্দ অনেক-ই কমে যায় হয়তো। যাঁরা সে-লেখা পড়েন, গান শোনেন বা ছবি দেখেন তাঁদেরও আনন্দ সম্ভবত ক্রমশই কমে আসতে থাকে। অথচ আনন্দই সব ‘সৃষ্টি’র উৎস এবং গন্তব্য। পেশাদার হয়ে যাওয়ার পরও সৃষ্টিকে একঘেয়েমি থেকে বাঁচিয়ে রাখা ভারি কঠিন। বড়ো কম মানুষেই তা পারেন।
—ছবিকে তো বেসাতি করেইছি। গানটা না-হয় আমার নিজস্ব গোপন ধন হয়েই থাকল।
—কথাটা ভাববার বটে।
চিকু বলল, কুড়ি মিনিটেরও বেশি হয়ে গেছে। এবার চিন্তাতে পড়া গেল। মিয়া-বিবি পথের পাশে গাড়ি লাগিয়ে ঘুম লাগাল না তো? চলো গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে দেখতে যেতে হবে।
পুবের আকাশে সাদা ছোপ লাগলেও পাহাড় থাকাতে এবং ঘন জঙ্গল থাকাতে হেডলাইট জ্বেলেই চলতে লাগল চিকু। ছায়াচ্ছন্ন পথের ওপরে অন্ধকার-ই আছে এখনও। গাড়ি চলেছে তো চলেছেই।
এবারে চিন্তা হতে লাগল ওদের সকলের-ই।
বাংরিপোসিতে ওরা রাতে থেকে গেল না তো কোনো হোটেল-টোটেলে?
—বা: তা কী করে হবে?
—বিসোই-এর ঘাটে পুজো দিল না? সে জায়গা তো বাংরিপোসি পেরিয়ে এসে।
—বা: ওরা কোথায় ছিল? আমরা তো আগেই পুজো দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
—তাহলে হতেও পারে।
জারুল বলল।
—ছাড়ো তো। পরস্ত্রী হলেও না হয় বোঝা যেত। নয়তো প্রেমিকা। বিয়ের পাঁচ বছর পরেও অত রস থাকে না কারও যে, হঠাৎ করে পথ-পাশের হোটেলে রাত কাটাতে যাবে।
—তোমার মতো আনরোমান্টিক তো সকলে নাও হতে পারে।
—হারিত ঘোষ আমার চেয়ে অনেক বেশি আনরোমান্টিক। ব্যালান্সশিট মিলিয়ে মিলিয়ে রস-কষ বলতে, ওর আর নেই কিছুমাত্রই।
ওরা প্রায় পাঁচ-সাত কিমি মতো চলে এসেছে এমন সময়ে চিকু বলল, সর্বনাশ।
—কী?
জারুল আর গামহার সমস্বরে বলে উঠল।
—ভিড়িয়েছে।
চিকু বলল।
চিকরাসির গাড়ির হেডলাইটে পথের ডান দিকে তালগোল পাকানো কাচের গুড়োতে মাখামাখি একটা সাদা পিন্ড দেখা গেল খুব মোটা একটা গাছের সামনে।
—গাছের সঙ্গে ভিড়িয়েছে।
আবার স্বগতোক্তি করল চিকু।
চিকু গাড়িটা ডান দিকে করে এগিয়ে নিতে নিতে আবারও স্বগতোক্তি করল, দু-জনেই শেষ!
—কী বলছ?
বলেই, ডুকরে কেঁদে উঠল জারুল।
বাঁ-দিকের বুকে খুব কষ্ট হতে লাগল গামহারের। ভাবল, ছবিটা আঁকবে ভেবেছিল মনোমতো করে, আঁকা হল না আর। ওর কপালটাই এরকম।
চিকু গাড়ি দাঁড় করিয়ে নামল, ওরা দু-জনেও নামল। পরক্ষণেই ভূত দেখার মতো দেখল, সেই পিন্ড থেকে হারিত আর ঝাঁঝি বেরিয়ে আসছে। বেরিয়ে, আশ্চর্য! নিজেদের পায়ে ভর দিয়েই দাঁড়াল। তবে দু-জনেরই সর্বাঙ্গ কাচের গুঁড়ো আর রক্তর ফোঁটা।
গামহার দেখল ঝাঁঝির ঝাঁঝি-রঙা শিফনের শাড়িটার মধ্যে আর তার ছোটোহাতার গাঢ় সবুজ ব্লাউজে লাল রক্তর হাজারো বিন্দু ফুটে উঠে একটা দারুণ ডিজাইন-এর সৃষ্টি করেছে।
ওরা দু-জনে বেঁচে আছে দেখে ওরা তিনজন-ই একইসঙ্গে বিভিন্নরকম অভিব্যক্তি করল, যা আলাদা করে বোঝা গেল না কিন্তু একইসঙ্গে শোনা গেল।
—গাছের সঙ্গে মারলে, তো গাড়িটার মুখ রাইট অ্যাঙ্গেলে ঘুরে গেল কেমন করে?
চিকু জিজ্ঞেস করল হারিতকে।
—গাছের সঙ্গে নয়।
যেন ঘোরের মধ্যে বলল হারিত।
—তো?
—ট্রাকের সঙ্গে।
—ট্রাকের সঙ্গে? মুখোমুখি?
—হুঁ। তবে সে ব্যাটা ট্রাক-ড্রাইভার আমাকে বাঁচাবার অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কী করব। দু-জনেই তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অথচ দু-মিনিট আগেই গল্প করছিলাম।
—আনথিংকেবল। তোমরা বেঁচে আছ কী করে, তাই তো মাথাতে আসছে না।
গামহার বলল।
ঝাঁঝি শব্দ না করে, হেসে বলল, কপালে আরও অনেক দুঃখ আছে, হয়তো তাই।
আশ্চর্য মেয়ে বটে! অন্য যেকোনো মেয়ে হলে হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠত। সহানুভূতি আর কলের চাবি একইরকম মেয়েদের কাছে। চাবি খুললেই জল ঝরতে থাকবে। এমন শক্ত মেয়ে দেখেনি কখনো।
গামহার ভাবছিল।
ও তড়িঘড়ি করে বলল, কে বলতে পারে! কপালে সুখও থাকতে পারে অনেক!
চিকু বলল, একঘুঁট হুইস্কি খেয়ে নাও দু-জনেই। যা শক পেয়েছ। আর সারাশরীরে হুইস্কি ঘষে নাও। তারপর বলল, কতক্ষণ হয়েছে?
সকাল চারটে কুড়িতে।
—এই গাড়ি দেখলে কেউই কি বিশ্বাস করবে যে, সামনের সিটে-বসা দুই যাত্রীই বেঁচে আছে?
—তা করবে না। তবে মারুতি কোম্পানির গাড়ির বিশেষত্ব আছে বলতে হবে।
—ধাক্কা লাগার সঙ্গে সঙ্গে স্টিয়ারিংটা আমার বুকে না লেগে ওপরে উঠে গেছিল।
জারুল বলল, প্লাস্টিকের গাড়ি বলে ঠাট্টা করেন অনেকে কিন্তু এ যদি বিড়লার অ্যাম্বাসাডার বা মাহিন্দ্রার জিপ হত মার্সিডিজ ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা লাগার ইমপ্যাক্টে কী অবস্থা হত বলো তো। স্পট-ডেড হত দু-জনেই।
—রাখে কেষ্ট মারে কে?
হারিত বলল।
মস্ত গাছটার বিরাট পরিধির কালচে-খয়েরি গুঁড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঝাঁঝি। রাত্রি জাগরণে ক্লান্ত, মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ায় ভীত এবং সারাশরীর ও মুখ কাচের গুড়ো লেগে রক্তাক্ত হওয়া বিভ্রান্ত ঝাঁঝির দিকে তাকাল গামহার। খুব ইচ্ছে হল ওকে একটা চুমু খায়। অথবা ওর সমস্ত ক-টি ক্ষতস্থানে জিভ দিয়ে চেটে রক্তবিন্দুগুলি পরিষ্কার করে দেয়। ওকে বুকে নিয়ে একটু আশ্বস্ত করে। গামহার যদি মানুষ না হয়ে কোনো চতুষ্পদ প্রাণী হত, তবে তো জিভ দিয়ে চেটে-চেটেই শুশ্রূষা করত। প্রথমত ও প্রাণী নয় মানুষ, দ্বিতীয়ত সমাজের মতে ঝাঁঝি তার কেউই নয়। তাই অনাত্মীয়া নারীশরীরে তার হাত ছোঁয়ানোও মানা। হারিত তার স্বামী। ঝাঁঝির শুশ্রূষা করতে পারত সে-ই কিন্তু তালগোল-পাকানো গাড়ির পেছন থেকে বাকার্ডি রাম-এর বোতল খুলে, সে তখন সোজা গলায় ঢেলে বল সঞ্চয় করছিল।
হঠাৎ-ই গামহারের মনে পড়ে গেল, পরশু কোনো কাগজে একটি বিজ্ঞাপন দেখেছিল ‘যারা দুর্বল তারাই মদ্যপান করে’। কথাটা হয়তো সত্যি। হারিতের মুখে মদ আর ঝাঁঝির মুখে হাসি। কী সুন্দর বিধুর হাসি। সে হাসি, যে হাসে তাকে যত না আনন্দ দেয়, তার চেয়ে অনেক-ই বেশি আনন্দ দেয়, যে সেই হাসি দেখে, তাকে।
লেগেছে খুউব? ঝাঁঝির কাছে গিয়ে বলল, গামহার। কাল বিকেলের পর এই প্রথম সরাসরি কথা বলল গামহার ঝাঁঝির সঙ্গে।
—না তো। লাগেনি।
—চা খাবে?
—কোথায় পাব?
—নিয়ে আসছি যোশীপুর থেকে বোতলে করে।
বলবার সময়ে ভুলে গেল যে, সে পরনির্ভর এবং যোশীপুর ছ-সাত কিমি দূরে কম করে।
চিকু শুনে বলল, উলটোটাই করছি। তুমি বরং এখানে থেকে গাড়িটা পাহারা দাও গামহারদা। গাড়িটা টেনে যোশীপুরে নিয়ে যাবার বন্দোবস্ত করতে হবে। কিন্তু সামনেটার যা অবস্থা, সামনের দুটো টায়ার-ই গেছে। টেনেও তো নিয়ে যাওয়া যাবে না। কোনো ট্রাকে করে কলকাতাতে পাঠাবার বন্দোবস্ত করতে হবে। নবেন্দুকে গিয়েই এস টি ডি করতে হবে, ও যেন ওর ফিয়াট উনো নিয়ে এখুনি রওনা হয়ে চলে আসে। তা নইলে আমার মারুতি জেন-এ তো মালপত্র নিয়ে পাঁচজন মিলে যাওয়া যাবে না।
জারুল বলল, তুমি কি পাগল? এরপরও জঙ্গলে যাবে! এবারে বাদ দাও, বাধা যখন পড়েছে।
চিকু বলল, বাধা পড়েছে বলেই তো জেদ চেপে গেছে আমার। জঙ্গলে যেতেই হবে। গামহারদাকে জঙ্গল দেখাব বলেছি!
গামহার বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ যাব।
ঝাঁঝিও বলল, বাধা পড়েছে তো কী হয়েছে? আমাদের বেঁচে যাওয়াটাও সেলিব্রেট করতে হবে না জঙ্গলে গিয়ে? মানুষের তো একটাই মাত্রজীবন।
গামহারের এত বয়স হলেও ও যেন ভুলেই গেছিল যে, মানুষের একটামাত্র জীবন। সেও বিড়বিড় করে বলে উঠল, একটামাত্র জীবন। মাত্র একটা! ঝাঁঝির সঙ্গে ক-টা দিন জঙ্গলে কাটাবার জন্য, কর্বুর মার্বল বা ঘুড়ি পাওয়ার জন্যে শিশুর যা আকুতি তেমন-ই আকুতি বোধ করল গতযৌবন গামহার। শিশু হয়ে গেল।
—ইনশিয়োরেন্স-এজেন্ট-এর ফোন নাম্বার জানা আছে কি হারিত?
চিকু আবারও জিজ্ঞেস করল।
—কীসের জন্যে ফোন করবে এজেন্টকে?
জারুল বলল।
—বা: ইনশিয়োরেন্স কোম্পানি তা নইলে থোড়াই ক্লেইম দেবে। থানাতেও ডাইরি করতে হবে একটা।
—কী আছে আর গাড়ির? এ তো টোটাল লস।
হারিত হতাশ গলায় বলল।
—সে-জন্যেই তো আরও করা দরকার।
গামহার বলল, আরে গাড়ি গেছে আবার নতুন গাড়ি আসবে। প্রাণ গেলে কি প্রাণ আসত? তুমি তো বড়ো কৃপণ আছ হে হারিত।
চিকু মনে মনে একটু খুশিই হল। সন্দেহ নেই হারিত বেশ কৃপণ। অথচ কৃপণ হওয়া উচিত ছিল না।
গামহার-এর দিকে তাকিয়ে এবার চিকু বলল, পুলিশে ছুঁলে বাহাত্তর ঘা। তুমিই বলেছ গামহারদা। আর আমাদের মধ্যে তুমিই একমাত্র ওড়িয়া জানো। সামলাও এবারে। ছোটো জায়গার থানার বাবুরা তো তেমন ইংরেজি জানবেন না।
—তাহলে? আমি কি যাব?
গামহার বলল।
—দাঁড়াও না। পর্বত-ই মহম্মদের কাছে আসবে। আমি আহতদের আর জারুলকে নিয়ে যোশীপুরে গিয়ে ওইসব কাজ করছি। প্রাথমিক। ওদের তো ফার্স্ট-এইডও দিতে হবে। মেয়েদের একটু বাথরুম-টাথরুমেও যেতে হবে। ফেরবার সময়ে তোমার জন্যে বোতলে করে চা নিয়ে আসব। আর যদি বেশি ঘাবড়ে গিয়ে থাকো তো হুইস্কির বোতল রেখে যাচ্ছি। দু-চুমুক মেরে দাও। সর্বরোগহারী নিজৌষধি।
গামহার বলল, না, না। খালি পেটে হুইস্কি?
—তাতে কী? নাইনটি পার্সেন্ট কবিরাজি বা বায়োকেমিক ওষুধ তো খালি পেটেই খেতে হয়।
গররাজি গামহার বলল, না। তোমরা এগোও। সিগারেট আছে কি?
—আছে। তোমাকে কখনো সিগারেট খেতে তো দেখিনি।
—এমন বিপদেও তো কখনোই পড়িনি।
—তাই? নাও একটা প্যাকেট রাখো। আমি এগোলাম।
বলে, ওর গাড়িতে এ গাড়ির যতখানি লাগেজ আঁটে, ততটুকু নিয়ে চিকু চলে গেল। তবু অনেক মাল-ই রয়ে গেল।
হারিত কথা বলছিল না। স্তম্ভিত হয়ে গেছিল সে। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে তফাত যে, বড়ো সামান্যই —এই কথাটাই বোধ হয়, সে আস্তে আস্তে হৃদয়ংগম করে একেবারে নীরব হয়ে গেছিল। এতক্ষণ ভয় পায়নি। কিন্তু এখন তার হাত, পা থরথর করে কাঁপতে লাগল।
গামহার ভাবছিল, ভাগ্যিস ওদের ছেলে-মেয়ে নেই। বাবা-মা একসঙ্গে চলে গেলে, সেই শিশুদের কী হত?
ওরা চলে গেলে, গামহার গাড়িটার পেছনের অংশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে অনভ্যস্ত হাতে একটা সিগারেট ধরাল। এবং ধরিয়েই খুক খুক করে কাশতে লাগল। এমন সময়ে জঙ্গলের মধ্যে থেকে যেন, জঙ্গল ফুঁড়েই একটা-দুটো করে মানুষ, অধিকাংশই ছোটো ছেলে-মেয়ে গাড়ির কাছে এগিয়ে আসতে লাগল আর অনর্গল প্রশ্নবাণে তাকে জর্জরিত করতে লাগল। গামহারও যথাসাধ্য তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতে লাগল।
—সব্বে মরিলা কি বাবু?
—নাই ম।
—কেত্তেজন থ্বিলা?
—দ্বিজন।
—আপনি থ্বিলে কি?
—নাহি। মু অন্য গাড়িরে থিলা।
—আপনংকু চোট লাগিলা কি?
—নাহি।
—কেমিতি এমিতি হেলা?
—নিন্দ লাগিকি আঁখি বন্ধ হই যাই থিলা।
এই বাক্যটা লাগসই হল না ইশশ কুমুদিনী! তুমি এতবছর পরে, আমাকে এমন করে কষ্ট দেবে কে জানত! মনে মনে নিরুচ্চারে বলল, গামহার।
—সেমানে কুয়াড়ে পলাইলে আপনঙ্কু ছাড়িকি?
—পুলিশ আসিথিলা কি?
—নাহি।
উত্তর দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেল গামহার। ভাবল, একদিক দিয়ে ভালোই হল, তার চর্চা চলে-যাওয়া ওড়িয়াটা বাধ্য হয়েই চালু করতে হল। পুলিশের সঙ্গে কথোপকথনে কাজে লাগবে।
—ই গাছ্বটা কওন গাছ্বরে পিলা?
একটি ছোট্টছেলেকে জিজ্ঞেস করল গামহার।
—সেটা গুট্টে গাছ্ব বাবু।
বিরক্ত হয়ে গামহার বলল, সে তো সব্বমানে জানিচি। তাঙ্কু নাম্বটা কন?
—সে মু জানিনান্তি। কহি পারিবুনি।
তার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটি বলল, তু জানিনান্তি? সে গাছ্বটা কদ্দম গাছ্ব বাবু। সে বহুত বুড়া গাছ্বটা।
—কদ্দম গাছ্ব?
হাসি পেয়ে গেল গামহার-এর। কদমতলাতে রাধা-কৃষ্ণর তো একইসঙ্গে থাকার কথা। সে এখন পান্ডব-বর্জিত জঙ্গলের কদমতলাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাধার শাড়ি-জামা-আণ্ডি-ব্র্যাসিয়ার ভরতি স্যুটকেসটি পাহারা দিচ্ছে। আর রাধা তার নোটারি-পাবলিক-এর অথেনটিকেটেড কৃষ্ণর সঙ্গে গরম গরম চা খাচ্ছে যোশীপুরে। যার কপালের যেমন লিখন। এর-ই জন্যে বেঁটে-কাকিমা চিরদিন বলে এলেন, ‘কপালে গোপাল করে’।
এখন চারদিকে রোদ ঝকঝক করছে। অনেকক্ষণ ধরে হব-হব করে, সকাল সত্যিই হয়েছে। বসন্তর রোদ। এখনও বসন্তর রেশ আছে। কতরকমের গাছ চারদিকে। নাম জানে না ও। ঘাসে ছাওয়া মাঠ। ক্লোরোফিল-উজ্জ্বল ঝকঝকে সবুজ পাতা। সবুজ আর লাল টিয়াপাখির ঝাঁক ‘ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ’ করতে করতে উড়ে গেল হাওয়াতে চাবুক মেরে। কোনো জবরদস্ত পুরুষগায়কের দিল-ধড়কান অচানক হলক তানের-ই মতো।
যেখানে ঘাস নেই, জমি উদোম, সেখানে জমির রং লাল। ছেলেবেলাতে হাজারিবাগে যেমন দেখেছিল বলে মনে আছে। বিহার, ওড়িশার চেহারাতে বোধ হয় বিশেষ তফাত নেই। ওড়িশাতেও দেখছে বিহারের মতোই পাহাড় আছে। তবে, ওড়িশা সম্ভবত বিহারের চেয়ে বেশি সবুজ। তা ছাড়া, ওড়িশাতে সমুদ্র আছে অনেক-ই জায়গাতে। বিহারে সমুদ্র নেই।
হারিতের গাড়িটা রাস্তার এককোণে এই কদমগাছতলাতে সমকোণে যেদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, সেদিকেই পথের অদূরেই একটি পাহাড় উঠেছে। ছোটো পাহাড়। পাহাড়ের পর পাহাড়। তারপরে আরও পাহাড়। সমুদ্রের ঢেউয়ের-ই মতো। সমুদ্রের ঢেউ নীল, আর সাদা পাহাড়ের ঢেউ সবুজ আর লাল আর হলুদ আর কালো। ভারি সুন্দর মিষ্টি একটা গন্ধ ভাসছে হাওয়াতে। পাহাড়ের উলটোদিকের ফাঁকা লাল প্রান্তরের মধ্যে ছোটো ছোটো গাছ ছড়ানো। এগুলো কি শাল? কে জানে! জারুল আর চিকু থাকলে বলতে পারত। সেই প্রান্তরের মধ্যে একটা প্রকান্ড বড়ো প্রাচীন গাছ। এদের-ই বোধ হয় মহিরুহ বলে। তার নীচে ছোটো-বড়ো মেয়েরা ভিড় করে কী যেন কুড়োচ্ছে। হাওয়াটা এদিক দিয়েই আসছে। কোনো ফুল কুড়োচ্ছে কি ওরা? নাকি ফল?
—সে বড্ড গাছ্বটার নাম কন?
—সেট্টা মহুয়াটা না! আউ কন?
—সে গাছতল্বে সে ঝিওমানে কন করিছন্তি?
—মহুল ফুল, নুচিকি নেউচি, আউ কন? সে গাছ্ব মালিক আসি পড়িবে আটটা বেলে। নুচিকি নেইকি পলাইবে সেমানে।
—মানে, মহুয়ার ফুল লুকিয়ে লুকিয়ে কুড়িয়ে নিচ্ছে। সেই গাছের যে-মালিক, সে আটটার সময়ে এসে যাবে তাই এত তাড়া ওদের।
—তাই?
—তাই তো।
বেলা বাড়তেই ছেলে-মেয়ে ও বয়স্করা নিজের নিজের কাজে চলে গেল। একটা যাত্রী-বোঝাই বাস চলে গেল বাংরিপোসির দিকে। দু-একটা টেম্পো, ট্রেকার ও ট্রাকও দেখা যেতে লাগল। সবাই গাড়িটাকে দেখে হায়! হায়! করতে লাগল। হাওয়াতে উড়ে আসতে লাগল তাদের সখেদ মন্তব্য: জনে বাঁচিলানি। সব্বে মরিলা।
সহযাত্রী বলল, হউ! তম্মে ত সব্ব জানুচি!
প্রায় দেড়ঘণ্টা হতে চলল। কিছুই করার নেই। গামহার গাছতলাতে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। তারপর ছবিটা আবার আঁকতে শুরু করল মনে মনে। কল্পনাতে ওই রোদ-ঝলমল দিনের মধ্যেই সবজে-হলদে শিফন শাড়ি পরা ঝাঁঝিকে জামা-কাপড় এক এক করে খুলিয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন করল। তারপর মনে মনে আঁকতে লাগল। যতবার আঁকল, মুছল তার চেয়ে বেশি। চোখ, চিবুক, চুল সব-ই মিলল কিন্তু মেলাতে পারল না শুধু মনের ভাবটুকুকে। এই তো কিছুক্ষণ আগেই এই কদমতলাতে ঝাঁঝি দাঁড়িয়েছিল। এরইমধ্যে ভাবটি চুরি হয়ে গেছে। এই সুন্দর পৃথিবীতে অনেক-ই সুন্দর জিনিস আছে বিধাতার সৃষ্ট, যাতে মানুষের তৈরি কোনো তালা-চাবিই লাগে না। তা তার নিজ-খেয়ালে রইলে থাকে, না রইলে থাকে না।
গামহার-এর মনে মনে আঁকা ছবির ক্যানভাসটা ছিঁড়ে-খুঁড়ে দিয়ে, ভটভটানি শব্দ তুলে একটি বড়ো মোটরসাইকেলে একজন খাকি পোশাকের লোক এসে গাড়ির সামনে নামল। তার প্রায় পেছন পেছন একটা জিপে চার-পাঁচজন পুলিশের উর্দিপরা মানুষ এসে উপস্থিত হল। যা জানত, মানে চিকুরা থানাতে যা রিপোর্ট করেছে, তাই নতুন করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গামহারের কাছ থেকে শুনল। এমন সময়ে আর. টি.-তে খবর এল সার্কল ইনস্পেক্টর এসেছেন থানাতে রাইরাংপুর থেকে। অতএব জিপটি মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। মোটরসাইকেল-বাহিত ফর্সা, গোলগাল, লম্বা, চওড়া মানুষটি বললেন, নমস্কার। মু প্রশান্ত পন্ডা। সান্ববাবু।
মানে, থানার ছোটোবাবু।
—নমস্কার আইজ্ঞাঁ।
সবিনয়ে বলল, গামহার।
থানার সান্ববাবু, অর্থাৎ ছোটোবাবু খুব ভালো করে গাড়িটাকে ঘুরে ঘুরে নিরীক্ষণ করে বললেন, এ-গাড়ি তো নিজে যেতে পারবে না, টো করেও নেওয়া যাবে না। কোনো ট্রাক ভাড়া করে সেই ট্রাকে ক্রেন-এ করে তুলে যেখানে নিয়ে যাওয়ার সেখানে নিয়ে যেতে হবে।
—তাই?
—আপনারা এসেছেন কোথা থেকে?
—কলকাতা।
—কিন্তু এ গাড়ি তো ছাড়া যাবে না।
—মানে?
—মানে অ্যাকসিডেন্টের কেস হবে। গাড়ি থানাতেই থাকবে এখন।
—কারও তো তেমন চোট লাগেনি।
—তাতে কী? গাড়ির তো লেগেছে।
—গাড়ি তো গেছে আমাদের-ই। অন্য কারও ক্ষতি তো হয়নি।
—তা নাই বা হল।
—কিন্তু কেসটা হবে কার বিরুদ্ধে? ওরা তো ট্রাক-এর নাম্বারও নিতে পারেনি। শেষরাতের অন্ধকারে নির্জন পথে ট্রাক মেরে দিয়ে অথবা বাঁচিয়ে দিয়ে চলে গেছে। ওই অবস্থাতে প্রাণ বেঁচেছে এই ঢের এখন। কে ট্রাকের নম্বর নিতে গেছে?
—সে মানঙ্কু রিলেশনটা জানিচু কি আপুনি?
—হাজব্যাণ্ড অ্যাণ্ড ওয়াইফ।
—সত্য করিকি কহন্তু।
—মু কি মিছা কহিলি?
—সে বাবু মদ্দ খাইকি চালাইথান্তি কি?
—মু কেমিতি জানিবি? মু তো অন্য গাড়ির থিলা।
—হউ। যাই হউ। নিশচয় কেস করিবাঙ্কু হেব্ব।
—কার বিরুদ্ধে কেস করবেন? ট্রাকের নাম্বার-ই তো নেই।
—আননোন-ট্রাককু এগেইনস্টে কেস্ব হেব্ব।
—হাঁ হয়ে গেল গামহার। আননোন-ট্রাকের এগেইনস্টে কেস!
ভাবছিল, যেসব অপরাধীর খুনির, চোর-ডাকাতের নাম ঠিকানাও দেওয়া হয় সেখানেও পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ তাদের ধরে এনে সাজা দিতে পারে না আর এখানের পুলিশ তাদের কাজে এতই দড় যে, আননোন-ট্রাকের বিরুদ্ধেও পুলিশ কেস দিচ্ছে। এমন উদ্ভট কথা বাপের জন্মে শোনেনি গামহার। স্তম্ভিত হয়ে সে, গৌরবর্ণ মুখটির দিকে চেয়েছিল। মুখটা দেখে কিন্তু মনে হয় মানুষটা ভাজামাছটিও উলটে খেতে জানে না অথচ ‘আননোন ট্রাক’-এর বিরুদ্ধে কেস ঠুকে দেওয়ার ‘ঐশী’ ক্ষমতা রাখে। গামহারের মনে হল, তার স্বদেশ এই ভারতবর্ষ প্রকৃতই তো শিবঠাকুরের আপন দেশ। এখানের আইনকানুন ‘পেরকিতোই’ সব্বোনেশে।
এমন সময়ে দেখা গেল চিকুর গাড়ি ফিরে আসছে। একাই এল। গাড়িটা লাগিয়ে বলল, চা খাও। বলেই, আধ-বোতল চা আর দুটো ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া কলাইডালের বড়া দিয়ে বলল, খেয়ে নাও।
গামহার বলল, ঠাণ্ডা।
—যা পাচ্ছ চাঁদমুখ করে খেয়ে নাও গামহারদা। পরে কখন খেতে পাবে তা মারাংবুরুই জানে।
তারপর বলল, তুমি তোমার প্রেমিকার ভাষাতে কথা বলে আমাদের কিছু সুরাহা করতে পারলে?
গামহার হতাশ গলায় বলল, না:। বলছেন, আননোন-ট্রাকের এগেইনস্টে কেস হবে।
—সে মানঙ্কু মেডিকেল এগজামিনেশনভি করিবা হেব্ব।
—তাদের কিছুই তো হয়নি রে বাবা।
—না হেলে, কন হেব্ব। মেডিক্যালে এগজামিনেশন নিশ্চয় করিবাংকু হেব্ব।
চিকু বলল, এ তো মহা চিত্তির। রেপ-কেস নাকি?
তারপরেই পবননন্দনবৎ প্রত্যুৎপন্নমতিত্বর সঙ্গে বাহু ধরে আকর্ষণ করে নিয়ে গিয়ে নিজের গাড়ির সামনের সিটে বসাল। ছোটোবাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট হাতে একটা কালো নোটবুক নিয়ে মোটরসাইকেলের পেছনের সিটে বসে এসেছিল। সে নোটবইটা নিয়ে চিকুর গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই ছোটোবাবু তাকে অঙ্গুলি-সংকেতে ফিরে যেতে বললেন। তার মিনিট পাঁচেক পরেই চিকু ছোটোবাবুর হাতে হাত রেখে, যেন তারা প্রেমিক-প্রেমিকা, এমন-ই ভাবে এসে বলল, যাও গামহারদা তুমি এবারে গাড়িতে গিয়ে বসে চা-টা খাও। ইশ। এই কাঁকুরে মাটিতে বসেছিলে এতক্ষণ? পেছনে কালশিটে পড়ে যাবে যে।
—কী হল?
গামহার জিজ্ঞেস করল।
—যা হওয়ার কথা ছিল, তাই হল।
—মানে?
—মানে, উনি ফিরে গিয়ে একজন পুলিশ পাঠিয়ে দিচ্ছেন এখানে গাড়ি পাহারা দেবার জন্যে। যতটুকু মালপত্র আছে এ গাড়িতে আমরা সব-ই নিয়ে যাব।
—তারপর?
—তারপর কী? নবেন্দুর সঙ্গে কলকাতায় কথা হয়ে গেছে। ও, ওর একজন ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে ব্রেক-নেক স্পিডে কলকাতা থেকে রওয়ানা দিয়ে এসে পড়ছে। এলে, ওর ড্রাইভার ট্রাকের সঙ্গে বসে গাড়িটাকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে কারখানায় দেবে।
—ট্রাকও ঠিক করে ফেলেছ? কত ভাড়া নেবে?
—ছ-হাজার।
—আর আমি? আমিও কি ট্রাকে করে ফিরে যাব গাড়ির সঙ্গে?
—সত্যিই! তোমরা এই আর্টিস্ট-টার্টিস্টরা রিয়্যাল কাছাখোলা। তোমার জন্যে এবারে জঙ্গলে আসা আর তোমাকেই ফেলে রেখে আমরা চলে যাব? ভাবলে কী করে এমন!
—ঝাঁঝি, জারুল ওরা সব কোথায়?
—জারুলদের ফরেস্ট অফিসের পথে একটা গেস্টহাউসে তুলে দিয়ে এসেছি। নবেন্দুরা এলে হারিত নবেন্দুর সঙ্গে আসবে চাহালাতে। আমরা, মানে, তুমি আর মেয়েরা, যতখানি মাল নেওয়া সম্ভব সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যাব।
—চাহালা? সেটা কোথায়?
—গেলেই দেখতে পাবে। রাতটা চাহালাতে থেকে কাল ভোরে জোরাণ্ডাতে যাব।
—‘জোরাণ্ডা’ মানে কি জোড়া আণ্ডা?
—মানে-ফানে নেই। থাকলেও, আমি জানি না।
অধৈর্য গলাতে বলল চিকু।
গামহার আবার বলল, কেস হবে না? মেডিক্যাল এগজামিনেশন? কিসসু হবে না।
ছোটোবাবু ততক্ষণে মোটরসাইকেল স্টার্ট করে ফেলে চিকুকে ‘প্রণাম স্যার’ বলে, মোটর সাইকেল ভটভটিয়ে এগিয়ে গেলেন।
—ম্যাজিকটা কী করলে?
—ম্যাজিকটা কী করব? আমি কি, পি সি সরকার? ম্যাজিক করে, অশোকচক্র ছাপমারা কাগজ। এক গচ্চা গেল, আর কী!
—একহাজার?
—ইয়েস দাদা। তুমি ওড়িয়া জেনেও কিছু করতে পারলে না। টাকার চেয়ে বড়ো উকিল, টাকার চেয়ে সর্বমান্য ভাষা এমন আর কিছুই নেই গামহারদা। ব্যাপারটা তোমার পছন্দ হোক কী নাই হোক।
—বলো কী?
হতাশ গলাতে বলল, গামহার।
ভাবল, এই নব্য পৃথিবীতে ও একেবারেই অচল হয়ে গেছে।
—আমাদের পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ তো হাইলি এডুকেটেড। ওঁরা নিশ্চয়ই এইরকম আননোন ট্রাক-এর বিরুদ্ধে কেস করতেন না?
—দ্যাখো দাদা, পুলিশের কোনো রাজ্যভেদ নেই। রক্ষকরা সর্বত্রই ভক্ষক। তাঁরাও এক-শোবার করতেন। আননোন কেন, আনসিন ট্রাক-এর বিরুদ্ধেও করতেন। আর টাকাটা নেওয়ার পরেও সম্ভবত কাজটা ঠিকমতো করতেন না। পশ্চিমবঙ্গ, থুড়ি বাংলার হ্যাংলাদের সঙ্গে অন্য সব জায়গার ক্যাংলাদের এইটুকুই তফাত। এই হচ্ছে বাঙালিদের বিশেষ ঐতিহ্য।
—বলো কী তুমি? বুদ্ধদেববাবু তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট সৎ।
—মন্ত্রী সৎ হলেই যে, সান্ত্রীদেরও সৎ হতে হবে এ-কথা কোন শাস্ত্রে লিখেছে? তোমার বয়স হয়েছে খোকাবাবু, বিদ্যে হয়নি কিসসু। দাও, সিগারেটের প্যাকেটটা দাও। দেখি, ক-টা খেলে?
—একটা।
—দু-ঘণ্টাতে একটা! তুমি একটি রিয়্যাল খোকাবাবু। সত্যি।
তারপর বলল, তোমার জন্যে ঝাঁঝি খুব-ই উদবিগ্ন। বার বার তোমার কথাই জিজ্ঞেস করছে। তুমি চা খেলে না, আমরা খেলাম স্বার্থপরের মতো, এইসব আর কী!
—তাই?
—হ্যাঁ। তবে অ্যাকসিলারেটরে আস্তে চাপ দিয়ো।
—মানে?
—মানে, হারিতের কাছে পিস্তল আছে। আর ও আর্ট-কালচার বিশেষ বোঝে না। আফটার অল, ঝাঁঝি ওর বিয়ে-করা বউ তো! ছেলের বিয়েতে দেড় হাজার লোক খাইয়েছিলেন ওর বাবা।
—ওর বাবা কী করতেন? তিনিও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট?
—না। তিনি হাওড়ার নামকরা ঢালাইওয়ালা ছিলেন। বড়ো এক্সপোর্টার।
—বিরাট প্যাণ্ডেল হয়েছিল ‘সিংহি’ প্যালেস-এ।
—কীসের জন্যে?
—আরে হারিতের বিয়ের সময়ে, থুরি বউভাতের সময়ে।
বলেই বলল, তবে আমার একটা নিজস্ব থিয়োরি আছে। সেটার জন্যেই আমি ও-পথে হাঁটিনি।
—সেটা কী?
—যার বিয়ের প্যাণ্ডেলে যত বাঁশ লাগে, সেইসব বাঁশের টোটাল বাঁশ-লেন্থ যে-পুরুষের সব্বোবাঁশ হল, তার-ই পেছনে সারাজীবন ধরে একটু একটু করে যায়।
—তুমি একটা যাচ্ছেতাই।
গামহার বলল। রীতিমতো শীৎকার তুলে।
চিকু বলল, হায় কুমুদিনী। তুমি আমার হাজার টাকা গচ্চাটা বাঁচাতে পারলে না। যাই বলো আর তাই বলো গামহারদা, তোমার ওই প্রেমটা টোটালি আনপ্রোডাকটিভ। না করতে পারলে প্রেগন্যান্ট, না বাঁচাতে পারলে আমাদের আননোন-ট্রাকের এগেইনস্টে কেস-এর হাত থেকে। দেখি, তোমার নতুন প্রেমে কতদূর এগোতে পারো।
গামহার মনে মনে বলল, ক্ষমা করে দাও, ক্ষমা করে দাও এইসব ক্রুড, ম্যাটার-অফ-ফ্যাক্ট আজকালকার ছোঁড়াদের। এরা কী বুঝবে— তোমার মতো একজন আর্টিস্টের মানসিকতা! ক্ষমা করে দাও গামহার।
চিকু, গামহার, জারুল এবং ঝাঁঝিরা রাস্তাতে একটা ধাবাতে খাওয়ার পাট চুকিয়ে যখন যোশীপুর থেকে বেরোল তার একটু পর-ই বড়োরাস্তার ওপরেই ঝড়ের গতিতে একটি বেগুনি মেটালিক রঙের ফিয়াট ‘‘উনো’’ উলটোদিক থেকে এসে জোরে ব্রেক কষে পথের ডান দিকে দাঁড়াল। একটি একগাদা-ফর্সা যুবক, লম্বা, চোখে র্যেবান-এর সানগ্লাস, ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে ডান হাতের ভঙ্গি দিয়ে কথা বলল, মুখে কিছু না বলে। ভঙ্গি বলল, ঠিকঠাক সব?
চিকু ড্রাইভিং সিট-এর কাচ নামিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ভালো আছে। বেঁচে গেছে।
নবাগন্তুকের বডি-ল্যাঙ্গোয়েজ তবু উদবেগের সঙ্গে বলল, তাই কি?
চিকু আবারও চেঁচিয়ে বলল হারিত থানাতে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। ট্রাকওয়ালাও ট্রাক নিয়ে। তোমার ড্রাইভার আর তোমরা দু-জনে ধাবায় খেয়ে নিয়ে গাড়িটাকে ক্রেন দিয়ে ট্রাকে তুলে সেই ট্রাকে ড্রাইভারকে বসিয়ে, কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়ো ট্রাককে। তারপর তোমরা দু-জন চাহালা চলে এসো। বৃন্দাবন গেটে আমি বলে যাব।
আগন্তুকের ঊর্ধ্বাঙ্গে একটি ‘মড’ জামা। হয়তো ‘উইকএণ্ডার’ থেকে কেনা। তবে জামার হাতাটা মেয়েদের মেগিয়া-স্লিপ ব্লাউজের মতো। বিশেষত্ব এই যে, হাতাটা এতই ঢোলা যে, হাত তুললে বগল দেখা যায়। মেয়েদের ওই দৃশ্য কেমন লাগে, তা বলতে পারবে না, কিন্তু গামহারের অন্য কোনো পুরুষের লোমঅলা বগল দেখতে আদৌ ইচ্ছা করে না।
নবাগন্তুকের শরীরের ভাষা দেখে মনে হল যে, সে একবার এই গাড়ির কাছে আসতে খুব-ই ইচ্ছুক। খুব-ই উদবিগ্ন দেখাচ্ছিল তাকে। সে যেন, চিকুর মুখের কথাতে ভরসা করতে পারছিল না। ঝাঁঝি যে, সত্যিই অক্ষত আছে— এই সত্য সে নিজের চোখেই দেখতে চায়।
চিকু তার উৎসাহে জল ঢেলে দিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে বলল, আমি এগোলাম। তোমরা এসো।
গাড়ির রঙিন কাচের ভেতর থেকে বাইরেটা দেখা যায় কিন্তু বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই দেখা যায় না। ওরা পেছনের কাচ নামাতে পারত। নামালেই নবাগন্তুক ঝাঁঝিকে দেখে তার তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারত। কিন্তু ডান দিকে বসা ঝাঁঝি কাচটা একটুও নামাল না। কেন? কে জানে! হয়তো গাড়ি গরম হয়ে যাবে বলে।
অথবা নবাগন্তুক গরম হয়ে যাবে বলে।
প্রথমদর্শনেই গামহার-এর মনে হল যে, নবাগন্তুক ঝাঁঝিকে ভালোবাসে। হয়তো ঝাঁঝিও তাকে ভালোবাসে। মেয়েরা যাদের ভালোবাসে, তাদের সঙ্গে বেশি দুর্ব্যবহার করে। সেই দুর্ব্যবহারে পুরুষদের ভালোবাসা আরও তীব্র হয়। এসব-ই বিধাতার চক্রান্ত।
গামহার মনে মনে নিজেকে বলল, ছবিটা নির্বিঘ্নে আঁকা যাবে না। ঝাঁঝির স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল ও। মাঝে মাঝেই গাড়ির রিয়ার-ভিউ মিরারে এক এক ঝলক দেখছিল। একা হারিত-ই যথেষ্ট ছিল পথের কাঁটা হিসেবে, এ আবার কোন উটকো আপদ এসে জুটল! ওর কপালটাই এরকম। গামহারের পাশের বাড়ির ন্যাপাদা জ্যোতিষচর্চা করেন। তিনি বলেছিলেন, একটা গাঢ় নীল-রঙা রুমাল সবসময়ে পকেটে রাখতে যখন-ই বাইরে বেরোবে। তাড়াতাড়িতে গাঢ় নীল-রঙা রুমাল জোগাড় করতে পারেনি। আগে জানত থোড়াই যে, ভাগ্যর সাহায্য এমন দরকার পড়বে। কিছুদিন হল গামহার-এর একটা ইনটিউশন হচ্ছে। ও নিজের ভাগ্য গুনতে না পারলেও জ্যোতিষীর-ই মতো মুখ দেখে বা শরীরের ভাষা দেখেই অনেক কিছু বলে দিতে পারে, যার নিরানব্বই ভাগ-ই সত্যর সঙ্গে মিলে যায়।
কখনো-কখনো আজকাল ও ভাবে ছবি আঁকা ছেড়ে দিয়ে ফেস-রিডিংকেই পেশা করবে। ঝাঁঝিকে স্টাডি করে মনে হচ্ছিল, কেসটা পাকলেও পাকতে পারে।
চিকু গাড়িটা এগোতেই গামহার চিকুকে বলল, এই তোমার নবেন্দু!
—হ্যাঁ।
—কী করে?
—ওদের মস্ত কোম্পানি।
—কীসের ব্যাবসা?
—স্টিভেডরিং অ্যাণ্ড শিপ-চ্যাণ্ডলারিং। শিপ-রিপেয়ারিং। এন সি বোস অ্যাণ্ড কোম্পানি। খুব নাম করা কোম্পানি। তিনপুরুষের ব্যাবসা। কোটি কোটি টাকার মালিক ওরা।
চিকু বলল।
গামহার-এর মনে হল যে, সেটা বোঝা গেছিল। কারণ পিতৃপুরুষের পয়সাতে যারা বড়োলোক হয় তাদের মধ্যে একটা বোকা-বোকা ছাপ থাকে।
—বাঙালির ব্যাবসা তো তিনপুরুষেই উঠে যায়। এই শেষপুরুষ।
জারুল বলল।
—কাজ দেখলে তো ব্যাবসা থাকবে। কর্মচারীরা লুটে-পুটে খাচ্ছে।
ঝাঁঝি বলল, পেছন থেকে।
—তো, ও করে কী?
গামহার জিজ্ঞেস করল।
চিকুর কথার তোড় থামলে আবার ও বলল, নবেন্দু তাহলে করে কী? কাজ দেখে না তো!
তারপর বলল, আচ্ছা তোমাদের পরিমন্ডলে কোটিপতি নয়, এমন কেউই কি নেই? তবে আমাকে বেঁধে আনলে কেন? তোমাদের পেছনে গাধা-বোটের মতন। আমি কি মানাই এখানে?
ওরা হেসে উঠল জোরে।
চিকু বলল, তোমার কপাল এখন খুলতে শুরু করেছে। এখন তো আর্টিস্টদের-ই দিন। তুমি যে, মাটিজ, ভ্যান গঁ, বা গঁগা হয়ে যাবে না, তা কে বলতে পারে?
—ভ্যান গঁ’র জীবদ্দশাতে তাঁর তো একটিমাত্র ছবি বিক্রি হয়েছিল।
—তোমার অনেক হবে। তুমিও কোটিপতি হলে বলে।
—ও বুদ্ধিজীবী।
—কে?
—কে আবার? নবেন্দু।
—মানে?
—ও কবি। বলে, বুদ্ধিজীবী, আসলে দুর্বুদ্ধিজীবী।
—তাই? নিজের নামেই লেখে, না কোনো ছদ্মনাম আছে?
—না, না নিজের নামেই লেখে।
—নবেন্দু রায়ের কবিতা পড়েননি আপনি? নানা পত্রপত্রিকাতেও বেরোয়।
জারুল বলল।
ঝাঁঝি বলল, নিজের নামেই বেরোয় তবে, নিজেই লেখে কি না তা বলতে পারব না।
—মানে?
—মানে, পয়সার তো অভাব নেই। কোনো উপোসি-কবিকে মাইনে করে রেখেছে হয়তো। সে লিখে দেয় আর ওর নামে ছাপা হয়।
—এমনও হয় নাকি?
—এমন-ই তো বেশি হচ্ছে আজকাল।
ঝাঁঝি বলল।
—ওর তো চার-পাঁচটা বইও আছে।
চিকু বলল।
—হ্যাঁ। নিজের পয়সাতে ছাপালে বই বের করতে আর কী লাগে?
—কী কী নাম বইয়ের?
জারুল জিজ্ঞেস করল।
—সব বইয়ের নাম বলতে পারব না। শেষেরটা জানি।
ঝাঁঝি ঝাঁঝের সঙ্গে বলল।
তারপর বলল, সেটা আমাকেই উৎসর্গ করা তো, তাই জানি।
গামহার না-বলেই নিজেকে বলল, ধরেছি ঠিক-ই!
—তাই? বা: সত্যি ঝাঁঝি! তুমি কী ভাগ্যবতী। তার মানে, কবির প্রেরণা তুমি। হাউ ফরচুনেট। ভাবা যায় না। আমাকে যদি কোনো কবি-সাহিত্যিক একটি বই উৎসর্গ করতেন তাহলে কী-না করতে পারতাম আমি তার জন্যে।
জারুল বলল। অগ্রিম কিছু করো না কেন, তাহলে এই কবিই পরের বই তোমাকেই উৎসর্গ করতেন।
—তুমিও অগ্রিম কিছু করেছিলে কি?
—বাজে কথা বোলো না তো।
বিরক্তির সঙ্গে বলল ঝাঁঝি।
তারপর বলল, কবির প্রেরণা না কপির প্রেরণা তা বলতে পারব না। তা ছাড়া, প্রেরণা আদৌ নই, কিছু যদি আদৌ হই তো আমি তার যন্ত্রণা।
—যন্ত্রণা। ওমা! কেন?
—কেন-টেন জানি না, যন্ত্রণা ছাড়া অমন মাখন-বাবুকে আর কীই বা দেওয়ার আছে।
—ছি:। ছি:। এমন করে কি কেউ ভালোবাসার পুরস্কার দেয়?
চিকু বলল।
—বইটির নাম কী?
গামহার জিজ্ঞেস করল।
—‘তুমি বড়ো দাগা দিলে’।
সকলে একসঙ্গে হেসে উঠল ওরা। একমাত্র গামহার ছাড়া।
—ও দাগা পাওয়ার জন্যে মনে মনে তৈরি হচ্ছিল।
ইশ। বেচারি। কষ্ট হচ্ছে। কী নিষ্ঠুর গো তুমি ঝাঁঝি। এত কষ্টও কি, কেউ দেয় কাউকে?
জারুল বলল।
—তাতেও যদি ‘জ্ঞানচক্ষু’ না খোলে তো, আমি কী করতে পারি!
—একবার ভেবে দ্যাখো। আমি যখন ফোন করি নবেন্দুকে ও তখন ঘুমিয়েছিল। তোমাদের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে শুনে পড়ি-কী-মরি করে, নেক-ব্রেক স্পিডে নিজে গাড়ি চালিয়ে একটার মধ্যে যোশীপুর পৌঁছে গেল। সকালে এককাপ চাও খেয়েছে কি না সন্দেহ। ভালোবাসার টান না থাকলে কেউ এমন করে ছুটে আসতে পারে! একটু ভালোবাসা তো ফিরিয়েও দিতে পারো! একটুখানি!
চিকু বলল।
—তা পারি। কিন্তু বাড়িতে তার খাণ্ডার বউ। সেও কম বড়োলোকের মেয়ে নয়। পাছাল না কী গাছাল পরিবারের। হাওড়ায় বিরাট বড়োলোক তারা। আর এদিকে আমার ঘরেরচাড্ডাকান্টেন্ট—শিপ-রিপেয়ারাকে ভালোবাসা ফেরত দিতে গেলে, তারা দু-জনে যখন আমাকে ধরেই রিপেয়ার করে দেবে তখন আমাকে দেখতে আসবে কে!
—আহা! ভালোবাসলে একটু দুঃখ সইতেই হয়।
—কী বিপদ রে বাবা! ভালো তো আমি বাসিনি। যে বেসেছে, সে-ই দুঃখটা সহ্য করুক।
ঝাঁঝি বলল।
—এসব বড়ো কমপ্লিকেডেট ব্যাপার-স্যাপার। যার ফোঁড়া সে-ই বোঝে।
চিকু বলল।
—ইয়েস স্যার। যার ফোঁড়া সেই বোঝে।
ঝাঁঝি বলল।
ঝাঁঝি যে, এতকথা বলে, কাল তো বোঝেনি গামহার। কথা না বললেও ওর একরকম আকর্ষণ, কথা বললেও অন্যরকম আকর্ষণ।
এমন সময়ে ধপ করে একটা পাথরে গাড়ির আণ্ডারক্যারেজটা ধাক্কা খেল।
জারুল বলল, পরের ফোঁড়ার চিন্তা রেখে, এখন ভালো করে গাড়িটা চালাও। গাড়ির ফোঁড়া হলে এখানে সেঁক দেওয়ার লোক পাবে না।
সেই যে, গতকাল বিকেল তিনটেতে বেরিয়েছিল কলকাতা থেকে তারপরে একটুও বিশ্রাম পায়নি শরীর। চাহালাতে পৌঁছেই বাথরুমে গেছিল গামহার এবং চানও করেছিল। তারপর এসে, তার জন্যে যে, আলাদা ছোটোঘরটি বরাদ্দ করেছিল চিকু, সেই ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিল। সারারাত-ই তো ঘুম নেই। ঝাঁঝিদের অ্যাকসিডেন্ট। তার ওপরে ‘আননোন-ট্রাক’-এর বিরুদ্ধে পুলিশ কেস হয় তার ধকল! কখন যে, গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন হয়েছিল, জানেও না।
ঘুম যখন ভাঙল, তখন রাত নেমে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। চাঁদ উঠেছে। বেশ একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব। বাইরের ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর সুগোল মসৃণ সাদা কান্ডগুলিকে মেমসাহেবদের ওয়াক্সিং-করা ঊরুর মতো দেখাচ্ছে, আর হাওয়ার দোলায় হাতছানি-দেওয়া শাখা-প্রশাখাগুলি তাদের বাহুর-ই মতো। অগণিত, আন্দোলিত, মসৃণ, রুপোলি বাহুর বাহুমূল থেকে গন্ধ ছুটছে হাওয়ায় ভেসে চাঁদের দিকে। মিশ্র বনগন্ধ মুখে করে হাওয়াটা ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে, বনময় শুকনো পাতা উড়িয়ে-তাড়িয়ে রিট্রিভার কুকুরের মতন।
ওরা বাইরে চেয়ার পেতে বসে গল্প করছিল। নবেন্দুরা এসে গেছে। অনেকক্ষণ-ই এসেছে মনে হয়। কারণ, ওদের কথাবার্তাতে মনে হল ওদের চানও হয়ে গেছে। দু-কাপ চাও খাওয়া হয়ে গেছে।
ঝাঁঝি বলল, গামহারদা উঠলে চা করে দিতে হবে।
জারুল বলল, বাসনপত্র তো সব এখানেই আছে। চৌকিদারকে শুধু বলতে হবে, গরম জলটা নিয়ে আসতে। গামহারদা হাফ-অ্যাণ্ড-হাফ বিস্কুট খান তো? চিকু?
—কে জানে রে বাবা! হাফ-অ্যাণ্ড-হাফ খায়? না, ফুল-অ্যাণ্ড-ফুল খায়। এই জঙ্গলে যা দেবে, তাই খাবে। গামহারদা কি অবুঝ? কিছু অবান্তর চিন্তা করাটা তোমাদের স্বভাব!
—আমাদের মানে?
—মানে, মেয়েদের।
—বলতে পারতে ‘তোমার’। জাত তুলে কথা বলবে না। জেনারালাইজ করবে না।
বগল-কাট্টি জামা পরা নবেন্দু বলল, সেটা ঠিক-ই?
গলার স্বরটা কিন্তু ভালোই ছেলেটির। এই প্রথমবার শুনল গামহার। এতক্ষণে সেই বগল-কাট্টি জামাটা ছেড়েছে নিশ্চয়ই।
শুয়ে শুয়ে ভাবল, গামহার।
রাত্রি জাগরণের পরে বাথরুম এবং চান এবং তারপরে ঘুম এবং পরে বিছানাতে শায়ীন থেকেই এই সিমলিপালের জঙ্গলের চাঁদনি রাতের অভিঘাতে একটা ঘোরের মতো লাগছে গামহার-এর। ওর ঘুম যে, ভেঙেছে তা ও জানাতে চায় না ওদের কারোকেই এখুনি। শুয়ে শুয়ে এই বাসন্তী বনের রাতে ওদের কথা শুনতে ভালো লাগছে। যেন, চুরি করেই শুনছে কথা। ইভস-ড্রপার ও ভয়্যারদের মধ্যে তফাত নেই বিশেষ। দু-জনের চুরি-করা আনন্দই সমান। একজন শ্রবণে আনন্দিত অন্যজন নয়নে। এবং তারা হয়তো এই সমাজ-অস্বীকৃত অপরাধের জন্যে সমান ধিকৃতও। যা কিছুই চুরি করে করা যায়, চুরি করে কারও চান দেখা, চুরি করে কারও গান শোনা, চুরি করে কারোকে চুমু খাওয়া এসবের-ই মধ্যে এক, সমাজ-অস্বীকৃত আনন্দ থাকে। সেই অস্বীকার-ই, সেই চোখ-রাঙানিই, সেই আনন্দকে এক অন্যমাত্রা দেয়। অপরাধীমাত্রই সেই কথা জানে।
কে কী পারফিউম মেখেছে, জানে না গামহার। মেয়েরা সাবান দিয়ে গা ধুয়ে পাট-ভাঙা শাড়ি পরে, সামান্য প্রসাধন আর সুগন্ধি মেখে এলেই, কীরকম এক গা-শিরশির ভালো লাগাতে ভরে যায় পরিবেশ, আর এইরকম জায়গাতে তো যায়-ই! সেই সুগন্ধর সঙ্গে প্রকৃতির গায়ের সব সুগন্ধও বুঝি মাখামাখি হয়ে যায়। পায়ের কাছের জানলা দিয়ে যতটুকু দেখা যায়, তাই অনেক। এখন জানলার নীচেই চেয়ার পেতে বসে-থাকা ওদের কথা শুনবে গামহার আর দু-নাক ভরে গন্ধ নেবে শুধু।
জারুল বলল, হরিমতি কেমন আছে নবেন্দুদা?
—সে আছে।
গামহার ভাবল, হরিমতিটা কে? বাড়ির ঝি নাকি? নবেন্দু কি তাহলে ঝৈন? স্ত্রীতে প্রবল আসক্ত যে, সে স্ত্রৈণ হলে, ঝিতে প্রবল আসক্ত যে, সে ঝৈন কেন হবে না?
গামহার নিজের সঙ্গে নি:শব্দে কথা বলল।
—আছে মানে?
—আছে, মানে আছে। তার অরুণ-বরুণ-কিরণমালা নিয়ে এবং চন্দনা পাখি এবং রান্নাঘরের তদারকি, তামা-পেতল পালিশ নিয়ে বেশ আছে।
একটু চুপ করে থেকে নবেন্দু বলল,তার কোলে আর একটি আসছে।
এমন নিরাসক্ত ‘কুড নট কেয়ারলেস’ গলাতে কথাটা বলল নবেন্দু যে, শ্রোতাদের মনে হতেই পারে যে, হরিমতি অর্থাৎ তার বউকে অন্য কোনো পুরুষেই গর্ভবতী করেছে।
ঘাবড়ে গেল গামহার। এ তো সাংঘাতিক জিনিস। তার ছবিটা আর শেষ হবে না। ঝাঁঝির ছবিটা ওই উপদ্রুত পটভূমিতে সম্ভবত আর আঁকা হয়ে উঠবে না। ‘আননোন ট্রাক’ ড্রাইভারটার ওপরে তার অত্যন্তই রাগ হচ্ছে এখন। ব্যাটা গুঁতোবার আর সময় পেল না যেন।
—তাই?
জারুল বলল, উচ্ছ্বসিত গলায় নবেন্দুকে।
চিকু আর হারিত বলল, কনগ্রাচুলেশানস।
—কবে আসছে সে?
—কে?
চমকে উঠে বলল, নবেন্দু।
—আঃ। কী ন্যাকামিই যে, করতে পারো। আরে, নবাগন্তুক।
আবারও ঘাবড়ে গেল গামহার। বগল-কাট্টি নবাগন্তুককে নিয়েই, সে এতক্ষণ মনে মনে ব্যতিব্যস্ত ছিল, তারমধ্যে আবার অন্য নবাগন্তুক। কী কেলো!
—ও।
বলল, নবেন্দু। অনেক অঙ্ক কষতে হবে।
তারপর বলল, কিরণমালার বয়স এখন যদি দেড় মাস হয়। তাহলে দেড় মাস প্লাস এক মাস প্লাস দশ মাস দশ দিন। হিসেব করে নাও কবে আসতে পারে? পাঁচ-দশ দিন আগেও আসতে পারে। সিজারিয়ান হবে তো!
—যা বাব্বা! তুমি তো জাব্বারের ক্লাব-এ নাম লেখালে দেখছি।
হারিত বলল।
—মানে?
—কোন জাব্বার?
—আরে আমাদের গ্রেট আঁতেল আবদুল জাব্বার।
—জাব্বারের সঙ্গে আমার কী?
—মানে?
—বা:। ওঁর স্ত্রীর পেটও কখনোই খালি থাকে না। শ্বশুরের অগাধ সম্পত্তি তো! ওর শালা ইমতিয়াজের সঙ্গে কমপিটিশনে নেমেছে জাব্বার, কে বেশি ছেলে-মেয়ের বাবা হতে পারে। শ্বশুর প্রত্যেক পোতা-পুতিকে নাকি দশলাখ করে দিয়ে যাবেন।
—হায়! হায়! গুগনে গুরজে মেঘ ঘন বুরষা, কূলে একা বইস্যা আছি, নাহি ভুরসা। তুমিও কি এই ক্লাবের মেম্বার হতে চাও নাকি?
চিকু বলল।
ঝাঁঝি বলল, পার সন্তানে দশলাখ পেলে কারও সন্তানের জননী হতাম। মন্দ কী!
—তুমি কি বাঙাল নাকি?
নবেন্দু জিজ্ঞেস করল।
—এখন তো বাঙাল-ঘটি সর্বত্রই হরে-দরে এক-ই হয়ে গেছে। বাঙালি, বাংলাদেশি আর বঙ্গস। আমার আদিবাড়ি ফরিদপুরে। বাড়িতে জ্যাঠা আর বাবা এখনও ওই ভাষাতে কথা বলেন। আমার মামাবাড়িও ঢাকার বিক্রমপুরে। মা ও দিদিমাও ওই ভাষায় কথা বলেন। লোকে বলে না, মাদার-টাং। তাই বলতে পারি। তবে, না-বলাই উচিত।
—কেন? না বলাই উচিত কেন?
—বাংলাদেশিরাই তো আর তাদের লিখ্য ভাষাতে ওই ভাষা ব্যবহার করেন না। কথ্য ভাষাতেও পশ্চিমবঙ্গীয় ভাষা, এমনকী ‘কল্লুম-খেলুম’ পর্যন্ত ব্যবহার করেন। জানি না, ভাষার জন্যে যাঁরা এত করলেন, তাঁদের এ-ব্যাপারে এমন হীনম্মন্যতা কেন? তা তাঁরাই যদি, ওই মিষ্টিভাষাকে ফেলে দেন, আমাদের দরকার কী বিজাতীয় ভাষা ব্যবহার করে! আমার পিতৃকুল, মাতৃকুল সকলেই তো উদবাস্তু। কোনো মধুর স্মৃতি নিয়ে তো তাঁরা ভিটে-মাটি, জমি-জিরেত, মাঠ-পুকুর, হরিসভা, লেখার টেবিল, পিয়ানো, সরোদ, কুলদেবতা সব একবস্ত্রে ছেড়ে আসেননি! যারা পরম-অসম্মানে একদিন আমাদের উৎখাত করেছিল তাদের প্রতি ভালোবাসা রাজনীতিকদের নিজস্বার্থের কারণে থাকতে পারে নানা কারণে আমাদের তো থাকার কথা নয়। তবু থেকে গেছে কিছু ভালোবাসা, নস্টালজিয়া। যত তাড়াতাড়ি তা মুছে ফেলা যায়, ততই ভালো।
—বাবা:। হচ্ছিল গুগনে গুরজে মেগ ঘন বরষার কথা আর তুমি তো ছোটোখাটো বক্তৃতাই দিয়ে দিলে।
চিকু বলল।
জারুল বলল, তুমি বুঝবে কি মিস্টার চিকু ব্যানার্জি? উদবাস্তু হলে জানতে। হঠাৎ-ই সব শিকড় কেটে দিয়ে, নাভিমূল-এর সঙ্গে নাড়ি থেকে বিযুক্ত হতে কেমন যে, লাগে তা যারা নাড়ি ছিঁড়েছে অসহায় নিরুপায়তায় শুধুমাত্র তারাই জানে। আমরা অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে জানিনি। কিন্তু মা-দিদিমা, জ্যাঠা-দাদুরা জানেন। শরীরের ক্ষত হয়তো শুকিয়েছে, এখনও শুকোয়নি, তাঁদের হৃদয়ের ক্ষত। শুকোবেও না, যতদিন বাঁচেন। সেকথা আমরাই বা ভুলি কী করে বলো?
সকলে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ।
—এবারে কিন্তু গামহারদাকে ওঠাও। রাতের রান্না-বান্নার কিছু একটা করতে হবে তো। গামহারদা কী খাবেন?
জারুল বলল।
—গামহারদার খাওয়ার ব্যাপারে কোনো ঝামেলা নেই। মানে, নেড়ি-কুত্তার মতো আর কী! গামহারদাকে একবার চাকদাতে নিয়ে গেছিলাম। তাই জানি। যা দেবে তাই চেটেপুটে তৃপ্তিভরে খাবে। বাইরে তো এমন সঙ্গীই দরকার।
—নেড়ি-কুত্তার সঙ্গে একজন নির্বিরোধী অন্তর্মুখী ভদ্রলোকের তুলনাটা কি ভালো হল!
—কেন? নেড়ি-কুত্তা খারাপ নাকি? কোন দিক দিয়ে খারাপ? তোমাদের এইসব ইডিয়টিক ইডিয়োসিনক্র্যাসি যত তাড়াতাড়ি ত্যাগ করবে, ততই মঙ্গল।
তারপর বলল, এ-যাত্রা জঙ্গল দেখার শখ মিটিয়ে দিতে হবে গামহারদার। বুঝেছ জারুল?
—হুঁ।
জারুল বলল।
গতরাতে মুরগির পাতলা ঝোল আর ভাত রেঁধেছিল জারুল আর ঝাঁঝি মিলে। খুব সুন্দর স্বাদ হয়েছিল। ‘Knor’-এর টোমাটো স্যুপও ছিল। আর যোশীপুর থেকে আনা পোড়পিঠাও। বারোটা মুরগিও নিয়ে এসেছিল নবেন্দু যোশীপুর থেকেই। তার-ই থেকে দুটো গেছে কাল রাতে, দশটা রয়েছে। হারাধনের দশটা ছেলে। ডিম আছে পর্যাপ্ত, নানা তরি-তরকারি। চাল-ডাল-তেল-নুন-মশলা আর নিজৌষধিও যথেষ্ট আছে, অ্যাকসিডেন্টে কিছু স্টক নষ্ট হওয়া সত্ত্বেও। রাম-এর ভাঙা বোতল থেকে গড়ানো রামের গন্ধ পেয়েই পুলিশ অফিসার চিকুকে জিজ্ঞেস করেছিল : ‘সে বাবু মদ্দ খাইছন্তি কি?’
অনেকক্ষণ বাইরে বসে সকলেই রাম খেতে খেতে গল্প করেছে ওরা। গামহারও উঠে ওদের সঙ্গে বসেছিল মাথায় টুপি দিয়ে টাকে ঠাণ্ডা লাগে বলে।
চিকু বলেছিল, তুমি এই চাহালা বাংলোর ইউক্যালিপটাস বনের চাঁদনি রাতের একটা ছবি আঁকতে পারো গামহারদা?
—পারি। তবে আমি রিপ্রেসেন্টেশনাল বা ফিগারেটিভ ‘আর্টিস্ট’ তো নই। ফোটোগ্রাফারও নই। আমি স্যুরিয়ালিস্ট আর্টিস্ট।
—‘স্যুরিয়ালিস্ট’ শব্দটার মানে কী গামহারদা?
চিকু জিজ্ঞেস করেছিল।
—এর মানে হল, কী বলব, ‘স্বপ্নময়’। অবচেতনের দলিল এইসব ছবি। সালভাডর ডালি ছিলেন এই স্কুলের পথিকৃৎ। ফরাসি শব্দ ‘স্যুর’ (Sur) মানে হচ্ছে ওপরে, দূরে। আর ইংরেজি ‘রিয়্যালিজম’—এই দুইয়ের অভিঘাতে সৃষ্টি হয়েছে স্যুরিয়ালিজম-এর। যাঁরা এই স্কুলের আর্টিস্ট তাঁদেরই বলা হয় ‘স্যুরিয়ালিস্ট’।
—তাই? শব্দটা বহুদিন হল পড়ছি, দেখছি। মানেটা জানতাম না।
—আমি যা আঁকব, তা শেষরাতের স্বপ্নে দেখা এই চাহালার চাঁদনি রাতের স্বপ্নর-ই মতো হবে। তা, বাস্তবের মতো হবে না অথচ বাস্তবের চেয়ে বেশি সুন্দরও হতে পারে। এই রাত আমার ছবিতে আভাসিতই থাকবে শুধু। স্বপ্নের-ই মতো, বাস্তবের রূঢ়তা তাকে ছুঁতে পারবে না।
—এই বাস্তব তো রূঢ় নয়।
—তা ঠিক। ‘রূঢ়তা’ শব্দটা এখানে আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করিনি আমি।
—বা:। তাই এঁকো। চমৎকার। আমার স্টাডিতে টাঙিয়ে রাখব।
জারুল বলল, গামহারদা তোমাকে আমরা অরণ্যের সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছি বলেই বলছি, বনে এসে কিন্তু আমরা এত কথা বলি না। ‘বন’-এর কী বলার আছে তা শুনি।
গামহার লজ্জিত হয়ে বলল, সরি। আমি অনেক কথা বলে ফেললাম যে!
আরে, সে তো আজ আমরা সকলেই বলছি। আজ ঝাঁঝি আর হারিতের পুনর্জন্মটা সেলিব্রেট করছি বলেই তো এখানে আড্ডা বসিয়েছি। সত্যি! এখন বলতে দ্বিধা নেই যে, ওদের তালগোল পাকানো গাড়িটা দেখে ওরা কেউ আদৌ বেঁচে আছে —একথা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। ওদের অক্ষত দেখে, কী যে খুশি হয়েছিলাম কী বলব!
তোমরা অবশ্যই আনন্দিত হয়েছিলে, তবে আমি বেঁচে যাওয়াতে দুঃখিতও কম মানুষ হয়নি। মরে গেলে, তারা হয়তো আনন্দের বন্যা বইয়ে দিত।
ঝাঁঝি বলল।
—তারা কারা?
—তারা তো অগণ্য। প্রথমেই ধরো না কেন, আমার শ্বশুরবাড়ির সকলেই। আমার স্বামীও, যদি তিনি নিজে বেঁচে যেতেন।
—কেন বাজে কথা বলে মেজাজ খারাপ করিয়ে দাও। এই বনবাদাড় আমার মোটে ভালো লাগে না। শুধু তোমার-ই জন্যে চিকুদের পিছু নিলাম। নইলে, গতকাল আমার তাস-এর আড্ডা ছিল রাতে, মহীনদের বাড়িতে। সঙ্গে স্কচ এবং বিরিয়ানি।
ঝাঁঝি চুপ করে রইল একটুক্ষণ। তারপরে বলল, তোমাকে তো জোর করি না। আমি জঙ্গল ভালোবাসি তাই বারে বারে আসতে চাই কিন্তু তুমি আসো কেন? আমি তো স্বচ্ছন্দে চিকুদের সঙ্গেই আসতে পারি। অথবা মনে করো, নবেন্দুর সঙ্গেও। তোমার কি আমাকে একা ছাড়তে পারার মতো সাহস আছে? তুমি তো আসো শুধু পাহারা দিতেই।
—পাহারা! হা:। পাহারা দেয় মানুষ ধন-দৌলতকে। তোমাকে কী জন্যে পাহারা দিতে যাব? তুমি তো আমায় লায়াবিলিটি। যাও না চলে তুমি, যার সঙ্গে খুশি।
—তুমি কি সত্যিই খুশি হবে? যদি যাই?
—খুউব। খুউব-ই খুশি হতাম। বেঁচে যেতাম।
—তাই? এতজনের সামনে কথাটা বললে কিন্তু। মনে থাকে যেন।
তারপরে বলল, কারও সঙ্গে কেন? আমি একাই যেতে পারি।
—যাবে তো! কিন্তু খাবেটা কী?
মাথা নীচু করে ঝাঁঝি বলেছিল, সে-চিন্তা আমার।
গামহার-এর বুকটা ধড়াস-ধড়াস করছিল। ও নি:শব্দে বলল, আমি খাওয়াব, আমি।
—হারাবার ভয় যদি নাই-ই থাকে, তবে পাহারা দাও কেন?
—পাহারা দিয়ে বেড়াই শুধু পারিবারিক সম্মানের জন্যে। হারিত বাসুর বউ ভেগে গেছে বলবে পাড়ার লোকে, তাই!
—তোমাদের পরিবারে তো ইসলামিক সংস্কৃতি। মেয়েরা তো সেখানে নিছক-ই বস্তু, পণ্য, ভোগ্যপণ্য! তা ছাড়া, পাড়ার লোক-ই তোমার সব? তুমি তো আর একজন চাড্ডাকান্টেন্ট মহীনের বাড়ি তাস খেলতে যেতে, আমি কী করতাম একা একা বাড়ি বসে? কী করি সন্ধের পর সন্ধে একা একা, কখনো কি ভেবেছ তুমি! আমার কি ছেলে-মেয়েও আছে একজন? সঙ্গী হিসেবে?
হারিত রাগে ফেটে গিয়ে গলা চড়াল। চৌকিদারের কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে উঠল।
হারিত বলল, তোমার মাথাটা পুরোপুরি বিগড়েছে সেই স্কাউন্ড্রেল লেখকের লেখা বইগুলো পড়ে। এবারে ফিরে গিয়ে আমি গুণ্ডা দিয়ে হারামিকে খুন করাব। ‘হারামজাদ’-এর সীমা আছে একটা।
—সে আবার কে? সে কোন লেখক?
নবেন্দুও উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করল।
—কে আবার? বুদ্ধদেব গুহ।
—হারামজাদা, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট না ছাই! প্রফেশনে সাকসেসফুল হলে কি, কেউ বনপ্রেমী হতে যায়? না নেকুপুষুমুনু প্রেমের গল্প লেখে। জ্বালিয়ে দিল হারামি! ঝাঁঝি তো সর্বক্ষণ তার বই মুখে করেই বসে থাকে।
চিকু পরিবেশ লঘু করার জন্যে বলেছিল, আহা। শোনো, শোনো ঝাঁঝি তোমার দুঃখ কী?
তারপর নবেন্দুর দিকে ফিরে বলল, এই নবেন্দু, কিরণমালার পরে যে-আসছে তাকে দিয়ে দাও তো ঝাঁঝিকে।
—উরি বাবা। দশলাখ কোথায় পাব আমি? খেটে-খাওয়া মুহুরি। ঝাঁঝির ভাষায়, চাড্ডাকান্টেন্ট।
সকলের সামনে দাম্পত্য-কলহ করে ফেলে লজ্জিত হারিত হেসে বলল।
ঝাঁঝি মুখ নীচু করে বসেছিল।
—সত্যি হারিত! তুমি দিলে পুরো আনন্দটাই মাটি করে। এত বাইরের লোকের সামনে কেউ স্ত্রীকে এমন বলে! জঙ্গলে আসতে তোমার ভালো লাগে না, না এলেই পারো। কিন্তু এ কী। জঙ্গলে তো আমি আর জারুল আসি নিয়মিত। স্বভাবটা জংলি হওয়ার কথা ছিল আমাদের-ই! আর তুমি ভূপেন বোস অ্যাভিনিউতে থেকে এরকম জংলি হলে কী করে!
বলেই বলেছিল, গামহারদা! তুমি চুপ করে গেলে কেন?
—আই অ্যাম সরি!
—সে কী? তোমার কী দোষ?
—না। আমি এলাম বলেই বোধ হয় তোমাদের এই অশান্তি? আমি না এলেই বোধ হয় ভালো করতাম।
ঝাঁঝি গামহারের মুখের দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে চাইল। বলল, আমার খুব লজ্জা করছে। ক্ষমা করবেন আমাকে গামহারদা।
—কী যে বলো! কী যে বলো। আমি....ক্ষমা...কী যে বলো!
গামহার-এর বুকের মধ্যে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এই ধরনের কষ্ট আগে ঠিক কখনো বোধ করেনি।
চাহালা থেকে জোরাণ্ডাতে রওড়া হওয়ার জন্যে সকালে এককাপ করে লিকার খেয়ে গাড়িতে ওঠবার সময়ে জারুল-ই বলেছিল, নবেন্দু, চলো তোমার গাড়িতে তোমার আর হারিতের সঙ্গে আমি যাই আর ঝাঁঝি যাক চিকু আর গামহারদার সঙ্গে। একঘেয়ে একটানা কারও সঙ্গই কি, কারও ভালো লাগে! এই ভয়েই তো বিয়ে করব না কোনোদিনও আমি।
ঝাঁঝি একবার হারিতের দিকে তাকাল।
হারিত বলল, আর লোকদেখিয়ো না, দয়া করে গিয়ে ওঠো ও-গাড়িতে। এমন-ই ভাব করছ যেন আমার কথাতেই উঠছ আর বসছ। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই আমার সারাশরীরে চিমটি কেটে কেটে কালশিরে ফেলে দিয়েছিলে তা মনে নেই। আর আমার বোকা মা বলতেন, বউ আমার ভারি লক্ষ্মীমেয়ে। মুখে রা-টি নেই। মা বলতেন, জানিস, খোকা, আমি কিন্তু বাবা, বিয়ের পরে পরে তোর বাবার সঙ্গে খুব ঝগড়া করতুম।
তারপর নবেন্দুর গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে বলল, মাকে আর কী বলব বলো? কেষ্টনগরে আমাদের চারমহলা বাড়িতে স্ত্রীকে তো আর শ্বশুর-শাশুড়ির পাশের ঘরে শুতে হত না। মেয়েমাত্রই গ্রেট অভিনেত্রী।
চিকু গাড়িটা স্টার্ট করার পরেই গামহার বলেছিল, কথাটা বোধ হয় ঠিক নয়। মানে, হারিত বোধ হয় ঠিক বলেনি। অধিকাংশ মেয়েরাই যুগের পর যুগ ধরে সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করে গেছে বলেই, আমরা ধরেই নিয়েছি যে, তারা অভিনেত্রী, তাদের মনের যথার্থ ভাব মুখে প্রকাশ করে না বা করতে পারে না বলেই যে, তারা ‘অভিনেত্রী’ এ-কথা বলাটা বোধ হয় ঠিক নয়।
চিকু বলল, ঠিক-ই বলেছ।
ঝাঁঝি চুপ করেই রইল। গামহার সাহস করে একবার সামনের সিটে বসে পেছন ফিরে ঝাঁঝির দিকে চাইল। দেখল, তার দু-চোখভরা জল।
প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার জন্যে চিকু বলল, কেমন লাগল বলো চাহালা, ঝাঁঝি?
—তেমন করে দেখলাম আর কই? তবে ভালোই লাগল। বাংলোর কম্পাউণ্ডের চারপাশে অমন পরিখা কাটা কেন? গেট-এর সামনেও তো ব্রিজ। সেই ব্রিজের তক্তাগুলো আবার খুলে নিয়ে ভেতরে করে রাখল, দেখলাম চৌকিদারেরা সন্ধের আগে আগেই, কেন?
—হাতির জন্যে। সিমলিপাল হাতির জন্যে বিখ্যাত। এত হাতি নাকি আফ্রিকার নানা গেম-পার্কেও নেই। জারুল বলছিল। তা ছাড়া, আমরা এসেছি ঠিক সময়েই। সিমলিপালে শুনেছি এপ্রিল মাসেই হাতির সেন্সাস হয়, মানে সংখ্যা গোনা হয়। বনবিভাগের আমলারা বলেন ‘ম্যাঙ্গো সেন্সাস’। এই সময়ে বুনো আম পাকে এখানে। হাতিরা গিরিখাত-এর দুর্ভেদ্য জঙ্গল ও উঁচু পাহাড়ের খাঁজ-খোঁজ, মালভূমি, উপত্যকা, সব ছেড়ে বেরিয়ে আসে আম খাওয়ার জন্যে। তখন গাছতলিতে তাদের গোনা সহজ হয়।
গামহার বলল, কদমতলিতে গোপী আর আমতলিতে হাতি।
চিকু হেসে উঠল জোরে। মনে হল, ঝাঁঝিও হাসল। কিন্তু পেছন ফিরে মুখ ঘুরিয়ে ওকে দেখতে লজ্জা করল। ওর মনে পড়ে গেল যে, দিদিমার ঘরের দেওয়ালে ফ্রেমে-বাঁধানো একটি বাক্য: ‘লজ্জা, মান, ভয়, তিন থাকতে নয়’। কে বলেছিলেন বাক্যটি, কোন প্রসঙ্গে, তা জানে না গামহার। কেউ বলেও দেয়নি ওকে। কিন্তু বাক্যটি যে, চিরকালীন সত্য এবং সাধু ও পকেটমার দু-জনের পক্ষেই সমান মান্য, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই ছিল না শিশুবয়েসেও। কিন্তু এত দীর্ঘদিন পরে, সেই বাক্যটি মনে পড়ে যাওয়াতে নিজের মনে মনে ও বল সঞ্চার করতে লাগল। ঝাঁঝিকে প্রথমবার দেখার পর থেকেই ওর প্রতি এক তীব্র শারীরিক আকর্ষণ বোধ করছে ও, যেমনটি এত বয়স অবধি অন্য কোনো নারীর প্রতিই করেনি। মানুষের মন যে, অসীম রহস্যময় তা ও জানে কিন্তু মানুষের শরীরের মধ্যেও যে, এত খামখেয়ালিপনা, এত রহস্য আছে, তা ও আগে কখনো উপলব্ধি করেনি। মেয়েদের প্রতি পুরুষের আকর্ষণ থাকেই। তা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো বিশেষ নারীর শারীরিক সান্নিধ্যর জন্যে এমন উন্মাদনা যে, জাগতে পারে এমন বেলাশেষে, তা অভাবনীয়ই ছিল।
পেছন থেকে ঝাঁঝি বলল, জোরাণ্ডা কত দূর?
—বেশ অনেকখানি রাস্তা। প্রায় চল্লিশ কিমি মতো হবে চাহালা থেকে। জঙ্গুলে রাস্তা, কাঁচা, এবড়ো-খেবড়ো। তার ওপর চড়াই-উতরাই তো আছেই। খুব উঁচু উঁচু পাহাড়ে উঠে আবার নামতে হবে আবারও অন্য অনেক পাহাড়ে উঠতে হবে। পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে যেতে হবে। তবে জঙ্গল যদি সুন্দর হয়, তবে রাস্তা ভালো কী মন্দ তাতে কিছুমাত্রই যায় আসে না। আর বছরের এই সময়টিতে আমাদের দেশের জঙ্গল যা-সুন্দর, তেমন তো অন্য কোনো সময়েই নয়!
—কেন? এখন সবচেয়ে সুন্দর কেন?
—এখন যে, বসন্ত। মানুষ-মানুষী, পশু-পাখি, ফুল, প্রজাপতি সকলের-ই ভালোবাসার সময়। লাল, হলুদ, খয়েরি, কচিকলাপাতা-সবুজ, হলুদ; কালো, পাটকিলে, মরচে-রঙা পেঁয়াজখসি, বেগুনি, ম্যাজেন্টা, মভ আরও কত রঙের দাঙ্গা এখন বনে-বনে। মহুয়া, আর করৌঞ্জ-এর গন্ধ। আরও কত ফুলের মিশ্র গন্ধ এখন হাওয়াতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুকনো পাথর আর লালমাটির ওপরে বিচিত্র বর্ণ শুকনো পাতাকে তাড়িয়ে, ঘূর্ণি উড়িয়ে হাওয়াটা দামাল রাখালছেলের মতো বনময় দাপাদাপি করে বেড়ায়। ভালো করে চেয়ে দ্যাখো। এতদিন কালোকে শুধু কালো, লালকে শুধুই লাল, সবুজকে সবুজ-ই, হলুদকে হলুদ বলেই জেনে এসেছ তো। আজ এই বসন্তবনে ভালো করে চেয়ে দ্যাখো, দেখবে কুঁড়ির ভেতরে যেমন পরতের পর পরত ঘুমন্ত পাতা থাকে, স্তরে স্তরে, তেমন-ই সব রঙেরও অমন পরত হয়। এক-ই রঙের কতরকম যে, ছায়া (Shades)।
বলেই চিকু বলল, সরি গামহারদা। আমার পাশেই যে, একজন আর্টিস্ট বসে আছেন আর আমি তারঁই সামনে রঙের ব্যাখ্যা করছি? আমার স্পর্ধা ক্ষমা করো।
—আর্টিস্ট কি শুধু ছবি আঁকলেই হয় চিকু? তুমি যেভাবে বাসন্তী-বনের বর্ণনাটি অনভিজ্ঞ আমাদের দিলে, তেমন করে হয়তো অবন ঠাকুর-ই শুধু লিখতে পারতেন। যেকোনো সৃষ্টিশীলতার উৎসমুখে থাকে ভালোবাসা। ক্রিয়েটিভিটির সবচেয়ে বড়ো উপাদান সেটি।
—আর যন্ত্রণা?
ঝাঁঝি বলল।
—ভালোবাসার মধ্যে যন্ত্রণা তো থাকেই। অনেক সময়ে একের থেকে অন্যকে আলাদা করে চেনা পর্যন্ত যায় না।
—আরও একটা ব্যাপার বোধ হয় থাকে।
চিকু বলল।
—কী?
—আন্তরিকতা।
এক-শোবার ঠিক। ভন্ড আর খল মানুষ, দুর্বুদ্ধিজীবী মানুষ, কোনোদিন-ই প্রকৃত সৃষ্টিশীলতা যে কী, তা জানতেই পারে না।
বলেই বলল, ওই দ্যাখো, বাঁ-দিকের উপত্যকাতে ওই গাছটা দ্যাখো।
—বা:।
গামহার বলল।
—কী অপূর্ব। দারুণ ফুলগুলো। মাছের রক্তর সঙ্গে জল মেশালে যেমন ফিকে লাল হয়, তেমন লাল, না? আর কী মসৃণ ফুলগুলো, কী ফিনফিনে!
ঝাঁঝি বলল।
চিকু হেসে বলল, ওগুলো ফুল নয়। নতুন পাতা এসেছে কুসুমগাছে।
ঝাঁঝি বলল, রবীন্দ্রনাথের গানে পেয়েছি ‘কুসুমবনেতে’ কথাটি। নিজে চোখে না দেখলে আজ সত্যিই কিছু হারাতাম। এতদিন ভাবতাম, কুসুমবন বুঝি ফুলের বন।
চিকু হাসছিল।
—ওইদিকে দেখুন চিকুদা। কী আশ্চর্য নরম বেগুনি-রঙা ফুলগুলো। থোকা থোকা ফুটেছে।
—ওগুলো জারুল। জোরাণ্ডাতে পৌঁছে জারুলকে বোলো যে, তুমি জারুল দেখেছ। সে অবশ্য চেনে ও গাছ।
—বকুল-পারুল-শাল-পিয়ালের বন তো শুনেছি। কিন্তু জারুল তো শুনিনি।
—এখন শোনো।
—আচ্ছা! ডানদিকে ওই বিরাট গাছটা দেখছ গামহারদা?
—কোনটা? বাঁ-দিকে বসে তো ডান দিকে ভালো দেখা যায় না। ডান দিকে আবার পথ থেকেই ডাঙা উঁচু হয়ে উঠেছে।
—হ্যাঁ, ওটা যে, পাহাড়। এখান থেকে উঁচু হতে শুরু করেছে। দাঁড়াও। গাড়ি দাঁড় করাচ্ছি। ওই গাছটা তোমার চেনা দরকার।
—কেন? কেন? আমার চেনা দরকার কেন? আমার চিতা সাজাতে লাগবে নাকি?
—এমন সুন্দর সকালে বাজে কথা বলবেন না তো!
ঝাঁঝি ভর্ৎসনা করল পেছন থেকে।
তারপরে বলল, চিতা সাজানোর মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। কাল শেষরাতে যা-ঘটেছিল তাতে এতক্ষণে আমাদের আপনারা নিমতলাতে নিয়ে গিয়ে পৌঁছোতেন।
গামহার বলল, অত সোজা নয়। এদেশে অ্যাকসিডেন্টে মরেও নিস্তার নেই।
চিকু অবাক হয়ে বলল, কেন একথা বলছ?
বলছিলাম যে-পুলিশ, ‘আননোন ট্রাক’-এর এগেইনস্টে কেস করে, তারা দু-দুটো ডেডবডি পেলে তো আনন্দে নৃত্য করত।
—এখানে পোস্ট-মর্টেম কোথায় হয়?
গামহার জিজ্ঞেস করল।
চিকু বলল, নো আইডিয়া রাইরাংপুর-ফুরে হবে।
—সেইখানে লাশকাটা ঘরের সামনে হত্যা দিয়ে পড়ে থাকতে হত আমাদের। কতদিন, তা কে জানে! তোমরা তো মরে গিয়ে বেঁচে যেতে কিন্তু আমাদের মরার বাড়া করে রেখে যেতে।
—সত্যি। থাক। থাক। ওসব বোলো না। পুলিশ কোথায় বিপদে সাহায্য করবে, বিপদগ্রস্তর সহায় হবে, তা নয়। শকুনের মতো লাশ-এর ওপরে এসে পড়ে। সত্যি! স্বাধীনতার কী দশাই করলাম আমরা গতপঞ্চাশ বছরে!
বলতে বলতে নামল চিকু গাড়ি থেকে। গামহার আর ঝাঁঝিও নামল। দরজাটা ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করতেই লালমতো কী একটা জানোয়ার হিস্টিরিয়াগ্রস্ত অ্যালসেশিয়ান কুকুরের মতো ডাকতে ডাকতে নিস্তব্ধ বন-পাহাড়ের পিলে চমকে দিয়ে পাহাড়ে চলে গেল জোরে দৌড়োতে দৌড়োতে।
ঝাঁঝি ভয় পেয়ে, পাশে দাঁড়ানো গামহারের ডান বাহু চেপে ধরল।
ভালো লাগায় মরে গেল গামহার। মুখে বলল, বাঘ টাঘ নাকি? লালমতো দেখলাম।
গামহার-এর ইচ্ছে করছিল, ঝাঁঝি যেন তার হাতটি কখনোই আর না ছাড়ে।
—না। বাঘ ডাকলে আমাকে চিনিয়ে দিতে হত না, তা বাঘের ডাক বলে। এটা একরকমের হরিণ!
—এরকম করে ডাকে? বলো কী?
—হ্যাঁ। কুকুরের মতো ডাকে বলেই এদের নাম ‘বার্কিং-ডিয়ার’। লালচে ঠিক নয়, মরচে-রঙা হয় দেখতে ওরা এখানে। লাল-ই বটে তবে বিভিন্ন রাজ্যের জঙ্গলে এদের গায়ের লালের ছায়া আলাদা। ওরা বাঘ বা চিতা দেখলে, বা ভয় পেলে, এরকম করে ডাকতে ডাকতে দৌড়োয় যাতে বনের সব প্রাণী সাবধান হয়ে যেতে পারে।
—বাঘ দেখলে আর কোনো প্রাণী ডাকে না?
—ডাকে বই কী। ময়ূর ডাকে খুব জোরে জোরে আর বাঁদর অথবা হনুমান।
—ওমা হনুমানও ডাকে নাকি?
—সে কী? হনুমানের ডাক শোনোনি কখনো? বলো কী তুমি? তোমার মতো সুন্দরী যখন দু-বেণী ঝুলিয়ে বেথুন কলেজে পড়তে যেত, তখন রকে-বসা হনুমানেরা তোমাকে দেখে কখনো হুপ-হুপ-হাপ করেনি সেকথা বললেই আমি মানব?
হেসে ফেলল ঝাঁঝি।
—বলল, সত্যি! পারেনও আপনি।
চিকু বলল, এইবারে গামহারদা সামনের এই মহিরুহটির পা ছুঁয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করো।
—সে কী? পা ছুঁয়ে কেন? পায়ের কাছে কোনো বনদেবী-টেবী আছেন নাকি?
—বনদেবী কী! উনি নিজেই তো দেব।
—তাই?
—নাম কী?
—গামহার!
—গামহার!
—ইয়েস। এই গাছের নামেই তোমার নাম।
তারপরে বলল, তোমার নাম কে রেখেছিলেন?
—দাদু। মানে, মায়ের বাবা।
—তাঁর সঙ্গে কি বন-জঙ্গলের কোনো যোগ ছিল? বন্যপ্রাণী ভালোবাসতেন?
—দুর দুর। তিনি এ জি বেঙ্গলের অফিসার ছিলেন। সার্কাস দেখতে যেতেও ভয় পেতেন।
—তবে এমন নাম রাখলেন কী করে তোমার?
—মায়ের কাছে শুনেছিলাম, আমি তখন মায়ের পেটে, মাকে নিয়ে দাদু একদিন বটানিকাল গার্ডেনস-এ বেড়াতে গিয়ে একটি গাছের সামনে দাঁড়িয়ে, গাছটি খুব লম্বা ও ঋজু দেখে, মাকে বলেছিলেন, গাছটার নাম লিখে রাখ। ছেলে হলে, তার নাম দিবি এই গাছের নামে। মা, সেই নামটি সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন। আমার জন্মের দু-মাস আগেই দাদু গত হয়ে যাওয়াতে সেন্টিমেন্টাল কারণেই ওই নাম-ই রেখেছিলেন মা। কিন্তু দাদু বেঁচে থাকলে হয়তো এ নিয়ে তকরার-এর সুযোগ ছিল। গাছের নামে নাম হল কিন্তু গাছটি চেনার আর সুযোগ হয়নি। সত্যি! থ্যাঙ্ক ইউ। চিকু!
—ফর হোয়াট? ইটস মাই প্লেজার।
ওরা গাড়িতে উঠতে যাবে এমন সময়ে ঝাঁঝি বলল, একটু দাঁড়ান গামহারদা। ইশ, কী অপূর্ব দেখাচ্ছে নীচের ঘনবনাবৃত গভীর গিরিখাত। তার ওপাশে পাহাড় তারপরে আরও পাহাড়, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। তুমি সত্যিই বলেছিলে রঙের দাঙ্গা লেগেছে যেন।
—ক্যামেরা আনোনি?
—না:। কী হবে! চোখের মধ্যে সামনের এই ছবিকে জলছবির মতো সেঁটে নেব। ক্যামেরা কতটুকু ধরতে পারে? পারবে কি এই, রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধর সমারোহকে কোনো ক্যামেরা বন্দি করতে?
চিকু বলল, গামহারদা, ভালো করে দেখে রাখো, গামহার গাছের পাতাগুলো। শালগাছের চেয়ে বড়ো কিন্তু সেগুনের চেয়ে অনেক ছোটো, হালকা হলদে-সবুজ। পাতা চিনে রাখলেই গাছ চিনতে পারবে আর গাছের গড়নকে। মানুষের বেলাতে যাকে বলে Torso।
গামহার অভিভূত হয়ে গেছিল। তাকিয়ে ছিল পাহাড়ের গা থেকে সোজা উঠে-যাওয়া মস্ত উঁচু ঝাঁকড়া গাছটার দিকে। ঝাঁঝি বলল, গীতায় আছে না? ‘আত্মানং বিদ্ধি’। নিজেকে জানো। আপনার সেই নিজেকে জানা হয়ে গেল একরকম। ভাবলেও অবাক লাগে যে, গামহার যাঁর নাম, তিনি গামহারকেই চিনতেন না।
গামহার আর চিকু হেসে উঠল ঝাঁঝির কথাতে।
—বেশ বলেছ ঝাঁঝি।
বলল, গামহার।
বলেই ঝাঁঝির দিকে ভালো করে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল। মেরুন জমির ওপর সাদা ফুটকি তোলা একটা মাহেশ্বরী পরেছে সে। সঙ্গে মেরুন ব্লাউজ। বাঙালি মেয়েদের তুলনাতে বেশ লম্বা ঝাঁঝি। সকালে তো এখনও চান করেনি। ভোরে উঠে, এলো খোঁপা করেছে একটা। কাল রাতে লন্ঠনের আলোতে বুঝতে পারেনি, এই শাড়িটি পরেই শুয়েছিল হয়তো, অবশ্যই নাইটি পরে শোয়নি, কারণ, ওরা চারজন-ই একই ঘরে তিনটি আলাদা খাটে শুয়েছিল। পরপুরুষের সামনে নিশ্চয়ই নাইটি পরেনি। কিন্তু যা পরে আছে তাতেই তাকে অপরূপ সুন্দরী দেখাচ্ছে। তার পেছনে একটা শালগাছ। তাতে কচিকলাপাতা রঙা নতুন পাতা এসেছে। গিরিখাদ-এর খাড়া গায়ে অনেকগুলি পলাশ। লালে লাল হয়ে গেছে। আরও নীচে একটি মস্ত কুসুমগাছ। সকালের রোদে তাদের ফিনফিনে, লালচে পাতারা ঝিলমিল করছে ফুল হয়ে।
গামহার নি:শব্দে চেয়েছিল ঝাঁঝির দিকে। ঝাঁঝি অন্যের চোখে কতখানি সুন্দর তা কে জানে! কিন্তু গামহার-এর চোখে সে হুরি-পরি। ‘Beauty is in the eyes of the beholder.’
—চলো, ওঠো এবার গাড়িতে। নবেন্দুরা চিন্তিত হয়ে আবার দাঁড়িয়ে না পড়ে। কাল শেষরাতে যা খেল দেখালে তোমরা।
গাড়িতে উঠতে উঠতে ঝাঁঝি বলল, খেল তো একটু হলেই খতম হয়ে যেত।
—তা যেত। কিন্তু যায় তো নি!
আরও আধঘণ্টাটাক যাওয়ার পরে ঝাঁঝি চেঁচিয়ে উঠল উত্তেজিত হয়ে, চিকুদা। চিকুদা। বাঁ-দিকে দ্যাখো। কী অপূর্ব প্রপাত।
—জানি। আর একটু গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাব। অনেক ভালো দেখা যাবে। বলেই কিছুটা এগিয়েই গাড়িটা দাঁড় করাল।
বলল, নামো গামহারদা, নেমে দ্যাখো।
ঝাঁঝি আর গামহার দু-জনেই নামল। গাড়ির কাচ নামিয়ে দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল চিকু। ঠিক সেই সময়ে ওদের সামনে দিয়ে রাস্তা পেরোল একঝাঁক ময়ূর। দু-টি ময়ূর চারটি ময়ূরী।
ময়ূর। ময়ূর। বলে চেঁচিয়ে উঠল ঝাঁঝি। কিন্তু তার গলার স্বর উবে গেল হাওয়ায় চাবুক মেরে ‘ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ’ করতে করতে সোজা উড়ে-আসা একঝাঁক টিয়ার কর্কশ ডাকে।
চিকু খুশি হল ঝাঁঝির খুশি দেখে। গামহারদার লক্ষণ বিশেষ ভালো বুঝছে না চিকু। উত্তর-পঞ্চাশে পুরুষরা প্রেমে পড়লে, সে-প্রেম খুব সিরিয়াস ব্যাপার হয়ে ওঠে। মনে হচ্ছে গামহারদা একেবারে হেড-ওভার-হিলস পড়েছে। ঝাঁঝিও যে, গামহারদাকে খুব একটা অপছন্দ করছে তা মোটেই নয়। আর ‘যব মিয়া বিবি রাজি, ক্যায়া করে কাজি।’
চিকু বলল, মনে মনে, হউক। হউক। যাহা ঘটিবার তাহাই ঘটুক। হারিতের একটু শিক্ষাও হওয়া দরকার। হি হ্যাজ টেকেন ট্যু-ম্যাচ ফর গ্রান্টেড।
তারপরে ও-ও নামল গাড়ি থেকে। বলল, দেখেছ কত উঁচু থেকে পড়ছে জল। ওর নাম বড়াইপানি ফলস। ওখানে একটি বন-বাংলোও আছে। এর পরেরবার যখন আসব, থাকব ওখানে। তবে একটা কথা...।
—কী কথা?
—ওই বাংলোতে ভূত আছে।
—সত্যি?
—অনেকেই বলে।
—কী বলে?
—এক একজন এক একরকম বলে। তবে আমরা তো সবাই কিম্ভূত। ভূতে আমাদের কী করবে!
তারপর বলল, আমরা যেখানে যাচ্ছি জোরাণ্ডা, সেখানেও খুব সুন্দর একটি প্রপাত আছে। তবে সেটি বাংলো থেকে ভালো দেখা যায় না। একটু ওপরে উঠে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে দেখতে হয়। জোরাণ্ডা বন-বাংলোটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। বাংলোর পাশের গিরিখাতটি শুধু ভয়াবহই নয়, অশেষ রহস্যময়ও।
—কেন, রহস্যময় কেন?
—আজ রাতেই দেখতে পাবে।
—নামটা ওরকম কেন? মানে কি জোড়া-আণ্ডা? গামহারদা না....
—না, তা নয়। এখানে, মানে, সিমলিপালের জঙ্গলে, ময়ূরভঞ্জ জেলাতে ‘বাথুরি’ সমাজ বলে একটি সমাজ আছে। তারা এই সময়েই তাদের দেবতা বড়াম দেওকে পুজো দিতে আসে বারিপদা থেকে পায়ে হেঁটে। গতবছরের আগের বছর তাদের-ই একজনের কাছে শুনেছিলাম যে, নামটা আসলে জোরাণ্ডা নয়। এই গভীর কালো ল্যাটারাইট পাথরের গিরিখাতের গায়ে কোথাও নাকি জগন্নাথদেবের ঠাঁই আছে। বহু বহু বছর আগে এখানে নাকি ‘জাউ’ মানে, ভাত, যা জগন্নাথদেবের প্রসাদ, তা রান্না হত। জাউ রান্না হত বলে ওড়িয়াতে বলত ‘জাউ-রন্ধা’। সাহেব ব্যাটাদের জিভ ভারী। অনেক শব্দের উচ্চারণে তারা অপারগ। তাই, যেমন খড়গপুরকে তারা ‘খাড়াগপুর’ করেছে, মেদিনীপুরকে ‘মিদনাপুর’, বর্ধমানকে ‘বার্ডওয়ান’, তেমন-ই জাউরান্ধাকে করেছে ‘জোরাণ্ডা’।
—সত্যি?
উত্তেজিত হয়ে বলল ঝাঁঝি।
গামহার বলল, তুমি কত জানো তাই ভাবছি! তুমি যথার্থই পন্ডিত।
দয়া করে ওই শব্দটি ব্যবহার কোরো না গামহারদা। রবীন্দ্রনাথ কী বলেছিলেন জান তো?
—কী?
—যাঁহারা সবকিছুই পন্ড করেন তাঁহারাই পন্ডিত।
—তাই?
হেসে উঠল ওরা দু-জন।
আরও মিনিট কুড়ি পরে গাড়িটা উতরাইয়ে নামতে নামতে একটা প্রকান্ড উপত্যকাতে নেমে এল। দু-পাশে জঙ্গল, মধ্যে দিয়ে সোজা পথে চলে গেছে। একজন সুন্দর শবর যুবক, হাতে তার তির-ধনুক আর সঙ্গে তার অতিস্বল্প-বাস সুগঠিত সুন্দরী শবরী। বনে হেঁটে চলেছে। হাসতে হাসতে, কথা বলতে বলতে সখার গায়ে ঢলে পড়ছে। যেন ‘রাইকমল’-এর কাবেরী বসু। শুধু রংটা কালো, এই যা।
গামহার ভাবছিল, যৌবনের মতো সুন্দর বিধাতার এই সৃষ্টিতে আর কিছু নেই। ওদেরদু-জনের আনন্দ তো শিক্ষা, অর্থ, যশ, ক্ষমতা কিছু দিয়েই সমান করা যাবে না। যৌবন যার চলে গেছে, শুধু সে-ই জানে, যৌবনের সম্পদের কথা।
একটি দীর্ঘশ্বাস পড়ল গামহার-এর।
—কী হল তোমার?
চিকু বলল।
—হয়নি কিছুই। ওদের দেখছিলাম। সুখের সংজ্ঞা যেন। না?
—যা বলেছেন গামহারদা।
ঝাঁঝি বলল।
এই আদিবাসীদের সারল্য, তাদের সহজে খুশি হওয়ার ক্ষমতা, তথাকথিত দারিদ্র্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা, যদি আমাদের থাকত!
চিকু বলল, কিন্তু আমরা তো ওদের মূর্খ মনে করে, ওদের জিনস পরিয়ে, সোলার পাওয়ার টিভি বসিয়ে পঞ্চায়েতে পঞ্চায়েতে, আমাদের-ই মতো ‘সভ্য’ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। হাউ ইডিয়টিক।
তারপর বলল, তোমাদের একটা বই পড়তে দেব। পড়ে দেখো।
—কী বই?
—‘Savaging The civilized.’ পড়ে খুব আনন্দ পাবে।
—দিয়ো।
—ওই যে, সামনে টিলার ওপরে একটা ছোট্টবাংলো দেখা যাচ্ছে ওটার নাম কী চিকুদা?
—ওটার নাম ‘ন-আনা’। এই যে-উপত্যকা পেরিয়ে এলাম, এর নামও ন-আনা। পাহাড়ের নীচে একটি ছোট্টবস্তি আছে। তার নামও ন-আনা।
—এরকম নাম কেন?
—পুরো সিমলিপাল-ই তো ময়ূরভঞ্জের রাজার Shooting preserve ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ময়ূরভঞ্জ একটি করদ রাজ্য ছিল। ওড়িশাতে এরকম অগণ্য করদ রাজ্য ছিল।
—যেমন?
—যেমন, ময়ূরভঞ্জ, ঢেনকানল, বৌধ, শোনপুর, কালাহাণ্ডি, পারিকুত, কেওনঝরগড়, নুয়াগড়, দশপাল্লা, আরও কত, এখন নাম সব মনে আসছে না। তা এই ন-আনার নাম ন-আনা হয়েছে, কারণ ময়ূরভঞ্জের রাজাকে এদের বছরে ন-আনা খাজনা দিতে হত।
—তাই?
—তাই!
—এখানে জলের খুব কষ্ট ছিল আগে। নীচে একটা কুয়ো ছিল। সেই কুয়ো থেকে চৌকিদারের সব প্রয়োজনের জন্যেই জল বয়ে নিয়ে যেতে হত ওপরে। তাই খুব কম ট্যুরিস্ট-ই থাকতেন এখানে। এখন নীচে একটি ডিপ টিউবওয়েল করে দিয়েছেন সরকার। তার জলও ভারি মিষ্টি। চলো, খাওয়াব তোমাদের সে-জল।
—আর কতক্ষণ লাগবে জোরাণ্ডা পৌঁছোতে আমাদের?
—মিনিট পঁয়তাল্লিশ।
—বা:।
ঝাঁঝি খুশি হয়ে বলল।
—খাবে নাকি জল?
—ভালো?
—বললাম-না, অমৃত। চলো, জল খেয়ে নিই।
ওরা তিনজনেই নামল। সকলের শেষে ঝাঁঝি যখন টিউবওয়েল থেকে জল খেল, তখন চিকু পাম্প করছিল আর গামহার পাশে দাঁড়িয়েছিল। পাছে শাড়ি ভিজে যায় তাই শাড়িটা একটু তুলে নিয়েছিল ঝাঁঝি। গামহার ওর পা দেখে ভালো লাগাতে মরে গেল। কী সুন্দর পায়ের গোড়ালি আর পাতার গড়ন। লাল টুকটুকে। বাঁ-পায়ের মধ্যমাটি অন্য আঙুলের চেয়ে বেশি লম্বা। গামহার-এর এক জীবন-অভিজ্ঞ বন্ধু বলত যে, যে-মেয়েদের পায়ের মধ্যম আঙুল বড়ো হয়, তারা খুব কামুক হয়। গামহার শুনে বলেছিল ‘একে মায় রাঁধে না, তপ্ত আর পান্তা’।
সামনে ঝুঁকে, নীচু হয়ে জল খাচ্ছিল ঝাঁঝি। তার স্তনদ্বয় মেরুন-রঙা ব্লাউজের মধ্যে পদ্মর মতো ফুটেছিল। সামনে ঝুঁকলে যে-মেয়েদের স্তনের সৌন্দর্য বেড়ে যায় অনেক, তা পঞ্চাশ পেরিয়ে এসে হাবা-গবা গামহার এই প্রথম আবিষ্কার করল। সন্ত তুলসীদাস বলেছিলেন, ‘সকল পদারথ হায় জগমাহি, কর্মহীন নর পাওয়াত নাহি’। অর্থাৎ এই পৃথিবীতে সব জিনিস-ই আছে কিন্তু যে-কর্মহীন মানুষ, তার কপালে কিছুই জোটে না। পরম-আশ্লেষে, মুঠিভরে কোনো পূর্ণযুবতীর প্রস্ফুটিত কোমল মসৃণ স্তন-ই যে ধরেনি, তার জীবন-ই বৃথা। গামহার একটা রিয়্যাল হতভাগা। যার নাম জঙ্গলের দামড়া গাছের নামে, যার জীবন গ্রীষ্মর ঊষর নাবাল ভূমির মতো ধু ধু, তার পক্ষে এই পূর্ণ-প্রস্ফুটিত যুগল-পদ্ম দর্শন-ই অনেক পাওয়া। মুহূর্ত কয়েক চোখ ভরে দেখার সঙ্গে সঙ্গে, ঝাঁঝি বাঁ-হাত দিয়ে তার আঁচল ফেলে দিল স্তনযুগলের ওপরে। মেয়েদের ষষ্ঠেন্দ্রিয়তে তারা বুঝতে পারে, কোনো পুরুষের চোখ তাদের শরীরের কোথায় কখন ছোঁয়। লজ্জা অবশ্য ঝাঁঝি অথবা গামহার কেউই পেল না। গামহারকে ঝাঁঝি অপরাধীও সাব্যস্ত করল না। সংস্কারবশেই আঁচলটা ফেলে দিল ঝাঁঝি।
—চলো, এবার।
—আর বেশি দেরি তো নেই পৌঁছোতে। আমাকে দু-মিনিট সময় দেবে? একটা সিগারেট খেয়ে নিতাম।
চিকু বলল।
—গাড়ির কাচ নামিয়েই চলো-না। এখন তো গরম নেই। এ সি চালানোর দরকার কী?
—তা নেই। তবে লাল ধুলোয় ভরে যাবে গাড়ি।
—যাক-না চিকুদা। রঙে রঙে ভরে যাক গাড়ি, আমাদের মন, সব।
—বা:। নেশা ধরে গেছে মনে হচ্ছে।
ঝাঁঝি বলল, সাতসকালে নেশা! কীসের?
তার চেয়ে বলো জীবনের নেশা, যৌবনের নেশা। এমন নেশা কি আর আছে? প্রথমবারেই বুঝেছি এসে!
ঝাঁঝি বলল।
—মাঝেমাঝেই মনে হচ্ছে কী জান, রবীন্দ্রনাথ ছাদের টবে জুঁই-টগর-রজনিগন্ধা আর শান্তিনিকেতনের শাল, বকুল, পারুল, পিয়াল আর খোয়াই দেখেই বসন্তের যা-প্রশস্তি করে গেলেন তাঁর গানে গানে, জোব্বা-মুড়ে তাঁকে একবার এই সিমলিপালে বা অন্য কোনো গভীর বনে একবার নিয়ে এসে ফেলতে পারলে, আমরা কী-যে পেতে পারতাম ওঁর কাছ থেকে তা ভাবলেও রোমাঞ্চ লাগে। যে-কবি, যে-লেখক, যে-শিল্পী এই বনময় ভারতবর্ষকেই না দেখলেন, না অনুভব করলেন বুকের মধ্যে, তাঁর জীবন-ই বৃথা।
গামহার বলল।
চিকু বলল, অনেকের কাছে এই বন আবার শুধুই ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার আতঙ্ক। তাঁরা বলেন, খারাপ রাস্তা, কোনো বাংলোতে কমোড নেই, খাওয়া-দাওয়ার সুখ নেই, চৌকিদারেরা ভালো বাবুর্চি নয়, তদুপরি ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া! এখানে কোনো ভদ্রলোকে আসে! না, আসা উচিত তাঁদের?
—ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয় বুঝি এখানের মশার কামড়ে?
ঝাঁঝি বলল।
—হয় বই কী! প্রতিবছর-ই সিমলিপাল থেকে ফিরে গিয়ে কিছু বনপ্রেমী মারা যান-ই ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়াতে। এ সুন্দরী বড়োই বিপজ্জনক।
—বলো কী চিকু? তাহলে আমাদের কী হবে? তবে সুন্দরীমাত্রই তো বিপজ্জনক!
গামহার চিন্তিত গলায় বলল।
—আমাদের মধ্যেও কেউ কেউ টেঁশে যেতে পারি।
—তবে?
—তবে আবার কী! কণ্ডোমহীন নিবিড় সংগমের সুখটা সুখ নয়, শুধু এইডস-এর কষ্টটাই কষ্ট? যতসব গোলমেলে কথাবার্তা। এমন সুন্দর বাসন্তী-বন-এর আনন্দর পরে যদি ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়াতে মরতেও হয় তাহলেও দুঃখের কী আছে? আমরা বেঁচে থেকেই-বা পৃথিবীতে কোন উপকারটা করছি?
—জন্মালে তো মরতে হয়ই। কে কী করে মরল তার ওপরেই সব নির্ভর করে। গুডি, গুডি বয়কেও মরতে হয়, নটি-নটি বয়কেও তাই। নটি-নটি বয়, এই জীবনের অনেক দিক দেখে যায়। মৃত্যু তাকে মাকড়সার জালে পড়া পোকার মতো ধীরে ধীরে গ্রাস করে না, সে নিজে এগিয়ে গিয়ে, ‘নাইস ট্যু মিট ইউ’ বলে, মৃত্যুর সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করে। আমরা গুডি-গুডি নই, নটি-নটি।
সিগারেটটা শেষ করে গাড়িতে বসে এঞ্জিন স্টার্ট করে ন-আনা ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পরে জঙ্গলের মধ্যে একটা বাঁক নিতেই পেছন থেকে ঝাঁঝি চিৎকার করে উঠল, ওমা, ওমা, চিকুদা। দাঁড়ান। দাঁড়ান। দেখি!
চিকু গাড়ি থামাল।
একদল লাল প্রজাপতি পথের ওপরে ন-দশ ফিট উঁচুতে দল বেঁধে উড়ছে। সকালের রোদ তাদের ফিনফিনে লাল ডানাতে পড়ায় রং প্রতিসরিত হচ্ছে দু-পাশের জঙ্গলে।
লাল তিতলি।
স্বগতোক্তি করল চিকু।
যতক্ষণ প্রজাপতিগুলো পথের ওপরেই থাকল, গাড়ি দাঁড় করিয়েই রাখল চিকু। তারপরে আকাশ লাল মেঘে ঢেকে দিয়ে শূন্য থেকে ঝুলতে ঝুলতে, দুলতে দুলতে তারা বাঁ-দিকের বহুরঙা বনের ভেতরে ঢুকে গেল।
—কী সুন্দর!
স্বগতোক্তি করল এবারে ঝাঁঝি।
চিকু বলল, লাল-তিতলি পেতনির দূত।
—সে আবার কী কথা?
—তুমি কোজাগর পড়োনি?
—না তো!
—তবে যে, হারিত সেই লেখককে এত গালাগালি করল তোমার মাখা বিগড়ানোর জন্যে?
ঝাঁঝি বলল, ওই বইটি তো পড়িনি। গিয়েই পড়ব।
‘কোজাগর’-এ লাল তিতলিকে এক আধি-ভৌতিক ব্যাপার-স্যাপারের প্রতীক হিসেবে এনেছেন লেখক এ-উপন্যাসে।
সকাল-সন্ধেতে এই এপ্রিলের গোড়াতে এখানে এখনও ঠাণ্ডা। তবে এখন বেলা বেড়েছে। ঝকঝক করছে রোদ। শীতের ‘শ’ও নেই।
জোরাণ্ডা বাংলোর হাতাতে সামনের দিকে খাদের পাশে একটি গোল ঘর করা আছে। চারদিক খোলা। মাথাতে ছাতার মতো ছাদ। নীচটা বেদির মতো করে বাঁধানো। তার ওপরে চেয়ার-টেবিল পাতা।
এখন বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে। ওরা ওই ঘরটিতেই বসেছিল। চৌকিদারদের খবর দেওয়া হয়েছে। হারাধনের দশটি ছেলের আরও তিনটি আজ দুপুরে যাবে। মুরগির ঝোল আর ভাত আজও হবে দুপুরে। রাতে খিচুড়ি। খিচুড়ি, বেগুন ভাজা আর আলু ভাজা।
হারিত বোতল-টোতলগুলোও বের করে আনল। জলের বোতলও। তারপর যে, স্কচ-এর বোতল থেকে চিকু গামহারকে পরশু রাতে দিয়েছিল এবং গতরাতেও, সেই বোতলটি এনে একটি পাতিয়ালা পেগ ঢালল নিজে।
চিকু বলল, আমি দিনের বেলাতে খাই না কিছু।
হারিত বলল, গামহারদা কি খাবেন?
—না খেলেই হয়। খালি পেট। তা ছাড়া বলেইছি তো আমার তেমন অভ্যেস নেই।
—কিছু তো করার নেই। তাই...
হারিত বলল।
—আগে জানতাম, ‘নাই কাজ তো খই বাছ’। এখন দেখছি ‘কাজ নাই তো মদ খাই’।
চিকু বলল, আমি রান্নাঘরে গিয়ে গামহারদা আর মেয়েদের জন্যে কিছু খাবার করে নিয়ে আসি। সকলেই ওমলেট খাবে তো?
ঝাঁঝি বলল, এতদিনে বুঝলাম চিকুদা, তোমাকে মেয়েরা এত ভালোবাসে কেন?
—কেন?
—আমি তো জানতাম রান্নাঘর মানেই মেয়েরা, তা তারা যত সফিস্টিকেটেড আর ওয়েল-অফ-ই হোক না কেন! ঢেঁকিদের স্বর্গে গিয়েও ধান ভানতে হয়। তুমি সত্যিই ব্যতিক্রমী পুরুষ।
জারুল বলল, তোমরাই তো পুরুষদের মাথাটি খেয়েছ ঝাঁঝি। আমি কি পারি না, যা চিকু পারে? আমিও গাড়ি চালিয়ে আসতে পারতাম চিকুকে পাশে বসিয়ে। আমি রান্না করতে জানতে পারি তো চিকু বা হারিতরাই বা জানবে না কেন?
—হারিতও খুব ভালো রান্না করতে পারে।
ঝাঁঝি বলল।
—তাহলে হারিতদাও যাও। চিকুকে সাহায্য করো গিয়ে একটু।
—তুই চুপ কর তো।
চিকু বকে দিল জারুলকে।
তারপর ঝাঁঝি বলল, ও রাঁধে ভালো কিন্তু নিরুপায় হলেই রাঁধে কিংবা স্ট্যাগ-পার্টির পিকনিক-এ।ধারে-কাছে মহিলারা থাকলে রান্নাঘরে ঢুকতে ওর পৌরুষে বাধে।
হারিত কথা না বলে পাতিয়ালা পেগ-এ একটি চুমুক দিয়েই সেটাকে ক্লাব-পেগে নামিয়ে আনল।
—আপনি রান্না করতে পারেন, গামহারদা?
ঝাঁঝি জিজ্ঞেস করল গামহারকে।
গামহার লজ্জিত হয়ে বলল। পারি, মানে, ওমলেট আর চা করতে পারি। তাও ইলেকট্রিক স্টোভে। গ্যাস জ্বালতে পারি না আমি।
চিকু বলল, ওগো আমার নেকুপুষুমুনু দাদারে।
ঝাঁঝির গামহার-এর এই অকপট স্বীকারোক্তি খুব ভালো লাগল। আহা। তোমাকে রান্নাঘরে যেতেই হবে না। তুমি রান্নাঘরে যাবেই বা কেন? কোন দুঃখে।
মনে মনে বলল ও।
সিমলিপালে আসবার আগেই গামহার সম্বন্ধে অনেক কিছু শুনেছিল, চিকু, জারুল আর কিছু হারিতেরও কাছে। সব-ই ভালো ভালো কথা। মানুষটি ভালো কি না বলতে পারবে না কিন্তু ভারি ছেলেমানুষ যে, তা বুঝেছে ঝাঁঝি। নিষ্পাপ। এমন ইনোসেন্ট পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষ ও জীবনে দেখেনি। আজকালকার পনেরো বছরের ছেলেরাও গামহার-এর চেয়ে বেশি জানে। একতাল কাদা হাতে পেলে সব মেয়ের-ই ইচ্ছে করে, একটি সুন্টুনি-মুন্টুনি পুরুষপুতুল বানাতে।
চিকু উঠে চলে যাওয়ার আগে, মুখ ঘুরিয়ে হারিতকে বলল, স্কচটা এনেছিলাম দাদার জন্যে। পুরো শেষ করে দিয়ো না। তুমি তো রাম-এর পার্টিভাই। গাল দেখলেই কি টিপতে ইচ্ছে করে?
—ও সরি! সরি!
লজ্জিত হয়ে বলল হারিত।
ঝাঁঝিও উঠে পড়ল। বলল, যাই! চিকুদাকে একটু সাহায্য করি গিয়ে।
জারুল কিছু না বলে উঠে-যাওয়া ঝাঁঝির দিকে চেয়ে থাকল পেছন থেকে। হঠাৎ-ই ওর মনে হল ঝাঁঝির ফিগারটা যে, এতভালো তা আগে খেয়াল করেনি। অন্য সব ব্যাপারেই চিকুর মতো ছেলে হয় না। কিন্তু এই একটা ব্যাপারেই তাকে বিশ্বাস করা যায় না। হনুমানে যেমন খেয়াল হলেই গাছের এ ডাল ছেড়ে অন্য ডালে ঝাঁপায়, চিকুও তেমনি এক নারী ছেড়ে অন্য নারীতে। ওর জীবনে জারুল সম্ভবত চোদ্দো কী পনেরো নম্বর হবে। চিকুর যা বয়স, তা বিবেচনা করে বলা চলে যে, ওর সমবয়েসি কোনো জেনুইন হনুমানও এতবার ডাল-বদল করেনি।
রান্নাঘরটাকে এখান থেকে দেখা যায়। তবে ভেতরটা অন্ধকার। তা ছাড়া, চিকু তো জারুল-এর বিবাহিত স্বামী নয়! আইনের জোর, সমাজের জোর তো কিছু নেই। শুধুই ভালোবাসার, ভালোলাগার জোর-এর বিনিসুতোর মালায় গাঁথা ওদের সম্পর্ক।
ভাবনাটা জারুলের মনে আসতেই, নিজেকে বকল খুব-ই জারুল। জোর করে হয়তো কারওকে জীবনের কোনোক্ষেত্রেই ধরে রাখাও যায় না, যদি ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা না থাকে একে অন্যের প্রতি। সে-সম্পর্ক দাম্পত্যর-ই হোক কী উকিল-মক্কেলের। ও-ও তো ফেলনা নয়। পরনির্ভর নয়। ওকেও তো কম পুরুষ আজ অবধি শরীর-মনে প্রার্থনা করেনি। তবে তারও এই হীনম্মন্যতা কেন? ও তো সাধারণও নয়!
তারপর-ই ভাবল যে, এটা হীনম্মন্যতা নয়। এটা অধিকার হারানোর আশঙ্কা। ক্লিওপেট্রাও হয়তো সিজার-এর সম্বন্ধে এমন ভাবনাই ভাবতেন বা লায়লাও মজনু সম্পর্কে। একজন চিরন্তন নারী তো রয়েইছে তার মধ্যে, সে যতই আধুনিকা হোক না কেন! ‘লি’ বা ‘হফম্যান’-এর জিনস আর ‘উইকএণ্ডার’ বা ‘প্যান্টালুন’-এর পোশাক তার বহিরঙ্গর খোল-নলচে পালটে দিয়ে থাকতে পারে, তার অন্তরঙ্গর নারীকে বদলাতে হয়তো আরও অনেক যুগের বাহারি ছেলেপনার প্রয়োজন হবে। অথবা, এমনও হতে পারে যে, ততদিনে নারীরা স্বমহিমাতে তাদের পুরোনো মাতৃরূপে, জায়া-রূপে বা প্রেমিকা-রূপেই ফিরে আসবে তাদের শালীনতম পোশাক, শাড়ি পরে, যেমন ফিরে এসেছে অনন্ত আর বাজুবন্ধর মতো পুরোনো গয়নার ফ্যাশান।
গামহার, সুন্দরী জারুল-এর দিকে চেয়ে ভাবছিল যে, টম-বয় কাট-এ চুল কাটা, জিনস আর উইকএণ্ডারের আটটি পকেটঅলা জামা পরা জারুলকে হয়তো, একটিও পকেট না-থাকা শাড়িতে, কোমরে চাবির গোছা ঝুলিয়ে, কপালে বড়ো সিঁদুরের টিপ পরে, পায়ে আলতা দিয়ে, চোখে কাজল দিয়ে এর চেয়েও অনেক অনেক-ই বেশি সুন্দরী দেখাত। হয়তো! হয়তো!
গামহার বলল, এই ‘জোরাণ্ডা’ নামের ইতিবৃত্ত শুনলাম আসতে আসতে চিকুর কাছে। তোমরা কি জান?
—না তো! জোরাণ্ডা ইজ জোরাণ্ডা। বহুদিন থেকেই বহু-জনার মুখেই শুনে আসছি। তার আবার ইতিবৃত্ত কী?
নবেন্দু বলল।
এই নবেন্দু ছেলেটাকে প্রথমদর্শনেই ভালো লাগেনি গামহার-এর। আজ সকালে চাহালাতে ওর প্রাণের বন্ধু হারিত ঝাঁঝির সঙ্গে এমন খারাপ ব্যবহার করল, তা দেখেও ও হারিতকে কিছুই বলল না, তা লক্ষ করে অবাক এবং দুঃখিত হয়েছিল গামহার। কে জানে! ও হয়তো ভুল। যেহেতু ওর মনে হয়েছে যে, নবেন্দু ঝাঁঝিকে ভালোবাসে এবং যেহেতু গামহার-এরও প্রথমদর্শন থেকেই ঝাঁঝিকে ভালো লাগতে শুরু করেছে, সেইজন্যেই হয়তো ওর এত অপছন্দ হচ্ছে নবেন্দুকে। বেচারি নবেন্দু। কত কষ্ট করে প্রাণ বিপন্ন করে গাড়ি চালিয়ে ঝাঁঝিদের বিপদ শুনে দৌড়ে এসেছে এত দূরে নিজের কাজ নষ্ট করে।
একথা মনে হতেই মনে মনে খুব বকল গামহার নিজেকে। আসলে, গামহার কল্পনাতেও কারওকে কষ্ট দিতে চায় না। অন্যকে ভুল করে কষ্ট দিলে, সে-কষ্ট তার মনে দশগুণ হয়ে ফিরে আসে। তবে যেক্ষেত্রে ও কোনো মানুষকে খারাপ বলে জেনে নিশ্চিত হয়েছে, সেই মানুষকে আঘাত দিতে ওর একটুও বাজে না। চাইনিজ দার্শনিক কনফ্যুসিয়াস বলেছিলেন, ‘If you pay evil with good what do you pay good with?’ অপর মানুষের ‘খারাপত্ব’ সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হতে অবশ্য অনেক-ই সময় নেয় গামহার। পাছে ভুল করে, তাই।
গামহার বলল, জানেন নবেন্দুবাবু, পথে চিকু আমাকে আত্মদর্শন করাল।
—আরে দাদা। সকলকেই যখন ‘তুমি’ বলছেন তখন আমাকে আবার আপনি কেন? কী-এমন অপরাধ করলাম আমি!
গামহার হেসে বলল, ঠিক আছে। তুমিই বলব।
—তা আত্মদর্শনটা কীরকম?
গামহার ওদের বলল, বিস্তারিত।
হারিত বলল, অ্যাকসিডেন্ট হল বলেই সব গোলমাল হয়ে গেল।
—সব ভালো যার শেষ ভালো।
গামহার বলল।
—বুঝলেন গামহারদা, আসলে কাল রাত অবধিও ঠিক বুঝতে পারিনি, পরশু শেষরাতে কী ঘটতে যাচ্ছিল। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। আজ ভোর থেকেই আমার হাত-পা ছেড়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছে। তখন থেকেই মেজাজটা বিগড়ে ছিল। ভয়টা আর শকটা এতদেরি করে যে, কখনো আসতে পারে, তা আমার জানাই ছিল না। কিছু মনে করবেন না গামহারদা, আপনার জন্যে আনা ভালো জিনিস আমি অভদ্রর মতো খেয়ে ফেললাম বলে।
—তাতে কিছুই হয়নি। কিন্তু খালি পেটে কেন?
—আর পেট! পেট তো এতক্ষণ লাশকাটা ঘরে ফর্দাফাঁই হয়ে যেত। পেট-ই থাকত না, তার খালি আর ভরতি। পুনর্জন্মটা সেলিব্রেট করব আজকে রাতে। দুপুরে মুরগির ঝোল-ভাত খেয়েই ঘুম লাগাব একটা। সেইজন্যেই জেনেশুনেই দিনমানেই মাতাল হচ্ছি।
—তাই বলো। আমি ভাবছিলাম, মাতাল হওয়ার জন্যে এতকষ্ট করে প্রাণ বিপন্ন করে এতদূরে আসা কেন? মাতাল তো কলকাতা শহরেই হওয়া যেত সহজেই, তোমার মহীন না কোন বন্ধুর বাড়িতে তাস খেলতে যেতে তুমি, সেখানেও।
হারিত বলল, এখনও তো ব্রেকফাস্ট-ই হয়নি। তোড়জোড় সব শেষ হোক। দুপুরে খেতে খেতে তিনটে চারটে তো হবেই।
—আমি ততক্ষণে বরং একটু ঘুরে ঘুরে দেখি জঙ্গল। জঙ্গলেই আমার নেশা একেবারে পুরো হয়ে গেছে। খাদ্য-পানীয় কিছুমাত্র না হলেও চলবে।
গামহার বলল।
—একা যাবেন না দাদা। সেটা ঠিক হবে না। জঙ্গল সুন্দর যেমন, বিপজ্জনকও বটে। চিকু অথবা জারুল কারওকে সঙ্গে নিয়ে যান। হাতিতে তো যখন তখন ফুটবল খেলতেই পারে। তা ছাড়া কখন ভাল্লুকে নাক খুবলে নেবে, কী শঙ্খচূড় সাপে দূর থেকে তেড়ে এসে মাথায় ছোবল মারবে বা বাঘ গালে থাপ্পড় কষাবে কে বলতে পারে! সেবা শুশ্রূষা করার জন্যে নিদেনপক্ষে একজন লোকও তো চাই!
নবেন্দু বলল।
বাঘ-ই যদি গালে থাপ্পড় মারে, তো সেবা আর কারওকে করতে হবে না। ধড় থেকে মুন্ডুই আলাদা হয়ে যাবে। শুনেছি, শঙ্খচূড়ে ছোবল মারলে পাহাড়ের মতন হাতিও মরে যায়, আর মানুষ! আর ভালুকে যা করে, তা আমি নিজচোখেই একবার দেখেছিলাম বন্ধুদের সঙ্গে তিলাইয়া ড্যামে বেড়াতে গিয়ে সেখান থেকে রজৌলির ঘাটের জঙ্গলে চড়ুইভাতি করতে গিয়ে। সে-দৃশ্য মনে করলে আমার অন্নপ্রাশনের ভাত-ই উঠে আসে।
—তাহলে বাংলোর হাতাটাই একটু ভালো করে দেখি।
—তা দেখুন। হারিত আর আমি একটু নিজেদের ভোলাই। আপনি আত্মদর্শন করে এলেন, আমরা আত্ম-বিস্মরণ করি।
নবেন্দু বলল।
গামহার উঠে গেলে হারিত বলল, চিকুর যত কান্ড। সঙ্গে এক বুড়ো ঢ্যামনা সাপ নিয়ে এসেছে। এইসব সাহিত্যিক-শিল্পী-গাইয়ে দেখলেই আজকাল রক্ত মাথায় চড়ে যায়। দুর্বুদ্ধিজীবী অ্যাণ্ড কোম্পানি।
—তুই চিকুর ফোন পেয়ে কী ভেবেছিলি?
—কী আর ভাবব? হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এসেছিল। পরশু রাতে রশিদ খাঁ-র গান শুনতে গেছিলাম জয়ন্তদার বাড়িতে।
—ও।
—মেঘমল্লার গাইল। তাড়াহুড়োতে গাইল বটে কারণ পন্ডিত ভীমসেন যোশীজি অপেক্ষা করছিলেন তারপরে গাইবেন বলে। তবুও দুর্দান্ত গেয়েছিল। রশিদের গলার কোনো তুলনা নেই। মেঘের মতো গলা। এমন গলাতেই ‘মেঘমল্লার’ গাইতে হয়।
—সামনে তো পুরোজীবন পড়েই আছে।
—রশিদ খাঁর গান শুনেই চলে এলি? যোশীজিকে শুনলি না?
—আরে শুনলাম বই কী। তাই তো অতদেরি হল। রাত দেড়টাতে বাড়ি ফিরেছি জয়ন্তদার বাড়িতেই খাওয়া-দাওয়া সেরে। বাড়ি ফিরে স্নান করলাম গরম জলে। নইলে ঘুম আসে না। তারপর শুতে শুতে প্রায় আড়াইটা। আর ঠিক ছ-টার সময়ে চিকুর ফোন। ভালো করে মুখ ধোওয়ারও সময় পাইনি।
—একটু চুপ করে থেকে বলল, বেচারা হরভজন! কাল ছুটি চেয়ে রেখেছিল অনেকদিন আগে থেকেই। ওর চাচেরা ভাইয়ের বাড়ি যাবে কী অনুষ্ঠানে নৈহাটিতে। সে তো সেজন্যে সাতসকালে উঠে চানটান করে তার কোয়ার্টারে ‘প্রীত ভইল মধু বনোঁয়া রামা, তোরা মোরা’ গাইতে গাইতে জামাকাপড় পরে ট্রেন ধরতে বেরোচ্ছিল। আমি গিয়ে প্রায় অ্যারেস্ট করে গাড়িতে ওঠালাম। বেচারা দুঃখে মরে যায় আর কী! কী করে ওকে মানাই? আমি তোদের দু-জনকেই মেরে দিলাম।
—মেরে দিলি মানে?
—মানে, মেরে দিলাম। হরভজনের দুঃখ লঘু করার জন্যে বললাম তোরা দুজনেই খতম হয়ে গেছিস মুখোমুখি ট্রাকের সঙ্গে ভিড়িয়ে।
হারিত বলল, সত্যি! কী করে বাঁচলাম বল তো? এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
—আচ্ছা কাল এসব প্রসঙ্গ ওঠালি না কেন?
—সত্যি কথা বলতে কী, সাহস পাইনি।
—তাই?
—সত্যি বলছি।
—আর ঝাঁঝি? তোর গার্লফ্রেণ্ড? কী মেয়ে মাইরি!
হারিত বলল।
—কী মেয়ে? কেন? শি ইজ আ ভেরি ব্রেভ গার্ল। অন্য কেউ হলে তো এখনও হাপুস নয়নে কেঁদেই যেত কী হতে পারত তা ভেবে। শি নেভার লুকস ব্যাক ইন লাইফ।
—পাথরে তৈরি না প্ল্যাটিনামে, কিছুই বুঝতে পারলাম না আজও।
ওড়িশাতে ঢুকে ভালোরাস্তাতে পড়ামাত্রই ঝাঁঝি বলেছিল, অ্যাকসিডেন্ট কিন্তু ভালো রাস্তাতেই হয়। ঘুমিয়ে পোড়ো না।
আমি বলেছিলাম, তুমি গল্প করো। অথবা ঘুমোও। তোমার যা খুশি। ড্রাইভিং-এর ব্যাপারে কারও কাছ থেকে কোনো জ্ঞান শুনতে আমার ভালো লাগে না।
ঝাঁঝি বলল, পাঁচ বছর বিয়ে হয়ে গেছে। ঝগড়া ছাড়া কথা নেই। দুটো কথার পর-ই তো ঝগড়া লেগে যাবে। চুপ করে থাকাই ভালো। আর গল্পই যদি করতে বলো, তো তোমার মায়ের নিন্দা করতে পারি।
আমি বললাম, চুপ করো।
—যাকগে। আমি তবে ঘুমোলাম। ঘুম পেলে বোলো কিন্তু। ঘুম ঘুম পেলেও গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিয়ো পথের পাশে।
বললাম, জ্ঞান দিয়ো না। তুমি কি ড্রাইভিং জান?
—শিখিয়েছ কি, যে জানব? তোমার বাবা তো অনেক ঝেড়ে-বেছে, পড়তি ঘর থেকে মেয়ে এনেছিলেন যাতে শত অত্যাচারেও মুখ বুজে থাকি। আমার বাবার তো গাড়ি ছিল না যে, শিখে আসব। তুমিও যা কেপ্পন। কতদিন বললাম যে, আমাকে একটা লাল ছোটো মারুতি কিনে দাও। তা নয়। সব চাড্ডাকানটেন্ট-ই কি তোমার-ই মতো কেপ্পন?
—তারপর অ্যাকসিডেন্টটা কী করে হল তাই বল। তোদের বস্তাপচা পুরোনো ঝগড়ার কথা শুনতে চাই না।
—কী করে হল, কখন হল কিছুই বুঝলাম না রে ব্রাদার। একটা প্রচন্ড ঝাঁকুনি। তারপর-ই দেখলাম গাড়িটার মুখটা ডানদিকে রাইট অ্যাঙ্গেলে ঘুরে গেছে আর পেছনটা ঠেকে রয়েছে একটা ইয়া-মোটা গাছে। তখন তো অন্ধকার। রাস্তার একপাশে যে-জঙ্গলময় পাহাড়, অন্য পাশে ঝাঁটি জঙ্গলে ভরা মাঠ তাও জানি না।
ঝাঁঝি নিশ্চয়ই অজ্ঞান হয়ে গেছিল ভয়ে!
নবেন্দু জিজ্ঞেস করল।
—অজ্ঞান? তাহলে আর বলছি কী? সে ফার্স্ট সেন্টেন্স বলল, গেল আমার কাচের চুড়ি ক-টা।
আমি বললাম, আমার নতুন গাড়িটা! টোটাল লস। পাঁচ লাখ দিয়ে কেনা।
ও বলল, তোমার ভাব দেখে মনে হচ্ছে গাড়িটা থেকে গিয়ে, বউটা গেলেই ভালো হত!
গামহার অবাক হয়ে জোরাণ্ডা বাংলোর বাঁ-দিকের গিরিখাদের পাশের বাঁশের বেড়ার সামনে দাঁড়িয়েছিল। কালোরও যে, কত ছায়া হয়, তা এই গিরিখাতের চারদিকের পাথরের দিকে চেয়ে একজন আর্টিস্টের চোখ দিয়ে বোঝবার চেষ্টা করছিল। আড়াই-তিন হাজার ফিট সোজা খাড়া নেমে গেছে খাদ, নীচে, সবদিকেই। তার চারদিক-ই এমন খাড়া যে, মানুষ তো দূরস্থান, পাখিরও পা রাখার জায়গা নেই। অশান্ত ঝরঝরানি শোনা যাচ্ছে জোরাণ্ডা ফলস-এর। বহুনীচে গিয়ে পড়ছে সে-জল। তবে প্রপাতের উৎসটি বাংলোর দিক থেকে ভালো দেখা যায় না। নীচে দহমতো সৃষ্টি হয়ে রুপোলি ফিতের মতো এঁকে-বেঁকে নদী হয়ে বয়ে গেছে গভীর অরণ্যের বুকে বুকে। একলা পাহাড়ি বাজ উড়ছে গিরিখাদের ওপরে। তার ডানায় সাদা-কালো ডোরা। অন্যদিকে উড়ছে একদল শকুন। তারাও চক্রাকারে। অনেক ওপরে। তাদের কাক বলে মনে হচ্ছে। নীচের বনাবৃত গহ্বরের একই জায়গার ওপরে তারা উড়ছে, গিরিখাদের গভীর তলের সামান্য ওপরে।
এমন সময়ে একজন লোক এসে বলল, বাবু জলখিয়া খাইবাকু আসন্তু। সে বাবুমানে ডাকিছন্তি।
—চলো।
বলল, গামহার।
লোকটি নিশ্চয়ই চৌকিদারদের মধ্যেই একজন হবে। সম্ভবত জুনিয়র চৌকিদার। তাকেই জিজ্ঞেস করল গামহার, শকুনগুলো ওরকম করে উড়ছে কেন ওখানে?
—গুট্টে হাতি মরিলানি।
—কী করে মরল?
—চোরা শিকারিরা মারল দাঁতের জন্যে।
—তারা ধরা পড়েছে?
—তারা কি ধরা পড়ে! এসব কথা ছোটোমুখে মানায় না বাবু। আমার প্রাণও চলে যেতে পারে। এই খাদেই যদি আমাকে আপনি ঠেলে ফেলে দেন তাহলেই তো হল। বন্দুকের গুলিও খরচ করতে হবে না। পরদিন শকুন উড়ছে দেখে কেউ ভাববে, কোনো জানোয়ার মেরেছে বুঝি নীচে বাঘ কী চিতাতে! এই বনপাহাড় বড়োসাংঘাতিক জায়গা বাবু।
—সাংঘাতিক বলছ কেন? এমন সুন্দর জায়গাকে?
—সুন্দরমাত্রেই তো বিপজ্জনক বাবু। তা ছাড়া এখানে দেবদেবীর বাস। ভূতপ্রেতও কম থাকে না। রাত নামার আগে আগেই আমরা দুয়ার দিয়ে শুয়ে পড়ি। আপনারা দু-একদিনের জন্যে শখ করে বেড়াতে আসেন, আপনাদের ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু যারা বারোমাস থাকে তারা সৌন্দর্যের কিছু দেখে না।
গামহার ভাবল, যাদের চোখ নেই, তারা দু-দিন থাকলেও দেখে না, সারাজীবন থাকলেও না।
—তা রান্নাবান্নার কী হবে আমাদের? তোমরা যদি অত তাড়াতাড়ি চলে যাও?
—পার্টি যতক্ষণ না খাবেন ততক্ষণ তো থাকতে হয়-ই। দিনবেল্বে কিছি ভয় নান্তি কিন্তু রাতিবেল্বে যেমিতি আপন্বমানে খাইবা-পিবা সারিবে, আম্মোমানে চঞ্চল পলাইবি।
—তাই?
—হঁ আইজ্ঞাঁ।
গামহার গিয়ে পৌঁছোতেই চিকু বলল, কোথায় হারিয়ে গেছিলে? ছিন-ছিনারি দেখতে?
—না না বাইরে যাইনি। হারিত আগেই সাবধান করে দিয়েছিল যে, বাংলোর হাতার বাইরে পা ফেললেই নানা বিপদ। তোমার অথবা জারুলের সঙ্গে ছাড়া যেন না যাই এক পা-ও।
—তাই? হারিতও তোমার-ই মতো প্রথমবার এল সিমলিপালে। আর জঙ্গলের কথা ও জানেই বা কী? ডালহাউসি স্কোয়ার-থুরি পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বি-বা-দী বাগের জঙ্গল ছাড়া!
—আরে আজকাল কোনো ব্যাপারেই যে-কেউ কিছু সত্যি জানে, সে নিজের সম্মানজ্ঞান আর অভিমান নিয়ে নিজের ঘরে বসে থাকে যারা কিছু জানে না তারাই দলে নাম লিখিয়ে নিজেদের ঢাক নিজেরা বাজায়। অজ্ঞরাই আজকাল সর্বজ্ঞ। আর সর্বজ্ঞরাই অজ্ঞ। এল ঘোর কলি। বুঝলে কিনা!
—তা যা বলেছ।
নবেন্দু বলল।
চিকু বলল, একটু খেয়ে নাও। তারপর চলো, তোমাকে নিয়ে জঙ্গলে বেরোব জারুল আর আমি।
ঝাঁঝি বলল, আমাকে নেবে না জারুল?
—ইউ আর ওয়েলকাম।
—তোমরা কি কেউ যাবে?
নবেন্দু বলল, জঙ্গলের মধ্যে সেঁধিয়ে গেলেই কি আর জঙ্গল বেশি ভালো করে দেখা যাবে? এইখানে বসেই তো চমৎকার দেখা যাচ্ছে ‘প্যানোরোমিক ভিউ’। ‘আই অ্যাম দ্যা মনার্ক অফ অল আই সার্ভে।’
ওরা সকলে হেসে উঠল নবেন্দুর কথায়।
চিকু বলল, সরি গামহারদা। কিম্ভূত ব্রেকফাস্ট। ক্রিম-ক্র্যাকার বিস্কিট আর ডিমের ভুজিয়া।
—আর চমৎকার ‘লপচু’ চা-এর কথা বললে না!
—ওই হল।
—শাড়ি পরে কি যেতে পারব জঙ্গলে?
ঝাঁঝি বলল।
—পারা তো উচিত। ভারতের নিবিড়তম জঙ্গলের আদিবাসীরা কেউই তো জিনস পরে বলে জানি না। এইসব-ই তোমাদের বাহানা! ধুতি-শাড়ি পরে নাকি অফিস করা যায় না। আগে রণপা চড়ে যেসব বাঙালি ডাকাতি করত তারাও তো মালকোচা মারা ধুতিই পরত, নাকি? ভোম্বল সর্দার বা রঘু ডাকাতেরা গলফ-শু বা জিনস পরত বলেও তো শুনিনি।
—চলো, ডান দিকে যাই।
—চলো।
কয়েক-শোমিটার যাওয়ার পর-ই লালমাটির এবড়ো-খেবড়ো পথের ওপরে একটি শুকনো খড় পড়ে আছে দেখা গেল। ঝাঁঝি আর গামহার আগে আগে যাচ্ছিল। পেছনে চিকু। চিকু হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, দাঁড়াও।
ঝাঁঝি একটু আহত হল। বন-জঙ্গল, চিকুর চেয়ে ও নিশ্চয়ই অনেক-ই কম জানে। কিন্তু দাঁড়িয়ে পড়তে বলার পেছনে একটা আদেশের সুর ছিল। তবু দাঁড়িয়ে পড়ে পেছনে তাকাল ওরা দু-জনেই।
চিকু বলল, দাঁড়াও। সাপটা চলে যাক।
—কোথায় সাপ?
—তোমাদের সামনেই। পথের ওপরে।
—সেকী! ওটা তো একটা খড়।
—খড় আসবে কোথা থেকে? আশেপাশে কি খড়ের গাদা আছে? চারদিকে কাটা খেতে হেমন্তর ধান উঠে গেছে কি এই পাহাড়ে জঙ্গলে? পিছিয়ে এসো। ওটা দেখেই তোমাদের বোঝা উচিত ছিল যে, ওটা খড়ের মতো দেখতে হলেও আসলে খড় নয়।
বলেই, চিকু পথপাশের একটা গাছ থেকে লাঠির মতো একটি শুকনো ডাল ভেঙে নিয়ে হাতে রাখল। তারপর একটা নুড়ি তুলে নিয়ে ওই বস্তুটির কাছাকাছি ছুড়ে মারল। তাকে আহত করার জন্যে নয়, ভয় দেখাবার-ই জন্যে। মুহূর্তের মধ্যে খড়টি মোটা হয়ে গেল, প্রায় পুরুষের পায়ের বুড়ো আঙুলের সমান। এবং হাত দেড়েক দাঁড়িয়ে উঠল ল্যাজ-এ ভর করে। তারপর-ই তার ফণা ছড়াল। ফণাটি কম করে চিকুর হাতের পাতার সমান।
চিকু মরা গাছের ডালটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। সাপটা এঁকেবেঁকে পথ পেরিয়ে ডানদিকে গিয়ে দু-টি পাথরের মাঝখান দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল।
জারুল বলল, কী সাপ এটা? লাউডগার চেয়েও তো সরু মনে হয়, ফণা না-তোলা অবস্থাতে।
—হ্যাঁ। দেখে রাখো ভালো করে। এর নাম ‘কান্বখুণ্টা’।
—‘কান্বখুণ্টা’ মানে কী?
গামহার বলল, ঠিক জানি না। তবে মনে হয় কানখুসকি হবে। কান খোঁচাবার জিনিস।
—এই সাপের মতো বিষধর সাপ ওড়িশার বনে-পাহাড়ে খুব কম-ই আছে। কামড়ালে, সঙ্গে সঙ্গেই পটল তুলতে হবে।
বলেই বলল, চলো, এগোই আমরা।
—কী করে বোঝা যায়, কোন সাপ বিষধর আর কোন সাপ নয়?
—যে-সাপেরা এঁকেবেঁকে চলে তারাই সচরাচর বিষাক্ত হয়। তবে এসব আমার চেয়ে জারুল ভালো জানে।
—ও তো প্রাণীতত্ত্বর-ই ছাত্রী ছিল। ডক্টরেটও করেছে।
—পথটি যেখানে ডান দিকে বাঁক নিয়েছে সেখানে একটি মস্তবড়ো গাছ দাঁড়িয়ে আছে। তার কান্ডে অনেকগুলো ভাগ। যেকোনোটার আড়ালেই কোনো প্রেমিক-প্রেমিকা বসে স্বচ্ছন্দে প্রেম করতে পারে। করলে, সামনের দিক ছাড়া অন্য কোনোদিক দিয়েই দেখা যাবে না তাদের। গাছটার ডালগুলো আশ্চর্য সমান্তরাল। দু-পাশে, দু-হাত সটান ছড়িয়ে দিয়েছে সে। হাতশুধুমাত্র দু-টি নয়। কিছুদূর বাদে, বাদে বিভিন্ন উচ্চতাতে দু-দিকে দু-টি করে ডাল সমান্তরালে ছড়িয়ে দিয়েছে সে। সেই ডালগুলি থেকে উপডাল যে, বেরোয়নি তা নয়, তবে তারা খুব একটা বড়ো নয়। এখন গাছটি প্রায় পত্রশূন্য। সিঁদুরে লাল ফুলে ভরে আছে পত্রশূন্য ডালগুলি আর পথের ওপরে এত সিঁদুরে-লাল ফুল পড়ে আছে যে, মনে হয় গালিচা বিছানো আছে।
চিকু বলল, দ্যাখো গামহারদা। এই গাছের-ই নাম হচ্ছে শিমুল। এ গাছ কলকাতাতেও অনেক আছে, এবং বসন্তে তাদের ডালে ডালে ফুল এমন করেই ফোটে, নীচেও ঝরে পড়ে, কিন্তু কলকাতার মানুষদের ফুল দেখার মন কই?
—কলকাতাতে আছে নাকি এই গাছ? সত্যি?
—অনেক-ই আছে। এবারে দ্যাখো। জানো তো, এই শিমুলের ফুল কোটরা হরিণেরা, মানে বার্কিং-ডিয়ারেরা খেতে খুব ভালোবাসে। বেলা পড়লে সন্ধের আগে আগে এসে, তারা খুব রেলিশ করে এই ফুল খায়।
—এই ‘Relish’ করা শব্দটির মানে জানো চিকু?
গামহার বলল।
—কে না জানে! ক্লাস ফোর-এর ছেলেরাও জানে।
—তোমাদের সময়ের ক্লাস ফোরের ছেলেরা হয়তো জানত। এখনকার বাংলা-মিডিয়াম স্কুলের ছেলেরা জানে না সম্ভবত। আমাদের বাংলা মিডিয়াম স্কুলের মাস্টারমশাই-ই মানেটা বলেছিলেন। বলেছিলেন, ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে মেয়েদের পেছনে শিস দিতে দিতে যেতে যেমন লাগে, তাকেই বলে ‘রেলিশ’ করা।
চিকু আর ঝাঁঝি হেসে উঠল।
গামহার বলল, আচ্ছা চিকু, ব্রতীন বলছিল যে, তোমার নামও নাকি একটি গাছের নামে। ‘চিকরাসি’। সে-গাছ তো এখনও দেখালে না।
চিকু হাসল। বলল, সে গাছ দেখতে হলে আমার সঙ্গে একবার সময় করে পশ্চিমবঙ্গের বক্সার জঙ্গলে যেতে হবে।
তারপরে বলল, তোমরা কেউ জিম করবেট-এর লেখা পড়েছ?
—আমি পড়েছি।
ঝাঁঝি বলল।
—My India পড়েছ?
—পড়েছি।
—বেশ করেছ। তাঁর মতো বড়ো ভারতপ্রেমিক আজকের দেশনেতাদের মধ্যেও খুব কম-ই আছেন। তাঁর ওই বইয়ে উত্তরপ্রদেশের ভাব্বার অঞ্চলের কথা তুমি নিশ্চয়ই পড়েছ।
—পড়েছি বই কী।
—বক্সার জঙ্গলও হচ্ছে ভাব্বার। পূর্ব-হিমালয়ের পাদদেশের। এইসব ভাব্বার অঞ্চলের নানা বিশেষত্ব আছে। তারমধ্যে একটা হচ্ছে এই যে, সেই অঞ্চলের নদীগুলি ভুটান পাহাড় থেকে সমতলে নেমে কিছূদূর যাওয়ার পরেই অন্তঃসলিলা হয়ে গেছে। ওপরে ধুধু বালি। অনেক-ই নীচে জল। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পরে আবার তাদের জলরাশি দৃশ্যমান হয়। যেখানে নদীগুলি ঊষর, সেখানের গাছেদের তাদের শিকড়গুলিকে বহুদূর অবধি নীচে নামিয়ে দিতে হয়। তাদের শিকড়গুলিকে বলে, Tap Roots. সুন্দরবনে আবার অন্য ব্যাপার। মানে, উলটো ব্যাপার। চব্বিশ ঘণ্টায় চারবার জোয়ার-ভাটার খেলা চলে সেখানে। তাই গাছেদের শিকড়েরা গাছের চারপাশে ঝোপের মতো হয়ে থাকে মাটির-ই ওপরে। ভাটির সময়ে যাতে যথেষ্ট হাওয়া ও রোদ পায়। সেই শিকড়দের বলে, Aerial Roots.
গামহার বলল, জানতে চাইলাম চিকরাসি গাছের কথা, আর তুমি তো সাতকান্ড রামায়ণ শোনালে। আমরা কি বটানির ছাত্র?
—ছিলে না। কিন্তু হতে ক্ষতি কি গামহারদা? শেখার কি কোনো সময়-অসময় আছে? যদি শেখার ইচ্ছেটা থাকে, তবে চিতায় ওঠার আগের মুহূর্ত অবধিও শিখে যেতে পারো। আমি তো তাই মনে করি। আর সত্যি বলতে কী, এইসব বিষয়ে যতই জানছি, যতই গভীরে যাচ্ছি, ততই দেখছি যে, কিছুই জানি না।
তারপর বলল, চিকরাসি গাছ তো ও-অঞ্চলে হয় না। যে-অঞ্চলের কথা বললাম, সেই অঞ্চলেইহয়। তাই তোমাকে দেখাতে পারব না এখানে।
—তোমার নাম দিল কে? অমন গাছের নামে?
—আমার বড়োমামা। তিনি আলিপুরদুয়ারের মস্ত ঠিকাদার ছিলেন। কাঠের ঠিকাদার।
—মানে, বলতে কি পারি জঙ্গল-ধ্বংসকারী?
গামহার বলল।
—না গামহারদা।
দৃঢ়তার সঙ্গে বলল চিকু।
তারপর বলল, ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত দেশে আইন-কানুন তবু কিছু ছিল। তখনও আমরা এমন এক-শো ভাগ স্বাধীন হয়ে, নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়ুল মারিনি। তখন জঙ্গলও যথেষ্ট ছিল এবং বনবিভাগও যথেষ্ট সজাগ ছিল। দেশে গিনিপিগের মতো মানুষ বাড়েনি। তখন গাছকর্তন আর বনসৃজনের মধ্যে এক সুষম সামঞ্জস্য ছিল। দেশের জনসংখ্যা যদি সীমিত রাখতে পারতাম আমরা, এত খিদে না থাকত, এত অশিক্ষা, তবে আজ দেশের চেহারাই অন্যরকম হতে পারত।
—গুলি মারো দেশকে। জঙ্গলে বেড়াতে নিয়ে এসেছ, এখন জঙ্গল চেনাও। দেশের কথা নেতারা ভাবুন গে।
—নেতারা তো আমাদের-ই মধ্যে থেকে আসে গামহারদা! আমরা যদি সারমেয় হই তো আমাদের নেতা বড়োবাঘ হবে কোত্থেকে? দেশকে গুলি মারলে, আজ থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরে পরে এই সিমলিপালের মতো বনেও কোনো গাছ আর থাকবে না গামহারদা। বন না থাকলে, আমরাও আর থাকব না। তোমার আমার ঝাঁঝির মতো প্রত্যেক শিক্ষিত মানুষের-ই এ-কথা হৃদয়ংগম করার সময় এসেছে এবং যারা অশিক্ষিত তাদেরও প্রত্যেককে একথা ভালো করে বোঝাবারও সময় হয়েছে। দেশকে ‘গুলি মারার’ চিন্তা কোনো প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের মনে আসা কিন্তু উচিত নয়।
—সরি চিকু। আমার অন্যায় হয়েছে। তোমার আর জারুলের মতো প্রকৃতি-পাগল মানুষের আরও অনেক-ই প্রয়োজন এইমুহূর্তে।
—প্রয়োজনটা বনের কারণে নয়, আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার-ই কারণে গামহারদা।
গামহার ঠিক করল, আর কথা বলবে না। শুধু দেখবে দু-চোখ ভরে। এই আশ্চর্য সুন্দর বাসন্তী প্রকৃতির সব রং-রূপ-গন্ধ, সে তার শিল্পীর চোখ দিয়ে নিংড়ে নেবে। আরও কিছুদূর গিয়ে পথটা যেখানে চড়াই-এর শেষে বেশ উঁচুতে পৌঁছেছে, সেখানে একটা বড়োপাথরে ঝাঁঝিকে সামনে বসিয়ে ভালো করে দেখবে। পটভূমিতে থাকবে সেই আশ্চর্য কালো, আদিম অনন্ত গহ্বর। তার বুকের মধ্যে দিয়ে উৎসারিত-হওয়া জোরাণ্ডা ফলস, দূরের পাহাড়শ্রেণির পর পাহাড়শ্রেণির ছবি। সবুজের কত বিভিন্ন ছায়াতে আঁকা। আর সেই পটভূমিতে লাল, হলুদ, বেগুনি ও আরও কত মিশ্ররঙের বাহার। ‘একলা বসে হেরো তোমার ছবি, এঁকেছি আজ বসন্তি রং দিয়া, খোঁপার ফুলে একটি মধুলোভী মৌমাছি ওই গুঞ্জরে বন্দিয়া।’
—না: ছবিটা আঁকা শুরুই করা গেল না।
গামহার বলল, মনে মনে।....বাগড়ার পর বাগড়া।
দেখতে দেখতে সেই উঁচু জায়গাটাতে পৌঁছে গেল ওরা আধঘণ্টার মধ্যে।
চিকু বলল, বসা যাক এখানে। কী বলো গামহারদা? ঝাঁঝিরা বড়ো ধকল দিল এবারে আমাদের। কী বলো ঝাঁঝি? কলকাতা ফিরে একদিন ভালো করে খাদ্য-পানীয় হবে তো তোমাদের পুনর্জন্ম সেলিব্রেট করবার জন্যে?
—আমি তো রোজগার করি না চিকুদা। তোমার ‘চাড্ডাকান্টেট’ খাওয়াবে কি না বলতে পারছি না। সে মহাকেপ্পন আছে।
—তাই?
চিকু অপ্রতিভ হল। কিন্তু ঝাঁঝি কথাটা বলল, Statement of Fact-এর মতো। একটুও অপ্রতিভ না হয়েই।
গামহার বলল, তাতে কী হল। আমার বাড়িতে হবে পার্টি। নবেন্দুকেও ডাকব সস্ত্রীক।
—শুনলেন না আপনি? নবেন্দুর স্ত্রীর পেট তো কখনোই খালি থাকে না। সে সবসময়েই ফিজিকালি আনফিট, মেনটালি কিইড-আপ। আপনাদের ‘চাড্ডাকান্টেন্ট’-এর অধিকাংশ বন্ধুই ওরকম।
—কিন্তু নবেন্দু তো মনে হল....
গামহার বলল।
কী মনে হল?
—তোমার প্রতি যথেষ্টই দুর্বল।
—তাই? মনে হল বুঝি? আমার তো মনে হচ্ছে, আপনিও আমার প্রতি বিশেষ দুর্বল। এত দৌর্বল্য সামলানো কি আমার একার পক্ষে সম্ভব হবে? কলকাতাতে ফিরে দুর্বলদের সেবা-শুশ্রূষার জন্যে একটি নার্সিংহোম খুলতে হবে দেখছি।
চিকু ফিচিক করে হেসে গামহার-এর দিকে চেয়ে বলল, কেমন বুঝছ গামহারদা? ঝাঁঝিকে? এমন স্যাম্পল কি আগে পেয়েছ কখনো?
গামহার বলল, গলাটা একটু খাঁকরে নিয়ে, দ্যাখো চিকু, একজন আর্টিস্টের জীবনে কিছুই ফেলা যায় না। না! কোনো অভিজ্ঞতাই নয়। চুমু কিংবা লাথি সব-ই লেখকের বা শিল্পীর কোনো-না-কোনো কাজে লেগে যায়-ই। আমি ঝাঁঝির কথাতে মনে করিনি কিছুই।
ঝাঁঝি মুখে কিছু না বলে স্থিরচোখে গামহার-এর মুখের দিকে চেয়ে থাকল।
চিকু কথা ঘুরিয়ে বলল, গামহারদা তোমার মুখে রোদ পড়ছে। একটু পিছিয়ে বোসো।
বলেই, কাঁধ থেকে রুক-স্যাকটা নামাল পাথরের ওপরে।
—এটা কী গাছ চিকু? যেটার নীচে আমরা বসে আছি?
—এটা তিন্তিরি বৃক্ষ।
—মানে?
ঝাঁঝি বলল, তেঁতুল। ‘তিন্তিরি’ সংস্কৃত শব্দ। তাও জানেন না?
কী সুন্দর ছায়া দেখছ না? চিকু বলল।
তারপর বলল, নাও, বিয়ার খাও।
—বিয়ার বয়ে এনেছ নিজে কাঁধে করে?
—তা কী করি। পরের কাঁধ এখানে পাই কোথায়? এতবড়ো নামি আর্টিস্টকে সঙ্গে করে এনেছি, খাতির তো একটু করতে হয়-ই! ফিরে গিয়ে, এই জোরাণ্ডার একটি ছবি আমাকে এঁকে দিয়ো তো গামহারদা।
—দেব। কিন্তু স্যুরিয়ালিস্ট ছবি।
—তুমি যা আঁকবে তাই নেব।
—ঝাঁঝি, তুমি খাবে তো?
—শ্যাণ্ডি করে খেলে ভালো হত। চিকুদা, তোমার মতো আর গামহারদার মতো কম্পানির জন্যেই খাব। আমি এমনিতেও খাই না। কিন্তু....
—কোনো কিন্তু-টিন্তু নয়। এই গরম, শরীরকে খুব-ই ডি-হাইড্রেট করে। সন্ধে নামলেই দেখবে আবার কেমন শীত লাগবে।
—জীবনে কখনো বোতল থেকে বিয়ার খাইনি। খারাপ মেয়েরা কি এমন করেই খায়?
হেসে ফেলল চিকু।
—জানো, তুমি যদি আমার আগে মরো, তাহলে তোমার কঙ্কালটি আমি জাদুঘরে তিমিমাছের কঙ্কালের পাশে ঝুলিয়ে রাখব। তুমি সত্যি বিধাতার এক আশ্চর্য সৃষ্টি। নাও। খুলে দিলাম তোমারটাও।
বলেই, বটল ওপেনার দিয়ে বিয়ারের বোতলটা খুলে দিল। গামহারকেও দিল। নিজেও নিল একটা। তারপর বলল, জঙ্গলে আর গ্লাস-টাস কোথায় পাওয়া যায়! হুইস্কির বোতল থেকেও খেয়ে অভ্যস্ত আমরা। এখানে কাট-গ্লাস এর গেলাস দেখবে কে বলো! ওসবের অধিকাংশই তো প্রয়োজনের জন্যে নয়, দেখাবার-ই জন্যে। আদিবাসীরা তো মহুয়া বা হাঁড়িয়া খায় শালপাতার দোনাতে করে। তাতে কি তাদের নেশা কিছু কম হয় গামহারদা? বাহ্য আড়ম্বর ছাড়ার ‘শিক্ষা’ তাদের কাছ থেকে দেখে যতখানি পেয়েছি, ততখানি আর কোনো কিছু থেকেই পাইনি। বিয়ারে চুমুক দাও। হাওয়া চলতে শুরু করেছে বনে বনে এখন। সেই হাওয়ার সওয়ার হয়ে শুকনো পাতার-ই মতো পেরিয়ে যাও পাহাড়ের পর পাহাড়, সংস্কারের পর সংস্কার, দেখবে তোমার আবারও মায়ের গর্ভে ফিরে গিয়ে নতুন করে জন্মাতে ইচ্ছে করবে। তুমি যে, এই দেশে জন্মেছ, এই দেশে বড়ো হয়েছ, সেইজন্যে তোমার গর্ব হবে।
তারপর বলল, গর্ব যেমন হবে, দুঃখও হবে। এমন সুন্দর একটা দেশের অযোগ্য সন্তান আমরা, এ-কথা বুঝতে পেরে।
ওরা সকলে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। আর চুপ করতেই এই শেষবসন্তের সকালের বন বা'য় হল। কত ফিস-ফিস, কত কিস-কিস, কত ঝির-ঝির, ঝর-ঝর। তার-ই মধ্যে উপত্যকা থেকে পাগলের মতো ‘পিউ-কাঁহা’ ডাকতে লাগল, ক্রো-ফেজেন্ট ডাকতে লাগল পাহাড়ের ওপরের ঘন বনের ছায়াছন্ন গভীর থেকে ‘ঢাব-ঢাব-ঢাব-ঢাব’ করে।
—ওটা কী পাখি?
রসভঙ্গ করে কথা বলল গামহার।
চিকু ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারাতে বলল, পরে বলব।
পাহাড়ের ওপর থেকে ময়ূরও ডেকে উঠল ‘কেঁয়া-কেঁয়া’ করে। এই ডাকটা চেনে গামহার। কারণ সিংহিদের বাড়িতে একজোড়া ময়ূর ছিল।
একটা বড়ো নীল কাচপোকা বুঁ-বুঁ-বুঁই করে উড়ে উড়ে ওদের মাথার ওপরে ঘুরতে লাগল। আহা! গামহার বলল, না-বলে, ‘আমার বনে বনে ধরল মুকুল, বহে মনে মনে দখিন হাওয়া’। পথের লাল ধুলো-ওড়ানো দমক দমক হাওয়াতে মহুল ফুলের গন্ধ ভেসে আসতে লাগল আরও নানা ফুল-পাতার মিশ্রগন্ধের সঙ্গে। গামহার সামনের আদিগন্ত বিস্তৃত বাসন্তী প্রকৃতির ফ্রেমের দিকে চেয়ে, সেই ফ্রেমের কেন্দ্রবিন্দুতে কালো পাথরের ওপরে মেরুন জমির ওপর ছোটো ছোটো সাদা বুটির শাড়িপরা ঝাঁঝিকে বসিয়ে আদিগন্ত রঙের দাঙ্গা-লাগা পাহাড়শ্রেণির দিকে নিশ্চুপে চেয়ে রইল আর চিকুর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল ওর মন। বিয়ারের মুখখোলা বোতলের মধ্যে হাওয়া ঢুকে সিঁসি করে বাঁশি বাজতে লাগল নীচু-গ্রামে। কত কী বিস্ময়ই যে, বাকি ছিল!
ভাবছিল, গামহার।
অথচ সব হাতের নাগালের মধ্যেই ছিল। সকলেই জানে যে, জীবন একটামাত্র। অথচ চিকুকে ছাড়া আর কারওকেই দেখল না যে, সমাজের মুখে থুথু দিয়ে, সেই জীবনকে নিজের করতলগত করে, তা নিয়ে রঙিন কর্বুর মার্বল-এর মতো খেলতে। শুধুমাত্র এই কারণেই তার চেয়ে বয়সে অনেক-ই ছোটো চিকুকে ও শ্রদ্ধা করে।
অনেকক্ষণ পরে কথা বলল চিকু।
কেমন লাগছে, গামহারদা?
গামহার হেসে বলল, চিত্ত আমার হারাল। নিজের ভাষায়, কিছু বলি, সে সাধ্য কী আমার? বিপদে পড়লেই তাই দাড়িঅলা বুড়োকে ধরি।
তারপর বলল, এবারে বলো, কী পাখি ডাকছিল ওটা? এখনও তো ডাকছেই পাহাড়ের গা থেকে।
ওটার-ই ইংরেজি নাম ‘ক্রো-ফেজেন্ট’। বাদামি আর কালো মস্ত বড়ো ল্যাজঅলা পাখি। তুমি বাংলার গ্রামে-গ্রামেও দেখতে পাবে এ পাখি, যেখানেই গাছ-গাছালি এখনও আছে। ডাহুক আর এই পাখি, পান-পায়রা, জল-পিপি এদের তো প্রায় সব জায়গাতেই দেখা যায়। তবে এই পাখিটি জলের পাখি নয়, পান-পায়রা বা জল-পিপির মতো। ডাহুকও উভচর। এদের এখানকার নাম কুম্ভাটুয়া।
—কী বললে?
‘কুম্ভাটুয়া’।
ওড়িয়াতে বলে।
—কী সুন্দর নাম, না?
—আর আমরা যে, পাথরের মস্ত চাঁইটির ওপরে বসে আছি, সেটি কী পাথর? জান?
—তুমি কি পাথরও চেন?
—আমি কিছুই চিনি-জানি না গামহারদা। তোমার মতো আর্টিস্ট তো নই যে, হৃদয়ের কারবারি হব। তাই পাথর-টাথর চেনার চেষ্টা করি। তবে এই সবে জানতে আরম্ভ করেছি। কতরকম পাথর আছে। ল্যাটারাইট, গ্র্যানাইট, ব্যাসাল্ট, ভলকানিক, স্যাণ্ডস্টোন, মার্বল, সিস্ট, লাইমস্টোন, স্লেটস। এই পাথরটি ল্যাটারাইট। জানব কী করে বলো? পড়াশুনো কী আর করেছি তেমন? আর এখন তো সফটওয়্যারের আর কম্পিউটারের চক্করে পড়ে,নিজেই হার্ডওয়্যার হয়ে গেছি। রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারার ‘নমো যন্ত্র নমো ষন্ত্র নমো যন্ত্র নমো’ করছি। তবে একটা সময় আসছে গামহারদা, শিগগির-ই আসছে, যখন মানুষের ‘মনুষ্যত্ব’কেই এই যন্ত্রের দুনিয়া গ্রাস করে ফেলবে।
—হয়তো বলেছ ঠিক-ই চিকু, মানুষ চাপা পড়ে মরবে তার কৃতিত্ব আর অহমিকার ভারে। নিশ্চিত মরবে। তখন আমি-তুমি হয়তো বেঁচে থাকব না।
—তাই তো বলি, গামহারদা, ঝাঁঝি, তোমাদের সকলকেই বলি, বাঁচো বাঁচো দারুণভাবে বাঁচো। প্রতিটি মুহূর্ত বাঁচো। তুমি যেমন করে বাঁচতে চাও তোমার মতো করে। তেমন করে বাঁচো। ভয় কোরো না, দ্বিধা কোরো না।
—সবকিছুই এখন যেমন সংখ্যাতে হচ্ছে মানুষের পরিচয়ও তেমন হয়ে যাবে একদিন হয়তো সংখ্যাতেই। ‘রক্তকরবী’র রাজার মতো কেউ সুপারকম্পিউটারের ঘরে বসে চোখের আড়াল থেকে আমাদের চালাবে। গামহার ঘোষ হবে হয় ১৭৩৭০০৫৪০০৮২ নং, ঝাঁঝি হয়তো হবে ৯৯৪৪৯৯৬৬২২।
—আর তুমি?
—ঈশ্বর-ই জানেন! আমি হয়তো হব ০০০০০০০০১। কে বলতে পারে? এই যন্ত্রদানব সব-ই গ্রাস করে ফেলবে। জনগণায়ন সম্পূর্ণ হবে। ব্যক্তি থাকবে না। ব্যক্তি-স্বাধীনতা থাকবে না আর।
—তা হয়তো গ্রাস করে ফেলবে কিন্তু তারও পরে একটা সময় আসবে যখন ‘মুক্তধারা’র ধনঞ্জয় বৈরাগীর-ই জয় হবে। ধনঞ্জয় বৈরাগী এই গান গাইতে গাইতে দিগন্তে মিলিয়ে যাবেন, ‘তোর শিকল আমায় বিকল করবে না। তোর মারে মরম মরবে না।। তাঁর আপন হাতের ছাড়া চিঠি সেই যে/তোর মনের ভিতর রয়েছে এই যে, তোদের ধরা আমায় ধরবে না। তোর শিকল আমায় বিকল করবে না।’’
এমন সময়ে একটা গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজ শোনা গেল।
চিকু বলল, ওই যে এসে গেল।
আমাদের সব আনন্দ মাটি হল। গামহার বলল।
ঝাঁঝিকে বলল চিকু, মুখে ঝগড়া করলে কী হয়! প্রেম তো দেখছি অতিগভীর। হারিত তো দেখছি তোমার বিরহ একেবারেই সহ্য করতে পারে না।
—হুঁ। ভাবছ তাই! আসলে দেখতে এসেছে তুমি বে-আক্কেলের মতো আমাকে একা গামহারদার সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছ, না সঙ্গে সঙ্গে থেকে পাহারা দিচ্ছ।
গামহার বলল, জারুলও তো তাই ভাবতে পারে। আমি চিকুর হাতে তোমাকে ছেড়েই দিলাম, না পাহারায় আছি?
—ভাবুন ভাবুন গামহারদা। যা খুশি ভাবুন। আমি আর জারুল তো বাঁধনহীন। আমাদের ভয় তো কিছুই নেই। তারও নেই, আমারও নেই। ভয় ঝাঁঝির, ভয় হারিতের, ভয় বছর-বিয়ানি হরিমতির স্বামী শ্রীমান নবেন্দুবাবুর।
গাড়িটা এসে গেল পেছনে লাল ধুলো, ঝরা-ফুল ঝরা-পাতা উড়িয়ে। পেছনে পেছনে ওদের তাড়া করে এল একঝাঁক টিয়া। তারপর জলপাই-সবুজ মিগ-প্লেনের-ই মতো নীলাকাশকে বিদ্ধ করে সকলের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল, গিরিখাতের গহ্বর পেরিয়ে অন্য কোনো গাঢ়তর সবুজ পাহাড়ের বুকের কোরকে।
গাড়ি থেকে নেমেই নবেন্দু বলল, হাউ মিন অফ উ অল! তোমরা আমাদের ফেলে বিয়ার খাচ্ছ? আর আমরা তোমাদের বিয়ার খাবার জন্যেই ডাকতে এলাম! একা একা খাব না বলে!
—হাউ গ্রেশাস অফ ইউ!
ঝাঁঝি বলল।
তারপর যোগ করল, দো, ফর আ চেঞ্জ।
এত হট্টগোল ভালো লাগছিল না গামহার-এর। বিয়ার খেতে খেতে ঝাঁঝির দিকে অপলকে চেয়ে থাকতে থাকতে ছবিটার কথা ভাবছিল। মনে মনে তার সদ্যরচিত কবিতাটা আবৃত্তি করল—
যতবার আঁকলাম, মুছলাম তার চেয়ে বেশি।
চোখ চিবুক চুল সব-ই মিলল হুবহু,
মিলল না শুধু সেই ভাবনাটুকু!
কবে যেন চুরি হয়ে গেছে।
চিকু গামহারকে চমকে দিয়ে বলল, সকলে তো গাড়িতে আঁটব না।
—আঁটব না কেন? একটু চাপাচাপি করে গেলেই হবে। মাত্র তো ছ-জনই আমরা। এতটুকু পথ। এ-ওর কোলে বসে গেলেই হবে।
—যদি হয় সু-জন তেঁতুলপাতায় ন-জন।
নবেন্দু বলল।
নবেন্দুর কোলে ঝাঁঝি বসলে চাড্ডাকান্টেট হারিতের আপত্তি হবে না তো?
হারিত সিগারেটের টুকরোটা জঙ্গলে ছুড়ে ফেলে বলল, বিন্দুমাত্রও নয়। কেউ যদি চিরদিনের জন্যেও নিয়ে যেতে চায়, তো তাকে একটি গাড়ি প্রেজেন্ট করব।
ঝাঁঝি বলল, তার আগে নিজের গাড়িটি রিপ্লেস করো। গাড়ির শোকে তো দু-চোখের পাতা এক করতেই পারছ না।
চিকু বলল, তার আগে হারিত তুমি গিয়ে সিগারেটের টুকরোটা ভালো করে নিভিয়ে দিয়ে এসো। তোমরা শিক্ষিত মানুষ হয়ে যদি এমন করো! তুমি কি জানো, তোমার এই অবহেলাতে ছুড়ে ফেলা সিগারেটটির জন্যে লক্ষ লক্ষ টাকার জঙ্গল পুড়ে যেতে পারত?
—টাকাটার কথাই মনে হল তোমার শুধু চিকু! আর সৌন্দর্য। কত জঙ্গল যে, ধ্বংস হয়ে যেত। ধ্বংস হত আমাদের ভবিষ্যতের এক টুকরো।
জারুল বলল।
—সৌন্দর্যের কথা? তোমার মতো সকলে যে সৌন্দর্য বোঝে না জারুল। তাই যা সকলে, সহজে বোঝে তাই তো বললাম। টাকার অঙ্ক দিয়ে ক্ষতির পরিমাণ বোঝাতে হয়। এমন করে বোঝালে সকলের পক্ষেই বোধগম্য হয়। কী দুর্ভাগ্য!
নবেন্দু বলল, ফিলিম ডিরেকটরের মতো, চলো চলো, লেটস প্যাক-আপ। রান্না হয়ে যাবে আর একঘণ্টার মধ্যে। চলো তার আগে একটু বু-উ-জ হোক, মুখে স্বাদ হবে। তারপর ঘুমোব ভালো করে। আজ চাঁদনি রাত এখানেই সেলিব্রেট করতে হবে। ঝাঁঝির পুনর্জন্ম। খুব ড্রিঙ্ক করব আজকে।
গামহার বলল, শুধু ঝাঁঝির-ই কেন? হারিতের নয় কেন? মনে হচ্ছে, হারিত ফওত হয়ে গেলে তুমি খুশি হতে নবেন্দু।
—একী গামহার দা! আপনিও আমার পেছনে...
চিকু বলল, আমরা এখান থেকে যাব একটু বসন্ত-বন্দনার পরে।
—তার মানে?
—তার মানে গামহারদা এখানে এই শিলাসনে এসে আমাদের একটি বসন্তর গান শোনাবে।
—কী গান?
নবেন্দু বলল, ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে।’
চিকু বলল এক্সকিউজ মি, উইথ অল রেসপেক্টস টু রবীন্দ্রনাথ এই গানটি এতবেশি গাওয়া হয়ে গেছে যে ‘ক্লিশে’, হয়ে গেছে। তুমি বসন্ত-বন্দনার অন্য কোনো গান শোনাও আমাদের গামহারদা।
গামহার বলল, একটা গান মনে এল বটে কিন্তু গাইতে ভয় করছে।
—কেন? কীসের ভয়?
—এ গানটি দীপালিদির রেকর্ড আছে।
—কোন দীপালিদি?
—আরে দীপালি নাগ চৌধুরী।
—ও। তিনি তো বহত-ই বড়ো গাইয়ে। সত্যি! আর কী সুরেলা গলা। আজকাল তো এত গাইয়ে উঠেছে কিন্তু পুরো সুর ক-জনের গলায় লাগে বলো তো? তবে আমাদের কারও সঙ্গেই তো আলাপ নেই দীপালিদির। উনি জানবেন কোত্থেকে, তুমি যদি ভুলও গাও। আর ভুল গাইলে আমাদের মধ্যেই বা কে এমন তালেবর আছে যে, সে ভুল ধরতে পারবে?
—আচ্ছা! এই ‘তালেবর’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি কেউ জানো?
গামহার বলল।
হারিত বলল, আমি জানি।
—কী?
—তালের বড়া।
ওরা সকলেই একসঙ্গে হেসে উঠল।
তারপর চিকু বলল, সেটা কথা নয়। অদৃশ্য পাহারাদার তো একজন থাকেই সবসময়ে, সব জায়গায়।
—সে কে?
—বিবেক।
—গুলি মারো।
—সেটাই তো মুশকিল। যাদের ওই বস্তুটি আছে তাদের পক্ষে নিজে হাতে তাকে মারা বড়োই কঠিন।
—না:। বড়ো ভারী সব ডিসকাশন হচ্ছে। আমার মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। গানটা যদি গাইতে হয় তবে গেয়ে ফেলুন গামহারদা। মিছে বেলা বাড়ছে। চানও হয়নি কারোর-ই।
—আমাদের হয়ে গেছে। তোমরা করে নেবে।
গামহার একটু কেশে গলাটা ছাড়িয়ে নিয়ে ধরে দিল।
‘মধুবসন্ত আজি এলো ফিরিয়া, অনুরাগ রঙে রাঙিল হিয়া....।
চম্পক বনে আজি পীক কুহরে/চঞ্চল তনুমন পুলকে শিহরে/ভ্রমর ভ্রমরী সনে ফেরে গাহিয়া/মধুবসন্ত আজি এল ফিরিয়া।’
অশোকের মঞ্জরী গুঞ্জরে বনে/পলাশের কুমকুম ঝরে ক্ষণে ক্ষণে/চন্দন তরুগণ গন্ধে উতলা/চন্দ্রিমা লয়ে বুকে নিশীথ উজলা/বনমৃগ ফেরে কারে খুঁজিয়া/এলো/ফিরিয়া/মধুবসন্ত আজি এলো ফিরিয়া।’
আহা। আহা। করে উঠল সকলেই।
—এটা কি বাহার?
নবেন্দু বলল।
—না। এটা বসন্ত।
চিকু বলল, এই গানটা চাঁদ উঠলে জোরাণ্ডা বাংলোর ওই বসার জায়গাটার নীচে বসেই গাইতে গামহারদা। দিনমানে গেয়ে গানটার প্রতি অন্যায় করলে তুমি।
জারুল বলল, ‘অধিকন্তু ন দোষায়ঃ’। তাতে কী? রাতের বেলা আবার হবেখন।
নবেন্দু বলল, আবারও বলল, গামহারদা আপনি কি ঠিক জানেন যে, এটা বসন্ত? বাহার নয়?
—আমারও কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে।
হারিত বলল।
ঝাঁঝি সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ করল হারিতকে। তুমি তো ‘চাড্ডাকান্টেন্ট’। গানের তো ‘গও’ জানো না। তোমারও কি বন্ধুর দেখাদেখি মাতব্বরি না করলেই চলছে না? অন্ধ এলেন ল্যাংড়াকে পথ দেখাতে। বাহারে আর বসন্ত-এ কী কী পর্দা লাগে বলো তো?
—আঃ। তুমি বড়ো পার্সোনাল অ্যাটাক করো ঝাঁঝি।
নবেন্দু বলল।
—বা:। চাড্ডাকান্টেন্ট কি গামহারদাকে ইমপার্সোনাল অ্যাটাক করল?
চিকু মধ্যে পড়ে বলল, এসব থামাও, আমি একটা জেনুইন ইমপার্সোনাল গল্প বলছি। গল্পটাও জেনুইন এবং জেনুইনলি ইমপার্সোনাল। এই ‘রাগ-রাগিণী’ সম্বন্ধেই।
—কী? তাড়াতাড়ি বলো।
হারিত বলল।
চিকু বলল, তুমি যখন ঝাঁঝিকে আদর করো তখনও কি এমন তাড়াতাড়ি করার ফরমান জারি করো নাকি?
ঝাঁঝি কথা না বলে অন্যদিকে চেয়ে রইল।
হারিত বলল, নষ্ট করার মতো সময় থাকে না আমার হাতে কখনোই।
—চলো। ফিরে যেতে যেতে গাড়িতেই শুনব। তোমাদের তো চান হয়ে গেছে। আমাদের তো চান করতে হবে। আর দেরি করা ঠিক হবে না এখানে।
চলো।
নবেন্দু বলে, স্টিয়ারিং-এ গিয়ে বসল।
—বেশ করেছে কিন্তু ‘উনো’ গাড়িগুলো। না?
চিকু বলল।
—হ্যাঁ। বেশ জায়গা আছে।
চিকু বলল, গামহারদা তুমি সামনে বোসো। আমরা চারজনে পেছনে চাপাচাপি করে বসে যাব।
নবেন্দু বলল, নো প্রবলেম। দু-টি কাপল। যে-যার বউকে চাপো।
নবেন্দু ওর ফিয়াট উনো গাড়িটাকে ঘুরিয়ে নিল। তারপর গিয়ারে ফেলে, গাড়িটাকে উতরাইয়ে গড়িয়ে দিয়েই বলল, বলো চিকু। কী গল্প বলবে বলছিলে।
—হ্যাঁ। লক্ষ্ণৌতে এক রহিস বাঙালির বাড়িতে কলকাতা থেকে একজন নামি বাঙালি সরোদিয়া গেছেন বাজাতে। বাড়ির সামনের মস্ত লন-এ শ্রোতাদের গায়ে আতর আর গোলাপ জল ছিটিয়ে তো মেহফিল আরম্ভ হয়েছে। লক্ষ্ণৌর তাবৎ বাঙালি-অবাঙালি সমঝদার আর রহিস আদমিরা সব শুনতে এসেছেন গান। পাহাড়ী সান্যাল, তখন ওখানে ছিলেন, কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়....
—তিনি কে?
—আরে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে।
—কেন? তুমি তার ‘কুদরত রঙ্গি-বিরঙ্গী’ পড়োনি নাকি? অমিয়নাথ সান্যালের ‘স্মৃতির অতল’-এর পরে এমন সেন্স অফ হিউমার বড়ো একটা দেখিনি সাহিত্যে এই বিষয়ে।
—সমঝদারি আর রহিসির মধ্যে কি বিরোধ আছে কোনো?
গামহার বলল।
চিকু বলল, বিলক্ষণ আছে গামহারদা। সমঝদার হয়েও কেউ রহিস নাও হতে পারেন আবার রহিস হয়েও অধিকাংশই সমঝদার হন না। কিন্তু রহিসির অনেক দায়-দায়িত্বও থাকে। সৎসঙ্গে, ভালো মেহফিলে নিমন্ত্রিত হলে, তাঁদের দু-পাঁচলাখি শাল গায়ে চড়িয়ে সেইসব অকুস্থলে যেতেই হয়, কিছু বুঝুন আর নাই বুঝুন। যেতে হয়, নইলে রহিসির বে-ইজ্জত হয়।
—বহত খুব।
বলল, গামহার।
—এবার গল্পটা বলো।
—তা উস্তাদ অথবা পন্ডিত তো দু-ঘণ্টা বাজালেন। লাজোয়াব বাজনা।
—কী রাগ বাজালেন?
ঝাঁঝি জিজ্ঞেস করল।
—বলছি। বলছি।
মুসুম্বির রস-এর সঙ্গে উদার হাতে জিন মিশিয়ে সকলকে দেওয়া হয়েছে বাজনার আগে এবং মধ্যেও। রুপোর তবকমোড়া পান, সঙ্গে ডমদা জর্দা। গৃহকর্তা যেহেতু বাঙালি, তাই কলকাতা থেকে তাঁর শ্বশুরালয়ের কিছু মানুষও এসেছিলেন। তাঁদের-ই মধ্যে গৃহকর্তার দু-জন চাড্ডাকানটেন্ট শ্যালকের পুত্র এবং তাদের এক সতীর্থও ছিল। গান-বাজনার ব্যাপারে তাদের তেমন জ্ঞান ছিল না। প্রথম সারিতে বসে, যে-বিপুল উৎসাহে রথী-মহারথীদের সঙ্গে মাথা নেড়ে ‘কেয়াবাত কেয়াবাত’ বলতে বলতে, আঙুল উঁচিয়ে তারা ‘সম’ যেভাবে দেখাচ্ছিল, তা দেখেই ওই ধারণা হয়েছিল আমার।
বাজনা শেষ হতেই তো ‘সাব্বাস! কেয়া বাত কেয়া বাত! মশহুর বাজাইয়া, আপ কি উমর লম্বি হো’; ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি সাধুবাদের ফুল উড়ছে চারদিকে। এমন সময়ে কলকাতার শালাবাবুর ছোঁড়ারা বাজিয়ের কাছে এসে বলল, কী যে বাজালেন দাদা। জুতো। জুতো। একেবারে জুতো।
বাজিয়ে তো লক্ষ্ণৌ শহরে এসে এমন বদতমিজ ছেলে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। কিন্তু মুখে কিছুই বললেন না।
আবারও যখন তারিফের ফুলঝুরি ফুটতে শুরু করল, বিনয়ী শিল্পী তাতে আরও একটু সংকুচিত হয়ে গেলেন।
তখন কলকাতার সমঝদারদের মধ্যে একটি ছেলে বললে, পন্ডিতজি এবারে একটু ‘চন্দ্রকোষ’ শোনাবেন না আমাদের?
বাজিয়ে চমকে উঠলেন। তারপর কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে বিনয়কে ফাটা-ফুটো শালের মতো ছুড়ে ফেলে বললেন, তাহলে এই পুরো দু-ঘণ্টা কি আমি আপনাদের অন্ডকোষ-ই বাজাচ্ছিলাম?
দুপুরে খেতে খেতে প্রায় চারটে বাজল। তারপর সকলেই শুয়ে পড়ল। রাতে চাঁদের আলোতে জঙ্গলের রূপ দেখবে। আজ সম্ভবত ত্রয়োদশী।
বাসন্তী পূর্ণিমাতে নাকি বনে-পাহাড়ে ঠাণ্ডা থাকার জন্যে, চাঁদের রূপ তত উপভোগ করা যায় না। কুয়াশাও থাকে নাকি। তাই চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠর পূর্ণিমাই নাকি সবচেয়ে সুন্দর লাগে জঙ্গল পাহাড়ে। সুন্দর লাগে বর্ষার পূর্ণিমাও যদি অবশ্য আকাশ পরিষ্কার থাকে। তখন আবার বনের অন্য রূপ। বর্ষণসিক্ত—বনের ওপরে প্রতিসরিত জ্যোৎস্নাতে চোখ ধেঁধেঁ যায়। তবে সবচেয়ে মোহিনী রূপ কোজাগরি পূর্ণিমাতে। জারুল বলছিল।
নির্মেঘ চাঁদভাসি আকাশে অগণ্য তারাদের সঙ্গে কৃত্রিম উপগ্রহও দেখা যায় এইসব নির্মল পরিবেশের আকাশে। তারার-ই মতো। তারাদের চেয়ে অনেক-ই কাছে থাকাতে তাদের পরিক্রমাটা চোখে পড়ে। যদিও অতিধীরগতিতে তারা পরিক্রমা করে যায় আমাদের এই ভালোবাসার পৃথিবীকে।
খেতে খেতেই বাইরে মানুষের গলার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল। গামহার উৎকর্ণ হল। চিকু বলল, ওরা ‘বাথুরি’ সমাজের লোক। সমতল থেকে পায়ে হেঁটে এসেছে। পুজো দেবে কাল রাতে।
—কীসের পুজো?
—বড়াম দেব-এর। ওদের দেবতা। সারাবছর যেন ওরা বাঘ, ভাল্লুক, হাতি, সাপ, শম্বর, হরিণ, শুয়োর, খরগোশ, টিয়া ও আরও অগণ্য পাখিদের হাত থেকে ওদের নিজেদের এবং ফসল রক্ষা করতে পারে, সেইজন্যে।
গামহার বলল, খেয়ে উঠে আমি ওদের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি? আমি তো একটু-একটু ওড়িয়া বলতে পারি....
চিকু হেসে বলল, ‘হউ! মু জানিচি যে, তমে টিক্কে টিক্কে ওড়িয়া কহু পারুচি।’
গামহার বুঝল যে, নবেন্দু ভালো ওড়িয়া জানে। চিকু বলল, ওদের ব্যাবসাতে অনেক ওড়িয়া প্লাম্বারদের সঙ্গেও কাজ করতে হয়। নবেন্দুর কান আছে, শিখে নিয়েছে ভাষাটা।
—তা ঠিক। গান আর ভাষাতে কান খুব বড়োব্যাপার। কিন্তু তুমি যেটুকু ওড়িয়া কুমুদিনীর দৌলতে শিখেছিলে তাতে তো পুলিশ বশ হল না। এরা কি বশ হবে? তোমাকে উদ্ধার করে আনতে আবারও অর্থদন্ড লাগবে না তো? দ্যাখো।
চিকু বলল।
গামহার লজ্জা পেল। তারপর বলল, পুলিশের কথা আলাদা। ওড়িয়াতে একটি দ্বিপদী আছে, ‘‘মাছু খাইবি ভাকুর, ঘইতা কইবি ডাইভর। মাছ্ব খাইবি ইলিশি ঘইতা কইবি পুলিশি।’’
ওরা সমস্বরে জিজ্ঞেস করল, মানে কী হল?
—মানে হল, যদি বোয়াল মাছ খেতে চাও তো ট্রাক-ড্রাইভারকে বিয়ে করো। আর যদি ইলিশ মাছ খেতে চাও তো বিয়ে করো পুলিশকে। মানে আর কী! বিস্তর ঘুস না খেলে ইলিশ মাছ খাবে কী করে? তারপর বলল কুমুদিনীর কাছে শুনেছিলাম।
বলতেই, ঝাঁঝি বলল, কুমুদিনী কে?
জারুল বলল, ভয় নেই ঝাঁঝি, তোমার বা আমার। কুমুদিনী গামহারদার প্রথমযৌবনের ওড়িয়া প্রেমিকা যার সঙ্গে বিয়ে হয়নি গামহারদার। আমরা, যারা গামহারদার অ্যাডমায়রার, তারা আপাতত নির্বিঘ্ন।
—বিয়ে হয়নি বলেই তো প্রেম উজ্জ্বল আছে।
গবগব করে হারিত বলল।
ঝাঁঝি বলল, আরে! কী কহিল কানু?
জারুলও হাসতে হাসতে বলল, আরও ঠাট্টা করে বলো— ‘চাড্ডাকান্টেন্ট।’ রস কী কম আছে হারিতের ঝাঁঝিতে? এ তো দেখছি মৌচাক। তুমিই ঠিকমতো কৌশল করে ধুঁয়ো দিয়ে মধু নিংড়োতে পারোনি দেখা যাচ্ছে।
—তুমিই নিংড়ে নাও-না ভাই। একটা খল-নোড়া দোব কি? সঙ্গে মকরধ্বজও আছে। সেই রস নিংড়ে চাড্ডাকান্টেন্টকে মকরধ্বজ দিয়ে মেড়ে খেয়ে ফ্যালো। নিপাতনে সিদ্ধ হবে।
খুব হাসাহাসি হল একচোট।
গামহার-এর মনে হল, হারিত ছেলেটা ভালো। রসিকও খুব। কিন্তু বহিরঙ্গে একটু বেরসিক। জারুল ঠিক-ই বলেছে। বহিরঙ্গে ও মৌচাক নয়, হর্স-চেস্টনাট। হাতুড়ি ছাড়া ভাঙা মুশকিল।
ওরা যখন খাওয়া-দাওয়ার পরে লম্বা ঘুম লাগাবে বলে শুল তখন গামহার গুটিগুটি গেট পেরিয়ে বাংলোর হাতার বাইরে এসে দেখল জঙ্গলের এখানে ওখানে প্লাসটিকের শিট, ত্রিপল, চাদর ইত্যাদি সুতলি দিয়ে গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে রাতে শোয়ার বন্দোবস্ত করছে বাথুরি সমাজের লোকেরা। রান্নাবান্নার বন্দোবস্তও করছে পাথর সাজিয়ে উনুন করে জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠ-কুটো, পাতা-পুতা কুড়িয়ে এনে।
ওদের একজনের সঙ্গে কথা বলতেই, সে গামহারকে তাদের রাজার কাছে নিয়ে গেল। বাথুরি সমাজের রাজা। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, রোগা একজন সাধারণ মানুষ। পরনে একটি কোরা ধুতি। অর্ধেকটা নিম্নাঙ্গে পরা, অন্য অর্ধেকটা গায়ে জড়ানো। খালি পা। কোনো গুমর নেই রাজা বলে।
তিনি একটা বড়ো পাথরের ওপরে বসেছিলেন। তাঁর পাশে বসে গামহার তাঁর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল। তার আগে, মাথা নীচু করে বিনয়ের সঙ্গে ‘নমস্কার আইজ্ঞাঁ’ বলে নমস্কারও করল।
পশ্চিমের আকাশে লালের ছোপ লেগেছে। পাহাড়ের পর পাহাড়ের প্রাচীর ঘেরা হাজার হাজার হাতির এবং অন্যসব জানোয়ারের বাসভূমি, এই সিমলিপাল অভয়ারণ্যের পর্ণমোচী বনের পাতা-খসার দিনে চিকু তাকে যে, কী এক উপঢৌকন দিল তার মূল্যায়ন করা গামহার-এর পক্ষে সম্ভব নয়। কলকাতাতেই চিকু আর জারুলের মুখে শুনেছিল যে, এই সিমলিপাল অভয়ারণ্যের বিস্তৃতি নাকি পৌনে তিনহাজার বর্গকিমি। তার কতটুকুই বা তারা দেখল বা অন্য ভ্রমণার্থীরাও দেখতে পারেন। এই সমস্ত বনপাহাড়-ই একসময়ে ছিল ময়ূরভঞ্জের রাজার শিকারভূমি। অন্য কারও শিকার করার অনুমতি ছিল না এখানে। তবে রাজার নিজের অতিথিদের কথা আলাদা। সেইসব সৌভাগ্যবানেরাই হয়তো দেখে থাকবেন, এই বিশাল পাহাড়বেষ্টিত বনরাজিনীলার আনাচ-কানাচ। বাইশ-শো থেকে প্রায় তিনহাজার ফিট উঁচু এখানের এই পাহাড়গুলি। মানে, সাত-শো পঞ্চাশ মিটার থেকে প্রায় সাড়ে ন-শো মিটার পর্যন্ত। এখানকার বন-বাংলোগুলির নাম শুনলেই বুকের মধ্যে গুড়গুড় করে মাদল বেজে ওঠে। আশ্চর্য! ভাবছিল, গামহার। দর্শনের আনন্দ, শ্রবণের আনন্দ, স্পর্শন, ঘর্ষণ সবকিছুর-ই আলাদা আলাদা আনন্দ আছে কিন্তু কোনো অদেখা জায়গার বা ব্যক্তির নাম কানে শুনলেই ‘মন’ সেই জায়গা বা ব্যক্তি সম্বন্ধে একটা ধারণা গড়ে নেয়। কেন যে নেয়, কে জানে! যেমন ঝাঁঝিকে দেখার আগে ঝাঁঝির নাম শুনেই ও প্রেমে পড়েছিল। যেমন পড়েছিল, জোরাণ্ডার। গুড়গুড়িয়া, জোরাণ্ডা, ধুধুরুচম্না, বড়াকামরা, আপার বড়াকামরা, জেনাবিল, গায়েরকাচা, বাছুরিচরা, ন-আনা, ভঞ্জবাসা, চাহালা আরও কত-না বাংলো আছে। গুড়গুড়িয়া হয়েই ওদের ফিরে যাওয়ার কথা। তার পাশেই খৈরি নদী, যে খৈরির বালিতেই নাকি সিমলিপাল টাইগার প্রোজেক্টের ফিল্ড ডিরেক্টর সরোজরাজ চৌধুরী কুড়িয়ে পেয়েছিলেন মাতৃহারা একটি ব্যাঘ্রশাবক এবং যার নাম রেখেছিলেন ‘খৈরি’। পৃথিবীর নানা পত্র-পত্রিকাতে খৈরির ছবি দেখেছে ও খবর পড়েছে আগে গামহার। খৈরি মারাও গেছে আজ বহুদিন হল। তার পালিকা মাতা ও পালক পিতা চৌধুরীরাও আর বেঁচে নেই।
গামহার, রাজার কাছে বাথুরি সমাজের কথা জিজ্ঞেস করছিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। রাজা তো নন, যেন ‘আরণ্যক’-এ পড়া রাজা দোবরু পান্না! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল গামহার-এর, চাপা উত্তেজনাতে।
রাজা বললেন, আলো একেবারে নিভে যাওয়ার আগে আগে পাহাড়চুড়োয় উঠে, আমাদের সন্ধিপুজো করে আগমনি গান গাইতে হবে। কাল ভোরে পুজো শুরু হবে। তাই আজ সময় তাঁর হাতে বেশি নেই।
গামহার বলল, যেটুকু আছে, তাই তার পক্ষে যথেষ্ট।
বেলা পড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির পরে পথ থেকে, মাঠ থেকে, বন থেকে, যে একরকমের গন্ধ আর ঝাঁঝ ওঠে ঠিক তেমন-ই গন্ধ আর ঝাঁঝ উঠতে লাগল বনের বুকের কোরক থেকে। তবে অন্য গন্ধ, অন্য ঝাঁঝ।
একটা মস্ত ঝাঁকড়া গাছের নীচে গামহার রাজার সঙ্গে বসেছিল।
গামহার জিজ্ঞেস করল, এটা কী গাছ?
—কোনটা?
ওপরে আঙুল দিয়ে দেখাল গামহার।
রাজা হেসে বললেন, এ তো কদম।
গামহার ভাবল ভাগ্যের এ কী পরিহাস! বারে বারেই তাকে বিধাতা শুধু কদম গাছতলাতেই কেন ঠেলে দিচ্ছেন একা একা? কদমতলে একা কি কারোর-ই ভালো লাগে!
এমন সময়ে দেখা গেল ঝাঁঝি আসছে। তার পায়ে একটু দ্বিধা, একটু দ্বন্দ্ব, আর তা এক বিশেষ ছন্দ দিয়েছে তার চলার গতিকে। হলুদ, লাল, কালো, সবুজ বনের মধ্যে বিদায়ী সূর্যর কাঁচা সোনা রঙে বিধুর হয়ে যাওয়া লাল-পথ বেয়ে নবীন কুসুমপাতা-লাল শাড়ি পরে দীর্ঘাঙ্গি ঝাঁঝি এক এক পা করে এগিয়ে আসছে গামহার-এর দিকে। গামহার যেন, যুগযুগান্ত ধরে এই ক্ষণটির জন্যেই অপেক্ষা করেছিল। তার ভেতরে ভেতরে যেন নিরুচ্চারে কিন্তু তীব্র অনুরণনে গেয়ে উঠল একটি বহুশ্রুত, বহুগীত গান, ‘আজি এই গন্ধবিধুর সমীরণে/কার সন্ধানে ফিরি বনে বনে/আজি মুগ্ধ নীলাম্বর মাঝে একি চঞ্চল ক্রন্দন বাজে/ সুদূর দিগন্তের সকরুণ সংগীত লাগে মোর চিন্তায় কাজে—আমি খুঁজি কারে অন্তরে মনে/আজি এই গন্ধবিধুর সমীরণে।’
ঝাঁঝি কাছে এসে দাঁড়াতেই রাজা উঠে দাঁড়ালেন। গামহারও উঠে দাঁড়াল। গামহার পরিচয় করিয়ে দিতে যেতেই রাজা হেসে বললেন, জানি জানি, আপনার স্ত্রী।
গামহার মনে মনে বলল, আহা রাজা! তুমি শুধু ‘বাথুরি’ সমাজের-ই নয়, তুমি পৃথিবীর রাজা হও। তোমার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।
গামহার প্রচন্ড আপত্তি দেখাতে যাচ্ছিল কিন্তু ঝাঁঝি হাসতে হাসতে হাত তুলে বাধা দিল।
বলল, স্বপ্নেই যখন পোলাউ রান্না হচ্ছে তখন ঘি ঢালতে কঞ্জুষি করছেন কেন?
গামহার ক্রমশই এই সাধারণ মেয়েটির অসাধারণ দুঃসাহসে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছিল। কে জানে! আজ রাতে কী ঘটবে? এমন রাতে, এমন পরিবেশে যা-কিছুই ঘটা সম্ভব। যা, কলুষিত, চিৎকৃত, বুভুক্ষু, লোভী, রাজনৈতিক কলকাতাতে কখনো ঘটা সম্ভব নয়। সম্ভব ছিল না। এখানে রাজা আছেন কিন্তু রাজনীতি নেই। ব্যক্তি আছে কিন্তু সমাজের শকুন-চোখা নজর নেই তার ওপরে। এখানে ব্যক্তি স্বরাট সম্রাট। পার্টি-চালিত যূথবদ্ধ জানোয়ার নয়। সে পতাকাবাহী, স্লোগান-সর্বস্ব, কৃত্রিম-স্বরের চালিত Robot নয়। প্রকৃতির মধ্যে সে পুরোদস্তুর একজন মানুষ, কোনোরকম বৈকল্য ও বিকৃতি ছাড়াই। অল্পে সুখী, একজন সহজ সাধারণ মানুষ। যেমন মানুষের জন্যেই ঈশ্বর এই সুন্দর পৃথিবী নিজে হাতে গড়ে দিয়েছিলেন একদিন।
—এসো, বোসো।
বলল, গামহার।
এমন করে বলল, যেন মনে হল ওর এবং হয়তো ঝাঁঝিরও, যে, এই বাক্যবন্ধটি ঝাঁঝিকে বলবে বলেই ও এতগুলো বছর যেন, জীবনের পথে হেঁটে এসেছে। তার এই আহ্বানের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। সৃষ্টির প্রথম থেকে পুরুষ, নারীকে যে, আসঙ্গ-লিপ্সাতে আহ্বান করে এসেছে, রাধাকে কৃষ্ণ, জুলিয়েটকে রোমিও, লায়লাকে মজনু, থৈবীকে খাম্বা যেমন, তেমন করেই। এতে কোনোই ভুল ছিল না। ভান ছিল না।
গামহার-এর গা ঘেঁষে বসল ঝাঁঝি।
মেয়েরা তাদের পছন্দ-অপছন্দ ভারি তির্যকভাবে প্রকাশ করে। আর্টিস্ট বলেই তা জানে গামহার। তার শরীরের পারফিউমের গন্ধ, এতখানি হেঁটে আসাজনিত তার মিষ্টি বগলতলির ঘামের গন্ধ, বেলাশেষের প্রকৃতির গায়ের গন্ধর সঙ্গে মিশে যখন গেল, ঠিক সেই সময়েই একঝাঁক টিয়া সেই গন্ধপুঞ্জ সঙ্গে করে নিয়ে উড়ে গেল ঝুমঝুমির মতো বাজাতে বাজাতে ডুবন্ত সূর্যের দিকে, একজন মানুষ, আর এক মানুষীর নিবিড় নৈকট্যর খবর জানাতে। ওদের বিদ্যুৎগতি দেখে মনে হল ওরা বুঝি অচিরে সেই লাল গোলকের মধ্যে ঢুকে গিয়ে একটু সবুজ ধার দেবে জ্বলন্ত মার্তন্ডকে।
—কহন্তু আইজ্ঞাঁ, রাজাবাবু। তাঙ্কু নাম হেল্বা ঝাঁঝি। সে আপনঙ্কু কথা শুনিবা পাঁই আসিলু এটি।
তারপর-ই খুশির আধিক্যে পাঞ্জাবির পকেট থেকে পার্স বের করে পাঁচ-শো টাকা দিয়ে গামহার বলল, পূজা সারিলে পিলামানঙ্কু নৃত্য-গীত করিবি মদ্দটদ্দ খাইবাকু পাঁই মু দেলি। খরাপ বাসিলু কি আপুনি রাজা?
—না ম। খারাপ কাঁই বাসিবি? ভল্ব বাসিলু।
রাজা বললেন, যে খারাপ ভাবব কেন? ওরা সকলে খুব-ই খুশি হবে। তবে নাচগান সব আগামীকাল রাতে হবে। পুজোর পর। কিন্তু আমরা মদ-টদ খাই না। সে মহুয়া কী, হাঁড়িয়া কী, কী পানমৌরি বা সল্বপ রস। কিচ্ছি নাই।
—আপনারা দেখে শিখুন।
ঝাঁঝি বলল।
—হুঁ।
গামহার বলল।
তারপর বলল, আপনাদের এই বাথুরি সমাজ সম্বন্ধে কিছু বলুন রাজা।
—হউ।
রাজা শুরু করলেন। রাজার নাম বৃন্দাবন মহাপাত্র।
মাঝে মাঝে কেউ কেউ এসে রাজার কাছে নানা ব্যাপারে নির্দেশ নিয়ে যাচ্ছিল।
রাজা বললেন, আমাদের দেবতার নাম বড়াম দেব। প্রতিবছর-ই পুজো হয় এই চৈত্রমাসেই। ঠিক কবে যে, হবে তার ঠিক থাকে না আগে থেকে। তবে চৈত্রমাসের এগারো থেকে পনেরো তারিখের মধ্যেই হয় এই পুজো, ভালো তিথি-নক্ষত্র দেখে।
—আপনাদের সমাজের মানুষেরা কি এই পাহাড়েই থাকেন?
—না। পাহাড়ে থাকার তো অনেক-ই কষ্ট। তা ছাড়া, সরকার আর বনবিভাগ এই অভয়ারণ্য আর বাঘ-প্রকল্পের মধ্যে মানুষ বাস করুক, তা চান না। আমরা না থাকলেও আদিবাসীদের মধ্যে অনেকেই আছে এখনও। বহুদিন আগে আমরাও এইসব পাহাড়েই থাকতাম। সিমলিপাল পাহাড়শ্রেণির মধ্যে ‘বাকুয়া’ নামের একটি জায়গা ছিল সেখানেই ছিল আমাদের বাস। আমাদের পূর্বপুরুষেরাই সিমলিপালের এই আদিগন্ত পাহাড়শ্রেণির রাজা ছিলেন। যোশীপুরের দোর্দন্ডপ্রতাপ খড়িয়া রাজা, দাশু খড়িয়াকে আমরা যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছিলাম। এখনও এই সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণির মধ্যের বাটালি দুর্গের চু¨ড়োতে রাজা দাশু খড়িয়ার মাথা অবিকৃতভাবে রাখা আছে। করোটি নয়, মাথা। তা ছাড়াও, আমাদের পূর্বপুরুষেরা বামনঘাটির যুদ্ধে গোন্দদেরও হারিয়েছিলেন। আমাদের এক পূর্বসূরি, তাঁর নাম বীরবর, খৈরি নদী বেয়ে দু-টি শিলাখন্ডকে ভেসে যেতে দেখে দু-টিকেই জল থেকে দু-হাতে ওঠাতে যান। কিন্তু বাঁ-হাতের ধরা শিলাখন্ডটি ভেসে যায় স্রোতে। ডান হাতের শিলাখন্ডটিকে এনে রঘুনাথজি মঠ-এ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ-অঞ্চলের সব মঠ-মন্দিরের মধ্যে এখনও রঘুনাথজির মঠকেই সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়।
গামহার বলল, আমি নৃতত্ত্বর যা সামান্য জানি, তাতে জানি, আমাদের দেশের পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের অধিকাংশ আদিবাসীর আদিবাস-ই ছিল দক্ষিণ ভারতে। ওঁরাও, গোন্দ, খারোঁয়ার, বাইগা ইত্যাদি ইত্যাদি।
রাজা বলেন, তেমন কথাও শুনতে পাই আমরা বহুলেখাপড়া করা পন্ডিতদের মুখে।
যেমন?
—যেমন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা নাকি ‘দুধ’-এর বাটুলিগড়ে থাকতেন তারপর দাক্ষিণাত্যের গোদাবরী নদীর রেখা ধরে তাঁরা নাকি চলে যান। তা হতেও-বা পারে। কিন্তু হাজার হাজার বছরের ইতিহাস দিয়ে আমরা করব কী? যে-ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের ক্ষীণতম যোগসূত্রও আছে বলে মনে করি আমরা, তাকেই ‘ইতিহাস’ বলে মানি। তা ছাড়া এসব অ-বাথুরি পন্ডিতদের-ই কথা। আমরা তো আমাদের বাবা-ঠাকুরদাদের মুখে ওসব কথা শুনিনি কখনো।
—আপনাদের ভাষা কী?
—আলাদা ভাষা কিছু নেই। আমরা ওড়িয়াই বলি।
—আপনারা কি গোন্দ বাইগাদের মতো আলাদা বস্তি করে থাকেন অরণ্যাঞ্চলে?
—না। তাও থাকি না। আমাদের সঙ্গে নানা জাতের আদিবাসীরাই থাকে, যেমন, সাঁওতাল, গোন্দ, মুণ্ডা, সৌঁতি, ভূমিজ, ভুনিয়া ইত্যাদিরা।
—আপনারা তো বারিপদা থেকে এসেছেন শুনলাম। বারিপদাই তো ময়ূরভঞ্জের রাজধানী। আপনারা কি তাহলে ময়ূরভঞ্জেই থাকেন সকলে?
রাজা বললেন, না, তাও ঠিক নয়। আমরা নানা জায়গাতেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি। যেমন কেওনঝড়গড়ের পাঁচপির (করাঞ্জিয়া) আর কাপ্তিপদা উপজেলাতে, বালেশ্বর জেলার নীলগিরি উপজেলাতেও বাথুরিদের বসতি আছে।
—আপনাদের কোনো দেবদেবী বা ধর্ম আছে কি আলাদা? নাকি আপনারা হিন্দুই?
—আমরা তো হিন্দুই। বড়ামদেব একজন উপদেবতা, জগন্নাথদেব-ই আমাদের প্রধান দেবতা। জাউ-রন্ধার এই গিরিখাতের গায়ে কোথাও জগন্নাথদেবেরও ঠাঁই আছে। তা না হলে, বহুবছর আগে এখানেই জগন্নাথদেবের ভোগ রান্না হত কেন?
—‘জাউ’ মানে?
ওড়িয়াতে ‘জাউ’ মানে তো ভাত-ই। জগন্নাথদেবের মন্দিরের প্রসাদ তো ভাত-ই, যাকে আমরা জাউ বলি। ‘জাউ-রন্ধা’ই নাম এই জায়গাটার। ইংরেজদের জিভে তো অনেক-ই জড়তা ছিল। তাই ওরা জাউ-রন্ধাকে জোরাণ্ডা বলত।
তারপর-ই রাজা বললেন, এবার আমাকে উঠতে হচ্ছে। কালকে যদি আসেন তাহলে অনেক গল্প হবে।
গামহারও উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, কাল যে-নাচ হবে সেই নাচের কি কোনো নাম আছে?
—আছে বই কী। সে নাচের নাম ‘ছাঙ্গু’ নৃত্য।
—সঙ্গে বাজনা থাকবে না?
—রাজার তাড়া ছিল। বললেন, বাজনা ছাড়া কি নাচ হয়? থাকবে বই কী! ছাঙ্গু, খঞ্জনি, মৃদঙ্গ, শঙ্খ, বাইকুন্ডল।
রাজা চলে গেলেন। ততক্ষণে শোভাযাত্রা করে পুরুষেরা এসে পড়েছে। রাজাকে সম্মুখভাগে নিয়ে তারা পাহাড় চড়তে লাগল।
—যাবে ওদের পেছন পেছন? নাকি বাংলোতে যাবে? হারিত যদি ঘুম ভেঙে তোমাকে দেখতে না পায়?
গামহার বলল।
ঝাঁঝি হাসল। বাঁকা হাসি। বলল, সে কি দুগ্ধপোষ্য শিশু, যে আমাকে না দেখতে পেয়ে কান্না জুড়ে দেবে?
—দুগ্ধপোষ্য না হলেও পুরুষমানুষমাত্রই আমৃত্যু স্তন্যপায়ী তো বটেই।
—ভারি অসভ্য তো আপনি।
—এমন জঙ্গলে এসেও, যদি জংলিপনা না করি একটু, তবে কি শহরে করব?
—সেটা ঠিক-ই বলেছেন কিন্তু। এখানে সব আদিমতা, আদিরসও স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। এই অরণ্যর এক আশ্চর্য প্রভাব পড়ে সব মানুষের-ই ওপরে।
—একে এককথায় কী বলা যেতে পারে?
গামহার একটু ভেবে বলল, ‘আরণ্য’।
—বা:।
—সত্যি! আগে যে, কেন আসিনি। এবার থেকে চিকুদা অথবা জারুল যেখানেই যাবে, আমি সঙ্গে যাব। আমার তো কোনো পিছুটান নেই। আমি রুপোর দাঁড়ে-বসা, অন্ধকার উঠোনের কাকাতুয়া। দম বন্ধ হয়ে আসে।
—পিছুটান তো আমারও নেই। সামনের টানও ছিল না কিছুই। সাম্প্রতিক অতীত থেকে মনে হচ্ছে, একটা সামনে-টানের ইঙ্গিত মিলছে। শেষ পর্যন্ত কী হয় তা অবশ্য এখনও বলা যাচ্ছে না।
—মানে?
—মানে সামনে যদি কেউ টানে, তবে তার সঙ্গেই ভেসে পড়ব আর কী! ভাবছি, জঙ্গলে এলে এরপর থেকে রং, তুলি, কাগজ সব নিয়ে আসব। তুমি কি আসবে আমার সঙ্গে?
—আনবেন না গামহারদা।
—কেন একথা বলছ?
—আপনি তো সুরিয়্যালিস্ট আর্টিস্ট। এখানে রং-তুলিই যদি বয়ে আনবেন তাহলে আপনার সঙ্গে ওয়ার্ল্ড-লাইফ-ফোটোগ্রাফার জারুল-এর তফাত রইল কী? ক্যামেরা যা দেখতে পায় না, আপনার চোখ তো সেইটুকুই দেখবে।
—ঠিক-ই বলেছ তুমি। চমৎকার বলেছ। এইসব ছবিকে মনের মধ্যে জলছবির মতো বসিয়ে নিয়ে ফিরে যেতে হবে। তারপর একটু ঘষে, একটু মেজে, একটু রহস্য যোগ করে বাস্তব আর অবাস্তবের মিশেল দিয়ে নতুন সব সৃষ্টি করব আমি। ভাবছি জুনিপার এবার ফিরে এসে আমার নতুন ছবিগুলি দেখে কী যে বলবে? বলবে, তুমি নিজেকে নবীকৃত করেছ।
—জুনিপার আপনাকে খুব ভালোবাসে, না?
—মিথ্যে বলব না। বাসে। কিন্তু ওদের ভালোবাসাটা অন্যরকম ভালোবাসা। তা নিয়ে তোমার বা আমার চিন্তিত হবার কিছু নেই।
—তাই?
—তাই।
তারপরে ঝাঁঝি বলল, তাই তো করা উচিত। নতুন সৃষ্টি যিনি না করতে পারেন, তাকেও কি সৃষ্টিশীল বলা চলে?
—আমরা এখন কোনদিকে যাব?
—চলো, ওদের পিছু পিছুই যাই। দূর থেকে দেখব।
কিছুক্ষণ পরে সেই বাথুরিরা একটা পায়েচলা পথ দিয়ে পাহাড়ে উঠে জোরাণ্ডার কালো খাড়া পাথরে ঘেরা গিরিখাতের পাশের একটা উঁচু পাহাড়চুড়োতে গিয়ে নীচের গিরিখাতের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে করজোড়ে গান ধরল। গান তো নয়, যেন স্তোত্র, যেন উপনিষদের শ্লোক। কিন্তু ওড়িয়াতে।
পূর্ণরূপ পরমব্রহ্ম হে বড়াম ঠাকুর
অত্রাহি ভঞ্জন প্রভু জগত্তর ঈশ্বর।
নাহি রূপ নাহি বর্ণ অলংকার ঠাকুর
তুমি রূপ বর্ণিবাক নূহে মোর অন্তর
ইত্যাদি....
গামহার বলল, এসো, এই পাথরটার ওপরে বসি। আহা! কী অপূর্ব প্যানোরোমিক ভিউ। জাপান বা আমেরিকার কোনো নবতম ক্যামেরার প্যানোরোমিক বা ওয়াইডঅ্যাঙ্গল লেন্স দিয়েও এই ছবি তোলা যাবে না। এ শুধু মানুষের চোখ-ই দেখতে পারে। আজ সন্ধেবেলার এই রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ ক্যামেরা কোথা থেকে পাবে? কোনোদিন যদি পায়ও, তবেও তা চোখের সমতুল কখনোই হবে না।
ওরা গানটি গেয়েই চলেছিল, সমবেত কন্ঠে। গভীর আবেগের সঙ্গে। স্তব্ধ হয়ে শুনছিল ওরা দু-জনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
গামহার বলল, আমি একটি ব্রহ্মসংগীত জানি তার সঙ্গে এই গানটির আশ্চর্য মিল আছে।
—কী গান? আপনি ওদের ওই গানের মানে বুঝতে পারছেন?
—কিছুটা পারছি বই কী। থ্যাঙ্কস টু কুমুদিনী। যে-গানটির কথা বললাম, সেটি নিমাই চরণ মিত্রর লেখা, ‘কেন ভোলো মনে করো তাঁরে, যে সৃজন পালন করেন এ সংসারে।’ ব্রহ্মসংগীত।
তারপর বলল, লেখা নিমাইচরণ মিত্রর বটে, কিন্তু এটি উপনিষদের-ই একটি শ্লোকের হুবহু তর্জমা।
—কোন উপনিষদ?
—‘শ্বেতরোপনিষদ’। উপনিষদ পড়েছ নাকি তুমি?
—আমি তো দর্শনের ছাত্রী ছিলাম। সংস্কৃত ও বাংলাতেও এম এ করেছিলাম। এখন ধর্ষণের ছাত্রী।
—বলো কী? তিন তিনটে এম এ। না: তোমাকে প্রণাম করতে হবে। একটু পরে করব।
—যাই বলুন বাংলায় এম এ করলে কী হবে, আমার মাথা থেকে ‘আরণ্য’ শব্দটি বেরুত না। আপনিই কি তৈরি করলেন শব্দটি?
গামহার হেসে বলল, ভালোই বলেছ। আমি তো বি কম ফেল। তারপরে আর্ট স্কুল থেকে সাধারণভাবে পাশ করা ছেলে। শব্দ বানাব এমন যোগ্যতা কি আমার আছে? কলকাতাতে ফিরে অভিধানে দেখো। ‘আরণ্য’ শব্দটি তো থাকা উচিত তাতে। এর আগে কোনো বাঙালি কবি-সাহিত্যিক হয়তো ব্যবহার করেননি এই শব্দ। তাই হয়তো নতুন বলে মনে হচ্ছে তোমার।
—ওরা গান শুরু করার আগে একটু যজ্ঞমতো করেছিল। সম্ভবত বড়ামদেব-এর পুজোর আগের সন্ধিপুজো। তাতে শঙ্খ বেজেছিল বারে বারে। গান শেষ হলে ওরা সেই যজ্ঞের আগুন সযতনে পাথরে ঘিরে দিল, যাতে আগুন ছড়িয়ে যেতে না পারে। তারপর শোভাযাত্রা করে নয়, দল ভেঙে একজন দু-জন করে নেমে যেতে লাগল পাহাড়চুড়ো থেকে।
রাজা গামহারদের দেখতে পেয়ে বললেন, পুরো অন্ধকার হয়ে গেলে এখানে না-থাকাই ভালো কিন্তু।
—কেন বলুন তো? হাতি?
—না, না, হাতি এই দু-দিন আসবে না। জোরাণ্ডার এই গিরিখাতে নানা রহস্য আছে। দেবতা যেমন আছেন অপদেবতাও আছেন অনেক।
—তাই? কিন্তু আজ তো অন্ধকার থাকবে না। ওই দেখুন পুবাকাশে চাঁদ এখুনি উঠে পড়েছে আর সূর্য পশ্চিমের পাহাড়ের পিঠে স্থির দাঁড়িয়ে ছুটি চাইছে। নেমে যাবে এখন-ই। তারপর-ই তো ফুটফুট করবে জ্যোৎস্না।
রাজা একমুহূর্ত দাঁড়ালেন। বললেন, যে-ভয়ের কথা বলছি, চাঁদনি রাতেই সে-ভয় বেশি।
বলে, রাজাও নেমে গেলেন।
ঝাঁঝি বলল, কী শুনলেন? বুঝলেন কিছু?
—শুনলাম। কিন্তু বুঝলাম না। গিরিখাদের রহস্যের চেয়েও বেশি রহস্যময় মনে হচ্ছে রাজার কথা।
—আমারও তাই মনে হয়। চাঁদনিরাতেই অপদেবতার ভয় বেশি।
—কিন্তু উনি তো অপদেবতার কথা বললেন না শেষবারে। অন্য কোনো ভয়ের কথা বললেন।
—সেইটাই তো রহস্য।
—আপনার একটা কার্ড কিন্তু আজ অবধি আমাকে দেননি গামহারদা।
—কার্ড দিয়ে কী করবে? আমি অপদেবতা হয়ে হারিতের কাছ থেকে তো বটেই নবেন্দুর কাছ থেকেও তোমাকে ছিনিয়ে নেব। আসবে আমার কাছে? থাকবে? আমি গান গাইতে গাইতে ছবি আঁকব আর তুমি সঙ্গে সঙ্গে গাইবে।
—আর সুন্দরী ফরাসিনি জুনিপার? সে যখন আসবে?
—এলে আসবে।
তারপরে বলল, কেন? তুমিও কি হারিতের-ই মতো নাকি? আমাকে তার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবে না, যদি তেমন প্রয়োজন ঘটে? আমাদের ভালোবাসার ক্ষমতা কি এতই সীমিত যে, একজনকে দিয়েই তা ফুরিয়ে যাবে?
—না যাবে না। তবে কথাটা আমার বেলাও খাটবে তো?
—অবশ্যই। তুমিও নবেন্দুর সঙ্গে আমাকে...
—নবেন্দুর কথা বলবেন না। হরিমতি যার স্ত্রীর নাম, যে দশলাখ টাকা পাবে বলে বছর বছর স্ত্রীকে গর্ভবতী করে, তেমন পুরুষের নামও আমার কাছে উচ্চারণ করবেন না গামহারদা। আমার রুচি বলে একটা ব্যাপার আছে। আশ্চর্য! এখনও আছে!
—আমিও নবেন্দুকে অপছন্দ করি। মানে করেছি, প্রথমদর্শনের ক্ষণ থেকেই।
—কেন বলুন তো?
—প্রথমত কোনো পুরুষ বগল-দেখানো জামা পরলে আমার সমস্ত শরীর চিড়বিড় করে ওঠে। আর দ্বিতীয়ত ও তোমাকে ভালোবাসে বলে।
খুব জোরে হেসে উঠল ঝাঁঝি। তারপরে বলল, আর মেয়েরা যদি...
—যদি দেখবার মতো বগলতলি হয় তবে অবশ্যই দেখব। আমি আর্টিস্ট। কিন্তু কী দেখাবার আর কী দেখাবার নয়, এই সহজ বুদ্ধিটুকু যে, তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের নেই, সেই পুরুষ এবং স্ত্রীকে কী বলি?
ঝাঁঝি চুপ করেছিল।
—হঠাৎ-ই বলল, এখন আর কথা বলবেন না, প্লিজ।
সামনে চেয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল ওরা দুজনে-ই। বিদায়ী সূর্যের শেষ-আভা আর নবাগতা চাঁদের চাল-ধোওয়া সাদা আলোর মিশ্রণে যে-এক ঐশী ঔজ্জ্বল্যর সৃষ্টি হয়েছিল সমস্ত অঞ্চল জুড়ে, তার বর্ণনা দেয়, অমন ভাষার জোর ওদের দু-জনের কারোর-ই ছিল না। স্তব্ধ হয়ে সামনে চেয়েছিল ওরা। নির্বাক, নিস্পন্দ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর অভিঘাত যে, এমন মারাত্মক হতে পারে তা ওরা কাল রাত থেকেই বুঝছে কিন্তু এখনকার মতো সেই বোধ আগে তীব্র হয়নি।
গিরিখাতের অন্যপ্রান্তে দাবানল লেগেছে পাহাড়ে। এই স্নিগ্ধ উজ্জ্বল আলোর মধ্যে অঙ্গার-লাল দাবানলের আলোর মালা জড়িয়ে-মড়িয়ে গেছে পাহাড়চুড়োয়। সেই ঘনকৃষ্ণ বৃক্ষহীন, রুক্ষ, গম্ভীর পাহাড়-ই শুধু জানে, কার সঙ্গে মালাবদল করবে সে।
ঝাঁঝি স্বগতোক্তি করল, ওরা কি এখনও ঘুমোচ্ছে, নাকি মদ খাচ্ছে? এই দুই কর্ম করতে এতদূরে কেন যে আসা! মহীনের বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারলেই তো যথেষ্ট।
—সে-কথা তো পরশু রাতে চিকুও বলছিল হারিতকে। তাই নয়?
—হ্যাঁ।
হঠাৎ-ই গামহার-এর গলাতে কাঠিন্য লাগল।
সে আদেশের সুরে বলল, শোনো ঝাঁঝি, তুমি এই সামনের পাথরটার আর একটু ওপরে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ অনাবৃত করো।
—অ্যাঁ?
অবিশ্বাস এবং আতঙ্ক-মিশ্রিত গলাতে বলল, ঝাঁঝি।
তারপর বলল, গামহারদা, আপনি কি পাগল?
—পাগল নই। সেয়ানা-পাগলও নই। আমি আর্টিস্ট। এই ঐশী প্রকৃতির মাঝে আমি তোমাকে একবার পরিপূর্ণভাবে দেখতে চাই। তোমার নগ্নিকা মূর্তিকে।
—আমার গায়ে আপনি আঙুল ছোঁওয়াবেন না?
—না ঝাঁঝি। আমি আর্টিস্ট। শুধু চোখ ছোঁয়াব। রাজা বৃন্দাবন মহাপাত্রর ভাষায় বললে বলতে হয়, আমি যদি অপদেবতা হতাম ঝাঁঝি, তাহলে তোমাকে এই শিলাসনে গর্ভবতী করতে পারতাম। কিন্তু আমি যে, আর্টিস্ট। আমি দেবতা। তোমাকে নিয়ে আবার আসব এখানে অন্য এক পূর্ণিমায়।
—তুমি আমাকে একটি সন্তান দেবে গামহারদা? তুমি আমাকে ওই চাড্ডাকান্টেন্ট-এর হাত থেকে মুক্তি দেবে?
—দেব।
—তাহলে, তাড়াতাড়ি করো। আমার বয়স বেয়াল্লিশ।
ঝাঁঝি বলল।
—পাগলি। আমার বয়স ছাপ্পান্ন। তাড়াতাড়িই করব।
—ছেলে হলে কী নাম দেবে?
—কদম।
—আর মেয়ে হলে?
—কুসুম।
—বা:।
—এখন দেরি কোরো না। প্লিজ তাড়াতাড়ি করো। এসব জঞ্জাল খুলে ফ্যালো। ভারমুক্ত হও। জন্মদিনের পোশাকে ফেরো।
দু-মিনিটের মধ্যে ঝাঁঝি বিবস্ত্রা হয়ে গামহারের দিকে পাশ ফিরে দাঁড়াল।
বলল, আণ্ডিও খুলতে হবে?
—সব-ই খুলবে। তোমার নগ্নতার পূর্ণতায়, আমি এই দেবদুর্লভ মুহূর্তে তোমাকে দেখতে চাই।
হালকা মেরুন-রঙা আণ্ডিটিও খুলে ফেলল ঝাঁঝি। কালো পাথরে পড়ে রইল।
ওর মনে হল, ঝাঁঝির নগ্নিকা রূপ যেন, স্নিগ্ধ ফানুসের মতো চাঁদকেও হারিয়ে দিল সৌন্দর্যে। তার অনাবৃত পিঠের পরে মেঘরাশির মতো কেশভার মেলে দিল। সামান্য নত স্তনদ্বয়। একজোড়া পরিযায়ী হাঁসের মতো, উড়ুউড়ু। তার জঘন যেন আষাঢ়ের কালো মেঘাচ্ছাদিত উপবন।
গামহার-এর মনে হল, যেন সিমলিপাল পাহাড়শ্রেণির বাটুলি দুর্গর ওপরেই তারা দু-জনে দাঁড়িয়ে আছে, আজ থেকে বহুশতাব্দী আগে। ও বাথুরিদের রাজা। আর ঝাঁঝি রানি।
চাঁদ ও সূর্যের সেই দো-আঁশলা আলো ধীরে ধীরে ঝাঁঝিকে উজ্জ্বলতর করে তুলতে লাগল। তারপর একসময়ে সূর্য অদৃশ্য হল পাহাড়ের ওপারে। অদৃশ্য হল তার সব চিহ্ন। তখন রাত রুপোঝুরি। ঝাঁঝির ঊরুমূলের মেঘের ছায়াতেও রুপোচুর লাগল। গামহার এগিয়ে গেল ঝাঁঝির দিকে। ঝাঁঝির চোখে রুপোলি আতঙ্ক দেখা দিল। কিন্তু গামহার দাঁড়িয়ে-থাকা ঝাঁঝির পায়ের কাছে জোড়াসনে বসে তার শরীর স্পর্শ না করে তাকে ভক্তিভরে প্রণাম করল। তারপর উবু হয়ে তার জড়ো-করা পায়ের পাতাতে সোহাগভরে চুমু খেল।
—এ কী? একী! কী যে করেন আপনি!
—এই তো!
—‘এই তো’ মানে?
—সৌন্দর্যকে পুজো করল শিল্পী, চিরন্তন নারীকে, চিরন্তন পুরুষ।
তারপর বলল, নাও, এবারে সব পরে নাও।
ঝাঁঝি বলল, গামহারদা আমার বাবাও চিত্রী ছিলেন, কিন্তু মনে হয় আপনার মতো এতবড়ো ছিলেন না। আপনি জাতশিল্পী। জীবনে আপনাকে অনেকদূর যেতে হবে কিন্তু।
আমি বজ্জাত শিল্পী। কোথাওই যাব না আমি। তোমার সামনে তোমার পায়ের কাছে বসে শুধু তোমার-ই মুখের দিকে চেয়ে থাকব।
ঝাঁঝি তৈরি হয়ে বলল, চলুন।
গামহার বলল, তোমাদের পরমসৌন্দর্য তো তোমাদের নগ্নতাতেই। তবু অত যত্ন করে এত কিছু পরো যে কেন, তা তোমরাই জানো।
—চলো, আমার হাত ধরো। আজ থেকে তোমাকে নিজেকে আর পথ দেখে চলতে হবে না।
—আবার আমরা কবে আসব এখানে?
ঘোর-লাগা গলাতে বলল, ঝাঁঝি।
—শ্রাবণী পূর্ণিমাতে। যখন কদম ফুলে ছেয়ে যাবে পথ, এখন যেমন ছেয়েছে শিমুলে পলাশে। এখানে নয়, সেবারে যাব বাটুলি দুর্গে।
—খুঁজে বের করতে হবে তো সে দুর্গ।
সে, আমি আগে এসে খুঁজে বের করে যাব। তোমাকে নিয়ে আসব পরে। বাটুলি দুর্গের মাথাতে একদিকে কদম আর একদিকে কুসুম গাছের পাহারাতে শ্রাবণী পূর্ণিমার রাতে তোমার গর্ভাধান করব।
বলেই বলল, খুশি তো তুমি? ঝাঁঝি?
—খু-উ-ব।
—এতবছর কোথায় লুকিয়ে ছিলেন আপনি গামহারদা?
—তুমিই বা কোথায় ছিলে? কতপথ হেঁটে এলাম একা একা। সময়ে সব হয়। সময়কে সময় তো দিতেই হয় ঝাঁঝি। তুমি কি Walt Whitman পড়েছ? Leaves of Grass?
—না।
—তোমাকে আমি উপহার দেব।
‘All truths wait in all this,
They neither hasten their own delivery nor resist it,
They do not need the obsteric forceps of the Surgeon.’’
—বা:।
ঝাঁঝি বলল, গামহারের হাতে হাত রেখে নামতে নামতে।
ঝাঁঝি বলল, এখন যদি হারিত কান্বখুণ্টা সাপ হয়ে পথে শুয়ে থাকে?
গামহার হাসল। বলল, হারিত ছেলে ভালো। তবে তোমার সঙ্গে মেলেনি এই যা। তুমি ওকে ছেড়ে এলে ওর হয়তো ভালোই হবে। ও হরিমতির-ই মতো কোনো বড়োলোকের মেয়েকে বিয়ে করে শ্বশুরের পয়সার জন্যে স্ত্রীকে বছর-বিয়োনি করবে।
—আর নবেন্দু?
গামহার বলল।
—এমন সুন্দর সন্ধেবেলাতে ওর নাম কোরো না। রাগ হয়ে যায়।
ঝাঁঝি বলল।
—আমার একটাই ভয়।
গামহার বলল।
—কী?
—হারিত ‘ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস’-এ নালিশ করে দেবে না তো আমার নামে?
খিলখিল করে হেসে উঠল ঝাঁঝি।
চাঁদের আলো, গাছগাছালির ফাঁকফোঁকর দিয়ে এসে পথে পড়েছে। গামহারের মনে পড়ল, বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’-এ পড়েছিল আলো-ছায়ার বুটিকাটা গালচের কথা। এতবছর পরে তা প্রত্যক্ষ করে ভালোলাগাতে ভরে উঠল। তারপর ও স্বগতোক্তি করল, ‘কিওরোস্কিওরো’।
—কী বললেন?
—কিওরোস্কিওরো।
—মানে কী?
—তুমি কখনো রেমব্রান্টের ছবি দেখেছ?
—প্রিন্ট দেখেছি।
—ওরিজিনাল কি আমিই দেখেছি নাকি?
—কেন এই প্রশ্ন?
ছবিতে আলো-ছায়ার ব্যবহারশৈলীকে বলে ‘কিওরোস্কিওরো’। বানানটা হচ্ছে Chiaroscuro এতদিন রেমব্রান্টকেই কিওরোস্কিওরোর মাস্টার বলে জানতাম। আজ জানলাম, তিনিও ছাত্রই। আসল মাস্টার প্রকৃতি। ঈশ্বর। চাহালা থেকে জোরাণ্ডা আসতে আসতে সকালেই এই কথাটি আমার মনে হচ্ছিল। এই রাতে, সেই মনে হওয়াটা প্রত্যয়ে এসে পৌঁছোল।
ওরা সমতলে নেমেই দেখল জোরাণ্ডা বাংলো থেকে হেডলাইট জ্বেলে দু-টি গাড়িই বেরোচ্ছে।
পাছে ওরা ঘুরে মরে ওদের-ই খোঁজে তাই গামহার তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে পথের মাঝখানে দাঁড়াল।
দু-টি গাড়িই থেমে গেল।
—পরস্ত্রীর সঙ্গে গেছিলে কোথায় চাঁদনি রাতের আড়ালে-আবডালে?
চিকু বলল।
জারুল হাসছিল।
বলল, যেমন ‘ভ্যাবলা-ভ্যাবলা’ ভান করে থাকেন আসলে তেমন তো নন আপনি গামহারদা! এদিকে হারিত তো খাদে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল।
গামহার বলল, রাজা বললেন, এখানে নাকি অনেক-ই অপদেবতা আছেন। পাছে পরস্ত্রীকে তারা গর্ভবতী করে দেয়, তাই পাহারা দিচ্ছিলাম।
নবেন্দু বিদ্রূপের গলাতে বলল, গামহারদার বয়েস হলে কী হয়, খুব শিভালরি আছে। রস তো আছেই।
যার স্ত্রীকে নিয়ে সে হারিয়ে গেছিল, সেই হারিত গাড়ি থেকে নেমেই এগিয়ে এল।
গামহার ভাবল, এই পড়ল বুঝি ঘুঁসি তার নাকে।
কিন্তু না। হারিত বলল, সেই জাপানি সানটোরি না পানটোরি হুইস্কিটা কী হল গামহারদা? আমাদের পুনর্জন্ম সেলিব্রেট করতে হবে না! সেজন্যেই আমাদের তোমাকে খুঁজতে বেরোতে হল। তোমার ব্যাগের চাবিটা তো দিয়ে যাবে অন্তত যাবার আগে।
সরি, হারিত। চলো, এখুনি বের করে দিচ্ছি।
গামহার উঠল নবেন্দুর গাড়িতে আর ঝাঁঝি, চিকুর গাড়িতে।
গামহার ভাবছিল, ‘হারিত’ শব্দর মানে অপহারিত। টাকার হিসেব, কম্পিউটার, আর মদ আর তাস তাকে অপহরণ করে নিয়েছে অনেকইদিন হল।
হারিত যার নাম সে তো হারবেই! এই ‘আরণ্য’ কাকে হারায় আর কাকে জেতায়— তা সে-শুধু জানে। আর হয়তো জানেন বাথুরিদের বড়াম ঠাকুর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন