বুদ্ধদেব গুহ

রান্নাঘরে অরা ও বৃহস্পতি সকালের ব্রেকফাস্ট বানাতে ব্যস্ত। রান্না বৃহস্পতি করে। অরা নির্দেশ দিয়ে দেন। মেয়েটি বুদ্ধিমতী আছে। যা অরা শেখায় তাই শিখে নেয়। কড়াইশুঁটির চপ, তাঁর শাশুড়ির রেসিপির ভুনিখিচুড়ি, তাঁর মায়ের রেসিপির চাওমিয়েন, কষা মাংস, মোমো, পাটিসাপটা ও সব-ই শিখে নিয়েছে।
তৃষা আর চুমকির জন্যে চিজ-টোস্ট বানাবেন বলে চিজ গ্রেট করছিলেন অরা। দু-জনেই তখনও ঘুমোচ্ছে। আজ রবিবার। কাল রাতে চুমকি দেরি হওয়াতে এখানেই থেকে গেছিল। চুমকিরা সল্টলেক-এ থাকে। অরাই চুমকির মাকে বলে দিয়েছেন ফোনে। অতরাতে ট্যাক্সি নিয়ে সল্টলেকে যাওয়াটা আজকাল নিরাপদ নয়।
এমন সময়ে ফোনটা বাজল।
অরা বললেন, আমার হাতজোড়া। ধরো তো গিয়ে ফোনটা বিস্পতি। আর কর্ডলেসটা নিয়ে এসো। তারপর মেয়েদের তোলো গিয়ে। আজকালকার ছেলেমেয়েদের রকম-ই অমন। রাত দুটোর আগে শুতে যাবে না, বই পড়বে, গান শুনবে, টিভি দেখবে, হিহি-হাহা করবে, তারপর ঘুমোবে।
অরারা অন্যভাবে মানুষ হয়েছেন। রাতে যদি কখনো শুতে দেরিও হয় ঠিক পাঁচটাতে ঘুম ভেঙে যায়। অবশ্য একদিক দিয়ে ভালো। সকালের দু-তিন ঘণ্টা সময়ই তাঁর নিজস্ব সময়। কিছু পড়বার, একটু গান গাইবার, কারওকে চিঠি লিখবার। তবে তিনি যাঁকে নিয়মিত লিখতেন সেই অগ্নিভ রায় এখন কলকাতাতেই চলে এসেছেন নাগপুর ছেড়ে। তাঁরও ভোরে ওঠার অভ্যেস। কোনো কোনোদিন অগ্নিভকে সকালের ফালিটুকুতে ফোনও করেন—অগ্নিভও করেন প্রায়-ই। সারাদিনটা ভালো কাটে যেন, এনে অন্যের সঙ্গে সকালে কথা বললে।
বিস্পতি কর্ডলেসটা এনে দিয়ে বলল, যাই, দিদিদের তুইলে দিই আসি গে।
—ফোনটা কে করেছেন?
—ওই।
—‘ওই’ মানে কী হল?
—ওই অগ্নিবাবু।
—অগ্নি নয়, অগ্নিভ।
—ওই হল গা। বুইজতে পাইরলেই তো হল।
চিজ-এর স্ল্যাবটা রান্নাঘরের টেবিলে নামিয়ে রেখে অরা বললেন, বলছি।
—কী করছ?
ও প্রান্ত থেকে অগ্নিভ বললেন।
—মেয়েদের ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছি।
—আমার জন্যেও বানিয়ো। আমি আসছি আধ ঘণ্টার মধ্যে।
—আজকাল তো দেখছি ডুমুরের ফুল হয়েছ। টালিগঞ্জে বুঝি কোনো গার্লফ্রেণ্ড হয়েছে নতুন?
—আজ্ঞে না। আমার ওল্ড ইজ গোল্ড। তা ছাড়া, এই বুড়োর দিকে চাইছে আর কে?
—চলে এসো। কাল চুমকি রাতে এখানে ছিল। তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল।
—ফাইন। বুড়ো হয়েছি বলেই অল্পবয়সিদের সঙ্গে মিশতে ভালো লাগে। ওদের জগৎটাই আলাদা। যে-জগতের মধ্যে আমরা ঢ়ুকতে পারব না। আর তাই-ই হয়তো ওরকম মনে হয়। জীবনেও যদি মোটরগাড়ির মতো ব্যাক গিয়ার থাকত তবে বেশ হত।
—বয়সে বুড়ো হলেই কি মানুষ বুড়ো হয়। চারধারে কত যুবক-বুড়ো দেখি।
—তা হয়তো ঠিক। মনের বয়স আমার পনেরোতেই আটকে আছে।
—ভয় তো সেজন্যেই।
—ভয়টা কীসের?
অরা একটু চুপ করে রইল। তারপরে বলল, সকালেই এমন কথার ফুলঝুরি ফোটাতে শুরু করলে।
—সকালে কি কেউ ফুলঝুরি ফোটায়? এখন তো ফুল ফোটানোর সময়। ঠিক আছে। আসছি আমি।
তারপর বললেন, আমাদের রাস্তার মোড়ের মিন্টুর দোকানে দারুণ অমৃতি বানায়। নিয়ে যাচ্ছি এক কেজি। তারপর-ই বললেন, অমৃতি ছাড়া কিছু আনব কি? দোকানটাতে ভালো হিঙের কচুরিও করে।
—না। একদম না। তৃষা এবং চুমকি ঘি-এর কোনো জিনিস-ই মুখে দেয় না।
—সত্যি। পৃথিবীটা কেমন বদলে গেল। স্নানটা করেই যাচ্ছি।
—এসো। ছাড়ি এখন?
—হ্যাঁ।
অরা অন্য দশজনের মতো ফোনের রিসিভার তুলে বলে না, হ্যালো বা ইয়েস। বলে, বলছি।
তৃষা আর চুমকি নাইটির ওপরে ড্রেসিং গাউন পরে বসার ঘরে এল। তৃষা বলল, বিস্পতিদি, মা কোথায়?
—তিনি তো আন্নাঘরে।
—মা আবার রান্নাঘরে কী করতে গেলেন। দেখেছিস চুমকি। তোর জন্যেই স্পেশ্যাল কোনো আইটেম বানাচ্ছে হয়তো।
—ভারি খারাপ। আমি কি খেতে এসেছি? কোথায় মাসিমার সঙ্গে একটু গল্পটল্প করব, মাসিমার গান শুনব। তা না।
তৃষা বলল দাঁড়া, দেখে আসি। বলে, কিচেনের দিকে গেল। কিচেনে ঢ়ুকে তৃষা বলল, ঘি-টি দিয়ে কিছু কোরো না মা। চুমকি মুখেও দেবে না।
—হুঁ। তা ঘি তো আজকাল রাখিই না বাড়িতে বলতে গেলে। সামান্য থাকে, গাওয়া ঘি। খিচুড়ি বা ফেনাভাতের সঙ্গে পাতে খাওয়ার জন্যে। সবকিছুই তো হোয়াইট অয়েলেই রান্না হয়।
এমন সময়ে চুমকির মোবাইলে কোনো মেসেজ এল। মেসেজটা দেখে খুশি হল চুমকি।
আমাদের ছেলিবেলায় শুধু কুকুরদের-ই ঘি সয় না জাইনতাম। আইজকালকার ছেইলে মেয়িদের বুইজতে পারি না—
বিস্পতি বলল, নিজের মনে।
তৃষা ফিরে এল বসার ঘরে।
মা তোর জন্যে চিজ টোস্ট আর সুজির হালুয়া করছেন। বেশ লবঙ্গ, তেজপাতা, ভালো করে ঘি-টি দিয়ে।
—ঘি?
আতঙ্কিত চোখে বলল চুমকি।
—ইয়েস ঘি।
অরা বসবার ঘরে ঢ়ুকতে ঢ়ুকতে বললেন, হালুয়াতে আর কী ঘি! তোর অগ্নিকাকা আসছেন অমৃতি নিয়ে। সঙ্গে হিঙের কচুরিও আনছিলেন। মানা করেছি।
চুমকি উত্তেজিত হয়ে বলল অগ্নিকাকা আসছেন। গ্রেট। এই রবিবারের সকালটা একেবারে জমে যাবে। কী বলিস তৃষা?
তৃষা বলল, সত্যি। অগ্নিকাকাকে পছন্দ করে না, এমন কারওকে আমি দেখিনি, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে। তবে উনি নিজে বলেন, ওঁর কোনো মিত্র নেই, সব-ই শত্রু।
—বাজে কথা।
অরা বলল।
তারপর বলল, মানুষটার শত্রু-মিত্র কারওকে নিয়েই কোনো মাথাব্যাথা নেই। অমন উদাসীন মানুষ আমি তো আর দেখিনি।
অরা একটু চুপ করে থেকে চুমকিকে বলল, তবে তোমার মেসোমশায়, মানে তৃষার বাবা ঠাট্টা করেই বলতেন ও একটা মিচকে শয়তান। আ গ্রেট ইমপোস্টর। তবে আমার নিজের কিন্তু তা কখনো মনে হয়নি। হরিহর আত্মা বলতে যা বোঝায় ওঁরা তাই ছিলেন দু-জনে অথচ দু-জনের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল-ই বেশি ছিল। উনি গান-বাজনা ভালোবাসতেন না তেমন, রেডিয়োতে ক্ল্যাসিকাল গান হলে বলতেন, আরে বন্ধ করো এই কুকুরের কান্না।
—কী বলছেন মাসিমা আপনি! এমন হতেই পারে না।
চুমকি বলল, অবিশ্বাসের গলাতে।
—কেন পারবে না। ক্ল্যাসিকাল গান ভালো না বাসলেই কি একজন মানুষ অমানুষ হয়ে যান? ‘মানুষ’ নানা উপাদান দিয়ে তৈরি। অনেক কিছুকে বাদ দিয়ে এবং অনেক কিছু নিয়েই একজন মানুষ। সবাই-ই কি আর রবীন্দ্রনাথের ‘পূর্ণ মনুষ্যত্ব’র স্বর্গে পৌঁছোতে পারেন? খন্ড মানুষও অবশ্যই মানুষ। আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ-ই তো খন্ড মানুষ। পূর্ণ মনুষ্যত্বকে একটা আদর্শ হিসেবে সামনে রাখাটা ভালো কিন্তু তা অর্জন করা বড়ো কঠিন।
এমন সময়ে বসবার ঘরের কোণাতে রাখা ল্যাণ্ড-লাইনটা বাজল।
অরা বললেন, দেখ তো তৃষা, কে করল?
তৃষা ফোন তুলেই একগাল হেসে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ হর্ষদ। থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। ইটস ভেরি নাইস অফ ইউ। ফুল পাঠিয়েছে? এখনও পাইনি। পাব নিশ্চয়ই। কী আর করব? কাল রাতে চুমকি এখানে ছিল। অনেক রাত অবধি গানটান হল। শি ওয়াজ ইন হার এলিমেন্টস।
—কে? অগ্নিভ কাকা? না উনি কাল আসেননি। আজ আসছেন একটু পরে আমাদের জন্যে অমৃতি নিয়ে।
তারপর একটু থেমে বলল, ভালো বলেছ তো।
—মা কি জানেন?
—জানি না? জিজ্ঞেস করছি। তুমি মায়ের সঙ্গে কথা বলবে? দিচ্ছি।
বলো হর্ষদ। অরা বললেন। তোমার সব খবর ভালো? শুনেছ তো এখন এখানে প্লেজেন্ট ওয়েদার। কী বললে? ওখানেও প্লেজেন্ট ওয়েদার? তবে এ-বছর বৃষ্টি তো তেমন হল না, শীতও পড়ল না। যা গরম পড়বে এরপর ভেবেই আতঙ্কিত হচ্ছি।
—কোথায় যাচ্ছ ছুটিতে? মাথেরান-এ? যাও যাও ঘুরে এসো। তোমার মেসোমশাই বলতেন, পরের জন্মে বিয়ে করে মাথেরান-এ হানিমুন করতে আসব। সত্যি দারুণ-ই সুন্দর জায়গা। একা গেলে ভালো লাগবে? ও বন্ধুদের সঙ্গে যাচ্ছ? যাও, ঘুরে এসো। নাও তৃষার সঙ্গে কথা বলো। কলকাতাতে আসছ কবে? পুজোর সময়ে? ফাইন। মা-বাবা ভালোই আছেন তো? তৃষা তো গেছিল গত সপ্তাহেই।
তৃষা রিসিভারটা মায়ের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলল, হর্ষদ উই উইল বিট ইট আপ হোয়েন ইউ কাম। কোথাও সকলে মিলে বেড়াতে যাব। কোনো জঙ্গলে-টঙ্গলে, মা অগ্নিভকাকা সকলকে নিয়ে। মাসিমা মেসোমশাইও কি যাবেন?
—বোধ হয় নয়। মা-বাবার বস্টনে যাওয়ার কথা আছে দিদি-জামাইবাবুর কাছে।
—তুমি একা থাকবে?
—একা কেন? নন্দন তো থাকবে। কলকাতাতে এলে ওই তো আমার গার্জেন হয়।
তারপর তৃষা বলল, ওক্কে। বাই। থ্যাঙ্কস আ লট হর্ষদ।
ফোনে শব্দ করে একটা চুমু খেল তৃষাকে হর্ষদ। বলল, তুমি আমাকে একটা খাও।
তৃষা গলা নামিয়ে আদুরে গলাতে বলল, না-আ-আ। মা পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
বলেই, ফোন ছেড়ে দিল। বলল, পরে ফোন করব মোবাইলে।
ফোন ছাড়তেই অরা বলল, কী বলছিলরে হর্ষদ?
—কী আবার বলবে। একনম্বরের পাজি ছেলে।
—বলছিল কী বল না?
—বলছিল ফোনে চুমু দাও।
অরা এবং চুমকি হেসে উঠলেন ও উঠল।
অরা বললেন, আই অ্যাডোর হর্ষদ। একটা দারুণ প্রাণবন্ত ছেলে। তা তোর মা কি এতই ব্যাকডেটেড যে, তুই ফোনে শব্দ করে একটা চুমু খেলে রাগ করত?
তারপর বললেন, তোদের এই দোষ, জানিস তো?
—কী?
—তোরা ভাবিস যে, আমরা জন্ম থেকেই বয়স্ক। আমাদের যেন, কৈশোর বা যৌবন ছিল না। তোদের অনুভূতি যেন, আমাদের ছিল না। তোদের যেন আমরা বুঝতে পারি না একেবারেই।
—ওরকম করে বোলো না মা। তোমরা কি বয়ফ্রেণ্ডদের ফোনে শব্দ করে চুমু খেতে?
—না, তা অবশ্য খেতাম না। আমাদের সময়ে ভালোবাসায় গোপনতা ছিল, তাই তার মাধুর্য ছিল বেশি। সবকিছুই সব অনুভূতিই আজকের মতো ‘বাজারি’ হয়ে যায়নি।
প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে তৃষা বলল, আজকে ভ্যালেন্টাইনস ডে। জান মা?
—কে জানে বাবা। আমাদের ছেলেবেলায় তো এসব শুনি টুনিনি। এই গ্লোবাইলাইজেশনের যুগে কত কীই যে, ঘটছে!
এমন সময় রুরু ফেডেড জিনস এবং একটা গেঞ্জি পরে একেবারে চান-টান করে বসার ঘরে এল গাইতে গাইতে—‘‘তোমার দেখা নাইরে তোমার দেখা নাই।’’
চুমকি ওকে দেখে একটু ব্লাশ করল।
রুরু বলল তৃষাকে, বুঝলি দিদি, তোর বন্ধুটা আনসিভিলাইজড।
—কোন বন্ধু?
—আরে এই যে, চুমকি বোস।
—এই চুমকি, তোর চেয়ে বয়সে বড়ো। সম্মান দিয়ে কথা বল।
—পুরো সম্মান দিয়েই বলছি। বয়সে ছোটোবড়োতে কী আসে যায়। ‘উইসডম’ হচ্ছে আসল। তা ছাড়া, জান না? আজকাল পশ্চিমি দেশে ট্রেণ্ড এসেছে যে, অধিকাংশ ছেলেরাই তাদের চেয়ে বয়সে বড়ো, মেয়েদের সঙ্গে প্রেম করছে, বিয়ে করছে।
তৃষা বলল, থাকিস তো মায়ের হোটেলে। কাজকর্ম কর, রোজগার-টোজগার কর, নিজের পায়ে দাঁড়া, তারপর তো বিয়ের স্বপ্ন।
—দেখ দিদি, তোকে ওই সিউডো-ইনটেলেকচুয়াল হর্ষদাটা একেবারে জাদু করে রেখেছে। প্রেমের সঙ্গে বিয়ের কী সম্পর্ক? প্রেমটা একটা এটার্নাল ব্যাপার আর বিয়েটা তাতে বাঁধন দেয়। তবে এই বিয়ে ব্যাপারটাই পৃথিবী থেকে উঠে যাবে একদিন। তোর বন্ধু একটা বেরসিক। পড়াশুনোতে ভালো হতে পারে। দেখতেও ভালো হতে পারে। দেখ আজ ভ্যালেন্টাইনস ডে—সাতসকালে মোবাইলে মেসেজ পাঠালাম কিন্তু রেসপন্স-ই করল না।
তৃষা চেপে ধরল চুমকিকে।
—এ কী রে! সকালের মেসেজটার শব্দ পেয়েছিলাম। সেটা যে, রুরুর-ই মেসেজ ভাবতেও পারিনি।
চুমকি বলল, বাচ্চা ছেলেরা কত দুষ্টুমিই না করে। তা বলে সবসময়েই কি কান মুলে দিতে হয়?
রুরু, অরাকে বলল, দেখেছ মা। তুমি দিদির এই বন্ধুকে ভালো মেয়ে বলতে পারো কিন্তু এমন হার্টলেস মেয়ের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
সকলেই হো হো করে হেসে উঠলেন।
চুমকি বলল, সম্পর্ক ছিলটাই বা কবে যে, আজ না থাকার কথা উঠছে?
—তাই? ঠিক আছে চুমকি। তুমি ভাবো তুমি অনেক জানো কিন্তু আসলে যে, কিছুই জানো না তা পরে বুঝবে। আমার নাম রুরু। একদিন আমিই হব তোমার গুরু।
—এবার চল আমরা একে একে চান করে নিই।
—না, আগে ব্রেকফাস্ট খেয়ে নাও তারপর চানে যাবে। অগ্নিকাকা এই এসে পড়লেন বলে।
অরা বললেন।
তারপর গলা তুলে বললেন, বিস্পতি, পেঁপে আর আপেলগুলো কেটে ফেল ততক্ষণ। চিজ টোস্টগুলো আমি গিয়েই ভাজছি। তোমরা কেউ দুধ কর্নফ্লেকস খাবে কি? তাহলে বিস্পতিকে দুধ গরম করতে বলি।
রুরু বলল, আমি খাব। তবে ঠাণ্ডা দুধ দিয়ে।
তোমরা কেউ ‘রিয়্যাল’-এর ফুট জ্যুস খাবে? পেয়ারা আর টোম্যাটো জ্যুস আছে।
চুমকি বলল, এতসব কি খাওয়া যায় মাসিমা? তারপর অগ্নিকাকা আবার অমৃতি আনছেন।
—তাও মাত্র এককেজি।
রসিকতা করে বললেন অরা। তারপর বললেন অগ্নি হচ্ছেন তৃষার বাবার বিপরীত মেরুর মানুষ। তোদের বাবা হলে, গুনে গুনে আটটা আনতেন চারজনের জন্যে। তবে খুব ‘হিসেবি’ ছিলেন বলেই অসময়ে তোর বাবার মৃত্যুর পরে আমরা ভেসে যাইনি। সংসারে সব জিনিসের-ই ভালো দিক মন্দ দিক থাকে।
রুরু বলল, বাবাকে আমার ভালো করে মনেই নেই। আমি তো তখন আড়াই বছরের ছিলাম, না-মা?
—হ্যাঁ। আর চুমকি ছিল পাঁচ বছরের। তোর বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে তোর অগ্নিকাকা দু-মাসের ছুটি নিয়ে নাগপুর থেকে এসে ঝড়ের মধ্যে হাল ধরেছিলেন।
চুমকি বলল, নাগপুরে অগ্নিকাকা কী কাজ করতেন?
—উনি প্রথমদিকের এনভায়রনমেন্ট সায়ান্টিস্ট। উনি আর তোর বাবা একইসঙ্গে বস্টনে পড়াশুনো করেছিলেন। তোর বাবা পড়েছিলেন নিউক্লিয়ার ফিজিক্স নিয়ে আর উনি এনভায়রনমেন্ট নিয়ে।
—নাগপুরে কোথায় পড়াতেন?
চুমকি জিঞ্জেস করল।
—নিরিতে।
—‘নিরি’টা কী জিনিস?
রুরু বলল।
—‘নিরি’ মানে ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট। তোদের অগ্নিকাকা তখন ডিরেক্টর ছিলেন, পরে ম্যানেজিং ডিরেক্টর হন। বহুদিন এম.ডি. ছিলেন রিটায়ার করার দিন পর্যন্ত। নাগপুরেই সেটল করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আমাদের-ই কারণে কলকাতাতে এসে সেটল করলেন।
অগ্নিকাকা বিয়ে করেননি কেন মাসিমা?
—তা কী করে বলব? বলো মা। তিনি বলেন, সময় করতে পারেননি। তা ছাড়া বিয়ে করার মতো কেউ নাকি আসেইনি তার জীবনে।
—কলকাতায় তো প্রায়-ই আসতেন।
—হ্যাঁ। আমরা এখানে চলে আসার পর। তার আগে খড়্গপুরে আসতেন। ‘আই আই টি’-র ফ্যাকাল্টি ক্যাম্পাসে আমাদের বাংলোতে তো জায়গার অভাব ছিল না। তবে সেখান থেকে কলকাতাতে চলে আসতেন প্রায়-ই গানের টানে। চন্ডীদাস মাল ও দিলীপ মুখোপাধ্যায় মশায়দের কাছে পুরাতনি গানের তালিম নিতেন। রবীন্দ্রসংগীত শিখতেন সন্তোষ সেনগুপ্ত ও দেবব্রত বিশ্বাসের কাছেও, যতদিন ওঁরা ছিলেন। ওর কাছেই শুনেছি দিলীপ মুখোপাধ্যায় নাকি সাম্প্রতিক অতীতে গত হয়েছেন।
ওরা ডাইনিং টেবিলে বসেছিল সকলে। অরার স্কুল শনি, রবি ছুটি থাকে। তাই সোমবার সকালে মানডে মর্নিং সিকনেস হলেও শনি, রবি বেশ রিল্যাক্সড থাকেন। ছেলেমেয়েরা খাওয়া শুরু করেছে এমন সময় ডোরবেলটা বাজল। রুরু গিয়ে দরজা খুলল। প্রতিবেশী অপালা এলেন। ব্যারিস্টারের বউ।
—এই যে অপালা মাসি, ভালো সময়েই এসেছ। আমরা ব্রেকফাস্ট করছি। এসো টেবিলে। বলেই বলল, তোমার হাতে ওটা কী?
—ওটা একটা রজনিগন্ধার মালা।
—কার জন্যে?
—তোমার মায়ের ভ্যালেন্টাইনের জন্যে। তিনি আজ নিশ্চয়ই আসবেন।
—আসবেন কী? এসে পড়লেন বলে।
অপালা খাওয়ার ঘরে ঢ়ুকতেই তৃষা বলল, আমার মায়ের ভ্যালেন্টাইন না তোমার ভ্যালেন্টাইন অপালা মাসি?
অপালা সুরসিকা। বললেন, ধরো, না হয় দু-জনেরই।
চুমকি বলল দু-জন নারীর এক-ই ভ্যালেনটাইন হয় কি না তা দেখতে হবে। ইন্টারনেটে ব্রাউজ কোরো তো রুরু ব্রেকফাস্টের পর।
অরা বললেন, একটা বুড়ো মানুষকে নিয়ে তোরা কী ইয়ার্কি শুরু করলি। ভালো এবং বোকা মানুষটা শুনলে দুঃখ পাবেন।
—ভালো মানুষ অবশ্যই, তবে বোকা মানুষ কখনোই নন। তা ছাড়া, মানুষটার মধ্যে এমন একটা ‘ক্যারিশমা’ আছে যে, তরুণীরাও সহজেই প্রেমে পড়তে পারে। অতসহজে অগ্নিকাকাকে ডিসমিস করা সম্ভব নয়। করতে চাইলে, আমি প্রতিবাদ করব।
তৃষা কপট রাগের সঙ্গে বলল।
—আমিও।
রুরু বলল।
অপালা বললেন, আমিও।
চুমকি বলল, আমি একাই বা বাদ যাই কেন?
এমন সময় ডোরবেল আবার বাজল।
এবারে বিস্পতি গিয়ে দরজা খুলল। আপ্যায়ন করে বলল, আসুন আসুন আগুনবাবু। আপনার লেইগেই সক্কলে টেবলে বইসে আচেন। তা আমৃতি এইনেচেন তো।
—আনিনি আবার। সঙ্গে কিছু হিং-এর কচুরিও এনেছি। তুমিও খেয়ো বিস্পতি ভালো করে।
—এঁজ্ঞে।
অগ্নিও খাওয়ার ঘরে গিয়ে ঢুকতেই সকলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
—আমি কি অসময়ে এলাম?
তৃষা বলল, তুমি যখন-ই আসবে তখন-ই সুসময়।
অরা চোখের ইশারাতে অপালাকে বললেন, কই অপা তোমার প্রেমের দানটা দাও এবারে।
অগ্নিভ একটু হকচকিয়ে গেলেন।
অরা বলল, অপালা কেমন মডার্ন দেখেছ। আজ ভ্যালেন্টাইনস ডে তাই তোমার জন্যে রজনিগন্ধার মালা নিয়ে এসেছে।
বলতেই কলাপাতার মোড়ক খুলে অপালা অরাকে দিয়ে বললেন, নে তৃষা, এটা পরিয়ে দে ওকে।
তৃষা দুষ্টুমি করে বলল, মাথা খারাপ। তোমার ভ্যালেন্টাইনকে আমি মালা পরাব কোন দুঃখে? আমার বুঝি ভ্যালেন্টাইন নেই?
এ কথাতে সকলেই হেসে উঠলেন।
অপালা মালা খুলে অরাকে ডাকলেন, বললেন আয় অরা, আমরা দুজনে-ই পরাই।
অরা হেসে বলল, পৃথিবীর ইতিহাসে দু-জনে মিলে একজনকে মালা পরানোর কোনো নজির আছে বলে আমি জানি না। কিন্তু আমার স্বামী না হয় বহুদিন পরলোকে, তোমার ঘরের ডাকসাইটে ব্যারিস্টার ঘোষসাহেব জানতে পারলে কুরুক্ষেত্র বাঁধাবেন না তো?
অপালা হেসে বললেন, আমার ঘরের পতিদেবতাটি রসকষহীন হলেও, এসব ব্যাপারে অত্যন্তই উদার। আমার ভ্যালেন্টাইনের ওপরে তার বিরূপ হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। বরং উনি বেঁচে যাবেন।
—উনি কী করছেন?
—কী আবার করবেন? সকাল থেকেই মক্কেল-বিক্কেল নিয়ে কনফারেন্সে বসেছেন। চলবে বেলা একটা অবধি। তারপর খেয়েদেয়ে জমিয়ে ঘুম। দুপুরে ঘুমোয় অবশ্য শনি-রবিবারেই। যেদিন কোর্ট থাকে, সেদিন কোর্ট থেকে ফিরে ঘুমোয়। তারপর রাত আটটা থেকে আবার কনফারেন্স চলে রাত একটা অবধি।
—তুই যে, কেন ছেড়ে দিস না হাইকোর্টের ব্যারিস্টারকে তা, তুই-ই জানিস।
—ছাড়তে পারলে তো ভালোই হত, কিন্তু পারলাম কই? অভ্যেস হয়ে গেছে। দাম্পত্যটা একটা অভ্যেস। এ অভ্যেস কাটানো ভারি শক্ত।
তারপর বললেন, মানুষটার অনেক দোষ থাকতে পারে, তবে একটা মস্ত গুণ এই যে, তাঁর নিজের সব খামতি সম্বন্ধে উনি পুরোপুরি সচেতন। মানুষটার মধ্যে রোমান্টিসিজম-এর ‘র’ও নেই। সেজন্যে তার মনে কোনো অপরাধবোধও নেই। আমার কোনো স্বাধীনতাতেই তিনি হস্তক্ষেপও করেন না। সফল উকিল-ব্যারিস্টারেরা বোধ হয় সকলেই এরকম।
অগ্নিভ বললেন, বা:। ঘরে ঘরে এমন স্বামী হোক।
তারপর-ই কলাপাতা মোড়া মালাটি অপালার গলাতেই পরিয়ে দিয়ে গেয়ে উঠলেন—
‘‘গাছে ফুল শোভা যেমন, হয় কি তেমন গাঁথলে মালা
গলায় দিলে ক্ষণিক মজা, তারপরেতেই হেলা ফেলা।
কোথা সে সৌরভ সুখ কোথা সে প্রফুল্ল মুখ
দুই অধরে রসভরে ভ্রমরে করে না খেলা
গাঁথলে মালা....................’’
সকলেই হইহই করে উঠলেন ও উঠল।
রুরু বলল, অগ্নিকাকা তুমি একটার পর একটা প্রেমের গান গেয়ে যাও। আজ যে ভ্যালেন্টাইনস ডে।
—আমার রোজ-ই ভ্যালেন্টাইনস ডে।
তারপর-ই রুরুকে বললেন, বাংলা ব্যাণ্ডের সেই গানটা তুই গা না।
—কোন ব্যাণ্ড?
—আহা, নাম টাম সব ভুলে যাই আজকাল। অনিন্দ্যর ব্যাণ্ড রে।
—ওঃ। ‘গান ভালোবেসে গান’।
—রাইট ইউ আর।
অরা বললেন, চিজ টোস্টগুলো, অমৃতি এবং হিং-এর কচুরি সব যে, ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আগে সকলে খেয়ে নাও। তারপর গান হবে।
তারপর স্বগতোক্তির মতো বললেন, হিং-এর কচুরির সঙ্গে গাঢ় ছোলার ডাল বা ঝলঝলে আলুর তরকারি দেয় না তোমার দোকানে?
—আমার দোকান হলে অবশ্যই দিত। কতদিন বলছি তোমাকে যে, চলো আমরা একটা দোকান দিই—সে দোকানে ক্ষীরের পাটিসাপটা, তোমার শাশুড়ির রেসিপির কড়াইশুঁটির চপ আর ঘুগনি বিক্রি করব শুধু। তাতেই বাড়ি-গাড়ি হয়ে যাবে।
—কথা পরে, আগে বসে পড়ো। কে কে চা খাবে আর কে কে কফি?
তৃষা বলল, মা, ড্রিঙ্কিং চকোলেট। ঠিক আছে?
—ঠিক আছে।
বলেই বললেন, অগ্নিভর আর অপালার দিকে চেয়ে— আজকালকার ছেলেমেয়েদের সময়ের বড়োই দাম। ঠিককে বলে ‘ঠি’, ইকনমিকসকে ‘ইকো’ দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিকসকে ডি. স্কুল, ফ্লেক্সিবলকে ‘ফ্লেক্সি’ এইসব।
তৃষা বলল, ‘সময়’ কোথা সময় নষ্ট করবার মা। তোমাদের সময়ে তোমাদের হাতে অঢেল সময় ছিল।
—আমাদের সময়কার সময় ছিল শান্ত, মধুর, আমরা ‘সময়’ নিয়ে কী করতে হয় তা জানতাম। আর তোরা সব ছটফট করা চড়াই পাখি, ডানার ঝাপটাতে সবসময়েই ধুলো ওড়াচ্ছিস।
—আর তোমরা?
—আমাদের ছিল শান্ত-গ্রীষ্ম দুপুরের ঘুঘুর ডাকের মতো সময়। তার মাধুর্য ইন্টারনেটে বসে আঙুল চালিয়ে তোরা কী করে বুঝবি?
অপালা বললেন, বুঝলে তৃষা, তোমরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জান, তবে এতজ্ঞানের প্রয়োজন সত্যিই ছিল কী ছিল না, তা একদিন তোমাদের বুঝতে হবে। জীবনকে ‘মধুর’ করতে এতজ্ঞান বোধ হয় বাধা হয়ে দাঁড়াবে তোমাদের কাছে। নিজেরাই এ কথা বুঝতে পারবে একদিন।
রুরু গেয়ে উঠল: ‘কে সারা সারা, হোয়াটেভার উইল বি, উইল বি।’
তৃষার মোবাইল বেজে উঠল।
সেটটার দিকে তাকিয়ে বোতাম টিপে বলল, হর্ষদ? আবার কী হল? না ফুল তো আসেনি এখনও। পাঠিয়েছ যখন, আসবে নিশ্চয়ই। আমরা এখন ব্রেকফাস্ট করছি জমিয়ে, অগ্নিকাকা, অপালা মাসি সব এসেছেন, চুমকি তো রাতে ছিল-ই। রুরু আর কোথায় যাবে? এখনও তো ডানা গজায়নি ওর। আমি তোমাকে পরে ফোন করছি। বাই-ই।
ব্রেকফাস্ট খাওয়ার পরে ওরা সকলে বসার ঘরে এসে বসেছে। সকলের অনুরোধে অগ্নিভ গান ধরেছেন—
‘প্রণয়’ পরম রত্ন, যত্ন করে রেখো তারে
বিচ্ছেদ তস্করে আসি যেন, কোনোরূপে নাহি হরে।
অনেক প্রতিবাদী তার হারালে আর পাওয়া ভার।
কখন যে, সে হয় কার কে বা বলিতে পারে।
অপালা বললেন, এটা কার গান?
—নিধুবাবুর, আবার কার? রামনিধি গুপ্ত। যিনি বাংলা টপ্পার জনক। নিধুবাবু অত্যন্ত বড়োমাপের কবিও ছিলেন। ওর গানে যেমন পানিং, তেমন কম রচয়িতার গানেই দেখা যায়। শব্দ চয়ন ও উদ্ভাবনও তেমন-ই। যেমন ‘অপ্রণয়’ এই শব্দটি।
অরা বললেন, একটি গানে ‘বাসনাকুসুম’ শব্দটি পেয়েছিলাম। ওটিও কি নিধুবাবুর? না বোধ হয়। ইফফাত আরা খান-এর গলাতে, তখন উনি দেওয়ান ছিলেন না, এই শব্দটি, একটি গানে পেয়েছিলাম। ‘‘বাসনাকুসুম হৃদয়ে যা ছিল, সকলি ফেলেছি তুলিয়া’’ বা ওইরকম কিছু।
চুমকি বলল, ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে আরও কিছু প্রেমের গান হোক অগ্নিকাকা। তারপর অরা মাসি রবীন্দ্রসংগীত বা অতুলপ্রসাদ গাইবেন।
—আজ আমার গলাটা ভালো নেই। তোমরা কেউ আমার গলাতে তিনটে চুমু খাও তো। ঠিক হয়ে যাবে।
অগ্নিভ বলল।
কার চুমু খাবেন?
—চুমু তো সকলের-ই খেতে ইচ্ছে করে। যে খাবে খাও।
—তবে আমিই খাচ্ছি।
চুমকি বলল।
—একে বলে চুমু-থেরাপি। সব রোগের চিকিৎসা করা যায় এই থেরাপিতে। বুঝেছ।
—এত আপনি শিখলেন কোথায়?
অপালা বলল।
—এই! একজীবনে কম কিছু তো করলাম না। অরাদের দেশ হাজারিবাগে, আমার এক মুসলমান গুরু ছিলেন। বাওয়ার্চিকে ‘বাওয়ার্চি’, হেকিমকে হেকিম, ইত্বরওয়ালাকে ইত্বরওয়ালা, তাঁর কাছ থেকেই এইসব বিদ্যা শিখেছি। আমি আর আশিস যখন হাজারিবাগে তোর মাকে দেখতে যাই, মানে আমি আর তোর বাবা, কাকাবাবু মেয়ে পছন্দ করার পরে তখন আশিসের সঙ্গেও তাঁর আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম। হাজারিবাগ তো আমার পুরোনো ঠেক। খুব মজা হয়েছিল সেবারে। আমরা কানহারি পাহাড়ের মাথার ওপরের বনবাংলোতে ছিলাম।
তৃষা বলল, চলুন-না অগ্নিকাকা, আমাদের সকলকে নিয়ে একবার হাজারিবাগে। মামাবাড়ি তো আর নেই। দিদিমা তো আগেই চলে গেছিলেন, দাদুর মৃত্যুর পরে তো বাড়ি বিক্রিই হয়ে গেছে। বড়োমামা স্টেটস-এ চলে গেলেন পাকাপাকি, বাড়ি দেখাশোনারও কেউই ছিল না। মামার কাছে শুনেছি, কানহারি হিল রোড-এ ছিল সেই বাড়ি।
মা তো এখনও নস্টালজিক। লাল মাটি, শালবন, কানহারি, সীতাগড়া আর সিলওয়ার পাহাড় ঘেরা হাজারিবাগ-এর কথা উঠলেই মায়ের চোখ এখনও ছলছল করে ওঠে।
—চলো একবার। সকলে মিলে যাওয়া যাবে। রাজডেরোয়া ন্যাশনাল পার্ক-এর উলটোদিকে ‘শালপর্ণী’ বলে একটা দোতলা রেস্ট হাউস বানিয়েছে বনবিভাগ। কাছেই ঝরনাও আছে একটা। চড়ুইভাতি করার আইডিয়াল জায়গা। তবে তোরা সকলেই যা ব্যস্ত। তোদের সকলকে একসঙ্গে একই সময়ে পাওয়াই তো অসম্ভব। আমি তো রিটায়ার্ড বুড়ো, আমার তো অঢেল সময় হাতে। গেলেই হল।
চুমকি বলল, বড়োবেশি কথা হচ্ছে। গান শুরু করো অগ্নিকাকা।
—চুমুটা খা আগে। বললাম না গলা খারাপ।
চুমকি উঠে এসে নীচু হয়ে অগ্নিভর গলাতে গুনে গুনে এক, দুই, তিন করে তিনটি চুমু খেল।
অগ্নি একবার গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, বা: ওষুধে কাজ হল বেশ। বলেই শুরু করলেন—
সে কেনরে করে অপ্রণয়? তার উচিত নয়।
ওগো তারি সনে কভু বিচ্ছেদ নয়।
কখন কী বলেছি মানে
আমার আজ কী তা আছে মনে
ওগো তাই বলে কী মানে মানে
অভিমানে রইতে হয়?
সে কেনরে করে অপ্রণয়?
সখী গো, বোলো তারে, বোলো গিয়ে বুঝাইয়ে
ওগো পিরিতি করিতে গেলে, সুখ দুখ সইতে হয়।
সে কেনরে করে অপ্রণয়,তার উচিত নয়।
সকলে হইহই করে বাহবা দিল।
অগ্নি বললেন, আজ আর নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন না, ভালো জিনিস ‘অল্প’ বলিয়াই ভালো।
তৃষা বলল, এবারে অপালা মাসি তুমি একটা গান গাও।
—মাথা খারাপ। এই গানের পরে! তার চেয়ে চল সকলে মিলে কোরাস গাই একটা।
—কোন গান গাইব অরা? তবে কোরাস নয়, তুই একাই গা।
—তা হবে না। তোরও গলা দিতে হবে।
ধর তো তুই।
অপালা গান ধরল,
খেলা যখন ছিল তোমার সনে, তখন কে তুমি তা কে জানত,
ছিল না ভয় ছিল না লাজ মনে, জীবন বয়ে যেত অশান্ত...
অরার স্কুলে এখন ওকেই হেডমিস্ট্রেসের কাজ করতে হয়, যদিও ডেজিগনেশন সিনিয়র টিচার। হেডমিস্ট্রেস রিটায়ার করার পর, সেই পদের স্যাংশন আসেনি হায়ার সেকেণ্ডারি বোর্ড থেকে।
এবারে গরমটা বোধ হয় তাড়াতাড়িই পড়বে। পড়ানো ছাড়াও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজও কম থাকে না। স্কুলের পরে বড়োক্লান্ত লাগে। একটা গাড়ি থাকলে বেশ হত কিন্তু ভালোভাবে বাঁচতে আজকাল যা খরচ তাতে অরার পক্ষে গাড়ি কেনা সম্ভব নয়। গাড়ি কেনাটা আজকাল অতিসহজ কিন্তু ড্রাইভারের মাইনে, রানিং কস্ট এসবে অনেক-ই টাকার দরকার। ওর স্কুলের দু-জন টিচার গাড়ি কিনেও কিছুদিন পরে অনেক টাকা গচ্চা দিয়ে গাড়ি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
বাইরে বেরিয়ে দেখলেন, মিনির জন্যে লম্বা লাইন। একটা ট্যাক্সি নেবেন কি না, তা নিয়ে দোনামোনা করছিলেন। তৃষা বেশ ভালোকাজ করে, একটি অ্যাড এজেন্সিতে। খুব সুনামও করেছে। মাইনেও ভালোই পায়। রুরু এখনও ছাত্র। তবে প্রাইভেট টিউশন করে। আশিস বলতেন, ছেলেমেয়েরা হচ্ছে টোয়েন্টি ওয়ান ইয়ার্স গেস্টস। ওদের সাধ্যমতো প্যাম্পার করতে হবে। তবে আজকালকার সন্তানেরা একুশে পায়ে দাঁড়ায় না। তবু যতদিন কাছে থাকে ততদিন-ই সুখ।
ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে নাকটা মুছলেন। ওঁর নাক ভীষণ ঘামে। এমন সময়ে ওর পাশে একটি সান্ট্রো গাড়ি এসে দাঁড়াল। হালকা নীল রঙা গাড়ি। আজকাল যা দিনকাল। অচেনা লোক গাড়ি নিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালে ভয় করে। অরার বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই কিন্তু দেখলে মনে হয় পঁয়তাল্লিশ। আয়নার সামনে দাঁড়ালে বা স্নান করার সময়ও, নিজেকে তেমন সুন্দরী বলে মনে হয় না। অন্যসব মেয়ের শরীরে যা-কিছু গর্ব করার থাকে তাঁর শরীরেও তাই-ই আছে। কিন্তু পুরুষের চোখ তাঁকে ‘সুন্দরী’ই দেখে। সুন্দরীমাত্রই কিশোরী বয়েস থেকে নানা বিপদের মধ্যে দিয়ে বড়ো হয়ে ওঠেন। এইসব বিপদের কথা শুধুমাত্র মেয়েরাই জানে। কখনো অপালাকে বলেননি, একদিন তার মহাদেব স্বামী ঘোষ সাহেবও একা বাড়িতে অরাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। প্রেমহীন শরীরে কখনো আকর্ষণ বোধ করেননি অরা। এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন ঘোষ সাহেবকে। তারপর থেকে অবশ্য আর কখনো দুঃসাহস দেখাননি। দুশ্চরিত্র পুরুষ মাত্রই ভীরু হয়। এমন-ই বিশ্বাস হয়েছে তার জীবনের মধ্য গগনে পৌঁছে।
—উঠে এসো অরা।
স্টিয়ারিং-এ বসা অগ্নিভ বললেন।
—এ কী! গাড়ি কবে কিনলে?
—আজ-ই ডেলিভারি পেয়েছি।
বাঁ-দিকের দরজাটা ঠেলে খুলে দিলেন অগ্নিভ।
সামনের সিটে বসতে বসতে অরা বললেন, গাড়ি কেনার কী দরকার ছিল? কী এমন দরকার তোমার গাড়ির?
—আমি কি আমার জন্যে কিনেছি?
গাড়ি ফার্স্ট গিয়ারে দিয়ে বললেন অগ্নিভ।
—তবে কার জন্যে কিনেছ?
—তোমার জন্যে।
আনন্দে ও গর্বে অরার মুখটি উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
বলল, বাজে কথা বলার জায়গা পাও না।
—সত্যিই বলছি। তোমাদের বাড়িতে তো একটা গ্যারাজও আছে।
—তোমার কাছেই থাকবে গাড়ি। তুমিই ব্যবহার করবে। খড়্গপুরে তো গাড়ি চালাতে তুমি। ‘এ.এ.ই.আই’ বা কোনো মোটর ট্রেনিং স্কুলে ক-দিন তামিল নিলেই তুমি আবার চালাতে পারবে।
—খড়্গপুরে আলাদা ব্যাপার ছিল। তবে শুনতে পাই, এখন সেখানেও খুব ভিড়। কিন্তু আজকের কলকাতাতে গাড়ি চালানো আমার কম্মো নয়। তা ছাড়া, আমার ব্লাড প্রেশারও যে, হাই। গাড়ি চালাতে গেলে তা আরও বেড়ে যাবে।
—চলো, আজ তোমাকে প্রেশার নেমে যাওয়ার ইনজেকশান দেব।
—কোথায়?
অবাক হয়ে বললেন অরা।
—আমার বাড়িতে।
—কী যে, হেঁয়ালি করো, বুঝি না।
—বুঝবে।
নিজের বাড়ির দিকে গাড়ি চালাতে চালাতে বললেন অগ্নিভ।
—কোথায় চললে তুমি?
—বললাম না, আমার বাড়িতে।
—এখন হুট করে কি যাওয়া যায়? বাড়িতে বিস্পতি বসে থাকবে। রুরুটা ফিরবে কলেজ থেকে। আমার কি কোনো স্বাধীনতা আছে?
—যে, নিজেকে পরাধীন করে রাখতে চায়, তাও নিজের হাতেই শিকল পরিয়ে, তাকে ‘স্বাধীন’ করতে পারে কোন শক্তি?
—তুমি বোঝ না?
—সব বুঝি।
—চলো অরা। আজ আমি কোনো কথা শুনব না। অনেক বছর অপেক্ষা করেছি আমি। বড়োকষ্ট হয় আমার। আমি এখনও যুবক আছি। তুমিও যুবতী। চলো, আজ আমরা পরীক্ষা দেব আর পরীক্ষা নেব।
—ছি: ছি:। এ কী হল, তোমার দু-যুগ পরে? তুমি তো এমন ছিলে না!
—চিরদিন-ই এমন-ই ছিলাম। কখনো প্রকাশ করিনি। কত কষ্ট যে, পেয়েছি। সব একা একা সয়েছি। এতে দোষের কী আছে?
—আশিস যদি থাকত তবে পারতে এমন করতে? ও জানলে কী ভাবত, কী বলত?
অরা বলল।
—ও নেই বলেই তো তোমাকে চাইছি আমি। তোমারও কি কষ্ট নেই অরা? পুরুষ মনে করে, শরীরের কষ্ট বুঝি তাদের-ই একার। মেয়েদের বুঝি নষ্ট নেই?
—নেই তা নয়। তবে মেয়েরা মেয়েবেলা থেকেই অনেক কষ্টকেই নীরবে মেনে নিতে শেখে। সবকিছুতেই পুরুষদের মতো অধৈর্য হয়ে ছটফট করে না।
—তুমি আমাকে অধৈর্য বলছ? পঁচিশ বছরের ধৈর্যটা কি ধর্তব্যের মধ্যে নয়?
—তুমি অবশ্য আমার শরীরটা দাবি করতেই পারো। গত পঁচিশ বছরে, তুমি আমার এবং আমার ছেলেমেয়ের জন্যে যা করেছ, তা অস্বীকার করার মতো অকৃতজ্ঞ আমি নই। কিন্তু...
—কিন্তু কী?
—তোমাকে তো আমি আমার মন দিয়েছি পুরোপুরিই। একজন মেয়ের পক্ষে যতখানি, যেমন করে দেওয়া যায় তেমন করেই। যাকে মেয়েরা মন দেয়, তাকে শরীর দিতে তাদের কণামাত্রও আপত্তি থাকে না। তোমরা পুরুষেরা এরকম-ই। তোমরা মেয়েদের শরীরটাকে তাদের মনের চেয়ে ‘দামি’ বলে মনে করো সবসময়েই। শরীর-বর্জিত আমাদের এই যে, অমলিন সম্পর্ক; এর মাধুর্য কি শরীরী সম্পর্ক হলে থাকবে?
—তুমি শরৎবাবুর নায়িকার মতো কথা বলছ অরা। তুমি যে, কত মহৎ আর আমি যে, কত নীচ তাই বলবার চেষ্টা করছ।
অরার দু-চোখ জলে ভরে এল।
বলল, তুমিও যদি আমাকে ভুল বোঝো তাহলে আমি কোথায় যাই বলো তো? তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে? আমি মনে মনে এখনও তৈরি নই অগ্নি। তা ছাড়া ব্যাপারটা এমন চটজলদি হয়? এমন একটা সুন্দর ব্যাপার, বিশেষ করে তোমার সঙ্গে আমার—এরজন্যে প্রস্তুতি লাগবে না? বিছানা ফুলে ছেয়ে দিতে হবে, ধূপ জ্বালাতে হবে সন্ধে থেকে, আতর গোলাপজলের বন্দোবস্ত করতে হবে। তুমি তো নিজেই আতরের স্পেশালিস্ট, রাশিদ খাঁ-এর ‘‘বাঁতো বাঁতো মে বিত গ্যয়ি রাত’’—এর ক্যাসেট চালাবে নীচুস্বরে। আমরা কি জন্তু জানোয়ার? শরীরসর্বস্ব? আমাদের শারীরিক ব্যাপারটা স্বর্গীয় হবে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অগ্নিভ বলল, তোমার পরম সুন্দর স্বর্গীয় ব্যাপারটি ঘটবার আগে আমি নিজেই স্বর্গে চলে যাব। গিয়ে, আশিসের সঙ্গে মন্দাকিনীর পাড়ে বসে পেশেন্স খেলব।
অরা মৃদু হেসে অগ্নির কাঁধে হাত ছুঁইয়ে বলল, লক্ষ্মী সোনা, আর একটু সময় দাও আমাকে।
গাড়িটা লাল আলোতে দাঁড়িয়েছিল। এমন সময় ফুটপাথে দাঁড়ানো রুরু চেঁচিয়ে উঠল ‘মা-আ-আ’।
এয়ারকণ্ডিশাণ্ড গাড়ির মধ্যেও সেই ডাক পৌঁছোল। অরা তাড়াতাড়ি অগ্নির কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে নিয়ে বাঁ-হাত দিয়ে কাচ নামিয়ে বলল, কী রে!
—এটা কার গাড়ি? তুমি কার সঙ্গে যাচ্ছ? কোথায়?
অগ্নি গলা তুলে বলল, উঠে আয় রুরু। তুই কোথায় এসেছিলি?
গাড়িতে উঠতে উঠতে রুরু বিস্ময়ের গলায় বলল অগ্নিভকে, একেবারে ব্রাণ্ড নিউ। কী দারুণ নতুন নতুন গন্ধ। কবে কিনলে? কীজন্যে কিনলে?
—আজ-ই কিনলাম। তোদের জন্যেই কিনলাম। গাড়ি চালানোটা শিখে নে। আঠেরো বছর তো হয়ে গেছে তবে আর কী?
অরা বলল এটাই বাকি। নিজে রোজগার করে গাড়ি কিনে, তারপর গাড়ি চালাবে।
বা: রে! আমার বন্ধুরা তাদের বাবার গাড়ি চালায় না বুঝি?
—অগ্নিকাকা তো, তোর বাবা নন।
—বাবার মতো তো!
—বাবার মতো আর বাবায় তফাত থাকে।
অগ্নিভর চোয়ালটা শক্ত হয়ে এল।
—কোথায় যাচ্ছ? অগ্নিকাকা? মাকে কোথায় পেলে?
—তোর মাকে দেখলাম, স্কুলের সামনে বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। তাই নতুন গাড়িতে তুলে নিয়ে বললাম, আমার বাড়ি চলো। বিরিয়ানি আনিয়ে খেয়ে সেলিব্রেট করি।
—বা: রে। আমরা বুঝি বাদ? দিদি শুনলেও ফায়ার হয়ে যাবে।
—তাহলে আজ থাক। চল তোদের নামিয়েই দিয়ে আসি বাড়িতে।
—তাহলে পার্টটা কবে হচ্ছে?
—তোরা যেদিন বলবি সেদিন-ই হবে। বাড়িতে বিরিয়ানি না খেয়ে, যদিও আমাদের পাড়ার নতুন বিরিয়ানির দোকানটা দারুণ বিরিয়ানি করে, চল সকলে মিলে একদিন মেইনল্যাণ্ড চায়নাতে খেয়ে আসি।
—ও বাবা:। সে তো ভীষণ-ই দামি জায়গা।
—তোরাও তো আমার কাছে খুব-ই দামি। সেদিন চুমকি আর তোর অপালা মাসিকেও নিয়ে যেতে হবে। ঘোষ সাহেব নিশ্চয়ই যেতে পারবেন না।
—সব বড়ো ব্যারিস্টারদের সপ্তাহে একদিন-ই ছুটি। সেদিন কোনো কনফারেন্স রাখেন না, ওঁরা কেউই।
—কবে?
—শুক্রবার সন্ধেতে।
অরা বলল।
—তবে তাই হবে। কোনো এক শুক্রবার সন্ধেতেই করা যাবে। ভদ্রলোক আমার একটা বড়ো উপকার করেছিলেন। কিছুতেই ফিস নেননি। যদিও একবোতল ‘স্কচ’ জোর করে দিয়েছিলাম। সেটা তো ওঁর ফিস-এর তুলনাতে কিছুই নয়। তা ছাড়া, অপালাও আমাকে খুব ভালোবাসে।
—আর, মা বুঝি বাসে না?
রুরু বলল।
—সে-কথা তোর মা-ই জানে।
অগ্নিভ ওদের বাড়িতে নামিয়ে দিল।
অরা বলল, এককাপ চা খেয়ে যাবে না?
—তুমি তো জানো যে, যখন তখন চা খাওয়ার হ্যাবিটটা আমি কালটিভেট করিনি অধিকাংশ বাঙালির মতো। তা ছাড়া, সন্ধের পরে আমি চা-টা খাই না। আজ এই গাড়ি ডেলিভারি নিতে খুব-ই হ্যাপা গেছে। বাড়ি গিয়ে স্নান করে দুটো হুইস্কি খাব তারপর চন্দনবাবু দয়া করে যা, রেঁধেছেন তাই খাব।
—আমার এখানে হুইস্কি-টুইস্কি নেই। তবে খেয়ে যেতে পারো এখানে। আজ চাওমিয়েন আর ধোঁকার ডালনা করতে বলেছি বিস্পতিকে।
রুরু বলল, স্ট্রেঞ্জ কম্বিনেশান।
তারপর বলল, এ মাসের তিনটি টিউশন থেকে যে-টাকা পাব তা দিয়ে, তোমার জন্যে একটা কিছু কিনে রাখব বাড়িতে অগ্নিকাকা।
—তুমি কি শুধু হুইস্কিই খাও? না রামও রাখব।
অরা বলল, তোমার ডেঁপোমি করতে হবে না। অগ্নিকাকার নাম করে বাড়িতে ওসব রেখে এই বয়েসে নিজেই পাঁড়মাতাল হয়ে উঠবে হয়তো।
রুরু বলল, মা-আ-আ। আমাদের বন্ধুরা যে, জলীয় তো বটেই, আরও কত কিছু খায় তা যদি তুমি জানতে! তোমার হিরের টুকরো ছেলেকে ওসব বোলো না।
গাড়ি থামিয়ে অগ্নি বলল, নাম এবারে।
তারপর বলল, আমার গাড়ির কী দরকার? তোদের গ্যারেজটা পরিষ্কার করে রাখিস রুরু। একজন ভালো ও বয়স্ক ড্রাইভার পেলে, গাড়িটাকে তোদের বাড়িতেই রাখব। তোদের ও তোদের মায়ের সুবিধে হবে। দিনে দিনে যা-অবস্থা হচ্ছে কলকাতা শহরের, বাসে মিনিবাসে যেতে তো কালঘাম ছুটে যায়। তোদের ফ্ল্যাটের গ্যারাজটা তো খালিই পড়ে থাকে।
অরাও গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল।
অগ্নি ডান হাত স্টিয়ারিং-এ রেখে বাঁ-হাত তুলে বলল, চললাম।
বিদায় সম্ভাষণটা অরাকে বলল, না রুরুকে। অরা ঠিক বুঝতে পারল না।
একটা মস্ত দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার। গাড়ির ব্যাকলাইটের আলোটা অন্য গাড়ির ভিড়ে হারিয়ে না-যাওয়া অবধি ফুটপাথেই স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল অরা।
রুরু ডাকল, মা।
রুরুর ডাকে সংবিৎ ফিরল অরার।
ছয়
ফ্ল্যাটে ঢুকেই অরা বিস্পতিকে ডেকে এককাপ চা করে দিতে বলল, লিকার, চিনি ছাড়া, একটু লেবু আর বিটনুন দিয়ে।
রুরু বলল, তোমার না প্রেশার বেড়েছে বলছিলে মা কালকে? বিটনুন খাওয়া কি ভালো?
—আমার ভালো, খারাপ নিয়ে তোর মাথা ঘামাতে হবে না। নিজেরা পায়ে দাঁড়া, ভালো করে পড়াশুনো কর। তোর লিটল ম্যাগ আর বাংলা ব্যাণ্ডের হুজুগ একটু কমা। জীবনে ‘সময়’-এর চেয়ে দামি আর কিছুই নেই। সময়ের জিনিস সময়ে না করলে পরে পস্তাতে হয়। যে-সময় চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না।
রুরু অরার কাছে এসে অরার হাতের সঙ্গে নিজের হাত জড়িয়ে বলল, তোমার কী হয়েছে মা? শরীর খারাপ?
—হ্যাঁ। শরীরটা ভালো না। তা ছাড়া, স্কুলেও খুব ঝামেলা গেছে। এত নোংরা রাজনীতি স্কুলে, যে বলার নয়। সব ব্যাপারেই জনগণায়ন আর রাজনীতিকরণ দেশটার সর্বনাশ করে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এর কুফল যখন ফলবে তখন বড়োই দেরি হয়ে যাবে। এই ক্ষতি আর পূরণ হবে না কোনোমতেই। ওই মনীষা রায় মহিলা একেবারে পেইন ইন দ্যা নেক। তার ওপরে কোথায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে স্নান করে একটু শুয়ে থাকব এককাপ চা খেয়ে, না তোর অগ্নিকাকা স্কুলের সামনে পৌঁছে আমাকে নতুন গাড়িতে চড়িয়ে সেলিব্রেট করতে এল। সবসময়ে সকলের মন যে, সেলিব্রেশনের জন্যে তৈরি থাকে না, এ-কথাটা যদি সবাই বুঝত।
উনি কী করে জানবেন যে, তোমার শরীর খারাপ আর স্কুলে ঝঞ্ঝাট গেছে। উনি তো ভালোবেসেই নতুন গাড়ি নিয়ে তোমাকে চড়াবার জন্যে এসেছিলেন।
—সবসময়ে সকলের ভালোবাসা সহ্য হয় না। আজও মাইনে হল না। ইনক্রিমেন্টের পরে চার মাসের ব্যাক পে বাকি রেখেছে। এদিকে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। ব্যাঙ্কের সুদের হারও কমে গেছে। সঞ্চিত অর্থের রোজগার-ই যাদের প্রধান আশ্রয়, তাদের কথা তারাই জানে। শুধু মাইনের টাকাতে তো চলে না।....
—মা, আমি তোমাকে মাসে হাজার টাকা করে দেব।
—এখনও দরকার হবে না। তেমন প্রয়োজন হলে বলব। তোদের তো পকেট-মানি বলে কিছুই দিতে পারি না। নিজের সব খরচ তো তুই নিজেই চালিয়ে নিস। তাছাড়া তৃষা তো, প্রতিমাসেই দেয়। না, না, তোর কিছু দিতে হবে না। আজ মাইনেটা হলে মেজাজ এমন বিগড়ে যেত না। কাল সকালেই তো দুধওয়ালা, কাগজওয়ালা সব এসে হামলা করবে। রেশনও তুলতে হবে। বাড়তি টাকা বলতে হাতে তো কিছুই থাকে না।
তারপর বলল, যাই হোক, এ নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবে না। কালও মাইনে না হলে, ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে নেব। তুই তোর পড়াশুনোর চিন্তা কর।
বিস্পতি চা-টা নিয়ে এলে চা খেয়ে, অরা স্নানে গেলেন। সব ঘরেই অ্যাটাচড বাথরুম আছে। নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দেওয়ার আগে বললেন, আমি স্নান করে একটু বিশ্রাম করব। তৃষা ফিরলে তোদের যদি খিদে পায় তো, তোরা খেয়ে নিতে পারিস। আমি পরে খাব। আর শরীর ভালো না লাগলে খেতে নাও পারি। ফোন এলে ধরিস। কেউ এলে দরজা খুলিস। ‘কি-হোল’ দেখে নিয়ে দরজা খুলিস। দিনকাল ভালো নয়। গতকাল সন্ধেবেলাতেই তো ‘স্বর্ণালি’ অ্যাপার্টমেন্টে মস্ত ডাকাতি হয়ে গেল। আমাদের বাড়িতে নেওয়ার মতো তো, কিছু নেই—তবু হাতঘড়ির জন্যে, টিভি-র জন্যেও ডাকাতি হয় আজকাল।
—পুলিশ তো কিছু করে না।
—পুলিশ কী করবে। এত মানুষ। পুলিশের কী দোষ? পুলিশ ভগবান হলেও কিছু করতে পারত না। ‘জনসংখ্যা’ই তো আমাদের দেশের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা।
—অথচ তা নিয়ে কোনো দলের-ই মাথাব্যাথা নেই একফোঁটা।
একথা বলে বিরক্তির সঙ্গে দরজা বন্ধ করে অরা ভেতরে গেল। ঘরে গিয়ে জামাকাপড় সব ছেড়ে একেবারে নিরাবরণ হয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়াল। বহুদিন পরে নিজেকে এমন মনোযোগ সহকারে দেখল। ভাবল, ওর কী এমন আছে যে, অগ্নি আজ ওকে এমন পাগলের মতো পেতে চাইল। এতবছর ধরে ওর কাছ থেকে ঠাঁই-নাড়া হল না।
তারপর স্নানঘরে গিয়ে গরম-ঠাণ্ডা জল মিশিয়ে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল অরা, খুব ভালো করে সাবান মেখে। শরীরের মধ্যেও একটা জ্বলন বোধ করছিল—অগ্নির ওপরে রাগ যেমন হচ্ছিল, তেমন তার জন্যে দুঃখও হচ্ছিল। বেচারা! তার পক্ষে এতদিন ধরে এতকিছু করার পরে একদিন অরাকে শরীরে চাওয়াটা তো অপরাধের নয়। সে দেবতা বলেই এতদিন চায়নি। দেবতাদেরও তো চাওয়া থাকে।
ছাড়া-জামাকাপড় বাথরুমের কোণাতে রাখা ডার্টি লিনেন বক্সে ফেলে শায়া ব্রা কিছুই না পরে, শুধু নাইটিটা পরে বিছানাতে এসে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল অরা।
ঘুম যখন ভাঙল তখন ঘড়িতে দেখল, সাড়ে দশটা বাজে। দরজা খুলে রান্নাঘরে গিয়ে বিস্পতির কাছে শুনল যে, তৃষা ও রুরু দু-জনেই খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়েছে। কাল ওদের দু-জনকেই নাকি সকাল সকাল বেরোতে হবে।
অরা বললেন, তুমি খেয়ে শুয়ে পড়ো বিস্পতি। আমি কিছু খাব না।
—দুটো ধোকা খাও মা অন্তত।
—না গো। শরীরটা ভালো নেই। আমাকে ঘরে এক বোতল জল আর একটা গ্লাস দিয়ে যাও। কাল ওরা যদি সকালেই বেরোয় তাহলে খাবার কিছু আছে তো?
—সব আছে মা। রুটি, ডিম, দুধ, কর্নফ্লেক্স, চিঁড়ে, ফল, যা-বলবে ওরা বানিয়ে দেব।
—ঠিক আছে। আমার উঠতে একটু দেরি হলে ওদের ব্রেকফাস্ট বানিয়ে দিয়ো। না খেয়ে যেন বাড়ির বাইরে কেউ না বেরোয়। তবে ওরা বেরোবার আগেই আমি অবশ্যই উঠে পড়ব।
—ঠিক আছে মা।
বিস্পতি বলল।
ঘরে এসে, খাটের পাশে রাখা চেয়ারটাতে কিছুক্ষণ বসে রইল অরা। বিস্পতি খাওয়া-দাওয়ার পর ভলিউমটা কমিয়ে বসার ঘরে টিভি দেখে রাতে সাড়ে-বারোটা একটা অবধি। বাংলা সিরিয়াল। এই ওর রিক্রিয়েশান। তারপর, খাওয়ার ঘরের মেঝেতে পাখা চালিয়ে ওর বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে চুল ছড়িয়ে। পাখার হাওয়াতে ওর চুলের নারকোল তেলের গন্ধ ওড়ে।
চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ ভাবল অরা। আজকের ঘটনার অভিঘাত, ওর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। অগ্নির জন্যে যেমন কষ্ট হচ্ছে খুব, ওর নিজের জন্যেও হচ্ছে। কী ন্যায় আর কী অন্যায় ভেবে ঠিক করতে পারছে না। সাত-পাঁচ ভেবেও যখন কূলকিনারা পেল না, তখন আলো নিবিয়ে শুয়েই পড়ল।
মাঝরাতে কতগুলো পথের কুকুরের চিৎকারে অরার ঘুম ভেঙে গেল। বিছানাতে উঠে বসে শূন্যদৃষ্টিতে পর্দা দেওয়া জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরে চেয়ে রইল। পথের মার্কারি ভেপার ল্যাম্পের খয়েরি আলো এসে, ওর ঘরকেও আলোকিত করে দেয়। পেলমেট-এর নীচের পর্দা একটু ফাঁক করা থাকে। তা দিয়েই আসে আলো।
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে লেখার টেবিলে এসে বসল অরা।
তারপর চিঠি লেখার প্যাড নিয়ে ব্যাগ থেকে কলমটা বের করে অগ্নিভকে চিঠি লিখতে বসল। চিঠিটা আরম্ভ করেই ওর মনে হল, ওর মন শান্ত হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। ওর খুব ইচ্ছে হল যে, অগ্নিভকে একটা ফোন করে দেখে সেও এমন জ্বলনে জ্বলছে কি-না—নাকি বেশি হুইস্কি খেয়ে শান্তি পাওয়ার জন্যে অঘোরে ঘুমোচ্ছে? কিন্তু ফোন তো বসার ঘরে। ওর নিজের মোবাইল ফোন নেই। ছেলেমেয়েরা নিজেরাই কিনেছে। অগ্নিভ অনেকবার বলেছে যে, ওকে এটা উপহার দেবে। ‘‘কিন্তু কী দরকার? প্রয়োজন বাড়ালেই বাড়ে। প্রয়োজন বাড়ানোর কোনো শেষ নেই।’’ এই বলে অরা প্রতিবারেই ‘না’ করে দিয়েছে।
আজ রাতে এই প্রথমবার মনে হল তার একটা মোবাইল ফোন থাকলে আজ তার ঘরে শুয়ে শুয়েই অগ্নির সঙ্গে কথা বলতে পারত। মনে মনে ঠিক করল ব্যাক পে-টা পেলেই নিজের জন্যে একটা ফোন কিনে নেবে। অল্প টাকার ক্যাশ কার্ডেই চলে যাবে ওর। ক-টাই বা করবে ফোন।
কলম হাতে অনেকক্ষণ বসে থাকার পরে আরম্ভ করেছিল চিঠি লেখা। কী সম্বোধন করবে ভেবে পেল না। আগে আগে লিখত অগ্নিভবাবু, তারপরে অগ্নিবাবু, তারও পরে মশাই, তারপরে বন্ধু। মাঝে অনেকদিন চিঠি লেখেনি, দরকার হয়নি অগ্নিভ কলকাতাতে চলে আসায়। অগ্নিভই লিখত বেশি, অরা সংক্ষেপে জবাব দিত। আজ প্রথম সম্বোধন করল ‘প্রিয়বরেষু অগ্নি’ বলে। তারপরেই দেখল তার কলম তরতর করে লিখে চলেছে। তার বুকের মধ্যে এই সম্বোধনটি যে, কত দিন না-ফোঁটা ফুলকুঁড়ির মতো সুপ্ত ছিল তা ও নিজেও উপলব্ধি করেনি। আশিস চলে যাওয়ার পরেও তার যে, ‘প্রিয়বরেষু’ বলে সম্বোধন করার মানুষ কেউ আছে, এইটে ভেবেই ওর মনে হঠাৎ শিহরন জাগল।
প্রিয়বরেষু অগ্নি,
এখন রাত কত জানি না। বিছানার পাশেই টেবিল ক্লক আছে। ইচ্ছে করলেই দেখা যায় কিন্তু ইচ্ছে করছে না। আমার জীবনে সময়ের কোনো ভূমিকা সম্ভবত আর নেই। গত সন্ধেতে তোমাকে দেখে, তোমার কথা শুনে আমার সব গোলমাল হয়ে গেছে।
জানি না, তুমিও জেগে আছ কি না। তোমার কথাতে আমার মনের ওপরে যে-অভিঘাত হয়েছে তেমন-ই তোমার মনের ওপরেও নিশ্চয়ই হয়েছে আমার কথাতে। এ-কথা মনে করেই আমি ভীষণ-ই কষ্ট পাচ্ছি।
তোমাকে কী বলব জানি না। তোমরা পুরুষ। তোমরা যত সহজে তোমাদের মনের কথা অকপটে প্রকাশ করতে পারো আমরা তা পারি না। আমরা মেয়েরা অন্য ধাতুতে তৈরি। নারীবাদীরা যত-ই সোচ্চার হন না কেন, নারীরা কখনোই পুরুষের মতো হতে পারবে না। পুরুষের পোশাক পরলে বা আমার মেয়ে তৃষার মতো পুরুষদের সঙ্গে সমান দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে বা, দেশবিদেশ চষে বেড়ালেও নারী আর পুরুষে তফাত থাকবেই। এটা বড়ো-ছোটোর প্রশ্ন নয়। এটা গড়নের প্রশ্ন। আমাদের সম্পর্কটা পরিপূরণের, প্রতিযোগিতার নয়। নারীকে নইলে পুরুষের চলে না, নারীরও পুরুষকে নইলে চলে না। নারী, সে যতই স্বয়ম্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হোক না কেন, একজন মনের মতো পুরুষের কাছে সে, নিজেকে সমর্পণ করতে পারলে, তার শরীর এবং মনকেও নিবেদন করতে পারলে, সার্থক হয়।
তুমি আমার কাছে যা-চেয়েছিলে তা তুমি আশিস চলে যাওয়ার, কিছুদিন পরেই চাইতে পারতে। একবারের জন্যেও চাওনি যে, সে তোমার-ই মহত্ত্ব। এই দীর্ঘ সময়, তুমি শুধু আমার-ই নয়, আমার সন্তানদের জীবনেও যে-ভূমিকা পালন করেছ তা, অস্বীকার করার মতো নীচ আমি বা আমার ছেলেমেয়েরা কখনো হব বা হবে, তা আমার মনে হয় না।
তুমি যে, শুধু বন্ধুকৃত্যই করেছ তা নয়, আমার বুঝতে ভুল হয়নি যে, তুমি আমাকে প্রথম দেখার দিন থেকেই ভালোওবেসেছ। তুমি জানো না যে, সে ভালোবাসা আমার ‘প্রসাদি’ ফুল।
তোমাকে একটা কথা বলব অগ্নি। ভালোবাসার নানারকম হয়। ভালোবাসার পাত্রপাত্রীরও নানারকম হয়। তুমি ও আমি কেউই সাধারণ নই। আমাদের এই অসাধারণত্বর গর্বটা যেমন আমাদের-ই, তার দুঃখটাও তেমনই আমাদের-ই।
আজ বাড়ি ফিরে স্নানঘরে নিরাবরণ হয়ে শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে সাবান মাখতে মাখতে আয়নাতে নিজেকে দেখতে দেখতে ভাবছিলাম যে, কী আমার আছে? যারজন্যে তোমাকে এত কষ্ট পেতে হবে বা আমি তোমাকে এত কষ্ট দেব? আমার কাছ থেকে তুমি যা চাও তা তো যেকোনো মেয়েই এত দীর্ঘদিনের মধ্যে তোমাকে দিতে পারত। এখনও দিতে পারে। সেই সহজ সুখে নিজেকে সুখী না করে এতদিন ধরে আমার জন্যে এবং আমার সন্তানদেরও জন্যে নিজেকে এত কষ্ট কেন দিলে তুমি? তুমি তো এখনও একটা বিয়ে করতে পারো। আজকালকার দিনে উনষাট বছর কোনো বয়স-ই নয়।
আসলে কথাটা কী জান? তুমি যে, আমার কাছে শুধুমাত্র একজন প্রিয় পুরুষ-ই নও, আমার প্রিয়তম-ই নও, তুমি যে, আমার দেবতা। তোমাকে যে, কুলুঙ্গির ঠাকুর করেছি আমি। সেই আসন থেকে তোমাকে নামিয়ে, বিছানাতে এনে আধঘণ্টার শারীরিক সুখ পেতে যে, আমি কখনো চাইনি। তুমিও নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখো যে, তুমি আমার এবং আমার তিন ছেলেমেয়ের কাছ থেকে তোমার সব কৃতকর্মের প্রতিদানে যে, নির্মল নৈবেদ্য পেয়েছ তার আনন্দর সঙ্গে আমাকে শরীরী আদর করার এলেবেলে কি কোনোভাবেই তুলনীয়?
তুমি জানো যে, আমার ছেলেবেলা কেটেছে হাজারিবাগে। আমরা ব্রাহ্ম। ব্রাহ্মসমাজ কম্পাউণ্ডের মধ্যে আমাদের বাড়ি ছিল না বটে তবে আমার বাবা হাজারিবাগের ব্রাহ্মসমাজের একজন মাথা ছিলেন। তিনি বিয়ে ও স্মরণসভাতে আচার্যর ভূমিকাও পালন করতেন। অভ্র খাদানের মালিক ছিলেন তিনি। গিরিডির মনোরঞ্জন গুহঠাকুরতার মন্ত্রশিষ্য ছিলেন। পন্ডিত ও দেশপ্রেমী। আমাদের বাড়িতে যে, লাইব্রেরি ছিল, তা তুমি আশিসের সঙ্গে আমাকে দেখতে যখন হাজারিবাগে এসেছিলে তখন-ই দেখেছ। সেই লাইব্রেরি-ঘরে বসেই তোমরা দু-জনে আমার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছিলে। পরেও একাধিকবার গেছ। তখন আমার বাড়ির অন্য কেউই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। আমি অতিসাধারণ কিন্তু আমি আমিই। তুমি দেবতা। এ জন্মে যা দিতে পারলাম না, সেই অপারগতার জন্যে তুমি আমাকে ক্ষমা করো। ক্ষমা না করতে পারলে আমার লজ্জা রাখার জায়গা থাকবে না। তুমি আমার জন্ম জন্মান্তরের প্রিয়—তুমি তোমার জায়গাতেই থাকবে চিরদিন। আমি এখনও মনস্থির করতে পারিনি। আশিসের স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলতেও পারিনি। তা বলে তোমাকে আমি আশিসের চেয়ে একটুও কম ভালোবাসিনি। অবশ্যই জেনো, একথা আমার অন্তরের কথা।
আমার ছেলেমেয়ে এবং তাদের বন্ধু-বান্ধবীদের দেখে বুঝি যে, এই পৃথিবী বড়োই দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কিন্তু আমাকে আশীর্বাদ করো তুমি, আমাকে জোর দাও, আমি যেন না বদলাই। তুমি যেকোনো মেয়ের শরীরেই যেতে পারো। তাতে যদি তুমি আনন্দ পাও তাহলে আমি আনন্দিতই হব। এবং মনে কিছুই করব না।
আমি তোমাকে যা দিয়েছি, যা দিতে পারি, তাই নিয়েই এ জন্মে সুখী থেকো। যা দিতে পারি না, তার দুঃখ এমনিতেই আমাকে মর্মে মর্মে দুখি করে রেখেছে। সেই দুঃখ আমাকে চেয়ে তুমি আর বাড়িয়ো না। এইটুকুই প্রার্থনা।
এই ইন্টারনেট আর মোবাইল ফোনের যুগে এরকম চিঠি কেউ লেখে না জানি। কিন্তু ইন্টারনেটে কি এরকম চিঠি কারওকে কখনোই লেখা যেত? তাই আমার মনে হয় যে, ইন্টারনেট কাজের পক্ষে খুব-ই ভালো কিন্তু আমার তোমার মতো সম্পর্কে যারা বিশ্বাসী তাদের জন্যে নয়। আমরা অন্য যুগের অন্য মানব-মানবী, অন্য ‘মূল্যবোধ’ বিশ্বাসী। আমরা হয়তো শিগগির-ই বাতিল হয়ে যাব কিন্তু তবু ওরা ওরা, আমরা আমরাই। এই গর্বটুকু নিয়েই যেন আমরা বাঁচতে পারি বাকি জীবন, এই আশীর্বাদ করো।
—ইতি—তোমার চিরদিনের অরা।
চিঠিটি লিখে, টিকিট লাগানো খাম বন্ধ করে, অগ্নিভর ঠিকানা লিখে, নিজের হাতব্যাগের মধ্যে রেখে, টেবিল লাইট নিভিয়ে অরা শুয়ে পড়ল। চিঠিটি লিখে ফেলতে পেরে, ওর অশান্ত মন শান্ত হল।
সকালে তৃষা দরজাতে ধাক্কা দিল—‘মা, মা’ করে ডেকে। অরা ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলেন সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। পৌনে নটার মধ্যে বেরোতে হবে স্কুলে।
দরজা খুলতেই, তৃষা বলল, তুমি ভালো আছ তো? কাল রাতে কিছু খাওনি, এতবেলা অবধি ঘুমিয়ে আছ, কী হয়েছে মা তোমার? ডাক্তার সেনকে কি ফোন করব?
—না, না। কাল শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল। সম্ভবত প্রেশারটা বেড়েছিল। ব্রেকফাস্টের পরে ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।
—ডাক্তার সেনকে ডাকি না, প্রেশারটা চেক করে যাবেন।
সে কথার উত্তর না দিয়ে অরা বললেন, তুই এর-ই মধ্যে তৈরি হয়ে গেছিস?
—কী করব? আজ নটাতে মুম্বাই-র বড়ো ক্লায়েন্ট আসবে। প্রেজেন্টেশান আছে। কিছু কাজ এখনও বাকি। ফিনিশিং টাচ দিতে হবে। আমি ব্রেকফাস্টও করে নিয়েছি। বেরোতে হবে এখুনি মা।
—কী খেলি?
—দুধ আর কর্নফ্লেক্স। ব্যাগে কলা আর আপেল নিয়ে নিয়েছি। অফিসে গিয়ে কাজ করতে করতে খাব।
—তোর এই অ্যাড এজেন্সির কাজটা ছেড়ে দে। এ কী কাজ! রাত বারোটা একটা অবধি কাজ করতে হয় আবার সাতসকালে যাওয়া। দুপুরে কী খাস কে জানে! এমন করলে শরীর থাকবে?
—কাজ করলে শরীর খারাপ হয় না মা। বরং কাজ না করলেই হয়।
তারপরই বলল, এই নাও দু-হাজার টাকা রাখো। কাল এ.টি.এম. থেকে তুলেছিলাম তিন হাজার। রুরু বলছিল তোমার মাইনে হয়নি কাল।
—টাকা লাগবে না তৃষা। তুই তো মাসে পাঁচ হাজার দিস-ই আমাকে। আমার মাইনেতেই তো কুলিয়ে যায়। তোর এত কষ্টের রোজগার। তোর কাছেই রাখ। তোরও তো ভবিষ্যৎ আছে। বিয়ে করবি, সংসার করবি, ছেলেমেয়ে হবে, ভবিষ্যৎ-এর কথা না ভাবলে চলবে কী করে? তোর বাবার সঞ্চয় থেকে সুদও তো পাই—ইনভেস্টমেন্টস-এর ডিভিডেণ্ডস। তবে কোনো কোনো সময়ে একটু টানাটানি হয়। কিছুদিনের জন্যে। এই যা।
—দুধওয়ালা আর কাগজওয়ালাকে আমি টাকা দিয়ে দিয়েছি মা।
—তাই? রুরু বলেছিল বুঝি?
—হ্যাঁ।
—তোকে বলার কী ছিল?
—কেন? আমি কি সংসারের কেউ নই?
—তা কেন? তুই তো দিস-ই। পয়লা বৈশাখ আর পুজোর সময়েও দিস। তা ছাড়া, আটকে গেলে তোর অগ্নিকাকার কাছ থেকে ধার চেয়ে নেব।
—অগ্নিকাকাকে আর কত জ্বালাতন করব মা আমরা? তা ছাড়া, আমাদের যখন টেনে-টুনে চলেই যায়।
—টাকা তো নিই না এমনিতে। নিলে, ধার হিসেবেই নেব। তবে তার দরকার হবে না বোধ হয়। আজ চেক পেলে ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে আজ-ই টাকা তুলে নেব। তা ছাড়া ব্যাঙ্কেও আছে কিছু। এ নিয়ে তোদের চিন্তা করতে হবে না।
তারপর বললেন, রুরু কোথায়?
সে অগ্নিকাকার বাড়িতে গেছে স্নান করে। অগ্নিকাকা ফোন করেছিলেন। সেখানেই খেয়ে ইউনিভার্সিটিতে যাবে।
—কী হল আবার? সাতসকালে তোর অগ্নিকাকা শমন পাঠালেন?
—কীসব কথা আছে নাকি রুরুর সঙ্গে।
—ভালো লাগে না আমার।
—কেন মা?
—রুরুটার আত্মসম্মান জ্ঞান একটু কম আছে।
—এ কথা বলছ কেন মা? অগ্নিকাকা কি আমাদের পর?
—পর নয়তো কী? আর আপন হলেও তার কাছ থেকে আর কতরকমের উপকার নেওয়া যায়?
—অগ্নিকাকা নাকি গাড়ি কিনেছেন?
—হ্যাঁ। সেইজন্যেই তো ভাবনা। রুরুটা বড়ো হ্যাংলা হয়েছে। সে গাড়ি তার-ই ভোগে লাগবে হয়তো। তোর বাবার আত্মসম্মান জ্ঞান অত্যন্তই তীব্র ছিল। রুরুটা একেবারেই তার বাবার মতো হয়নি।
—অগ্নিকাকাও তো আমাদের বাবার-ই মতো।
বিরক্তিমাখা মুখ তুলে অরা বলল, তুইও দেখি রুরুর মতো কথা বলছিস। তাঁর সঙ্গে কি আমার স্ত্রীর সম্পর্ক? একটা মানুষ নিজ স্বার্থপরায়ণ নয় বলেই কি, আমরা চিরদিন-ই তাঁর ওপর অত্যাচার করেই যাব?
তৃষা জবাব দিল না কোনো।
বলল, টাকাটা রাখো। না লাগলে পরে আমাকে না হয় ফেরত দিয়ো। তোমার হাত একদম খালি।
—বললাম না, ভবিষ্যতের কথা ভাব।
তৃষা হেসে বলল, আমাদের বর্তমানটাই ভবিষ্যৎ মা। আমরা ‘‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পীবেৎ’’-এর যুগের ছেলেমেয়ে। আমাদের কাছে বর্তমানটাই সব।
—টাকাটা তুই-ই রাখ। বললাম, না যে, আমার দরকার নেই। মাইনে না পেলেও ব্যাঙ্ক থেকে তুলে নেব।
অগ্নিভর বন্ধু ব্রতীন আর নরেশ ওকে নিয়ে ‘আইনক্স’-এ সিনেমা দেখতে গেছিল। তারপর সেখান থেকে ক্যালকাটা ক্লাবে গিয়ে একটু হুইস্কি খেয়ে চাইনিজ খেয়ে ওরাই ওদের গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল। কলকাতাতে ওর বেশি বন্ধুবান্ধব নেই। নাগপুর, রায়পুর এবং মুম্বাইতে অনেক বন্ধুবান্ধুব আছে। এই বয়সে আর নতুন বন্ধু পাতানোর ইচ্ছেও করে না। মাঝে মাঝে ওদের-ই কারও গেস্ট হয়ে ক্যালকাটা সাউথ ক্লাবে বা টলি ক্লাবে টেনিস খেলে উইক-এণ্ডে। ব্রতীন বিবাহিত তবে নরেশ ব্যাচেলার। যেদিন ব্রতীন বলছিল নরেশ আর অগ্নিভকে ‘‘A Bachelor is the souvenir of some woman who had found someone better than him at the last moment’’. ব্রতীন বিবাহিত হলেও তার বাড়িতে বিশেষ নিয়ে যায় না কারওকেই। তার স্ত্রী খুব বড়োলোকের মেয়ে। তার ওপর দু-দিনটি শখের N.G.O.-র সঙ্গে যুক্ত আছে। হাই-সোসাইটির মহিলা। তাঁর উদ্ধত হাবভাব, ইংরেজিতে কথা বলা ইত্যাদি পছন্দ করে না অগ্নি। অগ্নি অরা, তার ছেলেমেয়ে এবং তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের নিয়েই খুশি ছিল এবং থাকে। ওর ধারণা অগণ্য মানুষের সঙ্গে ভাসা ভাসা সম্পর্কর চাইতে অল্পক-টি গভীর সম্পর্কের মধ্যেই একজন মানুষ সার্থক হয়।
তৃষার বিয়ে হলে গেলে ও কন্যা হারানোর শোক পাবে। রুরুকেও সে, নিজের ছেলের মতোই দেখে এবং সবরকম প্রশ্রয় দেয়। রুরু কম্পারেটিভ লিটারেচারে এম এ করার পর স্কলারশিপের পরীক্ষাতে বসে স্টেটস বা কানাডাতে পড়বে এমন ইচ্ছে রাখে। কানাডার মনট্রিয়ালের ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার ইচ্ছে খুব ওর। স্কলারশিপ না পেলেও অগ্নিভই ওকে পাঠাতে পারে কিন্তু সেটা রুরুর পক্ষে সম্মানজনক হবে না। বাবার পয়সায় যারা বিদেশে পড়তে যায় তাদের প্রতি রুরু এক গভীর বিদ্বেষ পোষণ করে। অগ্নিও তেমন ছেলেদের অনুকম্পার চোখেই দেখে। মাঝেমাঝেই রুরু তার বাংলা-ব্যাণ্ডের বন্ধুবান্ধব বা লিটল-ম্যাগ করা তরুণ কবির দলকে নিয়ে অগ্নিকাকার বাড়িতে চলে আসে। একটু বিয়ার-টিয়ার খায়। গান ও কবিতার চর্চা হয়। অগ্নি ওদের সঙ্গ পছন্দ করে। নানা কারণে ও এই তরুণ প্রজন্মে বিশ্বাসী। ওদের সঙ্গে মিশে ওর বয়েস কমে যায় বলেই ধারণা হয় অগ্নির। বন্ধুদের বলে, লিটল ম্যাগ-এর জন্যে বিজ্ঞাপন এবং বাংলা ব্যাণ্ডের জন্যে স্পনসরশিপ জোগাড় করে দেয়। এই দু-দলের গোটা কুড়ি ছেলে রুরুর বন্ধুত্বের খাতিরে তাকে অগ্নিকাকা বলে এবং নি:সংকোচে নানা অত্যাচার করে। সেইসব অত্যাচার সইতে অগ্নির ভালোও লাগে। তার যা-সঞ্চয় আছে, তারজোরে এইসব তরুণদের নানাভাবে প্রশ্রয় দেওয়ার সামর্থ্য সে রাখে। কত স্বপ্নমাখা থাকে ওদের চোখে। মাঝে মাঝে দল বেঁধে ওরা নানা জায়গাতে বেরিয়েও পড়ে। অগ্নিকাকাকেও সঙ্গে নিতে চায় কিন্তু অগ্নি মুখ্যত অরার-ই কারণে যায় না। অরা একা থাকবে, কখন কী দরকার হয়, অসুখবিসুখ হয়, এইসব ভেবেই থেকে যায়। সকলে মিলে একবার পুণেতে গেছিল হর্ষদের সঙ্গে ক-টি দিন কাটাতে। হর্ষদের ছুটি ছিল সেই সময়ে। পুণে থেকে ওরা মহাবালেশ্বর এবং পঞ্চগণিতেও গেছিল। ভারি ভালো ছেলে হর্ষদ। অত্যন্ত বিত্তবান মা-বাবার একমাত্র সন্তান। গান ভালোবাসে, সাহিত্যও। নিজেও একসময় উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখত। ভীমসেন জোশীজি তো পুণেতেই থাকেন। তাঁর-ই এক শিষ্যর কাছে তালিম নেয় ও এখনও। মাঝে মাঝে এর তার বাড়িতে ছোটোখাটো জলসাতে গানও গায়। নাগপুরের বেঙ্গলি সোসাইটির প্রদীপ গাঙ্গুলিকে বলে নাগপুরেও একবার ওর গানের বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল অগ্নিভ। তৃষার খুব-ই ভাগ্য যে, অমন ছেলের সঙ্গে সে ‘স্টেডি’ যাচ্ছে। তবে বিয়ের কথা দু-জনের কেউই বলে না। কবে যে, বিয়ে করবে তা ওরাই জানে। বিয়ে করলে, তৃষা নাকি চাকরি ছেড়ে দেবে। ও বলে, সন্তান পালন আর কেরিয়ার একসঙ্গে হয় না। ছেলেমেয়ে হলে তাদের কুকুর বেড়ালের বাচ্চার মতো চাকর বা আয়ার কাছে ফেলে রেখে কাজ করা তার একেবারেই পছন্দ নয়।
ওদের পৃথিবীটা আর সত্যিই নেই। সব স্বামী-স্ত্রীই আজকাল কাজ করে। স্বামীর যতই রোজগার থাক, স্ত্রীরা হাউসওয়াইফ হয়ে আর থাকতে রাজি নয় কেউই। মেয়েদের এই নবলব্ধ ‘স্বাধীনতা’র স্বাদ তারা পুরোপুরিই উপভোগ করে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও বদলে গেছে একেবারে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই নীরব বিপ্লব ঘটে গেল। ভাবলে অবাক লাগে। অগ্নিভরা আর অরারা ক্রমশই অন্য গ্রহের জীব বলে গণ্য হচ্ছে। যদিও তারা দু-জনেই অত্যন্তই আধুনিক তাদের মানসিকতাতে।
বাড়ি ফিরে গরম জলে স্নান করে টিভি-টা একটু খুলল। আজকালকার বাংলা বা হিন্দি সিরিয়াল ওর দেখতে ভালো লাগে না। অদ্ভুত ভঙ্গির নাচ আর তারসঙ্গে উদ্ভট গান অত্যন্তই বিরক্তি ঘটায়। ন্যাশানাল জিয়োগ্রাফিক চ্যানেল, ডিসকভরি চ্যানেল দেখে। কখনো-কখনো স্টার মুভিজ বা এইচ.বি.ও। সেখানেও শুধু মারপিট, গোলাগুলি। সারাপৃথিবীর মানুষের রুচিই কেমন বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। আগেকার দিনের মূল্যবোধ-সম্পন্ন ‘ক্লাসিক’ ছবি আর দেখতে পায় না বলে মন খারাপ লাগে। ক্যাসেট বা সি.ডি. এনে দেখা যায়, কুঁড়েমি লাগে। নরেশ এবং ব্রতীন-ই মাঝে মাঝে ওকে নিয়ে নন্দনে যায় ভালো ছবি দেখতে। ফিলম ফেস্টিভ্যালেও যায়। তখন সময় করতে পারলে অরাও যায়। অরা মাসে, দু-মাসে একবার ব্রতীন আর নরেশকে অগ্নিভর সঙ্গে অরাদের যোধপুরের ফ্ল্যাটে নেমন্ত্রণ করে খাওয়াও, তবে ব্রতীনের হাই-ব্রাওড স্ত্রী কখনো যাননি। নরেশের তো বউই নেই—সে একাই যায়। নরেশের বিয়ে হয়েছিল কিন্তু বিয়ের চারমাসের মধ্যেই ডিভোর্স হয়ে যায় অনেক বছর আগে। তারপর থেকে মেয়েদের ব্যাপারে ওর একটা ভীতি জন্মে গেছে।
দিনে যা চিঠিপত্র আসে তা একটি রুপোর ট্রেতে করে রুপোর পেপার-কাটারের সঙ্গে বিছানার পাশে রেখে দেয় চন্দন। অগ্নিভর ম্যান-ফ্রাইডে। কুক-কাম-ভ্যালে-কাম-এভরিথিং। নরেশ আর ব্রতীনকে তো বলেইছে, চন্দনকেও বলেছে একটি বয়স্ক ও বিশ্বাসী ড্রাইভার দেখতে। অগ্নি গাড়ি কেনাতে ও যেমন খুশি সেই গাড়ি যে, রুরুবাবুদের বাড়িতে থাকবে— এই খবরে সে একটু অখুশিও। অগ্নির ফ্লাটে কোনো গ্যারাজও নেই। ফ্ল্যাট কেনার সময়ে গাড়ি কেনার কথা ভাবেনি। গাড়িটা আপাতত পাশের পেট্রোল পাম্পে থাকে রাতের বেলা, দিনের বেলা অ্যাপার্টমেন্টের সামনেই পার্ক করানো থাকে।
চিঠির ট্রেতে তাকিয়েই একটা মোটা খাম দেখতে পেল। অরার হাতের লেখা। নাগপুরে থাকতে সপ্তাহে অন্তত একটি করে চিঠি পেত। অরার হাতের লেখাতেই-তার চরিত্রের সারল্য ও দার্ঢ্য পুরোপুরিই প্রকাশিত হয়। তাই অরার হাতের লেখা চিনতে তার কোনো অসুবিধেই হল না। পিঠে একটা বালিশ দিয়ে আধশোয়া হয়ে শুয়ে পেপার-কাটার দিয়ে চিঠিটা খুলে পড়তে লাগল।
চিঠিটি দু-তিন বার করে পড়ল অগ্নি। তারপর ঠিক করল কাল সকালে উঠেই এর উত্তর দেবে।
চিঠিটি পেয়ে ওর মধ্যে এক চাপা উত্তেজনা হল। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লেও ঘুম এল না। বারোটা নাগাদ উঠে পড়ে পাশের লেখাপড়ার ঘরের টেবিলে গিয়ে বসে রাইটিং প্যাড খুলে উত্তর দিতে বসল।
আনওয়ার শাহ রোড
টালিগঞ্জ
কলকাতা/বৃহস্পতিবার
কল্যাণীয়াসু অরা,
তোমার চিঠি আজ পেলাম।
আমি তো বাংলার শিক্ষিকা নই, তাই তোমার মতো ভালো চিঠি লিখতে পারি না, পারব না। ইংরেজিটা আমি বাংলার চেয়ে ভালো লিখি। এ সত্যটি গর্বের নয়, লজ্জার-ই, তবে ‘সত্য’ সত্যই।
আমি অত্যন্তই লজ্জিত। সেদিন যে, আমার কী হয়ে গেছিল আমি নিজেই জানি না। ঘামে তোমার দুই বগলতলির কাছে ব্লাউজ ভিজে ছিল। তোমার দু-নাকের পাটাতে ঘাম ছিল। এতবছর পরে যে-বাসনা আমার মধ্যে সুপ্ত ছিল তা হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে উঠেছিল। ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়েছিল। আমার এতদিনের সংযমের বাঁধ ভেঙে গেছিল। এই লজ্জা আমার রাখার জায়গা নেই।
আসলে, তোমার বিয়ের দিন সালংকারা সুসজ্জিতা তুমি যখন, তোমাদের হাজারিবাগের বাড়ির সাদা মার্বেলের মস্ত হলঘর পেরিয়ে ঝাড়-লন্ঠনের আলোর মধ্যে দিয়ে হেঁটে বাসরঘরের দিকে যাচ্ছিলে, সেইমুহূর্ত থেকেই তোমাকে আমি ভালোবেসে এসেছি। তোমাকে দেখে আমার বুকটা হু হু করে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, যা হবার তা হয়ে গেছে এ জন্মের মতো। মনে হয়েছিল, তুমি আমার-ই জন্যে এ পৃথিবীতে এসেছিলে। তোমার আর কোনো গন্তব্য নেই। তোমাকে নইলে আমার জীবন বৃথা। অথচ তখন তুমি আমার বন্ধুর বিবাহিতা স্ত্রী।
আশিস তার আগে আমার বন্ধু ছিল ঠিক-ই কিন্তু শুধু তোমার-ই কারণে আমি তাকে আমার প্রিয়তম বন্ধু করেছিলাম।
তোমাকে যখন দেখতে গেছিলাম তখনও, তোমাকে খুব ভালো লেগেছিল কিন্তু বিয়ের রাতে লাল বেনারসি পরা, জড়োয়াতে মোড়া তোমার রূপ আমাকে বিদ্ধ করেছিল। শুধুমাত্র রূপেই কেউ অমন মন কাড়তে পারে না। তোমার হাঁটা, মানে ঋতি, তোমার কথা বলার ধরন, তোমার হাসি, তোমার পায়ের পাতার গড়ন থেকে হাতের আঙুলের গড়ন, তোমার চোখ, চিবুক, তোমার গ্রীবা, তোমার পাতলা দু-টি ঠোঁট আমাকে কেন এমনভাবে আলোড়িত করেছিল তা বলতে পারব না।
সত্যিই বলছি যে, তোমাদের বিয়ের পরে বেশ কিছুদিন আশিসকে আমার খুন করতে ইচ্ছে করত। ছেলেমানুষি ইচ্ছে। অথচ সেই আশিস-ই যখন অ্যাকসিডেন্টে মারা গেল তখন তোমার ও তোমার ছেলেমেয়েদের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম। সেদিন আমি হৃদয়ে বুঝেছিলাম যে, ভালোবাসার সব মহত্ত্ব ভালোবাসার জনকে ‘সুখী’ দেখার-ই মধ্যে। নিজের বুকে তাকে টেনে নিয়ে পিষ্ট করার মধ্যে নয়। সেদিন, আমি আসলে-যা তার চেয়ে অনেক বড়ো হয়ে গেছিলাম। কোনো মানুষ-ই নিজের মহত্ত্ব অথবা নীচত্বর মাপটা প্রথম থেকেই জানে না, হঠাৎ কোনো অভিঘাতে তা বিদ্যুৎ চমকের মতো তার সামনে উদ্ভাসিত হয়।
আমি অতিসাধারণ একজন মানুষ। তুমিই আমাকে দেবত্ব দান করেছ। নিজের অজান্তেই তোমার সংস্পর্শে এসে আমি নিজের চেয়ে অনেক বড়ো হয়ে গেছি। তোমার চাবুক খাওয়ার আমার দরকার ছিল।
আমাদের উপনিষদে আছে:
আহার নিদ্রা ভয় মৈথুনম সামান্যমেতাৎ পশুভি: নরানা:
ধর্মহি তোষাম অধিকো বিশেষো: ধর্মেনাহীনা পশুভিসমানা:।
মানে, আহার, নিদ্রা, ভয় এবং মৈথুন মানুষেরও আছে পশুরও আছে কিন্তু যে-মানুষ ধর্মরহিত, সে পশুর-ই সমান। এই ধর্ম হিন্দু মুসলমানদিগের ধর্ম নয়, এই ধর্ম সকলের। এ ধর্ম ‘মনুষ্য’ধর্ম।
আমার পশুত্ব তুমি ক্ষমা করো। আর যার সঙ্গে যাই করি না কেন, তোমার সঙ্গে এ জীবনে মানুষের মতোই ব্যবহার করব। দেবতা না হয়েও দেবতা সেজে থাকার চেষ্টা করব, দেবত্বর মূল্য দিতে নিজেকে কোনোরকম কষ্ট দিতেই দ্বিধা করব না।
তবে আমার কঠিনতম পরীক্ষার দিন শেষ হয়ে গেছে। আমার দুঃখরাত পেরিয়ে এসেছি। গত দু-যুগ মনে মনে তোমাকে চেয়ে যে, কী নিদারণ কষ্ট ভোগ করেছি তা আমিই জানি আর ঈশ্বর-ই জানেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলতেন ‘‘A man can be destroyed but he cannot be defeated’’. আমি ধ্বংস হয়ে গেছি তোমাকে কামনা করে। কিন্তু হারিনি।
তবে একথা ঠিক যে, সে রাতে হারার কাছাকাছি এসেছিলাম কিন্তু সাধারণ্যের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া থেকে সেদিন তুমিই আমাকে বাঁচিয়েছ। তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ।
‘‘আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি তুমি অবসর মতো বাসিও।
আমি নিশিদিন হেথায় বসে আছি তুমি অবসর মতো আসিও।’’
অনেকদিন হয়ে গেছে এই গানটা তোমার গলাতে শুনিনি। একদিন শুনিয়ো অরা।
—ইতি তোমার কুলুঙ্গির উপোসি দেবতা
অগ্নিভ
নয়
সেদিন অরা স্কুলের পিকনিক-এ যাবে বলে বাড়ি থেকে সকাল আটটাতে বেরিয়েছিল। যাবে, বাদুর এক বাগানবাড়িতে। সকলে মিলে বাসে করে যাবে স্কুল থেকে ন-টার সময়ে। তৃষা অফিসের কাজে মুম্বাই গেছে। সেখান থেকে উইকএণ্ডে হর্ষদের কাছে যাবে পুণেতে। হর্ষদ পুণে ক্রিকেট ক্লাবে ঘর ঠিক করে রেখেছে ওর জন্যে।
স্কুলে যখন টিচাররা ও মেয়েরা বেরোবার তোড়জোর করছে, এমন সময়ে মীনাক্ষীর হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হল। ভূগোলের টিচার মীনাক্ষী বিবাহিতা। একটি আট বছরের ছেলে আছে। স্বামী সেলস ট্যাক্স অফিসার। ওর বয়স হবে তেতাল্লিশ মতো। খুব হাসিখুশি মেয়ে। তবে দিন তিন-চার হল খুব-ই মনমরা থাকত। পাপিয়া বলেছিল যে, মীনাক্ষীদের পাড়ার কার কাছে শুনেছে যে, তার স্বামী অফিসের-ই একজন আপার ডিভিশন ক্লার্ক-এর সঙ্গে অ্যাফেয়ার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ধরা পড়ে গেছেন চারদিন হল। ব্যাপারটা শুধু পাড়া প্রতিবেশীই নয়, অফিসের ওপর মহল অবধি পৌঁছেছে। সেজন্যেই নাকি মীনাক্ষী অমন অফ-মুড-এ থাকত এই ক-দিন। সঙ্গে ওর ছেলেকেও এনেছিল পিকনিকে নিয়ে যাবে বলে। ওদের কো-এড স্কুল, কোনো অসুবিধে নেই।
অ্যাটাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে ওকে এস.এস.কে.এম-এ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ডাক্তাররা বলেছেন: ব্রট ডেড। সেই মর্মে ডেথ সার্টিফিকেটও দিয়েছেন। ওর স্বামীকে অফিসে এবং ওর শ্বশুরবাড়িতেও খবর দেওয়া হয়েছে। এখনও ডেডবডি নিয়ে যেতে কেউই আসেনি। পিকনিক বাতিল করে ছেলেমেয়েদের বাড়ি চলে যেতে বলা হয়েছে। মীনাক্ষীর ছেলেটা পাগলের মতো করছে। নীচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের বাড়িতে ফোন করে দেওয়া হয়েছে, যাতে বাড়ি থেকে কেউ এসে ওদের নিয়ে যান। টিচারেরা, যাঁরা পিকনিকে যাবেন বলে এসেছিলেন, তাঁরা সকলেই স্কুলেই রয়ে গেছেন। সকলেই মীনাক্ষীর গুণপনা নিয়ে আলোচনা করছেন। ভারী প্রাণবন্ত হাসিখুশি মেয়ে ছিল মীনাক্ষী। যাঁরা ওকে দেখতে পারতেন না এবং ওর সম্বন্ধে ঈর্ষাকাতর ছিলেন নানাকারণে, তাঁরাও এখন ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন। মৃত্যু এসে মৃত মানুষের সব দোষ মুছে দেয়।
মীনাক্ষীর বাড়ি থেকে স্বামী, তাঁর অফিসের সহকর্মীরা, আত্মীয়স্বজন সকলে এসে বডি নিয়ে যেতে যেতে প্রায় একটা বাজল। টিচাররা এবং উঁচু ক্লাসের ছেলেমেয়েরা একে একে ফিরে যেতে লাগলেন ও লাগল। একটা মিনি ধরে অরা যখন বাড়ি পৌঁছোল তখন আড়াইটে বাজল। মনটা বড়োই খারাপ হয়ে গেছে। ঠিক করল, বাড়ি গিয়ে বিস্পতিকে বলে এককাপ চা খেয়েই শুয়ে পড়বেন। খিদে তো নেইই কিছু খাওয়ার প্রশ্নও ওঠে না মনের এই অবস্থাতে। হেমিংওয়ের For whom the Bells Tolls-এর মুখবন্ধে আছে—
For whom the bell Tolls :
The bell tolls for Thee.
প্রত্যেক মৃত্যুর মধ্যেই অরা নিজের ‘মৃত্যু’কে উপলব্ধি করে।
ওর কাছে দরজার চাবি থাকে তবে বিস্পতি আর রুরু বাড়িতে আছে বলে আজ আর চাবি নিয়ে যায়নি। যখন বাড়ি ফেরার কথা ছিল তখন রুরু কোথাও বেরোলেও বিস্পতি থাকবেই।
ফ্ল্যাটে পৌঁছে বেল দিতেই বেলটা কয়েকবার বাজলেও দরজা কেউই খুলল না। অবাক হলেন অরা। বেশ কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলল এসে রুরু। রুরুর মুখ-চোখ কেমন অপ্রকৃতিস্থ দেখাল। উদবিগ্ন হল অরা। দরজাটা খুলে দিয়েই প্রায় দৌড়ে গিয়ে নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে অরার কাছে ফিরে এসে যেন হতাশ গলায় বলল, কী হল? তুমি পিকনিকে গেলে না?
—না।
—কেন? কী হল?
—একজন অল্পবয়সি টিচারের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে স্কুলেই।
—কেমন আছেন?
—নেই।
বলেই, অরা জিজ্ঞেস করল, বিস্পতি কোথায়? ঘুমোচ্ছে? তোর খাওয়া হয়ে গেছে?
—হ্যাঁ তা হয়েছে।
—বিস্পতিকে একটু ডেকে দে তো।
—বিস্পতিদি খেয়ে সিনেমায় গেছে।
—সিনেমাতে?
অবাক হয়ে বলল, অরা।
তারপর বলল তিনবছর কাজ করছে কোনোদিন তো সিনেমাতে যায়নি? কোন হল-এ গেল?
—প্রিয়াতে।
—প্রিয়া? সে তো অনেক দূরে। ও তো টিভির সিনেমা ছাড়া আর কোনো সিনেমা দেখে না। চিনে যেতে পারবে? টিকিট-ই বা কিনে দিল কে?
—আমিই কিনে দিয়েছি গতরাতে ওকে। আমি বাসেও চড়িয়ে দিয়ে এসেছি। বুঝিয়ে দিয়েছি কী করে আসবে। ফোন নাম্বারও দিয়ে দিয়েছি। আসতে না পারলে ফোন করলে আমি গিয়ে নিয়ে আসব।
এমন সময়ে রুরুর ঘরের দরজা খুলে ভেতর থেকে চুমকি বেরিয়ে এল।
—তুই? কখন এসেছিস?
অবাক হয়ে বলল, অরা। ও একটা ষড়যন্ত্রর গন্ধ পাচ্ছিল। বেশ তীব্র গন্ধ।
—একটু আগে।
চুমকি বলল।
—খেয়েছিস কিছু?
—আমি খেয়ে এসেছি মাসিমা।
—কী করছিলি তোরা?
বিরক্তির গলায় বলল অরা। তার ও তৃষার অনুপস্থিতিতে বিস্পতিকে সিনেমা দেখতে পাঠিয়ে ওরা দু-জনে যুক্তি করেই ফাঁকা ফ্ল্যাটে যে, কেন এসেছে তা বুঝতে দেরি হল না অরার। মীনাক্ষীর মৃত্যুতে এমনিতেই কেঁদেছিল স্কুলে, এখন এই অঘটনে তার আবারও কান্না পেতে লাগল। ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল অরার।
অরা রুরুকে কিছু না বলে চুমকিকেই বলল, তুই রুরুর ঘরে কী করছিলি? বসার ঘরে টিভি না দেখে বা গানটান না শুনে?
চুমকি কেঁদে ফেলল হাতে মুখ ঢেকে। তারপর বলল, কিছু করিনি মাসিমা। তবে আপনি এই সময়ে ফিরে না এলে কী ঘটত জানি না!
—কী হয়েছে, মানে তোরা কী করছিলি? আমাকে সত্যি কথা বল চুমকি। নইলে আমি তোর মাকে এখুনি ফোন করব।
—অনেকদিন থেকে রুরু দেখতে চাইছিল।
—কী দেখতে চাইছিল?
—আমাকে।
—মানে? বুঝলাম না।
—মানে, আঙ্গাপাঙ্গা আমাকে। বলেছিল, শুধু একবার দেখতে চায়। কোনোদিনও দেখেনি। কারওকেই দেখেনি।
—আঙ্গাপাঙ্গা মানে?
অবাক হয়ে শুধোলেন অরা।
—মানে, আমার Nakedness । ও নাকি কখনো কোনো মেয়েকে Naked দেখেনি।
—তুই কী করলি?
—আমি কী করব? ও তো নিজেই আমাকে খাটে শুইয়ে জোর করে আমাকে আনড্রেস করে দেখল।
—তারপর কী হল?
—কিছুই হয়নি।
—অরা Awestruck হয়ে গেল।
—ঠিক সেইসময়েই আপনি বেল বাজালেন।
—রুরুর কাছে কনট্রাসেপটিভও ছিল? কনডোম-টনডোম?
—তা আমি জানি না মাসিমা। বোধ হয় ছিল না। ও সত্যিই আমাকে কিন্তু শুধু দেখতেই চেয়েছিল। ও খুব-ই ভদ্র ছেলে।
—তা তো বুঝতেই পারছি।
—আর ওর কথাতেই তুমি ওকে দেখতে দিলে?
—বহুদিন ধরে কাকুতি-মিনতি করছিল মাসিমা। বিশ্বাস করুন। তবে ওর মনে কোনো কু-মতলব ছিল না।
—হ্যাঁ। তুমি পুরুষদের কতটুকু জানো?
তারপরে প্রায় অপ্রকৃতিস্থ গলাতে বলল, সংযমী হতে হয় মেয়েদের-ই। তুমি তো ছোটো মেয়ে নও চুমকি। কুড়ি বছর বয়স হয়ে গেছে। দেখতে চাইল বলেই রীতিমতো প্ল্যান করে ফাঁকা বাড়িতে মেয়েদের Modesty—যা সবচেয়ে মূল্যবান তাই তুমি বিকিয়ে দিতে এসেছিলে? তোমার মা জানলে তাঁরও তো হার্ট-অ্যাটাক হবে। আমারও হতে পারে।
—বিশ্বাস করুন মাসিমা। ও আমাকে শুধু আঙ্গাপাঙ্গাই দেখেছে। আর কিছুই করেনি।
উদ্ভট একটা ওয়ার্ড। ‘আঙ্গাপাঙ্গা’। কোন ভাষার শব্দ এটা?
—কোনো ভাষার নয়। আমার মায়ের কাছেই শোনা। আমাদের ছোটোবেলাতে মা চান করাবার সময়ে বলতেন, আঙ্গাপাঙ্গা হও, চান করাব তোমাকে।
অরার মুখে এসে গেছিল কথাটা। ও দৃঢ় গলায় চুমকিকে বলতে যাচ্ছিল, তুমি এ বাড়িতে আর কখনো আসবে না। কিন্তু বলতে গিয়েও বললেন না। দোষ তো চুমকির নয়, দোষ তো রুরুর-ই। উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলেমেয়ে ওরা কি এখনও দেবশিশু? আঙ্গাপাঙ্গা দেখতে ও দেখাতে এমন তীব্র ইচ্ছা ওদের? শুধুই দেখতে?
কারওকেই কিছু না বলে অরা ঘরে গিয়ে শব্দ করে দরজা বন্ধ করলেন বিরক্তির তীব্রতম প্রকাশ ঘটিয়ে। তারপর দরজাটা খুলে চুমকিকে বললেন, তুমি রুরুকে আঙ্গাপাঙ্গা দেখোনি?
—না মাসিমা।
—কেন? তোমার ইচ্ছে করেনি?
—না মাসিমা। আমাদের বাড়ির পাশের গলিতে রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, কুলি এরাসব শুশু করে। আমি ছোটোবেলা থেকেই অনেক দেখেছি। আমার কোনো উৎসাহ ছিল না। বিচ্ছিরি দেখতে।
—কথা শুনে হাসবেন না কাঁদবেন বুঝতে না পেরে দুটো পাঁচ মিলিগ্রামের অ্যালজোলাম খেয়ে অরা জোরে পাখা চালিয়ে শুয়ে পড়লেন ল্যাণ্ড-লাইনের এক্সটেনশান রিসিভারটাকে নামিয়ে রেখে।
শুয়ে পড়ার আগে রুরুকে বললেন, দরজার চাবি নিয়ে যাও, চুমকিকে বাড়ি পৌছে, ‘প্রিয়া’ সিনেমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকো। বিস্পতি গ্রামের মেয়ে, হারিয়ে গেলে পুলিশ-কেস হবে। তারপর বলল, আমার পরম সৌভাগ্য যে, তুমি বিস্পতির আঙ্গাপাঙ্গা দেখতে চাওনি। পুলিশে বলে দিলে তোমার জেল হয়ে যেত। মুখে চুনকালি পড়ত আমার। আর শোনো, আমি নিজে এই ঘটনার কথা তোমার অগ্নিকাকাকে বলব না। কাল তুমি গিয়ে নিজে বলবে। তারপরে তিনি যা-শাস্তি দেন তা দেবেন। বিস্পতিকে নিয়ে ফিরলে ওকে বোলো, আমাকে আটটার সময়ে এককাপ চা দিয়ে ঘুম থেকে তুলবে। স্নান করে আমি আবার ঘুমোব। রাতে খাব না কিছু। তৃষা পুণে থেকে ফোন করতে পারে। করলে বলবে যে, কাল কথা বলব।
অরা দরজাটা বন্ধ করল কিন্তু লক করল না। অরা শুয়ে শুয়ে ভাবছিল অগ্নিও হয়তো সেইদিন তাকে শুধু আঙ্গাপাঙ্গাই দেখতে চেয়েছিল।
এই পুরুষরা সত্যিই এক আশ্চর্য জাত। সত্যি। ব্যাপারটাকে ঠিক কীভাবে নেওয়া যাবে, কতখানি প্রাধান্য একে দিতে হবে, এ নিয়ে অগ্নির সঙ্গে পরে ঠাণ্ডামাথাতে আলোচনা করা যাবে। ছেলেটা কি তার একেবারেই বয়ে গেল এই বয়েসে। রুরু?
আঙ্গাপাঙ্গা।
শব্দটা মনে করেই আবার হাসি পেল অরার। তারপর-ই ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল। একাঘরে হেসেও ফেললেন একবার। যাই হোক, তার অসময়ে বাড়ি ফিরে আসাতে একটা মস্ত দুর্যোগ কেটে গেল তার জীবনের। ঈশ্বর যাই-ই করেন তাই মঙ্গলের জন্যে। মীনাক্ষীর অসময়ের মৃত্যুর শোকটাকে তার ব্যক্তিজীবনের এই কেটে যাওয়া দুর্যোগ যেন অনেকখানি লাঘব করে দিল।
পুণের ক্রিকেট ক্লাবটা ছোটো কিন্তু ভারি সুন্দর। ‘ক্যালকাটা ক্রিকেট অ্যাণ্ড ফুটবল ক্লাব’-এর সঙ্গে অনেক মিল আছে। তবে ‘সি.সি.এফ.সি’ ক্লাবে কোনো গেস্টরুমস নেই। পুণের ক্রিকেট ক্লাব-এ আছে।
তৃষা এর আগে কখনো পুণেতে আসেনি। এবারেও এসেছে মাত্র দু-দিন একরাত্রির জন্যে। হর্ষদ ব্যাঙ্কের অফিসার। তার পক্ষেও ছুটি পাওয়া খুব মুশকিল, ছুটি ম্যানেজ করতে পারলে ওকে নিয়ে মহাবালেশ্বর এবং পঞ্চগণি ঘুরে আসত। তৃষা মুম্বাই থেকে ট্রেনেই এসেছে পুণেতে। যদি হাতে যথেষ্ট সময় থাকত তবে ম্যাথেরান-এ স্টপ ওভার আসতে পারত। এখন পুণে থেকে কলকাতা থ্রু ট্রেইন হয়ে গেছে। সেই ট্রেনেই ফিরে যাবে আগামীকাল। কিন্তু ‘মুম্বাই-কলকাতা’ প্লেনের টিকিটও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ও। তবে এত শর্ট নোটিশে কনফার্মড সিট পাবে না হয়তো। তা ছাড়া, তাকে মঙ্গলবার অফিসে যেতেই হবে।
সকালে হর্ষদ ওকে গাড়ি ভাড়া করে শিবাজির একটা দুর্গ দেখাতে নিয়ে গেছিল। গাড়ি, ও অফিস থেকেই পেতে পারত কিন্তু ট্রাভেলিং অ্যালাউন্স থেকে বেশ কিছু বাঁচিয়ে নেয়। যখন দরকার হয় তখন ট্রাভেল এজেন্সি থেকে গাড়ি নিয়ে নেয়। খাদাকভাসালার পাশ দিয়ে পথ। হ্রদ আছে ওখানে একটা। তৃষার এক কাকা কমপিটিটিভ পরীক্ষা পাশ করে আর্মির কমিশানড অফিসার হওয়ার জন্যে, এই খাদাকভাসালার মিলিটারি আকাদেমিতে ট্রেনিং নিয়ে আর্মির কমিশানড অফিসার হয়েছিলেন। কাশ্মীরে সেই কাকা মারা গেছিলেন উগ্রপন্থীদের গুলিতে বছর পনেরো আগে। কাকা বিয়ে করেনি।
হর্ষদ বলছিল, দুর্গর ওপরে তৃষাকে নিয়ে কিছুটা চড়ে যে, ভাবতে পারো একজন মানুষ এক জীবনে এতগুলি দুর্গম দুর্গ বানিয়েছিলেন, আজ দাক্ষিণাত্য বিজয় করছেন, কাল দিল্লির দরবারে বন্দি হয়ে যাচ্ছেন। আর এই ক্রিস-ক্রসিং করছেন জেট প্লেন-এ চড়ে নয়, স্রেফ ঘোড়ায় চড়ে। তখনকার দিনের মানুষদের শৌর্যবীর্যর কথা ভাবলেও নিজেদের লিলিপুট বলে মনে হয়। তাই নয়? তাঁরা যেসব অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতেন তা আমরা হয়তো তুলতেই পারব না। অন্য এক সময় ছিল সেসব।
দুর্গের নীচেই ভালো ক্যানটিন আছে। মারাঠি খাবার পাওয়া যায়। সেখানেই কাড়হি, বেসনের রুটি, পোহা (মানে চিঁড়ে) এসব দিয়ে গাছতলাতে বসে জমিয়ে লাঞ্চ করল ওরা দু-জন। হর্ষদ অনেক ছবিও তুলল তৃষার। তৃষা বলল, বেঙ্গালুরুতে আমার একটা চাকরির কথা হচ্ছে। যদি হয়, তাহলে ডিসেম্বর নাগাদ হবে। ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়েন করতে হবে।
হর্ষদ বলল, আরে! আগে বলবে তো। আমি তো এদিকে তোমার-ই জন্যে কলকাতায় ট্রান্সফার চাইছিলাম। তোমাকে যদি বেঙ্গালুরুতেই আসতে হয়, তবে আমিও বেঙ্গালুরু চাইব। তাহলে বিয়ের কথাটাও ভাবা যাবে। মা ইন্টারনেটে রোজ-ই মনে করান।
মাসিমা আমাকেও বলেন মাঝে মাঝেই। গত সপ্তাহেও তো গেছিলাম। কলকাতাতে তোমাদের বাড়িতে।
—তুমি কী বলো?
—আমি কনভিনিয়েন্টলি তোমার ঘাড়ে দোষ চাপাই।
তৃষা বলল।
—আর আমিও তোমার ঘাড়ে। তবে ব্যাপারটাকে আর বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না মনে হচ্ছে। আগে তো তিন-চার বছর হানিমুন করে নেব। তারপর ফ্যামিলির কথা ভাবা যাবে। আসলে তুমি তোমার মা-বাবাকে এবং আমি আমার ভাবী শ্বশুর-শাশুড়িকে যতই ভালোবাসি বা পছন্দ করি না কেন আজকাল সকলেই আলাদা থাকতে চায়। আলাদা কিচেন, অপার স্বাধীনতা, বন্ধুদের আসা-যাওয়া, পার্টি...........। আসলে এখন কোনো আধুনিক দম্পতিই বাবা-মাকে নিয়ে জড়িয়ে-মড়িয়ে থাকতে চায় না।
—আমার কথা আলাদা। আমার তো শুধুই মা—আর মা যে, আমাদের অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন।
—তোমার অগ্নিকাকা আছেন মাকে দেখার জন্যে। উনি তো আর একেবারে একা হয়ে যাবেন না।
—তা হলেও। অগ্নিকাকা তো বাবার অভাব পূরণ করতে পারবেন না।
তারপর বলল, তিন-চার বছর হানিমুন করতে করতে ততদিনে তোমার মাইনেও নিশ্চয়ই অনেক বেড়ে যাবে। আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে তখন ভালো মা হয়ে বাচ্চার দেখাশোনা করব।
হর্ষদ বলল, সুইটি পাই। দ্যাটস লাইক আ গুড গার্ল। আমারও তাই-ই ইচ্ছে।
খাওয়া-দাওয়ার পরে একটা গাছতলাতে বসে হর্ষদ বলল, একটা গান শোনাও। কতদিন তোমার গান শুনি না।
—আমি কীই বা গান জানি। গান জানেন মা আর অগ্নিকাকা। সেদিন ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে কত যে, গান হল। মাকে আমাদের ছেলেবেলা থেকে অর্গান বাজিয়ে গান গাইতে শুনেছি। গানের আবহতেই বড়ো হয়ে উঠেছি আমরা। রবীন্দ্রসংগীত আর অতুলপ্রসাদের গানের আবহে। দিদিমাও খুব-ই ভালো ব্রহ্মসংগীত গাইতেন। অগ্নিকাকাও ভালো গান। কিন্তু পুরাতনি গান। নিধুবাবু, শ্রীধর, কথক দাশরথী রায়, গোপাল ওড়িয়া এঁদের গানও দারুণ গান। কীসব টপ্পা রে বাবা। আমরা গাইতে গেলে দাঁত খুলে যাবে। আমাদের রুরুও কিন্তু বেশ ভালো গায়। তবে আজকাল বাংলা ব্যাণ্ডের গান নিয়েই বেশি মেতেছে।
—এবারে গানটি গাও।
—কী গান গাইব?
—‘‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে, এখন ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন অন্যমনে।’’
বেশ। বলে, গানটি গাইল তৃষা।
গান শেষ হলে হর্ষদ বলল, বা:। ভারি ভালো লাগল। আমরা যখন হানিমুনে যাব তখন কোন কোন গান শোনাবে আমাকে তার একটা লিস্ট বানিয়ে রেখো।
কিছু না বলে, হাসল তৃষা।
তারপর বলল, ‘গ্লোব নার্সারি’ ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে ফুলগুলো কিন্তু ভারি সুন্দর দিয়েছিল। ইয়ালো রোজেস।
পুণেতে থাকাকালীন ওরা অন্য অনেক কিছুও করতে পারত কিন্তু করেনি। তৃষা সবসময়ই বলে, বাকি থাক কিছু। এখন থাক। সবকিছুই এখন-ই হয়ে গেলে ভবিষ্যতের স্বপ্নটাই মাঠে মারা যাবে। বিয়ে হোক। তারপরে সব হবে। তাড়া কীসের? সংযমী জীবনযাপনের মধ্যে যে, গভীর আনন্দ তা, আপাত-কষ্টেরও বটে। তবে যারা এই কষ্টটা স্বীকার করে নেয় স্বেচ্ছাতে, তারাই ভবিষ্যতে গভীরতর আনন্দের শরিক হতে পারে।
গাড়িটাকে অরাদের বাড়িতেই পাঠিয়ে দিয়েছে অগ্নিভ। রুরুকে ডেকে কয়েকদিন আগেই বলে দিয়েছিল। আণ্ডার গ্রাউণ্ড গ্যারাজটা ধুয়েমুছে রাখতে। একজন ড্রাইভারও ঠিক করে ফেলেছে অগ্নি। সে সকালে আসে। তৃষার অফিস বন্দেল রোডে। তৃষাকে সেখানে নামিয়ে রুরুকে নিয়ে যাদবপুরেযায় ইউনিভার্সিটিতে। তারপর আবার চলে যায় তৃষার কাছে। তৃষার ঘুরে ঘুরে কাজ। অফিস থেকে মোটা ট্রান্সপোর্ট অ্যালাউন্স পায় তৃষা। তা থেকে অনেক বেঁচে যায়। তৃষা বলেছিল, অগ্নিকাকা, পেট্রোলের খরচ এবং সার্ভিসিং-টার্ভিসিং-এর খরচ আমিই দেব।
অগ্নি বলেছিল, একদম নয়। তোর বাবা থাকলে কি তোর কাছ থেকে ওসব নিত? একদম বাজে কথা বলবি না।
ওরা ভাইবোনেই বেশি ব্যবহার করে গাড়ি। অরা কিন্তু একদিনও গাড়ি ব্যবহার করে না। মিনিতেই স্কুলে যায় মিনিতেই ফিরে আসে।
এ নিয়ে অভিযোগ করেছিল অগ্নি কিন্তু অরা কান দেয়নি। বলেছিল, তোমার কাছে আর ঋণ বাড়াতে চাই না। এমনিতেই অনেকই ঋণী হয়ে আছি। বলেছিল যে, অভ্যেস খারাপ করতে চাই না। প্রয়োজন বাড়ালেই বাড়ে। আজকালকার ছেলেমেয়েদের দ্যাখো-না? তাদের কী যে, প্রয়োজন নেই, তাই ভেবে পাই না আমি। সবকিছুই তাদের চাই। ওয়েস্ট সাইড আর প্যান্টালুনে গিয়ে যে দামে ওরা জামাকাপড় কেনে তাতে আমার সারাবছরের শাড়ি হয়ে যায়। তৃষা হাজার পঁচিশ মতো মাইনে পায়। কিন্তু ওর এক-একটা সালোয়ার কামিজের যা দাম, তা শুনলে মাথা ঘুরে যায়। মিথ্যে প্রয়োজনের ভারে ওরা একদিন চাপা পড়ে মারা যাবে। এখন বুঝছে না।
ঠিক-ই বলেছ তুমি। আর তেমন-ই হয়েছে আজকালকার ব্যাঙ্কগুলো। জোর করেই ধার দেবে। কত যে, ফোন আসে। বলে দু-লাখ টাকা দিচ্ছি, নিন-না। কোনো সিকিয়োরিটি, ওয়ারান্টি কিছুই লাগবে না। নমিনাল ইন্টারেস্ট।
তারপর অরা বলল, আমার বাবা শিখিয়েছিলেন, থাকলে খাবে, না থাকলে না খেয়ে থাকবে কিন্তু ধার নেবে না কারও কাছ থেকে। এদের পুরো প্রজন্মটাই অধমর্ণর প্রজন্ম হয়ে গেল। নিত্য নতুন মোবাইল, সিডি প্লেয়ার, ডি ভি ডি প্লেয়ার, হ্যাণ্ডিক্যাম—কত্ত যে, প্রয়োজন এদের। নীরব দর্শক হয়ে দেখে যাই। ওরা ওরা, আমরা আমরা। তুমি গাড়ি কিনেছ, তুমি অ্যাফোর্ড করতে পারো। আমি পারি না, তাই চড়ি না।
অগ্নি শুধু শনিবারে গাড়িটা নেয়। রবিবার ড্রাইভারের ছুটি। অন্য সবদিন গাড়ি ছেলেমেয়েদের-ইকাছে থাকে।
এক শনিবার সকালে অগ্নির ফোন এল। শনিবার অরার স্কুল ছুটি থাকে। অগ্নি বলল, আজ এগারোটাতে গাড়িটা নিয়ে আমার কাছে এসো। কচুর শাক আর ইলিশ মাছ আনিয়েছি। চন্দন এসব রাঁধতে পারে না। তুমি এসে রাঁধো। ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক রাঁধবে, সরষে-ইলিশ, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে টক। রাতের বেলা তৃষা, রুরু আর অপালাকেও আসতে বলো। ওরাও খাবে, গানটান হবে। অনেকদিন জমায়েত হয় না। দুপুরে আমি আর তুমি একা খাব। একটু একা থাকব। গল্প করব। আসবে প্লিজ?
—রাতে অপালাকে বলব আর ঘোষ সাহেবকে বলব না?
অরা একটু ভেবে বলল। সরি সরি খুব ভুল হয়ে গেছে। অবশ্যই বলবে। তুমি ফোন করে ওদের বললেই কি ভালো দেখাবে-না? ঠিক আছে।
তারপর বলল, ঠিক-ই বলেছ। তাই-ই বলব।
একটু চুপ করে থেকে অরা বলল, রুরু তোমার কাছে গেছিল? কিছু কি বলেছে?
—হ্যাঁ। বলছিল বটে। তবে আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।
—তবে খুব-ই রিপেট্যান্ট মনে হল। কোনো অন্যায় করেছে কি?
—অন্যায় অবশ্যই করেছে। খুব প্ল্যান করে করেছে। রীতিমতো ক্রিমিনালের মতো প্ল্যান করে। আমি গিয়ে বলব। ওকে তুমি একটু শাসন কোরো। ব্যাপারটা আমার পক্ষে একটু ডেলিকেট। তুমি বললেই ভালো হয়।
—এসো। শুনব। আমি কি আজ-ই অপালাকে বলব নিজে ফোন করে? শনিবার ঘোষ সাহেব, মানে ব্যারিস্টারদের তো অনেক-ই কাজ। অপালার স্বামীও কি আসতে পারবেন?
—শুক্রবার সন্ধেবেলা হলে হয়তো পারতেন।
অরা বলল। কোনো ব্যারিস্টার-ই শুক্রবার সন্ধেবেলা কাজ করেন না।
—তাই বুঝি?
—হ্যাঁ। তুমি জানতে না?
—তাহলে শুক্রবার-ই করা যাবে। তবে সেদিন তুমি স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আমার কাছে চলে এসো গাড়ি নিয়ে। সেদিন দয়া করে গাড়িটা নিয়েই স্কুলে গিয়ে আমাকে ধন্য কোরো।
—বাড়ি থেকে রান্না করে নিয়ে গেলে হয় না?
—তাহলে তোমাকে একটু একা পাওয়া হবে না। গল্পও করা হবে না। তোমার জন্যে তোমাকে ভালোবেসে একজীবনে তো কম কষ্ট পেলাম না। আমাকে একটু আনন্দ দিতে তোমার এতই আপত্তি? আমি কবে মরে যাব কে বলতে পারে? এ মাসের ‘ই সি জি’ ভালো বেরোয়নি। আমার বন্ধুবান্ধবেরাও তো টপাটপ মরে যাচ্ছে। তা ছাড়া ডিমেশনিয়া মতোও হয়েছে। কোথায় যে, কী রাখি মনে থাকে না। মানুষের নাম মনে থাকে না। কারও সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করলে তাও মনে থাকে না আজকাল। কেউ নিমন্ত্রণ করলে একদিন আগে অথবা একদিন পরে গিয়ে পৌঁছোই সেখানে, ভয় করে। শেষে অ্যালঝাইমারে না দাঁড়ায়। আমি তোমাদের কারও কাছেই বোঝা হতে চাই না। অ্যালঝাইমার যদি সত্যিই হয় তবে আত্মহত্যা করে মরে যাব। অমন বাঁচা বাঁচব না।
—কিছু হবে না। তুমি যতদিন গান গাইতে পারবে ততদিন তোমার কিছুই হবে না। তোমার মতো মানুষের কি এত তাড়াতাড়ি যাওয়া চলে? এত মানুষকে তুমি আনন্দ দাও। তোমাকে ঈশ্বর ঠিক বাঁচিয়ে রাখবেন।
—তাহলে অপালা আর ঘোষ সাহেবকেও আসতে বলছি শুক্রবারে। তুমি এলে দুপুরে ড্রাইভারকে পাঠিয়ে চাইনিজ আনিয়ে নেব। খাওয়া-দাওয়ার পরে তুমি ধীরেসুস্থে রান্না কোরো। বিকেলে একটু রাবড়ি নিয়ে আসতে বলব ড্রাইভারকে।
—‘শর্মা’ থেকে?
—না না শর্মা থেকে নয়, মে-ফেয়ার রোড-এর নেপালের দোকান থেকে।
—রাবড়ি তুলে নিয়ে রুরুকে নিয়ে আসবে ড্রাইভার।
—রুরুর জন্যে গাড়ি লাগবে না। তুমি বরং তৃষার অফিসে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়ো। ওর-ই তো দেরি হয়।
—আর চুমকিকে বলব না?
—তোমার ইচ্ছে হলে বোলো।
তবে এইকথাই রইল। আমি নিজে সকালে বাজারে যাব। গড়িয়াহাট বাজারে সনাতনের দোকান থেকে বড়ো ইলিশ নিয়ে আসব আর কচুর শাক। আগের দিন সনাতনকে বলে রাখব। কত মাছ আনব? তিন কে.জি.?
—অত কে খাবে? আমরা কি রাক্ষস? যা মাছ ইতিমধ্যেই আনিয়েছ তার কী হবে?
—ও চন্দন যেমন করে পারে রাঁধবে। আমার বন্ধুদের ডেকে নেব। ওরা সেসবের সৎকার করবে। তুমি যেদিন রাঁধবে সেদিন হবে স্পেশাল ট্রিট।
—গড়িয়াহাট বাজারে তোমার গৌর-এর কী হল?
—গৌর এখন খুব বড়ো হয়ে গেছে। আমার মতো ছোটোখাটো খদ্দেরকে ও পাত্তা দেয় না। তাই ওকে ছেড়েছি। তা ছাড়া ওর লোকেরা দাম ও ওজনেও গোলমাল করে।
—তিন কেজি মাছ আনবে কেন? নষ্ট হবে না?
—থাকলে, ফ্রিজে থাকবে। পরদিনও খাব। আর বিস্পতির জন্যেও নিয়ে যাবে বাড়িতে সব রান্না। ও আমাকে কত কী রান্না করে খাওয়ায়।
অরা চুপ করে থাকলেন।
—চিতল মাছ আনব নাকি? খুব বড়োপেটি পাওয়া যায় সনাতনের দোকানে।
—ইচ্ছে করলে আনতে পারো, পেটি রাঁধতে আর অসুবিধে কী? মুইঠ্যা করতেই ঝামেলা।
—তাহলে চিতলও আনব। কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা দিয়ে রাঁধবে। তুমি কিন্তু বারোটা নাগাদ চলে এসো। গাড়ি নিয়েই স্কুলে যেয়ো। শুক্রবারে সাড়ে এগারোটার সময় ড্রাইভার যেন, গাড়ি নিয়ে স্কুলে পৌঁছে যায় তা বলে দিয়ো।
তারপর বলল, ছাড়ছি। সঙ্গে চেঞ্জ নিয়ে এসো। রান্নার পরে চানটান করে ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সুন্দর করে সাজতে হবে তো। আমি অবশ্য তোমাকে সবসময়েই সুন্দর দেখি। এবারে নববর্ষে, মানে পয়লা বৈশাখে তোমাকে একটা দারুণ সুন্দর শাড়ি দেব। একদিন শাড়িটা পরে আমাকে দেখিয়ো। আর একদিন না-পরে।
অরা অনেকক্ষণ টেলিফোনের অন্যপ্রান্তে চুপ করে থাকল। তারপর বলল, তুমি বড়ো প্রগলভ হয়ে গেছ। আগে তো এমন ছিলে না।
—রুরুদের সঙ্গে মিশে মিশে আমিও নবযৌবনের দলের একজন হয়ে গেছি।
—আমার কিছু বলার নেই।
অগ্নি বলল, রামকুমার বাবুর কাছে একটা গান শুনেছিলাম।
—কে রামকুমার বাবু?
—রামকুমার চট্টোপাধ্যায়।
—কী গান?
একদিন তোমায় বুকের মাঝে ধরেছিলাম প্রাণ
তখন তোমার মন ছিল না, তাই আমায় করলে অপমান।
এখন প্রেমনদীতে ভাটা যে গো নেই যোবনের টান,
একদিন তোমার বুকের মাঝে ধরেছিলেম প্রাণ।
তারা গান শুনে বলল, কিছু আছেও তোমার স্টকে! ধন্যি তুমি।
ফ্ল্যাটের বেলটা বাজতেই অগ্নি গিয়ে দরজা খুলল।
বলল, কী সৌভাগ্য আমার।
অরা একটা ফলসা রঙা শাড়ি পরেছিল তাঁতের, গাঢ় বেগুনি ব্লাউজের সঙ্গে। হাতে চামড়ার হালকা বেগুনি ব্যাগ।
—তোমাকে ‘জ্যাকারাণ্ডা’ বলে ডাকতে ইচ্ছে করছে।
—যা খুশি বলে ডাকো। কিন্তু তার আগে একটা কোল্ড ড্রিঙ্কস দাও।
—চন্দন।
বলে, ডাকল অগ্নি।
চন্দন এলে বলল, মেমসাহেবকে গ্লাসে ম্যাঙ্গো-পান্না দে, বেশি করে বরফ দিয়ে।
—ম্যাঙ্গো-পান্না? সেটা আবার কী জিনিস?
—খাওনি কখনো? ভুটানে তৈরি হয়। খেয়ে দ্যাখো। আর তা না খেতে চাও তো ‘রিয়্যাল’—এর ফুট জ্যুসও খেতে পারো। টোম্যাটো অরেঞ্জ আর গুয়াভা আছে।
—না, তোমার ম্যাঙ্গো পান্না খেয়েই একটু অ্যাডভেঞ্চার করি। রিয়্যাল-এর জ্যুস তো খাই-ই।
—সঙ্গে একটু ভদকা বা জিন মিশিয়ে দিই?
—না। একদম না। রান্না করতে হবে না? নেশা টেশা হয়ে গেলে মুশকিল হবে। এত মানুষে খাবেন।
—আরে টেনশান কোরো না। আমার চন্দনও খারাপ রান্না করে না। তুমি শুধু একটু সুপারভাইজ করে ফিনিশিং টাচ দিয়ে দেবে, তাহলেই হবে। তোমার ড্রিঙ্কটা আমি নিজে বানিয়ে দিচ্ছি তার আগে কিচেনে যাও একবার, মাছগুলো ঠিক এনেছি কি না দেখে নাও।
চলো, বলে, অরা চন্দনের সঙ্গে কিচেনে গেল।
ফিরে এসে বলল, খুব ভালোই মাছ এনেছ। চন্দন তো ইলিশ মাছগুলো কেমন, গাদা পেটি আলাদা করে কেটেও ফেলেছে। বেশ মোটা মোটা পিস করেছে। আর চিতলের পেটিও বোধ হয় মাছওয়ালাই কেটে দিয়েছে।
—হ্যাঁ। গড়িয়াহাট বাজারের সনাতন।
—খুব ভালো কেটেছে। পাতলাও নয় আবার খুব মোটাও নয়। আর পেটিগুলো সত্যিই খুব বড়ো বড়ো। তবে আজকালকার ছেলেমেয়েরা মুঠা খেতেই ভালোবাসে পেটির চেয়ে।
—তাদের কথা ছাড়ো। তারা তো কাঁটাঅলা মাছ খেতেই পারে না। খেলেও একটা কাঁটাঅলা মাছ খায়, যেমন পাবদা। নইলে রুই কী চিংড়ি অবশ্য খায়।
—সত্যি। বাঙালির ছেলেমেয়ে পুঁটি, পারশে, বাটা, খয়রা, ইলিশ মাছ খেতে চায় না এ অভাবনীয়। শুধু ইন্টারনেট মোবাইল-ই নয়, এদের খাদ্যাভ্যাসেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। হঠাৎ দেশসুদ্ধু ছেলেমেয়ে সাহেব-মেম হয়ে গেল। বোনলেস ছাড়া মাছ নাকি খাওয়াই যায় না।
—এই বদলটা বড়ো হঠাৎ-ই হল। তাই না? গত দশবছরে। দশবছর নয়, আমি বলব পাঁচবছরে। নিজেদের ওদের প্রেক্ষিতে কেমন বুড়ো বুড়ো, আউট অফ প্লেস বলে মনে হয়। মনে হয় এবারে ছুটি হয়ে গেলেই ভালো।
অরা বলল।
—তা কেন হবে। উই মাস্ট মুভ উইথ দ্যা টাইম। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলেই আমরা বাতিল হয়ে যাব। চলতেই হবে।
—এই বয়সে এসে নিজেদের বদলানো বড়ো কষ্টকর।
—কষ্ট হয়তো হবে একটু। কিন্তু আমরা নিরুপায়। নিজেদের বদলাতে হবেই।
অগ্নি নিজে হাতে ম্যাঙ্গো পান্নার গ্লাস নিয়ে এল অরার জন্যে। তারপর সেলারের দিকে গিয়ে বলল, একটু জিন বা ভদকা মিশিয়ে দিই?
না, বললাম না। অরা বলল, আমার ওসব ভালো লাগে না।
—ভালো না লাগলে খেয়ো না।
চন্দনকে ডেকে বলল অগ্নি, ড্রাইভারকে ডাক চন্দন। চাইনিজ খাবারটা আনিয়ে রাখি। তোর কী খেতে ইচ্ছে?
চন্দন মুখ নামিয়ে বলল, আপনারা যা খাবেন আমিও তাই খাব।
—তা কেন? তোর কী ভালো লাগে বল না।
—বাড়িতে তো চাওমিয়েন, ফ্রাইড রাইস এসব আমরাই বানিয়ে খাই। সেই একদিন হাঁসের মাংস আনিয়েছিলেন, ভালো খেয়েছিলাম।
অগ্নি হেসে উঠল।
অরাও হাসল চন্দনের কথা বলার ধরনে।
অগ্নি বলল, বেশ তাই হবে। যা ড্রাইভারকে ডেকে নিয়ে আয়। কী কী আনবে কাগজে লিখে দেব। টাকা এখন দিতে হবে না। দোকানে আমার অ্যাকাউন্ট আছে।
চন্দন চলে গেলে অরা বলল, একা থাকো, বেশি লাই দিয়ো না, কোনদিন গলা কেটে সব নিয়ে চলে যাবে।
—আমার সর্বস্ব নেবে বলছ?
—হ্যাঁ।
—আমার সর্বস্ব তো এ বাড়িতে নেই।
—মানে?
—সে তো অন্য জায়গাতে আছে।
—সে কী? কোথায়?
অবাক হয়ে, গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, অরা।
—যোধপুর পোস্ট অফিসের রাস্তা দিয়ে ঢুকে, সেকেণ্ড রাইট তারপর সেকেণ্ড লেফট-এ গিয়ে সে বাড়ি।
কথা শুনে হেসে ফেলল অরা। অগ্নি নাগপুর থেকে অবসর নিয়ে আসার পর ভবানীপুরে ওর দিদির বাড়ি থেকে আসতে যোধপুর পার্কের ফ্ল্যাটের ডিরেকশন জানতে চেয়েছিল যখন তখন এইভাবেই ডিরেকশন দিয়েছিল অরা।
অগ্নির কথার জবাব না দিয়ে, মুখ নীচু করে শরবত খেতে লাগল সে। তার মুখে এক নিরক্ত খুশির উচ্ছ্বাস আভাসিত হল।
অগ্নি বলল, নরেশ আর ব্রতীনকেও বলেছি। তুমি রাগ করবে না তো? ওরা অনেক-ই খাওয়ায় আমাকে। আজ এমনিতেই ব্রতীনের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। পল কক্স-এর একটা ছবির সিডি জোগাড় করেছে ও। ‘‘দ্যা আইল্যাণ্ড’’। একটি শ্রীলঙ্কান মেয়ে নায়িকা। ওই ছবিতে ঋতু গুহর গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ‘‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই বারেবারে কেন পাই না’’ গানটিকে থিম মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ডিরেক্টর।
—ইংরেজি ছবিতে বাংলা গান?
—অপর্ণা সেনও তার ৩৬, চৌরঙ্গি লেন-এ ঋতু গুহ-র গাওয়া ‘‘এ কী লাবণ্য পূর্ণ প্রাণে’’ গানটির কিছুটা একটা পার্টি সিন-এ ব্যবহার করেছিলেন, মনে আছে?
—আছে।
—পল কক্স-এর ছবিটি দেখার আগ্রহর সেটাও একটা কারণ।
তারপর-ই অগ্নি বলল, ওরা কিন্তু হুইস্কি-টুইস্কি খাবে। তোমার আপত্তি নেই তো?
হুইস্কি খাওয়ার মধ্যে তো দোষ নেই। তুমি আর আশিস তো কতই খেতে। হুইস্কি কারওকে খেলেই বিপদ। তাছাড়া, তুমি অপালার স্বামী উজ্জ্বল ঘোষ সাহেবকেও বলেছ। তিনি তো রোজ-ই খান! হুইস্কি না খেলে খাবারের স্বাদ-ই পাবেন না।
বড়ো বড়ো উকিল-ব্যারিস্টারদের মধ্যে অধিকাংশরাই খান। বাবার মুখে শুনেছিলাম, শচীন চৌধুরী সাহেব কনফারেন্সের সময়ে নিজে তো খেতেন-ই সব মক্কেলদেরও খাওয়াতেন। রাত ন-টা বেজে গেলেই একজন বেয়ারা স্কচ, হুইস্কি আর সোডার গ্লাসে ভরা ট্রে নিয়ে সবাইকে দেখাত আর অন্যজন ‘ফাইভ-ফাইভ-ফাইভ’ আর ‘স্টেট এক্সপ্রেস’ সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই ট্রেতে করে নিয়ে ঘুরত।
—আচ্ছা তখন তো স্মোকিং আর প্যাসিভ স্মোকিং নিয়ে এত হইচই হত না। তাঁরা তো নিজেদের জীবন পুরোপুরি উপভোগ করে গেছেন।
—করেছেন-ই তো। শচীন চৌধুরী সাহেব শিকারও করতেন। ‘পরিমিতি’ বোধ ছিল সেসব মানুষদের। তা ছাড়া ব্যাপারটা কী জান এসব টাবু পশ্চিমি দেশে বা জাপান সিঙ্গাপুরেই মানায়। গড়িয়াহাটের মোড়ে দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলে একজন মানুষের যতখানি ক্ষতি হয় ততখানি চার প্যাকেট সিগারেট বা চার পেগ হুইস্কি খেলেও হয় না। শহরের পরিবেশ আগে দূষণমুক্ত করতে হবে, নইলে এসব বাড়াবাড়ি আমাদের দেশে মানায় না। সরকারের যা করণীয় তা না করে এমন করে আমাদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হাত দেওয়াটা সমর্থনযোগ্য নয়।
—তা অবশ্য ঠিক-ই বলেছ।
তারপর ড্রাইভার ওপরে এলে অগ্নি ওর নাম লেখা স্লিপ-প্যাড-এ খাবারের সব আইটেম লিখে দিল।
—বেশি আনিয়ো না, নষ্ট হবে।
—না। চন্দন আর আমাদের দু-জনের মতোই অর্ডার দিলাম। আর চার প্লেট ফ্রায়েড প্রন লিখে দিলাম। রেখে দেবে। সকলে এলে মাইক্রো-ওভেন-এ গরম করে দেবে চন্দন হুইস্কির সঙ্গে খাওয়ার জন্যে।
ড্রাইভারকে তারপরে বলল, এগুলো এনে দিয়ে তুমি তোমার ধাবাতে খেয়ে নিয়ে তৃষা দিদির অফিসে চলে যেয়ো।
ড্রাইভার চলে গেলে বলল, রাতে সবসুদ্ধু ক-জন হবে তাহলে? আমরা দু-জন, রুরু আর চুমুকি, অপালা আর ঘোষ সাহেব, নরেশ আর ব্রতীন আর চন্দন? ক-জন হল?
—তৃষাকে বাদ দিলে।
—ও হ্যাঁ।
—দশজন হল সব মিলে।
তারপর-ই বলল, দেখেছ। বিস্পতিকে ধরা হয়নি। তার খাবার তো পাঠাতে হবে ড্রাইভারকে দিয়ে বাড়িতে।
—খাওয়ার কম পড়বে না তো?
—না, না। এত এত কেজি করে মাছ এনেছ। সবাই কি রাক্ষস?
—পোলাউ হবে? না ভাত?
—ভাত-ই করতে বলো চন্দনকে। চিতলের পেটি আর ভাপা ইলিশ পোলাও দিয়ে ঠিক জমবে না। তা ছাড়া, হুইস্কি যারা খাবে তারা খাবার বেশি খাবেও না।
—তুমিই জানো। শুনেছিলাম হুইস্কি খেলে খিদে বেড়ে যায়।
—অনেকের হয়তো বাড়ে। সকলের নয়।
—খাবারটা এলে, খেয়ে নিয়েই রান্না শুরু করতে হবে। নইলে সময়মতো সব করে ওঠা হবে না। তোমার চাইনিজ রেস্তরাঁ কত দূরে?
—আরে কাছেই। আধ ঘণ্টার মধ্যে চলে আসবে। আজকাল যোধপুর পার্ক তো লানডান-এর অক্সফোর্ড স্ট্রিট হয়ে গেছে।
বলেই বলল, তোমার চেঞ্জ আনোনি? সন্ধেবেলা এই শাড়ি পরেই থাকবে? স্নান করবে না?
—এনেছি তো। কিন্তু ওহো! চেঞ্জ তো ছোটো স্যুটকেসে গাড়িতেই আছে। চন্দনকে বলে রাখো ড্রাইভার ফিরলেই ওটাকে ওপরে নিয়ে আসবে। নইলে ড্রাইভার সঙ্গে করে নিয়ে যাবে হয়তো বুঝতে না পেরে।
—এখুনি বলে রাখছি।
—আমি দুটো ভদকা খাব লেবু আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে—উইথ প্লেন্টি অফ আইস। তোমার আপত্তি আছে?
অগ্নি বলল।
—আমার কি কোনোদিনও আপত্তি ছিল? আশিস আর তুমি তো এসব দেখা হলেই খেতে। আর অ্যাকসিডেন্টটাও তো হল বেশি খেয়ে গাড়ি চালাবার জন্যেই।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, এখন বয়স হচ্ছে। এসব কমাও এবারে।
—আরে এই বয়সেই তো একটু পিপ-আপ-এর দরকার। আমার বউ নেই, সংসার নেই, ছেলেমেয়ে নেই, এমনকী একটা কুকুর পর্যন্ত নেই। এই তো একমাত্র শখ। ‘উজ্জীবনী’।
—তোমার নিজের সংসার করোনি ঠিক-ই কিন্তু অন্যের বোঝা তো শখ করে সব নিজের কাঁধেই বয়ে বেড়াচ্ছ প্রতিদানে কিছুমাত্র না পেয়েই।
—শখ করে নিয়েছি বা দৈবাদেশে নিয়েছি, কে বলতে পারে! তা ছাড়া, কী পেয়েছি আর কী পাইনি তা আমিই জানি। আমাদের ছেলেবেলাতে পঙ্কজ মল্লিকের একটা গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল না? একটা রবীন্দ্রসংগীত?
—কোন গান?
—‘‘কী পাইনি তার হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি।’’
—হুঁ।
তুমিই তো আমার ছেলেমেয়েদের বাবার মতো।
অরা বলল, মুখ নীচু করে।
—‘‘বাবার মতো’’ আর বাবাতে তফাত আছে।
অগ্নি বলল।
অরা চুপ করে রইল। ভাবছিল, এই বাক্যটিই তার ছেলেমেয়েদের অরা নিজে বহুবার বলেছে। আশ্চর্য! আজ অগ্নিও সে কথা বলল। তবে অগ্নির গলাতে দুঃখের রেশ ছিল। অগ্নির সেই দুঃখ অরার বুকে নিরুপায়তার ‘অবলিগাটো’ হয়ে বাজল যেন।
অগ্নি তারপরে বলল, তুমি এবং তোমার ছেলেমেয়েরা কেউই যে, আসলে আমার কেউই নয় তা আমার মতো আর কে জানে! তবে এই আমার আনন্দ। নিজের সংসারের জন্যে তো সবাই-ইসবকিছুই করে। পরের সংসারের জন্যে করাটার মধ্যে একটা অন্য আনন্দ আছে। তোমাদের জীবনে আশিস-এর অভাব কিছুটা যে, মোচন করতে পেরেছি এই আমার মস্ত আনন্দ। বন্ধু আমার অনেক-ই ছিল কিন্তু আশিসের মতো বন্ধু কেউই ছিল না।
—আমার এখানকার দুই বন্ধু নরেশ আর ব্রতীনের সঙ্গে আলাপ তো হয়েছে। তাদের বেশ কয়েকবার নেমন্তন্নও খাইয়েছ কিন্তু তেমন ঘনিষ্ঠভাবে জানোনি ওদের। তোমাকে নিয়ে ওদের ঔৎসুক্যেরও শেষ নেই। আমাদের সম্পর্ক নিয়েও ওদের ঔৎসুক্য কম নয়। আজ ওদের সেই ঔৎসুক্যের আরও একটু নিরসন হবে।
—ওঁরা যদি হতাশ হন। আমাকে আরও কাছ থেকে দেখে?
—তা যে হবে না, তা তুমি ভালো করেই জানো। ওরা দু-জনেই গান-পাগল। তাই তো তোমাকে ওরা এত ভালোবাসে। আজ তোমার গান শুনে ওদের খুব-ই ভালো লাগবে। তোমার নিজের বাড়িতে তুমি কিন্তু ওদের একদিনও গান শোনাওনি। তা ছাড়া, তোমাকে খারাপ লাগবে এমন পুরুষ কি এই ধরাধামে আছে?
—রুরু তোমাকে সেদিন কী বলেছিল?
প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে অরা বলল। অগ্নির মুখে অরার নিজের প্রশংসা একঘেয়ে লাগছিল।
—কোনদিন?
—তোমার কাছে যেদিন পাঠিয়েছিলাম আমি। তোমাকে কনফেশানাল করতে।
—ও হ্যাঁ। এসেছিল তো রুরু কিন্তু কী যে, বলল ঠিক বুঝতে পারলাম না।
গ্লাসটা টেবিল-এর ওপরে নামিয়ে রেখে অরা বলল, সাংঘাতিক কান্ড হতে পারত সেদিন।
—কীরকম?
—আমার স্কুলের পিকনিকে যাওয়ার কথা ছিল। তৃষা মুম্বাই গেছিল অফিসের কাজে, সেখান থেকে হর্ষদের কাছে যাওয়ার কথা।
—তারপর?
—তারপর আর কী? রুরু বিস্পতিকে নিজে টিকিট কেটে ‘প্রিয়া’ সিনেমাতে একটা হিন্দি ছবি দেখতে পাঠিয়ে ফ্ল্যাট ভেতর থেকে বন্ধ করে চুমকিকে নিয়ে বেডরুমে ঢুকেছিল। এদিকে স্কুলের একজন অল্পবয়েসি টিচার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে স্কুলেই মারা যাওয়াতে পিকনিক ক্যানসেল হয়ে গেল। আমি যে-অসময়ে ফিরে আসব তা তো জানত না ও।
—বলো কী? দারুণ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।
—ইন্টারেস্টিং বলছ তুমি? কী বিপদ যে, হতে পারত!
রাগের গলাতে বলল অরা।
—তারপর কী হল বলো?
অরা হেসে বলল, আমি যখন চুমকিকে বললাম, তোরা বেডরুমে কী করছিলি? ও প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, রুরু বহুদিন হল আমাকে দেখবে বলে ঘ্যান ঘ্যান করছিল।
—দেখবে মানে? ওকে তো প্রায় রোজ-ই দেখছে।
—না, দেখা মানে ওর Nakedness দেখা।
—বলো কী?
হ্যাঁ। বলল, রুরু আমাকে আঙ্গাপাঙ্গা দেখতে চেয়েছিল।
—আঙ্গাপাঙ্গা মানে? কোন দেশি শব্দ সেটা?
—শব্দটা বাংলাই। চুমকির মা নাকি ওর ছোটোবেলায় চান করাবার আগে বলতেন, আঙ্গাপাঙ্গা হও। তাই আঙ্গাপাঙ্গা।
—মানে ন্যাংটো হওয়া বলছ?
অরা মুখ টিপে হেসে বলল, ওই।
—শুধু দেখতেই চেয়েছিল?
—ওরা দু-জনেই তাই তো বলল।
অগ্নি খুব জোরে হেসে উঠে বলল, হাউ সুইট অফ দেম। ব্যাপারটা দারুণ রোমান্টিকও। ভাবা যায়? এ তো দেবশিশু-দেবকন্যার প্লেটোনিক ব্যাপার।
—কী বলছ তুমি। আগুন নিয়ে খেলতে গেছিল।
—হাত তো আর পোড়ায়নি। কী দারুণ স্বর্গীয় একটা ব্যাপার বলো তো! আমাদের সময়ে এমন রোমান্টিসিজম-এর কথা আমরা ভাবতে পর্যন্ত পারতাম না। ওরা এক অন্য প্রজন্মের ছেলেমেয়ে। ওদের দু-জনের প্রতিই আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। ওরা আগুনের মধ্যে বাস করেও পোড়ে না। আমার হাজারিবাগের গুরু একটি শের আওড়াতেন।
—শেরটা কী?
আগ চারোতরফ দহকতি হ্যায়,
জিনা ইস বিচ কিতনা মুশকিল হ্যায়
ফিরভি জাঁবাজ খে লেঁতে হ্যায়
উনকো আহসান হরেক মঞ্জিল হ্যায়।
মানেটা ইংরেজিতেই বলতেন উনি ‘‘The valiant takes delight in danger and face fires and floods with joy. Indeed no difficulty seems too great for them.’’
বলেই বলল, ওদের সংযমটার কথাও ভাব একবার। শরীরকে ওরা মন্দিরের মতো দেখতে যে, পারে এটা একটা কত বড়োব্যাপার একবার ভাবো তো! গ্রে-এ-এ-ট। সকলকে তো এ ঘটনার কথা বলা যাবে না। সব মানুষের মন সমান উদার নয়—বেশিরভাগের-ই অনুদার—। তবে এই ‘‘আঙ্গাপাঙ্গা’’ শব্দটা চালু করে দেব আমি। শব্দটা উচ্চারণ করতেই কেমন রোমাঞ্চ বোধ করছি।
—তুমি অদ্ভুত! চিন্তাতে আমার রাতের ঘুম চলে গেছে। সেদিন তো দশ মিলিগ্রাম ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিলাম আমি। কবে যে, কী বিপদ ঘটে যাবে।
—কোনো বিপদ-ই ঘটবে না। ওরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ম্যাচিয়োরড। ওদের ‘আই-কিউ’ যেমন, আমাদের চেয়ে অনেক বেশি ওদের মানসিকতাও অন্যরকম। ওরাই টেনিস-এর উলিসিসের মতো বলতে পারে, ‘‘I will drink life to the lees’’ সত্যিই গ্রেট ব্যাপার ঘটিয়েছে রুরু আর চুমকি একটা। আমার কাছে এসে কী আঙ্গাপাঙ্গা করছিল চোরের মতো মুখ করে, এখন বুঝছি তোমার কাছে তাড়া খেয়ে—আমি কিছু বুঝতে তো পারিইনি, বোঝার চেষ্টাও করিনি।
অরা বলল যাই এবার কিচেনে। আর গল্প করলে চলবে না। ভাতটা শুধু সবাই আসার পরে করব। ভাত চন্দন-ই করে নিতে পারবে। গোবিন্দভোগ চাল আছে তো বাড়িতে?
—গোবিন্দভোগ নেই, বাসমতি আছে।
—তাহলেই হবে। তবে বাসমতির পোলাওই ভালো হয়। ইলিশ মাছ আর চিতল মাছ বাসমতি দিয়ে খেতে কি ভালো লাগবে? তার চেয়ে এমনি সেদ্ধ চাল দিয়েই ভাত করুক।
—তুমি যা বলবে।
দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পরে যখন অরা কিচেনে গেল তখন অগ্নিও গেল তার সঙ্গে।
—তুমি কী করতে এলে?
—তোমাকে দেখতে।
—পাগলামি না করে বসার ঘরে গিয়ে বোসো।
—এখানেই থাকি। তোমাকে তো দেখতেই পাই না আজকাল। তুমি রান্না করো, আমি মোড়া পেতে বসে গল্প করি।
—ফোনে তো কথা প্রায় রোজ-ই হয়।
—তা হয়। দেখা তো হয় না।
—যতো বুড়ো হচ্ছ তত পাগল হচ্ছ।
—ভাগ্যিস বুড়ো হয়েছি। রুরুর মতো ছেলেমানুষ থাকলে তো আঙ্গাপাঙ্গা দেখার বায়না ধরতাম।
অরা হেসে ফেলে বলল, চন্দন এখুনি এসে ঢুকবে। তুমি যাও তো। গিয়ে বোসো বসার ঘরে।
বসার ঘরে গিয়ে রাশিদ খাঁর একটি সিডি চালিয়ে দিয়ে ইজিচেয়ারে বসল অগ্নি। ভলিউমটা একটু বাড়িয়ে দিল যাতে রান্না করতে করতে কিচেন থেকেও শুনতে পারে অরা। গান শুনতে শুনতে চোখ জুড়ে এল অগ্নির। সকালে ব্রতীনের সঙ্গে বেশি টেনিস খেলার ক্লান্তিতে এবং ভালো লাগায়ও, অরা যে, তার-ই কিচেনে রান্না করছে এই ভাবনাটাই তাকে বড়ো সুখী করে তুলেছিল।
সিডি-টা শেষ হয়ে যাওয়াতে বন্ধ হয়ে গেছিল। অগ্নি ইজিচেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ষাট পেরোলে, নিজের অজানতে কিছু ক্লান্তি এসে জমা হয় মস্তিষ্কে। মানসিকতাতে সে খুব-ই তরুণ, কিন্তু শরীরটা এখন মাঝে মাঝে মনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। যদিও ষাটে এখনও পৌঁছোয়নি।
চোখ খুলে দেখলেন, অরা বসার ঘরে সোফাতে গা এলিয়ে বসে আছে।
—বাজল ক-টা?
চোখ খুলেই বলল, অগ্নি।
—চারটে।
—তাই? দেখেছ কেমন বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। দুপুরে খাওয়ার পরে ঘণ্টা দেড়েক শোয়া এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। আমার ডাক্তার তো বলেছেন, খাওয়ার পরে ফোনেও কথা না বলতে। ড. বিধান রায় কিন্তু বলতেন, দুপুরে খাওয়ার পরে কিছুক্ষণ ঘুমোনো খুব-ই ভালো, বিশেষ করে একটু বয়স হলে।
—ভালোই তো। রিটায়ার যখন করেছ তখন রিটায়ার্ড লাইফ-ই লিড করা উচিত। লাফিয়ে বেড়াবার দরকার-ই বা কী?
—তা ঠিক। আমি এবারে স্নানে যাই। তাড়াহুড়ো আমি করতেও পারি না আজকাল। কোন বাথরুমে যাব? গেস্টরুমের?
অরা বলল।
—কেন? তুমি আমার বাথরুমেই যাও। তোমার স্যুটকেসটা নিয়ে যাও। ঘরের দরজা বন্ধ করে একটু শুয়েও নিতে পারো। তারপর স্নান করে চেঞ্জ করো। আমার ঘরের ড্রেসিং-টেবিলের আয়নাটা বড়ো। তোমার সুবিধে হবে। দাঁড়াও, এ সি-টা চালিয়ে দিই নইলে স্নান করে উঠে তোমার গরম লাগবে।
তারপর বলল, একদিন তোমার স্নান দেখার বড়ো ইচ্ছে ছিল। বিশেষ করে বয়স যখন কম ছিল।
—ইচ্ছেকে দমন করাটাই বড়ো মানুষের লক্ষণ। তোমার মনুষ্যত্বের মাপ তো মস্তবড়ো। এমন সস্তা ইচ্ছে তোমাকে মানায় না।
—জানি! ‘‘মনকে মারো, ভাবনাগুলি মাড়িয়ো না, পাবে না, যা, না পাওয়াটাই সভ্যতা।’’
—কার কবিতা এটি?
—আমার।
—আমি স্নানে চললাম।
বলে, অরা চলে গেল।
অরার মুখে জয়ীর অভিব্যক্তি নয়, অগ্নির মনে হল, এক দারুণ সহমর্মিতার ভাব মাখামাখি হয়ে গেল বৈজয়ন্তীর কথার সঙ্গে। সম্ভবত জীবনে অরা কারওকেই হারাতে চায়নি। সহজ জয়ে ও কখনোই বিশ্বাস করেনি। সকলের সঙ্গে হাতে হাত ধরে বাঁচতে চেয়েছে সে চিরটাকাল। তাই তো অরাকে এত ভালোবাসে অগ্নি।
অগ্নি ভাবছিল, বিস্পতিও অগ্নিকে ‘আগুনবাবু’ বলে ডাকে। বিস্পতিও খুব ভালোবাসে অগ্নিকে তার মতন করে, বৈজয়ন্তীও বাসত, অরাও বাসে—প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা রকম। সব ভালোবাসার রকম-ই বোধ হয় আলাদা আলাদা।
—তাই? তুমি আজকাল কবিতাও লিখছ নাকি?
—আজকাল কেন? কবিতা তো লিখি সেই ছেলেবেলা থেকেই। এমন কোনো শিক্ষিত বাঙালি আছে কি যে, কৈশোরে এবং প্রথমজীবনে কবিতা লেখেনি? আমার সতেরো বছর বয়সে একটি কবিতার বইও বেরিয়েছিল। তার প্রচ্ছদও আমিই এঁকেছিলাম। তার নাম ‘জলজ’।
—কে ছিল? প্রেরণা?
—সে ছিল, পাড়ার-ই একটি মেয়ে। খুব উজ্জ্বল, পুঁইডাঁটার মতো কালচে-সবজে সতেজ ছিপছিপে।
—নাম কী ছিল?
—বৈজয়ন্তী।
—এখনও যোগাযোগ আছে?
—না। সে তো তোমার কাছে হেরে গেছে। তার নাম এখন পরাজিতা। তবে মাস ছয়েক আগে হঠাৎ দেখা হয়েছিল গড়িয়াহাট বাজারে। প্রচন্ড মোটা হয়েছে, খুঁড়িয়ে চলে, ‘পানবাহার’ খায়, সঙ্গে স্কুলে-পড়া নাতি। বলল, আগুনদাদা, এসো নাগো একবার আমরা এগডালিয়াতে থাকি।
—ওনার স্বামী কী করেন?
—রাইটার্স-এর কেরানি ছিল। রিটায়ার করেছে। এখন সিপিএম করে। হোল টাইমার।
চোদ্দো
সন্ধে হয়ে গেছে ঘণ্টাখানেক হল। অরা একটি কচিকলাপাতা রঙা সিল্কের শাড়ি পরেছিল। গলাতে ও কানে সবুজ পান্নার হার ও দুল। একটা বটল-গ্রিন রঙের ব্লাউজ। মুখে হালকা প্রসাধন। অগ্নি ওকে ‘ফিরদৌস’ আতর দিয়েছিল মাখতে। বগলতলিতে, ঘাড়ে, কানের লতিতে ও স্তনসন্ধিতে আতর মেখেছে অরা।
সাড়ে সাতটা নাগাদ অতিথিরা সকলেই এসে গেলেন। ব্রতীন সব সময়ে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে আর নরেশ ফেডেড জিনস ও কলারঅলা গেঞ্জি। রুরু এসেছে চুমকির সঙ্গে। দু-জনেই জিনস পরেছে। রুরু কলারঅলা গেঞ্জি আর চুমকি একটি হালকা গোলাপি টপ—কটন-এর। অপালা কাঞ্জিভরম সিল্কের একটি শাড়ি পরে এসেছে। ঘোষ সাহেব আদ্দির গিলে-করা পাঞ্জাবি ও ধুতি, পায়ে বিদ্যাসাগরি চটি।
রুরু আর চুমকি একটু অপরাধী অপরাধী মুখ করে বসেছিল। অগ্নি তাদের স্বাভাবিক করার জন্যে বলল, রুরু, তুই একটা ব্যাণ্ডের গান দিয়ে আজ সন্ধের ম্যায়ফিল শুরু কর।
—আমি?
—হ্যাঁ তুই-ই।
—তোর পরে ঘোষ সাহেব একটি গান গাইবেন।
—অপালা হেসে বলল, ঘোষ সাহেব? গান গাইবেন?
—হ্যাঁ। ঘোষ সাহেব-ই।
অগ্নি বলল।
ঘোষ সাহেব, মানে, উজ্জ্বল ঘোষ কিন্তু সপ্রতিভভাবে বললেন, গেয়ে দেব। গান গাওয়া আর কী কঠিন কাজ! গান কি তোমাদের অগ্নিদাদাই শুধু গাইতে পারেন?
ঘোষ সাহেবের এই কথাতে ঘরের সকলেই হেসে উঠলেন। ঘোষ সাহেব নিজেও সেই হাসিতে যোগ দিলেন।
অপালার যেন টেনশান হতে শুরু করল, ঘোষ সাহেবের এই ননশালান্ট অ্যাটিট্যুড দেখে।
রুরু বলল, এখুনি মনে পড়ছে না কোনো জুতসই গান। অন্য সকলের গান শুনতে শুনতে মনে পড়ে যাবে। আমি পরে গাইব।
—তাহলে অপালাই একটা গান শোনাও।
তারপর-ই বলল, ঘোষ সাহেবের হাতের গ্লাসের দিকে চেয়ে, কী ঘোষ সাহেব? আপনি তো শুধু জল-ই খাচ্ছেন? এত কম হুইস্কি? কীরে ব্রতীন? তোর ওপরে বার-এর ভার দিলাম আর আমার অতিথিদের জল খাওয়াচ্ছিস?
ঘোষ সাহেব বললেন, না, না, উনি তো বড়োই দিয়েছিলেন, আমিই কমিয়ে নিয়েছি। অনেকগুলোখাইত, তাই ছোটো ছোটো করে খাই।
—অনেকগুলো মানে? ক-টা খান আপনি?
তারপরই অগ্নি বলল, যারা গুনে গুনে হুইস্কি খায় তারা মানুষ খুন করতে পারে, সুদের কারবার করতে পারে।
অগ্নির এই কথাতে সকলেই হেসে উঠলেন।
অগ্নি এবারে বলল, অপালা, তাহলে শুরু হোক একটা অতুলপ্রসাদের গান। তোমাকে বিয়ার দেয়নি বুঝি ব্রতীন? ব্রতীন মিসেস ঘোষকে এক গ্লাস বিয়ার দে। শ্যাণ্ডি নয় কিন্তু প্রপার বিয়ার। উনি অরার মতো বেরসিকা নন।
—বিয়ার খেলেই রসিকা আর না খেলেই বেরসিকা এর কোনো মানে নেই।
অপালা বললেন।
—এবারে গানটা।
ব্রতীন বিয়ার এনে দিলে, বিয়ারের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে শুরু করল অপালা।
অতুলপ্রসাদের একটি ক্বচিৎ-শ্রুত গান গাইল অপালা। ‘‘বিফল সুখ আশে জীবন কি যাবে?’’
গান শেষ হলে সকলেই বা:। বা: করে উঠল।
নরেশ বলল, এবারে ঘোষ সাহেবের টার্ন।
ঘোষ সাহেব বললেন, ‘‘সে ভয়ে কম্পিত নয় আমার হৃদয়, আমি কি ডরাই সখি ভিখারি রাঘবে?’’
তারপর বললেন কিন্তু আমি নিদেনপক্ষে চারটি না খেলে গাইতে পারি না। বন্দুকে গুলি পুরলে না ট্রিগার টানলে গুলি বেরুবে। আমি পরে।
ব্রতীন বলল, অগ্নি, তুই-ই তাহলে একটা গেয়ে দে।
অগ্নি বলল, একটা অতুলপ্রসাদের গান গাই? ফর আ চেঞ্জ। সন্তোষ সেনগুপ্ত, মানে সন্তোষদা খালি গলাতে এই গানটি রেকর্ড করেছিলেন। অনেকদিন আগে শোনা, ভুল-ভাল হতে পারে। তোমরা কেউ গানটি জানলে ক্ষমা-ঘেন্না করে শুনো।
বলেই, ওর হুইস্কির গ্লাসে একটি চুমুক দিয়ে অগ্নি গান ধরল :
আমি বাঁধিনু তোমার তীরে তরণী আমার
একাকী বাহিতে তারে পারি না যে আর... ইত্যাদি।
গান শেষ হলে ঘর বেশ কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতাতে ভরে রইল। শ্রোতাদের প্রত্যেকের মুখেই মুগ্ধতা।
এমন সময় ডোরবেলটা বাজল। অগ্নির বন্ধু নরেশ মিত্র গিয়ে দরজা খুলল। তৃষা এল। মনে হল, বাড়ি গিয়ে চেঞ্জ করে এসেছে। একটা সি-গ্রিন সালোয়ার কামিজ পরে এসেছে ও। হাতে মোবাইল ফোন। সবুজ প্লাস্টিকের বালা, সবুজ রঙা টিপ, সবুজ রঙা চটি।
অরা বললেন, মোবাইলটাকে অফ করে দাও।
—দিচ্ছি মা।
অরার এই কথাতে অন্য যাদের কাছে মোবাইল ছিল তাঁরাও সকলেই অফ করে দিলেন।
অপালা বলল, অরা, এবারে তুই একটা গান শোনা। কতদিন হয়ে গেছে তোর গান শুনি না।
অরা বলল, কতদিন গানটান গাই না। অভ্যেস-ই চলে গেছে।
নরেশ বলল, গান গাওয়া, সাইকেল চড়া আর সাঁতার কাটা একবার শিখলে কেউই আর ভোলে না।
ব্রতীন বলল, আমার ঠাকুমা বলতেন, লজ্জা নারীর ভূষণ, কিন্তু গানের বেলা নয়।
অগ্নি বলল, গাও গাও, একটা গান গাও।
অরা একটু গলা খাঁকরে নিয়ে ধরে দিল একটি রবীন্দ্রসংগীত—
ঘাটে বসে আছি আনমনা, যেতেছে বহিয়া, সুসময়আমি সে হাওয়াতে তরী ভাসাব না, যাহা তোমা পানে নাহি বয়।
ব্রতীন বলল, আহা। কী ভাব আপনার গলাতে।
ঘোষ সাহেব বললেন, ‘‘ভাব ভাব কদমের ফুল।’’
ব্রতীন বলল, এ নামে রাজলক্ষ্মী দেবীর একটি কবিতার সংকলন আছে। দারুণ সুন্দর সব কবিতা।
—রাজলক্ষ্মী দেবীর কবিতা তো বিশেষ দেখতে পাই না। তিনি কোথায় থাকেন? ওঁর কবিতা রমাপদ চৌধুরী আনন্দবাজারের বিশেষ সংখ্যাগুলিতে নিয়মিত ছাপতেন।
—উনি একজন আর্মি অফিসারের স্ত্রী পুণেতে থাকতেন। সম্ভবত সেখানেই সেটল করেছেন।
—ওঁর কবিতা একটা শোনা ব্রতীন। আগে বললে বইটা নিয়ে আসতাম। আমার মুখস্থ থাকে না। তাহলে নরেশ তোর তো মুখস্থ থাকে, আবৃত্তিও ভালোই করিস, তোর প্রিয় কোনো কবির একটি কবিতা শোনা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ অথবা অমিতাভ দাশগুপ্তর।
—দাঁড়া। গানটান হোক আগে তারপর শোনানো যাবে। কলরোল স্তিমিত হয়ে এল।
ইতিমধ্যে ঘোষ সাহেব কালি-পটকা ফাটাবার-ই মতো হঠাৎ করে গান ধরলেন, গেলাসটা সাইড টেবিল-এ ‘টাক’ শব্দ করে নামিয়ে রেখে।
দুটো ঘুঘু পাখি দেখিয়ে আঁখি
জাল ফেলেছে পদ্মার জলে।
দুটো ছাগল এসে হেসে হেসে
খাচ্ছে চুমু বাঘের গালে।।
দু-বার রিপিট করলেন গানটা।
সকলেই গান শুনে হাসতে হাসতে হইহই করে হাততালি দিয়ে উঠলেন।
তারপর অপালা, নরেশ এবং ব্রতীনও একসঙ্গে বলে উঠলেন অগ্নিকে, এবারে অগ্নির একটা টপ্পা শোনা যাক।
চুমকি, রুরু এবং তৃষাও তাল মেলাল সেই অনুরোধে।
সকলেই অনেক কথা বলছেন ও বলছে। অরাই শুধু চুপচাপ। অরা চোখ দিয়ে কথা বলে। তবে সন্ধেটা যে, উপভোগ করছে সেও তা তার চোখমুখ-ই বলে দিচ্ছে। ও যে, ওর চেহারাতে, কথাবার্তায়, মানসিকতাতে সকলের চেয়েই আলাদা, এ কথা কারওকে বলে দিতে হয় না।
—গাইতে কি হবেই?
অগ্নি বলল।
তারপর বলল, নিন্দুকে বলতে পারে যে, নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খাইয়ে গাজোয়ারি করে গান শোনাচ্ছে।
—কেউই যে, তা বলবে না এ-কথা আপনি ভালো করেই জানেন।
অপালা বলল।
অগ্নি একটু চুপ করে থেকে বলল, গাইছি একটি গান। তবে এটি নিধুবাবুর নয়।
—তবে কার?
—শ্রীধর কথকের।
নরেশ বলল, নে শুরু কর।
অগ্নি ধরল, ‘‘যে যাতনা যতনে, মনে মনে আমার মন-ই জানে।’’
এককলি গেয়েই গান থামিয়ে বলল, ‘‘যতন’’ শব্দটির মানে, এখানে ভালোবাসা। বুঝেছ?
ব্রতীন বলল, বুঝলাম। এবারে গাও।
যে যাতনা, যতনে, আমার মনে মনে মন-ই জানে।
পাছে লোকে হাসে শুনে আমি লাজে প্রকাশ করিনে।
প্রথম মিলনাবধি, আমি যেন কত অপরাধী,
সাধি প্রাণপণে,তবু তো সে নাহি তোষে,
আমায় আরও দোষে অকারণে,
যে যাতনা যতনে....
সকলেই অনেকক্ষণ নীরব থেকে গানটা যে, তাদের প্রাণে বেজেছে তাই বোঝালেন।
চন্দন বরফের বাকেটে করে ফ্রিজ থেকে বরফ এনে ফুরিয়ে যাওয়া বাকেটটা নিয়ে যেতে এসেছিল।
অগ্নি বলল, ওরে, চন্দনবাবু বিস্পতিদিদির খাবারটা হটকেস-এ করে দিয়ে দিতে ভুলিস না যেন, অরা মায়েরা যখন বাড়ি যাবেন।
—না বাবু। ভুলব না।
ড্রাইভারকেও ওপরে ডেকে খাইয়ে দিস। ও তো টালিগঞ্জেই গাড়ি রেখে চাবি দিয়ে ওখান থেকেই বাড়ি চলে যাবে।
—হ্যাঁ বাবু।
ঘোষ সাহেব বললেন, ও তো আগেই চলে যেতে পারে। ওঁরা তো আমাদের সঙ্গেও ফিরতে পারেন। আমার তো কালিস গাড়ি। অনেক জায়গা।
—এত তাড়াতাড়ি তো ওর খিদে পাবে না। তা ছাড়া, আমাদের খাওয়া না হলে কি খাবে ও? চন্দনবাবুই দেবেন না খেতে। প্রোটোকল-এর ব্যাপার আছে না!
হাসলেন ঘোষ সাহেব। বললেন, যা বলেন।
অগ্নি বলল, ওর খাওয়া হয়ে গেলে ও যেতেই পারে।
আজ শনিবার। অরার স্কুল ছুটি।
তৃষা আর অরা বসার ঘরে বসেছিলেন।
অরা বললেন, তুই কি কোথাও বেরুবি?
—কোথাও না। কী যে ছাতার চাকরি। কুকুরির মতো খাটায় মা। শনিবার রবিবারেও তো রেহাই নেই। আর যে উইকএণ্ডে কাজ থাকে না, তখন এত ক্লান্ত লাগে যে, মনে হয় পড়ে পড়ে ঘুমোই। কতদিন যে, কোনো ডিসকোতে যাইনি।
—কার সঙ্গে যাবি? হর্ষদ থাকলে না হয় যেতিস।
—হর্ষদ তো আমার বয়ফ্রেণ্ড মা। এমনি বন্ধুবান্ধবী কত আছে আমার। আজকাল আমার কাজের জন্যে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
—তোদের বন্ধুত্বের বয়স তোরাই জানিস। হর্ষদকেও তো ‘তুই’ ‘তুই’ করে বলিস। যাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করা যায় তার সঙ্গে প্রেম কী করে হয় এ তো আমি ভেবে পাই না।
এমন সময়ে ডোরবেল বাজল। তৃষা উঠে দরজা খোলাতে অপালা এল হাতে একটা ক্যাসারোল।
—কী ব্যাপার অপালামাসি?
তোর মেসোমশায়ের এক ভেড়িওয়ালা মক্কেল অনেকখানি ভেটকি মাছ, প্রায় পাঁচ কেজি হবে ফিলে করে পাঠিয়েছিলেন। আমরা মানুষ তো মাত্র দু-জন। তোদের জন্যে কিছু নিয়ে এলাম আর কিছু পাঠিয়ে দিলাম অগ্নিভদার বাড়িতে। সেদিন কত খাওয়ালেন আমাদের। যদিও রান্নাটা তুমিই করেছিলে। সত্যি চেতলের পেটিগুলো যেমন ভালো ছিল, ইলিশ মাছটাও। আর তেমন-ই রেঁধেছিলে তুমি। আমার কর্তার তো আর কোনো খাবার রুচছেই না তারপর থেকে। বলছেন, রান্নাটাও তো ভালো করে শিখতে পারতে—গানটা না হয় অরার মতো ভালোই নাই গাইতে পারলে।
—ছাড়ো তো। বিবাহিত পুরুষেরা সবাই-ই ওইরকম-ই হয়। পরস্ত্রীর সব-ই ভালো দেখে।
—আর অগ্নিভর মতো অবিবাহিত পুরুষেরা?
অপালার রসিকতাতে হেসে ফেলল অরা। বলল, তাদের তো পরস্ত্রীর ব্যাপার নেই— নিজের স্ত্রী যাদের নেই, তাদের পক্ষে তুলনা করার কোনো প্রয়োজন-ই নেই। তাদের কাছে আমরা সকলেই তুলনাহীনা।
—মা মেয়েতে কী গল্প হচ্ছিল?
—আসলে তৃষা বসে আছে হর্ষদের ফোনের জন্যে।
—ও হ্যাঁ তাইতো! ও তো প্রতি শনিবারেই এই সময়ে ফোন করে!
—হ্যাঁ। এমনিতে তো ইন্টারনেটেই কথাবার্তা হয়। তবু সপ্তাহে একবার করে ফোন করে।
তৃষা ক্যাসারোলটা কিচেনে বৃহস্পতিকে দিয়ে এল। বলল, বৃহস্পতিদিকে বলে এসেছি—খালি করে তোমারটা দিয়ে দেবে।
—ওমা। তার কী দরকার? ওতেই থাকুক। খাবার সময়ে গরম গরম বের করে খাবি। আমি তো কিউ ইয়র্ক থেকে নিয়ে আসিনি। ক্যাসারোলটা কাল সকালে দিলেই হবে।
—তা অগ্নিকে যে পাঠালে, সে কি তোমাকে ধন্যবাদ দিল ফোন করে?
সঙ্গে দুই লাইনের চিঠি দিয়েও পাঠিয়েছিলাম। আমার ড্রাইভার বলল, সাহেব বাড়ি নেই। চন্দনের কাছে দিয়ে এসেছে।
—তোমার ফোন নাম্বার জানে কি ও?
—জানে তো! মাঝে মাঝে ফোনও তো করে। আমিও করি কখনো-কখনো একা লাগলে।
—বা:। খুব-ই ভালো করো। মানুষটাও যে, একা তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই।
অরা বলল।
তৃষা বলল, মা বলছিল, আমরা তুই-তোকারি করতে করতে তাদের-ই সঙ্গে প্রেম কী করে করি?
—সত্যিই। আমারও একথা ভেবে অবাক লাগে। ‘তুই’ বললে কি প্রেম থাকে?
—তোমাদের সময়ের প্রেম তো আর এখন নেই। আমরা তোমাদের মতো রোমান্টিক নই। রোমান্স করার সময়ও আমাদের নেই। জীবনটাই কেরিয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কেরিয়ারে আর জীবনে কোনো তফাত নেই, সে কেরিয়ার যাই হোক না কেন। বিয়ে যেখানে হচ্ছে, যদিও বিয়ে ব্যাপারটা আর কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে, সেখানে সেটা একটা প্রয়োজন বলেই হচ্ছে। রোমান্সের কোনো জায়গা নেই।
—হাই সোসাইটিতে হতে পারে। আমার মনে হয় না এই কথা সকলের বেলাতে সত্যি। তোরা তো প্রেম করিস না, ভালো গান শুনিস না, ভালো সাহিত্য পড়িস না—কিন্তু এসব করে এমন অগণ্য মেয়ে আছে, মধ্যবিত্ত সমাজে যারা আজও পুরোপুরি ‘বাঙালি’। সবকিছু বাঙালিআনা তারাই বাঁচিয়ে রেখেছে। তারা সবাই তাদের প্রেমিককে ‘তুই’ বলে না, দু-একজন বললেও বলতে পারে।
তৃষা বলল, জানো মা, সেদিন আমার এক কলিগের বিয়ে হল, অন্য এক কলিগের সঙ্গে। দু-জনেই তুমুল ‘তুই-তোকারি’ করতে করতেই বিয়ের ডিসিশনটা নিয়ে ফেলল। মেয়েটির নাম ঝিনুক। তার বড়োমামা তাকে একটা লাল গোলাপ ফুল আঁকা টিনের তোরঙ্গ দিয়েছেন, উপহার হিসেবে, অন্য অনেক উপহারের সঙ্গে। সেই কালো ট্রাঙ্কের ওপরে সাদা রং দিয়ে বড়ো বড়ো করে লিখিয়ে দিয়েছেন ‘‘সুখে শান্তিতে ঘর করো, তুই-তোকারি বন্ধ করো।’’
অপালা আর অরা দু-জনেই জোরে হেসে উঠল তৃষার কথা শুনে।
অপালা বলল, দারুণ তো। গল্প করতে হবে সবাইকে।
অরা বলল, ঘোষ সাহেবকেও নিয়ে এলি না কেন, আড্ডা মারা যেত। তবে হুইস্কি তো আমার কাছে নেই।
—হুইস্কি না হয় সে নিজেই নিয়ে আসত কিন্তু নীচে একবার উঁকি মেরে দ্যাখো-না গাড়ির লাইন। বলেছি না, শুক্রবার রাত ছাড়া একদিন রাতেও ছুটি নেই। ছেলেমেয়ে নেই, তেমন প্রয়োজনও নেই, তবু কাজ, কাজ করেই মানুষটা গেল।
—কাজ কি শুধু টাকার জন্যেই করে কেউ অপালামাসি? সফল মানুষদের কাছে ‘কাজ’ একটা নেশা। এই যে, এত মানুষ তাঁর ওপরে নির্ভর করছে, তিনি নইলে চলবে না— এইকথা বারে বারে বলছে, এর একটা নেশা নেই? সফল একবার হতে পারলে টাকা দৌড়ে এসে তাঁর পকেটে ঢোকে। তখন ‘‘না’’ করার উপায় থাকে না।
অপালা বললেন, আর শুধুই কী টাকা? মান সম্মান, নানারকম উপহার, শ্রদ্ধা এসবের একটা ইনটক্সিকেটিং এফেক্ট হয়, সব সফল মানুষের ওপরেই। কাজ-ই তাঁদের কাছে এক নম্বর প্রায়োরিটি হয়ে যায়। এ-কথা ওঁরা সকলেই মানেন যে, ‘work comes first in a person's life’ সে কাজ ওকালতিই হোক, চাকরিই হোক, লেখালেখি বা অভিনয়ই হোক। কাজের মতো বড়ো ‘নেশা’ আর নেই। কথায় বলে-না ‘workholic’ অ্যালকোহলের চেয়েও বড়োনেশা কাজের নেশা। মক্কেলরা ভালো ভালো হুইস্কিই কি কম এনে দেয়? আমার জন্যে গয়না, পারফিউম, শাড়ি, বাংলাদেশ থেকে ইলিশ মাছ, লইট্যা, শুঁটকি, ঢাকাই শাড়ি। এমন ভাব করেন যেন, তাঁরা সব দিয়ে ধন্য হচ্ছেন।
অরা বলল, তবু আমার মনে হয় এই ভাবনাটা ভুল তৃষা।
—কেন মা? ভুল বলছ কেন?
—প্রত্যেক মানুষের-ই জীবিকা একটা থাকেই। কিন্তু সব জীবিকাই জীবনের-ই জন্যে। জীবিকার দ্বারা উপার্জন করে, সেই উপার্জিত অর্থ সুন্দর, সুস্থ, আনন্দময় জীবনের জন্যে ব্যয় করা উচিত। জীবনে যদি একটুও সময় না থাকে, মানে সুন্দর জীবনযাপনের জন্যে, জীবিকাই যদি জীবনকে গ্রাস করে নেয় তাহলে তো বেঁচে থাকাই অর্থহীন। তোর অগ্নিকাকা কিন্তু এ কথাটা বোঝেন। তোর বাবাও বুঝতেন। অগ্নির রিটায়ারমেন্টের পরে মুম্বই-র একটি অত্যন্ত নামি প্রাইভেট সেক্টর কোম্পানি ওকে তিনগুণ মাইনা আর অঢেল পার্কস দিয়ে রিটেইনার নিয়োগ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ও রিফিউজ করে দিয়ে কলকাতা চলে এল।
—হয়তো সে তোমাদের-ই জন্যে।
অপালা বলল।
তৃষা বলল, হয়তো আমাদের-ই জন্যে। কিন্তু ওঁর এক বিশেষ ফিলজফি অফ লাইফ ছিল। হি ডিডনট বিলঙ টু দ্যান রান অফ দ্যা মিলস।
—অপালা বলল, জানো তোমাদের ঘোষ সাহেব যে, এত সাকসেসফুল, ওঁর এত নাম, যশ, টাকা। কিন্তু মানুষটা টোটালি ফ্রাস্ট্রেটেড।
অরা বলল, জানো অপালা, শুধু ব্যর্থতা থেকেই ফ্রাস্ট্রেশান আসে না, সাফল্য থেকেও আসে। আমি এমন অনেককে দেখেছি, এ-জীবনে যাঁদের ফ্রাস্ট্রেশানের মূলে তাঁদের প্রচন্ড সাফল্য।
—ব্যাপারটা খুব-ই কম্পলিকেটেড মা। তবে একথা হয়তো ঠিক যে, প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কিছু অপূর্ণ চাওয়া থাকা প্রয়োজন। সবকিছু পেয়ে গেলেই কি মানুষ তৃপ্ত হয়?
তৃষা বলল।
—সে কথা ঠিক। নইলে রবীন্দ্রনাথের মতো অমন সফল মানুষ অত-অল্প বয়সে লিখতে পারতেন— ‘‘কিছুই তো হলো না সেই সব, সেই সব, সেই অশ্রু সেই হাহাকার রব।’’ এই গানটা অগ্নিকাকার গলাতে শুনেছ অপালামাসি কখনো? না শুনলে একবার শুনো। চোখের জল ধরে রাখা যায় না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সবাই।
অপালা বলল, রুরুকে দেখছি না।
—সে ফেস্ট-এ গেছে। সেখানে তাদের ব্যাণ্ডের গান আছে। ফিরতে রাত হবে।
তৃষা বলল।
—কী যে, করবে আমার ছেলে, কে জানে? ওকে নিয়ে আমার বড়োচিন্তা হয়।
—কেন? পড়াশুনোতে তো ও ব্রিলিয়ান্ট।
—পড়াশুনাই জীবনের ভালোত্বর একমাত্র ক্ষেত্র নয় অপালা। তোমার যে, ছেলেমেয়ে নেই একদিক দিয়ে তুমি বেঁচে গেছ। মা-বাবার জীবনে নিজেদের আনন্দ বলে আর কিছু থাকে না। ছেলেমেয়ের ভালোত্ব-খারাপত্ব তাদের সুখ-দুঃখ-ই, নিজেদের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে। এ এক বড়ো পরনির্ভর অবস্থা। মুখে বলে ঠিক বোঝাতে পারব না।
ল্যাণ্ডলাইনের ফোনটা বাজল।
তৃষা উঠে ধরল।
বলল হাই! অগ্নিকাকা! হ্যাঁ আছেন। নাও কথা বলো।
অপালার দিকে কর্ডলেসটা এগিয়ে দিয়ে বলল, অগ্নিকাকা তোমাকে চাইছেন।
অপালার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে গেল। বলল, সামান্য একটু ফিশফ্রাই তারজন্য আবার এতকথা।
উত্তরে অগ্নি কী বলল, তা তো শোনা গেল না তবে অপালা ব্লাশ করল।
অরা কৌতুকের সঙ্গে কিন্তু গভীর মনোযোগের সঙ্গেও অপালার মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ করছিল।
কিছুক্ষণ কথা বলার পরে অপালা বলল, ঠিক আছে। পরে কথা বলব। আপনি কি অরার সঙ্গে কথা বলবেন? না? ঠিক আছে। গুড ডে, বলে, কর্ডলেসটা ক্র্যাডল-এ নামিয়ে রাখল অপালা।
এমন সময়ে তৃষার মোবাইলটা বাজল।
তৃষার মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
বলল, মা হর্ষদ। পুণে থেকে।
তারপর অপালাকে বলল, এক্সকিউজ মি, অপালামাসি। আমি একটু আমার ঘরে যাচ্ছি।
অপালা ওর চলে যাওয়া দেখল। স্বগতোক্তির মতো বলল, প্রেমে পড়লে মানুষ, মানুষী সবাই খুব সুন্দর হয়ে যায়-না?
—কী করে জানব বলো। একটু আগেই বলছিল-না তৃষা যে, ওদের প্রেম নেই।
—বাজে কথা।
অপালা বলল, তারপর বলল ‘‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে।’’
এমন সময়ে ফোনটা আবার বাজল।
অরা উঠে গিয়ে রিসিভারটাই তুলল। বলল, বলছি।
অপালা বুঝল যে, সম্ভবত অগ্নির ফোন। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ফ্রাইগুলো খেয়ো। কড়া করে ভেজেছে, মাস্টার্ড দিয়ে খেতে ভালো লাগবে।
কানে ফোন লাগানো অরা মুখে কথা না বলে, নীরবে মাথা হেলাল।
দেখ রুরু ম্যাকলাস্কি’জ নোজ।
সামনের সিটে বসা গাড়ির জানলা দিয়ে দেখল অগ্নি রুরুকে। ড্রাইভার গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল অগ্নির নির্দেশে।
এ গাড়িতে রুরু, অগ্নি, নরেশ ও ব্রতীন আছে। অগ্নি ড্রাইভারের পাশে। আর ঘোষ সাহেবের গাড়িতে অরা, আর স্মিতা। চুমকিরও আসার কথা ছিল কিন্তু ওর মায়ের জ্বর তাই আসতে পারেনি ও। সামনের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়াতে পেছনের গাড়িও দাঁড়াল। ওরা সকলেই নামল গাড়ি থেকে। ঘোষ সাহেব তাঁর গাড়ির ড্রাইভারের পাশে বসেছেন। সবাই মিলে দেখল ম্যাকলাস্কি’জ নোজ। ছবিও তুলল। নরেশ এবং স্মিতা। অপালা ক্যামেরা এনেছে কিন্তু সেটা এখনও স্যুটকেস থেকে বের হয়নি। থিতু হয়ে বের করবে।
হাজারিবাগেই যাবে ভেবেছিল কিন্তু ব্রতীনের এক বন্ধুর বাড়ি থাকাতে ম্যাকলাস্কিগঞ্জের-ই দিকে বেরিয়ে পড়ল ওরা। খুব ভোরে বেরিয়েছিল ওরা, কলকাতা থেকে সন্ধের আগে আগেই পৌঁছে যাবে বলে। এখান থেকে আর দশ-পনেরো মিনিট লাগবে পৌঁছোতে। গাড়ি নিয়ে না এলেও হত। এখন শক্তিপুঞ্জ ট্রেন হয়ে গেছে। দুপুরে কলকাতা ছেড়ে রাত দেড়টাতে ম্যাকলাক্সি পৌঁছোয়। আগে বলে রাখলে ট্যাক্সিও আসে স্টেশনে। অনেক গেস্ট হাউস হয়েছে এখন থাকার মতো।
ব্রতীন বলল, ‘একটু উষ্ণতার জন্যে’ উপন্যাস পড়েই সব মানুষে আসেন এখানে।
অপালা বলল, ব্যারিস্টার ও লেখক সুকুমার বোস এবং তাঁর অল্পবয়সি পাঠিকা ছুটির জন্যে এ জায়গাটা রোমান্টিক ট্যুরিস্টদের টেনে আনে।
অরা ফিস ফিস করে অপালাকে বলেছিল, হাজারিবাগের সঙ্গে এই জায়গাটার অনেক-ই মিল আছে তবে অমিলও কম নেই।
—মন খারাপ করছিস কেন? অগ্নিদা তো বলেছেন, হাজারিবাগেও নিয়ে যাবেন আমাদের। তোদের বিক্রি হয়ে যাওয়া বাড়ি দেখাবেন। এখন তো কোডারমা স্টেশনে নেমে বড়হি হয়ে তিলাইয়া ড্যাম-এর পাশ দিয়ে হাজারিবাগে যাওয়া খুব-ই সহজ বলেই শুনেছি।
অরা বলল, আমরা তখন বগোদার হয়ে, সারিয়া হয়ে হাজারিবাগ রোড স্টেশনে নেমে আসতাম এবং যেতাম। তখন ঝুমরি তিলাইয়ার নাম শুনতাম বটে, তবে তিলাইয়া ড্যামের কাজ সবে আরম্ভ হয়েছে হয়তো তখন। আমরা খুব ছোটো ছিলাম। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন দামোদরের বাৎসরিক বান ঠেকাতে তিলাইয়া, পাঞ্চেত, মাইথন এইসব বাঁধ বানান ভারত সরকার আমেরিকান টেনিসি ভ্যালি কর্পোরেশনকে মডেল করে। প্রত্যেক ড্যামের সঙ্গেই ‘হাইডাল’ প্রোজেক্ট ছিল। প্রকান্ড প্রকান্ড জলাধার হওয়াতে প্রতিটি জায়গাতেই অনেক গ্রামকে সরিয়ে দিতে হয়েছিল। তারা সব গিয়ে অন্যত্র নতুন গ্রামের পত্তন করেছিল। বিরাট সব ক্রিয়াকান্ড।
তারপর বলল, তপন সিংহ ‘পঞ্চতপা’, নামের একটি ছবি করেছিলেন-না, এইরকম কোনো একটি বাঁধের প্রস্তুতির পটভূমিতে? মা ছবিটি দেখে এসে খুব উত্তেজিত হয়ে আমাদের গল্প করেছিলেন। তখন আমরা নীচু ক্লাসে পড়ি। ছবি দেখার অনুমতি ছিল না।
ব্রতীন পেছন থেকে ড্রাইভারকে বলল, একটু আস্তে করো ভাই। এই চড়াইটা থেকে নেমেই ডান দিকে একটা গেট পাবে—গেটটা একটু ভেতরে ঢোকানো। সেই গেটে হর্ন দিতে হবে।
সেই গেটে গাড়ি পৌঁছোলে ব্রতীন ডান দিক থেকে নেমে গেটের কাছে গিয়ে বলল, তালা খুলেই রেখেছে। তার মানে কেয়ারটেকার খবরটা পেয়েছে।
—তিনি এত তাড়াতাড়ি খবর পেলেন?
—জানি না, ইন্দ্রজিৎ হয়তো মিস্টার ক্যামেরনকে ফোন করে দিয়েছিল।
বাড়ির ভেতরে দুটো গাড়িই ঢুকে এল। অগ্নি বলল, রুরু, যা তো, গেটটা বন্ধ করে দিয়ে আয়। নইলে গোরু কী ছাগল ঢুকে বাগান নষ্ট করে দেবে। যদিও এখানে গোরু, ছাগল কম-ই আছে।
রুরু বলল, তারা সব এখন শহরে ভিড় করেছে।
গেট বন্ধ করে রুরু এর-ই মধ্যে বাড়িটা সার্ভে করে এসে বলল, বাড়িটা একটা পাহাড়ের চুড়োতে। পেছন দিকে পাহাড়টা অনেকখানি নেমে গিয়ে একটা উপত্যকাতে মিশেছে।
ব্রতীন বলল উপত্যকাতে শুনেছি মিস্টার ক্যামেরনের স্টার্ড-ফার্ম ছিল—ঘোড়া ব্রিডিং করাতেন উনি। সেই ফার্ম এখন বন্ধ করে দিয়ে, হোটেল খুলেছেন উনি স্টেশনের কাছে। ওখানেই আগে মিসেস কার্নি একটি হোটেল চালাতেন, একটু ভেতর দিকে। দু-কামরার হোটেল।
—তুই এত জানলি কী করে?
অগ্নি বলল।
—আমি যে, গত ত্রিশ বছরে বহুবার এসেছি এখানে। এখানের নাড়িনক্ষত্র সব আমার জানা। এখানে আমিও একটা ছোটোকটেজ কিনব ভেবেছিলাম। তখন জলের দর ছিল। এখন দাম বেড়ে গেছে।
—চল আমরা তিন-জনে মিলে একটা কিনি।
নরেশ বলল।
—আমাদের কারোর-ই তো উত্তরাধিকারী নেই। কে দেখবে আমাদের পরে?
—তার চেয়ে ঘোষ সাহেব-ই কিনে ফেলুন একটা।
—আমার কি উত্তরাধিকারী আছে?
ঘোষ সাহেব বললেন।
রুরু বলল, তা নিয়ে চিন্তা করছ কেন অগ্নিকাকু। আমাকে দিয়ে দিয়ো।
সকলেই রুরুর কথাতে হেসে উঠলেন।
অরা বলল, বড়োদের কথার মধ্যে কথা বোলো না রুরু। দিন দিন তোমার ম্যানারস গোল্লায় যাচ্ছে। ওকে একটু শাসন করতে পারিস না তৃষা?
—আরে খারাপ-ই বা কী বলেছে রুরু?
ঘোষ সাহেবসুদ্ধু ওঁরা সকলেই বলে উঠলেন একসঙ্গে।
ততক্ষণে বাড়ির কেয়ারটেকার মুখার্জিবাবু এসে নমস্কার করে দাঁড়ালেন। আদিবাসী পরিচারিকা জীরুয়াও এসে নমস্কার করল। একজন আদিবাসী কাজের লোক, জানি। ওর পুরোনাম জানি ওঁরাও।
ব্রতীন আর অগ্নি মুখার্জিবাবুকে আড়ালে ডেকে নিয়ে, তাঁর হাতে দু-হাজার টাকা দিয়ে বললেন, এটা রাখুন। ফুরিয়ে গেলে বলবেন। রাতে কী খাওয়াবেন আমাদের?
—যা বলবেন স্যার।
—আজ তো জোগাড়, যন্ত্র করতে সময় লাগবে। আমরাও সারাদিন জার্নি করে ক্লান্ত। আজ মুগের ডাল বানিয়ে চালে-ডালে খিচুড়ি করে দিতে বলুন। সঙ্গে কড়কড়ে করে আলুভাজা আর ডিম ভাজা। শুকনো লঙ্কাও ভাজতে বলবেন। কাল মুরগি ও ডিম নিয়ে আসবেন বেশি করে। এখানে হাট কবে? ভুলে গেছি।
—হাট কালকে।
—তবে তো আমরা কাল সকলেই হাটে যাব। তবে হাট লাগতে লাগতে তো দুপুর হয়ে যাবে।
—কাল তাহলে লাঞ্চে এগ-কারি, ডাল আর একটা সবজি ও স্যালাড করুন। ডিমের কারিতে বেশি করে কারি পাতা দিতে বলবেন। কিচেনের পাশেই তো গাছ।
—তা ঠিক। পাঁঠার মাংস আর শুয়োরের মাংস দুই-ই আনব কালকে হাট থেকে। আপনার কাজের মেয়েটি কি পর্ক-এর ভিন্দালু রাঁধতে পারবে?
—ভিন্দালু পারবে না হয়তো। এমনিই ওরা শুয়োরের মাংস যেমন করে খায়, ঝালটাল দিয়ে রাঁধে, তেমন করে রাঁধতে পারবে।
ব্রতীন বলল, ভিন্দালু না হয় আমিই রাঁধব।
অগ্নি বলল, এখানে ভালো মহুয়া পাওয়া যাবে মুখার্জিবাবু?
মুখার্জিবাবুর হয়ে ব্রতীন বলল, হ্যাঁ। হ্যাঁ।
—তাহলে মহুয়া আনবেন তো আজ-ই তিনবোতল। আমি ডক্টর করে নেব।
ব্রতীন বলল।
—ঠিক আছে।
—ডক্টর করবি কী করে?
অগ্নি বলল, আরে, বাড়ির মালিক ইন্দ্রজিৎবাবুকে একজন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান সাহেব শিখিয়ে গেছিলেন।
—কী করে করতে হয়?
একটা তাওয়াতে লবঙ্গ আর চিনি লাল করে ভেজে, বোতলের মধ্যে ফেলে দিয়ে খুবভালো করে ঝাঁকিয়ে তারপর ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে অন্য বোতলে ঢালতে হয়। তখন তার রং হয়ে যায় হুইস্কির মতো। আর খেতেও চমৎকার। যে জানে না, তাকে বিলিতি জিনিস বলে খাইয়ে দিলে সে মহা আহ্লাদ করে খাবে।
মুখার্জিবাবু বললেন, আমি তাহলে বেরুই একটু দোকানের দিকে। আপনারা চান করবেন তো? জল তোলার জন্যে আলাদা লোক আছে। কুয়ো থেকে জল এনে বাথরুমে দিয়ে দেবে। দু-টি বাথরুম আছে। গরম জল লাগলেও বলবেন দিয়ে দেবে আলাদা বালতিতে। বাইরে কাঠের উনুনে জল গরম হচ্ছে। সকালে আর রাতে দু-বেলাতেই হয়।
—ঠিক আছে।
নরেশ বলল, বড়ো বাথরুমটা মেয়েদের জন্যে ছেড়ে দেওয়া যাক। সঙ্গে একটি বড়ো ড্রেসিং-রুমও আছে। আর অন্যটা আমরা ব্যবহার করি।
—গিজার নেই বাথরুমে?
তৃষা এসে বলল।
—তা নেই কিন্তু গরম জলের কোনো অসুবিধে হবে না। মায়েদেরও বোলো চান করার আগে, বললেই বাথরুমের পেছনের দরজা দিয়ে এনে দেবে।
—পেছনটাতে যা জঙ্গল। বাঘ ভাল্লুক ঢুকে পড়বে না তো!
অগ্নি বলল, নারে মা। এই ব্রতীনকাকা বাড়ির মালিকের সঙ্গে কতবার এসে থেকে গেছে এখানে। জায়গাটা অবশ্যই জঙ্গুলে। একসময়ে হয়তো সব জানোয়ার-ই ছিল। কিন্তু এখন শুয়োর আর ক-টি ভাল্লুক ছাড়া কিছু নেই। শেয়াল আছে অবশ্য। কী বল ব্রতীন?
—ঠিক-ই বলেছিস।
ওরা সকালে চানটান করে, সঙ্গে করে আনা চা, কুরকুরে, পোট্যাটো চিপস ইত্যাদি খেয়ে ফ্রেশ হয়ে বারান্দার সামনে চেয়ার পেতে বসেছে। ব্রতীন বলল সন্ধের পরেই মনোরম হয়ে যায় আবহাওয়া এখানে। কতরকম পাখি ডাকছিল শেষবিকেলে লক্ষ করেছিস? মনে হচ্ছিল বাড়িতে যেন পাখিদের ডাকাত-ই পড়েছে। ম্যাকলাস্কিগঞ্জে দু-একজনের বাড়িতে টেবিল পাখা আছে অথবা পেডেস্টাল ফ্যান—সিলিং ফ্যান প্রায় কারও বাড়িতেই নেই। এপ্রিলের মাঝামাঝি অবধি রাতে গায়ে চাদর দিয়ে শুতে হয়। বাইরে বসলেও পাতলা সোয়েটার বা চাদর লাগে। টাক থাকলে, টুপি। কখনোই ফ্যান লাগে না। বৃষ্টি নেমে গেলে আবার চাদরও চড়াতে হয়।
—কী কী দেখার জায়গা আছে এখানে?
অপালা শুধোল।
—এখানে সব-ই তো দেখার জায়গা। চামা থেকে বাঁ-দিকে ঘোরার পরেই তো জঙ্গলে জঙ্গলে পথ। দু-পাশে পাহাড়। দেখলেন-না সব জায়গাই পিকনিক করার জায়গা। তবে বিশেষ পিকনিক স্পট হচ্ছে চাট্টি নদী। ভারি সুন্দর জায়গাটা। তবে বর্ষাকালে আরও সুন্দর হয়।
বলেই, রুরুর দিকে চেয়ে ব্রতীন বলল, জানো তো রুরু। চাট্টি নদীতে পিকনিক করতে যাওয়া, এক সাহেবের পেছন খুবলে নিয়েছিল এক ভাল্লুক। শখ করে বানানো নতুন ট্রাউজারের দেড় গিরে কাপড় খামচে নিয়েছিল। তোমার ট্রাউজারটাও তো দেখছি নতুন। চাট্টি নদীতে গেলে সাবধানে থেকো তুমি।
সকলেই হেসে উঠল ব্রতীনের কথা শুনে।
তারপর ব্রতীন বলল, আর একটি সুন্দর জায়গা ম্যাকলাস্কিগঞ্জ স্টেশন। কোনো উঁচু প্ল্যাটফর্ম নেই। গ্রাউণ্ড লেভেল-এর প্ল্যাটফর্ম। উলটোদিকে শালজঙ্গল। জানি না এখনও আগের মতো আছে কি না!
—শেষ কবে এসেছিলি তুই?
অগ্নি জিজ্ঞেস করল।
—তা বছর তিনেক তো হবেই।
অরা বলল, ‘‘একটু উষ্ণতার জন্যে’’-তে ওই স্টেশনের কথাও পড়েছি।
—নয়নতারার প্রেমিক শৈলেন যেখানে আত্মহত্যা করেছিল?
অপালা বলল।
হুঁ। অরা বলল। আর শুধু কি তাই-ই? সেই প্ল্যাটফর্মে তো মিস্টার কাব্রালের মুন্ডুহীন ভূত রাতের বেলা টুপি হাতে পায়চারি করে।
তৃষা বলল, উরি বাবা।
ব্রতীন বলল, গভীর শুনশান রাতে তো স্টেশনে যাব না আমরা তাই কাব্রাল সাহেবের ভূত হয়তো দেখাতে পারব না কিন্তু মিসেস কার্নির চায়ের দোকানটা এখনও আছে। এদিকে বারকাকানা আর ওদিকে ডালটনগঞ্জ থেকে যে, দু-টি প্যাসেঞ্জার সকালে বিকেলে যাওয়া-আসা করে এদিকে গোমিয়া, পত্রাতু, রায় এসব স্টেশন আর ওদিকের ডালটনগঞ্জ, ছিপাদোহর, লাতেহার, মহুয়ামিলন, ওইসব স্টেশন থেকে। তাদের যাত্রীরা নেমে গরম গরম চা আর নিমকি-শিঙাড়া খায় আজও, মিসেস কার্নির দোকান থেকে। মিসেস কার্নি যদিও দেহ রেখেছেন অনেক-ই দিন হল। তাঁর এক কর্মচারী মাজিদ এখন চালায় দোকানটি। তার চুলেও নিশ্চয়ই পাক ধরেছে এতদিনে।
ঘোষ সাহেব বললেন, যাই বলুন আর তাই বলুন মশায়, জায়গাটা এখনও একটা, আউট-অফ-দ্যা-ওয়ার্ল্ড প্লেস রয়ে গেছে কোনো ফেয়ারি টেলস-এর বইয়ে বর্ণিত জায়গার মতো। অথচ রাঁচি থেকে মাত্র পঁয়ত্রিশ মাইল দূরে।
ব্রতীন বলল, রাঁচি এখন রাজধানী হয়ে গেছে নতুন স্টেট ঝাড়খন্ড-এর। রাঁচিতে খুব-ই কনজেসশান হওয়াতে ম্যাকলাস্কির কাছেই নতুন রাজধানী তৈরি হচ্ছে। তাই এই জায়গাটা আর বেশিদিন এমন নির্জন থাকবে না। জমি বাড়ির দামও বেড়ে গেছে প্রচুর। আগে সব বাংলো বাড়ি ছিল, বহুবিঘা জায়গার ওপরে। এবারে হয়তো পাকা বাড়ি হতে শুরু হবে। মালটিস্টোরিড হবে। সর্বনাশ হবে ‘একটু উষ্ণতার জন্যে’র ম্যাকলাস্কিগঞ্জের।
অগ্নি বলল, শুনেছি সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরীর ছেলেবেলার কিছুটা কেটেছিল এখানে। তখন স্টেশনটির নাম ছিল আণ্ডাহল্ট। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘ভারতবর্ষ’ এই আণ্ডাহল্ট স্টেশন নিয়েই লেখা নাকি। যুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ টমিদের ব্রেকফাস্ট খাওয়ার জন্যে ট্রুপস ট্রেইন এখানে দাঁড়াত তাই মুখে মুখে স্টেশনের নাম হয়ে গেছিল আণ্ডাহল্ট।
ব্রতীন বলল, সেই সময়ে, মানে চল্লিশের দশকে, ফুটফুটে অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান মেয়েরা গোরুর গাড়ি চালিয়ে যেত, খেতে কাজ করত গান গাইতে গাইতে। এখানে চার্চ ছিল, ক্লাব ছিল। এখনও আছে ক্লাব, যদিও ছাগল চরে বেড়ায়। তবে চার্চ এখনও আছে। দিশি পাদরিরা আছেন সেখানে। তবে ক্রিশ্চান এখন আর খুব বেশি নেই হয়তো।
নরেশ বলল, কাল হাট আছে। মেয়েরা কি হাটে যেতে চান? আমরা পাঁঠা আর শুয়োরের মাংস কিনব। তরি-তরকারি যা পাব। মোরগা-আণ্ডা।
—থাকা তো হবে মোটে আড়াইদিন। আপনাদের ফিরিস্তি শুনে মনে হচ্ছে মাসখানেক-ই থাকা হবে বুঝি।
অরা বলল।
তারপর বলল, যেকোনো দেহাতি জায়গাতে হাট একটা অবশ্য দ্রষ্টব্য জায়গা। স্পেশালি টু হ্যাভ আ ফিল অফ দ্যা প্লেস। আমরা অবশ্যই যাব। হাজারিবাগের আশপাশের কত হাটে যেতাম ছেলেবেলাতে।
ব্রতীন বলল, একমাস থাকতেও অসুবিধে নেই। ইন্দ্রজিৎবাবু তো চান-ই যে, তার বাড়িতে মানুষে যান। গিয়ে থাকুন। তাঁর ছবির মতো একটি বাড়ি আছে শান্তিনিকেতনেও, অর্কিডে ভরা দারুণ বাগান। উনি প্রতি উইক-এণ্ডে সেখানেই যান। এখানে আজকাল আসতে প্রায় পারেন-ই না। আমরা একমাস ইচ্ছে করলে থাকতেই পারি। ওঁর কোনো অসুবিধে নেই।
নরেশ বলল, অসুবিধে আমাদেরও কারও নেই শুধু ঘোষ সাহেবের ছাড়া। তার তো মিনিটে হাজার। বহত-ই লস হয়ে যাবে।
থাকলে, তৃষা বলল, আমার নতুন চাকরিটাও যাবে।
রুরু বলল, কলেজে আমি ফেইল করব। মায়েরও তো স্কুল আছে। হেড মিস্ট্রেস না থাকলে স্কুল কি চলবে?
অগ্নি অপলাকে বলল, তাহলে দেখা যাচ্ছে আমরা তিনজন রিটায়ার্ড বন্ধু আর আপনিই কেবল মুক্ত পুরুষ ও নারী। আর সকলের-ই বন্ধন আছে।
অপালা বললেন, আমার থাকতে আপত্তি নেই আপনাদের সঙ্গে।
ঘোষ সাহেব বললেন, আমারও তোমাকে ছেড়ে যেতে আপত্তি নেই। আমার কাজ তো সব করে কেষ্টা আর রাম, আর ড্রাইভার কালু সিং। আমি, অরা, তৃষা আর রুরু আমার গাড়ি নিয়ে ফিরে যাব। অগ্নিবাবু আর তাঁর বন্ধুরা থেকে যাবেন ওঁর গাড়ি নিয়ে। তোমরা থেকেই যাও না। বন্ধন-মুক্তি সবসময়েই ভালো, বিরহ যত দীর্ঘ হয়, ততই তো মিলন মধুরতর হয়। তাই না?
কাট....অরা বলল।
নীচু গলাতে বলল, তৃষা আর রুরুকে। তোমরা যাও-না, একটু হেঁটে এসো-না বাগানে, কতরকম বড়ো বড়ো গাছ আছে, দ্যাখো তো, কতগুলো গাছের নাম জান তোমরা?
ওরা দু-জনে উঠে গেল।
অগ্নি চাপাস্বরে বলল, এটা তোমার বাড়াবাড়ি অরা। তুমি একটু বাড়াবাড়ি রকমের কনসার্ভেটিভ। ওরা কি ছোটো আছে? তা ছাড়া আমাদের চেয়ে ওরা বেশি ছাড়া কম ম্যাচিয়োরড নয়। ওদের এমন করে ট্রিট করলে ওরা ইনসালটেড ফিল করতে পারে। দিস ইজ নট ডান।
অরা চুপ করে রইল। কোনো জবাব দিল না।
তারপরে অগ্নি নরেশকে বলল, তুই তো একটা দড়কচ্চা মেরে যাওয়া ব্যাচেলার। তুই মিলন-বিরহর কী জানিস রে?
সকলেই ওই কথাতে হেসে উঠল। একটু পরে অরা বলল, তোমার কথার জের টেনেই বলছি, জীবনে সব জিনিসের-ই সময় আছে। ওয়াল্ট হুইটম্যানের সেই কবিতাটি আছে-না?
—কোন কবিতার কথা বলছ অরা?
অগ্নি বলল।
—আরে! ওয়াল্ট হুইটম্যানের, Leaves of Grass-এ আছে না কবিতাটি?
—বলো না কোন কবিতা?
All Truths Wait, In All Things,
They Neither Hastern Their Own Delivery Nor Resist It,
They Do Not Need The Obsteric Forceps Of The Surgeon
তোমার উদ্ধৃত এই কবিতাটি তো আমার-ই বক্তব্যর পক্ষে গেল।
—যে-যেমন মানে করবে।
অরা বলল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে মুখার্জিবাবু বাজার নিয়ে ফিরে এলেন। হাতে টর্চ আর থলে। উনি অপরাধীর গলাতে বললেন, ওই জিনিসটা পাওয়া গেল না স্যার। কাল অবশ্যই পাওয়া যাবে।
—কোন জিনিসের কথা বলছেন উনি?
অপালা বলল।
—কাল পেলে বলব।
—আপনাকে টেস্ট করতে দেব।
ব্রতীন বলল।
—জিনিসটা কী?
—মহুয়া।
—ইস। ভদ্রলোকে মহুয়া খায়!
মুখ বিকৃত করে বলল অপালা।
—আমরা তো ভদ্রলোক নই। মানে, অগ্নি, আমি আর নরেশ।
—অনেক ভদ্রলোক-ই খায়। তার ওপরে আমি এমন করে Doctor করে দেব না।
—ভদ্রলোকেরা খেলেও খেতে পারে। কোনো ভদ্রমহিলা কখনোই খান না।
ঘোষ সাহেব বললেন, দেখলেন তো বুর্জোয়া অ্যাঢিট্যুড। সব ব্যাপারে একটা সুপিরিয়োরিটি কমপ্লেক্স।
—রান্না ক-টা নাগাদ হয়ে যাবে মুখার্জিবাবু?
ব্রতীন জিজ্ঞেস করল।
—আমরা কি একটু সাহায্য করব গিয়ে?
অরা বলল।
—না, না, আজকে তো খিচুড়ি, ডিমভাজা আর আলুভাজা হচ্ছে। কোনো দরকার নেই।
—শুকনো লঙ্কা ভাজতে বলতে ভুলে যাবেন না যেন, মুখুজ্যেমশায়।
—আজ্ঞে না।
মুখার্জিবাবু চলে গেলে ব্রতীন বলল, কাল দুপুরেও আণ্ডাকারি, একটা ডাল আর একটা সবজি। কারিপাতা দিতে বলেছি ডিমের ডালনাতে বেশি করে। কিচেনের পাশেই দুটো গাছ আছে।
—কারিপাতা গাছ? কী দারুণ! চলো অপালা, দেখে আসি।
—উত্তেজনার কোনো কারণ নেই। কাল সকালে দেখলেই চলবে। এখানে আরও কত কী দেখার আছে। খয়ের গাছ, কুঁচফল-এর গাছ।
—কুঁচফলটা কী ফল অগ্নিকাকা! আঁশফলের মতো?
তৃষা বলল।
—দুর বোকা মেয়ে। কুঁচফল আগেকার দিনের স্যাকরারা সোনা ওজন করার সময়ে ব্যবহার করতেন, সোনা ওজন করতেন পেতলের হালকা ছোট্ট দাঁড়িপাল্লাতে। উজ্জ্বল, মসৃণ লাল আর কালো রঙের হয় ছোটো ছোটো ফলগুলো। শীতকালে হয়। এ বাড়িতেই আছে গাছ। শীতকাল হলে ফলও দেখতে পেতে।
নরেশ বলল, একটা কথা এখন-ই পরিষ্কার করে বলে দেওয়া ভালো।
—কী কথা?
—মহিলারা এখানে কিচেনে যাবেন না। কিচেন আপনাদের জন্যে আউট-অফ-বাউণ্ডস। অগ্নির ভাষাতে, ‘দড়কচ্চা মারা ব্যাচেলাররাই’ যা রান্না-বান্না করার তা করব। ঘোষ সাহেব সংসারী মানুষ। তা ছাড়া ডাকসাইটে ব্যারিস্টার। তাঁকেও রান্নাঘরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। আপনাদের কোনো অসুবিধে হলে তখন-ই বলবেন।
ঘোষ সাহেবও বললেন, ‘সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়’। সাতটা তো বাজতে চলল। দড়কচ্চা-মারা ব্যাচেলরেরা গ্লাস-টাস-এর বন্দোবস্ত করুন। ‘শিভাস রিগ্যাল’-এর বোতল আছে চারটে আমার ব্যাগে।
—কোন ব্যাগে?
—ওই কালো ব্যাগটাতে। স্মিরনক ভদকাও আছে। একটি ভ্লাডিভারও আছে। বিয়ারও এনেছি। ফস্টার বিয়ার। বরফ হবে তো ফ্রিজে?
—এখানে ফ্রিজ নেই। গরমে তো বিশেষ কেউ আসেন না এখানে। আর শীতটা এমন-ই জব্বর পড়ে যে, তখন বরফের দরকার-ই হয় না। এখনও কুয়োর জল বরফের মতোই ঠাণ্ডা।
—যা করার তাড়াতাড়ি করুন মশায়। ন-টার সময়ে খিচুড়ি রেডি হয়ে যাবে। ফ্যুট জ্যুস, পেপসি, কেক সব আছে। মেয়েরা কে কী খাবেন?
ব্রতীন অরাকে বলল, আপনি কী খাবেন?
—কিছু না। একগ্লাস জল খাব শুধু।
নরেশ বাড়ির ভেতরে গেল সব বন্দোবস্ত করতে।
ব্রতীন গলা তুলে ডাকল তৃষা, রুরু তোমরা সব কোথায় গেলে? আরে, জঙ্গুলে জায়গা। টর্চ না নিয়ে যেয়ো না। সাপ বিছেতে কামড়ে দেবে।
—সাপ আছে নাকি এখানে?
অরা আতঙ্কিত গলাতে বলল।
—সাপ নেই মানে? সাপ, কাঁকড়া বিছে, কী নেই? তবে এখনও তো তেমন গরম পড়েনি। গরমের সময়েই প্রকোপ বাড়ে।
—আপনারা কিছু মনে করবেন না ঘোষদা, আমি পা-টা তুলে বসছি।
বলে, একটা খালি চেয়ার টেনে নিয়ে তার ওপরে পা দু-টি তুলে বসল অরা।
ঘোষ সাহেব বললেন, আহা। এতদিন শুধু অরার মুখটিই দেখেছি। কী সুন্দর পায়ের পাতা দু-টি অরার। সাপ বা বিছের তো কামড়াতে ইচ্ছে করতেই পারে, আমার কিন্তু চুমু খেতে ইচ্ছে করছে। সত্যি। পায়ের পাতা থেকে মাথার সিঁথি পর্যন্ত এমন সুন্দরী, কলকাতা শহরে অরার মতো আর আছেন কি না জানা নেই।
—আপনিও ফ্লার্ট করেন তা তো জানতাম না। আপনি আর ক-জন মহিলা দেখলেন জীবনে। মোটা মোটা মক্কেল আর টেকো-টেকো জজসাহেবদের দেখেই তো, জীবন কাটল আপনার।
অরা বলল।
সকলেই সে কথাতে হেসে উঠল। এমনকী ঘোষ সাহেব নিজেও।
নরেশ বলল, অরা দেবীর মাথার সিঁথি, মুখ আর পায়ের পাতা ছাড়া আর কিছু কি দেখেছেন আপনি?
অরা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, বড়ো বাজে রসিকতা করেন আপনারা।
নরেশ বলল, আমরা মানুষগুলোই তো থার্ড গ্রেড—তবে অগ্নি আর ঘোষ সাহেব আমাদের মধ্যে পড়েন না।
একটু পরে রুরু আর তৃষা কাছে এল।
—কী কী গাছ দেখলে?
—অন্ধকারে কি গাছ চেনা যায়? বেঁটে গাছ, লম্বা গাছ, সরু গাছ, মোটা গাছ এইসব-ই দেখলাম।
রুরু বলল, আমরা একটা করে কোক খাই অগ্নিকাকা? আর একটু কুরকুরে।
অরা বলল, ওসব বেশি খেয়ো না। ন-টাতে ডিনার সার্ভড হবে। খিদে নষ্ট হয়ে যাবে।
নরেশ, জানি ওঁরাওকে সঙ্গে করে গ্লাস, জলের বোতল এবং হুইস্কির বোতলও নিয়ে এল। ভদকাও।
তারপর বলল, সোডা লাগবে কারও? আমি নিয়ে এসেছি দু-ক্রেট।
—এখানে যেন সোডা পাওয়া যেত না?
ব্রতীন বলল।
—এখানে পাওয়া যাবে না? গাড়িতে জায়গা ছিল। ভাবলাম, যদি দরকার হয়। স্প্রাইট আর লিমকাও এনেছি। যদি কেউ ভদকা বা জিন-এর সঙ্গে খায়। আমার কাছে জিন আছে।
—টনিক এনেছিস নাকি?
ব্রতীন বলল।
—এ কি মুম্বই নাকি যে, পানের দোকানেও টনিক পাওয়া যাবে। বড়ো বড়ো ক্লাব ও হোটেল ছাড়া কলকাতাতে তো টনিক পাওয়াই যায় না।
—অপালা, আপনাকে কি, স্প্রাইট দিয়ে একটা জিন বানিয়ে দেব? অথবা ভদকা?
—নিতে পারি যদি অরা আর অগ্নিবাবু গান শোনান। এমন পরিবেশ। গান শোনার এমন জায়গা কি আর পাওয়া যাবে?
ব্রতীন বলল, তা তো শুনতেই হবে। এই আড়াই দিন শুধু গান-ই শুনব।
রুরু বলল, ‘গান ভালোবেসে গান’।
—বা:! ভেরি গুড। রুরু কোকটা নিয়ে এসে তুই বাংলা ব্যাণ্ডের ‘গান ভালোবেসে গান’টা দিয়েই শুরু কর আজকের সান্ধ্য আসর। গিটারটাও আনতে ভুলিস না।
—আচ্ছা, তৃষা গান গায় না কেন?
ঘোষ সাহেব বললেন।
—তৃষার গলাটা চাপা। কিন্তু গান ও খুব সুরেই গায় রুরু অথবা হর্ষদের-ই মতো। কিন্তু গাইতে একেবারেই চায় না। গানটা ভালোবাসার জিনিস, প্রাণের জিনিস, জোর করে কি কারওকে দিয়ে গান গাওয়ানো যায়? তাও এতবড়ো মেয়েকে?
—তা অবশ্য ঠিক।
ঘোষ সাহেব বললেন।
নরেশ বলল, ‘‘দুটো ঘুঘু পাখি দেখিয়ে আঁখির মতো’’ আরও কিছু গান কি আছে আপনার স্টকে, ঘোষ সাহেব?
—না মশাই। ওই এক এবং অদ্বিতীয়ম।
—তাহলে ওই গানটাই আর একবার শুনব।
সকলেই বলে উঠল, তাই সই।
যার যার গ্লাসে চুমুক দেওয়া হলে ব্রতীন বলল, তুই-ই শুরু কর অগ্নি।
—দাঁড়া দাঁড়া। একটা খাই। নইলে আমার গলা সুরে বলে না। আর দেখছিস তো অরা আছে। ও অসুরদের একেবারেই সহ্য করতে পারে না।
তারপর বলল, ফর আ চেঞ্জ এবং অরার হাজারিবাগের অনুষঙ্গ মনে করে ছোট্ট একটা ব্রহ্মসংগীত গাইব প্রথমে?
—ছোট্ট কেন? বড়ো গাইতেই বা ক্ষতি কী?
—যে, গানটি গাইব সেটি দিল্লির সুধীরচন্দ মশায় কিছু ব্রহ্মসংগীত আমাকে ক্যাসেট করে পাঠিয়েছিলেন, সেই ক্যাসেট থেকেই তোলা।
অপালা বলল, ইনি কোন সুধীর চন্দ? শান্তিনিকেতনে ছিলেন কি? অরূপ গুহঠাকুরতাদের ব্যাচ।
—হ্যাঁ। তাই তো। আপনি চিনলেন কী করে!
—শান্তিনিকেতনেই দেখেছি। তখন আমি পাঠভবনে পড়তাম। একেবারে পুঁটকি মেয়ে ছিলাম।
—তাই?
অবাক হয়ে বলল অগ্নি।
তারপর বলল, সুধীরদা তো দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে নিজের বাড়িতে একটা গানের স্কুলও চালান।
অপালা বলল, শুনেছি উনি আপনাদের-ই মতো। ব্যাচেলর।
—সুধীরদা কোনো বিবাহিতা ছাত্রীকেই তুমি বলে ডাকেন না। সে কিশোরী হলেও ‘আপনি’ বলেন।
—কেন?
নরেশ বলল।
—হয়তো কোনো ‘‘তুমি-সম্বোহিত’’ বিবাহিতা মহিলা তাঁকে কখনো দাগা দিয়ে থাকবেন।
ব্রতীন বলল।
—সব জিনিসের-ই কেন হয় না। আর মাত্রাতিরিক্ত কৌতূহলও অশিষ্টতা।
—তাই না অপালা?
অরা বলল।
—সে তো বটেই।
—এবারে গানটা ধর অগ্নি।
অগ্নি গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে ধরল :
তাঁরে দূর জানি ভ্রম সংসার সংকটে
আছে বিভু তোমা হতে তোমারও নিকটে।
কেন তুমি নিরন্তর থাকো তা হতে অন্তর
ভাবো সেই পরাৎপর নিত্য অকপটে।
ভ্রম, সংসার সংকটে।
অরা বলল, বা:। এ গানটি এতবছরে কখনোই তো শোনাওনি।
—কখন শোনাব? তুলেইছি তো গতমাসে।
সকলেই বলল, ভারি সুন্দর।
নরেশ বলল, পুরো পরিবেশটা ব্রাহ্মসমাজ ব্রাহ্মসমাজ হয়ে উঠল যেন।
—উদ্ভট যত কথা নরেশের।
ব্রতীন বলল। তুই ব্রাহ্মসমাজে গেছিস কখনো?
—যাইনি? ভবানীপুরের গাঁজা পার্ক-এর কাছে টাবলুর মৃত্যুতে যে-উপাসনা হয়েছিল তাতে যাইনি? তুইও তো গেছিলি।
—আমি তো বহুবার-ই গেছি। তবে একদিন কোনো মৃতর স্মরণসভাতে গিয়েই তুই স্পেশালিস্ট হয়ে গেলি? ক-টি ব্রাহ্মসমাজ আছে তা জানিস?
—ব্রাহ্মসমাজের বিল্ডিং বলছিস?
—না রে, বিল্ডিং নয়। সমাজের কথা বলছি।
—না।
—সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ এবং নববিধান সমাজ।
—সেই জমায়েতে ব্রাহ্ম কেউ-ই ছিলেন না।
—একমাত্র অরা ছাড়া। তাও তো তার বিয়ে হয়েছিল হিন্দুর সঙ্গেই। কিন্তু এই অনধিকারীদের আলোচনাতে যে, একেবারেই নীরব ছিল।
নরেশ বলল, অতসব ডিটেইলস তো জানি না ভাই, তবে একথা বলব যে, ভবানীপুরের গাঁজা পার্কের কাছের বাড়িটির অবস্থা অতীব শোচনীয়। ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে এতবড়ো বড়ো এবং বড়োলোক মানুষ ছিলেন এবং এখনও আছেন অথচ এই বাড়িটির একটু সংস্কার সাধন কি করা যায় না? মনে হয়, ভেঙে পড়ে যাবে ক-দিন বাদেই।
তা বটে। ঘোষ সাহেব বললেন। ডা. বিধান রায় থেকে সিদ্ধার্থশংকর রায় থেকে সত্যজিৎ রায়, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, মানে অপর্ণা সেন-এর বাবা, ব্রাহ্ম, কে না ছিলেন বা আছেন?
অগ্নি বলল, এ প্রসঙ্গ থাক। এটা আমাদের এক্তিয়ার বহির্ভূত-ও বটে। অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক।
ঘোষ সাহেব বললেন, তা ঠিক।
অরা বলল, যে-গানটা গাইলে ওটি কার লেখা?
—ওটি কালীনাথ রায়ের লেখা। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি গানও আমি জানি।
—গেয়ে শোনান-না।
ঘোষ সাহেব বললেন।
—পরে হবে। এখন গাইলে ওভারডোজ হয়ে যাবে।
—তবে অন্য একটি গান শোনাতে পারি। অসাধারণ গান একটি।
—কী গান?
‘‘কেন ভোলো মনে করো তাঁরে যে সৃজন পালন করেন এ সংসারে।’’ —উপনিষদের একটি বিখ্যাত শ্লোক ‘‘জবনো অপানিপাদো’’ ইত্যাদির বাংলা তর্জমা করে নিমাইচরণ মিত্র মশায় সুরারোপও করেছিলেন।
অগ্নি তারপর বলল, আমরা কেবল রবীন্দ্রনাথকেই জানি। কিন্তু ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য বহুমানুষ যে, সাহিত্যে, গানে, ছবি আঁকাতে অসাধারণ প্রতিভাবান ছিলেন, সে-খবর আমরা খুব কম জনেই রাখি। বহুবছর আগে, এক গ্রীষ্মসন্ধ্যাতে দিল্লির ‘মিরাণ্ডা’ হাউসের লন-এ একটি অনুষ্ঠান করেছিলেন সুধীর চন্দ মশায়, ‘‘Other Tagores’’-দের গান নিয়ে। তখন আমি ছেলেমানুষ। মায়ের সঙ্গে শুনতে গেছিলাম। এখনও সেই অনুষ্ঠানের স্মৃতি মনে জ্বলজ্বল করে। অসাধারণ!
ব্রতীন বলল, অপালাও শান্তিনিকেতনে পড়তেন জানলাম। আপনারাও কি ব্রাহ্ম?
অপালা মাথা নোয়াল, বলল, অরা তো জানে। ব্রাহ্ম হওয়াটা কি অপরাধের?
ব্রতীন লজ্জা পেয়ে বলল, না, না, ছি: ছি: অপরাধ কেন? গর্বের-ই। হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা ক্রিম তাঁরাই তো ব্রাহ্মধর্মের পত্তন করেছিলেন একসময়ে। তাঁরাই হিন্দু সমাজের মাথা ছিলেন।
অগ্নি বলল, রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে কিন্তু লিখেছিলেন: ‘‘হিন্দু ধর্ম যদি মৃত হইত তাহা হইলে ব্রাহ্মধর্মকে প্রসবই করিতে পারিত না।’’
ঘোষ সাহেব বললেন বা:। সবাই ভালো। কিন্তু ব্রাহ্ম মেয়েরা কি তাদের সমাজে ভালো ছেলে পায় না বিয়ে করার মতো? পেলেও, অনেক সময়েই পিসতুতো, মাসতুতো ভাইবোনকে বিয়ে করেন। তবে আমার নিজের অনেক ব্রাহ্ম বন্ধুবান্ধব আছে। তাদের একটি বিশেষ ক্যারেস্টারিস্টিক লক্ষ করেছি।
—কী?
—তাঁরা স্ত্রী ও বাড়ির ডাক্তারকে গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণ যেমন নারায়ণ শিলাকে মান্য করেন, ঠিক তেমন করেই মান্য করেন।
—কেন?
—কেন জানি না।
—তবে এ নিয়ে একটি গবেষণা হওয়া দরকার। গবেষণা হলে, ডক্টরেটও কেউ হয়ে যেতে পারেন। আমেরিকাতে তো বাঁদরের গা কেন চুলকোয়? অথবা বকবকম বা পায়রা কেন করে এ নিয়েও ডক্টরেট হচ্ছে মানুষে। কামাচকাটকান, হুঁহুঁকান ইত্যাদি কত ভাষা নিয়ে গবেষণা করেও ডক্টরেট হচ্ছেন কতজনে। কেউ কেউ আবার বিলম্বিত ডক্টরেটও। শিবঠাকুরের দেশ বটে একটা।
—তাঁরা সব দু-কান-কাট্টান মানুষ।
সকলে ঘোষ সাহেবের কথাতে হেসে উঠলেন।
—এবারে এইসব পেটিফগিং ছেড়ে গানে ফেরা যাক। এসব তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানডেন ব্যাপার নিয়ে আলোচনা তো কলকাতাতে বসেও যেকোনো সময়েই করা যেতে পারে।
ব্রতীন বলল।
—তা ঠিক। এবারে কে গাইবে অপালা না অরা?
অগ্নি বলল।
অপালা বলল, অরা গাইবে। স্প্রাইট দিয়ে জিনটা বেশ উপভোগ করছি আমি। দারুণ পরিবেশ, না? ঝুপড়ি ঝুপড়ি গাছ থেকে কালো কালো বেড়ালের মতো ছায়াগুলো লাফিয়ে পড়েছে বাংলোর আলো-আঁধারি মাখা হাতার মধ্যে। সত্যিই মনে হচ্ছে, এখানে কাব্রাল সাহেব তাঁর মুন্ডুহীন ধড় নিয়ে টুপিটি হাতে করে যখন তখন দেখা দিলেও দিতে পারেন।
তৃষা আপত্তি করে বলল, অপালামাসি, ভালো হচ্ছে না কিন্তু, প্লিজ এসব টপিক বন্ধ করো।
—এই ইন্টারেস্টিং কাব্রাল সাহেবটি কে বটেন?
নরেশ বলল।
—এই কাব্রাল সাহেবের কথা ‘একটু উষ্ণতার জন্যে’ উপন্যাসেও আছে।
প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গিয়ে ব্রতীন বলল, ইন্দ্রজিৎবাবুর কাছ থেকেই শুনেছিলাম যে, কাব্রাল সাহেবের বাড়িটিই সাহেবের মাইনিং এঞ্জিনিয়র জামাইয়ের কাছ থেকে কেনেন, সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ। আর তাঁর কাছ থেকে বছর পনেরো পরে কেনেন অপর্ণা সেন। পরে অপর্ণা সেন-এর কাছ থেকে কেনেন গুনেন মিত্র মশায়, লাইসি স্কুলের মালিক সোমনাথ মিত্রর বাবা। অপর্ণা সেন-এর মালিকানাধীন থাকার সময়ে ও বাড়িতে রাইফেলের গুলিতে একজনের মৃত্যুও ঘটে।
—খুন?
—তা বলতে পারব না। তবে অপর্ণার তৎকালীন স্বামী মুকুল শর্মার রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার বাবার কারবাইন রাইফেলের গুলিতেই নাকি মরে একজন।
—মুকুল শর্মা মানে কঙ্কনা সেন শর্মার বাবা?
—ইয়েস। অপর্ণার সেকেণ্ড হাজব্যাণ্ড।
—আর কল্যাণ রায় তা হলে কে?
—উনি থার্ড হাজব্যাণ্ড।
—অ।
—মানে? ঠিক কী ঘটেছিল?
নরেশ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
—আমার তা জানার বা গোয়েন্দাগিরি করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। অ্যাকসিডেন্ট-ই হবে হয়তো। তবে যা শুনেছি ইন্দ্রজিৎবাবুর কাছে তাই বললাম। আমরা এসেছি আড়াইদিনের জন্যে বেড়াতে। এসব নিয়ে গসিপ করতে তো আসিনি।
—তা অবশ্য ঠিক।
—মিসেস বাসু, এবারে গানটা হোক।
বলেই, খালি হওয়া গ্লাসটা নরেশের দিকে এগিয়ে দিলেন ঘোষ সাহেব।
অরা ধরল,
অবেলায় যদি এসেছো আমার মনে দিনের বিদায়ক্ষণে।গেয়োনা, গেয়োনা, চঞ্চল গান ক্লান্ত এ সমীরণে....
অপালা বলে উঠল, সাধু! সাধু!
তার গলাতে উচ্ছ্বাসের একটু আধিক্য লক্ষ করা গেল। যা সচরাচর দেখা যায় না।
বলেই, অপালা তার গ্লাসটাও নরেশের দিকে বাড়িয়ে দিল।
বোঝা গেল যে, এই আরণ্যক সন্ধেটি খুব-ই এনজয় করছে অপালা।
নরেশ ওর গ্লাস জিন আর স্প্রাইটে ভরে দিয়ে বলল, ভালো লাগছে না মিসেস ঘোষ?
ঘোষ সাহেব নরেশের দিকে চাইলেন একবার। চাউনিতে কোনো অসূয়া ছিল না। মজা ছিল।
অপালা বলল, ব্যাপারটা কী জানেন?
—কী?
নরেশ একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
—Ambience! আপনি এক কাপকফি বাড়িতে খান আর এককাপ কফি খান ‘তাজ বেঙ্গল’-এর স্যুইমিং পুল-এর পাশের কফি শপ-এ বসে, দেখবেন, আকাশ-পাতাল তফাত। সেইরকমই এই যে, গান শোনাল অরা আমাদের রাতে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে, এই পরিবেশে, এরসঙ্গে তুলনা করা যায় এরকম খুব কম জায়গার-ই। এক একটা গান, কোনো এক বিশেষ পরিবেশে, প্রতিবেশে শুনলে, তা আজীবন মনে গেঁথে যায়। রবীন্দ্রনাথের তরুণ সমালোচকেরা তাঁদের মূর্খামি এবং অকারণ ঔদ্ধত্যে যাই বলুন না কেন, রবীন্দ্রনাথ শিক্ষিত বাঙালির মনে চিরদিন-ই বেঁচে থাকবেন, বিশেষ করে তাঁর গানে। যাঁরা এই সুধারস থেকে বঞ্চিত হলেন, তাঁদের অনুকম্পা করা ছাড়া আর কীইবা করা যায়।
—বাবা:! খুব কঠিন কঠিন শব্দের বাংলা বলছ তো তুমি আজ। হলটা কী? কী জিন দিয়েছিলেন মশাই আমার স্ত্রীকে?
নরেশ বলল, Booths Gin।
—অ!
নরেশ বলল, আপনি একেবারেই ঠিক বলেছেন অপালা। রবীন্দ্রনাথকে যাঁরা অস্বীকার করেন, তাঁদের বিসমিল্লাতেই কিছু গলদ অবশ্যই থেকে গেছে বলতে হবে। সে কথা তাঁরা স্বীকার করুন আর নাই-ই করুন।
—এরপরে কে গাইবে?
অপালা বলল, গা-না একটা গান, তৃষা।
—আমি পারি না।
—যা পারিস তাই গা-না।
অরা বললেন।
—তাহলে একটা গান পুণেতে হর্ষদকে শুনিয়েছিলাম, সেটাই গাই, সবসুদ্ধু জানিই তো, সাড়ে তিনটে গান।
—আগেকার দিনে প্রত্যেক বাঙালি মেয়েকে বিয়ের আগে অন্তত পাঁচটি পুরো গান শিখতে হবে। তা কি জানো? তা তার গলাতে গান থাকুক আর নাই থাকুক। মেয়ে দেখতে যাঁরা আসতেন তাঁদের সামনে তো গাইতে হতই এবং সেই পাঁচটিই গাইতে হত বাসরেও।
ব্রতীন বলল।
—কী টরচার বলুন তো!
ঘোষ সাহেব বললেন।
—নিশ্চয়ই। মেয়েটির ওপরে তো অবশ্যই।
নরেশ বলল।
—আমি শ্রোতাদের কথা বলছি।
সকলে হেসে উঠলেন ঘোষ সাহেবের এই কথাতে।
—গাও তৃষা।
অপালা বলল।
তৃষা ধরল,
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে
তখন ছুটি ফুরিয়ে গেছে কখন অন্যমনে।
সকালে ঘুম থেকে আগে পরে উঠে কেউ চা খেয়ে, কেউ না খেয়েই হাঁটতে বেরিয়ে পড়েছিল বাড়িটির বাঁ দিকের পথে নামার দিকে নয়তো ডান দিকের পথে। ব্রতীন, নরেশ এবং অপালা একটি দলে, ঘোষ সাহেব, রুরু ও তৃষা অন্য দলে এবং অগ্নি আর অরা অন্যদলে। পলাশ এখনও ফুটছে। গাছে গাছে নতুন পাতা এসেছে। কোথাও বা পাতার রং গাঢ় সবুজ হয়ে গেছে, কোথাও এখনও কচিকলাপাতা সবুজ। ক্বচিৎ কুসুমের পাতাতে হালকা লাল আভা এসেছে। মাছের রক্ত-ধোওয়া জলের মতো লাল।
বাড়ির সামনেই পথের ওপরে একটা ছোট্ট পুকুর মতো আছে। এখন জল সামান্যই আছে। তারপাশে একটি বড়োগাছ বাজ পড়ে মরে গেছে। কী গাছ কে জানে?
ঘোষ সাহেব বললেন, তৃষা ও রুরুকে, এই গাছে বসে টিপনিস নামের এক সাহেব একটা চিতাবাঘ মেরেছিলেন। চিতাটা একটা বাছুর ধরেছিল। প্রথম রাতে কিছুটা খেয়ে পরদিন সন্ধেবেলা যখন বাকিটা খেতে এসেছিল তখন-ই মারেন টিপনিস সাহেব। বাঘটা খুব বুড়ো হয়ে গেছিল।
—তাই?
—হ্যাঁ। না হলে আর বলছি কী?
—কতদিন আগে?
—এই বছর পনেরো আগে।
—আপনি তো আঙ্কল এই প্রথমবার এলেন এখানে। আপনি জানলেন কী করে?
রুরু জেরা করল ঘোষ সাহেবকে।
ঘোষ সাহেব হেসে বললেন, সারমাইজ। বুঝলে না! অনুমানের মধ্যেই সত্য লুকিয়ে থাকে। এমন তো হতেই পারত, নাকি বলো?
ওরা হেসে উঠল।
তারপর বললেন, আসলে ব্রতীনবাবুর কাছে শুনেছি।
নি:সন্তান ঘোষ সাহেব অরার ছেলেমেয়েদের খুব-ই ভালোবাসেন। এমনকী হর্ষদকেও মাঝে মাঝে ফোন করেন পুণেতে, সময় পেলে। সন্তানহীন মায়ের দুঃখ নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে সব ভাষার-ই সাহিত্যে কিন্তু সন্তানহীন পুরুষের দুঃখ নিয়ে খুব কম-ই লেখা হয়েছে। সময়ে ছেলেমেয়ে হলে তৃষা ও রুরুর মতো ছেলেমেয়ে ওঁরও থাকতে পারত। বিদেশ থেকে মক্কেলরা নানারকম চকোলেট এবং অন্যান্য উপহার নিয়ে আসেন ওঁর জন্যে। সঙ্গে সঙ্গে উনি ওদের তা চালান করে দেন। তৃষার আঠেরো বছরের জন্মদিনে অগ্নি ওকে একটি মোবাইল ফোন দিয়েছিল। আর কুড়ি বছরের জন্মদিনে একটা কম্পিউটার। রুরুর সতেরো বছরের জন্মদিনে রুরুকেও একটি কম্পিউটার উপহার দিয়েছেন ঘোষ সাহেব। যে দান বা উপহারে কোনো ‘স্বার্থ’ নেই তার দাম-ই আলাদা। অগ্নিকে উনি মনে মনে ঈর্ষা করেন। কারণ উনি জানেন যে, তৃষা ও রুরু অগ্নিকে বাবার মতোই দেখে। উনি তো ওদের চেনেন যোধপুর পার্কে, ওরা ওঁর প্রতিবেশী হওয়ার পর-ই। মাত্র পাঁচ-ছ বছর হল। কিন্তু এই অল্পসময়েই উনি ওদের মায়ায় জড়িয়ে পড়েছেন।
—এগুলো কী ফল আঙ্কল?
রুরু বলল, একটা সাত-আট ফিট উঁছু গাছকে দেখিয়ে।
—এ গাছ চিনিস না রে বোকা। এর নাম আমলকী। ওই দেখ, ফলও ধরেছে। পাড়, পেড়ে খা। আমলকী খেয়ে জল খেলে মুখটা যে, কী মিষ্টি লাগে তা বলার নয়। আমাদের মামাবাড়ির বাগানে অনেক বড়ো বড়ো গাছ ছিল। জলপাই গাছ ছিল।
—যে জলপাই দিয়ে টক হয়, আচার হয়?
তৃষা বলল।
রুরু বলল। হ্যাঁরে।
ঘোষ সাহেব ভাবছিলেন, এরা কম্পিউটারে বসে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে পৃথিবীর সব খবর নখদর্পণে রেখেছে কিন্তু জলপাই বা আমলকী গাছ চেনে না। কে জানে! হয়তো ধানগাছও চেনে না। পৃথিবীটাই বদলে গেছে এখন। বড়ো অল্পকদিনেই বদলে গেল। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের শৈশব নেই, কৈশোর নেই, ঘোষ সাহেবরা যাই জেনেছিলেন, ধীরেসুস্থে জেনেছিলেন, এত অল্পবয়সে অতকিছু জানতেন না তাঁরা। তাঁদের অতিসাধারণ সব ব্যাপারে কৌতূহল ছিল অপরিসীম, বিস্ময়বোধ ছিল, অতিসহজেই তাঁরা ‘খুশি’ হতেন।
—পেড়েছিস? দাঁড়া! আমি রুমাল দিয়ে ভালো করে মুছে দিই। ধুলো পড়ে থাকবে আমলকীর ওপরে। নে, খা এবারে।
ঘোষ সাহেব বললেন।
তারপর বললেন, তুই যে-প্যান্টটা পরেছিস সেটা ভারি অদ্ভুত দেখতে। না ফুল না হাফ। আমাদের ছেলেবেলাতে কলকাতা পুলিশের ট্রাফিক কনস্টেবলরা এমন প্যান্টুলুন পরত।
—প্যান্টুলুন কী? বলুন প্যান্টালুন। ‘প্যান্টালুন’-এর দোকান দেখেননি?
—কী আর দেখলাম বল? দেখলাম তো শুধুই হাইকোর্ট। তা এই পেন্টুলুনের নাম কী? প্যান্টালুন?
—এগুলোকে বলে ‘বাহামাজ’। অগ্নিকাকু কিনে দিয়েছেন।
—তাই?
—তবে এরসঙ্গে হাফপ্যান্টের তফাত কী? আমরা তো খাকি-রঙা হাফপ্যান্ট পরে স্কুলে যেতাম আর ছিটের শার্ট।
—তফাত? তফাত হচ্ছে এই যে, এটাই আজকালকার ফ্যাশন। আর খুব দামি। অবশ্য মোটা কাপড়ে বানানো হয় বলে টেকেও অনেকদিন।
—অ।
ঘোষসাহেব বললেন।
ঘোষসাহেবের বাবা ব্যারিস্টার ছিলেন না, অধিকাংশ সফল ব্যারিস্টারদের মতো। নিজের কৃতিত্বেই তিনি বড়ো হয়েছেন। এক বড়োলোক আত্মীয়র কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে বিলেতে গেছিলেন ব্যারিস্টারি পড়তে। দেশে ফিরে নিজের বাগ্মিতায় আর মেধায় ধীরে ধীরে পসার গড়ে তোলেন। হাইকোর্টে এখন মানুষে ওঁকে প্রথম পাঁচজনের মধ্যে গণ্য করে। গোপনে অনেক দানধ্যানও করেন। অনেক গরিব ছাত্রদের পড়াশোনার খরচ জোগান। তবে মানুষটা শুধু আইন-ই বোঝেন। সাহিত্য, সংগীত এসব নিয়ে তাঁর বিশেষ উৎসাহ নেই। ভারতীয় সংবিধানের ওপরে খুব বড়ো একটা কাজ হাতে নিয়েছেন। ইস্টার্ন ল হাউস থেকে বেরোবে শেষ হলে। বইটা বেরোলে সারাদেশে যে, হইহই পড়ে যাবে সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই।
ঘোষ সাহেব বললেন, কেমন লাগছে রে, জায়গাটা?
দা—রু—ণ।
সমস্বরে বলল, ওরা দু-ভাইবোন।
—‘প্রকৃতি’র একটা আলাদা প্রভাব আছে মানুষের মনের ওপরে। তোরা বড়ো অভাগা। তোদের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির প্রায় কোনোই যোগাযোগ নেই। ছেলেবেলায়, আমরা থাকতাম কৃষ্ণনগরের নেদেরপাড়াতে। কত গাছপালা, মাঠ, ঘাট, চূর্ণি নদী। রানাঘাটের কাছে ছিল জলঙ্গী নদী। রাজবাড়িতে রাসের মেলা। তখন চারদিকে গাছপালা আর গাছপালাই ছিল। পাখি, প্রজাপতি আর ফুলেদের সঙ্গে ছিল আমাদের খুব ভাব। তোদের মতো কংক্রিটের জঙ্গলে তো বড়ো হয়ে উঠিনি আমরা। পাগলাচন্ডীতে খুব নাম করা ব্যারিস্টার শংকরদাস ব্যানার্জির বিরাট বাগান এবং খামারবাড়ি ছিল। ওঁর ছেলে শিবদাস ব্যানার্জিও ব্যারিস্টার। বাবাকে শংকরদাসবাবু খুব ভালোবাসতেন। বাবার সঙ্গে গিয়ে মাঝে মাঝেই উইকএণ্ডে সেখানে গিয়ে থাকতাম। উনি আসতেন কলকাতা থেকে। ওঁকে দেখেই তো, আমার ব্যারিস্টার হওয়ার ইচ্ছে জাগে মনে। ব্যারিস্টারি পাশ করে এসে আমি ওঁর জুনিয়রও ছিলাম অল্প কিছুদিন।
—চলুন আমরা ফিরি। অনেক তো হাঁটা হল। মা আর অপা কাকিমা কোথায় গেল?
—যার যেদিকে খুশি যাক না। শহরে সকলেই তো খাঁচার পাখি। একটু ইচ্ছেমতো ডানা মেলুক যার যেমন খুশি। তোদের অপা মাসিমা ভীষণ আমুদে, ফুর্তিবাজ। আমি তো ওকে কোনো কোম্পানিই দিতে পারি না। তাও তোর মা আর তোরা পাশে আছিস। ও একটু নিশ্বাস নিয়ে বাঁচে।
—কেন দিতে পারেন না মেসোমশাই?
—তোরা এখনও ছোটো। এখন বুঝবি না, পরে বুঝবি। জীবনে প্রত্যেক জিনিসের জন্যে একটা দাম ধরা থাকে। বুঝেছিস বড়ো বড়ো দোকানে জিনিসের ওপরে যেমন প্রাইস-ট্যাগ থাকে-না? আমাদের জীবনটাও তেমন-ই। পুরো মূল্য না দিয়ে কোনো কিছুই পাওয়া যায় না। আমি জীবনে অনেক টাকা, মান, সম্মান ও প্রতিপত্তি পেয়েছি। কিন্তু আমি যদি একজন সাধারণ আনসাকসেসফুল মানুষ হতাম, তবে বড়ো হতে গিয়ে যা-কিছু আমি হারিয়েছি, তা হারাতে হত না। তোদের সামনে মস্তবড়ো জীবন পড়ে আছে। আমি যা পারিনি তোরা যেন তা করতে পারিস। সবকিছুর মধ্যে একটা ব্যালান্স, একটা হারমনির খুব-ই দরকার। নইলে, মানুষের জীবন সার্থক হয় না।
ওরা দু-জনে চুপ করে শুনল। বাড়ির দিকে ফিরে যেতে যেতে। ঘোষ মেসোমশায়ের জন্যে ওদের কষ্ট হচ্ছিল।
ঘোষ সাহেব ভাবছিলেন, এতকথা ওদের বলে কী লাভ হল? ওরা ছেলেমানুষ। কত স্বপ্ন ওদের, কত মজা সামনে। এসব গভীর কথা বোঝার সময় এখনও হয়নি ওদের।
নিজেই বললেন, এই যে, তোদের এতকথা বললাম তাও এই প্রকৃতির-ই প্রভাবে। মানুষ আসলে প্রকৃতির-ই সন্তান। প্রকৃতির মধ্যে এলে তার মন পাপড়ি মেলতে থাকে। যে-কথা, যে-কাজ অন্য জায়গাতে করা যেত না, যা করার কথা ভাবাও যেত না, তাই করা যায়, ভাবা যায়। উই আর ওলওয়েজ ইন আওয়ার এলিমেন্টস হোয়েনেভার উই কাম টু নেচার।
তারপর বললেন, তোদের অগ্নিকাকা আর তার বন্ধুদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কী সুন্দর একটা জায়গাতে নিয়ে এল বলত কলকাতা থেকে মাত্র চব্বিশঘণ্টার মধ্যে।
তৃষা বলল, আমার তো কলকাতা থেকে বেরোলেই, নীল আকাশ দেখতে পেলেই, মন ভালো হয়ে যায়।
—নীল আকাশ তো ফ্ল্যাট থেকেও দেখা যায়।
রুরু বলল।
—সেরকম দেখা নয়। পথের দু-পাশের গাছগাছালি বাড়িঘর দিগন্ত অবধি যেখানে চোখ চলে যায় বাধাহীন, সেই আকাশের কথা বলছি।
তৃষা বলল।
—সেটা অবশ্য ঠিক।
রুরু বলল।
কুড়ি
—এখানে বসবে একটু?
অগ্নি বলল, পথের বাঁ-পাশে মস্ত একটি কালো পাথরের চ্যাটালো শরীর দেখিয়ে। পাথর তো নয় যেন কোনো ভিল যুবকের বুক।
—বসবে? দেরি হয়ে গেলে ওঁরা কিছু মনে করবেন হয়তো।
অরা বলল।
—পৃথিবীর সব মানুষের মন বুঝেই তো বেঁচে এলে এতদিন। এবারে আমার মনটা একটু বোঝার চেষ্টা করো।
—ছেলেমেয়ে দুটোই বা কী করছে?
—কিছুই করছে না। অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষের সঙ্গে আছে। বেশ কিন্তু মানুষটি। খাঁটি মানুষ। লোক দেখানো কোনো ভড়ং নেই। প্রফেশনাল টু হিজ বোনস। নিজের জগতে থাকা মানুষ। ভাবটা live and and let live.
—তা ঠিক। তবে অপা আর ঘোষ সাহেবের ম্যাচটা ফিটিং হয়নি।
—ক-জন স্বামী-স্ত্রীরই বা পুরোপুরি মিল থাকে। তুমি আর আশিস একসেপশনাল কেস ছিলে। তবে ওঁদেরও মানে, ঘোষ সাহেবদের ছেলেমেয়ে যদি থাকত তবে এই অমিলটা চোখে পড়ত না। ছেলেমেয়েরাই এসে দাম্পত্যের ফাঁকটা পূরণ করে দেয়।
—ওঁরা দু-জনেই দুরকম। বেচারা।
—সংসারে বেচারা নয় কে? তুমি এবং আমিও কি বেচারা নই?
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে অরা বলল, ছেলেমেয়েদের বড়ো করে তোলার দায়িত্ব যদি, না থাকত, যদি আমাকে চাকরিও করতে না হত, তবে এরকম-ই কোনো জায়গাতে, অথবা হাজারিবাগের মতো, বাকিজীবনটা কাটিয়ে দিতাম।
—এ-জায়গাটা হাজারিবাগের চেয়েও সুন্দর। তোমার ছেলেবেলার হাজারিবাগকে তো দেখিনি, বলতে পারব না, তবে তোমার সঙ্গে আলাপিত হতে যখন, আশিসের সঙ্গে গেছিলাম তখন জায়গাটাতে এই জায়গার চেয়ে ভিড় অনেক বেশি ছিল। এখানেও ভিড় আছে নিশ্চয়ই তবে সেটা স্টেশনের দিকেই হবে। রেলগাড়ি এলেই জায়গার নির্জনতা ছিঁড়ে-খুঁড়ে যায়। হাজারিবাগে এখনও রেল লাইন যায়নি বলেই হয়তো এখনও জায়গাটার কিছু নিজস্বতা আছে।
—তা ঠিক।
—যে-জায়গাটাতে আমরা বসে আছি এখানের চারপাশে নাকি রাসেল স্ট্রিটের সাটনস সিডস থেকে অনেক প্যাকেট পুর্টোলাকার বীজ এনে বুদ্ধদেববাবু ছড়িয়ে দিতেন প্রতিবর্ষাতে। যাতে, বসন্ত শেষে বহুবর্ণ পুর্টোলাকাতে ছেয়ে যায় জায়গাটা। পেছনে চেয়ে দ্যাখো, একটা উপত্যকা আছে অনেক নীচে। পথের ডান দিকেও আছে উপত্যকা—ম্যাকলাস্কি’জ নোজ-এর নীচে। সেখানে একটি গ্রামও আছে, যার নাম বাসারিয়া।
—তুমি এত জানলে কোথা থেকে?
—‘একটু উষ্ণতার জন্যে’ বইটি পড়ে এবং ব্রতীনের মুখে শুনে।
—বইটি আমার পড়া নেই।
—তোমাকে পড়াব কলকাতাতে ফিরে। পড়াব মানে, প্রেজেন্ট করব। কিছু বই থাকে, যা, বার বার পড়বার। যেকোনো ক্লাসিক সম্বন্ধেই এ কথা খাটে।
—তা ঠিক।
—ইচ্ছে করে, এখানে আমরা বাকিজীবনটা এই পাথরটার ওপরে বসেই কাটিয়ে দিই।
—ইচ্ছে তো কত কিছুই করে। সব ইচ্ছের আগুনকে হাওয়া করতে নেই, বিশেষ করে যেসব ইচ্ছে ভিজে গেছে, আগুন জ্বলার সম্ভাবনা নেই।
অরা বলল।
অগ্নি চুপ করে রইল।
তারপর বলল, অগ্নির ইচ্ছেতেও যদি আগুন না জ্বলে তবে তা বড়ো দুর্দৈবর-ই কথা বলতে হবে।
শব্দ না করে হাসল অরা।
তারপর বলল, চলো, উঠি। ওরা সকলেই ফিরে গেছে নিশ্চয়ই। ব্রেকফাস্ট খেয়ে তারপরে জায়গাটাকে ঘুরে দেখার জন্যে বেরোতে তো হবেই।
—হেঁটে তো দেখা যাবে না। বিরাট এলাকা। গাড়িতেই যেতে হবে।
—চলো, ওঠো।
—ব্রেকফাস্টে কী খাবে?
—দ্যাখো, এখানে আড়াইদিনের জন্যে এসে তুমি বা অপালা এসব নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামিয়ো না।
অগ্নি বলল।
তারপর বলল, তবে এসব রান্নাবান্নার ব্যাপারে আমি অপদার্থ হতে পারি কিন্তু ব্রতীন আর নরেশ খুব ভালো। তা ছাড়া, রান্নার লোকও তো আছে এখানে। আড়াইটা দিন, জাস্ট রিল্যাক্স করো। খাওয়ার সময়ে যা হয় পেলেই চলবে আমাদের সকলের।
—ঠিক আছে। তুমি যা বলবে তাই হবে।
—একটু দাঁড়াও অরা। হঠাৎ-ই দাঁড়িয়ে ওঠা অরার পথরোধ করে বলল অগ্নি।
—একটু দাঁড়াও।
আবারও আকুতি করে বলল অগ্নি।
—কী হল আবার তোমার?
—তোমাকে একটা চুমু খাব?
অরা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে, মুখ নামিয়ে বলল, খাও।
চুমু অশনিসংকেতের সূত্রপাত। রক্তের মধ্যে তুফান তোলে চুমু। নিশ্বাস দ্রুততর হয়। চুমু থেকে দু-টি শরীর গড়িয়ে যেতে পারে অনেক খানাখন্দে। কিছুক্ষণ ফাঁদে-পড়া পাখির মতো ছটফটানির পরে অরা দু-হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিল অগ্নিকে।
অস্ফুটে বলল অরা, আশিসের কাছে, আমার সন্তানদের কাছে ছোটো হয়ে গেলাম আমি।
—তুমি কোন যুগে যে, বাস করো। সত্যি! আজকের দিনে অভাবনীয়।
—কী করব!
—নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে অরা বলল, আমি যে আমিই! আমাকে ক্ষমা করো। তোমার কাছে আমি যে, কত অপরাধী হয়ে থাকি প্রতিটা মুহূর্ত তা তুমি কখনো জানবে না। এমন অবুঝপনা করে আমার দুঃখ আরও বাড়িয়ো না অগ্নি। তোমাকে তো বলেইছি আমি, যা দিতে পারি তা তো দিই-ই, সবসময়েই দিই, যা পারি না, তা চেয়ে তুমি আমাকে আরও বেশি অপরাধী কোরো না। প্লিজ।
পাথরটা ছেড়ে, ছোটো ছোটো টিলাটা থেকে নেমে ওরা ঘনজঙ্গলের মধ্যে পিচ-বাঁধানো পথে এসে পড়ে ইন্দ্রজিৎবাবুর বাড়ির দিকে এগোল।
চলতে চলতে অরা বলল, একটা কথা ভেবে আমি অবাক হই। যৌবনের যেসব দুরন্ত কামনার দিনগুলিকে তুমি পেছনে ফেলে এসেছ, নিজেকে যেভাবে সংযত, সংহত করেছ, তা মনে করলেই আমি আজও অবাক হই। তবে একটা কথা তোমারও স্পষ্ট করে জানা দরকার। কষ্ট আমারও কিছু কম হয়নি। পুরুষেরা ভাবে এসব ব্যাপারে শারীরিক কষ্ট বুঝি শুধু পুরুষদের-ই। মেয়েদের কষ্টও কি কম? তাদের বুঝি কষ্ট হয় না, নিজেকে সহজ সুখের দুয়ার থেকে বারে বারে ফিরিয়ে আনতে? পরমপ্রিয় মানুষকে বারে বারে ‘না, না, না’ বলতে।
একটু চুপ করে থেকে বলল, অগ্নি তুমি যে, আমার জন্যে অনেক এবং অনেকরকম কষ্ট পেয়েছ, তা আমি অস্বীকার করি না। তোমাকে আমি বুঝি। আমার একমাত্র অনুরোধ যে, তুমিও আমাকে বোঝো একটু। আমরা যে, সাধারণ নই, অসাধারণ, এ কথা জেনে আমাদের দু-জনেরই গর্বিত হওয়ার কথা। নিজেদের বঞ্চনা করার মধ্যে যে, এক গভীর আনন্দ আছে তা সহজ প্রাপ্তির মধ্যে নেই, কোনদিন-ই ছিল না। তোমার সঙ্গে শরীরী সম্পর্ক হলে আশিসের স্মৃতির কাছে তো বটেই আমরা আমাদের দু-জনের কাছেই ছোটো হয়ে যেতাম, নাকি? আমাদের এই পারস্পরিক বঞ্চনার শিকার করতে পারার জন্যে আমাদের নিজেদের অভিনন্দিত করা উচিত।
একটু থেমে অরা আবার বলল, আমি তোমাকে আমার চিঠিতেও একথা বলেছি, তুমি যদি অন্য কোনো নারীর সঙ্গে তোমার শরীরের সুখের জন্যে শারীরিক সম্পর্ক করো কোনোদিন, আমি কিছুই মনে করব না। সত্যিই বলছি, একটুও মনে করব না।
তারপর-ই বলল, অপাই তো তোমার প্রেমে পাগল। তা ছাড়া, ওর হাবে-ভাবে মনে হয় ওর স্বামী যতই ধনী, মানী ও ভালোমানুষ হন-না কেন, শারীরিকভাবে ওকে সুখী করতে পারেননি উনি একটুও। স্ত্রীকে উনি বোঝেন না একটুও। মেয়েদের মন আর ক-জন পুরুষ বোঝে। অধিকাংশ পুরুষের কাছে মেয়েদের শরীরটাই সব। মাঝে মাঝে ভারি দুঃখ হয়।
—আর নিজের জন্যে হয় না?
—না। আমার জীবনে কোনো যে, অসাধারণ সাধারণের দুঃখ তাই আমাদের বাজে না।
—তুমি কী করে বুঝলে?
অগ্নি অবাক হয়ে বলল।
—মেয়েরা অনেক কিছুই বোঝে যা, তোমরা বোঝো না। তা ছাড়া, ও যে, মা হতে পারেনি তারজন্যে ও নিজে দায়ী নাও হতে পারে। এখন মা হওয়ার সময় হয়তো আর নেই কিন্তু শারীরিকভাবে আনন্দিত হওয়ার সময় তো ওর শেষ হয়ে যায়নি।
—অরার জন্যে পোলাও-এর চাল নিয়ে এসেছি। ওঁর এক জুনিয়র চুঁচুড়া থেকে এনে দিয়েছিলেন। ভাবলাম এঁচড় নিয়ে যাই। গাছ-পাকা। ভালো গাওয়া ঘিও এনেছি। তা দিয়েই রাঁধব।
—সবাই-ই এত ভুলে যাচ্ছে কেন? ব্যাপারটা কী ঘটছে এখানে?
নরেশ-ই বলল।
ব্রতীন বলল, একেই বলে প্রকৃতির অভিঘাত।
—প্রকৃতির অভিশাপের কথা শুনেছি, অভিঘাতটা আবার কী জিনিস? এত কঠিন কঠিন বাংলা শব্দ ব্যবহার করিস যে, টেনশান হয়ে যায়। হচ্ছিল এঁচড় আর পাউরুটির কথা, তারমধ্যে হঠাৎ ‘অভিঘাত’ এনে ফেললি কেন?
—তোর দৌড় তো এঁচড় অবধিই। এঁচড়েই থাক।
—এঁচড় তো আর পচবে না। কোথায় আছে বলুন বউদি আমি উদ্ধার করি।
নরেশ বলল।
—ভালো গাওয়া ঘি এনেছ আর কাল রাতে খিচুড়ির সঙ্গে দিলে না? গাওয়া ঘি দিয়ে খিচুড়ি রাঁধলে তার স্বাদ-ই তো অন্যরকম হত।
ঘোষ সাহেব অভিযোগের সঙ্গে বললেন।
অরা বলল, ঠিক আছে। কাল কী পরশু, আমি নিজে হাজারিবাগী ভুনিখিচুড়ি রেঁধে খাওয়াব সবাইকে। আমার মায়ের কাছে শেখা।
তৃষা বলল, মা! তোমরা সকলে এমন খাওয়া খাওয়া করে, খেপে গেলে কেন বলো তো? চলো তাড়াতাড়ি স্নান করে তৈরি হয়ে আমরা ম্যাকলাস্কিগঞ্জ স্টেশন আর চাট্টি নদীটা আগে দেখে আসি।
ব্রতীন বলল, রাঁচি যেতে আসতে গাড়ির কতক্ষণ লাগবে?
—খুব বেশি হলে দেড় ঘন্টা।
বলেই ব্রতীন বলল, নরেশ, আমরা সকলে ফিরে এলে তুই-ই চলে যা, একটা গাড়ি নিয়ে। সেখানে পারফেক্ট আইস-এর দোকান নিশ্চয়ই পাবি। পাউরুটি, যদি আরও লাগে। সসেজ, সালামি, বেকন আর বরফ নিয়ে আয় গিয়ে। বেশি বরফ না হলে ভদকাটা জমবে না।
ঘোষ সাহেব বললেন, রাঁচি যদি যাবেন-ই তাহলে আমিও যাব। পথের ওপরেও মাছ নিয়ে বসে অনেক মাছওয়ালা। রাঁচি হাইকোর্ট-এ মামলা করতে এসে দেখেছিলাম গত মাসেই। তাহলে মাছও নিয়ে আসব।
অপালা বলল, সত্যি! তুমি কি এখানে খেতেই এসেছিলে? তা ছাড়া, তোমাকে রাঁচি পাঠাতে আমার ভয়ও করে। মেন্টাল অ্যাসাইলাম-এ ভরে দিলে!
অরা বলল, এই অপা। কী বাজে ইয়ার্কি হচ্ছে।
ঘোষ সাহেব অপার কথাতে কান না দিয়ে বললেন। বা: রে। আমি একা খাব কেন? ছেলেমেয়েগুলো মাছ ছাড়া খেতে পারে নাকি?
রুরু আর তৃষা সমস্বরে বলল, বা:। নিজেদের দোষ আমাদের ঘাড়ে কেন চাপাচ্ছেন মেসোমশাই?
অপালা বলল, দেখ তৃষা, তোরা, তোদের মেসোমশাইকে। মানুষটা এইরকম-ই।
সকলে দু-তিন কাপ করে চা খেয়ে, স্নান করে নিয়ে ব্রেকফাস্ট করে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ ঘুরে দেখবার জন্যে বেরিয়ে পড়ল। একটু চাপাচাপি হল বটে কিন্তু মুখার্জিবাবুকে ওদের গাড়িতে নিয়ে নিল ব্রতীন। স্টেশনে গিয়েই অবশ্য নামিয়ে দেবে মহুয়া সংগ্রহের জন্যে। এখানের দ্রষ্টব্য স্থান তো ব্রতীন-ই জানে। সেই গাইডের কাজ করবে।
—আমরা দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পরে হাটে যাব। কী বলেন মুখার্জিবাবু?
—হ্যাঁ স্যার। হাট জমতে জমতে তো বিকেল চারটেই হয়ে যায়।
—চার্চ, ক্লাব, স্টেশন, বুথস ফার্ম, হাটের পথ, এবং চাট্টি নদীতে নিয়ে যাব আপনাদের।
—কঙ্কা, লাপরা আর হেসাডি এই তিন গ্রাম নিয়ে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ।
ব্রতীন বলল।
—তুই জানলি কী করে?
—‘একটু উষ্ণতার জন্যে’ পড়ে। ওই বইটা পড়লে এই জায়গা সম্বন্ধে তোর অজানা কিছুই আর থাকবে না।
—এতই যদি ভালোবাসা তাহলে লেখক নিজের বাংলো বিক্রি করে দিলেন কেন?
নরেশ বলল।
ঘোষ সাহেব বললেন, ‘আ রাইটার শুড নেভার বি টায়েড ডাউন টু ওয়ান প্লেস’।
—সেটা অবশ্য খুব দামি কথা। সেইজন্যেই হয়তো উনি অমন সুন্দর বাংলোটা বিক্রি করে দিয়েছিলেন।
অগ্নিভর ফ্ল্যাট। সকালবেলা। অগ্নিভ ব্রতীনের সঙ্গে টেনিস খেলে ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট করছে দু-জনে।
অগ্নি বলল, আজ কি তোর কিছু কাজ আছে জরুরি।
—আমার আবার কাজ কী? ছোটোমামিমাকে একবার দেখতে যেতে হবে। সে বিকেলে গেলেও হবে। বয়স হয়েছে পঁচাত্তর। তার ওপর টার্মিনাল কেস।
—কী? ক্যান্সার?
—তা ছাড়া কী? এখন তো একটাই রোগ। মুম্বাইতে টাটা ইনস্টিটিউটে-ও দেখিয়ে এনেছে মাসতুতো দাদা। এখনও কেমো চলছে। তবে হয়তো আর মাসখানেক আছেন। চোখে দেখা যায় না। কী রূপসি মহিলার কী অবস্থা! কেমো করে করে সব চুল পড়ে গেছে। দেখলে ভয় করে। ওঁর নিজের মনেও এখন মৃত্যুভয় এসেছে। চোখ মুখ দেখলেই বোঝা যায়। সবসময় জোরে টিভি চালিয়ে বসে থাকেন। একা থাকতে ভয় পান।
ব্রতীন বলল, সকলের-ই তো একসময়ে, এই মৃত্যুভয় আসেই। তবে জরাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই। কত তাবড়-তাবড় মস্তানদের চোখের সামনে জরা-কবলিত হতে দেখলাম। জীবনে কোনো যুদ্ধেই না-হারা সব মানুষ—জরার কাছে হেরে গেলেন বিনা প্রতিবাদে। অন্যভাবে বললে বলা যায়, জরাই তাঁদের হারিয়ে দিল হ্যাণ্ডস ডাউন।
ব্রতীন বলল, ‘তোর লা দোলচে ভিতা’ ছবিটার কথা মনে আছে অগ্নি?
—ফেলিনি না আন্তোনিওনি কার যেন ছিল ছবিটা।
—কার ছবি সেটা অবান্তর। ছবিটা আন্তোনিওনির তাতে একটা আইডিয়া ছিল সেটা আমার মনে গেঁথে আছে। আজকের ছবি তো নয়, প্রায় চল্লিশ বছর আগের ছবি। ফিলম ক্লাবে দেখেছিলাম সরলা মেমোরিয়াল হল-এ।
—আইডিয়াটা কী?
—‘‘To die with a bang and not with a whimper’’.
—মানে, দুম করে শব্দ করে মরে যাও—কুকুরের মতো কঁকিয়ে কেঁদে মোরো না।
—আর্নেস্ট হেমিংওয়েও এ কথা বিশ্বাস করতেন। তাই তো তাঁর জীবনে তাঁর মনোমতো বাঁচা যখন আর হল না, উনি আত্মহত্যা করে মারা গেলেন।
—আত্মহত্যা করাটা কাপুরুষের কাজ।
—আমার কিন্তু তা মনে হয় না।
—কেন মনে হয় না?
—আমার তো মনে হয়, যাঁরা এই সুন্দর পৃথিবী থেকে অমন দুম করে চলে যেতে পারেন, নিজেদের জীবন নিজে হাতে নিভিয়ে দিতে পারেন, তাঁরা অসীম সাহসের অধিকারী।
তারপর বলল, আমি আন্তোনিওনির একটি লেখা পড়েছিলাম। তাঁর অধিকাংশ নায়ক-নায়িকাই আত্মহত্যা করে কেন মারা যান এই প্রশ্নর উত্তরে তিনি বলেছিলেন: ‘‘If life is a gift of God, the right to take it away is also a gift of God’’.
—তাই?
—তোকে একটু কাসুন্দি দিই? বেকন আর হ্যাম মাস্টার্ড ছাড়া জমে না। ইটালিয়ান মাস্টার্ড হলে তো কথাই নেই।
—ছাড় তো। ওসব সাহেবব্যাটাদের রটনা। নিজেদের দেশে মাস্টার্ড হয় না বলেই ইটালির মাস্টার্ড-এর প্রয়োজন পড়ত ওদের। আমাদের কাসুন্দির কোনো বিকল্প আছে?
—তুই কি রোজ-ই এসব খাস নাকি?
—না, না। প্রতি শনি-রবিতে খাই। হ্যাম, বেকন, ডিমের পোচ, কড়কড়ে করে টোস্ট করা গার্লিক ব্রেড আর কাসুন্দি। সঙ্গে মাখন আর অরেঞ্জ মার্মালেড।
—বয়স তো ষাট হবে শিগগির আমাদের। এখন এত ডিম খাওয়া কি উচিত?
—আরে সেদিন সি.সি.এফ.সি.-তে পি বি দা আর চুনীদার সঙ্গে কথা হচ্ছিল।
—কে, পি বি দা?
—আরে পি বি দত্ত, ক্রিকেটার। আর চুনীদা মানে চুনী গোস্বামী—ফুটবলার এবং ক্রিকেটারও।
—কী বললেন ওঁরা?
—বললেন, ব্রতীন দিনে দুটো করে ডিম খাবি। এরকম প্রোটিন আর নেই। ওঁরা দু-জনেই আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক-ই বড়ো।
ব্রতীন বলল, আমার বাবা বলতেন গ্রামে-গঞ্জে হিন্দু-মুসলমানেরা ইকুয়ালি পুত্তর। কিন্তু তাদের বেসিক ডায়েটে একটাই ডিফারেন্স।
—কী?
—মুসলমানেরা পেঁয়াজ, রসুন এবং লঙ্কা হিন্দুদের চেয়ে অনেক বেশি খায়। এগুলো, বলতে গেলে Staple Food ওঁদের কাছে। একজন মুসলমান কৃষক বা শ্রমিক যত পরিশ্রম করতে পারে একজন হিন্দু কৃষক ও শ্রমিক তা কখনোই পারে না।
তারপর বলল, তুই কি জানিস যে, ভারতবর্ষে যতগুলো বন্দর আছে সেইসব পোর্টে যারা মজুরের কাজ করে, মাল তোলা এবং মাল খালাসের কাজ, তারা সবাই-ই মুসলমান?
—তাই নাকি?
—হ্যাঁ তাই।
—তাদের দুপুরের খাদ্য হচ্ছে ক-টি আটার রুটি আর প্রচুর পেঁয়াজ, রসুন, লঙ্কা এবং একটু আচার। আচারটুকুই বিলাসিতা।
—এটা তো জানা ছিল না!
—অনেকেই জানেন না, শুধু তুই কেন?
তারপর বলল, ব্রিটিশ আর্মিতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে বার্মা ফ্রন্টে একজন জেনারেল ছিলেন, তাঁর নাম জেনারেল উইংগেট। তাঁর স্টেপল-ফুড-ই ছিল কাঁচা পেঁয়াজ। তাঁর বড়ো বড়ো পকেট ভরতি পেঁয়াজ থাকত। তাঁর সৈন্যদল এমন এমন সব অবিশ্বাস্য কান্ডমান্ড ঘটিয়েছিলেন যে, আর্মি ভোকাব্যুলারিতে তাঁর ব্রিগেডের নাম হয়ে গেছিল ‘উইংগেটস সার্কাস’। আমি তো আমার বাবাকে অনুসরণ করে সকালে একটি এককোয়া রসুন মুড়ি দিয়ে খাই—ফার্স্ট থিং ইন দ্যা মর্নিং, তারপর চা। আর দুপুরের ও রাতে খাওয়ার সময়ে দু-কোয়া রসুন ঘি দিয়ে ভাজা, দু-টি করে কাঁচালঙ্কা এবং একটি গোটা এবং সদ্য ছাল ছাড়ানো কাঁচা পেঁয়াজ।
—সম্ভবত এইজন্যেই তোকে কোনো মেয়ে চুমু খেতে চায় না।
অগ্নি বলল।
—তা না চাক কিন্তু তুই নিশ্চয়ই স্বীকার করবি যে, আমার বয়সের তুলনাতে আমি শরীরে মনে অনেকের চেয়ে বেশি ইয়াং আছি।
—হুঁ। সেইটাই তো ভয়। ম্যাকলাস্কিগঞ্জে অপালা তোর দিকে যেমন ঝুঁকেছিল তা দেখে তো তোর মন্ত্রগুপ্তিটি কী, তাই জানতে ইচ্ছে করছিল।
—অপালা ভারি ভালো মেয়ে। বাজে কথা বলিস না।
—আমার কাছে তো, মেয়েমাত্রই ভালো।
—তুই তো, একজনে সমর্পিত মন-প্রাণ ঋষিকুমার। দেহিপদবল্লভ মুদারম। তুই দেবতা। মানুষ নোস।
—আমরা প্রত্যেকেই দেবতা। তুই তোর দেবত্বকে উপলব্ধি করিসনি বা করার চেষ্ট করিসনি, তাই এ-কথা বলছিস।
—যাক এসব ভারী ভারী কথা। আমার কাজ আছে কি না জিজ্ঞেস করছিলি কেন?
—না, তাহলে রবীন্দ্রসদনে গিয়ে ব্রাত্য বসুর ছবিটা দেখে আসতাম।
ব্রতীন বলল, আইনক্স-এ গিয়ে ব্ল্যাক দেখতাম। OH Kolkata-তে একদিনও খাওয়া হয়নি—ওখানে বাঙালি খাওয়াটাও খেয়ে নেওয়া যেত।
—না। আইনক্সও যাব না। ‘OH Kolkata’-তেও যাব না।
—কেন?
—ওদের নিয়ে এখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
—বাবা:। এটা বাড়াবাড়ি। ওদের মানে, তৃষা রুরু অরা?
—হ্যাঁ। তবে এটা বাড়াবাড়ি নয়। যেখানে পরিবার নিয়ে সকলে যায় সেখানে একা একা যেতে বড়ো স্বার্থপরের মতো মনে হয়।
—তবুও যদি তোর নিজের পরিবার হত।
—নিজের না হলেও নিজের-ই মতো তো।
—যাক, এ নিয়ে আমি আর কিছু বলব না। আজকে জেদাজেদি করে রোদের মধ্যে চারটি সেট টেনিস খেলে ফেলেছি। ক্লান্ত লাগছে। আফটার অল, বয়স তো হয়েছে।
—আমার সঙ্গে তো মাত্র দু-সেট খেললি। আর দুটো কার সঙ্গে খেললি?
—কেন? বিয়ান্দকারের সঙ্গে। খুব ভালো খেলে ও। যৌবনে তো কমপিটিটিভ টেনিসও খেলত।
—তাই?
—হ্যাঁ।
—আজ বাড়ি গিয়ে শাওয়ারের নীচে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে খুব ভালো করে চান করব। তারপর দু-বোতল বিয়ার খাব। তোর সনাতনের দোকান থেকে মঙ্গল বড়ো বড়ো কই মাছ এনেছে। কালোজিরে কাঁচালঙ্কা দিয়ে তেল-কই করতে বলেছি। আজকাল তো, দেশি মাথা-মোটা বড়ো কই পাওয়াই যায় না। জানি না আজ কী করে পেয়ে গেল। খাবি তো চান করে চলে আয়।
—না:। আজ যাব না।
—কী করবি?
—অনেকগুলো চিঠি লিখতে হবে নাগপুরে।
—নাগপুরে কি তোর অন্য কোনো হার্টথ্রব আছে নাকি?
—না তা নয়। তবে কর্মজীবনের অতগুলো বছর তো নাগপুরেই কাটালাম।
—বন্ধু ও পরিচিত তো কম নেই।
—পুরুষ না স্ত্রী?
—দুই-ই আছেন। অনেকগুলো চিঠি পেয়েছি গত একমাসে, একটারও উত্তর দেওয়া হয়নি।
—এই মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেটের দিনে এত চিঠি লেখে কোন ব্যাকডেটেড মানুষেরা?
—চিঠি লেখা ব্যাপারটা সকলের-ই আয়ত্তাধীন নয়। ভালো চিঠি লেখা তো নয়-ই! যাঁরা ভালো চিঠি লিখতে পারেন তাঁরা চিরদিন চিঠিই লিখবেন।
—আই বেগ টু ডিফার।
ব্রতীন বলল।
—অতসময় নষ্ট করাটা আজকাল মূর্খামি বলেই গণ্য হওয়া উচিত।
—ব্যাপারটা তর্কের নয়। আই বেগ টু ডিফার অ্যাজ ওয়েল।
—তুই তো কফি খাবি?
—না চা।
—চন্দন চা নিয়ে এসো।
আনছি বাবু।
চা নিয়ে এলে দু-জনেই চা-ই খেল। তারপর ব্রতীন উঠে পড়ে বলল, তাহলে চলি আজকে, ফোন করিস। দুই ব্যাচেলারের আরও একটি অলস দুপুর শুরু হবে একটু পর থেকে। আজ খুব ঘুমোব আমি। তারপর সন্ধেবেলা ছোটোমামিকে দেখে বাড়ি ফিরে আসব। নরেশটা আসতে পারে। তোর যদি কোথাও যাবার না থাকে এবং চিঠি লেখা শেষ হয়, তবে চলে আসিস। জুবিলি স্টোরস-এর পল্লব একটা ব্ল্যাক টিচার্স দিয়েছে পরশু।
—দিয়েছে মানে? প্রেজেন্ট করেছে?
—প্রেজেন্ট কখনো-সখনো করে না-যে, তা নয় কিন্তু রোজ প্রেজেন্ট করলে তো ওর দোকান-ই উঠে যাবে। ওর দোকানের মতো পুরোনো এবং ভালো মদের দোকান কলকাতাতে তো কম-ই আছে।
—কালো টিচার্স, কথাটার মানে বুঝলাম না।
—টিচার্স তো সাদাই খেয়েছিস। এই কালোটা নতুন বেরিয়েছে।
—গুড।
—চানচানির বাড়ি খেয়েছিলাম। যদি রাতে আসিস তো খাওয়াব। সেলিম বাখখরখানি রুটি আর গুলহার কাবাব পাঠিয়েছে। তার ছেলের জন্মদিন আজকে।
—তা দিয়ে ডিনারও খেতে পারিস এলে।
তারপর বলল, বুঝলি, একটা সময় পর্যন্ত সংসার করলাম না বলে মাঝে মাঝে দুঃখ হত। এখন মনে হয়, যা হয়েছে তা ভালোই হয়েছে। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা প্রতিপালনের পরে রিটায়ার করার পরেও এমন কাপ্তানি করে কি জীবনটা কাটাতে পারতাম?
—জীবনের আসল অধ্যায়-ই তো এখনও বাকি আছে।
—সেটা কী?
—শেষজীবন। সেটা যে, ‘ওল্ড এজ-হোম’-এই কাটবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়? চিরটাজীবনই কি এমন হরিণের মতো লাফিয়ে বেড়াতে পারব?
—সে তখন দেখা যাবে।
—আসবি?
—দেখি। বড়ো বহির্মুখী হয়ে উঠেছি আমি সাম্প্রতিক অতীত থেকে। এমনিতে আমি খুব-ই অন্তর্মুখী মানুষ, যদিও কুনো যাকে বলে তা নই। রবীন্দ্রনাথের সেই গানটা আছে না?
বলেই গেয়ে উঠল, ‘‘বাহির পথে বিবাগী হিয়া কীসের খোঁজে গেলি, আয়, আয়, আয় রে ফিরে আয়। পুরানো ঘরে দুয়ার দিয়া ছেঁড়া আসন মেলি বসিবি নিরালায়, আয়, আয় রে ফিরে আয়।’’
—বা:। ছেলেবেলা থেকে তোর গানটাকেই প্রফেশান করা উচিত ছিল। এঞ্জিনিয়র তো লক্ষ লক্ষ আছে।
তারপর বলল, আজকাল তো কত মানুষের গান-ই শুনি। শিল্পীর ভিড়ে তো পথ চলাই দায়। কিন্তু ক-জনের গলাতে সুর লাগে বল? এখন গান শোনা একটা অত্যাচার হয়ে উঠেছে। মন ভরে না। তুই যে, কেন একটা সিডি করিস না।
অগ্নি হেসে বলল, আগে হলেও-বা কথা ছিল। এখন দেশে ক্যাসেট আর সিডি-র বন্যা হয়ে যাচ্ছে। কে না করল সিডি? তাদের সঙ্গে নিজেকে একাসনে বসাতে রাজি নই আমি। এই বেনোজল নেমে যাক, যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকি তো এ নিয়ে ভাবা যাবে।
—বয়স হয়ে গেলে গলা কি এরকম থাকবে?
ভীমসেনজির গান শুনলাম সেদিন সানি টাওয়ার্স-এর জয়ন্ত চ্যাটার্জির ওখানে। আশি তো পার করেছেন কবেই কিন্তু এখনও কী গলা!
—ভাবাই যায় না। ঈশ্বরের কৃপাতে কারও কারও গলা বয়স যত বাড়ে, ততই ভালো হয়।
—এই তোর এক রোগ। তোর মতো আধুনিক একজন বিজ্ঞানী যে, কেন ‘ঈশ্বর ঈশ্বর’ করিস তা বুঝতে আমার বড়োই অসুবিধে হয়।
—ব্যাপারটা সকলের বোঝার নয় রে ব্রতীন। এ-বাবদে আমরা না হয়, ভিন্নমত-ই পোষণ করলাম। তাতে আমাদের বন্ধুত্বটা অটুট থাকবে। ‘ভগবান’ মানে, দেবদেবীর কথা আমি বলিনি। বলেছি, এক সুপিরিয়র ফোর্স-এর কথা। অনেক নোবেল-লরিয়েট বিজ্ঞানীও আমার-ই মতো ঈশ্বর বিশ্বাসী। এ-নিয়ে আলোচনা শুরু করলে দিন-রাত কেটে যাবে।
—তাহলে একদিন, দিন স্থির কর। নরেশটাকেও ডাকব। ও তো প্রতি শনিবারে দক্ষিণেশ্বরে যায়, বছরে একবার তিরুপতিতেও। অথচ ছাত্র ছিল ফিজিক্সের।
—ডাকিস। ওর বিশ্বাসের রকম আর আমার বিশ্বাসের রকমটা আলাদা।
ব্রতীন উঠে পড়ে বলল, আমার বিশ্বাসেরও।
ব্রতীন চলে গেলে এক ঘুম দিয়ে উঠে, চা খেয়ে স্নান করে অগ্নি লেখার টেবিলে বসল চিঠি লিখতে। নাগপুরে অনেকগুলো চিঠি লেখার ছিল কিন্তু প্রথমে সে, অরাকে চিঠি লিখতে বসল।
বহুদিন চিঠি লেখে না অরাকে।
টালিগঞ্জ
কলকাতা
শনিবার
অরা,
কল্যাণীয়াসু,
বহুদিন বাদে গতকাল ন্যাশানাল লাইব্রেরিতে গেছিলাম। আমার এখনকার নিরবচ্ছিন্ন আসরে মাঝে মাঝেই ন্যাশানাল লাইব্রেরির রিডিং রুম-এ গিয়ে একটু পড়াশোনা করি। বলাই বাহুল্য যে, ‘প্রেমচাঁদ’ বৃত্তি পাব বলে করি না, করি, নিজের মনের ও মানসিকতার ওপরে যে, ধুলোর আস্তরণ জমে প্রাত্যহিকতার সাধারণ্যে, যাই, তার-ই কিছুটা পরিষ্কার করতে।
সেদিন রবীন্দ্রনাথের ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’র তৃতীয় খন্ডে পড়ছিলাম যে, ‘লাইব্রেরি’ সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন : ‘‘বিদ্যুতকে মানুষ লোহার তারে বাঁধিয়াছে কিন্তু কে জানিত মানুষ শব্দকে নি:শব্দের মধ্যে বাঁধিতে পারিবে। কে জানিত, সংগীতকে, হৃদয়ের আশাকে জাগ্রত আত্মার আনন্দধ্বনিকে আকাশের দৈববাণীকে সে কাগজে মুড়িয়া রাখিবে। কে জানিত মানুষ অতীতকে বর্তমানে বন্দী করিবে। অতলস্পর্শ কাল সমুদ্রর উপর একখানি বই দিয়া সাঁকো বাঁধিবে।’’
কি সত্যি কথা বলো?
ম্যাকলাস্কিগঞ্জের ঘোর এখনও কাটেনি। প্রকৃতির প্রভাব যে, আমাদের জীবনে কতখানি, তা প্রকৃতির মধ্যে না গেলে বোধ হয় বোঝা যায় না। ছিন্নপত্রাবলীতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: ‘‘প্রকৃতির মধ্যে, মানুষের মধ্যে আমরা আনন্দ কেন পাই? সে আনন্দ যতই ক্ষুদ্র, যতই চঞ্চল হোক।
এর একটি মাত্র সদুত্তর আমাদের উপনিষদেই আছে। আনন্দধ্বেব ঋদ্ধিমানি ভূতানি জায়ন্তে, আনন্দেন জাতানি জীবন্তি, আনন্দং প্রযুন্ত্যভিসংবিশন্তি। এ কথা নিজে না বুঝলে কাউকে বোঝাবার যো নেই।’’
তাইতো আমরা গাই ‘‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ, ধন্য হলো ধন্য হলো মানবজীবন।’’
আমাদের উপনিষদে ‘মায়াবাদ’ প্রসঙ্গে সালম্বন ভ্রম এবং নিরালম্বন ভ্রম-এর কথাও আছে। সালম্বন ভ্রম হচ্ছে illusion। তুমি জানলেও জানতে পারো। এখন বুঝি, তোমার আমার প্রেম হচ্ছে একটি বিশুদ্ধ সালম্বন ভ্রম।
তুমি কী বলো?
ইতি—অগ্নি
চিঠিটা লিখে ফেলতে পেরে খুব হালকা বোধ করল অগ্নি নিজেকে। নিজের মন যখন গ্রীষ্মদিনের ধুলোর মধ্যে ছটফট করা চড়াইপাখির মতো অশান্ত হয়ে ওঠে তখন অরার কথা ভাবলে, অরাকে চিঠি লিখতে পারলে, সেই অশান্ত মন শান্ত হয়ে যায়। চুমু-থেরাপিরই মতো এই চিঠি-থেরাপি।
ফোনটা বাজল এই সময়ে, নাগপুরের চিঠিগুলি শুরু করার আগেই। মনে মনে বিরক্ত হল অগ্নি।
—ইয়েস।
—আমি অপা বলছি।
—‘অপা’ মানে, অপালা?
—হ্যাঁ।
—বাবা:। আমার কী সৌভাগ্য!
—আপনার সৌভাগ্য না আরও কিছু। সৌভাগ্য তো আমার।
—তাই?
—নয়তো কী? কী করছেন এখন?
—এই! চিঠি লিখছিলাম।
—কাকে? অরাকে?
—না, নাগপুরের বন্ধুবান্ধবদের।
—শুনেছি নাগপুরের আশেপাশে অনেক জঙ্গল আছে। একবার নিয়ে চলুন-না আমাদের। আমার জঙ্গল খুব ভালো লাগে।
—গেলেই হল। আগে থাকতে আমাকে জানালেই হবে।
—কোথায় কোথায় যাওয়া যায়?
—কত জায়গাতে। চন্দ্রপুরের কাছে আন্ধারী তাড়োবা টাইগার প্রোজেক্ট আছে। দারুণ। সেখানে অনেক ভূত-গাছ আছে।
—ভূত-গাছ? সেটা আবার কী?
—হ্যাঁ। সত্যিই বলছি। যে জানে না, সে অন্ধকার রাতে ওই গাছ দেখলে হাত-পা ছড়ানো ভূত ভেবে ভিরমি খাবে।
—গাছগুলোর নাম-ই ভূত গাছ?
—ইংরেজি নাম Karu Gum trees-এ অন্য জায়গাতেও আছে। তবে কম।
—অন্য কোন জঙ্গলে?
—আমি পূর্ব-ভারতের জঙ্গলের কথা বলতে পারব না। আমার তো এদিকের জঙ্গল তেমন দেখা নেই। তোমাদের দৌলতে, আসলে ব্রতীনের-ই দৌলতে ঝাড়খন্ডর ম্যাকলাস্কিগঞ্জ দেখা হয়ে গেল।
—নাগপুর থেকে আর কোন জঙ্গলে যাওয়া যায়?
—নাগজিরাতে। সাতপুরা রেঞ্জের গোখুরি হিলস-এর নাগজিরা। সেও দারুণ জঙ্গল। নাগপুরের কাছেই সাতপুরা রেঞ্জ-এই আছে পেঞ্চ ন্যাশানাল পার্ক। পেঞ্চ নদী বয়ে গেছে মধ্যপ্রদেশ আর মহারাষ্ট্রের মধ্যে দিয়ে। দু-রাজ্যের জঙ্গল-ই দেখার মতো। নাগপুর থেকে একটু দূরে, এই শ তিনেক কিমি দূরে আছে মেলঘাটের জঙ্গল। চিকলধারা হিল স্টেশান। আর সেখান থেকে নেমে সেমাডোহ হয়ে সমতলের জঙ্গল।
—বাবা:। আপনি কত জায়গাতে গেছেন!
—কত মানুষে কত জায়গাতে যায়। আফ্রিকা, আলাস্কা, আন্টার্কটিকা, সি-ক্রইজ, লাক্সারি বোট-এ করে, মানস সরোবর। আমি তো শুধু কিছু জঙ্গলেই গেছি।
—কাল কী করছেন?
—কাল? কাল কী বার?
—বারও ভুলে গেছেন? মাস ও বছর মনে আছে তো?
—মনে পড়েছে। কাল রবিবার। কিন্তু কেন? কাল কী?
—আপনি সন্ধেবেলা বাড়িতে থাকবেন?
—কেন বলুন তো? হঠাৎ।
—বলুন নয়, বলো বলুন। অরাকে তো তুমিই বলেন।
—ও। সে তো অভ্যেস হয়ে গেছে।
—এটাও অভ্যেস করে ফেলুন। মানে, আমাকে তুমি বলাটা।
—বেশ। তাই না হয় বলব। কিন্তু কাল সন্ধেবেলা কী হবে?
—আপনার কাছে আসতে চাই।
—ঘোষ সাহেবও কি আসবেন?
—না। তিনি তো আজ দিল্লি গেছেন সুপ্রিমকোর্টে মামলা নিয়ে। ফিরবেন সেই মঙ্গলবার।
—ও। তুমি একাই আসতে চাও?
—হ্যাঁ। একাই। অরাকে জানাবেন না কিন্তু।
তারপর বলল, আপনাদের ঘোষ সাহেব কলকাতাতে ফিরলে বাড়িতে একটা পার্টি দেব। ম্যাকলাস্কিগঞ্জের দলের সকলকে ডাকব সেদিন। মানে, আপনার দুই বন্ধুকেও।
—বা:। সে তো উত্তম কথা। কিন্তু কাল রাতে, মানে সন্ধেতে কী হবে?
—হতে পারে অনেক কিছুই। গিয়েই না হয় ঠিক করব। আমরা দু-জনে বাইরে কোথাও খেতেও যেতে পারি। নইলে আপনার বাড়িতেই বসতে পারি। আমি আর আপনি ছাড়া আর কেউ থাকবে না কিন্তু।
—আমার চন্দন। সে যে, আমার লোকাল গার্জেন? অন্ধের নড়ি।
—তাকে সিনেমা দেখতে পাঠিয়ে দেবেন।
—বা: বা:। এ তো, রীতিমতো রাহস্যময় ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে। এ তো দেখছি রুরুর, চুমকির আঙ্গাপাঙ্গা দেখার মতোই রহস্যময় ব্যাপার।
—সেটা আবার কী?
—এই রে। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। তবে বলব কখনো।
—সব ব্যাপারে ঠাট্টা ভালো লাগে না আমার। আঙ্গাপাঙ্গা দেখা। সেটা আবার কী?
—আমারও নয়।
—কী?
—সব ব্যাপারে ঠাট্টা।
—এখন বলুন আমি আসব কি না। আবারও বলছি, আর কেউই যেন চলে না আসে তা দেখতে হবে কিন্তু।
—ঠিক আছে। চন্দনকে বাইরে পাঠিয়ে দরজা লক করে দেব।
—ল্যাণ্ডলাইনের রিসিভার নামিয়ে রাখতে হবে। মোবাইলও অফ করে রাখতে হবে।
—বেশ তাও না হয় করব। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার। হবেটা কী বলো তো?
—গিয়েই বলব।
—বেশ।
—কালকে আবার সকালে ফোন করে ক্যানসেল করে দেবেন না তো?
—আমি কথা দিলে আমার ডেডবডিও কথা রাখে।
—বা:। চমৎকার। তবে ওসব মরাটরার কথা ভালো লাগে না, আমার একেবারেই।
—আজ রাতে উত্তেজনাতে আমার ঘুম হবে না। কালকের কথা ভেবে।
—আমারও হবে না।
তারপর বলল, আপনি অন্ধ।
—কেন?
—এতদিনেও কিছু বুঝতে পারলেন না?
—কী?
—কাল-ই গিয়ে বলব। আমি আপনার মতো হাঁদা পুরুষ আর দেখিনি।
—ঠিক আছে। চাইনিজ কী মোগলাই খাবার আনিয়ে রাখব কি? তুমি এলে, ফোন করেও আনানো যায় অবশ্য।
—এখন-ই কিছু করতে হবে না। আপনার কিছুই করতে হবে না। কাল আমিই খাওয়াব আপনাকে। কালকের প্রোগ্রামটা পুরোপুরি ফ্লুইড থাকুক। সবকিছুই কাল আমি যাবার পরে প্ল্যান করব।
—ওক্কে। ডান।
—ক্যানসেল করবেন না যেন? প্রমিস?
—প্রমিস।
ফোনটা ছাড়ার পরে অগ্নির অত্যন্তই নার্ভাস লাগতে লাগল। এতখানি নার্ভাস কখনোই বোধ করেনি। অপার এই Move-এর পেছনে অরার কি কোনো হাত আছে? অরা কি পরীক্ষা করতে চায় অগ্নিকে? নাকি অরার প্ররোচনাতেই অপা কি অগ্নির সঙ্গে............
না:। কিছুই বুঝতে পারছে না।
বুঝতে না পেরে চিঠি লেখার খোলা প্যাড বন্ধ করে চন্দনকে বলল, আজ সাড়ে নটাতেই শুয়ে পড়বে খেয়ে দেয়ে। ঠিক করল শোয়ার আগে একটা পয়েন্ট ফাইভ অ্যালজোলাম খাবে। তারপর ন্যাশানাল জিয়োগ্রাফিক চ্যানেল খুলে দিয়ে, অরার চিঠিটা খাম বন্ধ করে খামটা চন্দনকে দিয়ে কাল সকালেই পোস্ট করতে বলে টিভির সামনের ইজিচেয়ারে পা ছড়িয়ে বসল। অনেকগুলোচিঠি লেখার ছিল। মনের এই উত্তাল অবস্থাতে চিঠি লেখা সম্ভব নয়।
সাড়ে আটটার সময়ে মোবাইলটা বাজল।
ব্রতীন।
—কী রে! তুই কি আসবি? নরেশ এসেছে। তুই এলেই খুলব গোল্ড-লেবেলের বোতলটা।
অগ্নি মিথ্যে কথা বলল। বলল, নারে! জ্বরজ্বর লাগছে। আজ আমি আর যাব না। এনজয় ইয়োরসেলভস।
—কাল টেনিস খেলতে যাবি তো?
—দেখি, কেমন থাকি? জ্বর না এলে, যাব। তুই সকালে ফোন করিস একটা।
—ঠিক আছে।
বলল, ব্রতীন।
অপা একটা লাল-কালো সম্বলপুরি সিল্কের শাড়ি পরে এসেছে। শ্যাম্পু করা খোলা চুল। কী সুগন্ধি মেখেছে কে জানে! ‘রেড ডোর’ হতে পারে। অনেক বছর আগে সেমন্তী তাকে একটি ‘রেড ডোর’ পারফিউম এনে দিতে বলেছিল। জোগাড় করতে পারেনি।
অপা যথেষ্ট সুন্দরী এবং তার মধ্যে একধরনের চাপল্য আছে, যাকে অবাঙালিরা বলে, ‘নামকিন’। এয়ার কণ্ডিশাণ্ড গাড়িতে এসেছে, এয়ার কণ্ডিশাণ্ড ঘরে বসে আছে তবু ওর বাহুমূল ঘেমে গেছে। চোখে গাঢ় করে কাজল দিয়েছে। একেবারে ডিভাস্টেটিং দেখাচ্ছে ওকে।
—এত গোপনীয়তা করলে, কিন্তু তোমার ড্রাইভার যদি ঘোস সাহেবকে বলে দেয় যে, তুমি একা আমার কাছে এসেছিলে।
অগ্নি বলল।
—বাড়ির গাড়ি নিয়ে আমি থোড়াই এসেছি। ট্রাভেল এজেন্সির গাড়ি নিয়ে এসেছি।
—বাবা:। তুমি তো খুব স্কিমিং।
—হলেই বা। মার্ডার করতে তো আসিনি।
—তবে কি মার্ডারড হতে এসেছ?
—দেখি কী হয়? আপনি তো অরার-ই নিরামিষ বন্ধু। নারী-বিদ্বেষী একরকম। আপনার সঙ্গে অরার সম্পর্কটা আমি আজও বুঝে উঠতে পারলাম না। এতবছরের প্রেম অথচ কখনো শরীরী সম্পর্ক হয়নি আপনাদের মধ্যে এটা অভাবনীয়।
—সম্পর্কটা প্রেমের কি না, তা আমি আজও সঠিক জানি না। তবে কর্তব্যের নিশ্চয়ই। তা ছাড়া, প্রেমের অনেক-ই রকম থাকে। সব ‘প্রেম’ সবার বোঝার নয়।
—যাই বলুন, আপনাদের সম্পর্কটা অ্যাবনর্মাল। হয়তো কিছুটা আনহোলসামও। অবিশ্বাস্য। অরার সঙ্গে কখনো আপনার শারীরিক সম্পর্ক হয়নি এ-কথা সত্যিই বিশ্বাস করার নয়।
—কোরো না বিশ্বাস। তা ছাড়া হোক আর নাই হোক তাতে তোমার এত কৌতূহল কেন? আমার আর তোমার সম্পর্ক নিয়েই কি আমাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত নয়?
—তা ঠিক।
তারপর বলল, আমি জানি না, জীবনের এই অবেলাতে এসে আমার কী হল!
—কী হল, তা গানে বলি?
—বলুন। অনেকদিন আপনার গান শুনি না। খালি গলাতে আপনার মতো গান খুব কম মানুষেই গাইতে পারেন।
—হা:। আমি তো আর গাইয়ে নই। যন্ত্রটন্ত্র পাবই বা কোথায়? তা ছাড়া সেদিন রামকুমারবাবু একটি কথা বলেছিলেন এক মজলিশ-এ।
—কী কথা?
—বলেছিলেন, আমাদের সময়ে কথাটা ছিল, ‘গান-বাজনা’ আর এখন হয়ে গেছে ‘বাজনা-গান’। মানে, হারমোনিয়াম, তবলা, সিন্থেসাইজার, গিটার, বাঁশি, পারকাশান ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক গায়ক-গায়িকার আবার জোড়ায় জোড়ায় দরকার হয়। গায়ক-গায়িকার গলা যে, কেমন তা বোঝার জোটি পর্যন্ত নেই।
—তা যা বলেছেন। কিন্তু গানটা গাইবেন তো? কী হল গান?
—হ্যাঁ। গাই।
—সত্যি! আপনি যেমন করে মানুষে বলে, ‘চানে যাই’ তেমন-ই করে গানে যান। বিনা প্রস্তুতিতে এমন গান গাইতে আমি কোনো মানুষকেই শুনিনি।
—আমি আবার গায়ক নাকি? ছাতার গায়ক।
—হয়েছে। এবার গান।
কী হল আমারো সই, বলো কী করি
নয়ন লাগিল যাহে কেমন পাশরি।
কী হল আমারো সই বলো কী করি।
হেরিলে হরিষচিত, না হেরিলে মরি
তৃষিত চাতকী যেন থাকে আশা করি।
ঘন মুখ হেরি সুখী, দুখ বিনে বারি।
কী হল আমারো সই, বলো কী করি।
—বা: সত্যি! আপনার প্রেমে যে, পড়েছি সে তো অবশ্যই। অনেক কিছুর জন্যেই পড়েছি। তারমধ্যে আপনার গান সম্ভবত একটি কারণ।
—তুমি মেয়েটি বড়ো সরল অপালা। প্রেমে অনেক মেয়েই পড়ে কোনো না কোনো পুরুষের কিন্তু তোমার মতো অবলার মতো তা অকপটে বলতে খুব কম মেয়েই পারে। মেয়েদের প্রেম বুঝে নিতে হয় চোখের ভাষায়, তাদের নীরবতায়, তাদের আপাত-বিদ্বেষে।
—আমরা যে, অন্যরকম। আমরা আর আপনারা বিপরীত না হলে একে অন্যের প্রতি কোনো আকর্ষণই থাকত না।
—তা অবশ্য ঠিক।
—আমরা তো পুরুষদের চেয়ে দুর্বল।
—সেটা হয়তো শারীরিকভাবে। তোমাদের ভূমিকাটা প্যাসিভ, আমাদেরটা অ্যাকটিভ। তবে আজকাল নারী-পুরুষের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশই কমে আসছে, সেটা ভালো কী মন্দ তা জানি না অবশ্য। মেয়েরাও ক্যারাটে শিখছে, কুংফু শিখছে, তাদের মধ্যেও জ্যাকি চ্যাঙ পাওয়া যাচ্ছে।
—তাহলেও, আমার মনে হয় মেয়েরা দুর্বল।
—আসলে, যেটাকে তোমরা দুর্বলতা বলে জানো, সেটাই তোমাদের বল।
—বা:। বেশ বললেন তো কথাটা।
—তা কথা বলেই কি কাটবে সময়? কিছু একটা খাও। কী খাবে? ম্যাঙ্গো-পান্না? নাকি বাকার্ডি বানিয়ে দেব? কি ব্লাডি-মারি খাবে একটা? ভালো ভদকা আছে। টোম্যাটো জ্যুসও আছে, ভালো করে বরফ দিয়ে বানিয়ে দিতে পারি।
—আপনি যা ভালোবেসে দেবেন।
—তাহলে তার আগে ভালোবেসে তোমার দু-চোখের পাতাতে দু-টি চুমু খাই—তারপর তোমার দু-কানের লতিতে।
অপার মুখটি লাল হয়ে উঠল—ব্লাশ করল সে। অগ্নিভ উঠে গিয়ে তাকে দু-হাতে আলতো করে জড়িয়ে ধরে তার দু-চোখে আর কানের লতিতে দু-টি করে চুমু খেল।
অপা দাঁড়িয়ে উঠেছিল। তার শরীরময় রক্ত ছোটাছুটি করতে লাগল। অপা বলল, আমার শরীরে গান বাজছে। স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ সব একসঙ্গে বেজে উঠেছে।
বলেই, অপা অনেকক্ষণ অগ্নিকে জড়িয়ে রইল। তার নরম স্তন অগ্নির দৃঢ় বুকে ঝড়ের পাখির মতো আশ্রয় খুঁজল। তারপর ভেজা চোখে অস্ফুটে বলল অপা, আমার স্বামী কোনোদিনও আমাকে এমন করে আদর করেনি।
—তো কী করে করেছে?
—শুয়োরে যেমন করে শটিখেত তছনছ করে, তেমন করে করেছে ফুলশয্যার রাত থেকে কাল রাত অবধি।
অগ্নি খুব জোরে হেসে উঠল। বলল, তুমি কচুবনে শুয়োর দেখেছ কখনো?
—দেখেছি বইকী। আমার মামাবাড়ি ছিল বহরমপুরের গ্রামে। রাতের বেলা কচুবনে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে কচুবন তছনছ করতে দেখেছি।
হাসতে হাসতে অগ্নি বলল, স্ত্রীকে আদর করার রকম দিয়েই, একজন পুরুষের পৌরুষকে বিচার কোরো না। ঘোষ সাহেব যখন শামলা গায়ে হাইকোর্ট সুপ্রিমকোর্টের বিপক্ষের তাবড় উকিল ব্যারিস্টারদের তাঁর সওয়ালে কচুকাটা করেন, সেটাও কিন্তু পৌরুষের মস্ত নিদর্শন। পুরুষ এবং অবশ্যই নারীরও একমাত্র কৃতিত্বের ক্ষেত্র তো, শোয়ার ঘর নয়।
—কিন্তু.................
—কিন্তু নয়, আমি জানি যে, অনেক মেয়ে ফ্রিজড। তাদের স্বামীরা তাদের কাছে যা-চায়, তা সারাজীবন পায় না—কিন্তু তা বলে তার জীবন, তার সংসার, তার সন্তান এসব কিছুই তো মিথ্যে হয়ে যায় না অপা। মানুষ তো পশু নয়। রমণ করাটাই তার একমাত্র কৃতিত্ব নয়—কী পুরুষের কী নারীর। মানুষের ‘মন’টাই সব। সব না হলেও জীবনের অনেকখানি। অন্তত আমাদের ভারতীয় ঐতিহ্যে। পশ্চিমি দেশের স্ত্রী-পুরুষ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শরীর-সর্বস্ব।
—কী বানিয়ে দেবেন বললেন দিন। আমি আজকে ড্রাঙ্ক হয়ে যাব।
—দিচ্ছি।
বলে, অগ্নি সেলারের দিকে এগিয়ে গেল। গ্লাসে ‘বাকার্ডি’ ঢেলে ফ্রিজের দিকে এগিয়ে গেল বরফ আর সোডার জন্যে।
তারপর ড্রিঙ্কটি বানিয়ে অপার কাছে এসে, একটি ন্যাপকিনে গ্লাসটি মুড়ে অপার দিকে এগিয়ে দিল। বলল, বোসো ওই চেয়ারে, বসে তারিয়ে তারিয়ে খাও। ড্রাঙ্ক হতে যাবে কোন দুঃখে? ড্রাঙ্ক হয় জীবনে অসফল, ফ্রাস্ট্রেটেট, হেরে-যাওয়া মানুষেরা।
—জিতে যাওয়া মানুষেরাও হয়। ফেইলিওরের মতো সাকসেসও মানুষকে ফ্রাস্টেটেট করে।
—বা:। খুব ভালো বলেছ তো কথাটা। এমন করে ভাবিনি কখনো।
—আপনাদের ঘোষ সাহেব-ই তো, এই স্পেসির জাজ্বল্যমান উদাহরণ একটি।
—ঘোষ সাহেব মানুষটি বড়োভালো। আই লাইক হিম। কোনো মানুষের-ই কি সব-ই গুণ থাকে, দোষ তো দু-একটা থাকবেই।
—সে-কথার উত্তর না দিয়ে অপালা বলল, আপনি কিছু নিলেন না? আমি বানিয়ে দেব?
—আজ থাক। আজ তুমিই আমার নেশা হও।
—বেশি, বেশি।
—কপট ভর্ৎসনার স্বরে বলল, অপা।
তারপরে বলল, না, আপনি একটা অন্তত ড্রিঙ্ক নিন। আমি আজ আপনার আদর খেতে এসেছি।
—আদর তো করলাম তোমাকে অপা।
—না।
তারপর চোখ মাটির দিকে নামিয়ে বলল, বড়ো আদর।
অগ্নি ছেলেমানুষের মতো হেসে উঠল। বলল বা: দারুণ তো শব্দটি।
—এই শব্দটিকে চালু করে দিতে হবে। যেমন চালু করব আঙ্গাপাঙ্গা শব্দটি।
—সেটা কী শব্দ?
অগ্নিভ জোরে হেসে উঠল বলল, ফ্যান্টাসটিক শব্দ একটা। বলব, বলব। পরে বলব।
তারপর নিজের জন্যে একটি ভদকা তৈরি করে নিয়ে এসে বলল, জীবনে কারওকে প্রথমবার আদর করতে হলে চার দেওয়ালের মধ্যে কখনো করতে নেই।
অপা অবাক হয়ে বলল, তাহলে? কোথায় করতে হয়?
—প্রকৃতির মধ্যে। ফুল, পাখি, গাছ-গাছালি, চাঁদ-তারাকে সাক্ষী রেখে। মানুষের ‘বড়ো আদর’ ব্যাপারটা তো একটা মহৎ ব্যাপার, শূকর-শূকরীর চর্মঘর্ষণ নয়,—তারজন্যে আয়োজন লাগে, শরীর মনে নহবতখানাতে সানাই বাজাতে হয়।
—আপনার ব্যাপার-স্যাপার-ই আলাদা।
—ব্যাপার-স্যাপার নয়, বলো স্টাইল।
তারপর বলল, তা বলতে পারো। আমি অন্য দশজনের থেকে আলাদা। আই কনটেইন মালটিট্যুডস।
আজকে তৃষা অফিসে যায়নি। মাঝে খুব-ই খাটনি গেছে। দিল্লি-মুম্বই-চেন্নাই দৌড়াদৌড়ি করে একেবারে ক্লান্ত। রুরুর কলেজের বাংলার এক অধ্যাপক কানকাটা স্যার আচম্বিতে বড়োবাজারের গলিতে তলপেটে এক ষাঁড়ের গুঁতো খেয়ে সাংঘাতিক আহত হয়ে হাসপাতালে তিনদিন ভুগে গতকাল সন্ধেতে মারা গেছেন। তাই আজ কলেজ ছুটি।
অরা যথারীতি স্কুলে গেছে।
সকালের জলখাবারের পরে ভাইবোনে বসবার ঘরে বসে গল্প করছিল। আজকাল ওরা প্রত্যেকেই, নিজের নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তৃষাকে তো প্রায় দেখাই যায় না। সাতসকালে বেরিয়ে যায় গভীর রাতে ফেরে। তবে কোম্পানির গাড়িই নামিয়ে দিয়ে যায়। এয়ারপোর্টে নিয়ে যাওয়া এবং ফিরিয়ে নিয়ে আসাও কোম্পানির গাড়িই করে। বিস্পতিদিকে বলে, ভাইবোনে আজ জম্পেশ করে লুচি, ঝাল-ঝাল আলুর তরকারি, বেগুন ভাজা আর পায়েস দিয়ে ব্রেকফাস্ট করেছে। তারপর দু-জনে বসে গল্প করছে।
তৃষা বলল, অগ্নিকাকা অনেকদিন আসে না, না রে? অগ্নিকাকা এলে বাড়ির পরিবেশটাই বদলে যায় যেন।
—যা বলেছিস। মা এতদিন স্কুলমাস্টারি করে কেমন বেরসিক, রাশভারী, রামগড়ুরের ছানার মতো গুরুগম্ভীর হয়ে গেছে।
—মা-ই তো আমাদের মানুষ করেছেন। মা-এর সম্বন্ধে, এমন হেলাফেলার কথা তোর বলা উচিত নয় রুরু। তুই বড়ো ইল-ম্যানার্ড, অ্যারোগান্ট হয়ে উঠেছিস দিনে দিনে।
—সরি। আই ডিড নট মিন টু হার্ট ইউ অ্যাণ্ড নট দ্যা লিস্ট মাই মাদার।
—জানি।
—তোর বাংলা ব্যাণ্ড কেমন চলছে?
—ভালোই। পরশু একটা প্রোগ্রাম আছে আমাদের খড়্গপুরে। ভোরে যাব সবাই বাসে করে আর গভীর রাতে ফিরব।
—মায়ের পারমিশান নিয়েছিস?
—আমি কি কিণ্ডারগার্টেনের ছাত্র? পারমিশানের কী আছে? তাও রাতে তো আর বাইরে থাকছি না।
—এটা কি নতুন ব্যাণ্ড?
—হ্যাঁ।
—পুরানোটা ছাড়লি কেন?
—আরে শীদাদার জন্যে। চোখের সামনে মানুষটা মেগালোম্যানিয়াক হয়ে গেল। আমরা সকলে মিলে বড়ো করলাম ব্যাণ্ডটাকে, আর তাঁর ধারণা হয়েছে, তিনি একাই এর সাকসেস-এর মূলে। ‘মেগলোম্যানিয়া’টা একটা অসুখে দাঁড়িয়ে গেল।
—তা ঠিক। এই রোগটা প্রায় মহামারির চেহারা নিয়েছে সমাজের সর্বত্র। অথচ কলেরা-টাইফয়েড তো নয় যে, ইনজেকশান দিয়ে ভালো করা যায়!
তৃষা বলল।
—ওষুধ যে, ছিল তা নয়। ছিল।
—কী?
—আড়ং ধোলাই। তবে আমরা ওঁকে স্পেয়ার করলাম।
—কেন?
—ওর ওল্ড টাইমস সেক।
—ভালোই করেছিস।
—তা তোদের নতুন ব্যাণ্ডের নাম কী?
—কেঁচে গন্ডূষ।
—কী নাম বললি?
—বললাম-ই তো, ‘কেঁচে গন্ডূষ।’ কেন? ভালো হয়নি নামটা?
—দুর্দান্ত।
তৃষা বলল।
তারপর বলল, তোদের নতুন ব্যাণ্ডের গান শোনাস একদিন। তোর লেখা গান আছে কোনো?
—নেই? অবশ্যই আছে।
—কী গান? শোনাবি?
—গিটার-ফিটার ছাড়া তো জমবে না।
—গানের কথাটা শোনা অন্তত। প্রথম লাইনটা—প্রথম লাইনটা, রঘুদাদুর কবিতার থেকে মারা।
—রঘুদাদু কে?
—আরে, রুদ্র পলাশের দাদু। রঘু ব্যানার্জি।
—শোনা না, অতকথা না বলে।
এক ঠোঙা খাবার নিয়ে যায় মতিলালতাই দেখে দূর থেকে মারলে ছোঁ চিল
—এটা আবার কী কবিতা?
—কেন ‘দেশ’-এ কি এর চেয়ে খুব ভালো কবিতা বেরোয় নাকি প্রতি সংখ্যাতে? চিলের ‘ল’ আর মতিলালের ‘ল’-তে মিল নেই?
তৃষা হো হো করে হেসে উঠল। তারপর বলল, পরের লাইনগুলো বল।
চিলকে দেখে বাচ্চা মামা উড়িয়ে দিল ঢিলতাই না দেখে মামার মামা পিঠে ঝাড়ল কিল।
—তৃষা বলল, বা: বাংলা কাব্য-সাহিত্যের ভবিষ্যৎ অতীব উজ্জ্বল।
—বাংলা কাব্য-সাহিত্য-সংগীতের লোকাল গার্জেন তো, এখন একটি সর্বজ্ঞ মিডিয়া। তাঁদের হাতেই তো ভুবনের ভার।
—সেই হচ্ছে কথা। আ কান্ট্রি গেটস আ মিডিয়া ইট ডিসার্ভস।
—রুরু তারপর বলল, দ্যাখ দিদি, মাকে ক-দিন হল কেমন মন-মরা দেখছি। কেন? তুই কি জানিস?
—কী করে বলব বল? টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো টেনশান হচ্ছে কি?
—জানি না। মা তো কিছু বলেন না।
—আমি কি বলব কিছু অগ্নিকাকাকে?
—মা জানলে রাগ করতে পারেন।
—মা জানবেন না।
—আমি কিন্তু মাকে মাসে আরও আড়াই হাজার করে দিতে পারি। আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখুনি অত ভাববার দরকার নেই। ভবিষ্যৎ-এর ভাবনা ভাবার এখনও সময় আসেনি।
—আমিও পারি মাকে হাজার খানেক করে দিতে।
—তোর টিউশনির টাকা? মা নিলে তো?
—তবে অগ্নিকাকাকেই বলব। উনি তো আমাদের বাবার-ই মতো।
—মা বলেন, ‘বাবার মতো’ আর ‘বাবাতে’ তফাত আছে।
—জানি।
—দিদি। তোকে একটা কথা বলব? এ কথাটা তোর মনেও আমার থেকে অনেক-ই আগে এসেছে নিশ্চয়ই।
—কী?
—মা, অগ্নিকাকাকে বিয়ে করলেন না কেন? অগ্নিকাকাই তো, বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পর থেকে আমাদের বাবার-ই মতো আগলেছেন। উনি না থাকলে আমাদের কী যে, হত তা কে বলতে পারে!
—কথাটা মনে আসেনি তা নয়। বহুবছর আগে থাকতেই এসেছে। কিন্তু ব্যাপারটা মা আর অগ্নিকাকার পার্সোনাল ব্যাপার। আমাদের এক্তিয়ার নেই ও ব্যাপারে কথা বলার।
—কিন্তু দু-জনে, দু-জনকে ভালো তো বাসেন।
—তাতো অবশ্যই বাসেন। এমন শুদ্ধ পবিত্র ভালোবাসার কথা আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ভাবতেই পারি না।
—তা ঠিক।
—তোর সঙ্গে হর্ষদদার কখনো ফিজিক্যাল রিলেশান হয়নি? সত্যি করে বল তো?
—হয়েছিল। মাত্র একবার-ই। এবারে যখন পুণেতে গেছিলাম। আমি বলেছিলাম, বিয়ে অবধি অপেক্ষা করো। তাতে আমাদের সম্পর্কের মাধুর্য আরও বাড়বে।
—ও কী বলল?
—তোরা ছেলেরা বড়ো অবুঝ, অধৈর্য, ছেলেমানুষ। তোরা যাই-ই চাস এখুনি চাস। তোদের তর সয় না কিছুতেই।
—এতে তোদের সম্পর্কটা কি আগের থেকে গভীর হয়েছে?
—গভীর হয়েছে কি না বলতে পারব না কিন্তু শরীরের স্বাদ পাওয়ার পর আমারও ইচ্ছে করেছে, করে, যে আবারও পাই। বাঘ যেমন মানুষের রক্তর স্বাদ পেলে আবারও মানুষ খেতে চায়, শরীরও বোধ হয় শরীরের স্বাদ পেলে আবারও পেতে চায়। ভালোবাসাতে শরীরেরও যে, একটা মস্ত ভূমিকা আছে, তা সে-সম্পর্ক হওয়ার আগে পর্যন্ত বোঝা যায় না।
—মানে?
—আগে হর্ষদের প্রতি ভালোবাসার রকমটা অন্য ছিল, এখন আর একরকম হয়েছে। এত কাকুতিমিনতি করল, এমন কাঙালের মতো করল যে, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। ওর কাঙালপনাটা এখন আমার মধ্যেও চারিয়ে গেছে।
—তবে? মাও তো তোর-ই মতো একজন মেয়ে, অগ্নিকাকাও হর্ষদদার মতো একজন পুরুষ। ওঁরা দু-জনে সম্পর্কটাকে এমন স্বর্গীয় করে রাখলেন এতবছর কী করে?
—জানি না। তবে যেভাবেই তা করে রাখুন না কেন, দু-জনেরই যে, খুব-ই কষ্ট হয়েছে হয়, তাতে কোনো সন্দেহই নেই।
—ওঁরা হয়তো ভাবেন যে, আমরা ওঁদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটাকে মেনে নিতে পারব না, আপত্তি করব। আমাদের কি উচিত নয়, ওঁদের দু-জনকেই জানিয়ে দেওয়া যে, আমরা কিছুমাত্রই মনে করব না।
—ওরে বাবা! কে বলবে? বিশেষ করে মাকে? হু উইল বেল দ্যা ক্যাট?
—তা অবশ্য ঠিক।
ওরা সকলে বসে আছে। চোখের সামনে সূর্য ডুবছে। ঝুরুঝুরু করে হাওয়া দিচ্ছে একটা। কোকিল আর পিউ কাঁহা ডাকছে বুকের মধ্যে চমক তুলে।
নরেশ বলল, অগ্নি আর আপনার ওয়াইফ কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন ব্যারিস্টার সাহেব? বিকেলে বেড়াতে তো গেছিলাম আমরা সকলেই।
—যেখানে গেছে যাক। কিণ্ডারগার্টেনের ছাত্র তো নয়।
নরেশ বলল, তা নয়। তবে এখানে আজকাল এম.সি.সি.-র ছেলেদের দৌরাত্ম্য আরম্ভ হয়েছে নাকি।
ব্রতীন বলল, যতটা রটনা ততটা ঘটনা নয়। বেড়াতে-আসা মানুষদের ওরা কিছুই বলে না। আমরা ওদের শ্রেণিশত্রু নই।
—তা নই। কিন্তু যদি একবার জেনে যায় যে, ডাকসাইটে ব্যারিস্টার ঘোষ সাহেবের স্ত্রী অপালা দেবী তবে তাঁকে কিডন্যাপ করে মোটা র্যানসাম মানি দাবি করতে পারে।
ব্রতীন বলল, আপনার কোনো টেনশান হচ্ছে না ঘোষ সাহেব? পাঁচটা নয়, দশটা নয়, একটামাত্র বউ।
—আরে মশাই! যদি কেউ নিয়েই যায় তবে র্যানসাম চাইতে হবে না, আমি তাকে এমনিতেই মোটা অঙ্কের চেক লিখে দেব। বিয়ে তো করেননি আপনাদের কেউই। ‘‘কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কীসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।’’
তৃষা বলল, ‘আশীবিষ’ মানে কী মেসোমশাই? আমি বিজ্ঞাপনের কপি রাইটিং করি, বাংলাতেও করি অথচ এই শব্দটি তো কখনো পাইনি।
—কী করে পাবি মা! তোরা কি মাইকেল পড়েছিস?
রুরু বলল, মাইকেল জ্যাকসন? তিনি আবার বইও লিখেছেন নাকি? স্ট্রেঞ্জ!
ব্রতীন, নরেশ, অরা সকলেই একইসঙ্গে জোরে হেসে উঠল রুরুর কথা শুনে।
ঘোষ সাহেব বললেন, মাইকেল মানে মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ব্যারিস্টার ছিলেন, মানে, সেম ফ্লাটার্নিটির মানুষ বলেই যে, তাঁর লেখা পড়েছি তাই নয়, বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁদের কারবার তাদের পক্ষে মাইকেল পড়াটা একটা মাস্ট। আমি বেশি কিছু পড়িনি, তবে ওটি পড়েছি।
—ব্রতীন বলল, রুরু তোরা তো বাংলা ব্যাণ্ড, লিটল ম্যাগ, নাটক-টাটকও করিস-টরিস, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তর জামাই মেঘনাদের একক অভিনয়ও দেখিসনি? মেঘনাদবধ কাব্য থেকে একটি অংশ নিয়ে করা?
রুরু কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থাতে থেকে বলল, মোসোমশাই যে, মেঘনাদবধ কাব্যর কথা বললেন একটু আগেই। মেঘনাদ যদি মরেই যাবে তাহলে আবার নাটক করবে কী করে!
অরা খুব লজ্জিত হল রুরুর অপার অজ্ঞতাতে। অস্ফুটে বললেন, ছি: ছি:। আমার ছেলেমেয়েগুলোযে, কী হল। ম্যাকলাস্কিগঞ্জের অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানরাও বোধ হয় এদের চেয়ে বেশি বাংলা জানে। তারপর বলল, ব্রতীনবাবু, রুদ্রপ্রসাদের জামাই মেঘনাদ ভট্টাচার্য নয়, তার পদবি হালদার এবং নামও মেঘনাদ নয়। নাম, গৌতম।
নরেশ বলল, মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্ত্রী কিন্তু অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ছিলেন। অপরূপ সুন্দরী। নাম ছিল হেনরিয়েটা।
ব্রতীন বলল, আমাদের একেবারে ছেলেবেলাতে যে, বাংলা ছবিটি এসেছিল মাইকেলের জীবনী অবলম্বন করে তাতে হেনরিয়েটাকে উদ্দেশ্য করে গাওয়া মধুসূদন দত্তর চরিত্রের অভিনেতার মুখে একটি গান ছিল মনে আছে অরা দেবী?
—কোন গান?
—‘‘তুমি যে আমার কবিতা’’।
—না। আমি ছবিটি দেখিনি।
তারপর বলল, অরা মানবী হতে পারে কিন্তু দেবী হলাম কী করে!
ঘোষসাহেব বললেন, যারাই আপনার সংস্পর্শে এসেছে, তারাই আপনার দেবী-মাহাত্ম্য সম্বন্ধে অবহিত। তাই আপনা থেকেই সম্বোধনে দেবী বেরিয়ে আসে।
—খুব-ই বিপজ্জনক কথা। আমি অতিসাধারণ মানবী, দয়া করে আপনারা কেউই আমাকে দেবী বলবেন না।
বলেই বলল, এবারে কিন্তু আপনাদের ওদের খোঁজে যাওয়া উচিত। মুখার্জিবাবুকে ডেকে নিয়ে টর্চ নিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলে কি ভালো হয় না, ঘোষসাহেব? শুনেছি আপনার কাছে তো পিস্তলও আছে।
ঘোষসাহেব হেসে বললেন, যাক না। যারা ইচ্ছে করে হারিয়ে যায় তাদের খুঁজতে যাওয়ার মতো মূর্খামি আর নেই। তা ছাড়া, অপালা তো সারাজীবন আমার মতো কাঠখোট্টা মানুষের সঙ্গেই জীবনটা কাটাল। অগ্নির মতো একজন পুরুষের মতো পুরুষের সঙ্গে এই অনন্তকালের মধ্যে দু-দন্ড কাটাতে চাইলে কাটাক-ই না।
অরা বলল, ওরা নিশ্চয়ই পথ ভুলে গেছে।
—হয়তো গেছে। কিন্তু পথ ভোলা শব্দটা দ্ব্যর্থক। পথ হয়তো ভুলেছে কিন্তু তা ম্যাকলাস্কির পথ নয়।
আপনার মতো উদার স্বামী পাওয়া খুব-ই সৌভাগ্যের কথা। আশিস কিন্তু ভীষণ-ই পজেটিভ ছিল আমার ব্যাপারে আর জেলাস ছিল, বিশেষ করে অগ্নির ব্যাপারে। আর বিধাতার কী লীলাখেলা দেখুন। সেই অগ্নিই তৃষা আর রুরুর গডফাদার হয়ে এল, ওর হঠাৎ চলে যাওয়ার পরে।
ঘোষসাহেব বললেন, আমি উদার কি না জানি না। তবে আমি নর্মাল। অনেক দিন আগে ‘স্বামী হওয়া’ নামের একটি গল্প পড়েছিলাম কোনো সাপ্তাহিক পত্রিকাতে। অসাধারণ গল্প মশাই। সেই গল্পে স্ত্রী, স্বামীর এক অল্পবয়সি ব্যাচেলার সহকর্মীর সঙ্গে অ্যাফেয়ারে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ছেলেটি যথেষ্ট মাখামাখির পর, তার বাড়ির পছন্দে বিয়ে করে অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কটিকে ছিঁড়ে ফেলে।
—আমিও পড়েছি গল্পটা।
ব্রতীন বলল।
অরা বলল, তারপর?
—তারপর অপমানিত, আহত, ব্যথিত স্ত্রী একরাতে তার স্বামীর কাছে ভেঙে পড়ে ক্ষমা চায় তার কৃতকর্মের জন্যে। স্বামী বলে, তুমি তো আমাকে কোনোভাবেই ঠকাওনি। আমার প্রাপ্য এবং চাহিদার, তার সবটুকু মিটিয়ে তোমার যা-উদবৃত্ত, তা থেকে অন্যকে যদি কিছু দিয়েও থাকো, এবং দিয়ে খুশি হয়ে থাকো তবে আমার আপত্তির কী থাকতে পারে!
ব্রতীন বলল, শেষলাইনটা বলুন ঘোষসাহেব।
—আপনিই বলুন।
—সেই স্বামী বলছেন, যেদিন উলুধ্বনির মধ্যে, সানাইয়ের সুরের মধ্যে, গুরুজনদের আশীর্বাদে ধন্য হয়ে, একটি নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম, সেদিন আমি ‘বর’ হয়েছিলাম। আর আজ এতদিন পরে ‘স্বামী’ হলাম।
—‘স্বামী হওয়া’ আমি পড়িনি কিন্তু এরকম-ই একটি গল্প পড়েছিলাম, ‘বাবা হওয়া’। সন্তানের জনক হওয়া আর বাবা হওয়াতে অনেক-ই তফাত।
ঘোষসাহেব বললেন, আমরা এই তিন মক্কেলের কেউই তো, বাবা হতে পারলাম না, তাই ‘বাবা হওয়া’ গল্পের সারমর্ম আমাদের উপলব্ধি করা হল না। তাই সে-প্রসঙ্গ না হয় থাক।
অন্ধকার নেমে-আসা জঙ্গলের মধ্যের একট চ্যাটালো কালো পাথরের ওপরে চিত হয়ে অপা শুয়েছিল। বিবস্ত্রা। পাশে দাঁড়ানো অগ্নি কেটে কেটে, সামান্য উত্তেজিত গলাতে বলল, চলো, এবারে ফেরা যাক। যেতেও মিনিট কুড়ি লাগবে। যদিও চাঁদ উঠেছে তবে সবে গরমটা পড়েছে। সাপ, বিছে আছে।
অপার জামাকাপড় পরা হয়ে গেছে, অগ্নির পাশে এসে অগ্নিকে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল শব্দ করে অপা।
—ভালো লেগেছে তোমার?
অগ্নি বলল।
—এখন কথা বোলো না। চলো, এগোই।
তারপর বলল, তোমার জীবনে এই কি প্রথম অভিজ্ঞতা?
—মিথ্যে বলব না। প্রথম নয়।
কিন্তু অরার সঙ্গে একদিনও হয়নি এ অভিজ্ঞতা?
—হয়তো বিশ্বাস করবে না। হয়নি। ও আমাকে ওর কুলুঙ্গির ঠাকুর করেছে। আমাকে সে, বিছানাতে পেতে চায় না।
—বিছানাতে না পেতে চাক, এমন বনের মধ্যে তো পেতে পারত?
পারত হয়তো। কিন্তু চায়নি।
ওই স্বল্প আলোতেও সদ্যতৃপ্ত শরীরের সব আনন্দ, অপালার মুখে এক জ্যোতি দিয়েছিল যা, শরীরের পূর্ণ পরিতৃপ্তির পরেই শুধু আসে। যারা জানেন, তারাই শুধু জানেন, বিশেষ করে, মেয়েরা।
অগ্নি বলল, ওরা সবাই খুব চিন্তা করছে।
—তুমি শুধু চিন্তা করাটার কথাই ভাবছ? ওরা কী মনে করছে তা ভাবছ না একবারও?
—তোমার জন্যেই তো এতদেরি হল। পথের কাঙালিরাও এমন করে চেটেপুটে খিচুড়ি খায় না। আমিও বুঝতে পারলাম যে, তুমি বড়োই উপোসি ছিলে।
—উপোসি ছিলাম না। কচুবনে শুয়োরের আবির্ভাব তো ঘনঘনই হয়। কিন্তু আমার শরীরের বনে বাঘ তো আসেনি এর আগে। কখনোই আসেনি। আমি জানি না, কী করে তোমাকে ধন্যবাদ জানাব। আমি তোমার জন্যে সব করতে পারি। ঘরও ছাড়তে পারি।
—ঘর ছাড়ার মতো সোজা কাজ আর কী আছে? তা ছাড়া ঘোষ সাহেবের মতো এমন দেবতুল্য স্বামী।
—দেবতুল্য না ছাই।
—ছি:। উনি একজন চমৎকার মানুষ। একজন মহৎ, উদার মানুষ। তাঁর একটি অপূর্ণতার জন্যে, পুরো মানুষটাকে কি বাতিল করা যায়? জানি না, তুমি বুঝতে পারবে কি না বললে, আমরা প্রত্যেকেই খন্ড মানুষ। রবীন্দ্রনাথ যে, ‘পূর্ণ-মনুষ্যত্ব’র কথা বলতেন, তাঁর শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, তা চারিয়ে দিতে চাইতেন, তা আদর্শ হিসেবে অবশ্যই গ্রহণীয়। কিন্তু এই পৃথিবীতে এই জীবনে, ‘পূর্ণ মানুষ’ ক-জন হতে পারে? ক-জন নারী বা পুরুষ? এ-জীবনে আমার দেখা নারী পুরুষদের মধ্যে, একমাত্র অরাকেই পূর্ণ মনুষ্যত্বের কাছাকাছি আসতে দেখেছি। ও আমাকে ওর কুলুঙ্গির ঠাকুর করেছে। ও বলে যে, কিন্তু আসলে ও নিজেই আমার মনে দেবীর আসনে অধিষ্ঠিতা।
একটু পরে অগ্নি বলল, আসলে আমরা প্রত্যেকেই ‘খন্ড’ মানুষ। আমার একটি গুণে তুমি অভিভূত হলে, আমার যে, কত দোষ তার কোনো খবর-ই তুমি রাখো না। ঘোষ সাহেবকে তুমি অসম্মান কোরো না কখনো। উনি একজন আশ্চর্য মানুষ। ওনাকে যত দেখছি ওনার প্রতি শ্রদ্ধা ততই বাড়ছে।
একটু চুপ করে থেকে বলল, দেখে চলো, পড়ে যেয়ো না।
অপালা বলল, পড়ে তো গেছিই। এখন আর দেখে চলে লাভ কী?
ব্রতীন বলল, সত্যিই তো অনেক-ই দেরি হয়ে গেল। না: এবারে একটা কিছু করতে হয়। মুখার্জিবাবুকে ডাকি? ঘোষসাহেব আপনাকেও উঠতে হবে। আপনার সঙ্গে পিস্তল আছে?
—ওরে বাবা। আমি মোটা মানুষ। অনেক হাঁটা হয়েছে বিকেলে। আমার দ্বারা আর হাঁটাহাঁটি সম্ভব নয়। তা ছাড়া আমার আহ্নিকেরও সময় হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। পরস্ত্রী হলেও না, হয় কথা ছিল। নিজের স্ত্রীকে গোরু খোঁজা খুঁজতে, অতকষ্ট করার মধ্যে আমি নেই। তা ছাড়া ইংরেজিতে একটা কথা আছে না?
—কী কথা?
—‘‘দেয়ার ইজ নো পয়েন্ট ইন ট্রাইং টু ডু সামথিং হোয়েন দেয়ারস নাথিং টু বি ডান।’’
—আপনাকে কিছু বলার নেই। আশ্চর্য মানুষ আপনি।
নরেশ বলল।
ব্রতীন বলল, কিছু বলতে যাসও না। ওদের একটু আলগা থাকতে দে-না।
পরের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাতে হস্তক্ষেপ করাতে আপনাদের এত উৎসাহ কেন মশায়? ঘোষ সাহেব বললেন।
তারপর-ই বললেন নরেশকে, আপনারা শিভালরি দেখাতে যেখানে খুশি যান স্যার, যাওয়ার আগে আমাকে একটা বড়ো করে হুইস্কি সেজে দিয়ে যান।
—আশ্চর্য মানুষ তো আপনি। আপনার-ই তো স্ত্রী। আর আপনার-ই কোনো হেলদোল নেই?
—আহা। সে তো যোগ্যজনের সঙ্গেই আছে। কিডন্যাপড তো আর হয়নি।
ইতিমধ্যে শোরগোল শুনে মুখার্জিবাবু নিজেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন।
নরেশ বলল, আপনারা টর্চটা নিয়ে একবার আসবেন আমাদের সঙ্গে?
—কী হল?
—না, অগ্নিবাবু আর অপালা দিদি এখনও ফেরেননি।
নিরুদবেগ গলাতে উনি বললেন, ফিরে আসবেন। চাঁদের আলো আছে। জঙ্গলে এই সময়ে হেঁটে বেড়াবার মজাই আলাদা।
—আর এম.সি.সি.-র ছেলেরা?
—ওরা সব ভালো ছেলে। আমাদের অতিথিদের কোনো ক্ষতি করবে না।
—একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলে হত না? ঘোষসাহেবের কাছে পিস্তলও আছে।
—আস্তে বলুন। ওরা জানতে পারলে, ওটিকে ট্যাঁকস্থ করবে। তা ছাড়া পিস্তল-ফিস্তল আজকাল কোনো কাজে আসে নাকি? ওরা সব এ.কে. ফর্টিসেভেন আর ল্যাণ্ডমাইনের কারবারি। তাও আবার রিমোট কন্ট্রোলে এক্সপ্লোশান ঘটায়।
—তাই নাকি?
নরেশ বেশ ভয়ার্ত গলাতে বলল।
ঘোষসাহেব হুইস্কির গ্লাসে একটু চুমুক দিয়ে তৃষাকে বললেন, একটা গান শোনাত মা। তোর মা তো আমার কথাতে গাইবেন না।
রুরু বলল, তাহলে কার কথাতে গাইবেন?
অগ্নিবাবু বললে গাইতেও বা পারেন।
—গাইতে ইচ্ছে করছে না। করলে, আপনি বললেও গাইতাম।
শেষপর্যন্ত ওরা কেউই অগ্নি আর অপালাকে খুঁজতে গেল না, মুখার্জিবাবুর কথা মেনে নিয়ে। এবং বলাই বাহুল্য, সকলেই আহ্নিক শুরু করে দিলেন।
তৃষা বলল, দেখেছ মা, জঙ্গলের মধ্যে আলো-ছায়া মিলে, কেমন রহস্যর বাতাবরণ তৈরি হয়েছে।
—হুঁ।
অরা অন্যমনস্ক গলাতে বলল। অগ্নি যে, অপালাকে নিয়ে রাতের জঙ্গলে ঘুরছে সেজন্যে তার কোনোই উত্তেজনা ছিল না। অগ্নি সম্বন্ধে অরা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, ওর মনে কোনোকিছুই হচ্ছিল না। ঘোষ সাহেবের মনেও হল না বলেই, মনে হল অরার।
ঘোষসাহেব বললেন, কী হল তৃষা? গান হবে না একটা? রবীন্দ্রসংগীত?
—কোনটা গাইব মা? ‘‘তুমি কিছু দিয়ে যাও’’?
—ওটা তো সকালের রাগের গান। অন্য কোনো গান গা।
অরা বলল।
—তাহলে ‘ও চাঁদ তোমায় দোলা দেবে কে’ গাই?
—গাও।
তৃষা গান ধরল। সকলে মাথা নেড়ে হাতে তাল দিয়ে, সেই গান অ্যাপ্রিসিয়েট করতে লাগলেন। অরা ছাড়া। ঘোষসাহেব সামনে কনফিডেন্টলি বেতালে তাল দিয়ে যেতে লাগলেন।
এমন সময়ে গেট দিয়ে অগ্নি আর অপালাকে আসতে দেখা গেল।
ওঁরা সকলেই একসঙ্গে ওদের আক্রমণ করল—ঘোষসাহেব ও অরা ছাড়া।
ওরা কাছে এলে অরা লক্ষ করল যে, অপার শাড়িটা ক্রাশড যে, শুধু তাই নয়, পেছন দিকে ধুলো-বালি-খড়কুটো লেগে আছে।
অপা বলল, কী যে, মিস করলি তুই অরা। কী অপূর্ব সানসেট যে, দেখলাম।
—জীবনে এতকিছু অপূর্ব দৃশ্য আছে, এতসব জায়গা, এতসব অনুভূতি, সব-ই কি, একজীবনে পাওয়া যায়? তৃষাদের মোবাইল ফোনের-ই মতো জীবনটা, প্রত্যেকের জীবন-ই ‘মিসড কল’-এ ভরা। ‘মিসড কল’-এই ঝুড়ি ভরে ওঠে জীবনের। সব ডাকে, সবার ডাকে কি সবসময় সাড়া দেওয়া যায়? বল তুই? অনেক কিছুই ছেড়ে দিতে হয়, হারাতে হয় জীবনে।
অরার বক্তব্যর অনেকখানিই হয়তো, অপালার সেই ঘোরলাগা অবস্থাতে ওর মাথার উপর দিয়ে চলে গেল। কিন্তু অন্য সকলেই অরার কথা শুনে একইসঙ্গে বলে উঠলেন, ভেরি ওয়েল সেইড ইনডিড।
অপালা ঘোষসাহেবের দিকে ফিরে বলল, তুমিও খুব মিস করলে কিন্তু। অন্য সকলেই, বিশেষ করে তৃষা ও রুরু। ব্রতীনবাবু তার বন্ধু ইন্দ্রজিৎবাবুর কাছ থেকে, এই জায়গাটার সব গলি-অলি চিনে রেখেছেন। ব্রতীনবাবু জায়গাটার হদিশ না দিলে তো আমরা খুঁজেই পেতাম না।
—আমি!
অবাক গলাতে বলল ব্রতীন। তারপর আরও কিছু বলতে গিয়ে চুপ করে গেল।
ঘোষসাহেব বললেন, আমি কিছুই মিস করিনি। তুমি সেই একটা গান গাও না? ‘‘তুমি সুখী হলে আমি সুখী হই’’, না-কী যেন। আমার সেই কথা।
অগ্নি চুপ করেছিল। অপার সুগঠিত শরীরের ঘ্রাণ, মসৃণ ত্বকের স্পর্শ, তার আশ্লেষ তাকে তখনও আচ্ছন্ন করেছিল। কত বছর পরে যে, সে নারীসঙ্গ করল। মন-বিবর্জিত শরীরে যাওয়া আর দেহপসারিনির কাছে যাওয়া একই ব্যাপার। কিন্তু পুরুষকে বিধাতা বড়োভঙ্গুর করে গড়েছেন। বড়ো দুর্বল। তাই মহাজ্ঞানী গুণী পুরুষকেও-তাঁর পিপাসা তেমন তীব্র হলে-তাঁর দেহ বড়ো বেশিদিন উপোসি থাকলে, অমন জায়গাতেও যেতে হয়। নয়তো তিনি এমন কিছু করে বসেন, যা অভাবনীয়। তাঁর ভাবমূর্তি তাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু প্রাণ তো বাঁচাতেই হবে। পুরুষের অসহায়তার কথা শুধু অন্য একজন পুরুষ-ই বুঝতে পারে।
—জায়গাটা কোন দিকে? অনেক দূরে?
নরেশ প্রশ্ন করল।
—অগ্নি কোনো বিশেষ দিক না দেখিয়ে আঙুল তুলে বলল ওইদিকে। সে-দিকটা যে-কোন দিক তা কেউই বুঝতে পারল না। আসলে কোনো সানসেট পয়েন্টেই তো যায়নি ওরা। ম্যাকলাস্কিতে কোনো সানসেট পয়েন্ট নেইও, নেতারহাটের ‘ম্যাগনোলিয়া’ পয়েন্টের মতো। ওরা নিজেদের শরীরের চাঁদ-সূর্য নিয়ে খেলা করতেই ব্যস্ত ছিল। অগ্নি ভাবছিল, শরীরের মধ্যে যে, কী গভীর আনন্দ থাকে তা তো দুই সন্তানের মা অরা, ভালো করেই জানে। তবু কেন, কী করে, সে নিজেকে এবং অগ্নিকেও এমন করে বঞ্চিত করে রাখল? এইজন্যেই বোধ হয় কথা আছে— ‘‘শ্রীয়াশ্চরিত্রম দেবা না জানন্তি, কুতো মনুষ্যা:’’।
ঘোষসাহেব বললেন, এতক্ষণে তো শান্তি হয়েছে আপনাদের। নিন আমার গ্লাস শেষ। আর একটা সাজুন দেখি। ভেবেছিলাম এম.সি.সি.-র ছেলেগুলো উঠিয়ে নিয়ে যাবে, তা-না দেখি, দিব্যি ফিরে এল। আরে বউ তো আমার, আমার নিজের কোনো টেনশান ছিল না, আর এই ব্রতীনবাবুরা টেনশানে মরে গেলেন।
পরস্ত্রী সম্বন্ধে পরপুরুষ মাত্রই অত্যন্ত কনসার্নড। তাঁদের ভালোমন্দর চিন্তা, নিজের স্ত্রীর ভালোমন্দর চেয়ে অনেক বেশি মথিত করে ওঁদের।
ঘোষসাহেব পাইপটা মুখ থেকে নামিয়ে জোরে হেসে উঠলেন।
নরেশ ওঁর গ্লাসটা নিয়ে আবার ভরে দিয়ে বলল, আচ্ছা খ্যাপা লোক ঘোষসাহেব আপনি। ওরা নিয়ে গেলে র্যানসাম তো আপনাকেই দিতে হত।
—ওরা জানত কী করে যে, অপালা আমার বউ। ওরা ভাবত সে, অগ্নির বউ। তা ছাড়া জানলেও র্যানসাম আমি থোড়াই দিতাম?
—হ্যাঁ। তাই ভাবছেন!
অপালা অরার পাশের চেয়ারে উঠে এল, তৃষা আর রুরু ভেতরে চলে গেল। বড়োদের কথার মধ্যে থাকাটা অরা পছন্দ করে না। খাওয়ার আগে, ওরা দু-জনে ঘুমিয়েও নেবে একটু। অনেক হাঁটাহাঁটি হয়েছে। অভ্যেস তো নেই।
অরা পূর্ণদৃষ্টিতে অপার মুখে চাইল।
অপালাকে অপরাধী অপরাধী দেখাচ্ছিল।
অপা অরার এই উদাসীনতাতে অবাক হল। ও ভেবেছিল, অরার চোখে রাগ বা ঘৃণা বা কোনো মিশ্র অনুভূতি দেখতে পাবে কিন্তু দেখল, অরা তেমন-ই উদাসীন এবং অপার প্রতি অপার প্রীতিময়ী।
অরা শুধু ফিসফিস করে, প্রায় অপার কানে-কানেই বলল, একটা সিল্কের শাড়ি পরে গেলেই পারতিস, তাঁতের শাড়ি না পরে।
ধরা-পড়া অপার মুখ লজ্জায় এবং অপরাধে লাল হয়ে গেল। রক্ত উঠে এল ওর গালে।
উত্তর না দিয়ে ও মুখ নামিয়ে নিল।
ঘোষসাহেব অগ্নিকে বললেন, একটা গান শোনান তো মশাই। কোথায় যে, আমার বউকে নিয়ে ভাগলবা হলেন, আর তা নিয়ে আপনার দুই বন্ধুর কী নার্ভাসনেস। আরে! যার সম্পত্তি, তাঁর-ই নেই কোনো মাথাব্যথা, এঁরা ভেবে ভেবে কপালের শিরা ফাটালেন। টিপিক্যাল বাঙালি! নিন, গান ধরুন একটা, নইলে আমি কিন্তু সেই ঘুঘু পাখির গানটা আবার গেয়ে দেব।
সকলেই বলল, তা হোক-না গানটা। ও গান তো হাজারবার শোনা যায়। তা ও গান শিখলেন কোথায়?
—চাটুজ্যে শিখিয়েছিল।
—তিনি কে?
—সে ছিল আমার গল্ফ খেলার পার্টনার। টলি ক্লাবে। একটা বিদেশি কোম্পানির সি.ই.ও ছিল। এক রবিবার খেলার পরে আমরা খড়ের চালের গোলঘরের নীচে বসে বিয়ার খাচ্ছি, তখন খোনা চাটুজ্যে গানটা শুনিয়েছিল।
—উনি কি খোনা ছিলেন?
—একটু। দেশ ছিল খন্যানে। বড়োলোকের মেয়েকে বিয়ে করে বিলেতে গিয়ে, এঞ্জিনিয়ারিং আর এম বি এ পড়ে এসেছিল। খুব আমুদে মানুষ ছিল চাটুজ্যে। মারা গেছে প্রায় পনেরো বছর। আমি গল্ফ খেলা ছেড়ে দিয়েছি চোদ্দো-পনেরো বছর হল। তারপরেই তো এই ভুঁড়ি।
—তা ছাড়লেন কেন?
ব্রতীন বলল।
—সময় কোথায়? তা ছাড়া, তখন সপ্তাহে দু-তিনদিন বিভিন্ন হাইকোর্ট এবং সুপ্রিমকোর্টে যেতে হত। জীবনে এখন সব-ই আছে শুধু সময়-ই নেই।
ঘোষসাহেবের দিকে চেয়ে অগ্নির অপালার বর্ণনা দেওয়া কচুবনে শুয়োরের ঘোঁতঘোতানির কথা মনে হচ্ছিল। হাসিও পাচ্ছিল আবার দুঃখও হচ্ছিল। ঘোষ সাহেব মানুষটা যে, বড়ো ভালো।
ঘোষসাহেব বেশিক্ষণ চুপ করে থাকার পাত্র নন।
আবার বললেন, কী হল? গানটা কী হল অগ্নিবাবু?
অগ্নি একবার আড়চোখে অরা এবং অপলার দিকে চেয়ে শুরু করল—
কলঙ্কেতে ভয় কোরো না বিধুমুখী
যে যা বলে সয়ে থেকো
হয়ে আমার দুখে দুখি।
মাতঙ্গ পড়িলে জলে,
পতঙ্গেতে কী না বলে,
কণ্টকেরি বনে গেলে কাঁটা ফোটে পায়
তাই বলে কি বিধুমুখী অমনি থাকা যায়?
ডুবেছি না ডুবতে আছি পাতাল কত দূরে দেখি
কলঙ্কেতে ভয় কোরো না বিধুমুখী
যে যা বলে সয়ে থেকো
হয়ে আমার দুখে দুখী।
দিন যায়, রাত যায়, এমনি করে জীবনও যায় অমোঘ মৃত্যুর দিকে। পর্ণমোচী গাছেরা পাতা খসায়, প্রতিবছরে পরের বছরে নবসাজে সেজে আসবে বলে। কিন্তু মানুষ চলে গেলে, আর ফিরে আসে না। যদি ‘জন্মান্তরবাদ’ সত্যিও হয়, তবুও ফুলের মতো, পাতার মতো তার পুরোনো অনুষঙ্গে, তার পুরোনো বৃন্ততে ফিরে আসে না। একজীবনের সব চাওয়াপাওয়া, সব পাপপুণ্য, সেই জীবনেই জারিত হয়। কোনো মানুষ যদি অসাধারণ হন, তবে তাঁর প্রভাব থেকে যায় অন্যদের মধ্যে, তাঁর লেখা, তাঁর ছবি আঁকা, তাঁর গান এ সব-ই, তাঁর চলে যাওয়ার পরে অন্য মানুষেরা, কাছের এবং দূরের, এক অন্য চোখে আবিষ্কার করেন। কিন্তু সেসব ঘটে, অসাধারণ মানুষদের-ই বেলাতে। অরা তো অসাধারণ নয়, সে অতিসাধারণ। তার জীবনের বিশ্বাস, অবিশ্বাস, ন্যায়, নীতি, শুচি-অশুচি বোধ, যা-কিছুই আঁকড়ে, সে এতদিন বেঁচেছিল, সেইসব-ই যেন লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। ম্যাকলাস্কিগঞ্জ থেকে ফিরে আসার পর ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Crestfallen’ —ও তাই হয়ে গেছে।
অগ্নিকে মুখে এবং চিঠিতে ও বহুবার বলেছিল যে, তুমি অন্য নারীতে যেতে পারো আমার আপত্তি নেই। শুধু আমাকে চেয়ো না। আমি তোমাকে কুলুঙ্গির ঠাকুর করেছি। মুখে বলেছিল, ‘‘তোমার ওপর আমার কোনো দাবি নেই’’ কিন্তু মনে মনে যে, তার দাবি কায়েম করেছিল পুরোপুরিই অগ্নির ওপরে, সে-কথা, অগ্নির শরীরের আগুন অপালা নিভিয়ে দেওয়ার পরেই অরার কাছে প্রাঞ্জল হয়েছে।
অগ্নিকে সে, সত্যিই কুলুঙ্গির ঠাকুর-ই করে রেখেছিল। দেবতাকে যে-ভক্ত পুজো করে, সে তো তার সব ভক্তি সঁপে দিয়েই তাঁকে পুজো করে কিন্তু দেবতারও কি ভক্তর প্রতি কোনো দায়দায়িত্ব নেই? পুজোর যে-উপচারকে, ভক্ত ‘পূত-পবিত্র’ বলে জানত, সেই উপচারের কোনো মূল্যই কি দেবতার নিজের কাছে ছিল না?
ম্যাকলাকিগঞ্জ থেকে ফিরে আসার পর, অরা যেন, তার মনের সব ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল। অগ্নিকে যে, কতখানি ভালোবেসেছিল তা অগ্নি অপালার সঙ্গে ম্যাকলাস্কিগঞ্জের আরণ্যক পরিবেশে সংগমে লিপ্ত হওয়ার পর-ই যেন, হাহাকারের সঙ্গে বুঝতে পেরেছে অরা। অথচ ও জানে যে, এই শাস্তি তার নিজের-ই কৃতকর্মের ফল। অরা যে, অসাধারণ, অসাধারণ তার ভালোবাসা, এই সৎ ও গভীর বোধ অরার প্রেমিককেও যে, সমানভাবে আচ্ছন্ন করবে না, এ-কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি অরা। ওর মনে মনে এই wishful Thinking ছিল যে, যত কষ্টই হোক-না কেন অগ্নির, সে অরার প্রেমিক হিসেবে সেই দুঃখের মহান ভার সারাজীবন হাসিমুখে বইবে। অগ্নিও যে, আর দশটি পুরুষের মতো সাধারণ, এই সত্য তাকে বজ্রর মতো বেজেছে। অরা বুঝেছে যে, একজন নারী যা পারে, একজন পুরুষ তা কখনোই পারে না। একজন ভারতীয় নারী, তার প্রেমে, তার বিরহে, তার কৃচ্ছ্রসাধনে চিরদিন-ই একজন পুরুষের চেয়ে অনেক-ই বড়ো। সত্যিই যে, বড়ো তাতে সন্দেহ নেই। তাই বাংলা সাহিত্যে পুরুষ ও নারীর প্রেমের যেসব উপাখ্যান আছে, সেসবে এই সত্যই স্বমহিমাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সমারসেট মম-এর একটি গল্প পড়েছিল প্রথম যৌবনে। গল্পটির নাম সম্ভবত ‘দ্যা রেইন’। ঠিক মনে নেই এতদিন পরে। সেই গল্পের যুবতী, এক অরমিতা নারী শেষে একজন ধর্মযাজকের দ্বারাও রমিত হয়েছিল তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে। গল্পের শেষে আছে যে, সেই নারী বলছে ‘‘অল মেন আর পিগস’’। পুরুষ মাত্রই শুয়োর। চর্ম ঘর্ষণ-ই তাদের জীবনের সারাৎসার। প্রেম বা রমণীর কোমল মানসিকতার যথার্থ মূল্য, কোনো পুরুষের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়—তারা সকলেই নারীকে ব্যবহার করে, করে জীবনানন্দর কবিতার নারীর মতো শূকরীর মাংস করে তুলতে চায়।
না, অরার চোখে অগ্নি এক ব্যতিক্রমী পুরুষ ছিল। তার স্বপ্নের পুরুষ। রবীন্দ্রনাথের নায়কদের মতো পুরুষ। কিন্তু আজকে অরার সে-ভুল ভেঙেছে।
তবে শুধু অগ্নিকে দোষ দেওয়াটা বোধ হয় ঠিক নয়। তার বান্ধবী অপালাই বা কী কম শরীর সর্বস্বী! অরা তো বহুদিন-ই বিধবা কিন্তু অপালার স্বামী তো জলজ্যান্ত বর্তমান। সে মানুষটার প্রতি কোনো দায়, এমনকী দয়াও কি অপালার ছিল না? ছিল যে-না, তা অরা তো বুঝতেই পারছে। ঘোষসাহেবও অরার-ই মতো প্রাঞ্জলভাবে বুঝতে পেরেছেন, সেই আরণ্যক গা-ছমছম সন্ধেতে তার স্ত্রী ও অগ্নির মধ্যে কী ঘটেছিল? কিন্তু বোঝার পরও তার মানসিকতা ও ঔদার্য হঠাৎ করে, অরাকে সেই মানুষটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাতে আপ্লুত করেছে। প্রীতি, মায়া, মমতা, সহানুভূতি এবং করুণার-ই মতো শ্রদ্ধা ও প্রেমের বীজতলি। প্রেমের বীজ এসবের কোন জমিতে রোপিত হয়ে যে, ফুল ফোটায়, তা হয়তো আগে থাকতে বোঝা যায় না। সাধারণত প্রেম নি:শব্দ চরণেই আসে, নি:শব্দ চরণে চলে যায় কিন্তু কখনো-কখনো হয়তো বিস্ফোরকের স্ফুটনের মতো হঠাৎ-ই শব্দ করেও প্রেমের ফুল ফোটে। নর-নারীর মনের সম্পর্ক বড়ো দুর্জ্ঞেয়। যখন মনে হয়, সব-ই জানা হয়ে গেছে অন্যের সম্পর্কে, তখন-ই বড়োবিস্ময় ও বেদনার সঙ্গে মন জানে যে, সেই মনে হওয়াটা ‘ভুল’। মস্ত ভুল।
বাড়িতে ছেলেমেয়েদের কেউই ছিল না। আজ রবিবার। থাকবেই বা কেন? ওদের এখন উড়ে বেড়াবার সময়। এখানে ওখানে ওড়াওড়ি করে নানা ফুলের মধু খেয়ে, অনেক পরে নীড় বাঁধার কথা ভাববে ওরা, কোনো বসন্ত প্রভাতে। ওদের প্রজন্ম আর অরাদের প্রজন্ম আলাদা। অরার আজকাল প্রায়-ই হাজারিবাগের কথা মনে পড়ে—তার ব্রাহ্ম বাবার কড়া কিন্তু আদর্শ শাসনের মধ্যে একটি মেয়ের বড়ো হয়ে ওঠা। সেই শাসন চোখরাঙানির ছিল না। তাতে ‘বাঁধন’ যতটুকু ছিল তা, সম্ভ্রান্ততার বাঁধন। একটি বাজে পরিবারের মেয়ের সঙ্গে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের যতটুকু তফাত থাকা উচিত—সেই তফাতটুকুই অরাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছিল। এতদিন অগ্নিকেও অরা ওর-ই মতো সম্ভ্রান্ত ও স্বতন্ত্র বলে মনে করত। অগ্নি অবেলায় পৌঁছে নিজেকে বদলাল।
পাগল পাগল লাগে অরার ম্যাকলাস্কিগঞ্জ থেকে ফিরে এসে। রোজ-ই রাতে একটি করে দীর্ঘ চিঠি লিখেছে অগ্নিকে আর, তারপর-ই ছিঁড়ে ফেলেছে। ছিঁড়েছ কুচি কুচি করে, ছেলেমেয়ে কারোর-ই চোখে না পড়ে সেইসব টুকরো-টাকরাও। ম্যাকলাস্কিগঞ্জের চাঁদভাসি আকাশে একটা পিউ-কাঁহা পাখি ‘পিউ-কাঁহা-পিউ-কাঁহা-হা-হা’ করে হাহাকার করে ডেকে ফিরত। সেই হাহাকারটা বুঝি অরার বুকে ফিরে এসেছে—বয়ে নিয়ে এসেছে সেই বসন্তবনের বুক থেকে অরা এই কলকাতাতে।
ম্যাকলাস্কিগঞ্জে অথবা হাজারিবাগে অথবা এদিকের অন্য কোনো বনেও বোধ হয় ভূত-গাছ নেই। যে, গাছের ইংরেজি নাম Karu-Gum tree। নাগপুর থেকে একবার মহারাষ্ট্রের আন্ধারী-তাড়োবা টাইগার রিসার্ভে গেছিল বসন্ত শেষে। সেখানেই প্রথম ভূতগাছ দেখে। রাতের কালো বনের মধ্যে ধবধবে সাদা পত্রশূন্য সে-গাছ দেখে চমকে উঠতে হয়। সত্যিই ভূত দেখার মতো অবস্থা হয় মনের মধ্যে। ম্যাকলাস্কিগঞ্জে ভূত গাছ ছিল না। কিংবা কে জানে! হয়তো ছিল। অরা দেখেনি। একটি ভূত-গাছকেও উপড়ে নিয়ে এসেছে অরা বুকে করে। সেই ভূত-গাছটাকে একেবারে অগ্নির মতো দেখতে কি?
অগ্নি বেচ্চারা। আহা ভালো তো বেসেছিল দু-জনে, দু-জনকে। ভীষণ-ই ভালোবেসেছিল। শ্যামার মতো গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করছে অরার ‘‘হায়! এ কী সমাপন।’’
লিখবে লিখবে লিখবে করে চিঠি আর লেখা হল না অগ্নিকে।
‘কেঁচে গন্ডূষ’-এর একটি অনুষ্ঠান আছে আগামী রবিবারে, স্বভূমিতে। তার-ই মহড়া ছিল বোদেদার বাড়িতে। বোদেদার বাবা বড়ো ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট। লনঅলা বাড়ি। একতলায় বসবার ঘরটাও মস্তবড়ো। ওদের ব্যাণ্ডের মহড়া সাধারণত সেখানেই করে। কিন্তু এতবেশি ডেসিবল-এ গাঁক-গাঁক করে বাজনা ও গান হয় যে, প্রতিবেশীরা পুলিশে ফোন করেছিলেন তিনদিন। তারপর থেকে মহড়া লন থেকে সরিয়ে বসার ঘরে করা হয়।
বয়স্করা বলেন, নয়েজ পলিউশন। কিন্তু উঁচুগ্রামে বাজনা এবং তারসঙ্গে উঁচুগ্রামে যৌবনদীপ্ত গান রুরুদের রক্তে নাচন তোলে। তবে এখন অলিতে-গলিতে বাংলা ব্যাণ্ডের জন্ম হয়েছে। সংখ্যাতে বেশি হলে যা হয় আর কী! তাই হয়েছে মান বিঘ্নিত হয়েছে এবং হচ্ছে।
রুরু আর একটা গান বেঁধেছে তার প্রথম দু-পঙক্তি হল এইরকম—
বৃন্দাবনে দেখে এলাম মাটি উঁচু নীচু
সেথা ময়ূর ময়ূরী নাচে উঁচু করে ফুচু।
বোদেদা বলেছে, জমিয়ে দিয়েছিস রুরু।
বোদেদাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড়োরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়েছিল রুরু মিনি ধরবে বলে। এখন প্রায় সন্ধে ছ-টা বাজে। সকাল দশটা থেকে মহড়া শুরু হয়েছিল। দুপুরে লাঞ্চ খাইয়েছে বোদেদা। শুয়োরের সসেজ, সালামি বেকন ভাজা তারসঙ্গে ফ্রায়েড এগস এবং শুকনো শুকনো খিচুড়ি। একেবারে জমে গেছিল।
একটা বাস এল কিন্তু তাতে পা রাখার জায়গা নেই। পরের বাসের জন্যে অপেক্ষা করছিল, এমন সময়ে পেছন থেকে চুমকি ডাকল—কী রে রুরু। তুই বেপাড়াতে কী করছিস?
রুরু ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, তুইও বেপাড়াতে কী করছিলি?
—কোচিং নিতে এসেছিলাম। আমি তো তোর মতো ব্রিলিয়ান্ট নই।
—ছাড় তো। ব্রিলিয়ান্ট তো তোর বান্ধবী তৃষা, মানে আমার দিদি। নইলে প্রায় এক-ই বয়সি হয়ে পড়শুনোতে এততেজি হয়।
—তা অবশ্য ঠিক।
—মাসিমা কেমন আছেন?
—ভালোই। তবে কলকাতাতে নেই।
—কোথায় গেছেন?
—জানি না।
উদাসীন গলাতে বলল রুরু।
—মানে?
—মানে ফানে নেই। পরশু সকালে উঠে একটা নোট দেখলাম বসার ঘরের টেবিলে, মা লিখেছেন, আমি দিনকয়েকের জন্যে কলকাতার বাইরে যাচ্ছি। সব বাজার-টাজার করে দিয়ে গেলাম। বিস্পতিকেও সব বলে গেছি। তৃষা কলকাতাতে ফিরলে ওকেও এই চিঠি দেখিয়ো।
—হঠাৎ? মাসিমা কি এর আগে কখনো এমন করেছেন?
—না, কখনো করেননি।
—তৃষা কোথায়?
—সে তো কুয়ালালামপুরে। সত্যি! এই অ্যাড এজেন্সির কাজের কোনো মাথামুন্ডু নেই। হর্ষদদা পুণে থেকে তিনবার ফোন করেছিল। ওর সঙ্গে তো অন্তত মোবাইলে বা ই-মেইল-এ কথা বলতে পারে। কিছুই বুঝি না।
—দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কথা বলবি নাকি? তার চেয়ে আমাদের বাড়ি চল-না। মা-বাবা, কেউই নেই। আমিও একা। বাড়িতে শুধু রঘুদা আছে। দারুণ চাইনিজ রাঁধে রঘুদা। আমাদের বাড়িতেই খেয়ে যা-না। তুইও তো একা।
—বলছিস? তাহলে চল।
—তুই কি অগ্নিকাকার বাড়ি যাবি ভেবেছিলি নাকি? তাঁর বাড়ি তো কাছেই। গতসপ্তাহেই ওঁর বাড়িতে কী জমজমাট পার্টি হল বল? গান হল কত, খাওয়াদাওয়া, খাসির রেজালা, বাখখরখানি রুটি, বটি কাবাব আর রাবড়ি। আহা। এখনও মুখে লেগে আছে।
—অগ্নিকাকা থাকলে যাওয়া যেত। কিন্তু উনিও তো নেই কলকাতাতে।
বলেই বলল, তুই কি হেঁটেই যাবি?
—মিনিবাসের অপেক্ষাতে অনির্দিষ্ট কাল অপেক্ষা না করে থেকে হাঁটাই তো ভালো। আজকাল ট্যাক্সির যা ভাড়া। ট্যাক্সি করার মতো সামর্থ্যও আমার নেই।
—আমার তো নেই-ই।
—তুই আমাকেও পড়ালে, তোর আরও কিছু আয় বাড়ত।
—দুস। তোকে পড়ালে কি, তোর কাছ থেকে টাকা নিতাম নাকি?
অন্যদের কাছ থেকে নিতে পারিস আর আমার কাছ থেকে নিতে বাধা কী ছিল? তোর ‘ব্রিলিয়ান্স’-এর একটা দাম তো আছে।
—তা হয় না। তোর সঙ্গে আমার একটা আলাদা সম্পর্ক। সব সম্পর্কর মধ্যেই কি টাকাপয়সা আনতে হয়? আনলে, সম্পর্কর মাধুর্যই নষ্ট হয়ে যায়। তা ছাড়া, বাধার কত্ত রকম হয়।
—জানি না। হয়তো তুই ঠিক-ই বলছিস।
চুমকি বলল, অরামাসির জন্যে তোর চিন্তা হচ্ছে না?
—হচ্ছে বই কী। মা তো কখনো এমন করে চলে যাননি। দিদিও বার বার ই-মেইল করছে মায়ের ব্যাপারে জানতে চেয়ে কুয়ালালামপুর থেকে।
—‘‘কয়েকদিনের জন্যে বাইরে যাচ্ছি’’ —ব্যস এইটুকুই লিখে গেছেন শুধু?
—ঠিক ওইটুকুই নয়। তারপরে যা-লিখেছেন, তাতেই আমার চিন্তা আরও বেড়েছে।
—কী লিখেছেন?
—লিখেছেন যে, ‘‘তোমাদের বাবার মৃত্যুর পর থেকে তোমাদের পাখি-মায়ের-ই মতো দু-ডানার নীচে রেখে বড়ো করেছি। আজ তোমরা উড়তে শিখেছ। স্বয়ম্ভর হয়েছ। তৃষা তো স্বাবলম্বী হয়েই গেছে। তুমিও শিগগির হবে—তুমিও মেধাবী হয়েছ—তাই তোমাদের নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই। আমি আমার নিজের দিকে তাকাইনি কখনোই। নিজের সুখ, নিজের আনন্দ, নিজের অবকাশ বলতে আমার কিছুই ছিল না গত কুড়ি বছরে। এখন সময় হয়েছে এই কর্তব্যের বাঁধন থেকে, অভ্যেসের একঘেয়েমি থেকে নিজেকে অন্তত কয়েকদিনের জন্যে ছুটি দেওয়ার। আশাকরি তোমরা দু-জনে, আমার এই ছুটি না-মঞ্জুর করবে না।’’
—এই অবধি বলে রুরু চুপ করে গেল।
চুমকি, রুরুর চিন্তিত, বিভ্রান্ত মুখের দিকে চেয়ে বলল, সত্যিই আশ্চর্যের ব্যাপার তো!
—আসলে মুশকিলটা কী হয়েছে জানিস—মায়ের অনুপস্থিতিতে আমাদের লোকাল গার্জেন অপামাসি আর মেসোমশাই। তাঁরা দু-জনেও কলকাতাতে নেই।
—তাহলে কি ওঁরা চারজনে একসঙ্গে কোথাও হলিডে করতে গেছেন? মানে, অগ্নিকাকাসুদ্ধু? তোদের আসল লোকাল গার্জেন তো অগ্নিকাকাই। তোরা নিজেরাও তো শতমুখে সে-কথা বলিস।
তারপর বলল, যাই বল আর তাই বল, আমার কিন্তু পুরো ব্যাপারটা জেনে কারও জন্যেই একটুও চিন্তা হচ্ছে না, বরং খুব এক্সাইটেড ফিল করছি আমি। এ একটা গ্রেট অ্যাণ্ড প্লেজেন্ট মিস্ট্রি। ফুল অফ এক্সপেক্টেশান। রীতিমতো রহস্যময় ব্যাপার, তবে খারাপ কিছু ভাবিস না। আমি তো এই চারজনের হঠাৎ অন্তর্ধানের জন্যে চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ-ই দেখছি না।
—না, তা নয়। তবে সব রহস্যময়তার মধ্যে চিন্তা তো থাকেই।
তারপর-ই বলল, চুমকি, আজকে তোর বাড়ি নাই বা গেলাম। আমার তো মোবাইল ফোন নেই। মায়েরও নেই। বাড়িতে দিদি আর মা ফোন করতে পারে। কাল রবিবার আছে। তুই-ই বরং কাল সকালে আয়। কী খাবি বল? বিস্পতি দিদি রাঁধবে। সারাদিন গান শুনব। ভালো ছবি দেখব। দিদি অনেকগুলো ভালো সিডি এনেছে কুয়ালালামপুরে যাবার আগের দিন-ই।
—দেখি। রাতে জানাব। তুই আবার অসভ্যতা করবি না তো কোনো?
—প্রমিস। করব না।
—তাহলে তুই তোর মিনি ধর। তোদের বাড়ি তো কাছেই, হেঁটেই তো যেতে পারিস। আমি বরং সামনের বাসস্টপ থেকে একটা মিনি ধরি। টা-টা।
—টা-টা।
ঘোষসাহেব ও অরা হোটেলের ঘরের লাগোয়া বারান্দাতে বসেছিলেন। সামনে উথাল-পাতাল করছে সমুদ্র। পুরীতে গিয়েছিল অরা বিয়ের পরে পরে। কিছুদিন পরে গেছিল গোপালপুরে। পুরী আর গোপালপুর অন-সির সঙ্গে ভাইজাগ-এর অনেক তফাত আছে। গোপালপুরের সমুদ্রে স্নান করা যায় না। বড়ো বড়ো পাথর আছে জলের উপরে এবং নীচে। সকালে জেলেরা তাদের মাছ-ধরা নৌকো বোঝাই করে লাল-রঙা ভেটকি মাছ ধরে আনে। এইরকম লাল-রঙা ভেটকি কোথাও-ই দেখেনি অরা আগে।
ঘোষসাহেব অরাকে বললেন, আর ইউ হ্যাপি? মাদাম?
—হুঁ।
স্বল্পহাসি হেসে বলল। অরা।
গতকাল প্লেনেই এসেছিল ভাইজাগ-এ, ওরা দু-জনে কিন্তু আলাদা দু-টি ঘরে আছে। দু-ঘরে আছে চরিত্র বা সুনাম রক্ষার জন্য নয়। অরার অভ্যেস চলে গেছে বহুদিন কারও সঙ্গে একঘরে শোয়ার। তা ছাড়া শারীরিক সংসর্গ করবেন বলেও আসেননি, দু-জনে একসঙ্গে বাইরে। অপালাকে নিয়ে অগ্নি যে, পুরীতে গেছে এ, কথা ওরা দু-জনেই জানেন। ওঁরা লুকিয়েই গেছেন কিন্তু হয়তো ইচ্ছে করেই সূত্র রেখে গেছেন যাতে ঘোষসাহেব এবং অরা দু-জনেই জেনে যান ব্যাপারটা। ওদের দু-জনকে-দুরকম কষ্ট দেওয়ার জন্যেই হয়তো গেছেন। ওঁরা।
সত্যি! মানুষের মন বড়ো দুর্জ্ঞেয়।
—রাতে ঘুম হয়েছিল মাদাম?
—না। প্রথম রাতে হয়নি। মাঝরাতে উঠে একটা পাঁচ মিলিগ্রামের অ্যালজোলাম খেয়েছিলাম। তার রেশ এখনও কাটেনি।
—আর একটু ঘুমোলেই তো পারতেন।
—পারতাম। কিন্তু আপনি একা উঠে বসে থাকবেন। ভেবেই, অপরাধী লাগল নিজেকে।
—অপরাধী লাগার তো কোনো কারণ নেই। আমরা তো কোনো অপরাধ করিনি। আমাদের একে অন্যর প্রতি তো করিইনি, অন্য কারও প্রতিও নয়।
—তা করিনি। তবুও অপরাধী লাগল। অপা আর অগ্নিও তো কোনো অপরাধ করেনি।
—না। তা করেননি।
—কিন্তু ওদের এই নিরুদ্দেশ হওয়ার পেছনের কারণ নিয়ে কি, কিছু ভেবেছেন আপনি?
—ভেবেছি।
—আর আপনি?
—আমিও ভেবেছি।
ঘোষসাহেব বললেন, কী ভেবেছেন আপনি?
—আসলে, অপাকে নিয়ে অগ্নির এমন করে বাইরে আসার পেছনে হয়তো, আমার-ই প্রচ্ছন্ন প্ররোচনা ছিল।
—বলেন কী? অপা আর অগ্নিকে আপনিই পাঠিয়েছেন নাকি?
—ঠিক তা নয়। অপা নয়, আমি অগ্নিকে বলেছিলাম যে, তুমি যেকোনো নারীতে যেতে পারো। শুধু আমাকে চেয়ো না। তাতে অসম্ভব আহত হয়েছিল ও।
—আপনিই বা অতনিষ্ঠুর হলেন কেন? কী হারাত আপনার? অগ্নিবাবু তো আপনার স্বামীর-ইমতো।
—স্বামী আর স্বামীর মতোতে তফাত আছে।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, ওকে আমি কুলুঙ্গির ঠাকুর করেছি। যে-আসনে ওকে আমি বসিয়েছি, সেই আসন থেকে ওকে টেনে নামিয়ে আনতে চাইনি। কিন্তু আমি ওকে দেবত্ব দান করলে কী হয় ও সেই আসন নিয়ে সুখী থাকতে পারেনি। ও একজন সাধারণ পুরুষের স্তরে নিজেকে নামিয়ে আনতে চেয়েছিল। হয়তো নামিয়ে এনেওছিল।
—ও কি আপনার শরীর চেয়েছিল? চাইলেও আমি তো দোষ দেখি না। আপনার মতো একজন নারীকে না-চেয়ে থাকাও তো, কম কষ্টর ব্যাপার নয়। তা ছাড়া, আপনার ছেলেমেয়েরাও যখন ওকে বাবার মতোই মান্যিগণ্যি করে, ভালোবাসে। তা ছাড়া, এতদিন ও যখন আপনাদের জন্যে এত করেছে। ওকে বিয়ে করতে আপনার অসুবিধে কী ছিল?
অরা একটু হাসল। বলল, শরৎবাবুর ‘গৃহদাহ’তে সেই আছে-না, অচলা সুরেশকে বলছে:‘‘একসময়ে যাকে বাঁচানো যায়, আর এক সময়ে ইচ্ছে করলেই বুঝি তাকে খুন করা যায়?’’
তারপর বলল, তা ছাড়া, বাবার ‘‘মতো হওয়া’’ আর ‘‘বাবা হওয়া তো’’ সমার্থক নয়।
—না, তা নয়।
—আপনার আর অগ্নির মতো, কৃতবিদ্য পুরুষেরা হয়তো অনেক-ই বোঝেন কিন্তু সব বোঝেন না। অরা বলল।
—হয়তো তাই।
—এবারে আপনি বলুন, আপনি কী ভেবেছিলেন?
—মানে?
—মানে, অপা আর অগ্নির অমন একসঙ্গে চলে যাওয়া সম্বন্ধে।
ঘোষসাহেব বললেন, সেরকম কিছু নয়। মানে, কিছুই ভাবিনি। ইটস আ ফ্যাক্ট অফ লাইফ। আমি অপাকে দোষ দিই না। ও যা কিছু ওর স্বামীর কাছ থেকে চেয়েছিল, যেমন করে চেয়েছিল, তা আমি ওকে দিতে পারিনি। তবে ওর ওপরে আমার অভিমান এইটুকুই যে, আমি ওর কাছ থেকে আশা করেছিলাম যে, যতটুকু আমি ওকে দিতে পেরেছিলাম, তার দাম ও বুঝবে। আজকে আমি দিনরাতে পেশার কাজে কুব্যস্ত থেকে থেকে হয়তো চেহারাতে আনকুথ হয়ে গেছি কিন্তু যে, অঢেল স্বাচ্ছল্য এবং সামাজিক সম্মান ওকে আমি দিয়েছি তার পেছনে আমার স্যাক্রিফাইসও তো কম নয়।
—আসলে, স্ত্রী বা পুরুষ, আমরা কেউই তো স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। আমাদের প্রত্যেকের-ই কিছু না কিছু অপূর্ণতা থাকেই। আর অন্যক্ষেত্রে আমাদের সব ‘সাফল্য’ ওই সামান্য অপূর্ণতার কারণেই হয়তো বাতিল হয়ে যায়।
—তা ঠিক। আর সেই অপূর্ণতার হাত ধরেই অন্য পুরুষ বা নারী আমাদের জীবনে প্রবেশ করে, লখিন্দরের লোহার বাসরঘরে যেমন করে সাপ প্রবেশ করেছিল।
—‘প্রবেশ করা’ কথাটার গভীরতা এক এক ক্ষেত্রে এক এক রকম। এই অনুপ্রবেশে শরীর যে, থাকবেই তার কোনো মানে নেই। এই ‘প্রবেশ’ বা অনুপ্রবেশ পুরোপুরি মানসিকও হতে পারে।
—তা পারে। অবশ্যই পারে।
—আমি যদিও অনেকদিন থেকেই একা তবু একদিন তো আমিও বিবাহিত স্ত্রী ছিলাম একজনের। তাই দাম্পত্যর রকমটা বুঝি।
অরা বলল।
—তা তো অবশ্যই বুঝবেন।
ঘোষসাহেব বললেন।
—তবে এত দীর্ঘদিন আপনার একা থাকার দরকার কী ছিল, আমি ভেবে পাই না। নিজেকে এমন করে বঞ্চিত করার কি দরকার ছিল কোনো? যেকোনো ব্যাপারেই আত্মত্যাগের মধ্যে আনন্দ অবশ্যই থাকে তবে এই ব্যাপারে একটা ‘সীমারেখা’ টানা অবশ্যই দরকার বলে মনে হয় আমার।
তারপর বললেন, অগ্নির সঙ্গে আপনার যে-সম্পর্ক, তা পুরোপুরি মানসিক থেকে শারীরিকে গড়িয়ে যেতে বাধা কোথায় ছিল, সে-কথা আমি ভেবেও বুঝে উঠতে পারিনি।
—আমার সম্বন্ধে আপনি তো অনেক ভেবেছেন দেখছি।
অরা বলল।
—আপনার বহিরঙ্গ রূপ দেখে আপনার অন্তরঙ্গ রূপের কোনো হদিশ পাওয়া মুশকিল।
—হয়তো তাই-ই।
ঘোষসাহেব বললেন।
—তবে এ-কথা সত্যি যে, আপনাকে আমার খুব-ই ভালো লাগে, প্রথম আপনার সঙ্গে আলাপিত হওয়ার পরমুহূর্ত থেকেই। তাই যখন-ই অবকাশ পেয়েছি তখন-ই আপনাকে নিয়ে ভেবেছি। ভেবেছি, অগ্নিকে নিয়েও। আর যতই ভেবেছি ততই অবাক হয়েছি।
—অপা তো খুব-ই প্রাণবন্ত এবং উচ্ছল মেয়ে। ভালো মেয়েও। অপালার সান্নিধ্য সত্ত্বেও আপনি আমাকে নিয়ে এত ভাবাভাবি করলেন কেন?
—সব কেনর তো উত্তর হয় না অরা দেবী।
অরা হেসে ফেলে বলল, আবারও বলছি। আমি প্রচন্ড রকমের মানবী। ‘দেবী’, ‘দেবী’ করবেন না প্লিজ। দেবী বললে মনে হয় যাত্রা করছেন। আমাকে শুধুই অরা বলেই ডাকবেন আপনি।
—বেশ। তাই হবে মাদাম।
—অরা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আর এক কাপ চা খাবেন?
—আপনি দিলে বিষও খেতে পারি।
—বিষ দিতে যাব কেন আপনাকে? তা ছাড়া, এই আপনি-আজ্ঞে-টাজ্ঞেও কি পুরোনো হয়ে যাওয়া জামার-ই মতো ত্যাগ করা যায় না?
—থাকুক-ই না। কিছু পুরোনো জামা থাকে, যা অতিপ্রিয়। সহজে ফেলে দেওয়া যায় জেনেও ফেলা হয়ে ওঠে না, কেমন মায়া পড়ে যায়। আপনাকে এই ‘আপনি’ বলাটাও সেরকম-ই একটা অভ্যেস। দেবীত্বকে না হয় বিসর্জন দেওয়া গেল, আপনিটা থাকুক।
—যা আপনার ইচ্ছা।
—আপনিও তো আমাকে ‘আপনি’ই বলেন।
—অরা হেসে ফেলে বলল, যা-কিছুই আপনা-আপনি না ঘটে, তাকে না ঘটানোই ভালো।
—বা:। ভারি চমৎকার বললেন তো আপনি।
অরা সে-কথার জবাব না দিয়ে বলল, এই যে-আমরা ভাইজ্যাগ-এর হোটেলের বারান্দাতে ভরদুপুরের ঘুঘুর মতো একে অন্যের ঘনছায়ার নীচে বসে আছি, এটা আমার কাছে বিশ্বাস-ই হচ্ছে না। অথচ এ এক অন্য গাছ, অন্যরকম পাতা সে গাছের, অন্যরকম ছায়া। এবং এ-কথাও সত্যি যে, আমরা দু-জনেই, দু-জনের পুরোনো গাছে ফিরে যাব। সেই পুরোনো গাছটিই স্থায়ী। নিত্য। আর আমাদের এই হঠাৎ—উৎসাহটাই অনিত্য। একেবারেই টেম্পোরারি। তাই-না? এটা একটা দুর্ঘটনা।
—হয়তো তাই। কিন্তু কিছু দুর্ঘটনা হয়তো থাকে যা, সুখবহ। এও তেমন-ই এক দুর্ঘটনা।
—তা তো বটেই! আসলে আপনি অগ্নির কাছে, আর আমি অপার কাছে নিজেদের নতুন করে প্রমাণিত করতে চেয়েছিলাম হয়তো।
—হয়তো তাই। ‘‘আমি নারী আমি পারি’’ —এ কথাটাও হয়তো নিজের কাছে প্রমাণ করার ছিল।
—অগ্নি কি বিশ্বাস করবে যে, আমরা হঠাৎ করে বাঁধন ছিঁড়ে বাইরে এলেও আমরা আলাদা ঘরে আছি। অগ্নির প্রিয়তমা অরাকে যে, আমি স্পর্শও করিনি, সেইকথা?
একটু ভেবে অরা বলল, অগ্নিকে যতটুকু জেনেছি, তাতে মনে হয় যে, করবে বিশ্বাস। আর এ-কথা ও অবিশ্বাস করলে, আমাকে ও ক্ষমা করবে না। হয়তো খুন-ই করে দেবে। তবে মনে হয় না তা। সে খুব বুঝি মানুষ।
—এতই যদি বুঝি, তাহলে পরস্ত্রীকে নিয়ে এমনভাবে পালিয়ে গেল কেন? তাও আবার ব্যারিস্টারের স্ত্রীকে নিয়ে। দুঃসাহস তো কম নয়।
—পরস্ত্রীটি তো নাবালিকা নয়। তাই অগ্নি তাকে ইলোপ করেছে একথা বলা চলে না। পরস্ত্রীটি যথেষ্টই সাবালিকা এবং অগ্নির জন্যে সে, অনেক-ই দিন হল প্রেম ও কাম জরজর। তা ছাড়া ইলোপ তো করেনি। দাম্পত্যর একঘেয়েমি কাটাবার জন্যেই হয়তো।
—আচ্ছা, ওরা কোথায় যেতে পারে তা নিয়ে আপনার কোনো মাথাব্যথা নেই?
—না। একটুও নেই। পাখি কখন খাঁচা থেকে উড়ে যায় তখন কোন দিকে যায় আদিগন্ত সুনীল আকাশে সেটা বড়োকথা নয়, উড়ে যে গেল, এইটাই বড়োকথা। চিরদিনের মতো গেলে চিন্তা হয়তো হত। পায়রারা যেমন সন্ধের আগে গ্রামীণ গৃহস্থের বাড়ি ফিরে এসে, বাড়ির টিনের চাল-এ সার দিয়ে বসে, অপাও একসময়ে ফিরে এসে আমার ঘরেই সেঁধোবে। কিছুদিনের জন্যে ঠাঁই-নাড়া হয়েছে মাত্র। এটা ওর শরীর ও মনের স্বাস্থ্যের জন্যে খুব-ই ভালো হল।
অরা বলল, আপনি আশ্চর্য মানুষ সত্যি। অপালার দুর্ভাগ্য যে, ও আপনাকে ঠিক বুঝতে পারল না।
—কেই বা কাকে ঠিকমতো বোঝে। সবাই ঠিকঠাক অন্যকে বুঝতেই যদি পারত তবে আর গোল ছিল কী? কে জানে! সব মানুষের মধ্যে ‘দুর্বোধ্য’তা হয়তো ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই রোপিত হয়েছে। প্রত্যেক মানুষ এইজন্যেই বোধ হয় এত ইন্টারেস্টিং।
তারপরে একটু চুপ করে থেকে ঘোষসাহেব বললেন, আমার স্ত্রী অপা কি প্রেম আর কাম-এর মধ্যে তফাত বোঝে? আপনার কী মনে হয়?
অরা একটু চুপ করে থেকে বলল, ঠিক জানি না। নাও বুঝতে পারে। খুব কম মানুষ-ই বোঝে।
—এই যে ‘জরজর’ শব্দটা ব্যবহার করলেন আপনি, এতে আমার জ্বর-এর কথা মনে পড়ে গেল। জ্বরের কতরকম হয় আপনি কি জানেন?
—টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হিট-ফিভার এইসব জানি।
—না, এ ছাড়াও মানুষের জ্বর হয়। অন্যরকম জ্বর। তারমধ্যে কামজ্বর-ই প্রধান। কারও কারও আবার ভাল্লুকের জ্বরও হয়।
—ভাল্লুকের জ্বর? সেটা কীরকম?
ভরতি চায়ের কাপটা ঘোষসাহেবের দিকে ঠেলে দিতে দিতে বলল, অরা।
—সেই জ্বর হঠাৎ করে আসে আবার হঠাৎ করে ছেড়েও যায়। অনেকের কামজ্বরও এমন ভাল্লুকের জ্বরের-ই মতো।
বলেই, বললেন, তবে অপার কামজ্বর, ভাল্লুকের জ্বর নয়। আসলে ও খুব-ই শরীর-সর্বস্বী। তা ছাড়া, ও বৈচিত্রেও বিশ্বাসী। তবে ও একদিন বুঝতে পারবে, রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতার মানে।
—কোন কবিতা?
অরা বলল।
—‘‘যাহা পাই তাহা ভুল করে পাই, যাহা চাই তাহা পাই না।’’
অরা বলল, অপা তো বটেই অগ্নিও এত শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান হয়েও একটা ব্যাপারকে জীবনে উপলব্ধি করেনি। অথচ করা উচিত ছিল দু-জনেরই।
—কী ব্যাপার?
—মানুষের মুক্তি আসে তার ‘মন’-ই মাধ্যমে, শরীরের মাধ্যমে নয়। শরীরের প্রয়োজন স্বীকার করে নিয়েও বলছি। সেই মুক্তি গৃহীর-ই হোক, কী সন্ন্যাসীর।
—এ তো অনেক গভীর কথা। সাধু-সন্তদের কথা। এ কথা ওর কেন? আমার মতো সাধারণ মানুষেও বুঝবে এটা আশা করাই অন্যায়।
ঘোষসাহেব বললেন।
—জানি না। এটা বুঝতে অসাধারণত্বর কী দরকার?
—আপনার মতো যাঁরা অসাধারণ, তাঁরা নিজেদের অসাধারণত্ব সম্বন্ধে নির্বিকার, উদাসীন। আমি আপনার মতো অত জানি না।
অরা বলল, আমিও বিশেষকিছু জানি না। তবে সেইন্ট অগস্টিনের, সেই উক্তির-ই মতো আমি বিশ্বাস করি যে, ‘The sufficieny of my knowledge consists in knowing that my knowledge is not sufficient’.
—বা:। সুন্দর কথা তো!
ঘোষসাহেব বললেন।
তারপর বললেন, রুরু আর তৃষার কথা আপনার মনে হচ্ছে না?
—হচ্ছে না তা নয়, মনে হচ্ছে। কিন্তু বাঘিনিও তার বাচ্চাদের বড়ো করে তুলে তাদের স্বাবলম্বনের শিক্ষা দিয়ে, একটা সময়ে তাদের ত্যাগ করে। কারও ছেলেমেয়েই তাদের চিরদিনের নয়। তাদের একটা সময়ে পৌঁছে, ছেড়ে দিতেই হয়। তাদের কাছ থেকে কিছু প্রত্যাশা করাটাও উচিত নয়। পশ্চিম দেশ-এ কেউ করেও না। ওদের জীবন ওদের। পশ্চিমি জগতের অনেক কিছুই আমার ভালো লাগে না কিন্তু ওদের এই ‘স্বাবলম্বন’-এর ঐতিহ্যটা আমার খুব ভালো লাগে। আসলে, প্রত্যেক মানুষ-ই চিরদিনের একা। মায়ার বাঁধনে, কর্তব্যের বাঁধনে, কম বা বেশিদিনের জন্যে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে-জড়িয়ে থাকি এইমাত্র। আমরা যে, একা-এই সত্যটা খুব কম মানুষ-ইউপলব্ধি করে।
তারপর বললেন, চলুন ব্রেকফাস্ট করে গাড়ি নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি অরাকু ভ্যালির দিকে। এই পথের সৌন্দর্য-ই আলাদা। লাঞ্চ বাইরেই করে নেব। ফিরে এসে রাতে ডিনার খাব হোটেলেই। শ্রীকাকুলম দেখিয়ে আনব আপনাকে।
—শ্রীকাকুলম কোথায়?
—ওই পথেই পড়বে। উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ির পরে এই শ্রীকাকুলমে, এই নকশাল আন্দোলন ভিত পেয়েছিল। দেশের যা অবস্থা, আমার নিজের-ই মাঝে মাঝে নকশাল হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এই ভুঁড়ি নিয়ে তো, এখন বন্দুক রাইফেল হাতে জঙ্গলে পাহাড়ে ঘুরতে পারব না। কিন্তু আমি ব্যারিস্টার বলেই বলছি। সারাজীবন আইনি তামাশা দেখার পর আমারও মনে হয় যে, সব ক্ষমতার উৎস হচ্ছে বন্দুকের নল। এখনও বঙ্কিমচন্দ্রের সেই উক্তি ‘‘আইন! সে তো তামাশামাত্র! বড়োলোকেরাই পয়সা খরচ করিয়া সে তামাশা দেখিতে পারে’’ আজও সত্যি। গণতন্ত্র যদি সত্যি গণতন্ত্রই না হয়ে উঠতে পারল, পঞ্চাশ বছরের বেশি সময়ে—চারদিকে এত দুর্নীতি, এত অনাচার অত্যাচার, গরিব আরও গরিব হয়ে রইল আর পয়সা আর ক্ষমতা কুক্ষিগত হল সামান্যসংখ্যক মানুষের হাতে, তাতে এ ছাড়া পথই বা কী?
—একজন ডাকসাইটে ব্যারিস্টার যদি, এ-কথা বলেন তবে তো অবশ্যই চিন্তার কথা।
—চিন্তা আর কে করে এখানে? সকলেই তো নিজের নিজের স্বার্থ, অর্থ আর যশের চিন্তাই করে। দেশ নিয়ে ভাবে আর ক-জন!
—সত্যি! এসব কথা ভাবলেও উত্তেজনা হয়।
—আমাদের ছোটো ছোটো সুখ, ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নিয়েই আমরা ব্যতিব্যস্ত সর্বক্ষণ, দেশ-এর মতো বড়োব্যাপার নিয়ে ভাবার সময় কার আছে? অথচ ‘দেশ না থাকলে যে, আমরাও থাকব না’ —এই সরল সত্যটা কাররো-ই মাথায় ঢোকে না।
অগ্নি বলল, পৃথিবীর এত দেশের এত সমুদ্রতীরে গেলাম, অথচ পুরীর সমুদ্রের মতো চান করে আরাম আর কোথাও-ই নেই।
ও আর অপা সমুদ্রমুখী বারান্দাতে বসে ছিল। পুরীর একটি নতুন হোটেলে।
তারপর বলল, ভালো লেগেছে তোমার?
—খু-উ-উ-ব। আর তোমার?
—আমি তো উপোসি ছারপোকা হয়েই ছিলাম। তোমাকে চেটেপুটে খেয়ে যে-সুখ পেলাম, পাচ্ছি, তার কোনো তুলনা নেই।
—চলো, ব্রেকফাস্ট করে আমরা সমুদ্রস্নানে যাই। তারপর ফিরে এসে তোমাকে নিজে হাতে স্নানঘরে স্নান করাব আজ আমি। নোনাজলের চ্যাটচেটে ভাব তুলে দিয়ে, মিষ্টিজলে সাবান দিয়ে তোমাকে নতুন করে নিয়ে আবারও আদর করব।
অগ্নি বলল।
—আমরা কি হানিমুনিং কাপল?
—আমার তো হানিমুন হয়নি। কী করে তুলনা করি?
অপালা বলল, আমাদের বিয়ের পর গোপালপুর অন সি-তে হানিমুনে গেছিলাম। তখন চান করা, খাওয়া আর ঘরে আগল তুলে ঘনঘন আদর। একজন চাইনিজ ম্যানেজার ছিল আমাদের হোটেলের। সে তোমার ঘোষসাহেবকে আলাদা করে ডেকে বলেছিল, ‘‘ইউ সি, দেয়ার আর ওনলি টু ওয়েজ উইথ দ্যা উইমেন। আইদার ইউ কিস দেম অর কিল দেম ইউ, দেয়ার ইজ নো ইন-বিটউইন ওয়ে।’’
—ঘোষ সাহেব কী বলেছিলেন?
কৌতুকের স্বরে বলল অগ্নি।
—ঘোষসাহেব বলেছিলেন, হাউ বাউট ইয়োর ওয়াইফ? উত্তরে সেই চিনে বলেছিল, ইউ থি, আই ক্যুদ নাইদার কিস হার নর কিল হার। থো আই লেফট তায়না অ্যাণ্ড কেম টু ইন্দিয়া।
হো হো করে হেসে উঠল অপা।
তারপর বলল, সত্যিই মনে হচ্ছে আমরা হানিমুনিং কাপল।
অগ্নি বলল।
—শরীরের মধ্যে যে, এতসুখ আছে, তা তুমি আমার জীবনে না এলে বোধ হয় কখনো জানতেই পেতাম না। অরা জানলও না, জীবনে ও কী হারাল!
—অরা আর দশজনের মতো নয়। ওর সুখদুঃখ ওর-ই একার! ও দেবী।
—দেবীরা দূরে থাকলেই ভালো। তাদের পুজো করা যায় কিন্তু তাদের কাছে আনা যায় না।
—কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ বলেও তো কিছু নেই। আমি তোমার সঙ্গে চলে এসে দুঃসাহসী হয়েছি বটে কিন্তু আমাকে তো ঘোষসাহেবের ঘরে ফিরেই যেতে হবে ক-দিন পরেই। আমাদের সন্তান না থাকলেও ঘর-ভাঙাটা আমার দ্বারা সম্ভব হবে না।
—অরা, তৃষা এবং রুরুকে জড়িয়ে আমার যে-জীবন, সেই জীবনেরও একটা আলাদা আনন্দ আছে। আমার এই মিথ্যেঘরও আমার পক্ষে ভাঙা সম্ভব নয়।
অগ্নি বলল।
—আমরা এইভাবে চলে এসে, দু-জনে দু-জনের শরীর নিয়ে অনেক খেলা করছি বটে, গভীর শারীরিক আনন্দে বদ্ধ হয়ে রয়েছি বটে, কিন্তু মিথ্যে বলব না, উজ্জ্বলের ওপরে আমার যা-কিছু অভিমান ছিল, সব-ই ভেঙে গেছে। মানুষটাকে আমি যেন এক অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছি। এখন মন চাইছে, কখন ফিরে যাব। মানুষ অত্যন্ত নীচ ও নিজ স্বার্থপরায়ণ না হলে, তার পক্ষে ঘর ভাঙা সম্ভব নয়।
—উজ্জ্বল মানে?
—আরে! তোমাদের ঘোষসাহেবের নাম তো উজ্জ্বল ঘোষ-ই।
—ও। ভুলে গেছিলাম।
অগ্নি বলল।
—ঘর ভাঙাটা উচিতও নয়।
অগ্নি বলল।
—বা:।
বলল, অপা।
তারপর বলল, তোমার সঙ্গে এসে এখন বুঝতে পারছি যে, দাম্পত্যটা একটা ঘর। কিন্তু সব দাম্পত্যর-ই একটি বারান্দা থাকা উচিত। দাম্পত্যকে সুন্দর করে তুলতে। এই বারান্দাই পরকীয়া। ঘর ছেড়ে এই বারান্দাতে এসে দাঁড়ালে একটু চাঁদের আলো, পাখির ডাক, ফুলের গন্ধে নিজেকে নবীকৃত করা যায়। কিছুক্ষণ বারান্দাতে থাকলেই ঘর থেকে ডাক আসে। মেয়ে বলে, মা ব্লাউজ খুঁজে পাচ্ছি না, স্বামী বলেন টাইটা বেঁধে দাও, ছেলে বলে, মা খাবার দাও, এখুনি বেরোতে হবে। তারপর-ই ঘরে ফিরে যেতে হয়। প্রত্যেক বিবাহিত স্ত্রী ও পুরুষের জীবনেই একটি বারান্দার দরকার। এই বারান্দাই দাম্পত্যর সবচেয়ে বড়ো সেফটি-ভালভ। যে-বিবাহিত স্ত্রী-পুরুষের জীবনে একটি বারান্দা নেই তারা সাংঘাতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে বাধ্য। না থাকলে, অধিকাংশক্ষেত্রেই তাদের দাম্পত্য একঘেয়েমি আর অভ্যেসেই পর্যবসিত হয়। তাতে হয়তো আর কোনো মাধুর্যই থাকে না, তা তাঁরা স্বীকার করুন আর নাই-ই করুন। তবে এ কথাও বলব যে, ব্যতিক্রম থাকেই। ‘Exception proves the rule’. তোমার কি তাই মনে হয়-না?
আমি কী বলি বলো। আমি তো বিবাহিত জীবনযাপন করিনি। অথচ স্বামী না-হয়েও অরা আর ওর দুই সন্তানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছি। তোমার কথা পুরো না বুঝলেও একটু একটু বুঝতে পারি বই কী! অরার শরীর না পেলেও, তার কাছে থেকে এবং সন্তানের কাছ থেকে যা পেয়েছি তাও তো ফেলনা নয়।
—বুঝি, তোমার কথা বুঝি।
অপালা বলল।
সামনের সমুদ্র উথাল-পাতাল করছিল। তবে উদ্দাম নয়। সকালের সমুদ্র সাধারণত শান্তই থাকে জোয়ারের সময় ছাড়া। জোয়ার শুরু হয়ে গেছে। সাদা সি-গাল, টার্ন আর স্যাণ্ডপাইপার পাখিরা ওড়াওড়ি করছে। জোয়ারের পরে ভাটা আসবে তারপরে আবার জোয়ার। এই চলেছে পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে। মানুষের জীবনও এরকম হলে ভালো হত। কিন্তু কোনো মানুষ সার্ফ-রাইডার-এর মতো সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর ফেনার সঙ্গে বেগে ভেসে চলে আর অন্য কেউ ভাটার সমুদ্রের প্রায় নিস্তরঙ্গ টান টান জলরাশির মতো শান্ত স্থিরভাবে বাঁচে। তাদের প্রত্যেকের বাঁচার রকমটা বোধ হয় ‘প্রি-ডেস্টিনড’। সব বোধ হয় আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। দম্পতির মধ্যে একজন জোয়ার আর অন্যজন ভাটা হলে বোধ হয় তাদের দাম্পত্য খুব সুখের হয়। ভাবছিল অপালা। অগ্নি হঠাৎ বলল, তুমি কী ভাবছ তা জানি না। তবে আমার মনে হয়, আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ-ই, এই সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে, জল-সইয়ে, উড়তে-বসতে থাকা টার্ন আর স্যাণ্ডপাইপার পাখিদের-ই মতো জীবনকে ছুঁয়ে ছুঁয়েই জীবন কাটিয়ে দিই, জীবনের আবর্তে প্রবেশ করি না। করতে পারলে, ওই তোলপাড়ের মধ্যে ভাসতে-উঠতে পারলে, জীবন বড়ো ইন্টারেস্টিং হতে পারত, গভীর, নোনা স্বাদে স্বচ্ছ।
অপা সমুদ্রের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনস্কর মতো বলল, বোধ হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন