ভিক্টর ঘোষ হত্যারহস্য

জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

সকাল সাতটায় জগাছার বাড়ি থেকে বেরিয়ে, সাঁতরাগাছি থেকে ঠিক সাড়ে সাতটায় বাসে চড়েছেন অমলেশ, আর দু—বার বাস বদলে পাক্কা দু—ঘণ্টা পরে গল্ফগ্রিনের মোড়ে এসে নামলেন ২৩৪ নম্বর বাস থেকে। এখন ঘড়িতে সাড়ে ন—টা। এদিকটায় আগে কখনো আসেননি। বেলা দশটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলেও, বাড়ি থেকে একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছেন, দক্ষিণ কলকাতার এইদিকটা এক্কেবারে অজানা। হাতে একটু সময় থাকা ভালো। গল্ফগ্রিনের মোড়ে নেমে খানিকটা হাঁটতে হবে। যদি দেরি হয়ে যায়? আজ রবিবার। শনি, রবি আর ছুটির দিনগুলোয় সকাল থেকেই ভিড় লেগে থাকে ওঁর চেম্বারে। রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ স্টেট লিগাল এইড—এর সেক্রেটারি ম্যাডাম শ্রীমতী দুর্গা খৈতান অমলেশকে পাঠিয়েছেন এই উকিলবাবুর কাছে। তা ছাড়া, অমলেশ নিজেও এই উকিলবাবুকেই মামলাটা দিতে চাইছিলেন। কিন্তু নামকরা উকিলদের কাছে যাবার সামর্থ্য ওঁর নেই। সেই কোনকালে রিটায়ার করেছেন। টাকাপয়সার জোর নেই। বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতেন, পেনশনও নেই। অপর পক্ষ জোরদার। তাদের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য এমন উকিলই খুঁজছিলেন। জোরদার হবে, এবং অপর পক্ষের উকিলদের ভয় পাবে না। ছোটখাটো উকিলদের তো অপর পক্ষের বাঘা উকিলরা উড়িয়েই দেবে। তবে এই উকিলবাবুকে অমলেশের পছন্দ অনেকদিন ধরেই। টিভি—তেও ওঁকে প্রায়ই দেখা যায়। সরকারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটা বড় মামলাও উনি লড়ে জিতেছেন। টিভি—তে ওঁর ইন্টারভিউগুলো বেশ মানবিক মনে হয়েছে। আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন। এখানে আসবার আগে ইউটিউবে ওঁর কয়েকটা ইন্টারভিউ দেখে আর গুগল ঘেঁটে মামলার খবরগুলো স্টাডি করে অমলেশের মনে হয়েছে—পারলে, উনিই পারবেন। কিন্তু, খরচ? ওঁর ফিসও নিশ্চয়ই অনেক। অতএব আবার গুগল ঘাঁটা। অমলেশ এবার নিশ্চিত হয়েছেন যে, উনি বিনা পয়সাতেও প্রচুর মামলা লড়েন। কামদুনি মামলাতে যে মেয়েটি রেপড হয়েছিলেন, তাঁর বাড়ির লোকের হয়ে মামলা লড়েছিলেন। খবরের কাগজে প্রায়ই ওঁর করা মামলার খবর ফলাও করে বেরোয় সবচেয়ে বড় কথা, লিগাল এইডের মাধ্যমে কোনও মামলা এলে উনি একটা পয়সাও নেন না। লিগাল এইডের দুর্গা খৈতান ম্যাডামকে বলতে, উনি বললেন, 'আমরা মামলাটা ওঁকে রেফার করছি। আপনি ওনার সঙ্গে দেখা করুন।' তারপর ফোনে ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে আর অসুবিধা হয়নি। উনি বারবার বলে দিয়েছেন, 'খুব ভিড় থাকে। টাইমটা মেনটেইন করবেন।'

গল্ফগ্রিনের বাসে উঠেই কন্ডাক্টরকে উনি বলে দিয়েছিলেন, 'একদম লাস্ট স্টপেজে নামব।' সেই অনুযায়ী কন্ডাক্টর ওঁকে লাস্ট স্টপেজেই নামিয়ে দেয়। এইদিকটা এখনও ফাঁকা—ফাঁকা। প্রচুর গাছ, পাখি ডাকছে। সামনে অটো স্ট্যান্ড। গা ঘেঁষে দুটো চায়ের দোকান। চয়ের দোকান দেখে মনে পড়ল, সকালে কিছুই খাওয়া হয়নি। বাড়ি থেকে যখন বেরোন, তখনও স্ত্রী উমা বিছানা ছাড়েননি। অমলেশ আর উঠতে বলেননি। উমারও বয়স হয়েছে। প্রেশার—সুগার—থাইরয়েড কিছুই বাদ নেই। অমলেশেরও ইচ্ছা করেনি উমাকে বিছানা থেকে তুলে চা করাতে। শুধু 'বেরোচ্ছি' বলে দরজাটা টেনে বন্ধ করে চলে এসেছেন। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে একটা চিনি ছাড়া লিকার চা আর দুটো প্রজাপতি বিস্কুটের অর্ডার দিয়ে দোকানের ছেলেটিকেই জিজ্ঞেস করলেন, 'ভাই, কন্দর্পনারায়ণবাবুর বাড়িটা কোন রাস্তায়?'

দোকানদার চা বানাতে বানাতে চোখ না তুলেই বলল, 'ডানদিকের রাস্তায় ঢুকে, ফের বাঁদিকে কয়েক মিনিট হেঁটে অরবিন্দনগর পার্কটাকে বাঁ হাতে রেখে খানিক এগিয়ে ফের ডান হাতে ঘুরলে সমাজগড়। ওখানে গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করবেন—বলে দেবে।'

কথা বলার ভঙ্গিতেই বোঝা গেল অনেকেই দোকানিকে ওঁর বাড়ির রাস্তা জিজ্ঞেস করে। আর দোকানিরও রাস্তা দেখিয়ে দেওয়ার অভ্যেস আছে।

চা—বিস্কুটের দাম মিটিয়ে অমলেশ হাঁটা শুরু করলেন—হাঁটতে হাঁটতে মাথার মধ্যে পুরোনো যন্ত্রণাটা ফিরে এল—

একটাই ছেলে ছিল অমলেশের। ভিক্টর। পড়াশোনা ভালোবাসত। ভালো ফুটবল—ক্রিকেট খেলত। জিমে গিয়ে গিয়ে সুন্দর চেহারা করেছিল। কত স্বপ্ন, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হোল। একদিনও বসে থাকেনি। পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে সল্ট লেক—সেক্টর ফাইভে চাকরি। গরিবের ছেলে। চাকরির এক বছরের মাথায় অমলেশের কাছে বায়না জুড়ল 'বাবা, বাইক কিনব।' বাইকে চিরকাল ভয় অমলেশের। প্রথমেই 'না' বলে দিয়েছিলেন। পরে উমা বোঝালেন, 'দাও না। ছেলের শখ। তা ছাড়া, নিজের রোজগারের টাকায় কিনবে। কিছুই তো দিতে পারিনি। টিউশনের টাকায় পড়েছে। সারাজীবন তো কষ্টই করেছে। এখন চায়, বাইক চালিয়ে জিমে যাবে, অফিসে যাবে—'

অনেক কিন্তু—কিন্তু করেও রাজি হয়েছিলেন অমলেশ। প্রথম যেদিন বাইক চালিয়ে জিম থেকে ফিরল, অমলেশ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। ছ—ফুট হাইট। সুন্দর, ব্যায়াম—করা চেহারা, যেন জ্যোতি বেরোচ্ছিল। সুন্দর চেহারাই বোধহয় কাল হল।

অনেকের মুখ থেকেই শুনেছিলেন, একটি মেয়ে নাকি ভিক্টরের বাইকের পেছনে বসে ঘোরে। একদিন উমাকে বললেন। উমা বললেন, 'থাক—না। ওরও তো আঠাশ বছর হল। ভালো চাকরি করে। যদি সব ঠিকঠাক থাকে, তো বিয়ে করুক। তুমি আর আপত্তি কোরো না।'

একদিন রাতে খেতে বসে অমলেশ জিজ্ঞেস করলেন, 'হ্যাঁ রে, মেয়েটি কে? তোর সাথে চাকরি করে?'

প্রথমে ভিক্টর কিছুতেই বলতে চায়নি। তারপর উমা চেপে ধরায় বলে, 'ওর নাম প্রিয়ংবদা—ডাকনাম প্রিয়া।' অফিস থেকে বেরিয়ে সল্ট লেকে একটা জিম যায় ভিক্টর। সেখানেই আলাপ। পরে প্রিয়া অমলেশের বাড়িতেও এসেছে। ভাত খেয়েছে। উমার সঙ্গে কত্ত গল্প। ভিক্টর আর প্রিয়ার কথা তখন আর গোপন কিছু নয়। দু—জনে একসঙ্গে বেড়াতে গিয়েছে। এমনকী একবার বাড়িতে না জানিয়ে দিঘায় চলে গিয়েছিল। বাড়িতে বলে গিয়েছিল, 'অফিসের কাজে দিল্লি যাচ্ছি। দু—দিন পরে ফিরব।' পরে জানাজানি হয়ে যায় যে, দু—জনে দিঘায় গিয়েছিল। অমলেশ রাগ করেছিলেন—বিয়ের আগে এসব কী? দু—জনে দু—জনকে চিনতে চাইছে, ঠিক আছে। কিন্তু এসব কেন? বিয়ের আগে? উমাও ভিক্টরকে দু—কথা শুনিয়েছিলেন। তবু, সব ঠিকঠাকই তো ছিল।

সালটা দু—হাজার বারোর শেষের দিক। অমলেশ গায়ে একটা হালকা চাদর জড়িয়ে টিভি দেখছেন। উমা রান্নাঘরে রুটি করছেন। এমন সময় বাইরে বাইকের আওয়াজ। ভিক্টর ফিরল। অফিস ফেরতা জিম ক'রে। দরজা খুলতেই অমলেশ চমকে গেলেন। এ কী! ছেলের এত উদ্ভ্রান্ত চেহারা কেন? দু—চোখে যেন কালি পড়েছে। চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। হাত দুটো শরীরের দু—ধারে ঝুলছে। গায়ে যেন জোর নেই। 'কী হয়েছে বাবাই—তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?' —চিৎকার করে ওঠেন অমলেশ।

উমা চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে দৌড়ে আসেন—'কী হয়েছে? বাবাইয়ের কী হয়েছে?'

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে অমলেশের গায়ে নিজেকে এলিয়ে দিয়েছে ভিক্টর। মুখ দিয়ে একটা ঘড়ঘড় আওয়াজ বেরিয়ে আসছে—কান্না চাপার চেষ্টা করছে। উমা দু—হাত বাড়িয়ে দিতেই, অমলেশকে ছেড়ে উমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভিক্টর। ডুকরে উঠে কাঁদতে কাঁদতে বলে, 'আমি শেষ হয়ে গেছি মা—প্রিয়া আমাকে ঠকিয়েছে। ও ম্যারেড, দশ বছরের ছেলে আছে।' অমলেশ—উমা দু—জনেই স্তম্ভিত। কথা বলার ভাষা নেই। উমা ভিক্টরকে জড়িয়ে ধরে খাবার টেবিলে বসিয়ে, একটা জলের গ্লাস এগিয়ে দেন। ভিক্টরের শরীরের সব জোর যেন কে শুষে নিয়েছে। বড় বড় চুল অবিন্যস্ত। গ্লাস তুলে খাবার শক্তি নেই।

ফ্যাঁসফেঁসে গলায় অমলেশ বললেন, 'তুই জানলি কী করে? তোকে কে বলল?'

প্রথমে তো ভিক্টর কিছুতেই বলতে চায় না। তারপর বলল, ওর সঙ্গে জিম করে একটি ছেলে। অঙ্কিত চোপড়া। কয়েকদিন আগে বাইকের পেছনে প্রিয়াকে দেখে বলে, 'ওই ভদ্রমহিলা ম্যারেড। নিউটাউনের দিকে থাকে। বড় ঘরের বউ। অতএব সাবধান।' প্রথমে ভিক্টর বিশ্বাস করেনি। প্রিয়াকে ওর সঙ্গে দেখে অনেকেই ওকে ঈর্ষা করত। তাই ভিক্টরের সন্দেহ হয়নি। তবে প্রিয়া ওর বাইকে উঠলে সবসময় মুখ—ঢাকা হেলমেট পরত। পরে ওরও সন্দেহ হয়। মুখ—ঢাকা হেলমেট পরা আসলে প্রিয়ার নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা, যাতে বাইরের লোক প্রিয়াকে চিনতে না পারে।

পরে জিমের ওই ছেলেটি আরও খবর এনে দেয়। নিউটাউনে প্রিয়ার শ্বশুরবাড়ি। খুব বড়লোক। সমাজে প্রতিপত্তিশালী। ওর শ্বশুরমশাই দু—তিনটে বড় ফ্যাক্টরির মালিক। পোষা গুন্ডা আছে। অতএব ভিক্টর যেন সাবধান হয়ে যায়। তবু ভিক্টর মানতে চায়নি। প্রিয়া সুন্দরী, বড়লোকের মেয়ে। কাজেই ভিক্টরকে তো লোকে হিংসে করবেই। কিন্তু, আজ রফিক বলে একজন ফোন করে হুমকি দেয়, বলে, বড়লোকের বউয়ের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করার মজা টের পাইয়ে দেবে। ভিক্টর বলে, কে বড়লোকের বউ? কোনো বড়লোকের বউকে সে চেনে না। রফিক বলে, যাকে সে ফাঁসিয়েছে, সে কলকাতার একটা নামকরা বড়লোক বাড়ির বউ। ফের যদি ওই ভদ্রমহিলার সঙ্গে ভিক্টরকে দেখা যায়, তাহলে ফল ভালো হবে না। এতদিনে ভিক্টর নিশ্চিত হয়েছে—প্রিয়া আসলে কলকাতার নামকরা ধনী ব্যবসায়ী বসন্ত পোদ্দারের ছেলে রবি পোদ্দারের বউ প্রিয়ংবদা পোদ্দার। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে ভিক্টরের।

সব শুনে অমলেশ—উমাও ধপ করে বসে পড়েন চেয়ারে। ওঠার শক্তি নেই। রান্নাঘরে রুটি বসানো গ্যাসে। পোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে। কিন্তু কেউই উঠতে পারছেন না। ছেলের স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছে। কত আশা—ছেলের বিয়ে দেবেন—বন্ধুমহলে কয়েকজনকে বলেও ফেলেছেন, সামনের বছর ছেলের বিয়ে, সুন্দরী পুত্রবধূকে ঘরে আনবেন। সাজানো গোছানো সংসারে বাড়ির হাল ধরবে প্রিয়া। দোতলার ঘরটা সুন্দর করে সাজিয়ে দেবেন। ছেলে— ছেলের বউকে। উমাও সংসারের সব ভার ছেড়ে দেবেন প্রিয়াকে। এক ছেলে—তাকে জড়িয়েই তো যাবতীয় স্বপ্ন। হঠাৎ উমা চিৎকার করে ওঠেন 'তুই জিজ্ঞেস কর, কেন এতবড় শত্রুতা করল, কেন তোকে ঠকাল!'

'ফোন করেছিলাম—সুইচড অফ। ওর বরও ফোন করেছিল, বলল, ফের যদি প্রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি, আমার লাশও পাওয়া যাবে না।'

শুনে চমকে ওঠেন উমা। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন—'বাবা—বাদ দে—বাদ দে—সব ভুলে যা—ওরা খারাপ লোক। ওদের সঙ্গে পারব কেন? আমাদের কপাল খারাপ।'

অরবিন্দনগর পার্কের সামনে এসে সংবিত ফিরল অমলেশের। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বলে দিল—পার্কটাকে বাঁ হাতে রেখে ডানদিকে ঘুরে ফের বাঁদিকে গলির মধ্যে। কাউকে জিজ্ঞেস করুন। হাঁটতে খারাপ লাগছে না অমলেশের। দু—দিকে উঁচু উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট। দু—ধারে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার দু—ধারে নারকেল গাছ। রাস্তার উপরে ঝুঁকে পড়েছে। এবার অপেক্ষাকৃত একটা সরু গলিতে এসে পড়লেন অমলেশ—এটাই সমাজগড়! এত সরু গলিতে উকিলবাবুর বাড়ি? দুর্গা খৈতান ম্যাডাম অবশ্য বলেছিলেন, 'আমি আপনাকে হাইকোর্টের সবচেয়ে সেরা লইয়ারও দিতে পারছি না, এক নম্বর ল'ইয়ারও দিচ্ছি না। আমি এমন একজন লইয়ার দিচ্ছি—যিনি খুব সাধারণ একজন মানুষ, আর সাধারণ মানুষের জন্য মামলা করেন—যিনি মস্তিষ্ক দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে মামলা করেন। আপনারা মামলায় হারবেন কি জিতবেন জানি না, কিন্তু আপনার ল'ইয়ার আপনার জন্য লড়বেন।'

সামনেই একটা ছোট্ট মন্দির। পুজো হচ্ছে। ধূপ জ্বলছে, ঘণ্টাধ্বনি, আরতি হচ্ছে। সকালের পুজো। অমলেশের মনটা ভরে গেল। মন্দিরের সামনের রাস্তাটাও ধূপের গন্ধে ম—ম। পুরোহিতমশাই খুব ভক্তিভরে পুজো করছেন। অমলেশ হাত জোড় করে চোখ বুঁজে নমস্কার করলেন। কয়েক মুহূর্ত হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিরতিরে হাওয়া দিচ্ছে। ঘণ্টাধ্বনি, শাঁখের আওয়াজ, ধূপের গন্ধ—গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল অমলেশের। চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠল ঘটনাগুলো—

একুশে ডিসেম্বর, দু—হাজার বারো, দিন ছোট হয়ে এসেছে। মন ভালো নেই অমলেশ—উমার। একে তো ঠান্ডা পড়ছে। উমা একটু ঠান্ডাতেই কাবু। দুপুরে অমলেশও শুয়ে ছিলেন খানিকক্ষণ। তারপর থেকেই গা—টা ম্যাজম্যাজ করছে। অন্যদিন সাতটার মধ্যে অফিস ফেরতা জিম করে ঘরে ফিরে আসে ভিক্টর। কিন্তু প্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কটা নষ্ট হবার পর, আর প্রিয়ার বরের কাছ থেকে, আর ওই যে লোকটা, কী যেন নাম, রফিক, হ্যাঁ হ্যাঁ, রফিকের হুমকি ফোনগুলোর পর অমলেশ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, 'ওসব জিম—টিম লাগবে না। তুমি অফিস থেকে সোজা ঘরে আসবে। আমি চাই না, তুমি কোনও ঝামেলায় জড়াও।'—তারপর থেকে ভিক্টরও ক—দিন অফিস আর বাড়ি করছে। কিন্তু, আজ যেন একটু দেরি হচ্ছে! উমাকেও বলতে পারছেন না। বুকের মধ্যটা যেন একটু গুড়গুড় করছে। একটা ভয় যেন অমলেশকে আস্তে আস্তে গিলে নিচ্ছে। অমলেশ ছাপোষা মানুষ, সারাজীবন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেছেন। কত কষ্ট করে ভিক্টরকে মানুষ করেছেন। অভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জির ভক্ত ছিলেন। তারপর যখন ছেলে জন্মাল, তারও টকটকে ফরসা গায়ের রং, টিকোলো নাক, লাল টুকটুকে ঠোঁট, সোনালি সোনালি মাথার চুল দেখে, নিজের পছন্দের নায়কের নামে নাম রাখলেন 'ভিক্টর'। স্কুলে পড়াশোনা, খেলাধুলো, সবকিছুতেই চৌখস ভিক্টর। উমা বলতেন, 'জীবনে একটা ছাপ রাখবে। সবসময় প্রচ্ছদে থাকবে। পরিশিষ্টে নয়।' হলও তা—ই। কলেজেও হিরো ছিল ভিক্টর। ওকে নিয়ে কখনো ভাবতে হয়নি অমলেশকে। আজকে এই বয়সে এসে এ কী যন্ত্রণা!!

প্রায় আটটা নাগাদ বাইরে বাইকের আওয়াজটা এসে দাঁড়াল। দরজা খুলে দিতেই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকল ভিক্টর।—'সরো, সরো এক্ষুনি বেরোব।'

'কোথায় যাবি এত রাতে?' অমলেশ প্রায় আর্তনাদ করে ওঠেন। প্রথমে তো কিছুতেই বলতে চায় না। তারপর বলল, 'আজ সারাদিন প্রিয়া দশবার ফোন করেছে। একটু আগে আবার করেছিল। কিছু বলতে চায়। আমিও বললাম, আমার সঙ্গে এমন করলে কেন? তুমি ম্যারেড, ছেলে আছে। আগে বলোনি কেন? প্রিয়া বলল 'পাঁচ মিনিটের জন্য এসো।'

এবার উমা দরজা আটকে দাঁড়ালেন, 'না, যাবে না। অনেক হয়েছে। ওরা বড়লোক, তায় খারাপলোক—না জানি কী বিপদে ফেলে দেবে—তুমি যাবে না।'

'মা—পাঁচ মিনিট, এই সামনেই কফি শপে ও আসছে। দেখা করেই চলে আসব। আমারও তো কিছু জিজ্ঞাসা করবার আছে। তা ছাড়া, কফি শপে বসব। ওখানে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। ও কিছু করতে পারবে না।'

এবার উমা কাঁদতে শুরু করলেন। ভিক্টর নিজের জেদে অনড়। ও যাবেই এবং প্রিয়াকে জিজ্ঞাসা করবেই—কেন ও এমন করল। অসহায় উমা শেষে বললেন, 'ঠিক আছে, কিছু খেয়ে যা। চিকেন স্টু করেছি। মুখে দিয়ে যা, একদম খালি পেটে যাস না।' ভিক্টর তাতেও রাজি না। ও তক্ষুনি বেরোবে। শেষে অনেক জোরাজুরির পর উমা একটু দুধ গরম করে এনে দিলেন। ততক্ষণে ভিক্টর জামা ছেড়ে, একটা ফুলশ্লিভ টি—শার্টের ওপর একটা জ্যাকেট পরে রেডি। কোনও মতে দুধটুকু খেয়ে হেলমেটটা মাথায় দিয়ে বাইকে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল।

খাওয়ার টেবিলে একটা চেয়ার টেনে অমলেশ আর উমা দু—জনেই গুম হয়ে বসে ছিলেন। কারও মুখে কোনও কথা নেই। ভয়ে, টেনশনে দু—জনেই চুপ—একটা যেন অমঙ্গলের আভাস। ফোনটা এল সাড়ে ন—টা নাগাদ। কোনা ট্রাফিক গার্ডের একজন ফোন করলেন, 'এটা কি ভিক্টর ঘোষের বাড়ি?'

অমলেশের গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না।—ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বললেন, 'ক্কেন? ক্কী হয়েছে?' কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। ওঁকে এস.এস.কে.এম. হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওখানেই আসুন।'

হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায় অমলেশের। উমা চিৎকার করে ওঠেন, 'বাবাইয়ের কী হয়েছে?' অমলেশের মাথা কাজ করছে না—কাকে ডাকবেন? কাকে বলবেন? কে এসে পাশে দাঁড়াবে? এই ঠান্ডার রাত? উমাকে কী জানাবেন? উমার যদি কিছু হয়ে যায়?

কয়েক সেকেন্ডে ঘোর কাটল। প্রতিবেশী রঞ্জিতবাবুর ছেলে কলেজে পড়ে। অমলেশ ছুটে জানালা খুলে চিৎকার করলেন, 'দেবজিৎ, দেবজিৎ, তোর বাবাইদার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। হাসপাতালে যাব—একটা ট্যাক্সি ডাক তো বাবা—'

পেছনেই একটা ধপ করে শব্দ শুনলেন। বুঝলেন, উমা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে দেবজিৎ ট্যাক্সি নিয়ে এল। রঞ্জিতবাবু, তাঁর স্ত্রী, আরও কয়েকজন ততক্ষণে এসে গিয়েছিলেন, তাঁরাই উমাকে ধরাধরি করে তুলে বিছানায় নিয়ে যান। প্রথমে ঠিক হল, দুটো ট্যাক্সিতে ভাগ করে অমলেশ, রঞ্জিতবাবু, দেবজিৎ ছাড়াও পাড়ার আরও অনেকে মিলে যাওয়া হবে। কিন্তু উমা জেদ ধরলেন, তিনিও যাবেন। উমাও চেপে বসলেন অমলেশের পাশটিতে। শক্ত করে ধরে রইলেন অমলেশের হাত। ট্যাক্সিতে কারও মুখে কোনও কথা নেই। এস.এস.কে.এম. হাসপাতালে যাবার কোনও দরকার কখনো হয়নি অমলেশ—উমার। রাস্তাটা যেন মনে হচ্ছে কত লম্বা! এত দূর হাসপাতালটা? অমলেশ আর উমা, দু—জনেই দু—জনের হাপরের মতো শ্বাস টানার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন।

হাসপাতালে পৌঁছে ইমার্জেন্সির দিকে ছুট লাগালেন সবাই। 'কোথায়? কোথায়? আমার বাবাই কোথায়?' এমার্জেন্সির প্যাসেজটায় একটা ট্রলিতে একজনকে শোয়ানো। কিন্তু, এ কী। কোনও ডাক্তার নেই কেন? এতক্ষণে ট্রিটমেন্ট শুরু হয়নি? ওই যে, ওই যে বাবাই। হাসপাতালের একজন সাফাইকর্মীকে দেখে, তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন অমলেশ। 'ভাই, এই যে, এই যে আমার ছেলে। একজন ডাক্তারকে ডাকো না ভাই—'

অল্পবয়সি ছেলেটি অমলেশকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল।—'ও, ইনি আপনার ছেলে? অ্যাক্সিডেন্ট কেস।' তারপর, শুয়ে—থাকা বাবাইয়ের কাছে গিয়ে বাবাইকে দেখে, অমলেশকে একটু নরম স্বরে বলল, 'একটু দাঁড়ান। ডাক্তারবাবু আসছেন।'

উমা ট্রলিতে শুয়ে—থাকা বাবাইকে জড়িয়ে ধরে উথালপাথাল করে কাঁদতে শুরু করেছেন—'ওগো, বাবাই কথা বলছে না কেন? বাবাই—বাবাই—শুয়ে আছিস কেন? ওঠ বাবা—বাবা—' উমার কথাগুলো অমলেশের শরীরে যেন চাবুকের বাড়ি দিচ্ছে—দেবজিৎ একজন অল্পবয়সি ডাক্তারবাবুকে ধরে আনল। সঙ্গে একজন পুলিশ অফিসার।

ডাক্তারবাবু খুব আন্তরিকতার সঙ্গে এসে ট্রলিতে শুয়ে—থাকা ভিক্টরের হাতের পালসটা একবার দেখলেন। স্টেথোস্কোপটা ঝুলিয়ে ভিক্টরের বুকে ধরে দেখে বললেন, 'এই কেসটাই তো—অ্যাক্সিডেন্ট কেস। ব্রট ডেড।'

পুলিশ অফিসারটি খুব স্বাভাবিক স্বরে বললেন 'অ্যাক্সিডেন্ট। কোনা এক্সপ্রেসওয়ের ওপর। একটু অপেক্ষা করুন। আনন্যাচারাল ডেথ কেস চালু হয়েছে। বড়বাবু আসছেন বডি পোস্টমর্টেমে যাবে।'

তারপরই একটা আঁ—আঁ—আঁ করে চিল চিৎকার। অমলেশের পৃথিবী দুলছিল—চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা। চিৎকার করছে কে? আঃ, মাথায় বড্ড যন্ত্রণা—গলাটা চেনা—চেনা লাগছে—উমা—উমার কান্না—আর কিছু মনে নেই অমলেশের।

জ্ঞান ফিরতেই অমলেশ দেখলেন, ইমার্জেন্সিতে একটা বেডে শুয়ে আছেন তিনি। তাঁর প্রথম চিন্তা হল উমা—উমা কোথায়? ও কি শকটা সহ্য করতে পারল? রঞ্জিতবাবু এসে অমলেশের হাতটা ধরলেন—'রঞ্জিত, উমা কোথায়?'

'উমাবউদিকেও ডাক্তার দেখেছেন। নার্ভ ফেল করেছিল। ওষুধ দেওয়া হয়েছে। একটু ঝিমুনির মতো অবস্থায়।'

অমলেশ বেড থেকে হুড়মুড়িয়ে নামলেন। পাশেই একটা ঘরে উমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ঘুমের ওষুধ দিয়েছে বোধহয়। একটানা একটা কান্নার শব্দ বেরিয়ে আসছে উমার মুখ দিয়ে। রঞ্জিতবাবু আর দেবজিতের কাঁধে ভর দিয়ে যেখানে ভিক্টর শুয়ে আছে, সেখানে এলেন অমলেশ।

পুলিশ অফিসারটির কথা কানে লেগে আছে—'বডি পোস্টমর্টেমে পাঠাতে হবে।' আটাশ বছরের তরতাজা, ছটফটে, ঝকঝকে বাবাই এখন 'বডি'? 'হে ভগবান'—

বাবাইয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন অমলেশ। ভালো করে দেখতে লাগলেন বাবাইকে। চোখটা বোজা। হাত দুটো শরীরের দু—পাশে। বিরাট বলশালী চেহারা, ব্যাকব্রাশ করা ঝাঁকড়া চুল। কপালের পাশটা একটু ফেটে গেছে। রক্ত গড়িয়ে নেমেছে। কিন্তু, যদি মোটরবাইক অ্যাক্সিডেন্ট হয়, বাবাই তো কক্ষনো হেলমেট না পরে বাইক চালাত না, কপালটা ফাটল কী করে? বাবাই ভালো কোম্পানির হেলমেট পরত। হেলমেটটা বেঁধে নিত চিবুকে ও বাইক থেকে পড়ে গেলেও হেলমেট খুলবে না। আশ্চর্য, আর এইটুকু চোটেই ও মরে গেল?

অমলেশের চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এল। আস্তে আস্তে তিনি অমলেশের মাথায়, কপালে, বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। থানা থেকে একজন অফিসার এলেন। বড়বাবু। অমলেশকে নমস্কার করে বললেন, 'বুঝতে পারছি আপনাদের কষ্ট। কিন্তু, আমাকে তো কাজ করতেই হবে। আমি বডি পোস্টমর্টেমে পাঠাব। কাল আপনারা বডি পেয়ে যাবেন। মোটর সাইকেলটা থানায় রাখা আছে। কিছু ফর্ম্যালিটি আছে। ওটা নিয়ে যাবেন।'

'বড়বাবু, একটু দাঁড়ান। ওর মা আসুক। দেবজিৎ, উমাকে একবার ডাক—না বাবা। একবার দেখুক।'

দেবজিৎ উমাকে নিয়ে এল। উমা বাবাইয়ের নিথর শরীরটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। একটানা গোঙানির মতো একটা কান্না।

অফিসার বললেন, 'ওর পকেট থেকে এই পার্স, মোবাইল, এগুলো পাওয়া গেছে। আমি দুটো কাগজ তৈরি করেছি। এটাকে বলে সুরতহাল রিপোর্ট। আর এইটা সিজার লিস্ট। আপনারা সাক্ষী হিসেবে এতে সই করে দিন।' বাবাইকে নিয়ে যাবার আগে, অমলেশ বাবাইয়ের নিথর দেহটা জড়িয়ে ধরলেন। হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন।

কাঁদতে কাঁদতেই অমলেশ বুঝতে পারলেন, বাবাইয়ের পিঠের কাছটা ভিজে—ভিজে। অমলেশ চোখ মুছে হাতটা চোখের সামনে মেলে ধরতেই দেখলেন, হাতে রক্ত লেগে। শুকিয়ে এসেছে। একটা কালচে রক্ত। মাথার মধ্যে ঝনাৎ করে উঠল। পিঠের কাছে রক্ত কেন? শুধু কপালে একটু ফাটা। সামান্য রক্ত বেরিয়েছে। সেই রক্ত তো পিঠে যাবে না। —'অফিসার! ওর পিঠে রক্ত। দেখুন দেখুন।'

অফিসারটি খুব তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন, 'অ্যাক্সিডেন্ট কেস, ওরকম হয়।' অমলেশ চিৎকার করে দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, 'আমি ওর পিঠটা দেখতে চাই।' অফিসারের আপত্তি সত্ত্বেও পাড়ার সবার নাছোড়বান্দা মনোভাবের সামনে অফিসার হার মানলেন। বাবাইয়ের গায়ের জ্যাকেটটা খুলে নেওয়া হল। অমলেশ পরম মমতায় ওর বুকে—পিঠে হাত বোলাতে শুরু করলেন।

ততক্ষণে বাবাইয়ের অফিসের আর জিমের কয়েকজন বন্ধুও চলে এসেছে। ওদেরই মধ্যে একজন—পরে নাম জেনেছিলেন অঙ্কিত চোপড়া। অঙ্কিত কাঁদতে কাঁদতে অমলেশের হাত দুটো ধরে বলল 'আঙ্কল। আমি ভিক্টরদাকে প্রিয়ার সঙ্গে ঘুরতে মানা করেছিলাম। ওরা খারাপ লোক। ভিক্টরদাকে ওরা শেষ করে দিল।'

থানার অফিসার ধমকে উঠলেন, 'বাজে কথা বলছেন কেন? এটা সিম্পল অ্যাক্সিডেন্ট কেস।'

হঠাৎই বাবাইয়ের কাঁধের নিচটায়, অমলেশের মনে হল, যেন একটা গর্ত। অমলেশ আঙুলটা গর্তে চেপে ধরলেন। তারপর চোখের সামনে মেলে ধরলেন—'রক্ত, রক্ত, কাঁধ থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে।'

অঙ্কিত চিৎকার করে উঠল, 'মার দিয়া—মার দিয়া, ভিক্টরদাকো মার দিয়া—ছোড়েঙ্গে নেহি—উন লোগোকো ছোড়েঙ্গে নেহি।'

বড়বাবু এবার ভিক্টরের শরীরটাকে উপুড় করে দিলেন।

ঠিক কাঁধের নিচে, ডানদিকে ছোট্ট একটা ফুটো। বড়বাবু ভিক্টরের শরীরের উপর ঝুঁকে পড়ে ছোট্ট ক্ষতচিহ্নটাকে পরীক্ষা করে বললেন, 'বুলেট ইনজুরি, ক্লোজ রেঞ্জ থেকে ফায়ার করলে তো একজিট পয়েন্ট থাকত। একজিট পয়েন্ট নেই কেন? তবে কি দূর থেকে ফায়ার করেছে?' পাশের অফিসারটিকে গাল দিয়ে বললেন, 'মার্ডারটাকে অ্যাক্সিডেন্ট বলে চালাচ্ছিলে। ব্যাপারটা কী বলো তো?'

সাংবাদিকরা কোত্থেকে খবর পেয়ে গেল কে জানে? ইমার্জেন্সির বাইরে ভিড় করল সাংবাদিক, ভিক্টরের কলেজের বন্ধুরা, জিমের বন্ধুরা আর অফিস কলিগরা। এত লোক? এত লোক ভালোবাসত বাবাইকে? অমলেশ কোনদিন বুঝতেই পারেননি। নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের যেকোনও ছাপোষা লোকের মতোই, লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে ছেলেকে মানুষ করেছেন। ছেলে স্কুল থেকে ফিরলে, কলেজ থেকে ফিরলে, অফিস থেকে ফিরলে, ঘরের দরজা এঁটে নিশ্চিন্ত বোধ করেছেন। যাক বাবা—ছেলে ঘরে চলে এসেছে। আর চিন্তা নেই, ভয় নেই। প্রতিমুহূর্তে ভেবেছেন, বাইরে জীবাণুর মতো থিকথিক করছে খারাপ লোক। তাদের হাত থেকে ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখাই একমাত্র কাজ।

কিন্তু শেষ অবধি পারলেন না। খারাপ লোকদের কাছে হেরেই গেলেন।

ছেলেকে নিয়ে চলে গেল অ্যাম্বুলেন্স। থুড়ি, 'বডি'টাকে নিয়ে গেল অ্যাম্বুলেন্স, পোস্টমর্টেমের জন্য। বডি পেতে পেতে কাল বিকেল হবে। ততক্ষণ কী করবেন অমলেশ—উমা? বাড়িতে তো আর কোনও কাজই নেই। কার জন্য অপেক্ষা করবেন? কার জন্য বাড়িতে যাবেন? তিরিশ বছর আগে বিয়ে হয়েছে—অমলেশের সঙ্গে উমার। তার মধ্যে আটাশ বছর ধরে মূল আকর্ষণই তো বাবাই। তাকে ছাড়া বেঁচে থাকার দরকার কী? অমলেশ উমাকে জড়িয়ে ধরে ইমার্জেন্সির বাইরে বেরিয়ে এলেন। একটা ভিড় ওঁদের জন্য অপেক্ষা করছিল। সাংবাদিকরা ঘিরে ধরল। ক্যামেরার আলো। একটি ছেলে প্রশ্ন করল, 'আপনার কেন মনে হচ্ছে ঘটনাটা মার্ডার?'

অমলেশ ভাবছিলেন কী জবাব দেবেন। পাশ থেকে উমার চিৎকার কানে এল—'প্রিয়া বলে একটা মেয়ে ফোন করে আমার ছেলেকে ডাকে, আমার ছেলে বেরিয়ে যায়। তারপর আমার ছেলেকে ওরা গুলি করে মেরে ফেলেছে। পুলিশ বলছিল অ্যাক্সিডেন্ট। এটা আসলে মার্ডার। প্রিয়া আসলে বড়লোকের ছেলের বউ। পরিচয় লুকিয়ে আমার ছেলেকে ফাঁসায়।'

'প্রিয়া কে?' একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন।

আবার উমার উত্তর কানে এল—'ওরা খুব বড়লোক। বসন্ত পোদ্দারের ছেলের বউ।'

'মাই গড—বিশিষ্ট শিল্পপতি বসন্ত পোদ্দার? তার ছেলে রবি পোদ্দার?'

'জানি না, জানি না—ওরা আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছে।'

'আপনারা এখন কী চান?' একজন সাংবাদিক—আবার প্রশ্ন করলেন।

'ফাঁসি চাই—ফাঁসি চাই—ওদের সবার ফাঁসি চাই।'

'কিন্তু, পুলিশ নাকি প্রথমে অ্যাক্সিডেন্ট বলছিল?' —সাংবাদিকরা আবার প্রশ্ন করলেন।

'পুলিশে আমার ভরসা নেই। আমি সিবিআই তদন্ত চাই। তাহলেই সত্য বেরোবে। ওরা বড়লোক। এই পুলিশকে কিনে নেবে।' —উমা বললেন। অমলেশ অবাক। এত জোর পেল কোথায় উমা? অমলেশ তো ভাবছিলেন, উমাকে বাঁচাবেন কী করে? আর কী বলল উমা—পুলিশি তদন্তে বিশ্বাস নেই? সিবিআই তদন্ত চাই? আসামিদের ফাঁসি চাই? এতক্ষণ অমলেশের পা কাঁপছিল। হাঁটুতে জোর পাচ্ছিলেন না। এখন আবার শরীরে একটা জোর আসছে। ওদিকে অঙ্কিত, দেবজিৎদের গলা কানে আসছে—'আসামিদের এক্ষুনি অ্যারেস্ট করতে হবে। যত বড়লোক, যত প্রভাবশালীই হোক—না কেন। পুলিশ যদি অ্যারেস্ট না করে, তাহলে কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে পথ অবরোধ হবে।'

অমলেশও দাঁতে দাঁত চেপে অস্ফুটে বললেন—'এর শেষ দেখে ছাড়ব। আসামিদের ফাঁসি চাই।'

পুরোহিতমশাইয়ের ডাকে সংবিৎ ফিরল অমলেশের। কতক্ষণ মন্দিরের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে ছিলেন, খেয়াল নেই। পুজো শেষ হয়েছে। মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এসে পুরোহিতমশাই প্রসাদ দিলেন অমলেশকে। অমলেশ ভক্তি ভরে প্রসাদ নিলেন। ভালো করে দেখলেন মন্দিরটিকে। ছোট্ট মন্দির, টিনের চাল। মন্দিরের সামনে গ্রিল দেওয়া। মা—কালীর মন্দির, পাশে শিবলিঙ্গ বসানো। ভারী শান্তি হল অমলেশের। সামনে বড় বড় কয়েকটা গাছ। প্রচুর পাখি। কিচিরমিচির শব্দ। একটা ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। শরীর জুড়িয়ে গেল। কতদিন এরকমভাবে শরীরটা জুড়িয়ে যায়নি। বাবাইয়ের চলে যাওয়া ইস্তক মনে শান্তি নেই। ঠিকমতো রান্না হয় না। রান্না হয় তো খাওয়া হয় না। খাওয়া হয় তো ঘুম হয় না। হারতে হারতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। প্রথম প্রথম সাংবাদিকরা যোগাযোগ রাখত, এখন তারাও আর যোগাযোগ করে না। বেশ কয়েকদিন বড় করে কাগজে খবরটা বেরোত। অমলেশ—উমার বক্তব্য বেরোত। তাঁরা কী চান, কেন তদন্তে দেরি হচ্ছে। এতে বসন্ত পোদ্দারের হাত আছে কি না, সাংবাদিকরা নিখুঁত খবর করতেন। এখন আর বেরোয় না। এখন আবার অন্য খবর হেডলাইন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

প্রসাদ নিতে নিতে পুরোহিতমশাইকেই জিজ্ঞেস করলেন অমলেশ। 'উকিলবাবুর বাড়িটা কোন রাস্তায়?' পুরোহিতমশাই দেখিয়ে দিলেন, 'সোজা যান, দোতলা বাড়ি। গাছগাছালি আছে। বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।'

কলিং বেল বাজাতেই একজন বয়স্ক ভদ্রলোক গ্রিলের ফাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী নাম? অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?'

নাম বললেন অমলেশ, 'দশটায় টাইম নেওয়া আছে।'

'আসুন'। বয়স্ক ভদ্রলোক গ্রিলের দরজা খুলে দিলেন।

বসার ঘরে আরও কয়েকজন বসে আছেন। ছোট ঘর। দু—দিকের দেওয়ালে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঠে—যাওয়া র‍্যাকে বই সাজানো। আর—একদিকের দেওয়ালে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাওয়া স্মারক সাজানো। একদিকে আবার বিভিন্ন খবরের কাগজের কাটিং সুন্দর করে কেটে বোর্ডে পিন দিয়ে আটকানো। অমলেশ না বসে পেপার কাটিংগুলো পড়তে লাগলেন। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন নামকরা কেসে, যেগুলোতে উকিলবাবু জিতেছেন, সেইসব খবর কাগজে বেরোনোর পর সেগুলোকে যত্ন করে কেটে লাগানো হয়েছে। বিভিন্ন কাগজে ওঁর ছবি, ইন্টারভিউ বেরিয়েছে, সেগুলোও লাগানো হয়েছে।

অমলেশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন। অল্পবয়সি জুনিয়র লইয়াররা অন্য ঘরে বসে ব্যস্ত নিজের নিজের কাজে। অমলেশ বুঝলেন, গোটা একতলাটা নিয়েই চেম্বার। প্রায় ছ—সাতটা ঘর জুড়ে চেম্বার চলছে। বড় বড় মাছের অ্যাকোয়ারিয়ামে রঙিন মাছেরা খেলা করছে। একটা কুচকুচে কালো ভয়ংকর চেহারার কুকুর একটা বড় ঘরের কোণে বাঁধা। অমলেশের ধারণা ছিল, তিনিই প্রথম ক্লায়েন্ট। এত সকালে আর কে—ই বা আসবে? কিন্তু, উকিলবাবুর চেম্বার রীতিমতো গমগম করছে। মিনিট দশেকের মধ্যে কন্দর্পনারায়ণ ডেকে পাঠালেন। সুন্দর করে সাজানো একটা ঘরে অমলেশকে নিয়ে আসা হল। এই ঘরেও অ্যাকোয়ারিয়াম। একটা র‍্যাকে প্রচুর স্মারক। সব দেওয়ালেই মেঝে থেকে ছাদ অবধি সাজানো বই। একজন কম্পিউটারে কিছু টাইপ করছেন। কন্দর্পনারায়ণ কাঠের চেয়ারে পিঠ সোজা করে বসে। ধপধপে সাদা চিকনের পাঞ্জাবি, তাতে মিনে করা সোনার বোতাম। চোখ বোজা, অমলেশ এসে বসলেন—কন্দর্পনারায়ণ চোখ খুললেন না। চোখ না খুলেই বললেন, 'বলুন! দুর্গা খৈতান ম্যাডাম পাঠিয়েছেন তো।' টেবিলের ডানদিকে একজন অপেক্ষাকৃত তরুণ দাড়িওয়ালা মানুষ বসে আছেন। কন্দর্পনারায়ণ আলাপ করিয়ে দিলেন, 'দেবাশিস ব্যানার্জি, আপনার মামলায় আমার সঙ্গে থাকবে। পুলিশি অসহযোগিতা সংক্রান্ত মামলা, যাকে বলে পুলিশ ইন্যাকশন—এর মামলা, সেই ধরনের মামলায় ও এক্সপার্ট। অপলক, তুমিও থাকো এই মামলাটায়। আমি অবশ্য এখনও বুঝতে পারিনি কী মামলা করব, আগে ভালো করে শুনব ওঁর কাছ থেকে, ব্যাপারটা কী, তবে মনে হচ্ছে, ক্রিমিনাল মামলার কিছু পয়েন্টও থাকতে পারে।'

অপলক বলে তরুণ উকিলবাবুটি এ ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আরও দু—জন অল্পবয়সি উকিলবাবুও এসে ঢুকলেন, পরে অবশ্য ওঁদের সঙ্গেও অমলেশের আলাপ হয়েছিল। একজন নাজির আহমেদ, আর—একজন সুপ্রিম নস্কর। ওদের দু—জনকে দেখেও কন্দর্পনারায়ণ খুশি হলেন—'তোমরাও থাকবে? থাকো। তবে, লিগাল এইডের মামলা—ফিস নেই কিন্তু। তোমরা জানো, লিগাল এইডের মামলা থেকে কোনও ফিজ আমরা নিই না। তবে হ্যাঁ, মনে হচ্ছে, মামলাটা ইন্টারেস্টিং হবে। তোমরা শিখতে পারবে প্রচুর।' কন্দর্পনারায়ণ বললেন। অমলেশ মনে মনে ধন্য হলেন। এতজন উকিলবাবু থাকবেন ওঁর জন্য!! তবে, আজ অবধি তো শুধু ঠোক্করই খেয়েছেন। পুলিশ তো কিছুই করল না।

'প্রথম থেকে বলুন, কী হয়েছিল? কী চান?'

এতক্ষণে কন্দর্পনারায়ণ সোজা তাকালেন অমলেশের দিকে। অমলেশ চুপ। ভাবছেন, কোথা থেকে শুরু করবেন। কাঁধের ব্যাগটা থেকে আস্তে আস্তে সমস্ত কাগজপত্র বার করলেন। আগে খবরের কাগজের কাটিংগুলো বের করলেন। মেলে ধরলেন কন্দর্পনারায়ণের সামনে। কন্দর্পনারায়ণও একটা একটা করে কাটিং খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করলেন। সেই সময়, সমস্ত খবরের কাগজ খুব সুন্দর করে কভার করেছিল ঘটনাটা। সাংবাদিক ছেলে—মেয়েগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিল অমলেশের। ঘরে উপস্থিত অন্য লইয়াররাও খবরের কাগজের কাটিংগুলো এক এক করে কন্দর্পবাবুর কাছ থেকে নিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়তে শুরু করলেন। কারও মুখেই কোনও কথা নেই। কন্দর্পনারায়ণ মুখ খুললেন, 'হুঁ, মনে পড়ছে। সেইসময় খবরের কাগজে বা নিউজ চ্যানেলগুলোতে খবরটা আমিও ফলো করতাম, কিন্তু আস্তে আস্তে ঘটনাটা মন থেকে হারিয়ে যায়।'

'এবার এফ.আই.আর—টা দেখি। আপনিই তো কমপ্লেইনটা করলেন?' —এবার প্রথম থেকে পুরো ঘটনাটা বললেন অমলেশ।

'বাপের মন তো, মনটা কিছুতেই মানতে চায়নি। এর অবশ্য কিছু কারণও আছে। এক, ও হেলমেট পরত। পুরো মাথা—মুখ ঢাকা হেলমেট, চিবুকে লক করে রাখত। কিন্তু, ওর কপালের কাছটা সামান্য ফাটা ছিল কেন? মাথায় হেলমেট থাকলে কপালটা ফাটার কথা নয়। দুই, ওইটুকু সামান্য ফেটে যাওয়ায় ওর মৃত্যু হবার কথা নয়। মনে রাখবেন, ওর ছ—ফুট হাইট ছিল, মারা যাবার সময় প্রায় আশি—পঁচাশি কেজি ওজন ছিল। তা, আমি যখন ওর গায়ে হাত বুলিয়ে কাঁদছিলাম, তখনই নজর পড়ে, পিঠের কাছ থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। তারপর, আমিই আবিষ্কার করি, ওর কাঁধের কাছে একটা ফুটো। পরে বুঝলাম, ওটা বুলেট ইনজুরি। তখনই মনে হল, পুলিশ কাউকে আড়াল করতে চাইছে না তো?'

'হুঁ, এবার আমার প্রশ্ন'—কন্দর্পনারায়ণ গভীর চিন্তামগ্ন —'এক, হেলমেটটা কোথায়? আপনি দেখেছিলেন? দুই, ওর মোবাইল ফোন কোথায়? আপনার কাছে? তিন, ওর মোটর সাইকেলটা কী অবস্থায় ছিল? চার, ঘটনাস্থল কোথায়? অবশ্য ঘটনাস্থল বলব না, আমার প্রশ্ন হবে, ওকে কোথায় পড়ে থাকতে দেখা গেল? ওই স্পট—এর ছবি আছে?'

অপলক বলে তরুণ উকিলবাবুটি কন্দর্পবাবুকে ফিসফিস করে বললেন, 'স্যার, জিজ্ঞেস করুন, মোবাইলের 'লাস্ট ফোন কলগুলো পুলিশ রিট্রিভ করেছে কি না? উনি বলছেন, প্রিয়ার ফোন পেয়ে ভিক্টরবাবু হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যান, তাহলে লাস্ট ফোন নিশ্চয়ই প্রিয়ার হবে।'

'গুড পয়েন্ট, থ্যাঙ্ক ইউ, অপলক।'

দেবাশিস বললেন 'দাদা, জিজ্ঞেস করো, কাউকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছিল? ওয়ান সিক্সটি ওয়ান স্টেটমেন্টে, অর্থাৎ পুলিশের কাছে দেওয়া বয়ানে, কেউ কিছু দেখেছে বলে বলেছে? বা ওঁকে রাস্তায় পড়ে থাকতে প্রথম কে দেখল?'

'এটাও গুড পয়েন্ট, দেবাশিস, আর তা ছাড়া, এসো, এফ. আই. আর. অর্থাৎ কমপ্লেইন্টটা আগে আমরা ভালো করে পড়ি, তারপর দেখব, স্কেচ ম্যাপ, অর্থাৎ যেখান থেকে ওকে রিকভার করা হল। তারপর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট, পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দি। —এইভাবে আমরা আস্তে আস্তে গভীরে ঢুকব। তারপর ওঁকে আমি জিজ্ঞেস করব, আমাদের কাছে উনি কেন এসেছেন? কী চান?'

অমলেশ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া শুরু করলেন 'এক নম্বর প্রশ্নের উত্তর দিই আগে—হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন, কোনা এক্সপ্রেসওয়ের ওপরে একটা জায়গায়, যে জায়গাটা পুলিশ ঘটনাস্থল বলে বলছে, সেখানেই হেলমেটটা পাওয়া যায়। সামান্য কিছু স্ক্র্যাচ আছে। এই যে হেলমেটটার কিছু ফোটো। আমি নিজেই মোবাইলে ছবি তুলে প্রিন্ট করে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, পুলিশের কাজে লাগতে পারে, কিন্তু পুলিশ গুরুত্বই দেয়নি।'

ছবিগুলো দেখে কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'হেলমেটসুদ্ধ মাটিতে আছড়ে পড়লে হেলমেটে আরও গর্ত হয়ে থাকত। তা ছাড়া আপনি বলছেন, ভিক্টর, মানে আপনার ছেলে, হেলমেট ভালো করে চিবুকের কাছে লক করে রাখতেন, মাটিতে আছড়ে পড়লেও হেলমেট মাথা থেকে খুলবে না। এতো মনে হচ্ছে, দাগগুলো ম্যানুফ্যাকচার করা হয়েছে। অর্থাৎ, তৈরি করা হয়েছে। পাঁচ—সাড়ে পাঁচ ফুট ওপর থেকে একটা হেলমেটকে পিচ রাস্তায় ছুড়ে ফেললে এইরকম ছড়ে—যাওয়া দাগই হবে।'

'তা ছাড়া স্যার, ওঁর ছেলের কপালে ডানদিকে একটা ফেটে যাওয়ার চিহ্ন ছিল। এমন হতে পারে, যখন ওঁকে গুলি করা হয়, তখন উনি বাইকে বসে ছিলেন। কিন্তু বাইক চালাচ্ছিলেন না, গুলিটা খেয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ায় ওঁর কপালটা সামান্য ফেটে যায়।'—অপলক যোগ করলেন।

অমলেশ আবার শুরু করলেন, 'আপনার দু—নম্বর প্রশ্ন মোবাইল নিয়ে। হ্যাঁ, মোবাইল আমার কাছে। পুলিশ রিট্রিভ না করলেও, কল লিস্ট আমি ভোডাফোন—এর কোম্পানির থেকে বের করেছি।'

কন্দর্পবাবু বললেন, 'লাস্ট কলগুলো প্রিয়ার ফোন থেকেই এসেছে। ঘটনার দিন, আটটা নাগাদ, ভিক্টরবাবু অফিস থেকে ঘরে ঢোকেন। প্রিয়ার ফোন এসেছে তার আগে। এই যে কল লিস্ট। প্রিয়ার কাছ থেকে প্রথম ফোন ছ—টায় আসে। প্রায় দু—মিনিট ধরে দু—জনের কথা হয়। একশো দশ সেকেন্ড। ধরে নিচ্ছি, প্রিয়া দেখা করতে চায়। বলে, অনেক কথা বলবার আছে। ভিক্টরবাবু তাকে বলেন, কেন আমার এমন ক্ষতি করলে, প্রিয়া বলে, এসো, সব বুঝিয়ে বলব। ভিক্টরবাবু বলেন, সাঁত্রাগাছিতে কফি শপে এসো। ধরে নিচ্ছি, এই ধরনের কথাই হয়েছে। হ্যাঁ, একশো দশ সেকেন্ড। তার পরের কলটা সাতটা নাগাদ, চল্লিশ সেকেন্ড। এই সময় প্রিয়া নিশ্চিত হতে চাইল, ভিক্টরবাবু আসছেন তো? সাড়ে সাতটায় আপনি ফোন করেছিলেন অমলেশবাবু? এটা তো আপনার নম্বর?'

'হ্যাঁ, প্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কেটে যাবার পর আমি একটা করে ফোন করতাম। দেরি হচ্ছে কেন? অফিস থেকে কখন বেরোবে—এইসব আর কী।'

'ঠিক আটটা চোদ্দোয় প্রিয়া আবার ফোন করে। কিন্তু এটা মিসড কল হয়ে যায়। ধরে নিচ্ছি, আটটা দশ নাগাদ ভিক্টরবাবু বাড়ি থেকে বেরোন আর আটটা চোদ্দোয় উনি মোটর সাইকেল চালাচ্ছিলেন, তাই কলটা ধরতে পারেননি। এ তো গেল, ভোডাভোন থেকে যে কল লিস্টটা আপনি বের করিয়েছেন, সেটা থেকে যা বোঝা গেল। আর মোবাইলটা এবার আমাকে দেখতে দিন।' অমলেশকে বললেন কন্দর্পনারায়ণ।

—'দেখুন, দু—হাজার বারোর শেষের দিকের ঘটনা। আমি আপনার কাছে আসব বলে মোবাইল চার্জ দিয়ে রেডি করে নিয়ে এসেছি—আপনাকে দেখাব বলে। কিন্তু, আশ্চর্যের ব্যাপার হল, হাসপাতালে পুলিশ আমাকে যে মোবাইল দেখায়, তাতে কল লিস্টে কোনও কলই ছিল না।'

'সে কী? তার মানে, ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে কেউ কলগুলোকে ডিলিট করেছে। অন্তত পুলিশ যাতে কিছু সন্দেহ না করে।'

'কিন্তু সে নিশ্চয়ই এটাও জানত, যে কলগুলো ডিলিট করলেও সে বাঁচবে না, কারণ ফোনের কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তো তারা বলে দেবে, লাস্ট কলগুলো কোত্থেকে এসেছিল'।—দেবাশিস যোগ করলেন।

'নিশ্চয়ই তা—ই—হয়তো অপরাধীরা ভেবেছিল, ততক্ষণে তারা পুলিশকে ম্যানেজ করে নেবে—এটাও হতে পারে।'—কন্দর্পনারায়ণ বললেন।

'আপনার তিন নম্বর প্রশ্নের উত্তর—মোটর সাইকেলটার ছবি এগুলো, এই দেখুন, মোটর সাইকেলটা ডানদিকে কাত হয়ে পড়েছিল এবং ডানদিকের লুকিং গ্লাসটা শুধু ভাঙা। গোটা মোটর সাইকেলটাতে আর কোনও ঘষে যাওয়ার দাগও নেই।' অমলেশ বললেন।

হুঁ, তার মানে যদি মোটর সাইকেলটা চলন্ত অবস্থায় কেউ ভিক্টরবাবুকে গুলি করত, তাহলে উনি সজোরে মাটিতে আছড়ে পড়তেন। সেক্ষেত্রে, হেলমেটে স্ক্র্যাচ থাকত। মোটর সাইকেল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হত।'

'এই অবধি আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, মোটর সাইকেলটা চলছিল না, মোটর সাইকেলে চেপে, ভিক্টরবাবু পেছন ফিরে মোটর সাইকেলেই বসে ছিলেন। হেলমেট মাথায় ছিল না। কেউ মোটর সাইকেলের পেছনে এসে বসে। অবশ্যই তিনি পরিচিত। না হলে ভিক্টরবাবু বাইকের পেছনে বসতে অ্যালাউ করতেন না। অথবা ভিক্টরবাবুকে বাধ্য করা হয়েছিল, তা—ও হতে পারে। পেছনে বসে কাঁধের কাছে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হল, ভিক্টরবাবু বাইক নিয়ে ডানদিকে পড়ে গেলেন। সেইজন্যই বাইকেরও ডানদিকের লুকিং গ্লাস ভাঙা, ভিক্টরবাবুরও ডানদিকের কপালটা ফাটা কিন্তু, খুব বেশি রক্ত বেরোয়নি। কারণ ততক্ষণে ভিক্টরবাবুর মৃত্যু হয়েছে।'

'তারপর অপরাধী হেলমেটটা হাতে নিয়ে খুব ক্যাজুয়ালি মাটিতে আছড়ে ফেলে, সেইজন্যই এলোমেলো কিছু স্ক্র্যাচ পড়েছে হেলমেটটায়। গুলি খেয়ে, চলন্ত বাইক থেকে আছড়ে পড়লে, মাথায় হেলমেট থাকলে কপালটা কাটত না।'

অমলেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন—'নিখুঁত আপনার বিশ্লেষণ, একদম ঠিক বলেছেন। আমারও তা—ই ধারণা।' এদিকে চেম্বারে ভিড় বাড়ছে। কন্দর্পনারায়ণ তাঁর ঘরে জুনিয়র লইয়ারদের নিয়ে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত। একজন মুহুরি গোছের লোক কন্দর্পনারায়ণকে কানে কানে বলে গেলেন, 'দাদা, বাইরের ঘরগুলোয় লোক বাড়ছে, কী করব?'

'কেন, দ্বৈপায়ন, পারমিতা, ওরা আছে তো? ওরা সবার সঙ্গে কথা বলুক। কে কী জন্য এসেছেন, নোট করুক। মৌমিতা বা জয়শ্রী, কাউকে নিয়ে ওদিকের ঘরে বসে যাক, স্বাগতা আর শ্রীপর্ণা বরং আর—একটা ঘরে অন্য কোনও ক্লায়েন্টকে নিয়ে বসুক। আর অভ্রদীপ কোথায়? ওকে বলুন, বাইরের ঘরটা সামলাতে। কে কে আসছেন—লাল অ্যাপয়েন্টমেন্টের ডায়েরি দেখে পরপর এক—একটা ঘরে বসিয়ে দিতে।'

অমলেশ বুঝলেন, তিনি অনেকক্ষণ সময় নিয়ে ফেলছেন। কিন্তু, কন্দর্পনারায়ণ আর অন্য জুনিয়র লইয়ারদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সবাই খুব ইন্টারেস্ট পেয়ে গিয়েছেন কেসটায়। তাঁরাও আর এখন কেউই মাঝপথে কেসটা ছেড়ে উঠতে চাইছেন না।

'হ্যাঁ, এবার কমপ্লেইন্ট, আই মিন, আপনার অভিযোগপত্রটা আর পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা দিন।' অমলেশ আবার খুব সাবধানে ফাইল থেকে তাঁর লেখা অভিযোগপত্রটা বের করে কন্দর্পনারায়ণকে দিলেন।

'প্রিয়া আর শ্বশুরবাড়ির লোকদের বিরুদ্ধে স্পেসিফিক অভিযোগ করেছিলেন দেখছি। অভিযোগপত্রের হাতের লেখাটা কার?' —কন্দর্পনারায়ণ প্রশ্ন করলেন।

'সেদিন অনেক রাতে ট্যাক্সি করে আমি আর পাড়ার কয়েকজন থানায় যাই। আমার তখন মাথা কাজই করছিল না। আটাশ বছরের জোয়ান তরতাজা ছেলেকে হারিয়েছি। মাথার ঠিক থাকে, বলুন? তখন আমি বললাম, আর দেবজিৎ লিখল, আমি সই করে দিলাম। হ্যাঁ, প্রিয়া, ওর হাজব্যান্ড রবি পোদ্দার, শ্বশুর বসন্ত পোদ্দার আর রবি পোদ্দারের বন্ধু, যে বার বার আমার ছেলেকে ফোন করে হুমকি দিত—সেই রফিক, প্রত্যেকের নামেই খুনের অভিযোগ করেছিলাম। প্রথমে পুলিশ এফ. আই. আর. নিতেই চাইছিল না। বলছিল, এই অভিযুক্তদের সম্পর্কে আপনি তো নিশ্চিত নন যে, ওরাই মেরেছে। কাজেই এই নামগুলো কেটে দিন। আমরা 'আননোন অ্যাকিউজড'—দের বিরুদ্ধে মামলা চালু করছি, না হলে অভিযোগ নেব না। শেষে বাবাইয়ের একজন কলিগ, তার বাবা, যিনি কলকাতা পুলিশের একজন ডিসি তাঁকে অনুরোধ করায়, তিনি থানায় ফোন করে দিলেন—তারপর থানা এফ. আই. আর. জমা নেয়।' অমলেশ বললেন—

'হুঁ! এবার পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা দিন।'

অমলেশ পোস্টমর্টেম রিপোর্টের কপি বের করে দিলেন।

'উফ!! এই এক জ্বালা, এই ডাক্তারদের হাতের লেখা বুঝবে কে? আর কী যে লেখে—নাজির, ম্যাগনিফায়িং গ্লাসটা আনো।'—কন্দর্পনারায়ণ বললেন,

পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা, টেবিলে বিছিয়ে দেওয়া হল।

দু—তিনটে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস নিয়ে এলেন নাজির। একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস বেশ কারুকার্য করা। অমলেশ বুঝলেন, ওটা হাতির দাঁত দিয়ে বাঁধানো, হ্যান্ডেলে হাতির দাঁতের উপর মিনে—করা। ওটাই কন্দর্পনারায়ণ নিলেন। কেন যেন কন্দর্পনারায়ণের উপর আস্তে আস্তে আস্থা জন্মাচ্ছে অমলেশের। মনে হচ্ছে, পারলে উনিই পারবেন। তবে উনি একা নন। কন্দর্পনারায়ণের বেশ বড় একটা টিম। টিমের প্রত্যেকে এক—একটি সৈনিক। বাবাইয়ের মৃত্যুর পর অনেকের কাছেই গিয়েছেন পরামর্শ নিতে, অনেক লড়াই করেছেন, উমা তো হালই ছেড়ে দিয়েছেন। আজ সঙ্গে উমাকে নিয়ে এলে বেচারির আবার আশা জাগত, যে কিছু একটা হবে। অপরাধীরা সাজা পাবে।

তবে টিভি—তে দেখে কন্দর্পনারায়ণকে বেশ ভারিক্কি লাগে। কিন্তু সামনাসামনি অতটা ভারিক্কি নন, বয়সও বেশি নয়। পঁয়তাল্লিশের আশপাশে হবে। ফরসা মুখে মোটা গোঁফ নেমেছে, দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার হিরোদের স্টাইলে।

'এই দেখো, আমার মনে এই প্রশ্নটাই জাগছিল। কাঁধ দিয়ে গুলিটা যদি ঢোকে, গুলিটা বেরোল কোথা দিয়ে? ক্লোজ রেঞ্জে, মানে পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করলে গুলিটা আর—একদিক দিয়ে, মানে পিঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবার কথা। আর যেহেতু ভিক্টরবাবুর ব্যায়াম—করা শক্ত চেহারা, গুলিটা যদি পিঠ ফুঁড়ে না—ও বেরোয়, সেক্ষেত্রে গুলিটা ভিতরে থেকে যাবার কথা। কিন্তু পোস্টমর্টেম রিপোর্টে, এন্ট্রি পয়েন্টে 'ব্ল্যাকেনিং, ট্যাটুয়িং, বার্নিং'—এর চিহ্ন রয়েছে। মানে, ক্লোজ রেঞ্জে অর্থাৎ পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করায়, ওই স্পটটা পুড়ে কালচে হয়ে গেছে। দূর থেকে গুলি করলে ওটা হত না। এখন দেখছি, কাঁধের কাছ থেকে গুলিটা ঢুকে হিপ জয়েন্টে আটকে গেছে। পোস্টমর্টেমের সময় ডাক্তারবাবু গুলিটা বের করেছেন।'

'আর পোস্টমর্টেম ডাক্তারদের যা হাতের লেখা। বোঝাও যায় না আর ওঁরা চানও না, কেউ হাতের লেখা বুঝুক। আগে ডাক্তারবাবুরা পোস্টমর্টেম করে একটা টাইম অফ ডেথ লিখে দিতেন। এখন তো আর তা—ও লেখেন না। ডোমরা পোস্টমর্টেম করে আর ডাক্তারবাবুরা শুধু সই করেন, অ্যাবসোলিউটলি নন অ্যাপ্লিকেশন অফ মাইন্ড।'

'স্যার, সেদিন ডিভিশন বেঞ্চে, ওপেন কোর্টে, পি. পি.—কে ডেকে, একজন জজ সাহেব ঠিক এ—কথাই বললেন, উনি এটাও বললেন, এরপর থেকে প্রতিটা কেসে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বুঝতে না পারলে ডাক্তারবাবুদের কোর্টে ডেকে এনে দাঁড় করিয়ে রিপোর্ট পড়াবেন। সেদিন ওই জজ সাহেব অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।' —অপলক যোগ করলেন।

'শুধু তা—ই নয়, দাদা, ক—দিন আগে পুলক বসু সাহেবের ডিভিশন বেঞ্চে একজন নামকরা পোস্টমর্টেম ডক্টরকে ডেকে এনে, যা নয় তা—ই বলে উনি বকাঝকা করলেন। উনি নাকি প্রায় একশোটার বেশি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কমপ্লিট করে জমা দেননি। জজ সাহেব এটাও বললেন, সাত দিনের মধ্যে যদি উনি পেন্ডিং পোস্টমর্টেম রিপোর্টগুলি জমা না দেন, তাহলে জজ সাহেব ভয়ংকর স্টেপ নেবেন।' দেবাশিসও একটা ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে খুঁটিয়ে রিপোর্টটা দেখছিলেন—উনি এতক্ষণে মুখ খুললেন।

কন্দর্পনারায়ণ বলতে শুরু করলেন, 'একটা সময় ছিল, যখন এই ডাক্তারবাবুদের দায়বদ্ধতা ছিল। কারণ, ওঁদের রিপোর্টের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করত। আজকে সেসব দায়বদ্ধতা আর নেই। তদন্তকারী অফিসারদের কথায় এঁরা ওঠেন—বসেন। কত মানুষের জীবন এঁদের ওপর নির্ভর করে। আত্মহত্যাকে হত্যা বলে রিপোর্ট দিলে তো হয়ে গেল, একটা লোকের সারাজীবন জেল! সেদিন দেব সাহেবের ডিভিশন বেঞ্চে আমি ঠিক এই আর্গুমেন্টটাই করলাম। এক ভদ্রমহিলা আত্মহত্যা করেছেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে ডাক্তারবাবু লিখে দিয়েছেন হত্যা। জেনে রাখো, সাধারণত, কেউ যখন গলায় দড়ি দিয়ে বা কাপড়ের ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করবে, তখন গলায় যে মার্কটা পাওয়া যাবে, সেটাকে বলে নন—কন্টিনিউয়াস লিগেচার মার্ক', আর যদি কেউ হত্যার উদ্দেশ্যে কাউকে গলায় দড়ি জড়িয়ে মেরে ফেলে সেটা হবে কন্টিনিউয়াস লিগেচার মার্ক। গলায় দড়ির দাগ দেখেই বলে দেওয়া যায়, যে সেটি হত্যা নাকি আত্মহত্যার ঘটনা। আজকালকার পোস্টমর্টেম ডাক্তাররা সেটুকুও ঠিকঠাক বলেন না। অথচ, জজ সাহেবরা ওঁদের কথায় কত গুরুত্ব দেন। পুত্রবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে, স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, জা—ভাসুর, সব্বাইকে ধরে জেলে পুরে দিচ্ছেন।'

'আচ্ছা, সিজার লিস্টটা দিন তো, ওই যে মোবাইল কল লিস্টের কথা আমরা আলোচনা করছিলাম, সেই কল লিস্টটা পুলিশ সিজ করেছিল? দ্বিতীয়ত, এই যে পুলিশ গুলিটা পোস্টমর্টেমের সময় পেল, সেটা কী করল? অভিযুক্তদের অ্যারেস্ট করে, তাদের কাছ থেকে মার্ডারিং ওয়েপন বা খুনে ব্যবহৃত পিস্তলটা রিকভার করেছিল?' —কন্দর্পনারায়ণ চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করলেন।

অমলেশ ঘাড় নেড়ে বললেন, 'না, পুলিশ আমার বের করা এই কল লিস্টটা আমার কাছ থেকে সিজ করেনি। আবার, ওরাও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনও কল লিস্ট বের করেনি। দ্বিতীয়ত, পুলিশ, আমি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলাম, তাদের কাউকেই অ্যারেস্ট করেনি। কাজেই ওদের কাছ থেকে খুনে ব্যবহৃত রিভলভারটা রিকভার করার প্রশ্নই নেই। অভিযুক্তরা প্রত্যেকেই জেলা জজের আদালত থেকেই আগাম জামিন নিয়ে নেয়। পুলিশ কেস ডায়েরিতে ওদের বিরুদ্ধে প্র্যাকটিক্যালি কিছুই লেখেনি।'

'তাআআই?' —স্বগতোক্তি করলেন কন্দর্পনারায়ণ।

'অবশেষে, যদিও দু—হাজার বারোর শেষের ঘটনা, দু—হাজার উনিশের মাঝামাঝি পুলিশ এতদিন পরে চার্জশিট দিয়ে দেয়। আসলে এফ. আর টি দেয়।' —অমলেশ বললেন,

'ফাইনাল রিপোর্ট—ট্রু? দেখি দেখি।' —কন্দর্পনারায়ণ উৎসুক হয়ে উঠলেন।

অমলেশ চার্জশীটের ফোটোকপিগুলো টেবিলে রাখলেন।

'দেবাশিস, অপলক, এই দেখো! চার্জশিট দিয়েছে ফাইনাল রিপোর্ট—ট্রু বলে। অর্থাৎ, খুনের ঘটনাটা সত্যি বলে পুলিশ মেনে নিচ্ছে। কিন্তু, ''অপরাধী কারা'', এই কলামটায় কারও নাম নেই। চার্জশিট দিচ্ছে, ''আননোন অ্যাকিউজড'' বলে! শাব্বাশ! তোমরা একই সঙ্গে মেনে নিলে যে, এটা একটা খুনের ঘটনা, কিন্তু কারা খুন করেছে, তোমরা জানো না? বাঃ বাঃ, এই তোমরা সাধারণ মানুষকে রিলিফ দিচ্ছ? সাধারণ মানুষ তোমাদের ওপর ভরসা করছে—ছি ছি।'

'সুপ্রিম, ক্রিমিনাল প্রসিডিয়োর কোডটা বের করো তো।'

সুপ্রিম উঠে, সামনের র‍্যাক থেকে একটা মোটা বাঁধানো বই বের করলেন—'দাদা, একশো তিয়াত্তরের দুইয়ের ডি ধারাটা দেখো।'

'রাইট, এইটাই তো চাইছিলাম—বুঝলেন অমলেশবাবু, সি.আর.পিসি বা ক্রিমিনাল প্রসিডিয়োর কোড—এর এই ধারাতে বলা আছে যে, তদন্তের শেষে পুলিশ যখন মেনে নিচ্ছে, যে একটা খুন হয়েছে, তখন পুলিশকেই বলতে হবে, যে কারা অপরাধটা করেছে। একই সঙ্গে, তুমি খুন হয়েছে মেনে নিচ্ছ, কিন্তু কারা খুন করেছে বলতে পারছ না, তা কিন্তু হবে না। তাহলেই প্রশ্ন উঠবে, তুমি তাহলে কী তদন্ত করলে? তদন্ত তাহলে সঠিক হয়নি।'

অপলক বললেন, 'স্যার, চার্জশিটে আর দুটো ইন্টারেস্টিং টুইস্ট আছে, দেখেছেন?'

'ইয়েস অপলক, দেখেছি—দেখেছি', বলে কন্দর্পনারায়ণ মুচকি হাসলেন। 'জমে গেছে হে, জমে গেছে। খেলা জমে গেছে। এই, প্রিয়াঙ্কাকে ডাকো, একটু মুখশুদ্ধি খাওয়াও, এই তো বেশ ইন্টারেস্ট পাচ্ছি।'

প্রিয়াঙ্কা বলে একটি অল্পবয়সি মেয়ে, অমলেশ বুঝলেন ইনিও একজন জুনিয়র লইয়ার, আমলকীর মুখশুদ্ধি ভরা কৌটো থেকে আমলকী বের করে কন্দর্পনারায়ণকে দিলেন। অমলেশ বুঝলেন, কন্দর্পনারায়ণকে এতক্ষণ তিনি চা, সিগারেট, পান কিছুই খেতে দেখেননি। এই চেম্বারে তিনি দশটার আগে থেকে আছেন, এখন প্রায় বারোটা বাজে। তার মানে, কেসে ইন্টারেস্ট পেলে ইনি খান মুখশুদ্ধি, ওই মাউথ ফ্রেশনার টাইপের আর কী। সবাই কৌটো থেকে একটু করে মুখশুদ্ধি নিয়ে মুখে ভরে দিয়ে আবার কাগজপত্রে ডুবে গেলেন।

অন্য কোনও ঘরে বোধহয় কাক্কু ক্লক রয়েছে। কুক কুক করে ঘড়িটা জানান দিল যে বেলা বারোটা বাজে। কন্দর্পনারায়ণ চার্জশিট থেকে মুখ তুলে বললেন, 'বারোটা বাজে। তোমরা সুইগিতে লাঞ্চের অর্ডার করে দাও। কে কী খাবে? নাজির আর অভ্রদীপ, তোমরা খাবারদাবারের দিকটা দেখো। আজ তোমরা ক—জন? মেয়েরা কী খাবে জিজ্ঞেস করে নাও।' অমলেশ জানতেন, শনি, রবি আর ছুটির দিনগুলোয় সারাদিন এখানে চেম্বার চলে। একেবারে রাত অবধি। খাওয়াদাওয়াটা সবাই তার মানে একসঙ্গেই সারেন।

কন্দর্পনারায়ণ বলা শুরু করলেন, 'অপলক, দেখো, পুলিশের কাছে কেউ কিচ্ছু বলেনি। ওয়ান সিক্সটি ওয়ান স্টেটমেন্টে পরিষ্কার যে, কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই। অর্থাৎ, গুলি করতে কেউ দেখেনি। কে গুলি করেছে আমরা জানি না। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার যে, পিঠে গুলি করা হয়েছে। খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। খুব পরিচিত লোক ছাড়া বাইকে, ভিক্টরবাবুর পেছনের সিটে কেউ বসবে কেন?'

'জোর করেও তো বসতে পারে? পরিষ্কার পিস্তল দেখিয়ে কেউ হয়তো বলল, চল, আমাকে নিয়ে, না হলে গুলি করব। ভয় দেখিয়ে বাইকের পেছনে বসে। তারপর সত্যি সত্যিই গুলি করল', নাজির বললেন।

—'হুউউ!! হতেই পারে, সেটাও একটা সম্ভাবনা। তবে, তিন—চারজন, যেমন অমলেশবাবু, ওঁর স্ত্রী, অঙ্কিত আর ভিক্টরবাবুর আরও একজন কলিগ, যিনি প্রিয়ার ব্যাপারটা জানতেন, মানে ভিক্টরবাবুই বলেছিলেন, তাঁরা কিন্তু তদন্তকারী অফিসারকে বলেছিলেন প্রিয়ার ব্যাপারে। সবচেয়ে বড় কথা, ভিক্টরবাবুকে লাস্ট ফোনগুলো করেছিলেন প্রিয়ংবদা বা প্রিয়া পোদ্দার, সে নিয়ে কোনও সন্দেহই নেই। পুলিশ চাইলে কল লিস্ট বের করতেই পারত। এই কেসটা পুরোটাই সারকমস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স—এর ওপর। অর্থাৎ, পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে, কিন্তু পুলিশ চাইলেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যার ষড়যন্ত্রের ধারায় চার্জশিট দিতে পারত।' —কন্দর্পনারায়ণ বলে চললেন।

অপলক বললেন, 'স্যার, বাস্তবে হল উলটো, পুলিশ খুঁজছিল একটা রাস্তা, যাতে অভিযুক্তদের সব অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া যায়। তারা অভিযুক্তদের লাই ডিটেক্টর টেস্টে বসাল।'

'ইয়েসস। লাই ডিটেক্টর টেস্টে পাওয়া গেল—অন্তত তিনজন সত্যি বলছেন না—এই তিনজন হলেন বসন্ত পোদ্দারের ছেলে রবি পোদ্দার, রবি পোদ্দারের স্ত্রী প্রিয়ংবদা পোদ্দার আর রবি পোদ্দারের প্রিয় বন্ধু রফিক পারভেজ। এই হল লাই ডিটেক্টর টেস্টের রিপোর্ট। আর এইটাই এই কেসে গুরুত্বপূর্ণ টুইস্ট। পুলিশ পড়ল বিপদে। লাই ডিটেক্টর টেস্টের রিপোর্ট মানতে হলে, বসন্ত পোদ্দারকে বাদ দিয়ে, বাকি তিনজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দিতে হবে এবং ওই তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা চালাতে হবে। পুলিশ সেটা চায় না। তারা এবার ওই চারজনের নারকো অ্যানালিসিস করাল। এই রিপোর্টটা পরিষ্কার এল না। অর্থাৎ, নারকো অ্যানালিসিস রিপোর্টে অপরাধটা ওঁরা চারজনেই করেছেন কি না, সেটা পরিষ্কার হল না। আর তারপরই দু—হাজার উনিশের জুন মাসে পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেয়। এবং বলে যে, ভিক্টর ঘোষ খুন হয়েছেন, কিন্তু কারা খুন করেছেন, বলা সম্ভব নয়। অতএব, ওই অভিযুক্তরা সব অভিযোগ থেকে মুক্ত হল। পুলিশ এই নারকো অ্যানালিসিস টুইস্টটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। তারা এই রিপোর্টে অত্যন্ত খুশি হয়ে ওই অভিযুক্তদের সব অভিযোগ থেকে মুক্ত করে দিল। অপলক, লাই ডিটেক্টর টেস্ট, আর নারকো অ্যানালিসিস—এই দুটো বিষয়ের উপর পড়াশোনা করো। বই বের করো। সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্টের এই সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার রায় বের করো। রেডি হতে হবে।' —কন্দর্পনারায়ণবাবু বলে যাচ্ছেন, 'তার মানে অমলেশবাবু, ভিক্টর ঘোষ খুন তো হয়েছেন। কিন্তু খুনি কারা তা বলা সম্ভব নয়। এবার আপনি কী চান? আমার কাছে কেন এসেছেন? অবশ্য আমি বুঝতে পারছি, আপনি কী চান, কিন্তু তবু আপনার মুখ থেকে শুনতে চাইছি।'—এতক্ষণে সামনে ছড়ানো কাগজপত্র ছেড়ে কন্দর্পনারায়ণ চেয়ারে হেলান দিয়ে অমলেশের দিকে সোজা তাকালেন।

দু—হাজার বারো থেকে দু—হাজার উনিশ, টানা সাত বছর অমলেশ থানা, পুলিশ, বিভিন্ন উকিলের কাছে দৌড়োদৌড়ি করেছেন। পুলিশ বাবাইকে খুনের মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেবার পরও বহু লইয়ারের কাছে গিয়েছেন। কিন্তু অমলেশের মনের কথা এতক্ষণ ধরে কেউ শোনেননি। এখানে অমলেশ অনেক কথা বলতে পেরেছেন। যে কথাগুলো কাউকে শোনাতে পারেননি, ইনি আর এঁর টিম ধৈর্য ধরে শুনেছেন। মনের মধ্যে কোথাও একটা জোর পাচ্ছেন, বিশ্বাস জাগছে। যা অমলেশ চাইছেন তা হতেও পারে। কন্দর্পনারায়ণের চেম্বারের অন্য লইয়ারদের মুখের দিকে দেখলেন অমলেশ। প্রত্যেকটা মুখ ঝকঝকে, নিষ্পাপ, কিছু করে দেখাবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যেন অমলেশবাবুর কিছু বলার অপেক্ষায়।

প্রিয়াঙ্কা বলে লইয়ার মেয়েটি আবার কৌটো থেকে মুখশুদ্ধি দিলেন কন্দর্পনারায়ণকে। কন্দর্পনারায়ণ কাঠের চেয়ারে পিঠ সোজা করে বসে মুখশুদ্ধি চিবোচ্ছেন। ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা। পাশের ঘরে ওই বুড়োমতন ভদ্রলোক ঠাকুরের কাছে ধূপকাঠি জ্বেলেছেন। ঘরে সুন্দর চন্দনের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।

অমলেশ যেন দেখতে পাচ্ছেন—জগাছায় তাঁর ছোট্ট দোতলা বাড়ির একতলায় ঠাকুরঘরে উমা বসে আছেন, বাবাইয়ের ছবির সামনে। চন্দন—ধূপ জ্বেলে। ধূপের ধোঁয়াটা গোল হয়ে বাবাইয়ের ছবির সামনে থমকে আছে। উমার জ্বালানো ধূপের গন্ধটা কি কন্দর্পনারায়ণের ঘরেও? সেই দৃশ্যটা সিনেমার মতো চোখে ভেসে উঠল—বিধ্বস্ত বাবাই ঘরে ঢুকল, উলোঝুলো চেহারা। হাত দুটো শরীরের দু—পাশে ঝুলছে। গায়ে যেন কোনও জোর নেই। অমলেশের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুকরে উঠল—'বাবা, ও আমাকে ঠকিয়েছে।'

চেম্বারে উপস্থিত প্রত্যেকে চুপ। অমলেশ শান্ত—ধীর—স্থিরভাবে কিন্তু খুব জোরের সঙ্গে বললেন, 'যারা আমার ছেলেকে মেরেছে, আমি তাদের শাস্তি চাই। আমি চাই, আমার ছেলের খুনিরা ধরা পড়ুক, আমি জানি তারা কারা। পুলিশ আমার কথা শোনেনি। আমি সিবিআই তদন্ত চাই।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'আমি জানতাম, আপনি এ কথা বলবেন। প্রশ্ন হল, সিবিআই কেন? আমি তো ফারদার ইনভেস্টিগেশন বা পুনরায় তদন্ত চাইতেই পারি। সেক্ষেত্রে অন্য কোনও পুলিশ অফিসার তদন্ত করবেন। এমনকী, স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা এসআইটি তৈরি করা যেতে পারে। একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশের নেতৃত্বে একটা টিম তৈরি করে দেবেন হাইকোর্ট। ওই স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম তদন্ত করে হাইকোর্টে রিপোর্ট জমা দেবেন। সেই ব্যাপারটাও তো খারাপ হবে না।'

অমলেশ দৃঢ়তার সঙ্গে মাথা নেড়ে বললেন, 'না স্যার। পুলিশ আবার নতুন করে তদন্ত শুরু করেও কিছুই করতে পারবে না। তা ছাড়া সাত বছরের বেশি হয়ে গেছে। নতুনভাবে তদন্ত করে ওরা প্রিয়া পোদ্দারদের অ্যারেস্ট করতে পারবে বলে মনে হয় না। আর, পোদ্দার ফ্যামিলি সমাজে প্রতিপত্তিশালী। এই ক—বছরে বহু লোক আমাকে বলেছে যে, আমি নাকি ওদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারব না। আমি বলছি না, সব পুলিশ খারাপ, কিন্তু সমাজে যাদের টাকা আছে, তাদেরই পাওয়ার আছে—আমি তো তা—ই দেখলাম। আচ্ছা স্যার, ওরা আমার ছেলেকে মারল কেন? বাবাই যখন জানল যে, প্রিয়া পোদ্দার ম্যারেড, ও তো সরে আসছিল। আর ঘটনার দিন তো প্রিয়া পোদ্দার বাবাইকে ফোন করে ডাকে। বাবাই জোর করে ওকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল—তা তো নয়।'

একটু থেমে অমলেশ আবার শুরু করলেন, 'আমি অনেক আশা নিয়ে এসেছি। আপনি সিবিআই তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে মামলা করুন। আমি বিশ্বাস করি, সত্যের জয় হবেই।'

কন্দর্পনারায়ণ ঘরে উপস্থিত, অন্য লইয়ারদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'চলুন'। দেখি কী করা যায়। সমস্ত কাগজপত্র রেখে যান। এফ. আই. আর., পোস্টমর্টেম রিপোর্ট, পুলিশের কাছে দেওয়া সাক্ষীদের বয়ান, চার্জশিট, নিচের কোর্টে চলা এই মামলার অর্ডার কপি।' অপলকের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি দেখে নাও, এই মামলাটা যে কোর্টে পেন্ডিং, মানে হাওড়া কোর্টে, এই চার্জশিটের বিরুদ্ধে একটা নারাজি পিটিশন দাখিল করা আছে তো? না হলে আবার হাইকোর্ট বলবে, ওখানে, এই চার্জশিটের বিরুদ্ধে একটা নারাজি পিটিশন করোনি কেন? আর হাওড়া কোর্টের সব অর্ডার কপি দেখে নাও।'

অমলেশ অবশ্য বুদ্ধি করে হাওড়া কোর্টের এই মামলা সংক্রান্ত যাবতীয় অর্ডার কপি তুলে জেরক্স করে নিয়েই এসেছেন। অমলেশ আস্তে আস্তে সব কাগজ সুন্দর করে সাজিয়ে দেবাশিসবাবুর হাতে দিলেন। কন্দর্পনারায়ণ দেবাশিসবাবু আর অপলকবাবুকে বললেন, 'সিবিআই এনকোয়্যারি চেয়ে মামলা রেডি করো। বেশি সময় দেওয়া যাবে না, আজ রবিবার, বুধবার মামলা হাইকোর্টে ফাইল করে দেব। বেস্পতি বা শুক্রবার মামলার শুনানি হবে। আর হ্যাঁ, আপনি একটু সাবধানে থাকবেন। মামলা ফাইল হলেই অভিযুক্তরা আপনাকে ভয় দেখাতে পারে বা হুমকি দিতে পারে। তেমন কিছু হলেই আমাকে ফোন করবেন।'

অমলেশ চেয়ার ছেড়ে উঠে কন্দর্পনারায়ণকে ও চেম্বারে উপস্থিত অন্য সকলকে নমস্কার করে বললেন, 'আপনার উপযুক্ত পারিশ্রমিক তো আমি দিতে পারব না। তবু যদি অন্তত মামলা হাইকোর্টে ফাইল করা ও অন্য আনুষঙ্গিক খরচাটা একটু বলেন, যেমন—টাইপ, জেরক্স ইত্যাদি। আর তা ছাড়া আরও সবাই রয়েছেন, ওঁরাও তো আমার জন্য খাটাখাটনি করবেন।'

কন্দর্পনারায়ণ হাত তুলে, কথার মাঝখানেই অমলেশকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'প্রথমত লিগাল এইডের মামলায় আমি এক পয়সাও নিই না। আমি মনে করি, সমাজের প্রতি এটা আমার কর্তব্য। আর তা ছাড়া, এই ঘরে আপনি অন্য যে লইয়ারদের দেখছেন, ওরা আমারই ছাত্র, নিশ্চয়ই ওরা আমার এই কথাটুকু মেনে চলবে, যে সমাজের প্রতি আমাদের একটা কর্তব্য আছে। অন্তত লিগাল এইড থেকে আমাদের কাছে যাদের পাঠানো হয়, তাঁদের আর্থিক অবস্থা আমরা বুঝি, তাঁদের কাছ থেকে তো নয়ই, এই মামলায় খরচ হওয়া একটা পয়সাও, এমনকী টাইপ, জেরক্স, কোনও পয়সাই আমরা লিগাল এইডের কাছ থেকে নেব না। আপনি আসুন। আর আমরা ফিজ নিচ্ছি না বলে ভাববেন না, আমাদের সিনসিয়ারিটির কোনও অভাব হবে। আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আপনার মামলাটা করব। বাড়িতে যান, আপনার স্ত্রী আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁকে গিয়ে বলুন, মামলাটা আমি করছি, তিনিও শান্তি পাবেন।'

অমলেশ জানেন যে, উমা শান্তি পাবেন। উমার দৃঢ় বিশ্বাস, সিবিআই তদন্ত হলে বাবাইকে যারা মেরেছে, তারা শাস্তি পাবেই। অমলেশ মনে মনে বললেন, উমা, আমি আসছি, ততক্ষণ তোমার পুজো শেষ করো। অনেকদিন পর নিশ্চিন্তে একসঙ্গে ভাত খাব। সে—এ—এই দু—হাজার বারোর একুশে ডিসেম্বর। সেদিন থেকে উমা আর ভালো করে খাওয়াদাওয়া করেন না। পাথরের মূর্তি হয়ে গিয়েছেন। অমলেশই রান্নাবান্না করেন। স্ত্রী—কে খাওয়ান। থানায়, কোর্টে, উকিলের বাড়ি যাবার দরকার হলে দরজার বাইরে দিয়ে তালা দিয়ে যান। এসে আবার তালা খুলে ঢোকেন। বেশির ভাগ দিনই এসে দেখেন, উমা পাথরের মূর্তির মতো ঠাকুরঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে বাবাইয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে ঠায় বসে আছেন।

অমলেশ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবার পর কন্দর্পনারায়ণ প্রথমে মুখ খুললেন, 'সারাজীবন পুলিশের তদন্তের বিরোধিতা করে কত মামলা করেছি। সিবিআই তদন্ত চেয়ে কত মামলা করেছি। কিন্তু, আজকে এই ভদ্রলোক আর ওঁর স্ত্রী—র কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল গো—এ মামলাটা চলো মনপ্রাণ দিয়ে করি।'

দেবাশিস বললেন, 'দাদা, আমরা তো প্রতিটা মামলা মনপ্রাণ ঢেলেই করি। তবে হ্যাঁ, আটাশ বছরের তরতাজা ছেলেকে উনি হারিয়েছেন। একদল বড়লোকের কাছে আমরা হারব—নিশ্চয়ই না—চলো দাদা—দেখিয়ে দিই।'

সুপ্রিম বললেন, 'তবে স্যার, ওরা কলকাতার তাবড় বাঘা উকিলদের দাঁড় করাবে।'

কন্দর্পনারায়ণ কৌটো থেকে দুটো আমলকীর মুখশুদ্ধি মুখে ফেলে বললেন, 'ওরা ওঁদের কাজ করবে আর আমরা লড়ব হৃদয় দিয়ে।' বলে, ডান হাত দিয়ে নিজের বুকের বাঁদিকটায় হাত রাখলেন।

নাজির বললেন, 'স্যার, অনেক বেলা হয়ে গেছে। এখনও অনেক ক্লায়েন্ট আছে। আমরাও লাঞ্চটা করি। আপনিও করে নিন। আজকে চেম্বার ছেড়ে উঠতে অনেক রাত হয়ে যাবে।'

কন্দর্পনারায়ণ অন্যমনস্ক হয়ে ঘরে রাখা অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙিন মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য, তাদের অপরাধীদের সঙ্গে লড়তে তো হয়ই, কখনো কখনো পুলিশের সঙ্গেও লড়তে হচ্ছে, যখন পুলিশ নিজেই অপরাধীদের আড়াল করতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা হল কোর্ট। চলো, দেখি, কোর্টে কী করতে পারি।'

ঠিক সাড়ে পাঁচটায় রোজই ঘুম ভাঙে কন্দর্পনারায়ণের। জগিংয়ের জন্য রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়েন। রোজকার রুটিন এটাই। আজও একটা টি—শার্ট, শর্টস আর স্নিকার পরে জগিংয়ের জন্য বেরিয়ে পড়লেন।

গল্ফ গ্রিন সেন্ট্রাল পার্কটাকে দুটো চক্কর মেরে, জগিং করতে করতে লেক গার্ডেন্সের দিকে এগোলেন। এখন ছ—টা কুড়ি। সাড়ে ছ—টার সময় লর্ডস বেকারির আগে 'ভারত পেট্রোলিয়াম' ভবনের সামনে আসবেন রূপকদা—রূপক সাহা। একটি নামী খবরের কাগজে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন। এখন ওই কাগজের চাকরি থেকে রিটায়ার করে গল্প—উপন্যাস লেখেন। ওঁর লেখা বইয়ের জনপ্রিয়তা খুব। কাল রাতে রূপক সাহাকে ফোন করেছিলেন। ভিক্টর ঘোষ মার্ডার কেসটার কথা বলতেই রূপকদা নিজেই গড়গড়িয়ে সব ঘটনা বলে গেলেন। সে সময় রূপকদা খবরের কাগজে চাকরি করতেন। রূপকদাই বললেন, রাতেই আর—একটু পুরোনো খবরের কাগজের কাটিংগুলো বের করে স্টাডি করে নেবেন। আর আজ সকাল সাড়ে ছ—টার সময় লর্ডস বেকারির আগে 'ভারত পেট্রোলিয়াম' ভবনের সামনে দেখা করবেন। মর্নিং ওয়াক করতে করতে উনিও চলে আসবেন ওখানে। ওখানেই কথা হবে। রূপকদা থাকেন লর্ডস বেকারিতেই। ওঁর বাড়ি থেকেও জায়গাটা কাছেই হবে। মর্নিং ওয়াকও হবে, আবার এই কেসটা নিয়ে আলোচনাও হবে। কন্দর্পনারায়ণের জীবনে রূপক সাহার ভূমিকাটা, ফেলুদার জীবনে সিধুজ্যাঠার ভূমিকার মতোই। সিধুজ্যাঠার যেমন যেকোনও বিষয়ে অপরিসীম জ্ঞান, রূপকদারও তেমনি। সারা পৃথিবীতে কোথায় কোন ক্রাইম হয়েছে? অপরাধী কে? পুলিশ কাকে অ্যারেস্ট করল? কোথায় কোন বড় ঘটনা ঘটল? সব জানেন আর সবচেয়ে বড় কথা, মনে রাখতে পারেন।

কন্দর্পনারায়ণ 'ভারত পেট্রোলিয়াম' ভবনের সামনে পৌঁছে দেখলেন, রূপকদা আগেই পৌঁছে গিয়েছেন। দু—জনে মিলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলেন, কাছেই একটা পার্কে। সেখানে একটা বেঞ্চিতে বসে কন্দর্পনারায়ণ পুরো ঘটনাটা সংক্ষেপে রূপকদাকে আর—একবার জানালেন। রূপকদা যা বললেন, তার সারমর্ম হল এই—এটা সত্যি যে, প্রিয়ংবদা পোদ্দারের সঙ্গে ভিক্টর ঘোষের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। পরে সেই সম্পর্কটা শারীরিক সম্পর্ক অবধিও পৌঁছোয়। ভিক্টর ঘোষ সত্যি সত্যিই জানতেন না যে, প্রিয়ংবদা ওরফে প্রিয়া পোদ্দার বিবাহিতা, এবং তাঁর দশ বছরের একটা ছেলে আছে। ভিক্টর ও প্রিয়া, দু—জনে একবার বাড়িতে না জানিয়ে দিঘা চলে যান। এইবার, ভিক্টর ও প্রিয়ার সম্পর্কটা জানাজানি হয়ে যায়। প্রিয়ার স্বামী রবি পোদ্দার, বড়লোকের বখাটে ছেলে বলতে যা বোঝায় তা—ই। দামি গাড়ি, দামি মদ, প্রচুর বান্ধবী—এই হল তার জীবন। তার গাড়ির কালেকশনে বি. এম. ডবলিউ, পোর্শে, বেন্ট লি—র মতো একাধিক গাড়ি রয়েছে। প্রথমে ভিক্টর আর প্রিয়ার বন্ধুত্বকে সে গুরুত্বই দেয়নি। কিন্তু, দু—জনের দিঘা চলে যাওয়ার ঘটনাটাতে তার চোখ খুলে যায়। রবি পোদ্দারের বাবা বসন্ত পোদ্দার বিশিষ্ট শিল্পপতি। কলকাতার দশজন ধনীর একজন। রাজ্যের সর্বোচ্চ মহলে তাঁর যাওয়া—আসা। আগে নিউ আলিপুরে বিরাট বাড়ি ছিল। এখন সে বাড়ি ছেড়ে রাজারহাট—নিউটাউনে আরও বড় বাড়ি নিয়ে থাকেন। এই ঘটনাতে তাঁর হাত থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এখানে আর—এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল রবি পোদ্দারের সব খারাপ কাজের সঙ্গী মহম্মদ রফিক পারভেজ। সে দিনের পর দিন ভিক্টর আর প্রিয়ার সম্পর্কে খবর দিতে থাকে রবি পোদ্দারকে।

কন্দর্পনারায়ণ সব শুনে বললেন, 'হুঁ, বুঝলাম। কিন্তু ঘটনার দিন প্রিয়া পোদ্দার ফোন করে কেন ডাকল ভিক্টরকে? তার মানে দাঁড়াচ্ছে, প্রিয়া ফোন করে ভিক্টরকে বাইরে ডেকে নিয়ে যায়, আর রবি পোদ্দার ও রফিক পারভেজ খুন করে ভিক্টরকে। মোটরবাইকের পেছনে চেপে বসে রফিক অথবা রবি এবং তাদেরই মধ্যে কেউ কাঁধে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে ভিক্টরকে। আর—একটা খটকা আছে। রবি পোদ্দারের হাইট কত? আর রফিক পারভেজের হাইট কত? কাঁধে পিস্তল ঠেকিয়েছে মানে, যে লোকটি পেছনে বসে কাঁধে পিস্তল ঠেকায়, তার উচ্চতা আরও বেশি। দ্বিতীয়ত, লাই ডিটেক্টর টেস্টের রিপোর্টে বলছে, তিনজন মিথ্যে বলেছে। আর একজন সত্যি কথা বলেছে। কে এই চতুর্থ ব্যক্তি, যিনি সত্যি কথা বলছেন? তার মানে কি—প্রিয়া পোদ্দার খুনের প্ল্যান সম্পর্কে কিছুই জানত না? বসন্ত পোদ্দার, রবি পোদ্দার আর রফিক পারভেজ, এই তিনজনই প্ল্যান করে ভিক্টর ঘোষকে সরিয়ে দিল?'

'আচ্ছা রূপকদা, প্রিয়া আর রবি পোদ্দারের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল?'

রূপকদা বললেন—'শোনো কন্দর্প, প্রিয়ার বাবাও ছোটখাটো লোক ছিলেন না। তিনিও বিশিষ্ট একজন শিল্পপতি, এবং তাঁরও উপরমহলে যাওয়া— আসা ছিল। সেইজন্যই, ভিক্টর আর প্রিয়ার খুল্লমখুল্লা ঘোরাফেরার পরও প্রিয়াকে রবি পোদ্দার কিছুই করতে পারেনি। শুনেছি, ওদের মধ্যে সম্পর্ক খুব খারাপ ছিল। এবং প্রিয়া পোদ্দার রবি পোদ্দারকে ডিভোর্স করবে বলে উকিলের চিঠিও ধরিয়েছিল।'

'হুঁ!! তার মানে, প্রিয়া রবিকে ডিভোর্স দিতে চাইছিল। অবশ্য রবির যা চরিত্র, তাতে কোনও স্ত্রী—রই এই ধরনের স্বামীকে নিয়ে খুশি হবার কথা নয়। আচ্ছা, তার মানে কী দাঁড়াল, প্রিয়া পোদ্দার ভিক্টর ঘোষের সঙ্গে সত্যি সত্যিই একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছিল। ব্যক্তিগত জীবনে সে নিজে অসুখী ছিল। ভিক্টর ঘোষকে সে সত্যি সত্যি ভালোবাসত। কিন্তু, ভিক্টরকে সব সত্যি কথা বলবার আগে ভিক্টর খুন যায়, যাতে প্রিয়ার হাত ছিল না। প্রিয়া রবিকে ডিভোর্স করতে চেয়েছিল এবং সেইজন্য সে ল'ইয়ারের কাছেও যায়। রবি পোদ্দার চাইলে প্রিয়াকেও খুন করতে পারত। কিন্তু, প্রিয়ার বাবা নিজেও একজন নামকরা লোক হওয়ায় রবি পোদ্দার সেই রিস্কটা নেয়নি। অথবা এমনও হতে পারে, প্রিয়া বড়লোকের বউ। অল্পবয়সি, সুন্দর সুপুরুষ ছেলেদের সঙ্গে ফ্লার্ট করাটা ওর একটা রোগ, একটা অসুখ। সেক্ষেত্রে, ভিক্টর ঘোষের খুন হয়ে যাওয়াটা ওর মধ্যে কোনও ছাপ ফেলবে না। ও আবার এতদিনে আরও অন্য অন্য অল্প বয়সি, সুপুরুষ ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে নিয়েছে।'

রূপকদা একটু ভেবে নিয়ে বললেন, 'যতটা মনে পড়ছে, এই মহম্মদ রফিক পারভেজ নিজে সাড়ে ছ—ফুট মতো লম্বা।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'পিঠের নিচের দিকে বা কোমরেও তো গুলি করতে পারত। তার কারণ ওটাই। ভিক্টরের বাইকের পেছনে রবি পোদ্দার কিছুতেই বসবে না। খুনও করবে না। সে বড়লোকের ছেলে। নিজে হাতে কাউকে খুন করতে যাবে কেন? টাকা ছড়ালে খুন করবার লোক অনেক পাবে। এখানে এই কাজটা রফিকের করার সম্ভাবনাই বেশি। তার উচ্চতাও ভিক্টরের চেয়ে বেশি। কাজেই কাঁধে গুলি করাটা তার পক্ষে সহজ। দু—হাজার বারো সালে কোনা এক্সপ্রেসওয়ে—এখনকার তুলনায় ফাঁকা—ফাঁকা থাকত। ওখানে একটা নির্জন জায়গায় খুন করাটাও সহজ।'

'থ্যাঙ্ক ইউ, রূপকদা, চলো উঠি, আবার কোর্টে বেরোতে হবে। আজই মামলাটা ফাইল করছি। তোমাকে জানাব, কী হয়।'

দু—জনেই পার্ক থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন। কন্দর্পনারায়ণ আবার দৌড়োতে শুরু করলেন সমাজগড়ের দিকে। রূপকদা টার্ন নিলেন লর্ডস বেকারির দিকে।

যেতে যেতে কন্দর্পনারায়ণ ঠিক করলেন, আজকে একবার অনুত্তমাকে ফোন করবেন। অনুত্তমা নামকরা মনস্তত্ত্ববিদ। প্রিয়ার সাইকোলজিটা বুঝতে হবে। ও কি ভিক্টরকে ভালোবাসত? ব্যাপারটা জানাজানি হতেই প্রিয়ার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়? নাকি বড়লোকের সুন্দরী বউ অল্পবয়সি ছেলেদের সঙ্গে প্রেম করাটা তার রোগ ছিল?

মামলাটা ঠিকঠাক ফাইল হয়ে গেল। পুলিশ—প্রশাসনের ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করে এই মামলা। অর্থাৎ, ভিক্টর ঘোষ হত্যা মামলাতে পুলিশ সঠিক তদন্ত করেনি। তারা একদিকে বলছে—হ্যাঁ, ভিক্টর ঘোষ খুন হয়েছেন। কিন্তু কারা খুন করেছে, বলা যাচ্ছে না। এই চার্জশিট, তদন্তে পুলিশের অক্ষমতাই প্রমাণ করছে। তাই সিবিআই—এর হাতে তদন্তভার তুলে দেওয়া হোক—এই হচ্ছে হাইকোর্টের কাছে মূল প্রার্থনা। আজ বুধবার। গত রবিবার চেম্বারে অমলেশ এসেছিলেন। খুব তাড়াহুড়ো করে, খাটাখাটনি করে মামলাটা ফাইল করে দেওয়া গেল। দেবাশিস, অপলক, নাজির, সুপ্রিম, সবাই খুব খেটেছেন। হাইকোর্টে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে এই ধরনের মামলাতে কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে থাকেন আর—একজন ল'ইয়ার, শীর্ষেন্দু সিংহ রায়। অমলেশের সঙ্গে সবারই মোটামুটি বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে। কন্দর্পনারায়ণের বিরাট টিম। এই টিমের সাহায্য নিয়েই কন্দর্পনারায়ণ কোর্টে লড়াই করেন। প্রত্যেকে অত্যন্ত সিনসিয়ার। শীর্ষেন্দুবাবুও কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে একাধিক বড় মামলায় সাহায্য করেছেন। ওঁকেও প্রায়ই টিভি—তে দেখা যায়। আজ কোর্টে মামলা ফাইল করার সময় উমা এসেছিলেন। তিনিই মামলায় আবেদনকারিণী। কন্দর্পনারায়ণের টিমের আরও অনেক ল'ইয়ারের সঙ্গে আলাপ হয়েছে—পারমিতা, দ্বৈপায়ন, মৌমিতা, অভ্রদীপ, রূপম। উমা, সবাইকে দু—হাত তুলে আশীর্বাদ করেছেন, বলেছেন, 'আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি। তোমরাই আমার ছেলে—মেয়ে।'

সাংবাদিকদের কল্যাণে খবরটা ছড়িয়ে গেল। 'ভিক্টর ঘোষ হত্যা মামলা এবার হাইকোর্টে গড়াল।' টিভি—তে খবরটা দেখাল। খবরের কাগজে বেরোল। 'শুক্রবার হাইকোর্টে সকাল সাড়ে দশটায় শুনানি।' 'পুলিশি তদন্তে অসন্তুষ্ট ভিক্টর ঘোষের মা—বাবা সিবিআই তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ।'—মোটামুটি ফলাও করে কাগজে খবরটা বেরোল।

গতকাল অনুত্তমাকে ফোন করেছিলেন কন্দর্পনারায়ণ। অনুত্তমার কাছে প্রশ্ন ছিল—বিবাহিতা মহিলা তাঁর পরিচয় গোপন করে অল্পবয়সি, অবিবাহিত পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন—এটা কি কোনও অসুখ? মনস্তত্ত্বের এই অসুখের নাম কী? ব্যাখ্যা কী? নাকি এটা ওই মহিলার স্বভাব? কোনও রোগ বা অসুখ বলে একে ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। অনুত্তমা প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলেছিলেন। বললেন, 'আচ্ছা, সমাজে এই যে বিবাহিত পুরুষেরা অল্পবয়সি মেয়েদের সঙ্গে ফ্লার্ট করতে ভালোবাসেন, সম্পর্ক তৈরি করেন, সেটাও তাহলে অসুখ!! আর সেটা যদি অসুখ না হয়, তাহলে বিবাহিতা মহিলারা যদি অবিবাহিত, অল্পবয়সি পুরুষের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন, সেটাও অসুখ নয়।' কন্দর্পনারায়ণের কাছ থেকে সব শুনে বলেছিলেন, 'আপনি আগে প্রিয়া পোদ্দারের পারিবারিক জীবন সম্পর্কে খোঁজ নিন। হতেও পারে যে, উনি সত্যি সত্যি ভিক্টর ঘোষকে ভালোবাসতেন। প্রিয়া পোদ্দার যদি স্বামীর সঙ্গে অসুখী হন, তাহলে তিনি একজন ভালো বন্ধু খুঁজবেন, এটাই স্বাভাবিক।' কন্দর্পনারায়ণ একমত হয়েছিলেন।

সল্টলেকের জিমে যাতায়াত ছিল ভিক্টর এবং প্রিয়া পোদ্দার—দু—জনেরই। সেখানে প্রথমে দুজনের আলাপ। পরে বন্ধুত্ব। প্রিয়ার অত্যন্ত অল্প বয়সে রবি পোদ্দারের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর প্রিয়া বুঝতে পারেন, রবি মদ্যপ, লম্পট। বড়লোকের বখাটে ছেলের মধ্যে যে দোষগুলি থাকে, সবই আছে তার মধ্যে। যে বছর বিয়ে হয়, তার পরের বছরই ছেলে হয় প্রিয়ার।

প্রিয়া প্রথমে নিজেকে অবিবাহিতা পরিচয় দিয়ে ভিক্টরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলেও, প্রিয়া ভিক্টরের মধ্যে একজন সত্যিকারের বন্ধু খুঁজে পাচ্ছিলেন। ভিক্টরও প্রিয়াকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। প্রিয়া হয়তো সব সত্যি কথা বলবেন বলে মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এবং হয়তো সব বলতেনও। এর মধ্যে ভিক্টরের বন্ধু অঙ্কিত চোপড়া প্রিয়াকে চিনে ফেলে। সে ভিক্টরকে বলে, 'তুমি যাকে এত বিশ্বাস করো, সে আসলে তোমাকে নাচাচ্ছে।' ভিক্টর আঘাত পায়। সে প্রিয়াকে তার আসল পরিচয় জিজ্ঞাসা করে। প্রিয়া সব খুলে বলতে চায়। হয়তো কিছুটা সময়ও চায়। এরই মধ্যে রবি পোদ্দারও সব জেনে যায়। সে নিজে এবং তার সব দুষ্কর্মের সঙ্গী মহম্মদ রফিক পারভেজ ভিক্টরকে হুমকি দেয়, শাসায়, বলে, 'ফের প্রিয়ার সঙ্গে মিশলে ফল ভালো হবে না।' ভিক্টর প্রিয়ার সঙ্গে দেখা করা বা যোগাযোগ করা বন্ধ করে দেয়। জিমে যাওয়াও বন্ধ করে দেয় অমলেশবাবুর অনুরোধে। এদিকে শ্বশুরবাড়িতেও প্রিয়ার সঙ্গে ভিক্টরের সম্পর্কের কথা জানাজানি হওয়াতে প্রিয়া শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসে, ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। লইয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ডিভোর্সের নোটিশ দেয়।—এই অবধি পরিষ্কার। এখন প্রশ্ন হল, যদি প্রিয়া পোদ্দার ডিভোর্সের নোটিশ দিয়েই থাকে তাহলে, দু—হাজার বারো সালের একুশে ডিসেম্বর, ভিক্টরের ফোনে প্রিয়ার ফোন থেকে ফোন এল কেন? ভিক্টর সেদিন অফিস থেকে ফিরে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। বলছিলেন, 'প্রিয়ার ফোন এসেছে। কথা বলতে চায়।' তার মানে, প্রিয়ার কনফিডেন্স ছিল, যে সে ফোন করলে, যত কাজই থাক, সব ছেড়ে ভিক্টর তার সঙ্গে কথা বলতে আসবে। কিন্তু, তারপরই গোলমাল হয়ে যায়। হয়তো প্রিয়াকে ফলো করে রবি পোদ্দার আর রফিক জানতে পারে যে, প্রিয়া আর ভিক্টর দেখা করবে। এরপর বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বাইক দাঁড় করিয়ে ভিক্টর যখন প্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল, তখন হঠাৎই বাইকের পেছনে চেপে বসে রফিক। কাঁধে রিভলভার ঠেকিয়ে গুলি করে ভিক্টরকে। ভিক্টর ডানদিকে আছড়ে পড়ে। তাই ডানদিকের কপালটা ফাটে। বাইকের ডানদিকের গ্লাসটা ভাঙে। সম্ভবত রিভলভারেও সাইলেন্সার ছিল, গুলির আওয়াজ কেউ শুনতেই পায়নি। গুলি কাঁধ দিয়ে নেমে হিপ জয়েন্টে এসে আটকে যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে। এই কেসে কে কে ইনভলভড? রবি পোদ্দারের বাবাও কি এই ষড়যন্ত্রে শামিল? তিনি কি জানতেন? আর প্রিয়ার ইনভলভমেন্ট কতটা? সে কি রবি পোদ্দারের নির্দেশে ফোন করেছিল ভিক্টরকে? অথবা সত্যি সত্যি সে সব কথা খুলে বলতে চেয়েছিল ভিক্টরকে? অথবা রবি পোদ্দার জোর করে প্রিয়াকে দিয়ে ফোন করায় ভিক্টরকে, যেখানে দেখা করার কথা ছিল, ভিক্টরের আগেই এসে সেখানে অপেক্ষা করছিল? রবির নির্দেশে, রফিক পারভেজ বাইকের পেছনে চেপে বসে এবং কাঁধে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে পালায়। বসন্ত পোদ্দারের এই খুনের ঘটনায় ইনভলভমেন্ট কতটা এখনই বোঝা না গেলেও এটা ঠিক, গোটা ঘটনাটা চেপে দেওয়ায় তাঁর ভূমিকা ছিল অসীম। মুঠো মুঠো টাকা ছড়িয়ে কেস চেপে দেওয়াটাও একটা অপরাধের মধ্যেই পড়ে। যা—ই হোক, পুলিশ সঠিক তদন্ত করেনি। কন্দর্পনারায়ণ পর পর ঘটনাগুলো সাজাচ্ছিলেন।

বুধবার কোর্ট থেকে বেরিয়ে একটা কাণ্ড ঘটল। কন্দর্পনারায়ণ ড্রাইভারের বাঁদিকে সামনের সিটে বসেন। পেছনে সেদিন অন্য দু—জন ক্লায়েন্ট হাইকোর্ট থেকে কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গেই আসছিলেন। ঠিক রেড রোডে কন্দর্পনারায়ণের সেভেন সিটার বড় মোবিলিও গাড়িটাকে কেউ যেন খুব জোরে ধাক্কা মারল। পাঁচটা—সাড়ে পাঁচটা মতন বাজে। পরিষ্কার দিনের আলো। রেড রোডের ট্রাফিক সিগনালটায় গাড়িতে জোরে ধাক্কা লাগায়, গাড়ি থেকে কন্দর্পনারায়ণ নামলেন। নেমে গাড়ির পেছনে এসে দেখলেন, একটা দামি উঁচু বাইক সজোরে এসে ধাক্কা মেরেছে। গাড়ির পেছনদিকে অল্প একটু টোল খেয়ে গিয়েছে। কন্দর্পনারায়ণ বাইকচালকের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে কাঁধ ঝাঁকাতেই ও হেলমেটের ফাঁক দিয়ে একটা দাড়িওয়ালা মুখ দেখতে পেল। সাপের মতো নিষ্পলক দৃষ্টি নিয়ে কন্দর্পনারায়ণের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। হিসহিসে গলায় চিৎকার করে বলে উঠল, 'বড়া ভকিল বন গয়া হ্যায়। তেরে জ্যায়সা ভকিল তো হামারা পকিট মে রহতা হ্যায়। আগ লেকর খেল রহা হ্যায় তু—ইয়াদ রাখনা।' কন্দর্পনারায়ণ গাড়ির পেছনে ধাক্কা লাগাটাকে অত গুরুত্বই দেননি। তিনি তো শুধু গাড়ি থেকে নেমে দেখতে এসেছিলেন, কী হয়েছে! তার মানে লোকটা ইচ্ছে করেই গাড়িতে ধাক্কা মেরেছে, যাতে, ধাক্কা লাগার পর কন্দর্পনারায়ণ গাড়ি থেকে নামলেই ওঁকে ভয় দেখানো যায়। মুহূর্তে কন্দর্পনারায়ণের মাথায় ঝনাৎ করে রক্ত চড়ে গেল। দু—পা লাফিয়ে গিয়ে, বাঁ—হাতে লোকটার জামার কলারটা শক্ত করে চেপে ধরেন। ডান হাতে লোকটার পেটের চামড়াটা বুড়ো আঙুল আর অনামিকা দিয়ে একটা চিমটি কাটার মতো করে ধরে ঘুরিয়ে দিয়ে খানিকক্ষণ ধরে রইলেন—আর লোকটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, 'শুয়োরের বাচ্চা, যা, তোর কত বড় বাপ আছে নিয়ে আয়। আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। এক হাত ভেঙে আর—এক হাতে ধরিয়ে দেব।' বাইকে বসে—থাকা লোকটা এতটা আশঙ্কাও করেনি। লোকটা মাথায় হেলমেট পরে আছে। না হলে, কন্দর্পনারায়ণের একটা পাঞ্চ মুখে গিয়ে আছড়ে পড়ত। তবে লোকটা পেটে যেটা পেল, সেটা জুডোর একটা প্যাঁচ। পনেরো মিনিট জায়গাটায় সেন্স থাকবে না। লোকটা 'আঁক' করে শব্দ করে উঠল। লোকটার ডান হাতে বাইকের একদিকের হ্যান্ডেল ধরা। বাঁ হাত দিয়ে কন্দর্পনারায়ণকে সজোরে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করল। কন্দর্পনারায়ণ নিজে একটু ঝুঁকে লোকটার বাঁহাতের ধাক্কাটাকে এড়িয়ে গিয়ে, লোকটার কলারটা ছেড়ে দিয়ে একশো আশি ডিগ্রি টার্ন করে বাঁহাতের কনুই দিয়ে লোকটার মেরুদণ্ডে জব্বর একটা গুঁতো মারলেন। লোকটা আবার আর্ত চিৎকার করে কোনওরকমে বাইকে স্টার্ট দিয়ে পালাল। পালাবার সময়, লোকটার দু—চোখে অবিশ্বাস। একটা ফরসা, টিপিক্যাল বাঙালি চেহারার লোকের গায়ে এত জোর, এটা সে ভাবতেও পারেনি।

কন্দর্পনারায়ণের পুরো টিম কোর্ট থেকে বেরিয়ে চেম্বারে আসবেন বলে পেছনে পেছনে গাড়ি চালিয়ে আসছিলেন। নাজির, সুপ্রিম, দ্বৈপায়ন, ততক্ষণে তাঁরাও হইহই করে এসে পড়েছেন। দ্বৈপায়ন দৌড়ে গিয়ে লোকটার পিঠে আরও কয়েকটা ঘুসি বসাল। সামনের ট্রাফিক গার্ড থেকে কয়েকজন অফিসার এসে পড়লেন। লোকটা যে চিৎকার করে কন্দর্পনারায়ণকে হুমকি দিয়েছে, আর তারপরই কন্দর্পনারায়ণ রিঅ্যাক্ট করেছেন, সেটাও তাঁরা লক্ষ করেছেন। ওঁদের মধ্যে একজন পরামর্শ দিলেন, 'স্যার, একটা কমপ্লেইন্ট করুন।' নাজির, সুপ্রিমও বললেন 'স্যার, চলুন। থানায় যাই।' এইসময়টায় হাইকোর্টের অন্য অনেক লইয়ারই এই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরেন। কন্দর্পনারায়ণকে দেখে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিলেন।

কন্দর্পনারায়ণ নাজির, সুপ্রিম, দ্বৈপায়নদের বললেন 'হুঁ! কমপ্লেইন্ট তো করব। কিন্তু, মজার ব্যাপার কী জানো? আমি যখন গাড়ি থেকে নামি, মোবাইলের ভিডিয়ো ক্যামেরাটা অন করে পকেটে রেখে দিয়েছিলাম। পুরো ব্যাপারটাই ভিডিয়ো হয়ে গেছে। চলো চেম্বারে, দেখাব।'

সেদিন সন্ধ্যায় চেম্বারে ঢুকে সবাই দেখল, কন্দর্পনারায়ণ চেম্বারে বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন। দেবাশিস বললেন, 'দাদা, কী দিনকাল পড়ল গো, তোমার মতো একজন ল'ইয়ারকে ভয় দেখাচ্ছে! কী সাহস!' অপলক বললেন, 'আসলে আপনাকে চেনে না। ওরা যদি জানত আপনি জুডো ওস্তাদ। তাহলে পেছনে লাগত না।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'না হে না, ক্রিমিনাল মামলা করতে গেলে কি এখন মারপিটও শিখে রাখতে হবে? এতদিন মামলা করছি, আরও কত বড় বড় মামলা করলাম, আমেরিকান সেন্টার অ্যাটাক কেসে অভিযুক্তদের হয়ে লড়লাম, খাদিম কর্তা অপহরণ কেসে দুবাই থেকে ধরে—আনা অভিযুক্ত আবদুর রহমান কুঞ্জির হয়ে, কামদুনি মামলাতে ভিকটিমের পরিবারের হয়ে, এ ছাড়াও কত বলব, কিন্তু এত সাহস কেউ কখনো পায়নি। তবে, আজকের ঘটনাটা প্রমাণ করল, আমি ঠিক রাস্তাতেই চলেছি। আর ওরা আমাকে ভয় পেয়েছে—হ্যাঁ ভয় পেয়েছে। বিশিষ্ট শিল্পপতি। কলকাতার প্রথম দশজন ধনীর একজন—সে আমার মতো একজন ল'ইয়ারকে ভয় পেয়েছে।'

ততক্ষণে কন্দর্পনারায়ণের মোবাইল থেকে পুরো ঘটনার ভিডিয়োটা নাজির ফেসবুকে পোস্ট করে দিয়েছে। চারদিক থেকে কন্দর্পনারায়ণের সাহস ও শক্তির প্রশংসা করে শুভেচ্ছাবার্তা আসতে লাগল। যাদবপুর থানার অফিসার—ইন—চার্জ পুলক দত্ত, তিনিও ফোন করে বললেন, যেকোনও প্রয়োজনে তাঁকে যেন জানানো হয়। চাইলে তিনি দু—জন আর্মড গার্ডকেও সবসময়ের জন্য কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে দিতে পারেন। কন্দর্পনারায়ণ এই প্রস্তাব সবিনয়ে ফিরিয়ে দিলেন।

কন্দর্পনারায়ণের স্ত্রী—ও নেমে এলেন দোতলার থেকে। মা—ও চলে এসেছেন। সবারই চোখে—মুখে একটা ভয়ের ছাপ। 'ওরা কিন্তু ভয়ংকর হতে পারে, সাবধান,' কন্দর্পনারায়ণের স্ত্রী বললেন।

'বিভিন্ন চ্যানেলে খবর দেখাচ্ছে যে, আইনজীবীকে হুমকি দিতে এসেছিল একজন দুষ্কৃতকারী, তবে সে—ই আইনজীবীর হাতে পালটা মার খেয়ে পালিয়েছে,' কন্দর্পনারায়ণের মা বললেন।

কন্দর্পনারায়ণ যোগ করলেন, 'এই ঘটনা দুটো জিনিস প্রমাণ করে। এক, আমার ক্যালকুলেশন বা অ্যাসেসমেন্ট একদম সঠিক। ঠিক পথেই এগোচ্ছি আমরা। দুই, আজকের ঘটনাটা খুবই ছেঁদো একটা ঘটনা। এই লোকটা পাতি একটা নেড়িকুত্তা, যাকে শুঁকতে পাঠিয়েছিল। আসল লোকেরা পেছনে আছে।'

বিকেলের ঘটনাটার পরে, কন্দর্পনারায়ণের স্ত্রী সবাইকে বলে দিলেন যে, চেম্বারের মহিলা লইয়াররা কেউই রাত অবধি থাকবেন না। আর একা একা কেউ বেরোবেন না। কোর্টে সবাই একসঙ্গে যাবেন—একসঙ্গে কোর্ট থেকে বেরিয়ে চেম্বারে আসবেন। চেম্বারের সব জুনিয়র লইয়ারেরই নিজস্ব গাড়ি আছে। হয়, একই গাড়িতে চারজন—পাঁচজন করে যাবেন, না হয়, প্রত্যেকে নিজস্ব গাড়িতে একসঙ্গে যাবেন, মানে পর পর গাড়িগুলো যাবে। কন্দর্পনারায়ণ মিটিমিটি হাসলেন—ওরা আজকের ঘটনার পর কিছুই করবে না। ওরা কিছু করতেই সাহস পাবে না।

'ব্যাস ব্যাস, অনেক হয়েছে, চলো, কাজ শুরু করি। দেবাশিস, বই ঘেঁটে কিছু নজির বের করো, কোন কোন কেসে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। সব বই নিয়ে চলো। অপলক, এই কয়েকদিন আগে হাওড়ার তপন দত্ত বলে বিশিষ্ট সমাজসেবী হত্যা মামলায় হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ, নিম্ন আদালতে ট্রায়াল শুরু হয়ে যাবার পরেও সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। ওই অর্ডারটা নাও।'

কন্দর্পনারায়ণ খুব সাধারণ অবস্থা থেকে উঠে এসেছেন। পরিবারে কেউই ল'ইয়ার ছিলেন না। আইন নিয়ে পড়তে শুরু করবার আগে কত লোক ভয় দেখিয়েছে, বলেছে যে, 'বাবা—কাকা ল'ইয়ার না থাকলে এই পেশায় সাফল্য আসে না।' কিন্তু কন্দর্পনারায়ণ নিজের মেধা, বুদ্ধি, পরিশ্রম ও শৃঙ্খলাপরায়ণতায় বিশ্বাস রেখেছেন। একের পর এক লড়াই টপকেছেন পরিশ্রমের জোরে। ছোটবেলা থেকে একটাই স্বপ্ন—'আমি ক্রিমিনাল ল'ইয়ারই হব।' কখনো কোনও চাকরির পরীক্ষায় বসেননি। কোনওদিন কোনও ইন্টারভিউ দেননি। পাঁচ বছর আইন পড়ে, স্নাতক হয়ে ওকালতি পেশায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। একটাই মূলমন্ত্র—লড়াই লড়াই আর লড়াই। খেলাধুলো, শরীরচর্চায় উৎসাহ ছিল খুব। এজলাসটাকে একটা খেলাধুলোর ময়দান বলেই মনে করেন। সৌরভ গাঙ্গুলি আদর্শ। সৌরভ যেমন হারিয়ে যেতে যেতে বার বার ফিরে এসেছেন, কন্দর্পনারায়ণও তেমন। ঠোক্কর খেতে খেতে আবার ভেসে উঠেছেন। আর—একজন প্রিয় খেলোয়াড় হলেন লিয়েন্ডার পেজ। এই দু—জনের ধৈর্য, পরিশ্রম করবার শক্তি আর অধ্যবসায়কে কন্দর্পনারায়ণ নিজের মধ্যে একটু একটু করে ভরেছেন। লিয়েন্ডার এই বয়সেও পরিশ্রমী, বাচ্চা বাচ্চা প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়ছেন। অবশ্য, খেলার জগতের সঙ্গে ওকালতি পেশার তফাত একটাই। খেলার জগতে, কম বয়সে খেলা যায়, আর বেশি বয়সে অবসর। ওকালতিতে আবার, অল্প বয়সে তুমি শিখবে, যত বয়স বাড়বে, ততই তোমার পসার, সুনাম বাড়বে। সারাজীবনে কত ঠোক্কর খেয়েছেন কন্দর্পনারায়ণ, কিন্তু দমে যাননি। দমে গেলে কবেই হারিয়ে যেতেন। সততা, পরিশ্রম তাঁর মূলধন। বাঁ হাতের বাইসেপসে একটা ট্যাটু করানো আছে—লেখা আছে, 'এ হিরো নেভার ডাইজ বিফোর হিজ ডেথ।' ডান হাতে, কনুইয়ের নিচে আর—একটা ট্যাটু করিয়েছেন, সেই যে মহাভারতে যখন অর্জুনকে হাতে তির—ধনুক ধরিয়ে একটা জল ভরতি থালার দিকে তাকাতে বলে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, 'ওপরে কী দেখছ?' অর্জুন বলেছেন, 'শুধু মাছের চোখ দেখছি।' অর্থাৎ, অর্জুনের 'লক্ষ্যভেদ'—এর ঘটনাটা। কন্দর্পনারায়ণের জীবনেও একটাই লক্ষ্য, 'ভালো লইয়ার হওয়া, ভালো ল'ইয়ার হওয়া আর ভালো লইয়ার হওয়া।'

সৌরভ গাঙ্গুলি যখন ইন্ডিয়া টিমের ক্যাপটেন ছিলেন, তখন সৌরভ মাঠে নেমে পিচের থেকে একমুঠো ঘাস ছিঁড়ে উড়িয়ে দিয়ে দেখতেন, হাওয়া কোনদিকে বইছে, অথবা আঙুল দিয়ে পিচটা টিপে বুঝতে পারতেন—এই পিচে বল ফাস্ট মুভ করবে, নাকি স্পিন করবে। একজন ফুটবলার যেমন মাঠে নেমে ঘাসে পা দিয়েই বোঝেন, এখানে বল দ্রুত দৌড়োবে, নাকি বল ধরে খেলা যাবে। ঠিক সেইরকম কন্দর্পনারায়ণও এজলাসে দাঁড়িয়ে জজসাহেবের মর্জি কেমন, অপর পক্ষই বা কতটা স্ট্রং, একনাগাড়ে কতক্ষণ সওয়াল করা যাবে, সওয়ালে একটু ঝাঁজ মেশাবেন, নাকি তাতে বিনয়ের ভাগটা বেশি থাকবে—এগুলো বুঝে নেন। তবে, উনি সওয়াল করার সময় নিজে অত্যন্ত বিনয়ী, কিন্তু বোল্ড বা ফার্ম থাকেন। দৃঢ়তার সঙ্গে নিজের যুক্তিজালগুলো বিছোতে থাকেন। আবার কখনো মনে করেন, ওকালতি পেশাটা একটা দাবা খেলার মতো, অপর পক্ষ কী চাল দিতে পারে, আগে সেটা অ্যাসেস করে, তারপর নিজের চালটা দেন। নিজের বিছানো যুক্তিজালে কতটা বিষ, সেটা আগে অপর পক্ষকে বুঝতে দেন না। সুযোগ পেলেই এক ছোবলে পুরো বিষটা ঢেলে দেন অপর পক্ষের বিরুদ্ধে। আবার কখনো মনে করেন, কোর্টের ভিতরটা আসলে বক্সিং রিং—আগে দুটো মুঠো দিয়ে নিজের মুখটা গার্ড করো। অপর পক্ষকে মাঝখানে রেখে, নেচে নেচে, দুলে দুলে ঘুরে যাও। অপরপক্ষকে ক্লান্ত করে দাও। তারপর এক—এক করে তোমার আস্তিন থেকে বের করে আনো মারাত্মক সব হুক, জ্যাব, আপারকাট। ধরাশায়ী করে দাও অপর পক্ষকে। তা সে অপর পক্ষ যতই শক্তিশালী হোক—না কেন। কিন্তু যাঁরা কন্দর্পনারায়ণকে দেখেছেন, তাঁরা জানেন, এজলাসের ভেতরে মামলা করার সময় কন্দর্পনারায়ণ স্থির, অচঞ্চল। তাঁর মুখের পেশিতে এতটুকু উত্তেজনা ধরা পড়ে না। তাঁর যাবতীয় বিষ লুকিয়ে থাকে ঝকঝকে দুটো চোখে আর মস্তিষ্কে। মাথার মধ্যে যে কী মারাত্মক হিসেবনিকেশ খেলে যাচ্ছে, সেটা বাইরে থেকে ধরবার কোনও উপায়ই নেই। যখন বিরোধী পক্ষ বিচারপতি মশাইয়ের সামনে বক্তব্য রাখছেন, কন্দর্পনারায়ণ সোজা সামনে তাকিয়ে বসে থাকেন। মাঝে মাঝে চোখে শুধু ঝিলিক দিয়ে যায় বিদ্যুতের মতো কিছু একটা। কোর্টে কখনোই কেউ তাঁকে মাথা গরম করতে দেখেনি। সবসময় উনি শান্ত, আর ফোকাসড। আর এই গুণগুলিই তাঁকে এগিয়ে রেখেছে অনেকখানি।

শুক্রবার সকাল সাড়ে দশটায় মামলার শুনানি। বৃহস্পতিবার সবাই চেম্বারে মামলাটার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত, যাকে বলে, সবাই বেশ চার্জড আপ। আটটা নাগাদ অমলেশ আর উমা ঢুকলেন। কন্দর্পনারায়ণ ডেকেছিলেন, শুক্রবার মামলার জন্য প্রস্তুতি নেবার ক্ষেত্রে যেন কোনও খামতি না থাকে। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। অমলেশ—উমার সঙ্গে একটু কথা বলে নেওয়া দরকার। বুধবারই মামলা দায়ের করবার সময় উমা গিয়েছিলেন হাইকোর্টে। সেখানেই কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে আলাপ হয়েছে উমার। তখন কন্দর্পনারায়ণকে দেখেছেন উকিলের ধরাচুড়ো পরে। আর বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলায় কন্দর্পনারায়ণের চেম্বারে ঢুকে দেখলেন, সাদা ধপধপে চিকনের পাঞ্জাবি ও চোস্ত পাজামা পরে চেম্বারে মামলার প্রস্তুতিতে মগ্ন। অন্য লইয়াররা তাঁকে বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় বুঝে নিতে সাহায্য করছেন। র‍্যাক থেকে প্রচুর বইপত্র নামানো হয়েছে। অমলেশ বুঝলেন, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন মামলার নজির খোঁজা চলছে, যেখানে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন সময়ে পুলিশের তদন্ত পদ্ধতিতে অসন্তুষ্ট হয়ে, সিবিআই—কে তদন্তের ভার দিয়েছেন। এই মামলাতে রাজ্য সরকার কিছুতেই চাইবেন না যে, তদন্তভার সেন্ট্রাল বা কেন্দ্রীয় সরকারি তদন্ত সংস্থার হাতে যাক। অবশ্য কোনও রাজ্য সরকারই তা চায় না। একটা ঘটনার তদন্তভার রাজ্য সরকারি তদন্ত সংস্থার হাত থেকে কেন্দ্রীয় সরকারি তদন্তকারী দলের হাতে যাওয়া মানে, রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণ হওয়া অর্থাৎ, ওই ঘটনার তদন্ত করতে রাজ্যের তদন্তকারী দল অপারগ বা ব্যর্থ, তাই কেন্দ্রীয় সরকারি তদন্তকারী সংস্থার সাহায্য চাওয়া হচ্ছে। বাস্তবে, এই ঘটনাতে অবশ্য তা—ই হয়েছে। পুলিশ কোনও তদন্তই করেনি। উলটে অভিযুক্তদের আড়াল করতে চেষ্টা করেছে। আসলে পুলিশ ভাবতেই পারেনি অমলেশ এত দূর এগোবেন। ভেবেছিলেন একে ছেলেকে হারিয়েছেন, তার ওপর অপর পক্ষ অত্যন্ত প্রভাব ও প্রতিপত্তিশালী, সেই ভয়ে অমলেশ আর এগোবেন না। কিন্তু, লিগাল এইডের সেক্রেটারি দুর্গা খৈতান ম্যাডাম যে অমলেশের পাশে এসে দাঁড়াবেন আর ওঁর সাহায্যে তিনি কন্দর্পনারায়ণকে নিজের আইনজীবী হিসেবে পাবেন—এটা বোধহয় কেউই ভাবেননি। সত্যি কথা বলতে কী, অমলেশ নিজেও এতটা আশা করেননি।

আজকে সন্ধেবেলা কন্দর্পনারায়ণের চেম্বারে বসে থাকতে থাকতে মনে হল, যেন তিনি একটি যুদ্ধক্ষেত্রে এসে পড়েছেন। চেম্বারের প্রতিটি ছেলেমেয়ে এক—একজন সৈনিক। ওরা জানে, এই মামলা থেকে ওরা টাকাপয়সা কিছুই পাবে না, কিন্তু প্রত্যেকে লড়তে তৈরি। অমলেশ উমার দিকে তাকালেন, উমাও সন্তুষ্ট। বাবাইয়ের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তারা সাজা পাক। সবাই জানে, বাবাই—এর মৃত্যুর জন্য দায়ী কারা। পুলিশ, মিডিয়া সবাই জানে। কিন্তু, তদন্তকারী অফিসার, যাকে বলে আই. ও. অর্থাৎ ইনভেস্টিগেটিং অফিসার দোষীদের আড়াল করছেন—এটা মেনে নেওয়া যায় না।

কন্দর্পনারায়ণ ডেকে নিলেন অমলেশ—উমাকে। আর এক—বার অমলেশের কাছ থেকে পুরো ব্যাপারটা ঝালিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, 'আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করছি। যদি প্রিয়া রবি পোদ্দারের কাছ থেকে ডিভোর্স নিয়ে ভিক্টরবাবুকে বিয়ে করতে চাইতেন, আপনারা সেই বিয়েতে রাজি হতেন?'

প্রশ্নটা শুনে অমলেশ—উমা দু—জনেই চুপ। কন্দর্পনারায়ণ আবার শুরু করলেন, 'এই কারণে জিজ্ঞেস করছি যে, প্রিয়ার সঙ্গে রবি পোদ্দারের বনিবনা ছিল না। যদি এমন হত যে, প্রিয়া রবি পোদ্দারকে ডিভোর্স দিলেন, তারপর ভিক্টরবাবুকে বিয়ে করতে চাইলেন। সেক্ষেত্রে আপনাদের রিঅ্যাকশন কী হত? প্রিয়া ডিভোর্সি, একটা দশ বছরের ছেলে আছে। বয়সে হয়তো, দু—জনেই কাছাকাছি, বা প্রিয়া একটু বড়ই হবেন, ওদিকে ভিক্টরবাবু ব্যাচেলর। আটাশ বছর বয়স। চেষ্টা করলে আপনারা হয়তো আরও ভালো পুত্রবধূ পেতেন—'

এবার উমা মুখ খুললেন, 'আপনি ঠিকই বলেছেন, সব ঘটনা জানাজানি হবার পর, একদিন আমাদের মধ্যে এই কথা উঠেছিল। বাবাই সব জানা সত্ত্বেও প্রিয়াকে বিয়ে করতে রাজি ছিল। আর, বাবাই রাজি ছিল বলে, আমরাও হয়তো আপত্তি করতাম না।'

'হুঁ!' —কন্দর্পনারায়ণ হাতের কলমটা নিজের ঠোঁটের কাছে ঠেকিয়ে আনমনা হয়ে গেলেন।

অপলকবাবু কন্দর্পনারায়ণকে বললেন, 'স্যার, খবর পাচ্ছি, কালকে, পোদ্দারদের হয়ে বড় বড় সব সিনিয়র অ্যাডভোকেট, ব্যারিস্টার থাকবেন। রাজ্য সরকারের হয়েও বড় ব্যারিস্টার থাকছেন। মনে হচ্ছে, লড়াই জমে যাবে।'

কন্দর্পনারায়ণ আনমনা হয়েই বললেন, 'অমলেশবাবুরা জাস্টিস চান, জাস্টিস, জাস্টিস। তদন্তকারী অফিসার, কমিশনারেটের পুলিশ কমিশনার, বসন্ত পোদ্দার, রবি পোদ্দার, প্রিয়া পোদ্দার আর রফিক পারভেজ—এই ক—জনের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ। এদের মধ্যে তদন্তকারী অফিসার আর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার—এরা তো খুনটা করেনি, এরা সঠিক তদন্ত করেনি, সত্য গোপন করতে ও এভিডেন্স লোপাটে যুক্ত। প্রশ্ন হল, বসন্ত পোদ্দার আর প্রিয়া পোদ্দার—এরা কি খুনে যুক্ত? একটা কথা পরিষ্কার যে, বসন্ত পোদ্দার পুলিশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এভিডেন্স লোপাট করেছে। ভিক্টর ঘোষ যে খুন হচ্ছেন, এটা বসন্ত পোদ্দার জানত কি? প্রিয়া পোদ্দার কি খুনে যুক্ত? রবি পোদ্দার আর রফিকের বিরুদ্ধে সরাসরি তিনশো দুই ধারা অর্থাৎ খুনের ধারা লাগু হবেই। প্রিয়ার ভূমিকাটাই ভাবাচ্ছে। একটা দশ বছরের ছেলে আছে। ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি বা খুনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তো ওর বিরুদ্ধে উঠছেই। তবে, যদি ও খুনে বা ষড়যন্ত্রে যুক্ত না হয়, তাহলে আমি ওকে জেলে পাঠাতে চাইছি না।'

ঠিক রাত সাড়ে দশটায় একটা ফোন এল কন্দর্পনারায়ণের মোবাইলে। রূপক সাহা ফোন করেছেন। রূপক সাহার সঙ্গে কথা বলতে বলতে কন্দর্পনারায়ণের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

কন্দর্পনারায়ণ দশটার মধ্যে হাইকোর্টে এলেন। রোজকার অভ্যেসমতো, হাইকোর্টের মেইন গেটে গাড়ি থেকে নেমে হাইকোর্টের চূড়ার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে, দু—হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে কোর্টের মধ্যে ঢুকলেন। গত আঠারো—কুড়ি বছর ধরে এভাবেই তিনি হাইকোর্টের চূড়াকে প্রণাম করে ভেতরে ঢোকেন। কোর্টই তাঁর কাছে মন্দির। মেইন গেটের বাইরে সাংবাদিক বন্ধুরা ক্যামেরা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কে জানে কোন মামলার জন্য? এই মামলার জন্যও হতে পারে। আজকের প্রায় সব ক—টা খবরের কাগজে 'ভিক্টর ঘোষ মামলা রিওপেনড' বলে খবর হয়েছে। রাজ্য সরকারের কাছেও এই মামলাটা প্রেস্টিজ ইস্যু। একে বসন্ত পোদ্দার, কলকাতার প্রথম দশজন ধনীর একজন, তা ছাড়া অমলেশ ঘোষ—উমা ঘোষের মতো একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের পাশে লিগাল এইড কর্তৃপক্ষ এসে দাঁড়িয়েছেন এবং কন্দর্পনারায়ণের মতো লড়াকু লইয়ার এই পরিবারটির হয়ে মামলা লড়তে রাজি হয়েছেন—তাই পুরো ব্যাপারটাই আলাদা মাত্রা পেয়েছে।

একটা সময় তো ভিক্টর ঘোষ হত্যারহস্য দৈনিক খবরের কাগজের পাতায় নিয়মিত জায়গা করে নিত।

কী জানি। হতে পারে, অন্য মামলার জন্য ওঁরা এসেছেন। তবে, শৌভিক, শ্রাবন্তী, অর্ণব, সুকান্ত, গোবিন্দ, রুসি—সব অল্পবয়সি সাংবাদিক, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের—সবার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন কন্দর্পনারায়ণ। ওঁরাও হাত নাড়লেন।

কোর্টরুমে আস্তে আস্তে ভিড় জমে উঠছে। আজকের তালিকায় প্রচুর মামলা রয়েছে। লইয়াররাও ঢুকে কোর্টের ভেতরে রাখা চেয়ারে বসছেন। মামলার সঙ্গে যুক্ত লোকজনের জন্য একেবারে পেছনের দিকে গ্যালারি করে বেঞ্চ পাতা। তাঁরা সেখানে বসবেন। কোর্টরুমে ঢুকে একটা সুন্দর গন্ধ পেলেন কন্দর্পনারায়ণ। এই গন্ধটা তাঁর চেনা। এই গন্ধটা তাঁর বাবার গায়ের গন্ধ। বাবার ইচ্ছে ছিল, কন্দর্পনারায়ণ উকিল হিসেবে নাম করেন। সারাজীবন বাবা বলে গিয়েছেন—'টাকার পিছনে ছুটো না। আমি তোমাকে বড় উকিল হিসেবে দেখতে চাই। বড়লোক উকিল হিসেবে দেখতে চাই না। সুনাম—সুযশ অর্জন করতে হয়। সেই চেষ্টাই কোরো।' মনটা ভালো হয়ে গিয়েছে কন্দর্পনারায়ণের। এই গন্ধটাই কন্দর্পনারায়ণকে আজ অনেকটা এগিয়ে দিল। বুকভরে শ্বাস নিলেন। পেছনের বেঞ্চে অমলেশ—উমা বসে আছেন। আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছেন। ওঁরা বোধহয় অমলেশ উমার সঙ্গেই এসেছেন। শীর্ষেন্দু, দেবাশিস, অপলক সবাই কোর্টরুমে হাজির। নাজির, সুপ্রিম বেশ কিছু সুপ্রিম কোর্ট—হাইকোর্টের মামলার রায় জেরক্স করে নিয়ে এলেন। সব সামনে টেবিলের ওপরে রাখা হল। কন্দর্পনারায়ণ সামনের সারিতে রাখা একটি চেয়ারে বসে মামলার নথিগুলোতে চোখ বুলিয়ে নিলেন। চোখ বুজে নিজের যুক্তিগুলো, নিজের বক্তব্য সাজিয়ে নিতে লাগলেন। পেছনে একটা 'সরুন, সরুন' জাতীয় কথা শুনতে পেলেন।

শীর্ষেন্দু, কন্দর্পনারায়ণের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, 'অপর পক্ষ বড় বড় ব্যারিস্টার রেখেছে, দাদা। ব্যারিস্টার প্রসূন মুখার্জি, ব্যারিস্টার ভি. কে. মেহরা, পোদ্দারদের হয়ে। ওদিকে স্বয়ং সিনিয়র অ্যাডভোকেট তুষার বোস রাজ্য সরকারের হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। সবাই কোর্টে ঢুকছেন।'

কন্দর্পনারায়ণ হেসে বললেন, 'ওদিকে মন দিয়ো না, ফোকাস নষ্ট হবে।' 'ফোকাস' কন্দর্পনারায়ণের জীবনে একটা বড় শব্দ। সৌরভ, শচীন, দ্রাবিড়, লিয়েন্ডারের মতো একাগ্রতা চাই জীবনে। উনি মনে করেন, গ্লেন ম্যাকগ্রা আসছেন বল করতে। আর তিনিই বুঝি সৌরভ বা শচীন বা দ্রাবিড়। কখনো বাউন্সারগুলোকে হুক করে পাঠাবেন মাঠের বাইরে। আবার কখনো বুকের সামনে ওঠা বলকে একটু লাফিয়ে উঠে নির্বিষ করে নামিয়ে দেবেন পায়ের কাছে। ফোকাস নড়ে গেলেই, হয় বোল্ড হবেন, না হয় লোপ্পা ক্যাচ তুলে দেবেন ফিল্ডারের হাতে। তাই ফোকাস নড়তে দেওয়া যাবে না, কিছুতেই না। আজ কোর্টরুমে ঢুকেই তিনি বাবার গায়ের গন্ধটা পেয়েছেন। বাবা গত হয়েছেন অনেকদিন আগে। কিন্তু, প্রতিটা ইম্পর্ট্যান্ট মামলার আগে তিনি এই গন্ধটা পান। আজ কন্দর্পনারায়ণ নিশ্চিত, আজ তাঁর দিন। আজ তিনিই ব্যাট করবেন। তিনিই বল করবেন। বিচারপতিমশাই ঠিক সাড়ে দশটায় কোর্টরুমে ঢুকলেন—একদম সাড়ে দশটায় মামলার ডাক হল। প্রথম মামলাটাই উমা ঘোষ বনাম রাজ্য সরকার। সেখানে বসন্ত পোদ্দার, রবি পোদ্দার, প্রিয়া পোদ্দার এবং মহম্মদ রফিক পারভেজ অভিযুক্ত পক্ষ। সিবিআই—এর জয়েন্ট ডিরেক্টরকে মামলায় একটি 'পক্ষ' হিসেবে রাখা হয়েছে। সিবিআই—এর কাছে জানতে চাওয়া হবে, এই ঘটনার তদন্তভার তাদের দিলে, তারা নেবে কি না, কারণ এই মুহূর্তে সারা দেশে অনেক ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব তাদের কাঁধে। তারা এই মামলাটা নিতে না—ও চাইতে পারেন। তবে, হাইকোর্ট এই মামলার তদন্ত তাদের করতে নির্দেশ দিলে অবশ্য তারা 'না' বলতে পারবে না। তবে, একবার সিবিআই—এর জয়েন্ট ডিরেক্টরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তাঁরা কী চান। তাঁদের হয়ে দাঁড়িয়েছেন পূর্বাঞ্চলের অ্যাডিশনাল সলিসিটার জেনারেল, সিনিয়র অ্যাডভোকেট বিক্রমজিৎ চৌধুরী স্বয়ং।

মামলার ডাক হতেই কন্দর্পনারায়ণ উঠে দাঁড়ালেন। সৌম্য, শান্ত, সুপুরুষ চেহারা। মসৃণ কণ্ঠস্বর। কোর্টরুমে তাঁর কথাগুলো খেলে বেড়াতে লাগল।

'মাই লর্ড, শ্রীমতী উমা ঘোষ একজন সিনিয়র সিটিজেন। এই মামলার আবেদনকারিণী এবং স্টেট লিগাল এইড অথরিটি আমাকে ওঁদের আইনি সুরাহা দেবার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

শ্রীমতী উমা ঘোষের ছেলে, আটাশ বছরের তরতাজা যুবক, পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, দু—হাজার বারো সালের একুশে ডিসেম্বর রাতে খুন হয়ে যান। তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায় কোনা এক্সপ্রেসওয়ের ওপর একটা ফাঁকা জায়গায়। পুলিশ প্রথমে রোড অ্যাক্সিডেন্ট বা মোটর সাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট বলে চালাতে চেয়েছিল। যে কাজ পুলিশের করার কথা, সে কাজ করেন আবেদনকারিণীর স্বামী অমলেশ ঘোষ। তিনিও একজন অসহায় বৃদ্ধ। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে যখন তিনি তাঁর ছেলের নিথর শরীরের ওপরে ডুকরে কাঁদছেন, তখনই আবিষ্কার করেন, তাঁর ছেলে, যাঁর নাম ভিক্টর ঘোষ, তাঁর পেছনদিকে কাঁধের কাছে একটা ছোট্ট ফুটো, বুলেট ইনজুরি, সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। অথচ পুলিশ সুরতহালের সময় খেয়ালই করেনি, অ্যাক্সিডেন্ট বলে চালাতে চাইছিল।'

'পোস্টমর্টেমে পাওয়া যায়, কাঁধের কাছ থেকে গুলিটি ঢুকে হিপ জয়েন্টে আটকে রয়েছে। গুলিটি বের করা হয়।'

'মাই লর্ড, এবার আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে। এই ভিক্টর ঘোষ সেক্টর ফাইভে একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ছ—ফুট হাইট, নিয়মিত জিমে যেতেন। সুদর্শন একজন পুরুষ। সল্টলেকের ওই জিমে আলাপ হয় একটি মেয়ের সঙ্গে, যিনি নিজেকে অবিবাহিতা বলে পরিচয় দেন এবং নাম বলেন প্রিয়ংবদা ওরফে প্রিয়া পোদ্দার। দু—জনে একসঙ্গে বাইকে চড়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতেন, এমনকী রাত্রিবাসও করেছেন। পরে জানা যায় যে, এই প্রিয়া আসলে কলকাতার অন্যতম প্রভাবশালী, ধনী ব্যক্তি বসন্ত পোদ্দারের একমাত্র ছেলে রবি পোদ্দারের স্ত্রী, যাঁর একটি ছেলেও রয়েছে। ঘটনার সময় যার বয়স ছিল দশ।'

'ঘটনা জানাজানি হতেই ভিক্টর ঘোষ প্রিয়া পোদ্দারের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেন। কিন্তু, আমাদের মামলার দুই—জন প্রধান অভিযুক্ত—বসন্ত পোদ্দার ও রবি পোদ্দার, যাঁরা মনে করেন, কলকাতাটাকে তাঁরা চালান, আইন, পুলিশ—প্রশাসন সব তাঁদের হাতে, তাঁরা এত সহজে ছাড়বেন কেন?'

'এখানে বলে রাখি মাই লর্ড, প্রিয়া পোদ্দার নিজেও একজন অত্যন্ত ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির মেয়ে। কাজেই তাঁকে ঘাঁটানোর চাইতে, অনেক সহজ ভিক্টর ঘোষকে সরিয়ে দেওয়া। রবি পোদ্দার ভিক্টর ঘোষকে সরিয়ে দিতে সুপারি দিলেন মহম্মদ রফিক পারভেজকে। বলে রাখি, মাই লর্ড, এই রফিক পারভেজের নামে অলরেডি কলকাতা শহরে চারটে খুনের মামলা পেন্ডিং আছে। কিন্তু, তাকে জেলে রাখা যায় না। সে প্রত্যেকবারই পুলিশের সহযোগিতায় জামিন পেয়ে বাইরে ঘোরে। —এই যে, ওই চারটে মামলার পেন্ডিং কেসের যাবতীয় কাগজপত্র।' —কন্দর্পনারায়ণ কাগজগুলো বিচারপতিমশাইয়ের কাছে এগিয়ে দিলেন।

'অপলক, এবার মহান রবি পোদ্দার মশাইয়ের ইতিহাস—ভূগোলের কাগজগুলো দাও।' অপলকবাবু আরও কিছু কাগজপত্র এগিয়ে দিলেন।

কন্দর্পনারায়ণ বলতে শুরু করলেন, 'মাই লর্ড, এই রবি পোদ্দার, অর্থাৎ আমাদের মামলার আর—এক অভিযুক্ত, তাঁর অতীতও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নিজস্ব সংগ্রহে আছে বেন্টলি, পোর্শে, বি. এম. ডবলিউ; মার্সিডিজ—এর মতো গাড়ি। রাত হলেই গাড়ি নিয়ে তিনি কলকাতার নাইট ক্লাবগুলোর উদ্দেশে বেরোন। সঙ্গে থাকেন সুন্দরী বান্ধবীরা। মদ আর নারীসঙ্গে তিনি রাতগুলোকে করে তোলেন আকর্ষণীয়। বাইপাসের ধারে একাধিক ফাইভ স্টার, সেভেন স্টার হোটেলে তাঁর নামে স্যুইট বুক করা থাকে বারোমাস। তিনি সেখানে একাধিক নারীসঙ্গে জীবন উপভোগ করেন। দু—হাজার আঠারোতে কলকাতার ফুটপাতে দু—জন ঘুমন্ত ভবঘুরেকে চাপা দিয়ে হত্যা করে শিরোনামে এসেছিলেন। সেই মামলাতেও তিনি জামিন পেয়ে যান। —মাই লর্ড, এই সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য, ফেসবুক থেকে সংগৃহীত ছবি, বাইপাসের ধারের হোটেলের রেজিস্টারের জেরক্স, আর ঘুমন্ত ভবঘুরেদের হত্যা সংক্রান্ত মামলার যাবতীয় নথি আপনার কাছে পেশ করলাম। আপনি দেখুন।' —কন্দর্পনারায়ণ কাগজের একটি বান্ডিল মাননীয় বিচারপতিকে জমা দিলেন।

অমলেশ—উমা দু—জনেই অবাক। এত খবর পেলেন কোথা থেকে কন্দর্পনারায়ণ?

কন্দর্পনারায়ণ বাঁদিকে সাংবাদিকদের জন্য রাখা নির্দিষ্ট জায়গাটার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতাসূচক ভঙ্গিতে ঘাড়টা হেলালেন। সেখানে সব সাংবাদিক দাঁড়িয়ে সওয়াল—জবাব শুনছেন, টেলিগ্রাফের তাপসদা, বর্তমানের পল্লবদা, আনন্দবাজারের শমীকদা, টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সুব্রত চট্টরাজদা, এই সময়ের অমিত চক্রবর্তী, মুকুল বিশ্বাস, সন্মার্গের সিংজি। ওঁরা সবাই এই মামলা সাজাতে আর রবি পোদ্দার সম্পর্কে বিভিন্ন খবর জোগাড় করতে সাহায্য করেছেন। বাইপাসের বিভিন্ন নামী হোটেলে যে রবি পোদ্দারের নামে 'স্যুইট' বুক করা থাকে, সেটা সাংবাদিকরা সাহায্য না করলে কন্দর্পনারায়ণের পক্ষে বের করা সম্ভব ছিল না। শুধু এই কেসে কেন, কুড়ি বছর আগে যখন এই কোর্টের দুনিয়ায় প্রথম পা রেখেছিলেন কন্দর্পনারায়াণ, তখন থেকেই সাংবাদিকরা তাঁর সঙ্গে। বিভিন্নভাবে কন্দর্পনারায়ণকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। তাই ওঁরা যে শুধু বিভিন্ন খবরের কাগজ বা নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিক তা—ই নয়, কন্দর্পনারায়ণের কাছে কেউ দাদা, ভাই বা বন্ধু। অবশ্য এই মামলাতে আর—একজন খুব সাহায্য করেছেন, তিনি হলেন লালবাজার হোমিসাইড শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার অতনু ব্যানার্জী। দু—হাজার আঠারোতে রাত্রিবেলায় জোরে গাড়ি চালিয়ে, দুজন ফুটপাতবাসী ভবঘুরেকে মেরে ফেলেন রবি পোদ্দার—সেই খবরটা এবং সেই সংক্রান্ত কেসের যাবতীয় তথ্য অতনুদাই জোগাড় করে দেন।

অনেকক্ষণ ধরেই বিরোধী পক্ষের সিনিয়র ল'ইয়াররা কিছু বলবেন বলে উশখুশ করছিলেন। কন্দর্পনারায়ণের দীর্ঘ সওয়াল ওঁদের পছন্দ হচ্ছিল না। দুঁদে ব্যারিস্টার ভি. কে. মেহরা উঠে দাঁড়ালেন। মুখটা বিকৃত করে ব্যঙ্গের সুরে বললেন, 'এখানে কি সিনেমা—সিরিয়ালের শুটিং চলছে মাই লর্ড? আবেদনকারীর আইনজীবী এসব কী বলছেন, আমার মক্কেলের ক্যারেকটার অ্যাসাসিনেশন হচ্ছে। সে মদ খায়, মেয়েদের সঙ্গে ঘোরে, দশটা গাড়ি আছে—এইসব বক্তব্য এই মামলাতে অপ্রাসঙ্গিক। ওঁর অনেক সময় আছে। আমাদের ওনার গল্প শোনার মতো সময় নেই। এক্ষুনি ওঁকে থামতে বলুন।' বিরোধী পক্ষের আর—একজন দুঁদে আইনজীবী—ব্যারিস্টার প্রসূন মুখার্জি আরও আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বললেন, 'উনি তো টিভি—তে শো করেন, বড় বড় লেকচার মারেন, উনি ভুলে গেছেন, যে এটা টিভি শো নয়, এটা কোর্ট। উনি আমাদের সময় নষ্ট করছেন।'

বিরোধী পক্ষের নামী আইনজীবীরা যখন কন্দর্পনারায়ণকে ব্যক্তিগত আক্রমণে ব্যস্ত, কন্দর্পনারায়ণ তখন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রেখেছিলেন। ওঁদের বক্তব্যকে একেবারেই আমল না দিয়ে মুখের সামনে থেকে মাছি তাড়াবার ভঙ্গিতে ওঁদের গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, 'মাই লর্ড, একটি আটাশ বছরের তরতাজা ছেলে খুন হয়েছেন। পুলিশ তদন্ত করেনি। আবেদনকারিণী একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা আজ অসহায়। আমাকে মহামান্য কোর্টকে বোঝাতেই হবে যে, অপরাধীরা কতটা প্রভাব—প্রতিপত্তিশালী। রাজ্য পুলিশও কতটা অসহায়। এখানে সিবিআই—এর মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাই প্রয়োজন।'

জজ সাহেবের খুব একটা বয়স নয়। এই পঞ্চাশের আশপাশে। চোখে—মুখে বুদ্ধির ছাপ। তিনি বিরোধী পক্ষের আইনজীবীদের চালটা ধরে ফেলেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, যে বিরোধী পক্ষের আইনজীবীরা চান না, কন্দর্পনারায়ণকে বলতে দিতে। কন্দর্পনারায়ণ যত মুখ খুলবেন, তত তাঁদের ওপর চাপ বাড়বে। মাননীয় বিচারপতি স্মিত হেসে ব্যারিস্টার মেহরা আর ব্যারিস্টার মুখার্জির উদ্দেশে বললেন, 'আপনারা নামী ব্যারিস্টার। ঠিকই তো, আপনাদের সময়ের অনেক দাম আছে—আমার সময়ের তো অত দাম নেই, এই মামলাটা না শুনলেও আমাকে অন্য মামলা তো শুনতেই হবে। তার চেয়ে এই মামলাটাই শুনি—আপনাদের অন্য কাজ থাকলে বরং সেরে আসুন। নিন মি. চ্যাটার্জি শুরু করুন।' জজ সাহেবের এই বিদ্রুপটা ঘরভরা কোর্টরুমে একেবারে শেলের মতো বিঁধল বিরোধী পক্ষের আইনজীবীদের। তাঁরা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন।

কন্দর্পনারায়ণ আবার তাঁর সওয়াল শুরু করলেন। তাঁর জোরালো, দৃপ্ত অথচ মসৃণ কণ্ঠস্বর ভরা কোর্টরুমে খেলে বেড়াতে শুরু করল আবার। 'স্বাভাবিকভাবেই, প্রিয়া পোদ্দার ব্যক্তিগত জীবনে অসুখী ছিলেন। তিনি খুঁজছিলেন একজন বন্ধু, যাঁর ওপর তিনি নির্ভর করতে পারেন। এবং তিনি নির্ভরশীলতা খুঁজে পেলেন ভিক্টর ঘোষের মধ্যে। কিন্তু, এদিকে, তিনি যে আসল পরিচয় গোপন রেখে বন্ধুত্ব করেছেন ভিক্টর ঘোষের সঙ্গে। তাঁর ভয় ছিল, তিনি ম্যারেড জানলে ভিক্টর ঘোষ তাঁর জীবন থেকে সরে যেতে পারেন। আর হলও তা—ই। ভিক্টর ঘোষ আর প্রিয়া পোদ্দারের সম্পর্কের কাহিনি তখন জানাজানি হয়ে গেছে। আর প্রিয়া পোদ্দার যা ভয় পাচ্ছিলেন তা—ই হল। ভিক্টর ঘোষ জেনে গেলেন যে, প্রিয়া পোদ্দার আসলে ম্যারেড, দশ বছরের একটি ছেলেও আছে। ভিক্টর ঘোষ আঘাত পেলেন। তিনি সরে যেতে চাইলেন প্রিয়া পোদ্দারের জীবন থেকে, কারণ তিনি নিজেকে 'প্রতারিত' বলে মনে করলেন। এদিকে প্রিয়া পোদ্দার তাঁর স্বামী রবি পোদ্দারের রোজকার উচ্ছৃঙ্খল জীবন থেকে মুক্তি পেতে শ্বশুরবাড়ি থেকে ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে চলে গেলেন বাপের বাড়ি। সেখান থেকে স্বামীর বিরুদ্ধে ডিভোর্সের মামলা দায়ের করে মামলার নোটিশ ধরালেন। রবি পোদ্দার স্ত্রী—র পাঠানো ডিভোর্সের নোটিশটাকে এক ধরনের পরাজয় বলে মনে করলেন। তিনি তাঁর সব দুষ্কর্মের সঙ্গীকে দিয়ে ভিক্টর ঘোষকে হুমকি দিতে শুরু করলেন ফোনে।'

'যদিও প্রিয়া পোদ্দার নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে ভিক্টর ঘোষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলেন, সেটা কিন্তু প্রকৃত অর্থেই বন্ধুত্ব ছিল, 'ফ্লার্ট' নয়। তিনি বাকি জীবনটা ভিক্টর ঘোষের সঙ্গেই কাটাবেন বলে ঠিক করে নেন। কিন্তু, ভিক্টর ঘোষ তাঁর বাবা—মা—র পরামর্শমতো প্রিয়া পোদ্দারের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এমনকী ফোনও ধরতেন না। প্রিয়া পোদ্দার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাবার পর, রবি পোদ্দার তাঁর মোবাইল ফোন হ্যাক করেন ও তাঁর প্রতি নজর রাখার জন্য লোক লাগান। অবশেষে এল সেই দিন—প্রিয়া পোদ্দার যোগাযোগ করতে পারলেন ভিক্টর ঘোষের সঙ্গে। তিনি সব কথা খুলে বলতে চাইছিলেন, অর্থাৎ তিনি যে রবি পোদ্দারকে ডিভোর্স করে ভিক্টর ঘোষকে বিয়ে করতে চাইছিলেন—সেই কথা ভিক্টর ঘোষকে বলবেন বলে সময় চাইলেন। ভিক্টর ঘোষ প্রিয়া পোদ্দারের সঙ্গে দেখা করতে রাজি হলেন। দিনটা দু—হাজার বারো সালের একুশে ডিসেম্বর। যেহেতু প্রিয়া পোদ্দারের ফোন হ্যাক করা ছিল, তিনি কার সঙ্গে কী কথা বলছেন, সবই জানতে পেরে যাচ্ছিলেন রবি পোদ্দার। তিনি, তাঁর বাবা বসন্ত পোদ্দার আর রফিক একসঙ্গে একটা ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি অর্থাৎ ষড়যন্ত্রে নামেন। প্ল্যান করা হয় যে, ভিক্টর ঘোষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। প্রিয়াকেও হয়তো সরিয়ে দেওয়া হত। কিন্তু, প্রিয়ার বাবাও ধনকুবের, তাই সেই সাহস পেলেন না পোদ্দার অ্যান্ড কোং। তাই ঠিক হল ভিক্টর ঘোষকেই সরিয়ে দেওয়া হবে। তাতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে। ভিক্টর ঘোষকে তো সরিয়ে দেওয়া হবেই। উপরন্তু প্রিয়া পোদ্দারকেও শিক্ষা দেওয়া হবে।'

'কথামতো কোনা এক্সপ্রেসওয়ের উপর অপেক্ষা করছিলেন ভিক্টর ঘোষ। বাইক দাঁড় করিয়ে, হেলমেট খুলে হাতে নিয়ে। হঠাৎই পেছন থেকে বাইকে এসে বসে রফিক। কাঁধে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে দেয়। রফিকের হাইট ভিক্টর ঘোষের থেকেও বেশি। তার পক্ষে কাঁধে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করাটাই সহজ। পিস্তলের মুখ নিচের দিকে ছিল বলে গুলি এসে আটকে যায় হিপজয়েন্টে।'

'মাই লর্ড, এই রফিক কতটা দুঃসাহসী, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ওর কাজে। পুলিশকে ভুল পথে চালাতে বা অ্যাক্সিডেন্টের রূপ দিতে হেলমেটটাকে মাটিতে আছড়ে ফেলে। কিন্তু, আমি হেলমেটের স্ক্র্যাচগুলো দেখেই বুঝতে পারি যে এটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়। শুধু তা—ই নয়, ভিক্টর ঘোষের মোবাইলটা নিয়ে প্রিয়া পোদ্দারের পাঠানো সমস্ত মেসেজ এবং কল লিস্ট থেকে প্রিয়া পোদ্দারের কলগুলো ডিলিট করে দেয়। তাতে অবশ্য প্রিয়া পোদ্দারের উপর সন্দেহ আরও বাড়ে।'

'এবার পুলিশি গাফিলতির দিকটায় আসি—

প্রথমত, পুলিশ চেষ্টা করেছিল এই ঘটনাটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট, সেটা দেখাতে। তারা একটা সুরতহাল রিপোর্টও তৈরি করে, যেখানে পুরো ঘটনাটা একটা মোটরবাইক অ্যাক্সিডেন্ট বলে দেখানো হয়েছে—দেবাশিস, সুরতহাল রিপোর্টের কপিটা দাও।'

দেবাশিসবাবু, সুরতহাল রিপোর্টের জেরক্স কপিটা এগিয়ে দিলেন। কন্দর্পনারায়ণ সুরতহাল রিপোর্টের কপিটা জজ সাহেবকে জমা দিলেন। জজ সাহেব কপিটা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন।

'মাই লর্ড, পুলিশের পক্ষে খুব সহজ কাজ ছিল মোবাইলের কল লিস্টটা চেক করা। আবেদনকারিণীর স্বামী নিজে উদ্যোগ নিয়ে ভোডাফোন কোম্পানিকে চিঠি লিখে গত সাত দিনের কল লিস্ট জোগাড় করে পুলিশকে দিয়েছিলেন। কিন্তু, পুলিশ গুরুত্বই দেয়নি। এই যে কল লিস্ট, যেখানে পরিষ্কার, যে প্রিয়া পোদ্দারের ফোন পেয়েই ভিক্টর ঘোষ অফিস থেকে ফিরে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যান।'—কন্দর্পনারায়ণ ভোডাফোনের দেওয়া কল লিস্টটা জজ সাহেবের দিকে এগিয়ে দিলেন।

'মাই লর্ড, এটা ঠিক যে, এই ঘটনাতে কোনও প্রত্যক্ষদর্শী বা আই উইটনেস নেই। এই গোটা কেসটাই সারকমস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স বা পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণাদির ওপর নির্ভরশীল। আই উইটনেস না থাকলে কি পুলিশ তদন্ত করবে না? আমাদের মতো সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য যে, অপরাধীদের সঙ্গে সঙ্গে মানুষকে এখন একশ্রেণির পুলিশের সঙ্গেও লড়তে হয়। আমি কিন্তু সব পুলিশ কর্মচারীর বিরুদ্ধে বলছি না। ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রচুর পুলিশ বন্ধু রয়েছেন। তাঁরা ভালো কাজ করছেন। এমনকী, এই কেসেও অনেক পুলিশ বন্ধু আমাকে সাহায্য করেছেন।'

'তৃতীয়ত, আবেদনকারিণীর স্বামী প্রত্যেক অভিযুক্তের নামে অভিযোগ করেছেন, কিন্তু পুলিশ কী করেছে? কাউকে অ্যারেস্ট তো করেইনি, উপরন্তু, এফ. আই. আর.—টাকে পুলিশ গুরুত্বই দেয়নি। কাজেই এই কেসে মার্ডারিং ওয়েপন অর্থাৎ যে পিস্তল দিয়ে ভিক্টর ঘোষকে গুলি করা হয়েছে, সেই পিস্তলটাই পুলিশ সিজ করেনি। মাই লর্ড, ভেবে দেখুন, চারজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের মামলা, অথচ পুলিশ কাউকেই অ্যারেস্ট করেনি। এমনকী প্রিয়া পোদ্দারকেও না? আমরা জানতে পেরেছি যে, প্রিয়া পোদ্দার এরই মধ্যে তাঁর স্বামী রবি পোদ্দারকে ডিভোর্স করেছেন, ডিভোর্সের মামলা চলছিল বারাসাত কোর্টে। অর্থাৎ, এমন নয় যে, প্রিয়া পোদ্দার ফেরার হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তো কোর্টে যেতেন নিয়মিত, তাঁর ডিভোর্সের মামলার তদবির করতে। পুলিশ তাঁকেও ধরেনি।'

'চতুর্থত, যদিও ভিক্টর ঘোষের শরীর থেকে বুলেটের যে অংশ পাওয়া গিয়েছিল, সেটাকে মার্ডারিং ওয়েপন—এর সঙ্গে ম্যাচ করানো যায়নি। কারণ বসন্ত পোদ্দার, রবি পোদ্দার আর রফিক—পুলিশ কাউকেই অ্যারেস্ট করেনি। অনেক পরে অবশ্য তাঁরা প্রত্যেকেই কোর্ট থেকে আগাম জামিন পেয়ে যান। আমার বিশ্বাস, পুলিশ যদি এই মামলাটাতে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করত, তাহলে অভিযুক্তরা কোর্ট থেকে জামিনও পেতেন না।'

'পঞ্চমত, আবেদনকারিণীর ও তাঁর স্বামীর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বয়ান নথিবদ্ধ করানো উচিত ছিল, পুলিশ তা করেনি।' কন্দর্পনারায়ণ একটু থেমে দম নিলেন।

'এবারে পুলিশ একটা অদ্ভুত ঘটনার আশ্রয় নিল। তারা অভিযুক্তদের এই হত্যার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেবেন ঠিক করেই রেখেছিল, কিন্তু মুক্তিই বা দেবে কী করে? কিছু যুক্তি তো চাই। তারা অভিযুক্তদের লাই ডিটেক্টর টেস্টে বসাল। কিন্তু, বিধি বাম। লাই ডিটেক্টর টেস্টে পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে গেল যে, বসন্ত পোদ্দার, রবি পোদ্দার আর রফিক মিথ্যে কথা বলছে। একজনই সত্যি কথা বলেছেন, তিনি প্রিয়া পোদ্দার। অপলক, লাই ডিটেক্টর টেস্টের রিপোর্টটা দাও।'—কন্দর্পনারায়ণ হাত বাড়ালেন, অপলকবাবু রিপোর্টটা এগিয়ে দিলেন। জজ সাহেব রিপোর্টটা হাতে নিয়ে মনোযোগের সঙ্গে পড়তে শুরু করলেন।

গোটা কোর্টরুম নিস্তব্ধ। সবাই কন্দর্পনারায়ণের সওয়াল শুনছেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে। অমলেশ—উমাও মন দিয়ে শুনছেন। উমা মাঝে মাঝে আঁচলে মুখ ঢেকে চোখ মুছছেন। অমলেশ খুশি। ঠিক যেরকম চাইছিলেন, সেরকম বক্তব্যই পেশ করছেন কন্দর্পনারায়ণ। ওদিকে কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গী ল'ইয়াররা অবাক, প্রিয়া পোদ্দারের যে বারাসাত কোর্ট থেকে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে, স্যার জানলেন কী করে? কন্দর্পনারায়ণ জুনিয়রদের মনের ভাব বুঝতে পেরে মুচকি হাসলেন। গতকাল রাতে চেম্বারে রূপক সাহা ফোন করে এই খবরটাই দিয়েছিলেন।

'মাই লর্ড, পুলিশ পড়ল উলটো বিপাকে, তারা তো লাই ডিটেক্টর টেস্টের রিপোর্টটা দেখিয়ে পোদ্দার অ্যান্ড কোং—কে মুক্তি দিতে চেয়েছিল। অতএব, তারা এবার ওই চার অভিযুক্তকে নারকো অ্যানালিসিসের জন্য পাঠাল চণ্ডীগড়ে। এই টেস্টটা চণ্ডীগড়েই করা হয়। অর্থাৎ, পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট না—দেবার ব্যাপারে এতটাই বেপরোয়া, যে তারা ঠিক করে নেয়, যে করে হোক অভিযুক্তদের ডিসচার্জ করবেই। নারকো অ্যানালিসিসের রিপোর্টটা কিন্তু ক্লিয়ার এল না। রিপোর্টটায় একটা ধোঁয়াশা ছিল। পুলিশ এইজন্যই অপেক্ষা করছিল। তারা নারকো অ্যানালিসিসের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে অভিযুক্তদের সসম্মানে মুক্তি দিল। চার্জশিটে লিখল ফাইনাল রিপোর্ট—ট্রু, অর্থাৎ পুলিশ মেনে নিল, যে খুন হয়েছে। কিন্তু, এই অভিযুক্তরা খুনি নন। মাই লর্ড, এই হল নারকো অ্যানালিসিসের রিপোর্ট আর এই হল চার্জশিট।'

কন্দর্পনারায়ণ রিপোর্ট আর চার্জশিটের জেরক্স কপি জজ সাহেবকে এগিয়ে দিলেন, 'মাই লর্ড, এবার আমি লাই ডিটেক্টর টেস্ট আর 'নারকো অ্যানালিসিস কী, এই টেস্টগুলোর রিপোর্টের ওপর কতখানি নির্ভর করা যায়, সেই সম্পর্কে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট কী বলেছেন, সেই সংক্রান্ত একটা রিসার্চ আমরা করেছি। মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু লাই ডিটেক্টর টেস্ট বা নারকো অ্যানালিসিস, দুটো ব্যাপারকেই খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেননি। এই পরীক্ষাগুলি বড়জোর তদন্তে সহযোগিতা করতে পারে। পলিগ্রাফ টেস্ট বা লাই ডিটেক্টর টেস্ট কতকগুলি ফ্যাক্টরকে সামনে রেখে করা হয়। যার টেস্ট করা হবে, তার শরীরে শারীরিক কম্পন মাপবার কতকগুলি তার জুড়ে দেওয়া হয়। তার মাধ্যমে শরীরে অধিক উত্তেজনা, বা ব্লাড প্রেশারের হঠাৎ হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, হার্টবিট হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, এগুলি মাপা হয়। যে লোকটিকে পলিগ্রাফ টেস্ট বা লাই ডিটেক্টর টেস্টে বসানো হচ্ছে, তাকে ওই ঘটনা সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন করা হয়। দেখা যায়, যদি তিনি ঠিকঠাক বা সত্যি উত্তর দেন তাহলে তাঁর হার্টবিট, ব্লাড প্রেশার বা শারীরিক উত্তেজনা যা থাকে, তার থেকে সেগুলি অনেক গুণ বেশি বেড়ে যায়, যখন তিনি মিথ্যা কথা বলেন বা মিথ্যা উত্তর দেন। সেই তফাতটাই ধরা পড়ে, ওই শরীরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া তারগুলোর মাধ্যমে। অর্থাৎ, কেউ যদি প্রশ্নের মিথ্যে উত্তর দেন তাহলে তাঁর হার্টবিট, ব্লাড প্রেশার বা উত্তেজনা অনেকগুণ বেশি বেড়ে যায়। আর সেটা ধরা পড়ে রিপোর্টে।

আবার নারকো অ্যানালিসিস টেস্টের পদ্ধতিটা অন্যরকম। যাঁর এই পরীক্ষাটি হবে, তাঁর শরীরে একরকম ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়, যার বশে ওই মানুষটির শরীরে অ্যানাসথেসিয়া জাতীয় ওষুধ প্রবেশ করে। মানুষটি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর মস্তিষ্ক তাঁর বশে আর থাকে না। তখন তাঁকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করে উত্তর বের করা হয়। হয়তো, স্বাভাবিক অবস্থায় বা সজ্ঞানে তিনি ওইসব প্রশ্নের উত্তর দিতেন না। তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় ওইসব প্রশ্নের উত্তর বার করা হয়।

'কিন্তু, যেখানে লাই ডিটেক্টর টেস্টে ধরা পড়েছে, তিনজন মিথ্যে বলছেন আর একজন সত্যি বলছেন, সেখানে শুধুমাত্র নারকো অ্যানালিসিস টেস্টের রিপোর্ট পরিষ্কার নয় বলে অভিযুক্তদের মুক্তি দেওয়া একেবারে বেআইনি।'

'অপলক, দেবাশিস, আমাদের রিসার্চ ওয়ার্ক আর মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলি দাও।'

অপলকবাবু আর দেবাশিসবাবুর হাত থেকে অনেকগুলি কাগজের একটা বান্ডিল নিয়ে কন্দর্পনারায়ণ জজ সাহেবকে এগিয়ে দিলেন। জজ সাহেব কাগজগুলির ওপর ঝুঁকে পড়ে পড়তে শুরু করলেন।

'মাই লর্ড, একটু দেখুন চার্জশিটে ''কারা অভিযুক্ত'' সেই কলামটায় লেখা আছে ''আননোন অ্যাকিউজড'', অর্থাৎ কারা আসামিকে হত্যা করেছে, পুলিশ জানে না। দু—হাজার বারো সালের ঘটনা, সাত বছর পর পুলিশ চার্জশিট দিচ্ছে, কিন্তু পুলিশ জানে না, কারা হত্যা করেছে। আমার মহামান্য আদালতের কাছে দুটো নিবেদন আছে—এক, আবেদনকারিণী মায়ের কি তাঁর ছেলের হত্যাকারী কে, তা জানার অধিকার আছে, কি নেই? আর দুই হল, এ তো সেই জেসিকা লাল মার্ডার কেসের মতো হয়ে গেল—নো ওয়ান মার্ডারড জেসিকার মতো, নো ওয়ান মার্ডারড ভিক্টর ঘোষ।

'মাই লর্ড, ক্রিমিনাল প্রসিডিয়োর কোড—এর একশো তিয়াত্তর নম্বর ধারায় পরিষ্কার বলা আছে, অপরাধ হয়েছে মেনে নিলে অপরাধীকে কে, সেটা তদন্ত করে বের করাটাও পুলিশের দায়িত্ব।'

এতক্ষণ জজ সাহেব সোজা হয়ে বসে সব শুনছিলেন, এবার চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বললেন, 'হুঁ! বুঝলাম। কিন্তু সিবিআই তদন্ত কেন? একজন সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে দিয়ে তদন্ত করিয়ে দিচ্ছি। চাই তো পুলিশ কমিশনার নিজে তদন্ত করবেন। আপনি কী মনে করেন, মি. চ্যাটার্জি, সিবিআই সব তদন্তের সমাধান করতে পারে?'

কন্দর্পনারায়ণ আবার বলা শুরু করলেন, 'মাই লর্ড, আমি বিশ্বাস করি না যে, সিবিআই—এর হাতে কোনও জাদুদণ্ড আছে, আর তারা সেই জাদুদণ্ডের বলে, যেকোনও সমস্যার সমাধানও করতে পারে। আবার এটাও আমি বিশ্বাস করি না যে, রাজ্য পুলিশ তদন্ত করতে পারে না, কিন্তু এই মামলায় মুশকিল হল, এই থানার পুলিশ প্রভাবশালী, বিত্তশালী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সঠিক তদন্ত করতে সাহসই পায়নি। উলটে তারা সমস্ত তথ্যপ্রমাণ গায়েব করতে ব্যস্ত থেকেছে। এই ঘটনায় একেবারে প্রথম থেকে পুলিশ অভিযুক্তদের আড়াল করতে ব্যস্ত থেকেছে। মাই লর্ড, আপনি জানেন যে, আমি অন্তত আমার প্রতিটি পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার মামলায় সিবিআই চাই না। ব্যক্তিগতভাবে, আমি কলকাতা পুলিশ ও রাজ্য পুলিশ তদন্ত করতে পারে না, তা বিশ্বাসও করি না। এখানে পুলিশ মেনে নিয়েছে যে ওইদিন ভিক্টর ঘোষ খুনই হয়েছেন। তারা চার্জশিট দিয়েছে তিনশো দুই ও একশো কুড়ির বি ধারায়। অর্থাৎ পুলিশ স্বীকার করছে যে, ষড়যন্ত্র করেই ভিক্টর ঘোষকে খুন করা হয়েছে, কিন্তু কারা মেরেছে, সেটা বলতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তা—ও সাত বছর পর, আপনি আবার রাজ্য পুলিশের উপর ভরসা রাখবেন? আবার তাঁরা ব্যর্থ হবেন। একজন অভাগা মায়ের তো নিশ্চয়ই ন্যায়বিচার পাবার অধিকার আছে, মাই লর্ড!'

কন্দর্পনারায়ণের শেষের কথাগুলোতে এমন আকুতি মেশানো ছিল যে ঘরে উপস্থিত সাংবাদিকরা ও অন্য মামলার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ও বুকটা মুচড়ে এল। অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীরা উঠে দাঁড়ালেন। ব্যারিস্টার মেহরা বললেন 'আবেদনকারিণী মা কী চান, আমার মক্কেলদের রক্ত? সাত বছর ধরে আমার মক্কেলরা নিয়মিত পুলিশকে সহযোগিতা করে এসেছেন। তাঁরা জেলা আদালতে আগাম জামিন নিয়েছেন, লাই ডিটেক্টর টেস্ট—এর মুখোমুখি হয়েছেন, নারকো অ্যানালিসিস টেস্ট—এর মুখোমুখি হয়েছেন, খবরের কাগজে তাঁদের নামে কুৎসিত বক্তব্য বেরিয়েছে। আর কত অপমানিত তাঁদের হতে হবে, মাই লর্ড? আমার মক্কেল বসন্ত পোদ্দার একজন সিনিয়র সিটিজেন। সমাজের সম্মানিত মানুষ। তিনি বিরাট ব্যক্তিত্ব। একাধিক কারখানার মালিক, বছরে কোটি কোটি টাকার টার্নওভার। তাঁকে আবার তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে? মাই লর্ড, এটা চরম অন্যায় হবে। আমি এর তীব্র বিরোধিতা করছি।'

মাননীয় বিচারপতি স্মিত হেসে বললেন, 'আপনার মক্কেল যে বিরাট ধনী—প্রতিপত্তিশালী, সে তো আজকে এখানে সকাল থেকে আপনাকে বসে থাকতে দেখেই বুঝতে পারছি। আপনার মতো সিনিয়র ব্যারিস্টারকে তিনি তাঁর মামলায় রাখতে পেরেছেন, কোনও সাধারণ মানুষের মামলা কি আপনি করেন মি. মেহরা?'

ব্যারিস্টার মেহরা বুদ্ধিমান মানুষ, বিদ্রুপটা ধরতে পেরে তিনি চুপ করে গেলেন।

এবার ব্যারিস্টার প্রসূন মুখার্জি উঠে দাঁড়ালেন—'মাই লর্ড, আমি আমার দুই মক্কেল রবি পোদ্দার ও মহম্মদ রফিক পারভেজের হয়ে বক্তব্য রাখছি। মাই লর্ড, আমি মেনে নিচ্ছি, ভিক্টর ঘোষ বলে একটি ছেলে খুন হয়েছেন, তাঁর সঙ্গে আমার মক্কেল রবি পোদ্দারের স্ত্রী প্রিয়া পোদ্দারের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন রাতে প্রিয়া পোদ্দারের ফোন পেয়েই ভিক্টর ঘোষ বাড়ি থেকে বাইক নিয়ে বেরিয়ে যান। তারপর কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে তিনি খুন হন। এখানে আমার মক্কেল কী করবে? পশ্চিমবঙ্গে যে যেখানে খুন হবে, তার দায়িত্ব আমার নাকি? কেউ দেখেছে রবি পোদ্দারকে বা রফিক পারভেজকে খুন করতে? তা ছাড়া নিজের স্ত্রী—র কারও সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক থাকলে স্বামী কী খুশি হবেন? হয়তো এখানেও রবি পোদ্দার অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, তিনি হয়তো ভিক্টর ঘোষকে ফোন করে হুমকিও দিয়েছিলেন।'

জজ সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, 'এই হয়তো হয়তো' বলে আপনি যে বলছেন, এই হয়তোর জায়গাগুলোতেই নিশ্চিত হওয়া দরকার। তা ছাড়া, আপনার মক্কেলদের ক্যারেকটর সার্টিফিকেট মি. চ্যাটার্জি কোর্টে জমা দিয়েছেন। আপনার মক্কেলরা সেদিন রাত আটটা থেকে ন—টা কোথায় ছিলেন, মিঃ মুখার্জি? পুলিশ এ ব্যাপারে সাইলেন্ট কেন? এফ. আই. আর.—এ আপনার মক্কেলদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁরা অ্যারেস্ট হননি? পুলিশ কীসের ভয় পেয়েছিল? রাজ্য সরকারের তরফে কে দাঁড়িয়েছেন? ও! সিনিয়র অ্যাডভোকেট মি. তুষার বোস? মি. বোস, জবাব দিন। একজন অভিযুক্তও কেন গ্রেপ্তার হননি? মোবাইল ফোনের কল লিস্ট অনুযায়ী এটা পরিষ্কার যে, রবি পোদ্দার আর মহম্মদ রফিক ভিক্টর ঘোষকে বার বার ফোন করেছেন। কেন? ফোনে কি সত্যি সত্যিই হুমকি দেওয়া হয়েছিল? এটা পরিষ্কার যে, প্রিয়া পোদ্দারের ফোন পেয়েই ভিক্টর ঘোষ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, তারপরই তাঁর মৃত্যু হয়। আপনারা প্রিয়া পোদ্দারকে অ্যারেস্ট করা দূরে থাক, জিজ্ঞাসাবাদও করেননি। কেন? রফিককে অ্যারেস্ট করে, তার কাছ থেকে পিস্তল রিকভার করে, ভিক্টর ঘোষের বডি থেকে পাওয়া বুলেটের সঙ্গে ম্যাচও করাননি? আপনারা সাত বছর ধরে করেছেনটা কী? লাই ডিটেক্টর টেস্ট—র রিপোর্টে যখন দেখা গেল, বসন্ত পোদ্দার, রবি পোদ্দার, মহম্মদ রফিক, মিথ্যে কথা বলছেন বা কিছু লুকোচ্ছেন, তক্ষুনি তাঁদের বিরুদ্ধে চার্জশিট করা হল না কেন? আপনারা লাই ডিটেক্টর টেস্টের রিপোর্টে যদি ভরসা না করেন তো নারকো অ্যানালিসিস টেস্ট—এর রিপোর্টে বিশ্বাস করে অভিযুক্তদের ডিসচার্জ করে দিলেন কেন?'

'আবার দেখুন, চার্জশিটে আপনারা মেনে নিচ্ছেন যে, ভিক্টর ঘোষ খুনই হয়েছেন। তাহলে খুনটা কে করেছে, সেটা বলাও তো আপনার কর্তব্য। মি. বোস, আপনার তদন্তকারী অফিসার কি আদালতে উপস্থিত আছেন? তাঁকে সামনে আসতে বলুন।'

মি. বোস অসহায়ের মতো পেছনদিকের জমাট বেঁধে থাকা ভিড়টার দিকে তাকাতেই একজন টাকমাথা ভুঁড়িওয়ালা অফিসার এগিয়ে এসে জজ সাহেবকে স্যালুট করে দাঁড়ালেন।

জজ সাহেব তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কতদিন চাকরি করছেন? এটা তদন্ত হয়েছে? আপনার বিরুদ্ধে ডিসিপ্লিনারি প্রসিডিং করবার নির্দেশ দিচ্ছি, আর ততদিন যাতে আপনি সাসপেন্ড হয়ে থাকেন, ডিজি—কে সেটাও নির্দেশ দেব। শুনুন মি. বোস, পুনরায় তদন্তের নির্দেশ যে দেব, সেটা আমি ঠিক করেছি। মি. চ্যাটার্জি, আগে আপনি বোঝান, কেন সিবিআই তদন্ত হবে, তারপর মিঃ বোস আপনি বলবেন যে, কেন সিবিআই তদন্ত হবে না। মি. মেহরা, মি. মুখার্জি, অভিযুক্তের বক্তব্য শুনে লাভ নেই। কারণ কাদের দিয়ে তদন্ত করানো হবে, অভিযুক্তের ইচ্ছে—অনিচ্ছে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়।'

কন্দর্পনারায়ণের জুনিয়র ল'ইয়াররা উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারছেন না। তাঁরা একজন আর—একজনের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে শুরু করেছেন, কোর্টরুমের মধ্যেই। কন্দর্পনারায়ণ হাসলেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠেছে বক্সিং রিং, তিনি নেচে নেচে অপর পক্ষকে ঘিরে ঘুরছেন, অপর পক্ষ একটার পর একটা ঘুসিতে নাজেহাল। চোখ বুজে গিয়েছে, ঠোঁটের কোণে রক্ত। হাত দুটো শরীরের দু—পাশে ঝুলছে। এবার তিনি মোক্ষম একটা ঘুসি মেরে অপর পক্ষকে কাত করবেন। হঠাৎই হিন্দিতে একটা কণ্ঠস্বর শুনলেন, আড়চোখে পেছনদিকে তাকিয়ে দেখলেন দুটো দৃশ্য, মামলার মোটা, টাকমাথা, ভুঁড়িওয়ালা, তদন্তকারী অফিসার পকেট থেকে রুমাল বের করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন আর রুমালে চোখ মুছছেন। আর—একজন আরও মোটা, সাদা স্যুট—পরা বয়স্ক ভদ্রলোক। তাঁর সারা গায়ে সোনার গয়না, আঙুলে সোনার আংটি, দামি ঘড়ি, দামি জুতো, তিনি ভরা কোর্টরুমে বলছেন, 'কেয়া হ্যায় ইয়ার? ইয়ে সব কেয়া হো রহা হ্যায়? পুলিশকো পয়সা দিয়া, ইতনা বড়া বড়া ভকিলকো রাখখা, ফির ইনভেস্টিগেশন?' সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন লোক তাঁকে নিয়ে কোর্টরুমের বাইরে চলে গেল। বাইরে থেকেই লোকটার উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল। উত্তেজিত স্বরে, হিন্দিতে কাকে যেন কী বলে যাচ্ছেন।

কন্দর্পনারায়ণ আবার নিজের বক্তব্যে ফোকাস করলেন। জজ সাহেব, জিজ্ঞাসা করলেন, 'ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে মামলাটা কী অবস্থায় আছে?'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'মাই লর্ড, ওখানে আমার মক্কেল এই চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি পিটিশন ফাইল করে রেখেছেন, কিন্তু সমস্যা হল, ম্যাজিস্ট্রেট তো আর সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন না। তিনি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন। সেখানে ওই থানারই অন্য অফিসার তদন্ত করবেন। কিন্তু, আমরা চাই সিবিআই তদন্ত। হত্যাকারী কে এবং তার বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করে তাকে জেলে ভরা—এটা সিবিআই—এর পক্ষেই সম্ভব।' এই বলে কন্দর্পনারায়ণ, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন মামলার রায়, যেখানে রাজ্য সরকারি পুলিশের তদন্তে সন্তুষ্ট না হয়ে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট সিবিআই—কে তদন্ত ভার দিয়েছেন, সেইগুলি জজ সাহেবকে জমা দিলেন।

'মাই লর্ড, আমার আর—একটা প্রার্থনা আছে। সিবিআই—কে তদন্তভার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত চলাকালীন আমার মক্কেল যাতে সুরক্ষিত থাকেন, তার জন্য তাঁদের উপযুক্ত সুরক্ষার বন্দোবস্ত করতে হবে। আপনি জানেন, অভিযুক্ত পক্ষ, আমার মক্কেলের উপর যেকোনও রকম আক্রমণ করতে পারে। তা ছাড়া, এইমাত্র আপনি দেখলেন, প্রধান অভিযুক্ত এই কোর্টরুমের ভেতরে কীরকম আচরণ করে গেলেন। এঁরা আইন মানেন না, আদালত মানেন না, যেকোনও মামলার সেটিং থানায় বসেই করে নিতে চান। আর কখনও কখনও, থানাগুলিও অপরাধীর সাথে 'সেটিং' করে নেয় থানায় বসেই। বলে, কোর্টে গিয়ে কী হবে, সেই তো মামলা চলবে বছরের পর বছর, এসো, এখানেই সেটিং করে দিচ্ছি।'

জজ সাহেব মাথা নেড়ে বললেন 'শুধু তা—ই নয়। আমি আপনাকেও পুলিশ প্রোটেকশন দিতে চাই, মি চ্যাটার্জি। গত বুধবার আপনার ওপরও তো অ্যাটাক হয়েছিল।'

কন্দর্পনারায়ণ মাথা নেড়ে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, 'না মাই লর্ড, আমার নিজস্ব প্রোটেকশনের দরকার নেই। আমার সঙ্গে আমার টিম আছে, আমার ছেলে মেয়েরাই আমার শক্তি', বলে সঙ্গে থাকা জুনিয়রদের দেখালেন।

জজ সাহেব আবার বললেন, 'সিবিআই—এর তরফে কে আছেন?'

এবার পূর্বাঞ্চলের অ্যাডিশনাল সলিসিটার জেনারেল বিক্রমজিৎ চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন—'মাই লর্ড, এই মামলাটি অত্যন্ত ইম্পর্ট্যান্ট আর ইন্টারেস্টিং। একজন অভাগা মা—কে যে এত দূর আসতে হল, তার জন্যই আমি দুঃখপ্রকাশ করছি। আমাদের এই মামলাটা তদন্তের জন্য গ্রহণ করতে কোন অসুবিধে নেই। শুধু আপনি তদন্তকারী অফিসারকে বলে দিন, তারা যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের কেসের যাবতীয় রেকর্ড হ্যান্ডওভার করে।'

জজ সাহেব আবার বলে উঠলেন, 'রায় আমি এক্ষুনি দেব, কিন্তু একটাই সমস্যা, প্রিয়া পোদ্দারের হয়ে কোনও আইনজীবী নেই? প্রিয়া পোদ্দারকে কে রিপ্রেজেন্ট করছেন?'

কন্দর্পনারায়ণ এবার বাঁদিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করলেন। ওড়না দিয়ে মুখ—ঢাকা এক ভদ্রমহিলা, যিনি এতক্ষণ ভিড়ের মধ্যে মিশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। মুখ থেকে ওড়নাটা সরাতেই উমা চমকে উঠলেন—'এ তো প্রিয়া—প্রিয়া পোদ্দার।'

অমলেশও চমকে গেলেন—'তা—ই তো!'

কোর্টের মধ্যে হিন্দিতে কতকগুলো কণ্ঠস্বর ছিটকে উঠল—'শালি... কুত্তি... কোর্ট মে আয়ি ....' আর—একটা চাপা গলা শোনা গেল—'ভাইয়া, ম্যায় তুমহে বোলা থা... ইস কো ভি... মার দো...'।

কোর্টে সবার বিস্ফারিত চোখের সামনে দিয়ে এক পরমাসুন্দরী মহিলা কোর্টে জজ সাহেবের সামনে এসে দাঁড়ালেন—'হুজুর, আমি এই মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত। প্রিয়ংবদা পোদ্দার, আমি কিছু বলতে চাই—আমার কোনও ল'ইয়ার নেই। আমি নিজেই বলব। আপনি অনুমতি দিন।'

জজ সাহেবও খুব অবাক হয়েছেন।—'আপনি বলুন কী বলতে চান, আমি নিশ্চয়ই শুনব। তার আগে আমাকে একটু একটা প্রশাসনিক কাজ করতে দিন—এইমাত্র, কোর্টরুমে হিন্দিতে আমি কিছু হুমকিসূচক ও আনপার্লামেন্টারি শব্দ শুনেছি। কোর্টের ভেতরে এই ধরনের শব্দ উচ্চারণ করা যায় না। সাধারণ মানুষ আদালতে ভরসা রাখেন। তাঁদের ভরসার মর্যাদা আমি দেব। আমি পুলিশকে নির্দেশ দিচ্ছি আগে যাঁরা কোর্টরুমের ভেতরে আনপার্লামেন্টারি শব্দ উচ্চারণ করলেন, তাঁদের অ্যারেস্ট করা হোক।'

প্রতিটি কোর্টরুমের বাইরেই পুলিশি পাহারা থাকে। জজ সাহেবের নির্দেশ পাওয়ামাত্র, পুলিশ কোর্টরুমের ভেতরে ঢুকে দু—তিনজনকে অ্যারেস্ট করে নিল। তার মধ্যে একজনের হাইট প্রায় সাড়ে ছ—ফুট, কানে সোনার দুল। কন্দর্পনারায়ণ একঝলক তাকিয়েই বুঝলেন, যে ওই লোকটাই রফিক। আর—একজন মাঝারি হাইটের রোগাটে, সে—ই রবি পোদ্দার হবে। কন্দর্পনারায়ণের জুনিয়ররা সবাই স্তম্ভিত, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন, 'স্যার, প্রিয়া পোদ্দার এখানে? আপনি এনেছেন? কী করে? কীভাবে?'

'কন্দর্পনারায়ণ হেসে বললেন—রূপকদার কৃতিত্ব। উনি একটা রেফারেন্স বার করে প্রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে আজ কোর্টে আসতে বলেছিলেন। এখন মামলায় ফোকাস করো।'

প্রিয়া পোদ্দার জজ সাহেবকে হাত জোড় করে নমস্কার করে বলতে শুরু করলেন, 'স্যার, এটা সত্যি যে, আমি নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে ভিক্টর ঘোষের সঙ্গে আলাপ করেছিলাম। আমাদের আলাপ, পরে গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছিল। আসলে, আমি বিবাহিত জীবনে অত্যন্ত অসুখী ছিলাম। আঠারো বছর বয়স হওয়ামাত্র বাবা জোর করে বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়ের পরে হানিমুনে গেলাম সুইটজারল্যান্ডে। ওখানে এক মাস থেকে দেশে ফিরে পুজোর সময় গেলাম মরিশাস। প্রথমদিকে সব ঠিকঠাকই চলছিল। আমিও খুশিতেই ছিলাম। তারপর আমি ধীরে ধীরে জানতে পারলাম, আমার স্বামী শুধু দুশ্চরিত্রই নন, একজন সত্যিকারের খারাপ মানুষ। আমি তাঁর দুষ্কর্মের প্রতিবাদ করায় তিনি আমাকে নিয়মিত মারতে শুরু করলেন। এমনকী কোমরের বেল্ট খুলেও মারতেন। কিন্তু, আমি ততদিনে ডানাকাটা পাখি হয়ে গেছি। আমার একটি ছেলে হয়েছে। আমি বাবাকে ডিভোর্সের কথা বলাতে তিনি বললেন, আমাদের পরিবারে ডিভোর্স বলে কিছু হয় না। হয়, সহ্য করতে হবে, না হয়, আত্মহত্যা করতে হবে। আমি আত্মহত্যা করবার কথাও ভেবেছিলাম, কিন্তু ছেলেটার মুখ চেয়ে আত্মহত্যা করতে পারিনি। বাবা জোর করে সল্ট লেকের একটা জিমে ভরতি করে দিলেন। সেখানে আলাপ হল ভিক্টর ঘোষের সঙ্গে। হ্যাঁ, আমি পরিচয় লুকিয়ে ভিক্টর ঘোষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলাম, সেটা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে আমি অন্যায় করেছি, হুজুর। তা ছাড়া, আমি ওকে সব বলেও দিতাম, সব জেনে যদি ও আমাকে বিয়ে করতে চাইত, তাহলে আমরা বিয়ে করতাম, এরই মধ্যে সব জানাজানি হয়ে গেল। আমার স্বামী আমার ওপর অত্যাচার আরও বাড়িয়ে দিলেন। আমি ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেলাম। সেখান থেকে আমি আমার স্বামীকে ডিভোর্সের নোটিশ পাঠালাম। আমার স্বামী তাতে আরও খেপে গেলেন। আমি কোথায় যাই, কার সঙ্গে কথা বলি, তা জানবার জন্য আমার পেছনে লোক লাগালেন, এমনকী আমার মোবাইল ফোন ওঁরা হ্যাক করলেন, অথচ আমি কিছু জানতেই পারলাম না। আমার স্বামী আর রফিক, ভিক্টর ঘোষকে খুন করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন দিনের পর দিন। ভিক্টর আমার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। আমার তখন পাগলের মতন অবস্থা—ডিভোর্সের মামলা করেছি স্বামীর বিরুদ্ধে। স্বামীকে ছেড়ে যাকে বিয়ে করব বলে ঠিক করেছি, তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। সে ফোনও ধরছে না। অবশেষে দু—হাজার বারো সালের একুশে ডিসেম্বর, আমার সঙ্গে ভিক্টর ঘোষের কথা হল। আমি ওকে বলতে চেয়েছিলাম যে, আমি রবি পোদ্দারকে ডিভোর্স করছি, ও আমাকে বিয়ে করবে কি না। অবশ্য আমি জানতাম, ও আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাবে, ও আমাকে এতটাই ভালোবাসত। কিন্তু আমি জানতাম না যে, রবি পোদ্দার আমার মোবাইল হ্যাক করে আমার সবকিছুর ওপর নজর রাখছে। সেদিন রাত আটটা কুড়ি নাগাদ কোনা এক্সপ্রেসওয়েতে আমার জন্য ভিক্টর ঘোষ অপেক্ষা করছিল। বাইকটা রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে বাইকের ওপরেই ও বসে ছিল। আমিও ট্যাক্সি নিয়ে আসছিলাম। আমি আসবার আগেই রবি পোদ্দার আর রফিক সেখানে পৌঁছে যায়। ভিক্টরের বাইকের পেছনে চেপে বসে রফিক ভিক্টরের কাঁধে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে দেয়। আমি রবি আর রফিককে দেখে ট্যাক্সি নিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে যাই। কিন্তু, আমি বুদ্ধি করে ট্যাক্সিতে বসেই পুরো ব্যাপারটা ভিডিয়ো রেকর্ড করে নিই। গোটা ঘটনাটাই আমার চোখের সামনে ঘটেছে, হুজুর। অথচ আমি বাধাও দিতে পারিনি। আমাকে দেখলে ওরা আমাকেও খুন করে দিত।' এই বলে প্রিয়া পোদ্দার কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

জজ সাহেব বললেন, 'আপনি বলছেন, আপনি গোটা ব্যাপারটা ভিডিয়ো রেকর্ড করেছেন, কোথায় সেই রেকর্ডিং? পুলিশকে জানিয়েছেন?'

প্রিয়া পোদ্দার সামনে এগিয়ে গিয়ে একটা পেনড্রাইভ জজ সাহেবকে জমা দিলেন।

জজ সাহেব বললেন, 'এটা আপনি পুলিশকে দিয়েছিলেন?'

প্রিয়া আবার মুখ খুললেন, 'বহুবার দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সাহস পাইনি। যখন বুঝলাম পুলিশ ওদের দিকে, তখন আর চেষ্টা করিনি। আমার প্রাণের ভয় ছিল।'

'এখন আমি ডিভোর্স করে ছেলেকে নিয়ে আলাদা থাকি। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় একটি বৃদ্ধাশ্রম চালাই। আমি টিভি দেখি না। খবরের কাগজ পড়ি না। আমি এই মামলার কথা জানতাম না। একজন সাংবাদিক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে এই মামলার কথা জানান। তিনি আমাকে সরাসরি কোর্টে আসতে বলেন।'

জজসাহেব সামনে রাখা ল্যাপটপে পেনড্রাইভটা ভরে ল্যাপটপটা চালু করে দেখতে শুরু করলেন। বিরোধী পক্ষের আইনজীবীরা হতাশ হয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়লেন। পুরো ভিডিয়ো রেকর্ডিংটা দেখে জজ সাহেব মামলার রায় দিতে শুরু করলেন, 'সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা হল আদালত। একজন পুত্রহারা অসহায় মা—কে যে স্টেট লিগাল সার্ভিসেস অথরিটি বা রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত আইনি সাহায্য দিতে এগিয়ে এসেছেন, তাতে আমি খুশি। পাশাপাশি, এটা খুব দুঃখের যে, একটি আটাশ বছরের তরতাজা যুবক, যাকে ঘিরে তাঁর মা—বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল, তিনি খুন হয়ে যান। আর পুলিশ মামলার সঠিক তদন্তই করেনি। অভিযুক্ত রবি পোদ্দার ও মহম্মদ রফিক পারভেজ একজন নিরীহ নাগরিককে শুধু খুনই করেননি, আর—এক অভিযুক্ত বসন্ত পোদ্দারের সঙ্গে মিলে এই জঘন্য হত্যার ঘটনাটাকে ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করেছেন। পুলিশ হত্যা ও ষড়যন্ত্রের ধারায় চার্জশিট দিয়েছেন, কিন্তু ইচ্ছে করেই বলেননি হত্যাকারী কে বা কারা এবং এখানে আবেদনকারিণী মায়ের জানবার অধিকার আছে, যে কে তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছে। পুলিশ শুধু হত্যাকারীদের আড়ালই করেনি, তথ্যপ্রমাণ লোপাটেও সাহায্য করেছে। তদন্তকারী অফিসারের বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলা ও হত্যার তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে মামলা রুজু করা হোক। অভিযুক্ত পক্ষ অত্যন্ত বিত্তশালী ও সমাজে প্রতিপত্তিশালী। আজকে যদি তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ মনে করবেন, আইন বোধহয় শুধু বড়লোকদের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য নয়। তাই এক্ষুনি অভিযুক্ত পক্ষের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অভিযুক্ত বসন্ত পোদ্দার হয়তো নিজে হাতে খুন করেনি, কিন্তু অপরাধ চাপা দেবার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।'

'কাজেই, গোটা মামলার যাবতীয় দায়িত্ব আমি সিবিআই—এর কাছে হ্যান্ডওভার করার নির্দেশ দিচ্ছি। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ কেসের সমস্ত কাগজপত্র সিবিআই—এর জয়েন্ট ডিরেক্টরের অফিসে অর্থাৎ নিজাম প্যালেসে জমা দেবেন। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে বসন্ত পোদ্দার, রবি পোদ্দার এবং মহম্মদ রফিককে অ্যারেস্ট করতে হবে।'

'আর—এক অভিযুক্ত প্রিয়া পোদ্দারের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পুলিশকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রাণের ভয়ে পুলিশকে পেনড্রাইভটা দিতে পারেননি। আমি প্রিয়া পোদ্দারের বক্তব্যকে বিশ্বাস করছি। সিবিআই প্রিয়া পোদ্দারের বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করবে। প্রিয়া পোদ্দার সিবিআইকে এই পেনড্রাইভ জমা দেবেন। সিবিআই একটি সিজার লিস্ট করে পেনড্রাইভ জমা নেবেন। ছ—মাসের মধ্যে এই তদন্ত শেষ করতে হবে। তদন্ত চলাকালীন এবং তারপর যতদিন আদালতে মামলা চলবে, আবেদনকারিণী মা, তাঁর পরিবার ও প্রিয়া পোদ্দার এবং তাঁর সন্তানের যাবতীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করবে সিবিআই।'

কোর্টরুমের মধ্যেই আনন্দে কাঁদতে শুরু করলেন উমা। কন্দর্পনারায়ণ সবাইকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। শীর্ষেন্দু, দেবাশিস, অপলক, নাজির, সুপ্রিম, সবাই আনন্দে প্রায় লাফাচ্ছেন। অমলেশ সবাইকে জড়িয়ে ধরছেন। সাংবাদিকরা সবাই অমলেশ, উমা আর কন্দর্পনারায়ণকে ঘিরে ধরলেন। কালকের কাগজে নিউজটা বড় করে বের করতে হবে যে, 'সাত বছর পরে ভিক্টর ঘোষ মার্ডার কেস রিওপেনড।' তবে, কন্দর্পনারায়ণ আজ আর কথা বলতে পারবেন না। তাঁর গলার কাছে একটা কান্না যেন দলা পাকিয়ে রয়েছে, চোখটা জ্বালা—জ্বালা করছে। অমলেশ যখন প্রথম দিন এসেছিলেন, সেদিন বলেছিলেন, 'আমি জাস্টিস চাই।' আজকে সাত বছরের পুরোনো একটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক কদম এগোনো গেল। এখনও অনেক লড়াই বাকি। খুনিদের সাজা হবার পর 'জাস্টিস' সম্পূর্ণ হবে।

ভিড়টাকে পেছনে ফেলে কন্দর্পনারায়ণ এগোলেন। সামনে মৌমিতা, অভ্রদীপ দাঁড়িয়ে। মৌমিতা বললেন, 'দাদা, দেব সাহেবের ডিভিশন বেঞ্চে, বহরমপুরের ট্রিপল মার্ডার কেসটা রয়েছে, চলুন। এক্ষুনি মামলা ধরবে।'

জয়শ্রী, শ্রীপর্ণা, স্বাগতা এগিয়ে এলেন—'দাদা, জাস্টিস বসুর কোর্টে হাওড়ার মার্ডার কেসটা—এক্ষুনি ধরবে।'

কন্দর্পনারায়ণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে শুরু করলেন, কোন মামলাটায় আগে যাবেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%