জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
পুরুলিয়া মহিলা সংশোধনাগারের সুপার ষষ্ঠীপদবাবু বড্ড ফাঁপরে পড়েছেন। তিনি এই সংশোধনাগারের সুপার হয়ে এসেছেন প্রায় তিন বছর হল। পুরুলিয়া শহরের এক প্রান্তে এই সংশোধনাগারটি। বার বার সংশোধনাগার বলছি বলে আপনারা হয়তো অনেকেই বুঝতে পারছেন না, 'সংশোধনাগার' মানে 'জেল' আর কী! আগে 'জেল' কথাটা ব্যবহার হত, এখন 'জেল' শব্দটা উঠে গিয়েছে। এখন 'সংশোধনাগার' শব্দটাই ব্যবহার হয়। কোর্ট থেকে সাজা পেয়ে একজন কয়েদি সেখানে সাজা খাটবেন, সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাজের ট্রেনিং নেবেন, কাজ করবেন, ওই কাজের বিনিময়ে কিছু টাকাপয়সাও রোজগার করবেন। তারপর যদি তিনি ছাড়া পান, তাহলে সংশোধিত হয়ে অর্থাৎ একজন ভালো মানুষ হয়ে, সমাজের মূলস্রোতে আবার ফিরে আসবেন—এটাই হল মূলকথা। কিন্তু, মানুষ এখানে ভালো থাকবেন কি করে? ছেলে—মেয়ে, বউ, মা—বাবাকে ছেড়ে এখানে থাকতে বাধ্য হলে কোনও মানুষ কি ভালো থাকতে পারেন? এ যে কী দুঃসহ যন্ত্রণা, বলে বোঝানো যাবে না! দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বন্দিদশায় থাকা? মানুষ পাগল হয়ে যায়। রাত্রে ঘুম হয় না। কেউ কেউ দুঃখে—জ্বালায়—যন্ত্রণায় রাত্রে ঘুম ভেঙে উঠে, জেলের দেয়ালে মাথা ঠোকেন, চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন—কেউ দরজা খুলে বাইরে বেরোতে দেয় না। তা ছাড়া যে লোকটি জেলে আছেন, তাঁর জেলের খরচ, মামলার খরচ জোগাতে জোগাতে তাঁর পরিবারও শেষ হয়ে যায়।
এরকম কত কেস দেখেছেন ষষ্ঠীপদবাবু, যেখানে স্ত্রী—কে খুনের দায়ে স্বামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। ছোটো ছেলে—মেয়েগুলোকে কেউ দেখবার নেই, তারা রাস্তায় ভিক্ষে করছে, তারপর একটু বড় হতেই, সেই বাচ্চারাও পেটের জ্বালায় খারাপ রাস্তা বেছে নিয়েছে। মেয়ে হলে এক রকমের রাস্তা, ছেলে হলে আর—এক ধরনের অপরাধের রাস্তা।
ইমরান বলে একজনকে তিনি চেনেন, যে সাত বছর জেল খাটার পর বাইরে বেরিয়ে দেখে, তার বউ অন্য আর—একজনের সঙ্গে রাত্রে থাকে। যখন ইমরান তার বউকে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, 'কেন তুমি এরকম করলে, কেন তুমি আর—একজনের সঙ্গে রাতে শোও?' ইমরানের বউ কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, 'কী করব? তোমার মামলার টাকা জোগাড় করতে আমার যা কিছু ছিল, সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছিলাম, শরীর ছাড়া আমার কাছে বিক্রি করবার আর কিচ্ছু ছিল না, আজকে তুমি যে জেল থেকে খালাস হয়ে বাইরে বেরিয়েছ, সেটা আমার শরীর বিক্রির টাকায় সম্ভব হয়েছে। পুলিশকে টাকা না দিলে চলবে না, কোর্টে টাকা লাগবে, উকিলকে টাকা দিতে হবে, জেলে টাকা দিতে হবে—কোথায় পাব আমি এত টাকা? যার সঙ্গে আমি রোজ রাতে শুই, সে টাকা দিয়েছে বলেই, আমি তোমার জন্য খরচ করতে পেরেছি। তুমি জেল থেকে বেরিয়েছ, না হলে সারাজীবন তুমি জেলেই থাকতে। এখন আমি তাকে ছেড়ে আসতে পারব না। ইমরান তার বউ—র কথা শুনে দুঃখে, রাগে, যন্ত্রণায়, হতাশায় চিৎকার করে, তার বউয়ের গলায় কাটারি চেপে ধরেছিল, বউয়ের গলার নলি কাটবে বলে। ইমরানের বউ ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলেছিল, 'আমার নলি তুমি কাটতে পারো, কিন্তু এবার তুমি আর জেল থেকে বেরোবে না। শরীর বিক্রির টাকায় তোমাকে বের করবে কে? তোমার বউই তো আর থাকবে না।'
তবে, জেলা লিগাল এইডের থেকে জজ সাহেবরা আসেন। তাঁরা জেলের মধ্যে ঢুকে সবার সঙ্গে কথা বলেন। কার কী সমস্যা শোনেন। ওই মহিলারা ঠিকঠাক কোর্টের সুবিধা পাচ্ছে কি না। ওই মহিলারা চাইলে বিনা পয়সায় উকিলবাবু পাবেন। কোর্টে কোনও খরচ লাগবে না। তাঁদের খাওয়াদাওয়া, চিকিৎসা ঠিকমতন হচ্ছে কি না, মেয়েদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থাকে, সেগুলির দেখভাল হচ্ছে কিনা, এ সমস্তই ওই জজ সাহেবরা খোঁজ নেন। বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। ছোট বাচ্চা থাকলে, তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন—এইসব আর কী!
প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল, বিভিন্ন সংশোধনাগারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ষষ্ঠীপদবাবু। আগে তো জেলগুলোর অবস্থা আরও খারাপ ছিল, এখন লিগাল এইডের থেকে জজ সাহেবরা নিয়মিত আসছেন বলে জেলগুলোর অবস্থা আগের থেকে অনেক ভালো। মফসসলের জেলগুলো শহরের জেলগুলোর চাইতে অনেক খোলামেলা। বেশির ভাগ জেলের ভেতরে পুকুর আছে। মাঝে মাঝে জাল ফেলে পুকুরের মাছ ধরা হয়। সেই মাছ কয়েদিরাও খান। অনেক গাছগাছালি, পাখি ডাকে। প্রচুর ফুল ফোটে। এখানে তো জেলের ভেতরে রীতিমতো ফুলের চাষ করা হয়। এ ছাড়াও প্রচুর সবজি ফলানো হয়, সেগুলো অবশ্য এই মহিলা কয়েদিরাই করেন। মহিলা কয়েদিরা পুরুষ কয়েদিদের তুলনায় পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করেন। আবার উলটোটাও হয়। দীর্ঘদিন জেলে থাকতে থাকতে তাঁরা বিভিন্ন শারীরিক অসুখে ভুগতে থাকেন। মানসিক সমস্যা তো প্রায় বিভিন্ন কয়েদিরই হয়। অনেকেই স্কিজোফ্রেনিয়ার মতো গভীর অসুখে ডুবে যান। ছেলে—মেয়ে, আত্মীয়—পরিজনকে না দেখলে যা হয় আর কী? গভীর মানসিক অসুখের শিকার হয়ে কেউ হয়তো দিনের পর দিন স্নান করেন না। গায়ে—মাথায় বিজবিজে উকুন হয়ে যায়। তাঁরা নিজেদের আত্মীয়স্বজনের সামনেও আসতে চান না। লিগাল এইডের জজ সাহেবরা দেখা করতে চাইলেও তাঁরা 'সেল'—এর বাইরে বেরোতে চান না। গভীর অন্ধকারে তাঁরা তলিয়ে যান। বাড়ির লোকও আস্তে আস্তে জেলে আসা বন্ধ করে দেন। এমনও হয়, এইসব মহিলা কয়েদিদের স্বামীরা আবার বিয়ে করে নেন, ছেলে—মেয়েরা বড় হয়ে নিজের নিজের সংসার করে, মা—কে তারা ভুলেই যায়। দশ—বারো বছর বাদে যদি বা এই মহিলারা জেল থেকে ছাড়া পান, তখন তাঁরা তাঁদের পুরোনো বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেখেন, তাঁদের বাড়িটাই আর নেই, স্বামী আবার বিয়ে করে নিয়েছেন, সেই সংসারেও হয়তো আবার ছেলে—মেয়ে হয়েছে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়া ওই মহিলাদের নিজেদের ছেলে—মেয়েরা বড় হয়ে গিয়েছে। নিজেরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। জেল থেকে বেরিয়ে ওঁদের আর থাকার জায়গা থাকে না। স্বামী, ছেলে—মেয়ে, সবার কাছেই তিনি অবাঞ্ছিত হয়ে যান। জেল থেকে বেরিয়ে, অনেক মহিলারই তাই জায়গা হয় রাস্তার ধারে, ফুটপাতে, কাউকে কাউকে ভিক্ষাও করতে হয়। তবে, সবার ভাগ্যই এতটা খারাপ হয় না। কেউ কেউ পুরোনো সংসারে জায়গাও পান। অনেকের ছেলে—মেয়েই কোর্টে লড়াই করে, মামলায় জিতে, মা—কে ঘরে নিয়ে যায়। তবে, এত ভালো ভাগ্য কম মহিলারাই হয়।
এবার বলি, এই জেলের সুপার ষষ্ঠীপদবাবুর ফাঁপরে পড়বার কারণ কী? এই জেলে মোট পঞ্চাশজন মহিলা কয়েদি আছেন। গত সপ্তাহে কলকাতা হাইকোর্টের একজন বিচারপতি এসেছিলেন পুরুলিয়া জেলার লিগাল এইডের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে। জেলের কয়েদিরা কেমন আছেন, তাঁদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন আছে, কোর্টে প্রত্যেকের মামলা ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, প্রত্যেকের উকিলবাবু আছেন কিনা, প্রত্যেকের বাড়ির লোক ঠিকঠাক আসেন কি না এইসব ব্যাপারে একটা বিশদ রিপোর্ট তিনি চেয়েছেন ষষ্ঠীপদবাবুর কাছ থেকে।
আর সেই রিপোর্ট তৈরি করতে গিয়েই ষষ্ঠীপদবাবুর সমস্যা। মোটামুটি উনপঞ্চাশজন মহিলা কয়েদিরই রিপোর্ট তিনি তৈরি করেছেন। গোলমাল বেঁধেছে পঞ্চাশতম কয়েদি প্রভাবতী মাহাতোকে নিয়ে। পুরুলিয়া জেলা কোর্ট থেকে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। এগারো বছর ধরে তিনি এই জেলেই আছেন। বয়স এখন চল্লিশ। তার মানে উনত্রিশ বছর বয়সে তিনি জেলে ঢোকেন। সে—এ—ই প্রথমদিকে কয়েকবার বাড়ির লোক এসে দেখা করে গিয়েছে। তারপর থেকে বাড়ির কেউ আর কোনওরকম খোঁজখবর নেয়নি। কোনদিন না। স্বামী, ছেলে, মেয়ে কেউ না। নিম্নকোর্টেও কোনও উকিলবাবু রাখতে পারেননি। শেষে, পুরুলিয়া জেলার লিগাল এইড কমিটি বিনা পয়সায় একজন উকিলবাবু ঠিক করে দিয়েছিলেন। চার—পাঁচ বছর মামলা চলার পর জেলা কোর্ট প্রভাবতী মাহাতোকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে দেন। আজকাল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে সারাজীবন জেলে থাকতে হবে। তা, প্রভাবতী নিজের ভাগ্যকে মেনেই নিয়েছেন। তিনি জেলে নিজের ঘর থেকেও বেরোন না। কারও সঙ্গে কথাও বলেন না। একা একাই থাকেন। যা কাজ দেওয়া হয়, সেটুকু যন্ত্রের মতো করে দেন। ক—দিন আগে বর্ষার সময় ওঁর ঘরে কুচকুচে কালো সাপ দেখা গিয়েছিল। ফণা তুলে ঘুরছে। সবাই চিৎকার করে সাপটাকে মারতে গিয়েছিল। উনি মারতে দেননি। সাপটা আবার ফণা নামিয়ে নিজে থেকেই পাশের পুকুরে নেমে গিয়েছিল। ষষ্ঠীপদবাবু তখন একবার নিজের অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন প্রভাবতীকে। জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'আপনার ভয় করেনি?' প্রভাবতী অফিসের জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, 'কেন ভয় করবে স্যার? আমি তো মরতে চেয়েছিলাম বহুবার। মরতে পারিনি। সাপেও আমাকে মারবে না। সাপের ছোবলে মরতে গেলেও ভাগ্য লাগে। আমার সেটুকু ভাগ্যও নেই।'
ষষ্ঠীপদবাবু বুঝেছিলেন, প্রভাবতীর মনের গভীরে কিছু বক্তব্য আছে। গভীর গোপন দুঃখ। যাঁরা যাঁরা কয়েদি হিসেবে জেলে আসেন, প্রত্যেকের দুঃখের ইতিহাস হয়। কাউকে কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়, কোনও অপরাধ না করেও তাঁরা বছরের পর বছর জেল খাটেন। স্বামী, সংসার সব হারিয়ে যায়, প্রভাবতীর সঙ্গেও তেমন কিছু হয়েছে নিশ্চয়ই।
এহেন প্রভাবতীর মামলা পাঁচ বছর ধরে হাইকোর্টে ঝুলে আছে। ষষ্ঠীপদবাবুর আগে এই জেলে যিনি সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন, তিনি হাইকোর্টে একজন উকিলবাবুকে ধরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে প্রভাবতীর আপিল মামলা দায়ের করে দেন। কিন্তু, তারপর আর কিচ্ছুটি হয়নি। গত পাঁচ বছর ধরে মামলা হাইকোর্টেই ঝুলে আছে। কেউই আর সেই মামলার খোঁজ নেয়নি। প্রভাবতীও কখনো জানতে চাননি মামলার কী অবস্থা, ষষ্ঠীপদবাবু রেকর্ড ঘেঁটে দেখেছেন, প্রভাবতীর সঙ্গে ওনার স্বামী বা ছেলে—মেয়ে শেষ দেখা করেছেন ন—বছর আগে। এই ন—বছর ধরে ওঁর বাড়ি থেকে কেউ আসেননি, প্রভাবতীর সঙ্গে দেখা করতে বা খোঁজ নিতে। জেলের একজন কর্মীকে তিনি পাঠিয়েছিলেন প্রভাবতীর বাড়ির ঠিকানায় খোঁজখবর নিতে। সেই লোকটি খোঁজ নিয়ে এসে জানিয়েছে, প্রভাবতীর স্বামী, প্রভাবতী জেলে ঢোকার দু—বছরের মাথায় বিয়ে করেছে, ছেলেও এখন বড় হয়ে গিয়েছে, সে কলকাতায় কাজ করে, মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই। প্রভাবতীর স্বামী ওই লোকটির মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বলেছে, প্রভাবতী বলে আমি কাউকে চিনি না। ষষ্ঠীপদবাবু বহু বছরের অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু বোঝেন যে, বাড়ির লোকের কাছে প্রভাবতী মৃত। প্রভাবতীর প্রয়োজনীয়তা আর বাইরের পৃথিবীর কারও কাছে নেই। প্রভাবতী জেলেই ভালো আছেন। জেলের বাইরে বেরোলে বরং না খেয়ে মরতে হবে। আর এ কথা প্রভাবতীও ভালোই বোঝেন। তাই তিনিও বেঁচে থাকার সব আগ্রহ হারিয়েছেন। নিজের স্বামী, ছেলে—মেয়ে যাকে ভুলে গিয়েছে, তার বেঁচে থেকে আর লাভ কী?
কিন্তু, হাইকোর্টের জজ সাহেবকে কী রিপোর্ট দেবেন ষষ্ঠীপদবাবু? কেন গত পাঁচ বছরে হাইকোর্টের মামলার শুনানি হয়নি? বাড়ির লোক কেনই বা খবর নেয় না প্রভাবতীর? কেনই বা প্রভাবতী 'সেল'—এর বাইরে বেরোতে চান না, ডাক্তার দেখাতে চান না? প্রভাবতীকে শেষ ডাক্তার দেখানো হয়েছে সাত বছর আগে। পুরুলিয়া জেলের অন্ধকারে তলিয়ে রয়েছেন প্রভাবতী বহু বছর ধরে। কীভাবে জজ সাহেবকে বোঝাবেন ষষ্ঠীপদবাবু যে, জেলের ভেতরেই ভালো আছেন প্রভাবতী। তবু তো দু—বেলা দু—মুঠো খেতে পাচ্ছেন প্রভাবতী, মাথার ওপর একটা ছাদ আছে, একটা ঘুমোবার জায়গা আছে। জেল থেকে বেরোলে তিনি সেটুকুও হারাবেন। সমাজে কোথাও প্রভাবতীর জায়গা নেই। আত্মীয়স্বজন সবার কাছেই তিনি মৃত, অপ্রয়োজনীয়।
যা—ই হোক, একটা রিপোর্ট তো তৈরি করতে হবে। তারও আগে প্রভাবতীর হাইকোর্টের কাগজগুলো দেখা দরকার। সেদিন অফিসে ঢুকে প্রভাবতীর জন্য একটা ফাইল তৈরি করলেন, সমস্ত কাগজপত্র রেডি করলেন ষষ্ঠীপদবাবু, কোন কেসে প্রভাবতী অ্যারেস্ট হয়েছিলেন, সেই কেসের যাবতীয় কাগজ। পুরুলিয়া জেলা কোর্টে বিচার চলাকালীন যাবতীয় নথিপত্র, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের কপি, হাইকোর্টে ঝুলে—থাকা মামলার কাগজপত্র সব। সমস্ত কাগজপত্র একটা ফাইলে ঢুকিয়ে তিনি ফোন করলেন, তাঁর অনেকদিনের বন্ধু—হাইকোর্টের ল'ইয়ার দেবাশিস ব্যানার্জিকে। বললেন, 'দেবাশিসবাবু, বড্ড বিপদে পড়েছি। হাইকোর্টের জজ সাহেব রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছেন, আর এদিকে মামলা তো হাইকোর্টেই ঝুলে আছে পাঁচ বছর ধরে। এক ইঞ্চিও এগোয়নি। কিন্তু, এ কথা তো জজ সাহেবকে বলা যাবে না। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, এই মামলাটা হাইকোর্টে করে দিতে হবে। হার—জিত যা—ই হোক—না কেন।' মনে মনে তিনি অবশ্য হারই চান। হারলেই বরং প্রভাবতী জেলের ভেতর ভালো থাকবেন। আর জিতে যাওয়া মানেই প্রভাবতী খুনের অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস হয়ে যাবেন। তাহলেই প্রভাবতীকে জেলের বাইরে বেরোতে হবে। জেলের বাইরে প্রভাবতীর জন্য যে কোনও জায়গা নেই, সেটা আর কেউ না জানুক, অন্তত ষষ্ঠীপদবাবু জানেন। দেবাশিসবাবু অবস্থার গুরুত্ব বুঝে বললেন, কালকের মধ্যে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজের ফাইল তাঁর হাতে পৌঁছে দিতে হবে।
সেদিন কোর্ট থেকে ফিরে হাত—মুখ ধুয়ে পরিচিত ধপধপে সাদা চিকনের পাঞ্জাবি আর চোস্ত পায়জামা পরে চেম্বারে এসে বসলেন কন্দর্পনারায়ণ। অন্য জুনিয়র ল'ইয়াররা আগেই এসে গিয়েছেন। সবাই নিজের নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
দেবাশিসবাবুও প্রভাবতী মাহাতোর ফাইল নিয়ে হাজির। —'দাদা, পুরুলিয়া জেলের সুপারিনটেনডেন্ট সাহেব এই মামলাটা পাঠিয়েছেন। খুব ইন্টারেস্টিং, গত এগারো বছর ধরে এই মহিলা গ্রামেরই একজন লোককে খুনের দায়ে জেল খাটছেন। ওঁর কেউ নেই। স্বামী আবার বিয়ে করেছে। মেয়ে বিয়ে করে চলে গেছে। ছেলেও বাইরে কাজ করে। পরিবারের লোক চায় না, ইনি বাইরে বেরোন। কিন্তু মূল সমস্যা হল, এই মামলাটায় কিন্তু টাকাপয়সা কিছু পাওয়া যাবে না। সুপারিনটেনডেন্ট সাহেব চান, এই মামলাটা আমরা করি। কিন্তু, ওঁর হয়ে টাকাপয়সা দেবার কেউ নেই। আসলে উনি জানেন, যে আমরা এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে থাকতে ভালোবাসি—তাই আর কী...' শেষের কথাগুলো দেবাশিস আমতা আমতা করে বললেন।
'দেবাশীস, তুমি তো জানো, আমাদের কাছে টাকাপয়সাটা বড় ব্যাপার নয়। তোমাদের মধ্যেও আমি সেই ব্যাপারটাই ইঞ্জেক্ট করতে চেয়েছি। নিশ্চয়ই, এহেন অসহায় মহিলার পাশে আমাদের থাকা উচিত। তবে, তার আগে আমাকে মামলাটা শোনাও। যদি মনে হয়, এই মহিলা কোনও অপরাধ না করেই সাজা খাটছেন, আমরা নিশ্চয়ই লড়ব। টাকাপয়সার ব্যাপারটা কোনও ফ্যাক্টর হবে না।'
ইন্টারেস্টিং কেসের গন্ধ পেয়ে অন্য জুনিয়ররাও সবাই কন্দর্পনারায়ণের ঘরে চলে এলেন—পারমিতা, অপলক, দ্বৈপায়ন, মৌমিতা, সুপ্রিম, জয়শ্রী, শ্রীপর্ণা, স্বাগতা—সবাই।
দেবাশিস বলতে শুরু করলেন, 'এগারো বছর আগের কথা। পুরুলিয়ার একটা প্রত্যন্ত গ্রামের গৃহবধূ প্রভাবতী মাহাতো। ঘটনার সময় উনত্রিশ বছর বয়স। গ্রামেরই একজন চাষি শ্রীমন্ত মাহাতোর স্ত্রী। এক ছেলে আর এক মেয়ে। চারজনের সুখের সংসার। বেশ খানিকটা চাষের জমি ছিল শ্রীমন্তর। শ্রীমন্ত আর প্রভাবতী দু'জনে মিলে চাষের কাজ করতেন। চাষবাস করে যা আয় হত, তাতে চলে যেত। প্রভাবতী মোটামুটি দেখতে—শুনতে ভালো, সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারিণী। গ্রামেরই একজন হল, রতন মণ্ডল। রতন মণ্ডল বিয়ে করেনি। গায়ে হাওয়া দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তার কুনজরে পড়েছিলেন এই প্রভাবতী। প্রভাবতী যখন দুপুরবেলায় গ্রামের পুকুরে স্নান করতেন, তখন লুকিয়ে দেখত রতন। প্রভাবতী সেটা বুঝতে পেরে শ্রীমন্তকে সব জানান। শ্রীমন্ত গা করেননি। মাঝে মাঝে শ্রীমন্ত যখন চাষের জমি থেকে চাষ করতে করতে উঠে বাড়িতে খেতে আসতেন, তখন প্রভাবতী মাঠে একাই কাজ করতেন। সেই সুযোগে রতন আসত প্রভাবতীর কাছে। কুপ্রস্তাব দিত প্রভাবতীকে। প্রভাবতী আপত্তি করতেন। চোলাই—হাঁড়িয়া খেয়ে প্রভাবতীর কাছে আসত রতন। গায়ের কাছে এলেই চোলাই—হাঁড়িয়ার পচা গন্ধে গা গুলিয়ে উঠত প্রভাবতীর। তিনি বলতেন, 'রতনদা, কাজের সময় বিরক্ত কোরো না। এখান থেকে যাও।' রতন শুনত না। প্রায়ই প্রভাবতীর হাত ধরে টেনে আড়ালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত রতন। মাঝে মাঝে সন্ধেবেলায় প্রভাবতী যখন হাটে যেতেন বাজার করতে, তখনও পিছু নিত রতন, সন্ধের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে কখনো প্রভাবতীর শরীর ছুঁতে চাইত, কখনো বা আঁচল ধরে টানত। প্রভাবতী প্রতিবাদ করলে, কোমরে গুঁজে রাখা কাটারি দেখাত। বলত, 'এর ফল ভালো হবে না,' একদিন প্রভাবতীর গলার নলি কেটে দেবে। এর মধ্যে দু—দিন সন্ধেবেলায় প্রভাবতীকে টেনে, গ্রামের পেছনে ভাঙা মন্দিরের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে। ওইদিকটা ফাঁকা থাকে। প্রভাবতী চিৎকার করে ওঠায়, রতন প্রভাবতীকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। প্রভাবতী প্রত্যেকবারই বাড়িতে ফিরে স্বামীকে সব ঘটনা জানিয়েছেন, বলেছেন, 'চলো, থানায় যাই, পঞ্চায়েতে বলি।' প্রত্যেকবারই শ্রীমন্ত ভয় পেয়েছেন। বলেছেন, বাদ দাও। আমরা গরিব লোক, রতনরা বড়লোক, ওদের সঙ্গে আমরা পারব কেন? কখনো কখনো প্রভাবতীর সাত বছরের ছেলে, সে—ও খানিকটা আন্দাজ করে, তার কচি গলায় চিৎকার করে বলেছে 'ছাড়ব না, ওই লোকটাকে মেরে শেষ করে দেব।' কিন্তু, শ্রীমন্ত না থানায় অভিযোগ করতে সাহস পেয়েছেন, না পঞ্চায়েতে জানিয়েছেন।' —এই অবধি একটানা বলে দেবাশিস একটু দম নেবার জন্য থামলেন। সঙ্গে সঙ্গে চেম্বারের ছেলেমেয়েরা হইহই করে উঠলেন, 'ওফ! ভারী পাজি লোক তো, একজন মহিলার সঙ্গে অশ্লীল আচার—আচরণ করছেন। পুলিশে দেওয়া উচিত ছিল।'
পারমিতা, মৌমিতা জোরের সঙ্গে বললেন, 'ধুসস। থানায় জানিয়ে কী হবে? এই ধরনের বদমাইশ লোকের সঙ্গে অন্য ভাষায় কথা বলা উচিত। রতনের কোমরে গোঁজা কাটারিটা কেড়ে নিয়ে রতনকেই একটা কোপ দেওয়া উচিত ছিল।'
অপলক হাসতে হাসতে বললেন, 'সে কী? তোমরা ল'ইয়ার হয়ে এরকম বলছ? আইন নিজের হাতে নেবে?'
পারমিতা বললেন, 'তাহলে কী করা উচিত? শুনলে না, রতন প্রভাবতীর গায়ে হাত দিচ্ছে। অন্ধকারে গ্রামের পেছনের ফাঁকা মন্দিরের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।'
মৌমিতা বললেন, 'কী বলছ অপলকদা, প্রভাবতীর কী উচিত ছিল, নিজেকে রেপড হতে দেওয়া? রতন প্রভাবতীকে রেপ করে দিলে তারপর সবাই প্রতিবাদ করবে? একটা গ্রাম্য গৃহবধূ, কী তার অপরাধ? কেন তাকে তার মতো করে বাঁচতে দেওয়া হবে না?'
দেবাশিস জলের বোতল থেকে ঢক ঢক করে খানিকটা জল খেয়ে বললেন, 'দাঁড়াও দাঁড়াও, আসল ঘটনায় এখনও আসিনি।' দেবাশিস বলে চললেন, 'প্রভাবতী একদিন একাই পঞ্চায়েতপ্রধানের কাছে গেলেন। তিনি বয়স্ক মানুষ। তিনি সব শুনে রতনকে খবর পাঠালেন এবং বললেন আগামী রবিবার পঞ্চায়েতের ঘরে আসতে। প্রভাবতীর উপর বার বার আক্রমণের ঘটনা নিয়ে বিচার হবে। যদিও শ্রীমন্তর এসব ঘটনায় মত ছিল না। তাঁর মতে, এইসব ঘটনা গ্রামে জানাজানি হলে তাঁর বদনাম হবে। তা ছাড়া, তিনি খেটে—খাওয়া চাষি, ঝামেলায় তিনি যেতে চান না। প্রভাবতী ঝাঁজিয়ে উঠে বলেছিলেন, 'তা আমি কী করব? আমাকে জোর করে কিছু একটা করলে, আমি কি সহ্য করব? নাকি আমার উচিত হবে, তোমার যাতে গ্রামে বদনাম না হয়, তার জন্য চুপচাপ গিয়ে রতনের সঙ্গে শুয়ে পড়া? তুমি কোনটা চাও?' প্রভাবতীর সাত বছরের ছেলে আর ন—বছরের মেয়ে প্রভাবতীর হাত জড়িয়ে বলেছিল, 'না মা, লোকটাকে আমরা ছাড়ব না। রবিবার পঞ্চায়েতের মিটিংয়ে তোমার সঙ্গে আমরাও যাব।' প্রভাবতীর সাহস বেড়েছিল।
'কিন্তু, রবিবার আসার আগেই, শুক্কুরবারে, শ্রীমন্ত যখন চাষের কাজ রেখে ঘরে খেতে গেছেন, আর প্রভাবতী ধান রুইছেন, সেইসময় রতন আবার এল। কোমরে গোঁজা কাটারি দেখিয়ে বলল, তুই আমার নামে পঞ্চায়েতে নালিশ করেছিস? এত বড় সাহস! এক্ষুনি আমার সঙ্গে আয়। আজ আর তোকে ছাড়ব না। এই বলে চাষের খেত থেকে ওকে টেনে নিয়ে গিয়ে পাশেই একটা ঝোপের আড়ালে নিয়ে যায়। প্রভাবতী চিৎকার করতে থাকেন। কিন্তু, সেইসময়টায় বেশির ভাগ যাঁরা চাষের কাজ করছিলেন, তাঁরা নিজেদের ঘরে খেতে গিয়েছিলেন। দূরে দূরে যাঁরা কাজ করছিলেন, তাঁরা প্রভাবতীর চিৎকার শুনতেও পাননি। রতন প্রভাবতীকে ঝোপের আড়ালে নিয়ে গিয়ে প্রভাবতীর শরীরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রতন তখনও ছিল মদে চুর। প্রভাবতী সরে যান। রতন মাটিতে পড়ে যায়। মাটি থেকে উঠে রতন কোমরে গোঁজা কাটারিটা বের করে প্রভাবতীর গলায় চেপে ধরে। প্রভাবতী গ্রামের স্বাস্থ্যবতী মহিলা, ওদিকে মদে চুর রতন। প্রভাবতীর সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে পারবে কেন? নিজের সম্মান বাঁচাতে, রতনের হাত থেকে কাটারি নিয়ে প্রভাবতী রতনকেই একটা কোপ দেন। রক্তাপ্লুত হয়ে রতন ঝোপের আড়ালেই পড়ে থাকে। বিধ্বস্ত অবস্থায় প্রভাবতী দৌড়োতে দৌড়োতে বাড়িতে আসেন। শ্রীমন্ত তখন বাড়িতে সবে ভাত খেতে বসেছেন। কাঁদতে কাঁদতে প্রভাবতী সব কথা বলেন শ্রীমন্তকে। শ্রীমন্ত খাওয়া ছেড়ে উঠে বজ্রাহতের মতো বসে থাকেন গুম হয়ে। ছেলে—মেয়েরাও তখন ঘরেই ছিল, তারা সব শুনে বলল, 'বেশ করেছ মা, লোকটার উচিত সাজা হয়েছে।' দেবাশিস থামলেন। চেম্বারে সবাই চুপ। এতক্ষণ যে পারমিতা, মৌমিতা, জয়শ্রী, স্বাগতা, শ্রীপর্ণা হইহই করছিলেন, তাঁরাও চুপ।
দেবাশিস আবার বলতে শুরু করলেন, 'এরপর যা হবার তা—ই হল। শ্রীমন্ত থানায় গেলেন। থানার ও.সি.—কে সব কথা খুলে বললেন। ও.সি. পুলিশের গাড়িতে করে শ্রীমন্তকে নিয়ে ঘটনাস্থলে গেলেন। রতনের রক্তাক্ত দেহ তখন নিস্পন্দ, প্রাণহীন। ঝোপ থেকে একটু দূরে পড়ে রয়েছে। গলার বাঁদিকে একটা কাটারি বিঁধে রয়েছে। পুলিশ নিজে থেকেই একটা খুনের মামলা চালু করল। প্রভাবতীকে সেদিন সন্ধেবলাতেই অ্যারেস্ট করা হয়। এই হচ্ছে কমপ্লেইন্ট, এই হচ্ছে সুরতহাল রিপোর্ট আর এইটা পোস্টমর্টেম রিপোর্ট।'
কন্দর্পনারায়ণ এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিলেন। এতক্ষণে মুখ খুললেন, 'কী পারমিতা, মৌমিতা? যা চাইছিলে তা—ই তো হয়েছে দেখছি—দাও হে, দেখি সব ডকুমেন্ট।'
পারমিতা বললেন, 'কোর্ট হয়তো প্রভাবতীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। কিন্তু, কী করত প্রভাবতী? একজন অসহায় গ্রাম্য গৃহবধূ, নিজেকে বাঁচাতে তার কী—ই বা করা উচিত ছিল?'
কন্দর্পনারায়ণ কমপ্লেইন্টটা দেখতে দেখতে বললেন, 'পুলিশ নিজে অভিযোগ দায়ের করেছে, শ্রীমন্ত মাহাতোর কথার ভিত্তিতে। শ্রীমন্ত মাহাতো বলেছে যে, আমার স্ত্রী আজকে দুপুরে, আমি যখন ভাত খেতে বসেছি তখন কাঁদতে কাঁদতে আমাকে এসে জানাল যে, গ্রামেরই রতন মণ্ডল, যে দীর্ঘদিন ধরে তাকে উত্ত্যক্ত করত, সে কাটারি নিয়ে তাকে আক্রমণ করে এবং রেপ করতে আসে। নিজেকে ও নিজের সম্মান বাঁচাতে আমার স্ত্রী রতন মণ্ডলকে ধাক্কা দেয়, রতন মণ্ডল মদে চুর ছিল, সে ধাক্কা সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায়। প্রভাবতীও মাটিতে পড়ে যান। তারপর প্রভাবতী রতনের হাত থেকে রতনের কাটারি কেড়ে নিয়ে রতনকে একটা কোপ দেন এবং ওখান থেকে পালিয়ে আসেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, একটাই বড় ইনজুরি ডানদিকের গলাতে। সুরতহাল রিপোর্ট বলছে, গলার ইনজুরি থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়। যেহেতু রতন ওখানেই পড়েছিল দীর্ঘক্ষণ, তাই ওখানকার মাটি ভিজে গিয়েছিল রক্তে। এবং মৃত্যুর কারণও অধিক রক্তপাত। এ ছাড়া বাঁদিকের কাঁধে একটা ছোট ক্ষত রয়েছে।'
দেবাশিস বললেন, 'ঘটনার দিন থেকেই আজ পর্যন্ত এগারো বছর ধরে প্রভাবতী জেলে আছেন। তিনি কোনওদিনই জামিনে ছাড়া পাননি। আশ্চর্য ব্যাপার হল, শ্রীমন্ত কোনদিন তার বউয়ের জামিনের জন্য চেষ্টাই করেনি। কোনও উকিলও রাখেনি। অবশেষে কোর্ট থেকে লিগাল এইডের মাধ্যমে ল'ইয়ার দেওয়া হয় প্রভাবতীকে।
'জেলা কোর্টে চার বছর বিচার চলার পরে, রতন মণ্ডলকে খুনের দায়ে তিনশো দুই ধারায় প্রভাবতীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে একটা আপিল মামলাফাইল করা আছে হাইকোর্টে। আমাদের কাজ হল ওই মামলাটার শুনানি করে প্রভাবতীকে জেল থেকে ছাড়ানো।'
কন্দর্পনারায়ণ এতক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজপত্র দেখছিলেন। এবার কাগজ থেকে চোখ তুলে বললেন, 'মৌমিতা, একটু মুখশুদ্ধি খাওয়াও হে। কেসটা জমবে মনে হচ্ছে।'
মৌমিতা কৌটো থেকে মুখশুদ্ধি বের করে কন্দর্পনারায়ণকে দিয়ে বললেন, 'স্যার, প্রভাবতী মাহাতোর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। চলুন স্যার, কোর্টে লড়াই শুরু করি।'
কন্দর্পনারায়ণ চোখ বুজে মুখশুদ্ধি খেতে খেতে চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বললেন, 'খাটতে হবে, খাটতে হবে। চলো, সবাই এই মামলাটা নিয়ে রিসার্চ শুরু করো।'
খবরের কাগজগুলিতে প্রভাবতী মাহাতোর কাহিনি বড় করে বেরিয়ে গেল। 'পুরুলিয়া জেলে এগারো বছর ধরে বন্দিনি এক অসহায় গ্রাম্য গৃহবধূ' সত্যিই তো, এতদিন ধরে যার কথা কেউ ভাবেনি। কেউ খোঁজ নেয়নি। সাধারণের নজরের আড়ালে বছরের পর বছর কাটিয়ে গিয়েছেন তিনি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে করা মামলাও ঝুলে আছে পাঁচ বছর ধরে। মোটামুটি বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি সব খবরের কাগজগুলিই খবরটা খুব সহানুভূতির সঙ্গে বের করল। কয়েকটা চ্যানেলের সাংবাদিকরা তো চলে গেলেন পুরুলিয়াতে শ্রীমন্ত মাহাতোর বাড়িতে। তাঁরা শ্রীমন্ত মাহাতোর ও তাঁর এখনকার বউয়ের ইন্টারভিউ দেখালেন তাঁদের চ্যানেলে। শ্রীমন্ত মাহাতো পরিষ্কার বলে দিলেন, প্রভাবতী তাঁর কাছে মারা গিয়েছেন অনেকদিন আগে। তারপর তিনি বিয়ে করেছেন, ছেলে—মেয়ে হয়েছে। নতুন করে তিনি আর প্রভাবতী মাহাতোর কথা ভাবতে চান না। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, 'নিজের সতীত্ব আর সম্মান বজায় রাখতে তো প্রভাবতী আত্মরক্ষা করতে গিয়ে রতন মণ্ডলকে কাটারির কোপ দেন। তাহলে কি প্রভাবতীর রতনের কাছে আত্মসমর্পণ করে, নিজেকে রেপড হতে দিলে ভালো হত?'—উত্তরে শ্রীমন্তর নতুন বউ সাংবাদিকদের মুখের ওপর উত্তর দিয়েছিলেন, প্রভাবতী বলে কাউকে তাঁরা চেনেন না, এ নিয়ে তাঁরা আর কথা বলতে চান না।
একটি চ্যানেলের তরুণ সাংবাদিক প্রভাবতীর মেয়ের ইন্টারভিউ করলেন, সে কাঁদতে কাঁদতে বলে যে, ঘটনার সময় সে অনেক ছোট ছিল। তবে, এখন সে বিয়ে করেছে, তার সংসার হয়েছে, তার মা যদি কোনওদিন জেল থেকে ছাড়াও পান, তাহলেও সে তার সংসারে জায়গা দিতে পারবে না। তার থেকে তার মা যেন সারাজীবন জেলেই থাকেন। তবু তো জেলে খেতে—পরতে পারছেন, বাইরে বেরোলে সেটুকুও জুটবে না।
ভরা কোর্টরুমে মামলা শুরু হল। যেহেতু খুনের দায়ে প্রভাবতীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে, তাই দু—জন জজ সাহেবের বেঞ্চে মামলার শুনানি শুরু হল। একে বলে ডিভিশন বেঞ্চ।
কন্দর্পনারায়ণ প্রত্যেকবারের মতোই খুব সহজ, সরল করে গোটা ঘটনাটা জজ সাহেবদের সামনে পেশ করলেন, 'একজন গ্রাম্য গৃহবধূ কীভাবে নিজের সম্ভ্রম, সম্মান বাঁচাতে গিয়ে আক্রমণকারীকে কাটারির কোপ দেন, তারপর তিনি তাঁর স্বামীকে সব ঘটনা জানান। স্বামী থানায় খবর দেন, পুলিশ এসে ওই গ্রাম্য গৃহবধূ অর্থাৎ প্রভাবতীকে অ্যারেস্ট করে। কিন্তু ঘটনাটা একদিনের নয়, দিনের পর দিন কীভাবে প্রভাবতীকে একজন লম্পটের হাতে অত্যাচার, লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে।' পুরো ঘটনাটাই জজ সাহেবের সামনে সুন্দরভাবে মেলে ধরলেন।
'তারপর থেকেই প্রভাবতী আস্তে আস্তে জেলের অন্ধকারে হারিয়ে যান। কেউ তার খোঁজ নেয়নি। এগারো বছর কেটে গেছে।' এইবার কন্দর্পনারায়ণ একে একে প্রভাবতীর সপক্ষে যুক্তিগুলো সাজিয়ে ধরতে লাগলেন—
'মাই লর্ড, সরকারপক্ষের সাজানো মামলা অনুযায়ী ইন্ডিয়ান পেনাল কোড বা ভারতীয় দণ্ডবিধিতে তিনশো দুই ধারায়, অর্থাৎ একজন মানুষকে হত্যা বা খুন করার অপরাধে প্রভাবতীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। তিনশো দুই ধারায় দুটো বৈশিষ্ট্য থাকে। অর্থাৎ খুনের ইচ্ছা এবং জ্ঞান। যদি এমন হত, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবতী রতনের অত্যাচারের শিকার, তাই প্রভাবতী রতনকে খুন করবার ইচ্ছা নিয়ে বাড়ি থেকেই একটা ধান কাটার হাঁসুয়া বা বঁটি নিয়ে রতনের বাড়ি গেলেন, রতনকে ডাকলেন, রতন বাড়ির বাইরে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে রতনকে হাঁসুয়া দিয়ে বা বঁটি দিয়ে কোপ দিলেন, রতন মারা গেল, তাহলে এখানেও তিনশো দুই ধারা লাগু হত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। হয়েছে উলটোটা। রতন এসেছে প্রভাবতীকে রেপ করবার জন্য কোমরে কাটারি নিয়ে। প্রভাবতী প্রতিবাদ করেছেন, রতন কোমর থেকে কাটারি বের করে প্রভাবতীর গলায় ধরেছেন। প্রভাবতী বাঁচার তাগিদে ধস্তাধস্তি করেছেন, রতন মদে চুর ছিল। প্রভাবতীর ধাক্কায় রতন দূরে ছিটকে যায়। রতনের হাত থেকে কাটারি ছিনিয়ে নিয়ে প্রভাবতী কোপ দেন রতনকে। যদি শুধু এইটুকু প্রসিকিউশন কেস হয়, তাহলে এটা কিছুতেই খুনের ধারায় আসে না।
'মাই লর্ড, খুন অর্থাৎ তিনশো দুই ধারা। আর অনিচ্ছাকৃতভাবে খুন করবার দায় অর্থাৎ তিনশো চার ধারা। আর দুটো ধারার মধ্যে একটা সরু লাইনের পার্থক্য আছে। অনিচ্ছাকৃতভাবে খুন করার ধারাতে 'খুন করবার ইচ্ছা ছিল' এই ব্যাপারটাই থাকে না। ধরা যাক, দুই বন্ধু আড্ডা মারতে মারতে ঝগড়া শুরু করলেন, ঝগড়া করতে করতে এক বন্ধু আর—এক বন্ধুকে ধাক্কা মারলেন, সেই বন্ধু দেওয়ালে পড়ে গেলেন। দেওয়ালে ঠোক্কর লেগে তাঁর মাথা ফেটে গেল। তিনি মারা গেলেন। এখানে কিন্তু এক বন্ধুর আর—এক বন্ধুকে খুন করবার কোনও ইচ্ছে ছিল না—এই ঘটনাটা হল অনিচ্ছাকৃত খুন করবার দায় বা তিনশো চার ধারা। আমাদের মামলায় প্রভাবতী বাড়ি থেকে হাঁসুয়া নিয়ে বের হননি, তিনি রতনের বাড়িও যাননি। রতনকে আক্রমণও করেননি। রতন এসেছে, প্রভাবতী যেখানে চাষ করছিলেন সেখানে, প্রভাবতীকে একা পেয়ে রেপ করবার চেষ্টা করেছে, প্রভাবতীর গলায় কাটারি ঠেকিয়ে রেপ করতে গেছে। প্রভাবতী নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছেন শুধু। প্রসিকিউশনের সাজানো গল্প বিশ্বাস করলেও তিনশো দুই ধারায় প্রভাবতীকে সাজা দেওয়া যায় না। বড়জোর তিনশো চার ধারা অনুযায়ী দশ বছর কারাদণ্ড হতে পারে। সেখানে প্রভাবতী এর মধ্যেই জেলে এগারো বছর কাটিয়ে দিয়েছেন।'
সরকারি আইনজীবী অনেকক্ষণ ধরেই কিছু বলবেন বলে উশখুশ করছিলেন। তিনি এবার লাফ দিয়ে উঠে বললেন, 'মাই লর্ড, এটি একটি সিম্পল মার্ডার কেস। আইন আর আবেগ একসঙ্গে চলে না। প্রভাবতী মাহাতো অসহায়, গ্রাম্য গৃহবধূ। আমি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু তাই বলে তিনি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। তিনি থানায় অভিযোগ জানাতে পারতেন, তিনি জানাননি। পঞ্চায়েতে মিটিং ঠিক হয়, তার আগেই তিনি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। প্রভাবতীকে রতন মণ্ডলকে খুনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া সঠিক হয়েছে।' খুব ক্রুর একটা ভঙ্গি করে মুখ বাঁকিয়ে আরও যোগ করলেন, 'আর ডিফেন্স লইয়ার বোধহয় ভুলেই গেছেন যে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে তাকে সারাজীবন জেলে থাকতে হবে। কাজেই এগারো বছর পার হয়ে গেছে বলে গেল গেল রব তোলার কিছু নেই, বেঁচে থাকলে আরও অনেক বছর জেলেই থাকতে হবে।'
সৌরভ গাঙ্গুলি যেমন অস্ট্রেলিয়ার ফাস্ট বোলারদের ছোড়া বাউন্সারকে সপাটে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বোলারদের দিকে তাকাতেন, ঠিক সেইরকমভাবেই, সরকারি আইনজীবীর দিকে যেন কিছুই হয়নি গোছের তাকিয়ে কন্দর্পনারায়ণ আবার শুরু করলেন, 'আমার বক্তব্য এখনও শেষই হয়নি, মাই লর্ড, তার মধ্যেই মাননীয় সরকারি আইনজীবী লাফ দিয়ে উঠে কোর্টকে ভুল পথে চালনা করবার চেষ্টা করছেন। তা ছাড়া, উনি তো মামলার সমস্ত রেকর্ড খুঁটিয়ে দেখেননি। দেখলে, উনি কোর্টের উদ্দেশে এই বক্তব্য রাখতেন না। আসলে ওঁরা কোনও কিছুকেই গুরুত্ব দেন না। একজন মানুষ এগারো সেকেন্ড লিফটে আটকে থাকলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর এখানে প্রভাবতী মণ্ডল অন্যায়ভাবে এগারো বছর বন্দি হয়ে আছেন।'
সরকারি আইনজীবী আবার লাফ দিয়ে উঠে চিৎকার করে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, জজ সাহেবরা হাত নেড়ে ওঁকে বসিয়ে দিয়ে বললেন, 'থামুন থামুন। আপনি পরে বলবার সুযোগ পাবেন। ডিফেন্স লইয়ার নতুন কী অ্যাঙ্গল আনছেন দেখি।' সরকারি আইনজীবী প্রচণ্ড অপমানিত হয়ে ভরা কোর্টরুমে উপস্থিত সাংবাদিক ও অন্য লোকজনের মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বসে পড়লেন।
কন্দর্পনারায়ণ আবার বলতে শুরু করলেন, 'দেবাশিস, পুরুলিয়া জেলা কোর্টের সমস্ত নথি থেকে সুরতহাল আর পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা দাও।'
দেবাশিস আর অন্য সবাই মামলার সমস্ত কাগজপত্র ঘেঁটে সুরতহাল আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বের করে দিলেন।
কন্দর্পনারায়ণ সেগুলিকে জজ সাহেবদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'মাই লর্ড, দয়া করে দেখুন, রতন মণ্ডলের শরীরের বাঁদিকে অর্থাৎ বাঁদিকের কাঁধে একটা ছোট ক্ষত আছে। এক ইঞ্চি লম্বা, আধ ইঞ্চি চওড়া আর আধ ইঞ্চি গভীর। যদি আমরা গোটা ঘটনাটা চোখের সামনে ভাসিয়ে তুলতে চেষ্টা করি, তাহলে দেখব, প্রভাবতী একজন ডানহাতি মহিলা, তিনি রতনের কাছ থেকে কাটারিটা কেড়ে ডান হাতে ধরে কাটারি দিয়ে আঘাত করলেন—রতন প্রভাবতীর দিকে মুখ করেই দাঁড়িয়ে—প্রভাবতীর ডান হাতে কাটারি দিয়ে করা আঘাত গিয়ে লাগল রতনের বাঁদিকের কাঁধে। রতন প্রভাবতীর চেয়ে লম্বা, সুরতহাল রিপোর্টে অর্থাৎ পুলিশ প্রথম ঘটনাস্থলে গিয়ে যে অবস্থায় মৃতদেহ পেল, সেই রিপোর্টে দেখছি, রতন শুয়ে থাকা অবস্থায় পাঁচ ফুট ন—ইঞ্চি লম্বা, প্রভাবতী মেরেকেটে পাঁচ ফুট, কাজেই প্রভাবতী যদি রতনের গলা লক্ষ্য করে কাটারি চালিয়েও থাকেন, ধস্তাধস্তিতে সেটা লাগে রতনের কাঁধে। রতনের কাঁধে লাগতেই রক্ত বেরোতে থাকে। এই অবস্থায় রতন প্রভাবতীকে ছেড়ে দিতেই প্রভাবতী কাটারিটা ফেলে দিয়ে পালায়। কাটারি ঠিক যেখানে ধ্বস্তাধ্বস্তি হচ্ছিল, সেখান থেকে অন্তত সাত ফুট দূরে গিয়ে পড়ে। এবার মাই লর্ড, আমি কিছু ছবি আপনাদের দেখাচ্ছি। ঘটনার পরে পুলিশ ফোটোগ্রাফার এই ছবিগুলি তুলেছিলেন। প্রতিটি ছবি জেলা আদালতে পেশ করা হয়েছিল, আমাদের ভাষায় এগজিবিট করা হয়েছিল।
'প্রথম ছবিটি প্রসিকিউশনের মামলা অনুযায়ী একটা ঝোপের ধারে, যেখানে কাদামাটিতে প্রচুর পায়ের ছাপ। এখানেই প্রভাবতী আর রতনের ধস্তাধস্তি হচ্ছিল।'
'দ্বিতীয় ছবিটি ওই একই জায়গায় ঝোপের ধারের মাটিতে বেশ কয়েক ফোঁটা রক্তের দাগের ছবি, প্রভাবতীর কাটারির আঘাতে রতনের কাঁধ থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তের দাগ।'
'তৃতীয় ছবিটি ধস্তাধস্তির জায়গা থেকে অন্তত সাত ফুট দূরের। এই ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, রতন তার ডানদিকে পড়ে আছে, ডানদিকের গলায় বিঁধে আছে কাটারি। আবার বলছি, প্রভাবতী ডানহাতি মহিলা, তিনি কাটারি দিয়ে আঘাত করলে রতনের বাঁদিকের গলায় লাগার কথা। তা ছাড়া, প্রভাবতী রতনের তুলনায় ছোটখাটো, তিনি কাটারি চালালে রতনের কাঁধেই লাগবে এবং লেগেছেও। প্রভাবতী রতনের বাঁদিকের কাঁধে কাটারি চালিয়েই কাটারিটা ভয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেন। অন্তত সাত ফুট দূরে। অর্থাৎ প্রভাবতীর পক্ষে রতনের ডানদিকের গলায় কোপ দেওয়া সম্ভব নয়, আর দেনওনি।'
'পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, রতনের মৃত্যু হয়েছে গলায় বিঁধে থাকা কাটারির আঘাতে যে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে, সেখান থেকেই। প্রশ্ন হল, দ্বিতীয় আঘাতটি তাহলে কীভাবে হল?'
'চতুর্থ ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, রতন ডানদিক ফিরে মাটিতে পড়ে আছে, তার ডানদিকের গলায় কাটারি বিঁধে আছে, আর কাটারির হাতলটা পেছনদিকে। অর্থাৎ, পেছন থেকে কেউ রতনকে আক্রমণ করেছিল। রতনের পেছনে, কাদামাটিতে বেশ কিছু পায়ের ছাপ, আর আশ্চর্যজনকভাবে পয়ের ছাপগুলো ছোট, মনে হয় কোন বাচ্চা ছেলের।'
'মাই লর্ড, পুলিশি তদন্তে প্রচুর গাফিলতি আছে।'
'এক, রতনের দেহের পেছনদিকের ছোট ছোট পায়ের ছাপগুলি কার, পুলিশ তদন্ত করে দেখেনি।'
'দুই, রতনের বাঁদিকের গলায় বিঁধে থাকা কাটারির হাতলে থাকা হাতের ছাপ পুলিশ পরীক্ষা করেনি বা প্রভাবতীর হাতের ছাপের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেনি।'
'তিন, প্রভাবতীর ছেলে—মেয়ের বয়ান পুলিশ রেকর্ড করেনি।'
'তিন, পুলিশ প্রভাবতীর বয়ান রেকর্ড করেনি।'
'চার, পুলিশের কাছে দেওয়া শ্রীমন্তর বয়ানকেই অভিযোগ ধরে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। তার মানে, শ্রীমন্ত নিজে ঘটনাটা চাক্ষুষ করেননি, প্রভাবতীর কাছ থেকে শুনে তিনি বয়ান দিয়েছেন।'
'পাঁচ, আদালত যখন প্রভাবতীকে জিজ্ঞাসা করেন, যে একমাত্র আপনিই জানেন, কী ঘটেছিল, কাজেই আপনি সব সত্যি কথা বলুন। প্রভাবতী উত্তরটা এড়িয়ে গিয়ে বলেন যে, তাঁর জায়গা কোথাও নেই। স্বামী আবার বিয়ে করেছেন। তিনি চান, ছেলে—মেয়েরা ভালো থাকুক, তাই তিনি মরতেই চান।'
'ছয়, প্রভাবতীর পক্ষে, রতন সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে রতনের বাঁদিকের গলায় কাটারি দিয়ে আঘাত করা সম্ভব নয়। কারণ, আবার বলছি, গলায় গেঁথে থাকা কাটারির কাঠের বাঁটটা পেছনদিকে অর্থাৎ পেছন থেকেই আক্রমণ এসেছিল।'
'সাত, পাঁচ ফুটেরও কম উচ্চতার প্রভাবতীর পক্ষে, পাঁচ ফুট ন—ইঞ্চি উচ্চতার রতনের গলায় কাটারি বিঁধিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, যদি না রতন মদে চুর অবস্থায় মাটিতে পড়ে যাওয়ার পরে কেউ পেছন থেকে ওই কাটারি দিয়েই তার গলায় কোপ না মারে।'
জজ সাহেবরা একসঙ্গে বলে উঠলেন—'লার্নেড ডিফেন্স লইয়ার, তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে, রতন মণ্ডলকে প্রভাবতী মারেননি, তাকে খুন করেছে অন্য কেউ পেছন থেকে এসে? ইন্টারেস্টিং!!'
কন্দর্পনারায়ণ জোরের সঙ্গে বললেন, 'অ্যাবসোলিউটলি, প্রভাবতী তো রতনের কাঁধে একটা কোপ মারেন, এক ইঞ্চি লম্বা একটা ক্ষত হয়। আমার দেখানো চার নম্বর ছবিটিতে পরিষ্কার, রতন পড়ে যাবার পর, কাটারি দিয়ে পেছন থেকে সজোরে কোপ মারা হয়, আর কাটারিটি যদিও গলায় বিঁধে আছে, কাটারির বাঁটটা কিন্তু, পেছনদিকেই। আর মৃতদেহের পেছনদিকেই বেশ কিছু ছোট ছোট পায়ের ছাপ, যা কাদামাটিতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।'
'মাই লর্ড, আমি আসামি পক্ষের ল'ইয়ার। আমার দায়িত্ব শুধু এটুকুই দেখানো যে, আমার মক্কেল খুনি নন। তা ছাড়া, প্রভাবতী খুনের ঘটনা কার কাছে স্বীকার করেছেন? তাঁর স্বামীর কাছে? পুলিশের কাছে দেওয়া তাঁর স্বামীর বয়ানের কী গুরুত্ব? এমনও তো হতে পারে, যে তাঁর স্বামীও সত্যি বলছে না? এমনও তো হতে পারে, প্রভাবতীও কাউকে বাঁচাতে গিয়ে, সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়েছেন।'
'মাই লর্ড, আসামি পক্ষের একজন ল'ইয়ার হয়ে আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই, আমার মক্কেল খুন করেননি। তিনি নিজেকে বাঁচাতে, রতনের কাটারি কেড়ে নিয়ে রতনকেই একটা কোপ দিয়েছিলেন। কিন্তু, কোপটা গিয়ে লাগে রতনের কাঁধে। রতন প্রভাবতীকে ছেড়ে দিয়ে সরে যেতে গিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। প্রভাবতী কাটারিটা ছুড়ে ফেলে দেন। কাটারিটা গিয়ে পড়ে প্রায় সাত ফুট দূরে। রতন যখন মাটিতে পড়ে যায়, তখন কাটারিটা আর কেউ তুলে নেয়। প্রচণ্ড ক্রোধে, সজোরে কাটারি চালিয়ে দেয়। রতনের ডানদিকের গলায় কাটারিটা বিঁধে যায়। মাই লর্ড, প্রথমে আমিও ভাবছিলাম, প্রভাবতীর স্বামীই প্রভাবতীকে বাঁচাতে খুনটা করেনি তো? পরে মৃতদেহের পেছনের পায়ের ছাপগুলো আমাকে অন্যরকম ভাবাল।'
'শেষ করব এই বলে যে, প্রভাবতী বাইরে বেরোলেও তাঁর যাবার জায়গা নেই। জেলা লিগাল এইড কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হোক। প্রভাবতীকে ভোকেশনাল ট্রেনিং দিয়ে, যেকোনও ধরনের একটা কাজ জুটিয়ে দেবার আর কোনও সরকারি হোমে তার থাকার সুযোগ করে দেওয়া হোক।'
এরপর সরকারি আইনজীবী আর কোনও কথা বলেননি। জজ সাহেবরা নিজেদের মধ্যে আলাপ—আলোচনা করে প্রভাবতীকে বেকসুর খালাস ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে দায়িত্ব দেন, প্রভাবতীকে ভোকেশনাল ট্রেনিং দিয়ে, সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসবার সুযোগ করে দিতে। আর সেই সঙ্গে পুরুলিয়ার একটা সরকারি হোমে তাঁর থাকবার বন্দোবস্ত করতে হবে।
রায় ঘোষণার পর হইহই করে কোর্টরুম থেকে সবাই বেরিয়ে এলেন। সাংবাদিকরা কোর্টের বাইরে ঘিরে ধরলেন কন্দর্পনারায়ণকে। প্রবীণ একজন সাংবাদিক কন্দর্পনারায়ণকে জিজ্ঞেস করলেন, 'প্রভাবতী তো বেকসুর খালাস। তাহলে খুনটা করল কে?'
কন্দর্পনারায়ণ হেসে উত্তর দিলেন, 'আমি ফেলুদা বা ব্যোমকেশের মতো গোয়েন্দা নই যে, কে খুন করেছে তা বলব, তবে প্রভাবতীর আইনজীবী হিসেবে আমি খুশি যে প্রভাবতীকে বেকসুর খালাস ঘোষণা করা হয়েছে।'
ভিড়টা একটু হালকা হতেই একটি সতেরো—আঠারো বছরের রোগা—পাতলা ছেলে আর একটি কুড়ি—একুশ বছর বয়সের বিবাহিতা মেয়ে এসে কন্দর্পনারায়ণকে প্রণাম করে বলল, 'আমরা প্রভাবতীর ছেলে—মেয়ে।' মেয়েটির দু—চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছিল। চোখ মুছতে মুছতে বলল, 'আপনি ঠিকই ধরেছেন, মা একা একা মাঠে চাষের কাজ করছিল বলে বাবাই আমাকে মায়ের কাছে মাঠে পাঠান। বললেন, আমি ঘর থেকে খেয়ে যাচ্ছি, তুই মা—এর কাছে থাক। আমি যখন মাঠের কাছাকাছি পৌঁছাই, তখন মা—র চিৎকার শুনি। ছুটে গিয়ে দেখি, রতন মা—র গলায় কাটারি ধরে মা—কে ঝোপের ধারে নিয়ে যাচ্ছে। মা বাঁচবার জন্য চিৎকার করছে আর ধস্তাধস্তি করছে। রতনকাকার হাত থেকে কাটারি কেড়ে নিয়ে মা রতনকাকাকে একটা কোপ দেয়। রতনকাকার কাঁধে কোপ লাগে। রক্ত বেরোতে থাকে। মা ভয়ে কাটারি ছুড়ে ফেলে দেয়। রতনকাকা মদ খেয়ে ছিল। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায়। রতনকাকা পড়ল ঠিক আমার দিকে পেছন ফিরে। আমার সামনে। আমি প্রচণ্ড রাগে, কাটারিটা দু—হাতে তুলে নিয়ে, দিলাম রতনকাকার গলায় একটা কোপ। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। আমি আর মা, দু—জনেই ছুটতে ছুটতে ঘরে এসে পৌঁছোই। বাবাকে সব খুলে বলি। মা আমাকে বাঁচাতে সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে নেন। সেই থেকে মা জেলে।'
কন্দর্পনারায়ণ সব শুনে বললেন, 'আমি মামলার নথি দেখে এইটাই আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু, আপনার মা—র প্রতি আপনাদের ব্যবহার তো ঠিক ছিল না। আপনার বাবা আবার বিয়ে করেছেন, আপনারা মা—কে তো দেখতেও যেতেন না। মা—র খোঁজখবরও তো নিতেন না।'
মেয়েটি ঘাড় নেড়ে বলল, 'আমার বাবা আর বিয়ে করেননি। বাবা যাঁকে বিয়ে করেছেন বলে সবাই জানে, তিনি আমার মাসি। আমরা ছোট ছিলাম, বাবা চাষের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের দেখাশোনা করবে কে? তাই আমাদের মাসি চলে আসেন আমাদের বাড়িতে। তিনিই আমাদের বড় করেছেন, আমাদের বড় করতে গিয়ে তাঁরও আর বিয়ে করা হয়নি। আর উকিল আমরা দিতে পারিনি, এ কথা ঠিক। মামলা চালাবার সামর্থ্য আমাদের ছিল না। তা ছাড়া, জেলে গিয়ে দেখা করতে, মা—ই আমাদের বারণ করে দিয়েছিলেন। আসলে, আমাদের দেখে উনি কান্নাকাটি করতেন। আমরাও কান্নাকাটি করতাম। আমরাও ভয় পেতাম, যদি সত্যি কথাটা জানাজানি হয়ে যায়, তাহলে তো আমাকেও পুলিশ ধরে নেবে। কিছুদিন আগে জেল থেকে আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল খোঁজখবর করতে। আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তারপর টিভি আর কাগজের সাংবাদিকরা এলেন জিজ্ঞাসাবাদ করতে। আমরা আরও ভয় পেয়ে যাই। সবাইকে বলে দিই যে, মা আমাদের কাছে মৃত। কাগজে দেখলাম যে, আজ হাইকোর্টে মা—র মামলার শুনানি। তাই আমি আর ভাই চুপিচুপি এসেছিলাম মামলা শুনতে। আপনাকে আমরা টিভিতে দেখেছি, আপনার কথা কাগজে পড়েছি, আপনি যখন মা—র হয়ে মামলা করছিলেন, তখনই ভরসা জেগেছিল। আপনি মা—কে বাঁচিয়েছেন।' তারপর একটু থেমে ফের জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা, পুলিশ যদি আবার এই মামলার তদন্ত শুরু করে? পুলিশ কি আমাকে অ্যারেস্ট করবে? আমি তাহলে কী করব?'—মেয়েটির কণ্ঠস্বর ভয়ার্ত শোনাল।
কন্দর্পনারায়ণ মেয়েটিকে ভরসা দিয়ে বললেন, 'চিন্তা নেই। আগে পুলিশ কিছু করে কি না দেখি? আমার ধারণা, পুলিশ নতুন করে তদন্ত শুরু করবে না। আর কোর্টও এই ব্যাপারে কিছু বলেননি।' তারপর জোরে হেসে বললেন, 'আরে, ভয় পাচ্ছেন কেন? আপনার মা—কে বাঁচালাম। আপনাকেও বাঁচিয়ে নেব।'
তারপর জোরে জোরে পা ফেলে এগিয়ে যেতে যেতে দেবাশিস, অপলক, পারমিতা, মৌমিতাদের বললেন, 'মনে রেখো, ওই মেয়েটি আমাদের কিছু বলেনি, আর আমরাও কিছু শুনিনি। প্রভাবতী খুন করেননি, ব্যাস। আমরা আর কিছু জানি না।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন