রূপা-সুমনের গল্প

জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

2007, 4th December. ৪টে, কুয়াশার ভোর


রাত থাকতে থাকতে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে কানাই আর তিনকড়ি। দু—জনেই গড়িয়া থেকে সাইকেল চালিয়ে যাবে বানতলা। ওখানেই একটা মাছের ভেড়িতে কাজ করে দু—জনে। ভোর ভোর বাড়ি থেকে না বেরোলে ঠিক সময়ে ভেড়িতে পৌঁছোনো যায় না। জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছে। মাথায় কান—ঢাকা টুপি, সোয়েটারের উপর চাদর, হাতে উলের জ্যালজেলে গ্লাভস পরে সাইকেল চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো কথা বলছে দু—জন দু'জনের সঙ্গে। একনাগাড়ে এই ঠান্ডায় সাইকেল চালানো মুশকিল। ঘুম পেয়ে যায়। তাই মাঝে মাঝে কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। দু'জনেই হতদরিদ্র, মালিকের মাছের ভেড়িতে কাজ করে সংসার চালায়। রুবি হাসপাতালের পেছনদিকের চওড়া রাস্তাটায় উঠে এল ওরা। এখান থেকে ভেড়িগুলো শর্টকাট হয়। এই ভোরবেলাতেও মাঝে মাঝে গাড়ি যাচ্ছে ঝড়ের বেগে। কানাই আর তিনকড়ি জানে, এই সময়টায় বাবুদের ছেলেমেয়েরা সারারাত পার্টি করে বাড়ি ফেরে। আজ রবিবার, শনিবার রাতে বাইপাসের ধারের সব হোটেলে সারারাত পার্টি চলে। তারপর ভোরবেলায় ওরা বাড়ি ফেরে গাড়ি চালিয়ে। এমন বেপরোয়া গাড়ি চালায়, যে নিজেরা সাবধান না হলেই বিপদ। পেছন থেকে গাড়ি এসে উড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে যাবে। বাইপাসের এইদিকটা নিরিবিলি, শুনশান, আর আজকে তো খুব কুয়াশা। দশ হাত দূরের জিনিস দেখা যাচ্ছে না, এদিকের রাস্তার ধারের আলোগুলোতেও আজ জোর নেই। মিটমিট করে জ্বলছে।

কানাই আর তিনকড়ি সাইকেল চালাতে চালাতে পেছন থেকে দুটো ভারী গাড়ি আসার শব্দ শুনতে পেল, ওরা বুঝল, ঝড়ের বেগে দুটো গাড়ি ছুটে আসছে। দু—জনেই ঘাড় ঘুড়িয়ে পেছনে তাকাল। কুয়াশার মধ্যে অন্ধকারে হেডলাইট জ্বালিয়ে দুটো লরি পাশাপাশি একসঙ্গে ছুটে আসছে, কেউ কাউকে জায়গা দিতে রাজি নয়। পিচ রাস্তায় ভারী গাড়িগুলো ছুটে আসায় রাস্তা যেন কাঁপছে। কানাই চিৎকার করে তিনকড়িকে বলল, 'তিনুউউউ, ধারে যা আ আ—মেরে দেবেএএ।' কানাই আর তিনকড়ি দু—জনেই সাইকেল নিয়ে রাস্তার ধারের জমিতে নেমে গেল। পেছন থেকে লরি দুটো রেষারেষি করতে করতে তীব্র গতিতে ওদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। একে প্রচণ্ড ঠান্ডা, তার ওপর লরি দুটো এত গতিতে গেল, যে হাওয়ায় ওদের শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিল।

রাস্তা জুড়ে ভারী লরি দুটো চলে যাবার পরও যেন খানিকটা রেশ থেকে গেল। কানাই আর তিনকড়ি দু—জনেই রাস্তার ধারের জমিতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অন্ধকারের মধ্যেই ধুপ করে একটা শব্দ শোনা গেল। একটা লরির দরজা খুলে কেউ কোনও ভারী বস্তাজাতীয় কিছু ফেলল মনে হয়। কানাই আর তিনকড়ি সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিয়ে সামনের দিকে এগোল। একটুখানি এগোতেই দেখল, রাস্তার ধারে একটা লোক পড়ে আছে। সারা গায়ে রক্ত মাখা। বিড়বিড় করে কী যেন বলছে।

কানাই আর তিনকড়ি সাইকেল থেকে নেমে তাড়াতাড়ি করে ছুটে গেল লোকটার কাছে। রাস্তার ধারে এই জায়গাটায় আলো নেই। কানাই তিনকড়িকে বলল, 'তিনু, সাইকেল থেকে টর্চ আর জলের বোতলটা আন। লোকটাকে একটু জল দিই।'

তিনু বলল, 'অ্যাক্সিডেন্ট কেস নাকি গো কানাইদা?'

কানাই বলল, 'বুঝতে পারছি না রে।'

তিনু টর্চ এনে দিল। টর্চের আলোতে পরিষ্কার দেখা গেল, লোকটার সারা শরীরে রক্ত। চাকু মেরেছে। গলার নলিটা কাটা। লোকটার মুখে বোতল থেকে জল ঢেলে দিল কানাই। জিভ দিয়ে জলটা চাটতে চাটতে লোকটা বলল, 'গল গীম, গল গীম, আমার দুটো ছেলে আছে। আমাকে বাঁচাও।'

তিনুর চোখে জল এসে গেল—'আহা রে, লোকটা মরে যাচ্ছে। ছেলেদের কথা বলছে।'

কানাই তিনুকে বলল, 'তিনু, তুই থাক, আমি পুলিশকে খবর দিই।'

তিনু বলল, 'এখেনে পুলিশ কোতায় গো দাদা? সে—ই—ই রুবির মোড় যেতে হবে।'

কানাই বলল, 'লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বেঁচে যেতে পারে। আমি পুলিশ ডাকি। পুলিশ যদি লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।' কানাই তাড়াতাড়ি সাইকেল চালিয়ে রুবির মোড়ের দিকে ছুটল।

দশ মিনিট যেতে না যেতেই একটা পুলিশের গাড়ি দেখতে পেল। রাতপাহারার গাড়ি। কানাই গাড়ি থামিয়ে সংক্ষেপে সব ঘটনা বলল—পুলিশও খুব তাড়াতাড়ি চলে এল ঘটনাস্থলে। তিনু এখনও লোকটার মাথার কাছে বসে আছে। একজন অল্প বয়েসি পুলিশ মাথা নিচু করে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনার নাম বলুন, বাড়ি কোথায়?'

লোকটা তখন প্রায় অচৈতন্য। বিড়বিড় করে বলল, 'গল গীম, আমার দুটো ছেলে আছে। আমাকে বাঁচাও,' পুলিশ আর দেরি করল না। লোকটাকে সবাই মিলে ধরে পুলিশের জিপে পেছনদিকে তুলে বসিয়ে দিল। লোকটার বসার ক্ষমতা নেই। ঘাড় গুঁজড়ে সিটের ওপরেই পড়ে গেল।

পুলিশের একজন অফিসার কানাইকে বলল, 'তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো। হাসপাতালে যাব, আর তারপর তোমার একটা বয়ান নেব।'

কানাই তিনকড়িকে বলল 'তিনু, তুই ভেড়িতে যা। থানা—পুলিশের কাজটা সেরে আমি আসছি।'

গাড়িতে লোকটা প্রায় অচৈতন্যই ছিল। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কিছু বলার চেষ্টা করছিল। গাড়ির শব্দে পুলিশ কিছুই বুঝতে পারেনি। হাসপাতালে পৌঁছে, পাঁজাকোলা করে লোকটাকে নামিয়ে একটা ট্রলিতে শুইয়ে দেওয়া হল। ডাক্তারবাবু এসে ভালো করে দেখে বললেন, 'মারা গেছে। সারা গায়ে একাধিক ইনজুরি। ধারালো অস্ত্র দিয়ে রীতিমতো কোপানো হয়েছে। তারপর গলার নলিটা কেটে দেওয়া হয়েছে।'

পুলিশ কানাইয়ের একটা বয়ান নিয়ে কানাইকে ছেড়ে দিল। পুলিশের ফোটোগ্রাফার এসে মৃতদেহের ছবি তুলল বিভিন্ন অ্যাঙ্গল থেকে। লোকটার পকেট হাতড়েও ওর পরিচয়ের ব্যাপারে কিছুই পাওয়া গেল না। একটা বিদেশি মিউজিক্যাল লাইটার আর একটা দামি গাড়ির চাবি ছাড়া। পুলিশ মৃতদেহ পাঠিয়ে দিল পোস্টমর্টেমের জন্য। আর ফোটোগ্রাফারকে বলল মৃতদেহের ছবিগুলি আজকেই দিয়ে যেতে, সমস্ত থানায় ছবি পাঠিয়ে দিতে হবে। লোকটা কে? লোকটার আইডেন্টিফিকেশন জরুরি। মৃতদেহটা পাওয়া গিয়েছিল আনন্দপুর থানার জুরিসডিকশনে। আনন্দপুর থানা একটা অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা শুরু করল।

2002, পাঁচ বছর আগের ঘটনা, এপ্রিল মাস

সুমন, গল্ফগ্রিনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে, ড্রাইভ করে সোজা চলে এল গড়িয়াহাট প্যান্টালুন্সের সামনে। গাড়িটা পার্কিং জোনে পার্ক করে ঢুকে পড়ল প্যান্টালুন্সের ভেতরে। লন্ডন থেকে কালই ফিরেছে। বাড়ি থেকে বেরোতেই ইচ্ছে করছিল না। গা—টা ম্যাজম্যাজ করছে। কিন্তু আজ আবার সৈকতদার জন্মদিন। যেতেই হবে। বার বার ফোন করছেন। তাই ও এল গড়িয়াহাট প্যান্টালুন্সে, একটা ভালো শার্ট কিনে নিয়ে যাবে। ভেবেছিল, লন্ডন থেকেই কিছু একটা কিনে আনবে, ভালো শার্ট বা পারফিউম। সেটা আর হয়নি, যা—ই হোক। এখানকার জিনিসগুলোও বেশ স্ট্যান্ডার্ড।

সুমনের পরিচয়টা একটু দেওয়া দরকার। পাঠকরা তাহলে সুমন সম্পর্কে একটা আইডিয়া করতে পারবেন। ছ—ফুট হাইট। ফরসার দিকে গায়ের রং, কিন্তু খুব একটা ফরসা নয়। টিকোলো নাক। ব্যাকব্রাশ করা চুল, দাড়ি—গোঁফ কামানো নিখুঁত করে। গল্ফগ্রিনে নিজেদের বড় দোতলা বাড়ি। বাবা দু—বছর হল গত হয়েছেন। একমাত্র ছেলে হিসেবে পৈতৃক ব্যবসা দেখভাল করছে। বাড়িতে মা, দু—তিনজন কাজের লোক আর সুমন—এই ক—জনই থাকে। ব্যাবসার কাজে মাঝে মাঝেই এ দেশ—সে দেশ করতে হয়। এই যেমন, গতকাল রাতেই ও লন্ডন থেকে ফিরেছে। সুমন এখনও বিয়ে করেনি। মানে, মনের মতো পাত্রী খুঁজে পায়নি। মা নিয়মিত পাত্রী খুঁজে চলেছেন। কিন্তু সুমন ব্যানার্জিকে বিয়ে করার মতো পাত্রীর সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। ক্যালকাটা বয়েজ স্কুলের ছাত্র সুমন, তারপর সেন্ট জেভিয়ার্স হয়ে জোকা থেকে ম্যানেজমেন্ট করা, সুপুরুষ, বুদ্ধিমান সুমনের সঙ্গে মানানসই কোনও মেয়ে আজ অবধি সুমন বা সুমনের মা, কেউই খুঁজে পাননি। এদিকে দেখতে দেখতে সুমনের বয়স হল তিরিশ। এরপর আর ভালো মেয়ে পাওয়া যাবে তো? সুমনের মা—র চিন্তায় মাঝে মাঝে ঘুম আসে না। এখন তাঁর কিছু একটা হয়ে গেলে সুমনকে দেখবে কে?

যা—ই হোক। সুমন একটা বিশেষ নামকরা ব্র্যান্ডের স্টলের সামনে এসে দাঁড়াল। সুমনকে স্টলের সামনে এসে দাঁড়াতেই সেলস গার্ল মেয়েটি নিখুঁত ইংরেজিতে সুমনকে বলল, তিনি কী ধরনের শার্ট খুঁজছেন? সে সাহায্য করবে কি না,' সুমনের হাসি পেল। মেয়েটা দেখতে পরমাসুন্দরী না হলেও বেশ ভালো দেখতে। মাথায় প্রচুর চুল। টপ নট করে বাঁধা। গায়ের রং বেশ ফরসা। ধারালো চোখ—মুখ এবং প্রচণ্ড বুদ্ধিমতী চেহারা। কিন্তু সুমনের হাসি পেল অন্য কারণে। এইসব বাঙালি সেলস গার্লদের মুখে ইংরেজি শুনলেই ও হেসে ফেলে। এরা না জানে ইংরেজি, না জানে বাংলা। ওই একটা—দুটো লাইন ইংরাজি মুখস্থ করে রাখে। খদ্দের এলে, ওই লাইনটাই সবাইকে বলে। এবার খদ্দেরও যদি পালটা ইংরেজিতে উত্তর দেয়, তাহলেই অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। তখন, ভাঙা হিন্দি, ভাঙা বাংলা ছাড়া আর রাস্তা নেই। আরে ভাই, কলকাতার দোকান, বাংলা বলতে তোদের লজ্জা কী? সবাই জানে তোরা বাঙালি। আর অতই যদি ইংরেজি জানতিস, তাহলে আর শপিং মলে, শার্টের দোকানে সেলস গার্লগিরি করতিস না। আর তোদের ইংরেজি মানে তো 'অ্যান্ড', 'বাট', 'অর', 'অবভিয়াসলি' এইটুকু। ভালো করে বাংলা বলতে তোদের লজ্জা কী?

মেয়েটাকে অপ্রস্তুত করার জন্য ও—ও পালটা, নিখুঁত ইংরেজিতে বলল,ও কী ধরনের শার্ট খুঁজছে। মেয়েটা ওকে অবাক করে, আরও সুন্দর ইংরেজিতে ওকে বুঝিয়ে বলল, হ্যাঁ, এই শার্ট দোকানে আছে। বিভিন্ন রঙের শার্ট আছে। তবে কার সাইজে খুঁজছে? যদি ও ওর সাইজের খোঁজে তা—ও হয়ে যাবে।

সেলস গার্লের মুখে এমন নিখুঁত ইংরেজি শুনে সুমন তাজ্জব। ও আলাপ একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মেয়েটার সঙ্গে কথা শুরু করল। বিভিন্ন ধরনের শার্ট দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিও ওর সঙ্গে গল্প আরম্ভ করে দিল। এবং কথোপকথন, বলাই বাহুল্য, হচ্ছিল বিশুদ্ধ ইংরেজিতে। মেয়েটি খুবই স্বচ্ছন্দ, ঝরঝরে, কোনও জড়তা নেই। এবার সুমন সোজাসুজি জিজ্ঞেস করল, 'মাফ করবেন, আমার একটা ব্যাপারে খুব কৌতূহল হচ্ছে। আপনি দেখতে সুন্দর, এত ভালো ইংরেজি বলছেন, আপনি এইরকম একটা দোকানে সেলস গার্লের কাজ করছেন কেন?' তার আগে ও অবশ্য দেখে নিয়েছিল, মেয়েটির শাড়িতে একটা ছোট্ট নেমপ্লেটে নাম লেখা—'রূপা রায়'।

মেয়েটির মধ্যে কুণ্ঠা বা লজ্জার লেশমাত্র দেখা গেল না। ঝরঝরে ইংরেজিতে বলল, ওর পড়াশোনা শুরু যোধপুর পার্ক কারমেল থেকে। তারপর যাদবপুরে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে পাশ করে এখন ইংরেজিতেই এম. এ. পড়ছে। বাবা মারা যাবার পর, পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং সংসার চালাতে ও এই পার্টটাইম জবটাই করছে। তবে ওর ইচ্ছা, আই.এ.এস পরীক্ষায় বসবে, তার জন্যও ট্রেনিং নিতে হবে। পয়সা রোজগার করতে আপাতত এই রাস্তাটা বেছে নিয়েছে। তবে, কাজের মধ্যে ও ছোট—বড় তফাত করে না। আই.এ.এস.এ চান্স পেলে, ও যেমন সিনসিয়ারলি সেই কাজটাও করবে, ঠিক একই রকম সিনসিয়ারিটি নিয়ে এই কাজটাও করছে। সুমন জাস্ট থ মেরে গেল। এতটা অবাক হবে, ও নিজেও আশা করেনি। মেয়েটি জানাল, যোধপুর পার্কে ওদের বাড়ি, মা আর এক ভাই আছে। সে—ও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। সে টিউশনিও করে, নিজের খরচ চালিয়ে ভাইও সংসারে কিছু টাকা দেয়। ওদের আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্য থাকতে পারে, কিন্তু ওরা নিজেরা ভালোই আছে।

সুমনের প্রথম আলাপেই মেয়েটিকে এত ভালো লেগে গেল, যে ও ঠিক করল, মেয়েটিকে আর—একটু চিনতে হবে। ওর বুকের মধ্যে একটা প্রজাপতি যেন পাখনা মেলে উড়তে শুরু করল।

ওর বন্ধুবান্ধব খুব বেশি নেই। সৈকতদা ওর স্কুলের সিনিয়র দাদা, কিন্তু বন্ধুত্বটা আজও অটুট। আজ, সৈকতদার বাড়িতে, বার্থডে পার্টিতে, সৈকতদা আর বউদির সঙ্গে মেয়েটির ব্যাপারে একটু আলোচনা করবে বলে মনে মনে ঠিক করল। সৈকতদার সঙ্গে অবশ্য ওর আর—একটা সম্পর্কও আছে। সৈকতদার রেস্তোরাঁ আছে কসবায়, সেইখানের ফর্টি পার্সেন্টের শেয়ারহোল্ডার সুমন। মানে, সৈকতদার রেস্তোরাঁয় টাকা ঢেলেছে সুমন। সুমন অবশ্য রেস্তোরাঁর লাভ—লোকসানের ব্যাপারে অত হিসেব রাখে না। সৈকতদার উপর সুমনের অগাধ বিশ্বাস। সৈকতদা যা দেন লভ্যাংশ হিসেবে, তা—ই নিয়ে নেয়। আজ অবধি ও কখনোই হিসেব জানতে চায়নি।

সৈকতদার বার্থডে পার্টিতে সুমন গিয়ে পৌঁছোতেই সবাই হইহই শুরু করে দিল। সুমন ছাড়া পার্টি জমে না। সুমন দুর্দান্ত কিশোরকুমারের গান করে। সবাই গান শুনতে চায়। সৈকতদা সুমনের গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে দিলেন। পার্টিতে অবশ্য খুব বেশি লোক নেই। সুমনের নিজের চেনা বলতে রোহিত। ও—ও ক্যালকাটা বয়েজেই পড়ত। সৈকতদার ক্লাসমেট রোহিত খান্না। পার্ক স্ট্রিটে বড় বাড়ির ছেলে। সৈকতদার সঙ্গে আবার অনেকদিন পর দেখা হয়েছে। সৈকতদাই ইনভাইট করেছেন। পার্টিতে উপস্থিত বাকি সবাই সৈকতদার পরিচিত। ব্যবসাসূত্রে আলাপ। সুমন প্রথম পেগটা গলায় ঢেলে, খালি গ্লাসে চামচ দিয়ে টুনটুন করে বাজাতে বাজাতে কিশোরকুমারের একটা প্রেমের গান ধরল। গান শেষে সবাই সুমনকে ঘিরে ধরল—'প্রথমেই প্রেমের গান, কী ব্যাপার?' সুমন হাসল, কিছু বলল না। সবার সামনে ও কিছু বলবে না। পার্টির শেষের দিকে, সবাই যখন প্রায় চলে গেছে, সৈকতদা আর বউদিকে বলল, আজকে গড়িয়াহাট প্যান্টালুন্সে দেখা—হওয়া সেলস গার্লটির ব্যাপারে।

সৈকতদা চিন্তিত মুখে বললেন, 'দেখ, এমনি যে কোনও সেলস গার্লের প্রেমে তুই পড়েছিস বললে আমি বারণই করতাম। তোদের স্ট্যান্ডার্ড অনেক হাই। তোরা সমাজের হাই ক্লাসে বিলং করিস। তোদের বাড়িতে একটা পাতি সেলস গার্ল—আই মিন, ওই স্ট্যান্ডার্ড মানাবেই না। কিন্তু তুই বলছিস, এই মেয়েটা শুধু দেখতেই ভালো না—হাই এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ডও আছে। ভালো বাড়ির মেয়ে, এই অবধি ঠিক আছে। কিন্তু প্রবলেম অন্য জায়গায়—তুই বলছিস মেয়েটা স্বাধীনচেতা, নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করে সংসারও চালায়। আই.এ.এস—এ বসবে। কিন্তু রাগ করিস না, একটা কথা বলি, তোর মা এর সঙ্গে বনিবনা হবে তো? তিনিও যা জাঁদরেল মহিলা! তিনি এই বউকে মানবেন? আর—একটা কথা, তোরা বামুন, মেয়েটা কায়স্থ। তোর মা উড়িয়ে দেবেন রে—তা ছাড়া, মেয়েটাকে আরও চেনাজানা দরকার। একদিনেই আজকাল মেয়েদের তুই কিচ্ছু ধরতে পারবি না। এ ছাড়াও, মেয়েটার অন্য জায়গায় অ্যাফেয়ার আছে কি না, সেটাও জানতে হবে।'

সুমন অধৈর্য হয়ে পড়ল, এত বছরের জীবনে কারও জন্য ও এতটা উতলা হয়নি। শেষে ঠিক হল, সৈকতদা আর বউদি কাল বিকেলে গড়িয়াহাট প্যান্টালুন্সে গিয়ে মেয়েটিকে দেখে, আলাপ করে, আরও কিছু তথ্য জানবার চেষ্টা করবেন। তারপর রাতেই ফোন করে সুমনকে সব জানাবেন।

সুমন এবার উঠে পড়ল। গাড়ি চালিয়ে গল্ফগ্রিন আসতে আসতে ও মনে মনে ভাবল, সৈকতদা ঠিক বলছেন। মেয়েটিকে এখনও ও কিছুই চেনেনি, জানেনি। এত উতলা হবার কী আছে? সত্যিই মেয়েটি সুন্দরী। ঝকঝকে, শিক্ষিতা। কিন্তু, মা—র সঙ্গে বনিবনা হবে তো? ওর মা—কে আর কেউ না চিনুক, ও তো চেনে। বড়লোক বাড়ির মেয়ে ছিলেন, তারপর বড়লোকের বউ হয়েছিলেন, আর এখন তিনিই সর্বেসর্বা। নামেই সুমন বড় ব্যবসাদার, মা—র হুকুম ছাড়া এক—পা—ও নড়ার সাহস বা ক্ষমতা নেই ওর। মেয়েটি অ—ব্রাহ্মণের মেয়ে—এটাই হবে আপত্তির অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া, আর কী কী ফ্যাঁকড়া তোলেন মা, দেখা যাক। সুমনের ইচ্ছা করছিল মেয়েটির ফোন নম্বর নিতে, কিন্তু প্রথম দিনই সেটা বাড়াবাড়ি হত ভেবে ও আর ফোন নম্বর চায়নি। ফোন নম্বরটা থাকলে এখন গাড়ি চালিয়ে বাড়ি যেতে যেতে বেশ কথা বলা যেত।

বাড়িতে গিয়ে ও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল বটে, কিন্তু গভীর উত্তেজনায় অনেক রাত অবধি ঘুম এল না।

2002, মে মাস

গড়িয়াহাট প্যান্টালুন্স থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে এল সুমন। ওর বাঁদিকে রূপা। সেই যে এক মাস আগে সৈকতদার জন্মদিনে প্যান্টালুন্স থেকে একটা শার্ট কিনতে গিয়ে রূপার সঙ্গে দেখা হয়, তারপর একটা মাস কেটে গিয়েছে স্বপ্নের মতো।

সৈকতদা, বার্থডে সেলিব্রেশনের পরের দিনই বউদিকে সঙ্গে নিয়ে রূপাকে দেখতে প্যান্টালুন্সে গিয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে গায়ে দিয়ে গিয়েছিলেন ওই দোকান থেকে কেনা সুমনের দেওয়া গিফটের শার্টটাই। রূপার নজর এমনই তীক্ষ্ন, যে দেখেই ধরে ফেলে যে গতকাল এই শার্টটাই এক ভদ্রলোক কিনে নিয়ে গিয়েছেন।

বউদি রূপার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ফেলেন। যদিও আলাপ করবার জন্য আর—একটা শার্টও কিনতে হয় দোকান থেকে।

তারপর থেকে গত এক মাসে, রূপার সঙ্গে সুমনের আলাপের মাত্রা আরও অনেক গভীর হয়েছে। সুমন এর মধ্যে বারকয়েক শরৎ বোস রোডের 'বারিস্তা' কফিশপে বসে রূপার সঙ্গে আড্ডাও মেরেছে। ও নিজের সম্পর্কে সব কথা রূপাকে বলেছে। আবার রূপার সম্পর্কেও জানবার চেষ্টা করেছে। অবশ্য সৈকতদা আর বউদিও, দু—জনকে দু—জনের কাছে আনবার জন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। গতকালই সুমন, সৈকতদা আর বউদি চলে এসেছিলেন 'বারিস্তা'তে। গড়িয়াহাটের প্যান্টালুন্স থেকে রূপাকেও ফোন করে ডেকে নেওয়া হয়। চারজনে আড্ডা জমে উঠেছিল খুব। তারপর একটু রাত হতে, সৈকতদা আর বউদি উঠে পড়েন। সুমন আর রূপাও বেরিয়ে আসে। সুমন রূপাকে রূপার বাড়ির সামনে নামিয়ে দেয়। বলতে গেলে, গত এক মাস এত সুন্দর জীবন, সুমন আগে কখনো কাটায়নি।

সুমনের সবচেয়ে টেনশন ছিল, রূপার কোনও অ্যাফেয়ার আছে কি না—এই ব্যাপারটা নিয়ে। কারমেল, যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে পড়া এত সুন্দরী আর বুদ্ধিমতী মেয়ে কোনও অ্যাফেয়ারে জড়ায়নি, এটা বিশ্বাস করাও মুশকিল। তবে রূপা পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, সে কোনওদিনই কোনও অ্যাফেয়ারে জড়িত ছিল না। বাবা—মা চেয়েছিলেন, ছেলেমেয়ে উচ্চশিক্ষিত হবে। তাই সাধ্যের বাইরে গিয়েও তাঁরা ছেলেমেয়েদের পড়িয়েছেন। গরিব বাড়ির মেয়ে, কিন্তু নিজে হাই ভ্যালুজ—এ বিশ্বাসী। আর রূপার কোনও লোভও নেই। সেই নিয়েই ভবিষ্যতে সুখী হতে চায়। নিজের সংসার নিয়ে, নিজের কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায়। আর কোনওদিকে তাকাবার আগ্রহ তার নেই। রূপার পড়াশোনার পরিধি তারিফ করবার মতো। ভারতের সঙ্গে আমেরিকা অথবা পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও যেমন রূপার অগাধ জ্ঞান, তেমনি সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক বা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর সিনেমা নিয়েও সে আলোচনা করতে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

এর মধ্যে সুমন একদিন রূপার বাড়িতে গিয়ে রূপার মা আর ভাইয়ের সঙ্গেও আলাপ করে এসেছে। যোধপুর পার্কে একতলা, সুন্দর বাড়ি, চারিদিকে গাছ। বাড়িতে একটা পোষা কুকুর আছে। রুচিশীলভাবে সাজানো ঘরগুলি। কোথাও কোনও আড়ম্বর নেই। ওয়াল ম্যাট থেকে শুরু করে টেবিল ল্যাম্প, সবই যেন পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা, যতটুকু দরকার ততটুকুই। রূপার ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে যাদবপুর থেকেই। ঝকঝকে একটি ছেলে, ওর মা—ও সুন্দরী এবং স্বাভাবিক ব্যবহার। কোনও বাহুল্য নেই। নিজেদের বড় করে দেখাবার প্রচেষ্টা নেই বলেই সুমনের ভালো লেগেছিল বেশি। রূপাকে অবশ্য নিজের মায়ের সঙ্গে এখনও আলাপ করায়নি সুমন। ওর বেশি চিন্তা ওর নিজের মা—কে নিয়ে। এমনিতেই হাই ক্লাসে বিলং করেন বলে, তিনি নিজে অত্যন্ত অহংকারী এবং জাঁদরেল। তার উপর মায়ের মুখ খুব খারাপ। মানুষকে আঘাত করে কথা বলতে খুব ভালোবাসেন। আত্মীয়—পরিজন সেইজন্য মা—কে এড়িয়ে চলেন। এমনকী, কাজের লোকেদের সঙ্গেও মা দুর্ব্যবহার করেন। সেইজন্য, সুমনের নিজের বন্ধুরাও পারতপক্ষে সুমনের বাড়িতে আসতে চায় না। আড্ডা মারতে ইচ্ছে হলে বা দেখা করতে চাইলে, ক্যালকাটা ক্লাব বা লেক ক্লাবই ভরসা।

সুমনের আশঙ্কা সত্যি হলে, মা এই সম্পর্কটাকে মানবেন না তিনটে কারণে। এক, রূপারা বাঙাল, আর সুমনরা ঘটি। বাঙাল পরিবারের মেয়েকে ঘটি বাড়িতে অন্তত সহজে মানতে চাইবে না। সুমনের মা তো নয়ই। সুমনের মা কট্টর বাঙাল—বিরোধী। সুমনের মা বলেন, বাঙালরা সব খায়। শুঁটকি মাছ থেকে কচু। ওদের রান্নার সঙ্গে ঘটিদের রান্নার কোনও মিলই নেই।

রূপা আবার বলে, দেশভাগের উপর বাঙালদের বা পূর্ববঙ্গের মানুষদের কোন হাত ছিল না। কেউ তাদের জিজ্ঞেসও করেনি দেশভাগ করা উচিত হবে কি না। একরাতে, পূর্ববঙ্গের মানুষদের ভিটেমাটি—ছাড়া করা হয়। নিজেদের ঘরবাড়ি, চাষের জমি, গোরু, ছাগল, মুরগি, টাকাপয়সা সব ছেড়ে তাদের পালিয়ে আসতে বাধ্য করা হয়। তাতে অসহায় মানুষগুলোর কিছু করার ছিল না। একটা ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে, লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে, অচেনা পরিবেশে, অচেনা জায়গায় থাকতে বাধ্য হয়। কী দোষ ছিল সেই লোকগুলোর, যারা সারারাত ধরে পায়ে হেঁটে, নিঃস্ব, সহায়—সম্বলহীন অবস্থায় কোলে, কাঁধে বাচ্চা নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে? যে সময় কলকাতার ঘটিরা হাতে বেল ফুলের মালা জড়িয়ে বাইজি নাচ দেখছে, আর পায়রা উড়িয়ে পয়সা ধ্বংস করছে, সেই সময় বাঙাল বাড়ির পুরুষেরা নতুন ঘর তৈরির জন্য কাঠকুটো জোগাড় করছে। বিস্তীর্ণ দক্ষিণ কলকাতার জলাজঙ্গল সাফ করে বাঁশ দিয়ে কুঁড়েঘর বানাচ্ছে। বাঙাল মেয়ে—বউরা বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দেবে বলে, জলে—জঙ্গলে কচুর শাক তুলে আনছে। আজ গোটা দক্ষিণ কলকাতা তৈরি করেছে বাঙালরা। গোটা পৃথিবীতে বড় বড় পদ অধিকার করে রয়েছে বাঙালরা। বাঙালরা ঘটিদের দয়ায় কলকাতায় আজ রাজত্ব করছে না, তারা আজকে নিজেদের প্রমাণ করেছে নিজেদের যোগ্যতায়। এইজন্য বাঙালদের সঙ্গে জার্মানদের তুলনা করা হয়। বাঙালরা হারতে জানে না—বলা বাহুল্য, এত বড় লেকচার শোনার পর ঘটি সুমন আর কথা বাড়ায়নি।

রূপাকে পছন্দ না—করবার দ্বিতীয় কারণটা হবে, সুমনরা ব্রাহ্মণ আর রূপারা অব্রাহ্মণ। মা এসব ব্যাপারে ভীষণ গোঁড়া। আর উচ্চবংশীয় ব্রাহ্মণ বলে খুব অহংকারী, আর সেটা প্রকাশও করে থাকেন।

আর তৃতীয় কারণটা হবে, এই অভিজাত, দাম্ভিক মহিলাটি কিছুতেই একজন সেলস গার্লকে বাঁড়ুজ্জে বাড়িতে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নেবেন না। হলই বা রূপার হাইলি এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড, ইংলিশে এম. এ. করছে, ভালো পরিবার, কিন্তু, এই মুহূর্তে তো ও একটা শপিং মলে সেলস গার্ল। মা—র সামাজিক সম্মানে আঘাত লাগবে।

সুমন এই এক মাসে বেশ কয়েকবার রূপাকে বলেওছে যে এই কাজটা ছেড়ে দিলে হয় না? রূপা ঘাড় কাত করে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছে, 'কেন? কাজটা খারাপ কী? এই কাজটা করে আমি আমার পড়াশোনা আর সংসার চালাই। কাজটার মধ্যে তো আমি অসম্মানের কিছু দেখছি না। তা ছাড়া কাজটার টাইমিংটা এমন যে, এই কাজটা করে আমি ইউনিভার্সিটিতেও ক্লাস করতে যেতে পারি।' রূপা সুমনকে বুঝিয়েছে, কাজ তো অনেক পাওয়া যায়, কিন্তু টাইমিংটা এমন হতে হবে, যাতে দিনের বেলায় ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করে, কাজটা করা যায়। এমনি দশটা—পাঁচটার কোনও কাজে জয়েন করলে, ইউনিভার্সিটির ক্লাসগুলো কামাই করতে হবে। রূপার যুক্তি আর জেদের কাছে সুমন তখনকার মতো হার মানলেও, মিনমিন করে বলার চেষ্টা করেছে, 'বিয়ের পর কাজটা ছেড়ে দেবে তো?' রূপা পালটা জিজ্ঞেস করেছে 'সুমন ব্যানার্জি কী চায়? একটা স্বাধীনচেতা, লড়াকু মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে বসিয়ে দিতে চায়? নাকি সেই মেয়েটার স্বপ্নের সঙ্গে নিজেও একসঙ্গে ডানা মেলে উড়তে চায়? আই. এ. এস. তার স্বপ্ন। একান্ত আই. এ. এস.—এ চান্স না পেলে প্রফেসর তো সে হবেই। তা ছাড়া এখান থেকে রোজগারের টাকা সে তার বাপের বাড়িতেও দেয়। না হলে মা—ভাইয়ের কী হবে? তাদের সংসার চলবে কেমন করে? সুমন ব্যানার্জির ব্যাবসার টাকা সে বাপের বাড়িতে দেবে না। আর মা সেটা নেবেনও না। রূপারা সুমনের মতো ধনী না হতে পারে কিন্তু আত্মসম্মানবোধ প্রখর', তারপর হেসে বলেছে, 'বাঙালরা এরকমই হয়।'

সুমন যত রূপার সঙ্গে মিশছে, ততই যেন রূপাকে ভালো লাগছে। সৎ, নির্লোভ, যুক্তিনিষ্ঠ একটি মেয়ে। নিজেরা গরিব বলে কোনও লজ্জা বা কুণ্ঠা নেই। বরং লড়াই করে নিজের যোগ্যতা দিয়ে, সমস্যাকে জয় করার মধ্যে অনেক গৌরব খুঁজে পায়। দ্যাট'স গুড। সুমন অবশ্য সোনার চামচ শুধু নয়, প্র্যাকটিক্যালি হীরের চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছে। বাবার বিরাট ব্যবসা, কলকাতাতেই একাধিক বাড়ি, এ ছাড়াও শান্তিনিকেতন, দার্জিলিংয়েও বাড়ি করেছিলেন বাবা। একাধিক গাড়ি। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, বাবার ছাতার তলায় রাজপুত্রের মতো বড় হয়েছে। বাবা মারা যাবার পর নামেই বাবার ব্যবসা দেখে ও, আসলে ব্যবসা পরিচালনা করেন মা। লোকে জানে, ও ব্যবসা করছে।

রূপার মনের জোর দেখে সুমনও যেন একটা জোর পেতে শুরু করেছে। সে এইরকম দৃঢ়চেতা, লড়াকু মেয়ে কেন, কোনও ছেলেও দেখেনি। রূপাকে পাশে পেলে অনেক দূর ও এগোতে পারবে। আরও একজন মানুষ আছেন, যিনি রূপাকে দেখে এখন খুব খুশি—খুশি ভাব দেখাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু রূপার সঙ্গে বিয়ে হলে তিনিও খুব একটা স্বস্তিতে থাকবেন না—তিনি হলেন সৈকতদা। এতদিন যদিও সৈকতদার রেস্তোরাঁ বিজনেসে সুমন ফর্টি পার্সেন্টের শেয়ারহোল্ডার, তবু, রেস্তোরাঁয় আয়—ব্যয়ের হিসেব সুমন কোনওদিনই দেখেনি। এই ক—দিন আগে রূপার সঙ্গে গল্ফ গ্রিন সেন্ট্রাল পার্কে সন্ধেবেলায় পায়চারি করতে করতে সৈকতদার সঙ্গে জয়েন্ট বিজনেসের কথা সুমন রূপাকে বলেছিল। শুধু মুখে মুখে সৈকতদার সঙ্গে এগ্রিমেন্টের শর্তগুলো আর আয়—ব্যয়ের হিসেবটা শুনেই রূপা বলল, 'সৈকতদা মোটামুটি বছরে কমসে কম পাঁচ লাখ টাকা তোমাকে কম দিচ্ছেন, পাঁচ বছরে হিসেবটা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে পঁচিশ লাখ। সৈকতদাকে তোমার বলা উচিত। ঠিক আছে, এখন কিছু না বললেও পরে বোলো।' তারপর কী ভেবে আবার বলল, 'সবাই ধরে নিয়েছে তুমি খুব বড়লোকের একটা বোকা ছেলে। তোমাকে ঠকানো খুব সহজ। এখন প্রবলেম হল, আমার সঙ্গে বিয়ের পর আমি যদি লোকদের এই অন্যায়গুলো ধরি, লোকে বলবে, আমি তোমাকে দুর্বুদ্ধি দিয়ে দিয়ে খারাপ করে দিচ্ছি।' সুমন একমত হয়ে ঘাড় নেড়েছিল। সুমন রূপাকে ওদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে হাত নেড়ে 'টা টা' বলে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে এল।

পাঁচ বছর পর, 2007, 3rd December

আজ আর সারাদিন বেরোয়নি সুমন। গত কয়েকদিন ধরেই মা—র সঙ্গে ওর অশান্তি চলছে। রূপার সঙ্গে মা—র বনিবনা হয় না একদমই। সেই প্রথম থেকেই। মা—কে যখন প্রথম রূপার কথা বলে, মা সরাসরি 'না' বলে দিয়েছিলেন। এখনও মনে আছে, দিনটা ছিল রবিবার দুপুরবেলা, সন্ধেবেলায় রূপার আসার কথা ছিল গল্ফগ্রিন সেন্ট্রাল পার্কে। দু—জনে একটু হাঁটবে, গল্প করবে, তারপর সিসিডি—তে বসে একটু কফি খাবে। তারপর রাত হলে সুমন রূপাকে ছেড়ে আসবে বাড়িতে, অথবা দু—জনে সিসিডি থেকে বেরিয়ে সোজা হাঁটতে হাঁটতে লর্ডস বেকারি হয়ে ভেতর দিয়ে চলে যাবে যোধপুর পার্ক। রূপাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে।

দুপুরবেলা, সুমন আর সুমনের মা একসঙ্গে খেতে বসেছিলেন। সবসময়ের লোক লক্ষ্মীদি খেতে দিচ্ছিলেন। তখনই মা—র ফোনে ফোন আসে। কে যেন মা—কে পাত্রীর সন্ধান দিচ্ছিল। মা তাকে ছবি পাঠাতে বললেন। সুমন এতদিন মনে মনে এই অপেক্ষাতেই ছিল। সে আস্তে আস্তে মা—কে বলল, 'মা, তোমার এই পাত্রী দেখাটা বন্ধ রাখো, আমি একজনকে পছন্দ করেছি। তাকেই বিয়ে করব।'

মা ভাতের মধ্যে চিকেন কারিটা ঢালতে ঢালতে বলেছিলেন, 'আমি অরুন্ধতী ব্যানার্জি, বেঁচে থাকতে ওই মেয়ে এ বাড়িতে ঢুকবে না।'

সুমন অবাক। 'তুমি জানো, আমি কাকে বিয়ে করতে চাই?'

অরুন্ধতী বললেন, 'তুমি গল্ফগ্রিন সেন্ট্রাল পার্কে তার সঙ্গে প্রেম করে বেড়াচ্ছ আর আমি জানব না? মনে রেখো, তোমার কোনও মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে বেড়ানোতে আমার আপত্তি নেই। আমার আপত্তি ওই মেয়েকে ঘরে তোলায়।'

সুমন হাঁ করে চেয়ে রইল মা—র দিকে।

বিড়বিড় করে বলল,'তুমি ওকে দেখেছ? তোমার আপত্তির কারণই বা কী?'

অরুন্ধতী এবার সোজা সুমনের দিকে তাকালেন, খাওয়া থামিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, আমি দেখেছি, তার সম্পর্কে সব খবরও নিয়েছি। তার রূপ, পড়াশোনা, বাড়িঘর নিয়ে আমার কোনও প্রবলেম নেই। আমার আপত্তি মূলত তিনটে কারণে। আমার ধারণা, তুমিও কারণগুলো জানো।'

সুমন জানে, কোন তিনটে কারণে মা—র আপত্তি, তবু না—বোঝার ভান করে বলল, 'সরি, তোমার আপত্তির কারণ আমি বুঝলাম না, যদি একটু পরিষ্কার করে বলো।'

অরুন্ধতী আরও গম্ভীর হয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, 'একে অব্রাহ্মণ, তায় বাঙাল বাড়ির মেয়ে। আর তুমি ভাবলে কী করে, একটা দোকানের সেলস গার্ল এই বাড়ির বউ হবে!'

সুমন মাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল। —'দেখো মা, আজকালকার দিনে ব্রাহ্মণ—অব্রাহ্মণ ব্যাপারগুলো উঠেই যাচ্ছে। তা ছাড়া এটা গ্লোবালাইজেশনের যুগ, এই যুগে বাঙাল—ঘটি? মাই গড। তুমি কোন প্রিমিটিভ এজে পড়ে আছ মা? আর—একটা কথা। ওকে সেলস গার্ল বলে ছোট কোরো না। ও ইংলিশে এম. এ. করছে। যাদবপুর থেকে। আই. এ. এস. হওয়া ওর স্বপ্ন। না হলেও ও কিন্তু প্রফেসরি করবেই। ওর রেজাল্ট, অল অ্যালং গুড।'

সেদিন মা কিছুতেই বুঝতে চাননি, খাওয়া ছেড়ে উঠে গিয়েছিলেন।

সুমন মনে মনে ভেবেছিল, 'যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। জানাজানি হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু, একটা ব্যাপারে ও খুব দুঃখ পেয়েছিল, সেটা হল, মা যখন রূপার ব্যাপারে জানতেই পেরেছিলেন, তখন সরাসরি সুমনকে জিজ্ঞেস করলেই হত, লোক লাগিয়ে রূপার ব্যাপারে খবর নেওয়া তো আসলে ছেলের পেছনে, মানে সুমনের পেছনে গোয়েন্দা লাগানোরই শামিল। সুমন মনে মনে খুব অপমানিত বোধ করেছিল। আর ঠিক করে রেখেছিল, এই রূপার পেছনে লোক লাগাবার ব্যাপারটা রূপাকে বলা ঠিক হবে না। রূপা জানতে পারলে অসন্তুষ্ট তো হবেই, মা এর সম্পর্কে খারাপ ধারণা হয়ে যাবে প্রথম থেকেই।

সুমন খুব অপমানিত হয়ে অরুন্ধতীকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'মা, খুব খারাপ লাগছে এই জেনে, যে তুমি আমার পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছিলে।' অরুন্ধতী শান্ত স্বরে বলেছিলেন, 'মিসটেক, মিসটেক, আমি গোয়েন্দা লাগাইনি, তোমার একজন কাছের লোক আমাকে সব খবর দিয়েছে। তার নামটা শুনলে তুমি কষ্ট পাবে।'

সুমন আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, 'তবু, নামটা শুনি?'

অরুন্ধতী বলেছিলেন, 'তোমার প্রিয় সৈকতদা।'

সুমন আকাশ থেকে পড়েছিল—সৈকতদা? রূপা তাহলে সৈকতদার সম্পর্কে ঠিকই বলেছিল—যে সৈকতদা আমাদের সম্পর্কটা পছন্দ করবেন না, কারণ রূপা যে তীক্ষ্ন বুদ্ধিমতী, সেটা সৈকতদা ধরে ফেলেছেন, আর সুমন রূপাকে বিয়ে করলে এতদিন ধরে সৈকতদা যে সুমনকে চুষে আসছিলেন, সেটাও বন্ধ হবে। কাজেই মুখে যা—ই বলুন—না কেন, যতই ওপর ওপর খুশির ভাব দেখান—না কেন, সুমন রূপাকে বিয়ে করলে সৈকতদা কিছুতেই খুশি হবেন না। বাস্তবে হচ্ছেও তা—ই, রূপা সম্পর্কে সমস্ত খুঁটিনাটি খবর তাহলে জোগাচ্ছেন সৈকতদা। সুমনের বিয়েটাকে ভাঙার চেষ্টা করছেন তিনি।

সেই বিকেলেই রূপাকে বাড়িতে ডেকে এনেছিল সুমন। রূপা পড়েছিল অফ হোয়াইটের ওপর চমৎকার কাজ করা একটা শাড়ি। সাজগোজও এমন রুচিশীল আর মার্জিত ছিল যে, চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। সেন্ট্রাল পার্কে রূপা এসে পৌঁছোনোমাত্র সুমন রূপাকে বলে, 'প্রোগ্রামে একটু চেঞ্জ হয়েছে। আজই তোমার সঙ্গে মায়ের আলাপ করাব, চলো।' রূপা যেন রেডিই ছিল। খুব স্বাভাবিক ভাব দেখিয়ে সুমনের বাড়িতে যেতে রাজি হয়ে যায়। সুমন অরুন্ধতীর সঙ্গে রূপার আলাপ করিয়ে দেয়। খুব নরম অথচ ঋজু স্বরে মা—কে জানিয়ে দেয় যে খুব শিগগিরই ও রূপাকে বিয়ে করবে। রূপা সুমনের বাড়িতে ঢুকেই অরুন্ধতীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। সুমন ভয় পাচ্ছিল যে, অরুন্ধতী বোধহয় কোনো সিনক্রিয়েট করবেন। কিন্তু অরুন্ধতীও স্বাভাবিক ব্যবহার করলেন এবং বললেন, যে, এখন থেকে যদি পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব রূপা নেয়, তাহলে উনি খুব খুশি হবেন। আর তিনিও একজন উপযুক্ত পুত্রবধূর অপেক্ষায় ছিলেন, যিনি ছেলের পাশে থেকে ছেলেকে জীবনে চলার পথে এগিয়ে চলতে সাহায্য করবে। তাঁর বয়স হয়েছে, এবার তিনি ব্যবসা থেকে অব্যাহতি চান।

সুমন জানে, এই আপাত শীতল ব্যবহার অরুন্ধতীর আসল রূপ নয়। ভেতরে ভেতরে অরুন্ধতী জ্বলছেন, কিন্তু ওই যে, বড় বাড়ির দম্ভ আর অহংকার। মনে যা—ই থাক, মুখে প্রকাশ করলেন না কিছুতেই।

তবে, সুমন কিন্তু ওর মায়ের মুখে—চোখে এক ধরনের ভয় আর অসহায়তা দেখতে পেয়েছিল। মা কি রূপাকে ভয় পাচ্ছেন? ইনসিকিয়োরড ফিল করছেন? সেদিন মা—র ঠান্ডা ব্যবহার দেখতে দেখতে সুমনের মনে হয়েছিল, এই যে তিরিশ বছর বয়স পর্যন্ত সুমনের বিয়ে হয়নি, এর জন্য ওর মা—ই দায়ী নন তো? রূপার সঙ্গে না হয় দু—আড়াই মাস আলাপ। কিন্তু তার আগে সুমনের যতই বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, সবই অরুন্ধতী কোনও না কোনও কারণে নাকচ করেছেন। এক—একসময় সুমনও অবাক হয়ে গিয়েছে যে, ভালো ভালো সম্বন্ধ ভেঙে যাচ্ছে কেন? এখন ওর মনে হচ্ছে যে, কোনও না কোনও অজুহাতে ওর মা—ই সম্বন্ধগুলোকে বিয়ে অবধি গড়াতে দেননি।

রাত তখন প্রায় দশটা। গল্ফগ্রিনের রাস্তা অনেকটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন দু—জন হাঁটতে হাঁটতে লর্ডস বেকারির দিকে আসছিল তখন রূপা হঠাৎ বলেছিল, 'সুমন, এখনও সময় আছে। ভেবে নাও।'

সুমন চমকে উঠে বলেছিল, 'কী? কী ভাবব?'

রূপা বলেছিল, 'আজ তোমার মায়ের চোখে মুখে আমি এক ধরনের ভয় আর অসহায়তা দেখলাম। তুমি আর তোমার মা, ছোট্ট সংসার। তোমার মা নিজের মতো করে চালাচ্ছিলেন। তুমি একই ছেলে। ছেলের বউ এসে যদি ওঁর শান্তির জীবনে ব্যাঘাত ঘটায়—এটাই হয়তো ওঁর ভয়। আমার এখন মনে হচ্ছে, তোমার এত বয়স অবধি বিয়ে না—হবার কারণ তোমার মা, উনি তোমার বিয়ের কথা শুনলেই ভয় পেয়ে যান।'

রূপার মুখে নিজের মনের কথাটা শুনতে পেয়ে সুমন একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপ করে ছিল।

রূপা আবার শুরু করে, 'তোমার ব্যবসায় আমার কোনও লোভ নেই। তুমি জানো, প্রথমে ঠিক করেছিলাম, গড়িয়াহাট প্যান্টালুন্সের চাকরিটা আমি চালিয়ে যাব। পরে ঠিক করি, তোমাদের পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে চাকরিটা আমি করব না। তোমাদের পরিবারের হয়তো সম্মানহানি হবে। তা ছাড়া, আর—একটা কথা বলি, তুমি তোমার মা—কে জানিয়ে দিয়ো, আমার কাছ থেকে তাঁর ভয়ের কোনও কারণ নেই। আমি তাঁর ব্যবসাতেও নাক গলাব না, তাঁর রাজত্বেও না।'

সুমন চুপ করে রূপার কথাগুলো শুনতে শুনতে হাঁটছিল। রূপার প্রতিটা কথার ওজন আছে। সুমনের এরকমই একজনকে দরকার ছিল। রূপার উপর ও আস্তে আস্তে আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল। ওর ইচ্ছে করছিল রূপার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিতে।

মা বিয়েতে আর কোনও আপত্তি করেননি। বিয়ের আগে মা শুধু বলেছিলেন, 'রূপাকে নিয়ে বড়মামার সঙ্গে একবার দেখা করিয়ে আনো।' বড়মামা বিশ্বজ্যোতি মুখার্জি রাজ্য পুলিশের খুব বড় কর্তা ছিলেন। তাঁর হাঁকডাকে একসময় বাঘে—গোরুতে এক ঘাটে জল খেত, এখন চাকরি থেকে রিটায়ার করে, রাজ্য সরকারের একটা কমিশনের চেয়ারম্যান, এখনও খুব প্রতিপত্তি। রূপাকে বলাতে, রূপা কোনও আপত্তি করেনি। একটা রবিবার দেখে, দু—জনে গিয়েছিল সল্ট লেকে। বড়মামার বিরাট বাড়ি, বাড়ির সামনে পুলিশ পাহারা। রূপাকে দেখে বড়মামা খুশি হয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'মেয়েটার চোখ দুটো খুব সাহসী, তোর সঙ্গে এমনই একটা দৃপ্ত মেয়ের বিয়ে হওয়া দরকার ছিল।' বড়মামা রূপাকে কাছে বসিয়ে রূপার সঙ্গে অনেক গল্প করেছিলেন, বেরিয়ে আসার সময় রূপার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, 'আমার দিদিকে আমি চিনি। ওকে কিছু বলতে পারব না। তোমাকে রিকোয়েস্ট করি, মানিয়ে চলো, কখনও কোনও অসুবিধা হলে আমাকে জানিয়ো, আমি তোমার পাশে গিয়ে দাঁড়াব।'

সুমনকে বলেছিলেন, 'ও আই.এ.এস. হবে কি না জানি না। তাতে আমার কিছু বলার নেই, তবে ওকে বিয়ে করলে তুই মানুষ হবি। ওর পাশে থাকিস। আমার পুলিশের চোখ, আমি অনেক মানুষ দেখেছি, কিন্তু এরকম নির্মল চোখ আর হাসি আমি আগে দেখিনি। একদম ওর সঙ্গে ঝগড়া করবি না, ঝগড়া করলে আমি কিন্তু ওর দলেই থাকব।'

বড়মামার কথা শুনে দু—জনেই হাসতে শুরু করেছিল।

বিয়ের পরের পাঁচ বছর—যেন সুন্দর স্বপ্ন, এত ভালো কখনও কাটায়নি সুমন। পুরো কৃতিত্বটাই ও রূপাকে দেবে। যদি একদম নিরপেক্ষ বিচার করতে হয়, তাহলে ও বলবে, অরুন্ধতী রূপাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। টেড়াবাঁকা, ঠেস—মারা কথার বন্যা বইয়ে দিয়েছেন রূপার উদ্দেশে। প্রত্যুত্তরে, রূপা আজ অবধি মা—র সঙ্গে একদিনও ঝগড়া করেনি। রূপার আপব্রিঙ্গিং অন্যরকম ছিল। আর পদে পদে অরুন্ধতী তার জন্য কথা শুনিয়েছেন রূপাকে।

রূপা সুমনকে নাম ধরে 'সুমন' বলেই ডাকত প্রথমদিকে, অরুন্ধতী হুকুম দিলেন, 'এ বাড়িতে স্বামীর নাম ধরে ডাকবার রেওয়াজ নেই, 'ওগো, শুনছ', এইসব বলেই ডাকতে হবে।'

রূপা একবার মিনমিন করে বলেছিল, 'মা, এই ধরনের ডাক তো উঠেই গেছে।' অরুন্ধতী চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিলেন, 'তাহলে ধরে নাও, তোমার একটা ব্যাকডেটেড বাড়িতে বিয়ে হয়েছে। এখন তো আর কিছু করার নেই। এই ব্যাকডেটেড বাড়ির নিয়মকানুনই তোমাকে মেনে চলতে হবে।' রূপা আর কথা বাড়ায়নি। আড়ালে—আবডালে বা বাইরে সুমনকে নাম ধরে ডাকলেও ঘরে বা অরুন্ধতীর সামনে সুমনকে 'ওগো', 'শুনছ' বলেই ডাকত।

বিয়ের পর রূপার আই.এ.এস.—এ বসা আর হয়নি। বি.এড. করে এখন সাউথ পয়েন্ট স্কুলে ইংরেজি পড়ায়। বিয়ের পর পর বাড়িতেই বেশ আসর জমে উঠত। সৈকতদা আসতেন বউদিকে সঙ্গে নিয়ে, রোহিত আসত। সবাই মিলে কফি খেতে খেতে ক্যারম খেলা হত, হোম থিয়েটারে সিনেমা দেখাও হত কখনো কখনো। এমনও হয়েছে, সুমন ব্যবসার কাজ থেকে তখনও ফেরেনি, সৈকতদা আর রোহিত আগেই এসে গিয়েছে। রূপা হয়তো ওদের সঙ্গে বসে কফি খেতে খেতে ক্যারম খেলছে বা হাসাহাসি, গল্প করছে। অরুন্ধতী তা দেখে পরে রূপাকে ডেকে বারণ করে দিয়েছেন—বলেছেন, 'বিয়ের পর পরপুরুষের সঙ্গে ঢলানি এ বাড়ির কালচার নয়।' রূপা অরুন্ধতীকে কিচ্ছুটি বলেনি। পরে সুমনের কাছে কেঁদে ভাসিয়েছে। বিয়ের পর পর রূপা বাড়িতে নাইটি পরত, অরুন্ধতী তাতেও বাদ সেধেছেন। বলেছেন, 'ম্যারেড মেয়েদের নাইটি পরে ধিঙ্গিপনা একদম সহ্য হয় না।' রূপা ঘরে নাইটি পরাও বন্ধ করেছে। তারপর থেকে রূপা ঘরেও শাড়ি পরেই থাকে।

সুমন বুঝতে পারে যে, মা রূপাকে আক্রমণ করে এক ধরনের আনন্দ পান। মা চান রূপাকে উত্তেজিত করে ঝগড়া করতে, কিন্তু বুদ্ধিমতী রূপা মা—র ফাঁদে গত পাঁচ বছরে একদিনও পা দেয়নি।

সুমনই একবার রূপাকে বলে, 'তুমি এবার সৈকতদার সঙ্গে বসে রেস্তোরাঁ বিজনেসের অ্যাকাউন্টসগুলো ঠিক করো।' রূপা তারপর থেকে কয়েকবার একা একাই সৈকতদার কসবার অফিসে যায়। কখনো কখনো সৈকতদাকে সঙ্গে নিয়ে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের অফিস গিয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স রিনিউয়ের জন্য সৈকতদার গাড়িতে করেই কর্পোরেশনের অফিসেও গিয়েছে। অরুন্ধতী এসব জানতে পেরে সুমনকে বলেছেন, 'হ্যা রে, রূপাকে একটু নজরে রাখিস। খবর পেলাম, ও আজকাল সৈকতের গাড়িতে করে এখানে—সেখানে যাচ্ছে—'

সুমন হতাশ ভঙ্গিতে বলেছে, 'ভুল করছ মা, সৈকতদা হিসেবে প্রচুর গরমিল করেছে, রূপাই গরমিলটা ধরেছে। ওকে আমিই বলেছি রেস্তোরাঁ বিজনেসটা সামলাতে। ওকে শুধু শুধু সন্দেহ কোরো না। আজ অবধি সৈকতদার কাছ থেকে আমি আরও প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা বেশি পাব। রূপা আছে বলেই আমি ব্যবসায় এত সাহস পাচ্ছি।'

মা খুশি হবার বদলে হঠাৎ রেগে গিয়েছিলেন, 'তার মানে আমি তোর ব্যবসায় এতদিন লোকসান করাচ্ছিলাম? এখন বউ এসেই বেশি কাছের, বাঃ বাঃ?'

সুমন আর কথা বাড়ায়নি, ও জানত, এটাই হবে। এমনিতেই রূপার রূপ আর বুদ্ধির প্রশংসা প্রত্যেকের মুখে মুখে। তারপরে, ব্যবসাতেও রূপার সুনাম, মা একেবারেই মানতে পারছেন না। সুমন নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, 'এ তো হবারই ছিল।' দুটো ছেলে হয়েছে। একটার বয়স সাড়ে তিন, আর—একটার বয়স দেড় বছর। অবশ্য, দুটো ছেলেই অরুন্ধতীর নেওটা। যদিও বাড়িতে দুটো বাচ্চাকে দেখাশোনার জন্য অন্য কাজের লোকদের পাশাপাশি দু—দু—জন আয়া রাখা আছে, তবুও অরুন্ধতী বাচ্চাদের দেখভাল নিজেই করেন, আর বাচ্চারাও ঠাম্মাকে ভীষণই ভালোবাসে। সুমন নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে, রূপা তো স্কুল সেরে আবার সুমনের ব্যাবসারও তদারকি করে।

সুমন এটাও বেশ বুঝতে পারছে, সৈকতদার সঙ্গে বিজনেস ও আর বেশি দিন টানতে পারবে না। এই যে রূপাকে রেস্তোরাঁ বিজনেসের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আর রূপা সব হিসেবের গরমিল ধরে ফেলেছে, এতে সৈকতদার ক্যারেকটার বেআব্রু হয়ে গিয়েছে। তিনিও আজকাল রূপাকে একদমই সহ্য করতে পারছেন না, সুমনকে তো নয়ই। সুমনও ঠিক করে ফেলেছে—সৈকতদার কাছ থেকে পাওনা পঞ্চাশ লাখ টাকা পেয়ে গেলেই, সৈকতদার কাছ থেকে সরে আসবে। রূপাকে প্রোপ্রাইটার করে অন্য বিজনেস চালু করবে। তবে সৈকতদা খুব সহজে পঞ্চাশ লাখ টাকাটা দেবেন বলে মনে হচ্ছে না।

আর রূপাকেও ও আর সৈকতদার অফিসে পাঠাবে না বলে ঠিক করল। সৈকতদাকে এখন যেন মনে হচ্ছে ভালো লোক নয়। যখন সুমন মুখ বুজে ঠকানোটা মেনে নিত, তখন সুমন ভালো ছিল, আর যেই সুমন পাওনা টাকা চাইছে, তক্ষুনি সুমন খারাপ হয়ে গেল। তা ছাড়া, প্রথম থেকে সৈকতদাই তো রূপা সম্পর্কে মা-এর কান ভাঙিয়েছে! বারবার চেষ্টা করেছে সুমন—রূপার পিঠে ছুরি মারবার। তবে রূপাকে নিয়ে সুমনের অত ভয় নেই। এর আগে রোহিতও বেশ কয়েকবার রূপাকে অশালীন ইশারা—ইঙ্গিত করেছে। মনে মনে কামনা করেছে রূপাকে কাছে পাবার। কুৎসিত মেসেজ পাঠিয়েছে ফোনে। রূপা সেগুলোও শক্ত হাতে হ্যান্ডেল করেছে। সুমনকে কিছুই চিন্তা করতে হয়নি।

আজ মা একেবারে বাড়াবাড়ি টাইপের অশান্তি শুরু করেছেন। আগামীকাল রূপার জন্মদিন। সুমন আর রূপা, কীভাবে দিনটা সেলিব্রেট করা যায়, সেই আলোচনাই করছিল। হঠাৎই মা এসে চিৎকার করে বলতে শুরু করেন যে, তাঁর নাতি রোগা হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে কারও খেয়াল নেই, সুমন আর রূপা সবসময় নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। ওরা দু—জনেই অরুন্ধতীর এই আচরণ দেখে অবাক হয়ে নিজেদের আলোচনা থামিয়ে দেয়। তারপর হঠাৎই অরুন্ধতী বলতে থাকেন যে, তিনি আর এখানে থাকতে চান না, তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শান্তিনিকেতনে কাটাতে চান। শান্তিনিকেতনের বাড়িতে যেন তাঁর থাকবার বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়। রূপা, শাশুড়ির অকারণ এই চিৎকার শুনে, বসার ঘরে সুমনের পাশ থেকে উঠে নিজের ঘরে চলে যায়। সুমন বুঝতে পারে, সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলে আর ছেলের বউয়ের প্রেমালাপ তিনি সহ্য করতে পারেননি। তারপরে, বউয়ের জন্মদিন পালনের প্ল্যান তাঁর কাছে অসহ্য লেগেছে। তাই তিনি অকারণে বাড়িতে অশান্তি তৈরি করতে চাইছেন। রূপা ঠিকই বলে, মা হলেন অ্যাটেনশন সিকার, সবসময় উনি সবার অ্যাটেনশন চান। বাড়িতে তিনি ছাড়া অন্য কাউকে গুরুত্ব দেওয়া হলেই তিনি খেপে ওঠেন। সুমন কোনও কথা না বলে খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল, তারপর ও উঠে বেডরুমে ঢুকল। দেখল, রূপা চোখের জল মুছতে মুছতে স্যুটকেস গোছাচ্ছে। সুমন অবাক হয়ে তাকাতেই রূপা বলল, 'তোমার মা—র উপর আমার কোনও রাগ হয় না, সুমন, করুণা হয়। উনি নিজের ছেলেকে খুশি দেখতে পারেন না। আমরা সকালে উঠে কালকে কী প্রোগ্রাম করব, কাকে কাকে ইনভাইট করব, এইসব নিয়ে আলোচনা করছি, উনি আমাদের হাসিখুশি থাকাটা সহ্য করতে পারলেন না। ঝামেলা তৈরি করে আমাদের মুখের হাসিটা মুছে দিলেন। যা—ই হোক, আমি দুটো দিন একটু মা—র কাছ থেকে ঘুরে আসি। কিচ্ছু ভালো লাগছে না।'

সুমনেরও চোখে জল এসে গেল—কালকের জন্য সুমন অনেক কিছু ভেবে রেখেছিল। কীভাবে দিনটা সবাই মিলে সেলিব্রেট করবে, কী কী রান্না হবে, সন্ধেবেলা কয়েকজন কাছের লোককে ইনভাইট করবে, রূপাকে কী গিফট দেবে—সব, সব ভেস্তে গেল। ও হতাশ গলায় বলল, 'আর কালকের আমাদের প্রোগ্রামের কী হবে?'

রূপা আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে বলল, 'তুমি কাল ওই বাড়িতে চলে এসো।' তারপর কী ভেবে বলল, 'নাঃ থাক, তোমার মা আবার অশান্তি করবেন। আমরা পরে সেলিব্রেট করব।'

রূপা বাচ্চা দুটোকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল। সারাটা দুপুর সুমনের কিছুই ভালো লাগল না। বিছানায় শুয়ে খানিকক্ষণ এপাশ—ওপাশ করল। তারপর উঠে, টিভি—তে একটা স্পোর্টস চ্যানেল চালিয়ে খানিকক্ষণ বিদেশের দুটো নামী ক্লাবের ফুটবল দেখল।

সন্ধেবেলায় কফি খেতে খেতে টিভি—তে নিউজ দেখছিল সুমন। তারপর আটটা নাগাদ সুমনের একটা ফোন এল। অরুন্ধতী রান্নাঘরে লক্ষ্মীকে নিয়ে লুচি আর মাংসের ঝোল করছিলেন। লক্ষ্মী প্লেটে করে লুচি আর মাংস এনে সুমনকে দিল। সুমন ততক্ষণে বাইরে বেরোবে বলে রেডি। খেতে চাইল না। লক্ষ্মীকে ফিরিয়ে দিল। লক্ষ্মী রান্নাঘরে গিয়ে অরুন্ধতীকে বলল, 'দাদা বেরোচ্ছে, রেডি হয়ে গেছে, এখন খাবে না, এসে খাবে।'

অরুন্ধতী ছুটে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখন আবার কোথায় বেরোচ্ছিস? খেয়ে যা।'

সুমন গাড়ির চাবির রিংটা টেবিলের ওপর থেকে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, 'সিসিডি—তে সৈকতদা এসেছে। একটু আড্ডা মেরে আসি। এসে খাব।' সুমন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।

2007, 4th December – সকাল সাতটা

সারারাত সুমন ঘরে ফেরেনি, ফোন সুইচড অফ। সারাটা রাত দু—চোখের পাতা এক করতে পারেননি অরুন্ধতী। সন্ধেবেলায় ছেলে বেরোল গাড়ি নিয়ে, বলে গেল, সৈকতদার সঙ্গে বেরোচ্ছি। তারপর ফোন সুইচড অফ হয়ে গেল? তোরই বা আক্কেল কী? একবার মা—কে জানাবি না কোথায় গিয়েছিস? রাত বারোটার সময়, দেরি হচ্ছে দেখে, ফোন করেছিলেন সৈকতের মোবাইলে, প্রথমে সৈকত ফোন ধরছিল না, তারপর ফোন ধরে, ঘুম—ঘুম গলায় বলে, যে, সুমন তার সঙ্গে বেরোয়ইনি। আজ সারাদিন ও ঘরেই ছিল। তখনই মনটা যেন কু—ডাক ডেকেছিল। সৈকত বলল বটে, ও ঘুম থেকে উঠে ফোন ধরল, কিন্তু পেছনে যেন খুব হই চই হচ্ছিল। কেউ যেন আর্ত চিৎকার করছিল। অরুন্ধতী ভালো বুঝতে পারলেন না। ওই রাতেই তিনি ফোন করেন রোহিতকে, রোহিত যে ড্রিংক করছিল, সেটা ওর কথা শুনেই বোঝা গেল। ও পরিষ্কার জানিয়ে দিল সুমন ওর সঙ্গে নেই, ও বাড়িতেই আছে। অরুন্ধতীর খুব ইচ্ছে করছিল রূপাকে ফোন করেন, কিন্তু করলেন না। যদি উনি নিজেই জানতে পারেন যে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে সুমন বউয়ের কাছে গিয়ে উঠেছে, আর ফোনটা অফ করে দিয়েছে, তাহলে বুঝতে হবে, ও নিজের মা—কে অ্যাভয়েড করছে। আর যদি দেখা যায়, সুমন নিজের ফোন অফ করে দিয়ে বউয়ের ফোনে কথা বলছে, তাহলে সেটা অরুন্ধতীর হার হবে। কাজেই খুব ইচ্ছে করলেও, তিনি রূপাকে ফোনও করেননি। আর সুমনের সারারাত বাড়ি না—আসাটা জানালেনও না। কিন্তু সকালে আর থাকতে না পেরে, বড়ভাই, রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন বড়কর্তা বিশ্বজ্যোতি মুখার্জিকে ফোন করলেন। বিশ্বজ্যোতিবাবু তখন ঘুম থেকে উঠে সবে চায়ে চুমুক দিয়েছেন, তিনি তো সব শুনে আঁতকে উঠলেন—'দিদি, তুমি কী? সারারাত ছেলে ঘরে ফেরেনি, তুমি চুপ করে বসে আছ? রূপাকে তোমার ফোন করা উচিত ছিল।'

বিশ্বজ্যোতিবাবু ততক্ষণে পরিবারে শাশুড়ি—পুত্রবধূর গণ্ডগোলের আঁচ পেয়ে গিয়েছেন, দিদির কথার মধ্যেই।

'দিদি, তুমি নিশ্চয়ই গণ্ডগোল করেছ। রূপা বাপের বাড়িতে চলে গেছে, তুমি রূপাকে ফোনও করোনি, জানাওনি কিছু, আমার ভালো লাগছে না।'

অরুন্ধতী এবার আর থাকতে পারলেন না, ছদ্ম গাম্ভীর্য সরিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, 'তুইই বল, মা—র ফোন ধরবে না বলে, ছেলে ফোন সুইচড অফ করে, বউয়ের পাশে সারারাত শুয়ে আছে। মা কেমন আছে খোঁজ নিল না, মা খেয়েছে কি না খোঁজ নিল না, রূপার তো উচিত ছিল আমাকে জানানো, যে সুমন তার সঙ্গে আছে।'

বিশ্বজ্যোতি অরুন্ধতীকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'বন্ধুদের ফোন করেছ? ওদের সঙ্গে নেই তো?'

অরুন্ধতী কান্না থামিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, কাল রাতেই সবাইকে ফোন করেছিলাম। ও হ্যাঁ, ওদেরই মধ্যে, সৈকত বলে একটি ছেলে, যে আবার সুমনের একটা বিজনেসের পার্টনার, তাকে আমি যখন ফোন করি, রাত বারোটা—সাড়ে বারোটা নাগাদ, সে বলল বটে, যে সে ঘরেই ঘুমোচ্ছিল—কিন্তু তার ফোনে বিচ্ছিরি সব আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম, এমনকী একটা আর্ত চিৎকারও যেন আমি শুনতে পাই।'

বিশ্বজ্যোতিবাবু বললেন, 'তোমার ফোনে কল রেকর্ডার আছে না? আমাকে ওই রেকর্ডিংটা পাঠাও, আর আমি রূপাকে একবার ফোন করি।'

রূপা তখন স্কুলে বেরোবে বলে রেডি হচ্ছিল। সারারাত সুমনের ফোনে অনেকবার ফোন করেছে, ফোন সুইচড অফ। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে রূপার। সুমন তো কখনো এভাবে ফোন অফ করে দেয় না! রূপা বাপের বাড়িতে বাচ্চাদের নিয়ে এলে যত রাতই হোক, যত কাজই থাকুক ও ফোনে রূপার সঙ্গে, বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলবেই। এমনকী বিদেশে গেলেও ঘুমোবার আগে বাচ্চাদের সঙ্গে কথা ও বলবেই। তা ছাড়া, আজ ওর জন্মদিন, বিয়ের পর থেকে প্রত্যেকবার সুমন সারপ্রাইজ গিফট দেয়। রূপা ভেবেছিল, রাত বারোটার পর সুমন অন্তত একবার ফোন করে উইশ করবে। সুমন তা—ও করেনি। আজ হঠাৎ কী হল সুমনের? একবারও ফোন করল না? এত্ত রাগ? কিন্তু কালকের ঘটনায় ও কী—ই বা করতে পারত? ওর তো কিছুই করার ছিল না। আর আসবার সময় ও তো সুমনের পারমিশন নিয়েই এসেছে। এমনও নয় যে, সুমনকে ও না জানিয়ে চলে এসেছে। রূপা স্কুলে বেরোবে বলে শাড়িটা পরছে—মোবাইলটা অনেকক্ষণ ধরে বাজছে। এই সময় কে করবে? সুমন নয়তো? সারারাত ফোন করেনি। এখন হয়তো বাবুর ঘুম ভেঙে, বাচ্চাদের জন্য মন কেমন করছে। রূপা ছুটে এসে ফোনটা তুলল, বড়মামাশ্বশুরের ফোন। উনি তো ফোন করেন না! অন্তত গত পাঁচ বছরে একবারও করেননি। কী ব্যাপার? রূপা নিজের উত্তেজনা চেপে স্বাভাবিক গলায় 'হ্যালো' বলল।

বড়মামা সংক্ষেপে সুমনের কাল সারারাত বাড়ি না আসার কথাটা বলে বললেন, 'ও কি তোমার কাছে আছে? মা—কে ফোন করতে বলো, আর এক্ষুনি বাড়ি ফিরতে বলো। না না, এ তো ভারী অন্যায়। মা—র উপর রাগ করে সারারাত বাড়ি ফেরেনি, ফোন করেনি, এ কী কথা? ঠিক আছে, মা—র উপর রাগ হতে পারে। কিন্তু ফোনটা কেন অফ করে দেবে?'

রূপার মাথাটা বনবন করে ঘুরছে। হাঁটু দুটো কাঁপছে। ও একটা খারাপ আশঙ্কা করে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'বড়মামা, সুমন আমার কাছে আসেনি, কাল সন্ধে থেকে ওর ফোন অফ, আমি তো ভেবেছি, আমি বাপের বাড়ি এসেছি বলে, ও আমার উপর রাগ করে ফোন অফ করে দিয়েছে। বড়মামা, ওর অনেক শত্রু, আপনি কিছু করুন। ওকে খুঁজে দিন—ও তো এমন করার ছেলে নয়—' রূপার হাত থেকে ফোন পড়ে গেল।

বিশ্বজ্যোতিবাবু রূপার সঙ্গে কথা বলে চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবলেন, রূপার শেষের কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, ওঁর কানে বাজছে। '...সুমনের অনেক শত্রু, ওকে খুঁজে দিন, ও তো এমন করার ছেলে নয়।' না না, এখনই তিনি রূপাকে কোনওরকম সন্দেহ করছেন না। সুমনের কাছ থেকে রূপার অনেক প্রশংসা তিনি শুনেছেন। যদিও দিদি রূপাকে একদমই সহ্য করতে পারেন না। আর প্রথম থেকেই তিনি এই বিয়ের বিরোধী ছিলেন। রূপা কিন্তু কোনওদিনই শাশুড়ির কোনওরকম নিন্দে করেনি। রূপাকে তিনি নিজে খুব পছন্দও করেন। বোল্ড, স্ট্রেট ফরওয়ার্ড, স্বাধীনচেতা, আধুনিক একটি মেয়ে।

দিদি সৈকতের সঙ্গে কথা বলার সময়ের রেকর্ডিংটা পাঠিয়ে দিয়েছেন। রেকর্ডিংটা শুনে, সত্যি সত্যিই বিশ্বজ্যোতির মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। ফোনের উলটোদিকে যেন অনেক শব্দ হচ্ছে। কেউ আর্ত চিৎকার করছে। ছি ছি! দিদি এটা কী করল? কাল রাতেই বিশ্বজ্যোতিকে ফোন করা উচিত ছিল।

তিনি রেকর্ডিংটা থামিয়ে কলকাতার বর্তমান পুলিশ কমিশনার প্রদীপমোহন চক্রবর্তীকে ফোন করলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে, পুরো ঘটনা সংক্ষেপে বললেন। কমিশনার প্রদীপমোহনবাবু বললেন, 'আপনার দিদির বাড়ি কোন জুরিসডিকশনে, স্যার?'

বিশ্বজ্যোতি বললেন, 'গল্ফগ্রিন।'

'আমি এক্ষুনি বাড়িতে পুলিশ পাঠাচ্ছি, স্যার। আর কল রেকর্ডিংটা ওরা সিজ করে নেবে। যা করবার করছি স্যার, আপনি টেনশন নেবেন না।'—পুলিশ কমিশনার বললেন।

বিশ্বজ্যোতি ফোন রেখে ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বললেন—একটা দুশ্চিন্তার কালো মেঘ আস্তে আস্তে বিশ্বজ্যোতিকে গিলে ফেলছে।

যোধপুর পার্ক থেকে একটা ট্যাক্সি ধরে, বাচ্চাদের আর ভাইকে নিয়ে গল্ফগ্রিন চলে এল রূপা। একটা কিছু খারাপ আশঙ্কা করেই ভাইকেও সঙ্গে এনেছে রূপা। যদি দৌড়োদৌড়ি করতে হয়! বসার ঘরেই বসে ছিলেন অরুন্ধতী। রূপার সঙ্গে একটা কথাও বললেন না। রূপা নিজে থেকেই কথা বলল, 'মা, ও কাল কখন বেরিয়েছে? কিছু বলেছে? কার সঙ্গে বেরোচ্ছে? সৈকতদা, রোহিত—ওদের ফোন করেছ? ওর অফিসের ছেলেদের জানিয়েছ? ওরা কোথায়?'

অরুন্ধতী এবার অসহায়ের মতো বললেন, 'কাল আটটা নাগাদ হঠাৎ বেরিয়ে গেল। একটা ফোন এসেছিল। কার সঙ্গে যেন কথা বলছিল। লক্ষ্মী লুচি—মাংস দিয়েছিল। বলল, এসে খাব। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছিস? বলল, সি.সি.ডি.—তে সৈকত এসেছে। দেখা করবে। তারপর থেকেই ফোন অফ। কতবার ওকে ফোন করেছি। রাত বারোটায় সৈকতকে ফোন করলাম। প্রথমে তো ফোন ধরতেই চায় না। তারপর ঘুম থেকে উঠে বলল, ওর সঙ্গে দেখাই হয়নি। রোহিতকে ফোন করলাম, সে—ও কিছু জানে না। আমি তো ভেবেছি, ও তোমার সঙ্গে আছে। আমার উপর রাগ করে, আমার ফোন ধরবে না বলে অফ করে রেখেছে।'—এই বলে হাউ হাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন অরুন্ধতী।

রূপা এবার অরুন্ধতীকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'মা, তুমি ভাবলে কী করে, আমার সঙ্গে ও থাকবে, অথচ তোমাকে সারারাত চিন্তায় রাখবে—তোমাকে ফোন করবে না?'

অরুন্ধতী এবার আরও কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন—'আমার ভয় করছে—আমার ভয় করছে।'

আধঘণ্টার মধ্যে বিশ্বজ্যোতিও চলে এলেন। যাদবপুর থানা থেকে পুলিশও এসে পড়ল। স্বয়ং ও.সি. তাপস ঘোষ নিজে এলেন। তিনি সব শুনলেন। অরুন্ধতী আর রূপার একটা বয়ান নিলেন। বিশ্বজ্যোতি এবার, অরুন্ধতীর কল রেকর্ডটা তাপসবাবুকে শোনালেন। যদিও সৈকত ঘুম—ঘুম ভাব করে কথা বলছে, তবু পিছনে অনেক লোকের চিৎকার, বিশেষত 'আ—আ—আ' করে একটা আর্ত চিৎকার একেবারে স্পষ্ট। রূপা চিৎকার করে বলে উঠল, 'মামা, এটা সুমনের গলা—পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। আপনি সৈকতদাকে অ্যারেস্ট করতে বলুন। ওর কাছ থেকে সুমন পঞ্চাশ লাখ টাকা পেত। ব্যবসার হিসেবে গরমিলটা আমিই ধরেছিলাম।' রূপা জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করেছে।

রূপার বাচ্চা দুটো এক্কেবারে ছোট। তারা গোটা বাড়ি 'পাপা—পাপা' বলে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। আসলে সুমনকে খুঁজছে। লক্ষ্মী এসে ওদের সরিয়ে নিয়ে গেল।

বিশ্বজ্যোতি তাপসবাবুর সঙ্গে একটা স্ট্র্যাটেজি ঠিক করলেন, সৈকত এলে, এখনই ওকে অ্যারেস্ট করা ঠিক হবে না। ওকে ওয়াচ—এ রাখা হবে। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে কথা বলছে—সব। এদিকে, কাল রাতে ও কোথায় কোথায় গিয়েছে, কার সঙ্গে কী কথা বলেছে, সব ফোন ট্র্যাক করে বের করা হবে। অবার এমন হতে পারে যে, সৈকত, সুমনের উধাও হয়ে যাবার ব্যাপারটা কিছুই জানে না। অন্য কেউ এই ঘটনায় জড়িত, বা সুমন নিজেই পারিবারিক অশান্তিতে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে সৈকত, রোহিত, সুমনের অফিসের স্টাফেরা সবাই এসে হাজির হল।

তাপসবাবু, ঘরে, বিশ্বজ্যোতির পাশে বসেই ফোন করে স্থানীয় থানাগুলোতে খোঁজ নিতে লাগলেন—কোথাও কোনও অ্যাক্সিডেন্ট কেস হয়েছে কি না। আর—একজন অফিসারকে বললেন, 'সব হসপিটাল, নার্সিং হোমে খবর লাগাও, কোন অ্যাক্সিডেন্ট কেস ভরতি হয়েছে কি না।' তারপর বিশ্বজ্যোতিকে বললেন, 'স্যার, আপনি তো সবই জানেন, যদি বাড়িতে ঝগড়া করে উনি রাগ করে, স্বেচ্ছায় কোথাও লুকিয়ে থাকেন, তাহলে তো খুঁজে আনা মুশকিল। তবে যদি, ইয়ে মানে, খারাপ কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আমরা জানতে পারব।' তাপসবাবু খুবই অ্যাকটিভ একজন অফিসার।

বিশ্বজ্যোতি শুধু বললেন, 'মি. ঘোষ, বিজনেস রাইভ্যালরি ব্যাপারটা আমাকে ভাবাচ্ছে। আপনি ওই নম্বরটা একটু ট্র্যাক করে দেখুন, কাল রাতে কোথায় ছিল।'

'হ্যাঁ স্যার, আমাকে সুমনবাবুর কয়েকটা ছবি দিন, সব থানায় পাঠিয়ে দিই, আর সি.সি.ডি.—তে একটু খোঁজ লাগাই। এই ভদ্রলোক কালকে সি.সি.ডি.—তে আদৌ গিয়েছিলেন কি না?' তাপসবাবু একজন সাব—ইন্সপেক্টরকে অরুন্ধতীর বাড়িতে ডেপিউট করে বেরিয়ে গেলেন।

বেলা একটা নাগাদ যাদবপুর থানার ও.সি তাপসবাবু বিশ্বজ্যোতিকে ফোন করে জানালেন,—'আনন্দপুর থানা এলাকায় আজ ভোরে একটা ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে অ্যাক্সিডেন্ট মনে করা হলেও পরে দেখা গেছে মার্ডার। বডি এখনও পোস্টমর্টেমে নিয়ে যাওয়া হয়নি। রুবি জেনারেল হাসপাতালে এখনও বডি রাখা আছে। এক্ষুনি গেলে শনাক্তকরণ সম্ভব। তা ছাড়া, ভিকটিমের কিছু পারসোনাল বিলঙ্গিংস, মানে গাড়ির চাবি ইত্যাদি থানাতেই রাখা আছে।'

অরুন্ধতী আর রূপা চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে দিলেন। সৈকত, রোহিত, সুমনের অফিসের ছেলেরা সব কেউ বসার ঘরে, কেউ বাইরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল। সৈকত ঘরে ঢুকে সব শুনে বলল, 'আমার কাছে গাড়ি আছে, আমি এক্ষুনি রুবি জেনারেল হসপিটালে চলে যাচ্ছি।'

সৈকত বেরিয়ে গেল। আধ ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট পর সৈকত ফোন করে জানাল, 'ভয়ের কিছু নেই, এ সুমন নয়।' তা ছাড়া ও আনন্দপুর থানাতেও গিয়েছিল, যে জিনিসগুলি মৃতের বলা হচ্ছে, সেগুলিও সুমনের নয়। বাড়িতে সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। কিছুক্ষণ পরে, তাপসবাবু বিশ্বজ্যোতির ফোনে ফোন করে বললেন, 'স্যার, বডি আইডেন্টিফিকেশনের জন্য কেউ গেছে? আমার কিন্তু মনে হচ্ছে—এই বডিটাই। ছবির সঙ্গে আর বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে।'

বিশ্বজ্যোতি বললেন, 'একজনকে পাঠিয়েছি, সে দেখে বলেছে, না, ওই বডিটা সুমনের নয়।'

তাপসবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'কাকে পাঠিয়েছেন স্যার? সে বিশ্বাসযোগ্য তো?'

বিশ্বজ্যোতিবাবুর মুখ থেকে সৈকতের নাম শুনে বললেন, 'কী করেছেন স্যার? প্রাইম অ্যাকিউজডকেই পাঠালেন স্যার? অন্য কাউকে পাঠান। আমি খারাপ কিছুর আশঙ্কা করছি। তা ছাড়া, সৈকতবাবুর ফোন ট্র্যাক করে পাচ্ছি—কাল রাত সাড়ে ন—টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত মল্লিকবাজারে একটা গাড়ির গ্যারেজের ভেতরে ছিল ও। ও যে সুমনবাবুর মা—কে বলেছে, বাড়িতে ঘুমোচ্ছে, সে ব্যাপারটা ডাহা মিথ্যা। একবার বডি আইডেন্টিফিকেশন হোক, সৈকতকে অ্যারেস্ট করে নেব।'

বিশ্বজ্যোতিবাবু তাপসবাবুর সমস্ত কথা অরুন্ধতী আর রূপাকে না বলে, শুধু বললেন, 'রূপা, তোমার ভাইকে আমার গাড়িটা নিয়ে এক্ষুনি রুবি হসপিটালে পাঠাও তো—এক্ষুনি, এক্ষুনি।'

রূপা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, 'মামা, কী হল, এই যে সৈকতদা বলল—ভয়ের কিছু নেই—'

বিশ্বজ্যোতি চুপ করে রইলেন। রূপার ভাই রুদ্র বিশ্বজ্যোতির গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।

ঘণ্টাখানেক পর রুদ্র কাঁদতে কাঁদতে বিশ্বজ্যোতিকে ফোন করল, 'মামা, সব শেষ। সুমনদাকে ওরা নৃশংসভাবে মেরেছে। সারা গায়ে ছুরি চালিয়েছে।'

আধ ঘণ্টা পর তাপসবাবু আবার এলেন, বাড়িতে তখন কান্নার রোল, রূপা স্থাণুর মতো বসে আছে। কোনও শব্দ নেই মুখে। ওর সব স্বপ্ন শেষ। বাচ্চাদের মানুষ করবে কীভাবে?

তাপসবাবু সবাইকে ডেকে বললেন, আজ সকালে ধাপার ধারে একটা লরি থেকে সুমনবাবুকে ছুড়ে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যায়। তখনও প্রাণ ছিল। ভোরবেলায় সাইকেল নিয়ে যেতে যেতে দু-জন ওঁকে দেখেন, তাঁরাই পুলিশে খবর দেন— মৃত্যুর আগে পর্যন্ত উনি বলেছেন—'আমার দুটো ছেলে আছে, আমাকে বাঁচাও।' ওঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে, উনি কোথায় থাকেন, বা ওঁর ঠিকানা কী? উনি বলছিলেন—'গল্ফগ্রিন', সেটাই পুলিশ বা ওই পথচারীরা শুনেছে 'গল গীম,' সেইজন্যই ওঁর আইডেন্টিটি বোঝা যাচ্ছিল না। তা ছাড়া মার্ডারার এত ক্লেভার, সে সুমনবাবুর চাবির রিংটা থেকে চাবিটা আলাদা করে পকেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে, আর রিংটা ফেলে দিয়েছে। তা ছাড়া সৈকতবাবু আগেই রুবি জেনারেল হসপিটালে গিয়ে বডি দেখে নিয়েছিলেন। আনন্দপুর থানাতেও গিয়েছিলেন উনি, মিউজিক্যাল লাইটারটা দেখেও উনি ইচ্ছে করে বলেছিলেন যে এটা সুমনবাবুর নয়। আসলে, এত তাড়াতাড়ি যে বডি আইডেন্টিফিকেশন হয়ে যাবে, সেটাও উনি ভাবেননি। যা—ই হোক, একটা ফর্ম্যাল কমপ্লেইন্ট আমি সুমনবাবুর মা—কে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছি, একটা মার্ডার কেস আমরা শুরু করছি। আর সৈকতবাবু ফোন অফ করে লুকিয়ে পড়েছেন। হুঃ, যাবেন কোথায়? ওঁকেও অ্যারেস্ট করে নিচ্ছি। আর যদি কাউকে সন্দেহ হয়, তাহলে বলবেন।'

সাংবাদিকরা কোথা থেকে খবর পেয়ে চলে এল—রূপাকে আর অরুন্ধতীকে প্রশ্ন করে করে নাজেহাল করে দিল। রূপাকে জিজ্ঞেস করল, 'আজকে তো আপনার জন্মদিন, মৃত্যুর আগে আপনাকে উইশ করেছিল? আপনাদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল? ঝগড়া হত? পাঁচ বছরে ঝগড়া হয়নি?'

'বিশেষ খবর' বলে একটা প্রোগ্রাম খুব জনপ্রিয়। দিনে তিনবার হয়। সেই বিশেষ খবরের একজন মহিলা সাংবাদিক কোত্থেকে খবর পেয়েছেন, সৈকতের সঙ্গে রূপার সখ্য ছিল, সুমনের ব্যবসার হিসেবপত্তরও দেখত রূপা। আবার রূপাই ব্যবসার একটা গরমিলও ধরে ফেলেছিল। তারা তো রূপাকে সরাসরি প্রশ্ন করল, 'আপনার সঙ্গে সৈকতবাবুর সম্পর্ক তো ভালো ছিল, আপনারা গাড়িতে একসঙ্গে বহুবার বেরিয়েছেন, আপনি গাড়িতে সৈকতবাবুর বাঁদিকে বসে বহু জায়গায় গেছেন।'

এবার রূপার নার্ভ ফেল করল। সকাল থেকে খাওয়াদাওয়া নেই। ঝড় বয়ে যাচ্ছে শরীর ও মনের উপর দিয়ে। সদ্য স্বামীহারা হয়েছে, শুধু তা—ই নয়, স্বামীকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে।

রূপা আর থাকতে না পেরে চিৎকার করে উঠল, 'কী বলছেন আপনারা? হ্যাঁ, আমার স্বামী বলেছিল বলেই আমি ব্যবসার হিসেব দেখতাম। পঞ্চাশ লাখ টাকার গরমিলটা আমিই ধরি। আর সৈকতদার পাশে বসে আমি কোথাও ঘুরতে যাইনি, ব্যবসার কাজে বেরিয়েছি। কখনো ট্রেড লাইসেন্স জমা দিতে, কখনো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের অফিসে। আপনাদের কি ধারণা, আমি এসবে জড়িত?'

ব্যস, আর যায় কোথায়?

'বিশেষ খবর' অনুষ্ঠানটা লাইভ টেলিকাস্ট শুরু করে দিল—'তাহলে, খুনের নেপথ্যে কী? শুধুই ব্যবসায়িক শত্রুতা, নাকি অন্য কিছু? আমাদের কাছে খবর আছে, মৃত সুমনবাবুর স্ত্রী—কে বহুবার দেখা গেছে প্রাইম অ্যাকিউজড সৈকত দত্তর গাড়িতে, পাশাপাশি বসে তাঁরা যাচ্ছেন, তা ছাড়া রূপাদেবী যে সৈকতবাবুর পাশে বসে বহু জায়গায় গেছেন, সেটা তিনিও আমাদের সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন, আমাদের এক্সক্লুসিভ নিউজ—এটা কি শুধুই ব্যবসায়িক শত্রুতা? নাকি ত্রিকোণ প্রেম?' 'বিশেষ খবর—এর নিউজ রিডার, দিনে তিনবার, এই খবরটাই ঘুরিয়ে—ফিরিয়ে 'এক্সক্লুসিভ' বলে টেলিকাস্ট শুরু করে দিল।

2007, 5th December—রাত এগারোটা

গতকাল থেকে খাওয়াদাওয়া, বাড়িসুদ্ধ কারও হয়নি, বাচ্চাগুলো কী বুঝেছে কে জানে। 'পাপা—পাপা' করে কেঁদেই যাচ্ছে। গতকাল রূপার চোখে এক ফোঁটা জল ছিল না। ও পাথর হয়ে গিয়েছিল। পোস্টমর্টেম থেকে 'বডি' পেতে পেতে আজ সকাল হয়ে গেল। সুমনের স্থির দেহটা গল্ফগ্রিনের বাড়িতে আনা হয়েছিল, সাদা কাপড়ে মোড়া, সুমনের দেহটা দেখামাত্র রূপা সুমনের নিস্পন্দ দেহের উপর আছড়ে পড়ে।

সব মিটতে মিটতে সন্ধে হয়ে যায়। অরুন্ধতী কাল থেকে কিচ্ছু খাননি। লক্ষ্মীদি একটু গ্লুকোজের জল করে অরুন্ধতী আর রূপা, দু—জনকেই খাইয়ে গিয়েছে।

অরুন্ধতী কাল রাত থেকে নিউজ চ্যানেলগুলো, বিশেষত 'বিশেষ খবর' অনুষ্ঠানটা দেখে যাচ্ছেন। ওরা মূলত অ্যাটাক করেছে রূপাকে। ওদের ধারণা, সৈকতের সঙ্গে মিলে রূপাই সুমনকে খুন করিয়েছে। এটা ত্রিকোণ প্রেমের গল্প। আজ অনেক কাগজেও এই কথাই লিখেছে। কাল রাত থেকে অরুন্ধতী রূপার সঙ্গে একটা কথাও বলেননি।

আজ বাচ্চাদের নিয়ে একতলার বেডরুমে একটু তাড়াতাড়িই ঢুকে এসেছে রূপা। বাচ্চাদের ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেও কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, মনে নেই।

দোতলার ঘরে বসে, 'বিশেষ খবর' প্রোগ্রামটা দেখতে দেখতে অরুন্ধতীর গা রাগে কাঁপছে। সাংবাদিকরা বারে বারে বলছে, 'তবে কি এটা ত্রিকোণ প্রেমের ফল?' সৈকতের সঙ্গে গাড়িতে করে ঘুরে বেড়িয়েছে রূপা। ঠিক। এ কথা তো উনিও বলেছিলেন সুমনকে—'বাবা, নজর রাখ, বউয়ের দিকে নজর রাখ,' কিন্তু বউয়ের প্রেমে মত্ত সুমন তাঁর কথা শোনেনি—'উফফ, কী নৃশংসভাবেই না মেরেছে আমার ছেলেটাকে। শেষ মুহূর্তেও নাকি সুমন বলার চেষ্টা করেছে, ওর বাড়ি গল্ফগ্রিনে। আর ওর দুটো বাচ্চা ছেলে আছে।'

নাঃ, শরীর কাঁপছে। এর একটা বিহিত করতেই হবে। 'আমার ছেলের খুনিকে সাজা দিতেই হবে।' পাশে রাখা ফোনটা তুলে নিয়ে বিশ্বজ্যোতিকে ফোন করলেন।

বিশ্বজ্যোতি জেগেই ছিলেন। এত রাতে দিদির ফোন পেয়ে চমকে উঠে ফোন ধরে বললেন, 'দিদি বলো, এত রাতে? শরীর ঠিক আছে তো? রূপা ঠিক আছে? বাচ্চারা?'

অরুন্ধতী ওসব কথার উত্তর না দিয়ে কেটে কেটে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, 'তুমি টিভি—তে ''বিশেষ খবর'' দেখছ? আমি যা বলেছিলাম, ওরাও তা—ই দেখাচ্ছে।'

বিশ্বজ্যোতি বললেন, 'ওদের কথা বাদ দাও দিদি। তুমি টিভি দেখছ? তুমি কি পাগল? যার ছেলে চলে গেছে, সে টিভি দেখে? কিছু খেয়েছ? খেয়ে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো। আমি রূপাকে বা লক্ষ্মীকে ফোন করে বলে দিচ্ছি। ওরা না হয় তোমাকে একটা ঘুমের ওষুধ দিক। ঘুমটা আসবে।'

অরুন্ধতী এবার চিৎকার করে উঠলেন, 'আমার ছেলে চলে যায়নি, ওকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আর ওই যে শনি—ঘরে শনি ঢুকে বসে আছে! তুমি বলছ, ও ঘুমের ওষুধ দেবে আমাকে? ও আমার ছেলেকে খেয়েছে, এবার আমাকে খাবে।' তারপর একটু থেমে বললেন, 'আমি নিশ্চিত, রূপাও এই খুনে যুক্ত। ওকেও অ্যারেস্ট করাও।'

বিশ্বজ্যোতি নিজের দিদিকে খুব চিনতেন, তিনি যে রূপাকে একদমই পছন্দ করেন না, সেটাও জানতেন। তা—ই বলে এত ক্রোধ? এত হিংসা? এতটা ভাবতে পারেননি।

উনি বললেন, 'দিদি, শান্ত হও, এটা কোরো না। ওই মেয়েটা কিছু জানে না। তুমি ওকে পছন্দ করো না, ঠিক আছে। আমি ওকে বলব, ও বাড়ি ছেলে চলে যাবে। কিন্তু, এই বাড়াবাড়িটা কোরো না। তা ছাড়া, বাচ্চাগুলোর কথা ভাবো।'

'বাচ্চারা এই বাড়ির। ওদের আমি মানুষ করব। ওই মেয়েটা, ওই সৈকতের সঙ্গে ফস্টিনস্টি করে বেড়াত, টিভির খবরেও তো দেখাচ্ছে। ওরা কি ভুল দেখাচ্ছে?'—অরুন্ধতী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

বিশ্বজ্যোতি আবার বলার চেষ্টা করলেন, 'বাচ্চাগুলো সবে বাবাকে হারিয়েছে, এরপর মা জেলে গেলে ওদের উপর কী প্রভাব পড়বে, বুঝতে পারছ? বাচ্চারা কোনওদিন মানুষ হবে না, আমি আমার এত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। শান্ত হও দিদি, যাও, ঘুমোও এবার।'

অরুন্ধতী এবার অত্যন্ত শান্ত স্বরে বললেন, 'তাহলে আমাকেই করতে হবে যা করবার। আমি যাদবপুর থানায় এক্ষুনি ফোন করছি।'

বিশ্বজ্যোতি হতাশ গলায় বললেন 'তোমার যা খুশি করো। এবার আমাকে নিস্তার দাও।'—এই বলে ফোন কেটে দিলেন।

অরুন্ধতী এবার ফোন করলেন যাদবপুর থানার ও.সি.—কে। ও.সি তাপস ঘোষ বিচক্ষণ মানুষ, উনি বেশ বুঝতে পারছিলেন, এই কেসে কোথাও একটা শাশুড়ি—বউমার দ্বন্দ্ব, তীব্র অপছন্দের ব্যাপার লুকিয়ে আছে। আবার পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন বড়কর্তার ভাগনে, সমাজের বিশিষ্ট এক তরুণ ব্যবসায়ী খুন হয়েছেন, স্বয়ং কমিশনার এই মামলার তদ্বির করছেন, আর সবচেয়ে বড় কথা, মিডিয়া উঠে—পড়ে লেগেছে এই মামলা নিয়ে। কাজেই সাবধানে পা ফেলতে হবে। অত রাত্রে, প্রাক্তন পুলিশকর্তার দিদির ফোন পেয়ে তিনি ফোন ধরলেন।

অরুন্ধতী বললেন, 'এই মামলায় একটা ত্রিকোণ প্রেমের ব্যাপার আছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার পুত্রবধূই সৈকত দত্তর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে আমার ছেলেকে খুন করেছে, মিডিয়াও তা—ই বলছে। আপনি এক্ষুনি আমার পুত্রবধূকে অ্যারেস্ট করুন। এখন ও ঘরেই আছে। আমার ধারণা, ও কাল ভোরেই পালিয়ে যাবে।'

তাপসবাবু বললেন, 'আপনি নিশ্চিত ম্যাডাম? তাহলে আমি বাড়িতে মহিলা পুলিশ পাঠাচ্ছি। আপনাকে কিন্তু এই মর্মে একটা বয়ান দিতে হবে। আপনি বয়ান দিলে তবেই অ্যারেস্ট করব।'

অরুন্ধতী দৃঢ় অথচ শান্ত স্বরে বললেন, 'আমি আমার পুত্রবধূর বিরুদ্ধে বয়ান দিতে রাজি আছি।'

রাত দেড়টায় বাড়িতে পুলিশ ঢুকল। লক্ষ্মীদি ডোরবেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলে দিলেন। যাদবপুর থানার ডাকাবুকো মহিলা পুলিশ অফিসার মিনতি দত্তর নেতৃত্বে একদল মহিলা পুলিশ হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলেন।

মিনতি দত্ত, দেখতে সুন্দরী এবং পুলিশের পোশাকে তাঁকে আরও সুন্দরী লাগছে। কিন্তু এলাকার অপরাধীরা জানে, তাঁর গায়ে কী অমানুষিক জোর, তাঁর হাতের রদ্দা যারা খেয়েছে, তারা এক সপ্তাহ ঘাড় নাড়াতে পারে না।

মিনতি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সরাসরি অরুন্ধতীকেই জিজ্ঞেস করলেন, 'ম্যাডাম, আসামি কোথায়? কিন্তু তার আগে আপনার একটা বয়ান আমি রেকর্ড করব। আপনি যদি বলেন, যে আপনার পুত্রবধূ এই খুনে জড়িত এবং আপনি নিশ্চিত, তবেই আপনার পুত্রবধূকে আমি অ্যারেস্ট করব।'

অরুন্ধতী দোতলায় তাঁর নিজের শোবার ঘরে এতক্ষণ পুলিশ আসার অপেক্ষাই করছিলেন, তিনি পুলিশ বাড়িতে ঢুকতেই, তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে, দোতলার ল্যান্ডিংয়ে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর দু—চোখ দিয়ে ক্রোধ ঠিকরে বেরোচ্ছে। তিনি শুধু ডান হাতটা তুলে রূপার শোবার ঘরটা দেখিয়ে দিলেন। মিনতি অরুন্ধতীর বয়ান রেকর্ড করে সোজা রূপার ঘরের দরজায় গিয়ে ধাক্কা মারলেন।

ক্লান্ত শরীরে, রূপার ঘুমটা একটু গাঢ়ই হয়েছিল। হঠাৎ দরজায় দুমদাম আওয়াজ শুনে ও ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। ক্ষণিকের জন্য ওর মনে হল সুমন এল বুঝি! তাহলে কি সুমন মারা যায়নি? ও ফিরে এসেছে? দরজা বন্ধ দেখে, জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা মারছে! ও বিছানায় উঠে বসে বুঝবার চেষ্টা করল, এখন কি অনেক রাত? নাকি ভোর হয়েছে! কিন্তু, এরকম দুমদাম করে দরজায় ধাক্কা মারছে কে? বাচ্চাদের ঘুম ভেঙে যাবে তো।

রূপা দরজা খুলতেই, মিনতি দত্তর শক্ত হাত এসে পড়ল ওর ঘাড়ে।

রূপা ঘুম ভেঙে উঠে, ঘরের মধ্যে এত পুলিশ দেখে হকচকিয়ে গেল। ও কল্পনাতেও আনতে পারেনি, যে, এই মাঝরাতে পুলিশ এসে ওকেই টানাহ্যাঁচড়া করবে! ও অসহায়ের মতো বলল, 'এ কী! ঘাড়ে হাত দিচ্ছেন কেন? টানছেন কেন? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? ছাড়ুন, ছাড়ুন।'

অরুন্ধতী দোতলার ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মীকে হুকুম দিলেন, 'লক্ষ্মী, বাচ্চাদের ঘুম থেকে তুলে আমার কাছে নিয়ে এসো।'

লক্ষ্মীর বড়লোক বাড়ির এই রকমসকম একটুও ভালো লাগছিল না। এ কী অনাচ্ছিষ্টি রে বাবা! মেয়েটা সবে বিধবা হয়েছে, তাকে পুলিশে না দিলে চলছিল না? তা ছাড়া পাঁচ বছর ধরে তো দিদিমণিকে দেখছে সে, দাদাবাবুর সঙ্গে খুব ভাব ছিল। একদিনের জন্যও দাদাবাবুর সঙ্গে ঝগড়া করেনি দিদিমণি। দু—জনে, দু—জনকে চোখে হারাত। তা ছাড়া দিদিমণি একটা ইংরেজি স্কুলে পড়ায়, ব্যবসার কাজে আসতেই চাইত না। দাদাবাবুই বরং দিদিমণিকে জোর করে ব্যবসার কাজে আনতে চাইত, বলত, 'সবাই আমাকে ঠকায়, তুমি পাশে থাকলে ওরা ঠকাতে পারবে না।'

উলটে মা—ই দিদিমণিকে সহ্য করতে পারতেন না।

লক্ষ্মীকে বলতেন 'লক্ষ্মী, ঘরে কালসাপ পুষছি রে—ছেলে বিয়ে দিয়ে বউও পেলাম না, ছেলেও হারালাম।

লক্ষ্মী উলটে মা—কে বলত, 'না মা, তোমার ছেলের বউ একেবারে দুগ্গাপ্রতিমা। ও—ই তোমাদের সংসারের হাল ধরবে।'—এই শুনে মা আরও রেগে যেতেন।

লক্ষ্মী আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বাচ্চাদের ঘুমন্ত অবস্থা থেকে তুলে অরুন্ধতীর বিছানায় শুইয়ে দিয়ে এল।

রূপা তখন অরুন্ধতীর পায়ে এসে পড়েছে, আছাড়িপিছাড়ি করে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, 'মা, আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে পুলিশে দেবেন না, আমি সুমনকে মারিনি, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি সুমনকে সৈকতদার সঙ্গে ব্যবসা করতে বারণ করেছিলাম। ওই ব্যবসা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বলেছিলাম। ও বলেছিল, ওই পঞ্চাশ লাখ টাকা পেয়ে গেলেই ব্যবসা ছেড়ে দেবে। মা, আমাকে বাঁচান, আমার বাচ্চাদের কী হবে? আপনার যেমন ছেলে গেছে, আমিও তো স্বামীকে হারিয়েছি।' অরুন্ধতী পাথরের মূর্তির মতো স্থির। চোখের পলকও পড়ছে না।

লক্ষ্মী আর থাকতে না পেরে, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ওর ঘরে ঢুকে গেল।

অরুন্ধতী এবার ঋজু স্বরে মিনতি দত্তকে বললেন, 'নিয়ে যান ওকে।'

মিনতি রূপাকে সিঁড়ি থেকে তুলে পিঠে ধাক্কা মারতে মারতে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে গিয়ে তুললেন—ততক্ষণে আশপাশের বাড়ির জানালা থেকে অনেকেই মুখ বাড়িয়েছে, একটা ফিসফিসানি ছড়িয়ে পড়ল—'ও, বুঝেছি, বাড়ির বউটাই খুন করেছে—ত্রিকোণ প্রেম, বুঝলে না? ত্রিকোণ প্রেম। ছি ছি! বউ হয়ে বরটাকে ওভাবে মারলি?'

2007, 6th December

প্রতিটা খবরের কাগজ হেডলাইন করেছে—'ত্রিকোণ প্রেমের ফল, দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত আবাসনে প্রেমিকের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে স্বামীকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছেন স্ত্রী।' তারপর রসালোভাবে লেখা হয়েছে, কীভাবে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষিকা, সুন্দরী রূপা ব্যানার্জি (রায়) স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, প্রথমে ব্যবসায় স্বামীর পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ক্ষতি করান, তারপর স্বামী টাকা ফেরত চাওয়াতে, স্বামীকেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেন ছক করে, প্রেমিকের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে।

রুদ্র হাউ হাউ করে কাঁদছিল। দেবযানী পাশের ঘরে বিছানায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। রুদ্র কী করবে এখন? কতই বা বয়স ওর, চব্বিশ—পঁচিশ। খুব অসহায় লাগছে ওর। প্রিয় জামাইবাবু খুন হয়ে গিয়েছেন, দিদিকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছে। খবরের কাগজ জুড়ে দিদিকে নিয়ে কেচ্ছা! খবরের কাগজ খোলা যাচ্ছে না। টিভি—তে দিদিকে নিয়ে যা—খুশি বলছে! মা ঘন ঘন অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন, ও কী করবে? প্রতিবেশীদের সামনে মুখ দেখানো যাচ্ছে না। সব দরজা—জানলা বন্ধ করে ওরা চোরের মতো ভেতরে রয়েছে।

রুদ্র বুঝতে পারছে, সাংবাদিকদের এই খবরগুলো সাপ্লাই করেছেন দিদির শাশুড়ি। প্রথম থেকেই দিদিকে উনি পছন্দ করতেন না, হিংসে করতেন। একে ওরা বাঙাল, দিদির শ্বশুরবাড়ি ঘটি। ওরা অব্রাহ্মণ, তাঁরা আবার কুলীন ব্রাহ্মণ। তারপর দিদি স্বাধীনচেতা, শিক্ষিতা, জামাইবাবু তো একেবারে দিদি অন্ত প্রাণ ছিলেন।

রুদ্র এখন কী করবে? কিচ্ছু মাথায় আসছে না। ও অনেক ভেবে, ওর ইউনিভার্সিটির একজন সিনিয়র দাদাকে ফোন করল। তিনি কাগজ পড়ে, টিভি—তে দেখে সবই জানতেন। রুদ্র সংক্ষেপে তাঁকে সত্যি ঘটনাটা বুঝিয়ে বলল। তিনি বললেন, 'এক্ষুনি একজন লইয়ার লাগবে। নিয়ম হচ্ছে, কাউকে অ্যারেস্ট করলে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কোর্টে প্রোডিউস করতে হয়। সেই অনুযায়ী, আজকেই ওঁকে আলিপুর কোর্টে প্রোডিউস করার কথা। এক্ষুনি কোনও ল'ইয়ার লাগবে।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, রুদ্র কোনও ল'ইয়ার চেনে কি না?

রুদ্র বলল, 'না', 'আমরা তাহলে কোর্টে গিয়ে কোনও লইয়ার ঠিক করে নেব। তুমি তাহলে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ো, আমার সঙ্গে কোর্টে চলো দাদা, আমি একা ঠিক ম্যানেজ করতে পারব না।' তিনি রাজি হতেই রুদ্র উঠে পড়ল।

এখন তাকে শক্ত হতেই হবে। দিদির পাশে দাঁড়াবার মতো সে ছাড়া আর কেউ নেই। সে বেশ বুঝতে পারছে, এই লড়াই তার একার লড়াই। আত্মীয়স্বজন এর মধ্যেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বাজে বাজে কথা বলছে। পাড়া—প্রতিবেশীদের তো আর মুখ দেখানোই যাবে না। সব চেয়ে চিন্তা, টাকাপয়সা আসবে কোথা থেকে। মা—র সঙ্গে সব কথা শেয়ারও করা যাবে না।

ও উঠে গায়ে একটা জ্যাকেট দিয়ে নিল। সাধারণত মাফলার, টুপি, এসব ও পরে না। কিন্তু আজকে একটা মাফলার বের করে মুখটা ঢেকে নিল, কেউ যেন চিনতে না পারে। গোটা পাড়াতে আজ একটাই আলোচনা, 'রূপা প্রেমিকের সঙ্গে ছক করে বরকে নৃশংসভাবে খুন করেছে!' ছি ছি ছি, কী করবে ও, তাহলে কি কোর্ট থেকে ফেরার সময় বিষ কিনে আনবে? মা—কে খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়ে ও নিজেও বিষ খেয়ে নেবে?

নাঃ, তা করবে না, তাহলে সত্যি ঘটনা কোনওদিন কেউ জানতেই পারবে না। দিদির পাশে থাকতেই হবে, দিদিরও তো মা আর ও ছাড়া আর কেউ রইল না। বাচ্চাদের আর কোনওদিন পাওয়া যাবে?

ও, রান্নাঘরে গিয়ে চা করল। মা—কে চা আর মুড়ি খাওয়াল, নিজেও খেল। সামনে অনেক লড়াই বাকি। এ লড়াই জিততেই হবে। তারপর মা—কে বলল, 'মা, কোর্টে যাচ্ছি, উকিল ঠিক করতে হবে, তুমি ঘরে একা থাকো, সাবধানে থেকো।' বলতে বলতে মা—কে জড়িয়ে ধরে ও কেঁদে ফেলল।

কোর্টে ঢুকেই বুঝতে পারল, যে কী ভীষণ ঝামেলায় ওরা জড়িয়েছে! সাংবাদিকরা, টিভি চ্যানেলের লোকেরা, সবাই ভিড় করে রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনের সদস্যরা প্ল্যাকার্ড নিয়ে কোর্টের সামনে জমায়েত করছে। তাদের দাবি—'সুমন ব্যানার্জির হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।' 'রূপা রায় নারীজাতির কলঙ্ক।' ইত্যাদি। কোর্ট চত্বরে উপস্থিত লোকেরা ওকে চেনে না, তাই বাঁচোয়া, কিন্তু তাদের কুৎসিত মন্তব্যে রুদ্রর বুকটা ভেঙে যাচ্ছিল।

ওই দাদা চলে এসেছেন, দু—জনে মিলে মোটামুটি নামকরা একজন লইয়ারের সেরেস্তায় গিয়ে, তাঁর সঙ্গে আলাপ করে, তাঁকে সব বুঝিয়ে বলা হল। ভদ্রলোকের নাম রাজা সেন।

তিনি সব শুনে বললেন, 'আজকে তো জামিন হবার আশাই নেই। আজকে রূপা রায়কে কোর্টে প্রোডিউস করা হবে। পুলিশ এই কেসে অবশ্যই পুলিশ কাস্টডিই চাইবে। পুলিশ চোদ্দো দিনের রিম্যান্ড চাইলেও দশ দিনের পুলিশ কাস্টডি তো হবেই। তা ছাড়া, পেপার হাইলাইটেড কেস, মিডিয়া রূপা ব্যানার্জি আর সৈকত দত্ত, দু—জনকেই ছিঁড়ে খাবে। আর ট্রায়াঙ্গুলার লাভ—র গল্পটাও পাবলিক বেশ ভালোই খেয়েছে। সবচেয়ে বড়ো কথা, পুলিশের প্রাক্তন বড়কর্তার ভাগনে খুন হয়েছেন, এই মামলায় কোনওদিনও রূপা রায়ের জামিন হবে কি না সন্দেহ।'

বেলা দুটোর পর দিদিকে কোর্টে আনা হল। প্রিজন ভ্যান থেকে দিদিকে অন্য পুলিশেরা ধরে ধরে নামাল। দিদির মুখটা একটা বালিশের খোল দিয়ে ঢাকা দেওয়া, চোখের জায়গায় শুধু দুটো ফুটো, ভ্যান থেকে নামানোমাত্র সাংবাদিকরা ছেঁকে ধরল, 'বলুন, বলুন, আপনি আপনার স্বামীকে খুন করেছেন?' 'কীভাবে মেরেছেন? ছুরি দিয়ে?' 'সৈকত দত্তর সঙ্গে কি আপনার প্রেমের সম্পর্ক?' 'সৈকত দত্তর সঙ্গে আপনি কি নিয়মিত সহবাস করতেন?' পুলিশ দিদিকে ধাক্কা দিতে দিতে কোর্টের ভেতরে নিয়ে গেল।

রুদ্রর চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এল। সারাজীবন যে মেয়ে ভালো পড়াশোনায়, স্ট্যান্ড করে এসেছে, আজীবন বাবা—মা যার গায়ে এতটুকু আঁচড় পড়তে দেয়নি, বাবা—মা—র চোখের মণি, তার আজ এ কী অবস্থা? ভাগ্যিস বাবা বেঁচে নেই, তাহলে এই দৃশ্য দেখলে হার্ট অ্যাটাক করেই মরে যেতেন।

দিদির পেছন পেছনই সৈকত দত্তকেও একইভাবে ভ্যান থেকে নামানো হল, তারপর পুলিশের লোকেরাই ধাক্কা মারতে মারতে তাকে কোর্টের ভেতরে নিয়ে গেল। উপস্থিত লোকেদের মধ্য থেকে আবার একটা চিৎকার উঠল, সে চিৎকার রাগের, ঘেন্নার।

ওর মাথা ঘুরছে। পা দুটো টলছে। ও মাফলারে মুখটা ঢেকে আলিপুর কোর্টের বাইরে বেরিয়ে সামনে যে বাস পেল, তাতেই উঠে পড়ল। ও যে কোন বাসে উঠল, সেটা খেয়াল করার মতো মনের জোরও ওর ছিল না। বাসে ওঠার অনেক পরে ও খেয়াল করল, এই বাসটা যোধপুর পার্ক যাচ্ছে না। আসলে ও কোর্ট থেকে পালাতে চাইছিল—দূরে দূরে।

ও সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের মুখটায় বাস থেকে নেমে পড়ল। এখান থেকে লেকের মধ্য দিয়ে ও বরং হেঁটে হেঁটেই যোধপুর পার্ক চলে যাবে।

শীতের বিকেল। ঝপ করে অন্ধকার নেমে এল। ও লেকের ভেতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করল গোলপার্কের দিকে।

দিদিকে যখন আসামির কাঠগড়ায় তুলে মুখের ঢাকনাটা খুলে দিল, দিদিকে যে কী অসহায় দেখাচ্ছিল—ওই পরমা সুন্দরী রূপ, ওই ফরসা গায়ের রং যেন কালো হয়ে গিয়েছে, ফ্যালফ্যাল করে কোর্টে উপস্থিত সবার দিকে তাকাচ্ছিল। এর আগে রূপা বা রুদ্র, কোনওদিনই কেউ কোর্টের চৌকাঠ মাড়ায়নি। রুদ্র এই প্রথম কোর্টে পা রাখল। কিন্তু, দিদি তো একেবারে প্রিজন ভ্যানে করে, আসামি হিসেবে কোর্টে ঢুকল! কোর্ট চত্বরে হাজির সাধারণ মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির চিৎকার, মুখ খারাপ করে গালাগালি, পুলিশের ধাক্কা, তারপর আসামির কাঠগড়ায় ওঠা—সব মিলিয়ে সদ্যবিধবা রূপাকে আরও বিহ্বল, অসহায় করে তুলেছিল। রূপা ভিড়ের মধ্যে রুদ্রকেই বোধহয় খুঁজছিল। দূরে, এক কোণে রুদ্রকে ভয়ে জড়সড় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল, বোধহয় বলতে চাইছিল —'ভাই, বিশ্বাস কর, আমি কিচ্ছু জানি না, ওরা জোর করে আমাকে ধরে এনেছে। আমাকে ছাড়িয়ে বাড়ি নিয়ে চল।' দিদিকে কাঁদতে দেখে রুদ্রও কোর্টের মধ্যে কাঁদতে শুরু করেছিল।

কোর্টে সরকারি উকিল রূপার লইয়ারকে কিছু বলতেই দেননি, রূপার লইয়ার জামিন চাওয়ামাত্র সরকারি উকিল চিৎকার করে ওঠেন এবং কোর্টকে বলেন, 'হুজুর, এ এক জঘন্য চক্রান্ত করে নৃশংস হত্যা। আসামি রূপা রায় ওরফে ব্যানার্জি, নিজের রূপকে ব্যবহার করে, প্রথমে ধনী ব্যবসায়ী সুমন ব্যানার্জিকে প্রেমে ফাঁসান। তারপর সুমন ব্যানার্জিকে বিয়ে করে সম্পত্তি ও অর্থের লোভে, সুমন ব্যানার্জিরই বন্ধু কাম বিজনেস পার্টনার সৈকত দত্তর সঙ্গে ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ঘটিয়ে নিজের স্বামীকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, সারা গায়ে চোদ্দোটা শার্প কাটিং ইনজুরি বা ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। সৈকত দত্ত ও ষড়যন্ত্রকারিণী রূপা রায় ওরফে ব্যানার্জি, দু—জনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুনের মোটিভ পরিষ্কার। মার্ডারিং ওয়েপন, অর্থাৎ যে অস্ত্রের মাধ্যমে খুনটা করা হয়েছে, তা এখনও রিকভার করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া এই ঘটনায় আরও অনেকের যুক্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদেরও খোঁজা চলছে। তাই চোদ্দো দিনের রিমান্ড প্রয়োজন দু—জনেরই।' কোর্টের মধ্যেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মেম্বাররা দৃষ্টান্তমূলক সাজা অর্থাৎ ফাঁসির দাবিতে চিৎকার শুরু করল। জজ সাহেব, সবাইকে থামিয়ে দিলেন। দিদির জন্য ঠিক করা লইয়ার ভদ্রলোক কিছু বলার চেষ্টা করেও সফল হননি। জজ সাহেব চোদ্দো দিন পুলিস কাস্টডি দিলেন সৈকত দত্ত আর দিদিকে, অর্থাৎ এই চোদ্দো দিন দিদিকে পুলিশি লক—আপেই থাকতে হবে।

এরপর দিদি আর রুদ্রর দিকে তাকাতে সাহস করেনি। আঁচল দিয়ে চোখ—মুখ ঢেকে, কোর্টেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিল।

রুদ্র উদ্দেশ্যহীনের মতো লেকের মধ্য দিয়ে হাঁটছিল। প্রচুর পাখির ডাকে ওর মাথার মধ্যটা ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল। চোখে যেন ও কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না। ওর হাঁটুতে জোর নেই।

ও ফুটপাতের একপাশে বসে পড়ল। ওর প্রিয় দিদি আজকে জামাইবাবুকে খুনের মিথ্যে অভিযোগে জেলে। ও দিদিকে থানার লক—আপে ছেড়ে কী করে বাড়িতে যাবে? মা—কে মুখ দেখাবে কী করে? মা যখন জিজ্ঞেস করবে, কী রে, দিদিকে কোথায় রেখে এলি? ও কী জবাব দেবে? লেকের এই জায়গাটা অন্ধকার, লোকজনও নেই।

ও 'দিদিইই—দিদিইই' বলে ফুটপাতে হাঁটু মুড়ে বসে কাঁদতে শুরু করল। প্রচণ্ড চিৎকার করে ও ফুটপাতে ঘুসি মারতে থাকল। কাঁদতে কাঁদতেই ওর যন্ত্রণায়, ক্ষোভে, রাগে, দুঃখে গা—টা গুলিয়ে উঠল। ও ফুটপাতের ধারেই হড়হড়িয়ে বমি করে ফেলল।

বমি করার পর ওর শরীরটা একটু শান্ত হল। ওর মনে পড়ল, সকাল থেকে ও কিছুই খায়নি, তারপর সারাদিনের ক্লান্তি, অবসন্নতা থেকেই ওর বমি এসে গিয়েছে।

একটু ঘোরটা কাটতেই ও শুনতে পেল, কোথায় যেন ঘণ্টাধ্বনি হচ্ছে। নাকে ধূপধুনোর গন্ধ আসছে। ও খেয়াল করল, ও লেক কালীবাড়ির উলটোদিকের ফুটপাতে বসে আছে। মনে পড়ল, বাড়িতে মা একাই আছেন। ওর ঘোর কেটে গেল। ওর মুখে—পিঠে কে যেন চাবুকের বাড়ি মারল। সেই সকালে মা—কে চা—মুড়ি খাইয়ে রেখে এসেছে। সারাদিন মায়েরও তো খাওয়া হয়নি। মা কী করছেন? ওর নিজেকে বড্ড একা মনে হল। ও মনে মনে লেক কালীবাড়ির উদ্দেশে প্রণাম করে বলল, 'মা, আমি যে বড্ড একা, আমাকে তুমি শক্তি দাও, দিদির পাশে আমি থাকবই, সারাজীবন।' ও চিৎকার করে উঠল 'দিদিইই, আমি আছি, তোর পাশে এএএ।' ও বাড়ির উদ্দেশে দৌড়োতে শুরু করল—'মা, আমি আসছি, তুমি আর—একটু একা থাকো। আমি এসে রান্না করব।' ও বুঝতে পারল, চোখের নোনতা জল, গাল বেয়ে ওর ঠোঁট ভিজিয়ে দিচ্ছে।

সাল 2020– জানুয়ারি মাসের একদিন, বেলা দুটো

আলিপুর মহিলা সংশোধনাগার, চলতি কথায় মেয়েদের জেল

এই জেলের সুপার হয়ে নতুন চার্জ নিয়েছেন অনুশীলা। এই জেলের বাসিন্দাদের সঙ্গে এখনও আলাপ করা হয়ে ওঠেনি। জেলে দু—ধরনের বাসিন্দা আছেন। এক ধরনের বাসিন্দাদের বলে 'আন্ডার ট্রায়াল প্রিজনার',সংক্ষেপে 'ইউ.টি.পি.' অর্থাৎ, যাদের বিচার এখনও চলছে। আর—এক ধরনের বাসিন্দাদের বলে 'কনভিক্ট' অর্থাৎ, যাদের সাজা হয়ে গিয়েছে। অনুশীলা কনভিক্ট প্রিজনারদের একটা তালিকা তৈরি করছেন। তাঁরা ক—জন আছেন এখানে, তাঁদের বয়স কত? হাইকোর্টে মামলা পেন্ডিং আছে কি না? কোনও কোনও কনভিক্টকে হাইকোর্ট থেকেও সাজা দিয়ে দিয়েছে। তাদের মামলা আবার সুপ্রিম কোর্টে পেন্ডিং, কী অবস্থা মামলাগুলোর—এইসব আর কী? সাধারণত একজন মহিলাকে যে—কোনও অপরাধে অ্যারেস্ট করে এই জেলে আনা হয়। এই জেলটা শুধুমাত্র মেয়েদের। মেয়েরাই এখানে থাকেন। তারপর তাঁদের বিচার শুরু হয় কোর্টে। বিচার চলাকালীন তাঁরা থাকেন আন্ডার ট্রায়াল প্রিজনার। তখন তাঁদের আত্মীয়স্বজন আসেন জেলে দেখা করতে। স্বামী, ভাই, ছেলে—মেয়ে। কখনো কখনো উকিলবাবুরাও আসেন কথা বলতে। কোর্ট সাজা ঘোষণা করলে, সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে যেতে হয় উচ্চ আদালতে বা হাইকোর্টে। হাইকোর্টও যদি সেই একই সাজা বহাল রাখেন তাহলে ওই আসামিকে যেতে হয় সুপ্রিম কোর্টে। সুপ্রিম কোর্টও যদি ওই একই সাজা বহাল রাখেন, তখন আর এই মেয়েদের কিছু করার থাকে না। তাঁদের জেলেই জীবন কাটাতে হয়। তবে এটা হল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড যাদের দেওয়া হয় তাদের জন্য। কারও কারও অবশ্য সাত বছর, দশ বছর জেল হয়। হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট অনেক সময়ই আবার সাজা কমিয়ে দেন। কাউকে কাউকে 'বেকসুর' বা 'নির্দোষ' ঘোষণা করে জেল থেকে ছেড়েও দেন।

জেলের ওয়েলফেয়ার অফিসার শুভদীপ মুখার্জির সঙ্গে বসে একটা তালিকা করছিলেন অনুশীলা। এই জেলে যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে, এমন ক—জন আছেন, যাঁদের মামলা এখনও হাইকোর্টে ঝুলে আছে বিচারের অপেক্ষায়—তাঁরা কতদিন ধরে জেলে আছেন, তাঁদের শারীরিক অবস্থা কীরকম? বয়স কত? —এইসব।

অনেকক্ষণ কাজ করার পর শুভদীপবাবু বললেন, 'ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে তো কারওই আলাপ হয়নি, চলুন, সেলগুলো থেকে একবার ঘুরে আসি। ইনমেটদের সঙ্গে, মানে এই জেলের বাসিন্দাদের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দিচ্ছি।'

অনুশীলা আর শুভদীপ উঠে পড়লেন। জেলের সুপার আর ওয়েলফেয়ার অফিস দুটোই মূল জেলের বাইরে, যদিও একই কম্পাউন্ডের মধ্যে। জেলের ভেতরে ছোট্ট একটা লোহার দরজা দিয়ে দু—জনেই মূল জেলের ভেতরে ঢুকলেন। দুপুরবেলা, জেলের মহিলা বন্দিরা বাইরে বসে বিভিন্নরকম হাতের কাজ করছিলেন, কেউ আবার স্নান করে, চুল খুলে রোদ্দুরে চুল শুকোচ্ছেন, কেউ বা এমনিই বসে আর একজনের সঙ্গে গল্প করছেন। মোটামুটি জেলের ভেতরের দুপুর যেমন হয় আর কী। বাড়ি ছেড়ে থাকতে থাকতে বেশির ভাগ বন্দিই গভীর মনঃকষ্টে ভোগেন।

আজ এই দুপুরবেলা, স্বয়ং জেলের সুপার আর ওয়েলফেয়ার অফিসারকে একসঙ্গে জেলের মধ্যে ঢুকতে দেখে, সবাই দু—জনকেই ছেঁকে ধরলেন, শুভদীপ সবার সঙ্গে অনুশীলার আলাপ করিয়ে দিচ্ছিলেন। সবাই সুপারকে সামনে পেয়ে একসঙ্গে হইহই করে নিজেদের অসুবিধার কথা উগরে দিতে শুরু করলেন। অনুশীলা সব বন্দিরই অসুবিধার কথা নোট করে নিলেন। কেউ চান তাঁর কেসের কী অবস্থা জানতে, কেউ চান, তাঁর উকিলবাবুর সঙ্গে কথা বলতে, কেউ বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলতে চান, আবার কারও বা খুব শরীর খারাপ, ডাক্তার দেখাতে হবে। সবার সঙ্গে আলাপ করে, কথা বলে অনুশীলা বললেন, 'শুভদীপবাবু, সব ইনমেটই এখানে আছে? নাকি সেলের ভেতরে গেলেও কাউকে কাউকে পাব?'

শুভদীপ বললেন, 'নাঃ সবাই এখানে নেই। চলুন, সেলগুলো একবার দেখে আসি।'

শুভদীপ অনুশীলাকে সেলগুলো দেখাতে নিয়ে এলেন। সাধারণত সাজাপ্রাপ্ত বন্দিনিরাই এখানে থাকে। মোটামুটি সবারই এখানে সাত বছর, দশ বছর বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে সারাজীবনই জেলে থাকতে হবে। সেলগুলো এমনিতেই, দিনের বেলাতেও অন্ধকার। লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। ঘুরতে ঘুরতে দু—জনে একটা সেলের সামনে থমকে দাঁড়ালেন। বাইরে থেকে যে ক্ষীণ আলো সেলে এসে ঢুকছে, তারই আলোতে এক সুন্দরী ভদ্রমহিলা কী যেন একমনে পড়ে চলেছেন। ভদ্রমহিলাকে দেখে, কী জানি কেন, অনুশীলা থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর সেলের বাইরে যে স্বয়ং সুপার আর ওয়েলফেয়ার অফিসার দাঁড়িয়ে রয়েছেন, সেটা ভদ্রমহিলা খেয়ালই করলেন না।

অনুশীলা শুভদীপকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'শুভদীপবাবু, ইনি কে?'

শুভদীপ জবাব দিলেন, 'উনি রূপা রায় ওরফে ব্যানার্জি। ট্রায়াঙ্গুলার লাভ—এর কেস। স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করে স্বামীকে খুন করেছেন। স্বামীর বন্ধুটিরও সাজা হয়েছে। আলিপুর অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জজের কোর্ট দু—জনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আপনার মনে আছে ম্যাডাম, রিটায়ার্ড পুলিশের বড়কর্তার ভাগনে খুন হয়ে যান—তেরো বছর আগে? উনি গত তেরো বছর ধরে এখানেই আছেন, কোনওদিনই জামিন পাননি, একদিনের জন্যও না।'

অনুশীলা বললেন, 'স্ট্রেঞ্জ! একদিনের জন্যও জামিন পাননি?'

শুভদীপ বললেন, 'খুব স্যাড, ম্যাডাম। ভালো বাড়ির মেয়ে।'

অনুশীলা এবার সেলের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকলেন 'শুনছেন? নমস্কার।'

ভদ্রমহিলা বইয়ের থেকে চোখ তুলে, শুভদীপকে দেখে উঠে এলেন—'নমস্কার শুভদীপবাবু, আপনি এখানে এইসময়?'

শুভদীপ প্রতিনমস্কার করে বললেন, 'ইনি আমাদের জেলের নতুন সুপার, আপনার সঙ্গে আলাপ করাতে নিয়ে এলাম।'

ভদ্রমহিলা বইটা এবার ভাঁজ করে হাতে নিয়েই বললেন, 'নমস্কার ম্যাডাম। আমার সঙ্গে আবার আলাপ করাবার কী আছে? আমি লাস্ট তেরো বছর ধরেই এখানে আছি। আমার নাম রূপা রায়। শ্বশুরবাড়ি ব্যানার্জি ছিল। আগে নিজের নাম বলতাম রূপা রায় ব্যানার্জি। এখন আর বলি না, এখন স্বামী নেই, শ্বশুরবাড়ি নেই, তাই তাদের পদবিটাও আর ব্যবহার করি না।'

অনুশীলা হেসে বললেন 'কী পড়ছিলেন? বেশ মোটা বই তো?' বলেই, রূপার সেলের ভেতরে তাকালেন—চারিদিকে প্রচুর বই ছড়ানো।

রূপা লাজুক হেসে বললেন, 'এটা? এটা সেক্সপিয়ারের ''কমপ্লিট ওয়ার্কস''। বহুবার পড়েছি, ম্যাডাম, মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। এখানে আর কাজ কী? তাই, শুধু বই পড়ি।' বলেই চোখ বন্ধ করে আবৃত্তির ঢঙে, নিখুঁত ইংরেজিতে বলে যেতে লাগলেন....

তারপর থেমে বললেন, ''আমার কালেকশনে সব আছে। শেক্সপিয়ার, শেলি, কিটস, বায়রন—ওই দেখুন, রবীন্দ্র রচনাবলী, বঙ্কিম, শরৎ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশংকর।''

শুভদীপ পাশ থেকে বললেন, 'ম্যাডাম, ওঁর ''সঞ্চয়িতা''র প্রায় সব কবিতা মুখস্থ।'

অনুশীলা আশ্চর্য হয়ে চোখ কপালে তুললেন—'কী বলছেন? কতটা পড়াশোনা করেছেন আপনি?'

রূপা শ্বাস ফেলে বললেন, 'আই.এ.এস. আমার স্বপ্ন ছিল, যোধপুর পার্কের কারমেল থেকে বেরিয়ে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে ইংলিশে অনার্স নিয়ে পাশ করে মাস্টার ডিগ্রি করি। অনার্স—এ ফার্স্ট হয়েছিলাম। কিন্তু এম.এ.—তে আমি সেকেন্ড হই। সাউথ পয়েন্টে পড়াতাম। তারপর তো—এই জীবন—তেরো বছর এখানেই কেটে গেছে ম্যাডাম।'

অনুশীলা এতটা আশ্চর্য হবেন, ভাবতে পারেননি। জেলের মধ্যে থেকে অনেকেই পড়তে চান, কেউ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে চান, কেউ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে চান, কেউ গ্র্যাজুয়েশনও করতে চান, কিন্তু এই মেয়েটি তো যেমন দেখতে সুন্দরী, তেমনই ভালো এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড!!

অনুশীলা পরম মমতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি পড়াশোনা করতে চান?'

রূপা ঘাড় হেলিয়ে হ্যাঁ বললেন।

অনুশীলা, শুভদীপকে বললেন, 'শুভদীপবাবু, ওঁর যা লাগবে, আমরা দেব। আপাতত একটা চেয়ার, টেবিল, পেন আর বেশ কিছু খাতা। আর যে বই উনি চাইবেন, তা—ই আমরা ওঁকে প্রোভাইড করব। আর হ্যাঁ, একটা হাই পাওয়ার টেবল ল্যাম্প দিতে হবে। এই আলোতে পড়াশোনা হয়?'

রূপা এবার একটু সাহস পেয়ে বললেন, 'ম্যাডাম, আমি ডক্টরেট করতে চাই, ইংলিশে—যদি হয়।'

অনুশীলা একটু নিচের ঠোঁটটা কামড়ে কিছু ভাবলেন—'ডক্টরেট করতে গেলে কী করতে হয়—আমি খোঁজ নিচ্ছি—যদি আমার পক্ষে সম্ভব হয়, আমি ব্যবস্থা করব।' তারপর একটু থেমে বললেন, 'আচ্ছা, আপনার কেসের কী অবস্থা? হাইকোর্টে পেন্ডিং না? আচ্ছা, আপনার লইয়ার কে?'

শুভদীপ বললেন, 'ম্যাডাম, গত চার—পাঁচ বছর ধরে পড়েই আছে। হাই প্রোফাইল, পেপার হাইলাইটেড কেস তো? আর ভিকটিমের ফ্যামিলিও এতই ইনফ্লুয়েনশিয়াল—আই মিন, আই মিন—'

অনুশীলা একমত হলেন। তারপর বললেন, 'ওঁকে একজন ভালো লইয়ার দেখে দিতে হবে—হুঃ। দেখছি। ঠিক আছে। আজকে আসি, কখনো কোনও দরকার হলেই, শুভদীপকে বা আমাকে জানাবেন।' দু—জনেই সেল থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, হঠাৎ রূপা পেছন থেকে ডাকলেন, 'স্যার, আমার ছেলেদের ব্যাপারটা?'

অনুশীলা আর শুভদীপ দু—জনেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। অনুশীলা জিজ্ঞেস করলেন, 'ছেলেদের ব্যাপারটা মানে?'

শুভদীপ বুঝিয়ে বললেন, 'উনি ওঁর বাচ্চাদের দেখতে পান না।'

রূপা এবার হাতজোড় করে অনুশীলার পায়ের সামনে ধপ করে বসে পড়লেন—'ম্যাডাম, আমাকে যখন ধরে আনে, তখন আমার বড়ছেলের বয়স সাড়ে তিন আর ছোটটার দেড়। আমাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমোচ্ছিল। রাত দেড়টার সময় আমাকে ঘুমন্ত অবস্থা থেকে ধরে আনে, সেই থেকে আমি জেলে। গত তেরো বছর। আমি আমার বাচ্চাদের দেখি না, ম্যাডাম! আমি কতবার কোর্টে বাচ্চাদের দেখতে চেয়েছি, আনেনি। আমি আগের সুপারদের কাছে বলেছি, শুভদীপ স্যারকে বলেছি, কেউ আমার বাচ্চাদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয়নি ম্যাডাম, আপনি একটু দেখা করিয়ে দিন। যন্ত্রণায় আমার বুক ফেটে যায় ম্যাডাম!' অনুশীলা ভিতরে ভিতরে দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন।

তিনি রূপাকে ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে বললেন, 'কাঁদবেন না, আপনার বড়ছেলের বয়সি আমারও একটি ছেলে আছে। দশ মিনিট ছেলের খবর না পেলে আমি পাগল হয়ে যাই, আর আপনি তেরো বছর বাচ্চাদের না দেখে আছেন, আমি আপনার কেস সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। আমি আজই আপনার ফাইলটা স্টাডি করব। আমি আর শুভদীপ দু—জনেই আপনার জন্য ফাইট করব। আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?

রূপা এবার আঁচলে চোখ মুছে বললেন, 'ভাই আর বৃদ্ধা মা।'

'কাল সকালে আপনার ভাইকে ডেকে নিচ্ছি। একটু আলোচনা করব। আপনার ভাই কী করেন?'—অনুশীলা জিজ্ঞেস করলেন।

রূপা মাথা নিচু করে বললেন, 'যাদবপুরেই ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল ইয়ার ছিল, কিন্তু আমার কেস চালাতে গিয়ে আর পড়াশোনা চালাতে পারেনি। এখন একটা প্রাইভেট ফার্মে আছে।'

অনুশীলার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল—'স্যাড', তারপর দু—জনেই চলে যাবার জন্য ফিরলেন। অনুশীলা দু—কদম গিয়েও আবার ফিরে এলেন—'রূপা, আমার আপনাকে দেখে, আপনার সঙ্গে কথা বলে, কেন যেন মনে হচ্ছে, খুনটা আপনি করেননি, তা—ই না?'

রূপা এবার জলভরা চোখ তুলে, সোজা অনুশীলার চোখে চোখ রেখে, মেরুদণ্ড, ঘাড় সোজা করে, চিবুকটা তুলে দৃঢ়স্বরে বললেন, 'না।'

পরের দিন বেলা সাড়ে দশটা

জেল থেকে ফোন পেয়ে অবাকই হয়েছিল রুদ্র। গত তেরো বছর ধরে প্রতি বুধবার বিকেলে ও দিদির সঙ্গে দেখা করতে আসবেই। ঝড়, জল, বন্যা, বনধ। কিছুতেই ওকে আটকানো যায় না। বুধবারগুলোতে, দিদির সঙ্গে দেখা করে ও অফিসে যায়, অফিসের ম্যানেজারকেও বলা আছে, বুধবার ওর একটু দেরি হবেই। এই দিনটায়, ও দিদির পছন্দের খাবার বানিয়ে নিয়ে যায় বাড়ি থেকে। তারপর চানাচুর, চিঁড়ে, মুড়ি, শ্যাম্পু, সাবান এগুলো দিয়ে যায়। পুজো বা পয়লা বৈশাখের আগেও নিয়ে আসে শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ। জেলে সব সাদা পরতে হয়। সাদা শাড়ি, সাদা সায়া, সাদা ব্লাউজ। চিরুনি, টিপ এগুলোও নিয়ে আসে। অবশ্য শাড়ি, ব্লাউজ বা বাড়ির খাবারের জন্য স্পেশাল পারমিশন করতে হয়। জেলের ওয়েলফেয়ার অফিসার শুভদীপ মুখার্জি ওকে খুব স্নেহ করেন। তিনি পারমিশন করেও দেন। এইদিনটায় দিদির কাছে ও অনেকক্ষণ থাকে। কথা বলার কিছুই থাকে না। শুধু দু—জন দু—জনের হাত দুটো ছুঁয়ে থাকে মাত্র। দিদির চোখ দিয়েও জল গড়ায়, ও কাঁদে না। দিদিকেও কাঁদতে বারণ করে। বলে, সব ঠিক হয়ে যাবে। একদিন ও ঠিক দিদিকে জেল থেকে ছাড়িয়ে বাড়ি নিয়ে যাবে। মা দিদিকে দেখবার জন্য আসতে চান, ও আনে না, বলে, কী দরকার? আমি তো যাচ্ছি। আমি অফিস যাবার পথে দেখা করে অফিস চলে যাব। তোমাকে নিয়ে গেলে, দিদির সঙ্গে দেখা করিয়ে তোমাকে আবার বাড়িতে রেখে যেতে হবে। আমার অফিসটাই কামাই হবে। আসলে ও জানে, দিদিকে জেলের মধ্যে এই পোশাকে মা সহ্য করতে পারবেন না। দিদিও বলে, 'ভাই আনিস না মাকে, মা—ও সহ্য করতে পারবে না, আমিও পারব না। তার থেকে এই তো বেশ ভালো আছি। মা—কে না দেখে, বাচ্চাদের না দেখে আমার একটা অভ্যেস হয়ে গেছে।'

আগে আগে দিদি বাচ্চাদের আনতে বলত, রুদ্রও দিদির লইয়ারকে বহুবার বলেছে—'একবার বাচ্চাদের, দিদিকে দেখানোর ব্যবস্থা করুন।'

রূপার ল'ইয়ার অনেকবারই কোর্টে বাচ্চাদের দেখতে চেয়ে পিটিশন জমা দিয়েছেন। প্রত্যেকবারই, দিদির শাশুড়ি বড় লইয়ার এনগেজ করে, দিদির বাচ্চা দেখার আবেদন নাকচ করিয়েছেন, কোর্টে বলেছেন, 'এই মা অ্যাডাল্টারাস লাইফ লিড করতেন। বাংলায় যাকে বলে, ব্যভিচারী জীবনযাপন করতেন। স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে স্বামীকে খুন করেছেন। তা ছাড়া, বাবাকে হত্যার অপরাধে মা—র যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে, মা জেলে আছেন, মা—র কাছে বাচ্চাদের নিয়ে গেলে বাচ্চাদের মনে কুপ্রভাব পড়বে।'

কোর্টও প্রত্যেকবারই রূপার বাচ্চা দেখার আবেদন নাকচ করেছেন। শেষের দিকে, রুদ্র দিদিকে বুঝিয়েছে, 'দিদি, কী দরকার বাচ্চাদের দেখতে চেয়ে? তুই এক—একবার বাচ্চা দেখতে চেয়ে কোর্টে যাস, আর তোকে নিয়ে কোর্টে খারাপ খারাপ কথা ওঠে। বাদ দে, মনে কর, তোর কোনওদিন বিয়ে হয়নি, তুই আনম্যারেড, তোর বাচ্চাও নেই।'

রূপা কেঁদে ফেলেছে, রাগ করেছে, বলেছে—'হ্যাঁ, আমার বাবা নেই, মা নেই, স্বামী নেই, বাচ্চা নেই, ভাইও নেই, আমার কেউ নেই। যা, তুইও চলে যা। তোকেও আসতে হবে না। তেরো বছর হয়ে গেল, আমাকে জেল থেকে বার করতেও পারলি না, যা—তুইও চলে যা।' রূপা কাঁদতে কাঁদতে আবার জেলে ঢুকে গেছে।

রুদ্রও খানিকক্ষণ বসে থেকে বেরিয়ে এসে অফিস চলে গিয়েছে। সারাটা দিন ওর মনটা খারাপ হয়ে থেকেছে। খালি দিদির চোখের জলভরা মুখটা মনে পড়েছে। পরের বুধবার আবার ঠিক সময়ে জেলের গেটে হাজির হয়ে শুভদীপবাবুকে বলেছে, 'স্যার, দিদিকে একবার ডেকে দিন।'

দিদিকে কোর্টেরও কোনও ভালো খবর শোনাতে পারেনি রুদ্র। আলিপুর কোর্ট দিদিকে যাবজ্জীবন সাজা দেবার পর, অনেক কষ্টে টাকাপয়সা জোগাড় করে, হাইকোর্টে দিদির আপিল মামলা ফাইল করে রুদ্র। সে—ও তো আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল। একে পেপার হাইলাইটেড কেস, তায় ইনফ্লুয়েনসিয়াল বাড়ির ঘটনা, মামলাটা হাইকোর্টে তুলতেই ওর ভয় করছে। হাইকোর্টও যদি হারিয়ে দেয়? তাহলে যেতে হবে সেই সুপ্রিম কোর্টে। সেখানে যাবার সামর্থ্য রুদ্রর নেই।

তবে, হাইকোর্টের খরচের জন্য ও টাকা জমাচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া আর হয়ে ওঠেনি। এখন অফিস থেকে ফিরে ও কয়েকটা টিউশনি করে। আজকাল টিউশনির বাজারও খারাপ। সবাই স্কুলের সঙ্গে অ্যাটাচড এমন টিচারই খোঁজে প্রাইভেট টিউশনির জন্য, যা—ই হোক, ও টাকা জমিয়ে যাচ্ছে হাইকোর্টের খরচের জন্য, বড় উকিল ওকে রাখতেই হবে। দিদির জন্য শেষ চেষ্টা ওকে করতেই হবে। দিদি আর মা—ছাড়া ওর যে আর কেউ নেই। মা—রও তো বয়স হল অনেক। এত্ত ঝড়ঝঞ্ঝা সয়েছেন যে ওর এক—একসময় মনে হয়, মায়েরও বোধহয় প্রাণশক্তি ফুরিয়ে এল।

শুভদীপবাবু বেলা এগারোটায় ডাকলেও ও একটু আগেই চলে এসেছে। দিদির জন্য ও একটা গায়ের চাদর নিয়ে এসেছে। গত বুধবার, দেখা করতে এসে ও খেয়াল করেছে, দিদির গায়ের চাদরটা জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গিয়েছে। দেখে ওর চোখে জল এসে গিয়েছিল। আহা রে, এমনটা তো হবার কথা ছিল না। দিদি যদি বিয়ে না করত, তাহলে আই.এ.এস.—এ বসতই। আর একবার যদি আই.এ.এস.—এ বসত, তাহলে ও চান্স পেতই—রুদ্রর দৃঢ় বিশ্বাস। তা ছাড়া, আই.এ.এস—এ না বসে ও সাউথ পয়েন্ট স্কুলে ইংলিশের টিচার হিসেবে চান্স পেল। সুমনদার সঙ্গে বিয়ে না হলেও, ওরা দুই ভাইবোন ঠিক নিজেদের কেরিয়ার নিজেরা তৈরি করে নিতই। অন্তত রুদ্র কখনোই নিজের দিদিকে ছেঁড়া চাদর গায়ে দিয়ে থাকতে দিত না।

আজ শুভদীপবাবুকে হাতজোড় করে মিনতি করে বলবে, চাদরটা যাতে উনি দিদিকে অ্যালাও করেন।

রুদ্র, আলিপুর মহিলা সংশোধনাগারের বাইরে একটা বড় গাছের নিচে বাঁধানো বেদিমতো জায়গায় চুপ করে বসে রইল। জেলের বড় লোহার গেটের সামনে অনেক লোকের ভিড়, অনেকে দেখা করতে এসেছেন, জেলের ভিতরে থাকা প্রিয়জনদের সঙ্গে। এই সময়টায় প্রিজন ভ্যানগুলো এসে দাঁড়ায় জেলের বড় লোহার গেটটার বাইরে। যে বন্দিনিদের কোর্টে পেশ করার তারিখ থাকে, তাঁদের কোর্টের তারিখ অনুযায়ী প্রিজন ভ্যানে তুলে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। আজও বেশ কয়েকটা প্রিজন ভ্যান জেলের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে, খাকি পোশাক পরা জেলের কর্মীরা বড় বড় মোটা জাবদা খাতা দেখে দেখে বন্দিনিদের প্রিজন ভ্যানে তুলছেন। কয়েকজন কালো কোট পরা ভদ্রলোক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছেন। রুদ্র জানে, ওঁনারা বিভিন্ন কোর্টের লইয়ার, এইসময়টায়, বন্দিনিদের দিয়ে ওকালতনামায় সই করাতে আসেন, কখনো কখনো বন্দিনিদের সঙ্গে মামলার ব্যাপারে শলাপরামর্শও করেন।

রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ও আর ভিড়ের দিকে গেল না। ইচ্ছেও করল না। ও জানে, এখানে থাকা প্রতিটা মানুষ দুঃখী। প্রতিটি মানুষের একটা করে দুঃখের ইতিহাস আছে। অনেকে আবার দিদির মতোই মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে বছরের পর বছর জেল খাটছেন।

হঠাৎই ও দেখল, শুভদীপবাবু জেলের লোহার গেটের ভেতর থেকে হাত নেড়ে ওকে ডাকছেন—ও দৌড়ে গেটের দিকে গেল। শুভদীপবাবু গেটের একজন গার্ডকে বললেন, 'গেটটা খুলে ওঁনাকে সুপারের ঘরে নিয়ে আসুন, সুপার ডেকেছেন।'

রুদ্র জানত, যে জেলে একজন নতুন মহিলা সুপার এসেছেন, কিন্তু তিনি কেন রুদ্রর সঙ্গে কথা বলতে চান, সেটা রুদ্র কিছুতেই ঠাহর করতে পারেনি।

গার্ড ভদ্রলোক রুদ্রকে নিয়ে সুপারের ঘরে এলেন। রুদ্র, সুপারের ঘরের বাইরের গাঢ় সবুজ পরদা সরিয়ে ভিতরে এল। একজন সুন্দরী এবং ব্যক্তিত্বময়ী ভদ্রমহিলা বসে রয়েছেন, ওর দিদির বয়সিই হবেন। শুভদীপবাবুও পাশে বসে রয়েছেন।

রুদ্র এবার একটু ভয়ই পেয়ে গেল। ব্যাপার কী, ভয়ের কিছু নেই তো? দিদির শরীর খারাপ নয় তো? সুপার ম্যাডাম মিষ্টি হেসে বললেন, 'আসুন, আসুন, বসুন। আমরা আপনার দিদির ফাইলটা নিয়েই স্টাডি করছি। অ্যাকচুয়ালি, কালকে আপনার দিদির সঙ্গে আমি আলাপ করি। শুভদীপবাবুই আলাপ করিয়ে দেন। উনি জেলের মধ্যে থেকেই আরও পড়াশোনা করতে চান, আমি সাধ্যমতো সাহায্য করব। আপাতত আমরা ওঁকে ওঁর পছন্দমতো বই, খাতা পেন প্রোভাইড করছি। সেলের ভেতরে পড়াশোনা করবার জন্য চেয়ার, স্টাডি টেবল, আর টেবল ল্যাম্পের স্পেশাল পারমিশন করে দিচ্ছি। আচ্ছা, আপনাকে ডাকবার কারণ হল, আপনার দিদির হাইকোর্টের মামলাটা কী অবস্থায় আছে? কে দেখছেন? আই মিন, কোন লইয়ার দেখছেন?'

রুদ্র আমতা আমতা করে বলল, 'মানে, দেখছেন একজন, কিন্তু আমি চাইছিলাম, খুব বড় কোনও লইয়ারকে দিয়ে মামলাটা করাতে, কিন্তু বড় লইয়ার মানে বুঝতে পারছেন তো? ফিজও অনেক হয়। তাই, মানে, ওই লাস্ট পাঁচ বছর ধরে পড়েই আছে আর কী''

অনুশীলা খুব মমতা—মাখানো স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করছি, কিছু মনে করবেন না—আপনি কী করেন? আপনাদের তো বাবা নেই শুনেছি।'

রুদ্র সুপারের অফিসের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক স্বরে বলল, 'বাবা মারা যান আমাদের খুব অল্প বয়সেই। দিদিই পড়াশোনা চালানোর জন্য, তারপর সংসার খরচ চালাবার জন্য গড়িয়াহাট প্যান্টালুন্সে সেলস গার্লের চাকরি নেয়, তখন ও যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ইংলিশ নিয়ে এম. এ. পড়ছিল। তারপর তো ওর বিয়ে হয়ে যায়। ঘটনার সময় আমিও যাদবপুর থেকে ইলেকট্রিক্যাল নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিলাম। মামলা চালাতে গিয়ে, আমার আর পড়া চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হল না। এখন আমি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করি। আর হাইকোর্টে মামলার খরচ জোগাড় করতে গিয়ে সন্ধেবেলায় কয়েকটা টিউশনি করছি।'

অনুশীলা আর শুভদীপ দু—জনেই গালে হাত দিয়ে রুদ্রর কথা শুনছিলেন একমনে।

শুভদীপ এবার মুখ খুললেন, 'আমি একটু আগে ম্যাডামের সঙ্গে আপনাদের ব্যাপারটা নিয়েই কথা বলছিলাম। আমাদের দু—জনেরই পরিচিত এক লইয়ার আছেন। তিনি কিন্তু একদমই বড় লইয়ার নন। মানে, আপনারা হাইকোর্টে বড় লইয়ার বলতে যা বোঝেন, তিনি তা নন। কিন্তু আমরা ওঁকে পছন্দ করি। কারণ উনি খুব লড়াকু। শেষ মুহূর্ত অবধি লড়ে যান তাঁর ক্লায়েন্টের জন্য। খুব সিনসিয়ার আর আন্তরিক, ক্লায়েন্টের কথা ভাবেন। ওঁর কাছে ফিজটাই সব নয়। আমার বহুদিনের বন্ধু, আপনি চাইলে ফোন নম্বর দিতে পারি, গিয়ে একবার কথা বলতে পারেন।'

অনুশীলা বললেন 'দেখুন, আপনার দিদি তেরো বছর ধরে জেলে আছেন। এদিকে হাইকোর্টে মামলা ঝুলে আছে। কিছু একটা তো করতে হবে। আপনি এবার মামলাটা হাইকোর্টে শুনানি করবার ব্যবস্থা করুন। মামলার ব্যাপারে আমরা তো কিছু করতে পারি না। তবে, আপনার দিদি জেলের ভেতরে যাতে ভালো থাকেন, সেই ব্যবস্থা আমরা করছি। আর মৌসুমি ভট্টাচার্য বলে একজন বিশিষ্ট সমাজসেবী আছেন, তিনি জেলের বন্দিনিদের নিয়ে একটা ইংরেজি নৃত্যনাট্য করাচ্ছেন। আপনার দিদিকে আমরা সেই নৃত্যনাট্যটার লিড রোলের জন্য বেছেছি। নৃত্যনাট্য, তার রিহার্সাল ইত্যাদির মধ্যে থাকলে, আপনার দিদিরও মনটা একটু ভালো থাকবে।' রুদ্র শুভদীপবাবুর কাছ থেকে ল'ইয়ার ভদ্রলোকের নাম আর ফোন নম্বরটা নিল।

নামটা দেখে ওর চেনা লাগল। কন্দর্পনারায়ণ। টিভিতে আসেন, পেপারে লেখেন। ইনিই কি তিনি? করবেন আমাদের মামলা? ফীজই বা কেমন হবে? রুদ্র কি পারবে ওঁনার ফীজ জোগাতে?

শুভদীপবাবু বোধহয় রুদ্রর মনের কথা পড়তে পারলেন। তিনি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, 'একবার দেখা করুন। আমার বহুদিনের বন্ধু, দেখা করে আমার কথা বলবেন। সাধারণত আমরা কখনো কাউকে কোনও লইয়ারের নাম সাজেস্ট করি না। কী জানি, মামলায় খারাপ কিছু হয়ে গেলে, সবাই এসে আমাদেরই ধরবে। তবে, এঁর উপর আমার বিশ্বাস আছে। তা ছাড়া, অনুশীলা ম্যাডামও ওঁকে চেনেন। আপনি আসবার আগে আমরা ওঁকে নিয়েই আলোচনা করছিলাম। সেই অর্থে উনি সেরা বা এক নম্বর লইয়ার নন, তবে আমি ওঁর মামলা করা দেখেছি। মাটি কামড়ে পড়ে থাকেন। মরার আগে মরবেন না। আপনি একবার ওঁর সঙ্গে কথা বলুন, একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করে দেখা করে নিন।'

রুদ্র রাজি হল। দিদির জন্য আনা চাদরটা শুভদীপবাবুকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'স্যার, দিদির গায়ের চাদরটা জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। এই চাদরটা দিদির জন্য এনেছিলাম। যদি একটু স্পেশাল পারমিশন করে দিয়ে দেন। আসলে, ওর তো এত কষ্ট পাওয়ার কথা নয়। সবই আমাদের ভাগ্য।' রুদ্র চাদরটা নিজের নাকের কাছে ধরল। গালের কাছে ধরল। মনে মনে ভাবল, দিদি এই চাদরটা যখন গায়ে দেবে, ওর স্পর্শও পাবে। 'তুই ভালো থাকিস দিদি।' রুদ্রর চোখে জল এসে গেল। তাড়াতাড়ি চোখের জলটাকে ও আড়াল করল। অনুশীলা রুদ্রকে স্টাডি করছিলেন। দিদির মতোই ভাইও সুন্দর দেখতে। সুপুরুষ, কিন্তু কেমন যেন বিমর্ষ, যন্ত্রণামাখা মুখখানা। আহা রে, দিদির মামলা সামলাতে গিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে ভাই। ইঞ্জিনিয়ারিং কমপ্লিট করতে পারেনি। আর বিয়ে—শাদিও করা হয়ে ওঠেনি।

অনুশীলা হাত বাড়িয়ে চাদরটা নিলেন—'দিন, আমাকে দিন, আমি—ভিতরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।'

রুদ্র, অনুশীলা আর শুভদীপ, দু—জনকেই নমস্কার করে অফিসঘর থেকে বেরিয়ে এল।

কন্দর্পনারায়ণের চেম্বার, রবিবার, বেলা সাড়ে দশটা

জানুয়ারি মাসের সকাল, সাড়ে দশটাতেও বেশ ঠান্ডা, জুনিয়র লইয়াররা সবাই সকাল সকাল চেম্বারে চলে এসেছেন, ক্লায়েন্টরা এখনও এসে ঢোকেননি, চেম্বারে সবাই বসে নিজেদের মধ্যে আড্ডা বেশ জমিয়ে তুলেছেন। দেবপ্রিয়া বলে উঠলেন, 'স্যার, প্রফেশনে পারব তো? পাঁচ বছর প্র্যাকটিস হয়ে গেল। বেশ ভয়—ভয় লাগছে কিন্তু।'

অপলক বললেন, ' পাঁচ বছর তো কিছুই নয়, এই পেশায় আরও সময় দিতে হবে।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ইংরেজিতে একটা কথা আছে—এ লইয়ার মাস্ট বি এ থরো জেন্টলম্যান। একজন লইয়ারকে হতেই হবে একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক।' এই পেশাটাতে তোমাদের কাছে ক্লায়েন্ট হয়ে যাঁরা আসবেন, তাঁদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। ক্লায়েন্ট অনেক সময় অবান্তর কথা বলবেন, অপ্রয়োজনীয় কথা বলবেন, কিন্তু তোমাকে ধৈর্য ধরে ক্লায়েন্টের কথা শুনতে হবে। ক্লায়েন্টের বক্তব্য শোনো। ক্লায়েন্টকে নিজের মনের কথা বলতে দাও। ক্লায়েন্ট শুধু তোমার সঙ্গে, মানে নিজের লইয়ারের সঙ্গে কথা বলবেন বলে, বহু দূর থেকে আসছেন। তিনি যদি তাঁর ল'ইয়ারের সঙ্গে কথা বলতে না পরেন, তাহলে তিনি আর আসবেন না। তুমি একজন ক্লায়েন্ট হারাবে। গানের জগতে একটা কথা আছে—তানসেন বননে সে পহলে কানসেন বনো। অর্থাৎ ভালো গায়ক হতে গেলে, ভালো শ্রোতা হতে হবে। আগে গান ভালো করে শুনতে হবে। তবেই তুমি ভালো গায়ক হতে পারবে। আমাদের ওকালতি জগৎটাও সেইরকম। কোর্টে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় লইয়ারদের আর্গুমেন্ট শোনো। জজ সাহেবরা কী বলছেন শোনো, ক্লায়েন্টদের বক্তব্য শোনো। ক্লায়েন্টদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবে না কখনো।'

প্রিয়াঙ্কা আর মৌমিতা বলছিলেন, 'স্যার, মেয়েদের ক্রিমিনাল মামলা করা উচিত? কোনও ভয় নেই তো?'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ভয়ের আবার কী? লইয়ারের আবার পুরুষ—মহিলা কী? একজন পুরুষ লইয়ার যদি ক্রিমিনাল মামলা করতে পারেন, তাহলে মহিলা লইয়ার পারবেন না কেন? একজন লইয়ারকে সবসময়ই তাঁর ক্লায়েন্টের আস্থা অর্জন করতে হবে। আর হ্যাঁ, টাকার পেছনে না ছুটে, চেষ্টা করো ভালো লইয়ার হতে, মানুষের পাশে থাকতে। মনে রেখো, একজন ভালো লইয়ারের সম্মান সবসময় আছে। আর সেই সম্মানটা রক্ষা করা আমাদের সবসময় কর্তব্য।'

এমন সময় বীরেনবাবু ঘরে ঢুকে কন্দর্পনারায়ণকে বললেন, 'রুদ্র রায় বলে একজন এসেছেন, সকাল এগারোটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।'

বীরেনবাবু বুড়ো মানুষ, আগে কন্দর্পনারায়ণের গাড়ি চালাতেন। এখন অনেক বয়স হয়েছে, বয়সের কারণে চোখ দুটো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন আর গাড়ি চালাতে পারেন না। এখন কন্দর্পনারায়ণের চেম্বারেই দেখাশোনা করার কাজ করেন। কেউ এলে দরজা খুলে দেওয়া, চেম্বারে ক্লায়েন্টদের জল এগিয়ে দেওয়া—এইসব। মোটের উপর চেম্বারের বেশ একটা বড় দায়িত্ব এখন ওঁরই কাঁধে।

কন্দর্পনারায়ণ বেশ একটা বড় আড়মোড়া ভেঙে সবাইকে বললেন, 'বেশ, অনেকক্ষণ গল্প হল, চলো, এবার আমরা কাজকম্ম শুরু করি। বীরেনবাবু, ডাকুন ওঁনাকে।'

রুদ্র রায় ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে এলেন। হাতে একটা বড়ো বাজারের ব্যাগের মতন চটের ব্যাগ।

কন্দর্পনারায়ণ দেখলেন—বেশ সুপুরুষ, বত্রিশ—তেত্রিশ বা ওইরকমই বয়স। গায়ের রং খুবই ফরসা। চোখে চশমা, ট্রাউজার্সের ওপর জ্যাকেট পরা। তবে, জ্যাকেটটা বেশ পুরোনো। রংটাও ফেড হয়ে গিয়েছে। হাতের ঘড়িটাও পুরোনো মডেলের। কমসে কম দশ—পনেরো বছরের পুরোনো মডেলের ঘড়ি, এই ঘড়িগুলো এখন আর পাওয়া যায় না। মুখে একটা বেদনা আর হতাশার ছাপ স্পষ্ট। কন্দর্পনারায়ণ ভদ্রলোককে টেবিলের উলটোদিকে রাখা চেয়ারে বসতে বললেন। ভদ্রলোক বসলেন। তারপর, চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন।

কন্দর্পনারায়ণের বহুদিনের পুরোনো অভ্যেস, কেউ সামনে এসে বসলে তাঁকে জরিপ করে, তাঁর সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরির চেষ্টা করা। চেম্বারে উপস্থিত অন্য সবাই অর্থাৎ, অপলক, দেবপ্রিয়া, প্রিয়াঙ্কা, মৌমিতা—সবাই, একদৃষ্টে ভদ্রলোকের দিকে, অর্থাৎ রুদ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। এই ব্যাপারটা ওঁরা সবাই, কন্দর্পনারায়ণের থেকেই পেয়েছেন, ওঁরাও একজন ক্লায়েন্ট এলে, তাঁকে দেখে যতটা সম্ভব স্টাডি করার চেষ্টা করেন।

দ্বৈপায়ন একদম পেছনে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন, তিনি চেম্বারের নিজস্ব হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে মেসেজ পাঠালেন—'ইকনমিক অবস্থা ভালো নয়। ডান পায়ের মোজাটা ছেঁড়া, বুড়ো আঙুলটা বেরিয়ে আছে। একে তো এই ঠান্ডা, তার মধ্যে ছেঁড়া মোজা পরে বেরিয়েছে, মানে ইকনমিক কন্ডিশন সত্যি খারাপ।' অপলক রুদ্রবাবুর পেছনদিকটায় বসে ছিলেন, তিনি লিখলেন—'জ্যাকেটের কলারটা ছেঁড়া।' প্রিয়াঙ্কা লিখলেন—'তবে, ভদ্রলোক সত্যি হ্যান্ডসাম। বউয়ের সঙ্গে গণ্ডগোল হবার কথা নয়।' মৌমিতা লিখলেন—'আরে, হ্যান্ডসাম বলেই তো বউয়ের সঙ্গে গণ্ডগোল। সেইজন্যই আমাদের কাছে এসেছেন।' দ্বৈপায়ন লিখলেন—'এইরকম একটা হ্যান্ডসাম লোক একটা পুরোনো চটের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছেন। আজকালকার দিনে ব্যাপারটা ইউনিক।' তবে, একটা ব্যাপারে সবাই একমত যে, ভদ্রলোকের আর্থিক অবস্থা সত্যিই খারাপ। এবং সেটা অনেক বছর ধরেই। হাতের পুরোনো মডেলের ঘড়িটা তারই প্রমাণ। এই ধরনের ঘড়ি উঠেই গিয়েছে দশ—পনেরো বছর আগে। ভদ্রলোক এতক্ষণ চুপ করেই বসে ছিলেন, একটি কথাও বলেননি। কন্দর্পনারায়ণ মোবাইল তুলে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিজের জুনিয়রদের কথোপকথন পড়ছিলেন। এবার মোবাইলটা থেকে চোখ সরিয়ে, মোবাইলটা টেবিলের ওপর রেখে, নীরবতা ভঙ্গ করলেন 'হ্যাঁ, রুদ্রবাবু, এবার বলুন।'

রুদ্রবাবু, একমনে কিছু ভাবছিলেন। কন্দর্পনারায়ণের কথায় চমকে উঠে, ঘরে উপস্থিত জুনিয়রদের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বললেন—'স্যার, আলিপুর মহিলা সংশোধনাগারের অনুশীলা ম্যাডাম আর শুভদীপ স্যারের কাছ থেকে আপনার ফোন নম্বর পেয়েছি।'

কন্দর্পনারায়ণ মাথা নেড়ে বললেন—'হ্যাঁ, ওঁরা আমাকে আপনার কথা বলেছেন।'

রুদ্রবাবু খুব আস্তে প্রায় ফিসফিস করে বললেন—'স্যার, একটু প্রাইভেট কথা ছিল, একটু আলাদা বলা যাবে?'

কন্দর্পনারায়ণ হেসে বললেন, 'এখানে যাদের দেখছেন, প্রত্যেকে লইয়ার এবং প্রত্যেকের পাঁচ—সাত বছর ওকালতি হয়ে গেছে। ওরাই আমার সৈনিক। ওরা না থাকলে আমি একা এক—পা—ও এগোতে পারব না। আপনি যা বলবার, ওদের সামনেই বলুন। ওরাও শুনুক। হয়তো কোনওদিন এমন হল, আপনার মামলায় আমি অন্য ব্যস্ততার কারণে পৌঁছোতেই পারলাম না—সেদিন ওরাই সামলে দিল!'

রুদ্রবাবু মাথা নেড়ে একমত হলেন।

রুদ্রবাবু, প্রথম থেকে শুরু করে, আস্তে আস্তে সমস্ত ঘটনা বললেন।

পুরো ঘটনা জেনে নিয়ে, কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'হাইকোর্টে মামলাটা করতে হবে তো?'

রুদ্রবাবু হাত জোড় করে বলল, 'স্যার, মামলাটা শুধু করলে হবে না, দিদিকে বের করে দিতে হবে। আমি আর লড়তে পারছি না।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'রুদ্রবাবু, ক্রিমিনাল মামলায় কোনও গ্যারান্টি দেওয়া যায় না। আর আমি তো কোনও মামলাতে কখনোই গ্যারান্টি দিই না।' কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'হাইকোর্টে মামলাটা কী অবস্থায় আছে দেখতে হবে। শুনানির জন্য রেডি আছে কি না জানা দরকার। অপলক, দেবপ্রিয়া, তোমরা দু—জন কালকেই কোর্টে গিয়ে ক্রিমিনাল সেকশনে গিয়ে একবার খোঁজ নেবে, মামলাটা শুনানির জন্য রেডি হয়েছে কি না?'

অপলক, দেবপ্রিয়া দু—জনেই ঘাড় নাড়লেন।

'রুদ্রবাবু, আপনার কাছে মামলা সংক্রান্ত যাবতীয় যা কাগজপত্র আছে, সব দিয়ে যান। আমরা স্টাডি করব।'

রুদ্রবাবু এবার চটের ব্যাগ থেকে ধীরে ধীরে সমস্ত কাগজ, ফাইল বের করে টেবিলে রাখলেন। 'দ্বৈপায়ন, প্রিয়াঙ্কা, মৌমিতা, সমস্ত কাগজ বুঝে নাও। অভিযোগপত্র, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট, চার্জশিট, আলিপুর কোর্টের রায়—যাতে রূপাদেবীর যাবজ্জীবন সাজা হল, আলিপুর কোর্টে মামলা চলাকালীন সমস্ত সাক্ষীর দেওয়া সাক্ষ্যের কপি, হাইকোর্টে দায়ের হওয়া আপিল মামলা সব।'

কন্দর্পনারায়ণ এবার জুনিয়রদের দিকে তাকালেন। সবার মুখ কাঠিন্যে ভরা। রূপা রায়ের জীবনকাহিনির সঙ্গে ওঁরাও কীরকম নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছেন। সবাইকেই চার্জড লাগছে। রুদ্রবাবু ভয়ে ভয়ে বললেন, 'স্যার, মামলাটা আপনি নিচ্ছেন তো? শুধু একবার বলুন, হ্যাঁ নিচ্ছি। তাহলেই হবে। বাড়িতে গিয়ে মা—কে শুধু বলব—মা, কন্দর্পনারায়ণবাবু মামলাটা নিতে রাজি হয়েছেন, তাহলেই আজকে মা একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোবেন। আসলে সেদিন জেলে গিয়ে অনুশীলা ম্যাডাম আর শুভদীপবাবুর কাছ থেকে আপনার কথা জেনে আসার পর, মা—কে বলাতে, মা—তো আপনার কথা শুনে ভীষণ খুশি। বললেন, উনি কি আর আমাদের মামলাটা নেবেন, আমরা তো বেশি ফিজও দিতে পারব না। আর কেসটাও হাইলাইটেড কেস, তাই আর কী। আসলে জানেন তো? ঘরপোড়া গোরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরাই— আপনি একবার শুধু বলুন, আপনি আমাদের পাশে আছেন, তাহলেই হবে।'

কন্দর্পনারায়ণ মোবাইলে টুংটাং করে পর পর অনেক মেসেজ ঢোকার শব্দ পেলেন, বুঝলেন, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ঢুকছে। মোবাইলটা তুলে হোয়াটসঅ্যাপে, 'চেম্বার' গ্রুপটা খুলে দেখলেন—জুনিয়ররা হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েছেন—'স্যার, কেসটা নিন।' 'স্যার, রাজি হয়ে যান।' 'স্যার, রূপা রায় আর রুদ্র রায়ের ঘটনা শুনে খুব খারাপ লাগছে। ওদের পাশে থেকে, কেসটা নিন। আমরা আপনাকে সাধ্যমতো অ্যাসিস্ট করব।' কে যেন আবার লিখেছেন—'ইসস, ভদ্রলোক এখনও বিয়েই করতে পারেননি। ওনার দিদিকে আমরা জেল থেকে বের করলে ওঁর ভালো বিয়ে হবে। কেসটা নিয়ে নিন স্যার।'

কন্দর্পনারায়ণ পর পর মেসেজগুলো পড়ে নিয়ে, একটু হেসে, মোবাইলটা টেবিলের ওপর রেখে সোজা হয়ে বসে রুদ্রবাবুকে বললেন, 'রুদ্রবাবু, এতদিন যা ছিল আপনার একার লড়াই, আজ থেকে তা আমাদের সবার লড়াই হল। যান, আমি একা নই, আমরা সবাই আপনার সঙ্গে আছি। আপনার মা—কে আমার শ্রদ্ধা জানাবেন।' তারপর একটু থেমে আবার বললেন, 'আর হ্যাঁ, ওঁনাকে এটাও বলবেন—যে আমি খুব সাধারণ একজন উকিল। গ্যারান্টি দিয়ে মামলা করা সম্ভব নয়। তবে, আমার সিনসিয়ারিটিতে কোনও ফাঁকি থাকবে না, মরার আগে মরব না।'

2020, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিক, সন্ধেবেলা

চেম্বারে নাওয়া—খাওয়ার সময় নেই। সামনের সপ্তাহেই হাইকোর্টে রূপা রায়ের মামলার শুনানি শুরু হবে। রুদ্রবাবু, রুদ্রবাবুর মা দেবযানীদেবী, এর মধ্যে বেশ কয়েকবার কন্দর্পনারায়ণের চেম্বারে এসে দেখা করে গিয়েছেন। প্রত্যেকবারই কন্দর্পনারায়ণের হাত ধরে অনুরোধ করেছেন, যাতে হাইকোর্ট থেকে রূপাকে নির্দোষ প্রমাণ করে বের করে আনা হয়। কন্দর্পনারায়ণ একবারও কথা দেননি, প্রত্যেকবারই বলেছেন, 'আপ্রাণ চেষ্টা করব। আমাদের চেষ্টাতে কোনও ত্রুটি থাকবে না। আপনি আমাদের উপর আস্থা রাখুন।' দেবযানীদেবী চোখের জল মুছতে মুছতে চেম্বার থেকে বেরিয়েছেন।

প্রত্যেকবারই কন্দর্পনারায়ণ সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন 'হে ঈশ্বর, আমি যেন এই অসহায় মা—র চোখের জলের মূল্য চোকাতে পারি।' জুনিয়রদের বলেছেন, 'খাটো, খাটো, আরও খাটো, ভালো করে পড়ো। আমি মনে করি, হাইকোর্টে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে একটা আপিল মামলা করতে গেলে, মূল মামলার বিষয়গুলি একশোবার করে পড়তে হবে—বার বার পড়তে হবে। কোনও পয়েন্ট যেন মিস না হয়। একটা কাগজও যেন বাদ না যায়।' জুনিয়ররাও সেইমতো ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মামলা সংক্রান্ত যাবতীয় নথির উপর।

চেম্বারে, কন্দর্পনারায়ণের নিজস্ব টেবিলের ওপর থেকে, অন্য সমস্ত মামলার নথি, ব্রিফ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু রূপা রায়ের মামলা সংক্রান্ত কাগজেই এখন টেবিলটা ঠাসা থাকে। কন্দর্পনারায়ণ দিবারাত্র এই একটা মামলাতেই ডুবে রয়েছেন। জুনিয়রদের বলে দিয়েছেন, 'অন্য সমস্ত কোর্টের যাবতীয় মামলা এখন তোমরাই দেখবে। আমি আগামী কয়েকদিন এখন, শুধুমাত্র এই একটা মামলা নিয়েই ভাবতে চাই। আমি এখন শুধুমাত্র এই একটা মামলা নিয়েই পড়াশোনা করছি। এখন আমি আর অন্য মামলা নিয়ে ভাবতেও চাই না। মহাভারতের অর্জুনের ফোকাস এখন নষ্ট করতে চাই না। মহাভারতের অর্জুনের জলভরা থালায় মাছের চোখ দেখে বাণ ছুড়ে লক্ষ্যভেদ করার মতো আমারও একটাই উদ্দেশ্য—লক্ষ্যভেদ।'

আর বাস্তবে হলও তা—ই, কন্দর্পনারায়ণ ঘুমোতে ঘুমোতে, খেতে খেতে, হাঁটতে হাঁটতে এই একটাই মামলার কথা ভেবে যাচ্ছেন।

সেদিনই তো রাত্রে খেতে বসে ডালের বাটি থেকে, ডাল ভাতের মধ্যে ঢালতে গিয়ে, জলের গ্লাস থেকে জল ঢেলে দিলেন ভাতের মধ্যে। ওঁর স্ত্রী অবশ্য খুব একটা অবাক হননি। তিনি কন্দর্পনারায়ণকে দেখে আসছেন অনেকদিন ধরেই। প্রায় কুড়ি বছর হল বিয়ে হয়েছে দু—জনের, বড় মামলার আগে এই অন্যমনস্কতা তাঁর গা—সওয়া। তিনি তাড়াতাড়ি উঠে ভাতের থালা পালটে দিলেন।

সেদিন সকালবেলা যেমন, দাঁত মেজে, দাড়ি কাটবেন বলে শেভিং ব্রাশ—এ ক্রিম লাগিয়ে গালে লাগাচ্ছিলেন। কিন্তু কিছুতেই ফেনা হচ্ছিল না, তারপর খেয়াল করলেন, শেভিং ব্রাশ—এ টুথপেস্ট লাগিয়ে গালে ঘষে যাচ্ছেন।

কন্দর্পনারায়ণও জানেন, এই অন্যমনস্কতা আসলে দিবারাত্রি মামলা নিয়ে চিন্তাভাবনা করারই লক্ষণ।

তবে কয়েকটা পয়েন্ট এখনও ক্লিয়ার হয়নি। নিম্ন আদালতে সাক্ষীদের যে বয়ান দেওয়া হয়েছে, সেই বয়ানগুলো কিছুতেই যেন পরিষ্কার হচ্ছে না। আরও পড়তে হবে, আরও ভাবতে হবে। চেম্বারে মামলার নথিগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে কন্দর্পনারায়ণ অপলককে জিজ্ঞাসা করলেন, 'অপলক, সুপ্রিম কোর্টের যে রায়গুলো বের করতে বলেছিলাম, ওগুলো দাও। এ ছাড়া, অনেকদিন আগে, আমি কলকাতার সবচেয়ে বড় টেরর অ্যাটাকের মামলা করেছিলাম, যেটা সবাই আমেরিকান সেন্টার অ্যাটাকের ঘটনা বলেই জানে। সেই ঘটনাতে কলকাতা পুলিশের চোদ্দোজন পুলিশকর্মী মারা গিয়েছিলেন আর বহু পুলিশ কর্মী আহত হয়েছিলেন। আফতাব আনসারি—সহ সাতজন মানুষ অভিযুক্ত হয়েছিলেন। আমার মক্কেল ছিলেন ফারহাত আলম ও অন্য দু—জন, এঁদের সবার বিরুদ্ধেই নিম্ন আদালতে দেশদ্রোহিতা, হত্যা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এবং নিম্ন আদালত এঁদের দোষী সাব্যস্ত করে ওই সাতজন অভিযুক্তকেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। হাইকোর্টে আমি ফারহাত আলম—সহ তিনজন অভিযুক্তের হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম এবং হাইকোর্ট মূল দু—জন অভিযুক্ত ছাড়া বাকি পাঁচজনকেই খালাস করে দেন, ছোটখাটো কিছু অপরাধের সাজা দেওয়া ছাড়া তাঁদের ফাঁসির সাজা মাফ করে দেন। মহামান্য বিচারপতি অসীমকুমার ব্যানার্জি এবং মহামান্য বিচারপতি কালিদাস মুখার্জির ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানি হয়েছিল। চৌষট্টি দিন একনাগাড়ে আর্গুমেন্ট হয়েছিল। ওই মামলাটাতে একটা পয়েন্ট নির্ধারিত হয়েছিল—যে ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বলতে কী বোঝায়? এই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের আইনি বৈশিষ্ট্য কী? ধরা যাক, এই চেম্বারে আমরা সাতজন পড়াশোনা করছি। দ্বৈপায়ন, চেম্বার শেষে এখান থেকে বেরিয়ে গেল। রাস্তায় ওর সঙ্গে কারও বচসা হল। ও সেই লোকটাকে ঘুসি মারল। এবারে সেই লোকটা কি অভিযোগ করতে পারে, যে কন্দর্পনারায়ণবাবুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে যখন দ্বৈপায়নবাবু ওঁকে মেরেছেন, তখন কন্দর্পনারায়ণবাবুর সঙ্গে দ্বৈপায়নবাবু ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি করেই ওঁকে মেরেছে?'

চেম্বারে হাজির জুনিয়ররা বললেন, 'না না, তা কী করে হবে?'

মৌমিতা বললেন, 'ক্রিমিনাল কন্সপিরেসির কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। তার মধ্যে না এলে কাউকেই বলা যাবে না, যে, তিনি ষড়যন্ত্র—এর মধ্যে ছিলেন।'

প্রিয়াঙ্কা বললেন, 'যদি কেউ প্ল্যান করে কোনও মার্ডার করে, বা যদি কেউ ওই প্ল্যানের মধ্যে কোনও পার্ট নেয়, তাহলেই তো বলা যাবে যে সেই লোকটাও কন্সপিরেসি করেছে?'

অপলক বললেন, 'এগজ্যাক্টলি, ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রেও, যারা ষড়যন্ত্র করছে, তাদের মধ্যে একটা এগ্রিমেন্ট বা মিটিং অফ মাইন্ড হতে হবে। তাকেও ওই প্ল্যানে সহমত হতে হবে।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ঠিক তা—ই। আমি যদি চেম্বারে বসে, দ্বৈপায়নকে বলতাম, চলো, ওই লোকটাকে ঠেঙাব, তারপর দ্বৈপায়ন আমার সঙ্গে একমত হত, অর্থাৎ 'মিটিং অফ মাইন্ড' বা 'এগ্রিমেন্ট অফ মাইন্ড' হত, তারপর লোকটাকে মেরে আসত, তাহলে কিন্তু আমারও ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি করা, বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়া হত। ওই যে আমেরিকান সেন্টার অ্যাটাক কেসটার কথা বললাম, সেখানে অভিযোগ ছিল যে, আফতাব আনসারি অন্য ছ—জনের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে আমেরিকান সেন্টারে গুলি চালিয়েছে। যেখানে চোদ্দোজন পুলিশকর্মীর মৃত্যু হয়। ওই মামলায় হাইকোর্ট একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, যে সাতজনকে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল, তারা কেউ গুলি চালায়নি। গুলি চালিয়েছিল অন্য লোক, যাকে হাজারিবাগে একটা এনকাউন্টারে পুলিশ মেরে ফেলে। আমাদের মক্কেলরা নাকি ওই আমেরিকান সেন্টার অ্যাটাকে শুধু ষড়যন্ত্র করেছিল। ওই মামলাতে আমি ওই পয়েন্টটাই নিয়েছিলাম, বলেছিলাম, আমার মক্কেলরা গুলিও চালায়নি, আর যারা গুলি চালিয়ে পুলিশকর্মীদের মেরেছে, তাদের চিনতও না, তাদের কোনওদিন দেখেওনি। তাদের সঙ্গে মুখোমুখি বসে বা টেলিফোনে কোনও মিটিংও করেনি, গুলি চালাবার প্ল্যানের কথাও জানত না, তাই, আমার মক্কেলদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও খাটে না। অবশেষে মহামান্য বিচারপতি অসীমকুমার ব্যানার্জি ও মহামান্য বিচারপতি কালীদাস মুখার্জির ডিভিশন বেঞ্চ, আমেরিকান সেন্টার অ্যাটাক কেসের মতো গুরুতর মামলা থেকে আমার মক্কেলদের খালাস করে দেন।

'রূপা রায়ের মামলাটাও ঠিক সেইরকম। রূপা রায় নিজে খুন করেছেন, এটা কিন্তু পুলিশ বলছে না। পুলিশের বক্তব্য হল, সুমন ব্যানার্জিকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান সৈকত দত্ত। নিয়ে চলে যান মল্লিকবাজারে, একটা গাড়ির গ্যারাজে। সেখানে সারারাত ধরে সুমন ব্যানার্জির উপর চলে অকথ্য নির্যাতন। ভোরবেলা ধাপার ধারে সুমন ব্যানার্জির অর্ধমৃত দেহটাকে লরি করে নিয়ে গিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। পুলিশের বক্তব্য, এই গোটা ব্যাপারটাতে ষড়যন্ত্রকারীর ভূমিকায় ছিলেন সুমন ব্যানার্জির স্ত্রী—শ্রীমতী রূপা রায়। যেহেতু সৈকত দত্তর সঙ্গে রূপা রায়ের অবৈধ সম্পর্ক ছিল, সেইহেতু রূপা রায় সুমন ব্যানার্জিকে হত্যা করে সৈকত দত্তকে বিয়ে করতে চাইছিলেন। তিনিই সৈকত দত্তর সঙ্গে ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করে সুমন ব্যানার্জিকে খুন করিয়েছেন। যেহেতু, নিজের হাতে খুন করলেও যে সাজা, খুনের ষড়যন্ত্রে উপস্থিত থাকলেও সেই একই সাজা, তাই এখানে রূপাদেবীকেও সুমন ব্যানার্জি হত্যার ঘটনায় ষড়যন্ত্র করে সুমন ব্যানার্জিকে হত্যার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই দেওয়া হয়েছে।'

'এখন আমাদের দেখাতে হবে, রূপাদেবী সুমন ব্যানার্জিকে হত্যার ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। আর—একটা কথা মনে রেখো। এখানে, অভিযোগকারিণী ইনফ্লুয়েনশিয়াল, তাদের সঙ্গে লড়াই। মিডিয়া অপেক্ষা করে থাকবে, আমাদের তাঁদেরও বোঝাতে হবে, যে রূপা রায় দোষী নন। কাজেই আমাদের হাইকোর্টের জজ সাহেবদের যেমন যুক্তি দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে, সরকারি আইনজীবীকে আমাদের যুক্তিজালে জড়িয়ে দিতে হবে, মিডিয়া, বিপরীত পক্ষ, সবাইকে কিন্তু ওই যুক্তি দিয়েই চুপ করাতে হবে। কাজেই আমাদের লড়াই বেশ কঠিন। এখানে আবেগের কোনও জায়গা নেই।'

3rd February, 2020

রিচার্ড হ্যাডলির বোলিং রান আপটার কথা মনে আছে? মসৃণ, দ্রুত গতির, সুন্দর একটা রান আপ। তারপর আরও সুন্দর একটা ডেলিভারি, কিন্তু বোলিংয়ে মেশানো থাকত সুইংয়ের ভয়ংকর বিষ। ঠিক সেইরকমই হল, আজকে কোর্টে রূপা রায়ের মামলার শুনানির শুরুটা।

বলা হয়, একজন পাইলট প্লেন চালানোর ক্ষেত্রে কতটা দক্ষ, তা বোঝা যায় তাঁর টেক অফ এবং ল্যান্ডিং কতটা মসৃণ, জার্ক ফ্রি হয়, সেটা দেখে। যে পাইলট যত মসৃণভাবে প্লেন নিয়ে টেক অফ করে উড়ে যাবেন, বা যত মসৃণ, জার্কবিহীনভাবে রানওয়েতে ল্যান্ড করবেন, তিনি নাকি ততটই দক্ষ।

আজ মামলার শুরুটা হল এইরকমই মসৃণ বা জার্ক ফ্রি।

যেহেতু রূপা রায়কে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাই তাঁর মামলাটা ডিভিশন বেঞ্চেই হচ্ছে। সৈকত দত্তর মামলাও একসঙ্গেই শুনানি শুরু হয়েছে।

তবে, রূপা রায়ের লইয়ার হিসেবে কন্দর্পনারায়ণ প্রথম থেকে গোটা মামলাটা পেশ করছেন কোর্টের সামনে।

সকালে খবরের কাগজ খুলতেই আজকের মামলার খবর চোখে পড়েছে। তেরো বছর আগের মিডিয়া হাইলাইটেড কেস আজকেও খবরের শিরোনামে, 'কী আছে রূপা রায়ের ভাগ্যে?' 'সত্যিই কি রূপা রায় দোষী?' 'বিশিষ্ট লইয়ার কন্দর্পনারায়ণ কি পারবেন তেরো বছর পর রূপা রায়কে নির্দোষ প্রমাণ করতে?' এইরকমই সব বিভিন্ন কাগজের হেডলাইন। কন্দর্পনারায়ণ অবশ্য এইরকম গুরুত্বপূর্ণ মামলার দিনগুলোতে খবরের কাগজ পড়েন না। পড়লে অহেতুক নিজের ওপর চাপ বাড়ে। তিনি শুধু চান একমনে নিজের কাজটা করে যেতে, একজন খেলোয়াড়ের মতোই। ফোকাসটা নড়ে যাক, তিনি চান না। কোর্ট রুমে আজ তিলধারণের জায়গা নেই। অনেক উৎসুক মানুষ এসেছেন। অন্য অন্য মামলার লইয়াররা তো আছেনই, তা ছাড়া, আইন নিয়ে পড়াশোনা করছেন, এমন অনেক ছাত্রছাত্রীও এসেছেন। প্রিন্ট মিডিয়া আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরাও আছেন।

আজকে দু—জন বিচারপতিই খুব বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ, কিন্তু খুঁতখুঁতে। প্রতিটি পয়েন্টে তাঁদের সন্তুষ্ট করতে না পারলে যে আজ মুশকিল হবে, এটা কন্দর্পনারায়ণ বিলক্ষণ জানেন, তাই সবদিক দেখে আর্গুমেন্ট করতে শুরু করেছেন।

প্রথমে তিনি অভিযোগকারিণী, অর্থাৎ মৃত সুমন ব্যানার্জির মা—র করা অভিযোগপত্রটা কোর্টে পড়ে শোনালেন, তারপর বলতে শুরু করলেন—

প্রথম পয়েন্ট, রূপা রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, সুমন ব্যানার্জির নিখোঁজ হবার দু—দিন, পর অর্থাৎ পাঁচই ডিসেম্বর রাত্রে, বাড়িতে পুলিশ ঢোকার পর। সুমন ব্যানার্জি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন দু—হাজার সাত সালের তেসরা ডিসেম্বর, রাত আটটার পর। সেই সময় রূপা রায় বাপের বাড়িতে।

বাড়ি থেকে বেরোবার সময় সুমন ব্যানার্জি তাঁর মা—কে, অর্থাৎ অভিযোগকারিণীকে পরিষ্কার বলে যান, যে তিনি তাঁর বিজনেস পার্টনার সৈকত দত্তর সঙ্গে বেরোচ্ছেন। প্রসিকিউশন কেস অনুযায়ী সেই রাত্রেই বা ভোরের দিকে সুমন ব্যানার্জি খুন হন। চৌঠা ডিসেম্বর সুমনবাবুর মৃতদেহ শনাক্তকরণ হয়। পোস্টমর্টেম থেকে দেহ ফেরত পাবার পর পাঁচ ডিসেম্বর দিনের বেলায় দাহকার্য সম্পন্ন হয়। পুলিশ যদিও অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য একটা কেস করেছিল, তবুও সুমন ব্যানার্জির মায়ের নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে পাঁচ তারিখ গভীর রাতে রূপা রায়কে তাঁর শোবার ঘর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই মামলায় অপর অভিযুক্ত হলেন সৈকত দত্ত। যিনি সুমন ব্যানার্জির দীর্ঘদিনের বন্ধু ও বিজনেস পার্টনার। তেসরা ডিসেম্বর তাঁর সঙ্গেই বেরিয়ে গিয়েছিলেন সুমন ব্যানার্জি এবং তার প্রমাণও রয়েছে। গল্ফগ্রিনের কাফে কফি ডে'র সিসিটিভি ফুটেজ, যেগুলো নিম্ন আদালতে পুলিশ 'এগজিবিট' করেছে, অর্থাৎ পুলিশ সেগুলোর ওপর নির্ভর করে কেস সাজিয়েছে।

অর্থাৎ, 'লাস্ট সিন টুগেদার' থিয়োরি, বা 'শেষ দেখা গেছে যার সঙ্গে', সেই থিয়োরিটা প্রমাণিত হয় সৈকত দত্তর বিরুদ্ধে, রূপাদেবীর বিরুদ্ধে নয়। তিনি, সুমনবাবু শেষবারের মতো বাড়ি থেকে বেরোবার আগেই, নিজের বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন।'

কন্দর্পনারায়ণ একটু দম নিয়ে আবার শুরু করলেন—

'প্রথম থেকেই এই বিয়েটাকে মন থেকে মেনে নিতে পারেননি সুমন ব্যানার্জির মা—অরুন্ধতীদেবী। তার তিনটে প্রধান কারণ—এক, গড়িয়াহাট প্যান্টালুন্সের সেলস গার্ল তাঁদের মতো বনেদি বড়লোক বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে, এটা তিনি মেনে নিতে পারেননি।

দুই, রূপাদেবী বাঙাল বাড়ির মেয়ে, আর তাঁরা ঘটি বলে অরুন্ধতী দেবী সবসময়ই রূপাদেবীকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করতেন ও ঠেস দিয়ে কথা বলতেন, এমনকী বাঙালরা যে কাঁটাতার—পেরিয়ে আসা ভিখিরি, সে কথা বলতেও তিনি দ্বিধা করেননি।

তিন নম্বর, রূপাদেবী, স্বাধীনচেতা, শিক্ষিতা মহিলা, তিনি স্কুলে পড়ানোর শেষে বাড়িতে ফিরে স্বামীর বন্ধুদের সঙ্গে কফি খেতে খেতে ক্যারম খেলতেন, স্বামীর বন্ধুদের নাম ধরে ডাকতেন, আবার 'আপনি' বলে সম্বোধন করতেন। এই আধুনিকমনস্কতা অরুন্ধতীদেবী মানতে পারতেন না। বাড়িতে পুত্রবধূর নাইটি পরে থাকাও তিনি পছন্দ করতেন না। আশ্চর্য ব্যাপার হল, রূপাদেবী একদিনের জন্যও অরুন্ধতীদেবীর সঙ্গে ঝগড়া করেননি। অরুন্ধতীদেবী যখন যা হুকুম করেছেন, বা ফরমান জারি করেছেন, রূপাদেবী বিনা বাক্যব্যয়ে, তা—ই মেনে নিয়েছেন। রূপা দেবীর এই 'ভালোমানুষি' আবার অরুন্ধতীদেবী মেনে নিতে পারেননি। তিনি রূপাদেবীর 'সব কথা মেনে চলা'কে 'নাটক' বা 'অভিনয়' বলে মনে করেছেন।

মাই লর্ড, কখনো কখনো বোধহয় পুত্রবধূ আর শাশুড়ির ঝগড়া হওয়াও দরকার, তাতে মনের কোণে লুকিয়ে—থাকা ক্লেদ, অসন্তোষ বা আরও কিছু বেরিয়ে যায়, এখানে অরুন্ধতীদেবীর মনের ক্রোধ অরুন্ধতীদেবী মনেই জমিয়ে রেখেছিলেন। ছেলের দাহকার্য সম্পন্ন হবার পর, তিনি তা—ই পুত্রবধূর বিরুদ্ধে বিষ হিসেবে বের করে এনেছেন।

মাই লর্ড, এতক্ষণ আমি যা বললাম, তা কিন্তু কোনও গল্পকথা নয়। আমি জানি, আদালতে গল্পকথা চলে না। এই মামলায় মোট একুশজন সাক্ষীর মধ্যে ছ—জনই বাড়ির কাজের লোক। এই ছ—জন মানুষই গল্ফগ্রিনের এই ব্যানার্জি পরিবারকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, বাড়ির ড্রাইভার, রান্নার লোক, বাচ্চা দেখার জন্য দু—জন লোক, বাড়ির মালী আর যিনি সবসময় বাড়িতেই থাকতেন, সেই লক্ষ্মীদি। তাঁরা কিন্তু একবাক্যে বলেছেন যে অরুন্ধতীদেবী, রূপাদেবীকে একেবারেই পছন্দ করতেন না।

মাই লর্ড, এই মামলায় পনেরো নম্বর সাক্ষী হলেন সুমনবাবুর বিজনেসের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট শ্যামল সিকদার। শ্যামলবাবুর সাক্ষী যদি আমি আপনার কাছে প্লেস করি, তাহলে বোঝা যাবে, অরুন্ধতীদেবীর রূপাদেবীকে অপছন্দ করার আরও কারণ ছিল।

শ্যামলবাবু তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন, যদিও বিয়ের আগে সুমন ব্যানার্জির ব্যবসা দেখতেন মূলত তাঁর মা অরুন্ধতীদেবী, কিন্তু বিয়ের পর থেকেই ব্যবসার কাজেও সুমনবাবু নির্ভর করতে শুরু করেন তাঁর স্ত্রী—র ওপরেই। কারণ, রূপাদেবী ছিলেন তুখোড় বুদ্ধিমতী ও হিসেবি। রূপাদেবী স্বামীর ব্যবসায় সাহায্য শুরু করায় সুমনবাবু আস্তে আস্তে রূপাদেবীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিলেন। এই ব্যাপারটাও অরুন্ধতীদেবী মেনে নিতে পারেননি।

মাই লর্ড, এই মামলার অপর অভিযুক্ত সৈকত দত্ত ছিলেন সুমনবাবুর রেস্তোরাঁ বিজনেসের পার্টনার। অনেকদিন ধরেই তিনি সুমনবাবুকে ঠকিয়ে আসছিলেন। বিয়ের পর ব্যবসার কাগজ দেখতে দেখতে রূপাদেবী সৈকত দত্তর এই জোচ্চুরিটা ধরে ফেলেন। পরের পাঁচ বছর সুমনবাবুর ব্যবসায় মোট লসের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা। সুমনবাবু টাকার দাবি করতে থাকেন। সৈকত দত্ত বিপদ আসছে বুঝে সুমন ব্যানার্জিকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবার প্ল্যান করছিলেন অনেকদিন ধরেই। ঘটনার দিন তিনি ফোন করে ডাকেন সুমনবাবুকে। প্রথমে গল্ফগ্রিনের কাফে কফি ডে—তে নিয়ে যান, সেখান থেকে সুমনবাবুর গাড়িতে করেই তাঁরা একসঙ্গে চলে যান। এই ঘটনার সাক্ষী শুধু সিসিটিভি ফুটেজই নয়, কাফে কফি ডে—র কর্মী অশোক দাশ, যিনি এই মামলার চোদ্দো নম্বর সাক্ষী, তিনি টি. আই. প্যারেডে এবং আলিপুর আদালতে সৈকত দত্তকে শনাক্তও করেছেন।

মাই লর্ড, এই মামলার তদন্তকারী অফিসার তাঁর সাক্ষীতে মেনে নিয়েছেন, যখন আলিপুর আদালতে রূপাদেবীর আইনজীবী তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, শুরুতে অভিযোগকারিণী অরুন্ধতী দেবী এবং তাঁর বড়ভাই, পুলিশের প্রাক্তন বড়কর্তা, ঘটনায় রূপাদেবীর ইনভলভমেন্ট সম্পর্কে কিছুই বলেননি। যেদিন রূপাদেবী অ্যারেস্ট হন, অর্থাৎ পাঁচই ডিসেম্বর, সেদিন সারাদিন ধরেই অরুন্ধতীদেবী টিভি—তে 'বিশেষ খবর' বলে একটা অনুষ্ঠান দেখছিলেন—সেখানে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল যে, যেহেতু রূপাদেবী সৈকত দত্তর সঙ্গে বেশ কয়েকবার ব্যবসার কাজে গাড়িতে করে ওঁদের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের অফিসে গেছেন, বা ট্রেড লাইসেন্স রিনিউ করবার কাজে বেরিয়েছিলেন, সেইহেতু, ওঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক আছে কি না, বা একটা ত্রিকোণ প্রেমের গন্ধ এই হত্যারহস্যের মধ্যে আছে কি না?

মাই লর্ড, এই 'বিশেষ খবর' অনুষ্ঠানটির সাংবাদিককেও ডেকে এনে আদালতে জিজ্ঞাসা করা হয়, যে তাঁর কাছে রূপাদেবীর সঙ্গে সৈকত দত্তর অন্তরঙ্গতার কোনও প্রমাণ আছে কি না? সেই সাংবাদিক কিন্তু তেমন কোনও প্রমাণ আদালতে দিতে পারেননি, কিন্তু ততদিনে যা ক্ষতি হবার রূপাদেবীর জন্য তা হয়ে গিয়েছে। পাঁচই—ডিসেম্বর, সারাদিন টিভিতে নিজের ছেলের হত্যা কাহিনির রসালো বর্ণনা শুনে তিনিও নিশ্চিত হলেন, যে তাঁর পুত্রবধূই এই হত্যার নেপথ্যে রয়েছেন।

মাই লর্ড, এবার আমি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন মামলার রায় আপনাদের কাছে পেশ করছি। এই মামলাগুলিতে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ও আমাদের মহামান্য হাইকোর্ট বিভিন্ন সময় বলেছেন যে 'ষড়যন্ত্র' প্রমাণ করতে গেলে প্রসিকিউশনকে বা সরকারি পক্ষকে দেখাতেই হবে যে, অভিযুক্তরা কোথাও অপরাধ ঘটানোর জন্য একমত হয়েছিলেন। এই মামলাতে, রূপাদেবী তাঁদের ব্যবসার জন্য সৈকত দত্তর গাড়িতে করে সৈকত দত্তর পাশে বসে এক জায়গা থেকে আর—এক জায়গায় গিয়েছিলেন—এ কথা সত্যি, কিন্তু রূপাদেবী সৈকত দত্তর সঙ্গে প্ল্যান করে বা পরামর্শ করে সুমন ব্যানার্জিকে হত্যা করেছেন—সরকারপক্ষ এই জায়গাটা প্রমাণ করতেই পারেননি।

মাই লর্ড, এবার আসি 'মোটিভ' পার্টে, অর্থাৎ সুমন ব্যানার্জিকে হত্যা করে কে লাভবান হবেন, সেই প্রশ্নে।

মাই লর্ড, সব হত্যার মামলাতেই একটা মোটিভ থাকে। এই ধরনের 'সারকমস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স'—এর মামলাতে, অর্থাৎ যেখানে হত্যার কোনও প্রত্যক্ষদর্শী নেই, পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণাদির উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে—থাকা এই ধরনের মামলাতে 'মোটিভ' অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একটা কথা পরিষ্কার যে, সুমন ব্যানার্জিকে মারলে সৈকত দত্তকে আর পঞ্চাশ লাখ টাকা দিতে হবে না। তাঁর ক্ষেত্রে মোটিভ স্পষ্ট। অন্যদিকে, সুমন ব্যানার্জিকে বিয়ে করে রূপাদেবীর লাভ কিন্তু হয়নি। তিনি নিজের আই.এ.এস হবার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়েছেন, এই ধরনের স্বাধীনচেতা, লড়াকু, শিক্ষিতা মেয়ের কাছে বিয়েটাই বড়, অর্থ নয়। তিনি সুমনবাবুকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলেন, সুমনবাবুর অর্থকে নয়। তিনি নিজে একটি বেসরকারি স্কুলে পড়াতেন। মানে তাঁর নিজস্ব রোজগারও ছিল। সত্যি সত্যি যদি সুমনবাবুকে তাঁর অপছন্দ হত, তিনি সুমনবাবুকে ডিভোর্স করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। সরকারপক্ষ যেরকম বলতে চাইছেন যে, সুমনবাবুকে ডিভোর্স করে তিনি সৈকতবাবুকে বিয়ে করতেন, এরকম কোনও তথ্যপ্রমাণ সরকারপক্ষ দিতেই পারেননি। রূপাদেবী যেমন সুমনবাবুর বিরুদ্ধে আদালতে ডিভোর্স চাননি, তেমনি সৈকত দত্তও তাঁর স্ত্রী—র বিরুদ্ধে ডিভোর্সের মামলা দায়ের করেননি। তাহলে শুধু শুধু রূপাদেবী সুমনবাবুকে মারবেন কেন? সর্বোপরি, মল্লিকবাজারের যে গ্যারাজে সৈকত দত্ত সুমন ব্যানার্জিকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছেন, সেখানে রক্তের দাগ পাওয়া গেছে, যা সুমনবাবুর রক্তের সঙ্গে ম্যাচ করে যাচ্ছে। যে ছুরি দিয়ে সুমনবাবুকে খুন করা হয়েছে, পুলিশ সেই ছুরিটিও সৈকত দত্তর দেখিয়ে—দেওয়া জায়গা থেকে উদ্ধার করেছেন। সৈকত দত্ত সুমনবাবুকে খুনের পর ছুরিটিকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

কাজেই, এই মামলায় রূপাদেবী সৈকত দত্তর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুমন ব্যানার্জিকে হত্যা করেছেন, এই বক্তব্য আদৌ প্রমাণিত হয় না। অতএব মাই লর্ড, রূপাদেবীকে যাবতীয় অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক।

এই বলে কন্দর্পনারায়ণ তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন। কন্দর্পনারায়ণের বলা শেষ হতেই জজ সাহেবরা উৎসুক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সরকারি আইনজীবীর দিকে তাকালেন। এতক্ষণ জজ সাহেবরা কন্দর্পনারায়ণের বক্তব্য শুনতে শুনতে নোট করছিলেন, মামলার নথিপত্র ঘাঁটছিলেন, মামলা সংক্রান্ত রেকর্ডগুলো দেখছিলেন। কন্দর্পনারায়ণের জমা দেওয়া সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিভিন্ন মামলার রায়ের কপিগুলো দেখছিলেন। দু—জনেই অত্যন্ত ধীর, স্থির, গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। মামলার মধ্যে এতক্ষণ ডুবে ছিলেন।

তাঁরা এবার সরকারি আইনজীবীকে প্রশ্ন করলেন, 'মাননীয় পাবলিক প্রসিকিউটর, আমাদের মূল প্রশ্ন একটাই, রূপা রায় এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না? ব্যস। যদি জড়িত থাকেন, জড়িত থাকার প্রমাণ কী?'

সরকারি আইনজীবীও একজন প্রবীণ মানুষ, কিন্তু ধুরন্ধর তাঁর আইনি বুদ্ধি, তিনি তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, 'আমি দু—জন সাক্ষীকে মূলত আপনাদের সামনে তুলে ধরব। একজন, অভিযোগকারিণী অরুন্ধতী ব্যানার্জি স্বয়ং। নিম্ন আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি বলেছেন—কীভাবে প্রেমের ফাঁদে ফেলে রূপা রায় সুমন ব্যানার্জিকে বিয়ে করে সব সম্পত্তি হাতিয়ে নেবার চেষ্টা করেছেন। প্রথমে তিনি সুমনবাবুর বিশাল ব্যবসাতে নাক গলাতে শুরু করেন, ব্যবসা দেখাশোনা করবার নামে ব্যবসার অ্যাকাউন্টস তছরুপ করতে থাকেন। তারপর সৈকত দত্তকেও একইভাবে রূপের ফাঁদে ফেলে তাঁর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তারপর তাঁর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুমন ব্যানার্জিকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন।'

এই অবধি বলার পরই জজ সাহেবরা সরকারি আইনজীবীকে থামিয়ে দিলেন—'মাননীয় পাবলিক প্রসিকিউটর, গল্প শোনার সময় আমাদের নেই। আপনি কি দেখাতে পারবেন, রূপা রায় সুমনবাবুকে ট্র্যাপ করেছিলেন? পুলিশি তদন্তে উঠে—আসা বিষয়গুলি কিন্তু অন্য কথা বলছে। মৃত সুমন ব্যানার্জি রূপা রায়ের প্রেমে পাগল ছিলেন। বিবাহের প্রস্তাব, সুমন ব্যানার্জিই দেন রূপা রায়কে। রূপা রায় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, বিয়ের জন্য সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় তিনি বসেননি। তা ছাড়া, আপনি কি দেখাতে পারবেন, সুমন ব্যানার্জির ব্যবসা হস্তগত করবার কোনও চেষ্টা, রূপা দেবী করেছিলেন? কখনো কোনও বড় সংখ্যার টাকা রূপাদেবী কী নিজের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছিলেন? রূপাদেবী সুমনবাবুর বিজনেস পার্টনারও তো ছিলেন না—তাহলে সুমনবাবুর ব্যবসায় রূপাদেবীর লোভ ছিল, কী করে বলছেন?'

এবার একজন জজ সাহেব সামনে ঝুঁকে পড়ে সরাসরি সরকারি আইনজীবীকে প্রশ্ন করলেন, 'শুনুন, শাশুড়ি—বউমার কেচ্ছা শোনার মতো সময় আমাদের নেই। এই মামলায় রূপাদেবী ষড়যন্ত্রে জড়িত, এমন কী প্রমাণ আপনার কাছে আছে বলুন?' এই অবধি সব ঠিকঠাকই ছিল, কন্দর্পনারায়ণের জুনিয়ররাও নড়েচড়ে বসলেন, এত তাড়াতাড়ি জজ সাহেবরা কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে একমত হবেন, তাঁরাও ভাবতে পারেননি।

এবারেই সরকারি আইনজীবী তাঁর ঝুলি থেকে বের করলেন আসল তাস।

'মাই লর্ড, তাহলে আমরা সরাসরি চলে আসি সুমন ব্যানার্জির বহুদিনের বন্ধু রোহিত খান্নার সাক্ষ্যে। রোহিত খান্নার নিয়মিত আসা—যাওয়া ছিল মৃত সুমন ব্যানার্জির বাড়িতে। এই রোহিত খান্না, সুমন ব্যানার্জি এবং সৈকত দত্ত, দু—জনের কমন ফ্রেন্ড ছিলেন। একসঙ্গে আড্ডা মারা, খাওয়াদাওয়া, পার্টি করা, বেড়াতে যাওয়া, সবই চলত। তিনি নিজের চোখে দেখেছেন, রূপাদেবীর সঙ্গে সৈকত দত্তর বন্ধুত্ব কীভাবে আস্তে আস্তে প্রেমে পরিণত হয়েছে। তিনিই প্রত্যক্ষদর্শী এই ঘটনার যে, দিনের পর দিন রূপাদেবী আর সৈকত দত্ত একসঙ্গে গাড়িতে বসে ঘুরছেন। এমনকী, সৈকত দত্ত যে রূপাদেবীকে পছন্দ করেন, সেটাও রোহিত খান্নাকে জানিয়েছিলেন। এবারে আমি বেশ কিছু ফোটোগ্রাফ পেশ করব আদালতের সামনে, যা থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে, রূপাদেবী ও সৈকত দত্তর প্রেমের সম্পর্ক ছিল।'

এই বলে সরকারি আইনজীবী, বেশ কয়েকটা রঙিন ফোটোগ্রাফ আদালতে পেশ করলেন।

'এইসব ছবিই রোহিত খান্নার মোবাইল ফোন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।'

কন্দর্পনারায়ণ ছবিগুলো দেখলেন, কোনওটায় সৈকত দত্তর পাশে গাড়িতে বসে রয়েছেন রূপা রায়। হাতে একগাদা কাগজের তাড়া। কোনওটায় রূপা রায়, সৈকত দত্ত একসঙ্গে ক্যারম খেলছেন। কোনওটায় আবার পার্টিতে, ড্রিংকসের গ্লাস হাতে, সৈকত দত্ত আর রূপা রায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

সরকারি আইনজীবী আবার শুরু করলেন 'অর্থাৎ একটা জিনিস পরিষ্কার যে, রূপা রায়ের সঙ্গে সৈকত দত্তর সখ্য ছিল গভীর। দু—জনের যোগাযোগ, বন্ধুত্ব প্রমাণিত। এবার দ্বিতীয় অংশ—তদন্তকারী অফিসার বেশ কিছু ফোন কল—এর লিস্ট নিম্ন আদালতে জমা দিয়েছিলেন। সেখান থেকে পরিষ্কার যে, দিনের পর দিন সৈকতবাবুর সঙ্গে রূপাদেবী কথা বলেছেন। যা থেকে পরিষ্কার যে ফোনে নিয়মিত তাঁদের মধ্যে কথা হত, তা ফোনেও তো ষড়যন্ত্র করা যায়, মাই লর্ড?'

এই বলে সরকারি আইনজীবী বেশ কিছু ফোন কল—এর লিস্ট আদালতে জমা দিলেন। কন্দর্পনারায়ণও একঝলক দেখে নিলেন কললিস্টগুলো। কখনো রূপাদেবী ফোন করেছেন সৈকত দত্তকে, কখনো আবার সৈকত দত্ত ফোন করেছেন রূপাদেবীকে।

এইবার জজ সাহেবরা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। দু—জনেই একবার কন্দর্পনারায়ণের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ওলটালেন। এর অর্থ—খেলার ভাষায়, অ্যাডভান্টেজ সরকারি আইনজীবী।

সেটা বুঝতে পেরে সরকারি আইনজীবী উদ্দীপিত হয়ে উঠলেন। পেছনে জমে—থাকা ভিড়টাকে উদ্দেশ্য করে ঘাড় ঝাঁকিয়ে বললেন, ''হুঁ হুঁ বাওয়া, চল্লিশটা বছর তো আর এমনি এমনি কোর্টে কাটাইনি।' কন্দর্পনারায়ণ ঠোঁট কামড়ে কী যেন ভাবছেন, জুনিয়রদের কাঁধ ঝুলে গিয়েছে। যেন তরুণ বোলার অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যানের কাছে ছ বলে ছ—টা ছয় খেয়ে গিয়েছেন।

জজ সাহেবরা হঠাৎ কোর্টের দেওয়ালে টাঙানো বড় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আজ আর শুনব না, কাল সকাল সাড়ে দশটায় আবার এই মামলাটা শুনব। মিস্টার ডিফেন্স কাউন্সিল, কাল কিন্তু আমাকে একটা পয়েন্টে সন্তুষ্ট করতে হবে, যে ষড়যন্ত্রে রূপাদেবী জড়িত ছিলেন না। মাননীয় পি. পি. কিন্তু রূপাদেবীর সঙ্গে সৈকত দত্তর অতিরিক্ত বন্ধুত্ব আর ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। আমি রোহিত খান্নার সাক্ষ্য যদি বিশ্বাস করে নিই, তাহলে কিন্তু রূপাদেবীর ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মাননীয় ডিফেন্স কাউন্সিল, কাল আপনার সামনে একটা সুযোগ থাকছে। আপনি আমাকে বলুন যে, রোহিত খান্নাকে আমি বিশ্বাস করব? নাকি করব না? যদি রোহিত খান্নাকে বিশ্বাস না করি, কেন করব না?'

জজ সাহেবরা তাঁদের চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন। কন্দর্পনারায়ণ কোর্টরুমে বসেই রইলেন, কী যেন ভাবছেন, জুনিয়ররাও সবাই বুঝতে পেরেছেন, যে মামলা উলটোদিকে ঢলে পড়েছে, কোর্টের মধ্যে আজ রুদ্রবাবুও হাজির ছিলেন, তিনিও চুপ করে দূরে দাঁড়িয়ে আছেন, সরকারি আইনজীবী ঘর ছেড়ে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকদের ভিড়টাও তাঁকে ঘিরেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। কোর্টের বাইরে সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে ধরেছে। সরকারি আইনজীবী আজকে আদালতে তাঁর যে একরকম জয় হয়েছে, সেটাই ফলাও করে বলছেন। সাংবাদিকরা নোট করছেন, তেরো বছর পরে সুমন ব্যানার্জি হত্যা মামলা হাইকোর্টে শুরু হয়েছে, তাতে সরকারপক্ষ সুবিধাজনক অবস্থাতেই আছে, তার মানে, ত্রিকোণ প্রেমের তত্ত্বে হাইকোর্টও স্বীকৃতি দিচ্ছে। এটা যথেষ্ট বড় খবর।

কিন্তু কন্দর্পনারায়ণ সেসব ভাবছেন না, অথচ, মেরুদণ্ড সোজা করে বসে আছেন, 'কোথাও যেন একটা খটকা লাগছে।' রোহিত খান্নার সাক্ষ্যটা এত ভাইটাল হয়ে যাবে, তিনি ভাবতে পারেননি। বেশ খানিকক্ষণ পর অপলক বললেন, 'স্যার, চলুন, একটু বাইরে যাই, একটু লিকার চা খান, মাথাটা ছাড়বে 'প্রিয়াঙ্কা বললেন, 'স্যার, একটু মুখশুদ্ধি দেব?'

কন্দর্পনারায়ণ ফেলুদার কায়দায় বললেন, 'চোখের সামনে একটা পরদা আসছে, আবার সরে যাচ্ছে, কিছুতেই বুঝতে পারছি না হে অপলক। ঠিক আছে, চলো উঠি।'

কন্দর্পনারায়ণ হাইকোর্টের দোতলার করিডোর ধরে আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকলেন। অপলককে বললেন, 'পার্লামেন্টে যে অ্যাটাক হয়েছিল দু—হাজার এক সালে, তাতে বেশ কয়েকজনকে ওই অ্যাটাকের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন শওকত হোসেন গুরু আর তাঁর স্ত্রী নভজ্যোত সন্ধু ওরফে আফসান গুরু। প্রথমে দেশদ্রোহিতা, হত্যা ও ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করলেও পরে কোর্টের নির্দেশে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট অবধি। দু—হাজার পাঁচ সালে সুপ্রিম কোর্ট যুগান্তকারী একটা রায় দেন। ওই জাজমেন্টটা জোগাড় করো তো। আর তাড়াতাড়ি সবাই চেম্বারে চলে এসো, খাটতে হবে।'

মৌমিতা 'পেছন থেকে হঠাৎ বললেন, 'স্যার, রুদ্রবাবু, আপনার পেছনে, হয়তো কিছু বলবেন।'

কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় ঘুরিয়ে রুদ্রবাবুকে দেখলেন, বিষণ্ণ মুখ, হতাশ চোখের দৃষ্টি। কন্দর্পনারায়ণ, খুবই আন্তরিকভাবে, রুদ্রর পিঠে হাত রাখলেন—'কী হল, রুদ্রবাবু? মন খারাপ? ভাবছেন, মামলায় হেরেই গেলাম? ভয় পাবেন না। আজকের রাতটা তো বাকি আছে, এত সহজে হারব না, চলুন—না দেখি কাল কী হয়?' তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে সবাইকে বললেন, 'চলো, সোজা চেম্বারে, এখনও অনেক দৌড় বাকি আছে।'

যেতে যেতে হঠাৎ, পাশ ফিরে রুদ্রবাবুকে বললেন—'আচ্ছা, আপনার জামাইবাবু কী ঘড়ি পরতেন মনে আছে?'

রুদ্রবাবু, একটু ভেবে নিয়ে বললেন, 'কার্তিয়ার, জামাইবাবুর ফেভারিট ব্র্যান্ড ছিল। পার্টিতে গেলেও কার্তিয়ারের মেটাল ব্যান্ডের ঘড়ি। আর বাড়িতে থাকলে কার্তিয়ারেরই একটা ব্ল্যাক লেদার ব্যান্ডের ঘড়ি। সবসময় পরে থাকতেন।'

কন্দর্পনারায়ণ 'হুঁ' বলে হাঁটা লাগালেন।

রেড রোড দিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ছিল সবুজ মাঠ, দূরে কলকাতার বিখ্যাত স্কাইলাইন। সন্ধে হয়ে আসছে। কন্দর্পনারায়ণ হঠাৎ ড্রাইভারকে বললেন, 'উদয়বাবু, গাড়িটা বাঁদিকে ওই মাঠটার কাছে নিয়ে চলুন তো, নামব।' ড্রাইভার তা—ই করলেন। কন্দর্পনারায়ণ গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলেন। রাস্তার দিকে পেছন করে গাড়িতে হেলান দিয়ে, হাত দুটো বুকের কাছে নিয়ে দাঁড়ালেন। বড় বড় গাছ, ঝুপসি অন্ধকার, আস্তে আস্তে দূরের স্কাইলাইনে জ্বলে উঠছে আলো। পেছনে রাস্তা দিয়ে মাঝে মাঝেই একটা—দুটো ঘোড়ায় টানা গাড়ি টুংটাং ঘণ্টা বাজিয়ে ঘোড়ার খুরের খটাখট শব্দ তুলে ছুটে যাচ্ছে। দূরে ডানদিকে, ভিক্টোরিয়ার দিকটায় ফোয়ারাগুলোতে আলো জ্বলে উঠল। কন্দর্পনারায়ণ গড়ের মাঠের এই সৌন্দর্য আজ আর দেখছেন না। 'চোখের সামনে একটা পরদা আসছে। আবার সরে যাচ্ছে। কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে। কোথায়... কোথায়?'

সন্ধেবেলায় চেম্বারে দমবন্ধ করে সবাই মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। 'ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি' বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বলতে কী বোঝায়? অপরাধের মাত্রা কতখানি হলে একজন অভিযুক্তকে ষড়যন্ত্রকারী বলা হবে? সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন মামলায় কী বলেছেন, সেইসব নিয়ে তুল্যমূল্য আলোচনা চলছে। দ্বৈপায়ন বললেন 'স্যার, মনে আছে, হাওড়ার উলুবেড়িয়াতে এক বাড়ির তিনজন খুন হয়ে যান? পুলিশ তদন্তে নেমে, মৃতদের জ্যাঠতুতো দাদাসহ সাতজনকে অ্যারেস্ট করেছিল। সেই মামলায় পুলিশ বলেছিল দু—জন সরাসরি খুনের সঙ্গে জড়িত, বাকি পাঁচজন, সরাসরি খুনে জড়িত না হলেও তারা ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। হাওড়া কোর্ট সাতজনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও, হাইকোর্ট ওই পাঁচজনকে ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস করে দিয়েছিল। ওই পাঁচজনের হয়ে আপনিই ছিলেন, স্যার। পরে সরকারপক্ষ ওই পাঁচজনের মুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টেও যায়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়কেই বহাল রাখেন। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টও মেনে নিয়েছিলেন যে, ওই পাঁচজন কোনওভাবেই অপরাধের সঙ্গে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে যুক্ত ছিলেন না।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ঠিক, ওই রায়টা নাও। ক্রিমিনাল কন্সপিরেসির ওপর সুপ্রিম কোর্ট যা যা বলেছেন, সেই সমস্ত জার্নালের কপি নাও।'

এই সময়ই হইহই করে কন্দর্পনারায়ণের স্ত্রী চেম্বারে ঢুকলেন। সাধারণত বড় বড় মামলা থাকলে উনি সন্ধেবেলায় চেম্বারে আসেন, জুনিয়রদের কাছ থেকে মামলার খবরাখবর জিজ্ঞাসা করেন। কোর্টে ভালো কিছু হলেও যেমন খুশি হন, খারাপ কিছু হলে আবার কষ্ট পান। একটা বেসরকারি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ান। আজকে স্কুল থেকে ফিরেই চেম্বারের আবহাওয়াতেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন যে, মামলাটা প্রথমদিকে পক্ষে থাকলেও বিকেলের দিকে ঘুরে গিয়েছে সরকারপক্ষের দিকে। জজ সাহেবরা কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর চেয়েছেন কন্দর্পনারায়ণের কাছে। কাল সকালে সাড়ে দশটায় আবার মামলার শুনানি। জজসাহেবরা যদি কাল তাঁদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর না পান, তাহলে আর রূপা রায়ের জেল থেকে বেরোনো হবে না।

বউদি ঘরে ঢুকেই চেম্বারের জুনিয়রদের বললেন, 'চলো চলো, অনেক খেটেছ, পাড়ার মোড়ে যাব ফুচকা খেতে, মনটাও ভালো হবে। ফুচকা খেয়ে, আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করবে।'

কন্দর্পনারায়ণ চোখে—মুখে একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে স্ত্রী—র দিকে তাকালেন, যেন বলতে চাইলেন, 'আর সময় নেই, হাতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। হয় জজ সাহেবদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব, না হয় ফুটে যাব। ঠিক যেন টোয়েন্টি টোয়েন্টি ক্রিকেট ম্যাচ। হাতে শেষ কয়েকটা বল বাকি, হয় সব ক—টা বল বাউন্ডারির বাইরে পাঠাও, না হলে তুমি খেলা থেকে আউট।'

কন্দর্পনারায়ণের স্ত্রী স্বামীর মনের কথা টের পেলেন ঠিকই, কিন্তু পাত্তা দিলেন না। জুনিয়ররাও বউদির প্রস্তাবে এক—পায়ে খাড়া। কিন্তু কন্দর্পনারায়ণ স্ত্রী—কে জুনিয়র ছেলেমেয়েদের দেখিয়ে বলে দিলেন 'তুমি ওদের নিয়ে যাও, আমি এখন চেম্বার ছেড়ে উঠতে পারব না।' কিন্তু ওঁর স্ত্রী নাছোড়, তিনি একরকম জোর করেই সবাইকে নিয়ে ফুচকা খেতে বেরোলেন। তাঁর যুক্তি, এই মামলাটা নিয়ে গত বেশ কয়েকদিন সবাই নাওয়া—খাওয়া ছেড়ে খাটছেন। একটু ফুচকা খেয়ে এলে মাইন্ডটা ফ্রেশ হবে। কিন্তু শর্ত একটাই। ফুচকা খেতে গিয়ে মামলার কোনও আলোচনা চলবে না। মামলার আলোচনা আবার হবে চেম্বারে ফিরে। ফুচকা খেতে গিয়েও মামলার আলোচনা হতে থাকলে মাইন্ডটা ফ্রেশ হবে না।

সব মিলিয়ে বারোজন ফুচকাওয়ালাকে ঘিরে দাঁড়ালেন। অন্য ক্রেতারাও ছিলেন। তাঁরাও অনেকেই কন্দর্পনারায়ণকে চেনেন। অনেকদিন পর সবার সঙ্গে পাড়ার মোড়ে ফুচকা খেতে এসেছেন। বেশ ভালোও লাগছে। একটা জোরে হাওয়া দিচ্ছে। শরীর যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে। আসলে এই সময়ে বাইরেটা সত্যিই বেশ আরামদায়ক, চেম্বারের ভেতরে থাকলে বাইরের সুন্দর পরিবেশটা আন্দাজ করা যায় না।

কিন্তু মামলার কথা ভাবব না বললেই তো আর মাথা থেকে মামলা বেরিয়ে যায় না। ফুচকা খেতে খেতেও মনের মধ্যে একটা খচখচানি থেকেই গেল।

সবে সবাই মিলে চারটে করে ফুচকা খেয়েছেন, কন্দর্পনারায়ণের পাতায় পঞ্চম ফুচকাটা পড়েছে। কন্দর্পনারায়ণ ফুচকাটা নিয়ে মুখের মধ্যে ভরেছেন। হঠাৎই গোঁ গোঁ করে আওয়াজ করতে শুরু করলেন। সবাই চমকে উঠলেন। স্ত্রী বললেন, 'কী হল, কী হল, বিষম খেলে? গলায় ফুচকা আটকে গেছে?'

অপলক বললেন, 'না না, স্যারের নিশ্চয় ঝাল লেগেছে, স্যার একদম ঝাল খেতে পারেন না।'

দ্বৈপায়নের বড়সড়ো চেহারা, তিনি তো ফুচকাওয়ালাকে এই মারেন তো সেই মারেন, 'তোমাকে বললাম না, স্যার ঝাল খেতে পারেন না, তুমি ঝাল দিলে কেন?'

ফুচকাওয়ালা ঘাবড়ে গিয়ে কন্দর্পনারায়ণের দিকে গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে আছে, উপস্থিত অন্য লোকজনও সবাই কন্দর্পনারায়ণকে দেখছেন। জুনিয়ররা সবাই ফুচকা খাওয়া ছেড়ে কন্দর্পনারায়ণকে নিয়ে পড়েছেন, কেউ বলছেন, 'স্যার, উপরদিকে তাকান', কেউ বলছেন, 'স্যার, মুখের ফুচকাটা গলায় আটকে গেছে। মুখ থেকে বের করে ফেলুন।'

কিন্তু কন্দর্পনারায়ণ দু—চোখ বড় বড় করে কী যেন বলবার চেষ্টা করছেন।

শেষে, মুখে—ফুচকা থাকা অবস্থাতেই কোনওমতে বললেন, 'লক্ষ্মীদি আর স্বপন', সবাই একসঙ্গে বলে উঠলেন, 'তারা কারা, স্যার?'

কন্দর্পনারায়ণ আবার বললেন, 'অরুন্ধতী ব্যানার্জির সবসময়ের কাজের লোক আর সুমন ব্যানার্জির ড্রাইভার।'

স্ত্রী এবার আর রাগ চেপে রাখতে না পেরে বলে উঠলেন, 'তোমাদের বলেছিলাম না, ফুচকা খেতে এসে মামলার কথা নয়।'

কন্দর্পনারায়ণ আনন্দে ভাসতে ভাসতে বললেন, 'চোখের সামনে থেকে পরদা সরে গেছে, সব পরিষ্কার। আমি চেম্বারে চললাম, তোমরা ফুচকা খেয়ে এসো'। বলেই কন্দর্পনারায়ণ ফুচকা খাওয়া ছেড়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা লাগালেন।

এরপরে আর ফুচকা খাওয়া খুব একটা জমল না। সবাই তাড়াতাড়ি চেম্বারে ফিরে এলেন। স্যারের মনের খটকা দূর হয়েছে, মানেই আশার আলো দেখা যাচ্ছে।

ভরা কোর্টরুম, সবার চোখ আজ কন্দর্পনারায়ণের দিকে। জজ সাহেবরা আজকে কিছুতেই কন্দর্পনরায়ণকে বেশি সময় দিতে চাইবেন না। কাজেই, অল্প কথায় জজ সাহেবদের সন্তুষ্ট করতে হবে। কোর্টে একদম সামনের সারির চেয়ারে কন্দর্পনারায়ণ বসে রয়েছেন। স্থির, মেরুদণ্ড সোজা, সামনের দিকে চেয়ে রয়েছেন, ঠিক যেমন থাকতেন, ওপেন করতে নেমে সৌরভ গাঙ্গুলি। ফার্স্ট ওভার, ম্যাকগ্রাকে ফেস করা। পুরোপুরি ফোকাসড। প্রথম কয়েকটা বল দেখে, বলের লাইনে পা নিয়ে খেলতেই হবে। ফোকাস নড়ে গেলেই বিপদ। আজকে কন্দর্পনারায়ণকেও জজ সাহেবের মর্জি বুঝে বক্তব্য রাখতে হবে। একটাও অপ্রয়োজনীয় কথা বলা যাবে না। জুনিয়র ছেলে—মেয়েরাও পুরো কনসেনট্রেশন নিয়ে কোর্টে হাজির। তুলনায় সরকারি আইনজীবী অনেকটা রিল্যাক্সড, তিনি খুব ভালো মুডে আছেন বলেই মনে হচ্ছে, হাসছেন, সবার সঙ্গে কথা বলছেন।

কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে দশটা, জজ সাহেবরা এজলাসে উঠলেন। কন্দর্পনারায়ণ মনে মনে ঈশ্বরকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন।

জজ সাহেবরা মামলার কাগজপত্রগুলো একবার দেখে নিয়ে কন্দর্পনারায়ণকে মামলা শুরু করতে বললেন।

'মাই লর্ড, একটা ব্যাপার অলরেডি প্রতিষ্ঠিত যে, রূপা রায় খুন করেননি বা খুনের সময় তিনি হাজির ছিলেন না। সরকারি আইনজীবী মূলত দু—জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করেছেন—তাঁরা হলেন অভিযোগকারিণী অরুন্ধতী ব্যানার্জি এবং মৃত সুমন ব্যানার্জি ও এই মামলার মূল অভিযুক্ত সৈকত দত্তর কমন ফ্রেন্ড রোহিত খান্না।'

একজন জজ সাহেব ভুরু কুঁচকে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে কন্দর্পনারায়ণের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, 'মি. চ্যাটার্জি, রিপিটেশন হয়ে যাচ্ছে। একই কথা বার বার কেন? এই কথাগুলি আমরা কালকেও শুনেছি।'

'হ্যাঁ, রূপা রায় এই হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত নন, সেটাই আপনার বক্তব্য তো? ব্যাস, মূলকথায় আসুন।'

কন্দর্পনারায়ণ চোখ বুজে প্রমাদ গুনলেন, ম্যাকগ্রার প্রথম ওভার মেডেন হয়ে গেল।

'মাই লর্ড, সরাসরি দু—জনের সাক্ষী আমি আপনাদের কাছে পেশ করব। সরকারি আইনজীবী গতকাল রোহিত খান্নাকে একজন নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে পেশ করেছিলেন। আজকে আমি দেখাব, রোহিত খান্না মোটেই নিরপেক্ষ সাক্ষী ছিলেন না। তাঁরও উদ্দেশ্য ছিল যেকোনওভাবে রূপা রায়ের বিরুদ্ধে বদলা নেওয়া। আমার প্রথম সাক্ষী হলেন ব্যানার্জি বাড়ির সবসময়ের কাজের লোক, লক্ষ্মীদি বা লক্ষ্মী পাইন। লক্ষ্মীদি তাঁর ক্রস এগজামিনেশনে বা তাঁকে যখন ডিফেন্স কাউন্সিল জেরা করেছেন, সেই জেরায় তিনি বলেছেন, প্রথমত, দাদা বউদিকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, বউদিও দাদাকে চোখে হারাতেন। পাঁচ বছরে দু—জনের মধ্যে একদিনের জন্যও ঝগড়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, বউদি দাদার ব্যবসায় আসতে চাইতেন না। দাদা, বউদিকে ব্যবসার হিসেব দেখতে বলতেন। দাদা বলতেন, তুমি ব্যবসার হিসেবপত্র না দেখলে সবাই আমাকে ডুবিয়ে দেবে। সৈকতবাবু যে ব্যবসায় পঞ্চাশ লাখ টাকা গরমিল করেছিলেন, সেটা বউদিই ধরে ফেলেছিলেন, তারপর থেকে বউদির সঙ্গে সৈকতবাবু কথাই বলতেন না।'

এই পর্যন্ত একনাগাড়ে বলে কন্দর্পনারায়ণ একটু দম নিলেন।

তারপর আবার শুরু করলেন, 'লক্ষ্মী পাইনের সাক্ষ্য এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ইনি অরুন্ধতীদেবীর বাড়ির সবসময়ের কাজের লোক। প্রসিকিউশনের আনা সাক্ষী। তা ছাড়া চার দেওয়ালের মধ্যে, অর্থাৎ ঘরের মধ্যে কী হচ্ছে, সেটা কাজের লোকই সবচেয়ে ভালো জানেন। লক্ষ্মী পাইনের কথা বিশ্বাস করলে, রূপা রায়ের সঙ্গে সৈকত দত্তর প্রেমের সম্পর্ক দূরে থাক, মুখ দেখাদেখিই ছিল না।

'এবার, আর—একজন প্রসিকিউশনের তরফের সাক্ষী হলেন ব্যানার্জি বাড়ির গাড়ির ড্রাইভার স্বপন মণ্ডল। যদিও সুমনবাবু নিজের গাড়ি নিজেই চালাতেন, তবুও বাড়িতে সর্বক্ষণের ড্রাইভার রাখা হয়েছিল।

এই স্বপন মণ্ডলকে যখন নিম্ন আদালতে ডিফেন্স লইয়ার ক্রস এগজামিনেশন করেন, বা জেরা করেন, তিনি বলেছেন, বউদি সৈকত দত্তর অফিসে যেতে চাইতেন না, বলতেন লোকটার তাকানো ভালো নয়। তা ছাড়া বউদিকে সৈকত দত্ত পছন্দও করতেন না। বউদি ব্যবসার হিসেবে অনেক গরমিল ধরে ফেলেছিলেন। দাদাবাবু জোর করে বউদিকে সৈকত দত্তের অফিসে ব্যবসার হিসেব দেখতে পাঠাতেন। দাদাবাবু বউদিকে যেমন ভালোবাসতেন, তেমনই বিশ্বাস করতেন।'

'অতএব মাই লর্ড, এই দু—জনের সাক্ষ্য থেকে বোঝা যায় যে, রূপা রায়ের সঙ্গে সৈকত দত্তর ভালোবাসার সম্পর্ক তো ছিলই না, উলটে ছিল চূড়ান্ত অপছন্দের সম্পর্ক। কারণ, রূপা রায় সুমনবাবুর জীবনে আসবার পরই সুমনবাবু ব্যবসাতে সৈকত দত্তর ডিসঅনেস্টিটা ধরে ফেলেছিলেন। মাননীয় সরকারি আইনজীবী নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে রোহিত খান্নাকে এনে মনে করেছিলেন খুব বড় চালটা দিয়েছেন। রোহিত খান্নার চরিত্রের সব বর্ণনা দিয়েছেন আমার ইস্কাপনের টেক্কা লক্ষ্মী পাইন। লক্ষ্মী পাইনের ক্রস এগজামিনেশনের বা জেরার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা লাইন আমার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। গতকাল রাতে হঠাৎই আমার নজর গিয়ে পড়ে, লক্ষ্মী পাইনের ক্রস এগজামিনেশনের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলোয়। এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ আমার জুনিয়র লইয়ার ব্রাদার অ্যান্ড সিস্টারদের কাছে। ওরা না থাকলে, এই লাইন ক—টা আমি খুঁজেই পেতাম না।'

পাশে বসে—থাকা অপলক, দ্বৈপায়ন, মৌমিতা, প্রিয়াঙ্কা, দেবপ্রিয়ারা নিজেরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে মুখ টিপে হেসে নিলেন। গতকাল রাতে ফুচকা খেতে গিয়ে স্যারের হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায়, লক্ষ্মী পাইন আর স্বপন মণ্ডলের জেরার কথাগুলো।

'মাই লর্ড, ওই যে বলছিলাম না, চার দেওয়ালের মধ্যে এমন অনেক কিছু ঘটে যায়, যা বাইরের লোক জানতেও পারেন না। কিন্তু বাড়ির কাজের লোকেদের নজর এড়ায় না। বিয়ের পর থেকেই রূপাদেবীকে কুনজরে দেখতেন রোহিত খান্না। বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দিতেন রূপাদেবীকে। রূপাদেবী নিজে ছিলেন স্বাধীনচেতা ও ডাকাবুকো প্রকৃতির। তিনি নিজেই রোহিতবাবুর কুপ্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টা স্বামীকে জানিয়েছেন। কিন্তু সুমনবাবু রোহিতবাবুকে কিছু বলবার আগেই, নিজেই শক্ত হাতে রোহিতবাবুর কুৎসিত আচরণগুলিকে সামলেছেন। সুমনবাবুর মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগেই, একদিন সন্ধেবেলায় রোহিতবাবু সুমনবাবুর অনুপস্থিতিতে সুমনবাবুর বাড়িতে আসেন এবং রূপাদেবীর সঙ্গে ক্যারম খেলতে খেলতে রূপাদেবীর হাত ধরে টানেন ও রূপাদেবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করেন, রূপাদেবী রোহিতবাবুর এই আচরণের তীব্র নিন্দা করেন ও রোহিতবাবুকে একটি থাপ্পড় মারেন। অত্যন্ত অপমানিত হয়ে রোহিতবাবু আর ব্যানার্জি বাড়িতে আসেননি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার সময় রোহিতবাবু হুমকি দিয়ে যান যে রূপাদেবীকে তিনি দেখে নেবেন। অবশ্য রোহিতবাবু আবার এসেছিলেন সুমনবাবুর মৃত্যুর খবর পাবার পর। সেদিনের পুরো ঘটনাটাই আড়াল থেকে দেখেছিলেন বাড়ির সর্বক্ষণের কাজের মহিলা লক্ষ্মী পাইন।'

'এ ছাড়াও, আমি আদালতে, রোহিতবাবুর রূপাদেবীর উদ্দেশে পাঠানো কিছু মোবাইল মেসেজের স্ক্রিন শটের ফোটোকপি আমি আদালতে পেশ করছি। অত্যন্ত অশ্লীল এই মেসেজগুলি রূপাদেবীর মোবাইলে পাঠিয়েছিলেন রোহিতবাবু। রূপাদেবীকে মনে মনে তিনি কামনা করতেন। রূপাদেবীর হাতের থাপ্পড় খেয়ে রূপাদেবীর বিরুদ্ধে বদলা নেবার রাস্তা খুঁজছিলেন, তাই তিনি আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।'

'অতএব মাই লর্ড, রোহিত খান্নার সাক্ষীতে মিশে রয়েছে মিথ্যার বিষ।'

'আমাদের আইনজগতে একটা মূলমন্ত্র রয়েছে—এ ম্যান মাস্ট কাম বিফোর দ্য কোর্ট উইথ ক্লিন হ্যান্ডস। দুঃখের ব্যাপার হল, মাননীয় পি. পি. সাহেবের মূল দু—জন সাক্ষী—অরুন্ধতীদেবী এবং রোহিত খান্না, আদালতে সত্যি কথা বলেননি। দু—জনেই অত্যন্ত অপছন্দ করতেন রূপাদেবীকে। তাই দু—জনেই যেনতেনপ্রকারেণ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রূপাদেবীর নাম জড়িয়ে দিয়েছেন।

'এবারে আমি আর—একটা দিক তুলে ধরব মাননীয় সরকারি আইনজীবী, এই মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত সৈকত দত্তর সঙ্গে রূপাদেবীর প্রেমের সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে আদালতের সামনে কতকগুলো ছবি পেশ করেছেন, যেখানে দেখা যাচ্ছে, পার্টিতে সৈকত দত্ত ও রূপাদেবী পাশাপাশি বা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছেন বা ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মাননীয় পি. পি. বা সরকারি আইনজীবী আপনাদের বলেননি, যে প্রতিটা ছবিই নিম্ন আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছিল এবং নিম্ন আদালত ছবিগুলিকে জেনুইনিটি টেস্টে পাঠান বা ছবিগুলি সত্যি কি না জানতে ল্যাবরেটরি টেস্টে পাঠানো হয়। রিপোর্ট আসে যে প্রতিটি ছবিই এডিটেড, অর্থাৎ এডিট করা হয়েছে।'

'মাই লর্ড, খুব ভালো করে ছবিগুলি দেখুন, প্রতিটি ছবিতেই হয়, রূপাদেবীর পাশে, না হয় সৈকতবাবুর পাশে কেউ না কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাচ্ছে, খুব সযত্নে ওই মানুষটির ছবিকে এডিট করে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, মাই লর্ড, এই নিন ম্যাগনিফায়িং গ্লাস—' বলে কন্দর্পনারায়ণ দুটো ম্যাগনিফায়িং গ্লাস পকেট থেকে বের করে জজ সাহেবদের দিকে এগিয়ে দিলেন, জজ সাহেবদের সামনে বসে—থাকা, কোর্ট অফিসাররা ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দুটো নিয়ে জজসাহেবদের দিলেন।

'মাই লর্ড, দয়া করে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দুটো দিয়ে ছবিগুলো ভালো করে নজর করুন। প্রতিটি ছবিতেই পাশে দাঁড়িয়ে—থাকা ভদ্রলোকের শুধু হাতের একটা অংশ ছবিতে ধরা পড়েছে। আর সেই ভদ্রলোকের হাতে থাকা ঘড়িটি হল কার্তিয়ার। সুমনবাবু খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন, তাঁর ফেভারিট ঘড়ির ব্র্যান্ড ছিল কার্তিয়ার। অর্থাৎ যে ক—টি ছবি আদালতে গতকাল মাননীয় সরকারি আইনজীবী পেশ করেছেন, সব ক—টি ছবিতেই সৈকত দত্ত ও রূপাদেবীর সঙ্গে সুমন ব্যানার্জিও উপস্থিত ছিলেন। শুধুমাত্র রূপাদেবীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর জন্য, নিজেদের কেস এস্টাবলিশ করতে এই ছলনার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। খুব কায়দা করে সুমন ব্যানার্জিকে ছবিগুলি থেকে কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, তবুও প্রতিটি ছবিতেই কার্তিয়ার ঘড়ি—পরা সুমনবাবুর কবজির অংশটা ধরা পড়েছে। বাড়ির কাজের লোকদের সাক্ষী থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, যদিও রূপাদেবী শিক্ষিতা, আধুনিকা, স্বাধীনচেতা একজন মহিলা, তবুও তিনি সংসারকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। স্বামী, দুই ছেলে, শাশুড়ি, শ্বশুরবাড়ি ছাড়া তাঁর আর কোনও জগৎ ছিল না। তবে হ্যাঁ, আমি মানছি যে, সৈকত দত্তের সঙ্গে তিনি গাড়িতে করে কয়েকবার ব্যাবসায়িক কাজে বেরিয়েছিলেন, কিন্তু তা শুধু সুমনবাবুর জোরাজুরিতেই। কিন্তু সুমনবাবুর মৃত্যুর কমসে কম পাঁচ মাস আগে থেকে সৈকতবাবুর সঙ্গে রূপাদেবীর আর কোনওরকম যোগাযোগ ছিল না। এমনকী টেলিফোনেও নয়।'

'মাই লর্ড, আমার আর—একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বাকি আছে। গতকাল কিছু কল লিস্টের ফোটোকপি আদালত জমা দিয়েছেন মাননীয় সরকারি আইনজীবী। এবার আসুন, একটু কল লিস্টটায় চোখ বোলাই।'

কন্দর্পনারায়ণ পাশে বসে—থাকা জুনিয়র লইয়ারদের দিকে হাত বাড়ালেন, তাঁরা বেশ কিছু মোবাইলের কল লিস্টের ফোটোকপি এগিয়ে দিলেন, কন্দর্পনারায়ণ এবার সেগুলির উপর ঝুঁকে পড়লেন।

'মাই লর্ড, এগুলি রূপাদেবীর টেলিফোনের আউটগোয়িং ও ইনকামিং কল লিস্টের কপি। সৈকত দত্ত বেশির ভাগ ফোনই করেছেন রূপাদেবীকে, রূপাদেবী কখনো সৈকত দত্তকে ফোন করেননি, কখনো না। কোনও ব্যবসায়িক কারণেও নয়। কারণ, রূপা দেবী সৈকত দত্তকে পছন্দ করতেন না।'

'সুমনবাবু খুন হয়ে যান তেসরা ডিসেম্বর, ২০০৭ সালে। যদি সৈকত দত্ত রূপাদেবীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেই সুমনবাবুকে খুন করে থাকেন, তাহলে তেসরা ডিসেম্বরের আগে—পরে ফোনের রেকর্ড থাকবেই, কিন্তু সৈকত দত্তর সঙ্গে রূপাদেবীর ফোনে লাস্ট কথোপকথন হয় জুলাই মাসে। তারপর থেকে রূপাদেবীর সঙ্গে সৈকত দত্তর ফোনেও কথাবার্তা হয়নি। মুখোমুখি দেখা হবার তো প্রশ্নই নেই।'

'মাই লর্ড, এবারে আমি আরও কিছু কল লিস্টের ফোটোকপি আদালতে পেশ করছি। এগুলি সৈকত দত্ত ও সুমন ব্যানার্জির কথোপকথনের কল লিস্ট। সৈকত দত্ত কিন্তু ফোন করতেন সুমন ব্যানার্জিকে। তেসরা ডিসেম্বর রাত আটটায় সৈকত দত্ত শেষ ফোনটি করেন সুমন ব্যানার্জিকে, এই ফোনটি পেয়েই সুমন ব্যানার্জি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।'

'রাত সাড়ে বারোটায় সুমন ব্যানার্জির মা অরুন্ধতীদেবী ফোন করেছিলেন সৈকত দত্তকে, যদিও তিনি তখন মল্লিকবাজারে একটি গ্যারেজে সুমন ব্যানার্জিকে নির্যাতন করতে ব্যস্ত, কিন্তু সৈকতবাবু বলে দেন যে, তিনি বাড়িতে ঘুমোচ্ছিলেন।'

জজ সাহেবরা এই পর্যন্ত শুনে, চেয়ারে নিজেদের এলিয়ে দিলেন, নিজেরা কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, কোর্টরুমে একটা গুঞ্জন উঠল।

কন্দর্পনারায়ণ স্থির, নিষ্পলক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, এখনও শেষ ওভারটা খেলা বাকি। মাথার মধ্যে টুনটুন করে সেতার বাজছে, 'খেলা ঘুরছে, খেলা ঘুরছে', 'এবার মাই লর্ড, আমি একটা ঘটনার কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেব, তেরোই ডিসেম্বর, দু—হাজার এক, পাঁচজন টেররিস্ট অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দিল্লিতে পার্লামেন্ট ভবনে গুলি চালাতে চালাতে ঢুকে পড়ে এবং প্র্যাকটিক্যালি পার্লামেন্ট হাউসকে লন্ডভন্ড করে দেয়। তিরিশ মিনিট স্থায়ী এক গুলির যুদ্ধে পাঁচজন সন্ত্রাসবাদীই নিহত হয়, এবং আমাদের মোট ন—জন দেশবাসী শহিদ হন, তাঁদের মধ্যে আটজন ছিলেন নিরাপত্তারক্ষী ও একজন ছিলেন পার্লামেন্টের ভেতরেই কর্মরত একজন নিরীহ মানুষ, একজন মালী। গুলির লড়াইয়ে মোট ষোলো জন ভারতীয় নাগরিক আহত হন। তার মধ্যে তেরোজনই নিরাপত্তারক্ষী। ঘটনাতে জয়েশ—ই মহম্মদ বলে একটি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জড়িত বলে জানা যায়। দেশদ্রোহিতা, অস্ত্র আইন, সন্ত্রাস দমন আইন, হত্যা, ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রসহ, একাধিক আইনের একাধিক ধারায় পুলিশ তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ পুলিশি তদন্ত ও দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার শেষে, মূল তিনজন অভিযুক্তকে ফাঁসির সাজা শোনান দিল্লিতে বিশেষ আদালত—তাঁরা হলেন গিলানি, মহম্মদ আফজল এবং শওকত হোসেন গুরু। নভজ্যোত সন্ধু ওরফে আফসান গুরু বলে একজন মহিলাকে অল্প কিছু সাজা দেওয়া হয়, এবং তাঁকে অন্য গুরুতর অভিযোগগুলি যেমন—সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ, দেশদ্রোহিতা, অস্ত্র আইনের বিভিন্ন ধারা, হত্যা, ষড়যন্ত্র ইত্যাদি অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস করা হলেও, দেশদ্রোহিতা সম্পর্কিত তথ্য জানা সত্ত্বেও গোপন করার অভিযোগে তাঁর পাঁচ বছরের সাজা হয়।'

'মামলা যায় হাইকোর্টে, হাইকোর্ট আবার সব দিক খতিয়ে দেখে, গিলানি ও নভজ্যোত সন্ধু ওরফে আফসান গুরুকে সমস্ত অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস করে দেন। কিন্তু, দিল্লি হাইকোর্ট মহম্মদ আফজল ও শওকত হোসেন গুরুর ফাঁসির সাজা বহাল রাখেন।'

'অর্থাৎ, দিল্লি হাইকোর্ট নিশ্চিত হন, গিলানি বা নভজ্যোত সন্ধু ওরফে আফসান গুরু পার্লামেন্ট হাউসে আক্রমণ সংক্রান্ত ষড়যন্ত্রে জড়িত নন।'

'শওকত হোসেন গুরু সম্পর্কে তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়—এক, সাতই নভেম্বর, দু—হাজার এক তারিখে অর্থাৎ পার্লামেন্ট অ্যাটাকের কিছুদিন আগেই তিনি নাকি মূল অভিযুক্ত আফজলের সঙ্গে দিল্লিতে ক্রিশ্চান কলোনির বয়েজ হস্টেলে একটি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন যেখানে পার্লামেন্ট হাউসে গুলি চালানোর ঘটনায় মৃত এক জঙ্গিও থাকত।'

'দুই, দু—হাজার এক সালের নভেম্বর—ডিসেম্বর মাস নাগাদ আফজলের সঙ্গে শওকতের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ ছিল। এমনকী, শওকতের ঘর থেকে যে মোবাইল ফোনটি পাওয়া যায়, সেখান থেকে শুধু যে আফজলকেই ফোন করা হয়েছিল তা—ই নয়, পার্লামেন্ট হাউস অ্যাটাকের ঘটনায় অন্যতম মৃত জঙ্গি মোহাম্মদের সঙ্গেও সেই মোবাইল ফোন থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল—সেটিও প্রমাণিত হয়।'

'তিন, সন্ত্রাসবাদীদের হাইড আউট থেকে শওকতের মোটর সাইকেল উদ্ধার হয়, যেটিতে চড়ে সন্ত্রাসবাদীরা পার্লামেন্ট হাউসের আশপাশের এলাকা রেইকি করতে বেরিয়েছিল।'

'চার, এমনকী, তেরোই ডিসেম্বর দু—হাজার এক তারিখে, শওকত, আফজল ও অন্য চার—পাঁচটি ছেলের সঙ্গে বেলা দশটার সময় একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়িতে করে বেরিয়ে যায়।'

'তা সত্ত্বেও, স্টেট (এন. সি. টি. অফ দিল্লি) বনাম নভজ্যোত সন্ধু মামলায় দু—হাজার পাঁচ সালে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট পার্লামেন্ট অ্যাটাক সংক্রান্ত ঘটনায় মহম্মদ আফজলকে ফাঁসির সাজা শোনালেও শওকত হোসেন গুরুকে ওই জঘন্য সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে মুক্তি দেন, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট শুধুমাত্র তথ্য গোপনের অভিযোগে শওকতকে দশ বছরের সাজা দেন।

'এই মামলাতে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বলেন, শওকত সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের প্ল্যান বা ষড়যন্ত্র সম্পর্কে কিছুই জানত না। আফজল শওকতের সম্পর্কিত ভাই হত, তাই শওকত আফজলকে নিয়ে ঘুরে বেড়াত, দোকানে নিয়ে যেত ইত্যাদি। তাই ষড়যন্ত্রের কোনও অভিযোগই শওকতের বিরুদ্ধে খাটে না।

'আমাদের এই মামলাতেও সুমন ব্যানার্জিকে হত্যার কোনো প্ল্যান বা চক্রান্তে রূপা রায়ের ভূমিকা ছিল, একথা বলা যায় না। সরকারি আইনজীবী তদন্তে কোথাও দেখাতে পারেননি যে, সুমন ব্যানার্জিকে হত্যার ব্যাপারে সৈকত দত্তর সঙ্গে কোনও প্ল্যান রূপা রায় করেছিলেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই যে, রূপা রায় সৈকত দত্তের সঙ্গে গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন, তাতেও ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না।

'অতএব মাই লর্ড, আপনাদের কাছে আমার বিনীত নিবেদন যে, আমার মক্কেল গত তেরো বছর ধরে বিনা অপরাধে জেল খাটছেন, তাঁকে এক্ষুনি নিঃশর্তে মুক্তি দেওয়া হোক, কারণ মাননীয় সরকারি আইনজীবী আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে সুমন ব্যানার্জিকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার কোনও অভিযোগই আদালতে প্রমাণ করতে পরেননি। তাই আবার বলছি, রূপা রায়কে এক্ষুনি বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া হোক।'

কন্দর্পনারায়ণ এতক্ষণ একটানা কথা বলে হাঁপিয়ে গিয়েছেন, ঠোঁট শুকিয়ে গিয়েছে। মাথার পেছনদিক থেকে ঘামের ধারা নামছে। কিন্তু, কোথাও যেন দূর থেকে একটা সেতারের টুং টুং আওয়াজ ভেসে আসছে। কন্দর্পনারায়ণ জানেন, আসলে আওয়াজটা আসছে মাথার ভেতর থেকে, সেতারের এই আওয়াজ তাঁর চেনা, অতি চেনা।

ঘাড় ঘুরিয়ে সরকারি আইনজীবীকে দেখলেন তাঁর ধূর্ত চাহনি উধাও, আজকেই সকালে তিনি ভীষণ রিল্যাক্সড, হাসিখুশি ছিলেন, এখন মুখ ঝুলে পড়েছে, বুঝতে পেরেছেন, কী হতে যাচ্ছে।

সৈকত দত্তর লইয়ারকে আর খুব বেশি সময় দিলেন না জজ সাহেবরা। 'লাস্ট সিন টুগেদার' থিয়োরি একেবারে অ্যাপ্লিকেবল সৈকত দত্তর বিরুদ্ধে। কাফে কফি ডে—র একজন সেলস বয় কোর্টে সৈকত দত্তকে শনাক্তও করেছেন এই বলে যে, তেসরা ডিসেম্বর রাত আটটায় উনি একজনকে নিয়ে সিসিডি—তে এসেছিলেন। সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গিয়েছে, সৈকত দত্ত আর সুমন ব্যানার্জিকে একসঙ্গে। মল্লিকবাজারের গ্যারেজ থেকে রক্তমাখা অস্ত্র ইত্যাদিও পাওয়া গিয়েছে।

জজ সাহেবরা তাঁদের দীর্ঘ রায়ে সৈকত দত্তকে সুমন ব্যানার্জি হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা বহাল রাখলেন।

অন্যদিকে, রূপা রায়ের বিরুদ্ধে আনা হত্যা ও ষড়যন্ত্রের যাবতীয় অভিযোগ তাঁরা উড়িয়ে দিয়ে তাঁকে বেকসুর খালাস ঘোষণা করলেন।

কোর্টে একটা হইচই শুরু হল। কন্দর্পনারায়ণের জুনিয়ররা কোর্টের মধ্যেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে শুরু করলেন। ভিড়ের মধ্য থেকে রুদ্র রায় এগিয়ে এসে কন্দর্পনরায়ণকে জড়িয়ে ধরলেন।

সাংবাদিকরা সবাই কন্দর্পনারায়ণের কাছ থেকে কালকের কাগজের জন্য নোট নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

কন্দর্পনারায়ণ কোর্টের বাইরে বেরিয়ে এসে মহিলা জেলের ওয়েলফেয়ার অফিসার শুভদীপকে ফোন করলেন, বললেন, 'শুভদীপবাবু, রূপা রায়কে খবরটা পাঠিয়ে দেবেন, হাইকোর্ট ওঁকে বেকসুর খালাস করে দিয়েছেন। উনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন কোর্টে। ওঁর হারিয়ে—যাওয়া তেরো বছর হয়তো ফেরাতে পারিনি। কিন্তু এবার থেকে সমাজে উনি মাথা উঁচু করে বেরোতে পারবেন। এবার যেন উনি নতুন করে বাচ্চাদের কাছে পাবার লড়াই শুরু করেন।'

অধ্যায় ১ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%