অস্থায়ী সরকার গঠনের আগে, এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ বাহিনী বা মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়। অস্থায়ী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ বাহিনীর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো সরকার দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মুক্তিবাহিনী সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের সব কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরেও কিছু বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে তৎপর ছিল। এদের বেশির ভাগই ছিল স্থানীয় পর্যায়ের এবং তাদের অভিযানের এলাকা ছিল সীমিত। তারা কিছুটা স্বাধীনভাবে তাদের অভিযান পরিচালনা করলেও স্থানীয় সেক্টর সদর দপ্তরের সঙ্গে সব সময় সমঝোতা করে চলত। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে তারা সরকারের বিপক্ষেও ছিল না। মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে আরও দুটি বাহিনী ছিল, যারা তুলনামূলকভাবে জনবল ও সামর্থ্যের দিক দিয়ে বড় ছিল। এ দুটির মধ্যে প্রথমটি ছিল টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনী, যারা কাদের সিদ্দিকীর মাধ্যমে পৃথকভাবে পরিচালিত হলেও সরকার ও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখত। দ্বিতীয়টি ছিল মুজিব বাহিনী, যারা সম্পূর্ণভাবে অস্থায়ী সরকার ও বাংলাদেশ বাহিনী থেকে স্বতন্ত্র ছিল। প্রায়শই তারা অস্থায়ী সরকার ও মুক্তিবাহিনীকে অবজ্ঞা করত এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করত। মুজিব বাহিনী সৃষ্টি হয়েছিল ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-র প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।
শুরু থেকেই মুজিব বাহিনী ও এর কর্মকাণ্ড নিয়ে বহু বিতর্ক ছিল। অস্থায়ী সরকারের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা দ্বন্দ্ব হয়তো মুজিব বাহিনী গঠনে অনুপ্রাণিত করেছিল। রাজনৈতিকভাবে তাজউদ্দীন সাহেব অস্থায়ী সরকারের সব মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও নেতৃস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সমর্থন পাননি। অস্থায়ী সরকার গঠনকালে একপ্রকার চেষ্টা চলছিল তাজউদ্দীন সাহেবকে যেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া না হয়। কারণ হিসেবে বলা হতো যে তিনি বঙ্গবন্ধুর অনুগত নন। তাজউদ্দীনের বিরোধীরা এমন কাউকে প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিল, যাকে সামনে রেখে তারাই ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। তাজউদ্দীনের ব্যক্তিত্ব ও সততার কারণে বিরোধীরা সুবিধা করতে পারছিল না। এটা খুবই দুঃখজনক যে যখন আমরা স্বাধীন নই এবং অন্য দেশের ভূখণ্ডে বসে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছি, যখন আমরা জানি না আমাদের ভবিষ্যৎ কী, যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি ঐক্যের প্রয়োজন তখনই কিনা আমরা নানা দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলাম।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুক্তিবাহিনী ও এর সেক্টরগুলো অস্থায়ী সরকারের নির্দেশনায় পরিচালিত হলেও স্থানীয় ও অন্য বাহিনীগুলো তাদের নিজস্ব নিয়মে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাত। এটা হতে পেরেছিল মূলত অস্থায়ী সরকারের প্রথম দিকের একটি সিদ্ধান্ত থেকে। সিদ্ধান্তটি ছিল, আওয়ামী লীগ বা তাদের মনোনীত ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকে মুক্তিবাহিনীতে নেওয়া হবে না। অপর দিকে মুক্তিবাহিনীর ওপর ভারতীয়দের প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও অন্যদের আলাদা বাহিনী গঠনে উৎসাহিত করে। কর্নেল ওসমানী চেয়েছিলেন যুদ্ধরত সব বাহিনী মুক্তিবাহিনীর অধীনে যুদ্ধ করবে। কিন্তু তা হয়নি। ছোট ছোট বাহিনীগুলো তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে মুক্তিবাহিনীর সেক্টর অধিনায়কদের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করত। কিন্তু মুজিব বাহিনীর বিষয়টি ছিল একেবারেই ভিন্ন। যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব ছিল। এই দ্বন্দ্বে অস্থায়ী সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রচ্ছন্ন প্রভাবও হয়তো ছিল। এ বাহিনীর গঠন নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া ছিল-যেহেতু আমরা দেশ স্বাধীন করতে এসেছি, তাই এখানে আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ বা দ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয়। আমাদের সবার লক্ষ্য থাকা উচিত ঐকমত্যের ভিত্তিতে যুদ্ধ করা। তবে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মুজিব বাহিনীর ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করার যে আশা আমরা করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি।
মুজিব বাহিনীর গঠনপ্রণালি আলাদা ছিল। এ বাহিনীর সমন্বয়কারী ও প্রশিক্ষক ছিলেন ‘র’-র কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান। তিনি এস এস উবান নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় মুজিব বাহিনীকে প্রশিক্ষিত করা হয়। মেজর জেনারেল উবানের বক্তব্য অনুযায়ী মুজিব বাহিনী নামটি তিনিই চালু করেন, যদিও নামটি উপরস্থ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মনঃপূত হয়নি। তারা বলেছিল যে এতে বিভ্রান্তি ও ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হবে। কিন্তু মুজিব বাহিনীর সদস্যরা বাহিনীর নাম পরিবর্তন করতে অস্বীকার করে। এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত বিতর্ক চলতে থাকে এবং এর কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধকালে ব্যক্তির নামভিত্তিক অনেক বাহিনীর মতো মুজিব বাহিনীও সেভাবেই পরিচিত থাকে। মুজিব বাহিনীকে কোথাও কোথাও বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স বা বিএলএফ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মুজিব বাহিনীর সরকারি কোনো নাম না থাকলেও এই বাহিনীকে স্যাম’স বয় নামেও কোথাও কোথাও উল্লেখ করা হয়েছে। জেনারেল উবানের বর্ণনা অনুযায়ী ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ নাকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বলেছিলেন যে মুজিব বাহিনীকে তিনি (জেনারেল মানেকশ) গঠন করেছেন তাঁর সেনাবাহিনীর হয়ে বিশেষ কিছু অভিযান পরিচালনার জন্য।
সম্ভবত জুন মাসে আমি মুজিব বাহিনী সম্পর্কে প্রথম শুনতে পাই। কর্নেল ওসমানীর অফিসে বিভিন্ন ধরনের লোকের যাওয়া-আসা ছিল। তাদের কাছ থেকেই জানতে পারি যে প্রধান সেনাপতি বা সি-ইন-সির স্পেশাল ফোর্স বা বিশেষ বাহিনী নামে একটি বাহিনী গঠিত হতে যাচ্ছে। আমার ধারণা, কর্নেল ওসমানীকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যাতে তিনি এতে সমর্থন দেন। বিষয়টি নিয়ে আমি কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে কথা বলি। তিনি বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না দিলেও তাঁর কথাবার্তার মধ্য দিয়ে আমি বুঝতে পেরেছি যে একটা বিশেষ বাহিনী হতে যাচ্ছে, যা সি-ইন-সির স্পেশাল ফোর্স নামে অভিহিত হবে। এই বাহিনী গঠনে তাঁর যে সম্মতি আছে, সেটাও আমি বুঝতে পারলাম। সি-ইন-সির স্পেশাল ফোর্স যে পরে মুজিব বাহিনীতে পরিণত হবে, কর্নেল ওসমানী সম্ভবত তা বুঝতে পারেননি। তাই সি-ইন-সির স্পেশাল ফোর্স গঠনের শুরুতে কর্নেল ওসমানীর কাছ থেকে কোনো আপত্তির কথা শুনিনি, বরং আচার-আচরণ ও মৌনতায় মনে হতো যে এ বিষয়ে তাঁর পূর্ণ সম্মতি আছে। জুন মাসের পর বেশ কিছুদিন এ সম্পর্কে আর কোনো আলাপআলোচনা শোনা যায়নি।
মুজিব বাহিনী গঠনের বিষয়টি দীর্ঘদিন পর্যন্ত অনেকেরই অজানা ছিল। কারণ সংগঠনটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে গঠন করা হয় এবং এর সদস্যদের গোপন জায়গায় রাখা হয়। গোপনীয়তার জন্যই তখন এই বাহিনী সম্পর্কে বেশি কিছু জানা সম্ভব হয়নি। মুজিব বাহিনী গঠন সম্পর্কে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নজরুল ইসলাম সাহেব বা অন্য কেউ জানতেন কি না জানি না, তবে তাজউদ্দীন সাহেব এ বিষয়ে একেবারে অজ্ঞ ছিলেন। কর্নেল ওসমানীও যে কিছু জানতেন না সে বিষয়ে আমি শতভাগ নিশ্চিত। তবে সি-ইন-সির স্পেশাল ফোর্স গঠন বিষয়ে কর্নেল ওসমানীর আগ্রহ লক্ষ করেছিলাম। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে তাজউদ্দীন আহমদের মন্তব্য ছিল, দেরাদুনের একটি বিশেষ ঘাঁটিতে এরা স্বতন্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং বাংলাদেশ বাহিনী বা মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বের বাইরে স্বতন্ত্র নেতৃত্বের অধীনে থেকে এরা সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মতবিরোধ ও সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।
মুজিব বাহিনীকে খুব গোপনে প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হতো। অভিযানের জন্যও গোপনীয়তার সঙ্গে তাদের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হতো। ফলে, এই বাহিনীর কার্যক্রম বা এদের উপস্থিতি আমরা অনেক পরে জানতে পারি, তা-ও পুরোপুরি নয়। ভারতীয় আর্মিও মনে করত যে মুজিব বাহিনীকে বাংলাদেশ বাহিনী থেকে গোপন ও আলাদা রাখা উচিত। তাই গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ভারত আর্মিও তাদের সহযোগিতা করে। এটাই ছিল স্বাভাবিক কারণ, ভারতীয়রাই তো মুজিব বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তবে জেনারেল উবানের বর্ণনা অনুযায়ী পূর্বাঞ্চল কমান্ডার জেনারেল অরোরা মুজিব বাহিনীকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রচণ্ড চাপ দিয়েছিলেন।
ক্রমশ অল্প অল্প করে আমরা বিভিন্ন সেক্টর থেকে মুজিব বাহিনীর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পারি। ডিসেম্বর পর্যন্ত এই বাহিনীর সংখ্যা প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল চার হাজার। কিন্তু পরে জেনেছি যে এই সংখ্যা ৯ থেকে ১২ হাজার। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করার ফলে আমি সঠিক সংখ্যাটি বলতে পারব না। জেনারেল উবানের হিসাবে মুজিব বাহিনীর প্রায় ১০ হাজার সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এ সম্পর্কে জেনারেল উবান তাঁর বইয়ে লিখেছেন :
আমরা প্রায় ১০ হাজার মুজিব বাহিনী নেতাকে গেরিলাযুদ্ধের বিভিন্ন পদ্ধতির প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলি এবং কথা ছিল যে তারা পালাক্রমে বাংলাদেশে অবস্থিত তাদের সংগঠনের লাখো জনকে প্রশিক্ষণ দেবে।
ফ্যান্টমস অব চিটাগাং : দ্য ফিফথ আর্মি’ ইন বাংলাদেশ,
মেজর জেনারেল এস এস উবান (অব.) এলাইড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড (ভারত), পৃ. ৪০
মুজিব বাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো ভারতীয়দের কাছ থেকে পেয়েছিল। ভারতীয়রা তাদের যাতায়াতের জন্য পরিবহন এবং সম্মানীও দিত। মুজিব বাহিনী খুব পরিকল্পিত ও সংগঠিত ছিল, যা অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দেখা যায়নি। পরে শুনেছি তাদের উন্নতমানের অস্ত্র দেওয়ার বিষয়টি ভারত সরকারের অনুমতি নিয়েই করা হয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমতি ছাড়া অধিক পরিমাণে উন্নত ধরনের অস্ত্র পাওয়া সম্ভবও ছিল না।
বিভিন্ন এলাকা থেকে যেসব ছেলেকে মুজিব বাহিনীতে ভর্তি করা হতো, সে সম্পর্কে কাউকে কোনো কিছু জানতে দেওয়া হতো না। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ভারতীয়রা এই কাজটি করত। উইং কমান্ডার (অব.) এস আর মীর্জা যুব শিবিরের মহাপরিচালক ছিলেন, তবু তিনি মুজিব বাহিনী সম্পর্কে কিছু জানতেন না বা নির্বাচন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাঁকে যুক্ত রাখা হয়নি। ‘র’-র সরাসরি তত্ত্বাবধানে মুজিব বাহিনী দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নিত। এ বাহিনীর সদস্যদের বড় অংশই শিক্ষিত ছিল ও সচ্ছল পরিবার থেকে এসেছিল। মুজিব বাহিনীতে গ্রামের ছেলে ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কোনো শ্রমজীবী মানুষকেও এই বাহিনীতে দেখা যায়নি। বলা হতো, এই বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধ যেন বামপন্থীদের হাতে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করা। আর সে জন্যই কোনো গরিব, মজদুর, চাষি বা সাধারণ ঘরের মানুষকে এই বাহিনীতে নেওয়া হয়নি। অপর দিকে গেরিলা বা গণবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের ৮০ ভাগই ছিল বিভিন্ন শ্রমজীবী শ্রেণি, বিশেষত কৃষক পরিবার থেকে আসা তরুণ।
ভারতের দেরাদুনে এস এস উবানের সঙ্গে মুজিব বাহিনীর নেতৃবৃন্দ
আমি মুজিব বাহিনীর বেশ কিছু সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সবাই বেশ ভালো, শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের। আমার মনে হয়েছে, যুব শিবিরে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগেই ওই ছেলেদের বাছাই করা হয়েছিল। এমপিএ এবং এমএনএরা বিভিন্ন যুব শিবির, শরণার্থী শিবিরসহ অন্যান্য নানা শিবিরে যাতায়াত করত। তারা বা তাদের কেউ কেউ মুজিব বাহিনীর জন্য সদস্য বাছাই করত, যা তারা কোনো দিন বলত না। মুজিব বাহিনীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল আলাদা, যা তারা খুব গোপনভাবে পালন করত। তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রকাশ্যে কিছু না জানানোর ফলে আমার মনে হয়েছিল যে এদের একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল আর তা হচ্ছে, স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে যেন তাদের রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভিন্নমত কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি বা কোনো মাধ্যম দিয়ে আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর একটা যোগাযোগ হয়েছিল বলেই মনে হয়। এ কথা এ জন্য বলছি যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হওয়া ও প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগেই মুজিব বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পেতে শুরু করে। জুলাই মাস থেকে মুজিব বাহিনী প্রশিক্ষণ শেষে সীমান্ত এলাকায় বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের কর্মকাণ্ড শুরু করে। তবে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসার পর এদের মধ্যে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। বরং তারা বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে প্রশিক্ষণ-ফেরত গেরিলাদের অথবা যুব শিবিরে যেসব যুবক আসত তাদের প্রশিক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত করার আগেই সেখান থেকে বাছাই করে মুজিব বাহিনীর জন্য নির্বাচন করত বা নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করত।
জেনারেল উবান শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা তৎপরতার বিরুদ্ধে পাল্টা গোয়েন্দা তৎপরতা চালানোর (কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স) বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এ ছাড়া প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের বিদ্রোহীদের কীভাবে প্রশিক্ষিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে হয় বা নিজেদের অধীনে রেখে তাদের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে ও দমিয়ে রাখতে হয়, সে বিষয়েও একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনি। এই উবানই ছিলেন মুজিব বাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণের মূল ব্যক্তি। মুজিব বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জেনারেল উবানও কিছু বলতে চাননি। যে কারণে এই বাহিনী সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যায়নি। তবে জেনারেল উবানের মতে, মুজিব বাহিনীর সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে শেখ মুজিবের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যকে একমাত্র বিবেচনা হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। তিনি মনে করতেন যে মুক্তিবাহিনীতে বিভিন্ন দল ও মতের ব্যক্তিরা যোগ দিয়েছে এবং তাদের অনেকেই শেখ মুজিবের প্রতি অনুগত নয়, কিন্তু মুজিব বাহিনীর সদস্যরা শেখ মুজিবের প্রতি শতভাগ অনুগত ছিল। তার মতে, তারা কখনো শেখ মুজিবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। বাস্তবে যদিও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মধ্যে মুজিব বাহিনীর প্রথম ও দ্বিতীয় সারির নেতাদের মধ্যে শতকরা ৫০ জনের বেশি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে চলে যায় এবং জাসদ নামে একটি উগ্র রাজনৈতিক দল গঠন করে। শেখ মুজিব বেঁচে থাকা অবস্থায় জাসদ দেশে অনেক ধ্বংসাত্মক কাজ করে। তাই আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের শেখ মুজিব বা দেশের প্রতি আনুগত্য সন্দেহাতীত ছিল না। এই বাহিনী মূলত গঠিত হয়েছিল স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক বাহিনীর প্রয়োজন বিবেচনা করে। স্বাধীনতার পর জেনারেল উবান পুনরায় বাংলাদেশে আসেন অপর একটি রাজনৈতিক বাহিনী বা রক্ষীবাহিনী গঠনের জন্য। মুজিব বাহিনীর বেশ কিছু সদস্য নতুন গঠিত রক্ষীবাহিনীতে যোগ দেয়।
জেনারেল উবান বলেন, মুজিব বাহিনীর সদস্যদের মূলত দলনেতা ও প্রশিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। কথা ছিল ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়া মুজিব বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ শেষে দেশের ভেতরে গিয়ে নতুন নতুন তরুণকে প্রশিক্ষণ দেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষিত ১০ হাজার তরুণ দেশের ভেতরে নতুন নতুন তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে লাখো যোদ্ধার বিরাট বাহিনী গঠন করবে। এরপর এই বাহিনী শেখ মুজিবের প্রতি অনুগত থেকে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করবে। জেনারেল উবানের এই পরিকল্পনা কোনো কাজে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধে বিভ্রান্তি ও ভেদাভেদ সৃষ্টি করা ছাড়া মুজিব বাহিনী সামরিক ক্ষেত্রে খুব বেশি সফলতা দেখাতে পারেনি। তবে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে জেনারেল উবান পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের (পাকিস্তানিদের) অনুগত বিদ্রোহী মিজো বাহিনীকে উৎখাত করার জন্য একটি অভিযান পরিচালনা করেন। উবানের বাহিনী অক্টোবর মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে বরকল ও সুবলং হয়ে রাঙামাটিতে এসে এই অপারেশনের সমাপ্তি টানে। ভারতীয় এসএসএফ (স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স) এবং মুজিব বাহিনীর একটা অংশ এই অপারেশনে যোগ দিয়েছিল।
মুজিব বাহিনী যুদ্ধে কতখানি অবদান রেখেছে বা প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ করেছে তা বলা মুশকিল। এ বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্যকে যুদ্ধের ময়দানে দেখা যায়নি। মুজিব বাহিনীর হাতেগোনা কয়েকজন সদস্যের যুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা জানা যায়। যুদ্ধে তাদের কিছু সদস্য আহত বা নিহতও হয়। তবে তারা কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছে সেই পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
মুজিব বাহিনীর সদস্যদের দেশের ভেতরে পাঠানোর সময় তাদের বিশেষভাবে বাছাই করে পাঠানো হতো। দেশের ভেতরে তারা কোথায় যাচ্ছে, কী কাজে যাচ্ছে, এটা সাধারণত কাউকে বলা হতো না। একমাত্র তাদেরই বলা হতো যাদের ভেতরে পাঠানো হতো। এ বিষয়ে জেনারেল উবান কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখতেন। যুদ্ধের সময় তাদের কর্মকাণ্ড দেশের স্বাধীনতার পক্ষে যতটা না প্রবল ছিল, তার থেকে বেশি ছিল অন্য কিছুর জন্য। তাজউদ্দীন সাহেব মুজিব বাহিনী বিষয়ে খুব অসন্তুষ্ট ছিলেন। অন্য নেতাদের দেখে মনে হতো যে তাঁরা এ বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না, তাঁরা মুজিব বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সমর্থন বা বিরোধিতা কোনোটাই করেননি। আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয়দের কেউ এ বাহিনীর বিরুদ্ধাচরণ না করার একটা বড় কারণ মুজিব বাহিনীর প্রধান চার নেতা–শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ—যাঁরা আওয়ামী লীগের তরুণ ও যুব প্রজন্মের মধ্যে অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। এ ছাড়া এঁরা শেখ মুজিবের আস্থাভাজন অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
চলমান মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে মুজিব বাহিনী যতটা আগ্রহী ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী বা তৎপর ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের করণীয় বা ভূমিকা নিয়ে। তাদের হাবভাবে মনে হতো যে স্বাধীনতার পরে দেশে যে সরকার গঠিত হবে, সেই সরকারের নিরাপত্তা দেওয়াই তাদের মূল উদ্দেশ্য, যাতে বামপন্থীরা নতুন সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করতে না পারে। সে জন্য বাহিনীটি যাতে সংগঠিত থাকে এবং যুদ্ধোত্তর নতুন সরকারের পক্ষে কাজ করতে পারে সেই দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। তাই তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ঝুঁকি নিত না। তা ছাড়া এদের ধারণা ছিল বা তাদের বলা হয়েছিল যে ভারত একদিন বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দেবে। তখন এরা স্বাধীন দেশের মূল সেনাবাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে পুষ্ট অপর একটি বাহিনী গঠন করবে। সেই বাহিনীকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য একটি রাজনৈতিক পট তৈরি করার পরিকল্পনাও তাদের ছিল বলে আমার মনে হয়েছে।
মুজিব বাহিনীর প্রধান নেতারা শুরু থেকেই অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের বিরোধী ছিলেন এবং তাঁদের কার্যকলাপ যথেষ্ট বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছিল। মুজিব বাহিনী বলত, অস্থায়ী সরকার অবৈধ, বঙ্গবন্ধুর অনুমোদন না নিয়েই এটা গঠন করা হয়েছে এবং অবিলম্বে তা ভেঙে দেওয়া উচিত। এই মর্মে তারা রাজনৈতিক প্রচারণাও শুরু করে। এতে মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা সন্তুষ্ট ছিল না। মুজিব বাহিনীর এসব কর্মকাণ্ড আমার কানেও আসত। যুদ্ধের সময় যেখানে আমরা দেশকে স্বাধীন করতে এসেছি, সেখানে আমাদের নিজেদের মধ্যে এই রকম সম্পর্ক মোটেই কাম্য ছিল না। জেনারেল উবান জানতেন যে মুজিব বাহিনীর মূল নেতারা অস্থায়ী সরকারকে স্বীকার করে না এবং তাদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথাও বলে না। মুজিব বাহিনীর নেতারা তাজউদ্দীন সাহেবকে কমিউনিস্টদের প্রতিনিধি মনে করতেন। তাঁরা জেনারেল উবানকে বলতেন যে ডি পি ধরের ইন্ধনে তাজউদ্দীন সাহেব আওয়ামী লীগ ছাড়াও কমিউনিস্টদেরও মুক্তিবাহিনীতে গ্রহণ করছেন। মেজর জেনারেল উবান নিজেও তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে অস্থায়ী সরকারের নেতৃবৃন্দ, কর্নেল ওসমানী এবং মাঠপর্যায়ের সেনা কর্মকর্তারা মুজিব বাহিনীর গঠনকে মেনে নেয়নি। তিনি লিখেছেন :
বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার মানেই মূলত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকেই বোঝাত, যিনি মুজিব বাহিনীর নেতাদের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলতেন না এবং তাদের সকল অভিযোগ তুচ্ছভাবে দেখতেন।
ফ্যান্টমস অব চিটাগাং : দ্য ‘ফিফথ আর্মি’ ইন বাংলাদেশ
মেজর জেনারেল এস এস উবান (অব.)
এলাইড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড (ভারত), পৃ. ৩১
আমার সঙ্গে প্রথম যে দুজন মুজিব বাহিনী সদস্যের সাক্ষাৎ হয়, তাঁরা নিজেদের পরিচয় দেন খসরু ও মন্টু নামে।
এঁদের কাউকে আমি চিনতাম না, তাঁরা নিজেরাই নিজেদের মুজিব বাহিনীর সদস্য বলে পরিচয় দেন। তাঁরা বলেন যে তাঁদের কাছে অস্ত্র আছে, তাঁরা তা বাংলাদেশের ভেতরে নিয়ে যেতে চান। তাঁরা জানতে চান যে ভারতীয় সীমান্ত বাহিনীকে বিষয়টি জানাবেন কি না। একপর্যায়ে আমি তাঁরা কোথা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন জানতে চাই। তাঁরা দুজন বেশ অন্যরকম একটা হাসি দিয়ে আমাকে জানান যে তাঁরা ভারতের ভেতর থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন। আমি আবারও জিজ্ঞেস করি, কোন স্থানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন? উত্তর প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করে তাঁরা বলেন যে সেটা জানাতে অসুবিধা আছে। আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করি যে তাঁরা আমাদের সেক্টরের অধীনে থাকবেন কি না। তাঁরা হেসে এর কোনো জবাব দেননি। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে আমার একটু খারাপ লাগল এই ভেবে যে আমি মুক্তিযুদ্ধের অভিযানগুলো সমন্বয়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি আর মুজিব বাহিনীকে কোথায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় আর কোথায় কীভাবে তারা অভিযান পরিচালনা করবে, সেটা আমার কাছেও গোপন রাখা হয়েছে। পরে বিষয়টি আমি কর্নেল ওসমানীকেও বলেছি।
এর কিছুদিন পর বিভিন্ন সেক্টর অধিনায়কের কাছ থেকে অভিযোগ আসতে শুরু করে যে তাদের সেক্টরে কিছু সশস্ত্র তরুণ নেতা এসেছে, যারা নিজেদের মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে এবং তারা সেক্টরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলাদের নিজেদের দলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারা প্রচার করছে যে সেক্টর অধিনায়কেরা কেউ না, তারাই সব। সেক্টর এলাকায় মুজিব বাহিনী সদস্যদের বিতর্কিত কার্যক্রম নিয়ে তাদের সঙ্গে সেক্টর অধিনায়কদের সংঘাত বা বিরোধ সৃষ্টি হয়। এসব বিরোধ ও দ্বন্দ্ব মাঝেমধ্যে রক্তাক্ত সংঘর্ষের রূপ নেয়। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে সেক্টর অধিনায়ক ছাড়াও সাব-সেক্টর অধিনায়ক, এমনকি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকেও অভিযোগ আসতে শুরু করে। দুই বাহিনীর মধ্যে বিভেদের কারণে আমাদের সেক্টর অধিনায়ক ও অন্যদের মধ্যে যে ক্ষোভের জন্ম নেয় তা ছিল যুদ্ধের শেষ অবধি। তারা অভিযোগ করত যে মুজিব বাহিনীর অনেক সদস্যই তাদের (মুজিব বাহিনীর) হয়ে কাজ করার জন্য সেক্টরের গেরিলাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করত। মুজিব বাহিনীর সদস্যরা জোর করে সেক্টরের গেরিলাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, কোনো কোনো জায়গায় তারা সফলও হয়। মুজিব বাহিনীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ পাওয়া যায় যে আমাদের গেরিলাযোদ্ধাদের যে লক্ষ্যবস্তুতে পাঠানো হতো মুজিব বাহিনীর সদস্যরা সেই লক্ষ্য থেকে তাদের বিচ্যুত করে অন্য লক্ষ্যে নিয়ে যেত। মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিব বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এ ধরনের বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার ফলে উভয় বাহিনীর মধ্যে কোথাও কোথাও গোলাগুলিও হয়েছে। এ ধরনের মারামারি, দ্বন্দ্ব মুক্তিযুদ্ধে বিভাজনের সৃষ্টি করে। সেই সময় মুজিব বাহিনী প্রচার চালাচ্ছিল যে তারাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মনোনীত আসল মুক্তিযোদ্ধা। তাজউদ্দীন আহমদ চক্রান্ত করে ক্ষমতা দখল করেছেন। বঙ্গবন্ধুকে যাতে দেশদ্রোহের অভিযোগে পাকিস্তানিরা মৃত্যুদণ্ড দেয়, সেই জন্যই তাজউদ্দীন সরকার গঠনের ব্যবস্থা করেছেন।
সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের এসব নালিশের বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম। এরকম প্রথম নালিশ আসে আগস্ট মাসের দিকে। এ সময় মুজিব বাহিনী নিয়ে নানা মহল থেকে আরও জোরেশোরে কথা উঠতে শুরু করে। সেক্টর অধিনায়কেরা এদের সম্পর্কে সরকারের কাছে প্রশ্ন করে। তারা অভিযোগ করে যে এমন অবস্থা চললে যুদ্ধ চালানো মুশকিল হয়ে পড়বে। কর্নেল ওসমানীর কাছে বিভিন্ন সেক্টর থেকে এমন অভিযোগ একের পর এক আসতে থাকে। জাতির একটি ক্রান্তিকালে তাদের এই ধরনের আচরণ দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। সব অভিযোগই যে লিখিত আকারে আসত তা নয়, মৌখিকভাবেও জানানো হতো। ওই সময় আমাদের সব রকমের দাপ্তরিক সুবিধা ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং সেই কাঠামো সচল রাখার জন্য যে লোকবল ও অন্যান্য সহযোগিতার প্রয়োজন, সব ক্ষেত্রে তা পাওয়াও সম্ভব ছিল না। তাই এ ধরনের সব ঘটনা যা সেক্টর এলাকা, সীমান্ত, এমনকি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে ঘটেছিল, তার বিবরণ আমাদের কাছে পৌঁছাত না। এর অংশবিশেষ আমরা বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে পরে জানতে পারি। পাঠকের অবগতির জন্য বইয়ের শেষে পরিশিষ্ট ৩ ও ৪-এ এ ধরনের ঘটনা নিয়ে দুটি চিঠি যুক্ত করা হলো।
এই সব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কর্নেল ওসমানী এই বাহিনীর ওপর ক্রমশ অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের গোচরীভূত করেন এবং মন্ত্রিপরিষদে বিষয়টি উত্থাপন করেন। মন্ত্রিপরিষদ সভাতেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং সে আলোচনা ছিল বেশ উত্তপ্ত। মন্ত্রিসভার সব সদস্য এ বাহিনীর কর্মকাণ্ড ও দায়িত্ব নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি। আমি যতটুকু জানি, এ বিষয়ে মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে ভারতীয় সরকারকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়। এই বাহিনীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও মন্ত্রিসভা ভারত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চায়। প্রশ্ন করা হয় যে বাংলাদেশ সরকারকে না জানিয়ে কেনই বা এমন একটা বাহিনী গড়ে তোলা হলো। মন্ত্রিসভায় যদিও আলোচনা হয়েছিল যে মুজিব বাহিনীর বাংলাদেশ সরকারের আওতায় এবং কেন্দ্রীয় ও একক নেতৃত্বের অধীনে থাকা উচিত, কিন্তু আমার মনে হয়নি মন্ত্রিসভার সব সদস্য এ বিষয়ে অন্তরে একমত পোষণ করেছেন। আমার মনে হয়েছিল যে তাঁদের মধ্যে কোথায় যেন একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। আমার এ কথাও মনে হয়েছিল যে মন্ত্রিসভার কেউ কেউ মুজিব বাহিনীর বিষয়ে আগে থেকেই জানতেন। এ সম্পর্কে কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু সে সময় তাঁদের কথাবার্তায় এমনই মনে হয়েছিল।
কর্নেল ওসমানী বলেছিলেন, মুজিব বাহিনীর এই সব কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বারবার প্রশ্ন করেছিলেন যে সমস্ত বাহিনী, অর্থাৎ নিয়মিত বাহিনীসহ গেরিলা ও মুজিব বাহিনী কেন কেন্দ্রীয় সামরিক নেতৃত্বের আওতায় বা নিয়ন্ত্রণে থাকবে না? তিনি চেয়েছিলেন, সব বাহিনী বাংলাদেশ বাহিনীর একক নিয়ন্ত্রণে থাকবে। মন্ত্রিসভায় বিষয়টি আলোচনার পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে উল্লেখ ছিল যে সব গেরিলাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী বাংলাদেশ বাহিনীর অধীন থাকবে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এর কোনো প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রে পড়েনি এবং সত্যিকারভাবে মুজিব বাহিনী কখনোই বাংলাদেশ বাহিনীর অধীনে আসেনি।
সেক্টর অধিনায়ক এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্য দেখে মনে হয়েছে মুজিব বাহিনী চলমান মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে যতটা না আগ্রহী, তার চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী বা তৎপর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের করণীয় বা ভূমিকা নিয়ে। স্বাধীনতা-উত্তর দেশে তাদের যে একটা সামরিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা থাকবে, সে বিষয়টি আমার কাছে বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই লক্ষ্য বা ভূমিকা সম্পর্কে তখন স্পষ্ট করে কিছু জানতে পারিনি। আমার ধারণা, মুজিব বাহিনীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিরাই শুধু জানতেন, নিচের দিকের সদস্যরা এই বাহিনীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানত না।
মুজিব বাহিনী সম্পর্কে ভারত সরকারের মনোভাব অনেকটা ধোঁয়াটে ছিল। তাদের মনোভাব আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারিনি। মুজিব বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও এদের কারণে সৃষ্ট অসুবিধা সম্পর্কে ভারত সরকারকে অবহিত করা হলেও তারা এমন কিছু করেনি যাতে এই বিশেষ বাহিনীর কর্মকাণ্ড হ্রাস পায় বা যাতে এ বাহিনী নিয়ন্ত্রণে আসে। যুদ্ধের ময়দানে মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর দ্বন্দ্বের সংবাদে তাজউদ্দীন সাহেব সতর্ক হন। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে কথা বলার জন্য তিনি দিল্লিতে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাজউদ্দীন সাহেব তাঁকে বলেন যে মুক্তিযুদ্ধে একটি বাহিনী হবে। যদি দুটি বাহিনী থাকে এবং তাদের যদি দুটি উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে যুদ্ধ বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে মুজিব বাহিনীর কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য দৃঢ়ভাবে অনুরোধ করেন।
আমার ধারণা, মুজিব বাহিনী গঠন বিষয়ে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ভালোভাবেই অবহিত ছিলেন এবং নিশ্চিতভাবেই তাঁর সম্মতিতেই বাহিনীটি গঠিত হয়েছে। তাঁর মতামতের বাইরে এই বাহিনী গঠন অসম্ভব ছিল। মুজিব বাহিনীর প্রধান জেনারেল উবান তো ভারত সরকারের বাইরের কেউ ছিলেন না। আমি শুনেছি, শ্রীমতী গান্ধী তাজউদ্দীন সাহেবকে জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি দেখবেন। আমি যত দূর জানতে পেরেছি, আশ্বাস দেওয়া ছাড়া ভারত সরকার এ বিষয়ে তেমন কিছু আর করেনি। আমার মনে হয়েছে, তারাও চেয়েছে যে মুজিব বাহিনী সক্রিয় থাকুক এবং তাদের ওপর ন্যস্ত কাজ চালিয়ে যাক। আমার আরও মনে হয়েছে, সেই সময় ভারতে যে নকশাল আন্দোলন চলছিল তা ক্রমশ বেশ জোরদার হয়ে উঠছিল। ফলে গেরিলা ও মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ যদি বামপন্থী হয়ে যায় বা নকশাল আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে, তাহলে ভারত সরকার মুজিব বাহিনীকে নকশালপন্থীদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করবে। তা ছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও যদি বামপন্থীদের হাতে চলে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়, তাহলে এই বাহিনীকে ব্যবহার করা হবে। যে কারণে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি, যাতে মুজিব বাহিনীকে নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার একটি সন্তোষজনক সমাধানে আসা যায়। আরও একটি কারণ মুজিব বাহিনী গঠনে ভারত সরকারকে উদ্বুদ্ধ করে থাকতে পারে, তা হচ্ছে তাজউদ্দীন আহমদের ওপর ভারতীয়দের একটি সার্বক্ষণিক চাপ বজায় রাখা। মুজিব বাহিনীর নেতৃত্ব পুরোপুরিভাবে তাজউদ্দীন-বিরোধী ছিল। তারা কখনোই তাজউদ্দীন সাহেবকে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। তাই ভারতীয়রা মুজিব বাহিনীকে তাজউদ্দীন সাহেবের বিকল্প বা সমান্তরাল হিসেবে সৃষ্টি করে থাকতে পারে। আসলে মুজিব বাহিনী বাংলাদেশ সরকার বা বাংলাদেশ বাহিনীর আওতায় আসুক, এটা কৌশলগত কারণেই ভারত সরকার চায়নি।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থক ছাড়া আর কাউকে যুদ্ধে নেওয়া হবে না। এই প্রতিবন্ধকতার জন্য ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা প্রাথমিকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। আগস্ট মাসে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদনের পর ডি পি ধর আমার সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ-কর্মীদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এর পর মুক্তিবাহিনীতে তাদের নেওয়া শুরু হয়। ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির কিছু নেতা-কর্মী প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়, কিন্তু তাদের কোনো একক কমান্ড ছিল না। এতে তাদের মধ্যে একটা হতাশার সৃষ্টি হয়। তখন আমি নিজে একটা পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করি যাতে মুজিব বাহিনী, ছাত্র ইউনিয়ন এবং অন্য গেরিলারা ঐক্যবদ্ধভাবে অপারেশন করতে পারে। এর জন্য আমি মুজিব বাহিনীর তোফায়েল আহমেদ এবং ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলামের সঙ্গে কয়েকটা বৈঠক করেছি। তোফায়েল আহমেদ মুখে মুখে সম্মতি জানালেও কার্যক্ষেত্রে তার এই উত্তরের প্রতিফলন খুব একটা দেখতাম না। তবে নুরুল ইসলামের উৎসাহ ছিল। আমি কয়েকটা বৈঠক করার পর উপলব্ধি করি যে এখানে জোর খাটিয়ে কিছু করবার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত আমার চেষ্টায় কোনো ফল হয়নি। অক্টোবরের দিকে ডি পি ধর মুজিব বাহিনী এবং অন্য সব গেরিলার মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনিও ব্যর্থ হন। জেনারেল বি.এন সরকারও এ বিষয়ে চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা সফল হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত মুজিব বাহিনী পৃথকভাবেই তৎপর ছিল।
ভারত সরকারের জ্ঞাতসারে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিল। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে আসার আগেই তারা (মুজিব বাহিনী) ভারতে ঢোকে এবং প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করে। তা না হলে ভারতে এসে তাদের যে অবস্থায় দেখেছি, সেই অবস্থায় থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ থেকে বোঝা যায়, মুজিব বাহিনীর নেতৃত্ব বেশ আগেই ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পন্ন করেছিল এবং হানাদার বাহিনীর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই তারা সীমান্ত পেরিয়ে পূর্বনির্ধারিত ব্যক্তির কাছে বা স্থানে পৌঁছে যায়। ভারতও তাদের জন্য দ্রুত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক অস্ত্রের বন্দোবস্ত করে। মুজিব বাহিনী মুক্তিযুদ্ধকালে যেসব কর্মকাণ্ড করেছিল তা মুক্তিযুদ্ধকে কোনো গরিমা এনে দেয়নি বরং কলুষিত করেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই মুজিব বাহিনীর কিছু সদস্যই লুটপাটে নেতৃত্ব দিয়েছিল। তারা বঙ্গবন্ধু সরকারকে সহযোগিতা করা তো দূরের কথা বরং তাদের কর্মকাণ্ড সরকারকে ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন করে দেয়। মুজিব বাহিনী সৃষ্টির যে মূল লক্ষ্য ছিল, অর্থাৎ নতুন সরকারকে শক্তিশালী করা, তা মাঠে মারা যায়। তারা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দৈত্যের রূপ নেয়। কিছুদিন পর তো তারা সরাসরি অবস্থান নেয় সরকার তথা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন