১৯৭১ : জানুয়ারি থেকে ২৬ মার্চ

১৯৬৯ সালের মার্চে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ঢাকা বেসে অ্যাডমিন উইং বা প্রশাসনিক ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে বদলি হয়ে আসার পর থেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক ঘটনা আমার চোখের সামনে ঘটেছে, যা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোতে খুব কম উঠে এসেছে। যেটুকু এসেছে, তাতেও সামগ্রিক চিত্রটি ফুটে ওঠেনি।

আমি ছিলাম ঢাকায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে সর্বজ্যেষ্ঠ বাঙালি কর্মকর্তা। এ সুবাদে সরকারের ভেতরের অনেক কর্মকাণ্ড আমার নজরে আসত। আবার সরকারের প্রতিপক্ষ ও সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের নেতাদের পদক্ষেপগুলোও আমি নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করতাম।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পর প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে টালবাহানা করতে থাকেন। ১৯৭১ সালের ১১ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে ১৪ জানুয়ারি ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। যখন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, আমি আর থাকব না। শিগগির শেখ মুজিবের সরকার হবে।’ জেনারেল ইয়াহিয়া রাওয়ালপিন্ডিতে যাওয়ার পর পাখি শিকারের আড়ালে ১৭ জানুয়ারি লারকানায় জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে ভুট্টোর সঙ্গে তাঁর গোপন আলোচনা হয়। ধারণা করা যায়, এ আলোচনার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা থেকে কীভাবে বাঙালিদের দূরে রাখা যায় এবং তাদের আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে বাঙালি বা আওয়ামী লীগের হাতে কোনোমতেই ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। এ জন্য তাঁরা সবকিছু করতে প্রস্তুত ছিলেন। লারকানার এই ষড়যন্ত্রমূলক আলোচনায় সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার টু প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস জি এম পীরজাদা, চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান, গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল ওমর প্রমুখ। ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করলেও তখন পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশনের তারিখ ঘোষণা করেননি। ২৭ জানুয়ারি মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একটি আপস-মীমাংসার লক্ষ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টোও ঢাকায় এলেন। এই বৈঠকে নতুন সরকারে ভুট্টো ও তাঁর দলের ভূমিকা কী হবে, এই বিষয়টি ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়নি।

জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানের নতুন কেন্দ্রীয় সরকার তাদেরই গঠন করার কথা। এ সময় কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ প্রচার করা হয় যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের জাতীয় দিবস, অর্থাৎ ২৩ মার্চ উপলক্ষে প্যারেডটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে এবং এটি হবে পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্যারেড। ঢাকায় আমি বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হওয়ায় আমাকে ওই প্যারেডের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। আমি সফলভাবে প্যারেড অনুষ্ঠানের জন্য সকল প্রকার প্রস্তুতি ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের প্যারেডে যাওয়া-আসার পথ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে জেনারেল ও ব্রিগেডিয়ারদের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রায় প্রতিদিন কুর্মিটোলায় পূর্বাঞ্চলীয় সেনা সদর দপ্তরে যেতাম।

আগেই উল্লেখ করেছি, ১৭ জানুয়ারি ভুট্টো গং লারকানাতে বসে সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। এই বৈঠকের কিছুদিন পর আমার কাছে এক ব্রিগেডিয়ার সংবাদ দিলেন যে এবারের প্যারেড অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। এই সংবাদে আমি বেশ আশ্চর্য হলাম। হঠাৎ কেন অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হলো, তা জানতে আমি সেনা সদর দপ্তরে যাই। অফিসে ঢুকতেই দেখি, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল পদমর্যাদার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সেখানে আলোচনা করছেন। তাঁরা হঠাৎ আমাকে সেখানে দেখে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে যান। তাঁদের অবস্থা দেখে মনে হলো, এই সভায় আমার উপস্থিতি কাম্য নয়। তাঁরা আমাকে দেখে বললেন, ‘খন্দকার সাহেব, ভেতরে এসে বসুন।’ আমি বললাম, ‘ধন্যবাদ। আমার কিছু কাজ আছে।’ এরপর আমি সেখান থেকে চলে আসি।

এতগুলো পাকিস্তানি সিনিয়র অফিসারের উপস্থিতি এবং সভার মেজাজ দেখে আমার মধ্যে অনেক ধরনের প্রশ্নের উদয় হয়। সন্দেহ জাগে যে কোথাও কিছু একটা হতে যাচ্ছে, যা খুবই গোপনীয় ও সন্দেহজনক। কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়া সত্ত্বেও কোনো পূর্বাভাস ছাড়া এত বড় একটি প্যারেড বাতিল করে দেওয়ার বিষয়টি আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক মনে হয়। আমি বিষয়টি উইং কমান্ডার এস আর মীর্জার সঙ্গে আলোচনা করি; তিনিও আমার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। আমি এবং উইং কমান্ডার মীর্জা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আহমেদ রেজাকে বলি, ‘তুমি দয়া করে আওয়ামী লীগের উচ্চপদস্থ নেতাদের জানাও যে দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। আগামীতে সাংঘাতিক কোনো কিছু হতে যাচ্ছে।’ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজা আমার কিছু পরে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়া একজন বৈমানিক। তিনি আগেভাগে বিমানবাহিনী থেকে অবসর নেন। ১৯৭১ সালে তিনি ইস্ট পাকিস্তান জুট করপোরেশনের কর্মকর্তা ছিলেন। বেসামরিক প্রশাসনে সংযুক্ত থাকায় তাঁর সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাদের যোগাযোগ ছিল। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত যুব শিবিরের উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নৌ-কমান্ডো দলের প্রশিক্ষণ শুরু হলে তিনি কিছুদিন প্রশিক্ষণ শিবিরের তত্ত্বাবধান করেছিলেন।

তখন দেশে রাজনীতির ময়দানে অনেক আলোচনা-সমালোচনা চলছে, আন্দোলন হচ্ছে—তার গুরুত্ব একরকম; আবার রাজনীতির বাইরে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের ভেতরে যা হচ্ছে তার গুরুত্ব আরেক রকম। আমি মোটামুটিভাবে দেশের রাজনৈতিক অবস্থার দিকে নজর রাখছিলাম। তবে আমি বেশি নজর রাখছিলাম পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মধ্যে কী হচ্ছে, সেদিকে। মনে রাখতে হবে, আমি সামরিক প্রশাসনের ভেতরে থাকায় বা প্রশাসনের অংশ হওয়ার কারণে দেশের পরিস্থিতি ও পাকিস্তানিদের গতিবিধি রাজনীতিবিদ বা অন্যদের চেয়ে বেশি উপলব্ধি করতে পারতাম। আর এ কারণেই আমি সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরের খবর প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের কাছে পাঠাতে পারতাম।

ফেব্রুয়ারি মাসের বিভিন্ন ঘটনা দেখে আমার মনে হয়েছিল, পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বা আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। ইতিমধ্যেই তারা গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য নিয়ে আসা শুরু করে। পাকিস্তানিদের এ ধরনের খারাপ মতলব বা কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। এমনকি বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের কাছেও বিষয়টা খুব গোপন রাখা হতো। সম্ভবত বাঙালি হিসেবে আমিই প্রথম পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য নিয়ে আসার বিষয়টি বুঝতে পেরেছি। এ সময় ঢাকায় শুধু তেজগাঁও বিমানবন্দরে বোয়িং বিমান ওঠানামা করত। তেজগাঁও বিমানবন্দরের উল্টো পাশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উত্তরে সরকারি বাসায় আমি পরিবার নিয়ে বসবাস করতাম। বিমানবন্দরে কোনো বিমান ওঠানামা করলে আমি বাসা থেকেই তা দেখতে পেতাম।

সম্ভবত ১৮ ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে ৩টার দিকে বিমানবন্দরে একটি বোয়িং এয়ারক্রাফট অবতরণ করে। আমি সে সময় বিমানবন্দরের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি ঢাকা বেসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হওয়ায় সব বিমানের আসা-যাওয়ার খবর জানতে পারতাম। অথচ এই সময় যে পশ্চিম পাকিস্তান বা অন্য জায়গা থেকে কোনো বিমান আসবে, তা আমার জানা ছিল না। বিমানটি নামার পর দেখলাম, সিভিলিয়ান পোশাকে সেনাবাহিনীর জোয়ানরা নামছে। ঘটনার পরপরই আমি তখনকার ডিজিএফআইয়ের ঢাকা শাখার প্রধান উইং কমান্ডার আমিনুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করেছি, কেন সৈন্য নিয়ে আসা হচ্ছে? তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে ওদের একটা এক্সারসাইজ হবে, তাই কিছু সেনা আসছে, কিছু সেনা যাচ্ছে। এই, আর কিছু নয়।’ কিন্তু আমি স্পষ্টতই বুঝতে পারছিলাম যে তিনি সঠিক কথাটি বলছেন না। আমার মনে হয়েছে যে তিনি প্রকৃত তথ্যটি আমার কাছে গোপন করছেন। তবে এটাও হতে পারে, পাকিস্তানিরা তাঁকেও অন্ধকারে রেখেছিল। উইং কমান্ডার ইসলাম বিমানবাহিনীর একজন বাঙালি কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি আগস্ট মাসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধে তাঁকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, বরং তাঁকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। আমিনুল ইসলাম পরবর্তী সময়ে এয়ারভাইস মার্শাল পদে উন্নীত হয়ে ডিজিএফআইয়ের প্রধান হয়েছিলেন। পরে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন।

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আসার সংবাদ আমি নিজের ভেতরে রাখিনি, বরং চেষ্টা করেছি সবাইকে জানাতে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলও হয়েছি। আমি প্রায় ২০ বছর পর পূর্ব পাকিস্তানে এসেছি। তাই অল্প সময়ে আমার পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত সব বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা সম্পর্কে জানা বা পরিচিত হওয়া সম্ভব ছিল না। তার পরও আমি ওই সময়ে আমার স্ত্রীর বড় বোন ফৌজিয়া মীর্জা, উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনের ভেতরকার সংবাদ, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর সংবাদ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের কাছে পাঠাতাম। তাঁদের জানাই যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রায় প্রতিদিন বিমানভর্তি অস্ত্র ও সেনা ঢাকায় আসছে। গোপনীয়তার স্বার্থে এদের বেসামরিক পোশাকে ঢাকায় জমায়েত করা হচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা অস্ত্রগুলো দ্রুত অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যাতে কেউ দেখতে না পায়। এভাবে অস্ত্র ও সেনা আনা ক্রমে বাড়তেই থাকে। এ ধরনের খবর যে শুধু আমি একা আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে পাঠাতাম, তা নয়। আমার পরামর্শে আমার স্ত্রীও বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন খাদিজা হোসাইনের স্বামী সৈয়দ হোসেনের কাছে এসব খবর নিজ উদ্যোগে পৌঁছে দিতেন।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ১ ডিভিশন (১৪তম ডিভিশন) সৈন্য ছিল। এই ডিভিশনের জনবল ছিল প্রায় ১৪ হাজার। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে পশ্চিম পাকিস্তানের রিজার্ভ ডিভিশন হিসেবে পরিচিত ৯ ডিভিশন ও কোয়েটা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১৬ ডিভিশনকে এভাবে গোপনে বেসামরিক পোশাকে বিমানে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। অন্যদিকে ২ মার্চ ‘এমভি সোয়াত’ নামের একটি পাকিস্তানি জাহাজ প্রায় সাত হাজার টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে। এতে বোঝা যায়, পাকিস্তানিরা কীভাবে দ্রুত পূর্ব পাকিস্তানে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করছিল।

এ সংবাদ আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে অনেকে জানতেন। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্ভবত পাকিস্তানের সামরিক প্রস্তুতি এবং পূর্ব পাকিস্তানে তাদের (পাকিস্তানিদের) শক্তি বৃদ্ধির দিকে ছিল না। তাঁদের একটি ধারণা ছিল, তাঁরা সমস্যাটি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করে ফেলবেন। আমি মনে করি, জাতির এ ধরনের ক্রান্তিকালে রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়াও একাধিক বিকল্প পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল, যাতে একটি ব্যর্থ হলে অন্যটি প্রয়োগ করা যায়। আমি এমন কোনো তথ্য পাইনি, যাতে মনে করতে পারি যে রাজনৈতিক পন্থা ব্যর্থ হলে আওয়ামী লীগের নেতারা বিকল্প পন্থা হিসেবে অন্য কোনো উপায় ভেবে রেখেছিলেন।

সম্ভবত মার্চ মাসের শুরুতে পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ও সেনা আনার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন বাঙালি বৈমানিক ক্যাপ্টেন নিজাম চৌধুরী। ক্যাপ্টেন নিজাম পিআইএর কো-পাইলট ছিলেন। একপর্যায়ে তিনি পিআইএর বিমানে সৈনিক পরিবহনে অস্বীকৃতি জানান এবং বিমান থেকে নেমে চলে যান। যদিও আমি ঘটনাটি পরে শুনেছি। নিজাম খুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন। দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাঁর কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নিয়ে তিনি বেশ অখুশি ছিলেন। তিনি অন্যদের সঙ্গে আলাপআলোচনার সময় তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতেন, ‘আমরা পাকিস্তানিদের এই অন্যায় মেনে নিতে পারি না।’ সামরিক কর্তৃপক্ষ এটাকে সহজভাবে নেয়নি। তারা ক্যাপ্টেন নিজামকে বরখাস্ত এবং অন্তরীণ করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। দেশদ্রোহের অভিযোগে ক্যাপ্টেন নিজাম চৌধুরীর কপালে দীর্ঘ কারাবাস অথবা আরও খারাপ কিছু হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে সৌভাগ্যবশত তাঁর স্ত্রী একজন বিদেশি (জার্মান) হওয়ায় সে যাত্রায় তিনি বেঁচে যান। তাঁর স্ত্রীর প্রচেষ্টায় এবং জার্মান দূতাবাসের হস্তক্ষেপের কারণে তিনি তখন কঠিন শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেলেও একাত্তরের পুরো সময়টাই তাঁকে অন্তরীণ অথবা নজরবন্দী থাকতে হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি করাচি থেকে পালিয়ে আসেন।

একাত্তরের ১ মার্চ শাহীন স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ছিল। ওই ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ঢাকা এয়ার বেসের কমান্ডার এয়ার কমোডর জাফর মাসুদের সভাপতিত্ব করার কথা ছিল। এয়ার কমোডর মাসুদ হঠাৎ ওই দিন সকাল প্রায় আটটার দিকে আমাকে বলেন, ‘খন্দকার, তুমি আজকের অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত থেকো এবং সভাপতিত্ব করো।’ তিনি আরও বললেন, ‘আমার একটু কাজ আছে। তাই অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণ করতে পারব না।’ এখানে কমোডর মাসুদ সম্পর্কে একটি তথ্য দেওয়া প্রাসঙ্গিক মনে করছি। কমোডর মাসুদ ব্রিটিশ আমলে ভারতের রাজকীয় বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি অবাঙালি হলেও অহেতুক জীবনহানির বিরোধী ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় ঢাকার বাইরে যেসব এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল, সে জায়গাগুলোতে বিমান হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন পাকিস্তানি জেনারেলরা। কিন্তু কমোডর মাসুদের বিরোধিতার কারণে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। ২৫ মার্চের আক্রমণের পরপরই ঢাকায় নতুন বেস কমান্ডার যোগ দেন। ৩১ মার্চ কমোডর মাসুদকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং তাঁকে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে কোর্ট মার্শাল করে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

যাহোক, ১ মার্চ বেলা একটার দিকে ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন। অধিবেশন বাতিলের ঘোষণাটি যখন এল, আমি তখন শাহীন স্কুলের ভেতরে। তখন কোথায় অনুষ্ঠান, কোথায় পুরস্কার! সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। দ্রুত ঢাকার চেহারা পাল্টে যেতে লাগল। ইয়াহিয়ার ঘোষণার পরপরই জনতা রাজপথে নেমে আসে। ঢাকায় বিক্ষোভ শুরু হলে কলেজের অনুষ্ঠানটি ভেস্তে যায়। সবাই নিরাপদ স্থানের জন্য ছোটাছুটি করতে শুরু করে। এই মুহূর্ত থেকেই বাঙালিরা ধারণা করতে থাকে যে এবার বোধ হয় রক্তক্ষয়ী কিছু একটা হবে। অনেককে বলতে শুনেছি, এবার বাঙালি সহজে ছাড়বে না। আর পাকিস্তানিরা তো ক্ষমতা হস্তান্তর করবেই না।

১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় অধিবেশন অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করলে জবাবে আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর শক্তিবৃদ্ধির তৎপরতা—এ দুটি বিষয় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সদস্যরা খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। আন্দোলন জোরদার হওয়ার পটভূমিতে এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ব্যাপক যুদ্ধ-তৎপরতার মুখে সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন। তাঁরা দেশের আসন্ন বিপদ সম্পর্কে বুঝতে পারেন। তাঁরা অনুভব করতে থাকেন যে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তাঁদের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। আওয়ামী লীগের তরফ থেকে তাঁদের প্রতি কোনো নির্দেশনা বা কোনো সিদ্ধান্তের জন্য তাঁরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন। ইতিমধ্যে শেখ মুজিব বেসামরিক প্রশাসন, শিল্পকারখানা, সাধারণ জনগণকে বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ দেন, যা সবাই মেনে চলছিল।

আমি নিজেও গভীরভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মতৎপরতা লক্ষ করতাম। সরকারের ভেতরের খবরগুলো উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজা এবং অন্যদের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের কাছে পৌঁছে দিতাম ‘আমাদের কী করতে হবে?’—এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আশায়। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে কোনো নির্দেশ পাইনি। এ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতারা আমাদের কিছু জানাননি। যদি কেউ বলেন যে তখন আওয়ামী লীগের নেতারা যুদ্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তবে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে হয় যে তা সঠিক নয়। অন্তত আমি কোনো নির্দেশনা পাইনি।

শোনা যায়, মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্ররা নিজ উদ্যোগে পুরোনো ৩০৩ রাইফেল দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ের মতো তখন তথ্যপ্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। তাই এ ধরনের কোনো তৎপরতার খবর তাৎক্ষণিকভাবে আমি বা অন্য সামরিক কর্মকর্তারা জানতে পারিনি। এর ফলে কর্মরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের ধারণা হয় যে রাজনৈতিক নেতাদের কোনো ধরনের যুদ্ধ প্রস্তুতি নেই। ফলে ২৫ মার্চ ঢাকাসহ সারা দেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করল, তখন এটিকে প্রতিহত করার জন্য বাঙালি সেনাসদস্যদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এটা ছিল বাস্তব সত্য। তবু পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে নিজ উদ্যোগে বাঙালি সেনাসদস্যরা যে আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধযুদ্ধে অবতীর্ণ হন, সেটা একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। বিনা প্রস্তুতিতে সীমিত অস্ত্র নিয়ে তাঁরা যে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেন, তা মুক্তিযুদ্ধের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া শত্রুকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে আমাদের ভীষণ ক্ষতি হয়েছিল। এই ব্যাপক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো, যদি বাঙালি সেনাসদস্যদের রাজনৈতিক উচ্চমহল থেকে চলমান পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য আক্রমণ সম্পর্কে যথাসময়ে অবহিত করা হতো এবং তা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হতো।

এদিকে মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এ সময় যে লুটপাট শুরু হয়েছিল, তা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। এসব লুটপাটের সঙ্গে বাঙালিরাও জড়িত ছিল। প্রতিটি সমাজেই এই ধরনের দুষ্কৃতকারীর অভাব হয় না। আমরা সবাই যে ফেরেশতা, তা তো নয়। অবাঙালিরা নিরাপত্তাহীনতার জন্য ঢাকা ছেড়ে যখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকা বা পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাচ্ছিল, তখন রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাদের সোনার গয়না, টাকাপয়সা ও মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী লুট করে নিয়ে গিয়েছিল বাঙালিরা। এটা যে খুব ব্যাপকভাবে হয়েছিল, তা নয়। তবে যেটুকু হয়েছিল, তার জন্য আমি খুব কষ্ট পেতাম। সেই সময় স্থানীয় প্রশাসন খুব একটা কার্যকর ছিল বলে আমার মনে হয় না। আমার বাসা যেহেতু প্রধান সড়কের সঙ্গে লাগোয়া ছিল, তাই এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা আমার সামনেই ঘটেছে। এদের আমি চিনতে পারিনি বা বাধাও দিতে পারিনি, তবে এরা সবাই বহিরাগত ছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি এ ধরনের লুটপাটের চরম বিরোধী ছিলাম। পাকিস্তানিদের কুকীর্তির উত্তর এটা হতে পারে না, বরং এ কাজটি একই রকম অন্যায় বা অপরাধ ছিল। মুক্তিযুদ্ধকালেও এ ধরনের কিছু অপরাধমূলক কাজে বাঙালি দুষ্কৃতকারীদের সংবাদ আমরা পেতাম, যা আমরা কখনো সমর্থন করতাম না, বরং কঠোর হস্তে তা দমনের উদ্যোগ নিতাম। এ ধরনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে প্রতিরোধযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এগুলো ছিল নেহাতই কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

সাতই মার্চ রেসকোর্সে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

দেশের এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চ ভাষণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু কী বলেন তা শোনার জন্য দেশের মানুষ অপেক্ষা করছিল। ইয়াহিয়া খান অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে সাতই মার্চ যদি বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তাহলে এই আন্দোলনকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। তাই তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘তুমি এমন কিছু করো না, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। আমি আলোচনা করার জন্য ঢাকায় আসছি।’ সাতই মার্চের ভাষণের দিন ক্যান্টনমেন্টের ভেতরের পরিস্থিতি বেশ স্বাভাবিক ছিল, সবাই ব্যস্ত ছিল নিজ নিজ কাজে। এদিন বঙ্গবন্ধু যে ভাষণটি দিলেন, তা খুবই তির্যক ছিল। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে বাঙালিরা ভাবতে আরম্ভ করল, সত্যিই কি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, আমরা কি যুদ্ধে নামব, নাকি গ্রামে চলে যাব।

সাতই মার্চের ভাষণটি আমি শুনেছি। এর মধ্যে যে কথাগুলো আমার ভালো লেগেছিল, তা হলো : ‘দুর্গ গড়ে তোলো’, ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’, ‘শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ সময় সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ তাঁর কাছ থেকে এ ধরনের কথা আশা করছিল। ওই কথাগুলো শক্তিশালী ছিল বটে, তবে তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের নেতাদের ছিল না। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কিন্তু আমার মনে হয়েছে, কীভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে, তা তিনি পরিষ্কার করেননি। তা ছাড়া জনগণকে যুদ্ধ করার জন্য যেভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন, তা করা হয়নি। ভাষণে চূড়ান্ত কোনো দিকনির্দেশনা পাওয়া গেল না। ভাষণটির পর মানুষজন ভাবতে শুরু করল—এরপর কী হবে? আওয়ামী লীগের পূর্বপ্রস্তুতি না থাকায় যুদ্ধ শুরু করার কথা বলাও একেবারে বোকামি হতো। সম্ভবত এ কারণেই বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকেন। তা ছাড়া ইয়াহিয়া খান নিজেও ওই ধরনের ঘোষণা না দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হয়তো ঢাকায় ইয়াহিয়ার উপস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণেই যে মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছিল, তা আমি মনে করি না। এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’। তিনি যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন, ‘জয় পাকিস্তান’! এটি যে যুদ্ধের ডাক বা স্বাধীনতার আহ্বান, তা প্রচণ্ডভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং তর্কাতীতও নয়। যদি আওয়ামী লীগের নেতাদের কোনো যুদ্ধ-পরিকল্পনা থাকত, তাহলে মার্চের শুরু থেকে জনগণ এবং সরকারি, বেসরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের স্বল্প সময়ে সঠিকভাবে সংগঠিত করা যেত। সেটা করা হলে আমার মনে হয় যুদ্ধটি হয়তো-বা খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যেত এবং আমাদের বিজয় নিশ্চিত হতো। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সেটা করা হয়নি।

মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই সামরিক বাহিনীতে পাকিস্তানিরা কৌশলে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে বাঙালিদের এড়িয়ে যেতে শুরু করে। ফলে বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস ক্রমেই বাড়তে থাকে। সরকারি এবং বেসরকারি অফিসেও বাঙালি ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব দেখা দেয়। অন্যান্য সৈনিকের মতো বাঙালি সৈনিকেরাও সাধারণত রাইফেল নিয়ে প্রশিক্ষণ ও কুচকাওয়াজ করতেন। কিন্তু এ সময় বাঙালিদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে রাখা হয়। তাঁদের অস্ত্র দেওয়া হতো না। যাঁদের নিরস্ত্র করা সম্ভব হয়নি, মিথ্যা অজুহাতে তাঁদের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা একসঙ্গে বড় শক্তি না হয়ে দাঁড়ায়। অফিস-আদালতে সব কাগজপত্র ও দলিল-দস্তাবেজ আলমারির ভেতরে রেখে চাবি দেওয়া হতো পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের হাতে; তাঁরাই অফিসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো পালন করতেন। এভাবে বাঙালি ও পাকিস্তানিদের মধ্যে সন্দেহের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ঢাকায় বাঙালিদের সব রকমের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে কৌশলে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। বাঙালি কর্মকর্তারা ভাবতে লাগলেন, সহজে এই সমস্যার সমাধান হবে না; পাকিস্তানিরা সহজে ক্ষমতা ছাড়বে না।

বিরাজমান অস্থির ও গুমোট পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত পিআইএ বা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের বাঙালি প্রকৌশলী বা কলাকৌশলীরা মাঝেমধ্যে আমার কাছে আসতেন পরামর্শ ও উপদেশ নিতে। আমি সবাইকে সবকিছু ধীরস্থিরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বলতাম এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাঁদের কাজ বা অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে বলতাম। আমি তাঁদের পাকিস্তানিদের অসহযোগিতা করা বা বিদ্রোহ করা ইত্যাদি কোনো পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ দিতে পারতাম না। কারণ, এখানে দুই ধরনের জটিলতা ছিল। প্রথমত, আমি বাঙালি সব টেকনিশিয়ানকে চিনতাম না বা তাঁদের উদ্দেশ্য কী, তা জানতাম না। তাই সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে সবাইকে আমি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলতে পারতাম না। এ কাজটি আমার জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারত। দ্বিতীয়ত, আমি তাঁদের কোন সশস্ত্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বলব? সেই আন্দোলন তো তখনো শুরুই হয়নি। সর্বোপরি, সব বাঙালি টেকনিশিয়ান যে আমার কথা শুনবেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করবেন, তারও তো কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।

অন্যদিকে বিমানবাহিনীর সদস্যরা খুব ঘনিষ্ঠ না হলে একে অন্যের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলাটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতেন। তবে যাঁরা খুব পরিচিত এবং যাঁদের সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ জানাশোনা ছিল, আমি তাঁদের সঙ্গে খোলামনে দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতাম। যেমন উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা, উইং কমান্ডার এম খাদেমুল বাশার (বীর উত্তম, পরে এয়ারভাইস মার্শাল ও বিমানবাহিনীর প্রধান), ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজা প্রমুখ আমার ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ছিলেন। আমি বিশ্বাস করতাম যে তাঁরা আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবেন, জীবন দেবেন, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। বিমানবাহিনীর ভেতরে পরিচিত বাঙালি টেকনিশিয়ানদের মধ্যে যাঁরা পরামর্শের জন্য আমার কাছে আসতেন, তাঁদের আমি পরিষ্কারভাবে বলতাম, সবকিছু খুব অনিশ্চিত এবং জটিল, যেকোনো সময় যেকোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে। তাই তাঁদের সাবধানে থাকতে বলতাম। তাঁদের আরও বলতাম, ভবিষ্যতে তাঁদের এমন কাজ করতে হতে পারে, যা তাঁরা সে মুহূর্তে চিন্তাও করতে পারছেন না।

মার্চ মাসে প্রায় প্রতিটি শহরে অসহযোগ আন্দোলন যথেষ্ট গতি পেলেও এই আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর প্রস্তুতিতে বিশেষ কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। কিছুটা গোপনে আর কিছুটা প্রকাশ্যে তারা সব প্রস্তুতি যথাযথভাবে চালিয়ে যেতে থাকে। কীভাবে পাকিস্তানি সেনাদের এই প্রস্তুতি দুর্বল করা যায়, সেই পরামর্শ আমি বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে পৌঁছে দিতাম।

আমার স্ত্রীর বোন ফৌজিয়া মীর্জা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়াশোনা করতেন। তাঁদের বাড়িতে আমি প্রায়ই যাওয়া-আসা করতাম। আমি একদিন ফৌজিয়া মীর্জাকে বলেছিলাম, ‘এ আন্দোলনে অনেক কিছু করা সম্ভব। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা সেগুলো করছেন না।’ ফৌজিয়া মীর্জা জানতে চান, ‘কী করা যেতে পারে?’ আমি তখন বললাম, ‘নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে জ্বালানি তেলের আধার রয়েছে। এখানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত রাখা হয়। সেখান থেকে সড়কপথে পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়ি জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে আসে। যদি ঢাকায় আসা-যাওয়ার রাস্তাটিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যায়, তাহলে এদের জ্বালানি তেল সংগ্রহ বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে তাদের চলাচলও সীমিত হয়ে যাবে। যদি চলাচল কমানো যায়, তাহলে কিছুটা হলেও তাদের প্রস্তুতিতে বাধার সৃষ্টি হবে। এ জন্য গোদনাইলের রাস্তাটি কেটে বা গাছের গুঁড়ি দিয়ে এমনভাবে রাখতে হবে, যেন তারা যাওয়া-আসা করতে না পারে এবং জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে না পারে। ফৌজিয়া মীর্জা আমার প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন এবং তাঁর সহপাঠী চিশতির সঙ্গে আলোচনা করেন। চিশতি ও তাঁর বন্ধুরা মিলে একদিন গোদনাইল যাওয়ার রাস্তাটি কেটে দেন এবং বেশ কিছু গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে রাখেন। এ কাজে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষও অংশগ্রহণ করে। ওই সময় রাজনৈতিক নেতারা এসব কাজে সাহায্য করতে আসেননি। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাস্তাটি পুনরায় চলাচলের উপযুক্ত করে নেয়। তবু এ কাজের ফলে ছাত্র-জনতা তাদের সাময়িক অসুবিধার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। চিশতির সম্পূর্ণ নাম ও পরিচয় এখন আমার আর মনে পড়ছে না। তবে পরে জেনেছিলাম, ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানিদের আক্রমণে তিনি নিহত হন।

আমি পাকিস্তানিদের তটস্থ রাখা ও তাদের প্রস্তুতি ব্যাহত করার পরিকল্পনাগুলো উইং কমান্ডার এস আর মীর্জাকেও জানিয়েছিলাম। আমার এসব কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, দুই দিনের আন্দোলনেই যুদ্ধ জয় করা সম্ভব নয়, বিজয়ের জন্য যথেষ্ট পূর্বপ্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। আমাদের উচিত ছিল, পাকিস্তানিরা পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই ছোট ছোট আঘাত আর খোঁচার মাধ্যমে তাদের নাজেহাল করা, আর ছোট ছোট উদ্যোগের সাহায্যেই চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য সামরিক প্রস্তুতি গড়ে তোলা। আমার বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে ছিল, আমরা যদি এক জায়গায় ছোট্ট একটা ব্রিজ ভেঙে ফেলতে পারি বা অন্য এক জায়গায় ট্রান্সমিটার বিকল করে দিতে পারি, তবে পাকিস্তানিরা সব সময় একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপের মধ্যে থাকবে। এভাবে ছোট ছোট চলাচল ও যোগাযোগের মাধ্যম বা স্থাপনা নষ্ট বা ধ্বংস করে আমরা তাদের ক্রমেই একটি দুর্বল অবস্থানে নিয়ে যেতে পারতাম। এসব কাজ আমাদের করা উচিত ছিল, আর এগুলোর জন্য আমাদের অনেক প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু সেগুলো আমরা করিনি। তখন পাকিস্তানি বিমানের ভারতীয় ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসার অনুমতি ছিল না, শ্রীলঙ্কা হয়ে আসতে হতো। এ কারণে পাকিস্তানিদের তিন-চার গুণ বেশি জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হতো। এ ছাড়া সড়কপথে চলাচলের জন্যও পাকিস্তানি বাহিনীর প্রচুর জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হতো। গোদনাইল থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়ার রাস্তাটি কেটে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করলে পাকিস্তানি সেনারা সেখান থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারবে না। এটা ঠিক যে একবার রাস্তা কাটলে সেটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মেরামত করা সম্ভব। তবে একবার ঠিক করলে পুনরায় তা কাটাও সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে গোদনাইল সড়কে অনেক জায়গায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করাও কঠিন কোনো কাজ ছিল না। এতে তাদের যোগাযোগব্যবস্থা ঠিক রাখাই একটা বড় কাজে পরিণত হতো। বারবার নাজেহাল করা গেলে পাকিস্তানিরা কিছুটা হলেও অসুবিধায় পড়ত। সারা দেশে এ ধরনের ছোট ছোট তৎপরতা চালিয়ে পাকিস্তানিদের দৌড়ের ওপর রাখা যেত। এতে ২৫ মার্চ এবং এরপর কিছুদিন পর্যন্ত তারা যে ফাঁকা মাঠে একতরফা খেলেছিল, তা পারত না।

আরেক ধরনের কার্যকর অসহযোগিতার কথা নিচে উল্লেখ করছি। কচুক্ষেত বাজারের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে এই বাজারে মাছ, মাংস, চাল, ডাল, শাকসবজি প্রভৃতি নিত্যনৈমিত্তিক খাদ্যদ্রব্য আসত। কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বসবাসরত সব বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি পরিবার কচুক্ষেত বাজার থেকে এসব পণ্য কিনত। কচুক্ষেত তখন অনুন্নত উপশহর ছিল। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের পর কচুক্ষেতের সাধারণ মানুষ বাজারে কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে সেনানিবাসে বসবাসরত সামরিক ও বেসামরিক মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাকিস্তানি সেনারা সব সময় চোরাগোপ্তা আক্রমণের ভয়ে ভীত থাকত বলে দূরের কোনো বাজারে যেত না। কচুক্ষেত বাজারে নিত্যনৈমিত্তিক জিনিসের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে তারা অনেকে এক হয়ে নিরাপত্তাসহ ঢাকা শহরের বড় বাজারগুলোতে যেত। এতে আক্রান্ত হওয়ার ভয় কিছুটা কম থাকত। কিন্তু এভাবে নিরাপত্তাসহ বড় দলে চলাচলের ফলে তাদের সময় ও শ্রম বেশি লাগত, উপরন্তু চলাচলের গতিও মন্থর হয়ে পড়ত।

১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এলে অন্যদের সঙ্গে আমিও তাঁকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে যাই। ইয়াহিয়া খান ঠাট্টার ছলে তাঁর স্টিকের সাহায্যে এক পাকিস্তানি ঊর্ধ্বতন অফিসারের পেটে খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘খাওয়াদাওয়া কি কম হচ্ছে, না খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো পাচ্ছ না?’ এতে বোঝা যায় যে কচুক্ষেত বাজারের ঘটনা এবং এর ফলে সেনানিবাসে সৈন্যদের খাওয়াদাওয়ায় অসুবিধা সৃষ্টি হওয়ার কথাটি তিনি জানতে পেরেছিলেন। অর্থাৎ, একটি ছোট ও কার্যকর অবরোধের সংবাদ প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। কারণ, অবরোধটি ছোট হলেও এর প্রভাব ছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী। কচুক্ষেতের এই অসহযোগিতার কাজটি করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বেসামরিক বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিক, যাঁরা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থাকতেন। এ ধরনের কিছু কিছু অবরোধ অন্যান্য সেনানিবাসেও হয়েছিল, তবে তা ছিল খুব সাময়িক ও অপরিকল্পিত। এগুলো হয়েছিল একেবারে স্থানীয়ভাবে কোনো সমন্বয় ছাড়াই। এরকম অবরোধ বা ঘটনা যদি কেন্দ্রীয়ভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো-বা হানাদার বাহিনীকে আমরা খুব অল্প সময়েই দুর্বল করতে পারতাম।

৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে সরিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন। ৭ মার্চ জেনারেল টিক্কা খান ঢাকায় পৌঁছান। এরপর ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ জাতীয় অধিবেশন বসার ঘোষণা দেন। তাঁর এই ঘোষণার পরও পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অতিরিক্ত সামরিক ইউনিট নিয়ে আসার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। তাঁদের মধ্যকার আলোচনায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। আমি লক্ষ করলাম, আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানিদের অস্ত্র ও সেনা আসা অব্যাহত আছে। ১৫ মার্চ থেকে ঢাকায় শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খান উভয়েই আলোচনার নামে দুই ধরনের রাজনৈতিক খেলা খেলছিলেন। প্রায় ১০ দিন ধরে দুজনের মধ্যকার আলোচনা রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে বিশেষ কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখেনি। এদিকে ভুট্টো বলেন যে মুজিবুর রহমানের দাবি অনুযায়ী নতুন সংবিধান প্রণয়নের আগে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হলে তা একই সঙ্গে পাকিস্তানের উভয় অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে করতে হবে। ২২ মার্চ আওয়ামী লীগ এই পরামর্শ গ্রহণ করে নেয়। কিন্তু সেনাবাহিনী তাদের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এটাকে নিবৃত্ত করার লক্ষ্যে একটি নতুন ফর্মুলা দাঁড় করায়। সেনানিবাসে সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করার পর ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে আগের ছক-কাটা সামরিক আক্রমণের পথ বেছে নেন। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হন যে রাজনীতিবিদদের কাছে তাঁর নতিস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। তাঁরা প্রেসিডেন্টকে আশ্বাস দেন যে সেনাবাহিনী খুব সহজেই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তিনি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত হন। পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছিল, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আবারও স্থগিত হতে যাচ্ছে। আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না দেখে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র-জনতা পাকিস্তানের পতাকা না উড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে।

কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীকে ১০ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাঁর সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। ২২ মার্চ অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ও সৈনিকেরা বায়তুল মোকাররমে একটি বিরাট সমাবেশ করেন।

২২ মার্চ বায়তুল মোকাররমে অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সমাবেশ

সেখানে তাঁরা কর্নেল ওসমানীর কাছে দেশের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তাঁদের করণীয় সম্পর্কে জানতে চান। কর্নেল ওসমানী তাঁদের বললেন, ‘চিন্তা করো না। আমরা অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ট্যাংক প্রতিহত করব।’ অর্থাৎ, ওসমানী সাহেব সৈনিকদের বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁরা পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক তৎপরতা থামিয়ে দেবেন। তাঁর এই কথা শুনে বাঙালি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিকেরা হতাশ হন। পাকিস্তানিরা যেখানে ব্যাপক সামরিক শক্তি গড়ে তুলছে, সেখানে এ ধরনের কথা তাঁদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। এদিনের সমাবেশে মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ইসফাকুল মজিদ বলেছিলেন, ‘আমরা সৈনিক। কথার চাইতে কাজে বিশ্বাস করি।’ জেনারেল মজিদ একমাত্র বাঙালি, যিনি ইংল্যান্ডের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্ডস থেকে ১৯২৪ সালে কিংস কমিশন পেয়েছিলেন। এ সময় হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন ভারতীয় স্যান্ডহার্ডস থেকে কিংস কমিশন পেয়েছিলেন। তিনি ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানেরও জ্যেষ্ঠ ছিলেন। এদিন অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সামরিক সদস্যদের পক্ষ থেকে আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে জেনারেল মজিদসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা শেখ মুজিবকে একটি তরবারি উপহার দেন। এ ঘটনার দুই দিন আগে, অর্থাৎ ২০ মার্চ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের একজন বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘হে বঙ্গবন্ধু, বাংলার স্বাধীনতা কী করে আদায় করতে হয়, তা আমরা জানি। শুধু আপনি আমাদের পাশে থাকুন। আমাদের নেতৃত্ব দিন।’ এই সংবাদগুলো সে সময়ের পত্রপত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশ করা হয়েছিল। তবু রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

২৩ মার্চ সন্ধ্যার একটু পর আওয়ামী লীগের দুজন এমপিএ আমার বাসায় বেড়াতে আসেন। তাঁদের একজন পাকিস্তান নৌবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এ কে এম মাহবুবুল ইসলাম। তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং এমপিএ নির্বাচিত হন। তাঁর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে। তাঁরা আমাকে জানান, ‘এবার একটা সুরাহা হতে যাচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে আমরা এখন একটি সমাধান পেতে যাচ্ছি।’ এ কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই এবং প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা খাই। যেখানে আমরা প্রতিদিন পাকিস্তানিদের শক্তিবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করছি, যেখানে বাঙালিদের আড়ালে রেখে পাকিস্তানি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে গোপনে সভা করছেন, আর আমাদের নেতারা সবকিছু দেখেশুনেও নিশ্চিন্ত মনে আমাদের শান্তির বাণী শোনাচ্ছেন।

মার্চের শুরুতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কখনো স্বায়ত্তশাসনের কথা, কখনো ছয় দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনার কথা, কখনো-বা কনফেডারেশনের কথা বলতেন। মার্চের শুরুতে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেক আলাপ হয়েছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আলাপ কী হয়েছিল, তা কিন্তু সঠিকভাবে কোনো পত্রিকায় ছাপা হয়নি। আলোচনার পর রাজনৈতিক নেতৃত্বও সংবাদ সম্মেলনে বা জনসমক্ষে খোলাখুলি কিছু বলতেন না। বিশেষ করে, ১৬ মার্চ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যে ইয়াহিয়া বা ভুট্টোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কী আলাপ-আলোচনা হয়েছিল, তা কখনো জানা যায়নি। সবকিছু খোলাসাভাবে প্রকাশিত না হওয়ায় কখনো কখনো রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য জাতিকে আরও বিভ্রান্তিতে ফেলছে। ২১ মার্চ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়, সেখানে উল্লেখ ছিল, ‘সংগ্রামী বাংলার অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল তাঁর দলের শীর্ষস্থানীয় অপর ৬ জন সহকর্মীকে নিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ১৩০ মিনিট আলোচনা শেষে তিনি ও তাঁর সহকর্মীগণ সহাস্যবদনে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে তাঁর বাসভবনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। শেখ সাহেব বলেন রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথে তাঁরা এগোচ্ছেন।’

২৫ মার্চের সকাল থেকে দেখতে পাই, সেনানিবাসের অভ্যন্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে। ট্যাংক, কামান ইত্যাদি ভারী অস্ত্রগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। একটা যুদ্ধপূর্ব থমথমে ভাব সেনানিবাসের সর্বত্র দেখা যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছিল, সামনে একটি অনিশ্চিত সময় আসছে। আমি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে দীর্ঘ সময় চাকরি করেছি। সৈনিক হিসেবে বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ আমার ছিল। তবু ভেবে দেখলাম, আসন্ন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে আমার কোনো সমস্যা হলে হোক, কিন্তু আমার স্ত্রী ও পুত্রদের নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। আমি ওদের আজিমপুরে স্ত্রীর বড় বোনের বাসায় পাঠিয়ে দিলাম।

২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আমি এয়ারপোর্টের টারমাকে দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রতিদিন আমি এই কাজটি করতাম। এখানে দাঁড়িয়ে একান্তে বোঝার চেষ্টা করতাম যে প্রশাসন ও রাজনীতিতে প্রকৃতপক্ষে কী হতে যাচ্ছে। ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন। তখন থেকে সব কাজ শেষে প্রতিদিন বিকেলবেলায় তাঁর গাড়িবহর নিয়ে তিনি ক্যান্টনমেন্টে আসতেন এবং জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে চা-চক্রে মিলিত হতেন। ২৫ মার্চ বিকেলে প্রতিদিনের মতো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বিরাট গাড়িবহর নিয়ে সেনানিবাসে এলেন। প্রেসিডেন্টের জন্য নির্দিষ্ট গাড়ির ভেতরে ইয়াহিয়া খান বসা, গাড়িতে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। তিনি চলে গেলেন চা-চক্র অনুষ্ঠানে। সন্ধ্যার পরপরই চা-চক্র শেষে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাঁর বিরাট গাড়িবহর নিয়ে সেনানিবাসের ভেতর থেকে চলে গেলেন প্রেসিডেন্ট হাউসে। এর কিছু পরে আমি লক্ষ করলাম, সেনানিবাস থেকে দুটি গাড়ি আগে থেকে অপেক্ষারত একটি বোয়িং ৭০৭ বিমানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গাড়ি দুটিতে কোনো পতাকা বা স্টার নেই, যা প্রেসিডেন্ট বা জ্যেষ্ঠ অফিসারদের গাড়িতে থাকে। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, বোয়িং ৭০৭ বিমানটি সেনাসদস্যরা কর্ডন করে আছেন। আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, ওই দুটি গাড়ির একটি থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেরিয়ে এলেন এবং বোয়িং ৭০৭-এ আরোহণ করলেন। অথচ একটু আগেই আমার সামনে দিয়ে ইয়াহিয়া খানের গাড়িবহর সরকারি বাসভবনে চলে গিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়া খানের চলে যাওয়াটা ছিল সাজানো একটি নাটক। উদ্দেশ্য ছিল মানুষ যেন বোঝে যে ইয়াহিয়া খান প্রতিদিনের মতো তাঁর বাসভবনে চলে গেছেন, যা ছিল একটা ধোঁকা। পরে জেনেছিলাম, চার তারকা আর পতাকাদণ্ডে জাতীয় পতাকা লাগানো গাড়িতে নকল প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার রফিক।

ইয়াহিয়া খানের এভাবে গোপনে ঢাকা থেকে চলে যাওয়া দেখে আমার মনে হলো, ওরা চেষ্টা করছে যেন ঢাকার মানুষ বা ক্যান্টনমেন্টের বাঙালিরা প্রেসিডেন্টের চলে যাওয়ার খবরটি জানতে না পারে। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানের পত্রিকাগুলোতে বঙ্গবন্ধুর বাসা ও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের ঠিকানা ও ফোন নম্বর দেওয়া থাকত। প্রেসিডেন্ট বিমানে আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে আমি বঙ্গবন্ধুর বাসার একটা টেলিফোন নম্বরে রিং করে ইয়াহিয়া খানের এইমাত্র ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সংবাদটি দিলাম। টেলিফোনের ওপার থেকে কে ফোন রিসিভ করেছিল, তা আমি জানতে পারিনি। কিন্তু গলার স্বর ছিল খুব গম্ভীর ও ভারী। আমি ফোনে কারও নাম ধরেও চাইনি। আর আমার পরিচয়ও তাকে বলিনি। তারপর আমি ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে চলে যাই। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যতগুলো বাঙালি পরিবার ছিল, তাদের অনেকের বাসায় গিয়ে আমি জানাই, ‘এইমাত্র ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেন। মনে হয়, আজ রাতে সাংঘাতিক কিছু একটা হবে। তবে আমি জানি না বা আমার কোনো ধারণাও নেই যে কী ঘটতে যাচ্ছে। যদি পারো তোমরা নিরাপদ কোনো জায়গায় চলে যাও।’

আমি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রেজার বাসায় গিয়ে লক্ষ করলাম, বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি আলাপ-আলোচনা করছেন। আমি তাঁকে পৃথকভাবে ডেকে নিয়ে প্রেসিডেন্টের ঢাকা ত্যাগের সংবাদটি জানালাম। তাঁকে আরও জানালাম যে আমি খবরটা বঙ্গবন্ধুর বাসায় পৌঁছে দিয়েছি কিন্তু সঠিক জায়গায় পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত নই। তাঁকে অনুরোধ করলাম বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়ে সংবাদটি আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে। রেজার বাসা থেকে আমি আমার বাসায় চলে আসি। রেজা আমার অনুরোধমতো বাসা থেকে বেরিয়ে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বঙ্গবন্ধুর বাসায় পৌঁছান। পরবর্তী অংশটুকু আমি রেজার বই থেকে উল্লেখ করছি—

গেলাম বত্রিশ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। যেখানে মিছিল আর মিটিংএর ডামাডোল চলছিল এতদিন, এখন একেবারে নিশ্চুপ সমস্ত এলাকা। বঙ্গবন্ধুর বাড়ীর গেটের ভিতরে আগে ঢুকিনি কোনোদিন। আজ একরকম নিরুপায় হয়ে ভিতরে গেলাম। দোতলা বাড়ির সব কামরাতেই বাতি জ্বলছে, কিন্তু কোনো সাড়া শব্দ নেই। ইতিমধ্যে আমার পরিচিত জাতীয় সংসদের এক সদস্য বেরিয়ে এলেন। তাঁকে জিজ্ঞাস করলাম অবস্থা কেমন। উত্তরে তিনি বললেন, অবস্থা খুব ভালো, চার দফার মীমাংসা হয়ে গেছে, বাকি দুই দফার সমাধান রাত্রে হয়ে যাবে, সকালে ঘোষণা শুনতে পারবো আমরা। তিনি সেই সঙ্গে গুজব ছড়ানো বন্ধ করার উপদেশ দিয়ে চলে গেলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কোনো সুযোগ হয়নি আমার। সুতরাং বাড়ীর ভেতরে যাবার সাহস হলো না। মাননীয় সদস্যের সঙ্গে আমিও বেরিয়ে এলাম বঙ্গবন্ধুর বাড়ী থেকে।

তিনি ফিরে এসে কিছু পরে আমার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কারণ, ততক্ষণে টেলিফোন-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এ কথা রেজা পরবর্তী সময়ে আমাকে জানিয়েছিলেন।

ওই দিন রাতে আমি একটু আগেই, অর্থাৎ রাত ১১টার আগেই শুয়ে পড়ি। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। হঠাৎ গড়গড় করে আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমার সামরিক জ্ঞান থেকে বুঝতে পারলাম, এটা বৃহদাকার সাঁজোয়া যানের শব্দ। আমি বিছানা থেকে উঠে লাইট না জ্বালিয়ে জানালার পর্দা ফাঁক করে দেখলাম, রাস্তা দিয়ে ট্যাংক, সাঁজোয়া গাড়িসহ বিশাল এক সৈন্যবাহিনী শহরের দিকে এগোচ্ছে। আমার সামনে যত দূর দেখা যায়, তত দূর আগুনের লাল শিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পূর্ব দিকের বসতবাড়িগুলো আগুনের আলোতে লাল হয়ে গিয়েছে। এসব দেখে আমার মনে হয়েছিল, দেশে সাংঘাতিক কিছু ঘটতে যাচ্ছে, যার ফল হবে সুদূরপ্রসারী। সারা রাত বিছানায় শুয়ে-বসে কাটালাম। ঘুম আসছিল না। ঘুম আসা সম্ভবও নয়। শুয়ে শুয়ে অন্ধকারে শুনছিলাম বন্দুক আর কামানের শব্দ। কয়েক ঘণ্টা গোলাগুলির পর ঢাকা শহরের সম্পূর্ণ এলাকা বা অধিকাংশ এলাকা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বুঝতে বাকি রইল না যে এই রাতে ঢাকা শহরে বহু লোক হতাহত হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার হওয়ার খবর আমি কয়েকদিন পর পত্রিকা থেকে জানতে পারি। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতার গ্রেপ্তার হওয়ার সংবাদটি পড়ে প্রথমত আমার খুব দুঃখ হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, তাঁর গ্রেপ্তারের কথা জানতে পেরে আমার মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয় যে বঙ্গবন্ধু কেন এই রকমের ভুল করলেন, যা তিনি সহজেই এড়িয়ে যেতে পারতেন। পরবর্তী সময়ে এই কথাটি আমাকে খুব পীড়া দিত যে এই ভুল না হলে মুক্তিযুদ্ধে আমরা আরও ভালো করতে পারতাম। হয়তো অনেক মানুষকে জীবন দিতে হতো না বা সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হতো না। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন অথচ গ্রেপ্তারের আগে কোনো আদেশ, নির্দেশ বা উপদেশ দেননি এবং পরিষ্কারভাবে আমাদের ভবিষ্যতের করণীয় সম্পর্কে কিছু বলেননি। তাঁর আদেশ বা নির্দেশের অভাবে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। আমি মনে করি, নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য বঙ্গবন্ধুর যথেষ্ট সুযোগ ছিল এবং গোপনে থেকে তিনি যুদ্ধে দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। যা-ই হোক, বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাতে কী করতে পারতেন, আর কী করতে পারতেন না, সেটা অনুমানসাপেক্ষ। সেই রাতে যেটা ভালো মনে করেছেন তিনি, সেটাই করেছেন। আমরা পুরো বিষয়টি বিচার করি আমাদের অবস্থান ও চিন্তাভাবনা থেকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হয়তো পুরো বিষয়টি বিবেচনা করেছেন তাঁর সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে, যেখান থেকে তিনি সবকিছু দেখতে ও বুঝতে পারতেন। তবে আমার ধারণা, তিনি গ্রেপ্তার না হলে ক্ষয়ক্ষতি কম হতো। সময়ও কম লাগত এবং মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর নেতৃত্বের অভাবে পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া অনেক বিভেদ, অবিশ্বাস, সন্দেহও কুঁড়িতেই বিনষ্ট হয়ে যেত।

২৫ মার্চ রাতে আক্রান্ত হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধুসহ শত শত লোকের নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়ার সুযোগ ছিল। ২৫ মার্চ রাতে সুযোগটি গ্রহণ না করায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের গ্রেপ্তারকে নিয়ে বহু রকম আলোচনা ও সমালোচনা হয়। তবে প্রথমেই এই ঘটনাটিকে আমাদের সোজা ও সরল চোখে দেখতে হবে এবং বুঝতে হবে যে প্রকৃত ঘটনাটি কী ঘটেছিল? এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার ছিল এবং প্রত্যেকেই বুঝতে পারছিল যে পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করবে। তাঁর গ্রেপ্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমেই আন্দোলন ও যুদ্ধের নেতৃত্ব প্রসঙ্গটি চলে আসে। তিনি যদি গ্রেপ্তার হন, তাহলে আন্দোলন ও সংগ্রামের নেতৃত্ব কে দেবেন? বঙ্গবন্ধুর খুবই কাছের সহকর্মী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, নজরুল ইসলাম প্রমুখ। স্বভাবতই কেউ কেউ মনে করতেন, তাঁদের ডেকে বঙ্গবন্ধুর বলা উচিত ছিল, ‘আমাকে (বঙ্গবন্ধুকে) যদি গ্রেপ্তার করা হয়, তাহলে তোমাদের আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া এবং দেশকে স্বাধীন করার দায়িত্ব নিতে হবে। অতএব, নিজ নিজ উদ্যোগে তোমরা গোপন স্থানে চলে যাও এবং পরে সুযোগ বুঝে তোমরা একত্র হয়ে আমার রেখে যাওয়া কাজগুলো শেষ করবে।’ আমার জানামতে, সেরকম কোনো নির্দেশ কিংবা আদেশ কিংবা পরামর্শ তিনি কাউকে দেননি। মুক্তিযুদ্ধের সময় থিয়েটার রোডে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যে ঘরে থাকতেন তার পাশের ঘরেই আমি মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে থাকতাম। একদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘স্যার, বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আপনি কি তাঁর কাছ থেকে কোনো নির্দেশ পেয়েছিলেন?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘না, আমি কোনো নির্দেশ পাইনি।’ ওই রাতে বঙ্গবন্ধু সবাইকে আত্মগোপন করার কথা বলেন, অথচ তিনি কোথায় যাবেন, সে কথা কাউকে বলেননি। যদি তিনি গ্রেপ্তার হন, তাহলে দলের নেতৃত্ব কী হবে, তা-ও তিনি কাউকে বলেননি। এ ছাড়া মঈদুল হাসান, উইং কমান্ডার এস আর মীর্জা এবং আমার মধ্যকার আলোচনাভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর : কথোপকথন গ্রন্থটিতে ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় তাজউদ্দীন আহমদ ও শেখ মুজিবের সাক্ষাতের বিষয়ে সাংবাদিক মঈদুল হাসান বলেন:

২৫-২৬ মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমান যে পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী হবেন, তিনি যে বাড়িতেই থাকবেন—এই সিদ্ধান্তটা তিনি দলের নেতৃস্থানীয় কারও সঙ্গে আলাপ করেননি। তেমনি বলে যাননি যে তিনি না থাকলে কে বা কারা নেতৃত্ব দেবেন এবং কোন লক্ষ্যে কাজ করবেন। নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কি কোনো আলাদা কমিটি করতে হবে? তাঁদের কৌশলটা কী হবে? এঁদের কি কোনো কর্মসূচি থাকবে? সেখানে দলের প্রবীণদের কী ভূমিকা হবে, তরুণদেরই বা কী ভূমিকা হবে—এসব কোনো প্রশ্নের উত্তরই কারও জানা ছিল না।

মঈদুল হাসানের কথাগুলো সামগ্রিকভাবে বাস্তব। তাঁর কথাকে সমর্থন করে বলছি, ২৫ মার্চ রাতে তাজউদ্দীন সাহেব বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। তাজউদ্দীন সাহেব তাঁকে স্বাধীনতার একটি লিখিত বার্তা রেকর্ড করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর কথায় সম্মত হননি। উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার বার্তা প্রচার হলে এবং পাকিস্তানিরা তা শুনলে তারা আমাকে দেশদ্রোহী বলবে।’ বঙ্গবন্ধুর এই কথা শুনে তাজউদ্দীন সাহেব হতাশ হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু দেশের জন্য বহু কিছু করেছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের মতো তিনিও কিছু ভুল করেছিলেন। তিনি এমন সময় এ ভুলগুলো করেছেন, যখন সমগ্র জাতি একটা সংকটকালীন অবস্থায় উপনীত হয়েছে। এ সময় সারা দেশের মানুষ তাকিয়ে ছিল বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে তাঁর দিকে, তাঁর নির্দেশ শুনতে। কিন্তু সেই ক্রান্তিকালীন সময়ে তিনি নির্দেশ দিতে পারেননি। মার্চের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানে কমসংখ্যক পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য উপস্থিত ছিল। বিপরীতে এখানে কয়েক ব্যাটালিয়ন বাঙালি সৈন্য, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ছিল, যাদের সংখ্যা ছিল পাকিস্তানিদের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া বিপুলসংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সৈনিক অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। এই সময়ে তিনি যদি বাঙালি সেনা, ইপিআর আর পুলিশকে কোনো নির্দেশ দিতেন, তাহলে আমাদের বিশ্বাস, সাধারণ জনগণের সহযোগিতা ও সমর্থনে অল্প রক্তপাতেই আমরা যুদ্ধ জয় করতে পারতাম। এটাই হয়তো-বা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।

২৫ মার্চ রাতে হাজার হাজার মানুষ বেঁচে যেত, যদি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা ঠিক সময়ে যুদ্ধ শুরু করতে পারতাম। বারবার মনে প্রশ্ন জাগে, বঙ্গবন্ধু কেন ওই রাতে কাউকে কিছু বলে গেলেন না? আবার ভাবি, উনি কাদের বলবেন? হয় তাজউদ্দীন সাহেব, না হয় নজরুল ইসলাম সাহেবকে। তিনি হয়তো বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদেরও বলে যেতে পারতেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা তাঁর (মুজিব সাহেবের) নির্দেশনা জানতে চেষ্টা করেছি কিন্তু তিনি কাউকে কিছু বলেননি বা আমরা কিছুই জানতে পারিনি। পরবর্তী সময়ে জানতে পেরেছি, চট্টগ্রামে অবস্থিত ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদারের নেতৃত্বে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসের মধ্যে বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা একটি সামরিক পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিকল্পনাটি ক্যাপ্টেন আমীন আহম্মেদ চৌধুরীর (বীর বিক্রম, পরে মেজর জেনারেল) মারফত কর্নেল ওসমানীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠানো হয়েছিল। সেনা কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে চলে এসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন এবং যুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেন। এ সময় চট্টগ্রামসহ সারা পূর্ব পাকিস্তানেই বাঙালি সেনাদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল, ফলে যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ২৫ মার্চ রাতেও শেষ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন শেখ মুজিবকে জয়দেবপুর নিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করতে। তাঁর এ উদ্যোগও সফল হয়নি। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার তাঁর সামরিক পরিকল্পনা রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন ও নেতৃত্বেই বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। যাহোক, বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের বিষয়টি আপাতত একটি রহস্য হয়ে আছে। আমার বিশ্বাস, এ রহস্যকে বহু গবেষক ও ঐতিহাসিক বিভিন্নভাবে বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করবেন। যদি কেউ একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবের গ্রেপ্তার হওয়াকে বিশ্লেষণ করেন, তবে সেটা সম্পূর্ণ হবে না। বিষয়টিকে দেখতে হবে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, আঙ্গিক ও অবস্থান থেকে। এ নিয়ে গভীর গবেষণা হওয়া উচিত।

২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমান আটক হওয়ার পর দেশবাসী সম্পূর্ণভাবে ঘোর অন্ধকারের মধ্যে পড়ে। তারা বুঝতে পারছিল না কী করবে? তারা কি যুদ্ধে যাবে, নাকি ঘরের মধ্যে বসে থাকবে। তাদের কাছে তো কোনো নির্দেশ নেই, তাদের তো এই পরিস্থিতিতে কী করণীয়, তা কেউ বলে দেয়নি। আপৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের উচ্চস্তরের নেতৃত্ব কী ধরনের হওয়া উচিত ছিল, সে সম্পর্কে কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না। যুদ্ধের আগে বা যুদ্ধ শুরুর অব্যবহিত পরে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগও নেননি। ফলে নেতাদের ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং নিজেদের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিন অবধি চলতে থাকে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই বিশৃঙ্খল অবস্থা বাংলাদেশ বাহিনীর নেতৃত্ব ও কাঠামোকেও আংশিকভাবে প্রভাবিত করে। যদি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত থাকত যে বঙ্গবন্ধুর ওপর কোনো প্রকার আঘাত এলে নেতারা অমুক জায়গায় মিলিত হয়ে তাজউদ্দীন সাহেব বা কোনো জ্যেষ্ঠ নেতার নেতৃত্বে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন, তাহলে হয়তো নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এত প্রকট হতো না। যুদ্ধের আগেই তাঁদের বলা উচিত ছিল, আমাদের লক্ষ্য কী এবং এই লক্ষ্য পূরণের জন্য কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে। এটা হলে আমরা একটি সফল মুক্তিসংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারতাম। এ ছাড়া এ সংগ্রামে সহযোগিতার জন্য ভারত বা অন্য কোনো সরকারের সঙ্গে কী আলোচনা করতে হবে এবং তাঁদের কাছ থেকে কী ধরনের সাহায্যের অনুরোধ করতে হবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকা দরকার ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা এই রকম কোনো পরিকল্পনা মার্চ মাসে নিয়েছিলেন বলে আমার জানা নেই।

রাজনৈতিকভাবে কোনো যুদ্ধপ্রস্তুতি না থাকা সত্ত্বেও বিচ্ছিন্নভাবে সেনা কর্মকর্তারা কোথাও কোথাও কিছু প্রস্তুতি নিলেও তা উল্লেখযোগ্য ছিল না এবং কারও সঙ্গে কারও সমন্বয় ছিল না। অন্যদিকে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের পরিকল্পনাটিও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমর্থন পায়নি। ফলে ২৫ মার্চ ঢাকাসহ সারা দেশে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করল, তখন এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি সেনাসদস্যরা নিজস্ব উদ্যোগে যে আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধযুদ্ধে অবতীর্ণ হন, তা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বিনা প্রস্তুতিতে সীমিত অস্ত্রপাতি নিয়ে তাঁরা প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেন। এর ফলে বাঙালি সৈনিকদের ভীষণ ক্ষতি ও জীবনহানি হয়েছিল। চট্টগ্রামে ইবিআরসি, যশোরে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল, পিলখানায় ইপিআর, রাজারবাগে পুলিশসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক বাঙালি সেনাকে জীবন দিতে হয়।

আক্রান্ত হওয়ার পর আমরা দ্রুত পাকিস্তানিদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারিনি। পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে আমরা তাদের যে পরিমাণ ক্ষতি করতে পারতাম, সেটা করতে পারিনি। তাই পরবর্তী সময়ে, অর্থাৎ পাকিস্তানিদের আক্রমণের পর দীর্ঘদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল বিধ্বস্ত ও বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে একত্র হওয়ার জন্য এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রপ্রাপ্তির আশায়। এরপর আমরা যুদ্ধ শুরু করি। আমাদের যদি আগে থেকেই নির্দেশ দেওয়া হতো, তাহলে আমরা আগে থেকে প্রস্তুত থাকতে পারতাম এবং অনেক গুছিয়ে আক্রমণ প্রতিহত করতে পারতাম বা ন্যূনতম ক্ষতি স্বীকার করতে হতো। রাজনৈতিক নেতাদের নির্দেশনা পেলে মার্চের প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি সৈন্য, ইপিআর, পুলিশ যা ছিল তা দিয়ে পাকিস্তানিরা আঘাত বা আক্রমণ করার আগে আমরাই তাদের আক্রমণ করতে পারতাম। উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে স্বাধীনতার জন্য সাধারণ মানুষও আমাদের সঙ্গে যোগ দিত এবং আমাদের লোকবল আরও অনেক গুণ বেড়ে যেত। এই আঘাতে তখনই আমাদের বিজয়ের সম্ভাবনা ছিল, আর যদি সরাসরি বিজয় না-ও হতো, তবু প্রতি পদে তাদের অভিযান ব্যাহত হতো এবং অনতিবিলম্বে বিজয় আমাদেরই হতো। এর জন্য কোনো বিদেশি সৈন্য আনারও দরকার হতো না। দেশে এত ধ্বংসযজ্ঞ বা সম্পদহানি ও অর্থনীতির এত বড় ক্ষয়ক্ষতি হতো না।

প্রথম পর্যায়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তা এবং সাধারণ সৈনিক ও সদস্যদের একত্রে পাওয়া যেত। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও আমাদের পাশে এসে দাঁড়াতে আগে থেকেই উন্মুখ ছিলেন। এসব অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক মার্চ মাসজুড়ে ঢাকায় অনেক সভা ও সমাবেশ করে তা জানিয়েও দিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম থেকে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত সব অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সৈনিকের নাম-ঠিকানা, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা ও প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কাছে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকেই পৌঁছে দিয়েছিলেন। মার্চ মাসে আমিসহ বেশ কিছু বাঙালি সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত ছিলাম। এ ছাড়া আরও কিছু বাঙালি কর্মকর্তা এ সময় ছুটিতে দেশে ছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের উচিত ছিল আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা। যদি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে সামান্য যোগাযোগও করা হতো, তাহলে আমরা সঠিকভাবে প্রস্তুত থাকতাম। ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তটি না নেওয়ার কারণে ২৫ মার্চের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়, যা পূর্বপরিকল্পনা থাকলে সহজে এড়ানো যেত।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকাসহ সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের খবর সবার কাছে বিদ্যুৎ-গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। একটি অদ্ভুত ব্যাপার হলো, টেলিফোনে হোক কিংবা অন্য যেকোনো উপায়ে হোক, সারা দেশেই খবরটি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন জায়গায় বাঙালি সেনা, police, ইপিআর নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের যুদ্ধ নিজেরাই শুরু করে। এদের অনেকে প্রথমে বাঁচার জন্য অস্ত্র নিয়ে সরে পড়ে, তারপর যুদ্ধ শুরু করে নিজেদের রক্ষা করার জন্য। দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত পাবনা, যশোর, কুষ্টিয়া, রংপুর, সৈয়দপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বাঙালিরা পাকিস্তানিদের পাল্টা আক্রমণ করে। পাবনায় পুলিশ ও সাধারণ মানুষ পাকিস্তানিদের আক্রমণ করে পরাজিত করে। কুষ্টিয়ায় সবচেয়ে ব্যাপক প্রতিরোধযুদ্ধ হয়, যেখানে ইপিআর ও জনতার কাছে পাকিস্তানিরা পরাজিত হয়। ২৫ মার্চে পাকিস্তানিদের আক্রমণ এবং এর ফলে বাঙালিদের প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দুটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রথমত, এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল কোনো প্রকার রাজনৈতিক নির্দেশ ছাড়াই। যদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধ শুরু হতো, তাহলে এই যুদ্ধের ফলাফল ভিন্ন হতো। দ্বিতীয়ত, বাঙালিদের আক্রমণের প্রথম দিকটি ছিল নিজেদের রক্ষার উদ্দেশ্যে। কিন্তু যখন সারা দেশে পাকিস্তানিদের আক্রমণ ও নিজেদের রক্ষার প্রচেষ্টার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে, তখন বাঙালি সশস্ত্র যোদ্ধারা পাকিস্তানিদের ওপর আক্রমণাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হন। এভাবেই যুদ্ধের প্রথম পর্ব শুরু হয়েছিল। সত্য এই যে আমরা কোনো যুদ্ধের নির্দেশ পাইনি। নির্দেশটা কেন আসেনি, সে জন্য ঐতিহাসিক, গবেষক, লেখক প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন মতামত দেবেন। তবে আমি মনে করি, রাজনৈতিক নেতারা যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না, তাই তাঁদের থেকে কোনো নির্দেশনাও আসেনি। তাঁরা বিভিন্ন বাহিনীর কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। এমনকি বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের পাঠানো সামরিক পরিকল্পনাগুলোকেও কোনো আমলে আনেননি। তাঁরা হয়তো রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন করে তাঁদের দাবি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন, যা কিনা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয় এবং জাতিকে এর জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়।

২৫ মার্চ রাতের পর থেকে বাঙালি ইউনিটগুলো যুদ্ধে যোগ দেয় এ কারণে যে পাকিস্তানি বাহিনী প্রথমেই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিভিন্ন ইউনিট, ইপিআর সদর দপ্তর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ওপর একযোগে আক্রমণ করে। এ অবস্থায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর ও পুলিশ নিজ নিজ ওয়্যারলেস মারফত তাদের বিভিন্ন ইউনিট, কোম্পানি ও ডিটাচমেন্টকে এসওএস বার্তা পাঠায়—’আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়েছি।’ ফলে বাংলাদেশের সর্বত্র সেনাবাহিনী, বিশেষত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসারের বাঙালি সদস্যরা একযোগে বিদ্রোহ করে এবং নিরাপদ জায়গায় সরে পড়ে। পরবর্তী সময়ে কেউ কেউ বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দেন যে এসব বাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের আহ্বানে বিদ্রোহ করে যুদ্ধে নেমেছিলেন। এ তথ্য মোটেও সত্য নয়। যুদ্ধ চলাকালে আমি যুদ্ধরত বাহিনীগুলোর অনেক সদস্যকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আপনারা স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে কি কোনো নির্দেশনা পেয়েছিলেন?’ উত্তরে প্রত্যেকে বলেছেন, ‘না।’ তবে যুদ্ধ শুরুর পর বেশির ভাগ বাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাঁদের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। আবার কোথাও কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৈনিকদের সঙ্গে একত্র হয়ে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করেন।

২৬ মার্চ যুদ্ধ দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানিরা ট্যাংক, এয়ারক্রাফট, কামান ও নৌবাহিনীর গানবোট থেকে বিভিন্ন জায়গায় গোলাবর্ষণ করে। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি বাহিনী বলতে সে সময় ছিল প্রধানত বাঙালি অফিসারদের নেতৃত্বে পাঁচটি ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, মুজাহিদ ও আনসার। পাকিস্তানি বাহিনীর চূড়ান্ত আক্রমণের আগে সেনা কর্তৃপক্ষ খোঁড়া অজুহাতে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের একত্রে না রেখে ছোট ছোট দলে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিল। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় বাঙালি সেনারা পাকিস্তানিদের হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও সংগঠিতভাবে বাঙালি সৈনিকেরা পাকিস্তানিদের আক্রমণকে খুব একটা প্রতিহত করতে পারেনি। ৩১ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশের বড় একটি অংশ তারা দখল করে নেয়। এ ছাড়া এপ্রিল মাসের মধ্যে বলতে গেলে পুরো দেশই তাদের দখলে চলে যায়।

পাকিস্তানি বাহিনী হত্যাযজ্ঞের সংবাদ যেন প্রচারিত না হয়, তার জন্য সব বিদেশি সাংবাদিককে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (পরে শেরাটন, বর্তমানে রূপসী বাংলা) আটক করে রাখে এবং ২৭ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগে বাধ্য করে। অসহযোগ আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল, তাই পাকিস্তানি বাহিনী প্রথম চোটেই তা দখলে নেয় এবং বহু ছাত্র ও শিক্ষককে হত্যা করে। এরপর তারা আক্রমণ চালায় পিলখানা ইপিআর ক্যাম্পে ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। পুলিশ ও ইপিআররা প্রতিরোধ করলেও তা অল্প সময়েই ভেঙে পড়ে। অনেক জায়গায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ এবং বাঙালি সেনারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে। তবে আমি আগেই উল্লেখ করেছি, সমন্বয় ও নেতৃত্বের অভাবে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া আধুনিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কুষ্টিয়া এলাকায় ইপিআর ও সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড লড়াই হয় এবং এতে পাকিস্তানিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পাবনাতেও সাধারণ মানুষ আর পুলিশ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করে। ঢাকার উত্তরে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কিছু বিক্ষিপ্ত লড়াইয়ের পর আরও উত্তরে সরে যায়। চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল ও ইপিআরের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি করে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়। একইভাবে রাজশাহী, দিনাজপুর, কুমিল্লা, সৈয়দপুর, যশোরসহ বিভিন্ন জায়গায় বাঙালি সৈনিকেরা কিছু প্রতিরোধের পর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে অবস্থান নেয়। পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো শরণার্থীরা ভারতে যেতে শুরু করে। পাকিস্তানিদের আক্রমণের প্রতিক্রিয়া ভারতেও অনুভূত হতে শুরু করে। প্রকৃত ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর সেখানে বাঙালির পক্ষে জনমত দানা বেঁধে ওঠে। তারা অবিলম্বে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের ওপর হস্তক্ষেপের দাবি জানায়। ৩১ মার্চ ভারতীয় সংসদে পাকিস্তানি সামরিক সরকারকে পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

২৬ মার্চ সন্ধ্যায় জেনারেল ইয়াহিয়া পাকিস্তান রেডিও ও টেলিভিশন ভাষণে এই জঘন্য অপরাধের দায়ভার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর চাপিয়ে দেন। তিনি এই ভাষণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশংসা এবং শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী বলে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু তখন তাদের কাছে বন্দী ছিলেন। ফলে তাঁর (শেখ মুজিব) পক্ষে এর প্রতিবাদ করা তখন সম্ভব ছিল না। তবে বাংলাদেশের কোনো মানুষ জেনারেল ইয়াহিয়ার এই ভাষণ বিশ্বাস করেনি। সাধারণ মানুষ পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল, ইয়াহিয়া খান এক জঘন্য আক্রমণ চালিয়ে সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে ধোঁকা দিয়ে শেখ মুজিবের ওপর দোষ দিতে চাচ্ছে। জেনারেল ইয়াহিয়া বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে। শেখ মুজিব একজন দেশদ্রোহী। তাই ২৫ মার্চ রাতে দেশরক্ষা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।’ আমি যখন এই খবর পত্রিকায় পড়লাম, তখন এটিকে আমার কাছে তামাশা ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। এ ঘোষণার ভেতর তাদের কুমতলব ছাড়া আমি আর কিছুই দেখতে পাইনি। জেড এ ভুট্টো পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করে তাদের অভিনন্দন জানিয়ে ২৬ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন। তিনি বলেন, ‘থ্যাংকস গড! পাকিস্তান হ্যাজ বিন সেভড।’

২৬ মার্চ সারা দিন কারফিউ ছিল। ২৭ মার্চ সকালে অল্পক্ষণের জন্য কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পর থেকে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। তাই ২৭ মার্চ সকালে ওদের নিয়ে আসার জন্য নিজেই জিপ চালিয়ে আজিমপুরে যাই, পথে রাস্তার দুই পাশে ভয়ংকর ও বীভৎস দৃশ্য দেখি। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। কালো পিচের রাস্তা রক্তে লাল হয়ে গেছে। ভাবলাম, এরপর তো এই হত্যাকারীদের সঙ্গে থাকার প্রশ্নই আসে না। আজিমপুর থেকে আসার পথে আমার স্ত্রীকে রাস্তার ডানে-বামে তাকাতে নিষেধ করি এবং ছেলেমেয়েরা যেন না তাকায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে বলি। কারণ, রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা বীভৎস সব লাশ দেখে তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। গাড়িতে বসেই আমি স্ত্রীর উদ্দেশে বললাম, ‘দেখো, এই দেশে আমরা আর থাকব না। তুমি কি রাজি আছ?’ ও আমাকে পূর্ণমাত্রায় সমর্থন করল এবং বলল, ‘আমি প্রস্তুত।’ আমি আরও বললাম, ‘তেজগাঁওয়ের সরকারি আবাসিক ভবনে থাকা নিরাপদ নয়। আমাদের অন্য বাসায় ওঠা উচিত।’ কয়েক দিনের মধ্যেই সরকারি কোয়ার্টার ছেড়ে আমরা পুনরায় আজিমপুরে স্ত্রীর বোনের বাসায় ওঠার সিদ্ধান্ত নিলাম।

২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ভাবলাম, এয়ারফোর্স অফিসার্স মেসে গিয়ে দেখি মেসের কী অবস্থা। মেসে গিয়ে দেখলাম, কয়েকজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন। লক্ষ করলাম, একটি সেনাভর্তি ট্রাক অফিসার মেসে প্রবেশ করল। সৈনিকদের অনেকের হাতে অগ্নিবর্ষক অস্ত্র (ফ্লেম থ্রোয়ার) দেখলাম। সৈনিকেরা গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অফিসার্স মেসের একটু পেছনেই ছিল নাখালপাড়া গ্রাম। নাখালপাড়া গ্রামটি ছিল গরিব, রিকশাওয়ালা ও খেটে খাওয়া মানুষের বাসস্থান। পাকিস্তানিদের ধারণা ছিল, এই গরিব মানুষগুলোই আসল শত্রু, কারণ এরাই সব আন্দোলনের পুরোভাগে থাকে। অগ্নিবর্ষক অস্ত্রগুলো দিয়ে ওরা এদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের শিখায় পুরো এলাকা লাল হয়ে গেল। ঢাকায় কারফিউ থাকার কারণে নাখালপাড়ার বাসিন্দারা বাসায় আবদ্ধ ছিল। সব ঘরবাড়িতে দারুণভাবে আগুন জ্বলে উঠল। তাদের তখন ঘর থেকে দৌড়ে বের হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। তাদের তো আগুন থেকে বাঁচতে হবে। যখন তারা ঘর থেকে দৌড়ে বের হওয়া শুরু করে, তখন এই অসহায় মানুষগুলোর ওপর পাকিস্তানি সৈন্যরা নির্মমভাবে গুলিবর্ষণ করতে শুরু করল। আমার পাশে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর কয়েকজন অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের একজন আমারই সামনে বলে উঠলেন, ‘দিস ইজ দ্য ওয়ে টু ডিল উইথ দ্য বাস্টার্ডস।’ এই কথাটা আমি জীবনে ভুলব না। নিজ চোখের সামনে এই ঘটনা দেখে আমি স্থির করলাম, এদের সঙ্গে আমি আর এক মুহূর্তও থাকব না।

২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের রূপ নেয়। এখান থেকে প্রথমে স্থানীয় নেতারা ও পরে মেজর জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম, পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি) বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আমি মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা শুনি এবং চট্টগ্রামে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা জানতে পারি। এই ভেবে উৎফুল্ল হই যে আমরা আক্রান্ত হয়ে চুপ করে নেই, আমরা আক্রমণও শুরু করেছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানি বাহিনী স্থলপথে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আক্রমণ করতে না পেরে ২৯/৩০ মার্চ বিমানের সাহায্যে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে বোমাবর্ষণ করে। ২৮ বা ২৯ মার্চের পর থেকে বিমানবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো বাঙালিদের পরিবর্তে শুধু পশ্চিম পাকিস্তানি বৈমানিকদের দ্বারা উড্ডয়ন করা হতো। আমিসহ সব বাঙালি কর্মকর্তা তখন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে ছিলাম নামেমাত্র। আমাদের কোনো দায়িত্ব-কর্তব্যে নিযুক্ত করা হতো না। পাকিস্তান বিমানবাহিনী কোথাও আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলে আমরা ধারণা করতে পারতাম, কিন্তু কবে, কখন ও কোথায় তা কার্যকর হবে, তা নির্দিষ্টভাবে জানতে পারতাম না। তাই চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র আক্রমণের কথা অনুমান করতে পারলেও সুনির্দিষ্টভাবে আক্রমণের কোনো খবর জানতে পারিনি।

এভাবেই শেষ হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন আর সূচনা হয় প্রতিরোধযুদ্ধের। অসহযোগ আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতারা মোটামুটি সফল হয়েছিলেন বটে, কিন্তু প্রতিরোধযুদ্ধ তথা মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক পর্বের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় দূরদৃষ্টি দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন, যার জন্য আমাদের অনেক উচ্চমূল্য দিতে হয়েছিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%