ডাম্পির সুখ-দুঃখ

অনীশ দেব

1

এবাড়িতে আমি কবে এসেছি তার সাল-তারিখ মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে, ছোড়দার ছেলে অন্তুর বয়েস তখন ছিল ছ’মাস। এরকম মনে থাকারও একটা কারণ আছে। প্রথম দিন ছোড়দা আমাকে নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিল ওর মায়ের ঘরে। সে-ঘরে পিসিমাও থাকেন। মা খবরের কাগজ পড়ছিলেন চোখে চশমা দিয়ে, আর পিসিমা ঠাকুরের ছবির সামনে বসে ধূপ জ্বেলে গুনগুন করে প্রার্থনা করছিলেন।

ছোড়দা আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘মা, এই যে, বলেছিলাম না সন্তোষদার কাছ থেকে একটা দারুণ কুকুর নিয়ে আসব। এটাই নিলাম—ডোবারম্যান।’

ছোড়দা আমার পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল। আর আমি তখন গন্ধ শুঁকছিলাম। ঘরের গন্ধ। ধূপের ধোঁয়ার গন্ধ। মায়ের গন্ধ। পিসিমার গন্ধ। ছোড়দার গন্ধ। সবরকম গন্ধ যে আমাকে শুঁকতে হবে। আলাদা করে চিনতে হবে। মনে রাখতে হবে।

মা জিগ্যেস করেছিলেন, ‘বয়েস কত এর?’

‘ছ’মাস মতো হবে। আমি নাম রেখেছি ডাম্পি। দ্যাখো, নাম ধরে ডাকলে কেমন তাকাবে আমার দিকে—।’

ছোড়দা কয়েকবার নাম ধরে ডাকল। ‘ডাম্পি’ নামটা আমার মোটেই পছন্দ হয়নি। কিন্তু ছোড়দা এত গর্ব করে মা-কে কথাটা বলেছে যে, স্রেফ ওর মান রাখতেই ডাকের তালে-তালে ওর মুখের দিকে হাঁ করে তাকালাম।

মা আপনমনেই বিড়বিড় করে বললেন, ‘ছ’মাস বয়েস? আমাদের অন্তুরও তো তাই।’

পরে জেনেছি, অন্তু ছোড়দার ছেলে।

ছোড়দা মায়ের কথা শুনতে পেয়েছিল। হেসে বলল, ‘কীরকম মজার ব্যাপার হবে বলো তো! ওরা দুজনে একসঙ্গে বড় হবে!’

পিসিমার পুজো-আর্চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। অবাক চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘ওর লেজটা কাটা কেন রে?’

ছোড়দা হো-হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘এও জানো না! খুব বাচ্চা বয়েসেই ডোবারম্যান কুকুরের লেজ কেটে দেয়। ওদের লেজ সরু, বিচ্ছিরি হয়—অনেকটা টিকটিকির মতো—তাই কেটে দেয়।’

পিসিমা শুধু বলেছিলেন, ‘আহা রে, ব্যথা লাগে না—!’

না, লেজ কাটার সময়কার ব্যথা আমার মনে নেই। কুকুরের এ-ধরনের স্মৃতিশক্তি খুব একটা জোরালো হয় না।

এটাই ছিল আমার প্রথম দিন।

তারপর একে-একে আলাপ হল বাড়ির সকলের সঙ্গে—বড়দা, বড়বউদি, ছোটবউদি, বাড়ির কাজের লোক প্রৌঢ় রামনাথ, ঠিকে কাজ করতে আসা দু-বউ, আর সবার শেষে দেখলাম অন্তুকে—বিছানায় শুয়ে-শুয়ে হাত-পা ছুড়ছে।

প্রথম আলাপের সময় থেকেই আমি প্রত্যেকের গন্ধ আলাদা করে চিনে নিয়েছিলাম। বেশ মনে পড়ছে, নানা জনে নানা কথা বলেছিল আমাকে নিয়ে।

ছোটবউদি বলেছিল, ‘বাদামি রঙের নিলে কেন? কালো পেলে না?’

ছোড়দা গম্ভীর গলায় জবাব দিয়েছে, ‘জানো, বাদামি ডোবারম্যানের প্রেস্টিজই আলাদা।’

আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। ছোড়দার গায়ে গা ঘষেছি বারবার।

বড়বউদি আমার কাছে এসে জিগ্যেস করল, ‘কী রে ডাম্পি, চোর ধরতে পারবি তো?’

আমি আমার মতো করে বলেছিলাম, ‘পারব—।’

বড়বউদি আমার কথা না বুঝে বলল, ‘বাব্বাঃ, গলায় বেশ জোর আছে তো!’

বড়দা জানতে চেয়েছিল, কী খেতে দেওয়া হবে আমাকে। ছোটবউদি দুবার ‘হুস-হুস’ করেছিল আমাকে লক্ষ্য করে। তারপর ছোড়দাকে বলেছিল, ‘ভালো করে ট্রেনিং দিয়ো এটাকে—সিনেমায় যেমন দেখায়।’

আর রামনাথ বেশ দূর থেকেই ভয়ে-ভয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘ছোড়দাদাবাবু, এই কুকুর পয়লা কোথায় কামড়ায়? হাতে, পায়ে, না গলায়?’

কথা শুনে আমার হাসি পেয়ে গিয়েছিল।

ছোড়দা মজা করে বলেছিল, ‘সেটা ডাম্পিকেই জিগ্যেস করো না!’

তারপর থেকে দিনগুলো বেশ কাটতে লাগল।

একটু পুরোনো বাতিল সোফায় আমার বিছানা তৈরি হল। সেই বিছানায় চোদ্দোটা বছর কেটে গেল কোথা দিয়ে কে জানে! এখন সেই সোফাটা আরও পুরোনো হয়েছে। গদি ছিঁড়েছে, তুলো বেরিয়ে পড়েছে খানিকটা। তবুও ওটার ওপরে শুতে আমার ভালো লাগে। কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে সোফাটার ওপরে। তা ছাড়া রোজকার চেনা গন্ধটাও আমার কাছে ভীষণ আরামের, ভীষণ স্বস্তির।

ছোটবউদি নিয়ম করে খেতে দেয় আমাকে। সেই খাবার যে সবসময় ভালো লাগে তা নয়। তাই মাঝে-মাঝেই আমি খাবার ফেলে ঘুরে বেড়াই। আর অন্য কোনও কুকুরের ডাক শুনতে পেলেই ছুটে যাই রাস্তার দিকের বারান্দায়। গলা ফাটিয়ে চেঁচাই। ওদের সাবধান করে জানিয়ে দিই, আমি আছি এ-বাড়িতে। তোরা কেউ কাছে ঘেঁষবি না কিন্তু।

দাদারা যখন সেজেগুজে অফিসে বেরোয় তখন বাড়িটা কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। দুপুরবেলা মা আর পিসিমা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েন, বিশ্রাম নেন। কিন্তু আমার তো ঘুম আসে না। তাই একবার এ-ঘর, আর একবার ও-ঘর করি। বড়বউদি দুপুরে ঘুমোয় না। টিভি দ্যাখে আর সেলাই করে। আমি বড়বউদির পায়ের কাছে গিয়ে বসি। টিভি দেখি। এখন আর টিভির ছবিগুলো তেমন স্পষ্ট দেখতে পাই না। কেমন যেন ঝাপসা দেখায়।

কী আনন্দেই না কেটেছে আমার ছেলেবেলা আর তার পরের দিনগুলো। অন্তু বড় হয়ে উঠতেই ওর সঙ্গে কত খেলা করেছি। ছুটোছুটি। নকল কামড়া-কামড়ি। আরও কতরকম খেলা।

বাড়ির কাছেই একটা ছোট পার্ক আছে। আমি, ছোড়দা, অন্তু সেই পার্কে রোজ বিকেলে বেড়াতে যাই। কোনও-কোনও দিন সঙ্গে থাকে রামনাথ। সেখানে আমি আর অন্তু ছুটোছুটি করি। ছোড়দা দূরের বেঞ্চিতে বসে দ্যাখে। আগে আমাকে বল ছুড়ে দিয়ে খেলাত ছোড়দা। আমি ছুড়ে দেওয়া বলটা এক ছুটে গিয়ে মুখে করে নিয়ে আসতাম। জিভ বের করে হাঁফাতাম। জিভ দিয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরে পড়ত।

ছোড়দার মুখেই শুনেছি, এরকম ছুটোছুটি করলে নাকি আমার নখ ক্ষয়ে যায়। তা না হলে নখ যদি খুব বড় হয়ে যায় তা হলে পায়ের আঙুল ব্যথা করবে। পা ফেলে হাঁটতে বা ছুটতে কষ্ট হবে। এখন তো আর আমি তেমন ছুটতে পারি না, তাই নখ বড় হয়ে যায়। তখন সত্যিই পা ব্যথা করে। ভালো করে হাঁটতে পারি না। ছোড়দা বা ছোটবউদি আমার খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটার ধরন দেখেই সব বুঝতে পারে। তখন ছোড়দা কাঁচির মতো কী একটা যন্ত্র দিয়ে নখগুলো কেটে দেয়। তারপর কী যে আরাম লাগে আমার! ছোট-ছোট ডাক ছেড়ে ছোড়দাকে বলি, ‘ছোড়দা, তুমি কী ভালো!’ ছোড়দা বা ছোটবউদি আমার কথা বুঝতে পারে না। তবে ছোড়দা আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করে। নাম ধরে ডাকে বারবার।

ছোড়দা যখন অফিসে বেরিয়ে যায় তখন আমার খুব বিচ্ছিরি লাগে। মনে হয়, ছোড়দার সঙ্গে অফিসে চলে যাই। শুনেছি, ছোড়দার অফিসের সামনে অনেকটা খোলা জমি আছে। তা সারাটা দিন আমি তো সেখানে ছুটোছুটি করে খেলা করে কাটিয়ে দিতে পারি। তারপর অফিস ছুটির পর ছোড়দার সঙ্গে একসঙ্গে বাড়ি ফেরা! সে যে কী আনন্দের ব্যাপার...। কিন্তু সেটা তো হওয়ার উপায় নেই। তাই ছোড়দা বেরিয়ে গেলেই আমার ঘুরঘুর করার কাজ শুরু। তখন দেখি বাড়িতে কে কোথায় কী করছে।

মা আর পিসিমা নিজেদের মধ্যে গল্প করেন, ঝগড়া করেন। এই দেখি আড়ি তো এই দেখি ভাব। আমাকে দেখলেই মা সাবধান করেন। বলেন, ‘ডাম্পি, তুই পায়ের কাছে একদম ঘুরঘুর করবি না। তোর জন্যে কোনওদিন হোঁচট খেয়ে পড়ব।’

পিসিমাও বলেন, ‘যা যা, এখন কাজলের কাছে যা—।’

কাজল মানে ছোটবউদি। ছোটবউদি তো এখন অন্তুকে খাওয়াতে ব্যস্ত। বড়বউদি বাড়ি নেই। কোথায় যেন গেছে বড়দার সঙ্গে।

আমার সঙ্গে তা হলে খেলা করবে কে! কথাই বা বলবে কে!

এসবের জন্যেই মাঝে মাঝে আমি খাটের তলায় এক কোণে ঢুকে চুপটি করে বসে থাকি। বসে-বসে আমার মায়ের কথা ভাবতে চেষ্টা করি। কিন্তু ভালো মতো মনে পড়ে না।

ছোটবউদি সময় হলেই খেতে দেয় আমাকে। এ-ঘরে ও-ঘরে খুঁজে না পেয়ে নাম ধরে ডাকে। এক-একদিন এত মন খারাপ থাকে যে, অনেক করে ডাকলেও সাড়া দিই না। পরে ছোটবউদি যখন খাটের তলায় উঁকি মেরে আমাকে খুঁজে বের করে তখন গজগজ করতে-করতে বেরিয়ে আসি। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই। অগত্যা কী আর করা!

ছোড়দা যখন অফিস থেকে বাড়ি ফেরে তখন পায়ের শব্দ চিনতে পারি আমি। দোতলা থেকে একছুটে সিঁড়ি নেমে পৌঁছে যাই একতলায় দরজার কাছে। ছোড়দার গায়ে গা ঘষে কুঁইকুঁই শব্দ করে কত যে নালিশ করি আমি! সবার নামেই নালিশ থাকে আমার—শুধু অন্তু ছাড়া। ছোড়দা আমার নালিশ কি ছাই একটুও বোঝে! খালি নাম ধরে ডাকে আর আদর করে।

বেড়াল, আরশোলা কি ইঁদুর দেখলে আমি ঠিক থাকতে পারি না। ওদের পেছনে পাগলের মতো তাড়া করি। ওদের গায়ের গন্ধও কী বিচ্ছিরি! আমার ছুটোছুটি আর ঘেউঘেউ করা শুনে মা আর পিসিমা ভারী বিরক্ত হন। মা বলেন, ‘চোর ধরার নামে দেখা নেই, শুধু ইঁদুর-বেড়াল তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে!’

কিন্তু আমি কী করব! বাড়িতে চোর না এলে আমি তাকে ধরি কেমন করে! ছোড়দাদের এই পাড়াটা এতই শান্ত যে, চোরের নামগন্ধ পর্যন্ত নেই।

গত চোদ্দো বছরে একবার মাত্র চোর ধরেছি আমি। তাও সেই ছেলেটাকে ঠিক চোর বলা যায় কি না জানি না।

বছর তিনেক আগের কথা। দিনটা ছিল রবিবার। সন্ধে সাতটা কি সাড়ে সাতটা হবে। আমি তিনতলায় বড়বউদির ঘরে বসে টিভি দেখছিলাম। বড়দা বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। টিভিতে সিনেমা হচ্ছিল। বড়বউদি একটা বড় বাটিতে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, চানাচুর দিয়ে মুড়ি মেখে খাচ্ছিল। সিনেমার প্রতিটি ছবির দিকে চোখ যেন আঠা দিয়ে আটকানো। দাদা-বউদির কথাবার্তায় বুঝতে পারছিলাম, সিনেমাটা রঙিন। কিন্তু আমি সাদা-কালোই দেখছিলাম। আমাদের চোখে তো আর বর্ণালির সাত-রং ধরা পড়ে না। আমাদের জগৎটাই সাদা-কালোর জগৎ। সেইজন্যেই তো ছোড়দা, রামনাথ, কিংবা অন্তু যখন আমাকে লাল বল দিয়ে খেলাত, তখন আমি সেটাকে কালচে রঙের দেখতাম।

সিনেমা দেখতে-দেখতে অচেনা একটা পায়ের শব্দ পেলাম। শব্দটা এসেছে দোতলার সিঁড়ি থেকে। ছোড়দা বাড়ি নেই। অন্তুকে নিয়ে কাছেই কোন এক বন্ধুর বাড়ি গেছে। রামনাথ গেছে মোড়ের মাথায়—বটতলায় আড্ডা মারতে। প্রতি রোববারেই যায়। মা আর পিসিমা নিশ্চয়ই ওঁদের ঘরে বসে সিনেমা দেখছেন। ছোটবউদি একটু আগে রান্নাঘরে রান্না করছিল দেখে এসেছি—এখন কী করছে জানি না।

টিভি দেখা ছেড়ে আমি চুপচাপ দোতলায় নেমে এলাম। নামতে-নামতে অচেনা গন্ধটা নাকে এল। ছোড়দা বা বড়দার কোনও নতুন বন্ধু হতে পারে। ওদের নানান বন্ধুবান্ধব প্রায়ই আসে বাড়িতে। তবে এই বন্ধু হয়তো আগে বাড়িতে আসেনি।

পায়ের খুটখুট শব্দ আর গন্ধ লক্ষ্য করে চলে গেলাম ছোড়দার ঘরে। গিয়ে দেখি রোগা চেহারার একটা ছেলে ঘরের সব জিনিসপত্র হাঁটকাচ্ছে। ছেলেটার মাথার চুল উশকোখুশকো, গায়ে ছেঁড়া জামা, আর মুখ থেকে বিচ্ছিরি গন্ধ বেরোচ্ছে।

দেখলাম, ছেলেটা ছোড়দার টেবিলে রাখা খুচরো টাকাপয়সা তুলে নিল। তারপর তুলে নিল ছোটবউদির হাতঘড়িটা। ওগুলো প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে যখন স্টিলের আলমারির দিকে এগোচ্ছে, তখনই আমি জোরে গর্জন করে উঠলাম।

ছেলেটা যে চুরি করছে সেটা বুঝতে আমার অসুবিধে হয়নি। মা যে দিনরাত ধিক্কার দেন আমি চোর ধরতে পারি না, সেটাও মনে ছিল আমার। সুতরাং আমি ছেলেটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতাম। পারতাম ওর গলায় কিংবা কাঁধে সাঙঘাতিক কামড় বসাতে। কিন্তু ছেলেটার ওইরকম অভাবী রুগ্ন চেহারা আমাকে থামিয়ে দিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ওর গায়ে একফোঁটা জোর নেই, একফোঁটা সাহসও নেই। দু-বেলা ঠিকমতো খেতে পায় কি না কে জানে!

আমার দ্বিতীয় গর্জন বোধহয় ছোটবউদি শুনতে পেয়েছিল। আমার নাম ধরে ‘কী হল, ডাম্পি! কী হল, ডাম্পি!’ বলতে-বলতে কোথা থেকে যেন ছুটে এল। এসেই পালিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল ‘চোর, চোর!’ বলে।

ব্যস, আর যায় কোথায়! সারা বাড়িতে যাকে বলে একেবারে হুলুস্থুলু। বাড়িসুদ্ধ লোকের হইচই চিৎকারের মধ্যেই ছেলেটা ছুটে পালিয়ে গেছে রাস্তায়। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেনি। পাড়ার ছেলেরাই মিনিটখানেক পরে ধরে নিয়ে এল ওকে। আর তার ঠিক আগেই ছোড়দা আর অন্তু ফিরে এল।

ছোড়দা, বড়দা, অন্তু আর দুই বউদি তখন বাড়ির দরজায়। আর মা-পিসিমা দোতলার বারান্দায় শরীর ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে। রামনাথ গিয়েছিল গলির মোড়ে চোর ধরে নিয়ে আসতে। আমি ছোটবউদির কাছে-কাছে ঘুরছিলাম।

ছোড়দাকে ঘিরে পাড়ার বহু লোকের জটলা। ছোড়দা সবাইকে আমার কথা বলছিল। প্রশংসা করছিল খুব। আমার ভালো লাগছিল। মা নিশ্চয়ই এবার খুশি হবেন।

ঠিক এমন সময় ছেলেদের দঙ্গল চোরটাকে পাকড়াও করে আমাদের বাড়ির গেটে নিয়ে এল। সঙ্গে রামনাথ। সে ছেলেটার কলার ধরে আছে শক্ত করে।

ছেলেটাকে দেখে আমি চমকে গেলাম। এ কী দশা হয়েছে ওর! জামা ফর্দাফাঁই। সারা গায়ে কালো রঙের ছিটে। রক্তের ছিটে। আমি তো রক্তের লাল রং দেখতে পাই না, কালো দেখি। ওর বাঁ-গাল কেটেও রক্ত বেরোচ্ছে। মাথা ঝুঁকিয়ে টলছে। মুখ দিয়ে গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে।

‘এই যে গৌতমদা, ওর পকেটে এগুলো পাওয়া গেছে।’ পাড়ারই মুখ-চেনা একটা ছেলে ছোটবউদির ঘড়ি আর টাকাপয়সা এগিয়ে দিল ছোড়দার দিকে। হইচই চিৎকার আরও বেড়ে গেল। কেউ বলছে ছেলেটাকে পুলিশে দিতে। আবার কেউ বলছে আচ্ছা করে পিটিয়ে ছেড়ে দিতে।

এরই মধ্যে আবার শুরু হয়ে গেল মার। অসহায় ওই ছেলেটাকে সব্বাই মিলে পেটাতে লাগল। যারা মারছিল তাদের মুখগুলো কী বিচ্ছিরি দেখতে হয়ে গেছে। মুখ কুঁচকে গেছে, দাঁত বেরিয়ে পড়েছে।

আমি ছোড়দার দিকে মুখ তুলে চেঁচিয়ে বললাম, ‘ছোড়দা, ওকে ছেড়ে দাও। ওকে আর মেরো না। মারতে বারণ করো। ছেলেটা মরে যাবে যে!’

আমার কথা কেউ বুঝতে পারল না। ছোড়দা সামনে দাঁড়ানো এক বন্ধুকে বলল, ‘দেখছিস, ডাম্পি আবার কেমন চেঁচাচ্ছে। ওর রাগ এখনও কমেনি।

আমি আবার বললাম, ‘জিনিস তো সব পেয়ে গেছ, ছোড়দা! ওকে ছেড়ে দিতে বলো!’

আমার কথা কেউ বুঝতে পারল না। তখন আমি চুপচাপ বাড়িতে ফিরে এসে মায়ের খাটের তলায় এক কোণে গিয়ে বসে পড়লাম। ইশ, ছেলেটাকে দেখে যদি আমি চিৎকার না করতাম তা হলে ভালো হত। কী দরকার ছিল আমার চোর ধরার! ছেলেটার কী দশা করবে ওরা কে জানে!

কিছুক্ষণ পর হইচই থেমে গেল। তার একটু পরেই ছোড়দা উঠে এল দোতলায়। আমাকে দেখতে না পেয়ে চেঁচিয়ে নাম ধরে ডাকতে লাগল। শুনলাম ছোটবউদিকে বলছে, ‘দেখলে, এই হচ্ছে ডোবারম্যানের জাত! কী সাহস!’

মনে আছে, সেদিন ছোড়দার হাজারটা আদরের ডাকেও আমি সাড়া দিইনি।

আমি চোর ধরায় মা ও পিসিমা খুশি হয়েছিলেন। বাড়িতে যেসব অতিথি আসত তাদের সবিস্তারে শোনানো হত আমার বীরত্বের কাহিনি। আমি লজ্জা পেয়ে সরে যেতাম সামনে থেকে। ওই ছেলেটার কাটা-ছেঁড়া মুখটা মনে পড়ত। আরও লজ্জা করত আমার।

মা আর পিসিমা এই চোদ্দো বছর ধরে কত যে শাসন করেছেন আমাকে! সন্ধেবেলা বা রাত্রিবেলা লোডশোডিং হলে আমার শরীরটা মিশে যায় অন্ধকারে! সেটা কি আমার দোষ! অথচ মা সবসময় আপনমনে গজগজ করেন: ‘কেন যে গৌতম একটা কালো কুকুর নিয়ে আসতে গেল!’

আমি তখন অন্ধকার থেকেই চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করি: ‘মা, আমার গায়ের রং তো কালো নয়, বাদামি। ছোড়দাকে জিগ্যেস করে দেখো—।’

কিন্তু কে শোনে কার কথা! সব ব্যাপারেই শুধু আমার দোষ। গা কুটকুট করলে আমি যে মেঝেতে গড়াগড়ি দিই তাতে মা-পিসিমা ভীষণ রাগ করেন। বকাঝকা করেন আমাকে। এতে নাকি ঘরে লোম ওড়ে। তাতে আবার ছোটবউদির অ্যালার্জি হয়। সেইজন্যেই তো ছোটবউদি আমার ছেঁড়া সোফাটায় হাত পর্যন্ত দেয় না। জানি, ঘেন্না করে। তা হলে চারবেলা আমাকে খেতে দাও কেন? কেন ভালোমন্দ দ্যাখো আমার? দয়া করে? দয়া আর ভলোবাসা তো এক নয় ছোটবউদি।

তা এইরকম করে, এইরকম দয়া-মায়া অথবা ভালোবাসার মধ্যে, কেটে গেছে আমার চোদ্দটা বছর। অন্তুও এখন চোদ্দো বছরের। এখন ও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। আগে যেমন আমার সঙ্গে সবসময় খেলাধুলো করত, অনেকদিন হল আর করে না। রামনাথও বেশ বুড়িয়ে গেছে। মাথার চুল সব সাদা। রাত্রিবেলা বাড়ির দরজায় বসে হাততালি দিয়ে ভজন গায়, ‘জয় জগদীশ হরে, জয় জগদীশ হরে...।’ আমি ওর পাশটিতে চুপ করে বসে থাকি। শুনি। রামনাথের গায়ের গন্ধ নাকে আসে। রামনাথ মাঝে-মাঝে কথা বলে আমার সঙ্গে। বলে, ‘কী রে ডাম্পি, মন দু খাতা কেয়া?’

আমি রামনাথের চোখে তাকাই। ওর মুখ ঝাপসা দেখায়। বুঝতে পারি, আমার চোখের নজর আর আগের মতো প্রখর নেই। পাশের বাড়ির বুড়ি পুষিটা খুব কাছে এসে না পড়লে আমি ওকে দেখতে পাই না, ওর গন্ধও টের পাই না। ঘ্রাণশক্তিও ক্ষয়ে এসেছে আমার।

বড়দা, ছোড়দা কি মা-পিসিমা বা বউদিরা সদর দিয়ে বাড়িতে ঢুকলেই আমি দোতলার সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়াই। দেখি, সিঁড়ি দিয়ে কে উঠে আসছে। ওপরে উঠে আসা মানুষটাকে আমি সবার প্রথমে চিনতে পারি পায়ের শব্দে। তখনও আমি দাঁড়িয়ে থাকি নিজের জায়গায়। ক্রমশ মানুষটাকে আমি ঝাপসাভাবে দেখতে পাই। তারপর সে খুব কাছে এসে পড়লে পায়ে নাক ঠেকিয়ে খুব জোরে শ্বাস টেনে গন্ধ শুঁকি। তখন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হই। না, এ আমার চেনা লোক।

বড়বউদির ঘরে বসে ক’দিন আগে টিভি দেখছিলাম। হঠাৎই বউদি বড়দাকে বলল, ‘জানো, ডাম্পির চোখে না ছানি পড়ছে।’

ও, সেইজন্যেই আমি দেখতে পাই না ভালো করে! কিন্তু আমি যে ভালো করে স্পষ্ট করে কোনও শব্দ শুনতে পাই না, ভালো করে গন্ধ চিনতে পারি না, একটু ছোটাছুটি করলেই যে আমার হাঁপ ধরে, এ সবই কি ছানির জন্যে? মায়ের চোখেও তো ছানি পড়েছিল, পিসিমারও তাই। ওঁরা তো অপারেশান করে সারিয়েছেন। ওঁদের তো কত বয়েস! বরং অন্তু আমার বয়েসি—কই, ওর তো কিছু হয়নি!

ছোড়দা আজকাল খুব কম সময় বাড়িতে থাকে। চাকরির পর সন্ধেবেলা কীসব নাকি পড়াশোনা করছে। কিন্তু তাও আমি সারাটা বাড়িতে ছোড়দার গায়ের গন্ধ পাই। সারা গায়ে ছোড়দার নরম হাতের ছোঁয়া পাই।

গতকাল রাতে ছোড়দা, ছোটবউদি আর অন্তু খেতে বসেছিল। আমি খাবার টেবিলের তলায় ছোড়দার পা ছুঁয়ে বসেছিলাম। অন্তু হঠাৎ বলল, ‘বাবা, ডাম্পি বুড়ো হয়ে গেছে, না?’

ছোড়দা ছোট্ট করে বলল, ‘হ্যাঁ—।’

ছোটবউদি বলল, ‘দেখলি না, সেদিন পুষিটাকে দূর থেকে দেখতে পেল না।’

অন্তু খেতে-খেতে বলল, ‘ডাম্পি মরে গেলে কী হবে, বাবা? বাড়ি পাহারা দেবে কে? যদি কখনও চোর আসে সেবারের মতো!’

ছোটবউদি বলল, ‘সন্তোষদাকে বলো না, একটা অ্যালসেশিয়ানের বাচ্চা দিতে—।’

ছোড়দা ভাতের গ্রাস মুখে দিয়ে বলল, ‘হুঁ—বলব।’

কিছু বলতে চাইনি, কিন্তু মুখ দিয়ে ভাঙাচোরা কতকগুলো আওয়াজ বেরিয়ে এল আমার।

ছোড়দা ছোটবউদিকে বলল, ‘ডাম্পির বোধহয় খিদে পেয়েছে, ওর খাবারটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দাও।’

আশ্চর্য! এই সাধারণ কথাটা কখনও মনে হয়নি আমার। আমি ভেবেছিলাম চিরকাল আমি থাকব এ-বাড়িতে। মা-পিসিমার সঙ্গে। ছোড়দা-বড়দার সঙ্গে। ছোটবউদি-বড়বউদির সঙ্গে। রামনাথের সঙ্গে। অন্তুর সঙ্গে। সবার সঙ্গে।

বোকার মতো ভেবেছি, ছোটবউদি রোজ আমাকে খেতে দেবে। ওই তুলো বের করা সোফায় সবসময় তৈরি হবে আমার বিছানা। আর, সবার গায়ের চেনা গন্ধ নিয়ে রোজ আমি ঘুমোতে যাব।

মা-পিসিমা আমাকে অনেক বকাবকি করেন। কিন্তু ওঁদের ভেতরের ভালোবাসা কি আমি টের পাই না! ওঁদের ছেড়ে যেতে আমার যে কষ্ট হবে। বড়বউদির ঘরে গিয়ে আমি তো প্রায়ই টিভি দেখি। তখন বড়বউদি আদর করে আমাকে। আর আমি টিভি দেখতে পাব না। বড়বউদিকেও না। কাল রাতে রামনাথ সুর করে নতুন গান গাইছিল: ‘মালিক জাগে, বান্দা সোয়ে। অন্তরমে কভি সুবহ্‌ না হোয়ে...’ ওর গান আর শুনতে পাব না। অন্তু, ছোড়দা, ছোটবউদি—ওদের কাউকেই আমি আর...।

আমার কেমন হাঁফ ধরছিল। এতই সহজে একটা ডোবারম্যান অ্যালসেশিয়ান হয়ে যাবে! চোদ্দো বছরের কোনও দাম নেই? এত চেনা প্রিয় সব গন্ধ ছেড়ে কেমন করে চলে যাব আমি! আমার জীবনে কোনও রং নেই—সবটাই সাদা-কালো। কিন্তু এই জীবনটাই তো আমি ভালোবেসেছি।

ছোড়দার পায়ে মাথা ঘষতে লাগলাম আমি। সেইসঙ্গে ওকে ডেকে বললাম, ‘ছোড়দা, শুনছ, তোমাদের ছেড়ে আমি যাব না। কিছুতেই না। ছোড়দা, তোমার কি মনে নেই, অন্তুর আর আমার একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার কথা ছিল? এ-বাড়ি ছেড়ে আমি যাব না—জীবনে না। মানছি, তোমাদের পাঁচভাগের একভাগ আমার জীবন—কিন্তু সেটাও তো জীবন, ছোড়দা!’

আমার ডাকাডাকিতে খাওয়া থামিয়ে মাথা হেলিয়ে টেবিলের নীচে দেখল ছোড়দা। ছোটবউদিকে বলল, ‘এই কাজল, জলদি করো, ডাম্পির সত্যি খুব খিদে পেয়ে গেছে।’

সকল অধ্যায়
১.
আমার বাঁ-হাতের পাঁচ আঙুল
২.
উনিশ বিষ
৩.
সন্ধের পর, একা
৪.
মনে করি, খুনির নাম এক্স
৫.
হঠাৎ বজ্রপাত
৬.
একটা ঘুঁটি কম ছিল
৭.
ফিরে আসা
৮.
জীবন যখন ফুরিয়ে যায়
৯.
ব্ল্যাকমেল ডট কম
১০.
আকাশবাণী নরক
১১.
সাবধান! সাপ আছে (১)
১২.
শেষ লেখা
১৩.
নীলবর্ণ বিড়াল
১৪.
সংঘর্ষ যদি হয়
১৫.
মায়াযৌবন
১৬.
চন্দনকাঠের বাক্স
১৭.
মুদ্রারাক্ষস
১৮.
যখন কিছুই মনে পড়ছে না
১৯.
নীল আলো ভালো নয়
২০.
বুকের ভিতরে
২১.
আলো নিভে গেলে বুঝবে
২২.
জিহাদপুরের সেই লোকটা
২৩.
সুখের সংসার ডট কম
২৪.
৩২শে জানুয়ারির রাত
২৫.
কুয়াশা, অন্ধকার এবং...
২৬.
ছলাবউ কলাবউ
২৭.
চেইন রিয়্যাকশন
২৮.
অপারেশন দাঁড়কাক
২৯.
সাবধান! সাপ আছে (২)
৩০.
আসুন, এদিকেই নরকের দরজা
৩১.
শুয়োর বিষয়ক একটি অসম্পূর্ণ গবেষণাপত্র
৩২.
আর-একজন কোকিল
৩৩.
পাখির রাজা
৩৪.
একটু-একটু দেখা যায়
৩৫.
আগে বোঝা যায় না
৩৬.
চিকুর স্বপ্ন
৩৭.
নির্মল বেকারির বাস্তুভূত
৩৮.
ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলে
৩৯.
চিত্রার অদৃশ্য মৃতদেহ
৪০.
যারা গাড়ি জোরে চালায়
৪১.
মাননীয় বিচারকমণ্ডলী
৪২.
বিদায় সংবর্ধনা
৪৩.
হারান স্যারের ভূত
৪৪.
বন্‌বনিয়া
৪৫.
চোর ধরল ঝামেলা
৪৬.
রাত ফুরোল, কথা ফুরোল
৪৭.
দাগের বাইরে যাবেন না
৪৮.
রাতের ট্রেনে দেখা হয়েছিল
৪৯.
অন্ধকারে, হাতে হাত রেখে
৫০.
ভয় পাওয়া মানুষ
৫১.
নগ্ন নির্জন রাত
৫২.
তিরিশ বছর পর চব্বিশজন
৫৩.
বিড়াল
৫৪.
মনে ভয় আছে
৫৫.
দৃশ্য-শেষ
৫৬.
অপারেশন ভারচুরিয়্যালিটি
৫৭.
একতিলের জন্য
৫৮.
আপনার নির্বাচন
৫৯.
সুন্দরী
৬০.
ভূতের গন্ধ
৬১.
হারিয়ে যাওয়া
৬২.
নখের আঁচড়
৬৩.
চুনিলালবাবুর লাল চুনি
৬৪.
ড্রাকুলা
৬৫.
অয়স্কান্তের অন্তিম ইতিহাস
৬৬.
অবচেতন
৬৭.
না ভেবে খুন কোরো না...
৬৮.
নষ্ট চাঁদ, কষ্ট চাঁদ
৬৯.
ভুলোমন ভুলোদা
৭০.
সন্দেহের এক কণা
৭১.
বকুলফুলের দিনগুলি
৭২.
আরশিনগরের অসভ্য লোকটা
৭৩.
আমার স্ত্রীর আততায়ী
৭৪.
খুন করা সহজ
৭৫.
ডাম্পির সুখ-দুঃখ
৭৬.
বিকল্পকবি সুবল বসু
৭৭.
মোনালিসার নতুন বন্ধু
৭৮.
মুশকিল আসান
৭৯.
বুদ্ধি যদি বৃদ্ধি পায়
৮০.
সাত ঋতুর জীবন
৮১.
তোমার আসা চাই
৮২.
আকাশে কীসের শব্দ
৮৩.
বিপদে পড়ে আপনাকে বলছি
৮৪.
ঝামেলা ও লম্ফমান ফুটবল
৮৫.
আস্তিনের তাস
৮৬.
ভোলাকে ভোলা যাবে না কিছুতেই
৮৭.
আমরা সবাই সমান
৮৮.
ভয়ের খুব কাছে
৮৯.
বাক্সের ভিতরে কী আছে?
৯০.
টিরা গ্রহের ভয়ংকর
৯১.
ছকের বাইরে
৯২.
অর্ধেক পুরুষ
৯৩.
ইনস্পেক্টর রনি ও অলৌকিক সার্কাস
৯৪.
রক্তের দাগ ছিল
৯৫.
(খুনি) তুমি রবে নীরবে
৯৬.
হারিয়ে যাওয়ার ভয়
৯৭.
অসুর
৯৮.
দধীচি সংবাদ
৯৯.
মরা মানুষের হাত
১০০.
টাইম-কিলার
১০১.
অমানুষিক হাত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%