অনীশ দেব

ভোর হতেই দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে সুকান্ত। চোখ জ্বালা করছে। মাথা অসম্ভব ভার। সামনে ভোরের আকাশ, নারকেল আর পেয়ারা গাছের সবুজ পাতা, কয়েকটা চঞ্চল পাখি। আর ওদের পিছনেই স্নিগ্ধ সূর্য। সদ্য উঠে পড়েছে দিগন্তের আড়াল ছেড়ে।
কিন্তু সুকান্তর মনে হচ্ছিল, এটা পুব নয়, পশ্চিম দিক। লাল সূর্যটা যেন নেমে যাচ্ছে নীচের দিকে। ধীরে-ধীরে ডুবে যাচ্ছে।
সুকান্তও ডুবে যাচ্ছিল লজ্জা আর গ্লানিতে।
গতকাল ছিল ফুলশয্যার রাত। যে-রাতের কথা কোনও পুরুষ কখনও ভোলে না। অথচ সুকান্ত সেই রাতটাকে প্রাণপণে ভুলতে চাইছিল। যেন গতকালের রাতটা ওর জীবনে কখনও আসেনি।
ভুলতে চাইছিল বলেই রাতটার কথা বেশি করে মনে পড়ছিল সুকান্তর। মনে পড়ছিল ওর নতুন বউ চন্দ্রিমার কথা। চন্দ্রিমা এখন ফুল দিয়ে সাজানো নতুন বিছানায় নিষ্পাপ সরল মুখে অসহায়ভাবে ঘুমিয়ে আছে।
রাতটার কথা ভাবতে-ভাবতেই সুকান্তর বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। শত চেষ্টাতেও নিজেকে ধরে রাখতে পারল না ও। কান্না পেয়ে গেল। হাতের ওপরে মাথা রেখে ও নীরবে কাঁদতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর কে যেন আলতো করে ভালোবাসার হাত রাখল ওর মাথায়। হাতের স্পর্শে আশ্বাস খুঁজে পেল সুকান্ত, নির্ভরতা খুঁজে পেল। ও হাউ-হাউ করে কাঁদতে শুরু করল। আর সোজা-সরল মেয়েটা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। যেন স্বামীর দুঃখকষ্ট ও আন্তরিকভাবে ভাগ করে নিতে চাইছে।
সুকান্ত ভেতরে-ভেতরে ভেসে যাচ্ছিল অকূলপাথারে। ভাসতে-ভাসতে পিছিয়ে যাচ্ছিল সেই দিনটাতে যেদিন ওর দিল্লির অফিসের ঠিকানায় পৌঁছে গিয়েছিল মায়ের চিঠি।
চিঠির বক্তব্য ছিল খুব সংক্ষিপ্ত। বরানগরের একটি মেয়েকে দেখে মায়ের খুব পছন্দ হয়েছে। মা ছোটমামাকে সঙ্গে করে মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। মেয়ে বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেনি, তবে দেখতে খুব মিষ্টি, গানও জানে। ওদের ছোট পরিবার। মেয়ের ওপরে এক দাদা আছে। সদাগরি অফিসে চাকরি করে। বোনের বিয়ে দিয়ে তারপর সে বিয়ে করতে চায়। মেয়ের বাবা পি. ডব্লিউ. ডি-তে চাকরি করতেন—দু-বছর হল রিটায়ার করেছেন। ওদের একতলা ছোটবাড়ি—তবে নিজেদের বাড়ি। মেয়ে দেখে, পরিবার দেখে ছোটমামারও খুব পছন্দ হয়েছে। এখন সুকান্ত একবার এসে দেখে গেলেই কথাবার্তা এগোনো যেতে পারে।
সুকান্তর বাবা বহু বছর ধরেই বাতের ব্যথায় কাহিল। তাছাড়া অন্যান্য রোগের উপসর্গও কম নয়। বরাবরই তিনি সব ব্যাপারে সুকান্তর ছোটমামার ওপরে নির্ভর করেন। সুতরাং বিয়ের ব্যাপারে ছোটমামাই শেষ কথা।
ছোটমামা খুব খুঁতখুঁতে মানুষ। এর আগেও অন্তত জনা দশেক পাত্রী দেখা হয়েছে। তার মধ্যে তিনজনকে মায়ের মনে ধরেছিল। কিন্তু ছোটমামা নাকচ করে দিয়েছেন। মাকে বলেছেন, ‘কী বলো, ছোড়দি! ভাগ্নে আমার হিরের টুকরো ছেলে। ওর জন্যে পণ-টন কিছু তো চাইছি না। শুধু রূপে লক্ষ্মী আর গুণে সরস্বতী—ব্যস।’
মাস তিনেক আগে দিল্লি থেকে শ্রীরামপুরের বাড়িতে এসেছিল সুকান্ত। তখন ছোটমামার এই নাকউঁচু সাধের কথা জেনে মনে-মনে বেশ একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ছোটমামার পছন্দসই মেয়ে পাওয়া যাবে তো!
যাই হোক, মাকে আড়ালে পেয়ে ভাববাচ্যে নিজের সাধটা জানিয়ে দিয়েছিল সুকান্ত। বলেছিল, ছোটমামার এতটা কড়াকড়ি না করলেই কি নয়!
সুকান্তর একটি মাত্র ছোটবোন সুধা। দাদার জন্য পাত্রী খোঁজার ব্যাপারে ওর উৎসাহও কম ছিল না। বন্ধুমহলে ও বেশ ঘটা করে জানিয়ে দিয়েছিল ওর দাদার জন্য ‘মেয়ে দেখা’ চলছে। সেই কারণে আশপাশের এলাকা থেকেও খোঁজখবর কম আসছিল না।
দিল্লি ফিরে এসে সুকান্ত ফ্ল্যাটের খোঁজ শুরু করে দিয়েছিল। ওর পছন্দের এলাকা ছিল কালকাজী অথবা চিত্তরঞ্জন পার্ক। অফিসের সহকর্মীদের ব্যাপারটা ও জানিয়েছিল। কারণ ও দিল্লিতে আছে মাত্র দু-বছর। অফিসে যারা আরও পুরোনো তারা নিশ্চয়ই দিল্লির আস্তানার ব্যাপারে ওর চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ।
সুতরাং ওদের ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট অফিস জুড়ে সে এক রীতিমতো হইচই। ডেপুটি ম্যানেজার সুকান্ত রায়চৌধুরী বিয়ে করতে চলেছে, ফ্ল্যাট খুঁজছে হন্যে হয়ে—এ-কথা জেনে গেল সবাই। লাঞ্চ আওয়ারে ওকে ঘিরেই যত জটলা।
যেমন সিনিয়ার ম্যানেজার দেশমুখ একদিন সিগারেট খেতে-খেতে বললেন, ‘রায়চৌধুরী, তোমার বিয়ের ব্যাপারটা আর কত মিটার এগোল জানতে পারি?’
সুকান্ত লজ্জা পেয়ে বলেছে, ‘মিটার নয়, স্যার, সেন্টিমিটার।’
কাছাকাছি যারা হাজির ছিল তারা হেসে উঠেছে।
অফিস ক্যান্টিনের রামুদা আগেভাগেই বলে রেখেছেন, ‘স্যার, আপনার বিয়ের পার্টিতে ক্যাটারিং-এর অর্ডারটা যেন আমি পাই। কালীমাতার দিব্যি কেটে বলছি, এক পয়সাও লাভ রাখব না। এমন আইটেম করব না, হোল লাইফ মনে রাখবেন!’
সুকান্ত নরম গলায় বলেছে, ‘এখনও সেরকম কিছু ঠিক হয়নি, রামুদা—হলে বলব।’
ওদের অফিসের সিনিয়ার ড্রাফ্ট্সম্যান সঞ্জীব বোস একদিন লাঞ্চের পর পান চিবোতে- চিবোতে বলেছেন, ‘সুকান্তবাবু, শুনলাম আপনি নাকি খোঁয়াড়ে ঢুকছেন?’
‘খোঁয়াড়!’ সুকান্ত বেশ অবাক হয়েছে।
‘হ্যাঁ, মানে—গোয়াল বললে খারাপ শোনায় তাই খোঁয়াড় বললাম!’ বোসদা পানের রসে রাঙানো ঠোঁট টিপে হেসে মন্তব্য করেছেন: ‘ওই যেমন দালাল বললে শুনতে খারাপ লাগে, অথচ ব্রোকার বললে বেশ সাহেবি-সাহেবি ব্যাপার মনে হয়।’
সুকান্ত কী জবাব দেবে বুঝতে পারছিল না।
তখন ওর পাশ থেকে রমেন সান্যাল বলে উঠেছে, ‘কেন বোসদা, বিয়ে করা মানে কি গোয়ালে ঢোকা।’
বোসদা চোখ ছোট-ছোট করে পাকা-চুল টাইপিস্ট রমেন সান্যালকে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর বললেন, ‘ব্যাপারটা আসলে তাই। এতদিন আমাদের সুকান্তবাবু ছাড়া ইয়ে ছিলেন, এখন থেকে বাঁধা পড়বেন। তবে এ-বাঁধনের মজা এমন যে, খোঁটাও দেখা যায় না, দড়িও দেখা যায় না। অথচ নাকে দড়ি দিয়ে শুধু ঘুরপাক। অবশ্য প্রথম-প্রথম ব্যাপারটা বেশ থ্রিলিং।’
আবার হাসির রোল।
সুকান্তর অফিসের পরিবেশটা এত ভালো যে, সবাই যেন ওর আপনজন। আর সেই আপনজনদের তদারকিতে মায়ের চিঠি পাওয়ার মাসখানেকের মধ্যেই ওর সবকিছু গোছানো হয়ে গেল।
চিত্তরঞ্জন পার্কে নতুন ফ্ল্যাট, আধুনিক আসবাবপত্র দিয়ে সেটা সাজানো, সংসার করার জিনিসপত্র কেনা, এ-সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে টিভি-ফ্রিজ থেকে শুরু করে বালতি, কাপড় কাচার সাবান, এমনকী জামাকাপড় ছড়ানোর ক্লিপ পর্যন্ত কেনা হয়ে গেল।
তারপর শুধু যেন নতুন বউয়ের অপেক্ষা।
নতুন ফ্ল্যাটে থাকতে একা-একা লাগলেও সুকান্ত জানে এই নিঃসঙ্গতা আর বেশিদিন নয়। ওর কলেজ জীবনের বন্ধুদের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে। সেইজন্যেই কি ও কিছুটা অধৈর্য হয়ে উঠেছে?
বেশ কয়েকটা চিঠিপত্র চালাচালির পর দিল্লি থেকে শ্রীরামপুরে ফিরেছিল সুকান্ত। তারপর এক রবিবারের বিকেলে ছোটমামার সঙ্গে বরানগরে গিয়েছিল ‘রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী’কে দেখতে।
মেয়েটির নাম চন্দ্রিমা। ডাকনাম মিনু।
কথাবার্তা বলার পর সুকান্তর মন হল, মেয়েটি ছোটমামার ‘রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী’ না হলেও তার প্রায় কাছাকাছি।
মিনু লেখাপড়া খুব বেশি করেনি, তবে প্রাণ ঢেলে গান শিখেছে। সুকান্তর অনুরোধে খালি গলায় গেয়ে শোনাল, ‘রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব।’
সুকান্ত বিস্ময়-মুগ্ধ চোখে মিনুকে দেখছিল। গানের সুরটা অনেকক্ষণ ধরে লেগে ছিল ওর কানে। ও যেন অবশ হয়ে গিয়েছিল।
ওদের মুখোমুখি বসেছিল মিনু। সুকান্তর প্রশ্নের ছোট-ছোট উত্তর দিচ্ছিল আনত মুখে। মিনুর মা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। একটু অপ্রস্তুত হেসে বললেন, ‘ও বরাবরই কথা একটু কম বলে।’
মিষ্টি মুখ ও হাসি-ঠাট্টা সেরে ফেরার পথে ছোটমামা সুকান্তকে জিগ্যেস করলেন, ‘কী ভাগ্নে, দিন ঠিক করি?’
সুকান্ত বলেছিল, ‘করুন।’
৩০ জানুয়ারি বিয়ের দিন ঠিক হল।
দিল্লির সব ব্যবস্থা পাকা করে ২২ জানুয়ারি কলকাতার ট্রেনে চড়ে বসল সুকান্ত। ওর কানে তখনও সঞ্জীব বোসের কড়া রসিকতাগুলো বাজছে।
ট্রেনের জানলা দিয়ে দূরের মাঠ-প্রান্তর দেখতে দেখতে সুকান্তর মনে হল, আর কিছুদিন পরই ও চন্দ্রিমাকে সঙ্গে নিয়ে কু-ঝিকঝিক করে ফিরবে। তারপর মধুচন্দ্রিমা।
খুশি-হুল্লোড় আর সানাইয়ের বাজনায় বিয়ে হয়ে গেল।
পরদিন নতুন বউ নিয়ে শ্রীরামপুর ফিরে এল সুকান্ত। সুধাকে ডেকে বলল, ‘বাড়ির সকলের সঙ্গে তোর বউদির আলাপ করিয়ে দে।’
সুধা মহা উৎসাহে ওর কাজে লেগে গেল। প্রথমে গোটা বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাল মিনুকে। তারপর বাড়ির পিছনের বাগান।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ও মিনুকে নিজের বন্ধু করে নিল। তবে সুধা সারাক্ষণ বকবক করলেও মিনু খুব কম কথা বলছিল।
সন্ধেবেলা মায়ের কাছ থেকে নতুন একজোড়া দুল দিয়ে এল সুধা। এই দুলজোড়া গড়ানো হয়েছে নতুন বউয়ের জন্য।
কিন্তু সেই দুলজোড়া চন্দ্রিমাকে পরাতে যেতেই ও আচমকা ঝটকা মেরে মুখ ঘুরিয়ে নিল। শক্ত গলায় বলল, ‘আমার কানের দুল খুলবে না।’
সুধা একটু থতোমতো খেয়ে গেল প্রথমটা। তারপর সামলে নিয়ে বলল, ‘তোমার বাড়ির দুলজোড়া খুলে তোমার কাছেই রেখে দাও। আর এই নতুন দুলজোড়া পরে নাও—তোমার জন্যেই দাদা তৈরি করিয়েছে।’
চন্দ্রিমা সুধার দিক থেকে মুখ ফিরিয়েই বসে রইল। আবার বলল, ‘গয়না খুলব না। মা বারণ করে দিয়েছে।’
সুধার ফরসা মুখ টকটকে লাল হয়ে গেল। ওর কান্না পেয়ে গিয়েছিল। কোনওরকমে কান্না চেপে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল ও।
সুকান্ত তখন হেঁটে আসছিল এ ঘরের দিকে। সুধাকে ওরকমভাবে ছুটে বেরিয়ে যেতে দেখে ও অবাক হয়ে গেল।
ঘরে ঢুকে মিনুকে দেখে জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে? সুধা ওরকমভাবে চলে গেল কেন?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মিনু বলে, ‘কী জানি!’
একটু পরে আবার বলল, ‘আপনি আমার কাছে থাকুন। আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না।’
সুকান্ত হেসে মিনুর কাছে এগিয়ে এল। আশপাশে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। তখন ও চট করে মিনুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘বোকা মেয়ে! “আপনি” নয়—“তুমি”।’
মিনু বলল, ‘ঠিক আছে। “আপনি” নয়, তুমি...তুমি।’
সুকান্ত একটু হেসে ঘর ছেড়ে বেরোল সুধার খোঁজে। নিজের ছোটবোনটাকে ও কম ভালোবাসে না!
কিন্তু সুধা কিছুই ভাঙল না দাদার কাছে। একদিন দেখেই কাউকে বিচার করা ঠিক নয়। ও জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘সত্যি বলছি, কিছু হয়নি। তবে বউদি দেখছি তোকে ছেড়ে একদণ্ডও থাকতে চাইছে না।’
শেষের কথাটা সুধা মজা করে বললেও সুকান্ত একটু অস্বস্তিতে পড়ল। কারণ সেই ফেরা থেকেই ও লক্ষ করেছে, চন্দ্রিমা প্রায় সবসময় ওর কাছে-কাছে থাকছে। সুকান্তরও যে ইচ্ছেটা কম তা নয়। কিন্তু একটু ধৈর্যের পরীক্ষা তো দিতেই হবে।
সুকান্তর ধৈর্যের পরীক্ষা শেষ হল ফুলশয্যার রাতে।
ফুল দিয়ে সাজানো ঘরে ওরা দুজনে যখন একা হল তখন রাত সাড়ে বারোটা।
ঘরের জানলা-দরজা বন্ধ। শুধু পুবের বারান্দার দিকের দরজাটা খোলা। একটু পরেই সুকান্ত ওটা বন্ধ করে দেবে।
সুকান্ত মিনুর কাছাকাছি এসে বসল। নরম গলায় জিগ্যেস করল, ‘ঠিকমতো খেয়েছ তো?’
মিনু মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে হাসল।
সুকান্ত এর মানে বুঝতে পারল না। অবাক হয়ে বলল, ‘হাসির কী হল?’
মিনু কোনও জবাব দিল না।
সুকান্ত এবার অন্য প্রসঙ্গে গেল।
‘আমাদের বাড়ি তোমার পছন্দ হয়েছে?’
মিনু ঘাড় নাড়ল।
‘আমাকে?’
মিনু আবার ঘাড় নাড়ল। শাড়ির ভাঁজ থেকে একটা চিঠি বের করে সুকান্তর হাতে দিল। তারপর মুখ নামিয়ে বসে রইল।
অবাক হয়ে চিঠিটা নিল সুকান্ত। খুলে পড়ল:
‘বৃষ্টি ভালোবাসি,
আকাশ ভালোবাসি,
সংসার ভালোবাসি।
আর তোমাকে ভালোবাসি।’
—চন্দ্রিমা।
মুক্তোর মতো সুন্দর হাতের লেখা। তার চেয়েও সুন্দর চন্দ্রিমার মুখ।
ওর দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে সুকান্ত বলল, ‘চন্দ্রিমা, তোমার এই চার রকম ভালোবাসা দিয়ে আমাকে ঘিরে রাখবে তো?’
চন্দ্রিমা মুখ নীচু করেই বলল, ‘হ্যাঁ, রাখব। মা বারবার করে বলে দিয়েছে।’
সুকান্ত একটা ধাক্কা গেল। একটা অদ্ভুত চিন্তা কালসর্পের মতো ওকে ঘিরে ধরছিল। ও উঠে গিয়ে বারান্দার দিকে দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিয়ে এল। তারপর ফিরে এল বিছানায়।
মিনুর একটা হাত চেপে ধরে চিঠিটা দেখিয়ে বলে, ‘এ চিঠি কেন লিখেছ?’
‘মা লিখিয়েছে। বলেছে ফুল দিয়ে সাজানো বিছানায় বসে তোমার হাতে দিতে।’
‘তারপর কী করতে বলেছে?’ সুকান্তর বুকের ভেতরে একটা চাপা ঢিপঢিপ শব্দ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
‘বলেছে শাড়ি-জামাকাপড় খুলতে। তুমি যা খুশি করো না কেন বাধা না দিতে।’
‘ “যা খুশি” বলতে?’
‘সে আমি জানি না। মা বলেছে, আমায় কিছু করতে হবে না, যা করার তুমিই করবে।’
‘তোমার মা তোমাকে সবকিছু শিখিয়ে দেয়?’
‘হ্যাঁ।’
‘আর কী শিখিয়ে দিয়েছে?’
‘বলেছে সবসময় তোমার কাছে-কাছে থাকতে। তুমি ছাড়া আর কেউ টাকাপয়সা-গয়না চাইলে না দিতে।’
সুকান্তর ভেতরে একটা ভাঙচুর চলছিল। ও মিনুর কাঁধ ধরে ওকে নিজের দিকে ফেরাল। জিগ্যেস করল, ‘আজ কী বার?’
মিনু সরাসরি ওর চোখে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘তিন বার।’
‘আজ কত তারিখ?’
মিনু কোনও উত্তর দিল না।
‘বলো, আজ কত তারিখ?’
মিনু গোঁজ হয়ে বলল, ‘জানি না। মা বলেছে কম কথা বলতে। নইলে সবাই ধরে ফেলবে।’
সুকান্ত দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘ওদিকে দেখে বলো। কাল ৩১শে জানুয়ারি ছিল। তাহলে আজ কত তারিখ?’
‘৩২শে জানুয়ারি। একত্রিশের পর বত্রিশ।’ মিনু সিরিয়াস মুখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল।
সুকান্ত আর পারল না।
মিনুকে ছেড়ে দিয়ে মুখ ঢাকল দু-হাতে।
ভগবান! কেন আমার এ সর্বনাশ করলে!
এরপর রাত চারটে পর্যন্ত মিনুকে অনেক প্রশ্ন করেছে সুকান্ত। আর মিনুর অদ্ভুত-অদ্ভুত সব উত্তর শুনেছে।
প্রশ্ন-উত্তরের পালা চলছিল আর সুকান্ত ভেতরে-ভেতরে আরও ভেঙেচুরে যাচ্ছিল। একটা পাগল-করা অনুভবের মধ্যে ডুবে যেতে-যেতে সুকান্ত বুঝতে পারছিল ভেসে ওঠার কোনও আশা নেই।
একসময় সুকান্ত জিগ্যেস করেছিল, ‘কবে থেকে তোমার এরকম মাথা খারাপ?’
উত্তরে সরল মুখে সুন্দরী মেয়েটা বলেছে, ‘ক্লাস সেভেন থেকে। তবে মা বলেছে, ডাক্তার দেখালে ঠিক হয়ে যাবে।’
‘তোমার কি মনে হয় তুমি সেরে উঠেছ?’
মিনু হেসে বলল, ‘এইবার তো সেরে উঠব। মা বলেছে, আর যেটুকু ইয়ে আছে সেটা বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে।’
‘কীভাবে ঠিক হবে?’ সুকান্ত প্রশ্নটা করেছে কোনও কৌতূহল থেকে নয়। শুধু এটা দেখার জন্য যে, শেখানো তোতাপাখির বুলি মেয়েটা কতক্ষণ আওড়াতে পারে।
‘মা বলেছে, তুমি আদর করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
শেষের কথাটা মিনু ঘুম-জড়ানো গলায় হাই তুলে বলল। তারপর হঠাৎই কাত হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়, ঘুমিয়ে পড়ল।
আবছা অন্ধকার ঘরে পাথরের মতো বসে রইল সুকান্ত। আর কোনওরকম অনুভূতি ওর ভেতরে কাজ করছিল না।
একসময় চন্দ্রিমার কাছ থেকে খানিকটা দূরে শরীর এলিয়ে দিয়েছিল ও। হাতের উলটো পিঠ মাথায় রেখে এলোমেলো অনেক কথাই ভাবতে চেষ্টা করছিল।
ছোটমামা কি চন্দ্রিমাদের পাড়ায় ভালো করে খোঁজখবর নেননি? সুকান্তও তো বিয়ের আগে ওকে দেখেছে, কথা বলেছে, ওর গান শুনেছে—কই কিছু তো বুঝতে পারেনি। সেই অবশ-করে-দেওয়া গান এখনও সুকান্তর কানে লেগে আছে। কী প্রাণ ঢেলেই না গান করেছিল মেয়েটা! তখন ওকে সরস্বতী মনে হচ্ছিল। তা ছাড়া...।
পাখির ডাক কানে যেতেই সুকান্ত বুঝতে পেরেছে ভোর হয়েছে। ও উঠে এসেছে বারান্দায়। গতকাল রাতের কথাটা ও প্রাণপণে ভুলতে চাইছিল। চন্দ্রিমা অজান্তে ঠিকই বলেছে। গতকাল ছিল ৩২ জানুয়ারি। এমন তারিখ যা ক্যালেন্ডারে নেই। ওই দিনটা সুকান্ত নিজের জীবনের ক্যালেন্ডার থেকে মুছে ফেলতে চায়। কিন্তু সত্যি সত্যিই কি মুছে ফেলা যাবে?
এরপর অসম্ভব সময় শুরু হল।
সুকান্ত প্রথমে কথাটা জানাল ছোটমামাকে। ছোটমামার কাছ থেকে মা শোনামাত্রই বাড়িতে কান্নার রোল শুরু হয়ে গেল। তারই সঙ্গে কানাকানি, গুঞ্জন, ফিশফাশ।
সুকান্ত সারাটা দিন গুম হয়ে বসে রইল। সুধা ছলছলে চোখ নিয়ে মায়ের কাছে-কাছে থাকতে চেষ্টা করল। বাড়িতে হাজির আত্মীয়স্বজন নানান মন্ত্রণা আর পরামর্শ দিতে শুরু করল। কিন্তু এ অবস্থায় চন্দ্রিমাকে নিয়ে ঠিক কী যে করা উচিত সেটাই কেউ ঠিকমতো বলতে পারছিল না।
চন্দ্রিমা নিতান্ত উদাসীন হয়ে এঘর-ওঘর ঘুরে বেড়াতে লাগল। ও সুকান্তর কাছ ঘেঁষে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু সুকান্ত বিরক্তি দেখানোয় স্বামী-আজ্ঞা শিরোধার্য করে সরে গেছে।
কয়েক ঘন্টার মধ্যেই খবরটা বাড়ি থেকে ছড়িয়ে গেল পাড়ায়। নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরে যাওয়া প্রতিবেশীরা রীতিমতো অবাক হল। কেউ কেউ সহানুভূতি দেখাল, কেউ বা সুকান্তর ছোটমামাকে ‘পাত্রী’ দেখার ব্যাপারে অনভিজ্ঞ বলে দোষারোপ করল।
অনেক রাতে সুকান্তর সঙ্গে কয়েক প্রস্ত আলোচনার পর গুরুজনেরা সিদ্ধান্ত নিলেন, চন্দ্রিমাকে ওর বাপের বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে আসা হবে। সুকান্তকে সঙ্গে করে তাঁরা চার-পাঁচজন এই অপ্রিয় দায়িত্ব পালন করতে যাবেন।
ছোটমামা এর মধ্যেই পাড়ার উকিলের সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে পরামর্শ করেছেন। তিনি বলেছেন, মেয়েটি যে অ্যাবনরম্যাল, তার প্রমাণ চাই। তা না হলে ডিভোর্স পাওয়ার অসুবিধে হতে পারে।
এইসব সমস্যা মাথায় করে পরদিন দুপুরে সুকান্তরা গেল চন্দ্রিমাদের বাড়িতে।
চন্দ্রিমাকে দেখেই ওর মা মুখে আঁচল গুঁজে কেঁদে ফেললেন।
সুকান্তর একটু-একটু খারাপ লাগছিল। কিন্তু কিছু করার নেই। ওর নিজের ওপর দিয়েও তো ঝড় কম যায়নি!
চন্দ্রিমার মা-কে ওরা প্রায় ঘিরে ধরল। প্রশ্নে-প্রশ্নে ভদ্রমহিলাকে একেবারে নাস্তানাবুদ করে তুলল।
চন্দ্রিমা মাকে আঁকড়ে বসেছিল বিছানায়। ওর বাবা করুণ মুখে ঘরের এক কোণে গদি-ছেঁড়া একটা সোফায় চুপচাপ বসে রয়েছেন। চন্দ্রিমার দাদা বাড়িতে ছিল না।
তীব্র প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েও চন্দ্রিমার মা একটুও ভেঙে পড়লেন না। ভদ্রমহিলার স্থৈর্য, ব্যক্তিত্ব সুকান্তকে অবাক করছিল।
তিনি বারবার শুধু বলতে লাগলেন, ‘চিকিৎসা করালে মিনু ঠিক হয়ে যাবে। ওর মাথায় এমন কিছু দোষ নেই।’
কথাবার্তা ক্রমেই কথা কাটাকাটির চেহারা নিচ্ছিল। সুকান্ত নাটকের দর্শকের মতো সবকিছু দেখছিল, শুনছিল।
হঠাৎই কী ভেবে ও চন্দ্রিমার মায়ের কাছে এগিয়ে গেল, স্পষ্ট স্বরে বলল, ‘মা, আমারই ভুল হয়েছে। আমি মিনুর ট্রিটমেন্ট করাব। যত যা-ই হোক, ও আমার স্ত্রী।’
ছোটমামা স্তম্ভিত হয়ে সুকান্তর দিকে তাকিয়ে রইলেন। গুরুজনদের কে একজন যেন বললেন, ‘সুকান্ত, তুমি এসব কী বলছ!’
সুকান্ত কোনও কিছু ভ্রূক্ষেপ না করে চন্দ্রিমার মাকে বলল, ‘আপনি মিনুর চিকিৎসার সব কাগজপত্র-প্রেসক্রিপশান আমাকে দিন। আমি দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে বড়-বড় স্পেশালিস্ট দেখাব। দরকার হলে আমেরিকা নিয়ে যাব ওকে। আপনি কোনও চিন্তা করবেন না, ও সেরে উঠবেই।’
ভদ্রমহিলা হাউ-হাউ করে কেঁদে ফেললেন। সুকান্তকে একেবারে জড়িয়ে ধরে মাথায় বারবার হাত বোলাতে লাগলেন। কান্না-জড়ানো গলায় বললেন, ‘বাবা, তুমি মানুষ নও, দেবতা। তুমি মানুষ নও, দেবতা।’
ভদ্রমহিলা ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। একটু পরেই দুটো মোটা ফাইল নিয়ে ফিরে এলেন। সুকান্তর হাতে ফাইল দুটো দিয়ে বললেন, ‘এই নাও, বাবা। এতে ওর বারো বছরের সমস্ত ডাক্তারি কাগজপত্র আছে।’
কথা শেষ করেই ভদ্রমহিলা সুকান্তর পায়ে লুটিয়ে পড়লেন। কাঁদতে লাগলেন অসহায়ের মতো।
সুকান্ত পা সরিয়ে নিয়ে মেডিক্যাল ফাইল দুটো এগিয়ে দিল ওর ছোটমামার দিকে। আবেগহীন গলায় বলল, ‘এই দুটো নিয়ে গিয়ে আজই ল-ইয়ারের সঙ্গে কথা বলুন। এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর হয় না।’
তারপর অপরিচিতের চোখে চন্দ্রিমার মা ও বাবার দিকে তাকিয়ে সুকান্ত বলল, ‘আপনারা শয়তানি করে আমার লাইফটা শেষ করে দিয়েছেন। লোকের কাছে আমি মুখ দেখাতে পারছি না। যদি ভালোয়-ভালোয় মেয়ের ডিভোর্স করিয়ে নেন, ভালো। নইলে কোর্টে দেখা হবে।’
সুকান্তর ভেতরটা অদ্ভুত আক্রোশে টগবগ করে ফুটছিল। ওর মাথার শিরা দপদপ করছিল।
চন্দ্রিমার মা চিৎকার করে কেঁদে উঠে বললেন, ‘বাবা, আমার মেয়েটার কী হবে?’
‘ও এখানেই থাকবে।’
ছোটমামা একটা বড় সুটকেস চন্দ্রিমার মায়ের হাতে দিয়ে বললেন, ‘আপনার মেয়ের গয়নাগাঁটি শাড়ি-জামাকাপড়—আপনারা যা যা দিয়েছেন, সব এতে আছে। ভালো করে দেখে নিয়ে এই কাগজটায় সই করে দিন।’
গোটা বাড়িটাকে বিধ্বস্ত শ্মশান করে দিয়ে সুকান্তরা ফিরে এল।
তারপর ক’দিন ধরে চলল উকিলের কাছে ছুটোছুটি।
ব্যাপারটাকে মোটামুটি একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে সুকান্ত ছন্নছাড়া মন নিয়ে চড়ে বসল দিল্লির ট্রেনে।
ট্রেন গাছপালা-মাঠঘাটের মাঝখান দিয়ে ছুটছিল। সুকান্তর মনে পড়ল চন্দ্রিমার কথা। সবকিছু যদি ঠিকঠাক হত তাহলে এখন ওর পাশে চন্দ্রিমার বসে থাকার কথা ছিল।
সুকান্তর মন খারাপ লাগছিল। আর একইসঙ্গে অস্বস্তি হচ্ছিল এই কথা ভেবে যে, কী করে ও অফিসের সহকর্মীদের মুখোমুখি হবে। কী করে রামুদাকে দেওয়া ক্যাটারিং-এর অর্ডার ক্যানসেল করবে। আর সাজানো ফ্ল্যাটটা নিয়েই বা ওর এখন কী করা উচিত।
ট্রেনের জানলা দিয়ে সুকান্ত গাছপালা দেখছিল আর এসব কথা ভাবছিল। চন্দ্রিমার মা ওকে বলেছিলেন, ‘তুমি মানুষ নও, দেবতা।’ সুকান্ত কি সেই কথার মর্যাদা রাখতে পেরেছে? ও কি মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে ভদ্রমহিলার কাছ থেকে ডাক্তারি কাগজপত্রগুলো হাতিয়ে নেয়নি? কিন্তু ওঁরাও তো লুকিয়ে পাগল মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন সুকান্তর সঙ্গে!
মিনুকে ঘিরে সুকান্ত অনেক দূর পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে ফেলেছিল। এখন ও স্বপ্নের রঙিন টুকরোগুলোকে মনে-মনে হাত নেড়ে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছিল। ওগুলো শিমুল তুলো হয়ে ভেসে যাচ্ছিল বাতাসে। আর ট্রেন ছুটে চলেছিল অক্লান্তভাবে।
রাতে ফ্ল্যাটে পৌঁছে মালপত্র এদিক-ওদিক রেখে সুকান্ত কিছু না-খেয়েই শুয়ে পড়েছিল বিছানায়। ডবল-বেড বিছানার খালি অংশটা ওকে বারবার বিব্রত করছিল। অন্ধকারে প্রায় ঘন্টাখানেক এপাশ-ওপাশ করার পর ও ঘুমিয়ে পড়ল।
রাতে স্বপ্নের ভেতরে মিনু ওকে গান শোনাল: ‘রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব...’
কখনও ওর মনে হল, মিনু ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে-দিতে বলছে! ‘এ কী, তুমি কাঁদছ কেন?’
সুকান্ত স্বপ্নের মধ্যেই কেঁদে ফেলল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ও এদিক-ওদিক ফেলে রাখা সুটকেসগুলো টেনে নিয়ে এল বিছানার কাছে। ওগুলো খুলে জিনিসপত্র গোছগাছ করতে শুরু করল।
খালি ফ্ল্যাটে ছোটখাটো প্রত্যেকটা শব্দ কেমন ফাঁপা শোনাচ্ছিল। সুকান্তর কিচ্ছু ভালো লাগছিল না।
হঠাৎই একটা ধুতির ভাঁজ থেকে একটা কাগজ খসে পড়ল বিছানায়।
কাগজটা তুলে নিয়ে দেখল সুকান্ত।
মিনুর সেই চিঠি:
‘বৃষ্টি ভালোবাসি,
আকাশ ভালোবাসি,
সংসার ভালোবাসি।
আর তোমাকে ভালোবাসি।’
—চন্দ্রিমা।
চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল সুকান্ত। মিনু বলেছিল, এই চাররকম ভালোবাসা দিয়ে ওকে ঘিরে রাখবে। ঘরের চার দেওয়ালের দিকে তাকাল সুকান্ত। মিনুকে সঙ্গে নিয়ে এলে এই দেওয়ালগুলো ভালোবাসা হয়ে যেত।
সুকান্তর হঠাৎই কেমন জেদ চেপে গেল।
রামুদার অর্ডার ও ক্যানসেল করবে না। মিনুকে ও এখানে নিয়ে আসবে। সেই সঙ্গে মেডিক্যাল ফাইল দুটোও। দিল্লিতে অনেক বড়-বড় ডাক্তার আছে। মিনুকে ভালো করে তোলার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে দেখবে সুকান্ত।
মিনুর মায়ের সেই কথাটা ওর মনে পড়ল: ‘তুমি মানুষ নও, দেবতা।’
মানুষ থেকে হয়তো দেবতা হওয়া যায় না, কিন্তু অ-মানুষ থেকে তো মানুষ হওয়া যায়!
সুকান্ত একবার সেই চেষ্টাই করে দেখবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন