৬.৫.১ শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ : প্রজাপতি

জগদানন্দ রায়

প্রজাপতি

প্রজাপতির কথা তোমাদিগকে আগেই কিছু বলিয়াছি এবং তাহার ছবিও দিয়াছি। ইহারা কখনই রাত্রিতে বাহির হয় না; কেবল দিনের বেলাতেই চারিখানি সুন্দর ডানা মেলিয়া ফুলে ফুলে ঘুরিয়া বেড়ায়। ইহাদের শত্রুও বড় অল্প। যে-সকল প্রজাপতির গায়ে নানা প্রকার রঙ্‌চঙ্ থাকে, তাহাদিগকে পাখী বা অন্য প্রাণীতে খায় না; বোধ হয় ইহাদের মাংস মুখে ভালো লাগে না। প্রজাপতিরা বেশি দিন বাঁচে না, দুই চারি দিন মধু খাইয়া তাহারা মারা যায়।

স্ত্রী-প্রজাতিরা গাছের পাতা বা সরু ডালে ডিম পাড়ে এবং ডিম পাড়িয়াই মরিয়া যায়। এই সকল ডিম ফুটিয়া যে শুঁয়ো-পোকার মত বাচ্চা বাহির হয়, তাহারা জন্মিয়াই ডিমের খোলাগুলি খাইয়া ফেলে এবং তার পরে সেই গাছেরই পাতা খাইয়া বড় হয়। খাবার সন্ধান করিবার জন্য তাহাদিগকে এদিক্ ওদিক্ ঘুরিয়া বেড়াইতে হয় না। ইহাদের শত্রু অনেক,—পাখী টিকটিকি গিরগিটিরা প্রজাপতির বাচ্চা খাইতে বড়ই ভালবাসে। তাই অনেক প্রজাপতির বাচ্চাদেরই গায়ের রঙ্ পাতার রঙের মত সবুজ হয়। পাতার রঙের সঙ্গে ইহাদের গায়ের রঙ্ এমন মিলিয়া যায় যে, পাখীরা উহাদিগকে প্রজাপতির বাচ্চা বলিয়া চিনিতে পারে না। অনেক বাচ্চার গায়ে চুলের মত শুঁয়ো থাকে এবং তাহাদের গায়ের রঙ্‌ও নানা রকম হয়। গায়ে লাল কালো হল্‌দে রঙ্ দেখিলে বা শুঁয়ো দেখিলে পাখীরা তাহাদিগকে ধরে না।

প্রজাপতিরা যখন গাছের ডালে বসিয়া বিশ্রাম করে, তখন তাহাদের ডানা কয়েকখানি কি-রকম থাকে, তোমরা দেখ নাই কি? মাছিরা যেমন ডানা গুটাইয়া পিঠের উপরে ফেলিয়া রাখে, প্রজাপতিরা তাহা কখনই করে না। বিশ্রামের সময়ে ডানা পিঠের উপরে উঁচু হইয়া দাঁড়াইয়া থাকে। ইহা দেখিয়া প্রজাপতিদিগকে অন্য শল্ক-পক্ষ পতঙ্গঙ্গের মধ্য হইতে চিনিয়া লওয়া যায়।

প্রজাপতির ডিম হইতে যে বাচ্চা হয়, তাহাদের দেহেও একটু বিশেষত্ব আছে। বাচ্চাদের দেহের নীচে তিন জোড়া সাধারণ পা ছাড়া, আরো দশখানা পা থাকে। এই দশখানা পায়ের আকৃতি বড় মজার। সেগুলি যেন রবারের বাটি। রবারের বাটি উপুড় করিয়া মাটিতে চাপিয়া ধরিলে তাহার ভিতরকার বাতাস বাহির হইয়া যায়, ইহাতে বাটি মাটির গায়ে জোরে আট্‌কাইয়া থাকে। প্রজাপতির বাচ্চারা ঐ দশখানা পা দিয়া ঠিক ঐ রকমেই গাছের ডালপালা আট্‌কাইতে আট্‌কাইতে চলা-ফেরা করে। চাপ দিলেই পায়ের তলার বাটি হইতে বাতাস বাহির হইয়া যায়, তার পরে উহা ডালপালায় আট্‌কাইয়া থাকে। কিন্তু এগুলি বাচ্চাদের স্থায়ী পা নয়। গাছের পাতা খাইয়া বড় হইলে পর ইহারা যখন পুত্তলি-অবস্থায় ঘুমাইতে থাকে, তখন ঐ-সকল পা লোপ পাইয়া যায়,—থাকে কেবল সম্মুখের তিন জোড়া পা। এই তিন জোড়া পায়ে ভর করিয়া সম্পূর্ণ আকারের প্রজাপতিরা ফুলের উপরে বসে।

পতঙ্গেরা পুত্তলি-অবস্থায় যখন মড়ার মত চুপ করিয়া পড়িয়া থাকে, তখন তাহাদের দেহগুলিকে কোনো রকম আবরণে ঢাকিয়া রাখে। দেহের পরিবর্ত্তন সেই ঢাকা অবস্থায় হয়। কিন্তু প্রজাপতির বাচ্চারা ঐ রকমে শরীর ঢাকিয়া রাখে না। কখনো লেজের দিক্‌টা ডাল বা পাতায় আট্‌কাইয়া ঝুলিতে ঝুলিতে ঘুমায়, কখনো বা দেহ হইতে সূতা বাহির করিয়া তাহা ডালে আট্‌কাইয়া ঝুলিতে থাকে। এই রকমে কয়েক দিন কাটিয়া গেলে, তাহারা গায়ের ছাল বদ্‌লাইয়া প্রজাপতি হইয়া দাঁড়ায়।

রাত্রির প্রজাপতি

আমরা কোন্ পতঙ্গদের রাত্রির প্রজাপতি বলিতেছি, তাহা বোধ হয় তোমরা বুঝিতে পার নাই। ইহারা প্রজাপতি নয়, কিন্তু প্রজাপতিদেরই মত ইহাদের চারিখানি ডানা থাকে এবং ডানার গায়ে রঙের গুঁড়া লাগানো থাকে—কাজেই ইহারাও শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ। এই রকম ছোট পোকা রাত্রিতে প্রদীপের কাছে অনেক উড়িয়া বেড়ায়। ইহাদের অনেকেরই ডানার রঙ্ সাদা বা সাদার উপরে লাল বা কালোর ছিটে-ফোঁটা দেওয়া। আবার কোনো কোনোটিকে বাদামী বা মেটে রঙেরও হইতে দেখা যায়। ডানায় হাত দিলে তাহার উপরকার রঙের গুঁড়া খসিয়া হাতে লাগে। কোন্ পতঙ্গদের রাত্রির প্রজাপতি বলিতেছি, তোমরা বোধ হয় এখন তাহা বুঝিতে পারিয়াছ। ইংরাজিতে এই পোকাকে Moth বলে।

দিনের বেলায় এই পোকার দল নানা জায়গায় লুকাইয়া থাকে, রাত্রিই ইহাদের উড়িয়া বেড়াইবার সময়। বাদুড় পেঁচা যেমন নিশাচর প্রাণী, ইহারাও সেই রকম নিশাচর পতঙ্গ। দিনের বেলায় ঝোপে জঙ্গলে অবিরাম ঘুরিয়াও তোমরা এই দলের একটি পোকাও দেখিতে পাইবে না।

প্রজাপতিরা যখন পাতা বা ফুলের উপরে বসিয়া বিশ্রাম করে, তখন ডানাগুলিকে পিঠের উপরে উঁচু করিয়া রাখে। ইহা তোমাদিগকে আগেই বলিয়াছি। কিন্তু রাত্রির প্রজাপতিরা বিশ্রামের সময়ে ডানা চারিটিকে বেশ গুটাইয়া রাখিতে পারে।

প্রজাপতিদের মুখের উপরকার শুঁয়ো দুটির আকৃতি কি রকম তাহা তোমরা দেখিয়াছ কি? বোধ হয় দেখ নাই। একবার পরীক্ষা করিয়ো,—দেখিবে, শুঁয়ো আগাগোড়া এক রকম নয়। ইহার গোড়া অপেক্ষা আগাটা যেন হঠাৎ মোটা হইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু রাত্রির প্রজাপতিদের শুঁয়ো সে-রকম নয়, ইহার আগাগোড়া প্রায় সমান মোটা, বরং আগাটাই যেন একটু সরু।

সকল অধ্যায়
১.
১. এক-কোষ প্রাণী – খড়িমাটির পোকা
২.
২. স্পঞ্জ
৩.
৩.১ হাইড্রা
৪.
৩.২ রাবণচ্ছত্র
৫.
৩.৩ প্রবাল
৬.
৪. তারা-মাছ – স্নায়ুমণ্ডলী
৭.
৫.১ কেঁচো
৮.
৫.২ পরাশ্রিত অকেজো প্রাণী
৯.
৫.৩ জোঁক
১০.
৫.৪ ক্রিমি – গোল ক্রিমি
১১.
৬.০ কীট-পতঙ্গ, প্রাণীদের বিভাগ
১২.
৬.১.১ কঠিনবর্ম্মী : চিংড়িমাছ
১৩.
৬.১.২ কঠিনবর্ম্মী : কাঁকড়া
১৪.
৬.১.৩ কঠিনবর্ম্মী : পতঙ্গ
১৫.
৬.২.১ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : বোলতা
১৬.
৬.২.২ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : ভীমরুল
১৭.
৬.২.৩ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : কুমরে-পোকা
১৮.
৬.২.৪ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : কাঁচ-পােকা
১৯.
৬.২.৫ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : মৌমাছি
২০.
৬.২.৬ ঝিল্লীপক্ষ পতঙ্গ : পিপীলিকা
২১.
৬.৩.১ শিরা-পক্ষ পতঙ্গ : উই
২২.
৬.৩.২ শিরা-পক্ষ পতঙ্গ : জল-ফড়িং
২৩.
৬.৩.৩ শিরা-পক্ষ পতঙ্গ : ভুঁই-কুমীর
২৪.
৬.৩.৪ শিরা-পক্ষ পতঙ্গ : পাখীর গায়ের উকুন
২৫.
৬.৪.০ কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ
২৬.
৬.৪.১ কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ : গোবরে পোকা
২৭.
৬.৪.২ কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ : ধামসা পোকা
২৮.
৬.৪.৩ কঠিন-পক্ষ পতঙ্গ : জোনাক পোকা
২৯.
৬.৫.০ শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ
৩০.
৬.৫.১ শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ : প্রজাপতি
৩১.
৬.৫.২ শল্ক-পক্ষ পতঙ্গ : গুটিপোকা
৩২.
৬.৬.০ দ্বিপক্ষ পতঙ্গ
৩৩.
৬.৬.১ দ্বিপক্ষ পতঙ্গ : মাছি
৩৪.
৬.৬.২ দ্বিপক্ষ পতঙ্গ : মশা
৩৫.
৬.৭.০ গান্ধী পোকা
৩৬.
৬.৭.১ ছারপোকা
৩৭.
৬.৮.০ ঋজুপক্ষ পতঙ্গ
৩৮.
৬.৮.১ ঋজুপক্ষ পতঙ্গ : ফড়িং
৩৯.
৬.৮.২ ঋজুপক্ষ পতঙ্গ : উচ্চিংড়ে ও ঘুর্‌ঘুরে পোকা
৪০.
৬.৮.৩ ঋজুপক্ষ পতঙ্গ : আরসুলা
৪১.
৬.৯.০ লূতা
৪২.
৬.৯.১ মাকড়সা
৪৩.
৬.৯.২ কাঁকড়া-বিছা
৪৪.
৬.১০.১ সহস্রপদী : তেঁতুলে-বিছা
৪৫.
৬.১০.২ সহস্রপদী : কেন্নো
৪৬.
৭. কোমলাঙ্গী : শঙ্খ, শামুক, গুগলি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%