বিদেশি পুরাণকথায় মহিষাসুর এবং আর্যতত্ত্ব

বিদেশি পুরাণকথায় মহিষাসুর এবং আর্যতত্ত্ব

পুরাণকাহিনি নিয়ে কথা হচ্ছে যখন, তখন বিদেশি পুরাণে প্রাচীন সভ্যতায় মহিষাসুরকে পাওয়া যায় কিনা দেখা দরকার। চন্দ্রগুপ্তের ঐতিহাসিক-পুরাতাত্বিক কালনির্ণয় যেমন মেগাস্থিনিস-এর বিবরণের ‘সান্দ্রাকোট্টাস’ বা ‘অগ্রামেনেস’ দ্বারা হয়ে থাকে, তেমনি তুলনামূলক আলোচনায় যেতে গেলে এবিষয়ে বিস্তারিত পৃথক প্রবন্ধ প্রয়োজন, আপাতত এগুলিকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা ভিন্ন উপায় নেই।

গ্রিকরা গ্রিস দেশে বাইরে থেকে এসেছিল, তারা গ্রিসে এসে যে সভ্যতার কথা উল্লেখ করেছে, সেটি মাইসিনিয়ান সভ্যতা। মাইসিনিয়দের প্রস্তর নির্মিত বড়ো বড়ো নগর ছিল এবং তারা নাকি দৈত্য বা সাইক্লোপসদের দ্বারা নির্মাণকার্য করত। যাদের ভাষার সঙ্গে মিশেলেই গ্রিক ভাষার পূর্বরূপ ‘মাইসিনিয়ান-গ্রিক তৈরি হয়েছিল। এই মাইসিনির সঙ্গে তার আগের মিনোয়ান সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত গ্রিকপুরাণের মিনোটার যার অর্ধেক ষাঁড়, বাকি অর্ধেক শরীর মানুষের। তাকে রাজা মাইনোস গোলকধাঁধার মধ্যে বন্দি করে রেখেছিলেন। গ্রিক বীর থেসেউস তাকে বধ করেন। গ্রিকরা তাকে মানুষখেকো দানব হিসাবে দেখেছে। কিন্তু তার আগের এট্রস্ক্যান সভ্যতা তাকে দেখেছে অন্যভাবে, ষাঁড়ের মাথাওয়ালা শিশু মিনোটার তার মা, মাইনোসের স্ত্রী প্যাসিফির কোলে বসে আছে, পানপাত্রের গায়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। ঠিক আমাদের পার্বতীর কোলে গণেশের মতো। ক্রিটের ক্লোসসোসে পাওয়া একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পর্বতশিখরে দণ্ডায়মান দুই পাশে দুটি সিংহ-সহ রেহা দেবীর মূর্তি দেখা যায়, যিনিই হয়তো এশিয়া মাইনরের দেবী সিবিলি। আমাদের দুর্গাও তো পার্বতী এবং সিংহবাহিনী! ব্যবিলনীয় ভাষায় ‘মাতা’ শব্দের রূপ ‘উন্মু’ বা ‘উম্ম’, অক্কাদীয় ভাষায় ‘উন্ম’, দ্রাবিড় প্রতিশব্দ ‘উন্মু’–সবগুলোই ‘উমা’ শব্দের রকমফের।

থেসেউস ও মিনোটার / শিশু মিনোটার
 

মাইসিনির সঙ্গে মাইসোর বা মহিম্মতীর অথবা রাজা মাইনোস-এর সঙ্গে মহিষাসুর-এর সম্পর্ক জুড়ে দিলে ফচকেমির মতো শোনাবে, কিন্তু বস্তুত বিষয়টি অত হালকা নয়। (অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলেন English Literature and Language আর পড়তে হল সফোক্লিস, অ্যারিস্টোফেনিস অথবা ছোট্ট থেকে জেনে এলেন চাণক্য হলেন প্রাচ্যের ম্যাকিয়াভেলি, পরে দেখলেন ম্যাকিয়াভেলি ইতালিয়ান ভাষায় দ্য প্রিন্সলিখেছেন ১৫০৮ খ্রিস্টাব্দে আর চাণক্য আনুমানিক ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে!!! এগুলোর থেকে বেশি ফাজলামো অবশ্যই নয়।) এ বিষয়ে ভাবনা চিন্তাও হয়েছে, ডক্টর ত্রিপুরা বসু তাঁর বাংলা পাণ্ডুলিপির পাঠ পরিক্রমা-র ভূমিকায় লেখেন—”ভূমধ্যসাগরের ক্রীট দ্বীপে প্রাপ্ত প্রত্ননিদর্শনের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের পাণ্ডুরাজার ঢিবি, তমলুক, হরিনারায়ণপুর ইত্যাদি স্থানের প্রত্ননিদর্শনের সাদৃশ্য তো এদেশের প্রত্নতাত্ত্বিকদের এই সিদ্ধান্তে অনুপ্রাণিত করেছে যে, রাজা মাইনোস ও তাঁর সংস্কৃতি (যেমন মহিষাসুর ও সিংহবাহিনী এক মাতৃদেবী) বাংলাদেশ থেকেই গেছে হয়তো।”

আর্য আক্রমণ তত্ত্বের পালটা হিসেবে আজকাল ‘আউট অভ ইন্ডিয়া’ তত্ত্ব শোনা যায়, যার মূল্য ইউরোপীয় পণ্ডিত মহলে যথেষ্টই কম, কারণ প্রত্যেকটি তত্ত্বের সৃষ্টি আর তাকে রক্ষার আড়ালে থাকে ক্ষমতার রাজনীতি, জ্ঞানচর্চার রাজনীতির সঙ্গে সেটা মিশলে হয়ে ওঠে আরও জটিল, অধিকাংশ সময়েই তা চলে যায় বোধগম্যতার পরিসরের বাইরে। আমার বক্তব্য হল, উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক ভারতে একটি ভাষার শ্রেণিবিভাগ থেকে, একটি জলজ্যান্ত জাতি বা Race আমদানি করাটা যেহেতু খুব সহজেই ক্ষমতার রাজনীতি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, তাই তার পালটাস্রোত হিসেবে, “ভারত থেকেই সব জাতি সারা পৃথিবীতে ওই ভাষা নিয়ে গেছে’—একইরকম সব যুক্তি ব্যবহার করে এই তত্ত্ব প্রচার হওয়ারই ছিল। বা বলা ভালো প্রায় সমসময় থেকেই প্রচলিত ছিল। অনেকেই বলেছেন সেরকম কথা। তবে পাক্কা ‘আউট অভ ইন্ডিয়া’ তত্ত্ব পাওয়া যাবে স্বামী বিবেকানন্দের সামান্য কয়েকটি বাক্যে, তাঁর আশ্চর্য ভাষা দক্ষতার নিদর্শনে—”মাদ্ৰাজ সেই ‘তামিল’ জাতির আবাস, যাদের সভ্যতা সর্বপ্রাচীন, যাদের ‘সুমের’ নামক শাখা ‘ইউফ্রেটিস’ তীরে প্রকাণ্ড সভ্যতা-বিস্তার অতি প্রাচীনকালে করেছিল, যাদের জ্যোতিষ, ধর্মকথা, নীতি, আচার প্রভৃতি আসিরি বাবিলি সভ্যতার ভিত্তি, যাদের পুরাণসংগ্রহ বাইবেলের মূল, যাদের আর এক শাখা মালাবার উপকূল হয়ে অদ্ভুত মিসরি সভ্যতার সৃষ্টি করেছিল, যাদের কাছে আর্যেরা অনেক বিষয়ে ঋণী। এদেরই প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড মন্দির দাক্ষিণাত্যে বীরশৈব বা বীরবৈষ্ণবসম্প্রদায়ের জয় ঘোষণা করেছে। এই যে এত বড়ো বৈষ্ণবধর্ম-ও এই ‘তামিল’ নীচবংশোদ্ভূত শঠকোপ হতে উৎপন্ন, যিনি ‘বিক্রীয় সূর্পং স চচার যোগী’। এই তামিল আলওয়াড় বা ভক্তগণ এখনও সমগ্র বৈষ্ণবসম্প্রদায়ের পূজ্য হয়ে রয়েছেন।” (স্বামীজির বাণী ও রচনা, ষষ্ঠ খণ্ড, উদ্বোধন, পৃ ৮৫)

ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাঙ্গালার ইতিহাস প্রথম পর্বে বলেছেন, “আর্যোপনিবেশের পূর্বে যে প্রাচীন জাতি ভূমধ্যসাগর হইতে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত স্বীয় অধিকার বিস্তার লাভ করিয়াছিল তাঁহারাই বোধহয় ঋকবেদের দস্যু এবং তাঁহারাই ঐতরেয় আরণ্যকে বিজেতৃগণ কর্তৃক পক্ষী নামে অভিহিত হইয়াছে। এই প্রাচীন দ্রাবিড়জাতিই বঙ্গ ও মগধের আদিম অধিবাসী।”

অথবা, অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ, “আর্যদের ধর্ম পারস্যের মধ্য দিয়া এশিয়া মাইনরে যায় নাই। ভারত হইতেই আর্যধর্ম বরাবর এশিয়া মাইনরে গিয়াছে।” (ভারত সংস্কৃতির উৎস ধারা, পৃ ১৯)

হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য তাঁর হিন্দুদের দেবদেবী উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বলেন—“ইউরোপীয় পণ্ডিতবর্গ বৈদিক আর্যরা বহির্ভারতীয় ব’লে যে রায় দিয়েছিলেন, সেই রায়কে আজও আমরা অভ্রান্ত বলে মেনে চলেছি। ভারতীয় অধিকাংশ পণ্ডিতই গড্ডলিকায় গা ভাসিয়ে চলেছেন […] ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে দেশান্তরে পাড়ি জমিয়েছিল, এ সত্য স্বীকার না করার পক্ষেও তো কোনো জোরালো যুক্তি পাওয়া যায় না”। (পৃ ৬৬-৬৭)

এসব কথা যদি বর্তমানের ‘ইতিহাসের গৈরিকীকরণ’-এর সমার্থক বলে মনে হয়, তাহলে ভুল বোঝা হবে। কারণ এঁরা সকলেই স্বঘোষিত হিন্দু, কিন্তু বঙ্গে বহিরাগত ব্রাহ্মণ্য জাতপাতের সমর্থক ছিলেন না, ছিলেন বিরোধী। এবং সমস্ত জনসংখ্যার বিচারে কর গুনে হিসেব করা যায় এমন বামুনদের প্রসঙ্গে নয়, সমগ্র জনজাতির কথাই তাঁরা বলেছেন। অধুনা গৈরিকীকরণ বা হিন্দুত্ববাদ মূলগতভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদ আর সেযুগের ব্রাহ্মণ্যবাদী যাঁরা ছিলেন সেই বাঙালিরাই ‘আর্য-আক্রমণতত্ত্ব’-কে চ্যাম্পিয়ান করার আসল খেলোয়াড়। তাই এখন পূর্বের রাজনীতির সমর্থকরা বর্তমান রাজনীতির বিরোধিতা করলে ঐতিহাসিক সত্য-মিথ্যা কিছুই প্রমাণিত হয় না, হয় ‘রাজনীতি করা’, ক্ষমতার জয়গান গাওয়া। তাই তথাকথিত বামপন্থী ঐতিহাসিকদের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীরা সর্বদা খড়গহস্ত। কারণ উভয়েই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পুরাণ-ভাষ্যকার, ইন্দো-ইউরোপিয়ানকে বা প্রোটো-ইন্দো- ইউরোপিয়ানকে জাতির রূপ দিতে চান—এক দলের কাছে সে জাতি ইন্ডিজেনাস বা ইন্দ(হিন্দ)জ, আরেক দলের কাছে ‘বহিরাগত’। যাইহোক হিন্দুত্ববাদীরা অধিক মারাত্মক কারণ তাদের কাছে ‘আর্য’-ও জাতি আবার ‘মুসলমান’-ও জাতি। দুই দল একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, ঐতিহাসিক খেলা শুরুর আগে ব্যবহৃত ‘টস’-এর মুদ্রা যেন, পেশাদার খেলোয়াড়রা তৈরি, প্রতিযোগিতা অবশ্যই আছে, সেটি হল পেশাদারিত্ব প্রদর্শন। আমরা দর্শককুল পক্ষ নিয়ে উত্তেজনার আঁচ পোয়াতে পোয়াতে কখন যে পারস্পরিক দাঙ্গা মারামারিতে জড়িয়ে পড়ি, বোধবিহীন পক্ষাবলম্বন করি, বুঝতেও পারি না।

আদপে আর্য আক্রমণ তত্ত্বটা এতই ছেঁদো যুক্তির উপর তৈরি ছিল যে, নেহাত গপ্পো শুনে পণ্ডিতি-মারা যাঁদের স্বভাব, তাঁরা ছাড়া আর কেউই যৌক্তিকভাবে মানতে পারেননি। তবে ওই তালি-তাপ্পা দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে টিকে থাকতে আর একদল ব্যক্তিগত বা জাতপাত-গত কারণে দালালি করে গেছেন এখনো করেন, এমনকি জিন গবেষণাও এই রাজনীতি মুক্ত হতে পারেনি। (সদ্য ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ‘SCIENCE’ পত্রিকায় ‘The formation of human populations in South and Central Asia’ [DOI: 10.1126/science.aat7487] যেখানে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরাঞ্চলে বিগত আট হাজার বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত ৫২৩-টি প্রাচীন দেহাবশেষের DNA পরীক্ষায় মানব উদ্বর্তনের এক নতুন মধ্যম-পর্যায়ের প্রস্তাবনা এবং ‘CELL’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন রাখিগড়িতে প্রাপ্ত ২০০০ খ্রিস্ট পূর্বের কঙ্কালের DNA রিপোর্ট, যার শিরোনাম, An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers, Highlights:

• The individual was from a population that is the largest source of ancestry for South Asians

• Iranian-related ancestry in South Asia split from Iranian plateau lineages > 12000 years ago

• First farmers of the Fertile Crescent contributed little to no ancestry to later South Asians

[doi.org/10.1016.j/cell/2019/08/048]

(দেখা যাক এবার কী কী চব্ব তৈরি হয়।) আর্যতত্ব ও তৎসংলগ্ন জাতপাতের মতো জটিল ও বিতর্কিত বিষয়ে আলোচনা করবার পরিসর এখানে নেই, মহিষাসুর সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের পরিকল্পনা আছে অনেকদিনের, যদি কখনো রূপায়িত হয় অর্থাৎ আদৌ লিখে ওঠা যায় তখন দেখানো যাবে আপাতত অতি সামান্য উল্লেখ এবং উদ্ধৃতিতে কাজ চালাতে হবে। যেমন এ প্রসঙ্গে যিনি সবচেয়ে গোলমেলে ‘যখন-যেমন-তখন-তেমন’ (একই বই বা প্রবন্ধে কখনও ‘আর্য’–’ভাষা’ আবার কখনও ‘জাতি’বাচক) অবস্থান অনুসারী, সেই বাংলাভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়-এর ভাষায়, “যাহা হউক, আগেকার জ্ঞান-গোচর এবং কল্পনা-মতে, মধ্য-এশিয়া হইতে আর্যেরা ভারতে আসিল তাহারা সুসভ্য শ্বেতকায় জাতি, উচ্চ সভ্যতা ও মনোভাব লইয়া, ভাবতের আদিম অধিবাসী অসভ্য কৃষ্ণকায় অনার্যদিগকে জয় করিয়া এদেশে রাজা হইয়া বসিল। আর্যেরা অনার্যদের অনায়াসেই নিজেদের অধীন করিয়া লইল অনার্যের বিজিত হইয়া আর্য প্রভুদের দাসত্ব স্বীকার করিল। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য, এই তিন বর্ণের লোকেরা আর্য বংশজ, আর বিজিত অনার্য হইল শুদ্র। হিন্দু সভ্যতা মুখ্যতঃ বৈদিক আর্যদেরই সৃষ্টি, হিন্দু জাতির মধ্যে যাহা-কিছু শ্রেষ্ঠ, সুন্দর, সাধু, সৎ ও শাশ্বত তাহার প্রায় সমস্তই আর্যজাতির দান, এবং যাহা-কিছু নিকৃষ্ট, কুৎসিত, অসাধু, অসৎ ও ক্ষণস্থায়ী, তাহার সবটাই অনার্য্য-মনোভাব-জাত। […] ভারতে ব্রাহ্মণাদি উচ্চ বর্ণের ব্যক্তিগণ সহজেই এইরূপ মতবাদ মানিয়া লয়, ইহাতে প্রবল ইউরোপীয়গণের সহিত দূর-গত স্বাজাত্যবোধ-জনিত একটু প্রচ্ছন্ন আত্মপ্রসাদ হয় তো বিদ্যমান ছিল, সে আত্মপ্রসাদটুকু স্পষ্টতঃ স্বীকার করাও হয় তো লজ্জার বিষয় ছিল। […] কিন্তু উপরে বর্ণিত এই মতবাদ এখন ধীরে ধীরে পরিবর্তন কবিবার আবশ্যকতা উপলব্ধ হইতেছে।” এবং আরও একটু পরিষ্কার ভাবে, মোটামুটি ১৯৪৩-এ লেখা- “ভারতবর্ষে বহু শত বৎসর পূর্বে যে-সব আর্য মানুষ এসেছিল, তারা ইউরোপীয়দের পূর্ব-পুরুষদেরই জ্ঞাতি, সুতরাং ভারতের উচ্চবর্ণের হিন্দু, যারা নিজেদের বিশুদ্ধ আর্যবংশীয় বলে মনে করে একটু গর্ব করে থাকে, তারা হ’ল ইংরেজ আর অন্য ইউরোপীয়দেরই স্বগোত্রীয় দূর সম্পর্কে জ্ঞাতি। কথাটা ভারতীয় উচ্চবর্ণের লোকেদের কাছে মন্দ লাগল না (আর এই উচ্চবর্ণের হিন্দুরাই তো প্রথমটা ইংরেজি পড়তে আরম্ভ করেছিল) রাজার জাতি ইংরেজ, তাঁদের সঙ্গে এক গোষ্ঠীর, একথা উচ্চবর্ণের হিন্দুর মনের নিভৃত কোণের মধ্যে একটু পুলকের ঝিলিক এনে দিয়েছিল বলেই মনে হয়”। (ভারত সংস্কৃতি, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, পৃ ১৬ এবং ৩)। উদ্ধৃত অংশে কিঞ্চিৎ বাঁকা ইঙ্গিত থাকলেও যা বলা হয়নি সেটি হল, প্রাথমিকভাবে ওই উচ্চবর্ণের লোকেদের মধ্যে নব্বই শতাংশ ছিল স্রেফ বাঙালি, যাদের তথাকথিত উচ্চবর্ণত্ব-র দাবিতে উত্তর-পশ্চিমের ঘোড়াও হাসে, আর দক্ষিণের তামিল ব্রাহ্মণেরা উত্তরের বামুনদের দীক্ষা পর্যন্ত দিতে অস্বীকার করতেন বেজাত বলে, তা আগে উদ্ধৃত বিবেকানন্দ বচনের ঠিক পূর্বে খুঁজলে পাঠক পেয়ে যাবেন। বাংলার ভাষাচার্য বারংবার ‘আর্য’ জাতি বলে গেছেন, এবং আদি দ্রাবিড়দের প্রসঙ্গে দিব্য তাদেরও ওই আর্য রাস্তা দিয়েই ভারতে প্রবেশের গল্প বলেছেন।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার এটাই যাঁরা ‘আর্য আক্রমণ তত্ত্ব’ মানেননি প্রথম থেকে, তাঁরাও প্রায় সকলেই ‘আর্য জাতি’-র গল্পটা মেনে নিয়েছিলেন। নাটের গুরুঠাকুর ম্যাক্সমুলার শেষ দিকে বারবার বলেছেন—”আর্য একটি ভাষার নাম, তাকে জাতি পরিচয় দেওয়া চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক।” আর্যরা বহিরাগত না ভূমিপুত্র প্রশ্নই ওঠে না, কারণ তথাকথিত আর্য জাতির অস্তিত্বই ছিল না—এ প্রসঙ্গে একটানা বিস্তারিত ইংরেজি ও বাংলায় লিখে গেছেন পরমেশ চৌধুরী। ম্যাক্সমুলারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন— “কিন্তু তীর একবার ছুঁড়ে দিলে কি তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায়? বিশ্বময় আর্য জাতির জয়ধবজা উড়িয়ে স্লোগান তুলে সে স্লোগান কি আর থামানো যায়? মানুষ যাতে একবার বিশ্বাস করতে শুরু করে সে বিশ্বাস থেকে তাকে ফেরানো কি অতই সোজা? এনসাইক্লোপিডিয়া এবং পাঠ্যপুস্তকে তাঁর আগের বক্তব্য স্থান পেয়েছে, সেগুলো পাল্টাবে কে? অতএব তাঁর ভুল শোধরানোর চেষ্টা বৃথা গেল। বলাবাহুল্য আমরা এখনো তাঁর ভুল শোধরানোর প্রচেষ্টার সাথী হতে পারিনি। মিথ্যাটাই শিখে এসেছি, শিখিয়ে যাচ্ছি। বঙ্কিমচন্দ্রও তাঁর ‘বাঙালি জাতির উৎপত্তি’ বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছেন তাঁর ভাষাতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে। এ ভাষাতত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই তিনি বাঙালিকে আর্য-অনার্য দু’ভাগে বিভক্ত করেছেন। এ ভাষাতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর শিষ্যরা ভারতবাসীদের আর্য-অনার্য ভাগে বিভক্ত করেছেন। এ ভাষাতত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই বিকৃত করে লেখা হয়েছে ভারতবর্ষের ধর্মীয় ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, বাংলা ভাষার ইতিহাস, সঙ্গীতশাস্ত্র, ছন্দশাস্ত্র সব।” (আর্য জাতির অস্তিত্বই ছিল না, ১ম খণ্ড, ১৪১৮, পৃ ১৪৫-৪৬)

সত্যিই আশ্চর্য! মোটামুটি ১৮৫০-এর আগে ইয়োরোপে বা ভারতবর্ষে আর্য জাতির কথা কেউ জানতই না, অথচ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষপ্রান্তে শতকরা নিরানব্বই জন শিক্ষিত ইউরোপীয় এবং ভারতীয় আর্য জাতির অস্তিত্বে নিঃসংশয় বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আজও যার বদল ঘটেনি, ঘটবে এরকম সম্ভাবনাও অদূর ভবিষ্যতে নেই। অসুর উৎসবের প্রবক্তা অজিতপ্রসাদ হেমব্রম তাঁর কথাতেও সেই আর্য জাতি বা সভ্যতাকে বহিরাগত শত্রু হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে বসেন।

গোদের উপর বিষফোঁড়া ‘হিন্দুত্ববাদ’ ও তাদের অধুনা নির্মিত ‘আউট অভ ইন্ডিয়া’ মতবাদ। তাদের কাছে আর্যও জাতি আবার মুসলমানও জাতি! বেদোমির চূড়ান্ত যাকে বলে! ‘আর্য’ জাতি এবং তারা সকলে ভারত বহির্গত হলে, ঐতিহাসিককালে ভারতে আগমনকারী মুসলমান বা ইসলামে বিশ্বাসীরাও আর্য এবং তাদের পূর্বপুরুষরা ভারতবাসী, আর যারা এদেশে ধর্মান্তরিত হয়েছেন তাদের নিয়ে তো কথাই ওঠার কথা নয়! ‘হিন্দ’ যদি দেশ হয়, তাহলে হিন্দু-রাষ্ট্রের প্রসঙ্গ আসে কী করে! মানে যুক্তিটা এরকম, ‘ভারত’ আমাদের দেশ, সেটাকে ‘ভারতবর্ষ’ বানাতে চাই। ‘ভারতে আগত’ এবং ‘ভারত থেকে বহির্গত’ এই উভয় তরফের মোদ্দা কথার সচলার্থ যা দাঁড়ায় তা হল—দু-চারটে লোক কাল্পনিক নিজ বংশ ও রক্তের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের বাসনায়, নিজদেশের অধিকাংশের অপমান করে চলে ‘অনার্য’, ‘শূদ্র’ ইত্যাদি নামে, অথচ যাবতীয় গর্ব দেশ নিয়ে! এবং এটা এই গণতান্ত্রিক দেশে চলতে পারে!! সত্যিই বিষ্ণু অবতার ভগবান বুদ্ধ সকলকে অহিংস পাষণ্ডে পরিণত করেছেন, নচেৎ এদের পরজন্মে অবধারিত গুয়ে- মাছি-মশা হয়ে জন্মানোর জন্য অপেক্ষা করতে হত না। মহান বামপন্থীরা আজকাল গোলমেলে শ্রেণিসংগ্রাম সরিয়ে জাতিসত্তা আন্দোলনের সমর্থক, সিপিয়েম বাচস্পতিরা ‘বহুত্ববাদ’ নিয়ে বাতেলা ঝাড়ছেন! (সর্বহারা শ্রেণির মানুষ যেহেতু সংখ্যাবহুল তাই তাদের ভ্যানগার্ড পার্টি যা বলবে সেটাই বহুত্ববাদ, এইরকম কোনো যুক্তিতে নিশ্চয়!) সাধারণ মানুষের, মেহনতি জনতার এই ‘যখন যেমন তখন তেমন জাতি সংজ্ঞা’ তাঁরা বোঝেন না, তা তো নয়, ‘রাজনীতি করেন’ এবং সেটা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মতোই কিছুতেই জাতপাতের রাজনীতি নয়! হোত্-ত্তেই পারে না। আমার এই ‘মহান’ প্রবন্ধের মান ক্রমশ নিম্নগামী বেশ বুঝতে পারছি কারণ ‘খেলো রাজনীতি’র কথা বলে চলেছি, অবশ্যই তাই। Orientalism এর ভূমিকায় এডওয়ার্ড সইদ পরিষ্কারভাবে বলেছিলেন— “এখানে আমি যা দেখাতে আগ্রহী তা হল, বিশুদ্ধ জ্ঞান মৌলিকভাবে অরাজনৈতিক (এবং বিপরীতক্রমে খুব বেশি রাজনৈতিক জ্ঞান বিশুদ্ধ জ্ঞান নয়), এই সাধারণ উদারতাবাদী ধারণা কিভাবে জ্ঞান-সৃজন মুহূর্তে বলবৎ ও গোপনে সুসংগঠিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আড়াল করে রাখে। আজকাল কাউকে সহজে বুঝতে দেওয়া হয় না যে, ‘অরাজনৈতিক উদ্দেশ্যের ভান করা’ নীতিকে ভাঙ্গার দুঃসাহস নিয়ে কিছু রচিত হলে সেই রচনাকে ছোট করবার জন্য ‘রাজনৈতিক’ বিশেষণে আখ্যায়িত করা হয়। […] ভারত ও মিশর সম্পর্কিত সকল প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান কোনো-না-কোনোভাবে রাজনৈতিক ঘটনাবলীর দ্বারা রঞ্জিত, প্রভাবিত এবং দূষিত।” যদিও এই কথাটার অর্থ সংকুচিত করে পার্টিবাদীরা নিজেদের কোলে ঝোল টেনে নেন।

পুরাণ প্রসঙ্গে ফেরা যাক, প্রাচীন মেসোপটেমীয় এপিক অভ গিলগামেশ-এর অন্যতম চরিত্র এনকিদু, যাকে দেবতা এনকি সৃষ্টি করেন। সেই পুরাণে এনকিদুর অর্ধ শরীর মহিষের ন্যায় মহিষের শিংযুক্ত। এই কাহিনি সুমের কবিতা থেকে অক্কাদীয় মহাকাব্য হয়ে পুরোনো ব্যাবিলোনিয়ান ভাষা পেরিয়ে অসুরীয় রাজা অসুর বনিপালের গ্রন্থাগারের ধ্বংসাবশেষ থেকে কিছু অংশ উদ্ধার হয়। এনকিদু হলেন সংস্কৃতিবান নগর সভ্যতার প্রতিভূ যোদ্ধা রাজা গিলগামেশের প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রাকৃত বন্যতার প্রতিভূ, তিনি বন্য পশুদের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করতেন। এক ব্যাধ দেখে ফেলে যে এনকিদু তার ফাঁদ থেকে পশুপাখিকে মুক্ত করে দিচ্ছেন। সে রাজা গিলগামেশের কাছে এর বিহিত চায়। গিলগামেশ, শামাৎ নামে এক দেবদাসীকে পাঠান এনকিদুকে বশে আনতে। শামাৎ-এর রূপ ও ছলাকলায় মুগ্ধ এনকিদু টানা সাতদিন তার সঙ্গে সঙ্গম করার পর পশুপাখিদের কাছে ফিরলে মানুষের গায়ের গন্ধে তারা পালিয়ে যায়। একাকী দুঃখী এনকিদুকে শামাৎ সভ্য জগতে উরুক শহরের রাজা গিলগামেশের কথা শোনায় আর সেখানে নিয়ে যায়। এনকিদু ছিলেন গিলগামেশের সমকক্ষ, ওই গাথায় মল্লযুদ্ধের পর তিনি গিলগামেশের পরম মিত্র হয়ে যান, তাঁর মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত গিলগামেশ অমরত্বের সন্ধানে উৎনাপিসতিম-এর খোঁজে বেরিয়ে পড়েন।

এক সিংহের সঙ্গে লড়াই

২২০০ খ্রিস্ট পূর্বের একটি অক্কাদীয় এম্পায়ার সিলে (উপরের চিত্র) এনকিদুকে দেখা যায় এক সিংহের সঙ্গে লড়াই করতে, সেই সিলের পাশেই রয়েছে গিলগামেশ স্বর্গীয় ষণ্ড গুলান্না-র সঙ্গে লড়াই করছেন। এখানে এনকিদুকে দেখে মহিষাসুর ও দুর্গাবাহন সিংহের লড়াই বলে মনে হবে। এনকিদু দেবী ইস্তার-এর রোষে অসুস্থ হয়ে মারা যান। মহেঞ্জোদারো থেকে প্রাপ্ত একটি সিলে (1357) কিন্তু একই অবিকল এনকিদু বা মহিষাসুরকে দেখা যায় বাঘের সঙ্গে লড়াই করতে, ভারতীয় সিলে সিংহের বদলে বাঘ থাকবে, এটা খুব স্বাভাবিক। দুর্গাও বহুস্থলে ব্যাঘ্রবাহিনী বা শেরাওয়ালি, মহেঞ্জোদারোর এই সিলকে অক্কাদীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে সিন্ধুসভ্যতার সংযোগের প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। পৌরাণিক গল্প কাহিনি বা কোনো প্রাচীন ঘটনা সূত্রের যোগাযোগ হিসেবেও ভাবা যেতে পারে। সিন্ধু বিশেষজ্ঞ ইরাবথম মহাদেভান মহেঞ্জোদারোর এই সিলের মূর্তিকে দ্রাবিড় ‘পুলিকাদিমাল’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন যার অর্থ ‘ব্যাঘ্রসংহারী বীরপুঙ্গব’ (tiger killing hero )।

সিন্ধু সিল 1357

সিন্ধুসভ্যতার সিলমোহরে মহিষাসুর প্রসঙ্গে আসবার আগে মিশরীয় সভ্যতার মহিষাসুর প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা বলে নিই। রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত মিশরে চতুর্থ বা পঞ্চম শতকের এক কবি ছিলেন নোনুস অভ প্যানোপলিস, তাঁর রচিত Dionysiaca যা ডায়ানোসিয়াসের ভারত অভিযান ও প্রত্যাবর্তন কাহিনি, ওই সময়ের (Greek Antiquity / Classical Era) সংরক্ষিত রচনার মধ্যে সৰ্ব্বহৎ—প্রায় ২০৪২৬ পংক্তির ৪৮টি অংশে বিভক্ত তার ৩৬ তম অংশের ২৪১–২৫৬ লাইনে Colletes-এর কথা আছে, নয় কিউবিট মানে প্রায় চোদ্দো ফুট উচ্চতার বিশালদেহী যোদ্ধা, ২৫১-২৫২ লাইনের ভারী চমৎকার তথ্যের ইংরেজি অনুবাদ— “ Such was Colletes, gigantic heavenhigh having in him the sacrilegious blood of his giant ancestor the founder of the Indian Race!”

দেবী ইস্তার, অক্কাদীয় সিল থ্রি পৃ ২৩৫০-২১৫০

এই কোলেটেশকে ব্যাকাসের নাচের দলের এক মেয়ে তীক্ষ্ণ পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলল! কয়েক পাতা আগে আর এক বীর মররেহুসকে (সান্ড্রাকোটাস চন্দ্রগুপ্ত হলে এ নিশ্চয়ই মহিষাসুর এক সুন্দরী তার নগ্ন রূপ দেখিয়ে বর্ম অস্ত্র সব খুলিয়ে নেয়, তারপর চূড়ান্ত মুহূর্তে একগাদা সাপ তার শরীর থেকে বেরিয়ে মররেহুসকে হত্যা করে।

এটিকে বাদ দেওয়াই যায় প্রসঙ্গ থেকে, কিন্তু বাঙালির লোকশিল্পে সরাসরি মিশরীয় প্রভাব ব্যক্ত করেন সুধাংশুকুমার রায়—বহু শব্দ, স্থাননাম, লোকশিল্পের নমুনা, সেঁজুতি ব্রতর আলপনা ইত্যাদি উদাহরণ দিয়ে তিনি বঙ্গদেশের সঙ্গে মিশরের প্রাচীন সম্পর্ক ব্যক্ত করেন। তাঁর Prehistoric India and Ancient Egypt নামক ৫২ পাতার পুস্তিকায় তিনি দাবি করেন রাজমহল পাহাড় এলাকায় মিশরের বিতাড়িত ফ্যারাও আখেনাতন ও তাঁর জামাতা সামেনখারার মমি সংরক্ষিত আছে সামেনখারা দ্বারা বঙ্গভূম অধিকৃত এবং শাসিত হয়। আখেনাতেন প্রথম মনোথেইস্ট সূর্য-পূজক, তাঁর বার্ষিক মৃত্যুদিবস পালনের অনুষ্ঠান হল আমাদের গাজন সন্ন্যাসীদের অশৌচ পালন ও অন্যান্য আচার। তাঁর বক্তব্য মিশরীয় ‘ডো-আহোম-রা’ শব্দ থেকে ধর্মরাজ শব্দের উৎপত্তি, এটা পড়লে মাথায় আসতে পারে ধৰ্ম্মঠাকুরের ঢিবি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কথিত বৌদ্ধ স্তূপের বদলে পিরামিড। ধর্মরাজের বাহন মহিষ। সুধাংশুকুমার রায় তাঁর পুস্তকে ‘নেরমার প্যালেট’-এর চিত্র বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ইটের প্রাচীর ঘেরা, মাঝে দুর্গযুক্ত নগর, সিন্ধু সভ্যতাকে চিহ্নিত করে (চিত্রের নিম্নাংশ)। ফ্যারাও-এর মহিষরূপ প্যালেটের উপরের মহিষের মোটিফ, মহিষাসুরকে মনে পড়তেই পারে, কিন্তু সুধাংশুকুমার রায় ওই পুস্তিকায় সরাসরি মহিষাসুরকে নিয়ে কিছু বলেননি। ওপরের ছবি গড-কিং মহাদেব আর পেছনে পাদুকাবাহক মুণ্ডিত-মস্তক বামুনের কথা মনে করায়। নেরমার প্যালেট নিয়ে পণ্ডিতদের মাঝে মতভেদ আছে, অনেকের মতে এটি কোনো বাস্তব ঘটনার চিত্র নয়, প্রচলিত কাহিনীর চিত্ররূপ। কে জানে মহিষাসুরের গল্প সে দেশেও গেছিল কিনা! সুধাংশু কুমার রায়ের কথা পণ্ডিত মহলে একেবারেই পাত্তা না-পেলেও ডক্টর অমলেন্দু মিত্র, রাঢ়ের সংস্কৃতি ও ধর্ম ঠাকুর গ্রন্থে ক্ষেত্রসমীক্ষা নির্ভর করে এই সংক্রান্ত আলোচনা করেছেন। ভুললে চলবে না, মিশরীয়দের যুদ্ধ-দেবী শেখমেত-এর মাথা সিংহীর। মিশরীয় যোগাযোগ নিয়ে সুধাংশু কুমার রায়ের প্রদর্শিত এই পথে লোকশিল্পের গবেষকেরা অনেকেই মাথা ঘামিয়েছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শিল্পক্ষেত্রে মিশরীয় যোগাযোগ ছিল বলে মনে করতেন।

নেরমার প্যালেট

নেরমার প্যালেটের নিম্নাংশ

শশিভূষণ দাশগুপ্ত তাঁর ভারতের শক্তি সাধনা ও শাক্ত সাহিত্য গ্রন্থের ৫৩-৫৪ পৃষ্ঠায় বলেছেন—”মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি সম্বন্ধেও একটা কথা মনে হয়। ‘মহিষ’ কথাটি বেদে মহিষ পশু, এই অর্থে যেমন ব্যবহৃত দেখা যায় তেমনই সায়নাচার্য কোন কোন স্থলে (ঋগ্বেদ ৮।১২।৮) ‘মহিষ’ শব্দটি মহান অর্থে গ্রহণ করিয়াছেন সেক্ষেত্রে মহিষাসুর কথার অর্থ মহান অসুর। দেবী হয়ত মূলে মহান অসুর মর্দন করিয়াই মহিষাসুরমর্দিনী, মহান অসুরই পরবর্তী কালে পশু, মহিষের মূর্তি ধারণ করিয়াছে। আমরা চণ্ডীকে অবলম্বন করিয়া ভারতীয় ভাষাসাহিত্যগুলিতে যত কাব্য দেখিতে পাই সেখানে সাধারণতঃ মহিষাসুরকেই প্রধান করিয়া দেখিতে পাই। […] দেবীর যত অসুরনাশিনী প্রাচীন প্রস্তরমূর্তি পাওয়া যায় তাহা সর্বত্রই মহিষাসুরনাশিনী বা মহিষমর্দিনী রূপ। মহিষমর্দিনী দেবী সম্বন্ধে আর-একটি ঐতিহাসিকব্যাখ্যা দেখা যায়। এই মতে দুর্গা হইলেন ভূমধ্যসাগরাঞ্চলের ব্যাইর্গো (Virgo) দেবী—ইনি সমরপ্রিয়া দেবী। এই ভূমধ্যসাগরাঞ্চলবাসীগণ কর্তৃক মনখমের জাতির বিজয়ই মহিষমর্দিনী দেবীর মূর্তির মূল কথা। মনখমেরগণ একটি মিশ্র জাতি, খানিকটা ক্যাম্পিয়ান, খানিকটা অস্ট্রালয়েড, কিছুটা অ্যালপাইন। ইহাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মহিষের একটা বিশেষ যোগ ছিল। ভারতীয় আর্যগণের মধ্যে গো যেরূপ পবিত্র হইয়া উঠিয়াছিল, মনখমেরগণের মধ্যে মহিষও সেইরূপ পবিত্র বলিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল। মনখমের মর্দনই হইল মহিষমদন ভূমধ্যসাগরীয়গণের সমরদেবী হইলেন ব্যাইর্গো বা দুর্গা তাই ভূমধ্যসাগরীয়গণ কর্তৃক মনখমের-বিজয়ই রূপ ধারণ করিল দুর্গার মহিষমর্দিনী মূর্তিতে।”

‘মন্-খেমর’ অর্থ, অস্ট্রএশিয়াটিক বা মুন্ডা, খাসি ইত্যাদি ভাষাভাষী। শব্দকল্পলতিকা-য় পাই ‘অসুর’-এর একটি নাম ‘পূর্বদেব’। ‘পূর্ব’ অর্থ, ‘দিক’ বা ‘প্রাচীন’, দুটিই হতে পারে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%