কিন্তু মহিষাসুরের কালে তো বাঙালি জন্মায়নি, দেশের নাম হিসাবে ‘বঙ্গ’ সরকারিভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে মুঘল শাসনকালে। যদিও কালিদাসের রঘুবংশে দেশের নাম বঙ্গ আর তার অধিবাসীরা বঙ্গাল। অবশ্য মহিষাসুর বঙ্গীয় হতেই পারেন, কারণ অনেকের মতে বঙ্গ শব্দটি এসেছে বোঙ্গা থেকে, যার অর্থ দেবতা। বোঙ্গা > বঙ্গ = দেবভূমি। পৌরাণিক কালে বঙ্গদেশে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি দুর্গাপূজা করেছিলেন বলে কথিত আছে। তারপর কেউ বলেন তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ, কেউ বলেন দিনাজপুরের রাজা গণেশ প্রথম মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে দুর্গাপূজা করেন। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত ‘ইভেন্ট’ দুর্গোৎসব-এর সূচনা যে বাঙালির জীবনে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অবদান সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এবং তার পশ্চাদপটে মুসলমান শাসনমুক্ত হবার সাময়িক বোকা-বোকা আনন্দ যে ছিল তা অনস্বীকার্য।
সনাতন ধর্মের একটা তাল-খিচুড়ি রিলিজিয়ান মাফিক রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক চক্রান্ত ঐতিহাসিক কাল থেকেই ভারতবর্ষে চালু আছে, এখন বর্তমানে যা নগ্নভাবে প্রতীয়মান কিন্তু হিন্দু ধর্মকে কালচার না-ভেবে রিলিজিয়ন রূপ দিতে গেলে মেনে নিতে হয় বৈষ্ণব, শৈব, সৌর, শাক্ত, গাণপত্য প্রত্যেকটি আলাদা-আলাদা রিলিজিয়ন। একসঙ্গে ঘেঁটে হিন্দু-রিলিজিয়ন বলে দেওয়ার অধিকার সেক্ষেত্রে থাকে না, কারণ পুরাণ-ভর্তি বিষ্ণুপন্থী আর শিবপন্থীদের মারামারি-কাটাকাটি, শিবপন্থীরা রাক্ষস অসুর ইত্যাদি অশুভ শক্তি আর দেবতাদের পক্ষে বিষ্ণু অবতার পশুরূপী বা মনুষ্য জন্ম নিচ্ছেন। মনুষ্য জন্ম নিয়েছেন বলেই তিনি যেন মানুষের পক্ষে, দেবতাদের স্বর্গ পুনরধিকার করার জন্যই যে অবতার জন্ম তা যত পরিষ্কার করেই লেখা থাক সেসব কথার কোনো মূল্যই যেন নেই! যে কারণে আজও “জয় শ্রীরাম” বলে বানরসেনার মতো দাঙ্গাবাজি করা যায়। রাম তো মানুষ, জন্মগ্রহণ দেবতাদের ষড়যন্ত্রে, সারা জীবন দুঃখ কষ্ট ভোগ তা-ও দেবতাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, এমনকি বৃদ্ধাবস্থায় একমাত্র প্রিয়জন লক্ষ্মণকে ত্যাগ বা মৃত্যুদণ্ড দিতে বাধ্য হন দেবতাদের ষড়যন্ত্রে এবং অবশেষে উপায়ান্তর না-দেখে সরযূর জলে ডুবে আত্মহত্যা করেন! আত্মহত্যাকে ‘প্রাণবিসর্জন’ বললেই তো ঘটনাটা বদলে যায় না। কেন বলা যাবে না বাঙালি রাবণকে শত্রু বা খারাপ বলে ভাবেনি কখনো, বাঙালি কৃত্তিবাস রামায়ণের যে অনুবাদ করেন সেখানে রামকে শত্রুরূপে ভজনা করবার জন্যই রাবণের জন্ম ও কর্ম, বাঙালির কাছে বিভীষণ ঘরশত্রু, হনুমান তার দেবতা নয়—যে হনুমান ইন্দ্রজিতের বৈদিক নিকুম্ভিলা যজ্ঞ পণ্ড করার জন্য যজ্ঞ বেদিতে প্রস্রাব করে, এছাড়া রাবণের অম্বিকা অর্থাৎ দুর্গাপূজায় হনুমান চণ্ডীর পাতা ছিঁড়ে পুজো বন্ধ করে দেয়—এসব কাণ্ডের সঙ্গে বর্তমানে রাজনীতি-করিয়ে হনুমানদের কর্মকাণ্ডের আশ্চর্য মিল। বাঙালি রাবণবধের সময়ের উত্তর ভারতে হিন্দু পালনীয় তিথি, উৎসবগুলোকে বদলে নিয়েছে। যেমন এখন তার সবচেয়ে বড়ো উৎসব দুর্গাপূজা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে যেখানে রাবণবধ বা দশেরার চিহ্নমাত্র নেই। দুঃখ আছে মেয়ে বা মা বাড়ি ফিরে যাবেন বলে, দশেরার উল্লাস নেই। মদ-মাংসের মহোৎসব আছে কিন্তু অষ্টমীতে নিরামিষ ছাড়া কোনো উপবাস কৃচ্ছ্রসাধন নেই। পরবর্তী সারা ভারতের প্রায় সব ধর্মের ও আঞ্চলিক পুণ্য তিথি উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের দেওয়ালি বা রামের অযোধ্যায় ফেরার দিন, বাঙালি সেটাকে তার কালীপুজো বানিয়ে নিয়েছে, যতই এখন ধনতেরাস করে, লক্ষ্মীপুজো করে, দিওয়ালি মানানো হোক, কালীপুজো কালীপুজোই থাকবে, শ্যামাপূজা শক্তি আরাধনা যেখানে স্বয়ং শিব তাঁর পায়ের তলে শুয়ে থাকবেন।
ভক্তিমন্ত বাঙালির ঘরে ঘরে দুর্গাপূজার গল্প বিশ্বাস করতে গেলে, তার একটি কারণ হিসাবে ১২৪০ সালের ২৭ আশ্বিন তারিখের ‘সমাচার দর্পণ’-এ প্রকাশিত একটি সংবাদকে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। “এই সপ্তাহে আমরা যে এক পত্ৰ প্রকাশ করিলাম, তাহাতে অধিক রাত্রিযোগে গৃহস্থ লোকেদের দ্বারে দ্বারে দেব প্রতিমা বিশেষতঃ দুর্গা প্রতিমা ফেলিয়া দেওয়ার যে অতি কদর্য্য ব্যবহার দিন দিন বর্ধিষ্ণু হইতেছে তদ্বিষয়ক প্রস্তাব লিখিত হইয়াছে। তাহার অভিপ্রায় এই যে প্ৰত্যেক গৃহস্থই এই পূজা করেন। আমাদের ইউরোপীয় পাঠক মহাশয়ের বুঝি এতদ্বিষয় জ্ঞাত না থাকিবেন অতএব লিখে যে এতদ্রুমে কোন গৃহস্থের দ্বারে অশিষ্ট যবিষ্ট ভুয়িষ্ট দৃষ্ট কর্তৃক প্রতিমা নিক্ষিপ্ত হইলে, তাহা লইয়া ঐ গৃহস্থের পূজা না করিলে নয়। ঐ উৎসব সময়ে সুতরাং বামুন ভোজনাদি কৰ্ম্মে নানা ব্যয় করিতে হয়। অতএব বিধি বোধিত পূজার ন্যায় এই পূজা না করলে লৌকিক অসম্মান আছে। বঙ্গদেশের মধ্যে অনেক গণ্ডগ্রামে কৃপণ ব্যক্তির এতদ্রূপে অর্থ দণ্ড করা হয়। প্রতিমা অধিক রাত্রিযোগে তাহার দ্বারে নিক্ষিপ্ত হইলেই তৎকাৰ্য্য ন্যূনাধিক ৫০-৬০ টাকাতেও নির্বাহ হওয়া কঠিন। এক রাত্রির মধ্যে ৫।৬ খান প্রতিমা যাহাদের ধনাপবাদ আছে এমত ব্যক্তিদের গৃহ দ্বারা দিতে নিক্ষিপ্ত হইয়াছে। কিন্তু কেবল কৃপণ ব্যক্তিদের উপরেই এই ভার চাপান যায় এমতও নহে। কখন কখন অতিপরিমিত ব্যয়ি সদ্বিবেচক যিনি স্বীয় ক্ষেত্র বুঝিয়া সাধারণ কর্ম্মে ব্যয় করেন তাদৃশ ব্যক্তির উপরেও কতকগুল পাগল বালকেরা এইরূপ ভার দিয়া ক্লেশ দেয়।” খুব বিশ্বাসযোগ্য সম্ভবপর ঘটনা, কারণ এখনও নববিবাহিত দম্পতির বাড়ির সামনে কার্তিক ফেলার ঘাওরামি বাঙালি ছেলে-ছোকরা চালু রেখেছে।
সে যাই হোক, বাঙালি দুর্গা মহিষাসুরমর্দিনী হলেও মহিষাসুরবধের স্মরণে কিন্তু এই পুজো করা হচ্ছে না, যিনি মহিষাসুরবধ করেছিলেন সেই দেবী কন্যারূপে পিতৃগৃহে আসছেন ছেলেমেয়ে নিয়ে পুজোর ছুটিতে, মায়ের আমাদের নিয়ে মামার বাড়ি যাওয়ার মতো অর্থাৎ মহিষাসুরকে নিয়েও বাঙালির বিশেষ কোনো চাপ নেই সে পুজোও পায়।
বাঙালির গোলমেলে হিন্দুত্বের কারণ ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক, যা-তে বৌদ্ধধর্ম মুখ্য প্রভাবক। যে সামান্য ঐতিহাসিক সময়ে সামান্য কিছুকাল বাঙালি হিন্দু রাজার অধীনে থেকেছে তারাও মুখ্যত ভিনদেশি হিন্দু। তাই বাঙালির ধর্মবোধটাও চিরকাল গোলমেলে। যেমন হালে উদাহরণ দেখা যাবে বিভিন্ন সম্প্রীতি উদ্যানে নজরুল রবীন্দ্রনাথ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন, আমাদের জাতি ধর্মের ঊধের্ব আমাদের কবি মনীষী এই অর্থে, অনুচ্চারিত থাকে যে নজরুল মুসলমান ও রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন। মজার ব্যাপার এটাই যে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, ছিলেন ব্রাহ্ম, আর ব্রাহ্মরা যে হিন্দু নয়, মহাপাতক ধর্মচ্যুত, তাদের ঘরে জল খাওয়া যায় না, বিবাহ তো নৈব নৈব চ, সেকথা বাঙালি বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছে। যদিও এসব জানতে বিন্দুমাত্র পড়াশোনা দরকার নেই উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা দেখা আপামর বাঙালির জানবার কথা। খবরের কাগজে পাত্র- পাত্রীর বিজ্ঞাপন দেখলেই এটাকে সচেতনতা বলার বাসনা থাকলে তা রগে উঠে যাবে। তবে রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ হঠাৎ নিজেকে ‘হিন্দু’ বলে দাবি করেছেন; কোন অর্থে সেটা গবেষণা সাপেক্ষ।
বাঙালির ধর্মবোধ ও ভক্তির নমুনা তো এখন সর্বত্র জ্বলজ্বল করে, সেকালের কিছু ঘটনা ফিরে দেখা যাক, প্রথম থেকেই দুর্গাপুজো কতটা পুজো আর কতটা আমোদ-প্রমোদ সেটা পরিষ্কার বোঝা যাবে। একটিমাত্র বই থেকে পরপর কয়েকটি উদাহরণ দেব, সেটি সুধীরকুমার মিত্র লিখিত দেবদেবীর কথা ও কাহিনী।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বঙ্গদেশে হুগলি জেলার অন্তর্গত গুপ্তিপাড়ায় সর্বপ্রথম বারো জন বন্ধু মিলে এক পূজা করেন, এটাই বঙ্গের সর্বপ্রথম সর্বজনীন পূজা। বারো জন ব্যক্তি পূজার উদ্যোক্তা ছিলেন বলেই বারো-ইয়ারি বা বারোয়ারি পূজা বলে খ্যাত হয়। তারপর গুপ্তিপাড়ার পুজো দেখে বল্লভপুর, কোন্নগর, উলা, চাকদা, শ্রীরামপুর প্রভৃতি স্থানে জাঁকজমকের সঙ্গে সর্বজনীন পূজা শুরু হয়। এই পুজোর জন্য বহু দূর থেকেও চাঁদা সংগ্রহ করা হত এবং পুজোর সমারোহ নিয়ে গুপ্তিপাড়ার সঙ্গে উলা, শান্তিপুরের অধিবাসীদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা হত।
একবার শান্তিপুরের পুজোর জন্য এক বিশাল আকৃতির দশভুজা মূর্তি তৈরি করা হয় এবং সেই প্রতিমার গণেশের পেট তৈরি করার জন্য একটা বিরাট ঢাকাই জালার প্রয়োজন হয়েছিল। গণেশের অনুপাতে দুর্গা কার্তিক লক্ষ্মী মহিষাসুরের মূর্তিও তৈরি হয়। শোনা যায়, ওই প্রতিমার আরতির সময় পুরোহিতকে কপিকলের সাহায্যে উপরে তুলে ধরে আরতি করাতে হয়েছিল। বিসর্জনের সময় মহাসমারোহে প্রতিমা নিয়ে যাবার সময় গাড়ির চাকা মাটিতে বসে যায় এবং অবশেষে প্রতিমাগুলোকে কেটে কেটে পৃথকভাবে বিসর্জন দিতে হয়। উলার বারোয়ারির পাণ্ডাগণ শান্তিপুরের এই ঘটনার পর একটি গণেশ মূর্তি গড়ে তাকে অশৌচের বস্ত্র বা কাছা পরিয়ে শান্তিপুর শহর ঘোরান এবং সর্বসাধারণকে জানালেন, “আমাদের গণেশের মাতার শান্তিপুরে অপমৃত্যু হইয়াছে, আপনারা গণেশকে কিছু ভিক্ষা দান করুন. গণেশ তাহার মাতার শ্রাদ্ধ-শান্তি করিবেন।” উলার ব্রাহ্মণেরা চাঁদা সংগ্রহ করে নির্ধারিত দিনে গণেশকে দিয়ে মাতৃশ্রাদ্ধ করিয়েছিলেন এবং সে উপলক্ষ্যে যথোপযুক্ত ব্রাহ্মণবিদায়ও দেওয়া হয়। (দেবদেবীর কথা ও কাহিনী, সুধীরকুমার মিত্র পৃ ১৫৬ )
‘বারো ইয়ার’ থেকে ‘বারোয়ারী’ শব্দের উৎপত্তির গল্পটা চালু, কিন্তু কৃষ্ণনগরসহ নদিয়ার অন্যান্য প্রাচীন শহরে দেখা যাবে বিভিন্ন পাড়ার মাঝে ‘বারোয়ারী থান’ গ্রামের ‘চণ্ডীমণ্ডপ’- এর মতো, পুজোর ক্ষেত্রে পরিবার-এর বিপরীতে বাইরের বা সর্বজনের অর্থে শব্দটি ‘বার-ওয়াড়ী’ হতে পারে, যেমন কৃষ্ণনগরের প্রাচীন ‘গোয়াড়ী’, হালে প্রচলিত জেলাওয়াড়ি, অঙ্গনওয়াড়ি ইত্যাদি তুলনীয়। ড়, র হয়ে যাওয়াটা কোনো ব্যাপার নয়, কারণ মনে রাখতে হবে শাহিদুল্লা কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী কৃষ্ণনগর, শান্তিপুর, নবদ্বীপ এই তিনটি শহরের অধিবাসীদের কথ্য ভাষাই মান্য বা প্রমিত বাংলা লেখ্য ভাষা। ‘মহারাজেন্দ্রবাহাদুর’ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রোহোৎসাহে বিভিন্ন পাড়ায় এইসব ‘বারওয়াড়ী’ পুজো চালু হয়েছিল। গ্রাম রেউই, গঞ্জ গোয়াড়ি বাদ দিলেও শুধুমাত্র স্থাপিত ‘রাজধানী’ শহর হিসাবে কৃষ্ণনগর কলকাতার চেয়ে অন্তত একশো বছরের পুরোনো নগর। কৃষ্ণনগর রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নামাঙ্কিত নয়, স্বয়ং কৃষ্ণের নামে তাঁর পূর্বপুরুষ রাজা রাঘব রাজধানী নির্বাচিত করে এই শহরের কৃষ্ণনগর নাম রাখেন। তৎপুত্র মহারাজা রুদ্র রায় ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাদশা ‘আলমগীর’-এর কাছ থেকে মহারাজা উপাধি পান এবং বর্তমান রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। কলকাতা ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী হয় ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে। ক্ষিতীশবংশাবলী চরিত-এ কলকাতায় ইংরেজরা বসতি স্থাপন করার পরেও আলিবর্দি খাঁ-র সময়, ভাগীরথী তীরের অন্যান্য পরগনার সঙ্গে কলকাতাও কৃষ্ণচন্দ্রের জমিদারির অন্তর্গত ছিল বলে দাবি করা হয়। রাজপরিবারের জবানিতে ‘রাজরাজেশ্বরী’-র পূজা ভবানন্দ মজুমদার-এর সময় (১৬০৩) থেকেই হয়ে আসছে। রাজধানী কৃষ্ণনগরে পূজার প্রামাণ্য সময় ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দ ধরা যেতেই পারে। গোয়াড়ি অঞ্চলের গোলাপট্টি বারোয়ারিতে এখনও শ্রাবণ মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথিতে প্রায় আড়াইশো বছরের পুরোনো ‘মহিষমর্দিনী’ পুজো হয়, যে প্রতিমায় দেবী ও মহিষাসুরের সঙ্গে লক্ষ্মী-সরস্বতী-কার্তিক-গণেশ থাকেন না, থাকেন দুই সখী, জয়া-বিজয়া, সেকালের প্রধান বাণিজ্য পথ অর্থাৎ নদীপথে ভরা- বর্ষায় নৌকাডুবি না-হওয়ার কামনায় এই পুজো খুব জাঁকজমক করে হত। কালনাতেও এই পুজো চালু আছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য কলকাতার প্রথম বারোয়ারি বা সর্বজনীন পুজো হয় সবে মাত্তর ১৯২৩-এ, সিমলা ব্যায়াম সমিতিতে, মতান্তরে ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাটে ‘সনাতন ধর্মোৎসাহিনীসভা’-য় ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে। তার আগে যত কলকাতার বাঙালির পুজোর গল্প সবই পারিবারিক, সে তো এক কথায় অসাধারণ ধর্মাচরণের নমুনা। যার তুলনা কোথাও খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। সে ইতিহাসের আলোচনা পুরোনো কলকাতার কথা উঠলেই আলোচিত হয়। ১২৩৬ সালের ২ কার্তিক ‘সমাচার দর্পণ’ লিখছে, “সমারোহপূর্ব্বক এই উৎসবকরণ অল্পকাল হইয়াছে এবং তাহা প্রায় কেবল বঙ্গদেশেই হইয়া থাকে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় প্রথমতঃ এই উৎসবে বড় জাঁকজমক করেন এবং তাঁহার ব্যাপার দেখিয়া ক্রমে ২ ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টের আমলে যাঁহারা ধনশালী হইলেন তাঁহারা আপনাদের দেশাধিপতির সমক্ষে ধনসম্পত্তি দর্শাইতে পূৰ্ব্বমত ভীত না হওয়াতে তদ্দৃষ্টে এই সকল ব্যাপারে অধিক টাকা ব্যয় করিতেছেন।” পরিষ্কার বোঝা যায় দুর্গাপুজোটাও বাঙালির ইতিহাসে আমাদের কৃষ্ণনগর নদীয়ার অবদান। যা দেখেশুনে কলকাতার জাঁকজমক, বাইজি নাচ-গান, গাঁজা-গুলি- মদ-মাংসের ফোয়ারা, সাহেব-সুবোদের নেমন্তন্ন করে নরক গুলজার, আর তাই নিয়ে বাবুতে বাবুতে রেষারেষির ইতিহাস।
ইংরেজ পরিচালিত সংবাদপত্রগুলি সাহেবদের নেটিভবাড়ি গিয়ে তাদের সঙ্গে মেলামেশা ও আমোদ-প্রমোদে মত্ত হওয়া একেবারে পছন্দ করতেন না। ‘ক্যালকাটা গেজেট’ (৯. ১০. ১৮২৬) লেখেন—”দুর্গাপূজার সময় মুসলমান বাইজী দিয়ে নাচ-গান ও ইংরেজ অতিথিদের তোষণের অত্যধিক আগ্রহ গোমাংস ও বিয়ার খাওয়ানো দেবী দুর্গার অর্চনার সঙ্গে একেবারে মিলনক্ষম নয়, বরং পরস্পরবিরোধী বলে মনে হয়।” (দেবদেবীর কথা ও কাহিনী, সুধীরকুমার মিত্র, পৃ ১৭৩)
আসলে ইংরেজ লেখকেরা বুঝতেই পারেননি, আমাদের আলোচ্য দেবী শাস্ত্রমতেই মদ্য-মাংস প্রিয়া। আর ইন্দ্রাদিকে ডেকে যজ্ঞ-ভাগ মদ মাংস খাওয়ানো, আশীর্বাদ হিসাবে ‘এই দাও’ ‘ওই দাও’ তো সাক্ষাৎ বেদ অনুসারী, ঋকবেদের গোটা নবম মণ্ডল সাক্ষী। মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ও দেবী ঢকঢক করে মদ গিলছিলেন, সেকথা চণ্ডীপাঠে এখনও বলা হয় –
“ততঃ ক্রুদ্ধা জগন্মাতা চণ্ডিকা পানমুত্তমম্ পপৌ পুনঃ পুনশ্চৈব জহাসারুণলোচনা।।
[…] মদোদ্ধৃতমুখরাগাকুল। গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ় মধু যাবৎ পিবাম্যহম”
নাগোজীভট্টের টীকা আছে, মহিষের শিবাবতারত্বহেতু জায়মান দয়াবিচ্ছেদের জন্য দেবীর মদ্যপান!
শ্রীমতী ফ্যানি পার্কস নামক এক ইংরেজ মহিলা তাঁর স্মৃতিকথায় (অক্টোবর ১৮২৩) দুর্গাপুজোর নিমন্ত্রণের অভিজ্ঞতা লেখেন, “পূজা মণ্ডপের পাশের একটি বড় ঘরে নানা রকমের সব খাদ্য দ্রব্য প্রচুর পরিমাণে সাজানো ছিল। সবই বাবুর ইউরোপীয় অতিথিদের জন্য বিদেশী পরিবেশক ‘মেসার্স গান্টার অ্যাণ্ড হুপার’ সরবরাহ করেছিলেন। খাদ্যের সঙ্গে বরফ ও ফরাসী মদও ছিল প্রচুর। মণ্ডপের অন্য দিকে বড় একটি হলঘরে সুন্দরী সব পশ্চিমা বাইজীদের নাচ-গান হচ্ছিল এবং ইউরোপীয় ও এদেশী ভদ্রলোকেরা সোফায় হেলান দিয়ে, চেয়ারে বসে সুরা সহযোগে সেই দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। বাইরেও বহু সাধারণ লোকের ভিড় হয়েছিল বাইজীদের গান শোনার জন্য। গানের হিন্দুস্থানী সুর সমাগত লোকজনদের আনন্দে মাতিয়ে তুলেছিল।” (সুতানুটি সমাচার)
গত কয়েকবছর ধরে মহরম আর দুর্গাপুজোর ভাসান একই দিনে হওয়া নিয়ে গোলমাল পাকানোর অনেক রাজনৈতিক ফিকিরের সাক্ষী আমরা, কিন্তু মুসলমান বাইজিদের না-পেলে কলকাতার দুগ্গাপুজোর ফুত্তি এককালে পুরো ঝুলে যেত। ১১২৭ সালে দুর্গাপূজার সময় মুসলমানদের মহরম পড়েছিল বলে কোনো বাইজি উৎসবে যোগদান করেননি। ‘সমাচার দর্পণ’-এ (২১ অক্টোবর ১৮২০) প্রকাশিত হয়েছিল, “দুর্গোৎসব।। এইবার মোং কলিকাতাতে দুর্গোৎসবে নাচ প্রায় কাহারও বাড়িতে হয় নাই তাহার কারণ এই মুসলমান লোকেদের মহরম প্রযুক্ত বাই লোক প্ৰায় নাচ প্রভৃতি করে নাই!”
বাঙালির দুর্গাপুজো শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ধর্ম ছাপিয়ে, উৎসব, আমোদ, কার্নিভাল। সেখানে যোগদানের ক্ষেত্রে জাতি- ধর্ম বিভাজন কখনই ছিল না, আজও নেই। পৃথিবীতে কোনো দেশের কোনো ভাষায় নজির নেই একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর হাজার হাজার পত্রপত্রিকা, সংবাদপত্র একসঙ্গে তাদের শারদীয় উৎসব সংখ্যা বের করে পাঠককে সাহিত্যের মহাভোজে আমন্ত্রণ করে! যাবতীয় বেলেল্লাপনা সহযোগে এটিও একান্তভাবে বাঙালি কালচারের অন্তর্ভুক্ত।
এই বাঙালির পূর্বপুরুষ মুসলমান শাসনে বসবাসকারী কৃত্তিবাস ওঝা কেন বাংলা রামায়ণ-এ তথাকথিত বিষ্ণু- অবতার রামের মহিষাসুরমর্দিনীর অকাল বোধনের কাহিনি অন্তর্গত করতে গেলেন কেনই-বা শৈব ব্রাহ্মণ রাবণকে দিয়ে অম্বিকা আরাধনা করালেন কে জানে! তার কারণ অনুসন্ধানে অনুমান-প্রমাণ পন্থা নিতে হবে, প্রথমত রাবণের প্রতি দ্রাবিড় ও অস্ট্রিক কৃষ্টি কুলাচারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বঙ্গজনের স্বভাবজ সহমর্মিতা (‘ঘরশত্রু বিভীষণ’, ‘যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ’, এসব প্রবচনের নিহিতার্থ বিশ্লেষণ করলে যা দেখা যায়। ছোটোবেলায় দু-কানে আঙুল দিয়ে রাবণের জ্বলন্ত চিতার শব্দ শোনেনি এমন বাঙালি বিরল)। দ্বিতীয়ত বীর রাজা রাবণ কিছু ব্রাহ্মণাচরণ পালন করা সত্ত্বেও ভয়ানক অপরাধ থেকে বিরত হচ্ছেন না, তাঁর নিজস্ব নীতিবোধ ও ন্যায়পরায়ণতা তাঁকে ব্রাহ্মণত্ব হতে বিচ্যুত করছে কবিমানসের এমত ব্যক্তিগত ধারণা। সূর্পনখার সঙ্গে রামলক্ষ্মণের বাজে খিল্লি ও তারপর অপ্রয়োজনীয় মাত্রাতিরিক্ত সহিংস ব্যবহার বাল্মীকি লিখিত, কৃত্তিবাস সেটি বদলাননি, রাজার ভগিনীর প্রতি দুই অনুপ্রবেশকারীর এই অন্যায় আচরণ রাজা যদি তাঁর রাজত্বে বরদাস্ত করেন তাহলে আর যাই হোক রাজত্ব রক্ষা করা যায় না, রাবণ কেন সীতাহরণ করেন বা আদৌ করেছিলেন কিনা (ছায়াসীতা দ্র) সে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ, হরণের পর যে কারণেই হোক কোনো অসৎ ব্যবহার করেননি।
উত্তর ভারতীয় বা আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে বেদবিরোধী বৌদ্ধধর্ম গ্রহণকারী অধিকাংশ বাঙালি, বৈদিক যজ্ঞ ছেড়ে পুজো-পাঠরত বাঙালি বামুন, আরাধনা অঞ্জলিতে বিশ্বাসী বাঙালি, শৈব-শাক্ত সাধক তান্ত্রিক বাঙালি, তান্ত্রিক বৌদ্ধ বনে যাওয়া বাঙালি, বৌদ্ধ থেকে ধর্মান্তরিত ‘নেড়ে’ মুসলমান, হিন্দু অন্ত্যজ জাতি থেকে ধর্মান্তরিত ‘খড়ে’ মুসলমান বাঙালি, পাঠান রাজত্বে স্বস্তিতে বসবাসকারী হিন্দু বাঙালি, যারা উত্তর ভারতীয় হিন্দু রাজাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পাঠান গৌড়েশ্বরদের সহায়তা করেন, পীরকে সত্যনারায়ণ বানিয়ে দেওয়া বাঙালির প্রতিভূ হিসেবে কৃত্তিবাস ওঝা রাবণের এই রাম-ভক্তির আখ্যান আপন কর্তব্যবোধে বাংলা রামায়ণ-এ অন্তর্ভুক্ত করেন। আর একটা অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে, পাঠান আমলে বাংলার সম্পদ বাংলাতেই থাকত, মোগল আমলের মতো দিল্লিতে বা ইংরেজ আমলের মতো ইংলন্ডে চলে যেত না, এছাড়া পাঠান রাজারা প্রায় বাঙালি হয়ে গেছিলেন, তাঁরা সাহিত্য সংস্কৃতিতে উৎসাহ দান করতেন। এই সময়ে অজস্র নিম্নশ্রেণির হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলাম গ্রহণ করেন তা মূলত জাতিভেদের বামনাই সামাজিক অত্যাচারে, পাঠান অত্যাচার বা জোর করে ধর্মান্তরিতকরণ তার চেয়ে ঢের কম ছিল। এখন সে ইতিহাসকে ধামাচাপা দেবার, মিথ্যাকে সত্য বলে চালাবার প্রচেষ্টা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হবে, যা ঊনবিংশ শতকেও ঘটেছে। কিন্তু সে সমস্তের বিপরীতে একা শ্রীচৈতন্যের জীবন কাহিনি যথেষ্ট। কৃত্তিবাস চৈতন্যপূর্ব মানুষ তাঁর রামভক্তি ও বাল্মীকি থেকে বিচ্যুতিতে সামান্য হলেও মুসলমানি প্রভাব আছে, বৈরিতা নেই। সুকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে কৃত্তিবাসের জন্ম ১৪৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি, মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমী রবিবার ১৪৫৯ থেকে ১৪৭৬-এর মাঝে কৃত্তিবাস রুকনুদ্দিন বারবক শাহ-র সভায় যান (ভারবি প্রকাশিত কৃত্তিবাস বিরচিত রামায়ণ, ভূমিকা) কৃত্তিবাসের রামায়ণ মোটামুটি দ্রাবিড় ভক্তিবাদী বৈষ্ণব (আলওয়ার) ভাবধারায় বিরচিত। যে বামুনেরা কৃত্তিবাস কাশীরামকে দেবভাষা হতে রামায়ণ মহাভারত-এর বাংলা অনুবাদের পাপে রৌরব নরকে স্থান নির্দেশ করেছিলেন- তাদের পক্ষাবলম্বন নিশ্চয়ই সম্ভব ছিল না। ধর্মীয় ধারণায় এই বহিরাগত বামনাই মনোভাব বোঝা যাবে অনেক পরে ব্রিটিশের আর্য আক্রমণ তত্ত্বে বাঙালি বিদ্বানদের অতিউৎসাহী সহযোগে।
অষ্টাদশ পুরানাণি রামস্য চরিতানি
ভাষায়ং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।।
পরবর্তী কালে,
কৃত্তিবেশে কাশীদেসে আর বামুনঘেঁষে
এই তিন সর্বনেশে।
‘ক্যালকাটা রিভিউ’, ভল্যুম ১৩, (জানুয়ারি-জুন ১৮৫০) পৃ ৪৮-এ দেখা যাবে বাঙলা রামায়ণ সম্পর্কে বলা হচ্ছে—“Its stories are more offensive, its language more indecent, than in the original; and the whole is tainted with an air off downright vulgarity, which would have made Valmiki turn aside in disgust.”
১৮৮১ নাগাদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃত কলেজের এক পণ্ডিত “জয়গোপাল তর্কালংকার কৃত্তিবাসী রামায়ণ ও কাশীদাসী মহাভারত-এর উপর কলম চালিয়ে, তাদের থেকে ‘অশ্লীল’ কথা বাদ দিয়ে তাদের বিশুদ্ধ সংস্করণ বার করেছিলেন।” (সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান, ২০১৩, অনুষ্টুপ, পৃ ২৭২)
লক্ষণীয় বিষয়টি হল, বাংলা রামায়ণ মহাভারত অধিকাংশ মঙ্গলকাব্য পাঠান রাজাদের ছত্রছায়ায় বসে লেখা হচ্ছে। কেন? মছলিখোর বাঙালির বাসস্থান বঙ্গদেশ, যেখানে পা রাখলেই আর্যাবর্তবাসীদের জাত যায় পৌরাণিক সময় থেকে, তারা তো আর্যাবর্তের ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে অগ্রসর করতে চাইতে পারে না, করেওনি।
বাঙালি মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যকে স্মরণ করে সমগ্র নদিয়াবাসী আজও একটি শব্দ অসচেতনে অনর্গল উচ্চারণ করে, ‘ন্যাকা চৈতন্য’, কেন-না বিষ্ণুর দশ অবতারের প্রায় সকলেই এসেছেন যুদ্ধে ত্রিভুবনেশ্বর শৈব রাজাদের বা তথাকথিত দৈত্য রাক্ষস যাদের প্রতাপে দেবতারা স্বর্গের আধিপত্য হারিয়েছেন, তাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ করতে এবং যা-তে বল-এর সঙ্গে সঙ্গে ছলনা ও কৌশল ব্যাপক ব্যবহৃত, কোনো অবতারত্ব সেখানে কাজ করেনি। পুরাণকে মোটামুটি পাঁচ ভাগে ভাগ করা চলে, বৈষ্ণব শৈব গাণপত্য সৌর এবং শাক্ত, বিষ্ণুপুরাণের সবই যুদ্ধকাহিনি, আমাদের দুই মহাকাব্যের নায়করা বিষ্ণুর অবতার। যে কৃষ্ণ সমগ্র ভারতকে প্রায় পুরুষশূন্য করে তুললেন ধর্মযুদ্ধের নামে সেই কৃষ্ণকে বংশীধারী প্রেমের রাজা গোবিন্দ সাজিয়ে, যাঁকে পূজা করলেই নাকি সব দেবতার আরাধনা হয়ে যাবে, প্রচারকারী কিনা দুর্দান্ত নিমাই! যার পূর্বাশ্রমে পড়াশোনার খ্যাতি ছিল মুখ্য, ক্ষুরধার তার্কিক, তাঁর এই মতপ্রচার! তা-ও আবার
পাক্কা এযুগের মিছিলের ধাঁচে, কাজী-র বাড়ি ঘেরাও করে, যবন শিষ্য নিয়ে, মেরেছ কলসির কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না মার্কা স্টাইল, পরবর্তীকালের বাঙালি কৃষ্ণনাগরিকের কাছে ন্যাকা-চৈতন্যপনা মনে হওয়া স্বাভাবিক। ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা মানবিক নব বৈষ্ণব ধারার প্রবর্তককে খুন করা হয় পুরীর মন্দিরে, তিনি মারা যেতেই বামুন বৈষ্ণবেরা নিজেদের জাত্যভিমান তুঙ্গে তুলে ধরেন, বাকিরা হয়ে যায় স্রেফ বোস্টম। কৃষ্ণনগরের রাজপরিবার বামুন, তাঁরা চৈতন্যকে অবতার বলে স্বীকার করেননি, এই রাজপরিবারের ভবানন্দ মজুমদার রাজা হয়েছিলেন জাহাঙ্গিরের সেনাপতি মানসিংহকে প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা ও সৈন্যসংগ্রহ করে দিয়ে। (যদিও ‘প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলাম খাঁর আমলে প্রতাপাদিত্যের পতন ঘটেছিল ‘ যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী, আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় নদীয়া, পৃ ২০) তিনি মোটামুটি ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা উপাধি ও নদিয়াসহ ১৪টি পরগনার জমিদারি পান। তাঁরা নাকি ভট্টনারায়ণের বংশধর। কনৌজাগত পাঁচঘর বামুনের এক বামুন, যিনি নাকি প্রভূত ধন- সম্পত্তি সঙ্গে করে এনেছিলেন! যাঁর ষোলো পুত্রের একজন বরাহ বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি, যিনি বেণীসংহার কাব্য লেখেন আর একজন নিপু, যিনি এই বংশের পূর্বপুরুষ। তাঁরা বৈষ্ণব, তাই সুযোগ্য উত্তরসূরি বাংলা সংস্কৃতিতে প্রায় বিক্রমাদিত্যের মতো যশস্বী কৃষ্ণচন্দ্র রায়, যিনি প্রামাণ্যভাবে দুর্গাপূজাকে বাঙালির প্রধান ইভেন্ট বানাবার হোতা, তাঁদের প্রাসাদের প্রতিমা ‘রাজরাজেশ্বরী’-র বাহনের মুখ সিংহের নয়, ঘোড়ার বা ঘোটকের। কারণ সিংহ অর্থাৎ হিংস্র, তাঁরা অহিংসাবাদী বৈষ্ণব!! ধর্মবিশ্বাস জিনিসটা এতই গোলমেলে আর অযৌক্তিক যে, কোনো কথা আলোচনা করলেই একদল লোকের বিশ্বাসে আঘাত লাগে, আর যেটা নাকি কোনো ভদ্র শিক্ষিত মানুষের ভারতীয় সংবিধান অনুসারে একদম করা উচিত নয়।
কিন্তু কী করা যাবে এই যে ‘ভদ্র’ শব্দটা লিখলাম, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধান খুলে দেখুন, আপনার জানা অর্থগুলির পর মনুসংহিতাকে দ্রষ্টব্য করে হরিচরণ লিখছেন, ‘কল্যাণাচারে যাহার পাপ প্রচ্ছন্ন অর্থাৎ যে গোপনে পাপ করে ও বাহিরে সদাচারে তাহা প্রচ্ছন্ন রাখিয়া পরধন গ্রহণ করে, তাদৃশ ব্যক্তি’। এর বাস্তব প্রয়োগ একমাত্র শুনতে পাবেন ডোমেস্টিক হেলপ-এর “ভদ্দরনোক! হুঁহু”, বাক্যে। হরিচরণ ‘মহিষাসুর শব্দের অর্থে কোনো জটিলতায় যাননি, শুধু লিখেছেন, ‘মহিষ নামক অসুর’। এইসূত্রে এবার মহিষাসুরের খোঁজে এক আজব অভিধান অভিযানে যাওয়া যাক, কলিম খান রবি চক্রবর্তীর বাংলা শব্দার্থকোষ, বাংলা ভাষার ‘ক্রিয়াভিত্তিক – বর্ণভিত্তিক শব্দার্থের অভিধান’, যাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় সেই কোন কালে ‘অপর’ পত্রিকার সৌজন্যে। ওই অভিধানে মহিষাসুর এন্ট্রির সামান্য অংশ তুলে দিলাম— “শব্দের ভিতরে যথার্থ ইতিহাসের পদচিহ্ন থাকে। সেই পদচিহ্ন দেখতে পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয় এবং সেই পদচিহ্ন ধরে ধরে এগিয়ে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। তাহলেই বহু অজানা ইতিহাসও ক্রমে চোখের সামনে দৃশ্য হতে থাকে। সেই যোগ্যতার অতি সামান্য আমাদের কপালে এখন পর্যন্ত জুটেছে। আমরা যেটুকু বুঝেছি, সেটুকু অতি সংক্ষেপে বলি। ব্যাপারটি এইরূপ—বৈদিক-পূর্ববর্তী মহান যুগ বা সনাতন যুগটি ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সেখানে দু-ধরনের পুরুষ ও নারী ছিলেন— মহিষ ও মহিষী এবং মহিল ও মহিলা। সমাজের পরিচালিকা নারীদের বলা হত মহিষী এবং তাদের সহযোগী নরদের বলা হত মহিষ আর সাধারণ অনুগামী নারীদের বলা হত মহিলা এবং তাদের সহযোগী নরদের বলা হত মহিল। এই মহিলা ও মহিলদের সংখ্যাই ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। মহিষীদের সহযোগী নরদের স্বভাব ছিল মহিষ বা ‘কাঁড়া’র মতো, সমাজ পরিচালনার বোঝা বইতেন এঁরাই, এঁরাই ছিলেন মানবজাতির আদি নেতা, এঁরাই ধর্ম্ম (সামাজিক রীতিনীতি) সৃষ্টি করতেন এবং সেই ধর্ম্ম রক্ষা করতেন এঁরাই, এঁরাই ছিলেন আদি শিব, সনাতন শিব, মহান-শিব। বৈদিক যুগের সূচনার পরে ধর্ম রক্ষার দায়িত্ব চলে যায় যমের (= বিচারালয়ের) হাতে। স্বভাবতই তার বাহন হয়ে যায় মহিষ বা দেশনেতাগণ, যাঁরা জলে (জনগণের ভিতরে ও জনসমর্থনের ভিতরে) ডুবে থাকেন, জলকে আন্দোলিত করেন, জনগণকে নিয়ে আন্দোলন করেন এবং জলে (জনসমর্থনের ভিতরে) ডুবে না-থাকলে এদের শরীর গরম হয়ে যায়, মাথা গরম হয়ে যায়। এরাই লোকসভা-বিধানসভায় গিয়ে আইন বা ধৰ্ম্ম সৃষ্টি করেন, সবাই যাতে সেই ধৰ্ম্ম পালন করে, সেদিকে নজর রাখেন। আর, সনাতন-শিব যতিধৰ্ম্ম গ্রহণ করে সামাজিক উৎপাদন কর্মযজ্ঞ থেকে সরে দাঁড়ান, তার বাহন বৃষ বা ষাঁড় মালিকহীন হয়ে বনে-বাদাড়ে মাঠে-ময়দানে ঘুরে বেড়াতে শুরু করে।” প্রসঙ্গত উল্লেখ থাক এই অভিধানে বিষ্ণু অর্থ ক্যাপিটালিস্ট বাণিজ্যবাদী। স্মর্তব্য ক্যাপিটালের প্রথম খণ্ডে মার্কসের বাক্যটি— “ Enough, that the world still jogs on, solely through the self-chastisement of this modern penitent of Vishnu, the capitalist.”
বিভিন্ন পুরাণ পর্যালোচনায় আমরা দেখতে পাই, যে অসুর স্বর্গরাজ্য দখল করেননি, পৌরাণিক ইতিহাসে তাঁর নাম নেই, তাঁদের অত্যাচারের কথার কোনো উল্লেখও পুরাণে নেই। সাধারণত একটা কারণেই অসুরেরা নিন্দিত হয়েছেন- স্বর্গ রাজ্যে হানা দেওয়া। সে নিন্দাও প্রায় একই রকম, তাদের অত্যাচারে ত্রিভুবন অতিষ্ঠ, দেবতারা স্বর্গ থেকে বিতাড়িত, ব্রাহ্মণের যাগযজ্ঞ নাশ, ইত্যাদি। ব্রাহ্মণের যজ্ঞের ভাগ যেহেতু দেবতারা পেতেন, তাই দেবতারা স্বর্গচ্যুত হলে ব্রাহ্মণের যজ্ঞনাশ হত। এর মধ্যে কোনোটা অত্যাচার হতে পারে না। দেবতাদের দলবদ্ধ হয়ে বিষ্ণুর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে যাওয়ার জন্য এটা বানানো ছুতো। ব্রহ্মা বিষ্ণু ও শিব, এই তিনজন দেবাসুরের বিবাদের ঊর্ধ্বে ছিলেন। অসুরেরা তপস্যায় এঁদের তুষ্ট করে বর লাভ করতেন এবং স্বর্গ থেকে বাহুবলে দেবতাদের বিতাড়িত করতেন। তারপর দেবতারা নিজেদের বাহুবলে নয়, পৃথিবীর পালনকর্তা বিষ্ণুর সাহায্যে কৌশলে হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধার করতেন। পিতামহ ব্রহ্মাকে দেবতারা বোঝাতেন যে অসুররা বড়ো অত্যাচারী হয়ে উঠেছে, আর দেরি করলে সৃষ্টি রসাতলে যাবে, ব্রহ্মা তখন দেবতাদের বিষ্ণুর কাছে নিয়ে যেতেন। বেদ ও পুরাণের অসুরেরা ধর্মবিদ্বেষী বা অত্যাচারী বলে চিহ্নিত হয়েছেন, কিন্তু এঁরা বলবীর্যবান, সচ্চরিত্র, সরল বিশ্বাসী, তপস্বী, সাধনায় সিদ্ধিলাভকারী। ছলনা বঞ্চনা তাঁরা ঘৃণা করেছেন, বিপদ বরণ করেছেন দলবদ্ধ হয়ে। তারপর দেবতা ও মানুষের সঙ্গে নিরন্তর সংঘর্ষে পৃথিবী থেকে অবলুপ্ত হয়ে গেছেন। আজ যাঁদের নাম বেঁচে আছে সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মিথ্যা নিন্দা। সুবোধকুমার চক্রবর্তী শাশ্বত ভারত:অসুরের কথা-য় লেখেন, “যে যুগে দেবতায় ও অসুরে কোন প্রভেদ ছিল না, সে যুগ গত হয়ে গেছে। সত্য যুগের অসুরদেরও আমরা নিন্দা করতে পারি না। তাদের ধর্ম ছিল, ধর্ম জ্ঞান ছিল গভীর। শিবের তপস্যার কথা জানি, ব্রহ্মাও তপস্যা করতেন। কিন্তু সাধারণ দেবতাকে তপস্যা করতে দেখিনি, তারা মানুষের যজ্ঞে হবির ভাগ নিতে আসতেন। কিন্তু তপস্যা করেছে অসুরেরা, দৈত্য দানব রাক্ষসেরাও তপস্যায় বল সঞ্চয় করেছে। ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের কৃপা লাভের যোগ্যতা লাভ করেছে কঠোর তপস্যায়। এদের আমরা নিন্দা করতে পারি না। এরা শক্তিতে স্মরণীয়, ভক্তিতে বরণীয়, নমস্য এরা। তারপর এক দিন রাক্ষস নামের সঙ্গে নিন্দা জড়িয়ে গেল। কোন গুরুতর কারণের জন্য যে নয় তাতে সন্দেহ নেই। পুরাণকারদের সক্রিয় চেষ্টাতেও যাঁরা নিন্দার পাত্র হননি, তারা সাধারণ মানুষের কাছে ধীরে ধীরে অশ্রদ্ধার পাত্র হয়ে গেলেন। কী করেছিলেন রাক্ষসেরা! ব্রাহ্মণের যজ্ঞ নষ্ট! দেবতারা করেননি! দেবরাজ ইন্দ্রের অত্যাচারে কি ঋষিরা কখনও নির্বিঘ্নে তপস্যা করতে পেরেছেন! রাক্ষসেরা রক্ত মাংস ছিটিয়েছেন যজ্ঞ স্থলে, আর দেবরাজ অল্পবা পাঠিয়েছেন ঋষির তপোভঙ্গের জন্য। ছলনা বঞ্চনা চরিত্রহীনতায় অসুরেরা দেবতাদের মতো পারদর্শী ছিলেন না। তবু আজ দেবতারা আমাদের পূজ্য, আর অসুররা হয়েছেন নিন্দার পাত্র”। (পৃ ১৩২)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন