ঝুনঝুন প্রাসাদের ছায়ামূর্তি

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

‘ওটাই কি চিতোরগড়?' প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দূরে পাহাড়ের মাথায় থাকা কেল্লাটা দেখিয়ে পার্থ জিগ্যেস করল অনিকেতকে।

অনিকেত তাকিয়ে ছিল সেদিকে। সূর্যের আলোয় ভোরের কুয়াশা কেটে গিয়ে ফুটে উঠেছে এক প্রাচীন কেল্লার চেহারা। অনিকেত বলল, 'হ্যাঁ, ওটাই হবে। কত শুনেছি ওই কেল্লার গল্প। দূর থেকে দেখেই কেমন যেন রোমাঞ্চ হচ্ছে। ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে। রাজপুতদের সংগ্রামের ইতিহাস প্রায় সবটাই ওই কেল্লাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল।'

পার্থ বলল, 'সত্যি, কেল্লাটা দেখে তোর মতো আমারও রোমাঞ্চ হচ্ছে।'

অনিকেত হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল। সাড়ে ছ'টা বাজে। পার্থকে বলল, 'চল, এবার প্ল্যাটফর্মের বাইরে যাওয়া যাক। বাইরে বেরিয়ে আগে টিফিন করে নেব, তারপর একটা হোটেল খুঁজে সেখানে স্নান করে কেল্লা দেখতে যাব।

পার্থ মাটিতে নামিয়ে রাখা সুটকেসটা তুলে নিয়ে বলল, 'হ্যাঁ চল, এবার এগোনো যাক।'

দুজনে হাঁটতে শুরু করল প্ল্যাটফর্মের বাইরে যাওয়ার জন্য। গত কাল রাতে জয়পুর থেকে লেকসিটি এক্সপ্রেস ধরে ভোররাতে চিতোরগড়ে এসে পৌঁছেছে। দুদিন চিতোরে থেকে উদয়পুরে চলে যাবে। কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে ক'দিন আগে এবং তারপরেই কলকাতা থেকে রাজস্থান বেড়াতে এসেছে তারা। তবে সম্পূর্ণ রাজস্থান নয়, এ যাত্রায় জয়পুর, চিতোরগড়, উদয়পুর, এই কয়েকটা জায়গা তারা ভালো করে ঘুরতে চায়।

নিজেদের লাগেজ নিয়ে প্ল্যাটফর্মের বাইরে এসে দাঁড়াল। সামনের চত্বরটা পাথর দিয়ে বাঁধানো। তার শেষ মাথায় বেশ কিছু দোকানপাট চোখে পড়ল ওদের। টুরিস্ট সিজন হলেও প্ল্যাটফর্মের বাইরে খুব বেশি লোকজন চোখে পড়ল না। বেশিরভাগ টুরিস্টই বাসে চেপে কন্টাকটেড টুরে রাজস্থানে আসে। তাই এই ছোট-ছোট স্টেশনে তেমন ভিড় থাকে না। চত্বরটার একপাশে বেশ কয়েকজন টাঙাওয়ালা দাঁড়িয়ে ছিল। অনিকেতরা প্ল্যাটফর্মের বাইরে পা রাখতেই তারা ছুটে এসে ঘিরে ধরল দুজনকে। তাদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনিকেত বলল, 'টাঙা তারা নেবে না, তাদের নিতে লোক আসবে।'

টাঙাওয়ালারা ফিরে যাওয়ার পর অনিকেত পার্থকে চত্বরের শেষ মাথার দোকানগুলো দেখিয়ে বলল, 'ওখানে নিশ্চয়ই খাবারের ব্যবস্থা আছে, আগে খেয়ে নিই। তারপর কাছাকাছি কোনও হোটেল বা ধর্মশালা খুঁজব। না পাওয়া গেলে তখন না হয় টাঙা নিয়ে হোটেল খুঁজব।'

পার্থ বলল, 'ঠিক আছে।'

চত্বরটা পেরিয়ে দোকানগুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই একটা খাবারের দোকান চোখে পড়ল। দোকানের সামনে বিরাট কড়াইতে পুরি ভাজা হচ্ছে। ঘিয়ের গন্ধে ম-ম করছে তার চারপাশ। দুজনে গিয়ে ঢুকল দোকানের ভিতর। কাঠের চেয়ার টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে বেশ কয়েকজন খাচ্ছে। পোশাক দেখে মনে হয় তারা স্থানীয় মানুষ। অনিকেতরা একটা টেবিলে বসে চারটে করে পুরি আর চায়ের অর্ডার দিল। দোকানের লোক খাবার দিয়ে যাওয়ার পর খেতে-খেতে পার্থ অনিকেতকে বলল, 'দেখে মনে হচ্ছে জায়গাটা এখনও খুব বেশি ডেভেলপ করেনি। চারপাশ বেশ ফাঁকা-ফাঁকাই আছে। স্টেশন চত্বর, অথচ বড়-বড় বাড়ি ঘর নেই।'

অনিকেত বলল, 'আমার তো মনে হয় এরকমই ভালো। ঐতিহাসিক জায়গাগুলোয় আকাশচুম্বী চোখ ধাঁধানো বাড়ি-ঘর থাকলে স্থানমাহাত্ম্য কেমন যেন নষ্ট হয়ে যায়। পুরোনো-পুরোনো গন্ধটা ঠিক পাওয়া যায় না।'

পার্থ বলল, 'তবে টুরিস্ট যখন আসে তখন বড় হোটেল টোটেল নিশ্চয়ই এখানে আছে।'

অনিকেত বলল, 'তা তো বটেই, সেগুলো হয়তো কেল্লার কাছাকাছি বা অন্য কোথাও হবে।'

এরপর অনিকেত গরম চায়ের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, 'যদি হোটেল বা ধর্মশালায় না থেকে কেল্লার ভিতর রাত কাটানো যায়, তা হলে দারুণ হয়। আমার পরিচিত একজন একবার রাজস্থানের এক প্রাচীন কেল্লায় রাত কাটিয়েছিলেন। তাঁর মুখ থেকে গল্প শুনেছি, সে নাকি এক আশ্চর্য অনুভূতি।'

পার্থ জিগ্যেস করল, 'আমরা সেরকম কোনও ব্যবস্থা করতে পারি না?'

অনিকেত বলল, 'কেল্লার ভিতর সাধারণত কোনও হোটেল থাকে না। আর যেসব মানুষ কেল্লায় বসবাস করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই অপরিচিত মানুষজনকে নিজেদের বাড়িতে ঠাঁই দেবেন না। কাজেই ইচ্ছে হলেও আমাদের সে সুযোগ নেই।'

অনিকেতের কথা শুনে পার্থ কী যেন তাকে বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যে একটু দূর থেকে এক ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন, 'আপনারা কি কলকাতা থেকে আসছেন?'

পার্থ তাকিয়ে দেখল, ঘরের কোনার এক টেবিল থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের চুল প্রায় সব সাদা, চোখে পুরোনো ধরনের গোল ফ্রেমের চশমা, পরনে ধুতির উপর চাদর জড়ানো। টেবিলের নিচ থেকে উঁকি মারছে তাঁর সাদা কেডস পরা পা দুটো। ভদ্রলোকই যে প্রশ্নকর্তা তা বুঝতে অসুবিধে হল না পার্থর। সে বলল, 'হ্যাঁ, আমরা কলকাতা থেকে আসছি।'

'বেড়াতে নিশ্চয়ই?' ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন।

এবার অনিকেত বলল, 'হ্যাঁ, বেড়াতে।' তারপর সে জিগ্যেস করল, 'আপনিও বেড়াতে নাকি?'

ভদ্রলোক বললেন, 'না, আমি এখানেই থাকি। এখানেই আমার পাঁচ পুরুষের বাস।'

তাঁর কথা শুনে পার্থ বলল, 'তা হলে আপনি বাঙালি না রাজস্থানী?'

ভদ্রলোক হেসে বললেন, 'সরকারি কাগজপত্রে আমি রাজস্থানী, কিন্তু আসলে আমি বাঙালি। আর সেই জন্যেই তো আপনাদের দেখে আমি বাংলায় কথা বলার লোভ সামলাতে পারলাম না।'

অনিকেত জিগ্যেস করল, 'আপনি তো পুরুষানুক্রমে এখানকার বাসিন্দা বললেন। এখানে তো স্থানীয় ভাষায় নিশ্চয়ই আপনাকে কথাবার্তা বলতে হয়? তা হলে আপনি এত ভালো বাংলা বলেন কীভাবে?'

ভদ্রলোক বললেন, 'আমার ঊর্ধ্বতন চতুর্থ পুরুষ পূজারি ব্রাহ্মণ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে একসময় চিতোরে এসেছিলেন। তাঁর আমল থেকে আমরা বংশানুক্রমিকভাবে কেল্লার এক মন্দিরের পূজারি হলেও বাড়িতে বাংলায় কথা বলার রেওয়াজটা তখন থেকে চলে আসছে। আমার মা, পিতামহীরাও সকলেই ছিলেন বাঙালি। ছেলেবেলায় আমি বাবা মার কাছ থেকে বাংলা শিখেছি। তাঁরা যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন বাড়িতে বাংলাতেই কথা হত। চিতোরে বেশ কিছু বাঙালি পরিবার আছে। যজমানির সুবাদে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে আমার। তা ছাড়া অনেক বাঙালি এখানে আপনাদের মতো বেড়াতে আসেন। তাঁদের সঙ্গে বাংলাতেই কথা হয় আমার। কাজেই ভাষাটা আমি ভুলিনি।' একটানা এত কথা বলার পর ভদ্রলোক একটু দম নিয়ে অনিকেতদের জিগ্যেস করলেন, 'তা অপনাদের কী করা হয়?'

খেতে-খেতে অনিকেত বলল, 'এখনও তেমন কিছু করি না। কলেজের শেষ পরীক্ষাটা দিয়ে এখানে বেড়াতে এসেছি। পাশ করার পর আমি চাকরি খুঁজব। আর আমার এই বন্ধুর বই ছাপাবার ব্যবসা মানে প্রকাশনা সংস্থা আছে। পৈতৃক ব্যবসা, সেই কাজেই লেগে যাবে ও।'

ভদ্রলোক এর পর জিগ্যেস করলেন, 'আপনারা ক'দিন থাকবেন এখানে? একদিন না দুদিন?'

পার্থ বলল, 'দুদিন।'

ভদ্রলোক যেন খুশি হলেন তার কথা শুনে। চাদরের খুঁট দিয়ে চশমার কাচটা মুছতে-মুছতে তিনি বললেন, 'ভালো ভালো। অন্তত দুটো দিন না থাকলে কেল্লাটাকে ভালোভাবে চেনা যায় না। হাজার বছরের প্রাচীন কেল্লা। এর প্রতিটি ইট-কাঠ-পাথরের সঙ্গে ইতিহাস জড়িয়ে আছে। খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে না পারলে জানার চেয়ে অজানাই থেকে যায় বেশি। অথচ সাধারণ পর্যটকরা মাত্র একবেলাই কেল্লা দেখে অন্য জায়গায় চলে যান।'

তাঁর কথা শুনে চায়ের গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে অনিকেত বলল, 'আমরা কিন্তু খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে সব কিছু দেখব বলে ভেবেছি, আর সেজন্যেই দুদিন থাকা এখানে।'

অনিকেতদের খাওয়া শেষ, এবার তাদের উঠতে হবে। অনিকেত টেবিল ছেড়ে উঠতে-উঠতে ভদ্রলোককে বলল, 'আমরা তা হলে এবার উঠছি। এখান থেকে বেরিয়ে আমাদের আবার হোটেল ঠিক করতে হবে। আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।'

ভদ্রলোক বলল, 'হ্যাঁ, আসুন, ভালো করে বেড়ান। তবে টাঙায় চাপার আগে ভালো করে দরদাম করে নেবেন। বাইরের লোক দেখলে অনেক সময় ওরা বেশি দর হাঁকার চেষ্টা করে।'

অনিকেত বলল, 'আচ্ছা, ধন্যবাদ।'

দোকানির খাবারের দাম মিটিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল ওরা। পার্থ জিগ্যেস করল অনিকেতকে, 'এবার কোন দিকে যাবি?'

অনিকেত বলল, 'দেখি, কাউকে জিগ্যেস করি, হাঁটাপথে কাছাকাছি কোনও হোটেল বা ধর্মশালা আছে কি না। নইলে টাঙা ভাড়া করে খুঁজতে যাব।'

পার্থ বলল, 'তা হলে এতক্ষণ যে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বললাম আমরা, তাঁর থেকে জেনে নিলেই তো ভালো হত। স্থানীয় মানুষ, নিশ্চয়ই এসব খবর ভালো জানেন।'

অনিকেত বলল, 'তা হলে চল, ভিতরে ঢুকে ভদ্রলোকের কাছ থেকে জেনে নিই।'

ওদের আর দোকানের ভিতরে ঢুকতে হল না। তার কথা শেষ হওয়ার আগেই দোকানের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন সেই বৃদ্ধ। তিনি অনিকেতদের দিকে না তাকিয়ে সামনের রাস্তা ধরতে যাচ্ছিলেন। পার্থ তাঁর উদ্দেশে বলল, 'এই যে, একটু শুনবেন।'

পার্থর গলা শুনে ভদ্রলোক ঘুরে দাঁড়ালেন তাদের দিকে। তারপর বললেন, 'আমাকে কিছু বললেন?'

পার্থ বলল, 'হ্যাঁ, আচ্ছা এখানে মোটামুটি ধরনের হোটেল বা ধর্মশালা কোথায় আছে বলতে পারেন?'

ভদ্রলোক বললেন, 'সামনের রাস্তা ধরে মিনিট পাঁচেক হাঁটলে একটা জৈন ধর্মশালা পাবেন। তার কাছাকাছিই আছে ''মহেশ্বরী'' নামে একটা ধর্মশালা। কেল্লার কাছেও একটা ধর্মশালা আছে। এগুলো মোটামুটি মন্দ নয়। আর হোটেলে থাকতে হলে আপনাদের বাসস্ট্যান্ডের কাছে যেতে হবে।'

অনিকেত জিগ্যেস করল, 'বাসস্ট্যান্ড এখান থেকে কত দূর?'

বৃদ্ধ বললেন, 'কিছুটা দূর আছে। টাঙায় দশ টাকা ভাড়া নেবে। তবে কেল্লার কাছে যে ধর্মশালাটা আছে, আগে সেখানে দেখতে পারেন। সেখানে থাকার জায়গা পেলে কেল্লা ঘুরে দেখতে আপনাদের সুবিধে হবে। একটা টাঙা ভাড়া করে আপনারা সেখানে চলে যান।'

অনিকেত বলল, 'অনেক উপকার হল। আচ্ছা নমস্কার।'

ভদ্রলোকও প্রতিনমস্কার জানিয়ে নিজের রাস্তা ধরার জন্য পা বাড়ালেন। পার্থ অনিকেতকে বলল, 'টাঙা ভাড়া করে কেল্লার কাছে যে ধর্মশালা আছে সেখানে আগেই যাওয়া যাক। কেল্লার ভিতর তো আমাদের থাকা হবে না। তবে তার কাছাকাছি থাকতে পারলে দুধের সাধ ঘোলে মেটানো যাবে।'

অনিকেতদের সঙ্গে কথা বলে বেশ কয়েক পা এগিয়ে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। হঠাৎ থেমে ফিরে দাঁড়ালেন। তারপর এগিয়ে এসে পার্থর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনার কথাটা যেতে-যেতে কানে গেল, তাই একটা কথা বলতে এলাম। আপনারা সত্যিই কেল্লায় রাত কাটাতে চান নাকি?

তাঁর কথা শুনে পার্থ বলল, 'সেখানে থাকার একটা ইচ্ছে তো ছিল, কিন্তু থাকার কোনও জায়গা আছে কি?'

ভদ্রলোক কী যেন একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, 'কেল্লায় কোনও হোটেল বা ধর্মশালা নেই, তবে...' এই বলে চুপ করে গেলেন।

অনিকেত বলল, 'তবে কী?'

বৃদ্ধ একটু ইতস্তত করে বললেন, 'আমার বাড়িতেই একটা ঘর খালি আছে, আপনারা ইচ্ছে করলে থাকতে পারেন। তবে সেখানে বিজলি বাতি নেই, এই যা একটু অসুবিধে।'

'আপনি ঘর ভাড়া দেন? কত ভাড়া?' অনিকেত জিগ্যেস করল।

বৃদ্ধ হেসে বললেন, 'না, আমি ঘর ভাড়া দিই না। আমি পূজারি ব্রাহ্মণ, বিয়েথা করিনি, একলা মানুষ। যজমানি করে যেটুকু আয় হয় তাতেই আমার চলে যায়। আপনারা বাঙালি, তাই বললাম। একলা থাকি, দুদিন আপনাদের সঙ্গে গল্প করে কাটানো যাবে। তাছাড়া...'

'তাছাড়া কী?' প্রশ্ন করল পার্থ।

ভদ্রলোক ইতস্তত করে বললেন, 'আমার একটু লেখালিখির বাতিক আছে। কেল্লার ইতিহাস নিয়ে আমি একটা লেখা লিখেছি। লেখাটা আমি আপনাদের শোনাতে চাই। আপনার তো বই ছাপাবার ব্যবসা আছে। ভালো লাগলে যদি কলকাতায় গিয়ে সেটা ছাপাবার ব্যবস্থা করেন। অনেক দিন ধরে সেটা ছাপাবার ইচ্ছে আমার। কিন্তু এ তল্লাটে বাংলায় বই ছাপাবার কোনও ছাপাখানা নেই।'

তাঁর কথা শুনে পার্থ কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। অনিকেত চুপ করে ভাবতে লাগল অপরিচিত এই বৃদ্ধের বাড়িতে হুট করে চলে যাওয়া ঠিক হবে কিনা। অচেনা জায়গা, ভেবেচিন্তে কাজ করা উচিত।

বৃদ্ধ এবার বললেন, 'আপনারা বরং ভাবুন, আমি এখনই আসছি', এই বলে তিনি গিয়ে ঢুকলেন সামনের একটা দোকানে।

বৃদ্ধ তাদের সামনে থেকে চলে যাওয়ার পর পার্থ জিগ্যেস করল, 'কী রে, কী করবি?'

অনিকেত বলল, 'প্রস্তাবটা নিঃসন্দেহে লোভনীয়। হাজার বছরের প্রাচীন কেল্লার মধ্যে রাত কাটানো বেশ একটা থ্রিলিং ব্যাপার। কিন্তু ভদ্রলোকের মনে কোনও দুরভিসন্ধি নেই তো। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পরে বেশি টাকাপয়সা দাবি করবেন না তো? একবার পুরী বেড়াতে গিয়ে আমি এরকম একটা লোকের পাল্লায় পড়েছিলাম।

পার্থ তার কথা শুনে বলল, 'লোকটিকে তেমন মনে হচ্ছে না। একটা কাজ করা যাক, আগে ওঁর সঙ্গে যাই। গিয়ে যদি দেখি বাড়িটা পছন্দ হচ্ছে না বা লোকটির ভাবগতিক সুবিধের মনে হচ্ছে না, তখন ফিরে আসবখন।

'ঠিক আছে?' অনিকেত রাজি হল পার্থর কথায়।

মিনিট তিনেকের মধ্যেই ফিরে এলেন বৃদ্ধ। তারপর তাদের জিগ্যেস করলেন, 'কী ঠিক করলেন আপনারা?'

অনিকেত বলল, 'আমরা যাব আপনার সঙ্গে। কিন্তু জায়গাটা পছন্দ না হলে ফিরে আসব।'

ভদ্রলোক হেসে বললেন, 'ঠিক আছে।'

পার্থ জিগ্যেস করল, 'কীসে যাব আমরা?'

ভদ্রলোক বললেন, 'টাঙায়। আমি বরং টাঙা নিয়ে আসি। আর আপনাদের যদি টুকিটাকি কিছু কেনার থাকে তো এখান থেকে কিনে নিন। কেল্লার ভিতর দোকানপাট খুব বেশি নেই, আর দামও বেশি', এই বলে ভদ্রলোক টাঙা আনতে চলে গেলেন।

অনিকেতদের কিছু জিনিস কিনতে হবে। তাঁরা কাছেই একটা দোকানে গেল। কয়েক প্যাকেট বিস্কুট, কেক আর দুটো জলের বোতল নিল। দাম মেটাবার জন্যে পার্থ পকেট থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে এগিয়ে যেতেই দোকানদার বলল, 'পাঁচশো টাকার নোট এখন এখানে কেউ নিচ্ছে না, খুব জাল হচ্ছে।'

অগত্যা খুচরো টাকায় দাম মিটিয়ে মালপত্র নিয়ে দোকানের বাইরে এসে দাঁড়াল তারা। আর তখনই দেখতে পেল ভদ্রলোককে টাঙা নিয়ে আসতে। তাঁকে দেখে তারা একটু অবাক হল। অনিকেতরা ভেবেছিল, ভদ্রলোক টাঙা ভাড়া করতে গিয়েছেন। কিন্তু টাঙার চালকের আসনে বসে আছেন ভদ্রলোক। অনিকেতদের সামনে টাঙা দাঁড় করিয়ে তিনি বললেন, 'নিন, উঠে পড়ুন।'

পার্থ বলল, 'টাঙা কি আপনি চালাবেন নাকি?'

ভদ্রলোক বললেন, 'হ্যাঁ, এটা আমার টাঙা, এটা নিয়েই আমি ঘুরে বেড়াই। কেল্লার বাসিন্দাদের টাঙাই এখনও প্রধান বাহন।

অনিকেতরা আর কথা না বাড়িয়ে মালপত্র নিয়ে উঠে পড়ল টাঙায়। চলতে শুরু করল টাঙা।

অনিকেতদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে টাঙা। পথের দুপাশ দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল তারা। টাঙাটা বেশ পুরোনো। মাঝে-মাঝে ক্যাঁচ-ক্যাঁচ শব্দ উঠছে চাকার ধুরা থেকে। অনিকেতের মনে হল, টাঙাটা আবার ভেঙে পড়বে না তো। টাঙা চালাতে চালাতে ভদ্রলোক বললেন, 'আপনাদের নাম কিন্তু আমার এখনও জানা হয়নি।'

পার্থ তাঁর কথা শুনে বলল, 'আমার নাম পার্থ আর ওর নাম অনিকেত। আপনার নাম?'

ভদ্রলোক বললেন, 'আমার নাম বিদ্যাপতি ভট্টাচার্য।'

ভদ্রলোকের নাম শুনে অনিকেত বলল, 'জয়পুর শহর যিনি তৈরি করেছিলেন সেই বিদ্যাধর ভট্টাচার্য আপনার কেউ হতেন নাকি?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'না, তিনি আমার কেউ নন। আমার পূর্বপুরুষেরা প্রত্যেকেই ছিলেন সাধারণ পূজারি ব্রাহ্মণ। বিদ্যাধর ভট্টাচার্যের মতো অত গুণী মানুষ তাঁদের কেউ ছিলেন না।'

পার্থ আবার জিগ্যেস করল, 'কেল্লায় তো যাচ্ছি, কিন্তু সেখানে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা কী হবে?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'কেল্লায় কয়েকটা খাবারের দোকান আছে। আর আপনারা যদি চান তা হলে আমিই আপনাদের দুটো ডাল ভাত ফুটিয়ে দিতে পারি।'

অনিকেত পার্থকে বলল, 'আগে তো যাই, খাবারের ব্যাপারটা পরে ভাবা যাবে।'

যেতে-যেতে এক সময় টাঙা ফোর্ট রোডে এসে পড়ল। পাহাড়ের মাথার উপর সূর্যের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা কেল্লার গবাক্ষ-বুরুজ-মিনারগুলো ক্রমশই আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে অনিকেতদের চোখে। দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের উপর কেল্লার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্তম্ভের শীর্ষদেশ। সেটা দেখিয়ে অনিকেত পার্থকে বলল, 'ওটা নিশ্চয়ই চিতোরে বিখ্যাত বিজয়স্তম্ভ।'

ফোর্ট রোডে বেশ জমজমাট। পথের দু পাশে অনেক দোকানপাট, হোটেল ইত্যাদি রয়েছে। রাস্তায় টাঙা আর অটোরিকশার ভিড়। টুরিস্ট সিজন, তাই রাস্তায় অনেক টুরিস্ট বাসও চোখে পড়ছে। একসময় তারা পাহাড়ের কাছে এসে হাজির হল। পাহাড়ের নীচে ঠিক তার গা বেয়ে রয়েছে বেশ চওড়া একটা শুকনো নদীখাত। তার উপর কংক্রিটের একটা ব্রিজ। ব্রিজের উপর দিয়ে যেতে যেতে পার্থ বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করল, 'এটা কী নদী?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'এর নাম গাম্ভীরী'। একসময় এই নদী চিতোরের প্রতিরক্ষায় সাহায্য করত। তখন কিন্তু পাহাড়ের নীচে কোনও জনপদ ছিল না। চিতোর বলতে পাহাড়ের মাথার উপর প্রাকারবেষ্টিত দুর্গনগরীকেই বোঝাত। এই দুর্গনগরী থেকেই রাজস্থানের তামাম মরু রাজ্যকে শাসন করতেন রানারা।'

ব্রিজ পার হওয়ার পর শুরু পাকদণ্ডী বেয়ে উপরে ওঠার পথ। সে পথ বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল বিদ্যাপতির টাঙা। পথের একপাশে দুর্গপ্রাকার আর অন্যপাশে পাহাড়ের পাথুরে দেওয়াল। সেদিকে অনিকেতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিদ্যাপতি বললেন, 'আপনারা পথের বাঁ পাশে কালচে ধরনের যে পাথরগুলো দেখতে পাচ্ছেন, স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে বলে ''চিত্তৌর''। এর থেকেই ''চিতোর'' শব্দের উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন।'

পাকদণ্ডী বেয়ে তারা ক্রমশ উপরে উঠতে লাগল। তাদের পাশ দিয়ে আরও অনেক টাঙা যাওয়া আসা করছে। পাথুরে রাস্তায় ঘোড়ার খুরের খটাখট-খটাখট শব্দ হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তাদের চোখে পড়ল বিরাট এক পাথুরে তোরণ। এত বড় তোরণ যে, তার নিচ দিয়ে হাওদা সমেত হাতি অনায়াসে গলে যেতে পারে। বয়সের ভারে তোরণের অবস্থা জীর্ণ হয়ে পড়েছে। মাথার উপর জন্মেছে বটগাছ। একটা বিশাল লোহার কপাট মহাকালের সাক্ষী হয়ে আজও কীভাবে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে তোরণের গায়ে। বিদ্যাপতি বললেন, 'আপনরা যে তোরণ দেখতে পাচ্ছেন তার নাম ''পোদল পোল''। এরকম সাত সাতটা তোরণ পেরিয়ে আমাদের কেল্লানগরীতে ঢুকতে হবে। অন্য পোল বা তোরণগুলোর নাম ভৈঁর পোল, হনুমান পোল, গণেশ পোল, জোডলা পোল, লক্ষ্মণ পোল ও রাম পোল বা সূর্যতোরণ। এই পোলগুলো ছিল দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রধান অঙ্গ। দুর্ভেদ্য ছিল এইসব তোরণ। আপনারা লক্ষ করুন, তোরণের গায়ে যে লোহার কপাটটা আজও দাঁড়িয়ে আছে, তার মাথার দিকে লোহার গজাল পোঁতা আছে। শত্রুসেনারা হাতি দিয়ে গুঁতিয়ে যাতে তোরণ ভাঙতে না পারে, তার জন্য তোরণের কপাটে এই ব্যবস্থা করা থাকত। সম্রাট আকবরের সমুদ্র সমান সেনাবাহিনীকেও তিনমাস রুখে দিয়েছিল এই তোরণ।'

পার্থ বলল, 'আলাউদ্দিন খলজিই তো সর্বপ্রথম আক্রমণ করেছিলেন চিতোরগড়, তাই না?'

টাঙা চালাতে চালাতে বিদ্যাপতি বললেন, 'হ্যাঁ, আমির খসরুর তারিখ-ই ফিরোজশাহি' বইয়ে তার সন-তারিখ উল্লেখ আছে। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৫ আগস্ট তিনি চিতোর অধিকার করেন।' এরপর একটু চুপ করে তিনি বললেন, 'চিতোর দ্বিতীয়বার পদানত হয় ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহর কাছে। আর শেষ আক্রমণ করেন সম্রাট আকবর ১৫৬৭ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর আক্রমণে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় চিতোরগড়।'

বিদ্যাপতির কথা শুনে অনিকেতরা বুঝতে পারল, কেল্লার ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর একটা স্পষ্ট ধারণা আছে। বিদ্যাপতির কথা শুনতে-শুনতে পাকদণ্ডী বেয়ে ক্রমশই উপর দিকে উঠতে লাগল তারা। একসময় বিদ্যাপতি বললেন, 'আপনাদের একটা কথা বলি, কেল্লায় কেউ যদি আপনাদের পরিচয় জানতে চায় তা হলে দয়া করে বলবেন যে, আপনারা আমার আত্মীয় হন। আমার কাছে বেড়াতে এসেছেন।'

তাঁর কথা শুনে অনিকেত বলল, 'ঠিক আছে। কিন্তু এ কথা বলতে হবে কেন?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'কেল্লায় সাধারণ টুরিস্টদের রাতে থাকার নিয়ম নেই। তার জন্য সরকারের অনুমতির দরকার হয়। অনেক ঝামেলা সেসব করতে হলে। তাই আমার আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতে বলছি আপনাদের।'

অনিকেত বলল, 'ও।'

ভৈঁর পোল, হনুমান পোল, গণেশ পোল পার হয়ে আরও উপর দিকে উঠছেন তাঁরা। পথের পাশে কোনও বিশেষ কিছু দেখার থাকলে টাঙা চালাতে চালাতে সেগুলোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাচ্ছেন বিদ্যাপতি। দুর্গপ্রাকারের গা বরাবার উঁচু বেদির মতো সৈন্য চলাচলের যে পথ চলে গিয়েছে, তার উপর কিছু দূরে দূরেই চোখে পড়ছে ছোট লেজওয়ালা লালমুখো বাঁদরের দল। নীচের দিকে তাকিয়ে অনিকেতরা বুঝতে পারল, পাকদণ্ডী বেয়ে বেশ অনেকটাই উপরে উঠে এসেছে। নীচে তাদের ফেলে আসা পথের বাঁকগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সামনের পথটা বেশ খাড়াই, কিছুটা সংকীর্ণও বটে। বিদ্যাপতির ঘোড়ার গতি কিছুটা মন্থর হয়ে এল। উলটো দিক থেকে কোনও টাঙা এলেও তাঁরা সাবধানে পাশ কাটিয়ে নীচের দিকে নামছেন। বিদ্যাপতি বললেন, 'আমরা প্রায় পৌঁছে গিয়েছি। আর মিনিট দশেক লাগবে সূর্যতোরণে পৌঁছতে। সূর্যতোরণ হল কেল্লানগরীতে ঢোকার প্রধান তোরণ।'

মিনিট দুয়েকের মধ্যে একটা জায়গায় এসে পৌঁছল অনিকেতরা। পথ সেখানে ইউ-এর মতো আরও উপরে ওঠার জন্য বাঁক নিয়েছে। পথের পাশে পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বটগাছ তার ডালপালা মেলে যাত্রাপথের উপর একটা চাঁদোয়ার সৃষ্টি করেছে। বাঁকের মুখটায় আধো অন্ধকার। সেখানে ঢুকে বাঁক নিতে গিয়েই একটা ঝাঁকুনি দিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল টাঙা। অনিকেত আর পার্থ উপর থেকে তাকিয়ে পাহাড়ের নীচের দৃশ্য দেখছিল। ঝাঁকুনি খেয়ে নিজেদের কোনও রকম সামলে নিয়ে তারা সামনের দিকে তাকাল। তারা দেখল, পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আড়াআড়িভাবে রাস্তা আগলে এসে দাঁড়িয়েছে এক ঘোড়সওয়ার। গায়ে তার রাজাদের মতো ঝলমলে পোশাক। কোমরে চামড়ার খাপে লম্বা তলোয়ার, পায়ে জমকালো নাগরা। শুধু মাথায় পাগড়ির বদলে একটা ক্রিকেট ক্যাপ। বেশ সুন্দর, লম্বা, ফরসা চেহারা। বয়স মনে হয় অনিকেতের চেয়ে কিছু বেশি, অর্থাৎ আঠাশ-তিরিশ হবে। পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল আরও দুজন ঘোড়সওয়ার। তাদের পোশাক অবশ্য জলুসহীন। পরনে খাটো ধুতির উপর ফতুয়া ধরনের জামা পরা, মাথায় রাজস্থানী পাগড়ি। দুজনেরই হাতে ধরা আছে বর্ষা। দেখে মনে হল, প্রথমজনের অনুচর তারা দুজন। ঝলমলে পোশাক গায়ে লোকটি বেশ কিছুক্ষণ তীক্ষ্নদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বিদ্যাপতির টাঙার দিকে। তারপর বিদ্যাপতিকে হিন্দিতে জিগ্যেস করল, 'আপনার টাঙায় কারা?'

বিদ্যাপতি হিন্দিতে বললেন, 'এরা আমার আত্মীয়, কলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছে।'

তাঁর কথা শুনে লোকটি একবার ভালো করে তাকিয়ে নিল অনিকেত আর পার্থর মুখের দিকে। তারপর বিদ্যাপতিকে বলল, 'তা কী ঠিক করলেন পণ্ডিতজি?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'এখনও ভাবিনি কিছু।'

লোকটি বলল, 'ভাবুন, তাড়াতাড়ি ভাবুন,' এর পর আর কোনও কথা বলল না লোকটি। তার কালো রঙের পাহাড়ের মতো ঘোড়াটার মুখ ঘুরিয়ে অনিকেতদের টাঙার পাশ দিয়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করল। তার সঙ্গী দুজনও তাঁকে অনুসরণ করল। তারা চলে যাওয়ার পর আবার টাঙা চলতে শুরু করল। লোকটির পোশাক দেখে পার্থর মনে তার সম্বন্ধে একটা কৌতূহলের সৃষ্টি হল। বিদ্যাপতিকে সে বলল, 'কিছু মনে করবেন না, রাজার মতো পোশাক পরা লোকটি কে?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'ওর নাম রানা বিক্রম সিংহ, রাজবংশধর।'

'রাজবংশধর! তাঁরা এখনও কেল্লায় থাকেন নাকি?' প্রশ্নটা করল অনিকেত।

বিদ্যাপতি বললেন, 'সকলে না থাকলেও কেউ কেউ থাকেন এখনও। তাঁদের নিজস্ব মহল আছে কেল্লায়। তবে রাজবংশধরেরা অধিকাংশই থাকেন উদয়পুরে বা জয়পুরে। অনেকে বিদেশেও থাকেন।'

লক্ষণ পোল অতিক্রম করে কিছুক্ষণের মধ্যেই অনিকেতরা হাজির হল সূর্যতোরণের সামনে। বয়সের ভারে কিছুটা ধ্বংস হলেও তোরণের গায়ে অপূর্ব শিল্পকলার চিহ্ন আজও আছে। বিশাল সূর্যতোরণের ভিতর ঢুকতে-ঢুকতে বিদ্যাপতি বললেন, 'এই তোরণের মাটি রাজপুতদের কাছে খুবই পবিত্র। সূর্যতোরণ ছিল দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শেষ স্তর। মাতৃভূমি রক্ষার্থে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে-করতে অনেক রাজপুত বীর শহিদ হয়েছেন এখানে। ইতিহাসে তাঁদের অনেকের নাম লেখা আছে। শত্রুর হাতে সূর্যতোরণের পতন ঘটলেই পতন ঘটত চিতোরগড়ের। কেল্লায় শুরু হত বহ্নি উৎসব। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে আত্মসম্মান রক্ষা করতেন ঝাঁকে-ঝাঁকে রাজপুত নারী।'

সূর্যতোরণ অতিক্রম করার পর পথের দুপাশে মাটি থেকে একটা উঁচু বেদির মতো করা আছে। সেগুলো দেখিয়ে অনিকেত জিগ্যেস করল, 'ওর উপর কি সৈন্যরা দাঁড়িয়ে তোরণ পাহারা দিত?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'না, তারা থাকত তোরণের মাথার উপরের অলিন্দে আর তার পাশের দুর্গপ্রাকারে। এই বেদিগুলো ব্যবহৃত হত অন্য কাজে। মহারানা হাম্বীর, মহারানা কুম্ভ, মহারানা সংগ্রাম সিংহ প্রমুখ রাজপুত বীররা যখন যুদ্ধ জয় করে কেল্লায় ফিরে আসতেন, তখন ওই বেদির উপর সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁদের উদ্দেশ্যে শঙ্খধ্বনি আর পুষ্পবৃষ্টি করতেন রাজপুত রমণীরা।'

সূর্যতোরণ বা রাম পোল পার হয়ে অনিকেতরা ঢুকল কেল্লার ভিতর। সামনেই একটা প্রশস্ত চত্বর। তার একপাশে অনেক টাঙা আর অটোরিকশা দাঁড়িয়ে আছে। বেশ কিছু ছোটখাটো দোকানপাটও রয়েছে সেখানে। গাইড আর টাঙাচালকদের হাঁকডাকে জায়গাটা বেশ জমজমাট। সোজা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল বিদ্যাপতির টাঙা। কিছুটা পথ চলার পর পথের ডান পাশে একটা মাঠের মধ্যে খুব জীর্ণ প্রাসাদ চোখে পড়ল। প্রাসাদ না বলে তাকে প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ বলাই মনে হয় ভালো। তার সামনে পর্যটকদের ভিড়। বিদ্যাপতি বললেন, 'ওই হল কুম্ভ প্রাসাদ, কেল্লার সবচেয়ে প্রাচীন প্রাসাদ। চিতোরের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই প্রাসাদকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল। আপনারা আগে আমার বাড়িতে চলুন। তারপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আপনাদের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখাব।'

কুম্ভ প্রাসাদকে পিছনে ফেলে একটু এগিয়ে বাঁ দিকে বাঁক নিল টাঙা। বিদ্যাপতি বললেন, 'এবার আমরা কেল্লার প্রধান সড়ক ছেড়ে আমার বাড়ির দিকে যাওয়ার রাস্তা ধরলাম।'

এ পথটা অপেক্ষাকৃত সরু। একটু এগোবার পর পথের দুপাশে চোখে পড়তে লাগল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরোনো ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। পথের দুপাশে বড় বড় গাছও আছে। টাঙার শব্দে হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা প্রাচীরের উপর উঠে বসল বিরাট একটা ময়ূর। তার গলার নীল রং সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। রাজস্থান আসার পর এই প্রথম ময়ূর দেখতে পেল অনিকেতরা। উট, ময়ূর, আর কেল্লা, এই তিন নিয়েই তো রাজস্থান। উট অবশ্য এর আগে অনেক দেখতে পেয়েছে তারা। ময়ূরটা একটা কর্কশ ডাক ছেড়ে লাফিয়ে অনিকেতদের সামনে দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে উলটো দিকের একটা প্রাচীরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। আরও কিছুটা এগোবার পর টাঙা চলে এল দুর্গপ্রাচীরের কাছাকাছি। তারপর মিনিট পাঁচেক চলার পর টাঙার গতি একসময় মন্থর হয়ে এল। রাস্তা থেকে নেমে বিদ্যাপতির টাঙা এসে থামল একটা পুরোনো একতলা বাড়ির সামনে। বাড়িটা পুরোনো হলেও বাইরেটায় সাদা চুনকাম করা। বাড়ির সামনেটাও বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। টাঙা থেকে নেমে বিদ্যাপতি অনিকেতদের বললেন, 'এই আমার বাসা। ভিতরে ঢুকে দেখুন বাড়িটা পছন্দ হয় কিনা। বাড়িটা পুরোনো হলেও কেল্লার যা বয়স তার তুলনায় বাড়িটাকে শিশুই বলা যেতে পারে। আমার ঠাকুরদা তৈরি করেছিলেন এ বাড়ি। বয়স খুব বেশি হলে একশো বছরের কিছু বেশি হবে।'

টাঙা থেকে মালপত্র নিয়ে নেমে পড়ল অনিকেত আর পার্থ। বিদ্যাপতি কোমর থেকে চাবির গোছা বের করে সদর দরজার তালা খুলতে লাগলেন।

বিদ্যাপতির বাড়িটা মোটামুটি পছন্দ হয়ে গেল অনিকেত এবং পার্থর। আকাশ খোলা একফালি বারান্দা ঘিরে গোটা আষ্টেক বড় বড় ঘর। তবে ঘরগুলোর অধিকাংশই মনে হয় দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। পুরু ধুলো জমেছে ঘরগুলোর চৌকাঠের বাইরে। বন্ধ জানলার গরাদে জাল বুনেছে মাকড়সা। তবে বারান্দার যেদিকে অনিকেতদের ঘর, সেদিকটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। অনিকেতদের ঘরের মেঝেও বেশ ঝকঝকে-তকতকে, যত্ন নিয়ে পরিষ্কার করা। ঘরের মাঝখানে রয়েছে আগেকার দিনের বিরাট এক পালঙ্ক। তার উপরের বালিশ বিছানাও মন্দ নয়। ঘরের কোনায় একটা চেয়ার টেবিলও আছে। আর কী চাই অনিকেতদের। স্নান সেরে পোশাক পালটে কেক-বিস্কুট দিয়ে টিফিন সেরে বিছানায় শুয়ে তারা অপেক্ষা করছিল বিদ্যাপতির জন্য। বিদ্যাপতি অনিকেতদের ঘরের পাশে নিজের ঘরে গিয়েছেন। তিনি তৈরি হয়ে অনিকেতদের নিয়ে কেল্লা দেখতে যাবেন। খাটের উপর শুয়ে একটা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছিল অনিকেত। কলকাতা থেকে বইটা সঙ্গে করে এনেছে সে। কর্নেল টডের লেখা বিখ্যাত বই ''অ্যানালস অ্যন্ড অ্যান্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান''-এর একটা বাংলা অনুবাদ। ট্রেনে আসবার পথে বইটার প্রায় সবটাই পড়ে ফেলেছে। অল্প কিছুটা বাকি আছে। পার্থ তাকিয়েছিল খোলা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে। জানলার বাইরে বেশ কিছুটা ফাঁকা জমি, তারপর বড় বড় গাছের জঙ্গল। অনেক দূরে জঙ্গলের মাথার উপর দিয়ে চোখে পড়ছে এক জীর্ণ প্রাসাদের চূড়া। সম্ভবত জঙ্গলের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রাসাদটা। পার্থ সেদিকে তাকিয়ে অনিকেতকে বলল, 'তা হলে এ বাড়িতে থাকা আমাদের একেবারে ফাইনাল তো?'

অনিকেত বলল, 'হ্যাঁ, ফাইনাল।'

কয়েক মিনিট পর বিদ্যাপতি পোশাক পালটে এসে দাঁড়ালেন অনিকেতদের ঘরের চৌকাঠে। তাঁর পরনে এখন পুরোদস্তুর রাজস্থানী পোশাক। মাথায় পাগড়ি, পায়ে শুঁড়তোলা নাগরা। এমনিতেই বিদ্যাপতি বেশ লম্বা মানুষ, পাগড়ির জন্য এখন আরও লম্বা দেখাচ্ছে তাঁকে। অনিকেতদের তিনি বললেন, 'আমি তৈরি, চলুন এবার কেল্লা দেখতে বেরিয়ে পড়ি।'

পার্থ ক্যামেরা আর অনিকেত জলের বোতল হাতে বাইরে এসে দাঁড়াল। দরজার পাল্লাটা বন্ধ করতে করতে পার্থ বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করল, 'আপনার কাছে একটা তালা হবে? আমাদের কাছে যে তালাটা ছিল সেটা আমি ভুল করে জয়পুরের হোটেলে ফেলে এসেছি।'

বিদ্যাপতি বললেন, 'না, সদর দরজার তালা ছাড়া অন্য কোনও তালা আমার কাছে নেই। দরজার শিকলটা শুধু তুলে দিন, তা হলেই হবে। এখানে চোর নেই।'

ক্যামেরা, টাকাপয়সা সবই অনিকেতদের সঙ্গে রয়েছে। ঘরে দামি জিনিস কিছু নেই, শুধু তাদের জামাকাপড় রয়েছে। তাই বিদ্যাপতির কথা শুনে দুশ্চিন্তা না করে পার্থ শুধু শিকলটা তুলে দিল। তারপর বিদ্যাপতির পিছন পিছন তারা পা বাড়াতে যেতেই তাদের কানে এল এক কণ্ঠস্বর, 'কে, বিদ্যা নাকি?'

সেই কণ্ঠস্বর কানে যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন বিদ্যাপতি। তারপর বারান্দার উলটো দিকের একটা ঘরের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, আমি।'

সে ঘরটা বাইরে থেকে শিকল তুলে বন্ধ করা, কিন্তু অনিকেতরা দেখল, সেই বন্ধ ঘরের জানলাটা ভিতর থেকে আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে। পাল্লাটা বেশ কিছুটা খুলে যাওয়ার পর অন্ধকার ঘরের ভিতর থেকে উঁকি মারলেন একজন বৃদ্ধ। বৃদ্ধের অনেক বয়স, মাথার সব চুল একদম সাদা, বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে সাদা দাড়ি, খালি গা। তাঁর চোখের দৃষ্টি কেমন যেন ঘোলাটে ধরনের। অনিকেতদের দিকে তিনি একবার তাকিয়ে দেখলেন, তারপর বিদ্যাপতিকে বললেন, 'ওরা কারা? ওরা কি কুম্ভের গুপ্তধন খুঁজতে এসেছে?'

বৃদ্ধ মনে হয় কানে কম শোনেন। তাই বিদ্যাপতি গলাটা একটু চড়িয়ে বললেন, 'ওঁরা বাঙালি, কলকাতা থেকে কেল্লা দেখতে এসেছেন।'

'কেল্লা দেখতে কলকাতা থেকে...কলকাতা...কলকাতা...সে তো অনেক দূর। আমি একবার কলকাতা গিয়েছি।'

জানলার পাল্লাটা ধীরে-ধীরে আবার বন্ধ হয়ে গেল। সেইসঙ্গে বৃদ্ধের কণ্ঠস্বরও হারিয়ে গেল ঘরের ভিতর। পার্থ অবাক হয়ে বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করল, 'উনি কে?'

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বিদ্যাপতি বললেন, 'উনি আমার দাদা গণপতি।'

অনিকেত বলল, 'তা হলে আপনি যে বলেছিলেন আপনি একলা মানুষ?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'একলাই বলা যায়। কারণ, আপনারা যাঁকে দেখলেন, তিনি থেকেও নেই। দাদা কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। খাওয়া দাওয়াও এখন প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। চিতোরেশ্বরীর দয়ায় এখনও বেঁচে আছেন', বিদ্যাপতি বাড়ির বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন।

মিনিট তিনেকের মধ্যেই বিদ্যাপতির টাঙা চেপে অনিকেত পার্থ বেরিয়ে পড়ল কেল্লা দেখতে।

বিদ্যাপতির টাঙা প্রথমে এসে থামল কুম্ভ প্রাসাদের সামনে। অনিকেতদের নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে ধ্বংসস্তূপের ভিতর ঢুকতে ঢুকতে তিনি বললেন, 'এই প্রাসাদ সম্ভবত মহারানা সমর সিংহের আমলের। আলাউদ্দিনের আক্রমণে একবার ধ্বংস হয় এই প্রাসাদ। মহারানা হাম্বীর ও তাঁর পরে মহারানা কুম্ভ প্রাসাদের সংস্কার করেন। মহারানা কুম্ভের সময় থেকে এই প্রাসাদ পরিচিত হয় কুম্ভপ্রাসাদ নামে।'

অনিকেতরা এসে দাঁড়াল প্রাসাদের ভিতরে। চারপাশে শুধু ইট-পাথরের স্তূপ। একতলার কয়েকটা ঘর আর তার মাথার উপরে কিছু ছাদহীন দেওয়াল শুধু দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সাক্ষী হয়ে। বিদ্যাপতি বললেন, 'একসময় এই প্রাসাদ বিভক্ত ছিল, দরবার মহল, মন্দির মহল, জেনানা মহল, সুরজ মহল, কানওয়ার মহল ইত্যাদিতে। প্রাসাদের দক্ষিণ-পশ্চিমে যে ধ্বংসস্তূপ আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, ওখানেই একসময় ছিল কানওয়ারপদ মহল। ওখানেই বাস করতেন মীরাবাঈ। ওই মহলেরই একটি ঘরে কৃষ্ণনাম স্মরণ করে তিনি বিষের পাত্র তুলে নিয়েছিলেন বিক্রমাদিত্যের হাত থেকে। কিন্তু সেই বিষ পরিণত হয়েছিল অমৃতে। কানওয়ারপদ মহলেরই একটি ঘরে মেবারের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী শিশু উদয় সিংহকে ঘাতক বনবীরের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজের শিশুপুত্রকে বলি দেন ধাত্রী পান্না। এরকম নানা ইতিহাস ছড়িয়ে আছে এ প্রাসাদের আনাচে-কানাচে।'

অনিকেতরা বিদ্যাপতির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল প্রাসাদের বিভিন্ন অংশ। বিদ্যাপতি বলে যেতে লাগলেন প্রাসাদের ইতিহাস। তাঁর কথা তন্ময় হয়ে দুজনে শুনতে লাগল।

অনিকেতের মনে হল, এই জীর্ণ প্রাসাদ, তার ইতিহাস যেন ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। এক সময় বিদ্যাপতি অনিকেতদের এনে দাঁড় করালেন এক জায়গায়। মাটির গভীরে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে সেখান দিয়ে। বিদ্যাপতি সেই সিঁড়িগুলো দেখিয়ে বললেন, 'এটা হল একটা সুড়ঙ্গে ঢোকার মুখ। এখান থেকে কিছু দূরে গোমুখকুণ্ড নামে এক জলাশয় আছে। এই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে সেই জলাশয়ে স্নান করতে যেতেন রানিরা। এরকম অনেক সুড়ঙ্গ, ঘর ছড়িয়ে আছে কেল্লার মাটির নীচে। কুম্ভ প্রাসাদেরই মাটির নীচের একটি ঘরে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন মহারানি পদ্মিনী।'

পার্থ জিগ্যেস করল, 'এখান দিয়ে আমরা এখন নীচে নেমে সুড়ঙ্গে ঢুকতে পারব?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'না। নীচে নামার পর সুড়ঙ্গের মুখ লোহার গরাদ দিয়ে বন্ধ করা আছে।'

অনিকেত জিগ্যেস করল, 'কেন?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'অনেক দিনের প্রাচীন সুড়ঙ্গ, তার ভিতর ঢুকে কেউ যাতে দুঘর্টনায় না পড়ে তাই লোহার গরাদ বসিয়েছে সরকার। আমাদের ছেলেবেলায় এসব সুড়ঙ্গের মুখ খোলা থাকতে দেখেছি। তখন বন্ধুদের সঙ্গে অনেক সময় সুড়ঙ্গের ভিতরেও ঢুকেছি।

অনেকটা সময় ধরে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে প্রাসাদ দেখার পর অনিকেতরা আবার চেপে বসল টাঙায়। টাঙায় ওঠার পর পার্থ বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করল, 'এরপর আমরা কী কী দেখব?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'দেখা তো সবে শুরু হল। আমরা এখন যাব মহারানা কুম্ভের তৈরি বিখ্যাত বিজয়স্তম্ভ আর কুম্ভশ্যাম মন্দির দেখতে। তারপর যাব গোমুখকুণ্ডে। তারপর বাড়ি ফিরে বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে দেখতে যাব চিতোরেশ্বরীর মন্দির আর পদ্মিনী প্রাসাদ।'

অনিকেত বলল, 'চিতোরের অনেক কিছুই তো দেখছি কুম্ভময়!'

টাঙা চালাতে-চালাতে বিদ্যাপতি বললেন, 'হ্যাঁ, চিতোরের অনেক স্থাপত্যই তাঁর সময়ে তৈরি। গোটা রাজপুতনায় তাঁর অজস্র কীর্তি ছড়িয়ে আছে। এই মরুপ্রদেশে যে দুর্গগুলো ছড়িয়ে আছে, তাঁর মধ্যে ৩৪টি দুর্গ কুম্ভ একাই তৈরি করেন। তিনি শুধু সফল রণনায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। তিনি ছিলেন বীণাবাদক। গীতগোবিন্দের এক অপূর্ব পরিশিষ্টও রচনা করেন তিনি।'

বিদ্যাপতির সঙ্গে কথা বলতে-বলতে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তাঁরা হাজির হলেন বিখ্যাত বিজয়স্তম্ভের সামনে। টাঙা থেকে নেমে অনিকেত আর পার্থ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মহারানা কুম্ভের সেই অমর কীর্তির দিকে। বিজয়স্তম্ভ। রাজপুতদের বীরত্ব, সংগ্রাম, দেশপ্রেমের প্রতীক। সেই রাজা, সেই রাজত্ব আর নেই। কিন্তু আজও স্বদম্ভে আকাশের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে মনে করাচ্ছে রাজপুত জাতির ফেলে আসা ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে। কত বইয়ের পাতায় অনিকেত ফোটো দেখেছে এই স্তম্ভের। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজকাহিনিতে পড়েছে তার গল্প। আর আজ সে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। এ কথা ভাবতেই কেমন একটা রোমাঞ্চ লাগছিল তার। অনিকেত এগিয়ে চলল সেই স্তম্ভের দিকে।

বিজয়স্তম্ভ দেখে কুম্ভশ্যাম মন্দির হয়ে অনিকেতরা যখন গোমুখকুণ্ডে হাজির হন তখন ঘড়িতে একটা বাজে। রোদের তাপ থাকলেও গোমুখকুণ্ডের পরিবেশ বেশ ঠান্ডা। ধাপে ধাপে সোপানশ্রেণি নেমে গিয়েছে গোমুখকুণ্ডর কাকচক্ষু শীতল জলে। বিদ্যাপতি বললেন, 'এই কুণ্ড প্রকৃতির বিস্ময়। এমনিতেই রাজস্থান শুষ্ক দেশ, জলের পরিমাণ কম, তার উপর পাহাড়ের এত উপরে এমন মিষ্টি জলের কুণ্ড সত্যিই আশ্চর্যের বিষয়। দেখুন, আপনাদের বাঁ দিকে পাহাড়ের যে ফাটল থেকে জল বের হচ্ছে, সে জায়গাটা গোমুখের মতো দেখতে। তাই এর নাম গোমুখকুণ্ড।'

পার্থ বলল, 'এই কুণ্ডেই রানিরা স্নান করতে আসতেন না?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'হ্যাঁ। মহারানি পদ্মিনী জহরব্রত পালনের আগে এই কুণ্ডেই স্নান সেরেছিলেন। রাজপুতদের কাছে এর জল গঙ্গার জলের মতোই পবিত্র। গোমুখকুণ্ডের জল দুর্গের পানীয়জলের সমস্যা মেটাত। যুদ্ধের সময় বা অন্য কোনও সময় যাতে শত্রুরা এই জলে বিষ মেশাতে না পারে, তাই কুণ্ডের চারদিকে কড়া পাহারার ব্যবস্থা থাকত।'

অনিকেতরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার উলটো দিকে একটা বিরাট পাথরের ঝুলন্ত চাতাল আছে। কুণ্ডের বেশ কিছুটা অংশের উপর সেই ঝুলন্ত পাথরের চাঁই একটা আচ্ছাদন তৈরি করেছে। তার নীচে কয়েকটা ছোট পাথরের ঘর চোখে পড়ল অনিকেতের। সে বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করল, 'ওগুলো কীসের ঘর?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'ওগুলো আসলে ঘর নয়, সুড়ঙ্গে ঢোকার মুখ। ওই পথেই কুম্ভ প্রাসাদ থেকে এখানে যাওয়া আসা করত রাজা-রানিরা।'

অনিকেতরা গোমুখকুণ্ডের সোপানশ্রেণিতে বসে রইল কিছুক্ষণ। কুণ্ডের শীতল পরিবেশে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছিল তাদের।

এক সময় বিদ্যাপতি বললেন, 'অনেক বেলা হয়ে গেল, এবার আমাদের ফিরতে হবে। ভালো লাগলে কাল না হয় আপনাদের আবার নিয়ে আসব।'

তাঁর কথা শুনে ধীরে ধীরে উঠে পড়ল দুজনে।

বিদ্যাপতির টাঙায় ওঠার পর ওদের দুজনের এতক্ষণে মনে হল, তাদের বেশ খিদে পেয়েছে। পার্থ বিদ্যাপতিকে বলল, 'এখানে কোনও হোটেল আছে? আমাদের খাওয়াটা সেরে নিতে হবে।'

বিদ্যাপতি বললেন, 'এদিকে তেমন কোনও হোটেল নেই। তবে যাওয়ার পথে একটা দোকান পড়বে, সেখানে পুরি সবজি পাওয়া যায়। টাঙাওয়ালারা সেখানে খাওয়া দাওয়া সারে। সেখানে আপনাদের চলবে কি?'

পার্থ বলল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ। এবেলা ওতেই আমাদের চলে যাবে। ওবেলা সম্ভব হলে ভাতটাতের খোঁজ করা যাবে।'

বিদ্যাপতি তার কথা শুনে বললেন, 'ওবেলাটা আপনারা আমার ওখানেই খাবেন। আমি ব্যবস্থা করব।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বিদ্যাপতির টাঙা এসে থামল দোকানের সামনে। ছোট্ট দোকান, তার সামনে খাটিয়া পাতা। জনা তিনেক টাঙাওয়ালা বসে খাচ্ছে সেখানে। অনিকেতরা গিয়ে বসল খাটিয়ার উপর। বিদ্যাপতিকেও ডাকল তাদের সঙ্গে খাওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। তিনি অনিকেতের পাশের খাটিয়ায় বসে থাকা সম্ভবত তাঁর পরিচিত একজন লোকের সঙ্গে বাজার নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। সবজি আর গরম-গরম রুটি খেতে মন্দ লাগল না তাদের। রান্নার গুনেই হোক বা খিদের জন্যেই হোক, বেশ তৃপ্তি করে খেল তারা। তারপর আবার চেপে বসল টাঙায়। বিদ্যাপতির বাড়ির সামনে যখন পৌঁছল তখন দুটো বেজে গিয়েছে। টাঙা থেকে নেমে দরজার তালা খুলতে-খুলতে বিদ্যাপতি বললেন, 'ঘণ্টা দু-এক বিশ্রাম নিয়ে নিন। সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা আবার বাইরে যাব।'

তালাটা খোলার পর বিদ্যাপতির পিছন-পিছন ওরা বাড়ির ভিতর ঢুকল। বিদ্যাপতি নিজের ঘরে ঢুকে পড়লেন। পার্থও নিজেদের ঘরের সিকল খুলে ভিতরে ঢুকল। বারান্দার এক কোনায় একটা জলভরা চৌবাচ্চা আছে। সেখানে একটা ছোট বালতিও রাখা আছে। অনিকেত চৌবাচ্চা থেকে বালতিতে জল তুলে নিয়ে ভালো করে মুখ হাত ধুয়ে নিল। তারপর ঘরে গিয়ে ঢুকল। সে দেখল, পার্থ ততক্ষণে টানটান হয়ে শুয়ে পড়েছে বিছানায়।

অনিকেত ঘরে ঢুকতেই সে বলল, 'দরজাটা ভেজিয়ে দে, আলো আসছে চোখে। আমি এখন একটু ঘুমিয়ে নেব।'

অনিকেত 'দিচ্ছি' বলে পিছন ফিরে পাল্লাটা বন্ধ করতে যেতেই হঠাৎ তার চোখে পড়ল বারান্দার উলটো দিকের সেই ঘরটায়। জানলার পাল্লাটা খোলা, আর সেই জানলা দিয়ে অনিকেতের দিকে তাকিয়ে আছেন বিদ্যাপতির দাদা। অনিকেত দরজার পাল্লা ধরে তাকিয়ে রইল সেদিকে। কয়েক মুহূর্ত পর জানলাটা আবার ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিলেন গণপতি। অনিকেতও নিজেদের ঘরের দরজার পাল্লাটা বন্ধ করে পার্থর পাশে এসে শুয়ে পড়ল। আগের রাতে জয়পুর থেকে আসার সময় ট্রেনে ভালো ঘুম হয়নি তার। বিছানায় শোওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুম নেমে এল অনিকেতের চোখে।

বিদ্যাপতির ডাকে যখন অনিকেত-পার্থর ঘুম ভাঙল, তখন চারটে বেজে গিয়েছে। বিদ্যাপতি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, 'তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন। শীতের বেলা, আলো বেশিক্ষণ থাকবে না। তার আগেই চিতোরেশ্বরীর মন্দির আর পদ্মিনী প্রাসাদ দেখা শেষ করতে হবে। আর সঙ্গে শীতের পোশাক নেবেন। সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু ঠান্ডা পড়বে।'

মিনিট পনেরোর মধ্যেই তৈরি হয়ে নিল দুজনে। বিদ্যাপতি তৈরিই ছিলেন। অনিকেতদের নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন চিতোরেশ্বরী মন্দিরের দিকে। পথে যেতে যেতে বিদ্যাপতি অনিকেতদের বললেন, 'ভাবছি, চিতোরেশ্বরী মন্দিরের কাছে আপনাদের নামিয়ে দিয়ে আমি রাম পোলের কাছে বাজার করতে যাব। চিতোরেশ্বরী মন্দির থেকে পদ্মিনী প্রাসাদ বা জলমহল খুব বেশি দূরে নয়। আপনারা পায়ে হেঁটেই যেতে পারবেন সেখানে। আমি আপনাদের জন্য বাজার করে ফিরে এসে জলমহলের কাছ থেকে আপনাদের আবার টাঙায় তুলে নেব।'

পার্থ বলল, 'ঠিক আছে, তাতে আমাদের কোনও অসুবিধে হবে না।'

বিদ্যাপতির বাড়ি থেকে চিতোরেশ্বরী মন্দিরে পৌঁছাতে তাদের মিনিট কুড়ি সময় লাগল। মন্দিরের সামনে অনিকেতদের নামিয়ে দিয়ে বাজার করতে চলে গেলেন বিদ্যাপতি। তার আগে অবশ্য টাঙা থেকে নেমেই তাঁর হাতে একটা একশো টাকার নোট গুঁজে দিল পার্থ। অনিকেত আর পার্থ ঢুকল মন্দির চত্বরে। প্রাচীন মন্দির, গর্ভগৃহে অধিষ্ঠান করছেন দেবী কালিকা। কালীমূর্তিই এখানে চিতোরেশ্বরীরূপে পূজিতা। গর্ভগৃহে চিতোরেশ্বরীকে দেখার পর মন্দির চত্বরে একটা বেদির উপর বসল দুজনে। অনিকেত পার্থকে বলল, 'এই চিতোরেশ্বরীকে নিয়ে একটা অদ্ভুত গল্প আছে। আমি টডসাহেবের লেখায় পড়েছি।'

পার্থ বলল, 'কী গল্প?'

অনিকেত শুরু করল, 'চিতোরে তখন তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়েছে আলাউদ্দিনের সেনাদল ও মহারানা লক্ষ্মণ সিংহের সেনাদলের মধ্যে। প্রতিদিন বৃদ্ধ মহারানা লক্ষ্মণ সিংহ এই মন্দিরে এসে যুদ্ধজয়ের জন্য প্রার্থনা করেন কিন্তু প্রতিদিনই যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয় ঘটতে থাকে রাজপুতদের। বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ বিসর্জন দেন তাঁরা। কিন্তু বিজয়লক্ষ্মী অধরাই থেকে যান তাঁদের কাছে। একদিন রেগে গিয়ে রানা দেবীমূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, 'মা, আর কত রাজপুতদের রক্ত পান করলে তোর তৃষ্ণা মিটবে বল?' এই বলে তিনি দেবীকে ''পিশাচিনী'' বলে গর্ভগৃহ ত্যাগ করলেন। সেদিন রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল মহারানার। তিনি শুনতে পেলেন এক কণ্ঠস্বর, ''ম্যায় ভুখা'' অর্থাৎ আমি ক্ষুধার্ত। লক্ষ্মণ সিংহ দেখলেন, তাঁর সামনে আর্বিভূত হয়েছেন চিতোরেশ্বরী। দেবী তাঁকে বললেন, 'যতদিন না যুদ্ধক্ষেত্রে তোর বারোজন পুত্রের মৃত্যু হবে ততদিন আমার রক্ততৃষ্ণা মিটবে না। রাজা বলে অভিষেক করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠা তাদের। তাদের মৃত্যু ঘটলে অবসান হবে এ যুদ্ধের।' এই বলে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন দেবী। পরদিন দরবারে সভাসদদের লক্ষ্মণ সিংহ একথা বলায় তাঁরা হেসেই উড়িয়ে দিলেন ব্যাপারটা। তাঁরা ভাবলেন বৃদ্ধ মহারানা নিশ্চয়ই ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু সেদিন রাতেও একই স্বপ্ন দেখলেন মহারানা। পরদিন ঘুম থেকে উঠে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দেবী আজ্ঞা পালন করবেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র অরি সিংহকে চিতোরের সিংহাসনে বসিয়ে তারপর তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠালেন তিনি এবং সেখানেই তার মৃত্যু হল। দ্বিতীয় পুত্র অজয় সিংহকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন লক্ষ্মণ সিংহ। তাকে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠালেন না। চিতোরের ভাবী রক্ষাকর্তা বলে তাকে নির্বাচন করে তার পরিবর্তে তৃতীয় পুত্রকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠালেন। এইভাবে একের পর এক পুত্রের প্রাণ বিসর্জন দিতে লাগলেন বৃদ্ধ মহারানা', এ পর্যন্ত বলে চুপ করে গেল অনিকেত।

পার্থ জিগ্যেস করল, 'তারপর কী হল?'

অনিকেত বলল, 'না। সে যুদ্ধে জয়লাভ করেননি লক্ষ্মণ সিংহ। মহারানার দশম পুত্রের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই চূড়ান্ত পরাজয় ঘটল রাজপুতদের। ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৫ আগস্ট কেল্লার পতন হল। রক্তে পিচ্ছিল সূর্যতোরণ অতিক্রম করে কেল্লায় ঢুকলেন আলাউদ্দিন।'

অনিকেত তার কথা শেষ করার পর পার্থ বলল, 'তুই তো ভালো গল্প বলতে পারিস। বিদ্যাপতিবাবুর চেয়ে কোনও অংশে কম যাস না।'

অনিকেত কবজি উলটে একবার ঘড়ি দেখল, তারপর বলল, 'চল, তা হলে এবার পদ্মিনী প্রাসাদের দিকে যাওয়া যাক।'

মন্দির চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে এল অনিকেতরা। একজন স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে পদ্মিনী প্রাসাদে যাওয়ার রাস্তাটা জেনে নিল তারা। তারপর সেই রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল।

মোরাম বিছানো রাস্তা একদম সোজা চলে গিয়েছে। রাস্তার দু'পাশে বড় বড় গাছ আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। কিছুটা এগোবার পর রাস্তার বাঁ পাশে চোখে পড়ল একটা বিরাট মাঠ। সেই মাঠে একজন লোক একটা মোটরবাইক নিয়ে চক্কর কাটছে। লোকটির হাত মনে হয় কাঁচা। মাঝে মাঝেই প্রচণ্ড গোঁ গোঁ শব্দ করছে গাড়িটা। তা দেখে পার্থ বলল, 'সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী কত পাল্টে যায়। হয়তো এই মাঠে একসময় ঘোড়ায় চড়া শিখত লোকে, আর আজ শিখছে মোটরবাইক। হয়তো আর একশো বছর পর এই মাঠ থেকে স্পেসশিপ উড়ে যাবে মহাকাশে।'

অনিকেত পার্থর কথা শুনে কী একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ সে দেখতে পেল, বাইকটা প্রচণ্ড শব্দ করতে করতে ঝড়ের বেগে মাঠ ছেড়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে আসছে। তা দেখে অনিকেত পার্থর হাত ধরে টেনে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাদের কয়েক হাত দূর দিয়ে বাইকটা মাঠ ছেড়ে রাস্তায় উঠে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উলটো দিকের একটা গাছে ধাক্কা মারল। চালক আর বাইক দু'পাশে ছিটকে পড়ল। ঘটনাটা দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল তারা। কিন্তু পরপরেই দুজনে ছুটল লোকটা যেখানে পড়ে আছে সেদিকে। তারা যখন লোকটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, তখন লোকটি মাটির উপর উঠে বসেছে। পার্থ বুঝতে পারল আঘাতটা তা হলে সেরকম মারাত্মক নয়। মাথায় হেলমেট থাকায় বেঁচে গিয়েছে লোকটি। সে ইশারায় তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিতে বলল। দু'জনে মিলে দাঁড় করিয়ে দিল লোকটিকে। লোকটির পরনে ব্লু জিনস আর লাল রঙের টি-শার্ট, পায়ে স্পোর্টস শু। লোকটি তার মাথার হেলমেটটি খোলার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। হাত উপরে ওঠাতে কষ্ট হচ্ছে। ডান হাতের কনুইয়ের কাছে বেশ অনেকটা ছড়ে গিয়েছে, রক্ত বের হচ্ছে সেখান থেকে। অনিকেত তার হেলমেটটা খুলে দিতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ল বছর তিরিশের এক যুবকের সুন্দর মুখ। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর সে হিন্দিতে বলল, 'ধন্যবাদ, আসলে নতুন কিনেছি গাড়িটা, তাই কন্ট্রোলে রাখতে পারিনি।' তারপরই সে অনিকেতদের জিগ্যেস করল, 'আপনারা কি টুরিস্ট?'

পার্থ উত্তর দিতে যাচ্ছিল, 'হ্যাঁ, কিন্তু বিদ্যাপতির সেই কথাটা মনে পড়ে যাওয়ায় সে বলল, 'আমরা এখানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছি।'

তার কথা শোনার পর সে কয়েক মুহূর্ত পার্থর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, 'আজ সকালে পণ্ডিতজির টাঙায় তো আপনারাই ছিলেন?'

পার্থ কিছুটা অবাক হয়ে বলল, 'হ্যাঁ।'

অনিকেতের মনে হল, লোকটিকে আগে কোথায় দেখেছে। হঠাৎ সে চিনে ফেলল লোকটিকে। এই লোকটাই তো রাজার মতো পোশাক পরে ঘোড়ায় চেপে অনিকেতদের টাঙার পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল কেল্লায় আসার পথে। বিদ্যাপতির কথা অনুযায়ী সে একজন রাজবংশধর। অনিকেতের সঙ্গে একটা জলের বোতল ছিল। সেটা দেখে লোকটি বলল, 'আমাকে একটু জল দিন।'

বোতলের মুখটা খুলে অনিকেত জলের বোতলটা এগিয়ে দিল। পার্থর এবার নজর পড়ল গাড়িটার উপর। সে কাছে গিয়ে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে দিল। নামি কোম্পানির হালফ্যাশনের দামি বাইক, এখনও নম্বর হয়নি। গাড়ির হেডলাইটটা ভেঙে গিয়েছে। তা ছাড়া অন্য কোনও ক্ষতি হয়নি। পার্থ ফিরে এল। লোকটি চোখে মুখে বেশ ভালো করে জল দিয়ে এবং খানিকটা জল খেয়ে অনিকেতকে বলল, 'ঘোড়ার পিঠ থেকে পোলো খেলার মাঠে বেশ কয়েকবার পড়েছি, তবে বাইক থেকে এই প্রথম পড়লাম। অবশ্য দিন পাঁচেক আগে জয়পুর থেকে বাইকটা আনিয়েছি।'

অনিকেত বলল, 'এটা কোনও ব্যাপার নয়। প্রথম প্রথম এরকম দুর্ঘটনা অনেকেরই ঘটে।'

পার্থ জিগ্যেস করল, 'আপনি পোলো খেলেন?'

সে বলল, 'শুধু খেলি নয়, আমি একটা নামি দলের ক্যাপ্টেন।'

পার্থ জিগ্যেস করল, 'কোথায় খেলেন?'

'উদয়পুরে একটা প্লে-গ্রাউন্ড আছে সেখানে,' এর পর লোকটি পার্থকে জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা পণ্ডিতজি আপনাদের কেমন আত্মীয় হন?'

বাধ্য হয়ে মিথ্যে কথা বলতে হল পার্থকে। বলল, 'উনি আমাদের সম্পর্কে কাকা হন।'

তাদের কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত যেন কী ভাবল লোকটা। পার্থরা যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল তার কিছু দূরে একটা পাথরের ভাঙা স্তম্ভ রাস্তার পাশে শোয়ানো ছিল। সেটা দেখিয়ে লোকটি বলল, 'চলুন, ওই পাথরটার উপর একটু বসি। আপনাদের সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।'

পার্থ এবং অনিকেত লোকটির সঙ্গে গিয়ে বসল সেখানে। বসার পর লোকটি জিগ্যেস করল, 'আমার পরিচয় এখনও দেওয়া হয়নি আপনাদের। আমার নাম রানা বিক্রম সিংহ। আপনারা নিশ্চয়ই মহারানা কুম্ভের কথা শুনেছেন, আমি তাঁদের বংশধর।'

অনিকেত বলল, 'আপনি যে রাজবংশধর এ কথা কাকা বলেছেন আমাদের। তবে আপনি যে মহারানা কুম্ভের বংশধর তা জানা ছিল না।'

অনিকেতের কথা শুনে এতক্ষণ পর পার্থও চিনতে পারল তাকে। বিক্রম সিংহ বললেন, 'আপনাদের কাকা আর কিছু বলেননি আমার সম্পর্কে?'

অনিকেত বলল, 'না।'

বিক্রম সিংহ এরপর একটু দোনোমোনো করে বললেন, 'পণ্ডিতজিকে আপনারা একটু বোঝান। গণপতিজি আমার প্রয়াত পিতার বন্ধু ছিলেন, তাঁকে আমি ঠকাব না। আমি তাঁকে পাঁচ লাখ পর্যন্ত দিতে রাজি আছি। আর সেখানে কিছু পেলে তারও একটা অংশ আমি তাঁকে দেব। প্রাসাদটা যেন তিনি আমাকেই দেন।'

অনিকেতরা বিক্রম সিংহের কথা কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে। পার্থ বিক্রম সিংহকে বলল, 'আমরা আপনার কথা বুঝতে পারছি না। আপনি কোন প্রাসাদের কথা বলছেন?'

'আমি ঝুনঝুন প্রাসাদের কথা বলছি। পণ্ডিতজির বাড়ির উত্তরে জঙ্গলের মধ্যে যে প্রাসাদটা রয়েছে,' বললেন বিক্রম সিংহ।

অনিকেত অবাক হয়ে বলল, 'ওই প্রাসাদের মালিক বিদ্যাপতি ভট্টাচার্য?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'কেন, আপনারা জানেন না সেটা?' তার গলায় বিস্ময়ের সুর ঝরে পড়ল। এরপর উঠে দাঁড়ালেন বিক্রম সিংহ। ঠোঁটের কোনায় তাঁর চাপা হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, 'গণপতিজি বা পণ্ডিতজির মুখে আগে কিন্তু শুনিনি যে, তাঁর কোথাও কোনও ভাই আছে। যাই হোক, আমার কথাটা কিন্তু আপনারা চাচাজিকে বলবেন।'

ইতিমধ্যে সেখানে এসে হাজির হন বিক্রম সিংহের সেই দুই ঘোড়সওয়ার সঙ্গী। তাদের একজন বিক্রম সিংহের সেই কালো ঘোড়টাকেও সঙ্গে করে এনেছে। বিক্রম সিংহ তাদের দেখে অনিকেতদের বললেন, 'ওরা আমার দেহরক্ষী। আমাকে খুঁজতে এসেছে। আপনারা এবার যান, অনেকটা সময় নষ্ট হল আপনাদের। আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।'

অনিকেতরা উঠে পড়ল তাঁর কথা শোনার পর। তারপর তাঁকেও ধন্যবাদ জানিয়ে যখন রাস্তার দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছে, তখন বিক্রম সিংহ বললেন, 'আরও দুটো কথা বলবেন পণ্ডিতজিকে। তিনি যেন লকেশ সিংহের থেকে সাবধানে থাকেন, আর আমি কিন্তু ভূত বিশ্বাস করি না', এই বলে তিনি এগিয়ে গেলেন বাইকটার দিকে।

অনিকেতরা হাঁটতে শুরু করল নিজেদের গন্তব্যের দিকে। যেতে-যেতে পার্থ বলল, 'লোকটি মনে হয় বুঝতে পেরেছে যে, আমরা বিদ্যাপতিবাবুর কেউ হই না।'

অনিকেত বলল, 'তাঁর ঠোঁটের কোনায় হাসি দেখে আমারও তাই মনে হল।'

পার্থ বলল, ব্যাপারটা তোর কী মনে হল? বিক্রম সিংহ কথাগুলো আমাদের বললেন কেন?'

অনিকেত বলল, 'আমাদের মাধ্যমে বিদ্যাপতিবাবুর কানে তাঁর কথাগুলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য', তারপর অনিকেত বলল, 'তাঁর শেষের কথাটার মধ্যে কেমন যেন রহস্য লুকিয়ে আছে বলে আমার মনে হল।'

পার্থ বলল, 'ওই ভূত বিশ্বাস না করার ব্যাপারটা তো। আমারও মনে হচ্ছে কথাটার অন্য কোনও তাৎপর্য আছে।'

কথা বলতে বলতে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই অনিকেতরা এসে হাজির হল পদ্মিনী প্রাসাদের কাছে। প্রাসাদের চারপাশে খুব নিস্তব্ধ। শুধু মাঝে মাঝে কোথা থেকে একটা ঘুঘুর ডাক শোনা যাচ্ছে। ছোট্ট প্রাসাদ, মোরাম বিছানো পথ ধরে প্রাসাদের ভিতর ঢুকল। পথে দু'পাশে কাঠগোলাপের বাগান, বড় বড় ফুল ফুটে আছে। ফুলের গন্ধে ম-ম করছে বাতাস। মোরাম বিছানো রাস্তার দু'পাশে ছোট ছোট ঘর। রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে একটা প্রাচীরের গায়ে। অনিকেতরা গিয়ে দাঁড়াল সেই প্রাচীরের সামনে। প্রাচীরের ওপাশে বেশ কিছুটা নীচে একটা ছোট্ট সরোবর। তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি প্রাসাদ। তার থেকে ধাপে ধাপে সোপানশ্রেণি নেমে গিয়েছে সরোবরের জলে। এই সেই বিখ্যাত জলমহল। অনিকেতের মনে হল, বহুশ্রুত সেই কাহিনি। রূপসী রানি পদ্মিনীকে নিজের বিবি করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আলাউদ্দিন অবরোধ করে বসলেন চিতোরগড়। কিন্তু তিন মাস অবরোধ করার পরও যখন তিনি কেল্লায় ঢুকতে পারলেন না, তখন তিনি মহারানা লক্ষ্মণ সিংহের কাছে প্রস্তাব পাঠালেন, একবার মাত্র পদ্মিনীকে চোখের দেখা দেখতে চান। তার পরেই তিনি ফিরে যাবেন দিল্লির পথে। দুর্যোগ এড়াবার জন্য লক্ষ্মণ সিংহ রাজি হয়েছিলেন তাঁর প্রস্তাবে। তবে শর্ত ছিল, সুলতান একা ঢুকবেন কেল্লায় এবং আয়নায় পদ্মিনীর প্রতিবিম্ব দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে তাঁকে। সুলতান রাজি হলেন এই প্রস্তাবে। শর্ত অনুযায়ী একদিন সুলতানকে নিয়ে আসা হল পদ্মিনী প্রাসাদের একটা ঘরে। সেখানে রাখা ছিল বিশাল এক আয়না। দিনের শেষে পড়ন্ত সূর্যের আলোয় জলমহলের সোপানশ্রেণী বেয়ে সরোবরের ধারে এসে দাঁড়ালেন রূপসী রানি। সরোবরের স্বচ্ছ জলে তাঁর প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয়ে ধরা দিল ঘরের মধ্যে রাখা আয়নায়। তাঁর অপার সৌন্দর্য দেখলেন সুলতান। পরে অবশ্য সুলতান তাঁর কথা রাখেননি। তিনি ধ্বংস করেন চিতোরগড়। আর পদ্মিনী জহরব্রত পালন করে কুম্ভ প্রাসাদের ভূগর্ভস্থ একটি ঘরে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেন। মহাকালের সাক্ষী হয়ে আজও অনিকেতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রাসাদ। দিনের শেষে, পড়ন্ত বিকেলের অস্তাচলগামী সূর্যের লাল আভা এসে ছড়িয়ে পড়েছে ছোট্ট সাদা জলমহলের মাথায়। এরকমই একসময় ছিল সেদিন, যখন আলাউদ্দিনকে দেখা দেওয়ার জন্য সোপানশ্রেণি বেয়ে স্বচ্ছ জলাশয়ের তীরে এসে দাঁড়িয়েছিলেন রূপসী রানি পদ্মিনী। জলমহলের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা বিষণ্ণতা নেমে এল অনিকেতের মনে। পার্থও তাকিয়েছিল সেদিকে। হঠাৎ সে জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা, আলাউদ্দিন তো চিতোরের সব কিছু ধ্বংস করেছিলেন, তবে জলমহলকে ধ্বংস করেননি কেন?'

অনিকেত বলল, 'হয়তো সুলতানের পাষাণ হৃদয়ে কিছু করুণার সঞ্চার হয়েছিল রানির মৃত্যুতে। তাই তিনি তাঁর স্মৃতিবিজড়িত জলমহলের কোনও ক্ষতি করেননি। এ ব্যাপারে ইতিহাসে তেমন কিছু লেখা নেই।'

'কী, আপনাদের জলমহল দেখা হল?' কথাটা শুনে পিছনে ফিরে তাকিয়ে অনিকেতরা দেখল, তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন বিদ্যাপতি।

অনিকেত বলল, 'হ্যাঁ, হল।'

বিদ্যাপতি বললেন, 'চলুন, তা হলে ফেরা যাক। আপনাদের ভাগ্য ভালো, বাজারে মাছও পেয়ে গেলাম। মাছ এখানকার বাজারে কখনও সখনও আসে।'

কোনও কথা না বলে অনিকেত আর পার্থ প্রাসাদের বাইরে যাওয়ার জন্য বিদ্যাপতির পিছন পিছন হাঁটতে শুরু করল। বাইরে বেরিয়ে এসে তারা উঠে বসল টাঙায়।

বিদ্যাপতির টাঙা ফিরে চলল তাঁর আস্তানার দিকে। সন্ধে নামছে চিতোরগড়ের বুকে। আস্তে-আস্তে অন্ধকার গ্রাস করে নিচ্ছে কেল্লার বুরুজ-মিনার-অলিন্দগুলোকে। একটু-একটু ঠান্ডাও লাগতে শুরু করেছে অনিকেতদের। বিদ্যাপতি ঠিকই বলেছিলেন। সূর্য ডোবার সঙ্গে-সঙ্গে ঠান্ডা নামে এখানে। অনিকেতরা চুপচাপ বসে দু'পাশ দেখতে-দেখতে চলেছে। সারাদিনের পরিশ্রমে বিদ্যাপতির ঘোড়াটা মনে হয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তার চলার গতি কিছুটা মন্থর। বিদ্যাপতিও কোনও কথা বলছিলেন না। মাঝে মাঝে শুধু মুখ দিয়ে শব্দ করছিলেন তাঁর ঘোড়াটার উদ্দেশ্যে। পার্থ একসময় ইশারা করল অনিকেতকে বিক্রম সিংহের ব্যাপারটা বিদ্যাপতিকে বলার জন্য। একটা গলাখাঁকারি দিয়ে অনিকেত বিদ্যাপতিকে বললেন, 'আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।'

তার কথাটা মনে হয় কানে গেল না। পার্থর মনে হল, টাঙা চালাতে চালাতে তিনি যেন অন্য কোনও চিন্তার মধ্যে ডুবে আছেন। অনিকেতরা টাঙায় ওঠার পর তাদের সঙ্গে কোনও কথা বলেননি। এমনিতে কিন্তু তিনি মিশুকে প্রকৃতির মানুষ, কথা বলতে ভালোবাসেন। অনিকেত আবার বলল কথাটা। এবার তার কথা কানে গেল বিদ্যাপতির। তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, বলুন।'

অনিকেত বলল, 'রানা বিক্রম সিংহের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল, তিনি আপনাকে কিছু বলতে বলেছেন।'

কথাটা কানে যেতেই চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকালেন বিদ্যাপতি। হয়তো তাঁর হাতের লাগামে টান পড়ে গিয়েছিল, থেমে গেল তাঁর ঘোড়া। নিজেকে মুহূর্তের মধ্যে সামলে নিয়ে ঘোড়াটাকে আবার চালাতে শুরু করে বিদ্যাপতি জিগ্যেস করলেন, 'কীভাবে তাঁর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় হল?'

অনিকেত ঘটনাটা বলল বিদ্যাপতিকে। বিক্রম সিংহ কী কী বলতে বলেছেন বিদ্যাপতিকে সে কথাও বলল অনিকেত। তার কথাগুলোর কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে শুনে গেলেন বিদ্যাপতি। অনিকেত আর পার্থ মনে করেছিল, কথা শোনার পর এ বিষয়ে মুখ খুলবেন বিদ্যাপতি। কিন্তু তিনি চুপচাপ টাঙা চালাতে লাগলেন। সম্ভবত কথাগুলো শোনার পর আরও গম্ভীরভাবে কিছু ভাবতে লাগলেন। পার্থ হঠাৎ বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করল, 'আপনি কি সত্যি সত্যি ওই প্রাসাদের মালিক?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'হ্যাঁ, আমার উর্ধ্বতন চতুর্থ পুরুষ চণ্ডীপতি, বিক্রম সিংহের ঊর্ধ্বতন ষষ্ঠ পুরুষ রানা বীরভদ্র সিংহের থেকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে লাভ করেন ওই প্রাসাদ। ওই প্রাসাদে একটা সরস্বতী মন্দির ছিল, চণ্ডীপতি ছিলেন সেখানকার পূজারি।'

পার্থ বলল, 'আপনি তো তা হলে অনেক বড়লোক। একেবারে একটা প্রাসাদের মালিক।

বিদ্যাপতি বললেন, 'ইট-পাথরের স্তূপের মালিককে যদি বড়লোক ধরেন, তা হলে সে অর্থে আমি বড়লোক। আসলে বীরভদ্রের তো অনেক আগে এই প্রাসাদ পরিত্যক্ত হয়ে যায়। মন্দিরটা অবশ্য সে সময় টিকে ছিল। আমার ঊর্ধ্বতন তৃতীয় পুরুষ উমাপতির আমলে সেটাও ধ্বংস হয়ে যায়। এখন শুধু রয়েছে প্রাসাদের দক্ষিণ মহলের কয়েকটা দোতলা ঘর আর সেই লাগোয়া একটা অলিন্দ। আর কিছু নেই।'

অনিকেত এবার জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা, প্রাসাদটার নাম ''ঝুনঝুন প্রাসাদ'' কেন?'

টাঙা চালাতে চালাতে বিদ্যাপতি বললেন, 'আসলে এই প্রাসাদের নাম ''সরস্বতী প্রাসাদ''। চিতোরে অন্য অনেক কিছুর মতো এই প্রাসাদও মহারানা কুম্ভ তৈরি করান। ঝুনঝুন নামে একসময় এক রাজ্য ছিল। মহারানা যেদিন ওই ঝুনঝুন রাজ্য জয় করেছিলেন, সেইদিন ওই প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। এই জন্যে ওই প্রাসাদ ঝুনঝুন প্রাসাদ নামেও পরিচিত হয় এবং সরস্বতী প্রাসাদের চেয়ে ঝুনঝুন প্রাসাদ নামটাই বেশি খ্যাতি লাভ করে।'

অনিকেত বলল, 'আপনাকে দুটো প্রশ্ন করব? যদিও তাঁর পিছনে কোনও কারণ নেই, নিছক কৌতূহল মেটাবার জন্যই জানতে চাই।'

বিদ্যাপতি বলল, 'হ্যাঁ, করুন।'

অনিকেত বলল, 'আমার প্রথম প্রশ্ন হল, ওই ধ্বংসপ্রায় প্রাসাদ বিক্রম সিংহ কিনতে চাইছেন কেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনিও বিক্রম সিংহ অত টাকা দিতে চাওয়া সত্ত্বেও প্রাসাদটা তাকে বিক্রি করছেন না কেন?'

টাঙা চালাতে চালাতে গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে বিদ্যাপতি বললেন, 'আপনাদের প্রথম প্রশ্নের উত্তর হল, ওঁর ধারণা ঝুনঝুন প্রাসাদে কোথাও গুপ্তধন লুকোনো আছে। আর তাই খুঁজে বের করার জন্য উনি প্রাসাদটা কিনতে চাইছেন।'

বিদ্যাপতির কথা শুনে অনিকেতের মনে পড়ে গেল যে, এর ইঙ্গিত বিক্রম সিংহের কথাতেও ছিল। কারণ, বিক্রম সিংহ অনিকেতদের বলেছেন যে, সেখানে কিছু পেলে তার একটা অংশ তিনি বিদ্যাপতিকে দান করবেন। বিদ্যাপতি এরপর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মাঝখানে হঠাৎ পার্থ জিগ্যেস করল, 'ঝুনঝুন প্রাসাদে সত্যিই কি গুপ্তধন থাকতে পারে? আপনার কী মনে হয়?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'প্রাচীন প্রাসাদে গুপ্তধন পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তবে অধিকাংশ সময়েই দেখা যায় যে, এসব প্রাসাদকে কেন্দ্র করে যেসব গল্প শোনা যায়, সেগুলো সবই মিথ্যে রটনা। খোঁজাখুঁজিই সার হয়, মেলে না কিছুই।'

বিদ্যাপতির টাঙা এবার একটা বাঁক নিয়ে বাড়ির পথ ধরল। বিদ্যাপতি বললেন, 'এবার আপনাদের দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দেব। যদিও ব্যাপারটা গোপনীয়, তবুও বিশ্বাস করে আপনাদের বলছি। কোনও সময় ইচ্ছে হলেও বিক্রম সিংহকে প্রাসাদটা আমি বিক্রি করতে পারব না। কারণ, প্রাসাদটা আমি একজনের কাছে বিক্রি করব বলে কথা দিয়েছি। আমি যদি প্রাসাদটা তার হাতে তুলে না দিই, তা হলে সে আমার ক্ষতি করতে পারে।'

'সে কি খুব ক্ষমতাবান ব্যক্তি?' জানতে চাইল অনিকেত।

বিদ্যাপতি বললেন, 'হ্যাঁ, তার নাম রানা লকেশ সিংহ। তিনি উদা'র বংশধর, জ্ঞাতিসূত্রে তিনি বিক্রম সিংহের কাকা হন। তাঁর নামে অনেক কানাঘুষো শোনা যায়। কেল্লার লোকজন বেশ ভয় করে চলে তাঁকে।'

অনিকেত জিগ্যেস করল, 'কোন উদা? কুম্ভপুত্র উদা? যে পিতাকে খুন করেছিল?'

'হ্যাঁ, সে-ই', বললেন বিদ্যাপতি।

তাঁর কথা শুনে পার্থ বলল, 'আপনি অমন লোকের পাল্লায় পড়লেন কী করে?'

একটু চুপ করে থেকে বিদ্যাপতি বললেন, 'সে এক লম্বা গল্প। আপনারা আমার স্বজ্ঞাতি, আমার কোনও ক্ষতি করবেন না। তাই যে কথা আমি কোনও দিন কাউকে বলিনি, সেকথা আজ আমি আপনাদের বলব। বলব, কারণ, এ ব্যাপারে আমি আপনাদের পরামর্শ চাই। কেল্লার কোনও লোকের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে আমি ভরসা পাচ্ছি না। আমাকে একটু জল দিন, তারপর বলছি আমার কথা।'

বিদ্যাপতি থামিয়ে দিলেন তাঁর টাঙা। রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ল অনিকেতরা, যেখানে সকালবেলায় ময়ূর দেখেছিল তারা।

সন্ধে নেমে আসছে, আকাশে আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে গোল চাঁদ। সেই আলোয় অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে দু'পাশের ধ্বংসস্তূপগুলো। অনেক দূর থেকে ভেসে আসা ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পেল অনিকেতরা। বোতল থেকে জল খেতে খেতে বিদ্যাপতি বললেন, 'চিতোরেশ্বরী মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, সেখানে সন্ধ্যারতি শুরু হল।'

জল খাওয়ার পর আবার টাঙা চালাতে শুরু করে বিদ্যাপতি বললেন, 'একটু আগে থেকেই বলি, তা হলে বুঝতে সুবিধে হবে। বছর পাঁচেক আগের কথা, আমার দাদা গণপতি তখন বছর দু-এক হল, উদয়পুরের এক মিউজিয়ামের কিউরেটরের চাকরি ছেড়ে কেল্লায় এসে বসবাস করতে শুরু করেছেন। দাদা বরাবরই কেল্লার বাইরে তার আগের জীবন কাটিয়েছেন। বিয়ে-থা করেননি। কিউরেটরের চাকরির আগে জয়পুরের এক কলেজে অধ্যাপনার কাজ করতেন। যাই হোক, কেল্লায় আসার পর তিনি পড়াশোনা নিয়েই সময় কাটাতেন, আর ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন কেল্লার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা খণ্ডহর প্রাসাদগুলোয়। তাঁর একজন সঙ্গী ছিলেন, তিনি হলেন বিক্রম সিংহের বাবা বিজয় সিংহ। তিনিও পণ্ডিত মানুষ ছিলেন। কেল্লার ইতিহাস নিয়ে চর্চা করতেন। হঠাৎ একদিন তিনি খুন হয়ে যান।'

অনিকেত বিদ্যাপতির কথার মাঝে হঠাৎ বলল, 'খুন! কেন খুন হয়েছিলেন তিনি?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'দাদা আর বিজয় সিংহ খুব বেড়াতেন বিভিন্ন প্রাসাদে। কীভাবে যেন রটে গিয়েছিল তাঁরা কোথাও কোনও গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছেন। সম্ভবত তাঁর মুখ থেকে গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়ার জন্যই কেউ অপহরণ করে তাঁকে। সাতদিন নিখোঁজ থাকার পর তাঁর মুন্ডুহীন পচা-গলা মৃতদেহ গোমুখকুণ্ডের কাছে পাওয়া যায়। পোশাক দেখে শনাক্ত করা হয় তাঁকে। পুলিশ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু অপরাধীর সন্ধান পায়নি।'

এরপর একটু দম নিলেন বিদ্যাপতি। টাঙা তাঁর বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। আর মিনিট পাঁচেকের পথ। বিদ্যাপতি বললেন, 'এবার আমি আসল ঘটনায় অর্থাৎ লকেশ সিংহের ফাঁদে কীভাবে পড়লাম, বলছি। বিজয় সিংহের মৃত্যুর সপ্তাহ খানেকের মধ্যে দাদাও এক দুর্ঘটনায় পড়েন। একদিন বিকেলে বাড়ি থেকে হাঁটতে বেরিয়ে তিনি আর বাড়ি ফিরলেন না। পরদিন তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া গেল ঝুনঝুন প্রাসাদে। তাঁর মাথায় পাথরের চাঙড় খসে পড়েছিল। অচৈতন্য দাদাকে লোকজনের সাহায্যে আমি প্রথমে নিয়ে যাই চিতোর হাসপাতালে। কিন্তু সেখান থেকে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় জয়পুরের এক হাসপাতালে। জয়পুর হাসপাতালে যখন তিনি পৌঁছন, তখন তিনদিন কেটে গিয়েছে, কিন্তু দাদার জ্ঞান ফেরেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে জানাল, মাথায় অস্ত্রোপচার করতে হবে। নইলে তাঁর জ্ঞান আর কোনওদিন ফিরবে না। এ কাজের জন্য প্রায় এক লক্ষ টাকার দরকার। দাদার টাকাকড়ি কোথায় আছে তা আমি কোনও দিন জানার চেষ্টা করিনি। এদিকে আমার কাছে কিছুই নেই বললেই চলে। মহা সমস্যায় পড়লাম আমি। চেনাশোনা লোকের জন্য হন্যে হয়ে টাকা ধারের জন্য ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। কিন্তু পাছে শোধ দিতে না পারি, সেই ভয়ে কেউই আমাকে অত টাকা ধার দিতে রাজি হল না। কারণ, আমার চাকরি নেই। কোনও স্থায়ী উপার্জন নেই। কাজেই এ ব্যাপারে তাদের দোষ দেওয়া যায় না। টাকা জোগাড় করতে না পারায় যখন দাদাকে বাঁচানোর আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি, ঠিক এমন একসময় একদিন আমার বাড়িতে এসে হাজির হন লকেশ সিংহ। লকেশ সিংহকে আমি আগে চিনলেও তাঁর সঙ্গে পরিচয় ছিল না আমার। তিনি আমাকে বললেন যে, তিনি আমাকে এক লক্ষ টাকা সুদে ধার দিতে পারেন, কিন্তু তার পরিবর্তে ঝুনঝুন প্রাসাদটা বন্ধক রাখতে হবে তাঁর কাছে। এ ছাড়া আরও দুটো শর্ত আছে তাঁর। এক, পাঁচ বছরের মধ্যে আমি যদি টাকা শোধ করতে না পারি, তবে প্রাসাদটা তাঁকে লিখে দিতে হবে। দুই, এই টাকা ধার বা প্রাসাদ বন্ধক রাখার ব্যাপারটা অর্থাৎ চুক্তির ব্যাপারটা আমি অমৃত্যু কাউকে জানাতে পারব না। আমার তখন টাকার দরকার। আমি রাজি হয়ে গেলাম তাঁর প্রস্তাবে। তাঁর দেওয়া টাকাতেই আমি দাদাকে বাঁচিয়ে আনলাম, যদিও আঘাতের জন্যে মাথাটা খারাপ হয়ে গেল তাঁর। বলাবাহুল্য, টাকাটা আমার পক্ষে এখনও শোধ দেওয়া সম্ভব হয়নি। সুদে-আসলে এখন তা দু'লক্ষেরও বেশি হয়েছে। পাঁচ বছর শেষ হতে এখনও মাস দুয়েক বাকি আছে। কিন্তু ওই টাকা আমার পক্ষে শোধ দেওয়া আর সম্ভব নয়। দিন কুড়ি আগে তিনি এসেছিলেন আমার কাছে। কোথা থেকে তিনি যেন খবর পেয়েছেন যে, বিক্রম সিংহও প্রাসাদটা কিনতে চান। তিনি আমাকে বললেন যে, তিনি জানেন টাকা শোধ দেওয়া আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। কিন্তু সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই যদি আমি প্রাসাদটা তাঁর হাতে তুলে দিই, তা হলে আজীবন মাসিক দু'হাজার টাকা করে আমাকে তিনি দিয়ে যাবেন। কোনও এক বিশেষ কারণে অতি দ্রুত নাকি ওই প্রাসাদ তাঁর দরকার।

এ প্রস্তাব ভাবার জন্য তিনি আমাকে কিছুদিন সময় দিয়েছিলেন। সেই সময়সীমা আজই শেষ হচ্ছে। আমার সিদ্ধান্ত জানতে আজ রাতেই আমার বাড়িতে তিনি আসবেন।'

টাঙা বিদ্যাপতির বাড়ির একদম কাছে চলে এসেছে। অনিকেত দেখতে পেল তার বাড়িটা। বিদ্যাপতি বললেন, 'প্রাসাদটা কিন্তু লকেশ সিংহের হাতে তুলে দেওয়ার আমার কোনও ইচ্ছে নেই। লোকটিকে মোটেই পছন্দ করি না। কিন্তু কী করব? আমি ওঁর কাছে ফেঁসে গিয়েছি। একথা আমি বলতেও পারছি না বিক্রম সিংহকে। গোপনীয়তা ভঙ্গ করলে লকেশ সিংহ আমাকে ছাড়বেন না। তিনি নাকি একবার একটা খুনের ঘটনায় ধরা পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষী দিতে না চাওয়ায় পুলিশের হাত থেকে তিনি মুক্তি পেয়ে যান।'

টাঙা এসে দাঁড়াল বিদ্যাপতির বাড়ির সামনে। টাঙা থেকে নামতে-নামতে বিদ্যাপতি বললেন, 'সবই তো আপনাদের বললাম। এখন একটু ভেবে বলবেন, কী করা যায়? আমার সিদ্ধান্ত আজকেই তাঁকে জানাতে হবে।'

টাঙা থেকে লাফ দিয়ে নেমে অনিকেত বলল, 'ঠিক আছে, দেখি অন্য কোনো রাস্তা বাতলানো যায় কিনা?'

টাঙা থেকে অনিকেত আর পার্থ নীচে নামার পর বিদ্যাপতি টাঙায় তাদের বসার আসনের তলা থেকে একটা বাজারভর্তি ব্যাগ বের করে পার্থর হাতে দিয়ে বললেন, 'এটা একটু ধরুন। ঘোড়াটাকে গাড়ি থেকে খুলে তারপর দরজার তালা খুলছি। সারাদিন আজ বেচারার উপর দিয়ে অনেক ধকল গিয়েছে।'

এই বলে ঘোড়া আর গাড়ির সঙ্গে বাঁধা চামড়ার ফিতেগুলো খুলতে শুরু করলেন তিনি। অনিকেত চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগল। বেশ ঠান্ডা পড়েছে। চারপাশে নিঝুম পরিবেশ। দূরে জঙ্গলের মাথার উপর দিয়ে চাঁদের আলোয় ঝুনঝুন প্রাসাদটা বেশ অস্পষ্টভাবে দেখতে পেল অনিকেত। পার্থ এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। হঠাৎ সে বিদ্যাপতিকে বলল, 'আপনাকে একটা কথা জিগ্যেস করছি। বিক্রম সিংহ আপনাকে বলতে বলেছেন যে, তিনি ভূতে বিশ্বাস করেন না। এর কারণ কী?'

বিদ্যাপতি ঘোড়াটাকে গাড়ি থেকে খুলে ফিরে দাঁড়ালেন পার্থর দিকে। তারপর বললেন এক অদ্ভুত কথা, 'ঝুনঝুন প্রাসাদে চাঁদনি রাতে এক ছায়ামূর্তিকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। তার দীর্ঘ শরীর, মাথা থেকে পা পর্যন্ত পোশাকে ঢাকা, হাতে ধরা থাকে বিরাট এক বর্শা। স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস, ওই ছায়ামূর্তি আসলে নাকি মহারানা কুম্ভের প্রেতাত্মা। কুম্ভ ওরকম পোশাক আর বর্শা ব্যবহার করতেন। বিক্রম সিংহের ধারণা, আসলে ওই ছায়ামূর্তির ব্যাপারটা আমারই কারসাজি। ওখানে গুপ্তধন লুকানো আছে বলে আমি ভূতের ভয় দেখিয়ে কৌশলে মানুষদের ওই প্রাসাদ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি।'

তাঁর কথা শুনে অনিকেত জিগ্যেস করল, 'কুম্ভ ওই প্রাসাদে সত্যিই থাকতেন নাকি?'

কোমর থেকে চাবির গোছা বের করতে করতে বিদ্যাপতি বললেন, 'ঝুনঝুন প্রাসাদকে কেন্দ্র করে কিছু প্রাচীন জনশ্রুতি ছড়িয়ে আছে। সারাদিনের রাজকার্য শেষ হলে কেল্লার প্রান্তে নির্জন এই প্রাসাদে নাকি প্রতি সন্ধ্যায় চলে আসতেন মহারানা। তারপর প্রাসাদের কাছের মন্দিরে দেবী সরস্বতীকে প্রণাম জানিয়ে মগ্ন হতেন সঙ্গীত ও কাব্য সাধনায়। কুম্ভের বীণার মূর্চ্ছনা প্রাসাদ থেকে রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ত চারপাশে। কখনও প্রাসাদের ভিতর থেকে উদাত্ত কণ্ঠে মহারানার গীতগোবিন্দম পাঠ। গভীর রাত পর্যন্ত এইভাবে এই প্রাসাদে একাকী কাটাতেন তিনি। তাই মৃত্যুর পরেও নাকি ঝুনঝুন প্রাসাদের মায়া কাটাতে পারেননি মহারানা। আজও তাই তাঁকে দেখা যায়। আরও একটা জনশ্রুতি হল, পুত্র উদা'র ভয়ে নাকি মহারানা কুম্ভ কিছু দুর্মূল্য রত্নরাজি রাজপ্রাসাদ থেকে এনে লুকিয়ে রেখেছিলেন ঝুনঝুন প্রাসাদে। ঘুমন্ত অবস্থায় বৃদ্ধ মহারানা পাষণ্ড পুত্র উদা'র ছুরির আঘাতে নিহত হন। এখনও নাকি সেই গুপ্তধন লুকনো আছে ওই প্রাসাদে। বর্শা হাতে সেই গুপ্তধনই নাকি পাহারা দেন মহারানা কুম্ভের প্রেতাত্মা।'

কথা বলতে বলতেই দরজার তালা খুলে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়লেন বিদ্যাপতি। তারপর তিনি একটা লণ্ঠন জ্বালালেন। বিদ্যাপতির পিছন পিছন বাড়ির ভিতরে নিজেদের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল অনিকেত ও পার্থ। উঠোনের ভিতরে চাঁদের আলো এসে পড়েছে। গণপতির ঘরটার দিকে একবার চোখ গেল অনিকেতের। দরজা জানলা সব বন্ধ। ঘরের ভিতরেও কোনও সাড়াশব্দ নেই। বিদ্যাপতি তাঁর এবং অনিকেতের ঘরের মাঝে মাটিতে লন্ঠনটা নামিয়ে রাখলেন। পার্থ বাজারের ব্যাগটা বিদ্যাপতির হাতে দিয়ে শিকল খুলে ঘরের ভিতর ঢুকল। অনিকেত ঘরে ঢোকার আগে বিদ্যাপতিকে বলল, 'আপনি বরং লকেশ সিংহের কাছ থেকে আরও দু-তিনদিন সময় চেয়ে নিন। তা হলে ভালো করে ভাবার সময় পাওয়া যাবে।'

'আচ্ছা', বলে নিজের ঘরের শিকল খুলে ভিতরে ঢুকে গেলেন বিদ্যাপতি।

অনিকেতও ঢুকল নিজেদের ঘরের ভিতর। পার্থ ঘরের ভিতরে ঢুকে জানলাটা খুলে দিল। অনিকেত গিয়ে দাঁড়াল জানলার সামনে। চাঁদের আলোয় তার চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে উঠল জঙ্গলের মাথার উপর দিয়ে জেগে থাকা ঝুনঝুন প্রাসাদ।

রাত সাড়ে নটা বাজে। বিদ্যাপতির ঘরের তক্তোপোশে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে বিদ্যাপতির পাণ্ডুলিপির পাঠ শুনছিল অনিকেত আর পার্থ। তারা দুজনে বসেছে একপাশে, আর অন্য পাশে লণ্ঠনের সামনে একটা জলচৌকির উপর পাণ্ডুলিপিটা নিয়ে বিদ্যাপতি। লন্ঠনের আলোয় একের পর এক অনুচ্ছেদ পাঠ করে চলেছেন। শুনতে খুব একটা মন্দ লাগছে না অনিকেত আর পার্থর। হয়তো বইটা ছাপানো যেতে পারে। তবে অনিকেতের মনে হল, প্রামাণ্য ইতিহাসের তুলনায় লেখাটায় স্থানীয় উপকথা বা লোকগাথার প্রাধন্যই বেশি। বিদ্যাপতির সঙ্গে পার্থ আর অনিকেতের কথা হয়েছে। লেখাটা শোনার পর প্রাথমিকভাবে যদি তা পছন্দ হয়, তবে সেটা তারা কলকাতায় নিয়ে যাবে। এ বিষয়ে কোনও অভিজ্ঞ লোককে দেখাবার পর তাঁর সম্মতি পেলে ছাপাবার চেষ্টা করবে। আর অমনোনীত হলে পাণ্ডুলিপিটা ডাকযোগে বিদ্যাপতিকে পাঠিয়ে দেবে।

মন দিয়ে বিদ্যাপতির লেখা শুনছিল অনিকেত। বিদ্যাপতি তখন সংগ্রাম সিংহের কাহিনি পাঠ করছেন, 'যুদ্ধ জয় করে কেল্লায় ঢুকেছেন সংগ্রাম। সূর্যতোরণের দু'পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রাজপুত কুলনারীরা শঙ্খধ্বনি আর পুষ্পবৃষ্টি করছেন তাঁর উদ্দেশ্যে। মহারানার ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়ল। তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন কুলপুরোহিত। হাতে তাঁর চিতোরেশ্বরী মন্দিরের পবিত্র হোমাগ্নি। মহারানা স্পর্শ করবেন তা। পুরোহিত হোমাগ্নির পাত্র তুলে ধরলেন ঘোড়ার পিঠে বসা মহারানার দিকে। মুহূর্তের জন্য কেমন যেন থমকে গেলেন মহারানা। তারপর বাঁ হাত দিয়ে সেই পবিত্র অগ্নি স্পর্শ করে সেই হাত নিজের মাথায় ছোঁয়ালেন। কিন্তু বাঁ হাত কেন। বৃদ্ধ কুলপুরোহিতের দৃষ্টি পড়ল মহারানার ডান হাতের দিকে। তিনি দেখলেন, মহারানার ডান হাতটা কবজির নিচ থেকে আর নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি হারিয়েছেন সেটি। অথচ তার জন্য মহারানার চোখে মুখে কোনও কষ্টের ছাপ নেই। বরং তাঁর মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে আছে যুদ্ধজয়ের আনন্দ', এই পর্যন্ত পাঠ করে হঠাৎ থেমে গেলেন বিদ্যাপতি।

অনিকেত আর পার্থর কানে গেল, কে যেন বাইরের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। কানখাড়া করে শব্দটা শোনার পর বিদ্যাপতি বললেন, 'নিশ্চয়ই লকেশ সিংহ। তাঁর এসময়ই আসার কথা।'

তাঁর কথা শুনে অনিকেত বলল, 'সময় নেওয়ার ব্যাপারটা মনে আছে তো? আমরা এখানে বসব, না নিজেদের ঘরে ফিরে যাব?'

বিদ্যাপতি প্রথমে বললেন, 'হ্যাঁ, মনে আছে। আরও তিনটে দিন সময় চেয়ে নেব আমি,' তারপর বললেন, 'আপনাদের এখানে বা পাশের ঘরে থাকার দরকার নেই। আপনারা আমার সঙ্গে বাইরের ঘরে চলুন। যাঁর কথা এত শুনলেন, তাঁকে একবার দেখবেন না?'

তক্তপোশ থেকে নামতে-নামতে অনিকেত বলল, 'ঠিক আছে চলুন, দেখি তাঁকে।'

লন্ঠনটা হাতে নিয়ে সেই ঘর ছেড়ে বিদ্যাপতি হাজির হলেন বাইরের ঘরে। তাঁর সঙ্গে গেল অনিকেত আর পার্থ। তারা গিয়ে দাঁড়াল ঘরের কোনায়। দরজা খুলে দিলেন বিদ্যাপতি। যিনি ঘরে ঢুকলেন তাঁর দীর্ঘ চেহারা। পরনে পুরোদস্তুর রাজস্থানী পোশাক। পায়ে নাগরা, কানে দুল, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে 'লোঙ'। কোমরবন্ধ থেকে ঝুলছে একটা লম্বা তরবারি। ঘরের মাঝখানে দরজার ঠিক উলটো দিকে গোটা দুয়েক চেয়ার রাখা আছে। তিনি ঘরে ঢুকে বসলেন তারই একটায়। দরজার পাল্লাটা বন্ধ করে লণ্ঠনটা মাটিতে নামিয়ে রেখে ওঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন বিদ্যাপতি। লণ্ঠনের আলো এসে পড়েছে লোকটির মুখে। তাঁর চেহারায় যে দুটো জিনিস অনিকেতের দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তা হল তাঁর পেল্লাই গোঁফ আর মুখের ডান দিকে কপাল থেকে চিবুক পর্যন্ত নেমে আসা লম্বা কাটা দাগ। লোকটির বয়স মনে হয় পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। চেয়ারে বসার পর লকেশ সিংহ বিদ্যাপতিকে বললেন, 'কী ঠিক করলে পণ্ডিত? আমি কিন্তু কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে তৈরি হয়ে এসেছি।'

বিদ্যাপতি তাঁর কথা শোনার পর চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। উত্তর না পেয়ে লকেশ সিংহ বিদ্যাপতিকে কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকা অনিকেতদের উপর। ঘরের মধ্যে তাদের উপস্থিতি এতক্ষণে তিনি খেয়াল করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। পার্থ খেয়াল করল, লকেশ সিংহের ডান হাতটা সঙ্গে সঙ্গে আড়াআড়ি ভাবে চলে গেল তরবারির হাতলে। তাদের দিকে কয়েক মুহূর্ত তীক্ষ্নদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর লকেশ সিংহ বিদ্যাপতিকে বললেন, 'এঁরা কারা? তোমার এখানে তো কারওর থাকার কথা নয়।'

বিদ্যাপতি বললেন, 'ওঁরা আমার আত্মীয়। কলকাতা থেকে কয়েকদিনের জন্য কেল্লায় বেড়াতে এসেছেন।'

লকেশ সিংহ বললেন, 'তোমার আত্মীয় আছে জানা ছিল না।'

অনিকেতরা বুঝতে পারল, স্পষ্ট অবিশ্বাসের সুর ঝরে পড়ল লকেশ সিংহের গলায়। লকেশ সিংহ এরপর জিগ্যেস করলেন, 'আমার কাছে খবর আছে, আজ বিকেলে দুজন বাইরের লোকের সঙ্গে কথা বলছিল বিক্রম, এ দুজন তারা নয় তো?'

মিথ্যে বললেন বিদ্যাপতি, 'না, বিক্রম সিংহকে ওঁরা চেনেন না।'

'না চেনাই ভালো।' বললেন লকেশ সিংহ।

বিদ্যাপতি এবার একটু ইতস্তত করে লকেশ সিংহকে বললেন, 'আমাকে আরও তিনটে দিন সময় দিতে হবে', তারপর অনিকেতদের দেখিয়ে তিনি লকেশ সিংহকে বললেন, 'ওরা ফিরে যান, তারপর আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব।'

বিদ্যাপতির কথা শুনে লকেশ সিংহ কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন তাঁর দিকে। তারপর বললেন, 'ঠিক আছে, তিনদিন পরই আসব আমি। তবে সেদিন কিন্তু খালি হাতে ফিরব না।' এই বলে লকেশ ঘর ছেড়ে চৌকাঠের বাইরে পা রাখতে গিয়েও আবার ফিরে দাঁড়ালেন, তারপর অনিকেতদের বললেন, 'তোমরা কেল্লা দেখতে এসেছ, কেল্লা দেখে ফিরে যাবে। তার বেশি কোনও কিছুতে নাক গলাতে যাবে না। তাতে বিপদ হবে। আর পণ্ডিত তোমার অবস্থা হবে বিজয় সিংহের মতো', এই বলে বিদ্যাপতির দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি হেসে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন লকেশ সিংহ।

লকেশ সিংহ বেরিয়ে যাওয়ার পর অনিকেত গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বিদ্যাপতি ঘরের মাঝে একই জায়গায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনিকেত দরজাটা বন্ধ করার পর বিদ্যাপতি বললেন, 'দেখলেন তো, যাওয়ার সময় কেমন হুমকি দিয়ে গেল? মনে হয়, ওঁকে প্রাসাদটা দেওয়া ছাড়া আমার আর কোনও উপায় নেই।'

অনিকেত তাঁর কথার কোনও উত্তর দিল না। পার্থ এবার বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা, ওঁর মুখের কাটা দাগটা কীসের?'

লন্ঠনটা তুলে নিয়ে বাড়ির ভিতর দিকে যেতে যেতে বিদ্যাপতি বললেন, 'অসম্ভব সাহস এই লোকটির। চিতোরে ওঁর চেয়ে বড় তলোয়ারবাজ আর কেউ নেই। যুবা বয়সে উনি একবার বন্ধুদের সঙ্গে তলোয়ার নিয়ে আরাবল্লির জঙ্গলে বুনো শূকর শিকারে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি হঠাৎ এক দাঁতালের মুখোমুখি পড়েন। দাঁতাল শূকর বড় সাংঘাতিক। মরবার আগে সে তার হত্যাকারীকে নিয়ে মরতে চেয়েছিল। কিন্তু নেহাতই বরাত জোরে বেঁচে যান লকেশ সিংহ। তবে সেই লড়াইয়ের চিহ্ন সারা জীবনের জন্য আঁকা হয়ে যায় লকেশ সিংহের মুখে।'

তাঁর কথা শুনে পার্থ বলল, 'সত্যিই তা হলে লোকটি দুর্ধর্ষ প্রকৃতির, প্রচণ্ড সাহস আছে বলতে হবে।'

বিদ্যাপতি বললেন, 'হ্যাঁ, সকলে সে কথাই বলে।'

বিদ্যাপতির ঘরে ঢুকে অনিকেতরা যখন তক্তপোশের উপর আবার বসতে যাচ্ছে, ঠিক তখন তাদের কানে এল গণপতির গলা, 'বিদ্যা, আমার আজ খিদে পেয়েছে। আমাকে খেতে দে।'

বিদ্যাপতি তক্তপোশে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়েছিলেন। গণপতির গলা কানে যেতেই তক্তপোশ থেকে নেমে ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালেন। অনিকেত আর পার্থও বাইরে এসে দাঁড়াল। গণপতির ঘরের দরজা-জানলা আগের মতোই বন্ধ আছে। বিদ্যাপতি সেই বন্ধ ঘরটার দিকে তাকিয়ে একটু জোরে বললেন, 'তোমার খাবার দিচ্ছি দাদা।'

কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধতার পর আবার শোনা গেল গণপতির গলা, 'তাড়াতাড়ি দে, খাওয়ার পর আমি ঝুনঝুন প্রাসাদে যাব। রানা আমার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছেন। তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি।'

অনিকেত বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করল, 'উনি কি বাড়ির বাইরে যান নাকি?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'না, ওঁকে আমি বাড়ির বাইরে যেতে দিই না।'

পার্থ বলল, 'তা হলে যে উনি প্রাসাদে যাওয়ার কথা বললেন?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'আসলে আজ তো পূর্ণিমা। অমাবস্যা পূর্ণিমায় ওঁর মাথাটা একটু বেশি গণ্ডগোল হয়ে যায়। এরকম নানা ভুলভাল কথা বলতে থাকেন তখন।'

অনিকেত এবার বলল, 'রানা বলতে উনি কার কথা বললেন? রানা কুম্ভের?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'না, রানা মানে রানা বিজয় সিংহ। তাঁকে শুধু রানা বলেই সম্বোধন করতেন দাদা।' এর পর বিদ্যাপতি অনিকেতদের বললেন, 'আপনারা একটু আপনাদের ঘরে গিয়ে বসুন। আমি ওঁকে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করি। আজ অনেক দিন পর দাদা নিজে থেকে খেতে চাইলেন', এর পর তিনি অনিকেতকে জিগ্যেস করলেন, 'এখন ক'টা বাজে?'

ঘড়ি দেখে অনিকেত বলল, 'দশটা বাজতে পাঁচ।'

তাই শুনে বিদ্যাপতি বললেন, 'তা হলে খুব বেশি রাত হয়নি এখনও আমার আধঘণ্টা মতো সময় লাগবে। তারপর আমি আপনাদের আবার পাণ্ডুলিপিটা শোনাতে বসব।'

অনিকেত বলল, 'ঠিক আছে। রাত বারোটার আগে বাড়িতে আমি ঘুমোই না।'

বিদ্যাপতি গিয়ে ঢুকলেন তাঁর ঘরে। তিনি চলে যাওয়ার পর পার্থ বলল, 'আমি বরং ঘরে গিয়ে খাটে বসি। পা দুটো বড্ড টনটন করছে।'

এই বলে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল পার্থ। অনিকেত একা দাঁড়িয়ে রইল বাইরে। আকাশে বেশ বড় চাঁদ উঠেছে। তার আলোয় ভেসে যাচ্ছে সারা উঠোন। অনিকেত তাকিয়ে রইল চাঁদের দিকে। তার মনে পড়ে গেল, ঠাকুরমার কথা। ছেলেবেলায় অনিকেতকে কোলে নিয়ে চাঁদ দেখিয়ে তাঁকে চাঁদের চরকাকাটা বুড়ির গল্প শোনাতেন সেই ঠাকুরমা। চাঁদের দিকে তাকিয়ে সেই ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ে যেতে লাগল তার।

হঠাৎ একটা মৃদু শব্দ কানে যেতে চিন্তাজাল ছিন্ন হল অনিকেতের। সে দেখল, কখন যে খুলে গিয়েছে গণপতিবাবুর ঘরের জানলাটা। ঘরের ভিতর থেকে তিনি উঁকি মারছেন। চাঁদের আলো এসে পড়েছে তাঁর গায়ে। সেই আলোয় তার বুক পর্যন্ত নেমে আসা সাদা দাড়ি ধবধব করছে। তিনি তাকিয়ে আছেন অনিকেতের দিকে। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর অনিকেত বুঝতে পারল, বৃদ্ধ ডান হাত তুলে ইশারায় তাকে কাছে ডাকছেন। একটু ইতস্তত করে অনিকেত ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়াল তার জানলার সামনে। এবার সে একদম কাছ থেকে দেখতে পেল বৃদ্ধকে। তাঁর এলোমেলো সাদা চুলের ফাঁক দিয়ে কপালের একপাশে উঁকি মারছে একটা গভীর ক্ষতচিহ্ন। তাঁর শরীরে কাপড় প্রায় কিছুই নেই। শুধু একটা সাদা কাপড়ের ফালি জড়ানা রয়েছে কোমরে। অনিকেত কাছে যাওয়ার পর বেশ কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বৃদ্ধ জিগ্যেস করলেন, 'তুমি কি গুপ্তধন খুঁজতে এসেছ?'

অনিকেত বলল, 'না, আমরা বেড়াতে এসেছি।'

বৃদ্ধ বিড়বিড় করে বললেন, 'বেড়াতে...বেড়াতে...রানা আর আমিও বেড়াতে যেতাম।'

অনিকেত তাকিয়ে রইল বৃদ্ধের দিকে। বৃদ্ধ বললেন, 'আমার ঘরের দরজা খুলে দাও। আমি ঝুনঝুন প্রাসাদে বেড়াতে যাব।'

অনিকেত কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, 'আপনার ভাই খাবার নিয়ে আসছেন। তিনি খুলে দেবেন।'

বৃদ্ধ এর পর ধীরে ধীরে জানলাটা বন্ধ করে দিলেন। জানলার কাছ থেকে সরে আসতে যাচ্ছিল অনিকেত, হঠাৎ সে শুনতে পেল, ঘরের ভিতর থেকে হেসে উঠলেন গণপতিবাবু। আবার দাঁড়িয়ে পড়ল অনিকেত। সে শুনতে পেল ঘরের ভিতর থেকে গণপতিবাবু নিজের মনে বলছেন, 'সকলেই ভেবেছে পোশাক দেখিয়ে আমাকে ধোঁকা দেবে। কুম্ভের গুপ্তধন খোঁজা অত সহজ নয়। ভগবতীর মুখ দিয়ে ঢুকতে হয় তাঁর উদরে, সেখানে সরস্বতীও আছেন, লক্ষ্মীও আছেন...এক দেবী নকল...তাঁকে পাহারা দেন নকল কুম্ভ...'

এরপর আরও কীসব কথা বললেন গণপতিবাবু। কিন্তু সেগুলো আর স্পষ্টভাবে কানে এল না অনিকেতের। সম্ভবত কথা বলতে বলতে ঘরের অন্য পাশে চলে গেলেন তিনি। অনিকেত দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, কথাগুলো কি নিছক পাগলের প্রলাপ, নাকি অন্য কিছু? হঠাৎ পার্থর গলা তার কানে এল, 'অনি, একবার ভিতরে আয়।'

অনিকেত ঢুকল তাদের ঘরে। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে পার্থ। সে গিয়ে তার পাশে দাঁড়াতে পার্থ বলল, 'ওই শিমুলগাছটার দিকে তাকা।'

বিদ্যাপতিবাবুর বাড়ি থেকে একটু দূরে জঙ্গল যেখানে শুরু হয়েছে, সেখানে একটা বাজে পোড়া পাতাহীন শিমূলগাছ আছে। অনিকেত দেখতে পেল, সেই শিমুলগাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে এক ঘোড়সওয়ার। ঠিক পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সে। চাঁদের আলো চুঁইয়ে পড়ছে ঘোড়াটার গা থেকে। মাঝে মাঝে লেজটা নাড়ছে সে। লোকটার মাথাটা নীচের দিকে ঝোঁকানো। এত দূর থেকে তাকে চেনা যাচ্ছে না। পার্থ বলল, 'লোকটা অনেকক্ষণ থেকে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে এ বাড়িটার ওপর নজর রাখছে।'

অনিকেত বলল, 'লোকটা কে হতে পারে? লকেশ সিংহের চর নয় তো?'

পার্থ বলল, 'আমার কিন্তু দেখে অন্য একজনের কথা মনে হচ্ছে। লক্ষ করে দ্যাখ, ঘোড়াটার সামনের দুটো পায়ের নীচের দিকে সাদা ফেট্টি জড়ানো আছে। বিক্রম সিংহের ঘোড়ার পায়েও আমি ওরকম ফেট্টি দেখেছি। আর লোকটির চেহারাও ওঁরই মতো।

অনিকেত বলল, 'হ্যাঁ, এবার আমারও তাই মনে হচ্ছে।'

বারান্দার ভিতর থেকে শিকল খোলার শব্দ কানে এল। তারপর বিদ্যাপতিবাবুর গলার অস্পষ্ট শব্দ। গণপতিবাবুকে সম্ভবত খাবার দিচ্ছেন বিদ্যাপতি। অনিকেত আর পার্থ জানলা দিয়ে তাকিয়ে রইল সেই ঘোড়সওয়ারের দিকে। মিনিট পাঁচেক পর ঘোড়সওয়ার একটু নড়ে উঠল। তারপর তার ঘোড়ার মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে তাদের চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। আর ঠিক তখনই ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বিদ্যাপতিবাবু তাদের বললেন, 'এবার আসুন, আমার কাজ হয়ে গিয়েছে।'

জানলার কাছ থেকে ঘরের বাইরে এল দুজনে। অনিকেত যখন বিদ্যাপতিবাবুর ঘরে ঢুকতে যাচ্ছে, তখন সে একবার তাকাল গণপতিবাবুর ঘরের দিকে। সেই ঘরের দরজাটা খোলা। ভিতর থেকে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা বাইরে এসে পড়েছে। মোম জাতীয় কোনও ছোট আলো সম্ভবত জ্বলছে সেখানে। খাওয়া সারছেন হয়তো গণপতিবাবু।

তক্তপোশে বসার পর অনিকেত বিদ্যাপতিবাবুকে জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা, ঝুনঝুন প্রাসাদের প্রেতাত্মার ব্যাপারটা আপনি নিজে বিশ্বাস করেন?'

অনিকেতের প্রশ্ন শুনে চশমার ফাঁক দিয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন বিদ্যাপতি। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন, 'হ্যাঁ, করি, কারণ আমি তাকে দেখেছি।'

তাঁর কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল পার্থ আর অনিকেত। পার্থ জিগ্যেস করল, 'কীভাবে?'

উত্তর দেওয়ার জন্য সোজা হয়ে বসলেন বিদ্যাপতি। তারপর বললেন, 'মাস ছয়েক আগে এরকমই এক চাঁদনি রাতে দরজা খোলা পেয়ে দাদা বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটতে শুরু করলেন জঙ্গলের দিকে। তাঁর পিছন পিছন ছুটতে ছুটতে একসময় আমি গিয়ে হাজির হলাম এই ঝুনঝুন প্রাসাদের কাছে। তখনই আমি দেখতে পেলাম তাঁকে। চাঁদনি রাতে বর্শা হাতে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন অলিন্দে, ঋজু, বলদীপ্ত ভঙ্গিতে', এই বলে চুপ করে গেলেন বিদ্যাপতি।

পার্থ জিগ্যেস করল, 'তারপর কী হল?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'ভয়ে আমার হাত-পা অবশ হয়ে গিয়েছিল। আমি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ পর অদৃশ্য হয়ে যায় সেই ছায়ামূর্তি। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে আসি। দাদাকে আর সে রাতে খোঁজা হয়নি আমার। পরদিন সকালে তিনি আবার নিজেই ফিরে আসেন। আমি তাঁকে জিগ্যেস করি, সারারাত তিনি কোথায় ছিলেন? তিনি বললেন, ঝুনঝুন প্রাসাদে রানার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।'

বিদ্যাপতির কথা শুনে পার্থ কী একটা জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তারা তিনজনই হঠাৎ শুনতে পেল, বাইরের ঘরের দরজায় কে যেন ধাক্কা দিচ্ছে। তাই শুনে বিদ্যাপতি বললেন, 'এত রাতে আবার কে এল? লকেশ সিংহ ফিরে এল না তো?'

বিদ্যাপতির গলাটা কাঁপা-কাঁপা শোনাল। মনে হল, তিনি ভয় পেয়েছেন। পার্থ তাই বলল, 'ভয় পাচ্ছেন কেন? প্রাসাদটা হস্তগত করা লকেশ সিংহের মূল উদ্দেশ্য। তিনি মুখে যাই বলুন, প্রাসাদটা হস্তগত না হওয়া পর্যন্ত কোনও ক্ষতি আপনার হবে বলে মনে হয় না।'

অনিকেত বলল, 'হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়। চলুন, দেখা যাক। অন্য কেউও হতে পারে।'

দরজা খোলার পর দেখা গেল লকেশ সিংহ নন, বিক্রম সিংহ। তাঁকে দেখে বিদ্যাপতি অবাক হলেও খুব একটা অবাক হল না অনিকেতরা। তা হলে তাদের অনুমানই ঠিক। গাছতলায় ঘোড়ায় চেপে একটু আগে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি বিক্রম সিংহই। বিদ্যাপতি বিক্রম সিংহকে জিগ্যেস করলেন, 'আপনি এত রাতে? আসুন, ভিতরে আসুন।'

ঘরে ঢুকলেন বিক্রম সিংহ। তারপর বসলেন ঠিক সেই চেয়ারটায়, যেখানে কিছুক্ষণ আগে এসে বসেছিলেন লকেশ সিংহ। তাঁর পরনে খাঁকি রঙের আঁটসাঁট পোশাক, কোমরে চওড়া বেল্ট, পায়ে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা হাইহিল বুট। তাঁকে লাগছে ঠিক শিকারিদের মতো। চেয়ারে বসার পর অনিকেতদের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বিক্রম সিংহ বললেন, 'আপনারা এখনও জেগে আছেন? আমি ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে পড়েছেন।'

অনিকেতের মনে হল, বিক্রম সিংহ হয়তো একান্তে কথা বলতে এসেছেন বিদ্যাপতির সঙ্গে। তাই সে বলল, 'এতক্ষণ আমরা গল্প করছিলাম, তাই জেগে আছি। আপনারা দুজন কথা বলুন, আমরা বরং ভিতরে যাই।

বিক্রম সিংহ বললেন, 'না, না, ভিতরে যাওয়ার দরকার নেই। আমি তেমন কোনও গোপন কথা বলতে আসিনি। আপনারা এখানে থাকলে কোনও অসুবিধে নেই।' তারপর তিনি বিদ্যাপতিকে বললেন, 'তা কী ঠিক করলেন পণ্ডিতজি? প্রাসাদটা আপনি কাকে দেবেন? আমাকে, নাকি লকেশ সিংহকে?'

তাঁর কথা শুনে বিদ্যাপতি চমকে উঠলেন, কিন্তু কোনও উত্তর দিলেন না। বিক্রম সিংহ এরপর একটু হেসে বললেন, 'আপনি ভাবছেন, লকেশ সিংহ যে প্রাসাদটা কিনতে চান তা আমি জানলাম কী করে? আসলে বলতে পারেন এটা আমার অনুমান। একটু আগে তাঁকে আমি এ বাড়িতে ঢুকতে এবং বের হতে দেখেছি। আমি ওঁকে বেশ কয়েক দিন প্রাসাদের কাছেও ঘুরতে দেখেছি। আপনি ভদ্রলোক। এত রাতে লকেশ সিংহের মতো লোক আপনার বাড়িতে আসবেন কেন? এসেছেন নিশ্চয়ই ওই প্রাসাদের জন্য। কী, ঠিক বললাম আমি?'

তাঁর কথা শুনে বিদ্যাপতি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, 'আমাকে ক্ষমা করবেন রানা, এ ব্যাপারে আমি এখন কিছু বলতে পারব না।'

আবার হেসে উঠলেন বিক্রম সিংহ। এবার একটু জোরেই। তারপর বিদ্যাপতিকে বললেন, 'আপনার উত্তরই বলে দিচ্ছে আমার অনুমান সঠিক। তবে লকেশ সিংহ কিন্তু লোক ভালো নন, ওঁর থেকে সাবধানে থাকবেন আপনি।'

বিদ্যাপতি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন তাঁর কথা শুনে। এরপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বিক্রম সিংহ। তারপর বললেন, 'ঠিক আছে, আমি তা হলে এখন আসি। আসলে আমি রাতে বেরিয়েছি ঝুনঝুন প্রাসাদে ভূত দেখতে যাব বলে। ভূত দেখবার আমার খুব ইচ্ছে, আজ তো চাঁদনি রাত, দেখি তাঁর দেখা পাওয়া যায় কিনা। শুনেছি, এরকম রাতেই তাঁকে দেখা যায়।' বিক্রম সিংহ বিদ্যাপতিকে বলার পর হঠাৎ অনিকেতদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'কী, আপনারাও যাবেন নাকি আমার সঙ্গে ভূত দেখতে? বেড়াতে এসে ভূত দেখতে পেলে একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে আপনাদের।'

তাঁর কথা শুনে পার্থ বলল, 'না, এত রাতে আমরা আর বাইরে যাব না। সারাদিন আমাদের অনেক বেড়ানো হয়েছে। এখন আমরা ক্লান্ত।'

পার্থর কথা শেষ হওয়ার আগেই বিক্রম সিংহ অট্টহাস্য করে উঠে বললেন, 'আমি জানতাম আপনারা রাজি হবেন না। বাঙালিরা রাজপুতদের মতো সাহসী হয় না। তারা ভিতু হয়, আর ভূতের ভয়ও পায় খুব।' এই বলে হাসতে-হাসতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন বিক্রম সিংহ।

অনিকেতরা চুপচাপ ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ পার্থ একটা কাণ্ড করল। দৌড়ে গিয়ে দরজার চৌকাঠের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, 'এই যে শুনছেন...।'

বিক্রম সিংহ ততক্ষণে তাঁর ঘোড়ার পিঠে উঠে বসেছেন। পার্থর গলা শুনে ফিরে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'আমাকে কিছু বলছেন?'

পার্থ বলল, 'হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি। আপনি একটু দাঁড়ান, আমরা যাব আপনার সঙ্গে।'

পার্থর কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল অনিকেত আর বিদ্যাপতি। আবার ঘরে এসে ঢুকলেন বিক্রম সিংহ। তারপর পার্থর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনারা সত্যিই যাবেন আমার সঙ্গে?'

পার্থ দৃঢ় গলায় বললেন, হ্যাঁ যাব। বিক্রম সিংহ বললেন, 'শাবাশ।'

পার্থ এরপর অনিকেতকে বলল, 'চ অনি, ভিতর থেকে তৈরি হয়ে আসি।'

বিদ্যাপতি বললেন, 'তা হলে আমিও যাব আপনাদের সঙ্গে। রানা, আপনি এ ঘরে একটু বসুন, আমরা এখনই আসছি।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ, আমি বসছি। কিন্তু আপনি সঙ্গে গেলে ভূতের দেখা পাওয়া যাবে তো? আপনি তো আবার ব্রাহ্মণ মানুষ!'

বিক্রম সিংহের কথার মধ্যে বিদ্যাপতির প্রতি লুকিয়ে থাকা কটাক্ষ বুঝতে অসুবিধে হল না কারওরই। কিন্তু বিদ্যাপতি কোনও উত্তর দিলেন না। তিনি বাড়ির ভিতর দিকে পা বাড়ালেন।

নিজেদের ঘরে পোশাক পালটাতে পালটাতে অনিকেত পার্থকে জিগ্যেস করল, 'কাজটা ঠিক হচ্ছে কি? এত রাতে বিক্রম সিংহের কথায় রাজি হাওয়া মনে হয় ঠিক হল না। অচেনা জায়গা। তাছাড়া ব্যাপারটার মধ্যে একটা গন্ডগোল আছে।'

জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে পার্থ বলল, 'আসলে বিক্রম সিংহ এমন ভাবে কথা বললেন যে, আমি আর মাথা ঠিক রাখতে পারলাম না। যাব যখন বলেছি তখন আর না করা যায় না। যা হওয়ার হবে।'

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে অনিকেতরা তৈরি হয়ে বিদ্যাপতির ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। বিদ্যাপতিও তৈরি হয়ে গিয়েছেন। তাঁর পরনে মালকোচা মারা ধুতির উপর ফুলহাতা সোয়েটার চাপানো। মাথায় কানঢাকা বাঁদুরে টুপি, পায়ে মোজা আর কেডস। অনিকেতদের দেখে তিনি বললেন, 'এই তক্তপোশের নীচে একটা ট্রাঙ্ক আছে। সেটা বের করতে আমাকে একটু সাহায্য করবেন?'

অনিকেতও উঁকি মারল তক্তাপোশের নীচে। বেশ বড় মাপের ট্র্যাঙ্ক। ট্রাঙ্কটা বেশ ভারী। বাইরে টেনে বের করতে খুব কসরত করতে হল। মনে হয়, অনেক দিন খোলা হয়নি বাক্সটা। তিনজনে মিলে কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর একসময় বাক্সটা খুলে গেল। বিদ্যাপতি লন্ঠনটা নিয়ে ঝুঁকে পড়লেন তার ভিতর।

নানা ধরনের জিনিসে ভর্তি সেটা। বিদ্যাপতি তাঁর ভিতর থেকে হাতড়ে হাতড়ে বের করে আনলেন একটা পুরোনো তলোয়ার। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'চলুন, এবার যাওয়া যাক। এত রাতে বাইরে খালি হাতে যাওয়া ঠিক নয়।'

অনিকেতরা বাইরের ঘরে ঢুকতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বিক্রম সিংহ। তারপর বিদ্যাপতির হাতে তলোয়ারটা দেখতে পেয়ে বললেন, 'আপনি কি ওই মরচে ধরা তলোয়ার নিয়ে রানা কুম্ভের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন নাকি? অবশ্য কুম্ভের প্রেতাত্মা যদি আপনার নিজের লোক হয়, তা হলে অন্য কথা। ওই তলোয়ারেই আপনার কাজ চলে যাবে।'

আবার একটা কথার খোঁচা দিলেন বিক্রম সিংহ। তাঁর কথা শুনে বিদ্যাপতি শুধু বললেন, 'চলুন, যাওয়া যাক।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ, যাওয়া যাক। তবে তার আগে আপনাদের একটা জিনিস দেখিয়ে নিই।' এই বলে বিক্রম সিংহ তাঁর খাকি পোশাকের নিচ থেকে কী যেন একটা টেনে বের করলেন।

অনিকেত দেখতে পেল, লন্ঠনের আলোয় তাঁর হাতে চকচক করছে একটা পিস্তল। তাদের দিকে তাকিয়ে বিক্রম সিংহ বললেন, 'এর নাম মাউজার। খাঁটি জার্মানির তৈরি, আমার নামে লাইসেন্সড করা। মানুষ হোক বা প্রেতাত্মা, এর সামনে দাঁড়ানো মুশকিল।' এই বলে পিস্তলটা কোমরে গুঁজতে গুঁজতে ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। অনিকেতরাও বিদ্যাপতির বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল ঝুনঝুন প্রাসাদের উদ্দেশ্যে।

বিদ্যাপতির বাড়ির পর বেশ খানিকটা ফাঁকা জমি, তারপর শুরু হয়েছে জঙ্গল। সেই শিমুলগাছটায় বিক্রম সিংহের ঘোড়াটাকে বেঁধে রাখার পর সকলে ঢুকলেন জঙ্গলে। সকলের আগে বিক্রম সিংহ, তারপর পার্থ আর অনিকেত, শেষে তলোয়ার হাতে বিদ্যাপতিবাবু। বিশাল বড়-বড় গাছের জঙ্গল। আকাশে চাঁদ থাকলেও গাছের বড় বড় ডালপালা ঢেকে রেখেছে তাকে। আলো জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে পারছে না বললেই চলে। তার উপর মাটিতে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে ইট আর পাথরের স্তূপ। বিক্রম সিংহ একটা টর্চ জ্বালালেন। তারপর সেই টর্চের মুখ নীচের দিকে করে ধীরে-ধীরে এগোতে লাগলেন। অনিকেত বলল, 'এছাড়া প্রাসাদে যাওয়ার পথ নেই?'

বিদ্যাপতি পিছন থেকে বললেন, 'না, রাস্তা যেখানে একসময় ছিল সেখানে এখন এর চেয়েও বেশি জঙ্গল।'

চলতে চলতে হঠাৎ খুব কাছেই একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে বিক্রম সিংহ আলো ফেললেন। অনিকেতরা দেখতে পেল, তাদের কাছেই ঝোপ থেকে বেরিয়ে এল একটা বিরাট সাপ। টর্চের আলোয় তার চোখ দুটো চুনির মতো জ্বলছে। একবার থমকে দাঁড়াল সে। মাথা উঁচু করে একবার তাকাল আলোর দিকে। তারপর সরসর করে কিছু দূরে একটা পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। বিক্রম সিংহ শুধু চাপা গলায় বললেন, 'রাজগোখরো, রাতে শিকার ধরতে বেরিয়েছে।' তারপর আবার চলতে শুরু করলেন।

অনিকেত পার্থকে বলল, 'যা দেখছি তাতে ভূতের হাতে মরণ না হলেও সাপের কামড়ে মরার আশঙ্কা যথেষ্টই আছে।'

পার্থ বলল, 'হ্যাঁ, তাই দেখছি।'

বেশ কিছুক্ষণ চলার পর একসময় ফিকে হয়ে এল জঙ্গল। গাছপালার ফাঁক দিয়ে আস্তে আস্তে অনিকেতদের চোখের সামনে ফুটে উঠতে লাগল ঝুনঝুন প্রাসাদ। তারা এসে পৌঁছল জঙ্গলের শেষ প্রান্তে। জঙ্গল যেখানে শেষ হয়েছে, তারপর বেশ কিছুটা ফাঁকা জমি। আর সেখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝুনঝুন প্রাসাদ। দ্বিতল প্রাসাদের একটা দিক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ছাদহীন কয়েকটা...দেওয়াল আর স্তম্ভ শুধু সেখানে আকাশের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাসাদের ডান দিকের অংশটা অবশ্য এখনও মোটামুটি অক্ষত আছে। লম্বা লম্বা বিরাট পাথরের স্তম্ভ ধরে রেখেছে সে অংশের দোতলা ঘরগুলোকে। সেই ঘরগুলোর সামনে একটা লম্বা অলিন্দ আছে। তার পাথুরে রেলিংগুলো অবশ্য মাঝে মাঝে ভেঙে পড়েছে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে সেই অলিন্দে। সেই আলোয় অলিন্দের পাশের ঘরের কপাটহীন দরজা জানলার গহ্বরগুলো স্পষ্ট চোখে পড়ছে অনিকেতদের। বিদ্যাপতি চাপা গলায় বললেন, 'প্রাসাদের যে অংশটা ভেঙে পড়েছে, একসময় ওই অংশেই ছিল সরস্বতী মন্দির। আর যে অলিন্দটা দেখতে পাচ্ছেন, ওখানেই আমি দেখতে পেয়েছিলাম তাঁকে।'

তাঁর কথা শুনে বিক্রম সিংহ ফিরে তাকালেন পিছনে। তারপর বললেন, 'চলুন, এবার তা হলে প্রাসাদে যাওয়া যাক। দেখা যাক, প্রাসাদের ভিতর মহারানা কুম্ভ আমাদের জন্য আবার অপেক্ষা করছেন কি না।'

তাঁর কথা শুনে বিদ্যাপতি এবার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, 'না, এত রাতে আমরা ওই প্রাসাদের ভেতর যাব না। এ জন্য আপনি আমাকে যা খুশি ভাবতে পারেন। আর আপনাকেও আমি নিষেধ করছি, একলা প্রাসাদের ভিতর না ঢুকতে। এসব ভাঙা প্রাসাদ বিষধর সাপের আড্ডাখানা। যা করবেন ভেবে করবেন।'

বিক্রম সিংহ এবার যেন থমকে গেলেন বিদ্যাপতির কথা শুনে। তারপর নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এখন সবে রাত বারোটা বাজে। ঠিক আছে। এখানে দাঁড়িয়েই আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখি, মহারানা আমাদের দর্শন দেন কি না। তারপর নয় আমি একাই ভিতরে ঢুকব।'

বিক্রম সিংহের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের কানে একটা শব্দ ভেসে এল। কোথায় যেন একটা ছোট্ট শিশু কেঁদে উঠল। কথা থামিয়ে কান খাড়া করল সকলে। কয়েক মুহূর্ত পর আবার শোনা গেল সেই শব্দ। একটা ছোট্ট শিশুর কান্না। শব্দটা এল প্রাসাদের দিক থেকেই। অনিকেত স্পষ্ট শুনতে পেল, পাশ থেকে বিদ্যাপতি বললেন, 'রাম, রাম।'

কোমর থেকে পিস্তলটা বের করে আনলেন বিক্রম সিংহ। তারপর বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে কোনও শিশুকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওই প্রাসাদের ভিতর। আমাদের আর দেরি করা ঠিক হবে না।'

তাঁর কথা শুনে হঠাৎ হাসতে শুরু করল অনিকেত। তার হাসি শুনে বিক্রম সিংহ, বিদ্যাপতি, এমনকী পার্থও অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে। হাসি থামিয়ে অনিকেত বলল, 'এটা মানুষের বাচ্চার কান্নাও নয় বা ভূতের কান্নাও নয়। শব্দটা আসলে শকুনের বাচ্চার চিৎকার। অবিকল মানুষের বাচ্চার কান্নার মতো শোনায়। আমার মামারবাড়ির গ্রামে, এ ডাক আমি অনেক শুনেছি।'

তার কথা শুনে বিক্রম সিংহ একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, 'আসলে এ ব্যাপারটা আমার জানা ছিল না।'

একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল অনিকেতরা। মাঝে মাঝে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে চাঁদ। অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে ঝুনঝুন প্রাসাদ, আশপাশের সবকিছু। আবার কয়েক মুহূর্ত পর মেঘ সরে গেলেই চোখের সামনে ফুটে উঠছে সবকিছু। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর শুরু হল মশার উপদ্রব। কোথা থেকে যেন ঝাঁকে-ঝাঁকে মশা এসে ঘিরে ধরল অনিকেতদের। ঘণ্টাখানেক তার মধ্যেই কাটিয়ে দিল অনিকেতরা। পার্থ একসময় বলল, 'না, এভাবে জঙ্গলে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খাওয়ার কোনও মানে হয় না। মনে হয়, রানা কুম্ভের প্রেতাত্মা আমাদের আজ দর্শন দেবেন না।'

তার কথা শুনে বিক্রম সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে। আসলে এসবই হচ্ছে...।'

বিক্রম সিংহ কথা শেষ করতে পারলেন না, তার আগেই বিদ্যাপতি হঠাৎ বলে উঠলেন, 'ওই যে, ওই যে।'

তাঁর কথা শুনে চমকে সকলে তাকাল প্রাসাদের দিকে। কয়েক মুহূর্ত আগেই একবার মেঘে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল চাঁদটা। মেঘটা এখন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে আবার অনিকেতদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে ঝুনঝুন প্রাসাদ। অনিকেতরা দেখতে পেল, প্রাসাদের অলিন্দে এসে দাঁড়িয়েছে এক দীর্ঘকায় ছায়ামূর্তি। মেঘ কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের আলোয় স্পষ্ট হচ্ছে তার চেহারা। সারা শরীর তার ঢোলা পোশাকে ঢাকা, মাথায় পাগড়ি, ডান হাতে ধরা একটা দু'মানুষ সমান লম্বা বর্ষা। তার ফলাটা চাঁদের আলোয় চিকচিক করে উঠল একবার। ছায়ামূর্তি একদম পাথরের মতো স্থির। অনিকেতরা সকলে অবাক হয়ে দেখতে লাগল তাকে। বিদ্যাপতি কাঁপা-কাঁপা গলায় বিক্রম সিংহকে বললেন, 'আমার কথা বিশ্বাস হল তো এবার?'

বিক্রম সিংহ তাঁর কথার কোনও জবাব দিলেন না। তিনি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন অলিন্দের দিকে। অনিকেত আর পার্থ শুনতে পেল, বিদ্যাপতি এরপর রাম নাম জপ করতে শুরু করলেন। এরপর হঠাৎই একটা কাণ্ড ঘটল। অনিকেতরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, তার কাছেই একটা ঝোপ হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে দুলে উঠল। আর সেখান থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল এক মূর্তি। সামনের ফাঁকা জমিটা ফুঁড়ে প্রাসাদের দিকে ছুটতে শুরু করল। আর তারপরই বিদ্যাপতি, 'আরে, এ যে দাদা।' বলে চিৎকার করে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পার্থকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে দৌড়তে শুরু করলেন তাঁর পিছু-পিছু। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে বিক্রম সিংহ, অনিকেত, পার্থর দু-এক মুহূর্ত সময় লাগল। তারপর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তাঁরাও ছুটতে শুরু করলেন ওঁদের পিছনে। ছুটতে-ছুটতে গণপতি অদৃশ্য হয়ে গেলেন প্রাসাদের মধ্যে। বিদ্যাপতি আর তাঁর পিছন-পিছন অন্যরাও তখন প্রায় প্রাসাদের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন।

ঠিক তখন অট্টহাস্য করে উঠল অলিন্দে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মূর্তি। ছুটতে ছুটতে অনিকেতের মনে হল, ছায়ামূর্তির ডান হাতটা যেন একটু উপর দিকে উঠল। পরমুহূর্তে বর্শাটা অলিন্দের দিকে ছুটে এল সকলের আগে ছুটতে থাকা বিদ্যাপতির দিকে। একটা আর্তনাদ করে মাটিতে মুখথুবড়ে পড়ে গেলেন বিদ্যাপতি। আর সঙ্গে-সঙ্গেই বিক্রম সিংহ দাঁড়িয়ে পড়ে সেই ছায়ামূর্তিকে লক্ষ্য করে চালিয়ে দিলেন গুলি। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল চারদিক। ডানা ঝটপট করে উঠল জঙ্গলের ভীত পাখির দল। বিক্রম সিংহের গুলি ঠিক ছায়ামূর্তির গায়ে লাগল কি না বোঝা গেল না। তার শরীরটা শুধু জোরে একবার ঝাঁকুনি খেল। আর তারপরই আবার রক্তজল করা অট্টহাস্য হেসে উঠল সেই ছায়ামূর্তি। বিক্রম সিংহ তা দেখে আবার গুলি ছুঁড়তে যাবেন, কিন্তু সেই মুহূর্তেই একখণ্ড মেঘ আবার ঢেকে দিল চাঁদকে। অন্ধকারে ডুবে গেল অলিন্দ। চারপাশে নেমে এল গাঢ় অন্ধকার। দাঁড়িয়ে রইলেন বিক্রম সিংহ। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান মাত্র। তারপরেই আবার মুখ তুলল চাঁদ। কিন্তু প্রাসাদের অলিন্দ থেকে অদৃশ্য হয়েছে সেই ছায়ামূর্তি। অনিকেতরা শুনতে পেল, সেই অট্টহাসি ধীরে-ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে প্রাসাদের ভিতরে।

বিক্রম সিংহ বললেন, 'আপনাদের কেউ একজন পণ্ডিতজিকে দেখুন, আর-একজন আমার সঙ্গে আসুন।'

অনিকেত এগিয়ে গেল বিদ্যাপতির দিকে। পার্থ বিক্রম সিংহের পিছন পিছন প্রাসাদের ভিতর ঢুকল। প্রাসাদের ভিতরে চারপাশে ভেঙে পড়া পাথর আর কড়ি-বরগার স্তূপ। বিক্রম সিংহ তাঁর হাতের টর্চটা মাঝে-মাঝে জ্বালাচ্ছেন। ভাঙা দেওয়াল, স্তম্ভের ফাঁক দিয়ে ক্রমশই ভিতরে ঢুকতে লাগলেন তাঁরা। বিক্রম সিংহ পার্থকে বললেন, 'এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে গণপতিজি কোথায় গিয়ে ঢুকলেন কে জানে। কুম্ভের প্রেতাত্মাও হয়তো এখনও এ প্রাসাদ ছেড়ে যায়নি। আচ্ছা, আমার গুলিটা কি তার গায়ে লেগেছিল?'

পার্থ বলল, 'ঠিক বুঝতে পারলাম না।'

একসময় তাঁরা এসে হাজির হলেন একটা হলঘরে। বিক্রম সিংহ টর্চের আলো ফেলে দেখলেন, একটা রেলিংহীন সিঁড়ি সেই ঘরের পাশ দিয়ে উঠে গিয়েছে উপর দিকে। আগে বিক্রম সিংহ তারপর পার্থ উঠতে শুরু করলেন সেই সিঁড়ি বেয়ে। তাঁরা যখন প্রায় উপরে পৌঁছে গিয়েছেন, হঠাৎ পা রাখতে গিয়ে বিক্রম সিংহের পায়ে নিচ থেকে খসে পড়ল সিঁড়ির একটা ধাপ। আর একটু হলে নীচে পড়ে যাচ্ছিলেন তিনি। পার্থ কোনওরকমে ধরে ফেলল তাঁকে। কিন্তু বিক্রম সিংহের হাতের টর্চটা নীচের পাথরে আছড়ে পড়ে খানখান হয়ে গেল। চারপাশে নেমে এল অন্ধকার।

কোনওরকমে সাবধানে সিঁড়ির বাকি কয়েকটা ধাপ পেরিয়ে দুজনে উঠে এল দোতলায়। এবার অন্ধকার একটু কাটল। দোতলার ছাদে এক জায়গায় একটা ফাটল দিয়ে চাঁদের আলো ঘরের ভিতর ঢুকেছে। চারপাশ মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পার্থরা একটু পরে বুঝতে পারল এ ঘরটা সেই অলিন্দের পাশের ঘরই। এই ঘরের মধ্যে দিয়ে অন্য ঘরে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সেদিকে না গিয়ে বিক্রম সিংহ পিস্তল বাগিয়ে এগিয়ে গেলেন সেই অলিন্দের দিকে। না, সেখানে কেউ নেই। শূন্য অলিন্দ। পার্থও গিয়ে দাঁড়াল সেই অলিন্দে। একটু আগে এখানেই তারা দেখতে পেয়েছিল সেই ছায়ামূর্তিকে। উপর থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে তারা দেখতে পেল, মাটির উপর উঠে বসেছেন বিদ্যাপতি। অনিকেত তাঁর সামনে একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে কী যেন কথাবার্তা বলছে। তা দেখে বিক্রম সিংহ বললেন, 'যাক, পণ্ডিতজির আঘাতটা তা হলে তেমন মারাত্মাক নয়। নইলে ওভাবে উঠে বসতে পারতেন না উনি।'

পার্থ বলল, 'আমারও তাই মনে হয়।'

এরপর বিক্রম সিংহ পিস্তলটা পার্থর হাতে দিয়ে বললেন, 'আপনি এটা ধরে নীচের দিকে লক্ষ রাখুন। যদি কেউ প্রাসাদ ছেড়ে নীচের ফাঁকা জমি পার হয়ে জঙ্গলের দিকে পালাবার চেষ্টা করে তা হলে উপর থেকে সোজা গুলি চালিয়ে দেবেন। দোতলার দক্ষিণ দিকে কয়েকটা ঘর আছে। সেদিকটা আমি একবার দেখে আসি।'

পার্থ কোনও দিন রিভলভার বা পিস্তল চালায়নি। মানুষের উপর গুলি চালানো তো দূরের কথা। তবু সে পিস্তলটা হাতে নিল। তারপর বলল, 'কিন্তু খালি হাতে যাবেন ওদিকে? যদি ওই ঘরগুলোর মধ্যে ছায়ামূর্তি লুকিয়ে থাকে?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'না, খালি হাতে নয়।' তারপর তিনি একটু ঝুঁকে তাঁর জুতোর মধ্যে থেকে টেনে বের করে আনলেন একটা লম্বা ছুরি। চাঁদের আলোয় তার ধারাল ফলাটা চকচক করে উঠল। এরপর বিক্রম সিংহ অলিন্দ ছেড়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন ভিতরের দিকে।

নীচের দিকে তাকিয়ে অলিন্দে একলা দাঁড়িয়ে রইল পার্থ। নীচে কিছু দূরে বিদ্যাপতিকে ধরে দাঁড় করাবার চেষ্টা করছে অনিকেত। কিন্তু সে পারছে না। আঘাতটা মনে হয় বিদ্যাপতিবাবুর পায়ে লেগেছে। বারবার দাঁড়াতে গিয়ে আবার পড়ে যাচ্ছেন তিনি। একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, কুম্ভের প্রেতাত্মাটার ব্যাপারটা আর যাই হোক, বিদ্যাপতির কারসাজি নয়। তা হলে নিশ্চয়ই সেই ছায়ামূর্তি বিদ্যাপতিকে লক্ষ করে বর্শা ছুঁড়ত না। বিদ্যাপতি ছুটছিলেন সকলের আগে। তিনি প্রাসাদের ভিতর ঢুকুন, নিশ্চয়ই চায়নি প্রেতাত্মা। মিনিট তিনেক কেটে গেল। পার্থকে অলিন্দে দাঁড়িয়ে থাকতে সম্ভবত খেয়াল করেননি বিদ্যাপতি আর অনিকেত।

পার্থ দেখল, একসময় অনিকেতের চেষ্টায় উঠে দাঁড়ালেন বিদ্যাপতি। পার্থ অনিকেতকে ডাকতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে পিছনে পায়ের শব্দ শুনতে পেল। বিক্রম সিংহ ফিরে এসেছেন মনে করে পার্থ ঘুরে দাঁড়াতেই এক মুহূর্তের জন্য তার চোখের সামনে ফুটে উঠল কালো পোশাকে মোড়া দীর্ঘকায় এক মানুষের চেহারা। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুটো লৌহকঠিন হাত চেপে ধরল তার গলা। পার্থ কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারল না সেই বাঁধন থেকে। হাত দুটো ক্রমশই চেপে বসতে লাগল তার গলায়। অন্ধকার নেমে এল চোখে। গুলি চালাবার কথা মনেই এল না। শিথিল হাত থেকে পিস্তলটা খসে পড়ল অলিন্দের নীচের জমিতে একটা পাথরের উপর। প্রচণ্ড শব্দ তুলে একটা গুলি ছিটকে বেরিয়ে গেল। গুলির শব্দে বিদ্যাপতি আর অনিকেত চমকে উঠে তাকালেন প্রাসাদের দিকে। কিন্তু তাঁদের চোখে কিছু পড়ল না। চাঁদের আলোয় প্রাসাদ আর তার শূন্য অলিন্দ একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কোথা থেকে একটা বাদুড় ডানা ঝটপট করতে করতে উড়ে গেল চাঁদের দিকে।

পর দিন বেলা দশটার সময় কেল্লার পুলিশচৌকিতে বসে এজাহার লেখাচ্ছিল অনিকেত। টেবিলের এক দিকে পাশাপাশি চেয়ারে বসে ছিলেন বিক্রম সিংহ, অনিকেত আর বিদ্যাপতি। আর অন্য দিকের চেয়ারে বসে বিক্রম সিংহ আর অনিকেতের কথা শুনতে শুনতে সরকারি খাতায় তা লিখছিলেন পুলিশ অফিসার। গণপতির আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা, পার্থও আর বেরিয়ে আসেনি প্রাসাদ ছেড়ে। রাতের পর সকালেও তাঁরা তন্নতন্ন করে গোটা প্রাসাদ খুঁজে দেখেছেন, কিন্তু খোঁজ মেলেনি পার্থর। বিক্রম সিংহ শুধু সেই অলিন্দে খুঁজে কুড়িয়ে পেয়েছেন পার্থর ঘড়িটা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বাধ্য হয়েই পুলিশচৌকিতে হাজির হয়েছেন তাঁরা। যে অফিসার এজাহার লিখছেন তাঁর নাম করমজিৎ রাঠোর। লম্বা, ফরসা চেহারা, দাড়ি গোঁফ কামানো মুখ। চেহারায় একটা বেশ সপ্রতিভ ভাব আছে। বয়স বছর পঁয়ত্রিশ হবে। অনিকেতের সব কথা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর তিনি অনিকেতকে বললেন, 'কাজটা ঠিক হয়নি। এত রাতে প্রাসাদে যাওয়া আপনাদের মোটেই উচিত হয়নি।'

অনিকেত চুপচাপ মাথা নীচু করে শুনল তাঁর কথা। পাশ থেকে বিক্রম সিংহ বললেন, 'আসলে, বলতে পারেন এক অর্থে আমিই ওঁদের নিয়ে গিয়েছি ওই প্রাসাদে। দোষটা আসলে আমারই।'

এর পর অফিসার বিক্রম সিংহকে বললেন, 'আমি মাত্র চারদিন আগে আজমিড় থেকে বদলি হয়ে এখানে এসেছি। নতুন জায়গা, কেল্লাটা এখনও পুরোপুরি দেখা হয়নি। তবে আপনার সঙ্গীকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে যতটা চেষ্টা করা যায়, আমি তা করব। একটু পরেই আমি গাড়ি নিয়ে স্পটে যাচ্ছি। সেরকম কোনও খবর পেলে কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে আমাকে জানাবেন।'

'নিশ্চয়ই।' বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বিক্রম সিংহ।

তিনজন পুলিশ চৌকির বাইরে এসে দাঁড়ালেন। অনিকেত মাথাটা নীচের দিকে ঝোঁকাল। একটাই কথা শুধু সে ভাবছে, পার্থকে যদি খুঁজে না পাওয়া যায়, তা হলে কী হবে। কীভাবে সে একলা ফিরে গিয়ে দাঁড়াবে পার্থর বাবা-মার সামনে। বিক্রম সিংহ অনিকেতের কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'আপনি ভেঙে পড়বেন না। আমি আপনার সঙ্গে আছি, পুলিশও আছে। দেখা যাক, সকলে মিলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় কিনা।'

অনিকেত তাঁর কথার কোনও উত্তর দিল না। সে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বিক্রম সিংহ তারপর বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করলেন, 'আপনার পায়ের অবস্থা কেমন?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'ঠিক আছে, শুধু হাঁটতে একটু কষ্ট হচ্ছে।'

বরাত জোরে বিদ্যাপতি রক্ষা পেয়ে গিয়েছেন। বর্শাটা ছুটে এসে তাঁর দু'পায়ের মাঝখানে মাটিতে গেঁথে গিয়েছিল। তাতেই পা আটকে মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। কোমরে আর হাঁটুতে লাগলেও তার ধাক্কা সামলে উঠেছেন বিদ্যাপতি।

বিক্রম সিংহ এরপর বিদ্যাপতিকে বললেন, 'আপনি বরং এখন বাড়ি ফিরে যান। আর নিখোঁজ দুজনের কেউ যদি বাড়ি ফিরে আসেন তা হলে সঙ্গে সঙ্গে খবর দেবেন আমাকে।'

বিদ্যাপতি জিগ্যেস করলেন, 'আর আপনারা?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'আমরা দুজন এখন আমার মহলে যাব। আমাকে পোশাক পালটাতে হবে, একটু ফ্রেশও হয়ে নিতে হবে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা আবার পৌঁছে যাব আপনার ওখানে।'

বিক্রম সিংহের কথা শোনার পর বিদ্যাপতি ওঁদের দু'জনের থেকে বিদায় নিয়ে পুলিশচৌকির বাইরে রাখা তাঁর টাঙায় উঠে বসলেন।

বিদ্যাপতি চলে যাওয়ার পর বিক্রম সিংহ অনিকেতকে বললেন, 'চলুন, এবার রওনা হওয়া যাক। আজ সকাল থেকে তো একটা দানাও পেটে পড়েনি আপনার। আমার ওখানে কিছু খেয়ে নেবেন চলুন। এ সময় শরীর দুর্বল হয়ে পড়লে, মনও দুর্বল হয়ে পড়বে। আমাদের মাথা ঠান্ডা রেখে চিন্তা করতে হবে।'

অনিকেত একথার কোনও উত্তর দিল না। সে জিগ্যেস করল, 'এখানে কাছাকাছি কোনও টেলিফোন বুথ আছে?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ একটু দূরেই আছে। কিন্তু কেন?'

অনিকেত বলল, 'কলকাতায় টেলিফোন করে জানিয়ে দেব ভাবছি।'

তার কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন বিক্রম সিংহ। তারপর বললেন, 'আমার মনে হয় আজকের দিনটা অন্তত দেখে তারপর টেলিফোন করা ভালো। অত দূর থেকে আপনাদের বাড়ির লোকজন কিছু করতে পারবেন না। শুধু তাঁদের দুশ্চিন্তাই সার হবে।'

অনিকেত বুঝতে পারল কথাটা অযৌক্তিক কিছু বলেননি বিক্রম সিংহ। পার্থর মা আবার হার্টের রোগী। খবরটা তাঁর কানে গেলে অন্য দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। কাজেই সে বলল, 'ঠিক আছে, চলুন এবার। একটু দূরে একটা গাছের তলায় বিক্রম সিংহের দুই সঙ্গী নিজেদের ঘোড়া আর বিক্রম সিংহের ঘোড়াটা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। সকালবেলা বিক্রম সিংহকে খুঁজতে তারা গিয়ে হাজির হয়েছিল বিদ্যাপতির বাড়ির কাছাকাছি। বিক্রম সিংহ তাঁর নিজের ঘোড়ায় চেপে বসলেন, আর অনিকেতকে বিক্রম সিংহের এক সঙ্গী তার নিজের ঘোড়ায় উঠিয়ে নিল। পুলিশচৌকি ছেড়ে তাঁরা রওনা হলেন বিক্রম সিংহের মহলের দিকে।

পুলিশচৌকি সূর্যতোরণের কাছেই অবস্থিত। সেখান থেকে উত্তরমুখী পথ ধরলেন তাঁরা। কিছুদূর এগোবার পর অনিকেতের চোখে পড়ল কারুকার্যমণ্ডিত একটি স্তম্ভ। সম্ভবত অনিকেতের মনকে দুশ্চিন্তা থেকে সাময়িক অন্য দিকে ঘোরাবার জন্য বিক্রম সিংহ সেদিকে অনিকেতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, 'ওই দেখুন কীর্তি স্তম্ভ। কেল্লার অন্যতম দ্রষ্টব্যস্থান। অপূর্ব কারুকার্যমণ্ডিত এই স্তম্ভ তৈরি করিয়েছিলেন জিজা নামের এক জৈন বণিকের পুত্র। তিনি এই স্তম্ভ জৈন গুরু আদিনাথের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।'

স্তম্ভের চারপাশে পর্যটনকারী ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছু টাঙা আর অটোরিকশা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে সেখান দিয়ে যেতে যেতে অনিকেতের মনে হল, ঝুনঝুন প্রাসাদের ব্যাপারে যদি তারা জড়িয়ে না পড়ত, তা হলে হয়তো সে আর পার্থ এখন ওই পর্যটকের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকত। চলতে চলতে কিছুক্ষণ পর তাঁরা হাজির হলেন একটা ঘিঞ্জি এলাকায়। বিক্রম সিংহ চলতে চলতে অনিকেতকে বললেন, 'এ অঞ্চলের নাম ''মোতি বাজার''। কেল্লার যাঁরা স্থায়ী বাসিন্দা, তাঁদের একটা বড় অংশ এ অঞ্চলে বসবাস করেন। স্কুল, পোস্ট-অফিস সবই আছে এখানে।'

অনিকেতরা চলতে লাগল বাজারের মধ্যে দিয়ে। অনিকেত যে ঘোড়ায় বসে আছে, বিক্রম সিংহের ঘোড়া চলছে তার পাশাপাশি। চলতে চলতে বিক্রম সিংহ একসময় অনেকটা স্বগতোক্তির সুরে বললেন, 'আমার কয়েকটা জরুরি কেনাকাটা ছিল। কিন্তু কাল বাড়ি থেকে বাইরে আসার সময় সঙ্গে টাকা নিয়ে আসিনি। মহলে পৌঁছে আবার কাউকে এখানে পাঠাতে হবে জিনিসগুলো কেনার জন্য।'

তাঁর কথা শুনে অনিকেত বলল, 'যদি কিছু মনে না করেন তা হলে বলি, আমার কাছে হাজার তিনেক টাকা আছে। তাতে দরকার মিটলে আপনি তা নিতে পারেন। মহলে পৌঁছে ফেরত দেবেনখন।'

তার কথা শুনে বিক্রম সিংহ বললেন, 'না না, থাক। আমার বিশেষ অসুবিধে হবে না।'

অনিকেত এবার একটু জোরের সঙ্গেই বলল, 'সঙ্কোচ করবেন না। নিন, নইলে আমি দুঃখ পাব।'

তার কথা শুনে হেসে ফেললেন বিক্রম সিংহ। তারপর মনে হয় অনিকেতকে দুঃখ না দেওয়ার জন্যেই বললেন, 'ঠিক আছে, তা হলে আমাকে চারশো মতো টাকা দিন। এই প্রথম টাকা ধার করছি। সুদ নিতে হবে কিন্তু।' তাঁর কথা শুনে হেসে ফেলল অনিকেতও। বিক্রম সিংহের ঘোড়া দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে পড়ল অনিকেতের ঘোড়াও। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে খুলল অনিকেত। তার মধ্যে ছ'টা পাঁচশো টাকার নোট আর দশ বিশ টাকা খুচরো পড়ে আছে। সেখান থেকে একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে অনিকেত এগিয়ে ধরল বিক্রম সিংহের দিকে। বিক্রম সিংহ কিন্তু হাত বাড়ালেন না। তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে লাগলেন। অনিকেত জিগ্যেস করল, 'আপনি হাসছেন কেন?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'হাসছি, কারণ, এ নোট এখন এখানে চলছে না।'

'চলছে না কেন?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'কিছুদিন হল পাঁচশো টাকার জাল নোটে বাজার ছেয়ে গিয়েছে। তাই সাহস করে ওই নোট কেউ নিতে চাইছে না, বিশেষত এইসব বাজার অঞ্চলে।'

অনিকেতের মনে পড়ে গেল, গত কাল তারা যখন বিস্কুটের দোকানে ঢুকেছিল, তখন দোকানদারও তাদের একথা বলেছিল। অনিকেত বিক্রম সিংহকে বলল, 'কিন্তু আমার কাছে তো খুচরো চারশো টাকা নেই।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'তাতে আমার এখন খুব একটা অসুবিধে হবে না। টাকাটা এখন আপনি রেখে দিন। আমার মহলে গিয়ে আমার কাছ থেকে পালটে একশো টাকার নোট নিয়ে নেবেন। আপনার নোটগুলো আমি পরে অন্য কোথাও ভাঙিয়ে নেব।' বলে ঘোড়া চালাতে শুরু করলেন তিনি।

মিনিট কুড়ির মধ্যেই তাঁরা এসে হাজির এলেন বিক্রম সিংহের মহল বা হাভেলির সামনে। জায়গাটা বেশ ফাঁকা-ফাঁকা। বাড়ি ঘরগুলো দূরে-দূরে ছড়ানো। বিক্রম সিংহের হাভেলিটা দোতলা, বেশ পুরোনোও। ঘোড়া থেকে নামার পর অনিকেত জিগ্যেস করল, 'এখানে কে কে থাকেন?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'আমি একলাই থাকি এখানে, আর কয়েকজন কাজের লোক। আমার অনুপস্থিতিতে তারাই দেখাশোনা করে বাড়িটা।'

অনিকেত বলল, 'আপনার নিজের লোকজন? মানে, পরিবার পরিজন, তাঁরা কোথায় থাকেন?'

বিক্রম সিংহ হেসে বললেন, 'সেরকম আমার এখন কেউ নেই। আমি বিয়ে করিনি। ছেলেবেলায় আমার মা মারা যান। আর বাবার মৃত্যু হয় বছর পাঁচেক আগে,' এর পর একটু থেমে তিনি বললেন, 'আমি ছেলেবেলা থেকে লেখাপড়া আর খেলাধূলার কারণে কেল্লার বাইরে বাইরেই কাটিয়েছি। মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবাও একলাই কাটাতেন এ বাড়িতে।'

বিক্রম সিংহ অনিকেতকে নিয়ে হাভেলিতে ঢুকলেন। চকমেলানো বারান্দার দুপাশে বড় বড় ঘর। দেওয়ালে টাঙানো বড় বড় তৈলচিত্র, হরিণের শিংওলা মাথা, ঢাল তলোয়ার। সিনেমার পরদায় এরকম বাড়ির ছবি দেখেছে অনিকেত। বারান্দার শেষ প্রান্তে একটা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন বিক্রম সিংহ। তারপর দরজা খুলে দিয়ে বললেন, 'আপনি এ ঘরে বিশ্রাম নিন। ঘরের লাগোয়া বাথরুম আছে, তাতে স্নানও সেরে নিতে পারেন। আমিও আধ ঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয়ে নিচ্ছি। তারপর খেতে খেতে আলোচনা করা যাবে', এই বলে বিক্রম সিংহ অন্য দিকে পা বাড়ালেন।

ঘরটা বেশ বড় আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ঠিক মাঝখানে ধবধবে সাদা বিছানা পাতা। ঘরের লাগোয়া বাথরুমে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিল অনিকেত। তারপর বিছানায় শুয়ে চিন্তা করতে লাগল পার্থর কথা। কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা দেওয়া শব্দ। দরজা খুলে সে দেখল, একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে। অনিকেতকে সে বলল, 'আপনি আমার সঙ্গে আসুন, রানা আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।'

খাবার ঘরে একদম তৈরি হয়ে বসে ছিলেন বিক্রম সিংহ। স্নান সেরে পোশাক পালটে ফেলেছেন তিনি। অনিকেত ঘরে ঢুকতেই তিনি বললেন, 'আসুন, কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।'

অনিকেত খাবার টেবিলে গিয়ে বিক্রম সিংহের মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসল। টেবিলে পোর্সিলিনের পাত্রে পুরি, সবজি আর হালুয়া সাজানো আছে। একজন খানসামা গোছের লোক খাবার বেড়ে দিল দুজনের প্লেটে। অনিকেতের খেতে ইচ্ছে করছে না। দুটো মাত্র পুরি আর দু চামচ হালুয়া নিল সে। এক টুকরো পুরি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে সে বিক্রম সিংহকে জিগ্যেস করল, 'আপনার কী ধারণা, কোথায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে পার্থ?'

খেতে খেতে বিক্রম সিংহ বললেন, 'ধারণা আমার একটা হচ্ছে, তবে তা কতটা সঠিক জানি না। কেল্লার প্রাচীন প্রাসাদগুলোর গুপ্তকক্ষ, সুড়ঙ্গপথ ইত্যাদি থাকে। বাইরে থেকে তার অস্তিত্ব বোঝা যায় না। আমার ধারণা, ঝুনঝুন প্রাসাদেও সেরকম কোনও গুপ্তস্থান আছে, যেখানে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নইলে একটা মানুষ তো বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারে না?'

তাঁর কথা শুনে একটা আশার আলো ফুটে উঠল অনিকেতের মনে। সে বলল, 'তা হলে আপনার ধারণা পার্থ এখনও ওখানেই আছে?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ, যদি তাকে সুড়ঙ্গপথে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া না হয়। জানেন তো, এক প্রাসাদ থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য এখানে অনেক সুড়ঙ্গ আছে মাটির নীচে?' এরপর একটু চুপ থেকে বিক্রম সিংহ বললেন, 'খাওয়ার পর আমরা যাব ঝুনঝুন প্রাসাদে। ভালো করে দেখতে হবে প্রাসাদে কোনও গুপ্তকক্ষ বা গুপ্তপথ খুঁজে পাওয়া যায় কি না।'

তাঁর কথা শুনে অনিকেত বলল, 'আচ্ছা, আপনার কোনও লোক জানা নেই যে, এসব সুড়ঙ্গ-টুড়ঙ্গর ব্যাপারে খোঁজখবর রাখে অর্থাৎ এসব ব্যাপারে হাল-হকিকত জানে? সেরকম লোক সঙ্গে পেলে ঝুনঝুন প্রাসাদে গুপ্তকক্ষ বা সুড়ঙ্গ থাকলে তা খুঁজে বের করতে সুবিধে হতে পারে।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'না, সেরকম কোনও লোকের সন্ধান আমার এই মুহূর্তে জানা নেই।' কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বিক্রম সিংহ বললেন, 'আমার বাবা আর গণপতিজি এসব ব্যাপারে কিছু খোঁজখবর রাখতেন। দুজনে মিলে ঘুরে বেড়াতেন বিভিন্ন পুরোনো প্রাসাদে। বাবা মারা গিয়েছেন, আর গণপতিজি যদি কাল নিখোঁজও না হতেন, তা হলেও তাঁর যা অবস্থা তাতে তিনি আমাদের সাহায্য করতে পারতেন বলে মনে হয় না।'

অনিকেত আর বিক্রম সিংহের খাওয়া শেষ হতে মিনিট পনেরো সময় লাগল। তারপর তাঁরা হাভেলি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। তবে এবার ঘোড়ার পিঠে নয়, একটা হুডখোলা জিপে। জিপগাড়িটা পুরোনো। কিছুদিন আগে নাকি বিকানির থেকে গাড়িটা তিনি নিলামে কিনেছেন। অনিকেতকে গাড়িতে বসিয়ে নিজেই গাড়ি চালিয়ে মিনিট পনেরোর মধ্যে বিক্রম সিংহ এসে হাজির হলেন বিদ্যাপতির বাড়ির সামনে। সেখানে আরও একটা জিপ দাঁড়িয়ে আছে। সেটা যে পুলিশের জিপ তা দেখেই বুঝতে পারল অনিকেত। গাড়িটা দেখে বিক্রম সিংহ বললেন, 'যাক, পুলিশ তা হলে নিজের কাজ শুরু করেছে।'

জিপে কেউ নেই। বিদ্যাপতির বাড়িতে তালা ঝুলছে। তবে তাঁর টাঙাটা বাড়ির সামনে দাঁড় করানো আছে। বিক্রম সিংহ বললেন, 'মনে হচ্ছে সকলেই ঝুনঝুন প্রাসাদের দিকেই গিয়েছে।'

নিজের গাড়িটা পুলিশের জিপের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে বিদ্যাপতির বাড়ির লাগোয়া ফাঁকা জমিটা পার হয়ে অনিকেত আর বিক্রম সিংহ ঢুকলেন জঙ্গলের ভিতর। দিনেরবেলায় জঙ্গলের ভিতর কেমন গা ছমছম পরিবেশ। একটা পাখির ডাক পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না। বড় বড় গাছগুলোর নীচে ঝোপঝাড় আর অনেক পুরোনো ইট-পাথরের স্তূপ। আজ যেখানে জঙ্গল গড়ে উঠেছে, সেখানে একসময় কিছু ঘর বাড়ি ছিল বলে মনে হয়। ওই ইটের স্তূপগুলো তারই চিহ্ন বহন করছে। জঙ্গল পার হয়ে যখন তাঁরা ঝুনঝুন প্রাসাদের কাছে হাজির হলেন, তখন অনিকেত দেখতে পেল, বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সঙ্গে আছেন বিদ্যাপতিও। পুলিশকর্মীদের সঙ্গে তাঁরা যেন কীসব কথাবার্তা বলছেন। অনিকেতদের দেখতে পেয়ে একজন পুলিশকর্মী হাত নেড়ে তাঁদের ডাকলেন। অনিকেত চিনতে পারল লোকটিকে। ইন্সপেক্টর রাঠোর। বিক্রম সিংহ আর অনিকেত হাজির হলেন তাঁদের সামনে। ইন্সপেক্টর রাঠোর বিক্রম সিংহকে বললেন, 'কী, নতুন কোনও ইনফরমেশন আছে?'

বিক্রমক সিংহ বললেন, 'না। আপনি কিছু পেলেন?'

ইন্সপেক্টর রাঠোর বললেন, 'না, মাত্র মিনিট পাঁচেক হল এখানে এসেছি। প্রাসাদের ভিতর ঢোকার আগে ওঁর থেকে প্রাসাদের সম্বন্ধে জেনে নিচ্ছিলাম।' এই বলে তিনি বিদ্যাপতির দিকে তাকালেন।

বিক্রম সিংহ বিদ্যাপতিকে বললেন, 'আপনার দাদা তা হলে এখনও ফিরে আসেননি?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'না।'

ইন্সপেক্টর রাঠোর বললেন, 'তা হলে এবার প্রাসাদের ভিতরে যাওয়া যাক।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ, তবে আমরা দু'দলে ভাগ হয়ে যাই। তা হলে খোঁজার সুবিধে হবে।'

তাঁর কথামতো দু'দলে ভাগ হয়ে গেলেন। বিক্রম সিংহ, অনিকেত, বিদ্যাপতি আর একজন পুলিশকর্মী ঢুকলেন প্রাসাদের ভিতরে। আর ইন্সপেক্টর রাঠোর জনাতিনেক পুলিশকর্মীকে নিয়ে ঢুকলেন, যে অংশে একসময় সরস্বতী মন্দির ছিল, সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে।

প্রাসাদের ভিতরে একটার পর একটা ঘরের মেঝে, দেওয়াল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন বিক্রম সিংহ। সঙ্গী পুলিশকর্মীর হাতের লাঠিটা নিয়ে মাঝে মাঝে ঘা মারতে লাগলেন দেওয়ালে, মেঝেয়। ধুলোবালিতে ঢেকে যাচ্ছে অনিকেতদের জামাকাপড়, মুখ, হাত-পা। একতলায় খোঁজা শেষ হলে তাঁরা উঠে এলেন দোতলায়। সেখানেও একইভাবে লাঠি দিয়ে ঘা মারতে লাগলেন বিক্রম সিংহ। না, কোনও ফাঁপা জায়গা বা গুপ্তকক্ষ সুড়ঙ্গের সন্ধান মিলল না। ঘণ্টা দেড়েক খোঁজাখুঁজির পর অনিকেতরা আবার প্রাসাদের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। ইতিমধ্যে ইন্সপেক্টর রাঠোর ও তাঁর সঙ্গীরা ফিরে এসেছেন। তিনি বিক্রম সিংহকে জিগ্যেস করলেন, 'কী, কিছু পেলেন?'

বিক্রম সিংহ মাথা নেড়ে বললেন, 'না, আপনি?'

ইন্সপেক্টর রাঠোর বললেন, 'আমি একটা অদ্ভুত জিনিস পেয়েছি। তবে এ কেসের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'কী?'

তাঁর কথা শুনে ইন্সপেক্টর কয়েকটি লম্বা কাগজের ফালি পকেট থেকে বের করে বিক্রম সিংহের হাতে দিলেন। বিক্রম সিংহ কাগজের টুকরোগুলো হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেন। ধুলোমাখা সাদা কাগজ। তার মধ্যে কী বিশেষত্ব আছে বুঝতে না পেরে তিনি তাকালেন ইন্সপেক্টর রাঠোরের দিকে। তিনি বিক্রম সিংহকে বললেন, 'কাগজটা সূর্যের আলোয় চোখের সামনে মেলে ধরুন। তা হলেই বুঝতে পারবেন।'

তাঁর কথামতো বিক্রম সিংহ কাগজটা মেলে ধরলেন। অনিকেতও বিক্রম সিংহের হাত থেকে একটা কাগজ নিয়ে একই কাজ করতেই তার চোখের সামনে কাগজের মধ্যে ফুটে উঠল অশোক স্তম্ভের জলছাপ। বিক্রম সিংহ বললেন, 'বুঝতে পারছি, এগুলো সরকারি কাগজ।'

ইন্সপেক্টর রাঠোর কাগজগুলো ফিরিয়ে নিতে নিতে বললেন, 'এগুলো নিছক সরকারি কাগজ নয়, এগুলো কারেন্সি পেপার। অর্থাৎ যে কাগজে টাকা ছাপা হয়।'

অনিকেত বলল, 'কোথায় পেলেন এগুলো?'

ইন্সপেক্টর বললেন, 'সরস্বতী মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটা পরিত্যক্ত ময়ূরের বাসায়। কিন্তু ময়ূরটা বাসা তৈরি করার জন্য কোথা থেকে সংগ্রহ করেছে কাগজগুলো? আমি যতদূর জানি, চিতোর বা তার আশেপাশে কোথাও সরকারি টাঁকশাল নেই।' এই বলে কয়েক মুহূর্ত তিনি কী যেন ভাবলেন। তারপর অনিকেতদের বললেন, 'ছাড়ুন এসব। এখানে তো আর কিছুরই সন্ধান মিলল না। আমরা বরং এখন ফিরে যাই। তারপর সকলে মিলে ঠান্ডা মাথায় ভাবি, যে দুজন নিখোঁজ, তাঁদের অন্য কোনওভাবে সন্ধান করা যায় কিনা।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ, চলুন।'

ঝুনঝুন প্রাসাদ ছেড়ে ফেরার পথ ধরল অনিকেতরা।

১০

পার্থর যখন জ্ঞান ফিরল তখন বুঝতে পারল না সে কোথায় শুয়ে আছে। তার চারপাশে জমাটবাঁধা অন্ধকার। জায়গাটা ঠান্ডা-ঠান্ডা, কেমন যেন একটা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব। অন্ধকারে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে হাত পা নাড়াবার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। তার হাত পা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। পার্থ একবার মাথাটা ওঠাবার চেষ্টা করল, কিন্তু তাও সে পারল না। মাথাটা পাথরের মতো ভারী, গলার কাছটায় প্রচণ্ড ব্যথা। অনেক কষ্টে সে পাশ ফিরল। তারপর চিন্তা করল সে এখন কোথায়।

বেশ কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস নিল পার্থ। জায়গাটায় বাতাস কম, শ্বাস নিতে অসুবিধে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ঘরটা মাটির তলায়। পার্থ ভাবতে লাগল, যাঁরা তাকে ধরে এনেছে তারা কি তাকে মেরে ফেলবে? তার মনে কয়েক মুহূর্তের জন্য একটা আতঙ্কের সৃষ্টি হল। পরমুহূর্তেই সে ভাবল, না ভয় পেলে চলবে না। যেভাবেই হোক তাকে এখান থেকে মুক্তি পেতে হবে। এর পরেই তার মনে হল অনিকেতের কথা, বিক্রম সিংহের কথা। তাঁরা এখন কোথায়। তাঁরাও কি এখন তারই মতো বন্দি, নাকি তাঁরা এখন খুঁজে বেড়াচ্ছেন পার্থকে। পার্থর হঠাৎ কানে এল একটা অস্পষ্ট শব্দ। কান খাড়া করল পার্থ। কয়েক মুহূর্তে সে বুঝতে পারল, শব্দটা মানুষের পায়ের আর কথাবার্তার। শব্দগুলো ক্রমশই তার দিকে এগিয়ে আসছে। নড়াচড়া বন্ধ করে মড়ার মতো শুয়ে রইল পার্থ। লোকগুলো কী তাকে এখনই খুন করবে? চোখ বন্ধ করে মনটা শক্ত করার চেষ্টা করল পার্থ। বেশ কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ, সেগুলো এক সময় এসে দাঁড়াল পার্থর সামনে। কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধ। তারপর একটা ভারী গলার শব্দ শুনল সে। সেই ভারী গলা অন্য একজনকে হিন্দিতে বলল, 'দ্যাখ ছেলেটা বেঁচে আছে নাকি?'

যাকে বলল সে উত্তর দিল, 'না মারা যায়নি, অজ্ঞান হয়ে আছে।'

ভারী গলা বলল, 'ভালো করে দ্যাখ, সত্যি অজ্ঞান হয়ে আছে নাকি অজ্ঞান হওয়ার ভান করছে?'

তার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কে একজন লাথি মারল পার্থর পাঁজরে। প্রচণ্ড লাগল পার্থর, কিন্তু সে কোনও শব্দ করল না। পার্থ বুঝতে পারল এই মুহূর্তে তার সহ্যশক্তির উপর জীবন মরণ নির্ভর করছে। মনটা শক্ত করে সে পরের আঘাতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল কিন্তু আর কোনও আঘাত নেমে এল না। যে লোকটি লাথি মেরেছিল সে এবার বলল, 'না রানাজি, ছেলেটা সত্যি সত্যি অজ্ঞান হয়ে আছে।'

ভারী গলা এবার বলল, 'ছেলেটিকে এখানে আনতে গেলি কেন? ওখানেই তো শেষ করে দিলে পারতিস। পুলিশ আর বিক্রম খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে। তোর শরীরটা যেমন মোটা মাথাটাও তেমনই মোটা।'

এবার নতুন একটা গলা মিনমিন করে বলল, 'মাফ করবেন রানাজি, আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম ছেলেটিকে এখানে ধরে আনলে...'

তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে রানাজি বলল, 'থাম, আমার হাতে বেশি সময় নেই। এখানে যা আছে কাল ভোর হওয়ার আগেই সব সরিয়ে ফেলতে হবে। সব গুছিয়ে ফ্যাল। আর বৃদ্ধটিকেও এখানে নিয়ে আয়। একটা শেষ চেষ্টা করে দেখি। তারপর বৃদ্ধ আর এই ছেলেটিকে গলা কেটে কেল্লার প্রাচীরের বাইরে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে দিবি। বৃদ্ধের মুখটা নষ্ট করে দিবি, যাতে কেউ চিনতে না পারে।'

তার কথা শুনে একজন বলল, 'জি রানাজি।'

পায়ের শব্দগুলো এর পর ধীরে ধীরে পার্থর কাছ থেকে দূরে সরে গেল। তার আশপাশে আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর সাবধানে চোখ মেলল পার্থ। প্যাকিংবাক্সগুলোর মাথার উপর দিয়ে আলো এসে পড়েছে দেওয়ালের উপর দিকে। আলোটা দেখে পার্থর মনে হল, সেটা মশালের। ভালো করে দেখার পর পার্থ বুঝতে পারল জায়গাটা মাটির নীচে। একটু পরে প্যাকিংবাক্সর ওধারে কিছু দূরে গলার শব্দ শুনতে পেল পার্থ। সেই লোকগুলোর কথাবার্তার শব্দ। মনে একটু সাহস সঞ্চয় করে পার্থ তার শরীরটাকে ঘষটে একটু নীচের দিকে নামিয়ে এনে চোখ রাখল প্যাকিংবাক্সের মধ্যের ফাঁকে। পার্থর চোখের সামনে ফুটে উঠল ঘরটার ছবি। বেশ লম্বা ঘর, তার দেওয়ালের গায়ে একটা মশাল আটকানো আছে। আলো ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরে। পার্থ দেখল, ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে দুজন লোক। পার্থর দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে সম্ভবত ঘরের কোনায় যে দরজাটা আছে সেদিকে তাকিয়ে আছে তারা। পার্থর মনে হল, তারা কারও আসার প্রতীক্ষা করছে। সেই ভারীগলা, বৃদ্ধকে নিয়ে আসার কথা বলছিল। বৃদ্ধ কে? তিনি কি গণপতি? তিনিও কি তা হলে ঝুনঝুন প্রাসাদে ঢোকার পর এই লোকগুলোর হাতে বন্দি হয়েছেন? আর এই লোকগুলোই বা কে, যারা তাঁকে ধরে এনেছে?

হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকা লোক দুটোর মধ্যে একজন তার মুখটা ফেরাল। মশালের আলোয় পার্থ দেখতে পেল তার মুখটা। সেই মুখে একটা লম্বা কাটা দাগ। এবার চিনতে অসুবিধে হল না পার্থর। লোকটি লোকেশ সিংহ। তা হলে তাঁকেই রানা বলে ডাকছিল অন্যরা? আর তাঁরই নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে সব কিছু?

মিনিট দু-এক পর একজন দীর্ঘদেহী লোক কালো ঢোলা পোশাক পরে এক বৃদ্ধকে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল। ঢোলা পোশাক পরা লোকটিকে দেখেই চিনতে পারল পার্থ। ঝুনঝুন প্রাসাদের আলিন্দে জ্ঞান হারাবার আগে একেই দেখতে পেয়েছিল পার্থ তা হলে এই হল কুম্ভর সেই প্রেতাত্মা। কিন্তু এই বৃদ্ধ কে? ইনি তো গণপতি নন। বৃদ্ধের পরনে শতচ্ছিন্ন পোশাক, মুখভর্তি সাদা দাড়ি-গোঁফ, চুলগুলোও সাদা। অনেকটা ঠিক গণপতির মতো। ঢোলা পোশাক পরা লোকটি বৃদ্ধের ঘাড় ধরে টেনে হিঁচড়ে এনে দাঁড় করাল ঘরের মাঝখানে লকেশ সিংহের সামনে।

লকেশ সিংহ তাঁকে জিগ্যেস করলেন, 'আজ শেষবারের মতো তোমাকে জিগ্যেস করছি, কুম্ভ রানার গুপ্তধন কোথায় রাখা আছে?'

বৃদ্ধ তাঁর কথার কোনও উত্তর দিলেন না। তিনি চুপচাপ দাড়িয়ে রইলেন। লকেশ সিংহ তাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, বলো চুপ করে আছ কেন? না বললে আজই তোমার শেষ দিন।'

মুখ খুললেন বৃদ্ধ। শান্তস্বরে তিনি বললেন, 'সেই ভালো, তুমি বরং আমাকে মেরেই ফ্যালো। তোমার অত্যাচার আমি সহ্য করতে পারছি না। কিন্তু গুপ্তধনের সন্ধান আমি তোমাকে বলব না।'

পার্থ দেখতে পেল মশালের আলোয় ক্রমশই হিংস্র হয়ে উঠছে লকেশ সিংহের মুখ। চিৎকার করে বললেন, 'বলবি না?'

বৃদ্ধ শান্ত স্বরে বললেন, 'না, বলব না।'

তাঁর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই লকেশ সিংহ একটা সজোরে চড় কষালেন বৃদ্ধর গালে। তারপর তিনি তাঁর সঙ্গীদের কী একটা ইঙ্গিত করতেই তারা দুজনে সেই বৃদ্ধকে টেনে নিয়ে দাঁড় করাল দেওয়ালের গায়ে। সেখানে মাথার উপর পাথরের দেওয়ালের গায়ে দুটো লোহার কড়া লাগানো আছে। তার থেকে শিকল ঝুলছে। লকেশ সিংহের সঙ্গীরা বৃদ্ধের হাত দুটো মাথার উপর থেকে ঝোলা শিকলগুলোর সঙ্গে বেঁধে দিল। এর পর সেই ঢোলা পোশাক পরা লোকটি খুলে ফেলল তার পোশাক। পার্থ দেখতে পেল সেই লোকটির গায়ে ধাতুর সুতোয় বোনা একটা জ্যাকেট। ঢোলা পোশাকটি খোলার পর লোকটি জ্যাকেটের বুকের কাছে খুব ছোটমতো কী যেন একটা জিনিস খুলে নিল। তারপর সেটা একবার লকেশ সিংহকে দেখিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল প্যাকিংবাক্সগুলোর দিকে। পার্থ যেখানে শুয়ে আছে ঠিক তার কাছেই প্যাকিংবাক্সর ওপাশে জিনিসটা এসে পড়ল। জিনিসটা ছোট হলেও দেখতে পেল পার্থ। সেটা রিভলবারের বুলেট। তা হলে লোকটির গায়ের ধাতব সুতোর জ্যাকেটটা আসলে বুলেটপ্রূফ জ্যাকেট। আর বুলেটটা সম্ভবত বিক্রম সিংহের ছোঁড়া সেই বুলেট। জ্যাকেট পরা লোকটি এরপর ঘরের কোণা থেকে একটা চামড়ার সরু চাবুক তুলে এনে বৃদ্ধের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একবার সে তাকাল লকেশ সিংহের দিকে, তারপর তাঁর ইঙ্গিতে চাবুকটা চালাতে শুরু করল বৃদ্ধর উপর। লকেশ সিংহ চিৎকার করতে লাগলেন, 'বল, বল কোথায় আছে সেই গুপ্তধন?'

বৃদ্ধ কোনও উত্তর দিলেন না। চাবুকের আঘাতে তাঁর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। তাঁর সাদা দাড়ি লাল হয়ে উঠল রক্তে। মিনিটখানেক পর বৃদ্ধর মাথাটা নুয়ে পড়ল ঘাড়ের একপাশে। সংজ্ঞা হারালেন বৃদ্ধ। লকেশ সিংহ তাঁর হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'একে নিয়ে অনেকটা সময় নষ্ট হল। কিন্তু কাজ হল না। এবার চট করে সব কিছু গুছিয়ে ফ্যাল। জিনিসপত্র সব সরানো হয়ে গেলে এই বৃদ্ধ আর ছেলেটিকে শেষ করে দিবি', এই বলে লকেশ সিংহ তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

পার্থ এবার বুঝতে পারল সত্যি-সত্যি সে মৃত্যুর খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। উত্তেজনায় সে উঠে দাঁড়াল। তার পা বাঁধা। পরক্ষণেই টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল সে। মাথায় পাথুরে মেঝের আঘাতে আবার চেতনা লোপ পেল পার্থর।

১১

একটা বিরাট বড় টেবিলের দু'পাশে মুখোমুখি দুটো চেয়ারে বসে ছিলেন অনিকেত আর বিক্রম সিংহ। যে ঘরটায় তাঁরা এসে বসেছেন সে ঘরটা ছিল বিক্রম সিংহের বাবা স্বর্গত বিজয় সিংহের লাইব্রেরি। ঘরটার চারপাশে বিরাট বড় বড় আলমারি। তার মধ্যে সাজানো আছে থরে-থরে বই। বিকেল হতে চলেছে, জানলা দিয়ে নরম আলো ঘরের ভিতর এসে পড়েছে। বিক্রম সিংহ বললেন, 'আমার কিন্তু এখনও বিশ্বাস ওই প্রাসাদের কোথাও সে আছে। আর সেখানে যাওয়ার পথটাই আমাদের যে করেই হোক খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু কীভাবে?' নিজেকেই প্রশ্নটা করে আবার চুপ করে গেলেন তিনি।

তাঁর কথা শুনে অনিকেত কিছু বলল না। সে আগের মতোই নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিলিঙের দিকে। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বইয়ের আলমারির কাছে গিয়ে বইগুলো দেখতে শুরু করল। বইগুলো সবই ইংরেজি নয় হিন্দিতে লেখা। বেশির ভাগই ইতিহাস বই, বইয়ের নামগুলো দেখে বুঝতে পারল অনিকেত। হঠাৎ একটা র‌্যাকে চামড়ায় মোড়া বেশ মোটা একটা বই দেখতে পেল অনিকেত। বইটায় সোনার জলে অস্পষ্টভাবে ইংরেজিতে লেখা আছে 'এনালস অ্যান্ড এন্টিকুইটিজ অফ রাজস্থান, কর্নেল জেমস টড'। কান্নাটা ক্রমশই পাক খেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছে। নিজের মনটাকে অন্যদিকে ঘোরাবার জন্য বইটা বের করে হাতে নিল অনিকেত। তারপর বইটা খুলল। বইয়ের পাতাগুলো বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে। বইটা খোলার পর তার প্রথম পাতাটা দেখে অনিকেত বুঝতে পারল, সেটা টডসাহেবের বইয়ের প্রথম সংস্করণ। বইয়ের প্রকাশকাল আঠারশো ঊনত্রিশ। লন্ডনের প্রকাশনা সংস্থার নামও উল্লেখ করা আছে। অর্থাৎ এ বইটার বয়স প্রায় একশো আশি বছর। বইটা যে অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য তাতে কোনও সন্দেহ নেই। একটু কৌতূহলে বইটার পাতা ওলটাতে শুরু করল অনিকেত। হঠাৎ একটা পাতায় চোখ আটকে গেল তার। পাতাটির উপর দিকে খুদে বাংলা হরফে পেনসিল দিয়ে কী যেন লেখা আছে। অনিকেত অবাক হয়ে বিক্রম সিংহকে বলল, 'আপনার বাবা কী বাংলা লিখতে জানতেন?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'তিনি বুঝতে পারতেন কিন্তু বাংলা লিখতে বা পড়তে জানতেন না। কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?'

অনিকেত তাঁর কথার কোনও উত্তর না দিয়ে বইটা নিয়ে জানলার আলোর সামনে দাঁড়াল। তাতে লেখা, 'তা হলে সরস্বতী এখনও ঝুনঝুন প্রাসাদেই আছেন? ভগবতীর মুখ দিয়ে ঢুকতে হবে তার গর্ভে। সেখানেই অধিষ্ঠান করছেন তিনি?' তারপর একটু ছাড় দিয়ে লেখা, 'গোবিন্দের খবর গোবিন্দই রাখেন!'

ইতিমধ্যে বিক্রম সিংহ এসে দাঁড়িয়েছেন জানলার সামনে। লেখাটা দেখে তিনি বললেন, 'কী লেখা আছে ওতে?'

অনিকেত হিন্দিতে অনুবাদ করে কথাগুলো শোনাল তাঁকে। তারপর বলল, 'ঠিক একইরকম কথা আমি কাল বিদ্যাপতির বাড়িতে গণপতিজির মুখ থেকে শুনেছিলাম।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে লেখাটা তাঁরই। বাবার সঙ্গে এ ঘরে তিনি প্রায় আসতেন। কিন্তু তাঁর এসব কথার মানে কী?'

একটু ভেবে অনিকেত বলল, 'মানেটা সঠিক আমার জানা নেই। আমার ধারণা এর মধ্যে কোনও একটা পথের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। হয়তো আমরা যে পথের সন্ধান করছি সে পথেরই। কারণ, ঝুনঝুন প্রাসাদের উল্লেখ আছে এখানে।' এরপর একটু চুপ থেকে অনিকেত বলল, 'এই লেখা গণপতিজি নিশ্চয়ই তাঁর অ্যাক্সিডেন্টের আগেই লিখেছিলেন। তখন তাঁর মাথাটা ঠিক ছিল। তিনি সচেতনভাবেই লিখেছেন একথাগুলো। আমার মনে হয় গণপতিজির কথাগুলোর অর্থ যদি উদ্ধার করা যায় তা হলে হয়তো পার্থর কাছে পৌঁছাবার কোনও উপায় বের হতে পারে।'

কিছুক্ষণ পর বিক্রম সিংহ বললেন, 'না, আমার মাথায় কিছুই আসছে না, মাথার ভিতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এই বন্ধ ঘরে বসে চিন্তা না করে বরং খোলা বাতাসে একটু হেঁটে আসি।'

অনিকেতেরও ঘরের ভিতর বসে থাকতে ভালো লাগছিল না। সে বলল, 'চলুন!'

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে হাভেলি ছেড়ে ধীরে পায়ে সামনের রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলেন তাঁরা। রাস্তাটা বেশ ফাঁকা-ফাঁকা। দু'পাশে ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছ। সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়তে শুরু করেছে। ঝাঁক বেঁধে বাসায় ফিরে আসতে শুরু করেছে পাখিরা। বিক্রম সিংহও চুপচাপ হাঁটছিলেন। এক সময় তিনি বললেন, 'জানেন, আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন, মানে খুন হয়েছিলেন।'

অনিকেত বলল, 'হ্যাঁ জানি, বিদ্যাপতিবাবুর কাছ থেকে শুনেছি।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'যেদিন তিনি নিখোঁজ হন, সেদিন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে ছিলেন ঝুনঝুন প্রাসাদে যাবেন বলে। তিন দিন পর তাঁর মুন্ডুহীন মৃতদেহ উদ্ধার হয়। আমি অবশ্য তাঁর মৃতদেহ দেখতে পাইনি। আমি তখন খেলার ব্যাপারে রাজস্থানের বাইরে ছিলাম। ফিরে আসার আগেই সেই পচা গলা শরীর সৎকার করে দেওয়া হয়।'

অনিকেত বলল, 'আপনার বাবা নিখোঁজ হওয়ার দিন ঝুনঝুন প্রাসাদে যাওয়ার জন্য ঘর ছেড়েছিলেন তা জানা ছিল না?'

একটু চুপ করে থেকে বিক্রম সিংহ বললেন, 'আমার কেন জানি আজ মনে হচ্ছে যে, আমার বাবার খুন হওয়া, ঝুনঝুন প্রাসাদে প্রেতাত্মার আর্বিভাব, আপনার সঙ্গীর নিখোঁজ হওয়া, এসব একই সূত্রে গাঁথা।'

অনিকেত বলল, 'হতে পারে।' এরপর দুজনে আবার চুপচাপ হাঁটতে শুরু করলেন।

হাঁটতে-হাঁটতে দুজনে এক সময় বিক্রম সিংহের হাভেলি থেকে অনেকটা পথ দূরে চলে এলেন। পথের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন মন্দির। মন্দিরটা খুব বড় নয়, ঢোকার তোরণটা অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে। স্তম্ভগুলো ভেঙেচুরে ইতস্তত চারদিকে ছড়িয়ে আছে মন্দিরের সামনে।

অনিকেত মন্দিরের সমনে এসে বলল, 'আমার আর হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। চলুন, ওই মন্দিরে গিয়ে একটু বসি। তারপর ফিরে যাব।' এর পর হতাশ কণ্ঠে সে বলল, 'ফিরে গিয়ে কলকাতায় টেলিফোন করে জানিয়ে দেব সব কথা। আমিও এখান থেকে আর ফিরব না।' শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে অনিকেতের গলা ধরে এল।

দুজনে ঢুকল মন্দির চত্বরে। ছোট পাথুরে চত্বর। তার একপাশে গর্ভগৃহ দাঁড়িয়ে আছে। অনিকেতরা গিয়ে বসল একটা পাথুরে বেদির উপর। নিজের মনটাকে সামলাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে অনিকেত। কিন্তু ঘুরেফিরে তার মনে বারবারই ফিরে আসছে পার্থর চিন্তা। অনিকেত যেখানে বসে ছিল সেখান থেকে গর্ভগৃহের ভিতরটা দেখা যাচ্ছিল। সেখানে রয়েছে পাথরের তৈরি এক ষাঁড়ের মূর্তি। ষাঁড়ের মূর্তি দেখে তার ধারণা হল, মন্দিরটা শিবমন্দির। নিজের মনটাকে একটু অন্যদিকে ঘোরাবার জন্য অনিকেত বিক্রম সিংহকে জিগ্যেস করল, 'এটা কি শিবমন্দির?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'না এটা দেবী ভগবতীর মন্দির। এ মন্দিরের বয়স প্রায় পাঁচশো বছর।'

অনিকেত বলল, 'ভগবতী মন্দির। তা হলে গর্ভগৃহে ষাঁড়ের মূর্তি কেন? ষাঁড়ের মূর্তি তো শিবমন্দিরে থাকে।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'গর্ভগৃহের ভিতর একটু অন্ধকার আছে বলে মূর্তিটা আপনি ঠিক চিনতে পারেননি। ওটা ষাঁড়ের মূর্তি নয়, গোরুর মূর্তি। গোমাতাকে ভগবতী জ্ঞানে পুজো করা হয় এ মন্দিরে।'

তাঁর কথা শুনে 'ও', বলে চুপ করে গেল অনিকেত।

বিক্রম সিংহ বললেন, 'চলুন, তা হলে ওঠা যাক, সন্ধে নেমে আসছে।'

ঠিক তখনই অনিকেত হঠাৎ লাফিয়ে উঠে জড়িয়ে ধরল বিক্রম সিংহকে। তারপর চিৎকার করে বলল, 'পেরেছি। পেরেছি। আপনি আমার চোখ খুলে দিলেন।'

বিক্রম সিংহ অবাক হয়ে বললেন, 'কী পেরেছেন আপনি? আমি আপনার কী চোখ খুললাম?'

অনিকেত বলল, 'গণপতিজির লেখার মানে আমি বুঝতে পেরেছি। ওই যে আপনি বললেন, ''গোমাতাকে'' ভগবতী জ্ঞানে পুজো করা হয় এখানে, এ কথাতেই আমার চোখ খুলে গেল।'

তার কথা শুনে বিক্রম সিংহ বললেন, 'আপনি কী বলছেন বুঝিয়ে বলুন।'

অনিকেত বলল, 'গণপতিজি লিখেছেন, ভগবতীর মুখ দিয়ে তার গর্ভে ঢুকতে হবে। কাল তাকে একই কথা প্রলাপ বকার ছলে বলতে শুনেছি। সে পথে গেলেই নাকি কুম্ভ রানার গুপ্তধনের কাছে পৌঁছানো যাবে, যা আছে ওই ঝুনঝুন প্রাসাদে। ''ভগবতীর মুখ'' কথার অর্থ, ''গোমুখ'', অর্থাৎ ''গোমুখকুণ্ড''। যা আমরা কাল দেখেছি। আর ''গর্ভ'' বলতে নিশ্চয়ই তিনি ভূগর্ভে বুঝিয়েছেন। নিশ্চয়ই ওখান থেকে ঝুনঝুন প্রাসাদে যাওয়ার কোনও রাস্তা শুরু হয়েছে। আমার মন বলছে, ও পথ ধরে গেলে ঝুনঝুন প্রাসাদের কোনও গোপন জায়গায় পৌঁছতে পারব আমরা। আপনার অনুমান যদি ঠিক হয় অর্থাৎ পার্থকে যদি ওরকম কোনও গোপন জায়গায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তা হলে সরস্বতী বা গুপ্তধন মিলুক না মিলুক, পার্থর সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।'

অনিকেতের কথা শুনে বিক্রম সিংহ আশ্চর্য হয়ে বললেন, 'গোমুখকুণ্ড থেকে দুটো সুড়ঙ্গপথ শুরু হয়েছে তা আমি জানি। তার একটা গিয়ে শেষ হয়েছে কুম্ভ প্রাসাদে। সে পথের কথা সকলেরই জানা। কিন্তু আর-একটা পথ কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে তা কারও জানা নেই। আমি একবার একজনের মুখে শুনেছিলাম, ওই পথটা নাকি কিছুদূর এগিয়ে নানা শাখা প্রাশাখায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। এর চেয়ে বেশি খবর আমার অবশ্য জানা নেই। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে ওই দ্বিতীয় পথ ধরেই এগোতে হবে।'

অনিকেত বলল, 'হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি আমাদের এখন কাজ শুরু করতে হবে।'

এরপর বিক্রম সিংহ ও অনিকেত মন্দিরে দাঁড়িয়ে আর সময় নষ্ট না করে ফিরতে শুরু করলেন।

অনিকেতরা যখন মহলে ফিরে এল তখনই সন্ধে নামল। মহলে ফিরে আসার পর বিক্রম সিংহের তৈরি হতে আধ ঘণ্টার মতো সময় লাগল। তারপর বিক্রম সিংহ তাঁর দুই সঙ্গী আর অনিকেতকে নিয়ে রওনা দিলেন গোমুখকুণ্ডের উদ্দেশ্যে।

অনিকেতরা যখন গোমুখকুণ্ডের সোপানশ্রেণিতে এসে দাঁড়ালেন, তখন চাঁদের ছায়া নেমে এসেছে গোমুখকুণ্ডের ঠিক মাঝখানে। কুণ্ডের একদিকে কেল্লাপ্রাকার, সেদিক থেকে একটা ঝুলন্ত পাথুরে ছাদ ঢেকে রেখেছে কুণ্ডের এক দিক। তার নীচে জমাট বাঁধা অন্ধকার। ওখানেই রয়েছে সুড়ঙ্গে ঢোকার পথ।

অনিকেতরা নেমে দাঁড়াল কুণ্ডের জলের ধারে। তারপর এক এক করে সাবধানে কুণ্ডের ধার ঘেঁষে পাথরের গায়ে পা রেখে গিয়ে দাঁড়াল সেই ছাদের নীচে। পকেট থেকে টর্চ বের করে জ্বালালেন বিক্রম সিংহ। ছাদের তলার পাথর কুঁদে তৈরি বেশ কয়েকটা ছোট কুঠুরিমতো ঘর। তার কোনও জানলা নেই। বিক্রম সিংহ একটা কুঠুরিতে ঢুকলেন। তাঁর পিছন পিছন অনিকেতের সঙ্গে অন্যরাও। সেই কুঠুরির পিছনে একই রকম আরও দুটো কুঠুরি পেরিয়ে সকলে এসে হাজির হলেন একটা অলিন্দে। বিক্রম সিংহের টর্চের আলোয় অনিকেতের চোখে পড়ল, অলিন্দের শেষ প্রান্তে এক গহ্বর। তার সামনে লোহার গরাদ বসানো আছে। একটা অংশ মরচে ধরে খসে পড়েছে মাটিতে। অনায়াসে সেই ফাঁক দিয়ে মানুষ ভিতরে ঢুকতে পারে। ঢুকলেন সকলে। একটু এগিয়েই ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে মাটির গভীরে। নীচে নামার আগে বিক্রম সিংহ একটু থমকে দাঁড়ালেন। প্যান্টের পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে দেখে নিলেন সব ঠিকঠাক আছে কি না। বিক্রম সিংহের অন্য দুজন সঙ্গীও সশস্ত্র। তাদের কোমরে ঝুলছে লম্বা তলোয়ার। বিক্রম সিংহ অনিকেতের দিকে তাকিয়ে একবার শুধু বললেন, 'ভয় পাবেন না।' তারপর সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে শুরু করলেন। অনিকেত এবং অন্য দুজন তাঁকে অনুসরণ করল।

১২

পার্থর যখন আবার জ্ঞান ফিরল তখন অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে। ঘরের মশালের আলো নিভুনিভু হয়ে এসেছে। পার্থ প্রথমে ভাবতে লাগল সে বেঁচে আছে না লকেশ সিংহের লোকেরা তাকে মেরে ফেলেছে? মাথাটা একপাশে ঘোরাতে গিয়ে বেশ লাগল তার। মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের হল, 'উঃ'!

পার্থর এবার মনে পড়ে গেল, উঠে দাঁড়াবার পর মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। তখনই সে দেখতে পেল তার ঠিক কাছেই আধো অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক। ও নিশ্চয়ই লকেশ সিংহের লোক। পার্থর গলা কাটতে এসেছে। পার্থ এবার আতঙ্কে চিৎকার করতে গেল। কিন্তু গলা দিয়ে কোনও শব্দ বের হল না। তার হাত পা দড়ি দিয়ে বাঁধা।

কিছুক্ষণ পর তার মনে হল, কেউ যেন তার পায়ের বাঁধনটা খোলার চেষ্টা করছে। ধীরে ধীরে আবার চোখ মেলল সে। ভালো করে তাকাবার পর বুঝতে পারল, একজন লোক উবু হয়ে বসে আছে তার পায়ের সামনে। পার্থ হঠাৎ একটু নড়ে উঠতেই লোকটি মুখ তুলে তাকাল। লোকটির জুলজুলে চোখ, মুখভর্তি সাদা দাড়ি। মুহূর্তের মধ্যে পার্থ চিনে ফেলল তাঁকে। আরে ইনি যে বিদ্যাপতিবাবুর পাগল দাদা গণপতিবাবু। পার্থর মনে সাহস ফিরে এল। একটু চেষ্টা করার পর সে উঠে বসল। দড়ি বাঁধা হাত দুটো এগিয়ে দিল গণপতিবাবুর দিকে।

ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলেন তিনি। পায়ের বাঁধন খুলতে না পারলেও একটু চেষ্টা করার পরই হাতের বাঁধন খুলে দিলেন তিনি। পার্থ তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে। গণপতিবাবু এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। এবার তিনি চাপা গলায় হেসে উঠে বললেন, 'কুম্ভ রানার খোঁজে এসেছ, এবার দ্যাখো কেমন মজা। একটু পরেই কুম্ভ ফিরে আসবে। তারপরেই তোমার মুণ্ডু ঘ্যাচাং।'

পার্থ বঝুতে পারল গণপতিবাবু তার হাতের বাঁধন খুলে দিলেও তিনি আগের মতোই অপ্রকৃতিস্থ। পায়ের বাঁধনটা এরপর নিজেই খুলে ফেলল পার্থ। লকেশ সিংহ আর তাঁর দলবল ফিরে আসার আগে যেভাবেই হোক পালাতে হবে। পার্থ গণপতিবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'আপনি এখানে এলেন কীভাবে? এখান থেকে বাইরে যাওয়ার রাস্তা কোথায়?'

গণপতিবাবু বললেন, 'বলব না, বলব না, সে পথ শুধু আমিই জানি। বলব না, বলব না।'

পার্থ বুঝতে পারল গণপতিবাবুর সঙ্গে কথা বলে সম্ভবত কোনও লাভ নেই। যে কোনও সময় লকেশ সিংহ আর তাঁর সঙ্গীরা চলে আসতে পারেন। তার আগে নিজেকেই পালাবার পথ খুঁজে বের করতে হবে। পার্থ প্যাকিংবাক্সের ফাঁক দিয়ে ঘরের মাঝখানে তাকাল। শিকলে বাঁধা বৃদ্ধ লোকটি এখনও আগের মতোই দেওয়ালের গায়ে ঝুলছেন। উনি বেঁচে আছেন। একটা অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ আসছে সেদিক থেকে। ঘরের কোনায় সেই দরজাটাও চোখে পড়ল পার্থর। ওটাই কি বাইরে যাওয়ার একমাত্র পথ? ওখান দিয়েই বাইরে গিয়েছিল লকেশ সিংহ আর তাঁর সঙ্গীরা। ও পথ দিয়ে যেতে গেলেই তো লকেশ সিংহের হাতে ধরা পড়ে যাবে পার্থ। তা হলে কী করবে? সাহসে ভর দিয়ে প্যাকিংবাক্সর আড়াল থেকে ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল পার্থ। হঠাৎ মনে হল, দেওয়ালে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা লোকটির যদি জ্ঞান ফেরানো যায় তা হলে তিনি হয়তো পালাবার পথ বাতলাতে পারেন। চাপা গলায় পার্থ জিগ্যেস করল, 'এই যে শুনছেন, এই যে শুনছেন...'

ঠিক তখনই একটা ঘটনা ঘটল। পার্থর পিছন পিছন এসে দাঁড়িয়েছিলেন গণপতিবাবু। তিনি পার্থকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ লোকটিকে জাপটে ধরে 'রানা, রানা', বলে কাঁদতে শুরু করলেন। ভয় পেয়ে গেল পার্থ। লকেশ সিংহ ও তাঁর সঙ্গীরা এই শব্দ শুনে এখনই ছুটে আসবেন।

পার্থর আশঙ্কাই সত্যি হয়ে উঠল। হঠাৎ সে শুনতে পেল অনেক পায়ের শব্দ যেন ঘরের দিকে ছুটে আসছে। পরমুহূর্তেই ঘরে ঢুকলেন লকেশ সিংহ আর তাঁর দুই অনুচর। দানবাকৃতির সেই লোকটি, যে পার্থকে এখানে ধরে এনেছিল, সে ছুটে এসে জাপটে ধরল পার্থকে। অসীম শক্তি লোকটির শরীরে। তার হাত থেকে মুক্ত হতে পারল না পার্থ। লকেশ সিংহের আর এক সঙ্গী সেই বৃদ্ধের কাছ থেকে গণপতিবাবুকে ছাড়াবার চেষ্টা করল। লকেশ সিংহ ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অট্টহাসি হেসে বললেন, 'ভালোই হয়েছে, আর একটাকে পাওয়া গিয়েছে, এবার তিনটেকে শেষ কর।'

গণপতিবাবু বৃদ্ধকে জাপটে ধরেছিলেন, লকেশ সিংহের অট্টহাসি আর কথা কানে যেতেই তিনি ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন সেদিকে। পরমুহূর্তেই বৃদ্ধকে ছেড়ে দিয়ে লকেশ সিংহের অনুচরের হাত ছাড়িয়ে 'শয়তান', বলে চিৎকার করে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন লকেশ সিংহের উপর।

লকেশ সিংহ এ ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, তিনি পড়ে গেলেন মাটির উপর। আর গণপতিবাবু তাঁর বুকের উপর চেপে বসে গলা টিপে ধরলেন। লকেশ সিংহ তাঁর গলা গণপতিবাবুর হাত থেকে ছাড়াবার চেষ্টা করতে লাগলেন। লকেশ সিংহের যে সঙ্গী কয়েক মুহূর্ত আগে বৃদ্ধের কাছ থেকে গণপতিবাবুকে ছাড়াবার চেষ্টা করছিল, সে এই দেখে ঘরের কোনায় ছুটে গিয়ে একটা লম্বা কাঠের টুকরো তুলে আনল। তারপর সেটা সজোরে বসিয়ে দিল গণপতিবাবুর মাথায়। লকেশ সিংহের বুকের উপর থেকে মাটিতে গড়িয়ে পড়লেন গণপতিবাবু। লকেশ সিংহ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, 'এখনই সবক'টাকে শেষ করব। ছেলেটার দু'হাত দু'পাশে তুলে টেনে ধর', এই বলে ছুটে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

তাঁর সঙ্গী দুজন পার্থকে জাপটে ধরে দাঁড় করাল দেওয়ালের গায়ে। তারপর তার হাত দুটো দু'পাশে টেনে ধরল। পার্থ চেষ্টা করেও তাদের হাত ছাড়াতে পারল না। লকেশ সিংহ ঢুকলেন ঘরে। তাঁর হাতে একটা লম্বা তলোয়ার। শেষবারের মতো নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করল পার্থ, কিন্তু পারল না। লকেশ সিংহের তলোয়ারের তীক্ষ্ন ফলা ক্রমশই তার দিকে এগিয়ে আসছে। আর মাত্র হাতখানেক বাকি, তারপরেই...ভয়ে চোখের পাতা বন্ধ করে ফেলল পার্থ। পরমুহূর্তেই একটা প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল সারা ঘর।

১৩

মাটির নীচ দিয়ে এগিয়ে চলল অনিকেতরা। এঁকেবেঁকে চলছে সুড়ঙ্গপথ। কখনও উপরে উঠছে আবার কখন নীচে নামছে। প্রায় আধঘণ্টা চলার পর হঠাৎ একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল অনিকেতরা। সুড়ঙ্গ সেখানে তিনটে দিকে চলে গিয়েছে। বিক্রম সিংহ সুড়ঙ্গগুলোর দিকে আলো ফেলতে লাগলেন। একটু চিন্তান্বিত হয়ে চাপাস্বরে তিনি অনিকেতকে বললেন, 'এবার আমরা কোন পথে যাব?'

অনিকেত বলল, 'আর-একবার আলোটা সুড়ঙ্গের মুখগুলোর উপর ফেলুন তো।'

তার কথা শুনে বিক্রম সিংহ আলোটা ঘোরালেন সুড়ঙ্গের মুখগুলোর উপর। তিনটে সুড়ঙ্গের মুখই একই রকম। তবু একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরা পড়ল অনিকেতের চোখে। সে বিক্রম সিংহকে বলল, 'লক্ষ করুন, দুটো সুড়ঙ্গের মুখে জাল নেই। আমার মনে হয় ওই সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে আমাদের। যদিও সবটাই অনুমানের উপর বলছি আমি।'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'ঠিক আছে, আপনার কথাই দেখা যাক।'

বিক্রম সিংহ ঢুকলেন সুড়ঙ্গের ভিতর। টর্চের আলোটা নীচের দিকে ফেলে এগোলেন তিনি। তাঁর পিছন পিছন অনিকেত। কিছুদূর এগোবার পর হঠাৎ বিক্রম সিংহ থেমে গেলেন।

অনিকেত দেখতে পেল টর্চের আলোর বৃত্তের মাঝখানে মাটিতে পড়ে রয়েছে আধখাওয়া একটা সিগারেটের টুকরো। এর পর বিক্রম সিংহ অনিকেতের পিঠে মৃদু চাপড় মেরে বললেন, 'সত্যিই আপনি বুদ্ধিমান। এই সিগারেটের টুকরো প্রমাণ করছে এ পথে মানুষের যাওয়া আসা আছে। ওই জন্যই মাকড়সা জাল বুনতে পারেনি সুড়ঙ্গের মুখে। এ পথেই হয়তো কুম্ভের প্রেতাত্মা যাওয়া-আসা করে। আর এখন বুঝতে পারছি আমার বাবার মৃতদেহ কেন গোমুখকুণ্ডের কাছে পাওয়া গিয়েছিল।

নতুন উদ্যমে চলতে শুরু করলেন সকলেই। এক সময় বিক্রম সিংহ অধৈর্য হয়ে বললেন, 'এ পথের কি কোনও শেষ নেই? আমরা কি কোনও ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ঢুকে পড়লাম নাকি? অনেক সময় শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য এরকম পথ তৈরি করত রানারা।'

অনিকেতের মনেও ক্রমশ সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। তা হলে কি এ পথ ধরে খোঁজ পাওয়া যাবে না পার্থর? সকলে চুপচাপ চলতে লাগলেন। মাঝে মাঝেই বাঁক নিচ্ছে সুড়ঙ্গ। হঠাৎ একটা বাঁকের মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন বিক্রম সিংহ। তারপর টর্চের আলোটা নিভিয়ে দিলেন। দাঁড়িয়ে পড়ল সকলে। অনিকেত উঁকি মেরে তাকাল সেদিকে। অনিকেত যাতে দেখতে পায় তার জন্য বিক্রম সিংহ তাঁর টর্চের আলোটা মুহূর্তের জন্য একবার সেদিকে ফেলে আবার নিভিয়ে দিলেন। বাঁকের শেষে একটা বড় হলঘরের মতো জায়গা। বেশ কয়েকটা সুড়ঙ্গের মুখ এসে মিলেছে সেখানে। তারই একটার মধ্যে যেন একটা সরু আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। কয়েক মুহূর্ত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল অনিকেতরা। বিক্রম সিংহ তাঁর কোমরের নীচ থেকে পিস্তলটা বের করলেন। তারপর সেটা বাগিয়ে ধরে সামনের ঘরটা পার হয়ে সন্তর্পণে ঢুকলেন যে সুড়ঙ্গ পথ থেকে আলো ভেসে আসছে সেদিকে।

সুড়ঙ্গের ভিতর ঢুকেই অনিকেতরা বুঝতে পারল একটু এগিয়েই শেষ হয়ে গিয়েছে সুড়ঙ্গ। সেখানে একপাশে একটা ঘর রয়েছে। আলো ভেসে আসছে সেখান থেকেই।

নিঃশব্দে এক-পা, এক-পা করে এগিয়ে গিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সাবধানে ঘরের ভিতর উঁকি মারলেন বিক্রম সিংহ। উঁকি মারল অনিকেতও। না, সে ঘরে পার্থ নেই। তবে তিনজন লোক রয়েছে ঘরের মধ্যে। একজন ঘরের ঠিক মাঝখানে দরজার দিকে পিছন ফিরে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর অন্য দুজন লোক কাজ করে চলেছে। বেশ কয়েকটা বড় বাক্স ছড়িয়ে রয়েছে ঘরের মধ্যে। লোক দুটো একটা বাক্স থেকে টাকার বান্ডিল বের করে বস্তার মধ্যে ভরছে। নোটগুলো ঈষৎ হলুদ রঙের। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর অনিকেত বুঝতে পারল ওগুলো পাঁচশো টাকার বান্ডিল। এত টাকা লোকগুলো পেল কোথায়? মশালের আলোয় দ্রুত কাজ করে চলেছে লোক দুটো। যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে সে মনে হয় অন্য দুজনের কাজের তদারকি করছিল। সে একবার ঘড়ি দেখল। তারপর অন্য দুজনকে বলল, 'তাড়াতাড়ি কর, তাড়াতাড়ি কর। নোটগুলো বস্তায় ভরা হয়ে গেলে কাগজগুলোও বস্তায় ভরে ফেলবি। কোনও চিহ্ন যেন না থাকে।'

লোকটির কথা শুনে বিক্রম সিংহ ফিসফিস করে অনিকেতকে বললেন, 'লকেশ সিংহ।'

অনিকেত লক্ষ করল ঘরের একপাশে মেঝেয় কিছু সাদা কাগজের ফালিও পড়ে আছে। অনিকেত চিনতে পারল ঠিক ওরকম কাগজের ফালিই ময়ূরের বাসায় খুঁজে পেয়েছিলেন ইন্সপেক্টর রাঠোর। কিছুক্ষণের মধ্যেই নোটগুলো বস্তায় ঢোকানো হয়ে গেল লোক দুটোর। সেই বস্তা ছেড়ে অন্য একটা বস্তার মধ্যে মাটিতে পড়ে থাকা কাগজের ফালিগুলো তুলতে শুরু করল। লকেশ সিংহ মনে হয় অধৈর্য হয়ে উঠছেন। তিনি বললেন, 'তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর। বুড়ো আর ছেলেটিকে এর পর শেষ করতে হবে।'

কথাটা শুনেই চমকে উঠল অনিকেত। বুড়ো মানে নিশ্চয়ই গণপতিবাবু, আর ছেলে মানে নিশ্চয়ই পার্থ। দুজনেই তো নিখোঁজ। তা হলে পার্থ বেঁচে আছে! লকেশ সিংহই তা হলে বন্দি করে রেখেছেন। মনে মনে ভাবল অনিকেত। হঠাৎ কাছেই কোথা থেকে যেন একটা অস্পষ্ট চিৎকার শোনা গেল। শব্দটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ থামিয়ে কানখাড়া করল লকেশ সিংহের সঙ্গীরা। কানখাড়া করলেন লকেশ সিংহও। বিক্রম সিংহ এবং অনিকেতও শোনার চেষ্টা করলেন শব্দটা। তাঁদের মনে হল, কেউ যেন চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে কিছু বলছে। লকেশ সিংহ ঘরের ভিতর তাঁর সঙ্গীদের বললেন, 'বৃদ্ধের কি জ্ঞান ফিরে এল নাকি? কিন্তু এটা তো ঠিক তার গলা বলে মনে হচ্ছে না।'

তাঁর কথা শুনে সঙ্গীদের একজন বলল, 'হ্যাঁ রানাজি, আমারও মনে হচ্ছে এটা অন্য কারও গলা।'

তার কথা শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই লকেশ সিংহ ছুটলেন অনিকেতরা যে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার বিপরীতে ঘরের আর একটা দরজার দিকে। তাঁকে অনুসরণ করল সঙ্গী দুজন। সেই দরজা দিয়ে তিনজনই ঘরের বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। বিক্রম সিংহ আর অনিকেতরা ঢুকে পড়লেন ঘরের মধ্যে। বিক্রম সিংহ টাকা ভরা বস্তার কাছে গিয়ে কয়েকটা বান্ডিল বের করে হাতে নিয়ে দেখে বললেন, 'সব নোটেরই একই নম্বর, এগুলো সবই জাল নোট।'

অনিকেতের মনে পড়ে গেল গণপতিবাবুর প্রলাপের সেই অংশ, সেখানে সরস্বতী আছেন, লক্ষ্মীও আছেন...এক দেবী নকল...তাঁকে পাহারা দেয় নকল কুম্ভ। অনিকেত বুঝতে পারল, এক দেবী নকল বলতে তাঁর ইঙ্গিত হল নকল লক্ষ্মী। অর্থাৎ নকল টাকার ব্যাপারটা। কোনওভাবে তিনি সন্ধান পেয়েছিলেন এ ঘটনার। বিক্রম সিংহের দুই সঙ্গী দুটো দরজার সামনে পাহারায় দাঁড়াল। বিক্রম সিংহ আর অনিকেত ঘরে রাখা বাক্সগুলো দেখতে লাগলেন। বাক্সগুলোর মধ্যে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ রাখা। বিক্রম সিংহ বললেন, 'এগুলো মনে হয় নোট ছাপাবার যন্ত্রাংশ। বাইরে পাচার করার জন্য খুলে আলাদা করে রাখা হয়েছে।'

হঠাৎ কাছেই কোথাও একটা ঘর থেকে প্রচণ্ড চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ ভেসে এল। কানখাড়া করে দাঁড়িয়ে পড়লেন বিক্রম সিংহ আর অনিকেত। কিছুক্ষণ পর সেই শব্দ থেমে গেল। তারপরই বিক্রম সিংহের এক সঙ্গী বলল, 'কেউ যেন আবার এদিকে ফিরে আসছে।'

তার কথা শুনে সকলে চটপট ঘরের মধ্যে রাখা প্যাকিংবাক্সগুলোর আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। যে দরজা দিয়ে গিয়েছিলেন সেই দরজা দিয়েই আবার ঘরে ফিরে এলেন লকেশ সিংহ। তাঁর সারা শরীর ধুলোয় মাখা, যেন তিনি এইমাত্র ধুলোয় গড়াগাড়ি দিয়ে এসেছেন। দেওয়ালের গায়ে একটা তলোয়ার ঝুলছিল। ঘরে ঢোকার পর লকেশ সিংহ দেওয়াল থেকে সেই তলোয়ারটা খুলে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে আবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। বিক্রম সিংহ বাক্সের আড়াল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'এখনই ওর পিছু ধাওয়া করতে হবে। উনি নিশ্চয়ই কাউকে খুন করতে যাচ্ছেন।'

যে দরজা দিয়ে লকেশ সিংহ বেরিয়ে গেলেন, অনিকেতরা দ্রুত সে দরজা দিয়ে একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকল। সুড়ঙ্গের দু'পাশে বেশ কয়েকটা ঘর। শেষ মাথার একটা ঘর থেকে মশালের মৃদু আলো এসে পড়েছে সুড়ঙ্গে। নিশ্চয়ই ওখানেই গিয়ে ঢুকেছেন লকেশ সিংহ। অনিকেতরা সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘরের ভিতর তাকাতেই তাঁদের চোখে পড়ল ভয়ংকর এক দৃশ্য। বেশ বড় ঘর। তার এক প্রান্তে দেওয়ালের গায়ে পার্থকে দাঁড় করিয়ে তার দু'হাত দু'পাশে দুজন লোক টেনে ধরেছে। আর তার দিকে তলোয়ার হাতে এগিয়ে যাচ্ছেন লকেশ সিংহ। ব্যাপারটা কী হতে চলেছে বুঝতে অসুবিধে হল না কারও।

লকেশ সিংহ তখন অনিকেতদের দিকে পিছন ফিরে তাঁর তলোয়ারসুদ্ধ হাতটা মাথার উপর তুলে ধরেছেন পার্থকে কেটে ফেলার জন্য। ঠিক সেই সময় বিক্রম সিংহ চালিয়ে দিলেন গুলি। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল ঘর। অব্যর্থ লক্ষ্য। লকেশ সিংহের হাত থেকে ছিটকে পড়ল তলোয়ার। হুড়মুড় করে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল সকলে। বিক্রম সিংহের দুই সঙ্গী ঘরে ঢুকেই বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল লকেশ সিংহের দুই সঙ্গীর উপর। লকেশ সিংহের যে সঙ্গী কুম্ভ সাজে, সে একটু প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিক্রম সিংহের এক অনুচর তলোয়ারের উলটো পিঠ দিয়ে তার মাথায় এক ঘা দিয়ে তাকে ঠান্ডা করে দিল। সশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ল নকল কুম্ভ। বিক্রম সিংহের দুই সঙ্গী নিজেদের পাগড়ি কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলল লোক দুটোকে। অনিকেত গিয়ে জড়িয়ে ধরল পার্থকে। আনন্দে দুজনের কেউই কোনও কথা বলতে পারল না কিছুক্ষণ।

মাটির উপর বসে বাঁ-হাত দিয়ে তাঁর রক্তমাখা ডান হাতটা চেপে ধরে বিক্রম সিংহের দিকে তাকিয়ে ছিলেন লকেশ সিংহ। বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি। কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে পিস্তল তাক করে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বিক্রম সিংহ। কয়েক মুহূর্ত এইভাবে কেটে গেল। বিক্রম সিংহের চোয়াল ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠেছে। পার্থ ফিসফিস করে বলল, 'লকেশ সিংহের লোকদুটিকে এবার গুলি করে মেরে ফেলব নাকি?'

ঠিক তখনই বিক্রম সিংহের এক সঙ্গী তাঁকে বলল, 'রানাজি, দেওয়ালের গায়ে যে লোকটি বাঁধা আছে তাকে খুলে দেব নাকি?'

বিক্রম সিংহ বা অনিকেত এতক্ষণ ঘরের অন্য কিছুই খেয়াল করেননি। এবার তাঁরা তাকালেন ঘরের অন্য প্রান্তে দেওয়ালের দিকে। এক বৃদ্ধকে সেখানে দেওয়ালের সঙ্গে শিকলে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তার কিছু দূরে আরও একটা রক্তমাখা মানুষ মাটিতে পড়ে রয়েছে। সঙ্গীর কথা শুনে বিক্রম সিংহ লকেশ সিংহের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাকালেন শিকল বাঁধা সেই বৃদ্ধের দিকে। হঠাৎ যেন বিক্রম সিংহের চোখে মুখে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিল। লকেশ সিংহকে ছেড়ে দিয়ে তিনি ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন বৃদ্ধকে। তারপর বললেন, 'বাবা, তুমি বেঁচে আছ? চোখ খোলো, চোখ খোলো। দ্যাখো আমি এসেছি।'

বিক্রম সিংহের কাণ্ড দেখে অনিকেত, পার্থ আর তার সঙ্গীরা তাকিয়ে রইল সেদিকে। ঠিক এরকমই একটা অসতর্ক মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিলেন লকেশ সিংহ। তিনি লাফিয়ে উঠে ক্ষিপ্রগতিতে মাটিতে পড়ে থাকা তলোয়ারটা কুড়িয়ে নিলেন বাঁ-হাতে। তারপর দরজার দিকে দৌড়লেন ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য। অনিকেত চিৎকার করে উঠল, 'রানা লকেশ সিংহ পালাচ্ছেন।'

ঘরের মশালটা নিভু নিভু হয়ে এসেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই মশালটা দপ করে জ্বলে উঠে নিভে গেল। সারা ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকারের মধ্যে বিক্রম সিংহ চিৎকার করে উঠলেন, 'শয়তান, আমি তোকে ছাড়ব না।'

পকেট থেকে টর্চ বের করে জ্বালিয়ে অনিকেতের হাতে ধরিয়ে দিয়ে সঙ্গী দুজনকে ঘরটা পাহারা দিতে বলে, তাদের একজনের কোমর থেকে একটা তলোয়ার খুলে নিয়ে তিনি ঘরের বাইরে ছুটলেন। অনিকেত আর পার্থও ছুটল তাঁর পিছন পিছন। অন্ধকারে সুড়ঙ্গের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে লকেশ সিংহের পদশব্দ। তাকে অনুসরণ করে ছুটছেন তিনজন। বিক্রম সিংহের এক হাতে তলোয়ার, অন্য হাতে পিস্তল। হঠাৎ ছুটতে ছুটতে অন্ধকার দেওয়ালের ধাক্কা খেয়ে বিক্রম সিংহের হাত থেকে পিস্তলটা কোথায় ছিটকে পড়ল। অনিকেত দাঁড়িয়ে পড়েছিল পিস্তলটার জন্যে। ছুটতে ছুটতে বিক্রম সিংহ বললেন, 'থামবেন না, সময় নষ্ট করলে ওকে আর ধরা যাবে না। তলোয়ারটা তো আছে।'

থামল না অনিকেতরা, তারা ছুটতে লাগল। কয়েক মিনিট পর যখন তারা লকেশ সিংহের পায়ের শব্দটাকে প্রায় ধরে ফেলেছে, ঠিক তখনই কিছু দূরে হঠাৎই থেমে গেল সেই শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে বিক্রম সিংহ দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, 'টর্চ জ্বালান।'

অনিকেত টর্চ জ্বালিয়ে সামনের দিকে আলো ফেলল। একটা অদ্ভুত দৃশ্য এবার তাদের চোখে পড়ল। সুড়ঙ্গটা কিছু দূর গিয়ে একটা দেওয়ালের সামনে শেষ হয়েছে। টর্চের আলো একটা বৃত্ত রচনা করেছে দেওয়ালে। সেই বৃত্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে লকেশ সিংহ তাঁদের দিকে পিছন ফিরে দেওয়ালটা যেন ফেলার চেষ্টা করছেন। পরমুহূর্তেই তিনি যেন দেওয়ালের ভিতর ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেলেন। তিনি অদৃশ্য হতেই অনিকেতরা ছুটে গেল সেখানে। একটা দেওয়ালের একটু পিছনে সরে গিয়ে একটা ফাঁক সৃষ্টি হয়েছে। সেখান দিয়েই অদৃশ্য হয়েছেন লকেশ সিংহ।

বিক্রম সিংহ ঢুকে পড়লেন সেই ফাঁকের মধ্যে। অনিকেত আর পার্থও এক-এক করে ঢুকে পড়ল সেখানে। ভিতরে মাত্র হাত দুয়েক জায়গা। সেখান দিয়ে একটা পাথরের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে উপর দিকে। সিঁড়ির দু'পাশেই পাথরের দেওয়াল। আসলে দুটো দেওয়ালের মাঝে লুকিয়ে রাখা আছে এই সিঁড়ি। প্রাসাদের দেওয়ালগুলো এমনিতেই চওড়া হয়। তাই বাইরে থেকে এই সিঁড়ির অস্তিত্ব বোঝা সম্ভব নয়। কোনও রকমে একজন উঠতে পারে এই সিঁড়ি দিয়ে। বিক্রম সিংহ চটপট সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে চলেছেন। তাঁর সঙ্গে অনিকেত আর পার্থর বেশ কিছুটা ব্যবধান। প্রায় দোতলা সমান ওঠার পর একটা ফোকর গলে তাঁরা ঢুকলেন একটা ঘরের মধ্যে। মুহূর্তের মধ্যেই তাঁরা চিনতে পারলেন ঘরটাকে। আরে এ তো দরজার ফাঁক দিয়ে অলিন্দ থেকে চাঁদের আলো ঢুকছে ঘরের ভিতর। তা হলে এতক্ষণ সত্যিই তাঁরা এই প্রাসাদেরই নীচে ছিলেন?

হঠাৎ ঘরের একটা কোণ থেকে খসখস শব্দ শুনে তিনজনে তাকাল সেদিকে। অন্ধকার ঘরের কোণ থেকে তলোয়ার হাতে বেরিয়ে এলেন লকেশ সিংহ। চাঁদের আলোয় তাঁর চোখ দুটো হিংস্র পশুর মতো জ্বলজ্বল করছে।

বিক্রম সিংহ তাঁকে বললেন, 'ভালো চাও তো তলোয়ার ফেলে দাও। তোমার একটা হাত অকেজো, আর তুমি একা। আমরা তিনজন।'

তাঁর কথা শুনে একটা পৈশাচিক হাসি হেসে লকেশ সিংহ বললেন, 'আমার হাতে একটা তলোয়ার থাকলে সেটা তিনজনের পক্ষে যথেষ্ট এবং সেটা আমার ডান হাতেই হোক আর বাঁ-হাতেই হোক।' এই বলে তিনি তলোয়ার হাতে আক্রমণ করলেন বিক্রম সিংহকে।

বিক্রম সিংহ তাঁর তলোয়ারটা মাথার উপর তুলে ধরে ঠেকালেন সেই আঘাত। এর পর শুরু হল দুই রানার লড়াই। চাঁদের আলোয় দুজনের তলোয়ারই ঝিলিক দিয়ে উঠছে। আঘাত প্রত্যাঘাতে আগুনের ফুলকি উঠছে তলোয়ার থেকে। বাঁ-হাতে তলোয়ার চালালেও লকেশ সিংহই আক্রমণ করছেন বেশি। অনিকেতের বিদ্যাপতির মুখে শোনা সেই কথাটা মনে পড়ে গেল, 'চিতোরে ওঁর চেয়ে বড় তলোয়ারবাজ আর কেউ নেই।' লড়তে-লড়তে ক্রমশই লকেশ সিংহের মুখটা আরও বীভৎস হয়ে উঠছে। হঠাৎ তার তলোয়ারের প্রচণ্ড এক আঘাতে ছিটকে পড়ল বিক্রম সিংহের হাতের তলোয়ার। টাল সামলাতে না পেরে বিক্রম সিংহও মাটিতে পড়ে গেলেন। অট্টহাসি হেসে উঠলেন লকেশ সিংহ। তারপর অনিকেতদের বললেন, 'আগে এটাকে শেষ করি, তারপর তোদের শেষ করব।'

অনিকেত আর পার্থ নিরস্ত্র। হিংস্র লকেশ সিংহকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। আবার বিক্রম সিংহকে ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ঘরের এক কোনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল দুজনে। অলিন্দ বেয়ে চাঁদের একফালি আলো এসে পড়েছে ঘরের মেঝেয়। ঠিক সেইখানে মাটিতে পড়ে আছেন বিক্রম সিংহ। অসহায়ভাবে অনিকেতরা দেখতে লাগল, বিক্রম সিংহের দিকে এক-পা, এক-পা করে এগিয়ে আসছেন লকেশ সিংহ। তাঁর হাতে উদ্যত তলোয়ার চাঁদের আলোয় চকচক করছে। আর মাত্র হাত খানেকের ব্যবধান, ঠিক তখনই অলিন্দ বেয়ে আসা চাঁদের আলো যেন কিছুটা ঢেকে গেল। অনিকেতরা দেখতে পেল অলিন্দ থেকে ঘরের মধ্যে আবির্ভূত হল এক মূর্তি। তার সারা শরীর কালো পোশাকে আবৃত, মাথায় পাগড়ি, হাতে দীর্ঘ বর্শা। ঘরের ভিতর ঢুকে নিঃশব্দে সে গিয়ে দাঁড়াল লকেশ সিংহের পিছনে। লকেশ সিংহ তখন তাঁর তলোয়ারটা ওঠাতে যাচ্ছেন বিক্রম সিংহকে লক্ষ্য করে। কিন্তু তাঁর কাটা হাত আর উপরে উঠল না। তার আগেই সেই বর্শাধারী তার হাতের বর্শাটা লাঠির মতো করে সজোরে বসিয়ে দিল লকেশ সিংহের মাথায়। কাটা কলাগাছের মতো লকেশ সিংহের শরীর মাটিতে আছড়ে পড়ে স্থির হয়ে গেল। হতবাক বিক্রম সিংহ, অনিকেতরাও বিস্ময়ে হতবাক। যে লোকটি নকল কুম্ভ সাজত, সে তো লকেশ সিংহের অনুচর। সে তো এখন বিক্রম সিংহের লোকদের হাতে বন্দি। তা হলে তাদের সামনে এখন কে দাঁড়িয়ে আছে? তা হলে রানা কুম্ভের প্রেতাত্মা কি সত্যি আবির্ভূত হলেন তাঁদের সামনে? সেই মূর্তি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল একই জায়গায়। মুহূর্তের পর মুহূর্ত কেটে যেতে লাগল। এক সময় ধীরে ধীরে মাটি থেকে উঠে দাঁড়ালেন বিক্রম সিংহ। তারপর সেই মূর্তিকে জিগ্যেস করলেন, 'কে আপনি?'

বর্শাধারী কোনও উত্তর দিল না। আস্তে আস্তে সে সরিয়ে দিল তার মুখের আচ্ছাদন। অলিন্দ বেয়ে আসা চাঁদের আলো এসে পড়ল তার মুখের উপর। অনিকেতরা দেখল, তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বিদ্যাপতিবাবু। বিক্রম সিংহ জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। ঠিক তখনই খুব কাছে কোথায় যেন পুলিশের হুইসল বেজে উঠল। অনেক পায়ের শব্দ ঘরের দিকে ছুটে আসছে শোনা গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই একদল লোক হুড়মুড় করে সেই ঘরে ঢুকল। একসঙ্গে অনেক টর্চের তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল অনিকেতদের। ঘরের মধ্যে ঢুকলেন ইন্সপেক্টর রাঠোর। অনিকেতরা একটু ধাতস্থ হওয়ার পর ইন্সপেক্টর বিদ্যাপতিকে দেখিয়ে বিক্রম সিংহকে জিগ্যেস করলেন, 'ইনি তা হলে আসল অপরাধী?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'না, আপনার আসল আপরাধী মাটিতে পড়ে আছে। তাকে এখনই গ্রেপ্তার করুন।'

ইন্সপেক্টর রাঠোর টর্চের আলো ফেললেন মাটির উপর, তারপর জিগ্যেস করলেন, 'ও কে?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'ওর নাম লকেশ সিংহ। জাল নোট ছাপাত এখানে। আপনাদের পুলিশ ফাইট ঘাটলেই ওর সম্বন্ধে তথ্য পাবেন।'

ইন্সপেক্টর রাঠোরের নির্দেশে পুলিশ কর্মীরা চটপট বেঁধে ফেলল সংজ্ঞাহীন লকেশ সিংহকে। বিক্রম সিংহ এরপর ইন্সপেক্টর রাঠোরকে জিগ্যেস করলেন, 'আপনি হঠাৎ এখানে হাজির হলেন কীভাবে?'

ইন্সপেক্টর রাঠোর বললেন, 'আপনাদের খবর নেওয়ার জন্য আমি প্রথমে গেলাম আপনার মহলে। সেখানে গিয়ে শুনলাম, আপনারা সন্ধেবেলা বাড়ি ছেড়েছেন। তারপর পণ্ডিতজির বাড়িও দেখলাম তালাবন্ধ। এত রাতে একসঙ্গে কোথায় যেতে পারেন আপনারা? নিশ্চয়ই ঝুনঝুন প্রাসাদে। ফোর্স নিয়ে আমি চলে এলাম এখানে। প্রাসাদের কাছাকাছি আসতেই দেখতে পেলাম, এক বর্শাধারী ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে প্রাসাদের অলিন্দে। কয়েক মুহূর্ত পরই সে অদৃশ্য হয়ে গেল প্রাসাদের ভিতরে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে পাকড়াও করার জন্য আমিও ঢুকে পড়লাম প্রাসাদে। তারপর এ ঘরে এসে হাজির হলাম।' কথাগুলো বলার পর ইন্সপেক্টর রাঠোর বিদ্যাপতিকে জিগ্যেস করলেন, 'আপনি এ পোশাকে অলিন্দে দাঁড়িয়েছিলেন কেন?'

বিদ্যাপতিবাবু কী একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বিক্রম সিংহ তার আগেই ইন্সপেক্টর রাঠোরকে বললেন, 'চলুন, এখনই আমাদের প্রাসাদের নীচে যে সুড়ঙ্গ আছে সেখানে যেতে হবে।'

ইন্সপেক্টর রাঠোর বললেন, 'কেন?'

বিক্রম সিংহ বললেন, 'চলুন, যেতে যেতে সব বলছি।'

লকেশ সিংহকে দুজন পুলিশ কর্মীর হেফাজতে রেখে সকলে এর পর চললেন নীচে নামার জন্য।

১৪

পর দিন বিকেলে বিজয় সিংহের লাইব্রেরির সেই টেবিল ঘিরে বসে ছিলেন বিজয় সিংহ, বিক্রম সিংহ, অনিকেত, পার্থ আর বিদ্যাপতিবাবু। বিজয় সিংহের শরীরের নানা জায়গায় ব্যান্ডেজ জড়ানো। তবে গণপতিজি হাসপাতালে। তাঁর আঘাত গুরুতর হলেও বিপদের আশঙ্কা নেই। জ্ঞান ফিরে এসেছে তাঁর। মাথায় আঘাত পাওয়ার ফলে তিনি নাকি তাঁর স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি ফিরে পেয়েছেন। কিছুক্ষণ আগে হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে সকলকে এই খুশির খবর জানিয়েছেন বিদ্যাপতিবাবু। তবে আসল খুশির ব্যাপারটা অন্য।

অনিকেতদের সামনের টেবিলের উপর রয়েছে ফুট তিনেক লম্বা, ফুট দুয়েক চওড়া চ্যাপটা ধরনের একটা চন্দন কাঠের বাক্স। ওটাই কুম্ভ রানার গুপ্তধন। বিজয় সিংহের বাতলে দেওয়া পথ ধরে ঝুনঝুন প্রাসাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত সরস্বতী মন্দিরের নীচে, ভূগর্ভস্থ একটি ঘরের এক কুলুঙ্গি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এই বাক্স। সকলেই ওই বাক্স খোলার প্রতীক্ষায় বসে আছেন ঘরে।

ইন্সপেক্টর রাঠোর লকেশ সিংহ আর তাঁর দুই সঙ্গীকে কোর্টে চালান করতে গিয়েছেন। তিনি ফিরে এলে খোলা হবে ওই বাক্স। বিক্রম সিংহের মন ভালো নেই। কিছুটা বিমর্ষ হয়ে তিনি চুপচাপ বসে আছেন। কারণ, ইন্সপেক্টর রাঠোর জানিয়েছেন যে, বাক্সের ভিতরে যা পাওয়া যাবে তা বর্তমানে সবই সরকারি সম্পত্তি। সরকারের ঘরে জমা দিতে হবে।

হাতের নস্যির ডিবে থেকে একটিপ নস্যি নাকে নিয়ে নাক মোছার পর বিদ্যাপতিবাবু বললেন, 'আসলে ঝুনঝুন প্রাসাদের গুপ্তধন আর প্রেতাত্মার ব্যাপারটা দীর্ঘদিনের প্রচলিত গল্প। ছেলেবেলা থেকেই আমি এই গল্প শুনে আসছি। পুরোনো প্রাসাদ বা মন্দিরকে কেন্দ্র করে এজাতীয় গল্প প্রায়ই শোনা যায়। তবে আমি বিশ্বাস করতাম না এসব গল্প। দাদা কেল্লায় ফিরে আসার পর রানাজি আর দাদা দুজনেই প্রায় ঝুনঝুন প্রাসাদে যেতে শুরু করেন। তখন হঠাৎই আমার মনে প্রশ্ন জাগে। তাহলে ঝুনঝুন প্রাসাদে সত্যিই কি কিছু আছে, যার সন্ধান করছেন ওঁরা? প্রশ্নটা জিগ্যেস করব-করব করেও করা হয়ে ওঠেনি দাদাকে। তারপরই একদিন নিখোঁজ হয়ে যান রানাজি। কয়েকদিন পর তাঁর পোশাক পরা মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এর পরপরই ঝুনঝুন প্রাসাদে দাদার দুর্ঘটনা ঘটে আর দাদাকে বাঁচাতে গিয়ে আমি লকেশ সিংহের খপ্পরে পড়ি। লকেশ সিংহের আসল উদ্দেশ্য যে ঝুনঝুন প্রাসাদ হস্তগত করা, তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি আমার। কিন্তু তা কীসের জন্য? গুপ্তধনের জন্য? দাদা হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পর প্রলাপ বকার ছলে একটা কথা বলতেন মাঝে-মাঝে, 'রানা কুম্ভর গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া অত সহজ নয়।' তিনি আরও বলতেন, 'আমি কুম্ভ প্রাসাদে যাব, রানাজি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। পোশাক দিয়ে আমাকে ধোঁকা দেওয়া যাবে না।' এসব শুনে ঝুনঝুন প্রাসাদের গুপ্তধনের ব্যাপারটা ছাড়াও আরও একটা ধারণা আমার মনে জন্ম নিল, রানাজি কী জীবিত আছেন? এসব প্রশ্নের সমাধানের জন্য আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ঝুনঝুন প্রাসাদে ভালো করে অনুসন্ধান চালাব। সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার দরকার হয়ে পড়ল, তা হল লকেশ সিংহ বা ওই প্রাসাদ সম্পর্কে আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রাসাদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব? হঠাৎ একটা বুদ্ধি এল আমার মাথায়। কুম্ভের প্রেতাত্মার প্রাচীন গল্পটাকে হাতিয়ার করি আমি। গায়ে ঢোলা পোশাক, মাথায় পাগড়ি আর হাতে বর্শা নিয়ে কুম্ভ সেজে প্রাসাদে ঘোরাফেরা করতে থাকি। আর সঙ্গে সঙ্গে চালাতে থাকি গুপ্তধনের অনুসন্ধান। ওরকমই এক রাতে আমি যখন কুম্ভ সেজে প্রাসাদে ঢুকতে যাব তখনই দেখতে পাই, প্রাসাদের অলিন্দে দাঁড়িয়ে থাকা আর এক কুম্ভকে। এবার আমি ভয় পেয়ে যাই। সে কি আমার মতোই নকল তা বুঝতে পারিনি? তারপর থেকে ওই প্রাসাদে যাওয়া ছেড়ে দিই। আসলে আমার অস্ত্রেই আমাকে ঘায়েল করেছিলেন লকেশ সিংহ।'

পার্থ বলল, 'তা হলে দাদাকে খুঁজতে গিয়ে প্রেতাত্মা দেখার ব্যাপারটা...?'

বিদ্যাপতিবাবু বললেন, 'ওটা আমি আপনাদের মিথ্যে বলেছিলাম।'

'কালকের ব্যাপারটা?' অনিকেত জিগ্যেস করল।

বিদ্যাপতিবাবু বললেন, 'কাল রাতে এখানে আপনাদের খুঁজতে এসে দেখলাম, আপনারা দু'জন নেই। আমার মন বলল, আপনারা নিশ্চয়ই ঝুনঝুন প্রাসাদে গিয়েছেন। আমার মনে হল, আমারও সেখানে যাওয়া উচিত। বাড়ি ফিরে এসে পোশাক পালটাবার সময় নিছক মনের খেয়ালেই আমি পরে নিয়েছিলাম ওই পোশাক।'

অনিকেত জিগ্যেস করল, 'আপনার দাদা কীভাবে জানতে পেরেছিলেন রানাজি জীবিত আছেন বা নকল লক্ষ্মী বা নকল নোটের ব্যাপার?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'তা জানি না। দাদা এখানে থাকলে বলতে পারতেন। রানাজি নিখোঁজ হওয়ার পর কয়েকদিন তিনি গিয়েছিলেন ওই প্রাসাদে। তখনই হয়তো তাঁর চোখে পড়ে থাকবে কিছু।'

অনিকেত বিদ্যাপতিবাবুকে আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আর প্রশ্ন করা হল না। ইন্সপেক্টর রাঠোর ঢুকলেন ঘরের ভিতর। অনিকেতের পাশে একটা চেয়ারে বসে পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছতে মুছতে তিনি বললেন, 'সারাদিন অনেক ধকল গেল, দু'দণ্ড বসার ফুরসত পাইনি। এখন উদয়পুর জেলে লকেশ সিংহের ডাল রুটি খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। লকেশ সিংহ শুধু জাল নোটের কারবারের সঙ্গেই জড়িত ছিলেন না, আরও অনেক মারাত্মক অপরাধ তিনি করেছেন। লকাপে পুলিশের রুলের গুতো খেয়ে তার দুই সঙ্গী অনেক কথা স্বীকার করেছে। রানাজির পোশাক পরা যে ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, তাকে জয়পুর থেকে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়েছিল। টাকা না পাওয়ায় তাকে খুন করা হয় এবং তার মুন্ডু কেটে রানাজির পোশাক পরানো হয়, যাতে আর কেউ রানাজির সন্ধান না করেন। এরকম আরও অনেক জেরার মুখে স্বীকার করেছে তারা। ঝুনঝুন প্রাসাদের ভূগর্ভস্থ ঘরগুলোকে এসব কাজে ব্যবহার করত তারা। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা স্বীকার করেছে। গণপতিজির মাথায় আঘাত লাগার ব্যাপারটা নিজক অ্যাক্সিডেন্ট নয়। অলক্ষ্যে তাঁর মাথায় পাথরের চাঁই ফেলেছিলেন লকেশ সিংহ।' কথাগুলো বলার পর টেবিলে রাখা গ্লাস তুলে নিয়ে ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খেলেন তিনি।

তারপর অনিকেতের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, 'আমার একটা খুশির খবর আছে। আসলে আমাকে এখানে বদলি করা হয়েছিল জাল নোটের কারবারিদের খুঁজে বের করার জন্য। এত তাড়াতাড়ি কেসটা সলভ হয়ে যাওয়ায় সরকার বাহাদুর আমার পদোন্নতি ঘটিয়েছেন। ইন্সপেক্টর থেকে সার্কেল ইন্সপেক্টর হয়েছি আমি। আসলে কিন্তু এটা আপনাদেরই কৃতিত্ব।'

অনিকেত বলল, 'একথা কিন্তু আর সরকারের কানে তুলতে যাবেন না। তা হলে আপনার পদোন্নতি আটকে যাবে।' তার কথা শুনে সকলে হেসে উঠলেন।

হাসলেন না শুধু বিক্রম সিংহ। গুপ্তধন পাবেন না জানতে পারার পর থেকেই তিনি বিমর্ষ। হাসি থামতেই বললেন, 'হাসাহাসি তো অনেক হল, এবার বাক্সটা খোলা হবে কি? আমার কাজ আছে, কাল সকালে আমাকে পোলো খেলতে যেতে হবে উদয়পুরে।'

এবারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে বাক্স সমেত টেবিলটাকে সকলে মিলে ধরাধরি করে বসানো হল জানলার ধারে। টেবিল ঘিরে দাঁড়ালেন সকলে। খোলা জানলা দিয়ে শেষ বিকেলের সূর্যের আলো এসে পড়েছে চন্দনকাঠের বাক্সের উপর। পাঁচশো বছর পর আবার পৃথিবীর আলো দেখতে চলেছে ভিতরের জিনিসগুলো।

ইন্সপেক্টর রাঠোর পকেট থেকে একটা পেনসিল কাটার ছুরি বের করে চাড় দিয়ে খোলার চেষ্টা করতে লাগলেন বাক্সটা। সকলে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বাক্সটার দিকে। এক সময় খুট শব্দ করে বাক্সের ডালাটা খুলে গেল। সকলে অধীর আগ্রহে ঝুঁকে পড়লেন বাক্সটার উপর। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া নীল রঙের রেশমের কাপড় দিয়ে জড়ানো কী যেন একটা জিনিস রাখা আছে বাক্সের মধ্যে। তার উপর ছড়ানো আছে শুকনো কীসব। দেখে অনিকেতের মনে হল, সেগুলো অনেক দিন আগের শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মালা। কাপড় মোড়া জিনিসটাকে সাবধানে বাক্স থেকে বের করে টেবিলের উপর রাখলেন। তারপর ধীরে ধীরে খুলে ফেললেন সেই রেশমের বাঁধন। কিন্তু এ কী, ধনরত্ন কই? শুধু কিছু তালপাতা পরপর সাজানো আছে। তার গায়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কালির আঁচড়।

বিক্রম সিংহ বললেন, 'এ তো সামান্য তালপাতা মাত্র। কুম্ভ রানার সম্পদ তো এখানে নেই।'

অনিকেত লক্ষ করল, সকলে অবাক হলেও অবাক হয়নি একজন। ব্যাপারটা যেন তাঁর কাছে প্রত্যাশিত ছিল। একটা হাসি ফুটে উঠল বৃদ্ধ রানার চোখে মুখে। অনিকেত তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, 'বাক্সের ভিতরে কী আছে আপনি জানতেন?'

বিজয় সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ, জানতাম।'

বিক্রম সিংহ অবাক হয়ে তাঁকে জিগ্যেস করলেন, 'তা হলে এই কি আপনার কুম্ভ রানার গুপ্তধন?'

বিজয় সিংহ বললেন, 'হ্যাঁ। এরই সন্ধানে আমি আর গণপতি ঝুনঝুন প্রাসাদে যেতাম। আমাদের সামনে যা দেখতে পাচ্ছি তা হল মহারানা কুম্ভের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কুম্ভের রাজকোষে যত সম্পদ ছিল তার চেয়েও দামি এ সম্পদ।'

অনিকেত তখন বুঝতে পেরে গেল আসলে এ জিনিসগুলো কী। এগুলো আসলে ভূর্জপত্র, যার উপর প্রাচীনকালে লেখা হত। কিন্তু কী লেখা আছে ওতে? সে উত্তর খোঁজার জন্য তাকাল বিজয় সিংহের দিকে। তার মনের কথা বুঝতে পেরে বিজয় সিংহ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ঝুনঝুন প্রাসাদে প্রতিদিন রাতে সরস্বতীর আরাধনা করতেন মহারানা কুম্ভ। একদিন দেবী আবির্ভূত হলেন মহারানার স্বপ্নে। দেবী তাঁকে বললেন, তিনি অধিষ্ঠান করবেন মহারানার লেখনিতে। লিখতে বসলেন মহারানা, রচনা করলেন এক অমর সৃষ্টি, তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। আপনি বুদ্ধিমান, ভেবে বলুন তো এগুলো কী?'

কর্নেল টডের বইয়ে গণপতির লেখা হেঁয়ালির একটা অংশ সমাধান করতে পারেনি অনিকেত। তা হল 'গোবিন্দর কথা গোবিন্দই জানেন।' বিজয় সিংহের কথা শুনে এবার তার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল সব কিছু। সে বুঝতে পারল তার সামনে রয়েছে মহারানা কুম্ভ রচিত বহুশ্রুত সেই গীতগোবিন্দম-এর পরিশিষ্ট, মহারানা কুম্ভের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। উত্তরটা জানিয়ে দিয়ে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল এই আশ্চর্য সম্পদের দিকে। শেষ বিকেলের আলো খোলা জানলা দিয়ে এসে পড়েছে টেবিলে রাখা ভূর্জপত্রের উপরে। তাতে ফুটে রয়েছে চিতোরের সর্বশ্রেষ্ঠ মহারানার হস্তাক্ষর।

কিছুক্ষণ পর ইন্সপেক্টর রাঠোর সকলকে বিদায় জানিয়ে জিনিসটা নিয়ে চলে গেলেন। ওটা তিনি পাঠিয়ে দেবেন উদয়পুর সিটি প্যালেস মিউজিয়ামে। তাঁর চলে যাওয়ার পর বিদ্যাপতি অনিকেতকে বললেন, 'আমার পাণ্ডুলিপির কী হবে? সেটা তো পুরো শোনাই হল না আপনাদের?'

অনিকেত বলল, 'ওটা আমরা সঙ্গে করে কলকাতায় নিয়ে যাব। কিন্তু সেটা কার নামে ছাপা হবে? টড সাহেবের বইয়ে যে হস্তাক্ষর আছে তার সঙ্গে অদ্ভুত মিল আছে পাণ্ডুলিপির হস্তাক্ষরের।

বিদ্যাপতি বললেন, 'আমাকে আর লজ্জা দেবেন না। দাদার মাথা খারাপ শুনে আপনারা যদি তা ছাপতে না চান তাই মিথ্যে বলেছিলাম আমি। ওটা দাদার নামেই ছাপবেন।'

এই বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বিদ্যাপতি। তারপর বললেন, 'আমি এখন যাই, রাত আটটা নাগাদ আমি আবার আসব। আপনাদের এক জায়গায় নিয়ে যাব।'

অনিকেত জিগ্যেস করল, 'কোথায়?'

বিদ্যাপতি বললেন, 'পদ্মিনী প্রাসাদে, চাঁদনি রাতে অপূর্ব লাগে পদ্মিনীর জলমহল। একবার দেখলে সারা জীবন তা ভুলতে পারবেন না।'

তাঁর কথা শুনে কপট ভয় প্রকাশ করে অনিকেত বলল, 'ওরে বাবা, সেখানে আবার কারও প্রেতাত্মা এসে হাজির হবে না তো?'

বিক্রম সিংহ গম্ভীর মুখে বসেছিলেন। অনিকেতের কথা শুনে হো হো করে হাসতে শুরু করলেন তিনি।

অধ্যায় ১ / ৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%