অভীক সরকার

সন্ধ্যা নেমে আসছে দ্রুত৷ আকাশের পশ্চিমদিক রক্তাভ। দেব দিবাকর অস্তাচলগামী। নীড় প্রত্যাশী পাখিদের কলকাকলিতে চারিদিক মুখরিত।
কলস্বিনী মেঘান্দ বয়ে চলেছে পূর্বসমুদ্রের দিকে। এই শীর্ণা, ক্ষীণা মেঘান্দকে দেখে কে বলবে, প্রবল বর্ষায় কী ভয়ঙ্কর রূপই না ধারণ করে এই নদী। স্রোতে, গর্জনে, উথাল পাথাল ঢেউতে তার সে কী মহানাগিনী রূপ।
বাতাসে হিমের পরশ। হেমন্তের রিক্ততা প্রকৃতির সর্বাঙ্গে৷ যতদূর চোখ যায় শুধু শূন্যতা। নদীর তীরে স্থির হয়ে বসেছিলেন এক পুরুষ। বসেছিলেন বজ্রাসনে। সুঠাম এবং ঋজু দেহ। কুঞ্চিত কেশদাম চূড়া করে মাথার ওপরে বাঁধা। চোখদুটি তীব্র এবং অন্তর্ভেদী। আপাতত সেই চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ মেঘান্দ’র স্রোতের দিকে।
একটু পিছনে শ্মশানভূমি। তার একপাশে দুটি অস্থায়ী কুটির। গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী বা ছন্নছাড়াদের সাময়িক আবাস।
একটি কুটিরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক বিশালদেহী পুরুষ। ইনি একজন অরণ্যচারী শবর। কটিদেশ পশুচর্মাবৃত, পিঠে শবরধনু ও তূণ।
নদীতীরে বজ্রাসনে বসে থাকা পুরুষটির প্রতি ইতস্ততভাবে প্রশ্ন ভাসিয়ে দিলেন শবর, ‘আচার্য, আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে এখানে?’
আচার্য গম্ভীরস্বরে উত্তর দিলেন, ‘জানি না মিত্র। তবে আদিনাথ স্বপ্নাদেশ দিয়েছেন যে আজই আমি সন্ধান পাব সেই অব্যর্থ অস্ত্রের।’
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শবর পুরুষ। কজঙ্গলের অরণ্য ছেড়ে এই অস্থায়ী কুটিরে থাকতে তাঁর ভালো লাগছে না। কিন্তু আচার্য’র অনুরোধ বা আদেশ উপেক্ষা করার সাহস তাঁর নেই।
কথাটা ভেবেই লজ্জা পেলেন তিনি। এই মহাযোগীকে কি শুধু ভয় করেন তিনি? তা তো নয়। ভালোও তো বাসেন।
নিখাদ, নিষ্পাপ ভালোবাসা। তাই তো এঁর এক ডাকে এখানে এসেছেন। কুটির বেঁধে আছেন।
মাসখানেক পূর্বে মহাযোগী অবস্থান করছিলেন তাঁর কাছে। আসন্ন মহাবিপ্লবের কিছু পরিকল্পনার জন্য। সেখানেই আদিনাথের স্বপ্নাদেশ পান। একমাস পর পূর্ণিমার দিনে সন্ধ্যা আর রাত্রির স্পর্শমুহূর্তে মেঘান্দ’র জলে ভেসে আসবে বঙ্গদেশের সৌভাগ্যচিহ্ন। আসন্ন মহাবিদ্রোহের সময়ে সেই সৌভাগ্যচিহ্ন যেন তাঁদের সঙ্গে থাকে, আদিনাথের কঠোর নির্দেশ।
সন্ধ্যা শেষ হয় হয়। এমন সময় আচার্যের চোখে পড়ল কী যেন একটা ভেসে আসছে মেঘান্দের বুকে। মুহূর্তের মধ্যে জলে ঝাঁপ দিলেন মহাযোগী মৎস্যেন্দ্রনাথ।
ক্রুদ্ধচোখে নগ্ন দেহটির দিকে তাকিয়েছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ আর শবর পুরুষ। দেহটি এক নারীর। কতই বা বয়েস হবে এর? পঞ্চদশী? ষোড়শী? দেহটির সর্বাঙ্গে হিংস্র দংশন। বোঝা যায় একাধিক পাশবিক ধর্ষণের শিকার হয়েছে এই কন্যা। হিংস্র নেকড়ের দল যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে ত্রস্তা হরিণীর ওপর, সেভাবেই একে ভোগ করেছে কতিপয় নরাধম।
‘এ কার কাজ হতে পারে আচার্য?’
শক্তমুখে উত্তর দিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘হরিকেলের শাসনভার এখন হরিদত্ত নামক এক কামুক রাক্ষসের হাতে। এই কাজ তার বা তার অনুগত নপুংসক রাক্ষসবাহিনী ছাড়া আর কারও হতে পারে না।’
নির্বিচার গণধর্ষণের পর নিঃসাড় দেহটি মৃতভ্রমে কাঠের পাটাতনে বেঁধে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেটিই চোখে পড়েছিল মৎস্যেন্দ্রনাথের। দেহটি তুলে আনার পর বোঝা যায় যে এখনও প্রাণ রয়ে গেছে কন্যাটির দেহে।
‘আচার্য, কে হতে পারে এই কন্যা?’
‘জানি না মিত্র, তবে অনুমান করতে পারি। ধর্ষকরা যেভাবে দেহটি ভাসিয়ে দিয়েছে, তাতে বোঝা যায় যে তারা চেয়েছিল দেহটির যেন সন্ধান না পাওয়া যায়। নইলে দেহটি তারা হরিকেলেই কোথাও ডুবিয়ে দিতে পারত, বা পুড়িয়ে দিতে পারত, অথবা মাটিতে পুঁতে দিতে পারত। তা যখন করেনি তার মানে কৃতকর্মের কোনও প্রমাণ রাখতে চায়নি দুষ্কৃতীর দল। অর্থাৎ তাদের মনে ভয় ছিল। এই কন্যা কোনও সাধারণ কন্যা নয় মিত্র। কোনও প্রভাবশালী রাজপুরুষের পরিবারের কেউ হবে।’ এই বলে উঠে দাঁড়ালেন মৎস্যেন্দ্রনাথ, ‘হরিদত্ত’র মহামাত্য হচ্ছেন জয়নাথ। বিচক্ষণ, ক্ষমতাধর এবং প্রতিভাবান পুরুষ। তাঁর একটি প্রাণপ্রিয় ভাগিনেয়ী ছিল। শুনেছিলাম তার বিবাহ সামনেই। আমি জানি না এই হতভাগিনী সে কী না। তবে আদিনাথ একেই নির্দিষ্ট করেছেন বাংলার ভাগ্যলক্ষ্মী বলে। এই ধর্ষিতা হতভাগিনী হয়ে উঠুক আমাদের সর্বোত্তম অস্ত্র। একে আপনার হাতে সমর্পণ করলাম মিত্র শবরবজ্র। বাংলার ভাগ্যলক্ষ্মীকে আসন্ন মহাবিদ্রোহের পূর্বে রণলক্ষ্মী করে তুলুন। এই আমার অনুরোধ।’
দুজনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কুটিরের সামনে। শবরবজ্র হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, ‘কালী, কালী রে।’
অন্য কুটির থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন এক রমণী।
প্রথম যেদিন এই রমণীকে দেখেন, অভিভূত হয়েছিলেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। এই নারী অরণ্যসম্ভূতা, সিদ্ধাচার্য শবরবজ্রের পালিতা কন্যা। একই অঙ্গে এমন ভয়ঙ্করী অথচ মোহময়ী রূপ দেখেননি তিনি। এমন ঘনকৃষ্ণ বর্ণ সচরাচর দেখা যায় না। তার মেঘের মতো উন্মুক্ত কেশরাশি নেমে এসেছে কটিদেশ অবধি। সুডৌল স্তনদুখানি উন্মুক্ত। চোখ দুখানি স্থির এবং রক্তাভ। কটিদেশে বিভিন্ন প্রাণীর অস্থি দিয়ে তৈরি একটি বিচিত্র মেখলা।
এই নারীকে ভয় করেন মৎস্যেন্দ্রনাথ। শুধু ভয় নয়, অনেকটা সম্ভ্রম আর শ্রদ্ধাও মিশে থাকে তার মধ্যে। এত ক্ষিপ্র, এত তীব্র, এত রণোন্মত্তা নারী দেখেননি মৎস্যেন্দ্রনাথ।
শুধু তাই নয়, সমগ্র অরণ্য শাসন করে এই নারী। কজঙ্গলের প্রতিটি প্রাণী এর অনুগত। এটা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করতেন না মৎস্যেন্দ্রনাথ।
আর শ্মশান! শ্মশানের প্রতি কেন যে এত অদ্ভুত মোহ আছে এই নারীর, জানেন না মৎস্যেন্দ্রনাথ।
নারীটি এসে দাঁড়াল। তারপর তার চোখ পড়ল শায়িতা মৃতবৎ কন্যাটির ওপর।
এর পর যা ঘটল, তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না মৎস্যেন্দ্রনাথ। মনে হল অকস্মাৎ যেন শত কৃষ্ণগহ্বরের আলো বিস্ফারিত হল নারীটির শরীর জুড়ে। মুহূর্তের মধ্যে অব্যক্ত ক্রোধে দ্বিগুণ ফুলে উঠল তার শরীর। চোখদুটি রক্তাক্ত হয়ে উঠল! উন্মুক্ত কেশদাম উড়তে লাগল ভয়াল অশনির মতো।
চক্ষু তুলে পালক পিতার দিকে ক্ষণেক তাকাল সেই নারী। পিতাপুত্রীর মধ্যে চোখে চোখে কী কথা হয়ে গেল বুঝতে পারলেন না মৎস্যেন্দ্রনাথ। শুধু দেখলেন ধর্ষিতা কন্যাটির অচৈতন্য দেহখানি পরম মমতায় দু’হাতে তুলে নিজের কুটিরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভয়ঙ্কর সেই নারী।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন