শৈলেন ঘোষ

ছোট্ট-ছোট্ট পাখি। আকাশে যেন একটি-একটি রঙের ফোঁটা। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ।
মাটিতে-এক প্রকাণ্ড রাজ্য। আর এক মস্ত বড়ো রাজা। আগে রাজার ঘরে সব ছিল। আলো ছিল। রং ছিল। মন ছিল। এখন কিছুই নেই।
রাজার রানি নেই। রাজার মেয়ে নেই। রাজার ছেলে নেই। একে-একে সক্কলে চলে গেছে। চলে গেছে নীল আকাশের দরজা পেরিয়ে যেখানে স্বর্গ--সেখানে।
রাজার আছে মস্ত রাজবাড়ি। রাজবাড়িতে আছে মন্ত্রী, সান্ত্রি, সিপাই, বরকন্দাজ। রাজা তাদের সঙ্গে কথা বলে। তাদের ওপর হুকুম চালায়। পানের থেকে চুন খসলেই রাজার চোখ লাল হয়ে ওঠে। রাজার গলা গাঁক করে গর্জে ওঠে, 'মেরে ফেলো।' রাজবাড়ি কেঁপে ওঠে। ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা লেগে ধবনি ফেরে প্রতিধবনি হয়ে 'মেরে ফেলো-রে ফেলো-ফেলো।'
রাজার মনে নেই দয়া। চোখে নেই জল। আগে তো এমন ছিল না রাজা! কেন এমন হয়ে গেছে!
আকাশে তারা যখন ফুট ফুট করে জ্বলে সেদিকে চোখ গেলে রাজা হেঁকে ওঠে, 'জানলা বন্ধ করে দাও।'
রাজবাড়ির সমস্ত জানলা দুম দুম করে বন্ধ হয়ে যায়।
গাছে-গাছে ফুল যখন হাসে--রাজার সেদিকে নজর গেলে চিৎকার করে ওঠে, 'ছিঁড়ে ফেলো।'
গাছের সমস্ত ফুল মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে।
আহা! ফুলের ব্যথা লাগে না!
একদিন গাছে দুটি পাখি নাচছিল। ছোট্ট দুটি পাখি। একটি হলুদ পাখি। একটি নীল পাখি। ঘরের জানলা দিয়ে দেখছিল রাজা। হঠাৎ তার দেহের সব রক্ত একসঙ্গে টগবগ করে ফুটে উঠল রাগে। সঙ্গে সঙ্গে হাতের তির ছুটল। নীল পাখিটা ছিটকে পড়ল। নীল পাখির
নীল পালক রক্তে লাল হয়ে গেল। মরে গেল। আর সেই হলুদ পাখিটা উড়ল আকাশে--প্রাণের ভয়ে। উড়তে উড়তে কোথায় যে হারিয়ে গেল--কে জানে!
নীল পাখিটা মরে পড়ে আছে। রক্ত তার শুকিয়ে গেছে। একটি একটি পাখি আসছে। ভয়ে-ভয়ে। দেখছে তাকে। শেষদেখা। নীল পাখিটা হয়তো তাদের বন্ধু। হবে বোধ হয়! হয়তো তারা কাঁদছে।
আচ্ছা, দুঃখ হলে পাখির চোখে জল আসে না? মিষ্টি-মিষ্টি চোখে ফোঁটা ফোঁটা জল?
রাজা দেখছিল। দেখছিল মরা নীল পাখিটাকে। হাজার হাজার পাখি আসছে, যাচ্ছে। ছোট্ট ছোট্ট ডানা নাড়িয়ে হাওয়া করছে। যদি বেঁচে ওঠে।
পাখিরা জানে না বুঝি একবার মরে গেলে বাঁচে না কেউ!
রাজা চেঁচিয়ে উঠল, 'তাড়িয়ে দাও।' কী ভয়ংকর চিৎকার!
হাঁক শুনে চল্লিশজন সিপাই ছুটে এল।
'আমার চোখের সামনে থেকে পাখি তাড়িয়ে দাও।'
রাগে দেহ ঠকঠক করে কাঁপছে রাজার। 'আমার রাজ্যে একটিও পাখি থাকবে না। একটিও না।'
হুকুম শুনে চল্লিশজন সিপাই ছুটল চল্লিশশো লোক ডাকতে।
চল্লিশশো লোক ছুটল চল্লিশ হাজার পাখির পেছনে।
রাজার হুকুম, রাজ্যে আর একটিও পাখি থাকবে না। সব পাখি তাড়িয়ে দিতে হবে।
চল্লিশশো লোক সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধে পর্যন্ত রাজ্যে পাখি তাড়িয়ে বেড়াতে লাগল। পাখিরা একবার উড়ে যায়। আবার আসে। আবার তাড়ায়। বার বার আসে। আকাশে চরকি ঘোরে। রঙের চরকি। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ।
যেন ঝড় উঠেছে। আকাশে পাখির ঝড়। মাটিতে মানুষের ঝড়। চল্লিশশো লোক ছুটছে। পড়ছে আবার উঠছে। আবার পড়ছে।
পাখিরা আসছে, যাচ্ছে। যাচ্ছে, আসছে।
তারপর?
পাখিরা সত্যি সত্যি চলে গেল।
কোথায় গেল?
তাদের ঘরে। গাছের ডালে। রাত আসছে। ঘুমবে না?
একটি পাখি। ছোট্ট এতটুকু। রাত্তিরবেলা মা তাকে ঘুম পাড়াচ্ছিল। ঘুম চোখে সে তার মাকে জিজ্ঞেস করল, 'মাগো, অতগুলো মানুষ আমাদের অমন করে মারতে এল কেন? আমরা তো ওদের কোনো ক্ষতি করিনি।'
পাখির মা ছেলের কথায় চুপ। রা কাড়ে না।
ছেলে আবার আবদার করল, 'বলো না মা?'
আকাশে তারার পর তারা ফুটছে। একটির পর একটি পাখির চোখে ঘুম আসছে। আকাশে তারা যখন জাগে, পাখি তখন ঘুমোয়। তারা যখন ঘুমিয়ে পড়ে--পাখি তখন জাগে।
ভোর হল। পাখিরা জাগল। গান শুরু করে দিল। গাছের পাতায় দোলা লাগল। দোল-দোল। দোল-দোল।
রাজার ঘুম ভাঙল। ঘুম ভাঙতেই আবার কানে এল পাখির গান। চোখ চাইতেই--সামনে পাখির নাচ। তারা যেন রাজাকে ভেংচি কাটছে নেচে নেচে। রাজার চোখ জ্বলজ্বল করছে। রাগে! হিংসেয়!
'কৌন হ্যায়'--রাজার গলায় যেন মেঘের ডাক।
চল্লিশজন সিপাই ছুটে এল।
রাজার চোখ লাল টকটক।
সিপাইগুলো দেখছে যত, কাঁপছে তত। ঠকঠক।
'পাখি আবার এল কেন?' রাজা ধমক দিল।
'আজ্ঞে ওরা যে পাখি', একজন সিপাই উত্তর দিল।
'আমি না তাড়িয়ে দিতে বলেছিলুম!'
'আজ্ঞে হুজুর তাড়িয়ে দিলে আবার আসবে।'
'আসবে কেন? আমার হুকুম ওরা মানে না?'
'পাখি কি আর রাজার হুকুম বোঝে!'
'না বোঝে তো ধরো। মেরে ফেলো। সমস্ত পাখি মেরে ফেলো। একটি পাখিও যেন না আসে আমার রাজ্যে।'
আবার ছুটল লোক পাখির পেছনে।
ফাঁদ পাতল। জাল পড়ল। তির ছুটল। আকাশের পাখি মাটিতে ছিটকে গেল। হাজারে-হাজারে। ছোট্ট-ছোট্ট পাখি। তাদের কান্না কে শুনবে?
দিন দিন সাতদিন রাজার লোকেরা পাখি তাড়াল। সাতটি দিন রাজার লোকেরা পাখি মারল। সাতদিন ধরে কত যে পাখি ফাঁদে পড়ল, পাখির পা জালে আটকাল তা কে গুনবে?
তারপর?
তারপর পাখিরা আর আসে না। একটিও পাখি আসে না।
যেমন রাজা তেমনি রাজ্য। সেখানে গাছে ফুল নেই। ফুলের পাশে পাখি নেই। সেখানে রাতে তারা দেখে না কেউ। রাজার হুকুম!
রাজার চবিবশ ঘন্টা চোখ লাল। চোখদুটো যেন সব সময় দপ দপ করে জ্বলছে। সে-চোখে খুশি নেই। সে-মুখে হাসি নেই। খালি গর্জন। একটা মস্ত ঘরে রাজা একা বসে থাকে। কারোর সঙ্গে কথা বলে না। খোলা জানলা দিয়ে দেখে, দূর, অনেক দূরের পাহাড়টা। সন্ধেবেলায় আকাশ রাঙিয়ে সূয্যিঠাকুর ঢলে পড়ে পশ্চিমে। রাজার সমস্ত শক্তি যেন তখন হাতের মুঠোয় এসে জড়ো হয়। রাজা ভাবে, 'যদি পারতুম সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনতে!'
রাজবাড়ির সিংদরজায় ঘন্টা বাজছে ঢং ঢং ঢং। রাতের ঘন্টা। সোনার পালঙ্ক। রাজা শুয়ে আছে। চোখে ঘুম নেই। ঘুম আসছে না। উঠে পড়ল। সামনের জানলায় চোখ মেলে দাঁড়িয়ে রইল রাজা। রাত্তিরের মিশমিশে কালো অন্ধকার চারিদিকে ছড়িয়ে। চাঁদ যে ওঠেনি। চোখে সব ঝাপসা। নিজঝুম রাত্তিরে গাছের ঝরে পড়া পাতায় হাওয়া লাগে--খসখস। পাতা উড়ে যায়। নিজঝুম রাত্তিরে রাজবাড়ির দেওয়ালের ফাঁকে টিকটিকি ডেকে ওঠে--টিক টিক। দরজায় সিপাই লাঠি ঠোকে--ঠক ঠক। অনেক অ-নে-ক দূর থেকে সান্ত্রি চেঁচিয়ে ওঠে--'এই হো হো-ও'। অন্ধকারে চমকে ওঠে রাজা। থমকে থামে বুকের ধুকধুকি।
রাত গড়ায় প্রহরের পাকে। রাজা দাঁড়িয়ে থাকে।
কখন ঘরে যাবে রাতের জুজুবুড়ি? কখন আসবে সকালের রোদ কুমারী? সোনালি গয়না গায়ে সাজিয়ে?
রাত গড়িয়ে গেল। তখনও রাজা ঠায় দাঁড়িয়ে। জানলার ধারে। ভোরের আলো ভেসে আসে ধীরে-ধীরে। আকাশ থেকে কে যেন চুমকি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ঝলমল ঝলমল আলো উছলে ঝরে পড়ছে। আলো ছড়িয়ে গেল আকাশে। আকাশ নীল হল।
আলো ছড়াল নদীর জলে। নদী নাচল। আলো ছড়াল গাছের পাতায়। পাতা দোল খেল।
আলো ছড়িয়ে গেল রাজার মুখে। তবুও রাজার হাসি নেই। খুশির বাঁশি বাজে না মনে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে। কীসের ভাবনা রাজার?
'টুই-টুই', আচমকা একটি পাখি ডেকে উঠল।
রাজা চমকে উঠল। আবার পাখি!
জানলার ধারে কান পেতে রইল রাজা। হ্যাঁ, সত্যিই তো পাখিটা ডাকছে 'টুই-টুই।' একবার। দুবার। বারবার।
রাজার চোখ ঘুরছে। পাখিটাকে খুঁজছে বড়ো-বড়ো দুটো চোখ। রাগে লাল দুটো চোখ। কিন্তু কই? পাখি তো দেখা যাচ্ছে না?
আবার ডাকছে, 'টুই-টুই!'
ফের ডাকল, 'টুই-টুই!'
ওইতো ডেকেছে 'টুই-টুই!'
রাজা আর থাকতে পারল না। পাগলের মতো চেঁচিয়ে উঠল, 'পাখি!' কী ভীষণ চিৎকার।
পাত্রমিত্র, রাজমন্ত্রী, সিপাই-সান্ত্রি ছুটে এল চিৎকার শুনে।
রাজা আবার চেঁচিয়ে উঠল, 'পাখি!'
কই? কই? কই? পাত্রমিত্র, রাজমন্ত্রী, সিপাই-সান্ত্রি চোখ চাওয়াচাওয়ি করলে। ভয়ে কুঁচকে যাওয়া চোখ।
রাজা তেড়ে উঠল, 'ডাকছে!'
'আজ্ঞে কই?' রাজমন্ত্রী জুজুর মতো জিজ্ঞেস করল।
রাজা দু-হাত দিয়ে নিজের দু-কান চেপে ধরল! ছোটোছেলের মতো চেঁচাতে লাগল, 'ওইতো! ডাকছে। আমি শুনতে পাচ্ছি। আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার মাথা ঘুরছে। ধরে আনো। ধরে আনো।'
চেঁচাতে-চেঁচাতে রাজা পড়ে গেল মাটিতে। অজ্ঞান হয়ে।
অবাক! সক্কলে অবাক! আর তো কেউ শুনতে পাচ্ছে না পাখির ডাক! আর তো কেউ দেখছে না পাখি!
তবে?
আবার লোক ছুটল পাখির খোঁজে।
একদিন গেল। রাজার জ্ঞান এল না। পাখিও পাওয়া গেল না। গাছে গাছে শিকারিরা পাখি খুঁজছে, আর রাজবাড়িতে হাকিম-বদ্যি রাজার রোগ খুঁজছে।
দুদিন গেল। রাজা চোখ চাইল। কথা বলল না। পাখিও পাওয়া গেল না।
তিনদিন গেল। রাজা কথা বলল। উঠতে পারল না। পাখিও পাওয়া গেল না।
চারদিনের দিন রাজা বিছানা ছেড়ে উঠে বসল।
মন্ত্রী এসে খবর দিল, 'আজ্ঞে পাখি তো পাওয়া যাচ্ছে না। রাজ্যে তো একটিও পাখি নেই। আপনি বোধ হয় ভুল শুনেছেন।' রাজা মন্ত্রীর দিকে তাকাল। কী কটমট চাউনি! মন্ত্রী ভয়ে-ময়ে সরে পড়তে গেল। রাজা ধমক দিল, 'দাঁড়াও!'
থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মন্ত্রী। 'এখানে এসো।'
মন্ত্রী গুটিগুটি এগিয়ে এল রাজার বিছানার কাছে। লক্ষ্মীছেলের মতো।
চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে রইল রাজা। একদৃষ্টে মন্ত্রীর চোখের দিকে। ওরে বাবা! মন্ত্রীর বুক দুরদুর করছে। গলা শুকিয়ে আসছে। গলা টিপে দেবে নাকি!
'শুনতে পাচ্ছ?' মন্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল রাজা।
মন্ত্রী ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল, 'আজ্ঞে!'
রাজা দাবড়ি দিল, 'শুনতে পাচ্ছ।'
চমকে উঠল মন্ত্রী। ফসকে গেল কথা, 'আজ্ঞে পাচ্ছি।'
'কী শুনতে পাচ্ছ?'
'পাখির ডাক!'
'তবে যে বলছিলে শুনতে পাচ্ছ না?'
'আজ্ঞে, আগে পাচ্ছিলুম না, এখন পাচ্ছি।'
রাজা ধমক দিল, 'পাখি এল কোত্থেকে?'
'আজ্ঞে, আকাশ থেকে!'
আবার চেঁচিয়ে উঠল রাজা, 'মিথ্যে কথা। ডাহা মিথ্যে। এটা আকাশের পাখি নয়। এটা কারো পোষা পাখি। আবার হুকুম না-শুনে কেউ পাখি লুকিয়ে রেখেছে। দরকার নেই তোমাদের। এ-পাখি আমি নিজে খুঁজে বার করব। যেমন করে হোক খুঁজে বার করব। তারপর--যার পাখি তাকে শূলে চাপাব। তোমাদেরও আস্ত রাখব না। টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলব।'
কেঁপে উঠল মন্ত্রী। হেসে উঠল রাজা, হো-হো-হো। যেন একটা দত্যি!
মন্ত্রী হাঁপাতে-হাঁপাতে ছুটে পালাল।
রাজার হাসি শুনে রাজবদ্যি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল।
'আজ্ঞে, কী হয়েছে?'
রাজার মুখে রা নেই। গুম হয়ে গেল।
'হুজুর কীসের কষ্ট? পায়ের না মাথার?'
'চলে যান!' ঘর কেঁপে উঠল রাজার গলার শব্দে।
পিলে চমকে উঠল রাজবদ্যির। একটি ঢোঁক গিলে পথ দেখল।
'দাঁড়ান।' হঠাৎ রাজা ডাকল।
থমকে দাঁড়াল বদ্যিমশাই।
'আমার কাছে আসুন।'
সুড়সুড় করে এগিয়ে গেল বদ্যিমশাই।
'আমার চোখের দিকে তাকান।'
মিটমিট করে চেয়ে রইল রাজার দিকে।
'শুনতে পাচ্ছেন?'
বদ্যিমশাই কান পেতে রইল। বদ্যির বাঁদিক হেলছে। ডানদিক দুলছে।
দুলতে-দুলতে ঘাড় নড়ল। মাথা হেলল। হ্যাঁ! সত্যিই তো! অনেক দূর থেকে একটা পাখির ডাক ভেসে আসছে--টুই-টুই। ভয়ে ঘামতে শুরু করল বদ্যিমশাই। একেবারে স্থির। যেন পাথর! গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। কাঠ। শুকনো গলায় আমতা-আমতা করে বদ্যিমশাই বলল, 'আজ্ঞে হ্যাঁ।'
'কী আজ্ঞে হ্যাঁ?'
'একটা পাখি ডাকছে!'
রাজা লাফিয়ে উঠল। রাজার লাফ দেখে বদ্যি ওরে বাবারে বলে, পড়ি-মরি পিঠটান দিল। রাজা আবার পাগলের মতো হাসতে শুরু করে দিল। হাসতে-হাসতে দড়াম করে বন্ধ করে দিল ঘরের দরজা। একলা ঘরে রাজা সারাদিন কাটাল। বাইরে এল না। কাউকে সাড়া দিল না। রাজা কি পাগল হয়ে গেল?
রাত এল। রাত গভীর হল। সাতমহলা রাজবাড়িতে ঘুম এল। রাজার চোখে ঘুম নেই।
রাজা তার সোনার মুকুট খুলে ফেলল। হিরে-মুক্তোর হার লুকিয়ে রাখল। জরির জুতো সরিয়ে রাখল। রাজার এখন অন্য বেশ। ছদ্মবেশ। রাতদুপুরে ছদ্মবেশে কোথায় যাবে রাজা?
রাত আরও গভীর হয়েছে।
'খুট।' ঘুমিয়ে-পড়া রাজবাড়িতে কে যেন দরজা খুলল? ঘরের দরজা? কে? তার মাথা থেকে পা অবধি কালো কুচকুচে কাপড় জড়ানো।
রাজা। নিজের ঘরের দরজা খুলেছে রাজা। দরজা একটুখানি ফাঁক করে ডঁ×কি মারল।
খট খট। রাতের প্রহরী পাহারা দিচ্ছে। তাদের শক্ত মোটা নাগরা-জুতো।
রাজার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। দেখে ফেলল নাকি?
না। কেউ দেখেনি সামনে কেউ নেই। ঘরের সামনে। ঘরের সামনে লম্বা-চওড়া দালান। এদিক থেকে ওদিক দেখা যায় না। বড়ো-বড়ো ঝাড়লন্ঠনের আলোগুলো নিভে গেছে। দেওয়ালের গায়ে আকাশি রঙের আলো ছড়িয়ে একটা দেওয়াল-গিরি জ্বলছে। আবছা আবছা আলো। দূরে দূরে সান্ত্রিরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে।
রাজা আবার উঁকি মারল। এদিক-ওদিক। চট করে বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে। সামনের দেওয়াল-গিরিটা ঝট করে নিভিয়ে দিল ফুঁ দিয়ে। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। অন্ধকারে সান্ত্রি চেঁচিয়ে উঠল, 'কৌন হ্যায়।' একটা দমকা হাওয়ায় ঝাড়লন্ঠনের কাচে-কাচে ঠোকাঠুকি লেগে গেল। ঠুংঠাং। ছুটে এল সান্ত্রি চটপট। খট খট খট। ঝটপট বাতিটা জ্বেলে দিল। বাঁদিক দেখল। ডানদিক দেখল। সামনে দেখলে। পেছন দেখলে। না। কেউ কোত্থাও নেই। সব চুপচাপ। সান্ত্রি ভাবল, হয়তো হাওয়ায় নিভে গেছে বাতি। আবার তার কাজে চলে গেল। রাজা রাজবাড়ির পেছনের গোপন রাস্তায় ছুট দিল। সুড়ঙ্গ দিয়ে রাজপথে বেরিয়ে গেল।
অন্ধকার। সামনে কী আছে, দেখা যায় না। সামনের পথ চেনা যায় না। জমাট অন্ধকার। কে যেন একটা কালো কুচকুচে কাপড় পরিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর গায়ে। আকাশের তারাগুলো যেন কালো কাপড়ের ওপর ঝকমকে চুমকির কাজ। চুপিচুপি নিঃসাড়ে সেই অন্ধকারে রাজা চলেছে।
রাজা চলেছে পাখির খোঁজে। লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে পাখি বার করতে হবে। যেমন করে হোক খুঁজতে হবে।
হঠাৎ একটা কুকুর ডেকে উঠল, 'ঘেউ-উ-উ।'
রাজার গা ছমছম! বুক দুর-দুর করছে! যদি ধরা পড়ে যায় !
চলতে-চলতে একটি বাড়ির সামনে দাঁড়াল রাজা। বাড়ির দরজা বন্ধ। ঢুকবে কেমন করে? পাখি খুঁজবে কেমন করে? জানলা দিয়ে উঁকি মারল। জানলার ধারে কি আর পাখি আছে? তাইতো! কী করবে তাহলে রাজা! সামনে আরেকটি বাড়ি তারও দরজা বন্ধ।
আরও একটি বাড়ি।
আরও বাড়ি।
বাড়ি। বাড়ি। বাড়ি। সব বন্ধ।
তাহলে এত চেষ্টা সব মাটি!
না। একবার শেষ চেষ্টা করতে হবে। একটি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল রাজা। বাড়ির গায়ের সঙ্গে একটা মস্ত গাছ দাঁড়িয়ে। হেলে আছে। ওই গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরে রাজা ওপরে উঠছে। পাঁচিল ডিঙিয়ে ভেতরে যাবে। বাড়ির ভেতরে।
অনেক কষ্টে উঠেছে। একটা ডাল ধরেছে। আরেকটা। ব্যাস! মড়মড় করে আওয়াজ। অপলকা ডাল গেছে মচকে। রাজা হাত ফসকে, পা লটকে মাটিতে ধপাস। ডিগবাজি।
সঙ্গে সঙ্গে একটা বেড়াল ডেকে উঠল, 'ম্যাঁও।'
মায়ের পাশে ঘুমুতে-ঘুমুতে ছোট্ট ছেলে কেঁদে উঠল, 'মা-উ।'
একটা কুকুর হেঁকে উঠল, 'ঘেউ-উ।'
সঙ্গে-সঙ্গে কোত্থেকে সিপাই চেঁচিয়ে উঠল, 'চোর।' রাজার বুক কেঁপে উঠল।
দেখতে দেখতে এ-বাড়ির লোক বেরিয়ে এল, 'চোর।'
ও-বাড়ির লোক চেঁচিয়ে উঠল, 'চোর।'
পাশের বাড়ির লোক ছুটে এল, 'চোর।'
'চোর। চোর। চোর।' অগুনতি লোকের চেঁচামেচি।
'ঘেউ। ঘেউ। ঘেউ।' অসংখ্য কুকুরের চিৎকার।
রাজা ছুট দিল। আগুপিছু না-ভেবে ভয়ে-ময়ে ছুট।
দলে দলে লোক ছুটল সাঁই সাঁই রাজার পেছনে।
অন্ধকারে রাজা ছুটছে। রাজাকে 'চোর' বলে তাড়া লাগিয়ে লোক ছুটছে।
লোক ছুটছে।
রাজা ছুটছে।
কেউ জানতেও পারছে না, সামনের যে-লোকটা ছুটছে সে চোর নয়। তাদের রাজা।
রাজা তাড়া খেতে-খেতে ছুটছে। হোঁচট খাচ্ছে। পড়ছে। উঠছে। আবার ছুটছে। হাত কাটছে। পা কাটছে। জামা ছিঁড়ছে। কাপড় ফাঁসছে।
পেছনে লোক ছুটছে একশো, না এক হাজার। এক হাজার, না পাঁচ হাজার--কে গুনবে?
তারপর?
অনেক দূর পর্যন্ত লোক ছুটল। কিন্তু চোর ধরা পড়ল না। চোর অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে গেল। আর চোর না ধরতে পেরে চোর-তাড়ুয়ার দল মুখ শুকিয়ে ঘরে ফিরে এল।
রাজা তবুও ছুটছে। হাঁপাচ্ছে। দম ফেটে পড়ছে। তখনও অন্ধকার।
কোথায় চলেছে, রাজা নিজেও জানে না। জানে না, এটা পথ, না বেপথ। উত্তর, না দক্ষিণ। পুব, না পশ্চিম। বন, না গ্রাম। গ্রাম, না শহর। হাট, না বাজার।
চারদিক অন্ধকার।
রাজা ছুটছে--রাত হাঁটছে।
রাজা হাঁটছে--রাত গড়াচ্ছে।
রাজা থামছে--ভোর নামছে।
আর যেন পারছে না।
রাজার কপাল কেটেছে--রক্ত পড়ছে।
রাজার হাত কেটেছে--রক্ত ঝরছে।
ছুটতে-ছুটতে, চলতে-চলতে, থামতে-থামতে রাত ভোর হল।
পাখি ডাকল, টিই-ই-ই। চিক-চিক। চিরিক-চিরিক। ভোরের আলো মিষ্টি। ভারি মিষ্টি।
ভোরের আবছা আলোয় চোখ যেন ধাঁধিয়ে যাচ্ছে রাজার। এ-কোথায় এসে পড়েছে তাড়া খেয়ে?
সামনে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে-গায়ে মেঘ ঘুমিয়ে আছে। পাহাড়ের কোলের গোড়ায় ছোট্ট গ্রাম।
রাজার মাথা ঘুরছে। শরীর ঝিমঝিম করছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। পা টলে টলে পড়ছে। কী করবে এখন? পড়ে যাবে নাকি? বসে পড়ল। একটা জামরুল গাছ তার নীচে।
তারপর?
তারপর রাজা আর কিচ্ছু জানে না। শুয়ে পড়েছে। অজ্ঞান হয়ে গেছে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল গাছের নীচে।
এমনি করে গাছের নীচে কতক্ষণ পড়েছিল, রাজা জানে না।
কখন সূয্যিঠাকুর সোনার আলো ছড়িয়ে দিয়েছে, কখন সকাল হয়েছে, রাজা জানে না।
কখন পাহাড়ের কোলে ঘুমিয়ে-পড়া মেঘ, ঘুম ভেঙে হাওয়ায় নাচতে-নাচতে চলে গেছে, রাজা জানে না।
কখন মৌমাছিরা ফুলে ফুলে দোলা দিয়ে উড়ে গেছে, রাজা জানে না।
অনেকক্ষণ পর রাজার জ্ঞান ফিরল।
চোখ চাইল রাজা। ক্লান্ত দুটি চোখ। চোখের ওপর সবুজ গাছ। গাছের ডালে পাখি। গাছের পাতার ফাঁকে নীল আকাশ। আকাশের ঝিলিমিল আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রাজার গায়ে এসে পড়েছে। ঝিলমিল-ঝিলমিল। কিন্তু এ কে? রাজার কোলের কাছে বসে আছে? রাজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে? মুখখানি হাসি-মাখা?
একটি ছোট্ট ছেলে। ছেলেটিকে দেখে রাজা ধড়ফড়িয়ে উঠতে গেল, 'আমি কোথায়?'
ছেলেটি চট করে রাজাকে ধরে ফেলল, 'আহা! উঠো না। উঠো না। আর একটু শুয়ে থাকো। তা না হলে আবার অজ্ঞান হয়ে যাবে।'
রাজা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল! শুয়ে পড়ল এককথায়। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ছেলেটির দিকে। কে এই ছেলেটি? কী মিষ্টি কথা! যেন কত আপন! রাজা তো চেনে না তাকে? ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবছে রাজা, রাজার চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবছে ছেলেটি। বলল, 'এখনও কষ্ট হচ্ছে? এখন একদম ওঠা নয়। আরেকটু থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে। খোলা মাঠের হাওয়া খুব ভালো।'
রাজা খুব ভালো করে তাকাল ছেলেটির দিকে। ছেলেটি হাসল।
'তাকাচ্ছ কী? হাত-পা কেটে একেবারে খান-খান হয়ে গেছল।'
রাজা তুলল ডান হাত। কাপড় দিয়ে বাঁধা। রাজা কিছু বলার আগেই ছেলেটি বলল, 'আমি বেঁধে দিয়েছি। অনেকখানি কেটে গেছে। আর কিচ্ছু হবে না।'
একটা কুটো আটকে ছিল রাজার চুলে। সরিয়ে দিল হাত দিয়ে ছেলেটি। তারপর রাজার কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। জিজ্ঞেস করল ' তোমার কী হয়েছে? হাত-পা কাটল কেমন করে?'
এমন আদর করে কেউ তো কোনো কথা জিজ্ঞেস করে না রাজাকে! রাজা বোবার মতো চুপটি করে শুয়ে রইল। কী উত্তর দেবে?
তিনটে-চারটে পাখি এসে খেলা শুরু করে দিল গাছের ডালে। রাজা চেয়ে দেখল!
'দাদা-আ-আ-আ---'
হঠাৎ ডাকল কে? একটি ছোট্ট মেয়ের নরম গলার মিষ্টি ডাক! অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে।
রাজা ছেলেটির মুখের দিকে তাকাল।
ছেলেটি বলল, 'আমার বোন।'
উঁচু-নীচু পাহাড়ের পথ। পাহাড়ের পথে ছুটতে ছুটতে, দুলতে দুলতে আসছে একটি ছোট্ট মেয়ে। যেন একটি প্রজাপতি। পায়ে তার মল বাজছে--ঝুমঝুম।
রাজা দেখছে।
ছেলেটি বলল, 'ও আমার নিজের বোন। চুমকি। আমাদের কেউ নেই। আমি আর চুমকি। আমি ছাগল চরাই। ও আমার সঙ্গে-সঙ্গে থাকে। ওই যে দেখছ দূরে ছোট্ট মাটির কুঁড়েঘর--ওটা আমাদের বাড়ি। চুমকি আমায় বড্ড ভালোবাসে। আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না। ভারি লক্ষ্মী।'
রাজার কানে সুর ছড়িয়ে ছড়িয়ে চুমকি এসে দাঁড়াল।
বাঃ, কী মিষ্টি দেখতে! হাতে তার কাঁসার ঘটি। তাতে কানাভরতি দুধ। রাজার কাছে এগিয়ে গেল চুমকি। আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, 'নাও, এই দুধটুকু খেয়ে নাও!'
রাজা কি স্বপ্ন দেখছে?
'কী দেখছ আমার মুখের দিকে? নাও, খেয়ে নাও?' চুমকি আবার বলল, আরও মিষ্টি করে--আবদারের সুরে।
যে-রাজা সোনার বাটিতে ক্ষীর ননী খায়, তার আজ সোনার বাটি কই? আজ তার কাঁসার ঘটিতে দুধ?
ছেলেটি বলল, 'ভাবছ কী, খাও?'
রাজা দুধের ঘটিতে চুমুক দিল। আঃ, কী মিষ্টি!
'এইতো লক্ষ্মী ছেলের কাজ।' চুমকি তার কাপড়ের আঁচল দিয়ে রাজার মুখ মুছিয়ে দিল!
ছেলেটি বলল, 'ব্যস! আরেকটু শুয়ে থাকো চুপটি করে। আমি মাঠ থেকে ছাগলগুলোকে ফিরিয়ে আনি, তারপর বাড়ি যাব। চুমকি, তুই এখানে বসে থাক। আমি এক্ষুনি আসছি।' ছেলেটি ছুটতে ছুটতে চলে গেল।
রাজা দেখছে অবাক হয়ে ছেলেটির দিকে।
চুমকি বলল, 'কী দেখছ? আমার দাদা। আমার নাম চুমকি। দাদার নাম শান্ত।'
কী মিষ্টি গলা ছোট্ট মেয়েটির!
' তোমার কষ্ট হচ্ছে?'
রাজা ঘাড় নাড়ল, না।
'এই দেখো না। এক্ষুনি দাদা এসে পড়বে। আমি যে ছোট্ট। একা পারব না। তা না হলে ধরে ধরে তোমায় আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতুম।'
রাজা চেয়ে রইল মেয়েটির দিকে। চুমকি! কী মিষ্টি নাম!
'খাবে কিছু? খিদে পেয়েছে? আমি আনছি।' উঠতে গেল চুমকি। রাজা হাত ধরে ফেলল। উঠে বসল রাজা।
'আরে! আরে! উঠছ কেন?' ব্যস্ত হয়ে ধরতে গেল চুমকি রাজাকে।
রাজা চুমকির মাথায় হাত দিয়ে আদর করল।
চুমকি হাসল। চোখ দুটি খুশিতে ঝকঝক করে উঠল। বলল, 'ও, এখন বুঝি আর কষ্ট হচ্ছে না? ভালো হয়ে গেছ? হাঁটতে পারবে আমার হাত ধরে? না বাবা দরকার নেই? শেষে কী করতে কী হয়ে যাবে! তা না হলে দাদা আসার আগেই তোমাকে বাড়ি নিয়ে যেতুম। দাদা এখানে এসে দেখত, তুমিও নেই, আমিও নেই। ভাবত, কোথায় গেল। ভয় পেয়ে যেত। খুব মজা হত। তোমাকে খুঁজত। আমাকে খুঁজত। আমার নাম ধরে ডাকত, চুমকি-ই-ই-ই। তোমায় ডাকত--' বলতে-বলতে থমকে থামল। 'এই যাঃ! দেখেছ, তোমার নাম জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি।'
রাজা উঠে দাঁড়াল।
চুমকি একেবারে সঙ্গে-সঙ্গে দুটি হাত দিয়ে রাজাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, 'পড়ে যাবে! পড়ে যাবে! কোথায় যাচ্ছ?
হঠাৎ রাজা কথা বলল, 'তোমাদের বাড়িতে।'
চুমকি নেচে উঠল। হেসে উঠল। পায়ের মল বেজে উঠল। ঝুমঝুম। খুশি, খুশি চারদিকে খুশি। ছোট্ট হাতটি তার বাড়িয়ে দিল রাজার দিকে। রাজা চুমকির হাত ধরে, উঁচু-নীচু পাহাড়ের পথ ভেঙে চলল কুঁড়েঘরে।
ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। শান্ত আর চুমকির বাড়ি।
আর, শান্ত ছাগল চরানোর কাজ সেরে যখন ঘরে ফিরল, তখন চুমকির সঙ্গে রাজার খুব ভাব হয়ে গেছে।
শান্ত আর চুমকি। ভাই আর বোন। শান্তর বয়েস সাত বছর। চুমকির পাঁচ। আর তাদের এই একটি কুঁড়েঘর।
আকাশ-ছোঁয়া রাজবাড়ি নয়। সাতমহলে সাতসতেরো লোকের আনাগোনা নেই। সান্ত্রি নেই। পাত্র নেই। মিত্র নেই। সোনার পালঙ্ক নেই। হিরে-মুক্তোর গয়না নেই। সোনাচাঁদির ঝকমকি নেই। রাজা ভাবে, তবু সব আছে। রাজবাড়ির চেয়ে অনেক আছে।
'চুপচাপ কী ভাবছ?' শান্ত জিজ্ঞেস করল।
'কিচ্ছু না। দেখছি।' রাজা উত্তর দিল।
শান্ত বলল, 'কী দেখছ? আমাদের মাটির ঘর? ভালো লাগছে না?'
'না, না, আমার খুব ভালো লাগছে।'
'তবে মাঝে-মাঝে মুখটা অমন গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে কেন?'
রাজা শান্তর চোখের দিকে চেয়ে বলল, 'এমনি।'
'আমি জানি কেন', ছুটে এসে রাজার কাছে বসল চুমকি। রাজার মাথায় চুলের মধ্যে হাত পুরে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'বাড়ির কথা ভাবছ, না?'
রাজা হাসল।
'হাসছ কী! নিশ্চয়ই মায়ের জন্যে মন কেমন করছে?'
'আমার মা নেই,' রাজা উত্তর দিল।
অবাক হল চুমকি, 'তোমার মা নেই কেন?'
'আমি যে অনেক বড়ো হয়ে গেছি।'
'যারা অনেক বড়ো হয়ে যায় তাদের বুঝি মা থাকে না! তাহলে আমরা তো কত ছোটো। আমাদের মা, বাবা কেউ নেই কেন?'
হঠাৎ একটা মৌমাছি ঘরের মধ্যে উড়ে এল গুন-ন-ন-ন।
রাজা যেন রেহাই পেল। চুমকির কথার জবাব দিতে হল না। শান্ত আর চুমকিও মুখে গুনগুন শব্দ করতে করতে খেলা শুরু করে দিল মৌমাছির সঙ্গে। ঘরের মধ্যে। মৌমাছির পেছনে ছুটতে লাগল। এদিক-ওদিক। এ-কোণ সে-কোণ। উড়তে-উড়তে বেরিয়ে গেল মৌমাছি ঘর থেকে। খোলা আকাশে। পিছু পিছু ছুটল শান্ত, চুমকি। ছুটতে ছুটতে কোথায় চলে গেল!
তখনও আসেনি শান্ত আর চুমকি। তখনও হয়তো তারা খেলা করছে মৌমাছির সঙ্গে। সবুজ মাঠে মাঠে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে।
রাজা ভাবছে ঘরে বসে একলা। মৌমাছির দুটি বন্ধু--শান্ত আর চুমকি। কেমন করে হয়!
রাজা ভাবছে। ভাবতে-ভাবতে দেখছে। দেখছে, ঘরের দেওয়াল। তার গায়ে হিজিবিজি ছবি। হিজিবিজি মাছ! ইকড়িমিকড়ি পাখি। কাগের ঠ্যাং, বগের ঠ্যাং। কুলুঙ্গিতে গণেশঠাকুর! মাটির পুতুল--বেনে বউ। তার ছেলে-মেয়ে। একটা হাতি। তার পিঠে রাজা। শিলেট-পেনসিল। বইখাতা। একটা মুখোশ। ভাঙা বাঁশি। তালপাতার টুপি। পাখা।
বাঁশের মাচায়, ঠিক রাজার মাথার ওপর একটি কাগজের ফুল। দুলছে দুল দুল। ফুল দুলছে--দুল দুল।
হঠাৎ ছুটতে ছুটতে ঢুকল চুমকি। হাঁপাচ্ছে। 'এই নাও', হাতে তার গোলাপ ফুল। পেছনে শান্ত।
রাজার মুখে কথা নেই। ফুল! চোখে তার অবাক চাউনি।
'নাও,' চুমকি ছোট্ট হাত আরেকটু বাড়াল রাজার দিকে।
রাজা যেন থ হয়ে গেছে। শুধু দেখছে। দেখছে গোলাপ ফুল। দেখছে শান্তকে। দেখছে চুমকিকে।
ওপরের কাগজের ফুলটা যেন খুশির হাওয়ায় আরও জোরে জোরে দুলছে--দুল দুল। দুল দুল।
রাজা হাত বাড়াল। রাজার হাতে ফুল! সে কী! যে-রাজা ফুল দেখলেই চটে উঠত--এ কী হল তার হঠাৎ!
চুমকি বলল, 'জানো, সেই মৌমাছিটা না এই গোলাপ ফুলটায় বসেছিল। গোলাপ ফুলের মধু খুব মিষ্টি, না?'
রাজা একদৃষ্টে চেয়ে রইল ফুলের দিকে। চাইল শান্তর দিকে। তারপর চুমকিকে কাছে ডাকল, ' শোনো।'
'কী?' চুমকি এগিয়ে গেল।
রাজা চুমকির মাথায় চুলের মধ্যে আটকে দিল ফুলটা।
শান্ত হেসে উঠল হাততালি দিয়ে।
চুমকি রাজার গলা জড়িয়ে, আদর করে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কে?'
রাজা হাসতে গিয়েও হাসতে পারল না। হঠাৎ যেন মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বলল, 'আমি কেউ নই!'
'তোমার বাড়ি নেই?'
রাজা চুপ করে রইল।
'থাকবে তুমি আমাদের বাড়িতে?'
রাজা ঘাড় নাড়ল, হ্যাঁ।
'তুমি আমাদের বন্ধু,' হাসির সুর ছড়িয়ে গেল শান্তর গলায়।
'তুমি আমাদের বন্ধু,' খুশির আনন্দে নেচে উঠল চুমকি।
'বন্ধু,' রাজা দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে টেনে নিল বুকে--শান্তকে, চুমকিকে।
তারপর বলল, 'আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?'
'কী কথা?' শান্ত জানতে চাইল।
'আমাকে তোমরা চেন না। আমি কে জান না। একটা রাস্তার লোককে তোমাদের বাড়িতে থাকতে দেবে? আমি যদি চোর হই। ডাকাত হই। তোমাদের যদি মেরে ফেলি!'
শান্ত জড়িয়ে ধরল রাজাকে। হেসে ফেলল। বলল, 'না, না, তুমি কেন ডাকাত হবে? কেন চোর হবে? তুমি ভালো লোক। খুব ভালো। ও-কথা বলো না কোনোদিন। আমার মা বলত, কাউকে খারাপ ভাবতে নেই। সকলে ভালো। আমরা যদি কারো অনিষ্ট না করি তা হলে অন্যে কেন আমাদের অনিষ্ট করবে?'
ছোট্ট ছেলে শান্ত, ছোট্ট মেয়ে চুমকি। কত সুন্দর! কত সরল!
রাজা থেকে গেল তাদের বাড়ি। রাজার বন্ধু তারা।
পরেরদিন সকালবেলা রাজা চলল মাঠে। শান্তর সঙ্গে। ছাগল চরাতে।
মিষ্টি সকাল! পাহাড়ের গায়ে গায়ে রোদ ছড়িয়ে আছে। গাছে গাছে পাখিরা গান গাইছে। ফুলে ফুলে প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। পাহাড়ের গা-বেয়ে নেমে আসছে ঝরনা। ঝুনঝুন, ঝুনঝুন। রাজা চুমকির হাত ধরে ঘুরে ঘুরে দেখছে তাই। একটা পাথরের ঢিপির ওপর বসে বসে গান গাইছে শান্ত। ছাগল চরছে আপন মনে।
'দাদা গান গাইছে। চলো না?' রাজার হাত ধরে টান দিল চুমকি। 'আমার সঙ্গে ছুটতে পারবে?' ছুট দিল চুমকি। ছুটতে ছুটতে দাদার কাছে চলে এল। নাচতে শুরু করে দিল সে। দাদার গান শুনে শুনে।
শান্ত গান গাইছে।
চুমকি নাচছে।
রাজা শুনছে। দেখছে।
হেসে ফেলল রাজা। চুমকি নাচ থামাল।
হেসে উঠল চুমকি। শান্ত গান থামাল।
হেসে উঠল শান্ত। লজ্জা পেয়েছে। ছুট দিল। ছুট ছুট। একেবারে ঝরনার জলে।
ছুট দিল চুমকি। ছুট ছুট। একেবারে ঝরনার বুকে।
ঝরনার জল নেচে উঠল। ছলাৎ ছলাৎ।
আর রাজার মনে ভাবনার ঢেউ উছলে পড়ল এরা কে? আমার কে?
'বন্ধু', চেঁচিয়ে উঠল শান্ত।
'এসো না?' ডাক দিল চুমকি।
'যাচ্ছি,' চেঁচিয়ে সাড়া দিল রাজা। ছুটতে ছুটতে লাফিয়ে পড়ল ঝরনার জলে।
জলে দোলা লাগল--দুলদুল।
গাছে হাওয়া লাগল--ঝুরঝুর।
রাজা যেন ছোট্ট ছেলেটি হয়ে গেল। রাজার সে হাঁকডাক গেল কোথায়? সেই লাল টকটকে চোখ পাকিয়ে হুকুম চালানো? রাজার মুখে হাসি এল কোথা থেকে?
রাজা ভুলে গেল। সব ভুলে গেল। ভুলে গেল, রাজবাড়ির কথা। ভুলে গেল, রাজকার্যের কথা। ভুলে গেল, তার সব দুঃখের কথা। রাজা ভাবল, রাজবাড়ির সোনার পালঙ্কের চেয়ে মাটির ঘরের শীতলপাটি অনেক সুখের।
'এই রে যাঃ! ভুল হয়ে গেছে যে!' হঠাৎ শান্ত বলে উঠল।
'কী ভুল হয়ে গেছেরে দাদা?'
চুমকির কথায় উত্তর দিল না শান্ত। ভিজে কাপড়ে ছুট দিল। বাড়ির দিকে। ছুটতে ছুটতেই বলল, 'তোমরা ঝরনায় চান করো। আমি এক্ষুনি আসছি।'
চুমকি কী ভাবল। কে জানে, কী ভাবল! সেও ছুটল দাদার পেছনে।
রাজা পড়ে রইল একা। হঠাৎ কী হল?
ঝরনার পাড়ে পাড়ে ছাগল চরছে। তাদের গলায় ঘন্টা বাজছে--টুং টাং।
পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘের ছায়া নামছে। আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। বেশ লাগছে রাজার।
'বন্ধু,' হঠাৎ চুমকি ডাকল ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, ঝরনার পাড়ে রাজাকে। দূর থেকে যেন দোল খেতে খেতে ভেসে আসছে চুমকির গলার সুর।
'কেন,' সাড়া দিল রাজা।
'তাড়াতাড়ি এসো। একটা মজা হবে।'
'কী মজা?' চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল রাজা।
'না এলে বলব না।' চেঁচিয়ে উত্তর দিল চুমকি।
'বেশ যাচ্ছি।' ছুটতে ছুটতে ঘরের দিকে পাড়ি দিল রাজা।
কিন্তু ঘরে তো কেউ নেই! না শান্ত, না চুমকি! তবে?
রাজা বাইরেটা চোখ মেলে দেখল। খোলামেলা বাইরেটা। দেখল বাইরের উঠোনটা। না--নেই। ঘরের চারপাশ কেমন যেন থমথমে! চুপচাপ!
কী ভাবল রাজা। তারপর ডাক দিল, 'চুমকি-ই-ই।'
আড়াল থেকে সাড়া এল, 'টুকি-ই-ই-ই।' চুমকির ডাক।
রাজার মুখে হাসি ফুটল। 'ওরে দুষ্টু ছেলে! দুষ্টু মেয়ে! লুকোচুরি খেলা হচ্ছে! কোথায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়েছে দেখো। দাঁড়াও দেখাচ্ছি।'
চুপিসাড়ে আলতো-পায়ে ঘরে ঢুকল রাজা। খুব সামলে। যেন একটুও শব্দ না হয়। তক্তপোষের তলায় উঁকি দিল রাজা। হামাগুড়ি দিয়ে। সেখানে নেই। কোণের সিন্দুকের আড়াল হাতড়াল। পাত্তা নেই। বাইরের চালাটায় ঢুকল। যাঃ চলে। তা-ও নেই।
তাহলে?

'হুস-স-স!' ওমা! কোত্থেকে শান্ত বেরিয়ে এল। চেঁচিয়ে উঠল। একেবারে রাজার পেছনে। আচমকা থতমত খেয়ে রাজা চমকে উঠেছে।
শান্ত হেসে উঠল, 'হি-হি-হি।'
চুমকি হাততালি দিল--তাই-তাই। নেচে-নেচে রাজার মুখের সামনে হাত নেড়ে বলতে লাগল, 'এ ম্যা ভিতু! বুড়ো ছেলে ভিতু!'
ভারি ভালো লেগেছে রাজার। হেসে উঠল, 'হো-হো-হো।'
এমন হাসি রাজা যেন কতদিন হাসেনি।
কিন্তু হাসতে-হাসতে হাসি থেমে গেল কেন হঠাৎ? শান্তর হাতের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল রাজা। ওটা কী শান্তর হাতে?
শান্তর হাতে একটি পাখির খাঁচা।
কী রকম ফ্যাকাশে হয়ে গেল সব। রাজার চোখ দুটো। রাজার মুখটা।
শান্ত হাসতে-হাসতেই জিজ্ঞেস করল, 'কী দেখছ অমন করে আমার হাতের দিকে?'
রাজা সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল। চটপট উত্তর দিলে, 'না কিচ্ছু না।'
চুমকি চট করে দাদার হাত থেকে খাঁচাটা নিয়ে নিল। রাজার মুখের সামনে দোলাতে লাগল। খাঁচা দুলছে। রাজার চোখ দুটো ভয়ে-ভয়ে কাঁপছে। আর তাই দেখতে-দেখতে শান্ত হেসে উঠল।
চুমকি বলল, 'এ আবার কী? খাঁচা দেখে ভয় পেয়ে গেলে যে! বুড়ো ছেলে। তুমি কী পাখি যে তোমায় খাঁচায় বন্দি করে রাখব!'
রাজা যেন জোর করে নিজের মুখে হাসি নিয়ে এল। বলল, 'তোমাদের খাঁচার মধ্যে যদি আমায় বেঁধে রাখ, তাহলে তো ভালোই হয়। কিন্তু আমায় যে তোমাদের খাঁচায় ধরবে না। আচ্ছা, পাখি কই? খাঁচা খালি কেন?'
'পাখি?' শান্ত জিজ্ঞেস করল রাজাকে, 'এই মাত্তর ছেড়ে দিয়েছি। রোজ সকালবেলা ছেড়ে দিই। আজ তোমার সঙ্গে খেলা করতে করতে পাখির কথা ভুলে গেছলুম। তাই তো ঝরনায় চান করতে করতে ছুটে এলুম। তুমি দেখবে? আমাদের পাখি দেখবে? আচ্ছা দাঁড়াও।'
ঘর থেকে বেরিয়ে এল শান্ত। একেবারে বাইরে। খোলা আকাশের নীচে। ডাক দিল, 'টুই-টুই-ই-ই।'
দুরদুর করে কেঁপে উঠল রাজার বুকটা। একী! এ যে সেই চেনা সুর!
'টুই-টুই-ই-ই।' আকাশে ডানা ছড়িয়ে নেচে উঠল ছোট্ট পাখি।
রাজা চোখ মেলল সে-দিকে।
'টুই-টুই-ই-ই,' ছুট দিল শান্ত খোলা মাঠে।
'টুই-টুই-ই-ই,' গান গাইল আকাশের পাখি আকাশে।
পাখি উড়ছে।
শান্ত তাকে ডাকছে। ছুটছে।
রাজা দেখছে। আশ্চর্য তো! এমনও হয়।
উড়তে-উড়তে পাখি নেমে এল। একেবারে শান্তর হাতে।
শান্ত তার গালে একটা চুমু খেল চুক করে। বলল, 'চ, দেখবি চ আমাদের বাড়িতে কে এসেছে!'
পাখিকে বুকের মধ্যে লুকিয়ে শান্ত ছুট দিল ঘরের দিকে।
'এই নাও,' বুকের পাখি বাড়িয়ে দিল রাজার দিকে। রাজা হাত পাতল।
ওমা! হঠাৎ কেন পাখিটা ভয় পেয়ে গেল! ডানা ঝাপটে ছটফটিয়ে উঠল! সে যাবে
না। কিছুতেই যাবে না রাজার কাছে! যেন সে বলছে, 'ছেড়ে দাও, আমায় ছেড়ে দাও।' কেন?
পাখিটা যতই ঝটপট করছে, শান্ত, তার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছে, 'আ-আ! চ্চু চ্চু! লক্ষ্মীসোনা।'
পাখি কোনো কথা শুনবে না। ডানা ছড়িয়ে উড়ে যেতে চাইছে। বেরিয়ে যেতে চাইছে আকাশে।
'তুমি যেমন আমাদের বন্ধু, হলুদ পাখিও আমাদের বন্ধু' পাখির গালে আর একটা চুমু খেয়ে শান্ত বলল রাজাকে। আবার এগিয়ে দিল পাখি। রাজার হাতে।
চিৎকার করে উঠল পাখি। প্রাণের ভয়ে। গলা ফেটে যাচ্ছে যেন তার। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।
শান্তর অবাক লাগছে। হলুদ পাখি তো কোনোদিন এমন করে না। হঠাৎ আজ কেন এমন করছে বন্ধুকে দেখে? ভয় পাচ্ছে কেন?
চুমকি রাজাকে বলল, 'তোমার কাছে যাবে না। ভয় পেয়েছে। নতুন দেখছে তো।'
কী বলবে রাজা! গলা শুকিয়ে কাঠ। শুধু বলল, 'ওকে ছেড়ে দাও।'
শান্ত বলল, 'না, না, এখন ছাড়া যাবে না। ভয় পেয়েছে। এখন ছেড়ে দিলে উড়ে যাবে। হয়তো আর আসবে না।'
শান্ত হলুদ পাখিকে খাঁচায় পুরে রাখল।
থাকবে না পাখি খাঁচার মধ্যে। কিছুতেই থাকবে না। রাজাকে দেখছে। চেঁচাচ্ছে। ডানা ঝাপটাচ্ছে। যতই সে ছটফট করছে একটি একটি পালক খসে পড়ছে। ডানার পালক। হলুদ পালক।
দেখতে পারল না আর চুমকি। মনটা তার কেমন করে উঠল। দাদাকে বলল, 'দাদা, তার চেয়ে ছেড়ে দে। ছটফট করছে বড্ড। খাঁচায় লাগছে। পালক খসে যাচ্ছে। ওর কষ্ট হচ্ছে। সব পালকগুলো যদি খসে যায়! যদি আর উড়তে না পারে। নীল পাখিটা গেল, হলুদটাও যদি চলে যায়! আমি কার গান শুনব?'
নীল পাখি! হঠাৎ রাজার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। কোন নীল পাখি? যে নীল পাখিটাকে রাজা মেরে ফেলেছে?
চুমকির কথা শুনে শান্তর মনটাও যেন কেমন করে উঠল। খাঁচার ডালা খুলে দিল শান্ত। হলুদ পাখি উড়ে গেল--ফুড়ুৎ।
তাকিয়ে রইল শান্ত আর চুমকি সেইদিকে। উড়তে উড়তে হারিয়ে গেল চোখের আড়ালে।
রাজা যেন বোবা হয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। চোখের সামনে ভেসে উঠছে হাতের তির। নীল পাখির রক্ত! কানে ভেসে আসছে হাজার পাখির কান্না। আজ রাজার মন কেন বলছে, 'ছিঃ ছিঃ আমি কী করেছি! অমি পাখি মেরেছি। একটি ছোট্ট ছেলে, একটি ছোট্ট মেয়ের পাখি!'
দোলন লাগে পাখির খাঁচায়। কাঁপন লাগল রাজার ভাবনায়। মন বলছে বার বার, 'ছিঃ ছিঃ, কী করেছি, আমি কী করেছি।'
হঠাৎ ঠেলা দিল চুমকি রাজাকে। 'কী গো? অমন চুপটি করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবছ?'
রাজার চমক ভাঙল। বলল, 'না। ভাবছি, হলুদ পাখিটা কত সুন্দর। নীল পাখিটা না জানি আরও কত সুন্দর ছিল।'
'না, না, হলুদ-নীল দুটোই ভালো,' উত্তর দিল চুমকি।
শান্ত বলল, 'হলুদ-নীল। দুটি পাখি। দুজনের কী ভাব। রোজ সকালবেলা খাঁচার ডালা খুলে দিই। ওরা একসঙ্গে উড়ে যায়। একসঙ্গে সারাদিন আকাশে, গাছে গাছে উড়ে বেড়ায়। সন্ধেবেলায় ফিরে আসে। নিজের খাঁচায় নিজেরা ঢুকে পড়ে। তারপর একদিন যে কী হল--হলুদ একা-একা ফিরে এল। নীল ফিরল না। আর কোনোদিনও ফিরল না। হয়তো নীলের আর ভালো লাগল না আমাদের। হয়তো কেউ ধরে রাখল। হয়তো কেউ মেরে ফেলল। পাখির খবর কে আর রাখবে।'
চুমকি রাজার কোলের কাছে সরে এসে বলল, 'শুনেছি নাকি কোনো এক
রাজা--'
রাজার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
চুমকি বলতে বলতে থামল। জিজ্ঞেস করল, 'কী? অমন চমকে উঠলে কেন?'
রাজা আমতা-আমতা করে উত্তর দিল, 'না, না, ও কিছু না। কী বলছিলে? কোনো এক রাজা--?'
'কোনো এক রাজা নাকি হুকুম দিয়েছে, তার রাজ্যে কোনো পাখি থাকবে না। সে রাজ্যে পাখি দেখলেই মেরে ফেলতে হবে। হয়তো সেই রাজাই নীল পাখিকে মেরে ফেলেছে। আচ্ছা, বলতো রাজার কী কোনো দয়ামায়া নেই? ওরা তো পাখি। ছোট্ট। ওদের মারে কেন?' চুমকি রাজার গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল, 'বলো না, রাজা পাখি মারে কেন?'
রাজা চেয়ে রইল। চুপটি করে, চুমকির ছোট্ট দুটি চোখের দিকে।
চুমকি আবার বলল, 'বন্ধু তুমি আমায় সেই রাজার কাছে নিয়ে যাবে?'
রাজা পাথরের মতো চুপচাপ।
'আমি রাজার সামনে গিয়ে দাঁড়াব। বলব, রাজামশাই, তুমি পাখি মারো কেন? ওরা আমাদের বন্ধু। ওদের মেরো না। তোমার হাতের তির দিয়ে আমায় মারো।'
এতটুকু ছোট্ট মেয়েকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বুকে তুলে নিল রাজা। বলল, 'না, না, অমন কথা বলো না, বলো না। তোমাকে কেউ মারবে না। কেউ মারতে পারবে না। কোনোদিনও না।'
মাঠে ছাগল চরছে। শান্ত মাঠে ছুটল।
ছায়া নামছে। সন্ধ্যার ছায়া।
সারাদিন ধরে সূর্যিঠাকুরের বেশ কাজ। সকালে ঘুম যখন ভাঙবে, মনে হবে, রাজপুত্তুর আসছেন ঘোড়ায় চেপে, সোনার টোপর মাথায় দিয়ে। টগবগ-টগবগ। অমনি মুঠো মুঠো আলো ছড়িয়ে পড়ছে। আকাশ থেকে মাটিতে।
তারপর সারাদিন ধরে সূর্যিঠাকুরের লুকোচুরি খেলা। মেঘের সঙ্গে, নীল আকাশের সঙ্গে। যখন তিনি পাটে যাবেন, লাল আলোর টিপটি পরিয়ে দিয়ে যাবেন পাহাড়ের কপালে।
সেই টিপ ঘুম পাড়ায়। ঘুম আনে।
ঘুম আনে গাছের বুকে। ফুলের মনে। পাখির চোখে। ছায়া নামছে মাঠে-মাঠে। গাছে-গাছে। পাহাড়ের গায়ে-গায়ে।
আর ছায়া নামছে, শান্ত আর চুমকির ছোট্ট কুঁড়েঘরে। পাখিরা ফিরে আসছে নিজের-নিজের ঘরে। কিন্তু সকালে সেই যে হলুদ-পাখি উড়ে গেল, এখনও এল না সে। এখনও ফিরল না।
আকাশে কে যেন তারার প্রদীপ জ্বেলে দিচ্ছে একটি একটি করে। চুমকি মাটির প্রদীপ হাতে নিয়ে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। আর শান্ত আকাশের দিকে চেয়ে ডাকছে, 'টুই-টুই-ই-ই। টুই-টুই-ই-ই।'
সত্যিই কি আসবে না? হলুদ পাখি?
শান্ত ডেকেই চলেছে, 'টুই-টুই-ই।'
চুমকি বলেই চলেছে, 'আয়-আয়, আয়-আয়।'
আর রাজার বুক কেঁপে উঠছে, হায়-হায়! হায়-হায়!
তারপর?
অন্ধকার হয়ে গেল। হলুদ পাখি সত্যিই এল না।
রাজার হাতে প্রদীপটি তুলে দিয়ে চুমকি বলল, 'আমার হলুদ এল না যে!'
রাজার মন গুমরে উঠছে। বললে, 'হয়তো আমার জন্যে এল না। আমায় দেখে ভয় পেয়েছে। আমি তোমাদের এখানে থাকি, হয়তো চাইছে না পাখি।'
চুমকি উত্তর দিল, 'ওতো পাখি। ও কি আর অত বোঝে!'
'টুই-টুই-ই-ই। টুই-টুই-ই-ই।' ডাকতে ডাকতে শান্তর যেন গলা ভেঙে যাচ্ছে।
সাড়া দিল না পাখি। ঘরে এল না ফিরে।
শান্ত ছোট্ট বোনের হাতটি ধরে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। একদৃষ্টে। আকাশের সব কটি তারা তখন ফুটে উঠেছে। ঝলমল--ঝলমল।
চুমকির গলা ভার ভার। বলল, 'দাদা, হলুদ এল না সত্যি?' চোখ তার ছল-ছল।
থাকতে পারল না শান্ত। রেগে-মেগে চেঁচিয়ে উঠল, 'হয়তো সেই রাজাটা মেরে ফেলেছে। আমি যাব সেই রাজার কাছে। যেমন করে হোক যাব। তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করব, কেন? কেন তুমি আমাদের পাখি মেরেছ? পাখি কী দোষ করেছে? আমরা কী দোষ করেছি?'
রাজা এগিয়ে এল শান্তর কাছে। তার মাথায় হাত রাখল। বলল, 'না শান্ত, তুমি ঠিক বুঝতে পারছ না। তোমাদের হলুদ পাখিকে কেউ মারেনি। আমি আছি এখানে, তাই তোমাদের পাখি চলে গেছে। আমি যতক্ষণ থাকব, তোমাদের পাখি আসবে না। আমি কাল সকালেই চলে যাব।'
'কেন? তোমার তো কিছু দোষ নেই,' শান্ত বলল।
'বারে! তোমার কী দোষ? তুমি কেন যাবে? না, না, তুমি যাবে না।' আবদার করে চুমকি রাজার হাতটি জড়িয়ে ধরল।
শান্ত বলল, 'তুমি যে আমাদের বন্ধু।'
রাজা উত্তর দিল, 'হ্যাঁ বন্ধু। সত্যিই তোমরা আমার বন্ধু। পথের মধ্যে গাছের তলায় আমি পড়েছিলুম। তোমরা আমায় ডেকে এনেছ তোমাদের ঘরে। আমায় থাকতে দিয়েছ। আমাকে আপন করে নিয়েছ। কেমন করে, তা জানি না। তোমরা আমায় বাঁচিয়েছ।'
'না, না, তোমাকে যেতে দেব না। তোমার তো কেউ নেই! মা নেই, বাবা নেই। ঘর নেই, বাড়ি নেই। তুমি কোথায় থাকবে? তোমায় কে দেখবে?'
রাজা হাসল। যেন কত কষ্ট-মাখানো সে-হাসি। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, 'তোমরা ভারি লক্ষ্মী।'
রাত্তির হয়েছে। রাজার কোলের কাছে অঘোরে ঘুমুচ্ছে চুমকি। ঘুমের ঘোরে সে রাজার গলাটি জড়িয়ে আছে। সে যে যেতে দেবে না রাজাকে। কিছুতেই না।
রাজার ঘুম আসেনি। রাজা ভাবছে, এ কী হল? আমার হাতের তিরে এদের নীল পাখি মরেছে। আমারই জন্য এদের হলুদ পাখি উড়ে গেল! একটি ছোট্ট ছেলে, ছোট্ট মেয়ে--আমার জন্যে তাদের এত কষ্ট! রাজার মন কেমন করছে। এদের ছেড়ে যাবার কথা ভাবতে মন কেন বার বার ভেঙে যাচ্ছে! তবু যেতেই হবে।
কিন্তু রাজার যাওয়া হল না।
কেন?
সকালে ঘুম থেকে উঠে শান্ত কোথায় গেল? সে তো ঘরে নেই! তার বিছানা খালি!
অন্যদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চুমকিকে ডাকবে, প্রথমে। তারপর মুখ-হাত-পা ধুয়ে মুড়ি খাবে। নারকেল দিয়ে, দুজনে। তারপরে ভাই-বোন ছাগলের পিঠে চেপে মাঠে যাবে। কিন্তু আজ?
চুমকি খুঁজছে দাদাকে। সারা ঘর। রাজা খুঁজছে শান্তকে চারধার, বার বার। কিন্তু সে কোথা? নেই তো!
'দাদা,' চেঁচিয়ে ডাকল চুমকি। সাড়া নেই।
'দাদা-আ-আ-আ।'
'দাদা। দাদা। দাদা।।'
সাড়া দিল না দাদা।
রাজা বলল, 'চুমকি, শান্ত মাঠে চলে যায়নি তো? ছাগল নিয়ে?'
'তা কেন যাবে? দাদা আমায় না নিয়ে কোনোদিন তো মাঠে যায় না।'
'তবু চলো না, একবার দেখে আসি?'
'তাই চলো।'
না মাঠে কেউ নেই। না শান্ত। না তার ছাগল।
'কোথায় গেল দাদা?' রাজার দুটি হাত ধরে জিজ্ঞেস করল চুমকি।
মাঠ থেকে ঝরনার ধার। না। সেখানেও নেই শান্ত।
ঝরনা থেকে শালবন।
শালবনের পর মউবন।
বন পেরিয়ে উঁচু পাহাড়। নীচু পাহাড়।
পাহাড় থেকে এর দোর। তার দোর।
নেই, নেই। কোত্থাও নেই।
না, না। কেউ জানে না শান্তর কথা।
কেমন করে জানবে? পাহাড়ের কোলে-কোলে, ছুটে-ছুটে যখন চুমকি ডাকছে 'দাদা,' রাজা খুঁজছে 'বন্ধু,' তখন অনেক দূরে চলে গেছে শান্ত। এক গভীর বনে। হলুদ-পাখি খুঁজছে। আর ডাকছে, 'টুই-টুই-ই-ই।'
চুমকি যখন রাজার হাতটি ধরে কাঁদছে, 'আমার দাদা কই? দাদা কই?'
শান্ত তখন বনে বনে গাছে গাছে খুঁজে বেড়াচ্ছে, 'আমার বোনের হলুদ পাখি কই?'
খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠেছিল শান্ত। কাউকে ডাকেনি, কাউকে বলেনি মনের কথাটি। বলেনি যে সকাল হলেই সে পাখি খুঁজতে বেরোবে। কিন্তু পাখির খোঁজে সে কোথায় চলে এসেছে? নিজেও জানে না। এ এক গভীর বন। বনে পথ হারিয়ে ফেলেছে। এখান থেকে তার ছোট্ট বোনের ডাক সে শুনতে পাবে কেমন করে?
ছোট্ট পায়ে হেঁটে-হেঁটে চলেছে শান্ত। আর বারবার ডাকছে, 'টুই-টুই-ই-ই।'
ডেকে ডেকে গলা তার ভেঙে গেছে।
সকাল গেল ডাকতে ডাকতে, 'টুই-টুই।'
দুপুর গেল কাঁদতে কাঁদতে, 'দাদা আয়।'
বিকেল এল ভাবতে ভাবতে, 'শান্ত কোথায়।'
শান্ত হাঁটছে।
বন পেরিয়ে পাহাড় এল।
পাহাড় গেল, নদী এল।
নদীর ধারে মাঠ পড়ল।
মাঠ পেরোলে রাত এল।
রাত কাটছে, দিন আসছে।
দিন আসতেই বনের শেষ।
বনের শেষে পায়ের ছাপ!
কীসের ছাপ?
পায়ের ছাপ!
অবাক কাণ্ড! তাহলে তো নিশ্চয়ই এখানে লোক আছে! বসতি আছে!
অবাক চোখে মাটির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চলেছে শান্ত। একটি একটি পা দেখছে। একটি একটি পা হাঁটছে। পায়ে পায়ে বন শেষ।
এ কোথায় এসে পড়ল শান্ত? বনের শেষে?
এখানে তাদের মতো ছোট্ট-ছোট্ট ঘর নেই। মাঠ নেই। মাঠে ছাগল নেই। গাছে পাখি নেই। শক্ত শক্ত রাস্তা। পাথর ঢালা। একটা এঁকে গেছে। একটা বেঁকে গেছে। কোনোটা সিধে গেছে। কত বড়ো বড়ো বাড়ি। আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। নীচের থেকে কপালে চোখ তুলে দেখতে হয় হুউ-ই-ই ওপর বাগে। মাথা ঘুরে যায়। কত লোক রে বাবা! কত রকমের লোক। একেবারে গিজগিজ করছে।
কেউ বা বুড়ো, গুটিগুটি হাঁটে।
কেউ বা জোয়ান, গটমট চলে।
কেউ বা ছোটো, খুটখুট ছোটে।
কেউ বা বড়ো, চটপট জোটে।
কেউ করে ফিসফাস।
কেউ ডাকে গাঁক-গাঁক।
কেউ-কেউ বকবক।
কেউ কাশে খক খক।
সব মিলিয়ে হইহই! রইরই!
কারো গায়ে সাদা জামা ঝকঝক।
কারো পায়ে লাল জুতো টকটক।
কেউ পরে নীল টুপি ফিটফাট।
ঘোড়া ছোটে টগবগ।
উট হাঁটে ঠুক ঠুক।
জুড়িগাড়ি সাঁই সাঁই, পাঁই পাঁই।
এরই নাম বোধহয় শহর!
আনমনে দেখতে দেখতে, হাঁটছে শান্ত। দেখছে, আর অবাক হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেমন যেন লোকগুলো এখানকার? একটা নতুন মানুষ দেখলে জিজ্ঞেস তো করবে, কোথায় ঘর? কী নাম? যাঃ চলে! কথা বলবে কী, চেয়েই দেখে না। যাও-বা দেখে আড়চোখে। দেখেই চোখ ঘুরিয়ে চলে যায়! এত কী কাজ সবার?
আচ্ছা, ওই লোকটা কী করছে? রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে? আহা! কী সুন্দর সেজেছে দেখ? নীল-পোশাকে লাল-ফিতে, কোমরে জড়ানো! লাল-পাগড়ি, তাতে পাখির পালক। জামার বোতাম, তাও সোনালি রং। ঝকমক। পায়ে জুতো, কালো কুচকুচ। খাপে ঢাকা তরোয়াল, কোমরে আঁটা। ইয়া লম্বা পাকানো-গোঁফ। গোঁফ দেখলে হাসি পায়।
লোকটা সিপাই।
নিজের দিকে তাকাল শান্ত। ঈশ! কী বিচ্ছিরি নোংরা হয়ে গেছে কাপড়টা। হবে না? এতখানি পথ হাঁটতে-হাঁটতে এসেছে সে। সেই কাল সকাল থেকে হাঁটছে এক কাপড়ে।
লোকটার সঙ্গে ভাব করতে ইচ্ছে করছে শান্তর। ইচ্ছে করল, তাই এগিয়ে গেল। সিপাইটার কাছে। কত লম্বা সিপাইটা! আর শান্ত কতটুকু! ঘাড় কাত করে দেখছে শান্ত।
'হ্যাঁ গো, তোমার নাম কী গো?' এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল শান্ত।
শান্তর পেছনে একটা জুড়ি-ঘোড়ার এক্কাগাড়ি ছুটে আসছে।
সিপাইটা চোখ পাকাল।
থতমত খেয়ে গেল শান্ত। লোকটা তাকে দেখে হাসল না কেন? মুখটা কেন গোমরা হয়ে গেল।
তাই ভয়ে-ভয়েই শান্ত আবার বললে, 'না, তোমার সাজটা কী সুন্দর! তাই বলছিলুম।'
'হাটো', সিপাইটা আচমকা চেঁচিয়ে উঠল।
সাংঘাতিক ঘাবড়ে গেল শান্ত। তাকে কেউ কোনোদিন ধমকায়নি এমন করে। তাকেও না, চুমকিকেও না।
হয়তো শান্ত কেঁদে ফেলত। কাঁদবে কী! উরি বাবা! একী কাণ্ড! এক্কাগাড়িটা একেবারে শান্তর ঘাড়ের কাছে ছুটে এসেছে। হুড়মুড় করে।
'হট যাও।' সহিস চেঁচিয়ে উঠল। লাগাম ধরে টান দিল।
'চিঁ-হিঁ-হিঁ।' চেঁচিয়ে উঠল দু-দুটো ঘোড়া। কী বিকট চিৎকার!
'রোককে,' চেঁচিয়ে উঠল সহিসটা আবার।
'গেল-গেল-গেল', হইহই করে উঠল রাস্তার লোক।
চাপা পড়ল নাকি শান্ত?
না। চাপা পড়েনি। তার আগেই সিপাইটা ছুটে এল। মারলে এক হ্যাঁচকা টান। শান্তর হাত ধরে। ছিটকে পড়ল শান্ত রাস্তার ধারে। চোখের ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল এক্কাগাড়ি। সাঁই সাঁই করে। উঃ! খুব বেঁচে গেল শান্ত! মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চোখে যেন সরষে ফুল দেখছে। কানটা ভোঁ ভোঁ করছে। যেন তালা লেগে গেছে।
কান ধরে তুলল তাকে, সেই সিপাইটা। ধমক দিল, 'কী করছিস এখানে?'
'কই? না তো। কিচ্ছু না।' কেমন যেন হাঁদার মতো উত্তর দিল।
বেশ করে কানটা মলে দিল সিপাইটা।
'উঃ লাগছে।'
'লাগবার জন্যেই মলা হচ্ছে। ফের যদি আসবি, কান উপড়ে ফেলব। যাঃ পালা এখান থেকে।' সিপাইটা একঠেলা দিল।
ঠেলা খেয়ে শান্ত সিপাইটার দিকে তাকাল। একবারটি। কেমন জুলজুল করে। তারপর মাথা হেঁট করে রাস্তা ধরল। সামনের রাস্তা। কাপড়টা ঠিক করল। লোকগুলো চেয়ে চেয়ে দেখছে তার দিকে। হাসাহাসি করছে। ঈশ কী লজ্জার কথা। ওদিকে আর যায়!
অন্য আর একটা রাস্তা ধরে হাঁটছিল শান্ত। ভয়ে ভয়ে। কী বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়ে গেল একটু আগে। লজ্জা করছে। ভারি লজ্জা করছে।
হঠাৎ থমকে দাঁড়াল শান্ত। এটা কার বাড়ি?
আঃ। চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে তার দেখতে দেখতে। কত উঁচু বাড়িটা। যেন আকাশ পেরিয়ে যাবে। রোদের আলোয় ঝকমক ঝকমক করছে। একটা মস্ত বড়ো সিংদরজা। সিংদরজার গায়ে গায়ে সোনা-রুপোর পাত মোড়া। চুড়োয়-চুড়োয় হিরে জহরতের কাজ করা।
কে যেন মেঘ এনেছে ছেঁকে। তুলতুল। তাই যেন ছড়িয়ে দিয়েছে বাড়ির গায়ে গায়ে।
কে যেন রং এনেছে সাতটি। ঝলমল। তাই যেন ঢেলে দিয়েছে মেঘের গায়ে।
সাতটি রঙের রামধনু যেন ছবি এঁকেছে।
শান্তর ভারি ইচ্ছে করছিল। ইচ্ছে করছিল ভেতরে যেতে। ওই সোনার তোরণ পেরিয়ে। বাববা! যাবে কী করে? কত সিপাই! তরোয়াল উঁচিয়ে গটমট করে হাঁটছে। পা বাড়ালেই হয়তো আবার কান মলে দেবে। তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে দেখছিল শান্ত।
একটা লোক আসছে। এ-দিকেই। তাকে দেখে শান্ত এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'হ্যাঁগো, এটা কার বাড়ি গো?'
লোকটা বলল, 'সে কীরে? এখনও রাজার বাড়ি চিনিস না? কোথায় থাকিস? এটা রাজার বাড়ি।'
রাজার বাড়ি? অবাক হয়ে যাচ্ছে শান্ত। রাজার গল্প শুনেছে সে--অনেক। শুনেছে রাজকন্যের গল্প। কিন্তু রাজবাড়ি তো সে কোনোদিন দেখেনি! তার চোখের সামনে রাজার বাড়ি!
ওই বাড়ির ভেতর রাজা আছে! তার মাথায় সোনার মুকুট। হয়তো রাজকন্যে এখন চুল আঁচড়াচ্ছে। সোনার কাঁকুই দিয়ে। না-জানি কতটুকু রাজকন্যে। হয়তো চুমকির--
ভাবতে ভাবতে থামল শান্ত। হঠাৎ মনে পড়ে গেল চুমকির কথা।
ছোট্ট মাটির ঘর। আর তার ছোট্ট বোনটি। কতক্ষণ দেখেনি তাকে। কী করছে এখন চুমকি? হয়তো খুঁজছে তাকে। হয়তো কাঁদছে। আর বন্ধু? হয়তো তাকে ভোলাচ্ছে। কিন্তু এখন শান্ত কেমন করে ফিরে যাবে? পথ যে তার হারিয়ে গেছে। কোনদিকে তার গ্রাম? সেই পাহাড়-ঘেরা গ্রাম?
আহারে! রাজার কাছে ও যদি যেতে পারত একবার? তাহলে রাজা কী ওর সঙ্গে কথা বলত না? ওকে আদর করে কাছে ডাকত না?
রাজাকে তখন সে সব বলত। বলত, 'রাজামশাই আমার ছোট্ট বোনের হলুদ পাখি হারিয়ে গেছে। তুমি আমায় ধরে দাও। আমি খুঁজে পাচ্ছি না। কত বড়ো আকাশ। এত বড়ো আকাশে কোথায় লুকিয়ে আছে আমার ছোট্ট বোনের পাখি। সে কাঁদছে। আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি।'
হঠাৎ আকাশের দিকে চোখ পড়ল শান্তর। কই? এখানে তো একটাও পাখি দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।
আচমকা চেঁচিয়ে উঠল সান্ত্রি, 'সামালকে।'
বুকটা ধড়াস করে উঠল শান্তর। আবার কী হল?
না। কিছু না। হাতি বেরোচ্ছে রাজবাড়ি থেকে, রাজবাড়ির সিংদরজা দিয়ে। রাজার হাতি।
দূর থেকে দেখল শান্ত।
কী সুন্দর পোশাক পরিয়েছে হাতিটার গায়ে। মখমলের ওপর সোনার কাজ পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। ঝুলে পড়েছে দুদিকে। একটা সোনার ঘন্টা গলায়। বেজে চলেছে ঢং ঢং। হেঁটে চলেছে হাতি থপথপ।
হাতির পিঠে মাহুত। মাথায় জরিদার পাগড়ি। গায়ে চুড়িদার জামা। হাতে রুপোর বালা। কানে বড়ো বড়ো মাকড়ি। কী সুন্দর দেখতে লাগছে। আহারে, ওই মাহুতটার সঙ্গে যদি ভাব থাকত শান্তর! তাহলে শান্তও হাতির পিঠে চেপে বেড়াতে যেত। হাতির কপালের ওপর শান্ত বসত। তার পেছনে মাহুত থাকত। মাহুতের কোলে চুমকি।
থাকতে পারল না শান্ত। নীচের থেকেই চেঁচিয়ে ডাকল, 'ও মাহুতভাই, মাহুতভাই, কোথায় যাচ্ছ গো?'
মাহুত শুনতেই পেল না। হাতিও দাঁড়াল না।
হাতির পাশে পাশে শান্ত চলেছে। আবার ডাকল, 'ও মাহুতভাই, আমায় হাতির পিঠে চাপাবে?'
মাহুত সাড়া দিল না।
শান্ত আরও কাছে এগিয়ে এল। একেবারে হাতির সামনে। 'ও মাহুতভাই, তুমি কি কানে শুনতে পাও না? কালা? এত জোরে চেঁচাচ্ছি আমি?'
ওমা! সাঁ করে শুঁড়ে জাপটে ধরেছে হাতিটা শান্তকে। উরি ব্যস! কী ভীষণ ভয় পেয়ে গেল শান্ত। চিৎকার করে উঠেছিল প্রায়। মাহুতটা সঙ্গে সঙ্গে চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠল, 'রোক যা--রোক যা।' মারলে ডাঙশের বাড়ি, হাতির মাথায়। কে কার কথা শোনে? হাতি যেমন চলছিল, তেমনিই চলেছে। শান্তকে দোল দিতে লাগল নরম তুলতুলে শুঁড়ে জড়িয়ে।
শান্ত দুলছে আর ভয় পাচ্ছে। কথা বেরোচ্ছে না মুখ দিয়ে। পা ছুড়ছে। হাত ছুড়ছে। অমনি রাস্তার লোক ছুটল।
হাতি খেপেছে। ছেলে ধরেছে। মেরে ফেলেছে।
না তো। হাতি শান্তকে মারল না তো।
তবে?
হাতি শান্তকে আদর করে দোল দিতে-দিতে শুঁড়ে জড়িয়ে তুলে নিল। নিজের মাথায়। একেবারে মাহুতের কোলের কাছে।
মাহুত 'হা-হা-হা' করে লাফিয়ে উঠল। চেঁচিয়ে উঠল রেগেমেগে, 'নেবে যা। যা, নেবে যা।'
শান্ত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। মাহুতের মুখের দিকে। এত উঁচু থেকে কী করে নামবে সে?
মাহুতটা কী করবে?
ছটফট করছে। লাফিয়ে উঠছে। হাতির মাথায় ডাঙশ দিয়ে মারছে। চেঁচাচ্ছে, 'রোক যা।'
গ্রাহ্যি নেই। হাতি হেঁটেই চলেছে।
রাস্তায় লোক জড়ো হয়ে গেল। হইহই লাগিয়ে দিলে।
মাহুতটা খ্যাঁক-খ্যাঁক করে তেড়ে উঠল শান্তকে, 'উঠেছিস কেন?'
শান্ত আমতা আমতা করে বললে, 'আমি তো উঠিনি। হাতি তুলে নিলে।'
মাহুত তেড়েমেড়ে উঠল, 'নেবে যা। শিগগির নেবে যা।'
শান্ত হাতির পিঠের ওপর থেকে তাকিয়ে দেখলে। নীচের দিকে। আরি ব্যস! কত উঁচু!
'নাব।' ধমকে উঠল মাহুতটা।
'নামব কী করে?' কাঁদো-কাঁদো হয়ে বললে শান্ত।
'এমনি করে,' আচমকা এক ধাক্কা মারল মাহুতটা। শান্তর গলায়। শান্ত মারল এক ডিগবাজি। হাতির কপাল দিয়ে গড়িয়ে গেল।
একেবারে হাত পা ছরকুট্টে পড়ছিল শান্ত। অমনি চট করে হাতি থেমে গেল। টুপ করে শান্তকে লুফে নিল শুঁড়ের দোলনায়। দোল দিয়ে নামিয়ে দিল রাস্তায়। আস্তে আস্তে। যেন না লাগে।
শান্ত ভয় পেয়েছে ভীষণ। হাঁপাচ্ছে। ভয়ে ভয়ে মিটমিট করে চোখের দিকে তাকাল হাতিটার। কিন্তু একী! হাতির চোখের কোণে যেন সে দেখতে পেল দু-ফোঁটা জল। চকচক করছে। শুঁড়টা বাড়িয়ে দিল হাতি শান্তর দিকে। শান্তর গলা জড়িয়ে ধরল আলতো করে। শান্তর গাল চেটে দিল। হয়তো একটা চুমু খেল।
মাহুত আবার মারল হাতির মাথায় ডাঙশ। ধীরে ধীরে সে হাঁটল। ঘন্টা বাজল ঢং ঢং। শান্ত দাঁড়িয়ে রইল সেই দিকে চেয়ে। তারও যেন চোখ ছলছল করে উঠল। কিন্তু সে তো কোনোদিন কাঁদেনি।
চলতে চলতে হারিয়ে গেল হাতিটা রাস্তার একদিকে। ঘন্টা মিলিয়ে গেল সেইদিকে।
শান্তর মনটা কেমন করে উঠল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, 'কত ভালো রাজার হাতি।'
তারপর চলতে শুরু করল।
চুমকি কাঁদছে। খুঁজছে দাদাকে। বন্ধুর হাত ধরে। সবুজ মাঠে মাঠে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে।
আর শান্ত পথ হারিয়েছে। শহরের ভিড়ের মধ্যে। অগুনতি মানুষ এখানে। পাখি নেই একটিও পাখি নেই। নেই তার হলুদ পাখি।
চলতে চলতে থমকে থামল শান্ত। আহা! কী সুন্দর সাজানো-গোছানো দোকান এদিকটায়। খালি সোনা-চাঁদি। মুক্তো-মোতি। হিরে-কমল।
কত দোকান। রঙিন-কাপড়। খেলনা-পুতুল, রংবেরঙের। চোখ ঝলসে যায়।
উঃ! কতবড়ো একটা খাবারের দোকান দেখো! কতরকমের খাবার সাজানো বড়ো বড়ো থালায়। যেন চোখ মিটমিট করছে। যেন চোখ টিপে ডাকছে শান্তকে, 'এসো না, খাবে এসো।' বড়ো বড়ো গামলায় ওগুলো কী? সাঁতার কাটছে!
বড্ড খিদে পেয়েছে শান্তর। ভারি জল তেষ্টা পেয়েছে। আহা! পাবে না? পুরো একটাদিন সে কিচ্ছু খায়নি। সেই যে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে পড়েছে, তারপর পেটে একদানা খাবার, একফোঁটা জল পড়েনি। তাই মুখে যেন আপনা থেকে জল এসে যাচ্ছে শান্তর। খিদের সময় চোখের সামনে খাবার দেখলে কার না নোলায় জল আসে?
দোকানিকে কী রকম দেখতে! দেখলেই হাসি পায়। ঠিক যেন একটা জালা। গোল-গাল নাদুসনুদুস। মাথাটা ছোট্ট। ইয়া বড়ো লম্বা টিকি। চোখ দুটো ড্যাবডেবে। পেটটা ভুঁড়িদার। যেন ভাতের হাঁড়ি। কী নরম নিরীহ-নিরীহ গোবেচারিটি। বোধ হয় লোকটা ভালো। ভাব করলে হয় না?
থাকতে পারল না শান্ত। দোকানিকে জিজ্ঞেস করল, 'হ্যাঁ গো, ওই খাবারটার নাম কী গো।'
'রসমালাই।'
বাবা! অত বড়ো লোকটার কী রকম গলা। যেন ঘোড়ার মতো ডেকে উঠল। চিঁ-হিঁ-হিঁ করে।
আবার জিজ্ঞেস করল শান্ত, 'ওইটা?'
'আবার খাবো।'
'আর ওই পাশেরটা?'
'রাজভোগ। কোনটা দেব?'
অবাক হয়ে গেল শান্ত। কী উদ্ভুট্টি নাম। আবার খাবো!
'কোনটা নেবে?' লোকটা আবার চিঁ-হিঁ-হিঁ সুরে জিজ্ঞেস করল।
শান্ত বলল, 'সিঁড়ির নাড়ু নেই?'
'না।' লোকটা ব্যাজার হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
'কটকটি?'
'না।' যেন রেগে উঠছে লোকটা।
'নারকেল পুলি?'
ধাঁ করে রেগে গেল। খপ করে ধরে ফেলল শান্তকে। চিঁ-হিঁ, চিঁ-হিঁ করে ধমকে উঠল, 'কেনবার নাম নেই--বায়না। এটা নেই? ওটা নেই? ফুক্কুড়ি! নারকেল পুলি খাবে! আগে তোমার পিঠে নারকেল ভাঙি, তারপর পুলি খাওয়াব। আয় ইদিকে।'
লোকটা শান্তকে হিড়হিড় করে টান দিল। শান্তর ঘাড় ধরে মাথাটাকে নিজের পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। গাঁট্টাগোট্টা হাত। বেঁটে বেঁটে আঙুল। আঙুল পাকিয়ে ঘুষি তুলল। পিঠের ওপর ঘুষি যেই মারতে যাবে--অমনি শান্ত মেরেছে এক ঢুঁ দোকানির ভুঁড়িদার পেটে। আর দেখতে হয়। দোকানি 'কোঁক' করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিল শান্তর। নিজের নাক টিপে ধরে, কাতরাতে শুরু করে দিলে।
বড্ড ভয় পেয়ে গেছে শান্ত। একেবারে সঙ্গে সঙ্গে তিরের মতো ছুট দিল। না, না, শান্ত ইচ্ছে করে তো অমন করেনি লোকটাকে। ও কেন শুধু-মুধু মারবে শান্তকে?
ছুটছে প্রাণপণে। যদি লোকটা তাড়া করে শান্তকে?
ওমা! লোকটা সত্যিই তাড়া করেছে। আয়ি ব্যস! কী মোটা! ছুটছে--আর কী জোর ভুঁড়িটা নাচছে। থুপ থুপ। আরে, ও কখনো শান্তর সঙ্গে পারে? শান্ত এ-দিক দিয়ে, এর-তার ফাঁক দিয়ে ভোঁ-কাট্টা।
ছুটতে ছুটতে লুকিয়ে পড়ল শান্ত। এদিকটা বেশ ফাঁকা। একটা বাড়ি। দরজা-জানলা সব বন্ধ। সামনে খানিকটা গাছ-বাগান-ঝোপ মতো। লুকিয়ে পড়ল সেই ঝোপের আড়ালে। চুপটি করে বসে রইল। কেউ না দেখতে পায়। হাঁপাচ্ছে তখনও। দম ফেটে যাচ্ছে। কিছুতেই পারছে না নিশ্বাস আটকাতে। কেউ যদি টের পেয়ে যায়।
এবার যেন ওর কান্না পাচ্ছে। সত্যি সত্যি কান্না পাচ্ছে। এ কোথায় এসেছে সে? কোথায় তার হলুদ পাখি। কোথায় তার ছোট্ট বোনটি--চুমকি। তার সব হারিয়ে গেল। ও কেমন করে ফিরে যাবে? ও কেমন করে পাবে আবার সব? ভারি দুঃখ হচ্ছে মনে মনে। খাবারের কথা জিজ্ঞেস করলে মারতে আসে এরা। কে তাকে আদর করে একটু জল দেবে? ভারি যে তেষ্টা পেয়েছে শান্তর।
অনেকক্ষণ কেটে গেছে সেই ঝোপের মধ্যে। হয়তো লোকটা এতক্ষণে শান্তর কথা ভুলে গেছে। হয়তো এতক্ষণে ফিরে গেছে দোকানে। দেখাই যাক না।
শান্ত বেরিয়ে এল ঝোপ থেকে পা টিপে টিপে। উঁকি মেরে দেখল এদিক-ওদিক । না, নেই। কেউ কোত্থাও নেই।
কিন্তু এটা কার বাড়ি? নিজঝুম চারিদিক। দরজা-জানলা সব বন্ধ। আঁটোসাঁটো। টুঁ শব্দটি শোনা যাচ্ছে না। না বাইরে, না ভেতরে। কেউ নেই নাকি?
আশ্চর্য! অত বড়ো বাড়িটায় কেউ নেই। কোনো জন-মনিষ্যি নেই। কী রকম অবাক হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল শান্ত।
ভেতরে কেউ আছে কিনা ডেকে দেখবে নাকি একবার? কী দরকার বাবা। শেষে কী করতে কী হয়ে যাবে।
কিন্তু পা দুটো যে বড্ড ব্যথা করছে শান্তর। পা দুটো বেশ করে ছড়িয়ে বসতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু বসবে কোথায়? বারান্দাটায়?
এগিয়ে গেল বারান্দার কাছে ভয়ে ভয়ে। এক-পা দু-পা করে। চেয়ে চেয়ে দেখছিল কোনখানটায় বসবে।
হুট। সঙ্গে-সঙ্গে দরজা খুলে গেল।
চমকে তাকাল শান্ত।
কে?
একটা লোক। বুড়ো থুত্থুড়ো। একেবারে শান্তর সামনে দাঁড়িয়ে শান্তর দিকে চেয়ে। চুলগুলো ধবধবে। একগাল দাড়ি। সাদা। সোনালি আভা। গায়ে একটা ফিকে নীল জামা। গলা থেকে পা অবধি ঢাকা। যেন ভার-ভার মুখটা। আঁতকে চেঁচিয়ে উঠল শান্ত, 'না, না, আমার কিচ্ছু চাই না। আমায় মেরো না--'
ছুটে পালাতে গেল শান্ত। পালাবে কোথায়? লোকটা ঝট করে ধরে ফেলল শান্তকে। চটপট কোলে তুলে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল।
শান্ত হাত-পা ছুড়ে ককিয়ে উঠল, 'ছেড়ে দাও, আমায় ছেড়ে দাও--'
দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শান্তর গলা আর শোনা গেল না।
একী! বাড়ির ভেতর আসতেই শান্তর চমক লাগল! কেন! আর তো সে চেঁচাল না! ঝলসে গেল তার চোখ দুটি! কী দেখে?
আহা। কী চমৎকার বাড়ির ভেতরটা! কী সুন্দর সাজানো-সাজানো ছবি দেওয়ালের গায়ে-গায়ে। কত রং--ছবির রং! এ-পাশ ও-পাশ চারপাশ রঙিন হয়ে আছে। এ কোথায় এসে পড়েছে শান্ত! মন জুড়িয়ে যাচ্ছে তার। আনন্দ-খুশিতে দুলে উঠছে তার ছোট্ট দুটি চোখ।
কিন্তু বুড়ো লোকটা তাকে ধরে আনল কেন?
লোকটা শান্তকে কোলে নিয়েই একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। শান্তকে কোল থেকে নামিয়ে দিল। কী রকম ভারী ভারী গলায় বলল, 'ভেতরে আয়!'
ভয়ে ভয়ে, সুড়সুড় করে শান্ত ভেতরে এল।
আহা! ঘরের ভেতর কত পুতুল। নানান পুতুল! মাটির পুতুল। কাঠের পুতুল। কাগজের পুতুল। কাপড়ের পুতুল।
কোনোটা পাখি। কোনোটা ছাগল। কোনোটা হাতি। কোনোটা ঘোড়া।
একটা নীল--তো চারটে লাল।
পাঁচটা হলুদ--তো দশটা সবুজ।
একশোটা বেগুনি--তো চারশোটা খয়েরি, গোলাপি, রুপোলি। শেষ নেই যেন। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে শান্তর।
লোকটা গম্ভীর গলায় বলল, 'এখানটায় বস!'
একটা ছবি-আঁকা মাদুর। শান্ত কেমন কাঠের পুতুলের মতো সেটার ওপর বসে পড়ল।
লোকটা একটা উঁচু মতো টুলের ওপর গিয়ে বসল। টুকরো মতো একটা কাঠ নিল। তুলিতে রং নিল। কাঠটার ওপর তুলি বুলিয়ে রং দিতে লাগল।
চারদিক নিস্তব্ধ, চুপচাপ। শান্ত হাঁ করে সেইদিকে চেয়েছিল খালি। আহা! এখন যদি চুমকি কাছে থাকত?
হঠাৎ লোকটা গলা খেঁকারি দিলে। শান্ত চমকে চাইল, তার চোখের দিকে। লোকটা হঠাৎ কথা বলল, 'শান্তর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে, 'বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করছিলি কেন?'
কী উত্তর দেবে শান্ত? চট করে বলে ফেলল, 'না তো, জল তেষ্টা পেয়েছিল তাই।' কথা বলতে গিয়ে শান্তর গলা যেন আটকে আসছে।
কথা নেই, বার্তা নেই লোকটা রঙের তুলি নামিয়ে রাখল। ঘরের বাইরে চলে গেল। এক গেলাস জল, এক থালা খাবার নিয়ে এল। উরি বাবা! কত খাবার। একসঙ্গে অত খাবার শান্ত কোনোদিন দেখেনি। নোলায় জল গড়িয়ে পড়ছে।
শান্তর সামনে থালাটা রাখল, 'খা।'
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শান্ত লোকটার মুখের দিকে। তাকে সত্যি সত্যি খেতে বলছে?
আবার নিজের কাজ করতে লাগল লোকটা। রং দিতে লাগল ছোট্ট কাঠটায়।
থালায় আর হাত উঠছে না শান্তর। হতভম্বের মতো চেয়ে রইল তার দিকে।
আবার তাকাল লোকটা শান্তর দিকে, 'নে খেয়ে নে।'
শান্তর মনে পড়ে গেল চুমকির কথা। চুমকি হয়তো এখনও খায়নি। সে কেমন করে খাবে।
'খাচ্ছিস না কেন?' এবার কেমন ধমক দিয়ে লোকটা বলল।
শান্ত ভয়ে ভয়ে বলল, 'আমার তো জল তেষ্টা পেয়েছে। খিদে--'
'খিদেও পেয়েছে।' শান্তর কথা শেষ হবার আগেই লোকটা বলল, 'আমি তোর চোখদুটোয় খিদে দেখতে পাচ্ছি।' বলেই আবার গম্ভীর হয়ে গেল।
শান্ত চট করে নিজের চোখদুটো বুজে ফেলল। চোখে আবার খিদে থাকে নাকি? সে তো কোনোদিন চোখে খিদে দেখেনি কারো!
এবারে যেন সত্যি রেগে গেল লোকটা, 'খেলি!'
শান্ত থতমত খেয়ে বলে ফেলল, 'খাচ্ছি।'
একথালা খাবার। কোনটা খাবে? সেই দোকানটায় যেমন দেখেছিল তেমনি দু-দুটো। কী যেন নাম বলেছিল! ও হ্যাঁ, 'আবার খাবো'। ওটাই খেতে ইচ্ছে করছে শান্তর। হাত বাড়াল থালায়।
এমন সময়--খট-খট-খট। বাইরে দরজা ঠেলার শব্দ। 'দরজা খোলো--'
খাওয়া হল না শান্তর।
লোকটা চমকে চাইল। উঠে দাঁড়াল। বলল, 'খেয়ে নে তুই। আমি দেখি, বাইরে কে ডাকছে।'
আবার শব্দ, খট-খট-খট।
দরজা খুলে গেল। ওমা! একী! বাইরে সেই দোকানিটা! সেই গাবদাগোবদা পেট ঢাপুস লোকটা!
'এই বুড়ো, এখানে একটা ছেলে এসেছে?' দোকানি জিজ্ঞেস করল।
'কেন? ছেলে কী করেছে?'
'আমার দোকানে সে খাবার চুরি করতে গেছল।'
বুড়ো লোকটা কী ভাবল একটু। সঙ্গে-সঙ্গে ঝটপট বলল, 'না, এখানে কেউ আসেনি।'
দোকানিটা বললে, 'ছোট্টমতো দেখতে?'
উসকো খুসকো চুল?
ফর্সা ফর্সা মুখ?
ছেঁড়া ছেঁড়া কাপড়?'
বুড়ো বললে, 'না।'
দোকানিটা আবার জিজ্ঞেস করল, 'দেখেছ ভালো করে--ওপরটা-ছাতটা-গাছটা?'
'হ্যাঁ, দেখেছি।'
'নীচেরটা-ঘরটা-দোরটা?'
'তা-ও দেখেছি।'
'সামনেটা-নাকটা-মুখটা?'
'দেখেছি, দেখেছি, দেখেছি। আমার ঘরে কেউ ঢোকেনি। তুমি পথ দেখো।' বলে লোকটা দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।
চলে গেল দোকানিটা।
শান্তর খাওয়া হয়নি। কেমন করে হবে? কান পেতে শুনছিল সে। শুনছিল সেই দোকানির কথাবার্তা।
'কীরে এখনও খাসনি?' লোকটা ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল শান্তকে।
'না, খাব না।' শান্তর যেন কেমন কান্না-কান্না গলা।
'কেন, কী হল?'
'না, আমি খাব না।' উঠে পড়ল শান্ত, 'আমায় ছেড়ে দাও!'
'কোথা যাবি?'
'ওই লোকটার কাছে। ও কেন আমায় চোর বলল। সিঁড়ির নাড়ু পাওয়া যায় কি না জিজ্ঞেস করতে, ও আমায় মারতে এল। আমি ভয়ে পালিয়ে এসেছি। আমি কি চুরি করেছি যে, আমায় চোর বলবে? তোমার খাবার আমি খাব না। তাহলে তুমিও আমায় চোর বলবে। আমায় ছেড়ে দাও, দরজা খুলে দাও!' রেগে চেঁচিয়ে উঠল শান্ত।
লোকটা শান্তর মাথায় হাত দিল। শান্ত চুপ করে গেল। লোকটার মুখের দিকে তাকাল শান্ত। লোকটা শান্তর মাথায়-গালে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগল। বলল, 'নে খা।' একটি সন্দেশ শান্তর মুখে তুলে দিল লোকটা। শান্ত কেঁদে ফেলল। ক-ফোঁটা চোখের জল ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। তাড়াতাড়ি শান্ত মুছে ফেলল চোখের জল--নিজে নিজেই। ছিঃ ছিঃ সে কাঁদছে? সে না বড়ো হয়ে গেছে। লোকটা দেখে ফেললে কী লজ্জার কথা।
লোকটা বোধ হয় দেখেই ফেলেছে। শান্ত তাই তাড়াতাড়ি নিজেই হাত দিয়ে খেতে লাগল।
লোকটা আবার টুলের ওপর গিয়ে বসল। আবার কাঠের ওপর রং বুলোচ্ছে। যেন নজরই নেই শান্তর দিকে। আর শান্তর সঙ্গে কথাই বলে না। চুপচাপ।
শান্ত অবাক হয়ে ভাবছিল তার দিকে চেয়ে চেয়ে। লোকটা কে? শান্তকে এত আদর করল কেন? এত যত্ন করে খাওয়াল কেন? বেশি কথা বলে না। খালি ওই টুকরো কাঠটার ওপর রং দিয়ে কী করছে!
শান্ত ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়াল। কী করছে লোকটা দেখতে ইচ্ছে করছে। ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেল তার দিকে। না, কিচ্ছু বলল না সে।
উঃ! ভারি সুন্দর একটা কাঠের ঘোড়া তৈরি করছে লোকটা? শান্তর চোখদুটি খুশিতে চকচক করে উঠল। থাকতে পারল না। বলেই ফেলল 'তুমি বুঝি পুতুল তৈরি কর?'
কোনো উত্তর দিল না বুড়ো লোকটা। কাজই করছে।
কথাটা আরেকবার জিজ্ঞেস করতে ভয় করছে শান্তর। যদি রেগে যায়। যদি বলে, 'সরে যা এখান থেকে।' তার চেয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখাই ভালো। আহা! কী ভালো লাগছে শান্তর।
আনমনে দেখছে শান্ত। ভাবছে, ঘোড়াটা যদি কাঠের ঘোড়া না হত। যদি জ্যান্ত হত। তাহলে সে ঘোড়ার পিঠে চেপে পাড়ি দিত, বাড়ির দিকে। চুমকিকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিত। দুজনে ঘোড়ার পিঠে চেপে ছুট দিত সেই রাজার কাছে। সেই রাজা--যে-রাজা পাখি মারে। কোমর থেকে তরোয়াল বার করে তার সঙ্গে লাগিয়ে দিত যুদ্ধ। রাজাকে হারিয়ে বন্দি করত। শেকল পরিয়ে দিত রাজার হাতে। তারপর হয়তো রাজার ছোট্ট মেয়ে, রাজকন্যে, ছুটে আসত কাঁদতে কাঁদতে। শান্তর হাতদুটি জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলত, 'আমার বাবাকে ছেড়ে দাও, আমার বাবাকে ধরে নিয়ে যেও না।' কেঁদে লুটিয়ে পড়ত যখন, শান্ত তখন বুক ফুলিয়ে বলত, 'আমার বোনের পাখি দাও, হলুদ পাখি, নীল পাখি।' তখন?
'কী দেখছিস?' আচমকা লোকটা জিজ্ঞেস করল। শান্ত থতমত খেয়ে বলল, 'ঘোড়া।'
'নিবি?'
'না।'
'কেন?'
'তুমি অত কষ্ট করে তৈরি করছ।'
আবার লোকটা রং দিতে লাগল। শেষ হয়ে এল প্রায় ঘোড়াটা। যতই দেখছে ততই মনটা খুশি হয়ে উঠছে শান্তর। কী সুন্দর হচ্ছে।
হঠাৎ চট করে বুড়োর গায়ে হাত দিল শান্ত। নরম নরম হাত। ভাব করতে ইচ্ছে করছে। তার মুখের দিকে তাকাল। রঙের তুলি থামল। বুড়োও তাকাল শান্তর দিকে।
'আমার নাম শান্ত।' বুড়োর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত বলল।
'তুমি তরোয়াল তৈরি করতে পার?'
'কেন?'
'এমনি বলছি।',
'না।' উত্তর দিয়ে বুড়ো রং দিতে লাগল ঘোড়ার গায়ে।
'জান, আমার একটা ছোট্ট বোন আছে--চুমকি। আমি অনেক দূরে থাকি। এখান থেকে অনেক দূরে। আমি হারিয়ে গেছি। পথ হারিয়ে এখানে চলে এসেছি।'
'অ।' রং দিতে দিতেই বলল বুড়ো আনমনে। 'তোমার কেউ নেই?'
'উহুঁ।'
'এত বড়ো বাড়িটায় তুমি একা থাক?'
'হ্যাঁ।'
'ঘরের দরজা-জানলাগুলো বন্ধ রেখেছ কেন?'
'ভয়ে।'
'ভয়ে! এত বড়ো লোক ভয় পায় নাকি!' হেসে ফেলল শান্ত হি-হি-হি করে। ওমা! অমনি সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ফেলল সেই বুড়ো লোকটা। চোখ মেলে চাইল শান্তর দিকে। ঝরঝর করে জল গড়াচ্ছে দুচোখ বেয়ে।
হাসতে হাসতে শুকিয়ে গেল শান্তর মুখ। সঙ্গে সঙ্গে কী রকম কুঁচকে গেল শান্ত। একী, লোকটা কাঁদছে কেন! মনটা কেমন করে উঠল। জিজ্ঞেস করল, 'কাঁদছ কেন গো? আমি হাসলুম বলে?'
'গান গাইতে পারিস?' লোকটা ধরাধরা গলায় জিজ্ঞেস করল। 'কতদিন গান শুনিনি।' চোখে তখনও তার জল গড়াচ্ছে।
'কে তোমায় গান শোনাত?'
'পাখি। গাছের পাখি। এরা সব মেরে ফেলেছে।'
চমকে উঠল শান্ত। জিজ্ঞেস করল 'কারা?'
'এখানকার রাজা। রাজার লোকেরা। আমি পাখির কান্না শুনতে পাই। মরা পাখির কান্না। আমার বুক কেঁপে ওঠে। তাই দরজা-জানলা বন্ধ রাখি।'
'এখানকার রাজা?' শান্তর মুখটা লাল হয়ে উঠল। রাগে সমস্ত শরীরটা যেন কাঁপছে তার। চোখের ওপর ভেসে উঠছে রাজবাড়ির সিংদরজা। কী হল হঠাৎ, ছুটল সে। চোখের পাতা পড়তে-না-পড়তেই ছুটল।
বুড়ো লোকটা থমকে দাঁড়াল। হাত থেকে তার ঘোড়া ছিটকে পড়ল মাটিতে। চেঁচাল, 'কোথা যাচ্ছিস?'
'রাজার কাছে। আমার বোনের পাখি মেরেছে রাজা।' দরজা খুলে ফেলল শান্ত। রাস্তায় বেরিয়ে এল। ছুটল সে রাজবাড়ির দিকে।
বুড়োও ছুটল শান্তর পেছনে। দুটি হাত বাড়িয়ে ছুটল, 'ওরে যাস না। তোকে মারবে।'
ছুটছে শান্ত। এ-রাস্তা সে-রাস্তা দিয়ে ছুটছে। মারুক। তবু সে যাবে রাজার কাছে।
কিন্তু একী! রাজবাড়ির সিংদরজা বন্ধ যে। দুপুরের সোনার রোদে ঝকমক করছে বন্ধ সিংদরজা। ছুটতে ছুটতে শান্ত এসে দরজায় ধাক্কা দিল, 'দরজা খোলো।' গলা কাঁপছে তার।
কত বড়ো সিংদরজা। আকাশ ছোঁয়া। কতটুকু শান্তর হাত। দরজা নড়ল না। দরজা খুলল না।
ছুটতে ছুটতে বুড়ো এসে জড়িয়ে ধরল শান্তকে, 'ওরে যাস না। ফিরে চ।'
'না, আমায় ছেড়ে দাও।' আবার ধাক্কা দিল, 'দরজা খোলো।'
এখনও খুলল না।
বুড়ো বুকের মধ্যে টেনে নিল শান্তকে, 'ওরে চ, আমার সঙ্গে চ, আমি তোকে পাখি দেব, সব রং দিয়ে পাখি তৈরি করে দেব।'
শুনবে না শান্ত, চেঁচিয়ে উঠল, 'দরজা খোলো, খোলো, খোলো।'
'ঘরে চ। আমার ঘরে। লক্ষ্মী সোনা।'
শুনল না কথা। কী ভাবল শান্ত, কী মনে হল তার, হঠাৎ ডেকে উঠল, 'টুই-টুই-ই-ই।' একবার। দুবার। বারবার। একটি পাখির মিষ্টি সুর শান্তর গলায় গেয়ে উঠল।
অমনি সিংদরজা খুলে গেল। রাজবাড়ির সিংদরজা। সামনে সিপাই। চল্লিশজন সিপাই একেবারে তরোয়াল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। রোদে ঝিলিক দিচ্ছে ঝকঝকে তরোয়াল।
আবার ডেকে উঠল শান্ত, 'টুই-টুই-ই-ই।'
বুড়ো চটপট কোলে তুলে নিল শান্তকে। ছুট দিল উলটো দিকে। শান্ত হাত-পা ছুড়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'ছেড়ে দাও, আমায় ছেড়ে দাও, আমি রাজার কাছে যাব।'
বুড়ো ছুটল। তার পেছনে চল্লিশজন সিপাই ছুটল।
বুড়ো ছুটছে! সিপাই ছুটছে। শান্ত চেঁচাচ্ছে।
বুড়ো আর পারছে না। ছুটতে পারছে না। পারছে না শান্তকে তার কোলে ধরে রাখতে। শান্ত লাফিয়ে পড়ল তার কোল থেকে। 'ওরে যাস না' বলে বুড়ো হোঁচট খেয়ে পড়ল মাটিতে। লুটিয়ে পড়ল। চল্লিশজন সিপাই মাড়িয়ে চলে গেল তাকে। পিষে গেল রাস্তার সঙ্গে। ছুটল তারা শান্তর পেছনে।
আবার ডাক দিল শান্ত, 'টুই-টুই-ই-ই।'
অমনি ঘোড়া ছুটল। টগবগ, টগবগ।
শান্ত ছুটল, সাঁই সাঁই, পাঁই পাঁই।
ঘোড়ার পিঠে সিপাই আসছে--টগবগ, টগবগ। লোকে লোকারণ্য।
'চোর।' হঠাৎ কে চেঁচিয়ে উঠল অত লোকের মাঝ থেকে? ওমা! এ যে সেই দোকানিটা, পেট-ঢাপুস লোকটা!
'চোর। চোর।' সঙ্গে-সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল একটা লোক, দুটো লোক, তিনটে লোক, চারটে লোক, চারশো লোক, অগুনতি লোক।
ছুট দিল শান্ত আরও জোরে। ছুটবে কোথায়?
সামনে ঘোড়া--টগবগ।
পিছন বাগে--টগবগ।
বাঁয়ে ঘোড়া--টগবগ।
শান্তকে ঘিরে ফেলেছে।
তবুও শান্ত ছুটছে। ছোট্ট-ছোট্ট শান্তর পা। কদম-কদম ঘোড়ার ছুট। কতক্ষণ ছুটবে?
'সপাং।' চাবুক পড়ল। শান্তর পিঠে। শান্ত 'মাগো' বলে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। আর উঠতে পারল না।
অমনি চারশো সিপাই ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এল। শান্তর পা বাঁধল। হাত বাঁধল।
মুখ বাঁধল। চোখ বেঁধে চ্যাংদোলা করে কোথায় নিয়ে চলে গেল, কেউ জানতেও পারল না।
সিপাইরা শান্তকে কোথায় যে ধরে নিয়ে গেল, চুমকিও জানতে পারল না। কেমন করে জানবে? কোথায় চুমকি আর কোথায় শান্ত। শান্ত বন্দি হয়েছে সিপাই-এর হাতে। অনেকদূরে, কোনো এক শহরে। আর চুমকি রাজার হাতটি ধরে দাদাকে খুঁজছে আঁতিপাঁতি করে। পথে-পথে, পাহাড়-ঘেরা ছোট্ট গ্রামে।
রাত হয়েছে। কাঁদছে চুমকি। দাদার জন্যে কাঁদছে। ছোট্ট মাটির ঘরে, রাজার কোলে মাথা রেখে কাঁদছে 'আমার দাদা কই? দাদা আয়।'
রাজা চুমকির কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আদর করে। বলছে, 'তোমার দাদা ফিরে আসবে। আমি আছি ভয় কী? কাল সকাল হলেই দাদাকে আমি ফিরিয়ে আনব।'
রাজার কথা শোনে না চুমকি। বলে, 'এক্ষুনি দাদা আসছে না কেন? দেখছ না কত রাত হয়ে গেছে। সকাল যদি আর না হয়।'
রাজা বলল, 'সোনা মেয়ে, ঘুমিয়ে পড়ো। ঘুমিয়ে পড়লেই সকাল হবে।'
'দাদা নেই, কেমন করে ঘুমোব? কে আমায় ঘুম পাড়াবে? কে আমায় গল্প শোনাবে?'
রাজা বলল, 'আমি গল্প বলি।'
পিলসুজের ওপর প্রদীপ জ্বলছে ঘরের মধ্যে। তার আলো কাঁপছে রাজার চোখে। সেই আলো দুলে দুলে ছড়িয়ে আছে চুমকির মিষ্টি মুখে। আর রাজা গল্প বলছে .
এক রাজা। তার এক রানি। একটি ছেলে। একটি মেয়ে। রাজার মনে কোনো হিংসে নেই। রাগ নেই। কোনো দুঃখ নেই। রাজার মনে খুশি। সারা রাজ্যে খুশি।
এমন যে রাজা, তার বেশিদিন সুখ সইল না।
একদিন সন্ধেবেলা। রানি গল্প করছিল রাজার সঙ্গে। গল্প করছিল খোলা আকাশের নীচে। আনমনে আকাশের দিকে চেয়ে।
হঠাৎ রানি বলল, 'রাজামশাই, দেখো, দেখো, আকাশের কপালে খালি টিপ আর টিপ।'
রাজা বলল, 'আহা! মিষ্টি তারা!
রানি বলল, 'কী সুন্দর! অমন একটি টিপ এনে দাও না, আমার কপালে পরি।'
রাজা বলল, 'অমন টিপ পাইতো, তোমার কপালে পরাই। আলোর ঘরে আলোর নাচ দেখি। কিন্তু অমন টিপ পাই কোথা?' অমনি সাজো-সাজো রব পড়ে গেল। ঘোড়া সাজল, হাতি সাজল। দশ হাজার লোক কোমর বাঁধল। রাজা ছুটল টিপ খুঁজতে। এল এক পাহাড়ের দেশে।
সাত দিন, সাত রাত কাটল। দশ হাজার লোক পাহাড় ভাঙছে। পাথর কাটছে। মাটি খুঁড়ছে। কিন্তু আকাশের টিপ মাটিতে মিলবে কেমন করে? তাইতো!
কিন্তু হঠাৎ একদিন অন্ধকার পাতালে আলো জ্বলে উঠল। একটুখানি আলো, এক টুকরো আলো। রাজা চেঁচিয়ে উঠল, 'কী ওটা?'
দশ হাজার লোক চেঁচিয়ে উঠল, 'কী ওটা? কী ওটা?'
একটি হিরে। আহা! নীল হিরে!
সেই পাতালের অন্ধকারে দশ হাজার লোক আনন্দে পাগলের মতো নেচে উঠল। রাজা সেই হিরে কুড়িয়ে আনল। রানির কপালে পরিয়ে দিল।
ওমা! সত্যিই তো! আকাশের একটি তারা যেন ভালোবেসে রানির কপালে নেমে এসেছে! রানি ভারি খুশি। খুশিতে ডগমগ। বলল, 'তুমি রাজার মতো রাজা।'
কিন্তু একী হল! দিন যায় আর যেন রানির কপালের নীল হিরের নীল-আলো নিবে আসে একটু একটু করে! কেন? রানির কপালে হিরের আলো সহ্য হল না। একদিন একেবারে নিবে গেল। আহা! সেইদিন রানিও মারা গেল।
তারপর অনেকদিন পরে আর এক কাণ্ড।
সেদিন রাজার মেয়ে চুপটি করে চেয়ে ছিল একটি গাছের দিকে। চেয়ে চেয়ে বলে, 'বাবা, দেখো, দেখো, সবুজ পাতার ফাঁকে লাল-ফুল।'
রাজা বলল, 'আহা! গোলাপফুল।'
মেয়ে বলল, 'সকাল হলেই ফুলের পাপড়ি ঝরে যাবে। আহা রে? এমন কেন হয় না, ফুলের পাপড়ি একবছরেও ঝরে না? এমন যদি গোলাপ পাই, তো খোঁপায় সাজাই। বাবা, তুমি আমায় এমন একটি ফুল দাও না?'
রাজা ছুটল ফুলের খোঁজে।
আবার হাতি সাজল। ঘোড়া ছুটল। পাহাড় গেল। নদী পড়ল। বনের-পর-বন এল। এ-বন সে-বন করে এক গভীর বনে দেখা হল একটি ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে। মিষ্টি মেয়ে। খোঁপায় সাজানো তার লাল গোলাপ। মেয়ে বলল, 'কী চাও গো রাজামশাই?'
রাজা বলল, ' গোলাপ চাই। যে-গোলাপ লাল। যে-গোলাপের পাপড়ি একবছরেও ঝরে না।'
মেয়ে তার খোঁপায় আঁটা গোলাপ রাজার হাতে দিল। বললে, 'তুমি রাজা তাই আমার গোলাপ তোমায় দিলুম। একবছরে এ গোলাপের একটিও পাপড়ি ঝরবে না। তুমি আমায় কী দেবে?'
'আমার গজমতির সাতনলিহার তোমার গলায় পরিয়ে দিলুম।'
বনের মেয়ে খুশি হয়ে বনের মধ্যে হারিয়ে গেল। আর রাজা সেই গোলাপ এনে রাজকন্যের খোঁপায় সাজিয়ে দিল!
রাজকন্যে খুশির আনন্দে রাজবাড়িতে নেচে নেচে ফুলের গন্ধ ভরিয়ে দিল। কিন্তু...
হায়! হায়! একটি বছর যেই পার হয়েছে, যেই গোলাপের পাপড়ি ঝরেছে, ওমা! রাজকন্যেও চিরদিনের মতো চোখ বুজেছে!
রাজবাড়িতে আবার কান্না। কান্না। রাজার একী হল! রানিও গেল, মেয়েও হারাল!
তারপর বছর গেল কেটে।
রাজবাড়িতে রাজার বলতে এখন শুধু ছেলেটি।
একদিন সকালবেলা রাজপুত্তুর ঘুম থেকে উঠেছে। গাছের দিকে চেয়ে পাখির নাচ দেখছে, গান শুনছে। হঠাৎ রাজাকে বলল, 'বাবা, এমন যদি পাখি হয়?'
রাজা বলল, 'কেমন পাখি?'
ছেলে বলল, 'তেমন পাখি, যে পাখি গান গাইলে আমি শুনতে পাব, একটি ছোট্ট মেয়ের মিষ্টি গলা। এমন পাখি আমায় এনে দাও তো তার গান শুনি।'
অমনি রাজা ছুটল সেই পাখির খোঁজে।
কিন্তু এমন পাখি পাবে কোথা? যে-পাখির ছোট্ট মেয়ের মিষ্টি গলা।
সে-পাখি গাছে নেই।
গাছে নেই, মাঠে নেই।
জলে নেই, স্থলে নেই।
কোথা আছে? আকাশে? নেই, নেই।
পাহাড়ে? নেই, নেই।
মরুতে? নেই, নেই।
তবে কোথা? বনে আছে।
কোন বনে! যে-বনেতে বাঘ নেই, সাপ নেই, জুজু নেই, ভয় নেই।
যে-বনেতে কালো নেই থমথম।
আলো আছে ঝলমল।
যে-বনেতে ফুল ফোটে তুলতুল,
যে-বনেতে পাখি নাচে দুলদুল,
যেখানে হাওয়ার নাচন ঝুমকোলতায়।
ঝুমঝুমি ঝুম ঝুম পাতায় পাতায়।
এমন এক বনে রাজা হাজির হল। দেখা হল এক বুড়ির সঙ্গে। বুড়ি বলল, 'কী গো ছেলে, একা একা বনে বনে কী খুঁজে বেড়াচ্ছ?'
রাজা বলল, 'পাখি খুঁজছি। আমার ছেলে বলেছে, তার এমন একটি পাখি চাই, যে-পাখি গান গাইলে মনে হবে একটি মেয়ে গাইছে। এমন পাখি কোথা পাই?'
বুড়ি বলল, 'দেখো বাপু, সে-পাখির খোঁজ আমি দেব। কিন্তু তার বদলে আমায় কী দেবে?'
রাজা বলল, 'কী নেবে?'
'তোমার গলার ওই মালাটি। মুক্তোমালা।'
রাজা সঙ্গে সঙ্গে গলার মালা বুড়ির হাতে তুলে দিল।
বুড়ি বলল, 'এসো আমার সঙ্গে।'
বুড়ি একটা বাঁশের খাঁচায় পুরে পাখি নিয়ে এল। আর অমনি পাখি রাজাকে দেখে গান গেয়ে উঠেছে। ওমা! সত্যিই তো। পাখির যেন একটি ছোট্ট মেয়ের মিষ্টি গলা!
বুড়ি রাজার হাতে পাখির খাঁচা তুলে দিয়ে বলল, 'দেখো, পাখি যেন কোনোদিন উড়ে না যায়, তাহলে কিন্তু বিপদ হবে।'
রোজ সকালে সোনার খাঁচায় পাখি গান গায়। রাজার ছেলের সে-গান শুনে ঘুম ভাঙে। রাজার ছেলে পাখির সঙ্গে খেলা করে।
একদিন রাজার ছেলে সোনার খাঁচায় হাত পুরে, পাখির গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করছিল। পাখির সঙ্গে কথা বলছিল। অনেকক্ষণ। তারপর সাঁঝ এল। খেলা সাঙ্গ হল। রাজপুত্তুর ঘরে গেল। আর খাঁচার পাখি ঘুমিয়ে পড়ল। যাঃ! যাবার সময় রাজপুত্তুর ভুলেই গেল সোনার খাঁচার ডালা বন্ধ করতে। রাত্তিরবেলায় রাজার ছেলে ঘুমিয়ে পড়ল অঘোরে। আর সকালবেলায় সোনার খাঁচার মিষ্টি-সুরের মিষ্টি-পাখি ফুড়ুত করে উড়ে গেল আকাশে, খোলা খাঁচার দরজা দিয়ে।
আর? হায়! হায়! রাজপুত্তুরের রাতের ঘুম সকালে আর ভাঙল না।
সেই থেকে রাজা যেন পাগলের মতো হয়ে গেল। একটি তারার লোভে তার রানি গেল। একটি ফুলের জন্যে মেয়ে হারাল। একটি পাখির জন্যে ছেলে চোখ বুজল। সেই থেকে রাজা আকাশে তারা দেখলে চেঁচিয়ে উঠত, 'ঘরের জানলা বন্ধ করে দাও!' গাছে ফুল দেখলে হেঁকে উঠত, 'গাছের ফুল ছিঁড়ে ফেলো!' আকাশের পাখি দেখলে, পাগলের মতো চেঁচাত, 'তাড়িয়ে দাও, মেরে ফেলো!'
তাই সে রাজ্যে আকাশে তারা দেখে না কেউ। গাছে ফুল ফোটে না। পাখি গান গায় না।
গল্প শুনতে শুনতে চুমকি ঘুমিয়ে পড়েছে। কখন ঘুমিয়েছে রাজা নিজেও জানে না। রাজা আপন মনে বলে গেছে গল্প। এ যে নিজের গল্প। নিজের কথা।
চুমকির ঘুম ঘুম চোখের দিকে তাকাল রাজা। কী সুন্দর চোখ দুটি! চোখের পাতার আড়ালে স্বপ্নের দেশ। চুমকি হয়তো স্বপ্ন দেখছে। কার? দাদার।
আর অন্ধকারে রাজা কীসের স্বপ্ন দেখছে চুমকির মুখের দিকে চেয়ে?
চুমকি যেন তার হারিয়ে যাওয়া মেয়ে। শান্ত যেন তার কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে।
কিন্তু শান্ত গেল কোথা? কোথা গেল?
সকাল হতেই চুমকির হাত ধরে রাজা বেরিয়ে পড়ল। শান্তকে খুঁজতে। কত গ্রাম পেরিয়ে গেল। কত বন চলে গেল। কত পাহাড় পড়ে রইল। তবু শান্তকে খুঁজে পাওয়া গেল না। পথে পথে একটি ছোট্ট মেয়ের হাত ধরে একটি ছোট্ট ছেলেকে খুঁজে বেড়াচ্ছে রাজা। হাঁটতে হাঁটতে ঘাম ঝরছে রাজার সারা শরীর বেয়ে। আর কাঁদতে কাঁদতে জল ঝরছে চুমকির দুটি চোখ দিয়ে, 'দাদা আয়। দাদা আয়।'
পথ কি শেষ হবে না? পথে পথে কেঁদে কেঁদে সারা হয়েছে চুমকি। কিন্তু কই তার দাদা?
তাইতো! সত্যিই কি শান্তকে পাওয়া যাবে না খুঁজে? রাজার মন ভেঙে যাচ্ছে। শরীরও আর বইছে না। কী করবে রাজা? বসবে, না চলবে? চলবে, না থামবে?
একী! রাজা থামল কেন? অবাক চোখে চাইল যেন! চমকে উঠে থমকে গেল! কী হল?
রাজার কানে শব্দ এল।
কীসের শব্দ?
ঝড় উঠেছে আকাশে?
না তো। পাতা নড়ে না বাতাসে।
বাজ হাঁকছে মেঘে কী?
আকাশে মেঘ নেইতো বাজ কী।
রাজার মনে হল, অনেকদূরে কারা হাঁকাহাঁকি করছে। হইহই।
ছুটল রাজা সেইদিকে। সামনেদিকে। সামনেদিকে শহরতলি।
শহরতলির--অলিগলি
ছোট্ট বাড়ি
এক্কাগাড়ি
ছাগলছানা
কুকুর কানা
ছোট্ট মেয়ে
যাচ্ছে গেয়ে।
শহরতলি এড়িয়ে
ডাইনে নদী পেরিয়ে
আর কী এল? আর কী এল?
শহর এল। খাশ-শহর।
উরি বাবা! কত লোক! শহরের রাস্তা ধরে চলেছে। হাজারে-হাজারে, কাতারে-কাতারে। চেঁচামেচি, হুড়োহুড়ি চারিদিকে। ও, তাই বলো! রাজা এতক্ষণ শহরের হুল্লোড় শুনছিল! কিন্তু এটা কোন শহর? রাজার যেন চেনা-চেনা। খুব চেনা।
চুমকি কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করল, 'বন্ধু, এ কোথায় নিয়ে এলে? এত লোক কেন? এখানে বুঝি আমার দাদা আছে?'
রাজা হাঁটছে আর অবাক হয়ে দেখছে! সত্যিই তো, এত লোক কেন? কোথা চলেছে? মেলা বসেছে কোথাও নাকি! এখন মেলা? কীসের মেলা?
রাজা চুমকির হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
রাজা চিনে ফেলেছে। ফিরে এসেছে। এ তার নিজের রাজ্য। ওই দেখা যাচ্ছে রাজবাড়ির চুড়ো আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। সিপাইরা তকমা এঁটে তরোয়াল উঁচিয়ে ভিড় সামলাচ্ছে। রাজা ভিড়ের মধ্যে, চুমকির হাত ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে এগিয়ে চলল। সিপাইরা না দেখতে পায়! চিনে ফেললে?
রাজা ভিড়ের মধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করল, 'হ্যাঁ ভাই, তোমরা সব কোথায় যাচ্ছ?'
লোকটা 'হ্যা-হ্যা-হ্যা' করে কী বিচ্ছিরি হেসে উঠল। বলল, 'আচ্ছা বোকা তো হে তুমি। রাজার লোক ঢেঁড়া দিয়ে গেল! তুমি কি কানে ছিপি এঁটে বসেছিলে? চোর, চোর দেখতে যাচ্ছি। রাজ্যে একটা চোর ধরা পড়েছে।'
'কী চুরি করেছে চোর?'
লোকটা যেন আকাশ থেকে পড়ল, 'ওমা! রাজবাড়িতে ঢুকতে গেছল, এ কথাটাও জান না! চোরকে শূলে চাপাবে। আমরা তাই দেখতে যাচ্ছি।'
কথা শুনেই চট করে চুমকিকে কোলে তুলে নিল রাজা। ছুটল রাজবাড়ির দিকে।
ছুটতে ছুটতে একেবারে রাজবাড়ির সিংদরজার সামনে। দাঁড়াল রাজা। প্রথমে চিনতে না-পেরে দ্বারী রাজাকে তেড়ে উঠল, 'ভাগ যাও!' মুখ তুলে রাজার দিকে চোখ চাইতেই দ্বারীর মাথা হেঁট। ভয়ে ঠকঠক কাঁপছে দ্বারী।
আর দেখতে হয়! এক নিমেষে খবর রটে গেল, 'রাজা এসেছেন, রাজা এসেছেন।'
মন্ত্রী ছুটল। সান্ত্রি জুটল। পাত্রমিত্র সবাই তটস্থ। 'রাজা এসেছেন, রাজা এসেছেন।' রাজবাড়িতে হইহই পড়ে গেল। কিন্তু রাজার কোলে ওই যে মেয়ে ছোট্ট--কার মেয়ে! অবাক সবাই! কে মেয়েটি!
রাজা মন্ত্রীকে ডাকল। হুকুম দিল, 'চোরকে শূলে চাপানো বন্ধ রাখো।'
সিংদরজার দত্যি-ঘন্টা বেজে উঠল, ঢং-ঢং-ঢং!
টগবগ-টগবগ ঘোড়া ছুটল।
টুং টাং, টুং টাং হাতি নাচল।
সার সার উট বেরল।
রঙিন পতাকা পতপত।
সিপাই ছোটে গটমট।
ডুম-ডুমা-ডুম বাদ্যি বাজে।
ঘরে ঘরে ছেলে সাজে, মেয়ে সাজে, বউ সাজে। রাজাকে দেখতে যাবে। রাজার কোলে মেয়েকে দেখতে যাবে।
রাজাকে রাজপোশাক পরানো হল। সোনার মুকুট মাথায় উঠল। সোনার মুকুট ঝলমল। হিরের মালা টলমল। আর চুমকির চোখ ছলছল।
অবাক লাগছে চুমকির। রাজাকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কে? এ কোথায় নিয়ে এলে আমায়? আমার দাদা কই?'
রাজা চুমকিকে কোলে তুলে নিল। তার গলায় এক জোড়া মুক্তোর মালা পরিয়ে দিল।
হুকুম হল, 'রাজদরবার সাজাও। নাচ হবে, গান হবে। রাজার কোলে ছোট্ট মেয়ে গান শুনবে, নাচ দেখবে।'
অমনি একশোজন গাইয়ে এল, দুশোজন নাচিয়ে এল। শহর ভেঙে লোক এল।
ভালো লাগছে না চুমকির। ভালো লাগছে না গান। নাচ। চুমকির মন দাদার মনে। রাজার কোলে বসে-বসে আনমনে সে কাঁদছে। চোখের জল টলমল। টুপ করে রাজার হাতে পড়ল এক ফোঁটা জল। রাজা চুমকির চোখের দিকে তাকাবার আগেই মন্ত্রী এসে জিজ্ঞেস করল, 'আজ্ঞে আজকে এই আনন্দের দিনে চোরটাকে কী করব? ছেড়ে দেব কি?'
'না, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' রাজা গম্ভীর গলায় হুকুম দিল।
অমনি নাচ থেমে গেল।
'ঘড়ঘড়, ঘড়ঘড়', বন্দি গাড়ির কাঠের চাকার শব্দ উঠল। ঘোড়া টানছে বন্দি-গাড়ি। সিপাই হাঁকছে 'হেঁইও-হো।'
রাজদরবারের সামনে এসে গাড়ি থামল।
'ক্যাঁচ,' গাড়ির দরজা খুলছে। লোহার কপাট। চোর বেরল। চোরের পায়ে শেকল, হাতে শেকল। সিপাইরা সেই শেকল ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলল রাজার সামনে।
থমথম করছে রাজদরবার। একটু আগে নাচে-গানে খুশি ছিল যে দরবার, হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে গেল।
চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়েছে চোর। হাত-পা তার অবশ হয়ে গেছে। না, না, সত্যি আর পারছে না সে। টান দিল সিপাই শেকল ধরে। চাবুক পড়ল 'সপাং' করে, পিঠের ওপরে।
'উঃ!' মুখ গুঁজড়ে পড়ে গেল চোর রাজদরবারের তকতকে শানের ওপর।
রাজা ধমকে উঠল, 'থামো।'
সিপাইরা সরে গেল। হাতের চাবুক নামিয়ে নিল।
শেকলের বোঝা নিয়ে মাটি থেকে উঠছে চোর। আহা! কত কষ্ট হচ্ছে। টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল। মুখ তুলল। হাতজোড় করে সামনে চাইল। রাজার দিকে।
'দাদা।' হঠাৎ কেঁদে উঠল চুমকি। চেঁচিয়ে উঠল। রাজার কোল থেকে লাফ মেরে ছুটে এল চোরের কাছে। চোরকে জড়িয়ে ধরে 'হাউ-হাউ' করে কেঁদে ফেললে, 'দাদা, দাদা, আমার দাদা। তোমায় কে বাঁধল চোর বলে!'
রাজা চমকে তাকাল চোরের দিকে, একী! শান্ত!
চোর চাইল রাজার দিকে, একী! বন্ধু!
শান্তর চোখ--চোখের জলে টলমল।
রাজার চোখ--চোখের জলে ছলছল।
রাজা ছুটে এসে বুকে জড়িয়ে ধরল শান্তকে। হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল শান্ত। কেঁদে ফেলল রাজা। কাঁদছে চুমকি। রাজদরবারের অত লোক সবাই থ। ব্যাপার কী? কী ব্যাপার?
আচমকা একটি পাখি ডেকে উঠল 'টুই-টুই!'
রাজদরবারের অত লোক চমকে উঠল। পাখি! পাখি! রাজবাড়িতে পাখি ডাকছে!
পাখি আবার ডাকল 'টুই-টুই!'
ওমা! এ যে সেই হলুদ পাখি। শান্তর সেই বন্ধুটি।
চুমকির সেই হলুদটি।
একী! একী! এ তো হলুদ নয়! তবে?
নীল গাইছে, লাল ডাকছে, সবুজ পাখি তা-ও নাচছে।
কোত্থেকে হাজার হাজার পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসছে। আসছে খালি। আকাশে ডানা ছড়িয়ে। এত পাখি ছিল কোথা?
হলুদ পাখি উড়ে-উড়ে নেমে এল।
কোথা?
ওমা? একেবারে রাজার কাঁধের ওপর। রাজার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে ডেকে উঠল, 'টুই-টুই।'
দুটি হাত দিয়ে পাখিকে জড়িয়ে ধরল রাজা আদর করে। পাখির গালে একটা চুমু খেল চুক করে। পাখির মিষ্টিচোখের দিকে তাকিয়ে রাজাও ডাকল, 'টুই-টুই।'
হেসে ফেলল শান্ত। হেসে উঠল চুমকি। হেসে উঠল রাজবাড়ি।
তারপর?
তারপর সে রাজ্যে ছোট্ট ছোট্ট পাখি আবার একটি একটি রঙের ফোঁটার মতো আকাশ ভরিয়ে রাখল।
আর?
শান্ত আর চুমকি রাজবাড়িতে চিরদিনের মতো থেকে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন