ইংরাজের লোকলজ্জা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেখিলাম, “টাইম্‌স্‌’ পত্রে একজন ইংরাজ লেখক আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন যে, চিত্রল অধিকার করিয়া যদি ছাড়িয়া দেওয়া যায়, তবে ইংরাজের এই অনিশ্চিত আগুপিছু পলিসি লইয়া ভারতবর্ষের দেশীয় রাজসভায় এবং প্রজাবর্গের মধ্যে বিরুদ্ধ সমালোচনা উত্থাপিত হইবে। আমরা দেখিয়া পরম সন্তোষ লাভ করিলাম যে, ভারতবাসীদের নিকটেও সময়ে সময়ে ইংরাজ লোকলজ্জা অনুভব করিয়া থাকেন। কিন্তু এ স্থলে লজ্জার কোনো কারণ দেখি না। একটা দেশ জয় করিয়া অপরাধীদিগকে শাসন করিয়া তাহা ত্যাগ করিয়া আসিলে ইংরাজের সেই নির্লোভ উদারতা ভারতবর্ষের নিকট প্রশংসার বিষয় বলিয়াই গণ্য হইবে।

কিন্তু যথার্থ যদি ইংরাজের তিলমাত্র লোকলজ্জা থাকে তবে গরিব ভারতবাসীর নিকট হইতে টাকা লইয়া মহারানীর নিমন্ত্রিত অভ্যাগতদের আতিথ্য করিতে ক্ষান্ত থাকা তাঁহাদের কর্তব্য। ভারতবর্ষের রাজন্যবর্গের নিকট মহারানীর নামে এই হীনতা-কলঙ্ক প্রচার না করিলেই ভালো হয়। গরীবের অর্থে রাজার আতিথ্য রাজোচিত দেখিতে হয় না। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হইলেও উলুখড়ের প্রাণ যায় আবার রাজায় রাজায় বন্ধুত্বের বেলাও উলুখড় বেচারার পরিত্রাণ নাই।

তাহা ছাড়া, স্পষ্টরূপে স্বীকার করিয়া, কাবুলের মন পাইবার জন্য নসেরুল্লাকে লইয়া এমন অতিমাত্রায় ব্যগ্রতা প্রকাশ করাতে দেশীয় রাজা ও প্রজার নিকটে মহারানীর সম্মান যে কতখানি খর্ব হইতেছে তাহা ইংরাজ অন্ধভাবে বিস্মৃত হইতেছেন। নসেরুল্লাকে যদি মহারানী নিজের অতিথিভাবেই অভ্যর্থনা করিতেন তবে তাহাতে লজ্জার বিষয় কিছুই ছিল না, কিন্তু এই আতিথ্যকে ভারত-রাজকীয় পলিসির অঙ্গ করিয়া লইয়া ভারত ভাণ্ডার হইতে অর্থ লইবার উপক্রম করাতে ইংরাজের মর্যাদা অত্যন্ত ক্ষুণ্ন হইতেছে। যে ইংরাজের ঔদ্ধত্য ও অভিমান জগদ্‌বিখ্যাত, কাজ উদ্ধারের সময় সেই ইংরাজের মেরুদণ্ড কাবুলের পাঠানের নিকটে এমন অনায়াসে অবনত হইতেছে ইহা লইয়া কি হাসিবার লোক কেহই নাই? শুনা যাইতেছে অনেক মুকুটধারী য়ুরোপীয় রাজাও ইংলন্ডে এরূপ আতিথ্য লাভ করেন নাই। পলিসিও যে খুব পাকা তাহা বলিতে পারি না। পদ্মাতীরে বালুভিত্তির উপর বহুব্যয়ে অট্টালিকা নির্মাণ করা সংগত নহে, সেখানে অল্প খরচে ক্ষণিক বন্দোবস্ত করাই শ্রেয়। কাবুলের সহিত বহুব্যয়সাধ্য নির্মাণও সেইরূপ অবিবেচনার কাজ। কাবুলের সিংহাসন ইংরাজের বহুমূল্য সখ্যসমেত আজ বাদে কাল ধসিয়া যাওয়া কিছুই বিচিত্র নহে, অতএব কাবুলের মতো রাজ্যের সহিত স্বল্পব্যয়ে ক্ষণিক সখ্যের আয়োজন রাখাই সংগত। ভারতবর্ষের বহুকষ্টসঞ্চিত রাজভাণ্ডার তাহার পদমূলে উজাড় করিয়া দিলেও কাবুলের সিংহাসন এক বংশে স্থায়ী হইবে না।

সকল অধ্যায়
১.
মণিপুরের বর্ণনা
২.
আমেরিকার সমাজচিত্র
৩.
পৌরাণিক মহাপ্লাবন
৪.
মুসলমান মহিলা
৫.
প্রাচ্য সভ্যতার প্রাচীনত্ব
৬.
ক্ষিপ্ত রমণীসম্প্রদায়
৭.
সীমান্ত প্রদেশ ও আশ্রিতরাজ্য
৮.
ভিক্ষায়াং নৈব নৈব চ
৯.
স্ত্রী-মজুর
১০.
প্রাচীন-পুঁথি উদ্ধার
১১.
ক্যাথলিক সোশ্যালিজ্‌ম্‌
১২.
আমেরিকানের রক্তপিপাসা
১৩.
সুখ দুঃখ
১৪.
সোশ্যালিজ্‌ম্‌
১৫.
প্রাচীন শূন্যবাদ
১৬.
পরিবারাশ্রম
১৭.
মানুষসৃষ্টি
১৮.
জিব্রল্টার বর্জন
১৯.
পলিটিক্স্‌
২০.
কন্‌গ্রেসে বিদ্রোহ
২১.
ভারত কৌন্সিলের স্বাধীনতা
২২.
পুলিস রেগুলেশন বিল
২৩.
ভারতবর্ষীয় প্রকৃতি
২৪.
ধর্মপ্রচার
২৫.
ইণ্ডিয়ান রিলিফ সোসাইটি
২৬.
উদ্দেশ্য সংক্ষেপ ও কর্তব্য বিস্তার
২৭.
হিন্দু ও মুসলমান
২৮.
কন্‌গ্রেসে বিদ্রোহ
২৯.
রাষ্ট্রীয় ব্যাপার
৩০.
ফেরোজ শা মেটা
৩১.
বেয়াদব
৩২.
কথামালার একটি গল্প
৩৩.
চাবুক-পরিপাক
৩৪.
জাতীয় আদর্শ
৩৫.
অপূর্ব দেশহিতৈষিতা
৩৬.
কুকুরের প্রতি মুগুর
৩৭.
ইংলন্ডে ও ভারতবর্ষে সমকালীন সিবিল সর্বিস পরীক্ষা
৩৮.
মতের আশ্চর্য ঐক্য
৩৯.
ইংরাজি ভাষা শিক্ষা
৪০.
জাতীয় সাহিত্য
৪১.
ভ্রম স্বীকার
৪২.
চিত্রল অধিকার
৪৩.
ইংরাজের লোকপ্রিয়তা
৪৪.
ইংরাজের স্বদোষ-বাৎসল্য
৪৫.
ইংরাজের লোকলজ্জা
৪৬.
প্রাচী ও প্রতীচী
৪৭.
নূতন সংস্করণ
৪৮.
জাতিভেদ
৪৯.
বিবাহে পণগ্রহণ
৫০.
ইংরাজের কাপুরুষতা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%