আমেরিকার সমাজচিত্র

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিখ্যাত ইংরাজলেখক হ্যামিল্টন আইডে লিখিতেছেন যে, যদিও আমেরিকায় আইরিশ হইতে আরম্ভ করিয়া কাফ্রি এবং চীনেম্যান প্রভৃতি বিচিত্র জাতির সমাবেশ হইয়াছে তথাপি তাহাদের মধ্যে একটা স্বভাবের ঐক্য দেখা যায়। যাহার টাকাকড়ি আছে সে আপন নিবাসস্থান শহরের উন্নতির জন্য যথেষ্ট অর্থব্যয় করা প্রধান কর্তব্য বোধ করে। তাহা ছাড়া খাঁটি মার্কিন, বিশ্রাম কাকে বলে জানে না; একদণ্ড স্থির থাকিতে হইলে তাহার প্রাণ ওষ্ঠাগত হইয়া যায়। নিজের কাজই করুক বা সাধারণের কাজেই লিপ্ত থাকুক প্রাণপণ খাটুনির ত্রুটি নাই। চিকাগো শহর একবার আগুন লাগিয়া ধ্বংস হইয়া গেল আবার দেখিতে দেখিতে কয়েক বৎসরের মধ্যে এমনি কাণ্ড করিয়া তুলিল যে, আজকাল অত বড়ো শহর মুল্লুকের মধ্যে আর দ্বিতীয় নাই। ইংরাজ যেখানে হতাশ্বাস হইয়া নিরস্ত হয়, মার্কিন সেখানে কিছুতেই দমে না। ব্যবসায়ে একবার যথাসর্বস্ব খোয়াইয়া পুনর্বার নবোদ্যমে অর্থসঞ্চয় আমেরিকায় প্রতিদিন দেখা যায়। ইহারা হাল ছাড়িয়া দিবার জাত নয়। ইংরাজের একান্ত অধ্যবসায় দেখিয়া আমাদের তাক লাগিয়া যায়, ইংরাজ আবার আমেরিকার অপ্রতিহত উদ্যম দেখিয়া ধন্য ধন্য করিতেছে।

কিন্তু লেখক বলেন, অবিশ্রাম কাজ করিয়া ইহারা যে সুখী আছে তাহা বলা যায় না। পুরুষদের মধ্যে অতিরিক্ত শ্রমের পর শ্রান্তি এবং মেয়েদের মধ্যে নিয়ত চাঞ্চল্য ও পরিবর্তনপ্রিয়তাকে সুখের অবস্থা বলা যায় না। আমেরিকায় দেখা যায়, উচ্চ শ্রেণীর নাট্যাভিনয় অপেক্ষা ভাঁড়ামি মস্করামি প্রভৃতিতে অধিকসংখ্যক লোক আকৃষ্ট হয়। লোকেরা এত অধিক মাত্রায় পরিশ্রম করে যে, অবসরের সময় তাহারা নিছক আমোদ চায়, যাহাতে মনোযোগ, চিন্তা বা মনোবৃত্তি বেশি উদ্রেক করে এমন কিছুই তাহাদের সহ্য হয় না।

মেয়েরা কেবলই বিষয় হইতে বিষয়ান্তরে চঞ্চলভাবে উড়িয়া বেড়াইতেছে। শহর হইতে দূরে আপনার নিভৃত কুটিরের মধ্যে গার্হস্থ্য এবং গ্রাম্য কর্তব্য লইয়া দিনযাপন করা মার্কিন মেয়ের পক্ষে অসাধ্য। কোথায় ব্রাউনিং সম্বন্ধে ব্যাখ্যা হইতেছে, কোথায় বাগ্‌নারের সংগীত সম্বন্ধে তর্ক চলিতেছে; কোথায় কোন্‌ পণ্ডিত আজ্‌তেক জাতির বিররণ সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতেছে, কোথায় ভূতনামানো হইতেছে, চঞ্চল কৌতূহল লইয়া সর্বত্রই আমেরিকানি উপস্থিত আছেন। সাধারণ ইংরাজ মেয়ে বিদ্যালয় ছাড়িলেই মনে করে শিক্ষা সমাপ্ত হইল, কিন্তু মার্কিন মেয়ে একটা-না-একটা কোনো অধ্যয়ন লইয়া লাগিয়া আছেই। সকলেরই প্রায় ক্ষুদ্র পরিবার এবং দুটি-চারিটি চাকর, গৃহকর্ম সামান্য, এইজন্য মেয়েরা আমোদ অথবা শিক্ষা লইয়া চঞ্চলভাবে ব্যাপৃত থাকে। অনেক গৃহস্থ আপন কন্যাদিগকে শিক্ষার্থে য়ুরোপে প্রেরণ করেন। তাঁহারা বলেন, আমেরিকায় মেয়েরা বড়ো শীঘ্র পাকা হইয়া যায়। নিতান্ত অল্প বয়স হইতেই লোকলৌকিকতা আমোদ-অনুষ্ঠানে সকলের সহিত সমকক্ষভাবে দেখা-সাক্ষাৎ ও প্রেমাভিনয়ে অকালেই তাহাদের তারুণ্যের স্নিগ্ধ সৌরভ দূর হইয়া যায়। যাহা হউক, ইংরাজলেখক বলিতেছেন এমন অতিকর্মশলীতা এবং অতিচাঞ্চল্য সুখের অবস্থা নহে।

সকল অধ্যায়
১.
মণিপুরের বর্ণনা
২.
আমেরিকার সমাজচিত্র
৩.
পৌরাণিক মহাপ্লাবন
৪.
মুসলমান মহিলা
৫.
প্রাচ্য সভ্যতার প্রাচীনত্ব
৬.
ক্ষিপ্ত রমণীসম্প্রদায়
৭.
সীমান্ত প্রদেশ ও আশ্রিতরাজ্য
৮.
ভিক্ষায়াং নৈব নৈব চ
৯.
স্ত্রী-মজুর
১০.
প্রাচীন-পুঁথি উদ্ধার
১১.
ক্যাথলিক সোশ্যালিজ্‌ম্‌
১২.
আমেরিকানের রক্তপিপাসা
১৩.
সুখ দুঃখ
১৪.
সোশ্যালিজ্‌ম্‌
১৫.
প্রাচীন শূন্যবাদ
১৬.
পরিবারাশ্রম
১৭.
মানুষসৃষ্টি
১৮.
জিব্রল্টার বর্জন
১৯.
পলিটিক্স্‌
২০.
কন্‌গ্রেসে বিদ্রোহ
২১.
ভারত কৌন্সিলের স্বাধীনতা
২২.
পুলিস রেগুলেশন বিল
২৩.
ভারতবর্ষীয় প্রকৃতি
২৪.
ধর্মপ্রচার
২৫.
ইণ্ডিয়ান রিলিফ সোসাইটি
২৬.
উদ্দেশ্য সংক্ষেপ ও কর্তব্য বিস্তার
২৭.
হিন্দু ও মুসলমান
২৮.
কন্‌গ্রেসে বিদ্রোহ
২৯.
রাষ্ট্রীয় ব্যাপার
৩০.
ফেরোজ শা মেটা
৩১.
বেয়াদব
৩২.
কথামালার একটি গল্প
৩৩.
চাবুক-পরিপাক
৩৪.
জাতীয় আদর্শ
৩৫.
অপূর্ব দেশহিতৈষিতা
৩৬.
কুকুরের প্রতি মুগুর
৩৭.
ইংলন্ডে ও ভারতবর্ষে সমকালীন সিবিল সর্বিস পরীক্ষা
৩৮.
মতের আশ্চর্য ঐক্য
৩৯.
ইংরাজি ভাষা শিক্ষা
৪০.
জাতীয় সাহিত্য
৪১.
ভ্রম স্বীকার
৪২.
চিত্রল অধিকার
৪৩.
ইংরাজের লোকপ্রিয়তা
৪৪.
ইংরাজের স্বদোষ-বাৎসল্য
৪৫.
ইংরাজের লোকলজ্জা
৪৬.
প্রাচী ও প্রতীচী
৪৭.
নূতন সংস্করণ
৪৮.
জাতিভেদ
৪৯.
বিবাহে পণগ্রহণ
৫০.
ইংরাজের কাপুরুষতা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%