শৈলেন ঘোষ

হিমসাগরের রঙ যেমন রুপো-ঝরানো সাদা, শরৎরানীর আকাশ যেমন হাসি-মাখানো নীল, ভোরবেলাকার সূর্যি যেমন সোনা-ছড়ানো রঙিন, তেমনি যেন সকল রঙের রঙ-মেশানো ছবি-সাজানো একটি রাজবাড়ি।
আর?
সন্ধ্যারাতের একটি তারা যেমন হাসে ঝলমল, গাছের ডালে একটি পাখি যেমন নাচে ঝুমঝুম, পদ্মপাতায় শিশির ফোঁটা যেমন দোলে টলমল, রাজবাড়িতে একটি তেমন রাজকন্যা।
রাজকন্যে সাত বছরের ছোট্টটি।
কন্যের মুখটি যেমন মিষ্টি, মুখের কথা তেমন মিষ্টি।
গায়ের রঙটি যেমন মিষ্টি, গলার গানটি তেমন মিষ্টি।
কিন্তু সবচেয়ে মিষ্টি কী?
রাজকন্যের মিষ্টি মুখের হাসি। রাজকন্যে হাসলে যেন চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ে। ফিনিক দিয়ে।
হঠাৎ এক কাণ্ড হল! কী হল?
রাজকন্যে হাসতে ভুলে গেল।
সে কী!
রাজকন্যে আর হাসে না।
সাত-সাতটি দিন পেরুল। রাজকন্যা হাসে না।
সাত-সাতটি রাত কাটল। রাজকন্যা হাসে না।
রাজকন্যার মুখ ভার। মুখ তার অন্ধকার। কে তার হাসি চুরি করল?
রাজবাড়িও অন্ধকার।
রানীমার চোখ টলমল। চোখের জলে বুক ভেসে যায়।
রাজামশাই ভেবে ভেবে কান্না চাপেন। বুক ভেঙে যায়।
কবরেজ এল। হাকিম এল। বদ্যি এল। তিনমুণ্ডু এক করল। মাথার ঘাম পায়ে ফেলল। সাতশো পাতার ফর্দ এঁটে সটকে গেল। কিছুতেই কিছু হল না। রাজবাড়িতে হায়-হায় পড়ে গেল। অমন যে সোনার টুকরো মেয়ে তার একী হল!
তারপর?
ডিড্ডিম, ডিড্ডিম-ডিম। ঢেঁড়া পড়ল। এ-রাজ্যে সে-রাজ্যে ঢাকিরা ঢাক পিটিয়ে পিটিয়ে হেঁকে গেল, “রাজার মেয়ের হাসি চুরি গেছে। রাজকন্যে হাসতে ভুলেছে। যে মেয়ের মুখে হাসি ফিরিয়ে এনে দেবে, রাজা তাকে রাজ্য দেবেন।”
ঢেঁড়া পড়ল, আশ্চর্য! কেউ এল না!
এক দিন যায়। দু’ দিন যায়। তিন দিন যায়। চার-পাঁচ-ছ’ দিন যায়। তবু কেউ এল না।
হায়! হায়! কেউ বুঝি এল না সত্যি আর! আর বুঝি পেল না রাজকন্যা হাসি ফিরে, তার মিষ্টি মুখে!
ছ’দিনের রাত গড়াল।
রাত গড়িয়ে ভোর হল।
সূর্যিঠাকুর মুখ তুলল।
আলো ফুটল।

পাখি ডাকল।
রাজকন্যের ঘুম ভাঙল।
ঠিক তক্ষুনি রাজরাড়ির সিংদরজায় ঘা পড়েছে। কে যেন কাঁপা গলায় গেয়ে উঠেছে, “জয় হোক রানীমার। জয় হোক রাজামশায়ের।”
দ্বারী হাতের লাঠি ঠুকে হাঁক দিলে, “কৌন হ্যায়।”
“আমি হ্যায় বাবা, আমি হ্যায়।”
দ্বারী সিংদরজার সামনে এল। দেখল এক খুনখুনে বুড়ি দাঁড়িয়ে। লাঠি ধরে ঠকঠক করে কাঁপছে।
দ্বারীকে দেখে বুড়ি বললে, “আমি রাজামশায়ের সঙ্গে দেখা করব। আমি রাজকন্যার অসুখ সারাব বলে এসেছি।”
বুড়ির মুখের কথা শেষ আর হল না।
দ্বারী হাঁকল।
সেপাই ছুটল।
শান্ত্রী নাচল।
মন্ত্রী উঠল।
সবাই জুটল।
রাজবাড়ি সরগরম। হৈ-হৈ, রৈ-রৈ। সাড়া পড়ে গেল, “এসেছে, এসেছে।”
রাজবাড়ির তুলসী মঞ্চ। সেখানে সকালের রোদ এসে পড়েছে। ছড়িয়ে গেছে সোনার রোদ। সোনার মেয়ে সেই রোদে এসে বসল। বুড়ি বসল তার সামনে। হাঁ করে চেয়ে রইল বুড়ি রাজকন্যার মুখের দিকে। অনেকক্ষণ। বসে থাকতে থাকতে একটি তুলসী পাতা ছিঁড়ে নিল বুড়ি গাছ থেকে। খকখক করে কেশে উঠল। তুলসী পাতাটা রাজকন্যার মাথায় ছিঁড়ে, ছড়িয়ে দিলে। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললে। তারপর বললে, “হয়েছে মা। এবার তুমি যাও। খেলা করগে।”
তুলসীমঞ্চের পাশ থেকে রাজকন্যা উঠে গেল দাসীর ঘরে। আর গম্ভীর মুখে বুড়ি উঠে গেল রানীর ঘরে।
রানী কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী দেখলেন মা? মায়ের আমার কী হয়েছে?
বুড়ি ভারী গলায় উত্তর দিলে, “তোমার মেয়ের হাসি চুরি যায় নি মা। হাসি ফুরিয়ে গেছে।”
চমকে উঠলেন রানী! জিজ্ঞেস করলেন, “সে আবার কী! কেমন করে হাসি ফুরয়?”
বুড়ি মাথা নাড়লে। ফোকলা দাঁতে হেঁ-হেঁ করে হাসলে। হাসতে হাসতে বললে, “হয় মা, হয়। কেমন জান? এই যেমন সোনার বাটি ভর্তি দুধে চুমুক দিলে দুধ ফুরয়। যেমন গাওয়া ঘি ভর্তি সোনার পিদিমে আলো জ্বলতে জ্বলতে ঘিও ফুরয়, পিদিমও নেভে। তেমনি হাসতে হাসতে হাসিও নেভে। ফুরিয়ে যায়। এতে অবাক হবার কিচ্ছু নেই।”
রানীর চোখ দুটি ছলছল করে উঠল। বললে, “তা হলে মেয়েকী আমার আর কোনদিন হাসবে না?”
বুড়ি আবার ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললে, “হাসবে গো, হাসবে। কিন্তু ব্যামোটা বড় কঠিন রকমের। দাওয়াই যোগাড় করাও তেমনি শক্ত। পারবে কি তোমরা?”
সোনার প্রতিমার মত রাজরানী। বুড়ির পায়ের কাছে আছাড় খেয়ে লুটিয়ে পড়লেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “পারব মা, পারব। আমার বুকের বাছা ঐ একটি মেয়ে। তার মুখে হাসি ফিরিয়ে আনার জন্যে যা বলবে, আমরা তাই করব।”
“বেশ! তাহলে একটু থির হও মা লক্ষ্মী! ওষুধটা মন দিয়ে শুনে নাও।”
রানী হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কী মা? ওষুধটা কী?”
বুড়ি বললে, “হাতি।”
রাজা অবাক হলেন, “হাতি!”
রানী চমকালেন, “হাতি!”
“হ্যাঁ মা, হ্যাঁ। হাতি! একটি সাত বছরের হাতি। তোমার মেয়ের যেদিন জন্ম, ঠিক সেইদিনে জন্মেছে যে-হাতি, তার কান্না যখনই তোমার মেয়ের কানে পৌঁছবে, তখনই ও আবার হাসবে। ওর হাসি ফিরে আসবে।”
রাজা গালে হাত দিয়ে বসে পড়লেন, “এমন হাতি পাই কোথা?”
রানী হতাশ হয়ে কেঁদে পড়লেন, “হাতির খোঁজে যাই কোথা?”
বুড়ি বললে, “সে-কথাটাও শুনে নাও। একদল লোক পুবে পাঠাও। একদল লোক পশ্চিমে হাঁটাও। একদল লোক দক্ষিণ ছাড়ুক। একদল লোক উত্তর বাড়ুক। এই চারদল লোক চলতে চলতে যেখানে গিয়ে মিলবে, ঠিক সেখানে এই হাতিটি দেখতে পাবে।”
অমনি সাজ সাজ রব পড়ে গেল। চারদিকে চার হাজার রাজসৈন্য হাতির খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
একদল যায় মরুর দেশে।
একদল যায় গহন বনে।
একদল যায় পাহাড় চূড়ায়।
একদল যায় নদীর বুকে।
পাহাড় চূড়ায় শব্দ ওঠে।
নদীর জলে তুফান ছোটে।
গহন বনে গাছের কাঁপন।
মরুর দেশে বালির নাচন।
যেতে যেতে সাত মাস সাত দিন কেটে গেল। চারদিক থেকে চার হাজার রাজসৈন্য এক জায়গায় এসে পড়ল। মিলে গেল।
এ এক বন। গভীর বন। এই বনে চার হাজার রাজসৈন্য তাঁবু গেড়ে বনের এ-কোণ, সে-কোণ ঘুরে ঘুরে সাত বছরের হাতি খুঁজতে লাগল।
ক’দিন কেটে গেল। কিন্তু হাতি কই?
একদিন হঠাৎ সবাই থমকে গেল। কে যেন গান গায়!
গভীর বন। গাছের ছায়ায় অন্ধকারে পথ-পাথালির চিহ্ন নেই। জন-মানুষের দেখা নেই। অথচ গান গায় কে?
সঙ্গে সঙ্গে হুস-হাস। ফুস-ফাস। চার হাজার রাজসৈন্য চার হাজার গাছের ফাঁকে লুকিয়ে পড়ল। চুপচাপ। ঘাপটি মেরে তাকিয়ে রইল।
গানের সুর এগিয়ে আসছে। কাছে।
আরও কাছে।
তারপর কী দেখল চার হাজার রাজসৈন্য? দেখল, একটি ছোট্ট হাতি। হাতির পিঠে একটি ছোট্ট ছেলে। দুলছে। গান গাইছে। এগিয়ে আসছে। আঃ কী মিষ্টি গান!
আর কী দেখতে হয়! চার হাজার সৈন্য। আট হাজার হাত ওপরে তুললে। “হা-রে-রে রে” করে চেঁচিয়ে উঠল। হাতির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ছেলের গান চমকায়।
হাতির চলন থমকায়।
এক হাজার চেঁচাল, “নাম কী?”
এক হাজার চেঁচাল, “বাড়ি কোথা?”
এক হাজার চেঁচাল, “কার হাতি?”
এক হাজার চেঁচাল, “বয়স কত?”
ছেলেটা সামলে নিলে। আস্তে বললে, “আজ্ঞে আমার নাম মংলু। আমার হাতির নাম রাজপুত্তুর। আমার বন্ধু। হাতির বয়স সাত। আমার বয়স সাত। আজ্ঞে আপনারা কারা?”
মংলুকে আর কথা কইতে হল না। চার হাজার রাজসৈন্য চেঁচিয়ে উঠল, “মার-মার, ধর-ধর, কাট-কাট!” ঝাঁপিয়ে পড়ল হাতির ওপর। মংলুকে হাতির পিঠ থেকে তুলে নিলে। পাখির মত আকাশে ছুঁড়ে দিলে। মংলু, “ও মা গো” বলে ককিয়ে কেঁদে উঠল। আকাশ থেকে আছাড় খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
লোহার শেকল বাঁধা হল হাতির পায়ে।
লোহার শেকলের ফাঁস লাগল হাতির গলায়।
“হেঁইও মারি জোয়ান ঠেলা,” চার হাজার রাজসৈন্য হাঁক পাড়লে! শেকলে টান মারলে। হাতিকে নিয়ে চলল। টানতে টানতে।
“ছেড়ে দাও, আমার হাতিকে ছেড়ে দাও।” মংলু ছোট্ট দুটি হাত বাড়ালে। রাজসৈন্যের পায়ে পায়ে লুটিয়ে লুটিয়ে কেঁদে উঠল।
চার হাজার রাজসৈন্য, তারা শুনবে না মংলুর কথা। তারা দেখবে না মংলুর দিকে চেয়ে। তারা মাড়িয়ে দিল মংলুকে। মাটিতেমুখ থুবড়ে পড়ে গেল মংলু। পড়ল, আবার উঠল। না, সে ছাড়বে না। কিছুতেই যেতে দেবে না তার বন্ধুকে। তার রাজপুত্তুরকে। ছুট্টে গিয়ে মংলু পড়ে গেল রাজপুত্তুরের পায়ের সামনে। ঠেলে দিল তাকে রাজসৈন্যরা। মংলু রাজসৈন্যের পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে লুটিয়ে কেঁদে পড়ল, “ওগো ছেড়ে দাও, ওগো ছেড়ে দাও।”
শুনল না রাজসৈন্যরা। তারা মংলুকে একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেললে। বেঁধে, হাতিকে টানতে টানতে বন পেরুল। মাঠ ছাড়ল। ঘাট ডিঙুল। মংলুর চোখের আড়ালে চলে গেল।
মংলু গাছের বুকে মাথা ঠুকে, গাছের বুকে হাত জড়িয়ে হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল।
কাঁদতে কাঁদতে দিন গড়াল।
রাত ফুরুল। আলো ফুটল।
কেউ এল না মংলুর কান্না শুনে।
গভীর বনে মংলু ক’দিন কাঁদল, কেউ শুনল না। ক’দিন ধরে একটি ছোট্ট ছেলের কান্না বনে বনে, গাছে গাছে ফিরেছে, কেউ জানল না।
একদিন মংলুও জানতে পারল না কিচ্ছু। জানতে পারল না, আলো নিভছে, না জ্বলছে। দিনের আলো ফুটছে, না রাতের কালো নামছে। দিনের পাখি ডাকছে, না রাতের পেঁচা হাঁকছে। কাঁদতে কাঁদতে নিভে গেছে মংলুর দুটি চোখের দুটি তারা। চিরদিনের মত। মংলু অন্ধ।
একদিন আর পারছিল না মংলু। কাঁদতে পারছিল না। ভাঙা বাঁশির সুরের মত ওর কান্না ভেসে আসছিল। থেকে থেকে।
কে যেন ডাকল এমন সময়, “কেঁদো না মংলু, কেঁদো না। আমি আছি। ভয় কী?”
আহা! কী মিষ্টি গলা!
ফিরে তাকাল। দেখতে পেল না। তার চোখে আলো কই? সে যে অন্ধ! চারিদিক অন্ধকার।
“আমি বলছি তুমি আবার তোমার রাজপুত্তুরকে ফিরে পাবে। তোমার সব দুঃখের শেষ হবে।”
বলতে বলতে কে যেন ওর বাঁধন খুলে দিচ্ছে!
মংলু বুঝতে পারল না, কে? কিন্তু আর সবাই দেখল। দেখল বনের গাছ। দেখল বনের ফুল। দেখল বনের লতাপাতা। এ-যে বনের দেবী!
বনদেবী হাতটি বাড়িয়ে দিল মংলুর হাতে। বললে, “এস মংলু। তোমায় রাজপুত্তুরের কাছে নিয়ে যাব।”
বনদেবীর হাত ধরলে মংলু। অন্ধ চোখে কাঁদতে কাঁদতে বনের পথে পা বাড়াল।
বনের পথে মংলু কাঁদছে অন্ধ চোখে রাজপুত্তুর-হাতির জন্যে।
রাজবাড়িতে রাজপুত্তুর-হাতি কাঁদছে মংলুর জন্যে।
কই? হাতির কান্না শুনে রাজকন্যা তো হাসি ফিরে পায় নি?
তবে?
সেদিন ভোর হল।
রাজবাড়ির সিংদরজার সামনে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। সে ডাকছে চেঁচিয়ে, “রাজপুত্তুর-র-র।”
দ্বারী তেড়ে এল, “কে রে?”
সে বললে, “আমার রাজপুত্তুর কোথা? আমার রাজপুত্তুর? কোথা তাকে বন্দী করে রেখেছ?” আবার ডাকল সে, “রাজপুত্তুর র-র।”
দ্বারী দেখল, একটা অন্ধ ছেলে। “হট” বলে এক ঠেলা মারলে। ফেলে দিলে রাস্তায়।
ঠিক তখুনি রাজকন্যা যাচ্ছিল দাসীর হাত ধরে। তার হাতে ফুলের সাজি। সে যাচ্ছে মন্দিরে।
দাসীর হাত ছাড়িয়ে নিল রাজকন্যা। ফুলের সাজি ফেলে দিল। ছুটে এল। দ্বারীর হাত ধরে আকুল হয়ে বললে, “না, না। মের না,মের না ওকে।”
তুলে নিল রাজকন্যা অন্ধ ছেলেকে ধুলো থেকে। গায়ের ধুলোঝেড়ে দিলে। জিজ্ঞেস করলে, “কী হয়েছে ভাই তোমার? খিদে পেয়েছে?”
“না।”
“ভিক্ষা নেবে?”
“না, না।”
“কাপড় চাইছ?”
“না, না, না। আমার রাজপুত্তুরকে ফিরিয়ে দাও।”
রাজকন্যা অবাক হল। জিজ্ঞেস করল, “কে তোমার রাজপুত্তুর? আমার তো কোন ভাই নেই!”
“তোমার ভাই কেন হবে? রাজপুত্তুর আমার বন্ধু। আমার হাতি। তোমাদের লোকেরা তাকে ধরে এনেছে। বেঁধে এনেছে।”
চমকে উঠল রাজকন্যা। আপন মনে ভাবল, “ও বুঝেছি। তাই দেখি ক’দিন ধরে হাতিশালে নতুন হাতি। ছোট্ট হাতি। তাই বলি ছোট্ট হাতি কাঁদে কেন রাতদিন।”
রাজকন্যে দ্বারীর দিকে ঘুরে দাঁড়াল। চেঁচিয়ে উঠল, “ছেড়ে দাও, পথ ছেড়ে দাও।”
দ্বারী ভয়ে সরে গেল।
অন্ধ ছেলের হাত ধরল রাজকন্যা। বললে, “আমার সঙ্গে এস।” ছুট দিল রাজকন্যা রাজপুরীর হাতিশালের দিকে।
অন্ধ ছেলে রাজকন্যার হাত ধরে ছুটতে লাগল। ডাকতে লাগল, “রাজপুত্তুর-র-র।
আহা! হাতিশালে কাঁদছেরাজপুত্তুর! তার পায়ে শেকল বাঁধা। কাঁদছিল আপন মনে। মংলুর জন্যে।
কাঁদতে কাঁদতে হটাৎ চমকে ওঠে হাতি। কে যেন ডাকে তার নাম ধরে! এ যে তার চেনা গলা! এ যে তার মংলুর সুর।
হ্যাঁ, সত্যিই তো! ঐ তো তার মংলু। রাজকন্যার হাতটিধরে ছুটে আসছে!
আর দেখতে হয়! কোথায় কান্না আর কোথায় কী! নেচে উঠল হাতি। মাথায় শুঁড় দুলে উঠল। কানের পাতা কেঁপে উঠল। হেলে-দুলে-গড়িয়ে ডেকে উঠল।
মংলু দু’ হাত বাড়িয়ে আকুল হয়ে এগিয়ে গেল। বললে, “কই? কই? কই, তুই রাজপুত্তুর?”
রাজকন্যা হাতটি ছুঁয়ে মংলুকে নিয়ে গেল রাজপুত্তুরের কাছে। অমনি রাজপুত্তুর শুঁড়টি দিয়ে জড়িয়ে ধরল মংলুকে। পিঠে তুলে নিল।
মংলু দুটি হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল রাজপুত্তুরের গলাটি। জড়িয়ে ধরে হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল। সে কী কান্না! সমস্ত আকাশ ভেঙে যেন মেঘের কান্না! কাঁদতে কাঁদতে বললে, “আমি আর দেখতে পাই না রে, দেখতে পাই না। তোর জন্যে কেঁদে কেঁদে আমার চোখ গেছে। কই, তোর মুখখানা কই?”
রাজকন্যা কেঁদে ফেললে। মাহুতকে বললে, “খুলে দাও। এক্ষুনি হাতির পায়ের শেকল খুলে দাও।”
রাজকন্যার কথা কে ঠেলবে? হাতির বাঁধন খুলে গেল।
মংলুকে পিঠে নিয়ে বেরিয়ে এল রাজপুত্তুর হাতিশাল থেকে। বাইরে। হাঁটা দিল।
“শোন।” ডাকল রাজকন্যা হঠাৎ। ওর গাল দুটি ভেসে গেছে চোখের জলে। “শোন ভাই।”
হাতি দাঁড়াল।
রাজকন্যা বললে, “আমার বাবা তোমার রাজপুত্তুরকে ধরে এনেছেন। রাজপুত্তুরের জন্যে কেঁদে কেঁদে তোমার চোখ দুটিও হারিয়ে গেছে। কেউ জানবে না এ-কথা কোনদিন। কেউ জানবে না তোমার এ দুঃখের কথা। জানলেও কেউ তো আর পারবে না তোমার চোখ দুটিতে আলো ফিরিয়ে দিতে। আমি ছোট্ট। সত্যি বলছি আমি কিচ্ছু জানি না। আমি কোন দোষ করি নি। শুধু একটি কথা তোমায় বলব। রাখবে?”
“কী কথা?”
“একটিবার তুমি হাতির পিঠ থেকে নেমে আমার কাছে আসবে?”
রাজপুত্তুর শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ধরল মংলুকে। নামিয়ে দিল রাজকন্যার পাশে।
আঁচল দিয়ে মংলুর চোখের জল মুছিয়ে দিল রাজকন্যা। চুনি-পান্নার হারটি খুলে নিল নিজের গলার থেকে। পরিয়ে দিল মংলুর গলায়।
মংলু চেঁচিয়ে উঠল, “না, না। চাই না আমার।”
কথা শেষ হল না। এ কী!
কী?
চুনি-পান্নার মালার আলো মংলুর গলায় দুলে উঠছে। যেন সেই মালার আলো তার চোখের তারায় ভেসে উঠছে! মংলুর চোখে যেন আলো নামছে। একটু-একটু। আরও একটু।
হ্যাঁ, সত্যিই তো! মংলু দেখতে পেয়েছে সকালের সোনার রোদ। সোনার রোদে রূপার চাঁদের মত একটি ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে। তার সামনে।
এ কী সত্যি!
সত্যি! সত্যি! সত্যি! হঠাৎ হেসে উঠল মংলু, “হা-হা-হা।”
ঝরনার সুরের মত মিষ্টি হাসি। ভোরের ফুলের মত রঙিন হাসি! হাসতে হাসতে গড়িয়ে গেল মংলু। ছুট্টে এসে জড়িয়ে ধরল রাজকন্যার হাতটি।
ওমা! অমনি রাজকন্যা হেসে উঠেছে, “হি-হি-হি!” এতদিনের হারিয়ে যাওয়া হাসি হঠাৎ ফিরে পেয়েছে রাজকন্যা। মুখখানি তার উছলে গেল আলোতে-হাসিতে। সে কী আনন্দের হাসি! কাঁচা রোদের মত সোনার হাসি।
ভোরের ফুল, কাঁচা রোদ, ঝরনার সুর সব মিলিয়ে সে একহাসির রাশি। সেই হাসির সুরে সুর মিলিয়ে রাজপুত্তুর তুলে নিল মংলুকে। তুলে নিল রাজকন্যাকে নিজের পিঠে।
ওপরে আকাশ। নীল। আলো তার উপচে গেছে। নীল আকাশের নিচে একটি মিষ্টি ছেলে, একটি মিষ্টি মেয়ে হাতির পিঠে বসে। ওরা দুলছে। দুলতে দুলতে এগিয়ে যাচ্ছে। ওরা হাসছে। হাসতে হাসতে তাকিয়ে দেখছে।
দেখতে পেয়েছেন রাজা। হেসে উঠেছেন।
দেখতে পেয়েছেন রানী। হেসে ফেলেছেন।
মন্ত্রী হেসেছেন।
শান্ত্রী হেসেছে।
সিপাই হেসেছে।
হেসেছে হাতিশালের হাতিগুলো। আস্তাবলের ঘোড়াগুলো।উটগুলো।
সব্বাই হেসেছে। হেসে কুটোকুটি হয়ে লুটোপুটি খেয়েছে। রাজবাড়িতে হাসির হাট বসে গেল।
কিন্তু কেউ দেখতেও পায় নি রাজকন্যার পুতুল-পুতুল মাছরাঙা সে-ও আজ মুচকি মুচকি হাসছে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন