শৈলেন ঘোষ

টুং। একটি ছেলের নাম।
কেউ যখন ডাকে ওর নাম ধরে, মনে হয় কে যেন টোকা মারল জলতরঙ্গে। বেজে উঠল টুং। ভারি মিষ্টি!
ভারি মিষ্টি ছেলেটি। ছোট্ট। ডাগর ডাগর দুটি চোখ। খুশির মত আলো ছড়িয়ে রয়েছে চোখ দুটিতে। চোখ দুটি মেলে থাকে টুং ঐদিকে। ঐ যেদিকে বনটা সুরু হয়েছে।
ছোট্ট ঘরটি তাদের। মাটির। বনের ধারে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন আঁকা ছবি। সত্যি! ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে ছবি। টুং এঁকেছে। রঙ-ঝিলমিল ফুল। লাল-টুকটুক পাখি। রূপা-ঝুরঝুর মাছ। বাবা কিচ্ছু বলে না টুংকে। ও যত পারে আঁকে। আঁকে আর মোছে। যখন পারে না টুং, বাবা এঁকে দেয়।
না, টুং-এর কেউ নেই বাবা ছাড়া। বাবা মাটির কাজ করে। মাটির কলসি গড়ে। হাঁড়ি-গেলাসে নক্সা কাটে। আলপনা দেয়। তারপর নৌকো চেপে হাটে যায়। সেখানে বেচে আসে। বাবা বলেছে, আর একটু বড় হলে টুংও যাবে। টুং যাবে হাটে। বাবারসঙ্গে। হাঁকতে হাঁকতে ফিরি করবে, “হাঁড়ি চাই, কুঁজো চাই। কলসি নে—বে।”
রোজ সন্ধেবেলা বাবা যখন হাট থেকে ফিরবে, জিলিপি কিনে আনবে টুং-এর জন্যে। একদিন জিলিপি। কোনদিন জিবেগজা। আর একদিন সিঁড়ির নাড়ু। ঘরে ফিরে ঢোলক বাজাবে বাবা। গান গাইবে।
টুংও ঢোলক বাজাতে পারে। বাবা যখন থাকে না ঘরে, টুং গলায় ঢোলক ঝুলিয়ে বাজায় আর গান গায়।
খুব সকাল সকাল উঠবে টুং। খুব সকাল। তখন একটু একটু আলো ফুটবে। একটু একটু সোনালী আলো গাছের পাতায় ছড়িয়ে পড়বে। একটি একটি পাখি ডাকবে। তখন ও ছুটবে। ঘর থেকে বাইরে। ছুটতে ছুটতে নদীর জলে লাফিয়ে পড়বে। নদীর জলে নেচে উঠবে। সাঁতার কাটবে। দুলবে। দুলতে দুলতে ইচ্ছে হয় নদীর ওপারে চলে যায় টুং। নদীর ওপারে, বনটা যেখানে খুব গভীর। কেউ যায় না ওদিকে। বাবা বলে, ওদিকে নাকি একটা দত্যি আছে! ভারিশয়তান! সে নাকি এক রাজকন্যাকে চুরি করে এনে বন্দী করে রেখেছে ঐ বনে।
মাঝে মাঝে মনে হয় ঐ গভীর বনে লড়াই করে আসে টুং শয়তানটার সঙ্গে।
ধ্যাৎ! ভয় না আর কিছু! বনে ঢুকতে একটুও ভয় করে না ওর। বাঘ না ঘেঁচু। ভালুক না ছাই। এক-এক দিন ও যখন শুকনো পাতা কুড়ুতে যায় বনে, ডাল ভেঙে আনে গাছের, তখন ভয় করে ওর? মোটেই না। তখন বাঁদরগুলো ওকে দেখে কেমন হুটোপাটি লাগিয়ে দেয় গাছে! ডালে ডালে! টুং তখন মজা করে চেঁচাবে, “এই বাঁদর, কলা খাবি, জয় জগন্নাথ দেখতে যাবি?” বাঁদরগুলো কিঁচ কিঁচ করে ডাকবে ওর কথা শুনে। লাফাবে কেমন!
একবার ছবি এঁকেছিল টুং কাগজে। একটা পাখির ছবি। ছবিরনিচে লিখেছিলঃ
“দত্যির হাতে বন্দিনী রাজকন্যার জন্যে আমার উপহার।
ইতি—তার অচেনা ভাই টুং।”
তারপর একটা বাঁদরকে “আয় আয়” বলে ডেকেছিল টুং। তাকে সত্যি সত্যি একছড়া কলা দিয়েছিল। হ্যাঁ, সেই ছবির কাগজটা একটা সুতো দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছিল বাঁদরের গলায়। বলেছিল, “বন্দিনী রাজকন্যাকে পৌঁছে দিবি।”

কি বুঝল কে জানে। হাতে কলা নিয়ে বাঁদরটা মারল লাফ। একেবারে গাছের ওপর। ছবিটা দুলছে গলায়। তারপর গাছে গাছে লাফাতে লাফাতে কোথায় যে চলে গেল জানে না টুং। দেখতেই পেল না আর।
না, আর কোনদিনই দেখতে পায় নি টুং সেই বাঁদরটাকে। কতদিন খুঁজেছে। হয়তো বাঁদরটা সত্যি সত্যি চলে গেছে সেই রাজকন্যার কাছে। এখন হয়তো বন্দিনী রাজকন্যা টুং-এর আঁকা ছবি দেখছে। হয়তো কাঁদছে। ভাবছে কে অচেনা ভাইটি তার!
বাঘ অবিশ্যি টুং কোনদিন দেখে নি। বাঘের ডাক শুনেছে। দেখলেই বা কী! বাঘকে মোটেই ভয় পায় না টুং। কতদিন তো ও বাঘ খুঁজেছে ঐ বনে বনে। তীর-ধনুক নিয়ে। অবিশ্যি বনের অনেক ভেতরে তো আর যাওয়া যায় না। কেউ-ই যেতে পারে না। তবু মাঝে মাঝে ওর যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে, বনের গাছের সঙ্গে গাছ হয়ে, ফুলের সঙ্গে ফুল হয়ে, বাঘের সঙ্গে বাঘ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তা তো হবার যো নেই!
আজ মেঘ করেছে৷
তখনও পর্যন্ত জানত না টুং আজ মেঘ করবে। কেমন করেজানবে? বাবা তো কোন সকালে হাটে বেরিয়েছে। আকাশ তখন রোদ-ঝিলমিল। এখন কালো ঘুরঘুট্টি। মেঘ করলে টুং-এর মনটা কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। জানলায় মুখটি বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে টুং। চেয়ে চেয়ে দেখে। দেখে বাইরেটা। আকাশটা। আর দেখে গাছে গাছে, সবুজে সবুজে ঢাকা বনটা। মেঘ যায় কোথা ঐ নীল আকাশের গা বেয়ে? ভাবে টুং।

টুপ টুপ! বিষ্টি নামল। মুখখানি খুশিতে উছলে গেল টুং-এর। ছুট্টে বাইরে বেরিয়ে গেল। চেঁচিয়ে ডাকল, “আয় বিষ্টি ঝেঁপে, ধান দেব মেপে।”
দেখতে দেখতে ঝমঝমিয়ে বিষ্টি নেমে এল। ছুট দিলে টুং। ছুটছে ও। জলে ভিজছে। ছুটবে ও যেদিকে পা দুটি যায়। গাছের পাতায় পাতায়, নাচছে বিষ্টির ফোঁটারা। মাটিতে নাচছে ওর পা দুটি। ও আজ থামবে না। মানবে না। চলে যাবে টুং বন্দিনী রাজকন্যার কাছে ছুটতে ছুটতে। ঐ বনের মধ্যে।
বনেই ঢুকল টুং। একেবারে ভিজে নেয়ে গেছে। বনের গাছে গাছে, সবুজ পাতার নিচে নিচে ও আনন্দে নেচে উঠল। গুড়-গুড়-গুড় মেঘ ডাকল, ও থামল না। কড়-কড়-কড় বাজ পড়ল, ও শুনল না। ও ছুটল। যেন হরিণ। ছোটে আর বনের সবুজে লুকিয়ে পড়ে। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে টুং। এদিক ওদিক। দেখে গাছ আর গাছ। শুধু গাছ। কই, ডালে ডালে আজ একটিও তো বাঁদর নেই! একটিও তো পাখি দেখতে পাচ্ছে না টুং! কাঠবিড়ালিরা তো ছুটছে না তুড়ুক-তুড়ুক, এডাল ওডাল। সব্বাই আজ লুকিয়ে পড়েছে। বাব্বা! বিষ্টিকে এত ভয়!
ভয় নেই টুং-এর একটুও। ও শুধু আজ একা। একা ঘরের বাইরে। ও তাই হাসবে। গাইবে। ডাকবে।
টুং সত্যি সত্যি ডাকল। ডাকল গাছের দিকে চেয়ে, “ও পাখি, ও পাখি, কোথা তোমরা?”
কোন সাড়া পেল না।
চেঁচাল, “কাঠবিড়ালি, কাঠবিড়ালি, বিষ্টিকে এত ভয়!”
সব চুপচাপ।
না, না, চুপ তো নয়! কী যেন একটা কুঁৎ কুঁৎ করে ডাকছে!
ছুটতে ছুটতে থামল টুং। থমকে চাইল। কিসের শব্দ! কে ডাকে? খুঁজল। বুনোগাছের ঝোপঝাড় হাত দিয়ে সরিয়ে দেখতে লাগল। হঠাৎ চমকে ওঠে টুং।
ওমা! ওমা! ওটা কী?
ছুট্টে এগিয়ে গেল টুং।
আরে! এ যে একটা ভালুকছানা! জলে-কাদায় গড়াগড়ি যাচ্ছে! ছিঃ ছিঃ! মা কোথা ওর?
টুং ভালুকছানার গায়ে হাত বুলালে। আহা-রে! কাঁপছে। কোলে তুলে নিল টুং। ছোট্ট তো! একদম কষ্ট হল না। চোখের দিকে চাইল টুং। চোখ দুটো কেমন পিটপিট করছে ছানার। মাথায় হাত দিলে। ইস! জলে ভিজে শপশপ করছে। মুছে দিলে। গায়ে কাদা লেগেছে, ফেলে দিলে। জিজ্ঞেস করলে, “তোর মা কোথা?”
ভালুকছানা কি টুং-এর কথা বুঝতে পারে? কী বুঝবে? কাঁপছে। কুঁৎ কুঁৎ কুঁৎ ডাকছে। জুলুক জুলুক চাইছে।
বুঝতে আর বাকি রইল না টুং-এর। মা পালিয়েছে। ঠিক পালিয়েছে। বিষ্টি দেখে ছেলেকে ফেলে পালিয়েছে। ইস! দয়া-মায়া নেই মায়ের! মা বুঝি আবার এমনি হয়? এমনি নিষ্ঠুর?
তবু ডাকল টুং, “ও ভালুকমা, ও ভালুকমা, তোমার ছেলে কাঁদছে।”
বয়েই গেছে। কে সাড়া দেবে? ভালুকমা কাছে-পিঠে থাকলে তবে তো! যা বিষ্টি!
তবু এধার ওধার একটু খুঁজল টুং।
পেল না দেখতে। ভাবলে, জলের মধ্যে, বনবাদাড়ে বেশিক্ষণ না থাকাই ভাল। ছানাটার অসুখ করলে! এখন ওকে নিয়ে ঘর যাই। পরে ওর মাকে খুঁজে বার করব।
ভালুকছানাকে কোলে নিয়ে ছুট দিল টুং। ঘরের দিকে।
ঘরে যখন পৌঁছুল তখনও বিষ্টি পড়ছে। কমে এসেছে অবিশ্যি। তখনও বাবা আসে নি। ভালুকছানার গাটা ও চটপট মুছে দিল।শুকনো শুকনো পাতা বিছিয়ে বিছানা করল। ছানাকে শুইয়ে দিলে। ছানার গায়ে বেশ করে একটা কাপড় চাপা দিলে। মাথার গোড়ায় বসল টুং। হাত বুলিয়ে দিল গায়ে-মাথায়। ঘুমিয়ে পড়ল ভালুকছানা। ঘুমুবে না? বাব্বা! কী কষ্ট! ঐটুকু তো প্রাণ! কতক্ষণ কষ্ট সইবে?
পরেরদিন ভালুকছানা চুক-চুক-চুক দুধ খেল। টুং-এর দিকে চেয়ে চেয়ে ফিক-ফিক-ফিক হাসল।
“দুষ্টু!” টুং গালটা টিপে দিলে ভালুকছানার। ভালুকছানা শুয়ে পড়ল মাটিতে। গড়াগড়ি লাগিয়ে দিলে। টুং হাততালি দিয়ে হেসে উঠল। নেচে উঠল। বললে, “চ, তোর মায়ের কাছে দিয়ে আসি।”
টুং ভালুকছানাকে নিয়ে বনে ছুটল।
টুং বনে বনে ডাকল।
বনে বনে ছুটল।
বনে বনে হাঁটল।
দেখতেই পেল না ভালুকছানার মাকে।
ফিরে এল টুং। আর যায় নি কোনদিন। গিয়ে কি হবে? যার ছেলে তারই মাথা-ব্যথা নেই! মনটা খারাপ হয়ে গেল টুং-এর।
তাই একদিন টুং বললে, “ভালুকছানা, ভালুকছানা, আমার সঙ্গে হাঁটবি?” বলে টুং হাঁটল।
টুং হাঁটল, টুক-টুক, টুক-টুক।
ভালুকছানা টুং-এর দিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগল, থুপ-থুপ, থুপ-থুপ।
আর একদিন টুং বললে, “ভালুকছানা, ভালুকছানা, আমার সঙ্গে ছুটবি?” বলে টুং ছুটল।
টুং ছুটল, পাঁই-পাঁই, সাঁই-সাঁই।
ভালুকছানা টুং-এর দিকে দেখতে লাগল। দেখতে দেখতেছুটতে লাগল, থপ-থপ, থপ-থপ।
টুংও ছোটে, ভালুকও ছোটে।
ছুটতে ছুটতে একেবারে নদীর সামনে। টুং লাফিয়ে পড়ল নদীর জলে।
নদী-নদী জল দেখে থমকে দাঁড়াল ভালুকছানা। দাঁড়িয়ে রইল ডাঙায় চুপটি করে। দেখতে লাগল। দেখতে লাগল নদীর জলে দোল খাচ্ছে টুং। ভারি মজা!
সেইবার নদীতে গেল ভালুকছানা টুং-এর সঙ্গে।
একবার শহরে গেল ভালুকছানা টুং-এর পিঠে।
হাটবার, হাটে গেল ভালুকছানা টুং-এর পিছে।
টুং-এর বন্ধু হয়ে গেল ভালুকছানা।
টুং খাবে, ভালুক চাইবে।
টুং ঘুমুবে, ছানা গড়াবে।
টুং হাসবে, ছানা নাচবে।
তাই একদিন টুং ঘরের দেওয়ালে ছবি আঁকতে বসল।
কী আঁকছে? কী আঁকছে?
ভালুক-ভালুক ছানা আকছে।
ভালুকছানার ছবি আঁকছে টুং, আর ছানা-ছানা ভালুকটা বসে বসে দেখছে।
আঁকতে আঁকতে ছবি আঁকা শেষ হল টুং-এর। কিন্তু দেখতে দেখতে দেখা আর শেষ হল না ভালুকছানার। সে দেখছে আর দেখছে।
তাই টুং ডাকল, “ভালুকছানা, আয়, আয়, খেলি আয়।”
ভালুকছানা ছবি-ছবি রঙ দেখছে। গেল না।
টুং বললে, “ভালুকছানা, আয়, আয়, খাবি আয়।”
ভালুকছানা ছানা-ছানা ছবি দেখছে। উঠল না।
টুং বললে, ভালুকছানা, আয়, আয়, শুবি আয়।”
ভালুকছানা ভালুক-ভালুক আঁক দেখছে। নড়ল না।
তখন টুং ঘরে গেল। ঢোলক নিলে। গলায় দিলে। টাক-ডুম-ডুম বোল বাজালে। গান ধরলে।
ছানা তখন তড়বড়িয়ে উঠে পড়ল। তার ছবি দেখা শেষ হল। নড়বড়িয়ে ঘরে ছুটল। ওমা! ওমা! নাচ ধরল। ঢোলক বাজে টাক-ডুম, টাক-ডুম। ভালুক নাচে ঝুমঝুম, ঝুমঝুম।
খিলখিল করে হেসে উঠল টুং। জড়িয়ে ধরল ভালুকছানাকে। নাচতে নাচতে গড়িয়ে পড়ল ভালুকছানা মাটিতে। হাসতে হাসতে ওর গালে একটা চুমু খেল টুং। ছুট্টে গিয়ে ভালুকছানার ছবির নিচে লিখে দিলঃ
আমার বন্ধু ঝুমঝুমি
ইতি
টুং
তারপর ভালুকছানার গলা জড়িয়ে বললে, “আজ থেকে তোর নাম ঝুমঝুমি! চ, খাবি চ।”
এদিকে ভালুকছানার মা একদিন খুঁজেছে ছানাকে। পায় নি।
দুদিন খুঁজেছে ছানাকে। পায় নি।
ক’দিন পরে ভালুকমা ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে নদীর ঘাটে এল। তখন খুব রাত্তির। নদীর জলে চিকচিক মাছেরা ঝিলমিল নাচছে। ছানা-পোনারা খেলছে। দুল-দুল দুলছে। ভালুকমা সেইদিকে, চেয়ে রইল। চেয়ে চেয়ে নিজের মনে কাঁদতে লাগল।
চিকচিক মাছেরা ঠিক দেখতে পেয়েছে ভালুকমাকে। ছানা-ছানা পোনাটা টুপ করে মুখটি তুললে। বললে, “ভালুকমা, ভালুকমা, ঘাপটি মেরে বসে কেন? আমাদের ধরবার মতলব! খাবে বুঝি? তা আর হচ্ছে না।” বলে, ছানা-ছানা পোনাটা জলের তলায় আবার টুপ করে ডুব মারলে। আর সব মাছেদের খিলখিল করে কী হাসি!
কথা শুনে ভালুকমা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
চিকচিক মাছেরা হাসতে হাসতে থামল। বললে, “ও ভালুকমা, ও ভালুকমা, কাঁদছ কেন গো?”
ভালুকমা বললে, “মাছ-চিকচিক, মাছ-চিকচিক, আমি তোদের খেতে আসি নি। আমার ছেলেকে খুঁজতে এসেছি।”
“খুঁজছ কেন?”
“আমার ছেলে যে হারিয়ে গেছে!”
“কে বললে হারিয়ে গেছে? হারায় নি তো!”
ভালুকমা বসেছিল। ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। ঘাড় বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলে, “তবে? তবে?”
“কেন, সে তো আছে টুং-এর কাছে।”
ভালুকমার মনটা নেচে উঠল। ছটফটিয়ে জিজ্ঞেস করলে, “কে? কে? সে কে? সে কে?”
“ওমা! টুংকে চেন না? টুং গো টুং। সে সাঁতার কাটে জলে।
কাঠ কাটে বনে।
ঢোলক বাজায় টাক-ডুম-ডুম।
ছবি আঁকে গাছ-মাছ-ফুল।”
ভালুকমা জিজ্ঞেস করলে, “মাছরে মাছ, ঝুন-ঝুন-ঝুন, কোথায় থাকে টুং?”
“আমরা কেমন করে জানব? আমরা থাকি জলে। সে থাকে ডাঙায়। গেছি কোনদিন তার বাড়িতে? খুঁজে নাও না।”
ভালুকমা মাছের কথা শুনে তক্ষুনি ছুটল টুং-এর বাড়ি খুঁজতে। ছুটল সেই রাত্তিরে। অন্ধকারে।
টুং-এর ঘর একটু দূরে নদীর ঘাট পেরিয়ে। একটু বাঁয়ে নদীর ঘাট ছাড়িয়ে।
ভালুকমা একটু একটু হাঁটে। একটু একটু ছোটে। এক-পা এক-পা থামে। এদিক ওদিক দেখে।
দেখতে দেখতে সামনে একটা ঘর পড়ল। ঘরের দাওয়ায় একটা ছাগল ঘুম দিচ্ছে।
ভালুকমা ডাক দিল, “ও ছাগল, ও ছাগল, এটা কি টুং-এর বাড়ি?”
ভালুকের ডাক শুনে ছাগলের ঘুম তো গেছে ভেঙে! চেয়েই চক্ষু ছানাবড়া! তিড়িং করে মারলে এক লাফ! মেরেই ছুট। ছুটল আর চেঁচাল, “ম্যা-এ্যা-এ্যা-এ্যা।”
ভালুকমা তো হতভম্ব! বললে, “যাঃ বাব্বা! ছাগল না তো, পাগল।”
ভালুকমা আবার হাঁটল।
হাঁটতে হাঁটতে আর একটা ঘর দেখলে। এগিয়ে গেল ভালুকমা ঘরের দিকে। দেখলে কী, ঘরের সামনে একটা গাধা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢুলছে।
ভালুকমা হাঁক দিল, “ও গাধা, ও গাধা, এটা কি টুং-এর বাড়ি?”
গাধার কোথায় ঢুলুনি আর কোথায় কী! ভালুক দেখে চার পা তুলে মারলে লাফ। বাপরে বাপ! বিকট হেঁকে ডাক পাড়লে, “ঘ্যাঙকু, ঘ্যাঙকু।” তারপর দে ছুট। দে ছুট।
ভালুকমা তো ভ্যাবাচাকা। বললে, “যাঃ চলে! গাধা নয় তো, খেঁদা!”
ভালুকমা আবার হাঁটা দিলে।
আর একটা ঘর। একটা হাঁস। বসে আছে। ডিমে তা দিচ্ছে। চুপচাপ।
ভালুক ডাকল, “ও হাঁসমা, হাঁসমা, এটা কি টুং-এর বাড়ি?”
আর দেখতে হয়! ভালুক দেখে হাঁসমায়ের পিলে শুকিয়ে গেল। ডিম ছেড়ে মার ছুট। ছুটতে ছুটতে হাঁক পাড়লে, প্যাঁক-প্যাঁক, প্যাঁক-প্যাঁক।”
ভালুকমা বললে, “দূর তোর! হাঁস নয় তো, হাঁদা!” বলেআবার পা ফেললে।
হাঁটতে হাঁটতে এবার থমকে দাঁড়ায় ভালুকমা।
কেন?
চমকে চায়।
কেন? কেন? কী দেখল?
পাগল-পাগল ছাগলটা?
না, না।
খেঁদা-খেঁদা গাধাটা?
না, না।
হাঁদা-হাঁদা হাঁসটা?
না, না।
তবে?
দেখল কী, একটা ছোট্ট ঘর।
দেওয়ালে দেওয়ালে ছবি।
ফুল-ফুল-ফুল।
মাছ-মাছ-মাছ।
পাখি-পাখি-পাখি।
আর?
ওমা! ওটা কী? ওটা কী ছবি?
একটা ভালুকছানার ছবি।
ভালুকমা ভালো করে দেখলে ছবির দিকে। তাই তো! তাই তো! ভালুকছানার ছবিই তো! কী যেন লেখা আছে ছবির নিচে! দেখতে পেল না ভালুকমা দূর থেকে। এগিয়ে গেল কাছে। হ্যাঁ, এবার স্পষ্ট দেখতে পেলে ভালুকমা। ছবির নিচে লেখাঃ
আমার বন্ধু ঝুমঝুমি
ইতি
টুং
আর দেখতে হয়! ভালুকমা দোর ঠেলল। ওমা! দোর তোবন্ধ নয়। ঠেলতেই খুলে গেল। উঁকি দিলে ভালুকমা ঘরের ভেতর। চমকে উঠল। ঐতো, ঐতো তার ছেলে! টুং-এর গলা জড়িয়ে ঘুমুচ্ছে। টুংও ঘুমুচ্ছে ভালুকছানার গলা জড়িয়ে।
আঃ! বুকখানা জুড়িয়ে গেল ভালুকমার। ইচ্ছে হল ছুট্টে যায় তক্ষুনি। টুংকে বুকে তুলে নেয়। ওর গালে চুমু খায়। এত ভালো টুং! দু’ চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল ভালুকমায়ের।
না, টুং-এর ঘুম না ভাঙে! ঘুম ভাঙতে দেবে না ভালুকমা। খুব আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকে গেল। খুব আস্তে। ধীরে ধীরে হাত দুটি সরিয়ে দিল টুং-এর। ঘুমন্ত ঠোঁট দুটি ওর কেঁপে উঠল। একবার। পাশ ফিরে আবার শান্ত হয়ে গেল টুং। ও ঘুমুবে এখন। অনেকক্ষণ।
ভালুকমা আস্তে আস্তে তুলে নিল ছানাকে নিজের কোলে। ঘর থেকে বেরুবার আগে চোখ মেলে দেখল ভালুকমা টুং-এর মিষ্টি মুখখানির দিকে আর একবার। ওর চোখ দুটি ঘুমে ডুবে আছে। কাল সকালে ও যখন উঠবে, যখন দেখবে ওর পাশটিতে বন্ধু নেই, ঐ চোখ দুটি জলে ভেসে যাবে হয়তো তখন।
দাঁড়াল না ভালুকমা। দোর ডিঙিয়ে, ঘর পেরিয়ে বনে পাড়ি দিল।
খুব সকালে উঠেছিল টুং সেদিন। সেদিন ও সবপ্রথম দেখেছিল তার বিছানার পাশটি। না, ছিল না ঝুমঝুমি। ভেবেছিল হয়তো ঝুমঝুমি আজ সকাল সকাল উঠেছে। বাইরে গেছে। এক-এক দিন তো ঝুমঝুমি ঘুম থেকে উঠেই বাইরে ছুটবে। ওর ভালো লাগে হয়তো। ভালো লাগে খুব সকালের মিষ্টি সোনা রোদ।একদিন ঝুমঝুমি একা একা নদীর ধারে চলে গেছল। দেখতে পেয়েছিল টুং। ভাগ্যিস! নইলে নদীর জলে পড়ে গেলে তখন? তখন কী হত?
ঘর থেকে ছুট্টে বেরিয়ে এল টুং বাইরে। ঘুম চোখে। ডাকল, “ঝুমঝুমি।”
না, ঝুমঝুমি এল না।
আবার ডাকল টুং, “ঝুমঝুমি-ই-ই-ই।”
এবারও দেখতে পেল না।
ঘরের ভেতরটা ভালো করে খুঁজল। ভারি দুষ্টু ঝুমঝুমি। যদি লুকিয়ে থাকে।
না, নেই।
এবার খুব চেঁচিয়ে ডাকল টুং, “ঝুমঝুমি-ই-ই-ই-ই।”
ঝুমঝুমি থাকলে তবে তো!
ডালিমগাছের ফাঁকটা।
নেই, নেই।
শর্ষে ক্ষেতের ঝোপটা।
নেই, নেই।
বার-দরজার কোণটা।
নেই, নেই।
বুকটা চমকে উঠল টুং-এর। কই ঝুমঝুমি? গলায় যত জোর ছিল চেঁচাল সে, “ঝুমঝুমি-ই-ই-ই-ই।”
রোদ দুল-দুল সোনাল ফুল। ভালো লাগে না আজ দেখতে টুং-এর।
রঙ তুল-তুল ফুল পাপড়ি। মন মানে না আজ তা দেখে।
নাচ ঝুমঝুম প্রজাপতি। মন নাচে না সে নাচ দেখে।
কই? কই? তার ঝুমঝুমি কই? না, না, দেখবে না সে। আজ সে কিচ্ছু দেখবে না। আজ শুধু ও খুঁজবে ঝুমঝুমিকে। ও ডাকবে, “ঝুমঝুমি-ই-ই ই।”
তবে কী ঝুমঝুমি নদীর ঘাটেগেছে?
ছুটল টুং। ছুটল আর ডাকল।
নদীর পাড়ে পাড়ে কাশ ফুলের ঢেউ লেগেছে। ও ডাকে। ফুল দুলে দুলে ওঠে। আরও জোরে। জোরে জোরে। যত জোরে ও ডাকে।
নেই ঝুমঝুমি। এখানেও নেই।
নদীর জলে লাফিয়ে পড়ল টুং। এ-পার ও-পার তোলপাড় করে খুঁজল সে। খুঁজতে খুঁজতে হাঁপিয়ে গেল। পেল না। উঠে পড়ল। ভিজে কাপড়ে ছুটল।
কোথা যাবে টুং ছুটতে ছুটতে?
বনে ছুটল।
ও হাঁপাচ্ছে। তবু দাঁড়াল না।
গলা কাঁপছে। তবু থামল না।
ও ডাকবে। গলায় ওর যত জোর আছে ও ডাকবে, “ঝুমঝুমি-ই-ই-ই।”
মিষ্টি গলা তার কাঁপছে। ভাঙছে।
ছুটছে।
বনের কাঁটা বিঁধল। গা কাটল। কিচ্ছু মানল না।
হোঁচট খাচ্ছে। পড়ছে। উঠছে। তবু ছুটছে আর ডাকছে, “ঝুমঝুমি-ই-ই-ই।”
আর পারল না টুং। পারল না আর ছুটতে। টলে টলে পড়ছে টুং। পা কেটেছে খান-খান। রক্ত পড়ছে। গাছের গুঁড়িটা জড়িয়ে ধরল টুং টলতে টলতে। কেঁদে ফেলল। হ্যাঁ, এবার সে সত্যি কেঁদে ফেলেছে। হাউ হাউ করে। ওর চোখ দুটি উপছে গেছে কান্নার জলে। ও আর পারছে না। পারছে না দাঁড়িয়ে থাকতে। লুটিয়ে পড়ল। মাটিতে।
আর উঠতে পারে নি টুং। ওর মাথা ঝিমঝিম করছে। হয়তো আর একবার ভালুকছানার নাম ধরে ডেকেছিল টুং। সে-ডাক কারো কানে পৌঁছায় নি। তারপর আর কিচ্ছু জানে না। ওর চোখের পাতা দুটি নেমে এসেছিল কাঁপতে কাঁপতে। ওর হাত দুটি নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ল। অজ্ঞান হয়ে গেল টুং।
অনেকক্ষণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে ছিল টুং বনের ছায়ায়। ওর চোখের তারা দুটি অনেকক্ষণ অন্ধকারে ডুবে ছিল।
হঠাৎ যেন ওর চোখের পাতা দুটি কেঁপে উঠেছিল। কানে কানে বেজে উঠেছিল ঝুরঝুর হাওয়ার ঝুমঝুম সুর। শুনতে পেয়েছিল টুং গাছের ডালে ডালে পাখির গান।
হঠাৎ মনে হল যেন, কে ওর গায়ে নরম তুলতুল মখমল বিছিয়ে দিয়েছে! কে যেন ওর বুকের ওপর মাথা রেখে আদর করছে!
চমকে উঠল টুং। না না, মখমল তো নয়। ওমা! ওমা! এ যে ঝুমঝুমি!
আদর করছে ঝুমঝুমি টুং-এর বুকে মাথা রেখে। কাঁদছে ঝুমঝুমির মা টুং-এর পাশে বসে। টুং-এর পা দুটি কেটে গেছে। চেটে দিচ্ছে। আহা! রক্ত যেন না বেরয় আর!
কোথা ছিল ওরা?

লাফিয়ে উঠল টুং! জড়িয়ে ধরল ঝুমঝুমিকে বুকের মধ্যে। “দুষ্টু, দুষ্টু” বলে খুশিতে কেঁদে ফেলল টুং। ওর চোখ দুটি জলে জলে টুপ-টুপ। ঝুমঝুমির গালে চুমু খেল টুং। খুশিতে লুটিয়ে গেল। দেখল না ঝুমঝুমির মায়ের দিকে। মায়ের কান্নায় ভরা চোখ দুটির দিকে।
না, না। ও এখন আর দেখবে না কিচ্ছু। ও খুঁজে পেয়েছে। খুঁজে পেয়েছে ঝুমঝুমিকে। ও এখন গাইবে। ও এখন নাচবে।
ও এখন ঝুমঝুমিকে বুকে নিয়ে বনের ছায়ায়-ছায়ায় ছুটে বেড়াবে।
“টুং।” কে যেন ডাকল। অনেক দূর থেকে।
বাবা ডেকেছে। বাবা যে খুঁজছে টুংকে।
“টুং রে-এ-এ-এ।” আবার ডেকেছে।
“বাবা-আ-আ-আ।” টুং সাড়া দিয়েছে।
ছুটল টুং ঝুমঝুমিকে পিঠে নিয়ে।
খুশি, খুশি! চারদিকে আজ খুশির দোলা।
ঠিক তক্ষুনি রোদ দুল-দুল সোনাল ফুল ডালে ডালে নেচে উঠল।
রঙ ঝুর-ঝুর ফুল কুঁড়িতে প্রজাপতি নাচ ধরল।
কারা যেন জলতরঙ্গ বাজাচ্ছে। নাচের তালে তালে বেজে উঠছে, টুং, টুং।
না, না, জলতরঙ্গ নয়! বাবা ডাকছে টুংকে, “টুং, টুং, টুং।”
টুপ, টুপ, টুপ! জল পড়ছে ভালুকমা’র চোখ দিয়ে। ছলছল চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে ভালুকমা ছেলের দিকে, টুং-এর দিকে। ওরা কত খুশি! আহা!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন