চ্যাংঝোলা

শৈলেন ঘোষ

এক রাজা। একদিন খুব সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেল রাজামশায়ের। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলেন। এ কী! উঠতে পারলেন না। যাঃ, রাজামশায়ের বাঁ পা-টা বিছানার গদির সঙ্গে, আটকে গেছে! কী মুশকিল!

রাজা বাঁ দিক হেললেন। পা নড়ল না।

ডান দিক বেঁকলেন। পা সরল না।

মাথা ঝাড়লেন। পা হেলল না।

কোমর দোলালেন। পা দুলল না।

গা তুললেন,

হাত ছুঁড়লেন,

পেট ফোলালেন,

পিট ফেরালেন,

কান মুললেন,

নাক টানলেন,

চুল ছিঁড়লেন,

জিব ভেঙালেন।

পায়ের বয়েই গেছে! সে যেমন ছিল, তেমনি আটকে রইল। তাইতো, কী হল?

তাইতো, কী হল! রানী ছুটে এলেন।

তাইতো, কী হল! মন্ত্রী ছুটে এলেন।

তাইতো, কী হল! শান্ত্রী ছুটে এল।

তাইতো, কী হল! দাসী ছুটে এল।

রানী ডান হাত টানেন।

দাসী বাঁ হাত টানে।

মন্ত্রী কোমর ঠেলেন।

শান্ত্রীডান পা টানে।

টানাটানি, হেঁচড়া-হেঁচড়ি, ধামসা-ধামসি, ঠেলাঠেলি। কিছুতেই কিছু হল না। সবাই দড়দড় করে ঘেমে নেয়ে একসা।

যখন পা কিছুতেই উঠল না, তখন রাজা ভ্যাঁ-এ্যাঁ-এ্যাঁকরে কান্না জুড়ে দিলেন। গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমার কী হল রে।” রাজার সে কী কান্না!

ডাক ডাক বদ্যি ডাক!

বদ্যিবাটির বদ্যি এল। বদ্যিমশাই রাজার বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলে সুড়সুড়ি দিলেন। তারপর ভাবলেন। ভাবতে ভাবতে নাকে নস্যি গুঁজলেন। কড়িকাঠের দিকে মুখ তুললেন। তুড়তুড়ি কাটলেন, তুড়-ড়-ড়। তারপর একটা চিনেবাদামের খোসা বার করলেন ঝুলি থেকে। রাজাকে বললেন, “দুগগা নাম জপতে জপতে এটা গিলে ফেলুন।”

রাজা খোসা নিয়ে দুগগা নাম জপতে লাগলেন। তারপর গালে দিলেন। গিলে ফেললেন। কোঁৎ করে রাজার মুখ থেকে একটা আওয়াজ বেরুল। ব্যস! যেই আওয়াজ হওয়া, অমনি বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলটা হুহু শব্দে ফুলতে শুরু করেছে। ফুলতে ফুলতে প্রথমে একটা ঘটির মত, তারপর একটা হাঁড়ির মত, তারপর একটা ঘড়ার মত ঢোল হয়ে গেল। সব্বনাশ!

তাই না দেখে রাজা তো আরও জোরে কেঁদে উঠলেন, “এ্যাঁ-এ্যাঁ-এ্যাঁ।” নাকি সুরে সে কী কান্না! কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, “বঁদ্যিকে শূলে দাঁও।”

বদ্যি শূলে চাপল।

এবার?

ডাক ডাক কবরেজ ডাক।

কবরহাটার কবরেজ এল।

কবরেজমশাই রাজার পায়ে খিমচে দিলেন। নাকে টুসকি মারলেন। তড়বড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “উই চিংড়ি, না ফড়িং? ফড়িং না তেলেপোকা? তেলেপোকা, না আরসুলা? আরসুলা, না টিকটিকি?”

রাজা কাঁদছেন। নাকের জল টানছেন। টানতে টানতে বললেন, “আজ্ঞে বুঝতে পারছি না। একটু খোলসা করে বলুন।”

কবরেজ ধমক দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “কে চেটেছে?”

ধমক খেয়ে চমকে গেলেন রাজা। আঁৎকে উঠে মুখ ফসকে বলে ফেললেন, “আজ্ঞে বদ্যি চেটেছে।”

অমনি কবরেজমশাই ফস করে নিজের টিকির একটা চুল ছিঁড়ে বলে উঠলেন, “সর্দি। আপনার পায়ে সর্দি হয়েছে। বুড়ো আঙুলের ঠাণ্ডা লেগেছে।”

রাজা আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন, “আজ্ঞে, সর্দি পায়ে কেমন করে হয়?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ হয়! প্রথমে নাক ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ। নাক থেকে নামতে নামতে বুক ঘড়ঘড়। বুক থেকে নামতে নামতে পেট চড়চড়। আর পেট থেকে নামতে নামতে পা খচখচ।”

তারপর কবরেজমশাই কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইলেন। চোখ বুজে দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলেন। একটু পরে ঠোঁট বিড়বিড় করতে করতে আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেন, “সলতে!”

একঘর লোক চিৎকারে চমকে উঠল।

রাজার ভিরমি লাগতে লাগতেও লাগল না। সামলে গেলেন কোন রকমে।

রানী জোড় হাত করে বললেন, “আজ্ঞে?”

কবরেজ আবার চেঁচালেন, “সলতে আন।”

“আজ্ঞে সলতে না পলতে?”

“সলতে।”

রানী ছুটলেন সলতে আনতে।

সলতে এল।

কবরেজ সরষের তেলে সলতেটা ভেজালেন প্রথমে। তারপর একটা নরুন দিয়ে রাজার বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের নোখের একটু কোণা কেটে নিলেন। সলতের সঙ্গে নোখটা জড়িয়ে রাজাকে বললেন, “সাত বার ঘুঘুর ডিম, ঘুঘুর ডিম আউড়াতে আউড়াতে এটা চিবিয়ে গিলে ফেলুন।”

রাজা সলতেটা চিবুতে চিবুতে আউড়াতে লাগলেনঃ

ঘুঘুর ডিম

ঘুঘুর ডিম

ঘুঘুর ডিম

ঘুঘুর ডিম

ঘুঘুর ডিম

ঘুঘুর ডিম

ঘুঘুর ডিম।

শেষবার ঘুঘুর ডিম বলে রাজা গিলে ফেলেছেন সলতে। মুখে গোঁৎ করে আওয়াজ! ব্যস! আর দেখতে আছে! অমনি সেই বাঁ পায়ের ঘড়ার মত বুড়ো আঙুলটা ফস করে ফানুসের মত লম্বা হয়ে গেল। লম্বা হয়ে দেখো, দেখো ওপর দিকে উঠছে! আরি বাবা! সত্যিই তো! উঠতে উঠতে আঙুলটা, পা-টা একেবারে কড়িকাঠে আটকে গেল। রাজার মুণ্ডু রইল মাটির দিকে। ঠ্যাং উঠল শূন্যের দিকে। রাজা ঠ্যাং উঁচিয়ে মাথা নামিয়ে ঝুলতে লাগলেন! বাদুড়-ঝোলা।

কিছু বোঝাবার আগেই কেঁদে ফেললেন রাজা, “প্যাঁ-এ্যাঁ-এ্যাঁ।” আরও জোরে। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, “কবরেজের গর্দান নাও।”

কবরেজের গর্দান গেল।

চার-চার দিন রাজামশাই শূন্যের দিকে ঠ্যাং উঁচিয়ে আর মাটির দিকে মাথা ঝুলিয়ে দুলতে লাগলেন। কথাটা আর চাপা রইল না। সারা রাজ্যে ঢি-ঢি পড়ে গেল। সবাই বললে, “রাজার চ্যাং-ঝোলা অসুখ করেছে। রাজা কড়িকাঠে ঠ্যাং ঠেকিয়ে ঝুলছেন।”

শেষকালে যখন রাজার অসুখ সারল না, কড়িকাঠ থেকে ঠ্যাং নামল না, তখন রাজবাড়ির লোকেরা ঢেঁড়া পিটিয়ে গেল। ঢেঁড়া পিটিয়ে বলে গেল, “রাজার চ্যাং-ঝোলা অসুখ যে ভাল করে দিতে পারবে, রাজা তাকে সাত ঘড়া মোহর দেবেন। সাতটা বাড়ির মালিক করে দেবেন।”

সেই দেশে ছিল একটি ছেলে। বড় দুঃখী। কেউ ছিল না তার। ছিল একটি বেড়াল। সারাদিন এর ঘর, তার দোর ঘুরে ঘুরে ঘরকন্নার কাজ করে দেয়। তার বদলে আধ পেটা খেতে পায়। সারাদিন কাজ করে। তারপর পড়বে। লিখবে। পড়বে ছেঁড়া-ছেঁড়া বই নিয়ে। ভাঙা-ভাঙা শিলেট নিয়ে। ও যখন পড়বে, বেড়ালটা বসে থাকবে সামনে। ও যখন লিখবে, বেড়ালটা বসেবসে দেখবে আর ডাকবে। এত কষ্ট করেও সে কোনদিন ভোলে নি লিখতে, পড়তে।

একদিন ছেলেটা শুনল রাজার অসুখের কথা। শুনল বলে ভাবল। ভাবল, একবার চেষ্টা করে দেখলে হয় না? কদ্দিন আর এমনি করে কষ্ট করা যায়।

ভাবতে ভাবতে সেদিন সে কাজে গেল না। ভাঙা ঘরে, ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল। বেড়ালটা মাথার কাছে বসে বসে দেখতে লাগল।

ভাবতে ভাবতে বেড়ালটার পিঠে হাত বুলিয়ে ছেলেটা বললে, “কি রে? কি দেখছিস?”

বেড়ালটা চেয়েই রইল।

ছেলেটা আবার বললে, “আজ আর কাজ করতে যাব না, বুঝলি। আজ উপোস! পারবি না একদিন উপোস করে থাকতে?”

বেড়াল আর কি বলবে? কথা বলতে পারলে তবে তো!

এবার নিজের কোলে টেনে নিল বেড়ালটাকে ছেলেটা। ওর চোখের দিকে চেয়ে চেয়ে বললে, “জানিস রাজামশায়ের চ্যাং-ঝোলা অসুখ করেছে। কি জানি বাবা, এমন অসুখের নাম কখনও শুনি নি। কোন রকমে যদি রাজামশায়ের অসুখ ভাল করে দিতে পারি, তাহলে কি আর এমনি করে কষ্ট করতে হয়? দূর! আমি কি আর সারাতে পারি? আমি হাকিম, না বদ্যি!

বেড়ালটা বোধ হয় ছেলেটার কথা বুঝতে পারলে। তাই মারলে লাফ, তিড়িং। উঠে দাঁড়াল ছেলেটার কোল থেকে মাটিতে। মুখ দিয়ে ছেলেটার জামা ধরে টান দিলে। যেন বলছে, “উঠে চল, আমার সঙ্গে উঠে চল।”

ছেলেটা ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ল। বললে, “কোথা যাব? দাঁড়া দাঁড়া। আমার জামা ছিঁড়ে যাবে।”

যাবে তো যাবে। সে তবুও টানছে। তার যেন তর সইছে না।

ছেলেটা উঠে দাঁড়াল।

তারপর?

ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে পড়ল বেড়ালটা। ছুটল।

ছেলেটাও ছুটল।

আগে ছুটল বেড়ালটা।

পেছনে পেছনে ছেলেটা।

“কোথা যাস রে, কোথা যাস?” চেঁচিয়ে ওঠে ছেলেটা।

কোথা যায় কেউ জানে না। বেড়াল জানে। জানে বলেই ছুটছে।

ছুটতে ছুটতে শহর গেল।

শহর গেল, গ্রাম পড়ল। সবুজ-সবুজ মাঠ গেল। জল-চকচক নদী গেল। ফল-ঝলমল বাগান গেল। মৌটুসকি পাখি গেল। ছেলে গেল। মেয়ে গেল। চাষী গেল। লাঙল গেল। গরু গেল। ভেড়া গেল।

তারপর?

গ্রাম পেরিয়ে এল গা-ছমছম গভীর বন।

হুক! হুক! হুক! পেঁচা-ডাকা অন্ধকার।

গাঁক! গাঁক! গাঁক। বাঘ-ডাকা অন্ধকার।

হুক্কা হুয়া! হুয়া! হুয়া! শেয়াল-ডাকা অন্ধকার!

হিস! হিস! হিস! সাপ-ডাকা অন্ধকার। অন্ধকার। শুধু অন্ধকার। গা-ছমছম গভীর বনে দিনের বেলা অন্ধকার।

“অন্ধকারে কেযায় রে, কে যায়?” কে যেন ডাকল!

“কে যায় রে কে যায়?” তাই তো! সত্যি-সত্যি ডাকল!

বেড়ালটা ছুটতে ছুটতে থমকে দাঁড়াল।

ছেলেটাও ছুটতে ছুটতে থমকে থামল। ছেলেটা চমকে চেয়ে দেখল একটা ল্যাজের মত কি সুড়-সুড় করে একটা ইয়া বড় গর্ত থেকে বেরিয়ে এগিয়ে আসছে। অন্ধকারে ঠিক বুঝতেই পারল না কী ওটা? সাপ ওটা? কেউটেটা?

“কী চাস রে? বনের ভেতর ছুটোছুটি করছিস কেন? আমরা ঘুমুতে পাচ্ছি না!” ল্যাজটা বলে উঠল।

ছেলেটা পাখির ডাক শুনেছে। গরুর হাঁক শুনেছে। বেড়ালের ম্যাও শুনেছে। কিন্তু ল্যাজের কথা-কওয়া কোনদিন শোনে নি তো! তাই কেমন হকচকিয়ে গেল। ভয়ে-ময়ে বলে ফেললে, “রাজার চ্যাং-ঝোলা অসুখ!”

ল্যাজটা ধমকে উঠল, “রাজার চ্যাং-ঝোলা অসুখ, তো তোমরা হেথায় কেন?”

ছেলেটা তেমনি আমতা আমতা করে বললে, “চ্যাং-ঝোলা অসুখটা কী তাই জানতে এসেছি।”

ল্যাজ বললে, “চ্যাং-ঝোলা অসুখ, না লঙ্কা পোড়া গন্ধ?”

ছেলেটা কেমন হাঁদা-হাঁদা হয়ে গেল। মুখটা আমচুরের মত শুকনো করে বললে, “তার মানে?”

ল্যাজটা সড়াৎ করে ছিটকে এল। একেবারে লাফিয়ে উঠে ছেলেটার কানের গর্তে ঢুকে গেল। খানিকটা। ছেলেটা ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। ল্যাজটা কানের গর্তে ফিসফিস করে কথা বলতে সুরু করলে।

বাব্বা!

ব্যস! কথা শেষ করেই বলা-নেই, কওয়া-নেই আবার নিজের গর্তে চুপচাপ সেঁদিয়ে গেল।

ছেলেটা কী শুনল, কে জানে! চিৎকার করে হেসে উঠল। বেড়ালের গালটা টিপে লুফে নিল কোলে। তারপর ছুটল। ছুট, রাজবাড়ির দিকে।

ছুটতে ছুটতে রাজবাড়ির সিংদরজার সামনে এসে হাজির। সিংদরজার সামনে উঁকি মারল।

উঁকি মারল পিছনে।

উঁকি মারল সামনে।

তারপর আগু দেখলে, পিছু দেখলে। মারল ছুট রাজবাড়ির ভেতর দিকে।

দ্বারী হাঁকল, “ছুটল, ছুটল। বেড়াল কোলে ছেলে ছুটল।”

শান্ত্রী হাঁকল, “ঢুকল, ঢুকল! বেড়াল নিয়ে ছেলে ঢুকল। ধর, ধর।”

অমনি পঞ্চাশটা লোক পেছন পেছন তাড়া লাগিয়ে দিলে।

ছেলেটা বেড়াল-কোলে ছুটতে ছুটতে একেবারে রাজার ঘরে। ছুটে এসে রানীমার কোলে বেড়ালটা রাখলে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, “রাজার অসুখ আমি সারাব, আমার লঙ্কা চাই!”

সবাই অবাক। বদ্যি গেল, কবরেজ গেল। এইটুকুনি ছোট্ট ছেলে বলে কিনা রাজার অসুখ সারাব! লঙ্কা দিয়ে অসুখ সারে! কী ছেলেমি? না, ছেলেখেলা?

ছেলেটা আকুল হয়ে বলে উঠল, “রানীমা গো, তাড়াতাড়ি লঙ্কা আন। গাওয়া ঘি-এর পিদিম আন। রাজার অসুখ না সারালে তোমরা আমার মুণ্ডু নিও!”

রানীমার মন তো কান্নায়-কান্নায় ভরেছিল। ভাবনায়-ভাবনায় মুষড়ে ছিল। রানী ভাবলেন, এত করা হচ্ছে, কেউ তো রাজার অসুখ সারাতে পারছে না। দেখাই যাক না ছেলেটার কথা শুনে!

অমনি শুকনো-শুকনো লঙ্কা এল। গাওয়া ঘি-এর পিদিম এল। পিদিমে আগুনের শিখাটি জ্বালিয়ে দিল ছেলেটা। তারপর বললে, “ঘর ছেড়ে এবার সব বাইরে যান। ঘরে থাকব আমি আর আমার বেড়ালছানা।”

সকলে একে একে ঘর ছেড়ে বাইরে গেল। ঘরের দরজা বন্ধ হল।

এবার ছেলেটা রাজার মুখের সামনে দাঁড়াল। রাজার তোঠ্যাং তখনও ওপরে। কড়িকাঠে। মুণ্ডুটা নিচের দিকে। মুখের দিকে চাইতেই, রাজা ছেলেটার চোখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন। ছেলেটা বললে, “রাজামশাই গো, রাজামশাই, চোখ বন্ধ কর।”

রাজা চোখ বুজলেন।

ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে গাওয়া ঘি-এর প্রদীপে শুকনো-শুকনো লঙ্কাগুলোপোড়াতে লাগল। পুড়িয়ে-পুড়িয়ে একটা পোড়া লঙ্কা রাজার নাকের সামনে ধরেছে। যেই ধরা, রাজা ফ্যাঁউ-ফ্যাঁউ-ফ্যাঁউ করতে করতে, একেবারে বাজপড়ার মত আওয়াজ দিয়ে ফ্যাঁচ-চ-চ-চ করে হেঁছে দিয়েছেন। বাবা, সে কী সাংঘাতিক হাঁচি! যেই হেঁচেছেন, অমনি সেই কড়িকাঠে ঠেকানো ঠ্যাংটা চিঁড়ে-মুড়কির বস্তার মত ছটকে পড়েছে বিছানার ওপরে। পড়েই ফানুসের মত বুড়ো আঙুলটা, “দুম ফটাস!” ফেটে গেছে! তারপর ভুসসসস! হাওয়া বেরিয়ে গেল ফাটা আঙুল দিয়ে। হাওয়া বেরুতে বেরুতে চুপসে গেল আঙুলটা। ঠিক হয়ে গেল। আগে যেমন ছিল ঠিক তেমনি!

রাজা তড়াং করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। একবার নিজের পায়ের দিকে চেয়ে, তারপর অবাক হয়ে ছেলেটার মুখের দিকে তাকালেন।

ধিন ধিন, একটু একটু নাচতে লাগলেন।

ধিন ধিন, আরও একটু একটু।

ধিন ধিন, খুব জোরে জোরে নাচতে লাগলেন।

নাচছেন। থামছেন। দেখছেন। আবার নাচছেন। তারপর হা-হা-হা করে গান গাইতে সুরু করে দিলেন। গাইতে গাইতে ছেলেটাকে কাঁধে তুলে নিলেন। বেড়ালটা কোলে নিলেন। লাফাতে লাফাতে, ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বাইরে। চেঁচাতে লাগলেন, “আমি ভাল হয়ে গেছি, আমি ভাল হয়ে গেছি।”

চেঁচাতে চেঁচাতে ছেলেটাকে কাঁধে নিয়ে, বেড়ালটাকে কোলে নিয়ে চিলের ছাতে দৌড়। চিলের ছাতে গিয়ে, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালেন। আদর করে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। ওর গালে একটা চুমু খেলেন। বেড়ালের গালে একটা চুমু খেলেন। তারপর ছেলেটার কানে কানে জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁরে, আমার কী অসুখ করেছিল?”

ছেলেটা বললে, “আজ্ঞে রাজামশাই, আপনার নাকে একটা হাঁচি আটকে গেছল। আমি লঙ্কা পুড়িয়ে সেটা বার করে দিতেই আপনার অসুখ সেরে গেছে।”

ছেলেটার কথা শুনে রাজা সেই চিলের ছাতে কী জোর হেসে উঠলেন, “হো-হো-হো।” সে-হাসি সারা রাজ্যের লোক শুনতে পেয়েছিল। তারাও হেসে উঠেছিল রাজার হাসি শুনে।

তারপর সেই ছেলেটা আর বেড়ালটার আর কোন দুঃখই রইল না।

___

অধ্যায় ৬ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%