সর্দার

শৈলেন ঘোষ

দেহটা লোহার মত ছিল সর্দারের। রাজবাড়ির মাহুত-সর্দার।

সর্দার যখন রাজবাড়িতে ছিল, তখন তো এমন বুড়ো ছিল না। সাত-রঙের রেশমি পোষাক পরত। মাথায় পাগড়ি বাঁধত। শুঁড় তোলা নাগরা পরে যখন হাতির পিঠে বসত, মনে হত যেন সাতরাজ্য জয় করে বীর এসেছে।

রাজবাড়ির হাতিশালে কত হাতি! গোনা যায় না। রোজ সকালে সর্দার আসত হাতিশালে তদারক করতে। একটি একটি হাতির গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করত সর্দার। কেমন শুঁড় তুলে সেলাম জানাত তারা। হাতিশালের সবচেয়ে যে ছোট্ট হাতি, তার নাম বাচ্চা। সর্দারকে দেখলে তার কী আনন্দ! একবার শুঁড়টি তুলে ওর হবে না। ক’বার দোল দেবে এদিক ওদিক। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে-নাচিয়ে। সর্দার ওর দু’ গালে দুটি চুমু খাবে। ওর মুখে একছড়া কলা দেবে। তবে ছুটি। তখন ওর নাচন থামবে।

সর্দারের একটি ছেলে। ঝুমরু। তখন ওর বয়েস দশ। রোজসকালে সেও বাবার মত সাজত। মাথায় পাগড়ি বাঁধত। রেশমি পোষাক পরত। পায়ে নাগরা দিয়ে বাচ্চার পিঠে চড়ত। খোলা মাঠে বেড়াতে যেত বাচ্চাকে নিয়ে। বাচ্চা হাঁটত। গলার ঘণ্টা বাজত।

রাজবাড়ির ছোট্ট মেয়ে রাজকন্যা। সোনার জানলায় মুখ বাড়িয়ে হাতি দেখে। ঘণ্টা শোনে। হাতির গলার ঘন্টা শুনতে শুনতে নিজের হাতের চুনি-পান্নার ঝুনঝুনি বাজিয়ে ডাকে হাতিকে। হাতির পিঠে ঝুমরুকে। রোজ। রোজ। রোজ।

একদিন ঝুমরু হাতির পিঠে বসে চেঁচিয়ে রাজকন্যাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “রোজ রোজ কী দেখ? ডাক কেন? বেড়াতে যাবে আমার সঙ্গে? হাতির পিঠে চেপে?”

রাজকন্যা চেঁচিয়ে উত্তর দিয়েছিল, “নিয়ে যাবে?”

ঝুমরু বেশ মুরুব্বির মত বলেছিল, “দুষ্টুমি না করলে ভেবে দেখতে পারি।”

“সত্যি বলছি আমি দুষ্টুমি করব না।”

“বেশ, তা হলে যেতে পার।”

তারপর একদিন রাজার গলাটি জড়িয়ে ধরেছিল মেয়ে। আব্দার করে বলেছিল, “বাবা, আমি ছোট্ট হাতির পিঠে চেপে বেড়াতে যাব।”

বাবা বললেন, “কোথা?”

মেয়ে সবুজ ঘাসের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললে, “হোথা।”

রাজা ঘাড় নাড়লেন, “আচ্ছা।”

তাই একদিন বাচ্চাকে সাজান হল। তার পিঠে মখমলের গদি চড়ল। সেপাই তৈয়ার হল।

কন্যা অবাক হল। বাবাকে জিজ্ঞেস করলে, “অত সেপাই কেন?”

বাবা বললেন, “তোমার সঙ্গে যাবে। তুমি যে বললে হাতির পিঠে চেপে বেড়াতে যাবে।”

মেয়ে বললে, “ওমা! ওমা! সেপাই কী হবে? আমি কী যুদ্ধে যাচ্ছি? সেপাই গেলে আমি যাব না।”

“বেশ, তা হলে সর্দার-মাহুত যাক তোমার সঙ্গে।”

“না, না। সর্দার গেলেও যাব না। সর্দারের ছেলের সঙ্গে যাব আমি, একা।”

রাজা প্রথমে একটু থমকে গেলেন মেয়ের কথা শুনে। তারপর কি যেন ভাবলেন মনে মনে। একটু ভেবে সায় দিলেন, “বেশ, তাই হবে।”

তারপর?

ঝুমরু বসল হাতির মাথার কাছে। রাজকন্যা বসল তার পেছনে। পিঠে। সোনা সাজান মখমলের গদি, তার ওপরে।

হাঁটল বাচ্চা।

ছোট্ট হাতি হাঁটল। দুলল। গলার ঘণ্টা বাজল, টুং টাং। রাজা দাঁড়িয়ে জানলার ধারে। সোনার গরাদ ধরে। দেখতে লাগলেন। শুনতে লাগলেন, ঘণ্টা বাজে টুং টাং, টুং টাং। বাজতে বাজতে হারিয়ে গেল ভেসে ভেসে। দেখতে দেখতে মিলিয়ে গেল দূরে দূরে। আরও দূরে।

কতদূর চলে এসেছে বাচ্চা! সামনে নদী। ময়ূরপংখী নাও। দুলছে। ভেসে যাচ্ছে। কত পাখি গাছে গাছে। গান গাইছে। ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ উড়ে যাচ্ছে। রঙিন ডানায় রঙ ঝরছে।

ঝুমরু জিজ্ঞেস করলে রাজকন্যাকে, “কেমন লাগছে?”

রাজকন্যা পাখির দিকে চেয়ে বললে, “বেশ লাগছে। নামব।”

ঝুমরু ঘাড় নাড়লে, “না।”

মেয়ে আব্দার করলে, “হ্যাঁ। একবারটি।”

“দুষ্টুমি করবে না তো?”

“না। সত্যি বলছি।”

“বেশ, তবে নামতে পার।”

বাচ্চা শুঁড়ে জড়িয়ে নামিয়ে দিল রাজকন্যাকে নিচে। রাঙা-রাঙা মাটিতে।

ছুট দিল রাজকন্যা পিয়াল বনে।

ছুট দিল ঝুমরু তার পিছনে।

শুঁড় নেড়ে ঘণ্টা বাজাতে লাগল বাচ্চা। মজা লেগেছে। টুং টাং। টুং টাং।

“কোথা যাচ্ছ?” চেঁচিয়ে উঠল ঝুমরু।

ধরে ফেলল রাজকন্যার হাতটি।

“কোথা যাচ্ছ?” হাঁপাচ্ছে ঝুমরু।

“কোত্থাও না।” হাঁপাচ্ছে রাজকন্যা।

“ছুটছ কেন?”

“আমি ময়ূরপংখী না-এ চাপব।”

“না।”

“আমি পাখি নেব।”

“না, না।”

“আমি প্রজাপতির পাখায় নাচব।”

“না, না, না।” বলতেই রাজকন্যা ঝুমরুর হাত ছাড়িয়ে নিল। ছুট দিল।

পিয়াল বন।

শাল বন।

মৌ বন।

দুজনেই হারিয়ে গেল বনের ভেতর।

ঝুমরু ছুটতে ছুটতে ডাক দিল, “রাজকন্যা-আ-আ।”

বনের গাছ, গাছের পাতা কেঁপে উঠল, না-না-না।

এখন কী হবে?

অনেকক্ষণ বনে বনে হাঁটল ঝুমরু। আনমনা। খুঁজল। ভাবল। বুক ওর ভয়ে ভয়ে দুর-দুর কাঁপল।

হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে চমকে উঠেছে ঝুমরু! টুং টাং, টুং টাং। বাচ্চার গলার ঘণ্টা বাজছে। ইস! এতক্ষণ সে বাচ্চার কথা ভুলেই গেছল। ছুটল সেইদিকে। বাচ্চার কাছে।

ওমা! একী! থমকে গেল কেন ঝুমরু?

কেন?

এতক্ষণ বনে বনে যাকে খুঁজছিল ঝুমরু, সে তো বাচ্চার পিঠেই বসে আছে। কী দুষ্টু রাজকন্যা! কেমন ঠকিয়েছে ঝুমরুকে! কেমন মুচকি মুচকি হাসছে দেখ!

মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে খিলখিল করে হেসে উঠল রাজকন্যা।

লাল হয়ে গেল ঝুমরুর মুখখানা রাগে। লজ্জায়। একটি কথাও আর বললে না। চুপচাপ। উঠে পড়ল শুঁড় জড়িয়ে হাতির পিঠে। পথ চলল।

দুষ্টু-দুষ্টু হাসছে রাজকন্যা। আড়চোখে চাইছে ঝুমরুর দিকে। বললে, “কেমন ঠকালুম!”

কোন উত্তর দিল না ঝুমরু। বাচ্চাকে ঘুরিয়ে দিল।

“রাগ হয়েছে বুঝি?”

তবু উত্তর দিল না। বাচ্চাকে হাঁটতে বলল।

“আর কোনদিন নিয়ে আসবে না আমায় বেড়াতে?”

এখনও উত্তর নেই ঝুমরুর মুখে। বাচ্চা হাঁটল।

“কথা বলবে না আমার সঙ্গে?” জিজ্ঞেস করল রাজকন্যা। “নাই বললে”, ঠোঁট উল্টে মুখ ফিরিয়ে নিল রাজকন্যা। চুপচাপ বসে রইল। কারো মুখে কথা নেই।

বাচ্চা হাঁটছে। ঘণ্টা বাজছে, টুং টাং।

একটু পরেই রাজবাড়ি এসে গেল। ঐ দেখা যাচ্ছে রাজবাড়ির চূড়া। রোদের আলো পড়েছে। ঝলমল করছে।

হঠাৎ যেন কেমন করে উঠল ঝুমরুর মনটা। আর তো একটু। একটু পরেই রাজকন্যা অন্দর-মহলে চলে যাবে। তারপরে আর দেখা হবে না রাজকন্যার সঙ্গে। খেলা করবে না।

ইচ্ছে হল কথা বলতে ঝুমরুর। একটি কথা। ভাব করতে। একবারটি।

পারল না। এখন লজ্জা করছে। একটু আগে আড়ি হয়ে গেছে না রাজকন্যার সঙ্গে!

রাজবাড়ির সিংদরজায় ঘণ্টা বাজছে।

দ্বারী হাঁকল, “রাজকন্যা আসছে।”

রাজা নেমে এলেন সিংদরজার কাছে। দূর থেকে কাছে এগিয়ে আসছে বাচ্চা। শুঁড় নাড়ছে। খুশিতে দুলছে।

দেখতে দেখতে এস গেল বাচ্চা একেবারে সিংদরজার কাছে। থাকতে পারল না ঝুমরু। জিজ্ঞেস করে ফেলল, “আবার কবে যাবে বেড়াতে? আমার সঙ্গে?”

না, শোনা গেল না ঝুমরুর কথা। ঘণ্টা বাজছে যে সিংদরজায়। কেমন করে শুনতে পাবে রাজকন্যা? বাবার হাতটি ধরে চলে গেল অন্দর-মহলে। চেয়ে রইল ঝুমরু। তবু চেয়ে দেখল না রাজকন্যা একবারটিও তার দিকে।

ভার হয়ে গেল মনটা ঝুমরুর!

পরেরদিন ডাক পড়ল সর্দারের। ঝুমরুর বাবার। রাজা ডেকেছেন।

কেন?

হাজির হল সর্দার রাজার সামনে।

“তোমার ছেলে এই বয়েসে তো বেশ চালাকচতুর হয়েছে।” রাজা হাসতে হাসতে বললেন।

“আপনার আশীর্বাদে।” উত্তর দিল সর্দার।

“সাহস আছে। কেমন একা একা বেড়িয়ে নিয়ে এল আমার মেয়েকে!”

মাথা নোয়াল সর্দার।

“শোন, আমি ঠিক করেছি রাজ্য জয় করতে বেরুব। তোমার ছেলেকে সঙ্গে নেব।”

“যুদ্ধে!” আঁৎকে উঠল সর্দার। “যুদ্ধে নিয়ে যাবেন? আজ্ঞে ছেলে যে আমার ছোট।” হাত জোড় করল সর্দার।

রাজার মুখের ওপর কথা! রেগে গেলেন রাজা। ধমক দিলেন, “হোক ছোট। সে ভাবনা তোমার নয়। আমি বুঝব। তোমার ছেলের বুদ্ধি আছে। বুদ্ধিকে কাজে লাগাব আমি।”

ভয়ে কাঠ হয়ে গেল সর্দার। আর কথা বলতে পারল না। সর্দার রাজার মুখের ওপর। নিঃসাড়ে চলে এল নিজের ঘরে।

আজ সারাদিন কাজ করে নি সর্দার। ভাল লাগছে না। বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে বড় ছেলের কথা।

বড় ছেলেটাও যুদ্ধে গেছল রাজার সঙ্গে। সে ফেরে নি। কতদিন কেঁদেছে সর্দার বড় ছেলেটার জন্যে। লুকিয়ে লুকিয়ে। সে-কান্না কেউ শুনতে পায় নি। তারপর ঝুমরুকে চোখে চোখে রেখে বুকে করে মানুষ করেছে। শক্ত লোহার মত গড়ে তুলেছে। এ ছেলেটাও যদি যুদ্ধ থেকে আর না ফেরে কোনদিন? তাহলে কী নিয়ে থাকবে সর্দার? ভাবতে ভাবতে শিউরে ওঠে।

সারাদিন ভেবেছে সর্দার। কী ভেবেছে, কেউ জানে না। রাতে ঘুময় নি সর্দার। জেগে বসেছিল।

ঘুমুচ্ছিল ঝুমরু। নিঃসাড়ে। গভীর রাত যখন আরও নিঃঝুম, ডাক দিল সর্দার ঝুমরুকে। গায়ে হাত দিল। ধড়ফড় করে উঠে পড়ল ঝুমরু। বাবার মুখের দিকে চেয়ে রইল। অবাক হয়ে। ঘুমন্ত চোখে।

ফিসফিস করে বাবা বললে, “চ।”

চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলে ঝুমরু, “কোথা?”

“চলে যাব এখান থেকে।”

“কেন?”

“এমনি।”

সত্যি সত্যি চলে গেল সর্দার।

কোথা গেল?

রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিল। পালিয়ে গেল। পালিয়ে গেল সর্দার ঝুমরুকে নিয়ে রাজবাড়ি থেকে।

খবর হাওয়ার আগে ছোটে। ছড়িয়ে গেল সারা শহরে, সারা রাজ্যে, সর্দার পালিয়েছে।

রাজা হুকুম দিলেন, “যেখান থেকে পার সর্দারকে ধরে আন। পাকড়াও কর।”

গুপ্তচর ছুটল এদিক, ওদিক, চারদিক। সমস্ত রাজ্যটাকে ঘিরে ফেলল তারা। পালাতে পারল না সর্দার। ধরা পড়ে গেল। সর্দারকে বাঁধল। ঝুমরুকে বাঁধল। নিয়ে এল রাজার সামনে।

রাজা হুকুম দিলেন, “সর্দারকে গভীর বনে হাত-পা বেঁধে ফেলে দিয়ে এস।”

রাজার লোকেরা ফেলে দিয়ে এল সর্দারকে গভীর বনে। আর সর্দারের ছেলে ঝুমরু চলল যুদ্ধে রাজার সঙ্গে।

তারপর কতদিন হয়ে গেল। কত বছর কেটে গেছে। শুধু বনে বনে ঘুরেছে সর্দার। খুঁজেছে পথ। বন পেরিয়ে শহরেরপথ। নিঃঝুম বনে শুধু অন্ধকার। ভয়ঙ্কর! সেই বনের অন্ধকারে কত শীত সর্দারের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে, খেয়াল নেই সর্দারের। কত বসন্ত গাছে গাছে নতুন পাতায় সেজেছে, জানে না সর্দার। কতবৰ্ষার রিমঝিম মেঘে মেঘে নেচে গেছে, মনে নেই সর্দারের। শুধু ঘুরেছে সর্দার। আর খুঁজেছে।

হঠাৎ আজ আকাশ দেখতে পেয়েছে সর্দার। পথ দেখতে পেয়েছে। বন পেরিয়ে ঐ তো শহরের পথ।

আকাশে আজ কত আলো। কত সোনা। রোদের নাচন লেগেছে। খুশি ছড়িয়ে গেছে গাছের পাতায়। এত প্রজাপতি এল কোথা থেকে? কে দিয়েছে আকাশে উড়িয়ে ওদের? ছড়িয়ে দিয়েছে আলোতে এত রঙ? এত স্বপ্ন? এতদিন চোখ মেলে দেখে নি সর্দার আকাশটা। এতদিন দেখে নি প্রজাপতির পাখায় ছড়ানো রঙের বাহার। আজ ভাল লাগছে তাই দেখতে।

বয়েস হয়েছে সর্দারের। অনেক। এখন আর তেমন করে বুক উঁচিয়ে দাঁড়াতে পারে না। এখন আর তেমন করে শক্ত পায়ে হাঁটতে পারে না। মাথার চুল সব সাদা হয়ে গেছে। ভেঙেগেছে শরীরটা। অমন লোহার মত দেহটা। চেনা যায় না।

ভাঙবে না? শরীরের আর দোষ কী! কত বছর ধরে শুধু ঘুরেছে। বনে বনে। একা। খুঁজেছে আঁতিপাতি ওর চোখ দুটি। কাকে? ছেলেকে। ঝুমরুকে। চোখে এখনও দেখতে পায়। ক’দিন পরে আর দেখতে পাবে না হয়তো! ক’দিন পরে যদি সর্দার দাঁড়াতে না পারে? না পারে হাঁটতে?

জোরে জোরে পা ফেলল সর্দার।

কিন্তু এ-পথ যে চেনে না সর্দার! এ-পথে সে কোথা যাবে? এ-পথে গেলে তার ছেলেকে সে কি খুঁজে পাবে? ভাবে সর্দার।

তা দশ বছর হয়ে গেছে। যুদ্ধে গেছল ঝুমরু। কে জানে সে ফিরেছে কিনা। সে এখন কেমনটি হয়েছে? চিনতে পারবে তো সর্দার?

পেছনে একটা ঘোড়া আসছে। ইস! দেখ, একেবারে হাড়-জিরজিরে। কোথা ছিল?

হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় ফেরাল সর্দার। ঘোড়াটার দিকে দেখল। ঘোড়াটা চলে যাক, মনে ভাবল। সরে দাঁড়াল।

না, ঘোড়াও হাঁটল না। সর্দারের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।

দাঁড়ায় কেন?

মনে পড়ল না সর্দারের এ ঘোড়াটাও একদিন রাজবাড়িতে ছিল। বয়েস হয়ে গেছে। তাই ওর ছুটিও হয়ে গেছে। এখন খেতে পায় না। পথে পথে ঘোরে। যত্ন নেই আর একদম। রাজবাড়ির যত্ন।

চিনতে পেরেছে সর্দারকে ঘোড়াটা। তাই দাঁড়াল।

সর্দার একবার দেখল ঘোড়াটার দিকে। আবার হাঁটল।

ঘোড়াও হাঁটল। পিছু পিছু।

সর্দার থামল।

ঘোড়াও থামল।

“আরে!” অবাক লাগল সর্দারের। ঘোড়াটা অমন করেপিছু নেয় কেন? ঘোড়ার পিঠে হাত দিল সর্দার। ডেকে উঠল ঘোড়া, “চিঁহিঁহিঁ।” ঘাড় নাড়ল। যেন কত খুশি! সর্দারের কি মনে হল, উঠে পড়ল ঘোড়ার পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে ছুট দিল ঘোড়া তীর বেগে। কোথা?

রাজবাড়ি।

আহা! আকাশ-ছোঁয়া রাজবাড়ি। এখনও তেমনি দাঁড়িয়ে। এখনও তেমনি ঝকমক করছে। এখনও সিংদরজার দু’পাশে দুই দ্বারী দাঁড়িয়ে। তাদের হাতে তরোয়াল। উঁচিয়ে আছে। এখনও সিংদরজার মাথায় সোনার ঘণ্টা। দুলছে আর বাজছে। কত কথা মনে পড়ছে সর্দারের। হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলি! চোখ জলে ভরে যায়।

না, না। হঠাৎ খুশিতে বুকখানা ভরে ওঠে সর্দারের। আজ দেখতে পাবে সে তার ছেলেকে। ঝুমরুকে। আঃ, কতদিন! কতদিন পর!

রাজবাড়ির ঠিক সিংদরজার একটু দূরেই দাঁড়াল ঘোড়া। নামল সর্দার।

এত লোক কেন আজ?

কোথা চলেছে?

রাজবাড়িতে।

কেন?

আজ আম-দরবার। রাজা আজ সবার সঙ্গে দেখা করবেন। সবার সঙ্গে কথা বলবেন। সকলের কথা শুনবেন। আজ সবাই যেতে পারবে রাজবাড়ির ভেতরে। দ্বারী আটকাবে না। প্রহরী বকবে না। আজ বাধাও কেউ মানবে না। নতুন নতুন পোশাক পরেছে সবাই। ঝকঝকে। রঙচঙে। কী সুন্দর দেখতে লাগছে! আগে তো এমনি করে দল বেঁধে কেউ রাজবাড়ি আসত না, ভাবে সর্দার।

তবু ওদের সঙ্গে গেলে যদি ছেলেকে দেখতে পায়! দেখতে পায় ঝুমরুকে! বুকটা নেচে উঠল সর্দারের। আনন্দে। মিশে গেল অত লোকের সঙ্গে। হারিয়ে গেল সর্দার ভিড়ের মধ্যে।

সব চেনা সর্দারের। এ-বাড়ির দেওয়ালে যত নকসা, দরবারে যত রঙ, যত আলো, যত ছবি সব চেনে। ঐ তোসোনার সিংহাসন। এখনও ঝলমল করছে।

বসে পড়ল সর্দার দরবারে অত লোকের মাঝখানে।

ঢং ঢং ঢং।

ঘণ্টা বাজল হঠাৎ। চমকে উঠল সর্দার। গমগম করে চেঁচিয়ে উঠল ঘোষক, “রাজা আসছেন।”

শিঙা বেছে উঠল।

নড়ে উঠল সোনার ঝিকিমিকি পর্দা। সরে গেল পর্দার আড়াল। পর্দার আড়াল থেকে রাজা দরবারে পা বাড়ালেন। অতবড় দরবার, অত লোক নিশ্চুপ। চোখ মেলে দেখলে সর্দার রাজার দিকে।

না, এ-রাজা তো চেনা ঠেকছে না! না, না, অচেনাও ঠেকছে না! অবাক লাগল সর্দারের! কে তবে সিংহাসনে বসেছে এখন?

কে রাজা, এ রাজ্যের?

পাশের লোককে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলে সর্দার, “এ কোন রাজা?”

পাশের লোক আরও চাপা গলায় বললে, “চেন না?”

“না তো!”

“কোথা থাক তুমি?”

“ভিন দেশে।”

“এখানে কেন?”

“তোমাদের রাজাকে দেখতে। এ-রাজার নাম কি?”

“ঝুমরু।”

“ঝুমরু।” চমকে উঠল সর্দার। থরথর করে হাতের আঙ্গুলগুলো শিউরে উঠল। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। কথা ফুটল না মুখ দিয়ে। উঠে দাঁড়াতে গেল সর্দার। পারল না।

লোকটা বললে, “অমন করছ কেন? কি হয়েছে?”

কাঁপা-কাঁপা গলায় সর্দার বললে, “কিচ্ছু না। আচ্ছা, তোমাদের রাজা কার ছেলে?”

“জান না? রাজা আমাদের মাহুতের ছেলে। এর আগেযিনি রাজা ছিলেন, তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে গেছলেন আমাদের এই রাজা। হাজার হাজার সেনার সঙ্গে লড়াই করেছেন একা। এমন সহসী মানুষ আর দেখা যায় না। এমন বীর আর হয় না। রাজা তাই যখন স্বগ্‌গে গেলেন, বিয়ে দিলেন নিজের মেয়ের সঙ্গে মাহুতের ছেলের। আর দিয়ে গেলেন তাঁর গোটা রাজত্ব।”

থাকতে পারল না সর্দার। আদর ঢালা বুকখানা খুশিতে উপচে গেল। আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, “ঝুমরু-উ-উ-উ।”

থতমত খেয়ে গেল দরবার চিৎকারে। চমকে চাইল রাজা সেইদিকে। অবাক। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “কে!”

সর্দার নিমেষে উঠে দাঁড়াল। চোখ দুটি তার জলে ভরে গেছে। আনন্দে, খুশিতে।

রাজা এবার হাঁক দিল, “কে?”

দরবার কেঁপে উঠল।

কেঁপে উঠল দরবারের যত লোক। একসঙ্গে ডেকে উঠল, “কে? কে? কে?”

“বাবা!” হঠাৎ চিনতে পেরেছে ঝুমরু। দেখতে পেয়েছে তার বাবাকে। লাফিয়ে উঠল ঝুমরু। ছুটে এল সেইদিকে।

না, সর্দারও দাঁড়াল না। ছুট দিল। দরবারের অত লোকের ভিড় ঠেলে ছুট দিল। হঠাৎ কোথা থেকে এত শক্তি পেল সর্দার?

ছুট দিল সর্দার দরবার থেকে। না, এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা নয়। ছেলেকে সে দেখেছে। ঝুমরু তার রাজা হয়েছে। সমস্ত বুকখানা তার খুশির আলোয় ভরে গেছে। আর কী দরকার তার এ-রাজবাড়িতে। সে যে মাহুত! আজ সর্দারের ছুটির দিন। ছুটি, ছুটি, ছুটি।

কিন্তু কেমন করে ছুটি দেবে ঝুমরু, তার বাবাকে?

“বাবা-আ-আ-আ।” সে ডাক দিল। সে ছুটল। ঐ পা দুটি সে জড়িয়ে ধরবে বাবার।

অতবড় দরবার থমকে গেল।

অত লোক চমকে গেল।

না, কেউ ধরতে পারল না সর্দারকে। ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে পড়েছে সর্দার দরবার থেকে। বেরিয়ে পড়েছে রাজবাড়ির বাইরে।

তখনও দাঁড়িয়েছিল ঘোড়াটা। সেই হাড়-জিরজিরে ঘোড়াটা বাইরে। লাফ দিল সর্দার ঘোড়ার পিঠে। ঘোড় ছুট দিল। জোড় কদম।

সঙ্গে সঙ্গে রাজাও ছুটল ঘোড়ার পিঠে। রাজার সঙ্গে সিপাইছুটল।

না, পারল না। পারল না ঝুমরু বাবার কাছে পৌঁছতে। হাড়-জিরজিরে ঘোড়া অনেক আগে ছুটছে। পিঠে তার সর্দার।

অনেক আগে।

অনেক দূর।

আরও দূরে চলে গেল ঘোড়া। তীরের মত ছোটে সে।

একটু একটু করে মিলিয়ে গেল। একটু একটু করে হারিয়ে গেল ঐ পাহাড়ের আড়ালে।

ঝুমরুর চোখ দুটিঝাপসা হয়ে এসেছে। ওর চোখ দুটি আর খুঁজে পাচ্ছে না বাবাকে। ওর চোখ দুটি ভেসে গেল কান্নায়।

সর্দার আর ফিরবে না। আজ যে আলো দেখতে পেয়েছে সর্দার। সামনে শুধু আলো। আলো আর রঙ। ছেলে তার রাজা হয়েছে। এ স্বপ্ন তো সে কোনদিন দেখে নি। আজ শুধু খোলা আকাশের নিচে বুক ভরা খুশি নিয়ে ঘুরে বেড়াবে সর্দার। ফিরবে না আর।

ফিরে এল ঝুমরু। ফিরে এল যে-পথে ওর বাবা চলে গেল সে-পথ দিয়ে।

কতদিন হয়ে গেছে। এখনও চেয়ে থাকে ঝুমরু ঐ পথের দিকে। রোজ।ঐ পথের দুপাশে সবুজ গাছের ছায়ায় পাখিরা ডাকে। হাজার হাজার ফুল রঙে রঙে ভরে যায়। ঐ পথসোনা-রূপায় মুড়ে দিয়েছে ঝুমরু। ও ভাবে, একদিন ওর বাবা ফিরবে।

হয়তো ফিরবে। হয়তো ওকে আবার তেমনি বুকের মধ্যেজড়িয়ে ধরবে। আদর করবে। তেমনি আবার গল্প বলবে। বলবে, অভিমন্যু-বীরের গল্প। রাম আর লব-কুশের গল্প।

আর?

আর বলবে মায়ের গল্প। মা! মনে নেই ঝুমরুর মাকে। বাবার মুখে গল্প শুনতে শুনতে ও যেন দেখতে পায় মাকে। মায়ের মুখখানি। চোখ দুটি। আদর-ছোঁয়া হাত দুটি।

হোক সে রাজা। কিন্তু বাবার কাছে সে তোঝুমরু। নিঃঝুম ঘরে একটি প্রদীপ জ্বালবে ঝুমরু। অন্ধকার আবছা-আবছা! সে-ঘরে কেউ থাকবে না। শুধু বাবার বুকে মাথা রেখে গল্প শুনবে ঝুমরু। বাবা কী সুন্দর গল্প বলতে পারে!

তাই রোজ সকালে যে-ফুলটি প্রথম ফোটে সবুজ গাছে, সে-ফুলটি তুলে নেয় ঝুমরু। ঐ পথে তার পাপড়িগুলি ছড়িয়ে দেয় আর কাঁদে, “বাবা, তুমি ফিরে এস, ফিরে এস।”

সে-কান্না কেউ শুনতে পায় না। কেউ না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%