ইটারনার আগন্তুক

জয়দীপ চক্রবর্তী

মাবাড়ি ফেরেন সন্ধের একটু আগে। বাবা তাঁরও পর। স্কুলে ছুটি থাকলে বাড়িতে বিতানের সঙ্গী বলতে শুধু ঠাকুরমা। অবশ্য আশাপিসিও খানিকক্ষণ গল্পগাছা করে তার সঙ্গে, সকালের রান্নাবান্না কাজকর্ম হয়ে যাওয়ার পর। তারপর বেলা একটু বেশি হলে আশাপিসি চলে যায় অন্য বাড়িতে কাজ করতে। ব্যাপারটায় মোটামুটি অভ্যস্তই হয়ে গিয়েছে বিতান।

সময় কাটাতে কখনও বড় একটা অসুবিধে হয়নি তার। স্কুল থাকলে তো অসুবিধে হওয়ার কথাও নয়। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে-ফিরতেই বিকেল। তারপর একটু টিফিন খেয়েই খেলার মাঠ। খেলেধুলে বাড়ি ফিরে, চোখেমুখে হাতে-পায়ে জল দিয়ে পড়ার টেবিলে বসতে-না-বসতেই মা এসে যান প্রতি দিন। আর স্কুল যদি না থাকে, তা হলেও সমস্যা নেই। সকালে পড়াশোনা হয়ে গেলে টিভিতে কার্টুন নেটওয়ার্ক অথবা গান শোনা। নিদেনপক্ষে ঠাকুরমার সঙ্গে দস্যিপনা কিংবা লক্ষ্মী হয়ে গল্প শোনা চুপটি করে—কাজের তার অভাব ছিল না কোনও। অভাব ছিল না মজারও। কিন্তু ইদানীং ভারী বিপদে পড়ে গিয়েছে বিতান। বাবা টিভির কেবল কানেকশন কাটিয়ে দিয়েছেন কিছুদিন আগে এবং টিভি দেখার ব্যাপারেও কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গিয়েছে তার উপর। আর বিকেলবেলা খেলতে যাওয়াটাও কায়দা করে বন্ধ করে দিয়েছেন মা। ওই সময় রোজ সুধন্যস্যার আসেন তাকে অঙ্ক আর ইংরেজি পড়াবার জন্য। রোজ একগাদা করে অঙ্ক আর বিচ্ছিরি-বিচ্ছিরি সব ট্রানস্লেশন করতে হয় তাঁর সামনে বসে। সুধন্যস্যার খুবই কড়া ধাতের মানুষ। খেলাধুলোয় উৎসাহও তাঁর কম। কাজেই তাঁকে কব্জা করা একেবারেই অসম্ভব, একথা বুঝে বিতান হাল ছেড়ে দিয়েছে একেবারেই। এমনকী, ঠাকুরমাও আজকাল কেমন যেন শত্রুভাবাপন্ন হয়ে গিয়েছেন। বিতানকে ছেড়ে হঠাৎ মা-বাবার দলে ভিড়ে গিয়েছেন বিশ্বাসঘাতকতা করে। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে ওঠার পর সিডি প্লেয়ারটায় কোনও গানের সিডি ঢোকাতে গেলেই কেমন যেন হাঁই হাঁই করে ওঠেন। পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে একটুও যদি আড্ডা দিতে যায় ঠাকুরমার সঙ্গে, অমনি মুখ গোমড়া করে সিরিয়াস গলায় ঠাকুরমা বলে ওঠেন, 'বিতান, সুধন্যমাস্টারমশাই যেসব কাজ দিয়ে গিয়েছেন, সব করা হয়ে গিয়েছে তো? উনি বিকেলে টাসক দেখতে চাইবেন কিন্তু! যাও যাও, সময় নষ্ট কোরো না, পড়তে বোসো। জানো তো বড়-বড় মানুষরা বলে গিয়েছেন, সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায় / যে জন বোঝে না তারে...'

বাড়িটা কেমন যেন একটা কয়েদখানা হয়ে গিয়েছে এ-কদিনে। অথচ বিতান যে মারাত্মক কোনও অপরাধ করে ফেলেছে হঠাৎ, এমন তো নয়। ক্লাস সেভেনের ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষার রেজাল্টটা তার আশানুরূপ হয়নি। এইটুকুই তো তার অপরাধ।

বিতানকে কোনওমতেই খারাপ ছেলে বলা যায় না। স্কুলের প্রোগ্রেস রিপোর্ট কার্ডে তার নামের পাশে 'গুড কনডাক্ট' লেখা থাকে। ক্লাস পারফরম্যান্সও তার মন্দ নয়। বরাবর ক্লাসে তার রোল নম্বর এক থেকে দশের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করে। এমনকী, আত্মীয়স্বজনরাও মা-কে প্রায় বলেন যে, 'তোমার বিতান একেবারে সোনার টুকরো ছেলে!' একথাও বিতান নিজের কানে শুনেছে অনেকবার। তবুও যে কেন তার উপরে এই অন্যায় অত্যাচার, সেকথার কোনও জুতসই উত্তর খুঁজে পায়নি বিতান। অবশ্য কদিন আগে মা তাকে একটু রেগেমেগেই বলছিলেন বটে যে, তার মাথাটা আসলে ঠিকঠাক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয়, অনেকটাই ছাইভস্ম পোরা। না হলে ক্লাস সেভেনের অঙ্ক কষে কেউ মাত্র ৫৬ পেতে পারে না। তা ছাড়া ইংরেজিতে ১০০-র মধ্যে ৬৩-টাও নাকি ভদ্রসমাজে বলার মতো নয়। কিন্তু সত্যিই কি তাই? বিতানের ঘোর সন্দেহ আছে কথাটায়। সে যদি সত্যি-সত্যিই এমন গবেটকুল চূড়ামণি হবে, তা হলে বাংলা আর জীবনবিজ্ঞানে সে সারা ক্লাসের সব ছেলেমেয়ের মধ্যে হায়েস্ট নম্বর পেল কীভাবে? অবশ্য বিতান জানে যে, এসব কূট তর্কে তার মাকে বুঝ মানানো খুবই মুশকিল। কাজেই তার যাবতীয় কষ্ট মনের মধ্যেই চাপা দিয়ে রেখেছে সে যত্ন করে। কিন্তু এভাবেও তো আর খুব বেশিদিন চলতে পারে না। কাজেই অবসর পেলেই মুক্তির একটা জুতসই উপায় খুঁজতে লাগল বিতান, মনে-মনে।

আজ স্কুলে ইন্টারক্লাস ক্রিকেট কম্পিটিশনের টিম সিলেকশন ছিল বিতানদের। ক্রিকেট খেলাটা বিতানের বরাবরই আসে ভালো। বাঁ-হাতে চমৎকার ব্যাট করে সে। সঙ্গে ডান হাতে মিডিয়াম পেস বোলিং। বলতে গেলে, তাদের ক্লাসের একজন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় সে। কিন্তু আজ দল গঠনের সময় স্পোর্টস টিচার গৌরাঙ্গস্যার যখন তাদের ক্লাসের অন্য ছেলেদের ট্রায়াল নিচ্ছিলেন, তখন মাঠের ধারেকাছেও যায়নি বিতান। মা-র কড়া নির্দেশ, দিনভর ব্যাট ঘুরিয়ে সময় নষ্ট করার বিলাসিতা এখন তাকে একদম ত্যাগ করে পুরোপুরি পড়াশোনায় মন দিতে হবে। অতএব, ক্লাসের একধারে হাই বেঞ্চে মাথা রেখে চুপ করে শুয়েছিল বিতান। এখন টিফিন টাইম। ক্লাসের সকলেই মাঠের কাছে জড়ো হয়ে ট্রায়াল দেখছে। ওদের চিৎকার এসে লাগছে বিতানের কানে। সত্যি বলতে কী, কেমন যেন কান্না-কান্না পেয়ে যাচ্ছিল ওর। হঠাৎ ছুটতে-ছুটতে ক্লাসে ঢুকে ওর সামনে এসে দাঁড়ায় ভাস্কর। ভাস্কর ওর ক্লাসের সেকেন্ড বয়। বিতানের খুব ভালো বন্ধুও। তা ছাড়া ওদের ক্লাসের ক্রিকেট টিমে গতবারের ক্যাপ্টেন ভাস্কর। বিতানকে অমন চুপ করে বেঞ্চে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায় ভাস্কর। ওর গায়ে ঠেলা মেরে বলে, 'কী রে, মাঠে যাবি না?'

'না!' বিষণ্ণ গলায় জবাব দেয় বিতান।

'কেন?'

'মা বারণ করেছেন।'

'কাকিমা বারণ করেছেন, ধুস!' একটু যেন অবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে ভাস্কর।

'হ্যাঁ রে, সত্যি!' দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে বিতান।

'কিন্তু কেন?'

'ফার্স্ট টার্মে আমার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে না? সেই জন্য!'

'কোথায় খারাপ? তুই তো সিক্সথ হয়েছিস। গতবারের নাইনথ পজিশনের চেয়ে তো প্রোগ্রেস করেছিস।'

'মা তাতে খুশি নন।'

'কী বলেছেন কাকিমা?'

'মা চান আমি ফার্স্ট হই।

'আমার মা-ও চান।'

'কিন্তু তোর মা তো আর তোর খেলা বন্ধ করে দেননি। আমার জানিস তো, খেলাধুলো, গান শোনা, টিভি দেখা, গল্পের বই পড়া, সব বন্ধ।'

'বিকেলে ওই জন্য তুই মাঠে আসিস না এখন?'

'হ্যাঁ। ওই সময় আমাকে সুধন্যস্যার পড়াতে আসেন।'

বিতানের কথা শুনে ভাস্করেরও মনটা যেন কেমন হয়ে যায়। একটা কষ্ট-কষ্ট ভাব এসে বাসা বাঁধে তার বুকের মধ্যে। কী বলে যে বিতানকে সান্ত্বনা দেবে, বুঝে উঠতে পারে না ভাস্কর।

বিতানই কথা বলে আবার। ভাস্করের মুখোমুখি সোজা হয়ে বসে সে ডান হাতটা রাখে তার কাঁধের উপর। তারপর উদাস গলায় বলে, 'জানিস ভাস্কর, মাঝে-মাঝে না খুব ইচ্ছে করে কোথাও চলে যেতে।'

'কোথায় যাবি?' একটু ভয় পেয়ে গিয়ে জিগ্যেস করে ভাস্কর!

'জানি না!'

'তা হলে?'

'তা হলে আবার কী? মোটমাট কথা হল, কোথাও একটা যেতে হবে। অনেক দূরে, যেখানে মা-বাবা থাকবেন না, হোমটাস্ক থাকবে না, সুধন্যস্যারের ট্রানস্লেশন বা বীজগণিতের ঝামেলা বিরক্ত করবে না একটুও। সারাদিন আমি শুধু খেলব আর গল্পের বই পড়ব।'

'কী খাবি?' ভারী কৌতূহলী গলায় জিগ্যেস করে ভাস্কর।

'কী আবার খাব! যা পাব তাই!'

'যদি কিছু না পাস?'

'ধুস। কী যে বলিস! কিছু-না-কিছু ঠিক পেয়ে যাব, যাবই!'

বিতানের কথা শুনে গা-শিরশির করে ওঠে ভাস্করের। সত্যি-সত্যি বিতানটা কোথাও চলে যাবে নাকি? ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করে ভাস্কর, 'তুই কি সত্যি-সত্যি কোথাও চলে যাবি নাকি বিতান?'

'সত্যি চলে যাব।' গলাটাকে গম্ভীর করে বলে বিতান।

'তুই চলে গেলে কাকিমা খুব কষ্ট পাবেন বিতান। আমাদের পাড়ার একটা ছেলে ওরকম কোথায় একটা যেন চলে গিয়েছিল কাউকে কিছু না বলে। তার মায়ের সে কী কান্না!'

'তারপর কী হল?' উৎসাহের সঙ্গে জিগ্যেস করে বিতান।

'ছেলেটা পরের দিনই ফিরে এল। এসে বলল, মামার বাড়ি না মাসির বাড়ি, কোথায় যেন চলে গিয়েছিল হঠাৎ।'

'ওর মা কী করলেন ছেলেটাকে তখন? বকলেন?'

'উঁহু।'

'তা হলে?'

'ছেলেটাকে দু-হাতে জড়িয়ে আবার কান্না শুরু করলেন।'

'হেব্বি ব্যাপার তো!' ভাস্করের কথা শুনে বেশ মজা পেয়ে গেল বিতান। আর মনে-মনে ভাবতে লাগল, তার মাকেও যদি এমনই করে জব্দ করা যেত, ব্যাপারটা তা হলে মন্দ হত না! কিন্তু যাব বললেই তো আর হুট করে সত্যি-সত্যি কোথাও চলে যাওয়া যায় না! কাজেই কী উপায় যে বের করা যায়, তা নিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল বিতান।

একটা হালকা অথচ গম্ভীর আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল বিতানের। ঘরের মধ্যে নাইট ল্যাম্পের হালকা নীলচে আলো। মশারির মধ্যে চুপ করে শুয়ে আওয়াজটার উৎস বোঝার চেষ্টা করল বিতান। প্রথমটা কিছু বুঝে উঠতে পারল না সে। একটা ভয়-ভয় ভাবও এসে গেল মনের মধ্যে। হঠাৎ বিতানের মনে হল, যেন তার খাটটা মৃদু-মৃদু কাঁপতে শুরু করল। একটা হালকা টিনটিন-টিনটিন আওয়াজ হতে শুরু করল যেন কোত্থেকে। বিছানায় উঠে বসে মশারির বাইরে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল সে। মাথার দিকে বিছানার পাশে একটা ছোট টেবিলের উপর মা রোজ রাতে শুতে যাওয়ার সময় একটা কাচের গেলাসে করে জল রেখে যান তার জন্য। গেলাসের উপর চাপা দেওয়া ছোট্ট স্টিলের রেকাবিটা থিরথির করে কাঁপছে এখন। টিনটিন করে শব্দটাও আসছে ওখান থেকেই। মশারি তুলে বাইরে বেরিয়ে এল বিতান। ভালো করে লক্ষ করে দেখল, গ্লাসের মধ্যের জলটাও কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে হঠাৎ। দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারটাও খসখস করে দুলছে।

বিতান ভয় পেয়ে গেল। ভূমিকম্প নাকি? নাকি আবার সুনামি-টুনামি শুরু হল কোথাও। পাশে পুকুর থাকলে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট করে বুঝে নেওয়া যেত। কিন্তু বিতানদের বাড়ির আশপাশে পুকুরের চিহ্ন নেই কোথাও। বিতান দু'-এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবল। সে শুনেছে, ভূমিকম্পের সময় ঘরের মধ্যে থাকা ভালো নয়। তার মনে হল, পাশের ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে মা-বাবাকে ডাকা উচিত। কিন্তু বিতান মা-বাবার ঘরের দিকে পা বাড়াতে-না-বাড়াতেই সেই অদ্ভুত কম্পন একদম মিলিয়ে গেল।

বিতান ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল চুপটি করে। হঠাৎ তার বিছানার মাথার দিকের খোলা জানালাটা দিয়ে একটা তীব্র সবুজ আলোর রেখা ঠিকরে এল তার ঘরের মধ্যে। আলোটা তার ঘরের মেঝের উপর আছড়ে পড়ে প্রথমটা চরকিবাজির মতন ঘুরতে লাগল বনবন করে। তারপর এক সময় আলোটা থামল। আর ওই আলোর কেন্দ্রবিন্দু থেকে একটা হালকা সবুজ রঙের ধোঁয়া বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে পড়তে লাগল সারা ঘরময়। এই আশ্চর্য ঘটনাবলির মধ্যে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল বিতান। এসময় তার যে কী করা উচিত, কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারল না সে। এমনকী, এই অদ্ভুত ঘটনার মধ্যে দাঁড়িয়ে ভয় পেতেও বেমালুম ভুলে গেল সে! হঠাৎ সেই সবুজ ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে থেকে ভারী মিষ্টি গলায় কে একজন বলে উঠল, 'বিতান, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?'

কণ্ঠস্বরটা শুনে ভীষণ চমকে উঠল বিতান। ঘাবড়েও গেল খুব। সবুজ ধোঁয়ার দিকে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল সে কোনও উত্তর না দিয়ে।

কণ্ঠস্বর আবার জিগ্যেস করল, 'আমার কথা তুমি শুনতে পাচ্ছ না বিতান?'

'পাচ্ছি।' একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে ভিতু-ভিতু গলায় উত্তর দেয় বিতান।

'বাঃ, বেশ!' ভারী খুশি হয় কণ্ঠস্বর।

কণ্ঠস্বরকে খুশি-খুশি মনে হওয়ায় একটু সাহস পায় বিতান। অনেকটা সহজ গলায় সে এবার জিগ্যেস করে কণ্ঠস্বরকে, 'তুমি কে?'

'আমি?' বলে খানিকক্ষণ কী যেন ভাবে সেই অদ্ভুত কণ্ঠস্বর। তারপর বলে, 'আমাকে তুমি প্রায় তোমাদের মতো একজন মানুষই ভাবতে পারো।'

'প্রায় আমাদের মতো!' বিতান অবাক হয়ে বলে, 'তার মানে তুমি আমাদের মতো সম্পূর্ণ মানুষ নও?'

'না।' কণ্ঠস্বর বলে।

'তুমি কি তা হলে ভূত?' ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করে বিতান।

'তাও না!' কণ্ঠস্বর হাসে।

'তা হলে কী তুমি?'

'আমিও তোমাদেরই মতো একটি বুদ্ধিমান প্রাণী এবং একটি সভ্য, সুসংবদ্ধ ও উন্নত সমাজের নাগরিক।'

'আমি তোমার কথা ঠিকমতো বুঝতে পারছি না।' কণ্ঠস্বরকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে বিতান।

'আসলে আমাদের পৃথিবীটা তোমাদের পৃথিবীর চেয়ে অনেকটাই আলাদা।'

'তুমি কি তা হলে আমাদের এই পৃথিবীর লোক নও?' ভীষণ উত্তেজিত গলায় বলে বিতান।

'না বিতান।' কণ্ঠস্বর ভারী শান্ত গলায় উত্তর দেয় তাকে।

'তুমি তা হলে কোথায় থাকো?' ভীষণ কৌতূহলী কণ্ঠে তাকে জিগ্যেস করে বিতান।

'আসলে, তোমাদের এই সৌরমণ্ডলের বাইরে অনেক দূরের অন্য এক সৌরমণ্ডলের অধীন এক গ্রহে আমাদের বসবাস। গ্রহটি খুবই ছোট্ট, কিন্তু অপূর্ব সুন্দর।'

'তোমাদের ওই গ্রহের কী নাম?'

'আমাদের গ্রহের নাম ইটারনা।'

'ইটারনা? অদ্ভুত নাম তো! ইংরেজিতে এই শব্দটির কাছাকাছি একটা শব্দ আছে, তার মানে শাশ্বত বা চিরন্তন।' সুধন্যস্যারের কাছে সদ্য-শেখা বিদ্যেটা তড়িঘড়ি প্রকাশ করে দেয় বিতান।

'ইটারনা শব্দটাকে তুমি ওই অর্থেই প্রকাশ করতে পারো!' কণ্ঠস্বর মিষ্টি করে বলে।

'তোমার গ্রহটার এমন নাম হল কেন?' জিগ্যেস করে বিতান।

'সেটা তো ওখানে গিয়ে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না তুমি!'

'কিন্তু ওখানে যাব কীভাবে?'

'তুমি চাইলে তোমাকে আমি নিয়ে যেতে পারি ওখানে। তুমি কি আমার সঙ্গে আমাদের ওখানে যাবে বিতান?'

বিতান প্রস্তাবটা খানিক ভাবে মন দিয়ে। কিন্তু একটা খটকাও থেকে যায় তার মনে। যে কথা বলছে, তাকে তো এখনও পর্যন্ত দেখতেই পায়নি সে। সত্যি-সত্যি সে এখানে আছে তো! নাকি পুরো ব্যাপারটাই কোনও দুষ্টু লোকের কারসাজি? আজকাল প্রায়ই নাকি একদল বিচ্ছিরি লোক তার মতো বয়সের ছেলেমেয়েদের ভুলিয়ে-ভালিয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট, বাড়ি-স্কুল থেকে। তারপর টাকার লোভে বিক্রি করে দিচ্ছে তাদের, অন্য সব খারাপ লোকের কাছে। কাগজে বা টিভি নিউজে প্রায়ই প্রকাশ হচ্ছে এধরনের খবর। বিতানের মা-বাবা-ঠাকুরমাও মাঝেমধ্যেই সাবধান করে দেন বিতানকে, যাতে সে দুষ্টু লোকের খপ্পরে গিয়ে না পড়ে কখনও। কণ্ঠস্বরটা শুনে এই লোকটাকে দুষ্টু লোক বলে বিতানের একবারও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না ঠিকই, তবু লোকটাকে আর একটু যাচাই করে নিতে চাইল বিতান। অনেকটা স্বচ্ছ হয়ে আসা সবজেটে ধোঁয়ার যে কুণ্ডলীটা, সেদিকে এক-দু-পা এগিয়ে গিয়ে সে একটু দৃঢ় গলায় বলল, 'তুমি যে আমাকে নিয়ে যাবে বলছ, তুমি কোথায়? তোমাকে তো আমি দেখতেই পেলাম না এখনও পর্যন্ত!'

এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে কণ্ঠস্বর বলল, 'আসলে এই মুহূর্তে আমি আমার শরীরকে আশ্রয় করে নেই।'

'মানে?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে বিতান।

'তুমি তো অনেক ছোট। কাজেই সবটা হয়তো বুঝতে পারবে না তুমি!'

'যেটুকু বুঝব, অন্তত সেটুকু বলো!' উৎসাহ নিয়ে বলে বিতান।

'আসলে ব্যক্তি বলতে আমরা সাধারণত একটা অবয়ব বুঝি...একটা শরীর বুঝি। ওই শরীরটারই একটা ফোটোকপি আমরা রেখে দিই আমাদের স্মৃতির মধ্যে। যেমন ধরো, তোমরা যেমন কোনও একটা ছবি বা একটা ঘটনাকে লোড করে রাখো কম্পিউটার মেমরিতে।' কণ্ঠস্বর থামে। আবার বলে, 'আমার কথা কি তুমি বুঝতে পারছ বিতান?'

'পারছি। তুমি বলো!' ছোট্ট করে উত্তর দেয় বিতান।

'কিন্তু তোমার শরীরটা মানে তুমি নও। শরীরটা একটা পোশাক, একটা খোলস, যার মধ্যে আসল তুমি লুকিয়ে রয়েছ। আমরা ইচ্ছেমতো ওই খোলস ছেড়ে সূক্ষ্ম শরীরে দেহের বাইরে বেরিয়ে আসতে পারি। ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে পারি যেখানে খুশি। আলোর চেয়েও অনেক বেশি দ্রুতবেগে। তোমরা মানুষেরা সকলে এখনও এই বিজ্ঞানকে রপ্ত করতে পারোনি ঠিকঠাক। তোমাদের কাছে এই সাধারণ ঘটনাগুলো এখনও অলৌকিকের পর্যায়ে...'

'সব মানুষ মানে?' কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিয়ে বলে বিতান, 'তুমি কি বলতে চাইছ, কিছু-কিছু মানুষ এই প্রক্রিয়া জানে?

'ঠিক তাই বিতান!'

'তাঁরা কারা?'

'তাঁরা অত্যন্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন। প্রকৃতির সঙ্গে ভারী সুন্দরভাবে নিজেদের টিউনড করে নিতে পারেন তাঁরা। এই বিশ্বপ্রকৃতির সমস্ত রহস্য তাঁদের জানা এবং এসব আপাত-রহস্যের কলাকৌশলও তাঁদের করায়ত্ত।'

'তুমিও কি তাঁদের মতো শক্তিসম্পন্ন?'

বলতে পারো।'

'ওই জন্যই কি আমার নাম আমি না বলতেই জেনে ফেলেছ তুমি?'

'হ্যাঁ। আর শুধু এটুকুই নয়, আরও জেনেছি যে, এ-বাড়ি ছেড়ে, মা-বাবাকে ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে চাইছ তুমি! যেখানে কেউ খুঁজে পাবে না তোমায়।'

'আমি সত্যি-সত্যিই চলে যেতে চাই, বিশ্বাস করো। হাসি, খেলা, গল্প, আদরবিহীন এই একঘেয়ে, বিচ্ছিরি রুটিনের মধ্যে একদম ভাল্লাগছে না আমার। হ্যাঁ, আমি চলেই যাব।'

'ঠিক বলছ তো?'

'হ্যাঁ।'

'পরে মত পালটাবে না?'

'না।'

'মা-বাবার জন্য মন কেমন করবে না?'

'না।'

'ঠাকুরমার জন্য?'

'উঁহু।'

'তোমার বন্ধু-বান্ধব, স্কুল...'

একটু থেমে থাকে বিতান। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, 'না!'

'আমাদের গ্রহে একবার পৌঁছে গেলে ফিরে আসা কিন্তু খুব শক্ত!'

'হোক, তবু আমি যাব।'

'তা হলে দরজা খুলে সাবধানে বাইরে বেরিয়ে এসো। রাস্তার ওপারে যে একফালি ফাঁকা জায়গা, সেখানে সবুজ রঙের একটা ক্যাপসুলের মতো দেখতে স্পেসশিপ রাখা আছে। তুমি ওটার দরজার কাছে পৌঁছলেই আপনি-আপনি দরজা খুলে যাবে। তুমি ভিতরে ঢুকে পোড়ো। ওখানে টেবিল-চেয়ার আছে। টেবিলে অনেক গল্পের বই। ইচ্ছে হলে শুয়ে পড়তেও পারো। বিছানা পাতা আছে আর-এক ধারে।'

'দরজা খুলতে গিয়ে মা-বাবা বা ঠাকুরমা যদি জেগে যান?'

'জাগবেন না। আমি জাগতে দেব না।' বলতে-বলতে মিলিয়ে যায় কণ্ঠস্বর। সবজে ধোঁয়ার কুণ্ডলীটাও ফিকে হতে-হতে মিলিয়ে যায় একদম। বিতান তার মা-বাবার ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকায় একবার। একবার ঠাকুরমার ঘরের দিকে।

তারপর পড়ার টেবিলে পড়ে থাকা খাতাটার মলাটের উপর কী একটা লাইন খসখস করে লিখে দিয়েই দ্রুত পায়ে বাইরে বেরোনোর দরজার দিকে এগিয়ে যায়।

লোকাল থানার সাব-ইনস্পেকটর চন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বিভাসবাবুর পূর্ব পরিচিত। একসময় তাঁরা দুজনে একই কলেজে পড়াশোনা করতেন একসঙ্গে। চন্দ্রনাথের ছেলে নীলাঞ্জন এখন বিতানের সহপাঠী। উদভ্রান্তের মতো বিভাস যখন থানায় ঢুকলেন, চন্দ্রনাথ অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলছেন তখন। বিভাস ঘরে ঢুকতে, ইশারায় তাঁকে নিজের উলটো দিকের চেয়ারে বসতে বললেন চন্দ্রনাথ। বিভাস চুপ করে বসে থাকতে পারছিলেন না। ভয়ংকর একটা উদ্বেগ সর্বক্ষণই যেন অস্থির করে রেখেছে তাঁকে। প্রতিটি মুহূর্ত যেন কী দীর্ঘ মনে হচ্ছে এখন! চন্দ্রনাথের সামনে থেকে অন্য লোকটি উঠে পড়তে বিভাসের দিকে মুখ ফেরালেন তিনি। ঠান্ডা গলায় আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে তিনি বলতে লাগলেন, 'পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে বিভাস। সকালে তোর ফোন পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই পসিবল সমস্ত স্টেপই নিয়েছি আমরা। কিন্তু আমাদেরও তো সময় দিতে হবে!'

'কিন্তু বিতানের যদি একটা ভয়ংকর খারাপ কিছু হয়ে যায় এর মধ্যে?' কাতর স্বরে বলে ওঠেন বিভাস।

'তুই ওয়ার্স্ট পসিবিলিটিটাই বা ভাবছিস কেন?' চন্দ্রনাথ সাহস দেন তাঁকে, 'আমার কিন্তু স্থির ধারণা, ওটা অপহরণের কেস নয়!'

'কী করে এতটা শিওর হচ্ছিস তুই?'

'কারণ আছে। আর কারণগুলো বেশ স্পষ্ট।'

'কী কারণ?'

'প্রথমত, বিতানকে পাওয়া যাচ্ছে না আজ ভোর থেকে। তাই তো?'

'হ্যাঁ। আমার মা সকলের আগে ঘুম থেকে ওঠেন রোজ। উঠে মুখটুখ ধুয়ে চা করে খেয়ে বাড়ির সামনের লনে পায়চারি করেন কিছুক্ষণ। আজ ঘুম থেকে উঠে মা-ই আবিষ্কার করেন যে, বাড়ির বাইরের দরজা খোলা এবং বিতান নেই।'

'বেশ, তাই যদি হয়, তা হলে একটা প্রশ্ন তো এসেই যায় যে, বাড়ির দরজা খুলল কে?'

'হ্যাঁ।'

'আর এর উত্তর হল, বিতান নিজেই!'

'কিন্তু...'

'কোনও কিন্তু নয়। এর পিছনের লজিকটা ভাব। আসলে এ ঘটনায় এটুকু তো বুঝছিস যে, বিতান নিজের ইচ্ছেতেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছে। আর তাই যদি হয়, তা হলে সে নিশ্চয়ই কোথাও লুকিয়ে আছে আশপাশেই। অথবা কোনও পরিচিত আত্মীয়-বন্ধুর বাড়িতে আছে আপাতত। ঠিক ফিরে আসবে নিজে-নিজেই। আমরা তো এই লাইনে রয়েছি বিভাস, ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রেই কিন্তু ব্যাপারটা এরকমই ঘটে!'

'আর যদি বিতানকে কেউ ভুলিয়ে-ভালিয়ে, ফুসলে নিয়ে যায় কোনও অসৎ উদ্দেশ্যে?'

একটু চুপ করে থাকেন চন্দ্রনাথ। তারপর অভ্যস্ত পেশাদারি গলায় বলেন, 'আমরা দেখছি। চিন্তা করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখিস!'

একটুক্ষণ চুপ করে থাকেন বিভাস। তারপর স্খলিত গলায় বলেন, 'ওর মা আর ঠাকুরমাকে কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না চন্দ্র। ভীষণ কান্নাকাটি করছেন সকাল থেকে!'

চন্দ্রনাথ বাঁ-হাতের কবজি উলটে ঘড়ি দেখেন। তারপর টিং করে টেবিলে রাখা ঘণ্টাটা একবার বাজিয়ে দিয়ে বিভাসকে বলেন, 'দাঁড়া, দুজনে চা খেয়ে নিই এক কাপ করে। তারপর একবার ঘুরেই আসি তোর বাড়ি থেকে। আর তোর বাড়ি যাওয়ার সময় ওর আরও দু-একজন বন্ধুর সঙ্গেও কথাবার্তা বলে নিই একটু।'

ডান হাত নেড়ে অনিচ্ছে প্রকাশ করেন বিভাস, 'চা খেতে ইচ্ছে করছে না চন্দ্র! তুই একা খা।'

'ইচ্ছে না করলেও খা। পেটে কিছু পড়লে দেখবি মাথাটাও কাজ করতে শুরু করছে ঠিকঠাক।' বলে পাশে এসে দাঁড়ানো বেয়ারাকে চা আর অমলেট অর্ডার দেন চন্দ্রনাথ।

স্পেসশিপটার মধ্যে ঢুকে অবাক হয়ে গেল বিতান। বাইরে থেকে দেখে একদমই বোঝার উপায় নেই যে, এতখানি জায়গা রয়েছে এটার ভিতরে। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে বিতান, সেটা প্রায় একখানা মাঝারি মাপের ঘরেরই মতো। একটা ভারী মিষ্টি ঠান্ডা সবুজ আলো ঘিরে রেখেছে পুরো ঘরটাকে। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা সুন্দর টেবিল পাতা, টেবিলের একধারে একটা চেয়ার। চেয়ার-টেবিল দুটো যে কী দিয়ে বানানো বুঝতে পারল না বিতান। এমন সুন্দর আর স্বচ্ছ আর আলোকময় সেগুলো যে, দেখলেই ভালো লেগে যায়। বিতানের স্পষ্ট অনুভব হল, যেন কী একটা অনুচ্চারিত ভাষায় চেয়ার-টেবিলগুলো ডাকছে তাকে। সম্মোহিতের মতো এগিয়ে গিয়ে বিতান বসে পড়ল সেই চেয়ারটার উপর।

টেবিলের উপর একরাশ গল্পের বই পরিপাটি করে সাজানো। বিতান বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে অবাক হয়ে গেল। বইগুলোর বেশির ভাগই তার মনের মতো। পরম আগ্রহে একটা বই তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করে দিল বিতান। পড়তে-পড়তে যে কতক্ষণ সময় পার হয়ে গেল, খেয়ালই রইল না তার। বইটা এত সুন্দর আর চিত্তাকর্ষক যে, পুরো বইটা একনাগাড়ে পড়ে যেতে লাগল ও। পড়তে-পড়তে বইটা শেষও হয়ে গেল একসময়। বিতান নিজেই অবাক হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল পুরো বইটা! ভালোও লাগল খুব। আসলে পড়াশোনার চাপে এভাবে গল্পের বই পড়ার সময় তার বড় একটা হয় না আজকাল। পড়ার ফাঁকে সামান্য অবসরে অথবা অন্যের চোখ ফাঁকি দিয়ে পড়ার বইয়ের আড়ালে লুকিয়ে-লুকিয়ে এমন একটানা গল্প পড়ার কোনও অবকাশ নেই তার। তা ছাড়া ওভাবে গল্প পড়ার মজাও অনেক কম। বইটাকে আরও একবার হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে ওটাকে পরিপাটি করে টেবিলের উপর গুছিয়ে উঠে পড়ে বিতান। একটানা অনেকক্ষণ পড়ে পিঠে একটা হালকা অস্বস্তি হচ্ছে। তা ছাড়া ঘুমচোখে হঠাৎ উঠে পড়ে এইভাবে চলে আসায় ঘুমটাও পুরোপুরি না হওয়ায় চোখ দুটো জ্বালা করছে অল্প-অল্প।

টেবিলের কাছ থেকে বাঁ-দিকে সরে এসে সামনের সরু করিডোর বেয়ে এগিয়ে যায় বিতান। এখন ক'টা বাজে কে জানে। তার কাছে ঘড়ি নেই। যে অদ্ভুত আকাশযানে চেপে এখন চলেছে সে, তার দেওয়ালেও এখনও পর্যন্ত কোনও ঘড়িটড়ি চোখে পড়েনি তার। ধীর পায়ে আরও একটু এগিয়ে গিয়েই ডান দিকে আর একটা ছোট্ট ঘর চোখে পড়ে বিতানের। ঘরটার ভিতর একটা ছোট্ট খাটের উপর পরিপাটি করে বিছানা পাতা। এ ঘরটাতেও ছড়িয়ে রয়েছে একটা হালকা সবুজ রঙের আলো। তবে এ-ঘরের আলোটা অনেক ম্লান, অনেকটা বিতানেরই ঘরের রাতবাতিটার আলোর মতো। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সবুজ চাদর পাতা বিছানাটার উপরে উঠে বসল বিতান। আর তার বসার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। তার বিছানার পায়ের দিকে স্পেসশিপটার দেওয়ালটা নিঃশব্দে একদিকে সরে যেতে লাগল। আর তার পিছনের কাচের চেয়েও আরও স্বচ্ছ যদি কিছু থাকে, তেমনই একটা আবরণের ওপারে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে লাগল নিকষ কালো রঙের অনন্ত প্রসারিত আকাশটা।

এমন আকাশ কখনও দেখেনি বিতান! সাধারণ যেমন আকাশ দেখতে আমরা অভ্যস্ত, এ দৃশ্য তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। স্বচ্ছ আবরণের ওপারে আকাশের কালো পরদার উপরে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে অন্তত পাঁচ-ছ'টা চাঁদ। নানারকম রং তাদের। অজস্র নক্ষত্র ঝলমল করছে আকাশময়। একটা মস্ত ধূমকেতু তার ঝাঁটার মতো লম্বা লেজ নাড়িয়ে শাঁ করে ছুটে চলে গেল, যেন ওই স্বচ্ছ জানলাটার একেবারে গা ঘেঁষে। একটা গাঢ় লাল রঙের মস্ত বড় ডিম্বাকৃতি গ্রহ ক্রমশ আকাশের এক দিক থেকে আর-এক দিকে সরে যাচ্ছে আপনমনে। বিতান হাঁ করে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল।

বালিশের উপর মাথা রেখে শরীরটাকে টানটান করে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল সে। আর বাইরের আকাশে ফুটে থাকা অসংখ্য ছোট-বড় উজ্জ্বল মিটমিটে নানারকম গ্রহ-নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে ভাবতে লাগল, ওসব অতি ক্ষুদ্র মিটমিটে গ্রহ-তারাদের ভিড়েই নিশ্চয়ই মিশে আছে তার অতি পরিচিত গ্রহটা। যার নাম পৃথিবী। যেখানে একটা অতি প্রাচীন দেশের এক প্রান্তে একটা ছোট্ট বাড়ির মধ্যে এই কয়েক ঘণ্টা আগে পর্যন্তও বাস করত সে, আরও কয়েকজন মানুষের সঙ্গে।

বাড়ির কথা মনে আসতেই নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসে বিতানের বুকের মধ্যে থেকে। বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে আপনমনে যে, তার পরিচিত পৃথিবীতে হয়তো এতক্ষণে রাত কেটেছে। ঠাকুরমা উঠে পড়েছেন বিছানা ছেড়ে। ঠাকুরমা উঠে বিতানের ঘরে গিয়ে দেখবেন, বিতান নেই। তারপর বাইরের দরজা খুলতে গিয়ে দেখবেন, দরজা আগে থেকেই খোলা! ঠাকুরমা নিশ্চয়ই ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে তখন মা-বাবাকে ডাকবেন। মায়ের কথা মনে আসতেই মনে-মনে খুব মজা পায় বিতান। মা যখন জানবেন যে, বিতান সত্যিই চলে গিয়েছে, আর কখনও কোনওদিন ফিরে আসবে না সে, তখন নিশ্চয়ই খুব আশ্চর্য হয়ে যাবেন। ভয়ও পেয়ে যাবেন খুব। মায়ের সেই বেদম ভয় পেয়ে যাওয়া মুখটার কথা ভাবতে-ভাবতে এক সময় ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যায় বিতান।

বিতানের বাড়ি এখন লোকে লোকারণ্য। সকালে বিতানের নিরুদ্দেশ হওয়ার খবরটা চাউর হয়ে পড়া থেকেই পাড়া-প্রতিবেশীদের অবিরাম আনাগোনা শুরু হয়েছে এ-বাড়িতে। তা ছাড়া, সকালে যেসব আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বা বিতানের বন্ধুবান্ধব-সহপাঠীর বাড়ি ফোন করা হয়েছিল বিতান সেখানে গিয়েছে কিনা জানার জন্য, সেই সব বাড়ি থেকেও কেউ-কেউ আসছেন খবর নেওয়ার জন্য। এঁদের মধ্যে যাঁরা পুরুষমানুষ, তাঁরা গম্ভীর মুখে বসে আছেন এদিক-সেদিক। মাঝে-মাঝে বিভাসবাবুকে দু-একটা পরামর্শও দিচ্ছেন। কেউ-কেউ আবার বিতানের ঠাকুরমার কাছে গিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন ভীষণ আন্তরিক গলায়। আর মহিলারা ঘিরে বসে আছেন বিতানের মাকে। এঁদের অধিকাংশই বিতানদের প্রতিবেশী। এঁরা সকলেই যে এ-ধরনের ব্যাপারে বেশ খোঁজখবর রাখেন, বা তাঁরা যে অপহরণ নামক ভয়ানক আশঙ্কাটি সম্পর্কে কী মারাত্মক সচেতন, বারবার তা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন বিতানের মায়ের কাছে।

বিতানের দুটো বাড়ি পাশে থাকেন সুরঞ্জন ঘোষ। ভদ্রলোকের স্ত্রী সেকেন্ড ক্লাসে বি এ পাশ। তিনি সুযোগ পেলেই সকলের সামনে প্রমাণ করেন, এই রাজ্যে তাঁর মতো উচ্চশিক্ষিত মহিলার চাকরিবাকরি না পেয়ে বসে থাকার কথা নয়। তা ছাড়া তাঁর নিজেরও যা দক্ষতা, তা দিয়ে মোটামুটি ভদ্রস্থ একটা চাকরি জুটিয়ে নেওয়া এক-দেড় মাসের মামলা। শুধু নীতিগত কারণে নিজের ছেলেটাকে ঠিকমতো দেখভাল করার জন্যই নাকি তিনি জীবনে চাকরি না করার মতো স্বার্থত্যাগ করেছেন স্ব-ইচ্ছেয়। নিন্দুকরা যদিও অন্য কথা বলে, তবু তিনি তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে একেবারে মনুমেন্টের মতো স্থির। হাত নেড়ে-নেড়ে তিনি এখন বিতানের মাকে বোঝাচ্ছিলেন, 'দেখুন দিদি, মনে কিছু করবেন না, আপনাকে বলছি না, তবু চাকরি-বাকরি করে ছেলেপুলের দেখাশোনা ঠিকঠাক করাটা বড় মুশকিল।'

'চাকরি তো আমিও করি ভাই!' তাঁকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আর এক ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, 'তা আমার ছেলে তো অমানুষ নয়। এই তো গেল বারে সব বিষয়ে পাশ করেই ক্লাসে উঠেছে। তা ছাড়া অমন চড়ুবড়ু কাজের ছেলে আর গুরুজনে ভক্তিশ্রদ্ধাও আজকাল খুব কমই দেখা যায়।'

'আমি তো তোমাকে বলছি না ভাই,' সুরঞ্জনবাবুর স্ত্রী খেঁকিয়ে উঠলেন, 'তোমার গায়ে কথাটা পড়ল কেন হঠাৎ?'

উনিও কী একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বিতানের মা থামিয়ে দিলেন হাত তুলে, 'কী দরকার ওসব তর্কাতর্কিতে...'

'ছি-ছি, কী রে তোরা!' রায়মাসিমা ধমকে উঠলেন ওঁদের, 'দেখছিস, ওর এখন সন্তান শোক...'

'ও কী গো...' বলে চেঁচিয়ে ওঠেন উলটো দিকের ফ্ল্যাট বাড়িটার তিনতলায় থাকা অন্নদা ঠাকুরমা, 'কথার কী ছিরি হে তোমার অ্যাঁ? সন্তান শোক কেন হবে ওর? শ্রীহরি ছেলেটাকে দীর্ঘায়ু করুন, ভালো রাখুন, মানুষ করুন সত্যিকার মানুষের মতো।'

'আমরাও তো সেই কামনাই করি মাসিমা,' অন্যরা বলে উঠল সমস্বরে। তার মধ্যে একজন আবার যোগ করে, 'তবে দিনকাল যা পড়েছে! মায়ের মন, চিন্তা কি আর হয় না ওর? কাগজ খুললেই তো দেখি, লিখছে ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করে ফেলছে রাতদিন।'

আরও হয়তো কিছু বলতেন তিনি। কিন্তু এরই মধ্যে পাশের বাড়ি কাজ করে যে মেয়েটা, যার নাম লক্ষ্মী, সে চিৎকার করে বলতে লাগল, 'শোনো বউদি, ওসব পুলিশ-টুলিশে কিচ্ছু হবেনি। তার চে বরং আমার বাড়ির ধারে মুলটি বাজারের পিছনে এক মস্ত গুণিন থাকে, কাল সকালে কাজে আসার সময় তাকে ধরে নে' আসি। সে একেবারে সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি বউদি। বাটি চেলে ঠিক বলে দেবে বাবু এখন কোতায় আচে।'

বিতানের মায়ের এ-সমস্ত কথাবার্তা কিছুই ভালো লাগছে না। কথাগুলো ঠিকঠাক কানেও যাচ্ছে না তাঁর। মানসিক উদ্বেগ আর কষ্ট সইতে-সইতে ক্রমশ যেন বড় ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন তিনি এখন। মানুষজনের সান্নিধ্য আর ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে, একদম একা-একা চুপ করে বসে থাকেন খানিক। এঁদের যে চলে যেতে বলবেন, তাও পারছেন না তিনি। সৌজন্যবোধে বাধছে। তাঁর এই অস্বস্তিকর অবস্থায় চন্দ্রনাথ এসে উদ্ধার করলেন তাঁকে। গলায় পেশাদারি গাম্ভীর্য এনে লোকজনদের উদ্দেশে ঘোষণা করলেন তিনি, 'আপনারা এখন আসুন। আমি এঁর সঙ্গে একটু একান্তে কথা বলতে চাই।'

পুলিশের লোক দেখে একটা মৃদু চাঞ্চল্য শুরু হল ঘরের মধ্যে। তবে একটুক্ষণের মধ্যে ফাঁকাও হয়ে গেল ঘরটা।

বিতানের মা ম্লান হাসলেন। চন্দ্রনাথের দিকে চেয়ে বললেন, 'চন্দ্রদা, আপনি আমায় বাঁচালেন।'

চন্দ্রনাথও হাসলেন। তারপর একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বিতানের মা-র মুখোমুখি বসে পড়ে বললেন, 'তবে আমি কিন্তু সত্যিই আপনার সঙ্গে দু'-একটা কথা বলতে চাই বউদি। অবশ্য কথাগুলো খুবই প্রয়োজনীয়।'

'বলুন।'

'আপনার কী ধারণা, বিতানকে কেউ জোর করে নিয়ে গিয়েছে? মানে, কোনওভাবে তাকে প্রলোভন বা ভয় দেখিয়ে দরজা খুলিয়ে...'

'আমার তেমনই মনে হয়!'

'কেন?'

'আজ সকালে ওর ঘরে গিয়ে দেখলাম, ওর পড়ার টেবিলের একটা খাতার উপর বিতান লিখে রেখেছে, ''আকাশের অন্য পারের লোকেদের সঙ্গে আমি অন্য গ্রহে পাড়ি দিচ্ছি''!'

'স্ট্রেঞ্জ! কাগজটা দেখাতে পারেন?'

'পারি!' বলে উঠে গিয়ে পাশের ঘর থেকে খাতাটা নিয়ে এসে চন্দ্রনাথের হাতে দিলেন বিতানের মা। খাতাটার দিকে ভুরু কুঁচকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন চন্দ্রনাথ। তারপর মুখ তুলে বললেন, 'আমি কিন্তু অন্যটাই ভেবেছিলাম বউদি।'

'কী ভেবেছিলেন?'

'শুধু ভাবিনি, প্রায় নিশ্চিত ছিলাম যে, বিতান নিজের ইচ্ছেতেই বাড়ি ছেড়ে কোথাও বেরিয়ে পড়েছে, ছেলেমানুষি আর অভিমানের জন্য।'

'অভিমান?'

'হ্যাঁ।'

'কার উপর?'

'ডোন্ট মাইন্ড বউদি। অভিযোগটা মূলত আপনার বিরুদ্ধেই।'

'কী বলছেন চন্দ্রদা?'

'ঠিকই বলছি, বউদি।'

'কিন্তু কারণটা কী?'

'আপনি পড়াশোনার জন্য যে প্রেশারটা ওর উপর ইম্পোজ করেছিলেন, সেই স্ট্রেসটা মেন্টালি নিতে পারেনি ও।'

'আমি ঠিক বুঝলাম না চন্দ্রদা!'

'আসলে বউদি, আমরা, মানে যারা অভিভাবক, আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে সব সময় এমন পারফরম্যান্স আশা করি, যেটা হয়তো তার ক্ষমতার বাইরে।'

'হতে পারে!' চন্দ্রনাথকে থামিয়ে দেন বিতানের মা, 'তবে বিতানের কাছে আমরা যেটুকু চাই, সেটা তো বিয়ন্ড ক্যাপাসিটি নয়। আপনিই বলুন, বিতানের মতো ছেলে ম্যাথসে বিলো সিক্সটি পাবে কেন? অথচ ওর বাবা অঙ্কে কী ব্রিলিয়ান্ট!'

'ব্যাপারটা ওভাবে ভাবাটাই তো ভুল। বিভাস অঙ্কে ব্রিলিয়ান্ট বলে বিতানকেও হতে হবে, এমন তো নয়। বিতান হয়তো লিটারেচারে শাইন করবে। আর ইনফ্যাক্ট বাংলায় তো ও হায়েস্ট মার্কস পেয়েওছে। আপনার উচিত ছিল, ওর কৃতিত্বটাকে হাইলাইট করে ওকে অন্য বিষয়গুলোতে মোটিভেট করা। তাতে ও হয়তো সত্যিই এনকারেজড হত।'

'কিন্তু আমি তো ওর ভালোই চেয়েছিলাম চন্দ্রদা।'

'হয়তো। কিন্তু তা করতে গিয়ে আপনি ওর ক্ষতিই করেছেন বউদি। ওর স্বাভাবিক জীবনচর্যা আপনি পালটে দিয়েছেন নিজের অজান্তেই।'

'কীভাবে?'

'আপনি ওর শৈশব কেড়ে নিয়েছেন। ওকে যন্ত্র বানাতে চেয়ে, ওর মানসিক স্থিরতা নষ্ট করে ফেলেছেন। এই বয়সের একটা শিশুর কাছে পৃথিবীটা যতখানি সুন্দর থাকার কথা, ওর কাছে তা নেই।'

'আপনি এত কিছু জানলেন কীভাবে?'

'আমি ওর বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেছি, ইনক্লুডিং মাই সন। বিতান কিন্তু তার বন্ধুদের কাছে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল।'

'অথচ আমি একটুও বুঝিনি চন্দ্রদা!' বলতে-বলতে বিতানের মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্না-ভেজা গলাতেই তিনি বলতে থাকেন বারবার, 'যে করে হোক, আপনি আমার বিতানকে ফিরিয়ে এনে দিন চন্দ্রদা। দেখবেন, আর ভুল করব না আমি। আমি ওকে সবকিছু ফিরিয়ে দেব।'

খেলার মাঠ থেকে বাড়ির দিকে রওনা হতে-হতে প্রায় সন্ধে হয়ে গেল আজ। আসলে প্রাকটিস ম্যাচ শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ ফিজিক্যাল ট্রেনিং করাল বাপ্পাদা। বাপ্পাদা মানুষটা এমনিতে খুবই ভালো, কিন্তু ট্রেনিংয়ের সময় খুব কড়া। ফাঁকি দেওয়ার একটুও জো নেই। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে এখানে ক্রিকেট কোচিং করাচ্ছেন উনি। ভাস্কর এখানে ভর্তি হয়েছে বছর দুই হল। এই মাঠটা ভাস্করদের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে। বাড়ি ফিরতে খুব জোরে পা চালালেও কুড়ি-বাইশ মিনিট লেগে যায়। অবশ্য মাঠের পিছন দিকের বাগান আর টানা খালটার পাশ দিয়ে একটা শর্টকাট রাস্তা আছে। তবে সন্ধের দিকে সে পথে কেউ বড় একটা যায়-টায় না। এমনিতে ও-পথে আলো নেই। তা ছাড়া লোকজন থাকে না বলে, ওদিকটা নির্জনও খুব। তবু আজ পিঠ বাঁচাতে ওই পথই ধরল ভাস্কর। এমনিতে তার মা খুব ভালো। খেলাধুলোর ব্যাপারে কখনও না করেন না তাকে। কিন্তু যেখানেই থাকুক না কেন, মায়ের কড়া নির্দেশ, সন্ধে হলেই বাড়ি ফিরে এসে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসে যেতে হবে। এর অন্যথা করা যাবে না।

সন্ধে হব-হব দেখে দ্রুত পা চালাচ্ছিল ভাস্কর। আর আনমনে চিন্তা করছিল বিতানের কথা। আজ দু-দিন হল, বিতানটা বেপাত্তা। কোথায় যে গেল, কে জানে। বিতান তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তার সহ-খেলোয়াড়ও বটে। তা ছাড়া সেদিন স্কুলে বিতানের সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই মনটা কেমন যেন করছিল তার। আর বিতান চলে যাওয়ার পর মনখারাপটা যেন আরও চেপে বসেছে তার উপর। কোনও কাজে মন বসাতে পারছে না, পড়াশোনাতেও না। কী ভীষণ একটা শূন্যতা যেন ক্রমশ গ্রাস করে ফেলছে তাকে। সর্বক্ষণ মনে হচ্ছে, বিতানটা হয়তো বড় কষ্টে আছে এখন। সত্যি বিতানটা যে কোথায় আছে, কী খাচ্ছে কে জানে! কবে ফিরবে বিতান ভাবতে-ভাবতে চোখে জল এসে যায় ভাস্করের।

সূর্য ডুবে গিয়েছে। দ্রুত অন্ধকার নামছে এখন গাছপালার মাথার উপর। একঝাঁক পাখি ট্রি-ই-ই ট্রি-ই-ই করে ডাকতে-ডাকতে উড়ে গেল কচুরিপানা বোঝাই খালটার পাশে যে উঁচু-উঁচু আমগাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে সোজা হয়ে, তাদের উপর দিয়ে। কেন কে জানে, গা-টা ছমছম করে উঠল ভাস্করের। তার মনে হল, এ-পথে না এলেই বোধ হয় ভালো হত। একটু থমকে দাঁড়িয়ে ভাস্কর ভাবল, দেরি হয় হোক, এ-রাস্তায় না গিয়ে মূল রাস্তা দিয়ে যাওয়াই বোধ হয় ভালো। বিতানটা হারিয়ে গিয়েছে। সত্যি-সত্যিই ও নিজে কোথাও চলে গেল, নাকি কেউ জোর করে তুলে নিয়ে গেল ওকে, কে জানে! কথাটা ভেবে বেজায় ঘাবড়ে গেল ভাস্কর। একা পেয়ে তাকেও যদি এখান থেকে ধরে নিয়ে যায় কেউ?

কথাটা ভেবেছে কি ভাবেনি, একটা হালকা সবুজ আলো হঠাৎ লাফিয়ে উঠল খালের ওপার থেকে। চমকে উঠল ভাস্কর। একবার ভাবল, আলোটা বোধ হয় আলেয়া। আলেয়া শব্দটা সে শুনেছে। কেউ-কেউ ওটাকে ভূতুড়ে ব্যাপার ভাবে। কিন্তু ও জানে, আলেয়া আসলে ভূতটুত কিছু নয়। এ-রকম জলা জায়গায় মিথেন নামে একটা গ্যাস তৈরি হয়। বিজ্ঞানের স্যারের মুখে সে শুনেছে, মিথেন গ্যাসের সঙ্গে অশুদ্ধি হিসেবে যে ফসফরাস হাইড্রাইড থাকে, বাতাসের সংস্পর্শে এসে সেটাই নাকি এমন আলোর রোশনাই জ্বালে হঠাৎ-হঠাৎ। কিন্তু এই আলোটা কি তাই? তা হলে আলোটা নিভছে না কেন? আর অমন স্বচ্ছ একটা ধোঁয়াই বা তৈরি হচ্ছে কেন আলোটাকে ঘিরে? ভাস্করের বিস্ময় আরও বাড়িয়ে দিয়ে আলোটা হঠাৎ চলতে শুরু করে বাতাসের উপর ভর দিয়ে। তারপর সোজা ভাস্করের সামনে এসে তার চেয়ে হাত দুয়েক তফাতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভাস্কর কী করবে বুঝে ওঠার আগেই সেই আলোর মধ্যে থেকে একটা গম্ভীর অথচ মিষ্টি গলা কথা বলে ওঠে তাকে উদ্দেশ্য করে, 'তুমিই তো ভাস্কর?'

'হ্যাঁ।' ভয়ে-ভয়ে উত্তর দেয় ভাস্কর।

'আমি তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই ভাস্কর।' কণ্ঠস্বর আবার বলে।

'আপনি কে কথা বলছেন আমার সঙ্গে?' কাঁপা-কাঁপা গলায় জিগ্যেস করে ভাস্কর।

'আমাকে তুমি চিনবে না।'

'আমাকে আপনি চিনলেন কী করে?'

'আমি অনেক কিছুই বুঝে নিতে পারি। তা ছাড়া বিতানের কাছে তোমার কথা শুনেছি। তোমাকে দেখতেও পেয়েছি তার মনের মধ্যে।'

'আপনি বিতানকে চেনেন?'

'হ্যাঁ।'

'ও তো বাড়ি থেকে দু-দিন ধরে নিখোঁজ।'

'জানি।'

'জানেন?'

'হ্যাঁ, আমিই তাকে নিয়ে গিয়েছি।'

'আপনি নিয়ে গিয়েছেন?' আতঙ্ক আর বিস্ময় একসঙ্গে ফুটে ওঠে ভাস্করের গলায়।

'হ্যাঁ। তবে বিশ্বাস করো, জোর করে বিতানকে আমি ধরে নিয়ে যাইনি। ও নিজের ইচ্ছেতেই গিয়েছে আমার সঙ্গে।'

'ও কোথায় আছে এখন?'

'ইটারনা নামে একটা ছোট্ট গ্রহে, যেখানে আমরা থাকি।'

'ইটারনা নামে কোনও গ্রহ নেই, আমি জানি। তুমি মিথ্যে কথা বলছ। তুমি আসলে খারাপ লোক। তুমি আমাকেও ধরে নিয়ে যেতে এসেছ, তুমি নিশ্চয়ই ছেলেধরা।' উত্তেজিত ভাস্করের অচেনা লোকটাকে সম্মান দেখানোর ইচ্ছে রইল না আর।

'না, ভাস্কর। আমি সত্যি কথাই বলছি। মিথ্যে আমরা বলি না। ইটারনা গ্রহে মিথ্যে নেই, অন্যায় নেই, অসততা নেই।'

'কিন্তু ইটারনা নামে কোনও গ্রহের নাম তো আমরা জানি না!'

'তোমরা এখনও এ গ্রহের সন্ধান পাওনি। পাওয়ার মতন শক্তিশালী বিজ্ঞানও তোমরা করায়ত্ত করতে পারোনি এখনও। ইটারনা তোমাদের সৌরমণ্ডল থেকে বহু দূরে। বহুদিন আগে থেকে সেখানে গড়ে উঠেছে একটা সমৃদ্ধ জনপদ, পৃথিবী সৃষ্টিরও আগে। তোমাদের যে বিজ্ঞান তা এখনও শৈশবে, তা আমরা পিছনে ফেলে এসেছি অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার বছর আগে।'

'আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?'

'আমি নিজেকে তোমার সামনে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারছি না।'

'আমি তোমাকে দেখতে চাই।'

'একটু অসুবিধে আছে যে!'

'তোমাকে না দেখলে তোমার কথা বিশ্বাস করতে পারছি না আমি।'

'আমি তো বলছি ভাস্কর, আমরা মিথ্যে বলি না!'

'তবু তোমাকে আমি দেখতে চাই।'

'তুমি খুব জেদি আর একগুঁয়ে!'

'আমার মা-ও তাই বলেন।'

'ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করছি। তোমার সামনে জ্বলতে থাকা সবুজ আলোটার কেন্দ্রে তাকাও। ভালোভাবে না দেখতে পেলেও, আমার শরীরের একটা আবছা প্রতিবিম্ব অন্তত তৈরি করার চেষ্টা করছি আমি।'

সবুজ আলোর মধ্যে সত্যি-সত্যিই একটা হালকা, স্বচ্ছ চেহারা ভেসে উঠতে থাকে ধীরে-ধীরে। ভাস্কর অবাক হয়ে দ্যাখে, লোকটার চেহারাটা অনেকটা মানুষের মতোই, কিন্তু তার হাত দুটো অনেক দীর্ঘ আর মাথার গড়নটাও পৃথিবীর মানুষের চেয়ে বেশ বড়। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে অবাক হয়ে যায় ভাস্কর। তার প্রাথমিক আতঙ্কটুকু কেটে যায়। সবুজ গোলকের মধ্যে লোকটা বলে ওঠে আবার, 'এখন আমার কথা তুমি অবিশ্বাস করছ না তো ভাস্কর?'

'না।' দু-দিকে মাথা নাড়িয়ে বলে ভাস্কর।

'আমি তোমার কাছে একটা বিশেষ দরকারে এসেছি ভাস্কর!' লোকটা বলে।

'কী দরকার?'

'আমি তোমাকেও নিয়ে যেতে চাই।'

'কেন?'

'না হলে বিতানকে আমরা হয়তো ওখানে পুরোপুরি আনন্দে রাখতে পারব না!'

'কেন?'

'ওখানে ওর সঙ্গীর বড় অভাব।'

'ও কি ওখানে আর থাকতে চাইছে না?' উৎসাহী গলায় বলে ভাস্কর।

'এখনও পর্যন্ত তেমন কিছু ও বলেনি। তবে আমরা বুঝতে পারছি, ওর খুব বেশিদিন হয়তো ওখানে ভালো না-ও লাগতে পারে।'

'কী করে বুঝলেন?'

'ওর মানসিক গঠন বিশ্লেষণ করে। আসলে, পৃথিবীর মানুষের মনের গঠন আমাদের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। এ-দিকটা আমরা আগে সেভাবে ভাবিনি।'

'যেমন?'

'এখানকার মানুষ বড় বেশি আবেগপ্রবণ। আমরা মূলত যুক্তিনির্ভর। আমাদের গ্রহ চলে যুক্তি এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে। পৃথিবীতেও হয়তো এধরনের মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ আছে। কিন্তু বিতান তেমন নয়। ওর মন প্রতিনিয়ত নড়ছে, চলছে। একটা নির্দিষ্ট অনুভূতিতে ওর মন দাঁড়িয়ে থাকছে না। কাজেই আমাদের মনে হচ্ছে, এখন যদিও ও পৃথিবী ছেড়ে, মা-বাবাকে ছেড়ে দিব্যি আনন্দে রয়েছে, কিন্তু এই অবস্থান থেকে ওর মন যে-কোনও সময় সরে আসতে পারে।'

'আমাকে পেলে কি তা হবে না?'

'হয়তো হবে। কিন্তু তার মধ্যে আমরা কিছুটা সময় পেয়ে যাব।'

'সময় পেলে কী করবেন?'

'আমাদের মতো করে ওকে পালটে ফেলব।'

'কীভাবে?'

'ওকে রি-প্রোগ্রামড করে।'

'এখনই করছেন না কেন?'

'অসুবিধে আছে।'

'কী অসুবিধে?'

'এখন ওকে স্টাডি করা হচ্ছে। উপযুক্ত পদ্ধতি নির্বাচনটাও এক্ষেত্রে ভাইটাল।'

'আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই।'

'পারবে না।'

'কেন?'

'যেভাবে ওর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব, তা তো তোমার জানা নেই।'

'আপনি কি আমার সামনে আছেন সত্যি-সত্যি?'

'না।'

'তা হলে আপনি আমার সঙ্গে কীভাবে কথা বলছেন? ওই প্রতিচ্ছবিই বা তৈরি করছেন কীভাবে?

'তুমি খুবই বুদ্ধিমান ভাস্কর।'

'আমার প্রশ্নের উত্তর আপনি এড়িয়ে যাচ্ছেন।'

'তুমি সত্যিই যদি ওর সঙ্গে কথা বলতে চাও, সেই চাওয়ার মধ্যে যদি ফাঁকি না থাকে, তা হলে তুমি বিতানের সঙ্গে কথা বলতে পারবে নিশ্চয়ই।'

'আপনি আবার এড়িয়ে যাচ্ছেন।'

'না, ভাস্কর। আমার কথার মধ্যে আমি উত্তর সাজিয়ে রেখেছি। তুমি বুঝে নিও।'

ভাস্কর চুপ করে থাকে। এরপর কী কথা বলা উচিত, কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারে না।

লোকটা গম্ভীর গলায় বলে, 'কিন্তু আমার প্রশ্নও যে তুমি এড়িয়ে গেলে ভাস্কর!'

'কী প্রশ্ন?'

'তুমি কি আমাদের ওখানে যাবে?'

'আমাকে সময় দিন।'

'কতটা?'

'দু'-দিন।'

'বেশ। আমি তৃতীয় দিনে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব আবার!'

কণ্ঠস্বর থেমে যায়। সবুজ আলোটা ক্রমশ ফিকে হতে-হতে একেবারে মিলিয়ে যায় ভাস্করের চোখের সামনে থেকে। ভাস্কর আর দাঁড়ায় না এক মুহূর্তও। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে সে ছুটতে থাকে বাড়ির দিকে। ছুটতে-ছুটতেই সিদ্ধান্ত নেয় ভাস্কর। বিতানকে যদি আবার এই পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে হয়, তা হলে যা কিছু উপায় তাকে ভেবে বের করতে হবে আর মাত্র দু-দিনের মধ্যেই।

ইটারনা গ্রহে দু'তিন দিন কেটে গেল বিতানের। বিতান খুব খুশি। তা ছাড়া এই গ্রহে পা দেওয়ার পর থেকে অদ্ভুত একটা রোমাঞ্চ হচ্ছে তার। এ একটা দারুণ অ্যাডভেঞ্চার। সে অ্যাডভেঞ্চারের অনেক কাহিনি পড়েছে গল্পের বইয়ে। কতদিন নিজেও ভেবেছে, এমন কোনও একটা অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে পড়লে দুর্দান্ত ব্যাপার হবে। কিন্তু ঠিক সাহস হয়নি কখনও আগে। এখন আচম্বিতে এই সুযোগটা এসে পড়ায় সে একেবারে শিহরিত। সে জানে, পৃথিবীতে সে-ই একমাত্র মানুষ, যার ভাঁড়ারে এমন বিরল এক অভিজ্ঞতা। অবশ্য পৃথিবীতে আর কখনও ফিরবে কি না, তা বিতান জানে না। এটুকুই শুধু সে বুঝেছে যে, ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম। সত্যি বলতে কী, এজন্য তার খুব বেশি দুঃখও নেই। ইটারনায় দিব্যি মন বসে গিয়েছে তার। ইটারনা গ্রহটা সত্যিই ভারী সুন্দর। চতুর্দিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। আকাশ সবুজ, জল সবুজ, মাটি সবুজ, এমনকী এখানকার লোকজন, পাখি-টাখিও সব সবুজ। একটা অদ্ভুত সবুজ আলো সব সময় ভরিয়ে রেখেছে এই গ্রহটিকে। সে আলো বড় স্নিগ্ধ, ভারী মনোরম। দিন আর রাতের পার্থক্য এখানে খুব কম। কারণ, ইটারনা গ্রহে সে অর্থে কোনও রাত নেই, অন্ধকার নেই। আকাশের দিকে তাকালে সব সময়ই জ্বলজ্বল করছে পাঁচ-পাঁচটা চাঁদ। অবশ্য তাদের আয়তন পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে অনেক ছোট।

ইটারনায় জন্ম নেই, মৃত্যু নেই, জরা নেই, বার্ধক্য নেই। এখানে সকলেই যুবক। সকলের বয়সও সমান। দেখতেও সকলে প্রায় একই রকম। এমনকী, এদের আলাদা আলাদা কোনও নামও নেই। কাজের ভিত্তিতে শুধু একটা করে কোড নম্বর আছে এদের। এই নম্বরটাই এদের পরস্পরের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। ইটারনার মানুষ খিদে, ঘুমকেও জয় করে ফেলেছে অনেক দিন আগে। কেউ-কেউ অবশ্য শখ করে মাঝে-মাঝে খাওয়াদাওয়া করে। তবে তা ওই শখ করেই, প্রয়োজনে নয়। আর এক্ষেত্রে যেটা অদ্ভুত, সেটা হল এই যে, এসব খাবারদাবার তাদের রান্না করতে হয় না। এরা যে-কোনও কিছু খেতে ইচ্ছে করলেই তা আপনাআপনি তৈরি হয়ে যায় চোখের পলক ফেলতে-না-ফেলতেই!

বিতান টেলিভিশনে 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' ছবিটা দেখেছে একাধিকবার। ছবিটা তার খুবই প্রিয়। এখানে আসার পর স্থির বিশ্বাস জন্মেছে বিতানের যে, ভূতের রাজা খাবারদাবার পাওয়ার যে বর গুপি-বাঘাকে দিয়েছিল, তার কলাকৌশল নিশ্চিত ইটারনা গ্রহ থেকেই আমদানি করা। এ বিষয়ে একবার বিতান এখানে একজনকে জিগ্যেসও করেছিল। সে একথা শুনে অবশ্য হ্যাঁ বা না কিছুই বলেনি। হো হো করে শুধু গা দুলিয়ে হেসেছে। যে লোকটা বিতানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল পৃথিবীতে, তার কোড নম্বর CR-27। লোকটা আসলে বৈজ্ঞানিক। জনসংযোগের দায়িত্ব আছে এর উপর। এই লোকটার মতো আরও অনেকেরই সঙ্গে আলাপ হয়েছে এখন বিতানের। তাদেরও একটা করে কোড নম্বর আছে। এখানে যে ঘরটায় বিতানের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে, সেখানে অনেকটা কম্পিউটারের কি বোর্ডের মতো দেখতে একটা মেশিন আছে। কারও সঙ্গে কথা বলতে বা দেখা করতে হলে, ওই যন্ত্রটায় তার কোড নম্বর টাইপ করতে হয়। ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে সে লোক হাজির হয় বিতানের সামনে। সে এক ভীষণ মজা। বিতান দেখেছে, এরা তাকে খুশি রাখতে সদা সতর্ক। বিতান যা চাইছে খেতে পারছে। যত খুশি খেলতে পারছে। এমনকী, যে-কোনও গল্পের বই চাইলেই সঙ্গে-সঙ্গে ওর জন্য সেই বই হাজির করছে এরা। ওরা বলে, এসব যা কিছু ওরা করছে সবই করছে ইচ্ছাশক্তির সাহায্যে। ওরা এমনও বলে যে, বিতানদের পৃথিবীর মানুষও যদি তাদের ইচ্ছাশক্তিকে ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারত, তা হলে অসাধ্যসাধন করতে পারত তারা।

কাল ইটারনা গ্রহটা ঘুরে দেখতে গিয়েছিল বিতান এদের দু'তিনজন লোকের সঙ্গে একটা গাড়িতে চেপে। গাড়িটা অদ্ভুত। কোনও চালক নেই এতে। এমনভাবে প্রোগ্রামিং করা আছে এটায়, যে কাউকে রিমোটেও কন্ট্রোল করতে হয় না বসে-বসে। এ আপনিই চলে। থামার সময় থামে। তা ছাড়া আর যারা রয়েছে বিতানের সঙ্গে, তারাও তাদের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে গাড়িটার গতি বা গতিপথকে রি-প্রোগ্রাম করতে পারে যখন-তখন। কাল গাড়িতে ঘুরতে-ঘুরতে ওদের সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে বিতানের। বিতান দেখেছে, লোকগুলো মন্দ নয়। তার সব কথারই তারা উত্তর দিচ্ছিল স্নিগ্ধ কণ্ঠে। তাদের নিজেদের সম্পর্কে, এই গ্রহটা সম্পর্কে, এদের ইতিহাস, এদের বিজ্ঞান সম্পর্কে। শেষে বিতান একটা লোককে জিগ্যেস করেছিল শান্ত গলায়, 'তোমরা তোমাদের এই জগতে হঠাৎ আমাকে ধরে আনতে চাইলে কেন পৃথিবী থেকে?'

লোকটা একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল বিতানের দিকে। তারপর ধীরে-ধীরে বলল, 'আমরা তো তোমাকে ধরে নিয়ে আসিনি বিতান। তুমি নিজের ইচ্ছেতেই এসেছ আমাদের এখানে।'

কথাটা ঠিকই। বিতান বোঝে, তার প্রশ্নটায় প্রচ্ছন্ন একটা দোষারোপ ছিল এদের প্রতি। সত্যিই তো শুধুমুধু এরা দোষের ভাগীদার হতে যাবে কেন? বিতান নিজেই তো চলে আসতে চেয়েছিল, তার পরিচিত পরিমণ্ডল ছেড়ে। অতএব সতর্ক হয় বিতান। আন্তরিক গলায় বলে আবার, 'আমি ঠিক তা বলতে চাইছি না। ভুল বুঝো না আমাকে। আসলে, আমি জানতে চাইছি যে, তোমরা হঠাৎ আমার সঙ্গে যোগযোগ করলে কেন? অনেকেই তো বাড়ি থেকে চলে যেতে চায়, চলে যায়ও অনেকে।'

'তা ঠিক।' লোকটা বলে।

'এই তো আমার সঙ্গে পড়ে দেবাঞ্জন, ওর পাশের বাড়ির বসুঠাকুরমা রাতদিন কত দুঃখ-আক্ষেপ করেন যে, চার-চারটি ছেলেমেয়ে ওঁর, অথচ কেউ তাঁকে দেখে না। এই বৃদ্ধ বয়সে একা-একা থাকেন। কী কষ্ট ঠাকুরমার। সব সময় উনি বলেন যে, এ পৃথিবীতে আর এক পলও থাকার বাসনা নেই ওঁর। তোমরা তো কই বসুঠাকুরমাকে নিয়ে এলে না এখানে?' এক নিশ্বাসে বলে বিতান।

'ইটারনায় পূর্ণবয়স্ক মানুষের আর প্রয়োজন নেই বিতান।' লোকটা ঠান্ডা গলায় বলে।

'মানে?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে বিতান।

'শোনো বিতান,' লোকটা বলতে শুরু করে তাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে, 'আমাদের ইটারনায় বয়স স্থির হয়ে গিয়েছে। এখানে আমরা সকলেই সমবয়সি, সকলেই যুবক। অবশ্য সমবয়সি কথাটা হয়তো ঠিক হল না। কারণ, এখানে কারও বয়স চল্লিশ হাজার বছর তো কারও বয়স চল্লিশ হাজার দশ। কেউ-কেউ চল্লিশ হাজারের চেয়ে কিছু কমও হতে পারে হয়তো। কিন্তু চেহারায় আমরা তোমাদের গ্রহের তিরিশ-বত্রিশ বছরের মানুষের মতো যুবক।'

'তুমি মজা করছ না তো আমার সঙ্গে?' লোকটাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলে ওঠে বিতান, 'এ-ও কি সম্ভব?'

'সম্ভব।' গম্ভীর গলায় বলে লোকটা, 'কয়েক হাজার বছর আগে আমাদের গ্রহের এক মহান বৈজ্ঞানিক এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। তিনিই আমাদের সকলের বয়স নির্দিষ্ট একটি জায়গায় এনে বেঁধে দিয়েছিলেন। আমাদের করেছিলেন অক্ষয় এবং অমর।'

'আর সেই বৈজ্ঞানিক নিজে?' জিগ্যেস করে বিতান।

'প্রশ্নটা সেখানেই বিতান!' লোকটা বলে।

'কেন?'

'তিনি নিজের উপর তাঁর আবিষ্কার কিছুতেই প্রয়োগ করলেন না। আমাদের অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন যে, তিনি অমরত্বের একঘেয়েমি চান না।'

'তারপর'?

'তার মাত্র দু'তিন মাসের মধ্যেই তিনি দেহ রাখলেন।'

'কীভাবে?'

'স্বেচ্ছামৃত্যু।'

'ওরেব্বাস! এ যে একেবারে রূপকথার গল্পের মতো।'

বিতানের কথা শুনে লোকটা হাসে। তারপর বলে, 'আমরা তখন নবযৌবন আর অমরত্বের নেশায় একেবারে উদ্বেল। সেই মহান মানুষটিকে তখন আমরা ভেবেছিলাম মস্ত বোকা আর উন্মাদ। কিন্তু...' বলে থেমে যায় লোকটা।

'কিন্তু?' পরম আগ্রহের সঙ্গে বলে ওঠে বিতান।

'কিন্তু সেই মানুষটাই ঠিক ছিল বিতান। আমরাই ভুল।' বিষণ্ণতায় ভারী হয়ে যায় লোকটার কণ্ঠস্বর।

'কেন?'

'দীর্ঘদিন একই রকম ভাবে বেঁচে থাকতে-থাকতে আমরা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি বিতান। এই নিদারুণ বৈচিত্রহীন জীবন আমাদের কাছে এখন অসহ্য!'

'তোমরা নিজেদের পালটে নিচ্ছ না কেন?'

'আমরা পারি না!'

'সেই বৈজ্ঞানিক কিছু বলে যাননি?'

'তিনিও জানেন না। জানতে পারেননি। জানাতেও। তিনি থামানোটা আবিষ্কার করেছিলেন। নতুন করে চলার পথ তিনি খুঁজে পাননি।'

'তোমাদের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তোমরা তো সব পারো। এটা পারো না?'

'না।' কাতর কণ্ঠে বলে লোকটা।

বিতান চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে-আস্তে বলে, 'কিন্তু এর সঙ্গে আমাকে এখানে নিয়ে আসার কী সম্পর্ক?'

'আমরা বৈচিত্র্য খুঁজছি বিতান।'

'সে বৈচিত্র্য তো বসুঠাকুরমার মধ্যেও পেতে পারতে?'

'না। সে বৈচিত্র্য আমরা চাইনি। তিনি বৃদ্ধ। তিনি ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছেন। তাঁকে দেখে আমরা হয়তো আরও বিষণ্ণ হতাম। হতাশ হতাম। কিন্তু তোমার শৈশব, তোমার সারল্য, তোমার নিরবচ্ছিন্ন স্ফূরণ আমাদের প্রতিনিয়ত প্রাণিত করবে বিতান। তা ছাড়া...'

'তা ছাড়া কী?' আগ্রহ নিয়ে বলে বিতান।

'তোমাকে সামনে রেখে আমাদের বৈজ্ঞানিকরা নতুন করে গবেষণা শুরু করতে পারবেন নতুন উদ্যমে।'

'কীসের গবেষণা?'

'শৈশব ফিরে পাওয়ার, যে শৈশব আমরা হারিয়ে ফেলেছি নিজেদের নির্বুদ্ধিতায়!'

বাড়ির সামনের লনে দাঁড়িয়ে সবুজ রঙের আকাশটার দিকে চেয়ে এসব কথা ভাবতে-ভাবতে লোকগুলোর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল বিতানের। বারবার মনে হচ্ছিল, একটা নির্দিষ্ট জায়গায় যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে লোকগুলো। চেষ্টা করেও না পারছে এগোতে, না পারছে পিছোতে।

প্রথমটা বিতানের মনে হল যে, লোকগুলোকে সে যদি কোনওভাবে সাহায্য করতে পারে, তা হলে মন্দ হয় না। কিন্তু পরক্ষণেই আরও একটা আশঙ্কার কথা মাথায় আসতেই ভীষণ চমকে ওঠে সে। এদের সুখের জন্য তাকে যদি অনন্তকাল এই রকম শৈশবে আটকে থাকতে হয়! শিউরে ওঠে বিতান। মা তাকে কিছুতেই বড় ভাবতে পারেন না বলে কতদিন মনে মনে ভীষণ রাগ করেছে সে।

ঠাকুরমা কদিন আগেও বলেছিলেন যে, সে আর একটু বড় হলে বাবাকে বলে সুন্দর একটা সাইকেল কিনে দেবেন তার জন্য। তা ছাড়া ভাস্কর, দেবাঞ্জন, স্নেহাশিস, সুকন্যা সবাই বড় হয়ে যাবে দেখতে-দেখতে। এমনকী, তার মাসির মেয়ে অরিজিতা, যে এখন হামাগুড়ি দেয় ঘরময়, সে-ও তো একদিন ছাড়িয়ে যাবে তাকে। বড় হয়ে যাবে তার চেয়ে। হঠাৎ কেন কে জানে, ভীষণ ভয় করতে শুরু করে বিতানের। আর বারবার মনে হতে থাকে, সে বড্ড একা। মা-বাবা-ঠাকুরমা, বন্ধু-বান্ধব সকলের থেকে সে যেন নির্বাসিত।

পৃথিবী থেকে চলে আসার তিনদিন পর এই প্রথম পৃথিবীর জন্য চোখে জল এসে যায় বিতানের। মনে হয়, পৃথিবীটা কত রঙিন, কত বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যে মোড়া। ইটারনা গ্রহের এত আতিথেয়তা মুহূর্তে ভুলে যায় বিতান। আর ঠিক সেই সময়েই তার মাথার মধ্যে কী একটা অদ্ভুত অনুরণন টের পায় সে। চোখ বুজে মনটাকে স্থির করতেই স্পষ্ট বুঝতে পারে, কে যেন ডাকছে তাকে। একটুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকার পর ডাকটা চিনতে পারল বিতান। এ তো ভাস্কর, ভাস্কর ডাকছে তাকে।

ভীষণ উত্তেজিত হয়ে ওঠে বিতান, নিজের অজান্তেই উঁ-উঁ-উঁ বলে সাড়া দেয় সে।

বাড়ি ফিরে মা-কে ইটারনা গ্রহের লোকটা সম্পর্কে কোনও কথা বলল না ভাস্কর। তার ফিরতে দেরি হয়েছে বলে মা অল্প বকাবকি করার সময়েও নয়। মা যদিও তার কথাকে সচরাচর অবিশ্বাস করেন না, তবু ভাস্কর জানে, এসব কথা মা-কে বিশ্বাস করানো খুবই কঠিন। আর বাবা তো আরও উড়িয়ে দেবেন এসব কথা! এমনিতেই হ্যারি পটার আর স্পাইডারম্যান পড়তে সে ভালবাসে বলে বাবা প্রায়ই অসন্তোষ প্রকাশ করেন মায়ের কাছে। এসব গল্পগুলোই নাকি সর্বনাশ করে দিচ্ছে আজকালকার ছেলেমেয়েদের। যুক্তির জগৎ থেকে এই বইগুলো নাকি ছোটদের ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মিথ্যে আর আজগুবিতে ভরা এক কল্পরাজ্যে, যার জন্য বাস্তবে ভুগতে হচ্ছে নাকি মা-বাবাকেই। এসব কথা বলার সময় বাবা খবরের কাগজের অনেক কাটিংও দেখান মা-কে। সেসব কাটিংয়ে লেখা আছে, কোথায় কোন ছেলে স্পাইডারম্যানের মতো দেওয়াল বাইতে গিয়ে কী কাণ্ড ঘটিয়েছে বা শক্তিমান সেজে লাফ দিয়েছে তিনতলা বাড়ির ছাদ থেকে। ভাস্কর জানে, খবরগুলো মিথ্যে নয়। কিন্তু বাবা নিজে যে তাকে আরও ছেলেবেলায় ঠাকুরমার ঝুলি থেকে গল্প পড়ে শোনাতেন, সেগুলো কি খুব বাস্তবসম্মত?

বাবার এই ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না ভাস্কর। আর এই নিয়ে যে বাবার সঙ্গে তর্ক করবে, এমন সাহসও তার নেই। কাজেই হাতমুখ ধুয়ে সটান পড়তে বসে গেল সে চুপটি করে। কিন্তু পড়াশোনায় আজ কিছুতেই মন বসাতে পারল না ভাস্কর। রাতে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসতে চাইল না তার। বারবার মনে হতে লাগল, কীভাবে ইটারনা থেকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায় বিতানকে। কিন্তু তারও আগে তো কোনও একটা উপায়ে বিতানের সঙ্গে যোগাযোগ করা চাই। ইটারনার লোকটার কথাগুলো বারবার ভাবতে লাগল ভাস্কর। লোকটা বলেছে, ওই কথাগুলোর মধ্যেই নাকি লুকোনো আছে বিতানের সঙ্গে যোগাযোগ করার উপায়। সেই লুকিয়ে থাকা উপায়ের কথা ভাবতে-ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ল সে শেষ রাতে।

হাতে সময় তো বেশি নেই। আর মাত্র একটা দিন হয়তো পেতে পারে সে বড়জোর। এতখানি সিরিয়াস একটা ব্যাপার শুধুমুধু নিজের কাঁধে নিয়ে অন্যদের কাছে চেপে যাওয়াটা বোধ হয় ঠিক কাজ হবে না। কথাটা মনে আসতেই স্কুল ফেরত সোজা থানায় চলে যায় ভাস্কর। চন্দ্রনাথকাকু তার চেনাজানা। নীলাঞ্জনের সঙ্গে ওর বাড়িতে একাধিকবার গিয়েছে ভাস্কর। চন্দ্রকাকু ভীষণ ভালো। দিলখোলা, হাসিখুশি। পুলিশ বলতে যে গম্ভীর-গম্ভীর আর ভয় পাওয়ানো মুখটা ভেসে ওঠে, চন্দ্রকাকু তেমন নন। একটুও ভয় না পেয়ে ওঁর সঙ্গে দিব্যি কথা বলতে পারে ভাস্কর। থানায় ঢুকে ওঁর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল ভাস্কর। চন্দ্রনাথ চেয়ারেই ছিলেন। ভাস্করকে দেখতে পেয়ে হাতছানি দিয়ে ভিতরে ডাকলেন। ভাস্কর এসে তাঁর সামনে দাঁড়ালে তিনি স্নেহের সুরে বললেন, 'বোসো!'

ভাস্কর তাঁর সামনের চেয়ারটায় চুপ করে বসে পড়ে।

চন্দ্রনাথ তার দিকে তাকিয়ে হাসেন। তারপর হালকা গলায় বলেন, 'তারপর ভাস্করবাবু, কী খবর বলো? তুমি হঠাৎ থানায় কেন?'

'আমি আপনার কাছেই এসেছি কাকু!' উত্তেজিত কিন্তু নিচু গলায় বলে ভাস্কর।

'কেন?'

'বিতানের খোঁজ দিতে...'

ভাস্করের কথা শুনে চেয়ারে সোজা হয়ে বসেন চন্দ্রনাথ। তারপর ভীষণ উত্তেজিত গলায় বলেন তিনি ভাস্করকে, 'বিতান কোথায় আছে, তুমি জানো?'

'জানি।' শান্তভাবে বলে ভাস্কর।

'কোথায়?'

'ইটারনায়!'

'ইটারনা? সেটা আবার কোন জায়গা?'

'ওটা একটা গ্রহের নাম। পৃথিবী থেকে অনেক দূরের ছোট্ট একটা গ্রহ।'

'ভাস্কর, কী আবোল তাবোল কথা বলছ তুমি? তোমার কী কিছু হয়েছে, শরীর ঠিক আছে তো তোমার?' খুব চিন্তিত গলায় বলে ওঠেন চন্দ্রনাথ।

'আমি ঠিক আছি কাকু।' ভাস্কর বলে, 'আসলে আমি যে কথাগুলো বলতে চাইছি, তা শুনলে হয়তো অনেকে ভাববে যে, আমার মাথার ঠিক নেই।'

'কীরকম?' কৌতূহলী গলায় জিগ্যেস করেন চন্দ্রনাথ।

ভাস্কর আগের দিন সন্ধের পুরো ঘটনাটার অনুপুঙ্খ বর্ণনা দেয় চন্দ্রনাথকে। সমস্ত শুনে একটুক্ষণ গম্ভীর মুখে চুপ করে বসে থাকেন চন্দ্রনাথ। কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে। ভাস্কর তাড়া দেয় তাঁকে, 'কাকু, আমরা কী করব এখন?'

'ভাবছি'। আনমনে জবাব দেন চন্দ্রনাথ।

'আমাদের হাতে সময় কিন্তু বেশি নেই। হয়তো শুধু আজ রাতটাই।' ভাস্কর আবার বলে।

'হুঁ।' ছোট্ট জবাব দেন চন্দ্রনাথ।

ভাস্কর তাঁর মুখের দিকে চুপ করে তাকিয়ে থাকে। অপেক্ষা করে তিনি কী বলেন, তা শোনার জন্য। চন্দ্রনাথ আচমকা উঠে পড়েন। তারপর ভাস্করের কাঁধে হালকা চাপড় মেরে বলেন, 'চলো।'

'কোথায়?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে ভাস্কর।

'বিতানদের বাড়ি।' বলে দরজার দিকে এগিয়ে যান চন্দ্রনাথ।

বিভাস এবং তাঁর স্ত্রী চন্দ্রা বাড়িতেই ছিলেন। বিতান হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে অফিসকাছারি প্রায় ভুলতেই বসেছেন দুজনে। গেট দিয়ে ভাস্করকে সঙ্গে নিয়ে চন্দ্রনাথকে ঢুকতে দেখে দুজনেই দৌড়ে এলেন। উত্তেজিত গলায় জিগ্যেস করলেন চন্দ্রা, 'খোঁজ পাওয়া গেল চন্দ্রদা?'

'সম্ভবত।' ভারী গলায় উত্তর দেন চন্দ্রনাথ।

'কোথায়, কোথায়?' ব্যস্তসমস্ত হয়ে জিগ্যেস করেন বিভাস।

'ইটারনায়।' চন্দ্রনাথ বলেন!

'কী হেঁয়ালি করছিস চন্দ্র?' একটু বিরক্ত হয়েই বলেন এবার বিভাস।

'আমি ঠিকই বলছি বিভাস।'

'তা হলে ওকে আনার ব্যবস্থা করছিস না কেন?'

'ওখানে যাওয়ার কোনও উপায় নেই বলে!'

'উপায় নেই কেন?'

'জায়গাটা যে অনেক দূরে রে বিভাস?'

'কত দূর, কোন দিকে?'

'ওই মহাশূন্যে।' আকাশের দিকে হাত তোলেন চন্দ্রনাথ, 'আমাদের সৌরমণ্ডলের বাইরে অন্য সৌরসংসারের একটা ছোট্ট গ্রহে।'

'কী যা-তা বলছিস! তোর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে চন্দ্র।'

'যে-কারও কথাটা শুনলে এমনই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমি যা প্রকৃত ঘটনা, তাই বলছি।'

'কী করে জানলি?'

'ভাস্করের থেকে।' বলে ভাস্করের দিকে তাকান চন্দ্রনাথ।

বিভাসও তাকালেন সেদিকে। তারপর ক্ষুণ্ণস্বরে বললেন, 'ভাস্কর বলল আর তুই এসব আজগুবি কথা বিশ্বাস করলি?'

'করলাম।' চন্দ্রনাথ স্থির প্রত্যয়ে বলেন।

'কিন্তু কেন?'

'প্রথমত, এমন কিছু না হলে বিতানকে আমি এতদিনে ঠিক খুঁজে বের করে ফেলতাম। আর দ্বিতীয়ত, বিতানও তার খাতার মলাটের উপর এমনই একটা কথা লিখে রেখে গিয়েছে।'

'তা হলে বিতানকে কি আমরা আর ফিরে পাব না চন্দ্রদা?' বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন চন্দ্রা। বিতানের ঠাকুরমাও তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিলেন এঁদের। কথা শুনতে-শুনতে তাঁর চোখ থেকেও জল গড়িয়ে পড়ল টুপটাপ করে।

'নিশ্চয়ই ফিরে পাব বউদি।' চন্দ্রনাথ আশ্বাস দেন তাঁকে।

'আপনি মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছেন।'

'মোটেই না। এটা একটা চ্যালেঞ্জ। বিতানকে আমাদের ফিরিয়ে আনতেই হবে।'

'কীভাবে?'

'যেভাবে ওরা এসে পৌঁছেছিল বিতানের কাছে।'

'আপনার কথা বুঝতে পারছি না চন্দ্রদা।' চন্দ্রা ব্যাকুল গলায় বলেন।

'বিতানকে যে আমরা ফেরত চাই, এই ইচ্ছেটাকে জোরদার করে তুলতে হবে মনের মধ্যে।'

'তুই বড্ড হেঁয়ালি করছিস চন্দ্র।' বিভাস বিরক্ত হয়ে বলেন।

'না বিভাস। ভাস্করের কাছে সব শুনে আমার মনে হয়েছে, ইটারনার লোকেরা শুধুমাত্র এই একটা সম্ভাবনারই ইঙ্গিত রেখে গিয়েছে বিতানকে ফিরে পাওয়ার জন্য।'

'তা হলে কী করণীয় এখন আমাদের?'

'চল, আমরা সকলে একটা ঘরে গিয়ে বসি।'

'এখনই?'

'হ্যাঁ, এখনই। আমাদের হাতে সময় খুবই অল্প। এ পদ্ধতি ফেল করলে, অন্যভাবে ভাববার আর সময় পাওয়া যাবে না দেরি করে ফেললে।'

'তারপর?'

'তারপর সবাই চুপ করে চোখ বুজে বসে সমস্ত চিন্তা-চেতনাকে একটিই মাত্র আকাঙ্ক্ষাবিন্দুতে স্থির করে রাখতে হবে যে, বিতানকে এখানে আমরা ফেরত চাই।'

'ব্যস এইটুকু?' অবাক হন বিভাস।

'কাজটা মোটেও খুব সহজ নয় হে। এবার চলো, বসে পড়ো ঘরের মধ্যে, দেখবে এক ভাবনা ভাবতে গিয়ে তোমার মন তোমাকে কত বিচিত্র দিকে ছোটায়। আমি ভুক্তভোগী। উপরওয়ালাদের নির্দেশে আমাকে মেডিটেশনের ট্রেনিং নিতে হয়েছিল পাক্কা দেড় মাস।' মৃদু হেসে বলেন চন্দ্রনাথ।

বিতানদের বাড়িতে একটা ঘরের মধ্যে মেঝের উপর গোল হয়ে বসে ছিল সক্কলে। ভাস্করের প্রথমটা একটু গা ছমছম করছিল। সে জানে, এমনিভাবেই প্রায় অন্ধকার ঘরে বসে নাকি প্ল্যানচেট করা হয়। আর যে বিদেহী আত্মাকে ডাকা হয় একমনে, সেই আত্মা একসময় চুপিসারে ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে। অনেক সময় অনেক দুষ্টু আত্মাও নাকি জোর করে ঢুকে পড়তে চায় ঘরের মধ্যে। ভাস্কররা যদিও কোনও প্রেতাত্মাকে ডাকতে বসেনি, তবু দুষ্ট কোনও আত্মা সুযোগ বুঝে চলে আসবে না তো এখানে? ভাস্কর চোখ ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখে নেয় একবার।

ঠাকুরমা, চন্দ্রকাকু, বিভাসকাকু, কাকিমা সব্বাই স্থির হয়ে বসে আছেন চোখ বন্ধ করে। তাঁদের শরীরে যেন কোনও স্পন্দন নেই। ঘর একেবারে নিস্তব্ধ, থমথমে। দেখতে-দেখতে ভাস্করও এক সময় চোখ বুজে ফ্যালে। প্রথমটা মন বসতে চায় না কিছুতেই। হাজাররকম চিন্তা এসে ভিড় করে মনের মধ্যে। এমনকী, যেসব কথা একেবারেই ভাবে না ভাস্কর, ভাবতে চায়ও না, তারাও ছুট্টে চলে আসে মাথার মধ্যে। সেই সব অসংলগ্ন, অনভিপ্রেত চিন্তার ঢেউগুলো প্রাণপণে সরাতে-সরাতে এক সময় থিতু হয়ে যায় মন। ভাস্করের দেহবোধ লুপ্ত হয়ে যায়। মনে হয়, পুরো শরীরটা পালকের মতন হালকা হয়ে গিয়ে ভাসতে-ভাসতে ঘর ছাড়িয়ে, আকাশ ছাড়িয়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে নিজের খেয়ালে। খুব সুন্দর একটা ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে যায় ভাস্কর। আর তখনই উজ্জ্বল অথচ স্নিগ্ধ নীল রঙের একটা বিন্দু স্থির হয়ে দাঁড়ায় তার দু-চোখের মাঝখানে। সেই নীল আলোর বিন্দুর দিকে তাকিয়ে প্রাণপণে ডাকতে থাকে ভাস্কর, 'বিতান, বিতান...'

ডাকতে-ডাকতে, ডাকতে-ডাকতে এক সময় হঠাৎ সেই নীল বিন্দুটা ফেটে যায়। আর আতশবাজির ফুলকির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে শুধু আলো আর আলো। আর সেই আলোর মধ্যে থেকেই কে যেন হঠাৎ সাড়া দিয়ে ওঠে 'উঁ-উ-উ-উ—'

ভাস্করের শরীরটা কেঁপে ওঠে একবার। সে আবার ডাকে, 'বিতান।'

'কী রে?' ভাস্কর স্পষ্ট শুনতে পায় বিতানের কণ্ঠস্বর।

'তুই আমার ডাক শুনতে পাচ্ছিস?' ভাস্কর জিগ্যেস করে।

'পাচ্ছি।'

'তুই ফিরে আয় বিতান।'

'কেন?'

'আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তোকে ছাড়া!'

'শুধু তোরই কষ্ট হচ্ছে?'

'না, সকলের। আমাদের সব বন্ধু, মাস্টারমশাই, পাড়া-প্রতিবেশী, চন্দ্রকাকু...'

'আর?'

'ঠাকুরমা, বিভাসকাকু, কাকিমা...'

'সত্যি বলছিস, মায়ের কষ্ট হচ্ছে?'

'সত্যি বলছি বিতান। কাকিমা ভীষণ কান্নাকাটি করছেন, ঠাকুরমাও। কাকু-কাকিমা অফিস যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। আমারও স্কুলে ভালো লাগছে না তোকে ছাড়া।' বলতে-বলতে গলা বুজে আসে ভাস্করের।

'আমারও খুব মন কেমন করছে রে, ভাস্কর। সকলের জন্য। এমনকী, আমাদের বাড়ি, মাঠ, স্কুল, পাড়া, দেশ এবং বিশ্বাস কর, ছেড়ে চলে আসা পৃথিবীটার জন্যও।'

'তা হলে তুই চলে আয় বিতান।'

'যেতে চাইছি তো, কিন্তু কীভাবে যাব?'

'ওদের বল।'

'ওরা শুনবে না।'

'শোনাতে হবে।'

'কীভাবে?'

'তুই একমনে চলে আসতে চা বিতান, সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে চলে আসতে চা।'

'তোর সঙ্গে কি মা-বাবা, ঠাকুরমা, চন্দ্রকাকুরাও আছেন ভাস্কর?'

'কেন বল তো?'

'আমার মনে হচ্ছে, ওঁরা সকলেই যেন আমার নাম ধরে ডাকছেন। আমি ওঁদের সকলের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি।'

'ওঁরা সক্কলে সত্যিই তোকে ডাকছেন রে বিতান!'

'আমি যাব ভাস্কর, চলে যাব। পৃথিবী ছেড়ে কোথাও থাকতে পারব না আমি।' বলতে-বলতে হঠাৎ থেমে যায় বিতানের গলা। দু-চারবার ডেকেও আর তার সাড়া পায় না ভাস্কর। ক্রমশ দেহবোধ ফিরে আসে তার। চোখ খোলে সে। দ্যাখে, অন্যরা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে তার দিকে। ভাস্কর ধীরে-ধীরে বলে, 'আমাদের সকলের ডাক বিতান শুনেছে। সে ফিরে আসতে চায়।'

'কিন্তু কীভাবে ফিরবে?' জানতে চান বিভাস।

'জানি না।' বলে চুপ করে যায় ভাস্কর।

১০

ইটারনা কখনও কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখেনি। ইটারনার গাঢ় সবুজ সমুদ্র চিরকাল শান্ত। বাতাস সব সময় আরামদায়ক। ইটারনায় ঝঞ্ঝা নেই, প্রলয় নেই, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতও ঘটেনি কোনওদিন। অথচ সমগ্র ইটারনা আজ হঠাৎ যেন তুমুল অশান্ত হয়ে উঠল বিনা নোটিসে। ফুঁসে উঠল সমুদ্র, শনশন হাওয়া উঠল সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে। সবকিছু যেন নড়ছে, দুলছে, ছিটকে বেরিয়ে যেতে চাইছে ইটারনার মাটি ছেড়ে। ইটারনার কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান কেন্দ্রের বিশাল কম্পিউটার স্ক্রিন আর হাজারও যন্ত্রপাতির উপর বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে প্রায় সমস্বরে চিৎকার করে উঠলেন বিজ্ঞানীরা, 'সমগ্র ইটারনা গ্রহটাই এক অস্বাভাবিক আচরণে মত্ত হয়ে উঠেছে হঠাৎ। তার গতি রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমন চললে, পুরো গ্রহটাই হয়তো ছিটকে যাবে মহাশূন্যে, আর ধ্বংস হয়ে যাবে সবকিছু।'

বিজ্ঞান কেন্দ্রের বাইরে তখন অসংখ্য মানুষের ঢল নেমেছে। তাদের আর্ত চিৎকারে ভরে উঠেছে ইটারনার আকাশ। হঠাৎ গবেষণাগার থেকে বিদ্যুৎ-বেগে বাইরে বেরিয়ে এলেন বিজ্ঞান কেন্দ্রের অধিকর্তা। অপেক্ষমাণ জনসমুদ্র চিৎকার করে উঠল তাঁকে দেখে। তিনি হাত তুলে থামতে বললেন তাঁদের। তারপর চিৎকার করে উঠলেন, 'ইটারনা বিপন্ন!'

সমস্বরে চিৎকার উঠল, 'কেন, কেন, কেন?'

'পৃথিবীর মানুষ ফেরত চায় বিতানকে। বিতানকে তারা ডাকছে। তাদের সেই ভালবাসার টান সামলাতে পারছে না ইটারনা। ইটারনা কক্ষচ্যুত হয়ে যাচ্ছে সেই ভীষণ শক্তিতে। ইটারনায় এমন কোনও শক্তি নেই, যা দিয়ে ভালোবাসার এই টানকে প্রতিহত করা যায়।' তিনি আকুল কণ্ঠে বললেন।

'তা হলে উপায়?' চিৎকার উঠল আবার।

'বিতানকে আর এখানে রাখা যাবে না। ওকে ফিরিয়ে দিতে হবে ওর মা-বাবা-ঠাকুরমা-বন্ধুদের কাছে। নইলে শেষ হয়ে যাবে ইটারনা।

১১

শব্দহীন হালকা অন্ধকারে চুপ করে ঘরের মধ্যে বসে ছিলেন ভাস্কর, চন্দ্রনাথ, বিভাস, চন্দ্রা এবং বিতানের ঠাকুরমা। হঠাৎ একটা তীক্ষ্ন সবুজ আলোর রেখা জানলা দিয়ে ঠিকরে এল ঘরের মধ্যে। আর সেই আলোর রেখার মধ্যে থেকে ভেসে এল একটা আর্ত কণ্ঠস্বর, 'বিতানকে ডাকা থামান, আপনাদের কান্নায়, আপনাদের আন্তরিক আহ্বানে বিতানসহ সমগ্র ইটারনা গ্রহ ছুটে চলে আসতে চাইছে পৃথিবীর দিকে। এমন চললে ধ্বংস হয়ে যাব আমরা।'

'কিন্তু বিতান...' গম্ভীর গলায় বলে ওঠেন চন্দ্রনাথ।

'বিতানকে আমরা ফিরিয়ে দিচ্ছি।'

'কখন?'

'এখনই।' বলে চুপ করে গেল কণ্ঠস্বর। নিভে গেল সেই সবুজ আলোর রেখা। আর তখনই জানলা দিয়ে বাইরে দেখা গেল আর-একটা সবুজ আলোর রেখা। অনেকটা ক্যাপসুলের মতো তার আকার। ভাসতে-ভাসতে সেটা এসে নামল রাস্তার ওপারে যে একফালি ফাঁকা জায়গাটা, সেখানে। মৃদু একটা কাঁপন উঠল ঘরে। ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন সকলেই। বিতান ততক্ষণে বাইরে বেরিয়ে এসেছে স্পেসশিপের দরজা দিয়ে। বিতানকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে সকলে আনন্দে হইহই করে ওঠেন। সেই আওয়াজে প্রথমটা একটু থমকায় বিতান। তারপর একছুট্টে রাস্তা পার হয়ে এসে দু-হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। চন্দ্রা আন্তরিক স্নেহে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে-দিতে বলেন, 'বোকা ছেলে! এমনি করে সব ছেড়ে অত দূরে পালিয়ে যায় কেউ?'

বিতান মুখ তুলে তাকায় তাঁর দিকে। তারপর আদুরে গলায় বলে, 'আমি আর কক্ষনও হারিয়ে যাব না মা! তুমি দেখে নিও, এবার থেকে একদম লক্ষ্মী হয়ে থাকব আমি। পড়াশুনো করব। সব কথা শুনব তোমার।'

চন্দ্রা শক্ত করে বিতানকে চেপে ধরেন তাঁর বুকের মধ্যে। ছেলের কথা শুনে তাঁর চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ে এবার।

আর এসব হাসি-কান্না-আনন্দের ফাঁকে সবুজ ক্যাপসুলের মতো স্পেসশিপটা নিঃশব্দে আকাশে উঠে গিয়ে আবার হারিয়ে যায় ইটারনার পথে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%