জয়দীপ চক্রবর্তী

নিবারণ চক্কোত্তি যখন নবতারা হাইস্কুলে মাস্টারি করতে এসেছিলেন তাঁকে দেখে কারুর মনেই একটুও সন্দেহ তৈরি হয়নি। কেউ ভাবতেই পারেনি এমন একজন সাদামাটা নিপাট গোবেচারা ছেলের মধ্যে অমন সাংঘাতিক একটা মানুষ ঘাপটি মেরে বসে থাকতে পারে লোক চক্ষুর আড়ালে।
নিবারণের দোহারা চেহারা, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা, পরনে মিলের ধুতি আর বাংলা শার্ট। তাকে দেখে হেড মাস্টার শশীবাবু বরং খুশিই হয়েছিলেন। তাঁর দিকে বাড়িয়ে দেওয়া ফাইল খুলে ফাইলের মধ্যে রাখা কাগজগুলোর ওপর দিয়ে খুঁটিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছোট্ট মতন একখানা কৌটো বের করে একটিপ নস্যি নিলেন তিনি। তারপর কাগজ সমেত ফাইলটা বাড়িয়ে দিলেন স্কুল সেক্রেটারি বিমল মান্নার দিকে। বিমল মান্নাও গম্ভীর মুখে চশমাটা নাকের আরো একটু নীচে নামিয়ে এনে কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর শশীবাবুর দিকে চেয়ে খুশি খুশি গলায় বলে উঠলেন, 'বেশ ভালোই তো, কী বলেন শশীবাবু?'
'এই ভালোটাই তো আমায় ভাবাচ্ছে দাদা,' মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলেন শশিভূষণ বাঁড়ুজ্জে।
'কেন বলুন দেখি?' চোখ কুঁচকে জিগ্যেস করেন বিমল মান্না।
'বুঝলেন না?'
'উঁহু।'
'পিওর সায়েন্সে এত ভালো রেজাল্ট। বয়েসও কম। এ ছেলে এই গণ্ডগ্রামে কেন পড়ে থাকবে?'
'কথাটা ঠিক।'
'আরো একটা কথা।'
'কী?'
'মাস্টারিতে ক'পয়সা মাইনেই বা পাবে? এখন একা। চিরদিন কি ছেলেটা একা থাকবে? সংসার-টংসার তো করবে একদিন। আমরা এক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি বিমলবাবু। অভাব আমাদের কষ্ট দেয় না আর। তাছাড়া ইশকুলের ভালো মন্দে এমন ভাবে জড়িয়ে গেলুম দিনকে দিন, আর ছেড়ে যাবার কথা ভাবার ফুরসত হল না। কিন্তু এই ছেলে এত ভালো কেরিয়ার নিয়ে এখানে পড়ে থাকবে কেন? নিশ্চিত কদিন পরেই নিবারণ এই ইশকুল থেকে অন্য কোথাও ভালো চাকরি জোগাড় করে নিয়ে চলে যাবে।'
'স্যার, যদি অনুমতি দেন আমি কয়েকটা কথা বলতে পারি,' এতক্ষণ চুপ করে চেয়ারে বসে শশীবাবু আর বিমলবাবুর কথা শুনছিল নিবারণ। অত্যন্ত বিনয়ী গলায় এবারে সে কথা বলে উঠল।
'বলো কী বলতে চাইছ,' বলে তার দিকে চাইলেন শশীবাবু, 'তুমি বাপু আমার চেয়ে অনেকই ছোট। বলতে গেলে বয়েসে তুমি আমার সন্তানেরই মতন। তোমায় আপনি আজ্ঞে করতে পারব না বাপু, সে তার জন্যে তুমি যাই মনে করো আমায়।'
'না না, ঠিক আছে,' লাজুক গলায় বলে নিবারণ, 'আপনি নিশ্চিন্তে আমাকে তুমি বলতে পারেন স্যার। চাইলে আপনি আমাকে তুইও বলতে পারেন। কোনো আপত্তি নেই আমার।'
'বেশ, বেশ,' খুশি হয়ে বললেন শশীবাবু, 'হ্যাঁ, কী যেন একটা বলবে বলছিলে তুমি?'
'স্যার, বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। নবগ্রাম এখনও গণ্ডগ্রাম আছে বলেই আমি এখানে চাকরিটা করতে আগ্রহী হয়েছি। অনেকদিন থেকেই কাগজপত্রে চোখ রাখছিলাম। এই স্কুলের বিজ্ঞাপনটা দেখে মনে ধরল। মনে হল এই চাকরিটা করা যায়।'
'কেন বলো দেখি?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করেন বিমলবাবু।
'আজ্ঞে আমার খুব শখ নিজস্ব একটা ল্যাবরেটরি বানানোর। তারপর সেই ল্যাবরেটরিতে নিজের মতন করে কিছু কাজকর্ম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। শহরে থাকলে এসব কাজে বিস্তর অসুবিধা।'
'অসুবিধা কেন? বরং শহরে তো এসব কাজে সুবিধেই হবার কথা। সেখানে সুযোগ সুবিধে বেশি...' শশীবাবু জিগ্যেস করেন কৌতূহলী গলায়।
'আপনার কথা অস্বীকার করব না,' ঘাড়টা আনমনে চুলকে নিয়ে বলে নিবারণ, 'শহরে মাল মেটিরিয়াল, কাজকর্মের সুবিধে এ কথাটা সত্যি, কিন্তু পাশাপাশি আরো এমন কিছু সত্যি সেখানে ঘাপটি মেরে আছে যে আমার ওখানে কাজ করতে ভয় লাগে।'
'কীরকম?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করেন বিমল মান্না।
'আজ্ঞে শহরের মানুষের কৌতূহল বড় বেশি। যদি গোপনে কোনো এক্সপেরিমেন্টের কথা ভাবি তারা আমার ওপরে হামলে পড়বে একেবারে। তাছাড়া...'
'তাছাড়া?' শশীবাবু জিগ্যেস করেন এবার ভারিক্কি গলায়।
'শহরে বুঝদার মানুষ বড্ড বেশি, মানে তারা নিজেদের অন্তত বুঝদার বলেই মনে করে।'
'তাতে তোমার কী বাপু?' শশীবাবু হাতে ধরে থাকা নস্যির টিপটা নাকে চালান করে দিয়ে জোরে নাক টানেন, 'কে কী বলল, অত কথায় কান দিলে কি কাজ করা যায় বাপু?'
'তা ঠিক। তবে আর একটা ব্যাপারও আছে।'
'আবার কী?'
'আমার ল্যাবরেটরি বানানোর জন্যে বেশ কয়েকখানা ঘর লাগবে। শহরে জায়গা কিনে অতবড় বাড়ি বানাতে গেলে আমার চাকরি জীবন শেষ হয়ে যাবে। যা দাম ওদিকে জমি জায়গা বসত বাড়ির...'
'এ কথাটা মন্দ বলোনি হে', বিমল মান্না মাথা নেড়ে সায় দেন তাঁর কথায়। তারপর স্থির চোখে তার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করেন, 'তোমার পরীক্ষাগার বানাতে মোটমাট কতগুলো ঘর লাগবে বলে মনে হয়?'
'নিজের থাকা শোয়ার জন্যে একখানা ঘর যদি বাদ দিই, তাহলে আরো অন্তত খান দুই বড় ঘর...'
'বড় মানে কত বড়? এই ধরো যদি পনেরো ফুট বাই বারো ফুটের ঘর হয়, চলবে তোমার?'
'তা চলে যাবে'। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় নিবারণ।
'পেয়ে যাবে।' আদালতের রায় শোনানোর ভঙ্গিতে বলে ওঠেন বিমল মান্না, 'কিন্তু একটা শর্তে।'
'কী শর্ত?'
'এই ইশকুল থেকে অন্য কোথাও পালানো চলবে না।'
'রাজি।' নিবারণ হাসে, 'পালানোর জন্যে তো আসিনি।'
'আর একটা কথা।'
'বলুন।'
'আমাদের ইশকুলেও একটা মিনি ল্যাব বানাতে হবে। টাকাপয়সার দায় আমাদের। তোমাকে গায়ে-গতরে খেটে জিনিসটা দাঁড় করিয়ে দিতে হবে। আমরা চাই বইতে পড়া জিনিসগুলো ছেলেরা হাতে-কলমে করে দেখুক।'
'সে তো করতেই হবে।'
'শাবাশ'। বিমল মান্না পিঠ চাপড়ে দেন নিবারণের, 'তোমার নিজের পরীক্ষাগার তৈরির ঘরের অভাব হবে না। পেয়ে যাবে। স্কুলে যোগ দেবে যেদিন, সেদিন সটান সেখানেই চলে যাবে।'
'জায়গাটা স্কুল থেকে খুব বেশি দূরে হবে না তো?' উদ্বিগ্ন গলায় জিগ্যেস করে নিবারণ।
'একেবারেই নয়,' বিমলবাবু তাকে আশ্বস্ত করেন, 'এখান থেকে কত আর, এই ধরো হেঁটে দশ মিনিট। এতে খুব কি অসুবিধে হবে তোমার?'
'তাহলে তো কাছেই।' খুশি হয় নিবারণ, 'বাড়ি ভাড়া বাবদ কত দিতে হতে পারে আমায়?'
'কিছুই দিতে হবে না। ফ্রি।'
'মানে?'
'মানে খুবই সোজা। তোমাকে কানাকড়িটিও দিতে হবে না।'
'বাড়ির মালিককে জিগ্যেস না করেই আপনি'... ইতস্তত করতে থাকে নিবারণ।
বিমল মান্না হেসে ওঠেন। নিবারণের পিঠে চাপড় মেরে বলেন, 'অত ভাবার দরকার নেই বাছা। মালিক আমি নিজেই। এক কালে জমিদারি ছিল। এখন তাল পুকুরে ঘটি ডোবে না ঠিকই, তবে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া পেল্লায় বাড়িটা আছে। মেলা ঘর-দোর। ব্যবহার না হয়ে হয়ে নষ্ট হচ্ছে পড়ে পড়ে। তুমি তার খান কতক দখল করলে ঘরগুলো বেঁচে যায়।'
'দেখুন একেবারে বিনা ভাড়ায় থাকাটা কি আর ঠিক হবে আমার পক্ষে?' একটু মাথা চুলকে ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে নিবারণ, 'তার চেয়ে একটু কমসম করে আমার সাধ্যের কথা ভেবেই নাহয় আমাকে বলুন কত টাকা ভাড়া দিতে হবে আপনার বাড়িটা ব্যবহার করার জন্যে।'
'তুমি তো বেশ বিষয়ী ছোকরা হে নিবারণ,' বিমল মান্না তার দিকে চেয়ে হেসে ওঠেন, 'টাকাপয়সার কথা একেবারে শুরুতেই সেরে রাখতে চাইছ খোলা মনে, যাতে বাড়িওলার সঙ্গে পরে এই নিয়ে গোলোযোগ না হয়।'
'আজ্ঞে আমার সামর্থ তো বেশি নয়। কাজেই সাধ্যের বাইরে কিনা ব্যাপারটা সেটা তো সত্যিই জেনে নেওয়া চাই বলুন,' মাথা নামিয়ে বিনয়ী কণ্ঠে বলে নিবারণ।
বিমল মান্না তার পিঠে আলতো চাপড় মারেন। তারপর স্নেহের সঙ্গে বলেন, 'আমাদের জমিদারি গেছে ঠিকই, তবু বাড়ি ভাড়া দিয়ে খাব এমন দুর্দিন আমার এখনও আসেনি হে।'
'তবে?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে নিবারণ।
'দেখো নিবারণ, আমি একা মানুষ। বিয়ে থা করিনি। বাপ-পিতামহর সম্পত্তি আগলে যক্ষের মতন পড়ে আছি এই গ্রামে। মস্ত পরিবারের সবাই যে যার অংশ বেচে কিনে দিয়ে শহরে পাড়ি দিয়েছে। এদিক পানে ফিরেও তাকাবে না আর কেউ কস্মিনকালে। আমার অভাব তো নেই-ই, উপরন্তু যা আছে তা দিয়ে নিজের খাওয়া পরা, দায়দড়া সামলেও খানিকটা উদবৃত্ত থেকে যায় ফিমাসে। শুধু একটা জিনিসেরই বড় অভাব গো আমার। সেটা হল ওয়ারিশনের অভাব আর মানুষের সঙ্গের টানাটানি। আগে এমনটা হত না। দিব্যি খেয়ে দেয়ে বগল বাজিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। কিন্তু আজকাল নিঃসঙ্গতা যেন থাবা বসাচ্ছে মনের ওপরে। সন্ধে পেরোলে যেই বাড়ির বাগানের গাছগুলোর মাথার ওপরে ঝুপসি সন্ধে নেমে আসে গড়াতে গড়াতে, অমনি আমায় যেন ছেলেবেলা গিলে ফেলে। কতকাল আগেকার কথা মনে পড়ে তখন,' বলেই কী একটা কথা মনে পড়ে যাওয়ায় একটু চুপ করে বসে থাকেন বিমল মান্না। তারপর নিবারণের মুখের দিকে খানিকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর একটা অদ্ভুত প্রশ্ন জিগ্যেস করেন তিনি, 'আচ্ছা নিবারণ, তুমি ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করো?'
'কেন বলুন দেখি?' থতমত খেয়ে গিয়ে জিগ্যেস করে নিবারণ।
'আহা বলোই না।'
'না করি না।'
'একেবারে বিশ্বাসই করো না, নাকি আছে জানো, কিন্তু ভয়-টয় পাও না...'
'ভূত প্রেত দত্যি দানোয় আমার বিশ্বাস নেই। তবে ছোটবেলায় ভূতের গল্প পড়তে খুব ভালো লাগত আমার। সেই সময় ভূতের গল্প পড়ে একটু-আধটু গা ছমছম ভাবও আসতো মাঝেমধ্যে।'
'তাহলে তো একটু সমস্যাই হল হে। ভূত-প্রেতে একটু-আধটু বিশ্বাস করলে সুবিধে হত খানিক।'
'সে কী? কেন?' আবারও হতবাক হয়ে বলে ওঠে নিবারণ।
'আমার বাড়িতে কিন্তু ভূত আছে।'
'কী করে বুঝলেন?' হেসে ফেলে নিবারণ, 'আপনি কি দেখেছেন তাদের?'
'না দেখিনি ঠিক, তবে তাদের ফিসফাস প্রায়ই শুনি আমি।'
'ফাঁকা বাড়িতে অমন কত আওয়াজ পাওয়া যায়।' তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে নিবারণ।
'রাতে ভিতে তারা হাঁটা চলা করে। বারান্দার ওপরে কতদিন তাদের পায়ের শব্দ শুনেছি আমি।'
'সোড়েল-টোড়েল হবে বোধহয়।'
'এই বিশ্বাস নিয়ে টিঁকে থাকতে পারলে ভালোই। আসলে কোনো কথা গোপন করে ওই বাড়িতে আমি তোমায় নিয়ে গিয়ে তুলতে চাই না।'
'আপনার সংকোচের কারণ নেই। সত্যি-সত্যি ভূত বলে কিছু যদি ও-বাড়িতে থাকেও তাহলেও আমার ওখানে থাকতে অসুবিধে নেই।'
'তোমার আমার বাড়িতে থাকতে তাহলে সত্যি-সত্যিই আপত্তি নেই তো ভাই নিবারণ?'
'আজ্ঞে না। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। আপনি আমার পাশে না দাঁড়ালে আমি আদৌ কখনও আমার ল্যাবরেটরিটা বানাতে পারতাম না হয়তো।'
'তাহলে এই কথাই পাকা। স্কুলে জয়েন করার চিঠি পেয়ে সটান ব্যাগ বাক্স নিয়ে আমার বাড়িতেই উঠছ তুমি। আজ আমার সঙ্গে চলো। আমার বাড়িটা ঘুরে দেখে নেবে একবার। কোন কোন ঘর পেলে সুবিধে হবে তোমার দেখেশুনে বলে দাও। রঘুকে দিয়ে ঝাড়াপোঁছা করিয়ে রাখব। তারপর তুমি এলে দুজনে মিলে একসঙ্গেই নাহয় তোমার ল্যাবরেটরিটা খাড়া করে ফেলব দু'-এক মাসের মধ্যে।'
'ঠিক আছে স্যার। তাই হবে।' বলে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে নিবারণ, 'আজ আমি তাহলে আসি। আবার দেখা হচ্ছে তাহলে।'
'এসো। সাবধানে যেও।' শশীবাবু হাত নাড়েন তার দিকে চেয়ে।
'আর হ্যাঁ, শোনো,' বিমল মান্না পিছু ডাকেন নিবারণকে।
'বলুন স্যার,' নিবারণ বলে।
'আমাকে স্যার বলে ডেকো না। আমি যদিও এই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারি, তবু তোমার মুখে ওই ডাকটা শুনতে একটুও ইচ্ছে করছে না আমার। ও ডাকটা বড্ড ফর্মাল বাপু। অমন ফর্মাল সম্পর্ক হলে এক বাড়িতে থাকা বেজায় কঠিন। তুমি বরং আমাকে জেঠু বলেই ডেকো।'
'যে আজ্ঞে স্যার।'
'আবার...' চোখ পাকিয়ে বলেন বিমল মান্না।
'না-না। ঠিক আছে জেঠু। আর ভুল হবে না।'
'গুড। এসো এবার। সোজা বাড়ি তো, নাকি আর কোথাও যাওয়ার আছে?'
'বাড়ি।' বলে দরজার দিকে পা বাড়ায় নিবারণ। বুকের কাছটা আজ বেশ ফাঁকা লাগছে। একটা জম্পেশ ভারী বোঝা যেন এইমাত্র নেমে গেল বুকের ওপর থেকে। চাকরিটা পাওয়ার সত্যিই খুব দরকার ছিল নিবারণের। পায়ের তলায় মাটিটুকু না পেয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করা খুবই কঠিন। মাঝে মনে হচ্ছিল, দীর্ঘদিন ধরে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ইচ্ছেগুলো বোধহয় সত্যি করে তোলার কোনো সুযোগই পাবে না সে আর। আজ এতদিন পরে মনে মনে বড় নিশ্চিন্ত বোধ করল নিবারণ।
নবগ্রাম জায়গাটি ভারি মনোরম। প্রচুর গাছপালা। মস্ত মস্ত পুকুর। সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ। গরু ছাগল হাঁস মুরগি মিলে গবাদি পশুরও অভাব নেই। আর এই গ্রামের সবচেয়ে বড় সম্পদ হল এখানকার মানুষ। খুবই সজ্জন তারা। অন্যের জীবনের সাতে-পাঁচে অন্যায় মাথা গলানোর অভ্যাস তাদের নেই। কিন্তু কেউ বিপদে পড়লে অথবা দায়- দড়ায় ঠেকে গেলে কোথাও, তারা সবসময় অন্যের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে একেবারে কোমর বেঁধে তৈরি।
নিবারণের গ্রামটা বেশ ভালো লেগে গেল। সত্যি বলতে কী মনে মনে এমনই একটা জায়গা চেয়েছিল নিবারণ। যে কাজটা নিয়ে সে মেতে আছে গত কয়েক বছর, শহরের ঘিঞ্জি পরিবেশে সেই কাজের এন্ড রেজাল্ট পাওয়া বেশ কঠিন। তাছাড়া কাজটার শেষের দিকে এসে খানিক ফাঁকা জায়গা আর তাদের সহযোগিতারও দরকার হয়ে পড়েছিল খুব। কিন্তু শহরে তাদের আবাসনগুলো দ্রুত লোপ পাচ্ছিল।
বড় বড় বাড়ি আর পেল্লায় রাস্তা চারদিকে। রাত বিরেতেও আর অন্ধকার নামে না শহরের পথে ঘাটে। শ্মশান গোরস্থানগুলোও এমনই বিচ্ছিরি রকম সাজানো গুছনো যে চেষ্টা করেও মানুষের মনে ভয় ভয় ভাবটা আর আসে না আজকাল। কাজেই তারা শহর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমাগত। প্রাণপণে ডাক দিলেও সে ডাক আর তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে না। কাজেই নিজের কাজের সাফল্যের জন্যে নবগ্রামের মতন এমন একটা জায়গা খুবই দরকার ছিল নিবারণের।
এই গ্রামে এখনও গাছপালা বন-জঙ্গলের অভাব নেই। ঘুপচি অন্ধকারে গা ছমছমে পরিবেশটা পুরোদস্তুর বেঁচে আছে। সন্ধের পরে এলাকা একেবারে থমথমে হয়ে যায়। ইলেকট্রিক আছে এলাকায়, তবু রাতের আঁধারের অভাব নেই এতটুকু। বাড়ির ছাদে উঠে দাঁড়ালে চাঁদকে একটুও ফ্যাকাসে লাগে না নবগ্রামের আকাশে। তারারা আনন্দে ঝিকমিক করে জ্বলে সারা রাত।
নিবারণ নিশ্চিত ছিল এই পরিবেশে তার কাজটা নিশ্চিন্তে এগনো যাবে। প্রথম দিন ইচ্ছে করেই বিমল জেঠুকে একটু মিথ্যে বলতে হয়েছে। ভূত সে একেবারে মানে না তা নয়, তবে আর পাঁচটা মানুষ যে ভাবে তাদের মানে তার মানাটা তাদের সঙ্গে মেলে না। সত্যি বলতে কি একেবারেই যদি অবিশ্বাসী হত সে, তাহলে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলোই যে ব্যর্থ হয়ে যেত। নিবারণের গভীর বিশ্বাস ছিল নবগ্রামে তার কাজটা দিব্যি জমে যাবে। এবং বলতে নেই কাজটা জমে গেলও শেষ পর্যন্ত।
নিবারণ কিছু বিশেষ তরঙ্গ নিয়ে কাজ করছিল। তরঙ্গগুলোর দৈর্ঘ্য ও কম্পাঙ্কের হেরফের ঘটিয়ে সিগন্যালের মতন ব্যবহার করছিল সে। তার স্থির বিশ্বাস ছিল এই বিশেষ তরঙ্গের মাধ্যমে পাঠানো সংকেতকে ব্যবহার করে এই সময়ের সঙ্গে ফেলে আসা সময়ের একটা মেলবন্ধন সে ঘটাতে পারবে।
এই ধরনের কাজে অতীত হয়ে যাওয়া মানুষের সঙ্গে একটা যোগসূত্রও তৈরি হওয়া সম্ভব যদি দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মনে থেকে যাওয়া সেই বিশ্বাসটা সত্যিই আজগুবি না হয়ে থাকে।
নিবারণের ইদানিং এক মনে এই কাজটা করতে গিয়ে বার বার মনে হচ্ছিল, ভূত সম্পর্কে যে সমস্ত ধারণা সে এতদিন বয়ে বেড়িয়েছে, সেটা বোধহয় পুরোপুরি ঠিক নয়। বিমল জেঠু প্রথম আলাপেই তাঁর বাড়িতে তাঁদের অস্তিত্বের কথা নিবারণকে বলেছিলেন। নিবারণ বিশ্বাস করতে পারেনি তাঁর কথা। তার বার বার মনে হয়েছিল সাধারণ মানুষের পক্ষে ফেলে আসা সময়কে কি কোনো উন্নত যন্ত্র ছাড়া এমনভাবে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধি করা সম্ভব? কিন্তু এই বাড়িতে পাকাপাকিভাবে উঠে আসার পর থেকেই কেন যেন মনে হয়েছে তার বার বার, কোথায় কী একটা হিসেবের ভুল হয়ে যাচ্ছে।
নানা তরঙ্গ নিয়ে কাজ করতে করতেও একটা জিনিস সে টের পাচ্ছিল। কারা যেন এই বাড়ির আনাচ কানাচ থেকে তার পাঠানো সংকেত নিখুঁতভাবে রিসিভ করছে। এমনকী কাজ করতে করতেই ইদানীং বেশ বুঝতে পারছে নিবারণ কারা যেন তার চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে তার কাজ লক্ষ করছে। তারা খুব মিহিন বাতাসের মতন শব্দে মাঝে মাঝেই কথা বলে।
প্রথম দিন তাদের সেই কথা শুনে গা ছমছম করে উঠেছিল তার। পরে অবশ্য সে নিজেকে সামলে নিয়েছে। তাদের কথা একমনে শুনে ডিকোড করার চেষ্টা করেছে। বোঝার চেষ্টা করেছে তারা কী বলতে চায়। কী তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু কিছুই মাথায় ঢোকেনি তার। আর নিজের এই যে অপারগতা, এইটিই আরো জেদি করে তুলেছে নিবারনকে। যে করেই হোক, এই অদ্ভুত অপার্থিব ফিসফাসকে জানা শব্দভান্ডারের আয়ত্তে আনতেই হবে। এক এক দিন প্রাণপনে কাজ করতে করতে রাত গড়িয়ে যেত। খেয়ালই থাকত না নিবারণের। নিকষ কালো রাত গড়াতে গড়াতে আকাশের এক প্রান্তে গিয়ে হারিয়ে যেত। তখন পুব দিকের আকাশ লালচে আলোয় ভরে উঠত ক্রমাগত।
পৃথিবীটা এসময় ভারি শান্ত আর পবিত্র লাগত নিবারণের। ঘরের জানালা খুলে দিয়ে একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত সে এই সময়ে আর ভাবত কবে ওই বিশাল আকাশটা ধরা দেবে হাতের মুঠোয়।
এক-এক দিন বিমল জেঠু খুব রাগ করতেন। বকাবকি করতেন তাকে। বার বার মনে করিয়ে দিতেন, 'বাপু হে, এই শরীরটা হেলাফেলার বস্তু নয়। যে কাজই করো না কেন, এই শরীর যদি তোমাকে সাথ না দেয়, কিছুই করে উঠতে পারবে না তুমি। জানো তো বড় বড় ঋষি-মুনিরা একসময় কষে হঠযোগ করতেন শুধু শরীরটাকে সুঠাম এবং নিরোগ রাখার জন্যে। ক্ষয়ে যাওয়া, রুগণ শরীর নিয়ে ঈশ্বরকেও ডাকা যায় না জুত করে।'
'কাজের নেশায় ঘুমনোর কথা মনেই আসে না জেঠু।' লাজুক গলায় বলে নিবারণ।
'সে তো দেখতেই পাচ্ছি বাছা,' বিমলবাবু এগিয়ে এসে নিবারণের পিঠে হাত রাখেন, 'কিন্তু শরীরের ওপরে এমন অত্যাচার করলে শরীর যে একদিন শোধ তুলবেই। তখন তোমার গবেষণা যে লাটে উঠবে হে।'
'হুঁ।' মাথা নাড়ে নিবারণ। বিমলবাবুর কথা বিনা তর্কে মেনে নেয় সে। কথাটা ভুল নয়। মানুষটা সত্যিই বড় স্নেহ করেন তাকে। তার চিন্তাটা শেষ হবার আগেই ভারী গলায় বলে ওঠেন বিমল মান্না, 'বলি তোমার মাথার ওপরে কেউ কি আছেন?'
'আজ্ঞে?' প্রশ্নটা ঠিকমতন বুঝে উঠতে না পেরে বলে ওঠে নিবারণ।
জানতে চাইছি যে তুমি কী নিমস্তক, নাকি সাত কূল খুঁজলে অভিভাবক স্থানীয় কাউকে পাওয়া যেতে পারে?'
'কেন বলুন দেখি?'
'আমার প্রশ্নের এটা উত্তর হল না বাপু।'
'আজ্ঞে না। বাবা যখন গত হলেন আমি তখন বছর ছয়েকের। মা মারা গেলেন কলেজে ঢোকার আগে আগেই। এক মামার কাছে তারপর থেকে ছিলাম। তিনিই বলতে গেলে লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন তারপরে। একা মানুষ ছিলেন। বিয়ে থা করেননি। বছর দুই আগে তিনিও চোখ বুজিয়েছেন। চোখ বুজোনোর আগে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর, সম্পত্তি এক আশ্রমকে দান করেছিলেন। তারা সে সম্পত্তির দখল নিয়ে আমাকে উৎখাত করতে একটুও সময় নেয়নি।'
'বুঝতে পেরেছি।'
'কী বলুন দেখি?'
'তোমার জন্যে যা কিছু করার আমাকেই করতে হবে নিজের বিচার বিবেচনা অনুযায়ী।'
'কী করতে চাইছেন বলুন দেখি আমাকে নিয়ে?' সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে বিমল মান্নার দিকে চেয়ে জিগ্যেস করে নিবারণ।
'তোমায় সংসারি করে দিতে চাইছি। তোমার ওপরে খবরদারি করার এবং তোমাকে দেখভাল করার জন্যে খুব শিগগিরি একজন কাউকে জুড়ে দিতে হবে তোমার জীবনের সঙ্গে। নইলে তোমায় বাপু ভরসা নেই। যা উদাসীন তুমি, খুব শিগগিরি হযতো একখানা ভারি অসুখ বাঁধিয়ে বসবে তুমি।'
'খেয়েচে। আমার একি সর্বোনাশ করতে চাইছেন আপনি,' প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে নিবারণ, 'বিয়ে থা করলে আমার কাজকম্ম যে লাটে উঠবে।'
'খবরদার বলছি। বেশি ডেঁপোমি কোরো না। মেয়ে একখানা এর মধ্যেই দেখে রেখেছি আমি। বেশি ত্যান্ডাই-ম্যান্ডাই না করে লক্ষ্মী ছেলের মতন বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়বে তুমি। দিনক্ষণ দেখে সময় মতন সব ব্যবস্থা আমিই করে দেব। তোমার চিন্তার কোনো কারণ নেই।'
কী বলবে কথা খুঁজে পেল না নিবারণ। বিমলবাবুর দিকে হাঁ-করে চেয়ে রইল সে স্থির চোখে। তার সেই ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখটার দিকে চেয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না বিমল মান্না। আকাশ ফাটিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন তিনি দরাজ গলায়।
সকাল থেকে শরীরটা ঠিক জুতের লাগছিল না পরমেশের। নাক দিয়ে কাঁচা জল ঝরছে অনবরত। মাথাটাও অসম্ভব ভার হয়ে আছে। হাতে পায়ে বেশ ব্যথা। নির্ঘাত জ্বর এসে যাবে দু-এক ঘণ্টার মধ্যে। অসুখ-বিসুখের কথা মনে এলেই মনটা কেমন যেন আনচান করে ওঠে পরমেশের। শরীর খারাপ হলেই ডাক্তার দেখানো। ডাক্তার দেখানো মানেই কিছু ওষুধ-বিষুধ কেনা। আর ওষুধ কেনা মানেই বেমক্কা কিছু জমা টাকা খরচ হয়ে যাওয়া। খরচের কথা ভাবলেই বিষাদে পরমেশের মন ভারী হয়ে যায়।
পরমেশের টাকাপয়সার অভাব নেই। খাওয়া পরারও না। জমি-জিরেত যা আছে, তাতে সারা বছর ধান আর সবজি যা চাষ-আবাদ হয়, তা দিয়ে দিব্যি চলে যায় পরমেশের। পুকুরে মাছ আছে। ধরে মেরে নিতে পারলে মন্দ খাওয়া হয় না।
কাজের লোক নিকুঞ্জ আর মঙ্গলা খুবই করিতকর্মা। সব দিকে তীক্ষ্ন নজর তাদের। মঙ্গলার রান্নার হাতটিও বেশ খাসা। একটাই অসুবিধে। এরা পরমেশের ওপরে রীতিমতন খবরদারি করে মাঝে মাঝে। বাবার আমলের লোক দুজনেই। পরমেশের বলতে গেলে অভিভাবকেরই মতন তারা। বাপ-মা মারা যাবার পরে সত্যি বলতে কী একেবারে হাতের তালুর মধ্যে করে রেখেছে তারা পরমেশকে। কাজেই এদের খবরদারি মুখ বুজে মেনেই নিতে হয় পরমেশকে।
শরীরটা খারাপ বুঝে একটু দমেই গেল আজ পরমেশ। একটু পরেই নিকুঞ্জ বা মঙ্গলা ব্যাপারটা বুঝে ফেলবে। তারপরেই জোর করে ডাক্তার-বদ্যি করাবে তারা। তখন আর রক্ষে নেই।
ওদের খপ্পরে পড়লে পরমেশ কিছুতেই আর ডাক্তার এবং ওষুধের খরচটা বাঁচাতে পারবে না। কথাটা মাথায় আসতেই সতর্ক হল পরমেশ। তার যে শরীর খারাপ এ কথাটা কিছুতেই বুঝতে দেওয়া চলবে না ওদের। অন্য দিন আরো খানিক আলসেমি করে শুয়ে থাকে পরমেশ। কিন্তু আজ সে উঠে পড়ল। দ্রুত হাতে মুখে জল দিয়ে নিল। মুড়ি খেল কয়েক গাল। তারপর এক গেলাস জল খেয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। খানিক হেঁটে আসা যাক। অসুস্থ লোক তো আর সাত সকালে মর্নিং ওয়াকে বেরোতে পারে না খোশ মেজাজে। নিকুঞ্জ আর মঙ্গলাকে দিব্যি বোকা বানিয়ে দেওয়া যাবে আজ।
পরমেশ নিজেই নিজেকে বলতে থাকে, 'সর্দি কাশি কি একটা অসুখ নাকি? তার বাবা মস্ত বৈজ্ঞানিক ছিলেন। কাজে ডুবে থাকলে দিনের পর দিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে থাকতেন তিনি। আর তাঁর ছেলে হয়ে সে কিনা সামান্য সর্দি জ্বরে কাবু হয়ে ডাক্তার ওষুধের কাছে বশ মানবে?'
বাড়ি থেকে বেরিয়ে মস্ত খিরিশ গাছটার পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা গ্রামের বাইরে চাষের জমির দিকে সোজা এগিয়ে গেছে সেইদিকে হাঁটতে থাকে পরমেশ। আগে তেমন চল ছিল না, কিন্তু ইদানিং অনেকেই রাত থাকতে হাঁটতে বেরোয়। সঙ্গে হাল্কা জগিং আর প্রাণায়াম।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বা কাগজ পেতে বসে কয়েকজন এমন ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে, যে চট করে শুনলে ভয় লেগে যায়। পরমেশ একদিন চেষ্টা করে দেখেছিল। কিন্তু চেষ্টা করার পরের দু-দিন পেটে আর কোমরে বেজায় ব্যথা ছিল তার। পাশ ফিরতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছিল। তারপরে আর শ্বাস নিয়ন্ত্রণের পথ মাড়ায়নি সে। নিজেই নিজেকে বুঝিয়েছিল এ পৃথিবীতে সব কাজ সকলের জন্যে নয়।
আজও বাইরে বেরিয়েই কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। পরমেশের সঙ্গে সকলেই যে খুব উৎসাহের সঙ্গে কথা বলে তা নয়। এলাকায় তার খ্যাপা লোক বলে পরিচিতি আছে। কৃপণ হিসেবেও যথেষ্ট নাম ডাক তার। পাড়ার দুর্গাপুজোয় কোনো বছরেই দশ টাকার বেশি চাঁদা দেয় না পরমেশ। ভিখিরি-টিখিরি এলে সে মোটেই পাত্তা দেয় না। এ বিষয়ে তার অবশ্য একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে।
পরমেশ বলে, বিনা কাজে মানুষ যদি হাতে পয়সা পেয়ে যায় তাহলে তার কাজের ইচ্ছে মরে যায়। তাছাড়া অন্যের থেকে দান নিয়ে পেট ভরালে নিজে কিছু করার যে পুরস্কার সেটাও কিছুতেই গড়ে ওঠার সুযোগ পায় না।
কথাগুলো শুনতে মন্দ নয়, কিন্তু নিন্দুকে বলে এ সমস্তই খরচ না করার জন্যে পরমেশের তৈরি করা বাহানা। কেননা এই যে দুটো যুক্তি পরমেশ দেখায় তা তার নিজেরই ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি করে অবহেলা পায় বলেই নবগ্রামের মানুষ বলাবলি করে।
কাজ করার মানসিকতা পরমেশেরও নেই। বলতে গেলে সে নিজে কিছুই করে না। চাকরি-বাকরি করার প্রশ্নই নেই। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা তার ধাতে নেই। বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি যা আছে তা দিয়ে দিব্যি চলে যায় তার। সেখানেও তাকে নিজে গায়ে-গতরে কিছুই করতে হয় না।
কাজের লোক নিকুঞ্জই সব দেখাশুনো করে পরিপাটি করে। পরমেশের বাবা এলাকার হাই স্কুলে চাকরি করতেন। একটু পাগলাটে মানুষ ছিলেন। নিজস্ব গবেষণাগারে পড়ে থাকতেন দিন রাত। কী আবিস্কার তিনি করতে চেয়েছিলেন কেউ জানে না। কিন্তু লোকে বলে মাঝ রাতে তাঁর গবেষণাগার থেকে নাকি অদ্ভুত সব আওয়াজ পাওয়া যেত। নানা রকমের, নানান রঙের আলোর বিচ্ছুরণও নাকি দেখা যেত তাঁর সেই অদ্ভুত ল্যাবরেটরির জানালার ফাঁক দিয়ে। এমন কথাও শোনা যায় তিনি নাকি ভূত-প্রেত নিয়ে কাজ করতেন।
ভূতেদের সঙ্গে শলা করে দুই জগতের মধ্যে একটা সিঁড়ি বানানোর মতলবে ছিলেন নাকি ভদ্রলোক। নিজে একাধিকবার মৃত্যুর জগৎ থেকে বেড়িয়ে এসেছেন নাকি নিবারণ চক্কোত্তি। পুরনো মৃত লোকেদের সঙ্গে গ্রামের উন্নতি নিয়ে কথা বলেছেন।
এক কালে এই গ্রামের খুব বর্ধিষ্ণু জমিদার ছিলেন বিমল মান্নারা। তাঁর ঠাকুর্দার নিজস্ব লেঠেল বাহিনী একসময় লুঠপাট করে প্রচুর ধন-সম্পদ জড়ো করেছিলেন জমিদারি তোষাখানায়। পরে জমিদার প্রাণবল্লভ মান্না সোনার ঘড়ায় ভরে সেই সম্পদের বড় একটা অংশ নাকি কোথায় কোন একটা গোপন জায়গায় গচ্ছিত রেখেছিলেন জমিদার বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে। সে সম্পদ তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী গ্রামের ভীষণ কোনো দুর্দিনে কাজে লাগানোর কথা ছিল। কিন্তু তেমন দুর্দিন এ-গাঁয়ে এখনও আসেনি। সে সম্পদেরও হদিশ পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত।
পরমেশের মনে ভারি সাধ সেই সম্পদ খুঁজে বের করার। মনে মনে নিজস্ব একখানা জাঁদরেল কোষাগারের স্বপ্ন দেখে পরমেশ। অন্তত গ্রামের পরিচিত মানুষজনকে এই স্বপ্নের কথাই বার বার বলে সে। গ্রামের যে লোকগুলো তার সঙ্গে কথা-টথা বলে খানিক, তাদের সুযোগ পেলেই বলে পরমেশ, 'মান্নাদের এই পুরনো বাড়িতে একটা সত্যিকারের কোষাগার বানাব আমি একদিন। সেখানে মস্ত মস্ত কলসিতে টাকা পয়সা, সোনা-দানা রাখা থাকবে। মাঝে মাঝে রাতের বেলা মোমবাতির আবছা আলোয় নিজে হাতে সেই টাকা গুনে গেঁথে নেড়েচেড়ে দেখব বার বার। সম্পদ নিয়ে খেলব, সম্পদের মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়ব...'
নিকুঞ্জকে কখনও এমন ইচ্ছের কথা জানায়নি পরমেশ। কিন্তু গ্রামের কিছু লোকজনের মুখে এই কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে নিকুঞ্জ পরমেশকে জিগ্যেস করেছিল একবার, 'আচ্ছা ছোটবাবু, তুমি টাকা ভোগ না করে তা নিয়ে খেলতে চাও?'
'হ্যাঁ।' নির্বিকার মুখে উত্তর দিয়েছিল পরমেশ।
'তোমার ভোগ করতে ইচ্ছে করে না?'
'না?'
'ভালো-মন্দ খেতে প্রাণ চায় না?'
'উঁহু।'
'ভালো জামাকাপড় পরতে?'
'না।'
'দেশে-বিদেশে বেড়াতে যেতেও প্রাণ চায় না তোমার?'
'এই একটা জায়গাতেই আমার মনটা টলটলে হয়ে আছে জানো তো,' উদাস চোখে বাইরের আকাশের দিকে চেয়ে বলে পরমেশ, 'দেশ-বিদেশ ঘুরতে সত্যিই মাঝে মাঝে আমার মন চায়।'
'তবে যাও না কেন?'
'বেড়াতে গেলে বড় খরচ হে।'
'খরচ করবে। খরচ করার ক্ষমতা তো তোমার আছে।'
'আমার আর কীসের ক্ষমতা?'
'তোমার কি ধনদৌলতের অভাব?'
'তা অভাব খানিক আছে বইকি।'
'কীসের অভাব তোমার ছোটবাবু?'
'কী যে বলো নিকুঞ্জ, আমার বলতে এ পৃথিবীতে তো কিছুই নেই।'
'তাহলে এই পুকুর, জমি, ব্যাঙ্কে গচ্ছিত টাকা, গয়না, এসব কার?'
'তা তো জানি না।' বলে উদাস মুখে আকাশের দিকে তাকায় পরমেশ।
নিকুঞ্জ হাঁ করে চেয়ে থাকে তার মুখের দিকে। মাঝে মাঝে মানুষটাকে তার কেমন যেন অচেনা মনে হয়। মনে হয় লোকটাকে বোঝা এত সহজ নয়। ছোটবাবুকে সকলে যা ভাবে তা বোধহয় মানুষটার ছদ্মবেশ। মনে মনে এ-লোকটার কিছু একটা অন্য থাক আছে যেটা চট করে বাইরে থেকে দেখা যায় না।
পরমেশ তার দিকে নিকুঞ্জকে অমন হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেসে ফেলে। জিজ্ঞেস করে, 'কী দেখছ বলো দেখি আমার দিকে চেয়ে অমন হাঁ করে? মুখ বুজিয়ে ফেলো। তা নাহলে মুখে মশা ঢুকে যাবে যে।'
নিকুঞ্জ হেসে ফেলে। তারপরে পরমেশের দিকে চেয়ে জিগ্যেস করে, 'একটা কথা বলবে ছোটবাবু?'
'কী?'
'তোমার মতলবটা একটু খোলসা করে বলবে আমায়?'
'কী যে বলো, বুঝতে পারি না বাপু।'
'তোমার সম্পত্তি কিছুই তো খরচ করতে চাও না তুমি...'
'খরচ করলেই যে ফুরিয়ে যাবে হে,' নিকুঞ্জের কথার মাঝখানেই বলে ওঠে পরমেশ।
'কিন্তু কার জন্যে রাখছ এসব? সাত-কূলে কে আছে তোমার? বিয়ে থা-ও তো করলে না...'
'তোমরা আছ যে। তুমি, মঙ্গলা...'
'আমরা আর কদ্দিন?'
'যদ্দিন আছ তদ্দিন। মরার পরের হিসেব এখন করে লাভ কী?'
'কথা ঘুরিও না। কার জন্যে রেখে যেতে চাইছ এসব?'
'সময়ের জন্যে।'
'মানে?' অবাক হয়ে বলে নিকুঞ্জ।
'সব কথার কি আর মানে হয়?' মাথা নেড়ে বলে পরমেশ, 'আমি কি আর আমার বাবার মতন অতখানি পণ্ডিত মানুষ?'
'তুমিও কী খুব কম? বড়বাবু যথেষ্ট পড়াশুনো শিখিয়েছেন তোমায়। তোমার মাথা খুবই পরিষ্কার ছিল বরাবর। তাছাড়া আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না তুমি ছোটবাবু। আমি বহু রাতে দেখেছি, রাত নিশুত হলে সকলে ঘুমিয়ে পড়ার পরে চুপি চুপি তুমি বড়বাবুর গবেষণাগারে ঢুকে আপন মনে কাজ করো। তখন তোমার বাহ্যজ্ঞান থাকে না। অনেকদিন কাজ করতে করতে ভোর হয়ে যায়। তোমার খেয়ালই থাকে না।'
'এই মেরেছে। তুমি এসব জানলে কী করে?' অপ্রস্তুত গলায় বলে পরমেশ।
'ওই যে বললাম আমার চোখে ধুলো দেওয়া সহজ নয়। প্রায় জম্ম থেকে দেখছি তোমায়। তোমাকে আমি চিনি না ভেবেছ?'
'এসব কথা পাঁচ কান কোরো না'।
'কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তরটা?'
'এক্ষুনি আমার জানা নেই।'
'তুমি কি সত্যিই কৃপণ?'
'সকলে তাই তো জানে। কথাটা তারা ভুল জানে যে এমনও নয়...'
'তুমি নিজে কী বলো?'
'এক কাপ চা খাওয়াতে পারো? গলাটা বড্ড শুকনো শুকনো লাগছে আজ।'
'তার মানে আমার কথার জবাব তুমি দেবে না।'
'তুমি আজ বড্ড জ্বালাচ্ছো তো বাপু! কী হয়েছে সত্যি করে বলো দেখি আমায়? দেখো বাপু মনের রোগ-টোগ কিছু বাঁধিয়ে বোসো না যেন আবার। অনেকগুলো টাকা বেমক্কা খরচা হয়ে যাবে তখন।'
নানান কথা ভাবতে ভাবতে আনমনে পথ হাঁটছিল পরমেশ। যে-দিনের কথা ইঙ্গিতে জানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তার বাবা নিবারণ চক্রবর্তী, সেই দিন কত দিন পরে আসবে? আদৌ তার নিজের জীবদ্দশায় আসবে কি? না যদি আসে তাহলে বাবা ডাইরিতে তাকে সতর্ক ও প্রস্তুত থাকতে বলেছেন কেন বার বার?
'পরমেশ না? কেমন আছ বাবা?' রতন সাঁফুই-এর গলা শুনে চমক ভাঙল পরমেশের।
'ভালো আছি জেঠু। আপনি কেমন আছেন?'
'ভালো আর কী করে বলি বাবা। হাই ব্লাড সুগার। পৃথিবীর যা কিছু সুস্বাদু খাবার -দাবার সবই খাওয়া নিষেধ। এভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ বলো...'
'জগতে খাওয়াটাই কি বড় হল জেঠু?' পরমেশ হেসে ফেলে।
'আমি যে জীবনটাকে তেমন ভাবেই দেখি হে। সকলকে বলি খাওয়াটা বাঁচার জন্যে নয়, বাঁচাটা ভালোমন্দ চাড্ডি খেতে পাবো বলে।'
পরমেশ হা হা করে হেসে ওঠে আবার।
রতন চোখ কুঁচকে তাকান তার দিকে, 'হাসছ ভায়া?'
'কী করি বলুন দেখি। যেভাবে বললেন কথাটা।'
'আমি যে অমন করেই ভাবি,' বলেই একটু চুপ করে থাকলেন রতন সাঁফুই। তারপর পরমেশের দিকে চেয়ে জিগ্যেস করলেন, 'তোমার কী খবর?'
'চলছে,' বলে বড় করে শ্বাস ছাড়ে পরমেশ। নাক টানে দুবার।
'ঠান্ডা লাগিয়েছ মনে হচ্ছে?'
'হুঁ।'
'ওষুধ খেয়েছ নাকি কিছু?'
'এখনও পর্যন্ত না'।
'বেশ করেছ। কথায় কথায় ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস ভালো নয়।
'বাবাও তাই বলতেন।'
'মস্ত মানুষ ছিলেন। স্কুলকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। স্কুলটাকে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে খুবই অবদান ছিল তাঁর। শশীবাবু আর বিমলবাবুর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে গেছেন তিনি। শুনেছি শেষদিকে রাতে নাকি ঘুমোতেন না। সারা রাত নিজের ল্যাবরেটরিতে কাজ করতেন। কিন্তু সকালে স্নান-টান করে ঠিক স্কুলে চলে আসতেন। কামাই শব্দটাই তাঁর অভিধানে ছিল না বোধহয়। কিন্তু ভালো মানুষদের ক্ষেত্রেই কেন যে অমন হয়! যাই বলো বাপু, ঈশ্বর কিন্তু মাঝে মাঝেই বড্ড অবিবেচকের মতন কাজ করে ফেলেন। তা নাহলে ওনার মতন অমন একজন মানুষ কথা নেই বার্তা নেই, এমন করে উধাও হয়ে যান? এত খোঁজ, তল্লাশ, থানা-পুলিশ কিছুতেই তো সন্ধান পাওয়া গেল না...'
'এই রহস্য নিয়ে কত যে ভেবেছি,' দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে পরমেশ, 'প্রথম প্রথম তো অসহায় লাগত। মা শুধু কেঁদে কেঁদেই মারা গেল। বিমলদাদুও খুব শক পেয়েছিলেন বৃদ্ধ বয়েসে। তবে আজকাল কেন জানি মনে হয় বাবা যেন আছেন। আমি তাঁর উপস্থিতি টের পাই...'
রতন সাঁফুই এগিয়ে এসে পরমেশের পিঠে হাত রাখেন। খুব স্নেহের সুরে বলতে থাকেন, 'কথাটা শুনতে ভালোই লাগছে পরমেশ। সত্যি বলতে কী আমরা সকলেই তো তাঁকে ভালোবাসতাম, কাজেই তিনি আছেন একথা আমাদের বুকে বল ভরসা যোগায় সন্দেহ নেই। তবু বলব, অত বড় বাড়িতে বলতে গেলে একাই তো থাকছ তুমি। চাও বা না চাও, মনের ওপরে একটা চাপ তো পড়বেই বাপু। তাছাড়া বাবার কথা ভাবতে ভাবতে অনেক সময় হয়তো নানারকম ভ্রমকেও সত্যি বলে মনে হতে পারে তোমার। কাজেই এসব অশৈলি ব্যাপার-স্যাপারে খুব বেশি গুরুত্ব দিও না বাছা। বরং পারলে এবার তুমি একটা বিয়ে থা করে ফেল। কদিন আগেই সুধন্য ঘটক একটা ভালো মেয়ের কথা বলছিল। তুমি হ্যাঁ বললে তাকে বরং পাঠিয়ে দিই তোমার বাড়ির দিকে।'
'না-না। খবরদার নয়,' প্রায় আঁতকে উঠে বলে পরমেশ, 'বিয়ে করার এক্কেবারে সময় নেই আমার। সামনে অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। আগে সেই কাজ ঠিক মতন উদ্ধার করি জ্যাঠাবাবু।'
'কাজ?' অবাক হয়ে তার দিকে তাকান রতন সাঁফুই, 'তোমার আবার কাজ কী হে?'
'আছে, আছে', মাথা নেড়ে বলে পরমেশ, 'একটু-আধটু নয়, মেলা কাজ...'
'আছে না হয় মেনেই নিলাম। কিন্তু কাজটা কী?'
'সেইটেই তো বুঝতে পারছি না এখনও। শুধু জানি যে কাজ একটা আছে, আর সে কাজে অনেক খরচ খরচা করতে হবে আমায়'। বলে সটান হাঁটা লাগায় পরমেশ। রতন সাঁফুই হাঁ-করে তাকিয়ে থাকেন খানিক সেদিকে। তারপর হতাশভাবে মাথা নাড়াতে থাকেন আপন মনে।
হাটে, বাজারে ছেলেটা সম্পর্কে নানা কথা উড়ে বেড়ায় ইদানীং। অনেকেই বলে পরমেশ রীতিমতন ছিটেল। তার মাথার স্ক্রু ঢিলেই শুধু নয়, একেবারে খুলে পড়েই গেছে হয়তো কোনোদিন বেখেয়ালে। কেউ কেউ আবার বলে মাথার ব্যামো-ট্যামো বাজে কথা, সে আসলে বিশ্ব কঞ্জুষ। আবার কেউ এমন কথাও বলে যে ছেলেটা খারাপ নয়, কিন্তু অত বড় বাড়িতে একলা থাকে।
চিরকালই বাড়িটা সম্পর্কে নানান অশৈলী গুজব উড়ে বেড়িয়েছে সারা নবগ্রাম জুড়ে। তাছাড়া পর পর ওই বাড়ির কতগুলো মানুষ জীবন থেকে মৃত্যুর রাজত্বে চলে গেল। নিবারণ মাস্টার নিখোঁজ। বেঁচে আছেন কিনা কেউ জানে না। এসব কি এমনি হয়? অপদেবতার কোপদৃষ্টি লেগেছে ওই বাড়ির ওপরে। ওকেও নিশ্চিত অপদেবতায় ভর করে রেখেছে এখন।
পরমেশ এখন আর নিজের ইচ্ছেয় চলে না। তাঁরা যেমন চালান তেমনই চলে এখন ছেলেটা। এসব কথা কোনোদিনই তেমন আমল দেননি রতন। কিন্তু আজ মনে হল কথাগুলো পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়াও বোধহয় ঠিক হবে না একেবারে।
টেবিলের ওপরে ঝুঁকে একমনে কাজ করে যাচ্ছিলেন নিবারণ। গত কয়েকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল কাজটা একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে চলেছে। তাঁর পাঠানো তরঙ্গ এতদিনে কারা যেন রিসিভ করেছে বলে মনে হচ্ছে। তারা তাঁর উদ্দেশ্যে প্রতিতরঙ্গও পাঠাচ্ছে কয়েকদিন ধরে। নিবারণ আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন সেই প্রতিতরঙ্গের অর্থ বোঝার। বার বার মনে হচ্ছিল এই তরঙ্গের মধ্যে দিয়ে তাঁকে যেন কারা সাবধান করতে চাইছে বার বার। নিবারণ কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না, কারা সাবধান করতে চাইছে তাঁকে আর কী জন্যেই বা তাঁকে সাবধান করতে চাইছে তারা।
বাইরে থমথম করছে রাত। জানালা দিয়ে আকাশে অগণন নক্ষত্রের ঝিকিমিকি দেখা যাচ্ছিল। বাড়ির সকলেই ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে এতক্ষণে। নিবারণ জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে চেয়ে আনমনে আকাশ দেখছিলেন। হঠাৎ-ই একটা অদ্ভুত দৃশ্য নজরে এল তাঁর। আকাশের বুক চিরে চোঙ আকৃতির একটা আবছা সাদা সাদা মেঘের মতন ধোঁয়াটে পথ যেন ক্রমশ এগিয়ে আসছে তাঁর ঘরের জানালার দিকে।
নিবারণ হাঁ-করে তাকিয়ে রইলেন সেই ভাসমান সুড়ঙ্গের দিকে। তাঁর ল্যাবরেটরির মধ্যে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের তরঙ্গের মধ্যে অদ্ভুত একটা চাঞ্চল্য তৈরি হল কিছুক্ষনের মধ্যেই। নানা রঙের অসংখ্য অজানা সংকেত ফুটে উঠতে লাগল তাঁর ঘরের দেওয়ালে টাঙানো বিশেষ পর্দার ওপরে। কেন কে জানে নিবারণের বার বার মনে হতে লাগল কারা যেন নীরবে ডাকছে তাঁকে। ডেকেই চলেছে একটানা।
গা শিরশির করে উঠল নিবারণের। পরক্ষনেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিল সে। সে বৈজ্ঞানিক। ভয় পাওয়া তার সাজে না। তাছাড়া সাধারণ মানুষ যাদের ভয় পায়, পারতপক্ষে মুখোমুখি হতে চায় না যাদের, নিবারণ তো তাদের সঙ্গেই চিরকালীন যোগাযোগের পথ আবিষ্কার করতে চায়। মনে মনে কতদিন স্বপ্ন দেখেছে সে এমনভাবে জীবন ও মৃত্যুর জগতদুটোকে জুড়ে দেবে সে, যাতে করে চাইলেই বিজ্ঞানের জটিল কোনো সমস্যার সমাধানে অনায়াসে আইনস্টাইন বা নিউটনের সঙ্গে কথা বলা যায়, মন খারাপ হলে রবি ঠাকুরের পায়ের কাছে বসে আবদার করতে পারে, 'একটা মন ভালো করা কবিতা শোনাবেন আমায় গুরুদেব?'
আপন মনেই বলে ওঠে নিবারণ, 'কে ডাকছেন আমায় এমন করে? আপনারা কেউ কি সত্যিই এসেছেন আমার কাছে?'
'এসেছি,' খুব চাপা অথচ স্পষ্ট কন্ঠস্বর ঝমঝম করে বেজে ওঠে তার কানের মধ্যে।
নিবারণ চমকে ওঠে। জিগ্যেস করে, 'কে আপনারা?'
'আমরা?' কন্ঠস্বর ভাবে খানিক। তারপর বলে, 'আমাদের পরিচয় দেওয়া যে ভারি কঠিন নিবারণ। আসলে পরিচয় তো হয় শরীরের। ভেবে দেখো, আলাদা আলাদা শরীরকে চিহ্নিত করার জন্যেই আলাদা আলাদা নামের প্রয়োজন। কিন্তু এই স্থূল শরীরটাই না থাকে যদি, নাম দিয়ে তুমি কাকে চিহ্নিত করবে বলো?'
'কথাটা ঠিকই,' মাথা নাড়ে নিবারণ, 'তবু কিছু একটা বলে যে ডাকা দরকার আপনাকে বা আপনাদের। নইলে কথাবার্তা চালাব কেমন করে?'
'বেশ। তোমার সুবিধের জন্যে তাহলে আমাদের আবহমান বলে ডাকতে পারো।'
'ঠিক বুঝতে পারলাম না।'
'আমরা শক্তিপুঞ্জ। আমরা ছিলাম আছি এবং থাকবও। মাঝে মাঝে আমরা স্থূল শরীরে কিছুকাল বর্তমানে থাকি। পৃথিবীর রূপ রস বর্ণ গন্ধের সঙ্গে স্থূল ইন্দ্রিয়ের সম্পর্ক তৈরি করার খেলায় মাতার জন্যে।'
'আপনি বড্ড কঠিন কঠিন কথা বলছেন।'
'তুমি বৈজ্ঞানিক নিবারণ,' কন্ঠস্বর স্নেহের সঙ্গে বলে, 'সত্যিটাকে জানাই যে তোমার সাধনা।'
'আমি সত্যি জানতে চাই।'
'জানি। ওইজন্যেই তো তোমার কাছে এলাম।'
'আমার কাছে এসেছেন বলছেন, কিন্তু আমি তো কই আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না?' নিবারণ বলে।
'তোমার মতন রক্ত-মাংসের স্থূল শরীরে তো আমরা নেই আর নিবারণ। আমাদের সেই শরীর এখন অতীত হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনে কখনও আবার হয়তো শরীর নিতে হতে পারে আমাদের...'
'এখন তবে কী অবস্থায় আছেন আপনারা?'
'দেখো নিবারণ, মানুষের শরীরের তিনটি অবস্থা থাকে। স্থূল শরীর, সূক্ষ্ম শরীর এবং কারণ শরীর...'
'কারণ শরীর?' কন্ঠস্বর থামার আগেই বলে ওঠে নিবারণ।
'হ্যাঁ। সে শরীরকে অতি সূক্ষ্ম শরীরও বলতে পারো। সে শরীর ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য নয়। আগুন তাকে পোড়াতে পারে না, জল ভেজাতে পারে না, অস্ত্রও তাকে ছিন্ন করতে পারে না...'
'উরিব্বাস।'
'এই ধরনের অবস্থায় অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সমস্তই মানুষের অধিগত থাকে...'
'তাহলে অনাগত পৃথিবীতে কী ঘটতে চলেছে আপনারা জানেন?'
'জানি,' বলে কন্ঠস্বর গাঢ় শ্বাস ছাড়ার মতন আওয়াজ করে।
'আপনি কি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন?'
'আমাদের তো শ্বাস ফেলার দরকার হয় না নিবারণ, কাজেই তার দীর্ঘও নেই, হ্রস্বও নেই।'
'কিন্তু আওয়াজটা তেমনই শোনালো।'
'তবে এটা বলতে পারি, শরীরে থাকলে এ মুহূর্তে দীর্ঘশ্বাসই ফেলতাম হয়তো।'
'কেন?'
'তোমার পাঠানো তরঙ্গের পথ ধরেই আমাদের নেমে আসা কিনা। ওই তরঙ্গ যে তোমার মন, তোমার ইচ্ছে, তোমার স্বপ্ন, সমস্ত কিছুই পৌঁছে দিয়েছে আমাদের কাছে। কাজেই তোমার সবচেয়ে প্রিয় স্বপ্নটা অদূর আগামীতেই ভেঙে চুরে দুমড়ে পড়ছে দেখতে পেয়ে আপনা আপনিই ওই আক্ষেপসূচক শব্দটা বেরিয়ে এসেছে আমাদের কাছ থেকে।'
'আমার কোন স্বপ্নের কথা বলছেন বলুন তো?' কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করে নিবারণ।
'যে স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছে তোমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু...'
'আমার ছেলে পরমেশের কথা বলছেন? পরমেশকেই বোধহয় আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।' ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে নিবারণ।
'সবচেয়ে ভালোই যদি বাসবে তাহলে ওই বোধহয় কথাটা জুড়লে কেন হে?'
'তাহলে কি বাসি না?' একটু ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া গলায় বলে ওঠে নিবারণ।
'না। সত্যি বলতে কী ভালো তুমি ছেলেকে খুবই বাসো, কিন্তু তাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালো বাসো না।'
'তাহলে কি আমার স্ত্রী?'
'উঁহু, উঁহু...'
'তবে?' বিহ্বল কণ্ঠে জিগ্যেস করে নিবারণ।
'এসো তোমাকে দেখাই তাহলে।'
'কী দেখাতে চাইছেন আমাকে?'
'সেই অনাগত সময়ের ছায়া।'
'তা কি সত্যিই সম্ভব?'
'এই মহাজগতে অসম্ভব শব্দটার কোনো অস্তিত্বই নেই নিবারণ। তুমি শুধু বলো, সেই আগামী দিনের ছবি তুমি দেখতে চাও কি না...'
'চাই।'
'তাহলে তোমাকে ওই সময়সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে যেতে হবে নিবারণ।'
'কী ভাবে ঢুকব?'
'তোমার এই স্থূল শরীরে এই সময়সুড়ঙ্গে তুমি ঢুকতে পারবে না। এই সুড়ঙ্গপথে যাত্রা করাও অসম্ভব এই শরীরটা নিয়ে।'
'তাহলে উপায়? আমাকে কি মরতে হবে? মানে আত্মহনন?'
'না। আত্মহনন খুবই খারাপ জিনিস। মহাজগতের যাঁরা নিয়ন্তা তাঁরা এই আত্মহননকে কখনোই অনুমোদন দেন না।'
'আমি কী করে ঢুকব তাহলে ওই সুড়ঙ্গে?'
'তোমাকে এই শরীরের মধ্যে থেকে বের করে আনব আমরা। সেই সূক্ষ্মতর তুমি এই সময়সুড়ঙ্গের পথ ধরে আগামী সময়ে যাবে আমাদের সঙ্গে। সেখানে গিয়ে জটিল কিছু গাণিতিক ফর্মুলা প্রয়োগ করে পারো তো ঠেকিয়ে দিও আগামীর সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাপ্রবাহকে।'
'আমি কি পারব?'
'পারবে বলেই বিশ্বাস আমাদের। সেইজন্যেই আমরা এসেছি তোমার কাছে। তোমাকে সাহায্য করতে চাই বলে। তার আগে একটা কাজ করে যেতে হবে তোমাকে।'
'কী কাজ?'
'পরমেশের জন্যে এই সংকেত আর এই ছোট্ট যন্ত্রটি রেখে যাও তুমি। ও যদি এই যন্ত্রের মধ্যে জমিয়ে রাখা কালখণ্ডকে আবিষ্কার করতে পারে, তাহলে তোমার স্বপ্নটা টিঁকে যেতেও পারে। মনে রেখো যা ঘটার তাকে পুরোপুরি আটকানো যায় না। আটকানো গেলেও আটকানো উচিত বলে মনে করি না আমরা। তাতে করে সৃষ্টির নিজস্ব গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। আমরা বড়জোর ঘটনার প্রবাহটাকে সদর্থক দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারি। তবে এই কাজটাও বলতে যত সহজ লাগল কাজে করে দেখানোটা ততটাই কঠিন।'
'তা তো বটেই।'
'আমরা তোমার মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করছি কয়েক মিনিটের জন্যে। তুমি তোমার ডাইরি আর কলম হাতে নাও। আপাতত পরমেশের জন্যে এটাই তোমার শেষ নির্দেশ।'
'আমি কি আর ফিরব না তাহলে কোনোদিন?'
'যদি সেই অঙ্কটা সফলভাবে কষে ফেলতে পারো, তাহলে ঠিক মুহূর্তে আবার এখানে এসে পৌঁছবে তুমি। নাও সময় নেই। ডাইরি খোলো। আর এই যে দেখো, তোমার টেবিলের ড্রয়ারে এই ঘড়ির মতন দেখতে যন্ত্রটাকে রেখে দিলাম আমরা। নির্দিষ্ট সময়ে পরমেশ পেয়ে যাবে এটা। আমরা আপাতত অঙ্কটাকে এই পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছি।'
নিবারণ কিছুই বুঝতে পারে না। ডাইরিটা হাতে তুলে নেয়। ডাইরির পাতা খুলতে খুলতে জিগ্যেস করে, 'আমাকে এই শরীর থেকে বের করে নেওয়া মানে এক অর্থে আমার তো মৃত্যুই হল। এই শরীরটা তো আর অক্ষত থাকবে না অত দিন?'
'থাকবে।'
'তা কী করে সম্ভব?'
'আমরা তোমার শরীর আমাদের চতুর্থ আয়মের ল্যাবরেটরিতে যত্ন করে সংরক্ষণ করব। সেখানে সময় স্থির। কাজেই তোমার এই শরীরও সেই ল্যাবরেটরিতে সময়ের গ্রাস থেকে মুক্ত। সময় না এগোলে সবই নিত্য। কোনো কিছুই মরণশীলও নয়, পচনশীলও নয়...'
বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে দুলতে ডাইরির পাতায় কলম ছোঁয়ায় নিবারণ। আর তখনই তার মনে হয়, চেতনা ক্রমশই তার নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। কোন এক অন্ধকার ঘূর্ণায়মান গহ্বরে যেন ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে সে।
ঘড়িটা বাঁ-হাতের কবজিতে লাগিয়ে নিয়ে কবজি ভাঁজ করে সময় দেখতে গেল পরমেশ। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়েই চোখ দাঁড়িয়ে গেল তার। যাচ্চলে কাল সন্ধেবেলাতেই ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে। এবারে বন্ধ হল মানে ঘড়িটা একেবারেই গেল। সারিয়ে-টারিয়ে হাতে পরার আর উপায়ই রইল না কোনো। আগেরবারেই হারান মুৎসুদ্দি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিল। কাজেই আর তার কাছে ঘড়িটাকে সারাতে নিয়ে গিয়ে লাভ নেই। আর এই গ্রামে হারান মুৎসুদ্দির ফিরিয়ে দেওয়া ঘড়ি সারিয়ে দেবে এমন দরের মিস্তিরি আর একজনও নেই।
এই ঘড়িটাও পরমেশের নয়। ঘড়িটা আসলে ছিল নিবারণের। নিবারণ চলে যাবার সময় ঘড়িটা তাঁর শোবার ঘরের টেবিলের ওপরেই রাখা ছিল। অমনই পড়ে থাকত প্রথম প্রথম। দম দেওয়া ঘড়ি। মা দম দিয়ে রাখতেন রোজ। আর বলতেন, 'কে জানে মানুষটা দুম করে একদিন যদি ফিরে আসেন...' বাবা অবশ্য ফিরে আসেননি আর। জলজ্যান্ত মানুষটা বাতাসের মতন উবেই গেলেন বলতে গেলে।
পরমেশ বেশ ছোট তখন। জ্ঞান হওয়া থেকে দেখে আসছে বাবা আত্মভোলা আর উদাস। সংসারে খুব বেশি মন তাঁর কস্মিনকালেও ছিল না। কিন্তু বাবা তাকে ভালোবাসতেন খুব। মায়ের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর। বাবাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন মা। বাবার জন্যে গর্বের অন্ত ছিল না তাঁর। অন্যদিনের মতনই সেদিনও রাতে খাওয়াদাওয়ার পরে বাবা তাঁর ল্যাবরেটরিতে ঢুকেছিলেন। নিবিষ্ট মনে কাজ করছিলেন নিজের টেবিলের ওপরে ঝুঁকে পড়ে।
পরমেশ ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম যখন ভাঙল, বাড়িতে হুলুস্থুল কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে তখন। বাবাকে পাওয়া যাচ্ছে না কোত্থাও। মা কান্নাকাটি করছিলেন। বিমলদাদু প্রাণপনে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন তাঁকে। বার বার বলছিলেন, 'কোথায় আর যাবে? সব বৈজ্ঞানিকই একটু-আধটু খ্যাপা হয় জানোই তো। আমাদের নিবারণ তো আর যে সে মানুষ নয়। আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার চালচলন কি সবসময় মেলে মা? তাছাড়া জানোই তো ইশকুল তার প্রাণ। ইশকুল ছেড়ে সে কোত্থাও যাবে না। যেতে পারবেই না। ঠিক সুড়সুড় করে ফিরে আসবে খানিক বাদে স্কুলে যাবার সময় হয়ে গেলেই। তুমি বরং জমিয়ে রান্না করে রাখো। একপেট খিদে নিয়ে ফিরে যখন বলবে কী আছে চাট্টি খেতে দাও বাপু, তখন যাতে অপ্রস্তুতে পড়তে না হয় তোমায়।'
'কিন্তু এমন তো আগে কক্ষনও করেননি উনি...' মা দাদুর যুক্তি মানতে চাইছিলেন না।
'আহা ইনটেলেকচুয়ালরা তো অমনই হয়। বাঁধা গণ্ডির মধ্যে কি চিরকাল চলেন তাঁরা?' আবার বলেন বিমলদাদু। বলেন বটে, কিন্তু তাঁর গলাটাও যেন কেঁপে ওঠে এবার।
বাবা কিন্তু আর ফিরলেন না। সেই যে উধাও হয়ে গেলেন নিজের ল্যাবরেটরি থেকে, আর ফিরে এলেন না সংসারে। ছেলে, স্ত্রী, সাধের ল্যাবরেটরি, সমস্ত কিছুই যেমনকার তেমনই পড়ে রইল। বহু খোঁজ তল্লাশি করেও কোনো চিহ্নই পাওয়া গেল না তাঁর।
বাবার শোকে প্রথমটা প্রায় বোবাই হয়ে গিয়েছিলেন মা। তারপর তিনিও চলে গেলেন কয়েক বছর পরে। মা মারা যাবার পরে বিমলদাদুই বলতে গেলে বুকে করে মানুষ করেছেন পরমেশকে। বিমলদাদুর জন্যে মাঝে মাঝেই খুব মন কেমন করে পরমেশের। মনে হয় দাদুর আরো কিছুদিন বাঁচাটা খুব জরুরি ছিল। শুধু তার জন্যে নয়। এই গ্রামের জন্যে, এমনকী তাদের গ্রামের স্কুলটার জন্যেও।
মা মারা যাবার পরে ঘড়িটা বেশ কিছুদিন এমনিই পড়ে ছিল। চাবি-টাবি দেওয়া হত না। কিন্তু ঘড়িটা খারাপ হয়নি। দিব্যি চালু হয়ে গেল, পরমেশ যেদিন চাবি দিয়ে হাতে গলাল ঘড়িটাকে। তারপর থেকে ঘড়িটা লাগাতার সময় জানিয়ে যাচ্ছিল অক্লান্তভাবে। মাঝে মাঝে এক আধবার সামান্য সমস্যা হয়েছে, হারান মুৎসুদ্দির হাতে সে সমস্যার চটজলদি সমাধানও হয়ে গেছে প্রত্যেকবার। আগেরবার যখন হারানদার দোকানে ঘড়িটা সারাতে দিয়েছিল পরমেশ, নিকুঞ্জ বলেছিল, 'ছোটবাবু, অনেক হয়েছে, এবারে একটা ঘড়ি কিনে ফেল নিজের জন্যে।'
'ধুস, শুধুমুধু চাড্ডি পয়সা খরচা করে কী হবে,' নিকুঞ্জর কথাটা উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল পরমেশ, 'একটু-আধটু রোগ বালাই কি আর এই মানুষের শরীরটাতেই হয় না? তখন কি এই রুগণ শরীরটাকে ফেলে দিয়ে অন্য শরীরের খোঁজ করি?'
'কোন কথার কী উত্তর,' নিকুঞ্জ বিরক্ত হয়ে বলে, 'আরে এ হল যন্তর। মানুষের শরীরের সঙ্গে কি এর তুলনা চলে?'
পরমেশ হাসে, 'আমাদের এই মানব শরীরটাও আসলে যন্ত্রই। একটু জটিল আর উন্নত যন্ত্র এই যা।'
'কী যে বলো তুমি ছোটবাবু, আমাদের নিরেট মাথায় সব কথা ঢোকে না। তবে যাই বলো না কেন বাপু, একথা তোমায় স্বীকার করতেই হবে যে হাত দিয়ে তোমার পয়সা মোটেই গলতে চায় না।'
পরমেশ প্রতিবাদ করেনি। আসলে সব কথা সকলকে বলা যায় না। তাছাড়া কথাটা এমনই ধোঁয়া ধোঁয়া যে অন্য কাউকে ঠিকমতন বুঝিয়ে বলা তার পক্ষেও ভীষণই ঝকমারির ব্যাপার। অত ঝক্কি হুট বললেই নেওয়া যায় না। শুধু পরমেশ জানে, বাবা ডাইরিতে লিখে গেছেন অপচয় মোটে নয়। নিজের সর্বস্ব গচ্ছিত রাখো যত্ন করে। সময় আসছে। তোমাকে সব দিয়ে মোকাবিলা করতে হতে পারে সেই বিপরীত সময়ের সঙ্গে।
গেলবারেই হারান মুৎসুদ্দি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিল যে এই ঘড়ি আবার যদি খারাপ হয় তাহলে তা সারানো সম্ভব নয়। এ-ঘড়ির লাইফ ফুরিয়েছে। জোড়াতালি দেবার জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বাজারে পাওয়া যাবার সম্ভাবনাও এখন আর নেই। কাজেই আজ ঘড়িটা বন্ধ দেখে মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল পরমেশের।
এই ঘড়িটা হাতে দিলেই যেন বাবার স্পর্শ টের পাওয়া যেত। মনে হত বাবা তাকে যেন ছেড়ে যাননি। দিব্যি ছুঁয়ে আছেন তাকে এখনও। এমন মনে হয় বাবার ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেও।
পরমেশ বড় হবার পর থেকেই বিমলদাদু রাত্রি বেলা বাবার ল্যাবেরটরিতে ঢোকা তার জন্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। প্রতিদিন সন্ধে বাতি জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে নিজে হাতে ওই ঘরে তালা লাগিয়ে চাবি নিজের জিম্মায় রেখে দিতেন যত্ন করে। পরমেশ একবার জিগ্যেস করেছিলেন কেন তিনি রাতে তাকে ওই ঘরে ঢুকতে দিতে চান না। বিমলদাদু চোখ গোল করে আতঙ্কিত গলায় বলেছিলেন, 'ও বড় সব্বোনেশে ঘর দাদু। যে ঘর থেকে একটা জলজ্যান্ত মানুষ বলা নেই কওয়া নেই ভ্যানিশ হয়ে যেতে পারে-সে ঘরে যে-কোনো সময় যে-কোনো কিছু ঘটতে পারে...'
'তা তেমন কিছু কি দিনে ঘটতে পারে না?'
'সম্ভবত না'।
'কারণ?'
'অত শত জানি না বাপু। তবে অনুমান করতে পারি।'
'কী সেই অনুমান?'
'দেখ ভাই, নিবারণ ঠিক কী নিয়ে গবেষণা করত আমার জানা নেই। জানার চেষ্টাও করিনি তেমন। তবে গ্রামের লোকে তার গবেষণা নিয়ে নানান কথা বলে বেড়াত।'
'যেমন?'
'তারা বলত সে নাকি ভূত নিয়ে গবেষণা করত। আর ভূতেরাই নাকি তাকে উড়িয়ে নিয়ে চলে গেছে...'
'এসব গাঁজাখুরি গল্পে তুমি বিশ্বাস করো নাকি?'
'আগে করতাম না। তবে ইদানীং করি। আর সেইজন্যেই আমি চাই না যে ওই ভূতুড়ে গবেষণাগারে তুমি রাত-বিরেতে গিয়ে বসে থাকো।'
'তোমার ভয়টা শুধুই রাতে কেন?'
'রাতে ওই সব অপদেবতাদের শক্তিবৃদ্ধি হয়,' বলতে বলতেই পরমেশের সামনে থেকে সরে যান বিমল মান্না।
বিমলদাদু মারা যাবার পর থেকে ল্যাবরেটরির চাবি রাত্রিবেলা থাকে নিকুঞ্জের কাছে। নিকুঞ্জের কাছে জোর-জবরদস্তি করলে সে হয়তো চাবি দিয়ে দিত তাকে, কিন্তু পরমেশ জোর করতে চায়নি তাকে। বরং নিঝুম দুপুরে সকলে ভাতঘুমে গেলে সে একলা ঢোকে ওই ঘরে। আপন মনে বসে থাকে ঘরের মধ্যে। বেশ লাগে তার সে সময়। মনে হয় কে যেন ছায়া শরীর নিয়ে তার পাশে এসে বসে।
বাবা কি? হলে দিব্যি হয় মনে মনে ভাবে পরমেশ। ঘরের নানান যন্ত্রপাতি নেড়েচেড়ে দেখে সে মাঝেমধ্যে। কোন যন্ত্রের কী কাজ সে বুঝতে পারে না, তবু সেগুলো নাড়তে-চাড়তে ভালো লাগে তার। মনে হয় প্রতিটা যন্ত্র তার বাবার স্মৃতি বুকে বয়ে তাঁর ফেরার অপেক্ষায় স্থির হয়ে আছে।
পরমেশ বোঝে এই ল্যাবরেটরির মধ্যে ভয়ানক একটা রহস্য চাপা দিয়ে রাখা আছে। সেই রহস্য তার অপেক্ষাতেই যে বসে আছে ঘাপটি মেরে এ কথাটাও ক্রমশ বদ্ধমূল হয়ে ওঠে।
পরমেশ সিদ্ধান্ত নেয়, ল্যাবরেটরির ডুপ্লিকেট চাবি বানানো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এতদিনে। রাতের ল্যাবরেটরি তাকে আজকাল ডাক পাঠায়। সেই ডাক স্পষ্ট শুনতে পায় সে মনের মধ্যে। রাতের নির্জনতায় সকলের অগোচরে ল্যাবরেটরির রহস্যময় আলো-আঁধারিতে পরমেশের যাতায়াত বাড়তে থাকে ক্রমাগত।
আজও দুপুর ঘন হয়ে এলে অচল ঘড়িটা হাতে ঝুলিয়ে ল্যাবরেটরির মধ্যে এসে ঢুকল পরমেশ।
এখন নিবারণের কোনো নাম নেই, কোনো অবয়ব নেই। বিশ্বের অনন্ত শক্তিপুঞ্জের সে এক ক্ষুদ্র অংশমাত্র। সে বোঝে এই মহাবিশ্ব তাকে বাদ দিয়ে নয়, আবার এখানে সে খুব অপরিহার্যও নয়। এখন নিবারণের হাত নেই, পা নেই, মাথা নেই, কোমর নেই। আছে শুধু অদ্ভুত শক্তিধর এক চৈতন্যময় সত্ত্বা। আর সেই চৈতন্যময় সত্ত্বা সততই কাজ করে যাচ্ছে অক্লান্তভাবে।
তার সেই কাজের কোনো ছেদ নেই, বিরাম নেই। আপন মনে সে তার অভিষ্ট অনুযায়ী লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছনোর চেষ্টা করে যাচ্ছে একভাবে। এই চৈতন্যের জগতটাই এমন। সকলে নিজের নিজের জগৎ তৈরির খেলায় মগ্ন। কারোর অন্য কারো দিকে তাকানোর উপায় নেই।
নিবারণ নীরবে বয়ে চলা সময়ের স্রোতের দিকে তাকিয়ে ছিল একমনে। এই সময় আদি থেকে অন্ত, সঞ্চরণশীল। এক অদ্ভুত সূত্রে নিরন্তর এগিয়ে চলেছে সে নিরবচ্ছিন্নভাবে।
মহাবিশ্বের অনন্ত শক্তির সঙ্গে মিশে সেই সময়ের স্রোত নিয়ন্ত্রণের আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে নিবারণ। মগ্ন চৈতন্যের মধ্যে জটিল সব গণিতের ঢেউ উঠছে, ঢেউ নামছে ক্রমাগত। চৈতন্যের গভীর আত্মমগ্নতা আর একমুখীনতা দিয়ে সেই গণিতের প্রবাহকে সঠিকভাবে সময়প্রবাহের সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছিল সে। এখানে সময়ের পরিমাপ করে না কেউ। এখানে দিন-রাতের ফারাক নেই। স্থির শূন্যতায় মিশে থেকে নির্মোহভাবে বয়ে চলা সময়কে প্রত্যক্ষ করাই এখানকার নিয়ম। নিবারণ অবশ্য অতখানি নির্মোহ নয়। শুধুমাত্র সাক্ষীভাবে স্থির সময়ের মধ্যে নিরুপদ্রব অনন্তযাপন তার উদ্দেশ্য নয়। সে জানে যে অঙ্কটাকে সফল করার জন্যে এখানে আসা তার, সেই অঙ্কের খুবই কাছাকাছি পৌঁছে গেছে সে এখন। সময়ের ওঠা-নামাও তাকে জানান দিচ্ছে কী হতে চলেছে।
নিবারণ অঙ্ক আর ইচ্ছে দিয়ে তা প্রতিহত করতে এসেছে এখানে। কাজ হয়ে গেলে আবার ফেরা তার। এখানকার অন্য শক্তিপুঞ্জের মতন তার দেহ শেষ হয়ে যায়নি। তার দেহ সংরক্ষিত আছে সময়ের স্পন্দনহীন এক বিশেষ তরঙ্গে মোড়া অন্যতর আয়মে। এখানকার কাজ শেষ হলে শক্তি সুড়ঙ্গের মুখ খুলে যাবে আবার। তখন ফিরে চলা। সেই ধুলোমাখা প্রিয় পৃথিবীতে তার ছোট্ট ল্যাবরেটরিতে। যা রেখে এসেছিল, সে জানে, তা এখন পালটে গেছে অনেকখানি। তবু সব জানলে তার প্রিয় গ্রামের মানুষ তার কথা ভালোবাসার সঙ্গেই স্মরণ করবে আবহমানকাল।
বৃহত্তর কর্তব্যের টানে নিজের সংসারের কাছে তার হয়তো কিছু ত্রুটি থেকে গেল, কিন্তু নিবারণ নিজে তৃপ্ত। নিজে ভালোভাবে বেঁচে থাকাটাই তো শেষ কথা নয়। বরং নিজে ভালো থাকার থেকেও অনেক বেশি জরুরি অন্যদের ভালোভাবে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাটাকে নিশ্চিত করতে পারা।
নিবারণ নিজের সমস্ত শক্তি পুঞ্জিভূত করে ইচ্ছেকে একটি বিন্দুতে স্থির করে ফেলল। ওই যে বয়ে চলা সময় জানান দিচ্ছে, সেই মুহূর্ত সমুপস্থিত। সে ইচ্ছেতরঙ্গের বিচ্ছুরণ ঘটাতে শুরু করল এতদিন ধরে আয়ত্তে আনা মহাজাগতিক গণিতসূত্রকে নিপুণ ও নিখুঁত কাজে লাগিয়ে। তার সমস্ত সত্ত্বা জানান দিল তাকে সে অসফল নয়। এই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলা শুভ ইচ্ছার তরঙ্গ ভবিষ্যতে ঘটতে চলা অনভিপ্রেত ঘটনার বিরুদ্ধ তরঙ্গকে প্রতিহত করার জন্যে তৈরি। এক অদ্ভুত ভালোলাগার আবেশ তার চৈতন্যকে গ্রাস করে নিল আজ। আর এতদিন পরে নিজের রেখে আসা সেই স্থূল, জড়শরীরটার জন্যে মন কেমন করে উঠল নিবারণের।
ল্যাবরেটরির মধ্যে ঢুকে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল পরমেশ। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল চারপাশ। হাত থেকে ঘড়িটা খুব সন্তর্পণে বাবার টেবিলের ওপরে রেখে দিল। এই টেবিলের ওপরে ঝুঁকে পড়ে অনেক রাত্তির অবধি তিনি পড়াশোনা করতেন। পরমেশ ছোটবেলায় ঘুমচোখে সেই দৃশ্য দেখেছে কয়েকবার। কিন্তু নিবারণের সেই ছবিটা তার আজও মনে আছে। টেবিলের উল্টোদিকে রাখা চেয়ারটায় বসে পড়ল সে। এই চেয়ারটায় বাবা বসতেন। এখানে বসলেই তার মনে হয় বাবা যেন কোল পেতে দিলেন তার জন্যে। মনে হয় এই চেয়ারে মানুষটার গায়ের ছোঁয়া মিশে আছে প্রকটভাবে।
আজও প্রথমটা তেমনই মনে হল পরমেশের। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত কাটতেই অনুভূতিটা আজ কেমন যেন পালটে যেতে লাগল। পরমেশের মনে হল এই ঘরের বাতাসটা হঠাৎ করেই কেমন যেন বদলে গেল।
ঘরের মধ্যে মৃদু একটা বাতাস বইছে মনে হচ্ছে। অথচ বাইরে গাছের পাতারা স্থির। তারপরেই মনে হল খুব মৃদু একটা শব্দের স্রোত যেন তার দুই কান দিয়ে মাথার মধ্যে ঢুকে গেল। মাথার মধ্যেটা ফাঁকা হয়ে গেল ক্রমশ। যেন অনেক দিনের বয়ে বেড়ানো বোঝা মাথার মধ্যে থেকে দ্রুত খসে পড়ে যাচ্ছে বাইরের পৃথিবীতে।
নিজেকে বড় ভারমুক্ত মনে হল পরমেশের। বেশ একটা চনমনে ভাব এল শরীরের মধ্যে। রক্তে অনেক কাজ করার উদ্যম। আর ঠিক তখনি কি এক অদ্ভুত ম্যাজিকে তার সামনের টেবিলের ওপরে রাখা বাবার মৃত হাতঘড়িটা মিহি টিকটিক শব্দে বেঁচে উঠল আবার।
সেই অতি ক্ষীণ শব্দটা শুনতে পরমেশের কোনো অসুবিধাই হল না। কৌতূহলী হয়ে ঘড়িটা হাতে তুলে নিল পরমেশ। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ঘড়িটার সাদা ডায়ালের দিকে। আর তখনই ব্যাপারটা চোখে পড়ল তার। সেকেন্ডের কাঁটাটা দুলছে। কিন্তু নড়ছে না জায়গা থেকে। বাকি দুটো কাঁটার একটাকে দেখা যাচ্ছে না আর। অন্য কাঁটাটা ঠিক বারোটার ঘরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মতন ঘড়িটা হাতে তুলে নিল পরমেশ। দম দেবার জন্যে চাবিটা ঘোরাতে যেতেই বুঝল সেখানেও কী একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে। চাবি দিতে গিয়ে ঘড়ির কাঁটাটা সরে গেল পিছন দিকে। প্রায় ছটার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে কাঁটাটা। সেকেন্ডের কাঁটাটা অস্বাভাবিকভাবে দুলছে এখন। ঘড়িটা হাতে পরে নিল পরমেশ। একবার যখন চালু হয়েছে, হারান মুৎসুদ্দি নিশ্চিত একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবে ঘড়িটার। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল পরমেশ। আর দাঁড়িয়েই অবাক হয়ে গেল।
ঘরটা কী এক ভেল্কিতে যেন পালটে গেছে এক্কেবারে। টেবিলের ওপরে কাগজপত্র ছড়িয়ে রয়েছে। কে যেন একটু আগে পর্যন্ত কাজ করেছেন এই টেবিলে বসে। ঘরের প্রতিটা কোণ কেমন যেন আবছা স্মৃতি থেকে উঠে আসছে মনে হচ্ছে তার। বিহবল পরমেশ উঠে দাঁড়াল। চিৎকার করে ডাকতে লাগল নিকুঞ্জকে। কিন্তু কী আশ্চর্য, তার গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হল না।
পরমেশ ভয় পেয়ে গেল। হঠাৎ কী হয়ে গেল তার? শরীরটাও কেন যেন অসম্ভব হাল্কা লাগছে। মনে হচ্ছে সারা শরীরটাই হালকা তুলো দিয়ে তৈরি। এক্ষুনি যেন বাতাসের সঙ্গে উড়ে যাবে সে। দ্রুত ঘরের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল পরমেশ। টানা বারান্দা দিয়ে হেঁটে এসে শোবার ঘরের জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে উঁকি মেরেই থতমত খেয়ে গেল সে। বিছানার ওপরে আড় হয়ে চুল খুলে দিয়ে বই হাতে ও কে শুয়ে আছে...মঙ্গলা তো কোনোমতেই নয়। কিন্তু যাকে দেখছে তা কী করে সম্ভব? গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল পরমেশের। ভয় নয়, রোমাঞ্চে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার। চরম উত্তেজনায় চিৎকার করে ডেকে উঠল সে মা, মা গো—'
মা সাড়া দিলেন না। ঘুরলেনই না তার দিকে। পরমেশ পাগলের মতন নিকুঞ্জ আর মঙ্গলাকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেল না সে। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতেই মনে মনে ভয়ানক চমকে গেল পরমেশ। উঠোনের দু-পাশের কামিনি ফুলের গাছদুটো কী করে মাটি ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল আবার?
অন্তত বছর দশেক আগে সাপের উৎপাতে গাছদুটো কেটে সাফ করে ফেলা হয়েছিল এখান থেকে। পিছনে তাকিয়ে পুরো বাড়িটা দেখেই অবাক হয়ে গেল সে। মনে হল তার ছেলেবেলা যেন নতুন করে ফিরে এসেছে আবার। সেই রকমই ছবি। ঘাসে ঢাকা উঠোন। দু-পাশে ঝাঁকড়া কামিনি আর কলকে ফুলের গাছ। উঠোন পেরিয়ে ইটের গোল ঘোরানো সিঁড়ি। তারপর বারান্দা। বারান্দার একপাশে কাঠ আর খড় রাখার ঘর। নিয়মিত কার্বলিক অ্যাসিড ছড়ানো হত ওখানে। কিন্তু ওই ঘর এত বছর পরে আবার কী করে ফিরে এল?
আজ ল্যাবরেটরি ঘরে ঢোকার পর থেকে কী যে ঘটে যাচ্ছে কিছুই মাথায় ঢুকছে না পরমেশের। আনমনে সে উঠোন মাড়িয়ে রাস্তায় পা দিল। বাড়ির সামনে দিয়ে যে রাস্তাটা সোজা স্কুলের দিকে গেছে, সেটা পিচ হয়ে গেছে অনেকদিন, অথচ আজ পরমেশ দেখল রাস্তাটা মোরাম বিছনো। রাস্তার পাশের নতুন গজিয়ে ওঠা ঘর বাড়ি দোকান পাঠও কী এক ভোজবাজিতে এক্কেবারে উধাও। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক পুরনো মানুষ জনের সঙ্গে দেখা হল যাদের সঙ্গে কোনোভাবেই আর দেখা হওয়া সম্ভব নয়। পরমেশ কিছুতেই তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারল না। তাকে যেন কেউ দেখতেই পাচ্ছে না। পরমেশের অস্তিত্ব কিছুতেই ধরা পড়ছে না তাদের কাছে।
একটা অদ্ভুত সম্ভাবনার কথা হঠাৎ করেই মাথায় চলে এল তার। মনে মনে খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ল পরমেশ। যতটা দ্রুত সম্ভব সে স্কুলে গিয়ে হাজির হল। গেট বন্ধ। অথচ দিব্যি পরমেশ ভেতরে ঢুকে পড়তে পারল। তার শরীর কোথাও বাধা পেল না একটুও।
স্কুলের বারান্দার ও পাশে সারি সারি ক্লাস রুম। ক্লাস চলছে। মাস্টারমশাইরা পড়াচ্ছেন। সব স্যারকে চিনতে পারল না পরমেশ। কিন্তু বাবাকে দেখতে পেল না সে ক্লাসের মধ্যে। গুটি গুটি পায়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেল পরমেশ। দোতলার বারান্দা দিয়ে একটু দূরেই বয়ে যাওয়া নদীটা দেখা যাচ্ছে।
স্কুল আর নদীর ব্যবধান খুব বেশি নয়। মাঝে ছোট্ট মাঠ একটা। মাঠে নানান সব গাছ। তাদের বেশিরভাগই অনেক পুরনো গাছ। ইয়া মোটা মোটা গুঁড়ি তাদের।
পরমেশ জানে এখন নদী স্কুলের আরো কাছে এগিয়ে এসেছে। মাঠের সেই বড় বড় গাছগুলো স্থানীয় ছেলেরা কেটে ফেলে ক্লাব ঘরের দরজা জানালা চেয়ার বেঞ্চি বানিয়ে নিয়েছে।
দোতলার এক প্রান্তে মাস্টারমশাইদের বসার ঘরে পরমেশ দেখতে পেল তাঁকে। গম্ভীর মুখে বসে একটা বই পড়ছিলেন তন্ময় হয়ে। আগের হেড মাস্টারমশাই শশীবাবু এসে বললেন, 'বাবা নিবারণ, ক্লাস আছে যে তোমার...'
'ও তাই, সরি স্যার, খেয়ালই ছিল না' অপ্রস্তুত লাজুক গলায় বলে উঠেই হন্তদন্ত হয়ে ক্লাসের দিকে পা বাড়ালেন নিবারণ...
পরমেশ একরাশ আবেগ নিয়ে ছুটতে ছুটতে তাঁর কাছে গিয়ে বাবা বাবা বলে ডাকতে লাগল বার বার, কিন্তু নিবারণ তার ডাক শুনতে পেলেন না। তাকে দেখতে পেয়েছেন বলেও মনে হল না আদৌ।
মারাত্মক একটা অস্বস্তি নিয়ে ঘরে ফিরে এল পরমেশ। মনটা ভয়ানক উচাটন হচ্ছে তার। কেন এমন ঘটছে আজ বার বার। সামনের রাস্তা দিয়ে গরুর গাড়ি ধান বোঝাই করে নিয়ে ফিরছিল। পুকুর পাড়ে হেলতে দুলতে আর প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ করতে করতে একপাল পাতিহাঁস জলে নেমে গেল। সেইসময়েই পরমেশের খেয়াল হল ব্যাপারটা। হাত থেকে নিবারণের ঘড়িটা খুলে চাবি ঘুরিয়ে ঘড়ির কাঁটাটা আবার আগের জায়গায় নিয়ে এল সে। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের দৃশ্যপট পালটে গিয়ে আগের অবস্থা ফিরে এল। সেই চেনা ঘর, চেনা বাড়ি, চেনা রাস্তা আর বিজলি আলো।
পরমেশের ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসির ঝিলিক দেখা গেল। আর তখনই মনে পড়ল তার স্কুলের টিচার্স রুমে টাঙানো ক্যালেন্ডারটার কথা। তখন খেয়াল করেনি, কিন্তু এখন স্পষ্ট বুঝতে পারল পরমেশ ব্যাপারটা। ক্যালেন্ডারটা প্রায় তিরিশ বছর আগের, এটা তখনই খেয়াল করা উচিত ছিল তার, পরমেশ ভাবতে লাগল, মাথাটা আর একটু খেলানো দরকার এবার। মনে হচ্ছে মাথা ঘামানোর সময়টা এবার সত্যিই কাছে চলে এসেছে। তার এতদিনের অপেক্ষার অজানা কারণ নিশ্চিত এবারে স্বচ্ছ হবে তার চোখে, তার মনে।
বাইরে রাত নেমেছে। নিকুঞ্জ ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। নিজের ঘরের বিছানায় ঘড়িটা হাতে নিয়ে বসে ছিল পরমেশ। উত্তেজনায় হার্টবিট বেড়ে রয়েছে তার বিকেল থেকেই। ঘড়িটা যে-সে ঘড়ি নয় মোটেই। এই ঘড়িটা আসলে সময়কে অতিক্রম করার যন্ত্রবিশেষ। বর্তমানের একটি বিশেষ বিন্দু থেকে অতীতের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু এবং ভবিষ্যতের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে এই যন্ত্রটি।
পরমেশ হিসেব করে দেখছিল বারোটার ঘরে কাঁটা এই সময়কে প্রতিনিধিত্ব করছে। চাবি দিয়ে যখন কাঁটা ঘুরিয়েছিল সে, সময় পিছিয়ে গিয়েছিল এক নিমেষে। কতটা পিছিয়েছিল? কতটা সময়ের মধ্যে ঘোরা যায় এই যন্ত্রের সাহায্যে। হঠাৎ-ই স্কুলে টিচার্স রুমের দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটার কথা মনে এল পরমেশের। তিরিশ বছর আগের ক্যালেন্ডার মানে ঘড়ির প্রতিটি ঘর পাঁচ বছর করে সময় ধরে রেখেছে। অর্থাৎ কাঁটা সামনের দিকে ঘুরিয়ে আগামী তিরিশ বছরে কী ঘটতে চলেছে তা দেখে নিতে পারে পরমেশ।
তাহলে যে বিপদের কথা বাবা তাঁর ডাইরিতে লিখে গেছেন আর বলে গেছেন সেই বিপদে নিজের সর্বস্ব দিয়ে যেন মোকাবিলার জন্যে দাঁড়ায় পরমেশ, একটুও কার্পণ্য না করে ধ্বংসের হাত থেকে তাঁর প্রিয় বস্তু বাঁচাতে, সেই ভয়ংকর ঘটনা আগামী তিরিশ বছরের মধ্যেই ঘটতে চলেছে?
বাবার সেই প্রিয় বস্তু কী? মা বাবার খুবই প্রিয় ছিলেন কিন্তু তিনি আর নেই। পরমেশকেও নিবারণ খুবই ভালোবাসতেন। তাহলে কি তারই কোনো বিপদ আসতে চলেছে? উঁহু। নিজের চিন্তাটাকে নিজেই খারিজ করে দিল পরমেশ। তারই যদি বিপদ হত তাহলে বাবা সেই বিপদে পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিতে যাবেন কেন তাকে? ভাবতে থাকে পরমেশ। আরো গভীরভাবে ভাবতে থাকে। আর তখনই আচম্বিতে উত্তরটা এসে ধাক্কা মারে মাথার মধ্যে।
নিজের বোকামিতে নিজেই ভারি লজ্জা পেয়ে যায় পরমেশ। ছি-ছি, এই কথাটা অনেক আগেই বোঝা উচিত ছিল তার। চিরকাল বাবার প্রথম ভালোবাসা ছিল তাঁর স্কুল। স্কুলকে নিজের প্রথম সন্তান হিসেবেই দেখতেন তিনি। আর সংশয় নেই। স্কুলের কোনো বিপদের কথাই বলতে চেয়েছেন বাবা।
উত্তেজনায় পরমেশের শরীর ঘেমে ওঠে। ঘড়িটা কব্জিতে গলিয়ে সেই রাতেই কাউকে কিছু না জানিয়ে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরোয় পরমেশ। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে সোজা হাঁটতে থাকে স্কুলের দিকে।
স্কুলের বন্ধ গেটের সামনে এসে থামে পরমেশ। চাঁদের আলোর স্নিগ্ধ আভা এসে পড়েছে স্কুলের বন্ধ দরজার ওপরে। একটু তফাতেই আপন মনে কুল কুল করে গান গাইতে গাইতে একা একা বয়ে যাচ্ছে জলে ভরা নদীটা।
পরমেশ তাকিয়ে দেখছিল নদীটাকে। আগের চেয়ে চওড়া হয়ে গেছে কি নদীটা? নদীর পাড়ে ভাঙ্গনের চিহ্ন। গাছপালা কমে গেছে ভীষণভাবে।
কব্জিতে আটকানো ঘড়িটার বেল্ট আলগা করে ধীরে ধীরে খুব সন্তর্পণে কাঁটাটাকে সামনের দিকে এগোতে শুরু করে পরমেশ। যতই এগোয়, দেখে গ্রামটা ধূসর হয়ে যাচ্ছে। গাছ নেই, পাখি নেই, শুধু কংক্রিটের আগ্রাসন। রোদ্দুর ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে যাচ্ছে। জ্যোৎস্না কমনীয় নয়। মানুষের চোখে-মুখে কেমন যেন অনাত্মীয় লোভ।
বুকের মধ্যে ভয়ানক কষ্ট হতে শুরু করে পরমেশের। বুকের সেই চাপ চাপ কষ্ট নিয়েই ঘড়ির কাঁটা আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করে সে। অনাগত সময় একলাফে সামনে চলে আসে তার। আর সেই অনাগত সময়ের ছবি দেখে শিউরে ওঠে পরমেশ। গ্রাম জুড়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছে লোভী স্বার্থপর মানুষের প্ররোচনায়। সাদায়-কালোয় যুদ্ধ, জাতে-অজাতে, সত্যে-মিথ্যেয়, ছুতোয় নাতায় লড়াই করে মানুষ মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলছে ক্রমাগত আর একসময়ের আপাত শান্ত নদীটা এইসব দেখে ভীষণ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে, ফুলতে ফুলতে গ্রাস করে নিচ্ছে স্কুল বাড়ি।
নদীর ভাঙনে ওই যে হেলে পড়ছে, আলগা হয়ে ধসে পড়ছে স্কুল ভবনের পুরনো ভিত আর শিশু কান্নায় ভরে যাচ্ছে সমস্ত আকাশ। পরমেশ সেই কান্নার শব্দ সইতে না পেরে দু-হাতে নিজের দু-কান চেপে ধরে। তড়িঘড়ি হাত থেকে সেই ঘড়ি খুলে দ্রুত কাঁটা ঘুরিয়ে দেয় পিছন দিকে। যত শিগগিরি সম্ভব বর্তমানে ফেরা দরকার তার। সামনে সময় বেশি নেই। অথচ মেলা কাজ তার।
গ্রামের সমস্ত মানুষকে ছুটে হেঁটে দরকার পড়লে হাতে-পায়ে ধরে বোঝাতে হবে আমাদের একটা পরিচয়ই যথেষ্ট। আমরা মানুষ। শুধুই মানুষ। পরস্পর পরস্পরের সহায় আমরা। পুরো গ্রামটাকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলতে হবে যে করেই হোক। সেই সুতো ভালোবাসা আর সৌভ্রাতৃত্বের। পাশাপাশি আরো সবুজ করে তুলতে হবে এই গ্রাম। নদীর পাড় বাঁধাতে হবে পাথর দিয়ে। প্রয়োজনে আগে ভাগেই নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে স্কুলভবন।
'কিন্তু তাতে যে খরচও আছে বিস্তর', চেনা গলার আওয়াজটা পেয়েই চমকে পিছন ফেরে পরমেশ। নিবারণ তার দিকে চেয়ে মিটমিট করে হাসছিলেন। মায়াবী জ্যোৎস্নার আলোয় অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল তাঁকে। পরমেশ এগিয়ে এল তাঁর সামনে। ঘড়িটার দিকে তাকাল। তারপর বলে উঠল, 'তুমি আমায় দেখতে পাচ্ছ বাবা?'
'পাচ্ছি। দেখছি কত বড় হয়ে গেছ তুমি।'
'এখন আমি সময়ের কোন বিন্দুতে আছি বাবা? অতীতে না ভবিষ্যতে?' বলতে বলতেই এগিয়ে এসে দু-হাত দিয়ে নিবারণকে ছুঁয়ে দেখে পরমেশ। অনুভব করে বাবাকে সে দিব্যি ছুঁতে পারছে আবার। তার বিহবল চোখের ওপরে চোখ রেখে স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে দিয়ে নিবারণ বলেন, 'তুমি বর্তমানেই দাঁড়িয়ে আছ পরমেশ। আমি ফিরে এসেছি।'
'তুমি কি সত্যিই আমার সঙ্গে থাকবে এরপর থেকে?'
'নিশ্চয়ই'।
'আবার চলে যাবে না তো?'
'কক্ষনো না।'
'এইমাত্র যা দেখলাম আমি তা কি সত্যি?'
'কী দেখেছ তুমি পরমেশ?'
'এই গ্রামের বিনাশ। এই স্কুলের অবলুপ্তি। শিশুমৃত্যু।'
'সব সত্যি। আবার সমস্তটাই মিথ্যে।'
'বুঝতে পারলাম না বাবা।'
'দেখো পরমেশ,' নিবারণ বলতে থাকেন, 'কাল তার মতন করে ঘটনাক্রম সাজিয়ে রাখে। যা ঘটার তা ঘটবেই ধরে নিয়ে বসে থাকলে তার ওপরে আর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কিন্তু মানুষ ইচ্ছে করলে সেই ঘটনার গতিপথটাকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।'
'পারে?'
'পারে, যদি সত্যি-সত্যিই তার ভালো কিছু করার ইচ্ছে আর জেদ থাকে। মেকি উপকার করার গর্ব দিয়ে ভবিতব্যকে পালটে ফেলা মোটেও সহজ কাজ নয়। তোমার কি নিজের ওপরে বিশ্বাস আছে পরমেশ যে প্রয়োজনে বৃহত্তর স্বার্থে নিজের প্রাণ পর্যন্ত তুচ্ছজ্ঞান করার?'
'আছে।'
'তাহলে তোমার ইচ্ছেশক্তি দিয়ে যা ঘটতে চলেছে তার অভিমুখ পালটে দাও পরমেশ। মনে রেখো তুমি একা নও। আমিও তোমার সঙ্গে আছি।'
'তুমি সঙ্গে থাকলে আমি সব করতে পারি।'
'নিজের যা কিছু আছে সর্বস্ব পণ করতে পারবে অন্যের জন্যে?'
'পারব', বলে হেসে ওঠে পরমেশ, 'নিজের কথা ভাবিনি তো আজ পর্যন্ত। এই দিনটার কথা ভেবে প্রাণপনে নিজেকে তৈরি করে গেছি শুধু এতদিন।'
'জানি। সব জানি। আগামী সম্পর্কে বড় চিন্তা ছিল আমার পরমেশ। এখন আমি চিন্তামুক্ত। সময়ের স্রোতে নিজেকে লুকিয়ে রেখে আমিই তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম পরখ করে দেখব বলে। এটা আমার একটা পরীক্ষাই বলতে পারো। বলতে ভালো লাগছে, এই পরীক্ষায় তুমি পাশ করে গেছ। তোমার এই ভবিষ্যচিত্র আমাকে নিশ্চিন্ত করল। চলো এবার আমরা ফিরে যাই।'
'কোথায় বাবা?'
'যে বিন্দুটি থেকে শুরু করেছিলাম আমরা সেইখানে। স্থির সময় থেকে চলমান সময়ের প্রবাহে ফিরে যাই চলো পরমেশ।'
পরমেশের যখন ঘুম ভাঙল বাইরে ঝকমক করছে সকালবেলার রোদ্দুর। মা এসে বলল, 'একী রে, এত বেলা অব্দি কেউ ঘুমিয়ে থাকে? পড়াশুনো কিছু নেই নাকি?' চোখ কচলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে পরমেশ। বাবার ল্যাবরেটরির দিকে হাঁটতে থাকে সে। একটা কী অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিল সে রাতভোর। ঠিক মনে পড়ছে না কী দেখেছিল। কিছু ছেঁড়া ছেঁড়া ছবি শুধু মনে ভাসছে।
পরমেশের মনে হচ্ছিল বাবার সঙ্গে কথা বলাটা খুব জরুরি। ল্যাবরেটরির দরজা ভেজানো ছিল। হাত দিয়ে আলতো ঠেলা দিতেই দরজা খুলে গেল হাট হয়ে। নিবারণ টেবিলের ওপরে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিলেন। চোখে-মুখে ঝরে পড়ছে অপার প্রশান্তি।
পরমেশ তাঁকে ডাকতে যেতেই বিমলদাদু পিছন থেকে তার পিঠের ওপরে হাত রাখলেন। পরমেশ তাঁর দিকে ঘুরতেই নীচু গলায় বলে উঠলেন তিনি, 'ডেকো না বাবাকে। ওকে ঘুমোতে দাও। কাজ পাগল মানুষ। সারা রাত জেগেই ছিল হয়তো। কিছুক্ষণ নিশ্চিন্তে ঘুমোতে দাও ওকে। মনে রেখো গাঢ় ঘুমটাও কখনও কখনও ভীষণই জরুরি।'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন