জয়দীপ চক্রবর্তী

জগাছায় যদু জাদুকরের নাম শোনেননি, এমন মানুষ নেই বললেই চলে। কিন্তু তাঁকে দেখেছেন এমন কেউই প্রায় বেঁচে নেই এখন। যদু জাদুকর দেহ রেখেছেন তা প্রায় চল্লিশ বছর। তাঁর ছেলে হারুন তখন বছর পঁয়ত্রিশ। তা হারুনও জগাছা ছেড়েছে প্রায় পঁচিশ-পঁচিশটা বছর পেরিয়ে গেল। এখনকার ছেলে-ছোকরারা তাকে চেনেই না বলতে গেলে। এক তাঁকে চেনার মতন মানুষ এই গাঁয়ে হরিশংকর মুখুজ্জে।
একসময় তিনি হারুনের সঙ্গে একক্লাসে পড়াশুনো করতেন। খুব হলায়-গলায় বন্ধুত্ব ছিল তাঁদের সেই সময়ে। যদু জাদুকর মারা যাবার সময় দুজনে একসঙ্গে কাঁধ দিয়েছিলেন শ্মশানযাত্রায়।
যদু তালুকদারের অন্দরমহলের হালহকিকত হরিশংকরের চেয়ে বেশি এই গ্রামে কেউ জানে না। তা তিনিই বলেন মাঝেমধ্যেই,'ওই যদু জাদুকরের বাড়ির খানিক তফাতে যে উঁচু মতন ঢিবিটা, ওটা নাকি খুবই রহস্যজনক। এই ঢিবি নাকি যদু জাদুকরের সাধনার ঢিবি। অনেক জাদু মন্ত্র দিয়ে গড়া এই জায়গা। এ জায়গার অনেক অলৌকিক ক্ষমতা।'
সেই কথা এ-মুখ ও-মুখ ঘুরতে ঘুরতে আরো পল্লবিত হয়েছে কালে কালে। কেউ বলে ওটা ভূতুড়ে ঢিবি, কেউ বলে জাদুর নানান গোপন কলকব্জা, যন্ত্রপাতি লুকোনো আছে ওখানে, কেউ আবার বলে দেশ-বিদেশ ঘুরে খেলা দেখিয়ে যে বিস্তর টাকা জমিয়েছিলেন যদু জাদুকর তাই নাকি ওই ঢিবির আড়ালে লুকিয়ে রাখা আছে কোথাও।
গুপ্তধনের ব্যাপারে হরিশংকর অবশ্য কোনোদিন মুখ খোলেননি, শুধু বলেছেন, 'থাকলে থাকতেই পারে। আর যদি থাকেও ও নিয়ে আমার তো মাথা ঘামানোর কথা নয়। হারুন একদিন এই গ্রামে ফিরে আসবেই। আমায় সে কথা দিয়েছে। ফিরে এসে তার নিজের জিনিস যা বিলিবন্দোবস্ত করার সে নিজেই করবে।'
ঢিবিটা অদ্ভুত। একটা প্রায় আয়তাকার হাত চারেক উঁচু জমি। চওড়ায় ফুট চারেক। ওপরটা চ্যাটালো। পুরো ঢিবিটাই ঘাস জঙ্গলে ছাওয়া। তবে কোনো বড় গাছ ঢিবিটায় কেন কে জানে গজায়নি আজ পর্যন্ত।
মাঝে মধ্যে গরু ছাগল চরা খেতে খেতে ঢিবির মাথায় উঠে ঘাস খেত। একবার গোপাল মণ্ডলের গাই গরুটাকে ঢিবির ওপরে সাপে কামড়ানোর পর থেকে সকলে সতর্ক হয়ে গেছে। ওদিকে গরু ছাগল ভিড়তে দেয় না। মানুষ ওঠার তো প্রশ্নই নেই।
ঢিবি থেকে হাত বিশেক দূরে যদু জাদুকরের কালী মন্দির এখন পোড়ো পরিত্যক্ত পড়ে আছে। মূর্তিটা ভয়ঙ্কর। তাকালেই গা ছমছম করে ওঠে।
একসময় যদু তালুকদার তন্ত্র সাধনা করতেন ওই মন্দিরে। পশুরক্ত দিয়ে মায়ের পুজো হত প্রতি অমাবস্যায়। কেউ কেউ বলে মা নাকি নররক্তও পেয়েছেন এই মন্দিরে। তবে সে কথার প্রমাণ-টমান কেউই দিতে পারেননি কোনোদিন।
এখন রক্ত দিয়ে পুজো করার সাহস ও সামর্থ গ্রামবাসীর নেই। তাছাড়া এই হ্যাপা নেবে কে! পুজোয় না জেনে ত্রুটি হলেও ক্ষমা নেই। দৈবী আঘাত বড় সাংঘাতিক। কাজেই ভুলেও ও ধার মাড়ায় না কেউ।
ব্রজ বোষ্টম একটু খ্যাপাটে মানুষ। এ-গ্রাম ও-গ্রাম হরিসংকীর্তন করে রাত-বিরেতে বাড়ি ফেরে সে। তার মুখে শোনা যায়, ওই মন্দির আর ঢিবির আশেপাশে প্রায়ই একাধিক অশরীরীকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে সে। এলাকার কিছু অবিশ্বাসী ছেলে ছোকরা তাকে জিগ্যেস করেছিল, সেইসব প্রেতাত্মাদের ঠিক কেমন দেখতে।
ব্রজ অবশ্য সে কথার একেবারে ঠিকঠাক জবাব দিতে পারেনি। সাঁঝে বা মাঝরাতে যাদের সে দেখেছে তাদের চেহারা ছায়া ছায়া, মুখ-চোখ অন্ধকারে দেখা যায় না। কারো ঢোলা জোব্বার মতন পোশাক তো কেউ নিকষ অন্ধকারে মোড়া। তবে দেখতে তাদের যেমনই হোক না, তারা যে এ জগতের মানুষজন নয় সে বিষয়ে ব্রজর মনে বিন্দুমাত্রও সংশয় নেই। তার ধারণা ইদানীং অতৃপ্ত আত্মাদের আনাগোনা সেখেনে আরো বেড়েছে। কাজেই ব্রজ পৈত্রিক প্রাণটার নিরাপত্তাজনিত কারণে ওই পথ পরিত্যাগ করেছে মাস তিনেক হয়ে গেল। সে এখন ঘুরপথে জটাশংকরের দেউল হয়ে গ্রামে ঢোকে। যদু জাদুকরের ঢিবি বা মন্দিরের আশেপাশে সে আর ঘেঁষে না।
ইশকুলে পড়ার সময় থেকেই হারুনের বাবার পেশার প্রতি আকর্ষণ ছিল একটা। টুকটাক হাত সাফাই-এর খেলাও সে দেখাতে পারত সেই সময় থেকেই। আর একটু বড় হবার পরে সে বাবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলা দেখাতে শুরু করে দূরের শো গুলোয়।
কিন্তু বাবা মারা যাবার পরে সে কেমন যেন হয়ে গেল। খ্যাপাটে, উদাসীন। সম্পূর্ণ নিরামিষ খাওয়া শুরু করেছিল। অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলত। যেদিন সে নিরুদ্দেশ হল তার দিন পাঁচেক আগে হরিশংকরকে জানিয়েছিল সে, 'হরি, আমি চলে যাব।'
'সে কী, কোথায়?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিলেন হরিশংকর।
'কোথায় জানি না। কিন্তু যেতে আমায় হবেই।'
'কেন?'
'একটা জিনিস জানতে চাইছি। ব্যাপারটা না জেনে শুতে খেতে ঘুমুতে পারছি না।'
'কী এমন জিনিস?'
'নিজেকে। আমার এই খোলটার ভেতরে যে আছে তাকে না জানা অব্দি বিরাম পাচ্ছি না রে হরি। কে যেন মনে মনে তাড়া করে বেড়াচ্ছে আমায় সর্বক্ষণ।'
'তোর মাথাটা গেছে হারুন', হাত নেড়ে বলেছিলেন হরিশংকর, 'জেঠুর দুম করে চলে যাওয়াটা আসলে এখনও মেনে নিতে পারছিস না তুই মনে মনে।'
'এ জগতে কেউই একেবারে চলে যায় না রে হরি। থেকে যায় সব। সব্বাই। অন্যভাবে। বাবাও আছেন। আমি জানি। তাই তাঁর জন্যে আমার শোক নেই।' হারুন হাসে। অদ্ভুত সেই হাসি। হরিশংকরের গায়ে কাঁটা দেয়। এখনও গা শিরশির করে ওঠে সেকথা মনে পড়লে।
হারুন আবার বলে, 'আমি চলে যাব। তুই আমার কথা মনে রাখিস। আমি ফিরব আবার। এই গাঁয়ে। আমার জন্যে অপেক্ষা করিস হরি।'
'কদিন পরে ফিরবি?'
'তা বলতে পারি না। তবে ফিরব।'
'যদি অনেক দেরি করে ফিরিস...'
'দেরি,' উদাস গলায় বলে হারুন, 'তা দেরি হতেও পারে...'
'তবু কত দেরি?'
'তা কী বলা যায়!' হারুন হাসে, 'দশ বিশ বছরও হতে পারে, কিংবা আরো বেশি।'
'তদ্দিন আমি যদি বেঁচে না থাকি?'
'থাকবি, থাকবি। চিন্তা নেই। তোর আয়ু লম্বা। আমারই মতন। বেঁচে তোকে থাকতেই হবে। না হলে ফিরে এসে যাদুর যে সেরা খেলাটা দেখাতে চাইছি তা যে তোর আর দেখা হবে না।' বলে দু-হাত দিয়ে হরিশংকরকে জড়িয়ে ধরে হারুন।
সেই শেষ দেখা। তারপর পঁচিশ বচ্ছর চলে গেল গায়ের ওপর দিয়ে। আর ফিরল না সে। হরিশংকর সত্যি মরেননি। এই গাঁ ছেড়ে চলে যেতেও পারেননি অন্য অনেকের মতন। তাঁকে যে হারুন অপেক্ষা করতে বলে গিয়েছিল।
এখন একা ঘরে বসে থাকলে হারুনের সেই জিজ্ঞাসাটা তাঁকেও যেন ঘিরে ধরে, কে আমি? কোথা থেকে এলাম। যাবই বা কোথায়? মাথা ঝিমঝিম করে ভাবতে ভাবতে, অথচ উত্তর মেলে না। হারুন কি এ প্রশ্নের উত্তর জানতে পারল? সত্যিই কি জানা যায় এ প্রশ্নের উত্তর?
বাড়ি থেকে এতদূরে এসে চাকরি করতে হবে কখনও ভাবেনি সুসময়। কলেজে পড়ার সময় থেকেই তার ইচ্ছে ছিল স্কুলে পড়ানো। অন্য চাকরি তার ভালো লাগে না। মনে মনে সে নিশ্চিতও ছিল একরকম যে কলকাতার মধ্যে না হলেও আশেপাশে একটা কিছু ঠিকই জুটে যাবে। কেননা স্কুলের সংখ্যা তো অল্প নয়। কিন্তু বিধি বাম। স্কুল সার্ভিস পরীক্ষায় যে র্যাঙ্ক হল তাতে কাছাকাছি স্কুলে চাকরি পাওয়া আর হল না তার। কাউন্সেলিং এর সময় তার মুখের ওপর দিয়ে অন্যেরা কাছের স্কুলগুলোয় অপশন দিয়ে দিল। তার যখন ডাক পড়ল তখন যে স্কুলগুলো পড়েছিল সেগুলো সম্পর্কে প্রায় কিছুই ধারনা ছিল না তার। বলতে গেলে মনে মনে একরকম লটারি করেই জগাছা উপেন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয় নামের স্কুলটা বেছে নিয়েছিল সে।
জগাছা নামটা শোনা ঠেকেছিল একবার। কিন্তু জায়গাটা কোথায় ধারণা ছিল না। বাড়ি এসে পুরো ব্যাপারটা বলতেই বাবা বেঁকে বসেছিলেন একেবারে। গম্ভীর মুখ করে বলেছিলেন, 'তোমার তো আর যাকে বলে একেবারে হ্যান্ড টু মাউথ অবস্থা নয়। এখনও বেশ কবছর চাকরি আছে আমার। এরমধ্যে পড়াশোনাটা আরো বাড়িয়ে নাও। অন্য চাকরির চেষ্টা করো। না পোষালে পরের বারেই নাহয় আরো ভালো প্রিপারেশন নিয়ে স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বোসো। পরীক্ষাটা তো আর উঠে যাচ্ছে না দুম করে।'
বাবার মুখের ওপরে কথা বলেনি সুসময়। পরে মা-কে বুঝিয়েছিল, 'এই বাজারে চাকরিবাকরি পাওয়া মুখের কথা নয়। কম্পিটিশন দিন কে দিন আকাশ ছোঁয়া হচ্ছে। হাতের লক্ষ্মী এ ভাবে পায়ে ঠেললে পরে পস্তাতে হতে পারে।'
'তাই বলে এতদূরে? বাড়ি ঘর ছেড়ে কোথাকার কোন ধ্যাড়ধেড়ে জগাছায় পড়ে থাকবি তুই একলা একলা?' মা-ও বাবার সুরে সুর মিলিয়েছিলেন। সুসময় বোঝানোর চেষ্টা করেছিল তাঁকে, 'কী এমন দূর? রাজ্যের বাইরে তো নয়? একটু এক্সট্রিম দক্ষিণে এই যা। চাকরি বাকরির জন্যে ছেলেমেয়েরা আরো কতদূরে পাড়ি দিচ্ছে আজকাল। ভিন রাজ্যে তো বটেই, এমনকী ভিন দেশে পর্যন্ত চলে যাচ্ছে তারা।'
'তুই একা থাকতে পারবি?' মা সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।
'না পারলে চলে আসব,' মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল সুসময়, 'চাকরি ছাড়তে কতক্ষণ মা? তাছাড়া এখন তো জেনারেল ট্রান্সফারের সুযোগ আছে টিচারদের। কবছর বাদে ঠিক এদিকে কোথাও চলে আসব দেখো না।'
'কবছর?' চোখ গোল করে মা বলেছিলেন, 'আমি শিওর ক-মাসও টিকতে পারবি না তুই ওখানে।'
'দেখা যাক,' হেসেছিল সুসময়।
ভয় একটা সুসময়ের নিজের মনের মধ্যেও যে ছিল না তা নয়। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ। কেমন লাগবে কে জানে! তবু চাকরিটা ছেড়ে দেবার ঝুঁকি নেবার মনের জোর সে জোগাড় করতে পারেনি। তবে স্কুলের নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে প্রথম যেদিন দেখা করতে এল সে জগাছা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে, সেদিনই এই স্কুলটা আর এই গ্রামটাকে দেখে কেন কে জানে ভারি ভালো লেগে গিয়েছিল তার। অতএব আর কিছু না ভেবে চাকরিটা নিয়েই ফেলল সুসময়।
প্রথম প্রথম এখানে এসে কষ্ট যে তার একেবারেই হয়নি তা নয়, বরং বাড়ি ঘর, মা-বাবা, বন্ধু-বান্ধব, পাড়ার গলি, সেনদের রোয়াকে আড্ডা, এই সব, সমস্ত কিছুর জন্যেই মন হুহু করত তার। কিন্তু এখন এই পাঁচ -সাত মাস পেরিয়ে যাবার পরে সেই মন উতল করা ভাবটা কখন একসময় যেন কেটে গেছে সুসময়ের।
জগাছা গ্রামটার সঙ্গে দিব্যি খাপ খাইয়ে নিয়েছে এখন সে। স্কুলের মাস্টারমশাইদের সঙ্গে তার অত্যন্ত সদ্ভাব। ছাত্রদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। আর তার বাড়িওয়ালা হরিশংকর মুখুজ্জে তো তাকে একেবারে চোখে হারান। বয়স্ক মানুষ। একলা থাকেন। ছেলে বউ কলকাতা চলে গেছেন বহুদিন আগে। তিনি যাননি। কাকে নাকি কথা দিয়ে বসে আছেন তাই নড়তে পারবেন না এখেন থেকে। পরে গল্পটা শুনেছে সুসময়। শুনে অবাক হয়েছে। কিন্তু মানুষটার প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে বই কমেনি। বন্ধুর প্রতি কী আন্তরিক টান থাকলে এমন একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে একা একা সবাইকে ছেড়ে গ্রামে পড়ে থাকা যায় হাজারটা অসুবিধার মধ্যে। এমন সজ্জন মানুষের সঙ্গে থেকে খারাপ থাকা যায় না। কাজেই খারাপ নেই সুসময়।
আরো একটা ব্যাপার মনে বড় দাগ কেটেছে সুসময়ের। তার স্কুলের জীবনবিজ্ঞানের মাস্টারমশাই বিষাদলীনবাবু একদিন তাকে বিষণ্ণ মুখে বলেছিলেন, 'দ্যাখো ভাই সুসময়, তোমার মতন ওয়ার্ম ব্লাডেড ইয়ুথই তো দরকার আমাদের। আমরা নিজেরা তো ক্রমশ কোল্ড ব্লাডেড এম্ফিবিয়ান হয়ে যাচ্ছি। বয়েসের ভারে ন্যুব্জ, থ্যাপথেপে হয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত। আমাদের দিয়ে সমাজে আর কোন কাজটা হবে! কাজেই তোমরা এসে যদি হাল না ধরো, তোমরা সবাই যদি শহরমুখো হও, তাহলে এইসব প্রান্তিক ছেলেপুলেরা সারভাইভাল অফ দা ফিটেস্ট এর এই ভয়ংকর যুগে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে কী করে বলো দিকিনি ভায়া? তুমি কচি ছেলে, কাঁচা বয়েস তোমার, কাজেই মন খুলে চেষ্টা করো ভাই। জেনারেল ট্রান্সফার নিয়ে ফুড়ুৎ করে একদিন আবার শহরে পালিয়ে যেও না।'
বিষাদলীনবাবুর কথায় এমন আন্তরিকতা ছিল যে, মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সুসময়। কথাগুলো যুক্তিহীন আবেগও তো নয় নেহাত। কাজেই সে কথা দিয়েছে, আপাতত জগাছা ছেড়ে কোথাও চলে যাবার চেষ্টা সে করবে না। জগাছার সুখে, জগাছার দুঃখে, সকলের সঙ্গে সমানভাবে অংশ নেবে সে।
তবে তার কথায় বিষাদলীনবাবু পুরোপুরি বিশ্বাস বোধহয় করতে পারেননি এখনও। মাঝে মাঝেই অফ পিরিওডে সুসময়কে একা পেলেই সুসময়ের একদিন গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া নিয়ে বিষাদ প্রকাশ করে যান তিনি।
সুসময়ের মন এখন অনেকটাই থিতু। জগাছা ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে তার নিজেরই নেই আপাতত। সে যে এখানে থেকে যেতে চায় তার একটা কারণ অবশ্যই তার প্রিয় ছাত্র- ছাত্রীরা। তবে আরো একটা কারণ আছে। সেটা সুসময় নিজের মনের মধ্যেই বয়ে বেড়াচ্ছে সঙ্গোপনে। কাউকে বলে না সে এই কথাটা।
আসলে জগাছা গ্রামের একটা অদ্ভুত রহস্য মনে মনে ভারি বেঁধে ফেলেছে তাকে। সেই রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন এক প্রাচীন জাদুকর যাকে এ-গ্রামের কেউই দেখেননি। অথচ সেই আজব আর অসীম শক্তিশালী মানুষটার গল্পে গল্পে ছেয়ে আছে সমস্ত গ্রাম।
আর একজন সেই জাদুকরের ছেলে হারুন। তিনিও বেশ কিছু জাদু জানতেন। কতটা জানতেন কেউ জানে না অবশ্য। সে মানুষটা আবার খ্যাপাটে। অদ্ভুত জীবন জিজ্ঞাসা নিয়ে পঁচিশ বছর ধরে নিখোঁজ তিনি। তার বাড়িওলা হরিশংকর তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে পারলেন না কোনোদিন। সেই লোক সত্যিই কি ফিরে আসবে আবার? কথা রাখতে? হরিশংকরের কাছে? তিনি কি বেঁচে আছেন আদৌ? কোথায় কীভাবে আছেন? কবে গ্রামে এক বন্ধুকে কী কথা দিয়েছিলেন তা কি তিনি মনে রেখেছেন আজও?
সুসময়ের এই শেষ না হওয়া গল্পের অন্তিম পরিণতিটা জানতে ইচ্ছে করে খুব। মনে হয় এই গল্পটার শেষ না দেখে চলে যাওয়াটা বোকামি হয়ে যাবে। এমন জমাটি একটা রহস্যের মধ্যে থাকার সুযোগ কজনের কপালেই বা জোটে। তাছাড়া শহরে বেড়ে ওঠা সুসময় খোঁজ খবর না নিয়ে অন্যের কথায় বিশ্বাস করেই বা নেবে কেন যদু জাদুকরের ঢিবির অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার কথা? তাছাড়া ওই যে পরিত্যক্ত ভূতুড়ে কালীমন্দির, সত্যিই কি ওখানে অশরীরী আত্মারা পাহারা দেয় সারা রাত? এমন সত্যি সত্যি হয় কখনও? হতে পারে? সুসময় মনে মনে ভাবে এই সব রহস্য আর রহস্যের আড়ালে থাকা সত্যিগুলো তাকে যে করে হোক জানতেই হবে একদিন।
এই যদু জাদুকর লোকটি বড় অদ্ভুত। নানা জনে নানান কথা বলে তাঁর সম্পর্কে। আর সে সব কথায় একের সঙ্গে আরেকজনের মিলও হয় না সবসময়ে। এই যেমন কিছুদিন আগে গাঁয়ের বৃদ্ধ পুরোহিত শশী ভটচাজ বলছিলেন, 'যদু তালুকদার তো আর আসলে জাদুকর ছিল না। জাদুর খেলা দেখানোটা ছিল তার ভেক। সে আসলে ছিল এক মস্ত তান্ত্রিক। মূলত পিশাচ সিদ্ধ সে। আসলে তরুণ বয়েস থেকেই খেলা দেখানোর নামে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে কামাক্ষার পাহাড়ে চড়ে তন্ত্র সাধনা করত সে। সেখেনে তার তান্ত্রিক গুরুও ছিল। কথায় কথায় মরা মানুষদের আত্মাকে ডেকে নিয়ে আসত গুরু। আখড়ার ভৃত্যের কাজ করাত তাদের দিয়ে। তাদের দলে ভিড়েই ওইসব গুপ্ত মন্তর রপ্ত করে এসেছিল যদু তালুকদার। ওই যে দেখছ জঙ্গুলে ঢিবি, ওর নীচে গোপন গুহায় সে শব সাধনা করে মড়া জাগিয়েছিল। সেইসব জ্যান্ত মড়া মারাত্মক। আজও তারা দিনরাত পাহারা দেয় ওই ঢিবিটাকে। সেইজন্যেই না ঢিবিটা থেকে শতহস্ত দূরে থাকে এ গাঁয়ের লোকজন। ওইসব পিশাচের দল নিয়ে থাকতে থাকতে আর তাদের দিয়ে নিজের হাজার রকম কাজ করাতে করাতে যদু তালুকদার লোকটার আর ভগবানকে পাওয়া হল না। সে একসময় পিশাচসিদ্ধ হয়ে যায়...'
'তার মানে?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করে সুসময়, 'এ আবার কেমন সিদ্ধি?'
'মানে আবার কী হে,' শশী ভটচাজ বলতে থাকেন, 'এ হল গিয়ে একধরনের পতন। ঈশ্বর ছেড়ে দত্যি দানো নিয়ে মেতে থাকা। ভূত-প্রেত তো তার কথায় তখন ওঠে আর বসে। সে ভূত চালনায় এক্কেবারে সিদ্ধহস্ত ছিল। আমার জেঠু নিজে তার বাড়ি চা খেতে খেতে স্বকর্নে গায়ের চারপাশে সেইসব পোষা ভূতেদের ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলতে শুনেছিলেন। যদু তালুকদার অবিশ্যি তাঁকে এসব কথা বাইরে বলতে বারণ করেছিলেন। আজ এত বচ্ছর হয়ে গেছে তাই তোমায় বিশ্বাস করে বলছি। তুমি বাপু আবার পাঁচ কান কোরো না। তাহলে যদু জাদুকরের শাপ এসে লাগতে পারে আমার গায়। এমনিতেই শরীর ভালো থাকে না আজকাল সবসময়। সুগারের পেশেন্ট, প্রেশারটাও বাড়তির দিকে, তার ওপরে তিনি যদি অলক্ষে আবার রুষ্ট হন...'
'কিন্তু কথাটায় যে একটু খটকা থেকে যাচ্ছে দাদু,' সুসময় সন্দিগ্ধ গলায় বলেছিল চাপা স্বরে।
'খটকা আবার কীসে হে ছোকরা,' খেঁকিয়ে ওঠেন শশী ভটচাজ, 'আমার জেঠু কি মিথ্যে বলে গিয়েছিলেন নাকি? জেনে রাখো, সত্যের আঁট ছিল তাঁর মারাত্মক। পুজো-আচ্চা করতেন। নিয়মিত একাদশীর উপবাস। ত্রি সন্ধ্যা গায়ত্রী। উরেব্বাস তাঁর ব্রহ্মতেজ নিয়ে প্রশ্নই ওঠে না। নমস্য ব্যক্তি তিনি। তাঁর কথায় সন্দেহ করতে নেই।'
'আজ্ঞে না, তা বলছি না। তবে একটা প্রশ্ন...'
'আবার প্রশ্ন? এ ছেলে তো জ্বালালে দেখচি।'
'না মানে ইয়ে, আমি বলছিলাম কী,' আমতা আমতা করে বলে সুসময়, 'ভূতেরাও কি তাহলে প্রশ্বাস নেয়, নিশ্বাস ছাড়ে? আপনার কি তাহলে মনে হয় যে মরার পরেও তাদের অক্সিজেন-টক্সিজেনের দরকার পড়ে? তাহলে যে আমাদের খুবই বিপদ...অক্সিজেনের ভাঁড়ারে যে টান পড়ে যাবে দাদু। তার চেয়ে বরং—' কথাটা বলতে গিয়েও ঢোক গিলে নেয় সুসময়।
শশীদাদু এমন কটমট করে তাকিয়ে আছেন তার দিকে যে প্রাচীন কাল হলে নির্ঘাত ভস্ম-টস্মই হয়ে যেত সে। অথচ এই যদু তালুকদার সম্পর্কেই তাদের স্কুলের হেডমাস্টারমশাই এর মূল্যায়ণ আবার অন্যরকম। তিনি কথায় কথায় একদিন বলছিলেন, 'জানো তো সুসময়, যদু জাদুকর জাদুবিদ্যায় পারঙ্গম বলে এলাকায় যে এত খ্যাতি, আমার তার বাইরেও অন্য একটা কথা মনে হয়।'
'কী মনে হয় স্যার?'
'আমার মনে হয় লোকটা আসলে মস্ত বড় বিজ্ঞানী ছিলেন। এই গ্রামে বসে তিনি নিরিবিলিতে বিজ্ঞান চর্চা করে গেছেন আজীবন। তাঁর দেখানো জাদু আসলে কিছু ফলিত বিজ্ঞান।'
'কীরকম?'
'শোনো আমি নিজেও তো এই অঞ্চলেরই মানুষ। তাঁর নানা জাদু প্রদর্শনের গল্প শুনতে শুনতেই বড় হয়েছি।'
'আপনি নিজে তাঁর খেলা দেখেননি কখনও?'
'নাহ,' দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন বিষ্ণুবাবুু, 'তিনি যখন মারা যান আমার তখন বছর দশেক বয়েস। শেষ জীবনে এই গ্রামে তিনি প্রায় থাকতেনই না। বাইরে বাইরে খেলা দেখাতেন। এখানে থাকলেও বাড়ির বাইরে দেখা যেত না তাঁকে। আমি তো কখনও সামনাসামনি তাঁকে দেখেছি বলে মনেই করতে পারি না। তবে তাঁর একটা খেলার কথা খুব শুনতাম ছোটবেলা থেকে বাবা মায়ের মুখে।'
'কী খেলা স্যার?'
'নরনারায়ণ সেবার খেলা।'
'সেটা আবার কীরকম খেলা?'
'জগাছায় এটাই তাঁর শেষ প্রদর্শণী ছিল। এই একটাই খেলা দেখিয়েছিলেন সেবার। অসংখ্য গরিব মানুষকে সারি দিয়ে বসিয়ে দিয়েছিলেন রাস্তার দু-ধারে চট বিছিয়ে। পরিবেশন করার জন্যে জনকুড়ি ছেলে নিয়েছিলেন গ্রাম থেকে। কয়েকটা মাটির হাঁড়ি মুখে গামছা চাপা দিয়ে কী সব মন্ত্র পড়ে বসিয়ে রেখেছিলেন সেইসব বুভুক্ষু মানুষদের সামনে। শর্ত ছিল শুধু হাঁড়ির ঢাকনা সরানো যাবে না। হাত গলিয়ে ভেতর থেকে উঠে এসেছিল গরম গরম লুচি, মন্ডা-মিঠাই, পায়েস। অসম্ভব সুস্বাদু সেই সব খাবার। ওই ক'টা হাঁড়িতে অন্তত শ'-দুই লোকের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। যদু তালুকদারের চোখ-মুখ চকচক করছিল তখন। শুনেছি শিশুর মতন আনন্দে লাফাতে লাফাতে চিৎকার করছিলেন তখন তিনি, ''পেরেছি, পেরেছি। শুধু ফর্মুলাটা আর একটু সরল করতে পারলেই এ জগতে মানুষের অন্ন কষ্ট থাকবে না আর''। ভাবতে পারো সুসময়? কী কথা বলতে চেয়েছিলেন তিনি! কত বড় একটা আবিষ্কারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ভদ্রলোক! আমার বিশ্বাস এই গ্রামেই কোথাও তাঁর লুকোনো পরীক্ষাগার আছে একটা। সেখানে তাঁর বিজ্ঞান চর্চার নথি বা ফরমুলা হয়তো এখনও অবহেলায় পড়ে আছে সুসময়, সকলের চোখের আড়ালে!'
'দারুন ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো?' সুসময় বলে, 'আপনার মতন করে আর কেউ ভাবে না এই গ্রামে?'
'উঁহু, হতাশ গলায় বলেন বিষ্ণুবাবুু, 'জানোই তো, মানুষকে দেবতা বানানোর প্রবণতা আমাদের চিরকালের। তাঁর সাফল্য, তাঁর পরিশ্রম, তাঁর স্বপ্ন, সব ভুলে আমরা এতদিন ধরে মানুষটাকে দেবতা বানিয়ে, যোগী বানিয়ে, তান্ত্রিক বানিয়ে কেমন রহস্যে মুড়ে ফেললাম। তাঁকে সত্যিকারের জানার চেষ্টাই করলাম না কখনও। আর হারুনদাটাও যে কোথায় গায়েব হয়ে গেল! অত্যন্ত ট্যালেন্টেড লোক ছিল বলে শুনেছি। হারুনদা থাকলে যদু জেঠুর বিজ্ঞান চর্চার একটা যোগ্য উত্তরাধিকার থাকত। আজকে জগাছা গ্রামের ইতিহাস নতুন করে লেখা হত হে'।
'আপনার কাছে যা শুনছি, তাতে সত্যিই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আমি,' সুসময় বলে, 'কিন্তু স্যার, এমনও তো হতে পারে যে হারুনবাবু সেই গবেষণার কাগজপত্র নিয়েই এই গ্রাম থেকে অন্য কোথাও গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো করছেন?'
'হতে পারে', উদাস গলায় বলেন বিষ্ণুবাবুু, 'তবে আমার মনে হয় তেমন কিছু সত্যিই যদি থেকে থাকে তা এই জগাছাতেই আছে।'
'কেউ খুঁজে দেখার চেষ্টা করেনি কোনোদিন?'
'কে খুঁজতে যাবে? এসব কথা বিশ্বাসই তো করে না কেউ। সকলে হাজার রকম ভূত-পেত্নীর গল্প খাড়া করে তাঁর বাড়ি, তাঁর মন্দির, তাঁর ঢিবি সবকিছুকেই রহস্যে মুড়ে আমাদের এলাকার সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে দিয়েছে। এগুলো সম্পর্কে মানুষের এখন কৌতূহলের চেয়েও ভয় বেশি।'
'সবাই এইসব উদ্ভট গল্প মেনে নেয়?'
'নিয়েছে তো। আর কেউ না মানলেও ফালতু ঝঞ্ঝাটে যেতে চায় না।'
'হরিদাদু তো ওই বাড়িতে মাঝে মাঝে যেতেন শুনেছি'।
'তা যেতেন। ওঁর সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল যদুজেঠু আর হারুনদার। হারুনদা আর তাঁর বাবা সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন উনি। মূলত হারুনদা যেহেতু ওনাকে কথা দিয়ে গিয়েছিলেন যে এখানে আবার ফিরে আসবেন তাই লোক লাগিয়ে বাড়িটাকে ঝকঝকে-তকতকে করে রাখতেন তিনি সবসময়। বলতেনও, ''আমার এটা দায়িত্ব। ফিরে এসে হারুনের যেন অসুবিধে না হয়''। প্রথম প্রথম রোজ ও-বাড়ি যেতেন। পরে সপ্তায় সপ্তায়। এখন শুনি মাসে মাসে লোক লাগিয়ে ঝাড়া-মোছা করেন তিনি বাড়িটায়। আমি ওনাকে কয়েকবার জিগ্যেস করেছিলাম যদু জেঠা সম্পর্কে, হারুনদা সম্পর্কে। কিন্তু কী আশ্চর্য, কিছুই বলতে চাননি উনি স্পষ্ট করে। শুধু রহস্যের হাসি হেসে বলেছেন, ''আমি আর কী বলব বলো, হারুন তো ফিরে আসবে একদিন এই গ্রামে। তার কাছেই যা জানবার জেনে নিও''।'
'অদ্ভুত।'
'শুধু অদ্ভুত নয়। ইন্টারেস্টিং এবং রহস্যময়। যদু তালুকদার সম্পর্কে আমার যে ধারণা উনি তার কিছুটা অন্তত আঁচ করতে পারেন বলেই আমার বিশ্বাস।'
'কিন্তু উনি নিজেই তো শুনেছি যদু জাদুকরের সাধনা-টাধনার কথা বলে ওই ঢিবি, কালীমন্দির, তাঁর ফাঁকা পড়ে থাকা বাড়ি এসব সম্পর্কে গাঁয়ে একটা রহস্যের গল্প তৈরি করে রেখেছেন।'
'ঠিকই। তবে এটা একটা কৌশলও হতে পারে।'
'কীসের কৌশল স্যার?'
'হারুনদার সম্পত্তি যাতে ঠিকঠাক থাকে। ভয়ে ওদিকে কেউ যাতে না হাত বাড়ায়। না হলে এই বাজারে এতখানি জমি, বাড়ি, তাও গ্রামের একেবারে প্রান্তে...কবে বেহাত হয়ে যাবার কথা ওসব।'
'কথাটা মন্দ বলেননি।'
'তবে এসবই আমার কৌতূহল আর অনুমান থেকে বলছি ভায়া। চুপিচুপি আর একটা কথাও তোমায় বলি। আমি নিজেও বার কতক একা একা ওই পরিত্যক্ত মন্দিরে গেছি। রাত্রিবেলা। ভূত-প্রেত কেন, সন্দেহজনক কিছুই মনে হয়নি। হ্যাঁ, মূর্তিটা একটু আনকমন। বিটকেল আর ভয়ংকর। হঠাৎ দেখলে পিলে চমকে যেতে পারে চাঁদের আলোয়। কিন্তু কোনো প্রেত-টেত কই চোখে পড়েনি তো আমার।'
'কিন্তু ব্রজদা নাকি বলেছে...'
'শুনেছি। আর শুনে থেকে সন্দেহ হচ্ছে। ব্রজ ভুল নাকি আমি ভুল। অথবা ভূতেরা আমায় ভয় পায়। কিংবা ধরো এমনও হতে পারে, এইসব ভূত এই গ্রামে নতুন চালান হয়ে এসেছে ইদানীংকালে, আমি ঘুরে আসার পরে...' বলতে বলতে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন বিষ্ণুবাবুু।
তাঁকে বেশ চিন্তিত মনে হল সুসময়ের। এমনও মনে হল বিষ্ণুবাবুু অন্য কিছু একটা সন্দেহ যেন লুকিয়ে রেখেছেন মনের মধ্যে যেটা সুসময়ের কাছে ভাঙতে চাইলেন না এক্ষুনি।
চিন্তা সুসময়ের মনটাকেও ঘিরে ফেলল। কী রহস্য ঘিরে রয়েছে গ্রামটাকে, এতদিন ধরে? আকারে ইঙ্গিতে কী বলতে চাইছেন হেডস্যার? আর কীই-বা সেই ম্যাজিক যে ম্যাজিক হারুন তালুকদার ফিরে এসে দেখাতে চান হরিদাদুকে? কথা বলা দরকার। ব্যাপারটা নিয়ে শিগগিরই কথা বলা দরকার দাদুর সঙ্গে।
সন্ধে পেরিয়ে যাবার পর জগাছা গ্রামটা কেমন যেন ঘুমিয়ে পড়ে। শান্ত শুনশান হয়ে যায় চারদিক। সন্ধের একটু আগেও গাছে গাছে যে সমস্ত পাখিগুলো চিৎকার করতে করতে পরস্পরের সঙ্গে সারাদিনের খবর দেওয়া নেওয়া করে, তারাও চুপ করে যায় রাত নামলে। এখন শব্দ বলতে শুধু একটানা ঝিঁঝির ডাক। মাঝে মাঝে দু'-একটা রাতের পাখি ডেকে ওঠে আড়াল-আবডাল থেকে।
আগে এই সময় শেয়াল ডাকত খুব। আজকাল ডাকে না। বিজলি বাতির আলো থেকে সরে অনেক দূরে চলে গেছে ওরা। এইসময় মনটা খুব খারাপ লাগে হরিশংকরের। একা লাগে। প্রতিদিন। মনে হয় এই অপেক্ষা কি অর্থহীন? এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা, সব ছেড়ে, একটা আশা নিয়েই এই যে দীর্ঘদিন বসে থাকা তা কি মিথ্যে হয়ে যাবে? হারুন যে কথা দিয়েছে তাঁর কাছে। সে কথা কি রাখবে না সে! আপন মনে দু-দিকে মাথা দোলাতে থাকেন হরিশংকর। না, কথা দিয়ে কথার খেলাপ করার মতন ছেলে তো হারুন নয়। সে বলেছিল, সঠিক সময়ে ঠিক জগাছায় এসে পৌঁছে যাবে সে। আর তারপর থেকে এখানেই থাকবে। আর যাবে না কোথাও। এই গ্রামটাও পালটে যাবে তখন। সে পালটে দেবে। সেই পালটে দেবার সাধনা কি এখনও শেষ হয়নি তার?
হারুনের জন্যে খুব অভিমান হল হরিশংকরের। তাঁর বন্ধুত্বের আর কত পরীক্ষা সে নেবে! কবে আসবে আর সে এই গ্রামে ফিরে? বয়েস যে কামড় বসাচ্ছে আজকাল শরীর জুড়ে। আর কতদিন টেনেটুনে নিয়ে যেতে পারবেন তিনি এই পুরনো হয়ে যাওয়া শরীরটাকে? চিন্তাটা আরো কিছুক্ষণ চলত হয়তো। কিন্তু সুসময়ের ডাকে আজ ভাবনাগুলো থেমে গেল মাঝপথে। ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবার খুব মায়া মাখানো গলায় ডাকল সুসময়, 'দাদু—'
হরিশংকর চিন্তার জগৎ থেকে ফিরে এলেন। সুসময়ের দিকে চেয়ে হালকা হাসলেন। হাতছানি দিয়ে তাকে কাছে ডেকে বললেন, 'এসো সুসময়। বসো। বলো কী খবর তোমার? স্কুল ভালো চলছে তো? বাড়ির জন্যে মন কেমন ভাবটা কি কমল খানিক?'
'হ্যাঁ দাদু।' সুসময় হাসে। এগিয়ে এসে হরিশংকরের পাশটিতে চুপটি করে বসে সে।
'তোমার এখানে থাকতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?' আবার বলেন হরিশংকর।
'না, না।'
'হলে বোলো।'
'নিশ্চয়ই।'
'আসলে একা থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠেছিলাম ভায়া। তোমাকে পেয়ে আমি আবার নতুন করে বেঁচে উঠছি।'
সুসময় বলে, 'আমারও আপনার সঙ্গে কথা বলতে খুব ভালো লাগে দাদু। বাড়ির সকলকে ছেড়ে এসে আপনাকে পেয়ে মনে হয় আপনি যেন আমার কবেকার চেনা। আমার সত্যিকারের আপনজন।'
'আমি তো সত্যিকারেরই আপনজন তোমার ভাই।'
'আপনাকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রামটাকেও ক্রমশ ভালোবেসে ফেলছি আমি দাদু। মনে হচ্ছে এই গ্রাম ছেড়ে আর আমি অন্য কোথাও চাকরি নিয়ে চলে যাবার চেষ্টা করব না আপাতত। বরং এই গ্রাম, এই গ্রামের মানুষ, এই গ্রামের ইতিহাস আরো ভালো করে জেনে এখানকারই একজন হয়ে যাব আমি।'
'সে তো খুব ভালো কথা সুসময়।'
'এই গ্রাম সম্পর্কে জানতে আপনি আমায় সাহায্য করবেন তো দাদু?'
'কেন নয় ভাই? কী জানতে চাও তুমি আমার কাছে বলো।'
'যদু জাদুকর আর তাঁর ছেলে হারুন তালুকদার সম্পর্কে।'
'হঠাৎ?' শিরদাঁড়া সোজা করে বসে তীক্ষ্ন চোখে সুসময়ের দিকে চেয়ে বলেন হরিশংকর।
'সত্যি বলতে কী এই মানুষদুটোকে না জানলে এই এলাকা সম্পর্কে জানা অসম্ভব দাদু। কী একটা অদ্ভুত রহস্য জড়িয়ে আছে এদের ঘিরে। এই মানুষদুজন, তাদের বাড়ি, কালীমন্দির, ওই ঢিবি...'
'হুঁ'। গম্ভীর হয়ে যান হরিশংকর, 'রহস্য তো আছেই। তবে কথা হল সে রহস্য আমারও জানা নেই ঠিকঠাক।'
'হারুন তালুকদার তো শুনেছি আপনার খুব বন্ধু ছিল।'
'ছিল কেন, এখনও সে আমার বন্ধু।'
'বেশ। তা তিনি আপনাকে কিছু বলেননি এ বিষয়ে?'
'কী বিষয়ে?'
'এই রহস্যের বিষয়ে?'
'না।'
'আপনি জানতে চাননি কখনও?'
'না।'
'আপনার কী মনে হয়, যদু জাদুকর একজন নিছক জাদুকর?'
'না। তাঁর অনেক শক্তি ছিল।'
'কীরকম?'
'ইচ্ছে করলে তিনি অনেক কিছুই করতে পারতেন। মানুষের মনের ওপরে নিয়ন্ত্রণ আনতে পারতেন তিনি। প্রকৃতির ওপরেও অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর।
'মানে?'
'খরায় বৃষ্টি আনতে পারতেন তিনি, অতিবৃষ্টি থামিয়ে দিতে পারতেন।'
'এমন আবার হয় নাকি?'
'হয়'।
'তিনি একবার নরনারায়ণ সেবার ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন নাকি?'
'হ্যাঁ।'
'আপনি সে ম্যাজিক দেখেছিলেন?'
'দেখেছি'।'
'আপনার কী মনে হয়, এগুলো নিছক ম্যাজিক, চোখে ধুলো দেওয়া?'
'না। এটা তাঁর সিদ্ধি।'
'তিনি কি সাধক ছিলেন?'
'একশোবার। মস্ত সাধক ছিলেন তিনি। অনেক কষ্টসাধ্য সাধনার মধ্যে দিয়ে অর্জন করেছিলেন তিনি এই শক্তি।'
'বিজ্ঞানীরাও তো সাধক, বলুন দাদু?'
'তা বলতে পারো। কিন্তু কেন একথা বললে হঠাৎ?'
'এমন হতে পারে না যে মানুষের সেবার জন্যে এমন কিছু একটা উপায় বের করেছিলেন তিনি যা দিয়ে নিরন্ন মানুষের মুখে আহার তুলে দেওয়া যায়। হয়তো কোথাও সেই ফরমুলা লিখে রেখেও গেছেন তিনি। এমনকী একটা ফরমুলার কথা শুনেছি নাকি তিনি বলেওছিলেন?'
'হতে পারে। তবে সে ফরমুলার খোঁজ না করাই ভালো।'
'কেন?'
'হারুন বলেছিল একদিন সে ফরমুলার কথা। শুধু সে ফরমুলাই বা কেন... এমন অনেক ফরমুলাই নাকি বানিয়েছিলেন সেই মানুষটি মাথা খাটিয়ে আর নিরলস পরিশ্রম করে। কিন্তু হারুন আবার একথাও বলেছিল যে সেই গোপন ফরমুলা মানুষের ভালো করতে পারে যেমন, চরম খারাপও করতে পারে। অনধিকারীর হাতে পড়লে তা কিন্তু বিপজ্জনক। এমনকী হারুন নিজেও সে ফরমুলার ব্যবহার জেনে উঠতে পারেনি তখনও। সে-ও বলেছিল সাধনার কথা। ওই যে নিজেকে জানার চেষ্টা হারুনের, সে তো ওই গোপন শক্তির অধিকারী হবার জন্যেই।'
'ইন্টারেস্টিং। তাহলে আপনি স্বীকার করছেন যে ওই বাড়িতে সেই ফরমুলা আছে।'
'বাড়িতে আছে কিনা জানি না। তবে আছে কোথাও। হারুন তেমনই বলে গেছে। আর সেজন্যেই তার বাড়ি আর সম্পত্তি যক্ষের মতন আগলে পড়ে আছি আমি।'
'আপনি একথা আর কাউকে বলেছেন?'
'না। তুমিও বোলো না। বিপদ হতে পারে। ওই যে বললাম, যে অধিকারী নয় তার হাতে পড়লে এই ফরমুলা ভয়াবহ ফল দিতে পারে।'
'আর একটা প্রশ্ন দাদু।'
'বলো।'
'আপনি কখনও জানার চেষ্টা করেননি সে গোপন আবিষ্কার কোথায় লুকিয়ে রাখা আছে?'
'মিথ্যে বলব না তোমায় সুসময়,' আকাশের দিকে মুখ করে বলেন হরিশংকর, 'কম বয়েসে চেষ্টা করেছিলাম কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে। তখন বাড়ি ঝাড়পোঁছের নামে প্রায়ই যেতাম হারুনের ফেলে যাওয়া বাড়িতে। পুরো বাড়িটাই আমি কিন্তু ইঞ্চি-ইঞ্চিতে খুঁজেছি। কিন্তু কোনো খাতাপত্র বা ডাইরি- টাইরি বা অন্য কিছু এমনকী ম্যাজিক দেখানোর সাজ-সরঞ্জামও আমি পাইনি ও বাড়িতে।'
'তাহলে কি ওই ঢিবির মধ্যে?' আনমনে বলে সুসময়।
'কে জানে?' ঠোঁট ওল্টান হরিশংকর, 'ঢিবিটায় ঢোকার তো কোনো পথ নেই। হারুন চলে যাবার বেশ কিছুকাল পরে উঠতি ছেলেপুলেরা শাবল টাবল এনে একবার ঠোকাঠুকি করেছিল ঢিবিটায়, কিন্তু কোথাও ফাঁপা বলে মনে হয়নি তাদের। তারপরে অন্যদের আপত্তিতে রণে ভঙ্গ দেয় তারা।'
'আপত্তি কেন?'
'ওই যে গ্রামে ছড়িয়ে থাকা যদু জেঠাকে নিয়ে হরেক গল্প। মানুষটাকে ভয় পায় যে আসলে সক্কলে। অথচ কী ছেলেমানুষের মতন মন ছিল তাঁর, আর কী স্নেহপ্রবণ...'
'তার মানে আপনি ওইসব আত্মা-টাত্মার গল্প বিশ্বাস করেন না?'
'বিশ্বাস-অবিশ্বাস কিছুই করি না। আসলে ওসব নিয়ে আজকাল মাথাই ঘামাই না আর। শুধু মনে হয় এসব গল্প যত রটে ততই মঙ্গল। লোকে ও জায়গাগুলো এড়িয়ে গেলে আমারই সুবিধে। সম্পত্তি রক্ষনাবেক্ষনে সুবিধে। তা না হলে যা দিনকাল পড়েছে, বোঝোই তো, আমি একা বুড়ো মানুষ। আমার পক্ষে কি সম্ভব? বারো ভূতে ঠিক লুটেপুটে খাবার চেষ্টা করত অ্যাদ্দিনে।'
'আচ্ছা দাদু উঠি এখন,' বলে উঠে পড়ে সুসময়। একটা অদ্ভুত উত্তেজনা মনকে ছুঁয়ে আছে তার। একটা অদ্ভুত রহস্য। এর সমাধান না হলে যেন শান্তি নেই। আজ রাতে ভালো করে ঘুম আসবে কিনা কে জানে!
স্কুল ছুটির পরে পরেই আজ বেরিয়ে পড়ল সুসময় তাড়াহুড়ো করে। অন্যদিন ছুটির পরেও বসে অন্যদের সঙ্গে গল্প করে সে কিছুক্ষণ। ছেলেমেয়েদের ক্লাসটেস্টের খাতা চেক করে। আজ কিছুই না করে সটান বাইরের দিকে পা বাড়াল সে।
একবার ভেবেছিল অন্তত বিষ্ণুবাবুুকে বলে যাবে। তারপর নিজেই মত পালটে ফেলল সে। আগে দেখাই যাক না ব্যাপারটা কী। শেষমেশ নিজেই যদি কিছু খুঁজে না পায়, বা রহস্য রহস্যই থেকে যায় তাহলে আগে-ভাগে ঢাক পিটিয়ে লাভ হবে না কিছুই।
কাজেই একা-একাই হাঁটা দিল সুসময়। প্রথম গন্তব্য যদু জাদুকরের বাড়ি। তারপর কালী মন্দির। সম্ভব হলে ঢিবিটাও সামনে থেকে দেখতে পারলে ভালো হয়। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। সন্ধে নেমে যাবে ঘণ্টা দুই পরেই।
জায়গাটা দূরে। স্কুল থেকে অনেক পথ হাঁটতে হবে। গ্রামের একেবারে প্রান্তে। শ্মশান-টশান পেরিয়ে। ওদিকটা বেশ নির্জন। সন্ধে পেরিয়ে যেতে পারে আঁচ করেই ব্যাগে টর্চ লাইট নিয়ে এসেছে সুসময়।
এ জিনিসটি খুবই কাজের। ভূতের ভয় তার নেই। কিন্তু এইসব জঙ্গুলে পথের নির্জনতায় অন্য যে ভয়গুলো ঘাপটি মেরে থাকে তাদের ভয় পায় সুসময়। বিশেষ করে পরিত্যক্ত মন্দির আর ঢিবির দিকটায় সাপখোপ থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কাজেই সতর্ক থাকাই মঙ্গল।
যদু জেঠুর বাড়ির কাছে পৌছতেই অনেকখানি দেরি হয়ে গেল। পথে একটা দোকানে চা-মুড়ি খেতে হল। খিদে পেয়েছিল। বাড়ির কাছে আসতেই স্বরূপদার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। স্বরূপদার বিল্ডিং মেটেরিয়ালের ব্যবসা। সুসময়দের স্কুলেও কিছুদিন আগেই মালপত্র সাপ্লাই করে গেছেন তিনি। খুব মিষ্টভাষী আর ভীতু টাইপের মানুষ। ভূতে তাঁর মারাত্মক বিশ্বাস আর ভয়।
ভদ্রলোক ঘাড় নীচু করে হনহন করে হেঁটে আসছিলেন। সুসময়কে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। অবাক চোখে তার দিকে চেয়ে বলে উঠলেন, 'আরে মাস্টারমশাই যে, এদিকে কোথায় চললেন এই অবেলায়?'
'কালীমন্দিরে যাব প্রণাম করতে।' সুসময় হেসে বলল।
'বলেন কী? ওই ভূতুড়ে জায়গায়...আপনার কি মাথা খারাপ নাকি? ওখানে মাঝে মাঝেই যান নাকি আপনি?'
'না। আগে কখনও যাইনি। আসলে এখানে এসে থেকে মন্দিরটার কথা শুনেছি। আজ মঙ্গলবার। স্কুল থেকে ফেরার সময় হঠাৎ মনে হল যাই ঘুরে আসি। মায়ের কাছে মাথা ঠুকে আসি একবার। আসলে বাড়িতে থাকতে শনি-মঙ্গলবার করে স্থানীয় একটা মন্দিরে যেতাম কিনা।' শেষের কথাটা বানিয়েই বলে দেয় সুসময়।
'ও মন্দিরে কেউ যায় না মাস্টারমশাই। জায়গাটা সুবিধের নয়। মেলা ভূত-প্রেতের আখড়া। দেখছেন না আমি নিজেই কেমন পড়ি কী মরি করে পালিয়ে আসছি ওদিকের পথ মাড়িয়ে? আপনি অযথা সুস্থ শরীর কেন ব্যস্ত করতে চাইছেন বলুন তো? চলুন ফিরে চলুন।'
'আমার কিচ্ছু হবে না স্বরূপদা, চিন্তা নেই। আমি তো যাব আর আসব। তার মাঝেই যদি ভূত-টুত সামনে এসেই পড়ে মন্দ হয় না। দেখা হয়ে যাবে। ছোটবেলা থেকে শুধু তো শুনেই এলাম তাদের কথা। দেখা তো হল না আজ অব্দি...'
'রাম রাম, ওকথা মুখে আনবেন না মাস্টারমশাই। বড় অলুক্ষণে কথা বলেন আপনি। জানেন তো কথা ক্ষণে পড়ে গেলে খুব বিপদ। গ্রহ-নক্ষত্রের নানা যোগের কথা কিচ্ছু বলা যায় না। তেমন গ্রহ-নক্ষত্রের সন্নিবেশ থাকলে নিছক মজা করেও যদি মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরিয়ে যায় ফস করে, সে কথা ফলে যায় মাস্টারমশাই। ভগবান না করুন, কিন্তু যদি ফলে, সত্যি-সত্যি ঝামেলায় পড়ে যাবেন তখন। আসলে কম বয়েস আপনার, তায় এ-গাঁয়ের লোক নন, তাই আপনাকে সাবধান করছি বার বার।'
'থ্যাঙ্ক ইউ। আপনাদের এই ভালোবাসা কোনো বিপদই গায়ে লাগতে দেবে না আমার দেখবেন।'
'তাই যেন হয়,' বলে সামনে পা বাড়ান স্বরূপ। যেতে যেতেই আবার বলেন, 'তবে সন্ধে ঘন হবার আগেই ফিরে আসবেন কিন্তু।'
'নিশ্চয়। চিন্তা করবেন না,' বলে দ্রুত পা চালায় সুসময়। অনেকটা সময় পথে পেরিয়ে গেল। আর একটুও দেরি না করে গন্তব্যে পৌঁছনো দরকার এখন।
যদু জাদুকরের বাড়িটা মলিন হয়েছে, কিন্তু একেবারে পোড়ো বাড়ি তাকে বলা যাবে না। লোহার গেট ঠেলে বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল সুসময়। সে সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠল, পায়চারি করল খানিক। তালা বন্ধ ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল একটু। তারপর নীচে নেমে ঘুরে গেল বাড়ির পিছন দিকে। আর তখনই ব্যাপারটা নজরে এল তার।
বাড়ির পিছন দিকে একটা ঘরের জানালা খোলা। সুসময় কৌতূহলী হয়ে জানালার কাছে এগিয়ে গেল। ঘর ভিতর থেকেই বন্ধ। সামনে তালা দেওয়া। নিশ্চয়ই শেষ যেবার হরিদাদু এসেছিলেন বাড়ি পরিষ্কার করাতে তখনই হয়তো ভুলে জানালাটা খুলে রেখে গেছেন তিনি। ব্যাপারটা জানানো দরকার দাদুকে। না হলে খোলা জানালা দিয়ে আবর্জনা ঢুকতে পারে, সাপখোপ ঢুকেও বাড়ির ভেতরে বাসা বানাতে পারে।
ভাবতে ভাবতেই জানালার গরাদে মুখ ঠেকিয়ে ভেতরে উঁকি মারল সুসময়। আর উঁকি মেরেই অবাক হয়ে গেল। এটা কী করে সম্ভব? ঘরের মধ্যে বিস্কুটের খোলা প্যাকেট, সিগারেটের খালি বাক্স, পোড়া দেশলাই কাঠি। কোত্থেকে এল এগুলো ঘরের মধ্যে? বন্ধ ঘরে কে ঢুকল? আর ঢুকলই বা কেমন করে?
জানালার কাছ থেকে সরে আসে সুসময়। বারান্দা থেকে নীচে নেমে এসে পিছনের ফাঁকা ঘাসজমিতে এসে দাঁড়ায়। নীচের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে। ঘাসের ওপরে পায়ের চাপে একটা প্রায় দেখা যায় না এমন রাস্তা। সে রাস্তা ক্রমশ পিছনের ছোট দরজার দিকে এগিয়ে গেছে। সেই রেখা ধরে এগোয় সুসময়। দরজা ঠেলে বাইরে বেরোয়।
পাঁচিলের বাইরে কিছুটা খোলা জমি। পিছনে একটা ডোবা। ডোবার পাশ দিয়ে ঘাসজমিটা ঠেলে উঠেছে গিয়ে পাকা রাস্তায়, যেটা দিয়ে কৃষ্ণগঞ্জ চলে যাওয়া যায় সরাসরি। কদিন আগে ভারি পশলা হয়েছিল দিন দুই ধরে। নিম্নচাপের জন্যে। মাটি নরম ছিল। সেই নরম মাটির ওপরে গাড়ির চাকার স্পষ্ট ছাপ দেখতে পেল সুসময়। মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত বোধ করল সে। সুসময় দ্রুত পা চালাল মন্দিরের দিকে। সে দিব্বি বুঝতে পারছে এখন, গাঁয়ের প্রান্তে অন্যের নজর এড়িয়ে কিছু একটা ঘটছে এদিকে।
মন্দিরের কাছাকাছি যখন পৌঁছল সুসময় তখন সন্ধে নামছে। হঠাৎ-ই মনে হল তার, তাকে এগিয়ে আসতে দেখে একটা আবছা ছায়া ছায়া মূর্তি যেন সাঁৎ করে ঢুকে গেল মন্দিরের মধ্যে। বুকের মধ্যেটা কেমন যেন করে উঠল সুসময়ের। তাহলে লোকে যা বলে তা কি মিথ্যে নয়? সত্যি-সত্যিই প্রেতের দল পাহারা দেয় এই মন্দির?
পরক্ষণেই আর একটা চিন্তা মাথায় এল তার। প্রেতই যদি হবে তাহলে তাকে দেখে অমন লুকিয়ে পড়ল কেন সে? তাহলে মানুষের তাদের প্রতি এই যে ভয় তা অমূলক! আসলে ওরাই ভয় পায় মানুষকে। আর তাই যদি সত্যি হয়, তবে আর এগিয়ে যেতে বাধা কোথায়? আপন মনে নিজেকে এই কথা বোঝাতে বোঝাতে মন্দিরের চাতালের দিকে এগিয়ে যায় সুসময়।
মন্দিরের চাতালে উঠে একটু দাঁড়ায় সে। অপেক্ষা করে।
এখন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে তার। মনে হচ্ছে কে বা কারা যেন আড়াল থেকে নজরে রাখছে তাকে। হঠাৎ একটু দূরে নজর পড়ল তার। আর তখনি সে দেখতে পেল তারই স্কুলের কমিটি মেম্বার ভুবন মণ্ডলকে। লোকটা চারদিকে তাকাতে তাকাতে হেঁটে আসছে মন্দিরের দিকে।
মানুষটার চাউনিটা আজ কেমন যেন অন্যরকম লাগছে। চারদিকে সন্ধানী চোখে তার তাকানোর ভঙ্গির মধ্যেই বোঝা যায় কিছু একটা যেন ঢেকে ঢুকে রাখতে চাইছে সে। কী কাজে আসছে লোকটা এই নির্জন জায়গায় সন্ধেবেলা?
এমনিতেই মানুষটা সম্পর্কে নানা জনে নানা কথা বলে। শোনা যায় লোকটা সুবিধের নয়। ব্যক্তিগত লাভের জন্যে সে নাকি সবই করতে পারে। রাজনীতি করা মানুষ। ধূর্ত আর লোভী। স্কুলে নতুন বিল্ডিং-টিল্ডিং উঠলে এদের খুব লাভ। এই এবারেও নাকি স্বরূপবাবুর সঙ্গে ভিড়ে ভালোই কমিশন আদায় করেছেন ভদ্রলোক স্বরূপ দাসের থেকে।
স্বরূপদার থেকে মালপত্র নেবার জন্যে তুমুল তদবির করেছিলেন নাকি তিনি ম্যানেজিং কমিটির মিটিং-এ। ভুবন মণ্ডলের চোখের আড়ালে থাকতে দ্রুত নাটমন্দিরের একটা মোটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে সুসময়।
মন্দিরের কাছে এগিয়ে এসে ভুবন মণ্ডল বাঁ-হাত ভাঁজ করে ঘড়ি দেখল একবার। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ রাস্তার দিকে। বোঝা যাচ্ছে কারো জন্যে অপেক্ষা করছে লোকটা। অবাক হল সুসময়। কে আসবে এখানে এখন এই অসময়ে? হঠাৎ চোখে পড়ল রাজুদাকে। একটা সাইকেল ভ্যানে চেপে আসছে লোকটা। সঙ্গে আরেকজন। রাজুদা সেলফ হেল্প গ্রুপের লোক। স্কুলে স্কুলে মিড ডে মিলের দায়িত্ব সামলায়। সুসময়দের স্কুলেও বাচ্চাদের খাওয়ানোর দায়িত্বে আছে লোকটা।
সুসময় দেখেছে অনেকসময়েই ঠিকঠাক খেতে পায় না ছেলেমেয়েরা। খাবারের গুণমান ও পরিমাণ দুই-ই খারাপ। এ নিয়ে হেডস্যার বিষ্ণুবাবুুর সঙ্গে বেশ কয়েকবার কথা কাটাকাটিও হয়েছে রাজুদার। কিন্তু রাজুদার সেই একই কথা, সরকার যে টাকা এলট করে তাতে এর চেয়ে ভালো খাবার দেওয়া সম্ভব নয়।
সুসময় মনে মনে লোকটাকে খুব পছন্দ করতে পারে না। সে জানে রাজুদা সত্যি কথা বলছে না। ওই টাকাতেই আরো ভালো খাওয়ানো নিশ্চিত সম্ভব।
অন্ধকার হয়ে যাওয়া পথ পেরিয়ে সুসময়কে অবাক করে দিয়ে সেখানে এসে দাঁড়াল স্বরূপ দাসও। অবাক হয়ে গেল সুসময়। স্বরূপদার মতন ভীতু লোকও এই অসময়ে এখানে...রাজুদা ভ্যান থেকে নেমে এগিয়ে এল স্বরূপ দাসের দিকে। অন্য লোকটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, 'ইনি রুপাই সাহা। পীরপুকুরে বাড়ি। আমাদের ব্যবসায় আপাতত রুপাইদাই আমাদের থেকে মাল কিনবে। দরটাও পছন্দসই হয়েছে আমার। আর সবচেয়ে বড় কথা হল রুপাইদা বিশ্বাসী। কথা বাইরে বেরনোর চান্স নেই কোনো'।
স্বরূপ দাস বিচ্ছিরি শব্দ করে হাসল খানিক। তারপর পাশে ঘাসের ওপরে থুতু ফেলে বলে উঠল, 'আর বাইরে বললেও আমাদের তো লবডঙ্কা। ফাঁসবে হেডমাস্টার। সরকারের কাছে যে কাগজ যাবে তাতে তাঁরই তো সই থাকবে। তাছাড়া ম্যানেজিং কমিটি তাঁকে ছাড়বে কেন? কী বলেন ভুবনদা?' ভুবন মণ্ডলের দিকে তাকায় স্বরূপ দাস।
'সে কথা তো একশোবার সত্যি,' বলতে বলতে মন্দিরের চাতালে উঠে আসে লোকগুলো। সুসময়ের হাড় হিম হয়ে যায়। কী ষড়যন্ত্র করছে এরা? প্রায় তার গায়ের পাশ দিয়েই পরিত্যক্ত, পোড়ো মন্দিরের মধ্যে ঢোকে ওদের দুজন। রুপাই আর ভ্যানঅলা। তারপর মন্দিরের মধ্যে থেকে বড় বড় দু-তিনটে বস্তা বের করে আনে।
অবাক হয়ে যায় সুসময়। পুরো ব্যাপারটাই পরিষ্কার হয়ে যায় তার কাছে। মিড ডে মিলের চাল, ডাল, তেল, মশলা গোপনে বিক্রি করে দিচ্ছে এরা! মাথা গরম হয়ে গেল সুসময়ের। এত নীচ আর লোভী এরা! বাচ্চাদের মুখের খাবার পর্যন্ত কেড়ে নেয় শুধুমাত্র টাকার লোভে! কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে এদের বিরুদ্ধে।
সুসময় ভাবল মাল লুকনোর জায়গাটা তো জানাই হয়ে গেল। পরে লোকজন এনে এদের মুখোশটা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে হবে এক্কেবারে।
প্রথম বস্তাটা ভ্যানে উঠে গেল। দ্বিতীয় বস্তাটা উঠছে। তখনই আচম্বিতে বিপর্যয়টা ঘটে গেল। ভ্যানে বস্তাটা তোলার সময়ে ভ্যানটা একটু হেলে যেতেই তাড়াতাড়ি মন্দিরের চাতাল থেকে নীচে নামতে গিয়ে হঠাৎ যে পিলারটার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল সুসময় এক্কেবারে তার সামনে চলে এল ভুবন মণ্ডল। আর হবি তো হ ঠিক তক্ষুনি উড়তে উড়তে বোঁওও করে একটা মশা ঢুকে পড়ল একেবারে সুসময়ের নাকের মধ্যে। সামলে নেবার সময় পাবার আগেই হ্যাঁচ্চো করে হেঁচে উঠল সুসময়।
প্রথমটা মারাত্মক চমকে উঠল ভুবন। তারপরেই নিজেকে সামলে নিয়ে চাপা গলায় বলে উঠল, 'কে, কে এখানে?' তার কথায় তাড়াতাড়ি করে মন্দির চাতালের সেই থামের কাছে চলে এল স্বরূপ এবং রুপাই।
সুসময়ের লুকিয়ে পড়ার উপায়ই রইল না কোনো। স্বরূপ দাস আগুন চোখে তাকাল তার দিকে, 'মাস্টার, আপনাকে বারণ করেছিলাম এদিকে আসতে। আপনি কথা শুনলেন না। পই পই করে বললাম সন্ধের পরে এদিকটা ভালো নয়। আপনি বাইরের লোক, ভালোভাবে থাকুন, ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরে যান এখান থেকে। কিন্তু কী করব, আপনার কৌতূহল যে বড্ড বেশি। আর অতিরিক্ত কৌতূহল চিরকাল মানুষের বিপদ ডেকে আনে।' রুপাই অবাক চোখে এগিয়ে এসে জিগ্যেস করে, 'এ ছোঁড়াটা কে? চেনেন নাকি?'
'বিলক্ষণ,' ভুবন হাসে, 'আমারই স্কুলের টিচার। কিন্তু পরিস্থিতি যা দাঁড়াল তাতে একে তো নিরাপদে আর বেঁচে থাকতে দেওয়া যাবে না। আমাদের কীর্তি যে ফাঁস হয়ে যাবে এই লোকটাকে ছেড়ে দিলে।'
'ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই নেই। কথা হল কী করা যাবে এখন একে নিয়ে।' রাজু চিন্তিত গলায় বলল। রুপাই আর ভ্যান চালক ছেলেটি শক্ত করে চেপে ধরল সুসময়কে। সুসময় বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল খানিক, কিন্তু লাভ হল না। ওরা শক্ত করে ধরে একটা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল সুসময়কে। পকেট থেকে সুসময়ের মোবাইল ফোনটা বের করে নিয়ে খানিক নাড়াচাড়া করে সুইচ অফ করে রেখে দিল একজনের কাছে। স্বরূপ চিন্তিত গলায় বলল, 'কী ব্যবস্থা করবে এখন এর?'
'আপাতত যদু জাদুকরের পিছনের ঘরে রাখি। রাতে ফিরে বন্দোবস্ত করা যাবে কিছু একটা।' রাজু বলে।
সুসময় অবাক হয়ে যায়। জিগ্যেসই করে ফেলে, 'ওই বাড়ি তো বন্ধ। চাবি হরি জেঠুর কাছে।'
'চাবি বানিয়ে নেওয়া যায় তো চাঁদু,' রাজু মুখ ভেংচে বলে, 'তোমার দাদুর বিশ্বস্ত নবীন, যাকে দিয়ে ও-বাড়ি ঝাড়পোঁছ করান হরিশংকর, সেই গোপনে মোমের ওপরে ছাপ তুলে এই বাড়ির চাবি তৈরি করায় সাহায্য করেছে আমাদের প্রয়োজনে। ওরে বাপু টাকায় কি না হয়! কথায় আছে না ভাত ছড়ালে কাকেরা ঠিক এসে হাজির হয়ে যায় সুড় সুড় করে। নাই যদি আসত তাহলে আমাদের ব্যবসা বানিজ্যের কাজগুলো সামলাতাম কোন অফিস থেকে?'
বুকের মধ্যে খুব কষ্ট হচ্ছিল সুসময়ের। ওই বাড়িতে ঠিক কী কাজ যে এরা করছে কে জানে! তবে যে কাজই করুক তা যে খুবই মারাত্মক আর অমানবিক সে বিষয়ে বুঝতে অসুবিধা হল না তার।
রুপাই বলে উঠল, 'আচ্ছা স্বরূপদা, একে তাড়াতাড়ি ওখানে গ্যারেজ করে দিয়ে আসি চলুন। মালটার ডিম্যান্ড আছে। আমায় আজ রাতেই ঝেড়ে দিতে হবে এগুলো। চলুন ওই বাড়ির স্টকটাও ভ্যানে তুলে নিই তাড়াতাড়ি।'
'চলো,' বলে সুসময়কেও ভ্যানে তুলে যদু জাদুকরের বাড়ির দিকে চলল সকলে।
রাজু বলল, 'মাস্টারকে বেশিক্ষণ বাঁচিয়ে রেখে লাভ কী? ভ্যানটা রয়েছে। হাত-পা বেঁধে রেললাইনে ফেলে দিয়ে এলেই তো হয়'।
'মন্দ বলিসনি,' ভুবন বলে।
'উঁহু, অত তাড়াহুড়ো নয়,' স্বরূপ বলে, 'ওকে নিয়েও একটা বড় দাঁও মারব আজ। আমি বরং নিখিল প্রধানকে ফোন লাগাই একটা। বেওয়ারিশ ছেলেপুলে জানা আছে কিনা জিগ্যেস করছিল আমায় কদিন আগে। নিখিল বলেছে তেমন কাউকে পেলে হাপিশ করে দিতে হবে। তারপরে শুধু নিখিল প্রধানকে একটা ফোন। বাকি কাজের হ্যাপা সে নিজেই সামলে নেবে। আজকাল মানুষের শরীরের নানা অরগ্যানের হেবি ডিম্যান্ড। ভালো দাম পাওয়া যায় মার্কেটে,' বলেই ফোন বের করে স্বরূপ পকেট থেকে।
সন্ধে গড়িয়ে গিয়ে রাত নেমেছে অনেকক্ষণ। সুসময় এখনও স্কুল থেকে বাড়ি ফিরল না কেন? মনের মধ্যে তোলপাড় হতে লাগল হরিশংকরের। একেকদিন তার অবশ্য দেরি হয়। স্কুল ছুটির পরেও স্কুলে বসে কাজ কর্ম করে খানিক। কোনোদিন আবার গ্রামের পথে হেঁটে বেড়ায় সে আপন মনে। কিন্তু তাই বলে এত দেরি তো সে করে না কখনও! এই রাতে একলা কোথায় যেতে পারে সে এই গ্রামে-গঞ্জে?
সুসময় বাচ্চা ছেলে নয়, তবু তার জন্যে প্রাণ উতলা হয় হরিশংকরের। এ কদিনে নিজের ছেলের মতনই ভালোবেসে ফেলেছেন ছেলেটাকে। আর বিদেশ বিভুঁইয়ে অভিভাবক বলতে তো তার তিনিই। কাজেই তিনি চিন্তা না করলে কেই বা করবে তার জন্যে। টেবিলের ওপরে রাখা ফোন থেকে বিষ্ণুবাবুুকে ফোন করলেন হরিশংকর, 'আচ্ছা, সুসময় কি কোথাও গেছে স্কুল ফেরত? কিছু জানা আছে তোমার? ওর মোবাইলে ফোন করছি কিন্তু উত্তর নেই কোনো। সুইচড অফ বলছে।'
'সেকী, সুসময় বাড়ি ফেরেনি এখনও?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করেন বিষ্ণুবাবুু।
'না তো,' উদ্বিগ্ন গলায় বলেন হরিশংকর, 'স্কুল থেকে কখন বেরিয়েছে সে বলতে পারো?'
'আজ তো ও অন্যদিনের চেয়ে আরো আগে বেরিয়ে গেছে হরিদা। খুব তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল স্কুল থেকে।'
'সেকি!' বলে একটু চুপ থাকলেন হরিশংকর। তারপর বললেন, 'আমার খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে ভাই।'
'কেন বলুন তো?'
'কালই সে আমায় যদু জেঠু, হারুন আর তাদের বাড়ি, কালী মন্দির এসব নিয়ে দেদার প্রশ্ন করছিল। ছেলেটা ভীষণ কৌতূহলী। আমার মনে হচ্ছে সে হয়তো সেদিকেই গেছে। আর নিশ্চিত কিছু একটা বিপদ হয়েছে তার। নাহলে ফোন অফ করে রাখার অন্য কোনো কারণ তো থাকতে পারে না। তুমি তো জানো ও জায়গাগুলো ভালো নয়। নানা জনে নানা কথা বলে ওসব জায়গা সম্পর্কে। তাছাড়া সাপখোপ, চোর-ডাকাত এসবও তো থাকতে পারে। দিনকাল তো ভালো নয়। আমার বড্ড চিন্তা হচ্ছে ভাই।'
'আমি আসছি আপনার কাছে। চিন্তা করবেন না। ও হয়তো এসে পড়বে তার মধ্যেই।'
'তাই যেন হয়,' বলে ফোন কেটে দিলেন হরিশংকর।
বিষ্ণুবাবুু যখন এলেন ঘড়ির কাঁটা তখন সাড়ে ন'টা ছুঁই ছুঁই। গ্রামে সাড়ে ন'টা মানে অনেকটাই রাত। বহু মানুষ ঘুমিয়েই পড়ে এইসময়ে। আগে তো পুরো এলাকাই নিশ্চুপ হয়ে যেত। আজকাল টিভি-র দৌলতে কিছু মানুষ তবু জেগে থাকে।
'কী করবেন ভাবছেন?' দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকেই জিগ্যেস করলেন বিষ্ণুবাবুু। মেঝের দিকে চোখের দৃষ্টি রেখে, হাত পিছনে করে গম্ভীর মুখে ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পাইচারি করছিলেন হরিশংকর। বিষ্ণুবাবুুর প্রশ্ন শুনে তিনি দাঁড়ালেন। দেওয়ালে ঝোলানো হাফ হাতা বাংলা শার্টটা হাতে টেনে নিয়ে বললেন, 'মনস্থির করে ফেলেছি হে। ঘরে বসে অহেতুক দুশ্চিন্তা না করে আমি বেরোব। ছেলেটার নিশ্চিত বিপদ হয়েছে কিছু। এসময় অযথা সময় নষ্ট না করাই উচিত।'
'এক্কেবারে খাঁটি কথা। সময় নষ্ট করা সত্যিই উচিত নয় আর', বিষ্ণুবাবুু নয়, একটা গম্ভীর গমগমে গলা বলে উঠল দরজার বাইরে থেকে। হরিশংকর আর বিষ্ণুবাবুু দুজনেই চমকে উঠে ফিরে তাকালেন দরজার দিকে আর তখনই দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘ মানুষটাকে চোখে পড়ল তাঁদের। পরনে লালচে আলখাল্লা, গলায় রুদ্রাক্ষ, পায়ে কাঠের খড়ম। হরিশংকর আর বিষ্ণুবাবুুকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাদা ধপধপে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল ফাঁক করে হেসে উঠল লোকটা। তারপর ধীর গম্ভীর গলায় বলে উঠল, 'খুব অবাক হয়ে গেলি মনে হচ্ছে হরি! কী ভেবেছিলি, মিথ্যেই কথা দিয়েছিলুম তোকে, আর ফিরব না আমি কোনোদিন?'
প্রাথমিক জড়তাটুকু কাটিয়ে নিয়ে দ্রুত লোকটার দিকে এগিয়ে গেলেন হরিশংকর। তারপর দু-হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে আবেগ আপ্লুত গলায় চিৎকার করে উঠলেন, 'হারুন, তুই! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো?'
হারুন হাসলেন, 'সত্যিই আমি। এ তোর স্বপ্ন নয়। আমি তো বলেইছিলাম ফিরে আসব।'
'কিন্তু এতদিন কোথায় ছিলি তুই?'
'কত জায়গায় ঘুরলাম। কত কি জানলাম, দেখলাম। কত মানুষ, কত বিদ্যা, জ্ঞান...এ পৃথিবীটা যে মস্ত একটা পাঠশালা। তার আনাচেকানাচে কত অমূল্য সব জ্ঞান সম্পদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমি কুড়নোর চেষ্টা করছিলাম সেইসব...'
'কুড়োলি সব?'
'দুর পাগল, একজন্মে কি আর সব কুড়িয়ে নেওয়া যায়? সে যে অনন্ত ভাণ্ডার। তার মধ্যে যৎকিঞ্চিতই মাত্র সংগ্রহ করতে পেরেছি এতদিনে। আরো কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থেকে আরো কিছু কুড়োতাম হয়তো, কিন্তু হঠাৎ একটা অদ্ভুত তরঙ্গ এসে দুলিয়ে দিল আমার মন। সেই তরঙ্গ বার বার আমায় সাবধান করতে লাগল এখানে খারাপ কিছু একটা ঘটতে চলেছে।'
'এ কি সত্যিই বাস্তবে সম্ভব?' বিষ্ণুবাবুু বলে উঠলেন অবাক হয়ে, 'এর পিছনে কি কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে?'
'বিজ্ঞান বলতে কী বোঝো বলো তো হে?' হারুন হাসেন।
'না মানে একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা আছে তো নিশ্চিত আপনার কথার,' বিষ্ণুবাবুু থতমত খেয়ে বলেন, 'মানে ইয়ে পরীক্ষা পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়ে গিয়ে নেওয়া একটা ঠিকঠাক সিদ্ধান্ত...'
'বিজ্ঞান আর কতটুকু জানে বাপু', হারুন তালুকদার তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলতে থাকেন, 'এ বিশ্ব কত বিস্ময় আর কত রহস্য যে সাজিয়ে রেখেছে আমাদের জন্যে, আমরা তার কতটুকুই বা সমাধান করতে পেরেছি বিজ্ঞান দিয়ে? তবে একটা কথা তো জানো যে এই সমস্ত জগতটাই নানা দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ দিয়েই তৈরি।'
'তা জানি,' মাথা নাড়েন বিষ্ণুবাবুু।
'মনটাকে আরো খানিক সূক্ষ্মতায় নিয়ে যেতে পারলে অথবা প্রকৃতির সঙ্গে আত্মপ্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে এই তরঙ্গের সামান্য নড়াচড়া হেরফেরগুলো ধরা যায় হে, পড়াও যায়। বৃষ্টি আসার আগে পিপড়েরা যেমন জানতে পারে...আমরা তো জানতে পারি না। সত্যি বলতে কি এ বিষয়ে পশু পাখিরা আমাদের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে। এতদিনের প্রচেষ্টায় আমি সেই তরঙ্গের নড়াচড়া বোঝার ক্ষমতা অর্জন করেছি।' বলেই দু-চোখ বুজিয়ে স্থির হয়ে রইলেন হারুন তালুকদার কিছুক্ষণের জন্যে। তারপর ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'এসব কথা পরে হবে আবার হরি। এখন আর সময় নেই হাতে। শিগগির চল আমার সঙ্গে। নইলে ভয়ানক বিপদে পড়ে যাবে ছেলেটা।'
দরজায় তালা দিয়ে দ্রুত পথে নামলেন তিনজন। হাতের তিন ব্যাটারির টর্চটা একবার জ্বেলে দেখে নিলেন হরিশংকর।
হারুন বললেন, 'যত তাড়াতাড়ি পারিস পা চালা। বেশি দেরি হয়ে গেলে ঠেকানো যাবে না হয়তো।'
'কী ঠেকাবি, কী ব্যাপার?' উদ্বিগ্ন গলায় জিগ্যেস করেন হরিশংকর।
'একটা ছেলে...তোর মনের মধ্যে তার ছায়া দেখছি...সেই ছেলেটার ভারি বিপদ...'
'সুসময়?' ভয় পাওয়া গলায় বলেন হরিশংকর, 'খুব খারাপ কিছু ঘটেছে নাকি রে তার?'
'ঘটেনি, তবে ঘটতে চলেছে।'
'কোথায়?'
'আমার বাড়িতেই'।
'সেকী? ও-বাড়ির চাবি তো আমার কাছে।'
'তবু ওরা ঢুকেছে। খুব খারাপ কাজ করছে ওরা আমার বাড়িটাকে নিয়ে। বাড়িটাকে কলুষিত করছে...'
'কী করতে চলেছে ওরা হারুন?'
'ঠিক বুঝতে পারছি না। মনটা ছড়িয়ে যাচ্ছে। একটা বিন্দুতে আনতে পারছি না মনটাকে। কথা না আর। আয় আমার সঙ্গে। আমিও মনটাকে থিতু করার চেষ্টা করি।'
'কোন দিকে?'
'কালী মন্দির।'
'এই যে বললি ঘটনা তোর বাড়িতে ঘটছে। সুসময় নিশ্চিত সেখানেই আছে তাহলে। আমাদের তো তাহলে ওদিকেই যাওয়া উচিত হারুন।'
'কোনো প্রশ্ন নয়। মুখ বুজিয়ে চলে আয় আমার পিছু পিছু।'
কালী মন্দিরের কাছে পৌঁছে সটান মন্দিরের গর্ভগৃহের মধ্যে ঢুকে পড়লেন সবাই। আবছা আলোয় মন্দিরের বিগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে প্রণাম করলেন হারুন। তারপর উবু হয়ে বসে মূর্তির বেদি ধরে দুই হাতে চাপ দিতে থাকলেন বাঁ-দিকে। একটু পরেই বিগ্রহ নড়ে উঠল। তারপর সরসর করে সরে গেল। হরিশংকর টর্চ জ্বালতেই দেখা গেল ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে সেই বিগ্রহের নীচে লুকনো গহবরের মধ্যে দিয়ে। হারুন চাপা গলায় বললেন, 'চলে আয়।'
সুসময়ের প্রথমটা রাগ হচ্ছিল খুব লোকগুলোর ওপর। ভদ্র ভালোমানুষের মুখোশ এঁটে সক্কলকে ধোঁকা দিয়ে মানুষের ক্ষতি করছে এরা ঠান্ডা মাথায়। এদের অবশ্যই শাস্তি পাওয়া উচিত। একবার ঘর থেকে বেরোতে পারলে কাউকে ছাড়বে না সুসময়। গ্রামের সবাইকে জানিয়ে দেবে এদের কথা। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল ক্রমশই হতোদ্দম হয়ে পড়তে লাগল সুসময়। এই ঘর থেকে বেরোনোর কোনো উপায়ই দেখতে পেল না সে। গামছা দিয়ে হাত-পা-মুখ বাঁধা তার। তবু গামছার বাঁধনটা একটু সহনীয়। প্রথমে এখানে আনার সময় লোকগুলো যখন দড়ি দিয়ে বেঁধেছিল, মনে হচ্ছিল যেন হাত-পা কেটে শরীরের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে ক্রমশ দড়িগুলো।
দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। কাউকে চেঁচিয়ে ডাকার উপায়ও নেই। অবশ্য চেঁচিয়েও খুব যে লাভ হত তা নয়। এদিকে লোকজন আজকাল আসে না বললেই চলে। ঘরের মধ্যে আলো নেই। মাছি উড়ে উড়ে গায়ে এসে বসছে। এক আধটা মশাও কামড়াচ্ছে মাঝে মাঝে। কিন্তু কিছু করার নেই তার। মুখ বুজে এই যন্ত্রণা সহ্য করা ছাড়া দ্বিতীয় উপায় নেই এই মুহূর্তে। একটু পরেই লোকজন নিয়ে এসে ওকে বিক্রি করে দেবে ওই পাজি লোকগুলো নিখিল প্রধানের কাছে। তারপর নিখিল প্রধানের হাত ঘুরে অন্য কোথাও পাচার হয়ে যাবে সে, যেখানে তার চোখ, তার কিডনি বা অন্যান্য প্রত্যঙ্গ কেটেকুটে বের করে নেওয়া হবে চড়া দামে বিক্রি করার জন্যে। কেউ জানবেও না কী ভাবে সকলের অলক্ষে হারিয়ে গেল সুসময়। জগাছা গ্রামে যদু জাদুকরকে নিয়ে, তাঁর ছেলে হারুন তালুকদারকে নিয়ে যে রহস্য আছে, তার সঙ্গে যোগ হবে সুসময়ের হঠাৎ করে হারিয়ে যাবার রহস্য। এই রহস্যেরও হয়তো কিনারা হবে না কোনোদিনই।
সুসময়ের কান্না পেয়ে গেল। বাড়ির কথা মনে পড়ল তার। মায়ের কথা, বাবার কথা। এখানে আসার ব্যাপারে প্রবল অনিচ্ছে ছিল তাঁদের। তখন যদি তাঁদের কথা শুনত, আজ তাহলে এমন বিপদের মধ্যে অসহায়ের মতন চোখের জল ফেলতে হত না সুসময়কে।
এখন ক'টা বাজে কে জানে। হাত বাঁধা, ঘড়ি দেখার উপায় নেই। তার মোবাইলটাও সুইচড অফ করে শয়তানগুলো রেখে দিয়েছে নিজেদের কাছে। এতক্ষণ বাড়ি ফেরেনি সে। হরিদাদু নিশ্চিত তার জন্যে চিন্তা করছেন খুব। হঠাৎ একটা যেন আশার আলো দেখতে পেল সুসময়। হরিদাদু উতলা হয়ে গ্রামের লোকজন জুটিয়ে হয়তো খুঁজতে বেরোতে পারেন তাকে। কিন্তু সে যে এখানে আছে তা জানবেন কেমন করে উনি?
নিজের চিন্তার মধ্যেই ডুবে ছিল সুসময়। হঠাতই একটা অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে শব্দে চমক ভেঙে গেল তার। অনেকক্ষণ অন্ধকারে থাকতে থাকতে এখন চোখ সয়ে গেছে। জানলা দিয়ে যেটুকু আবছা চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরের মধ্যে, সেই আলোতেই হঠাৎ মনে হল তার ঠিক পিছনেই দেওয়ালটা যেন সরে যাচ্ছে একপাশে। খুব কষ্ট করে উঠে বসল সুসময়। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারল না প্রথমটা। একি সত্যি নাকি একটা অদ্ভুত এবং অসম্ভব স্বপ্ন দেখছে সে।
এই সময়েই বাইরে গাড়ির আওয়াজ শুনতে পেল সুসময়। ওরা এসে গেল। নিখিল প্রধানের কাছে এইবার বিক্রি হয়ে যাবে সে। গাড়ির হেডলাইটের আলো জানলা গলে ভেতরে ঠিকরে পড়েই নিভে গেল। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হবার শব্দ। বাগান মাড়িয়ে বারান্দায় উঠে আসছে ওরা। ঠিক এই সময়েই সরে যাওয়া দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে একটা জোরালো টর্চের আলো এসে পড়ল তার মুখে। আর সেইসঙ্গেই খুব চেনা দুটো গলা ডেকে উঠল তাকে, 'সুসময়, সুসময়...'
নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সুসময়। এমন টেলিপ্যাথি সত্যি হয়! দাদু তাকে সত্যি খুঁজে বের করেছেন এই ঘোর বিপদে? কিন্তু এ কোন পথে এই বাড়িতে ঢুকলেন তিনি? আর এমনভাবে ঢুকতেই বা গেলেন কেন? ভাবতে ভাবতেই দেওয়ালের গোপন পথ দিয়ে হরিশংকর, বিষ্ণুবাবুু আর হারুন এসে ঢুকলেন ঘরের মধ্যে। হারুন দেওয়ালে আটকানো সুইচ বোর্ডে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন ঘরে। তারপর সেই দেওয়ালেরই একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ডান হাতের তর্জনি দিয়ে হালকা চাপ দিলেন। দেওয়ালের সেই গোপন পথ বন্ধ হয়ে গেল আবার।
সুসময় অবাক হয়ে দেখছিল সব। দ্রুত তার হাতের বাঁধন খুলে দিলেন বিষ্ণুবাবুু। মুখ আর পায়ের বাঁধন খুলে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সুসময় আর তখনই বাইরে থেকে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল রাজু, স্বরূপ, ভুবনের দল। সঙ্গে দুজন অপরিচিত মানুষ।
সুসময়ের সঙ্গে বাকি তিনজনকে দেখে প্রথমটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল ওরা। তারপরেই ওদের চোখেমুখে ফুটে উঠল একটা ভয়ানক আক্রোশ। ভুবন মণ্ডল বিষ্ণুবাবুুর দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন, 'আপনিও এসে গেছেন দেখছি। মানে মরার আর তর সইল না। এমনিতেই তো কদিন পরে মিড ডে মিলের চাল ডাল গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার দায়ে জেলে পচে মরতেন। আজ এখানে এমনিই মরুন। অপমানের মৃত্যুর চেয়ে এই মৃত্যু বরং ভালো হবে।'
স্বরূপ আর রাজু হেসে উঠল হা-হা করে। রাজু বলল, 'নিখিলদা, আপনার তো কপাল জোর। একটার বদলে এতগুলো লোক পেয়ে গেলেন। বেচে তো লাল হয়ে যাবেন একেবারে। আমাদের কথাটা তখন মাথায় রাখবেন একটু মনে করে। ভুলে যাবেন না যেন। মনে রাখবেন আমাদেরও তো ঘর সংসার আছে। সে সংসার চালাতে আমাদেরও খরচ খরচা করতে হয়।'
নিখিল প্রধান হাসলেন। পেশাদারি গলায় বললেন, 'বুড়োদুটোর জন্যে কিন্তু দাম বেশি দিতে পারব না।'
'ঠিক আছে। যা ভালো মনে করেন। তবে ইঞ্জেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে তাড়াতাড়ি এদের গাড়িতে তোলার ব্যবস্থা করুন,' রাজু তাড়া লাগায়।
'ডাক্তার,' হাঁক দেয় নিখিল প্রধান অন্য অচেনা লোকটার দিকে চেয়ে। লোকটা ব্যাগ থেকে সিরিঞ্জ আর ইঞ্জেকশন বার করে ভাবলেশহীন মুখে। অভ্যস্ত হাতে এম্পুল ভেঙে ওষুধ ভরে সে সিরিঞ্জে। তারপর এগিয়ে আসে বিষ্ণুবাবুুর দিকে।
'খবরদার', চিৎকার করে ওঠে সুসময়। সঙ্গে সঙ্গে নিখিল প্রধানের হাতে কালচে রঙের রিভলভারটা উঠে আসে ফস করে। স্থির শান্ত গলায় সে বলে ওঠে, 'এসব কাজে ঝামেলা ঝঞ্ঝাট হয় জানি। এটা কাজে লাগে তখন। আমি মানুষটা কিন্তু ব্যবসার কাজে বড্ড সিরিয়াস। মায়াদয়া এসব শব্দ আমার অভিধানে নেই। এসব কাজে ওই সেকেলে শব্দগুলো অহেতুক গোল পাকায়। কাজেই এক পা কেউ যদি এগোবার চেষ্টা করে তাহলে একদম দানা ভরে দেব আমি তার বুকের বাঁ-দিকে।'
হরিশংকর এগিয়ে আসেন। বিষ্ণুবাবুু আর সুসময়ের মাঝখানে এসে দাঁড়ান। নির্ভীক গলায় বলেন, 'মরতে আমার ভয় নেই। বুড়ো হয়েছি, এমনিই মরব দু-দিন পরে। কিন্তু সত্যি এদের গায়ে যদি হাত পড়ে আমি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাদের দেখে নেবার অঙ্গীকার করছি।'
হারুন খুব শান্ত ভঙ্গিতে পুরো ব্যাপারটা দেখছিলেন। মৃদু গলায় হরিশংকরকে সরে যেতে বললেন তিনি এইবার। হরিশংকর প্রতিবাদ করে উঠলেন, 'কী বলছিস তুই হারুন?' সুসময় চমকে উঠল। ইনিই। এই সেই হারুন তালুকদার!
হারুন খুব শান্ত গলায় আবার বললেন, 'সরে আয় হরি। ওদের কাছে আসতে দে। যদু তালুকদার যে জাদুর খেলাটা কখনও স্টেজে দেখাননি সেটা আজ আমি দেখাব তোদের। খেলাটা কঠিন। অনেক কষ্টে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করে তবে রপ্ত করেছি আমি বহুদিন ধরে। মানুষের ওপরে প্রয়োগ করিনি কখনও। আজ পরীক্ষা হয়ে যাক।'
ডাক্তার সিরিঞ্জ হাতে এগিয়ে আসছে বিষ্ণুবাবুুর দিকে। কঠিন মুখ। অনুতাপবিহীন। কাছে, ক্রমশ আরো কাছে এগিয়ে আসছে মানুষটা। হঠাৎ-ই নিজের ডান হাতটা কপালের কাছ থেকে ভাঁজ করে ঝুলিয়ে খুব ধীরে ধীরে দোলাতে লাগলেন হারুন। আর খুব নরম মায়াবী গলায় বলতে লাগলেন,'সকলের সুমতি হোক, সকলের মনে মায়া আসুক, প্রেম আসুক, ভালোবাসা আসুক অন্যের জন্যে...' তিনি বলতে থাকলেন, বলতে থাকলেন, বলতেই থাকলেন...
ডাক্তারের সিরিঞ্জ ধরা হাত ক্রমশ নীচে নেমে এল। সিরিঞ্জ ফেলে দিয়ে দু-হাতে মুখ ঢেকে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন তিনি আর বলতে লাগলেন, 'আমি অতি নীচ। আমি একটা পশুরও অধম। মানুষের মঙ্গলের শপথ নিয়েছিলাম ডাক্তারি পাশ করার সময়, অথচ জেনে বুঝে তাদের চরম ক্ষতি করেছি আমি।'
নিখিল প্রধানের মাথার মধ্যে দিয়ে একটা অদ্ভুত আলো খেলা করছিল। কি অপার্থিব একটা অনুভূতি। জীবনটাকে আজ কেন যেন অন্যরকম লাগছে। সামনের মানুষগুলোর মুখের দিকে চোখ পড়তেই মায়ায় বুকটা ভরে গেল। হাতের রিভলবারটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল সে হারুন তালুকদারের পায়ের সামনে।
রাজু, স্বরূপ, ভুবন মণ্ডল সক্কলে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে তখন। তাদের সকলের মুখে এক অন্য রকমের আলো খেলা করে বেড়াচ্ছে তখন। সেখানে হিংসা, বিদ্বেষ, লোভের লেশমাত্র নেই আর।
তাদের প্রত্যেকের মাথায়, মুখে, চোখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন হারুন, 'আজকের দিনটা মুছে যাক তোমাদের স্মৃতি থেকে। কাল নতুন সূর্য উঠলে তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে এই বাড়িতে। নতুন করে শুরু করো আর একটা জীবন আগামীকাল থেকে। সকলের জন্যে। আজ এসো তোমরা। যাও।'
কী আশ্চর্য, বাধ্য ছেলের মতন ওরা সবাই হারুনের কথায় উঠে দাঁড়াল। পিছু ফিরল। তারপর রওনা দিল নিজের নিজের গন্তব্যে।
ওরা বেরিয়ে যাবার পরে সুসময় এসে দাঁড়াল হারুনের সামনে। দু-হাত জোড় করে প্রণাম জানিয়ে বলল, 'আপনার কথা কত শুনেছি। আপনার বাবার কথাও। আপনার যাদু আজ দেখলাম। কী অদ্ভুতভাবে আপনি সম্মোহিত করে ফেললেন এতগুলো মানুষকে। অনায়াসে।'
হারুন হাসলেন, 'সম্মোহন কিছুক্ষণের জন্যে ফলপ্রসূ। আমি এদের চিরকালের জন্যেই পালটে দিয়েছি সুসময়। আসলে কিছু অন্যরকমের ভাইব্রেশন আমি পাঠিয়েছি ওদের মস্তিষ্কের মধ্যে। এগুলো ওদের অন্তর্জগতকেই বদলে দিয়েছে একেবারে।'
'আশ্চর্য। এমনও হয়!' বিষ্ণুবাবুু বলে উঠলেন অবাক হয়ে।
'হয় যে তা তো দেখেই নিলে হে,' একগাল হেসে বললেন হারুন, 'এমন আরো কতকিছু হয়। সেসব উপায় বের করে ফেলেছিলেন আমার বাবা। কত রহস্যের উত্তর যে লেখা আছে যদু জাদুকরের ল্যাবরেটরিতে।'
'কিন্তু সেই অদ্ভুত ল্যাবরেটরিটা কোথায়?'
'যদু জাদুকরের ঢিবির নীচে। লুকোনো। সকলে সেখানে ঢুকতে পারবে না যে। ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ দিয়ে পাসওয়ার্ড সেট করা আছে সেই ল্যাবরেটরির প্রবেশমুখে। অধিকারী ছাড়া সেখানে প্রবেশ নিষেধ। ঠিক আছে, তোমাদের সেই ল্যাবরেটরি আমি দেখাব। কথা দিলাম,' বলে হরিশংকরের দিকে চাইলেন হারুন, 'বড় খিদে পেয়েছে রে, চল তোর বাড়ি যাই। আজ দিনটা তোর সঙ্গেই খেয়েশুয়ে কাটিয়ে দিই কী বল?'
'একশোবার', বলে দু-হাত দিয়ে তাঁকে আবার একবার বুকে জড়িয়ে ধরলেন হরিশংকর। পথে নেমে হাঁটতে হাঁটতে হারুনকে জিগ্যেস করলেন তিনি, 'আচ্ছা হারুন, সেই যে তুই বলে গিয়েছিলি, নিজেকে জানার সাধনায় সব ছেড়ে চললি তুই। বললি তোর এই খোলটার ভেতরে কে আছে না জেনে শান্তি হবে না এই জম্মে, সে জানা কি সত্যি-সত্যিই হয়েছে তোর?'
হারুন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বড় করে। তারপর রাতের তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে বললেন, 'কী জানি, তবে এটুকু জেনেছি তিনি বহু হয়ে ছড়িয়ে আছেন সকলের মধ্যে। আমি এখন সকলের মধ্যেই খুঁজে বেড়াচ্ছি তাঁকে রাত্রিদিন...'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন