জয়দীপ চক্রবর্তী

রামগোপালপুরে শহুরে ছোঁয়া লেগেছে খুব বেশি দিন নয়। শহুরে ছোঁয়া মানে এই নয় যে, পুরো রামগোপালপুর একেবারে ঝাঁ চকচকে হয়ে গেছে। তবে ইদানীং মূল শহরের সঙ্গে সংযোগকারী রাস্তাটা পাকা হয়েছে। কেরোসিন বাতি অচল হয়ে বিজলিবাতি এসেছে ঘরে ঘরে। আগে সন্ধের পরে ঝুপসি আঁধার ঘরগুলোর মধ্যে থেকে ছেলেছোকরাদের পড়াশুনোর শব্দ শোনা যেত, শাঁখ বেজে যাওয়ার পর থেকেই। এখন টিভি সিরিয়ালের শব্দ শোনা যায় রামগোপালপুরের ঘরগুলো থেকে।
কয়েকবছর আগে পর্যন্ত রাত্রি আটটা-সাড়ে আটটা বাজলেই রামগোপালপুর ঘুমিয়ে পড়ত। এখন এখানকার মানুষ মাঝ রাত্তির অব্দি জেগে থাকে। মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন হয়েছে আজকাল। দোকান বাজারও বেড়েছে। তবে এলাকার মানুষের মধ্যে আগে যেমন একটা আত্মীয়তা ছিল সেটা ক্রমশই যেন কমে আসছে ইদানীং।
কম বয়েসি ছেলে-মেয়েরা বড়দের আর পাত্তাই দেয় না। সামনে সিগারেট ফোঁকে, মুখের ভাষায় আগল দেয় না। আরো দু-একটা ব্যাপারেও পুরোনো মানুষেরা মনে মনে অসন্তুষ্ট হন, কিন্তু যুগের হাওয়া বলে মেনে নিয়ে মুখ বুজিয়ে সহ্য করে নেন সব কিছু। তবে এই আধুনিক রামগোপালপুরের পাশে আর একটা রামগোপালপুর আছে। সেই রামগোপালপুর আদ্যিকাল থেকে একই রকম আছে। পাল্টায়নি বড় একটা। বিজলি বাতি সেখানে থেকেও নেই। কেননা সে চত্বরে বাড়ি-ঘর নেই তেমন। আছে একটা মস্ত মাঠ, মাঠের ওপারে জঙ্গলে মোড়া একখানা পড়ি পড়ি করেও দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি। মাঠ বললাম যাকে তারও অধিকাংশই এখন জংলি আগাছায় ছাওয়া। সন্ধে নামলেই শেয়াল ঘোরে সেখানে। আকাশের দিকে মুখ তুলে হাঁক ছাড়ে সুর করে।
ওই অঞ্চলে সাপ-খোপ থাকাটাও খুবই স্বাভাবিক। মাঠের পাশ দিয়ে একটা পায়ে চলা সরু পথ আছে। তবে বেশিরভাগ মানুষ সে পথ এড়িয়েই চলে। আগে ও রাস্তায় তবু লোক চলাচল ছিল। শহরে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত রাস্তা হিসেবে দিনের বেলা অনেকেই ব্যবহার করত সেটা। আজকাল পাকা রাস্তা হয়ে যাওয়ায় পথটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
বহুদিন ধরেই শোনা যায় ওই জঙ্গুলে মাঠটা বঙ্কিমবাবুর আমলেই নাকি কোন এক শহুরে বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগের গবেষণায় কাজে লাগানোর জন্যে। তাঁরা সে জমির দখল নিয়ে কোমর সমান উঁচু পাঁচিলও তুলেছিলেন একসময়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পাঁচিলের অধিকাংশই ধসে গেছে। কস্মিনকালে কেউ কখনো ওই জমিতে কৃষি সম্পর্কিত কোনো গবেষণা তো দূর অস্ত, একটা বাহারি গাছ পুঁততেও দেখেনি।
কথা প্রসঙ্গে বঙ্কিমবাবুর নাম এসেই যখন গেল তাঁর একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে রাখা দরকার। বঙ্কিম ঘোষাল আদিতে কোথাকার মানুষ সেটা একটা ধোঁয়াশা। তাঁর পূর্ব জীবন সম্পর্কে কেউই খুব বেশি জানত না। এটুকু জানা ছিল যে, তিনি সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন। লেফটেন্যান্ট পদে কাজ করে অবসর নেন। অবসরের পরে এই রামগোপালপুরে অনেকখানি জমি কিনে তার ওপরে একটা পেল্লায় বাগানবাড়ি বানান তিনি। নাম দেন বসন্তকুঞ্জ।
বাড়ির সামনেও বেশ খানিক ফাঁকা জমি ছিল। তাঁর ইচ্ছে ছিল সেখানে পুকুর খুঁড়িয়ে পদ্মফুল ফোটাবেন। সে শখ যে-কোনো কারণেই হোক আর মেটাননি তিনি। পরে সেই জমিই তিনি দান করে দেন। চেহারাটা বেশ দশাসই ছিল বলে গাঁয়ের লোকে খুব মানত তাঁকে। তাঁকে আরো মান্যি করার কারণ তাঁর গাদা বন্দুকটা। বন্দুকটাকে সকলেই খুব সমীহ করত। সকলের বিশ্বাস ছিল, যে কোনো বিপদে-আপদে ওই বন্দুক এবং বন্দুকের মালিকই নাকি তাদের রক্ষাকর্তা।
বঙ্কিমবাবুর বন্দুক কখনো কাজে লেগেছিল বলে কারো জানা নেই। তবে মাঝে মাঝেই বঙ্কিমবাবু তাঁর মস্ত বাড়ির বারান্দায় বসে সেই বন্দুক খুব যত্ন করে পরিষ্কার করতেন। সেদিন গ্রামের দু-পাঁচজনকে ডেকে এনে খাওয়াতেন-টাওয়াতেনও নাকি তিনি।
এত বড় বাড়ি, বাড়ি সংলগ্ন বাগান তিনি নিজেই দেখাশোনা করতেন। কাজের লোক রাখা তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর পরিবারেও আর কেউ ছিল না। তাঁর আত্মীয়-স্বজনের খোঁজও পাওয়া যায়নি কোনোদিন। বঙ্কিমবাবুর মৃত্যুর পর ও-বাড়ি অমন পড়েই আছে।
লোকে বলে বঙ্কিমবাবু মরার পরেও ও-বাড়ি ছেড়ে যাননি। ওখানেই সূক্ষ্মশরীরে দিব্যি রয়ে গেছেন তিনি তাঁর বন্দুক সমেত। গ্রামের বিপদে-আপদে সে বন্দুক গর্জে ওঠার জন্যে অপেক্ষায় আছে দশকের পর দশক ধরে। আজকালকার ছেলেপুলেরা এসব কথা তেমন বিশ্বাস করে না। তারা বলাবলি করে এমন একটা আজগুবি কথায় বিশ্বাস করে আগের প্রজন্মের মানুষগুলো কেন যে অমন সুন্দর বাড়িটা আর তার সাজানো বাগানটা নষ্ট হতে দিলেন কে জানে।
নিদেন বাড়িটাকে ক্লাব ঘর বানিয়ে রেখে দিলেও একটা কাজের কাজ হত। এলাকার ছেলেদের আড্ডা দেবার একটা লোভনীয় জায়গা থাকত। এখন বাড়িটার যা ছিরি তাতে ওখানে ঢোকার ভরসা জোগাড় করা মুশকিল। সারিয়ে নেবার সামর্থ্যও তাদের নেই। অগত্যা ওই জংলি বাড়ির চৌহদ্দি থেকে এলাকার ছেলে-বুড়ো সকলেই নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে ধরে নিয়েছেন।
তারক, মানে মুন্সীগঞ্জের তারক দাস এ সমস্ত খবর বিলক্ষণ জানত। আসলে আশপাশের এলাকা সম্পর্কে খোঁজ খবর না রাখলে তাদের চলেও না। এতদিন এ ভাবেই নিজের কারবারটা চালিয়ে আসছিল সে। কারবারে বিরাট কিছু করে না উঠলেও কোনোরকমে সংসারটাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল তারক।
তার বন্ধু বিশুর এই লাইনে হাতযশ বরাবরই বেশি। রাতের ব্যবসা সম্বল করেই সে এখন ইটের বাড়ি বানিয়েছে। পুরনো খড়ের চালের বদলে মাথায় এখন টিনের চাল। ঘরে ইলেকট্রিক আলো, রঙিন টিভি। তারকের মাঝে মাঝে খারাপ লাগে না যে তা নয়। মনে হয় কাজটা আর একটু মন দিয়ে করলে হয়তো তার অবস্থাটাও ফিরে যেতে পারত। আবার নিজেই নিজেকে বোঝায় সে, পুরোনো কথা ভেবে মন খারাপ করে লাভ নেই। যা হবার হয়ে গেছে।
বিশু তাকে আগে প্রায়ই বলত, 'তারক, আর একটু কর্মঠ হ। বিদ্যেটাকে হেলাফেলা করিসনি। হাত বসে গেলে বড় কাজ আর করতেই পারবি না।' তবু তারক মনে মনে ঠিক জেগে উঠতে পারল না কোনোদিনই। এর বাগানের কলা, ওর বাগানের কাঁঠাল, নিদেন গেরস্থের টুকিটাকি বাসনপত্তর, টাকাপয়সা হাতিয়েই সন্তুষ্ট থেকেছে চিরকাল।
কিন্তু ইদানিং পরিস্থিতি একেবারেই বদলে গেছে। বিশু যে বিশু তারও বাজার মন্দা। আগের মতন মানুষ আর সাত সকালে ঘুমিয়ে পড়ে না। রাত দুপুর পর্যন্ত ফটফটে আলো জ্বালিয়ে টেলিভিশন চালিয়ে বসে থাকে তারা। গৃহস্থ অসতর্ক না হলে বা ঘুমিয়ে না পড়লে তাদের কাজকর্ম চলে না। বিশু মন খারাপ করে বলছিল, 'এ লাইন ছেড়ে দেব রে তারক।' সত্যি বলতে কি এ তারকেরও মনের কথা। খুশি হয়ে সে বলল, 'সেই ভালো। রাত বিরেতে কুকুরের তাড়া খাওয়া আর মানুষ জনের অভিশম্পাত না কুড়িয়ে অন্য কিছু একটা করি চল।'
'কিন্তু কী করবি?' মাথা চুলকে বলে বিশু।
'একটা দোকানটোকান দিই চল।'
'কীসের দোকান?'
'চা-বিস্কুট, চপ-মুড়ি।'
'তার জন্যেও তো টাকা লাগবে। তাছাড়া একটা জুতসই জায়গা দরকার। দোকান ঘর করার জন্যে।'
'টাকাটা তুই দে আপাতত। পরে তোকে আমি শোধ করে দেব না হয়।' অনেক আশা নিয়ে বলেছিল তারক। কিন্তু বিশু মিহি করে হেসে বলল, 'দুর পাগল। জমা টাকা আমি কোথায় পাব? ব্যবসায় এমন ভাঁটা পড়বে কখনও কি ভেবেছি আগে যে পয়সা জমাবার চেষ্টা করব।'
'তাহলে উপায়?'
'তার চেয়ে দুজনে চল একদিন বীরেনদার বাড়ি যাই। নেতা মানুষ। যদি কিছু সাহায্য করেন।'
'তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।' তারক হাসে।
'কেন?'
'লোকটা তো আমাদের চেয়েও বড় চোর। রাস্তা বানাতে গিয়ে টাকা মারে, একশো দিনের কাজে টাকা মারে। তাছাড়া আরো নানা কীর্তি তুই তো জানিস...'
'আমায় একবার বলেছিল, বিশু আমার হয়ে একটা কাজ করে দিবি? আমি বল্লুম কী কাজ? বলে কিনা তোর তো গোপনে এর ওর বাড়িতে ঢোকা অভ্যেস আছে। আমার একতাড়া নোট আমার অপোনেন্ট পার্টির নেতার ঘরে ঢুকিয়ে রেখে আসতে পারিস? কাজটা করলে শ'-দুই টাকা দেব। আমি রাজি হইনি। কি জানি শেষমেশ নিজেই ফেঁসে যাব হয়তো।'
'তাহলেই বোঝ।' বিজ্ঞ বিজ্ঞ গলায় বলে তারক। তখন বিশুই মতলবটা দিয়েছিল। বলেছিল 'তার চেয়ে দুজনে মিলে চল বঙ্কিম ঘোষালের পোড়ো বাড়িটায় গিয়ে ঢুকি।'
অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিল তারক, 'ঢুকে?'
'লোকটা মরার পর থেকে বাড়িটা তো অমনই পড়ে আছে। ওই বাড়িতে টাকাপয়সা, গয়না-গাঁটি বা দামি আসবাব কিছু থাকতেও তো পারে।'
'ধুস', উড়িয়ে দিয়েছিল তারক, 'তুই কি গুপ্তধনের সন্ধানে নামবি নাকি? ওসব যদি থাকতও এতদিনে তার আর অবশিষ্ট কিছু থাকবে ভেবেছিস? সাপখোপের আড্ডায় ঢুকে পাবি হয়তো কাঁচকলা।'
'না হয় নাই পেলাম। একবার দেখতে ক্ষতি কী? নিদেন পুরোনো বাড়িটার ভেঙে পড়া কড়ি বরগাও যদি পাই আমাদের দোকান দিতে কাজে লেগে যেতে পারে পরে।'
'ঠিক আছে চল'। বলে হাঁটা লাগিয়েছিল দুজনে। সিদ্ধান্তটা নিয়ে বসন্তকুঞ্জের কাছাকাছি পৌঁছতে বেশ দেরিই হল। ঝোপ-ঝাড়ে মুড়ে থাকা মাঠ আর ভাঙা বাড়িটাকে জড়িয়ে কালো রঙের আঁধার নেমে গেছে তখন। মিটমিটে জোনাকি উড়ছে মাঠের মধ্যে ভিড় করে থাকা ঝোপগুলোর শরীর ছুঁয়ে। দুটো শেয়াল ওদের দুজনের দিকে খুব বিরক্তির সঙ্গে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে দৌড়ে ঢুকে গেল বাড়িটার মধ্যে। পায়ের খুব কাছ দিয়েই সরসর করে কী যেন সরে গেল। সাপই হবে হয়তো।
ঝিঁঝি ডাকছে একনাগাড়ে। অন্য কেউ হলে ভয়ে হাত-পা হিম হয়ে যেত এমন পরিস্থিতি। কিন্তু তারক আর বিশুর এমন অবস্থায় ভয় পাবার উপায় নেই। তাদের কাজে ফস করে ভয় পেয়ে যাওয়ার রেওয়াজ নেই। কাজেই তারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিটা একটু বুঝে নেবার চেষ্টা করল প্রথমে। তারপর এগিয়ে গেল বসন্তকুঞ্জের দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহারে জীর্ণ হয়ে যাওয়া ফটকের দিকে।
এক সময় এখানে কাঠের পাল্লা ছিল। এখন খুলে পড়ে গেছে। একটা পাল্লার ভগ্ন অবশেষ মাটিতে শুয়ে রয়েছে এখনও। তার গা জড়িয়ে রয়েছে জংলি লতার দল। অন্ধকারে দেখার অভ্যাস আছে বলেই দেখতে পেল বিশু আর তারক। অন্য কেউ হলে হয়তো চোখেই পড়ত না এসব। তারক বিশুর দিকে চাইল। চাপা গলায় জিগ্যেস করল, 'কী করবি? ঢুকবি, নাকি কাল দুপুরের দিকে আসবি?'
'দুপুরে এলে যদি কারো নজরে পড়ি তাহলে হাজার প্রশ্নে জেরবার হয়ে যেতে হবে। সে এক বিচ্ছিরি ফ্যাচাং।'
'কে আর আসছে এদিকে?'
'তারপর ধর কিছু যদি মালপত্র নিয়ে যেতে হয় এখান থেকে, দিনের আলোয় নিয়ে যাবি কী করে?'
'সেটা অবশ্য একটা কথা।'
'তুই বরং এখানে দাঁড়া। আমি ঢুকে গতিকটা বুঝে আসি খানিক।'
'একা যাবি? কেন? দুজনেই না হয় যাই চল।'
'যা বলি শোন। দাঁড়া চুপ করে।' বলে দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকে বিশু। তারক দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়েই থাকে। সময় কেটে যায় নিঃশব্দে। বিশুর সাড়া পাওয়া যায় না। তারকের গা ছমছম করে ওঠে এবার। ভাঙা দরজার ওপাশে সে-ও ঢুকে পড়ে বাড়ির মধ্যে। নীচু স্বরে ডাক দেয়, 'বিশে, এই বিশে—'
বিশুর কোনো সাড়া ফিরে আসে না। তারক আবার ডাকে, 'বিশু, কোথায় গেলি রে?' তার পরেই থমকে যায় সে। তার কান সাধারণ মানুষের থেকে বেশি সজাগ বলেই শব্দটা শুনতে পায়। খুব হালকা ঝুপ করে আওয়াজ। তার পরেই সব চুপ। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তার। শব্দটা গোলমেলে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন সাবধান করে দিতে চাইছে তাকে।
স্থির হয়ে আরো একটু অপেক্ষা করে তারক। তারপর আবার একটা খুব মৃদু আওয়াজ। দেশলাইয়ের কাঠি জ্বলে ওঠার মতন। কিন্তু আলোর রেখা দেখা যায় না কোথাও। কেমন যেন ঘোর লেগে যাচ্ছে এখন তারকের। এতদিন এই চুরির লাইনে আছে, এমন অনুভূতি কখনও হয়নি তার।
হঠাৎ-ই অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়া ছায়া মূর্তি যেন নড়েচড়ে উঠল। অবয়ব স্পষ্ট নয়, তবে মনে হল মূর্তিটা বেশ লম্বা আর তার হাতে চওড়া থেকে ক্রমশ সরু হয়ে আসা লম্বা নলের মতন কী একটা। ঝপ করে বঙ্কিম ঘোষালের গাদা বন্দুকটার কথা মনে এসে গেল তারকের। আগু পিছু আর কিচ্ছু না ভেবে পিছন ফিরেই মাঠ ভেঙে সোজা দৌড় লাগাল সে বসন্তকুঞ্জের সীমানা পেরিয়ে দূরে,আরও দূরে...
বিশুর জন্যে দুর্ভাবনাটা রয়ে গেল মনে। কিন্তু থামতে সাহস হল না তার। সাহস হল না পিছু ফিরে আর একবার তাকানোরও।
রামগোপালপুরের পুরনো লোকজন বলতে তেমন কেউ আর নেই। বেশিরভাগই মারা গেছেন, আর কিছু লোক গ্রামের বাড়ি বেচে কিনে দিয়ে শহরে পাড়ি দিয়েছেন। বিধুভূষণ কথা বলার লোকই পান না আজকাল। ছেলে সকাল হলেই কলকাতা পাড়ি দেয় চাকরির জন্যে। বউমা সংসারের কাজ আর নোটনের পড়াশুনো নিয়েই ব্যস্ত। তাঁর সঙ্গে বসে গল্প করার সময় তার নেই। মাঝেমধ্যে নোটনই যা কাছে এসে বসে একটু। পুরনো দিনের গল্প শোনে। কিন্তু তারই বা সময় কতটুকু। স্কুল আছে। বাড়ি ফিরে স্কুলের দেওয়া বাড়ির কাজ করা আছে। তারপর আবার মাস্টারমশাইয়ের কাছে টিউশন পড়তে যাওয়া।
সন্ধেবেলাটা আজকাল যেন আর কাটতেই চায় না বিধুভূষণের। আজ নোটনের পড়তে যাওয়া নেই। মাস্টারমশাই কোথায় একটা যাবেন বলে ছুটি দিয়েছেন আজ। কিছুক্ষণ দাদুর সঙ্গে গল্প করার পর সে এখন পড়তে বসেছে পাশের ঘরে।
বিধুভূষণ হোমিওপ্যাথি ডাক্তারির বইটা খুলে একমনে পাতা ওল্টাচ্ছিলেন। প্রতিদিনই তিনি বইটা পড়েন। দীর্ঘদিন এ-গ্রামে শখের হোমিওপ্যাথি ডাক্তারি করছেন তিনি। আগে প্রচুর লোক আসত তাঁর কাছে ওষুধ নিতে। উপকারও পেত। আজকাল কেউ আর আসে না তেমন। এখন গ্রামে পাশ দেওয়া এলোপ্যাথি ডাক্তারের চেম্বার হয়েছে। শহরের হাসপাতালও আগের চেয়ে ভালো পরিষেবা দিচ্ছে নাকি। তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় অনেকেই সরাসরি কলকাতায় চলে যাচ্ছে চিকিৎসা করানোর জন্যে।
বিধুবাবু প্র্যাক্টিসের অভাবে এখন অনেক ওষুধের নাম মনে করতে পারেন না। রোগের লক্ষণ চিনে ঠিকঠাক ওষুধ দিতে ভুল হয়ে যায়। কাজেই রোজ নিয়ম করে চিকিৎসার বইটা পড়েন তিনি। পড়েন, ভুলে যান। আবার পড়েন। আজ বইয়ের যে পাতাটা তিনি পড়ছিলেন সেটা কালও পড়েছিলেন, পরশুও; তবু খুব মনোযোগ দিয়ে পাতাটা পড়ছিলেন তিনি। হঠাৎ-ই দরজায় একটা হালকা খটখট আওয়াজ হতে মনঃসংযোগটা ছিঁড়ে গেল তার। বই থেকে মুখ তুলে তিনি দরজার দিকে চাইলেন। এসময় কে আসতে পারে! ছেলের বাড়ি ফেরার সময় এখনও হয়নি। তাছাড়া তার দরজায় আওয়াজ করার পদ্ধতি ভিন্ন। সে আওয়াজ শুনলেই চেনা যায়।
ইতস্তত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ান বিধুভূষণ। তাহলে হঠাৎ বিপদে পড়ে কেউ কি ওষুধ নিতে এল? এমন হয়নি যে দু-চারবার তা নয়। রাতের দিকে গাঁয়ের মধ্যে ডাক্তার পাওয়া যায় না। টুকটাক সমস্যায় শহর পর্যন্ত না গিয়ে তাঁর কাছে চলে আসে মানুষজন, রাতটুকুর মতন অন্তত ঠেকা দিয়ে নেবার জন্যে। তেমনই কেউ হবে বোধহয়, ভাবতে ভাবতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজা খোলেন বিধুভূষণ। আর দরজা খুলেই থতমত খেয়ে যান একেবারে।
ক্ষয়াটে চেহারার মলিন পোশাক পরা উলুঝুলু চুলের যে মানুষটা সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাকে কস্মিনকালে দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না তিনি। তাঁর থতমত ভাবটা ঠাওর করতে পেরে লোকটাই নিজে থেকে কথা বলে উঠল বিপন্ন গলায়, 'বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এলাম কত্তা।'
লোকটাকে ভেতরে আসতে বলাটা ঠিক হবে কিনা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না বিধুভূষণ। আজকাল এমন হয়। উচিত অনুচিত বোধটা কেমন যেন জট পাকিয়ে যায় মনের মধ্যে। লোকটাই আবার কথা বলে উঠল, 'আমরা ভেতরে গিয়ে বসি বরং চলুন। ক'টা কথা আপনাকে বলতে এলাম। যদি একটা সুরাহা পাই অন্তত, মনে মনে এই আশায়।'
'আচ্ছা বেশ এসো।' বলে ঘরের দিকে পা বাড়ান বিধুবাবু। লোকটা তাঁর পিছন পিছন ঘরে এসে ঢোকে। একবার মনে হল অচেনা একটা লোককে ঘরে ঢুকিয়ে নেওয়াটা কি ঠিক হল? আড় চোখে লোকটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন তিনি, 'তোমাকে তো বাপু ঠিক চিনলাম না।'
'আমি তারক, মানে তারক দাস।' খুব বিনীত ভঙ্গিতে বলল লোকটা।
'কোন তারক দাস? গাঁয়ের পুব দিকে মিত্তিরদের বাড়ির পাশে যে দাসেরা সম্প্রতি বাড়ি করেছে সেই বাড়ির?'
'আজ্ঞে না। আমি এ-গ্রামে থাকি না।'
'সে-কী?' অবাক হয়ে বলেন বিধুবাবু, 'তাহলে তুমি থাকো কোথায়?'
'মুন্সীগঞ্জ।'
'ও বাবা, অতদূর থেকে আমার কাছে ওষুধ নিতে এসেছ তুমি... তা রোগটা কার? লক্ষণ কী?'
'আমি ওষুধ নিতে আসিনি কত্তা।'
'সে কী হে, তাহলে তোমার আমার কাছে আসার কী কারণ? আমার কাছে তো কেউ আসে না আজকাল।'
'সব বলছি আপনাকে। বলার জন্যেই তো আসা,' তারক বলে। তারপর জোরে শ্বাস টেনে চুপ করে যায় আবার।
'কী হল?' কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করেন বিধুবাবু।
'একটু খাবার জল হবে? বড্ড তেষ্টা পেয়ে গেছে,' খুব কাহিল গলায় বলে তারক, 'অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি তো, তার ওপরে কাল থেকে মনের ওপর দিয়ে যে ঝড় বইছে...'
'দিচ্ছি দাঁড়াও,' বলে বিধুবাবু ওঠেন। ঘড়া থেকে জল গড়িয়ে গ্লাসে করে বাড়িয়ে দেন তারকের দিকে। ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে পুরো জলটা শেষ করে তারক। তারপর তৃপ্তির শ্বাস ছাড়ে একটা। বিধুবাবু তার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে রেখে আসেন। আবার চেয়ারের ওপরে বসেন জুত করে। তারপর বলেন, 'এবারে বলো।'
'আসলে আমি খুব বিপদে পড়ে গেছি। ধন্ধেও পড়ে গেছি বলতে পারেন। আপনি এলাকার প্রাচীন মানুষ। দেখেছেন অনেক, শুনেছেনও প্রচুর। সেই অভিজ্ঞতা থেকে যদি আমার এই ধাঁধাটা সমাধান করে দেন তো বড় ভালো হয়।'
'কী ব্যাপার বলো তো দেখি, তোমার কথার মাথামুন্ডু কিছুই তো আমি বুঝতে পারছি না।'
'আমি নিজেই কী ছাই সব বুঝতে পারছি,' বলে ঘরের ছাদের দিকে হাঁ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তারক। তারপর বলে, 'বয়েস আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা দেয় বাবু। তাই চিন্তা-ভাবনা করে আপনার কাছেই ছুটে এলাম।'
'এ কথা কে আর আজকাল মানে বলো,' উদাস স্বরে বলেন বিধুবাবু, 'আজকাল বয়স্ক লোকজনকে কে পাত্তা দেয়...শ্রদ্ধা-ভক্তি কবে উঠে গেছে। আমরা এখন তো জঞ্জাল হে।'
'অমন বলবেন না। যারা বোঝার তারা ঠিক বোঝে। ওইজন্যেই না আপনার কাছে আসা।' আন্তরিক স্বরে বলে তারক।
বিধুবাবুর তারককে বেশ লাগছে এখন। তার দিকে একবার চেয়ে নিয়ে তিনি এবারে নিজেই আগ্রহ দেখালেন, 'হ্যাঁ হে, কী একটা বিপদের কথা বলছিলে যেন...'
'হুঁ', বলে একটু আনমনা হয়ে বসে থাকে তারক। তারপর বিধুবাবুকে অবাক করে দিয়ে বলে ওঠে, 'আচ্ছা, সত্যি করে বলুন দেখি, আপনি ভূতে বিশ্বাস করেন?'
'হঠাৎ?' অবাক হয়ে জিগ্যেস করেন বিধুভূষণ।
'বলুন না', তারক আকুল হয়ে বলে,'আচ্ছা আমি প্রশ্নটাকে বরং আরো সরল করে দিই। আমি যেটা জানতে চাইছি, আপনি তো পুরনো লোক। আপনি বলুন দেখি মরে যাবার পরেও কি মানুষ দেহ ধরে সামনে আসতে পারে?'
'কেন বলো দেখি এ প্রশ্ন তোমার মাথায় এল?'
'কাল আমি আর আমার এক বন্ধু বসন্তকুঞ্জে ঢুকেছিলাম—'
'অ্যাঁ, কী সর্বনাশ, মানে বঙ্কিমবাবুর বাড়ি?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ'।
'দিনের বেলা?'
'আজ্ঞে না। রাতে।'
বিধুবাবু হাঁ করে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তারকের মুখের দিকে। তারপর কাঁপা গলায় বললেন, 'তোমার মাথায় কি ছিট আছে? সত্যি করে বলো দিকিনি!'
'এমন কথা কেউ বলেনি এখনও অব্দি।'
'তাহলে মরতে ওখানে ঢুকেছিলে কী করতে?'
'দরকার ছিল'।
'ওখানে আবার কারো দরকার থাকতে পারে নাকি?'
'পারে কত্তা। আমার মতন লোকেদের কিছু দরকার থাকে বইকি। কিন্তু কথাটা হল ওই বাড়িতে ঢোকার পর অদ্ভুত ঘটনা ঘটল একটা।'
'কীরকম?'
'আমি একটা গোলমেলে শব্দ শুনেছিলাম। বিশু ভেতরে ঢুকেছিল তখন।'
'বিশুটা আবার কে?'
'আমার বন্ধু'।
'তারপর?'
'একটা লোক। আবছা ছায়া দেখেছিলাম শুধু। হাতে গাদা বন্দুক। বেশ লম্বা...'
'বঙ্কিমবাবু। লেফটেন্যান্ট। খুব কড়া লোক ছিলেন।' তারকের কথার মাঝখানেই বলে উঠলেন বিধুবাবু।
'এই কথাটাই জানতে চাইছিলাম। আমাদের কাজ-কারবারে রাতে ভিতেই তো ঘুরে বেড়াতে হয় সবসময়। কই কখনও তো তাদের দেখিনি। এখানে সত্যি কি তাঁকেই দেখলাম? মানে সত্যি কি দেখা সম্ভব? আপনি নিজে বিশ্বাস করেন যে তিনি সত্যি মরার পরেও ওখানে থাকেন। দেখা দেন?'
'এ-গাঁয়ের লোক চিরকাল তাই তো বলে এসেছে।'
'আপনি কী বলেন?'
'আমি কিছুই বলি না। শুধু মানুষকে বলি চোখ-কান খোলা রেখে চলতে।'
তারকের গলা ভারী হয়ে ওঠে। উদবেগের সঙ্গে বলে ওঠে, 'বিশু কাল থেকে আজ পর্যন্ত বাড়ি ফেরেনি। ওর কোনো খোঁজ নেই ওই বিচ্ছিরি বাড়িটায় ঢোকার পর থেকে। আমি কী করব বুঝতে না পেরে আপনার কাছে এলাম। বঙ্কিমবাবুর ব্যাপারটা সত্যি নাকি শুধুই গল্পকথা তা জানার জন্যে।'
'একটা জলজ্যান্ত লোক দু-দিন হতে চলল গায়েব হয়ে গেল সেকথা পুলিশকে না জানিয়ে তুমি আমার কাছে এলে কেন?'
'আজ্ঞে পুলিশের কাছে যাওয়ায় আমার একটু অসুবিধে আছে।'
'কেন?'
'মানে আমি তো লোকটা খুব সোজা পথের নই।'
'মানে?'
'কী বলি বলুন দেখি কত্তা, আসলে যে রুজি-রুটির পথটা আমি বেছে নিয়েছি বা বলতে পারেন বেছে নিতে হয়েছে তাতে পুলিশের সঙ্গে খুব সদ্ভাব থাকার কথা নয়।'
বিধুবাবুর বুকের মধ্যেটা ছ্যাৎ করে উঠল। লোকটা যা বলছে তার মানে তো খুব ভালো ঠেকছে না। এ কাকে ঘরে এনে বসালেন। সরু চোখে তারকের দিকে তাকালেন তিনি, 'তোমার কাজটা কী বলো তো তারক? তোমার কথা শুনে আমার কিন্তু খুব খারাপ একটা সন্দেহ আসছে মনের মধ্যে।'
'আপনি ঠিক সন্দেহই করেছেন।' খুব বিনয়ের সঙ্গে বলে তারক।
'চুরি-চামারিই করো তাহলে সত্যি-সত্যি?'
'আজ্ঞে করি।'
'কাজটা ভালো নয় তা তো মানো?'
'মানি। মানি বলেই তো ওই ব্যবসাটা ছেড়ে দেবার কথা ভাবছি।'
'ব্যবসাটা ধরাই উচিত হয়নি।' গলাটাকে ভারী করে বলেন বিধুবাবু।
'তা সত্যি কথা বলতে কী, চোর কে নয় বলুন। নেতা, মন্ত্রী, পুলিশ, চাকরি করা বাবু সকলেই তো চুরি-চামারি করছে কমবেশি। দেখছি তো সব বাবু চোখের সামনে। মুশকিল হল দোষটা হচ্ছে শুধু আমাদের...'
'কথাটা মন্দ বলোনি,' বলে চুপ করে গেলেন বিধুবাবু। এ কথার উত্তরে কীই-বা বলা যায়।
তারক উঠে পড়ে। হাতজোড় করে নমস্কার করে বলে, 'বাবু আমি আসি তাহলে।'
'এসো,' বলে আবার তার দিকে চাইলেন বিধুবাবু, 'বন্ধুর ব্যাপারটা তাহলে কী করবে ভাবছ?'
'দেখি, যদি দু-একদিনের মধ্যে ফিরে আসে নিজের থেকে। তা না হলে আবার ঢুকতে হবে ওই বাড়িতে।'
'আবার যাবে?'
'উপায় কী? তাছাড়া আপনি তো খানিক ভরসা দিলেন যে ভূত টুত...'
'না-না বাপু, বঙ্কিমবাবুর ব্যাপারে পুরো ভরসা দেওয়া যাচ্ছে না। লোকটাকে বিশ্বাস নেই। ভূত হয়ে থাকলেও থাকতে পারে বসন্তকুঞ্জে।'
'থাকেনও যদি পায়ের কাছে নাহয় বসে পড়ব। হাঁটু মুড়ে বিশুটার প্রাণ ভিক্ষে করে নেব। আপনার রেফারেন্স দিয়ে বলব, 'অপরাধ যদি কিছু করেই থাকি এবারের মতন ক্ষমা-ঘেন্না করে নেন,' বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় তারক। তারপর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে রাস্তার আবছা অন্ধকারে মিশে যায়।
সন্ধে হব হব করছে এখন। দিনের আলো মরে এসেও অদ্ভুত একটা লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ছে আকাশ থেকে। এই সময়টা খুব ভালো লাগে ঝুলনের। বাড়িতে থাকলে জানালার পাশে বসে রোজ এই সময়টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। মনে হয় খুব বড় একজন শিল্পী যেন আকাশের ক্যানভাসে ছবি আঁকতে বসেছেন।
কলেজ থাকলে অবশ্য এমন অলসভঙ্গিতে বসে আকাশের বুকের ওপরের এই অদ্ভুত সুন্দর রঙের খেলাটা দেখা যায় না। কলকাতা থেকে কলেজ সেরে ফিরতে ফিরতেই সন্ধে পেরিয়ে যায়। তখন রামগোপালপুর জুড়ে ঝুপসি অন্ধকার নেমে যায়।
তাদের বাড়ি আসার পথে যে মস্ত আদ্যিকালের খিরিশ গাছটা, তার মাথায় পাখিদের মেলা বসে ওই সময়। কলর-বলর করে তারা পরস্পর পরস্পরকে সারাদিনের গল্প শোনায় তারস্বরে। সেই আওয়াজে পুরো এলাকাটা যেন গমগম করে সন্ধেবেলায়।
কাল থেকে কলেজে ছুটি পড়েছে। এখন কদিন আর সাততাড়াতাড়ি ট্রেন ধরে শহরের দিকে দৌড়োতে হবে না। তাই আজ বেশ কিছুদিন পরে প্রিয় জানালার পাশে বসার ফুরসত পেয়ে গেছে ঝুলন। লালচে আকাশের রং মুছে গিয়ে ক্রমশ ধূসর সন্ধে নামছে। খিরিশ গাছ থেকে ঘরে ফিরে আসা পাখিদের গল্পগুজবের শব্দ কানে আসছে। ঠিক সেই সময়েই তার পিছন থেকে নোটন ডেকে উঠল, 'ঝুলনদিদি—'
ঝুলন অন্যমনস্ক ছিল। নোটনের ডাকে চমকে উঠল। তারপর ওর দিকে ফিরে বলল, 'কী রে তুই, এমন অসময়ে?'
'তোমার সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে।'
'কী কথা? স্কুলে নিশ্চিত কোনো রিডল শুনেছিস, মানে বের করতে পারছিস না'।
'ধুস, না।'
'তবে কি সামনে কোনো কমপিটিশন-টমপিটিশন আছে। মডেল বানাবি। আমায় তার প্ল্যান দিতে হবে।'
'তাও না।'
'তবে?'
'খুব ক্যাডাভ্যারাস কাণ্ড। সিরিয়াস ব্যাপার।'
'বটে। বলে ফেল তবে। কিন্তু তার আগে বল, এই ভরসন্ধেবেলা বাড়ি থেকে বেরোলি কী করে? কাকিমাকে গুল মেরেছিস নিশ্চয়ই?'
নোটন লাজুক মুখে হাসে। বলে মাকে বললাম, 'ইংলিশের গোটা দুই কবিতা কিচ্ছু মানে বুঝতে পারছি না, অথচ ওই দুটো কবিতাই পরীক্ষার জন্যে খুব ইম্পোর্ট্যান্ট। আর তুমি তো জানো, তোমার কাছে আসছি জানলে মা একদম নিশ্চিন্ত...'
পুরো রামগোপালপুরে ঝুলনের মতন উজ্জ্বল রেজাল্ট মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকে কেউ করতে পারেনি এখনও পর্যন্ত। ওর মতন বুদ্ধিমান আর ডানপিটে মেয়েও এই এলাকায় আর দ্বিতীয়টি নেই। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই খেলার মাঠে তার পারফরম্যান্স হিংসে করার মতন। মূলত তার উদ্যোগেই ওর কলেজের সিনিয়র ইন্দ্রদা রামগোপালপুরে ক্যারাটে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলেছে মাস ছয়েক হল। তখনই জানা গেছে ঝুলনও কয়েকবছর ধরে ক্যারাটের প্রশিক্ষণ নিয়েছে শহরে গিয়ে এবং ইতিমধ্যে সে নিজেও ক্যারাটের স্পেশাল ব্রাউন বেল্ট।
নোটন ঝুলনদিদির একেবারে অন্ধ ভক্ত। তার ধারণা ঝুলন দিদির যা বুদ্ধি আর সাহস তাতে যে-কোনো কঠিন সমস্যা সে অন্য কারো সাহায্য না নিয়েই একা সামাল দিয়ে দিতে পারে। আর একজন মানুষকে নোটন খুব মনে মনে গুরু বলে মানে। তিনি হলেন সামারসেট ক্লাবের সেক্রেটারি শেখরদা। কী গ্ল্যামারাস দেখতে শেখরদাকে। সবসময় ফিটফাট হয়ে থাকে। দিলদরিয়া মেজাজ। খরুচে আর হুল্লোড়বাজ। ভারত যেদিন ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জিতল সারা পাড়াকে ভুরিভোজ দিয়েছিল। বড়রা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে ব্যবসার কাজে শেখরদা মাঝে মাঝেই যখন বাইরে থাকে পুরো পাড়াটা যেন ঝিমিয়ে থাকে।
নোটনকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে বিছানার ওপরে পা মুড়ে আরাম করে বসল ঝুলন। বলল, 'বল, কী স্কুপ নিউজ দেওয়ার জন্যে ছুটেমুটে আমার কাছে এলি।'
'ঝুলনদি, বসন্তকুঞ্জকে ঘিরে একটা রহস্য দানা পাকিয়ে উঠেছে। কিন্তু কেউ সেটা জানে না।'
'কীরকম, কীরকম?' নড়েচড়ে বসে ঝুলন।
'একটা লোক আজ দুদিন হল বসন্তকুঞ্জে গিয়ে গায়েব হয়ে গেছে।'
'কী করে জানলি?'
'কাল আমাদের বাড়ি একটা লোক এসেছিল। দাদুর কাছে। দাদুকে সে জিগ্যেস করছিল বসন্তকুঞ্জে সত্যি-সত্যি ভূত আছে কি না...'
'লোকটা কি পাগল?'
'না না। ওই লোকটা আর তার বন্ধু ওখানে গিয়েছিল পরশু রাতে।'
'কেন?'
'আমি ডিটেলস জানি না। পরদার আড়াল থেকে দাদুর সঙ্গে ওর কথা শুনছিলাম পাশের ঘরে দাঁড়িয়ে। শুনলাম ওর বন্ধু বাড়ির ভেতরে ঢুকেছে কিন্তু বেরোয়নি। তার কোনো ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া লোকটা নিজেও নাকি ওই বাড়িতে বঙ্কিমদাদুর ভূতকে দেখেছে।'
'বঙ্কিমদাদুকে কি ওই লোকটা চিনত?'
'না বোধহয়।'
'কী করে জানলি?'
'লোকটার বাড়ি আমাদের গ্রামে নয়। মুন্সীগঞ্জে।'
'তাহলে ও বুঝল কী করে যে ভূতটা বঙ্কিমদাদুরই।'
'ওর ডেসক্রিপশন শুনে দাদুই বলল।'
'হুঁ', বলে একটুক্ষণ চুপ করে রইল ঝুলন। তারপর বলল, 'এ বিষয়ে তোর এত আগ্রহ কেন?'
'না তুমি দেখো আমাদের গ্রামে একটা লোক হাপিশ হয়ে গেল। তার কারণ হিসেবে একটা আজগুবি ভূতের গল্প খাড়া করে দেওয়া হচ্ছে। এটা কি ঠিক বলো?'
'কথাটা মন্দ বলিসনি। কিন্তু আমরা কী করতে পারি এ-বিষয়ে?'
'আমি ভাবছিলাম তুমি যদি রাজি থাকো তাহলে আমরা ওই বাড়িতে একবার ঢুকতে পারি।'
'ঢুকে কী করবি?'
'সত্যি ওই বাড়িতে ভূত আছে কিনা দেখব। তাছাড়া একটা লোক দুম করে একটা বাড়িতে ঢুকে হারিয়ে গেল কেন সেটাও তো জানার চেষ্টা করা দরকার।'
'এ কাজ তো আমাদের নয়, এ কাজ পুলিশের।'
'লোকটা পুলিশের কাছে যাবে না।'
'সে আবার কী কথা। তার বন্ধু অমন বিশ্রীভাবে মিসিং, তবু সে পুলিশে যাবে না?'
'না', বলে ফিক করে হেসে ফেলল নোটন। তারপর বলল, 'মজার কথা কী জানো, দুজনেই ওরা নাকি চোর।'
'সত্যি?' বলে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল ঝুলন।
নোটন অবাক হয়ে গেল। তার দিকে চেয়ে জিগ্যেস করল, 'কী হল, দুম করে অমন চুপ মেরে গেলে যে?'
'তোর শেষের কথাটা খুব ইম্পোর্ট্যান্ট নোটন। এবারে কিন্তু আমার নিজেরও ব্যাপারটা নিয়ে কৌতূহল জাগছে।'
'কেন বলো দেখি?'
'চোরেদের ভূতের ভয় পেলে তো চলে না। ওই ভয় থাকলে তারা রাতে ভিতে বেরোতেই পারত না। অথচ এমন পেশার মানুষই ভূতের খপ্পরে পড়ে নাজেহাল হয়ে গেলো? একজন বেপাত্তা, আর একজন কনফিউজড। এ তো স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।'
'বুঝলে তো কেন আমি তোমার কাছে ছুটে এলাম। এবারে বলো ও-বাড়িতে কি আমরা একবার সরেজমিনে তদন্ত করে আসব?' বেশ উত্তেজিত লাগছে এখন নোটনকে। ঝুলন আড়চোখে দেখে তাকে। মিটিমিটি হাসে। তারপর বলে, 'এমন ভাব করছিস যেন মস্ত একটা এক্সপিডিশনে যেতে চাইছিস!'
'তা বলতে পারো। তুমি তো জানো না, বসন্তকুঞ্জে ঢোকার লোভ আমার কতদিনের।'
'কেন, ওই পোড়োবাড়িতে ঢোকার জন্যে তোর এত আগ্রহ কেন?'
'আসলে ওই বাড়িটা নিয়ে আমার আগ্রহের কারণ ওই বাড়ির মালিক,' নোটন বলতে শুরু করে, 'তুমি ভাবো ঝুলনদি, একটা লোক এ-গ্রামে এসে বাড়ি বানাল। তার আদি বাড়ি কোথায় কেউ জানে না, তার আত্মীয়-স্বজন কেউ কোথাও আছে কিনা কেউ জানে না, সে বাড়িতে একা থাকত। তার কিছু তো টাকাপয়সা সম্পত্তি ছিল। অথচ সেগুলোর হদিশ পাওয়া গেল না। মরার পর তার কী হল কেউ জানে না, তোমার এই ঘটনাগুলো অস্বাভাবিক লাগে না...তাছাড়া লোকটার শেষ বয়েসের যা গল্প শুনি দাদুর কাছে...'
'কী গল্প?'
'শেষের কয়েকবছর নাকি মানুষটার মাথার ঠিক ছিল না। অসংলগ্ন কথা বলতেন। এলাকার কাউকে বাড়িতে অ্যালাও করতেন না। সবসময় নাকি চোখেমুখে আতঙ্ক আর সন্দেহ নিয়ে বলতেন, 'তাঁকে কারা নাকি মেরে ফেলতে চাইছে। তাঁর বাড়ি-জমি সব কেড়ে নিতে চাইছে।'
'এ কথাটা আমিও শুনেছি। সেইসময়েই নাকি ওই জঙ্গল হয়ে পড়ে থাকা মাঠটা ইউনিভার্সিটিকে দান করে দিয়েছিলেন তিনি।'
'আচ্ছা এমন হতে পারে না যে ওই বাড়িতে এমন কিছু হয়তো ছিল, যার জন্যে তিনি শেষ বয়েসে ইন্সিকিওয়রড ফিল করতেন।'
'তুই কি ইদানিং পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে দিন-রাত্তির গোয়েন্দা গল্প পড়ছিস কাকিমার চোখে ধুলো দিয়ে?' ঝুলন হাসতে হাসতে বলে।
'ইয়ার্কি নয় ঝুলনদি, আমার সত্যিই মনে হয় বসন্তকুঞ্জে একটা কিছু মিস্ট্রি আছে।'
ঝুলনও এবার সিরিয়াস মুখ করে বলল, 'আমারও মনে হচ্ছে এখন। বঙ্কিমদাদুর কথাগুলোর জন্যে নয়, ওই লোকটার দুম করে ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ার জন্যে।'
'তাহলে সত্যি একবার ঢুকবে ওখানে?'
'ঢুকব।'
'কবে?'
'কাল দুপুরে। তোর ছুটি পড়েছে?'
'হ্যাঁ। আজ স্কুল হয়ে। সামনের সপ্তায় আবার বুধবার স্কুল খুলবে'।
'গুড। কাল দুটো নাগাদ চলে আসতে পারবি?'
'আসতেই হবে।'
'মাকে ম্যানেজ করবি কী ভাবে?'
'ওটা তুমি আমার ওপরে ছেড়ে দাও ঝুলনদি।'
অনিলকাকুর বিল্ডিং মেটিরিয়ালসের দোকানটা পেরিয়ে গেলেই চারপাশ একেবারে ফাঁকা শুনশান। বাড়ি নেই, দোকান নেই, যেন দুম করে আধুনিক সভ্য জগতের বাইরে কোথাও এসে পড়া। এদিকে বিজলি বাতির খুঁটিও পোতা হয়নি এখনও। এখানে একটা সরকারি নিম্নবুনিয়াদি স্কুল আছে। তার সামনে একচিলতে খেলার মাঠ। আগে এখানে ছেলেমেয়েরা অনেকেই পড়ত, কিন্তু আজকাল এই স্কুলে কেউ আর পড়ে না।
রামগোপালপুরের মধ্যেই এখন তিনখানা বেসরকারি নার্সারি ও প্রাথমিক স্কুল। তার মধ্যে দুটো ইংরেজি মাধ্যম। ওইসব স্কুলেই এখন ভিড় বেশি। নিম্নমধ্যবিত্তরাও সরকারি স্কুলের ওপরে আস্থা রাখতে পারছেন না আর। আর একটু এগিয়ে গেলেই জঙ্গল হয়ে পড়ে থাকা ভাঙা ভাঙা পাঁচিলে ঘেরা মাঠটা। তার পাশ দিয়ে বেঁকে ডানদিকে চলে গেলেই লেফটেন্যান্ট বঙ্কিম ঘোষালের পোড়ো পোড়ো ভূতুড়ে বাড়িটা।
নোটন আর ঝুলন পাশাপাশি হাঁটছিল। গরমে ঝুলনের ফর্সা মুখটা লালচে দেখাচ্ছিল। ও একটা জিনস পরেছে আজ। সঙ্গে লুজ টি-শার্ট। পায়ে জুতো। নোটনও জিনস শার্টের সঙ্গে শু পরে নিয়েছে পায়ে। কালই ঝুলনদি বলে দিয়েছিল পা ঢাকা জুতো মাস্ট।
মাঠের কাছে পৌঁছতেই সরু পায়ে চলা রাস্তা দিয়ে অবিনাশ জেঠুকে হেঁটে আসতে দেখল ওরা। কাঁধে সেই বিখ্যাত ঝোলা ব্যাগটা। অবিনাশ জেঠু কবিরাজি ওষুধ তৈরি করে ওই ব্যাগে করেই ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করেন। মানুষটা গম্ভীর। কারো সঙ্গেই কথা বলেন না তেমন। আপন মনে থাকেন। বনে-বাদাড়ে ঘুরে বিভিন্ন গাছ-গাছড়া সংগ্রহ করেন।
গ্রামের অনেকে বলে বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে অবিনাশজেঠুর মাথা নাকি বিগড়ে গেছে। প্রায়ই নাকি আপন মনে নানা আজগুবি কথা বলেন তিনি বিড়বিড় করে। অনেকে অহেতুক রাগানোর চেষ্টা করে তাঁকে। একবার একদল ছেলে খুব খ্যাপাচ্ছিল তাঁকে। ঝুলন প্রতিবাদ করে পাশে দাঁড়িয়েছিল তাঁর। সেই থেকে ঝুলনকে দেখতে পেলে দু-একটা কথা বলেন ওর সঙ্গে। হাসেন। তখন ওঁর মুখের দিকে চাইলেই বোঝা যায় যে মানুষটা খুশি হয়েছেন।
আজ কিন্তু চোখের সামনে ঝুলন আর নোটনকে দেখে একটুও হাসলেন না অবিনাশজেঠু। প্রথমটা ওদের দেখে যেন ভয়ানক চমকে উঠলেন তিনি। তারপর ঝুলনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। ঝুলন হাসল। খুব স্বাভাবিক গলায় বলে উঠল, 'ভালো আছেন জেঠু?' অবিনাশজেঠু সে কথার উত্তর দিলেন না। বরং কেমন ভয় পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা এই ভরদুপুরে এখানে কি করছ? কোথায় যাচ্ছ দুটিতে মিলে?'
'ঘুরতে ঘুরতে এদিকে চলে এসেছিলাম। এখন ভাবছি বঙ্কিমদাদুর বাড়ির দিকটায় বেশ গাছের ছায়া আছে, ওখানে একটু বসে বিশ্রাম নেব।' ঝুলন হাসল।
'খবরদার না।' ধমকে উঠলেন অবিনাশজেঠু, 'ফিরে যাও। ও-বাড়িতে বিপদের গন্ধ উড়ছে।'
'কী বিপদ?' আশ্চর্য হয়ে জিগ্যেস করে নোটন।
'তা জানি না, কিন্তু ভয়ানক একটা বিপদের কিছু ঘটছে। আমি গন্ধ পাচ্ছি। জানো তো আমি বাতাসে বিপদের গন্ধ পাই।'
নোটন বুঝতে পারছিল অবিনাশজেঠু আবার আবোল-তাবোল কথা বলতে শুরু করে দিয়েছেন। ওঁর কথা বলার ধরন দেখে হাসি পাচ্ছিল তার। ঝুলন কিন্তু একটুও হাসল না। বরং তাঁকে সমর্থন করে বলে উঠল, 'সে তো আপনি পাবেনই জেঠু। আপনি ছাড়া কে পাবে? আমি জানি গাছপালার কাছে থাকেন আপনি সারাদিন, তাদের সঙ্গে কথা বলেন...'
'বলিই তো,' তার কথা কেড়ে নিয়ে বলেন অবিনাশজেঠু, 'গাছেদের সঙ্গে কথা বলি, বাতাসের সঙ্গে কথা বলি, বাতাসে উড়েই তো কত খবর আমার কাছে আসে। কতকিছু গোপন কথা জেনে ফেলি আমি।'
'কীরকম?' চোখেমুখে কৌতূহল ফুটিয়ে তোলে ঝুলন।
চারদিকে সন্তর্পণে একবার চোখ বুলিয়ে নেন অবিনাশ। তারপর চাপা গলায় বলেন, 'যে কথা বলব কাউকে বলবে না?'
'কী কথা জেঠু?'
'আগে বলো বলবে না কাউকে।'
'বলব না।'
'কথা দিলে কিন্তু।'
'নিশ্চিন্ত থাকুন আপনি।'
'বঙ্কিমদা তাঁর প্রচুর টাকা সোনা করে নিয়েছিলেন। আর সেই সোনা লুকিয়ে রেখেছেন এই বাড়ির মধ্যে। কেউ জানে না। শুধু আমি জানি। আর এ-ও জানি বঙ্কিমদা নিজে পাহারা দেন সেই সম্পদ।' নোটনের আবার হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু ঝুলন সিরিয়াস গলায় জিগ্যেস করল, 'আচ্ছা জেঠু, আপনি কি বঙ্কিমদাদুর ভূত হয়ে এ-বাড়িতে থাকার কথা মানেন?'
'মানি বইকি।'
'আপনি কখনও ও-বাড়িতে ঢুকেছেন?'
'বহুবার।'
'গুপ্তধন খুঁজতে?' নোটন ফিক করে হেসে জিগ্যেস করে।
অবিনাশ জেঠু স্থির চোখে তাকান তার দিকে। নোটনের হাসিটা মোটেও ভালো ভাবে নিতে পারেননি তিনি। ঝুলনদিদিও কড়া চোখে তাকাল নোটনের দিকে। নোটন চুপ করে গেল। অবিনাশ জেঠু বলে চললেন, 'গাছ খুঁজতে ঢুকি। গাছের চেয়ে বড় সম্পদ কি আর আছে কিছু?'
'ঠিক বলেছেন।' ঝুলন আবার সায় দেয় তাঁর কথায়।
'কিন্তু একটা গাছ কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না গো, কত করে খুঁজছি। কোথায় যে লুকিয়ে পড়ল গাছটা। বঙ্কিমদাকে কত করে বললাম গাছের ঠিকানাটা আমায় বলে দাও। কিছুতেই দিলে না। বড় স্বার্থপর আর একরোখা ওই মানুষটা।'
'তাঁকে বললেন?' চোখ বড় বড় করে বলে নোটন, 'আপনি তাঁর ভূতকে দেখেছেন?'
'আর কিছু বলব না, আর কিছু বলব না', বলতে বলতে হঠাৎ দুদ্দাড় করে ওদের পাশ কাটিয়ে ছুটে মাঠের ভাঙা পাঁচিল গলে ঝোপের দিকে দৌড় মারলেন অবিনাশ জেঠু।
'মাথাটা একেবারে গেছে,' স্বগতোক্তি করে নোটন।
'আমার কিন্তু তা মনে হচ্ছে না রে নোটন, লোকটার কথাগুলো আপাতত প্রলাপ মনে হলেও কেন যেন আমার মনে হচ্ছে এই কথাগুলোর আড়ালে কী একটা যেন রহস্য লুকিয়ে আছে।'
'কী রহস্য গো ঝুলনদি?'
'সেটাই তো ভাবছি। আরো একটা কথা ভাবছি।'
'কী?'
'অবিনাশ জেঠুকে লোকে যতটা পাগল ভাবে লোকটা ততখানি পাগল নয়।'
'কী বলতে চাইছ বলো তো ঝুলনদি?'
'লোকটা বসন্তকুঞ্জ সম্পর্কে কিছু একটা জানে।'
'তুমিও কি গুপ্তধনের কথাটা বিশ্বাস করে নিলে নাকি?'
'অবিশ্বাসও করিনি পুরোটা।'
'তুমিও কি তাহলে গুপ্তধন খুঁজবে?'
'দেখা যাক। আগে তো চল বাড়িটায় ঢুকে দেখি।'
বঙ্কিমদাদুর বাড়িটা অদ্ভুত রকম নির্জন আর থমথমে। গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে নোটনের গা ছমছম করে উঠল। একসময় কাঠের ভারী দুখানা পাল্লা বসানো ছিল এখানে। এখন সেই পাল্লা খুলে পড়েছে। একটা মাটিতে পড়ে আছে একটু তফাতে। আর একটা ঝুলছে। যে-কোনো সময় জং ধরা কব্জা থেকে খুলে পড়ে যাবে। কী একটা পাখি গুব গুব করে ডাকছিল বাড়ির ভেতর থেকে। ঝুলন তার হাতে টান দিল, 'কী রে আয়—'
নোটন আর ঝুলন দুজনেই বাড়ির ভেতরে গিয়ে দাঁড়াল। একসময় ভেতরে একটা চৌকোনা উঠোন ছিল সম্ভবত। এখন পুরোটাই জংলি ঝোপ আর আগাছায় ভরে গেছে। ঝুলন বলল, 'ইশ, একসময় কত যত্ন-আত্তি ছিল হয়তো বাড়িটার। আর এখন কী ছিরি হয়েছে দেখ। বর্ষার পরে এখানে আর জঙ্গলের গুঁতোয় পা রাখাই যাবে না মনে হচ্ছে।' উঠোনের তিন দিক দিয়ে ঘোরানো উঁচু পাঁচিল। একদিকে পেল্লায় বাড়ি। অনেকগুলো ঘর আছে মনে হচ্ছে। নোটন অবাক হয়ে জিগ্যেস করল ঝুলনকে, 'একজন লোক একলা থাকবার জন্যে এতবড় একখানা বাড়ি বানিয়েছিল কেন বলো তো ঝুলনদি?'
'মানুষের কতরকম খেয়াল থাকে। পয়সা ছিল। মনে শখও ছিল বিস্তর। তায় মানুষটা একটু খ্যাপাটেও তো ছিল শুনেছি। না হলে পুকুর খুঁড়িয়ে পদ্মফুল ফোটানোর পরিকল্পনায় একটা আস্ত মাঠ কিনে কেউ অত খরচ করে?'
'ঠিক বলেছ', বলেই হঠাৎ চুপ করে গেল নোটন। চারপাশে তাকাতে লাগল সন্ধানী চোখে। আওয়াজটা ঝুলনেরও কানে গেছে নিশ্চিত। সে-ও তাকাচ্ছিল চারপাশে। নোটন বলল, 'কীসের আওয়াজ বলো তো?'
'কে জানে, কেমন যেন একটা চাপা গোঙানির মতন। একবারই শুনলাম। তার পরেই থেমে গেল।' উঠোনের মাঝখানে একটা পেয়ারা গাছ। তার ওপর থেকে একটা পাখি ডানা ঝটপট করে উঠল। আর কোত্থেকে যেন একটা টিকটিকি ঠিক ঠিক বলে চিৎকার করে উঠল এইসময়েই। নোটন চমকে উঠে ঝুলনের হাতটাকে শক্ত করে ধরে ফেলল। ঝুলন হাসল, 'একী রে, পাখির ডাক শুনেই অমন ভয় পেয়ে গেলি? সত্যি যদি বঙ্কিমদাদু এসে সামনে দাঁড়ান বন্দুক হাতে তাহলে তো ভিরমি খেয়ে যাবি তুই!'
'কথাটা কিন্তু হাসি-ঠাট্টা করার মতন নয়,' একটা কাঁপা কাঁপা গম্ভীর গলায় এবারে চমকে উঠল দুজনেই। প্রায় ম্যাজিকের মতন ভাঙা ভাঙা বাড়িটার মধ্যে থেকে ভেঙে ঝুলে পড়া কড়ি বরগার ফাঁক থেকে বেরিয়ে লোকটা ঝুলন আর নোটনের সামনে এসে দাঁড়াল।
ঝুলন সহজে ঘাবড়ানোর পাত্রী নয়। তবু সে-ও যেন কেমন থতমত খেয়ে গেল লোকটাকে দেখে। বেশ লম্বা লোকটার পরনে একটা প্রায় গোড়ালি পর্যন্ত নেমে আসা গাঢ় রঙের পাঞ্জাবির মতন পোশাক। মাথায় কাঁচা-পাকা উস্কো-খুস্কো চুল। গালে লম্বা দাড়ি। পুরোটাই প্রায় সাদা। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। ঝুলন আর নোটনের থতমত খেয়ে যাওয়া মুখদুটোর দিকে চেয়ে লোকটা আবার হাসল। তারপর একটু চাপা গলায় বলল, 'বঙ্কিমবাবুর সামনে এসে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা পুরোপুরি অবিশ্বাস কোরো না। এ-বাড়িটা সত্যিই খুব সুবিধের নয়।'
'আপনি কী করে জানলেন?' থতমত খাওয়া ভাবটা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তাকে প্রশ্ন করল ঝুলন।
'তোমরা জানো না বাড়িটা গোলমেলে?' ঝুলনের প্রশ্নটাকে আমল না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করল লোকটা।
'শুনেছি। আর সে জন্যেই দেখতে এসেছি, যে রটনা বাইরে শুনেছি তা সত্যি কিনা।' ঝুলন বলল।
'রটনা তো এমনি এমনি হয় না খুকি। তার কিছুটা অন্তত বাস্তব ভিত্তি থাকে। কাজেই অযথা অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় বাড়াবাড়ি করা কি ভালো? কখন কী ভাবে বিপদ আসে কেউ কি আগেভাগে বলতে পারে? আর তুমি তো কচি খুকিটি নেই। এ কথা বোঝার মতন বয়েস তোমার নিশ্চয়ই হয়েছে যে এমন অরক্ষিত জায়গায় তোমার মতন মেয়েদের বিপদে পড়ার সম্ভাবনাটা আরো অনেক বেশি...'
'জানি। কিন্তু যে ভয়টা আপনি আমাকে দেখাতে চাইছেন, অন্তত কোনো অশরীরি প্রেতাত্মার দিক থেকে সে ভয়ের সম্ভাবনা নেই নিশ্চয়ই।'
'লোকটা সরু চোখে ঝুলনকে জরিপ করল একটু। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, 'আমি তোমায় ভয় দেখাচ্ছি না, সাবধান করার চেষ্টা করছি। আর একটা খুব প্রয়োজনীয় কথা বলছি। পারলে মনে রেখে দিও।'
'বলুন।'
'দেখো সাহস খুব ভালো জিনিস। খুব দামি জিনিস। কিন্তু দুঃসাহস মোটেও ভালো জিনিস নয়। বিকেল হয়ে আসছে। জায়গাটা সত্যিই ভালো না। বাড়ি ফিরে যাও। একটু আগেই এখানে আমি একটা মস্ত সাপকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। সাপটা বিষধর। আর জায়গাটা দেখেই বুঝতে পারছ এমন সাপ এখানে যে একটাই আছে এমন নয়। কাজেই অনেক হয়েছে। এবারে বাড়ি চলে যাও।'
'এমন একটা বিপজ্জনক জায়গায় আপনিই বা কী করছেন আঙ্কল?' অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর নোটন জিগ্যেস করল তাকে।
'লোকটা হাসল, 'আমি সরকারি একটা সার্ভের কাজে এসেছিলাম। পুরনো যে বাড়িগুলোর কোনো ওয়ারিশন নেই, সেগুলোকে ভেস্টেড অ্যানাউন্স করে সরকার জায়গাগুলোকে জনকল্যাণমূলক কাজে লাগাতে চায়। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে আমরা জায়গাগুলোকে দেখে মার্ক করছি। এভাবে খুব শিগগির একটা ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরি করে সরকার নানা ভালো ভালো প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্ট করতে চাইছে।'
'আপনি কি সার্ভের কাজে আজকাল প্রায়ই আসেন এই বাড়িতে?' ঝুলন জিগ্যেস করল। লোকটা কেমন যেন চমকে উঠল। অপ্রস্তুত গলায় বলল, 'কেন বলো তো?'
'না এমনিই।' ঝুলন হাসে।
'আমি আজই প্রথম এলাম এখানে। এখন কলকাতা ফিরে যাব। আমাকে নিতে সরকারি গাড়ি আসবে। সেই গাড়ি অন্য কোন একটা গ্রামে এমনই একটা বাড়িতে আমার এক সহকর্মীকে আনতে গিয়ে ফেঁসে গেছে। সারাতে সময় লাগছে বলে আমি ওয়েট করছি। নয়তো এতক্ষণে আমার বেরিয়ে পড়ার কথা এখান থেকে।'
'আপনি তো তাহলে আরো কিছুক্ষণ আছেন এখানে। তাহলে আমাদের একটু বাড়ির ভেতরটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিন না সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে?' খুব আব্দারের ভঙ্গিতে বলে ওঠে ঝুলন। আর তখনই একটা গলা ভেঙে পড়া দরজার ওপাশ থেকে বলে ওঠে, 'বঙ্কিমবাবুর লুকিয়ে রাখা সোনা আর বোধহয় লুকোনো থাকল না। সবাই এখন গুপ্তধন খুঁজতে শুরু করেছে। বঙ্কিমবাবু একা কি আর সক্কলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন?'
লোকটা বিরক্ত হয়ে দরজার দিকে চাইতেই ঝোলা ব্যাগ কাঁধে অবিনাশজেঠুকে দেখা গেল। চোখদুটো ক্যামন যেন ঘোলাটে। নোটন আর ঝুলনের সামনে এসে বলতে লাগলেন, 'তোমাদের কোথায় দেখেছিলাম যেন...আটটা বাইশের আপ বারুইপুর, নাকি বনগাঁ লোকাল, তা নাহলে নির্ঘাত ডাউন ডায়মন্ডহারবার ট্রেনে...'
লম্বা লোকটা বিরক্ত হয়ে বলল, 'আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল। আবার পাগলের উৎপাত। তার পরেই কড়া গলায় ধমকে উঠলেন অবিনাশজেঠুর দিকে চেয়ে, 'চলুন এখান থেকে। এ বাড়ি সিল করে দেওয়ার অর্ডার আছে। একদম ঢোকা যাবে না এ-বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে।' অবিনাশজেঠু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন একটুক্ষণ লোকটার দিকে। তারপর কী মনে করে পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করলেন ভাঙা দরজা পার হয়ে মাঠের দিকে।
লোকটা এবারে ঝুলন আর নোটনের দিকে চাইল, 'কী হল তোমরাও চলো—' নোটন ঝুলনের দিকে চাইল একবার। ঝুলন চোখের ইশারায় চলে যাবার ইঙ্গিত দিল। লোকটার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির বাইরে পা রাখল ওরা। আর তখনই ওদের প্রায় পিছনেই ঝোপগুলোর মধ্যে কে যেন খুব মৃদু শব্দে ফ্যাচ করে হেঁচে উঠল। চলতে চলতেই দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। নোটন আর ঝুলনও। 'কে—কে ওখানে' বলে লোকটা দৌড়ে গেল একটা দুলতে থাকা ঝোপের দিকে। আর তখনই সেই ঝোপ থেকে একটা ধুমসো শেয়াল তার গোটা তিনেক বাচ্চা সমেত বাইরে বেরিয়ে এসে লোকটার দিকে কিছুক্ষণ জুল জুল করে তাকিয়ে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তিরবেগে অন্য একটা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
লোকটা চারদিকে সাবধানী নজর বুলোল বেশ কিছুক্ষণ ধরে। কিন্তু আর কিচ্ছু চোখে পড়ল না। আর কোনো শব্দও নেই কোথাও। কোনো কথা না বলে লোকটা হাঁটা লাগাল নোটন আর ঝুলনকে সঙ্গে নিয়ে। তারপর পকেট থেকে সেলফোন বের করে কাকে যেন ফোন করে বলল, 'গাড়ি রেডি হয়েছে? আমি বেরিয়ে এসেছি। রামগোপালপুর ছাড়িয়ে শহরে ঢোকার রাস্তার কাছে ওয়েট করব। ওখানে চলে এসো।'
সকালে হালকা টিফিন করে নিয়ে পড়তে বসেছিল নোটন। স্কুল ছুটি বলে আজ অঙ্কের শমিতস্যার বেলা দশটা থেকে পড়াবেন বলেছেন। পড়তে যাবার আগে অঙ্কগুলোকে একটু ঝালিয়ে নিচ্ছিল সে। হঠাৎ মা এসে মোবাইল ফোনটা ওর হাতে ধরিয়ে দিল। বলল, 'ঝুলন। তোর সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।'
'হ্যাঁ, ঝুলনদি বলো।' আগ্রহের সঙ্গে বলে নোটন। সক্কালবেলা ঝুলনদি মায়ের ফোনে ফোন করে তাকে চাইছে মানে নিশ্চিত গুরুতর কোনো খবর আছে।
'খবরটা শুনেছিস?'
'কী খবর?'
'অবিনাশজেঠু মারা গেছেন।'
'সে কী! কখন? কীভাবে?' উত্তেজিত গলায় বলে নোটন, 'কালই তো দেখা হল আমাদের সঙ্গে। তেমন কিছু অসুস্থ মনে হল না তো—'
'কাল সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে নাকি কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়েছিল রাতের ট্রেনে ওষুধ বিক্রি করবে বলে। এমনও বলেছিল যে খুব রাত হলে বাড়িতে নাও ফিরতে পারে।'
'বাড়ি না ফিরে কোথায় থাকবে?'
'তার আমি কী জানি। তবে শুনেছি এমন নাকি করতেনও মাঝে মাঝে। বাড়ির কেউ কিছু বলত না। এমনিতেই তো মানুষটা একটু ছিটেল ছিল।'
'তারপর?'
'আজ সকালে বঙ্কিমদাদুর বাড়ির পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা শহরের দিকে চলে গেছে বন-বাদাড়ের মধ্যে দিয়ে সেই রাস্তার ধারে মরে পড়ে থাকতে দেখা গেছে অবিনাশজেঠুকে।'
'ওই রাস্তায় কেন?'
'বেশি রাতের ট্রেনে স্টেশনে নামলে এদিকে আসার গাড়ি পাওয়া যায় না। অবিনাশজেঠু নাকি ওই রাস্তা দিয়ে শর্টকাটে হেঁটে বাড়ি ফিরতেন মাঝে মধ্যে।'
'কিন্তু ওই রাস্তায় তাঁকে সাত সকালে দেখল কে? ওদিকে তো আজকাল কেউ যায় না।'
'আমার মনেও ঠিক এই প্রশ্নটাই এসেছিল। তবে শুনলাম কারা নাকি মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে অবিনাশজেঠুর লাশ দেখতে পেয়ে গ্রামে বলে। তারপর যা হয়, থানা পুলিশ। পোস্ট মর্টেমের জন্যে বডি নিয়ে গেছে। মাথায় নাকি চোট রয়েছে। কেউ বলছে ট্রেন থেকে পড়ে গেছে। কেউ বলছে মাথায় শক্ত কিছু জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।'
'অবিনাশজেঠুর মতন একজনকে কে মারতে যাবে?'
'সেটাই তো আশ্চর্য।'
'আচ্ছা অবিনাশজেঠুর ব্যাগটা পাওয়া গেছে?'
'গুড কোশ্চেন। কিন্তু হঠাৎ এ কথাটা তোর মাথায় এল কেন?'
'এমন যদি হয় যে কাল ওষুধের বেচাকেনা ভালো হয়েছিল হয়তো। ব্যাগে টাকাপয়সা ছিল। কেউ চুরি-টুরি করার উদ্দেশ্যে জেঠুকে মারধর করতে পারে।'
'ব্যাগের কথা তো কেউ কিছু বলল না। সকলেই বলল অবিনাশজেঠু মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল রাস্তার পাশে। ব্যাস।'
'তুমি এতসব জানলে কী করে?'
'বাবা বাজারে গিয়ে শুনে এসে বলছিল। আমিও তারপর বাইরে বেরিয়েছিলাম। আমার শুধু মনে হচ্ছে ওই জায়গাটায় একবার গেলে ভালো হত। তুই যাবি?'
'যাব। কিন্তু কখন যাবে? আমার তো আবার শমিতস্যারের পড়া এখন'।
'ঠিক আছে পড়ে, বাড়ি যা। চান-খাওয়া সেরে বিকেলের দিকে চলে আয়। মাকে বলিস আমার কাছে রাত পর্যন্ত থাকবি। এখানেই আজ রাতে তোর খাওয়ার নেমন্তন্ন। আমি এখন একবার ঘুরে আসি। তোকে নিয়ে সন্ধেবেলা আর একবার যাব। কেন যেন বারবার আমার মনে হচ্ছে বসন্তকুঞ্জের ভেতরে ঢোকাটা খুব জরুরি। কিছু একটা ঘটছে ওখানে। তাছাড়া আরো কয়েকটা খটকা রয়েছে মনে। কিছুটা বুঝে গেছি। আর বুঝে গিয়েই এমন অবাক হয়ে গেছি যে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কার্য ও কারণ কিছুতেই মেলাতে পারছি না।'
'আমি এখনই তোমার কাছে আসছি। আজ আর পড়তে যাব না।'
'কাকিমা রাগ করবে কিন্তু।'
'করুক। আমি অতক্ষণ কৌতূহল ধরে রাখতে পারব না। আমি ঠিক বুঝতে পারছি কিছু একটা গণ্ডগোলে ব্যাপার ধরে ফেলেছ তুমি।'
'তুই আয় তারপর বাকি কথা হবে।'
চান-টান করে দ্রুত তৈরি হয়ে নিল নোটন। মা বলল, 'কী ব্যাপার রে? এমন তড়িঘড়ি চললি কোথায়?'
'ঝুলনদির সঙ্গে একজায়গায় যাব। বিকেলে ফিরব। ফিরে ওর কাছে পড়াশোনা করে নেব। রাতে ওখানেই নেমন্তন্ন। খেয়েদয়ে ফিরব।'
'জানি না বাপু, কী তোদের সারাদিনের এত কার্যক্রম,' গজগজ করতে করতে মা রান্নাঘরের দিকে চলে যেতেই বইয়ের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল নোটন।
ঝুলন তৈরি হয়েই ছিল। নোটন আসতে একগাল হেসে বলল, 'খাওয়া- দাওয়া কিছু করেছিস, নাকি উত্তেজনায় না খেয়েই ছুটে চলে এলি?'
নোটন উত্তর না দিয়ে হাসে।
'বুঝেছি,' বলে হাঁক ছাড়ে ঝুলন, 'মা , নোটনকে কিছু খেতে দাও।'
যেখানে অবিনাশজেঠুর লাশ পাওয়া গিয়েছিল সে জায়গাটা বেশ দূর। পাকদণ্ডী রাস্তাটা ধরে অনেকখানি হেঁটে গিয়ে যেখানে রেললাইন আর নির্জন লেভেল ক্রশিংটা সেইখানে। নোটন বলল, 'ঝুলনদি আমরা কি অতদূর হাঁটব এখন?'
'উঁহু।'
'তবে?'
'আমরা বঙ্কিমদাদুর বাড়ির সামনের মাঠ আর বসন্তকুঞ্জের ভেতরে যাব।'
'এখন? কেন?'
'তুই না বলেছিলি বাড়িটায় রহস্য আছে।'
'বলেছিলাম। কিন্তু বাড়িটা তো সরকার অধিগ্রহণ করেছে শুনলাম।'
'বাজে কথা। আমাদের মিথ্যে কথা বলে লোকটা কাল ভাগিয়েছে ওখান থেকে।'
'ভাগিয়ে তার লাভ?'
'আছে নিশ্চয়ই। সেটাই তো বোঝার চেষ্টা করছি। তবে তুই যে বলেছিলি বাড়িটায় রহস্য আছে সেটা আমি মেনে নিয়েছি। তা নাহলে একটা লোক কেন ওই বাড়িতে ঢুকেও আর বেরোল না? কেন ছদ্মবেশে আমাদের খুব পরিচিত একজন আমাদের ধোঁকা দিয়ে ওই বাড়িতে ঢোকায় বাধা দিয়ে জোর করে বাইরে নিয়ে চলে এল একরাশ মিথ্যে কথা বলে? অবিনাশজেঠুই বা দুম করে আজ মরতে গেল কেন? তাছাড়া—'
'এর পরেও আরো রহস্য আছে?'
'থাকতেও পারে। অবিনাশজেঠুর সোনাদানার গল্প কি শুধুই পাগলের প্রলাপ নাকি তার পিছনেও কোনো লুকোনো সত্য আছে? বসন্তকুঞ্জে কোন গাছ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন তিনি?'
'এই ছোট মাথায় এত রহস্য কী করে বয়ে বেড়াচ্ছ বলো দিকি। আমি তো আমার পাকা মাথাতেও একটা রহস্যের কূলকিনারা করতেই হিমসিম খেয়ে গেলাম গো' গায়ের পিছন থেকে চাপা গলায় কথাগুলো শুনে চমকে পিছন ফিরে তাকাল ঝুলন আর নোটন। মাঠের পাশের ঝোপের ধারে তখনই লোকটাকে চোখে পড়ল তাদের। ক্ষয়াটে চেহারা। মলিন পোশাকের বেঁটেখাটো মানুষ একটা। লোকটা আর একটু কাছে এগিয়ে এসে বলল নোটনের দিকে তাকিয়ে, 'আমায় চিনতে পারবে কি আর, আমি তোমার দাদুর কাছে গিয়েছিলাম দিন দুই আগে।'
'আপনার নাম তারক দাস?' নোটন বলে।
'হ্যাঁ'।
'আপনার বন্ধুই এই বসন্তকুঞ্জে গায়েব হয়ে গেছে?' ঝুলন বলে।
'ঠিকই বলেছেন দিদি'। তারক উপর-নীচ মাথা নাড়ে।
'এখনও তার সন্ধান কিছু পাননি?'
'কিছু পেয়েছি আবার কিছু পাইনি।'
'এ কীরকম কথা?' অবাক হয়ে বলে নোটন।
'এ বাড়িটা বড্ড গোলমেলে ভাই,' তারক মাথা নাড়ায়। আমি কদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছি বাড়িটার ভেতরে একটু সুলুক সন্ধান করব বলে, কিন্তু ঢুকতে পারছি না।'
'কেন?'
'পাহারা রয়েছে।'
'পাহারা?' অবাক হয়ে বলে ঝুলন।
'হ্যাঁ গো। কারা যেন নজরদারি করছে। সবসময় তাদের দেখতে পাই না, কিন্তু বুঝতে পারি। আমাদের চোখ-কান তোমাদের থেকে অনেক বেশি সজাগ তো। এই তো কালই ঢুকে পড়েছিলাম প্রায়। ওই বূড়ো লোকটা ঝামেলা পাকাল। তোমরাও তো দেখলাম ঢুকতে আর পারলে না। কাল আমি ঠিক ঢুকে পড়তাম লোকটার চোখে ধুলো দিয়ে। কিন্তু ওই যে মোক্ষম সময়ে হেঁচে ফেললাম। এমন ভয় পেয়ে গেলাম। ধরা পড়ার ভয়ে এ-চত্বর থেকে সরে দূরে গা ঢাকা দিলাম। রাতে ফিরে এসে দেখলাম আর এক কাণ্ড। সেই বুড়ো লোকটা আবার এসে বাড়ির মধ্যে ঢুকছে চুপি চুপি, গুটি গুটি পায়ে।
আমি গা ঢাকা দিয়ে ব্যাপারটা দেখছিলাম। কিন্তু সেই একই কাণ্ড আবার। লোকটা ভেতরে ঢোকার খানিক পরেই একটা হাল্কা আওয়াজ, গোঙানির শব্দ। একটা ছায়া মূর্তি সরে গেল। বুড়ো লোকটা আর বেরিয়ে এল না। খানিক পরে ওই জঙ্গুলে পথটায় দেখি হেডলাইট নিভিয়ে একটা গাড়ি আসছে ধীর গতিতে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে ভরসা পেলাম না। আজ সকালে শুনি রেললাইনের ধারে পথের ওপরে একটা বুড়ো নাকি মরে পড়ে আছে। কী অদ্ভুত ব্যাপার। গিয়ে দেখি কালকের সেই পাগলাটে বুড়োটাই।
আজ অনেকক্ষণ ধরে এই মাঠের জংলি ঝোপে ঝাড়ে লুকিয়ে বাড়িটার ওপরে নজর রাখছিলাম। মনে হল আজ আর পাহারা নেই। বাতাসটা বেশ সূক্ষ্ম। তাই বাড়িটার দিকে পা বাড়িয়েছি। এমন সময় দেখি তোমরা।'
ঝুলন কেমন যেন অন্যমনস্ক গলায় তার কথা শুনছিল। তারক থামতেই সে বলে উঠল, 'কাল রাতে অবিনাশজেঠু বসন্তকুঞ্জে এসেছিলেন?'
'এসেছিলেন'। ঘাড় নাড়াল তারক।
'কাঁধে সেই ব্যাগটা ছিল?'
'ছিল।'
'আজ ওঁর ডেডবডি তুমি দেখেছ বললে না?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ।'
'তখন আশেপাশে সেই ব্যাগটা দেখতে পেয়েছিলে?'
'কই না।'
'চলো আমরা তাড়াতাড়ি বসন্তকুঞ্জে যাই। বাড়িটা আমায় যেন টানছে।' অধৈর্য হয়ে বলে ঝুলন।
ওরা তিনজনেই ভাঙা সদর দরজা পেরিয়ে ঢুকে পড়ে বসন্ত কুঞ্জের অন্দরমহলে।
উঠোন পেরিয়ে দালান। তারপর একটা বড় ঘর। এটা সম্ভবত বাইরের ঘর। দালানের ওপর পর্যন্ত লতাপাতায় ছেয়ে গেছে। দালানের পিলার ফাটিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে অশ্বত্থ আর ডুমুর গাছ। নোটন বারান্দার ধারে একজায়গায় এসে থমকে গেল। চাপা গলায় ডাক দিল, 'ঝুলনদি—'
'কী বল,' বলে তার দিকে এগিয়ে এল ঝুলন।
'এই দেখ,' বলে ডান হাতের তর্জনী দিয়ে একদিকে ইশারা করে নোটন। ডুমুর গাছের ঝুপসি খরখরে পাতা আর ডালের মাঝে আটকে আছে অবিনাশজেঠুর কাপড়ের ঝোলা ব্যাগটা। ব্যাগ কাত হয়ে কাগজের টুকরোর ছোট ছোট মোড়ক ছড়িয়ে আছে গাছতলায়, পাতার ফাঁকে। ঝুলন হাত বাড়িয়ে ব্যাগটার নাগাল পেল না। 'আমি দেখছি', বলে একটা লাঠি কুড়িয়ে এনে তারক কায়দা করে ব্যাগটা পেড়ে আনল। ব্যাগের ভেতরে তখনও দু-চারটে পুরিয়ার মতন মোড়ক আর খান তিনেক শিশি রয়েছে দেখা গেল। আর রয়েছে একটা বেশ পুরনো লাইনটানা বঙ্গলিপি খাতা। ঝুলন খাতার পৃষ্ঠা উলটেপালটে দেখতে দেখতে উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, 'ইন্টারেস্টিং।'
'কী গো ঝুলনদি?'
'বঙ্কিমদাদু সোনাপুরের কোন এক উকিল মধুসূদন রায়কে দিয়ে তাঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উইল করিয়েছিলেন।'
'মধুবাবুকে দেখেছি আমি দিদিমণি। বুড়ো মানুষ। খুব ভুগতেন। বাড়িতে থাকতেন বেশিরভাগ সময়, কিন্তু মানুষটা খুব দুঁদে আর সাচ্চা ছিল।' তারক বলল অবাক হয়ে,'তা তিনি গত হয়েছেন তাও অনেক বছর হল। কিন্তু তিনি তো গোপন কথা ফাঁস করার লোক নন। তাছাড়া যে লোকটার কথা বলছ, আমার মনে হচ্ছে আজ মরে যাওয়া বুড়োর কথাই বলছ নিশ্চিত, তার সঙ্গে মধুবাবুর এসব কথা হবে কীভাবে?'
'তাও লেখা আছে। মধুবাবুর শেষ সময়ে অবিনাশজেঠু ওনাকে কবিরাজি চিকিৎসা করেছিলেন। সেই সময়ে তিনি বঙ্কিমবাবুর সম্পত্তির কথা বলেন ওনাকে। আরো বলেন ওই সম্পত্তির সঠিক বন্দোবস্ত না হলে মানুষটা মরেও শান্তি পাবে না হয়তো।'
'অবিনাশজেঠু সে সম্পত্তির খোঁজ পেয়েছিলেন নাকি?' নোটন চোখ বড় বড় করে বলে।
'সম্ভবত না।'
'সে কী? কী করে জানলে?'
'মধুবাবু তাঁকে সাংকেতিকভাবে বলেছিলেন উইল কোথায় আছে। মানুষটা তো সাচ্চা ছিলেন তারকদার মুখে শুনলি। কাজেই নিজের কাছে ঠিক থাকার জন্যে সরাসরি কোথায় রাখা আছে জিনিসগুলো অবিনাশজেঠুকে বলেননি তিনি। শুধু বলেছিলেন, যে গাছ জলে, যে গাছ স্থলে, খোঁজ করো সেই গাছের তলে।'
'উরিব্বাস এ যে একেবারে রহস্য গল্পের মতন ব্যাপার গো', নোটন বলে, 'আমরা কি তাহলে এখন সেই লুকোনো সম্পদ খুঁজে বের করার চেষ্টা করব নাকি?'
'দেখা যাক। তবে প্রথমে খোঁজ করা দরকার তারকদার বন্ধু কী করে হারিয়ে গেল। মানুষটাকে খুঁজে বের করার পর ধাঁধার ব্যাপারটা ভাবা যাবে—'
'এর পিছনে কি ভৌতিক কোনও ব্যাপারস্যাপার সত্যিই আছে নাকি ঝুলনদি?'
'না'।
'তুমি নিশ্চিত?'
'হ্যাঁ'।
'কী করে এমন নিশ্চিত হলে তুমি?'
'চোখ-কান খোলা রাখলে তুই নিজেও অনেকটা বুঝতে পারতিস।' বলতে বলতে বারান্দা পেরিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে ঝুলন। পা টিপে টিপে। সন্তর্পণে। নোটন আর তারকও ঢুকে পড়ে। ঘরে ঢুকে চারপাশে চোখ বুলোতে থাকে ঝুলন। একজায়গায় এসে থমকে দাঁড়ায়। মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে। তারপর চাপা অথচ উত্তেজিত গলায় বলে, 'দেখে যা নোটন।'
'কী' বলে মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে নোটন।
'ঘরের মেঝেয় জমে থাকা পুরু ধুলোর মধ্যে একটা চওড়া দাগ সোজা দরজা পর্যন্ত চলে গেছে। এ দাগটার ওপরে অনেক পায়ের ছাপ। কোথাও দাগের ওপরে আবার হাল্কা ধুলোর আস্তরনও পড়েছে। মানে কয়েকদিন আগে ভারী কিছু এখান দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাছাড়া মেঝের ওপরে ভেতরের ঘরের দিকে যাওয়ার দরজার কাছে মোম জমে আছে। অর্থাৎ মোমবাতি জ্বালানো হয়েছিল এখানে। ঘরের কোণে নিশ্চয়ই তুই সিগারেটের টুকরো খেয়াল করেছিস?' বলে একদিকে দেয়ালের কাছে সরে গেল ঝুলন, 'এই দেখ, দামি সিগারেটের টুকরোও আছে আবার বিড়ির টুকরোও রয়েছে। বাইরে ঝোপের ওপরে আমি তিরঙ্গার প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখেছি ঢোকার সময়ে। এখন ভেবে দেখ, ভূতের কি এসব জিনিস লাগে?'
'তার মানে যা কিছু এখানে ঘটছে তা মানুষেরই ঘটানো?'
'একদম?'
'কিন্তু সে লোক কে?'
'কে না কারা। এখানে একাধিক লোকের নিত্য আনাগোনা আছে। এখানে তারা ঘাঁটি গেড়ে থাকেও রাতে। তাদের একজনকে আমি চিনে ফেলেছি। কিন্তু উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারিনি এখনও।'
'কিন্তু যে ছায়া মূর্তি আমি নিজে দেখেছিলাম?' তারক বলে অবাক হয়ে।
'খুব সম্ভবত মোমবাতির আলো পিছন থেকে পড়ায় ওই দীর্ঘ ছায়া তৈরি হয়েছিল। মানে ছায়াটাকে ব্যবহার করা হয়েছিল প্ল্যান করে।'
'কিন্তু এতকিছু করা হচ্ছে কেন? এ-বাড়ির ওই লুকোনো সম্পদের কথা কী বলছিলেন, ওইসব হাতানোর জন্যে খোঁজ তল্লাশ চালানোর প্রয়োজনে?' তারক জিগ্যেস করে।
'না বোধহয়। ওরা সম্পত্তির ব্যাপারে কিছু জানে বলে মনে হয় না। এখানে অন্য কিছু একটা ঘটছে। না হলে রাতে এখানে আলো নিভিয়ে গাড়ি আসবে কেন?'
'ঠিক বলেছ।' নোটন বলে। 'পাহারাদারের ব্যাপারটা তাহলে ঠিকই বুঝেছিলাম,' তারক বলে, 'এখানে বেশিক্ষণ আমরা তাহলে আর নিরাপদ নই দিদিমণি। আজ ওই খুনখারাপির জন্যে লোকগুলো হয়তো বাইরের পরিস্থিতি নজর করতে এদিকের পাহারায় ঢিলে দিয়েছে। ওদের লোকবল কম বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু যে-কোনো সময় ওরা আবার এসে পড়লে আমরা বিপদে পড়ে যেতে পারি।'
'আচ্ছা তারকদা, অবিনাশজেঠুর মৃত্যুটা যে খুন তা তুমি নিশ্চিত হলে কী করে?' ঝুলন বলে ওঠে।
'মনে হল দিদিমণি। আমার অমন হামেশাই মনে হয়। আসলে এসব লাইনে থাকলে এইসব মনে হওয়াগুলো খুব ফলে যায়।' বলে চুপ করে গেল তারক। তারপর নিজেই আবার তাড়া দিল, 'আমরা বরং ভেতরের ঘরগুলো দেখে নিই এই ফাঁকে। আমার মনে হচ্ছে বিশুকে এখান দিয়েই টেনে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।'
ঝুলন এবারে চমকে উঠল। বলল, 'আমারও মনে হচ্ছে তোমার মনে হওয়াগুলো সত্যিই ফেলনা নয় তারকদা। চলো ভেতরে ঢুকে পড়ি আমরা।'
ঝুলন নোটন আর তারক ভেতরের দিকে হাঁটা দিল। ভেতর দিকে একটা চৌকোনা ঘর। তাকে ঘিরে দু-দিকে আরো তিন-চারখানা ঘর। সব ঘরের দেওয়ালেই পলেস্তারা খসে পড়েছে। ঝুল ঝুলছে দেওয়াল থেকে। এই দিনেরবেলাতেও বাড়ির ভেতরটা অন্ধকার হয়ে আছে।
বাইরের ঘরের খোলা দরজা দিয়ে যে ক্ষীণ আলো এসে পড়ছিল, তাইতেই ঝুলন নীচু হয়ে পায়ের ছাপ, জুতোর দাগ বা অন্য কিছু পাওয়া যায় কিনা দেখার চেষ্টা করছিল।
তারক হেসে ফেলল। বলল, 'ও ভাবে পাবে না কিছু দিদি। দাঁড়াও বন্ধ ঘরের দরজা জানালা খুলে দিয়ে দেখি যদি আলো আসে এ বাড়ির ভেতরে।'
নোটন বলল, 'কতদিন যে এ বাড়ির ভেতরে আলো ঢোকেনি কে জানে। ভেতরটা ক্যামন যেন ভ্যাপসা আর গুমোট হয়ে আছে'। ঘরের দরজাগুলো পরীক্ষা করতে গিয়ে অবাক হয়ে গেল তারক। চাপা গলায় বলল, 'দিদি, দেখে যাও।' ঝুলন এগিয়ে গিয়ে দেখে বলল, 'তার মানে এখানে তো কেউ দিব্বি ঘাঁটি গেড়ে বসেছে গো তারকদা।'
নোটনও ব্যাপারটা দেখল। দুটো ঘরের দরজা এমনিই ভেজিয়ে রাখা থাকলেও বাকি ঘরদুটোর দরজা বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে রাখা। তালাগুলোও একেবারে নতুন। প্রথমে তালা দেওয়া নেই এমন একটা ঘরে ঢুকল ঝুলনরা। ঘরে ঢুকে জানালা খুলে দিল। অমনি বাইরে থেকে একঝাঁক আলো লাফিয়ে এসে ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে। এই ঘরটা দিব্বি সাফসুতরো করা হয়েছে। ভেতরে পরিপাটি করে মাদুর পাতা। এককোণে জলের জাগ, গ্লাস, সিগারেটের প্যাকেট, এমনকী মদের হাফ ভর্তি বোতলও।
তারক বলল, 'এ-ঘরে বেশিক্ষণ থেকে লাভ নেই। চলো দিদিমণি অন্য ঘরগুলো দেখি। যে ঘরগুলো তালা দেওয়া, রহস্য নিশ্চিত সেখানেই বাসা বেঁধে আছে।'
ঝুলন তারকের মুখের দিকে তাকাল একবার। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, 'আমাকে বার বার অমন দিদিমণি দিদিমণি কোরো নাতো তারকদা, বিচ্ছিরি লাগে আমার। আমার নাম ঝুলন। তুমি আমাকে নাম ধরেই ডেকো।'
'আমি সামান্য মানুষ,' হাত কচলাতে কচলাতে বলে তারক, 'ছোট কাজ করে এসেছি কতদিন...'
'থামো তো, মানুষ মানুষই। তার আবার ছোট-বড় কীসের? মানুষ ছোট-বড় হয় বয়েসে। তুমি আমার চেয়ে বয়েসে বড়। অতএব আমায় তুমি নাম ধরে ডাকবে ব্যাস।'
'ঝুলনদিদি, মানুষ কর্মেও ছোট-বড় হয় গো', তারক মাথা নেড়ে বলে, 'আমার কর্ম ভালো নয় গো।'
'আবার বাজে কথা', এবারে ধমক লাগায় ঝুলন, 'অতই বোঝো যখন তাহলে কথা দাও অমন ছোট কাজ আর তুমি করবে না।'
'তাই তো চাই। মন থেকেই চাই,' করুণ স্বরে বলে তারক। ঝুলন তার উত্তরে কী একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। অদ্ভুত একটা আওয়াজ আসছে কোনো একটা ঘরের ভেতর থেকে। কষ্টের আওয়াজ। চাপা। গোঙানির মতন।
বন্ধ তালা দেওয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করে ঝুলন, 'ঘরে কেউ আছেন?' তার কথাগুলো ঝুল পড়া দেওয়ালে ধাক্কা খেল খানিক, কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। অসহায়ের মতন সে তাকায় তারকের দিকে। দরজার দিকে চেয়ে বলে, 'কী করা যায় বলো তো তারকদা?'
'কী করতে চাইছ? দরজা খুলবে?'
'হুঁ', ঝুলন অধৈর্য হয়ে বলে, 'তালা দেওয়া দরজার ওপাশে যদি কেউ থাকে সে অন্তত আমাদের শত্রু হবে না। তার আমাদের সাহায্যেরই দরকার। দেখো, তোমার বন্ধুকেই এরা হয়তো এখানে আটকে রেখেছে কোনো মতলবে।'
'দাঁড়াও দেখছি,' বলে প্যান্টের পকেট থেকে অনেকটা পেরেকের মতন দেখতে একগোছা লোহার কাঠি বের করে তারক। ঝুলন আর নোটনের দিকে চেয়ে একগাল হাসে। বলে, 'জীবনের কোনো শিক্ষাই একেবারে ফেলা যায় না দেখছি।' তারপর অদ্ভুত কায়দায় সেই কাঠি দরজায় ঝোলানো তালার মধ্যে ঢুকিয়ে কিছুক্ষণের কসরতে একটা ঘরের দরজা খুলে ফ্যালে তারক। ঘরে ঢুকে ঝুলন অবাক হয়ে যায়। ঘর ফাঁকা। কেউ নেই।
হঠাৎ ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ লেগে থাকা একটা গামছা তড়িৎ গতিতে হাতে তুলে নেয় তারক দাস। তারপর সন্ধানী চোখে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে ঘুরতে থাকে ঘরময়। ঘুরতে ঘুরতে বাগানের দিকের একটা জানালার কাছে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। জানালার পাল্লা খোলে। জানালার শিকগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে থাকে সে হাত ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে। তার মুখে ক্রমশই অনাবিল আনন্দ আর হাসির রেখা ফুটে উঠতে শুরু করে এবার। ঝুলন এগিয়ে যায় তার দিকে। জিগ্যেস করে, 'কী ব্যাপার তারকদা? কী হল তোমার?'
তারক তার দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলে, 'বিশু এখানেই আটক ছিল এ বিষয়ে আর গোল নেই কোনো। তার চোটও ছিল। কিন্তু এখন সে নির্ঘাত সামলে নিয়েছে নিজেকে। এখান থেকে সে পালিয়েছে। খুব সম্ভব আজকেই। প্রহরা নেই বুঝতে পেরে।'
'কী করে বুঝলে?' নোটন অবাক হয়ে জিগ্যেস করে।
'এই যে এই কর্মটি,' বলে জানালার শিকের ওপরে আবার হাত বোলাতে থাকে তারক।
'কী যে ছাই বলছ কিচ্ছু বুঝতে পারছি না তারকদা,' ঠোঁট উলটে বলে ঝুলন।
'এখানে এসো,' বলে ঝুলনকে কাছে ডাকে তারক। তারপর জানালার শিকগুলো দেখিয়ে বলে, 'দেখতে পাচ্ছ শিকগুলো হাল্কা বেঁকে আছে। হাত দিলে দেখবে নড়বড়েও লাগছে একটু।'
'তাতে কী?'
'হুঁ হুঁ বাবা, এমন মাখনের মতন হাত এ-তল্লাটে বিশু ছাড়া আর কারো নেই গো। সাধনা একেবারে। আমরা এই বিদ্যে তো বিশুর কাছে একেবারে শিশু। জানালার শিক-টিক আমরাও খুলে ফেলতে পারি, কিন্তু এমন ছিমছাম কাজ... শিক বেঁকিয়ে বাইরে বেরিয়ে আবার তাকে বেঁকিয়ে আগের মতন করে রেখে গেরস্তকে ফাঁকি দেওয়া এ বিষয়ে বিশুর জুড়ি নেই।' বলতে বলতে বন্ধুর জন্যে গর্বে একেবারে চোখ মুখ চকচক করে উঠল তারকের। তা দেখে ঝুলনের হাসি পেল। ভালোও লাগল।
মানুষটা সহজ। নাহলে একই লাইনে থেকেও বন্ধুর এই সাফল্যকে ঈর্ষা না করে এমন খোলা মনে কজন প্রশংসা করতে পারে। তারকই তাড়া লাগায় আবার, 'চলো, পাশের ঘরের তালাটা খুলে দেখি ও-ঘরটায় কী আছে। সময় নষ্ট করলে বিপদ হতে পারে কিন্তু।'
'চলো চলো,' বলে তড়িঘড়ি সেই ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ায় ওরা। আগের বারের মতনই প্রায় অনায়াসেই এ-ঘরের দরজার তালাটাও তারক খুলে ফেলল তার আজব যন্ত্র দিয়ে। তারপর ঝুলনের দিকে চেয়ে বলল, 'চলো ঢুকে পড়া যাক।'
দু হাত দিয়ে দরজার পাল্লা খুলে ফেলে ঝুলন ধাক্কা দিয়ে। তারপর নোটনের দিকে ফিরে বলে, 'আয়।' নোটন দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকার আগেই ঝুলন ভেতরে ঢোকে আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকার করে ওঠে তারকদা শিগগির এসো। নোটন তাড়াতাড়ি আয়।
ঘরে ঢুকে সকলেই অবাক হয়ে গেল। এই ঘরের মধ্যে মাদুর পাতা। আর সেই মাদুরের ওপরে দেওয়ালের গা ঘেঁষে পর পর শুয়ে আছে চারটি মেয়ে। ঝুলনেরই বয়েসি প্রায়। তার থেকে সামান্য ছোট বা বড় হতে পারে। তাদের প্রত্যেকেরই হাত-পা এবং মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা।
ঝুলনদের ঘরের মধ্যে ঢুকতে দেখে তাদের চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আর্তি ফুটে উঠল। ঝুলন তাড়াতাড়ি করে তাদের কাছে গিয়ে হাত-পা মুখের বাঁধন খুলে দিল। অবাক গলায় জিগ্যেস করল, 'তোমরা কারা? এখানে এলে কী করে?'
মেয়েগুলো ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। তাদের মধ্যে একজন নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, 'আমাদের ফুসলে ধরে নিয়েছে। একটা মেয়েকে দেখিয়ে বলল, ওর বাড়ি হিঙ্গলগঞ্জ, আমি থাকতাম বাগনান। আমাদের চাকরি দেবার টোপ দিয়ে ধরে এনেছে আমাদের পরিচিত একজন। ওদের এনেছে বাবা অথবা মায়ের অ্যাকসিডেন্টের গল্প শুনিয়ে। বলেছে হাসপাতালে ভর্তি, কন্ডিশন খুব খারাপ এইসব। আরো কত কী বলে ভয় দেখিয়েছে। ধর আমরা এখানে চালান হয়ে এসেছি। এরা আমাদের কিনে নিয়েছে। এবার আমাদের বেচে দেবে জানেন?'
'মানুষ বেচে দিতে পারে অন্য মানুষকে? কোথায় বেচে দেবে তোমাদের?' অবাক হয়ে বলে নোটন।
মেয়েগুলো মাথা নীচু করে ফেলে। নোটনের প্রশ্নের জবাব দেয় না কোনো।
ঝুলন নোটনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। শান্ত ধীর কণ্ঠে বলে, 'তুই এখনও ছোট তো নোটন, সব কিছু বুঝবি না। পৃথিবীতে এমন অনেক চোরা গলি আছে যেখানে একবার হারিয়ে গেলে মূলস্রোতে ফিরে আসা খুব কষ্টকর হয়ে যায়। প্রায় অসম্ভবই বলতে পারিস। মানুষের লোভ আর অমানবিকতা তাদের ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে চলে যায়। সব বুঝেও সেখান থেকে তখন আর নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। ওরাও বিক্রি হয়ে গেলে অমনই একটা চোরা গলিতে চিরকালের মতন হারিয়ে যাবে।'
মেয়েগুলো উঠে দাঁড়িয়ে ঝুলন, তারক আর নোটনকে ঘিরে ধরল। অনুনয় করতে লাগল তাদের বাঁচানোর জন্যে। ঝুলন তাদের হাতে হাত রাখল। নরম গলায় বলল, 'একদম চিন্তা কোরো না। আর একটুও ভয় নেই তোমাদের। তোমরা এখন নিরাপদ।
তারক বলে উঠল, 'চলো দিদিরা, আমরা একসঙ্গে সবাই এবার এই অন্ধকূপ থেকে আলোয় বেরিয়ে পড়ি।'
'চলো', বলে ঘর থেকে বাইরে বেরোতে গিয়েও দরজার পাশের দেওয়ালটার দিকে চেয়ে ঝুলন হঠাৎ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেওয়ালের ওপর ঝুঁকে পড়ে মন দিয়ে কী দেখতে লাগল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। হাতের আঙুল দিয়ে মাঝে মাঝে ঘষতে লাগল দেওয়ালের ওপর জমে থাকা ঝুলের আস্তরন। তারপর আপন মনে বিড়বিড় করতে লাগল, 'যে গাছ জলে, যে গাছ স্থলে, খোঁজ করো সেই গাছের তলে'। আর তখনি বাইরের বারান্দায় পায়ের শব্দ উঠে এল বাইরে থেকে। আর একটা চাপা ধমক, 'যাই বলিস তুই, বাড়ি ফাঁকা রেখে বাইরে মজা দেখতে যাওয়া একেবারেই ঠিক হয়নি তোর। একে বুড়োটাকে মেরে আশপাশে লোক সমাগম বাড়িয়ে দিলি। তারপর সেই ছেলেমেয়েদুটো আবার অ্যাডভেঞ্চারের জন্যে এই বাড়িটাই বেছে নিয়েছে দেখলাম কাল। আবার কখন ফিরে আসে কে জানে। ভালোয় ভালোয় আজ রাতে মেয়েকটাকে বসের গাড়িতে তুলে দিতে পারলে এবারের মতন নিশ্চিন্তি। যা দাম পাচ্ছি, এবার কদিন ধান্দা ছেড়ে সমাজ সেবা, টেবা করে বা কোথাও ঘুরতে-টুরতে গিয়ে সময় কাটানো যাবে এখান থেকে সরে গিয়ে।'
গলাটা চিনতে অসুবিধা হল না নোটনের। ঝুলনেরও অসুবিধা হবার কথা নয়। কাল বিকেলেই তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে এখানে লোকটার। কিন্তু ঝুলনদিদির মুখটা অমন থমথমে হয়ে উঠছে কেন ক্রমশ? কপালে ভাঁজ, চোখে বিরক্তি আর রাগ? ঝুলনের এই ভাবান্তরের কারণ ভাবতে লাগল নোটন।
তারক ভয় পাওয়া গলায় বলল ফিসফিস করে, 'এবারে কী করবে? আমরা যে ধরা পড়ে গেলাম দিদি। এই ভয়টাই করছিলাম এতক্ষণ। এখানে লুকিয়ে পড়বার মতন জায়গাও তো কোথাও নেই।'
যে মেয়েগুলো ঘরের মধ্যে বন্দি ছিল এতক্ষণ, তাদের মুখগুলোও মুহূর্তের মধ্যে এক্কেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেল ভয়ে। কোথাও লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করার আগেই আগের দিনে দেখা বয়স্ক দাড়িওলা লোকটার সঙ্গে আর একজন শক্ত সমর্থ জোয়ান লোক বাইরের ঘর পেরিয়ে ঢুকে পড়ল বসন্তকুঞ্জের অন্দরমহলে। ঝুলনদের একেবারে মুখোমুখি। ঝুলনদের সামনাসামনি হয়ে দাড়িওলা বয়স্ক মানুষটার মুখ রাগে লাল হয়ে গেল।
ঘরের মধ্যে একটু আগেও আটক ছিল যে মেয়েগুলো, তাদের মুখের ওপর থমথমে মুখে একবার চোখ বুলিয়ে নিল লোকটা। তারপর স্থির চোখে সে তাকাল ঝুলন আর নোটনের দিকে। অসম্ভব ঠান্ডা গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলতে লাগল, 'আমি তোদের কাল একটা সুযোগ দিয়েছিলাম। তোরা শুনলি না। কালই বলেছিলাম, কৌতূহলে সবসময় একটা সীমা টানা উচিত। তোরা আমার পরামর্শ কানেই তুললি না। কী করব বল। কপাল খারাপ তোদের। ভালোভাবে বাঁচা তোদের কপালে নেই। আর তো তোদের ছেড়ে দেওয়া যায় না। তোরা যে বড্ড বেশি কিছু জেনে গেছিস এখন...'
নোটনের ভয় করছিল। কিন্তু ঝুলন খুব স্বাভাবিক গলায় বলে উঠল, 'যতটা ভাবছেন আমরা তার থেকেও বেশি জেনে গেছি।'
'কী বলতে চাইছিস তুই?' লোকটা চিৎকার করে উঠল রুক্ষস্বরে।
'বলতে চাইছি যে তোমার ছদ্মবেশটার কোনো দরকার নেই আর শেখরদা। নকল চুল, দাড়ি আর গোঁফের আড়ালে যতই নিজেকে লোকানোর চেষ্টা করো না ক্যানো, তুমি ধরা পড়ে গেছো। বরং তোমার ওই ভালোমানুষির ছদ্মবেশটা অনেক পারফেক্ট ছিল। এমন নিপুনভাবে ভেক ধরেছিলে যে তোমার আসল মুখটা দেখতেই পাইনি,' ঝুলনের গলাটা আচমকা কেমন যেন ভিজে গেল।
নোটনের বুকের ভেতরটাও কেমন করে উঠল। কষ্ট হতে লাগল ঝুলনদিদির জন্যে। তাছাড়া শেখরদাকে সে নিজেও যে মনে মনে হিরোর আসনে বসিয়ে রেখেছিল। সন্দিগ্ধ গলায় বলে উঠল নোটন, 'তোমার ভুল হচ্ছে না তো ঝুলনদি?'
'উঁহু', নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল ঝুলন, 'নকল চুল দাড়িতে যতই মাথা মুখ ঢাকুক, ডান কানের নীচ থেকে ঘাড়ের কাছে নেমে আসা লম্বাটে কালচে জড়ুলটাকে কী দিয়ে ঢাকবে ও। ভুল আমার আগে হয়েছিল রে নোটন। এখন একটুও ভুল হচ্ছে না আমার। থ্যাঙ্ক গড, আরো বড় ভুল করার হাত থেকে বেঁচে গেছি আমি।'
'কে বলেছে ঝুলন যে তুমি বেঁচে গেছো,' মুখ থেকে টেনে টেনে গোঁফ আর দাড়ি খুলতে খুলতে হিসহিসে গলায় বলে উঠল শেখর, 'তোমায় বাঁচতে দিলে যে আমার মরণ নিশ্চিত। তুমি নিজেই যখন অতি স্মার্ট হতে গিয়ে আমার চালু ব্যবসাটা লাটে তুলে দিতে বসেছ, তোমায় তো ছাড়া যায় না সোনা। বরং তুমিই তো এখন সবচেয়ে দামি পণ্য। এদের সকলের থেকে তোমার জন্যে আমি বেশি দাম পাব।'
'শয়তান', তীব্র ঘৃণায় চিৎকার করে ওঠে ঝুলন।
শেখর হাসে, 'চেঁচিয়ে নাও। প্রাণভরে গালমন্দও করে নিতে পারো আমায়। কিন্তু লাভ নেই কোনো, আজ রাতেই বিক্কিরি হয়ে যাবে তুমি ঝুলন। তারপর...' বলে বিচ্ছিরি একটা ইঙ্গিত করে চোখ মটকায় সে অন্য লোকটার দিকে চেয়ে, 'হাঁ করে দেখছিস কী রে মদনা, এগুলোকে ঘরের মধ্যে চালান করে দে এবার।'
'আর মদ্দা দুটোকে?' বিচ্ছিরিভাবে হেসে জিগ্যেস করে মদনা নামে লোকটা।
'আপাতত ওদের সঙ্গে রাখ। রাতে যা হয় বিলি বন্দোবস্ত করা যাবেখন একটা।' শেখর পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে ধোঁয়া ছাড়ে। লোকটা এদিকে এগিয়ে আসতেই তারক ঝুলনের সামনে এসে দাঁড়াল। মুখের পেশী শক্ত হয়ে উঠছিল তার। ঝুলন খুব শান্ত ভঙ্গিতে সরিয়ে দিল তাকে। লোকটা আর একটু কাছে এগিয়ে আসতেই ক্যারাটের স্পেশাল ব্রাউন বেল্ট ঝুলন তার ডান হাতের রেওয়াজি পাঞ্চটা বসিয়ে দিল লোকটার বাঁ-দিকের চোয়ালে। কিছু বোঝার আগেই আঁক করে একটা শব্দ করে ঠিকরে পড়ল লোকটা খানিক তফাতে।
শেখরের মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। পলক ফেলার আগে হাতের সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে কোমরের কাছে গুঁজে রাখা চকচকে রিভলভারটা বের করে এনে ঝুলনের দিকে তাক করল সে। ধীর গম্ভীর স্বরে সে বলল, 'আমার কিছু হারানোর নেই ঝুলন। নিজেকে এবং নিজের ব্যবসাটাকে বাঁচানোর জন্যে আমি মানুষ খুন করতে দ্বিধা করি না কিন্তু। মনে রেখো, তুমি মরে এদের বাঁচাতে পারবে না আমার হাত থেকে।'
এক পা এগিয়েও থমকে গেল ঝুলন। আর তখনই বাইরে থেকে অনেকগুলো ভারী জুতোর শব্দ এদিকে এগিয়ে এল। একটা অচেনা গলার স্বর শোনা গেল, 'এদিকে স্যার।'
তারকের মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে গেল। আর শেখর দ্রুত এগিয়ে এসে রিভলভারটা চেপে ধরল নোটনের কপালের পাশে। পুলিশের লোকেরা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। শেখর হাসল। বলল, 'আমাকে ধরতে চাইলে এই ছেলেটার খুলি আমি উড়িয়ে দেব।'
'পুলিশের কর্তা গোছের একজন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, 'ওকে ছেড়ে দাও। আত্মসমর্পণ করে নাও তুমি।'
'উঁহু'। শেখর অনড়।
হঠাৎ বাইরের ঘরে তীক্ষ্ন শিসের মতন আওয়াজ উঠল দু বার। কে যেন চিৎকার করে উঠল, 'স্যার সরে যান তাড়াতাড়ি। একেবারে জাতসাপ। ঘরে ঢুকে পড়ছে।'
ঝুলনের কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠল পাশে দাঁড়ানো তারক, 'বিশু। একেবারে পাকা হরবোলার মতন তুলেছে আওয়াজটা। এমনি এমনি ওর গুণের এত কদর করি আমি?'
মুহূর্তের জন্যে অসতর্ক হল শেখর। চমকে ফিরে তাকাল বাইরের ঘরের দরজার দিকে। ঝুলনের জন্যে এই সুযোগটুকুই যথেষ্ট। ডান পা-টা বিদ্যুতের মতন শূন্যে ছিটকে উঠল। আছড়ে পড়ল শেখরের রিভলভার ধরে থাকা হাতের ওপর। রিভলভারটা ঠিকরে দূরে গিয়ে পড়ল। শেখর হতভম্ব।
হাত চেপে ধরে বসে পড়েছে সে আচমকা আঘাতে টাল সামলাতে না পেরে। হাততালি দিয়ে উঠল তারক। বিশু বলল, 'শাবাশ মেয়ে।' বাকি কাজটুকু তো পুলিশের। সে কাজে আর কোনো অসুবিধা ছিল না।
পুলিশ অফিসার নোটন আর ঝুলনের কাছে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন ওদের দিকে, 'ওয়েল ডান। খুব সাহসিকতার সঙ্গে মস্ত বড় কাজ করলে তোমরা। আর দারুণ কাজ করেছে বিশুও। দুর্বল শরীর নিয়েও মারাত্মক বুদ্ধি আর সাহস দেখিয়েছে ও।' ঝুলন বলল, 'তারকদাও।'
অফিসার বললেন, 'এবারে তাহলে যাওয়া যাক। একটু পরেই সন্ধে নামবে। জায়গাটা সত্যিই নিরাপদ নয়। বিশুর নকল সাপের শিস নয়, সত্যিকারের বিষধর সাপ বেরোনো এখানে মোটেও অসম্ভব নয়।'
ঝুলন বলল, 'যাবার আগে আর একটা কাজ আছে।'
'আবার কী?' নোটন বলে?
'একটা রিডল, যে গাছ জলে, যে গাছ স্থলে, খোঁজ করো সেই গাছের তলে', বলতে বলতে সেই ঘরে ঢুকে আবার দরজার পাশের দেওয়ালটার সামনে দাঁড়ায় ঝুলন। নোটনকে বলে, 'এখানে দেওয়ালের ওপর ক্ষীণ একটা নকশা দেখতে পাচ্ছিস?'
'পাচ্ছি'।
'কীসের নকশা বল দেখি?'
'গাছ। দুটো লম্বা ডাঁটিতে ফুল...পদ্ম মনে হচ্ছে।'
'এগজ্যাক্টলি। জলেও ফোটে, স্থলেও ফোটে। স্থলপদ্ম। এখানে একটু ধাক্কা দিলেই ফাঁপা আওয়াজ হচ্ছে। তারকদা এ জায়গাটা একটু ভাঙা যাবে?'
'কোমরের গোপন পকেট থেকে একটা ছেনির মতন যন্ত্র বেরিয়ে এল তারকের।
বিশু বলল, 'খোল চটপট।'
একটু চাড় দিতেই দেওয়ালে লুকোনো দেরাজটা বেরিয়ে পড়ল। তার ভেতরে একটা পাথরের বাক্সে খান চারেক সোনার বাট। একটা হীরের আংটি আর দলিল। সঙ্গে একটা কাগজে লেখা দু-লাইনের ইচ্ছাপত্র, 'যদি আমি বেঁচে থাকতে আমার কাছে মীরা ফিরে আসে আবার, তাহলে স্ত্রী হিসেবে এ সমস্তই তার, তা নাহলে আমার যা কিছু, তা দিয়ে গেলাম রামগোপালপুরের কল্যাণের কাজে।'
পুলিশ অফিসার বললেন, 'আপাতত এ সব কিছুই থানার মালখানায় জমা থাক আমাদের কাস্টডিতে। পরে গ্রামের মাথারা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক কী করা যাবে এই সম্পত্তির অর্থ দিয়ে।'
ঝুলন বলল, 'একটা ভালো স্কুল খোলা যেতে পারে বঙ্কিমদাদুর নামে।'
'কিংবা ডাক্তারখানা। দাদুও বসবে নাহয় মাঝেমধ্যে।' নোটন বলে উঠল।
'যাই হোক, আমাদের দুজনের কথা একটু মাথায় রাখবেন সবাই', বিশু আর তারক দুজনেই বলে উঠল বিগলিতভাবে, 'যেন কিছু একটা কাজ পাই। পুরনো ব্যবসায় ঘেন্না ধরে গেছে। আবার নতুন করে বেঁচে উঠতে ইচ্ছে করছে আজ এইসব কাণ্ডকারখানা দেখেশুনে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন