আয় বৃষ্টি রিমঝিম

শৈলেন ঘোষ

সে কত শো বছর আগের কথা। সে এক আশ্চর্য দেশ। একদিকে সবুজ কৃষিভূমি আর বন। আর-একদিকে রুক্ষ মরুদেশ। মধ্যিখানে পর্বত আরাবল্লি। মরুর দেশে ফুল ফোটে না— গোলাপ। নেই জুঁই, না রজনীগন্ধা। সে দেশের নাম রাজপুতানা।

মাথার ওপরে আকাশ। মেঘ নেই। রোদ আর রোদ। অসহ্য। সেই অসহ্য রোদ সহ্য করে এখানে দাঁড়িয়ে থাকে কাঁটাঘাস উটকাটরা। করিল গাছ। নাগর বেলি। আকন্দ। করিরের ঝাড়। ভুরট ঘাসের কাঁটাফল। এ দেশের মানুষ 'থর' মরুর বুকের ওপর থেকে ভেসে-আসা হাওয়ার ঝাপটায় জীবন কাটায়। এখানকার প্রকৃতি নির্দয়, ভয়ঙ্কর নির্দয়। জল নেই। থেকে-থেকেই দুর্ভিক্ষ। সেই দুর্ভিক্ষ। সেই দুর্ভিক্ষের দেশে ফুলের মতো তুকতুকে একটি মেয়ে থাকত মা আর বাবার সঙ্গে। সেই কত শো বছর আগে। মেয়েটির নাম নেহা।

কিন্তু যে-বছর আষাঢ়ের কালো মেঘ আকাশ ছেয়ে ফেলে, বৃষ্টি নামে আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে, সে-বছর কত পাপিয়া ডানা মেলে ডাক দিয়ে যায় বাতাসে, এই দেশে। শ্রাবণে অসংখ্য দাদুরি। কত ময়ূর। কত কোঁচবক লুকিয়ে থাকে করির ঝাড়ের আড়ালে। আর ভাদ্র মাসে যদি ভরা-বর্ষা হয়, তবে তো আর কথাই নেই। কী অপরূপ দেখতে তখন মরুর দেশ। তখন যেন খুশির শেষ নেই সেই ছোট্ট মেয়ে নেহার। তখন তার পায়ের ঝাঁঝর ঝনক-ঝনক বেজে ওঠে। সে ছুটে যায় যেদিকে মন চায়। বাদল-বাতাসের সঙ্গে খেলতে-খেলতে সে লুটোপুটি খায়। চোখদুটি তার আনন্দে নেচে ওঠে। সে হেসে ওঠে। হাসতে-হাসতে সে ডাক দেয়, দিয়া, দিয়া, দিয়া! সে নাম রেখেছে 'দিয়া' তার বন্ধু ময়ূরের।

কিন্তু এখন কোথায় সেই ময়ূর। কোথায় পাপিয়া! কোথায়-ই বা দাদুরি! এখন আকাশে মেঘ নেই। বাতাস হা-হা করে বয়ে যায়। থেকে-থেকে সে ঝাপটা দেয়। না-হয় ঘূর্ণি-ঝড়ের তুফান ছুটিয়ে সে বালি ওড়ায়। বৃষ্টি নেই। এখন দুর্ভিক্ষ। কুয়োয় জল নেই। খেতে ফসল নেই। খরায় পুড়ে খাক হয়ে গেছে খেত-খামার। নেহার বন্ধু দিয়াও যে কোথায় চলে গেছে জানে না সে। মেয়েটা ক-দিন তন্নতন্ন করে খুঁজেছে ময়ূরটাকে। খুঁজে পায়নি। শেষমেশ নেহা ভেবেই বসেছিল, বোধ হয় না-খেতে পেয়ে ময়ূরটা মরেই গেছে। নেহাদের এই দেহাতের খেত-খামারে উড়ে-হেঁটে ঘুরে বেড়াত আরও কত ময়ূর। একটা-একটা করে পাঁচটা না-খেতে পেয়ে মরে গেছে। নেহার চোখের সামনে। নেহা যে তাদের একমুঠো বজরা দেবে, তা-ই বা সে পাবে কোথায়? যে ক-টা ময়ূর মরতে-মরতে বেঁচে রইল, তারা যে কোথায় পালাল, কে জানে! বটেই তো, না-পালিয়ে করবেই বা কী! দুর্ভিক্ষের দেশে কে আর শখ করে পড়ে থাকে? উপোস করে মরে? যার উপায় নেই তার কথা আলাদা। কিন্তু পাখপাখালির আকাশ-পথটা তো কেউ পাঁচিল তুলে আটকাতে পারছে না। সুতরাং দুর্ভিক্ষ নামের এই দানবটার হাত থেকে বাঁচার জন্যে যে যেদিকে পারো পালাও। পালিয়ে বাঁচো। হয়তো নেহার দিয়াও পালিয়েই বেঁচেছে। কিন্তু নেহাকে ফেলে তার ময়ূর যে পালাবে, এ-কথা সে বিশ্বাসই করতে পারে না। ঠিকই তো, কতদিন নেহা নিজের হাতে মুঠো-মুঠো বজরার দানা তুলে দিয়েছে দিয়ার মুখে। কত আদর করেছে। কত ছুটে-ছুটে খেলা করেছে। ঠিক যেমন চোর-চোর খেলা করো তোমরা, ঠিক তেমন। নেহা দিয়াকে ধরবে বলে ছোটে, দিয়া ফুড়ুত। কিছুতেই আর ধরতে হচ্ছে না। সে হাওয়া। সত্যি-সত্যিই দিয়া তখন হাওয়া খাচ্ছে কারও ঘরের চালে, না-হয় গাছের ডালে। সেখানে হাত বাড়ালেও নেহার সাধ্যি নেই ধরার। হাতই যায় না। যাবে কেমন করে? সে তো আর উটের মতো আকাশ-ছোঁয়া ঢ্যাঙা নয়। সত্যি উচাই বটে উটগুলো। অবশ্য জিরাফও কম যায় না। সে তো উটের চেয়েও খাড়াই। আসলে নেহা বড়ো হয়েছে উট দেখতে-দেখতে। নয়তো ময়ূর দেখতে-দেখতে। জিরাফ সে দেখেনি কোনোদিন। দেখা দূরে থাক, নাম শুনেছে কি না তা-ই দ্যাখো! তবে বাপু হাতির কথাও বাদ দিতে পারো না। যেমন ধুমসো তেমনই পেল্লায়। হাতির চারখানি পায়ের কথা ভাবো তো একবার! উফ! একটি যদি একবার পেটে তুলে দেয়, ব্যস! পেটের পোঁটা ফেটেফুটে ফুস-স-স!

জিরাফ না-দেখলেও, হাতি দেখেছে নেহা। সেই যে-বছর উদয় সিংহ মারা গেলেন, সেই যে-বছর তাঁর ছেলে প্রতাপ সিংহ রাজপুতানার রাজসিংহাসনে বসলেন, সেই বছরেই হাতি দেখেছে নেহা। সেই একবারই যা দেখা। হাতি দেখার সেই দৃশ্যটা এখনও স্পষ্ট ভাসছে তার চোখে। প্রতাপ সিংহ রাজা হলেন যেদিন, সেদিন সারা রাজ্যে লেগে গেল খুশির উৎসব। কী আনন্দ! কত আলো! কত রং-ঝলমল পোশাকের চেকনাই। কত হাতি, ঘোড়া, উটের মিছিল। কত নাচ, গান, হল্লা। সে বছর আজকের মতো এমন দুর্ভিক্ষ মানুষকে বিপদে ফেলেনি। যদিও যুদ্ধের কালো-মুখখানা উঁকিঝুঁকি মারছিল এধারে-ওধারে তখনও। চারধারে যুদ্ধের বারুদ গন্ধ ছড়াচ্ছে। তবুও মানুষ তো তখন দু-বেলা দু-মুঠো খেতে পাচ্ছিল।

এ কী! শুকনো খেতের ওপর একটা যেন ময়ূর ঘুরে বেড়াচ্ছে! দ্যাখো, দ্যাখো, ময়ূরটা কেমন একটি-একটি পা ফেলে শুকনো খেতে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে! মনে হয়, খুব কষ্ট হচ্ছে ময়ূরটার। হয়তো তার পেটে আজ সারাদিনে একটিও দানা পড়েনি। পড়ার কথাও নয়। শুকনো খটখটে খেতে কি ফসল জন্মায়? এখন বাতাস ঘূর্ণি ঝড়ের তুফান ছুটিয়ে শুধু বালি ওড়ায়। বৃষ্টির মেঘ আনে না বাতাস। কাজেই খেত-ভর্তি আবাদ করা বজরা কবেই বালির স্তূপে চাপা পড়ে গেছে।

ওই তো নেহা দেখতে পেয়েছে ময়ূরটাকে। হ্যাঁ, এ তো নেহারই সেই আদরের ময়ূর দিয়া। ছুটে গেল নেহা ময়ূরের কাছে। না, আজ নেহার কাছে ময়ূরের জন্যে মুঠো-ভর্তি কোনো খাবার নেই। ময়ূর তার মুখের দিকে তাকাল। কী করুণ তার চোখের দৃষ্টি। তারপরেই চোখ নামিয়ে ময়ূর নেহার হাতের দিকে তাকাল। শূন্য তার হাত। নেহা শূন্য হাতটি বাড়িয়ে দিল ময়ূরের গলাটি জড়িয়ে ধরার জন্যে। পারল না। পেটে খিদে থাকলে কারই বা ভালো লাগে আদরে লুটিয়ে পড়তে! পেটের খিদে কি আদরে মেটে?

অথচ এখনই যদি আকাশে মেঘ দেখা যেত, তার গুড়গুড় গর্জন শোনা যেত, বৃষ্টি পড়ত, মাঠ-ভর্তি ফসলে সবুজ খেত টইটই করত, তখন দেখতে ময়ূরের পেখম ছড়িয়ে নাচের বাহার। দেখতে সুন্দর কাকে বলে। দেখতে-দেখতে চোখের পাতা পড়ত না তোমার। মনে হত দেখি, আরও দেখি, অনেকক্ষণ!

অনেকক্ষণ দেখা যেত না। তার আগেই তোমার নজর পড়ে যেত নেহার দিকে। ছোট্ট মেয়েটা তখন আনন্দে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে নাচতে-নাচতে চিৎকার করত—দিয়া, দিয়া, দিয়া। তারপর সে ছুটত। তার রং-ঝলমল ঘাঘরা রং ছড়িয়ে দুলে উঠত। মাথায় তার শিসফুল। কানে তার ঝুমকো। কপালে তিলক। নেহা যেন এক রূপকুমারী। ময়ূরের সঙ্গে ছুটে ছুটে খেলা করছে। ময়ূরের ছড়ানো পেখম ঝিরি-ঝিরি দুলছে, আর ময়ূরকণ্ঠী রং ছড়িয়ে দিচ্ছে। খেতের সবুজ ফসলের গায়ে কে যেন এঁকে দিয়েছে আশ্চর্য এক ছবি। সেই ছবির ওপর থেকে চোখ ফেরাবে কে?

কিন্তু না, আজ আর নেহার সঙ্গে পেখম তুলে খেলল না ময়ূর। আজ আর ময়ূরের পেখম ঝিরি-ঝিরি দুলল না। সে ধরা দিল না, নেহার নরম হাতের মিষ্টি ছোঁয়ায়। ভয় পায় নেহা। তবে কি দিয়ারও শেষ হয়ে যাবে প্রাণ? দুর্ভিক্ষের দানবটা তাকেও কি গিলে খাবে? হায় রে, কোথায় গেলে নেহা খুঁজে পাবে তার দিয়ার জন্যে একমুঠো খাবার? একটুখানি জল? তুমি একবার চোখ মেলে দ্যাখো ওই ময়ূরটার দিকে! সে যেন টলতে-টলতে পা ফেলছে খিদের যন্ত্রণায়। নেহারই বা কী দশা হয়েছে দ্যাখো একবার। কতই বা বয়েস হবে। খুব বেশি হলে নয়। এই বয়সে তার যে অমন চোখ ঝলকানো রূপ ছিল, কোথায় গেল সেই রূপ! সেই অস্থির চঞ্চল মেয়েটাও কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে এই ক-দিনে! এই সেদিন পর্যন্ত কী দুরন্তপনাই না করেছে সে। তার দুরন্তপনা দেখে তার পা-দুটিকে কেউ যদি বলত পাখির ডানা, তবে বুঝি সত্যি বলা হত। তার ঠোঁট দুটি যখন কথার ঢেউ তুলে দোলা দেয়, তখন তার চোখ দুটিও যেন পলক ফেলে নাচে। নেহার চোখ দুটি যেন আলোর জোনাকি। ফোঁটা পড়ছে, আলোর ফোঁটা টুপটাপ। হয়তো ক-দিন পেটভরে খাওয়া নেই মেয়েটার। হয়তো তার মা নিজে না-খেয়ে যা জোটে তা-ই দেয় মেয়েটাকে। শেষে যেটুকু পড়ে থাকে, নিজে বোধ হয় সেটুকুই মুখে দেয়। এমন করে মানুষ কি বাঁচতে পারে? মেয়েটাই বা বাঁচবে কী করে? কেন তোমরাও তো পারতে এই গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিতে। গ্রামের তো অর্ধেক মানুষ একফোঁটা জলের জন্যে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। এই থর মরুর বালি ভেঙে তারা গেছে পুষ্করে। সেখানে জল আছে অঢেল। হ্রদ উপচে-পড়া তৃষ্ণার জল। সেই হ্রদের তীরেই তারা আস্তানা গেড়েছে বাঁচার জন্যে।

না, নেহাকে সেখানে মা নিয়ে যাননি। কেননা, কথা আছে নেহার বাবা ফিরবেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যুদ্ধজয়ের খুশি নিয়ে। মহারানা প্রতাপ সিংহের তিনি সৈনিক। ঘোড়ার পিঠে তরোয়াল ঘুরিয়ে তিনি যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ করেন মুঘলদের সঙ্গে। সম্রাট আকবরের মুঘল সেনাদের সঙ্গে।

দ্যাখো, দ্যাখো, ময়ূরটা আর হাঁটতে পারছে না। ও কী! শুয়ে পড়ল যে! একটু জলের জন্যে নেহার দিয়া কেমন যেন হাঁকপাক করছে। ছুটল নেহা। কোথায় ছোটে সে! কোথায় পাবে জল? একটু জল এখনই যে ওর মুখে দিতে হবে। আহা, দ্যাখো, দ্যাখো, ডানা ঝাপটাচ্ছে। নেহা ছুটল মায়ের কাছে। ছোটা মানে, সে নিজেও হাঁফাচ্ছে। হাঁফাবেই তো। অমন করে ছোটে! তার কি এখন ছোটবার ক্ষমতা আছে? কিন্তু বললে কে শুনছে!

'মা!' নেহা ছুটে ঢুকে পড়ল ঘরে।

'কী রে?' মায়ের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে।

'আমার দিয়া কেমন করছে মা!' নেহা হাঁফাচ্ছে। এতদিন যতটা পথ ছুটলে তার একটুও কষ্ট হত না, আজ তার চেয়েও অনেক কম পথ ছুটে সে বেদম হয়ে পড়ল।

মা জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় ছিল সে?'

নেহা ব্যস্ত হয়ে বলল, 'জানি না। বোধ হয় খুব তেষ্টা পেয়েছে। একটু জল নিয়ে যাই মা!'

'দ্যাখ, কলসিতে কতটুকু আছে।'

নেহা দেখল কলসিতে যতটুকু জল আছে, তার থেকে দিয়ার জন্যে একটু নিলে, তাদের আর খুব জোর দু-দিন হবে। তারপর?

তার পরের কথা পরে ভাবলেই হবে। এখন তো ময়ূরটা বাঁচুক। এই ভেবে একটুখানি জল নিয়ে নেহা আবার ছুটল। পৌঁছে গেল সে ময়ূরের কাছে। দিয়া শুয়ে পড়েছে ধুঁকতে-ধুঁকতে। নেহা ঝটপট তার ঠোঁটের কাছে এগিয়ে দিল জলটুকু। ক্ষমতা নেই। সে পারল না নিজের জোরে মুখ তুলে খেতে। কাজেই নেহা তার মুখটা তুলে ধরল। অনেক কষ্টে যেটুকু জল সে খেল, সেটুকু যে তার তৃষ্ণা মেটাল না, সে তার হাঁসফাঁসানি দেখেই বুঝতে পারে নেহা। কিন্তু এখন নেহা আর কোথায় পাবে জল? নিজেদের বাড়ির কলসিতে যতটুকু জল আছে সেটুকু তো আর খরচ করা যায় না। ফুরিয়ে গেলে মা-র চলবে কেমন করে? তার ওপর বাবা আসবেন। অবিশ্যি ফুরিয়ে তো দু-দিন পরে যাবেই। তখন কী হবে? এখন এসব মিথ্যে ভাবা। এখন দিয়ার কথা ভাবতে-ভাবতেই নেহা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। দ্যাখো, ময়ূরটা কেমন কষ্ট করে শ্বাস ফেলছে। হায় রে, আর বুঝি পারে না সে বুকের প্রাণটাকে বুকে ধরে রাখতে। আর একটু জল দাও না ওর মুখে!

না, ময়ূরের কষ্ট আর দেখা যায় না। আর খানিকক্ষণ এমন করে কষ্টের যন্ত্রণায় ছটফট করলে নির্ঘাত একটা অঘটন ঘটে যাবে।

মায়ের কাছেই ফিরে গেল নেহা। মায়ের কাছেই সে আকুল হয়ে জল চাইল দিয়ার জন্যে। মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে মায়ের মুখ শুকিয়ে যায়। চোখে জল আসে। দিয়া একটা ময়ূর। পাখি বই আর তো কিছুই নয়। পাখির জন্যে মেয়েটার এমন কাতর আবদার শুনে নিজেদের কথা ভুলে যান মা। মেয়ের কথাই রাখেন। বলেন, 'নিয়ে যা, তাড়াতাড়ি নিয়ে যা।'

নেহা ছুটল। কলসি থেকে আর এক ঘটি জল নিয়ে ছুটল সে দিয়ার কাছে। কিন্তু কই দিয়া? দিয়া তো নেই! কোথায় গেল? নেহা অসহায় দৃষ্টিতে দেখতে লাগল চারপাশ। তবে কি পাখিটা উড়ে গেল! তবে কি দিয়া জল আনতে একটু দেরি করেছে বলে নেহার সঙ্গে আড়ি করে দিল! না কি, মরে গেছে দিয়া। কোনো নচ্ছার হয়তো তা-ই দেখে তার মৃতদেহটা নিয়ে পালিয়েছে। সে বোধ হয় দিয়ার গা থেকে একটি-একটি পালক খুলে বেচে দেবে কারও কাছে! সেই নচ্ছার কি লুকিয়ে-লুকিয়ে তার মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছিল? ভাবতে-ভাবতে ফিরে যায় নেহা। মায়ের কাছে।

ক্লান্ত মা শুয়ে আছেন। নেহাকে বিষণ্ণ মুখে ফিরতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'ফিরে এলি? পাখি জল খেয়েছে?'

''না মা।' ভারি দুঃখে ভার নেহার সেই গলার স্বর।

মা ব্যস্ত হয়ে উঠে বসলেন, 'কেন?'

'দিয়াকে আর দেখতে পেলুম না। কোথায় গেল জানতেও পারলুম না। কোথাও কোনো চিহ্নই নেই তার।' উত্তর দিল নেহা।

মা বললেন, 'দ্যাখ, আবার হয়তো আসবে!'

কিন্তু নেহা জানে, পাখি আর আসবে না। সে চিরদিনের মতোই চলে গেছে নেহাকে ছেড়ে। তার চোখ ছলছল করে ওঠে। সে ছুটে যায় জানলাটার ধারে। মাকে লুকিয়ে চোখের জল মুছে, চেয়ে থাকে অনেক দূরে, খেতের ওপারে। কান পেতে কী যেন শুনতে চায়? শুনতে চায় একটি শব্দের ঝঙ্কার। একটি বাজনার সুর। তার দুঃখের বন্ধু ওই সুরের নিক্কণ। কিংবা বলতে পারি, আনন্দের সঙ্গীও। ওই চঞ্চল মেয়েটা যখন ছুটতে-ছুটতে খেলে, আর, না-হয় খেলতে খেলতে চিৎকার করে, তখন যদি বেজে ওঠে ওই সুরের ঝঙ্কার, তখন নেহা যেন একটি আশ্চর্য শান্ত মেয়ে। মুখে তার কথা সরে না। তোলপাড় করা ঝড়ের পর যেন ধীর বাতাসের ছোঁয়া! চুপচাপ আনমনে কান পেতে থাকে। নিথর হয়ে চেয়ে থাকে দূরে, আরও দূরে। সুরেলা ওই শব্দ কে বাজায়? ভেসে আসে কোথা থেকে?

জানে না নেহা। তাই সে একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, 'কোথায় বাজে এমন সুর? কে বাজায়?'

মা বলেছিলেন, 'ওস্তাদজি।'

'তিনি কে মা?'

তিনি কে মা-ও তো জানেন না। তাই মেয়ের আলটপকা অমন প্রশ্ন শুনে তিনি যদি হকচকিয়ে যান, তবে তাঁকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ তিনিও দেখেননি সেই বাজনদারকে কোনোদিন। তিনি থাকেন গ্রামের আর-এক প্রান্তে, খেতের ওপারে আর-এক পাড়ায়। এই ছোট্ট গ্রামখানা ভেঙে-ভেঙে মানুষই ভাগ করে দিয়েছে এ-পাড়া আর ও-পাড়ায়। এ-পাড়ার লোক ও-পাড়ায় যায় না। যেতে নেই। বারণ। তাই আর কোনো উত্তর খুঁজে না-পেয়ে মেয়েকে বলেছিলেন, 'তিনি একজন মস্ত সারিন্দা বাজিয়ে।'

নেহার চোখ দুটি সেদিন খুশিতে ঝকমক করে উঠেছিল মায়ের কথা শুনে। ব্যাকুল হয়ে বলেছিল, 'ওই মস্ত বাজিয়ে কী সুন্দর সারিন্দা বাজান! মা, আমি পারব না অমন বাজাতে?'

মা উত্তর দিয়েছিলেন, 'সবাই পারে না।'

নেহার মুখখানা হঠাৎ উছলে উঠেছিল। সে মায়ের কোলের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে বলেছিল, 'আমি কিন্তু পারব।'

মা বলেছিলেন, 'কেমন করে পারবি? শিখতে হয়।'

নেহা মায়ের কোলের ভেতর মুখ সরিয়ে নিয়েছিল চকিতে। মায়ের চোখের দিকে অপলকে তাকিয়ে উত্তর দিয়েছিল, 'আমিও শিখব।'

'কে শেখাবে তোকে?'

'কেন ওই মস্ত মানুষের কাছে আমি যদি যাই, উনি শেখাবেন না আমায়?'

'ওঁর কাছে যাবি কেমন করে? কেউ যেতে দেবে না তোকে!'

'কেন?'

'আমাদের যাওয়া বারণ।'

'কেন বারণ?'

নেহার এই কঠিন প্রশ্নের মা কী জবাব দেবেন ভেবে পাননি। খানিক মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন। খানিক শূন্য আকাশটা দেখেছিলেন। আকাশ কেমন সুন্দর, কেমন সরল! মায়ের চোখে মেয়েও বুঝি তেমনই সুন্দর, তেমনই সরল। কেমন টলটলে মুখখানি। চোখের পাতায় টানা-টানা কাজল। ঠোঁট দুটি উছলে আছে একটু-ছোঁয়া হাসিতে। মন তার ঝরনার মতো উচ্ছল। স্বচ্ছ। নিষ্পাপ। কেন ও-পাড়ায় যাওয়া বারণ, সে-কথা কি বলা যায় এমন নিরীহ মেয়েটাকে!

মাকে চুপ থাকতে দেখে নেহা আবদার করল, 'চুপ করে আছ কেন মা? বলো না, কেন বারণ!'

মা উত্তর দিলেন, 'আজ থাক। আর-একদিন বলব।'

'না, তোমায় আজই বলতে হবে। নইলে আমি এখনই ছুটতে-ছুটতে চলে যাব ও-পাড়ায়।' মেয়ে বায়না ধরল।

মা ভয় পেলেন। তিনি জানেন, দুরন্ত এই মেয়ে যা বলে, তা-ই করে। শত বললেও শুনবে না। কাজেই না-বলে মায়ের উপায় নেই। তাই তিনি মেয়ের মুখখানি নিজের মুখের কাছে টেনে এনে বলেছিলেন, 'ওঁরা যে উঁচুতলার মানুষ।'

কী বুঝেছিল মেয়েটা কে জানে! সে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল। তারপর বলেছিল, 'সে আবার কী? মানুষ কি পাখির মতো উড়তে পারে যে, ডানা মেলে উঁচুতে উঠবে? এই দ্যাখো না আমি লাফাচ্ছি,' বলেই ওপরদিকে এক লাফ মারল। মেরেই সঙ্গে-সঙ্গে মাটিতে পা রেখে বলল, 'কই, আমি তো পারলুম না উঁচুতলায় উঠতে। উঁচুতলায় ওঠা খুব শক্ত।'

মেয়ের রকমসকম দেখে মা নিজেই হেসে কুটোকুটি। মেয়েটা দুরন্ত হলে কী হবে, সত্যিই সরল। নইলে, উঁচুতলার মানুষ বলতে সে যে মানুষকে পাখির সঙ্গে তুলনা করে বসবে, এ যে মা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি। উঁচুতলার মানুষ বলতে তিনি কী বোঝাতে চান, সেই শক্ত কথাটা তিনি কেমন করে এই ছোট্ট মেয়েটাকে সমঝাবেন? তবে কি তিনি নিজেদের নিচুতলার মানুষ বললে মেয়েটা বুঝতে পারবে? এ-কথাটা তিনি নিজেও জানেন না। তাই সেদিন নেহাকে বলেছিলেন, 'তোর বাবা যুদ্ধ থেকে ফিরে তোকে বুঝিয়ে দেবেন উঁচুতলার মানুষ কাদের বলে।'

এ-কথা শুনে নেহার সেদিন এমন হাসি পেয়ে গেছল যে, সে-হাসি আর থামতেই চায় না। নেহা হাসতে-হাসতেই বলেছিল, 'মা খুব চালাক। আমি যাতে বাবা আসার আগে এই বাজনদারের কাছে যেতে না-পারি তাই এই কথা বলছে। উঁচুতলার মানুষ আবার কী কথা? মা এমন সব বানিয়ে-বানিয়ে কথা বলে, শুনলে আমার ভীষণ হাসি পেয়ে যায়।'

হ্যাঁ, সেদিনও নেহার মুখে হাসি ছিল। হেসেছিল নেহা সেদিন মায়ের কথা শুনে বারবার। কিন্তু এখন হাসতে গেলে নেহা হাঁফিয়ে যায়। তাই দুর্ভিক্ষের তাড়নায় নেহাদের হাসি-খুশি ছোট্ট বাড়িটা এখন কেমন যেন নিঝুম হয়ে গেছে। শুধু নেহাদের বাড়ি কেন, সারা গ্রামখানাই থমথম করছে। নিস্তব্ধ চারদিক। ক-টা মানুষই বা আছে গ্রামে। নেই কোনো হই-হল্লা, কি গল্পগুজব। নেই সেই চেনা গলায় হাঁক পেড়ে ডাক, 'ওহে রামচরণ, কোথায় চললে!' এমনকী, সারিন্দার সুরেলা আওয়াজটা পর্যন্ত আর শুনতে পায় না নেহা। যিনি বাজান তিনিও কি গ্রাম ছেড়ে পুষ্করে চলে গেছেন! ভাবতে-ভাবতে চমকে ওঠে নেহা। উঁচুতলার ওই মানুষটাকে নেহা চোখে না-দেখলেও, নেহার যেন মন জুড়ে বসে আছেন তিনি সর্বক্ষণ। সারিন্দা-হাতে একটা অচেনা মানুষের ছবি নেহার কল্পনায় বারবার উঁকি মেরে যায়। এখন বাজনার ঝঙ্কার নেই বলে, যেন বেশি-বেশি মনে পড়ে যায় তাঁকে নেহার। আর যখন দুর্ভিক্ষ ছিল না, যখন খুশিতে বেজে উঠত সারিন্দা, তখন নেহা চুপিচুপি লুকিয়ে পড়ত মায়ের চোখের আড়ালে। লুকিয়ে পায়ে-পায়ে তাল দিত নেহা সুরের সঙ্গে। তাল দিতে-দিতে নাচত। কে জানে তার সে-নাচ কেমন নাচ! সে ছাড়া এ নাচ কেমন, কে বলবে! ওই সুরের শব্দটা যেমন-যেমন ছন্দে ওঠে, ছন্দে নামে, নেহার পা-দুটিও বোধ হয় তেমনই ছন্দে নেচে উঠত। সে আনন্দ ছিল তার নিজের, একার। কেউ দেখতে পেত না। না মা, না বাবা, না অন্য কেউ। কিন্তু যখনই সারিন্দার সুরে ঝঙ্কার থেমে যেত, তখনই তার মনে হত, সে এখনই ছুটে যায় তাঁর কাছে। গিয়ে বলে, তুমি আবার বাজাও, আমি নাচি। আবার নাচি। আনন্দে লুটোপুটি খাই। কিন্তু যাওয়া হয়নি নেহার। হয়তো গেলে সে জিজ্ঞেস করতেই পারত, তুমি কেন উঁচুতলার মানুষ? আমরা কেন নিচুতলার? কেন এই উঁচু-নিচু? কে করল মানুষকে এমন করে ভাগ? মা বলতে পারেননি। জিজ্ঞেস করত, তুমি কি বলতে পারো? তবে কি উঁচুতলার মানুষই এমন সারিন্দা বাজাতে পারে? এমনই হাজার প্রশ্ন বারবার নাড়া দিয়ে যায় তার মনে। সে উত্তর খোঁজে। খুঁজে পায়নি এখনও।

খুঁজে পায়নি বলেই এই দুর্ভিক্ষের দারুণ কষ্টের দিনে উঁচুতলার মানুষের ওই পাড়ায় যাওয়ার জন্যে তার মন অস্থির হয়ে ওঠে। কিছু হোক আর না-হোক, সেই সারিন্দা-বাজিয়ে মানুষটির একটা খোঁজ তো নেওয়া যাবে। অবিশ্যি তাঁর খোঁজ নেওয়াটাও খুব সহজ হবে না। কারণ উঁচুতলার ওই পাড়ার পথ-ঘাটের নাড়ি-নক্ষত্র কিছুই জানে না নেহা। এইখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বজরা খেতের ওপারের খবর কেমন করে জানবে নেহা। কিন্তু আশ্চর্য, ওই না-দেখা দূরের থেকেই দিব্যি সারিন্দার সুর ভেসে আসে এপাড়ায়। বজরা খেতের ওপর দিয়ে ভাসতে-ভাসতে এসে সে-সুর ছড়িয়ে পড়ে নেহার কানে। তবে, রাত-ঘুমঘুম অন্ধকারে নেহা যখন মায়ের পাশে শুয়ে থাকে, তখন যদি বেজে ওঠে সারিন্দা, তখন যদি হাওয়ায় দোল খেতে-খেতে সারিন্দার সেই ভাসন্ত সুর নেহার কানে বেজে ওঠে, তখন যেন কত স্বপ্নের রং একসঙ্গে নেহার চোখে ঝলকে ওঠে। নয়তো মনের ভেতর দোলা দেয়। ঘুমিয়ে পড়ে নেহা। সে-ঘুম স্বপ্নের খুশিতে উচ্ছল। আঃ! আচ্ছা, এখনই তো নেহা সেই সারিন্দা-বাজিয়ের কাছে যেতে পারে। নেহার মন যাওয়ার জন্যে ভারি ছোঁক-ছোঁক করছিল। এখন বেবাক সুনসান চারদিক। মানুষ নেই একটিও ঘরের বাইরে। তবে, যাব বললেই তো যাওয়া যায়, কিন্তু পাব বললেই তো আর তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না। হ্যাঁ, বলছি সেই মস্ত মানুষ, ওস্তাদ সারিন্দা-বাজিয়ের কথা। অবশ্য নেহা নির্বিঘ্নে এধার-ওধার ঘুরে-ঘুরে তাঁর আস্তানাটা খুঁজতেই পারে। কে আর চিনে রেখেছে নেহাকে। কে আর জানছে সে কোন পাড়ার বাসিন্দা। কিন্তু মা যদি জানতে পারেন? তা হলেই সব ভেস্তে যাবে। সুতরাং যেতে হলে মাকে লুকিয়েই যেতে হবে। সেটা কি ঠিক হবে? ধরো, এখন ভাবছি কেউ নেহাকে চিনতে পারবে না। কিন্তু উলটোটা যদি হয়? যদি কেউ চিনে ফেলে? তখন মা ছাড়া কে বাঁচাবে নেহাকে?

দ্যাখো, অত ভেবে-চিন্তে কাজ করতে গেলে কোনো কাজই হয় না। আগে তো নেমে পড়ো, তার পরের কথা পরে হবে। দেখতেই তো পাচ্ছ, এখন রোদ ঝাঁ-ঝাঁ দুপুর। মা ঘুমোচ্ছেন। একটি জনমনুষ্যি নেই এদিকে-ওদিকে। এখন বলতে পারো, অর্ধেকের ওপর মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। না-পালিয়ে উপায়ই বা কী! কে আর খিদে-তেষ্টায় পড়ে-পড়ে অঘোরে মরতে চায় বলো! একটু জল, দুটো অন্ন যেমন করে হোক বাঁচতে গেলে মানুষকে জোগাড় করতেই হবে। বুকের ভেতর যে প্রাণটা আছে, সে তো চবিবশটা ঘন্টা ধুকধুক করে উঠছে, নামছে। তার বিরাম নেই। সেই তো জীবনটা বাঁচিয়ে রেখেছে। তা, নিয়মমতো সে যদি রসদ না-পায়, তবে প্রাণ যেতে কতক্ষণ? তখন তো আর তাকে দোষ দেওয়া যায় না। প্রাণ যখন তোমারই, তখন সে-প্রাণ বাঁচিয়ে রাখার দায়ও তো তোমার। সুতরাং প্রাণ বাঁচানোর দায়েই মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। নির্জীব গ্রামটা এখন ফাঁকা হয়ে পড়ে আছে।

না, নেহা মাকে কিছু বলল না। না বলে দুপুরের এই জ্বলন্ত রোদ মাথায় নিয়ে সে একা-একাই চলল ওপাড়ায়। ভয় যে তার করছে না, তা বলা যাবে না। তবে ভয় যতটুকু, তার চেয়ে ওপাড়ায় কী আছে সেটি জানার আগ্রহ তার আরও অনেক বেশি। কোথায় আছেন সেই মানুষটি যিনি সারিন্দা বাজান? তিনিও কি গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন? তিনি কি এখন পুষ্করের হ্রদের তীরে বসে-বসে সারিন্দা বাজান?

পুষ্কর এখনও দেখা হয়নি নেহার। কখনও দেখা হবে কি না সে পরের কথা। কিন্তু পুষ্করের গল্প সে শুনেছে। শুনেছে, পুষ্করের হ্রদে যত মাছ খেলে বেড়ায়, নাকি তত কুমিরও। জ্যান্ত কুমির এখনও দেখেনি নেহা। অবশ্য ছবিতে দেখেছে। পাহাড়ও দেখেনি নেহা কোনোদিন। শুনেছে, পুষ্করের খানিক-খানিক দূরে পাহাড়। পাথর আর পাথর। এক পাহাড়ের নাম সাবিত্রী, অন্যটার নাম গায়ত্রী। পাহাড়ের চুড়োয় নাকি আছে মন্দির। সাদা দুধের মতো ধবধবে। একটার পর একটা পাথর ডিঙিয়ে যেতে হয় পাহাড়ের চুড়োয়, সেই মন্দিরে। কার্তিক মাসে, পূর্ণিমার চাঁদ যেদিন ওঠে, সেদিন পুষ্করে বসে মস্ত মেলা। কাতারে-কাতারে মানুষ আসে মেলা দেখতে। বিকিকিনি করতে। কত রকমের রংচঙে পোশাক। কত নাচ, গান, জাদুর খেলা। নেহা শুনেছে, এই মেলায় একটা মজার খেলা হয়। সে-খেলাটার নাম উটের দৌড়। দল বেঁধে উট ছুটবে। পিঠে বসবে উটের মালিক। যে জিতবে সে পাবে এত-এত সওগাত। আর কিছু না-হোক, এই উটের দৌড় দেখার জন্যেই নেহা যদি একবার পুষ্কর যেতে পারত! বাবা যে কেন শুধুই যুদ্ধ করেন, বুঝে উঠতে পারে না নেহা। বাবা যদি বেড়াতে নিয়ে যেতেন নেহাকে ওই পাহাড়ে, না হয় পুষ্করে, তবে সেটাই হত কাজের মতো কাজ। যুদ্ধ আবার কী কাজ! যুদ্ধে কত মানুষের প্রাণ যায় বলো! বেড়াতে গেলে তো আর মানুষের প্রাণ যায় না! বরঞ্চ কত কিছু দেখা হয়ে যেত নেহার। তবে অবশ্য, বাবার সঙ্গে নেহা একা-একা বেড়াতে যেত না। দস্তুরমতো মাকেও সঙ্গে নিয়ে যেত। মাকে একা রেখে নেহা কি একা-একা যেতে পারে কোথাও? কক্ষনো না। মা সঙ্গে না থাকলে মজাই হয় না।

কিন্তু এখন সে মাকে একা রেখেই চলেছে এপাড়া থেকে ওপাড়ায়। অবিশ্যি এটা তো পাহাড় বেড়াতে যাওয়া নয় যে, বিছানা বাঁধো, প্যাঁটরা গোছাও। নিজেদেরই গ্রামের পথে হেঁটে চলা। ওপাড়াটা এত কাছে থেকেও কেন যে তাদের নাগালের বাইরে, ভেবে পায় না নেহা। নিচুতলার মানুষ কেন উঁচুতলার মানুষের কাছে যেতে পারে না, এ কথা ভেবেও নেহা কূল-কিনারা করতে পারে না। মনে হয় সবই ধাঁধা। মানুষ সে মানুষই। এত ভাগাভাগির কী আছে? এই ভাগাভাগির কারণটা মা-ও জানেন কি না, নেহার তা জানা নেই। জানলে কি আর বলতেন না নেহাকে!

বজরা খেতের ধার ঘেঁষে বাবলা গাছের সার। সঙ্গে আকন্দ আর করিরের ঝাড়। কোথাও-কোথাও নাগর বেলি লতিয়ে আছে এদিকে-ওদিকে। কোথাও কাঁটাঘাস উটকাটরা। কোথাও বা করিল গাছ। তপ্ত রোদে তেতেপুড়ে ধুঁকছে যেন। খরার এমন বিপদে যে দেশের মানুষ শেষ কবে পড়েছে কে আর মনে রেখেছে। অথচ যে-ভাদ্র মাসে বৃষ্টি পড়ে অঝোর ধারায়, সেই ভাদ্রে মেঘের সঙ্গে রোদের আলোয়-কালোয় খেলা যে না দেখেছে, তার মতো মন্দ কপাল আর কার আছে! আর, এখন আকাশ দেখলে মনে হয়, সে যেন আগুন ঝরাচ্ছে। পুড়িয়ে-ধরিয়ে সব ছারখার করে দেবে। সূর্যের এই দুরন্ত তেজ যার গায়ে পড়েছে একবার সে-ই জানে তার কী জ্বালা। পাগল ছাড়া আর কে বলবে, 'আহা কী সুন্দর রোদ-ঝলমল দিন।' আর এই খটখটে রোদ ডিঙিয়ে যে এপাড়া থেকে ওপাড়ায় যায়, তাকে কী বলবে মানুষে?

'এই কে রে তুই?'

একেবারে ধড়াস করে উঠেছে নেহার বুকের ভেতরটা। কে ডাকে? চমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে নেহা। কোনদিক থেকে কে ডাকল সে ঠাওর করার আগেই তার মনে হল সে দেয় ছুট! কিন্তু ছোটার আগেই ভয়ে হাঁফাতে লাগল। আধ-পেটা খেয়ে-খেয়ে ছোটার দমও ফুরিয়ে গেছে। তবু মেয়েটা ছোটো বলেই রোদকে তুচ্ছ করে এতটা পথ এসেছে। কিন্তু হঠাৎ ডাকল কে? তাকে তো দেখা যাচ্ছে না। নেহা পিছু ফিরল।

'এই মেয়ে, কোথা যাচ্ছিস?'

দেখতে পেয়েছে নেহা। দেখে, একজন বুড়িমানুষ। ভুরটঘাসের কাঁটাফল খুঁজছে। আহা রে, কী দশা হয়েছে মানুষটার! চোখ দুটো যেন চুপসে কোটরে ঢুকে গেছে। গাল দুটো ভাঙা। মাথার চুল উসকো-খুসকো। গায়ের চামড়া ঝুলঝুল করছে। কতককালের একটা নোংরা ঘাঘরা পরে আছে। গায়ের জামাটাও তেমনই। তাকে দেখতে-দেখতে আনমনে এগিয়ে গেল নেহা। তার মুখখানা দেখে ভারি মায়া হল নেহার। নেহার ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল তার সঙ্গে কথা বলে। বলবে-কি-বলবে না ভাবতে-ভাবতেই সে কথা বলে ফেলল। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, 'বুড়িমা, তুমি এই ঝাঁ-ঝাঁ রোদে এখানে কী খুঁজছ?'

বুড়ি উত্তর না দিয়ে ভাঙা-ভাঙা গলায় নেহাকে ধমকে উঠল, 'আমি যা জিজ্ঞেস করছি আগে তুই তার উত্তর দে! তুই এই রোদ-দুপুরে কোথায় যাচ্ছিস? তুই কে রে?'

কোথায় নেহার বয়েস, আর কোথায় বুড়ির। কিন্তু বুদ্ধি বটে নেহার। উত্তর শোনার জন্যে নেহার মুখের দিকে বুড়িকে বেশিক্ষণ চাইতে হল না। নেহা তার চোখের পলক পড়ার আগেই উত্তর দিল, 'তুমি যা খুঁজছ বুড়িমা, আমিও তা-ই খুঁজতে বেরিয়েছি। দু-দিন আমার মা আর আমি কিচ্ছু খাইনি। একটু জল আর দুটো রুটির জন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি।'

নেহার কথা শুনে বুড়ি কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল। খিদের জ্বালায় অস্থির সেই মানুষটার গলার স্বর নিমেষে কেমন যেন নরম হয়ে গেল। বুড়ি নেহার মুখের ওপর থেকে নিজের চোখ সরিয়ে ভুরট ঘাসের ডালপালা হাঁটকাতে-হাঁটকাতে বলল, 'আমি দুটো কাঁটাফল খুঁজছি খিদের তাড়সে। আর তুই খুঁজছিস রুটি!' বলতে-বলতে বুড়ির শুকনো-মুখে কেমন যেন ঝলসে উঠল এক টুকরো হাসি। তারপর আবার বলল, 'তোর তো আশা কম নয়। রুটির কথা ভাবিস কী বলে! কে দেবে তোকে রুটি? যার আছে, সেও লুকিয়ে রাখে। নিজে খায়, কাউকে দেয় না। দুর্ভিক্ষের সময় এমনই হয়ে যায় মানুষ। স্বার্থপর! রুটি তোকে কেউ দেবে না। বরং আয়, দুটো কাঁটাফল খা। মায়ের জন্যে নিয়ে যা। আমি চারটে পেয়েছি। মানুষে যা পাচ্ছে তা-ই খাচ্ছে। আর থাকে! দ্যাখ না, গাছ ফাঁকা করে দিয়েছে। তার ওপর আমি আবার চোখে ভালো দেখি না। আমার খোঁজাই সার। কোথায়, কোন পাতার আড়ালে ফলটি ঝুলে আছে, সেটি আন্দাজে হাতড়ানো। দুটো চোখই গেছে।'

নেহা উত্তর দিল, 'তুমি সরো বুড়িমা, তোমায় কষ্ট করতে হবে না, আমি খুঁজে দিচ্ছি। আমি সব দেখতে পাচ্ছি।'

বুড়ি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, 'না, না, আমার জন্যে তোকে কষ্ট করতে হবে না।'

'এতে আবার কষ্ট কীসের? খিদের মুখে যদি দু-চারটে কাঁটাফল খুঁজে পাই, তবে কষ্টের বদলে আনন্দ হওয়ারই তো কথা।' উত্তর দিল নেহা।

বুড়ি ভাবল, কথাটা ঠিকই বটে। মেয়েটা ছোট্ট বটে, তবে বুদ্ধিতে খাটো নয়। তাই বুড়ি খুশি হয়েই বলল, 'তা বটে, তবে দ্যাখ খুঁজে পাস কি না! তার আগে তুই দুটো ফল মুখে দে!' বলে বুড়ি কোলের ভেতরে রাখা দুটো ফল তুলে ধরল নেহার চোখের সামনে।

নেহা হাত বাড়াল।

বুড়ি নেহার হাতে ফল দুটি তুলে দিতে-দিতে বলল, 'ক-দিন কাঁটাফল খেয়েই আছি।'

নেহা বুড়ির হাত থেকে ফল দুটি নিল। একটি ফল বুড়ির মুখের কাছে তুলে ধরে বলল, 'আমি তোমায় বুড়িমা বলে ডেকেছি। আমি তোমার মেয়ে। আমার যদি অনেক পয়সা থাকত, তোমার জন্যে ক-টা রুটি কিনে এনে দিতুম। সে আর যখন পারছি না, তখন, তোমার কষ্ট করে খুঁজে-পাওয়া খাবার তুমি খাও!'

বুড়ি চোখ মটকাল। তারপর বলল, 'তুই না বললি আমার মেয়ে? বল, কোন মা মেয়েকে উপোসি রেখে মুখে খাবার তুলতে পারে?'

হ্যাঁ, ঠিক বলেছে বুড়িমা। চকিতে নেহার মনে পড়ে গেল মায়ের কথা। সত্যিই তো, তিনি নিজে কিছু খাবার আগে দেন নেহাকে। তারপর যতটুকু থাকে, ততটুকুই মুখে দেন। মা-র মুখখানা ভেসে ওঠে নেহার চোখের ওপর হঠাৎ? মা-র অমন সুন্দর মুখের এখন কী ছিরি হয়েছে! কুঁচবরণী মায়ের অঙ্গে যেন অন্ধকারের ছায়া নেমেছে।

নেহাকে হঠাৎ অমন চুপ থাকতে দেখে বুড়ি জিজ্ঞেস করল, 'কই, কথা বলছিস না যে? আমার কথা রাখবি না?'

নেহা হকচকিয়ে গেছে। হঠাৎ যেন তার চমক ভাঙল। সে বলে উঠল, 'ঠিক আছে, তুমি যখন বলছ, আমি একটা খাচ্ছি। বাকি ক-টা তুমি খাও! দেখি, আর খুঁজে পাই কি না। এই ফল দু-চারটে খেয়ে কোনো মানুষের পেট ভরে বলো? তুমি আমায় ক-টা দিয়ে দিলে, তোমার পেট ভরবে কেমন করে?' বলতে-বলতে একটা কাঁটাফল বুড়ির মুখে নিজের হাতে তুলে দিল। আর একটা নিজের মুখে দিয়ে আরও পাওয়ার আশায় ভুরটঘাস হাতড়াতে লাগল।

নিজের মনে ফল খুঁজছে নেহা।

আপন মনে ফল চিবোচ্ছে বুড়ি।

হঠাৎ ভুরটঘাসে একটা ফল দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল নেহা, 'বুড়িমা, একটা পেয়েছি।' বলে ছিঁড়তে-না-ছিঁড়তে আবার চেঁচিয়ে বলল, 'আর-একটা পেয়েছি।'

বুড়ি খুশি-খুশি চোখে নেহার দিকে তাকিয়ে বলল, 'তোর চোখ দুটো ভোরের আলো রে, মেয়ে। সবে ফুটছে। আর, আমার চোখের আলো নিভছে। তোর আলোয় পাখি বাসা ছেড়ে আকাশে ওড়ে। আর, আমার আলোয় বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে।' বলে বুড়ি হেসে উঠল। সে কী দরদভরা হাসি।

নেহাও হাসল। হাসতে-হাসতে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি এখনও হাসতে পারছ? আর হেসো না, হাঁফিয়ে যাবে।'

'যা বলেছিস। না খেয়ে আর দম থাকে?' বুড়ির হাসি থামল।

বুড়ির হাসির সঙ্গে কথা থামতে-না-থামতেই নেহা আনন্দে চিৎকার করে উঠল, 'বুড়িমা, আর একাট ফল পেয়েছি। এই নাও! দেখি, আরও পাই কি না।'

বুড়ি উত্তর দিল, 'পাবি, নিশ্চয়ই পাবি। খুঁজলেই পাবি। তোর তো এখন খোঁজারই বয়েস।'

বুড়ির সব কথার সব মানে বোঝে না নেহা। খোঁজার আবার বয়েস কী? সব বয়েসের মানুষেরাই তো ঘুরছে, ফিরছে, খাবার খুঁজছে। খিদে পেটে নিয়ে কে আর চুপচাপ বসে থাকে?

এমন সময়ে হঠাৎ নেহা জিজ্ঞেস করে বসল, 'বুড়িমা, তুমি কোন তলার মানুষ গো? উঁচুতলার? না, নিচুতলার?'

থমকে চাইল বুড়িমা নেহার দিকে। নেহা তখন পিছু ফিরে ফল ছিঁড়ছে। জিজ্ঞেস করল, 'উঁচু-নিচু এসব কী জিজ্ঞেস করছিস রে মেয়ে?'

নেহা এবার মুখ ফেরাল বুড়ির দিকে। বলল, 'যেমন-যেমন পাড়া, তেমন-তেমনই তো উঁচুতলা, নিচুতলা। নিচুতলার পাড়ার লোক উঁচুতলার পাড়ায় যেতে পারে না। বলে নাকি যেতে নেই। কেন যেতে নেই, আমি ভেবেই পাই না।'

বুড়ি বলল, 'শোন রে মেয়ে, আমাদের সবার জন্যে আছে একটাই ছাদ। সে-ছাদের নাম আকাশ। আমাদের পাড়াও একটা। সে-পাড়ার নাম বসুন্ধরা। সেখানে বাতাস বয়। আমরা সবাই সেই বাতাস বুকে নিয়ে বেঁচে আছি। সেখানে আকাশ আলো দেয়। দিনের সূর্য, রাতে চন্দ্রিমা। এসবের জন্যে আমাদের কিছুই দাম দিতে হয় না। বৃষ্টির কোনো দাম নেই রে মেয়ে। কিন্তু বৃষ্টি না-হলেই আমাদের বিপদ। না-খেতে পেয়ে আমাদের জীবন যায়। জীবন দিয়ে দাম মেটাতে হয়।'

'তুমি ঠিক বলেছ বুড়িমা। অথচ মা বলে, আমরা নিচুতলার লোক। আমাদের ঠাকুরের মন্দিরে ঢুকতে নেই। ছোঁয়াছুঁয়ি করতে নেই। কেন বলো তো? এই তো আমি খেত ডিঙিয়ে উঁচুতলার পাড়ায় চলে এসেছি। তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে? আচ্ছা, তুমি উঁচুতলার লোক, না, নিচুতলার?'

হঠাৎ বুড়ি যেন চমকে উঠল। হঠাৎ বুড়ি যেন চোখ পাকাল। হঠাৎ বুড়ি ধমকে উঠল, 'তুই নিচুতলার লোক? অ্যাঁ! তুই লুকিয়ে-ছাপিয়ে এপাড়ায় ঢুকেছিস? তোর হাতে-ছোঁয়া কাঁটাফল খেলুম! থুঃ থুঃ! তুই তো ভারি নচ্ছার মেয়ে!' বলেই বুড়ি চিৎকার শুরু করে দিল। তার চিৎকার শুনে এই বুঝি দঙ্গল বেঁধে ছুটে আসে পাড়ার লোক!

কোত্থেকে আসবে? পাড়ার লোক পাড়ায় থাকলে তবে তো আসবে। আসলে কিন্তু তা নয়। বুড়ি জেনেশুনেই হাঁক পেড়েছে। জানে, কেউই আসবে না। এ চিৎকার তো বুড়ির ভণিতা করা। দেখতে পাচ্ছ না, বুড়ির ঠোঁটে কেমন মুচকি হাসির ছোঁয়া লেগে আছে?

কিন্তু নেহা কি আর অত দেখে! বুড়ির চিৎকার শুনেই তার ভয়ে প্রাণ শুকিয়ে গেছে। দে ছুট!

ছুটবে কী! দম নেই। একটু ছোটে, দাঁড়িয়ে পড়ে। দম নেয়। আবার ছোটে। হোঁচট খায়। সামলে যায়। আবার ছোটে।

নেহাকে হঠাৎ অমন ছুটতে দেখে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায় বুড়ি। চেঁচিয়ে ওঠে, 'ওরে মেয়ে, দাঁড়া, দাঁড়া! আমি তোকে মিথ্যে-মিথ্যে ধমকেছি। ওরে মেয়ে, আমাকে তুই মা বলেছিস। আমাকে আর কেউ মা বলেনি। আমি কারও মা হতে পারিনি। আমি বড়ো হতভাগ্য রে! আমাকে ফেলে পালাস না।'

আর পালাস না! নেহা হাঁফাতে-হাঁফাতে লাফাতে-লাফাতে যেদিকে চোখ যায়, সেইদিকেই পালায়! কোন পাড়া দিয়ে কোথায় ছুটছে, জানে না সে। জানে না সে এটা উঁচুতলার পাড়া, না, নিচুতলার। ভয়ে চোখে অন্ধকার দেখে নেহা!

না, আর ছুটতে পারে না নেহা। মেয়েটা যদি আধপেটা খেয়ে না-থাকত, তবে সে হরিণের মতো ছুটতে-ছুটতে আমাদেরও চোখের আড়ালে হারিয়ে যেত। কিন্তু পারল না সে। আর-একফোঁটাও দম নেই তার। সে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘন-ঘন নিশ্বাস পড়ছে তার। এখনই একটা কোনো কিছুর আড়ালে লুকিয়ে না-পড়লে, নির্ঘাত সে ধরা পড়বে। সুতরাং হাঁকপাক করে সে আড়াল খোঁজে। না, এখানে কোনো গাছ নেই। নেই আকন্দের ঝোপ কিংবা কোনো ছায়া। কোথায় লুকোবে নেহা?

ওই তো, দেখতে পেয়েছে একটা কুঁড়েঘরের আড়াল। ওই কুঁড়ের আড়ালেই লুকিয়ে পড়ল নেহা। গাছের আড়ালে যেমন করে লুকিয়ে থাকে পাখি, তেমনই করে লুকিয়ে সে কাঁপতে লাগল শ্বাস ফেলতে-ফেলতে। বুকের ভেতরে কাঁপন। মনের ভেতরে ভাবনা, এখন কী হবে তার? যে-মানুষটা তাকে মেয়ে বলল, যে-মানুষটা মুখে অমন ভালো-ভালো কথা বলল, সেই মানুষটাই এমন কাণ্ড করল! নেহা নিচুতলার মানুষ বলে চেঁচিয়ে লোক ডাকতে শুরু করে দিল!

না, না বুড়ি শুধু মজা করতে চেয়েছিল। এ তার শুধুই ভান। বুড়ি মিথ্যে-মিথ্যে ভয় দেখিয়েছে নেহাকে। নইলে, আকাশের ছাদটা যে আমাদের সবার, এই কথাটা বুড়ি কি বলতে পারত?

কিন্তু তাই বলে অমন করে আচমকা চেঁচিয়ে ওঠাটা বুড়ির কি উচিত হয়েছে? তুমি তো দেখতেই পাচ্ছ, মেয়েটা নেহাতই বাচ্চা।

সে-কথা তুমি বলতেই পারো। হঠাৎ অমন ধমক না দিলেই পারত বুড়ি। অবশ্য এটা বুড়ি বুঝতেই পেরেছে। পেরেছে, কিন্তু বড্ড দেরিতে। বুড়ির গলার আওয়াজ শুনে দু-চারটে লোকও তো ছুটে এসেছে। গ্রামে যদি সব মানুষই থাকত, তবে কী কাণ্ডটাই না হত বলো তো! তা ওই দু-চারটে মানুষেরই যদি ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই দেখতে! দুর্ভিক্ষের দেশের মানুষগুলো না খেতে পেয়ে প্যাঁকাটি হয়ে আছে, তবু তাদের তড়পানি যদি দেখতে! তাদের আপসোস শিকার হাতছাড়া হয়ে গেছে। পেলেই ছিঁড়ে খায়। বলতে কী, তাদের ওই তড়পানি দেখে বুড়ি নিজেই ভয়ে মরে। তা এখন ভয় পেলে কী হবে! তোমার হাঁকাহাঁকিতেই তো এই গোলমেলে কাণ্ডটা বাধল। তবে মিথ্যে বলব না, বুড়ি তাদের বলতে কসুর করেনি যে, সে ঝুটমুট চেঁচিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সে-কথা বললে কে শুনছে। এদিকে যে নেহাকে একজন দেখে ফেলেছে ছুটে পালাতে। সে তো আর কানা নয়। দস্তুর মতো তার বয়েস হয়েছে। এইটুকু ছুটে আসতেই দম ফুরিয়ে টসকে গেছে। নইলে গায়ে যদি তাকত থাকত, একছুটে ধরে ফেলত মেয়েটাকে। সে-ই তো বুড়িকে জাঁকিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করে বসল 'হঠাৎ তুমি অমন করে কথা ঘোরাচ্ছ কেন? আমি তো নিজে দেখেছি, একটা মেয়েকে পালাতে! নিচুপাড়ার মেয়ে না-হলে পালাবে কেন?'

'কে বলেছে তোকে সে নিচুপাড়ার মেয়ে?' বুড়ি তাকে খেঁকিয়ে উঠল। 'তা ছাড়া এখন আমরা অনাহারে মরতে বসেছি। মরবার সময় উঁচুনিচু নিয়ে তর্কাতর্কি করে কোন পুণ্যকাজের চিহ্ন রেখে যাব আমরা? আগে বাঁচ, তারপর রোখ দেখাস!'

'মেয়েটার জন্যে তোমার তো দেখি বড্ড দরদ।' লোকটা তিরিক্ষি মেজাজে চেঁচাল।

'দরদ হবেই তো। আমি চোখে দেখি না বলে সে নিজের হাতে গাছের থেকে কাঁটাফল পেড়ে দিয়েছে। দুটো-চারটে কাঁটাফল খেয়েই তো বেঁচে আছি। কোথাও একফোঁটা জল পর্যন্ত নেই। দু-একদিনের মধ্যে যদি দেবতা দয়া না করে, যদি আকাশ থেকে বৃষ্টি না-ঝরে, তবে আমরা সবাই শুকিয়ে মরব যে! তখন কোথায় থাকবে তোদের উঁচু-নিচুর লাঠালাঠি? বাঁচতে যদি চাস আকাশে হাত তুলে বৃষ্টির জন্যে কাঁদ। কিছু না-পারিস মরবার আগে অন্তত উঁচুতলা, নিচুতলার খেয়োখেয়িটা বন্ধ রাখ। তাতে সুখে মরতে পারবি। ওরে হতভাগা, উঁচুতলার মানুষই হোক, কি নিচুতলার মানুষ, মরলে সবাই ছাই। ঝড় উঠলে সেই ছাই-এর জাত থাকে না। সব একাকার।'

হক কথা বলেছে বুড়ি। কিন্তু মানছে কে! তবু মিছিমিছি একটা একরোখা বুড়ির সঙ্গে তক্ক-বিতক্ক করে লাভ নেই। বুড়ি তো পা বাড়িয়েই আছে। দু-একদিনের মধ্যে বৃষ্টি না-হলে, বুড়িই যে সবার আগে পথ দেখবে এ-কথা কে না জানে। কাঁটাফল খেয়ে তো আর অনন্তকাল বাঁচতে পারে না একটা বুড়ি। মরলে বুড়িই যে আগে যাবে, এ আর এমন কী কথা। সুতরাং বুড়ি যদি নিচুতলার একটা মেয়ের ছোঁয়া কাঁটাফল খেয়ে তৃপ্তি পায়, তবে পেতে দাও। বুড়িকে হাতে মারার দরকার নেই। সুতরাং এখান থেকে কেটে পড়াই ভালো। অবিশ্যি একজন বলতে ছাড়ল না, 'বুড়ির সঙ্গে ঝুটমুট কথা কাটাকাটি না করে মেয়েটাকে খুঁজলে কাজে দিত। মেয়েটার এপাড়ায় ঢোকা চিরদিনের মতো ঘুচে যেত। বড্ড ভুল হয়ে গেছে। আর কি তাকে খুঁজে পাবে? শিকার এতক্ষণে ফুড়ুত!'

লোকগুলোও ফুড়ুত। সুড়ুত-সুড়ুত যে যার জায়গায় ফিরে গেল। বুড়ি-মানুষটা রোদের মধ্যে পড়ে রইল একা। নিজের মনকে ধিক্কার দিয়ে ভাবতে বসল, ছি-ছি অমন সহজ-সরল মেয়েটাকে এমন করে কেন সে ভয় দেখাল। ভণিতা যে সত্যি হয়ে যাবে, এ-কথা যে বুড়ি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। হায় রে, মেয়েটাকে আর কি কোনোদিন কাছে পাবে সে! তার কি আর কোনোদিন দেখা পাবে! যদি কোনোদিন দেখা পায়, তবে বুড়ি সেদিন দু-হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরবে। বুক ভরে আদর করবে। আর বলবে, বেঁচে থাক মা, বেঁচে থাক। তোরা বেঁচে থাকলেই পৃথিবীটা বাঁচবে। পৃথিবীর ছাদের নীচে আমরা কেউ উঁচুও নই, নিচুও নই। আমরা সবাই একই ঘরের বাসিন্দা। সবাই একই বাতাসে শ্বাস নিই। একই জলে তৃষ্ণা মেটাই। আমরা সবাই, সবার বন্ধু।

বুড়ি উঠে দাঁড়ায় ভাবতে-ভাবতে। কোমরটা সোজা করতে পারে না। বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে সব ভাঙছে। যেমন কোমর ভাঙছে, তেমনই মনও। হ্যাঁ, মন ভেঙেছে তার অনেককাল আগেই। আজ আবার সেই ভাঙা-মন সে নিজেই আরও ভেঙে বসল। মেয়েটার জন্যে বুড়ির মন বড্ড কেমন কেমন করছে। ছোট্ট মেয়েটার মুখখানি আহা, কী টুলটুলে! শুকিয়ে গেছে। প্রজাপতির পাখার মতো নরম ঝলমলে তার দেহখানি। রোদের তেজে পুড়ে গেছে। রোগা-রোগা তার হাতের আঙুলগুলি গাছের পাতা ছুঁয়ে-ছুঁয়ে ফল খুঁজছিল। মনে হচ্ছিল, পাখি যেন নাচছে। কী চমৎকার দেখতে লাগছিল তখন। তখনই বুড়ির মনে পড়ে যায় নিজের কথা। তার কিশোর বয়েসের কথা। সেদিন বুড়িও তো কম সুন্দরী ছিল না। যেমন ছিল তার গায়ের রং, তেমনই ছিল তার মুখখানি। বয়েসকালে বুড়ি যখন মাথায় সাজাতো শিসফুল, কপালে দিত সোহিলী তিলক, কানে ঝুমকো, গলায় টকাবল হার, হাতে পরত বাজুবন্ধ, হাতির দাঁতের পেচদার, তখন কী সুন্দরীই না দেখতে লাগত বুড়িকে। রঙিন ঘাঘরা পরে আর রংচঙে জামা গায়ে দিয়ে পায়ের মল বাজিয়ে বুড়ি যখন সেই কম বয়েসে হেঁটে যেত, তখন রূপ উপচে পড়ত তার।

সেই কবে বিয়ে হয়েছিল বুড়ির, সে-ই-ই কবে। তখন সে কত ছোটো। তখন তার বয়েস হবে তিন কি চার। তেমনই তার বরও। তার বর এসেছিল বিয়ে করতে ঘোড়ায় চড়ে। ঘর-ভর্তি মানুষজন। কত বাজনা-বাদ্যি। কত খুশি মজা। বিয়ে যে কী, তার হাটহদ্দ কিছুই বুঝত না কনে। সবাই আনন্দ করছে। সবার সঙ্গে, সে-ও হেসে-খেলে লুটোপুটি খাচ্ছে। কখনও ছুটছে, কখনও নাচছে। কখনও পড়ছে, কখনও উঠছে। খিদে পেলে কাঁদছে। নয়তো, রসের খাবার মুখময় মাখামাখি করে লোক হাসাচ্ছে। সে এক কাণ্ড বটে! তার পর পুজো-আর্চা হল। বিয়ের গান হল। পেটপুরে খাওয়াদাওয়া হল। হই-হই ব্যাপার। ঘোড়ায় চড়ে অনেকটা পাহাড় ডিঙিয়ে, খানিকটা বালি টপকে বর এসেছিল বিয়ে করতে। আবার সেই পথেই বর বিয়ে করে একা ফিরে যাচ্ছিল নিজের বাড়িতে। একা মানে, সঙ্গে কনে ছিল না। তা ছাড়া আত্মীয়-স্বজন, বাবা-কাকা সবাই ছিল। নিয়মমাফিক বিয়ে হল বটে, কিন্তু ওই ছোট্ট কনেকে ঘরে নিয়ে গিয়ে কী করবে! বারো বছর পর বর আবার আসবে শ্বশুর বাড়ি। তখন বউ যাবে তার সঙ্গে। এই বারো বছর চোখের আড়ালে থাকলে যা হয়, দু-জনে দু-জনকে ভুলে গেল। হবেই তো এই বয়েসে কত বন্ধু। কত হাসি, গান, খেলা। কত আদর মা আর বাবার। এসব ছেড়ে মনে থাকে বিয়ের কথা! বিয়ে, সে কী-না-কী।

কিন্তু বারো বছর পর আবার যখন উৎসবের বাজনা বেজে উঠল, তখন তো বুড়ি বড়ো হয়েছে। ততদিনে কতবার যে সে তার নিজের বিয়ের গল্প শুনেছে আপনজনের কাছে! সে জানে, এবার বর আসবে তাকে নিয়ে যেতে। তাকে যেতে হবে শ্বশুরবাড়ি। বরের সঙ্গে। মা-ও যাবেন না, বাবা-ও যাবেন না। সবাই তাকে চোখের জলে বিদায় দেবে। সে চিরদিনের মতো পর হয়ে আপন ঘরে চলে যাবে। আহা!

বর এসেছিল যেদিন, আলো-ঝলমল উৎসব শুরু হয়েছিল সেদিন। সেদিনও বর এসেছিল ঘোড়ায় চড়ে। যেমন এসেছিল ছোট্টবেলায় বিয়ে করতে। ছোট্টবেলায় যে ঘোড়ায় চেপে সে এসেছিল বিয়ে করতে, সেটা ছিল টাট্টুঘোড়া, সাদা। কিন্তু এবার সে এসেছিল নীল ঘোড়ায় চেপে। এর নাম তুফানি। বউ যাবে চৌদোলায় চড়ে। বর যাবে ঘোড়ায়। সঙ্গে যাবে বাজনদার মিছিল করে। অনেকটা এক্কাগাড়ির মিছিল। অনেকটা, সেই নাগপাহাড়ের পা অবধি। তারপর নাগপাহাড় ডিঙোবে তারা পায়ে-পায়ে। শুধু বর যেমন যাচ্ছে ঘোড়ায় চেপে তেমনই যাবে। আর কনে যেমন যাচ্ছে তেমনই যাবে চৌদোলায় দুলে। বরের আগে চৌদোলা চলছে দোল-দোল। ঘোড়া চলছে টগবগ-ঘটাং ঘট। পাথর পড়ে গড়িয়ে। না-হয় শব্দ পড়ে ছড়িয়ে। পাহাড়ের গায়ে-গায়ে পথ। পথচলার শব্দ ছাড়া আর সব নিঃঝুম। নির্জন চারদিক। কোথাও পথ সোজা-খাড়া। কোথাও নিচু। কোথাও কোথাও খাদ। কোথাও মস্ত একখানা পাথরের ঢিপি। পথের মধ্যিখানে পথ আগলে পড়ে আছে। সাবধানে চলো! পিছলে গেলে নির্ঘাত মরণ। নির্জন পাহাড়ের গায়ে-গায়ে বিয়ের বাদ্যি প্রতিধবনি তুলছে। অদ্ভুত মায়াজাল ছড়িয়ে ভেসে যায় দূরে, আরও দূরে! ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যায়। কোথায় হারায় কেউ জানে না। কোথায় যায় এত শব্দ? কোথায় তাদের আস্তানা?

বর চলেছে ঘোড়ার পিঠে। বরের মাথায় চুমকি আঁটা পাগড়ি। পায়ে নাগরা। রেশম-বোনা কুর্তা। পাজামা। গলায় হার।

হঠাৎ এ কী হল!

কী হল?

বরের ঘোড়া পাহাড়ের পথ ভাঙতে-ভাঙতে হুমড়ি খায় যেন! চোখের পলকে থুবড়ে পড়ে পাথরের ওপরে। সঙ্গে সঙ্গে বরও পড়ে। বরের পাগড়ি ছিটকে পড়ে পাথরের ওপরে। গেল! গেল! গেল! বলতে না-বলতেই বর লাট খেয়ে পড়ে গেল খাদের ভেতরে! সর্বনাশ!

কোথায় বাজনা, আর কোথায় মিছিল! শুরু হয়ে গেল চিৎকার, চেঁচামেচি! আর্তনাদ, কান্নাকাটি! শুধু ওই কিশোরী কনে বোবার মতো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে নীচে, ওই খাদের দিকে। শূন্য তার চোখের দৃষ্টি। সে কী করবে এবার? সে কি কাঁদবে? না কি খাদের ভেতর সে-ও ঝাঁপিয়ে পড়ে বরকে উদ্ধার করে আনবে?

না, তাকে খাদে ঝাঁপ দিতে হয়নি। অন্য অনেকে অনেক কষ্টে খাদের ভেতর থেকে তুলে আনতে পেরেছিল রক্তে মাখামাখি বরের মৃতদেহটা। তারপর আবার যাত্রা। এ-যাত্রা আনন্দের নয়, শোকের। এবার কোনো বাদ্যি বাজল না। কেউ কোনো গান গাইল না। নিঃশব্দে সবাই এগিয়ে চলল, বরের ছিন্নভিন্ন দেহটা নিয়ে। পাহাড় থেকে সমতলে।

আর?

চৌদোলার ভেতরে এক হতবাক কিশোরী কনে হতভম্ব হয়ে ভাবছে, এ কেমন বিচার? কে তার এমন সর্বনাশ করল? কে সে? কোথায় থাকে সে?

হ্যাঁ, এবার সে কেঁদে ফেলল। তার বোবা-কান্না এবার অঝোর ধারায় চোখের জলে ভেসে গেল। চৌদোলা চলেছে। দুলছে। মেয়েটার অশ্রু-ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে তার গাল বেয়ে। সে কেঁদে-কেঁদে সারা হয়। তারপর? সে কিছুই ভেবে পায় না।! বারবার মনে হয় চৌদোলার বাহকদের বলে, আমায় ফিরিয়ে নিয়ে চলো আমার মায়ের কাছে, আমার বাবার কাছে। কিন্তু বলতে পারে না। এখন মা ছাড়া কে তাকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দেবে? বাবা ছাড়া কে তাকে সাহস জোগাবে?

না, এই দুর্গম পাহাড়ে এখন তার আপন বলতে কেউ নেই আর। যে তাকে আপন করলে তার অন্য স্বজন তাকে আপন করত, সেই মানুষটারই তো খাদে পড়ে প্রাণ গেল। না, সে কিছুতেই শান্ত থাকতে পারে না। কখনও ভয়ানক আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে ওঠে তার বুকের ভেতরটা! কখনও ভয়ঙ্কর ভাবনায় শিউরে ওঠে সারা দেহ! ভীষণ যন্ত্রণায় মাথা যেন খসে পড়ে! চোখ যেন অন্ধকার হয়ে আসে ভয়ে! সে বুঝি চৌদোলার ভেতর আর বসতে পারে না! বুঝি লুটিয়ে পড়ে দুলতে-দুলতে!

না, লুটিয়ে সে পড়ল না। অনেক কষ্টে নিজের চোখদুটোকে চৌদোলার ভেতর থেকে আলোর দিকে ফেরাতে পারল। অনেক কষ্টে অন্ধকার কাটল তার। অনেক কষ্টে বুকের কাঁপুনিটা সামলে সে একজন চৌদোলার বাহককে বলল, 'আমার বড়ো তেষ্টা পাচ্ছে। একটু জল দিতে বলো না কাউকে!'

না, কেউ তাকে জল দিল না। এদিক-সেদিক থেকে অনেকেই এলোমেলো গলায় বলে উঠল, 'না, এখন তোমার মুখে কিছু দেওয়া চলবে না!'

একজন বয়স্ক মানুষ কর্কশ গলায় তেড়ে উঠল, 'জল! অলক্ষুনে বউ! তোর পাপে আমার ছেলে ঘর পর্যন্ত পৌঁছতে পারল না। আমার ছেলের সঙ্গে তোকেও চিতায় উঠতে হবে। তখন একটু জল চাইলে পাবি। তার আগে একফোঁটা জলও তোকে দেওয়া হবে না।'

ভয়ে কাঠ হয়ে গেল সেই কিশোর বয়সের এই বুড়ি। সে জানে, তাকে বাঁচতে দেবে না এরা। তাকেও মরতে হবে তার বরের সঙ্গে। ভাবতে-ভাবতে আঁতকে ওঠে মেয়েটা। না, সে কিছুতেই মরবে না। সে তার বাবা-মার কাছে ফিরে যেতে চায়। 'চৌদোলার মুখ ঘোরাও' এই কথাটা খুব চিৎকার করে বলতে পারলে সে বাঁচতে পারত কি না, কে বলবে? কিন্তু চিৎকার করা দূরে থাক, সে টুঁ শব্দ পর্যন্ত করতে পারল ন। সেই বয়স্ক মানুষটার ধমক শুনে সে যেন সত্যিই বোবা হয়ে গেল। তার অমন মায়াবী মুখখানা বোবা-কান্নায় থম মেরে রইল।

চৌদোলায় দুলতে-দুলতে সে এল শ্বশুরবাড়ি। জীবন্ত বরের সঙ্গে এলে যে বাড়িতে এতক্ষণে আনন্দের বান বয়ে যেত, সেখানে কান্নার রোল উঠল। কেউ দেখল না কনের দিকে চেয়ে। মেয়ের সর্বনেশে ওই মুখ দেখতে কার আর মন কেঁদেছে। থাক ও পড়ে। এমন অলক্ষ্মীর দৃষ্টি ঘরে পড়লেও ঘরের অমঙ্গল।

কেউ তাকে দেখল না বলে, কনে বসেই ছিল চৌদোলায়। বাড়ি জুড়ে তখন শোকের হাহাকার। সব যেন কেমন তছনছ হয়ে গেল। অমন যে আনন্দের উচ্ছ্বাস ফুৎকারে কোথায় মিলিয়ে গেল! কোথায় গেল বাদ্যি-বাজন! কোথায় গেল গানের কলতান! রংচং। হই-হল্লা। হাসি-হুল্লোড়। এমনকী, কোথায় গেল চৌদোলার বাহকরা!

কনে বসে ছিল একাই চৌদোলার ভেতরে।

মৃত বরের দেহটা ঘিরে চলছে হা-হুতাশ।

চৌদোলার ভেতর বসে-বসে কনে তার মাথার মুকুট খুলে ফেলল। তার গায়ের গয়না ছুড়ে ফেলল। মুখের চন্দন মুছে ফেলল। মুখ বাড়িয়ে সে দেখল কেউ কোথায় আছে কি না! না, এদিকটা ফাঁকা। ভিড় যত বাড়ির ভেতর। কারও দৃষ্টি নেই এদিকে। সবার চোখ ওদিকে।

চৌদোলা থেকে চুপিসারে নেমে পড়ল কনে। ধীর পায়ে সে এগিয়ে গেল উলটো দিকে। কেউ না দেখতে পায়। সে এই গাছের আড়াল থেকে আর-এক গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। খানিক লুকিয়ে থাকল। তারপর উঁকি মারল। না, কেউ তাকে দেখতে পায়নি। একদঙ্গল মানুষ ভিড়ের ভেতর থেকে দেখছে বরের মৃতদেহটা। শোয়ানো আছে সামনেই। কনে ভাবল, বাঁচতে হলে পালাতে হবে। আর এই সুযোগ পালানোর। একটুও ছটফট করা নয়। আস্তে-আস্তে বেরিয়ে এসো গাছের আড়াল থেকে। একটি-দুটি পা ফেলে এগিয়ে চলো সামনে। মাথার চুলগুলো এক টু নুড়নুড়ি করে নাও! চোখের কাজল ঘসে ফেলো ধ্যাবড়া করে চোখের ওপর। গায়ের ওড়নাটা এলোঝেলো করে এপাশে-ওপাশে ছড়িয়ে দাও। ঘাঘরাটা পারো তো মাটিতে লুটিয়ে দাও পায়ের কাছে। না-হয় পায়ের ওপর থেকে আর একুট তুলে হাণ্ডুল-বাণ্ডুল করে ফেলো। সম্ভব হলে রাস্তা থেকে একমুঠো বালি তুলে গায়ে-মুখে মেখে নাও! তোমায় যেন দেখলে মনে হয়, তুমি পাগল মেয়ে। এবার চলো হেঁটে। এখন আর তোমাকে কেউ চিনতে পারবে না। যদি তোমার সামনে কেউ এসে পড়ে, তুমি অকারণে খিলখিল করে হেসে ওঠো। নয়তো, গুনগুন করে গান জুড়ে দাও! গুনগুন করতে করতে তুমি কেঁদে ফেলো! কিংবা হেসে ওঠো বিকট চিৎকার করে হা-হা-হা!

হ্যাঁ, ওই বুড়িকে তুমি যদি তার কিশোর বয়েসে ওইসময়ে দেখতে, তখন তুমি তাকে পাগল ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারতে না। কেমন সে পাগলের মতো হাঁটছে দ্যাখো নিঃসাড়ে! এখানে সে একটু দাঁড়াক। এখানে সে একটু আড় পেতে শুনুক। একঝলক দেখে নিক!

দেখছে সে। কেউ নেই ত্রিসীমানায়। ভেসে আসছে মৃত বরের শোকে কাঁদছে যেসব মানুষ, তাদের আর্তনাদ।

এবার ছুটল সেই পাগল। এখান থেকে দূরে, আরও একটু দূরে। অস্পষ্ট হয়ে এল কান্নার শব্দ। এবার সে দাঁড়াল নিমেষ। আর ছুটল না। হাঁটল সে। পাগলের মতো আলুথালু হয়ে এলোমেলো পা ফেলে। তার ওড়নাটা এখন দ্যাখো ধুলোয় লুটোচ্ছে! সে যতই হাঁটছে ততই ভাবছে, কোনদিকে যাবে। জানে না তাদের বাড়ির রাস্তাটা কেমন করে চিনতে পারবে। কাকে জিজ্ঞেস করবে সে-কথা? পাগল কি আর বাড়ির পথের খোঁজে হন্যে হয়ে জিজ্ঞেস করে বেড়ায়! পাগল তো আপন খেয়ালে এখানে-ওখানে পড়ে থাকে। কে আর তার দিকে ফিরে তাকায়? কে আর জিজ্ঞেস করে, তোর এমন দশা কেন? কী হয়েছে তোর?

কেউ জিজ্ঞেস না করলেও এই কথাটা যখনই তার মনে পড়ে, তখনই কেমন যেন হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়! তখনই সে আকুল হয়ে ভাবে, কেন তার এমন হল? কেমন করে সে আবার মুখ দেখাবে, মাকে, বাবাকে আর সক্কলকে? তাঁরাও যদি বলেন, সে অলক্ষুনে মেয়ে। যদি বলেন, 'তোর মুখ দেখতে চাই না। দূর হয়ে যা তুই।' তখন কী করবে সে?

অবশ্য সে তো এখন অনেক পরের কথা! আগে বাড়ি যাওয়ার পথটা খুঁজে বার করতে পারলে, তবে তো এসব কথা উঠবে। আর মা কিংবা মায়ের সঙ্গে বাবা যদি সত্যিই বলেন, তোর মুখ দেখব না, তখন তো সে তাঁদের জিজ্ঞেস করতেই পারে, 'তোমরা কেন আমার মুখ দেখবে না? বলো, আমি কী দোষ করেছি যে তোমরা নিজের মেয়ের মুখ দেখতে চাও না? বলো না, ছোট্টবেলায় তোমাদের মেয়ের এই মুখে তোমরা কত চুমো খেয়েছ আদর করে, সে-সবই কি মিথ্যে?'

ভাবনা, এ শুধুই ভাবনা। এই বুড়ির সেই কিশোরবেলার ভাবনা।

এ কী! ভাবতে-ভাবতে এ সে কোথায় চলে এসেছে! বোধ হয় আর তাকে খুঁজে পাবে না কেউ। সে বোধ হয় এ-যাত্রায় বেঁচে গেল!

বাঁচল হয়তো। কিন্তু এ-বাঁচার কী মানে! চেয়ে দ্যাখো আকাশটা। আকাশে সেই তখন ছিল সকাল। এখন কত বেলা হয়ে গেছে। মেয়েটার বোধ হয় পেটে কিছু পড়েনি তখন থেকে। নাই পড়ুক। এখন খিদের কথা কার মনে থাকে? খিদের কথা না তোলাই ভালো। এখন ভালোয়-ভালোয় মা আর বাবার কাছে পৌঁছতে পারলেই বাঁচে সে।

কত পথ পার হয়ে এখন সে কোন পথে হাঁটছে, নিজেও জানে না। কাউকে সে জিজ্ঞেস করবে তাদের বাড়ির ঠিকানাটা কোনদিকে, তারও উপায় নেই। যে পাগলের ভেক ধরে পথে হাঁটে, সে কেমন করে জানতে চায়, তার সঠিক পথের হদিস? লোকে সন্দেহ করবেই করবে। সুতরাং মুখ বুজে হাঁটো। হাঁটতে-হাঁটতে দ্যাখো, কত অচেনা পথ সামনে-পেছনে। কাছে দূরে। দ্যাখো, কত অজানা মানুষ পথে-পথে হেঁটে যায়। হেঁটে যায়, তার সামনে দিয়ে। পাশ কাটিয়ে। না-হয় পেছন দিয়ে হনহনিয়ে। কেউ দেখে তাকে। দেখে হাসে। কেউ ভয় পায়, তার চলন দেখে। কেউ মজা পায় তার রকম দেখে। যতই হোক, এখন সবাই জানে সে পাগলি। তাকে নিয়ে বেশি হাসাহাসি, ঠাট্টা-মজা না করাই ভালো। এক্ষুনি যদি একটা ইট তুলে ছুড়ে দেয়! কী দরকার বাবা!

তা, সেই পাগলির পায়ে-পায়ে একটা-দুটো গ্রাম গেল।

মেঠো-মেঠো ঘর গেল।

মাঠ গেল।

হাট গেল।

কিন্তু নিজের বাড়ির পথ সে আর খুঁজে পেল না।

এদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামব-নামব করছে। পাগলিরও মনের ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠছে। সত্যিই তো, এর পর সে করবেটা কী? থাকবে কোথায়? খাবে কী?

খাওয়ার কথা না-হয় বাদই দিলুম। সে না-হয় দু-দিন উপোস করে রইল। কিন্তু রাতদুপুরে পথে-ঘাটে একলা থাকা যায় কী? তার ওপর সে মেয়ে। বিপদ কখন কোন পথ দিয়ে আসে কেউ আগের থেকে বলতে পারে? তাই তো সবাই বলে, 'থাকো যদি সাবধানে/বিপদ পালায় সবাই জানে।'

ঘেউ-ঘেউ-ঘেউ!

এই রে, হঠাৎ তাকে দেখতে পেয়ে একটা কুকুর ডেকে উঠল। তার দশা দেখলে কুকুর কেন, মানুষও যদি খিলখিলিয়ে ওঠে, আশ্চর্যের কিছু নেই। সত্যি, দশা বলে দশা। চোখে দেখা যায় না।

ঘেউ-ঘেউ, ঘেউ-ঘেউ, ঘেউ-ঘেউ!

একটা ডাকল বলে আরও দুটো ডাকল।

দুটো কেন, এ তো দেখি চারটে, পাঁচটা, ছ'টা। ডাকছে, আবার তেড়েও আসছে।

ভীষণ ভয় পেয়ে গেল মেয়েটা। সে ছুটবে? না, পথ থেকে একটা ইট তুলে ছুড়ে মারবে? সে মরিয়া হয়ে একটা পাথরই তুলে নিল। দিল ছুড়ে! যে-ক-টা কুকুর ভিতু ছিল, সে ক-টা ইটের ভয়ে ল্যাজ তুলে দে লম্বা! একটার পায়ে লাগল। সে তো ঘেউ-ঘেউ ছেড়ে কিঁউ-কিঁউ করে দে ছুট। আর যেটা ওরই মধ্যে একটু থুম্বাধুম্বা, সেটা ছুটল না। চিল্লাতেও ছাড়ল না। চোখের পলকে মেয়েটাকে তেড়ে গেল। ঘ্যাঁক করে তার ঘাঘরাটাকে কামড়ে ধরে টান মারল। ঘাঘরাটা ফর্দাফাই হওয়ার আগেই মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল আঁতকে। তারপর লেগে গেল টানাটানি। কুকুরও টানে, পাগলের ভেক-ধরা মেয়েটাও টানে। কিন্তু এমন একটা ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখলে কার না চক্ষু কপালে ওঠে! যে যা হাতের কাছে পায়, তাই দিয়ে ছুড়ে মারে কুকুরটাকে কিন্তু কুকুরও তেমনই কুকুর! ছাড়েই না। শেষমেশ কে একজন কোত্থেকে একটা ডান্ডা নিয়ে এল। কুকুরের পিঠে এমন কষাল যে, বাছাধন একঘায়েই ঘায়েল। ঘাঘরা ছেড়ে দে ছুট!

'এই মেয়ে তুই কোথায় থাকিস?' ডান্ডা হাতে লোকটা জিজ্ঞেস করল।

মেয়ে উত্তর দিল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

আর-একজন জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় যাবি তুই?'

এবারও সে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে রইল।

একজন বলে উঠল, 'মেয়েটা পাগল।'

অন্য একজন বলল, 'মনে হচ্ছে বোবা।'

বোবা! কথাটা শুনেই মেয়েটার মাথায় যেন একঝলক বিদ্যুৎ চমকে উঠে মিলিয়ে গেল। হ্যাঁ, ঠিক তো বটে! সে তো বোবা সেজে থাকতে পারে! কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে মিথ্যেও বলতে হবে না, সত্যিও বলতে হবে না। চুপ করে থাকো। না-হয় হাত নেড়ে, চোখ ট্যারা করে আ-আ করো। মেয়েটা জানে, যে বোবা, সে-ই কালা। সুতরাং কারও কোনো কথার উত্তর না-দিয়ে মেয়েটা ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে দিল। সে আকাশের দিকে তাকাল। সন্ধে নেমেছে। মনে-মনে সে শিউরে উঠল। শিউরে ওঠারই কথা। কেননা, সে জানে না, এবার কী করবে? কোথায় যাবে?

'এই মেয়ে, কোথা যাচ্ছিস?' যে-মানুষটা কুকুরের পিঠে ডান্ডা মারল সে এগিয়ে এল। খুব দ্রুত পায়ে। মেয়েটার প্রায় মুখের সামনেই দাঁড়িয়ে পড়ল।মেয়েটাও থমকে দাঁড়ায়। শূন্য চোখে তার দিকে তাকায়। সে চাউনিতে কোনো হেলদোল নেই। একেবারে ভাবলেশহীন।

লোকটি এবার গলার স্বর চড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কী বলছি শুনতে পাচ্ছিস না? আমি জিজ্ঞেস করছি কোথায় যাচ্ছিস?'

এবারও সে নট নড়ন-চড়ন। বোবার ভেকটাও বেশ ধাতস্থ করে নিয়েছে মেয়েটা। সে আলচা চোখে তাকাল লোকটির দিকে।

লোকটি বলল, 'সন্ধে নেমেছে। এক্ষুনি রাতের অন্ধকার নেমে আসবে। সাঁঝের বেলায় তোকে একলা কোথাও যেতে দেব না। বিপদ হলে তখন দেখবে কে? আমার কথার যদি তুই উত্তর না দিস, তবে তোকে কোতোয়ালিতে নিয়ে যাব।'

তবুও তার মুখে হাঁ-না কিছুই নেই।

লোকটি তখন আরও জোরে চিৎকার করে উঠল। হাত-পা ছুড়ে বলল, 'চ' তবে কোতোয়ালিতে!'

বুঝতে পারার ভান করল মেয়েটি। তার চোখ কটমট করে চেয়ে দেখল। ভয় পেলে মানুষের মুখ যেমন উৎকণ্ঠায় কালো হয়ে যায়, তেমনই তার মুখখানা কালো হয়ে গেল। কেউ কিছু বোঝার আগেই সে তিরবেগে ছুট দিল। পারল না। খানিকটা গিয়েই সে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। পড়বেই তো। শরীরে তার আছেটা কী! শূন্য পেটে কি ছোটা যায়?

সে পড়ে যেতেই একদল লোক হই-হই করে ছুটে এসে তাকে তুলতে গেল। কিন্তু ততক্ষণে সে জ্ঞান হারিয়েছে।

জ্ঞান ফেরেনি তার অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ পর সে হঠাৎই চমকে উঠেছিল। অনেকক্ষণ পর হঠাৎই সে দেখেছিল, সে শুয়ে আছে বিছানায়। নরম। সে উঠতে গেল। পারেনি। তার চোখের ওপর চোখ রেখে এখন যে দাঁড়িয়ে আছে, তার সিঁথিতে সিঁদুর। মাথায় ওড়নার ঘোমটা। পরনে শাড়ি। নাকে নোলক। কানে মাকড়ি। মাথায় রুপোর চওড়া টিকলি। মেয়েটি একদৃষ্টে তাকে দেখছিল অবাক হয়ে। আর দেখছিল সকালের রোদ জানলা ডিঙিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের ভেতরে। আলোয়-আলো চারদিক। বোঝা যায়, কাল যখন মেয়েটি মুখ থুবড়ে পড়ে গেছল, তখন ছিল সন্ধে-রাত। তারপর রাত গভীর হয়েছে। এখন রাত গড়িয়ে রোদের সকাল। আকাশ উপচে নেমে এসেছে। এই দ্যাখো! আর একটু হলে কথা বলে ফেলেছিল মেয়েটি। সে যে বোবা সেজে আছে, বেমালুম সেটি ভুলে বসে আছে! ভুলে বসাটা অকারণ নয়। অচেনা একটা ঘরে, আজানা একজন স্ত্রীলোকের হঠাৎ মুখ দেখলে কার মনে থাকে সে-কথা? খুব রক্ষে, মুখ থেকে কথা ফসকে পড়ার আগেই সে বোবার মতো আ-আ করে উঠল। মাথা তুলে সে উঠে বসতে গেল। স্ত্রীলোকটি তাকে ধরে ফেলল। আবার শুইয়ে দিল। স্ত্রীলোকটির মুখ-চোখের চেহারা দেখে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে মেয়েটির। হঠাৎ ঘরের জানলার দিকে তার নজর পড়তেই সে দেখে একদল ছেলেমেয়ে জানলার গরাদে মুখ ঠেকিয়ে তাকে দেখছে। তাদের চোখে চোখ পড়তেই ছেলেমেয়ের দল এমন বিচ্ছিরি সুরে হেসে উঠল যে, তাই দেখে ভীষণ ভড়কে গেল মেয়েটি। সেই দলে কতজন আছে গোনা যায় না। গোনার আগেই মুখগুলো সব চোখের সামনে থেকে উবে গেল। কিন্তু হাসির একঝাঁক শব্দ, তখনও কানে আসছিল। স্ত্রীলোকটি ঠিক এই সময়ে জিজ্ঞেস করে বসল, 'বাড়ির থেকে পালিয়ে এসেছিস কেন?'

চমকে উঠল সে। খুব সাবধান, কথা বলে না-ফেলে। না, না, সে আর ভুল করে! সে অসহায়ের মতো শুধু তাকিয়ে দেখল স্ত্রীলোকটিকে।

'কোথায় থাকিস তুই?' এবার যেন তেড়ে উঠল স্ত্রীলোকটি।

বোবার স্বর নেই।

বলতে-না-বলতেই সেই ছেলেমেয়ের দল ঘরে ঢুকে পড়ল। হেসে লুটোপুটি খেতে-খেতে বোবা-মেয়ের বিছানায় উঠে পড়ল। উঠে, কেউ মেয়েটির চুল ধরে টানে। কেউ পায়ে সুড়সুড়ি দেয়। কেউ হাত ধরে টান মারে। তাকে ব্যতিব্যস্ত করে ছাড়ল। মেয়েটি জেরবার হয়ে কখনও হাত ছাড়ায়। কখনও পা টানে। চুল সামলায়। আর ছেলেমেয়েগুলো হাসে, শুধুই হাসে। আশ্চর্যের কথা, সেই স্ত্রীলোকটিও তাদের সঙ্গে সমানে হাসে। যতই হোক, তোমার তো বয়েস হয়েছে, সবাই জানে তুমি ওই ছেলেমেয়েদের মা। ছেলেমেয়েরা দুষ্টুমি করছে। তা তুমি তো তাদের সামলাবে। তা নয়, তুমিও তাদের সঙ্গে ছেলেমানুষের মতো হ্যা-হ্যা করছ! এ কেমন ব্যাভার! মেয়েটাকে ঘরে এনে, এমন করে খুনসুটি করার কোনো মানে হয়!

হঠাৎ দলের একটা মেয়ে মুখ ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, 'দ্যাখো মা, মেয়েটা আমার দিকে কেমন কটমট করে চেয়ে আছে! যেন মারতে আসছে!'

আর একটা ছেলে চেঁচিয়ে উঠল, 'মারুক না দেখি! যে হাতটা তোর গায়ে তুলবে, সেই হাত কামড়ে ছিঁড়ে দেব।'

মা অমনই সঙ্গে-সঙ্গে কড়কে উঠল, 'রাস্তায় পড়েছিলি। সেখান থেকে তুলে এনে ঘরে ঠাঁই দিলুম। কোথায় বড়োবোনের মতো এদের সঙ্গে গল্পগুজব করবে তা নয়, চোখ কটমট করে শাসানো! চোখ গেলে দেব! তোর বয়েস আর এদের বয়েস! চোখ কটমট করে রোখ দেখাচ্ছিস! ভালোমানুষের কাল নয়। দাঁড়া তোর হচ্ছে! পালিয়ে বেড়ানো বার করছি। জব্দ কাকে বলে বুঝবি এবার!'

বুকের ভেতর তোলপাড় করে উঠল সেই মেয়েটির। তবুও অনেক কষ্টে নিজের মুখখানা এমন করে রাখল, কার সাধ্যি বোঝে সে ভয় পেয়েছে।

ছেলেমেয়ের মা তাকে অমন অবিচল হয়ে বসে থাকতে দেখে তার গালে ঠোনা মেরে ধাঁতিয়ে উঠল, 'কথা বলছিস না কেন? অ্যাঁ? বল কোথায় থাকিস?'

এবার মেয়েটির চোখ ছলছল করে উঠল।

সেই একদল ছেলেমেয়ে হি-হি করে হেসে উঠল।

মেয়ের ছলছলে চোখ জলের ভারে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।

মা বললে, 'অ্যাঁ, আবার কাঁদা হচ্ছে! ভাবছিস কাঁদলেই বেঁচে যাবি? কথা না-বললে তোকে ছাড়বে কে? কাছেই কোতোয়ালি। সটান ফাটকে বন্দি করে ফেলবে।'

এবারও ভেতরটা ভয়ে তার কুঁকড়ে যায়। তবু বাইরে তার একফোঁটা চিহ্নও ফুটে বেরোয় না। কিন্তু বেশিক্ষণ যে আর চুপ করে থাকা যাবে না, এটা বুঝেই সে বোবার মতো গলায় শব্দ করে কেঁদে উঠল। তার গলার সেই শব্দ শুনে কারও বুঝতে বাকি রইল না, সে বোবা। দলের ভেতর থেকে একটা ছেলে চেঁচিয়ে উঠল, 'মা, মেয়েটা গোঙা-হাবা।'

মা বলল, 'ওমা, তাই তো! এ তো ভারি বিপদের কথা। কর্তা আসুক, তারপর যা করার করবে সে। বোবা-হাবা মেয়েকে আমি ঘরে রাখব না। আজ রাতটা থাক। কাল সকালে কর্তা সদর থেকে ফিরে যা করার করবে। মেয়েকে কোতোয়ালিতে নিয়ে যাবে, না, আর-কোথাও, তা সে বুঝবে। এখন দুটো খেতে দিই। খেয়ে-দেয়ে শুয়ে থাক। রাতটা শান্তিতে কাটলে বাঁচি।'

সে-রাত কাটেনি বোবা-হাবা সেই মেয়ের। ঘুমের ভান করে সে পড়ে ছিল বিছানায়। গভীর রাতে সে উঠে পড়েছিল বিছানা ছেড়ে। সে নিঃসাড়ে দেখেছিল, সেই ছ'টা, না আটটা ছেলেমেয়ে ঘুমোচ্ছে অকাতরে। আর তাদের বদ-মেজাজি মা নাক ডাকাচ্ছে আরামসে ঘুমিয়ে। সে সর্তক-পায়ে নেমে এল বিছানা থেকে। একটা দেয়াল-গিরি মিটি-মিটি জ্বলছে। বোধ হয় এটা রোজই জ্বলে সারারাত। সে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল। সারাঘর অন্ধকারে ঘুটঘুট করছে। এবার আর কেউ তাকে দেখতে পাবে না। সে আলতো-আলতো পা ফেলে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। একটু খুট, কি খাট, কোনও শব্দ পর্যন্ত শোনা গেল না। সে খুলে ফেলল সদর দরজাটা। বেরিয়ে এল রাস্তায়। হনহন করে পা ফেলে সে চলল সামনে। কোনদিকে বিপদ, আর কোনদিকে আপদ সেসব কথা ভাববার তার সময় নেই। শুধু চিন্তা তার, এই অন্ধকারে হনহন করে হাঁটতে-হাঁটতে পাঁই-পাঁই করে ছুটতে পারবে তো? নিঝুম চারদিক। গভীর রাতের অন্ধকার। এমন ভয়-জড়ানো রাতে তাকে যে কোনোদিন এমন করে একা-একা পথ চলতে হবে, সে কি ভেবেছিল কোনো সময়।

হ্যাঁ, অনেকটা পথই পেরিয়ে এসেছে সে। ঠিক আরও কতটা দূরে এলে সে যে বিপদের হাত থেকে রেহাই পাবে, জানা নেই তার। অন্ধকার, তাই দেখা যায় না স্পষ্ট কিছু। কাজেই চেনা-অচেনার কথা ওঠে না। সুতরাং খানিকটা সে হনহন করে হাঁটে। খানিকটা পা চালিয়ে ছোটে। কখনও সে আকাশে তাকায়, কখনও তাকায় অন্ধকারে ঢাকা সামনেটায়। কখনও ভাবে, আর কত দেরি সকালের আলো ফুটতে, কখনওভাবে সকালের আলো ফুটলে কেউ যদি তাকে চিনে ফেলে! সে যদি ধরা পড়ে যায়! কিন্তু ধরা যদি সে না-ও পড়ে, তবে সে যাবে কোথায়! করবেটা কী? সে কি বাড়ি যাবে? আপন বাড়ি? মায়ের কাছে? বাবার কাছে? কিন্তু তাঁরা যদি তাকে আশ্রয় না দেন? কেন দেবেন না? সে তো তাঁদের মেয়ে। সে তো কোনো দোষ করেনি! কিন্তু তাঁরা যদি বলেন, 'পালায় ভিতুরা। ভিতু তারাই, যারা মরতে ভয় পায়!' যদি বলে, 'তার মরাই উচিত!'

কেন উচিত? তার সঙ্গে যার বিয়ে হল, সেই মেয়েটি তো তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়নি? তার কী দোষ? সে মরেছে বলে তার বউ কেন মরবে? এ কেমন নিয়ম? এ কেমন বিচার?

বোধ হয় আর পারছিল না মেয়েটি। পা বোধ হয় তার চলতে চাইছিল না। মনে হচ্ছিল, এখনই একটু থামে। এখানেই কোথাও বসে পড়ে। সাহস হচ্ছিল না। এখনকার মতো নিস্তার পেলেও, চিরকালের মতো নিস্তার পাবে কি না, সেই ভাবনায় অস্থির হচ্ছিল।

হঠাৎ একটি পাখি ডেকে উঠল।

থমকে দাঁড়াল মেয়েটি। চমকে তাকাল।

অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। আকাশে ভোরের রং ধরছে। কেমন যেন শিউরে ওঠে মেয়েটি। এতক্ষণ সে অন্ধকারে ডুবে ছিল অন্ধকার হয়ে। আলোর মুখ দেখে তারও মুখ যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

মাত্র কিছুক্ষণ। পরক্ষণেই সে সাহসে বুক বাধল। না, কিছুতেই সে নিজেকে ধরা দেবে না। যেমন করে হোক বাঁচতে হবে তাকে। মা বললেও সে মরবে না। বাবা বললেও না। সামনেই একটা করিরগাছের ঝাড়। ওরই নীচে সে খানিক জিরিয়ে নেবে। কাল রাতে সে যা দুটো মুখে দিয়েছে! তাতে যে খিদের জ্বালা জুড়োয় না, সে কে না-জানে। তবু উপায় নেই। খিদের কষ্টটা তাকে চেপে রাখতেই হবে। পরে কী হবে, সে তো পরের কথা। কথায় বলে :

এখনই যা করার আছে

এক্ষুনি যে করে,

লক্ষ্য জয়ে এগিয়ে সে যে

কীর্তি মহান গড়ে।

তবে, সব বিপদ সে কাটিয়ে উঠতে পারলেও, খিদের বিপদ থেকে সে কেমন করে বাঁচবে, তা জানে না। তার বুকের ভেতরে প্রাণটা যতক্ষণ ধুকধুক করছে, ততক্ষণ আশায় বুক বাধতে বাধা নেই। না-খেয়ে মরতে সে পারেই। তবু সে-মৃত্যুর একটা সান্ত্বনা আছে। কিন্তু মারবার জন্যে সবাই তাকে একসঙ্গে আগুনের চিতায় ছুড়ে দেবে, এমন অত্যাচার সে মানবে না। মানুষ এত নির্দয় হয় কেমন করে? মানুষই তো মানুষকে যুদ্ধে মারে। না-হয় মারে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে। মানুষই ডাইনি অপবাদ দিয়ে মানুষকে মারে জলে ডুবিয়ে। না-হয় অস্ত্রে কুপিয়ে। কেন? কে উত্তর দেবে? কেউ উত্তর দেওয়ার নেই। কেননা, আমরাই যে এ নিয়মগুলো তৈরি করেছি। আমরাই মেনে নিয়েছি। কী নৃশংস আমরা, মানুষ!

এই করিরের ঝাড়ের ছায়ায় বসে-বসে এমনই কত কথা ভাবছিল মেয়েটি। রোদ উঠে গেছে এখন। একজন গড়ারিয়া (মেষপালক) একপাল ছাগল ভেড়া নিয়ে চলেছে চরাতে। মেয়েরা চলেছে মাথায় ঘড়া-কলসি নিয়ে কোনো তোবা থেকে জল আনতে। কী সুন্দর সেজেছে তারা। কপালে সোহিনী। কানে কুণ্ডল। নাকে নাকফুলি। গলায় টাকাবল হার। হাতে বাজুবন্ধ। আর পইছাঁর। পায়ে মল। পরনে কত না রং-এর ঘাঘরা। জামা। হ্যাঁ, বসে-বসে মেয়েটি ভাবে বিয়ের রাতে এ-সবই তার অঙ্গে ছিল। এখন সবই ছুড়ে ফেলে দিয়েছে সে। এখন সে পাগল, না-হয় বোবা। শুধু তার হাতে আঁকা মেহেদির রং এখনও হাতে ঝলমল করছে। না-হয় সে সবই লুকোতে পারে। কিন্তু কেমন করে গোপন করবে এই রং?

সারারাত হেঁটে-হেঁটে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল মেয়েটি। আঃ! কী কোমল করিরের এই ছায়া! রাতভর ঘুম নেই একফোঁটাও। ছায়ার আয়েসে চোখ যেন জড়িয়ে আসছিল তার। কখনও-কখনও ঢুলে পড়ছিল সে। অনেক চেষ্টা করেও ঘুমের হাত থেকে সে নিষ্কৃতি পেল না। মেয়েটি করিরের ছায়ার নীচে লুটিয়ে পড়ল। তারপর অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল। রক্ষে এই যে, এখানে এই করিরের ঘন গাছের আড়ালটা সহজে কারও নজরে পড়বে না।

আচমকা ঘুম ভেঙে গেছল তার। তখন কত বেলা, তার জানার কথা নয়। সূর্যের কিরণ এখন আগুনগরম। হয়তো অনেকটা বেলাই গড়িয়ে গেছে।

হঠাৎ সে শুনতে পেল অনেক ঘোড়ার পায়ের শব্দ। ভেসে আসছে কোথা থেকে? ওই তো , পাথরের ওপর পাথর সাজানো পথের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে তারা! হ্যাঁ, ওই পথের ওপর দিয়েই সে নিজেও সারারাত হেঁটেছে। কিন্তু এখন এই ঘোড়ার ঝাঁক কোথায় যাচ্ছে? জানার ইচ্ছে সে সামলাতে পারল না। সে বেরিয়ে এল করিরের ঝোপের আড়াল থেকে। চমকে উঠল সে। শুধু ঘোড়া নয়, এ যে অসংখ্য মানুষও চলেছে পথ দিয়ে। কত উট, কত হাতি। কত সাজ। কত বাহার। দেখে মনে হয় হঠাৎ নয়, অনেকক্ষণ ধরেই বোধ হয় তারা এই পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে। টের পায়নি সে খুব সম্ভব ঘুমোচ্ছিল বলে। অবাক চোখে দেখতে-দেখতে সে বেবাক মিশে গেল সেই মানুষ আর জন্তু জানোয়ারের ভিড়ে। সে হেঁটে চলল উটের পিছু-পিছু, হাতির পাশে-পাশে। আর মানুষের পায়ে-পায়ে। ঘোড়াগুলো এত দ্রুত হাঁটছে যে নাগালই পাওয়া যাচ্ছে না। এরা কোথায় যায়?

না থাক, কাউকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। দেখাই যাক না। চলো এদের সঙ্গে। চলো যেখানে এরা যায় সেখানেই।

কিন্তু বেশিদূর যেতে হল না। জগঝম্পের শব্দ কানে এল তার। কারা বাজায়? নজরে পড়ল মানুষের ভিড়। মাথা আর মাথা। রংবেরঙের সাজ-পোশাক।

মনে পড়ে গেল তার তিজ উৎসবের কথা। এই সময়েই হয়। কথা ছিল শ্বশুরবাড়ি থেকে একদিনের জন্যে সে মায়ের কাছে ফিরে যাবে। এ-উৎসব শুধু মেয়েদের। এইদিনে মা তাঁর কন্যাকে কত আদর-যত্ন করেন। কত রঙিন পোশাক দেন। কত মিঠাই-মন্ডা খাওয়ান। এই রঙিন পোশাক পরে কন্যা যখন দোলনায় দোল খায়, তখন মা আর সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনরা গলা মিলিয়ে গান শোনান। আহা, মন ভরে যায়! তাই বুঝি-এর আর এক নাম দোলনার উৎসব। আর এই উৎসব ঘিরেই মেলা। নানা পসরার কত দোকান। কত নাচ। কত গান। কত হাতি-ঘোড়া-উট। মানুষের যেমন সাজের বহর, তেমনই হাতি সেজেছে। ঘোড়া সেজেছে। উট সেজেছে। মস্ত মেলার কোথাও হচ্ছে পুতুলনাচ। কোথাও গান-বাজনা। কোথাও মাদারি কা খেল। ম্যাজিক। কোথাও ঘোড়া নাচছে। হাতি নাচছে। উট ছুটছে। একটা নিরিবিলি জায়গায় একটি কোণে শুধু একলা একটি ছেলে কী সুন্দর মিঠে সুরে সারিন্দা বাজাচ্ছে। উৎসবের জাঁকজমক দেখতে-দেখতে মেয়েটি এইখানে এসে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ছেলেটি বিভোর হয়ে সারিন্দার ছড় টানছে। সুরের শব্দ উঠছে ঢেউ খেলে। সেই ঢেউ আছড়ে পড়ছে মেয়েটির কানে। অবাক মনে তন্ময় হয়ে শুনছে সে। নিমেষে সে ভুলে গেল তার কষ্টের কথা। মন থেকে ভয় তার কোথায় উধাও হয়ে গেল। ছেলেটির কতই বা বয়েস হবে। মেয়েটি যদি হয় ষোলো, তবে, ছেলেটি মেরেকেটে বারো-তেরো।

মেয়েটিকে অমন অবাক মনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আচম্বিতে সেই বাজনদার বাজনা থামাল।

বাজনা থামতেই মেয়েটির চমক ভাঙল। বাজনার সুর তখনও তার মনে দোলা দিচ্ছে। তার চোখে বিস্ময়। সে চেয়ে থাকে একদৃষ্টে বাজনদারের দিকে।

হঠাৎ মেয়েটির খেয়াল হয়েছে। লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল সে। এমন করে বোকার মতো দৃষ্টি হেনে দাঁড়িয়ে থাকাটা যে ঠিক নয়, এটা মনে হতেই, সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। দ্রুত পায়ে পিছু ফিরল সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্যে।

'দিদি!'

চমকে দাঁড়িয়ে পড়ল মেয়েটি। সারিন্দা-বাজিয়ে ছেলেটি তাকে ডেকেছে। শিহরন লাগল তার সারা শরীরে তার ডাক শুনে। সে থমকে দাঁড়াল। ধীরে-ধীরে মুখ ফেরাল।

'চলে যাচ্ছ?' ছেলেটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল। বলল, 'কই, আমাকে কিছু দিলে না? তুমি আমার দিদি। তোমাদের আজ আনন্দের উৎসব তিজ। তোমাদের এই আনন্দে আমিও আনন্দ করে সারিন্দা বাজাতে এসেছি এই মেলায়। এসেছি, তোমাদের কাছে কিছু পাব বলে। আমাকে কিছু দাও!'

মেয়েটি ভাবল, তবে কি ছেলেটি তার চেহারা দেখে তার দুর্দশা ঠাওর করতে পারেনি! হয়তো তাই। ছেলেমানুষ। তাই হয়তো বুঝতে পারছে না, সে সব খুইয়ে বসে আছে। মেয়েটি কী বলবে ভেবে পেল না। তাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

'তুমি আজ সাজোনি কেন?'

হঠাৎ ছেলেটি এ কী কথা জিজ্ঞেস করে?

'ঘাঘরাটা ময়লা। জামাটা ময়লা। গায়ে গয়না নেই। পায়ে মল নেই। শুধু নাকে একটি নাকফুলি পরে আছ। তোমার মা আজ তোমাকে সাজিয়ে দেননি কেন?'

আবার শিউরে উঠল মেয়েটি। সত্যিই তো, তার একদম খেয়াল ছিল না নাকের ওই নাকফুলি গয়নাটার কথা। ওটা খুলে ফেলতে সে ভুলেই গেছে।

সঙ্গে-সঙ্গে সে নাকে হাত দিল। ওই নাকফুলিটা খুলে ফেলতে তার সময় লাগল না। এ তার বিয়ের গয়না। তবে মা-বাবার দেওয়া। সে এই নাকফুলি গয়নাটা দু-চোখ ভরে দেখল। দেখতে-দেখতে ছেলেটির কাছে এগিয়ে গেল। সে গয়নাটি ছেলের হাতে দিয়ে বলল, 'আমার কাছে আর কিছু নেই। এইটি ছাড়া তোমাকে আমার আর দেওয়ারও কিছু নেই।'

বলতে বলতে সে কেঁদে ফেলল। কান্নার ফোঁটাগুলি পাছে ছেলেটি দেখতে পায়, তাই দু-হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল নিজের চোখ।

ছেলেটি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। কী করবে সে বুঝতে পারে না। উঠে দাঁড়াল। কথাটা বলে যেন দোষ করে ফেলেছে। তাই আমতা-আমতা করে বলে, 'বিশ্বাস করো, তোমার মনে ব্যথা দেওয়ার জন্যে আমি তোমার কাছে কিছু চাইনি। মেলায়-মেলায় এমনই করে আমি সারিন্দা বাজাই। এমনই করে আমার দিন চলে। কেউ কোনোদিন তোমার মতো গায়ের গয়না খুলে আমার বাজনা শুনে উপহার দেয়নি। বিশ্বাস করো, আমার কেউ নেই। আমি একা। তোমার এই সাধের গয়নাটা আমার বাজনার সুরের চেয়ে আরও অনেক দামি। এ-গয়না তোমাকে কে উপহার দিয়েছেন?'

'কেউ না।' উত্তর দিল মেয়েটি।

'তবে পেলে কোথায়?'

'সব কথা এখনই আমি বলতে পারছি না।' মেয়েটি উত্তর দিল।

'তোমার কে আছেন?' সে জিজ্ঞেস করল।

'কেউ না। যারা ছিল, তারা সব পর হয়ে গেছে।' বলতে গিয়ে গলায় যেন শব্দ আটকে যায় মেয়েটির।

ছেলেটি বিস্ময়-ভরা চোখে তাকায় মেয়েটির মুখের দিকে।

তারপর বলল, 'তুমি কী বলতে চাও, আমি বুঝতে পারি না।'

মেয়েটি খানিক চুপ করে রইল। তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে ছেলেটির হাতের দিকে। দেখতে লাগল গয়নাটা।

ছেলেটি বলল, 'এই নাও তোমার গয়না!'

'না।' দৃঢ় গলায় উত্তর দিল মেয়েটি।

'এ-গয়নার অনেক দাম।'

মেয়েটি বলল, 'তোমার বাজনা শুনে, তোমাকে আমি অনেক দামই দিতে চাই। আমার খুব ভালো লেগেছে। ওটা আমি আর ফেরত নেব না। তোমার অসময়ে কাজে লেগে যাবে। আমি যাই।' বলে মেয়েটি তার কাছে বিদায় নেওয়ার জন্য পিছু ফিরল।

ছেলেটি চিৎকার করে উঠল, 'শোনো, শোনো!'

মেয়েটি দাঁড়াল।

'কোথা যাচ্ছ?'

মেয়েটি থমকে চাইল। চাইল মেলার অসংখ্য মানুষের দিকে। তারপর বলল, 'সত্যি, কোথায় যাচ্ছি আমি? কোথায় যাব?'

মেলার ময়দানে অসংখ্য মানুষের কোলাহল, অনেক বাজনার নানান সুর কানে আসে। অনেক দেহাতি মেয়ে নাচছে। অনেকে নাচের তালে গাইছে। সেই সুর ভেসে আসছে বাতাসে ঢেউ তুলে। শুধু, মেলার নির্জন এই আলো-আঁধারিতে একটি মেয়ে, তার চেয়েও ছোটো এক সারিন্দা-বাজিয়ের কাছে জানতে চাইছে, কোথায় যাবে সেই মেয়ে? কোথায় যাচ্ছে? মেয়েটি তো জানে, তার জানাশোনা কোনো মানুষ কেউ যদি তাকে এখন দেখতে পায়, তবে তাকে নির্ঘাত বিপদে পড়তে হবে। কেননা, তার সঙ্গে যার বিয়ে হয়েছে, তার যখন অঘটনে মৃত্যু হয়েছে, তখন তার আর এ পৃথিবীর বাতাসে নিঃশ্বেস ফেলার অধিকার নেই। কেননা, সে নিজেই অলক্ষুনে।

'দিদি!'

চমকে ওঠে মেয়েটি। তার সামনে দাঁড়িয়ে ছোট্ট সেই সারিন্দা-বাজিয়ে। মেয়েটি অবাক চোখে তাকায় বাজিয়ের চোখের দিকে।

'দিদি!' আর একবার ডাকল।

শিহরন জাগে মেয়েটির শরীরে।

ছেলেটি বলে, 'আমারও কেউ নেই।'

ঝন-ঝন, ঝম-ঝম, ডুম-তাক ডুম-ডুম, মেলায় বাজনা বাজছে। কী দারুণ আনন্দে সারা মেলা কাঁপছে। সবাই আনন্দে উচ্ছল।

সে বলল, 'তোমার গয়না আমি নেব।'

অনেক গলার একটা মেঠো সুরের গান মেলার বুক উপচে আকাশে লুটোপুটি খেতে লাগল।

'নেব, তবে, একটা শর্তে।'

হঠাৎ গানের তালে-তালে অনেক পায়ে ঝাঁঝর বেজে উঠল।

মেয়েটি চমকে তাকায়। ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে, 'শর্ত?' কীসের শর্ত?

ছেলেটি উত্তর দিল, 'তুমি যদি সত্যিই একা হও, সত্যিই যদি এ-পৃথিবীতে তোমার কেউ না-থাকে, তবে আমায় ছোটো ভাই বলে মেনে নিতে হবে তোমাকে। তুমি আমার দিদি হবে।'

মেলার চারদিকে কত দোলনা। দোলনায় দুলছে কত মেয়ে। কত না বাহারি তাদের সাজ। কেউ পরেছে শাড়ি। কেউ পরেছে ঘাঘরা। মাথায় টিকলি থেকে পায়ে মল। গা-ভর্তি গয়না। ঝলমল করছে। তিজের উৎসব যেন দোলনার দোদুল আনন্দ।

শিউরে উঠল সেই মেয়ে ছেলেটির শর্ত শুনে। হয়তো তার মনটি যত আনন্দে দুলে উঠেছিল, ঠিক ততটাই আতঙ্কে মুষড়ে গেল। আতঙ্কই তো! একদিন সে যদি ধরা পড়ে যায়! কিংবা একদিন যদি সে মা-বাবাকে দেখার জন্যে ব্যাকুল হয় ! তখন কী করবে সে? সেদিন যদি তার এই ছোট্ট ভাইটিকে ছেড়ে চলে যেতে হয়! এই ভাবনায় অস্থির হয় সে। মনের অস্থিরতা মনের কোঠায় বেঁধে রাখতে পারে না সে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে ছেলেটির মুখের দিকে শান্ত চোখে তাকায়। খানিক নিশ্চুপ থেকে হঠাৎ মেয়েটি অস্ফুট স্বরে বলে, 'ভাইটি, আমার পেছনে যে বিপদ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি যদি তোমার দিদি হই, বিপদ যে তোমাকেও ছাড়বে না।'

'দিদির বিপদ হলে ভাই যদি তাকে না-দেখে, সে তবে কেমন ভাই! কিন্তু তোমার কীসের বিপদ?' জিজ্ঞেস করে ছেলেটি।

তিজ মেলার সেই আনন্দ-রাজ্যে যখন অনেক মানুষ ঝলমলে আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে, ঠিক তখনই মেয়েটি তার দুঃখের কাহিনি শুনিয়েছিল সেই সারিন্দা-বাজিয়ে ছেলেটিকে।

ছেলেটি শুনেছিল তার কাহিনি। তারপর সাহসে বুক ফুলিয়ে বলেছিল, 'ভয় কোরো না দিদি, আমি আছি তোমার সঙ্গে। থাকবও চিরদিন। কিন্তু তোমার থাকার জন্যে আমি যে তোমায় কোনো ঘর দিতে পারব না তেমন চটকদার। আমি ঘর বাঁধি তাঁবু ফেলে মেলায়-মেলায়। তোমাকেও আমার সঙ্গে থাকতে হবে তাঁবুতে। কষ্ট হবে তোমার। পারবে তো?'

'পারব।' কথাটা বলেছিল সোচ্চারে সেই মেয়ে।

তারপর?

তারপর সে এক মস্ত ইতিহাস। মেলায়-মেলায় সেই ছোট্ট সারিন্দা-বাজিয়ে বাজনা বাজায়, মেয়েটি নাচে।

কখনও তারা যায় পুষ্করের লাখি মেলায়।

যায় আজমিরে উরস উৎসবে। সেই প্রথম যেবার দু-জনে গেছল উরস উৎসবে, সেবার মুঘল সম্রাট আকবর এসেছিলেন পায়ে হেঁটে এই তীর্থস্থানে। তিনি এসেছিলেন একটি সন্তান লাভের আশায় সাধু-সন্তদের আশীর্বাদ ভিক্ষা করতে।

তারা যায় বছর-বছর জৈনদের মহাবীরজির মেলায়। নয়তো কালীদেবীর উৎসবে।

উৎসবের কি শেষ আছে! শীতলমাতার উৎসব, কারনিমাতার মেলা। কপিল মুনির স্মরণে যে উৎসব হয় তার তুলনা হয় না।

থর মরুর কাছে এই উৎসবের মেলা বসে। তাতে যে কত দূর-দূর থেকে কত মানুষের সমাবেশ হয় তার হিসেব করে কার সাধ্যি।

এমনই করে প্রত্যেক বছর সেই মেয়ে আর সারিন্দা-বাজিয়ে কত মেলায় যে ঘুরল! কত বছর তাদের জীবন ছুঁয়ে-ছুঁয়ে চলে গেল। সময় চলতে-চলতে সেই মেয়েটি বুড়ি হয়ে গেল। সেই বাজনদার ছেলেটিও হয়ে গেল বুড়ো।

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ, ওই যে, দেখলে খিদের জ্বালায় ভুরটগাছের কাঁটাফল খুঁজছিল যে বুড়ি, সে-ই তো অনেকদিনের আগের সেই দুঃখী মেয়ে। আর নেহা যার সারিন্দার শব্দ শুনে মানুষটিকে দেখার জন্যে আকুল হয়ে খুঁজতে বেরিয়েছে, এই সারিন্দা-বাজিয়েই যে সেই মানুষ। সেই অনেকদিন আগের একটি কিশোর ছেলে।

নেহার জানা নেই এসব কথা। জানে না কিছুই। সে পালিয়ে এসে এখন এই কুঁড়েঘরের আড়ালে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে আর থরথর করে কাঁপছে। মনে মনে ভাবছে, মায়ের বারণ শুনলে তাকে হয়তো এমন বিপদে পড়তে হত না। আচ্ছা, ওই বুড়িমানুষটাকে সে যে অমন করে ভালোবাসল, তার কষ্ট দেখে যে তাকে অত কাঁটাফুল তুলে দিল, ত বু মানুষটা তাকে এমন করে হেনস্থা করল! তবে কি নিচুতলা মানুষের দয়া-মায়াও অচ্ছুত হয়ে যায় উঁচুতলা মানুষের কাছে! নিচুতলার মানুষকে ছুঁলেই বুঝি তার দয়া-মায়া উবে যায়! তা হলে তো বলা-ই যায়: বিপদে পড়লে বাছা নেই উঁচু-নিচু/কাজটি বাগিয়ে শেষে লাগো তার পিছু।

হঠাৎ ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ হল যেন ! নেহা কুঁড়েঘরের এই আড়াল থেকে শব্দটা স্পষ্ট শুনতে পেল। চমকে ওঠে নেহা। কে যেন কথা কয়ে উঠল, 'দিদি, এলি?'

'হ্যাঁ।' একজন বুড়িমানুষের ভাঙা গলার উত্তর। নেহার যেন চেনা লাগে এ-গলার স্বর। সে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে।

'এত দেরি করলি? কিছু খাবার পেলি?'

'পেয়েছি। কটা কাঁটাফল।'

'তাই দে! খাই'

আর থাকতে পারল না নেহা। সে এগিয়ে এল। সামনেই একটা জানলা। একটু উঁচুতে। পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে লেংচে না-দাঁড়ালে কিছু দেখতে পাবে না নেহা। কাজেই অনেক কষ্টেই পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়েই সে দাঁড়াল। চমকে উঠল নেহা। সে যে দেখতে পেল তার সেইবুড়িমাকে। আর দেখতে পেল, একটি মানুষ শুয়ে আছে বিছানায়। বুড়িমা তার মুখের কাছে একটি কাঁটাফল ধরে বলল, 'খা।'

লোকটি খেতে-খেতে বলল, 'মিষ্টি আছে।'

নেহার নজরে পড়ে গেল বিছানার পাশে রাখা একটি বাজনার দিকে। এই বাজনাটির নামই বুঝি সারিন্দা? তবে কি যাঁকে নেহা খুঁজতে বেরিয়েছে, এই মানুষটিই কি সেই মানুষ?

'তুই এত কাঁটাফল পেলি কোত্থেকে?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন তাঁর দিদিকে।

দিদি উত্তর দিল, 'গাছ থেকে।'

'চোখে তুই দেখিস না ভালো করে। খুঁজতে তোর খুব কষ্ট হয়েছে না রে? তিনি জিজ্ঞেস করলেন। দিদি চুপ করে রইল খানিক।

নেহা সারা ঘর চোখ বুলিয়ে দেখতে লাগল জানলায় উঁকি মেরে। অনেক ছবি ঘর-ভর্তি। অনেক ছবি চেনা নেহার। অনেক অচেনা। এই ছবির মাঝখানে দেয়ালে টাঙানো আর একটা সারিন্দা। অবাক হয়ে তাকায় নেহা মানুষটার দিকে। বোধ হয় দুটোই বাজান তিনি। মানুষটার ওই হাত দুটো দেখার জন্যে আঁকপাক করে চোখ বাড়ায় নেহা। ওই হাতে জাদু আছে। একহাতে ছড় টানেন তিনি, আর একহাতে তারের ওপর নেচে বেড়ায় সুর ছড়িয়ে।

হঠাৎ মানুষটি আবার বললেন তাঁর দিদিকে, 'আমার জন্যে তোকে কত কষ্ট করতে হচ্ছে, বল?'

'আজ কিন্তু তোর জন্যে কষ্ট করতে হয়নি আমায়।'

উত্তর দিল সেই বুড়িমানুষটি।

'কী বলছিস! এত কাঁটাফল খুঁজে বার করতে কষ্ট হবে না? চোখের দৃষ্টি কমলে আন্দাজেই তো হাতড়াতে হয়,' বলতে-বলতে উঠে বসলেন মানুষটি।

বুড়ি আবার বলল, 'না রে, আজ আমাকে একটুও কষ্ট করতে হয়নি। একটি ছোট্ট মেয়ে ফল খুঁজে দিল গাছ থেকে। মেয়েটি নেহাতই সরল শিশু। উঁচুতলার মানুষ কারা সে জানে না। শুধু জানে সে নিচুতলার মানুষ। নিচুতলার মানুষকে কেন উঁচুতলার পাড়ায় যেতে নেই, জানে না সে। হয়তো এইটা জানার জন্যেই এপাড়ায় সে এসেছিল। হয়তো উঁচুতলার মানুষকে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছিল, উঁচু-নিচুর তফাত কী! কিন্তু আমার দোষে মেয়েটি হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে ছুটে পালাল। আমি মজা দেখার জন্যে মিথ্যে-মিথ্যে তাকে ধমক দিলুম। বললুম, 'তুই নিচুতলার মেয়ে? লুকিয়ে-ছাপিয়ে এপাড়ায় ঢুকেছিস? তোর হাতে-ছোঁয়া কাঁটাফল খেলুম! থুঃ-থুঃ।' বলতে-বলতে বুড়ির চোখ ছলছল করে উঠল। কান্না-ভেজা গলায় বুড়ি আবার বলল, 'মেয়েটি আর তার মা দু-দিন কিচ্ছু খায়নি।' এবার বোধহয় বুড়ি কেঁ দেই ফেলল।

বুড়ো-মানুষটি কোনো কথা বললেন না। স্থির হয়ে বসে রইলেন। দেখলেন, বুড়ির গাল বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে।

বুড়ির কান্না দেখে আর তার কথা শুনে নেহার কেমন যেন সব গোল পাকিয়ে গেল। তার ইচ্ছে করছিল, তখনই সে ছুটে গিয়ে বুড়িমাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু তখন তার ভীষণ লজ্জা করছিল। ছিঃ! তবে কি সে বুড়ির মনের কথাটা বুঝতে ভুল করেছিল? ভুল ভেবে পালিয়ে বেড়াচ্ছে?

বুড়ির বোধ হয় তেষ্টা পেয়েছে। জল গড়াবে বলে কলসিতে হাত ঠেকাল সে। কিন্তু বুড়োমানুষটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'জল নেই।'

বুড়ি চমকে তাকাল বুড়োমানুষটির দিকে।

তিনি বললেন, 'একটু ছিল। তেষ্টা সহ্য করতে পারিনি। খেয়ে ফেলেছি। আবারও তেষ্টা পাচ্ছে। কী হবে বল দিকিনি? কোথায় পাওয়া যাবে জল? না পেলে যে শুকিয়ে মরব।'

জানলার আড়াল থেকে সরে গেল নেহা। বুকটা তার ধড়ফড় করে উঠল। এখনও একটু জল আছে নেহাদের কলসিতে। সেটুকু জল তো মা আর তার জন্যে লাগবেই। কিন্তু এই দুটো বুড়োমানুষ যে একটু জল না পেলে ভীষণ কষ্ট পাবে।

আসলে মা তো নেহার এখনও বুড়ি হননি। আর নেহা তো এখনও ছোটো। কষ্ট হলেও মা কি আর একটু সহ্য করতে পারবেন না? নিশ্চয়ই পারবেন। আর নেহা? দুটো বুড়োমানুষের কষ্ট দেখে সে কেমন করে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে! কাজেই তাকে আবার মায়ের কাছে যেতে হবে। সে আবার ছুটল।

রক্ষে এই, বুড়ির মিথ্যে ধমক খেয়ে আনিমানি করতে-করতে নেহা এখানে ছুটে এলেও, বাড়ির পথটা চিনতে তাকে খুব একটা গোলমালে পড়তে হল না। বাড়ি ফেরার সেই সিধে রাস্তাটা ঠিক তার চোখে পড়ে গেছে। শুধু দেখে রাখল কুঁড়েটা ভালো করে। আসার পথে যেন গুলিয়ে না-যায়।

বাড়ির দরজা ঠেলতেই মা ক্ষীণ গলায় ডাক দিলেন, 'নেহা, এলি?'

'হ্যাঁ মা।' নেহার শ্বাস পড়ছে ঘন-ঘন।

'এতক্ষণ কোথায় ছিলি? হাঁপাচ্ছিস কেন? ' মা ব্যস্ত হলেন।

নেহা ইতস্তত করল উত্তর দিতে।

'কী রে, চুপ করে আছিস কেন?' মা অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

নেহা আমতা-আমতা করে বলল, 'আমি উঁচুতলার পাড়ায় গেছলুম মা।'

'অ্যাঁ!' মা আঁতকে উঠলেন। তারপর বকা দিলেন, 'তোকে বারণ করেছিলুম না!'

'মা, উঁচুতলার একজন বুড়িমানুষ খিদের জ্বালায় কাঁটাফল খুঁজছিল। চোখে ভালো দেখতেও পায় না। তার কষ্ট দেখে আমি তাকে কাঁটাফল গাছ থেকে খুঁজে দিলুম। বুড়ি আমার হাতে খেল। আমাকেও খাবার জন্যে দিল। বুড়ি উঁচুতলার মানুষ হলেও খুব ভালোমানুষ। মাগো, ওই বুড়িরই তো ভাই যিনি সারিন্দা বাজান। তুমি বললে বিশ্বাস করবে না, ওদের ঘরের কলসিতে একফোঁটাও জল নেই। দু-জনেই জলের জন্যে ছটফট করছেন। একটু জল নিয়ে যাব মা?'

মা বললেন, 'আমাদেরও তো জল ফুরিয়ে এল। কতটুকুই বা আছে। আমিও একটু আগে এক গেলাস খেয়েছি। আর একদিনও হবে বলে মনে হচ্ছে না। তা দিবি কী করে? তোর তেষ্টা পেলে তুই বা খাবি কী? আমিও যে কোথাও গিয়ে একটু জল খুঁজে আনব, তারও ক্ষমতা নেই আমার। তোর বাবা না-এলে আমরাও শুকিয়ে মরব।'

'মা!'

'কী?'

'একটা কথা বলব?'

'কী কথা?'

'তোমার তো শরীর খারাপ। আমি যদি যাই জল আনতে?'

মা থতমত খেয়ে গেলেন, 'দুনিয়ার কেউ কোথাও একফোঁটা জল খুঁজে পাচ্ছে না, তুই কোথা যাবি জল আনতে?'

'আমি খুঁজব মা। খুঁজলে ঠিক পেয়ে যাব।' মেয়ে উত্তর দিল।

'কোথায় খুঁজবি? তুই পথঘাট কিছুই জানিস না? তার ওপর জলের কুয়ো তো সব শুকিয়ে গেছে।'

মেয়ে বলল, 'মা, আমি তো এখন বড়ো হয়ে গেছি। মায়ের কষ্ট দেখে কোন মেয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে। মা, তুমি আমায় বিশ্বাস করো। আমি পারব মা। জল আমি যেখান থেকে হোক খুঁজে আনব। তুমি বলো না, পড়ে-পড়ে শুকিয়ে মরার চেয়ে চেষ্টা করা ভালো নয়?'

মা বললেন, 'তবে আমিও তোর সঙ্গে যাব।'

'না। তোমার খাওয়া নেই দু-দিন।'

'তুইও তো দু-দিন কিছুই খাসনি।'

'খেয়েছি মা, ওই বুড়ি আমাকে কাঁটাফল খেতে দিয়েছে। ওই বুড়ির জন্যেই এখন আমি একটু জল নিয়ে যাই, তুমি বারণ কোরো না মা। কাল ভোরে উঠেই আমি জল আনতে যাব। বুড়ির হাতের একটা কাঁটাফল খেয়ে আমার গায়ে বল এসেছে। মা। আমি পারব।'

মা চুপ করে থাকলেন।

মাকে চুপ করে থাকতে দেখে, নেহা আবার আবদার করল, 'তাহলে একটু জল নিয়ে যাই মা?'

'যা।' মা দৃঢ় গলায় উত্তর দিলেন।

সমস্ত আকাশ-ভর্তি অসংখ্য আলোর ফুলকি যেন একসঙ্গে নেহার মনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ল নিমেষে।

সমস্ত বাতাস যেন একসঙ্গে উছলে উঠে মুঠো-মুঠো ছড়িয়ে গেল নেহার সারা দেহে খুশির তুফান তুলে।

যতটুকু জল কলসিতে ছিল সবটুকু জল একটি পাত্রে নিয়ে নেহা ছুটল সেই বুড়ো আর বুড়ির ঘরে। পথ তার চেনা। সুতরাং চলো যত তাড়াতাড়ি পারো। কিন্তু তবু তাকে চলতে হবে সাবধানে। একফোঁটা জলও যেন চলার দোষে টলন খেয়ে না উছলে পড়ে যায়।

হ্যাঁ, সে সাবধানেই হাঁটছিল। হাঁটতে-হাঁটতে ভাবছিল, ঘরের কলসিতে যতটুকু জল ছিল সব জলটাই সে নিয়ে এসেছে। তলানি একটু পড়ে আছে। বাবা যদি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এসে পড়েন, কোথা থেকে মা জল দেবেন তাঁকে? কিংবা ধরো মা-ও যদি একটু জলের জন্যে তেষ্টায় কাতর হন, কোথায় পাবেন জল?

তাই সে মনে-মনে ভাবছিল, আজ যেন বাবা না আসেন। অবিশ্যি বাবা যদি সঙ্গে খানিকটা জল তাঁর বোতলে ভরে নিয়ে আসেন, তবে অন্য কথা। তবে তো তিনি আজ এখনই এলে দারুণ সাহসে মা আর মেয়ে বেঁচে ওঠে। বলো, কী বিপাকে পড়েছে তারা!

জলের পাত্র হাতে নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ অমন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল কেন নেহা? কী হল নেহার?

ওই দূরের পথ দিয়ে কে যেন হেঁটে চলেছে!

কে!

এ যেন সেই লোকটা!

কোন লোকটা?

সেই যে তখন বুড়ির চিৎকার শুনে যেসব মানুষ ছুটে এসেছিল, তাদেরই একজন। নেহা তখন ছুটতে-ছুটতে দেখেছে এই মানুষটাকে পিছু ফিরে। না, চিনতে তার একটুও ভুল হচ্ছে না। ঠিক, ঠিক, ওই লোকটাই তো তাকে তেড়ে ধরতে এসে, হাঁফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। নেহাকে সে এখন দেখে ফেলেছে নাকি?

নেহা লুকিয়ে যে পড়বে, তার উপায় নেই।

তবে ছুটে পালাবে?

কোথায় পালাবে? এ তো ফাঁকা মাঠ। তার ওপর ছুটলেই তার হাতের পাত্রে-ভরা জল ছলকে পড়বে।

তবে কি সে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে সাহসে বুক ফুলিয়ে।

না, সে হাঁটল। মনে-মনে ভাবল, লোকটা যদি তাকে দেখেই ফেলে, তাকে যদি ধরতেই আসে, তবে, এই জল-ভরা পাত্রটা ছুড়ে মারবে তার কপালে। তারপর যা হয় হবে।

আশ্চর্য, লোকটা তার দিকে এল না। অন্য পথ ধরে অন্যদিকে চলে গেল। হয়তো নেহাকে দেখতে পায়নি। দেখতে পেলেও হয়তো চিনতে পারেনি। বুঝতে পারেনি, এই মেয়েটাই সেই নিচুতলা মানুষের মেয়ে।

নেহা লোকটাকে অন্যদিকে যেতে দেখে হনহন করে হাঁটা দিল। কষ্ট হচ্ছে, তবু টলতে-টলতেও সে, হাঁটছে। তাই তো, কাল ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সে কেমন করে খুঁজে আনবে জল? আজই যখন চলতে পথে টলছে, কাল কী হবে কে বলবে। শরীর বইবে তো!

ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে উঁচুতলা মানুষের পাড়ায় পৌঁছে গেল নেহা। এই রাস্তাটার বাঁদিক ধরে হাঁটলেই সেই বাড়িটা। বুড়ি আর তার ভাই থাকেন। নিশ্চয়ই তিনিই সারিন্দা বাজান। দু-দুটো সারিন্দা দেখেছে নেহা। একটা দেয়ালে টাঙানো। আর-একটা মানুষটি যেখানে শুয়ে আছেন, তার পাশে রয়েছে। নেহা কী পারবে শিখতে? ওঁর মতো বাজাতে? কী মিষ্টি সুরের শব্দ!

বাঁ দিকের পথ ধরে খানিকটা হাঁটতেই পৌঁছে গেছে নেহা! এই সেই কুঁড়ে ঘরটা। না, দাঁড়াল না সে। দরজায় নাড়া দিল না। সে সটান ঢুকে গেল দরজা ঠেলে ঘরের মধ্যে। নিচু গলায় ডাক দিল, 'বুড়িমা!'

দুটো মানুষ তেষ্টার তাড়সে নিঃশব্দে পড়েছিলেন মাটিতে। একটা ছোট্ট মেয়ের গলার শব্দ শুনে দুটো মানুষই চমকে উঠলেন। বুড়িমানুষটার মুখ দিয়ে অবাক স্বরে বেরিয়ে এল, 'কে?'

'আমি। তোমাদের জন্যে জল এনেছি। খেয়ে নাও!'

পাত্র-ভরা জল এগিয়ে দিল নেহা তাঁদের দিকে।

বুড়ির অবাক স্বর গলায়, 'তুই!'

বুড়োর অবাক দৃষ্টি চোখে।

নেহা বলল, 'আমাদের কলসিতে যতটুকু জল ছিল, সবটুকুই এনেছি। জানি না, তোমাদের তেষ্টা মিটবে কি না। কাল খুঁজে পেতে আবার নিয়ে আসব কোথাও থেকে।'

বুড়ি জলের পাত্র হাতে নিয়ে বলল, 'তোদের তেষ্টা পায় না বুঝি?'

নেহা উত্তর দিল, 'কলসিতে জল না-থাকলে, তেষ্টা পেলেই বা কী, আর না-পেলেই বা কী। কিন্তু কারও কলসিতে যদি জল থাকে, অথচ কেউ যদি তেষ্টায় কষ্ট পায়, তবে তাকে একটু জল দিলে মানুষের আনন্দ হয় না?'

বুড়োমানুষটি অবাক হয়ে শোনেন নেহার কথা।

বুড়ি জিজ্ঞেস করল, 'তুই আমাদের এই কুঁড়েঘরটা চিনলি কেমন করে?'

'কতদিন ধরে সারিন্দার সুর শুনেছি, আর মনে-মনে কত কী ভেবেছি। ভেবেছি একদিন সুর-শুনে খুঁজে বার করব এই ঘরটা! কিন্তু আজ তোমার ধমক শুনে হঠাৎ খুঁজে পেয়েছি সেই ঘরের দরজা। তুমি না-বকলে আমি কি খুঁজে পেতুম তোমাদের?' বলে একটু থামল নেহা। তারপর বুড়ির দিকে হাত বাড়াল, বলল, 'জলের পাত্রটা দাও, আমি তোমাদের মুখে জল ঢেলে দিই।'

বুড়ির হাত থেকে পাত্রটা আবার নিজের হাতে নিয়ে এগিয়ে গেল সেই বুড়োমানুষটির কাছে। বলল, 'সবাই বলে আমরা নিচুতলার মানুষ। আমার মা-ও বলেন। বলেন, নিচুতলা মানুষের ছোঁয়া খায় না উঁচুতলার মানুষ। আমার হাতের ছোঁয়া কাঁটাফল খেয়ে বুড়িমা তাই থুঃ-থুঃ করে ফেলে দিয়েছিল। আমি নিচুতলার মেয়ে হলেও তোমার সারিন্দার সুর কিন্তু আমার খুব ভালো লাগে। যখনই শুনতে পাই সারিন্দা বেজে উঠেছে, আমি সব ভুলে যাই। আমি কান পেতে শুনি। কিন্তু একটু আগে আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনে গেছি একটু জলের জন্যে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তাই আমি জল এনেছি। যার সারিন্দার সুর এত ভাল লাগে আমার, তার কষ্ট আমি দেখতে পারিনি বলেই ছুটে এসেছি জল নিয়ে। তুমি খাবে না আমার ছোঁয়া?'

বুড়োমানুষটি উঠে বসলেন। মেয়েটির চিবুকে হাত দিলেন। তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি কথা বলতে পারলেন না।

নেহার হাত থেকে জলের পাত্রটি নিয়ে দিদিকে ডাকলেন, 'দিদি!' তাঁর গলা ভার।

সেই বুড়ি এগিয়ে এল। বুড়ির চোখেও জল।

সেই বুড়োমানুষটি বললেন, 'এই পৃথিবীতে এমন সুন্দর একটি ছোট্ট মেয়ের এমন ভালোবাসার চেয়ে আর কী মহান বস্তু থাকতে পারে আমার জানা নেই। কাকে নিচুতলার মানুষ আর কাকে উঁচুতলার মানুষ বলে আমি জানি না। হয়তো দিদি তুমিও জানো না। আমাদের ভালোবেসে যে খুদে মানুষটি তাদের জলের কলসি উজাড় করে আমাদের তৃষ্ণার জল এনেছে, সে এত উঁচু, তার নাগাল পাওয়া আমাদের সাধ্যে নেই। তুমি এই জল মুখে দাও। তারপর আমি দেব।' বলতে-বলতেই একে-একে দু-জনেই প্রাণ ভরে জল খেলেন। দুটো মানুষই যেন তৃষ্ণার জল পেয়ে জীবন্ত হয়ে উঠলেন।

বুড়োমানুষটি বললেন, 'ওরে মেয়ে, আমাদের যে কিছুই নেই তোকে দেওয়ার মতো। কী চাস তুই?'

নেহা বলল, 'কিছুই চাই না আমি। যদি তোমার কষ্ট না হয়, তবে, তুমি একটু সারিন্দা বাজাও, আমি শুনি। কতদিন তোমার সারিন্দা শুনিনি।'

বেজে উঠল সারিন্দার ঝঙ্কার। সেই শুকনো তপ্ত হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতে সেই সুর যেমন নেহার সমস্ত মনপ্রাণ জুড়িয়ে দিল, তেমনিই দূরে, আরও দূরে কোথায় যে হাওয়ার দোলনায় দুলতে-দুলতে ভেসে গেল, সে-খবর কে জানে! তিনি যখন থামলেন, তখনও যেন ঝাঁক-ঝাঁক সুরের ঝনাৎকার কুঁড়েঘরের জানলা আর দরজা ডিঙিয়ে হাওয়ায় ভাসছে।

কেমন যেন হতবাক হয়ে গেল নেহা।

তিনি নেহার মুখখানা দেখে হাসলেন।

নেহা লজ্জা পেল।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আর শুনবি?'

নেহা চমকে তাকাল। তারপর ব্যস্ত হয়ে বলল, 'না, থাক। তোমার কষ্ট হবে।'

'না রে, আমার কিচ্ছু কষ্ট হবে না। শোন তবে।' বলে তিনি সারিন্দাটা কোলে টেনে নিলেন।

নেহা উঠে দাঁড়াল। সারিন্দার তারে হাত ছুঁয়ে বলল, 'আজ আমি আর শুনব না, কিছুতেই না। তোমার কপাল জুড়ে ক্লান্তির ফোঁটা ফুটে উঠেছে। আমি মুছে দিই।' বলে সে তার নরম হাতের আঙুল ছোঁয়াল তাঁর কপালে। ক্লান্তির ফোঁটাগুলি মুছতে-মুছতে বলল, 'তোমার এত কষ্ট হবে জানলে, আমি তোমাকে বাজাতে বলতুম না। তুমি আজ রাখো তোমার বাজনা। কাল যদি আমি তোমাদের জন্যে তৃষ্ণার জল খুঁজে আনতে পারি, তবে তোমার কাছে একটি জিনিস চাইব।'

'কী জিনিস?' সারিন্দা-বাজিয়ে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

'কাল বলব।'

'আজ নয় কেন?' তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

হঠাৎ নেহা সারিন্দার তারে হাত ঠেকিয়ে একটি শব্দ বাজাল।

তিনি হেসে উঠলেন।

নেহা হাত সরিয়ে নিল চকিতে।

তিনি হাসতে-হাসতেই বললেন, 'শেখবার ইচ্ছে বুঝি?' পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল বুড়ি। নেহা লজ্জায় জড়িয়ে ধরল তাকে। মুখখানা তার কোলের ভেতর লুকিয়ে ফেলে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, 'বুড়িমা!'

বুড়িমা বলল, 'বেশ তো, শেখার যখন ইচ্ছে, আমার ভাই তোকে শিখিয়ে দেবে।'

'আমি যে নিচু তলার মানুষ।' বুড়ির কোলের ভেতর থেকে নেহা মুখখানা বার করে, বুড়ির মুখের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, 'নিচুতলার মানুষকে শিখতে আছে?'

বুড়ি নেহার চিবুক ছুঁয়ে আদরে উছলে তার কপালে চুমো দিল। তারপর বলল, 'ওরে মেয়ে, আমি চুমো দিয়ে তোর নিচুতলার গঞ্জনা মুছে দিয়েছি। আজ থেকে তুই আমাদের আপনজন।'

একমুঠো বাতাস যেন উত্তাল হয়ে বয়ে গেল খুশির ছোঁয়ায়।

ছোট্ট মেয়েটার সারা শরীর খুশিতে উদ্বেল হয়ে উঠল বুড়ির কথা শুনে। তার চোখের দৃষ্টি আনন্দে উচ্ছল হয়ে ওঠে। অস্থির তার হাতের আঙুলগুলি বুড়ির চিবুক ছুঁয়ে ধরল। ধীরে-ধীরে তার মুখখানি বুড়ির কানের কাছে এনে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করল, 'আমি তোমার কপালে একটা চুমো খাব বুড়িমা?'

বুড়িমা হেসে উঠলেন। সে-হাসি থামতে চায় না। তারপর হাসতে হাসতে তিনি হাঁফিয়ে উঠলেন। হাঁপাতে হাঁফাতে নিজের কপালখানা নেহার ঠোঁটের ওপর রেখে বলল, 'খা, আমার কপাল জুড়ে যত পারিস তুই চুমো খা।'

অমনই শত-শত আনন্দের টুকরো যেন একসঙ্গে নেচে উঠল নেহার মনের ভেতর। একটা নয়, দুটো নয়, অসংখ্য চুমো খেতে-খেতে বুড়ির কপালে এঁকে দিল ভালোবাসর চিহ্নগুলি। বেজে উঠল সারিন্দা, আবার, সেই বুড়োমানুষটির হাতে।

একটি-একটি সুরের শব্দ শুনে মনে হয়, যেন কে ছড়িয়ে দিচ্ছে আলোর ফুলকি। তখন কার মনে থাকে দুর্ভিক্ষের কথা! কার মনে থাকে তৃষ্ণার কষ্ট! তখন যে খুশি, খুশি, চারদিকে খুশি। এ-খুশি আর থাকল না বেশিক্ষণ। এবার যেতে হবে নেহাকে মায়ের কাছে। মা হয়তো ভাবছেন। এখনই নেহাকে দেখতে না-পেলে মা হয়তো অস্থির হবেন। কাজেই নেহা সেই ছোট্ট কুঁড়ের দরজা খুলে ফিরে চলল মায়ের কাছে।

মা চেয়ে বসেছিলেন নেহার পথের দিকে। মেয়েকে দেখতে পেয়েই তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন যেন। নেহা ঘরে ঢুকেই মাকে আদরে জড়িয়ে ধরল। মা অবাক হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হল তোর? এত দেরি করলি?'

'মা, সেই ওস্তাদজি আমায় বাজনা শোনালেন। সেই বুড়িমানুষটি আমায় কত ভালোবাসলেন। আমি নিচুতলার মানুষ বলে, কেউ আমাকে ঘেন্না করলেন না। ওস্তাদজি বললেন, তিনি আমাকে শিখিয়ে দেবেন সারিন্দা বাজাতে।' বলতে-বলতে খুশিতে মায়ের কোলে শুয়ে পড়ল নেহা। মা বললেন, 'নেহা, আমাদের দু-দিনের জল সবই তো শেষ হয়ে গেল একদিনে। তেষ্টা পেলে কী খাবি?'

নেহা উত্তর দিল, 'মা, আমার একটা রাত জল না খেলে কিচ্ছু কষ্ট হবে না। আমি পারব সহ্য করতে। কিন্তু তোমার কষ্টের কথা ভাবলেই আমার কষ্ট হচ্ছে। মা, একটা রাত একটু সবুর করো। কাল ভোর হলেই আমি বেরিয়ে পড়ব। সকাল-সকাল বেরিয়ে ঠিক এক কলসি জল জোগাড় করে আনব। আর, যদি বলো, দু-কলসিও আনতে পারি।'

মার মন চায় না। তবু নিষেধও করতে পারেন না। সত্যিই তাঁর শরীরটা আর বইছে না। সত্যিই মানুষটা আধখানা হয়ে গেছেন। মেয়েটার জন্যেই তাঁর ভাবনা। বড়ো আদরের মেয়ে তাঁদের। তার যদি শরীরটা ভেঙে যায়!

এখনও ভাঙেনি। তবে যে-কটা বজরার দানা পড়ে আছে, তাতে নিজে আধ-পেটা খেয়ে, আর মেয়েটাকে খিদে মেটাবার মতো খাবার দিয়ে মেরে-কেটে একটা দিন চলবে। তার পরেও যদি মানুষটা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে না-ফেরেন, তবে তাদেরও অনাহারে মরতে হবে। এ-কথা ভাবলেই, মা শিউরে ওঠেন। মেয়ের কিছু হলে তার বাবা যে দোষ দেবেন মাকেই। অথচ মার যে কিছুই করার নেই। তাঁর যে হাত-পা বাঁধা। এ-কথা কি বুঝবেন মেয়ের বাবা?

কিন্তু কালকে কী হবে? মেয়েটাকে একা-একা ছেড়ে দেবেন তিনি? না দিয়ে উপায়ই বা কী? কোথায় যে একফোঁটা জল আছে, কেউ জানে না। কেউ যা জানে না, ওই ছোট্ট মেয়েটা কেমন করে জানবে? কোথায় ঘুরবে সে? কোন কুয়োর সন্ধানে? মন কেঁদে ওঠে। মন বলে, ওকে কেমন করে একা ছাড়ি! অথচ তিনিই বা কেমন করে যান? দু-পা হাঁটলেই হাঁফিয়ে পড়ছেন। তবু মেয়েটা এখনও পারছে। আজও সে ছুটে-ছুটে এর-ওর মুখে জল দিয়েছে। নিজের কথা সে ভাবেনি। মা-ও ভাবেননি নিজের কথা। মেয়েটা যে অন্যের কষ্ট দেখে ব্যাকুল হয়ে তৃষ্ণার জল বিলোচ্ছে, এই দেখে আনন্দে তিনি কেঁদেছেন। সে নিজের জীবন তুচ্ছ করে অন্যের জীবন রক্ষা করুক। দিক সে, বিলিয়ে দিক যা আছে সব। বিপদের সময় বিপন্ন মানুষের পাশে যে দাঁড়ায়, তাকেই তো আমরা মানুষ বলি। আর বিপন্নকে দেখে যে পালায়, সে নির্দয় কিংবা স্বার্থপর অমানুষ ছাড়া আর কী?

না, তিনি নিজের মেয়েকে নির্দয় হতে দেবেন না। হতে দেবেন না স্বার্থপর। সে শিখবে মানুষকে ভালোবাসতে। শিখবে মানুষের বিপদের দিনে তার বন্ধু হতে।

'মা।' হঠাৎ ডাকল নেহা।

মা থতমত খেয়ে গেলেন।

'অনেকক্ষণ তুমি একটিবারও আমার নাম ধরে ডাকোনি। কী ভাবছ? তুমি কি চাও না মা আমি জলের খোঁজে যাই? তুমি না-চাইলে আমি কখনও যাব না।'

'না রে নেহা। আমি সে-কথা একটিবারের জন্যেও ভাবিনি। আমি ভাবছি, তুই যে অত ভোরে যাবি, সারাদিন কত পথ হাঁটবি, তোর যে খিদে-তেষ্টা পাবে! তুই খাবি কী?' মা নেহার মাথায় হাত দিয়ে স্নেহ-ঝলমল চোখে তার মুখের দিকে তাকালেন।

'আমি বলি কী,' নেহা মাকে উত্তর দিল, 'তোমায় অত ভাবতে হবে না। মাঠে-ঘাটে অনেক ভুরটঘাস আছে, তার কাঁটাফল খেয়ে আমার দিন কেটে যাবে।' উত্তর দিল নেহা। মা বললেন, 'তা হয় না। আমি তোকে উপোসি থাকতে দেব না সারাদিন।'

নেহা হাসল। বলল, 'খাবার পাবে কোথা? ওই তো ক-টা বজরা পড়ে আছে। বাবা যদি এসে পড়ে, তাকে কী দেবে?'

'তোর বাবা কি খালি হাতে আসবে? তার মেয়ের জন্যে কত খাবার আনবে। চ, দু-জনে ধরাধরি করে জাঁতাটা নিয়ে আসি। বজরা গুঁড়িয়ে তোর জন্যে কটা রুটি করে রাখি। সঙ্গে নিয়ে যাবি।'

নেহা মায়ের কথায় আর আপত্তি করেনি। কেননা, মা যে নেহাকে একা ছাড়তে রাজি হয়েছেন, এতেই সে অবাক। তার ওপর মা যদি কটা রুটি করে তার সঙ্গে দিতে চায়, দিক। খিদে তো পাবেই। এ তো আর অস্বীকার করা যায় না।

রাত হয়েছে। অবশ্য চোখ-জড়িয়ে ঘুমের রাত এখনও আসেনি। মা রুটি ক-খানা সেঁকে নিয়ে, একটা পাত্রে বেঁধে গুছিয়ে রেখে দিলেন। অবশ্য মা আর মেয়ে কখানা খেলেন। আজ রাতের খাবার। থেকে-থেকেই তেষ্টা পাচ্ছিল দুজনের। কলসি চেঁছেপুঁছে এক গেলাসও জল মিলবে বলে মনে হয় না। তবু নেহা মাকে বলল, 'দেখি না।'

হ্যাঁ, দেখতে-দেখতে ছিটেফোঁটা জল যা মিলল, তাতে টেনেটুনে আধঘটি মতো হবে। যা হোক, তবু মিলল তো। নিজেদের তেষ্টা মেটাতে যত না, অন্য মানুষের তেষ্টা মেটাতেই তো কলসি ফাঁকা হয়ে গেল। কাল জল না-হলেই নয়!

রাতের আকাশটা দেখেছো, কী ভীষণ ঝকঝকে। ভীষণই তো! টুকরো-টাকরা একটা মেঘেরও দেখা নেই। জল-ভরা মেঘ কি আকাশের সঙ্গে আড়ি করে পাড়ি দিয়েছে অন্য কোথাও! রাবণরাজার মতো মানুষের হাতেও যদি একটা উড়ন্ত রথ থাকত, তবে আকাশ ঢুঁরে জল-ভরা মেঘের সন্ধান করা যেত। তরোয়াল উঁচিয়ে ভয় দেখিয়ে মেঘেদের বলা যেত, 'যেতে হয় আমাদের সঙ্গে চ! নইলে তরোয়াল চালিয়ে তোদের পেট ফাঁসিয়ে দেব।'

অবিশ্যি মেঘ তো আর মানুষ নয় যে, মানুষের ভয় দেখানোকে তারা তোয়াক্কা করবে! সে নিজের ইচ্ছেমতো যেখানে খুশি যাবে, যা খুশি করবে। কে তাকে বাধা দেবে? যে বাধা দেবার, সেই আকাশই তো তার দোসর। চবিবশ ঘন্টা আকাশের বুকেই তো সে ঘুরছে, ফিরছে। মেঘেরা যেন আকাশের সন্তান।

'মা।' রাত্রের অন্ধকারে মায়ের পাশে শুয়ে-শুয়ে এমনই সব নানা কথা ভাবতে-ভাবতে ডাকল নেহা।

মা অবাক হলেন, 'কী রে, তুই ঘুমোসনি?'

নেহা উত্তর দিল, 'না, ঘুম পাচ্ছে না। আমি ভাবছি।'

'কী ভাবছিস?'

'আমি যদি মেঘ হতুম?'

মা আরও অবাক হলেন, 'সে আবার কী কথা? মেঘ হতে যাবি কী দুঃখে?'

'না, বলছি, আমি মেঘ হলে তো আর তোমার কোনো কষ্ট থাকত না। জল-জল করে অমন তেষ্টায় তোমাকে ছটফট করতে হত না। মেঘ হয়ে জলে-জলে আমি ভরে দিতুম মাঠ-ঘাট, জলা-জমি সব। তখন চারদিক সবুজে-সবুজে ছেয়ে যেত। কত ফসল ফলত জমিতে। কত ময়ূর আসত, পাখি আসত, চারদিকে কত রং ছড়িয়ে পড়ত। তখন কী সুন্দর দেখতে লাগত আমাদের গ্রামখানা!'

মা বললেন, 'নেহা, কোন মা চায় রে তার বুকের ধন আকাশের মেঘ হয়! ওরে মেয়ে, মেঘের দয়ায় আমাদের এ গ্রাম সবুজে-সবুজে যতই সুন্দর হয়ে উঠুক, গ্রামে যদি নেহার মতো একটি ছোট্ট মেয়ে পায়ে ঝাঁঝর বাজিয়ে হেঁটে-ছুটে ঘুরে না বেড়ায়, তবে সে সুন্দর সুন্দরই নয়। মেঘ গর্জন করে, কিন্তু নেহার মতো 'মা' বলে ডাকে না। ডাকতে-ডাকতে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে না, "মা একটা গল্প বলো"…।'

'হ্যাঁ, মা একটা গল্প বলো!' মায়ের কথা শেষ করতে দিল না নেহা। মায়ের গলা জড়িয়ে সে আবদার করল।

মা বললেন, 'অনেক রাত হয়ে গেছে নেহা। ঘুমো। কাল ভোর-ভোর উঠতে হবে। এক কলসি জলের জন্যে তোকে আকাশ-পাতাল ঘুরতে হবে। কত কষ্ট হবে তোর। এই রাতটুকু যদি না-ঘুমোস, জল খোঁজার ধকল সইবি কেমন করে?'

'মাগো, তোমার মুখে গল্প শুনতে আমার ভালো লাগে। তোমার মুখে গল্প শুনলে আমি কষ্ট ভুলি। আমি দুঃখ ভুলি। তোমাকে আরও, আরও অনেক ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। তোমার গল্প শুনে কাল ভোরে যখন আমার ঘুম ভাঙবে, তখন আনন্দে আমার সারা মন ভরে যাবে! মাগো, আজ তোমার গল্প শুনলে, কালকের দিনটা আমার খুশির দিন হয়ে সারাবেলা আমায় জাগিয়ে রাখবে।' নেহা উত্তর দিল।

মা বললেন, 'ওরে নেহা, তা-ই যদি সত্যি হয়, তবে আমার সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে তোকে আমি গল্পই বলছি।' বলে তিনি সেই অন্ধকার রাতে জেগে-জেগে নেহাকে গল্প শোনাতে লাগলেন:

সে অনেক, অনেকদিন আগের কথা নয়। সেদিনের কথা। সে অনেক, অনেকদিনের রূপকথা নয়। সত্যি কথা। সে-ও এক মেয়ের কথা। তারও বিয়ে হয়েছিল কত ধুমধাম করে। বর এসেছিল ঘোড়ায় চড়ে। কত বাজনা, কত বাদ্যি। কত আনন্দ, কত…হইচই। আলোয় আলো-ঝলমল। কনে পরেছিল রেশমি-সুতোর শাড়ি। বর পরেছিল ধুতি। কনের সারা গায়ে গয়না। বরের মাথায় পাগড়ি। আনন্দের শেষ নেই। আসল গল্প কিন্তু বিয়ের ধুমধামও নয়, বরের সঙ্গে কনের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় মায়ের কান্নাও নয়, বাবার চোখ ছলছল করাও নয়। সে তো হয়েই থাকে। তারপর আবার সব হয়ে যায় সহজ স্বাভাবিক। কিন্তু…

বিয়ের দু-এক বছর পর বউ-এর কোলে একটি মেয়ে জন্ম নিল। এতদিন বেশ ছিল। এতদিন বউয়ের কত যত্ন, কত আত্তি। তারপর যেই মেয়ে জন্মাল, অমনই সবার মুখ হাঁড়ি। ছি-ছি করে উঠল সবাই। কেউ আর বউকে যত্ন করে না।

বউয়ের দোষের মধ্যে কী, না বউ-এর কোলে মেয়ে জন্ম নিয়েছে। এতে বউয়ের কী দোষ, কে জানে!

সে যাই হোক, সবাই তাকে ছি-ছি করলেও সে তো আর ছি-ছি বলে নিজের মেয়েকে ফেলে দিতে পারে না। সবাই যত গঞ্জনা দেয়, বউয়ের ততই মেয়ের জন্যে মন কেমন করে। সত্যিই তো ওই দুধের মেয়ে, তার কোনো দোষ নেই। দোষ কারই বা আছে যে, এত অচ্ছেদ্দা। শেষকালে এমন হল যে, বাড়িতে টেকাই দায়! বউ যেন সংসারের আবর্জনা। শেষমেশ, জন্মাল যে মেয়ে তার বাবাকে না-বলে পারল না। বলল, তাকে এমন হেনস্থা করলে সে কেমন করে থাকবে এ-বাড়িতে!

অগত্যা, একদিন কাউকে কিছু না বলে বউ আর মেয়েকে নিয়ে মেয়ের বাবা বাড়ি ছাড়ল।

বাড়ি ছেড়ে শান্তিতেই ছিল তারা। যেখানে ছিল আগে, তারই কাছাকাছি তারা বাসা বেঁধেছিল। এইখানেই তাদের দুটো বছর কেটে গেল। মেয়েটা একটু-একটু হাঁটতে শিখল। একটা-দুটো কথাও বলতে শিখল। আধো-আধো কথা বলে। মিষ্টি-মিষ্টি শুনতে লাগে। সেই নিয়ে হাসি-খুশিতে বাবা-মায়ের দিন কাটে। একদিন হয়েছে কী, মা তখন ঘরের ভেতর সংসারের কাজ করছে। মেয়ে তখন খেলতে-খেলতে ঘরের বাইরে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখছে ঘরের দেওয়ালে সিধে লাইন বেঁধে দলে-দলে পিঁপড়ে চলেছে খাবারের খোঁজ করতে। মেয়েটা বোধ হয় এই প্রথম এমন একটা দৃশ্য দেখছে। তাই হতভম্বের মতো চেয়েই আছে। এখন তো সবে সে দু-বছরে পড়েছে। সুতরাং সবে দেখার শুরু হয়েছে। কাজেই চোখভরা তার বিস্ময়। আনমনে দেখতে-দেখতে নিশ্চয়ই তার মনে হয়েছিল, এত পিঁপড়ে আসে কোত্থেকে? যায় কোথায়? ছোট্ট গর্তটার ভেতর কি ওদের মস্ত বাড়ি আছে? এই কথা ভাবতে-ভাবতে সে যখন আরও খানিকটা টলতে-টলতে বেরিয়ে এল, তখন হঠাৎ একটা অজানা হাত তার মুখটা টিপে ধরল। বেচারা চেঁচাতে পারল না। এমনকী, দু-বার হাত-পা ছুড়েই সে নিস্তেজ হয়ে লোকটার হাতের মধ্যে নেতিয়ে পড়ল। কাছে-পিঠে কেউ ছিল না। কাজেই মেয়েটার যে কী হল, কেউ জানতে পারল না। কে তাকে এমন করল, কেন করল, তার হালহকিকতও বলার মতো কাউকে পাওয়া গেল না।

এতক্ষণ মা তার কাজেই ব্যস্ত ছিল। এবার তার খেয়াল হয়েছে। মা মেয়ের নাম ধরে ডেকে হাঁক পাড়লেন, 'কোথায় গেলি রে মালতী? কই রে, এদিকে আয়! 'দ্যাখ, তোর জন্যে মিঠাই করেছি।' তা সে কাছেপিঠে থাকলে তবে তো সাড়া দেবে!

যখন এতবার ডাকার পরও সাড়া পেল না, তখন ব্যস্ত হয়ে মা হাতের কাজ ফেলে ছুটে এল। তন্নতন্ন করে এদিকে-ওদিকে তাকে খুঁজে বেড়াল। খুঁজলে আর কী হবে? মেয়েকে যে একটু আগেই কেউ বেহুঁশ করে চুরি করে নিয়ে গেছে সে তো আর মা জানে না। সুতরাং মা কান্না জুড়ে দিল। সে-সময় মেয়ের বাবাও ঘরে ছিল না। কাজেই পাড়ার লোকজন ছুটে এসে খোঁজতল্লাশি শুরু করে দিল। কোথায় পাবে তাকে! অবশেষে সবাই ঠিক করল, কোতোয়ালিতে খবর দেওয়া ছাড়া তাদের আর কিছুই করার নেই।

ইতিমধ্যে মেয়ের বাবা এসে পড়েছে। সবাই যখন কোতোয়ালিতে খবর দেওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছে, তখন মেয়ের বাবা বলল, 'কোতোয়ালিতে খবর দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু আমার মেয়ের খোঁজ আমাদেরই করতে হবে। কোতোয়ালি আমাদের ব্যতিব্যস্ত করবে এই পর্যন্ত। আমার মেয়ের খোঁজ তারা দিতে পারবে না। দায় আমাদের। আমাদের দায় অন্যে নেবে, এমন আশা করা ভালো। কিন্তু কাজ কতটা হবে, কেউ বলতে পারে না।' সুতরাং বাবা আর দেরি না-করে মেয়েকে নিজেই খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল।

মেয়েটা এই বয়সে একা-একা কোথায় যাবে? জানাশোনা পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে? অসম্ভব কথা। সে কিছুই চেনে না। হয় সে একা রাস্তায় হাঁটতে-হাঁটতে পথ হারিয়েছে, না-হয় কেউ তাকে চুরি করে লুকিয়ে রেখেছে। তবু মেয়ের যেখানে যত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব আছে সবার বাড়িতে খোঁজখবর নিল তারা, কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া গেল না। টানা সাতদিন এর-দোর তার-দোর করে হতাশ মা আর বাবার বুক ভেঙে গেল।

মেয়ের শোকে মা যখন-তখন চোখের জল ফেলে। বাবা বলেন, 'তুমি কেঁদো না বউ, আমি যেমন করে পারি তোমার মেয়েকে ঠিক খুঁজে বার করব।'

মেয়ের মা বলে, 'আর কোথা থেকে খুঁজে বার করবে? ওই মেয়ের জন্যে চারদিকে আমাদের শত্রু ওঁত পেতে আছে। দ্যাখো, তারাই হয়তো মেয়েকে হরণ করে তাকে মেরে ফেলেছে। মানুষ এত নির্দয় হয় কেন? মেয়ের নামে কেন এত হতচ্ছেদ্দা?

সে যাই হোক, শেষমেশ তারা আর মেয়েকে খুঁজে পেল না।

বছর ঘুরে গেল। একদিন মেয়ের বাবা বউকে বলল, 'মেয়েটা চলে গেল। সেইসঙ্গে আমাদের জীবনটাও কেমন যেন শূন্য হয়ে গেল।'

মার চোখ ছলছল করে উঠল।

বাবা বলল, 'বউ, চলো ক-দিনের জন্যে পুষ্করে বেরিয়ে আসি। মন বড়ো আনচান করছে। ভুলতে পারছি না মেয়েটাকে। হয়তো ক-দিন ঘুরে এলে মনটা শান্ত হবে।'

বউ উত্তর দিল, 'আমারও তা-ই মনে হয়। তবে যাবে কেমন করে? অনেকখানি পথ।'

'ভাবছি, একটা উট যদি জোগাড় করতে পারি।'

'উট কোত্থেকে জোগাড় করবে?' বউ জিজ্ঞেস করল।

'কিষাণকে বলেছি। সে বলেছে, তুমি আমার বন্ধু। তোমার জিম্মায় আমার উট থাকলে, আমি নির্ভয়ে থাকতে পারি।' উত্তর দিল মেয়ের বাবা।

বউ বলল, 'তা যদি হয়, তবে চলো। পুষ্করে যাওয়ার এই তো সময়। এখন সেখানে কার্তিক মেলা। মস্ত উৎসব।'

সত্যিই, একদিন বন্ধু কিষাণের উটের পিঠে বসে মেয়ের মা আর বাবা পুষ্করের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

তিনদিন লাগল তাদের পুষ্করে পৌঁছতে। তিনদিন তিনরাত্রি তারা যেখানে জনপদ পেয়েছে সেখানে বিশ্রাম নিয়েছে। তিনদিনের শেষদিনে তাদের পেরোতে হয়েছে অনেকখানি মরুর বালিয়াড়ি। অনেক দূর থেকে চোখে পড়ছে সাবিত্রী পাহাড়। পাহাড়ের চুড়োয় মন্দির। সাদা ঝলমল করছে। আর কিছুটা গেলেই তারা পৌঁছে যাবে মরুর শেষ সীমায়। দেখতে পাবে তারা পুষ্করের হ্রদ। এইখানেই তারা বিশ্রাম নেবে। তারপর পাহাড় চুড়োয় উঠবে। হয়তো মন্দিরের ঠাকুরের কাছে মানত করবে। মানত করে হয়তো বলবে, 'আমাদের মেয়েকে ফিরিয়ে দাও ঠাকুর।' কিন্তু না, মানত করা তাদের হল না।

কেননা, হঠাৎ কে যেন মরুর বুকে চিৎকার করে উঠল, 'মা-আ-আ, আমি এখানে।'

চমকে ওঠে উটের পিঠে বসা দুটো মানুষই। এ যে তাদের মেয়ের গলার স্বর। চোখের পলক পড়ার আগেই দু-জনেই পিছু ফিরে তাকায়। তখন অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটল হঠাৎ। কোথাও কিছু নেই আচমকা ঝড় উঠল। মরুর বুকে ঝড়। শুধু বালি আর বালি। নিমেষের মধ্যে ঝাপটা-ঝাপটা বালি এসে তাদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ল। উটটা যেন পাগলের মতো ছোটোছুটি লাগিয়ে দিল। তারপরে উটটা বসে পড়ল মুখ থুবড়ে। বালি উড়ছে। দিনেরবেলাতেই আঁধার নেমে এসেছে। চোখ চাইবার উপায় নেই। যতটা পারো মুখ লুকিয়ে ফেলো। পারো তো শুয়ে পড়ো বালির ওপর মুখ গুঁজে।

কতক্ষণই বা চলল এই ঝড়ের তাণ্ডব! এইটুকু সময়ের মধ্যেই ঘটে গেল সেই ভয়ঙ্কর কাণ্ডটা! উট আছে, উটের পাশে বিধবস্ত হয়ে পড়ে আছে মেয়ের বাবা। সারা গা বালিতে ভর্তি। কিন্তু মেয়ের মা কোথায় গেল!

লোকটি প্রায় অচেতন হয়েই পড়েছিল। তার চেতনা ফিরতেই কোনোরকমে টলতে-টলতে উঠে দাঁড়িয়েছে সে। পিছু ফিরে সে তার বউকে খোঁজে। কিন্তু কোথায় বউ? সে সামনে দেখে, চারপাশটা তন্নতন্ন করে ঠাওর করার চেষ্টা করে। দেখতে পায় না। এখানে-ওখানে বালির স্তূপ। সে হাতড়ে-হাতড়ে বালি সরায়। নেই, কোথাও নেই। চারদিক খাঁ-খাঁ করছে। সুনসান। শুধু বালি আর বালি। সে আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে। বউয়ের নাম ধরে ডাক দেয়, 'জয়ন্তী-ই-ই!'

কারও সাড়া নেই। শব্দ শোনা যায় বাতাসের।

আবার সে চিৎকার করে ওঠে, 'জয়ন্তী-ই-ই-ই!'

কোনো উত্তর নেই।

শুধু বাতাসই বয়ে যায়, শোঁ-শোঁ।

ভয়ে ধকধক করতে থাকে বুকের ভেতরটা। একটা মানুষ একা এই বিপদ থেকে কেমন করে উদ্ধার পাবে, ভেবে পায় না। কী করবে কিছু বুঝতে না-পেরে সে উঠে পড়ল উটের পিঠে। যেদিক দিয়ে এসেছিল, সেইদিকেই সে উটকে ছোটাল।

উট ছোটে।

সে ডাক দেয়, 'জয়ন্তী-ই-ই।'

ডাকতে-ডাকতে তার গলা ভাঙল। ভাবতে-ভাবতে সে অস্থির হয়ে উঠল। হাতের কাছে এখন উট ছাড়া জীবন্ত আর কেউ নেই। কিন্তু এখন এ প্রাণী থাকাও যা, না-থাকাও তা। উন্মাদ ছাড়া উটের সঙ্গে কথা বলে কে? কিন্তু তবু মানুষটা থাকতে পারল না। উটের পিঠের ওপর উপুড় হয়ে হাউ-হাউ করে কেঁদে ফেলল। সত্যিই তো, এই ভয়ঙ্কর অসহায় মানুষটা তখন একা-একা কোথায় খুঁজবে তার বউকে?

মানুষটা কাঁদতে-কাঁদতে আবার ডেকে উঠল, 'জয়ন্তী তুমি কোথায়?'

নিমেষের মধ্যে উত্তর শোনা গেল, 'আমি এখানে।'

হ্যাঁ, এ তার বউয়েরই কণ্ঠস্বর।

মানুষটা সিধে হয়ে বসে। আবার হাঁক পাড়ে, 'কোনদিকে?'

উত্তর আসে, 'তোমার সামনের দিকে।'

উট ছোটে সামনের দিকে।

উট ছোটে। ছোটে অনেকটা। কিছুই দেখা যায় না।

মানুষটা আবার চিৎকার করে ওঠে, 'দেখতে পাচ্ছি না কেন?'

সে বলে, 'আমিও তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। তুমি ভুল পথে চলে যাচ্ছ না তো? আমার গলার শব্দ কি তুমি সামনের দিক থেকে শুনতে পাচ্ছ না?'

মানুষটির মনে হল, না, না, তার বউয়ের কণ্ঠস্বর সামনের দিক থেকে আসছে না তো। মনে হচ্ছে পেছন দিক থেকে ডাক শোনা যাচ্ছে। সে উটের মুখ পেছনদিকেই ঘোরাল। ঘোরাতে-ঘোরাতে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আমার গলার স্বর তুমি কি এবার স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছ? আমি কি ঠিক দিকেই যাচ্ছি?'

উত্তর এল, 'শুনতে পাচ্ছি। তুমি একটু তাড়াতাড়ি এসো। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।'

মানুষটি উত্তর দিল, 'তুমি কিচ্ছু ভেবো না। আমি এখনই পৌঁছে যাচ্ছি।' বলতে-বলতে মানুষটি উটকে ছোটাল। বালির ওপর যত দ্রুত ছোটানো যায়, তত দ্রুত।

খানিকটা ছুটে মানুষটি আবার চিৎকার করে উঠল, 'জয়ন্তী, আমি কি ঠিক দিকে যাচ্ছি?'

'কই? তোমায় দেখতে পাচ্ছি না।' তার কন্ঠস্বর শোনা গেল।

'আমি তো ঠিক পথেই যাচ্ছি মনে হয়।'

'তুমি কোনদিক থেকে কোথায় যাচ্ছ, আমি বুঝতেই পারছি না।' সে উত্তর দিল।

'তবে কি তুমি ডানদিকে আছ? ডানদিক থেকে কি তুমি আমার গলার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছ?' মানুষটি জিজ্ঞেস করল।

সে কোনো উত্তর দিল না।

মানুষটি আবার হাঁক দিল, 'তুমি সাড়া দিচ্ছ না কেন?'

তবু সাড়া নেই।

মানুষটি ব্যস্ত হয়ে চেঁচাল, 'জয়ন্তী, তোমার কী হল? তুমি সাড়া দিচ্ছ না কেন?'

নিস্তব্ধ চারদিক।

মানুষটি ভয় পেল। অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কোনদিকে জয়ন্তী?'

কোনো মানুষের, কোনোই কণ্ঠস্বর শোনা গেল না। শুধু হাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে। শনশন। বালির ওপর সেই হাওয়া আলতো ছোঁয়া দিলে মনে হয়, হাওয়া যেন নূপুর বাজায় ঝুনঝুন।

মানুষটি নুপুররের শব্দ শুনে উটকে ছোটায় সামনে-পেছনে, ডাইনে-বাঁয়ে। বউকে ডাকতে-ডাকতে তার গলা ভাঙল। ছুটতে-ছুটতে উট থেমে গেল। সে আর ছুটতে পারে না। চলতে পারে না। সে দাঁড়িয়ে পড়ে। শেষমেশ বসে পড়ল তপ্ত বালির ওপর। উটকে ফেলেই মানুষটি ভাঙা গলায় চিৎকার করতে-করতে যেদিকে পারে সেইদিকেই ছোটে।

কিন্তু কতক্ষণ ছুটবে? কতক্ষণ তেষ্টার যন্ত্রণা সহ্য করে ছোটা যায়। মাথায় ওপর সূর্য। পায়ের নীচে বালি। বুকের ভেতরে থেকে বেদম হয়ে ঘন ঘন নিশ্বেস বেরিয়ে আসছে। সে-ও বোধ হয় আর পারবে না। উটের মতো তাকেও হয়তো বালির ওপর বসে পড়তে হবে।

না, বালির ওপর বসল না সে। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। আর পারছে না সে। পারা যায় না। কিন্তু ভাবতে পারল, জয়ন্তী ডাকতে-ডাকতে অমন চুপ করে গেল কেন? কেন তার আর সাড়া পাওয়া গেল না? কোথায় হারিয়ে গেল সে? উটটাই বা কোথায় গেল!

হ্যাঁ, মানুষটা হারিয়েই গেল ওই ভয়ঙ্কর বালির রাজ্যে। আর ঠিক তখনই আচমকা তার মনে পড়ে গেল, কার কাছে সে যেন শুনেছে, দিনের বেলা মরুর শয়তান নাকি মানুষের গলা নকল করে মরুর যাত্রীকে বিপাকে ফেলে। সে তার আপনজনের গলা নকল করে তাকে যেমন বালির রাজ্যে ঘুরপাক খাইয়ে বেপথে নিয়ে গিয়ে পথ ভোলায়, তেমনই বেদম করে তাকে মেরে ফেলে। এই কথাটা মনে হতেই মানুষটা নিজের মনকে শক্ত করল। না, সে শয়তানের মায়াজালে নিজেকে কিছুতেই জড়াবে না। যেমন করে হোক তার বউকে উদ্ধার করবে সে। যেমন করে হোক খুঁজে বার করবে তার উটকে। শয়তান না-হয় তার বউয়ের গলার স্বর নকল করেছে, তার মেয়েরও গলার স্বর সে কেমন করে নকল করল? মেয়ে কি তবে শয়তানের মায়াজালে বন্দি? বন্দি কি তার বউও?

এই কথা ভাবতে-ভাবতে সে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। অনেক কষ্টে মানুষটা উঠে দাঁড়াল। তারপর ধীরে-ধীরে হাঁটতে শুরু করল। একটা অসহায় মানুষ মরুর বুকে একা-একা খুঁজতে লাগল বউকে। কিংবা তার উটকে। ছিঃ! উটটা তার বন্ধুর। বাড়ি ফিরে সে বন্ধুর সামনে কেমন করে দাঁড়াবে? কেমন করে সে বলবে উট হারিয়ে গেছে? বন্ধু যদি বিশ্বাস না করে! তবে কি সে আর কোনোদিন বাড়ি ফিরবে না?

এই দুপুর রোদে মরুভূমির বালির তাপ অসহ্য। এই অসহ্য তাপ সহ্য করে তাকে হাঁটতে হবে। আশ্চর্য, একটা মানুষেরও চিহ্ন নেই! সাড়া যদি বা পেল, কেউ দেখা দিল না! এ তো এক রহস্যময় কাণ্ড! মানুষটা ভাবতে-ভাবতে অস্থির হয়। মরুর তাপে পুড়ে আর মনের ভয়ঙ্কর ভাবনায় মানুষটার কী চেহারা হয়েছে! বোধ হয় মুখ থুবড়ে এখনই পড়বে।

না, সে পড়ল না। মনটাকে লোহার মতো শক্ত করে সে পথ খুঁজতে লাগল। সেইসঙ্গে খুঁজতে লাগল তার বউকে। আর উটকে। ভাবলে অবাক লাগে, দুশ্চিন্তায় কাতর মানুষটাকে খিদে-তেষ্টার জ্বালা ক্ষণেকের জন্যেও কষ্ট দেয়নি। আকুল হয়ে সে খুঁজছে আর দেখছে চারদিক। ধু-ধু মরুর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত শুধুই বালি। কোথাই-বা তার বউ আর কোথাই-বা বন্ধুর ধার দেওয়া সেই উট। সে যে চিৎকার করে হাঁকাহাঁকি করবে তেমন শক্তি একফোঁটাও নেই। এমনকী, নিজের মনে কথা বলতেও তার মন সায় দিচ্ছে না। সে কি তবে পাগল হয়ে যাবে? অন্য কেউ হলে হয়তো পাগলই হয়ে যেত। কিন্তু মানুষটার বুকের ছাতি এতখানি। শক্তসমর্থ হাত দুটো দিয়ে সে বাঁই-বাঁই করে লাঠি ঘোরাতে পারে। একশোটা লোকের সামনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে ভয় পায় না মানুষটা। কিন্তু মরুর একঝাঁক বালি তাকে কাবু করে দিয়েছে হঠাৎই। প্রকৃতির সঙ্গে কে লড়াই করে জিতবে? প্রকৃতি যদি ক্ষিপ্ত হয়, কার সাধ্যি তার মুখোমুখি দাঁড়ায়? নিমেষে দর্প চূর্ণ করে দেবে সে।

বোঝা গেল প্রকৃতি সব পারে। প্রকৃতি ভয়ঙ্কর মূর্তি ধরল বলে, তার বউও হারিয়ে গেল মরুর বুকে! এর চেয়েও ভয়ানক ঘটনা আর কী ঘটতে পারে?

হঠাৎ যেন হাওয়ায় ভেসে একটা অস্পষ্ট শব্দ কানে আসছে।

অনেক মানুষের কথা বলার শব্দ কি? সে কান পেতে শুনতে লাগল। তার বুকের ভেতরটা ভীষণ ছটফট করে উঠল। কেননা, তার মনে হল, এ মানুষেরই গলার শব্দ। শুনেছে সে মরুর বুকে নানা ধরনের মানুষ ঘোরাফেরা করে। কেউ তারা তীর্থযাত্রী, কেউ সওদাগর, কেউ বা নিরীহ পথিক। এরা তো ভালোমানুষ। কিন্তু মরুর বুকে খুনিরাও যে হাতে ছোরাছুরি নিয়ে মানুষ খুন করে বেড়ায়। তাদের সঙ্গে গয়নাগাটি টাকাপয়সা যা থাকে সব লুটপাট করে নেয়। এখন সেই আগন্তুকের দল যদি তেমন হয়? অবশ্য এই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষটিকে এখন মেরে ফেললেও তার কাছে একটি কানাকড়িও পাবে না। সব গেছে। এখন মানুষটি একেবারেই নিঃস্ব।

ওই তারা এসে পড়ল বলে! এক বিপদ থেকে আর-এক বিপদে পড়তে কতক্ষণ! বোকার মতো সামনে সটান দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না। সটান দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয় ঠিকই, কিন্তু এই ধু-ধু মরুর চতুর্দিক তো খাঁ-খাঁ খোলা। মানুষ লুকোবে কোথায়? অবশ্য কোথাও-কোথাও বালি পাহাড় হয়ে আছে। তবে সে-পাহাড় এখান থেকে একটু দূরে-দূরে। কাছেপিঠে ছোটো-ছোটো বালির স্তূপও দেখা যাচ্ছে। ওই স্তূপগুলোর আড়ালে যদি শুয়ে পড়া যায়, তবে অবশ্য নজরে না-ও পড়তে পারে। সুতরাং ওদের আসার দৃশ্যটা যখন স্পষ্ট হয়ে উঠল, তখন একটা স্তূপের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে সে। শুয়ে-শুয়ে দেখতে অসুবিধে হচ্ছে। তবু, যতটা সাবধানে পারা যায়, মাথাটা তুলল সে। দেখল, একদল লোক। মনে হয় কোনো মানুষের মৃতদেহ নিয়ে চলেছে। অথবা কোনো অসুস্থ মানুষ। এই দূরত্ব থেকে স্পষ্ট দেখা যায় না। দেহটা কোনো স্ত্রী না কি পুরুষের তা-ও সঠিক বোঝা যায় না। সে যাই হোক, যেটা বোঝা গেল, তা হল, এখন সে নির্বিঘ্নে ওই দলটার পেছনে-পেছনে হাঁটতে পারে। অবশ্য বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে হবে। লুকিয়ে-ছাপিয়ে। কারণ, উলটে ওই দলটাই যদি ভাবে এই লোকটিও ডাকাত। ভেবে তাকে যদি ধরেবেঁধে ধোলাই দেয়! একেই তো এই বিপদের মধ্যে পড়ে এখন হাবুডুবু খাচ্ছে, তার ওপর যদি আরও বিপদ আসে, তবে রক্ষা করার কেউ নেই।

কাজেই সে হাঁটল বেশ খানিকটা পেছনে-পেছনে। মনে-মনে ভাবতে লাগল মরু পেরিয়ে মানুষের আস্তানায় পৌঁছনোর রাস্তা ধরেই এই দলটা নিশ্চয়ই হাঁটছে। সুতরাং ভাগ্য ভালো থাকলে, সে-ও এদের পেছনে পৌঁছে যাবে। তারপর বউয়ের খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবে। তেমনই উটেরও একটা হদিস হয়ে যাবে। সত্যিই তো, অচেনা মরুর মধ্যিখানে একা পড়ে-পড়ে হাঁকপাক করার চেয়ে পাঁচজনের সাহায্যে যা হোক একটা কিছু করা তো যাবে। সুতরাং সে হাঁটতেই থাকল।

উফ! কী ধকলটাই না যাচ্ছে। এখন ভালোয়-ভালোয় একটা নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে পারলে তবে নিশ্চিন্ত।

বেলা বাড়ছে। বেলা যত বাড়ছে, রোদও তত কামড় দিচ্ছে। কী কুক্ষণেই না মানুষটা ঘর থেকে বেরিয়েছিল! যাই হোক, এখনই ঘরে ফিরে যাওয়ার কোনো আশা নেই। যতক্ষণ না বউকে খুঁজে পাচ্ছে, ততক্ষণ ঘরের কথা ভাবা মিথ্যে। ঘর এখন তার শূন্য। বছর ঘুরে গেছে। তার মেয়েটা সেই যে হারাল, আজ পর্যন্ত তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না। এখন আবার আর-এক বিপদ। যতই ভাবছে, ততই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। মেয়েটার মতো তার মা-ও কি হারিয়ে যাবে চিরকালের মতো! তার ওপর আর-এক অনর্থ। বন্ধুর উটটা পর্যন্ত বেপাত্তা হয়ে গেল।

আরে! ওরা যেন থামল! হ্যাঁ, ওই তো ঘাড়ের মানুষটাকে ঘাড় থেকে নামিয়ে বালির ওপর শুইয়ে দিল। ওরা বোধ হয় একটু জিরিয়ে নেবে। বাবা, এই রোদে জিরনো যায়! রোদে মাথার চাঁদি ফেটে যাচ্ছে! দ্যাখো, দ্যাখো, ওদের থামতে দেখে এই পেছনের মানুষটি কেমন হকচকিয়ে গেছে। সে কী করবে? কোথায় লুকোবে? এখানে তো কোথাও লুকোবার জায়গা নেই।

এখানে কোনো বালির স্তূপ ছোট্ট পাহাড় হয়ে কোনও আড়াল সৃষ্টি করেনি যে, সে তার আড়ালে লুকিয়ে পড়বে।

আচ্ছা, লোকটা বারবার লুকোবার কথাই বা ভাবছে কেন? সে তো কোনো অন্যায় করেনি। সেতো ডাকাতও নয়, খুনিও নয়। তবে কেন ভয়? আর ওই যে মানুষগুলো কাঁধে করে লোকটাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, ওদেরও তো দেখে মনে হচ্ছে না, ওরা একদল ঠগ। সুতরাং মানুষটা আর লুকোবার কথা না-ভেবে সটান দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, ওদের কাছে তার বিপদের কথাটা বললে, ওদের মনে কি একটু দয়া হবে না! এই কথা ভাবতে-ভাবতে সে মনে সাহস আনল। সাহস এনে ওদের কাছে এগিয়ে গেল।

কতটুকুই বা দূর কতক্ষণই বা হাঁটতে হবে! ক-পা হেঁটেই তার চোখে কেমন ধাঁধা লেগে গেল। বুকটা ধড়াস করে উঠেছে। কেননা, ক-পা এগিয়ে আসতেই তার মনে হল, যে দেহটা এখন মাটিতে শোয়ানো, সেটা যেন চেনা-চেনা। আরও ক-পা এগিয়ে যেতেই সে স্পষ্ট চিনতে পেরেছে। এ যে তারই বউ। সে চিৎকার করে ডেকে উঠেছে, 'জয়ন্তী-ই-ই।'

যে লোকগুলো তার বউয়ের দেহটা নিয়ে যাচ্ছিল, তারা চিৎকার শুনে থতমত খেয়ে গেছে। যাওয়ারই কথা। কেননা, একজন অজানা মানুষ যে একেবারে তাদের ঘাড়ের ওপরে এসে পড়েছে, এটা তারা আদপে বুঝতেই পারেনি। মানুষটার চিৎকার শুনে লোকগুলো থতমত খেল বটে, কিন্তু জয়ন্তী নামে স্ত্রীলোকটি একটুও নড়ল না।

ওই দলের একজন বলে উঠল, 'কে হে তুমি?'

মানুষটি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, 'ওই স্ত্রীলোকটি আমার বউ।'

'নিজের অচৈতন্য বউকে মরুভূমির তপ্ত রোদে ফেলে রেখে তুমি কোন চুলোয় ছিলে এতক্ষণ?' আর-একজন বেশ রেগেমেগেই জিজ্ঞেস করল।

মানুষটি বলল, 'মরুর তপ্ত রোদে আমার বউকে ফেলে আমি কোথাও যাইনি। আমরা দু-জনে উটের পিঠে বসে পুষ্করে যাচ্ছিলুম। এমন সময় মরুর বুকে ঝড় উঠল। সেই বিপর্যয়ে আমরা ছিটকে পড়লুম। কে যে কোথায় পড়লুম জানি না। এমনকী, আমাদের উটটা পর্যন্ত কোথায় যে হারিয়ে গেল খুঁজে পেলুম না।' বলে খুবই অস্থির হয়ে মানুষটি জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমার বউকে?'

'কোতোয়ালিতে।' একজন উত্তর দিল।

'কেন?' জিজ্ঞেস করল মানুষটি।

'কোতায়ালি ছাড়া আর কোথায় নিয়ে যাব? স্ত্রীলোকটি যদি মারা যায়, তারা যা করার করবে। আর যদি বাঁচে, যার বউ তার খোঁজ করে তাকে ফিরিয়ে দেবে।' উত্তর এল তাদের একজনের কাছ থেকে।

মানুষটি বলল, 'এর জন্যে কোতোয়ালি যেতে হবে কেন? আমি তো বলছি, স্ত্রীলোক আমারই বউ।'

'প্রমাণ কী তোমার বউ? আবার একজন প্রশ্ন করল।

মানুষটি অত্যন্ত ব্যগ্র হয়ে বলল, 'আমার বউয়ের নাম জয়ন্তী।'

'তুমি যে মিথ্যে বলছ না, তারই বা প্রমাণ কী? স্ত্রীলোকটির জ্ঞান না ফিরলে, তার যে নাম জয়ন্তী সেটা সত্যি, না মিথ্যে জানা যাবে না। কাজেই তোমাকে আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না।' তাদেরই দলের ভেতর থেকে একজন বলে উঠল। সুতরাং বউ কার সেটা কোতোয়ালিতেই ঠিক হবে। তুমি ইচ্ছে করলে আমাদের সঙ্গে কোতোয়ালিতে যেতে পারো।'

আর-একজন আলটপকা বলে উঠল, 'অবিশ্যি পথে যেতে-যেতে বউটি যদি মারা যায়, তবে ল্যাঠা চুকে গেল।'

কথাটা শুনে মানুষটি কতখানি দুঃখ পেল বলা শক্ত, তবে মুখখানা তার এমনিতেই শুকিয়ে ছিল। এবার আরও মুষড়ে গেল। সেই অবস্থাতেই তাদের সঙ্গে মানুষটি কোতোয়ালিতেই চলল।

এই মরুর বালির রাজ্যে একা-একা ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেই উটটা। ঝড়ের ঝাপটায় তার সওয়ারি দু-জন কোথায় গেল সে ভাবনায় একটা উট নিশ্চয়ই অস্থির হয় না। তবু তার খিদে-তেষ্টা তো পায়। না-হয় ঘরের কথা মনে পড়ে। হয়তো মনে পড়ে, চেনা মুখগুলির কথা। অবিশ্যি, উটের মনের কথা উট ছাড়া আর জানবেই বা কে! কিন্তু সুনসান বালির রাজ্যে একলাটি ঘুরতে তার যে মোটেই ভাল লাগছিল না, সে তার চলন দেখলেই বোঝা যায়। হ্যাঁ, এই উটের পিঠে বসেই সেই মানুষটি আর তার বউ পুষ্করে যাচ্ছিল। মরুর মধ্যিখানে ঝড় উঠল। তাদের সব সাধ তছনছ হয়ে গেল। কে কোথায় যে হারিয়ে গেল। এমনকী, অনেক কষ্টে সেই মানুষটি তার বউকে খুঁজে পেলেও, তার সঙ্গে কোনো কথা বলার সুযোগ হল না। কেননা, বউয়ের জ্ঞান ছিল না। কে জানে এখনও তার জ্ঞান ফিরেছে কি না!

উটটা কি পথ হারিয়ে ফেলেছে? সে কি কোনোদিনই এই মরুর বালির রাজ্যে আসেনি? তা-ই বা কে জানে?

একটা চাপা কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে. অস্পষ্ট। অনেক দূর থেকে ভেসে এলে যেমন শুনতে লাগে, এ শব্দ তেমনই। কচিগলার কান্না। তবে কি একটু দূরে কোথাও মানুষের আস্তানা আছে? থাকতেই পারে। সেই আস্তানার ছোট্ট মানুষটি হয়তো কাঁদছে খিদের জ্বালায়। নয়তো দু-এক ঘা পড়েছে পিঠে, দুষ্টুমি করেছে বলে।

ওই কান্নার শব্দটা মনে হয় উটেরও কানে ভেসে এসেছে। উটটা হাঁটতে-হাঁটতে থমকে দাঁড়াল। বোধ হয় সে কান পেতে শোনবার চেষ্টা করল। খিদে পেলে মানুষের কাছেই যেতে হয়। তাই সে আবার ওই কান্না শুনতে-শুনতে অস্থির পায়ে এগিয়ে চলল।

কিছুটা গিয়েই সে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে। কই, কান্না তো আর শোনা যাচ্ছে না। তবে কি কাঁদতে-কাঁদতে কচি শিশুটা ঘুমিয়ে পড়ল। অবশ্য, এখনও তো রাত হয়নি। সবে সন্ধের আলো ঝাপসা হয়ে আসছে। এখনই ঘুমিয়ে পড়ার কথা নয়।

তবে কান্না থামল কেন?

থামবে না? একটা ছোট্ট শিশু কি আজন্মকাল ধরে কাঁদবে?

আশ্চর্য! নিশ্চয়ই তার মা তাকে আদর করে কোলে তুলে নিয়েছেন। নিশ্চয়ই তার চোখের জল মুছে দিয়ে তার কপালে চুমো খেয়েছেন। মায়ের আদর পেলে কার কান্না চোখ উপচে মাটিতে পড়ে শুনি?

হ্যাঁ, উটটা খানিক দাঁড়াল। আবার পা ফেলল। হাঁটা দিল ওইদিকেই, যেদিক থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। সন্ধে নামছে একটু-একটু করে।

উট হাঁটছে মরুর বুকের বালি টপকে।

তার খিদে পেয়েছে। তেষ্টা পেলে উট কাবু হয় না একটুও।

কিন্তু খিদে পেলে সামলায় কেমন করে? তাই সে হাঁটছে। হাঁটছে, যদি পৌঁছে যায় কোনো মানুষের আস্তানার কাছাকাছি। যদি কোনো মানুষ দয়া করে দুটো কাঁটাগাছের ডাল খেতে দেয়। কিংবা যদি সে পৌঁছে যায় কোনো মরূদ্যানে, তবে হয়তো সেখানেই পেয়ে যাবে দু-একটা গাছের সন্ধান। সুতরাং হাঁটো। ভোর আর সন্ধে এই দুটোর যেন সময়ের বড্ড টানাটানি। তর সয় না। যাওয়ার জন্যে যেন ঘোড়ার গলায় লাগাম দিয়েই রেখেছে। চোখের পলক পড়ার আগেই ফুস। যেমন করে আসে তেমন করেই চলে যায়। এই দ্যাখো না, এই তো একটু আগে দেখলুম আকাশে সন্ধে, এখন আকাশ ভর্তি তারা। রাত নেমেছে।

উটের তো আর ভূতের ভয় নেই। কাজেই সে নিশ্চিন্তেই হাঁটছে। অবশ্য মরুর দস্যুর পাল্লায় উটের কী দুর্দশা হয়, সে আর আমরা জানব কেমন করে?

তা, সে যাই হোক, উট হাঁটতে-হাঁটতে অনেকখানি আসার পর আলো দেখতে পেল। মনে হয়, তখন রাতও গড়িয়ে-গড়িয়ে গভীর হয়েছে। সুতরাং এই গভীর রাতে আলো দেখতে পেলেও যে উট-বাহাদুর খাবার দেখতে পাচ্ছে না, সে আর বলতে! সুতরাং খিদে পেটে নিয়ে থাকো সারারাত।

দেখতে-দেখতে উট আলোর কাছাকাছি পৌঁছে গেল। একখানা চার চৌকো ঘরের মধ্যে টিমটিম করে কুপি জ্বলছে। ঘরের জানলাটা খোলা। আলোর আভা বেরিয়ে আসছে জানলা দিয়ে। উটটা জানলায় মুখ ঠেকাল। ভেতরটা দেখার চেষ্টা করল। কোনো খাবার তার নজরে পড়ল কি না, সে ছাড়া সে-কথা আর কে বলবে! আর, নজরে পড়লেও ঘরের ভেতরে মুখ গলিয়ে সে-খাবারের নাগাল পাবে কী করে! হলেও বা উটের ইয়া লম্বা গলা!

কিন্তু খিদে কি আর ওসব কথা মানে! উট ঠিক তার গলাটি বাড়িয়ে দিল জানলার গরাদের ভেতর দিয়ে ঘরের ভেতরে। জানলার গরাদগুলো একুট বেশিই ফাঁক বলতে হয়। সেই ফাঁকের ভেতর দিয়ে উটের গলা ঢুকলেও যে চোরের দেহ ঢুকবে, এমন কথা বলা যাবে না। সুতরাং ঘরের ভেতর গলা সেঁদিয়ে উট খাবারের তালাশ করতে লাগল। তা গলা তো আর গরাদ টপকে ঘরের এ-কোণ থেকে ও-কোণে যেতে পারে না। তবু সে চেষ্টার কসুর করে না। তা করলেই বা কী, আর না-করলেই বা কী। গলা আটকেই থাকে। অগত্যা খাবার ছেড়ে সে ঘরের ভেতরটা দেখতে লাগল। দেখবে কী! আলো-আঁধারিতে স্পষ্ট সব দেখা যায় না। তবু তার হঠাৎ যেন মনে হল, একগোছা ঘাসের মতো কী পড়ে আছে সামনেই। মনে হতেই মুখ বাড়াল। আর পৌঁছেও গেল ঘাসের ওপর উটের ঠোঁট দুটো। কামড়ে ধরে টান দিতেই চিৎকার করে উঠল ঘরের ভেতরে ঘুমন্ত একজন মানুষ। এই দ্যাখো, ঘাস ভেবে উট তার দাড়ি ধরেই কামড় দিয়েছে। এমনকী, কচমচ করে দু-বার চিবিয়েও ফেলেছে।

চিৎকার করতেই উট তার দাড়ি ছেড়ে তাড়াতাড়ি মুখখানা জানলা থেকে বার করতে গিয়ে আর-এক কাণ্ড করে বসল। জানলার গরাদে মুখটা দেস আটকে। আর কিছুতেই বার করতে পারে না। সুতরাং দাড়ির যে মালিক সে কখনও ছাড়ে! ঘুমচোখে প্রথমটা ঠাওর করতে না-পেরে প্রচণ্ড ভয় পেলেও, এবার যখন বুঝতে পারল এটি একটি উটের কীর্তি, তার মুখে দিল একখানি জববর থাপ্পড়। তারপর উটের শুরু হয়ে গেল জানলার সঙ্গে ঝটাপটি। এ তো আশ্চর্য ব্যাপার, উটের মাথাটা গরাদে গলালো যখন, তখন তেমন ঝামেলা হয়নি। সুড়ুত করে ঢুকে গেল। এখন আবার আটকায় কেন?

দাড়ির মালিক যে একজন বেশ জাঁদরেল লোক, কুপির আলোতে এখন তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বোধ হয় লোকটার হাতের কাছেই ছিল একটা লম্বা দড়ি। আর সময় নষ্ট না-করে উটের গলায় দড়ি পরিয়ে জানলার সঙ্গে আচ্ছা করে বেঁধে রাখল। এবার উটের দফারফা।

দেখা যাচ্ছে, ঘরের মধ্যে একটি ছোট্ট মেয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। এত যে কাণ্ড হয়ে গেল, এত জোর চিৎকার, তার কিন্তু ঘুম ভাঙেনি। না, ঘুমোক সে! এই মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে, আর যদি তার ঘুম না আসে। অবশ্য, এখনও ঘুম ভাঙার ভয় যে একেবারেই নেই, তা বলা যাবে না। কেননা, গলায় বাঁধা দড়িটা ছেঁড়ার জন্যে উটটা কী দস্যিপনাই না করছে দ্যাখো! করুক! মেয়েটার ঘুম ভাঙলেও উট-বাছাধন তো আর পালাতে পারছে না। কে জানে, উটের ভাগ্যে কী আছে।

সেই রাতে আর ঘুমোয়নি জাঁদরেল লোকটা। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সে উটের পেছনের পা দুটোও এঁটেসেঁটে বেঁধে দিল। তার পালাবার আর উপায় থাকল না। থাকো অমনি করে! রাতের অন্ধকারে ঘরের ভেতরে যেমন মুখ ঢোকানো!

ভোর হতে-না-হতে ছোট্ট মেয়েটাও উঠে পড়েছে। জানলার সঙ্গে উট বাঁধার অমন একটা দৃশ্য দেখে তার অবাকই হওয়ার কথা। সে কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে চেয়ে আছে। সেই জাঁদরেল লোকটা হেসে উঠল। মেয়েটাকে আদর করল। তারপর বলল, 'তোকে আমি কুড়িয়ে পেয়েছি মরুর বালির রাজ্য থেকে। আর ওই উটটা আমায় ধরা দিয়েছ আমারই ঘরের জানলায়। তোকে যে কে ফেলে দিয়ে গেছে, গনগনে গরম বালির উপর হাত-পা বেঁধে, জানি না। জানি না, সে কে নৃশংস মানুষ। তোকে আমি কুড়িয়ে পেয়ে বহুত চেষ্টা করেও তোর বাপ-মার সন্ধান পাইনি। এখন আবার দ্যাখ, কোত্থেকে একটা উট এসে আমার হাতে ধরা দিয়েছে। ভাগ্য দেখেছিস আমার? ভালোই হল। উটটাকে আমি পোষ মানাব। উটটা হবে তোর খেলার সঙ্গী। চাই কী, উটটাকে আমি দৌড় শেখাব। তুই উটের পিঠে বসে থাকবি। দৌড়বাজিতে আমি নাম দেব। আমার উট জিতলে অনেক পয়সা পাব আমি। অবশ্য, তার আগেই যদি তোর মা-বাবা খবর পেয়ে মেয়ের সন্ধানে চলে আসে, তবে আমি তোকে নিশ্চয়ই তাদের হাতে তুলে দেব। বল তো, কে তোকে এমন করে ফেলে দিয়ে গেল? কেন ফেলে দিয়ে গেল? বল তো উটটা কি তোকে চেনে?'

সত্যি কথাই, এই জাঁদরেল লোকটা যেন ধন্দে পড়ে যায়! আসলে মানুষটা কৃষক। খেতির কাজ করে। এই মরুর সীমানায় তার এই ছোট্ট ঘরে সে এতদিন একলা থাকত। আজ তার ঘরে দু-দুটো প্রাণী কোত্থেকে যে এল।

এখন উটটাকে দেখলে অতি নিষ্ঠুর মানুষেরও দয়া হবে। সারারাত দুরন্ত শক্তিতে সে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করেছে। পারেনি। এখন একেবারেই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। না, আর বেঁধে রাখল না সেই জাঁদরেল লোকটা। জানলার সঙ্গে বাঁধা মুখখানা খুলে দিল। অবশ্য পা দুটো তার বাঁধাই রইল। পালাতে না পারে। বোঝাই গেল, তার ভীষণ খিদে পেয়েছে। সুতরাং একগোছা বাবলাগাছ কোত্থেকে নিয়ে এল সেই লোকটা। মেয়েটিকে বলল, 'দে, ওর মুখে তুলে দে।' মেয়েটি তুলে ধরে একটি-একটি ডাল। উটের মুখে এগিয়ে দেয়। উট ঘাড় নামিয়ে মুখে পুরে চিবোয়। কাঁটা ফুটে রক্ত ঝরে তার ঠোঁট দিয়ে। মেয়েটি দেখে! এমনটা যে হয়, এ তার জানাই আছে। সুতরাং উটের রক্ত দেখে ভয় পায় না মেয়েটি।

বোধ হয় এবার পেট ভরে গেছে উটের। অনেকক্ষণ ধরে খাবার পর এখন দেখে মনে হচ্ছে, আর ইচ্ছে নেই তার। পেট ভরলেও বাঁধা পা দুটো নিয়ে খুবই ফেরে পড়ে গেছে উটটা। না-পারে হাঁটতে, না-পারে বসতে। অগত্যা সে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই ছটফট করতে লাগল।

লোকটা উটটাকে অমন ছটফট করতে দেখে বললে, 'দাঁড়া, দাঁড়া! ঘরের ভেতর মুখ গলিয়ে আমার দাড়ি চিবোবার সময় তোমার মনে ছিল না। অন্যায় করলে শাস্তি তো ভোগ করতেই হবে। সময় হলেই খুলে দেব।'

ছোট্ট মেয়েটির সঙ্গে উটের যে ভাব হয়ে গেছে, সেটা স্পষ্ট বোঝা যায় এখন। তা নিজের হাতে উটের মুখে সে একটি-একটি করে আকন্দ আর বাবলাপাতা তুলে দিয়েছে। ছোট্ট মেয়েটা একটুও ভয় পায়নি। ভালোবাসলে কার না ভালো লাগে! সে মানুষই হোক, কী জন্তু। একটু আদর করলেই গলে জল। কাজেই লোকটার কথা শেষ হতেই মেয়েটি বলল, 'আমি উটের পিঠে চাপব।'

লোকটা জিজ্ঞেস করল, 'এখন?'

মেয়েটি বলল, 'হ্যাঁ, আমি একটু উটের পিঠে বসে বেড়াব।'

লোকটা বলল, 'অচেনা উট। ভয়ানক নচ্ছার। তোকে পিঠ থেকে ফেলে দেবে।'

'না, না, কিচ্ছু করবে না। তুমি পায়ের দড়ি খুলে উটের পিঠে আমায় বসিয়ে দাও না!' মেয়েটি আবদার করল।

লোকটা বলল, 'ঠিক আছে। আমি আগে ওর গলাটা বেঁধে ফেলি। ধরে না রাখলে পালাবে।' বলে সে দড়ি নিয়ে এসে ওর গলায় বেঁধে, পায়ে-বাঁধা দড়ি খুলে দিল। খুলে ছোট্ট মেয়েটিকে উটের পিঠে বসিয়ে গলার দড়ি ধরে টান দিল। উট হাঁটতে শুরু করল। সে-ও উটের গলার দড়ি ধরে এগিয়ে-এগিয়ে হেঁটে চলল।

একটুখানি হেঁটে সে জিজ্ঞেস করল, 'কী রে মেয়ে, উটের পিঠে কেমন লাগছে?'

'ভালো।'

'কষ্ট হচ্ছে না তো?'

'না।'

ভালো। সেদিনটা উটের পিঠে বসে, উটের সঙ্গে সারাদিন খেলে, গল্প করে কেটে গেল।

লোকটা ভাবল, যাক বাবা, মেয়েটা এতদিন একা-একা থাকত। না-পারত কারও সঙ্গে গল্প করতে, না-পারত খেলতে। যাক, তবু তার একটা সঙ্গী পাওয়া গেল।

তা, সে যা ভেবেছে ঠিক তা-ই। মেয়েটি সারাদিন উটের সঙ্গেই থাকে। তাকে খাওয়ায়। তার মাথায় জল ঢেলে দেয়। উট মাটিতে বসলে সে তার পিঠে বসে। পিঠে বসে মনে-মনে ভাবে, আহা রে, উটটার যদি পাখির মতো দুটো ডানা থাকত! ওই আকাশের ভেতরে কী আছে সেটা দেখার ভারি ইচ্ছে মেয়েটার। উটটা পাখির মতো উড়তে পারলে আকাশটা দেখা এমন কী-আর শক্ত ছিল! অবশ্য, আকাশের ভেতরটা দেখা না-হলেও, সেই জাঁদরেল লোকটা একদিন মেয়েটিকে উটের পিঠে বসিয়ে হাটে নিয়ে গেল।

আর একদিন মেলায় গেল।

আর একদিন শহরে গেল।

আর একদিন…

জাঁদরেল লোকটা উটটাকে বলল, 'চ, আজ তোকে দৌড় শেখাব।' বলে মেয়েকে উঠের পিঠে বসিয়ে বালির রাজ্যে নিয়ে এল। নিয়ে এসে, মেয়েকে বলল, 'শোন রে মেয়ে, উটের পিঠটা শক্ত করে ধরবি। তোকে উটের পিঠে বসিয়ে আমি উটকে দৌড় শেখাচ্ছি।' বলে, উটের গলায় বাঁধা দড়িটা ধরে সে নিজেই ছুটতে শুরু করে দিল বালির ওপর।

গলায় টান পড়তেই উটও ছোটে।

এমনই করে একবার, দু-বার, তিনবার, তারপর অগুনতি বার।

আকাশ থেকে রোদ ঝরছে। বাতাস তপ্ত। বালি তপ্ত। মানুষের সারা শরীর তপ্ত।

এ বার লোকটা নিজে ছুটল না। মেয়েটি অবশ্য বসে রইল উটের পিঠেই। সে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, 'কী রে মেয়ে, কষ্ট হচ্ছে?'

মেয়ে বলল, 'না।'

'এ বার একা-একা পারবি তো?'

মেয়ে বলল, 'হ্যাঁ।'

এ বার লোকটা পেছন থেকে উটকে তাড়া মারল, 'হ্যা রা-রা-রা!'

উট ছুটতে শুরু করে দিল।

উটের পিঠে ছোট্ট মেয়েটি বসে আছে তাকে জড়িয়ে। তার মুখে খুশির চিৎকার, 'হ্যাট-হ্যাট।'

একটু-একটু করে আরও একটু উট বেগ বাড়ায়। তারপর হঠাৎ সে দুরন্ত বেগে ছুটতে শুরু করে দেয়।

মেয়েটা ভয় পায় না একটুও। আনন্দে উদ্বেল হয়ে সে আরও জোরে চিৎকার করে ওঠে, 'হ্যাট, হ্যাট।'

উট এবার প্রচণ্ড জোরে পা চালায়। বালির ওপর সে কী তার দুরন্ত গতি।

লোকটা উটের এমন উদ্দাম দৌড় দেখে ভয় পায়। সে গলা ফাটিয়ে ধমক মারে, 'থাম, থাম!'

কিন্তু কে থামবে? সে তো আর কারও কথা শুনে থামবে না। সে তো এই মেয়েটিকে পিঠে বসিয়ে তার মনিবের কাছ নিয়ে যাবে। সে এখন ছুটবে।

সত্যি-সত্যিই সে থামল না। সত্যি-সত্যিই সে মরুর বালি ডিঙোবার জন্যে কোন পথে কোথায় চলে গেল, আর দেখা গেল না। সেই জাঁদরেল লোকটা হতভম্বের মতো খানিক দাঁড়িয়ে রইল। তারপর উটটাকে ধরার জন্যে নিজেই ছুটল। কিন্তু তার সাধ্যি কী তাকে ধরে!

অনেকক্ষণ ধরে লোকটা ছোটাছুটি করল। অনেকক্ষণ ধরে সে চিৎকার করে হাঁক পাড়ল। কিন্তু কারও কোনো সাড়াই তার কানে পৌঁছল না। রোদে পুড়ে ধস্ত একটা মানুষ ঘরে যখন ফিরল, তখন তার চোখ দুটো চিকচিক করছে। কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটাকে যে সে এমন করে হারাবে, এ-কথা সে যেন বিশ্বাস করতে পারে না। কিন্তু মেয়েটার কী হবে? উটের পিঠে চেপে সে কোনখানে যাবে? কার ঘরে? এমনই সব নানা কথা ভাবতে-ভাবতে দিন যেন তার কাটতেই চায় না। দুঃখের দিনগুলো এমন নির্দয় কেন! যেতে চায় না কিছুতেই!

অনেকক্ষণ ছুটেও উট দাঁড়াল না। অনেকক্ষণ ছুটেও উট মরুর বালি পেরিয়ে কেনো গাঁয়ে-গঞ্জে পৌঁছতে পারল না। এ বার ভয় পেল সেই ছোট্ট মেয়েটি। তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে উটটা। সে উটের পিঠে কিল-চড় মেরেও উটকে থামাতে পারল না। শেষমেশ সে কেঁদেই ফেলল।

মরুর কি শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেল উটটা?

হ্যাঁ, ওই তো দেখা যাচ্ছে একটি-দুটি কাঁচাঘর। ওই তো দেখা যাচ্ছে, একটি-দুটি মানুষের মুখ। এ বার উট কোথায় যাবে? কোনদিকে?

উটের দৌড় থামল।

মেয়েটি কাঁদছেই।

উট দ্রুতপায়ে হাঁটল।

মেয়েটি তবুও কাঁদছে।

এ বার একটি-দুটি লোক দেখতে পেল।

থমকে দাঁড়ায় কেউ-কেউ। অবাক চোখে তাকায় উটটার দিকে। তার পিঠের ওপর, মেয়েটির দিকে। সে কাঁদছে।

কেউ একজন চেঁচিয়ে উঠল, 'উটটা মেয়েটাকে নিয়ে পালাচ্ছে।'

একজনকে চেঁচাতে দেখে আরও দু-চারজন চেঁচিয়ে উঠল, 'ধর ধর!'

দু-চারজন চেঁচাল বলে আরও দু-পাঁচজন জুটে গেল। সবাই মিলে উটটাকে ধাওয়া করল।

উটটা দাঁড়িয়ে পড়ল। সে হাঁফাচ্ছে।

মেয়েটি কাঁদছে।

উটটা বসে পড়ল। মেয়েটি কাঁদতে-কাঁদতে উটের পিঠ থেকে নেমে পড়ল। তারপর লেগে গেল হুলুস্থুলু কাণ্ড!

কার মেয়ে? কার উট? কোথা যাচ্ছে? মেয়েটা কেন কাঁদছে? লোকের মুখে-মুখে নানা প্রশ্ন। সে এক হইহই ব্যাপার।

কে একজন মা মেয়েটাকে নিয়ে গেল।

কে একজন গাঁয়ের লোক উটটাকে নিয়ে গেল।

তারপর শুরু হল খোঁজ-তল্লাশি।

তা, এ-খবর কি আর চাপা থাকে? উটের পিঠে একটি মেয়েকে পাওয়া গেছে, এ খবর এর কান থেকে তার কান, তার কান থেকে পাঁচকান হতে আর বেশিদিন সময় লাগল না। কিন্তু আশ্চর্য, কেউ মেয়েরও খোঁজ করে না, উটেরও খোঁজ নেয় না। একদিন, দু-দিন করে সাতদিন কেটে গেল। অগত্যা লোকে ভাবল পরের মেয়ে, আর অন্যের উট বেশিদিন নিজেদের জিম্মায় না-রাখাই ভালো। কোতোয়ালিতে দিয়ে এসো! তারা যা করার করবে।

এই ব্যবস্থাই যখন পাকা হল, তখন মেয়েটি আরও কাঁদতে শুরু করে দিল। গাঁয়ের লোকেরা পড়ল ভারি ধন্দে। তাই তো, কী করা যায় তা হলে?

এমনই সময়ে হঠাৎ একদিন খোঁজ নিতে হাজির হল, একটি বউ আর তার স্বামী। তা, বললেই তো আর তোমার হাতে মেয়েকে তুলে দিচ্ছে না বাড়ির গিন্নি। বা মেয়েকে এনে তোমায় দেখাচ্ছে না। তুমি প্রমাণ দাও, যে সে তোমার মেয়ে!

'তা, কী প্রমাণ দিতে হবে?'

বাড়ির গিন্নি বলল, 'বলতে পারো মেয়ে কত বড়?'

বউ উত্তর দিল, 'তিন পেরিয়ে চারে পড়বে।'

'ফরসা, না কালো?'

'ফরসা।'

'মোটা, না, রোগা?'

বউ বলল, 'আজ্ঞে, মেয়েকে আমরা এক বছরের ওপর হারিয়েছি। এখন সে রোগা, না, মোটা এ আমরা কেমন করে বলি!'

'কেমন করে হারাল?'

'সে বলাও মুশকিল। কেননা, তখন আমি সংসারের কাজ করছি। মেয়ে তখন আপন মনে খেলা করছে। তারপরে যে কী হয়েছে, আমরা কেউ জানি না।' বউটি উত্তর দিল।

'খুঁজে যখন পেলে না তখন কী করলে?'

'সব বাবা-মা যা করে আমরাও তাই করলুম। হন্যে হয়ে সারা দুনিয়া চষে ফেললুম। মেয়েকে খুঁজে পেলুম না।'

'তুমি যদি এখন মেয়ের নাম ধরে ডাকো, সাড়া দিতে পারবে সে?' গিন্নিটি জিজ্ঞেস করল।

বউটি উত্তর দিল, 'কেমন করে বলব! তার কি-আর এখন আমাদের দেওয়া নাম মনে আছে? সে যেখানে ছিল তারা যে নামে ডাকত, হয়তো সেই নামটাই মনে আছে তার।'

গিন্নিটি বলল, 'দ্যাখো বাপু, তোমরা তার নাম ধরে ডাকলে সে যদি সাড়া দেয় তবে, সে যে তোমাদেরই মেয়ে সে নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। আর যদি সাড়া না দেয়, তবে বাপু তোমাদের পথ দেখতে হয়। আমরা মেয়েকে কোতোয়ালিতে দিয়ে আসব। তারা যা করার করবে।'

বউটি বলল, 'সে তোমরা যা ভালো বোঝো। কিন্তু একটা বাচ্চা মেয়ে এই এক বছরে সে যদি তার মায়ের ডাকা নামটা ভুলেই যায়, তবে কি তাকে একবার চোখের দেখাও দেখতে দেবে না?'

'তাতে কী লাভ?'

'যদি আমাদের চিনতে পারে?'

গিন্নি উত্তর দিল, 'মন যদি তার তোমাদের দেওয়া নামটাই ভুলে যায়, তবে তার চোখ কি-আর তোমাদের চিনতে পারবে?'

এমন সময়ে ঘরের ভেতরে হঠাৎই মেয়ে কেঁদে উঠল।

বাড়ির গিন্নি বললে, 'ওই দ্যাখো, আবার মেয়ে কেঁদে উঠেছে। যাই, দেখি আবার কী হল?'

তাকে যেতে হল না। মেয়ে কাঁদতে-কাঁদতে এ দিকেই এগিয়ে আসছে! বউটি আর তার স্বামী পলকে তাকাল সেই দিকে। বউটির মুখ দিয়ে যেন আপনা থেকে একটা আর্তস্বর বেরিয়ে এল, 'মালতী-ই-ই-ই।'

মেয়ে থমকে গেল। চমকে তাকাল সেই দিকে।

মেয়ের মা আকুল হয়ে হাত বাড়াল, 'আমি তোর মা।'

বাবার গায়ে কাঁটা দেয়।

মেয়ে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে একদৃষ্টে।

মা আবার আর্তনাদ করে ওঠে, 'ওরে মালতী, আমরা তোকে নিয়ে যেতে এসেছি।'

বাবার চোখের পাতা পড়ে না। অপলকে চেয়ে থাকে মেয়ের মুখের দিকে।

মেয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মতো।

মা আদরে উছলে উঠে জিজ্ঞেস করে, 'আমাদের চিনতে পারছিস না মালতী?'

ঠিক সেই মুহূর্তে যেন সমস্ত বাতাস জুড়ে একটা কান্নার শব্দ ভেসে উঠল, 'মা-আ-আ!' সে ছুটল। নিমেষে পৌঁছে গেল সে মায়ের কাছে। মাকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কেঁদে-কেঁদে মায়ের বুকের মধ্যে লুটিয়ে পড়ল।

পারল না বাবা নিজেকে সামলে রাখতে। তার চোখেও উছলে ওঠে ফোঁটা-ফোঁটা জল। সে-ও হাত বাড়ায়। মেয়ের মাথায় হাত রাখে।

তারপর?

তারপর সে এক সুখের দিন। বাবা, মায়ের আদরের ধন আবার ফিরে এল বাবা-মায়ের কাছে। তখন তাদের মনে হল, পৃথিবী কত সুন্দর। সুন্দর পৃথিবীর মেয়েও তাদের না-জানি কত সুন্দর।

গল্প শুনতে-শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নেহা মা খেয়াল করেননি। তিনি একবার শুধু বললেন, 'নেহা, আমার গল্প বলা শেষ হল।'

নেহা সাড়া দিল না।

মা অন্ধকারে তার চোখ দুটি দেখার চেষ্টা করলেন। দেখতেও পেলেন। সে চোখে ঘুম ছুঁয়েছে।

মা নেহার মুখের কাছে মুখ এনে অস্পষ্ট গলায় বললেন, 'ওরে নেহা, এ গল্প তোর। গল্পের মালতী, তুই-ই, আমার নেহা। তুই আমার কোলে যেদিন জন্মালি, সেদিন থেকেই ওরা আমার কাছ থেকে তোকে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল। তুই মেয়ে হয়ে জন্মেছিস, তাই তোকে মারতে চেয়েছিল ওরা তিলে-তিলে মরুর তপ্ত বালুতে ফেলে দিয়ে। ওরে নেহা, ওরা পারেনি। ওরা পারেনি মায়ের ভালোবাসাকে দাবিয়ে রাখতে। ভালোবাসার জয় হয়েছে নেহা। তোকে আমি ফিরে পেয়েছি। নেহা, নেহা, আমার নেহা।' বলতে-বলতে মা নেহার কপালে একটি চুমো দিলেন। তারপর নিজের মনেই বললেন, 'ঘুমোক, কাল ভোর-ভোর উঠতে হবে। কাল কোত্থেকে যে মেয়েটা জল আনবে কে জানে! জল চাই, জল, একটু জল। নইলে শুকিয়ে মরতে হবে। আমার শরীর আর বয় না। কেন এমন করে আমার শক্তি কেড়ে নিলে আকাশ? একটু বৃষ্টি যদি দিতে, আমার মেয়েটাকে কষ্ট করতে হত না। আমি নিজেই যেতে পারতুম। কিন্তু আর যে পারি না। আঃ!'

সেদিন খুব ভোরে উঠেছিল নেহা। মায়েরও ঘুম ভেঙে গেছল। ভোরের আকাশটা সুন্দর। কিন্তু এ-সুন্দরকে কে আর সুন্দর বলে এখন। মানুষ যখন যেমন দরকার তেমন সাজে। আকাশেরও তেমন আছে মরশুমি সাজ। কখনও কপালে তার গনগনে আগুনের জ্বলন্ত টিকা। কখনও কখনও পায়ে তার ঘন বর্ষার ঝরঝর পাঁয়জোর। কখনও গায়ে তার সাদা মেঘের ওড়না। কখনও সারা গায়ে নক্ষত্রের মুঠো-মুঠো চুমকি। নয়তো, গায়ে মোড়া কুয়াশার চাদর। কিংবা নানা রঙের মন-রাঙানো আবির। কিন্তু মাঝে-মাঝে কী হয় তার? কেন এমন আগুন জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয় সব কিছু?

নেহা বলল, 'মা আমি আজ সাজব! মাথায় আমি কলসি নেব। সবচেয়ে রঙিন ঘাঘরা পরব। তোমার গায়ের গয়না পরব। পায়ে আমার পায়েল বাজবে ঝনক-ঝনক।'

মা বললেন, 'বেশ, তাই হবে।'

আর সত্যিই নেহার পায়ে ভোরের হাওয়ার পায়েল বেজে উঠল ঝনক-ঝনক।

মা জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় যাবি জল আনতে? কোথায় পাবি জল?'

'মা, তুমি কিচ্ছু ভেবো না। আমার পা যেদিকে আমায় নিয়ে যাবে, আমি সেদিকে যাব।' বলে নেহা পা ফেলল।

মা বললেন, 'সাবধানে যাবি।'

নেহা উত্তর দিল, 'তুমি সাবধানে থেকো।'

মা বললেন, 'সঙ্গে ক-টা রুটি দিয়েছি। খাবি।'

নেহা বলল, 'আমার ভাগ থেকে ক-টা রুটি তোমার জন্যে রান্নাঘরে রেখে দিয়েছি, খেয়ো!' বলতে-বলতে নেহা মাথায় কলসি নিয়ে হেলে-দুলে এগিয়ে চলে ঝনক-ঝনক।

মা কেঁদে ফেললেন। মনে-মনে আকাশকে বললেন, 'তুমি আমার মেয়েকে দেখো আকাশ। ওই ওপর থেকে তুমি সব দেখতে পাচ্ছ। তুমি তো জানো কোথায় একটু জল মিলবে। তুমি আমার মেয়েকে সেই পথের হদিস দিয়ো। একটু জল না-হলে আমাদের আর বাঁচার উপায় থাকবে না। আমরা শুকিয়ে মরব। আমি তো আধমরা হয়েই আছি। আমার মেয়েটাও শেষ হয়ে যাবে। ওগো আকাশ, ওকে যে আমরা কেমন করে বাঁচিয়ে রেখেছি, সে-ও তো তোমার জানা আছে। ওকে বেঁচে থাকতে দাও আকাশ, ওকে বেঁচে থাকতে দাও!'

নেহার পায়ে পায়েল বাজে ঝনক-ঝনক। নেহা যাচ্ছে জলের খোঁজে। যাচ্ছে জল আনতে। কোথায় আছে জল জানে না নেহা। কোথায় যাবে জলের খোঁজে জানে না সে। তবু সে হাঁটছে।

দেখতে-দেখতে মায়ের চোখের আড়ালে চলে গেল নেহা।

দেখতে-দেখতে নিচুতলা মানুষের পাড়া ডিঙিয়ে উঁচুতলা মানুষের পাড়ায় পা ফেলল সে। অনেক, অ-নে-ক-টা পথ যখন সে পেরিয়ে এল তখন পথে-পথে লোক হাঁটছে। এ-বাড়ি ও-বাড়ির মেয়ের দল নেহার পায়ের ঝনক-ঝনক শব্দ শুনে উঁকি দেয়। হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করে, 'কোথাকার মেয়ে, কোথা যাস?'

নেহা বলে, 'আমি পুবপাড়ার মেয়ে। দক্ষিণ-পাড়ায় জল আনতে যাই।'

মেয়ের দল হেসে ওঠে। চেঁচিয়ে বলে, 'পাগল, পাগল! কুয়োতে জল নেই, তোবায় জল নেই। মাটিতে জল নেই, আকাশে জল নেই। তুই জল পাবি কোথায়?'

নেহা বলল, 'হাসছ, এখন হাসো! কালকে যখন জল থাকবে না কলসিতে, তখন হাসি মুখেই থাকবে আটকে। তার চেয়ে বরং এসো সবাই মিলে জলের খোঁজ করি। পেলে তুমিও পাবে, আমিও পাব, সবাই পাবে।'

তা, কে কার কথা শোনে! নেহা একলাই হাঁটে।

হাঁটতে-হাঁটতে একটা গাঁ, দুটো গাঁ, তিনটে গাঁ পেরিয়ে গেল। একটি কুয়োরও খোঁজ পেল না যাতে জল আছে। একটা তোবাও নজরে পড়ল না জল-ভর্তি। অগত্যা আরও হাঁটে। বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। তবুও হাঁটতে হবে।

হাঁটতে-হাঁটতে নজরে পড়ল একটা ঠাকুর-মন্দির। মন্দিরের সামনে দাঁড়াল। খানিক কী ভাবল। মা বলেছেন, নিচুতলার মানুষকে মন্দিরে ঢুকতে নেই। কিন্তু কেন ঢুকতে নেই? সে-কথা যতবার জিজ্ঞেস করেছে মাকে, মা কোনো উত্তরই দেননি।

দ্যাখো, যেন মনে হচ্ছে মন্দিরের ভেতরে কোনো জন-মানুষ নেই! এক পা এগিয়ে উঁকি মারল নেহা।

কাউকে দেখতে পেল না।

আরও এক পা এগিয়ে গেল।

তবুও কাউকে দেখতে পেল না।

তিন-পা এগিয়ে কাউকে দেখতে না-পেয়ে নেহা ভাবল, মন্দিরে যখন কেউ নেই যখন ঢুকে দেখাই যাক না কী হয়।

সে ঢুকেই পড়ল। ব্যাস, যা ভয় করেছি, হলও ঠিক তা-ই! কে একজন ফিনফিনে গলায় হাঁক দিল, 'কে রে?'

নেহার বুকটা ধক করে উঠেছে। সে যে ছুটে পালাবে, এমন ক্ষমতা এখন আর তার নেই। তাই পালাবার কথা না-ভেবে, সে বলল, 'আমি। আমার নাম নেহা। আপনি কে? আপনি কোথায়?'

হঠাৎ নেহা চোখ ফেরাতেই দেখে কে একজন তার দিকে এগিয়ে আসছেন। পা যেন পড়ছে না তাঁর। নিস্তেজ। দেখলেই মনে হয় গায়ে যেন একটুও জোর নেই। তিনি বললেন,

'এ মন্দির আমার।'

নেহা অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'আপনার বুঝি অসুখ করেছে?'

'না।'

'তবে?'

তিনি বললেন, 'তুই তো আচ্ছা বোকা মেয়ে। দেখতে পাচ্ছিস না, গাঁ খাঁ-খাঁ করছে? মানুষের ঘরে খাবারের অভাব। জল নেই, জল। আমি দু-দিন একফোঁটা জলও গলায় দিতে পারিনি। জল না-পেয়ে তেষ্টায় মরে যাচ্ছি।'

নেহা উত্তর দিল, 'আমি জানি, সব জানি। আমাদেরও একফোঁটা জল নেই। আমার মা-ও তেষ্টায় কষ্ট পাচ্ছে। আমাদের গ্রামে একজন ওস্তাদজি আছেন, খুব সুন্দর সারিন্দা বাজান। আমার খুব ভালো লাগে। তাঁরও জলের অভাবে এমন কষ্ট, সারিন্দা বাজাতেই পারছেন না। তাঁর এক দিদি আছেন। অনেক বয়েস। চোখে দেখেন না তেমন। কী কষ্টেই না দিন কাটাচ্ছেন। আমার একটা বন্ধু ময়ূর ছিল। আমি তার নাম রেখেছিলুম 'দিয়া'। সে পর্যন্ত তেষ্টায় ছটফট করতে-করতে কোথায় যে গেল, আর খুঁজেই পেলুম না। আমার বাবা মহারানা প্রতাপ সিংহের একজন সৈনিক। বাবার দু-একদিনের মধ্যে বাড়ি ফেরার কথা। বাড়িতে ফিরলে বাবাকে যদি একফোঁটা জল না দিতে পারি, কী লজ্জা! মা কষ্ট পাচ্ছে বলে, আমি তাই নিজেই জলের খোঁজে বেরিয়েছি। এত গ্রাম হাঁটতে-হাঁটতে চলে এলুম এখানে। কোথাও একটা জল-ভর্তি কুয়োও দেখতে পেলুম না। সব শুকিয়ে খটখট করছে। কিন্তু আমায় যেমন করে হোক, যেখান থেকে পারি জলের কলসি ভর্তি করে বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে।'

তিনি নেহার কথা শুনে অবাক চোখে খানিক চেয়ে রইলেন তার মুখের দিকে। তারপর বললেন, 'আমি ভুল করে তোকে বোকা বলেছি। কে বলে তুই বোকা। তুই যে বড্ড লক্ষ্মী মেয়ে। ওরে মেয়ে, চারদিকে জলের জন্যে হাহাকার পড়ে গেছে। সবাই যখন একটু জলের আশায় আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, তুই তখন খরার রাজ্যে জল খুঁজছিস রোদে পুড়তে-পুড়তে। তোর নিজের জল চাস না তুই। তুই জল চাস তোর মায়ের জন্যে। তোর ওস্তাদজির জন্যে। ওস্তাদজির দিদির জন্যে। আর তোর বাবার জন্যে। যে নিজের কষ্ট ভুলে, অন্যের কষ্টে নিজে কষ্ট পায়, সে যা চায়, তা-ই পায়। হয়তো তুই জলও পেয়ে যাবি। যদি পাস ওরে মেয়ে, তোর ফেরার পথে আমায় একটু দিয়ে যাস!'

নেহা বলল, 'নিশ্চয়ই দেব, পেলে আমি নিশ্চয়ই দেব। যার যত জলের দরকার তার জন্যে আমি কলসি ভরে জল এনে দেব। তারপর আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাব।' বলতে-বলতে বেরিয়ে এল মন্দিরের ভেতর থেকে। তারপর তার পায়ে আবার পায়েল বেজে উঠল, ঝনক-ঝনক। সে পথ চলতে শুরু করল।

সে পথ চলে । তার পায়ে ঝনক-ঝনক শব্দ ওঠে। মাথায় কলসি দোলে। কেউ দেখে। কেউ হাসে। কেউ ঠাট্টা করে। শুকনো মুখে চিঁ চিঁ করে একজন বউ বলে, 'মেয়ের আদিখ্যেতা দেখেছ! মাথায় কলসি নিয়ে নাচতে-নাচতে জল আনতে চলেছে। আমরা ইদিকে একফোঁটা জলের জন্যে মাথা খুঁড়ে মরে যাচ্ছি। 'আর উনি দিব্যি খোশমেজাজে হাঁটছেন।'

অন্য একজন বউ ফুট কাটল, 'এখনও ছোট্ট আছে তো, তাই পায়ে মল বাজিয়ে জলের খোঁজে উলুক-ঝুলুক করছে।'

আর একজন বলল, 'বলিহারি যাই মেয়ের মাকে। ওইটুকু মেয়েকে জলের খোঁজে একা ছেড়ে দিয়েছে।'

ওরই মধ্যে একজন কমবয়সী মেয়ে বলল, 'দ্যাখো, কারও নামে ঝুটমুট দোষ দিয়ে তো কোনো লাভ নেই। জলের অভাবে কার ঘরে যে কী বিপদ ঘটছে, আমরা তার কতটুকু জানি। আমরা নিজেরাই নাজেহাল হয়ে দিন গুনছি। খরার দিন না কাটলে শুকনো মুখে আমাদেরও যে কী হবে কেউ জানি না। কাজেই, বাঁচতে হলে আমাদেরও ওই ছোট্ট মেয়েটার মতো জলের খোঁজে বেরিয়ে পড়াই উচিত।'

একজন সায় দিল, 'ঠিক কথা।'

আর একজন বলল, 'ঠিক, ঠিক।'

অমনই সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, 'ঠিক বলেছ তুমি।'

ওরই মধ্যে কে একজন বলে উঠল, 'এসো, আমরা সবাই কলসি মাথায় নিয়ে মেয়েটার সঙ্গে যাই। মেয়েটা যদি জল পায় আমরাও পাব। চেষ্টা করাই কাজের কাজ। ঘরে বসে হা-হুতাশ করার কোনোই মানে হয় না।'

তার কথায় সায় দিয়ে যে যার ঘরে ছুটল। যে যার কলসি মাথায় নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কারও মাথায় একটা কলসি, কারও বা দুটো। কারও তিনটে, নয়তো চারটে। তারা সবাই নেহার পেছনে হাঁটা দিল। কোথায় যাবে কেউ জানে না। নেহাও জানে না। রকমারি রং তাদের পোশাকে। কত রকমের রুমঝুম তাদের পায়ের ঘুঙুরের শব্দে।

অনেকক্ষণ তারা হাঁটল।

ওই দ্যাখো সামনেই একটা কুয়ো!

সবাই ছুটল। একসঙ্গে পায়ের মল বেজে উঠল, ঝম-ঝম-ঝম। সবাই মিলে মাথার কলসি সামলে-সুমলে কুয়োর পাড়ে ঝুঁকে পড়ল।

ফক্কা! কোথায় জল?

আবার হাঁটো!

ওই দ্যাখো, ডানদিকে একটা জল রাখার তোবা!

সবাই ছুটল। তোবার সামনে থমকে দাঁড়াল।

হায়! হায়! কোথায় জল?

আবার হাঁটো!

ওই দ্যাখো বাঁদিকে একটা ইঁদারা!

সবাই ছুটল। ইঁদারার দিকে চমকে চাইল।

হা কপাল! জল কই?

হাঁটতে-হাঁটতে যখন অনেকটা পথ আরও পেরিয়ে গেল তখন কেউ কেউ বলল, 'তোমরা হাঁটো। আমরা ফিরি। মিথ্যে-মিথ্যে জল খোঁজা। সব কুয়োই শুকিয়ে গেছে।

তারা ফিরে গেল।

দল ভাঙতে শুরু করল।

আরও পথ পেরোল তারা। ছিটেফোঁটা জলও নজরে পড়ল না। আরও দল ভাঙল।

শেষে দল ভাঙতে-ভাঙতে সবাই যে যার ঘরে ফিরে গেল। একা হেঁটে চলল নেহা।

না, একা নয়। ওই দ্যাখো একটি ছোট্ট ছেলে।

ছেলেটি কোথায় ছিল? কখন দলে এল?

এতক্ষণ কারও খেয়াল হয়নি। নেহাও এতক্ষণে দেখতে পেল তাকে। জিজ্ঞেস করল, 'সবাই তো আমায় ছেড়ে চলে গেল, তুমি গেলে না।'

সে উত্তর দিল, 'কই, তুমিও তো ঘরে ফিরে যাওনি?'

নেহা বলল, 'আমি যাব বলে আসিনি। জল আমায় যেখান থেকে হোক যেমন করে হোক কলসি ভরে নিয়ে যেতে হবে।'

সে বলল, 'আমিও ফিরে যাব বলে তোমার পথের সঙ্গী হইনি। আমাকেও যেমন করে হোক, যেখান থেকে হোক আমার মাকে খুঁজে বার করতে হবে। তুমি যেখানে জলের খোঁজ করবে, আমি সেখানেই আমার মাকে খুঁজব। আমার মা তোমারই মতো জলের খোঁজে বেরিয়ে আর ঘরে ফেরেনি। হারিয়ে গেছে।'

চমকে ওঠে নেহা।

ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, 'অমন চমকে উঠলে কেন? ভয় পেলে?'

নেহার মুখে কথা আটকে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার নিজের মায়ের মুখখানা চোখের ওপর ভেসে উঠল।

সে আবার জিজ্ঞেস করল, 'কী ভাবছ?'

নেহার চমক ভাঙল। উত্তর দিল, 'ভাবছি, আমিও যদি জল খুঁজতে-খুঁজতে হারিয়ে যাই!'

সে বলল, 'হারাবে না। আমি তোমার সঙ্গে থাকব।'

নেহা ভয়-জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল, 'তুমিও যদি হারিয়ে যাও!'

ছেলেটি উত্তর দিল, 'মাকে যদি খুঁজে না-পাই আমাকে হারিয়েই যেতে হবে। এখন যেমন ক-ফোঁটা জলের জন্যে ছটফট করছি, তখন তেমনই ছটফট করতে-করতে মায়ের জন্যে কাঁদব।'

নেহা উত্তর দিল, 'কিন্তু আমি হারিয়ে গেলে মা যে আমার জন্যে কাঁদবে। মা যে আমার ক-দিনে ভীষণ কাহিল হয়ে পড়েছে। এমন চেহারা হয়েছে মায়ের, চেনাই যায় না। না, না মাকে আমার অমন কষ্টে ফেলে আমি হারাতে চাই না। আমি হারিয়ে গেলে মাকে কে দেখবে। মায়ের জন্যে আমায় জল নিয়ে যেতে হবে, একটু তেষ্টার জল।' বলতে-বলতে নেহার চোখ ছলছল করে উঠল।

ছেলেটি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, 'তোমার বাবা নেই?'

নেহা উত্তর দিল, 'বাবা মহারানা প্রতাপ সিং-এর সৈনিক। বাবা এখন যুদ্ধক্ষেত্রে। ফেরার কথা। তোমার বাবা?'

'নেই।' সে অস্ফুট স্বরে উত্তর দিল।

'নেই!' চমকে ওঠে নেহা।

তারপর দু-জনে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। অপলক চোখে এদিক-ওদিক দেখার চেষ্টা করে।

হঠাৎ ছেলেটি বলল, 'ওই দ্যাখো একটা ময়ূর।'

নেহা দেখল। দেখতে-দেখতে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার বাবার কী হয়েছিল?'

সে উত্তর দিল, 'বাবা ছিলেন তোমার বাবার মতোই।'

নেহা অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করে, 'সৈনিক?'

'হ্যাঁ।'

'কার সৈনিক?'

'আকবরের?'

'আকবর তো আমাদের দেশ জয় করার জন্যে লড়াই করছেন।'

ছেলেটির মুখে আর কোনো শব্দ নেই।

নেহাও নিশ্চুপ।

তারপর আরও খানিক হাঁটল তারা।

ছেলেটি বলল, 'আর পারছি না।'

'বসবে?' জিজ্ঞেস করল নেহা।

'একটু বসি, এসো।' ছেলেটি একটি গাছের নীচে বসে পড়ল।

নেহাও বসল। মাথার কলসিটা পাশেই রাখল।

ছেলেটি কলসিটা দেখে শুকনো মুখে মৃদু হাসল।

নেহার চোখ এড়াল না। জিজ্ঞেস করল, 'হাসলে কেন?'

ছেলেটি উত্তর দিল, 'তোমার কলসিটা দেখে।'

নেহা কলসিটা ছুঁয়ে দেখল একঝলক। তারপর বলল, 'একটু বেশি বড়ো। না?'

'তুমি কত আশা করে এসেছ, এক কলসি জল নিয়ে যাবে। অত ভারী বইতে পারবে?' সে জিজ্ঞেস করল।

নেহা উত্তর দিল, 'কেন পারব না?'

এবার ছেলেটি একটু কেমন যেন হতাশ স্বরে বলল, 'জল না-পেলে?'

নেহা থমকে চাইল তার মুখের দিকে। তারপর তার চোখের দিকে দৃষ্টি রেখে দৃঢ় গলায় বলল, 'দ্যাখো, কারও কাছে এখন আর আমাদের কিচ্ছু চাইবার নেই। কিন্তু দু-টি কাজ আমাদের যেমন করে হোক করতে হবে। তোমায় খুঁজে বার করতে হবে তোমার মাকে। আর আমায় খুঁজে বার করতে হবে একটু জল।'

'আর আমরা যদি দু-জনেই দুটি জিনিস খুঁজে বার করতে না পারি?' ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।

নেহা তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, 'না, অমন কথা মুখে এনো না। তোমার হারানো মা হারিয়ে গিয়ে নিশ্চয়ই সারাক্ষণ তোমার কথাই ভাবছেন। তোমার মুখখানি দেখার জন্যে নিশ্চয়ই তিনি পথ খুঁজে বেড়াচ্ছেন আকুল হয়ে। তেমনই আমার মা-ও নিশ্চয়ই আমার কথাই ভাবছেন সারাদিন ধরে। ভাবছেন, আমি নিশ্চয়ই জল নিয়ে যাব যেখান থেকে হোক। যেমন করে পারি। তাই আমাদের দু-জনেরই হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। মনকে শক্ত করতে হবে।'

আবার খানিক নীরব দু-জনেই।

হঠাৎই আবার কথা বলে উঠল নেহা, 'দেখেছ, তোমার নামটাই জানা হয়নি।'

'রাজন।'

'বাঃ!'

'তোমার?'

'নেহা।'

ছেলেটি আলতোভাবে হাসল।

নেহা অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, 'হাসলে কেন?'

উত্তর না দিয়ে ছেলেটি দলা পাকিয়ে শুয়ে পড়ল।

নেহা ব্যস্ত হল। জিজ্ঞেস করল, 'তোমার কি কষ্ট হচ্ছে?'

ছেলেটি হাসতে-হাসতেই বলল, 'আমি কাল থেকে নাগাড়ে মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।'

ঠিক এই মুহূর্তে হঠাৎ নেহার মনে পড়ে গেল মায়ের দেওয়া রুটির কথা। মা যে রুটি দিয়েছেন, একদম মনে ছিল না। রাজনেরও নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ কিছু খাওয়া হয়নি। তাই নেহা নিজেকেই নিজে যেন ধমক দিয়ে বলে উঠল, 'ইস, আচ্ছা মন তো আমার। আমার সঙ্গে যে খাবার আছে একদম খেয়াল নেই।'

ছেলেটি এত কষ্টেও ঠাট্টা করে বলে উঠল, 'খেয়াল থাকে! এতক্ষণ ধরে যা কাণ্ড হয়ে গেল! কত লোক! দল বেঁধে এসে হাজির। জলের জন্যে হন্যে হয়ে কী ছোটাছুটি। যেমন এসেছিল হুড়হুড় করে, তেমনই ফুসমন্তরে হুস হয়ে গেল চোখের পলকে।'

নেহা হাসল।

ছেলেটি বলল, 'তোমার হাসতে কষ্ট হচ্ছে মনে হয়।'

'তোমারও তো কষ্ট হচ্ছে। তাই শুয়ে পড়েছ। ওঠো, দু-জনে ভাগাভাগি করে রুটি ক-খানা খেয়ে ফেলি। কষ্ট কমবে।' বলে নেহা খালি কলসির ভেতর থেকে কাপড়ে বাঁধা ক-খানা রুটি বার করল।

ছেলেটি উপোসি চোখে নেহার হাতের দিকে তাকাল। উঠে বসল। তারপর হ্যাঁ, না কিছুই না বলে হাত পাতল। জিজ্ঞেস করল, 'তোমার ভাগ থেকে আমায় দিলে তোমারই তো পেট ভরবে না।'

নেহা এক লহমায় তাকে দেখে নিয়ে বলল, 'ভালো করে হাত পাতো।'

সে বলল, 'এই তো! ভালো করেই তো পেতেছি।'

নেহা গুনে-গুনে চারখানা রুটি তার হাতে দিয়ে বলল, 'শুকনো গুড় দিয়ে খেতে হবে।'

সে বলল, 'গুড়ও তো কতদিন খাইনি।' বলেই সে থামল। খানিক দূরেই তার চোখ কী যেন দেখতে পেল। থমকে দাঁড়ায় তার দৃষ্টি।

নেহা অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল, 'কী দেখছ?'

'দ্যাখো, একটু আগে যে ময়ূরটাকে দেখেছিলুম সেটা আবার এসেছে।'

'কই?' নেহা বিস্ময়ভরা চোখে তাকাল। দেখল। বলল, 'তাই তো!'

সে বলল, 'ময়ূরটা আমাদের দেখছে।'

নেহাও দেখল আর-একবার ময়ূরটার দিকে। তারপর বলল, 'দেখুক, তুমি খেয়ে নাও'

'ও বাবা! ময়ূরটা যে এদিকেই আসছে।' ছেলেটি টান হয়ে বসল।

'বোধ হয় রুটির ওপর চোখ পড়েছে।' নেহা উত্তর দিল।

'কী হবে?' ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।

'কী আবার হবে! তুমি পেছনে লুকিয়ে ফেলো রুটি ক-খানা।'

'তুমি?'

নেহা শান্ত গলায় উত্তর দিল, 'আসতেই দাও না। দেখি।'

কথা শেষ হল না। চোখের পলকে ময়ূরটা ওদের সামনে এসে হাজির। হ্যাংলা চোখে দেখতে লাগল নেহার হাতের রুটির দিকে, না হয় চোখের দিকে।

থতমত খেয়ে যায় নেহা! মনে হয় এ যেন তার দিয়া। না, ডাকল না নেহা। তার হাতের একখানা রুটি ছিঁড়ে-ছিঁড়ে ছুড়ে দিল। ময়ূরটা ঠুকরে-ঠুকরে গিলে ফেলল নিমেষে।

ছেলেটি বলে উঠল, 'কী করছ? একখানা গোটা রুটি তো শেষ হয়ে গেল!'

নেহা ছেলেটির কথার কোনো উত্তর দিল না। আরও একখানা রুটি সে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে ছুড়ে দিচ্ছে। ময়ূরটার খিদে পেয়েছে। খুব খিদে পেয়েছে!

ছেলেটি উঠে দাঁড়াল।

ময়ূরটা থমকে তাকায়।

ছেলেটি ময়ূরটাকে দু-বার হুস-হুস করে তাড়া দিল।

নেহা চিৎকার করে ওঠে, 'না রাজন, ওকে তাড়া দিয়ো না! ওকে খেতে দাও!'

ছেলেটি রুক্ষস্বরে বলে উঠল, 'না তাড়ালে ও তোমার সব রুটি খেয়ে ফেলবে।' বলেই ছেলেটি অত কষ্টেও ময়ূরটাকে তাড়া মারতে লাগল।

ময়ূরটা খানিক ছুটে পালায়, আবার আসে।

ছেলেটা খানিক তাড়া মারে, খানিক থামে।

আর নেহা ব্যস্ত হয়ে বলে, 'ওকে খেতে দাও!'

না, ছেলেটি শুনল না। একটা পাথর তুলে নিল। মারবার আগেই ময়ূর ছুট দিল।

নেহা চিৎকার করে ডাক দেয়, 'দিয়া দাঁড়া, দাঁড়া।'

ময়ূর তবু দাঁড়ায় না।

নেহা ছুটে ধরতে যায়। তুলে নেয় কলসি তার হাতে। ছেলেটি চিৎকার করে ওঠে, 'কোথা যাচ্ছ?'

নেহা উত্তর না-দিয়ে ডাক দেয়, 'দিয়া, দাঁড়া, দাঁড়া, আমার কাছে আয়।'

ময়ূর মাটির ওপর ছুটে-ছুটে পালায় ডানা ঝাপটে।

নেহা হাঁফিয়ে-হাঁফিয়ে ছোটে তাকে ধরবে বলে। তার পায়েল বাজে ঝনক-ঝনক।

রাজন ডাক দেয়, 'যেয়ো না, দাঁড়াও।'

কেউ দাঁড়াল না। দাঁড়াল না নেহা ডাকতে-ডাকতে। দাঁড়াল না ময়ূর নেহার ডাক শুনে। দাঁড়াল না রাজন ছুটতে-ছুটতে।

কিন্তু হঠাৎ নজরে পড়ল উঁচু-নিচু ঢিপি। এবড়ো-খেবড়ো জমি। সামনে-পেছনে ভাঙা-ভাঙা ইট-পাথরের স্তূপ। ময়ূরটা সেই উঁচু-নিচু ঢিপির আড়াল দিয়ে ছুটতে-ছুটতে আচমকা সেই ভাঙা-ভাঙা স্তূপের ইট-পাথরের কোন আড়ালে যে হারিয়ে গেল, আর নজর করা গেল না।

১০

দাঁড়াল নেহা। সে আর পারছে না।

দাঁড়িয়ে পড়ল রাজন। হাঁফাচ্ছে।

বেশ কিছুক্ষণ দম নেওয়ার পর নেহাই প্রথম কথা বলল, 'ওই স্তূপের আড়ালেই লুকিয়ে পড়েছে দিয়া।'

রাজনও নিজেকে সামলে নিতে বেশি সময় নিল না। ক্লান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, 'ওই ময়ূরটা কি তোমার পোষা?'

'আমার পোষা নয়।'

'তবে?'

'আমার বন্ধু।'

'তুমিই বুঝি নাম রেখেছ দিয়া?'

নেহা ঘাড় নাড়ল ওই স্তূপের দিকে চেয়ে।

রাজন জিজ্ঞেস করল, 'তোমার বন্ধুই যদি হয়, তোমার ডাক শুনে দাঁড়াল না তো।'

নেহা উত্তর দিল, 'পাথর তুলে ভয় দেখালে কোন পাখি দাঁড়ায়?'

রাজন বলল, 'চলো, দেখি কোথায় লুকোল ময়ূরটা।'

নেহা কাতর স্বরে বলল, 'হ্যাঁ, চলো। কিন্তু মনে হয় না, আর তার দেখা পাওয়া যাবে। আমি ভেবেছিলুম পাখিটা বুঝি আর নেই। হয়তো মরেই গেছে।'

বলতে কী দু-জনেই হাঁটতে পারছিল না। ওই স্তূপের কাছ-বরাবর যেতেই তাদের হাঁফ ধরে যায়। তবু অনেকটা এবড়ো-খেবড়ো পথ ডিঙিয়ে তারা স্তূপের কাছে পৌঁছে গেল। দূর থেকে এতক্ষণ মনে হচ্ছিল এ বুঝি ভাঙা কিছু ইট-পাথরের জঞ্জাল। কিন্তু কাছে আসতেই তারা অবাক হয়ে গেল। এ যেন মাটির নীচে পাথরগাঁথা ঘরবাড়ি। ভেঙে-দুমড়ে পড়ে আছে। ধুলোবালিতে পা ডুবে যায়। উঁচু-নিচু ঢিপিগুলো পাথরের চাঁই। টপকানো যার-তার কর্ম নয়।

নেহা থমকে দাঁড়িয়ে উত্তেজনায় পথের হদিস করতে লাগল।

রাজন জিজ্ঞেস করল, 'কী ভাবছ?'

নেহা অবাক স্বরে উত্তর দিল, 'ভাবছি ময়ূরটা এদিকে এসে গেল কোথায়?'

রাজন এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে বলল, 'এখানে তো লুকোবার অনেক জায়গা। নীচের দিকে চেয়ে দ্যাখো কত ঘর। ভাঙা।'

নেহা দেখতে-দেখতে বলল, 'চারদিকে শুধু জঞ্জাল।'

রাজন উত্তর দিল, 'কোনো একসময়ে হয়তো কোনও রাজার বাড়ি ছিল। তারপর রাজাও গেছে। রাজবাড়িও ভেঙেছে।'

'চলো, দেখবে?' নেহা জিজ্ঞেস করল। এই 'ভাঙা স্তূপ দেখে কী করবে?' রাজন উত্তর দিল।

'ভাঙা স্তূপের আড়ালে কোথাও নিশ্চয়ই দিয়া লুকিয়ে আছে। খুঁজে নিশ্চয়ই বার করতে পারব।' নেহার মুখখানা বিশ্বাসে ঝলমল করে উঠল।

রাজন জিজ্ঞেস করল, 'এইসব স্তূপ ডিঙোতে পারবে?'

'কেন পারব না?'

'কষ্ট হবে না?'

'তোমার বুঝি কষ্ট হচ্ছে?' নেহা রাজনের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল।

রাজন উত্তর দিল, 'তোমার যদি কষ্ট না-হয়, তবে আমারও কষ্ট হবে না।'

'না, আমার একটুও কষ্ট হবে না,' উত্তর দিল নেহা। 'আর যদি কষ্ট হয়ও, জিরিয়ে নেব।'

রাজন রাজি হল। বলল, 'তবে চলো।'

চলো বললেই তো আর চলা যায় না। ভাঙা ইট-পাথরের ওপর পা পড়তেই বোঝা যায়, বলা যতটা সহজ, কাজে ততটা সহজ নয়। যেখানেই পা পড়ে, সেখানেই ঝুরঝুর করে ধস নামে। বালির ধস। পা-সুদ্ধু সড়সড় করে সেঁধিয়ে যায় বালির মধ্যে। না হয় পিছলে পড়ে পাথরের ওপরে। তবু রাজনের অনেক সুবিধে। হাতে ক-খানা রুটি ছাড়া দুটো হাতই ফাঁকা। নেহার উপায় নেই। হাতে, না হয় মাথায় কলসি। আশ্চর্য, জলের খোঁজ করতে এসে শেষমেশ দিয়ার খোঁজ শুরু করে দিল। বটেই তো, খেলার সঙ্গীকে দেখতে পেলে কোন বন্ধু আর স্থির থাকতে পারে।

'নেহা।' রাজন একটা মস্ত পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে ডাক দিল।

নেহা পাথরের কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করল, 'কী বলছ?'

'এসো, রুটি ক-খানা দু-জনে ভাগ করে খাই।'

'তুমি খাওনি এখনও?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল নেহা।

'সময়ই পেলুম না। তোমার ভাগটা তো ময়ূরকেই দিয়ে দিলে।'

'খানিকটা দিয়েছি, আর-খানিকটা বোধ হয় যেখানে বসেছিলুম সেখানেই পড়ে আছে।' উত্তর দিল নেহা।

রাজন উত্তর দিল, 'সে গেছে। এসো আমার গুলো এখনও আছে। দু-জনে ভাগাভাগি করে খেয়ে নিই।'

নেহা পাথরের উপরে উঠতে-উঠতে বলল, 'শেষকালে তোমার খাবারে ভাগ বসাতে হবে।'

রাজন ভুরু কুঁচকে মজা করে বলল, 'সে আবার কী! আমার খাবারে তুমি ভাগ বসাবে কেন? আমিই বরং তোমার খাবার হাতিয়ে নিয়েছি।'

নেহা হাসল। ভারি অন্তরঙ্গ হাসি। হাসতে-হাসতে বলল, 'তুমি ঠিক বললে না। হাতাবে কেন, আমিই তোমায় নিজের থেকে দিয়েছি।'

রাজন বলল, 'আমি হাত না পাতলে তুমি দিতে কেমন করে?'

'তা অবশ্য ঠিক কথা।' উত্তর দিল নেহা।

রাজন এবার একখানা রুটি নেহার দিকে বাড়িয়ে বলল, 'এবার তুমি হাত বাড়াও। আমি দিই।'

নেহা হাসতে-হাসতে হাত বাড়াল।

ওদের খাওয়ার ধরন দেখে বোঝাই যাচ্ছিল, খুব খিদে পেয়েছে। দু-জনেরই। দু-জনে প্রায় গপগপ করে খাচ্ছে। শুকনো রুটি তাই সই।

ভাগাভাগি করেই খেল দু-জনে। অবশ্য পেট ভরল কি না সে ওরাই জানে। তবে নেহার যে খুব তেষ্টা পেয়েছে, সে ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

ঠিক এই মুহূর্তেই রাজন আপন মনে বলে বসল, 'তেষ্টা বেড়ে গেল।'

নেহা উত্তর দিল, 'আমারও।'

'জল খুঁজতে বেরিয়ে তুমি ধবংসস্তূপ খুঁজে পেয়েছ। সেই ধবংসস্তূপে তুমি এবার ময়ূর খুঁজবে।'

রাজনের কথা শুনে নেহা হতাশ স্বরে বলল, 'মনে হয় না ময়ূরটাকে আর খুঁজে পাব।'

'তবে এবার কী করবে?'

'তা-ই ভাবছি।'

'ফিরে যাবে?'

'তুমি?'

'আমি কোথায় ফিরব? আমার মাকে খুঁজে বার করতে না-পারলে আমি কার কাছে ফিরে যাব?' বলতে বলতে রাজনের চোখ টসটস করতে লাগল।

হঠাৎ রাজনই আবার চিৎকার করে উঠল, 'নেহা, সেই ময়ূর!'

'কই?' বলেই চকিতে তাকাল নেহা। দেখল ময়ূরটা ধবংসস্তূপের ওপর বসে ওদের দিকে মিটিমিটি চেয়ে আছে। নেহা আদর করে ডাক দিল, 'দিয়া, আয়, আয়!'

ময়ূর এল না। তাকিয়েই রইল।

নেহা বলল, 'রাজন, তোমাকে ও ভয় পাচ্ছে। তুমি এখানে দাঁড়াও! আমি দেখি।'

'কোথা যাবে?' ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করল রাজন।

নেহা বলল, 'যাব না কোথাও। ওকে ধরে আনব।'

'ও কি ধরা দেবে?'

'ও আমার বন্ধু।' বলে নেহা পাথরের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ল।

'সাবধানে পা ফেলো!'

'তুমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।'

'আছি।'

'আমার কলসিটা রইল।'

'থাক।'

নেহা ডাক দিল আবার, 'দিয়া—আ-আ, আয়-য়-য়!' ডাক দিতে-দিতে নেহা ময়ূরের দিকে এগিয়ে গেল।

ময়ূরও পিছুতে শুরু করল।

রাজন চেঁচাল, 'বেশিদূর যেয়ো না।'

নেহা আবার ডাক দিল, 'আয়, দিয়া আয়, আয়!' ময়ূর তবু পিছোয়। নেহা জঞ্জাল ডিঙোয়। ময়ূর তবুও দাঁড়ায় না। নেহা জঞ্জাল ডিঙিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায়! ময়ূর ডানা ঝাপটিয়ে আরও দ্রুতগতিতে পালিয়ে যায়।

রাজন চিৎকার করে উঠল, 'তুমি হারিয়ে যাচ্ছ নেহা।'

নেহাও চেঁচিয়ে উঠল, 'তুমি কলসিটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো! আমি এখনই আসছি।'

বলতে-না-বলতেই রাজনও চেঁচাল, 'না, আমিও যাচ্ছি।' বলেই সে কলসিটা নিয়ে পাথরের ওপর থেকে লাফ দিয়ে নেহার কাছে ছুটল। হাঁক দিল, 'আর যেয়ো না নেহা।'

নেহা তবুও ময়ূরকে চোখের আড়াল করে না।

নেহাকে দেখে-দেখে রাজনও জঞ্জাল ডিঙোয়। ডিঙোতে ডিঙোতে সে যখন প্রায় নেহাকে ধরে ফেলেছে, ঠিক তক্ষুনি ময়ূরটা ডানায় ভর দিয়ে কোথায় যে লুকিয়ে পড়ল আর দেখা গেল না।

নেহা নিরাশ হয়ে বলল, 'তোমাকে দেখে ময়ূরটা আবার পালাল।'

রাজন বলল, 'পালাক। তুমিই-বা কোথায় যাচ্ছ একা-একা? হারিয়ে যাচ্ছ যে। চলো ফিরে যাই।'

নেহা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল খানিক সেই ভগ্নস্তূপের দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'রাজন, পাখিটা আমায় ধরা দিল না কেন?'

রাজন বলল, 'হয়তো ওই ময়ূরটা তোমার দিয়া নয়।'

'কিন্তু আমার যে মনে হল।'

'চিনতে ভুল করেছে।'

'তা হলে এবার আমরা কী করব?'

'এবার আমরা ফিরে যাব?'

'কেমন করে ফিরে যাব? আমরা যে কিছুই পেলুম না। তুমি তোমার মাকে খুঁজে পেলে না। আমি জল পেলুম না খুঁজে। দেখা পেলুম একটা ময়ূরের। চিনতে পারলুম না সে দিয়া, না অন্য কেউ?' নেহার গলায় নিরাশা।

হঠাৎ রাজন বলে উঠল, 'দ্যাখো নেহা, চোখের সামনে ভাঙা-ভাঙা চারটে গম্বুজ।'

দেখতে-দেখতে নেহা বলে উঠল, 'ওই দ্যাখো, বাঁদিকে পর-পর সাজানো ধসে পড়া এগুলো বোধ হয় ঘর।'

'কত বড়ো উঠোন দেখেছ!'

আচমকা আরও খানিক দূরে চোখ পড়ে গেল নেহার, 'ওটা কী?'

'কোনটা?'

'ওই যে দূরে,' আঙুল দেখাল নেহা।

ভারি উৎসাহে ওইদিকে তাকাল রাজন। তারপর তারস্বরে চিৎকার করে উঠল, 'মনে হচ্ছে কুয়ো!'

উদ্দীপনায় অস্থির হয়ে নেহা চেঁচাল, 'সত্যি? চলো, চলো দেখি! হয়তো ওখানে জল আছে রাজন।'

রাজনও উত্তেজনায় গলা ফাটাল, 'আমারও তাই মনে হচ্ছে। চলো যাই।'

দু-জনেই তড়বড় করে জঞ্জাল ডিঙোতে লাগল হাঁফিয়ে-হাঁফিয়ে। দু-জনের মুখেই কথা নেই। চোখ তাদের থেকে-থেকেই কুয়োর দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে। পা তাদের ইট-পাথরের স্তূপে থেকে-থেকেই আঘাত পাচ্ছে। কিন্তু তাদের দাঁড়িয়ে থাকার আর সময় নেই। এখনই ওই কুয়োর কিনারায় তাদের পৌঁছতে হবে। জল, জল, এখন তাদের জল চাই!

কিন্তু ওই কুয়োটাও যদি শুকনো খটখটে হয়!

কথাটা মনে হতেই ধক করে ওঠে নেহার বুক। না, এ-কথাটা সে রাজনকে বলল না। তার বিশ্বাস, তার ময়ূর-বন্ধু দিয়াই নিশ্চয়ই তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। কুয়োতে নিশ্চয়ই জল আছে। জল না-থাকলে কেন দিয়া এখানেই বা আসবে!

হঠাৎ রাজন চেঁচিয়ে উঠল, 'নেহা, মুশকিল হয়ে গেল।'

'কীসের মুশকিল?'

'সামনেই খাদ।'

তাই তো, কুয়োর কাছে এ-পথ দিয়ে তো যাওয়া যাবে না। এই এবড়ো-খেবড়ো চত্বরটার গায়েই একটা গভীর গর্ত। পার হওয়া সত্যিই মুশকিল। যাঃ, সুযোগটা বুঝি হাতছাড়া হয়ে গেল!

নেহাও চেঁচিয়ে বলল, 'আমার মনে হয়, ডানদিকের ওই ভাঙা গম্বুজটার পাশ দিয়ে আমরা রাস্তা পেতে পারি।'

'তাই চলো।' বলে রাজন ভাঙা গম্বুজটার সামনের অনেক পাথর টপকে এগিয়ে চলল। নেহাও চলল পেছনে পেছনে। রাজন কখনও উঠছে, কখনও নামছে। কখনও হেঁট হচ্ছে, কখনও মাথা তুলছে। নেহারও সেই অবস্থা। কখনও সে রাজনকে দেখছে, এই তার চোখের সামনে, আবার এই দেখছে অদৃশ্য। রাজনও তাই। এই দেখছে নেহাকে তার পেছনে, আবার এই দেখছে ফাঁকা চারদিক। শুধু ধুলো-বালি। ইট-পাথর। বড়ো-বড়ো চাঙড়।

তা, এত ওঠা-নামা করা যায়? একেই শরীরের এই অবস্থা। ভাগ্যিস, তখন ক-টা রুটি দু-জনে ভাগ করে খেয়েছে। কিন্তু খেলে কী হবে? এখন তেষ্টায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখনই একটু জল না-হলেই নয়। কিন্তু…

এ কী! রাজন কোথা গেল? এই তো সে নেহার চোখের সামনেই ছিল। কোন পাথরের আড়ালে সে ধুলো ভাঙছে?

না, তাকে তো আর দেখতে পাচ্ছে না নেহা। আর তো ক-টা পাথর ডিঙোলেই কুয়োর রাস্তাটা ধরা যায়। তা, রাজন গেল কোথায়?

'রাজন।' ডাক দিল নেহা।

উত্তর পেল না।

আবার ডাকল, 'রাজন-ন-ন।'

সেই ভাঙা গম্বুজের আড়াল থেকে প্রতিধবনি উঠল, রাজন-ন-ন। জন-ন-ন। কেউ সাড়া দিল না।

এবার নেহা আর্তনাদ করে উঠল, 'রাজন-ন-ন-ন।'

উত্তর এল, 'নেহা-হা-হা, আমি-ই-ই এখানে-এ-এ।'

'কই তুমি-ই-ই?'

'পাথরে পিছলে আমি এখানে পড়ে গেছি-ই-ই।'

'তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না, কেন-ও-ও?'

'আমি দেখতে পাচ্ছি তোমাকে-এ-এ। আমার একেবারে সামনেই কুয়োর পথ। তুমি একটু বাঁদিক ঘেঁষে এসো। নইলে তুমিও পড়ে যাবে।'

নেহার হাতে কলসি। অনেক সাবধানে পা ফেলছে সে। তাড়াতাড়ি পা ফেলার চেষ্টা না করলেও, পা আপনা থেকে টাল খাচ্ছে। এক হাতে কলসি সামলে, আর-এক হাত দিয়ে নিজেকে সামলাচ্ছে। কখনও সে ইট বার-করা দেয়াল খামচে ধরছে, কখনও এক হাতে হামাগুড়ি দিচ্ছে। কলসিটা যদি ভাঙে তবে কুয়োতে জল থাকাও যা, না-থাকাও তা। কেমন করে বাড়িতে নিয়ে যাবে? কিংবা যারা জল চাইবে তাদের দেবে?

হ্যাঁ, নেহা নামতে পেরেছে। কাছেই ছিল রাজন। তার লেগেছে। ছুটে আসা তার আর হল না। আস্তে হেঁটে সামনে এসে দাঁড়াল।

নেহা হাঁফাচ্ছে। হাঁফাতে-হাঁফাতে জিজ্ঞেস করল, 'রাজন, তোমার কোথায় লেগেছে?'

'না, তেমন কিছু নয়। পায়ে একটু লেগেছে।' উত্তর দিল রাজন। তারপর বলল, 'ওই দ্যাখো কুয়োটা।'

'জল আছে? দেখেছ?' জিজ্ঞেস করল নেহা।

'না, আমি এতক্ষণ তোমায় দেখছিলুম। নামতে গিয়ে তুমি যদি পড়ে যেতে!' উত্তর দিল রাজন।

নেহা বলল, 'কলসিটাকে যে বাঁচাতে পেরেছি, এই যথেষ্ট। মাটির কলসি। টুক করে লাগলেই ফুট হয়ে যেত।'

রাজন বলল, 'চলো এবার দেখি।'

নেহার পায়ের পায়েলের শব্দ ছাড়া চারদিক নিস্তব্ধ। নির্জন। নেহার বুক কাঁপছে। কাঁপুনির শব্দটা পর্যন্ত যেন ওর কানে ধকধক করে উঠছে। এখান থেকে ওই কুয়োর দূরত্ব কতটুকুই বা। এটুকু পথ যেতেই পা যেন চলতে চায় না। মনে হচ্ছে যেন কত দূর। হওয়ারই কথা। কেননা, কী দেখবে কুয়োর ভেতর, দু-জনের কেউ-ই জানে না। তারই উত্তেজনায় দু-জনেই অস্থির।

না, শেষমেশ পৌঁছে গেছে নেহা রাজনের আগেই। কুয়োর গর্তের দিকে চেয়েই চিৎকার করে উঠল, 'জল-ল-ল-ল! রাজন-ন-ন, কুয়োয় ভর্তি জল।' সে লাফিয়ে উঠল। পায়েল বেজে উঠল ঝনক-ঝনক।

'কই দেখি?' রাজনও ঝুঁকি দিল। সে-ও আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, 'জল-ল-ল।' বলেই সে কুয়োর মধ্যে দুটো হাতই বাড়িয়ে দিল। সে ছুঁয়ে ফেলল জল। তারপর আনন্দে দু-হাত ছুড়ে দিয়ে চারদিকে জল ছুড়ে ছুড়ে উল্লাস জুড়ে দিল। সেই জল তার নিজের গায়ে পড়ল। সেই জল ছিটকে পড়ল নেহার গায়ে। দুটো আধমরা ছোট্ট মানুষ মুহূর্তের মধ্যে বাতাসের মতো দুরন্ত হয়ে সেই নির্জন ধবংসস্তূপের ওপর পায়ের ছন্দে ধুলো ওড়াতে লাগল। তারা আঁজলা ভরে জল নিয়ে মুখে দেয়। গায়ে দেয়। সমস্ত শরীর যেন জুড়িয়ে যায় তাদের।

কেঁদে ফেলে নেহা। তার চোখের জল উপচে পড়ে গাল বেয়ে।

রাজন অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে, 'কাঁদছ কেন নেহা?'

নেহা বলে, 'জানি না।'

রাজন হাত বাড়ায় বলে, 'দাও তোমার কলসিটা! আমি ডুবিয়ে জল তুলি।'

নেহা বলল, 'না, তুমি একা পারবে না। এসো, আমরা দু-জনেই ধরি।'

দু-জনেই ধরল। জল একেবারে নাগালের মধ্যে। জলের কলসি মাটিতে রেখে দু-জনেই আঁজলা ভরে জল খেতে লাগল কুয়োর থেকে তুলে-তুলে। আঃ! কতদিন তারা এমন তৃপ্তি করে জল খায়নি। কতদিন চোখে-মুখে এমন করে জল দেয়নি।

নেহা মাথায় তুলে নিল জলের কলসি।

হঠাৎ কোত্থেকে আবার দেখা দিল ময়ূরটা? ওই দ্যাখো সামনেই দাঁড়িয়ে! রাজন বলল, 'মাথায় জলের কলসি নিয়ে আর তো ধবংসস্তূপের পাথর টপকানো যাবে না। এবার অন্য পথ খুঁজতে হবে।'

নেহা বলল, 'চলো সামনে যাই। আমার মনে হয় ময়ূর যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ওইদিকেই কোনো পথ আছে।'

রাজন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কই তোমার ময়ূর?'

'ওই তো সামনে।'

রাজন সামনের দিকে চাইল। বলল, 'তাই তো, কোথায়?'

'যেখানেই থাক, এই কুয়োর সন্ধান দিয়েছে ওই ময়ূর। ও নিশ্চয়ই আমার দিয়া।' বলেই নেহা মাথায় কলসি নিয়ে পায়ে ঝনক-ঝনক মল বাজিয়ে এগিয়ে চলল। তাই তো, আবার কোথায় লুকিয়ে পড়ল ময়ূরটা!

রাজন নেহার সঙ্গে হাঁটল না। সেইখানে দাঁড়িয়ে থাকল।

নেহা রাজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, 'দাঁড়ালে কেন?'

রাজন উত্তর দিল, 'তোমাকে আবার আসতে হবে বলে আমি দাঁড়ালুম। যদি তুমি পথ ভুলে যাও। এক কলসি জলে ক-জনের আর তেষ্টা মিটবে?'

নেহা সায় দিল। বলল, 'ঠিক আছে। তুমি এইখানে দাঁড়িয়ে থেকো। আমি এখনই আসছি।'

১১

হাঁটতে-হাঁটতে নেহা অনেকটা পথ আসতেই একজন বউ চেঁচিয়ে উঠল, 'ও মেয়ে তুই জল পেলি কোথা?'

নেহা উত্তর দিল, 'পেয়েছি, পেয়েছি।'

'আমায় একটু দিবি? ঘরে একফোঁটা জল নেই।'

'দেব। আগে ঠাকুর-মন্দিরের পূজারিকে দিয়ে আসি।' বলতে বলতে নেহা ঠাকুর-মন্দিরের দিকে চলল।

ঠাকুর-মন্দির তো আর বেশি দূরে নয়। তাই ঠাকুর-মন্দিরে পৌঁছতে তার সময় লাগল না বেশিক্ষণ। মন্দিরে পৌঁছে সে ডাক দিল, 'ঠাকুরমশাই, ঠাকুরমশাই, আপনার জন্যে জল এনেছি।'

ঠাকুরমশায় নির্জীব শরীর নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। নেহাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'জল পেলি কোথা?'

নেহা উত্তর দিল, 'পেয়েছি, পেয়েছি। তুমিই তো বলেছিলে, 'যে নিজের কষ্ট ভুলে অন্যের কষ্টে নিজে কষ্ট পায়, সে যা চায় তা-ই পায়'। নাও, নাও, ধরো, ধরো, তোমার জন্যে জল এনেছি।'

মন্দিরের পূজারি খুশিতে উছলে উঠে নেহাকে জড়িয়ে ধরলেন। কত আদর করলেন। সে কী তাঁর আনন্দ!

জল দিয়ে নেহা বলল, 'আমাকে আরও অনেককে জল দিতে হবে। আমি এখন যাই।'

পূজারি-ঠাকুরের চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি নেহার চিবুক ছুঁয়ে বললেন, 'বেঁচে থাক মা, বেঁচে থাক। সুখে থাক।'

নেহা আবার জল আনতে ছুটল। জল ভর্তি কলসি এনে একে দিল, তাকে দিল। শ্যামকে দিল। রামকে দিল। দিতে-দিতে কলসি ফুরোয়। আবার আনে। আবার দেয়।

সবাইকে যখন দেওয়া হয়ে গেল, সে তখন ভাবল, এবার মায়ের জন্যে জল নিয়ে ঘরে ফিরব। তাই সে শেষবারের মতো সেই ধবংসস্তূপের আড়ালে লুকোনো কুয়োর থেকে জল আনতে গেল।

এ কী রাজন কোথা গেল? এতক্ষণ নেহাকে পথ দেখাবার জন্যে সে তো এখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। নেহা সতর্ক চোখে এদিক-ওদিক তাকাল। দেখতে পেল না। সে নরম স্বরে ডাকল, 'রাজন।'

সাড়া পেল না।

আর-একটু জোরে সে ডাক দিল, 'রাজন-ন-ন।'

তবু সাড়া পেল না।

এবার সে চিৎকার করে ডাকল, 'রাজন-ন-ন!'

কোনো সাড়া নেই।

নেহা এদিকে ছুটল, ওদিকে ছুটল। কোনোদিকেই রাজন নেই। তবে কি রাজন নেহার দেরি হচ্ছে দেখে তাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। হবে হয়তো। কেননা, শেষবার নেহার ফিরতে একটু দেরিই হয়েছিল।

সুতরাং নেহা আর দেরি করল না। বেলা পড়ছে। ঘরে ফিরতে-ফিরতে সূর্য ঢলে পড়বে। নেহা এবার নিজেই, একা-একা কলসি ডোবাল জলে। একা-একাই জল-উপচানো কলসি মাথায় নিয়ে হাঁটা দিল। হাঁটতে-হাঁটতে সজাগ চোখে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। তার চোখ খুঁজতে লাগল রাজনকে। সত্যিই তো, কোথায় গেল ছেলেটা।

নেহার মাথায় কলসি। কলসির ভেতর কানায়-কানায় জল দুলছে ছলাত-ছলাত। নেহার পায়ে বাজছে পায়েল ঝনক-ঝনক। কী আনন্দ তার। কলসি ভর্তি জল। মনে মনে সে হিসেব করে, কাকে কাকে জল দেবে। মা-র জন্যে অনেকটা। বাবা এলে অনেকটা। সারিন্দা-বাজিয়ে ওস্তাদজির জন্যে অনেকটা। বুড়িমার জন্যে অনেকটা, আর নিজের জন্যে খানিকটা। রাজনটা যে কোথায় গেল? রাজন কি তার ওপর রাগ করল? কেন, রাগই বা করতে যাবে কেন? জলের কুয়ো খুঁজে না-পেয়ে সবাই যখন নেহাকে ছেড়ে চলে গেল, তখন রাজন একা নেহার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাল। দু'জনে একসঙ্গে খুঁজে বার করল জলের কুয়োটা। দু-জনে একসঙ্গে তুলল কলসি ভরে জল। তারপর? তারপর সে গেল কোথায়? সে কি তবে তার মাকে খুঁজে পেয়েছে? না কি অন্য কিছু হল তার?

তা, আর কতক্ষণ তাকে খুঁজবে নেহা? বেলা পড়ছে। নেহাকে তো বাড়ি ফিরতেই হবে। বাড়িতে মা একা। নিজে পারেন না বলেই মা মেয়েকে একা ছেড়ে দিয়েছেন জল আনতে। উপায় নেই। ক-দিনে মায়ের শরীরটা একদম ভেঙে গেছে। বাবা না এলে যে কী হবে! অবশ্য বাবা এলেই বা কী! বাবার ভয়ে তো আর আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝমঝমিয়ে নেমে পড়ছে না। তবে হ্যাঁ, বলতে পারো নেহা ধবংসস্তূপের আড়ালে যে কুয়োটার সন্ধান পেয়েছে, বাবাকে সঙ্গে করে সেখানে নিয়ে গিয়ে অনেক জল আনতে পারবে। আর বাবা যদি এর মধ্যে না আসেন, নেহাই যাবে জল আনতে একা। সত্যি, রাজনটা কোথায় চলে গেল? না, নেহা তো এমন কিছু করেনি যে, তার রাগ হবে? তবে কি রাজন ভেবেছিল নেহাও তার সঙ্গে তার মাকে খুঁজে বেড়াবে? তা-ই বা কেমন করে হয়? রাজন তো এ-কথাটা একবারও তাকে বলেনি। ভাবতে-ভাবতে নেহার কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে যায়! আর সত্যি কথা কী, বললেই বা নেহা রাজনের মাকে কোথায় খুঁজবে? তিনি কোথায় জলের খোঁজে গেছেন কে জানে।

ওই দ্যাখো, আর ক-টা পাড়া গেলেই সেই ঠাকুর-মন্দিরটা পড়বে। এই পথ দিয়েই সে প্রথমে এসেছিল, সবশেষে এই পথ দিয়েই সে ফিরে যাচ্ছে। ধারে-ধারে যত বাড়ি, সবাইকে জল দিয়েছে নেহা। একটু যে কষ্ট হয়নি নেহার, তা বলতে পারো না। কষ্ট তো হবেই। তবে আনন্দও হয়েছে খুব। কত লোককে জল দিল। কত লোকের মুখে হাসি ফুটল। এইবার সে ঘরে ফিরে মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে।

নেহার পায়ে পায়েল বাজে ঝনক-ঝনক। হাঁটতে-হাঁটতে সে পার হয়ে যায় একটা-একটা পাড়া। এখন যে-পাড়ায় এল, এই পাড়ারই মধ্যিখানে ঠাকুর-মন্দির। একটু আগে এই পাড়ারই ঘরে-ঘরে সে হাসি দেখেছে। কিন্তু এখন কেউ নেই। কী আশ্চর্য সে ফিরে যাচ্ছে, অথচ কেউ তাকে দেখা দিচ্ছে না। সবাই যেন ঘরের মধ্যে কপাট দিয়ে লুকিয়ে আছে!

নেহা এ-বাড়িতে কপাটে ঠেলা মারে। খোলে না।

ও-বাড়িতে কড়া নাড়ে। বন্ধ দরজা, নড়ে না।

হাঁক দেয়, 'ও মাসি, আমি ঘরে যাচ্ছি।'

কেউ সাড়া দেয় না।

অবাক হয়ে নেহা ভাবে, তাই তো, আর কেউ সাড়া দেয় না কেন? যখন সে জল দিল তখন দু-হাত বাড়িয়ে সবাই জল নিল। আর এখন ডাকলে সাড়া দেয় না। দরজা খোলে না। কী স্বার্থপর মানুষ বলো।

যখন কারও সাড়া পেল না, তখন সে মন্দিরের সামনে এসে ডাক দিল, 'পূজারি-ঠাকুর, ঘুমোচ্ছ, না জেগে আছো! তোমাদের জল দিয়ে, আমি এবার ঘরে যাচ্ছি জল নিয়ে।'

বলতে-না-বলতেই পূজারি-ঠাকুর নেহার মুখের ওপর দড়াম করে মন্দিরের মস্ত দরজাটা বন্ধ করে দিল। নেহা অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল। ওমা, যে লোকটা তখন জল পেয়ে নেহাকে জড়িয়ে ধরে অত আদর করল, সেই লোকটাই এখন নেহার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়! এ কেমন পূজারি? কেমন মানুষ?

কী যে হল, কেন হল, এসব কথা তো আর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভাবলে চলবে না নেহার। সূর্য পাটে যাচ্ছে। সন্ধে নামছে। মা ভাবছেন। ঘরে পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে। সুতরাং আর দেরি করা যায় না। ঘরের রাস্তায় মুখ ফেরাল নেহা।

ঠাঁই-ই-ই। আচমকা একটা পাথর উড়ে এসে লাগল নেহার মাটির কলসিতে। কলসি ফটাস করে ফেটে গেল। এক কলসি জল নেহাকে চান করিয়ে হুড়মুড় করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। যাঃ কী হবে!

ভাঙা কলসির টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল নেহা। মায়ের জন্যে জল নিয়ে যাচ্ছিল নেহা। এবার সে কী করবে? তার কলসিটাই তো ভেঙে পড়েছে! মাটির কলসি মাটিতেই মিশে গেছে। কেমন করে সে বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে মুখ দেখাবে? চোখ ছলছলিয়ে উঠল নেহার।

হা-হা-হা। কে যেন হেসে উঠল।

চমকে তাকাল নেহা। কাউকে দেখতে পেল না। মন্দিরের দরজার আড়াল থেকে পূজারি-ঠাকুর কর্কশ গলায় খেঁকিয়ে উঠল, 'তুই নিচুতলা মানুষের মেয়ে। তুই কী বলে মন্দিরে ঢুকিস! আমাকে জল দিস! তোর সাহস তো কম নয়।'

নেহা মুখ বুজে বন্ধ দরজার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সন্ধের আঁধার নেমে আসছে।

হা-হা-হা। আবার কেউ হেসে উঠল।

চমক ভাঙল নেহার। সে দেখতে পেল সেই লোকটাকে। কাল যে লোকটা বুড়িমার চিৎকার শুনে ছুটে এসেছিল। নেহার বুকটা ধড়ফড় করে উঠল।

সে নেহার ক-হাত দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। সে রুক্ষ গলায় ধমকে উঠল, 'আমাকে চিনতে পারছিস? তুই নিচুতলার মানুষের মেয়ে হয়ে কাল উঁচুতলার মানুষের পাড়ায় গেছলি। আমার ভয়ে ছুটে পালিয়ে গেলি। আমি তোকে চিনে রেখেছি। তুই আজ আবার এ-পাড়ায় এসে ঘরে-ঘরে জল দিয়েছিস। সব অশুদ্ধ করে দিয়েছিস। তোর আর ছাড়ান-ছোড়ন নেই। তোকে আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। তোর কলসি পাথর ছুঁড়ে আমিই ভেঙে দিয়েছি। এবার তোর মাথাটা ভাঙব।'

আক্রোশে নেহার সমস্ত শরীর ঠকঠক করে কেঁপে উঠল। সে কান্না গিলে রুখে দাঁড়াল, 'কেন তুমি আমার কলসি ভেঙেছ? আমি মায়ের জন্যে জল নিয়ে যাচ্ছিলুম।'

'কেন তুই উঁচুমানুষের পাড়ায় ঢুকে মন্দিরের দরজা ডিঙিয়েছিস? কেন তুই জল ছুঁয়েছিস?' লোকটা ঝাঁঝিয়ে উঠল।

নেহা তেমনই গলা উঁচিয়ে বলল, 'মানুষগুলো জলের জন্যে মরতে বসেছিল। পূজারি-ঠাকুর একটু জলের জন্যে বেদম হয়ে ধুঁকছিলেন। আমি এত যে কষ্ট করে একটা কুয়ো খুঁজে বার করলুম, সবার ঘরে-ঘরে জল পৌঁছে দিলুম, তখন তুমি কোথায় ছিলে? তখন তো সবাই আমার কাছ থেকে জল নেওয়ার জন্যে হামলে পড়েছিল। সবাই দু-হাত তুলে আমার কাছে ছুটে এল! কেউ তো বলল না, 'তুই নিচুতলার মানুষ। তোর ছোঁয়া জল আমরা নেব না।' এখন আমাকে একা পেয়ে হেনস্থা করতে তোমার লজ্জা করছে না?'

লোকটা ধমকে উঠল, 'তোর গায়ে কি লেখা আছে, তুই নিচুতলার মানুষ যে তোকে চিনবে?'

'তোমার গায়ে কি লেখা আছে, তুমি উঁচুতলার মানুষ যে আমার কলসি ভাঙবে?' রুখে উঠল নেহা।

'খুব চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছিস দেখি!' লোকটা রেগে গরগর করতে লাগল।

'তুমিই বা আমাকে চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখাচ্ছ কেন?' মুখের ওপর তেড়ে উঠল নেহা।

'রোখ দেখাচ্ছিস?'

'তুমি চোখ রাঙালে আমিও রোখ দেখাতে পারি।'

হা-হা-হা, লোকটা হেসে উঠল। কী হিংস্র হাসি। আরও অনেক লোক এধার-ওধার থেকে হা-হা-হা করে উঠল। সন্ধের আলো-ছায়ায় কী ভয়ঙ্কর লাগছে তাদের চোখের চাউনি।

নেহা ভয় পেল না। কেননা, নেহা জানে ওরা সবাই নেহার হাত থেকে জল নিয়েছে।

একটা ইট ঠিকরে পড়ল নেহার পায়ের কাছে। নেহা চমকে উঠল। লোকগুলো একসঙ্গে হেসে উঠল, হা-হা-হা!

নেহা দেখল মন্দিরের দরজা খুলে পূজারি-ঠাকুরও হাসছে।

নেহা ছুটে গেল মন্দিরের দরজার কাছে। আকুল হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'পূজারি-ঠাকুর আমাকে মেরো না তোমরা।'

একদঙ্গল লোক পথ আটকাল নেহার। এবার ভয় পেল নেহা। সবার মুখগুলো অস্পষ্ট আলোয় দেখবার চেষ্টা করল সে। না, কারও মুখে দয়ার চিহ্ন নেই। যেন তারা এক-একটা কসাই।

নেহা আর দাঁড়াল না সেখানে। সে পা ফেলল সামনে।

হা-হা-হা! সে যেন শয়তানের হাসি! একসঙ্গে হেসে উঠল। একাট ইট এসে পড়ল নেহার কপালে। আঃ! লেগেছে নেহার।

আচমকা বিদ্যুৎ ঝলকে উঠল যেন আকাশে। বিদ্যুতের ক্ষণিক আভায় যেন দেখা গেল নেহার কপালে রক্ত। আবার একটা ইট পড়ল, ওর গালে। উঃ! এবারও লেগেছে নেহার।

আকাশে দ্যাখো মেঘ সাজছে!

এবার একটার পর একটা ইট পড়ছে নেহার গায়ে, হাতে, মাথায়, পায়ে। আঃ! উফ!

হঠাৎ আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে শব্দ উঠল, কড়-কড়-কড়াত! মাটিতে কি বাজ পড়ল? চমকে তাকায় নেহা আকাশে। সেই হিংস্র মানুষগুলো ভয়ে চিৎকার করে উঠল, 'বাজ পড়ছে, বাজ পড়ছে!' তাদের হাতে যত ইট ছিল সব নেহার দিকে ছুড়ে দিয়ে যে যেদিকে পারল ছুট মারল। পালা! পালা! বাজ পড়ছে!

আবার আকাশে বিদ্যুৎ ঝিলিক দেয়! একবার নয়, দু-বার নয়, বারবার। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে নেহা। চারদিক অন্ধকার। তার শরীরের এখানে ওখানে কোথায় ইট আঘাত করেছে এখন আর খেয়াল করার সময় নেই নেহার। ওই ছোট্ট মেয়েটা এখন দ্রুত পা চালিয়ে চলছে অন্ধকারে মাঠের ওপর দিয়ে। আকাশে মেঘ। বিদ্যুতের ঝলক। মেঘের গর্জন। এই উঠল ঝড়। বুঝি বৃষ্টি নামবে? শিহরন লাগে নেহার। আনন্দে বুক কেঁপে ওঠে।

আনন্দে ছুটতে চায় নেহা। পারে না। ঝড়ের ধুলোয় মাখামাখি হয়ে সে পথ খোঁজে। মনে-মনে বলে, 'মেঘ তুমি এখনও ঝরে পড়ছ না কেন? কেন সমস্ত পৃথিবীটাকে ভাসিয়ে দিচ্ছ না? কতদিন, ক-ত-দি-ন পর আজ আকাশে তুমি দেখা দিয়েছ, তোমার গর্জন কানে শুনছি! বাতাস ঝড় হয়ে লুটোপুটি খাচ্ছে!

এমন সময় সত্যি-সত্যিই একফোঁটা জল পড়ল আকাশ থেকে নেহার কপালে। অন্ধকারে একাই উল্লাস করে উঠল নেহা।

আবার পড়ল বৃষ্টি একফোঁটা দু-ফোঁটা, তারপর অঝোর ধারায়। নেমে আসছে স্বপ্নের বৃষ্টিরা আকাশ থেকে মাটিতে, নেহার সারা অঙ্গে।

মস্ত বড়ো মাঠ। ছোট্ট একটা মেয়ে একা হাঁটছে বৃষ্টিতে ভিজে-ভিজে। হাঁটতে-হাঁটতে দু-হাত বাড়িয়ে দেয় আকাশে, বৃষ্টির ফোঁটাগুলিকে জড়িয়ে ধরতে চায়। সে আর কিছুতেই ফিরে যেতে দেবে না বৃষ্টিদের। এখন আর বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছে না আকাশে। মেঘের নেই গর্জন। নেই বজ্রপাত। এখন শুধু বৃষ্টিই পড়বে গান গেয়ে, ঝর-ঝর-ঝর-ঝর। নেহার কপালের রক্ত মুছে দিয়েছে ওই স্বপ্নের বৃষ্টি। এখন সে ভিজে-নেয়ে ঘরে চলেছে মায়ের কাছে। আনন্দ যেন ফুলের মতো নেহার মনে গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এখন কত রাত হবে কে জানে! কে তার খোঁজ রাখছে!

আঃ! বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই। হয়তো সারারাত ঝরবে। হয়তো শুকনো খটখটে কুয়োগুলো আবার জলে টই-টই করবে।

কিন্তু এখন মা কী করছেন নেহার? মেয়েকে খুঁজতে তিনিও যদি বেরিয়ে পড়েন বৃষ্টির জলে?

নেহা আরও জোরে হাঁটতে লাগল।

বৃষ্টির ফোঁটারাও আরও জোরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

নেহা চিৎকার করে উঠল, 'আয়, আয়, আকাশ ভেঙে আরও জোরে আয়!'

আরও কতদূরে যেতে হবে নেহাকে? আরও কতদূরে তাদের সেই ছোট্ট বাড়িটা? আর দূর কই?

ওই তো সেই বজরার খেত, সারা খেতে একহাঁটু জল জমে গেছে! ওই তো নেহাদের বাড়ির রাস্তাটা। এখানেও থই-থই জল।

ওই দ্যাখো, নেহাদের ঘরের দরজা। সেজবাতি জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা! মানুষটা, হয়তো সারাদিন আনচান করেছেন।

ছুটতে-ছুটতে নেহা ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে।

মা চিৎকার করে উঠলেন, 'নেহা।'

নেহা ছুটে ঘরের মধ্যে ঢুকে কেঁদে ফেলল। সারা গা দিয়ে টসটস করে জল ঝরছে নেহার। ভিজে শপশপ করছে। মেয়ের ভেজা বৃষ্টির জলে মা-র ভিজে যায় পোশাক। মেয়ের চোখে কান্না দেখে মা-র ভিজে যায় চোখ। ফিরে পাওয়া মেয়েকে বুকে নিয়ে বৃষ্টির শব্দ শোনেন মা। হয়তো তাঁরও ইচ্ছে করছিল, মেয়ের মতো তিনিও বৃষ্টিতে ভিজে ছুটে যান যেখানে খুশি সেখানে। এ যেন তাঁর নতুন করে বেঁচে ওঠা। সত্যিই তো, মানুষটা মরতেই তো বসেছিলেন। মানুষ কি-আর মিথ্যে-মিথ্যে বলে, জলের আর-এক নাম জীবন। বৃষ্টি যদি না-হত আজ, কী হত নেহাদের? কত কষ্ট আর বিপদ তুচ্ছ করে, একটা কুয়োর সন্ধান পেল নেহা। সবাইকে কলসি-কলসি জল দিয়ে, নিজে যখন কলসি ভরে আনছিল মায়ের জন্যে, তখনই ওরা ভেঙে দিল কলসিটা। তাকে ইট ছুড়ে মারল। কপাল কেটে রক্ত পড়ল। কেউ তাকে দয়া করল না। উলটে সবাই মিলে ইট ছুড়ে তাকে আঘাত করতে লাগল! ছিঃ! এখন মাকে ফিরে পেয়েছে নেহা। এখন আকাশকে ফিরে পেয়েছে নেহা। মেঘের আকাশ। আর সে কাউকে ভয় পায় না। আজ সে সারাক্ষণ মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে কাঁদবে! আর মা তাকে আদর করবেন।

হঠাৎ একটি স্নেহের হাত নেহার মাথা ছুঁয়ে চিবুকে নেমে এল। চমকে ওঠে নেহা। মুখ তুলে ফিরে তাকায়। এ কী! তার সামনে বাবা! বাবা ফিরে এসেছেন! বৃষ্টির দুরন্ত ফোঁটাগুলোর মতো সে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবার বুকে। চিৎকার করে ওঠে, 'বাবা-আ-আ।' সমস্ত খুশি যেন বাতাসের মতো বাঁধন ভেঙে মনের ভেতর উথাল-পাথাল শুরু করে দেয় নেহার।

নেহার রেশমি-নরম চুলে হাত রেখে বাবা আদর করতে-করতে বলেন, 'আমি কখন থেকে তোর পথের দিকে চেয়ে বসে আছি। এখনই হয়তো আমাকে ভিজে-ভিজে তোকে খুঁজতে হত।'

মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে, ঝর-ঝর, ঝম-ঝম।

অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নেহা বাবার মুখের দিকে।

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, 'কী দেখছিস?'

নেহা লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।

সারারাত বৃষ্টি পড়েছে। সারারাত মেয়েটা ঘুমিয়েছে বাবার পাশে, অকাতরে। ঘুমোবেই তো। আজ দিনভর কি কম ধকল সহ্য করতে হয়েছে মেয়েটাকে!

পরের দিন খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেছল নেহার। তখনও বাবা ঘুমোচ্ছেন। ঘুমোতে দাও! জানলার গরাদে মুখ ঠেকিয়ে আকাশ দেখছিল নেহা। বৃষ্টি থেমেছে। কিন্তু আকাশের মুখ মেঘে-মেঘে এখনও ভার। চারদিকে জল থইথই করছে। কতদিন এমন সুন্দর দৃশ্য দেখেনি নেহা! এর পর যখন রোদ উঠবে তখন দেখো কেমন রূপের ছটায় ঝলমল করবে তাদের গ্রামখানা। কত পাখি আসবে, পাপিয়া, কোকিল, দাদুরি আর অসংখ্য ময়ূর। হয়তো তখন তার দিয়াও আসবে।

আচ্ছা, ওই দূর রাস্তা দিয়ে জল ভেঙে কে যাচ্ছে? রাজন না? সঙ্গে ওই কি রাজনের মা? তবে কি রাজন মাকে খুঁজে পেয়েছে? থাকতে পারল না নেহা। চিৎকার করে ডাক দিল, রাজন-ন-ন।'

রাজন শুনতে পেল না। এত দূর থেকে শোনা যায় না।

তবু আবার হাঁক দিল নেহা, 'রাজন-ন-ন।'

না, এবারও শুনতে পেল না সে।

নেহার মা এসে দাঁড়ালেন, তার পাশে। নেহার মাথায় হাত দিলেন, 'কাকে ডাকছিস?'

'রাজন। শুনতে পেল না।' উত্তর দিল নেহা, 'কাল আমরা দু-জনেই ধবংসস্তূপের ভেতর থেকে কুয়ো খুঁজে বার করেছিলুম।'

'কোথায় সে?' জানলায় চোখ রেখে মা জিজ্ঞেস করলেন।

'ওই দূর রাস্তা দিয়ে চলে গেল মায়ের সঙ্গে।' হতাশ গলায় উত্তর দিল নেহা।

মা বললেন, 'ওরা কি আমাদের বাড়িতে আসবে?'

নেহা চুপ করে রইল। মায়ের চোখ পড়ল নেহার কপালে। আঁতকে উঠে বললেন, 'কতটা কেটে গেছে রে! কাল রাতে নজর করিনি তো। ব্যথা আছে?'

নেহা বলল, 'না, না, একটুও না।'

'কেমন করে কাটল? পড়ে গেছলি?' মা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

'না, পড়ব কেন!'

'তবে?'

'উঁচুতলার মানুষ ইট ছুড়ে আমার কপালে আঘাত করেছে। কলসিটা চুরমার করে দিয়েছে।' উত্তর দিল নেহা।

মা নেহার কপালে হাত দিয়ে বললেন, 'যাক গে কলসি ভেঙে। ইটটা ভাগ্যিস তোর চোখে লাগেনি।'

নেহা বলল, 'কিন্তু একটা কলসি। তো চাই, নইলে জল ভরবে কীসে?'

মা বললেন, 'একটা নতুন কলসি এসেছে।'

নেহা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কে এনেছে? বাবা?'

মা মাথা নাড়লেন 'হ্যাঁ।'

নেহা আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরল। আর ঠিক তখনই তার কানে ভেসে এল সারিন্দার সুর। ওস্তাদজি বাজাচ্ছেন।

খানিক বোবার মতো চুপ থেকে নেহা অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, 'কী সুন্দর!'

কখন যে বাবা এসে পেছনে দাঁড়িয়েছেন, দেখেনি নেহা। তিনি নেহার কানের কাছে মুখ এনে নেহাকে চমকে দিয়ে বলে উঠলেন, 'সুন্দর!' বলেই হেসে উঠলেন, হা-হা-হা!

আবার বৃষ্টি নামল! আকাশ-ভাঙা বৃষ্টি ঝম-ঝম।

অধ্যায় ১০ / ১০
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%