খুদে যাযাবর ইসতাসি

শৈলেন ঘোষ

আমি ইসতাসি।

ইসতাসি আমার নাম। এমন নাম তো তোমরা কোনোদিন শোনোনি! সুতরাং ভাবতে পারো, ছেলেটার এ কী অদ্ভুত নাম রে বাবা! অবিশ্যি, আমার নামটা তোমার কানে অদ্ভুত ঠেকলেও, আমাকে দেখলে যে তোমার খুব খারাপ লাগবে, তা বলতে পারি না। কেননা, আমার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা এই যে লাল-নীল ডোরা-কাটা প্যান্টটা দেখছ, গায়ে রঙিন ফুল-হাতা, ফুল-কাটা জামাটা দেখছ, তার ওপর এই যে দেখছ, জরির-কাজ-করা জ্যাকেটটা, বলো, এ দেখে আমাকে তোমার ভালো লাগছে না? তবুও তো টুপিটা মাথায় দিইনি। অবিশ্যি, আমি দেখতেই-বা কম কী! বলতে পারো, আমার তো এখন বয়স তেমন হয়নি। সবে দশ পেরিয়ে এগারোয় পড়েছি। সুতরাং অমন রংচঙে সাজ-পোশাক পরলে এই বয়সে বাঁদরকেও দেখতে ভালো লাগে!

ছিঃ! ছিঃ! তা বলে আমায় বাঁদর বোলো না! আমি ইসতাসি। আমি এক যাযাবরের ছেলে।

আমি জানি না, যাযাবর বললে তোমরা আমায় ঠিক চিনতে পারবে কি না! শুধু জেনো আমাদের কোনো ঠিক নেই, ঠিকানা নেই। তোমাদের মতো আমাদের না আছে মস্ত-মস্ত বাড়ি, না আছে দামি-দামি আসবাব। পথেই আমাদের ঘর। এই পথে-পথেই আমরা দল-বেঁধে ঘুরে বেড়াই। যাই এক দেশ থেকে আর-এক দেশে। ক-দিনের জন্যে মাঠে-ঘাটে তাঁবু ফেলি। তারপর সময় হলেই আবার আর-এক দেশে পাড়ি দিই। বেশ লাগে। আমরা শুধু দেখে বেড়াই। নতুন-নতুন দেশে কত নতুন মানুষ, কত নতুন মুখ। কত নতুন কথা।

প্রথমেই বলে রাখি, আমার মা-বাবা কেউ নেই। কী করে যে আমি আমার মাকে, বাবাকে হারিয়েছি, সে-কথা বলতে গেলে এখনও আমার বুক কেঁপে ওঠে! তাদের কথা ভাবতে-ভাবতে আমি মাঝে-মাঝে নিজেকেও কেমন হারিয়ে ফেলি! এখনও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে তাদের। মায়ের মুখখানি এখনও আমার চোখের ওপর স্পষ্ট ভেসে ওঠে। আঃ! কী সুন্দর দেখতে ছিল আমার মাকে! কী মিষ্টি গান গাইত আমার মা। আমার বেশ মনে পড়ে, মা পরত রঙিন ঘাগরা। মায়ের পায়ে ছিল রুপোর মল। গলায় মোহর-আঁটা মালা। আর কানে ছিল এত্তো বড়ো দুটো চাঁদির রিং। সেজেগুজে মা যখন সন্ধ্যারাতে চাঁদের আলোয় গান গাইত, কী ভালোই না লাগত। আর আমার বাবা? একটা ঢিলেঢালা প্যান্ট পরে, রঙিন ডোরা-কাটা জামা গায়ে দিয়ে, মাথায় টুপি এঁটে মায়ের গানের সঙ্গে ব্যানডুররিয়া বাজাত। জ্যোৎস্নারাতে দলের সবাই যখন কাজের শেষে আমাদের তাঁবু-ঘেরা সবুজমাঠে জমায়েত হয়ে আনন্দ করত, সেই আনন্দে মাকেও গান গাইতে হত। আমি হলপ করে বলতে পারি, সে-গান শুনলে আমার মতো তোমরাও অবাক হয়ে যেতে।

ব্যানডুররিয়া বাজনাটা তোমরা কেউ দেখেছ কি না জানি না। এটা একটা তারের বাজনা। অনেকটা ম্যান্ডোলিনের মতো দেখতে। তবে, ম্যান্ডোলিনের পেটটা নাশপাতির মতো গোল। এটার পেট চ্যাপটা। গলায় ঝুলিয়ে আঙুল ছুঁয়ে এর তারে সুর তুললে আমি হলপ করে বলতে পারি, তোমার পা-দুটি আপনা-আপনি নেচে উঠবে।

আমার বাবা যেমন ব্যানডুররিয়া বাজাতে পারত, তেমনি জানত মজার জাগলিং-এর খেলা। একসঙ্গে কুড়িটা বড়ো-বড়ো কাঠের বল আকাশে ছুড়ে এমন চরকি খাওয়াত যে, দেখলে তুমি হাঁ হয়ে যেতে! বাবার হাতের কায়দায় শূন্যে ঘুরতে-ঘুরতে ওই কাঠের বলগুলোকে কখনো মনে হত একটা মস্ত মালা। কখনো মনে হত একটা এত্তো বড়ো লাট্টু বাঁই-বাঁই করে ঘুরছে। আবার কখনো মনে হত যেন আকাশ-মুখো একটা রকেট হুস-হুস করে উড়ে যাচ্ছে। শুধু কাঠের বল কেন! লোহার চাকতি, না-হয় তারের রিং, এমনকী কাঠের ছোট্ট-ছোট্ট রংচঙে টুল নিয়েও বেমালুম শূন্যে ছুড়ে নানান খেলা দেখাতে পারত আমার বাবা।

একটু-আধটু ম্যাজিকও জানত বাবা। তবে আনাতিদাদার মতো অমন নয়। আনাতিদাদা ম্যাজিক দেখাতে-দেখাতে 'ফুস' বলেই চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারত। উঃ! সে কী তাজ্জব ব্যাপার! তুমি এখানে খোঁজো, আর যেখানেই খোঁজো, খুঁজে আর পেতে হচ্ছে না। আমি তো প্রথম দিন খেলাটা দেখে একেবারে থ। এই খেলাটা দেখালে অনেক পয়সাও পেত আনাতিদাদা।

সে তো বটেই! পয়সা তো পেতেই হবে। নইলে চলবে কেমন করে! আমরা তো যাযাবর। আমাদের এমনি করেই দিন চলে। এমনি নাচ দেখিয়ে, গান শুনিয়ে, খেলা দেখিয়ে, আর নয়তো ঘরে-হাটে সাত-সতেরো জিনিস বিক্রি করে।

তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ, আনাতিদাদা কে? আনাতিদাদা আমাদের দলের সর্দার। আমাকে খুব, খুউব ভালোবাসত। ভারি শক্ত-সমর্থ মানুষ ছিল আনাতিদাদা। এত্তোখানি চওড়া বুক। বুকভরতি সাহস। হাতের আঙুলগুলো এমনি পুরুষ্টু! একখানি ঘুসি মারলে আর দেখতে হবে না! প্রাণ নিয়ে টানাটানি। অবিশ্যি, কম-বেশি আমাদের সকলেই সাহসী। হতেই হয়। কেননা, যাদের পথে-পথেই শুধু হাঁটতে হয়, জানে না, আজকের হাঁটা-পথ কালকে কোথায় গিয়ে থামবে, তাদের জীবনে পদে-পদে বিপদ যে! এই সাহস আর শক্তি দিয়েই তো সে-বিপদ রুখতে হয়!

এই ছোট্ট বয়েসেই, বাবার হাতে ওই ব্যানডুররিয়াটা বাজাতে দেখলেই, আমারও হাত নিশপিশ করত। মনে হত, আমিও যদি বাবার মতো ব্যানডুররিয়া বাজাতে পারতুম। ছেলেমানুষি বুদ্ধি তো! তবু, বাবাকে ফাঁকি দিয়ে, মাঝে-মাঝেই ওই ব্যানডুররিয়ার তারগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে টুং-টুং টান দিতে ছাড়িনি। বাজনা হত না। কিন্তু হাতের টানে বেসুরো যে-শব্দগুলো বাজনা হয়ে কানে বাজত, তাতেই ভারি মজা লাগত আমার। আর মজা লাগত বলে, সুযোগ পেলেই তার ধরে টান দিতুম। একদিন এমনি করে টান দিতে গিয়ে বেমক্কা একটা তার টং করে ছিঁড়ে ছিটকে গেল। বুঝতেই পারছ, তখন আমার কী অবস্থা! বাবার বকুনির ভয়ে আমি একেবারে জুজু! আমার যদি ছেঁড়া তার জোড়া দেওয়ার সাধ্যি থাকত, তাহলে তো কোনো কথাই ছিল না। বাবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কাজটি সেরে চুপচাপ বসে থাকতুম। বাজাতে-বাজাতে বাবাকেও দেখেছি কখনো-সখনো তার ছিঁড়ে ফেলতে। আবার দেখেছি, কত সহজেই তার জোড়া দিয়ে বাজনায় নতুন করে সুর জুড়েছে বাবা। সে যেন বাবার কাছে কিছুই নয়।

তোমাদের আগেই বলেছি, আনাতিদাদার কথা। সুতরাং এখন বাবার বকুনির হাত থেকে আমায় বাঁচতে হলে, আনাতিদাদার হাতে নিজেকে ধরা দিতে হয়। তাই আমি ছুটলুম আনাতিদাদার তাঁবুতে। আমরা যে-মাঠে এখন তাঁবু ফেলেছি, ঠিক তার সামনেই আনাতিদাদার তাঁবু। একছুটে তাঁবুতে ঢুকতেই দেখি, আনাতিদাদা তামুক খাচ্ছে। ঠিক এই সময়ে, হঠাৎ তার তাঁবুতে আমাকে ঢুকতে দেখে আনাতিদাদার চোখ দুটো খুশিতে চকচক করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় চিৎকার করেই আমার নাম ধরে ডাক দিল, 'ইসতাসি!' ডাক দিয়েই একবুক হাসি ছড়িয়ে আমাকে অভ্যর্থনা করল। আমাকে দেখে কী যে খুশি, সে তোমাকে কী বলব! আমার কিন্তু হাসি পেল না। আমার মুখখানা শুকনো দেখে, তার অবাক হওয়ারই তো কথা! হাসতে-হাসতে থমকে গিয়ে কেমন সন্দেহের চোখে চাইল আমার দিকে। আমি ছুটে গেলুম আনাতিদাদার কাছে। আনাতিদাদা আমাকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। তার বুকের মধ্যে মুখটা লুকিয়ে হাঁপাতে লাগলুম।

অবাক হয়েই আনাতিদাদা আমাকে জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে, ইসতাসি?'

আমি ফুঁপিয়ে উঠলুম। ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে বললুম, 'বাজনা!'

আনাতিদাদা আমার এমন উত্তর শুনে আরও অবাক হল। জিজ্ঞেস করল, 'বাজনা? কীসের বাজনা? কার বাজনা?'

'বাবার। ব্যানডুররিয়া।'

'কী হয়েছে?' আনাতিদাদার গলায় আরও অবাকের সুর।

'বাজাতে গিয়ে তার ছিঁড়ে ফেলেছি!'

আর কোনো কথা নয়। সঙ্গে-সঙ্গে একেবারে হো-হো করে হেসে উঠেছে আনাতিদাদা। আমি আনাতিদাদাকে হাসতে দেখে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি। আনাতিদাদার বুকের ভেতর থেকে মুখটা সরিয়ে এনে তার চোখের সামনে তুলে ধরলুম। আনাতিদাদা আমার মুখখানা দেখে আরও জোরে হেসে উঠেছে। হাসতে-হাসতে বলল, 'আরে ছ্যাঃ ছ্যাঃ! এর জন্যে ইসতাসি ভয় পায়।'

আমি নিজের ভয়টাকে তবুও নিজের মধ্যে লুকোতে পারলুম না? আমার চোখদুটো ভয়ে কাঠ হয়েই,আনাতিদাদার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। আনাতিদাদা আমার মাথায় একটা ছোট্ট ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, 'বুঝতে পেরেছি, ব্যানডুররিয়াটা বাজাতে ইচ্ছে যায় বুঝি?'

আমি বললুম, 'হ্যাঁ বাবার মতন।'

'আমি শিখিয়ে দেব।'

এতক্ষণ আমার যে-মুখখানা ভয়ে কালো হয়ে ছিল, হঠাৎ সে-মুখে আলো ঝলসে উঠল। আনাতিদাদার এ-কথাটা আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছি না। তাই তার হাত দুটো ধরে প্রায় লাফিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলুম, 'সত্যি?'

আনাতিদাদা বলল, 'নিশ্চয়ই!'

'আমি পারব?'

'আলবাত!'

আনন্দে আমি আরও লাফিয়ে উঠলুম, মাটি থেকে আকাশে।

কিন্তু তারপর হঠাৎ-ই আবার ব্যানডুররিয়ার তার ছেঁড়ার কথাটা মনে পড়তেই আনন্দটা কেমন যেন চুপসে গেল। আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'বাবার ব্যানডুররিয়াটার কী হবে?'

আনাতিদাদা বলল, 'ওটার জন্যে ভাবনা নেই। ওটা বাবাই ঠিক করে নেবে। আমি বলে দেব। কিন্তু এক শর্তে! আমি যে তোমাকে ব্যানডুররিয়া বাজাতে শেখাব, এ-কথাটা এখন কাউকে বলতে পারবে না।'

'কেন?'

'একদিন হঠাৎ সবাইকে অবাক করে দেব।'

কথাটা শুনে আমার খুব ভালো লাগল। হ্যাঁ, সত্যিই তো! হঠাৎ একদিন আমি যদি ব্যানডুররিয়া শুনিয়ে বাবাকে অবাক করে দিতে পারি, বলো, সেদিন কী দারুণ মজা হবে!

আনাতিদাদাও যে ব্যানডুররিয়া বাজাতে পারে, এ-কথাটা তোমাদের বলতে একদম ভুলে গেছি। অবিশ্যি, ম্যাজিক-খেলা দেখাতে আনাতিদাদার যতটা উৎসাহ দেখতে পাবে, ব্যানডুররিয়ার বেলায় তা নয়। একেবারেই বাজায় না যে তা বলি না, তবে কালেভদ্রে। তাই বলে যেন মনে কোরো না, তেমন বাজাতে পারে না! বাববা! দারুণ ওস্তাদ! কী ম্যাজিকে, কী ব্যানডুররিয়ায়।

আমার বেশ মনে আছে, একদিন সন্ধেবেলায়, মাঠের জমায়েতে বাবার সঙ্গে আনাতিদাদা ব্যানডুররিয়ার এমন লড়াই শুরু করে দিল যে, তাই শুনে তো সবাই একেবারে থ! এ বলে আমায় দ্যাখ, ও বলে আমায়! কেউ ছাড়বার পাত্তর নয়! যখন বাজনা শেষ হল, আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম! কে হারল, আর কে যে জিতল কেউ-ই বলতে পারল না। সেই রাতটা আমার আরও স্পষ্ট মনে আছে এই জন্যে যে, দুজনের কাউকেই আমি হারতে দিতে রাজি ছিলুম না। কেউ একজন হারলেই আমি সাংঘাতিক দুঃখ পেতুম। কারণ, দুজনেই যে আমাকে ভীষণ ভালোবাসে।

যাক বাবা! ব্যানডুররিয়ার তার-ছেঁড়ার ব্যাপারটা নিয়ে বাবা আমায় কিচ্ছু বলেনি। বাবা যখন শুনল, উলটে বলল কী, 'ছিঁড়ুক, ছিঁড়ুক। বাজাতে গেলে তো ছিঁড়বেই। এমনি ছিঁড়তে-ছিঁড়তে একদিন ইসতাসি ওস্তাদ হয়ে উঠবে। হবে একজন পাকা ব্যানডুররিয়া-বাজিয়ে!' এ-কথা শুনে, সেদিন যে আমার কী আনন্দ হয়েছিল, সে কী বলব তোমাদের!

হ্যাঁ, এখন আমি সত্যিই ব্যানডুররিয়া-বাজিয়ে হয়ে উঠেছি। তবে, এখনও ঠিক পাকা হইনি। আনাতিদাদা গোপনে-গোপনে তালিম দিয়ে, মোটামুটি অনেকটা বাজাতে শিখিয়ে দিয়েছে। প্রথম-প্রথম এত গোলমেলে লাগত! তেমনি অসুবিধা। হবেই তো। আমি যে ছোট্ট। বাজনাটাকে বাগে আনতেই কদিন কেটে গেল। তারপর ধীরে ধীরে যখন সড়গড় হয়ে গেল, তখন সা-রে-গা-মা ছাড়িয়ে গানের বাজনাও বাজাতে শিখে গেলুম। আর সত্যিই, এমন লুকিয়ে-ছাপিয়ে শিখলুম যে, কেউ ঘুণাক্ষরে জানতেও পারল না। এমনকী, বাবা, মা কেউ না। আমি বলতে পারি, আনাতিদাদা সত্যিই এক আশ্চর্য মানুষ! নইলে, আমার মতো এক আনাড়িকে এত সহজে এমন সুন্দর ব্যানডুররিয়া বাজাতে শিখিয়ে দিতে পারে! নিজের কথা ভেবে, আমার নিজেরই কেমন অবাক লাগে!

কিন্তু তার চেয়েও আশ্চর্য কথা, আমার এই ব্যানডুররিয়া শেখা নিয়ে আনাতিদাদার মনের ভেতর যে-মতলবটা লুকিয়ে ছিল, সেইটা। সে-মতলবটা কিন্তু কাকপক্ষীও টের পেল না। এমনকী, আমিও না। তোমাদের তো আগেই বলেছি , যাযাবর বলে এক জায়গায় বেশি দিন থাকি না। এক দেশ থেকে আর-এক দেশ এরই মধ্যে কতবার হয়ে গেল। আর এই দেশে-দেশে ঘুরে-ঘুরে আমারও গোপনে-গোপনে বাজনা-শেখা চলল। আনাতিদাদা আদা-জল খেয়ে এমন করে আমায় নিয়ে পড়েছে যেন ওস্তাদ না-করে কিছুতেই ছাড়বে না।

এমনি করে আমার বাজনা শেখা চলছে। আনাতিদাদা এরই মধ্যে ম্যাজিক-খেলা দেখিয়ে পয়সা রোজগার করে আনছে। মায়ের গান, বাবার মজার-মজার হাতের খেলা—সবই চলছে ঠিক-ঠিক। যে-দেশেই যাই সে-দেশের সবার চোখেই আমরা যেন আশ্চর্য মানুষ। যারা এক জায়গায় থাকতে জানে না, কোনো দেশে পাকাপোক্ত ঘর বেঁধে বাস করে না, আজকের পথ কালকে কোথায় থামবে—সে নিয়ে ভাবনা করে না, তাদের তো আশ্চর্য লাগবেই!

তবু একটা কথা এই ফাঁকে না বলে পারছি না। কী জানি কেন, কেউ আমাদের বিশ্বাসও করে না। হয়তো আমাদের দেশ নেই বলে, দেশে-দেশে ঘর-বেঁধে পাকাপাকি বাস করি না বলে, সবাই কেমন যেন সন্দেহের চোখে দেখে আমাদের। কেউ বলে, আমরা লুঠেরা! কেউ বলে, তস্কর! আমাদের পেটে-পেটে শয়তানি বুদ্ধি! আমরা মানুষ ঠকাই! এক দেশের গোপন খবর অন্য দেশকে জানিয়ে দিই! আমরা গুপ্তচর! এই ভেবেই বুঝি তারা আমাদের হেনস্তাও করতে ছাড়ে না। আমরা যখন খেলা দেখাই, তারা তখন আমাদের ইট-পাটকেল ছুড়ে মারে! পেছনে ফেউ ডাকে! ঠাট্টা করে! সুযোগ পেলে জিনিস-পত্তর কেড়ে নিতেও ছাড়ে না! তবু বলি, এই নিয়েই আমরা বেঁচে আছি। এই নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। অন্যের দেশে গিয়ে, অন্যের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করা তো আমাদের সাজে না! সেটা তো ঠিক রাস্তা নয়। কেউ যদি বলে, হটো এ-দেশ থেকে, এখানে তোমরা একমুহূর্তও থাকতে পারবে না, তখন কি আর গা-জোয়ারি চলে! তখন লোটা-কম্বল গুটিয়ে নিয়ে চলো আবার আর-এক রাজ্যে।

সে তবু ভালো। তোমার পোষাচ্ছে না, তুমি বললে, দেশ ছাড়ো! আমরাও মানে-মানে সরে পড়লুম। কিন্তু কোনো দেশ যদি মুখে টুঁ শব্দটি না করে পেছন থেকে ছুরি মারে, তখন তাকে কী বলবে? আর এমনিই এক ঘটনা ঘটে গেল কোনো-এক দেশে, সে-দেশের রাজ-সরকারের গোপন আদেশে। সেই কথাই এখন আমি বলব।

আমি এখন ব্যানডুররিয়া বেশ ভালো বাজাতে পারি। আমি এখন আরও একটু বড়ো হয়েছি বলে প্রথম-প্রথম যে-অসুবিধা ছিল, এখন আর তা একদম নেই। মা গান গাইলে, আমি লুকিয়ে-লুকিয়ে সেই গানের সুর ভাঁজতে-ভাঁজতে ব্যানডুররিয়ায় তুলে নিতে পারি। আমার ভাবতে মজা লাগে, আমার এই বিদ্যের বহরটা একমাত্র আনাতিদাদা ছাড়া আর কেউ জানে না। আর তাই একদিন সবাইকে হঠাৎ অবাক করে দেবার জন্যে যে-মতলবটা মনে-মনে এঁটে রেখেছিল আনাতিদাদা, সেটা আমিও একেবারে শেষমেশ জেনেছিলুম। মতলবটা আনাতিদাদার মুখে প্রথম শুনেই আমার যে কী মজা লাগল, সে তোমাদের কী বলব! ভাবতে-ভাবতে আনন্দে গা আমার শিউরে উঠছিল! ঘটনাটা যখন সত্যি-সত্যি ঘটবে তখন যে কী হবে, আমি ভাবতেই পারছি না।

এই মজার মতলবটা আনাতিদাদা মনে-মনে আঁটলেও, সে-দেশের রাজ-সরকার গোপনে-গোপনে যে-মতলবটা এঁটে রেখেছে, সে-খবরটা আনাতিদাদা একদম জানতেই পারেনি। তাই দলের সর্দার হিসেবে, সহজ মনেই ঘোষণা করল, আমাদের তাঁবু-গাড়া সামনের মাঠটায় সেদিন রাত্রে এক জলসা বসবে। কিন্তু জলসায় যে কী হবে, কে গাইবে, কে নাচবে, কে বাজাবে সে-কথা কিচ্ছু বলল না।

আজকের রাতটা বেশ নরম। হালকা-নীল চাঁদের আলো গড়িয়ে পড়েছে আমাদের সবুজ মাঠটার ওপর। আলোয়-আলোয় থিকথিক করছে চত্বরটা। চত্বরের মধ্যিখানে একটা মস্ত বড়ো ধুনুচি রাখা হয়েছে। সেই ধুনুচির আগুনের বুক থেকে গুগগুল ছড়ানো গাঢ় ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছে চারিদিকে। সেই ধুনিচিটাকে ঘিরে আমাদের দলের সবাই গোল হয়ে বসেছে। আমি ছাড়া। আমি তখন ব্যানডুররিয়াটা গলায় ঝুলিয়ে লুকিয়ে আছি আনাতিদাদার তাঁবুতে। মা ওই দলের মধ্যে বসে-বসে দু-একবার আমার খোঁজে মাথা উঁচিয়ে এদিক-ওদিক চাইল বটে, কিন্তু আমায় দেখতে না পেয়ে খুব যে একটা ব্যস্ত হল, তা অবশ্য মনে হল না। মা ভাবল, নিশ্চয়ই এখানে-ওখানে কোথাও আছি আমি। আমায় কী করতে হবে সেটা আনাতিদাদা চুপি-চুপি আগেভাগেই পাখিপড়ার মতো শিখিয়ে রেখেছে। সুতরাং সেই কথাটা যতই ভাবছি, ততই আমার বুকের ভেতরটা খুশিতে লাফিয়ে-লাফিয়ে উঠছে। কিন্তু আমরা তখনও কেউ-ই জানতে পারিনি, এ-আনন্দ কিছুক্ষণের। একটা ভয়ংকর ঘটনা ওত পেতে আছে। একটু পরেই বুঝি-বা সে থাবা মারবে।

থাক সে-কথা। এখন যা হচ্ছে, তাই বলি।

আনাতিদাদা সর্দার, সে-কথা তো তোমাদের আগেই বলেছি। নিশ্চয়ই মনে আছে। সুতরাং আনাতিদাদা ওই জলসার আসরে উঠে দাঁড়াল। তারপর হেঁকে-হেঁকে ঘোষণা করল, 'এ-দেশ ছেড়ে যাবার সময় হয়েছে আমাদের। কাল ভোরের আলোয় আমাদের আবার যাত্রা শুরু হবে। এখানে আজ আমাদের শেষরাত। শেষরাতে আজ তোমাদের সকলকে চমকে দেবার মতো একটি উপহার আমি দেব। তার আগে রুশমি-বোন আমাদের গান শোনাবে।'

তোমাদের বলে রাখি, রুশমি আমার মায়ের নাম। আনাতিদাদা আমার মাকে রুশমি-বোন বলেই ডাকে। সুতরাং, সর্দার আনাতিদাদার হুকুমে আমার মা গান শুরু করল। সে-গানের প্রথম দুটি লাইন আমার এত ভালো লাগে:

সুন্দর পৃথিবী আহা! তুমি সুন্দর,

তোমার বুকের নীড়ে আমাদের ঘর!

এই গানটা মায়ের গলায় যখন সুরে-সুরে ভরে যায়, আমি হলপ করে বলতে পারি, শুনলে তুমি একেবার হতবাক হয়ে যাবে। তার ওপর এই সুরে সুর মিলিয়ে বাবার হাতের ব্যানডুররিয়া যদি বেজে ওঠে, তাহলে সে যে কী আশ্চর্য ব্যাপার হয়, সে যে না শুনেছে, তাকে আমি বোঝাতে পারব না। কিন্তু আজ বাবার বাজনা বেজে উঠল না। আনাতিদাদার তাঁবুর ভেতরে এতক্ষণ আমি গলায় ব্যানডুররিয়া ঝুলিয়ে চুপটি করে বসে ছিলুম এই মুহূর্তটির জন্যে। আনাতিদাদার কথামতো, মায়ের গলায় গান শুরু হবার সঙ্গে-সঙ্গে আমার হাতের ব্যানডুররিয়া সেই গানের সুরে সুর মিলিয়ে বেজে উঠল। আমি বাজনা বাজাতে-বাজাতে ধীর পায়ে তাঁবুর ভেতর থেকে জলসার চত্বরে এগিয়ে এলুম। বিদ্যুৎ চমকে উঠলে আকাশে যেমন হঠাৎ আলোর ঝিলিক দিয়ে ওঠে, তেমনি যেন নিমেষে সবার চোখ ঝলসে গেল আমার দিকে তাকিয়ে। তারা বিশ্বাসই করতে পারছে না, তাদের আদরের ইসতাসি তার মায়ের গাওয়া গানের সঙ্গে ব্যানডুররিয়া বাজাচ্ছে নিজের হাতে! আমার মা গাইতে-গাইতে থমকে যায়। বাবা চমকে তাকায়। আনাতিদাদার মুখে মুচকি-মুচকি হাসি। থমকে গিয়ে মা যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলল ক্ষণেকের জন্যে। হারিয়ে গেল গানও তার কণ্ঠ থেকে। আমি থামলুম না। বাজিয়েই চললুম। একটুখানি থেমে নিমেষের মধ্যেই মা যেন গান ফিরে পেল আবার। মা গেয়ে উঠল দ্বিগুণ উৎসাহে। আমি মায়ের আরও কাছে এগিয়ে গেলুম। একেবারে মুখোমুখি। তোমায় বলব কী, অমনি সঙ্গে-সঙ্গে চত্বর জুড়ে আমাদের দলের যত মানুষ জমায়েত হয়েছিল, সবাই একসঙ্গে মায়ের গলায় গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠল : 'সুন্দর পৃথিবী আহা! তুমি সুন্দর!' অমন যে আনাতিদাদা, যাকে কোনোদিন আমি গান গাইতে শুনিনি, সেই আনাতিদাদার গলাতেও সুর! নিমেষের মধ্যে সেই জ্যোৎস্নারাতের সবুজ চত্বরটা যেন অপরূপ এক সুরের রূপকথার মতো ঝলমলিয়ে উঠল। তুমি শুনলে বোধহয় আরও অবাক হবে, কারো-কারো পা-দুটিও যেন অস্থির হয়ে উঠল। নেচে উঠল তারা। গলায়-গলায় গান, পায়ে-পায়ে ছন্দ। সে যে কী আশ্চর্য দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবে না।

হয়তো এ আনন্দ চলেছিল কিছুক্ষণ। তুমি যতক্ষণ ভাবছ, হয়তো তার চেয়েও কম সময়। আনন্দের জোয়ার যখন ঢেউ তুলে ফুলে-ফুলে উঠছিল, ঠিক তখনই সেই ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটে গেল। অদৃশ্য কোন আড়াল থেকে আমাদের এই আনন্দবিভোর মানুষগুলোর ওপর কারা যেন আচম্বিতে গুলি ছুড়ল, গুড়ুম-গুড়ুম! অতগুলো আনন্দ-উচ্ছল মানুষ পলকে হতচকিত। কিছু বুঝতে না-বুঝতেই আবার বুক-কাঁপানো আওয়াজ, দুম-দুম! এবার বন্দুকের গুলি নয়, বোমার বিস্ফোরণ! দেখতে-দেখতে সমস্ত চত্বরটা বারুদের গন্ধে আর নিকষ-কালো অন্ধকার ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল। বিপদে সন্ত্রস্ত মানুষগুলো আর্তনাদ করে উঠল, 'বাঁচাও, বাঁচাও!' গানে-গানে ভরপুর সেই সবুজ চত্বর কান্না আর চিৎকারে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেল! কার গায়ে আঘাত লাগল, কেউ দেখল না। কে বাঁচল, কে মরল কেউ জানল না। নিজে বাঁচার জন্যে যে যেদিকে পারল, সেই দমবন্ধ ধোঁয়ার ভেতর ঘুরপাক খেতে-খেতে ছুটতে লাগল।

ঠিক এই সময়ে আমি দেখতে পেলুম, একদল পুলিশ হম্বিতম্বি করতে-করতে এদিকেই ধেয়ে আসছে। আমি কী করব, ভেবেই পাচ্ছি না। আমি তখনও বুঝতে পারিনি, আমার মা আমারই সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে-পড়ে মাটির ওপর ছটফট করছে। মায়ের বুকে গুলি লেগেছে! দেখতে পেলুম না বাবাকেও। তার যে কী হল, তাও জানি না। আমি দেখতে পেলুম পুলিশের হাতে বন্দুকের নলগুলো এদিক-ওদিক ছটফট করতে-করতে আমারই দিকে এগিয়ে আসছে। আমার বুকের মধ্যে সাহসের আগুনটা দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠল। আমি ভাবলুম, ওরা যদি গুলি ছোড়ার আগে আমার আর একটু কাছে আসে, তবে ওই যে ধুনিচির আগুনটা এখনও ধিকিধিকি জ্বলছে, ওই আগুন ছুড়ে ওদের অন্ধ করে দেব। পুলিশের দল আমার আরও কাছাকাছি এসে পড়েছে। আর দেরি নয়। আমিও তড়িৎগতিতে ধুনুচিটার দিকে এগিয়ে যাব বলে পা বাড়ালুম। ঠিক এমন সময়ে কে যেন তারস্বরে চিৎকার করে ডেকে উঠল, 'ইসতাসি, ইসতাসি!'

আমি থতমত খেয়ে থমকে গেলুম। কিন্তু দেখতে পেলুম, পুলিশের দল আরও কাছে এগিয়ে এসেছে! আমি গলা শুনে বুঝতে পেরেছি, কে আমায় ডাকছে। এ ডাক আনাতিদাদার। তাকে খুঁজে পাবার জন্যে সেই অন্ধকার ধোঁয়ার মধ্যে আমার চোখ দুটো ছটফট করে উঠল। তাকে দেখতে না-পেয়ে আমিও চিৎকার করে ডেকে উঠলুম, 'আনাতিদাদা!'

অমনি সঙ্গে-সঙ্গে আবার বন্দুক গর্জে উঠল, গুড়ুম-গুড়ুম!

দেখলুম, আর দেরি করা ঠিক নয়। ওরা আমার বুকে আঘাত হানার আগে আমাকেই প্রতিশোধ নিতে হবে। তাই চোখের পলকে ছুট দিয়ে ওই মস্ত ধুনুচিটা এক হাতে তুলে নিলুম। ছুড়ে দিলুম ওদের গায়ে। ওদের গুলি আর ছোড়া হল না। আগুনের ফুলকি ছিটকে-ছড়িয়ে ওদের চোখে-মুখে জ্বালা ধরিয়ে দিল। দেখতে পেলুম, সেই আগুন ওদের মাথার টুপিতে জ্বলছে, পোশাক পুড়ছে। সারা দেহে আগুনের ঝলকানি। আমি ভাবলুম, এই সুযোগ! এবার আমায় পালাতে হবে! আমার হাতে তখনও সেই ব্যানডুররিয়াটা। এখন তার কোনো শব্দ নেই। একটু আগে এই ব্যানডুররিয়ার সুর থেকে যে আনন্দ উছলে উঠছিল, এখন সেই আনন্দ মরণ-কান্নার আর্তনাদে আছড়ে পড়ছে চারিদিকে। আমি ছুট দিলুম পালাবার জন্যে। ঠিক এই সময়ে ঝট করে কে যেন আমার জামার কলারটা খামচে ধরে টান দিল। আমি ঝটপট ঘুরে দেখার আগেই চিৎকার করে ডাক দিলুম, 'আনাতিদাদা, আমাকে বাঁচাও।'

আমার চিৎকার শুনে, আমার জামাসুদ্ধ গলাটা পাকিয়ে একটা লোক কাঁপা গলায় ধমকে উঠল, 'চোপরাও!'

আমি পিছন ফিরে দেখি,পুলিশের একজন হোমরা-চোমরা আমাকে মারবার জন্যে তার রিভলভারটা আমার দিকে তাক করে ধরে আছে। আমি এক্ষুনি নির্ঘাত মরব, এই কথাটা ভাবতে কতটুকুই বা সময় পেয়েছি, ঠিক সেই সময়ে আবার একটা রিভলভারের শব্দ, সাঁ-ই-ই! আমি আতঙ্কে শিউরে উঠে পিছু ফেরার সঙ্গে সঙ্গে দেখতে পেলুম, আমায় যে-পুলিশটা ধরেছিল, তার পিঠেই কে গুলি ছুড়েছে! লোকটা আমায় ছেড়ে মাটির ওপর আর্তনাদ করে নেতিয়ে পড়ল। পড়ামাত্র আনাতিদাদা পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল, 'ইসতাসি—'

ডাক শুনে মুখ ঘোরতেই দেখি, আনাতিদাদা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভীষণ উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে। তারই হাতে রিভলভার। ওই রিভলভারের গুলিতেই পুলিশের লোকটা ঘায়েল হয়েছে। আনাতিদাদার ডাক শুনে আমিও চিৎকার করে সাড়া দিলুম, 'আনাতিদাদা!'

আনাতিদাদা আমায় আর কোনো কথা বলতে দিল না। মুহূর্তে রিভলভারটা নিজের পকেটে পুরে ফেলে আমাকে জাপটে ধরল। তারপর চকিতে আমাকে নিয়ে একটা তাঁবুর আড়ালে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়ল। এমন চটজলদি সমস্ত ঘটনাটা ঘটে গেল যে, আমি নিজেই হতচকিত হয়ে গেলুম। সেই হোমরা-চোমরা পুলিশটার পিঠে গুলি লাগার সঙ্গে-সঙ্গে আমি শুনতে পেলুম, পুলিশের এক বিরাট বাহিনী তর্জন-গর্জন করতে-করতে সেই চত্বরটা তোলপাড় করছে। আমি তখনও শুনছি গুলির আওয়াজ। অবিশ্যি ততক্ষণে চত্বরটাও প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। যে বাঁচল, সে পালাল। যে পারল না, হয় সে গুলির আঘাতে কাতরাচ্ছে, না-হয় মরেছে। আমি আনাতিদাদাকে জড়িয়ে ধরে চুপিসারে জিজ্ঞেস করলুম, 'মা? বাবা?'

আনাতিদাদা আমার মুখটা চেপে ধরল, 'না কথা নয়। আড়াল থেকে নিঃশব্দে উঁকি মারল আনাতিদাদা। আমিও উঁকি দিলুম। পুলিশের দল আনাতিদাদাকে ধরার জন্যে আহত বাঘের মতো গর্জে-গর্জে খুঁজে বেড়াচ্ছে এধার-ওধার। আনাতিদাদা জানে, এমন অবস্থায় এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকা ঠিক নয়। তাই আমার হাত ধরে তক্কে-তক্কে এই তাঁবুর আড়াল থেকে, ঠিক পাশেই একটা ঝোপ ছিল, সেখানে লুকিয়ে পড়ল। এই ঝোপের আড়াল থেকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তাঁবুর ভেতরে পুলিশ ঢুকে-ঢুকে খোঁজাখুঁজি করছে। শুনতে পাচ্ছি, তাঁবু ছেঁড়ার শব্দ। ওরা এক তাঁবু থেকে আর এক তাঁবুতে দুড়দাড়িয়ে ঢুকে পড়ে। সব তছনছ করে বেরিয়ে আসে। চিৎকার করে। আর সামনে যা পায় পায়ের বুট দিয়ে ছুড়ে-ছুড়ে লাথি মারে!

ঠিক এই মুহূর্তে আমাকে নিয়ে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়ল আনাতিদাদা। তারপর সেখান থেকে নিঃসাড়ে একটা মস্ত বাড়ির পাঁচিলের আড়ালে গা-ঢাকা দিল। আমি প্রায় নিশ্বাস চেপে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম সেখানে। কী ভীষণ উৎকণ্ঠা। তারপর একফাঁকে সেই পাঁচিলের আড়াল থেকে ঢুকে পড়লুম একটা ঘুপচিমতো গলির ভেতরে। সেখান থেকে মার ছুট!

ছুটতে ছুটতে আমার বুকের ভেতরটা চমকে উঠল। চিৎকার করে আনাতিদাদাকে জিজ্ঞেস করলুম, 'আমার মা কোথায় গেল? আমার বাবা?'

আনাতিদাদা ছুটতে ছুটতেই বললে, 'এখন কোনো কথা নয়! তোকে বাঁচতে হবে!'

আমি হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলুম, 'কেন এ-কথা বলছ?'

'পুলিশ তাদের গুলি মেরেছে।'

আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। আমি ছুটতে ছুটতে থমকে গেলুম। আমার বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেছে। আমি কাঁদতে পারলুম না। কাঁপতে লাগলুম। আনাতিদাদা ব্যস্ত হয়ে আবার আমার হাত ধরে টান দিল। না, আমি যাব না। তখন আমার শরীর উত্তেজনায় গুমরে উঠছে। মন বলছে, যারা আমার মা আর বাবাকে গুলি মেরেছে, তাদের আমি দেখে নেব।

আনাতিদাদা আবার বলল, 'ইসতাসি, তোকে বাঁচতে হবে! এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ওরা দেখে ফেলবে!'

'তোমার তো রিভলভার আছে।'

'তাতে কটা মাত্র গুলি আছে।'

'একজনকেও তো মারতে পারবে।'

'একজনকে মারলে কী লাভ! প্রতিশোধ নিতে হলে আমাদের তৈরি হতে হবে।' বলে আনাতিদাদা আমার হাতটা তার হাতের মুঠি দিয়ে শক্ত করে ধরল। আশ্বাসে ভরপুর সেই হাতে হাত দিতেই আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলুম না। ডুকরে কেঁদে ফেললুম। আনাতিদাদা আমার মুখখানা তার চোখের কাছে সরিয়ে এনে বলল, 'ভয় নেই, আমি আছি। চ, আমার সঙ্গে।'

আমি কথা বলতে পারলুম না। এক হাতে আমার ব্যানডুররিয়া আর এক হাতে আনাতিদাদার শক্ত মুঠি শক্ত করে ধরে আমি ছুটলুম।

অনেকক্ষণ ছুটতে-ছুটতে আর যখন পারছিলুম না, আনাতিদাদা তখন নিজেই বলল, 'এবার একটু থামতে পারা যায়।'

আমরা দুজনেই হাঁপাচ্ছি । হাঁপাতে-হাঁপাতেই পিছু ফিরে এদিক-ওদিক দেখছি। না, কেউ টের পায়নি মনে হয়। আমরা বোধ হয় পুলিশের চোখ এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে গেছি।

আমার এখন কথা বলার মতো মনের অবস্থা নয়। আমি যেন প্রায় বোবা। মা আর বাবার মুখ দুটি যতই মনে পড়ছে, আমি যেন নিজেকে ততই কেমন অসহায় মনে করছি। আনাতিদাদার সেই কথাটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না, পুলিশ তাদের গুলি মেরেছে। এ-কথা শুনলে কোন ছেলের না মনের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে! এই পৃথিবীতে যার মা নেই, বাবা নেই তার আর কী আছে। আমি তাই ভারি একা, এখন, এই মুহূর্তে।

আমাকে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনাতিদাদাই কথা বলল। আমি বুঝতে পারছি, আনাতিদাদা এতক্ষণ ছুটে এসে তার দুরন্ত নিশ্বাসটাকে এখনও বাগে আনতে পারেনি। কষ্ট হচ্ছে। তবু সেই কষ্ট অগ্রাহ্য করে আমাকে ডাকল, 'ইসতাসি।'

হঠাৎ সেই ডাক শুনে চমকে উঠলুম।

'এটা রেল-স্টেশন।'

আমি হাত দিয়ে আমার চোখ মুছে নিলুম।

'আমাদের এইখানে খানিকক্ষণ গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে,' আনাতিদাদা বলল, 'এক্ষুনি ট্রেন আসবে।'

এতক্ষণ আমি ভালো করে দেখিনি এই জায়গাটা। ভালো করে দেখার কথাটা আমার মনেই আসেনি। আমার মনে শুধু একটা কথাই বার বার ধাক্কা দিয়ে বলে যাচ্ছে, প্রতিশোধ নিতে হবে, প্রতিশোধ!

সুতরাং আনাতিদাদা যখনই বলল, এখানে লুকিয়ে থাকতে হবে, তখনই আমি ঘুরে-ফিরে দেখবার চেষ্টা করলুম কেমন জায়গা এটা। হ্যাঁ, এটা রেলের স্টেশনই বটে। অনেক রাত হয়েছে বলে লোকজন কম। অবিশ্যি, প্ল্যাটফর্মে আলো ঝলমল করছে। আমরা দুজনে লুকিয়ে-ছাপিয়ে একটা বেঞ্চের ওপর জড়াজড়ি করে বসে রইলুম। এই যে ছুটে আসা, এই যে আলো-ঝলমল স্টেশন, বা পুলিশের ভয়, অথবা বন্দুকের আওয়াজ, সঙ্গে অতগুলো মানুষের আর্তনাদ, এসবের কোনোটাই এখন আমার কাছে কিছু নয়। এখন শুধু বার বার আমার মা আর বাবার কথাই মনে পড়ছে। মনে পড়ছে, মায়ের গান, বাবার ব্যানডুররিয়া বাজাতে-বাজাতে খুশিতে দুলে ওঠা, তার জাগলিং-এর খেলা দেখাবার কসরত, কিংবা তাদের গল্প বলা, তাদের মুখের শব্দগুলি আর প্রাণ-খোলা হাসি। মা হাসলে আমি তার মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতুম। কেননা, হাসতে-হাসতে মায়ের মুখখানি এমন অদ্ভুত আর সুন্দর হয়ে ঝলসে উঠত যে, তুমি তা না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবে না। আমার তখন সত্যিই মনে হত, ভাগ্যিস, আমার মা আমার না হয়ে অন্য কারো হয়ে যায়নি!

হঠাৎ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঝোলানো ঘন্টাটা বেজে উঠল। এদিক-ওদিক দূরে-দূরে অনেকগুলো লাল আলো লাইনের ওপর মাথা উঁচিয়ে পিটপিট করে জ্বলে জানান দিচ্ছে, এদিকের লাইন বন্ধ। যেদিকের লাইনে গাড়ি আসছে, দেখি, সেদিকে সবুজ আলো জ্বলে উঠেছে। উঠে দাঁড়াল আনাতিদাদা। আমার হাতের দিকে তাকিয়ে অনেকটা চাপা গলায় বলল, 'দে।' বলে আমার হাত থেকে ব্যানডুররিয়াটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে এবার বলল, 'চ।'

আমিও উঠে দাঁড়ালুম। আনাতিদাদার হাত ধরে এগিয়ে গেলুম প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি। দেখতে পেলুম, দূরে আলোর একটা বিন্দু ছুটতে-ছুটতে ধেয়ে আসছে। দেখছি যতই সেই বিন্দু এগিয়ে আসছে, ততই বাড়তে-বাড়তে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে সামনে, লাইনের ওপর। সেইসঙ্গে ট্রেনের ক্ষীণ শব্দটাও ধীরে-ধীরে যেন সেই আলোর সঙ্গে তীব্র হচ্ছে। ঝিক-ঝিক-ঝিক-ঝিক।

স্টেশনে ট্রেন এসে থামল। আনাতিদাদার হাত ধরে গাড়িতে উঠতে গিয়েই আমার বুকটা ধড়ফড় করে চমকে উঠল। চোখ ভেসে গেল কান্নায়। অনুতাপে ভগ্নমন বলে উঠল, আমি মা আর বাবাকে চিরদিনের মতো এখানে ফেলে রেখে পালিয়ে যাচ্ছি। আমার পা যেন চলতে চায় না। আনাতিদাদা আমার হাতে টান দিল। আমার চমক ভাঙল। আমি ট্রেনে উঠে পড়লুম। গাড়ি ছেড়ে দিল।

আমরা দুজনে চুপচাপ বসে পড়লুম এক-কোণে। আনাতিদাদা ব্যানডুররিয়াটা আবার আমার হাতে এগিয়ে দিল। আমি সেটা গলায় ঝুলিয়ে নিলুম। আমাদের সঙ্গে আর তো কিছু নেই। এই ব্যানডুররিয়াটা, আর বোধ হয় আনাতিদাদার পকেটে সেই রিভলভারটা। বোধ হয় কেন, নিশ্চয়ই। কেননা, আমি দেখেছি, রিভলভারটা আনাতিদাদা পকেটেই পুরেছে। এক যদি তালেগোলে পকেট থেকে পড়ে গিয়ে থাকে, তা হলে অন্য কথা। তবে এটা ঠিক, হুড়োহুড়িতে আনাতিদাদার জামা-প্যান্ট-জ্যাকেট সবই কেমন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। আনাতিদাদার মুখখানাও এতক্ষণে ট্রেনের আলোয় ভালো করে দেখতে পেলুম। বুঝতেই পারলুম, দুঃসহ ভাবনায় অথবা গভীর দুঃখে সেই মুখখানা চুপসে এতটুকু হয়ে গেছে। আমাকে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকতে দেখেই বোধ হয়, আনাতিদাদা আমার দিকে ফিরে তাকাল। হঠাৎ আমার চোখে চোখ পড়তেই দেখি, যেন তার চোখে ফোঁটা-ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠেছে। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলুম না। চকিতে নিজের মুখখানা জানলার ফাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে ডুকরে-ডুকরে কেঁদে উঠলুম। আমার পিঠে হাত রাখল আনাতিদাদা। হাত দিয়ে পিঠটা আস্তে চাপ দিতেই, আমার কান্নার শব্দটাকে আমি কোনোরকমে সামলে নিলুম। আমি বুঝতে পেরেছি, এভাবে কেঁদে-ওঠাটা আমার ঠিক হয়নি। পাশের লোক কান্না শুনতে পেলে সন্দেহ তো করতেই পারে!

আমি লুকোবার চেষ্টা করলেও আমার ঠিক পাশের লোকটি আমার কান্না শুনতে পেয়েছিল! সে আচমকা যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে বসল, 'কী খোকা, মন কেমন করছে?' তখন আমি চকিতে থমকে উঠে তার দিকে ফিরে তাকিয়েছি।

আনাতিদাদা তো দারুণ চালাক। পাছে আমি কী বলতে কী বলে ফেলি, তাই আমায় উত্তর দেবার সময় না দিয়েই নিজে বলে উঠল, 'হ্যাঁ, মা-বাবাকে ছেড়ে যাচ্ছে তো!'

'কোথায় যাচ্ছে?'

'আমার কাছে। আমি কাকা।'

'ও।'

লোকটা চুপ করে গেলেই ভালো ছিল। তা না, লোকটা আমাকেই আবার বলল, 'কাকার সঙ্গে যাচ্ছ, কাঁদতে আছে!'

আমার আর তখন কান্না! কখন থেমে গেছে! বোধ হয় লোকটার ভয়ে! কারণ, ভাবছি, যদি লোকটা অন্য কিছু জিজ্ঞেস করে! জিজ্ঞেস করে কোথায় যাচ্ছি, তখন কী উত্তর দেব?

অবশ্য সেসব কথা সে জিজ্ঞেস করল না। কিন্তু যে-কথা জিজ্ঞেস করল, তাতে অতি বড়ো সাহসী মানুষেরও বুকের রক্ত জল হয়ে যায়! আমি না-হয় ছোটো ছেলে! কিন্তু আনাতিদাদার মতো শক্তসমর্থ লোকও যখন তার কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল, তখন তুমি কী বলবে বলো?

লোকটা প্রথমে চুপ করেই ছিল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, 'দেখলুম, তোমরা এই স্টেশন থেকেই উঠলে?'

আনাতিদাদা মুখে কথা না-বলে ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

'আমিও এখান থেকেই উঠলুম।' লোকটাও বলল।

আমার বুকের ভেতরটা দুরদুর করে কেঁপে উঠেছে। আবার জিজ্ঞেস করল, 'ওদিকের কোনো খবর জানো নাকি?'

'কোন দিকের?'

'সে কী! জানো না? এমন একটা সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে গেল!'

'আমরা তো কিছুই জানি না!' যেন আকাশ থেকে পড়ল আনাতিদাদা।

লোকটা হাত নেড়ে বলল, 'তাজ্জব ব্যাপার। তোমরা কি শহরে বাস করো না? জানো না, একদল যাযাবরকে আজ পুলিশ ভীষণ ঠেঙিয়েছে! গুলি করে কটাকে খতম করেও দিয়েছে।'

'তাই নাকি।'

লোকটা আবার বলল, 'দেবেই তো। যা বাড়াবাড়ি করছিল! একেবারে ডাকাত মশাই, ডাকাত। ক-দিন ধরে শহরের মানুষকে তিষ্টুতে দিচ্ছিল না। মেরেছে, বেশ করেছে! গভর্মেন্ট তো হুকুমই দিয়েছে, যাযাবর দেখো আর খতম করো। অনেকগুলো ধরা পড়েছে। কটা পালিয়ে গেছে। শুনছি নাকি এই ট্রেনেও কটা লুকিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের খুঁজে বার করার জন্যে পুলিশও এই গাড়িতে ওত পেতে আছে। ওঃ, এই এক জাত মশাই, যাযাবর! ব্যাটাদের না আছে ধম্ম, না আছে কম্ম! শয়তান! শয়তান!'

আমি বলতে পারি, অন্য সময় হলে বাছাধনের ঘাড়ে ধড় থাকত না। এতক্ষণে তিনি ধরাশায়ী হতেন। কিন্তু লোকটার মুখে এইসব আজেবাজে বদনাম শুনেও আনাতিদাদা বেমালুম হজম করে গেল। বোধ হয়, এই গাড়িতে পুলিশ যাযাবরদের ধরবার জন্যে ওত পেতে আছে, এই কথাটা শুনেই তার মাথা ঘুরে গেল! আনাতিদাদা এমনই ঘাবড়ে গেল যে, প্রায় চমকে দাঁড়িয়ে উঠে চক্ষের নিমেষে চলন্ত ট্রেনের চেন ধরে টান মারল! মেরেই, আমায় টানতে-টানতে পালাবার জন্যে দরজার দিকে ধেয়ে গেল। মানুষ বিপদে পড়লে বোধ হয় এমনি করে তার বুদ্ধিটাও লোপ পেয়ে যায়! তা নইলে আনাতিদাদার মতো বুদ্ধিমান মানুষ হুট করে এমন একটা কাঁচা কাজ করে বসবে! এ-কথা ভাবাই যায় না! সঙ্গে-সঙ্গে একগাড়ি লোক হা-হা করে উঠেছে। আমাদের অমন করে পালাতে দেখে প্রথমটা তারা থতমত খেয়ে গেলেও, পরেই তারা 'ডাকাত, ডাকাত' বলে চিৎকার করে আমাদের ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চেনের টানে ট্রেন তো এখন একেবারে স্টপ! আমরা ধস্তাধস্তি করতে করতে ট্রেন থেকে লাফ দেবার চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না! ট্রেনের কামরায় শুরু হয়ে গেল ভীষণ হই-হুল্লোড়! আমি বোধ হয় আমার গলায় ঝোলানো এই ব্যানডুররিয়াটা আর রক্ষা করতে পারলুম না! এক্ষুনি চুরমার হয়ে গেল বলে!

হঠাৎ শুনি, সত্যিই চুরমার হয়ে যাওয়ার শব্দ! চুরমারের শব্দটা ব্যানডুররিয়ার নয়! পকেটে যে রিভলভারটা ছিল, সেইটা বার করে গুলি ছুড়েছে আনাতিদাদা! একটা লোকের গা ছুঁয়ে সেই গুলি ছিটকে লেগেছে ট্রেনের আলোর গায়ে। আলো নিভল। ঝনঝন করে আলোর কাচ ভেঙে পড়ল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে গেল সারাটা কামরা। সেই অন্ধকারে এক-কামরা মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করে মরাকান্না শুরু করে দিল! দেখতে-দেখতে পুলিশও হাজির। তাদের হাতের টর্চ ঝলসে উঠেছে! দৌড়ে এসে তারা কামরাটার মধ্যে ঢুকে পড়তেই আনাতিদাদা আমাকে নিয়ে মেরেছে লাফ! লাফ মেরেই চোঁ-চাঁ দৌড়, একেবারে সামনের দিকে। কামরা-ভরতি অত লোকের মধ্যে একজনও যে আমাদের দেখতে পাবে না, এ তো হতে পারে না। সুতরাং যার নজর গেল, সে-ও অমনি সঙ্গে-সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, 'ওই পালাচ্ছে, ওই পালাচ্ছে!'

আকাশে তখনও জ্যোৎস্না। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, রেল-লাইনের ধারটা। যেখানে আমরা লাফিয়ে পড়েছি, সেখানে এবড়ো-খেবড়ো পাথর ছড়ানো। ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়-মারা খুব শক্ত। তবু সেই পাথরের ওপর দিয়েই ছুটতে-ছুটতে আমরা রেল-লাইনের ঠিক ধারেই একটু নিচুমতো জলা জায়গায় ঝটপট নেমে পড়লুম। নামতে না-নামতে পুলিশের বন্দুক থেকে ক-রাউণ্ড গুলি গুড়ুম-গুড়ুম করে বুক কাঁপিয়ে আমাদের ঠিক মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। ভাগ্য বলতে হবে! ওই নিচু জায়গাটায় নামতে যদি আর এক মুহূর্ত দেরি হত, তবে আমাদের মরণের হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারত না।

আনাতিদাদা কথা না বলে হাঁটু ভেঙে, গুঁড়ি মেরে এগিয়ে চলল। আমাকে ইশারায় অনুসরণ করতে বলল। আমিও এগিয়ে চলি আনাতিদাদার পাশে-পাশে।

শুনতে পাচ্ছি, পুলিশ এগিয়ে আসছে। তার সঙ্গে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে-করতে ছুটে আসছে ট্রেনের যাত্রীরা। আমি জানি, আর রেহাই নেই। এবার নিশ্চিত ধরা পড়ব। ঠিক তক্ষুনি জলাটার ধার ঘেঁষে বেশ একটা ঘন ঝোপঝাড়ের জঙ্গল যেন নজরে পড়ল আমাদের। মাঝে-মাঝে দেখা যাচ্ছে, কটা বড়ো বড়ো গাছ। আনাতিদাদা আর কিছু না পেয়ে আমাকে হ্যাঁচকা মেরে ওই ঝোপের মধ্যেই ধাঁ করে ঢুকে পড়ল। পুলিশের দল তো প্রায় এসেই পড়েছে। যতই জ্যোৎস্না ঝিলিক মারুক, চাঁদ তো আর সূর্যের মতো চারিদিকে স্পষ্ট আলোয় ভরিয়ে দিতে পারে না। রাত সে রাতই! সুতরাং বলতে পারি, ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়ার ফলে আমরা অন্তত কিছুক্ষণের জন্যেও পুলিশের হাত থেকে বাঁচলুম! কেননা, এই ঝোপের মধ্যে, এই জ্যোৎস্না রাতে সবকিছু ঠিক ঠিক ঠাওর করা খুবই মুশকিল।

কিন্তু মুশকিল সে তো তোমার-আমার কাছে। পুলিশের কাছে মুশকিল-টুশকিল বলে কোনো কথা নেই। তার ওপর তাদের হাতে বড়ো বড়ো টর্চ। ঝোপের মধ্যে তাদের টর্চের আলো ঝলসে উঠতেই, আমি জানি, নির্ঘাত ধরা পড়ে গেছি! এই বুঝি টর্চের আলো আমাদের গায়ের ওপর ঠিকরে পড়ল!

প্রথমে আমি ভেবেছিলুম, ঝোপটা তেমন কিছু নয়। বুঝি একটুখানি। ওই সাংঘাতিক উত্তেজনায় আর উৎকণ্ঠায় সব কেমন গোলমাল হয়ে গেছল আমার। তার ওপর জ্যোৎস্নারাতের কুহেলি আলো! সুতরাং ঝোপের চেহারাটা বুঝে ওঠা, আমি কেন, কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। শুনলে বোধ হয় অবাক হয়ে যাবে, এটা আদপে ঝোপই নয়। যেটাকে এতক্ষণ ঝোপ বলে ভ্রম হচ্ছিল, আসলে সেটা একটা মস্ত ঘন জঙ্গলের শুরু! এ-কথাটা আনাতিদাদাই বা জানবে কী করে! কিন্তু পুলিশের টর্চ জ্বলে উঠতেই ব্যাপারটা বোঝা গেল। অন্য সময় হলে এই রাত-দুপুরে কে আর শখ করে এই জঙ্গলে ঢুকতে সাহস করে! পুলিশও হয়তো সাহস করল না। কেননা, তাদের পায়ের শব্দ শুনে মনে হচ্ছে, জঙ্গলের বাইরে থেকেই তারা ঝোপঝাড় সরিয়ে-মুড়িয়ে আমাদের খোঁজাখুঁজি করছে। আমি একেবারে স্পিকটি নট! আনাতিদাদার গা ঘেঁষে সিঁটিয়ে রইলুম! কিন্তু বিপদ যখন আসে, সে তো একা আসে না। হল কী, বোধ হয় একটা বড়ো-সড়ো গিরগিটি টপাস করে আমার পিঠের ওপর লাফিয়ে পড়ল! আমি তো আঁতকে উঠেছি। তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে সেটাকে যেই সরিয়ে দিতে গেছি অমনি বেমক্কা হাতটা গিয়ে পড়ল আমার গলায় ঝোলানো ব্যানডুররিয়াটার তারে! আচমকা ঝন করে সেটা বেজে উঠতেই পুলিশের দল ও তার সঙ্গে জনতা চিৎকার করে উঠেছে, 'ওইখানে, ওইখানে!'

আমরা এবার ধরা পড়লুম বলে! ছিঃ! ছিঃ! আমার অসাবধানে এ কী বিপদ ঘটে গেল! আনাতিদাদা সেই বিপদের কথা বুঝতে পেরেই, ঝট করে আমার জামাটা খামচে ধরে মারল এক ঝটকা-টান! তারপর সেই ঘন জঙ্গলের মধ্যে ছুট!

ছুট বললেই তো আর জঙ্গলের মধ্যে ছোটা যায় না! চারিদিকে ছোটো-বড়ো নানান গাছ। কাঁটা-ঝোপ, ডালপালা! গায়ে লাগছে, পায়ে ফুটছে। হয়তো রক্ত পড়ছে। কিন্তু সে-সব এখন কিছু নয়! কারণ, আমাদের ধরবার জন্যে টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে পুলিশদলও তেড়ে আসছে! তারা আমাদের সোজাসুজি দেখতে না পেলেও, আমাদের ছোটার সঙ্গে-সঙ্গে গাছে-গাছে, ঝোপে-ঝাড়ে গায়ের ধাক্কা যতই লাগছে, ততই শব্দ হচ্ছে আর ঝোপঝাড়গুলো নড়ে উঠছে। আমরা কোন দিকে পালাচ্ছি, হদিস করে ফেলতে তাদের এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না। সুতরাং তারা চোখ-কান বুজে সেইদিকেই বন্দুক ছুড়ল গুড়ুম-ম-ম! আমার লাগেনি। আনাতিদাদার লাগল কি না বলতে পারছি না। কিন্তু আনাতিদাদা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমার হাতটা চেপে ধরল। তারপর সেই ঘুপচি জঙ্গলের মধ্যে ঝুপ করে বসে পড়ল। আমিও বসে পড়েছি। একদম নিশ্বাস চেপে, নিঃসাড়ে শুনতে লাগলুম গাছপালা টপকে ওরা এদিকেই আসছে! ওরা বোধ হয় ভেবেই নিয়েছে গুলি খেয়ে আমরা ঘায়েল হয়েছি।

ওরা যখন আমাদের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে, আমাদের প্রায় ধরে-ধরে, তখনও আনাতিদাদাকে চুপটি করে বসে থাকতে দেখে, আমি ধরেই নিয়েছিলুম, আনাতিদাদার গায়ে গুলি লেগেছে! কিন্তু তা তো নয়! কেননা, এবার হামাগুড়ি দিয়ে আনাতিদাদা আমাকে নিয়ে আরও একটু নিরাপদ জায়গায় যাবার জন্যে খুব সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে চলল। বুকে ভর দিয়ে চলতে হচ্ছে বলে, আমার গলায় ঝোলানো ব্যানডুররিয়াটা হাতে নিয়েছি। কী যে অসুবিধা হচ্ছে, তোমাদের বোঝাতে পারব না! বুকের ছাল-চামড়া ছিঁড়ছে! ওরা যেদিকটা লক্ষ করে এগোচ্ছে, আনাতিদাদা একটু পাশ কাটিয়ে ঠিক তার উলটো দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ওদের চোখে প্রায় ধুলো দিয়ে আনাতিদাদা এমন একটা জায়গায় এসে লুকিয়ে পড়ল যে, আমার মনে হল, হয়তো বা এ-যাত্রা ওদের হাত থেকে আমরা রক্ষা পেলুম। আমার মনে হলে কী হবে! ওরা তো ছাড়বার পাত্র নয়! আমাদের খুঁজে না-পেয়ে, সেই পুলিশের দল একেবারে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড শুরু করে দিল। সেই জায়গাটাকে ঘিরে ফেলে তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল। ওরা যেদিকে টর্চের আলো ফেলছে, ঠিক তার উলটো দিকে অন্ধকারটা মনে হচ্ছে, আরও গাঢ়। সুতরাং এই গাঢ় অন্ধকারে আমাদের আরও বেশ খানিকটা দূরে সরে আসতে সুবিধাই হল। ওরা ওদিকে চেঁচামেচি করে তল্লাশি চালাচ্ছে, এদিকে আমরাও নিঃশব্দে জঙ্গলের আরও গভীরে ঢুকে পড়ছি। তারপর যখন মনে হল, ওদের নাগালের বাইরেই চলে এসেছি, আনাতিদাদা তখন দাঁড়িয়ে উঠে আমাকে প্রায় ছোঁ মেরে টেনে নিল তার কাছে। তারপর ওই অসংখ্য গাছগাছালি আর ভয়ংকর অন্ধকার পেরিয়ে, খানিকটা হেঁটে, অনেকটা ছুটে আর মাঝেমধ্যে ডিঙিয়ে লাফিয়ে পিটটান দিল! আমি হলপ করে বলতে পারি, অন্য সময় হলে রাত-দুপুরে বনে-জঙ্গলে ঢোকা তো দূরের কথা, আনাতিদাদা আমাকে এর আশপাশে ঘুরঘুর করতেই দিত না। আজ সেই আনাতিদাদাই আমাকে নিয়ে জঙ্গলের জালে জড়িয়ে পড়ে এক ভয়াবহ বিপদের সঙ্গে লড়াই করছে! এই বিপদসংকুল জঙ্গলে এই মুহূর্তে হঠাৎ কোনো হিংস্র জীব আমাদের যে আক্রমণ করতে পারে, সে কথা হয়তো এখন আনাতিদাদা ভাবতেই পারছে না। কিন্তু কপাল বলো আর যাই-ই বলো, আমরা এখনও বেঁচে আছি। পুলিশের গুলি অথবা জঙ্গলের জন্তু, কেউ-ই এখনও পর্যন্ত আমাদের মেরে ফেলতে পারেনি। যদিও পুলিশের হাত থেকে আপাতত আমরা বেঁচেছি, কিন্তু গভীর জঙ্গলের জন্তুর হাত থেকে আমরা নিস্তার পাব কি না, তা এখনই বলতে পারি না। আমরা চুরি করিনি, ডাকাতি করিনি, করিনি খুন-জখমের মতো কোনো অন্যায় কাজ, তবু সেই দেশের মানুষের চোখে, সরকারের চোখে আমরা শত্রু। আমাদের শেষ করতে ওদের বারুদের গুলি তাই গর্জে উঠেছে। আমরা যতই গান গাই, যতই বাজনা বেজে উঠুক আমাদের হাতে, সে সুরে তোমার মনে দোলা লাগলেও, ওরা টলবে না। সুতরাং খুনি-দস্যু অথবা লুঠেরার মতো জঙ্গলের এই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে আমাদের ছুটে পালাতেই হবে!

আচ্ছা, আমরা কি সত্যিই বেঁচে গেছি? বলতে পারি না। তবে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমাদের এখন। কারণ, যত ভয় পেয়েছি, তার চেয়ে দৌড়-ঝাঁপ করেছি অনেক বেশি। হাত দিয়ে ডালপালায় ঠেলা মারতে মারতে, অথবা পা দিয়ে কাঁটা মাড়াতে মাড়াতে আমাদের হাত-পা দুই-ই গেছে! শুনতে পাচ্ছি আনাতিদাদার নিশ্বাসের তীব্র শব্দ। হাঁপাচ্ছে! আমিও! আমাদের মুখে কোনো কথা নেই। দুজনেই অবাক। একটু আগে জঙ্গল জুড়ে ঝিঁঝির একটানা যে-শব্দ কানের ভেতর তোলপাড় করছিল, এখন তা-ও যেন কত অস্পষ্ট! এই প্রায় শব্দহীন অন্ধকার জঙ্গলের এইখানে এসে আমার পা-দুটো যেন আর চলতে চাইছিল না। আমি বুঝতে পারছি, আনাতিদাদারও কষ্ট হচ্ছে। তবু আনাতিদাদা হাঁটছে। আমি আর পারলুম না। একটা গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরলুম। সেই গুঁড়ির গায়ে নিজের মাথাটা ঠেকিয়ে হাঁসফাঁস করতে লাগলুম। আমি বুঝতে পারলুম, আনাতিদাদাও দাঁড়িয়ে পড়েছে। মুখ তুলে দেখি, আমার মতো আনাতিদাদাও আর একটা গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরে ছটফট করছে।

কষ্টটা একটু যখন থিতিয়ে এল, আমি আগুপিছু কিছু না ভেবেই বসে পড়লুম সেই গাছের নীচে। উঃ! দাঁড়াতে পারছিলুম না। গাছের নীচের এই অসমান জায়গাটা ঘিরে কত যে ঘুপচি-ঝোপে ভরতি হয়ে আছে,তা কি আর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি! হয়তো এটা সাপখোপের আড্ডাখানা। সে-কথা আর তখন কে ভাবছে! এখন একটু স্থির হয়ে বসতে পারলেই বাঁচি। শরীরের কোন জায়গাটায় যে কেটেছে, কোথায় লেগেছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে, সারা শরীরটাই যেন জ্বলে যাচ্ছে আমার। অসহ্য যন্ত্রণা।

আমার কাছে এগিয়ে এসেছিল আনাতিদাদা। জঙ্গলের গাঢ় অন্ধকারে কেউ কারোরই মুখ দেখতে পাচ্ছি না। আনাতিদাদাও আমার পাশে বসে পড়তে মনে হল, আমারই মতো তারও কষ্ট হচ্ছে। এই নিস্তব্ধ অন্ধকারে আমাদের নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটা মনে হচ্ছে যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো মাঝে-মাঝে গর্জে উঠছে। আমি চমকে যাচ্ছি। এরই ফাঁকে অনেক কষ্টে আমিই প্রথম কথা বললুম। কাঁপা গলায় ডাক দিলুম, 'আনাতিদাদা!'

'অ্যাঁ?' আনাতিদাদার গম্ভীর গলার স্বরটা এখন কেমন যেন ভাঙা-ভাঙা ক্লান্ত সুরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল।

'রিভলভারটা?'

আনাতিদাদার হাত দুটো ভীষণ ছটফটিয়ে পকেটটা পরখ করে স্থির হয়ে গেল। 'হ্যাঁ, আছে।'

আমি বললুম, 'ওদের অনেক লোক। যদি জঙ্গলটা ঘিরে ফেলে?'

আনাতিদাদা বলল, 'আমরা জঙ্গলের অনেক গভীরে চলে এসেছি। হয়তো খুঁজে পাবে না।'

'এর পর?'

'আজ রাতটা এখানেই কাটাতে হবে!'

'তারপর?'

'সকালে এখান থেকে বেরিয়ে পড়ব।'

'কোথায় যাবে?'

'জঙ্গলের বাইরে।'

'ওরা দেখে ফেললে?'

'রিভলভারটা যখন এখনও হারায়নি, তখন আশা করতে পারি ওটা কাজে লেগে যাবে।' আনাতিদাদার গলায় স্বরটা এখন ভারি দৃঢ়। বলল, 'মরার আগে কটাকে খতম করতে নিশ্চয়ই অসুবিধা হবে না। ভয় পাস না!'

আনাতিদাদার সেই গলার স্বর শুনে, আমার গলার স্বর, স্তব্ধ হয়ে গেল।

আবার নিস্তব্ধতা। নিস্তব্ধ এই জঙ্গলে এখন আমরা প্রাণ হাতে নিয়ে সকালের জন্যে অপেক্ষা করছি। আমরা জানি না, এখন কত রাত্রি। জানি, আনাতিদাদার হাতে একটা ঘড়ি আছে। কিন্তু এই অন্ধকারে শত চেষ্টা করলেও সেই ঘড়ির মধ্যে সময়ের আঁকগুলো খুঁজে পাওয়া খুবই শক্ত। হঠাৎ এমনই সময়ে আনাতিদাদাই আবার কথা বলল, 'ব্যানডুররিয়াটা?'

সেটা আমি হাত থেকে নামিয়ে পাশে রেখে দিয়েছিলুম। আনাতিদাদা জিজ্ঞেস করতেই আমি তাড়াতাড়ি সেটা হাত বাড়িয়ে দেখে নিয়ে বললুম, 'এই তো!'

'যাক, বেঁচে গেছে।'

'ভেবেছিলুম ভেঙে যাবে।'

আনাতিদাদা আমার কথা শুনে নিশ্বাসে বুকটা ভরে নিয়ে বলল, 'কোনোদিনই ভাঙবে না।'

'কেন?'

'তুই যে ওটাকে বড্ড ভালোবাসিস।'

আনাতিদাদার এই কথা শুনে আমি নিশ্চুপ হয়ে গেলুম। মনে পড়ে গেল আমার বাবার কথা। গলায় ঝুলিয়ে সেই ব্যানডুররিয়া বাজানোর দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে উঠল। বড্ড ভালোবাসত বাবা বানডুররিয়াটা। আর ভালোবাসত বলেই বুঝি অত মিষ্টি সুর তার হাতের আঙুল ছুঁয়ে ওই তারে বেজে উঠত।

'কী ভাবছিস, ইসতাসি?' আনাতিদাদা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

আনাতিদাদার গলা শুনে আনমনা আমি থতমত খেয়ে গেছি। তাড়াতাড়ি উত্তর দিলুম, 'কিচ্ছু না।'

'চুপ করে আছিস কেন?'

'ভাবছি, সব দোষ আমার!'

'কীসের দোষ?'

'তখন আমার হাতটা আচমকা লেগে গেল বলেই তো ব্যানডুররিয়ার তারটা বেজে উঠল, আর সঙ্গে-সঙ্গে সেই ঝোপের মধ্যে পুলিশও আমাদের হদিস পেয়ে গেল। তা নইলে পুলিশ হয়তো আমাদের খুঁজেই পেত না!'

আমার কথা শেষ হতে না হতেই আনাতিদাদা সামনে চেয়ে আচম্বিতে আমার মুখটা চেপে ধরল। আমি থতমত খেয়ে গেছি। ভয়-পাওয়া চোখদুটো আমার অন্ধকারে স্থির হয়ে গেল। যদিও আনাতিদাদা হাত দিয়ে আমার মুখটা চেপে ধরে আছে, বুঝতে পারলুম, তার চোখ দুটো অন্যদিকে চেয়ে আছে। চেয়ে আছে সামনে। আমিও তাকালুম সেইদিকে। আনাতিদাদা গলার স্বরটাকে একেবারে না শোনার মতো চেপে বলল, 'দেখতে পাচ্ছিস?'

দেখতে পাওয়ার মতো তেমন কিছু তখনও দেখতে না পেয়ে আমিও আরও চাপাস্বরে জিজ্ঞেস করলুম, 'কী?'

'দুটো চোখ!'

আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। স্বাভাবিক কারণেই সেই চোখদুটো দেখার জন্যে আমার চোখদুটোও ছটফটিয়ে ঝলসে উঠল। কিন্তু অন্ধকার ঘুটঘুটে বনে কোথায় যে সেই চোখ, আমি আঁতিপাতি করেও তা দেখতে পেলুম না। তাই আবার জিজ্ঞেস করলুম, 'কই?'

জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে দেখি, আনাতিদাদার চোখদুটো এতক্ষণ যে-দিকে স্থির হয়েছিল, সেদিকের ঝোপটা মড়মড় করে কেঁপে উঠেছে। মনে হল, দুরন্ত গতিতে কে যেন অন্য কোথাও লুকিয়ে পড়ল। আমি আঁতকে আনাতিদাদাকে জড়িয়ে ধরলুম। আনাতিদাদা চোখের পলকে রিভলভারটা পকেট থেকে বার করে ফেলল। আমরা দুজনেই ধড়ফড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম। বুঝতেই পারছ, আমরা দুজনেই তখন বোবা হয়ে গেছি। উত্তেজনায় দুজনেই হাঁপাচ্ছি। আমাদের নিশ্বাসের শব্দগুলোকে সামলাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। পারছি না। আমি ভেবেই নিয়েছিলুম, এ বোধ হয় পুলিশ! কারণ সেই মুহূর্তে পুলিশ ছাড়া আমার মাথায় আর কী ঠাঁই পাবে! সুতরাং আমি তখনই মনে মনে তৈরি হয়ে গেছি, এক্ষুনি মরব আমরা। এই বোধ হয় পুলিশের গুলি এসে লাগল আমাদের বুকে।

কিন্তু আশ্চর্য, সেই অবস্থায় সেইখানে অনেকক্ষণ জবুথবুর মতো দাঁড়িয়ে থেকেও পুলিশের গুলির আওয়াজ অথবা অন্য কোনো শব্দ আমরা শুনতে পেলুম না। এমনকী আর কিছু নজরেও পড়ল না। তখনই আবার ভয়-জড়ানো গলায় আনাতিদাদাকে জিজ্ঞেস করলুম, 'পুলিশ?'

আনাতিদাদা হাতের রিভলভারটা তেমনি হাতে উঁচিয়ে বলল, 'বোধ হয় না।'

আমি বললুম, 'তবে?'

'বুঝতে পারছি না।'

পুলিশ নয়, এই কথাটা শুনে আমার আরও গোলমাল হয়ে গেল সব কিছু। পুলিশ না হলে আর কী হতে পারে? এমন ঘন জঙ্গলে, এই গভীর রাতে আর কে আমাদের লুকিয়ে-লুকিয়ে দেখবে? আমি ভেবে কূল পাচ্ছি না। এমন সময় আনাতিদাদা হঠাৎ আমার হাতটা আবার ধরল। একটু দূরে সরিয়ে আনল। অবশ্য আনাতিদাদা তার চোখের দৃষ্টিটা সেই ঝোপের দিকেই স্থির রেখে দিল। তারপর তড়িৎগতিতে আর একটা মস্ত গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। সেখান থেকে উঁকি-ঝুঁকি মারতে লাগলুম।

অনেকক্ষণ পরে যখন মনে হল, তেমন কিছু নয়, তখন আমার নিশ্বাসের শব্দটাও প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। কিন্তু তবু আনাতিদাদাকে নিশ্চিন্ত হতে দেখলুম না। তার হাবেভাবে মনে হল না, এই গাছটার আড়াল থেকে আনাতিদাদা এখনই বেরিয়ে পড়বে। সুতরাং মনে মনে ভেবে নিলুম, তাহলে বোধ হয় বিপদ এখনও কাটেনি। কাজেই আনাতিদাদার গা ঘেঁষে আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলুম।

এমন সময় হঠাৎই আমার মনে হল, আমার পিঠের ওপর যেন একটা গরম বাতাস ধাক্কা মারছে! আমি বুঝতে পারলুম, এ কারো নিশ্বাসের ধাক্কা! নিশ্চয়ই আমার পেছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে! ঝট করে পিছন ফিরে তাকাতেই আমি ভয়ে নিথর পাথর! আমার পেছনে তখন কোনো পুলিশ না, কোনো মানুষ না। একটা অচেনা জন্তু! জন্তুটা তার মাথাটাকে আমার পিঠে টিপ করে দাঁড়িয়ে আছে! মনে হল, এই বুঝি ঢুঁ মেরে আমার পিলে ফাটিয়ে দেয়! বুঝতেই পারছ, আমি নেহাতই ছোটো। সুতরাং আমার পক্ষে সেই ভয়ংকর চেহারার জন্তুটাকে দেখে, সেই সময় চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকা কি সম্ভব? আমি চিৎকার করে উঠলুম, 'আনাতিদাদা—'

আচমকা আমার এমন চিৎকার শুনে আনাতিদাদাও বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে! সেই জন্তুটার দিকে নজর পড়তেই আঁতকে চিৎকার করে উঠল, 'ইসতাসি, বাইসন!' বলেই আমার হাতটা ধরে মারল লাফ! তারপর দৌড়!

আমি বুঝতে পারলুম,! এ-দৌড় আমাদের বাঁচার জন্যে ব্যর্থ চেষ্টা! কেননা, এখানে সহজে দৌড় দেওয়া যায় না, সে-কথা তোমাদের আগেই বলেছি। আর দৌড়তে পারলেও, জঙ্গলের জন্তুর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া আমাদের কম্ম নয়। সুতরাং আনাতিদাদা আমার হাত ধরে এর ফাঁকে ওর ফাঁকে ঘুরপাক খাচ্ছে বটে, কিন্তু জন্তুটাও তাড়া লাগিয়ে আমাদের প্রায় কাবু করে ফেলেছে! আমরা দুজনেই এমন ভয় পেয়ে গেছলুম যে সেই সময়ে রিভলভারটা ছুড়লে যে বাঁচি সেকথা কারোরই মনে পড়ল না! একবার যদি মনে পড়ত, তবে প্রাণ বাঁচাতে এত ছোটাছুটির দরকারই হত না! তাছাড়া জন্তুটার জঙ্গলের ঘোঁতঘাঁত সবই জানা! আমরা তার সঙ্গে পারব কেন! চরকি খেতে-খেতে আমাদের যতই দম ছুটে যায়, বাইসনটার ততই যেন তেজ বাড়ে! শেষমেশ আমারই পিঠের ওপর সেই বিকট চেহারার বাইসনটাটেনে মারল এক গোঁত্তা! আমি আর কিছু জানি না। শুধু এইটুকু মনে আছে, বাইসনের মাথার সেই প্রচণ্ড গোত্তা যখন আমার পিঠে এসে পড়ল মনে হল, যেন খুব উঁচু একটা পাহাড়ের ওপর থেকে একটা পাথরের চাঁই আমার ঘাড়ে পড়েছে! আমি গুঁড়িয়ে গেছি! আমার টুকরো-টুকরো হাড়গোড়গুলো সাত হাত দূরে-দূরে ছিটকে ছড়িয়ে গেছে! তারপরেই আমার চোখে সব অন্ধকার!

ধীরে-ধীরে আমার চোখের অন্ধকার যখন কেটে গেল, তখন রাতের অন্ধকারও চলে গেছে। আমার জ্ঞান ফিরে এসেছে। কিন্তু কেমন যেন একটা আচ্ছন্নভাব। আমি কিছুই ভালো করে দেখতে পাচ্ছিলুম না। সবই কেমন যেন অস্পষ্ট! সুতরাং আমি বুঝতে পারলুম না, এখন আমি কোথায় শুয়ে আছি!

একটু পরেই আমার চোখের ঝাপসা ভাবটা কেটে যেতে আমি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসতে গেছি। পারিনি। উঠতে গিয়ে পিঠের ওপর এমন একটা প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলুম যে, ওঠা তো দূরের কথা, মনে হল আমার পিঠের শিরদাঁড়াটা বুঝি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে! অন্য সময় হলে নিশ্চয়ই ওই ব্যথার চোটে ককিয়ে উঠতুম। কিন্তু এখন এই অসহ্য যন্ত্রণাতেও আমার মুখ ফুটে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত বেরোল না। আসলে এই মুহূর্তে আমার মুখ দিয়ে কথা না ফোটারই কথা! কারণ আমার জ্ঞান ফিরে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা মিষ্টি শব্দ যেন আমার কানে ভেসে এল। মনে হল, বুঝি বা আমার ব্যানডুররিয়ার তারে-তারে কার যেন আলতো হাতের ছোঁয়া লাগছে! তারগুলো টুংটাং করেবেজে উঠছে। তুমি হয়তো ভাবতে পারো, আমি এখনও সেই জঙ্গলেই পড়ে আছি, আর আনাতিদাদা আমার পাশে বসে বসে ব্যানডুররিয়ার তারে টান দিচ্ছে! এ তো আনাতিদাদা হতেই পারে না! আনাতিদাদার হাতে অমন সুরে ব্যানডুররিয়া কখনোই বাজতে পারে না। সুতরাং চোখদুটোকে আরও একটু ভালো করে মেলে ধরলুম। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলুম, এ জঙ্গলের ঝোপঝাড় নয়, আমি একটা ঘরের মধ্যে শুয়ে আছি। সেই ঘরে আমার সামনে একটি ছোট্ট মেয়ে বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে, সে আমার চেয়েও ছোট্ট। তারই হাতে আমার ব্যানডুররিয়া। আমি চোখ মেলে তার দিকে চেয়ে দেখতেই, তার বাজনা থামল। সে হাসল। ঠোঁটের হাসির সঙ্গে তার অবাক চোখের চাউনিটি আমার চোখ এড়াল না। সে বাজনা রেখে আমার কাছে এগিয়ে এল। আমি তাকে এখন আরও কাছ থেকে দেখলুম। অবাক হয়ে গেছি। কারণ তার পরনের এ-রকম সাজ এর আগে আমি আর কখনো দেখিনি। সে পরেছিল, কোমর থেকে হাঁটু অবধি লম্বা একটা ফুল-আাঁকা গোল ঘাগরা। দু-হাতের নীচ দিয়ে টান-টান করে এমন একফালি রঙিন কাপড় গায়ের ওপর জড়িয়ে রেখেছে যে, দেখলেই তোমার মনে হবে পাখির ডানা। তার সেই গোল ঘাগরাটার কোমর ঘিরে পাখির পালক সাজানো, মাথায় তার নানান রঙের বুনো ফুল। গায়ের রংটা তার তামাটে বলে, হাসতে হাসতে তার দাঁতগুলি যখনই হঠাৎ-হঠাৎ ঠোঁটের ফাঁকে ঝিলিক দিচ্ছিল, মনে হচ্ছিল, একঝলক জলের ফেনা ঝকঝক করে উঠছে! সে আমার গায়ে হাত রাখল। তারপর সেই হাতটি আমার কপাল ছুঁয়ে মাথায় উঠে এল। আমি তাকে দেখে অথবা তার আদর-মাখা হাতের স্পর্শ পেয়ে কিছুই বুঝে উঠতে পারলুম না। সুতরাং এবার আমি আগের মতো ধড়ফড়িয়ে ওঠবার চেষ্টা না করে, খুব সাবধানে হাতের ওপর ভর দিয়ে মাথা তোলবার চেষ্টা করলুম। মেয়েটি আমায় উঠতে দেখে এমন ব্যস্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল যে, সেই চিৎকারে হয়তো-বা মেয়েটির মা-ই হবে, বাইরে থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল আমার কাছে। আমায় উঠতে দিল না। আবার শুইয়ে দিল। তারপর মুখে কী-সব অদ্ভুত শব্দ করে কী যে বলল, তার ঠিক-ঠিক মানে আমি খুঁজে পেলুম না। তবে হাবেভাবে বুঝতে পারলুম, আমায় উঠতে বারণ করছে। সুতরাং আমি হতভম্বের মতো আবার শুয়ে পড়লুম, আর অবাক হয়ে ভাবতে লাগলুম, কে এরা? এই ছোট্ট মেয়েটি আমায় শুতে দেখে আবার খুব নিশ্চিন্তে হেসে ফেলল। আর এই ছোট্ট মেয়েটির মা চোখের পলকে কোথায় যে চলে গেল! অবশ্য বেশিক্ষণ না। নিমেষে একটা পাত্র করে কিছু নিয়ে এল। আমায় অত্যন্ত সাবধানে নিজের কোলের কাছে টেনে নিল। সেই পাত্রটা আমার মুখের কাছে ধরে আদর করে কিছু বলল। আমি বুঝতে পারলুম, পাত্রের মধ্যে যা আছে, সেটা আমায় খেতে বলছে। আমি তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। আমি এদের কাউকে চিনি না। কেমন করে এখানে এলুম জানি না। সুতরাং ওই পাত্রে মুখ ঠেকিয়ে ওই খাবারটা খেতেও আমার মন সরল না। আমি মুখ সরিয়ে নিলুম। কিন্তু আশ্চর্য! আমি অবাধ্য হলে আমার মা যেমন একটুখানি গলার স্বর তুলে ছোট্ট করে বকে দিত, ওই মেয়েটির মা-ও আমাকে ঠিক তেমনি করে বকল! তারপর সে হয়তো বলল, না খেলে কষ্ট হবে। আমার মুখখানা তার কোলের কাছে আর একটু টেনে নিয়ে আমার মুখে সেই পাত্রের খাবার ধীরে-ধীরে ঢেলে দিল। আমি খেয়ে ফেললুম। কিন্তু কী খেলুম, বুঝতে পারলুম না। কেননা, এটা যে দুধ নয়, তা বুঝতে আমার দেরি হল না। আমি সেটা খেয়ে নিতেই সে আমার মুখটা মুছিয়ে দিয়ে এমন স্বস্তির সঙ্গে নিশ্বাস ফেলল যে, তাই দেখে তার মেয়ের মুখখানিও খুশিতে উছলে উঠল। খুশি হয়ে তার মা আমার কপালে চুমু খেল। তাকে চুমু খেতে দেখে, মেয়েটিও আমার কপালে তার হাতটি রেখে, হাতের আঙুলগুলি আমার মাথায় নামিয়ে আনল। তারপর চুলের মধ্যে বিলি কাটতে-কাটতে কত কথা যে বলতে লাগল তার একটা অক্ষরও বোঝে কার সাধ্য! আসলে এখন আমি বুঝতে পারছি, আমি যেখানে এসেছি তাদের ভাষা আমার ভাষা নয়। সুতরাং তাদের কথার মানে বোঝার কথাই উঠতে পারে না।

এখন আমি শুয়ে-শুয়ে বেশ দেখতে পাচ্ছি, এটা একটা ঘর। ওপরে গাছের পাতা বিছিয়ে ছাত হয়েছে। চারপাশে গাছের ডাল গেঁথে দেওয়াল হয়েছে। আমি শুয়ে আছি ঘরের ভেতর একটা গাছের ছালের বিছানায়। এতদিন তাঁবুতে শুয়ে-শুয়ে এমন অভ্যেস হয়ে গেছে যে, এই গাছের পাতা-ছাওয়া ঘরে শুতে আমার অস্বস্তি লাগারই কথা। কিন্তু আপাতত আমার তেমন কিছু হচ্ছে না। ঘরের মধ্যে দু-দিকে দুটো বড়ো জানলা। সেখান দিয়ে সকালের সূর্যের আলো ঘরের মধ্যে যতটা ছড়িয়ে পড়ছে, তার চেয়েও বেশি ছড়িয়ে পড়ছে সূর্যের আলোর সঙ্গে গাছের ছায়া। হ্যাঁ, ওই জানলার দিকে চোখ রেখে যেটুকু দেখতে পাচ্ছি, তা খালি গাছ আর গাছ। সুতরাং আমি বুঝতে পারলুম, এ বোধ হয় সেই জঙ্গলের মধ্যেই কোনো-এক জঙ্গলের মানুষের ঘর। আমি শুনেছি, এখনও এমন অনেক মানুষ আছে, যারা গভীর জঙ্গলে বাস করে। শহরের আলো-বাতাসের খবর তাদের জানা নেই। অন্তত এদের দেখে আমার তাই মনে হচ্ছে। ছোট্ট মেয়েটির পোশাক, তার সাজগোজ, তার মায়ের পোশাক, নাকে একটা এত বড়ো পাথরের নাকচাবি, হাতে পোড়া-মাটির চুড়ি, পায়ে পাতাবাহারের মল, এমনকী মাথায় চুলের বেণী দেখলেও এ-কথাটা তোমাদেরও বিশ্বাস হবে। এদের দেখে, তাই, এখনই আমার যেটা মনে হল তা হচ্ছে, বাইসনের আক্রমণে আহত অবস্থায় জঙ্গলে পড়ে থাকতে দেখে এরা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। শুনেছি, গভীর জঙ্গলের মানুষ ভীষণ হিংস্র হয়। অনেক জঙ্গলের মানুষের পরনে কাপড়জামা কিছু থাকে না। তির-ধনুক বানিয়ে বনের জন্তু শিকার করে তারা খায়। এমনও শুনেছি, অনেক বন্য-মানুষ তো মানুষের মাংস পেলে আর কিছু চায় না। এই কথাটা মনে হতেই আমার বুক দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। আর ঠিক তক্ষুনি এ-পাশ ও-পাশ তাকিয়ে আমি আঁতকে উঠেছি! তাই তো, আনাতিদাদাকে দেখছি না তো! ঘর আর কতটুকু। ঘরের মধ্যে আনাতিদাদা থাকলে এতক্ষণে আমার চোখ ঠিক দেখতে পেত। আনাতিদাদাকে দেখতে না-পেয়েই আমি আবার ধড়ফড়িয়ে উঠতে গেছি। ঠিক সেই সময়ে সেই ছোট্ট মেয়েটি গলায় সুর টেনে-টেনে মুখ দিয়ে এমন সব অদ্ভুত শব্দ বার করে চেঁচিয়ে উঠল যে, তাই শুনে আমি একেবারে হতবাক! সেই শব্দের মাথামুণ্ডু আমি কিছু বুঝতে না পারলেও, সে যে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে গান গাইছে, সেটা ধরে নিতে আমার বেশি সময় লাগল না। গানের তালে তার ঢুলু-ঢুলু চোখ দেখে, মাঝে-মাঝে মুচকি-মুচকি হাসি আর থেকে-থেকে গানের ফাঁকে আঃ! আঃ! করে ধমকে উঠার শব্দ শুনে, আমি আরও কেমন ভয় পেয়ে গেলুম। আমার মনে হল, একটা জলজ্যান্ত মানুষ হাতে পেয়ে ছোট্ট মেয়েটা পর্যন্ত খুশি! আমাকে মেরে ভোজ বসাবে বলেই হয়তো আনন্দে গাওনা শুরু করে দিয়েছে। এই কথাটা মনে হতেই আমি আর স্থির থাকতে পারলুম না। আমার মাথা থেকে ছোট্ট মেয়েটার হাত এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে উঠে বসলুম। পিঠে যদিও ব্যথা প্রচণ্ড, তবু প্রাণের চেয়ে এ-ব্যথা নেহাতই তুচ্ছ! আমার হাতের ঝটকা খেয়ে মেয়েটির গলার গান থেমে যেতেই আমি চিৎকার করে হেঁকে উঠলুম, 'আনাতিদাদা—'

মেয়েটা হাঁদার মতো ফ্যাল-ফ্যাল করে চেয়ে রইল আমার দিকে। আমি আবার ডাক দিলুম, 'আনাতিদাদা—'

সাড়া পেলুম না। সুতরাং দাঁড়াবার জন্যে অতি কষ্টে পায়ে ভর দিলুম। টাল খাচ্ছি। খেতে-খেতে প্রায় যখন পড়ি-পড়ি মেয়েটা আমায় দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। তারপর এমন চোখ-মুখ করে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল যে, আমি বুঝতে পারলুম, সে আমাকে উঠতে বারণ করছে। কিন্তু এখন তার এ-সব কাকুতি-মিনতি আমার কানে ঢুকবে না। কেননা, এখন আমার মনের ভেতরটা গুমরে-গুমরে কেঁদে উঠছে, 'আনাতিদাদা তুমি কই?'

আমি যেন চোখে সব-কিছু শূন্য দেখছি। তবে কি আনাতিদাদা আমাকে এই জঙ্গলের মধ্যে ফেলে রেখে পালাল? আনাতিদাদা কি ভাবল, বাইসনের আক্রমণে আমি মরে গেছি? না কি, বাইসনটা আনাতিদাদাকেই মেরে ফেলেছে? যতই ভাবছি, আমার বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠছে। আমার এ কী বিপদ হচ্ছে একের পর এক। আমি এখন কী করব, কোথা যাব? কে বাঁচাবে আমাকে এই জঙ্গলের মানুষের হাত থেকে?

আমি দাঁড়াতে পারলুম না। নিঃশব্দে আবার বসে পড়লুম। আমি বসে পড়তেই মেয়েটাও ক-পা পিছিয়ে গেল। তারপরই আমি তার মুখের দিকে চেয়ে থ হয়ে গেছি! যে-মেয়েকে এতক্ষণ আমার মনে হচ্ছিল, জঙ্গলের এক ভয়ংকর হিংস্র মানুষের মেয়ে, হঠাৎ দেখি, তার চোখ দুটি জলে টলমল করছে! সে কাঁদছে! আমার অবাক হবারই কথা। কেননা, এই তো একটু আগেই সে আমার দিকে চেয়ে হাসছিল! আমার মাথায় হাত রেখে গাইছিল! হঠাৎ সে কাঁদে কেন? আমার সব যেন কেমন গোলমাল হয়ে গেল! এ তো আচ্ছা ধাঁধা! মেয়েটাকে যে কিছু জিজ্ঞেস করব, তারও তো উপায় নেই! আমার কথা বুঝতেই পারবে না। তবে কী করব এখন? আমার আর কী করার আছে? যা করার মেয়ের মা-ই করবে। মা তো আছে!

না, মা ছিল না তখন। আমাকে খাইয়ে সে যে কোথায় গেছে, আমি আর দেখতে পাচ্ছি না। কাছেপিঠে থাকলে কি আর ছুটে আসত না? কারণ, আমি তখন ভীষণ চিৎকার করেই আনাতিদাদাকে ডাক দিয়েছি। তবে কি ঘাতককে ডাকতে গেছে! একটু পরেই বুঝি সে আসবে। এসে আমায় মেরে ফেলবে।

হ্যাঁ, এল। একজন নয়, একদল। জানি না এরা ঘাতক কি না! তাদের সঙ্গে এল মেয়েটার মা আর বাবাও। আমার একেবারে মুখের সামনে এসে যে দাঁড়াল, সে-ই বোধ হয় আমাকে হত্যা করবে। বোধ হয় দলের পাণ্ডা। কেননা, তার সাজগোজ রংচং দেখলে এটাই তোমার মনে হবে। লোকটা একটা ছোট্টমতো গাছের ছালের চাটাই কোমরে জড়িয়েছে। গায়ে তার নানান রকম উল্কি আঁকা। মুখে ছাই-ছাই মাটি মেখেছে। চোখ আর নাকের পাশে মোটা কালো-কালো দাগ! মাথায় লম্বা-লম্বা পাখির পালক গাঁথা টুপি। টুপিটা এত বড়ো যে, একেবারে ঘাড় অবধি নেমে এসেছে। হাতে গলায় নানান রকমের গয়না। কোনোটা কাঠ কেটে-কেটে সুন্দর করে বানানো। আবার কোনোটা পাথর ঘষে-ঘষে তৈরি। লোকটার হাতে একটা কাঠের নল। অনেকটা বড়ো তালপাতার বাঁশির মতো দেখতে। মানুষ মারার-অস্ত্রের বদলে, কেন যে লোকটা অমন একটা নল হাতে করে নিয়ে এসেছে, আমি বুঝতে পারলুম না। এরই একফাঁকে আমার হঠাৎ নজর পড়ল সেই মেয়েটার দিকে। এ কী কাণ্ড। যে-মেয়ে এতক্ষণ চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল, চেয়ে দেখো, তার মুখে হাসি। এমনকী, ওই যে লোকগুলো সঙ্গে এসেছে তারাও খুশিতে চিৎকার করে নিজেদের মধ্যে এমন কথাবার্তা চালাচ্ছে যে, তা শুনে কানে তালা লেগে যাবার গোত্তর! কিন্তু অত চেঁচামেচি সত্ত্বেও আমার কানে যেন শব্দ ঢুকছে না। যত শব্দ যাচ্ছে তার চেয়েও বেশি ভয়ে থিরথির করছে আমার চোখ দুটো। কারণ, পাণ্ডামতো লোকটার ষণ্ডামার্কা চেহারাটা ও সেইসঙ্গে তার কিম্ভূত সাজের বহর দেখলে, তোমার মনে হবেই, লোকটা একটা আস্ত খুনি।

এইবার লোকটা এগিয়ে এল। আমার ভয়-পাওয়া চোখ দুটোর দিকে ভয়ংকর দৃষ্টি হেনে আর প্রচণ্ড চিৎকার করে আমায় কিছু জিজ্ঞেস করল। আমি যেমন বোবা, তেমনিই বোবা! লোকটা আমার কোনো উত্তর না-পেয়ে, একইভাবে, একই সুরে আবার চেঁচিয়ে উঠল। বোকার মতো তার মুখের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া, এখন আমি আর কী করতে পারি! মনে হয়, আমার এই বোকা-বোকা চাউনি দেখেই সব কটা লোক একসঙ্গে বিচ্ছিরি ঠাট্টার সুরে হেসে উঠল। যেন আমি নেহাতই কুকুর-ভেড়া। সুতরাং ভেতরে-ভেতরে ভীষণ জ্বলে গেলুম। এখন সত্যি বলছি, মরতে আমার ভয় নেই। আমি প্রস্তুত। আমি মরে গেলে কেউ কাঁদবেও না, কেউ মনেও রাখবে না। কিন্তু তাই বলে, মরার আগে আমাকে নিয়ে কেউ ঠাট্টা-তামাশা করবে, এ আমি কিছুতেই সহ্য করব না। আশ্চর্য, সেই ছোট্ট মেয়েটা কিন্তু হাসল না! সে সবার মুখের দিকে এক ঝলক দৃষ্টি হেনে আমার মুখের দিকে এমনভাবে চাইল, বুঝতে কষ্ট হল না, সে-ও এ-হাসি সহ্য করে না। ওর মাকেও হাসতে দেখলুম। কিন্তু লক্ষ করলুম, সে-হাসিতে কেমন যেন একটা অদ্ভুত দরদ-মাখানো।

কিন্তু সে যাই হোক, হঠাৎ ওই হাসির মধ্যেই পাণ্ডামতো লোকটা আবার বাজখাঁই গলায় হেঁকড়ে উঠল। অমনি চোখের পলকে লোকগুলো আমাকে সাঁড়াশির মতো জাপটে ধরল। আমি সঙ্গে-সঙ্গে তাদের হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্যে প্রাণপণে যুদ্ধ লাগিয়ে দিলুম। কিন্তু পারব কেন? ওই বন্য লোকগুলোর শক্তির কাছে আমার ক্ষমতা তো নেহাতই একটা টুনটুনি পাখির মতো। সুতরাং আমি যতই ধস্তাধস্তি করি ওদের সঙ্গে পারি না। ওরা অনায়াসে আমার হাত-পাগুলো চেপে ধরে আমাকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিল। প্রায় ঝুলিয়ে দুলিয়ে সেই ঘরটার ভেতর থেকে বাইরে টেনে আনল। আমার আর অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে, আমাক খতম করবে বলেই বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। অতএব এখন আমি 'বাবা গো', 'মা গো' বলে গলা ফাটিয়ে মরাকান্না কাঁদলেও এরা আমায় নিষ্কৃতি দেবে না। এখন এদের হাত থেকে ছাড়ান পাবার জন্যে আমার ধস্তাধস্তি করে আর কী লাভ! মরতে যখন হবে, চুপচাপ মরাই ভালো।

একটা অদ্ভুত ভাবনা, ঠিক এই সময়ে আমার মাথায় যে কোত্থেকে এল কে জানে! মনে হল, আচ্ছা, একটুপরে মরলে আমার কী হবে? কোথায় যাবে আমার প্রাণটা? আমি কি তখন সব দেখতে পাব? দেখতে পাব এই আলো, এই আকাশ, এই বন, এই সবুজ গাছ, পাখি—সব-কিছু? শুনতে পাব বন্দুকের আওয়াজ? বোমা? পিস্তল? বা হিংস্র মানুষের চিৎকার? আমি মরে গেলে তখন কি কেউ আমাকে বলবে, যাযাবর মানেই শয়তান, শঠ, চোর অথবা ঠগবাজ? নাকি তখন মানুষ ভাববে, যাক একটা শত্রু নিপাত হল। শত্রু মরলে মানুষ কি হাঁপ ছেড়ে বাঁচে? না কি তারা আরও শত্রু খুঁজে বেড়ায়? কে জানে!

হ্যাঁ, আমাকে বাইরে নিয়ে এসে একটা গাছতলার সামনে শুইয়ে দিল। কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালা হয়েছে। গনগনে আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। ছোট্ট মেয়েটার মা প্রায় ছুটে এসেই আমার মাথার গোড়ায় বসল। বসে আমার মাথাটা তার কোলের ওপর তুলে নিল। আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চাইতে না-চাইতে দেখি, সেই ছোট্ট মেয়েটাও এসে গেছে! সে-ও ঠিক আমারই পাশে হাঁটু-গেড়ে বসল। সে আমাকে যতটা না-দেখছে, তারচেয়ে বেশি দেখছে সেই পাণ্ডামতো লোকটাকে। পাণ্ডা-লোকটা এরই ফাঁকে আমার কাছে এগিয়ে এসেছে। দেখি, যে-লোকগুলো আমাকে চ্যাংদোলা করে এখানে নিয়ে এসেছে, তারা একটু তফাতে পিছিয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে পড়েছে সার বেঁধে। আরও দেখি কী, দুটো লোক দু-দুটো মস্ত ঢাকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই ঢাকগুলোকে ওরা বলে থুম্বা। আমার গলায় যখন খাঁড়ার কোপ বসাবে, তখন হয়তো বিকট শব্দ করে থুম্বা দুটো বেজে উঠবে ওদের হাতের তালে। তারপর এই বনের মানুষগুলো আমার রক্ত নিয়ে আনন্দে মাখামাখি করবে। কিন্তু আমায় যে কোন অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হবে, তা কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমি দেখতে পাইনি। এখন, এই মুহূর্তে সেইটা দেখার জন্যেই আমার চোখদুটো ছটফটিয়ে উঠল। সেটা কি খাঁড়া, না আর কিছু? কিন্তু ধারালো অস্ত্র তো ধারে-কাছে নজরে পড়ছে না! তবে কি আমায় ওই আগুনে ঝলসিয়ে মারা হবে? মেরে আমার দেহের ঝলসানো মাংস দিয়ে তারা ভোজ বসাবে?

এমনি নানান চিন্তা যখন আমায় পেয়ে বসেছে, তখনই হঠাৎ পাণ্ডা-লোকটা একটা বিকট চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে কান-ফাটানো আওয়াজ তুলে সেই থুম্বা দুটো গুড়গুড় করে বেজে উঠেছে। বাজনার তালে-তালে সামনে দাঁড়ানো লোকগুলো হাত-পা ছুড়ে বীভৎস ভঙ্গি করে নাচতে শুরু করে দিল! আমি ভাবলুম, বন্য-মানুষেরা বুঝি শিকার ধরে ভোজ বসাবার আগে এমনি করেই আনন্দ-উৎসব করে। তোমরাও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, সেই সময়ে আমার মনের অবস্থা কী হয়েছে!

দেখলুম, সেই পাণ্ডা-লোকটা তার হাতের সেই ফুটো-ফোঁপরা নলটা নিয়ে এগিয়ে গেল গনগনে আগুনটার কাছে। তারপর আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে ফুটো নলটা মুখে তুলে নিল। তুলে নিয়ে ফুঁ দিতেই সেটা একটা অদ্ভুত আওয়াজ করে বেজে উঠল। সেটা বাজাতে-বাজাতেই পাণ্ডাটা আগুনের চারপাশে চরকি খেতে লাগল। থুম্বা বাজছে, লোক নাচছে, আর পাণ্ডাটা নল ফুঁকে চরকি খাচ্ছে, সে যেন এক ভয়ংকর দৃশ্য! অন্তত এখন আমার চোখে।

হঠাৎ পাণ্ডাটা করল কী, তার সেই মুখের নলটা মুখ থেকে সরিয়ে এনে চট করে আগুনের মধ্যে চেপে ধরল। নলের মুখটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সেই জ্বলন্ত আগুন নিয়ে পাণ্ডাটা আমার কাছে এগিয়ে এল। একেবারে আমার মুখের সামনে। এবার আমার শেষ! মুখের সামনে আগুন ধরে পাণ্ডাটা হাঁকতে শুরু করে দিল। আমি বুঝতে পেরেছি, মন্ত্র পড়ছে। আমি জানি মন্ত্র পড়া শেষ হলেই ওই আগুন আমার গায়ে ধরিয়ে দেবে। আমি পুড়ে মরব। পুড়ে মরার যে কী জ্বালা আমার জানা নেই। আর জানি না বলেই বোধ হয় সেই সময় আমার মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত সাহস ভর করল। মনে হল, এক্ষুনি যখন সব শেষই হয়ে যাবে, তখন আর মিছিমিছি ভয় পেয়ে কী লাভ! ইচ্ছে করলে আমি তো আর পালাতে পারব না। সুতরাং লক্ষ্মী-ছেলের মতো মরণের জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আমি আর কী করতে পারি। কিন্তু মৃত্যুর জন্য এখন আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে আমায়? এরা এখনও কেন আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে না আমার দেহে?

আশ্চর্য ব্যাপার! হঠাৎ লোকটা আমার মুখের সামনে থেকে আগুনটা সরিয়ে নিয়ে শূন্যে বাঁই-বাঁই করে ঘোরাতে লাগল। ঘোরাতে লাগল আমার চারপাশে। ঘোরাতে-ঘোরাতে থুম্বার তালে-তালে ওই লোকগুলোর সঙ্গে নিজেও নাচতে লাগল। তারপর শুরু হয়ে গেল গান। তোমায় কী বলব, যেই গান শুরু হয়েছে, দেখি, ছোট্ট মেয়েটা আর তার সঙ্গে তার মা-ও উঠে পড়েছে। তারাও গাইতে শুরু করে দিল। এমনকী, দু-চারবার নেচে-নেচে পা-ও তাদের ছটফটিয়ে উঠল। আমি থ। সে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। আগুন জ্বলছে গনগন করে। কাঠকুটোর পোড়া গন্ধ নাকে এসে লাগছে। হাওয়ায় দোলা খেয়ে ধোঁয়া লাগছে চোখে। সেই আগুন আর ধোঁয়াকে থোড়াই কেয়ার করে নাচতে-নাচতে, গাইতে-গাইতে সবাই যেন উন্মাদ। আর আমি বোকার মতো চুপটি করে পড়ে-পড়ে দেখছি, আমার মৃত্যুর আগে তাণ্ডব-নৃত্য!

কিন্তু নাচ আর গান যেন শেষ হয় না। বলতে কী, সেইসময় আমার সেইভাবে শুয়ে থাকতে ভীষণ অস্বস্তি লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এখন বোধ হয় এভাবে শুয়ে থাকার আর কোনো মানে হয় না। আমি উঠেই বসলুম। বসে-বসে ফ্যালফ্যাল করে ওদের নাচ দেখতে লাগলুম। কী জানি কেন, আমার পিঠের ব্যথাটা আর তেমন করে চাগাড় দিল না! মরণ যখন সামনে হাতছানি দিচ্ছে, তখন কি আর ওই ব্যথা-ট্যথার কথা মনে থাকে! আশ্চর্য, আমি উঠে বসলুম, অথচ এবার কেউ আমায় সামাল দিতে এল না! উলটে তারা যেন দ্বিগুণ জোরে গেয়ে উঠল! বন্য-নাচে মেতে উঠল।

আমি আরও কিছুক্ষণ অমনি হাঁদার মতোই বসে রইলুম। কিন্তু এমনি করেই বা মানুষ কতক্ষণ বসে তাকতে পারে! যা থাকে বরাতে, আমি উঠে দাঁড়ালুম। এবারও আমার কষ্ট হল না। কিন্তু অন্য আর একটা কাণ্ড হল। সেই ছোট্ট মেয়েটা আমার কাছে ছুটে এল। আমার হাত ধরল। আমায় টানতে-টানতে ওই নাচের দলে নিয়ে চলল। তারপরে আমাকেও নাচার জন্যে ইশারা করল। আমি হতবাক! এই একটু আগে আমি নড়তে পারছিলুম না। পড়েছিলুম মাটিতে। এখন উঠে দাঁড়াতে পেরেছি। এখন ইচ্ছে করলে আমি হয়তো নাচতেও পারি! এ কেমন করে সম্ভব হল! এরা কি তবে এতক্ষণ ধরে আমার ব্যথা সারাবার জন্যে এতসব কাণ্ডকারখানা করেছে! তবে কি ওই পাণ্ডামতো লোকটা ডাকিনীবিদ্যে জানে! হ্যাঁ, আমি শুনেছি এই ডাকিনীবিদ্যের জোরেই মরা-মানুষের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারে এই বনের মানুষেরা! আর সেই বিদ্যের জোরেই বুঝি বাইসনের গুঁতিয়ে দেওয়া আমার পিঠের ব্যথা এই লোকটা ভালো করে দিল! তবে কি এরা আমায় মারবে না! এরা আমার বন্ধু!

আমার বুকের ভেতরটা দুরন্ত আনন্দে লাফিয়ে উঠল। আমার পা দুটোও ওদের পায়ের তালে নেচে উঠল। ওই বন্য-মানুষগুলোর সঙ্গে এই মুহূর্তে আমিও বন্য হয়ে গেছি! তাই, আমি ওদের গানের ভাষা না-বুঝলেও, ওদের সুরে সুর মিলিয়ে চিৎকার করে উঠলুম। আর মনে-মনে ভাবতে লাগলুম, শহর যখন হিংস্র মানুষের গুলির শব্দে তটস্থ, তখন বনের এই মানুষগুলো নাচ আর গানের বন্যায় সেই শহরেরই একটা ছোট্ট ছেলের প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে! আশ্রয় দিয়েছে! আশ্চর্য মানুষ এরা!

হ্যাঁ, আমায় আশ্রয় দিল এরা। অন্তত বলতে পারি, এরা যদি আমায় বনের ভেতর থেকে উদ্ধার করে না আনত, তবে ওইখানেই বাইসনের গুঁতো খেয়ে আমি পড়ে-পড়ে মরতুম। আর না-হয়তো, বনের অন্য কোনো হিংস্র জন্তু আমার রক্ত-মাংসে পেট ভরাত!

এত বিপদে পড়েও আমার ব্যানডুররিয়াটা যে বেহাল হয়ে পড়েনি, এ-কথা শুনলে তোমরাও বোধ হয় আমার মতো অবাক হবে! সত্যিই! ব্যানডুররিয়াটা আমার অটুট আছে! বাইসনের গুঁতো খেয়েও যে কেমন করে সেটা রক্ষা পেয়েছে, এ-কথা ভাবলেই আমি আশ্চর্য হয়ে যাই! আমার বড্ড প্রিয় ওই ব্যানডুররিয়াটা। আমি জানি, এখন ওই ব্যানডুররিয়াটা ছাড়া আমার সবই গেছে। তাই, ব্যানডুররিয়াটা যদি হারিয়ে যেত, কিংবা ভেঙে খানখান হয়ে এই জঙ্গলের জঞ্জাল হয়ে পড়ে থাকত, তবে আমার দুঃখের কি শেষ থাকত! হ্যাঁ, আর একজনও নিশ্চয়ই দুঃখ পেত, সে আনাতিদাদা। মানুষটা যেন ম্যাজিকের মতো কোথায় উবে গেল। আমার মা আর বাবার কথা, সে তো আমার অজানা নয়। আমারই চোখের সামনে আমার মাকে হত্যা করেছে ওই পুলিশের গুলি। সে-দৃশ্য আমার চোখের ওপর ভেসে উঠলে আমার বুকের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। তবু নিজেকে সামলে নিতে হয়। কেননা, প্রতিশোধ নেবার ক্ষমতা তো আমার এখনও হয়নি। সময় যখন আসবে আগুন হয়ে ঝলসে উঠে সেই হিংসার সামনে রুখে দাঁড়াব। ওই হত্যাকারীদের আমি জিজ্ঞেস করব, বিনা কারণে নিরীহ মানুষের প্রাণ নেবার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছে? ধিক তোমাদের! বারুদের তৈরি গুলি একদিন যে তোমাদের বুকেও আঘাত করতে পারে, সে কি তোমরা জানো না?

আপাতত আমি এই জঙ্গলেরই বাসিন্দা। গভীর জঙ্গলের মধ্যিখানে এই বন্য মানুষগুলির সঙ্গে আমি এখন যেখানে আছি, দেখলে তুমি ভয় পাবেই। মনে হবে, এই বুঝি বাঘ-ভাল্লুক লাফিয়ে পড়ল ঘাড়ের ওপর! হ্যাঁ, বাঘ তো আছেই। মাঝে-মাঝে একটু দূরে জঙ্গলের আরও গভীরে তারা যখন গর্জে ওঠে, কী-রকম দুরুদুরু করে কেঁপে ওঠে আমার বুকের ভেতরটা! তবু নিজের ভয়টা নিজের মধ্যেই চেপে থাকি! কারণ, আমি জানি, এখান থেকে পালিয়ে যাবার পথ আমার জানা নেই। পালাতে গিয়ে যদি জঙ্গলের মধ্যে আমি চিরদিনের মতো হারিয়ে যাই, তখন কী হবে? তখন হয়তো বাঘের পেটেই যেতে হবে। তাহলে কী এখানে আমায় সারা জীবনই থাকতে হবে? কে জানে!

ওই ছোট্ট মেয়েটা আমায় যে কী ভালোবাসে, সে তোমরা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবে না। ওর কোনো ভয় নেই। ভয় নেই বাঘ-ভাল্লুক কিছুরই। কী-রকম দুঃসাহসে একা-একা জঙ্গলের মধ্যে ছুটে যায়। অবশ্য এখন আর একা-একা যেতে হয় না। এখন আমি ওর সঙ্গী। আমায় এখন সে কলকল করে যে কত কথা বলে, কে বোঝে সে-সব কথার মানে! ও হাসে, গান গায়, আর যখনই ওর মন চায়, আমার হাত ধরে ছুট দেয়। আমিও যে কথা বলি না, তা নয়। আমার কথা বোঝে না একবর্ণও। নইলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকবে কেন আমার মুখের দিকে! ওর দুটি চোখের দৃষ্টি ভারি মিষ্টি! ওর চোখ দুটির দিকে তাকালে আমার মুখ যেন আপনা থেকে কথা কয়ে ওঠে!

এতদিনে শুনতে-শুনতে আমি ওর নামটা জেনে ফেলেছি, ওতিয়া। একদিন যখন 'ওতিয়া' বলে ডাক দিয়েছি আমি, কী বলব তোমায়, একঝলক হাওয়ার মতো উড়ে এসে আমার গলাটি জড়িয়ে ধরল সে। তারপর অঝোরে হাসতে-হাসতে সে আমায় বুঝিয়ে দিল, কী খুশিই না সে হয়েছে! হাসতে-হাসতেই সে যখন আমার বুকে হাত রেখে ইশারা করল, তখন আমার বুঝতে বাকি রইল না, সে আমারও নাম জিজ্ঞেস করছে! আমিও হেসে ফেললুম। তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললুম, 'আমার নাম ইসতাসি।'

'ইসতাসি!' মুখে একটা অদ্ভুত শব্দ করে আমার নামটা যখন সে উচ্চারণ করল, তারপর ছুটতে-ছুটতে তার মায়ের কাছে গিয়ে আমার নামটা বার বার বলতে লাগল, তখন কী মিষ্টি শোনাচ্ছিল তার গলার স্বর। এমন খুশি তাকে আমি আর কোনোদিনই দেখিনি। সে যেন ভেবেই পাচ্ছে না, কী করবে এই মুহূর্তে। শুধু একটাই শব্দ তার মুখে। সে শুধু ডাকছে, 'ইসতাসি, ইসতাসি।' সে সেই শব্দটাকে সুরের মতো গেয়ে-গেয়ে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমার ব্যানডুররিয়াটা হাতে করে নিয়ে এল। আমার হাতে তুলে দিল। ইশারা করল। মুখে শব্দ করল। যার মানে, 'বাজাও।' এখন মুখে যে-শব্দটা করল হয়তো এইটাই তার আবদারের ভাষা। সুতরাং আমি তার আবদার না-রেখে কেমন করে পারি? বাজাতে শুরু করে দিলুম। ওতিয়া হাততালি দিল।

এখনও ওতিয়া অবাক হয়ে চেয়ে থাকে আমার বাজনার দিকে। আমি যখনই বাজাই, ওর চোখের দিকে তাকালে আমার মনে হয়, বুঝি-বা আমার বাজনার শব্দের মধ্যে কোনো জাদুমন্ত্রের আঁচ পেয়েছে সে। তাই মাঝে-মাঝেই আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ও জঙ্গলের ভেতরে। জঙ্গলের ভেতরে এইখানে, এই যে গাছে-গাছে ছাওয়া নিরিবিলি জায়গাটা, এইখানে সে আমায় নিয়ে আসে। তারপর আমার নাম ধরে ডাকে, আমার ব্যানডুররিয়াটার ওপর হাত রাখে। আমার চোখের দিকে তাকায়। ঘাড় নাড়ে। আমার হাতের বাজনা বেজে ওঠে। এই নির্জন জঙ্গলের গভীরে সেই বাজনার সুর শুনতে-শুনতে ওতিয়ার চোখ দুটি অবাক হয়ে চেয়ে থাকে আমার হাতের দিকে। তারপর ছুটতে ছুটতে নাচতে থাকে। আর নয়তো গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে সুর করে গান গায়। গানের মানে না বুঝি, কী যে ভালো লাগে! খুব ভালো!

এখন এত ভালো লাগে ওতিয়াকে। ভালো লাগে ওর মাকে, বাবাকে। ওরা যেন আমাকে ওদেরই আপনজন ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না। কেমন যেন আমারই অজান্তে আমিও ওদের একজন হয়ে গেছি। ওদেরই মতো বন্য আর আনন্দে উচ্ছল। যদিও আমার পরনে সেই লম্বা প্যান্ট আর জামাটা এখনও আছে, ক-দিন পরে এ-দুটোর যখন আর পরবার মতো হাল থাকবে না, তখন আমি জানি, ওদেরই মতো আমায় গাছের ছালের নামমাত্র পোশাক পরতে হবে। তখন হয়তো এরা আমার গায়ে উল্কি এঁকে দেবে। আর নয়তো নানা রঙের আঁকিজুকি। কপাল জুড়ে গাছের লতা জড়িয়ে তাতে এঁটে দেবে পাখির পালক। তারপর রাতের বেলা জ্বলন্ত আগুন ঘিরে ওদের সঙ্গে নাচতে হবে আমায়। ভয়ংকর যুদ্ধের নাচ। অথবা শত্রুকে জয় করার উল্লাসনৃত্য!

সত্যি এরা নাচে। রোজই নাচে। সারাদিন জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরবে। শিকার খুঁজে এনে রাতের বেলা এক জায়গায় সবাই জমায়েত হয়ে আগুন জ্বালায়। গুরু-গুরু শব্দে থুম্বা বাজায়। মুখে অদ্ভুত শব্দ করে নৃত্যে মেতে ওঠে। ওই আগুনে তারা শিকার ঝলসে নেয়। তারপর ভোজ বসায়। সে-ভোজে আমাকেও ভাগ বসাতে হয়। ভারি আনন্দের সে-ভোজ। ভারি তৃপ্তির।

প্রথম-প্রথম যখন আমার কিচ্ছু ভালো লাগত না, শুধু মনে পড়ত মাকে, বাবাকে, আনাতিদাদা অথবা আমাদের সেইদলের সবাইকে, তখন কোনো খাবারই রুচত না আমার মুখে। তখন ওতিয়ার মা কতদিন আমার নিজের মায়ের মতো আমাকে আদর করে খাইয়ে দিয়েছে। মাঝে-মাঝে যখনই আমার চোখ ছলছলিয়ে উঠেছে, আমায় ভালোবেসে কাছে টেনে আমার চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছে। চুমু খেয়েছে। তখনই আমার মনে হয়েছে, এ মা তো শুধু ওতিয়ার মা নয়, এ যেন আমারও মা। এই বন্য মায়ের মুখখানি আমার মায়ের কথা বার বার মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। আমার মন বলছে, সব মায়ের বুকের মধ্যে আছে একই আদর, একই ভালোবাসা। মা যদি হয় বনের, কী শহরের, তফাত কোথায়?

আচ্ছা, ওতিয়া বুঝি আমাকে ছাড়া আর কিচ্ছু জানে না! আমাকে নিয়ে সারাক্ষণ এত ব্যস্ত! কী যে করবে, যেন ভেবেই পায় না। আমার মুখে হাসি না-দেখলে, তার মুখখানিও শুকিয়ে যায়। দেখে আমারই কষ্ট লাগে। তাই হাসতেই হয় আমাকে। অন্তত তার জন্যে। তার গান শুনতে হয়, নাচ দেখতে হয়, আর বার বার হাতে তালি দিয়ে তারিফ করতে হয়। তার ওপর, যখনই সে আমার হাতে ব্যানডুররিয়াটা তুলে দেবে, তখনই বাজাতে হয়। না বাজালে কী রাগ!

ভারি মায়া লাগে মেয়েটাকে দেখলে। না আছে দামি জামা-কাপড়, না আছে খেলনা-পুতুল। ওর কানে ওই যে কাঠের দুল দুটি দুলছে, কিংবা গলায় কাঠের তৈরি ওই যে মালাটি, ওই কাঠের গয়না দুটিই যেন ওতিয়ার কাছে সাত রাজার ধন। ও জানে না, সোনা কাকে বলে। ও কোনোদিনই চোখে দেখেনি। তাই ভাবতেই পারে না, সোনা পরলে তাকে আরও কত সুন্দর দেখতে লাগবে।

ওতিয়া এই জঙ্গলের সবুজ ছায়ার মতোই ঠান্ডা আর শান্ত। হাসিখুশিতে ভরা ওই ছোট্ট মেয়েটা সত্যিই সুন্দর। এই বনের মতোই সুন্দর। ওকে ছেড়ে যাবার কথা আমি এখন ভাবতেই পারি না। এখন আমি সত্যিই ওতিয়ার মতো বন্য হয়ে গেছি। তোমরা ওকে আমার আপনজন বলে স্বীকার না-করলেও, আমি মনে-মনে জানি, ও আমার বোন। আমি ওতিয়ার ভাই। আমাদের খেলাঘর এই বন আর জঙ্গল।

ওতিয়ার কথা এখন আমি একটু-একটু বুঝতে পারি। যত কথা বুঝতে পারি, তার চেয়েও না-বোঝার কথা অনেক বেশি। যে-কথাগুলো আমি বুঝতে পারি না, ওতিয়া বোবা মুখে হাত-পা নেড়ে এমন করে বুঝিয়ে দেবে, বা দেখিয়ে দেবে যে, তা আমার কাছে জলের মতো সোজা হয়ে যায়। ও এমনি করে একদিন বুঝিয়ে দিয়েছিল, গভীর জঙ্গলে একটি গুহা আছে। গুহার পাশে একটা জলপ্রপাত পাথর ডিঙিয়ে অঝোর ধারায় ছিটকে পড়ছে নীচে, চারিদিকে। সেই জলপ্রপাতের বিন্দু-বিন্দু জলের কণা যখন রোদের আলোয় দোল খায়, তখন রঙে-রঙে ছড়িয়ে যায় চারিপাশ । সে ভারি সুন্দর, ভারি অদ্ভুত। আভাসে ইঙ্গিতে ওতিয়া আমাকে জানিয়েছে, সেই জলপ্রপাত সে আমায় একদিন দেখাতে নিয়ে যাবে। আর বলতে কী, একদিন ওতিয়া সত্যিই আমায় নিয়ে গেছল সেই জলপ্রপাত দেখাতে। সেই গভীর, আরও গভীর জঙ্গলে। তারপর? সেই কথাই এখন বলতে হবে আমায়! বলতে গিয়ে আতঙ্কে বুক কেঁপে ওঠে। মনটা ভীষণ দুঃখে মুষড়ে পড়ে।

কথামতো সেদিন আমি আর ওতিয়া সেই গভীর জঙ্গলে জলপ্রপাত দেখতে চলেছি। অবিশ্যি মা আর বাবাকে বলে এসেছে ওতিয়া। আমিও। ওরা বারবার সাবধান করলেও অমত করেনি। গভীর জঙ্গল যত সুন্দর, তত ভয়ংকর, এ-কথাটা যে কত সত্যি, এতদিনে আমিও তা বুঝে গেছি। তবে হ্যাঁ, আগে যেমন ভয়ে গা-ছমছম করত, এখন তা করে না। এখন এই জঙ্গলই আমার সব-কিছু। এই জঙ্গলের সঙ্গে আমিও এখন জংলি ইসতাসি! এখানে আমি যাযাবর নই। ঘুরে-ঘুরে, দেশে-দেশে ঘর বাঁধার দিন আমার ফুরিয়ে গেছে। আমার সেই স্বপ্নের দিনগুলি হারিয়ে গিয়ে আর-এক নতুন জীবন শুরু হয়েছে। আমি ভাবি, কোনটা ভালো, সেই পথে-পথে ঘর বেঁধে নানান মানুষের দেশে ঘুরে বেড়ানো, না, এই গভীর জঙ্গলে বনের মানুষের সঙ্গে বন্য হয়ে জীবন কাটানো!

সেদিন ওতিয়ার সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে আমি জঙ্গলের যতই গভীরে চলেছি, ততই অবাক হয়ে ভাবছি, এই ছোট্ট মেয়েটার কাছে জঙ্গলটা যেন কিছুই নয়। এর পাতা-ঝরা পথ, সবুজ গাছের সারি, এর আলো কিংবা বাতাস, সবই ওতিয়ার আগপাছ জানা। ভয় নেই মনে। আমার তবু ভয় করে। কেননা, একবার যদি এই জঙ্গলের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাই, তবে পথ আর খুঁজে পেতে হচ্ছে না। তোমাদের বলতে ভুলে গেছি, ওতিয়া সঙ্গে একটা তির-ধনুক নিয়েছে। জঙ্গলের গভীরে যখন যেতে হয়, সঙ্গে তির-ধনুক নিতেই হয়। আমি অবিশ্যি এখনও ঠিক-ঠিক তির-ধনুক ছুড়তে পারি না। একেবারে পারি না বললেও ভুল হবে। আমিও তির ছুড়ি, কিন্তু ওতিয়ার মতো অত ওস্তাদ এখনও হতে পারিনি। ওস্তাদই বলব। কারণ, এই বয়সেও এক টিপে একটা নিশানা ও ঠিক ছিটকে দেবে। ওর ওই কেরামতি দেখলে অবাক না-হয়ে উপায় আছে! আমি অবাক হলে কী হয়েছে! তির ছোড়াটা এই বন্য মানুষগুলির কাছে জলভাত! সঙ্গে আমিও অবিশ্যি একটা তির-ধনুক নিতে চেয়েছিলুম। কিন্তু ওতিয়া নিতে দিল না। তার বদলে, আমার হাতে সে ব্যানডুররিয়াটাই তুলে দিল। আমি ভাবলুম, জঙ্গলের গভীরে যাচ্ছি—বাজনা কী হবে! যদি কোনো ভয়ংকর জন্তুর সামনা-সামনি পড়ি, তখন তাকে ব্যানডুররিয়া শোনালে সে কি লক্ষ্মীছেলের মতো বাজনা শুনে আমাদের বাহবা দেবে! না, আমাদের আক্রমণ করে মুণ্ডুপাত করবে! এখন অবিশ্যি আমিও তেমন জঙ্গলের জন্তু দেখলে ভয় পাই না। সয়ে গেছে। এখন রাত্তিরে বাঘের গর্জন যতই শুনি, আগের মতো দুরু-দুরু করে বুক কাঁপে না।

ওতিয়া চলতে-চলতে কলকল করে কত কথা বলছে। হা ভগবান! আমি যে কত বুঝছি! তোমাদের তো আগেই বলেছি, এদের সঙ্গে থাকতে-থাকতে সব কথা না-বুঝলেও, কিছু-কিছু কথা এখন বুঝতে পারি। তাই এখন ওতিয়ার অনেক কথার ফাঁকে-ফাঁকে যে-কথাগুলির মানে আমি জানি, তাতে আমার বুঝতে অসুবিধা নেই, ওতিয়া আমায় গল্প শোনাচ্ছে। গল্প শোনাচ্ছে আগুনের। আগুনকে ওরা মনে করে সব দেবতার সেরা দেবতা। ওরা ভাবে, এই বন্য মানুষের মনে যখন পাপ বাসা বাঁধে, তখন আগুনের দেবতা রুষ্ট হন। আর তখনই তিনি নিজমূর্তি ধারণ করে সব ধবংস করে দেন। এইরকমই একবার হয়েছিল। আর ওতিয়া এখন সেই গল্পটাই শোনাচ্ছে। শোনাতে-শোনাতে কখনো তার চোখদুটো এত বড়ো হয়ে যাচ্ছে! নয়তো ঠোঁটটা উলটে যাচ্ছে! মুখখানা ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছে! তখন যা ভালো লাগছিল ওতিয়াকে!

হ্যাঁ, সত্যিই একবার আগুন লেগেছিল এই জঙ্গলে। শুধু জঙ্গলে কেন, এই জঙ্গলের মাঝে-মাঝে এই যে গাছপাতা-ছাওয়া ঝুপড়িগুলো, আগুন লেগেছিল তাতেও। প্রাণের ভয়ে, সেই আগুন-দেবতার হাত থেকে নিস্তার পাবার জন্যে, ওরা আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়েছিল এই জঙ্গলেরই মাটিতে। দেবতা ওদের কথা শোনেননি। দেবতা তাদেরও আগুনে ছাই করে দিয়েছিলেন। কেননা, তখন সারা জঙ্গলের সমস্ত মানুষই হয়ে উঠেছিল পাপী, না-হয় অত্যাচারী! শুধু বেঁচেছিল চারজন। দুই বুড়ো-বুড়ি, তাদের এক ছোট্ট নাতনি আর একটি বালক। ওই বুড়ো-বুড়ি তাদের নাতনিকে বড়ো করেছিল। তারপর বিয়ে দিয়েছিল ওই বালকটির সঙ্গে। ক্রমে-ক্রমে আবার জন্ম নিল নতুন জীবন। আবার গড়ে উঠেছিল, নতুন মানুষের নতুন যুগ। তাই, এখনও ওরা মনে করে, আগুনই তাদের সব দেবতার শ্রেষ্ঠ দেব। তাই এখনও ওরা পুজো করে তাঁর। বনের অপদেবতার হাত থেকে বাঁচার জন্যে রাতের বেলা তাদের ঘরের চারপাশে জ্বেলে রাখে আগুন। আর সে-আগুনের ভয়ে অপদেবতাই শুধু নয়, ঘেঁষতে পারে না বনের বাঘ-ভাল্লুকও।

আমরা এগিয়ে এসেছি অনেকটা বনপথ। অবিশ্যি, এখনও পর্যন্ত তেমন কিছু জন্তু-জানোয়ার দেখতে পাইনি। মাঝে-মাঝে দু-একটা বুনো খরগোশকে এদিক থেকে ওদিকে ছুটে যেতে দেখেছি। একবার একটাকে ধরবার জন্যে ওতিয়া এমন এক ছুট দিয়েছিল। পারেনি। পারবে কেমন করে? ওরা তোমার চেয়েও চালাক! ধরতে যাও, এমন ভড়কি দিয়ে ঝোপের আড়ালে সুড়ুত করে লুকিয়ে পড়বে যে, তোমার আর সাধ্যি নেই তাকে খুঁজে পাও!

হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ ওতিয়া গান ধরল। এমন হঠাৎ-হঠাৎ গান গেয়ে ওঠে ওতিয়া যে, আমি নিজেই ভ্যাবাচাকা খেয়ে যাই। গাইতে-গাইতে সে আমার হাত ধরল। আমাকেও গাইতে বলল। আমি অবিশ্যি এখন ওদের সঙ্গে একটু একটু গাইতে পারি। শুনতে-শুনতে আমারও এখন গানের কলিগুলো সব মুখস্থ হয়ে গেছে। মানে-টানে সব না বুঝলেও সেই গান গাইতে আমার এত মজা লাগে! তার ওপর ওতিয়ার গলায় যদি সে-গান শুনি, তাহলে তো আর কথাই নেই। দারুণ ভালো লাগে। এমন আধো-আধো সুরে গাইবে! আমি হলপ করে বলতে পারি, সে-গান শুনলে তোমারও মেয়েটাকে ভীষণ আদর করতে ইচ্ছে হবে।

এতক্ষণ আমরা বনের এবড়ো-খেবড়ো পথ ধরে হাঁটলেও সে-পথ ছিল সমান। কিন্তু হঠাৎ যেন পথটা কেমন উঁচু-নিচু ঠেকছে। মনে হচ্ছে, আমরা যেন ওপরে উঠতে-উঠতে নীচে নামছি। এখানে মাটির চেয়ে পাথর বেশি। সেই পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে দেবদারু, পাইন আর ইউক্যালিপটাস গাছগুলো খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। আমি ওতিয়াকে জিজ্ঞেস করলুম, 'এদিকে কোথায় যাবে?'

ওতিয়া বলল, 'নীচে। নীচে গভীর খাদ। কী অন্ধকার!'

জঙ্গলের মধ্যে অন্ধকার খাদের ভেতর যেতে হবে শুনলে কোন মানুষ না ভয় পায়? আমি তো কোন ছার! আশ্চর্য, আমি কিন্তু ওতিয়ার মুখে ভয়ের কোনো লক্ষণই দেখতে পেলুম না! পাছে আমার মনের ভয়টা ওতিয়া জেনে ফেলে, তাই ওতিয়া এতক্ষণ যে-গানটা গাইছিল, আমিও এখন এই পাথর টপকাতে-টপকাতে সেই গানটাই গেয়ে উঠলুম। ওতিয়া কী খুশি! আমার হাত ধরে আমার সঙ্গে গলা মিলাল সে। সে-গানের যা মানে দাঁড়ায়, সেটা তোমাদের শোনাবার লোভ সামলাতে পারছি না :

এই যে বন, এই যে পথ

এই যে বনের গাছ-গাছালি,

ওই যে বাঘ, কিংবা ভালুক,

বন্ধু মোদের পাখ-পাখালি।

আর একটু নীচে নামতেই আমি জলের শব্দ শুনতে পেলুম। আমার গান থেমে গেল। আরও একটু এগিয়ে যেতেই দেখি ওই নিচু জায়গাটার মাঝ দিয়ে গাঢ় নীল রঙের জল উপচে একটা ঝরনা বয়ে যাচ্ছে। দুপাশে খাড়া উঁচু পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে কত গাছ! কোথাও নানান রঙের বুনো ফুলের গাছ! ওই উঁচু-উঁচু পাথরের ফাঁক দিয়ে আকাশটা যখন দেখছি, কী আশ্চর্য লাগছে! ঝরনার ওপর ওই আকাশ ছায়া ফেলে দোল খাচ্ছে! আমি দেখতে পেলুম, ওতিয়া ওই ঝরনার ধার ঘেঁষে, পাথরের ওপর পা ফেলে-ফেলে ওপরে উঠছে। উঠতে-উঠতে চেঁচিয়ে আমার নাম ধরে ডাকল, 'ইসতাসি—।' তাকে জোরেই ডাকতে হল। কেননা, তার চিৎকারের চেয়ে জলের ছলাতকারের শব্দ আরও তীব্র। আমি অবশ্য শুনতে পেয়েছি। এমন একটা চমৎকার দৃশ্য দেখে আমার মনটা এত খুশি যে, সঙ্গে সঙ্গে আমিও গলা ছেড়ে ওতিয়ার নাম ধরে ডেকে উঠেছি। দেখতে পেলুম, ওতিয়া পাথর ভেঙে ওপরে উঠতে-উঠতে আমার ডাক শুনে থেমে পড়ল। হাতছানি দিয়ে আমাকে ওপরে ডাকল। সত্যি বলতে কী, ওতিয়ার মতো অত সহজে আমি উঠতে পারছি না। ওতিয়া যেন একটা ছোট্ট হরিণ। তরতর করে এমন অনায়াসে পা ফেলে ওপরে উঠছে যে, দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি। এদিকে আমি কোনোরকমে সামলে-সুমলে পাথর টপকাচ্ছি। ওপরে কোথায় যাচ্ছে ওতিয়া, আমি জানি না। ও যতই ওপরে উঠছে, দেখে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে! একবার যদি ফসকায়, তাহলে যে কী কাণ্ড হবে, সে আর কাউকে বলে দিতে হবে না!

আর একটু ওপরে উঠতেই আমি দেখতে পেলুম, সেই ঝরনার জল দল বেঁধে ওপর থেকে ঝর-ঝর করে নেমে আসছে। পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে যেন জলতরঙ্গের সুর তুলে নাচছে। আমি চোখ ফেরাতে পারি না। স্থির চোখে চেয়ে থাকি সেইদিকে।

'ইসতাসি—' আবার ডাক দিল ওতিয়া।

আমি এবার ওকে ধরবার জন্যে আরও চটপট পা ফেলতে লাগলুম। আর মাঝে-মাঝে যখনই টাল খাচ্ছি, সামনে যা পাচ্ছি তাই-ই ধরে ফেলছি। হাঁপিয়ে গেলুম। অবাক কথা, ওতিয়ার ওসব নেই। হাঁপাচ্ছেও না, টালও খাচ্ছে না। ওতিয়া বোধহয় বুঝতে পেরেছে, আমার কষ্ট হচ্ছে। তাই দেখি, এবার দাঁড়াল। আমার ওপরে ওঠার করসত দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। আমিও ওতিয়ার মতো হাসতে পারলুম না বটে, কিন্তু হাসি শুনতে-শুনতে ওর কাছে পৌঁছে গেলুম। ওতিয়া আমার হাতটা ধরে ফেলল। টানতে-টানতে যেদিকে নিয়ে চলল, সেদিকটা তত উঁচু-নিচু না। কিন্তু এদিকে পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে জলের অজস্র ধারা। সেই জলের ধারা ছলকে-ছলকে পাথর ডিঙিয়ে ওইদিকের ঢালুপথে নেমে যাচ্ছে।

এতক্ষণ আমরা পাথর ভেঙে ওপরে উঠেছি। এবার উলটোদিকে নীচে নামব আমরা। আমার হাত ধরে ওতিয়া আমায় জিজ্ঞেস করল, 'খুব কষ্ট হচ্ছে তো?'

আমি কষ্টটাকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে ফেলে বললুম, 'না-না!'

ওতিয়া আমার হাঁসফাঁসানি দেখে আবার বলল, 'তবে হাঁপাচ্ছ যে!'

আমি উত্তর দিলুম, 'অনেকটা উঁচু তো!'

সত্যি, কত উঁচুতে উঠেছি। এখান থেকে নীচের দিকে চাইলে মনে হচ্ছে, জঙ্গলের মস্ত বড়ো গাছগুলো যেন ছোট্ট-ছোট্ট চারাগাছ। পৃথিবীর দেহটা কে যেন সবুজ মখমলে ঢেকে দিয়েছে। এখান থেকে শুনতে পাচ্ছি, জলের একটানা মৃদু শব্দ এখন দুরন্ত হয়ে উঠেছে। দেখতে পাচ্ছি, ঝরনার সব-কটা স্রোতের ধারা একই দিকে ছুটে চলেছে। একই সঙ্গে এই ওপর থেকে নীচে প্রচণ্ড বেগে ঝরে পড়ছে। অসংখ্য জলকণা ঠিক যেন কুয়াশার মতো জমাট বেঁধে সেই জলধারার মাথার ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে। যতই দেখছি, অবাক হয়ে থমকে যাচ্ছি। ওতিয়া আড়ে-আড়ে আমার দিকে দেখছে, আর হয়তো মনে-মনে বলছে, 'কী, কেমন লাগছে?'

এর আগে আমি তো আরও কত দেশ ঘুরেছি, না-দেখা কত কী দেখেছি! কিন্তু সত্যি বলতে কী, আমি কখনো জলপ্রপাত দেখিনি! সুতরাং দেখতে-দেখতে অবাক হয়ে যাচ্ছি। ভাবছি, যে-পৃথিবী এত সুন্দর, যে-পৃথিবীর বুকে এত আনন্দ, এত জাদু, তার কোলে জন্ম নিয়ে আমরা কেন এত নিষ্ঠুর, নির্দয় আর হিংস্র!

একটা পাথরের ওপর বসে পড়ল ওতিয়া। তার ওই মুখখানি জলের শব্দের মতোই উচ্ছল হয়ে উঠেছে। তারই পাশে আর-একটা বড়ো পাথরের ওপর বসবার জন্যে সে আমাকে ইশারা করল। বসব কী, ওই কুয়াশার মতো উড়ন্ত জলের বিন্দুগুলি গায়ে মুখে মাথায় চোখে ছড়িয়ে-ছড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে। ওতিয়ার মুখের ওপর ওই বিন্দুগুলি ছড়িয়ে পড়ে কী সুন্দর দেখতে লাগছে!

আমি বসলুম। ওতিয়া ওই পাথরটার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে নীচের দিকে চেয়ে রইল। জল পড়ছে অঝোর ধারায়। একটানা তার শব্দ। আর সব নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ। এমনকী ওতিয়া। তার সঙ্গে আমিও। এখন চুপ করে থাকারই সময়। এখন শুধু দেখার সময়। এই বন, এই পাথর-ঘেরা ঝরনা অথবা জলপ্রপাত। আর সেই জলের বিন্দুভরা কুয়াশার ওপর সূর্যের আলোয় রামধনু-রঙের বাহারি ছটা। চোখ ফেরাবে কে!

আমিও ওতিয়ার মতো হেঁট হয়ে নীচের দিকে চাইলুম। উঃ, কী ভীষণ গভীর! এই ওপর থেকে নীচের ওই গভীরে জলের ধারা লাফিয়ে পড়ে এমন তোলপাড় শুরু করেছে যে, তা দেখতে-দেখতে আমি বিভোর যাই!

হঠাৎ উঠে দাঁড়াল ওতিয়া। আমার গায়ে হাত দিল। আমার চমক ভাঙল। আমিও উঠে পড়েছি। আমার হাত ধরল ওতিয়া। নীচের দিকে নামতে লাগল। কেমন থরে-থরে সিঁড়ির মতো পাথরের সারিগুলি সাজানো রয়েছে! দেখলেই মনে হবে, কে যেন খুব যত্ন করে ওই পাথরে পা ফেলে নীচে যাবার পথটি পরিষ্কার করে রেখেছে। লাফিয়ে-লাফিয়ে আমরা নামতে লাগলুম। নীচে নেমে দেখি, ওই জলরাশি যেখানে পড়ছে, সেখান থেকে সামনে জঙ্গলের মধ্যে তার স্রোত বয়ে চলেছে। ওতিয়া আমাকে ওই স্রোতের দিকেই নিয়ে চলল। কী ভয়ংকর সেই স্রোতের তেজ! আমি বলতে পারি, একবার যদি বেসামাল হয়ে সেই স্রোতে কেউ পড়ে যায়, তবে আর তাকে খুঁজে পেতে হচ্ছে না!

ওই স্রোতের তীর ধরে ওতিয়া আর আমি আরও গভীর জঙ্গলে চলেছি। আমি দেখলুম, ওই জলধারা ছুটতে-ছুটতে এখন যেন একটি নদীর রূপ নিয়েছে। আমরা আরও দেখলুম, ওই নদী সামনে অন্ধকার এক গুহার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। হয়তো গুহার জমাট অন্ধকারে লুকোচুরি খেলতে-খেলতে ওপাশ দিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। ওতিয়ার সঙ্গে আমি ওপাশেই ছুটলুম। এখন আমরা যতই দূরে চলে যাচ্ছি, ততই জলপ্রপাতের শব্দ ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। শুধু শোনা যাচ্ছে, এই পাহাড়ি নদীটির জলের বাজনা। গুহার ভেতরে যেন জলের পরিরা নূপুর-পায়ে নাচছে।

আমরা যখন গুহার এপাশ থেকে ওপাশে পৌঁছোলুম, তখন সত্যি কী অদ্ভুত লাগছিল। মনে হচ্ছিল, গুহার মুখ থেকে যেন গলন্ত রুপো ঝলক-ঝলক করে বেরিয়ে আসছে। গাছের পাতায় হাওয়ার ঢেউ, জলের শব্দ, দু-একটি পাখির ডাক, আমাকে কেমন আনমনা করে দিল। আমি ব্যানডুররিয়াটা হাতে নিলুম। তারে-তারে সুর বেঁধে বাজাতে শুরু করলুম। সেই গানটা বাজাতে এখন আমার ভালো লাগছে। ভয়ংকর সেই রাতে যেদিন মা আমার শেষবারের মতো যে-গানটি গেয়েছিল। আর আমি যেদিন প্রথমবার মায়ের সুরে সুর মিলিয়ে ব্যানডুররিয়া বাজিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলুম। এই নির্জন জঙ্গলে, এই পাহাড়ি নদীর সামনে দাঁড়িয়ে সেই সুর বাজাতে-বাজাতে আমার চোখ ছলছলিয়ে উঠল। দেখে ফেলল ওতিয়া। কী ভাবল আমি জানি না। জানি না, এখন আমার এই বাজনার শব্দ তার শুনতে ভালো লাগছে কি না! এখন হয়তো অবাক হয়ে ওতিয়া ভাবছে, এত আনন্দেও আমি কাঁদছি কেন! ও কি বুঝতে পারে আমার মনের কথা? হয়তো পারে। নইলে, ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ায় কেন সে? আমার যে-হাতটি বাজনার সুর তুলছে, সেই হাতটি ছুঁয়ে থামিয়ে দিল। তারপর নরম-সুরে জিজ্ঞেস করল, 'ভালো লাগছে না ইসতাসি?'

আমি তাড়াতাড়ি নিজের চোখের জল সামলে নিয়ে বললুম, 'না না। খুব ভালো লাগছে।'

'তবে কাঁদছ?'

'কই না।'

'বুঝতে পেরেছি। মাকে আর বাবাকে মনে পড়ছে বুঝি?'

আমি চুপ করে রইলুম।

ওতিয়া বলল, 'তুমি এত সুন্দর বাজনা বাজাও।'

'তুমিও তো খুব সুন্দর গান গাও।'

ওতিয়া যেন লজ্জা পেল। লজ্জা পেয়ে ওতিয়া যখন মুখখানি নিচু করে নেয়, তখন এত ভালো লাগে দেখতে! এখন যেন আরও ভালো লাগল। আকাশ থেকে সূর্যের ঝকঝকে আলোর মুক্তাগুলি ওর চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। কী সুন্দর দেখতে লাগছে! আমি মনের দুঃখটা মনের ভেতর চেপে রেখে ওতিয়ার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললুম, 'ওতিয়া, তুমি একটা গান গাইবে? আমি বাজনা বাজাব।'

ওতিয়া আমার মুখের দিকে চাইল।

আমি আবার বললুম, 'গাও!'

ওতিয়া ছুটে পালিয়ে গেল। ওতিয়া পাথরের গায়ে লাফাতে-লাফাতে মস্ত একটা পাথরের আড়ালে হারিয়ে গেল। তারপর দেখতে পেলুম, পাথরের গায়ে যে সবুজ গাছটা নদীর দিকে মুখ হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে উঁকি মারল ওতিয়া। আমি না-দেখার ভান করলুম। ওতিয়া আমার নাম ধরে ডাকল, 'ই-স-তা-সি।'

আমি মুখে সাড়া না-দিয়ে আমার ব্যানডুররিয়ার সুরে বাজিয়ে দিলুম, 'ও-তি-য়া।'

ওতিয়া হেসে উঠল। তারপর গেয়ে উঠল। গাইতে-গাইতে ওই পাথরের আড়াল থেকে আর-এক পাথরের ওপর লাফিয়ে পড়ল। তারপর এই পাথর থেকে ওই পাথর, সেখান থেকে আর-এক পাথর, লাফিয়ে নেচে গাইতে লাগল। আমি বাজাতে লাগলুম।

তুমি যদি তখন সেই দৃশ্য দেখতে, তোমার সাধ্যি ছিল না, চোখ ফেরাও। ওতিয়া এমন মজা করে গান গাইছিল! তেমনি মজার কথায়-ভরা সেই গান। আমার তো হাসতে-হাসতে পেটে খিল লেগে যাবার গোত্তর! আমি জানি না, সে সময় তুমি ওতিয়ার সামনে থাকলে কী করতে! কে জানে, তোমার হাসি পেত কি না! কিন্তু এখন হাসি পাক চাই না-পাক ওতিয়ার সেই গানের কথাগুলো শুনতে তো কোনো দোষ নেই। সেই গান অনেকটা এমনি .

এক্ষুনি যদি এক ভাল্লুক,

রেগে বলে, এই দ্যাখ হাঁচছি,

তারপর পায়ে দিয়ে বুট-শ্যু

ধিন-ধিন নেচে বলে নাচছি!

তখন কী মজা হয় বলো তো?

এক্ষুনি যদি এক নেকড়ে,

কেঁদে বলে, পেটে ব্যথা মরছি,

ওরে বাপ দে-না ডাক বদ্যির

মাথা খুঁড়ে তোকে গড় করছি।

তখন কী মজা হয় বলো তো?

এই যে গানটা শুনলে, এটা আমি ওতিয়ার গলায় শুনে মোটামুটি একটা মানে দাঁড় করিয়েছি। দেখছ, গানের এক জায়গায় আছে, 'পায়ে দিয়ে বুট-শ্যু'। আসলে, ওতিয়ার গানে 'বুট-শ্যু' কথাটা ছিল না। ছিল অন্য আর-একটা শব্দ। সেই শব্দটার মানে করতে না-পেরে অগত্যা 'বুট-শ্যু' কথাটা আমিই জুড়ে দিয়েছি। অবিশ্যি, মানের যে খুব একটা গোলমাল করে ফেলেছি, তা মোটেই ভেবো না যেন!

গানটা গাইতে-গাইতে ওতিয়া যেন কী দেখে হঠাৎ থমকে গেছল। আমিও ওর মুখের দিকে চেয়ে হকচকিয়ে গেছি। ওতিয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলুম বলে, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি, আমার পেছনে কী দেখে, ওতিয়ার মুখখানা এমন ভয়ে কুঁচকে গেল! আমি নিজে পেছন ফিরে দেখার আগেই ওতিয়া চিৎকার করে উঠেছে, 'ইসতাসি!'

আমি চোখের পলকে পিছনে তাকিয়েছি। তাকিয়ে ভয়ে আঁতকে উঠেছি আমি! আমার পেছনে একটা দাঁতালো শুয়োর! কী বিচ্ছিরি আর কিম্ভূতকিমাকার দেখতে শুয়োরটাকে! কুতকুতে চোখ দুটো পিটপিটিয়ে দেখছে আমাদের। আমি কী করব, ভাবতে না ভাবতেই দেখি, শুয়োরটা তার বিটকেল মুখটা উঁচিয়ে, দাঁত খিঁচিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসছে। আমি পালাতে যাব, এমন সময় ওতিয়া ঝট করে এগিয়ে এসে আমায় আড়াল করে দাঁড়িয়ে পড়ল। ধনুকটা কাঁধ থেকে নামিয়ে তির জুতল। বুনো শুয়োরটাকে তাক করল। আমি নিশ্চিত জানি, সেই সময় বুনো শুয়োরের সামনে পড়লে, আমার মতো তুমিও প্রাণের ভয়ে কাঁপতে। কারণ, তার চেহারাটা সত্যিই এমন বীভৎস আর ভয়ংকর যে, আচমকা দেখলে যে-কোনো মানুষের বুদ্ধি-বিবেচনা সব কোথায় উবে যাবে! কিন্তু আশ্চর্য, ওতিয়া ভয় পেল না। বুনো শুয়োরটা তার নাকের পাশে বাঁকানো খড়গ দুটো খাড়া উঁচিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে আসছে। ওতিয়া মুখে একটা প্রচণ্ড আওয়াজ করল। সে আওয়াজে ছিল একটা ভীষণরকমের ধমক। কিন্তু সেই জন্তু শোনেনি ওতিয়ার ধমক। সে তেড়ে এসেছিল। ওতিয়া চেঁচিয়ে উঠে আমাকে বলেছিল, 'ভয় পেয়ো না ইসতাসি।' বলেই তির ছুড়ে দিয়েছিল সেই বুনো শুয়োরের কপালের মাঝখানে। আমি জানতুম, ওতিয়ার তিরে ছিল বিষ মাখানো। তির কপালে বিঁধে যেতেই সেই বুনো শুয়োর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে লাফিয়ে পড়ল আমাদের সামনে। ওতিয়া চিৎকার করে উঠল, 'ইসতাসি ছুট দাও!' বলে ওতিয়া নিজেই আমার হাত ধরে সেই পাথরের ওপর ছুটতে লাগল। আমার তো অত অভ্যেস নেই। তবু প্রাণের ভয়ে পড়ি-মরি ছুটতে লাগলুম।

বেশ খানিকটা ছুটে এসেছি। পিছনে ফিরে দেখি, শুয়োরটা ছুটছে না। একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে লাফাচ্ছে। যন্ত্রণায়। তার কপাল দিয়ে রক্তের বান বয়ে যাচ্ছে। আমি দূর থেকে স্পষ্ট দেখতে পেলুম, তার বুকটা হাঁসফাঁস করছে। হাঁপাচ্ছে সে। মনে হল, বিষের তেজ ওর রক্তে মিশে ওকে কাবু করে ফেলেছে।

সত্যিই তাই। সেই বুনো শুয়োরটা লাফাতে-লাফাতে কেমন ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়ছে। দেখতে পেলুম, যেখানে সেটা লাফাচ্ছিল, সেইখানেই মুখ গুঁজড়ে পড়ে গেল। পড়ে মুখে কীরকম একটা শব্দ করতে-করতে নির্জীব হয়ে গেল। ওতিয়া হেসে উঠল হাততালি দিয়ে। ওতিয়ার মুখে হাসি দেখে আমিও হেসে উঠলুম।

ওতিয়া বলল, 'খতম হয়ে গেছে।' বলেই ছুটে গেল সেখানে। আমিও ছুটলুম। জয়ের আনন্দে ওতিয়ার মুখখানা খুশিতে যতটা উছলে উঠছে, বুকখানা গর্বে ফুলে উঠছে তারও বেশি! আমি কাছে গিয়ে দেখলুম, সেটা তখনও ধুঁকছে। আমি জানি, এখনই ওর বুকের ধুকপুকুনি থেমে যাবে। বাছাধনের সময় হয়ে আসছে।

ওতিয়া হাতের ধনুকটা পাশে রেখে আমাকে বলল, 'ইসতাসি, এসো, শুকনো কাঠপাতাগুলো ওর গায়ের ওপর বিছিয়ে দিই।' বলে এ-ধার ও-ধার থেকে চটপট করে শুকনো কাঠপাতা কুড়ুতে থাকল। আমিও হাত লাগালুম। যদিও বুঝতে পারছি, এই শুকনো গাছপালা আর পাতা ছড়িয়ে ওর গায়ে আগুন লাগিয়ে দেবে, কিন্তু বুঝে উঠতে পারছি না ওতিয়া এখানে আগুন পাবে কোথায়! তাই জিজ্ঞেস করে ফেললুম, 'শুধু-মুধু ওর গায়ে এগুলো চাপিয়ে কী করবে ওতিয়া?'

'দাহ করব।'

'আগুন?'

'দেখো-না।'

দেখতে বেশিক্ষণ হল না। সামনে থেকে দুটো পাথর কুড়িয়ে নিয়ে এল ওতিয়া। অবাক হয়ে দেখলুম, সেই পাথর দুটো তার ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে ঠুকতে লাগল। আগুনের চকমকি ছড়িয়ে পড়ছে। সত্যিই, হঠাৎ সেই চকমকির ফুলকি ছিটকে ঝরাপাতায় ঝপ করে আগুন ধরে গেল। তারপরই দাউ-দাউ করে জ্বলে ধোঁয়ায় ভরে গেল চত্বরটা। খুশিতে চিৎকার করে উঠল ওতিয়া!

আমি এখন সত্যিই অবাক হয়ে যাচ্ছি, ওই একটা ছোট্ট মেয়ে ওতিয়ার অমন দুর্দান্ত সাহস আর বুদ্ধি দেখে! জঙ্গলের মানুষ যারা, তাদের বুঝি এমনিই সাহসী হতে হয়! হ্যাঁ, সারাজীবনই তো বিপদ মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। মনে সাহস আর বুকে তেজ না থাকলে উঠতে-বসতে মরতে হবে না!

ধোঁয়া উড়ছে, আগুনও জ্বলছে। এরই মধ্যে শুয়োরের পোড়া মাংসের গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আমি জানি, একটু পরেই মাংসটা বেশ কিছু ঝলসে গেলে, ওতিয়া ওই শুয়োরটার ঘাড় থেকে খানিকটা পোড়া মাংস ছিঁড়ে এনে আমায় দেবে। নিজেও নেবে। তারপর সেই আগুনে ঝলসানো মাংস মুখে দিয়ে আঃ, উঃ করবে। করতে-করতে কত কথাই না কইবে!

কিন্তু তা হল না। হল যা, তা আর এক ভয়ংকর কাণ্ড! একটা ভয়াবহ বিপদ যে ওই ধোঁয়ার আড়ালে এতক্ষণ ওত পেতে বসে আছে, আমরা তা একেবারেই টের পাইনি! কিন্তু আশ্চর্য মেয়ে ওতিয়া! ও যেন হাওয়ার স্পর্শ পেলে বলে দিতে পারে, কোথায় বিপদ উঁকি মারছে। কী সতর্ক দৃষ্টি ওতিয়ার চোখে! অথচ আমি? বুঝতেই পারি না কিছু! ওতিয়া যখন প্রায় লাফিয়ে উঠে ছোঁ মেরে সেই ধনুকটা আবার মাটি থেকে তুলে নিল, তখনই আমার টনক নড়ল। চোখের পলকে তার পিঠে বাঁধা তূণ থেকে একটা তির টেনে নিল সে। ছিলায় আটকে চেঁচিয়ে উঠল, 'ইসতাসি সাবধান!'

আমার বুকটা ধক করে আঁতকে উঠেছে। সত্যি বলছি, আমি এতক্ষণ মরা শুয়োরটার পোড়া গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে মনে-মনে ভাবছিলুম, মাংসটা দারুণ জমবে! মিথ্যে বলব না, নোলায় দু-এক ফোঁটা জলও উঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছিল। কিন্তু ওতিয়ার অমন চিৎকার শুনে নোলার জল নোলায় শুকিয়ে গেছে! পিছন ফিরে দেখি, ওতিয়া যেদিকে তির উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে, সেদিকের ঘন জঙ্গলের আড়ালে কমসে-কম দশ-পনেরোটা বুনো শুয়োর দাঁত খিঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রেগে তাদের ল্যাজগুলো সব খাড়া! তাক করে আছে আমাদের দিকে। বুঝতে বাকি রইল না, এবার ওরা একসঙ্গে আমাদের আক্রমণ করবে।

ওতিয়া হেঁকে উঠল, 'ইসতাসি, শিগগির আমার পেছনে চলে এসো।'

আমি দেখেশুনে এমনই ঘাবড়ে গেছি যে, ওতিয়ার কথা যেন আমার কানেই ঢুকল না। ভয়ে আমার পা নড়ছে না। তখন ওই একটা শুয়োরের বিদঘুটে মূর্তি দেখেই আমার কালঘাম ছুটে গেছল। এখন একসঙ্গে অতগুলো। একবার যদি খড়গ দিয়ে পেটের ভেতর ঢুঁ লাগায়, তবে যে কী হবে, সে-কথা তোমাদের না-বললেও চলবে।

হয়তো ওদের ভাবগতিক দেখে ওদের যে কী মতলব ওতিয়ার বুঝে নিতে একচুল দেরি হয়নি। শুয়োরগুলো আমাদের আক্রমণ করার আগেই ওতিয়া নিজেই তেড়ে গেল! আমি থতমত খেয়ে গেছি। আর্তনাদ করে ডাক দিয়েছি, 'ওতিয়া!'

ওতিয়া দৃঢ় গলায় সাড়া দিল, 'ভয় নেই ইসতাসি। তুমি এসো না। ওইখানেই দাঁড়িয়ে থাকো! শত্রু আক্রমণ করার আগে, তাকেই ঘায়েল করতে হবে।'

ওতিয়া আরও এগিয়ে গেল। এগিয়ে গেল, একেবারে শুয়োরগুলোর মুখোমুখি। ভয়ে আমার গায়ের লোম খাড়া! কী দুর্দান্ত সাহস ওতিয়ার!

কিন্তু তার চেয়েও আর এক দুঃসাহসী দৃশ্য আমার জন্যে অপেক্ষা করছিল। দেখলুম, ওতিয়া সাঁই-ই-ই করে একটা তির ছুড়ে দিল শুয়োরের দঙ্গলে। একটার পিঠে গিয়ে প্যাঁট করে বিঁধে গেল সেই তির। বাছাধন কাত। বলব কী, তাই দেখে শুয়োরের পাল ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে মার ছুট! আশ্চর্য! ওতিয়া কিন্তু ওদের পালাতে দেখে পিছু হটে এল না। আমি দেখলুম শুয়োরগুলোকে তাড়া করতে-করতে ওতিয়া জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। শুনতে পেলুম, জঙ্গলের মধ্যে ঘোঁত-ঘোঁত শব্দ আর ডালপালা ভেঙে পড়ার মড়মড়ানি! আমি বুঝতে পারলুম, ওতিয়া শুয়োরগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। শেষ না করা পর্যন্ত ছাড়বে না। তোমরাই বলো, এইরকম অবস্থায় আমার কি এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা সাজে? কে বলতে পারে কোথা থেকে বিপদ আসে! আমার এখনই উচিত ওর সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া। বিপদ হোক! হলে দুজনারই হবে। তবু তো কেউ বলতে পারবে না, একটা ছোট্ট মেয়েকে মরণের মুখে ঠেলে দিয়ে আমি এখানে লুকিয়ে বসে স্বার্থপরের মতো গা বাঁচাচ্ছি!

আর মুহুর্তের জন্যেও অপেক্ষা করলুম না। থাক-না ব্যানডুররিয়াটা হাতে। আমি বাজনা নিয়েই চেঁচিয়ে উঠলুম, 'ওতিয়া, দাঁড়াও, আমি আসছি।' বলতে-বলতে ছুট দিলুম।

কিন্তু ওতিয়ার সাড়া পেলুম না। এমনকী, এতক্ষণ চারিদিকে ডালপালা ভাঙার যে-সব পটাং-পটাস শব্দ শুনতে পাচ্ছিলুম, সেই শব্দও আর শুনছি না। হঠাৎ কেমন যেন সব নিথর, নিশ্চুপ হয়ে গেল। তবু আমি ছুটে গেলুম। ছুটতে-ছুটতে ডাক দিলুম, 'ওতিয়া!'

সাড়া পেলুম না।

এবার আমি আমার গলায় যত জোর ছিল, প্রাণপণে তত জোরে চিৎকার করে উঠলুম, 'ওতিয়া, তুমি কোথায়?'

এবারও সাড়া পেলুম না।

জলপ্রপাতের ক্ষীণ শব্দ, সেই শব্দের ফাঁকে-ফাঁকে জঙ্গলের একটা অদ্ভুত নির্জনতা আমাকে কেমন যেন অসহায় করে দিল। মাথায় আসছে না, কী করি! যদিও আমি এখন এই জঙ্গলেরই মানুষ, তবু তার সব রহস্য তো আমার এখনও জানা হয়নি। হয়তো জঙ্গলের সব রহস্য কেউ কোনোদিন জানতে পারেও না। হলেই-বা ওতিয়া এই জঙ্গলেরই একজন। সে-ও যে এই ছোট্ট বেলায় সব-কিছু জেনে ফেলেছে, এ আমি কেমন করে বিশ্বাস করতে পারি। কে জানে, ওই জন্তুগুলো হয়তো ওই ছোট্ট মেয়েটাকে রহস্যের জালে জড়িয়ে ফেলেছে এতক্ষণে। হয়তো ওতিয়া বাইরে বেরিয়ে আসার পথ হারিয়ে ফেলেছে। এ-কথা ভাবতে-ভাবতে আমার মন ভীষণ ছটফট করে উঠল। আমার কী যে হল, আমিও ওতিয়াকে ডাকতে-ডাকতেই জঙ্গলের গভীরে ঢুকে পড়লুম। কখনো জোরে, কখনো অস্পষ্ট স্বরে ডাকতে লাগলুম, 'ওতিয়া, ওতিয়া।' তার দেখা পাওয়া দূরে থাক, সাড়া পর্যন্ত পেলুম না। এ যেন ভোজবাজি! চোখের পলকে হারিয়ে গেল! নাকি, শুয়োরগুলো তাকে আক্রমণ করেছে! তাহলে চিহ্ন তো থাকবে! কোথায়, তেমন তো কোনো চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি না!

আমি আবার ছুটলুম পিছনদিকে। কিন্তু এ যে আবার আর এক সর্বনাশের কাণ্ড ঘটে গেছে! আমার অজান্তেই আমি নিজেই হারিয়ে গেছি! হারিয়ে ফেলেছি আমার পথ এই জঙ্গলের গোলকধাঁধায়। খেয়ালই করতে পারছি না, কোন পথ দিয়ে এখানে এসেছি! একবার এদিক, একবার ওদিক ছোটাছুটি করতে-করতে মাথা গোলমাল হয়ে গেল। ভীষণ ঘাবড়ে গেলুম। ঠিক-ঠিক চিন্তা করার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছি। অবশেষে চিৎকার শুরু করে দিলুম, 'ওতিয়া, আমায় বাঁচাও, আমায় বাঁচাও।' চেঁচাতে-চেঁচাতে ঝোপ-জঙ্গল টপকাতে লাগলুম। জঙ্গলের চক্করে চরকি খেতে-খেতে দম শেষ হয়ে যাচ্ছে। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। আমি বোধ হয় এক্ষুনি মুখ থুবড়ে পড়ে যাব! আঃ! ভারি তেষ্টা পাচ্ছে! গলা শুকিয়ে যাচ্ছে! আমার কি মরণের সময় ঘনিয়ে আসছে! আমি আর থাকতে পারলুম না। ঠোক্কর খেলুম। ছিটকে পড়লুম। বুঝতে পারলুম, প্রচণ্ড লেগেছে। কিন্তু তারপর সব যেন কেমন হয়ে গেল। আমি যেন আমাকে আর ধরে রাখতে পারছি না। আমি হারিয়ে যাচ্ছি। আর সত্যিই আমার জ্ঞান হারিয়ে গেল। আমি পড়ে রইলুম এইখানে। যেখানে পড়ে থাকলে আমি মরে গেলেও কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না।

আমার আবার জ্ঞান ফিরে এসেছিল হঠাৎ-ই। কতক্ষণ পড়েছিলুম, তা আমার খেয়াল থাকার কথা নয়। হয়তো হবে অনেকক্ষণ। অবাক লাগছে, এতক্ষণ পড়েছিলুম, অথচ এখনও আমি বেঁচে আছি! বাঘে তো খেতে পারত! কিংবা অন্য কোনো হিংস্র-জন্তু! বলতেই হবে, এ আমার ভাগ্য!

কিন্তু ওতিয়া! ওতিয়া কোথায়? ওতিয়ার কথা মনে পড়তেই ছ্যাঁক করে উঠল আমার বুকটা। আমি চকিতে উঠে দাঁড়ালুম! সত্যিই তো, কোথায় গেল মেয়েটা! আমি ব্যস্ত-পায়ে ঘুরে দাঁড়ালুম। মুখ ফেরালুম। ওতিয়া নেই। কিন্তু আমার চোখের সামনে ওটা কী দাঁড়িয়ে আছে।

একটা ভাল্লুক!

আমি স্থির! না-পারি বসতে, না-পারি চলতে! পা দুটো অসাড় হয়ে কাঁপতে লাগল। বুকে সাহস এনে কাঁপুনিটাকে যতই ঠেকাবার চেষ্টা করছি, কিছুতেই পারছি না। আমি স্পষ্ট দেখছি ভাল্লুকটাকে। দেখছি, জন্তুটার গায়ের রং বাদামি। নাকের সামনে সাদা ছোপ। গা-ভরতি লম্বা লোম। চোখ দুটো কুতকুত করছে। সে-চোখ দেখে বলা মুশকিল, এই মুহূর্তে সে পেটে-পেটে কী মতলব আঁটছে। কিন্তু তার পায়ের নোখগুলো দেখলে তোমার মনে হবেই, বাছাধন একবার যদি ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তবে আমাকে শেষ করে ফেলতে তার বেশি সময় লাগবে না।

এখন আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে ভাল্লুকটার দূরত্ব খুব বেশি হলে চার-পাঁচ হাত! সুতরাং তোমরা ধরে নিতে পারো, আমার শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। আহা রে! আমাকে মেরে ফেলার আগে এই গভীর জঙ্গলের জন্তুটা যদি আমার দু-চারটে কথাও বুঝতে পারে! তবে তাকে বলি, 'হে বন্ধু, এই দ্যাখো আমার গলায় ঝোলানো বাজনা। আমি তোমাকে মারতে আসিনি। আমার বন্ধু ওতিয়ার সঙ্গে আমরা আনন্দ করতে এসেছিলুম। কিন্তু আমাদের আনন্দে বাধা দিয়েছিল একদল বুনো শুয়োর। তারা আমাদের মারতে চেয়েছিল। আমার বন্ধু ওতিয়া ভয় করেনি তাদের। ওতিয়াও আক্রমণ করেছিল তির-ধনুক নিয়ে। তারপর ওতিয়া জঙ্গলের কোথায় যে হারিয়ে গেল, আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তাকে খুঁজতে-খুঁজতে আমিও হারিয়ে গেছি। আমায় যদি মারতে চাও তুমি, মারো! কিন্তু একটিবার যদি বলে দাও, কোথায় গেলে শেষবারের মতো আমি ওতিয়াকে দেখতে পাব, তবে তাকে শেষবারের মতো দেখে আমি নিজেই তোমার হাতে মরবার জন্যে এগিয়ে যাব।'

আমার চোখ ছলছলিয়ে উঠেছিল বোধহয়। খুবই স্বাভাবিক। এইরকম অবস্থায় আমার মতো তুমিও যদি পড়তে, তোমার চোখে জল আসত না?

হঠাৎ আমি হকচকিয়ে গেছি! আমার চোখ দুটো ছটফটিয়ে উঠেছে! দেখি কী, আচমকা ভাল্লুকটা সামনের পা-দুটো তুলে খাড়া দু-পায়ে দাঁড়িয়ে উঠল। দাঁড়াতেই, তার মুখের ঠোঁট দুটো দু-ফাঁক হয়ে দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল। তারপর অমনি দু-পায়ে হাঁটতে-হাঁটতে সে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। আমি তো জানি, এবার আমার সময় হয়ে এসেছে। আমি জানি, এবার ভাল্লুকটা তার সামনের দু-পা দিয়ে আমায় জাপটে ধরবে। জাপটে ধরে আমার হাড়গোড়গুলো সব গুঁড়িয়ে ফেলবে। আমি শেষ-নিশ্বাস ফেলার আগে হয়তো মাটির ওপরে আমাকে ছুড়ে ফেলে দু-পায়ের ওই তীক্ষ্ণ নোখগুলো দিয়ে আমার বুকটা চিরে ফেলে ভাল্লুকটা নিশ্চিন্ত হবে। কী জানি আমার কী হল, আমার বুকের মধ্যে কে যেন জাদুমন্ত্রের মতো সাহস এনে দিল। আমি ছুট দিলুম। এদিকটায় কত বড়ো-বড়ো ঘাস জন্মেছে। আমার একেবারে বুক অবধি লম্বা। আমি দু-হাত দিয়ে সেই ঘাস সরাতে-সরাতে যতটা সম্ভব জোর কদমে ছুটতে লাগলুম। তুমি তো জানো না, ঘাসের মধ্যে দিয়ে ছোটা কী দুঃসাধ্য কাজ! পায়ের দফারফা। বুঝতে পারছি, কেটে আর কাঁটা ফুটে রক্তারক্তি হচ্ছে। হোক। আমায় বাঁচতে হবে। ওতিয়াকে আমায় খুঁজে বার করতেই হবে।

আমি হঠাৎ-ই একবার দাঁড়ালুম। যদিও আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে, হাঁপাচ্ছি, তবু ভেবো না যেন, আমার দম ফুরিয়ে গেছে। এখনও আমি আরও কিছুক্ষণ নিশ্চায়ই ছুটতে পারব। ওই ভাল্লুকটার খপ্পর থেকে বাঁচার জন্যে আরও খানিকক্ষণ যুঝতে পারব। তবু দাঁড়ালুম। কারণ, ভাল্লুকটার তেড়ে আসার শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছিলুম না। শুনতে পাচ্ছিলুম না, ঝোপঝাড় ভেঙে পড়ার কোনো আওয়াজ। আমি চকিতে একবার পিছু ফিরলুম। হ্যাঁ, তাই তো। আমার পেছনে কোনো ভাল্লুকও নেই, কিচ্ছু নেই। আমি অবাক হয়ে গেলুম। তবে কি ভাল্লুকটা আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারল না। এ-কথাটা আমি কেন, তোমরাও নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবে না। সেটা নিশ্চয়ই এখানে কোনো ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে বসে আছে। সুতরাং এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা নয়! যেমন করে হোক এখান থেকে পালাতে হবে। এইকথা মনে হতেই আমি আবার ছুট দিলুম।

কিন্তু চমকে গেলুম। ছুটতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালুম। কেননা, যেদিক দিয়ে ছুটে যাব, ঠিক সেইদিকেই ভাল্লুকটা চুপটি করে বসে আছে। আমার চোখে ধুলো দিয়ে, কোন ফাঁকে, কোন পথ ধরে যে সে ওখানে গেছে, আমি বুঝতেই পারছি না। যেন ভেলকি! আমি এখন ভাল্লুকটার একেবারে নাগালের মধ্যে। এখান থেকে ছুটলেও আমার নিস্তার নেই।

কিন্তু আশ্চর্য! ভাল্লুকটার এখনই যা করা উচিত ছিল, সে তো তা করছে না! কই এক লাফে ছুটে এসে আমার গলাটা তো টিপে ধরছে না! স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমায় দেখছে খালি! ও কী ভেবেছে, আমার এই যে ব্যানডুররিয়াটা, এটা কোনো মারাত্মক অস্ত্র! ভেবেছে, এগিয়ে এলেই এটা দিয়ে ওর মুণ্ডুপাত করব। এ-কথা যদি ভেবে থাকে জন্তুটা আমার বাঁচোয়া! এ-যাত্রা আমি রক্ষা পেলেও পেয়ে যেতে পারি। সুতরাং ভাল্লুকটাকে আরও বেশি করে ভয় পাইয়ে দেবার জন্যে আমার মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল। আমি ব্যানডুররিয়াটা চটপট বাগিয়ে ধরে ভাল্লুকটার দিকে ঠিক বন্দুকের মতো তাক করে উঁচিয়ে ধরলুম। ভাল্লুকটা কিন্তু ভয় পেয়ে পালাল না। এমনকী, নড়েচড়ে ভয় পাবার ভাব-ভঙ্গিও করল না। আমি অবিশ্যি ঠিক অমনি করে ব্যানডুররিয়াটা উঁচিয়ে ধরে এক-পা এক-পা করে পিছু হটতে লাগলুম। ভাল্লুকটা ট্যাঁও করে না, টুঁও করে না। আমার দিকে যেমন করে চেয়েছিল, তেমনিই চেয়ে রইল। আমি এতক্ষণ প্রায় নিঃসাড়ে পিছু হটছিলুম। যখন দেখলুম, ভাল্লুকটার সত্যিই কোনো সাড়া-শব্দ নেই, দে টেনে দৌড়! ব্যাস ছুটতে গিয়েই চিতপটাং। ঝোপের মধ্যে বেটপকা পায়ে কিছু জড়িয়ে গেল! লাগল কি লাগল না সে-কথা ভাববার সময় কই! সামনে সাক্ষাৎ যমদূত! হাতের ব্যানডুররিয়াটা কোনোরকমে সামলে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালুম। এক বুক নিশ্বাস নিয়ে আবার ছুটতে গেলুম। পারলুম না। দেখলুম, যেদিক দিয়ে পালাবার ফাঁক খুঁজছি, ভাল্লুকটা এখন সেইদিকেই ঘাপটি মেরে বসে আছে! আশ্চর্য!

ঠিক এইসময়ে আমার মনের অবস্থা যে কী, তা খুলে না-বললেও তোমাদের নিশ্চয়ই বুঝে নিতে কষ্ট হবে না। আমি ভেতরে-ভেতরে এমন ভড়কে গেলুম যে, এখন কী করব সেটাই ভেবে পাচ্ছি না। সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল। মনে হল, ভাল্লুকের খপ্পর থেকে রক্ষা পাওয়ার আর বোধ হয় পথ নেই। আমি ভাল্লুকের ফাঁদে পড়েছি। ফাঁদের মধ্যে আটকা পড়ে এমনি করে ছটফটিয়ে মরতে হবে। আর সে-মরণ যে কী কষ্টের, তা এখন কেউ না-বললেও, বুঝে নিতে কষ্ট নেই। কিন্তু সেভাবে তিলে তিলে আমি মরতে চাই না। তাহলে কী করা? ভাল্লুকটার সঙ্গে লড়াই করব? আমার বয়েসটা যদি ঠিক-ঠিক মনে করতে পারো, মনে করতে পারো—আমি তোমাদেরই মতো ছোট্ট, তবে নিশ্চিত জেনো, ভাল্লুকের সঙ্গে খালি হাতে লড়াই করা আমার সাধ্যে কুলাবে না। ভাবো তো একবার ভাল্লুকের সেই দশাসই চেহারাটার কথা! উফ! কী ভয়ংকর মূর্তি! সত্যি, যেন একটা কালো যম! এই গভীর জঙ্গলে, এমনি এক কেলেকিষ্টি যমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটি ছোট্ট ছেলে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, এ-ছবিটা কল্পনা করলে, তোমার গায়ে কাঁটা দেবে না?

আপাতত আমি বন্দি। অর্থাৎ এই ঝোপের আড়াল থেকে ছুটে পালাবার আমি আর কোনো উপায় দেখছি না। কেননা, ভাল্লুকটা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে স্থির নজর রেখেছে আমার ওপর। একেই বোধ হয় বলে নজরবন্দি!

না, এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে মানুষ! একটা কিছু করতেই হয়! এই কথা মনে হতেই, একটা দুরন্ত দুঃসাহস আমার বুকের ভেতরে নাড়া দিয়ে উঠল। আমি শেষমেশ ভাল্লুকটার দিকেই এগিয়ে গেলুম। বলে রাখা ভালো, আমার হাতের ব্যানডুররিয়াটাকে আর বন্দুক বানাতে সাহস হল না। ওটা যেমন বাজনা আছে, তেমনিই থাক। কিন্তু যতই এগিয়ে যাচ্ছি, ততই মনে হচ্ছে, আমার শেষসময় বুঝি ঘনিয়ে এল! এই বুঝি ভাল্লুকটা লাফিয়ে পড়ল ঘাড়ে! শত্রুকে ঘায়েল করার এমন সহজ সুযোগ তার জীবনে বুঝি বা আর কোনাদিন আসেনি, আসবেও না।

কিন্তু ঠিক এইসময়ে অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল। আমাকে এগিয়ে যেতে দেখে ভাল্লুকটা কোথায় তেড়ে আসবে, তা নয়, পিছিয়ে যাচ্ছে। এ আবার কী ধরনের কৌশল! আমি দাঁড়িয়ে পড়লুম। ভাল্লুকটাও দাঁড়িয়ে পড়ল। আমি পিছু হটলুম। ভাল্লুকটাও সামনে হেঁটে এল। আমি থামলুম। ভাল্লুকটাও থামল। আমি বাঁ দিকে গেলুম। ভাল্লুকটাও বাঁয়ে ফিরল। আমি ডাইনে হাঁটলুম। ভাল্লুকটাও ডাইনে হেলল। তাজ্জব ব্যাপারতো!

এখন আমার কী করা উচিত? মাথায় আসছে না কিছুই! নিস্তব্ধ চারিদিক। সেই নিস্তদ্ধতারও একটা রহস্যময় শব্দ আমার কানে বাজছে। এখন জঙ্গলের সেই শব্দের সঙ্গে আমার বুকের ভেতরের ভয়ের শব্দটাও যেন একাকার হয়ে গেছে! অদ্ভুত একটা অবস্থা। সেই অবস্থায় নিশ্চুপ আর নিশ্চল হয়ে আমি ওই ভাল্লুকটার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। আর আমার সঙ্গে তাল রেখে ভাল্লুকটাও দাঁড়িয়ে রইল অনড় হয়ে।

হঠাৎ একটা কাণ্ড হয়ে গেল! হল কী, বেটপকা আমার হাত লেগে ব্যানডুররিয়ার একটা তার ঝন করে বেজে উঠল। চমকে গেল বোধ হয় ভাল্লুকটা। সে একটু চনমন করে নড়ে-চড়ে উঠল। তার উৎসুক চোখ দুটো এখন আমার মুখের ওপর থেকে সরে ওই ব্যানডুররিয়াটার ওপর গিয়ে পড়ল। সে রেগে গিয়ে আমার হাতের এই বাজনাটা দেখছে, না, শব্দ শুনে অবাক হয়ে চেয়ে আছে, তা আমি কেমন করে বলি! কিন্তু ব্যানডুররিয়ার এই ঝন শব্দটা আমার এই মুহূর্তের ভয়ের ভাবনাগুলিকে কেমন যেন হালকা করে দিল নিমেষের মধ্যে। আমার তক্ষুনি মনে হল, এখন এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে না-থেকে, মরবার আগে, শেষবারের মতো ব্যানডুররিয়াটা বাজাতে তো পারি! তুমি হলে এ-অবস্থায় কী করতে জানি না। কিন্তু আমি বাজালুম। আমার সাধের এই বাজনাটা নিয়ে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার মায়ের গাওয়া সেই গানটির সুর বাজালুম। নিস্তব্ধ প্রকৃতির বুকের ওপর আমার বাজনার সুর কেমন এক অদ্ভুত শোনাচ্ছে! এ যেন আমি বাজাচ্ছি না। আমার হাত ধরে বুঝি বা অন্য কেউ বাজিয়ে দিচ্ছে। আমি চোখ বুজে দেখতে পাচ্ছি আমার মাকে। দেখতে পাচ্ছি, আমার বাবাকে। মনে হচ্ছে, তাদের হাসি-হাসি মুখ দুটি আমার কপালের কাছে, একেবারে কাছে এগিয়ে এসেছে। তাদের ঠোঁটগুলি এইমাত্তর যেন আমার কপাল ছুঁয়ে গেল। আমি চমকে উঠলুম। চমকে চেয়ে ফেলতেই আমার স্বপ্ন ভেঙে গেল। না, তারা কেউ নেই। আমার মা, আমার বাবা কেউ-ই না।

কিন্তু আশ্চর্য হয়ে গেলুম আর-এক দৃশ্য দেখে। দেখলুম, সেই ভাল্লুকটা আমার বাজনার তালে-তালে সামনের দু-পা ওপরে তুলে দাঁড়িয়ে উঠেছে! নাচছে! এ কি বিশ্বাস করবার কথা? না সম্ভব? এ গভীর জঙ্গলের এক হিংস্র জীব তার শত্রুকে হাতে পেয়েও মারছে না, তারই বাজনার তালে নাচছে, এ-কথা বললে কোন মানুষ আমাকে পাগল না বলে! কিন্তু আমি যা স্পষ্ট দেখছি, তাকে মিথ্যে বলি কেমন করে! আমি দেখছি, ভাল্লুকটা আমার বাজনার সুরে যেন বিভোর হয়ে গেছে! এখন তাকে দেখলে মনে হয়, নাচ ছাড়া ও বুঝি জগতের আর কিছুই জানে না। আর ঠিক এই মুহূর্তে আমি ছাড়া এই বন্য-জন্তুটার বুঝি আর-কোনো বন্ধুই নেই! আমারও এতক্ষণ ভাল্লুক নামে যে-জন্তুটাকে মনে হয়েছিল নৃশংস এক জীব, এখন তার নাচ দেখতে-দেখতে মনে হচ্ছে, এই নিঃসঙ্গ, নির্জন বনে এমন চমৎকার বন্ধু বুঝি আর হয় না। কোথায় গেল আমার মরণের ভয়! কোথায় গেল আমার বিপদের ভাবনা! আমি এখন নিজেই নাচতে শুরু করে দিয়েছি। সে এক অদ্ভুত কাণ্ড! এখন এই বনের ভাল্লুকের সঙ্গে ইসতাসি নামে এই ছোট্ট ছেলেটার নাচ দেখলে, তোমার মনে হতে বাধ্য, ইসতাসি নিজেই বুঝি এক বন্য প্রাণী!

কে জানত, ওই নৃশংস জীবটার সঙ্গে আমার এ আনন্দের উচ্ছ্বাস একটুক্ষণের জন্যে। কে জানত, এমন এক গভীর জঙ্গলে অমন অসতর্ক হয়ে হই-হুল্লোড় করতে নেই। যে-কোনো মুহূর্তে বিপদ ঘটতে পারে! সত্যি বলতে কী, এমন আশঙ্কা আমার মনে একেবারেই আসেনি। আমি কেমন যেন সব ভুলে গেছি। ভাল্লুকটার নাচ দেখে, নিজেও নাচতে-নাচতে তার একদম কাছে চলে এসেছি। তারপরেই সব শেষ! অকস্মাৎ একটা প্রচণ্ড আঘাত পড়ল আমার ঘাড়ের ওপর। চকিতে আমার দু-চোখ ভরে অন্ধকার নেমে এল। আমি পড়লুম, না, মরলুম, কিছুই জানি না।

তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, আমি মরিনি। মরলে কী আর আমার এ-গল্প তোমরা শুনতে পেতে! আমি আঘাত পেয়ে পড়ে গিয়েছিলুম। পড়ে-পড়ে অচৈতন্য হয়ে ধুঁকছিলুম। আমার যখন চেতনা ফিরে এল, আমার চোখে তখন আলোর রোশনাইটা ভারি অসহ্য লাগছিল। ভালো করে চাইতে পারছিলুম না। সব যেন কুয়াশার মতো ঝাপসা। ভাবতে পারছি না কিছুই। যেন একটা জবুথবু জীবন্ত জঞ্জাল পড়ে আছি জঙ্গলে।

একটু-একটু করে যখন আমার চোখের আলো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, আমি ধীরে-ধীরে মনে করতে পারছিলুম আমার নিজের কথা, তখন যেন পর্দায় ভেসে ওঠা ছবির মতো আমার চোখে ফুটে উঠেছিল প্রথম সেই ভাল্লুকটার ছবি। আমি পরিষ্কার মনে করতে পারছি, তার সেই নাচের সেই উদ্ভট চেহারাটা! সে নাচছিল আমার ব্যানডুররিয়ার সুরে তাল মিলিয়ে। আমি মনে করতে পারছি, এমনই সময়ে আমার ঘাড়ের ওপর কে যেন প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল। আমি কিছু খেয়াল করার আগেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলুম। কিন্তু আমার শেষ মুহূর্তের শেষ দৃষ্টিটি ঠিক মনে করিয়ে দিচ্ছে, এ-আঘাত আমায় সেই ভাল্লুক করেনি। যে করেছে, তাকে আমার দেখতে পাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। কারণ সে আমায় আক্রমণ করেছিল পিছন থেকে। আর আক্রমণ এমনই অতর্কিতে যে, আমার তখন করার কিছুই ছিল না।

হঠাৎ বুকটা চমকে উঠল। কে যেন আমার বুকের মধ্যে ধাক্কা মেরে ওতিয়ার মুখটা মনে পড়িয়ে দিল। আমি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলুম। আমার ব্যানডুররিয়াটা হাতের কাছে দেখছি না। কষ্ট হচ্ছে, তবু উঠে দাঁড়ালুম। খুঁজতে লাগলুম বাজনাটা। দেখতে পেলুম, একটু দূরে ছিটকে পড়ে আছে সেটা। আমি হন্তদন্ত হয়ে সেটা তুলে নিতে গিয়ে দেখি, ভাল্লুকটা আহত অবস্থায় শুয়ে আছে সেটার পাশে। তার সারা গায়ে ক্ষত। রক্ত। সে যেন আমার অপেক্ষায় সেটা আগলে বেঁচে আছে। বুঝতে বাকি রইল না, সে কোনো হিংস্র জন্তুর সঙ্গে লড়াই করেছে। হয়তো আমাকে বাঁচাবার জন্যে। অথবা ব্যানডুররিয়াটা রক্ষা করতে। আমি তার কাছে ছুটে গেলুম। আমার দিকে ভারি করুণ দৃষ্টিতে চাইল সে। উঠে বসল। আমার চোখ থেকে তার চোখ সরিয়ে নিয়ে ওই সামনের ঝোপটার দিকে তাকাল। আঁতকে উঠলুম। দেখলুম, সেই ঝোপে একটা চিতা বাঘ ক্ষতবিক্ষত হয়ে মরে পড়ে আছে। দেখে মনে হল, কিছুক্ষণ আগে বনের দুই জন্তুর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়ে গেছে এইখানে। গাছের ডালপালা ঝোপঝাড় ভেঙে ছড়িয়ে একেবারে ছয়লাপ! বুঝতে পারলুম, এই চিতাটাই তখন আমায় আঘাত করেছিল। আর তার হাত থেকে আমাকে বাঁচাবার জন্যেই ভাল্লুকটাও লাফিয়ে পড়েছিল তার ঘাড়ে। দেখে বুঝতে কষ্ট নেই, এ-লড়াইয়ে জিতেছে ভাল্লুকটা। চিতা মরেছে, আমি বেঁচেছি। সুতরাং এখন নিশ্চিত হয়ে গেছি ভাল্লুকটা আমার বন্ধু। আনন্দের উত্তেজনায় আমি ভাল্লুকটার গলা জড়িয়ে ধরলুম। তার ক্ষত জায়গাগুলিতে হাত বুলিয়ে দিলুম। সে উঠে দাঁড়াল। তাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে খুশির আনন্দে আমার বুকের ভেতরটা দুলে উঠল। সে হাঁটল। সেই মৃত চিতাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, বাঘটা সত্যি মরেছে কি না। ছিটকে-পড়া ব্যানডুররিয়াটা তুলে নিয়ে আমিও পৌঁছে গেলুম চিতাটার সামনে। বিশ্বাস করতে পারছি না, এখন আমি বনের এক দুর্ধর্ষ জীবন্ত প্রাণী ভাল্লুকের পাশে দাঁড়িয়ে আর-এক ভয়ংকর হিংস্র প্রাণী চিতাবাঘের মৃতদেহটার দিকে চেয়ে-চেয়ে দেখছি। চিতাটার একটা চোখ ফুটো হয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। বুকের চামড়াটা ভাল্লুকের নোখের তীক্ষ্ণ আঁচড়ে দু-ফাঁক হয়ে ঝুলে পড়েছে। মনে হচ্ছে, কেউ যেন কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার বুকটা ফালা করে দিয়েছে। গায়ে কাঁটা দিল আমার। চিতাটাকে দেখতে-দেখতে তাচ্ছিল্যে চোখ ফেরাল ভাল্লুকটা। ঘুরে দাঁড়াল। আমায় দেখল। কী বুঝল জানি না। কিন্তু আমার মনে হল, ও যেন বলতে চাইছে, 'ভয় নেই ইসতাসি, আমি যতক্ষণ আছি তোমার গায়ে কেউ একটি আঁচড়ও কাটতে পারবে না।'

আমার তখন বলতে ইচ্ছে করল, 'হে আমার প্রিয় ভাল্লুকবন্ধু, তোমার এই দয়ার কথা আমি কোনোদিনই ভুলব না। তুমি ছিলে বলেই আমি বেঁচেছি। তোমাকে দেখে আজ আমি ভাবতে পারছি, বনের হিংস্র প্রাণী শুধু মানুষের প্রাণ নেয় না, তাকে ভালোওবাসে। দুঃখ এই, আমি তোমার এই ভালোবাসার প্রতিদান তো কিছুই দিতে পারব না । এ প্রতিদান আমি আমার মানুষবন্ধু ওতিয়াকেও যে দিতে পারিনি। হঠাৎই সে হারিয়ে গেল এই জঙ্গলে। তাকে আর খুঁজে পেলুম না। খুঁজতে-খুঁজতে আমি তোমার দেখা পেয়েছি। তুমি কি পারো না আমাকে একটু সাহায্য করতে?'

আমার মনের এত কথা ভাল্লুক বুঝল কি না জানি না। আবার দু-পায়ে ভর দিয়ে আমার মুখের সামনে সে উঠে দাঁড়াল। চিতাকে খুন করার রক্তে তার পায়ের থাবাদুটো এখনও রাঙা হয়ে আছে। ধারালো নোখগুলো কী ভয়ংকর তীক্ষ্ণ। দু-পায়ের সেই থাবা দিয়ে আচমকা সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। এবার বুঝি আমার পালা! বুঝি আমার প্রাণ নেয়! আমি আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠার আগেই, সে আমাকে নরম স্পর্শে বুকের মধ্যে টেনে নিল। সে বুকে ভালোবাসা, শুধু ভালোবাসা! আতঙ্ক নয়, আনন্দে চিৎকার করে উঠলুম আমি। তারপর তার বুকের ভেতরে হাবুডুবু খেতে-খেতে আমিও তাকে জড়িয়ে ধরার জন্যে আমার ছোট্ট দুটি হাত মেলে দিলুম। পারলুম না তাকে জড়িয়ে ধরতে। কারণ, বিরাট ই জন্তুটাকে ধরার জন্যে আমার এই হাতদুটি নিতান্তই ছোট্ট। হেসে উঠলুম আমি। হাসতে-হাসতে ওর বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছি। আমার ব্যানডুররিয়ার তারে ঝংকার তুলে ভাল্লুকটাকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছি। ভাল্লুকও ঘুরছে আমার সঙ্গে। হয়তো আমার ব্যানডুররিয়ার শব্দের তালে সেও দুলছে! ভারি একটা অদ্ভুত শব্দ বেরোচ্ছে এখন আমার ব্যানডুররিয়ার তারে, 'জোরো—জোরো।' বাজনার শব্দটাকে আমার মুখে লুফে লুফে আমিও গলা মিলিয়ে চেঁচাতে লাগলুম, 'জোরো—জোরো।' তখনই আমার মনে হল, আচ্ছা, ভাল্লুকটাকে যদি 'জোরো' বলে ডাকি। মনে হতেই, ছুটতে-ছুটতে আমি ভাল্লুকটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লুম। গলা ছেড়ে ডাক দিলুম, 'জোরো—'

দেখতে পেলুম, আমার ডাক শুনে ভাল্লুকটার ছোট্ট দুটো চোখ খুশিতে চকচক করেছ। আমি আর একবার ডাকতেই সে মুখে একটা অদ্ভুত শব্দ করে আমার কাছে প্রায় লাফিয়ে ছুটে এল। আমি ওর গলাটা জড়িয়ে ধরলুম। তারপর আমার মাথাটা ওর মাথায় ঠেকিয়ে ডাকতে লাগলুম, 'জোরো, জোরো, জোরো।'

ভাল্লুকটা হাঁপাচ্ছে। তার বুকের শব্দটা আমি শুনতে পাচ্ছি। তার নিশ্বাসে খুশির উত্তেজনা। সে-নিশ্বাস এত গরম!

মনে হচ্ছে, কতদিন পরে তোমাদের সঙ্গে আমার আবার দেখা হল। এখন আমি অন্য এক ইসতাসি। ওই বনজঙ্গল পেরিয়ে আমি এখন শহরের মানুষ। ওই বন পেরিয়ে কেমন করে যে আমি শহরে এসেছি, সে আর এক গল্প। হ্যাঁ, আমার বন্ধু জোরোই আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। এখন সে-ই আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র সঙ্গী। জোরোকে নিয়ে আমার আবার শুরু হয়ে গেছে পথে-পথে আর এক নতুন জীবন। ও নাচে, আমি বাজনা বাজাই। তোমরা শুনলে অবাক হবে, আমার এখন অনেক পয়সা। আর তা সব জোরোর জন্যে।

এখন যে শুধু জোরো আমার ব্যানডুররিয়ার তালে-তালে নাচে তাই নয়। খেলা দেখায়। অনেকরকম খেলার ভেলকি দেখাতে পারে সে। সামনের দু-পা উঁচিয়ে দাঁড়ানোটা তো সে টুসকি মারলেই করতে পারে। কিন্তু পেছনের পা শূন্যে তুলে, আর্চ হয়ে, মাথাটা নিচু করে সে যখন হাঁটে, দেখলে তোমার তাক লেগে যাবে। ওই অবস্থায় হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ এমন ভলট দেয় যে, দেখলেই হাততালি।

হ্যাঁ, এখন অনেক হাততালি আমার কপালে জুটছে। এখন যেন আমার আবার সেই যাযাবরের জীবন শুরু হয়ে গেছে। আমি এখন এক ভাল্লুক-নাচিয়ে যাযাবর। সত্যি বলছি, এই ব্যানডুররিয়া বাজিয়ে পথে-পথে আমি যে এইভাবে জোরোর নাচ দেখিয়ে বেড়াব এটা আমি কল্পনাই করতে পারিনি কোনোদিন। একদিন হঠাৎই ব্যাপারটা ঘটে গেল। সেদিন রাস্তার ধারে বসে নিজের খেয়ালেই আমি ব্যানডুররিয়াটা বাজাচ্ছিলুম। সেই বাজনার তালে-তালে এমন সব আজব কাণ্ড করছিল জোরো যে, তাই দেখে আমি নিজেই তো থ। হঠাৎ দেখি, তার সেই আজব কাণ্ডকারখানা দেখতে-দেখতে একটি একটি করে অগুনতি লোক আমার সামনে এই পথের ওপর জমে গেল। জোরোকে দেখে তারা হেসে কুটোকুটি। আনন্দে লুটোপুটি। আমার বাজনার তালে তারাও নাচতে লাগল। চেঁচাতে লাগল, 'বাহাবা! বাহাবা!' আর আমিও মনে-মনে জোরোকে বলতে লাগলুম, 'বহুত আচ্ছা! বহুত আচ্ছা!'

হ্যাঁ, আমি এখন আর ভাবতেই পারি না, এই বন্য জন্তুটা একটা নৃশংস জানোয়ার। এখন আমার মনে হয়, বনের এই ভাল্লুকটা যেন আমার অনেক কাছের এক আপনজন। এই পৃথিবীতে ও জন্ম নিয়েছে বুঝি আমারই জন্যে। হয়তো তাই। এই প্রাণীটা যদি না থাকত, ওই দুর্গম বনের বিপদ থেকে কে আমাকে রক্ষা করত! কিংবা আজ আমাকে কে এত পয়সা দিত!

এখন আমার কত পোশাক হয়েছে। রঙের ছড়াছড়ি। লাল নীল হলদে সবুজ। কত রঙের পোশাক। যখন যেটা মন চায় পরি। আর পরতে-পরতে ভাবি, আমার সেই জঙ্গলের বন্ধু ওতিয়ার গাছপাতা-সাজানো সেই পোশাকের মতো আমার এই পোশাক কি অত সুন্দর!

হঠাৎ-হঠাৎই মনে পড়ে যায় আমার ওতিয়ার কথা। হঠাৎ-হঠাৎ তার সেই মুখের হাসিটি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তার সেই গান, কিংবা কলকল করে কথা বলার মিষ্টি শব্দগুলি আমার কানে বেজে উঠলে আমার অশ্রুর ফোঁটাগুলিকে আমি ধরে রাখতে পারি না। তখন আমায় দেখে এই বনের ভাল্লুকটা যে কী ভাবে, জানি না। সে কী বুঝে যে এই সময়ে আমার হাতের ওপর তার মাথাটি এগিয়ে দেয়, তা-ও আমি জানি না। শুধু আমার চোখের জল সামলে নিয়ে আমি তাকে জড়িয়ে ধরি। আর অস্পষ্ট গলার স্বরে বলি, 'পারিস না তুই ওতিয়াকে খুঁজে দিতে? পারিস না আমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে?'

আমার ইচ্ছে আছে একটা গাড়ি কিনব। ঘোড়ায়-টানা গাড়ি। একটা-একটা করে এখন এতসব জিনিসপত্তর জমে গেছে যে, আর গাড়ি না-হলেই নয়। আমার পিঠে বাঁধা এই ব্যাগটা আর কাজে আসছে না। তাছাড়া পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে মুসাফিরের মতো ঘোরাঘুরি করতেও বেশ ঝামেলা। আমার এই তাঁবুটাই দ্যাখো কী ভারী! অবিশ্যি তাঁবুটা জোরোই পিঠে নিয়ে বয়ে চলে। দরকার মতো খাটিয়ে নিতে আমার তেমন কষ্ট হয় না।

আমি যে ঘোড়ায়-টানা গাড়ির কথা বলছি, সেই গাড়িগুলো দেখতে কিন্তু দারুণ। টায়ার-আঁটা চারটে চাকার ওপর ফ্রেমে এঁটে কে যেন একটা বাক্স বসিয়ে রেখেছে। এতে যত খুশি জিনিসপত্তর তো রাখতে পারোই, তার ওপরে বেশ গুছিয়ে বিছানা পেতে ঘুম দিতেও দিব্যি আরাম। গাড়ির দরজাটা পেছনদিকে। ওই তোমাদের পুলিশ-ভ্যানে যেমন থাকে আর কী! সামনে বসে তুমি গাড়ি চালাও গড়গড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে। ছোটো এক দেশ থেকে আর-এক দেশে! তবে জোরোকে নিয়ে মুশকিল আছে। গাড়ির ভেতরে তো আর সে ঢুকতে পারবে না। যা কুঁদো। অবিশ্যি গাড়ির চালের ওপর ইচ্ছে করলেই জোরো উঠে পড়তে পারবে। চালে বসেই সে দেশে-দেশে ঘুরতে পারবে।

কদিন হল আমি এক কারনিভলে জোরোর খেলা দেখাতে এসেছি। এখানেই তাঁবু গেড়েছি। এ যেন নানান খেলার মজার মেলা। যত পারো আনন্দ করে নাও। একটা মস্ত মাঠে কারনিভল সাজিয়ে কত খেলাই না দেখানো হয়। এখানে ম্যাজিক দ্যাখো, ভেলকি দ্যাখো, গান শোনো, নাচ দ্যাখো—যা খুশি তাই। ইচ্ছে করলে ওই জায়েন্ট হুইলে চড়ে যত খুশি চরকি খেতে পারো। মেরি-গো-রাউণ্ডে ঘুরপাক খাও। মিনি-রেলে চেপে যেখানে খুশি চলে যাও। আমিও এসেছি এখানে। আমি জানতুম, এখানে জোরোর খেলা দেখিয়ে আর আমার ব্যানডুররিয়া শুনিয়ে বেশ কিছু পয়সা হবে। গাড়িটা তো কিনতে হবে!

কিন্তু আমি যা ভাবতে পারিনি এ যে তাই হল। জোরো যে এত তাড়াতাড়ি সবার এমন প্রিয় হয়ে উঠবে, এ যে আমার কল্পনার বাইরে। কারনিভলের সব ভিড় যেন উপচে পড়ছে জোরোর খেলা দেখবার জন্যে। কারনিভল জুড়ে অত যে সব মজার কাণ্ড, সেদিকে কেউ ছোটে না। ছুটে আসে আমার দিকে। খেলা দেখাব কী, ভিড় সামলাতেই হিমশিম। আর তারপরেই হল উলটো বিপত্তি! অন্য যারা খেলা দেখাতে এসেছে, তারা আমার ওপর ভীষণ চটিতং! আমার ওপর ভীষণ হিংসে! বটেই তো! ব্যাবসা করতে এসে মার খেলে, কার আর মন-মেজাজ ঠিক থাকে বলো! সুতরাং আমি যাতে পাততাড়ি গুটিয়ে মানে-মানে কেটে পড়ি তার জন্যে কুচক্রীরা ফন্দি আঁটতে বসল। কে জানে, হয়তো আমায় মেরেই বসে।

কথাটা কানে এল আমার আজ। আমার এত যে উৎসাহ, এত যে খুশি, সব যেন চুপসে গেল নিমেষে! দুঃখে মনটা মুষড়ে পড়ল। আমি যেন কেমন হতাশ হয়ে পড়লুম। কী করব এবার?

যখনই আমার মনটা এমনি দুঃখ আর হতাশায় ভেঙে পড়ে, তখনই যেন আমার কানে-কানে কে বলে যায়, 'ভেঙে পড়ছ কেন ইসতাসি? ওই তো তোমার বন্ধুটি সঙ্গে রয়েছে! তোমার ব্যানডুররিয়া। ওর তারে তোমার হাতের আঙুলগুলি আলতো ছোঁয়ায় টান দাও, তোমার সব দুঃখ শেষ হবে।'

আমি তখন সত্যিই ব্যানডুররিয়াটা হাতে তুলে নিই। বাজাই। আজও তাই খেলার শেষে তাঁবুতে ফিরে, হাতে তুলে নিলুম আমার ব্যানডুররিয়া। তার একটি-একটি তারে ঝংকার টেনে ভাবতে লাগলুম, সত্যি ভারি প্রিয় আমার এই বন্ধুটি। কত গভীর সংকট থেকে সে আমাকে রক্ষা করেছে। কত মৃত্যুর হাত থেকে সে আমাকে বাঁচিয়েছে। আর এই বাজনাটার জন্যেই তো আজ আমি জোরোকে পেয়েছি। জঙ্গলের অন্ধকার থেকে কুড়িয়ে পাওয়া এক আশ্চর্য ভাল্লুক! আর ওতিয়া?

এখন রাত। ব্যানডুররিয়ার তারে-তারে সুর বেজে ওঠে আমার হাতের স্পর্শে। আমার গলা গেয়ে ওঠে ওতিয়ারই সেই গান :

দুঃখ কীসের বন্ধু

আমি তো আছি,

তোমারই যে পাশে-পাশে

এত কাছাকাছি।

গাইতে-গাইতে আমি যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি এই মুহূর্তে। আমার গানের শব্দগুলি ভারি ধীরে-ধীরে এই রাতের অন্ধকারে গুনগুনিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। মনে পড়ে যায়, আমার সেই ফেলে-আসা দিনগুলির কথা। আমার মা, আমার বাবা, আমাদের সেই দল। মনে পড়ছিল, সেই ভয়ংকর রাতের কথা। সেই রাতে প্রথমে মায়ের গানের সঙ্গে ব্যানডুররিয়া বাজাচ্ছিলুম আমি। তারপর সেই বন্দুকের গুলি। বোমা, পিস্তল, পুলিশ। তারপর আনাতিদাদার সঙ্গে—

'ইসতাসি!'

'কে!' আমি চমকে উঠলুম। আমার গান স্তব্ধ হয়ে গেল।

'ইসতাসি!'

আমি তাঁবুর বাইরে ছুটে এলুম!

'ইসতাসি!'

অত্যন্ত চেনা গলা আমার! অথচ অন্ধকার রাতে আমি তখনও ভালো করে চিনতে পারিনি। তাই ব্যস্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলুম, 'কে?'

'আমি।'

হঠাৎ আমার চোখের ওপর একঝলক আলো কে যেন ছুড়ে দিল। আমি দেখতে পেয়েছি। আমি চিনতে পেরেছি। আমি চিৎকার করে উঠেছি, 'আনাতিদাদা—।' ছুটে গেলুম তার কাছে। জড়িয়ে ধরলুম। কেঁদে ফেললুম। তারপর দুজনে অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলুম না।

আনাতিদাদাই প্রথমে কথা বলল, 'এতদিন কোথায় ছিলি ইসতাসি?'

উপছে-পড়া চোখের জল সামলাতে-সামলাতে আমিও জিজ্ঞেস করলুম, 'তুমিই-বা কোথায় ছিলে আনাতিদাদা?'

আমার মুখের দিকে চাইল আনাতিদাদা। তারপর বলল, 'জেলে।'

আমি শিউরে উঠলুম।

'পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলুম। ওরা আমার পায়ে গুলি মেরে আমায় কাবু করে ফেলে। তারপর ধরে নিয়ে যায়।'

আমি বুঝতে পারলুম,আনাতিদাদার সেই গুরুগম্ভীর গলার স্বর কেমন যেন ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। সেই ক্ষীণস্বরে আনাতিদাদা আবার বলল, 'কদিন আগে ছাড়া পেয়েছি। পয়সা নেই। তাই কারনিভলে ম্যাজিক দেখাতে এসেছি। এখন আর তেমন পারছি না। শরীরটা গেছে। পায়ে গুলি লেগে যে ঘা হয়েছিল, সেটা বিষিয়ে গেছে। তাই আমার ম্যাজিক দেখার লোকই জুটছে না। তার ওপর শুনলুম, একটি ছোট্ট ছেলে ভাল্লুক-নাচ দেখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। এই কারনিভলে লোকে দল বেঁধে তার খেলাই দেখতে ছুটছে। অন্যের খেলা কেউ দেখছে না। আমার কৌতূহল হল, কে ছেলেটি! কী এমন খেলা! দেখতে গেলুম। দেখে চমকে উঠলুম। এ যে ব্যানডুররিয়া হাতে আমার ইসতাসি! আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠেছিলুম। কিন্তু না, তখন আর কিছু করিনি। শুধু চুপিচুপি ইসতাসির আস্তানাটা খুঁজে বার করেছি। ইসতাসিকে অবাক করে দেব বলে, এই অন্ধকারে, লুকিয়ে-লুকিয়ে এখন এসেছি। এসে দেখছি, আমার চেয়েও এক বড়ো জাদুকরকে।' বলে আনাতিদাদা আমার মাথায় হাত রাখল। আমায় কাছে টেনে নিয়ে আদর করে চুমু খেল। তারপর হাঁপাতে লাগল। আমার মনে হল, আনাতিদাদার হাত-পাগুলো থরথর করে কাঁপছে। আমি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'তোমার কষ্ট হচ্ছে, আনাতিদাদা?'

'কই? না।'

আমি বুঝতে পারলুম, আনাতিদাদা দাঁড়াতে পারছে না। তার পিঠে-বাঁধা ম্যাজিকের ঝুলিটা তাড়াতাড়ি নামিয়ে নিয়ে বললুম, 'এসো, এসো, ভেতরে এসো।'

'হ্যাঁ, তাই চ। একটু বসে যাই।'

ভেতরে এল আনাতিদাদা। তাঁবুর ভেতর জ্বলন্ত আলোয় আনাতিদাদার মুখখানা ভালো করে দেখে আমি শিউরে উঠলুম।

'তোমার এ কী চেহারা হয়েছে আনাতিদাদা?'

'আর বাঁচব না বেশিদিন।'

'ও-কথা বোলো না আনাতিদাদা।'

'গুলির বিষে শরীরটা ঝরঝরে হয়ে গেছে যে।'

হাঁটুর ওপরে ব্যান্ডেজ-বাঁধা জায়গাটা আনাতিদাদা দেখাল।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'এখন কোথায় আছ?'

'পথে।' বলেই হেসে উঠল আনাতিদাদা। হাসি দেখে বুঝতে কষ্ট হল না, আনাতিদাদার কিছুই নেই।

আমি বললুম, 'আর পথে-পথে তোমায় ঘুরতে হবে না আনাতিদাদা। আজ থেকে মনে করো, আমার তাঁবুই তোমার নিজের তাঁবু।'

'ইসতাসি!' বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা আনন্দে আমার নাম ধরে ডাক দিল আনাতিদাদা। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমার চোখের দিকে চাইল। ভারি নিশ্চিন্ত সেই চাউনি।

আমি আবার বললুম, 'তোমাকে আমি যেমন করেই হোক ভালো করে তুলব, আনাতিদাদা।'

'কী করে পারবি?'

'যেমন করে তুমি পেরেছে আমাকে ব্যানডুররিয়া শেখাতে।'

'হ্যাঁ, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে শুনছিলুম তোর বাজনা। এখন কী চমৎকার বাজাস!' বলতে-বলতে একঝিলিক মুচকি হাসি আনাতিদাদার ঠোঁটে ঢেউ খেলে গেল। আমি দেখলুম, সে-হাসিতে জৌলুস নেই। যেন কষ্ট মেশানো।

আমি বললুম, 'আনাতিদাদা, বিছানায় শুয়ে পড়ো। তোমার কষ্ট হচ্ছে।'

আনাতিদাদা বলল, 'না, তেমন না। তবে শুতে আপত্তি নেই।'

আমার খাবারের কৌটোতে দুধ আর রুটি ছিল। এনে বললুম, 'খেয়ে নাও।'

'তোর?'

'আমি খেয়েছি।'

'না কি লুকোচ্ছিস?'

'তোমাকে কখনো মিথ্যে বলিনি আনাতিদাদা।'

'তাহলে খেতে পারি, দে!'

আনাতিদাদা দুধ আর রুটি খেতে-খেতে জিজ্ঞেস করল, 'গান শিখলি কোথায়?'

'নিজে-নিজে।'

অবাক হল আনাতিদাদা, 'বলিস কী! নিজে-নিজে এত সুন্দর শিখেছিস?'

'সব তো তোমারই জন্যে।' আমি উত্তর দিলুম।

'ভাল্লুকটা? কিনেছিস?'

'না!'

'তবে?'

'জঙ্গল থেকে পেয়েছি।'

'হঠাৎ-হঠাৎ এমন সব আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে যায়, ভাবাই যায় না।'

আমি বললুম, 'তোমার সঙ্গেও দেখো, হঠাৎ কেমন দেখা হয়ে গেল। এও তো এক আশ্চর্য ঘটনা।'

আনাতিদাদা উত্তর দিল, 'আশ্চর্য তো বটেই। কেননা, আমার ঠিক মৃত্যুর আগে, আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছি।'

আনাতিদাদার কথা শুনে আমার বুকটা ছ্যাঁত করে চমকে উঠল। আমি বললুম, 'ও-কথা কেন বলছ আনাতিদাদা? তুমি মরবে কেন? কে তোমাকে মরতে দেবে?'

আনাতিদাদা আমার মুখের দিকে চাইল। আমার একটা মস্ত বড়ো ছায়া তাঁবুর গায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার সেই ছায়ার মতো, আনাতিদাদাও নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ!

হঠাৎ আমিই সেই নিস্তব্ধতা ভাঙলুম। বললুম, 'ঘুমিয়ে পড়ো।'

আনাতিদাদা জিজ্ঞেস করল, 'তোর বাজনাটা কই?'

'শুনবে?'

'শুনব। বাজনার সঙ্গে তোর গান।'

আমি গাইলুম। অবাক হয়ে আমার গান শুনতে-শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়ল আনাতিদাদা। তার ঘুমে-নিজঝুম মুখখানি দেখতে-দেখতে কত কথাই না মনে পড়ে যায়। মানুষটার সেই লোহার মতো শক্ত-পুরুষ্টু চেহারাটা যেন ভেঙে খান-খান হয়ে গেছে। এই এতখানি চওড়া বুক, সেই শক্ত দুটি হাত, সেই জীবন্ত দূটি চোখ, সবই যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। এখন একটা হাড়-জিরজিরে মানুষের কঙ্কাল যেন আনাতিদাদা। বড়ো কষ্ট হল। মনে-মনে ভাবলুম, এমন-একটা নির্দোষ মানুষকে গুলি মারতে হাত কাঁপল না!

সকালে ঘুম ভাঙল যখন, আনাতিদাদাকে বললুম, 'আজ থেকে তোমাকে আর কষ্ট করে ম্যাজিক দেখাতে হবে না। তুমি তাঁবুতে শুয়ে থাকো। খেলা দেখাব আমরা, আমি আর জোরো। পয়সা আনব। তোমাকে আবার আগের মতো ভালো করে তুলব। শুরু করব নতুন জীবন। একটা গাড়ি কিনব। গাড়ি করে দেশে-দেশে ঘুরব। তখন আবার তুমি ম্যাজিক দেখাবে। জোরো নাচের ভেলকি দেখাবে, আমি গান গাইব, ব্যানডুররিয়া বাজাব।'

আমার কথাশুনে শুধুই হাসল আনাতিদাদা। কথা বলল না। উঠতেও পারল না। বোধ হয় বন্দুকের গুলি খাওয়া বিষাক্ত ঘা আরও বিষিয়ে উঠেছে আজ। বোধ হয় ব্যথাটা বেড়েছে।

১০

আরও সাতদিন কারনিভল এখানে থাকবে। আরও সাতদিন আমি আর জোরো কারনিভলে খেলা দেখাতে পারব। আরও সাত দিনে আরও পয়সা হবে। আজও যেমন হল।

আজ অবিশ্যি একটা ভারি মজার ব্যাপার হয়ে গেল। খেলার শেষে সব লোকজন চলে গেলে, আমিও যাব বলে গোছগাছ করছি, হঠাৎ দেখি একটি ছেলে দাঁড়িয়ে। সে আমার ব্যানডুররিয়ার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। প্রথমটা তেমন গা করিনি। কিন্তু অনেকক্ষণ পরেও যখন দেখলুম, তার সেই দৃষ্টি একইভাবে অবাক হয়ে আছে, তখন কেমন সন্দেহ হল। আমি তাকে ডাকলুম। জিজ্ঞেস করলুম, 'অমন অবাক হয়ে কী দেখছ?'

সে প্রস্তুত ছিল না। একটু থমকে গেল। তারপর বলল, 'বাজনা।'

আমি বললুম, 'ওঃ! বাজাতে ইচ্ছে করছে?'

সে আমার মুখের দিকে চেয়ে মুচকি হাসল।

আমি বললুম, 'বেশ তো, বাজাও।'

ছেলেটি ব্যানডুররিয়ার তারে হাত দিল। বেজে উঠল টুং-টাং-টুং। তার মুখখানা হাসিতে ভরে গেল।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'তোমার নাম কী?'

সে বলল, 'জুতসু।'

আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'কোথা থাকো তুমি?'

সে বলল, 'এখানে, এই কাছেই। দিদি নাচ দেখাতে এসেছে কারনিভলে।'

'তুমিও নাচতে পারো বুঝি?'

'ধ্যাত!' ছেলেটি লজ্জা পেল। বলল, 'নাচি না, দিদি নাচে। আমি তালি বাজাই।'

আমি হেসে ফেললুম। একটু জোরেই হেসেছি। আর ঠিক তক্ষুনি কোথা ছিল ছেলেটির দিদি, দৌড়ে এসে গম্ভীর গলায় ডাকল তার ভাইকে, 'জুতসু।'

ভাই চমকে চাইল।

দিদি ধমকে উঠল, 'এখানে কী করছিস?'

'বাজনা বাজাচ্ছি।'

'শিগগির আসবি!'

'একটু পরে যাচ্ছি।'

গলাটা আরও একটু চড়িয়ে দিদি বলল, 'এক্ষুনি আসবি।'

ছেলেটা যাচ্ছে না দেখে আমি বললুম, 'এখন যাও, পরে এসো।'

চলে গেল জুতসু নামে ছেলেটি। আমি জানি না তারপরে কী হল। কিন্তু অবাক হয়ে ভাবতে বসলুম, ছেলেটির দিদি অমন তিরিক্ষি মেজাজে কথা বলল কেন! ও তো কোনো দোষ করেনি!

দেখি, ছেলেটি পরের দিনও এসেছে। আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'আবার এলে? দিদি বকবে না?'

সে বলল, 'দিদিকে লুকিয়ে পালিয়ে এসেছি।'

আমি বললুম, 'লুকিয়ে? ঠিক করোনি।'

সে বলল, 'তোমাকে আমার ভালো লাগে।'

'কেন?'

'তুমি খুব ভালো। কী সুন্দর বাজনা বাজাও তুমি। আমি রোজ শুনি। এটা কী বাজনা?'

'ব্যানডুররিয়া।'

'আমায় শিখিয়ে দেবে?'

'দিদির নাচের সঙ্গে বাজাবে বুঝি?'

'ধ্যাত! ওই আবার নাচ! কেউ দেখেই না। সক্কলে তোমারই বাজনা শোনে আর ভাল্লুকের খেলা দেখে। তোমার ওপর দিদির কী রাগ।'

ছেলেটির এই কথা শুনে আমি একটু থতমত খেয়ে গেলুম। জিজ্ঞেস করলুম, 'কেন?'

সে বলল, 'দেখনি, খবরের কাগজে তোমার নাম বেরিয়েছে?'

আমি বললুম, 'আমি জানি না তো।'

'দেখে দিদির গা জ্বলে গেছে। আর অন্য যারা খেলা দেখাতে এসেছে, তাদের কী হিংসে তোমার ওপর। কেউ পয়সাই পাচ্ছে না।'

আমি বললুম, 'এতে আমার কী দোষ। আমিও তো পয়সা উপায় করতে এসেছি। আমাকে পয়সা উপায় করতেই হবে। আমার আনাতিদাদার খুব অসুখ। তাকে যে আমায় ভালো করতে হবে।'

ঠিক এই সময়ে ছেলেটির দিদি আচমকা এসেছিল। আমি বুঝতেই পারিনি সে এসেই আমার সঙ্গে চোটপাট শুরু করে দেবে। সে হঠাৎই এসেছিল ঝড়ের মতন। ঝড়ের মতন ঝাঁকিয়ে উঠে সে বলেছিল, 'আমি পছন্দ করি না, তুমি আমার ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলো। তোমার মতলবটা কী, তা আমার জানা আছে।'

আমি বললুম, 'কী জানো? আমি জানতে পারলে খুশি হব।'

ছেলেটির দিদি আরও রেগে উঠল। প্রায় গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলল, 'আমিও জানতে পারলে খুশি হব, ওর কানে তুমি কী-মন্ত্র দিচ্ছ!'

আমি বললুম, 'জুতসু আমাকে ভালোবাসে।'

সে বলল, 'আমি তোমাকে অপছন্দ করি।'

আমি থমকে গেলুম। আর কথা বলা যায়! এমন কথা যার মুখ দিয়ে বেরোয়, তার সঙ্গে কথা না-বলাই ভালো। দেখতে পেলুম, ছেলেটির মুখখানি ভারি করুণ হয়ে আছে আমার দিকে চেয়ে। আমার কেমন মায়া লাগল। আমি তাকে বলতে পারলুম না, তুমি আর এসো না আমার কাছে। দিদিই তার হাত ধরে টান দিল। হেঁচকা মেরে বলল, 'ফের যদি আসবি, পুঁতে ফেলব!'

ছেলেটি শেষবারের মতো আমার দিকে চাইল। তারপর দিদির সঙ্গে চলে গেল।

মনটা ভারি খারাপ লাগছে আজ। তাঁবুতে ফিরে দেখি, আনাতিদাদা আরও কাহিল হয়ে পড়েছে। অন্য দিন খুশিতে উছলে আমি তাঁবুতে ফিরি। আজ ওইরকম একটা কাণ্ড ঘটে যেতে স্বাভাবিকভাবেই আমার সে-খুশি মুখ থেকে মুছে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও নিজের দুঃখটা মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে পারলুম না। ধরা পড়ে গেলুম আনাতিদাদার কাছে। অবাক হয়েই আনাতিদাদা জিজ্ঞেস করল, 'ইসতাসির মুখখানা আজ অমন শুকিয়ে কেন? কী হয়েছে?'

আমি বললুম, 'এমনি।'

'একটা কিছু নিশ্চয়ই হয়েছে। নইলে হাসি নেই কেন ইসতাসির মুখে?'

আমি বললুম, 'ভাবছি, কারনিভলে আর খেলা দেখাব না। চলে যাব। আমার জন্যে অন্য সকলের ক্ষতি হচ্ছে।'

'কী ক্ষতি?'

'সক্কলে আমার খেলাই দেখে। ওদের খেলা দেখতে লোক হয় না।'

আনাতিদাদা রুগণ হাতটা এগিয়ে আমার মুখটা তার চোখের কাছে টেনে নিয়ে বলল, 'ছিঃ! ছিঃ! ইসতাসি হেরে গেল!'

আমি বললুম, 'ওরা আমায় পছন্দ করে না।'

'না, তোকে হিংসে করে।'

আমি চুপ করে গেলুম। আমায় চুপ থাকতে দেখে আনাতিদাদা বলল, 'আমার জন্যেই তোকে এমন হেনস্তা হতে হচ্ছে।'

'কে বলল তোমার জন্যে?' আমি প্রায় রেগে চিৎকার করে উঠেছিলুম। নিজেকে সামলে নিলুম। বললুম, 'আনাতিদাদা, কেউ আমাকে হেনস্তা করল, কি অপছন্দ করল তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। তোমার জন্যে আমি সবকিছু করতে পারি। তোমাকে ভালো হতে হবে আনাতিদাদা। আবার সেইরকম সাহসী আর শক্ত-সমর্থ হয়ে তুমি আমার হাত ধরে আমায় নিয়ে যাবে দেশে-দেশে। আমি ব্যানডুররিয়া বাজিয়ে গান শোনাব। চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে সকলকে বলব, 'আমার এই আনাতিদাদার কাছে আমি শিখেছি ব্যানডুররিয়া বাজাতে।'

আমি দেখতে পেলুম, আনাতিদাদার চোখের পাতাদুটি ভারি ছটফট করে ওঠা-নামা করছে। সেই আধো-আলো, আধো-ছায়াতে আমি দেখতে পেলুম না সেই চোখের পাতায় কোনো কান্নার ফোঁটা দুলে উঠছে কি না! সত্যি বলতে কী, সেই কান্না আমি দেখতে চাই না। আমি চাই, আনাতিদাদা হেসে উঠুক। তার একবুক হাসি হা-হা-হা করে উপচে আমাকে বলুক, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি ভালো হব আবার। আমার শক্ত হাতখানা তোর হাতের ওপর রাখব। তারপর দু-জনায় ছুটে যাব পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। সঙ্গে যাবে জোরো, এই ভাল্লুক আর এই ছোট্ট তাঁবুটা। আমরা সারা দুনিয়ায় আনন্দ বিলিয়ে বেড়াব। শুধু আনন্দ। যে আনন্দ মানুষকে দুঃখ ভোলায়!'

কিন্তু কিছুই বলল না আনাতিদাদা। চেয়েই রইল। ভারি শূন্য সেই চাউনি।

আজও আমি কারনিভলে এসেছি। আজও জোরোর খেলা দেখাতে হবে আমায়। কেননা, আজ এই শহরের মেয়র আসবেন কারনিভলে। তিনি কারনিভল দেখবেন। দেখবেন, হাসি-হল্লা খুশি-মজার মেলা। আজ তাই কারনিভলের এই মস্ত চত্বরটা ঝাড়পোঁছ করে ধুলো-জঞ্জাল সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নতুন করে সাজানো হয়েছে কারনিভল। কত রংচঙে বেলুন উড়ছে। কত রঙিন পতাকা। রং-ঝলমল কাগজের ফুল। আর কত আলোর বাহার। আসলে কালকের ওই ঘটনার পর থেকে মনটা আমার এমন মুষড়ে আছে যে, কিছুই যেন ভালো লাগছে না। তবু ব্যানডুররিয়া বাজাতে হবে। তবু জোরো খেলা দেখাবে।

মেয়র যখন এসেছিলেন, তখন সন্ধে পার হয়েছে। তিনি এসেছিলেন একা নয়, সঙ্গে আরও কত লোক। সন্ধ্যার কারনিভল জমজমাট। বুঝতেই পারছ, মেয়রকে খুশি করবার জন্যে, সবাই তাদের সব-সেরা খেলাগুলি দেখাচ্ছে আজ। সব-সেরা মজা।

একটি-একটি মজা দেখার জন্যে তিনি এক-এক জায়গায় দাঁড়ান। একটু মাথা হেলান, একটু খুক করে কাশেন, তারপর হাঁটেন। এমনি করে হাঁটতে-হাঁটতে তিনি আমার খেলার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমার ব্যানডুররিয়া বেজে উঠল। আমার ভাল্লুক মেয়রকে দেখেই মারল ভলট। মেরেই সটান দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর মেয়রকে সাল্যুট করল। সঙ্গে-সঙ্গে চারিদিক থেকে হাততালি। তারপর জোরো মাথায় একটি রঙিন ছাতা ধরে, শূন্যে তারের ওপর হাঁটতে-হাঁটতে, একবার এ-পাশ থেকে ও-পাশ, আবার ও-পাশ থেকে এ-পাশ এল। তারের ওপর জোরোর এ এক আশ্চর্য ব্যালেন্সিং-এর খেলা। আমার ব্যানডুররিয়া সেই ব্যালেন্সিং-এর তালে-তালে বেজে ওঠে। হাততালি, শুধু হাততালি। মেয়রসাহেব কিন্তু হাতে তালিও মারেন না, মুখে হাসিও আনেন না। গম্ভীর হয়ে দেখেন। যেন পাথর-কাটা মূর্তি।

দেখতে-দেখতে মেয়রসাহেব তাঁর পাশের লোককে ইশারায় কাছে ডেকে ফিসফিসিয়ে কী যেন বললেন। পাশের লোকটি আমার কাছে এল। একে মেয়রসাহেবের মুখখানা অমন গম্ভীর, তার ওপর তাঁর একজন পার্শ্বচর যখন আমার কাছে এসে দাঁড়াল, তখন আমার ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। এবার বোধ হয় সাহেব নিজেই আমাকে এখান থেকে চলে যাবার ফরমান জারি করবেন। কিন্তু না। তাঁর পার্শ্বচর গলার স্বরটা একটু উঁচিয়ে, সবাইকে শুনিয়ে-শুনিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'ওহে ভাল্লুক-নাচিয়ে, তোমার নাম কী?'

আমি ধরা-ধরা গলায় বললুম, 'ইসতাসি।'

আবার সেই ব্যক্তিটি চিৎকার করে বললে, 'ইসতাসি, তোমার ভাল্লুকের খেলা দেখে আর তোমার অদ্ভুত বাজনা শুনে মাননীয় মেয়র অত্যন্ত খুশি হয়েছেন।'

আমি মেয়রকে উদ্দেশ্য করে মাথা নোয়ালুম।

পার্শ্বচর আবার বলল, 'মাননীয় মেয়র মনে করেন, এখানে যতরকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, তার মধ্যে তোমার খেলাই সব-সেরা।'

আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে আবার মাথা নিচু করলুম। আবার হাততালি।

'তাই মাননীয় মেয়র তোমার এই অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য তোমাকে একটি উপহার দিতে চান।'

উত্তেজনায় আমার সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। দেখতে পেলুম মেয়রসাহেব

আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। তেমনি গম্ভীর তিনি। তেমনি চুপচাপ।

আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। এখন তিনি আমাকে দেখে একটু মুচকি হাসলেন। তারপর আমার কাঁধে হাত রাখলেন। কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, 'শাবাশ।' বলে তিনি পকেটে হাত পুরলেন। একটি সোনার মেডেল বার করে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিলেন।

এতক্ষণ থমথম করছিল চারিদিক। সবার মুখে কী-হয় কী-হয় ভাব। কিন্তু যে-মুহূর্তে আমার গলায় মেডেল ঝিকমিকিয়ে উঠল, সকলের মুখে সে কী খুশির হল্লা। আমি হাঁটু গেড়ে বসে তাঁকে শ্রদ্ধা জানালুম। তিনি আমায় দু-হাত দিয়ে তুলে নিলেন। তারপর আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, 'এমনি করে সবাইকে আনন্দ দাও।' বলে তিনি যেমন করে এসেছিলেন, তেমনি করে চলে গেলেন। আমি হতবাক।

আমার খেলার চারিপাশে যত লোক জমায়েত হয়েছিল, তারা সবাই চিৎকার করে আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমি হাত তুলে সে-অভিনন্দন গ্রহণ করছি। হঠাৎ দেখি, জুতসু। কোথায় ছিল? ওই অত লোকের ভিড় ঠেলে, একেবারে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। সে কী আনন্দ তার! যেন তারই কেউ আপনজন এই সোনার মেডেল জয় করেছে। আমি তাকে দেখে, এত আনন্দেও শিউরে উঠলুম। এই বুঝি তার দিদি এসে পড়ে। এই বুঝি লাগিয়ে দেয় চেঁচামেচি। রক্ষে, তার দিদি এল না।

আমি এবার জোরোকে নিয়ে প্রায় লাফাতে-লাফাতে তাঁবুর দিকে ছুটলুম। এখন আনাতিদাদা একা আছে তাঁবুতে। দেখে এসেছি তার শরীরটা আজ আরও খারাপ। কী খুশিই-না হবে আনাতিদাদা। আমার এ-জয় তো তারই জয়। তাঁবুতে ফিরেই ওই সোনার মেডেল তারই গলায় আমি পরিয়ে দেব। তারপর আনাতিদাদার বুকের ওপর মাথা রেখে বলব, 'আজ আমি জিতেছি আনাতিদাদা, আমি জিতেছি।'

কিন্তু বলতে পারলুম না। কেননা, তাঁবুতে ফিরে দেখি, আনাতিদাদা নেই! প্রথমটা ভেবেছিলুম, বুঝিবা আনাতিদাদা এদিক-ওদিক কোথাও আছে। কিন্তু আশ্চর্য, কোথাও নেই! সবদিক আঁতিপাতি করে খুঁজেও যখন পেলুম না তখন ডাক দিলুম, 'আনাতিদাদা, আনাতিদাদা।' সাড়া পেলুম না। ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠলুম। তবে কি আনাতিদাদা চলে গেল। হঠাৎই আনাতিদাদার ম্যাজিকের ব্যাগটা আমার নজরে পড়ে গেল। কিন্তু ওটা কী! রিভলভারটা বাইরে কেন! হাতে তুলে নিলুম। এ কী! রিভলভারটার সঙ্গে একটা চিঠি! চিঠিতে লেখা :

প্রিয় ইসতাসি,

আমি চলে যাচ্ছি। আমার মৃত্যুর দিন যখন এগিয়ে আসছে, তখন তোমাকে কষ্ট দিতে আমি খুবই ব্যথা পাচ্ছি। আমার মৃত্যুর আগে এই যে তোমার সঙ্গে আমার হঠাৎ দেখা হল, এই যে তোমাকে শেষবারের মতো দেখতে পেলুম এই তো আমার জয়। আমার ব্যাগ-ভরতি ম্যাজিক আর রিভলভারটা দিয়ে গেলুম। রিভলভারে একটাই গুলি আছে। পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করার আগে ওটা মাটির তলায় পুঁতে লুকিয়ে রেখেছিলুম। তোমার কাছেই থাক। বলা যায় না, কোনোদিন কাজে লেগে যেতে পারে। সুখী হও।

ইতি

আনাতিদাদা

চিঠিটা পড়া শেষ করে থমকে গেলুম। মনে হল, এই মুহূর্তে পৃথিবীটা যেন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আমার চোখ ফেটে কান্নাও এল না, মুখ ফুটে কথাও বেরোল না। আমি নির্বাক। বসে পড়লুম। মুখখানাকে লুকিয়ে ফেললুম দুই হাঁটুর ফাঁকে। তারপর ফুঁপিয়ে উঠলুম।

আমি জানি না এমনি করে কতক্ষণ বসেছিলুম। দেখিনি জোরো কখন নিঃসাড়ে আমার পাশে এসে বসেছে। হয়তো আমার মতো সে-ও দুঃখ পেয়েছে। তাই আমার মতো সেও এখন নিশ্চুপ, নির্বাক।

এমনই সময়ে হঠাৎ একটা শোরগোল শুনে আমার চমক ভাঙল। দেখলুম, সেই মেয়েটি একেবারে মারমুখী হয়ে আমার তাঁবুর ভেতর ঢুকে পড়েছে। দেখি, তার পেছনে আরও অনেকজন। দেখে চিনতে কষ্ট হল না, এরা সবাই কারনিভলে এসেছে খেলা দেখাতে। আমি অবাক চোখে তাদের মুখের দিকে চাইলুম। আমায় কোনো কথা বলতে দিল না তারা। আচমকা চিৎকার করে তাণ্ডব শুরু করে দিল তাঁবুর ভেতরে। আমাকে জাপটে ধরল আচম্বিতে। এমন অবস্থার জন্যে আমি একেবারেই তৈরি ছিলুম না।

আমার পাশেই জোরো। আমি জানি জোরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে আর রক্ষে নেই। তাই আমি চিৎকার করে উঠলুম, 'আমায় ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও।'

কে শুনছে! আমি ধস্তাধস্তি করে কোনোরকমে এদের হাত ছাড়িয়ে জোরোকে জড়িয়ে ধরলুম। জড়িয়ে ধরে আবার চেঁচালুম, 'তোমরা থামো। এক্ষুনি আমার তাঁবু থেকে বেরিয়ে যাও! জোরো খেপলে তোমাদের একজনও প্রাণে বাঁচবে না!'

কিন্তু তারা শুনল না। হিংসায় উন্মাদ হয়ে তারা আমায় শেষ করে ফেলতে চায়। তারা আমার সব-কিছু লুঠ করছে। তাঁবু তছনছ করে দিচ্ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি, রাগে ফুলছে জোরো।

তারা আমার জিনিসপত্তর ভাঙচুর করছে।

জোরোও ফুঁসছে।

তারা আমার তাঁবুটা টান মেরে ছিঁড়ে ফেলছে।

জোরো আমার হাত ছাড়াবার জন্যে আমায় ধাক্কা দিল।

দেখতে পেলুম সেই মেয়েটা চোখের পলকে আমার ব্যানডুররিয়া নিয়ে পালাচ্ছে।

জোরো দেখতে পেয়েছে। আমাকে সে ঝটকা মারল। আমি পড়ে গেলুম। পারলুম না তাকে ধরে রাখতে। আমি ধমকে উঠলুম, 'জোরো!'

ততক্ষণে জোরো বাইরে বেরিয়ে পড়েছে। আমি ছুটে এসে লাফিয়ে পড়লুম জোরোর ঘাড়ের ওপর। জোরোর সঙ্গে আমার ধস্তাধস্তি লেগে গেল! তাই দেখে যে-যেদিকে পারল মারল ছুট! কিন্তু জোরোর অন্য দিকে লক্ষ নেই। লক্ষ্য ওই মেয়েটা!

আমি আর জোরোর সঙ্গে কতক্ষণ ধস্তাধস্তি করতে পারি! জোরো শেষে আমারই ওপর খেপে উঠল। আমাকেই বুঝি আক্রমণ করে! আমি ছিটকে গেলুম। সেই তক্কে জোরো ছুটল ওই মেয়েটাকে ধরবার জন্যে।

আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। আমি জানি, জোরো এক্ষুনি এক ভয়ংকর কাণ্ড করে বসবে। আমি জোরোর পেছনে ছুটলুম। আমার হাতে আনাতিদাদার রিভলভার। এই ক্ষিপ্ত বন্য-জন্তুটাকে শায়েস্তা করতে এখন এই রিভলভার ছাড়া গত্যন্তর নেই। আমি যদি এখনই ওকে রুখতে না পারি, তবে মেয়েটার নির্ঘাত মরণ।

আমি ছুটতে-ছুটতে দেখতে পেলুম, জোরো প্রায় ধরে ফেলেছে মেয়েটাকে। ভয়ে পিছু ফিরে চিৎকার করে উঠল মেয়েটা, 'বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও।'

আর দেরি করা যায় না। আমাকে এখনই রিভলভার ছুড়তে হয়। এই ক্ষিপ্ত একটা বন্য-জন্তুর হাত থেকে একটি অসহায় মেয়েকে যদি রক্ষা করতে না পারি, তবে এ-রিভলভারের মূল্য কী! আমি রিভলভার তাক করলুম। আমি আমার প্রিয় বন্ধুকে ধমক দিয়ে শেষবারের মতো চিৎকার করে ডাক দিলুম, 'জোরো—'

বোধ হয় জোরো একটু থতমত খেয়ে গেছল। হয়তো চকিতে সে একবার আমার দিকে ফিরে তাকিয়েছিল। ঠিক এই ফাঁকে, মেয়েটি আশ্চর্য কৌশলে জোরোকে এড়িয়ে আমারই দিকে ছুটে এল। আর্তনাদ করছে সে। আমাকে আচমকা জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, 'বাঁচাও!' আমাকে এমনভাবে সে জাপটে ধরল যে, আমি টাল সামলাতে পারলুম না। আমার আঙুলের চাপ লেগে রিভলভারের গুলি ছুটল এলোমেলো। নিশানা ফসকে গুলি জোরোর গায়ে না-লেগে হাওয়ায় উড়ে গেল।

গুলির শব্দে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল জোরো। সে বুঝতে পেরেছে, আমি তাকে মারতে চাই। তাই সে লাফিয়ে পিছু ফিরে আমাকেই আক্রমণ করল। আমি ভয়ার্ত কণ্ঠে চিৎকার করে মেয়েটিকে বললুম, 'পালাও!' মেয়েটি পালাল।

জোরো আমাকে আক্রমণ করল তার সামনের পায়ের থাবা দিয়ে। আমি সে-আঘাত সহ্য করতে পারলুম না। এত তীব্র সে-আঘাত যে, আমি মুখ থুবড়ে ক-হাত দূরে ছিটকে পড়লুম। বুঝতে পারছি, মাথায় লাগল। অসহ্য যন্ত্রণা। আমার বুকের ভেতরটা এত হাঁপিয়ে উঠল যে, আমি নিশ্বাসটাকে কিছুতেই সামলাতে পারলুম না। অসহায়ের মতো সেই রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগলুম।

অনেকক্ষণ পর যখন আমার ঘোর কাটল, তখনও আমার ওঠার ক্ষমতা নেই। শুয়ে-শুয়েই অতি কষ্টে এ-পাশ ও-পাশ করছি। এ-দিক ও-দিক দেখছি। হঠাৎ বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। দেখি, জোরো! একটু দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে! আমার চোখে চোখ পড়তেই সে যেন একটু চনমন করে উঠল। তখনকার সেই হিংস্র চোখ দুটো তার এখন মনে হচ্ছে কত শান্ত! বুঝি বা বন্ধুকে অমন আঘাত করে এখন অপরাধীর মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে!

একটু পরেই আমি উঠে বসতে পারলুম। আর-একটু পরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে পারলুম। হাঁটতে-হাঁটতে তাঁবুতে ফিরে এলুম। আমার এই ছোট্ট তাঁবুটা এখন কেবলই একটা ধবংসস্তূপ। সেই ধবংসস্তূপের মধ্যেই আবার শুয়ে পড়লুম।

এখন কী করব আমি! কাল এখান থেকে আমায় চলে যেতেই হবে। হয়তো কাল একটু সুস্থ হয়ে উঠব। কিন্তু কোথায় যাব আমি এই শূন্য হাতে? শূন্যই তো! আমার যে আপন বলতে আর কেউ রইল না। অমন যে জোরো, যাকে নিয়ে এত স্বপ্ন আমার, সেই স্বপ্নও আজ ভেঙে গেল। আমার প্রিয় আর সবসেরা বন্ধু ব্যানডুররিয়া, সেটাও কেড়ে নিয়ে গেল ওরা! কেন এত হিংসা ওই একটা ছোট্ট বাজনার ওপর! আমার বাজনা তো শুধু সুরে-সুরে ছড়িয়ে দিয়েছে আনন্দ। ক্ষতি তো কারো করেনি। তবে কেন এত রাগ!

আমি ঘুমিয়ে পড়লুম।

ভেবেছিলুম, খুব সকাল-সকাল উঠব। পারিনি। ঘুমিয়েই ছিলুম। হঠাৎ একটা গরম নিশ্বাসের উত্তাপ আমার পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। ঘুম ভেঙে গেল। চমকে চেয়ে দেখি, জোরো। মনে হয় সারারাত জেগেই বসেছিল আমার পাশে। আমি উঠে পড়লুম। বাইরে রোদ। এবার যেতে হবে। যেতে হবে আমায় এক দেশ থেকে আর-এক দেশে। এ-জগৎ থেকে আর-এক অজানা জগতে। পড়ে রইল আমার ছেঁড়া টুকরো তাঁবু। পড়ে রইল তাঁবুর ভেতর ভাঙাচোরা আমার শখের জিনিসগুলি। ওগুলির দিকে চেয়ে দেখতে আমার মন চাইছিল না। চোখ ফেরালুম জোরোর দিকে। দেখতে কষ্ট লাগছিল। কেননা, ওর কাছ থেকে এবার আমায় বিদায় নিতে হবে। এগিয়ে গেলুম তার কাছে। তার মুখের দিকে চেয়ে থাকলুম কিছুক্ষণ। তার পিঠে হাত রাখলুম। কাঁপছে সে। তার গলাটা দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললুম, 'আমায় তুই মেরেছিস বলে মনে করিস না যেন, আমি তোর ওপর রাগ করেছি জোরো! তোর আবার দোষ কোথায়? আমিই তো রিভলভারের গুলি ছুড়ে তোকে মারতে চেয়েছিলুম। আমিই তো অপরাধী। এই জঘন্য কাজের জন্যে আমি যে নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছি না জোরো! আমার বারবার মন বলছে, আমি বিশ্বাসঘাতক! আমার বিপদের দিনে তোর মতো বন্ধু পেয়েছিলুম বলে, আজও আমি বেঁচে আছি। সেই বন্ধুকে গুলি মারতে যার হাত ওঠে, সে বিশ্বাসঘাতক। বিশ্বাসঘাতককে আর বিশ্বাস নয়। তুই বনে ফিরে যা জোরো। খোলা আকাশের নীচে। সেই তোর ঘর। সেইখানেই তোর সুখ। তোর আনন্দ। সেখানে আর যাই থাক, বিশ্বাসঘাতক নেই।' বলতে-বলতে কেমন যেন ভার হয়ে আসছিল আমার গলার স্বর। না, আমার ভেঙে পড়লে চলবে না। আমি বুক ফুলিয়ে উঠে দাঁড়ালুম। জোরোর দিকে আর ফিরে তাকালুম না। আমার শূন্য হাতের মুঠি দুটো শক্ত করে চেপে ধরে পা ফেললুম।

'ইসতাসি'।

আমি থতমত খেয়ে গেছি। হঠাৎ এ-সময়ে কে ডাকল? সামনে চমকে চেয়ে দেখি, এ যে সেই মেয়েটি! দেখি, তার হাতে আমার ব্যানডুররিয়া। তার চোখদুটিতে যেন অনেক দুঃখের কালোছায়া জড়িয়ে আছে।

মেয়েটি ব্যানডুররিয়াটা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরা-গলায় বলল, 'ইসতাসি, তোমার ব্যানডুররিয়া!'

আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকালুম। দেখলুম, তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট্ট ভাই জুতসু। মুখখানা তার থমথম করছে।

মেয়েটি বলল, 'কিছু মনে কোরো না ইসতাসি। আমি তোমাকে বুঝতে পারিনি।'

ক্ষণেক চেয়ে, হাত বাড়ালুম। ব্যানডুররিয়াটা হাতে নিলুম। বললুম, 'অনেক কষ্ট দিলুম। চলি।' পথে নামলুম।

'ইসতাসি!' সে আবার ডাকল।

আমি থামলুম।

সে বলল, 'তুমি যদি না যাও ইসতাসি?'

আমি বললুম, 'আমি যাযাবর।'

মেয়েটি আমার হাতদুটি জড়িয়ে ধরল। তার মুখখানি কান্নায় ভরে গেছে।

আমি বললুম, 'বোন, আমায় যেতে দাও! হয়তো আবার দেখা হবে।'

ওর হাতদুটি আলতো সরে গেল আমার হাত থেকে। আমি এগিয়ে গেলুম জুতসুর কাছে। দু-ফোঁটা চোখের জল ওর গালের ওপর দিয়ে ভেসে গেছে। আমি ওর চিবুকটি ধরে ওর চোখের ফোঁটাদুটি মুছে দিলুম। সে-কান্নার জল আমার হাতে ছড়িয়ে রইল। কথা বলতে পারল না জুতসু। হাতটা বাড়িয়ে দিল। তার হাতে একটা খেলনা-গাড়ি। আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'কী?'

'তোমার।' বলে সে আমায় জড়িয়ে ধরল। তারপর আবার ফুঁপিয়ে উঠল।

বোধ হয় এই খেলনা-গাড়ি কারনিভল থেকে কিনেছে সে, নিজে খেলবে বলে। আমি হাতে নিলুম। আমার সব গেছে। মনে-মনে ভাবলুম, একদিন স্বপ্ন দেখেছিলুম, একটা গাড়ি কিনব আমি। ঘোড়ায় টানা গাড়ি। সেই গাড়ি চেপে এক দেশ থেকে আর-এক দেশে যাব। দেশে-দেশে ব্যানডুররিয়া বাজিয়ে গান গাইব, জোরোর খেলা দেখাব। কিন্তু সে-স্বপ্ন আমার মিথ্যে। সত্যি যেন এই খেলনা-গাড়ি। এ-গাড়ি কত সুন্দর! এ যে একটি ছোট্ট ছেলে, জুতসুর, ভালোবাসায় ভরা! তাই এই খেলনা-গাড়িটা আমার ছেঁড়াখোঁড়া জামার পকেটে পুরে ফেললুম। তারপর ব্যানডুররিয়ার তারে সুর তুললুম। গেয়ে উঠলুম আমার হারিয়ে-যাওয়া বন্ধু ওতিয়ারই গাওয়া সেই গানটি :

আমি তো কখনো দিইনিকো ব্যথা

একটিও কোনো প্রাণীকে,

অনেক দুঃখ পেয়েও তো আমি

বন্ধু আমার জানি কে!

তারপর হাঁটা দিলুম।

অনেকক্ষণ পর, যখন ক্লান্ত পা-দুটো অবশ হয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল, পথের পাশে ওই গাছের নীচে বসি একটু, তখন আমি পিছু ফিরেছিলুম একটিবার। অনেক দূরে পিছনের হাঁটা-পথে চোখ পড়তেই আমি চমকে উঠেছিলুম। এ কী! জোরো সে আসছে ক্লান্ত পায়ে একা-একা। আমি দাঁড়ালুম। সে আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎই সে দু-পা ওপরে তুলে আমায় জড়িয়ে ধরল। যেন সে বলতে চাইল, 'তোমাকে একা-একা আমি কোথাও যেতে দেব না। তুমি যেখানে যাবে, সেখানেই আমি যাব। আমাকে মারতে চাও মারো। তবু জেনো, আমি তোমার বন্ধু।'

আনন্দে চোখে জল এসে গেল আমার। ওর মুখখানা দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে আমার মুখের সামনে তুলে ধরলুম। চেয়ে রইলুম কিছুক্ষণ। তারপর অস্ফুট গলায় বলে উঠলুম, 'বন্ধু।' তারপর দুজনে ওই সবুজ গাছের আড়ালে হারিয়ে গেলুম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%