ভালোবাসার ছোট্ট হরিণ

শৈলেন ঘোষ

আলা-ইজার অনেক সকালে ঘুম ভেঙে গেছল। মেয়েটা বোধ হয় সারারাত ঘুমোতেই পারেনি। যখনই চোখের পাতায় ঘুম জড়িয়ে এসেছে, তখনই চমক ভেঙেছে তার। কতবার যে এমনই করে চমকে উঠেছে সে! আর যতবার চমকে উঠেছে, ততবারই চোখের ওপর ভেসে উঠেছে সেই ছোট্ট হরিণের মুখখানা। তার চোখ দুটি। সারাটা দিন তার সঙ্গে খেলা করেছে আলা-ইজা। এই রাজপ্রাসাদের বাগানটা তো আর একটুখানি নয়। দেওদার গাছের ফাঁকে-ফাঁকে কত যে আঙুরগাছের সারি। লুকোচুরি খেলতে কী মজা! বলতে পারো, আলা-ইজা ওই ছোট্ট হরিণটার সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছে। এ-গাছ ও-গাছ লুকিয়ে-ছাপিয়ে সে যেই না একটু হাত বাড়িয়েছে, অমনই হরিণ লতাপাতার ফাঁক দিয়ে ছুট দিয়েছে। কী সুন্দর লাফায় হরিণটা। ছোট্ট হলে কী হবে, একনম্বরের চালাক। অবশ্য আলা-ইজার চেয়েও সে চালাক কি না, সে-কথা বলতে পারব না। নইলে একবার কেন আলা-ইজার হাতে ধরা পড়ে গেল! আসলে ছোটো হরিণটা আলা-ইজার হাতে ধরা পড়ল, না, আলা-ইজা নামের এই ছোট্ট মেয়েটির হাতে ধরা দিল, সেইটাই হচ্ছে কথা।

খুশিতে আলা-ইজারও মুখখানি উছলে উঠল। হরিণছানাকে জড়িয়ে ধরে আলা-ইজা চেঁচিয়ে উঠল, 'কী দুষ্টু, আমাকে এমন খাটাল যে, আমি হাঁপিয়ে মরি!' বলতে-বলতে আলা-ইজা তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে হরিণছানার গালটা দিল টিপে! তারপর বলল, 'আমনা, আমি তোর নাম রাখলুম, আমনা। বুঝলি!' বলে, প্রায় সারাদিন ওই হরিণের সঙ্গে খেলা করতে-করতে তার সময় কেটে গেল। একটি ছোট্ট হরিণের এখন এক ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজা। হরিণছানা লাফায়, আলা-ইজাও লাফিয়ে-ছুটে ধরে ফেলে হরিণকে। আবার আলা-ইজা ছুটে পালালে, হরিণও তাকে ধরতে ছোটে। গাছের ডালে ঝুলন্ত থোকা-থোকা আঙুর। দেখতে পায় হরিণছানা। দাঁড়ায়। তাক করে লাফ দেয়। ছুঁই-ছুঁই করেও তার মুখ ছুঁতে পারে না ওই থোকা-থোকা আঙুর। হেসে ওঠে আলা-ইজা। হাততালি দেয়। তারপর আলা-ইজা নিজের হাতে গাছের ডাল ছুঁয়ে টান দেয়। একটি থোকা ছিঁড়ে ফেলে গাছের ডাল থেকে। রস-টুসটুস একটি-একটি আঙুর হরিণের মুখে দেয়। একটি-একটি নিজে খায়। আঃ! কী মিষ্টি খেতে। হরিণছানা আরও চায়। আরও দাও। আলা-ইজা এ-গাছের আঙুর পেড়ে, ও-গাছে ছোটে। ও-গাছ থেকে আর-এক গাছে। তারপর চুপটি করে বসে পড়ে ঘাসের ওপর। হরিণছানার গলাটি জড়িয়ে ধরে বলে 'আর না। বেশি খাওয়া ভালো নয়।' বলতে-বলতে গল্প জুড়ে দেয়। সে কত গল্প। কখনও সে সুমুদ্দুরের গল্প বলে। কখনও বলে আকাশের। কখনও-বা আগুনের। কোন গল্পটা যে হরিণের ভালো লাগে, সে ঠাহর করতে পারে না। দ্যাখো না, ছানাটা খালি ছটফট করছে। শেষকালে আচ্ছা করে বকা দিল আলা-ইজা। কান মলে দিল। তারপর নিজের কাছে টেনে নিল হরিণছানাকে। তার মাথাটা নিজের কোলে রেখে আদর করে বলল, 'আমনা আমার, এবার ঘুমো, লক্ষ্মীটি।'

হরিণছানা ঘুমিয়েছিল কি না আলা-ইজা জানে না। কারণ আর তো বেশিক্ষণ রাজপ্রাসাদের বাগানে সে থাকতে পারেনি। একটু পরেই তার খোঁজ পড়েছিল। একটু পরেই রাজপ্রাসাদের এ-মহল ও-মহল সব মহলেই আলা-ইজাকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছেন তার মা। মায়ের সঙ্গে বাবা। বাবার সঙ্গে সারা রাজপ্রাসাদের যত মানুষ, সবাই। তবে কি আলা-ইজা কাউকে না-বলেই রাজপ্রাসাদের বাগানে ঢুকেছিল হরিণছানার সঙ্গে খেলা করতে! তা তো বটেই। নইলে প্রাসাদ জুড়ে এমন হইহই পড়ে যায়! খোঁজ-খোঁজ! কোথায় গেল মেয়েটা! মেয়েটা অবশ্য নিজেই বেরিয়ে এসেছিল বাগান থেকে। তা রাজপ্রাসাদের হাজারখানেক লোক যদি একসঙ্গে 'আলা-ইজা', কিংবা 'রাজকন্যা' অথবা 'আলা' বা 'ইজা' বলে ডাকতে শুরু করে দেয়, তখন সে-ডাক আলা-ইজার কানে পৌঁছতে কি বেশি সময় লাগে! আলা-ইজা তো আর কালা নয়। সে বাগান থেকে বেরিয়েই হতভম্ব হয়ে গেছে। কত লোক রে বাবা! মা তো আছেনই। তাঁর সঙ্গে বাবা। বাবার পেছনে একটা গোটা বাহিনী। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরি যেন। মা আলা-ইজাকে দেখতে পেয়েই পড়িমরি করে ছুটে গেলেন। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে একবুক নিশ্বাস ফেলে কেঁদে উঠলেন মা। আলা-ইজা ফ্যালফ্যাল করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে মা?'

মা কিছু বলার আগেই আলা-ইজার গালে-কপালে, চোখে-মুখে বারবার চুমো দিতে লাগলেন।

আলা-ইজা তো থ। তাই এবার মায়ের মুখখানা নিজের দুটি ছোট্ট হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আবার জিজ্ঞেস করল, 'বলো না, কী হয়েছে? বাবার সঙ্গে এত লোকজন কেন?'

মা এবার উত্তর দিলেন, 'তুই যে হারিয়ে গেছলি মা। তোকে যে আমরা কখন থেকে খুঁজছি আলা-ইজা।'

আলা-ইজা মায়ের কথা শুনে এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বলল, 'কে বলল আমি হারিয়ে গেছি! আমি তো বাগানে ছিলুম। খেলা করছিলুম।'

'একা?' উদবেগভরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন মা।

'একা কেন?'

'তবে?'

'একটা ছোট্ট হরিণছানার সঙ্গে।'

'হরিণছানা? কোত্থেকে এল?'

'আমি কেমন করে জানব! কী সুন্দর দেখতে। আমি তার নাম রেখেছি, 'আমনা'। দেখবে তো চলো না!' বলে আলা-ইজা মায়ের হাত ধরে টান দিল।

'না।' আলা-ইজার বাবার গলা গমগম করে উঠল।

'হরিণছানাটা আনা হয়েছে তোমার খেলা করার জন্যে নয়। তোমার অসুখ সারাবার জন্য।'

আলা-ইজা চমকে তাকাল বাবার চোখের দিকে। বাবার চোখ যেন জ্বলছে গনগন করে।

বাবার চোখের দিকে তাকাতেই বাবা বললেন, 'তুমি এখন মায়ের সঙ্গে অন্দরমহলে নিজের ঘরে যাও! তোমাকে বাগানে যেন আর না ঢুকতে দেখি।'

আলা-ইজার হাসিখুশি মুখখানা হঠাৎ কেমন যেন চুপসে গেল। সে একবার মায়ের মুখের দিকে, আর-একবার বাবার মুখের দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। তারপর অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, 'অসুখ কী মা?'

মায়ের বদলে বাবা উত্তর দিলেন, 'সে তোমার জানবার দরকার নেই। তোমাকে এখন যা বলছি তাই করো, অন্দরমহলে যাও!'

অগত্যা আলা-ইজা মায়ের সঙ্গে অন্দরমহলেই চলে গেল। ইচ্ছে না-করলেও তাকে যেতে হলই। বাবার হুকুম। কিন্তু অসুখ জিনিসটা কী, সেটা জানার জন্যে তখন থেকেই তার মন ছটফট করতে লাগল। আর সেই অসুখ সারাবার জন্যে হরিণছানাটাই বা কী কাজে লাগবে, এই কথাটা ভাবতে-ভাবতেও তার বুকের ভেতরটা তোলপাড় শুরু করে দিল। তবু তাকে যেতেই হল নিজের ঘরে, মায়ের সঙ্গে।

আলা-ইজার ঘরখানা কী সুন্দর! ঘর-ভর্তি যত খেলনা, তত ছবি। রঙে-রঙে ঝলমল করছে। ঝলমল করছে তার পোশাক-আশাক। ঝকঝক করছে খাট-বিছানা। তকতক করছে ঘরের মেঝে, দরজা-জানালা। তা একজন রাজকন্যার ঘর এমন হবে না, তো কি তোমার-আমার ঘরের মতো হবে?

আলা-ইজা যে রাজকন্যা, সেটা অবশ্য তোমরা অনেক আগেই জানতে পেরেছ। এই রাজপ্রাসাদের মালিক যে তার বাবা, বাবা যে একজন রাজা, সে তো আর বলবার দরকার নেই। একবার ওই রাজপ্রাসাদের তোরণটার দিকে চেয়ে দ্যাখো! দ্যাখো, প্রাসাদের তোরণটা কী ভয়ানক উঁচু। মনে হচ্ছে, তোরণের মাথাটা আকাশে ঠেকে যায় বুঝি। ওই তোরণের নীচে আলা-ইজা দাঁড়ালে, আর তুমি যদি ওই তোরণের ওপর থেকে আলা-ইজাকে দ্যাখো, তখন তোমার ঠিক মনে হবে, আলা-ইজা যেন এইটুকু একটি রাজকন্যা-পুতুল। এমনিতে বয়সেও আলা-ইজা এইটুকু। সবে সাতে পা দিয়েছে। তা হলে কী হয়, আলা-ইজা যখন ইচ্ছে তখন, ওই অত উঁচু তোরণটার অগুনতি সিঁড়ি টপকে, তরতর করে ওপরে উঠে যেতে পারে। একেবারে চুড়োয়। একটুও কষ্ট হয় না তার। তবে একটু হাঁপিয়ে যেতেই পারে। সে সবাই হাঁপায়। তোমাকে তরতর করে উঠতে হবে না। এমনই এক-পা, দু-পা করে ওঠো, দেখি কেমন পারো! হাঁপ ধরার কথা ছেড়েই দাও, এমন পা টনটনিয়ে যাবে যে, তার ঠেলাতেই অস্থির।

ওই তোরণের চুড়োর ওপর থেকে স্পষ্ট দেখা যায় একটা গভীর বন। যখনই চুড়োয় ওঠে আলা-ইজা, তখন আর কিছু দেখতে ইচ্ছে করে না তার। শুধু অবাক চোখে চেয়ে থাকে ওই বনটার দিকে। ওই বন যেন আলা-ইজাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ও শুনেছে, ওই বনের গহনে আছে সাপ, ভয়ঙ্কর। আছে অজস্র পোকামাকড়, বিষাক্ত। কত বুনো কুকুর, হিংস্র। আছে জাগুয়ার আর হরিণ। তার দেখতে ইচ্ছে করে, সব দেখতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে বনের গভীরে হারিয়ে যেতে। সে যে কী মজার! কিন্তু সে পারে না। বনের ভেতর হারিয়ে যাওয়ার উপায় যে তার নেই! এই দ্যাখো না, বাগানে ঢুকে ছোট্ট হরিণছানাটার সঙ্গে একটু খেলা করেছে, তাই-ই নিয়ে কী কাণ্ড! আলা-ইজার বাবা পর্যন্ত চোখ রাঙিয়ে কত বকাবকি করলেন তাকে। সে অন্যায়টা কী করেছে? একটু খেলা বই আর তো কিছু নয়! তা-ও কার সঙ্গে, না, একটা ছোট্ট হরিণছানার সঙ্গে। তার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। আবার মনে পড়ে যায় হরিণছানাটার মুখখানা। কী যেন নাম রেখেছে তার! হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমনা। আশ্চর্য তো! কেমন হঠাৎ এই নামটাই তার মুখে এসে গেল। কেন, অন্য আরও তো অনেক নাম ছিল। অন্য আর-একটা ভালো নাম তো সে রাখতে পারত! কিন্তু আলা-ইজার বাবা যে আরও বিচ্ছিরি একটা কথা বললেন। বললেন, তার অসুখ হয়েছে। শুনি, অসুখ কথাটাই-বা কী এমন শুনতে ভালো! একদম বাজে। অসুখ আবার কী কথা! কস্মিনকালে এ কথা শোনেনি আলা-ইজা। কিন্তু তার বাবা কেন বললেন, হরিণছানাটাকে আনা হয়েছে তার অসুখ সারাবার জন্যে? আলা-ইজা একটা কথার সঙ্গে আর-একটা কথার কোনোই মানে খুঁজে পায় না। কাজেই, সে মায়ের সঙ্গে নিজের ঘরে এসে এই কথাটাই বারবার ভাবতে লাগল। ভাবতে-ভাবতে অন্যমনা হয়ে বাইরের জানালায় চোখ মেলে আকাশটার দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো আর খানিক পরে সূর্য অস্ত যাবে। আলা-ইজা জানে, সূর্য-দেবতার এই রাজপ্রাসাদের ঠিক সামনেই একটা মন্দির। এই মন্দিরে সূর্য-দেবতার মূর্তি আছে। একটা জাগুয়ারের মুখের ভেতর থেকে সূর্য বেরিয়ে আসছেন। লাল টকটক করছে তাঁর সেই মূর্তি। এখন আকাশের গায়ে যে সূর্য আলো ছড়িয়ে ঝলমল করছেন, একটু পরে তিনিও যখন অস্ত যাবেন, আকাশ উপচে তখন রঙিন আলো ছড়িয়ে পড়বে। ছড়িয়ে পড়বে যেমন এই প্রাসাদের আনাচে-কানাচে, তেমনই প্রাসাদের বাগানেও। সেখানে আলা-ইজার বন্ধু আমনা আছে। তার হলুদ-হলুদ গা-টা তখন না জানি সেই রঙিন আলোর আস্তরণে কী সুন্দরই না দেখাবে! অবশ্য এই জানালার জাফরি দিয়ে যখন সেই আলো আলা-ইজার মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়বে আলপনার আঁকিবুকি কেটে, তখন আলা-ইজাকেও কী সুন্দরই না দেখতে লাগবে!

কিন্তু এ কী! মেঘ দেখা দেয় কেন? হঠাৎ মেঘে-মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল কেন? কেন ছেয়ে গেল, সে-কথা এই ছোট্ট মেয়েটা এখনও না-জানলেও, এমনটা যখন-তখন হয়, সেটা তার জানাই। আলা-ইজার বাবার এই রাজপ্রাসাদটা যেমন বনের কাছাকাছি, তেমনই তাঁর রাজ্যটাও। ওই যে গহন বনটা আলা-ইজা প্রায় দেখতে পায় রাজপ্রাসাদের তোরণে উঠে, সেই বনের আড়ালে-আড়ালে আরও যে কত রাজার রাজপ্রাসাদ আছে, তা জানে না আলা-ইজা। জানে না, সারা বছরের প্রায় সব দিনগুলোই বা কেন বৃষ্টিতে ভিজে থাকে। সে জানে না ওই বন বৃষ্টির দোসর। ওই বনকে বলে বৃষ্টি-বন। বন আছে বলেই বৃষ্টি নামে মেঘের ভেলায় দুলতে-দুলতে। বৃষ্টি বুঝি বনকে ভালোবাসে!

হ্যাঁ, সত্যিই বৃষ্টি নামল! আলা-ইজার মনটাও আনচান করে উঠল। আহা রে! তার ছোট্ট হরিণ আমনা যে ভিজে যাবে! কী হবে তখন?

আলা-ইজা জানে না, ওই বৃষ্টিতে তার ছোট্ট বন্ধু আমনার কিচ্ছু হবে না। আমনা যে বনের জীব। তার মতো সে তো রাজপ্রাসাদে থাকে না। রাজপ্রাসাদের জানলা দিয়ে বৃষ্টির যেটুকু ছাঁট আলা-ইজার গায়ে লাগে, সেইটুকু দেখলেই সবাই 'গেল গেল' বলে হল্লা শুরু করে দেয়। সুতরাং এখন, এই বৃষ্টির সময় আলা-ইজার মা তাকে জানালায় দাঁড়াতে দেখে আদর করে ডাক দিলেন, 'আলা!'

আলা-ইজা মুখ ফিরিয়ে মায়ের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

মা বললেন, 'এদিকে এসো। বৃষ্টির জলে ভিজে যাবে।'

আলা-ইজা উত্তর দিল, 'আমি ভিজলে কী হয়েছে! আমার ছোট্ট হরিণ যে ভিজে যাচ্ছে।'

মা বললেন, 'বাদলা-বৃষ্টিতে ওদের কিচ্ছু হয় না। তোমায় ভিজতে নেই।'

'কেন মা?' জিজ্ঞেস করে আলা-ইজা।

'বৃষ্টি ভালো নয়।' উত্তর দেন মা।

'বৃষ্টি আমার ভালো লাগে।' বলতে-বলতে জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে দেয় আলা-ইজা। ওর ছোট্ট দুটি হাতের ওপর বৃষ্টির ফোঁটারা ছড়িয়ে পড়ে।

মা ছুটে আসেন। আলা-ইজার হাত ধরে টান দেন। ব্যস্ত হয়ে বলেন, 'অমন করতে নেই।'

'কেন করতে নেই?' নরম গলায় জিজ্ঞেস করে মায়ের চোখের দিকে চেয়ে থাকল আলা-ইজা।

মা বললেন, 'শুনলে না, তোমার অসুখ হয়েছে!'

এবার জানালার ধার থেকে ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। তরপর বলল, 'অসুখ! হ্যাঁ, তখন বাবাও বলল। তোমরা সবাই অসুখ-অসুখ করছ। সেটা কী, তা তো বলছ না!'

'শুনতে নেই।' মা উত্তর দিলেন।

'তবে আমিও তোমার কথা শুনব না।' বলতে-বলতে আলা-ইজা মায়ের হাত ছাড়িয়ে আবার ছুটে গেল জানালার কাছে। আবার হাত বাড়িয়ে দিল জানালা গলিয়ে বৃষ্টির জলে। বৃষ্টির ফোঁটারা এখন ওর হাতের ওপর নাচছে যেন!

মা এবার একটুখানি গলা চড়ালেন। গলা চড়িয়ে একটু-একটু বকা দিলেন, 'কী হচ্ছে কী, আলা! বলছি না, অমন করতে নেই।' বলতে-বলতে আলা-ইজার মা আবার মেয়েকে জানালার ধার থেকে টেনে আনতে গেলেন। পারলেন না। কেননা, তার আগেই আলা-ইজার চোখ ছলছলিয়ে উঠেছে। আলা-ইজা জানালার ধার থেকে নিজেই ছুটে বিছানায় মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল।

হয়তো মা অতটা বুঝতে পারেননি। আলা-ইজা যে একটুখানি বকা খেয়ে অতখানি কেঁদে উঠবে, এ-আর মা জানবেন কেমন করে! তাই থতমত খেয়ে গেছেন মা আচমকা মেয়ের কান্না দেখে। তাড়াতাড়ি ছুটে এসেছেন মেয়ের কাছে। মেয়ের মুখখানি নিজের কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগলেন। মিষ্টি-মিষ্টি গলায় বললেন, 'ছিঃ আলা, তুমি না এখন বড়ো হয়েছ। বড়ো হলে কেউ কাঁদে না। লোকে কী বলবে!'

আলা-ইজা ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে উত্তর দিল, 'তুমি আমায় বকলে কেন?'

'আচ্ছা ঠিক আছে, আর কখখনও বকব না।' মা আলা-ইজার চোখের জল মুছে দিতে-দিতে বললেন।

আলা-ইজাও উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, তোমাদের সব মিথ্যে কথা। একটু আগে বাবাও আমাকে বকল। কেন? কেন বলল, আমার অসুখ হয়েছে! আমি যতবার জিজ্ঞেস করছি অসুখ কী, তুমিও বলতে চাইছ না। আমায় এখন না-বললে আমি তোমার কথাও শুনব না। আমি কাঁদব।'

'ছিঃ! আলা, মায়ের কথা অমন করে অমান্য করতে নেই।' মা আলা-ইজাকে আদর করে আরও কাছে টেনে নিলেন।

'তুমিই বা আমার কথা কেন শুনছ না? কেন বলছ না, আমার কী হয়েছে? খালি বলছ অসুখ হয়েছে। কেন বাবা বলল, হরিণছানাটা আনা হয়েছে আমার অসুখ সারানোর জন্যে, খেলা করবার জন্যে নয়?'

মা বললেন, 'ঠিক আছে, বলছি। তুমি আর কাঁদবে না বলো?'

'আগে বলো!' গোঁ ধরল আলা-ইজা।

মা আলা-ইজার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকালেন। তখনও আলা-ইজার চোখের পাতায় জল ছড়িয়ে আছে। তারপর খুব ভয়ে-ভয়ে বললেন, 'আলা আমার লক্ষ্মী মেয়ে, তোমার অসুখ হয়েছে মানে, তোমার শরীর ভেঙে যাচ্ছে। তুমি রোগা হয়ে যাচ্ছ।'

আলা-ইজা মায়ের কোল থেকে ছিটকে উঠে, চমকে তাকাল মায়ের মুখের দিকে। তারপর বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মায়ের সামনে। মায়ের চোখের পলক পড়ে না। আলা-ইজা অবাক হয়ে উত্তর দেয়, 'ও, এর নাম অসুখ! কই আমার অসুখ করেছে? আমার অসুখ করেছে, অথচ আমি তো কিছু জানি না। আমার তো ছুটতে-হাঁটতে কোনো কষ্ট হয় না। আমি তো তোমাদের কিছু বলিনি।'

'আলা-ইজা, তুমি তো এখন ছোট্ট, তাই বুঝতে পারছ না। তুমি এখন খেলছ, ছুটছ, হাসছ, কথা বলছ। কিন্তু ক-দিন পরে তুমি আর কিছুই পারবে না। তোমাকে শুধু বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে।' মা এক নিশ্বাসে গড়গড় করে কথাগুলো বলে গেলেন।

'এমন কথা তোমরা কেমন করে জানলে?' আলা-ইজা জিজ্ঞেস করল মাকে।

'তোমার বাবা জেনেছেন।' উত্তর দিলেন মা।

'কোত্থেকে?' আলা-ইজা চোখ ঠেরে জিজ্ঞেস করল।

মা বললেন, 'জানি না।'

'তা হলে আমার অসুখ সারাবার জন্যে হরিণছানাকে কেন নিয়ে আসা হয়েছে, সেটাও বুঝি জানো না?' বেশ রাগী-রাগী গলায় জিজ্ঞেস করল আলা-ইজা।

'জানি।'

'কী জানো?'

'ওই হরিণছানাটার প্রাণ বেরিয়ে গেলে, তোমার আর অসুখ করবে না। তোমার প্রাণ বাঁচবে।' উত্তর দিলেন আলা-ইজার মা।

'ও! তার মানে আমার অসুখ ভালো করার জন্যে ওই হরিণছানার প্রাণ নিতে চাইছ তোমরা!' যেন চিৎকার করে ককিয়ে উঠল আলা-ইজা। তারপর হঠাৎই থমকে গেল তার চিৎকার। থমথম করতে লাগল তার মুখখানা। মেয়ের সেই মুখ দেখে ভয় পেলেন মা। মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন মুহূর্তে। কেননা, মায়ের নিজেরই বুকখানা তখন ধড়ফড় করছে। মেয়ে তাঁর আচমকা চিৎকার করে হঠাৎ এমন করে চুপ করে গেল কেন! মা আকুল হয়ে আলতো গলায় আদর করে ডাক দিলেন, 'আলা আমার, অমন করে রাগ করতে নেই। রাগ করে অমন মুখভার কোরো না আলা! কথা বলো, লক্ষ্মী মেয়ে! আমায় কষ্ট দিয়ো না!'

আলা-ইজা কথা বলল না। মায়ের কোনো কথারই সে উত্তর দিল না। আচমকা যেমন করে সে চিৎকার করে উঠেছিল, ঠিক তেমনই করে সে মায়ের হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু কোথায় পালাল আলা-ইজা?

এতবড়ো রাজপ্রাসাদের যেখানে খুশি সে যেতে পারে। কেউ তাকে বারণ করবে না। বাধা দেবে এমন সাধ্যি কার! কারণ, আলা-ইজা রাজকন্যা। সাত বছর ধরে সে এই প্রাসাদের সব মানুষের চোখের সামনে একটু-একটু করে বড় হয়েছে। এক-পা এক-পা করে হাঁটতে শিখেছে। হাঁটতে-হাঁটতে পড়েছে। উঠেছে। কেঁদেছে। আবার হেসেছে। একটি-দুটি কথা বলেছে। তারপর অনেক কথা বলতে শিখেছে। এখন এইকথা সেইকথা কত কথা যে বলে সবার সঙ্গে! মুখে যেন খই ফুটছে! সেইসব কথা শুনতেও যেমন মজা, তেমনই হাসতে-হাসতে তাকে আদর করতে কী আনন্দই না লাগে!

এখন জানি, মেয়েটার কিছু হলে সে সকলের আগে ছুটবে উজ্জুর কাছে। সর্বপ্রথম উজ্জুর কাছে সবকথা না-বললে যেন তার শান্তি হয় না। উজ্জু যেন ওর বন্ধু। অনেক কাছের, অনেক আপন। এত-এত গল্প দিয়ে তার বুকের ভেতরটা কে যেন ভরে দিয়েছে। তবে মুখে হাসি দেখলে আলা-ইজা ভাবে এমন হাসি আর কেউ হাসতে পারে না! তাই উজ্জু হাসলে আলা-ইজা খুশিতে চেঁচাবে। লাফাবে। আর উজ্জুকে আনন্দে জড়িয়ে ধরবে। উজ্জু যখন গল্প বলবে, আলা-ইজা তখন তার কোলে মাথা রেখে অবাক-চোখে উজ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তখন গল্পের কথাগুলো আর কথার মানুষগুলো যেন ছবির মতো আলা-ইজার চোখের ওপর ভেসে ওঠে। সে যেন গল্পের স্বপ্ন দেখা।

নামটা কী অদ্ভুত বলো, উজ্জু। নামটা যেমন অদ্ভুত, তেমনই মানুষটাও। তার যে বয়েস হয়েছে অনেক, সেটা সবাই জানে। কিন্তু কত হল, কেউ জানে না। রেশমের মতো সাদা চুলের ঝাঁক তার মাথায় ঝলমল করছে। টিকলো নাক। কপালটা এতখানি চওড়া। আর বুকখানা তো এতবড়। কী শক্ত-সমর্থ চেহারা। দেখলে, তার বয়েসের হিসেব করে কার সাধ্যি। উজ্জু এখনও একটা হিংস্র বুনো-কুকুরের সামনে চোখ পাকিয়ে দাঁড়ালে, পালাবার পথ পায় না কুকুর। একটা বিষাক্ত সাপ উজ্জুকে দেখলে ফণা তোলবার আগেই গর্তে সেঁদিয়ে হাঁপ ছাড়ে। উজ্জু যখন প্রথম এই রাজপ্রাসাদে। আসে তখন সে কত ছোটো। বাবার সঙ্গে এসেছিল বাগানের মালি হয়ে। আসলে তার বাবা ছিলেন রাজপ্রাসাদের বাগানের মালী। সেই থেকে উজ্জু রয়ে গেছে রাজপ্রাসাদে, তারপর থেকে কত কাণ্ডই না সে দেখেছে। তার বাবা তাকে রাজপ্রাসাদে রেখেই চলে গেছেন স্বর্গে। আগের রাজাও চলে গেলেন তার বাবার ক-দিন পরেই। তারপর আরও দু-জনের পর রাজসিংহাসনে বসলেন আজকের রাজা আলা-ইজার বাবা। তাঁর অভিষেকের দিন সে কত গান-বাজনা, কত আলো আর রঙের উৎসব! কত মানুষের ভিড়। কত আনন্দের হইহল্লা। আর সেইসঙ্গে, কত জীবন্ত হরিণের যে রক্ত ঝরল, কে আর তা গুনে রেখেছে! তারপর মালির ছেলে উজ্জু রাজার দূত হয়েছে। রাজদূত। এ-দেশ ও-দেশ, কত দেশে রাজার এ-খবর সে-খবর, কত খবর পৌঁছে দিয়েছে। এরই ফাঁকে একদিন আলা-ইজার জন্ম হল। সে-ও এক আনন্দ-উৎসব। সে-ও ছিল আলোর দিন, রঙের ছড়াছড়ি। ধীরে-ধীরে বয়েসটা কেমন করে এত বেড়ে গেল, খেয়াল করতে পারে না উজ্জু। আসলে তার উজ্জু নামটা তো আর আসল নাম নয়। তার বাবা নাম রেখেছিলেন আকুলিক্কা। সেই আকুলিক্কা যে কেমন করে উজ্জু হয়ে গেছে, তারও ঠিক-ঠিক কারণ জানা নেই তার। তা সে যাই হোক, রাজকন্যার মুখে কিন্তু উজ্জু নামটা শুনতে ভারি মিষ্টি লাগে এই বৃদ্ধ আকুলিক্কার।

রাজকন্যা ছুটতে-ছুটতে, অনেক ঘর পেরিয়ে উজ্জুর ঘরেই ঢুকে পড়ল। বলা নেই, কওয়া নেই আলা-ইজা সটান তার কোলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল। বৃদ্ধ মানুষটা তখন সবে দু-মুঠো ভুট্টা মুখে দিয়ে সামনের গাছে দুটো পাখির কলকলানি শুনছিল। চমকে উঠেছিল আলা-ইজাকে অমন করে আছড়ে পড়ে কাঁদতে দেখে। কিন্তু পরক্ষণেই সামলে গেছে বৃদ্ধ মানুষটা। অবাক হয়ে তার মুখখানা নিজের চোখের সামনে তুলে ধরে জিজ্ঞেস করল, 'কী হয়েছে আলা-ইজা?'

আলা-ইজার তখন চোখ উপচে জল গড়াচ্ছে। কান্নার শব্দটা আলা-ইজার গলায় কেমন যেন অদ্ভুত শুনতে লাগছে। রাজকন্যা আল-ইজা কাঁদছে, এ যেন বিশ্বাসই হয় না এই বৃদ্ধ মানুষ উজ্জুর! তার আরও আশ্চর্য লাগল, আলা-ইজা তার কথার কোনও উত্তরও দিল না, কান্নাও থামাল না। কেন? কী হল মেয়েটার! তাকে তো কোনোদিন কাঁদতে দেখেনি উজ্জু!

আলা-ইজার চোখের জলে ভিজে গেল উজ্জুর দু-হাতের আঙুলগুলো আর বুকখানা। শত চেষ্টা করেও সে রাজকন্যা আলা-ইজার চোখের একফোঁটা জলও মুছে দিতে পারল না। থামল না তার কান্নাও। কেমন যেন ছটফট করে উঠল উজ্জুর মনটা। সে আর কিছু ভেবে না-পেয়ে ভাবল, বোধ হয় মাকে খুঁজে পাচ্ছে না মেয়েটা। তাই ছুটে এসেছে তার কাছে। এই ভেবে বৃদ্ধ উজ্জু এই ছোট্ট মেয়েটার চিবুক ছুঁয়ে আদর করল। বলল, 'ঠিক আছে, আমি তোমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।'

হঠাৎ মেয়েটা এমন চেঁচিয়ে উঠল, মনে হল যেন ঝাপটা মেরে একটা ঝড়ের দত্যি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। মেয়েটা গলা ফাটিয়ে জানিয়ে দিল, না, সে মায়ের কাছে যাবে না!

'কেন? কী করেছেন মা? বকেছেন?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'না।' কান্না-ভেজা গলায় উত্তর দিল আলা-ইজা।

'তবে?' আবার জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

আলা-ইজা এবার আর থাকতে পারল না। কাঁদছে সে যেমন, তেমনই কান্নার ফাঁকে-ফাঁকে সে কুঁতিয়ে-কুঁতিয়ে বলতে লাগল, 'আমার কিচ্ছু হয়নি, কোনও আসুখও করেনি। আর দ্যাখো না, বাবা বলেছে আমার অসুখ হয়েছে। কী বিচ্ছিরি কথা, অসুখ! সেইজন্যে একটা ছোট্ট হরিণ ধরে এনে, বাগানে বন্দি করে রেখেছে। আমি আজ সারাদিন হরিণটার সঙ্গে খেলা করেছি বলে বাবা আমায় কত বকল। মা বলল, হরিণটার প্রাণ গেলেই নাকি আমার অসুখ সেরে যাবে! আচ্ছা, তুমিই বলো উজ্জু, আমার যদি সত্যিই অসুখ করে থাকে, তবে, তাতে হরিণের কী দোষ! তার প্রাণ গেলে আমার অসুখ সারবে কেন? হরিণের জন্যে তো আর আমার অসুখ করেনি। সত্যি বলছি উজ্জু, আমি কিছুতেই হরিণছানাকে মরতে দেব না। সে আমার বন্ধু। কই, সে তো একবারের জন্যেও আমাকে গুঁতিয়ে দেয়নি! সে তো আমায় ভালোবেসেছে। তাই তো আমি তার নাম রেখেছি, আমনা।'

উজ্জু নামে এই বৃদ্ধ মানুষটা এতক্ষণে বুঝতে পারল, কেন কাঁদছে আলা-ইজা নামের এই রাজকন্যা। বুঝতে পারল, রাজজ্যোতিষী হয়তো রাজার কানে রাজকন্যার এই অসুখের কথাটা ঢুকিয়ে হরিণছানাটাকে মারবার পরামর্শ দিয়েছেন। এই রাজ্যে তাই হয়। রাজজ্যোতিষীর কথা, ফেলার কথা নয় কারও। এমনকী, তিনি রাজা হলেও না। সেই ছোট্টবেলা থেকে আজ এই বৃদ্ধ বয়েস পর্যন্ত একই ঘটনা সে দেখে আসছে। কত জ্যোতিষী গেলেন, কত এলেন, কিন্তু নিয়ম পালটাল না। অভিষেক হবে রাজার, প্রাণ নাও নিরীহ প্রাণীর। যুদ্ধে যাবেন রাজা, নিস্তার নেই নিরীহ প্রাণীর। অসুখ করল রাজার, ওষুধের বদলে রাজাকে দাও নিরীহ প্রাণীর তাজা রক্ত। আরও কত কী! দেখতে-দেখতে মাথার চুল পেকেছে। চোখের দৃষ্টি কমেছে। রাজজ্যোতিষীর কোনো কথাটাই যে সত্যি কথা নয়, সেটা উজ্জু বুঝতে পেরেছে। কিন্তু এ-রাজ্যের কোনো রাজাই তা বোঝেননি। আজও বোঝেন না আলা-ইজার বাবাও। এমন একটা তরতাজা মেয়ের নামে রোগের মিথ্যে ভয় দেখিয়ে রাজজ্যোতিষী নিজের কেরামতি দেখাতে চান। যার শরীরে রোগের কোনোই চিহ্ন নেই, তার রোগ হতে পারে বলে ভয় দেখালে রাজা যে কেমন করে ভয় পান! সেই কথাটা ভাবতে-ভাবতে আলা-ইজাকে আদর করে তার কান্না থামায় উজ্জু। তারপর তার চাপা-রাগটা যাতে আলা-ইজা বুঝতে না পারে তাই সহজ গলায় বলে, 'ছিঃ ছিঃ, বোকা মেয়ে, এইজন্যে কাঁদে বুঝি?' আমি রাজামশাইকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলব, আলা-ইজার কিচ্ছু হয়নি। কোনো অসুখই করেনি। শুধুমুধু তার বন্ধু-হরিণের প্রাণ নেওয়ার কোনো দরকার নেই। বরঞ্চ হরিণ আপনার বাগানে থাকবে। রাজকন্যা তার সঙ্গে খেলা করবে!'

আলা-ইজা মাথা নাড়ল। তারপর বলল, 'বাবা তোমার কথা কিছুতেই শুনবে না।'

'ওরে মেয়ে, আমি জীবনভর এই রাজপ্রাসাদে কাজ করছি। রাজসিংহাসনে যত রাজা বসলেন, তাঁদের হুকুম শুনে কখনও ব্যাজার হইনি। হাসিমুখে তাঁদের কথা শুনেছি। শুনতে-শুনতে আমি বৃদ্ধ হয়ে গেলুম। আর, আজ তোর একটা আবদার যদি আমি রাজামশাইকে জানাই, তবে, এই বৃদ্ধ লোকটার কথা কি তিনি শুনবেন না মনে করছিস!'

'যদি না শোনে?' আলা-ইজার গলায় ভয়।

'তখন দেখা যাবে!' উত্তর দিল উজ্জু।

'কী দেখবে তখন?' আলা-ইজার গলায় উৎকণ্ঠা।

'দেখব, যাতে আলা-ইজার ছোট্ট হরিণ আলা-ইজারই বন্ধু হয়ে, আলা-ইজার সঙ্গে রাজপ্রাসাদের বাগানেই খেলা করে।'

'না উজ্জু।' আতঙ্কে আলা-ইজার গলা যেন জড়িয়ে এল।

'না! কেন?' একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'রাজপ্রাসাদের বাগানে থাকবে না আমার বন্ধু। রাজপ্রাসাদের বাগানে থাকলে, আমার বন্ধুকে বাবা ছেড়ে দেবে না। মারবেই। বরং আমার বন্ধু যেখানে ছিল, সেই গভীর বনেই তাকে আমি রেখে আসব।' উত্তর দিল আলা-ইজা।

উজ্জু আর কোনো কথাই বলতে পারল না। কেননা, শোনা গেল কোলাহল। মনে হল, রাজকন্যাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে সবাই। হবেই তো! যেরকম রাগ করে সে মায়ের হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে এসেছে, তাতে রাজবাড়ি জুড়ে শোরগোল হওয়াটা এমন কিছু আশ্চর্যের নয়। বুঝতে পারা যাচ্ছে, রাজকন্যার নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে এধারে-ওধারে।

দুরুদুরু করে উঠল রাজকন্যা আলা-ইজার বুকের ভেতরটা। সে ভয়ে জড়িয়ে ধরল উজ্জুকে। তারপর ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, 'এবার কী হবে উজ্জু?'

'কিচ্ছু হবে না।'

'আমাকে ওরা দেখতে পেলে যে ধরে নিয়ে যাবে!' উত্তেজনায় আলা-ইজার যেন দমবন্ধ হয়ে আসে।

'ওরা কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না।' সাহস দিল উজ্জু।

'সবাই জানে আমি তোমার ঘরে আসি। তুমি আমায় ভালোবাসো।' ভয়ে যেন দলা পাকিয়ে গেল আলা-ইজা।

'আসতে দাও! তারপর দ্যাখা যাবে।'

'না-আ-আ! আমি তোমাকে ছেড়ে এখন কোথাও যাব না।' দাঁতে-দাঁত চেপে শিউরে উঠল আলা-ইজা।

'ঠিক আছে। তুমি আমার কাছেই থাকবে।'

'তবে আমায় লুকিয়ে রাখো!' ধরে বসল আলা-ইজা।

শোরগোলটা একেবারে কাছেই এগিয়ে এসেছে। আলা-ইজার আর সবুর সইছে না। সে আকুল স্বরে জিজ্ঞেস করল, 'আমি কোথায় লুকোব?'

'এই দরজাটার আড়ালে লুকিয়ে পড়ো।' যতটা ব্যস্ত হয়ে উজ্জু কথাগুলো বলল, তারও দ্বিগুণ ব্যস্ততায়, পলকের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল আলা-ইজা। মস্ত গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট পাখির মতো।

কোলাহলটা উজ্জুর ঘরের প্রায় দোরগোড়ায় এসে পড়লে উজ্জু দরজার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়াল। জিজ্ঞেস করল, 'কী হল হে? এত চেঁচামেচি কেন?'

একজন উত্তর দিল, 'রাজকন্যাকে খুঁজছি।'

'মানে?' ভণিতা করে জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'মায়ের ওপর রাগ করে রাজকন্যা কোথায় ছুটে পালাল, তারই তল্লাশ করছি আমরা।' উত্তর দিল সেই লোকটি।

এবার একেবারেই কিছুই না-জানার ছল করে উজ্জু বলল, 'বাববা! বলো কী, ওইটুকু মেয়ের তা হলে তো খুব জেদ। কেন, কী হয়েছিল?'

'জানি না।' সেই লোকটি উত্তর দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'এদিকে আসেনি তো?'

উজ্জু ন্যাকা সাজল, 'এদিকে এলে সে আমার ঘরে নিশ্চয়ই আসত। কিন্তু কই, আসেনি তো?'

'আশ্চর্য!'

'আমিও যাব নাকি তোমাদের সঙ্গে তল্লাশ করতে?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু। কী চালাক!

'না, না। তুমি বৃদ্ধ মানুষ, তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। আমরাই খুঁজে বের করছি। যাবে আর কোথায়! এই রাজপ্রাসাদেরই কোথাও-না-কোথাও লুকিয়ে আছে।' বলতে-বলতে তারা উজ্জুর ঘরের সামনে থেকে চলে গেল। উজ্জু যেমন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, তেমনই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল আলা-ইজা।

কোলাহলটা আরও একটু হালকা হলে, আলা-ইজার সাহস হল দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসতে। উজ্জুও ঘরের দরজাটা এবার বন্ধ করে দিল। কিন্তু এর পর? এর পর কী করবে উজ্জু!

উজ্জুর ভাবনাটা যখন তার চোখ থেকে আলা-ইজার চোখের ওপর গিয়ে পড়ল, তখন আচমকা আলা-ইজা বলে বসল, 'আমি তোমার এখান থেকে আর যাব না!'

উজ্জু বলল, 'না, না, তুমি আর কোথাও যাবে না।'

আলা-ইজাকে আদর করে এই সাহসটা দিলেও, উজ্জুর ভেতরটা কিন্তু আনচান করে উঠল। খবরটা তো আর চাপা রাখা যায় না। রাজকন্যা আল-ইজা তার ঘরে লুকিয়ে আছে, আর উজ্জু সেই কথা রাজামশাইকে না-জানিয়ে মুখ বুজে বসে আছে, এই কথাটা জানাজানি হতে বেশি সময় লাগবে না। সুতরাং একটা কিছু করতে হয়। কিন্তু কী করবে সে? আলা-ইজাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আবার তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাই তো এখন সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু কোন কথাটা কেমন করে বললে যে আলা-ইজার মন পাওয়া যাবে, সেটা ঠিক এখনই বুঝে উঠতে পারছিল না উজ্জু।

'কী ভাবছ তুমি?' উজ্জুর মুখখানা দেখতে-দেখতে আলা-ইজা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

সত্যি কথা বলতে কী, প্রথমটা আলা-ইজার হঠাৎ ওই কথা শুনে উজ্জু একটু থতমত খেয়ে গেছল। নিমেষে নিজেকে সামলে নিয়ে আমতা-আমতা করে বলে উঠল, 'আলা-ইজার এখন নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।'

আলা-ইজা কিচ্ছু বলল না। শুধু মুখে 'ধ্যাত' করে একটা শব্দ করল।

উজ্জু হা-হা করে হেসে উঠল আলা-ইজার মুখখানা দেখে। কেননা, আলা-ইজা তখন উজ্জুর চোখের ওপর থেকে নিজের মুখখানা সরিয়ে নিয়েছে। লজ্জা পেয়েছে।

উজ্জু হাসতে-হাসতেই বলল, 'ধ্যাত করলে যে! তবে শুনি তোমার মুখখানা কেন শুকিয়ে গেছে?'

আলা-ইজা সঙ্গে-সঙ্গে ছুট্টে গিয়ে উজ্জুর বিছানার মধ্যে মুখখানা লুকিয়ে ফেলল। কোনো কথাই সে বলতে পারল না আর।

উজ্জু এগিয়ে গেল তার কাছে। আলা-ইজার মুখখানা আলতো করে তুলে ধরল নিজের মুখের কাছাকাছি। মুখখানা তুলে ধরলে কী হবে, আলা-ইজা কিন্তু নিজের চোখ দুটি খুলল না। শক্ত করে বুজে রইল। না, আর সে এখন উজ্জুর মুখের দিকে চোখ খুলে তাকাবে না। এবারও লজ্জায়। কেননা, তার যে সত্যি-সত্যি খিদে পেয়েছে, এটা সে ছাড়া আর কাউকে জানতে দেবে না। নিজের চোখ খুললে যদি বুঝতে পারে উজ্জু!

কিন্তু ধরা পড়ে গেল আলা-ইজা। চোখের পাতা না-খুললেও ছোট্ট মেয়েটার ঠোঁট দুটি যে মুচকি হাসির ছোঁয়ায় ছটফট করছে, সেটা স্পষ্ট দেখতে পায় ওই বৃদ্ধ মানুষটা। তক্ষুনি আলা-ইজাকে বুকে তুলে নিল উজ্জু। তারপর হেসে উঠল এমন যে, ঘরটা গমগম করে উঠল।

কিন্তু উজ্জু হাসলেও আলা-ইজা হাসল না। সে ততক্ষণে চোখের পাতা খুলে ফেলেছে। আতঙ্কে সে চিৎকার করে উঠেছে, 'না-আ-আ, আমি যাব না। আমি তোমার কাছে থাকব।'

উজ্জু সঙ্গে-সঙ্গে আলা-ইজার মুখখানা চেপে ধরেছে। তারপর নিজেও ভয় পেয়ে চাপা স্বরে আলা-ইজাকে সাবধান করে বলে উঠল, 'আলা-ইজা, চুপ, চুপ! এক্ষুনি কেউ শুনতে পেলে আর রক্ষে নেই! তোমাকে তো ধরে নিয়ে যাবেই, আমাকে পর্যন্ত হেনস্থা করতে ছাড়বে না।'

আলা-ইজার গলার স্বর সঙ্গে-সঙ্গে থমকে থেমে গেছে। বুঝতে পেরেছে, তার অমন করে চিৎকার করাটা বোধ হয় ঠিক হল না। তাই এবার সে একেবারে মিনমিনে গলায় বলল, 'তবে, তুমি আমায় কেন অমন করে ধরে তুলে নিলে? আমি ভাবলুম, তুমি আমায় বাবার কাছে নিয়ে যাবে বলেই অমন করে ধরে তুলেছ।'

'আলা-ইজা, লক্ষ্মী রাজকন্যা,' আদর করল উজ্জু। তারপর বলল, 'তোমার যে খিদে পেয়েছে, আগে বলোনি কেন?'

আলা-ইজা এবার লজ্জায় উজ্জুর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলল। উজ্জুও আর দেরি করল না। নিজের কোলের ওপর থেকে আলা-ইজাকে নামিয়ে, বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। বলল, 'চুপটি করে বোসো। একদম কথা বলবে না। আমার ভাঁড়ার ভর্তি খাবার। আর তুমি যে কী খেতে ভালোবাস, তা-ও আমি জানি।'

আলা-ইজা এবার বলল, 'তুমি কেমন করে জানলে আমি কী খেতে ভালোবাসি?'

'রাজার মেয়ে কী খেতে ভালোবাসে, সেটা তোমার এই বৃদ্ধ উজ্জু জানবে না তো, আর-কে জানবে!'

'বলো শুনি, আমি কী খেতে ভালোবাসি?'

ঘাড় নেড়ে উজ্জু বলল, 'না, এখন বলব না। নিয়ে এলেই বুঝতে পারবে।' বলতে-বলতে উজ্জু তার ভাঁড়ার ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকে গেল খাবার আনতে। আর আলা-ইজা চুপটি করে উজ্জুর আসার পথের দিকে চেয়ে রইল উৎসুক হয়ে।

বেশি দেরি করল না উজ্জু। বলতে পারো, গেল আর এল। তার হাতে বাটিভর্তি খাবার। আলা-ইজা বাটির দিকে তাকিয়ে দেখার আগেই উজ্জু খাবারটা তার পেছন দিকে লুকিয়ে ফেলল। তারপর হাসতে-হাসতে বলল, 'কী এনেছি, বলো?'

আলা-ইজাও হাসতে-হাসতে উত্তর দিল, 'লুকিয়ে ফেললে কেউ বলতে পারে নাকি? দেখাও, তবে তো বলব।'

'উঁ হুঁ! আগে বললে তবে দেখাব।'

'আর না-বলতে পারলে?' জিজ্ঞেস করল আলা-ইজা।

'হেরে যাবে।' উত্তর দিল উজ্জু।

'তার মানে, আমি হেরে গেলে আমার জন্যে খাবার এনে তুমি নিজেই খেয়ে ফেলবে বুঝি?'

আলা-ইজার কথা শুনে হেসে ফেলল উজ্জু। হাসতে-হাসতে বলল, 'ওমা! রাজকন্যা এ কী কথা বলে!' বলতে-বলতে লুকিয়ে রাখা হাতের বাটি সামনে ধরে আদর করে গুনগুন করে উঠল.

রাজকন্যা খায় না কিছুই

খায় যে শুধুই কিশমিশ,

গাছের ডালে দেখলে আঙুর

জিভ করে তার নিশপিশ!

হেসে উঠল দু-জনেই।

হাসতে-হাসতে একটি কিশমিশ আলা-ইজার মুখে তুলে দিয়ে উজ্জু জিজ্ঞেস করল, 'ঠিক বলিনি?'

আলা-ইজা উত্তর দিল :

ঠিক বলেছ উজ্জু তুমি

ঠিক বলেছ ঠিক,

তাই তো পাখি ডাকছে গাছে

চুক চিকির-র চিক!

বেলা পড়ে আসছে। কে জানে, রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজে না-পেয়ে এখন রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে কী কাণ্ডকারখানা হচ্ছে! আলা-ইজার আর যেন কোনো ভয়ডর কিছুই নেই। ভাবনাও নেই। কেননা, সে যে এখন উজ্জুর কাছে। উজ্জুকে কেউ বকতেও পারে না, কিছু বলতেও পারে না। এমনকী আলা-ইজার বাবা, রাজাও না। আর তা ছাড়া আলা-ইজা যে এখানে লুকিয়ে আছে, সে-কথা জানতে পারলে তবে তো বকার কথা উঠবে! তা, লুকিয়ে থাকার কথা কে আর জানতে পারছে। কেউ ভাবতেই পারবে না যে, আলা-ইজা বৃদ্ধমানুষ উজ্জুর ঘরে এখন ঘাপটি মেরে বসে আছে।

লুকিয়ে থাকাটা ঠিক না বেঠিক, উচিত না অনুচিত, যে ভাববার সে ভাবুক। কিন্তু যতই বেলা পড়ছে, এই বৃদ্ধমানুষ উজ্জুর বুকের ভেতরটা যেন ততই টিপটিপ করছে। তুমি তার মুখ দেখলেই বুঝতে পারবে। সত্যি কথাই, এতক্ষণ এভাবে কাউকে কোনও খবর না দিয়ে কাজটা বোধ হয় ভালো করেনি উজ্জু। বিশেষ করে মেয়েটার যখন এখনও তেমন জ্ঞানগম্যি হয়নি। না, একটা কিছু তাকে করতেই হবে। কিন্তু কী করবে? বড্ড ভাবনায় পড়ে গেল মানুষটা।

ভাবনা যে আলা-ইজারও কম নয়, এটাও তো তোমাকে মানতে হবে। ভাবনা তার মায়ের জন্যেও নয়, বাবার জন্যেও নয়। ভাবনা তার ওই ছোট্ট হরিণছানার জন্যে। হরিণের মায়ের কাছ থেকে কেড়ে এনে তাকে যদি মেরে ফেলার ফন্দি আঁটা হয়, তবে আলা-ইজাও তার মায়ের কাছ থেকে পালিয়ে এসে কোনো অন্যায্য কাজ করেনি। হরিণের ছানাটাকে সে তার মায়ের কাছে কেমন করে পৌঁছে দেবে, সেই সাঙঘাতিক কথাটা ভাবতে-ভাবতেই সে হাই তুলল। নজর এড়াল না উজ্জুর। সে সঙ্গে-সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, 'ঘুম পাচ্ছে আলা-ইজা?'

'কই না তো!' উত্তর দিল আলা-ইজা।

'তবে হাই তুলছ কেন?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

হাসল আলা-ইজা। কোনো উত্তর দিল না।

উজ্জু বলল, 'শুয়ে পড়ো!'

'এখনও তো রাত হয়নি!'

'ঘুম কি শুধু রাতেই পায়! চোখে ঘুম জড়িয়ে এলে সে রাতও মানে না, দিনও জানে না।' উত্তর দিল উজ্জু।

খানিক চুপ করে রইল আলা-ইজা।

উজ্জু আবার বলল, 'শুয়ে পড়ো। লক্ষ্মী মেয়ে!'

হঠাৎ সেই লক্ষ্মী মেয়ে আলা-ইজা বলে ফেলল, 'আচ্ছা উজ্জু, তুমি যখন আমার মতো ছোট্ট ছিলে, তখন কে তোমাকে ঘুম পাড়াত?'

'মা।' উত্তর দিল উজ্জু।

'তুমিও মায়ের পাশে ঘুমোতে?' জিজ্ঞেস করল আলা-ইজা।

'এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করছ?'

'না, এমনই।' বলে থামল আলা-ইজা।

'আমি বুঝতে পেরেছি।' উত্তর দিল উজ্জু।

'কী বুঝতে পেরেছ?' চমকে তাকাল আলা-ইজা উজ্জুর মুখের দিকে।

'তোমার এখন ঘুম পাচ্ছে এটা যেমন ঠিক কথা, তেমনই মায়ের পাশে না শুলে তোমার চোখে যে ঘুম আসে না, এটাও সত্যি কথা!' বলতে-বলতে উজ্জু হাসল। হাসতে-হাসতে জিজ্ঞেস করল, 'মায়ের জন্যে এবার বুঝি মন-কেমন করছে?'

আলা-ইজার যেন চমক ভাঙল। সে থতমত খেয়ে বলে উঠল, 'কক্ষনো না।' তারপর উজ্জুর ঘরের জানালার কাছে ছুটে গেল সে। এখান থেকে রাজপ্রাসাদের বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়। জানলার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে সে বাগানটা দেখছে। দেখছে, গাছের পাতায় এখনও রোদ-ঝিলমিল করছে। একটু আগে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। পাতা-ভর্তি বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখনও টুপুস-টুপুস করে গড়িয়ে পড়ছে। রোদের আলোয় মনে হচ্ছে, একটি-একটি ফোঁটা যেন কার চোখের কান্নার জল। তবে কি তার আমনা নামের ছোট্ট হরিণবন্ধুর মা-ও অমন করে কাঁদছে। ভারি আনচান করে উঠল আলা-ইজার মন। মনে হল, এখনই সে ছুটে যায় ওই বাগানে। কিন্তু পারল না। তার আগেই উজ্জু চুপিচুপি এসে তার মাথায় হাত রাখল। পেছন থেকে। ফিরে দাঁড়াল আলা-ইজা। এবার তার মুখে হাসির কণামাত্রও দেখা গেল না। ভার হয়ে আছে তার মুখ। উজ্জু আলা-ইজার চিবুকে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'রাগ করলে?'

আলা-ইজা জানালার সামনে থেকে এগিয়ে গেল বিছানার কাছে। বসে পড়ল বিছানার ওপর। তারপর কী মনে হল, শুয়ে পড়ল। শুয়ে-শুয়ে বলল, 'উজ্জু, আমার ছোট্ট হরিণ আমনার জন্যে আমার মন-কেমন করছে!'

'তোমার কিচ্ছু ভয় নেই।' উত্তর দিল উজ্জু, 'কাল সকালেই আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।' বলতে-বলতে উজ্জু আলা-ইজার পাশে এসে বসে পড়ল।

আলা-ইজা আবার হাই তুলল।

উজ্জু বলল, 'আমি বলি কী, তুমি এখন একটু ঘুমিয়ে নাও।'

আলা-ইজা মুখে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করল না। শুধু একটা বোবা পুতুলের মতো ফ্যালফ্যাল করে একবার তাকায় বাইরে, ওই জানালাটার দিকে, আর-একবার তাকায় উজ্জুর দিকে। এমনই করে তাকায় কয়েকবার। তারপর বৃদ্ধমানুষটা, এই ছোট্ট রাজকন্যার মাথায় হাত রেখে, যেই তার চুলের মধ্যে বিলি কাটতে শুরু করল, অমনই আলা-ইজার চোখের পাতায় ঘুমের দোলা লাগল। ধীরে-ধীরে চোখ জড়িয়ে এল আলা-ইজার। আর সে পারল না, ঘুমিয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে কেমন মুছে গেল তার মুখের ওপর থেকে সব দুশ্চিন্তার ছায়াগুলো। এখন যেন ভারি নিশ্চিন্ত সে। কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে এখন মুখখানি তার!

কিন্তু উজ্জুর মুখের আনাচে-কানাচে এখন যে ভয়ানক দুর্ভাবনার রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে! এখন সে কী করবে? তবে কি তার এই ছোট্ট ঘরেই সে লুকিয়ে রাখবে রাজকন্যাকে। না, সেটা কখনও ঠিক কাজ নয়। তাকে রাজার কাছে পৌঁছে দিতেই হবে আলা-ইজার খবরটা। তাকে বলে আসতেই হবে, আলা-ইজাকে সে নিজের ঘরে আগলে রেখেছে। কিন্তু তারপর?

তারপর সে আর-এক কাণ্ড শুরু হবে। সারা রাজপ্রাসাদে সাজ-সাজ রব উঠবে। 'খুঁজে পাওয়া গেছে, খুঁজে পাওয়া গেছে' বলে মন্ত্রী-সান্ত্রি, সিপাই-সেনা হল্লা তুলবে। তারপর রাজামশাই রাজকন্যাকে উজ্জুর এই ছোট্ট ঘর থেকে নিয়ে গিয়ে রানির কোলে শুইয়ে দেবেন। তখন রানি আনন্দে আকুল হয়ে মেয়ের কপালে কতবার যে চুমো দেবেন, তার হিসেব রাখে কার সাধ্যি।

কিন্তু!

কীসের কিন্তু!

আলা-ইজার ছোট্ট হরিণ আমনার কী হবে?

রাজার হুকুমের যেমন নড়চড় হয় না, তেমনই হবে।

তার মানে, আলা-ইজার প্রাণ বাঁচাতে, বনের ওই ছোট্ট হরিণের প্রাণ যাবে?

নিশ্চয়ই। এ যে রাজজ্যোতিষীর আদেশ।

কিন্তু হায় রে, আলা-ইজার ওই ছোট্ট বন্ধু হরিণের প্রাণ গেলে যে ছোট্ট রাজকন্যা আলা-ইজা সেই ভয়ঙ্কর ব্যথা সইতে পারবে না! তখন কী হবে?

কিচ্ছু হবে না। যেমন গাছে ফুল ফুটছে, ফুটবে। যেমন নদীতে জল বয়ে যাচ্ছে, তেমনই যাবে। যেমন অন্ধকার নামে আকাশ থেকে, তেমনই নামবে। যেমন আলোয় ভরে দেয় সূর্য, তেমনই দেবে। গাছে-গাছে পাখিরা যেমন গান গায়, তেমনই গাইবে। শুধু একজন, একজনই শুধু কাঁদবে। সে আর কেউ নয়, একটি ছোট্ট মেয়ে। আলা-ইজা নামে এক রাজকন্যা।

কেন কাঁদবে?

কাঁদবেই তো! কেননা, এই রাজপ্রাসাদের তোরণে দাঁড়িয়ে আলা-ইজা নামে এক রাজকন্যা ওই যে গহন অরণ্যটা দেখতে পায়, সেই অরণ্যের গভীরে থাকে এই ছোট্ট হরিণের মা। এই মা-ও যে তার ছোট্ট হরিণশিশুর জন্য কাঁদছে। কাঁদছে আর খুঁজছে। সে যে কোনোদিন জানতেও পারবে না, যাকে সে খুঁজছে তার সেই দুধের বাছার প্রাণ গেছে। সে আর কোনোদিনও তার মায়ের কাছে ফিরে যাবে না। ডাকবে না। ছুটতে-ছুটতে নাচবে না। ফুলের গন্ধ গায়ে মেখে খুশিতে লুটোপুটি খাবে না।

ভাবতে-ভাবতে উজ্জুর হঠাৎ মনে হল, মেয়েটা এবার সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে। খুব ধীরে, আরও ধীরে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল আলা-ইজার ঢেউভাঙা চুলের ওপর থেকে। খুব সাবধানে। যেন তার ঘুম না ভাঙে।

না, আলা-ইজার ঘুম ভাঙল না।

এবার? এবার তা হলে কী করবে উজ্জু? সে কি ঘুমন্ত রাজকন্যাকে তার বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেবে? না, না। যদি ঘুম ভেঙে যায়! যদি মেয়েটা আচমকা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে! যদি সে এই বৃদ্ধমানুষটার বুকের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আবার ছুট দেয়! আবার কোথাও লুকিয়ে পড়ে, তখন! তখন যে এই বৃদ্ধমানুষটাকেই সবাই দুষবে। রাজকন্যাকে লুকিয়ে রাখার অপরাধে যে তার মাথাটা কাটা যাবে না, এমন কথা কেউ বলতে পারে না। মেয়েটা ঘুমিয়ে থাকুক। নিশ্চিন্তে। সেই ভালো। এখন বরং তার আদরের হরিণছানা আমনার প্রাণটা কেমন করে রক্ষা করা যায়, সেই উপায়টা বের করা যায় কি না, তাই ভাবা যাক!

হয়তো রক্ষা করা যায় না।

কেননা, এ যে রাজার আদেশ। কিন্তু কার কথা শুনে রাজা এ-আদেশ দিয়েছেন?

তিনি হলেন রাজজ্যোতিষী।

এমনও তো হতে পারে, রাজজ্যোতিষী ভুল করছেন।

ভুলই তো! নইলে রাজকন্যার অসুখই যদি করে, তবে উজ্জু নামে এই বৃদ্ধমানুষটা এতক্ষণে এতটুকু টের পেল না। সেই কখন থেকে মেয়েটা তার কাছে আছে। অসুখ করলে একবারও তো সে মুখে বলবে, 'ভালো লাগছে না।' কই, তেমন কথা তো উজ্জু শোনেনি রাজকন্যার মুখ থেকে। এখনও দ্যাখো, মেয়েটা কেমন অকাতরে ঘুমোচ্ছে। দ্যাখো কী মিষ্টি দেখতে লাগছে! না, না, এ-আদেশ রাজাকে ফিরিয়ে নিতেই হবে। অকারণে একটা ছোট্ট হরিণের প্রাণকে ছিনিয়ে নেওয়া, এ যে বড়ো নিষ্ঠুর কাজ। উজ্জু যাবে রাজার কাছে। রাজাকে বলবে, এ-কাজ বন্ধ করতে! রাজকন্যার বন্ধু-হরিণকে বাঁচাতে।

না, আগে রাজার কাছে যাওয়া নয়। যার উপদেশ শুনে রাজার এই হুকুম, সেই রাজজ্যোতিষীর কাছে আগে যেতে হবে। তাঁকেই আগে জিজ্ঞেস করতে হবে, সত্যিই কি রাজজ্যোতিষী রাজকন্যার বিপদ দেখেছেন!

বৃদ্ধমানুষ উজ্জু এই কথা ভেবে রাজজ্যোতিষীর কাছেই আগে ছুটল।

এতক্ষণ রাজজ্যোতিষীর নাম শুনে যতটা মনে হচ্ছিল তিনি লম্বা চওড়া, এখন দেখছি ঠিক ততটাই তিনি বেঁটেখাটো।

যতটা মনে হচ্ছিল গুরুগম্ভীর, ঠিক ততটাই তিনি খ্যানখেনে।

যতটা মনে হচ্ছিল তিনি বিদ্যেধর, দেখেশুনে এখন মনে হচ্ছে ঠিক ততটাই তিনি বুদ্ধির বৃহস্পতি।

এটা এমন নয় যে, এসব কথা উজ্জু জানে না। জানে, খুবই জানে। কিন্তু রাজামশাই যে অন্ধের মতো ভক্তি করেন রাজজ্যোতিষীকে। কাজেই রাজজ্যোতিষীর ঘরের দোরের কাছে দাঁড়িয়ে উজ্জু হাঁক পাড়ল:

জ্যোতিষমশাই, জ্যোতিষমশাই ঘরে আছেন কি?

এই কে দেখুন দাঁড়িয়ে দোরে, উজ্জু এসেছি।

অমনই ঘরের ভেতর থেকে একটা খ্যানখেনে গলায় জ্যোতিষমশাই সাড়া দিলেন।

কে বটে হে উজ্জু তুমি, দেখি তোমার মুখখানা,

কেন শুনি সাঁঝের বেলায় আমার ঘরে দাও হানা?

বলতে-বলতেই জ্যোতিষমশাই ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। বেরিয়েই চোখের ওপর থেকে চশমা সরালেন। তারপর উজ্জুর মুখের ওপর চোখ রাখলেন। পিটির-পিটির তাকিয়ে দেখে হেসে উঠলেন। বললেন, 'আরে আরে, এ কী আশ্চর্য! তুমি?'

উজ্জু বলল, 'আজ্ঞে, তা হলে চিনতে পেরেছেন?'

জ্যোতিষমশাই বৃদ্ধ উজ্জুর হাত ধরে বললেন, 'কী বলছ তুমি! তোমাকে চিনতে পারব না! আরে এসো! এসো! কী খবর বলো?'

বৃদ্ধ উজ্জু ঘরে ঢুকে, জ্যোতিষমশাইয়ের ঘরখানা একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়ে বলল, 'আমার খবর, আমি আর রাখি না। আপনার খবরটা জানতে পারলে, বড়োই খুশি হই।'

জ্যোতিষমশাই উত্তর দিলেন, 'আমার খবর অবশ্য আমি রাখি। মানে, রাখতেই হয়। না রাখলে রাজামশাই ভীষণ রাগ করেন!'

বৃদ্ধ উজ্জু একটুও অবাক না-হয়ে বলল, 'তা তো বটেই, রাগ তো করবেনই। আপনার মতো এমন একজন বন্ধু রাজামশাই কোথায় পাবেন বলুন!'

জ্যোতিষমশাই উত্তর দিলেন, 'তা যা বলেছ! বন্ধু যদি পাতাতে হয় তো রাজা-বাদশা ছাড়া আর কার সঙ্গে পাতাব! মাছ যদি খেতে হয় তো রুই-কাতলা ছেড়ে কার আর চুনো-পুঁটি মুখে রোচে!'

বৃদ্ধ উজ্জু জ্যোতিষমশাইয়ের কথা শুনে 'বাঃ বাঃ' করে তারিফ করে উঠল। তারিফ করে বলল, 'বটেই তো! এই না হলে রাজজ্যোতিষী! আরে মশাই, আপনারা আছেন বলেই না আমরা নির্ঝঞ্ঝাটে দিন কাটাচ্ছি!' বলে একটু হাসল উজ্জু। যতটুকু হাসল, তার চেয়ে আরও একটু গলা চড়িয়ে রাজজ্যোতিষীও হেসে উঠলেন। আর সেই হাসির ওপরই উজ্জু বলে বসল, 'কিন্তু জ্যোতিষমশাই, রাজকন্যা যে এমন করে হারিয়ে যেতে পারে, এটা যে কেন আপনার মতো একজন মহা-জ্যোতিষীর গণনায় ধরা পড়ল না, এইটা আমাকে বিলক্ষণ আশ্চর্য করেছে!'

রাজজোতিষী বৃদ্ধ উজ্জুর কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে-হাসতে বললেন, 'অ্যাই, অ্যাই, এইজন্যেই মানুষ বৃদ্ধ হয়! এইজন্যেই মানুষ বৃদ্ধ হলে তাদের বুদ্ধির ঘট ফুটো হয়ে যায়! আরে মশাই, রাজকন্যার গণনায় ধরা পড়েছে তার একটা সাঙঘাতিক ব্যামো হবে। তার মানে এই নয়, রাজকন্যা হারিয়ে যেতে পারে না। ব্যামো মানে কি শুধু গায়ে জ্বর, না, পেটে ব্যথা! আরে মশাই, হারিয়ে যাওয়াটাও তো ব্যামোর মধ্যে পড়তে পারে।' বলে ভারি মুরুবিবর চালে তিনি তাকিয়ে রইলেন।

বৃদ্ধ উজ্জু রাজজ্যোতিষীর কথা শুনে খুব যে মজা পেল, সেটা অবশ্য একফোঁটাও বুঝতে দিল না। নিজে বোকা সেজে, মুখখানা কচি-খোকার মতো কচি-কচি করে বলল, 'ও, ব্যামো মানে যে হারিয়ে যাওয়াও হয়, এটা তো আমি জানতুম না। অবশ্য আমরা মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, এসব আমাদের জানার কথাও নয়। তবে, আমার ধারণা ছিল, ব্যামো মানে ব্যারাম।'

জ্যোতিষমশাই এবার একটু গলা চড়ালেন। বোঝা গেল, তিনি একটু প্যাঁচে পড়েছেন। তাই চড়া গলাতেই তিনি বললেন, 'হারিয়ে যাওয়াটাও যে একটা ব্যারাম, এটাও আমার কাছে শিখে যাও তুমি! কতরকমের ব্যারাম আছে তা তোমার জানা আছে কি?'

'আজ্ঞে না!' উত্তর দিল উজ্জু, 'আর সেসব আমাদের জানার কথাও নয়।'

'তবে, তুমি আমার কাছে জেনে যাও!' প্রায় যেন ধমক দিয়ে উঠলেন রাজজ্যোতিষী। তারপর মুখস্থের মতো গড়গড় করে বলে গেলেন, 'হাঁটা-চলা, কথা বলা, ঠোঁট নাড়া, চোখ চাওয়া, খিদে পাওয়া, গিলে খাওয়া, জিব চাটা, দাঁতে কাটা, চুল ছাঁটা, ট্যাঁকে টাকা, ছোটাছুটি, লাফালাফি, শীতে কাঁপা, গায়ে জামা, রাতে শোয়া, ভোরে ওঠা ইত্যাদি, ইত্যাদি হরেক রকমের ব্যারাম নিয়ে মানুষ বেঁচে আছে। কাজেই হারিয়ে যাওয়াটাও যে ব্যারামের একটা সাঙঘাতিক লক্ষণ, এটা আমার কাছে শিখে রাখো! বুঝলে কিছু?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ, এবার বুঝতে পেরেছি।' বলে বৃদ্ধ উজ্জু হাত কচলাতে লাগল। তারপর বলল, 'আজ্ঞে, যদি কিছু মনে না-করেন তবে আর-একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি কি?'

'পারো বইকী! আমি আছি কীসের জন্যে? তোমাদের ভালো-মন্দ বিচার করার জন্যেই না আমি রাজজ্যোতিষী হয়েছি।'

উজ্জু বলল, 'সে তো বটেই। আপনার মতো এমন একজন গুণধর মানুষ না-থাকলে আমাদের কপালে কবেই ঘুন ধরে যেত!'

রাজজ্যোতিষী উজ্জুর মুখে তাঁর তারিফ শুনে ফিক করে একবারই হাসলেন, তারপর বললেন, 'তোমাদের জন্যেই তো আমি বেঁচে থাকতে চাই। আমাকে দিয়ে তোমাদের যদি কোনো কাজ হয়, তবে তার জন্যে আমার দরজা খোলাই আছে। আর খোলা থাকবেও চিরদিন। থাক ওসব কথা। বলো, তুমি যেন কী জিজ্ঞেস করবে বলছিলে?'

উজ্জু আমতা-আমতা করে বলল, 'আজ্ঞে জ্যোতিষমশাই, একটা কথা আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না।'

রাজজ্যোতিষী বললেন, 'আরে, অত কিন্তু-কিন্তু করার কী আছে? বলো, আমি ঢুকিয়ে দিচ্ছি!'

উজ্জু তেমনই বোকা-বোকা মুখখানা আরও বোকা-বোকা করে বলল, 'জ্যোতিষমশাই, জানেন বয়েসের সঙ্গে-সঙ্গে আমার বুদ্ধিটাও এমন ভোঁতা হয়ে গেছে যে, আপনাকে কী বলব! আমি জানেন, কেবলই ভাবছি, হারিয়ে যাওয়াটা যদি ব্যামোই হয়, তবে সেই ব্যামো সারাবার জন্যে একটা বাচ্চা হরিণের প্রাণ নেওয়ার কী কারণ থাকতে পারে? এই কথাটা আপনার কাছে জানবার জন্যেই ছুটে আসা।'

উজ্জুর কথা শুনে এবার জ্যোতিষমশাই আর যেন থাকতে পারলেন না। হো-হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে-হাসতে বললেন, 'এখন বুঝতে পারছি, সত্যিই তোমার বয়েস হয়েছে। বুঝতে পারছি, বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে তোমার বুদ্ধিটাও ভোঁতা মেরে গেছে! এমন সহজ কথাটা তুমি যে জিজ্ঞেস করতে পার, এ আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। দ্যাখো উজ্জু, এই দুনিয়ায় অমনই-অমনই কিছু কি পাওয়া যায়? ধরো, তোমার লাড্ডু খাবার ইচ্ছে হল। তুমি হাত পাতলে আর সঙ্গে-সঙ্গে লাড্ডু গড়াতে-গড়াতে এসে তোমার মুখের মধ্যে ঢুকে পড়ল, এ তো আর হয় না! ফেলো কড়ি, খাও লাড্ডু! তেমনই মারো হরিণ, হটাও ব্যামো!'

এবার আর উজ্জু না-হেসে থাকতে পারল না। হাসতে-হাসতেই বলল, 'জ্যোতিষমশাই, আপনি তো দারুণ এলেমদার লোক দেখছি! আমি যে লাড্ডু খেতে ভালোবাসি, এটা পর্যন্ত আপনি জানেন! কেমন করে জানলেন, ভেবে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি!'

'উঁহুঃ বাববা! আমায় কি-আর এমনই-এমনই রাজজ্যোতিষী করা হয়েছে! আমি দিনকে রাত করতে পারি! কে না-জানে, খিদে পাবে। খিদে পেলেই খেতে হবে।' বলতে-বলতে জ্যোতিষমশাই চোখের পাতা উলটে-পালটে এমন একখানা ভাব দেখালেন, যেন মাটিতে তাঁর পা নেই। তিনি হাওয়ায় উড়ছেন!

কিন্তু ওই বৃদ্ধ মানুষ উজ্জুও তো আর যেমন-তেমন মানুষ নয় তারই বা তোয়াক্কা করার কী আছে! বয়েস বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে তার চুল পেকেছে। চুল পাকার সঙ্গে-সঙ্গে গায়ের চামড়া ঝুলতে শুরু করেছে। মুখে বলিরেখা দেখা দিয়েছে। বয়েস যত বেড়েছে, তত কতরকমের যে মানুষ দেখেছে সে, তার হিসেব কে করে! তাই এখন ওই জ্যোতিষমশাই যে ডাহা মিথ্যে বলছেন, সেটা বুঝতে তার একটুও অসুবিধে হল না। উজ্জু মনে-মনে হাসল। আর ভাবল, এবার একটু জ্যোতিষমশাইকে প্যাঁচে ফেলা যেতে পারে। তাই উজ্জু জ্যোতিষমশাই-এর বাহাদুরির তারিফ করে ফট করে জিজ্ঞেস করে বসল, 'এতই যখন আপনি বলতে পারেন, তা হলে এখন রাজকন্যা কোথায় আছে, সেটাও নিশ্চয়ই আপনি জানেন?'

'জানি বইকী!' বুকটা একটু উঁচিয়েই উত্তর দিলেন রাজজ্যোতিষী।

'তা হলে, এত হইহল্লা করে খোঁজাখুঁজির কী দরকার? রাজামশাইকে খবরটা বলে দিলেই তো সব ল্যাঠা চুকে যায়।' বলে, উজ্জু একটু আড়চোখে তাকাল রাজজ্যোতিষীর দিকে।

রাজজ্যোতিষী উজ্জুর কথা শুনে এমন তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে উঠল যে, উজ্জু নিজেই গেল ঘাবড়ে। উজ্জু ভয় পেল। কেননা, হাসির রকম দেখে মনে হতেই পারে রাজজ্যোতিষী রাজকন্যা আলা-ইজা কোথায় আছে, সেটা জানেন। তার ওপর যখন উজ্জুর মুখের দিকে একটা অদ্ভুত চোখ পাকিয়ে তাকালেন, তখন উজ্জুর মনে হল, তার শিরদাঁড়ার ভেতরে কে যেন নখসুদ্ধু হাত ঢুকিয়ে খিমচি কাটছে। মনে হল, তক্ষুনি সে পালায়। উঠতেও গেল। কিন্তু রাজজ্যোতিষী তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলে বলে উঠলেন, 'আরে যাচ্ছ কোথায়? আমার কথাটা না-শুনলে তোমার ছাড়ান-ছোড়ন নেই।'

উজ্জু ভয়েমরে বলে ফেলল, 'আমার কোনো দোষ নেই।'

জ্যোতিষমশাই উত্তর দিলেন, 'জানি তোমার দোষ নেই, কাছে এসো!' বলে রাজজ্যোতিষী নিজের মুখখানা উজ্জুর কানের কাছে এনে ফিসফিস করে বললেন, 'তোমার বুদ্ধি কবে হবে?'

'কেন? এ-কথা বলছেন?' ভয়ে-ভয়েই জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'তুমি কি জানো না, আমি এ-কথা কেন বলছি?'

রাজজ্যোতিষীর কথা শুনে মুখখানা চুপসে গেল উজ্জুর। ভয় পেলে মানুষে মাথা নেড়ে যেমন করে 'না' জানায়, তেমনই করে শুধু মাথা নাড়ল উজ্জু।

রাজজ্যোতিষী ফিসফিস করেই ধমক দিলেন বৃদ্ধ উজ্জুকে। তারপর বললেন, 'সব কথা রাজাকে যদি আগেই বলে দিই, তা হলে আমার কী লাভ! রয়েসয়ে না বললে, খাতির করবে কেন! আলুবখরার চাটনি যেমন একটু-একটু চেটে রসিয়ে-রসিয়ে খেতে হয়, আমিও তেমনই রাজাকে একটু-একটু চেটে'—বলতে-বলতে হঠাৎ কী মনে হল, রাজজ্যোতিষী থমকে গেলেন। তারপর বললেন, 'ইস, তোমাকে সব কথা বলে ফেললুম! তুমি যেন আবার কাউকে বলে দিয়ো না!'

'না, মানে, আপনি,' উজ্জুও থমকে-থমকে কথাগুলো বলতে-বলতে থামল।

রাজজ্যোতিষী বললেন, 'আরে, 'আপনি' বলেই থামলে কেন? কী বলতে চাইছ? বলে ফেলো! অর্ধেক পেটে আর অর্ধেক মুখে রাখলে আমারও ঘুম হবে না, তোমারও খুঁতখুঁতুনি যাবে না।'

উজ্জু উত্তর দিল, 'আজ্ঞে, আপনি কি রাজামশাইকে আলুবখরার চাটনি—'

এবার কিন্তু খুব জোরেই খ্যানখেনে গলায় রাজজ্যোতিষী চিৎকার করে ধমক দিলেন উজ্জুকে, 'চুপ।'

উজ্জু থতমত খেয়ে চুপ করে গেল। কিন্তু বুঝতে তার বাকি রইল না, রাজজ্যোতিষী ছল-চাতুরি করে রাজাকে ঠকাতে চাইছেন। তাই, উজ্জু আর কথা বাড়াল না। কথা বলতে-বলতে এরই মধ্যে আকাশে দু-একটি তারা ফুটেছে। সুতরাং উজ্জু এখন রাজার সঙ্গেই দেখা করবার জন্যে অস্থির হয়ে উঠল। তার ওপর রাজকন্যা আলা-ইজা এখন তার ঘরে একা আছে। ঘুমোচ্ছে। তার ঘুম ভাঙার আগেই রাজামশাইকে খবরটা পৌঁছে দিতে হবে। না-পারলে, তার যদি ঘুম ভেঙে যায়, তবে মেয়েটা ঘরে তাকে দেখতে না পেলে হয়তো কান্না জুড়ে দেবে! সুতরাং রাজজ্যোতিষীর সঙ্গে আর কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট না করাই ভালো। এই কথা ভেবেই উজ্জু বলল, 'তা হলে এই পর্যন্তই থাক জ্যোতিষমশাই। পরে আবার আসব। আপনাদের মতো মানুষের সঙ্গে দু-দণ্ড কথা বলতে পারাটা কি কম ভাগ্যের কথা!'

জ্যোতিষমশাই বললেন, 'অ, তা হলে আজ উঠছ?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ।' উত্তর দিল উজ্জু।

'ঠিক আছে, উঠবেই যখন, তখন আর তোমাকে আটকাব না। তবে দেখো, তোমার সঙ্গে আমার এই যে সব কথাবার্তা হল, এ যেন আবার বাইরের কেউ জানতে না-পারে। তোমাকে তো আমি কোনোদিন, আমার আপনজন ছাড়া আর কিচ্ছু ভাবিনি। নিজের মনের কথা আপনার লোক ছাড়া আর কাকে বলা যায় বলো? আবার এসো! বিপদে-আপদে দরকার পড়লেই এসো! না না, আমার কাছে বুদ্ধি চাইলেই যে আমি তোমার কাছে হাত পাতব, এমন ছোঁচা আমি নই। এসো কিন্তু।'

রাজজ্যোতিষীর কথা শেষ হতেই পা বাড়াল উজ্জু। পা বাড়াবার আগে অবশ্য বলতে ভুলল না, 'আপনার মতো মানুষের সঙ্গে কথা বলে আমার যে এমন করে চোখ খুলে যাবে, আমি তা একেবারেই ভাবিনি।'

রাজজ্যোতিষী কী বুঝলেন কে জানে! শুধু হেসে উঠলেন হে-হে করে। ঠিক একজন ধড়িবাজ লোকের মতো।

রাজকন্যাকে সারাদিন তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে। তাকে খুঁজে না-পেয়ে রাজপ্রাসাদে তখন হাহাকার পড়ে গেছে। অথচ কেউ জানতেও পারল না, রাজকন্যা রাজপ্রাসাদেই আছে। সে আছে রাজপ্রাসাদের সকলের চেনা উজ্জু নামে সেই বৃদ্ধমানুষটার ঘরে। সেই বৃদ্ধমানুষটাই এখন রাজজ্যোতিষীর ঘর পেরিয়ে, রাজার সঙ্গে দেখা করতে চলল। অবশ্য, অন্য কেউ হলে, এমন সহজে রাজার দেখা পাওয়ার সুযোগ পেত না। তা লোকটা যখন উজ্জু, তখন যতই নজরদারি থাক, কেউ কোনও কথাও বলল না। তার ওপর তো সবাই তখন তটস্থ হয়ে আছে! হারিয়ে গেছে কে? না, রাজকন্যা। এ কী সহজ কথা! কার দোষে এমন একটা অঘটন ঘটল, সেই নিয়ে চারদিকে তখন চলছে কানাঘুষো, ফিসফিস। আর, এ-কথা না-বললেও কে না জানে, তখন রাজার মেজাজটাও ছিল তিরিক্ষি! তেমনই ভাবনায় ভেঙে পড়া চেহারাটাও।

বৃদ্ধ উজ্জু যখন রাজামশাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল, তার অনেক আগেই সেখানে জমায়েত হয়েছে সবাই। মানে, সেই মন্ত্রী-সান্ত্রি থেকে আরম্ভ করে সেনাপতি, বরকন্দাজ পর্যন্ত। সবাই। কোথায়-কোথায় রাজকন্যা থাকতে পারে, সেই নিয়ে নানান জন রাজাকে নানান রকম পরামর্শ দিচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে উজ্জু বৃদ্ধকে সেখানে হাজির হতে দেখে সবাই থমকে গেল। অন্য কেউ নয়, রাজামশাই নিজেই কথা বললেন উজ্জুর সঙ্গে। বললেন মানে কী, তিনি প্রায় কাঁদো-কাঁদো হয়ে উজ্জুর কাছে এগিয়ে এলেন। এসেই, উজ্জুর হাত ধরে বলে উঠলেন, 'উজ্জু, তোমরা সবাই থাকতে, তোমাদের সবার চোখের সামনে থেকে আমার মেয়েটা হারিয়ে গেল!'

উজ্জু আর অন্য কোনও কথা না-বাড়িয়ে, প্রায় সবাইকে অবাক করে বলে উঠল, 'রাজামশাই, না, না, রাজকন্যা তো হারিয়ে যায়নি!'

'তবে?' রাজামশাই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন।

একঘর লোক একসঙ্গে ঝলকে উঠে উজ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের যেন শ্বাস পড়ে না।

উজ্জু তাদের সবাইকে চমকে দিয়ে বলে উঠল, 'আজ্ঞে রাজকন্যা তো আমার ঘরে আছে!'

'তোমার ঘরে!' হতচকিত রাজা প্রায় চিৎকার করে উঠলেন।

'তবে যে সবাই বলল, তুমি বলেছ, তোমার ঘরেও সে যায়নি!' রাজার গলায় ক্ষোভ।

'আজ্ঞে, কথাটা মিথ্যে নয়। এই মিথ্যে-কথাটা আমিই মিথ্যে-মিথ্যে বলেছি রাজকন্যার হয়ে।' উত্তর দিল উজ্জু।

'কেন?' রাজার গলায় রাগ।

'কেননা, রাজকন্যা আমাদের সবার প্রিয় রাজার মেয়ে বলে।' উত্তর দিল উজ্জু।

'কিন্তু তাই বলে তুমি মিথ্যে বলবে?' ঝাঁঝিয়ে উঠলেন রাজা, 'সারাদিন ধরে সারা রাজ্য ঢুঁড়ে ফেলল আমার লোকেরা, অথচ তুমি মুখ বুজে বসে রইলে ঘরের কোণে! একবারের জন্যেও খবর পাঠালে না আমার কাছে?'

'রাজামশাই, আমার বেয়াদপি ক্ষমা করবেন।' এইটুকু বলে উজ্জু মাথা নোয়াল।

'কী বলতে চাও তুমি?' রাজা তেমনই গলা চড়িয়ে কথা বললেন।

'রাজামশাই, আমার তেমন কিছু বলার নেই। আমি রাজবৈদ্যও নই, রাজজ্যোতিষীও নই। আমার বিদ্যে-বুদ্ধিও তাদের মতো নয়। তবে এটুকু আমি বুঝেছি, রাজকন্যা আলা-ইজার শরীরে কোনও ব্যামোর লক্ষণও নেই, কোনো ভয়েরও কারণ দেখি না। শুধুমুধু রাজজ্যোতিষীর কথায় বিশ্বাস করে, একটি বাচ্চা হরিণের প্রাণ নিয়ে রাজকন্যার প্রাণ বাঁচানোর এই চেষ্টার আমি কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। তার ওপর আলা-ইজা নামের এই ছোট্ট মেয়েটি সেই ছোট্ট হরিণটিকে ভালোবেসেছে। তার সঙ্গে খেলা করেছে। তার নাম দিয়েছে 'আমনা'। এখন আপনি যদি জ্যোতিষমশাইয়ের কথা মেনে হরিণের প্রাণ নেন, তবে, আমার মনে হয়, আলা-ইজারই প্রাণ বাঁচানো দায় হবে।' এইটুকু বলেই বৃদ্ধ উজ্জু থামল। তারপর হঠাৎ যেন ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, 'রাজামশাই, রাজকন্যা এখন আমার ঘরে ঘুমোচ্ছে। আপনি দয়া করে এখনই তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। তারপর আপনার যদি মনে হয় আমাকে শাস্তি দেবেন, দিতে পারেন। কিন্তু আর দেরি করা ঠিক হবে না। রাজকন্যা আলা-ইজার যদি ঘুম টুটে যায়, আর আমাকে যদি সে দেখতে না পায়, তবে সে-ও হবে আর-এক বিপদ।'

রাজা কী ভাবলেন, সে রাজাই জানেন। তিনি শুধু এক-ঝলক দৃষ্টি হেনে দেখে নিলেন বৃদ্ধ উজ্জুকে। তারপর সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে নিজেই চললেন রাজকন্যাকে ফিরিয়ে আনার জন্যে, উজ্জুর ঘরের দিকে।

এখন আলো চাই। কেননা, আকাশে অন্ধকার নেমেছে। যদিও আকাশের বুকে ফুটে উঠেছে অনেক তারার আলো, তবু সে আলোয় উছলে পড়ে না সামনের অন্ধকারটা। তাই রাজপ্রাসাদের দেয়ালে-দেয়ালে জ্বলে উঠেছে দেয়ালগিরি। যেন ঘন অন্ধকারের সঙ্গে যুদ্ধ করছে তারা টিমটিম করে। যুদ্ধ করছে রাজার পথ করে দেওয়ার জন্যে। সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে রাজাও যেন যুদ্ধ করতে চলেছেন এখান থেকে উজ্জুর ঘরের দিকে। অবশ্য এই যুদ্ধযাত্রায় কারও মুখে কোনো কথা নেই। আলো-আঁধারিতে শুধু শোনা যাচ্ছে নিশ্বাসের শব্দ। দলটা তো নেহাত ছোটো নয়। অত মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটা গাছ-পাতার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ঝিঁঝিঁর শব্দকেও যতই ছাপিয়ে যাচ্ছে, ততই ওরা উজ্জুর ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।

পৌঁছে গেল তারা উজ্জুর ঘরের দোরগোড়ায়। তারপর থমকে দাঁড়াল। দরজা খোলা! ঘরের ভেতরটা অন্ধকারে ঘুটঘুট করছে। ঘরের প্রদীপ জ্বেলে দিল উজ্জু। ঘরভর্তি আলো ছড়িয়ে গেল। একদঙ্গল লোকের মুখ সেই আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল। রাজা ঘরে ঢুকলেন। থমকে দাঁড়ালেন রাজা। তার অনেক আগেই প্রদীপ জ্বালিয়ে উজ্জুও থমকে গেছল। কেননা, তারা কেউই রাজকন্যা আলা-ইজাকে দেখতে পেল না ঘরের ভেতরে।

রাজা জিজ্ঞেস করলেন, 'কই? আলা কই?'

উজ্জু চিৎকার করে ডাক দিল, 'রাজকন্যা!'

ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেল সেই শব্দ, কিন্তু কেউ সাড়া দিল না।

উজ্জুর মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। এই তো ছিল মেয়েটা! কোথায় গেল! সে ব্যস্ত পায়ে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আবার চিৎকার করল, 'আলা-ইজা!'

কেউ সাড়া দিল না।

আবার ডাকল সে।

আবার।

অনেকবার।

রাজা তার মুখের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। একটি কথাও মুখ ফুটে বললেন না। রাজার মতো রাজার সাঙ্গোপাঙ্গরা হতবাক!

উজ্জু চোখের পলকে ছুটতে লাগল। যেমন করে একজন বৃদ্ধমানুষ ছোটে, ঠিক তেমনই করে।

এবার রাজা কথা বললেন। তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের হুকুম করলেন, 'বৃদ্ধটার পিছু নাও!'

তারাও বৃদ্ধ উজ্জুর পিছু নিল।

উজ্জু ছুটতে-ছুটতে খানিকটা এসে দেয়ালগিরির একটি আলো দেয়াল থেকে খুলে নিল। সেই আলো নিয়ে সে ছুটতে-ছুটতে রাজপ্রাসাদের বাগানে ঢুকে পড়ল। রাজার সাঙ্গোপাঙ্গরাও তার পেছনে-পেছনে তাকে ধাওয়া করল।

সেই রাতের অন্ধকার-জড়ানো রাজপ্রাসাদের বাগানটাকে এখন যেন চেনাই যায় না। শব্দ নেই, কোথাও, কোনো দিকে। পথ আছে গাছের আড়ালে-আড়ালে। দেখা যায় না। মাঝে-মাঝে একটি-দুটি পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ গাছের ডালে শোনা যায়। ঝিঁঝিঁর শব্দ শুনে-শুনে এমনই সয়ে গেছে, সে-শব্দ যেন আর কানে ঢোকে না। কিন্তু এই বৃদ্ধমানুষ উজ্জু রাজকন্যা আলা-ইজাকে সন্ধান করতে এই বাগনে ঢুকে 'আলা-ইজা' বলে হাঁক দিতেই অনেক পাখির যেন একসঙ্গে চমক ভাঙল। একসঙ্গে অনেক পাখি অন্ধকারে ডানা ঝাপটিয়ে এ-ডাল ও-ডাল ওড়াউড়ি করতে লাগল প্রাণের ভয়ে। কিন্তু উজ্জু সাড়া পেল না রাজকন্যার। দেয়ালগিরির রোশনাই ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে যতটুকু, তার চেয়ে অনেক বেশি ছায়া অন্ধকারকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। কে জানে কোথাও সাপ আছে কি না ঘাপটি মেরে লুকিয়ে। কিংবা কোনো বিষাক্ত কীট! সেসব ভয় এখন উজ্জুর মনে এতটুকুও আঁচ ফেলতে পারেনি। সে জানে, এই বাগানে বন্দি আছে সেই ছোট্ট হরিণ। আলা-ইজার বন্ধু। আলা-ইজা আর কোথাও যাবে না। নিশ্চয়ই সে এই বাগানেই আছে। তার বন্ধুর কাছে। তাই বৃদ্ধ উজ্জু আবার ডাক দিল, 'রাজকন্যা-আ-!'

অনেক শুকনো পাতা পড়ে আছে এদিকে-ওদিকে। পা পড়ে যায় বৃদ্ধ উজ্জুর সেই পাতার ওপর। শব্দ ওঠে। কিন্তু রাজকন্যার সাড়া পায় না। গাছের ফাঁকে-ফাঁকে আলোর ঝিলিমিলি তার হাতের দেয়ালগিরির শিখা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে। সেই ঝিলিমিলির ওপর পা ফেলে-ফেলে বৃদ্ধমানুষটা ঘুরপাক খায়! কিন্তু দেখতে পায় না কাউকে। না দেখে আলা-ইজাকে, না তার হরিণ। ওই মস্ত বাগানটা চষে ফেলল সে। ও-প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। ডাকতে-ডাকতে গলা ভেঙে গেল তার। বুকের ভেতরটা কাঁপতে লাগল। দেয়ালগিরির শিখাটাও এখন কাঁপছে। কাঁপছে গাছের ছায়া। ডালপালা। বুঝি কাঁপছে ক্লান্তিতে বৃদ্ধমানুষটার পা দুটোও। তবু সে হাল ছাড়ে না। চোখের দৃষ্টিকে সে বারবার মুছে নেয়। পা-দুটোকে শক্ত করে কখনও দাঁড়ায় সে। একটু জিরিয়ে নেয়। তারপর আবার চুপিসারে উঁকি মারে এই গাছের আড়াল থেকে আর-এক গাছে। তারপর? তারপর আচমকা ফুস করে নিভে গেল হাতের দেয়ালগিরি! জমাট অন্ধকারে আবার ঢাকা পড়ে গেল রাজপ্রাসাদের বাগান। সেইসঙ্গে বৃদ্ধ উজ্জুও।

অন্ধকার। সে যে কী ভয়ঙ্কর অন্ধকার, তখন একমাত্র বৃদ্ধ উজ্জু ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়। বেচারা উজ্জু তখন কী করবে বলো! কোনদিকে যে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তাটা, তা-ও সে তখন ঠাহর করতে পারছিল না। পারা সম্ভবও নয়। কেননা, যত বড়ো সেই বাগান, তার চেয়েও অনেক বড়ো একটা চশমা তার চোখে। আলোটা নিভে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সেই চশমাটাও অকেজো হয়ে তার নাকের ডগায় ঝুলছে। বিপদ যে এমন করে তার পিছু নেবে, এ-কথা কি একবারও ভাবতে পেরেছিল উজ্জু! কে জানত, রাজকন্যা আলা-ইজাকে একা, ঘরে, অমন করে ঘুম পাড়িয়ে রাজার কাছে ছুটে যাওয়াটা তখন ঠিক হয়নি! সে জানে, এবার রাজার হাতে তাকে মরতে হবে। মরতে তার আপত্তি নেই। বয়েসটা তার এমন কিছু কম নয় যে, মরলে সবাই হা-হুতাশ করবে। কিন্তু তার ভালোবাসার ওই ছোট্ট আলা-ইজার যদি সত্যিই কোনো বিপদ হয়ে থাকে, তবে যে সে-বিপদ তারই জন্যে, এই গঞ্জনা মাথায় নিয়ে তাকে মরতে হবে যে!

কিন্তু এখন! এই অন্ধকারে সে কী করবে! পা তখন যাও-বা হাঁটছিল, এখন মনে হচ্ছে, তা-ও বুঝি অচল হয়ে গেছে। সে আর পারছে না। সারা বাগান জুড়ে ঝিঁঝিঁ ডাকার সেই শব্দটা এখন মনে হচ্ছে কান ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। সে কানে হাতচাপা দিল। তারপর টলতে-টলতে সেই অন্ধকার হাতড়ে পথ খুঁজতে লাগল। সে বুঝতে পারল কাঁটাগাছে পা কাটছে। মাথা ঠুকছে। গলার স্বর ভেঙে শব্দ হারিয়ে গেছে। এমনকী, বুকের ধুকধুকিটাও যেন আস্তে-আস্তে থেমে আসছে। এমন সময়ে সে হোঁচট খেল। আচমকা। মানুষটা পড়ে গেল গাছের গায়ে ধাক্কা খেয়ে। লাগল। হয়তো-বা কাটল। কিন্তু সে আর উঠতে পারল না। বাগানের সেই শুকনো পাতার ওপর, না কি মাটির শুকনো ঢেলার ওপর সে শুয়ে রইল, সে বোঝার জ্ঞান আর তখন তার নেই। এখন ঝিঁঝিঁর ডাকটা বন্ধ হলে সে একটু ঘুমোতে পারে।

না, ঘুমোতে তাকে হল না। রাজার সাঙ্গোপাঙ্গরা ততক্ষণে আলোর মশাল জ্বেলে ঢুকে পড়েছে রাজপ্রাসাদের সেই বাগানে। উজ্জুকে খুঁজে বের করতে তাদের বেশি সময় লাগল না। মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মানুষটাকে টেনে-হিঁচড়ে তারা দাঁড় করাল। তারপর টানতে-টানতে বাগান থেকে বৃদ্ধ উজ্জুকে তারা বের করে আনল রাজার সামনে।

রাজা দেখলেন না তার পা কেটেছে। জামা ছিঁড়েছে। দেখলেন না মানুষটা আর নিশ্বাস ফেলতে পারছে না। ধুঁকছে। আধখানা প্রাণ বুকে নিয়ে সে টলছে। রাজা হুকুম করলেন, 'লোকটাকে বন্দি করো। কয়েদখানায় পুরে রাখো!'

উজ্জু নামে মানুষটার তখন আর কথা বলার ক্ষমতা নেই। রাজার মুখের দিকে চেয়ে যে সে দেখবে, সেই শক্তিও তার শেষ হয়ে গেছে। মনে-মনে সে ভাবল, তার মৃত্যুর ঘন্টা বেজে উঠেছে। এবার তাকে মরতে হবে।

উজ্জুকে আটক করা হল কয়েদখানায়। অন্ধকার এখানেও। এটা এমন কিছু আশ্চর্যের নয়। কয়েদখানা আলোর রোশনাইয়ে ঝলমল করবে, এমনটা ভাবাই মিথ্যে। সুতরাং সেই অন্ধকারেই উজ্জুকে পড়ে-পড়ে সময় গুনতে হবে। অবশ্য কখন যে তার গর্দান যাবে, সে একমাত্র রাজা ছাড়া আর কেউ জানে না। গর্দান যখন যায়, যাবে, কিন্তু এই যে বৃদ্ধমানুষটা অন্ধকারে হাঁপাচ্ছে, কে তার মুখে একফোঁটা জল দেবে! মরা, সে তবু ভালো। কিন্তু যে-মানুষটা অন্ধকার কয়েদখানায় মরার আগে যন্ত্রণায় ছটফট করছে, এখন কেউ তাকে দেখবার নেই। অথচ বলো, তার তো কোনো দোষ নেই। সে তো রাজামশাইকে কোনো কিছু গোপন করতে চায়নি। বরং রাজকন্যা আলা-ইজার খবরটাই রাজামশাইকে দিতে এসেছিল। কিন্তু তাকে শেষমেশ যে এমন এক দুর্বিপাকে ফেলে রাজকন্যা অদৃশ্য হয়ে যাবে, সেটা কেমন করে জানবে বৃদ্ধ উজ্জু!

সে যাই হোক, খানিক পরেই উজ্জু বুঝতে পারল, সে দম ফেলতে পারছে। কষ্টটা অনেকটা সামলাতে পেরেছে সে। তবে তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসছে মাঝে-মাঝে। কিন্তু সে জানে এখানে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও, তার কথা কারও কানে পৌঁছবে না। এখানে কেউ তাকে দয়া করার জন্যে জলের পাত্র হাতে নিয়ে ছুটে আসবে না। এখানে কয়েদিকে যে দয়া দেখায় তার কপাল যে কখন ফাটবে, সে-কথা রাজামশাই ছাড়া আর কেউ জানে না। তবে নির্ঘাত মরণ থেকে তার নিস্তার নেই।

এখন একটু উঠে বসবার ইচ্ছে হল উজ্জুর। হ্যাঁ, তার মনে হল, সে বসতে পারবে। কয়েদখানার অন্ধকারে নিজের হাতদুটোকে নিজের চোখে দেখতে না-পেলেও, হাতদুটো নাড়াতে তার তো কোনও অসুবিধে নেই। সে দু-হাতে চাপ দিয়ে উঠে বসল। মাথাটা অবশ্য একটু ঝিমঝিম করে উঠল। তার বেশি আর-কিছু নয়। ইচ্ছে করল, উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়াল সে। পা দুটো টলমল করছে। অন্ধকারে সে বুঝতে পারল কয়েদখানার গরাদে-আঁটা ফটকটা তার চোখের সামনেই দেখা যাচ্ছে। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে ফটকের গরাদ ধরে ফেলল। আসলে ফটকের গরাদে মাথা ঠেকিয়ে একটু ঠান্ডা হাওয়ায় কষ্টটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল সে। কিন্তু এ কী! গরাদে-আঁটা ফটকটা কেমন যেন নড়ে উঠল! খোলা নাকি? টান দিল উজ্জু। সত্যিই তো ফটক খুলে গেল! এ কী কাণ্ড! কাছেপিঠে কাউকে তো দেখাও যাচ্ছে না। কেউ থাকলেও অবশ্য দেখা যাবে না। কারণ, এখন রাত বেড়েছে। রাতের সঙ্গে অন্ধকারও ঘন হয়েছে। কী মনে হল উজ্জুর, ফটক ডিঙিয়ে কয়েক পা বেরিয়ে এল সে। এধার-ওধার দেখার চেষ্টা করল। হয়তো কিছু দেখতে পেত। কিন্তু কখন যে তার চোখ থেকে চশমটা খুলে পড়ে গেছে, সে খেয়াল করতে পারছে না। সে যাক, দেখা কিছু না-গেলেও ক্ষতি নেই, সে জানে কোন রাস্তা দিয়ে হাঁটলে সে পালাতে পারে। কেননা, এই কয়েদখানার পাশ দিয়ে সে কতবার যে যাতায়াত করেছে তার হিসেব করা যায় না। সুতরাং আন্দাজে রাস্তাটা সে ঠিকই ঠাহর করতে পারবে। কাজেই পালাতে যদি হয় এখনই পালাতে হবে। এই অন্ধকারে। অন্ধকারই তো এখন উজ্জুর সবচেয়ে বড়ো বন্ধু। এমন বন্ধু বুঝি আর হয় না!

কিন্তু?

কিন্তু দু-পা ফটকের বাইরে বের করে অন্ধকার রাতটাকে সে যেন কয়েক মুহূর্তের জন্যে চোখ মেলে দেখবার চেষ্টা করল। আকাশটা এত তারার আলো বুকে নিয়ে কেমন করে চুপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকে! আকাশের কি ইচ্ছে করে না, ওই তারার আলোর ফুলকিগুলি এদিক-ওদিক দুলিয়ে-দুলিয়ে নাচায়! উজ্জু যখন ছোট্ট ছিল, মানে, যখন আলা-ইজার মতো অমনই ছোট্ট ছিল, তখন আকাশ দেখলেই ওর দুলতে ইচ্ছে করত। উজ্জু ভাবত ও নিজে দুললে বোধ হয় আকাশও তারাগুলোকে নাচাবে। কিন্তু নাচায় না। শুধু এক-একটা তারা মাঝে-মাঝে চোখ মটকে উজ্জুর সঙ্গে তামাশা করে। কী দুষ্টু! দূর থেকে সবাই তামাশা করতে পারে। এমনকী, ভেংচিও কাটতে পারে। কাছে এসে একবার দেখুক না!

উজ্জুর এসব ভাবনা, সেই কবেকার! ও তো আর তখন জানত না, আকাশের একটা তারা, আকাশ থেকে ভাসতে-ভাসতে যদি পৃথিবীর বুকে লাফিয়ে নেমে আসে, তবে পৃথিবীটাই হয়তো টুকরো-টুকরো হয়ে ছিটকে পড়বে! কোথায়? সেটা অবশ্য কেউ জানে না।

আচ্ছা, আজ কেন হঠাৎ কয়েদের ফটক থেকে চুপিসারে বেরিয়ে এসে তার এসব কথা মনে হচ্ছে? কেন মনে পড়ছে সেই ছেলেবেলার এই আজগুবি কথাগুলো। আজগুবি! তবে কি আলা-ইজার ওই ছোট্ট হরিণের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে খেলা করাটাও আজগুবি! হরিণের প্রাণ বাঁচাবার জন্যে আলা-ইজার এত যে কান্না, তবে কি সেটাও মিথ্যে, আজগুবি!

আশ্চর্য, ফটকটা অমন খোলা পেয়েও উজ্জু পালাল না! আবার ঢুকে পড়ল কয়েদের ভেতরে। আবার সে বসে পড়ল নোংরা ধুলো-ভর্তি কয়েদের মেঝের ওপর। তবে কি উজ্জু মরতেই চায়! এমন বোকা মানুষ কেউ দেখেছে কোথাও, কখনও! বাঁচবার এমন মস্ত সুযোগ হাতছাড়া কেউ করে?

না, পালাবে না উজ্জু। সে তো চোর নয়! সে তো কোনো অন্যায় করেনি। এই কয়েদের খোলা ফটকের দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে সে চুপচাপ বসে রইল। হাসি পেল তার। মনে-মনে ভাবল, কী বেকুব রাজামশাইয়ের লোকগুলো। আসামিকে কয়েদখানায় ভরল, অথচ ফটকে যে তালা পড়ল না সেটা তাদের খেয়ালই হল না! ফটকটা খোলাই থাক। অমনই হাট করে খোলা থাক! উজ্জু তো পালাবার জন্যে জন্মায়নি। রাজামশাইকে সে কোনোদিন ফাঁকি দেয়নি, আজও দেবে না। মরবার তো বয়েস তার হয়েই গেছে। এই বয়েসে সে কোন ভালো কাজে লাগবে মানুষের? বরং সে মরলে পৃথিবীতে আর-একজন নতুন মানুষের জায়গা হবে। তার কাজ তো শেষ হয়েই গেছে। তবে পৃথিবীর ভার বাড়ানো কেন?

কে বলেছে উজ্জু ভার বাড়িয়েছে! কে বলেছে উজ্জুর কাজ শেষ হয়ে গেছে! শেষ হয়নি উজ্জুর কাজ। এখনও শেষ হয়নি উজ্জুর মতো মানুষের দিন। চারটে হাত-পা থাকলেই তো আর মানুষ হয় না। কিংবা যদি থাকে ঘাড়ের ওপর একটা মস্ত মাথা, তবে, তাকেও কি মানুষ বলব! বুকে হাত দিয়ে দ্যাখো! বুঝতে পারছ, ওটাই আমাদের প্রাণকে বাঁচিয়ে রেখে, দিনরাত ধুকপুক করে আমাদেরই অজান্তে কেমন দুলে চলেছে! বুকের এই দোলন যেদিন থেমে যাবে সেদিন আমাদেরও কাজের শেষ হবে। কিন্তু বুকের ওই প্রাণের মধ্যে যদি মায়া-মমতা আর ভালোবাসা ভরিয়ে দিতে পারি, তবে কে বলবে আমরা ভার বাড়াচ্ছি! সেদিন একটি বৃদ্ধ মানুষও কেমন সুন্দর হয়ে ওঠে! এমন সুন্দর যতই দেখি, ততই মনে হয় পৃথিবীও কী সুন্দর! হ্যাঁ, সত্যিই তাই। উজ্জুকে দেখলে তোমারও তা মনে হবে। মনে হবে, উজ্জু বেঁচে থাকুক তোমার-আমার জন্যে। বেঁচে থাকুক আলা-ইজার জন্যে। কেননা, উজ্জু যেমন ভালোবাসতে জানে, তেমন আলা-ইজারও যে প্রাণভর্তি মমতা উছলে পড়ে। নইলে, একটি ছোট্ট হরিণের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে তার প্রাণ কেন কাঁদে! বুঝি-বা সে হারিয়ে গেছে ওই তার ছোট্ট হরিণ আমনার প্রাণ বাঁচতে! রাজার মেয়ে যে এমন একটি তুচ্ছ প্রাণীর জন্যে নিজের বিপদকে তুচ্ছ করতে পারে, এই ভেবে উজ্জুর গায়ে কাঁটা দেয়।

কে বলেছে রাজকন্যার ওই ভালোবাসার ছোট্ট হরিণ তুচ্ছ? বনের সবুজে-সবুজে যখন সে ছুটে যায় খেলতে-খেলতে, কিংবা তার মায়ের গায়ে-গায়ে মুখটি ঠেকিয়ে আনন্দে লাফ দেয় প্রজাপতি দেখে, তখন মনে হয়, একটি ছোট্ট হরিণ না-থাকলে, কিংবা ওই প্রজাপতি রঙের বাহার ছড়িয়ে বাতাসে না ভেসে বেড়ালে, পৃথিবী বুঝি এত সুন্দর হত না। তেমনই রাজকন্যা আলা-ইজার মতো একটি ছোট্ট মেয়ে তার অমন সুন্দর বন্ধুর প্রাণ বাঁচাবার জন্যে কাঁদে বলেই না, তার কান্না-ভেজা চোখ দুটি অমন মিষ্টি লাগে! এমন চোখে জল দেখে আমাদেরও চোখ ভিজে যায়! এ-ও যে আরও সুন্দর!

'উজ্জু!' হঠাৎই একটা ছায়া যেন কয়েদের ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল, ডাক দিল।

'কে?' উজ্জু থতমত খেয়ে গেল। এখন রাত কত গভীর, জানে না উজ্জু। কিন্তু রাত যে বেড়েছে, সেটা বুঝতে তার অসুবিধে হওয়ার নয়। এত রাতে কে ডাকে তাকে?

যে ডাকল, সে খোলা ফটকের সামনে দাঁড়াল। তারপর কিছু ভাবল। কয়েদের সিঁড়ি বেয়ে ক-পা উঠতে-উঠতে বলল, 'আমি উজ্জু, আমি।'

'রাজামশাই!' উজ্জুর গলার স্বরটা যেন আপনা থেকেই গলায় আটকে গেল।

'হ্যাঁ, উজ্জু। আমি।' রাজা উত্তর দিলেন।

উজ্জু ব্যস্ত হয়ে উঠল। অস্থির গলায় সে বলল, 'কয়েদের ফটকটা আমি-খুলিনি রাজামশাই।'

'আমি জানি।' ধীর গলায় উত্তর দিলেন রাজা। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কয়েদের ফটক খোলা দেখেও পালালে না কেন? তুমি তো জানো, কাল আমি তোমায় মৃত্যুদণ্ড দেব।'

'পালাব কেন রাজন! আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। আমার রাজামশাইয়ের চোখে আমি নিজেকে এত ছোটো করতে শিখিনি কখনও। আমার মনে হয়েছে, ফটকের তালায় চাবি দিতে ভুল হয়ে গেছে আপনাদের।' উত্তর দিল উজ্জু।

'ভুল নয় উজ্জু,' জবাব দিলেন রাজা। 'আমি ইচ্ছে করেই ফটকের তালায় চাবি লাগাতে বারণ করেছিলুম। আমি দেখতে চেয়েছিলুম, প্রাণের ভয়ে সত্যি তুমি পালাও কি না।'

'হুজুর, আমি জীবনে কখনওই পালাইনি। পালাতে শিখিনি।' আর পালিয়েই বা কী হবে! ক-টা দিনই বা পৃথিবীর বাতাসে আর শ্বাস নেব। দু-দিন আগে আর পরে।' উজ্জু উঠে দাঁড়াল।

'উজ্জু, আমি লুকিয়ে-লুকিয়ে দেখছিলুম তোমাকে। দেখছিলুম, পৃথিবীতে এখনও মানুষ আছে কি না। যে-মানুষ ভয়ে পালায়, তাকে কি মানুষ বলতে পারা যায়!' বলতে-বলতে রাজার গলা নরম হল।

উজ্জু রাজার কথা শুনে মাথা হেঁট করল।

'উজ্জু,' রাজা আবার বললেন, 'আমি নিজেই ভুল করেছি। রাজজ্যোতিষীর কথা যদি সত্যিই হয়, সত্যিই যদি আমার মেয়ের অসুখ করে, তবে একটা ছোট্ট হরিণকে তার মায়ের কাছ থেকে কেড়ে এনে হত্যা করলে, তার যে সে-অসুখ সারতে পারে না, এ আমি বুঝতে পেরেছি। উজ্জু, ছোট্ট হরিণের মাকে কাঁদিয়ে, আমার নিজের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে আজ মেয়ের জন্যে আমাকেই কাঁদতে হচ্ছে। উজ্জু, আমার মেয়ে হারিয়ে গেছে, এ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।' বলতে-বলতে রাজা যেন এক অসহায় মানুষের মতো আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠলেন।

উজ্জু এবার চোখ তুলে রাজার মুখের দিকে তাকাল। অন্ধকারে যতটুকু দেখা যায়, তার চেয়ে আরও একটু ভালো করে দেখবার চেষ্টা করল। তারপর বলল, 'রাজকন্যা আলা-ইজা হারিয়ে যায়নি রাজামশাই। সে তার বন্ধু খুঁজে পেয়েছে। ওই ছোট্ট হরিণটি আলা-ইজার বন্ধু। সে তার বন্ধুর প্রাণ বাঁচানোর জন্যে নিশ্চয়ই তার ছোট্ট হরিণ-বন্ধুকে নিয়ে গভীর বনে তার মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।'

রাজা আঁতকে উঠলেন। ভয়ে তাঁর গলা কেঁপে উঠল, 'কী বলছ তুমি উজ্জু!'

'আপনি তো রাজামশাই তন্নতন্ন করে তাকে খুঁজেছেন। কোথাও তো তার দেখা পাননি। এখন ওই গভীর বন ছাড়া সে আর কোথাও যেতে পারে না বলেই আমার মনে হয়।' শান্ত গলায় উত্তর দিল উজ্জু।

'কী ভয়ঙ্কর কথা!' রাজা অস্থির হয়ে উঠলেন।

'আমার আন্দাজ যদি সত্যি হয়, তবে ভয়ঙ্কর তো নিশ্চয়ই!' উত্তর দিল উজ্জু।

'তা হলে তো জ্যোতিষীর কথা ফলতে চলেছে।' আতঙ্কে গলা শুকিয়ে এলো রাজার।

উজ্জু বলল, 'আপনি অত উতলা হবেন না রাজামশাই।'

রাজা উত্তর দিলেন, 'সে আমার মেয়ে। আমার মেয়ে এই অন্ধকার রাতে বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমি উতলা না হয়ে চুপচাপ বসে থাকব, এ কেমন কথা তোমার?'

উজ্জু জবাব দিল, 'এখন তো আর আমরা কিছুই করতে পারি না।'

'কেন পারি না! আমার শক্তি কম কীসে! আমি এখনই ওই বন কেটে ফেলব। আমার কি লোক কম আছে?' এবার দম্ভে যেন রাজার গলা গর্জে উঠল।

উজ্জু তেমনই সহজ, শান্ত গলায় বলে গেল, 'আমি জানি না আপনার এই সিদ্ধান্ত কতখানি ঠিক। আজ্ঞে রাজামশাই, এই গভীর বনই তো আমাদের বন্ধু। একটি গাছই তো আমাদের প্রাণ। আর তা ছাড়া এই গভীর বনের অসংখ্য গাছপালা কি কাটা যায়! যদিও-বা যায়, তাতেও কি রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজে পাওয়া যাবে? সে যদি অন্য কোথাও, অন্য দেশে চলে যায়! তবে তো এমন সুন্দর যে বনের সংসার, সে তো ধবংস হবেই, সেইসঙ্গে যে শেষ হয়ে যাবে বনের যত ফুল, যত পাখি, যত পশু—সব। কে বলতে পারে, সেখানে যদি সত্যিই রাজকন্যা আলা-ইজা আশ্রয় নেয়, আশ্রয় নেয় কোনো গাছের ছায়ায়, তবে শেষ হয়ে যাবে তার আশ্রয়ও। হয়তো-বা তাকেও আর আমরা খুঁজে পাব না কোনোদিন।'

উজ্জুর কথা শুনে কেমন যেন থমকে গেলেন রাজা। আমতা-আমতা করে বললেন, 'তা হলে কী করব?'

উজ্জু খানিক চুপ করে রইল রাজার কথা শুনে। হয়তো কিছু ভাবল। তারপর বলল, 'হুজুর যদি সাহস দেন তো একটা উপায় আমি বলতে পারি।'

''কী উপায়? কী উপায়?' ভারি উৎসাহে রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

'আমি নিজে চেষ্টা করতে পারি। চেষ্টা করতে পারি তাকে খুঁজে আনার।' উত্তর দিল উজ্জু।

'তুমি?' রাজা অবাক হলেন। 'তোমার এই বয়েসে সাধ্যে কুলোবে কেন?'

'রাজামশাই, সময় আমার এখনও ফুরোয়নি। যেদিন ফুরিয়ে যাওয়ার সময় আসবে, সেদিন আমায় কেউ আটকাতে পারবে না। মরতেই হবে। কিন্তু রাজামশাই, আমার মরবার আগে জ্যোতিষমশাইয়ের গণনাটা যে ঠিক নয়, এটা যদি প্রমাণ করে যেতে পারি, তবে বোধ হয় আমাদের রাজ্যের অনেক উপকার হয়। একটি নিরীহ হরিণশিশুর জীবন না নিয়ে, যদি আলা-ইজা নামের এক রাজকন্যার সঙ্গে সেই ছোট্ট হরিণের বন্ধুত্ব হয়, যদি একটি ছোট্ট হরিণের পিছু ছুটতে-ছুটতে এক ছোট্ট রাজকন্যা খেলা করে, খেলতে-খেলতে হাসিতে-খুশিতে যদি লুটোপুটি খায়, তবে কি রাজামশাই আনন্দে আপনারও বুকের ভেতরটা দুলে উঠবে না? সেই ছোট্ট হরিণটিকে হত্যা করার জন্যে আপনি কি হাতে অস্ত্র তুলে নেবেন?'

'না-আ-আ-আ!' আচমকা এমন চিৎকার করে উঠলেন রাজা যে, বৃদ্ধ উজ্জুরই বুকের ভেতরটা ধড়াস করে চমকে উঠল। তখনই রাজার যেন মনে হল, অসাবধানে কিছু একটা করে ফেলেছেন, তাই কেমন যেন মুখ কাঁচুমাচু করে উজ্জুর মুখের দিকে তাকাবার চেষ্টা করলেন। অবশ্য অন্ধকারে কেউই কারও মুখ স্পষ্ট দেখতে পেল না। তবে বোঝা গেল, উজ্জু যেমন রাজার এই হঠাৎ-চিৎকারে অবাক হয়েছে, তেমনই রাজাও আচমকা চিৎকার করে লজ্জায় পড়ে গেছেন। কিন্তু কতক্ষণ আর অন্ধকার কয়েদের মধ্যে চুপ করে থাকতে পারেন রাজা! কতক্ষণ আর লজ্জাটাকে লুকিয়ে রাখতে পারেন অন্ধকারে! তাই খুবই আফসোসের সুরে রাজা বললেন, 'আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি উজ্জু। আমি একটু চিৎকার করে ফেলেছি। তুমি বিশ্বাস করো, আমি তোমার ওপর রাগ করে চিৎকার করিনি। আমি বলতে চেয়েছি, আর নয়, আর আমি কোনোদিনও হরিণ-শিশুর সঙ্গে খেলা করতে বারণ করব না আমার মেয়েকে। তুমি বিশ্বাস করো, আমি তার জন্যে হরিণের উদ্যান গড়ে দেব। সেখানে হরিণ আসবে অগুনতি। গাছের ডালে-ডালে পাখি ডাকবে অসংখ্য। ফুলে-ফুলে প্রজাপতি উড়বে দলে-দলে। আর আমার মেয়ে আলা-ইজা তাদের সঙ্গে খেলতে-খেলতে হাসবে, গান গাইবে। নাচবে। আমরা আড়াল থেকে দেখব। আমি আর রাজরানি। সে কী মজার হবে বলো!'

উজ্জু বলল, 'হ্যাঁ রাজামশাই, সত্যিই সে খুব মজার হবে। কিন্তু…'

'তোমার সন্দেহ কীসের?' জিজ্ঞেস করলেন রাজা।

'যদি রাজজ্যোতিষী আপত্তি করেন?'

'আমি মানব না।' উত্তর দিলেন রাজা।

'রাজজ্যোতিষীই যদি আপনাকে অমান্য করেন?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'তেমন সাহস যদি তাঁর হয়, তবে তাঁকে শাসনের নিয়ম মানতে বাধ্য করা হবে। তখনও তিনি যদি তা না মানেন, তবে, তাঁর শাস্তি হবে।' উত্তর দিলেন রাজা।

'কী শাস্তি দেবেন?'

'রাজাকে অমান্য করলে যে শাস্তি সবাই পায়। মৃত্যুদণ্ড।'

'আবার বোধ হয় ভুল করলেন রাজামশাই।' শান্ত গলায় উত্তর দিল উজ্জু।

'কেন?' ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন রাজা।

'একজন মানুষকে মেরে ফেললে তো সবই শেষ হয়ে গেল। রাজামশাই, প্রাণ তো ইচ্ছে করলেই আপনি নিতে পারেন। কিন্তু তাতে লাভ কী? রাজার শাস্তি কি শুধুই প্রাণ নেওয়া? একটি হরিণ-শিশুর প্রাণ নিতে গিয়ে, আপনি যে আজ নিজেই আপনার নিজেরই শিশুকন্যার জন্যে কী ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে পড়েছেন, তা কি এরই মধ্যে ভুলে গেলেন?'

রাজা অস্থির হয়ে অন্ধকারে উজ্জুর হাতটি ধরার জন্যে নিজের হাত বাড়িয়ে উজ্জুর হাত খুঁজতে লাগলেন। খুঁজতে-খুঁজতে ব্যস্ত গলায় বলে উঠলেন, 'উজ্জু, তুমি ঠিকই বলেছ। তোমার হাতটা আমায় ধরতে দাও! তুমি কোথায়? তুমিই আমার সত্যিকারের বন্ধু!'

অন্ধকারে উজ্জুও তার হাত বাড়িয়ে দিল। অন্ধকার কয়েদখানায় আবছা-আবছা দুটি মূর্তি দু-জনের কাছাকাছি এগিয়ে এল। তারপর দু-জনেই দু-জনের হাত ধরে ফেলল। একটা অদ্ভুত শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রাজা। বোধ হয় তাঁর মনে হল, পৃথিবী ঢুঁড়ে এমন বন্ধু আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাজা যেন জয়ের আনন্দে হাঁপাচ্ছেন। তেমনই হাঁপাতে-হাঁপাতে রাজা বললেন, 'চলো উজ্জু, আমরা এই অন্ধকার কয়েদখানা থেকে বাইরে যাই।' বলতে-বলতে রাজা বৃদ্ধমানুষটার হাত শক্ত করে ধরে, কয়েদের খোলা ফটক ডিঙিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।

রাত যে অনেক গভীর হয়েছে, সে তো দূর আকাশের চেহারা আর বাতাসের গা-শিরশির ভাব দেখলেই বোঝা যায়। চেপে ধরলেন রাজা উজ্জুর পুরুষ্টু হাতটা। মনে হল তাঁর, এ-হাত আর কোনোদিনই ছাড়বেন না। কেননা, বাইরে বেরিয়ে, ওই আকাশের দিকে চেয়েই তাঁর মেয়ের মুখখানি স্পষ্ট মনে পড়ে গেল। মনে হল, আহা রে! সারা আকাশটাই যদি একটা মস্ত আয়না হত? তা হলে হয়তো তাঁর হারিয়ে-যাওয়া মেয়ের সন্ধান পেয়ে যেতেন ওই আয়নার ছায়ায়। কিন্তু যা নয়, তা ভেবে মনকে আর কত কষ্ট দেবেন রাজা! তাই বন্ধুরা যেমন করে বন্ধুদের বলে, তেমনই করে রাজা উজ্জুকে বললেন, 'চলো উজ্জু, আমরা দু-জনেই ওই বনের মধ্যে আলা-ইজাকে খুঁজতে যাই।'

উজ্জু রাজার কথা শুনে কেমন যেন থমকে গেল। তারপর অবাক স্বরে বলল, 'এ কী বলছেন আপনি? রাজা তাঁর রাজকাজ ছেড়ে যদি নিজের হারানো মেয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন, তবে যে রাজ্যে অনাসৃষ্টি হতে পারে, এ-কথা কি আপনি ভাবছেন না? রাজকন্যা আলা-ইজা কোথায় গেছে, আমরা কেউই জানি না। সে বনেও যেতে পারে, বা অন্য কোথাও। তাকে সহজেই খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, আবার খুঁজে পাওয়া সহজ নাও হতে পারে। সে যদি বনে যায়, তবে নির্ঘাত কষ্টসাধ্য খুঁজে পাওয়া। আপনি অবশ্য একটি কাজ করতে পারেন, আমি বনে-বনে যখন সন্ধান করব, আপনি তখন শহর-রাজধানীতে তার খোঁজে আপনার গুপ্তচরদের কাজে লাগাতে পারেন। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আপনার কখনওই অন্য কোথাও রাজকন্যার সন্ধানে যাওয়া ঠিক হবে না। তখন কে বলতে পারে, ওই রাজজ্যোতিষীই হয়তো রটিয়ে দেবেন, আপনার মৃত্যু হয়েছে। তখন জ্যোতিষমশাই নিজেই হয়তো সিংহাসনটা দখল করে ফরমান জারি করে দেবেন, 'রাজার মৃত্যু হয়েছে। এখন এই রাজ্যের অধীশ্বর আমি। কেননা, রাজ্যের ভালো-মন্দের বিচার করার ক্ষমতা আমার হাতে। আমার প্রজাদের ভাগ্য ফেরাবার কবজ-তাবিজ আমিই দিতে পারি। সুতরাং আমাকে তোমরা রাজা বলে স্বীকার করে নাও। আমার জয়ধবনি করো। ভাবুন তো, তখন রানিমার কী অবস্থা হবে!'

এবার রাজা বৃদ্ধ উজ্জুকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, 'ঠিক বলেছ, ঠিক বলেছ উজ্জু। এতদিন আমি কেন আমার পাশে-পাশে তোমাকে রাখিনি! এতদিন আমি কেন তোমার কথা শুনে রাজকাজ চালাইনি! তা হলে বোধ হয় আমার আলা-ইজাকে আমি এমন করে হারাতুম না! তাই হোক উজ্জু, তুমি তোমার ইচ্ছেমতো বনেই যাও! আমি সন্ধান করি শহরের আনাচে-কানাচে। এমনও তো হতে পারে, রাজকন্যা আলা-ইজা যখন তোমার ঘরে ঘুমোচ্ছিল, আর তুমি তার খবর আমাকে দিতে এলে, তখন কেউ তাকে হরণ করেছে!'

'হতে পারে রাজামশাই।' উত্তর দিল উজ্জু। তারপর আবার বলল, 'তা যদি হয়, তবে সেই দুশমন এখনও নিশ্চয়ই শহরেরই কোথাও-না-কোথাও আছে। আর সে যদি বনে লুকিয়ে থাকে, তবে তো আমি আছি।'

রাজা যেন খানিক হকচকিয়ে গেলেন উজ্জুর কথা শুনে। নিমেষে সামলে নিয়ে বললেন, 'তেমন যদি কিছু ঘটে, কেউ যদি বনের গভীরেই আমার মেয়েকে নিয়ে পালায়, তবে, তুমি তার সঙ্গে পারবে কী করে? তা-ও যদি তোমার সঙ্গে অস্ত্র থাকত!'

'অস্ত্রের দরকার নেই রাজামশাই, এই বৃদ্ধের হাতদুটোই যথেষ্ট। দুশমনদের হাতে নিজে মরার আগে একটা-দুটোকে ঘায়েল করার মতো গায়ের তাকত আমার আছে।' বলতে-বলতে যেন বুকটা ফুলে উঠল উজ্জুর। গলার স্বরটা একটা শিকার-খোঁজা বাঘের মতো গর্জন করে উঠল। সেই স্বর শুনে রাজার নিজেরই বুকটা হয়তো কেঁপে ওঠে। রাজা আর কথা বাড়ান না। বিদায় জানালেন উজ্জুকে। যাওয়ার সময় দুটো যে পয়সা গুঁজে দেবেন উজ্জুর হাতে, তেমন সাহসও হল না। উজ্জু বনের উদ্দেশ্যে সেই গভীর রাতেই পা বাড়াল। খানিক হাঁটলেন রাজা তার সঙ্গে। খানিক হেঁটে দাঁড়ালেন। তারপর রাজা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন, একটা ছায়ার মতো অস্পষ্ট হয়ে ধীরে-ধীরে সেই রাতের আঁধারেই উজ্জু হারিয়ে গেল। রাজা ফিরে গেলেন তাঁর প্রাসাদে।

বোধ হয় ভোর হতে আর বেশি দেরি ছিল না। যদিও কয়েদের মধ্যে একফোঁটাও ঘুম উজ্জুর চোখের পাতা ছুঁতে পারেনি, তবু একনাগাড়ে কতক্ষণ আর একটা বৃদ্ধমানুষ জেগে থাকতে পারে। কিন্তু আশ্চর্য কথা, রাজার কাছে বিদায় নিয়ে সে যখন ধীরে-ধীরে বনের ভেতর প্রথম পা দিল, তখনও পর্যন্ত যেমন তার ঘুমও ছিল না চোখেতে, তেমনই এক কণা ভয়ও ছিল না মনেতে। কিন্তু ভোরের প্রথম আলো ঘন বনের বাধা ডিঙিয়ে যখন এদিকে-ওদিকে উঁকি দিতে শুরু করল, তখনই কেমন যেন ধাঁধা লেগে গেল উজ্জুর। কেননা, এতক্ষণ তার মনে হচ্ছিল যে, বোধ হয় অন্ধকার ভেঙে ঠিক লক্ষ্যের দিকেই চলেছে। কিন্তু আলো দেখে তার মুখখানা কালো হয়ে গেল। বনে যে সে কতবার এসেছে, তা হাতে গোনা যায় না। উজ্জুর বাবা যখন ছিলেন, সেই তখন থেকে বন তার চেনা। কিন্তু এখন সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, এ-বন কিন্তু তার সেই চেনা বন নয়। এই মস্ত বনের সবটা যে তার চেনা হবে, এমন কথা ভাবাও বোকামি। তবে এ-বোকামি তাকে হয়তো করতে হত না, যদি উজ্জু অন্ধকার রাতেই সাতপাঁচ না ভেবে ঢুকে পড়ত বনের ভেতর। আর রাজাকেও বলি, তুমিও তো লোকটাকে বারণ করবে! রাতটাকে কাটতে দাও না! তারপর খোঁজাখুঁজি করলে কী এমন ক্ষতি হত? যা হওয়ার সে তো হয়েই গেছে। এখন অত তড়বড় করলেই কি আলা-ইজা চোখের পলকে তোমার চোখের সমানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করবে, 'এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছ বাবা?' অত সহজ নয়।

থাক সে-কথা। কিন্তু এখন উজ্জু কী করবে শুনি? কোথায় যাবে রাজকন্যাকে খুঁজতে? উজ্জুর মতো এমন বুদ্ধিমান লোকের এখন কী অবস্থা!

একটা মানুষের পেটে যদি অনেকক্ষণ থেকে একটি দানাও না-পড়ে, কিংবা সেই মানুষটিকে যদি সারারাত জেগে-জেগে বনবাদাড়ে রাজকন্যা আলা-ইজার মতো একটি ছোট্ট মেয়েকে খুঁজে-খুঁজে চিৎকার করতে হয়, তবে মানুষটার শরীরের হাল যে কী হতে পারে, সে-কথা খুলে না-বললেও কে না বোঝে! তার ওপর সে যদি উজ্জুর মতো বৃদ্ধমানুষ হয়, তবে তো আর কথাই নেই। ভাগ্য ভালো যে, তাকে সাপে কাটেনি। কিংবা বুনো-কুকুরে তাড়া করেনি। সে ভয়টা যে এখনও নেই, তা যেন ভেবে বোসো না। কারণ, উজ্জু এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সাপ আর বুনো-কুকুর তো কোন ছার, বাঘ-ভাল্লুকও থাকতে পারে! কিন্তু থাকলেই বা কী করা যাবে! আর যে পা চলে না উজ্জুর। শরীর বয় না। মনে হয়, এখানেই একটু গাছের গায়ে ঠেসান দিয়ে জিরিয়ে নিলে ভালো হয়। অবশ্য চোখের সামনে আঙুরগাছে থোকা-থোকা আঙুর ঝুলছে। কাজেই একেবারে উপোস করেও থাকতে হবে না। খালি পেটে যা হোক একটু রসদ তো পড়বে!

সত্যি-সত্যিই এগিয়ে গেল উজ্জু ওই গাছটার নীচে। রস-টুসটুস একথোকা আঙুর পেড়ে নিল। তারপর দেখেশুনে একটা গাছের নীচে বসে পড়ল। আঃ! পা দুটো যেন তার রেহাই পেল এতক্ষণে। তারপর আঙুলের থোকা থেকে একটি-একটি আঙুর মুখে পুরে একটানা অনেকক্ষণের উপোসটা ভেঙে ভাবতে লাগল, না-জানি এই বনের কোলেই তাকে শেষ হয়ে যেতে হয়! সত্যিই তো! এ তো আর যেমন-তেমন বন নয়। তুমি যত গভীর ভাবছ, তার চেয়ে আরও গভীর এক অরণ্য। এখানে পথ হারালে, কেউ বলে দেওয়ার নেই পথের নিশানা। এখন তো সেই হালই হয়েছে উজ্জুর। কে তাকে পথের হদিস বলে দেবে! কোনদিকে আছে এই বন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ?

একটি-একটি করে অনেক ক-টি আঙুর খিদের চাপে খেয়ে ফেলল উজ্জু। আর ভালো লাগছে না। একসঙ্গে এত রসালো আর মিষ্টি ফল খেলে গা গুলিয়ে ওঠে। তাই হাতে তখনও বাকি যে ক-টি আঙুর ছিল, বনের ঝোপে ছুড়ে ফেলে দিল। যাক, তবু ভালো যে খিদেটা খানিক বাগে এসেছে। খিদে মিটলেও গাছের নীচে বসার এই আরাম ছেড়ে এখন আর উঠতে ইচ্ছে করছে না। সে তো বটেই। সারারাত ঘুম নেই চোখে। তাই এখন যদি ঘুমের আবেশে তার চোখ জড়িয়ে আসে, তা হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বলতে-না-বলতেই হাই উঠল উজ্জুর। চোখ দুটোও বুজে গেল। গাছের গায়ে ঠেসান দিয়েই ঘুমিয়ে পড়ল উজ্জু। আর কিচ্ছু জানে না সে। ঘুমটা কেমন যেন একটা অদ্ভুত ঘটনা! ঘুমিয়ে পড়লে মানুষের কোনো ভাবনাও থাকে না, কিছু মনেও পড়ে না। ঘুম মানে শুধু আরাম। অকাতরে ঘুমোলে এই আরামটাও যে কী, তারও খেয়াল থাকে না। অবশ্য যখন ঘুমের ঘোরে আমরা স্বপ্ন দেখি, সে অন্যকথা। কিন্তু এখন উজ্জুকে দেখলে তোমার কিছুতেই মনে হবে না, মানুষটা স্বপ্ন দেখছে। কোনো সাড়ই নেই। ডাকলে হয়তো সাড়া পাবে। কিন্তু তাকে দেখে ভেংচি কাটো, কি মুচকি হাসো, বয়েই গেছে। চোখ ঘুমে যেমন বুজে আছে, তেমনই থাকবে। চোখও খুলবে না, মানুষটাও নড়বে না, চড়বে না। তোমার ভেংচি কাটাই সার। কাজেই, কে এমন বোকা আছে যে, ঘুমন্ত মানুষকে ভেংচি কাটে!

কতক্ষণ যে উজ্জু গাছের নীচে এমনই করে ঘুমন্ত অবস্থায় পড়ে ছিল, সে যেমন উজ্জু জানে না, তেমনই আমরাও জানি না। ঘুম যখন ভাঙল তখন রাত, না দিন উজ্জু খেয়ালই করতে পারল না। কেননা, এখন মাথা উঁচিয়ে চোখ মেলে সে আকাশও দেখতে পায় না, আকাশে এখন আলো, না আঁধার, তা-ও জানতে পারে না। এমনকী যে-গাছটার গায়ে ঠেসান দিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সেই গাছটা হাতড়ে-হাতড়ে খুঁজে তারও পাত্তা করতে পারল না। আশ্চর্য তো! তবে কি উজ্জু স্বপ্ন দেখছে! না, উজ্জু এখন এক গভীর অন্ধকারে বন্দি হয়েছে।

উঠে দাঁড়াল উজ্জু। নিজে এখনও ঘুমোচ্ছে, না জেগে আছে সেটা পরখ করার জন্য দু-দুবার সে পা ছুড়ল। হাত ছুড়ল। এমনকী নিজের মাথার চুল টেনে দেখে নিল লাগছে কিনা!

লাগছে বটে।

তবে?

সে কথা বলতে পারছে কি! দেখা যাক তো! উজ্জু গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। প্রতিধবনি উঠল।

এমন তো হওয়ার কথা নয়। এ যেন মনে হয় একটা মস্ত ফাঁকা ঘরের মধ্যে সে এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিল! সে পায়ের তলায় মাটি খুঁজতে লাগল। না, মাটি তো নেই। পায়ে যেন শক্ত পাথর ঠেকছে! উজ্জু খানিকটা সামনে হাঁটল। খানিকটা পিছু ফিরে পা ফেলল। যা ভেবেছে ঠিক তাই। যেদিকেই যাও এখন পায়ে তার শক্ত পাথর-ঢালা মেঝে ছাড়া অন্য আর কিছুই ঠেকছে না। এ তো আচ্ছা আজগুবি কাণ্ড! এখানে উজ্জু এল কেমন করে! এই অন্ধকারে কোথাও যদি একটু আলোর চিহ্ন থাকত, তবে হয়তো খানিকটা তালাশ করতে পারত।

তবে কি উজ্জু ঘুমিয়ে অচেতন হয়ে পড়ে ছিল। অচেতন অবস্থায় গাছের নীচ থেকে এই শক্ত পাথর-আঁটা ঘরের ভেতর গড়িয়ে চলে এসেছে!

কিন্তু বনের ভেতর তখন তো সে কোনোই বাড়ি-ঘর দেখেনি! তবে কি কেউ তাকে তুলে এনেছে এখানে?

তাই-ই বা কেমন করে হবে! তাকে তুলে আনল, অথচ উজ্জু টের পেল না একটুও! তার ঘুম ভাঙল না! এ কখনও হয়!

হঠাৎ উজ্জু চিৎকার করে উঠল, 'কে আছ হে এখানে?'

কোনো সাড়া পেল না উজ্জু। শুধু তার চিৎকারের শব্দটা অনেকখানি জায়গা জুড়ে ঘুরপাক খেতে লাগল। উজ্জু বুঝতে পারল, ঘরটা যেমন-তেমন ছোট্ট নয়। কারও সাড়া যখন নেই, তখন মনে হয়, ঘরেও এখন কেউ নেই। তা হলে এই অন্ধকারে পড়ে-পড়ে চেঁচিয়ে কী লাভ! বরং এখান থেকে বেরোবার পথটা খুঁজে পাওয়া যায় কি না সেইটাই শেষমেশ দেখা যাক।

কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে গেল উজ্জু হঠাৎ। লাগে ধাক্কা, লাগুক! সেই অন্ধকারের ভেতরেই সে আঁকপাক করে পথ খুঁজতে লাগল। কখনও এদিকে ছুটছে সে, কখনও ওদিকে হাঁটছে। কখনও দম নিচ্ছে, কখনও দাঁড়াচ্ছে।

তারপর?

কে যেন হেসে উঠল, 'হা-হা-হা!'

চমকে গেল উজ্জু।

কে হাসল!

ফিরে তাকাল। হাসির প্রতিধবনিটা কোনদিক থেকে এসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, উজ্জু বুঝতেই পারল না। উজ্জু ভয় পেল না। উজ্জু জানে ভয় পাওয়ার বয়েস তার অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। আর তা ছাড়া এখন ভয় পেয়েই বা লাভ কী! হাসিটা যদি কোনো ভয়ঙ্কর শক্তিশালী কারও হয়, তবে তার সঙ্গে মোকাবিলা করাই এখন বাঁচার সহজ পথ। এ ছাড়া এখন আর অন্য কোনো রাস্তা তার জানা নেই। তাই সেই হাসির রেশটা ধীরে-ধীরে অন্ধকার ঘরের বাতাসে মিলিয়ে গেলে সে-ও চিৎকার করে উঠল, 'কে তুমি, হাসছ?'

'আমি।' অন্ধকারের ভেতর থেকে তার গলার আওয়াজ যেন একটা জ্বলন্ত গোলার মতো ছিটকে পড়ল উজ্জুর কানের ভেতর।

'অন্ধকারে অমন ভিতুর মতো লুকিয়ে-লুকিয়ে সাড়া দিলে আমি যদি মনে করি, তোমার গলার আওয়াজেই যত তেজ, গায়ের জোরে তুমি ফক্কা, তবে হয়তো সেটা ভুল বলা হবে না।' উত্তর দিল উজ্জু।

'ওরে বৃদ্ধ, এই বয়সেও তোর দম্ভ তো কম নয় দেখি! জানিস, এখনই আমি যদি ফুঁ দিই, এক ফুঁয়েই তোর মুণ্ডুটা ঘাড় থেকে উপড়ে হাওয়ায় সাঁতার কাটবে!' বলেই সে আবার হেসে উঠল।

এবার উজ্জুর স্পষ্ট মনে হল, তার হাসির সঙ্গে অন্ধকারটাও কাঁপছে। উজ্জু ধমক দিল, 'থামো! তোমার ফুঁয়ে যদি আমার মাথা উপড়ে পড়ে, তবে জেনে রাখো, আমারও ঘুসির জোরটা তোমার চেয়ে নেহাত একটা কম হবে না! এক ঘুসিতেই আমি তোমার ঘাড়টা ভেঙে দিতে পারি?'

অন্ধকারের ভেতর থেকে এবার তার হাসিটা ভীষণ একটা দানবের মতো আওয়াজ তুলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সে হাসতে-হাসতেই বলল, 'ওরে বৃদ্ধ আর বেশি বড়াই করিস না। আমি কে, তুই কি তা জানিস?'

'জানার দরকার মনে করি না। তবে এটুকু বুঝেছি, কাউকে না পেয়ে একটা বৃদ্ধমানুষকে তোমার ডেরায় ধরে এনে, তোমার শক্তির জাঁক দেখাচ্ছ! অথচ আমি তোমার কোনো ক্ষতিই করিনি। তুমি বোধ হয় জানোই না, জীবনে আমি কোনোদিনই কারও ক্ষতি করিনি।' বলতে-বলতে থামল উজ্জু। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'একটা ঘুমন্ত বৃদ্ধমানুষকে চোরের মতো এখানে ধরে আনার কারণটা জানতে পারি কি?'

এবার সেই অন্ধকারের ভেতরে মিশে থাকা অদৃশ্য মানুষের গলার আওয়াজটা আর তেমন তেজি বলে মনে হল না। খানিকটা যেন সহজ হয়ে গেল তার গলার স্বর। তেমনই অনেকটা সভ্যভব্যর মতো সে উত্তর দিল, 'উজ্জু, আমি চোর নই। আমি মৃত্যুদূত। আমি তোমায় নিয়ে যেতে এসেছি। এই অন্ধকার পেরিয়ে তোমাকে আমি নিয়ে যাব পৃথিবী থেকে স্বর্গে। পৃথিবীতে তোমার কাজ শেষ হয়েছে। আমি জানি, তুমি কোনোদিন কারও ক্ষতি করোনি। তাই তোমার জায়গা স্বর্গে।'

উজ্জুর বুঝতে আর বাকি রইল না, অন্ধকারে কে কথা বলছে। তা হলে এরই নাম মৃত্যুদূত! বুঝতে পারল, ওই অন্ধকারের সঙ্গে অন্ধকার হয়ে মৃত্যুদূত তাকে নিতে এসেছে। তার আয়ু ফুরিয়েছে। এবার তার ডাক পড়েছে। তাকে যেতে হবে। যেতে তার আপত্তি নেই। কিন্তু এভাবে, এখানে সে তো মরতে চায় না। সে যে রাজামশাইকে কথা দিয়ে বনের মধ্যে রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। কিন্তু এখনই যদি তাকে যেতে হয়, তবে যে, সে-কাজটা সারা হবে না। রাজামশাই ভাবতে পারেন, উজ্জু বুঝি-বা কথার খেলাপ করে তাঁকে ঠকিয়েছে। কাজেই উজ্জু এবার অন্ধকারে মৃত্যুদূতের উদ্দেশ্যে বলল, 'তা যদি সত্যি হয়, তুমি যদি সত্যিই মৃত্যুদূত হও, তবে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াও! আমি তোমায় দেখতে চাই। তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।'

মৃত্যুদূত উত্তর দিল, 'উজ্জু, আমি তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। আমায় কেউ দেখতে পায় না।'

উজ্জু জবাব দিল, 'তোমায় দেখতে না-পেলে, তোমার সঙ্গে যাব কেমন করে?'

'এই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে তুমি যেদিকেই যাবে, সেইদিকেই তুমি স্বর্গের রাস্তা খুঁজে পাবে।' উত্তর এল মৃত্যুদূতের।

উজ্জু মুহূর্ত চুপ করে রইল।

অন্ধকারের ভেতর থেকে আবার কথা শোনা গেল, 'কী হল তোমার? চুপ করে আছো কেন? ভয় পাচ্ছ?'

'না,' স্পষ্ট গলায় উত্তর দিল উজ্জু। তারপর আবার বলল, 'হে মৃত্যুদূত, মরতে আমার ভয় নেই। কেই-বা চিরদিন বেঁচে থাকে! আমার সময় হয়েছে, তাই তুমি আমায় নিয়ে যেতে এসেছ। কিন্তু একটা কথা কি জিজ্ঞেস করতে পারি তোমাকে?'

'কী কথা?'

'আমি যখন রাজকন্যা আলা-ইজা নামে এক শিশু-কন্যার খোঁজে বনের ভেতর তার সন্ধান করছি, তখনই কেন তুমি আমায় নিয়ে যেতে এলে?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

উত্তর এল, 'তোমার সময় হয়েছে বলে।'

'কিন্তু হে মৃত্যুদূত, রাজকন্যা আলা-ইজাকে যে আমায় খুঁজে বের করতে হবে। আমার বিশ্বাস, গহন বনে আমি যেমন তার খোঁজে এসেছি, তেমনই আলা-ইজা একটি হরিণ-শিশুকে সঙ্গে নিয়ে সেই হরিণ-শিশুর মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। খুঁজতে-খুঁজতে সেও বোধ হয় পথ হারিয়ে ফেলেছে। হে মৃত্যুদূত, রাজজ্যোতিষী বলেছেন, আলা-ইজার এক কঠিন অসুখ হয়েছে। একটি হরিণ-শিশুকে প্রাণে না-মারলে রাজকন্যার অসুখ সারবে না। সেইজন্যে হরিণ-শিশুকে তার মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা হল। কিন্তু হে মৃত্যুদূত, পৃথিবীতে যা সুন্দর, যা সত্যি, তাই-ই ঘটল। এক ছোট্ট রাজকন্যার খেলার সঙ্গী হল সেই ছোট্ট হরিণ-শিশু। তাকে ভালোবাসল রাজকন্যা নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি। কিন্তু যখনই সে জানতে পারল, তার অসুখ সারাবার জন্যে সেই ছোট্ট হরিণ-শিশুর প্রাণ নেওয়া হবে, তখনই রাজকন্যা কেঁদে উঠল, মৃত্যুদূত। কাঁদতে-কাঁদতে আমার কাছে ছুটে এল। আমার ঘরেই ঘুমিয়ে পড়ল সে। রাজকন্যা আলা-ইজা যখন ঘুমে অচেতন, তখনই আমি রাজামশাইয়ের কাছে খবর দিতে গেছি। ফিরে দেখি সে নেই। তার হরিণও নেই। তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাকে পাওয়া গেল না। তাই বনেই তাকে খুঁজতে বেরিয়েছি আমি। খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম যখন, তখনই তুমি আমাকে এই অন্ধকারে নিয়ে এসে আমার স্বর্গে যাওয়ার খবর শোনাচ্ছ। শোনো হে মৃত্যুদূত, তুমি যেন ভেবো না, আমি মরণের কথা শুনে ভয় পেয়েছি। না। আমি যাব তোমার সঙ্গে। তবে যাওয়ার আগে তোমার কাছে আমার একটি প্রার্থনা, রাজামশাইকে আমি যে-কথা দিয়ে এসেছি, সেই কথা রাখার সুযোগ আমায় দাও! মৃত্যুর আগে সেই ছোট্ট মেয়ে আলা-ইজার মুখখানি আমি একটিবারের জন্যে দেখে যেতে চাই। তাকে খুঁজে পেলেই আমি তোমার সঙ্গে এই পৃথিবীতে বাতাসে শেষ নিশ্বাসটি ছড়িয়ে দিয়ে স্বর্গে চলে যাব।' বলতে-বলতে উজ্জুর চোখ দুটো এমন জ্বলজ্বল করতে লাগল, মনে হল, অন্ধকারের কপালে কে যেন দুটি আলোর ফোঁটা সাজিয়ে দিয়েছে।

মৃত্যুদূতের মুখে সঙ্গে-সঙ্গে কোনো উত্তর শুনতে পেল না উজ্জু। তার উত্তর শোনার জন্যে উজ্জু রুদ্ধশ্বাসে সেই ছমছমে অন্ধকারের দিকে কান পেতে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু নিথর হয়ে রইল সেই অন্ধকার।

উজ্জু ব্যস্ত হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, 'হে মৃত্যুদূত, তুমি চুপ করে আছে কেন? আমার প্রার্থনায় তোমার কি সায় নেই?'

এবার শোনা গেল মৃত্যুদূতের কণ্ঠস্বর। সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে মৃত্যুদূতের দরাজ গলা ভেসে এল। সে বলল, 'শোনো উজ্জু, তোমার এ-প্রার্থনা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া খুবই শক্ত। তবু তোমার আকুতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজে বের করার জন্যে আমি তাই তোমাকে তিনদিন সময় দিলাম। কিন্তু শুনে রাখো হে বৃদ্ধ উজ্জু, তোমার সেই প্রিয় রাজকন্যা আলা-ইজা যদিও বনেই আছে, কিন্তু তাকে আর মানুষের মূর্তিতে তুমি দেখতে পাবে না। তার ছোট্ট বন্ধু হরিণ-শিশুটিকে মায়ের কাছে পৌঁছে সে দিতে পেরেছে। কিন্তু বনদেবীর শাপে আজ নিজেই সে একটি হরিণ-শিশু হয়ে বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।'

মৃত্যুদূতের কথা শুনে আঁতকে উঠল উজ্জু, 'না-আ-আ। এ হতে পারে না, কক্ষনো না।'

মৃত্যুদূত উত্তর দিল, 'তবে কি মনে করছ আমি তোমায় মিথ্যে বলছি! শোনো উজ্জু, এ-সত্যি। যেমন সত্যি তুমি, আর তোমার প্রাণ। যেমন সত্যি আমি, আর তোমার মৃত্যু। ঠিক আছে উজ্জু, আমি তোমার আর বেশি সময় নষ্ট করতে চাই না। এবার আমি যাব।'

উজ্জু ব্যস্ত গলায় বলল, 'হে মৃত্যুদূত, তুমি কি আর একটু দাঁড়াবে? তোমাকে আমি কি আর-একটি কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?'

'বলো!'

'রাজকন্যা আলা-ইজা কী এমন অন্যায় কাজ করেছে যে, তাকে বনদেবী শাপ দিয়ে হরিণ করে দিল?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'রাজকন্যা আলা-ইজা কোনো অন্যায় করেনি। অন্যায় করেছে তোমার রাজা, রাজজ্যোতিষী, রাজপুরোহিত সক্কলে। বৃদ্ধ উজ্জু, শুনে রাখো, বনদেবীর সন্তান হল বনের গাছপালা, বনের পশুপাখি, বনের যত ফুল, যত রং, সবই। কিন্তু মানুষ যদি হিংস্র শয়তানের মতো তার সন্তানদের ধবংস করে, ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে, তবে বনদেবীও তো প্রতিশোধ নিতে পারে। রাজকন্যা তার শাপে তাই আজ একটি হরিণ। কে বলতে পারে, একদিন হয়তো তোমাদের রাজাই ওই হরিণটিকে ধরে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতেই তার প্রাণ নেবে। জানতেও পারবে না, যে-হরিণটিকে সে মারল, সেই-ই তার আদরের মেয়ে—আলা-ইজা। আর সেটাই হবে বোধ হয় বনদেবীর শেষ প্রতিশোধ।' উত্তর দিল মৃত্যুদূত।

মৃত্যুদূতের কথা শুনে শিউরে উঠল উজ্জু নামে ওই বৃদ্ধমানুষটা। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ল। হাত-পা যেন অবশ হয়ে এল। মনে হল এখনই বুঝি তার প্রাণটা বেরিয়ে যায়। সে আর্তনাদ করে উঠল, 'না মৃত্যুদূত, আমি আলা-ইজাকে বাঁচাব। তুমি আমাকে বাঁচতে দাও। শুধু বলে দাও, অন্ধকারে কোন পথ দিয়ে গেলে আমি বনদেবীর দেখা পাব! বলে দাও, কোথায় আছে আমার আলা-ইজা!'

মৃত্যুদূত উত্তর দিল, 'বৃদ্ধ উজ্জু, বনদেবীর তো কোনো আলাদা সৌধ নেই। তার ঠাঁই তো সারা বনে। তুমি তাকে খুঁজে পাবে ফুলের গন্ধে। পাখির কলকাকলিতে। ঝরা পাতার ঝুমঝুমিতে। প্রজাপতির রঙিন পাখায়। মৌমাছির গুঞ্জরণে। হরিণের চোখের দৃষ্টিতে। আর, খুঁজে পাবে বনজুড়ে যত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে, সেইখানেও। এইসঙ্গে আরও শুনে রাখো উজ্জু, রাজকন্যা আলা-ইজাকে খোঁজবার জন্যে তোমায় কোনো চেষ্টা করতে হবে না। সে সে এখন হরিণ। তাকে তুমি চিনতে পারবে না। কিন্তু সে যদি তোমায় দেখতে পায়, তবে সে-ই তোমার কাছে ছুটে আসবে।' এইটুকু বলেই মৃত্যুদূত থামল। থামল কয়েক মুহূর্তের জন্যে। তারপর বলল, 'এবার আমি যাই উজ্জু। ঠিক তিনদিন পরে আবার দেখা হবে। আশা করি আমার কথা ভুলে যাবে না।'

মৃত্যুদূতের কথা শেষ হতে-না-হতেই কেমন যেন হঠাৎ সেই ভয়ঙ্কর অন্ধকারটা ধীরে-ধীরে সরে যেতে লাগল। উজ্জুর মনে হল তার চোখের ওপর থেকে একটা মিশমিশে কালো পরদা ভোজবাজির মতো আপনা-আপনি মিলিয়ে যাচ্ছে। কাছ থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে। আরও দূরে। অনেক দূরে। মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠছে আবার সেই বন। সবুজে-সবুজে চারদিক ছেয়ে গেল। গেয়ে উঠল পাখি। নেচে উঠল গাছের পাতা। বনফুলের গন্ধে ভরে গেল সারা বন। দেখা গেল নীল আকাশ, একটু-একটু গাছের ফাঁক দিয়ে।

কেমন যেন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল উজ্জু, অন্ধকার থেকে আলোয় বেরিয়ে এসে। এতক্ষণ কি তবে সে স্বপ্ন দেখছিল! না, না! তা কেমন করে হবে! অন্ধকারটা এখনও যে তার চোখে চমকে-চমকে ভেসে উঠছে। হ্যাঁ, আর মাত্র তিনদিন সে বেঁচে থাকবে। মাত্র তিনদিনই। জানে না সে, এই তিনদিনে বনের কোনদিকে গেলে বনদেবীর দেখা পাবে। জানে না, কোনদিকে রাজকন্যা আলা-ইজা বনদেবীর শাপে হরিণের সঙ্গে হরিণ হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। কেমন করে সেই হরিণরূপী আলা-ইজাকে দেখতে পাবে উজ্জু, তারও ঠিকানা তার জানা নেই। সুতরাং কোনদিকে যাবে সে!

না, আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই তার। এখনই ঝোপঝাড় ডিঙোতে হবে। কাজেই যেদিকে চোখ যায় সেইদিকেই হাঁটে উজ্জু। মাঝে-মাঝে থমকে থামে। চেয়ে দেখে এদিক-ওদিক। কোনো শব্দ কি ভেসে আসে তার কানে! না তো! বোধ হয় একটি কাঠবেড়ালি ছুটে যায়। ঝরাপাতায় তার পায়ের ছোঁয়াচ লাগে। কিংবা হয়তো গাছের ফাঁকে কোথাও হিসহিস করে ফুঁসে ওঠে সাপ। বানর লাফায় এ-ডাল থেকে ও-ডাল। উড়ে যায় পাখি গাছ থেকে গাছে। কিন্তু দেখা যায় না কোনো হরিণ। শোনা যায় না একটি হরিণেরও ছুটন্ত পায়ের দুরন্ত আওয়াজ। থামে না উজ্জু। সজাগ তার চোখ। হুঁশিয়ার তার মন।

হঠাৎ চমকে দাঁড়ায় উজ্জু।

কেন? কী দেখল?

একটি ফুল। রঙিন। বনের ছায়ায় ফুটে আছে। চোখ জুড়িয়ে গেল উজ্জুর। এগিয়ে যায়। ফুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। এমন ফুল সে তো দেখেনি আর কোনোদিন। তুমি দ্যাখো, কী নরম তার ফুটে-ওঠা পাপড়িগুলি। কে রাঙিয়েছে এমন রঙের বাহারে ফুলের পাতাগুলি। হাত বাড়াল উজ্জু ফুলের দিকে।

না, না। ছিঁড়ো না!

হাত সরিয়ে আনল উজ্জু নিমেষে। এ কী! অমন করে একটি সুন্দরকে কেন ছিনিয়ে আনতে তার লোভ হল! কে জানে, ওই ফুলের আড়ালেই বুঝি বনদেবী আছে। বনদেবী বুঝি ফুলের মতোই সুন্দর!

লজ্জা পেল উজ্জু। ধীরে-ধীরে তার হাঁটু কে যেন আপনা থেকে মুড়ে দিল। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল উজ্জু ওই ফুলের সামনে। তারপর দুটি হাত ফুটন্ত ফুলের সামনে ছড়িয়ে দিয়ে কাতর স্বরে বলে উঠল, 'ও আমার রঙিন ফুল, যাকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি তুমি কি সেই বনদেবী?'

ফুলের কোনও উত্তর পেল না উজ্জু।

'ওগো ফুল, তুমিই যদি সেই বনদেবী হও, তবে বলে দাও, কোথায় আমার সেই ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজা আছে! ওগো বনদেবী, মৃত্যুদূত আমায় বলে গেল, তোমার শাপে আমার রাজকন্যা-বন্ধু হরিণ হয়ে বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বলো বনদেবী, সে কী পাপ করেছে যে, তাকে তুমি এমন শাস্তি দিলে। একটি ছোট্ট হরিণ-শিশুকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যেই তো সে বনে এসেছিল। তুমি কি শোনোনি আলা-ইজার কান্নার শব্দ? তুমি কি জানো না, রাজজ্যোতিষী, আলা-ইজার অসুখ হয়েছে বলে মিথ্যে-মিথ্যে সেই হরিণ-শিশুর প্রাণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল রাজাকে। বনদেবী, সেই হরিণ-শিশুটি আলা-ইজার খেলার সঙ্গী হয়েছিল। সে যখনই জেনেছে তারই জন্যে তার সেই ছোট্ট বন্ধু হরিণের প্রাণ নেওয়া হবে, তখনই তো আলা-ইজার কান্নার শব্দ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে-কান্না কি তোমার কানে পৌঁছয়নি বনদেবী? বাতাসও কি তবে একটি ছোট্ট মেয়ের ভালোবাসাকে তুচ্ছ করেছে! ওগো বনদেবী, আমার ভালোবাসার আলা-ইজাকে তুমি ফিরিয়ে দাও! আর তিনদিন পরে মৃত্যুদূত আসবে আমায় নিয়ে যেতে। তিনদিন পরে এই পৃথিবীর এত ভালোবাসা, এত আনন্দ, এত আলোর উৎসব সব হারিয়ে যাবে। ওগো বনদেবী, সব কিছু হারাবার আগে আমি আমার আলা-ইজার কপালে একটি চুমো দিয়ে বলে যেতে চাই, 'ও আমার ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজা, তোরা আছিস, তবু পৃথিবীতে এত হিংসা কেন? মানুষ কেন মানুষকে মারে? কেন মারে জীবন্ত ওই পশু-পাখিদের? তোদের দেখেও কি তারা কিছু শেখে না? ওগো বনদেবী, শুধু এইটুকু বলেই আমি বিদায় নেব। তোমার কাছে আর কিছু চাইব না। কোনোদিনও না।' বলতে বলতে উজ্জুর চোখ দুটি কেমন যেন ছলছল করে উঠল।

হয়তো উজ্জুর গাল বেয়ে দু-চোখ উপচে অশ্রুর ফোঁটাগুলি মাটিতেই ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু না, উজ্জুর চোখের জল উপচে পড়ল না। হঠাৎই একঝলক বাতাস বয়ে গেল উজ্জুর গা ছুঁয়ে ওই ফুলের পাপড়িগুলির ওপর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফুলের পাপড়িগুলি বাতাসের ছোঁয়া লেগে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল মাটিতে। থতমত খেয়ে গেল উজ্জু। চোখের দৃষ্টি তার স্থির হয়ে গেল। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল পড়ে-থাকা ফুলের সেই পাপড়িগুলির দিকে। পাথরের মতো। আর মুখে কথা নেই তার। চোখে জলও নেই। শুকিয়ে গেছে। নিমেষে হতাশায় ছেয়ে গেল তার চোখ দুটি। উঠে দাঁড়াল সে। তারপর আচমকা চিৎকার করে ডাক দিল সে, 'আ-লা-ই-জা! আ-লা-ই-জা!' তার চিৎকারের আওয়াজটা আর্তনাদ করতে-করতে বনের গাছে-গাছে, পাতায়-পাতায় দোলা দিয়ে মিলিয়ে গেল।

উজ্জু আবার তারস্বরে ডাক দিল, 'ব-ন-দে-বী, কোথায় তুমি? সাড়া দাও! সাড়া দাও!'

কারও সাড়া পেল না সে। এবারও তার গলার স্বর বনের বাতাসে ভাসতে-ভাসতে কোথায় যে উধাও হয়ে গেল, কে জানে! হয়তো শুনতে পেয়েছিল বুনো-কুকুরের দল। একসঙ্গে অনেক কুকুর ডেকে উঠল। কী হিংস্র তাদের ডাক। অনেক বানর গাছের এ-ডাল থেকে ও-ডালে লাফালাফি লাগিয়ে দিল। একঝাঁক উড়ন্ত পাখির ডানার শব্দ শোনা গেল শূন্যে। উজ্জুর ভয় নেই কাউকেই। শুধু ওই বুনো-কুকুরের চিৎকারটাই তার কানে ভয়ঙ্কর ঠেকল। যদিও সে জানে, এখনই কেউ তার প্রাণ নিতে পারছে না। তিনদিন, এখনও তিনদিন বেঁচে থাকার সময় পেয়েছে সে। তবুও ভয় তার, যদি ওই হিংস্র কুকুরগুলো তাকে দেখতে পায়! যদি তাকে কামড়ে-ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে! তখন? তখন তো সে আর আলা-ইজাকে খুঁজতে পারবে না। এইখানে পড়ে ধুঁকিয়ে-ধুঁকিয়ে যদি তার তিনদিন কেটে যায়!

মনে হচ্ছে, কুকুরগুলো এইদিকেই তেড়ে আসছে। মনে হয়, উজ্জুর গায়ের গন্ধ তাদের জিভের লালা ঝরাচ্ছে। এখানে আর দাঁড়ানো ঠিক নয়। কিন্তু কোথায় যাবে সে? যেদিকে তাকাও ঘন বনে ছেয়ে আছে চারদিক। সেই ঘন বনের আড়ালে-আড়ালে লুকিয়ে-ছাপিয়ে উজ্জু পথ খুঁজতে লাগল। বুনো-কুকুরের গলার খ্যাঁকানিও এক ঝোপের আড়াল থেকে আর-এক ঝোপের আড়ালে আওয়াজ তুলল। শিকারের গন্ধ তাদের নাকে। সেই গন্ধ শুঁকে-শুঁকে তারা ঝোপ ডিঙোয়। আর উজ্জু তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পালাবার পথ খোঁজে। কখনও উজ্জু ছোটে। অবশ্য তেমন করে তো আর ছোটা যায় না এই গহন বনে। উজ্জু ঝোপঝাড় মাড়িয়ে-ডিঙিয়ে ছোটার চেষ্টা করে শুধু। হাঁপিয়ে পড়ে উজ্জু। কুকুরেরও জিভ লকলক করে ওঠে।

তারপর হঠাৎ কী করে যে কী হল কে জানে, সেই বনের ঝোপের ঘুপচিতে কীসের যেন ঝটাপটি লেগে গেল। সেই বুনো-কুকুরগুলো যত চিৎকার করে, ততই বনের ঝোপ কেঁপে ওঠে।

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে উজ্জু। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাঁপায়। আর আতঙ্কে এদিক-ওদিক তাকায়। কিছুই দেখতে পায় না সে। শুধু শুনতে পায়, সেই ঝোপ তোলপাড় করে কারা যেন সেই হিংস্র কুকুরগুলোকে আক্রমণ করেছে। কেননা, এখন আর কুকুরগুলোর গলায় সেই ভয়ঙ্কর ডাক নেই। আঘাতে-আঘাতে নাস্তানাবুদ হলে যেমন লেজ গুটিয়ে চেঁচায়, তেমনই কিঁউ-কিঁউ করতে-করতে কুকুরগুলোও বোধ হয় লেজ গুটিয়ে চেঁচাচ্ছে। ভারি দেখবার ইচ্ছে হল উজ্জুর। কাদের আঘাতে বুনো-কুকুরের এই হাল, সেটা কার-না-আর দেখতে ইচ্ছে করে! কিন্তু সাহস হল না। সে যেমন ঝোপের আড়ালে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তেমনই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হল, তার চোখের পাতাও যেন পড়তে চাইছে না।

ঝোপের মধ্যে সেই তোলপাড়-করা কাণ্ডটা কতক্ষণ ধরে চলল, তার ঠিক-ঠিক সময় কেমন করে আর ঠাওর করবে উজ্জু আর-এক ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে? তবে অনেকক্ষণই হল। অনেকক্ষণ পরে কুকুরের কিঁউ-কিঁউ শব্দ কিংবা লাফালাফি ও ঝাঁপাঝাপির সেই তুলকালাম আওয়াজটা আর তার কানে এল না। মনে হয় কুকুরগুলো পালিয়েছে। এবার হয়তো একটু সাবধানে উঁকি মারা যেতে পারে।

হ্যাঁ, উঁকি মারল উজ্জু। উঁকি মেরেই তার চোখে ধাঁধা-লেগে গেল। সে দেখল, একপাল হরিণ রক্তে-রাঙা শিং উঁচিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। তবে কি এতক্ষণ এই হরিণগুলোর সঙ্গেই কুকুরগুলোর মারামারি হচ্ছিল! তাই হবে। নইলে হরিণের শিং-এ কেন রক্ত লেগে থাকবে! বোধ হয় ওই শিং ঢুঁসিয়ে বুনো-কুকুরের পেট ফাঁসিয়ে দিয়েছে ওই হরিণের দল। কুকুরও মরেছে যেমন, তেমনই যে দু-একটা হরিণও ঘায়েল হয়নি, তা তুমি বলতে পারো না।

ধক করে কেঁপে উঠল উজ্জুর বুকের ভেতরটা। এই হরিণের দলে তার আলা-ইজা নেই তো! সে আর লুকিয়ে থাকতে পারল না। এই ঝোপ থেকে ওই ঝোপে হুড়মুড় করে ছুটে গেল। না, কিছুই তো সে দেখতে পেল না। তবে কি এই ঝোপে নয়, অন্য ঝোপে। আর-এক ঝোপে সে ছুট দিল। না, এখানেও তো কিছু নেই। এখান থেকে ওখানে। ওখান থেকে আরও অন্যখানে। হায়রে, কোথাও সে কিছুই দেখতে পেল না! তবে? কী হল এতক্ষণ! কোথায় গেল সেই কুকুরের চিৎকার! কোথা থেকে ছুটে গেল সেই হরিণের দল! তবে সবই কি ধাঁধা! আবার সে গলা ফাটিয়ে ডাক দিল, 'আ-লা-ই-জা, আ-লা-ই-জা!'

এবারও কেউ সাড়া দিল না। শুধু শোনা গেল পাখিদের কাকলি গাছে-গাছে অনেক সুরে বেজে উঠেছে। বোধ হয়, সাঁঝ নামছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। তবে কি একটা দিন শেষ হয়ে গেল! আর কিছুক্ষণ পরেই তো বনে ঘন অন্ধকার নেমে আসবে। তখন কী করবে উজ্জু! বনের অন্ধকারে কোথায় সে থাকবে! বড্ড ক্লান্ত এখন সে। আর বোধ হয় আলা-ইজাকে হাঁক দিয়ে ডাকতেও পারবে না। ডাকলেই-বা কী! সাড়া দেবে কে? কোথায় আলা-ইজা!

'কে এখানে এমন করে দাঁড়িয়ে আছ বাবা? কে তুমি?'

কে ডাকল তাকে! চমকে উঠল উজ্জু। এ যেন এক বৃদ্ধার গলা। ফিরে তাকাল। হ্যাঁ, একেবারেই তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই বৃদ্ধা। তবে বলতে পারো না, সে উজ্জুর মতো বয়সের ভারে অতখানি নুয়ে পড়েছে। তার মাথায় একবোঝা কাঠ। দিনের শেষে কাঠ কুড়িয়ে ঘরে ফিরছে। কিন্তু আশ্চর্য, বনের এত গভীরে, এই সময়ে কাঠ কুড়িয়ে পথ হাঁটতে তার ভয় করছে না? কিছু না থাক, বুনো-কুকুরের পাল্লায় পড়লে যে নিস্তার নেই, সেটা কি জানা নেই বৃদ্ধার!

'চুপ করে আছ যে! বুঝি আমায় দেখে অবাক হচ্ছ?'

এবার উজ্জুর চমক ভাঙল। বলল, 'আমি বড়ো বিপদে পড়েছি।'

'কীসের বিপদ?'

'একদল বুনো-কুকুর আমাকে তাড়া করেছে।' উত্তর দিল উজ্জু।

বৃদ্ধা বলল, 'তা বনের ভেতর এই সময়ে কেউ ঢোকে! এখনও যে প্রাণে বেঁচে আছ, এই যথেষ্ট।'

উজ্জুর বলবার ইচ্ছে ছিল, 'তুমিও তো একা-একা বনে ঢুকেছ। তোমারও তো বিপদ হতে পারে।' কিন্তু না, এই কথা সে মনে-মনে ভাবল বটে, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারল না। শুধু অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

'ও, বুঝতে পেরেছি, অমন করে তুমি কেন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছ। ভাবছ বোধ হয়, আমিও তো একা-একা মাথায় কাঠ নিয়ে ঘরে ফিরছি। আমারও তো বিপদ হতে পারে!' বলতে-বলতে বৃদ্ধা হেসে ফেলল। হাসতে-হাসতেই বলল, 'আমায় কেউ কিছু করবে না। আমাকে সবাই চেনে। আমি তো এই বনেই থাকি। এখানেই আমার ঘর। তা, তুমি কে, তা তো বললে না?'

'আমার নাম উজ্জু।'

'কোথায় থাকো তুমি?'

'রাজপ্রাসাদে।'

'রাজপ্রাসাদে!' অনেকটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল সেই কাঠকুড়ানি বৃদ্ধা। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'রাজপ্রাসাদ ছেড়ে এই বনে এসেছ কেন? কিছু অন্যায় করে পালিয়ে এসেছ নাকি?'

'না,' দৃঢ় গলায় উত্তর দিল উজ্জু। তারপর বলল, 'তোমার কি মনে হচ্ছে, আমার মতো একজন বৃদ্ধমানুষ অন্যায় করার জন্য বেঁচে আছে?'

'রাগ করছ কেন?' ভারি ভালোমানুষের মতো নরম গলায় বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল। 'তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, তোমার খুবই কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে, অনেকক্ষণ তোমার পেটেও কিছু পড়েনি। তা উপোস করে একটি মানুষ যদি বনের ঝোপ ডিঙিয়ে এদিক-ওদিক করে, তবে আমার মতো একজন কাঠকুড়ানি বৃদ্ধার কী মনে হতে পারে বলো? তা ছাড়া একটা কথা বলি বাছা, যে অন্যায় করে সে বৃদ্ধই হোক, কি জোয়ান, সে করবেই।' বলতে-বলতে বৃদ্ধা একটু থামল। উজ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, হয়তো, উজ্জু কী বলে তা শোনার জন্যে। কিন্তু উজ্জু কোনো কিছুই বলল না। তখন বৃদ্ধাই আবার বলল, 'রাত নামছে, তুমি যদি কিছু মনে না করো, একটা কথা বলতে পারি, এখন আর এই বনে তোমার ঘোরঘুরি করাটা ঠিক হবে না। তুমি আমার সঙ্গে চলো। আজ রাতটা আমার ঘরে থাকতে তোমার যদি আপত্তি না-থাকে, তবে আমি খুবই খুশি হব।'

সেই বনে সাঁঝের আবছা-আলো, আবছা-আঁধারে উজ্জু কাঠকুড়ানি বৃদ্ধার মুখটা ভালো করে দেখবার চেষ্টা করল। ভালো করে আর কতটুকু দেখতে পাবে! তবু যদি চোখে চশমা থাকত, তা হলে না-হয় কথা ছিল। এখন তাই যতটুকু দেখা যায়, ততটুকু দেখতে না-দেখতে সেই বৃদ্ধা আবার কথা বলল, 'আমার মুখখানা দেখে তোমার কি মনে হচ্ছে, আমার কোনো মতলব আছে?'

লজ্জা পেল উজ্জু। সত্যি, অমন ড্যাবড্যাব করে দেখলে মানুষ যে মনে-মনে দুঃখ পেতে পারে, এটা তার মতো একটা সমঝদার লোকের বোঝা উচিত ছিল। তাই সঙ্গে-সঙ্গে কেমন যেন আমতা-আমতা করে বলে উঠল, 'তুমি মনে কোরো না আমি তোমাকে সন্দেহ করছি। আমি শুধু ভাবছি, এই গভীর বনে এতক্ষণ আছি, কোনো ঘর তো আমার নজরে পড়ল না। তুমি কি তবে বনের বাইরে অনেক দূরে থাকো?'

বৃদ্ধা বলল, 'অনেক দূরে থাকলে তোমার কোনো অসুবিধে আছে নাকি?'

'অসুবিধে মানে, হ্যাঁ, তা একটু আছে।' উত্তর দিল উজ্জু থমকে-থমকে।

'কীসের অসুবিধে?' বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল।

'না, এখন থাক সে-কথা। চলো, তোমার ঘরেই যাই। ঘরে গিয়ে বলব। আমাদের দু-জনেরই যা অবস্থা, তাতে আর একটু দেরি করলে দু-জনই আর কিছু দেখতে পাব না। অন্ধকারটা বৃদ্ধদের যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো।'

বৃদ্ধা উত্তর দিল, 'তোমার ভয় নেই। ঘর আমার খুবই কাছে। তার ওপর চোখের দৃষ্টিও আমার বেশ ভালোই। অন্ধকার এখনও পর্যন্ত আমায় কাবু করতে পারেনি। অবশ্য বলতে পারো, আমি তোমার চেয়ে বয়সে ছোটোই। কাজেই দৃষ্টিটাও আমার ছোটো মনে করে, তুমি যেন আমায় ছোটো ভেবো না।'

উজ্জু বলল, 'ছিঃ ছিঃ! এ কী বলছ? আজ রাতটা তুমি যে আমায় আশ্রয় দিতে চেয়েছ, এতেই তো বুঝছি তুমি কত বড়ো, কত দয়ালু। চলো, আজকের রাতটুকুই শুধু তোমার ঘরে থাকার পরামর্শ আমি মেনে নিলুম। তবে, কাল ভোর হলেই আমায় বিদায় নিতে হবে। তাতে কিন্তু তুমি আপত্তি কোরো না।'

'না, না। তাতে আমি কেন আপত্তি করব?' উত্তর দিল বৃদ্ধা।

কাজেই সেই কাঠকুড়ানি বৃদ্ধা মাথায় কাঠ নিয়ে এগিয়ে-এগিয়ে চলল। আর ঠিক তার পিছু-পিছু পায়ের ব্যথা নিয়ে বৃদ্ধ উজ্জু হাঁটা দিল।

চলতে-চলতে কাঠকুড়ানি বৃদ্ধা গলা চেপে ফিসফিসিয়ে বলল, 'আর কথা বোলো না। চুপচাপ হেঁটে চলো। সাঁঝের বন ভীষণ ভয়ের।'

উজ্জুও গলার স্বর একেবারে নামিয়ে উত্তর দিল, 'না, না, কথা বলছি না। ভয়ও পাচ্ছি না। তবে তোমায় একটা অনুরোধ করতে ইচ্ছে করছে।'

'কী অনুরোধ?'

'তোমার মাথার কাঠগুলো তুমি একা কেন বইবে। আমিও তো খানিকটা বইতে পারি।'

বৃদ্ধা উত্তর দিল, 'তা পারো। তবে এই একটা দিন বয়ে, আমার কষ্টের তুমি আর কতটুকু আসান করতে পারবে? থাক। কাল যখন তুমি থাকবে না, সে তো আমাকেই বইতে হবে।'

সুতরাং উজ্জু আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ এগিয়ে চলল।

আশ্চর্যের কথা, ক-পা হাঁটতেই বৃদ্ধার ঘরটা একেবারে নাক-বরাবর সামনেই দেখা গেল। অথচ দ্যাখো, তখন থেকে কতবার যে উজ্জু এদিক-ওদিক করল, একবারও ঘরটা নজরে পড়ল না! বনের ভেতরে একা এক বৃদ্ধের ঘর যেমনটি ভাবা যায়, ঠিক তেমনটি। বনের ডালপালা ভেঙে-ভেঙে সাজানো হয়েছে দেয়াল। মাথার ওপর ছাউনি, তাও পাতার। এককথায় বলতে পারো পর্ণকুটির। ধরো, যদি বাঘ-ভাল্লুক লাফিয়ে পড়ে, তবে এক লাফেই খড়মড় করে ভেঙে তছনছ হয়ে যাবে বৃদ্ধার ঘর। আর সেইসঙ্গে মরবে বৃদ্ধাও।

দরজা বলতে যেমন বোঝো, মোটেই তেমনটি নয়। পাতায় ঢাকা। যেমন পলকা, তেমনই নড়নড়ে। ঠেলা মারতেই দরজা খুলে গেল। বৃদ্ধা বলল, 'এসো!'

সুড়সুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকে উজ্জু বলল, 'এইটা তোমার ঘর?'

'গরিবের ঘর তো! এর চেয়ে ভালো আর কী হবে! তুমি থাকো রাজপ্রাসাদে। এখানে থাকতে কষ্ট হবে না তো?' জিজ্ঞেস করল বৃদ্ধা।

উজ্জু বলল, 'রাজপ্রাসাদের চেয়ে এ-ঘর ভালো কি মন্দ সে-কথা আমি বলছি না। আমি বলছি, এই গা-ছমছম বনে তুমি এমন একটা ঘরে নির্বিঘ্নে থাকো কী করে? কেউ নেই কোত্থাও, না আছে কাছেপিঠে আর কোনো ঘর-দোর। তোমার তো যে-কোনো সময়ে, যে-কোনো বিপদ ঘটতে পারে!'

বৃদ্ধা হাসল। হাসতে-হাসতে বলল, 'জীবনটা তো কেটে গেল এইখানেই। এতখানি বয়েস হল, কোনো বিপদ তো হল না। আর হবেই-বা কেন! আমি তো কারও কোনোদিন ক্ষতি করিনি।' বলতে-বলতে বৃদ্ধা ঘরে ঢুকল। মাথার কাঠ এককোণে ফেলে একটা কুপি জ্বালাল। ঘরের ভেতরের আঁধারটা অনেকখানি কেটে গেল সেই কুপির আলোয়। ঘরে দেখার মতো কিছুই নেই। কিন্তু তবুও কেমন যেন একটা খুশি-ছোঁয়া ভালোলাগার বাতাস সারা ঘর ভরে আছে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল উজ্জু।

বৃদ্ধা বলল, 'তোমায় যে কোথায় বসতে বলি! রাজপ্রাসাদের মতো মখমল-বিছানো বসার জায়গা তো আমার নেই। পাতায়-বোনা এই আমার বিছানা। এইখানেই তোমায় বসতে হবে। আপত্তি নেই তো?'

উজ্জু উত্তর দিল, 'রাজপ্রাসাদের মখমলের চেয়ে এই পাতায়-ছাওয়া কুটির, আর এই পাতায়-বোনা বিছানাই আমার ভালো। এইখানেই আমি বোধ হয় আমার আলা-ইজাকে খুঁজে পাব।' বলতে-বলতে উজ্জু পাতার বিছানায় বসে হাঁপ ছাড়ল।

বৃদ্ধা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আলা-ইজা! সে আবার কে?'

'তোমায় বলব, সব বলব। এখন আমায় একটু যদি খাবার জল দাও তো বাঁচি। আমার গলা শুকিয়ে গেল।'

বৃদ্ধা জল আনল। ঘরের কলসিতে ভর্তি ছিল ঠাণ্ডা জল। আর সেইসঙ্গে আনল একবাটি মিঠাই। তার কী সুগন্ধ। উজ্জুর হাতে মিঠাই-এর বাটিটি দিয়ে বলল, 'খাও! আমারই হাতের তৈরি। বুঝতে পারছি, তোমার অনেকক্ষণ খাওয়া হয়নি। ক্লান্তি আর খিদেয় তোমার মুখখানা কালো হয়ে গেছে।'

উজ্জু কেমন যেন হতচকিত হয়ে বলল, 'না, না। মিঠাই না হলেও চলবে। জলটুকু পেলেই আমার চলে যায়। অনেকক্ষণ থেকে গলায় একফোঁটা জল পড়েনি। আমার শুধু তেষ্টাই পাচ্ছে। খিদের কথা তো বলিনি। আর তো মাত্র আজকের রাত। তারপরে বাকি থাকবে আর দুটো রাত।'

বৃদ্ধা একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, 'তুমি যে কী বলতে চাও কিছুই বুঝছি না। হয়তো কখনও-কখনও বলতে গিয়ে আমায় সন্দেহ করছ। বলতে সাহস করছ না।'

উজ্জু মুখে মিঠাই পুরল। বিশ্বাস করো, একবাটি মিঠাই সত্যিই যেন সে একটা রাক্ষসের মতো গপগপ করে গিলে ফেলল। তারপর একঘটি জল ঢকঢক করে গলায় ঢেলে প্রাণে বাঁচাল। আঃ।

বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল, 'আর-একটু জল দেব?'

'না। আর লাগবে না।' উত্তর দিল উজ্জু। তারপর বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে খানিক অবাক সুরে বলল, 'দ্যাখো, অনেকক্ষণ থেকে ভাবছি, একটা কথা তোমায় জিজ্ঞেস করি।'

'কী কথা?'

'সত্যি করে বলো তো, তুমি কে?'

বৃদ্ধা চমকে মুখ ফেরাল।

উজ্জু ভ্যাবাচাকা খেয়ে সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠল, 'না, বিশ্বাস করো, আমি অন্য কিছু বলতে চাইনি। তোমাকে দেখে বারবার আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, তুমি ঠিক আমার মায়ের মতন। মা ছাড়া এমন যত্ন আর কে করত বলো! কে আমায় বিপদ থেকে উদ্ধার করে এনে নিজের ঘরে আশ্রয় দিত! মাকে আমার মনে পড়ে। স্পষ্ট মনে পড়ে। তোমার মনে পড়ে না?'

'পড়ে।' কেমন যেন একটু অন্য সুরে উত্তর দিল বৃদ্ধা।

উজ্জু একটু থমকে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'তোমার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করতে তুমি কি কষ্ট পেলে?'

'হ্যাঁ।'

বৃদ্ধার হ্যাঁ শুনে থতমত খেয়ে গেল উজ্জু। তারপর যে কী জিজ্ঞেস করবে উজ্জু বুঝতে না-পেরে, চুপ করে বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বৃদ্ধা নিজেই বলল, 'হ্যাঁ, মায়ের কথা মনে পড়লেই আমার কষ্ট হয় উজ্জু। আমি যেমন তার মেয়ে, তেমনই তার আর-একটি মেয়ে ছিল উজ্জু। সে-মেয়ে তার নিজের মেয়ে নয়, একটি হরিণ। বনের হরিণ। সেই হরিণটিকে আমার সঙ্গেই মা, আমারই মতন করে পালন করত। তখন আমি খুবই ছোটো। আমি এই বনেই সেই হরিণের সঙ্গে খেলা করতুম। গাছের ফাঁকে-ফাঁকে লুকিয়ে থাকত সে। আমার সঙ্গে সে লুকোচুরি খেলত। তারপর একদিন কী হল, আমরা সেদিনও খেলাই করছিলুম। খেলতে-খেলতে সেদিন সে যে কোথায় লুকোলো, আমি আর খুঁজেই পেলুম না। আমি ছুটতে-ছুটতে এ-গাছের ফাঁকে, ও-ঝোপের আড়ালে তাকে খুঁজে বেড়াই। কিন্তু সে থাকলে তবে তো খুঁজে পাব! শেষমেশ তবে কি সে গভীর বনে হারিয়ে গেল!

'হ্যাঁ, সে হারিয়েই গিয়েছিল। তবে বনে নয়, রাজপ্রাসাদের অন্ধকারে। রাজার লোকেরা তাকে জ্যান্ত ধরে নিয়ে গিয়েছিল। দেবতার কাছে তার প্রাণ উপহার দেবে বলে। আচ্ছা, বলো তো উজ্জু, একজন মানুষের কাছে তার নিজের প্রাণের যত দাম, তেমনই একটি হরিণের কাছেও তো তা-ই। একটি হরিণ যেমন বেঁচে থাকবে বনে, তেমনই মানুষও বেঁচে থাকতে চায় পৃথিবীর আলো-বাতাসে। রাজার শক্তি আছে, অনেক ধন-দৌলত আছে বলেই কি পৃথিবীর সৌন্দর্যকে ধবংস করে দেবে? কিছু লোকের মিথ্যে আশ্বাসকে বিশ্বাস করে একজনের প্রাণ বাঁচাতে অন্যের প্রাণ নেবে?'

উজ্জু বৃদ্ধার কথা শুনে যেন বোবা হয়ে গেল। তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই থাকল শুধু। একটি কথাও আর বলতে পারল না। মনে-মনে ভাবল, বৃদ্ধার এই কথাটা যে তারও কথা। তবে কি বৃদ্ধা তার কথা জানে! তবে কি জানে, উজ্জু কেন বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে!

বৃদ্ধা উজ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'তুমি অমন চুপ করে আছ কেন? তুমি তো এক রাজারই আশ্রয়ে ছিলে। তোমার কি মনে হয় আমি মিথ্যে কথা বলছি?'

উজ্জু থতমত খেয়ে গেল হঠাৎ বৃদ্ধার কথা শুনে। তারপর আমতা-আমতা করে বলল, 'না, না। তুমি কেন মিথ্যে বলবে। আমার অবাক লাগছে, তুমি যেন আমারই কথা বলছ! মনে হচ্ছে আমারই মনের কথাটা তুমি যেন কেমন করে জেনে ফেলেছ!'

বৃদ্ধাও অবাক হল। বলল, 'তোমার মনের কথা? আমি জানি? না, না, কিচ্ছু জানি না। শুনি, কী সেই কথা!'

'জানো না যখন, তখন বলতে আমার আপত্তি নেই। আমার রাজাও তোমার কথামতোই এক নিষ্ঠুর মানুষ ছিল। আমার রাজাও অনেক প্রাণীর রক্ত নিয়েছে। তাই আজ আমার রাজার মেয়ে রাজকন্যা আলা-ইজা বনদেবীর শাপে হরিণ হয়ে বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি তাকে এই বনে খুঁজতে ঢুকে মৃত্যুদূতের মুখে এই কথা শুনেছি। মৃত্যুদূত আমায় স্বর্গে নিয়ে যেতে এসেছিল। আমায় সে তিনদিন বাঁচার সুযোগ দিয়েছে। এই তিনদিনে হরিণরূপী রাজকন্যা আলা-ইজা আমাকে যদি দেখতে পায়, তবেই ভালো। সে-ই আমার কাছে ছুটে আসবে। আমি তো আর কোন হরিণটি আলা-ইজা, তা চিনতে পারব না। এখন তাই তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ, তুমি কি আমায় একটু সাহায্য করবে? তুমি বিশ্বাস করো, আমার রাজা আমায় কথা দিয়েছে, সে আর কারও প্রাণ নেবে না। তুমি বিশ্বাস করো, বনের সৌন্দর্য সে আর নষ্ট করবে না। সে শুধু তার মেয়েকে ফিরে পেতে চায়।'

উজ্জুর কথা শুনে কেমন যেন একটা রহস্যের হাসিতে বৃদ্ধার মুখখানা ঝলসে উঠল। বৃদ্ধা উজ্জুর অনুরোধের কথায় কোনো সায় দিল কি না, বোঝা গেল না। বৃদ্ধা শুধু বলল, 'তোমার জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছে।'

'কেন?' ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'তিনদিন পর, তোমার মতো একজন মানুষকে পৃথিবী হারাবে,' উত্তর দিল বৃদ্ধা।

আর উজ্জু বলল, 'আমি চলে গেলে তোমার মতো মানুষ তো থাকবে। তোমরাই তো পৃথিবীর মা।' এইটুকু বলে একটু থামল। বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকাল। তারপর আবার বলল, 'মা আমার, মরতে আমার কষ্ট নেই। শুধু একটিবার আলা-ইজাকে দেখতে চাই। তোমারই কোলে। তুমি কি রাখবে না আমার কথা?'

না, বৃদ্ধা উজ্জুর সে-কথার কোনোই উত্তর দিল না। শুধু বলল, 'রাত হয়েছে অনেক। এবার তোমার জন্য কিছু খাবার করে আনি।'

'কোথায়?'

'এই তো, দ্যাখো না, যাব আর আসব। তবে তুমি যেন ঘরের বাইরে কোথাও যেয়ো না। আমার পাতায় সাজানো বিছানায় বিশ্রাম করো।' বলতে-বলতে বৃদ্ধা ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে বনের অন্ধকারে কোথায় যে খাবার আনতে গেল, কে জানে!

এখন একা, এই বনে, একটা ছোট্ট পর্ণকুটিরে বসে আছে উজ্জু। রাত্তির। বাইরে অন্ধকার। ভেতরে কুপির আলোয় ছায়ার দোলন। মানুষের কী থেকে যে কী হয়, কে বলতে পারে। কোথায় রাজপ্রাসাদ, আর কোথায় এই পাতায়-ছাওয়া পর্ণকুটির। আচ্ছা, এখনই যদি এই আলো-আঁধারে আবার মৃত্যুদূত এসে হাজির হয়। না, এখন তার আসার কথা নয়। আর তিনদিন সময় আছে তার জীবনের। তিনদিনের একটা দিন তো কেটেই গেল। আর মাত্তর দুটো দিন বাকি। দু-দিন পরে উজ্জু স্বর্গে যাবে। স্বর্গের কত গল্পই না শুনেছে সে! এবার নিজের চোখে দেখবে। দেখবে আলোর বাহার। রঙের রামধনু। কত ফুল। কত গান। কত অপ্সরা, কত নাচ। আর দেখবে পৃথিবীর ভালোমানুষের দল। হ্যাঁ, স্বর্গে তো পৃথিবীর ভালোমানুষেরাই থাকে। কিন্তু উজ্জু ভেবে পায় না, সে কেন স্বর্গে থাকবে। সে কি তবে ভালোমানুষ। তা যদি হয়, তবে তো সেখানে তার মা আর বাবাও আছেন। কে না জানে কত ভালোমানুষ ছিলেন তাঁরা। রাজপ্রাসাদের বাগানের মালী। সারাজীবন শুধু গাছকে ভালোবেসেছেন। গাছে-গাছে কত যে ফুল ফুটিয়েছেন তার বাবা। আর তার মা? বাবার সঙ্গে সেই ফুলের গাছে জল ছড়িয়ে তাদের প্রাণ রক্ষা করেছেন। সব মা-ই বুঝি তাই করেন। নিজের ছেলেকে তো তিনি এমনই করে বাঁচিয়ে রাখেন। বুকের কাছে আগলে। স্নেহ দিয়ে। আদর করে। আচ্ছা, উজ্জুর মনে-পড়া মা আর বাবার মুখ দু-খানি কি এত বছর ধরে এখনও তেমনই আছে! কে জানে! কে জানে, উজ্জুকে তাঁরা চিনতে পারবেন কি না! এখন উজ্জু কত বৃদ্ধ হয়ে গেছে। তার ওপর আজ সারাটা দিন রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজতে খুঁজতে কী চেহারা হয়েছে দ্যাখো।

ওমা। এ কী! উজ্জু তো ঘুমিয়ে পড়েছে। কখন ঘুমোল। গাছের পাতার নরম বিছানায় কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে মানুষটা।

ঘুমোক, ঘুমোক, ঘুমোতে দাও! সেই কখন থেকে মানুষটার জেগেই কেটেছে। এখন যদি তার চোখের পাতা দুটি ঘুমের ছোঁয়ায় বুজে আসে, তবে তো দোষ দিতে পারো না। আমরাও কি পারব এই বয়সে এত ধকল সইতে। আহা! মানুষটাকে দেখলে কষ্ট হয়। অথচ দ্যাখো তুমি, কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে! তোমার কি মানুষটার মুখ দেখে একবারও মনে হচ্ছে মৃত্যুর ছায়া পড়েছে ওই মুখে?'

১০

কী আশ্চর্য! এ কী অদ্ভুত ঘুম! ভোরের আকাশে যখন প্রথম আলোর রোশনাই ফুটে উঠল, তখনই তার ঘুম ভাঙল। সারারাত কী হয়েছে, কী হল না, কিছুই সে মনে করতে পারছে না। অবাক কথা, কোথায় গেল সেই পর্ণকুটির! ভোঁ-ভাঁ। সে তো এখন খোলা আকাশের নীচেই শুয়ে আছে। ধড়ফড় করে উঠে বসল উজ্জু। এদিক-ওদিক ব্যস্ত চোখে তাকিয়ে দেখল! সত্যিই তো! ঘর তো নেই। ঘরের সেই বৃদ্ধা মানুষটাও নেই। তার বেশ মনে আছে, বৃদ্ধা তার জন্যে খাবার আনতে গেল। তারপর সে এল কি না, উজ্জু খাবার খেল কি না, সে-কথাও তো সে মনে করতে পারছে না! এ তো বড়ো আজব ঘটনা! তবে কি সবটাই স্বপ্ন? সেই বৃদ্ধা, তার মাথায় কাঠ, সেই গাছের পাতায় সাজানো ঘর, সেই মিঠাই আর জল—সব, সব মিথ্যে? না, না, কক্ষনো না।

তবে, কোথায় গেল সেই ঘর? কোথায় গেল সেই বৃদ্ধা? কেমন করে সারারাত এই খোলা আকাশের নীচে পড়ে-পড়ে সে ঘুমোচ্ছে। এ যেন ঠিক ভোজবাজি!

হঠাৎ একঝলক আলো গাছের ফাঁক দিয়ে উজ্জুর মুখের ওপর চমকে এসে পড়ল। সেই আলোর চমক মিলিয়ে যেতে না-যেতে, মেঘ ডাকল গুড়গুড় করে। উজ্জু উঠে দাঁড়াল। এই ঘন বনের ফাঁকে-ফাঁকে আকাশটা তেমন চোখভরে দেখা না গেলেও, যেটুকু দেখা যায়, তাতে সে বুঝতে পারে আকাশ ঢেকে গেছে মেঘে।

উজ্জু উঠে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল ঝড় উঠতে পারে, বৃষ্টিও নামবে হয়তো। তখন কী হবে?

উজ্জু আর দাঁড়াল না।

আবার মেঘ ডাকল।

আবার চমকে উঠল উজ্জু।

না, এবার সে মেঘের ডাকে চমকাল না। একটি কচি গলার কান্না সে শুনতে পেল। কে কাঁদে এই জনমানবহীন বনে। ছুটে যায় উজ্জু। না, ছুটতেও সে পারল না। তার তো ছোটার ক্ষমতা আর নেই। পা যে ছুটতে চায় না। পা যেমন ছুটতে চায় না, তেমনই বুকের ভেতরটাও কেমন যেন ধড়ফড় করে ওঠে। কেমন যেন একটু-একটু করে ভেঙে যাচ্ছে শরীরের জোরটা। তবে কি আলা-ইজাকে খুঁজে পাবে না সে। না কি খুঁজে পাওয়ার আগেই মৃত্যুদূতের আসার সময় হয়ে যাবে!

কান্নাটা শোনা যাচ্ছেই। সেই কচি গলার কান্না। তবে কি এই বনের ভেতরে কাছাকাছি কোথাও মানুষ বাস করে! কষ্ট হলেও উজ্জু তার ভেঙে-পড়া দেহটা একরকম টানতে-টানতেই সেই কান্নার খোঁজ করতে লাগল।

বিদ্যুৎ চমকাল। ভীষণ শব্দে বন কাঁপিয়ে কোথায় যেন বাজ পড়ল। কচি গলার কান্নার শব্দটাও যেন আর্তনাদ করে উঠল।

আরও একটু জোরে পা ফেলার চেষ্টা করল উজ্জু। কষ্ট হোক। কষ্ট হচ্ছে বলে সে তো আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এ যে একটি ছোট্ট শিশুর কান্না। হঠাৎ-হঠাৎ কেমন সব অবাক-অবাক কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে দ্যাখো, উজ্জুর মৃত্যুর আগে। একটা সাজানো পর্ণকুটিরে যে বৃদ্ধা-মানুষটা তাকে আশ্রয় দিল, সেই কুটিরই বা গেল কোথায়? কোথায় গেল সেই দয়ালু বৃদ্ধা? একে তুমি অবাক কাণ্ড না বলে আর কী বলবে?

গাছে-গাছে ঢেকে আছে সামনেটা। আচমকা হোঁচট খায় উজ্জু। একটা গাছের গুঁড়িতে মাথাটা ঠুকে যায় উজ্জুর। সেই গুঁড়িটাকেই সে জড়িয়ে ধরল। বেঁচে গেল। ভাগ্যিস, মুখ থুবড়ে পড়ে যায়নি। সঙ্গে-সঙ্গে সে দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়েছে যে কাঁদে, এই গভীর বনে পড়ে-পড়ে। এ যে নেহাতই একটি কোলের শিশু। আগুপিছু আর কিছু ভাবল না সে। গাছের গুঁড়ি ছেড়ে টলতে-টলতে সে এবার এগিয়ে গেল সেই ছোট্ট শিশুটির দিকে। তাকে তুলে নিল মাটি থেকে, বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর চিৎকার করে উঠল, 'এখানে কার কন্যা এটি? এ-বনে কার কন্যা ধুলো-কাদায় পড়ে-পড়ে কাঁদছে? কে আছ?'

কেউ সাড়া দিল না।

উজ্জুর বুকের আদরে মেয়েটির কান্নাও আর শোনা গেল না। মেয়েটি যেন হঠাৎ তার আপনজনকে খুঁজে পেয়েছে! সে আপনজনের নাম মা নয়। বাবাও নয়। তার নাম উজ্জু।

আবার বিদ্যুৎ চমকাল। আবার মেঘ ডাকল। উজ্জুর বুকের মধ্যেই মেয়েটি আঁতকে উঠল। দু-হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল উজ্জুর বুকখানা। ভালোমানুষের এই এক জ্বালা। সে যে সত্যিই ভালো, সবসময় কে যেন তাকে বিপদে ফেলে সেটাই যাচাই করে চলেছে। বলি, আর কী দরকার? আর অমন করে বারবার তাকে বিপদে ফেলে লাভটা কী হচ্ছে? তার স্বর্গে যাওয়ার রাস্তাটা তো পরিষ্কার হয়েই আছে। কেন আর কষ্ট দেওয়া। এখন একটু শান্তি দাও না তোমরা! বলে দাও না, কোথায় আছে সেই বনদেবী! না পারো তো খুঁজে দাও না সেই হরিণটি। যার নাম আলা-ইজা।

জানি, কারও কানে পৌঁছবে না এ-কথা। কেউ তার পাশে এসে দাঁড়াবে না। সবাই যেন বৃদ্ধটাকে নিয়ে একটু মজা করতে চায়! যে মরবেই, তাকে নিয়ে মজা করতে একটুও বাধে না। কী নির্দয় বলো তো সবাই। বৃদ্ধ উজ্জুকে যে-বৃদ্ধা একটু আশ্রয় দিল তার সবুজ পাতার ঘরে, খাবার আনছি বলে সে-ও যে কোথায় পালিয়ে গেল! যাক, তাতে কারও কিছু বলার নেই। কিন্তু কেমন করে কে যে উজ্জুর মাথার ওপরের চালাসমেত ঘরটাই নিশ্চিহ্ন করে দিল, কে জানে। মানুষটা সারারাত ভয়ঙ্কর বনের বিপদ মাথায় নিয়ে এই খোলামেলা একটা নোংরা ঝোপের ধারে পড়ে রইল। এ কী তামাশা। লোকটাকে যদি ছিঁড়ে খেত বনের হিংস্র পশু! এমন নিষ্ঠুর তামাশা করতে তোমাদের একটুও বাধল না?

আর-একবার চিৎকার করে উঠল উজ্জু, 'কার মেয়ে হারিয়ে গেছে বনে?'

কেউ সাড়া দিল না।

উজ্জুর গলার স্বরটা ভারি ক্লান্ত-শোনাচ্ছে। ও বেচারি আর চেঁচাতে পারছে না। তবু তাকে চেঁচাতেই হবে। তবু সে চেঁচাল। তারপর কোনোরকমে বনের এদিক-ওদিকের ঝোপ সরিয়ে আরও ক-পা গেল। ঠিক তক্ষুনি আবার বাজ পড়ল। চমকে উঠল উজ্জুর বুকের শিশুটি। কাঁদল না বটে, কিন্তু ছটফটিয়ে দু-হাত দিয়ে উজ্জুর গলাটি জড়িয়ে ধরল। উজ্জুও এবার বাজের শব্দে ভয় পেল। তবে কি কাছেপিঠেই কোথাও বজ্রপাত হল।

'কে হে তুমি?' বাজের শব্দের মতো তার গলার শব্দ।

সেই গলার শব্দে উজ্জু যে একটু থতমত খেয়ে যাবে, এতে আর আশ্চর্য কী! উজ্জু গলার শব্দ শুনে চোখ ফেরাতেই যে-ডাকল তাকে দেখতে পেল। উজ্জু কোনোদিনই দত্যি-দানব দেখেনি। রাক্ষস-খোক্কস, সে-ও তার দেখা নেই। ভূত-প্রেত, সে তো শুধু গল্পের বই-এ লেখা হয়। কিন্তু উজ্জুর এখন সামনে যে-দাঁড়িয়ে, সে ভূতও নয়, প্রেতও নয়। রাক্ষসও বলি না, খোক্কসও নয়। সে এক মস্ত লম্বা আর তেমনই চওড়া এক মূর্তি। তাকে দেখে উজ্জু যে শুধু থতমতই খেয়েছে, এই যথেষ্ট। ভিরমি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লেও কিছু বলার ছিল না। যা-ই বলো, উজ্জুর সাহস আছে। ভয় পাওয়া দূরে থাক, অত কষ্টেও তার মুখের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল উজ্জু। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'জানতে পারি কি, তুমি কে?'

'তোমার উত্তরটা আগে পেলে, আমার উত্তরটা পেতে তোমার দেরি হবে না।' সে তেমনই গর্জনের মতো গলা চড়িয়ে কথা বলল।

উজ্জু উত্তর দিল, 'আমি উজ্জু।'

সেই ভয়ঙ্কর দেখতে লোকটা তখন বলল, 'ও, তুমিই উজ্জু? তুমিই রাজার মেয়ে আলা-ইজাকে খুঁজতে বেরিয়েছ?'

'হ্যাঁ,' উত্তর দিল উজ্জু। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'কই, তুমি তো বললে না, তুমি কে?'

সে বলল, 'তার আগে আর-একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই। তোমার বুকের মধ্যে জড়িয়ে আছে ওই যে মেয়েটি, ওটি কে?'

উজ্জু বলল, 'আমি কুড়িয়ে পেয়েছি, এই বনেই।' বলে সঙ্গে-সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করল, 'আমার উত্তরটা এবার নিশ্চয়ই পাব।'

'পাবে।' উত্তর দিল সেই মূর্তি।

'তবে দেরি কেন?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'শোনো উজ্জু, তোমার বুকের মধ্যে ওই যে শিশুটি লুকিয়ে আছে, ওকে আমার চাই। নইলে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাবে।' যেন তার গর্জনে সারা বন কেঁপে উঠল।

'তুমি ভেবো না, তোমার ওই গর্জনে আমি ভয় পাব। তুমি কে, সেটা আগে আমার জানার কথা। তুমি সেই কথা না জানিয়ে আমাকে শাসাচ্ছ! আমাকে দেখে কি তোমার কোনওই দয়া হচ্ছে না?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'না। তোমার তো পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় হয়ে এল। তোমাকে দয়া করে কী লাভ আমাদের!' উত্তর দিল সেই অচেনা মূর্তি।

এবার উজ্জুর গলাও কর্কশ শব্দে ধমকে উঠল, 'তবে তুমিও শুনে যাও নির্দয় মূর্তি, আমিও বুকের আড়াল থেকে ছাড়ছি না এই শিশুকে। যখন তোমার জানাই আছে আমার বিদায়ের সময় এগিয়ে এসেছে, তখন তুমিও জেনে রাখো, পৃথিবীতে এখন এমন কেউ নেই যে মরণের ভয় দেখিয়ে আমাকে কাবু করতে পারে!' বলতে-বলতে উজ্জুর বুকের ভেতরটা থরথর করতে লাগল।

সেই মূর্তি তখন বলল, 'তুমি কি জানো এই শিশু কার?'

'তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি জানো,' জবাব দিল উজ্জু। 'যদি তোমার জানাই থাকে এ শিশু কার তবে যার শিশু তাকে আমার কাছে ডেকে আনো। তাকেই আমি নিজের হাতে তুলে দেব এই শিশুকে।'

'সে কারও কাছে আসে না। সে কারও দয়া ভিক্ষা করে না।' আবার গর্জে উঠল লোকটা।

'তবে ফিরে পাবে না এই শিশু।' এবার উজ্জুর গলা আরও দৃঢ় হল।

'তুমি মরবে উজ্জু।' সে বলল।

উজ্জু হেসে উঠল। উত্তর দিল, 'মরেই তো আছি।'

'শুনে রাখো উজ্জু, বনদেবী নিজে আমাকে পাঠিয়েছেন মেয়েটিকে তোমরা কাছ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। আমি বনদেবীর গুপ্তচর। মেয়েটি তাঁর আপন।' তার গর্জন যেন এবার ভাঙা স্বরে ঘং-ঘং করে উঠল।

উজ্জু মুহূর্তের জন্যে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হেসে উঠল হঠাৎ। হেসে উঠল ঠিক যেন একটি ছোট্ট শিশুর মতো। সে যেন পেয়ে গেছে তার অনেক খেলার অনেক খেলনা মুঠো-মুঠো। সে যেন আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে লাফাতে চায়। পারে না। তার গলা-ভর্তি খুশির শব্দগুলো টলমল করতে-করতে যেন টাল খেয়ে আটকে যায় গলাতেই! শুধু চোখ দুটি তার ভিজে যায় অশ্রুফোঁটায়। তারপর বলে, 'ওহে বনদেবীর গুপ্তচর, বনদেবীকে গিয়ে বলো, আমি যে তারই জন্যে অপেক্ষা করছি। তারই জন্যে তিনদিনের জীবন ভিক্ষা পেয়েছি মৃত্যুদূতের কাছে। এত তাড়াতাড়ি তার খোঁজ যে তুমি আমায় এনে দিলে, তার জন্যে তোমাকে আমার উপহার দেওয়ার মতো যে কিছুই নেই। তাকে গিয়ে বলো, উজ্জু নামে একটা মানুষ তাঁর ছোট্ট মেয়েটিকে বুকে নিয়ে অপেক্ষা করছে বনের এই গভীরে। সেই মানুষটা বনদেবীর মেয়েকে বনদেবীর কোলে দিয়ে তাঁর কাছে একটি ভিক্ষা চাইবে। সেই ভিক্ষার নাম, আলা-ইজা।'

উজ্জুর কথা বোধ হয় শেষ হল না। প্রচণ্ড শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। মনে হয়, সারা আকাশ থেকে যেন লক্ষ-লক্ষ আগুনের ফুলকি ছিটকে পড়ছে বনের আনাচে-কানাচে। প্রচণ্ড ঝড়ের হা-হা-কা-র করে উঠল সেই বনের গাছপালা। অঝোর ধারায় নেমে এল বৃষ্টি। আর দেখা গেল না বনদেবীর গুপ্তচরকে। সে যে কোথায় হারিয়ে গেল, বুঝতে পারে না উজ্জু।

এখন উজ্জু একা। এখন উজ্জুর বুকে জড়ানো একটি শিশু। এই শিশুটিকে সে এখন কেমন করে বাঁচাবে? এই ঝঞ্ঝার দাপট আর বৃষ্টির আঘাত থেকে এ-শিশুকে বাঁচাতেই হবে। কিন্তু কেমন করে? সে নিজেই তো এখন ঝড় আর বৃষ্টির আঘাতে বেদম হয়ে হাঁপাচ্ছে।

হাঁপাতে-হাঁপাতে এই আধমরা মানুষটা ঝড়ের ধাক্কা সামাল দিয়ে ঝোপ ডিঙোয়। বৃষ্টির ঝাপটায় জেরবার হয়ে সে সামনে যে কী আছে আন্দাজ করতে পারে না। আর পোশাকের হালত দেখলে, তোমারই মনে হবে, হায় রে, নিজের একটা পোশাক যদি দেওয়া যেত মানুষটাকে! জলে আর কাদায় মানুষটাকে আর উজ্জু বলে চেনাই যায় না। না-ই চেনা যাক। ঝড় তাকে যত পারে আঘাত করুক। বৃষ্টি তাকে ধুয়েমুছে ফেলুক, তবু সে কিছুতেই আঘাত করতে দেবে না শিশুটিকে। নিজের সমস্ত বুকখানা আড়াল করে সে তাকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু তবুও কি পারা যায়? পারা সম্ভবও নয়। এই ঝড় আর বৃষ্টির তাণ্ডব যে কী ভয়ঙ্কর, যে কখনও চোখে দেখেনি, সে কেমন করে বুঝবে! এই তাণ্ডবের ধাক্কায় উজ্জু কখনও হোঁচট খায়। কখনও কাদায় পিছলে পড়ে। কখনও মেয়েটিকে একহাতে বুকে জড়িয়ে, আর-একহাতে মাটি খামচে গাছের নীচে বসে পড়ে। বসে-বসে অমন করে কেন দম ফেলে উজ্জু। বুকের ভেতরটা কেন বারবার ধড়ফড় করে ওঠে তার! তবে কি মৃত্যুদূতের আসার সময় হয়ে গেছে? এ কী তবে মৃত্যুদূতেরই কারসাজি!

'ওহে উজ্জু, তোমার ওই বুকের শিশুটিকে তোমার বুকের আড়াল থেকে সরিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দাও। নইলে আমি থামছি না।' কার গলা যেন গাছের গায়ে ধাক্কা দিয়ে ফিরে এল উজ্জুর কানে।

উজ্জু ফিরে তাকাল। আকাশভাঙা বৃষ্টির দুর্যোগে আবছা হয়ে আছে চারদিক। সে কিছুই দেখতে পায় না। কাউকেও ন। তবুও উজ্জু বুকটাকে শক্ত করে চেঁচিয়ে উঠল, 'কে তুমি? কে আমাকে ভয় দেখাও! জানো না, আমি ভয়কে গ্রাহ্য করি না!'

সে বলল, 'আমার নাম ঝঞ্জা। পৃথিবী আমার নামে কাঁপে। আমার আঘাতে আমি চুরমার করে ফেলি পাহাড়। আঘাতে-আঘাতে আমি উত্তাল করি সমুদ্র। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দিতে পারি শহর, নগর। ভেঙে তছনছ করে দিতে পারি মানুষের অহঙ্কারের তৈরি প্রাসাদগুলো। তুমি এত দম্ভ দেখাও কোন সাহসে? তুমি তো একটা নেহাতই বৃদ্ধ থুত্থুড়ো।'

'ওহে, ঝঞ্ঝা, তুমি ঠিকই বলেছ, আমি একটা নেহাতই বৃদ্ধমানুষ। তোমার যদি এতই শক্তি, তবে দাও না তুমি আমাকে পাহাড়ের মতো টুকরো করে! সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে আমাকে ভাসিয়ে, ভেঙে তছনছ করে ছুড়ে ফেলে দাও! তবু শুনে রাখো, এই শিশুকে আমার বুক থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। তুমি যদি পারো তো নিয়ে চলো আমাকে বনদেবীর কাছে। এ শিশু যদি সত্যিই বনদেবীর হয়, তবে কথা দিচ্ছি আমি, তারই হাতে ফিরিয়ে দেব এই শিশুকে। কিন্তু এক শর্তে। তাকেও ফিরিয়ে দিতে হবে রাজার মেয়ে আলা-ইজাকে। আমি জানি, বনদেবী তাকে মায়াবলে হরিণ করে রেখেছে!'

ঝঞ্ঝা দুরন্ত শক্তিতে বইতে-বইতে বলল, 'তবে তাই হোক, তোমাকে আমি নিশ্চিহ্ন করে ফেলব। তোমার দেমাককে আমি ঘুচিয়ে দেব চিরকালের মতো!' বলে শনশন আওয়াজ তুলল ঝঞ্ঝা।

উজ্জু ঝঞ্ঝার শক্তির সঙ্গে লড়াই করার জন্যে গাছের আড়ালে-আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। ঝঞ্ঝার আঘাতে গাছ ভেঙে যায়। ঝোপের ঘুপচি কোণে গা ঢাকা দেয় উজ্জু। ঝঞ্ঝার দাপটে ঝোপ উড়ে যায়। ছুটতে যায় উজ্জু, পালাতে যায়। ঝঞ্ঝার আঘাতে ছিটকে পড়ে বনের এক ভয়ঙ্কর গর্তে বুকের শিশুটিকে বুকে নিয়েই। তারপর আর কিছু জানে না। সে বোধ হয় জ্ঞান হারাল।

১১

কতক্ষণ পরে যে উজ্জুর জ্ঞান ফিরল, উজ্জু জানে না, হঠাৎই তার কষ্টের শব্দগুলি মুখ দিয়ে যখন বেরিয়ে এল, তখনই কে যেন সাড়া দিল। কে যেন ভারি আদরমাখা স্বরে তাকে জিজ্ঞেস করল, 'তোমার কষ্ট হচ্ছে উজ্জু?' সে এক মেয়ের কণ্ঠ।

উজ্জু ধড়ফড় করে উঠতে গেল। তার শক্তিতে কুলোল না। সে শুধু দেখল, তার চারপাশ ঘিরে জমাট অন্ধকারে ঝাঁক-ঝাঁক জোনাকি উড়ছে। যেদিকে তাকাও দেখবে, অসংখ্য জোনাকির আলোর বিন্দুগুলি টুপটাপ নিভছে, জ্বলছে। আর অন্ধকারের বুক ছুঁয়ে-ছুঁয়ে নেচে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট জোনাকির একটু-একটু আলোয় কতটুকুই-বা আঁধার কাটে। আবছা আলোয় কাউকে তেমন দেখা যায় না। শুধু ছায়া। সেই ছায়ার দিকেই তার চোখ পড়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কে?'

'আমি বনদেবীর রাতের সহচরী।'

'তুমিই বুঝি জোনাকির আলো রাতের বনে ছড়িয়ে দাও?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'হ্যাঁ, জোনাকির আলো দেখে-দেখে বনদেবী বাতাসের পাখনায় ভেসে বেড়ান যে?' সে উত্তর দিল।

উজ্জু শুয়ে-শুয়ে কেমন যেন ব্যস্ত হয়ে, এদিক-ওদিক হাতড়ে কিছু খোঁজবার চেষ্টা করল, তারপর আঁতকে উঠে বসে পড়ল।

তখনও তার হাত দুটি মাটি ছুঁয়ে ছটফট করছে।

সে জিজ্ঞেস করল, 'কিছু খুঁজছ?'

'আমার বুকের শিশুটি কোথায় গেল?' অস্থির হয়ে যেন বুজে আসছে তার গলার স্বর।

সে বলল, 'আছে।'

'কোথায়?'

'ওই তো, তোমারই পাশে।'

'আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন? আমার কোলে তুলে দাও!'

'এই তো! ধরো!' বনদেবীর রাতের সহচরী উজ্জুর কোলে তাকে শুইয়ে দিল।

'আঃ! মেয়েটি ঘুমোচ্ছে।' একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে উজ্জু তার মুখখানি দেখবার চেষ্টা করল।

'তুমি জানো মেয়েটি কার?' রাতের সহচরী জিজ্ঞেস করল।

'জানি,' উত্তর দিল উজ্জু, 'বনদেবীর।'

'তুমি কোথা থেকে পেলে?'

'বন থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি।'

'তুমি যদি জানোই মেয়েটি বনদেবীর, তবে তুমি যার মেয়ে তাকে ফিরিয়ে না-দিয়ে, নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছ কেন? লোকে তো তোমায় চোর বলবে।'

চোর! যে-লোকটা কোনোদিন একটিও অসৎ কাজ করেনি, যে-লোকটা ভালো ছাড়া মন্দ জানে না, তাকে চোর বললে সে কি সহ্য করতে পারে! উত্তেজনায় থরথর করে কেঁপে উঠল উজ্জু। বনদেবীর সহচরীর দিকে এক ভয়ঙ্কর দৃষ্টি হেনে রুখে উঠল। জোনাকির ছড়িয়ে-পড়া আবছা আলোয় উজ্জুর সেই চাউনি দেখে, সহচরীর বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে যায়। উজ্জু রুক্ষ স্বরে ধমকে উঠল, 'তোমায় কে বলেছে আমি চোর? কে বলেছে, এ মেয়েকে আমি নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছি? বনদেবী কি কানে শোনে না? আমি যে তখন অত চিৎকার করে 'কার মেয়ে, কার মেয়ে' বলে ডাকাডাকি করেছি, সে কি তার কানে ঢোকেনি? তখন তো কেউ আমার কাছে এসে বলেনি, 'এ মেয়ে আমার। ফেরত দাও!' বনদেবীর যদি সাহস থাকত, তবে আমার সামনে এল না কেন? না, সে আসবে না। কারণ সে নিজেই যে রাজার মেয়ে আলা-ইজাকে অভিশাপ দিয়ে হরিণ করে রেখেছে। সে জানে, আমি আলা-ইজাকে উদ্ধার করতে এসেছি। তাই সে ঝঞ্ঝার তাণ্ডবে আমাকে নাকাল করে তার মেয়েকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়। শুনে রাখো বনদেবীর রাতের সহচরী, আমায় তুমি যদি বলো চোর, তবে আমিও তাকে বলি নিষ্ঠুর। তুমি ইচ্ছে করলে তাকে দেওয়া আমার এই অপবাদটা এখনই তার কানে পৌঁছে দিতে পারো। আর সেইসঙ্গে এ-কথাটা বলে দিয়ো, তাকে নিষ্ঠুর বলে অপবাদ দিতে আমার বুক কাঁপেনি। আমার মৃত্যুর সময় হয়েই এসেছে। আমি মরণকে ভয় পাই না, তো বনদেবী! ফুঃ! শুধু মরতে-মরতে আমি একটি কথা বলে যাব, 'অন্যায় আমি কিছুই করিনি। একটি ছোট্ট শিশুকে ভালোবাসা যদি অন্যায় হয়, তবে সে-অন্যায় আমি বারবার করব। শিশুকে আমি ভালোবাসবই।' আর এ-কথাটাও তাকে বলে দিয়ো, বনদেবী আমায় যদি দেখা না-দেয়, আমার আলা-ইজাকে যদি শাপমুক্ত করে আবার তাকে মানুষ না-করে দেয়, তবে আমিও বনদেবীর এই কন্যাকে আমার মৃত্যুর সঙ্গী করে নেব।'

উজ্জুর কথা শুনে বনদেবীর রাতের সহচরী আঁতকে উঠেছিল কি না বোঝা গেল না। তবে কয়েক মুহূর্ত সে কোনো কথাই বলল না। বুঝি-বা উজ্জুর হুঙ্কারে থতমত খেয়ে গেল! হয়তো তাই। কেননা, তখন সেই অন্ধকারে জোনাকির আবছা আলোয় তার মুখখানা দেখলে তোমারও হাসি পেয়ে যেত। সে-মুখ সত্যিই রাতের মতো নিথর।

'আমি এখন কোথায় আছি, জানতে পারি কি?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'গহ্বরে।' রাতের সহচরী উত্তর দিল।

'কেন?'

'বনদেবী তোমাকে এখানে বন্দি করেছেন।'

'আমার দোষ?'

'তুমি বনের বাতাস দূষিত করছ। আর সেইসঙ্গে তার মেয়েকে…'

কথা শেষ হওয়ার আগেই উজ্জু বলল, 'চুরি করেছি।'

রাতের সহচরী কোনো কথা বলল না।

উজ্জুই জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা দ্যাখো, একটা কথা আমার মাথায় কিছুতেই আসছে না। ঝঞ্ঝার আঘাতে আমি জ্ঞান হারালুম। আমি গহ্বরে বন্দি হলুম। অথচ বনদেবী আমাকে অজ্ঞান দেখেও, তার মেয়েকে আমার কাছ থেকে উদ্ধার করল না। আমার কাছেই তাকে রেখে দিল। এটার মানে কী?'

'মানে তো খুবই সহজ। তুমি যে তার মেয়েকে হরণ করেছ, এটাই প্রমাণ করা।' উত্তর দিল রাতের সহচরী।

'বাঃ! তা হলে তোমাদের বনদেবী শুধু নিষ্ঠুর নয়, একজন ধুর্তও বলা যায়।' বলতে গিয়ে উজ্জু ভুরু কোঁচকাল।

হঠাৎ বনদেবীর রাতের সহচরী একটা আশ্চর্য কথা জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা উজ্জু, তোমার কি বাঁচতে ইচ্ছে করে না?'

'মানে!'

'ধরো, এখনই যদি তুমি একটি যুবক হয়ে যাও!' জবার দিল সহচরী। 'ধরো, এখনই যদি তুমি ফিরে পাও সেই হারিয়ে যাওয়া শক্তি! তোমার গায়ের পেশিগুলি যদি আবার শক্তিতে ভরপুর হয়ে ফুলে ওঠে! তোমার চোখের দৃষ্টি যদি আবার তুমি ফিরে পাও যুবকের মতো! তুমি যদি ছুটতে পারো, খেলতে পারো, হাসতে পারো, ঝরনার মতো, পাহাড়ি নদীর মতো অথবা ঝড়ের আঘাতে বনের গাছের মতো! তবে, তোমার মৃত্যুর দিনগুলিও তো অনেক পিছিয়ে যাবে! মৃত্যু তোমায় ছুঁতেই পারবে না!'

উজ্জু হাসল। মুচকি।

চোখ এড়াল না সহচরীর। সে বলল, 'হাসছ কেন? ভাবছ মিথ্যে?'

'না,' উত্তর দিল উজ্জু, 'না, মিথ্যে ভাবছি না। ভাবছি এমন দয়া কে আমায় করবে?'

'বনদেবী।' সে উত্তর দিল।

'বনদেবীর এত শক্তি?' উজ্জু জিজ্ঞেস করল।

'শক্তি আছে বলেই তো বনদেবী তোমাকে এ-কথা জিজ্ঞেস করার ভার দিয়েছেন আমাকে।' সহচরী জবাব দিল।

'শুধুমুধু বনদেবী আমাকে যুবক করে দেবে?'

'না। শুধুমুধু নয়। একটা শর্ত আছে।'

'শর্ত!' অবাক হল উজ্জু। জিজ্ঞেস করল, 'কী সেই শর্ত?'

সহচরী উত্তর দিল, 'আলা-ইজাকে আবার মানুষ করে দেওয়ার আর্জি তোমার ছাড়তে হবে।'

'চমৎকার! ভারি চমৎকার শর্ত!' একটু যেন রঙ্গ করেই জবাব দিল উজ্জু। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল, 'শোনো সহচরী, তোমার বনদেবীকে গিয়ে বলো, যৌবন ফিরে পাওয়ার কোনোই লোভ নেই আমার। আমি বৃদ্ধ হয়েছি। তার মানে পৃথিবী ছেড়ে এবার আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি না-গেলে পৃথিবীর মাটিতে আর-একটি নতুন মানুষের জায়গা হবে কী করে? ওহে সহচরী, তোমার বনদেবীকে এ-কথাও বলে দিয়ো, তার মেয়েকে আমি ঝঞ্ঝার আঘাত থেকে রক্ষা করেছি এই কারণে। সে এক নতুন মানুষ। আর এও বলে দিয়ো, আলা-ইজার জন্যে আমি প্রাণপাত করছি সেই একই কারণে। সেও এক নতুন মানুষ। তাকেও বাঁচাতে হবে আমায়। একটি সবুজ গাছের প্রাণ যেমন অনেক প্রাণের বন্ধু—তেমনই একটি ছোট্ট শিশুর জীবন, অনেক জীবনের আশা। সে মানুষের ভালো করবে। পৃথিবীকে ভালোবাসবে।'

এতক্ষণ এত যে আলো ছড়িয়ে অসংখ্য জোনাকি চারদিকে ওড়াউড়ি করছিল, কখন যে তারা একটি-একটি করে হারিয়ে গেল, উজ্জু খেয়ালই করতে পারেনি। এমনকী, এতক্ষণ বনদেবীর রাতের সহচরীর যে আবছা মূর্তি সে দেখতে পাচ্ছিল, তাও আর দেখা যাচ্ছে না। জোনাকির আলোর সঙ্গে-সঙ্গে সে-ও যেন অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। এ কী! এতক্ষণ বনদেবীর যে-মেয়েটিকে সে নিজের বুকের কাছে আগলে রেখেছিল, সেই-বা গেল কোথায়? কথা বলতে-বলতে তবে কি উজ্জু বড্ডই আনমনা হয়ে পড়েছিল?

উজ্জুর বুকটা শিউরে উঠল। সে হাত বাড়াল। অন্ধকার হাতড়ে সে খুঁজতে লাগল বনদেবীর মেয়েকে। আর হদিস পেল না। তারপর সে ডাক দিল। ডাক দিল খুবই নিচু স্বরে, 'সহচরী! বনদেবীর রাতের সহচরী!'

কেউ সাড়া দিল না।

উজ্জু ডাকল। আবার ডাকল। অনেকবার ডাকল। সেই অন্ধকার গহ্বর থেকে এখন কেউ সাড়া দিল না। কেউ এগিয়েও এল না। তবে কি তার সব প্রতিজ্ঞা মিথ্যে হয়ে গেল? এই অন্ধকারেই কি তবে মৃত্যুদূত এসে তার হাত ধরে বলবে, 'চলো?'

সত্যি বলতে কী, এই অন্ধকার গহ্বরে আটকে থাকলে, কে বলবে ক-টা দিন কাটল! এখানে দিনের আলোও যেমন দেখা যায় না, তেমনই রাতের তারাও চোখে পড়ে না। মনে হয় যেন আলো-আঁধারের সব পথই বন্ধ। এ যেন অন্ধকারের বন্দিশালা। খানিক পরে হয়তো বাতাসও আর ঢুকবে না। তখন কী হবে?

থাকতে পারল না উজ্জু। ঝঞ্ঝার দাপটে বেচারির সারা শরীরে কী ভীষণ যন্ত্রণা! এতক্ষণ বুঝতে পারেনি। এবার উঠে দাঁড়াতেই টনটন করে উঠল কোমর থেকে পা পর্যন্ত। না, এ যন্ত্রণা গ্রাহ্য করা নয়। তাকে যেমন করেই হোক গহ্বরের বন্দিশালা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর তাই সে পড়তে-পড়তে কিংবা বলা যায় মরতে-মরতে পথের হদিস করতে লাগল। অন্ধকারে গহ্বরের দেয়াল ছোঁয়ার সে চেষ্টা করে। পারে না। কখনও সে হামাগুড়ি দেয়। কখনও সে গড়িয়ে-গড়িয়ে নাকাল হয়ে যায়। কখনও তার দম আটকে আসে। তবুও সে একটু আলোও দেখতে পায় না।

১২

এমনই করে বোধ হয় আরও একটা দিন কেটে গেল। বোধ হয় আজকের দিনটাই শেষ দিন। কেননা, আজ যেন তার সব শক্তিই শেষ হয়ে এসেছে। গহ্বরের অন্ধকারে পড়ে আছে একটা পাথরের টুকরোর মতো ছিটকে-ছড়িয়ে। মনে হয়, কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে। কথাই-বা বলবে কার সঙ্গে। কাকেই বা বলবে, 'একটু জল দেবে আমাকে?'

এখন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উজ্জুর আর কোনও কিছুই করার নেই। তার সব আশাই মিথ্যে হয়ে গেল। সে পারল না তার ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজাকে উদ্ধার করতে। যে-কথা দিয়ে সে রাজার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এই বনে আলা-ইজাকে খুঁজতে এসেছিল, সেও বুঝি ব্যর্থ হয়ে গেল। কে জানে আর কত দেরি মৃত্যুদূতের আসার। এখন মনে হয়, মৃত্যুদূত যত তাড়াতাড়ি আসে ততই ভালো। এই তিনটে দিন যেন মনে হচ্ছে কত লম্বা, কত দূরের পথ। শেষ হতে চায় না। সব মানুষেরই বোধ হয় এমন হয়। যখন বিফল হয়ে যায় তার সব স্বপ্ন, তার চেষ্টা, তখনই যেন বয়সও তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। তখন যেতে পারলেই বাঁচে সে। কিন্তু কপালে যদি আরও দুর্ভোগ থাকে, তবে উজ্জু মরতে চাইলেই কি মরতে পারবে? সুতরাং এখন, একা এই অন্ধকারে মৃত্যুদূতের পথ চেয়ে তাকে পড়ে-পড়ে সময় গুনতে হবে।

আচ্ছা, মনে হচ্ছে কি, যেন কারও পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কি, অনেকদূর থেকে অন্ধকার টপকে আবছা-আবছা আলো ভেসে আসছে। এইদিকেই! গহ্বরের অন্ধকার গর্তের এবড়ো-খেবড়ো পথ বেয়ে!

ছটফট করে উঠল উজ্জুর চোখ দুটি চমকে উঠল তার সারা শরীর। তবে কি মৃত্যুদূত এসে গেল! তবে কি এবার সে একটু উঠে বসবে?

কষ্ট হল তার। তবু উঠে বসল উজ্জু।

আলোর দীপ্তি বাড়ছে।

তুমি কি এবার দেখতে পাচ্ছ উজ্জুর মুখখানা?

এখনও পাচ্ছ না? তবে আর কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করো।

এবার? আলোর রেখা ওই তো এবার সরাসরি উজ্জুর মুখেই এসে পড়েছে! আহা রে, দ্যাখো, দ্যাখো এই ক-দিনে লোকটার মুখের চেহারা কী হয়েছে? উসকো--খুসকো মাথার চুল। কোটরে ঢুকে গেছে চোখ। চোয়াল ভেঙে বসে গেছে গালের ভেতর। মুখখানা শুকনো এইটুকু।

'উজ্জু!'

কে ডাকল?

চমকে উঠল উজ্জু। ফিরে তাকাতেই তার চোখে যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। সারা গহ্বরটা নিমেষের মধ্যে আলোয়-আলো হয়ে গেছে। এবার জোনাকি নয়। এ যেন সবুজ আলোর ঝলমল-আভা ছড়িয়ে কোনো এক সবুজ সুন্দরী তার সামনে এসে দাঁড়াল। তার পরনে রেশমি সবুজ পোশাক। তার সারা অঙ্গে সবুজ ফুলের গয়না। তার চোখের তারায় আর চলার ছন্দে আলোর রোশনি দোলা দেয়। নিকষ কালো অন্ধকার-ঢাকা গহ্বরটা এখন আলোয় উছলে উঠেছে।

'উজ্জু!' সেই সবুজ সুন্দরীর গলার শব্দে যেন অনেক জলতরঙ্গ একসঙ্গে বেজে উঠল।

উজ্জু ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকাতেই চোখ ঝলসে গেল।

'উজ্জু!' সে আবার ডাকল। তারপর বলল, 'তুমি যাকে খুঁজছ আমিই সেই। আমি বনদেবী।'

'বনদেবী!' অস্ফুট স্বরে উজ্জুর মুখ থেকে যেন অনেক বিস্ময় ছড়িয়ে কথাটা বেরিয়ে এল, 'তুমিই বনদেবী?'

'হ্যাঁ।'

'তুমিই আমার ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজাকে হরিণ করে রেখেছ?'

'হ্যাঁ উজ্জু, আমিই।'

'তোমার এত রূপ! তোমার এত আলো! তোমার মুখের শব্দে এত ঝরনা ঝরানো ভালোবাসার সুর, তুমি এমন কাজ করতে পারো, এ যে আমি বিশ্বাস করতে পারি না বনদেবী! যে এমন ভালোবেসে ডাক দেয় আমার নাম ধরে, সে কেমন করে নিষ্ঠুর হয়!' একেবারে হতবাক হয়ে গেল যেন উজ্জু।

'উজ্জু,' বনদেবী উত্তর দিল, 'তোমার রাজার চেয়েও কি আমি নিষ্ঠুর? তোমার রাজার চেয়েও কি আমি নির্দয়? উজ্জু, কোনো রাজা যদি নিজের সন্তানের প্রাণ বাঁচানোর জন্যে আমার সন্তানের প্রাণ নেয়, তবে আমি কেমন করে তা সহ্য করতে পারি, তুমি তা বলতে পারো? কী দোষ করেছে আমার হরিণের দল? কী দোষ করেছে আমার গাছগাছালি? কী দোষ করেছে আমার গাছের পাখপাখালি? জীবজন্তু? তারা তো কোনোদিন ভালো ছাড়া মন্দ করে না মানুষের? কেন তাদের কপালে কুড়ুলের কোপ পড়ে? কেন তাদের হত্যা করা হয়? কেন তাদের শিকার করে মানুষ তার শক্তির দম্ভ দেখায়? আমি যদি তার প্রতিশোধ নিই, তবে অন্যায়টা আমার কোথায়? আঘাত আর কতদিন সহ্য করতে পারি আমি? তোমার রাজা কি জানে না, তোমার রাজার প্রজারাও কি জানে না, আঘাত করলে, একদিন সেই আঘাত তাদেরই দিকে ফিরে যায়?'

এবার উজ্জু কথা বলল, 'কিন্তু বনদেবী, রাজা দোষ করেছে বলে, তুমি রাজার ছোট্ট মেয়েটিকে অমন করে অভিশাপ দিয়ে হরিণ করে দিলে কেন? এ তোমার কেমন বিচার! বনদেবী, সে তো তোমারই হরিণ-শিশুটিকে ভালোবেসেছিল। সে তো তোমারই হরিণ-শিশুটিকে তোমারই কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সকলের দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে এই বনে এসেছিল। কিন্তু তুমি কেন তাকে শাস্তি দিলে? তুমি কেন ভাবলে, রাজা একদিন হরিণরূপী তার মেয়েটিকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করলে তোমার প্রতিশোধ নেওয়া সফল হবে?'

'উজ্জু,' উত্তর দিল বনদেবী, 'বোধ হয় আমি ঠিক করিনি। উজ্জু, এ-কাজটা বোধ হয় একটি শান্ত, নিরীহ আর দয়ালু রাজকন্যার প্রতি আমার চরম অবিচার হয়ে গেছে। এ আমার ভুল, অত্যন্ত ভুল! আমার দুঃখের শেষ নেই রাজকন্যা আলা-ইজার জন্যে।'

'বনদেবী, যে-অভিশাপ দিয়ে তুমি একটি নিরীহ মেয়েকে হরিণ করেছ, সেই অভিশাপ তুমি ফিরিয়ে নাও। তুমি আবার তাকে মানুষ করে দাও! আমার মৃত্যুর আগে এই আমার শেষ অনুরোধ তোমার কাছে।' ভারি আকুল হয়ে বলল উজ্জু।

বনদেবী কোনো কথা বলতে পারল না কিছুক্ষণ। একেবারে নির্বাক হয়ে রইল।

বনদেবীকে অমন করে চুপ থাকতে দেখে উজ্জুই আবার বলল, 'আমার অনুরোধটা কি তোমার পছন্দ হল না বনদেবী?'

'হায়! হায়! হায় রে! উজ্জু, আমি অভিশাপ দিতে পারি, কিন্তু ফিরিয়ে নিতে জানি না যে!' কেমন যেন এক আহত পাখির মতো চিৎকার করে উঠল বনদেবী।

কেঁপে উঠল উজ্জুর বুক। সে-ও আর্তনাদ করে উঠল, 'এ কী বলছ তুমি বনদেবী?'

'হ্যাঁ উজ্জু, আমি ঠিকই বলছি। মানুষকে হরিণ করার অভিশাপ দেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে, কিন্তু হরিণকে মানুষ কেমন করে করতে হয়, তা তো আমার জানা নেই?' উত্তর দিল বনদেবী অপরাধীর মতো।

একটি মানুষকে হয়তো আর কিছুক্ষণ পরে মৃত্যুদূত হাত বাড়িয়ে ডাক দেবে। সুতরাং বলতে পারো সে প্রায় আধমরা হয়েই সময় গুনছে। কিন্তু সেই আধমরা মানুষটাই বনদেবীর উত্তর শুনে এমন যে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে, এ ভাবা যায় না! দুর্বল শরীরে কত জোরে সে আর চেঁচাতে পারে! কিন্তু শুনলে অবাক হয়ে যাবে, সে হঠাৎ গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। বনদেবীকে ধিক্কার দিয়ে বলে উঠল, 'ধিক, ধিক তোমাকে। তুমি দেবী নও, তুমি রাক্ষুসী। তুমি এক্ষুনি চলে যাও আমার সামনে থেকে। আমার মরবার আগে তোমার অশুভ মুখ আমায় আর না দেখতে হয়। যাও, যাও! এক্ষুনি তুমি বিদায় হও। ওই ফুলের মতো একটি মেয়ে আলা-ইজার জন্যে আমাকে এই গহ্বরের অন্ধকারে একা-একা একটু কাঁদতে দাও! আমার আর কিছু চাইবার নেই তোমার কাছে।' বলতে-বলতে উজ্জু বোধ হয় কেঁদেই ফেলল। কেননা, দেখা গেল তার অশ্রুফোঁটাগুলি বনদেবীর আলোর আভায় তার গালের ওপর মুক্তোর মতো ঝলসে উঠেছে।

সঙ্গে-সঙ্গে গহ্বরে আবার অন্ধকার নেমে এল। চোখের পলকে বনদেবী সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। মিলিয়ে গেল তার আলোর ঝলকানি। সেখানে একা পড়ে রইল উজ্জু। একা পড়ে-পড়ে আলা-ইজার জন্য অন্ধকারে চোখের জল ফেলতে লাগল। তারপর যখন তার চোখের সব জলই নিঃশেষ হয়ে গেল, তখন যেন কেমন আচ্ছন্ন হয়ে তার চোখের পাতা মুদে এল। আর বুঝি সে পারছে না। মৃত্যুদূতের আসার সময় এখনও কি হয়নি? এখনও কি তিনদিন সময় কাটেনি? আর কষ্ট না দিলেই কি নয়? মানুষটার বয়েস দেখেও কি তোমাদের দয়া হয় না? এতদিনেও কি তিনদিন শেষ হল না?

অন্ধকার। শুধুই অন্ধকার। অন্ধকারে ডুবে আছে উজ্জু। তার নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ কানে আসছে না।

এক টুকরো আলোও আর দেখা যাচ্ছে না কোথাও, কোনোখানে। এমনকী, একটি জোনাকিও আর শূন্যে আলোর লুকোচুরি খেলতে-খেলতে ভেসে বেড়াচ্ছে না এই গহ্বরের ভেতরে। তারাও কি তবে জানতে পেরেছে বৃদ্ধ মানুষটার সময় হয়ে এসেছে! হয়তো তাই।

'উজ্জু!'

কে ডাকল! অন্ধকারটা তার গলার শব্দে অমন থিরথির করে চমকে উঠল কেন?

'উজ্জু!'

আবার সে ডাকল। বোধ হয় সে এগিয়ে এল উজ্জুর আরও কাছাকাছি। অন্ধকারে উজ্জুর চোখের দৃষ্টি যেন তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে আঁকপাক করে।

'উজ্জু, আমি এসেছি। আমি মৃত্যুদূত। এবার তোমায় যেতে হবে।'

গহ্বরের অন্ধকারে প্রতিধবনি উঠল, যেতে হবে.......যেতে হবে....হবে....হবে......।

উজ্জু এবার কথা কইল। ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল, 'মৃত্যুদূত, তুমি এসেছ? তিনদিন কাটতে তোমার এতদিন লেগে গেল?'

মৃত্যুদূত জবাব দিল, 'না উজ্জু, তিনদিন কাটতে ঠিক দিনই লেগেছে। মানুষ যখন কষ্টে পড়ে, তখন তার কষ্টের দিনগুলো মনে হয় অনেক বড়ো, কাটতেই চায় না। এসো, এবার আমার হাত ধরো। তোমার আর কষ্ট থাকবে না।'

উজ্জু তেমনই ক্ষীণ স্বরে বলল, 'এই অন্ধকারে তোমার হাত তো আমি দেখতে পাচ্ছি না। ধরব কেমন করে?'

মৃত্যুদূত উত্তর দিল, 'এই যে, আমি তোমার হাতে হাত রাখছি।'

মৃত্যুদূত উজ্জুর হাতে হাত রাখতেই, উজ্জুর ক্লান্তি যেন নিমেষে কোথায় দূর হয়ে গেল। মৃত্যুদূতের হাত ধরে উজ্জু নিজেই উঠে দাঁড়াল। এখন কত সহজেই একটি-একটি পা ফেলল উজ্জু। এগিয়ে চলল, অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর দিকে।

কয়েক পা এগিয়েই হঠাৎ আবার মৃত্যুদূতই ডাক দিল, 'উজ্জু!'

'কেন?'

'স্বর্গে যাওয়ার আগে পৃথিবীর কাছে তোমার কি কিছুই চাইবার নেই?' জিজ্ঞস করল মৃত্যুদূত।

'না।' গলা ঝাঁঝিয়ে উত্তর দিল উজ্জু। বলল, 'পৃথিবী বড়ো নির্দয়।'

'নির্দয় কেন বলছ?' জিজ্ঞেস করল মৃত্যুদূত। 'তার দয়াতেই তো তুমি এতদিন বাতাসের শ্বাস বুকে নিয়ে বেঁচে ছিলে?'

'আবার তারই আক্রোশে এই গহ্বরে আমায় বন্দি করা হয়েছে। কেন, আমি তো কোনো দোষ করিনি!' উত্তর দিল উজ্জু। 'না, আমি পৃথিবীর কাছে কোনো কিছুই চাইব না। তুমি যদি সাহস দাও, তোমার কাছে আমি একটি ছোট্ট ভিক্ষা চাইতে পারি।'

'তোমার প্রাণ?' জিজ্ঞেস করল মৃত্যুদূত।

'না মৃত্যুদূত, প্রাণ নয়। তোমার সঙ্গে স্বর্গে যাওয়ার আগে আমি একটিবার বনদেবীর অভিশাপে হরিণ হয়ে আছে আমার যে ছোট্ট বন্ধু, সেই আলা-ইজাকে একবার দেখতে চাই। এই ভিক্ষা কি তুমি দিতে পারো না?'

'পারি। এসো আমার সঙ্গে।'

মৃত্যুদূতের হাত ধরে উজ্জু যখন গহ্বর থেকে বেরিয়ে এল, তখনও একটি-দুটি তারা আকাশে ফুটে ছিল। আর খানিক পরেই ভোর হবে। সূর্য উঠবে। কিন্তু তবুও এই শেষরাতের আবছা আলোয় উজ্জু মৃত্যুদূতের মুখখানা দেখতে পেল না। শুধু তার হাতের স্পর্শটাই উজ্জুর হাত জড়িয়ে ধরছিল।

আঃ! এখন ভারি ভালো লাগছে উজ্জুর। গহ্বরের বাইরে এই খোলা আকাশের নীচে মৃদু-মৃদু বাতাস গায়ে লাগছে। শিশিরভেজা ঝরাপাতা পায়ে লাগছে। মনে হচ্ছে, যেন অনেক দুঃখের পর সুখের দিন ফিরে আসছে।

হঠাৎ অদৃশ্য সেই মৃত্যুদূত জিজ্ঞেস করল, 'এখন এই খোলা আকাশের বাতাস তোমার কেমন লাগছে?'

'খুব ভালো।' উত্তর দিল উজ্জু।

'এই শিশিরের আলতো ছোঁয়া তোমার কেমন লাগছে?'

'আরও ভালো।'

'বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ পাচ্ছ?'

'পাচ্ছি।'

'কেমন লাগছে?'

'ভারি মিষ্টি।'

'বুনো ফুলের গন্ধ নাকে আসছে না?'

'হ্যাঁ, আসছে।'

'মনে হয়, তা-ও ভালো?'

'ভালো, ভালো, সত্যি ভালো।'

'আকাশ দেখতে পাচ্ছ উজ্জু?'

'হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি। ভোর হয়ে আসছে। ওই দ্যাখো শুকতারা। শোনো মৃত্যুদূত, পাখিরা কাকলি শুরু করে দিয়েছে! আকাশ রঙিন হয়ে উঠছে। আঃ! কী সুন্দর! চারদিক রঙিন আলোয় উপচে উঠছে। মৃত্যুদূত, ওই দ্যাখো ঝাঁক-ঝাঁক মৌমাছি কেমন গুনগুন করে উড়ে চলেছে। আঙুরলতায় কত আঙুর। আনারদানায় গাছ কেমন ভরে আছে।'

'উজ্জু, তা হলে বোধ হয় তোমার রাগটা ঠিক নয়!' মৃত্যুদূত যেন ঠাট্টার ছলে জিজ্ঞেস করল উজ্জুকে।

'কীসের রাগের কথা তুমি বলছ মৃত্যুদূত?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'তুমি যে তখন রাগ করে বললে, পৃথিবী বড়ো নির্দয়।' উত্তর দিল মৃত্যুদূত। তারপর বলল, 'শুনে রাখো উজ্জু, পৃথিবী নির্দয় নয়। কখনওই নয়। পৃথিবীর সব সন্তানের সেরা সন্তান হল মানুষ। পৃথিবী তার সমস্ত সম্পদ উজাড় করে তুলে দিয়েছে মানুষের হাতে। কিন্তু সেই মানুষই এখন নির্দয়ের মতো আঘাত করে পৃথিবীকে ধবংস করে ফেলতে চায়। পৃথিবীর ভারি আদরের মেয়ে বনদেবী। তার সংসার সবুজ বন। সেই বনের যত পশু, যত পাখি, যত গাছ, যত ফুল, সব তার সন্তান। সেই বনদেবীর সন্তানকে আঘাত করা মানেই তো পৃথিবীকে কষ্ট দেওয়া! শোনো উজ্জু, নির্দয় পৃথিবী নয়, নির্দয় মানুষ।'

মৃত্যুদূতের কথা শুনতে-শুনতে কেমন যেন আনমনা হয়ে গিয়েছিল উজ্জু মুহূর্তের জন্যে। সে খেয়ালই করেনি তার পেছনে ছুটে এসেছে তখন অগুনতি হরিণের দল। তারা ছুটছে, খেলছে, নাচছে। তাদের চোখ-ভর্তি খুশির চাউনি। গা-ভর্তি রঙিন নকশা। মাথায় সাজানো আঁকাবাঁকা শিং।

'ওই দ্যাখো উজ্জু।' মৃত্যুদূতই বলল, 'ওই দ্যাখো, তোমার পেছনে কারা!'

'হরিণ!' আনন্দে চিৎকার করে উঠল উজ্জু, 'আমার আলা-ইজা কই?'

'ওই দ্যাখো, গাছের ফাঁক-ফাঁকে সে আসছে?'

'ওই-ই আমার আলা-ইজা? ওর সঙ্গে কে?' জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

'বনদেবী।'

'একটু আগে তাকে তো আমি দেখেছি সবুজ পোশাকে।'

'হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছ। তারও আগে তুমি বনদেবীকে দেখেছ, এক বৃদ্ধার বেশে। মনে আছে পর্ণকুটিরে এক রাতে, এক বৃদ্ধা তোমায় আশ্রয় দিয়েছিল? সে এই বনদেবী। তখন ছিল তার কাঠকুড়ানি বৃদ্ধার ছদ্মবেশ। এখন সে বনদেবী। দ্যাখো উজ্জু, তোমার আলা-ইজাকে বনদেবী কেমন আদর করে তোমার কাছে নিয়ে আসছে?'

আচমকা আনন্দে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল উজ্জু, 'আ-লা-ই-জা! আ-লা-ই-জা!'

সঙ্গে-সঙ্গে একটি হরিণ-শিশু খুশিতে উদবেল হয়ে বনদেবীর মুখের দিকে তাকাল। যেমন মায়ের মুখের দিকে খুশি হয়ে তাকায় একটি শিশু। বনদেবী হাসল। আলা-ইজার গালের ওপর নিজের হাত রেখে আদর করল। তারপর দেখা গেল, সেই হরিণ-শিশু দুরন্ত পায়ে লাফ দিল। তিরবেগে সে ছুট দিল। ছুটে এল উজ্জুর সামনে।

উজ্জু তার দু-হাত বাড়িয়ে বসে পড়ল মাটিতে। জড়িয়ে ধরল তার গলাটি। হরিণ-শিশু কখনও লাফায়। কখনও নাচে। কখনও লুটিয়ে পড়ে উজ্জুর কোলে। কিন্তু কথা বলতে পারে না।

উজ্জুর দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। হরিণও যেমন কথা বলতে পারে না, উজ্জুও পারে না তেমনই। শুধু অস্ফুটস্বরে উজ্জু ডাকে, 'আলা-ইজা আমার, আলা-ইজা, আমি তোর উজ্জু। আমার বুকখানি জড়িয়ে তুই যেমন আমায় আদর করতিস, তেমন করে একবার আদর কর! যেমন করে গান গাইতিস, তেমন করে একটি গান শোনা!'

মৃত্যুদূত উজ্জুর হাত ধরে টান দিল। কানে-কানে বলল, 'তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে উজ্জু!'

'ওগো মৃত্যুদূত, আর-একটু সময় দাও আমায়! আমার ছোট্ট বন্ধুর কপালে আমায় শেষবারের মতো একটি চুমো খেতে দাও!'

মৃত্যুদূত বলল, 'তোমার শেষ ইচ্ছাটিতেও আমি সায় দিলাম উজ্জু। আর দেরি নয়।'

উজ্জু এবার তার বুকের সমস্ত স্নেহ উজাড় করে জড়িয়ে ধরল আলা-ইজাকে। তার কপালে শেষবারের মতো একটি চুমো দিল। তারপর?

সঙ্গে-সঙ্গে ভোরের আকাশ আলোয় উছলে উঠল। সমস্ত গাছের পাতায় নূপুর বেজে উঠল। অসংখ্য পাখির গানে ভরে গেল বন। অগুনতি হরিণের দল নেচে উঠল আনন্দে। দেখা গেল সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট মেয়ে, একা। এতক্ষণ সে ছিল একটি হরিণ-শিশু। উজ্জুর স্নেহের চুমোটি তার কপাল স্পর্শ করার সঙ্গে-সঙ্গে সে আবার একটি ছোট্ট মেয়ে হয়ে গেল। সে এক রাজার মেয়ে। তার নাম আলা-ইজা।

নিজেকে বিশ্বাস করতে পারে না আলা-ইজা। সে কি তবে সত্যিই এখন মানুষ! সে চিৎকার করে ওঠে। চিৎকার করে ডাক দেয়, 'উজ্জু-উ-উ! বনদেবী—'

কেউ সাড়া দিল না। অবাক কাণ্ড!

তাদের বারবার ডাক দিল আলা-ইজা। বারবার হাঁক দিল, 'উজ্জু-উ-উ! বনদেবী!' কেউ নেই। সাড়া নেই কারও। এখন সে একা। ভীষণ একা। একলাটি দাঁড়িয়ে আছে এই বনের কিনারে।

কেঁদে ফেলল আলা-ইজা। দু-হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। তবু কান্না তার থামল না। তার ছোট্ট হাতের ছোট্ট আঙুলের ফাঁক দিয়ে আলা-ইজার কান্নার শব্দগুলি জল হয়ে গড়িয়ে পড়ল। টুপটাপ। মাটিতে। এখন এখানে একা সে কী করবে! এখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই কি কাঁদবে শুধু।

না, তার কান্না শুনে ছুটে এল বনের অসংখ্য হরিণ। আদরে-স্নেহে তার মনটি ভরিয়ে তুলল। তুলবেই তো! তারই জন্যে না একটি হরিণ-শিশুর প্রাণ বেঁচেছে! অনেক বিপদ তুচ্ছ করে, আলা-ইজা যদি তার সেই ছোট্ট বন্ধু হরিণটিকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে না দিত, তবে কবেই তো শেষ হয়ে যেত তার প্রাণ। ওই দ্যাখো, সেই ছোট্ট হরিণের মা কেমন এগিয়ে এল আলা-ইজার কাছে। উবু হয়ে বসে পড়ল আলা-ইজার পাশে। যেন বলতে চাইল, 'আলা-ইজা, তুমি আমার পিঠে বসে পড়ো। তোমার মায়ের কাছে আমি তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসি।'

কী বুঝল আলা-ইজা, কে জানে। সত্যি-সত্যিই সে হরিণ-মায়ের পিঠের ওপর বসল। হরিণ-মা আলা-ইজাকে পিঠে নিয়ে পাড়ি দিল সেই রাজ্যে, যেখানে তার মা আছেন, যিনি এক রানি। যেখানে তার বাবা আছেন, যিনি এক রাজা। আর আছে রাজপ্রাসাদ। রাজসিংহাসন। অনেক ধনদৌলত। আর আছে অনেক মানুষ।

সমস্ত বন উজাড় করে হরিণের দল আলা-ইজার সঙ্গী হল। তারা পৌঁছে গেল রাজপ্রাসাদে। ছুটে এলেন রাজা। ছুটে এলেন রানি। ছুটে এল মানুষ আর মানুষ। গোনা যায় না। রানি হরিণ-মায়ের পিঠ থেকে আলা-ইজাকে তুলে নিলেন নিজের কোলে। আলা-ইজা তারপর মায়ের গলা জড়িয়ে কেঁদে ফেলল। মা-ও কাঁদলেন মেয়েকে ফিরে পেয়ে। কাঁদল হয়তো হরিণের দলও। কেননা, তারাও স্থির হয়ে গেল মা আর মেয়ের কান্না দেখে।

সেইদিন থেকে রাজার হুকুমে কেউ আর হরিণের প্রাণ নেয় না। সে-দেশের মানুষ গান গায়, হরিণের জন্য ভালোবাসার গান। আলা-ইজা হরিণের সঙ্গে খেলা করে, যখন খুশি, তখন। আর যখন রাতের বেলা মায়ের কোলের কাছে শুয়ে-শুয়ে ঘুমপাড়ানি গান শোনে, তখন উজ্জুর জন্য মনটা তার কেমন যেন কেঁদে ওঠে। আলা-ইজা আজও জানে না, উজ্জু আর ফিরবে না। সে চলে গেছে অনেক দূরে। আর-এক দেশে। সে-দেশের নাম স্বর্গ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%